Tag: শিশুতোষ গল্প

  • ঢাকের বাদ্যি

    ঢাকের বাদ্যি

    আমাদের ক্লাবের দুর্গাপুজোর প্যান্ডেলে প্রতিবারই যে লোকটা ঢাক বাজাতে আসত তার নাম নটুরাম নট্ট। বড়রা নটু বলে ডাকত। আমরা বলতুম নটুদা। নটুদা প্রথম কবে আমাদের ক্লাবে ঢাক বাজাতে এসেছিল আমাদের তা মনে নেই। সত্যি কথা বলতে কী সেকথা কেউই জানে না। সবাই শুধু জানে যে আমাদের পুজোতে নটুদাই ঢাক বাজাবে।

    নাটুদাকে কিছু বলতে হয় না। ষষ্ঠী পুজোর দিন সেই কাকভোরে সে চলে আসত। আমরা বাড়ি থেকেই শুনতে পেতাম ঢাক বাজাচ্ছে।

    কাইনাড়া কাইনাড়া গিজগিনতা গিজগিনতা।

    ব্যস, আমরা ধড়মড় করে বিছানা ছেড়ে উঠে পড়তাম। হুররে। পুজো এসে গেছে! যেন নটুদাই এসে ঠিক ভোরবেলা আমাদের জানিয়ে দিত, দুর্গাপুজো শুরু হয়ে গেছে! তাই নটুদা ছাড়া আমরা পুজোর কথা ভাবতেই পারতাম না।

    কিন্তু নটুদার একটা বিচ্ছিরি স্বভাব ছিল। প্রতিবারই সে নিজের গ্রামে ফিরে যাওয়ার সময় আমাদের এখানে কিছু না কিছু ফেলে যেত। এই যেমন গামছাটা, জামাটা, ঢাক পেটাবার কাঠি দুটো। কখনও আবার যে টাকাটা ওকে দেওয়া হত সে টাকাটাই হয়তো পড়ে থাকতো। একেক বছর একেকটা জিনিস। আমরা ক্লাবের ছেলেরা জানতাম, নটুদা কিছু না কিছু ফেলে যাবেই। দশমীর দিন গঙ্গায় প্রতিমা বিসর্জন দিয়ে এসে আমরা নটুদার ফেলে রাখা জিনিস যত্ন করে ক্লাবঘরে তুলে রাখতাম। আবার পরের বছর পুজোর সময় নটুদার হাতে তুলে দিতাম। এরকমই চলছিল। নটুদাকে যখন বলতাম, তখন সে হাসতে হাসতে বলত, ‘ওটা তো তোমাদের জন্য রেখে গিয়েছিলাম’।

    বছরের পর বছর এরকম চলতে লাগল। আমরা বড় হয়ে গেলাম। বড়রা আরও বড় হয়ে গেল। অনেকে দূরে দূরে চলে গেল। তবে আমাদের ক্লাবের পুজোটাও রইল, আর রইল ঢাকী নটুদা। অনেক কিছু বদলালো কিন্তু নটুদার জিনিস ফেলে দেওয়ার স্বভাব বদলালো না। একবছর তো ঢাকটাই নটুদা নিয়ে যেতে ভুলে গিয়েছিল। আমরা ওকে জিগ্যেস করেছিলাম, কি নটুদা ঢাকটাও কি আমাদের জন্য রেখে গিয়েছিলে’?

    গত দু’বছর হল নটুদা আর আমাদের ক্লাবের পুজোতে আসছে না। শুনেছি, নটুরাম নট্ট নাকি মারা গেছে। সে আর আশ্চর্যের কথা কী? বয়স তো হয়েছিল। আমরা খবরটা শুনে দুঃখ পেয়েছিলাম। তবে নটুদার একটা রাখা জিনিস এখনও আমাদের পুজো প্যান্ডেলে রয়ে গেছে। কী সেটা? ঢাকের বাজনাটা। ওটা নটুদা সত্যি আমাদের জন্য রেখে গেল।

  • এরোপ্লেন

    এরোপ্লেন

    ক্লাস এইটের পটল প্রামাণিক এবার পুজোর ছুটিতে দিল্লি বেড়াতে গিয়েছিল।

    সেটা আসল কথা নয়, আসল কথা হল, সে গিয়েছিল এরোপ্লেনে চেপে। বেড়াতে যাওয়ার থেকে এরোপ্লেনে চাপাই পটলের কাছে অনেক বড় ব্যাপার। আর সত্যি কথা বলতে কি আমাদের এই পবনপুর উচ্চবিদ্যালয়ে কেউ কখনও এরোপ্লেনে চেপেছে এমনটা শোনা যায়নি। পটল সেই সুযোগ ছাড়ে?

    কিন্তু ব্যাপারটা একটু অন্য দিকে মোড় নিল। এরোপ্লেনে একবার চেপেই পটলের যেন সত্যি সত্যি পা মাটিতে পড়ছে না। সে বাড়াবাড়ি শুরু করল। পুজোর ছুটি একমাস বাদে ফুরলো। আমরা সবাই হইহই করে স্কুলে এলাম। পটলও এল। স্কুলে ঢোকার পর থেকে সে এমন একটা ভান করতে লাগল যেন এইমাত্র এরোপ্লেন থেকে নেমেছে। বাচ্চু গিয়ে জিগ্যেস করল, “কী রে পটল কেমন বেড়ালি?” পটল আড়মোড়া ভাঙতে ভাঙতে বলল, ‘দাঁড়া, দাঁড়া হাত-পাগুলো একটু ছাড়িয়ে নেই। অতক্ষণ এরোপ্লেনে থাকলে হাতে পায়ে সব খিল ধরে যায়।” বাচ্চু তো অবাক। সে বলল, “সে কি রে! তুই তো পনেরো দিন হল ফিরেছিস। এখনও হাত পা ছাড়েনি?” পটল খেঁকিয়ে উঠল, “মেলা বকিস না তো। এরোপ্লেনে চড়িসনি তো কখনও। তুই পা খিল ধরার কী বুঝবি?”

    বাচ্চু এতে যথেষ্ট অপমানিত হয় এবং চলে আসে। অপমানিত হওয়ার যথেষ্ট কারণও আছে। অনেকক্ষণ একটানা বসে থাকবার পর বাচ্চুরও অনেকবার হাত পায়ে খিল ধরেছে। হতে পারে সে খিল হয় এরোপ্লেনের নয়, তবু খিল তো।

    বাচ্চু গজ গজ করতে করতে এসে পিন্টুকে বলল, পটলার বড্ড বাড় বেড়েছে।”

    এর কয়েকদিন বাদেই পটলদের ক্লাসের ফার্স্ট বয় সুশান্তর জন্মদিন ছিল। সে একবাক্স টফি নিয়ে এসে সবাইকে দিচ্ছিল। প্রত্যেকেই হাসিমুখে সেই টফি খেয়ে টফি এবং সুশান্তর ভূয়সী প্রশংসা করছিল। শুধু পটল টফিটা মুখে দিয়ে এমন একটা মুখ করল যেন সে উচ্ছে সেদ্ধ খাচ্ছে। সুশাস্ত ব্যতিব্যস্ত হল, “কী হল পটল?” পটল মুখটা আরও বিকৃত করল, “না হয়নি কিছু। আসলে এরোপ্লেনের চমৎকার টফি খাওয়ার পর, এসব আর মুখে রোচে না।”

    সুশান্তর কান লাল হয়ে গেল। একদিন টিফিনের সময় হঠাৎ দেখা গেল পটল দুকানে তুলো গুঁজে বসে আছে। অনুপম সরল মনে গিয়ে বলল, “কী ব্যাপার, কানে ব্যথা হয়েছে নাকি? তুলো গুঁজেছিস কেন?” গম্ভীর মুখে পটল বলল, “বোকার মত কথা বলিস না তো। এরোপ্লেনে চড়বার অভিজ্ঞতা থাকলে এমন কথা বলতিস না। শব্দ আটকাতে এরোপ্লেনের ভেতর আমরা কানে তুলো দিয়ে বসে থাকতাম। টিফিনের সময় এখানে এত হট্টগোল হয় যে ঠিক করেছি এখন থেকে এখানেও কানে তুলো দেব। এরোপ্লেনের শব্দ তাও সহ্য হয়। তোদের চিৎকার চেঁচামেচি তো একেবারে জংলির মত।”

    অনুপমের মাথাটা রাগে গরম হয়ে যায়। এইসব পর্যন্ত তাও চলছিল। বন্ধুদের সঙ্গে এসব কথাবার্তায় পটলের কোন বিপদ ছিল না। কিন্তু হায়রে! পটল যে আরও বাড়ল!

    ইংরেজিতে পটল বরাবরই দুর্বল। কিন্তু সম্প্রতি এরোপ্লেনে ভ্রমণের পর সম্ভবত সে সেকথা ভুলতে বসেছে। নিজের মধ্যে সে একটা ‘ইংরিজি ইংরিজি’ ভাব আনতে চেষ্টা করছে। যেমন মাঝে মধ্যেই সে কারণে অকারণে ‘নো থ্যাঙ্কস’ বা ‘ওকে ফাইন’ এর মত দুএকটা কথা বলছে। কেলেঙ্কারিটা হল সেদিন ফোর্থ পিরিয়ডে। মানে ইংরিজি ক্লাসে।

    নিকুঞ্জবাবু এসে বললেন, ‘সবাই দশ লাইনে পুজোর অভিজ্ঞতা লিখে দেখা দিখিনি।’

    আশ্চৰ্য; সবার আগে খাতা জমা পড়ল পটল প্রামাণিকের! এই প্রথম। শুধু তাই নয়, সেই খাতার ওপর চোখ বুলিয়ে নিকুঞ্জবাবু চেয়ার থেকে লাফিয়ে উঠলেন। হুঙ্কার দিয়ে বললেন, ‘সবাই শোন, পটল লিখেছে, চেক ইন। টেক অফ। ককপিট। এয়ার হস্টেস। রান ওয়ে। ল্যান্ডিং। লাগেজ। ব্যস। রচনার নাম দিয়েছে এরোপ্লেন। আর ‘চেক ইন’-এর ইন’ ছাড়া সব বানান ভুল। ‘হুম’, বলে বসে পড়লেন নিকুঞ্জবাবু। রাগ তার চোখে নাকে। ‘এদিকে আয় পটল।’ পটল হাসি হাসি মুখে উঠে গেল।

    এরপর পটলের খাতায় নিকুঞ্জবাবু বড় বড় করে লিখে দিলেন, ‘এ ই আর ও পি এল এ এন ই’। বললেন, ‘যা এক হাজার বার লিখে নিয়ে আয়।’

    এই ঘটনার পর পটল আমাদের কুতুবমিনার, লালকেল্লা নিয়ে অনেক গল্প বলেছে, কিন্তু এরোপ্লেন নিয়ে কখনও একটা শব্দও উচ্চারণ করেনি।

  • ডাকনাম

    ডাকনাম

    সাতদিনে পাঁচটা ঘটনা। তিনটে মারাত্মক, দুটো ভয়াবহ। এরপরই হেডস্যার নোটিশ দিলেন। নতুন নিয়মের নোটিশ। আমাদের স্কুলের নোটিশ বোর্ডে একটা মুশকিল আছে। বোর্ডটা একটা বাক্সের মতো। সামনে কাঁচের ঢাকনা। বোর্ডে নোটিশ লাগিয়ে সেই ঢাকনা আটকে দিতে হয়। তারপর টিপ তালা সিস্টেম। মাস তিনেক হল ঢাকনার কাঁচের নিচে লম্বা একটা দাগ পড়েছে। আঁচড়ের মতো দাগ। পিওন দিবাকরদা অনেক ঘষেও সেই দাগ তুলতে পারেনি। ফলে নোটিশের কোনও কোনও লেখা অনেক সময় সেই দাগের আড়ালে পড়ে যায়। আর তখনই মুশকিলটা হয়। আড়ালের লেখা পড়া যায় না। কোন লেখাটা দাগের আড়ালে পড়বে আগে থেকে বোঝা কঠিন। বড় বড় পিন দিয়ে নোটিশ আটকে, কাঁচের দরজা বন্ধ করার পর বোঝা যায়। যেমন হেডস্যারের এই নোটিশে ঢাকা পড়েছে শেষ লাইনটা। বেশিরভাগ সময়ই শেষ লাইনে গুরুত্বপূর্ণ কথা থাকে না। এবারে কিন্তু আছে। নতুন নিয়ম লেখার পর, শেষ লাইনে হেডস্যার লিখেছেন, নিয়ম না মানলে কী শাস্তি হবে। আমরা, স্কুলের ছেলেরা, নিয়ম জানলাম, নিয়ম ভাঙার শাস্তি জানতে পারলাম না।

    সে যাই হোক, হঠাৎ করে স্কুলে একটা নতুন নিয়ম কোন চালু করতে হল? সবকটা ঘটনা না বলে শুধু মারাত্মক তিনটে বললেই এর কারণ বোঝা যাবে।

    প্ৰথম ঘটনা অপলককে নিয়ে। অপলক বিশ্বাস।

    ক্লাস এইটের এই ছেলে শুধু নামে সুন্দর নয়, স্বভাবেও সুন্দর। সুন্দর আর শান্ত। নামের সঙ্গে মিলিয়ে চোখদুটো বড় বড়, চুল কোঁকড়ানো। মারপিট দুরের কথা, কারও সঙ্গে তার ঝগড়া পর্যন্ত নেই। যদি বা ছোটখাটো রাগারাগি হয়, নিজেই মিটিয়ে ফেলে। যার সঙ্গে গোলমাল, টিফিনের সময় তার কাঁধেই হাত দিয়ে ঘুরে বেড়ায়। ছুটির পর পোটাটো চিপস কিনে বলে, “এই নে, তুই আগে প্যাকেট খোল।”

    সোমবার সেই ছেলেই মারাত্মক একটা কাণ্ড করে বসল!

