Author: কাজী নজরুল ইসলাম

  • আশান্বিতা

    আশান্বিতা

    আশান্বিতা

    আবার কখন আসবে ফিরে সেই আশাতে জাগবে রাত,

    হয়তো সে কোন নিশুত রাতে ডাকবে এসে অকস্মাৎ

    সেই আশাতে জাগব রাত।

    যতই কেন বেড়াও ঘুরে

    বরণ-বনের গহন জুড়ে

    দূর সুদূরে,

    কাঁদলে আমি আসবে ছুটে, রইতে তুমি নারবে নাথ,

    সেই আশাতে জাগব রাত।

      

    কপট! তোমার শপথ-পাহাড় বিন্ধ্যসম হোক না সে,

    ঝড়ের মুখে খড়ের মতন উড়বে তা মোর নিশ্বাসে।

    একটি ছোট্ট নিশ্বাসে।

    রাত্রি জেগে কাঁদছি আমি

    শুনবে যখন, হে মোর স্বামী,

    সুদূরগামী!

    আগল ভেঙে আসবে পাগল, চুমবে সজল নয়ন-পাত,

    সেই আশাতে জাগব রাত।

      

    জানি সখা, আমার চোখের একটি বিন্দু অশ্রুজল,

    নিববে তাতেই তোমার বুকের অগ্নি-সিন্ধু নীল গরল,

    আমার চোখের অশ্রুজল।

    তোমার আদর-সোহাগিনি

    তাই তো কাঁদায় নিশিদিনই

    এ অধীনী,

    ভুলবে জানি তোমার রানি গরবিনির সব আঘাত।

    সেই আশাতে জাগব রাত।

      

    আসবে আবার পদ্মানদী, দুলবে তরি ঢেউ-দোলায়,

    তেমনি করে দুলব আমি তোমার বুকের পরকোলায়।

    দুলবে তরি ঢেউ-দোলায়।

    পাগলি নদী উঠবে ক্ষেপে,

    তোমায় তখন ধরব চেপে,

    বক্ষ ব্যেপে,

    মরণ-ভয়কে ভয় কি তখন, জড়িয়ে কণ্ঠ থাকবে হাত।

    সেই আশাতে জাগব রাত।

    পোড়া চোখের জল ফুরায় না, কেমন করে আসবে ঘুম?

    মনে পড়ে শুধু তোমার পাতাল-গভীর মাতাল চুম,

    কেমন করে আসবে ঘুম?

    আজ যে আমার নিশীথ জুড়ে

    একলা থাকার কান্না ঝুরে

    হুতাশ সুরে,

    পোবের হাওয়ায় কাঁদবে সে সুর, আসবে পছিম হাওয়ার সাথ!

    সেই আশাতে জাগব রাত।

      

    বিজলি-শিখার প্রদীপ জ্বেলে ভাদর রাতের বাদল মেঘ,

    দিগ্‌বিদিকে খুঁজছে তোমায় ডাকছে কেঁদে বজ্র-বেগ –

    দিগ্‌বিদিকে খুঁজছে মেঘ।

    তোমার আশায় ওই আশা-দীপ

    জ্বালিয়েছে আজ দিক ভরে নীপ,

    হে রাজ-পথিক

    আজ না আসো, এসো যেদিন দীপ নিবাবে ঝঞ্ঝাবাত।

    সেই আশাতে জাগব রাত।

  • পিছু-ডাক

    পিছু-ডাক

    পিছু-ডাক

    সখি!
    নতুন ঘরে গিয়ে আমায় পড়বে কি আর মনে?
      
    সেথা তোমার নতুন পূজা নতুন আযোজনে!
      
          প্রথম দেখা তোমায় আমায়
      
          যে গৃহ-ছায় যে আঙিনায়,
      
          যেথায় প্রতি ধূলি-কণায়,
      
                    লতাপাতার সনে –
      
    নিত্য চেনার বিত্ত রাজে চিত্ত-আরাধনে,
      
    শূন্য সে ঘর শূন্য এখন কাঁদছে নিরজনে।

      

    সেথা
    তুমি যখন ভুলতে আমায়, আসত অনেক কেহ,
    তখন
    আমার হয়ে অভিমানে কাঁদত যে ঐ গেহ।
      
              যেদিক পানে চাইতে সেথা
      
              বাজতে আমার স্মৃতির ব্যথা,
      
                        নতুন আলাপনে।
      
    আমিই শুধু হারিয়ে গেলেম হারিয়ে-যাওয়ার বনে॥

      

    আমার
    এত দিনের দূর ছিল না সত্যিকারের দুর,
    ওগো
    আমার সুদুর করতে নিকট ঐ পুরাতন পুর।
      
          এখন তোমার নতুন বাঁধন
      
          নতুন হাসি, নতুন কাঁদন,
      
          নতুন সাধন, গানের মাতন
      
                    নতুন আবাহনে।
      
    আমারই সুর হারিয়ে গেল সুদুর পুরাতন।

      

    সখি!
    আমার আশাই দুরাশা আজ, তোমার বিধির বর,
    আজ
    মোর সমাধির বুকে তোমার উঠবে বাসর-ঘর!
      
          শূণ্য ভরে শুনতে পেনু
      
          ধেনু-চরা বনের বেণু-
      
           হারিয়ে গেনু হারিয়ে গেনু
      
                        অস্ত–দিগঙ্গনে।
      
    বিদায় সখি, খেলা-শেষ এই বেলা-শেষের খনে!
      
    এখন তুমি নতুন মানুষ নতুন গৃহকোণে।

      

  • মুখরা

    মুখরা

    মুখরা

    আমার
     কাঁচা মনে রং ধরেচে আজ,
      
    ক্ষমা করো মা গো আমার আর কি সাজে লাজ?
    আমার
     কাঁচা মনে রং ধরেচে আজ,

      

      
          আমার ভুবন উঠচে রেঙে
      
          তাঁর পরশের সোহাগ লেগে,
      
          ঘুমিয়ে ছিনু দেখনু জেগে মা,
    আমায়
    জড়িয়ে বুকে দাঁড়িয়ে আছেন নিখিল হৃদয়-রাজ।
      
    ক্ষমা করো মা গো আমার আর কি সাজে লাজ?

      

    আমায়
    দিনের আলোয় নিলেন বুকে আপনি লজ্জাহারী!
      
    মা গো, আমি আর কি মিথ্যা লজ্জা করে পারি?
    আমায়
    দিনের আলোয় নিলেন বুকে আপনি লজ্জাহারী।
      
          জগৎ যারে পায় না সেধে
      
          সেই সে যখন সাধছে কেঁদে
      
          আমার চরণ বক্ষে বেঁধে মা,
    আমি
    বাঁধব না চুল, এই ভালো মোর ভিখারিনির সাজ।
      
    ক্ষমা করো মা গো আমার আর কি সাজে লাজ?

      

    আমার
    কীসের সজ্জা, কীসের লজ্জা, কীসের পরানপণ?
    মা গো
    বক্ষে আমার বিশ্বলোকের চির-চাওয়া ধন,
    আমার
    কীসের সজ্জা, কীসের লজ্জা, কীসের পরানপণ?

      

      
          বিশ্ব-ভুবন যার পদছায়
      
          সেই এসে হায় মোর পদ চায়,
    আমার
    সুখ-আবেগে বুক ফেটে যায় মা,
    আজ
    লাজ ভুলেছি, সাজ ভুলেছি, ভুলেছি সব কাজ।
      
    ক্ষমা করো মা গো আমার আর কি সাজে লাজ?

      

  • সাধের ভিখারিণী

    সাধের ভিখারিণী

    সাধের ভিখারিণী

    তুমি
    মলিন বাসে থাক যখন, সবার চেয়ে মানায়!
    তুমি
    আমার তরে ভিখারিনি, সেই কথা সে জানায়!
      
          জানি প্রিয়ে জানি জানি,
      
          তুমি হতে রাজার রানি,
      
          খাটত দাসী, বাজত বাঁশি
      
              তোমার বালাখানায়
    তুমি
    সাধ করে আজ ভিখারিনি, সেই কথা সে জানায়।

      

    দেবী!
    তুমি সতী অন্নপূর্ণা, নিখিল তোমার ঋণী,
    শুধু
    ভিখারিকে ভালোবেসে সাজলে ভিখারিনি
      
          সব ত্যজি মোর হলে সাথি,
      
          আমার আশায় জাগছ রাতি,
      
          তোমার পূজা বাজে আমার
      
              হিয়ার কানায় কানায়!
    তুমি
    সাধ করে আজ ভিখারিনি, সেই কথা সে জানায়।

      

  • কবি-রাণী

    কবি-রাণী

    কবি-রাণী

    তুমি আমায় ভালোবাসো তাই তো আমি কবি।

    আমার এ রূপ-সে যে তোমায় ভালোবাসার ছবি॥

    আপন জেনে হাত বাড়ালো-

    আকাশ বাতাস প্রভাত-আলো,

    বিদায়-বেলার সন্ধ্যা-তারা

    পুবের অরুণ রবি,—

    তুমি ভালোবাস ব’লে ভালোবাসে সবি?

      

    আমার আমি লুকিয়েছিল তোমার ভালোবাসায়,

    আমার আশা বাইরে এল তোমার হঠাৎ আসায়।

    তুমিই আমার মাঝে আসি

    অসিতে মোর বাজাও বাঁশি,

    আমার পূজার যা আয়োজন

    তোমার প্রাণের হবি।

    আমার বাণী জয়মাল্য, রাণি! তোমার সবই।

      

    তুমি আমায় ভালোবাস তাই তো আমি কবি।

    আমার এ রূপ-সে যে তোমার ভালোবাসার ছবি।

      

  • আশা

    আশা

    আশা

    আমি
    শ্রান্ত হয়ে আসব যখন পড়ব দোরে টলে,
    আমার
    লুটিয়ে-পড়া দেহ তখন ধরবে কি ওই কোলে?
      
          বাড়িয়ে বাহু আসবে ছুটে?
      
          ধরবে চেপে পরানপুটে?
      
          বুকে রেখে চুমবে কি মুখ
      
                নয়নজলে গলে?
    আমি
    শ্রান্ত হয়ে আসব যখন পড়ব দোরে টলে!

      

    তুমি
    এতদিন যা দুখ দিয়েছ হেনে অবহলা,
    তা
    ভুলবে না কি যুগের পরে ঘরে-ফেরার বেলা?
      
