Author: কাজী নজরুল ইসলাম

  • জাগরণী

    জাগরণী

    জাগরণী

    কোরাস :
    ভিক্ষা দাও! ভিক্ষা দাও!
    ফিরে চাও ওগো পুরবাসী,
    সন্তান দ্বারে উপবাসী,
    দাও মানবতা ভিক্ষা দাও!
    জাগো গো,    জাগো গো,
    তন্দ্রা-অলস জাগো গো,
    জাগো রে!   জাগো রে!
     
    মুক্ত করিতে বন্দিনী মা-য়
    কোটি বীরসূত ওই হেরো ধায়
    মৃত্যুতোরণ-দ্বার-পানে –
    কার টানে?
    দ্বার খোলো দ্বার খোলো!
    একবার ভুলে ফিরিয়া চাও!
    কোরাস : ভিক্ষা দাও … …
     
    জননী আমার ফিরিয়া চাও!
    ভাইরা আমার ফিরিয়া চাও!
    চাই মানবতা, তাই দ্বারে
    কর হানি মা গো বারে বারে–
    দাও মানবতা ভিক্ষা দাও।
    পুরুষসিংহ জাগো রে!
    সত্যমানব জাগো রে!
    বাধাবন্ধন-ভয়হারা হও
    সত্যমুক্তিমন্ত্র গাও!
    কোরাস : ভিক্ষা দাও … …
     
    লক্ষ্য যাদের উৎপীড়ন আর অত্যাচার,
    নর-নারায়ণে হানে পদাঘাত
    জেনেছে সত্য-হত্যা সার!
    অত্যাচার! অত্যাচার!!
    ত্রিশ কোটি নর-আত্মার যারা অপমান হেলা
      করেছে রে
    শৃঙ্খল গলে দিয়েছে মা-র –
    সেই আজ ভগবান তোমার!
     অত্যাচার! অত্যাচার!!
    ছি— ছি— ছি ছি— ছি— ছি নাই কি লাজ–
    নাই কি আত্মসম্মান ওরে, নাই জাগ্রত
     ভগবান কি রে
    আমাদেরও এই বক্ষোমাঝ?
    অপমান বড়ো অপমান ভাই
    মিথ্যার যদি মহিমা গাও!
    কোরাস : ভিক্ষা দাও … …
     
    আল্লায় ওরে হকতালায়
    পায়ে ঠেলে যারা অবহেলায়,
    আজাদ-মুক্ত আত্মারে যারা শিখায়ে ভীরুতা
    করেছে দাস–
    সেই আজ ভগবান তোমার!
    সেই আজ ভগবান তোমার!
    সর্বনাশ! সর্বনাশ!
    ছি-ছি নির্জীব পুরবাসী আর খুলো না দ্বার!
    জননী গো! জননী গো!
    কার তরে জ্বালো উৎসব-দীপ?
    দীপ নেবাও! দীপ নেবাও!!
    মঙ্গল-ঘট ভেঙে ফেলো,
    সব গেল মা গো সব গেল!
    অন্ধকার! অন্ধকার!
    ঢাকুক এ মুখ অন্ধকার!
    দীপ নেবাও! দীপ নেবাও!
    কোরাস : ভিক্ষা দাও … …
     
    ছি ছি ছি ছি
    এ কী দেখি
    গাহিস তাদেরই বন্দনা-গান,
    দাস সম নিস হাত পেতে দান!
    ছি ছি ছি ছি ছি ছি
    ওরে তরুণ ওরে অরুণ!
    নরসুত তুমি দাসত্বের এ ঘৃণ্য চিহ্ন
    মুছিয়া দাও!
    ভাঙিয়া দাও,
    এ কারা এ বেড়ি ভাঙিয়া দাও!
    কোরাস : ভিক্ষা দাও … …
     
    পরাধীন বলে নাই তোমাদের
    সত্য-তেজের নিষ্ঠা কি?
    অপমান সয়ে মুখ পেতে নেবে বিষ্ঠা ছি!
    মরি লাজে, লাজে মরি
    এক হাতে তোরে ‘পয়জার’ মারে
    অপমান সে যে অপমান।
    জাগো জাগো ওরে হতমান।
    কেটে ফেলো লোভী লুব্ধ রসনা,
    আঁধারে এ হীন মুখ লুকাও।
    কোরাস : ভিক্ষা দাও … …
     
    ঘরের বাহির হোয়ো না আর,
    ঝেড়ে ফেলো হীন বোঝার ভার,
    কাপুরুষ হীন মানবের মুখ
    ঢাকুক লজ্জা অন্ধকার।
    পরিহাস ভাই পরিহাস সে যে
    পরাজিতে দিতে মনোব্যথা–যদি
    জয়ী আসে রাজ-রাজ সেজে।
    পরিহাস, এ যে নির্দয় পরিহাস!
    ওরে কোথা যাস্
    বল কোথা যাস ছি ছি
    পরিয়া ভীরুর দীন বাস?
    অপমান এত সহিবার আগে
    হে ক্লীব, হে জড়, মরিয়া যাও!
    কোরাস : ভিক্ষা দাও … …
     
    পুরুষসিংহ জাগো রে!
    নির্ভীক বীর জাগো রে!
    দীপ জ্বালো কেন আপনারই হীন কালো অন্তর
    কালামুখ হেন হেসে দেখাও।
    নির্লজ্জ রে ফিরিয়া চাও!
    আপনার পানে ফিরিয়া চাও!
    অন্ধকার! অন্ধকার!
    নিশ্বাস আজি বন্ধ মা-র
    অপমানে নির্মম লাজে,
    তাই দিকে দিকে ক্রন্দন বাজে–
    দীপ নেবাও! দীপ নেবাও!
    আপনার পানে ফিরিয়া চাও!
    কোরাস : ভিক্ষা দাও …
  • মিলন-গান

    মিলন-গান

    মিলন-গান

    [গান]

    ভাই হয়ে ভাই চিনবি আবার গাইব কি আর এমন গান।
    (সেদিন)
    দুয়ার ভেঙে আসবে জোয়ার মরা গাঙে ডাকবে বান॥
    (তোরা)
    স্বার্থ-পিশাচ যেমন কুকুর তেমনি মুগুর পাস রে মান।
    (তাই)
    কলজে চুঁয়ে গলছে রক্ত দলছে পায়ে ডলছে কান॥
    (যত)
    মাদি তোরা বাঁদি-বাচ্চা দাস-মহলের খাস গোলাম।
    (হায়)
    মাকে খুঁজিস? চাকরানি সে, জেলখানাতে ভানছে ধান॥
    (মা-র)
    বন্ধ ঘরে কেঁদে কেঁদে অন্ধ হল দুই নয়ান।
    (তোরা)
    শুনতে পেয়েও শুনলি নে তা মাতৃহন্তা কুসন্তান॥
    (ওরে)
    তোরা করিস লাঠালাঠি (আর) সিন্ধু-ডাকাত লুঠছে ধান!
    (তাই)
    গোবর-গাদা মাথায় তোদের কাঁঠাল ভেঙে খায় সেয়ান॥
    (ছিলি)
    সিংহ ব্যাঘ্র, হিংসা-যুদ্ধে আজকে এমনি খিন্নপ্রাণ।
    (তোদের)
    মুখের গ্রাস ওই গিলছে শিয়াল তোমরা শুয়ে নিচ্ছ ঘ্রাণ॥
    (তোরা)
    কলুর বলদ টানিস ঘানি গলদ কোথায় নাইকো জ্ঞান।
    (শুধু)
    পড়ছ কেতাব, নিচ্ছ খেতাব, নিমক-হারাম বে-ইমান॥
    (তোরা)
    বাঁদর ডেকে মানলি সালিশ, ভাইকে দিতে ফাটল প্রাণ।
    (এখন)
    সালিশ নিজেই ‘খা ডালা সব’ বোকা তোদের এই দেখান॥
    (তোরা)
    পথের কুকুর দু-কান-কাটা মান-অপমান নাইকো জ্ঞান।
    (তাই)
    যে জুতোতে মারছে গুঁতো করছ তাতেই তৈল দান॥
    (তোরা)
    নাক কেটে নিজ পরের যাত্রা ভঙ্গ করিস বুদ্ধিমান।
    (তোদের)
    কে যে ভালো কে যে মন্দ সব শিয়ালই এক সমান॥
    (শুনি)
    আপন ভিটেয় কুকুর রাজা, তার চেয়েও হীন তোদের প্রাণ।
    (তাই)
    তোদের দেশ এই হিন্দুস্থানে নাই তোদেরই বিন্দু স্থান॥
    (তোদের)
    হাড় খেয়েছে, মাস খেয়েছে, (এখন) চামড়াতে দেয় হেঁচকা টান
    (আজ)
    বিশ্ব ভুবন ডুকরে ওঠে দেখে তোদের অসম্মান॥
    (আজ)
    সাধে ভারত-বিধাতা কি চোখ বেঁধে ওই মুখ লুকান।
    (তোরা)
    বিশ্বে যে তাঁর রাখিস নে ঠাঁই, কানা গোরুর ভিন বাথান॥
    (তোরা)
    করলি কেবল অহরহ নীচ কলহের গরল পান।
    (আজও)
    বুঝলি না হায় নাড়ি-ছেঁড়া মায়ের পেটের ভায়ের টান॥
    (ওই)
    বিশ্ব ছিঁড়ে আনতে পারি, পাই যদি ভাই তোদের প্রাণ।
    (তোরা)
    মেঘ-বাদলের বজ্রবিষাণ (আর) ঝড়-তুফানের লাল নিশান॥
  • পূর্ণ-অভিনন্দন

    পূর্ণ-অভিনন্দন

    পূর্ণ-অভিনন্দন

    [গান]1

    এসো অষ্টমী-পূর্ণচন্দ্র! এসো পূর্ণিমা-পূর্ণচাঁদ!

    ভেদ করি পুন বন্ধ কারার অন্ধকারের পাষাণফাঁদ!

    এসো অনাগত নব-প্রলয়ের মহাসেনাপতি মহামহিম!

    এসো অক্ষত মোহান্ধ-ধৃতরাষ্ট্র-মুক্ত লৌহ ভীম!

    স্বাগত ফরিদপুরের ফরিদ, মাদারিপুরের মর্দবীর,

    বাংলা মায়ের বুকের মানিক, মিলন পদ্মা-ভাগীরথীর!

    ছয়বার জয় করি কারা-ব্যূহ রাজ-রাহুগ্রাসমুক্ত চাঁদ!

    আসিলে চরণে দুলায়ে সাগর নয়-বছরের মুক্ত বাঁধ।

    নবগ্রহ ছিঁড়ি ফণি-মনসার মুকুটে তোমার গাঁথিলে হার,

    উদিলে দশম মহাজ্যোতিষ্ক ভেদিয়া গভীর অন্ধকার!

    স্বাগত ফরিদপুরের ফরিদ, মাদারিপুরের মর্দবীর,

    বাংলা মায়ের বুকের মানিক, মিলন পদ্মা-ভাগীরথীর!

    স্বাগত শুদ্ধ রুদ্ধপ্রতাপ, প্রবুদ্ধ নব মহাবলী!

    দনুজদমন দধীচি-অস্থি, বহ্নিগর্ভ দম্ভোলি!

    স্বাগত সিংহবাহিনী-কুমার! স্বাগত হে দেবসেনাপতি!

    অনাগত রণ-কুরুক্ষেত্রে সারথি পার্থ মহারথী!

    স্বাগত ফরিদপুরের ফরিদ, মাদারিপুরের মর্দবীর,

    বাংলা মায়ের বুকের মানিক, মিলন পদ্মা-ভাগীরথীর!

    নৃশংস রাজ-কংসবংশে হানিতে তোমার ধ্বংস-মার

    এসো অষ্টমী-পূর্ণচন্দ্র, ভাঙিয়া পাষাণ-দৈত্যাগার!

    এসো অশান্তি-অগ্নিকাণ্ডে শান্তিসেনার কাণ্ডারি!

    নারায়ণী-সেনা-সেনাধিপ, এসো প্রতাপের হারা-তরবারি!

    স্বাগত ফরিদপুরের ফরিদ, মাদারিপুরের মর্দবীর,

    বাংলা মায়ের বুকের মানিক, মিলন পদ্মা-ভাগীরথীর!

    ওগো অতীতের আজও-ধূমায়িত আগ্নেয়গিরি ধূম্রশিখ!

    না-আসা-দিনের অতিথি তরুণ তব পানে চেয়ে নির্নিমিখ।

    জয় বাংলার পূর্ণচন্দ্র, জয় জয় আদি-অন্তরীণ,

    জয় যুগে-যুগে-আসা-সেনাপতি, জয় প্রাণ আদি-অন্তহীন!

    স্বাগত ফরিদপুরের ফরিদ, মাদারিপুরের মর্দবীর,

    বাংলা মায়ের বুকের মানিক, মিলন পদ্মা-ভাগীরথীর!

    স্বর্গ হইতে জননী তোমার পেতেছেন নামি মাটিতে কোল,

    শ্যামল শস্যে হরিৎ ধান্যে বিছানো তাঁহারই শ্যাম আঁচল।

    তাঁহারই স্নেহের করুণ গন্ধ নবান্নে ভরি উঠিছে ওই,

    নদীস্রোত-স্বরে কাঁদিছেন মাতা, ‘কই রে আমার দুলাল কই?’

    স্বাগত ফরিদপুরের ফরিদ, মাদারিপুরের মর্দবীর,

    বাংলা মায়ের বুকের মানিক, মিলন পদ্মা-ভাগীরথীর!

    মোছো আঁখি-জল, এসো বীর! আজ খুঁজে নিতে হবে আপন মা-য়,

    হারানো মায়ের স্মৃতি-ছাই আছে এই মাটিতেই মিশিয়া, হায়!

    তেত্রিশ কোটি ছেলের রক্তে মিশেছে মায়ের ভস্ম-শেষ,

    ইহাদেরই মাঝে কাঁদিছেন মাতা, তাই আমাদের মা স্বদেশ।

    স্বাগত ফরিদপুরের ফরিদ, মাদারিপুরের মর্দবীর,

    বাংলা মায়ের বুকের মানিক, মিলন পদ্মা-ভাগীরথীর!

    এসো বীর! এসো যুগ-সেনাপতি! সেনাদল তব চায় হুকুম,

    হাঁকিছে প্রলয়, কাঁপিছে ধরণি, উদ্‌গারে গিরি অগ্নিধূম।

    পরাধীন এই তেত্রিশ কোটি বন্দির আঁখি-জলে হে বীর,

    বন্দিনী মাতা যাচিছে শক্তি তোমার অভয় তরবারির।

    স্বাগত ফরিদপুরের ফরিদ, মাদারিপুরের মর্দবীর,

    বাংলা মায়ের বুকের মানিক, মিলন পদ্মা-ভাগীরথীর!

    গলশৃঙ্খল টুটেনি আজিও, করিতে পারি না প্রণাম পা-য়

    রুদ্ধ কণ্ঠে ফরিয়াদ শুধু গুমরিয়া মরে গুরু ব্যথায়!

    জননীর যবে মিলিবে আদেশ, মুক্ত সেনানী দিবে হুকুম,

    শত্রুখড়্গ-ছিন্নমুণ্ড দানিবে ও-পায়ে প্রণাম-চুম।

    স্বাগত ফরিদপুরের ফরিদ, মাদারিপুরের মর্দবীর,

    বাংলা মায়ের বুকের মানিক, মিলন পদ্মা-ভাগীরথীর!