    থার্ড আর ফোর্থ পিরিয়ডের মাঝখানের সময়ে পিছনে বসা তূর্যকে লক্ষ্য করে ঘুসি ছুঁড়ল। একটা ঘুষি নয়, পরপর তিনটে ঘুষি! তবে একটাও তূর্যর গায়ে লাগেনি। লাগার কথাও নয়। অপলক ভূগোল, অঙ্ক, ইংরেজিতে যেমন পাকা, কিল চড় ঘুষিতে ঠিক ততটাই কাঁচা। ফলে ঘুষিগুলো খুব সহজে লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে এদিক ওদিক হাওয়ায় ছড়িয়ে পড়ে। তবে গায়ে না লাগলেও অপলকের এই রণমূর্তি দেখে তূর্যর মুখ গেল শুকিয়ে। অপলকের সম্পর্কে অনেক কিছু ভাবা যায়, ঘুষি ভাবা যায় না। শুধু তূৰ্য নয়, গোটা ক্লাস হতবাক।

    আমাদের স্কুলে যে কোনও খবরই খুব সহজে ছড়িয়ে পড়ে। প্ৰথমে করিডোর, বাথরুম এবং লাইব্রেরিতে ছাত্রদের মধ্যে কানাকানি হয়। তারপর সেই খবর একতলা, দোতলা, তিনতলা টপকে, অফিস হয়ে, টিচার্স রুম ছুঁয়ে একেবারে হেডস্যারের ঘরে গিয়ে পৌছোয়। সমস্যা একটাই। এতটা পথ পেরোতে গিয়ে ‘সত্যি খবর’ এর গায়ে অনেক ‘মিথ্যে খবর’ও লেগে যায়। এবারও তাই হল। টিফিনের আগেই গোটা স্কুল ঘুষির খবর জেনে ফেলল। শেষপর্যন্ত হেডস্যারের ঘরে খবর যখন পৌঁছোল তখন সেই খবরের অবস্থা ভয়ংকর!

    দিবাকর প্রায় ছুটতে ছুটতে হেডস্যারের ঘরে ঢুকল। সে হাঁপাচ্ছে। উত্তেজনায় গলা কাঁপছে তার।

    “স্যার, কেলেঙ্কারি কাণ্ড। ভয়ংকর ব্যাপার। অপলক মেরেছে।”

    “মেরেছে! কাকে মেরেছে?”

    হেডস্যার তখন মন দিয়ে স্যারেদের রুটিন তৈরি করছিলেন। রুটিন তৈরি একটা জটিল কাজ। এই কাজে যোগ, বিয়োগ, গুণ, ভাগ সবরকম অঙ্ক লাগে। টেবিল জুড়ে একটা সাদা কাগজ পাতা। এত বড় কাগজ পাওয়া যায় না। বেশ কয়েকটা কাগজ আঠা দিয়ে জুড়ে জুড়ে তৈরি করতে হয়েছে। দিবাকরদাই তৈরি করে দিয়েছে। হেডস্যার একটা স্কেল দিয়ে সেই কাগজে রুল টানছেন। কাগজ বড় হওয়ার কারণে একেবারে রুল শেষ হচ্ছে না। টেবিলের চারপাশে ঘুরে ঘুরে টানতে হচ্ছে। তিনি ঘোরা বন্ধ করে মুখ তুলে দিবাকরের দিকে তাকালেন। দিবাকরদা বলল, “স্যার অপলক মেরেছে তূর্যকে। তূর্য ঠিক ওর পিছনেই বসে।”

    হেডস্যার ভুরু কেঁচকালেন। বললেন, “তুমি কোন অপলকের কথা বলছে। ক্লাস এইটের অপলক?”

    “হ্যাঁ, স্যার। স্কুলে তো ওই একটিই অপলক। অমন ভাল নাম আর কটা আছে?”

    হেডস্যার একটু হাসলেন। বললেন, “তুমি নিশ্চয় ভুল করছো দিবাকর। শুধু নাম নয়, ওই অপলক নিজেও অতি চমৎকার ছেলে। তুমি বোধহয় জানো না এবছর সে গুড কন্ডাক্টের জন্য প্রাইজ পাচ্ছে। তার জন্য দুটো বই পর্যন্ত কিনে রাখা হয়েছে। রবীন্দ্রনাথের শিশু এবং মার্ক টয়েনের হাকলবেরি ফিন।”

    দিবাকর জোর গলায় বলল, “স্যার, খবর পেলাম অপলকের ঘুষিতে তূর্যর নাক ফেটেছে। রক্তপাত হচ্ছে। রক্ত দেখে ইতিমধ্যে ক্লাসের আর দুটি ছেলে জ্ঞান পর্যন্ত হারিয়েছে স্যার।”

    এরপর আর দেরি করা যায় না। হাতে স্কেল নিয়েই তিনতলায় দৌড়োলেন হেডস্যার। চাপা না দেওয়ার কারণে স্যারেদের রুটিন পাখার হাওয়ায় ঘরময় উড়তে লাগল মহানন্দে।

    দ্বিতীয় মারাত্মক ঘটনা একটু অন্যরকম। তাতে ঝগড়া বা মারপিট নেই। ফুটবল আছে।

    সেদিন ছিল ক্লাস সেভেন আর এইটের ফুটবল ম্যাচ। এমনি ম্যাচ নয়, প্রেস্টিজ ম্যাচ। এর আগে দুটো ম্যাচেই হার হয়েছে সেভেনের। এটাতে জিততেই হবে। গেম টিচার ক্লাস সেভেনের জন্য নতুন গোলকিপার ঠিক করছেন। ঋষভ। ঋষভকে নেওয়ার পরামর্শটা প্রান্তিকের। প্রান্তিক সেভেনের ফুটবল টিমের ক্যাপটেন। ঋষভ শুধু প্রান্তিকের ক্লাসের বন্ধু নয়, পাড়ারও বন্ধু। পাশাপাশি বাড়ি। পাড়ার মাঠে এক সঙ্গে খেলাধুলোও হয়। গেম টিচার ক্যাপটেনের কথায় রাজি হয়ে গেলেন। রাজি হয়ে ঠিকই করেছেন। নতুন গোলকিপারের পারফরমেনস হাফ টাইম পর্যন্ত দুৰ্দান্ত। তিনটে অবধারিত গোল বাঁচিয়ে দিল। সেভেন এক গোলে এগিয়ে। জিতব জিতব করছে। গোটা টিম উত্তেজনায় ফুটছে টগবগ করে। আর এমন সময়ই মারাত্মক ঘটনা!

    খেলা শেষের বাঁশি বাজার মিনিট দুয়েক আগে সেভেন একটা গোল খেয়ে বসল। তুখোড় গোলকিপার ঋষভ লাফিয়ে ঝাঁপিয়েও বল আটকাতে পারেনি। পারবে কী করে? গোল যে সেমসাইড। বল এসেছে নিজের দলেরই খেলোয়াড়ের পা থেকে। সেই খেলোয়াড়ের নাম প্রান্তিক। দলের ক্যাপটেন। ক্লাসের সহপাঠী। পাড়ার বন্ধু!

    ম্যাচ শেষ হওয়া মাত্র কাদামাখা অবস্থাতেই ঋষভ ছুটল গেম টিচারের কাছে। নালিশ জানাতে। গেম টিচার প্রান্তিককেও ডেকে পাঠালেন। বিচার তো আর এক তরফা হয় না। তবে বিচার কিছু করা গেল না। দু’পক্ষের কথা শুনে গেম টিচার গম্ভীর হয়ে গেলেন।

    তিন নম্বর মারাত্মক ঘটনা মারাত্মকের থেকেও বেশি। ডবল মারাত্মক।

    অন্যদুটো তো তাও স্কুলের মধ্যে আটকে ছিল। এই ঘটনা স্কুলের গণ্ডি টপকে গেল। টপকে চলে গেল বাড়ি পর্যন্ত। আর যাবে নাই বা কেন? এতদিন ছিল দুজনে দুজনে। এবার হল সিঞ্জন বনাম গোটা ক্লাস টেন। দুদিন সহ্য করার পর সিঞ্জন সেদিন পেট ব্যথা বলে স্কুল থেকে হাফ ছুটি নিয়ে বাড়ি চলে গেল। পরদিন ফিরে এল বটে, তবে একা নয়, বাবা, মা দুজনকেই সঙ্গে নিয়ে এল। তিনজনেরই মুখ থমথমে। কোনদিকে না তাকিয়ে তারা সোজা ক্লাস টিচারের সঙ্গে দেখা করল।

    এরপরই নোটিশ বোর্ডে নিষেধের নোটিশ পড়ল—এখন থেকে স্কুলে ডাকনাম নিষিদ্ধ!

    এই নোটিশ ছাড়া কোনও উপায় ছিল না। কারণ ভয়ংকর সবকটা ঘটনার পিছনের কারণ একটাই। ডাকনাম।

    শান্তশিষ্ট অপলক। সেদিন অশান্ত হয়েছিল এই ডাকনামের জন্যই। সুন্দর নামের এই ছেলেকে বাড়িতে নাকি সবাই ডাকে ‘পেঁপে’ বলে। এই নামের পিছনে ইতিহাসও আছে। ছেলেবেলায় কেউ সন্দেশ, রসগোল্লার ভক্ত হয়, কারও নজর থাকে চকোলেট, ক্যাডবেরিতে। কেউ পছন্দ করে কেক, পেস্ট্রি, পিৎসা। ফুচকা, বাদাম, চিপসের জন্য পাগল তো সকলে। কিন্তু কোনও রহস্যময় কারণে অপলক ছেলেবেলায় ছিল পেঁপের ভক্ত। এমনি ভক্ত নয় বাড়াবাড়ি রকমের ভক্ত। পেঁপের ডালনা থেকে পাকা পেঁপে কিছুই খেতে বাদ দিত না। সেই থেকে বাড়িতে সবাই তাকে ‘পেঁপে’ বলে ডাকতে শুরু করে। একটু বড় হতেই অপলক বুঝতে পারে, এই নাম আগে ঝেড়ে ফেলতে হবে। সে পেঁপে ত্যাগ করল। কিন্তু নাম ত্যাগ করতে পারল না। ডাকনামের এই সমস্যা। ভাল নাম তাও বদলানো যায়। কিন্তু ডাকনাম বদলানো যায় না। মেনে নিতে হয়। অপলকও মেনে নিল। তবে একটা কাজ করল। নামটাকে গোপন করে রাখল। কিছুতেই বাড়ির চার দেয়ালের বাইরে বেরোতে দিল না।

    আর সেটাই সেদিন ফাঁস করেছে তূর্য কোনভাবে সে অপলকের এই ‘অতি চমৎকার’ ডাকনামটি জানতে পারে এবং পিছনে বসে ফিসফিস করে ডাকতে থাকে।

    “পেঁপে, অ্যাই পেঁপে। কী শুনতে পাচ্ছিস না? এবার দেখবি মজা? পেঁপে বলে ক্লাসের মধ্যে চেঁচাব নাকি?”