          বলো বলো জীবন-স্বামী
      
          সেদিনও কি ফিরব আমি
      
          অন্তকালেও ঠাঁই পাব না
      
                ওই চরণের তলে?
    আমি
    শ্রান্ত হয়ে আসব যখন পড়ব দোরে টলে!

      

  • শেষ প্রার্থনা

    শেষ প্রার্থনা

    শেষ প্রার্থনা

    আজ
    চোখের জলে প্রার্থনা মোর শেষ বরষের শেষে
      
    এমনি কাটে আসছে-জনম তোমায় ভালোবেসে।
      
          এমনি আদর, এমনি হেলা
      
          মান-অভিমান এমনি খেলা,
      
          এমনি ব্যথার বিদায়-বেলা
      
                এমনি চুমু হেসে,
    যেন
    খণ্ডমিলন পূর্ণ করে নতুন জীবন এসে!
    এবার
    ব্যর্থ আমার আশা যেন সকল প্রেমে মেশে!
    আজ
    চোখের জলে প্রার্থনা মোর শেষ বরষের শেষে!

      

    যেন
    আর না কাঁদায় দ্বন্দ্ব-বিরোধ, হে মোর জীবন-স্বামী!
    এবার
    এক হয়ে যাক প্রেমে তোমার তুমি আমার আমি!
      
          আপন সুখকে বড়ো করে
      
          যে দুখ পেলাম জীবন ভরে,
      
          এবার তোমার চরণ ভরে,
      
                নয়নজলে ভেসে
    যেন
    পূর্ণ করে তোমায় জিনে সব-হারানোর দেশে,
    মোর
    মরণ-জয়ের বরণমালা পরাই তোমার কেশে।
    আজ
    চোখের জলে প্রার্থনা মোর শেষ-বিদায়ের শেষে।

      

  • সে যে চাতকই জানে

    সে যে চাতকই জানে

    সে যে চাতকই জানে

    সে যে
    চাতকই জানে তার মেঘ এত কী,
    যাচে
    ঘন ঘন বরিষন কেন কেতকী,
    চাঁদে
    চকোরই চেনে আর চেনে কুমুদী,
    জানে
    প্রাণ কেন প্রিয়ে প্রিয়তম চুমু দি!

      

  • বিষের বাঁশী

    বিষের বাঁশী

    বিষের বাঁশী

    ‘বিষের বাঁশী’ কাজী নজরুল ইসলাম রচিত একটি কাব্যগ্রন্থ। এটি ১৩৩১ বঙ্গাব্দের ১৬ই শ্রাবণ—আগষ্ট ১৯২৪ খ্রিষ্টাব্দে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। কবি নিজেই হুগলি থেকে ‘বিষের বাঁশী’ প্রকাশ করেন। নামপৃষ্ঠায় এর মুদ্রণসংখ্যা ২২০০ বলে উল্লিখিত ছিল এবং লেখা ছিল, “গ্রন্থকার কর্তৃক সর্ব্বস্বত্ব সংরক্ষিত”। গ্রন্থের পৃষ্ঠা সংখ্যা ছিল ৪+৬০, মূল্য এক টাকা ছয় আনা এবং “সোল এজেণ্ট ও প্রাপ্তিস্থান— ডি. এম. লাইব্রেরি, ৬১ কর্ণওয়ালিশ ষ্ট্রিট, কলিকাতা।” এই গ্রন্থে ২৭টি কবিতা রয়েছে। কাজী নজরুল ইসলামের বাজেয়াপ্ত ৫টি গ্রন্থের মধ্যে এটি অন্যতম। প্রকাশের অব্যবহিত পরে তৎকালীন ভারত সরকার ২২ অক্টোবর ১৯২৪ সালে ‘বিষের বাঁশী’ নিষিদ্ধ ঘোষণা করে এবং এ নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহৃত হয় ২৭ এপ্রিল ১৯৪৫ খ্রিষ্টাব্দে।

    ‘বিষের বাঁশী’র দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয় নূর লাইব্রেরি, ১২/১ সারেঙ্গ লেন, তালতলা, কলিকাতা থেকে ১৩৫২ বঙ্গাব্দের শ্রাবণে। বাংলা একাডেমি ‘নজরুল রচনাবলী’তে আবদুল কাদির এই সংস্করণের পাঠ অনুসরণ করেছিলেন। রচনাবলীর নতুন সংস্করণে ‘বিষের বাঁশী’র প্রথম দুই সংস্করণের পাঠ মিলিয়ে প্রয়োজনীয় সংশোধন করা হয়েছে।

    প্রথম সংস্করণে উৎসর্গপত্রটি ছিল গ্রন্থের শুরুতে, দ্বিতীয় সংস্করণে তা কৈফিয়তের পরে আনা হয়। প্রথম সংস্করণের ‘জাগৃহী’ কবিতার শিরোনাম সংশোধিত হয়ে দ্বিতীয় সংস্করণে হয় ‘জাগৃহি’—বাংলা একাডেমি শেষেরটিই গ্রহণ করেছে। কৈফিয়তে মূলে ডি. এম. লাইব্রেরির ‘গোপাল-দা’ প্রসঙ্গে যে বাক্যটি ছিল, তা দ্বিতীয় সংস্করণে বর্জিত হয়েছে।

    ‘উৎসর্গ’ কবিতাটি মিসেস্ এম. রহমান [মুসাম্মাৎ মাসুদা খাতুন : জন্ম ১৮৮৪ খ্রি. মৃত্যু ২০শে ডিসেম্বর ১৯২৬ খ্রি.] সাহেবার উদ্দেশে রচিত। মিসেস্ এম. রহমান এদেশে নারী-অধিকার-আন্দোলনের একজন অগ্রনায়িকা ছিলেন। তিনি বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য-পত্রিকা, সওগাত, সহচর, সাম্যবাদী, ধূমকেতু, লাঙল, অভিযান প্রভৃতি সাময়িকপত্রে বহু প্রবন্ধ ও ছোটগল্প লেখেন। তাঁর ‘মা ও মেয়ে’ নাম অসমাপ্ত উপন্যাসখানি ১৩২৯ আষাঢ় হতে ধারাবাহিকভাবে মাসিক ‘সহচর’ পত্রে প্রকাশিত হয়। তাঁর ‘চানাচুর’ পুস্তকের ‘আমাদের দাবী’, ‘পর্দা বনাম প্রবঞ্চনা’, ‘নারীর বন্ধন’ প্রভৃতি প্রবন্ধগুলি তৎকালে পাঠকমহলে আলোড়নের সৃষ্টি করেছিল।

    ‘ফাতেমা-ই-দোয়াজদহম : আবির্ভাব’ ১৩২৭ বঙ্গাব্দের অগ্রহায়ণে এবং ‘ফাতেহা-ই-দোয়াজদহম : তিরোভাব’ ১৩২৮ বঙ্গাব্দের অগ্রহায়ণে ‘মোসলেম ভারত’ পত্রিকায় বের হয়।

    ‘জাগৃহি’ ১৩২৯ বঙ্গাব্দের ৩০শে শ্রাবণ ১ম বর্ষের দ্বিতীয় সংখ্যক ‘ধূমকেতু’তে ‘জাগরণী’ শিরোনামে প্রকাশিত হয়।

    ‘তুর্য-নিনাদ’ ১৩২৯ বঙ্গাব্দের বৈশাখে ১ম বর্ষের ১ম সংখ্যক মাসিক ‘বসুমতী’তে বের হয়।

    ‘বোধন’ ১৩২৭ বঙ্গাব্দের জ্যৈষ্ঠের ‘মোসলেম ভারতে’ প্রকাশিত হয়। শিরোনামের নীচে বন্ধনীর মধ্যে লেখা ছিল : “সূর—যেদিন সুনীল জলধি হইতে উঠিলে জননী ভারতবর্ষ।” তার পাদটীকায় লেখা ছিল : “হাফিজের ‘য়ুসোফে গুম্ গশ্‌তা বাজ্‌ আয়েদ্‌ ব-কিনান গম্ মখোর’ গজল অবলম্বনে।” কবিতাটির প্রথম (এবং পরবর্তী চারটি স্তবকের প্রত্যকটির শেষে পুনরাবৃত্ত) শ্লোকটি ছিল এরূপ—

    দুঃখ কি ভাই! হারানো য়ুসোফ কিনানে আবার আসিবে ফিরে;
    দলিত শুষ্ক এ মরুভু পুনঃ হয়ে গুলিস্তাঁ হাসিবে ধীরে।

    ‘উদ্বোধন’ গানটি ১৩২৭ বঙ্গাব্দের বৈশাখে ২য় বর্ষের ৬ষ্ঠ সংখ্যক ‘সওগাতে’ ছাপা হয়েছিল।

    ‘মরণ-বরণ’ গানটি ১৩২৮ বঙ্গাব্দের কার্তিকে ৪র্থ বর্ষের তৃতীয় সংখ্যক ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য-পত্রিকা’য় প্রকাশিত হয়েছিল।

    ‘বন্দী-বন্দনা’ গানটি ১৩২৮ বঙ্গাব্দের মাঘে ৮ম বর্ষের তৃতীয় সংখ্যক ‘নারায়ণে’ এবং ৪র্থ বর্ষের চতুর্থ সংখ্যক ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য-পত্রিকা’য় প্রকাশিত হয়েছিল। বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য-পত্রিকায় রচনা-স্থান ছাপা আছে : “কান্দিরপাড়, কুমিল্লা।” ‘নারায়ণে’ শিরোনামের নীচে লেখা ছিল ‘মল্লার—তেওরা’। তাতে শেষাংশ ছিল এইরূপ—

    আজি
    ধ্বনিছে দিগ্বধু শঙ্গ দিকে দিকে,
     
    গগনে কা’রা যেন চাঁহিয়া অনিমিখে
    ভারত হোমশিখা জ্বলিল জয়টিকা
     
    পরাতে ও কপালে।
    সে
    কারা মুক্তি-কারা যেখানে ভৈরব-রুদ্র-শিখা জ্বলে।
     
    কোরাস; জয় হে বন্ধন-মৃত্যু শঙ্কাজয়ী।
     
    মুক্তি-কামী জয়।
     
    স্বাধীন-চিত জয়। জয় হে॥

    ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য-পত্রিকা’য় পঞ্চম স্তবকের শেষ চরণটি ছিল এরূপ—