  • ঝোড়ো-গান

    ঝোড়ো-গান

    ঝোড়ো-গান

    [কীর্তন]

    (আমি)
    চাইনে হতে ভ্যাবাগঙ্গারাম
    ও দাদা শ্যাম!
    তাই
    গান গাই আর যাই নেচে যাই
    ঝমঝমাঝম অবিশ্রাম॥
    আমি   সাইক্লোন আর তুফান
    আমি   দামোদরের বান
    খোশখেয়ালে উড়াই ঢাকা, ডুবাই বর্ধমান।
    আর
    শিবঠাকুরকে কাঠি করে বাজাই ব্রহ্মা-বিষ্ণু-ড্রাম॥
  • মোহান্তের মোহ-অন্তের গান

    মোহান্তের মোহ-অন্তের গান

    মোহান্তের মোহ-অন্তের গান

    [গান]

    জাগো আজ দণ্ড-হাতে চণ্ড বঙ্গবাসী।
    ডুবাল পাপ-চণ্ডাল তোদের বাংলা দেশের কাশী।
      জাগো বঙ্গবাসী॥
    তোরা
    হত্যা দিতিস যাঁর থানে, আজ সেই দেবতাই কেঁদে
    ওরে
    তোদের দ্বারেই হত্যা দিয়ে মাগেন সহায় আপনি আসি।
      জাগো বঙ্গবাসী॥
    মোহের যার নাইকো অন্ত
    পূজারি সেই মোহান্ত,
    মা বোনে সর্বস্বান্ত করছে বেদি-মূলে।
    তোদেরে
    পূজার প্রসাদ বলে খাওয়ায় পাপ-পুঁজ সে গুলে।
    তোরা
    তীর্থে গিয়ে দেখে আসিস পাপ-ব্যভিচার রাশি রাশি।
      জাগো বঙ্গবাসী॥
    পুণ্যের ব্যাবসাদারি
    চালায় সব এই ব্যাপারি,
    জমাচ্ছে হাঁড়ি হাঁড়ি টাকার কাঁড়ি ঘরে।
    হায়
    ছাই মেখে যে ভিখারি-শিব বেড়ান ভিক্ষা করে –
    ওরে
    তাঁর পূজারি দিনে-দিনে ফুলে হচ্ছে খোদার খাসি।
      জাগো বঙ্গবাসী॥
    এইসব ধর্ম-ঘাগি
    দেবতায় করছে দাগি,
    মুখে কয় সর্বত্যাগী ভোগ-নরকে বসে।
    সে যে
    পাপের ঘণ্টা বাজায় পাপী দেবদেউলে পশে।
    আর
    ভক্ত তোরা পূজিস তারেই, জোগাস খোরাক সেবাদাসী!
      জাগো বঙ্গবাসী॥
    দিয়ে নিজ রক্তবিন্দু
    ভরালি পাপের সিন্ধু –
    ডুবলি তায়ডুবলি হিন্দু ডুবালি দেবতারে।
    দেখ
    ভোগের বিষ্ঠা পুড়ছে তোদের বেদির ধূপাধারে।
    পূজারীর
    কমণ্ডলুর গঙ্গাজলে মদের ফেনা উঠছে ভাসি।
      জাগো বঙ্গবাসী॥
    দিতে যায় পূজা-আরতি
    সতীত্ব হারায় সতী,
    পুণ্য-খাতায় ক্ষতি লেখায় ভক্তি দিয়ে,
    তার
    ভোগ-মহলের জ্বলছে প্রদীপ তোদের পুণ্য-ঘিয়ে।
    তোদের
    ফাঁকা ভক্তির ভণ্ডামিতে মহাদেব আজ ঘোড়ার ঘাসি।
      জাগো বঙ্গবাসী॥
    তোরা সব শক্তিশালী
    বুকে নয়, মুখে খালি!
    বেড়ালকে বাছতে দিলি মাছের কাঁটা যে রে!
    তোরা
       পূজারিকে করিস পূজা পূজার ঠাকুর ছেড়ে।
    মা-র অসুর শোধরা সে ভুল, আদেশ দেন মা সর্বনাশী।
    ‘জয় তারকেশ্বর’ বলে পরবি রে নয় গলায় ফাঁসি।
      জাগো বঙ্গবাসী॥
  • আশু-প্রয়াণগীতি

    আশু-প্রয়াণগীতি

    আশু-প্রয়াণগীতি

    কোরাস :
       বাংলার ‘শের’, বাংলার শির,
    বাংলার বাণী, বাংলার বীর
    সহসা ও-পারে অস্তমান।
    এপারে দাঁড়ায়ে দেখিল ভারত মহাভারতের মহাপ্রয়াণ॥
    বাংলার ঋষি বাংলার জ্ঞান বঙ্গবাণীর শ্বেতকমল,
    শ্যাম বাংলার বিদ্যাগঙ্গা অবিদ্যানাশী তীর্থজল!
    মহামহিমার বিরাট পুরুষ শক্তি-ইন্দ্র তেজ-তপন –
    রক্ত-উদয় হেরিতে সহসা হেরিনু সে রবি মেঘমগন।
    কোরাস :
       বাংলার ‘শের’, বাংলার শির,
    বাংলার বাণী, বাংলার বীর
    সহসা ও-পারে অস্তমান।
    এপারে দাঁড়ায়ে দেখিল ভারত মহাভারতের মহাপ্রয়াণ॥
    মদগর্বীর গর্বখর্ব বলদর্পীর দর্পনাশ
    শ্বেতভীতুদের শ্যাম বরাভয় রক্তাসুরের কৃষ্ণ ত্রাস!!
    নব ভারতের নব আশা-রবি প্রাচী-র উদার অভ্যুদয়
    হেরিতে হেরিতে হেরিনু সহসা বিদায়গোধূলি গগনময়।
    কোরাস :
       বাংলার ‘শের’, বাংলার শির,
    বাংলার বাণী, বাংলার বীর
    সহসা ও-পারে অস্তমান।
    এপারে দাঁড়ায়ে দেখিল ভারত মহাভারতের মহাপ্রয়াণ॥
    পড়িল ধসিয়া গৌরীশংকর হিমালয়-শির স্বর্গচূড়,
    গিরি কাঞ্চনজঙ্ঘা গিরিল – বাংলার যবে দিনদুপুর।
    শক্তিহাঙর শোষিছে রক্ত, মৃত্যু শোষিছে সাগরপ্রাণ, –
    পরাধীন মা-র স্বাধীন সুতের মেদ-ধূমে কালো দেশ শ্মশান।
    কোরাস :
       বাংলার ‘শের’, বাংলার শির,
    বাংলার বাণী, বাংলার বীর
    সহসা ও-পারে অস্তমান।
    এপারে দাঁড়ায়ে দেখিল ভারত মহাভারতের মহাপ্রয়াণ॥
    অরাজক মারি মড়াকান্নায় দেশজননীর বদ্ধ শ্বাস,
    হে দেব-আত্মা! স্বর্গ হইতে দাও কল্যাণ, দাও আভাস,
    কেমন করিয়া মৃত্যু মথিয়া মৃত্যুঞ্জয় হয় মানব।
    শব হয়ে গেছ, শিব হয়ে এসো দেবকী-কারার নীল কেশব।
    কোরাস :
       বাংলার ‘শের’, বাংলার শির,
    বাংলার বাণী, বাংলার বীর
    সহসা ও-পারে অস্তমান।
    এপারে দাঁড়ায়ে দেখিল ভারত মহাভারতের মহাপ্রয়াণ॥
  • ল্যাবেন্ডিশ বাহিনীর বিজাতীয় সংগীত

    ল্যাবেন্ডিশ বাহিনীর বিজাতীয় সংগীত

    ল্যাবেন্ডিশ2 বাহিনীর বিজাতীয় সংগীত

    কোরাস :
    কে বলে মোদেরে ল্যাডাগ্যাপচার? আমরা সিভিল গাড়,
    অরাজক এই ভারত-মাঠে হে আমরা উদ্‌মো ষাঁড়॥
    মোরা   লাঙল জোয়াল দড়াদড়ি-ছাড়া,
        বড় সুখে তাই দিই শিং-নাড়া,
        অসহ-যোগীও করিবে না তাড়া রে–
    ওরে
    ভয় নাই, ওরা বৈষ্ণব বাঘ, খাবে না মোদের হাড়!
    চলো
    ব্যাং-বীর বলো ঠ্যাং নেড়ে জোর, ছেডেডে ডেডেং হার্‌র্!
    কোরাস :
    কে বলে ইত্যাদি–
    মোরা গলদঘর্ম যদিও গলিয়া,
    বড়   বেজুত করেছে লেজুড় ডলিয়া,
    তবু   গলদ কোরো না বলদ বলিয়া হে,
    মোরা
    বড়ো দরকারি সরকারি গোরু, তরকারি নহি তার!
    তবে
    গতিক দেখিয়া অধিক না গিয়া সটান পগার পার!
    কোরাস :
    কে বলে ইত্যাদি –
    আজ   গোবরগণেশ গোবরমন্ত
        ল্যাজে ও গোবরে খিঁচেন দন্ত,
        তবু করুণার নাহিকো অন্ত হে,
    যত
    মামাদের কড়ি ধামা-ধরে দিয়া আমাদেরই ভাঙে ঘাড়!
    আর
    বাবাদেরে বেঁধে ঠ্যাঙাতে মোরাই কেটে দি বাঁশের ঝাড়।
    কোরাস :
    কে বলে ইত্যাদি –
    হয়ে   ইভিলের গুরু ডেভিল পশুর –
    সিভিল-বাহিনী, কী এত কসুর
    করেছি মাইরি? বলো তো শ্বশুর হে!
    ওই
    রাঙামুখে বাবা অন্ন দিয়ে তুলি নিজে খাই জোলো মাড়,
    তবু
    সেলাম ঠুকিতে মলাম বাবা গো বক্র মাজা ও ঘাড়!
    কোরাস :
    কে বলে ইত্যাদি –
    বহে   কালাতে ধলাতে গঙ্গা-যমুনা
    আমরা তাহারই দিব্যি নমুনা,
    এ-রীতি পিরিতি বুঝিবে কভু না হে,
    তাই
    কালামুখ প্রেমে আলা করি হাঁকি – ‘তাড় রে, নেটিভ তাড়’!
    তবে
    কোপন-স্বভাব দেখিলে অমনি গোপন খাম্বা-আড়!
    কোরাস :
    কে বলে ইত্যাদি –
    এবে কাঁপিবে মেদিনী শত উৎপাতে
    চিৎপটাং সে কত ‘ফুটপাথে’
    হবে আমাদেরই ভীম-কোঁৎকাতে হে!
    তবে
    পরোয়া কী দাদা? ক্যাঁকড়ার সম নিসপিস নাড়ো দাঁড়,
    যদি
    নিশ্চল হাতে পিস্তল কাঁপে তবু গোঁফে দাও চাড়।
    কোরাস :
    কে বলে ইত্যাদি –
    বাবা! যদিও এ-দেহ ঝুনো ঠনঠন
      তবু লোকে ভাবে ঠুঁটো পলটন!
    আরে ঘোড়া নাই! বাস, পায়ে হন্টন হে!
    বাজে
    করতাল – আজ হরতাল। ডাকে আত্মা যে খাঁচা ছাড়!
    ওরে
    ‘ওয়ান পেস স্টেপ ফরওয়ার্ড মার্চ, থুড়ি থুড়ি ব্যাকওয়ার্ড।’
  • সুপার (জেলের) বন্দনা

    সুপার (জেলের) বন্দনা

    সুপার (জেলের) বন্দনা3

    [ব্যঙ্গ-অনুকৃতি]

    তোমারই জেলে পালিছ ঠেলে, তুমি ধন্য ধন্য হে।

    আমার এ গান তোমারই ধ্যান, তুমি ধন্য ধন্য হে॥

    রেখেছ সান্ত্রি পাহারা দোরে

    আঁধার-কক্ষে জামাই-আদরে

    বেঁধেছ শিকল-প্রণয়-ডোরে

    তুমি ধন্য ধন্য হে॥

    আ-কাঁড়া চালের অন্ন-লবণ

    করেছ আমার রসনা-লোভন,

    বুড়ো ডাঁটা-ঘাঁটা লাপসি শোভন,

    তুমি ধন্য ধন্য হে॥

    ধরো ধরো খুড়ো চপেটা মুষ্টি,

    খেয়ে গয়া পাবে সোজা স-গুষ্টি,

    ওল-ছোলা দেহ ধবল-কুষ্টি

    তুমি ধন্য ধন্য হে॥

  • দুঃশাসনের রক্ত-পান

    দুঃশাসনের রক্ত-পান

    দুঃশাসনের রক্ত-পান

    বল রে বন্য হিংস্র বীর,

    দুঃশাসনের চাই রুধির।

    চাই রুধির, রক্ত চাই,

    ঘোষো দিকে দিকে এই কথাই

    দুঃশাসনের রক্ত চাই!

    দুঃশাসনের রক্ত চাই!!

    অত্যাচারী সে দুঃশাসন

    চাই খুন তার চাই শাসন,

    হাঁটু গেড়ে তার বুকে বসি

    ঘাড় ভেঙে তার খুন শোষি।

    আয় ভীম আয় হিংস্র বীর,

    কর আ-কণ্ঠ পান রুধির।

    ওরে এ যে সেই দুঃশাসন

    দিল শত বীরে নির্বাসন,

    কচি শিশু বেঁধে বেত্রাঘাত

    করেছে রে এই ক্রূর স্যাঙাত।

    মা বোনেদের হরেছে লাজ

    দিনের আলোকে এই পিশাচ।

    বুক ফেটে চোখে জল আসে,

    তারে ক্ষমা করা? ভীরুতা সে!

    হিংসাশী মোরা মাংসাশী,

    ভণ্ডামি ভালোবাসাবাসি!

    শত্রুরে পেলে নিকটে ভাই

    কাঁচা কলিজাটা চিবিয়ে খাই!

    মারি লাথি তার মড়া মুখে,

    তাতা-থই নাচি ভীম সুখে।

    নহি মোরা ভীরু সংসারী,

    বাঁধি না আমার ঘরবাড়ি।

    দিয়াছি তোদের ঘরের সুখ,

    আঘাতের তরে মোদের বুক।

    যাহাদের তরে মোরা চাঁড়াল

    তাহারাই আজি পাড়িছে গাল!

    তাহাদের তরে সন্ধ্যা-দীপ,

    আমাদের আন্দামান দ্বীপ

    তাহাদের তরে প্রিয়ার বুক

    আমাদের তরে ভীম চাবুক।

    তাহাদের ভালোবাসাবাসি

    আমাদের তরে নীল ফাঁসি।

    বরিছে তাদেরে বাজিয়া শাঁখ,

    মোদের মরণে নিনাদে ঢাক।

    জীবনের ভোগ শুধু ওদের,

    তরুণ বয়সে মরা মোদের।

    কার তরে ওরে কার তরে

    সৈনিক মোরা পচি মরে?

    কার তরে পশু সেজেছি আজ,

    অকাতরে বুক পেতে নিই বাজ।

    ধর্মাধর্ম কেন যে নাই

    আমাদের, তাহা কে বোঝে ভাই?

    কেন বিদ্রোহী সব-কিছুর?

    সব মায়া কেন করেছি দূর?

    কারে কস মন সে ব্যথা তোর?

    যার তরে চুরি সে বলে চোর।

    যার তরে মাখি গায়ে কাদা,

    সেই হয় এসে পথে বাধা।

    ভয় নাই গৃহী! কোরো না ভয়,

    সুখ আমাদের লক্ষ্য নয়।

    বিরূপাক্ষ যে মোরা ধাতার,

    আমাদের তরে ক্লেশ-পাথার।

    কাড়ি না তোদের অন্ন-গ্রাস

    তোমাদের ঘরে হানি না ত্রাস,

    জালিমের মোরা ফেলাই লাশ,

    রাজা-রাজড়ার সর্বনাশ!

    ধর্মচিন্তা মোদের নয়,

    আমাদের নাই মৃত্যুভয়!

    মৃত্যুকে ভয় করে যারা,

    ধর্মধ্বজ হোক তারা।

    শুধু মানবের শুভ লাগি

    সৈনিক যত দুখভাগী।

    ধার্মিক! দোষ নিয়ো না তার,

    কোরবানির4 সে, নয় রোজার5!