    এরপরেও কী অপলক ঘুষি ছুঁড়বে না? ফুটবল ম্যাচে সেমসাইডের ঘটনার পিছনেও সেই ডাকনাম। প্ৰান্তিকের ডাকনাম। এমন মনকাড়া নামের একটা ছেলের ডাকনাম যে কেন ‘গোল’ হয়েছিল কে বলতে পারে? প্ৰান্তিক মোটেও গোলগাল দেখতে নয়। ড্রইং ক্লাসে যে ভাল সার্কেল আঁকে তাও নয়। তবে? তবে আর কী। ডাকনাম যে কোনটা হবে কে বলতে পারে। বেচারি প্রান্তিকের কপালেও তাই ঘটেছে। আর সেটাই গোলমাল পাকালো ম্যাচের সময়।

    মুহূর্তটা ছিল চরম টেনশনের। হঠাৎ একটা ঝটিকা দিয়ে ক্লাস এইটের সৌর্য বল নিয়ে ক্লাস সেভেনের গোল পোস্টে পৌঁছে যায়। গোল কী হবে? গোটা মাঠ তাকিয়ে আছে। প্রান্তিক ছুটে আসে। লাফিয়ে বল কেড়ে নেয় সৌর্যর পা থেকে। ছোট দুটো ট্যাকেলে টপকে যায় এইটের অধিরাজ আর স্পন্দনকে। হাততালি আর চিৎকারে ফেটে পড়ে মাঠের পাশে দাঁড়ানো ছেলেরা। প্রান্তিক এগিয়ে আসে নিজেদের গোলপোস্টের দিকে। গোলপোস্টে দাঁড়ানো ঋষভ হাত পেতে চিৎকার করে ওঠে—

    “গোল দে। গোল দে। তাড়াতাড়ি দে। দেরি করিস না। গোল, গোল….”

    আর এখানেই হয় ভুল। যে ভুল হওয়ার নয়। যে ভুল কখনও হয় না। চরম উত্তেজনায় সেই ভুলটাই করে বসে প্রাত্তিক। ‘গোল” যে তার ডাকনাম এটাই ভুলে গেল সেই মুহূর্তের জন্য! পাড়ার বন্ধু ঋষভ তাকে সেই নামে ডেকে নিজের হাতে বল চাইছে সেইটাই মাথা থেকে উবে যায় যেন! অবধারিত গোল বাঁচানোর আনন্দে সব গোলমাল হয়ে যায়। প্ৰান্তিক শরীরের সব শক্তি দিয়ে বলে শট মারে। ওস্তাদ গোলকিপার ঋষভকে খুব সহজেই পরাস্ত করে নিজেদের গোলে বল ঢুকে যায় হাসতে হাসতে। বন্ধুর ‘গোল দে’ শুনে সে ‘গোল দিয়ে’ বসে!

    তারপর? তারপর আর কী? দুজনেই নালিশ জানাতে ছোটে গেম টিচারের কাছে।

    পেঁপে, গোল তাও মেনে নেওয়া যায়, কিন্তু ‘চুপ’? ‘চুপ’ কখনও কারও ডাকনাম হতে পারে? হলে যা ঘটতে পারে সেটাই ঘটল ক্লাস টেনের সিঞ্চনের। আর সেটাই তিন নম্বর মারাত্মক ঘটনা।

    সিঞ্চন তার ‘সিঞ্চন’ নাম নিয়ে খুবই গর্বিত। কেনই বা হবে না? সত্যি তো এমন সুন্দর নাম হয় কজনের? সে ‘চুপ’ এর কথা ঘূণাক্ষরেও বলে না কাউকে। অপলকের মতোই ডাকনাম লুকিয়ে রেখেছে। কিন্তু সেদিন হল দুর্ঘটনা। সেই দুর্ঘটনা নিজেই ঘটাল সিঞ্চন। এটাও অনেকটা ফুটবল ম্যাচের সেমসাইডের মতো।

    সোমবার অঙ্কের স্যার ভূপতিবাবু বোর্ডে অঙ্ক কসছিলেন। ক্লাসে চলছিল চাপা গুঞ্জন। স্যার পিছনে ফিরে ধমক দিলেন–

    ‘চুপ!’

    সিঞ্চন ছিল অন্যমনস্ক। নিজের ‘নাম’ শুনে উঠে দাঁড়িয়ে বলল “কী স্যার?”

    “কী স্যার মানে?” ভূপতি স্যারের ভুরু গেল কুঁচকে। বললেন, “তুমি উঠে দাঁড়িয়েছে কেন সিঞ্চন?”

    “ওই যে আমায় ডাকলেন।”

    “ডাকলাম মানে। ফাজলামি হচ্ছে ছেলে? চুপ তোমার নাম নাকি?”

    নার্ভাস সিঞ্চন নিজেকে সামলাতে পারল না। বলে ফেলল, “হাঁ, স্যার। চুপ আমার ডাকনাম। তবে বাড়ির নয়, শুধু মামাবাড়ির।”

    ব্যস। হাত থেকে তীর বেরিয়ে গেল। পরের কটা দিন ছেলেরা সিঞ্চনকে ‘চুপ’ নামে ডেকে ডেকে কান একেবারে ঝালাপালা করে দিল। তিনদিনের মাথায় অতিষ্ঠ সিঞ্চন “পেট ব্যথা’ বলে পালালো। ফিরল একেবারে বাবা-মাকে সঙ্গে নিয়ে নালিশ জানাতে।

    এরপরই বোর্ডে হেডস্যারের নোটিশ। তাতে তিনি যা লিখেছেন তার মোদ্দা কথা হল-আমাদের স্কুলে ছেলেদের নাম অতি চমৎকার। সেই নাম উচ্চারণে আনন্দ, শুনতে আরাম, বলতে গর্ব। সুতরাং সেইসব নাম বাদ দিয়ে বিচ্ছিরি ডাকনামে ডাকাডাকি আর চলবে না। এতে আইন শৃঙ্খলার অবনতি হচ্ছে। তাই এখন থেকে স্কুলের ভেতর ডাকনাম নিষিদ্ধ। যদি কেউ এই নিষেধ না মানে… (শেষ লাইন পড়া যাচ্ছে না। কাঁচের দাগে ঢাকা পড়েছে।

    কথাটা ভুল নয়। আমাদের স্কুলের ছেলেদের নাম সত্যি ভাল। অপলক, ঋষভ, সিঞ্চন, তুর্য, প্রান্তিক, সৌর্য, স্পন্দন। কী নেই? এসব বাদ দিয়ে পেঁপে, গোল, চুপ! ছিঃ। স্কুলের সব ছাত্রই হেডস্যারের নোটিশের সঙ্গে একমত। নিষেধাজ্ঞা জারি করে উনি ঠিক কাজই করেছেন।

    কিন্তু নোটিশ লাগানোর দুদিন পর থেকেই উল্টো কাণ্ড শুরু হয়ে গেল!

    নিষেধের একটা মজা আছে। যেটা নিষেধ করা হয় সেটাই যেন বেশি বেশি করে টানে। বিশেষ করে অল্প বয়সে তো বটেই। আমাদের স্কুলের ছেলেদেরও সেটাই হয়েছে। তারা মহা উৎসাহে ডাকনাম সংগ্রহে নেমে পড়েছে! সংগ্রহের কাজ চলছে খুব গোপনে। ক্লাসে ক্লাসে ডাকটিকিটের খাতার মতো ডাকনামের খাতা তৈরি হয়েছে। আশ্চর্যের কথা হল, অনেকে নিজে এসে সেই খাতায় নিজের ডাকনাম জমা করে যাচ্ছে! সেই সব খাতা অদল বদলও চলে। ক্লাস সিক্সের খাতা আসে সেভেনে। সেভেনের খাতা চলে যায় নাইনে। এতদিন যা লুকোনোর জন্য সবাই চেষ্টা করত, নিষেধের পর এখন সেটাই সবাইকে জানাতে চাইছে!

    বাপরে, ডাকনাম যে এতরকম হতে পারে কে জানত? আপেল, টুথপেস্ট, পাটিগণিত তো আছেই। এমনকি মাউস, ফ্লপি, সিডি, রিংটোন পর্যন্ত পাওয়া যাচ্ছে! ক্লাস সিক্সের সবথেকে হাসিখুশি শাকম্ভরের ডাকনাম যে ‘কাঁদুনে’ সেটা যদি সে নিজে এসে না বলত, কে বিশ্বাস করত? কে জানে হয়তো এই কারণেই ডাকনাম এত মজার। নোটিশের পর আরও কাণ্ড হয়েছে। ডাকনাম নিয়ে কেউ আর রাগারাগি করছে না! বরং বিচ্ছিরি নামটা হেডস্যারের নিষেধে সত্যি সত্যি মুছে না গিয়ে খাতায় লেখা হয়ে থাকছে তাতে তারা বেজায় খুশি।

    কেন এরকম হল কে জানে? ডাকনামের পিছন কি ভালবাসা বেশি থাকে?

    হেডস্যার জানলে শাস্তি যে মারাত্মক কোন সন্দেহ নেই। তবে শোনা যাচ্ছে, স্যারেরাও নাকি ডাকনাম সংগ্রহের ব্যবস্থা করেছেন! তবে সেটা খাতা নয়, ছোট্ট নোটবুক। টিচার রুমে সেই নোটবুক লুকোনো আছে। খবর ঠিক কিনা বলতে পারব না। স্যারেদের একথা জিগ্যেস করার সাহস কারও নেই।

  • প্রেয়ার

    প্রেয়ার

    আমাদের ক্লাস, অর্থাৎ ক্লাস সেভেনের ঘরটাই স্কুলের সব থেকে বড় ঘর। পবনপুর শ্ৰীমতী কালিদাসী স্মৃতি উচ্চবিদ্যালয়ে এত বড় ক্লাসঘর আর একটাও নেই। আমাদের স্কুল শুরু হয় বেলা এগারোটায়। শুরু হয় বলা ঠিক হবে না, বরং বলা ভাল প্রথম ঘণ্টা পড়ে। আমরা তখন যে যেখানে থাকি হুড়োহুড়ি করে ক্লাসঘরে চলে যাই। অন্যসব ক্লাসের ছেলেরাও তখন আমাদের ঘরে চলে আসে। ঘরের চারপাশে সবাই লাইন করে দাঁড়িয়ে পড়ে। এগারোটা বেজে পাঁচ মিনিটে দু নম্বর ঘণ্টাটা বাজে। ব্যস, সঙ্গে সঙ্গে আমাদের প্রেয়ার শুরু হয়ে যায়।

    আমাদের প্রেয়ার হল “বন্দেমাতরম সুজলাং সুফলাং…”। বেশি নয়। প্রথম প্যারাগ্রাফটুকু। এরকমই চলছিল। এমন সময় হঠাৎ একদিন কী জানি কী হল, আমাদের ইতিহাসের স্যার কুঞ্জবিহারী গাঙ্গুলি ঘোষণা করলেন, না। আর নয়। রোজ রোজ একই গান কেন? এবার থেকে ছেলেরা প্ৰেয়ারের সময় একেকদিন একেকটা গান গাইবে। কিন্তু মুশকিল হল, ছেলেরা তো গান জানে না। কুঞ্জবিহারী স্যার বললেন, ‘কই বাৎ নেহি। ডরো মৎ। আমি গান শেখাব। দু-একদিন রপ্ত করলেই সব ঠিক হয়ে যাবে। আসছে সোমবার থেকে শুরু হবে।’ আমাদের তো খুব উৎসাহ। বেশ নতুন একটা কিছু হবে।

    সোমবার আমরা সব তাড়াতাড়ি স্কুলে চলে এলাম। অনেকেই অবশ্য ভাল করে বুঝতে পারিনি ব্যাপারটা কী। ফাংশন টাংশন কিছু একটা হতে চলেছে ভেবে কেউ কেউ ইস্তিরি করা জামা-প্যান্ট পরে এল। হয়ত অনেকক্ষণ থাকতে হবে ভেবে কারও বাড়ি থেকে বেশি করে টিফিন দিয়ে দিল। সব থেকে ভয়ঙ্কর ঘটনা হল, ক্লাস নাইনের নেপু বগলদাবা করে বাঁয়া তবলা নিয়ে এসে হাজির হল হাসি হাসি মুখে। কুঞ্জবিহারী স্যার যথাসময়ে আমাদের ঘরে এলেন। পেছনে পেছনে অখিল বেয়ারা বয়ে নিয়ে এল একটা হারমোনিয়াম। টেবিলে হারমোনিয়াম, তবলা। একদিকে আমরা অন্যদিকে কুঞ্জবিহারী স্যার আর নেপু। ঘরে টুঁ শব্দ নেই। থম থম করছে। কী হয়, কী হয় ভাব। স্যার বললেন, “শোন আমি প্রথমে এক লাইন গাইব। শুনে শুনে তোমরা গাইবে।” একথা বলে তিনি হারমোনিয়াম টেনে টুনে দেখে নিলেন। নেপুর কানে কানে কী বললেন। নেপু খুব ঘাড় নাড়ল। এমন সময় দু-নম্বর ঘণ্টা বাজল।

    স্যার শুরু করলেন, “আমাদের যাত্রা হল শুরু, এখন ওগো কর্ণধার–।”