    ‘সে কারা নহে কারা যেখানে ভগবান-রুদ্র-শিখা জ্বলে॥’

    ‘বন্দনা-গান’ ১৩২৮ বঙ্গাব্দের অগ্রহায়ণের ‘সাধনা’ পত্রিকায় ‘বিজয়-গান’ শিরোনামে প্রকাশিত হয়। রচনা-স্থান : ‘কান্দিরপাড়, কুমিল্লা।’

    ‘শিকল-পরার গান’ ১৩৩১ বঙ্গাব্দের জ্যৈষ্ঠের ‘ভারতী’তে প্রকাশিত হয়। শিরোনামের নীচে বন্ধনীর মধ্যে লেখা ছিল : ‘খাম্বাজ—দাদ্‌রা’। তাতে কবির কৃত ‘স্বরলিপি’ও ছাপা হয়েছিল।

    ‘চরকার গান’ ১৩৩১ বঙ্গাব্দের বৈশাখের ‘ভারতী’তে ছাপা হয়। বন্ধনীর মধ্যে লেখা ছিল : ‘খাম্বাজ—কীর্তন—দাদ্‌রা’। সে সংখ্যাতে ‘চরকার গানে’র স্বরলিপিও ছাপা হয়েছিল। ১৯২৫ খ্রিষ্টাব্দে ফরিদপুরে অনুষ্ঠিত কংগ্রেসের প্রাদেশিক সম্মেলনে মহাত্মা গান্ধীর উপস্থিতিতে নজরুল ইসলাম ‘চরকার গান’ গেয়েছিলেন।

    ‘জাতের বজ্জাতি’ গানটি ‘জাত-জালিয়াত’ শিরোনামে ‘বিজলী’তে ছাপা হয়। পাদটীকায় লেখা ছিল : ‘মাদারীপুর শান্তি-সেনা চারণ-দলের জন্য লিখিত অপ্রকাশিত নাটক থেকে।’ ‘বিজলী’ হতে গানটি ১৩৩০ বঙ্গাব্দের শ্রাবণের ‘উপাসনা’য় ‘উদ্ধৃত’ হয়েছিল।১৩৩০ বঙ্গাব্দের শ্রাবণে ষষ্ঠ বর্ষের দ্বিতীয় সংখ্যক ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য-পত্রিকা’য়ও গানটি ‘জাত-জালিয়াত’ শিরোনামে প্রকাশিত হয়েছিল।

    ‘বিজয়-গান’ ১৩২৮ শ্রাবণের ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য-পত্রিকা’য় প্রকাশিত হয়। রচনা-স্থান : ‘কান্দিরপাড়, কুমিল্লা’।

    ‘পাগল পথিক’ ১৩২৮ বঙ্গাব্দের ভাদ্রের ‘মোসলেম ভারতে’ ‘গান’ শিরোনামে বের হয়েছিল। শিরোনামের নীচে বন্ধনীর মধ্যে লেখা ছিল : ‘সুর—মেঘ-ছায়ানট; তাল—দাদ্‌রা’।

    ‘বিদ্রোহীর বাণী’ ১৩৩১ বঙ্গাব্দের বৈশাখের ‘ভারতী’তে ‘এবার তোরা সত্য বল্’ শিরোনামে প্রকাশিত হয়েছিল।

    ‘ঝড়’ [পশ্চিম তরঙ্গ] ১৩৩১ বঙ্গাব্দের আষাঢ়ে দ্বিতীয় বর্ষ তৃতীয় সংখ্যক ‘কল্লোলে’ প্রকাশিত হয়েছিল।

  • উৎসর্গ

    উৎসর্গ

    উৎসর্গ

    বাংলার অগ্নি-নাগিনি মেয়ে মুসলিম-মহিলা-কুল-গৌরব

    আমার জগজ্জননী-স্বরূপা মা

    মিসেস এম. রহমান সাহেবার

    পবিত্র চরণারবিন্দে –

    এমনই প্লাবন-দুন্দুভি-বাজা ব্যাকুল শ্রাবণ মাস–

    সর্বনাশের ঝান্ডা দুলায়ে বিদ্রোহ-রাঙা-বাস

    ছুটিতে আছিনু মাভৈঃ-মন্ত্র ঘোষি অভয়কর,

    রণ-বিপ্লব-রক্ত-অশ্ব কশাঘাত-জর্জর!

    সহসা থমকি দাঁড়ানু আমার সর্পিল-পথ-বাঁকে,

    ওগো নাগমাতা, বিষ-জর্জর তব গরজন-ডাকে!

    কোথা সে অন্ধ অতল পাতাল-বন্ধ গুহার তলে,

    নির্জিত তব ফণা-নিঙড়ানো গরলের ধারা গলে;

    পাতাল-প্রাচীর চিরিয়া তোমার জ্বালা-ক্রন্দন-চূর

    আলোর জগতে এসে বাজে যেন বিষ-মদ-চিক্কুর!

    আঁধার-পীড়িত রোষ-দোদুল সে তব ফণা-ছায়া-দোল

    হানিছে গৃহীরে অশুভ শঙ্কা, কাঁপে ভয়ে সুখ-কোল।

    ধূমকেতু-ধ্বজ বিপ্লব-রথ সম্ভ্রমে অচপল,

    নোয়াইল শির শ্রদ্ধা-প্রণত রথের অশ্বদল!

    ধূমকেতু-ধূম-গহ্বরে যত সাগ্নিক শিশু-ফণী

    উল্লাসে ‘জয় জয় নাগমাতা’ হাঁকিল জয়-ধ্বনি!

    বন্দিল, উর নাগ-নন্দিনী ভেদিয়া পাতাল-তল!

    দুলিল গগনে অশুভ-অগ্নি পতাকা জ্বালা-উজল!

    তারপর মা গো কোথা গেলে তুমি, আমি কোথা হনু হারা,

    জাগিয়া দেখিনু, আমারে গ্রাসিয়া রাহু রাক্ষস-কারা!

    শৃঙ্খলিতা সে জননীর ব্যথা বাজিয়া এ ক্ষীণ বুকে

    অগ্নি হয়ে মা জ্বলেছিল খুন, বিষ উঠেছিল মুখে,

    শৃঙ্খল-হানা অত্যাচারীর বুকে বাজপাখি সম

    পড়িয়া তাহারে ছিঁড়িতে চেয়েছি হিংসা-নখরে মম,—

    সে আক্রমণ ব্যর্থ কখন করেছে কারার ফাঁদ,

    বন্দিনী দেশ-জননীর সাথে বেঁধেছে আমারে বাঁধ।

    হাতে পায়ে কটি-গর্দানে মোর বাজে শত শৃঙ্খল,

    অনাহারে তনু ক্ষুধা-বিশীর্ণ, তৃষায় মেলে না জল,

    কত যুগ যেন এক অঞ্জলি পাইনিকো আলো বায়ু,

    তারই মাঝে আসি রক্ষী-দানব বিদ্যুতে বেঁধে স্নায়ু –

    এত যন্ত্রণা তবু সব যেন বুকে ক্ষীর হয়ে ওঠে,

    শত্রুর হানা কণ্টক-ক্ষত প্রাণে ফুল হয়ে ফোটে!–

    এরই মাঝে তুমি এলে নাগমাতা পাতাল-বন্ধ টুটি

    অচেতন মম ক্ষত তনু পড়ে তব ফণা-তলে লুটি!

    তোমার মমতা-মানিক-আলোকে চিনিনু তোমারে মাতা,

    তুমি লাঞ্ছিতা বিশ্বজননী! তোমার আঁচল পাতা

    নিখিল দুঃখী নিপীড়িত তরে; বিষ শুধু তোমা দহে

    ফণা তব মা গো পীড়িত নিখিল ধরণির ভার বহে! –

    আমারে যে তুমি বাসিয়াছ ভালো ধরেছ অভয়-ক্রোড়ে,

    সপ্ত রাজার রাজৈশ্বর্য মানিক দিয়াছ মোরে,

    নহে তার তরে, – সব সন্তানে তুমি যে বেসেছ ভালো,

    তোমার মানিক সকলের মুখে দেয় যে সমান আলো,

    শুধু মাতা নহ, জগন্মাতার আসনে বসেছ তুমি,–

    সেই গৌরবে জননী আমার, তোমার চরণ চুমি!

    হুগলি

    ১৬ শ্রাবণ, ১৩৩১

    তোমার নাগ-শিশু

    নজরুল ইসলাম

  • কৈফিয়ত

    কৈফিয়ত

    কৈফিয়ত

    ‘অগ্নিবীণা’ দ্বিতীয় খণ্ড নাম দিয়ে তাতে যেসব কবিতা ও গান দেব বলে এতকাল ধরে বিজ্ঞাপন দিচ্ছিলাম, সেইসব কবিতা ও গান দিয়ে এই ‘বিষের বাঁশি’ প্রকাশ করলাম। নানা কারণে ‘অগ্নিবীণা’ দ্বিতীয় খণ্ড নাম বদলে ‘বিষের বাঁশি’ নামকরণ করলাম। বিশেষ কারণে কয়েকটি কবিতা ও গান বাদ দিতে বাধ্য হলাম। কারণ ‘আইন’-রূপ ‘আয়ান ঘোষ’ যতক্ষণ তার বাঁশ উঁচিয়ে আছে, ততক্ষণ বাঁশিতে তথাকথিত ‘বিদ্রোহ’-রাধার নাম না নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। ওই ঘোষের পো-র বাঁশ বাঁশির চেয়ে অনেক শক্ত। বাঁশে ও বাঁশিতে বাঁশাবাঁশি লাগলে বাঁশিরই ভেঙে যাওয়ার সম্ভাবনা বেশি। কেননা, বাঁশি হচ্ছে সুরের, আর বাঁশ হচ্ছে অসুরের।