    তোমাদের তরে মুক্ত দেশ

    মোদের প্রাপ্য তোদের শ্লেষ।

    জানি জানি ওই রণাঙ্গণ

    হবে যবে মোর মৃৎ-কাফন6

    ফেলিবে কি ছোটো একটি শ্বাস?

    তিক্ত হবে কি মুখের গ্রাস?

    কিছুকাল পরে হাড্‌ডি মোর

    পিষে যাবে ভাই জুতিতে তোর!

    এই যারা আজ ধর্মহীন

    চিনে শুধু খুন আর সঙিন;

    তাহাদেরে মনে পড়িবে কার

    ঘরে পড়ে যারা খেয়েছে মার?

    ঘরে বসে নিস স্বর্গ-লোক,

    মেরে মরে তারে দিস দোজখ7

    ভয়ে-ভীরু ওরে ধর্মবীর!

    আমরা হিংস্র চাই রুধির!

    শয়তান মোরা? আচ্ছা, তাই।

    আমাদের পথে এসো না ভাই।

    মোদের রক্ত-রুধির-রথ,

    মোদের জাহান্নামের পথ,

    ছেড়ে দাও ভাই জ্ঞান-প্রবীণ,

    আমরা কাফের ধর্মহীন!

    এর চেয়ে বেশি কী দেবে গাল?

    আমরা পিশাচ খুন-মাতাল।

    চালাও তোমার ধর্ম-রথ,

    মোদের কাঁটার রক্ত-পথ,

    আমরা বলিব সর্বদাই –

    দুঃশাসনের রক্ত চাই!

    দুঃশাসনের রক্ত চাই!!

    চাই না ধর্ম, চাই না কাম,

    চাই না মোক্ষ, সব হারাম

    আমাদের কাছে; শুধু হালাল8

    দুশমন-খুন লাল-সে-লাল॥

  • শহীদী-ঈদ

    শহীদী-ঈদ

    শহীদী-ঈদ

    (১)

    শহিদের ইদ এসেছে আজ

    শিরোপরি খুন-লোহিত তাজ,

    আল্লার রাহে চাহে সে ভিখ;

    জিয়ারার চেয়ে পিয়ারা যে

    আল্লার রাহে তাহারে দে,

    চাহি না ফাঁকির মণিমানিক।

    (২)

    চাহি নাকো গাভি দুম্বা উট

    কতটুকু দান? ও দান ঝুট।

    চাই কোরবানি, চাই না দান।

    রাখিতে ইজ্জত ইসলামের

    শির চাই তোর, তোর ছেলের,

    দেবে কি? কে আছ মুসলমান?

    (৩)

    ওরে ফাঁকিবাজ, ফেরেব-বাজ,

    আপনারে আর দিসনে লাজ, –

    গোরু ঘুষ দিয়ে চাস সওয়াব?

    যদিই রে তুই গোরুর সাথ

    পার হয়ে যাস পুলসেরাত,

    কী দিবি মোহাম্মদে (দঃ) জওয়াব!

    (৪)

    শুধাবেন যবে – ওরে কাফের,

    কী করেছ তুমি ইসলামের?

    ইসলামে দিয়ে জাহান্নম

    আপনি এসেছ বেহেশ্‌ত পর –

    পুণ্য-পিশাচ! স্বার্থপর!

    দেখাসনে মুখ, লাগে শরম।

    (৫)

    গোরুরে করিলে সেরাত পার,

    সন্তানে দিলে নরক-নার!

    মায়া-দোষে ছেলে গেল দোজখ।

    কোরবানি দিলি গোরু-ছাগল,

    তাদেরই জীবন হল সফল

    পেয়েছে তাহারা বেহেশ্‌ত-লোক!

    (৬)

    শুধু আপনারে বাঁচায় যে,

    মুসলিম নহে, ভণ্ড সে!

    ইসলাম বলে – বাঁচো সবাই!

    দাও কোরবানি জান ও মাল,

    বেহেশ্‌ত তোমার করো হালাল।

    স্বার্থপরের বেহেশ্‌ত নাই।

    (৭)

    ইসলামে তুমি দিয়ে কবর

    মুসলিম বলে কর ফখর!

    মোনাফেক তুমি সেরা বে-দীন!

    ইসলামে যারা করে জবেহ্,

    তুমি তাহাদেরই হও তাঁবে।

    তুমি জুতো-বওয়া তারই অধীন।

    (৮)

    নামাজ-রোজার শুধু ভড়ং,

    ইয়া উয়া পরে সেজেছ সং,

    ত্যাগ নাই তোর এক ছিদাম!

    কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা করো জড়ো,

    ত্যাগের বেলাতে জড়সড়ো!

    তোর নামাজের কী আছে দাম?

    (৯)

    খেয়ে খেয়ে গোশ্‌ত রুটি তো খুব

    হয়েছ খোদার খাসি বেকুব,

    নিজেদের দাও কোরবানি।

    বেঁচে যাবে তুমি, বাঁচিবে দ্বীন,

    দাস ইসলাম হবে স্বাধীন,

    গাহিছে কামাল এই গানই!

    (১০)

    বাঁচায়ে আপনা ছেলে-মেয়ে

    জান্নাত পানে আছ চেয়ে

    ভাবিছ সেরাত হবেই পার।

    কেন না, দিয়েছ সাত জনের

    তরে এক গোরু! আর কী ঢের!

    সাতটি টাকায় গোনাহ্ কাবার!

    (১১)

    জান না কি তুমি, রে বে-ইমান

    আল্লা সর্বশক্তিমান

    দেখিছেন তোর সব কিছু?

    জাব্বা-জোব্বা দিয়ে ধোঁকা

    দিবি আল্লারে, ওরে বোকা!

    কেয়ামতে হবে মাথা নিচু!

    (১২)

    ডুবে ইসলাম, আসে আঁধার!

    ইব্রাহিমের মতো আবার

    কোরবানি দাও প্রিয় বিভব!

    ‘জবীহুল্লাহ্’ ছেলেরা হোক,

    যাক সব কিছু – সত্য রোক!

    মা হাজেরা হোক মায়েরা সব।

    (১৩)

    খাবে দেখেছিলেন ইব্রাহিম –

    ‘দাও কোরবানি মহামহিম!’

    তোরা যে দেখিস দিবালোকে

    কী যে দুর্গতি ইসলামের!

    পরীক্ষা নেন খোদা তোদের

    হবিবের সাথে বাজি রেখে!

    (১৪)

    যত দিন তোরা নিজেরা মেষ,

    ভীরু দুর্বল, অধীন দেশ, –

    আল্লার রাহে ততটা দিন

    দিয়ো নাকো পশু কোরবানি,

    বিফল হবে রে সবখানি!

    (তুই) পশু চেয়ে যে রে অধম হীন!

    (১৫)

    মনের পশুরে কর জবাই,

    পশুরাও বাঁচে, বাঁচে সবাই।

    কশাই-এর আবার কোরবানি! –

    আমাদের নয়, তাদের ইদ,

    বীর-সুত যারা হল শহিদ,

    অমর যাদের বীরবাণী।

    (১৬)

    পশু কোরবানি দিস তখন

    আজাদ মুক্ত হবি যখন

    জুলুম-মুক্ত হবে রে দীন। –

    কোরবানির আজ এই যে খুন

    শিখা হয়ে যেন জ্বালে আগুন,

    জালিমের যেন রাখে না চিন॥

    আমিন রাব্বিল আলমিন!!

    আমিন রাব্বিল আলমিন!!

  • রিক্তের বেদন

    রিক্তের বেদন

    রিক্তের বেদন

    ‘রিক্তের বেদন’ কাজী নজরুল ইসলামের রচিত একটি গল্পগ্রন্থ। এতে মোট ৮টি গল্প রয়েছে। গ্রন্থটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯২৪ খ্রিষ্টাব্দের ডিসেম্বর মাসে। প্রকাশক ওরিয়েণ্টল প্রিণ্টার্স এণ্ড পাবলিশার্স লিমিটেড; ২৬/৯/১-এ, হ্যারিসন রোড, কলিকাতা। পৃষ্ঠা সংখ্যা ৪+১৬০; মূল্য দেড় টাকা। প্রকাশকের পক্ষে কবি মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক ‘নিবেদন’-এ বলেন—

    “রণকোলাহলের মত্ততার মাঝে জন্মেছিল তরুণ কবির ভাবরাজ্যের দ্যোতনা-করা এই উচ্ছ্বাস। মেসোপটেমিয়ার ধূলি ঝেড়ে আমার ন্যায় অযোগ্য ব্যক্তিকেই একে কোল দিতে হয়েছিল। আমার অযোগ্যতাই এতদিন কবির হৃদয়োচ্ছ্বাসকে চেপে রেখে সহৃদয় পাঠকবর্গের সহিত তার পরিচয়ের ব্যাঘাত জন্মিয়েছে। এতে কবি এবং তার পাঠকবর্গের প্রতি অন্যায়-অত্যাচারের জন্য আমি দায়ী। অদ্য প্রায়শ্চিত্ত করলাম।”

    কলিকাতা,

    বড়দিন, ১৯২৪।

    ‘রিক্তের বেদন’ গল্পটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৩২৭ বঙ্গাব্দের বৈশাখ মাসের ‘নূর’ পত্রিকায়।

    ‘বাউণ্ডেলের আত্মকাহিনী’ প্রথম প্রকাশিত হয় ১৩২৬ বঙ্গাব্দের জ্যৈষ্ঠের ‘সওগাত’ পত্রিকায়। এই গল্পটি কাজী নজরুল ইসলামের প্রথম প্রকাশিত রচনা।

    ‘মেহের নেগার’ প্রথম প্রকাশিত হয় ১৩২৬ বঙ্গাব্দের মাঘের ‘নূর’ পত্রিকায়।

    ‘সাঁঝের তারা’ প্রথম প্রকাশিত হয় ১৩২৭ বঙ্গাব্দের মাঘের ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য-পত্রিকা’য়।

    ‘রাক্ষুসী’ প্রথম প্রকাশিত হয় ১৩২৭ বঙ্গাব্দের মাঘের ‘সওগাত’ পত্রিকায়।

    ‘সালেক’ ১৩২৭ বঙ্গাব্দের আষাঢ়ের ‘বকুল’ পত্রিকায় ‘সালিক’ শিরোনামে প্রথম প্রকাশিত হয়।

    ‘স্বামীহারা’ ১৩২৬ বঙ্গাব্দের ভাদ্রের ‘সওগাত’ পত্রিকায় প্রথম প্রকাশিত হয়।

    ‘দুরন্ত পথিক’ দৈনিক ‘নবযুগ’ হতে ১৩২৭ বঙ্গাব্দের আশ্বিনের ‘মোসলেম ভারত’ পত্রিকায় সঙ্কলিত হয়েছিল।

  • নিবেদন

    নিবেদন

    নিবেদন

    রণ কোলাহলের মত্ততার মাঝে জন্মেছিল, তরুণ কবির ভাবরাজ্যের দ্যোতনা-ভরা এই উদ্ভাস। মেসোপটেমিয়ার ধূলি ঝেড়ে আমার ন্যায় অযোগ্য ব্যক্তিকেই একে কোল দিতে হয়েছিল। আমার অযোগ্যতাই এতদিন কবির হৃদয়োচ্ছ্বাসকে চেপে রেখে সহৃদয় পাঠকবর্গের সহিত তার পরিচয়ের ব্যঘাত জন্মিয়েছে। এতে কবি ও তার পাঠকবর্গের প্রতি অন্যায়-অত্যাচারের জন্য আমি দায়ী। অদ্য প্রায়শ্চিত্ত করলাম।

    কলিকাতা
    বড়দিন, ১৯২৪
    মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক
  • রিক্তের বেদন (গল্প)

    রিক্তের বেদন (গল্প)

    রিক্তের বেদন (গল্প)

    [ ক ]

    বীরভূম

    আঃ! একী অভাবনীয় নতুন দৃশ্য দেখলুম আজ? …

    জননী জন্মভূমির মঙ্গলের জন্যে সে-কোন্ অদেখা-দেশের আগুনে প্রাণ আহুতি দিতে একী অগাধ-অসীম উৎসাহ নিয়ে ছুটছে তরুণ বাঙালিরা,–আমার ভাইরা! খাকি পোশাকের ম্লান আবরণে এ কোন্ আগুনভরা প্রাণ চাপা রয়েছে! –তাদের গলায় লাখো হাজার ফুলের মালা দোল খাচ্ছে, ওগুলো আমাদের মায়ের-দেওয়া ভাবী বিজয়ের আশিস-মাল্য,–বোনের দেওয়া স্নেহ-বিজড়িত অশ্রু গৌরবোজ্জ্বল-কণ্ঠহার!

    ফুলগুলো কত আর্দ্র-সমুজ্জ্বল! কী বেদনা-রাঙা মধুর! ওগুলো তো ফুল নয়, ও যে আমাদের মা-ভাই-বোনের হৃদয়ের পূততম প্রদেশ হতে উজাড়-করে দেওয়া অশ্রুবিন্দু! এই যে অশ্রু ঝরেছে আমাদের নয়ন গলে, এর মত শ্রেষ্ঠ অশ্রু আর ঝরেনি,–ওঃ সে কত যুগ হতে!

    আজ ক্ষান্ত-বর্ষণ প্রভাতের অরুণ কিরণ চিরে নিমিষের জন্য বৃষ্টি নেমে তাদের খাকি বসনগুলোকে আরও গাঢ়-ম্লান করে দিয়েছিল। বৃষ্টির ঐ খুব মোটা ফোঁটাগুলো বোধ হয় আর কারুর ঝরা অশ্রু! সেগুলো মায়ের অশ্রু-ভরা শান্ত আশীর্বাদের মত তাদিগে কেমন অভিষিক্ত করে দিল!

    তারা চলে গেল! একটা যুগবাঞ্ছিত গৌরবের সার্থকতার রুদ্ধবক্ষ বাষ্পরথের বাষ্পরুদ্ধ ফোঁস ফোঁস শব্দ ছাপিয়ে আশার সে কী করুণ গান দুলে দুলে ভেসে আসছিল,–

    ‘বহুদিন পরে হইব আবার আপন কুটিরবাসী,

    হেরিব বিরহ-বিধুর-অধরে মিলন-মধুর হাসি,

    শুনিব বিরহ-নীরব কণ্ঠে মিলন-মুখর বাণী,–

    আমার কুটির-রানি সে যে গো আমার হৃদয়-রানি।’

    সমস্ত প্রকৃতি তখন একটা বুকভরা স্নিগ্ধতায় ভরে উঠেছিল! বাংলার আকাশে, বাংলার বাতাসে সে বিদায়-ক্ষণে ত্যাগের ভাস্বর অরুণিমা মূর্ত হয়ে ফুটে উঠেছিল। কে বলে মাটির মায়ের প্রাণ নেই?

    এই যে জল-ছলছল শ্যামোজ্জ্বল বিদায়-ক্ষণটুকু অতীত হয়ে গেল, কে জানে সে আবার কত যুগ বাদে এমনই একটা সত্যিকার বিদায়-মুহূর্ত আসবে?

    আমরা ‘ইস্তকনাগাদ্’ ত্যাগের মহিমা কীর্তন পঞ্চমুখে করে আসছি, কিন্তু কাজে কতটুকু করতে পেরেছি? আমাদের করার সমস্ত শক্তি বোধ হয় এই বলার মধ্য দিয়েই গলে যায়!