    বেজে উঠল হারমোনিয়াম। শুরু হল তবলার বোল। আমরা হতবাক। কোথায় গান? কোথায় হারমোনিয়াম? কোথায় তবলা? তিনটে যেন তিনদিকে ছুটছে! মনে হচ্ছে যেন একশো লোক মিলে ছাদ পেটাচ্ছে। ওরকম রোগা রোগা ইতিহাস স্যারের গলা যে এমন আশ্চর্য রকম হাঁড়ির মত হতে পারে কে ভেবেছিল? চোখ বুজে, আবেগ নিয়ে তিনি গেয়ে চলেছেন, “এখন বাতাস ছুটুক তুফান উঠুক, ফিরব না গো আর—।” তারপর হঠাৎ চোখ খুলে খেঁকিয়ে উঠলেন, “কিরে তোরা গা।’

    নেপুও টেরি নাড়িয়ে বলল, “হ্যাঁ, হ্যাঁ গা গা।”

    অগত্যা আর উপায় কী? আমরা প্রায় শ-দুয়েক ছেলে মিলে উচ্চৈস্বরে শুরু করলাম। দুশো জন মিলে ভুল সুরে, গলা ফাটিয়ে যদি “আমাদের যাত্রা হল শুরু-” গাইতে থাকে তাহলে যে কী ঘটতে পারে তা এক মিনিটের মধ্যে বোঝা গেল। গাইতে গাইতে শুনতে পেলাম হারমোনিয়াম আর তবলাকে ছাপিয়ে একটা গোঁ গোঁ শব্দ হচ্ছে। গান থামিয়ে সকলে তাকিয়ে দেখলাম আমাদের ক্লাসের মুকুন্দরাম ঘটকের মুখ দিয়ে গ্যাজলা বের হচ্ছে। আর সে মুখ দিয়ে গোঁ গোঁ আওয়াজ করছে। ওই দৃশ্য দেখে ক্লাস ফাইভের একটা ছেলে ‘ওরে বাবা রে, আমি আর গাইব না রে’ বলে কাঁদতে শুরু করল। হেডসার ছুটে এলেন।

    তারপর? তারপর আর কী। আমরা আবার প্ৰেয়ারের সময় ‘বন্দেমাতরম’ গাই। তবে মুকুন্দ নাকি এখনও রাতে ঘুমের ঘোরে মাঝে মাঝে গোঁ-গোঁ শব্দ করে!

  • টিফিন কমপিটিশন

    টিফিন কমপিটিশন

    আমাদের এই পবনপুর উচ্চবিদ্যালয়ের নানারকম মজার কম্পিটিশন হয়। আমাদের বাংলার মাস্টারমশাই বিমানবাবু এসব ব্যবস্থা করেন। ওঁর মাথা থেকে অদ্ভুত অদ্ভুত সব আইডিয়া বের হয়। এসব কম্পিটিশনে আমাদের খুব উৎসাহ। পড়াশুনোর সঙ্গে বেশ একটা অন্যরকম দিন কাটাই। এরকম একটা কম্পিটিশনের গল্প বলি।

    বিমান স্যার একদিন বললেন, “আগামীকাল তোমাদের একটা কম্পিটিশন হবে।” আমরা তো হৈ হৈ করে উঠলাম, কিসের কম্পিটিশন?”

    স্যার বললেন, টিফিন কম্পিটিশন। টিফিনের সময় আমি ঘুরে ঘুরে দেখব কে কে টিফিন খাও। যার টিফিন আমার সব থেকে ভাল লাগবে সে ফার্স্ট হবে। মনে রাখবে বিচার কিন্তু সবদিক থেকে হবে। যে টিফিন আনবে সেটা খেতে ভাল কিনা, কুড়ি মিনিট টিফিন টাইমের মধ্যে সেই টিফিন তোমরা শেষ করতে পারছ কি না, টিফিন খেয়ে স্কুল নোংরা কর কিনা—এইরকম সবদিক দেখব কিন্তু। ক্লাস সেভেনের সবাই তো দারুণ খুশি। এমন প্রতিযোগিতার কথা আগে কেউ কখনও শোনেনি।

    পরদিন আমাদের ক্লাসে সে একটা দেখবার মত দৃশ্য। পিন্টু এসেছে ইয়া বড় চারটে বাটিওলা একটা টিফিন ক্যারিয়ার নিয়ে, সোমনাথ এল কাঁধে একটা ফ্লাস্ক ঝুলিয়ে, সুমনের হাতে একটা ঠোঙা, মানসের সঙ্গে ওয়াটার বটল, দেবুর সঙ্গে ওদের বাড়ির কাজের ছেলে নিমাই এল। নিমাইয়ের হাতে একটা ডাব। প্রণব নিয়ে এসেছে মিষ্টির বাক্স আর হাঁড়ি, কৃষ্ণেন্দুর জামার পকেট থেকে কাঁটাচামচ উকি মারছে। আরও সবাই কত কি যে নিয়ে এসেছে তার ঠিক ঠিকানা নেই। তবে কেউ কিন্তু বলছে না যে কী টিফিন এনেছে। সবার মুখেই মিটমিটি হাসি। ‘আজ দেখে নেব’, এমন একটা ভাব সকলেরই।

    টিফিনের ঘণ্টা পড়তেই শুরু হল সে এক দারুণ কাণ্ড! পিন্টু টিফিন ক্যারিয়ার খুলে সাজিয়ে বসল। নুন, লেবু, ভাত, ডাল, মাছের ঝোল, চাটনি। সোমনাথ ফ্লাস্ক থেকে গরম দুধ ঢালতে লাগল। সুমনের ঠোঙা থেকে বের হল ফুলুরি, বেগুনি, মোচার চাপ। মানসের ওয়াটার বটলে লেবুর সরবত। দেবু পেনসিল কাটার ছুরি দিয়ে ডাবের মুখ কাটতে শুরু করল। প্রণব সন্দেশ আর রাজভোগ এনেছে। কৃষ্ণেন্দু গলায় রুমাল বেঁধে কাটা চামচ দিয়ে চাউমিন খেতে শুরু করল। এছাড়া কেউ এনেছে, প্যাকেট ভর্তি বিস্কুট। এমনকি ক্যাডবেরি পর্যন্ত।

    এদিকে স্কুলে তো কম্পিটিশনের কথা ছড়িয়ে পড়েছে। অন্য ক্লাসের ছাত্ররা সব দরজা-জানলায় ভিড় করেছে। খুব হাসাহাসি করছে সবাই। আমাদের ক্লাস সেভেনের ঘরটা যেন নেমস্তন্ন বাড়ি! বিমান স্যার ঢুকলেন। তাঁর মুখেও হাসি। তিনি এক একটা বেঞ্চে ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগলেন আর কাগজের টুকরোতে কিসব লিখতে লাগলেন। এদিকে আমরা তো খুব জোর খাওয়া-দাওয়া সারছি। এমন সময় বিমান স্যার ঘুরতে ঘুরতে হাজির হলেন আমাদের নিমাই সামন্তর সামনে। সে টিফিন খাচ্ছে না, কাঁদো কাঁদো মুখে বসে আছে। স্যার জিজ্ঞেস করলেন, “কিরে তোর টিফিন খাওয়া হয়ে গেছে?” নিমাই প্রায় কেঁদে ফেলে আর কি। সে বলল, “স্যার টিফিন কিনব বলে বাবার কাছ থেকে দুটো টাকা নিয়ে বেরিয়েছিলাম। সত্যি বলছি স্যার। একটা ভাল কেক কিনেছিলাম স্যার। বিশ্বাস করুন স্যার। কিন্তু স্কুলে ঢোকবার সময় বাহাদুরের (স্কুলের দারোয়ান) ছোট ছেলেটা এমন জুল জুল করে তাকাচ্ছিল-কেকটা স্যার ওকে দিয়ে দিলাম। আপনি স্যার বাহাদুরকে ডেকে জিজ্ঞেস করুন—”

    স্যার খুব বিরক্ত মুখে নিমাইকে বললেন, ‘ঠিক আছে, ঠিক আছে। দুঃখ কর না। পরেরবার আবার যোগ দিও কম্পিটিশনে।’ তিনি আবার ঘুরতে লাগলেন। প্রণব একবার স্যারকে বলল, “একটা রাজভোগ খাবেন স্যার?” স্যার কঠিন চোখে প্ৰণবের দিকে তাকালেন। ঘণ্টা পড়তে কম্পিটিশন শেষ হল। পরের দিন ফলাফল জানানো হবে।

    এরপর সারাটা দিন ধরে আমাদের খুব আলোচনা চলল। তপন বলল, “মনে হচ্ছে পিন্টুই ফার্স্ট হবে।” অজয়ের মতে ফার্স্ট হওয়া উচিত বাবলুর। কেননা ও হজমি আর আচার এনেছিল। অলক কিন্তু বলল, “ফার্স্ট প্রণবই হচ্ছে। ও কেমন স্যারকে রাজভোগ খাওয়াতে গেল।” তবে একটা বিষয়ে আমরা সবাই একমত হলাম যে নিমাইটা খুব বোকামি করেছে। বিমানস্যার ওর ওপর খুবই বিরক্ত হয়েছেন।

    পরদিন স্কুলে গিয়েই আমরা নোটিস বোর্ডের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়লাম। যা দেখলাম তাতে কৃষ্ণেন্দুর মুখ চামচের মত, প্ৰণবের মুখ রাজভোগের মত, দেবুর মুখ ডাবের মত হয়ে গেল।

    বিমান স্যার নোটিস বুলিয়েছেন: ক্লাস সেভেনের টিফিন কম্পিটিশনে ফাস্ট হয়েছে নিমাই সামন্ত।

  • মামা বাড়ির খাওয়া

    মামা বাড়ির খাওয়া

    আমাদের ক্লাসের মনোজের মামার একটা অদ্ভুত নেশা আছে। এমন নেশার কথা কেউ কখনও শোনেনি। নেশাটা হল, লোককে বেজায় খাওয়ানো। দিনে অন্তত একজনকে মনের মত খাওয়াতে না পারলে ওঁর রাতে ঘুম হয় না। বিছানায় শুয়ে ছটফট করেন। সারারাত ছাদে পায়চারি করতে হয়। ভোররাতে মাথায় জল ঢালতে হয়। সে এক বিচ্ছিরি কাণ্ড ঘটে।

    আর খাওয়ানো মানে, যেরকম সেরকম ভাবে নাম নাম করে খাওয়ানো নয় মোটেই। রীতিমত খাওয়ানো। গলা পর্যন্ত খাওয়ানো, জোর করে খাওয়ানো, দম বন্ধ করে খাওয়ানো। মোট কথা হল, খাওয়াতে খাওয়াতে যতক্ষণ না মামার তৃপ্তি হচ্ছে, যতক্ষণ না মনে হচ্ছে যে যাকে তিনি খাওয়াচ্ছেন, তার খাওয়ার মত খাওয়া হচ্ছে ততক্ষণ তিনি থামতে চান না মোটেও।

    খাওয়াতে অনেকেই ভালবাসে। আমার কাঁকুড়গাছির মাসি, প্ৰণবের উল্টোডাঙার কাকা, দেবুর বারুইপুরের পিসিও কি কম কিছু খাওয়াতে ভালবাসে? মোটেই না। আমাদের একবার হাতে পেলেই হল। পেট পুরে খাইয়ে তবে ছাড়বে। এদের কাছে খাওয়ার পর মনটা কেমন ফুরফুর করে। মনে হয়, আহা দিনটা কত ভাল। কিন্তু মনোজের মামার খাওয়ানো তো একপেশে খাওয়ানো! আর সে কথাটা বেশ ভালভাবেই জানাজানি হয়ে গেছে। খেতে কে না ভালবাসে? ভালমন্দ খাবার দাবার পেলে কার না ভাল লাগে? আর যদি কেউ নিজে থেকে ডেকে, আদর যত্ন করে খাওয়ায় তাহলে তো সোনায় সোহাগা। কিন্তু মনোজের মামার এই ঠেসেঠুসে, পারলে গলায় বাঁশ ঢুকিয়ে, চেপেচুপে খাওয়ানোকে সবাই ভয় পায়।

    আর ভয় পাবেই না বা কেন? একবার মনোজকেই তো উনি পঁয়তাল্লিশটা রসগোল্লা খাইয়ে প্রায় মেরে ফেলেছিলেন আর কী! সেবার মনোজের কোন দূর সম্পর্কের দাদাকে এক হাঁড়ি রাবড়ি খাইয়ে দিয়েছিলেন। তাকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়েছিল। মামার নজরে একবার পড়ে গেলেই হল। না খেয়ে পালাবার কোনও পথ নেই। ষণ্ডামার্কা ছটা দারোয়ান মামার হুকুম ছাড়া দরজা খুলবে না মোটেও। সুতরাং নিজের ইচ্ছেমত খেয়ে নিয়ে যে কেউ চম্পট দেবে সে গুড়ে বালি!