    এই বাঁশি তৈরির জন্য আমার অনেক বন্ধু নিঃস্বার্থভাবে অনেক সাহায্য করেছেন। তাঁরা সাহায্য না করলে এ বাঁশির গান আমার মনের বেণুবনেই গুমরে মরত। এঁরা সকলেই নিঃস্বার্থ নিষ্কলুষ প্রাণ-সুন্দর আনন্দ-পুরুষ। আমার নিখরচা কৃতজ্ঞতা বা ধন্যবাদ পাওয়ার লোভে এঁরা সাহায্য করেননি। এঁরা সকলেই জানেন, ওসব বিষয়ে আমি একেবারে অমানুষ বা পাষাণ। এঁরা যা করেছেন তা স্রেফ আনন্দের প্রেরণায় ও আমায় ভালোবেসে। সুতরাং আমি ভিক্ষাপ্রাপ্ত ভিক্ষুকের মতো তাঁদের কাছে চিরচলিত কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে তাঁদের আনন্দকে খর্ব ও ভালোবাসাকে অস্বীকার করব না। এঁরা যদি সাহায্য হিসাবে আমায় সাহায্য করতে আসতেন তাহলে আমি এঁদের কারুর সাহায্য নিতাম না। যাঁরা সাহায্য করে মনে মনে প্রতিদানের দাবি পোষণ করে আমায় দায়ী করে রাখেন, তাঁদের সাহায্য নিয়ে আমি নিজেকে অবমানিত করতে নারাজ। এতটুকু শ্রদ্ধা আমার নিজের উপর আছে। স্রেফ তাঁদের নাম ও কে কোন মালমশলা জুগিয়েছেন তাই জানাচ্ছি – নিজেকে হালকা করার আত্মপ্রসাদের লোভে।

    এ ‘বিষের বাঁশি’র বিষ জুগিয়েছেন আমার নিপীড়িতা দেশমাতা, আর আমার ওপর বিধাতার সকল রকম আঘাতের অত্যাচার।

    বাঁশ জুগিয়েছেন সুলেখক ঔপন্যাসিক বন্ধু সনৎকুমার সেন। এ-বাঁশকে বাঁশি করে তুলেছেন – ‘বাণী’ যন্ত্র দিয়ে ওই যন্ত্রাধিকারী বিখ্যাত স্বদেশ-সেবক আমার অগ্রজ-প্রতিম পরম শ্রদ্ধাস্পদ ললিতদা ও পাঁচুদা। তাঁদের যন্ত্রের সাহায্য না পেলে এ-বাঁশি শুধু বাঁশই রয়ে যেত। এই বাঁশি গায়ের অদ্ভুত বিচিত্র নকশাটি কেটে দিয়েছেন প্রথিত-যশা কবি-শিল্পী – আমার ঝড়ের রাতের বন্ধু – ‘কল্লোল’-সম্পাদক দীনেশরঞ্জন দাশ। এই সবের তত্ত্বাবধানের ভার নিয়েছিলেন দেশের-কাজে-উৎসর্গ-প্রাণ আমার পরম শ্রদ্ধার বন্ধু মৌলবি মঈনউদ্দিন হোসেন সাহেব বি. এ. (নূর লাইব্রেরি)। বলতে ভুলে গিয়েছিলাম, ডি. এম. লাইব্রেরির গোপালদা এই গান শোনাবার জন্য ঢোল শোহরৎ দেওয়ার ভার নিয়েছেন।

    এত বন্ধুর এত চেষ্টা সত্ত্বেও অনেক দোষত্রুটি রয়ে গেল আমার অবকাশ-হীনতা ও অভিমন্যুর মতো সপ্তরথী-পরিবেষ্টিত ক্ষতবিক্ষত অবস্থার জন্য। যাঁরা আমায় জানেন, তাঁরা জানেন, আমার বিনা কাজের হট্টমন্দিরে অবকাশের কীরকম অভাব এবং জীবনের কতখানি শক্তি ব্যয় করতে হয় দশ দিকের দশ আক্রমণ ব্যর্থ করবার জন্য। যদি অবকাশ ও শান্তি পাই, তাহলে দ্বিতীয় সংস্করণে এর দোষত্রুটি নিরাকরণের চেষ্টা করব। ইতি –

    হুগলি

    ১৬ শ্রাবণ, ১৩৩১

    নজরুল ইসলাম

  • আয় রে আবার আমার চির-তিক্ত প্রাণ!

    আয় রে আবার আমার চির-তিক্ত প্রাণ!

    আয় রে আবার আমার চির-তিক্ত প্রাণ!

    আয় রে আবার আমার চির-তিক্ত প্রাণ!

    গাইবি আবার কণ্ঠছেঁড়া বিষ-অভিশাপ-সিক্ত গান।

    আয় রে চির-তিক্ত প্রাণ!

      

    আয় রে আমার বাঁধন-ভাঙার তীব্র সুখ

    জড়িয়ে হাতে কালকেউটে গোখরো নাগের

    পীত চাবুক!

    হাতের সুখে জ্বালিয়ে দে তোর সুখের বাসা ফুল-বাগান!

    আয় রে চির-তিক্ত প্রাণ!

      

    বুঝিসনি কি কাঁদায় তোরে তোরই প্রাণের সন্ন্যাসী!

    তোর অভিমান হল শেষে তোরই গলার নীল ফাঁসি!

    (তোর) হাসির বাঁশি আনলে বুকে যক্ষ্মা-রুগির রক্ত-বান,

    আয় রে চির-তিক্ত প্রাণ!

      

    ফানুস-ফাঁপা মানুষ দেখে, হায় অবোধ

    ছুটে এলি ছায়ার আশায়,

    মাথায় তেমনি জ্বলছে রোদ।

    ফাঁকির ফানুস ছাই হল তোর,

    খুঁজিস এখন রোদ-শ্মশান!

    আয় রে চির-তিক্ত প্রাণ!

      

    তুই যে আগুন, জল-ধারা চাস কার কাছে?

    বাষ্প হয়ে যায় উড়ে জল সাগর-শোষা তোর আঁচে।

    ফুলের মালার হুলের জ্বালায় জ্বলবি কত অগ্নি-ম্লান!

    আয় রে চির-তিক্ত প্রাণ!

      

    অগ্নি-ফণী! বিষ-রসানো জিহ্বা দিয়ে দিস চুমা,

    পাহাড়-ভাঙা জাপটানি তোর – ভাবিস সোহাগ-সুখ-ছোঁওয়া!

    মৃত্যুও যে সইতে নারে তোর সোহাগের মৃত্যু টান!

    আয় রে চির-তিক্ত প্রাণ!

    সুখের লালস শেষ করে দে, স্বার্থপর!

    কাল-শ্মশানের প্রেত-আলেয়া! তুই কোথা বল

    বাঁধবি ঘর?

    ঘর-পোড়ানো ত্রাস-হানা তুই সর্বনাশের লাল-নিশান!

    আয় রে চির-তিক্ত প্রাণ!

      

    তোর তরে নয় শীতল ছায়া,

    পান্থ-তরুর প্রেম-আসার,

    তুই যে ঘরের শান্তি-শত্রু,

    রুদ্র শিবের চণ্ড মার।

    প্রেম-স্নেহ তোর হারাম যে রে

    কসাই-কঠিন তুই পাষাণ!

    আয় রে চির-তিক্ত প্রাণ!

      

    সাপ ধরে তুই চাপবি বুকে

    সইবে না তোর ফুলের ঘা,

    মারতে তোকে বাজ পাবে লাজ

    চুমুর সোহাগ সইবে না!

    ডাক-নামে ডাক তোর তরে নয়,

    আহ্বান তোর ভীম কামান।

    আয় রে চির-তিক্ত প্রাণ!

      

    ফণীমনসার কাঁটার পুরে

    আয় ফিরে তুই কালফণী,

    বিষের বাঁশি বাজিয়ে ডাকে নাগমাতা –

    ‘আয় নীলমণি!’

    ক্ষুদ্র প্রেমের শূদ্রামি ছাড়,

    ধর খ্যাপা তোর অগ্নি-বাণ!

    আয় রে আবার আমার চির-তিক্ত প্রাণ!

  • ফাতেহা-ই-দোয়াজ্-দহম্ : আবির্ভাব

    ফাতেহা-ই-দোয়াজ্-দহম্ : আবির্ভাব

    ফাতেহা-ই-দোয়াজ্-দহম্
    [আবির্ভাব]

     
      নাই   তা—জ
     
      তাই   লা—জ?
    ওরে
    মুসলিম, খর্জুর-শিষে তোরা সাজ!
    করে
    তসলিম হর কুর্নিশে শোর আওয়াজ
    শোন
    কোন মুজ্‌দা সে উচ্চারে হেরা আজ
     
          ধরা-মাঝ!

    উরজ-য়্যামেন নজ্‌দ হেজাজ তাহামা ইরাক শাম
    মেশের ওমান তিহারান স্মরি কাহার বিরাট নাম।

     
    পড়ে   ‘সাল্লাল্লাহু আলায়হি সাল্‌লাম।
     
        চলে     আঞ্জাম
     
        দোলে  তাঞ্জাম
    খোলে
    হুর-পরি মরি ফিরদৌসের হাম্মাম!
    টলে
    কাঁখের কলসে কওসর ভর, হাতে আব-জমজম জাম।
    শোন
    দামাম কামান তামাম সামান নির্ঘোষি কার নাম
    পড়ে
    ‘সাল্লাল্লাহু আলায়হি সাল্লাম।’
     
     মস্  তান!
     
     ব্যস  থাম্!
    দেখ
    মশ্‌গুল আজি শিস্তান-বোস্তান,
    তেগ
    গর্দানে ধরি দারোয়ান রোস্তাম।
    বাজে
    কাহারবা বাজা, গুলজার গুলশান
     
          গুলফাম!
    দক্ষিণে দোলে আরবি দরিয়া খুশিতে সে বাগে-বাগ,
     
    পশ্চিমে নীলা ‘লোহিতে’র খুন-জোশিতে রে লাগে আগ,
    মরু
    সাহারা গোবিতে সব্‌জার জাগে দাগ!
     
          নূরে    কুর্শির
      
          পুরে    ‘তূর’-শির,
    দূরে
    ঘূর্ণির তালে সুর বুনে হুরি ফুর্তির,
    ঝুরে
    সুর্খির ঘন লালি উষ্ণীষে ইরানি দূরানি তুর্কির!
    আজ
    বেদুইন তার ছেড়ে দিয়ে ঘোড়া ছুড়ে ফেলে বল্লম
    পড়ে
    ‘সাল্লাল্লাহু আলায়হি সাললাম।’
      
          ‘সাবে    ঈন’
      
          তাবে    ঈন
    হয়ে
    চিল্লায় জোর ‘ওই ওই নাবে দীন !
    ভয়ে
    ভূমি চুমে ‘লাত্ মানাত’ -এর ওয়ারেশিন ।
    রোয়ে
    ওয্‌যা-হোবল ইবলিস খারেজিন , –
      
          কাঁপে    জীন্ !
      