    পারবে? বাংলার সাহসী যুবক! পারবে এমনি করে তোমাদের সবুজ, কাঁচা, তরুণ জীবনগুলো জ্বলন্ত আগুনে আহুতি দিতে, দেশের এতটুকু সুনামের জন্যে? তবে এস! ‘এস নবীন, এস! এস কাঁচা, এস!’ তোমরাই তো আমাদের দেশের ভবিষ্যৎ আশা, ভরসা, সব! বৃদ্ধদের মানা শুনো না। তাঁরা মঞ্চে দাঁড়িয়ে সুনাম কিনবার জন্য ওজস্বিনী ভাষায় বক্তৃতা দিয়ে তোমাদের উদ্বুদ্ধ করেন, আবার কোনো মুগ্ধ যুবক নিজেকে ঐ রকম বলিদান দিতে আসলে আড়ালে গিয়ে হাসেন এবং পরোক্ষে অভিসম্পাত করেন। মনে করেন, ‘এই মাথা-গরম ছোকরাগুলো কী নির্বোধ!’ ভেঙে ফেল, ভেঙে ফেল ভাই, এদের এ সংকীর্ণ স্বার্থ-বন্ধন!

    অনেকদিন পরে দেশে একটা প্রতিধ্বনি উঠছে, ‘জাগো হিন্দুস্থান, জাগো! হুঁশিয়ার!’

    নান্নুর

    মা! মা! কেন বাধা দিচ্ছ? কেন এ-অবশ্যম্ভাবী একটা অগ্ন্যুৎপাতকে পাথর চাপা দিয়ে আটকাবার বৃথা চেষ্টা করছ?–আচ্ছা, মা! তুমি বি-এ পাশকরা ছেলের জননী হতে চাও, না বীর-মাতা হতে চাও? এ ঘুমের নিঝুম-আলস্যের দেশে বীরমাতা হওয়ার মত সৌভাগ্যবতী জননী কয়জন আছেন মা? তবে, কোন্‌টি বরণীয় তা জেনেও কেন এ অন্ধস্নেহকে প্রশ্রয় দিচ্ছ? গরিয়সী মহিমান্বিতা মা আমার! ছেড়ে দাও, ছেড়ে দাও–তোমার এ জনম-পাগল ছেলেকে ছেড়ে দাও! দুনিয়ায় সব কিছু দিয়েও এখন আমায় ধরে রাখতে পারবে না। আগুন আমার ভাই–আমায় ডাক দিয়েছে! সে যে কিছুতেই আঁচলচাপা থাকবে না। আর, যে থাকবে না, সে বাঁধন ছিঁড়বেই। সে সত্যসত্যই পাগল, তার জন্য এখনও এমন পাগলা-গারদের নির্মাণ হয়নি, যা তাকে আটকে রাখতে পারবে!

    পাগল আজকে ভাঙরে আগল

    পাগলা-গারদের,

    আর ওদের

    সকল শিকল শিথিল করে বেরিয়ে পালা বাইরে

    দুশমন স্বজনের মতো দিন-দুনিয়ায় নাইরে!

    ও তুই বেরিয়ে পালা বাইরে॥

    * * *

    আজ যুদ্ধে যাওয়ার আদেশ পেয়েছি! … পাখি যখন শিকলি কাটে, তখন তার আনন্দটা কী রকম বেদনা-বিজড়িত মধুর। …

    আহ্, আমায় আদেশ দিয়ে শেষ আশিস করবার সময় মার গলার আওয়াজটা কী রকম আর্দ্র-গভীর হয়ে গিয়েছিল! সে কী উচ্ছ্বসিত রোদনের বেগ আমাদের দুজনকেই মুষড়ে দিচ্ছিল! … হাজার হোক, মায়ের মন তো!

    আকাশ যখন তার সঞ্চিত সমস্ত জমাট-নীর নিঃশেষে ঝরিয়ে দেয়, তখন তার অসীম নিস্তব্ধ বুকে সে কী একটা শান্ত সজল স্নিগ্ধতার তরল কারুণ্য ফুটে উঠে!

    মার একমাত্র জীবিত সন্তান, বি-এ পড়ছিলুম; মায়ের মনে যে কত আশাই না মুকুলিত পল্লবিত হয়ে উঠেছিল! আমি আজ সে-সব কত নিষ্ঠুরভাবে দলে দিলুম! কী করি, এ দিনে এরকম যে না করেই পারি না।

    আমার পরিচিত সমস্ত লোক মিলে আমায় তিরস্কার করতে আরম্ভ করেছে যেন আমি একটা ভয়ানক অন্যায় করেছি। সবাই বলছে, আমার সহায়-সম্বলহীন মাকে দেখবে কে! … হায়, আজ আমার মা যে রাজরাজেশ্বরীর আসনে প্রতিষ্ঠাতা, তা কাউকে বুঝাতে পারব না!

    কাকে বুঝাই যে, লক্ষপতি হয়ে দশ হাজার টাকা বিলিয়ে দিলে তাকে ত্যাগ বলে না, সে হচ্ছে দান। যে নিজেকে সম্পূর্ণ রিক্ত করে নিজের সর্বস্বকে বিলিয়ে দিতে না পারল, সে তো ত্যাগী নয়। মার এই উঁচু ত্যাগের গগনস্পর্শী চূড়া কেউ যে ছুঁতেই পারবে না। তাঁর এ গোপন বরেণ্য মহিমা একা অন্তর্যামীই জানে!

    এই তো সত্যিকারের মোসলেম জননী, যিনি নিজ হাতে নিজের একমাত্র সন্তানকে যুদ্ধসাজে সাজিয়ে জন্মভূমির পায়ে রক্ত ঢালতে পাঠাতেন।

    এ বিসর্জন না অর্জন?

    সালার

    জননী আর জন্মভূমির দিকে কখনও আর এত স্নেহ এত ব্যথিত দৃষ্টিতে চেয়ে দেখিনি, যেমন তাঁদিগে ছেড়ে আসবার দিনে দেখেছিলুম। … শেষ চাওয়া মাত্রেই বোধ হয় এমনই প্রগাঢ় করুণ! …

    নাঃ, আমাকে হয়রান করে ফেললে এদের অতিভক্তির চোটে। আমি যেন মহামহিমান্বিত এক সম্মানার্হ ব্যক্তিবিশেষ আর কী! দিন নেই, রাত নেই, শুধু লোক আসছে আর আসছে। যে-আমাকে তারা এইখানেই হাজার বার দেখেছে তারাও আবার আমায় নতুন করে দেখছে। এ এক যেন তাজ্জব ব্যপার। আমি আমার চির পরিচিত শৈশব-সাথী বন্ধুদের মাঝে থেকেও মনে করছি যেন ‘আবু হোসেনের’ মত এক রাত্তিরেই আমি ঐ রকম একটা রাজা বাদশা গোছ কিছু হয়ে পড়েছি! সবচেয়ে বেশি দুঃখ হচ্ছে আমার অন্তরঙ্গ বন্ধুদের ভক্তি দেখে। বন্ধুরা যদি ভক্তি করে, তাহলে বন্ধুদের ঘাড়ে পড়ল একটা প্রকাণ্ড মুদ্গর! তাদিগে যতই বলছি, ভো ভো আহম্মকবৃন্দ, তোমাদের এ চোরের লক্ষণ, ওরফে অতিভক্তি সম্বরণ কর, ততই যেন তারা আমার আরও মহত্ত্বের পরিচয় পাচ্ছে! … বাইরে তো বেরোনো দায়! বেরোলেই অমনি স্ত্রী-পুরুষের ছোট বড় মাঝারি প্রাণী আমার দিকে প্রাণপণে চক্ষু বিস্ফারিত করে চেয়ে থাকে, আর অন্যকে আমার সবিশেষ ইতিবৃত্ত জ্ঞাত করিয়ে বলে, ‘ঐ রে, ঐ লম্বা সুন্দর ছেলেটা যুদ্ধে যাচ্ছে।’

    তারা কোন্‌টা দেখে আমার, – ভিতর না বাহির?

  • বাউণ্ডুলের আত্মকাহিনী

    বাউণ্ডুলের আত্মকাহিনী

    বাউণ্ডুলের আত্মকাহিনী

    [ ক ]

    [বাঙালি পল্টনের একটি বওয়াটে যুবক আমার কাছে তাহার কাহিনী বলিয়াছিল নেশার ঝোঁকে : নীচে তাহাই লেখা হইল। সে বোগদাদে গিয়া মারা পড়ে–]

    ‘কি ভায়া! নিতান্তই ছাড়বে না? একদম এঁটেল মাটির মত লেগে থাকবে? আরে ছোঃ! তুমি যে দেখছি চিটেগুড়ের চেয়েও চামচিটেল! তুমি যদিও হচ্ছ আমার এক ক্লাসের ইয়ার, তবুও সত্যি বলতে কি, আমার সে সব কথাগুলো বলতে কেমন যেন একটা অস্বস্তি বোধ হয়। কারণ খোদা আমায় পয়দা করবার সময় মস্ত একটা গলদ করে বসেছিলেন, কেননা চামড়াটা আমার করে দিলেন হাতির চেয়েও পুরু, আর প্রাণটা করে দিলেন কাদার চেয়েও নরম! আর কাজেই দু-চার জন মজুর লাগিয়ে আমার এই চামড়ায় মুগুর বসালেও আমি গোঁপে তা দিয়ে বলব, ‘কুচ্ পরওয়া নেই’, কিন্তু আমার এই ‘নাজোক’ জানটায় একটু আঁচড় লাগলেই ছোট্ট মেয়ের মত চেঁচিয়ে উঠবে! তোমার ‘বিরাশি দশআনা’ ওজনের কিলগুলো আমার এই স্থূল চর্মে স্রেফ আরাম দেওয়া ভিন্ন আর কোনো ফলোৎপাদন করতে পারে না, কিন্তু যখনই পাকড়ে বস, ‘ভাই, তোমার সকল কথা খুলে বলতে হবে’, তখন আমার অন্তরাত্মা ধুকধুক করে ওঠে,–পৃথিবী ঘোরার ভৌগোলিক সত্যটা তখন হাড়ে হাড়ে অনুভব করি। চক্ষেও যে সর্ষপ পুষ্প প্রস্ফুটিত হতে পারে বা জোনাক পোকা জ্বলে উঠতে পারে, তা আমার মত এই রকম শোচনীয় অবস্থায় পড়লে তুমিও অস্বীকার করবে না।

  • মেহের-নেগার

    মেহের-নেগার

    মেহের-নেগার

    [ ক ]

    ঝিলম

    বাঁশি বাজছে, আর এক বুক কান্না আমার গুমরে উঠছে। আমাদের ছাড়াছাড়ি হল তখন, যখন বৈশাখের গুমোটভরা উদাস-মদির সন্ধ্যায় বেদনাতুর পিলু-বারোঁয়া রাগিণীর ক্লান্ত কান্না হাঁপিয়ে হাঁপিয়ে বেরুচ্ছিল। আমাদের দুজনারই যে এক-বুক করে ব্যথা, তার অনেকটা প্রকাশ পাচ্ছিল ঐ সরল-বাঁশের বাঁশির সুরে। উপুড়-হয়ে পড়ে-থাকা সমস্ত স্তব্ধ ময়দানটার আশে-পাশে পথ হারিয়ে গিয়ে তারই উদাস প্রতিধ্বনি ঘুরে মরছিল! দুষ্ট দয়িতকে খুঁজে খুঁজে বেচারা কোকিল যখন হয়রান পেরেশান হয়ে গিয়েছে, আর অশান্ত অশ্রুগুলো আটকে রাখবার ব্যর্থ চেষ্টায় বারংবার চোখ দুটোকে ঘষে ঘষে কলিজার মত রক্ত-লোহিত করে ফেলেছে, তখন তরুণী কোয়েলিটা তার প্রণয়ীকে এই ব্যথা দেওয়ায় বোধ হয় বাস্তবিকই ব্যথিত হয়ে উঠেছিল,–কেননা, তখনই কলামোচার আমগাছটার আগডালে কচি আমের থোকার আড়ালে থেকে মুখ বাড়িয়ে সকৌতুকে সে কুক দিয়ে উঠল ‘কু-কু-কু’। বেচারা শ্রান্ত কোকিল তখন রুদ্ধকণ্ঠে তার এই পাওয়ার আনন্দটা জানাতে আকুলি বিকুলি করে চেঁচিয়ে উঠল, কিন্তু ডেকে ডেকে তখন তার গলা বসে গিয়েছে, তবু অশোক গাছ থেকে ঐ ভাঙা গলাতেই তার যে চাপা বেদনা আটকে যাচ্ছিল, তারই আঘাত খেয়ে সাঁঝের বাতাস ঝিলমতীরের কাশের বনে মুহুর্মুহু কাঁপন দিয়ে গেল।

    আমি ডাক দিলুম, ‘মেহের-নেগার’! কাশের বনটা তার হাজার শুভ্রশিষ দুলিয়ে বিদ্রুপ করলে, ‘…আ…র’! ঝিলমের ওপারের উঁচু চরে আহত হয়ে আমারই আহ্বান কেঁদে ফেললে, আর সে রুদ্ধশ্বাসে ফিরে এসে এইটুকু বলতে পারলে, ‘মেহের-নেই-আর’!

    পশ্চিমে সূর্যের চিতা জ্বলল এবং নিবে এল। বাঁশির কাঁদন থামল। মলয়-মারুত পারুল বনে নামল বড় বড় শ্বাস ফেলে। পারুল বললে, ‘উ-হু’–মলয় বললে, ‘আ-হা–আঃ’।

    আমি বুক ফুলিয়ে চুল দুলিয়ে মনটাকে খুব একচোট বকুনি দিয়ে আনন্দভৈরবী আলাপ করতে করতে ফিরলুম–আমার মত অনেক হতভাগারই ঐ ব্যথাবিজড়িত চলার পথ ধরে। এমন সাধা গলাতেও আমার সুরটার কলতান শুধু হোঁচট খেয়ে লজ্জায় মরে যাচ্ছিল। আমার কিন্তু লজ্জা হচ্ছিল না। আমার বন্ধু তানপুরাটা কোলে করে তখন শ্রীরাগ ভাঁজছেন দেখলুম। তিনি হেসে বললেন, ‘কি য়ুসোফ! এ-আসন্ন সন্ধ্যা বুঝি তোমার আনন্দ-ভৈরবী আলাপের সময়? তুমি যে দেখছি অপরূপ বিপরীত!’ আমার তখন কান্না আসছিল। হেসে বললুম, ‘ভাই তোমার শ্রীরাগেরও তো সময় পেরিয়ে গেছে।’ সে বললে ‘তাই তো! কিন্তু তোমার হাসি আজ এত করুণ কেন,–ঠিক পাথর-খোদা মূর্তির হাসির মত হিম-শীতল আর জমাট?’ আমি উল্টো দিকে মুখ ফিরিয়ে খুব তাড়াতাড়ি চলতে লাগলুম।

    আদরিনী অভিমানী বধূর মত সন্ধ্যা তার মুখটাকে ক্রমশই কালিপানা আঁধার করে তুলছিল। এমন সময় কৃষ্ণপক্ষের দ্বিতীয়া তিথির এক-আকাশ তারা তাকে ঘিরে বললে, ‘সন্ধ্যারাণী! বলি এত মুখভার কিসের? এত ব্যস্ত হসনে লো, ঐ চন্দ্রদেব এল বলে!’ অপ্রতিভ বেচারি সন্ধ্যার মুখে জোর করে হাসার সলজ্জ-মলিন ঈষৎ আলো ফুটে উঠল। চাঁদ এল মদখোর মাতালের মত টলতে টলতে, চোখ মুখ লাল করে। এসেই সে জোর করে সন্ধ্যা বধূর আবরু ঘোমটা খুলে দিলে। সন্ধ্যা হেসে ফেললে। লুকিয়ে-দেখা বউ-ঝির মত একটা পাখি বকুল গাছের থেকে লজ্জারাঙা হয়ে টিটকারি দিয়ে উঠল, ‘ছি-ছি’। তারপর চাঁদে আর সন্ধ্যায় অনেক ঝগড়াঝাঁটি হয়ে সন্ধ্যার চিবুক আর গাল বেয়ে খুব খানিক শিশির ঝরবার পর সে বেশ খুশি মনেই আবার হাসি-খেলা করতে লাগল। কতকগুলো বেহায়া তারা ছাড়া অধিকাংশকেই আর দেখা গেল না।

    আমার বিজন কুটিরে ফিরে এলুম। চাঁদ উঠেছে, তাই আর প্রদীপ জ্বাললুম না। আর, জ্বালালেও দীপশিখার ঐ ম্লান ধোঁয়ার রাশটা আমার ঘরের বুকভরা অন্ধকারকে একেবারে তাড়াতে পারবে না। সে থাকবে লুকিয়ে পাতার আড়ালে, ঘরের কোণে, সব জিনিসেরই আড়ালে; ছায়া হয়ে আমাকে মধ্যে রেখে ঘুরবে আমারই চারপাশে! চোখের পাতা পড়তে না পড়তে হড়পা বানের মত হুপ করে আবার সে এসে পড়বে–যেই একটু সরে যাবে এই দীপশিখাটি!–ওগো আমার অন্ধকার! আর তোমায় তাড়াব না।–আজ হতে তুমি আমার সাথী, আমার বন্ধু, আমার ভাই!–বুঝলে ভাই আঁধার, এই আলোটার পেছনে খামখা এতগুলো বছর ঘুরে মরলুম!