    প্রথম প্রথম যখন মামার এই ভয়ঙ্কর নেশার কথা তেমন করে ছড়ায়নি, তখন অনেকেই ভাল ভাল খাওয়ার লোভে ওখানে যেত। এখন আর তা হয় না। বেশিরভাগ লোকই জানে, মনোজের মামার বাড়ির খাওয়া মানে ফাঁসির খাওয়া। খেতে বসে যতই কেউ বলুক, ঠিক আছে মামা, আর নয়। পেট একেবারে আইঢাই হয়ে গেছে। ততই মামা বলবেন, দূর! এ আবার খাওয়া নাকি? মামার বাড়ির খাওয়া কী একে বলে? এ তো সবে শুরু।

    আজকাল তাই মামার খাওয়ার লোক পেতে ভারি মুশকিল। হচ্ছে। বড় বড় খাইয়েরাও ওঁর বাড়ির ধারে কাছে যাচ্ছে না।

    একদিন মনোজ স্কুলে এল। কাঁচুমাচু মুখে। আমরা জিজ্ঞেস করলাম, “কী হল?”

    মনোজ বলল, “মামী গতকাল আমাদের বাড়িতে এসে খুব কান্নাকাটি করছেন। মামার এই নেশা যেমন করে হোক কাটাতে হবে। মামার সর্বনেশে খাওয়ানোর দুর্নাম এত হয়েছে যে ফেরিওয়ালারা পর্যন্ত মামার বাড়ি খাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। আর মামার জমানো টাকাও সব ফতুর হয়ে যেতে বসেছে। তোরা কোনও একটা উপায় কর ভাই। নাহলে আর রক্ষে নেই।” এই কথা বলে মনোজ আমাদের হাত জড়িয়ে ধরল।

    আমরা ভাবতে বসলাম। টিফিন টাইমে খুব আলোচনা হল। এক একজন এক-একটা প্ল্যান দিতে থাকল। একজন বলল, মামী যদি সিন্দুকের চাবি লুকিয়ে রাখেন? একজন বলল, আমরা যদি মিষ্টির দোকানগুলোকে বলে দিই মামাকে মিষ্টি বিক্রি না করতে। একজন বলল, মামাকে যদি একদিন জোর করে একশোটা রাজভোগ খাইয়ে দিই। এমন সময় আমাদের মধ্যে সবথেকে চালাক মানস বলল, “না, এভাবে হবে না। মামার নেশা কাটাতে হবে অন্যভাবে। আমার মাথায় একটা আইডিয়া এসেছে। তবে তার জন্য মামীমাকে কয়েকদিন মনোজের বাড়ি এসে থাকতে হবে।”

    মনোজ বলল, “সে আর এমন কী? কাল থেকেই হবে।”

    মানস তখন মনোজকে জিজ্ঞেস করল, “আচ্ছা, তোর মামা রাতের খাবার কখন খেয়ে নেন?”

    মনোজ বলল, “লোককে ওরকম খাওয়ালে কী হবে, মামা নিজে তো সামান্য খান। উনি ঠিক রাত দশটায় খেতে বসেন।”

    মানস বলল, “ঠিক আছে। এখানে রাত দশটার আগেই দোকান বাজার সব বন্ধ হয়ে যায়।” সুতরাং মামা যে তখন দোকান থেকে খাবার কিনবে তারও উপায় নেই। তাই তো? কিছুই বুঝতে পারলাম না। মানস বলল, “দেখ না মজা। মামার খাওয়ানোর নেশা কেমন দৌড়ে পালায়। আমি যা বলব, তাই তোদের করতে হবে।”

    পরদিন ঠিক রাত দশটার সময় আমরা পাঁচজন ছেলে মনোজের মামার বাড়ি হাজির হলাম। দরজা খুলে মামা আমাদের দেখে তো অবাক। মানস বলল, “মামা, অনেকদিন আপনার বাড়িতে আসা হয়নি। তাই এলাম। বড় খিদেও পেয়েছিল। যদি-”

    খাওয়ার কথা শুনে প্রথমে মামার মুখ জ্বলজ্বল করে উঠল।

    পরের মুহূর্তেই কাঁচুমাচু হয়ে বললেন, “কিন্তু এত রাতে তোদের কী খাওয়াব? ইস, তোরা যদি একটু খবর দিয়ে আসতিস। আমার যে হাত কামড়াতে ইচ্ছে করছে।”

    আমরা বললাম, “কোনও চিন্তা নেই মামা। আপনার বাড়িতে এখন যা আছে, তাই খাব। মামা বললেন, “এখন রুটি, এক বাটি আলু-কুমড়োর তরকারি আছে।”

    আমরা সমস্বরে বললাম, “ওতেই হবে।” এরপর আমরা পাঁচজন একটুও দেরি না করে রান্নাঘরে ঢুকে মামার রাতের খাবারটা নিমেষে সাবাড় করে দিলাম। বিস্কুটের কৌটো, চানাচুরের শিশি ফাঁকা করে ফেললাম। তারপর ভালমানুষের মত বাড়ি চলে এলাম। মামা ফ্যালফ্যাল করে আমাদের দিকে তাকিয়ে রইলেন।

    পরদিন আবার একই ঘটনা। মামা তো তখন রাতের খাবার খেতে শুরু করে ফেলেছিলেন আর কী! তারপরের দিনও এক কাজ। তারপরের দিনও, তারপরের দিনও। এরকম টানা সাতদিন আমরা বলতে গেলে লুটেপুটে মামার রাতের খাবার খেয়ে এলাম।

    আটদিনের দিনও যখন পাঁচজনে মিলে মামার বাড়ির সামনে হাজির হলাম, আমরা দেখলাম দরজায় ইয়া বড় একটা তালা ঝুলছে।

    জুলজুল করে বসে থাকা দারোয়ান দুটো বলল,”বাবু মনোজদার বাড়ি চলে গেছেন।”

    আমরা লাফিয়ে উঠলাম, “হুররে!”

    সাতরাত উপবাসে কাটিয়ে মামার নেশা ছুটে গেল। খেতে না পাওয়ার কষ্ট থেকে তিনি বুঝলেন, বেশি খাওয়ালে কষ্ট কত হয়।

  • ইউনিফর্ম

    ইউনিফর্ম

    আমাদের স্কুলের ইউনিফর্ম নিয়ে অনেক জলঘোলা হয়েছে, অনেক গোলমাল হয়েছে। প্রথমে আমরা যে ইউনিফর্ম পরতাম, এখন আর সেটা পরি না। বদলে দেওয়া হয়েছে। এখন যেটা পরছি সেটাও আর কতদিন চলবে, কে জানে? সত্যি কথা বলতে কি, আমাদের এই পবনপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের ইউনিফর্ম একটা সমস্যার ব্যাপার।

    স্কুল চালু হওয়ার মুখে মুখে শুরু হল ইউনিফর্ম নিয়ে মিটিং। সেইসব মিটিংয়ে পবনপুরের মান্যিগণ্য ব্যক্তিরাও উপস্থিত থাকতেন। তবে হল কী, আমাদের পবনপুরের বড়রা তো কোন ব্যাপারেই কিছুতে একমত হন না। একজন একরকম বলেন তো আর একজন উল্টো বলবেন। ইউনিফর্ম নিয়ে মিটিংগুলোতেও সেরকম হচ্ছিল। কিছুতেই কোন ফয়সালা হচ্ছিল না। শেষপর্যন্ত স্কুল কমিটির সদস্যরা ঠিক করলেন, এবার মিটিংয়ে নিয়ে আসা হবে শিবপদ ভট্টাচার্যকে। অর্থাৎ আমাদের পবনপুরের এম এল এ-কে। তিনি একদিকে যেমন এম এল এ, অন্যদিকে তখন আবার তিনি না বললে এই স্কুলই হত না। সুতরাং তাঁর কথার যথেষ্ট দাম আছে। তিনি যা বলবেন তাই হবে শেষ কথা।

    সামান্য ইউনিফর্ম নিয়ে ডাকা মিটিংয়ে সভাপতি হতে হবে শুনে প্রথমে শিবপদবাবু রাজি হননি। পরে কী যেন হল, তিনি খবর পাঠালেন, “আমি যাচ্ছি।”

    এম এল এ মশাই মিটিংয়ে বেশি কিছু বলেননি। সামান্য দু’চার কথা। তিনি বললেন, “প্ৰথমে ভেবেছিলাম, এই সভায় আসব না। পরে ভুল ভাঙল। বিষয় যখন ইউনিফর্ম তখন তো আমাকে আসতেই হবে। ইউনিফর্ম মানে হল গিয়ে ইউনিটি, মানে হল গিয়ে সংহতি, সবাই মিলে মিশে থাকার শপথ। এটাই এখন সব থেকে বড় কথা। আসল কথা। মহান কথা। আর তাছাড়া পবনপুর উচ্চবিদ্যালয়ের ছাত্ররা যে ইউনিফর্ম পারবে তা বাইরে থেকে কেন আসবে? ছিছি। সে হবে। আমাদের লজ্জার। তাই অনেক ভেবে আমি সিদ্ধান্তু নিয়েছি, এই স্কুলের ছাত্ররা যে ইউনিফর্ম পরবে তা তৈরি হবে মাধব সাঁতরার দোকান থেকেই। আপনারা মাধবকেই দায়িত্ব দিন।” অনেক হাততালি, আর জলভরা সন্দেশ দিয়ে সেই মিটিং শেষ হয়েছিল।

    মাধব সাঁতরা এম এল এ মশাইয়ের দূর সম্পর্কের ভাগনে। পবনপুরের রেল স্টেশনের পাশে তার জামা-কাপড়ের দোকান ‘লজ্জা নিবারণ’। এক সপ্তাহের মধ্যেই স্কুলের তিনশো ছাত্রের ইউনিফর্মের অর্ডার সেখানে জমা হল। মাধববাবুই ঠিক করলেন, জামার রং হবে নীল, প্যান্ট হবে সাদা। হলও তাই।

    তবে এখানেই ইউনিফর্ম নিয়ে গণ্ডগোল থেমে গেল না।

    গত বর্ষাতে ছেলেদের সেই নীল জামা থেকে রং উঠতে শুরু করল। নীল রং গড়িয়ে গড়িয়ে সাদা প্যান্টের ওপর পড়তে লাগল। প্রথমে একজন দুজনের তারপর দশজন বিশজনের, শেষপর্যন্ত একশজন দেড়শজনের দল বেঁধে ছাত্ররা যখন স্কুলে আসত বা যেত তখন সে এক কিম্ভূতকিমাকার দৃশ্য। অভিভাবকরা প্ৰথমে মাধব সাঁতরার কাছে গিয়ে বলল, তারপর স্কুলের মাস্টারমশাইদের কাছে গিয়ে বলল, কিন্তু উপায় নেই। মাধব সাঁতরার ‘লজ্জা নিবারণ’ দোকান থেকেই ইউনিফর্ম তৈরি করতে হবে। এম এল এ মশাই যে সেরকমই বলে দিয়েছেন। তাই হেডমাস্টারমশাই মাধববাবুকে একদিন ডেকে পাঠিয়ে বললেন, “এ তো আর চোখে দেখা যায় না। একটা কিছু করুন।”

    তারপরই মাধববাবু ইউনিফর্মের রং বদলে দিয়েছেন। নীল জামার বদলে সাদা জামা। আর সাদা প্যান্টের বদলে নীল প্যান্ট। মাধববাবু বলেন, আবার যে রং উঠবে না এমন কথা বলতে পারি না। তবে সাদা জামা থেকে রং উঠলেও সাদা জামা সাদাই থাকবে।’

  • ক্লাস নাইনের ভূত

    ক্লাস নাইনের ভূত

    আমাদের স্পোর্টসে এক একজন ছেলে এক একটা ইভেন্টে দুর্দান্ত। তাদের পারফরমেন্স নিয়ে আমরা সারা বছর আলোচনা, ঝগড়া এমনকি মারামারি পর্যন্ত করি।

    কয়েকটা উদাহরণ দিলেই ব্যাপারটা পরিষ্কার হবে।

    ক্লাস নাইনে ছিপছিপে বাসুদেব একশো মিটার দৌড়ে একেবারে মারাত্মক। চোখের পলক পড়বার আগেই দৌড় শেষ। কালো হাফ প্যান্ট আর সাদা গেঞ্জি না পরে, ও যদি দৌড়ানোর সময় কালো হলুদ ডোরাকাটা কোনও পোশাক পরত তা হলে ঠিক মনে হত বাসুদেব নয়, একটা চিতাবাঘ ছুটছে। বাসুদেবের দৌড়ের কায়দা আমরা অনেকেই নকল করতে চেষ্টা করি। কিন্তু কখনই ঠিকমতো হয় না। ওর স্টার্ট আর ফিনিশিং নিয়ে একবার ক্লাস সেভেনের সঞ্জয় আর ক্লাস এইটের অমৃতর মধ্যে হাতাহাতি পর্যন্ত হয়েছিল।

    বাসুদেবের দৌড় যদি চিতাবাঘের মতো হয়, তা হলে রাজার হাই জাম্প পাখির মতো। ক্লাস সিক্সের রাজাকে শুধু তার ক্লাসের ছেলেরা হিংসে করে বললে ভুল হবে। গোটা স্কুলের ছাত্ররাই হিংসে করে। হিংসে করে আবার ওকে নিয়ে গর্বও করে। আশেপাশে চার-পাঁচটা স্কুলে খবর নিয়ে দেখা গেছে, এমন হাই জাম্প দিতে কেউ পারে না। লাফাচ্ছে তো না, যেন ডানা মেলে উড়ছে!