    জেদ্দার পূবে মক্কা মদিনা চৌদিকে পর্বত,
      
    তারই মাঝে ‘কাবা’ আল্লার ঘর দুলে আজ হর ওক্‌ত্‌,
    ঘন
    উথলে অদূরে ‘জম-জম’ শরবৎ!
      
          পানি    কওসর,
      
          মণি    জওহর
    আনি
    ‘জিবরাইল’ আজ হরদম দানে গওহর,
    টানি
    মালিক-উল-মৌত জিঞ্জির – বাঁধে মৃত্যুর দ্বার লৌহর।
    হানি
    বরষা সহসা ‘মিকাইল’ করে ঊষর আরবে ভিঙা,
    বাজে
    নব সৃষ্টির উল্লাসে ঘন ‘ইসরাফিল’ -এর শিঙা!

      
          জন্   জাল
      
          কঙ্   কাল
    ভেদি,
    ঘন জাল মেকি গণ্ডির পঞ্জার
    ছেদি,
    মরুভূতে একী শক্তির সঞ্চার!
    বেদি
    পঞ্জরে রণে সত্যের ডঙ্কার
      
                  ওংকার!
      
    শঙ্কারে করি লঙ্কার পার কার ধনু-টংকার
      
    হুংকারে ওরে সাচ্চা-সরোদে শাশ্বত ঝংকার?
    ভূমা-
    নন্দে রে সব টুটেছে অহংকার!
      
          মর-  মর্মরে
      
          নর-  ধর্ম রে
    বড়ো
    কর্মরে দিল ইমানের জোর বর্ম রে,
    ভর্
    দিল্ জান্ – পেয়ে শান্তি নিখিল ফিরদৌসের হর্ম্য রে!
    রণে
    তাই তো বিশ্ব-বয়তুল্লাতে মন্ত্র ও জয়নাদ –
    ‘ওয়ে
    মার্‌হাবা ওয়ে মার্‌হাবা এয়্ সর্‌ওয়ারে কায়েনাত !’
      
          শর- ওয়ান
      
          দর্- ওয়ান
    আজি
    বান্দা যে ফেরউন শাদ্দাদ নমরুদ মারোয়ান;
    তাজি
    বোর্‌রাক্ হাঁকে আশমানে পর্‌ওয়ান, –
    ও যে
    বিশ্বের চির সাচ্‌চারই বোর্‌হান –
      
                  ‘কোর-আন’!
      
    ‘কোন্ জাদুমণি এলি ওরে’ – বলি রোয়ে মাতা আমিনায়
      
    খোদার হবিবে বুকে চাপি, আহা, বেঁচে আজ স্বামী নাই!
    দূরে
    আব্‌দুল্লার রুহ্ কাঁদে, “ওরে আমিনারে গমি নাই –
    দেখো
    সতী তব কোলে কোন্ চাঁদ, সব ভর-পুর ‘কমি’ নাই।’
      
          ‘এয়্  ফর্ জন্দ’ –
      
           হায়   হর্‌দম্
    ধায়
    দাদা মোত্‌লেব কাঁদি, – গায়ে ধুলা কর্দম!
    ‘ভাই।
    কোথা তুই?’ বলি বাচ্চারে কোলে কাঁদিছে হাম্‌জা দুর্দম!
    ওই
    দিক্‌হারা দিক্‌পার হতে জোর-শোর আসে, ভাসে ‘কালাম’ –
    ‘এয়
    ‘শাম্‌সোজ্জোহা বদরোদ্দোজা কামারোজ্জমাঁ’ সালাম!’

      

    কুঞ্জিকা

    তাজ—মুকুট। তসলিম—সালাম, প্রণাম। শোর্-আওয়াজ—বিরাট বিপুল ধ্বনি। মুজ্‌দা—খোশ খবর, সুসংবাদ। হেরা—আরবের হেরা নামক পর্বত। এই গিরি-গুহায় হজরত মোহাম্মদ (সা) সাধনায় সিদ্ধি লাভ করেন। উরজ্, য়্যামেন, নজ্‌দ, হেজাজ, তাহামা—আরবের পাঁচটি প্রদেশের নাম। ইরাক—মেসোপটেমিয়া প্রদেশ। শাম—সিরিয়া প্রদেশ। মেসের—মিশর দেশ। ওমান—আরবের এক ছোট রাজ্য। সাল্লাল্লাহু আলায়হি সাল্‌লাম—আরবী ভাষায় উচ্চারিত ‘দরূদ’ বা শান্তিবাণী। মুসলমান মাত্রেই হজরতের নামের শেষে এই ‘দরূদ’ পাঠ করা একান্ত কর্তব্য। ইহার অর্থ— ‘তাঁহার উপর খোদার শান্তি ও করুণাধারা বর্ষিত হউক।’

    আন্‌জাম—আয়োজন। তান্‌জাম—সওয়ারি। ফিরদৌস—স্বর্গ। হাম্মাম—স্নানাগার। কওসর—অমৃত। ভর—ভরা, পূর্ণ। হুর-পরী—অপ্সরী-কিন্নরী। আব্-জম্‌জম্—মক্কার ‘জমজম’ নামক কূপের পবিত্র পানি। জাম—পেয়ালা। দামাম—দামামা। তামাম—সমস্ত। সামান—সাজ-সরঞ্জাম।

    মস্‌তান—মস্তানা, পাগলা। ব্যস্ থাম—ব্যস, থামো! শিস্তান-বোস্তান—শিস্তানের ফুলবাগিচা। তেগ—তলোয়ার। গর্দানে—স্কন্ধে। রোস্তাম—পারস্যের জগদ্‌বিখ্যাত দিগ্‌বিজয়ী বীর। কাহার্‌বা—তালের নাম। গুল্‌জার—মাৎ। গুল্‌শান—পুষ্প-বাটিকা। গুল্‌ফাম—গোলাবি রঙ্গিন। আরবী দরিয়া—আরব সাগর। খুশিতে বাগে বাগ্—আহ্লাদে আটখানা। নীলা—নীলবর্ণ জলবিশিষ্ট। লোহিতে—লোহিত সমুদ্রের। খুন-জোশিতে—রক্ত-উত্তেজনায়। আগ—আগুন। সাহারা, গোবি—দুই বিশাল মরুভূমির নাম। সব্‌জার—হরিতের। নূরে—জ্যোতিতে। লালী—অরুণিমা। ইরানি—পারস্যের অদিবাসী। দুরানি—কাবুলি। তুর্কি—তুরস্কের অধিবাসী।

    ‘সাবেঈন’—আরবের মূর্তিপূজকগণ। ‘তাবেঈন’—আজ্ঞাবহ। চিল্লায়—চিৎকার করে। ‘দীন’—সত্যধর্ম। ‘লাত্ মানাত’—আরবের মূর্তিপূজকগণের ঠাকুরের নাম। ওয়ারেশিন—উত্তরাধিকারীগণ, (এখানে) ঐ মূর্তিসমূহের দলবল।

    ‘ওয্‌যা হোবল’—আরব মূর্তি-পূজারীদের দুই প্রধান প্রতিমা। ইব্‌লিস—শয়তান। খারেজিন—এক বদমায়েশ সম্প্রদায়। জিন—দৈত্য; genii. জেদ্দা—জেদ্দা বন্দর। মদিনা—শহর (‘মদিনা’ নামক শহর নয়)। ‘কাবা’—মক্কার বিশ্ববিখ্যাত মস্‌জিদ। হর্ ওক্ত—সর্বদা। হর্‌দম্— সদাসর্বদা। গওহর—মতি। মালিক-উল-মৌত—ফেরেশতার (স্বর্গীয় দূত) নাম; জীবের জীবন-সংহার এই যমরাজের হাতে। জিঞ্জির—শৃঙ্খল। ‘মিকাইল’—ফেরেশতা। ভিঙ্গা—সরসা। ইস্‌রাফিল—প্রলয়-বিষাণ-মুখে এক ফেরেশতা। জঞ্‌জাল—জঞ্জাল। কঙ্‌কাল—কঙ্কাল। সরোদ—এক তারের যন্ত্রের নাম।

  • ফাতেহা-ই-দোয়াজ্-দহম্ : তিরোভাব

    ফাতেহা-ই-দোয়াজ্-দহম্ : তিরোভাব

    ফাতেহা-ই-দোয়াজ্-দহম্
    [তিরোভাব]

    এ কী বিস্ময়! আজরাইলেরও জলে ভর-ভর চোখ!

    বে-দরদ দিল্ কাঁপে থর-থর যেন জ্বর-জ্বর শোক।

    জান-মরা তার পাষাণ-পাঞ্জা বিলকুল ঢিলা আজ,

    কব্‌জা নিসাড়, কলিজা সুরাখ, খাক চুমে নীলা তাজ।

    জিব্‌রাইলের আতশি পাখা সে ভেঙে যেন খান খান,

    দুনিয়ার দেনা মিটে যায় আজ তবু জান আন্-চান!

    মিকাইল অবিরল

    লোনা    দরিয়ার সবই জল

    ঢালে    কুল মুল্লুকে, ভীম বাতে খায় অবিরল ঝাউ দোল।

    এ কি    দ্বাদশীর চাঁদ আজ সেই? সেই রবিয়ল আউওল?

    ঈশানে কাঁপিছে কৃষ্ণ নিশান, ইস্‌রাফিলের ও প্রলয়-বিষাণ আজ

    কাতরায় শুধু! গুমরিয়া কাঁদে কলিজা-পিষানো বাজ!

    রসুলের দ্বারে দাঁড়ায়ে কেন রে আজাজিল শয়তান?

    তারও বুক বেয়ে আঁশু ঝরে, ভাসে মদিনার ময়দান!

    জমিন্-আশমান জোড়া শির পাঁও তুলি তাজি বোর্‌রাক্,

    চিখ্ মেরে কাঁদে ‘আরশে’ র পানে চেয়ে, মারে জোর হাঁক!