    আমি বললুম, ‘ওগো মেহের-নেগার! আমার তোমাকে চাই-ই। নইলে যে আমি বাঁচব না! তুমি আমার। নইলে এত লোকের মাঝে তোমাকে আমি নিতান্ত আপনার বলে চিনলুম কী করে?–তুমিই তো আমার স্বপ্নে পাওয়া সাথী!–তুমি আমার, নিশ্চয়ই আমার!’–চলতে চলতে থমকে দাঁড়িয়ে সে আমার পানে চাইলে, পলাশ ফুলের মত ডাগর টানাটানা কাজল-কালো চোখ দুটির গভীর দৃষ্টি দিয়ে আমার পানে চাইলে! কলসিটি-কাঁখে ঐ পথের বাঁকেই অনেকক্ষণ স্তব্ধ হয়ে রইল সে। তারপর বললে, ‘আচ্ছা,–তুমি পাগল?’–আমি ঢোক গিলে, একরাশ অশ্রু ভিতর দিকে ঠেলে দিয়ে মাথা দুলিয়ে বললুম, ‘হুঁ’! তার আঁখির ঘনকৃষ্ণ পল্লবগুলোতে আঁশু উথলে এল! তারপর সে তাড়াতাড়ি চলে যেতে যেতে বললে, ‘আচ্ছা, আমি তোমারই!’

    একটা অসম্ভব আনন্দের জোর ধাক্কায় আমি অনেকক্ষণ মুষড়ে পড়েছিলুম। চমকে উঠে চেয়ে দেখলুম, সে পথের বাঁক ফিরে অনেক দূর চলে যাচ্ছে।

    আমি দৌড়ুতে দৌড়ুতে ডাকলুম, ‘মেহের-নেগার’! সে উত্তর দিল না। কলসিটাকে কাঁখে জড়িয়ে ধরে ডান হাতটাকে তেমনি ঘন ঘন দুলিয়ে সে যাচ্ছিল। তারপর তাদের বাড়ির সিঁড়িতে একটা পা থুয়ে দিয়ে আমার দিকে তিরস্কার-ভরা মলিন চাওয়া চেয়ে গেল। আর বলে গেল, ‘ছি! পথে-ঘাটে এমন করে নাম ধরে ডেকো না!–কী মনে করবে লোকে!’ পথ না দেখে দৌড়ুতে গিয়ে হুমড়ি খেয়ে একবার পড়ে গেছিলুম, তাতে আমার নাক দিয়ে তখনও ঝরঝর করে খুন ঝরছিল! আমি সেটা বাঁ-হাত দিয়ে লুকিয়ে বললুম, ‘আঃ, তাইতো।–আর অমন করে ডাকব না।’

    বুঝলে সখা আঁধার! যে জন্মান্ধ, তার তত বেশি যাতনা নেই, যত বেশি যাতনা আর দুঃখ হয়–একটা আঘাত পেয়ে যার চোখ দুটো অন্ধ হয়ে যায়। কেননা, জন্মান্ধ তো কখনও আলোক দেখেনি। কাজেই এ জিনিসটা সে বুঝতে পারে না,আর যে জিনিস সে বুঝতে পারে না তা নিয়ে তার তত মর্মাহত হওয়ারও কোনও কারণ নেই। আর, এই একবার আলো দেখে তারপর তা হতে বঞ্চিত হওয়া,–ওঃ কত বেশি নির্মম নিদারুণ!

    তোমায় ছেড়ে চলে যাওয়ার যে প্রতিশোধ নিলে তুমি, তাতে ভাই আঁধার, আর যেন তোমায় ছেড়ে না যাই। তোমায় ছোটো ভেবে এই যে দাগা পেলাম বুকে ওঃ তা,–

    সেদিন ভোরে ঝিলম নদীর কূলে তার সঙ্গে আবার দেখা হল। সে আসছিল একা নদীতে স্নান করে। কালো কশকশে ভেজা চুলগুলো আর ফিরোজা রঙের পাতলা উড়ানিটা ব্যাকুল আবেগে তার দেহ-লতাকে জড়িয়ে ধরেছিল। আকুল কেশের মাঝে সদ্যস্নাত সুন্দর মুখটি তার দিঘির কালোজলে টাটকা ফোটা পদ্মফুলের মত দেখাচ্ছিল। দূরে একটা জলপাই গাছের তলায় বসে সরল রাখাল বালক গাচ্ছিল,–

    গৌরী ধীরে চলো, গাগরি ছলক নাহি যায়–

    শিরোপরি গাগরি, কমর মে ঘড়া,

    পাতরি মকরিয়া তেরি বলখ না যায়, আহা টুট না যায়;–

    গৌরী ধীরে চলো।

    আমিও সেই গানের প্রতিধ্বনি তুলে বললুম, ‘ওগো গৌরবর্ণা কিশোরী, একটু ধীরে চলো,–ধীরে।–তোমার ভরা কুম্ভ হতে জল ছলকে পড়বে যে। অত সূক্ষ্ম তোমার কটিদেশ ভরা গাগরি আর ঘড়ার ভারে মুচকে ভেঙে যাবে যে! ওগো তন্বী গৌরী, ধীরে একটু ধীরে চলো!’ আমায় দেখে তার কানের গোড়াটা সিঁদুরের মত লাল হয়ে উঠল। আমার দিকে শরম-অনুযোগভরা কটাক্ষ হেনে সে বললে, ছি, ছি, সরে যাও। একী পাগলামি করছ?’–আমি ব্যথিত-কণ্ঠে ডাকলুম, ‘মেহের-নেগার!’ সে একবার আমার রুক্ষ কেশ, ব্যথাতুর মুখ ধুলিলিপ্ত দেহ আর ছিন্ন মলিন বসন দেখে কী মনে করে চুপটি করে দাঁড়াল। তারপর ম্লান হেসে বললে ‘ও হল! আমার নাম “মেহের-নেগার” কে বললে?–আচ্ছা, তুমি আমায় ও নামে ডাক কেন? সে তোমার কে?’ আমি দেখলুম, কী একটা ভীতি আর বিস্ময় তার স্বরটাকে ভেঙে টুকরো টুকরো করে দিয়ে গেল। তার শঙ্কাকুল বুকে ঘন স্পন্দন মূর্ত হয়ে ফুটল। আমারও মনে অমনি বিস্ময় ঘনিয়ে এল। দৃষ্টি ক্রমেই ঝাপসা হয়ে আসছিল। তাই তার গায়ে হেলান দিয়ে বললুম, ‘আহ! তুমি তবে সে নও? না-না, তুমি তো সেই আমার–আমার মেহের-নেগার! অমনই হুবহু মুখ, চোখ,–অমনই ভুরু, অমনই চাউনি, অমনই কথা!–না গো-না, আর আমায় প্রতারণা কোরো না। তুমি সেই! তুমি –‘! সে বললে, আচ্ছা, মেহের-নেগারকে কোথায় দেখেছিলে?’ আমি বললুম, ‘কেন, খোওয়াবে!’ তার মুখটা এক নিমিষে যেন দপ করে জ্বলে উঠল। তার সাদা মুখে আবার রক্ত দেখা গেল। সে ঝরনার মত ঝরঝর করে হাসির ঝরা ঝরিয়ে বললে, ‘আচ্ছা, তুমি কবি, না চিত্রকর?’ আমি অপ্রতিভ হয়ে বললুম, ‘চিত্র ভালবাসি, তবে চিত্রকর নই। আমি কবিতাও লিখি, কিন্তু কবি নই।’ সে এবার হেসে যেন লুটোপুটি খেতে লাগল।

    আমি বললুম, ‘দেখ, তুমি বড্ড দুষ্টু!’ সে বললে, ‘আচ্ছা, আমি আর হাসব না! তুমি কিসের কবিতা লেখ?’ আমি বললুম, ‘ভালবাসার!’

    সে ভিজা কাপড়ের একটা কোণ নিংড়াতে নিংড়াতে বললে, ‘ও তাই,–তা কাকে উদ্দেশ করে?’

    আমি সেইখানেই সবুজ ঘাসে বসে পড়ে বললুম, ‘তোমাকে–মেহের-নেগার! তোমাকে উদ্দেশ করে।’ আবার তার মুখে যেন কে এক থাবা আবির ছড়িয়ে দিলে। সে কলসিটা কাঁখে আর একবার সামলে নিয়ে বললে, ‘তুমি কদ্দিন হতে এরকম কবিতা লিখছ?’ আমি বললুম, ‘যেদিন হতে তোমায় খোওয়াবে দেখেছি।’ সে বিস্ময়-পুলকিত নেত্রে আমার দিকে একবার চাইলে, তার পর বললে, ‘তুমি এখানে কী কর?’ আমি বললুম, ‘গান-বাজনা শিখি।’ সে বললে, ‘কোথায়?’ আমি বললুম, ‘খাঁ সাহেবের কাছে।’ সে খুব উৎসাহের সঙ্গে বললে, ‘একদিন তোমার গান শুনবখন।–শুনাবে?’ তারপর চলে যেতে যেতে পিছন ফিরে বললে, ‘আচ্ছা, তোমার ঘর কোন্খানে?’ আমি বললুম, ‘ওয়াজিরিস্তানের পাহাড়।’ সে অবাক বিস্ময়ে ডাগর চক্ষু দিয়ে অনেকক্ষণ আমার দিকে চাইলে; তারপর স্নিগ্ধকণ্ঠে বললে, ‘তুমি তাহলে এদেশের নও? এখানে নূতন এসেছ?’–আমি তার চোখে রেখে বললুম, ‘হুঁ,–আমি পরদেশি।’ … সে চুপি চুপি চলে গেল আর একটিও কথা কইলে না। … আমার গলার তখন বড্ড বেদনা, কে যেন টুঁটি চেপে ধরেছিল। পেছন হতে ঘাসের শ্যামল বুকে লুটিয়ে পড়ে, আবার ডাকলুম তাকে। কাঁখের কলসি তার ঢিপ করে পড়ে ভেঙ্গে গেল। সে আমার দিকে একটা আর্তদৃষ্টি হেনে বললে, ‘আর ডেকো না অমন করে।’ দেখলুম তার দুই কপোল দিয়ে বেয়ে চলেছে দুইটি দীর্ঘ অশ্রু-রেখা।

  • সাঁঝের তারা

    সাঁঝের তারা

    সাঁঝের তারা

    সাঁঝের তারার সাথে যেদিন আমার নতুন করে চেনা-শোনা, সে এক বড় মজার ঘটনা।

    আরব-সাগরের বেলার ওপরে একটি ছোট্ট পাহাড়। তার বুক রঙবেরঙের শাঁখের হাড়ে ভরা। দেখে মনে হয়, এটা বুঝি একটা শঙ্খ-সমাধি। তাদেরই ওপর একলা পা ছড়িয়ে বসে যে কথা ভাবছিলাম সেকথা কখনও বাজে উদাস পথিকের কাঁপা গলায়, কখনও শুনি প্রিয়-হারা ঘুঘুর উদাস ডাকে; আর ব্যথাহত কবির ভাষায় কখনও কখনও তার আচমকা একটি কথা-হারা কথা—উড়ে-চলা পাখির মিলিয়ে-আসা ডাকের মত শোনায়।

    সেদিন পথ-চলার নিবিড় শ্রান্তি যেন আমার অণু-পরমাণুতে আলস-ছোঁওয়া বুলিয়ে দিয়ে যাচ্ছিল। ঘুমের দেশের রাজকুমারী আমার রুখু চুলের গোছাগুলি তার রজনীগন্ধার কুঁড়ির মত আঙুল দিয়ে চোখের ওপর হতে তুলে দিতে দিতে বললে, ‘লক্ষ্মীটি এবার ঘুমোও!’ বলেই সে তার বুকের কাছটিতে কোলের উপর আমার ক্লান্ত মাথাটি তুলে নিলে। তার সইদের কণ্ঠে আর বীণায় সুর উঠছিল—

    অশ্রু-নদীর সুদূর পারে

    ঘাট দেখা যায় তোমার দ্বারে।

    আমার পরশ-হরষে সদ্য-বিধবার কাঁদনের মত একটা আহত-ব্যথা টোল খাইয়ে গেল। আমি ঘুম-জড়ানো কণ্ঠে কণ্ঠ-ভরা মিনতি এনে বললাম, ‘আবার ওইটে গাইতে বলো না ভাই!’ গানের সুরের পিছু পিছু আমার পিপাসিত চিত্ত হাওয়ার পারে কোন্ দিশেহারা উত্তরে ছুটে চলল। তারপর… কেউ কোথাও নেই। একা—একা—শুধু একা! ওগো কোথায় আমার অশ্রু-নদী? কোথায় তার সুদূর পার? কোথায় বা তার ঘাট, আর সে কার দ্বারে? দিকহীন দিগন্ত সারা বিশ্বের অশ্রুর অতলতা নিয়ে আরেক সীমাহারার পানে মৌন ইঙ্গিত করতে লাগল,—‘ওই—ওই দিকে গো ওই দিকে!’… হায়? কোথায় কোন্ দিকে কে কী ইঙ্গিত করে?

    অলস-আঁখির উদাস-চাওয়া আমার সারা অঙ্গে বুলিয়ে মলিন কণ্ঠে কে এসে বিদায়-ডাক দিলে,—‘পথিক ওঠো! আমার যাওয়ার সময় হয়ে এল।’ আমি ঘুমের দেশের বাদশাজাদির পেশোয়াজ-প্রান্ত দু-হাত দিয়ে মুঠি করে ধরে বললাম, ‘না, না, এখনও তো আমার ওঠবার সময় হয়নি।…কে তুমি ভাই? তোমার সব কিছুতে এত উদাস কান্না ফুটে উঠছে কেন?’ তার গলার আওয়াজ একদম জড়িয়ে গেল। ভেজা কণ্ঠে সে বললে, ‘আমার নাম শ্রান্তি, আজ আমি তোমায় বড্ড নিবিড় করে পেয়েছিলাম।… এখন আমি যাই, তুমি ওঠো! আয় সই ঘুম, ওকে ছেড়ে দে!’