    অঙ্ক স্যার সুশীলবাবু হােমটাস্ক না করলে পরদিন ডবল হােমটাস্ক দেন। সেই সুশীলবাবু পর্যন্ত রাজাকে বলেন, “তোকে শুধু ছাড়। তুই বাড়িতে অঙ্ক প্র্যাকটিস না করে হাই জাম্প প্র্যাকটিস করবি। এতদিন জানতাম লাফিয়ে লাফিয়ে জীবনে উন্নতির ব্যাপারটা শুধুমাত্র কথার কথা। তোকে দেখে বুঝতে পারছি না, কথার কথা নয়। তুই সত্যি লাফিয়ে উন্নতি করবি। তুই বাবা মন দিয়ে লাফা, আরও বেশি বেশি লাফা।”

    রাজা মন দিয়েই লাফায়। নইলে প্রতি বছর স্পোর্টসে কেউ নিজের রেকর্ড ভাঙতে পারে?

    অনীশের হার্ডল রেস আমরা কখনও বসে দেখতে পারি না। উত্তেজনায় উঠে দাঁড়াতেই হবে। গত বছর শেষ দুটো বেড়া সে যেভাবে পা তুলে টপকে গেল যে আমরা ভয়ে চোখ বুজে ফেলেছিলাম। এই বুঝি বেড়া ভেঙে মুখ থুবড়ে পড়বে। তবে ওর একটাই দুঃখ। স্পোর্টসের হার্ডল টপকালেও পরীক্ষার হার্ডল কিছুতেই টপকাতে পারে না। এই নিয়ে এইটে তার দু’বছর হয়ে গেল। ভূগোল আর ইতিহাসের বেড়ায় সে হােঁচট খেয়েছে। ইংরেজিতে তো একেবারে মুখ তোবড়ানো অবস্থা। তবে পরীক্ষায় ফেল করলেও হার্ডল রেসের জন্য স্কুলে অনীশের খুবই খাতির। সেও একটা ‘অহঙ্কারী অহঙ্কারী’ হাবভাব নিয়ে চলাফেরা করে। আমরা অবশ্য এই হাবভাবের জন্য কিছু মনে করি না। স্পোর্টসে যে এতগুলো কাপ আর মেডেল পেয়েছে, তার তো একটু অহঙ্কার হবেই। আমরা ওর সঙ্গে কথা বলার জন্য ঘুরঘুর করি।

    গত দু’বছর ধরে শ্ৰীধরের নাম হয়েছে ‘ক্যাঙারু’। প্রথম প্রথম শুধু ক্লাস সেভেনের ছেলেরাই ওকে এই নামে ডাকত। এখন স্কুলের সব ছেলেরাই ‘ক্যাঙারু’, ‘ক্যাঙারু’ করে। শুধু ছেলেরা নয়, মাস্টারমশাইদের কেউ কেউ ক্লাসে ঢুকে বলেন, “ক্যাঙারু, যাও তো লাফাতে লাফাতে টিচার্স রুমে গিয়ে চট করে চক আর ডাস্টারটা নিয়ে এসো তো। আনতে ভুলে গেছি।”

    নিজের নাম বদলে দিলে সবাই রেগে যায়। শ্ৰীধর কিন্তু রাগে না। বরং তার বেশ আনন্দই হয়। সুকৃত সেদিন বলল, “আর কটা দিন যাক, দেখবি স্কুলের খাতাতেও শ্ৰীধরের নাম পাল্টে গেছে। লেখা হয়েছে ক্যাঙারু মজুমদার। হিহি।”

    পরে স্কুলের খাতায় কী হবে সেটা এখনই বলা যাচ্ছে না, তবে শ্ৰীধরের নাম এমনি এমনি ‘ক্যাঙারু’ হয়নি। সে স্পোর্টসের বস্তা দৌড়ে প্রতিবার এক নম্বর। মেডেল বাঁধা। দৌড় শুরুর বাঁশি একবার বাজলেই হল। দুহাতে বস্তা তুলে তার লাফ তখন দেখার মতো। ক্যাঙারুর পেটে থলি থাকে। আর শ্ৰীধর হল থলির ভেতর ক্যাঙারু! আমাদের গেম টিচার অলকনন্দনবাবু ওকে দুঃখ করে বলেন, “ইস, অলিম্পিকে স্যাক রেস ইভেন্টটা নেই রে শ্ৰীধর। থাকলে একদিন ঠিক তোর চান্স হত। তুই সোনা জিতে আসতিস। আমরা তোকে সংবর্ধনা দিতাম। বস্তা দিয়ে স্টেজ সাজানো হত।”

    সে কী আর করা যাবে? শুধু বস্তা দৌড় কেন, জিলিপি দৌড় আর হাঁড়ি ভাঙাও তো অলিম্পিকেও নেই। কিন্তু ক্লাস ফাইভের জয় আর ক্লাস টেনের বিক্রম এই দুই খেলায় যে কত বড় ওস্তাদ সে কথা আর বাইরের কটা লোক জানতে পারল? জিলিপি দৌড় দিয়ে যে কেউ নাম করতে পারে, এমন কথা কেউ কখনও ভাবতে পেরেছে? জয় পেরেছে। শুধু পেরেছে নয়, একেবারে তাক লাগিয়ে দিয়েছে। পিছনে হাত বাঁধা অবস্থায় সে যখন সবার আগে দৌড় শেষ করে তখন তার মুখে ঠিক আধখানা জিলিপির প্যাঁচ ধরা। সেই প্যাঁচ থেকে টপ টপ করে রস পড়ছে! বাকিদের অনেকে তখনও সুতো থেকে ঝোলানো সারি সারি জিলিপির সামনে নাচছে। মাঠের পাশে রাখা বক্সে চলছে বাজনা। মনে হচ্ছে, প্ৰতিযোগীরা যেন বাজনার তালে তালে নাচছে! সেই জিলিপি নাচ দেখে সকলে হাসতে হাসতে একেবারে গড়িয়ে পড়ে।

    সেবার অবশ্য কেলেঙ্কারি হল। জিলিপির ইভেন্ট দেখে আমরা হাসছি, হঠাৎ ভেউ ভেউ করে কান্নার আওয়াজ। চমকে উঠলাম। স্পোর্টসের মাঠে কে কাঁদে? তাড়াতাড়ি গিয়ে দেখি, ক্লাস সিক্সের তমাল কাঁদছে। বেচারির হাত পিছনে বাঁধা বলে চোখের জল মুছতে পারছে না। মাঠের ধারে নিয়ে গিয়ে শান্ত করার পর চোখের জল মুছে সে জানাল, সেও এই দৌড়ে ছিল। সুতো থেকে জিলিপি ছিড়ে সবার আগে দৌড় শেষও করেছে। কিন্তু এসে দেখে মুখে ধরা জিলিপি নেই! দৌড়তে দৌড়তে ভুল করে খেয়ে ফেলেছে।

    এরপর না কেঁদে আর উপায় কী? অধীরের হাঁড়ি ভাঙা নিয়ে গত বছর স্পোর্টসে খুব গোলমাল হয়েছিল। ক্লাস নাইনের ছেলেরা গেম টিচারের কাছে গিয়ে আপত্তি জানাল–

    ‘স্যার এ কখনও হতে পারে না। অধীরের রুমালে নিশ্চয় ফুটো আছে। সেবারও অধীর চোখে রুমাল বাঁধা অবস্থায় হাঁড়ি ফাটিয়েছিল, এবারও ফাটিয়ে দিল। পরপর দু’বার একই ঘটনা কী করে ঘটে স্যার? তাও কোনওরকমে হাঁড়ির গায়ে লাঠিটা লাগালে একটা কথা ছিল। একেবারে এক চান্সেই ফটাস! আপনি স্যার ওই রুমাল পরীক্ষার ব্যবস্থা করুন।” ক্লাস টেনের ছেলেরা এ কথা শুনে রে রে করে উঠল। উঠবেই তো। অধীর তাদের ক্লাসের ছেলে। হাঁড়ি ভাঙা ইভেন্টের চ্যাম্পিয়ন। রুমালে ফুটো থাকার অভিযোগ তারা মানবে কেন? বলল—

    “স্যার, ওদের কথা একদম শুনবেন না। হিংসেতে এই সব বলছে। আমরা সবাই দেখলাম, প্রতিটা রুমাল খুঁটিয়ে পরীক্ষা করে চোখ বাঁধা হয়েছে। অধীর এমনি এমনি চোখ বাঁধা অবস্থায় হাঁড়ি ভাঙেনি। ও তিন সপ্তাহ ধরে প্র্যাকটিস করেছে। প্র্যাকটিসের কোনও দাম নেই?”

    ক্লাস নাইনের ছেলেরা বিদ্রুপের হাসি হেসে বলল, “হাঁড়ি ভাঙা প্র্যাকটিস করছে মানে! হাঁড়ি ভাঙা কি থ্রি হানড্রেড মিটার রেস? নাকি লং জাম্প যে প্র্যাকটিস করলে হয়। স্যার, এদের কথা শুনেই বোঝা যাচ্ছে, ঘটনার পিছনে কোনও রহস্য আছে।”

    অলকনন্দনবাবু ভুরু কুঁচকে বললেন,”কীরকম রহস্য বলে তোমরা মনে করছ?”

    ক্লাস নাইনের ছেলেরা হইহই করে বলল, “রুমালের রহস্য স্যার। ওই রুমাল পরীক্ষা করলেই সব ধরা পড়বে।”

    অলকনন্দনবাবু অধীরের দিকে তাকিয়ে বললেন, “রুমালটা কী রকম ছিল অধীর?”

    অধীর মিটিমিটি হেসে বলল, “নতুন রুমাল স্যার। সাদার পাশে নীল বর্ডার।”

    ক্লাস টেনের ছেলেরা বলল, “অধীর ঘাবড়াসনি। তুই পকেট থেকে রুমালটা বের করে দেখিয়ে দে। আমরা তোর পাশে আছি।”

    অধীর এখনও মিটিমিটি হাসছে। বলল, “আমার কাছে রুমাল নেই।”

    ক্লাস নাইনের ছেলেরা গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে উঠল। বলল, “দেখলেন তো স্যার? ফুটো রুমাল চোখে বেঁধে হাঁড়ি ভেঙেছে, তারপর সেই রুমাল কোথায় সরিয়ে ফেলে এখন বলছে রুমাল নেই। স্যার অধীরের গতবারের হাঁড়ি ভাঙার মেডেলও কেড়ে নেওয়া হোক।”

    এ বার ‘হো হো’ করে হেসে উঠলেন অলকনন্দনবাবু। হাসতে হাসতেই ক্লাস নাইনের ছেলেদের দিলেন জোর ধমক । বললেন, “অ্যাই চোপ। একদম চুপ করো তোমরা। আজ যারা হাঁড়ি ভাঙা ইভেন্টে অংশ নিয়েছে তাদের সবার চোখ বাঁধা হয়েছিল স্কুলের মাস্টারমশাইদের রুমাল দিয়ে। এক একজন প্রতিযোগীর জন্য এক একজন মাস্টারমশাইয়ের রুমাল। আর অধীরের রুমালটা ছিল আমার। এই দেখ।”

    কথা শেষ করে অলকনন্দনবাবু পকেট থেকে একটা নীল বর্ডার দেওয়া নতুন সাদা রুমাল বের করলেন।

    ক্লাস টেনের ছেলেরা চিৎকার করে উঠল, “হাঁড়ি ভাঙার হিরো অধীর হিপ হিপ হুররে…।”