    হুরপরি শোকে হায়

    জল-    ছলছল চোখে চায়।

    আজ    জাহান্নমের বহ্নি-সিন্ধু নিবে গেছে ক্ষরি জল,

    যত    ফিরদৌসের নার্গিস-লালা ফেলে আঁশু-পরিমল।

    মৃত্তিকা-মাতা কেঁদে মাটি হল বুকে চেপে মরা লাশ,

    বেটার জানাজা কাঁদে যেন – তাই বহে ঘন নাভি-শ্বাস!

    পাতাল-গহ্বরে কাঁদে জিন, পুন মলো কি রে সোলেমান?

    বাচ্চারে মৃগী দুধ নাহি দেয়, বিহগীরা ভোলে গান!

    ফুল পাতা যত খসে পড়ে, বহে উত্তর-চিরা বায়ু,

    ধরণির আজ শেষ যেন আয়ু, ছিঁড়ে গেছে শিরা স্নায়ু!

    মক্কা ও মদিনায়

    আজ    শোকের অবধি নাই!

    যেন    রোজ-হাশরের ময়দান, সব উন্মাদসম ছুটে।

    কাঁপে    ঘন ঘন কাবা, গেল গেল বুঝি সৃষ্টির দম টুটে।

    নকিবের তূরী ফুৎকারি আজ বারোয়াঁর সুরে কাঁদে,

    কার তরবারি খান খান করে চোট মারে দূরে চাঁদে?

    আবুবকরের দর দর আঁশু দরিয়ার পারা ঝরে,

    মাতা আয়েষার কাঁদনে মুরছে আশমানে তারা ডরে!

    শোকে উন্মাদ ঘুরায় উমর ঘূর্ণির বেগে ছোরা,

    বলে ‘আল্লার আজ ছাল তুলে নেব মেরে তেগ্ , দেগে কোঁড়া।’

    হাঁকে ঘন ঘন বীর –

    ‘হবে,   জুদা তার তন শির,

    আজ যে বলিবে নাই বেঁচে হজরত – যে নেবে রে তাঁরে গোরে।’

    আজ দারাজ দস্তে তেজ হাতিয়ার বোঁও বোঁও করে ঘোরে!

    গুম্বজে কে রে গুমরিয়া কাঁদে মসজিদে মস্‌জিদে?

    মুয়াজ্জিনের হোশ্ নাই, নাই জোশ চিতে, শোষ হৃদে!

    বেলালেরও আজ কণ্ঠে আজান ভেঙে যায় কেঁপে কেঁপে,

    নাড়ি-ছেঁড়া এ কী জানাজার ডাক হেঁকে চলে ব্যেপে ব্যেপে!

    উস্‌মানের আর হুঁশ নাই কেঁদে কেঁদে ফেনা উঠে মুখে,

    আলি হাইদর ঘায়েল আজি রে বেদনার চোটে ধুঁকে!

    আজ    ভোঁতা সে দুধারি ধার

    ওই    আলির জুলফিকার!

    আহা    রসুল-দুলালি আদরিণী মেয়ে মা ফাতেমা ওই কাঁদে,

    ‘কোথা    বাবাজান।’ বলি মাথা কুটে কুটে এলোকেশ নাহি বাঁধে!

    হাসান-হুসেন তড়পায় যেন জবে-করা কবুতর,

    ‘নানাজান কই!’ বলি খুঁজে ফেরে কভু বার কভু ঘর।

    নিবে গেছে আজ দিনের দীপালি, খসেছে চন্দ্র-তারা,

    আঁধিয়ারা হয়ে গেছে দশ দিশি, ঝরে মুখে খুন-ঝারা!

    সাগর-সলিল ফোঁপায়ে উঠে সে আকাশ ডুবাতে চায়,

    শুধু         লোনা জল তার আঁশু ছাড়া কিছু রাখিবে না দুনিয়ায়।

    খোদ    খোদা সে নির্বিকার,

    আজ    টুটেছে আসনও তাঁর!

    আজ        সখা মহ্‌বুবে বুকে পেতে দুখে কেন যেন কাঁটা বেঁধে,

    তারে        ছিনিবে কেমনে যার তরে মরে নিখিল সৃষ্টি কেঁদে!

    বেহেশ্‌ত     সব আরাস্তা আজ, সেথা মহা ধুম-ধাম,

    গাহে        হুরপরি যত, ‘সাল্লালাহু আলায়হি সাল্‌লাম।’

    কাতারে কাতারে করজোড়ে সবে দাঁড়ায়ে গাহিছে জয়, –

    ধরিতে না পেরে ধরা-মা-র চোখে দর দর ধারা বয়।

    এসেছে আমিনা আবদুল্লা কি, এসেছে খদিজা সতী?

    আজ        জননীর মুখে হারামণি-পাওয়া-হাসা হাসে জগপতি!

    ‘খোদা,    একী তব অবিচার!’

    বলে    কাঁদে সুত ধরা-মা-র।

    আজ        অমরার আলো আরও ঝলমল, সেথা ফোটে আরও হাসি,

    শুধু         মাটির মায়ের দীপ নিভে গেল, নেমে এল অমা-রাশি

                      *    *    *    *    *

    আজ        স্বরগের হাসি ধরার অশ্রু ছাপায়ে অবিশ্রাম

    ওঠে        একী ঘন রোল – ‘সাল্লাল্লাহু আলায়হি সাল্‌লাম।’

    কুঞ্জিকা

    ঈমান—বিশ্বাস। বিশ্ব-বয়তুল্লাহ্—বিশ্বরূপ ‘কাবা’ বা আল্লার ঘর। ওয়ে—ওগো, বাছা। মারহাবা—সাবাস। ‘সরওয়ারে কায়েনাত’—সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ। ‘শর্‌ওয়ান’—নওশেরওয়ান নামক পারস্যের বিখ্যাত দানশীল বাদশাহ্। বান্দা—হুজুরে-হাজির গোলাম, বন্দনাকারী। ফেরাউন, শাদ্দাদ, নমরুদ, মার্‌ওয়ান—বিখ্যাত ঈস্বরদ্রোহী সব। তাজি—দ্রুতগামী অশ্ব। বোর্‌রাক—উচ্চৈঃশ্রবার মত স্বর্গের শ্রেষ্ঠ অশ্ব। আসমান—আকাশ। পরওয়ান—পরোয়ানা। সাচ্চারই—সত্যেরই। বোরহান—প্রমাণ। রোয়ে—কাঁদে। আমিনা—হজরত মোহাম্মদ (সা) জননীর নাম। খোদার হাবিব—আল্লার বন্ধু (হজরতের খেতাব)। আবদুল্লাহ্—হজরতের স্বর্গগত পিতা। রুহ্—আত্মা। ‘গমি’—দুঃখ। ‘গমি’ নাই—দুঃখ করো না। ভরপুর—পূর্ণ। ‘কমি’—অপূর্ণ। ‘কমি’ নাই—আজ কিছু অপূর্ণ নাই।

    আজরাইল—যমদূত। বে-দরদ—নির্মম। সুরাখ—ঝাঁঝরা। খাক্—মাটি। নীলা তাজ—আজরাইলের মাথার তাজ নীলবর্ণ। জিবরাইল—প্রধান ফেরেশতা ও স্বর্গীয় বার্তাবহ। আতশি—অগ্নিময়। মিকাইল—একজন ফেরেশতার নাম। কুল মুল্লুকে—সর্বদেশে। ইসরাফিল—প্রলয়-বিষাণধারী ফেরেশতা। রসুল—প্রেরিত পুরুষ। আজাজিল—শয়তানের নাম। তাজি বোর্‌রাক—বোররাক নামক স্বর্গীয় ঘোড়া। আরশ—খোদার সিংহাসন। ফিরদৌস—বেহেশ্‌ত, স্বর্গবিশেষের নাম। নার্গিস লালা—ফুলের নাম।

    তন্—দেহ। দরাজ দস্তে—বিশাল হাতে। জুলফিকার—হজরত আলীর দুধারী তলোয়ার। মাহ্‌বুব—প্রিয়।

  • সেবক

    সেবক

    সেবক

    সত্যকে হায় হত্যা করে অত্যাচারীর খাঁড়ায়,

    নেই কি রে কেউ সত্যসাধক বুক খুলে আজ দাঁড়ায়?

    শিকলগুলো বিকল করে পায়ের তলায় মাড়ায়, –

    বজ্র-হাতে জিন্দানের1 ওই ভিত্তিটাকে নাড়ায়?

    নাজাত2-পথের আজাদ3 মানব নেই কি রে কেউ বাঁচা,

    ভাঙতে পারে ত্রিশ কোটি এই মানুষ-মেষের খাঁচা?

    ঝুটার পায়ে শির লুটাবে, এতই ভীরু সাঁচা? –

      

    ফন্দি-কারায় কাঁদছিল হায় বন্দি যত ছেলে,

    এমন দিনে ব্যথায় করুণ অরুণ আঁখি মেলে,

    পাবক-শিখা হস্তে ধরি কে তুমি ভাই এলে?

    ‘সেবক আমি’ – হাঁকল তরুণ কারার দুয়ার ঠেলে।

      

    দিন-দুনিয়ায় আজ খুনিয়ার রোজ-হাশরের4 মেলা,

    করছে অসুর হক-কে না-হক, হক-তায়ালায়5 হেলা!

    রক্ষ-সেনার লক্ষ আঘাত বক্ষে বড়োই বেঁধে,

    রক্ষা করো, রক্ষা করো, উঠতেছে দেশ কেঁদে।

    নেই কি রে কেউ মুক্তি-সেবক শহিদ হবে মরে,

    চরণ-তলে দলবে মরণ ভয়কে হরণ করে,

    ওরে        জয়কে বরণ করে –

    নেই কি এমন সত্য-পুরুষ মাতৃ-সেবক ওরে?

    কাঁপল সে স্বর মৃত্যু-কাতর আকাশ-বাতাস ছিঁড়ে,

    বাজ পড়েছে, বাজ পড়েছে ভারতমাতার নীড়ে!

      

    দানব দলে শাস্তি আনে নাই কি এমন ছেলে?

    একী দেখি গান গেয়ে ওই অরুণ আঁখি মেলে

    পাবক-শিখা হস্তে ধরে কে বাছা মোর এলে?

    ‘মা গো আমি সেবক তোমার! জয় হোক মা-র।’

    হাঁকল তরুণ কারার-দুয়ার ঠেলে!