    জেগে দেখি, কেউ কোথাও নেই, আমি একা। তখন সাঁঝের রাণীর কালো ময়ূরপঙ্খি ডিঙিখানা ধূলি-মলিন পাল উড়িয়ে সাগর বুকে নেমেছে। … জানটা কেমন উদাস হয়ে গেল! …যারা আমার সুপ্তির মাঝে এমন করে জড়িয়ে ছিল, তাদের চেতনার মাঝে হারালাম কেন? এই জাগরণের একা-জীবন কী দুর্বিষহ বেদনার ঘায়ে ক্ষত-বিক্ষত, কী নিষ্করুণ শুষ্কতা তিক্ততায় ভরা! সেইদিন বুঝলাম, কত কষ্টে ক্লান্ত পথিকের ব্যর্থ সন্ধ্যা-পথে উদাস পুরবির অলস ক্রন্দন এলিয়ে এলিয়ে গায়–

    বেলা গেল তোমার পথ চেয়ে,

    শূন্য ঘাটে একা আমি,

    পার করে নাও খেয়ার নেয়ে!

    হায় রে উদাসীন পথিক! তোর সব ব্যর্থ ভাই, সব ব্যর্থ! কোথায় খেয়ার নেয়ে ভাই? কোন্ অচিন মাঝিকে এমন বুক-ফাটা ডাক ডাকিস তুই? কোথায় সে? কার পথ চেয়ে তোর বেলা গেল? কে সে তোর জন্ম-জন্ম ধরে চাওয়া না-পাওয়া ধন? কোন্ ঘাটে তুই একা বসে এই সুরের জাল বুনছিস? এ ঘাটে কি কোনোদিন সে তার কলসিটি-কাঁখে চলতে গিয়ে দু-হাতে ঘোমটা ফাঁক করে তোর মুখে চোখে বধূর আধখানা পুলক-চাওয়া থুয়ে গিয়েছিল? নাকি—সে তার কমল-পায়ের জল-ভেজা পদচিহ্ন দিয়ে তোর পথের বুকে স্মৃতির আলপনা কেটে গিয়েছিল? কখনও কাউকে জীবন ভরে পেলি নে বলেই কি তোর এত কষ্ট ভাই? হায় ও-পারের যাত্রী, তোমার সেই ‘কবে-কখন একটুখানি-পাওয়া’ হৃদয়-লক্ষ্মীর চরণ-ছোঁওয়া একটি ধূলি-কণাও আজ তোমার জন্যে পড়ে নেই! বৃথাই সে রেণু-পরিমল পথে পথে খোঁজা ভাই, বৃথা—বৃথা!

    অবুঝ মন ওসব কিচ্ছু শুনতে চায় না, বুঝতে চায় না। তার মুখে খ্যাপা মনসুরের একটি কথা ‘আনাল হক’ -এর মত যুগ-যুগান্তের ওই একই অতৃপ্ত শোর উঠছে, ‘হায় হারানো লক্ষ্মী আমার! হায় আমার হারানো লক্ষ্মী!’

    ঘুমিয়ে বরং থাকি ভাল। তখন যে আমি স্বপনের মাঝে আমার না-পাওয়া লক্ষ্মীকে হাজারবার হাজার রকমে পাই। তাকে এই যে জাগরণের মধ্যে পাওয়ার একটা বিপুল আকাঙ্ক্ষা,—বুকে বুকে মুখে মুখে চেপে নিতে, সেই তার উষ্ণ-পাওয়াকে আমি ঘুমের দেশে স্বপনের বাগিচায় বড় নিবিড় করেই পাই। মানুষের মন মস্ত প্রহেলিকা। মন নিক্তির মতন যখন যেদিকে ভার বেশি পায়, সেই দিকেই নুয়ে পড়ে। তাই কখনও মনে করি পাওয়াটাই বড়, পাওয়াতেই সার্থকতা। আবার পরক্ষণেই মনে হয়, না—না—পাওয়াটাই পাওয়া, ওই না-পাওয়াতেই সকল পাওয়া সুপ্ত রয়েছে। এ সমস্যার আর মীমাংসা হল না। অথচ দুই পথেরই লক্ষ্য এক। দুই স্রোতের লক্ষ্য সাগর-প্রিয়ার সীমাহারা বুকে নিজের সমস্ত বেগ সমস্ত গতি সমস্ত স্রোত একেবারে শেষ করে ঢেলে দেওয়া, তারপর নিজের অস্তিত্ব ভুলে যাওয়া—শুধু এক আর এক! কিন্তু এই ‘প্রতি অঙ্গ লাগি কান্দে প্রতি অঙ্গ মোর’ কথাটার এমন একটা নেশার মাদকতা রয়েছে, যেটা অনবরত আমার মনের কামনা-কিশোরীকে শিউরিয়ে তুলেছে এবং বলেছে, ‘বন্ধনেই মুক্তি’—এই যে মানব-মনের চিরন্তনী বাণী, সেটা কি মিথ্যা? না, এ সমস্যার সমাধান নেই।

    আবার মনটা গুলিয়ে যাচ্ছে।

    আমার মনের ভোগ আর বৈরাগ্যের একটা নিষ্পত্তিও হল না আর তাই কাউকে জীবন ভরে পাওয়াও গেল না!

    তবে?… …

    কাউকে না পেয়েও আমার মনে এ কোন্ আদিম-বিরহী ভুবন-ভরা বিচ্ছেদ-ব্যথায় বুক পুরে মুলুক মুলুকে ছুটে বেড়াচ্ছে? খ্যাপার পরশমণি খোঁজার মতন আমিও কোন্ পরশমণির ছোঁওয়া পেতে দিকে দিকে দেশে দেশে ঘুরে মরছি? কোন্ লক্ষ্মীর আঁচল প্রান্তে বাঁধা রয়েছে সে মানিক? কোন্ তরুণীর গলায়-রক্ষা-কবচ হয়ে ঝুলছে সে পাথর?

    ভাবতে ভাবতে চোখে জল গড়িয়ে এল। সেই জলবিন্দুতে সহসা কার দুষ্টু হাসির চপল কিরণ ছলছলিয়ে উঠল। আমি চমকে সামনে চোখ চাইতেই দেখলাম, আকাশের মুক্ত আঙিনায় ললাটের আধফালি ঘোমটায় ঢেকে প্রদীপ-হাতে সাঁঝের তারা দাঁড়িয়ে। তার চোখের কিনারায়, মুখের রেখায়, অধরপুটের কোণে কোণে দুষ্টুমির হাসি লুকোচুরি খেলছে। বারে বারে উছলে-উঠা নিলাজ হাসি ঠোঁটের কাঁপন দিয়ে লুকোবার ব্যর্থ চেষ্টায় তার হাতে মঙ্গল-প্রদীপ কেঁপে কেঁপে লোলুপ শিখা বাড়িয়ে সুন্দরীর রাঙা গালে উষ্ণ চুম্বন এঁকে দেওয়ার জন্য আকুলি-বিকুলি করছে। পাগল হাওয়া বারেবারে তার বুকের বসন উড়িয়ে দিয়ে বেচারিকে আরও অসংবৃত, আরও বিব্রত করে তুলছে।

    অনেকক্ষণ ধরে সেও আমার পানে চেয়ে রইল, আমিও তার পানে চেয়ে রইলাম। আমার কণ্ঠ তখন কথা হারিয়ে ফেলেছে।

    সে ক্রমেই অস্তপারের-পথে পিছু হেঁটে যেতে লাগল। তার চোখের চাওয়া ক্রমেই মলিন সজল হয়ে উঠতে লাগল। বড় বড় নিশ্বাস ফেলার দরুণ তার বুকের কাঁচলি বায়ুর মুখে কচিপাতার মত থরথর করে কাঁপতে লাগল। যতই সে আকাশ-পথ বেয়ে অস্ত-পল্লির পথে চলতে লাগল ততই তার মুখ-চোখ মূর্ছাতুরের মতন হলদে ফ্যাকাসে হয়ে যেতে লাগল। তার পর পথের শেষ-বাঁকে দাঁড়িয়ে সে তার শেষ অচপল অনিমেষ চাওয়া চেয়ে আমায় একটি ছোট্ট সেলাম করে অদৃশ্য হয়ে গেল।

    হিয়ায় হিয়ায় আমার শুধু একটি কাতর মিনতি মূঢ়ের মত না-কওয়া ভাষায় ধ্বনিত হচ্ছিল—‘হায় সন্ধ্যা-লক্ষ্মী আমার, হায়!’

    হঠাৎ আমার মনে হল, আমি কত বছর ধরে যে এই রকম করে, রোজ সন্ধ্যা-লক্ষ্মীর পানে চেয়ে চেয়ে আসছি তা কিছুতেই স্মরণ হয় না। শুধু এইটুকু মাত্র মনে পড়ে যে, সে কোন্ যুগে যেন আমি আজিকার মতনই এমনি করে প্রভাতের শুকতারাটির পানে শুধু উদয়-পথে তাকিয়ে থাকতাম। আমার সমস্ত সকাল যেন কোন্ প্রিয়তমার আসার আশায় নিবিড় সুখে ভরে উঠত। রোজ প্রভাতে উদয়-পথে মুঠি-মুঠি করে ফাগ-মাখা ধূলি-রেণু ছড়াতে ছড়াতে সে আসত, তার পর আমার পানে চেয়েই সলজ্জ তৃপ্তির হাসি হেসে যেন বারে বারে আড়-নয়নের বাঁকা চাউনি হেনে বলত ‘ওগো পথ-চাওয়া বন্ধু আমার, আমি এসেছি!’ আমি তার চোখের ভাষা বুঝতে পারতাম, তার চাওয়ার কওয়া শুনতে পেতাম। … তার পর অরুণদেব তাঁর রক্ত-চক্ষু দিয়ে আমাদের পানে চাইলেই সে ভীতা বালিকার মত ছুটে আকাশ আঙিনা বেয়ে ঊর্ধ্বে—ঊর্ধ্বে—আরো ঊর্ধ্বে উধাও হয়ে যেত। ছুটতে ছুটতেও কত হাসি তার! সারাদিন আমি শুনতে পেতাম তার ওই পালিয়ে যাওয়া পথের বুকে তার কটি-কিঙ্কিণির রিনিরিনি, হাতের পান্নার চুড়ির রিনিঝিনি আর পায়ে গুজরী পাঁইজোরের রুমুঝুমু। … এমন করে দিন যায়। … একদিন আমি বললাম, ‘তুমি কি আমার পথে নেমে আসবে না প্রিয়?’ সে আমার পানে একটু তাকিয়েই সিঁদুরে আমের মত রেঙে উঠে আধ-ফোটা কথায় কেঁপে কেঁপে বললে, ‘না প্রিয়, আমায় পেতে হলে তোমাকে এই তারার একটি হতে হবে। আমি নেমে যেতে পারি নে, তোমাকে আমার পথেই উঠে আসতে হবে।’ বলবার সময় অনামিকা অঙ্গুলি দিয়ে তার বেনারসী চেলির আঁচল প্রান্ত যেমন সে আনমনে জড়িয়ে যাচ্ছিল, তার চোখের চাওয়া মুখের কথা সেদিন যেন তেমনি করেই অসহ্য ব্যথা-পুলকে জড়িয়ে জড়িয়ে যাচ্ছিল। বুঝলাম, সে বিশ্বের চিরন্তন ধারাটি বজায় রেখেই আমার সঙ্গে মিলতে চায়। আমার সৃষ্টিছাড়া-পথে বেরিয়ে পড়তে তার কোমল বুক সাহস পাচ্ছে না। যতই ভালবাসুক না, আমার পথ-হারা পথে চলতে—আমার বিপুল ভার বয়ে সেই অজানা ভয়ের পথে চলতে—সে যেন কিছুতেই পারবে না।

    কিন্তু তাই কি?

    হয়ত তা ভুল। কেননা একদিন যেন সে বলেছিল, ‘প্রিয়তম, এ যে তোমার ভুলের পথ, এ পথ তো মঙ্গলের নয়। আঘাত দিয়ে তোমায় এ পথ হতে ফিরাতেই হবে। তোমায় কল্যাণের পথে না আনতে পারলে তো আমি তোমার লক্ষ্মী হতে পারি নে!’ সেকথা যেন আজকের নয়, কোন্ অজানা নিশীথে আমি ঘুমের কানে শুনেছিলাম। তখন তা কিন্তু বুঝতে পারিনি।

    আমি যেমন কিছুতেই তার চিরন্তন ধারাটির একগুঁয়েমি সইতে পারলাম না, সেও তেমনই নীচে নেমে আমার পথে এল না।

    বিদায় নেওয়ার দিনও সে তেমনি করে হেসে গেছে। তেমনি করেই তার দুষ্ট চটুল চাউনি দিয়ে সে আমায় বারেবারে মিষ্টি বিদ্রুপ করেছে। শুধু একটি নতুন কথা শুনিয়ে গেছল, ‘আর এ পথে আমাদের দেখা হবে না প্রিয়, এবার নতুন করে নতুন পথে নতুন পরিচয় নিয়ে আমরা আমাদের পূর্ণ করে চিনব।’

    তার বিদায়-বেলায় যে দীঘল শ্বাসটি শুনেও শুনিনি, আজ আমি সারা বাতাসে যেন সেই ব্যথিত কাঁপুনিটুকু অনুভব করছি। এখন সে বাতাস নিতেও কষ্ট হয়। … কবে আমার এ নিশ্বাস-প্রশ্বাসে-টেনে-নেওয়া বায়ুর আয়ু চিরদিনের মত ফুরিয়ে যাবে প্রিয়? … তার বিদায়-চাওয়া যে ভেজা-দৃষ্টিটুকু আমি দেখেও দেখিনি, আজ সারা আকাশের কোটি কোটি তারার চোখের পাতায় সেই অশ্রুকণাই দেখতে পাচ্ছি! এখন তারা হাসলেও মনে হয়, ও শুধু কান্না আর কান্না!

    তারপর রোজ আসি রোজ যাই, কিন্তু উদার-পথে আর তার রাঙা চরণের আলতার আলপনা ফুটল না! এখন অরুণ রবি আসে হাসতে হাসতে। তার সে হাসি আমার অসহ্য। পাখির কণ্ঠের বিভাস সুর আমার কানে যেন পুরবির মত করুণ হয়ে বাজে।…

    আমি বললাম, ‘হায় প্রিয়তম, তোমায় আমি হারিয়েছি!’ দেখলাম, আকাশ-বাতাস আমার সে কান্নায় যোগ দিয়ে বলছে, ‘তোমায় হারিয়েছি!’ তখন সন্ধ্যা—ওই সিন্ধুবেলায়।

    হঠাৎ ও কার চেনা-কণ্ঠ শুনি? ও কার চেনা-চাওয়া দেখি? ও কে রে, কে?

    বললাম, ‘আজ এ বধূর বেশে কোথায় তুমি প্রিয়?’ সে বললে, ‘অস্ত-পথে!’

    সে আরও বলে গেছে যে, সে রোজই তার ম্লানমূর্তি নিয়ে এই অস্ত-গাঁয়ের আকাশ-আঙিনায় সন্ধ্যা-প্রদীপ দেখাতে আসবে। আমি যেন আর তার দৃষ্টির সীমানায় না আসি।

    বুঝলাম সে যতদিন অস্ত-পারের দেশে বধূ হয়ে থাকবে, ততদিন তার দিকে তাকাবারও আমার অধিকার নেই। আজও সে তার জগতের সেই চিরন্তন সহজ ধারাটুকুকে বজায় রেখে চলছে। সে তো বিদ্রোহী হতে পারে না। সে যে নারী—কল্যাণী। সে-ই না বিশ্বকে সহজ করে রেখেছে, তার অনন্ত ধারাটিকে অক্ষুণ্ন সামঞ্জস্য দিয়ে ঘিরে রেখেছে।

    শুধোলাম, ‘আবার কবে দেখা হবে তবে? আবার কখন পাব তোমায়?’ সে বললে, ‘প্রভাত বেলায় ওই উদয়-পথেই।’

    আজ সে বধূ, তাই তার সাঁঝের-পথে আর তাকাইনি।

    জানিনে, কবে কোন্ উদয়-পথে কোন্ নিশিভোরে কেমন করে আমাদের আবার দেখাশোনা হবে। তবু আমার আজও আশা আছে, দেখা হবেই, তাকে পাবই!