    তবে আমাদের স্পোর্টসের আসল হিরোর নাম বাদল। ক্লাস নাইনের রোগাভোগা, খোঁচা খোঁচা চুলের বাদল। তাকে নিয়ে আমাদের সারা বছর ধরে কৌতুহল। স্পোর্টসের দিন যত এগিয়ে আসে সেই কৌতুহল বাড়তে থাকে। ক্লাসে ক্লাসে জল্পনাকল্পনা শুরু হয়। এমনকি মাস্টারমশাইরা পর্যন্ত আমাদের জিজ্ঞেস করেন, “কীরে, এ বছর বাদলের প্ল্যান কী?” বাদলের প্ল্যানের খবর আমরা বলতে পারি না। কারণ, এই সময়টা সে একেবারে তালা বন্ধ করে ফেলে। এমনি তালা নয়। ডবল তালা। তারপর যেন দুটো চাবিই ছুঁড়ে ফেলে দেয়। এ বিষয়ে কোনও প্রশ্ন করলে গম্ভীর মুখে বলে, “এখনও কিছু ঠিক করিনি। দেখি এখনও তো সময় আছে।”

    অথচ প্রতি বছর সে এমন এক একটা কাণ্ড করে যে স্পোর্টসের শেষ ইভেন্ট ‘যেমন খুশি সাজো’ সবথেকে মজার হয়ে যায়। বাদলকে কেউ হারাতে পারে না। তার সাজ দেখে চমকে উঠতে হয়। শুধু সাজপোশাকে নয়, ভাবনাতেও সে হয় এক নম্বর। একবার গুপি গাইনের বাঘা সেজে এমন ঢোল বাজাল যে মাঠে হাততালি আর থামতেই চাইছিল না। দু’বছর আগে সেজেছিল ফেলুদা। হাতে খেলনা রিভলভার নিয়ে স্কুলের পাঁচিল টপকে এল! সবথেকে মজা হয়েছিল যেবার হেডস্যারের সাজে ধুতি-পাঞ্জাবি আর কালো পাম্পসু পরে মস মস আওয়াজ তুলে হাঁটতে হাঁটতে ঘুরপাক খেল। হাসিতে আমাদের পেট ফেটে যাওয়ার অবস্থা। কিন্তু হাসতে পারছি না। হাসব কী করে? একটু দূরেই চাঁদোয়ার নিচে খোদ হেডস্যার নিজে বসে আছেন। শুধু বসে আছেন না, তিনি তো বিচারকদের একজন। আমাদের মনে হল, বাদলের কপালে দুঃখ আছে। আশ্চর্যের বিষয়, সেবার হেডস্যার বাদলকে সবথেকে বেশি নম্বর দিয়েছিলেন!

    তবে এবারের ঘটনা আগের সব ঘটনাকে ছাড়িয়ে গেল।

    আমি, তন্ময়, অৰ্চি আর ঋজু ঠিক করলাম, এ বছর বাদল কী সাজবে আগে থেকে জানতেই হবে। যে করেই হোক জানতে হবে। তন্ময় বলল, “দাঁড়া, আগে খোঁজ নিয়ে দেখি বাদল কী খেতে ভালবাসে।”

    অৰ্চি অবাক হয়ে বলল, “খাওয়ার সঙ্গে সাজের কী সম্পর্ক?”

    তন্ময় মুচকি হেসে বলল, “আরে বাবা, আছে। ফেবারিট জিনিস খাবার সময় সকলের মনই একটু দুর্বল হয়। বাদলেরও হবে। আর তখনই গল্প করতে করতে ওর সাজের পরিকল্পনা জেনে নেব।”

    সত্যি সত্যি তন্ময় খোঁজ নিয়ে এসে জানাল, বাদলের দারুণ ফেবারিট হল এগ রোল। তন্ময় বলল, “দে, সবাই চাঁদা দে। বেশি করে দিস। দুটো রোলের দাম লাগবে। এর নাম হল এগ রোল অপারেশন।”

    ঋজু বলল, “এগ রোল অপারেশনে দুটো রোল লাগবে কেন? বাদলকে কি তুই রোল খাওয়াবি।”

    তন্ময় রেগে গিয়ে বলল, “বোকার মতো কথা বলিস না ঋজু। বাদল দুটো খাবে কেন? আমাকে একটা খেতে হবে না? দুজনে রোল খেতে খেতে গল্প করব। নইলে ও সন্দেহ করে সতর্ক হয়ে যাবে।”

    দুটো রোলের চাঁদা তোলা হল এবং শনিবার স্কুল ছুটির পর বাড়ি ফেরার পথে তন্ময় সত্যি সত্যি বাদলকে রোল কিনে দিল। মন দিয়ে খাওয়া শেষ করে বাদল বলল, “খুব ঝাল লেগেছে রে, উপস। মনে হচ্ছে লঙ্কায় কামড় দিয়েছি, উপস। একটা আইসক্রিম খাওয়া রে, উপস।”

    তন্ময়ের খুব রাগ হল। কিন্তু কিছু করার নেই। আইসক্রিম না দিলে বাদল রেগে চলে যাবে। কিছুই বলবে না। তখন এগ রোলের টাকাটাও জলে যাবে। বাধ্য হয়ে নিজের পকেট থেকেই টাকা বের করে আইসক্রিম কিনল। তন্ময়। সস্তার আইসক্রিম নয়, একেবারে দামি চকোবার। বাদল আইসক্রিমে আলতো কামড় দিয়ে বলল, “নে এবার বল।”

    তন্ময় ঘাবড়ে গিয়ে বলল, “কী বলব?”

    বাদল অবাক হয়ে বলল, “বাঃ, বলবি না? কেন এগ রোল খাওয়ালি সেটা বল।”

    তন্ময় লজ্জা পেয়ে বলল, “বাঃ, বন্ধুকে একটা রোল খাওয়াতে পারি না?”

    বাদল নির্লিপ্ত মুখে বলল, “পারবি না কেন? তবে স্পোর্টস এসে গেছে তো, তাই সন্দেহ সন্দেহ হচ্ছে।”

    তন্ময় দেখল বাদল ধরে ফেলেছে। আর ধরেই যখন ফেলেছে। তখন সরাসরি কথাটা বলে ফেলাই বুদ্ধিমানের। সে আমতা আমতা করে বলল, “আসলে কী জানিস, ‘যেমন খুশি সাজো’তে তুই যা করিস না..একেবারে ফাটাফাটি। হ্যাঁরে বাদল, এবার কী সাজবি? ভেবেছিস কিছু?”

    বাদল আইসক্রিমের তলায় একটা হাত রেখে বলল, “দেখ, তন্ময়, সাজের কথা আমি আগাম বলি না। কিন্তু এবার তুই এগ রোল খাইয়ে আমার মনটা দুর্বল করে দিয়েছিস। শুধু এগ রোল নয়, সঙ্গে আবার আইসক্রিমও। তোর সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করাটা ঠিক হবে না। তাই ভাবছি, তোকে বলেই ফেলব।”

    তন্ময় রাস্তার মধ্যেই দাঁড়িয়ে পড়ল। বাদলের হাত ধরে বলল, “বলবি, বল তাহলে।”

    বাদল আইসক্রিম শেষ করে কাঠিটা ছুঁড়ে ফেলল। তারপর সে বলল, “ভূত। এবার আমি ভূত সাজছি। যা, এবার বাড়ি যা।”

    পরের দিন তন্ময় স্কুলে এল মুখ কালো করে। আমরা ঘিরে ধরলাম। আমরা বললাম, “কীরে, তোর এগ রোল অপারেশন কী হল? কিছু জানতে পারলি?”

    তন্ময় মুখ কাঁচুমাচু করে বলল, “অপারেশন ফেল করেছে। বাদল কিছুই বলল না। উল্টে এগ রোলের সঙ্গে একটা আইসক্রিমও খেল। শেষে রসিকতা করে চলে গেল।”

    ঋজু বলল, “রসিকতা! কী রসিকতা?” তন্ময় গজগজ করতে করতে বলল, “কী আবার বলবে? বলল, এবার নাকি ও ভূত সাজছে!”

    আমরা হাল ছেড়ে দিলাম। না, এবারও জানা হল না।

    স্পোর্টসের দিন ‘যেমন খুশি সাজো’ ইভেন্ট শুরু হতে সবাই নড়েচড়ে বসল। এক এক করে প্রতিযোগীদের নাম ডাকা হচ্ছে। হাততালি, হাসি আর চিৎকারের মধ্যে দিয়ে তারা মাঠে ঢুকছে। কেউ সেজেছে বাউল। কারও সাজ প্রফেসর শঙ্কুর মতো। কেউ আবার কোট-প্যান্ট আর টাই পরে হাতে বাবার ল্যাপটপ নিয়ে এসেছে! ক্লাস টেনের অনির্বাণ মাথায় গামছা বেঁধে ফুচকাওলা হয়েছে। ফুচকা ভর্তি একটা ঝুড়িও সঙ্গে এনেছে! তিনজন সেজেছে হ্যারি পটার। গোল গোল চশমা। এলোমেলো চুল। তিন সাইজের হ্যারি পটার দেখে সবাই হইহই করে উঠল। কিন্তু বাদল কোথায়? প্রথমে দু-একজনের মধ্যে ফিসফাস শুরু হল। সেই ফিসফাস খুব দ্রুত গোটা মাঠে ছড়িয়ে পড়ল। এমনকি মাস্টারমশাইরা পর্যন্ত চিন্তিত হয়ে পড়লেন। আমাদের ডেকে মুকুন্দবাবু বললেন, “কী হল রে? তোদের বাদল কোথায়? এতবার নাম ডাকা হল…।”

    অৰ্চি কাঁচুমাচু গলায় বলল, “বুঝতে পারছি না স্যার। খানিকক্ষণ আগেই দেখলাম মাঠ থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে।” আমি বললাম, “কোথায় চললি? বলল, সাজতে যাচ্ছি।”

    মুকুন্দবাবু বললেন, “তা হলে তো ব্যাপারটা সিরিয়াস মনে হচ্ছে। হঠাৎ কিছু হয়ে গেল নাকি? একবার খোঁজ নিতে হয়। তোরা কেউ চট করে বাড়ি থেকে ঘুরে আয়।”

    তন্ময় একটা সাইকেল জোগাড় করে রওনা দিল। বাদলের বাড়ি দূরে নয়। সাইকেলে যেতে-আসতে মিনিট পনেরো। তন্ময় ফিরে এল তেরো মিনিটের মাথায়। হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, “না, বাড়িতেও নেই।”

    মুকুন্দস্যার গম্ভীর হয়ে গেলেন। বললেন, “স্পোর্টস শেষ হয়ে গেল। কিছু একটা করতে হবে। সেরকম হলে থানায় খবর দেব। আমি হেডস্যারকে জানাচ্ছি। তোরা এখন চুপচাপ থাক।”

    আমরা চুপচাপ থাকলাম। কিন্তু তাতে লাভ হল না। খবর দ্রুত ছড়িয়ে পড়ল। বাদল ভ্যানিস! এর সঙ্গে আবার নানারকম গল্পও জুড়ল। কেউ বলছে, অপহরণ। কেউ বলছে, মনে হয় ডাকাত সেজে আসছিল। সত্যি ডাকাত ভেবে রাস্তাতেই পুলিস অ্যারেস্ট করেছে।

    স্পোর্টস শেষ হলে চাপা টেনশনের মধ্যেই শুরু হল পুরষ্কার বিতরণী অনুষ্ঠান। ‘যেমন খুশি সাজো’ ইভেন্টের পুরস্কারের সময় হেডস্যার উদ্বিগ্ন গলায় বললেন, “প্রতিবার যে ছেলেটি এতে প্রথম হয় সেই বাদল এবার আসেনি। অথচ আমরা জানতে পেরেছি সে ‘আসছি’ বলে খানিক আগে মাঠ ছেড়ে বেরিয়ে গেছে। মনে হচ্ছে, তার কোনও সমস্যা হয়েছে। স্পোর্টস শেষ হয়ে গেলেই আমরা তার খোঁজখবর শুরু করব। যাই হোক, এবার ‘যেমন খুশি সাজো’-তে ফার্স্ট হয়েছে… ”

    ঠিক এমন সময় বাদলের গলা! “এই তো আমি স্যার। এই তো আমি এসে গেছি।” সবাই চমকে উঠল। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল, মাঠের একপাশ থেকে ছুটতে ছুটতে আসছে সে! কোনও সাজগোজ নেই। একেবারে সাদামাঠা স্কুলের পোশাক। এমনকি পায়ে কালো বুটটা পর্যন্ত রয়েছে!