      

    বিশ্বগ্রাসীর ত্রাস নাশি আজ আসবে কে বীর এসো

    ঝুট শাসনে করতে শাসন, শ্বাস যদি হয় শেষও।

    – কে আজ বীর এসো।

    ‘বন্দি থাকা হীন অপমান!’ হাঁকবে যে বীর তরুণ, –

    শির-দাঁড়া যার শক্ত তাজা, রক্ত যাহার অরুণ,

    সত্য-মুক্তি স্বাধীন জীবন লক্ষ্য শুধু যাদের,

    খোদার রাহায় জান দিতে আজ ডাক পড়েছে তাদের।

    দেশের পায়ে প্রাণ দিতে আজ ডাক পড়েছে তাদের,

    সত্য-মুক্তি স্বাধীন জীবন লক্ষ্য শুধু যাদের।

    হঠাৎ দেখি আসছে বিশাল মশাল হাতে ও কে?

    ‘জয় সত্যম্’ মন্ত্র-শিখা জ্বলছে উজল চোখে।

    রাত্রি-শেষে এমন বেশে কে তুমি ভাই এলে?

    ‘সেবক তোদের, ভাইরা আমার! – জয় হোক মা-র!’

    হাঁকল তরুণ কারার দুয়ার ঠেলে!

  • জাগৃহি

    জাগৃহি

    জাগৃহি

    [তোটক ছন্দ]
    ‘হর
    হর হর শংকর হর হর ব্যোম’ –
    একী
    ঘন রণ-রোল ছায়া চরাচর ব্যোম!
    হানে
    ক্ষিপ্ত মহেশ্বর রুদ্র পিনাক,
    ঘন
    প্রণব-নিনাদ হাঁকে ভৈরব-হাঁক
    ধু ধু
    দাউ দাউ জ্বলে কোটি নর-মেধ-যাগ,
    হানে
    কাল-বিষ বিশ্বে রে মহাকাল-নাগ!
    আজ
    ধূর্জটি ব্যোমকেশ নৃত্য-পাগল,
    ওই
    ভাঙল আগল ওরে ভাঙল আগল!
    বোলে
    অম্বুদ-ডম্বুর কম্বু বিষাণ,
    নাচে
    থই-তাতা থই-তাতা পাগলা ঈশান!
    দোলে
    হিন্দোলে ভীম-তালে সৃষ্টি ধাতার,
    বুকে
    বিশ্বপাতার বহে রক্ত-পাথার!
    ঘোর
    নির্ঘোষে ‘মার মার’ দৈত্য, অসুর,
    প্রেত,
    রক্ত-পিশাচ, রণ-দুর্মদ সুর।
    করে
    ক্রন্দসী-ক্রন্দন অম্বর রোধ –
    ত্রাহি
    ত্রাহি মহেশ হে সম্বরো ক্রোধ!
    সুত
    মৃত্যু-কাতর, হাহা অট্টহাসি
    হাসে
    চণ্ডী চামুণ্ডা মা সর্বনাশী।
    কাল-
    বৈশাখী ঝঞ্ঝারে সঙ্গে করি –
    রণ-
    উন্মাদিনী নাচে রঙ্গে মরি!
    উর-
    হার দোলে নরমুণ্ড-মালা,
    করে
    খড়্গ ভয়াল, আঁখে বহ্নি-জ্বালা!
    নিয়া
    রক্তপানের কী অগস্ত্য-তৃষা
    নাচে
    ছিন্ন সে মস্তা মা, নাইকো দিশা!
    ‘দে রে
    রক্ত দে রক্ত দে’ রণে ক্রন্দন,
    বুঝি
    থেমে যায় সৃষ্টির হৃৎ-স্পন্দন!
    জ্বলে
    বৈশ্বানরের ধু ধু লক্ষ শিখা,
    আজ
    বিষ্ণু-ভালে লাল রক্ত-টিকা!
    শুধু
    অগ্নি-শিখা ধু ধু অগ্নি-শিখা,
    শোভে
    করুণার ভালে লাল রক্ত-টিকা!
    রণ-
    শ্রান্ত অসুর-সুর-যোদ্ধৃ-সেনা,
    শুধু
    রক্ত-পাথার, শুধু রক্ত-ফেনা!
    একী
    বিশ্ব-বিধ্বংস নৃশংস খেলা,
    কিছু
    নাই কিছু নাই প্রেত-পিশাচে মেলা।
    আজ
    ঘরে ঘরে জ্বলে ধু ধু শ্মশান মশান –
    হোক
    রোষ অবসান, ত্রাহি ত্রাহি ভগবান!
    আজি
    বন্ধ সবার পূতি-গন্ধে নিশাস,
    বিষে
    বিশ্ব-নিসাড়, বহে জোর নাভিশ্বাস!
    দেহো
    ক্ষান্ত রণে, ফেলো রঙ্গিণী বেশ,
    খোলো
    রক্তাম্বর মাতা সম্বরো কেশ!
    এ তো
    নয় মাতা রক্তোন্মত্তা ভীমা!
    আজ
    জাগৃহি মা, আজ জাগৃহি মা।
    তব
    চরণাবলুণ্ঠিত মহিষ-অসুর,
    হল
    ধ্বংস অসুর, লীন শক্তি পশুর।
    তবে
    সম্বরো রণ, হোক ক্ষান্ত রোদন–
    হোক
    সত্য-বোধন আজ মুক্তি-বোধন!
    এসো
    শুদ্ধা মাতা এই কাল-শ্মশানে
    আজ
    প্রলয়-শেষে এই রণাবসানে!
    জাগো
    জাগো মানব-মাতা দেবী নারী!
    আনো
    হৈম ঝারি, আনো শান্তি-বারি!
    এসো
    কৈলাস হতে মা গো মানস-সরে,
    নীল
    উৎপল-দলে রাঙা আঁচল-ভরে।
    এসো
    কন্যা উমা, এসো গৌরী রূপে,–
    বাজো
    শঙ্খ শুভ, জ্বালো গন্ধ ধূপে!
    আজ
    মুক্ত-বেণি মেয়ে একাকী চলে,
    ওই
    শেফালি-তলে হেরো শেফালি-তলে।
    ওড়ে
    এলোমেলো অঞ্চল আশ্বিন-বায়,
    হানে
    চঞ্চল নীল চাওয়া আকাশের গায়!
    ঘোষে
    হিমালয় তার মহা হর্ষ-বাণী, –
    এল
    হৈমবতী, এল গৌরী রানি।
    বাজো
    মঙ্গল শাঁখ, হোক শুভ-আরতি,
    এল
    লক্ষ্মী-কমলা, এল বাণী-ভারতী।
    এল
    সুন্দর সৈনিক সুর কার্তিক,
    এল
    সিদ্ধি-দাতা, হেরো হাসে চারিদিক!
    ভরা
    ফুল-খুকি ফুল-হাসি শিউলির তল,
    আজ
    চোখে আসে জল, শুধু চোখে আসে জল!
    নিয়া
    মাতৃ-হিয়া নিয়া কল্যাণী-রূপ
    এল
    শক্তি স্বাহা, বাজো শাঁখ, জ্বালো ধূপ!
    ভাঁজো
    মোহিনী সানাই, বাজো আগমনি-সুর,
    বড়ো
    কেঁদে ওঠে আজ হিয়া মাতৃ-বিধুর।
    ওঠে
    কণ্ঠ ছাপি বাণী সত্য পরম –
    বন্-
    দে মাতরম্। বন্‌দে মাতরম্!
  • তূর্য-নিনাদ

    তূর্য-নিনাদ

    তূর্য-নিনাদ

    [গান]

    কোরাস :
    (আজ) ভারত-ভাগ্য-বিধাতার বুকে গুরু-লাঞ্ছনা-পাষাণ-ভার,
    আর্ত-নিনাদে হাঁকিছে নকিব, – কে করে মুশকিল আসান তার?

    মন্দির আজি বন্দির ঘানি,

    নির্জিত ভীত সত্য, বদ্ধ রুদ্ধ স্বাধীন আত্মার বাণী,

    সন্ধি-মহলে ফন্দির ফাঁদ, গভীর আন্ধি-অন্ধকার!

    হাঁকিছে নকিব – হে মহারুদ্র চূর্ণ করো এ ভণ্ডাগার॥

    রক্তে-মদের বিষ পান করি

    আর্ত মানব; স্রষ্টা কাতর সৃষ্টির তাঁর নির্বাণ স্মরি!

    ক্রন্দন-ঘন বিশ্বে স্বনিছে প্রলয়-ঘটার হুহুংকার, –

    হাঁকিছে নকিব – অভয়-দেবতা, এ মহাপাথার করহ পার॥

    কোলাহল-ঘাঁটা হলাহল-রাশি

    কে নীলকণ্ঠ গ্রাসিবে রে আজ দেবতার মাঝে দেবতা সে আসি?

    উরিবে কখন ইন্দিরা, ক্রোড়ে শান্তির ঝারি সুধার ভাঁড়?

    হাঁকিছে নকিব – আনো ব্যথা-ক্লেশ-মন্থন-ধন অমৃত-ধার॥

    কণ্ঠ ক্লিষ্ট ক্রন্দন-ঘাতে,

    অমৃত-অধিপ নর-নারায়ণ দারুময় ঘন মনোবেদনাতে।

    দশভুজে গলে শৃঙ্খল-ভার দশপ্রহরণধারিণী মার –

    হাঁকিছে নকিব – ‘আবিরাবির্ম এধি’ হে নব যুগাবতার!

    মৃত্যু-আহত মৃত্যুঞ্জয়,

    কে শোনাবে তাঁরে চেতন-মন্ত্র? কে গাহিবে জয় জীবনের জয়?

    নয়নের নীরে কে ডুবাবে বলো বলদর্পীর অহংকার? –

    হাঁকিছে নকিব – সে দিন বিশ্বে খুলিবে আরেক তোরণ-দ্বার॥

  • বোধন

    বোধন

    বোধন2

    [গান]

    দুঃখ কী ভাই, হারানো সুদিন ভারতে আবার আসিবে ফিরে,

    দলিত শুষ্ক এ মরুভূ পুন হয়ে গুলিস্তাঁ হাসিবে ধীরে॥

    কেঁদো না, দমো না, বেদনা-দীর্ণ এ প্রাণে আবার আসিবে শক্তি,

    দুলিবে শুষ্ক শীর্ষে তোমারও সবুজ প্রাণের অভিব্যক্তি।

    জীবন-ফাগুন যদি মালঞ্চ-ময়ূর তখতে আবার বিরাজে,

    শোভিবেই ভাই, ওই তো সেদিন, শোভিবে এ শিরও পুষ্প-তাজে॥

    হোয়ো না নিরাশ, অজানা যখন ভবিষ্যতের সব রহস্য,

    যবনিকা-আড়ে প্রহেলিকা-মধু, – বীজেই সুপ্ত স্বর্ণ শস্য!