    * * *

    সিন্ধু পেরিয়ে ঘরের আঙিনায় যখন একা এসে ক্লান্ত চরণে দাঁড়ালাম, তখন ভাবিজি জিজ্ঞাসা করলেন, ‘হাঁ ভাই, তুমি নাকি বে করেছ?’ আমি মলিন হাসি হেসে বললাম ‘হাঁ।’ তিনি হেসে শুধোলেন, ‘তা বেশ করেছ। বধু কোথায়? নাম কী তার?’

    অনেকক্ষণ নিঃশব্দে বসে রইলাম। শ্রী-রাগের সুরে সুর-মূর্ছিতা মলিনা সন্ধ্যার ঘোমটায় কালো আবছায়া যেন সিয়াহ্ কাফনের মত পশ্চিম-মুখী ধরণির মুখ ঢেকে ফেলতে লাগল। আমি অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নিলাম।

    তারপর অতিকষ্টে ওই পশ্চিম-পারের পানে আঙুল বাড়িয়ে বললাম, ‘অস্তপারের সন্ধ্যালক্ষ্মী!’

    ভাবিজানের ডাগর আঁখিপল্লব সিক্ত হয়ে উঠল; দৃষ্টিটুকু অব্যক্ত ব্যথায় নত হয়ে এল। কালো সন্ধ্যা নিবিড় হয়ে নেমে এল!

  • রাক্ষুসী

    রাক্ষুসী

    রাক্ষুসী

    (বীরভূমের বাগদীদের ভাষায়)

    [ ক ]

    আজ এই পুরো দুটো বছর ধরে, ভাবছি, শুধু ভাবছি,—আর সবচেয়ে আশ্চয্যি হচ্ছি, লোকে আমাকে দেখলেই এমন করে ছুটে পালায় কেন! পুরুষেরা, যাঁরা সব পর্দার-আড়ালে গিয়ে মেয়ে-মহলে খুব জাঁদরেলি রকমের শোরগোল আর হল্লা করেন, আর যাঁদের সেই বিদঘুটে চেঁচানির চোটে ছেলেমেয়েরা ভয়ে ‘নফ্‌সি নফ্‌সি’ করে, সেই মদ্দরাই আবার আমায় দেখলে হুঁকো হাতে দাওয়া হতে আস্তে আস্তে সরে পড়েন, তখন নাকি তাঁদের অন্দর-মহলে যাওয়ার ভয়ানক ‘হাজত’। মেয়েরা আমাকে দেখলেই কাঁখ হতে দুম করে কলসি ফেলে সে কী লম্বা ছুট দেয়! ছেলেমেয়েরা তো নাকমুখ সিঁটকে ভয়ে একেবারে আঁতকে উঠে। হাজার গজ দূর থেকে বলে, ‘ওরে বাপরে, ঐ এল পাগলি রাক্ষুসী মাগি, পালা—পালা! খেলে, খেলে!’—কেনে! আমি কোন্ উনোনমুখো সুঁটকোর পাকা ধানে মই দিয়েছি? কোন্ খালভরা ড্যাকরার মুখে আগুন দিয়েছি? কোন্ চোখখাগী আবাগির বেটির বুকে বসে তপ্ত খোলা ভেঙেছি? কার গতর আমকাঠ না কুল-কাঠের আখায় চড়িয়েছি? কোন্ ছেলেমেয়ের কাঁচা মাথাটা চিবিয়ে খেয়েছি? বল তো বুন, তাদের কি ‘সরোকার’ আছে আমায় যা তা বলবার? কে তারা আমার?—মেরেছি?—বেশ করেছি, নিজের ‘সোয়ামিকে’ মেরেছি! … শুধু মেরেছি? দা দিয়ে কেটেছি! তাতে ওদের এত বুক চড় চড় করবে কেন? ওদের কারুর বুক থেকে তো সোয়ামিকে কেড়ে লি নাই, আর হত্যেও করি নাই, তাতে ওদের কথা বলবার আর সাওখুড়ি করবার কী আছে? ওরা কি আমার সাতপুরুষের কুটুম না গিয়াঁত? যদি এই রকমই করতে থাকে, তবে আমি সত্যিকারের রাক্ষুসীই হয়ে দাঁড়াব বলে রাখছি তখন। এক এক দায়ের কোপে ওদের সোয়ামির মাথাগুলো ধড় থেকে আলাদা করে দিব, মেয়েগুলোর বুক ফেঁড়ে কলজেগুলো ধরে পিষে পিষে দিব, তবে না সে আমার নাম সত্যসত্যিই রাক্ষুসী হয়ে দাঁড়াবে!

    আমায় পাগল করলে কে? এই মানুষগুলোই তো—আমি তো ফের তেমনি করেই—যেন কিছু হয় নাই—ঘর পেতেছিলুম। রাত্তির দিন আমার কানের গোড়ায় আনাচে-কানাচে, পথে-ঘাটে, কাজেকর্মে, মজলিসে-জৌলুসে আমার নামে রাক্ষুসী রাক্ষুসী বলে কুৎসা, ঘেন্না, মুখ ব্যাঁকানি, চোখ রাঙানি,—এই সব মিলেই তো আমার মাথার মগজ বিগড়ে দিল? যে ব্যথাটাকে আমি আমার মনের মাঝেই চেপে রেখেচিলুম সেটাকে আবার জাগিয়ে তুলে চোখের সামনে সোজা করে ধরলে তো এরাই! আচ্ছা তুই-ই বল তো বুন, এ পাগল হওয়ার দোষটা কার? একটা ভাল মানুষকে খোঁচা মেরে মেরে ক্ষেপিয়ে তুললে সে দোষটা কি সেই ভালমানুষের, না যে ভালমানুষেরা তাকে খেপিয়ে তোলে, তাদের?—

    আমার সোয়ামি ছিল সিদেসাধা মানুষ, সে তো সোজা ছাড়া বাঁকা কিছু জানত না। সে চাষ করত, কিরষাণি করত, আমি সারাটি দিন মাছ ধরে চাল কেঁড়ে, ধান ভেনে আনতুম। তা না হলে চলবে কী করে দিদি? তখন আমাদের তিনটি পুষ্যি,—বড়ো ছেলে সোমত্থ হয়ে উঠেছে, বে-থা না দিলে ‘উপর-নজর’ হবে, মেয়েটাও ঢ্যাং-ঢেঙিয়ে বেড়ে উঠেছিল, আর আমার ‘কোলাপুঁছা’ ছোটো মেয়েটিও তখন হাঁক্কো হাঁক্কো করে দু-একটি কথা ফুটছিল। ছা-পোষা মানুষ হলেও দিদি আমাদের সংসারে তো অভাব ছিল না কোনো কিছুর, তোমাদের পাঁচজনের আশীর্বাদে। এই বিন্দিই তখন নাই নাই করে দিনের শেষে তিনটি সের চাল-তরকারির জন্যে মাছ রে, শামুক রে, গুগলি রে পিত্থিমির জিনিস জোগাড় করে আনত। তাছাড়া বড়ো ছেলেটাও তোমাদের শীচরণের আশীর্বাদে করে কর্মে দু-পয়সা ঘরে আনছিল। মেয়েটাও পাড়ার বউ-ঝিদের সঙ্গে যা দু-চারটে শাগ-মাছ আনত, তাতেও নেহাৎ কম পয়সা হত না। লুন-তেলের খরচটা ও দিয়েই বেশ দিব্যি চলে যেত। এ সবের উপর সোয়ামি বছরের শেষে চাষবাস আর কিরষাণি করে যা ধান-চাল আনত তাতে সারা বছর খুব ‘সচল বচল’ করে খেয়েও ফুরাত না। সংসারে তখন কি ছিরিই ছিল! লক্ষ্মী যেন মুখ তুলে চেয়েছিলেন। এত সব কার জন্যে—ঐ ছেলে-মেয়েগুলির জন্যেই তো? সারাদিন রেতে একটি সেরের বেশি চাল রাঁধতাম না। বলি আহা, শেষে আমার ছেলেরা কষ্ট পাবে! সোয়ামি আর ছেলেগুলোকে দিতুম ভাত, আর নিজে খেতুম মাড়—শুধু ভাতের ফেন! মেয়ে মানুষের আবার সুখ কী, ছেলেমেয়ে যদি ঠান্ডা রইল তাতেই আমাদের জান ঠান্ডা! নাইবা হলুম জমিদার। আমরা তো কারুর কাছে ভিক্ষে করতুম না, চুরি-দারিও করতুম না। নিজের মেহনতের পয়সা নেড়ে-চেড়ে খেতাম। নিজে খেতুম, আর পালে রে পার্বণে রে যেমন অবস্থা দু-দশটা অতিথ-ফকিরকেও খাওয়াতুম। আহা, ওতেই তো আমার বুক ভরে ছিল দিদি! লোকে বলত আমি নাকি বড্ডো ‘কিরপণ’; কারণ আমি একটি পয়সা বাজে খরচ করতুম না। তা বললে আর কী করব, তাতে আমার বয়ে যেত। তারা তো জানতো না, আমার মাথায় কী বোঝা চাপানো রয়েছে। দু দুটো মেয়ে আর একটি ছেলের বিয়ে দিতে হবে, বাড়িতে বউ আসবে, জামাই আসবে, আমার এই মাটির ঘরই আনন্দে ইন্দিরপুরি হয়ে উঠবে, দুটো সাদ-আরমান আছে—তাতে কত খরচ বল দিকিনি বুন? দায়ে ঠেকলে কেউ একটা পয়সা কর্জ দিয়ে চালাবে? বাপরে বাপ এই বিন্দির অজানা নেই গো, গলায় সাপ বেঁধে পড়লেও কোনো বেটি একটি ক্ষুদ্রকণা দিয়ে শুধোয় না। তার আবার গুমোর! আমার কাছে ও-সব শুধু কথায় চিঁড়ে ভিজে না বাপু! তবে বুঝতুম, অনেক কড়ুই রাঁড়ির বুক চচ্চড় করত হিংসেয় আমাদের এই এতটুকু সুখ দেখে।

    এমনি করেই খুব সুখে দিন যাচ্ছিল আমাদের! আমি মনে করতুম, আর যটা দিন বাঁচি এমনি করে সোয়ামির সেবা করে, ছেলে-মেয়ে চরিয়ে, নাতিপুতি দেখে আমার হাতের নোওয়া অক্ষয় রেখে মরি ; কিন্তু তা আমার পোড়া বিধাতার সইল না। আমার সাধের ঘরকন্না শ্মশানপুরী হয়ে গেল! আর এত আশা-ভরসা সব-তাতে চুলোর ছাই-পাঁশ পড়ল! শুনে যা দিদি, শুনে যা সব, আর যদি দোষ দেখিস তো তোর ঐ মুড়ো খ্যাংরা দিয়ে আমার বিষ ঝেড়ে দিয়ে যাস, সাত উনুনের বাসি ছাই আমার পোড়া মুখে দিয়ে দিস! হায় বুন, আমার ‘দুখখুর’ কথা শুনলে পাথর গলে মোম হয়ে যায়, কিন্তু গাঁয়ের এই বে-দিল মানুষগুলো আমায় এতটুকু পেরবোধ তো দেয়ই না, তার উপর রাত্তির-দিন নানান কথা বলে জানটাকে খেপিয়ে তুলেছে! মনে করি আমার সব পেটের কথা কারুর কাছে তন্ন তন্ন করে বলি আর খুব আর খুব একচোট কেঁদে নিয়ে মনটাকে হালকা করি। তা যারই কাছ ঘেঁসতে চাই, সেই মনে করে এই আমায় খেলে রে। আমি যেন ডাইনি কুহকীরও অধম! এই ‘হেনস্থা’ আর ভয় করার দরুনে আমার সমস্ত মগজটা চমচম করে ধরে যায়। কাজেই আমার পাগলামি তখন আরও বেড়ে যায়। সাধে কি আমার মুখ দিয়ে এত গালিগালাজ শাপমন্যি বেরোয়, বুন! তুই সব কথা শুন আর নাথি মেরে আমার থোঁতা মুখ ভোঁতা করে দিয়ে যা!

  • সালেক

    সালেক

    সালেক

    [ ক ]

    আজকার প্রভাতের সঙ্গে শহরে আবির্ভূত হয়েছেন এক অচেনা দরবেশ। সাগরমন্থনের মতো হুজুগে লোকের কোলাহল উঠেছে পথে, ঘাটে, মাঠে,—বাইরের সব জায়গায়। অন্তঃপুরচারিণী অসূর্যম্পশ্যা জেনানাদের হেরেম তেমনই, নিস্তব্ধ নীরব,—যেমন রোজই থাকে দুনিয়ার সব কলরব ‘হ-য-ব-র-ল’র একটেরে! বাইরে উঠছে কোলাহল,—ভিতরে ছুটছে স্পন্দন।

    সবারই মুখে এক কথা, ‘ইনি কে? যাঁর এই আচমকা আগমনে নূতন করে আজ নিশিভোরে উষার পাখির বৈতালিক গানে মোচড় খেয়ে কেঁপে উঠল আগমনির আনন্দভৈরবী আর বিভাস’?

    ছুটছে ছেলে মেয়ে বুড়ো সব একই পথে ঘেঁষাঘেঁষি করে দরবেশকে দেখতে। তবুও দেখার বিরাম নাই। দুঃশাসন টেনেই চলেছে কোন্ দ্রৌপদীর লজ্জাভরণ, এক মুখ বিস্ময়-বিস্ফারিত-অক্ষি বিশ্বের চোখের সুমুখে, আর তা বেড়েই চলেছে। তার আদিও নেই, অন্তও নেই। ওগো, অলক্ষ্যে যে এমন একটি দেবতা রয়েছেন, যিনি গোপনের মর্যাদা ক্ষুণ্ন করেন না।

    দরবেশ কথাই কয় না,—একেবারে চুপ।

    অনেকে বায়না ধরলে দীক্ষা নেবে; দরবেশ ধরা-ছোঁয়াই দেয় না। যে নিতান্তই ছাড়ে না, তাকে বলে, ‘কাপড় ছেড়ে আয়!’ সে ময়লা কাপড় ছেড়ে খুব ‘আমিরানাশানের’ জামা জোড়া পরে আসে। দরবেশ শুধু হাসে আর হাসে, কিছুই বলে না।

    শহরের কাজি শুনলেন সব কথা। তিনিও ধন্না দিতে শুরু করলেন দরবেশের কাছে। দরবেশ যতই আমল দিতে চায় না, কাজি সাহেব ততই নাছোড়বান্দা হয়ে লেগে থাকেন। দরবেশ বুঝলেন, এ ক্রমে ‘কমলিই ছোড়তা নেই’ গোছের হয়ে দাঁড়াচ্ছে। তাঁর মুখে ফুটে উঠল ক্লান্ত সদয় হাসির ঈষৎ রেখা।

  • স্বামীহারা

    স্বামীহারা

    স্বামীহারা

    [ ক ]

    ওঃ! কী বুক-ফাটা পিয়াস! সলিমা! একটু পানি খাওয়াতে পারিস বোন? আমার কেন এমন হল, আর কী করেই এ কপাল পুড়ল, তাই জিজ্ঞেস করছিস—না? তা আমার সে ‘দেরেগ’ -মাখা ‘রোনা’ শুনে আর কী হবে বহিন। দোওয়া করি, তুই চির-এয়োতি হ! এসব পোড়াকপালির কথা শুনলেও যে তোদের অমঙ্গল হবে ভাই! খোদা যেন মেয়েদের বিধবা করবার আগে মরণ দেন, তা না হলে তাদের বে হওয়ার আগেই যেন তারা ‘গোরে’ যায়। তোর যদি মেয়ে হয় সলিমা, তাহলে তখনই আঁতুড় ঘরেই নুন খাইয়ে মেরে দিস, বুঝলি? নইলে চিরটা কাল আগুনের খাপরা বুকে নিয়ে কাল কাটাতে হবে।

    তুই তো আজ দশ বছর এ গাঁ ছাড়া, তাই সব কথা জানিস না। সেই ছোট্টটি গিয়েছিলি, আজ একেবারে খোকা কোলে করে বাপের বাড়ি এসেছিস! … আমি পাগল হয়ে গেছি ভেবে সবাই দূর হতে দেখেই পালায়। আচ্ছা তুইতো জানিস ভাই আমায়, আর এখনও তো দেখছিস, সত্যি বলতো আমি পাগল হয়েছি? হাঁ ঠিক বলেছিস, আমি পাগল হইনি,—নয়?