    ছেলেদের ভিড় ঠেলে চাঁদোয়ার তলায় এসে দাঁড়াল বাদল। সে একই সঙ্গে হাঁপাচ্ছে এবং হাসছে!

    মুকুন্দবাবু চোখ পাকিয়ে বললেন, “কোথায় ছিলি তুই? অ্যা, ছিলি কোথায়?

    বাদল হাসিমুখে বলল, “স্কুলে ঢুকে ফাঁকা ক্লাসরুমে লুকিয়ে বসে ছিলাম।”

    মুকুন্দবাবু ধমকে উঠলেন, “ফাঁকা ক্লাসরুমে লুকিয়ে ছিলি মানে! রসিকতা হচ্ছে? কান টেনে ছিঁড়ে দেব। এতবার নাম ডাকা হল, শুনতে পাসনি?”

    বাদল কাঁচুমাচু মুখে বলল, “হ্যাঁ শুনতে পাব না কেন স্যার? খুব শুনতে পেয়েছি।”

    এবার হেডস্যার কটমট করে তাকিয়ে বললেন, “শুনতে পেয়েছ তো আসনি কেন?”

    বাদল মাথা নামিয়ে বলল, “কী করে আসব স্যার? এবার যে আমি ভূত সেজেছি। ভূত কি দেখা যায়? ভূত তো অদৃশ্য। সেই জন্যই তো লুকিয়ে ছিলাম।”

    “যেমন খুশি সাজো’ এখন খেলাধুলোর মধ্যে পড়ে না, কিন্তু তখন পড়ত। খুব বেশি মাত্রাতেই পড়ত। আর সেবারও এই খেলায় প্রথম হল ক্লাস নাইনের বাদল।

  • পড়তে বসা

    পড়তে বসা

    মাস্টার মশাইরা বলেন, “অঞ্জনকে দ্যাখ। দেখে শেখ।” সত্যিই শুধু আমরা ক্লাস সেভেনের ছেলেরা শুধু নই, অঞ্জনকে দেখে আমাদের এই পবনপুর উচ্চবিদ্যালয়ের সব ক্লাসের ছেলেরাই। তাকিয়ে দেখার মতই ছেলে বটে সে। ক্লাস সেভেনের একটা ছেলে যে এত পড়াশুনো করতে পারে তা কেউ দেখা তো দূরের কথা, কানেও কখন শোনেনি।

    আমরা দু-একবার তমালকে জিগ্যেস করেছিলাম, ‘হ্যাঁরে তমাল তুই কখন পড়বি? তমাল বলেছে, “খেপেছিস। এত কাজ, পড়ার সময় কই।” সেই তমালই অঞ্জনের পড়ার যা হিসেব আমাদের দিয়েছে তা এইরকম—

    ভোর সাড়ে চারটের সময় ঘুম থেকে ওঠা। সময় যাতে নষ্ট না হয় তার জন্য বালিশের পাশেই বই থাকে। সঙ্গে সঙ্গে পড়তে বসে যাওয়া। দাঁত মাজতে মাজতে সেই পড়া মনে মনে আওড়ানো। ছাদে মর্নিং ওয়াক করতে করতে পড়া। জলখাবার খেতে খেতে পড়া। সাড়ে ছটার সময় ভূগোলের মাস্টারমশাই চলে আসবেন। সাড়ে সাতটায় ইতিহাসের, সাড়ে আটটায় ইংরেজির, সাড়ে নটায় অঙ্কের। মাস্টার মশাইরা চলে গেলে স্নান, খাওয়া। তখনই সকালের পড়াগুলো সব পরপর মুখস্থ বলে যাওয়া। এরপর চারটে পর্যন্ত স্কুল। তখনও টিফিনে পড়া। ছুটি হলেই দৌড়ে বাড়ি। সাড়ে চারটেয় বাংলার মাস্টারমশাই, পৌনে ছটায় বিজ্ঞানের, আটটা বেজে দশ মিনিটে কর্মশিক্ষার, সাড়ে ন’টার সময় সংস্কৃতর। এবং সবথেকে আশ্চর্যের বিষয়, তমাল আমাদের জানিয়েছে, অঞ্জনের জন্য একজন ড্রিলের মাস্টারমশাইও বাড়িতে আসেন। রাত সোয়া দশটা নাগাদ নাকি দেখা গেছে তিনি ছাদে অঞ্জনকে এক দুই, এক-দুই-তিন করে ড্রিল শেখাচ্ছেন!! এরকম ছেলেকে বাবা, মা, দাদা এবং মাস্টারমশাইরা যে “আদৰ্শ” হিসেবে বার বার আমাদের সামনে আনবেন এ আর আশ্চৰ্য্য কী?

    এদিকে বাড়িতে স্কুলে শুধু ‘অঞ্জন-অঞ্জন’ শুনে আমরা তো একেবারে তিতিবিরক্ত। এ কেমন পড়ার ছিরি? আমরা অনেক ভেবেচিন্তে একটা ফন্দি করলাম। ঠিক হল এবার আমরা সরস্বতী পুজোটা করব একেবারে অঞ্জনদের বাড়ির উল্টোদিকের মাঠে। সেই মত সব ব্যবস্থা হল। রাত জেগে প্যান্ডেল বাঁধলাম। মনোজ খুব ভাল বাজনা বাজাতে পারে। সে কোথা থেকে জানি একটা ঢাক যোগাড় করে আনল। এবার হতে না হতেই সেই ঢাক বাজতে শুরু করল, ধাঁই না না, ধাঁই না না গিজ গিনিতা গিজ গিনিতা। সঙ্গে তাপসের কাঁসরঘণ্টা। আমরা বললাম, “দেখি ব্যাটা অঞ্জন এমন দিনেও কত পড়ে!” সরেজমিনে দেখে আসতে তমাল পিছনের দরজা দিয়ে সুড়ুৎ করে অঞ্জনদের বাড়িতে ঢুকে পড়ল। মিনিট তিনেকের মধ্যেই তমাল ফিরে এসে জানাল, ঘরের সবকটা জানলায় দরজায় মোটা মোটা পর্দা টাঙিয়েছে অঞ্জন। ভেন্টিলেটারে সোয়েটার। এমনকি নিজের দুকানে তুলো পর্যন্ত গুঁজেছে! এত করেও ঘরে যেটুকু ঢাকের শব্দ ভেসে আসছে তা চাপা দিতে অঞ্জন ইতিহাস বই খুলে বাবর, আকবর, শেরশাহ, লৰ্ডকার্জন, বলে পরিত্ৰাহি চেঁচাচ্ছে!

    “যা বাবাঃ” বলে আমরা মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়লাম। পরীক্ষার রেজাল্ট যেদিন বের হল, সেদিন দেখা গেল অঞ্জন ভূগোলে সাত, ইতিহাসে তের, অঙ্কে সতের, বিজ্ঞানে নয় পেয়েছে। অঞ্জনের এই রেজাল্ট দেখে আমরা সত্যিই একটু দুঃখ পেয়েছিলাম। বেচারি এত খাটাখাটনি করল! সব একেবারে জলে গেল। অঞ্জন কিন্তু একটুও মুষড়ে পড়ল না। বলল, “বাড়ি যাই। পড়তে বসতে হবে।”

  • হিংসুটে

    হিংসুটে

    রঘুনাথের মত হিংসুটে ক্লাস সেভেনে কেন, গোটা ইস্কুলেই আর কেউ নেই। বন্ধুরা তার নাম রেখেছে হিংসুটে নাথ।

    সব কিছু নিয়ে রঘুনাথ হিংসে করে। পিন্টু কেন ক্লাসে ফার্স্ট হয়, আমি কেন হই না? তপন কেন ফুটবল টিমে চান্স পেল, আমি কেন পেলাম না? বিশ্বরূপ কেন ‘লক্ষ্মণের শক্তিশেল’ নাটকে লক্ষ্মণের পার্ট পেল, আমি কেন পেলাম না? অমিয় কেন ভূগোলে বিরাশি পেল, আমি কেন পেলাম না? অজয় কেন গান গাইতে পারে, আমি কেন পারি না? এইরকম সব।

    হিংসে করতে করতে রঘুনাথের এমন অভ্যেস হয়ে গেছে যে ক্লাসে কেউ মাস্টারমশাইয়ের কাছে মার খেলে পর্যন্ত সে হিংসে করে বসে। আসলে হিংসে করতে গিয়ে যেসব গুলিয়ে ফেলে। এরকম ছেলেকে কেইবা পছন্দ করবে? তাই রঘুনাথকেও তার বন্ধুরা এড়িয়ে চলে। নইলে ছোটখাটো সব ব্যাপার নিয়েই তো তার সঙ্গে ঝগড়া নয়, হাতাহাতি পর্যন্ত হয়। এই তো সেদিন বিদ্যুৎ ওর স্ট্যাম্পের অ্যালবাম নিয়ে এসেছিল। ক্লাসে একেবারে হৈ হৈ পড়ে গেল। টিফিনের সময় সবাই হুমড়ি খেয়ে সেই অ্যালবাম দেখছিল আর পঞ্চমুখে বিদ্যুতের প্রশংসা করছিল। বিদ্যুৎ নেতার মত মুখ করে গর্বের হাসি হাসছিল।

    রঘুনাথের তো এই কাণ্ড দেখে গা জ্বলে যাচ্ছে। সে আর সহ্য করতে না পেরে দুম করে বলে বসল, “ওসব জাল স্ট্যাম্প।” ব্যস, যা হবার তাই হল। বিদ্যুৎ ঝাঁপিয়ে পড়ল তার ওপর। কুস্তি, বক্সিং, ক্যারাটে কিছুই বাকি রইল না। অন্যরা কোনক্রমে দুজনকে সরিয়ে দেয়।

    আর একদিন মধু এসে বলল, “আমার সেজমামা আফ্রিকা ঘুরে আজ ফিরলেন।”

    অমনি সবাই মধুকে ঘিরে বসল। মধু তখন তার মামার গা ছমছমে আফ্রিকা ভ্রমণের গল্প বলতে শুরু করল বন্ধুদের। পরদিন রঘুনাথ ক্লাসে এসেই ঘোষণা করল, “আফ্রিকা না ছাই, মধুর সেজমামা সুন্দরবনের গোসাবা থেকে বদলি হয়ে কলকাতায় এসেছেন। আমার ছোট কাকার এক বন্ধু তো ওই অপিসেই কাজ করেন।” এরপর কি আর মধুর পক্ষে চুপ করে বসে থাকা সম্ভব? তবে সেদিন শুধু চুলের ওপর দিয়ে মারপিট শেষ হয়েছিল। এই হল রঘুনাথ। রঘুনাথকে তার বন্ধুরা হাড়ে হাড়ে চিনে ফেলেছে। কিন্তু পরশু দিন একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটে গেল।

    সেদিন রঘুনাথ ছুটির পর লাইব্রেরিতে বসে টিনটিনের নতুন বইটা পড়ছিল। নতুন বই অন্য কেউ আগে পড়ে নেবে একথা সে কল্পনাও করতে পারে না। যখন সে ইস্কুল ছেড়ে বের হচ্ছে, তখন সব ফাঁকা। সন্ধে হয় হয়। ঠাণ্ডা বাড়ছে। হনহনিয়ে ইস্কুল গেটের মুখে এসে দেখে দারোয়ানের বেঞ্চিতে জবুথবু হয়ে বসে আছে তাদেরই ক্লাসের কল্যাণ। আরে, এখনও কল্যাণ কেন? থমকে দাঁড়ায় রঘুনাথ। তার হিংসুটে মন খচখচ করে ওঠে। ব্যাপারটা কী? “কি রে কল্যাণ? কী হয়েছে?” জিগ্যেস করে সে।

    কল্যাণ প্ৰায় কাঁপতে কাঁপতেই বলে “জ্বর এসেছে রে। উঠতে পারছি না।” হিংসে করবার মত কিছু ঘটেনি দেখে যেন নিশ্চিন্ত হল রঘুনাথ। বলল, “তা বসে আছিস কেন? গায়ে তো দেখছি সোয়েটারও নেই। একটা রিকশা ডেকে বাড়ি চলে যা।”

    কল্যাণ কাঁচুমাচু মুখে জানাল, “রিকশ ভাড়া নেই।” কথা শেষ হলে রঘুনাথ চলেই যাচ্ছিল। হঠাৎ কী ভেবে ফিরে এল সে। নিজের পকেট থেকে বের করল দুটো টাকা। চারপাশ ভাল করে দেখে জোর করে সেগুলো ধরিয়ে দিল কল্যাণের হাতে। তারপর ফিসফিস করে বলল, “কাউকে বলিস না যেন। সব যা হিংসুটে। তোকে সাহায্য করে বাহাদুরিটা নিতে পারল না বলে হিংসে করবে।” কল্যাণ অবাক।