    অত্যাচার আর উৎপীড়নে সে আজিকে আমার পর্যুদস্ত,

    ভয় নাই ভাই! ওই যে খোদার মঙ্গলময় বিপুল হস্ত!

    দুঃখ কী ভাই, হারানো সুদিন ভারতে আবার আসিবে ফিরে,

    দলিত শুষ্ক এ মরুভূ পুন হয়ে গুলিস্তাঁ হাসিবে ধীরে॥

    দুদিনের তরে গ্রহ-ফেরে ভাই সব আশা যদি না হয় পূর্ণ,

    নিকট সেদিন, রবে না এদিন, হবে জালিমের গর্ব চূর্ণ!

    পুণ্য-পিয়াসী যাবে যারা ভাই মক্কার পূত তীর্থ লভ্যে;

    কণ্টক-ভয়ে ফিরবে বা তারা বরং পথেই জীবন সঁপবে।

    দুঃখ কী ভাই, হারানো সুদিন ভারতে আবার আসিবে ফিরে,

    দলিত শুষ্ক এ মরুভূ পুন হয়ে গুলিস্তাঁ হাসিবে ধীরে॥

    অস্তিত্বের ভিত্তি মোদের বিনাশেও যদি ধ্বংস-বন্যা,

    সত্য মোদের কাণ্ডারি ভাই, তুফানে আমরা পরোয়া করি না।

    যদিও এ পথ ভীতি-সংকুল, লক্ষ্যস্থলও কোথায় দূরে,

    বুকে বাঁধো বল, ধ্রুব-অলক্ষ্য আসিবে নামিয়া অভয় তূরে।

    দুঃখ কী ভাই, হারানো সুদিন ভারতে আবার আসিবে ফিরে,

    দলিত শুষ্ক এ মরুভূ পুন হয়ে গুলিস্তাঁ হাসিবে ধীরে॥

    অত্যাচার আর উৎপীড়নে সে আজিকে আমরা পর্যুদস্ত,

    ভয় নাই ভাই! রয়েছে খোদার মঙ্গলময় বিপুল হস্ত!

    কী ভয় বন্দি, নিঃস্ব যদিও, অমার আঁধারে পরিত্যক্ত,

    যদি রয় তব সত্য-সাধনা স্বাধীন জীবন হবেই ব্যক্ত!

    দুঃখ কী ভাই হারানো সুদিন ভারতে আবার আসিবে ফিরে,

    দলিত শুষ্ক এ মরুভূ পুন হয়ে গুলিস্তাঁ হাসিবে ধীরে॥

  • উদ্বোধন

    উদ্বোধন

    [গান]
    বাজাও প্রভু বাজাও ঘন বাজাও
    ভীম
    বজ্র-বিষাণে দুর্জয় মহা-আহ্বান তব,
    বাজাও!
    অগ্নি-তূর্য কাঁপাক সূর্য
    বাজুক রুদ্রতালে ভৈরব–
    দুর্জয় মহা-আহ্বান তব, বাজাও!
    নট-মল্লার দীপক-রাগে
    জ্বলুক তাড়িত-বহ্নি আগে
    ভেরীর
    রন্ধ্রে মেঘমন্দ্রে জাগাও বাণী জাগ্রত নব।
    দুর্জয় মহা-আহ্বান তব, বাজাও!
    দাসত্বের এ ঘৃণ্য তৃপ্তি
    ভিক্ষুকের এ লজ্জা-বৃত্তি,
    বিনাশো
    জাতির দারুণ এ লাজ, দাও তেজ দাও মুক্তি-গরব।
    দুর্জয় মহা-আহ্বান তব, বাজাও!
    খুন দাও নিশ্চল এ হস্তে
    শক্তি-বজ্র দাও নিরস্ত্রে;
    শীর্ষ
    তুলিয়া বিশ্বে মোদেরও দাঁড়াবার পুন দাও গৌরব–
    দুর্জয় মহা-আহ্বান তব, বাজাও!
    ঘুচাতে ভীরুর নীচতা দৈন্য
    প্রেরো হে তোমার ন্যায়ের সৈন্য
    শৃঙ্খলিতের টুটাতে বাঁধন আনো আঘাত প্রচণ্ড আহব।

    দুর্জয় মহা-আহ্বান তব, বাজাও!
    নির্বীর্য এ তেজঃ-সূর্যে
    দীপ্ত করো হে বহ্নি-বীর্যে,
    শৌর্য
    ধৈর্য মহাপ্রাণ দাও, দাও স্বাধীনতা সত্য বিভব!
    দুর্জয় মহা-আহ্বান তব, বাজাও!
  • অভয়-মন্ত্র

    অভয়-মন্ত্র

    অভয়-মন্ত্র

    [গান]
      
       বল,      নাহি ভয়, নাহি ভয়!
      
       বল,      মাভৈঃ মাভৈঃ, জয় সত্যের জয়!
    কোরাস :
       বল,      হউক গান্ধি বন্দি, মোদের সত্য বন্দি নয়।
      
       বল,      মাভৈঃ মাভৈঃ পুরুষোত্তম জয়।
      
       তুই      নির্ভর কর আপনার পর,
      
                আপন পতাকা কাঁধে তুলে ধর!
    ওরে
    যে যায় যাক সে, তুই শুধু বল, ‘আমার হয়নি লয়’!
      
       বল,      ‘আমি আছি’, আমি পুরুষোত্তম, আমি চির-দুর্জয়।
      
       বল,      নাহি ভয়, নাহি ভয়,
      
       বল,      মাভৈঃ মাভৈঃ, জয় সত্যের জয়। …

      

      
       তুই      চেয়ে দেখ ভাই আপনার মাঝে,
      
                সেথা জাগ্রত ভগবান রাজে,
    নিজ
    বিধাতারে মান, আকাশ গলিয়া ক্ষরিবে রে বরাভয়!
    তোর
    বিধাতার ধাতা বিধাতা, বিধাতা কারারুদ্ধ কি হয়?
      
       বল,      নাহি ভয়, নাহি ভয়,
      
       বল,      মাভৈঃ মাভৈঃ, জয় সত্যের জয়। …

      

      
       আজ      বক্ষের তোর ক্ষীরোদ-সাগরে
      
                অচেতন নারায়ণ ঘুম-ঘোরে
    শুধু
    লক্ষ্মীর ভোগ লক্ষ্য তাঁহার, নয় কিছুতেই নয়!
    তোর
    অচেতন চিতে জাগারে চেতনা নারায়ণ চিন্ময়।
      
       বল,      নাহি ভয়, নাহি ভয়,
      
       বল,      মাভৈঃ মাভৈঃ, জয় সত্যের জয়। …

      

      
       ওই      নির্যাতকের বন্দি-কারায়
      
                সত্য কি কভু শক্তি হারায়?
    ক্ষীণ
    দুর্বল বলে খণ্ড ‘আমি’র হয় যদি পরাজয়,
    ওরে
    অখণ্ড আমি চির-মুক্ত সে, অবিনাশী অক্ষয়!
      
       বল,      নাহি ভয়, নাহি ভয়,
      
       বল,      মাভৈঃ মাভৈঃ, জয় সত্যের জয়। …

      

      
       ওরে      সত্য যে চির-স্বয়ম্ প্রকাশ,
      
                রোধিবে কি তারে কারাগার-ফাঁস?
    ওই
    অত্যাচারীর সত্য পীড়ন? আছে তার আছে ক্ষয়!
    সেই
    সত্য মোদের ভাগ্য-বিধাতা, যাঁর হাতে শুধু রয়।
      
       বল,      নাহি ভয়, নাহি ভয়,
    বল,  মাভৈঃ মাভৈঃ, জয় সত্যের জয়। …
      
       যে      গেল সে নিজেরে নিঃশেষ করি
      
                তাদের পাত্র দিয়া গেল ভরি!
    ওই
    বন্ধু মৃত্যু পারেনিকো তাঁরে পারেনি করিতে লয়!
    তাই
    আমাদের মাঝে নিজেরে বিলায়ে সে আজ শান্তিময়!
      
       বল,      নাহি ভয়, নাহি ভয়,
      
       বল,      মাভৈঃ মাভৈঃ, জয় সত্যের জয়। …

      

      
       ওরে      রুদ্র তখনই ক্ষুদ্রেরে গ্রাসে
      
                আগেই যবে সে মরে থাকে ত্রাসে,
    ওরে
    আপনার মাঝে বিধাতা জাগিলে বিশ্বে সে নির্ভয়!
    ওই
    শূদ্র-কারায় কভু কি ভয়াল ভৈরব বাঁধা রয়?
      
       বল,      নাহি ভয়, নাহি ভয়,
      
       বল,      মাভৈঃ মাভৈঃ, জয় সত্যের জয়। …

      

      
       ওই      টুটে-ফেটে-পড়া লোহার শিকল,
      
                ভগবানে বেঁধে করিবে বিকল?
    ওই
    কারা ওই বেড়ি কভু কি বিপুল বিধাতার ভার সয়?
    ওরে
    যে হয় বন্দি হতে দে, শক্তি আত্মার আছে জয়।
      
       বল,      নাহি ভয়, নাহি ভয়,
      
       বল,      মাভৈঃ মাভৈঃ, জয় সত্যের জয়। …

      

      
       ওরে      আত্ম-অবিশ্বাসী, ভয়-ভীত!
      
                কেন হেন ঘন অবসাদচিত?
    বল
    পর-বিশ্বাসে পর-মুখপানে চেয়ে কি স্বাধীন হয়?
    তুই
    আত্মাকে চিন, বল ‘আমি আছি’, ‘সত্য আমার জয়’!
      
       বল,      নাহি ভয়, নাহি ভয়,
      
       বল,      মাভৈঃ মাভৈঃ, জয় সত্যের জয়।
      
       বল,      হউক গান্ধি বন্দি, মোদের সত্য বন্দি নয়!