    সেবার—ঠিক মনে পড়ে না কতকাল আগে—বিধাতার অভিশাপ যেন কলেরা আর বসন্তের রূপ ধরে আমাদের ছোট্ট শান্ত গ্রামটির উপরে এসে পড়েছিল, আর ঐ অভিশাপে পড়ে কত মা, কত ভাই-বোন, কত ছেলেমেয়ে যে গাঁয়ের ভরাবক্ষে শুধু একটা খাঁ খাঁ মহাশূন্যতা রেখে কোন্ সে অচিন মুল্লুকে উধাও হয়ে গেল তা মনে পড়লে—মাগো মা—জানটা যেন সাতপাক খেয়ে মোচড় দিয়ে ওঠে। কত সে ঘর-কে ঘর উজাড় হয়ে তাতে তালাচাবি পড়ল—আর গ্রামে যেমন এক একটি করে ভিটে নাশ হতে লাগল, তেমনই এই গোরস্থানে গোরের সংখ্যা এত বেশি বেড়ে উঠল যে, আর তার দিকে তাকানই যেত না।

    আচ্ছা ভাই, এই যে দিঘির গোরস্থান, আর এই যে হাজার হাজার কবর, এগুলো কী তবে আমাদেরই গাঁয়ের একটা নীরব মর্মন্তুদ বেদনা—অন্তঃসলিলা ফল্গুনিঃস্রাব—জমাট বেঁধে অমন গোর হয়ে মাটি ফুঁড়ে বেরিয়েছে? না কী আমাদের মাটির মা তাঁর এই পাড়াগেঁয়ে চির-দরিদ্র জরাব্যাধিপ্রপীড়িত ছেলেমেয়েগুলোর দুঃখে ব্যথিত হয়ে করুণ প্রগাঢ় স্নেহে বিরামদায়িনী জননীর মতো মাটির আঁচলে ঢেকে বুকের ভিতর লুকিয়ে রেখেছেন? তাঁর এই মাটির রাজ্যে তো দুঃখ-ক্লেশ বা কারুর অত্যাচার আসতে পারে না। এখানে শুধু একটা বিরাট অনন্ত সুপ্ত শান্তি—কর্মক্লান্ত মানবের নিঃসাড় নিস্পন্দ সুষুপ্তি। এ একটা ঘুমের দেশ, নিঝুমের রাজ্যি। আহা, আজ সে কত যুগের কত লোকই যে এই গোরস্থানে ঘুমিয়ে আছে তা এখন গাঁয়ের কেউ বলতে পারবে না। আমি কতজনকেই বা মরতে দেখলুম? এরা যখন মরেছিল, আমি তখন হয়ত এমনই একটা অ-দেখার ‘কোকাফ মুল্লুকে ঘুরতে ছিলুম, তারপর যখন আমায় কে এই দুনিয়ায় এনে ফেলে দিলে—আর দুনিয়ার এই আলোকের জ্বালাময় স্পর্শে আমার চক্ষু ঝলসে গেল, তখন আমি নিশ্চয় অব্যক্ত অপরিচিত ভাষায় কেঁদে উঠেছিলুম, ‘ওগো, এ মাটির—পাথরের দুনিয়ায় কেন আমায় আনলে? কেন, ওগো কেন?’—তারপর মায়ের কোলে শুয়ে যখন তাঁর দুধ খেলুম, তখন প্রাণে কেমন একটা গভীর সান্ত্বনা নেমে এল। আমি আমার সমস্ত অতীত এক পলকে ভুলে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়লুম।

    ঐ যে বাঁধানো কবরগুলো, ওগুলো অনেক কালের পুরোনো। তখন ছিল বাদশাহি আমল, আর আমাদের এই ছোট্ট গ্রামটাই ছিল, ‘ওলিনগর’ বলে একটা মাঝারি গোছের শহর। ঐ যে সামনে ‘রাজার গড়’ আর ‘রাণীর গড়’ বলে দুটো ছোট্ট পাহাড় দেখতে পাচ্ছ, ওতেই থাকতেন তখনকার রাজা রাণী—রাজকুমার আর রাজকুমারীরা। লোকে বলে, তাঁরা শুতেন হিরার পালঙ্কে, আর খেতেন ‘লাল জওয়াহের’ আর, কবরস্থানের পশ্চিম দিকে ঐ যে পির সাহেবের ‘দরগা’ ওরই ‘বর্দোয়ায়’ নাকি এমন সোনার শহর পুড়ে ঝাও হয়ে যায়। সেই সঙ্গে রাজার ঘরগুষ্টি সব পুড়ে ছাই হয়ে গেছে, আজ তাঁর বংশে বাতি দিতে কেউ নেই! পশ্চিমে-হাওয়ায় তাঁদের সেই ছাই-হওয়া দেহ উড়ে উড়ে হয়ত এই গোরস্থানের উপরই এসে পড়েছে। আচ্ছা ভাই, খোদার কী আশ্চর্য মহিমা! রাজা—যার অত ধন, মালমাত্তা, অত প্রতাপ, সেও মরে মাটি হয়! আর যে ভিখারি খেতে না পেয়ে তালপাতার কুঁড়েতে কুঁকড়ে মরে পড়ে থাকে, সেও মরে মাটি হয়। কী সুন্দর জায়গা এ তবে বোন!

    তুই ঠিক বলেছিস ভাই সলিমা, কেঁদে কী হবে, আর ভেবেই বা কী হবে! যা হবার নয় তা হবে না, যা পাওয়ার নয় তা পাব না। তবু পোড়া মন তো মানতে চায় না। এই যে একা কবরস্থানে এসে কত রাত্তির ধরে শুধু কেঁদেছি, কিন্তু এত কান্না এত ব্যাকুল আহ্বানেও তো কই তাঁর একটুকু সাড়া পাওয়া গেল না। তিনি কী এতই ঘুমুচ্ছেন? কী গভীর মহানিদ্রা সে? আমার এত বুকফাটা কান্নার এত আকাশচেরা চিৎকারের এতটুকু কী তাঁর কানে গেল না? সেই কোন্ মায়াবীর মায়াযষ্টিস্পর্শে মোহনিদ্রায় বিভোর তিনি? আমিও কেন অমনি জড়ের মতো নিঃসাড় নিস্পন্দ হয়ে পড়ি না? আমারও প্রাণে কেন মৃত্যুর ঐ রকম শান্ত-শীতল ছোঁয়া লাগে না? আমিও কেন দুপুর রাতের গোরস্থানের মতোই নিথর নিঝুম হয়ে পড়ি না? তাহলে তো এ প্রাণপোড়ানো অতীতটা জগদ্দল শিলার মতো এসে বুকটা চেপে ধরে না! সেই সে কোন্-ভুলে-যাওয়া দিনের কুলিশ-কঠোর স্মৃতিটা তপ্ত শলাকার মতো এসে এই ক্ষত বক্ষটায় ছ্যাঁকা দেয় না! ‘জোবেহ্’ করা জানোয়ারের মতো আর কতদিন নিদারুণ জ্বালায় ছটফট করে মরব? কেন মৃত্যুর মাধুরী মায়ের আশিসধারার মতো আমার উপর নেমে আসে না? এ হতভাগিনিকে জ্বালিয়ে কার মঙ্গল সাধন করছেন মঙ্গলময়? তাই ভাবি—আর ভাবি—কোনো কূলকিনারা পাই না, এর যেন আগাও নেই, গোড়াও নেই। কী ছিল—কী হল—এ শুধু একটা বিরাট গোলমাল!

    সেদিন সকালে ঐ পাশের চারাধানের খেতের আলের উপর দিয়ে কাঁচা আম খেতে খেতে একটি রাখাল বালক কোথা হতে শেখা একটা করুণ গান গেয়ে যাচ্ছিল। গানটা আমার মনে নেই, তবে তার ভাবার্থটা এই রকম, ‘কত নিশিদিন সকাল সন্ধ্যা বয়ে গেল, কত বারোমাস কত যুগ-যুগান্তরের অতীতে ঢলে পড়ল, কত নদনদী সাগরে গিয়ে মিশল, আবার কত সাগর শুকিয়ে মরুভূমি হয়ে গেল, কত নদী পথ ভুলে গেল, আর সে কত গিরিই না গলে গেল, তবু ওগো বাঞ্ছিত, তুমি তো এলে না!’ গানটা শুনছিলুম আর ভাবছিলুম, কী করে আমার প্রাণের ব্যাকুল কান্না এমন করে ভাষায় মূর্ত হয়ে আত্মপ্রকাশ করছিল? ওগো, ঠিক এই রকমই যে একটা মস্ত অসীম কাল আমার আঁখির পলকে পলকে যেন কোথা দিয়ে কোথায় চলেছে, আর আমি কাকে পাওয়ার—কী পাওয়ার জন্যে শুধু আকুলি-বিকুলি মিনতি করে ডাকছি, কিন্তু কই তিনি তো এলেন না—একটু সাড়াও দিলেন না। তবে দুপুর রোদ্দুরে ঘুনঘুনে মাছির মুখে ঐ যে খুব মিহি করুণ ‘গুন গুন’ সুর শুনি এই গোরস্থানে, ও কি তাঁরই কান্না? দিনরাত ধরে সমস্ত গোরস্থান ব্যেপে প্রবল বায়ুর ঐ যে একটানা হু হু শব্দ, ও কি তাঁরই দীর্ঘশ্বাস? রাত্তিরে শিরীষ ফুলের পরাগমাখা ঐ যে ভেসে আসে ভারী গন্ধ, ও কি তাঁরই বর-অঙ্গের সুবাস? গোরস্থানের সমস্ত শিরীষ, শেফালি আর হেনার গাছগুলো ভিজিয়ে, সবুজ দুর্বা আর নীল ভুঁই-কদমের গাছগুলোকে আর্দ্র করে ঐ যে সন্ধে হতে সকাল পর্যন্ত শিশির ক্ষরে, ও কি তাঁরই গলিত বেদনা? বিজুলির চমকে ঐ যে তীব্র আলোকচ্ছটা চোখ ঝলসিয়ে দেয়, ও কি তাঁরই বিচ্ছেদ-উন্মাদ হাসি? সৌদামিনী-স্ফুরণের একটু পরেই ঐ যে মেঘের গম্ভীর গুরু গুরু ডাক শুনতে পাই, ও কি তাঁর পাষাণ বক্ষের স্পন্দন? প্রবল ঝঞ্ঝার মতো এসে সময় সময় ঐ যে দমকা বাতাস আমাকে ঘিরে তাণ্ডব নৃত্য করতে থাকে, ও কি তাঁরই অশরীরী ব্যাকুল আলিঙ্গন? গোরস্থানের পাশ দিয়ে ঐ যে ‘কুনুর’ নদী বয়ে যাচ্ছে, আর তার চরের উপর প্রস্ফুটিত শুভ্র কাশফুলের বনে বনে দোল-দোলা দিয়ে ঘন বাতাস শন শন করে ডেকে যাচ্ছে, ও কি তাঁরই কম্পিত কণ্ঠের আহ্বান? আমি কেন ওঁরই মতো অমনই অসীম, অমনই বিরাট-ব্যাপ্ত হয়ে ওঁকে পাই না? আমি কেন অমনই সবারই মাঝে থেকে ঐ অ-পাওয়াকে অন্তরে অন্তরে অনুভব করি না? এ সীমার মাঝে অসীমের সুর বেজে উঠবে সে আর কখন? এখন যে দিন শেষ হয়ে এল, ঐ শুন নদীপারের বিদায়-গীত শুনা যাচ্ছে খেয়াপারের ক্লান্ত মাঝির মুখে –

    দিবস যদি সাঙ্গ হল, না যদি গাহে পাখি,

    ক্লান্ত বায়ু না যদি আর চলে, –

    এবার তবে গভীর করে ফেলোগো মোরে ঢাকি

    অতি নিবিড় ঘন তিমির তলে!

  • দুরন্ত পথিক

    দুরন্ত পথিক

    দুরন্ত পথিক

    [কথিকা]

    সে চলিতেছিল দুর্গম কাঁটা-ভরা পথ দিয়ে। পথ চলিতে চলিতে সে একবার পিছন ফিরিয়া দেখিল, লক্ষ আঁখি অনিমিষে তাহার দিকে চাহিয়া আছে। সে-দৃষ্টিতে আশা-উন্মাদনার ভাস্বর জ্যোতি ঠিকরাইয়া পড়িতেছিল। তাহাই দুরন্ত পথিকের বক্ষ এক মাদকতা-ভরা গৌরবে ভরপুর করিয়া দিল। সে প্রাণ-ভরা তৃপ্তির হাসি হাসিয়া বলিল, ‘হাঁ ভাই! তোমাদের এমন শক্তি-ভরা দৃষ্টি পেলে কোথায়?’ অযুত আঁখির অযুত দীপ্ত চাউনি বলিয়া উঠিল,–‘ওগো সাহসী পথিক, এ দৃষ্টি পেয়েছি তোমারই চলার পথ চেয়ে!’ উহারই মধ্যে কাহারও স্নেহ-করুণ চাউনি বাণীতে ফুটিয়ে উঠিল,–‘হায়! এ দুর্গম পথে তরুণ পথিকের মৃত্যু যে অনিবার্য’ অমনি লক্ষ কণ্ঠের আর্ত ঝংকার গর্জন করিয়া উঠিল, ‘চোপরাও ভীরু! এই তো মানবাত্মার সত্য শাশ্বত পথ!’ পথিক দু-চোখ পুরিয়া এই কল্যাণ-দৃষ্টির শক্তি হরণ করিয়া লইল। তাহার সুপ্ত যত কিছু অন্তরের সত্য, এক অঙ্গুলি-পরশে সাধা বীণার ঝঞ্ঝনার মতো সাগ্রহে সাড়া দিয়ে উঠিল,–‘আগে চল।’ বনের সবুজ তাহার অবুঝ তারুণ্য দিয়া পথিকের প্রাণ ভরিয়া দিয়া বলিল–‘এই তোমায় যৌবনের রাজটিকা পরিয়ে দিলাম; তুমি চির-যৌবন, চির অমর হলে।’ দূরের আকাশ আনত হইয়া তাহার শিরশ্চুম্বন করিয়া গেল। দূরের দিগ্‌বলয় তাহাকে মুক্তির সীমারেখার আবছায়া দেখাইতে লাগিল। দুই পাশে তাহার বনের শাখী শাখার পতাকা দুলাইয়া তাহাকে অভিনন্দন করিতে লাগিল। স্বাধীন দেশের তোরণ-দ্বার পারাইয়া বোধন-বাঁশির অগ্নি-সুর হরিণের মত তাহাকে মুগ্ধ মাতাল করিয়া ডাক দিতেছিল। বাঁশির টানে মুক্তির পথ লক্ষ্য করিয়া সে ছুটিতে লাগিল।–‘ওগো কোথায় তোমার সিংহদ্বার? দ্বার খোলো, দ্বার খোলো,–আলো দেখাও, পথ দেখাও! … বিশ্বের কল্যাণের মন্ত্র তাহাকে ঘিরিয়া বলিল,–‘এখনও অনেক দেরি, পথ চলো!’ পথিক চমকিয়া উঠিয়া বলিল,—‘ওগো আমি যে তোমাকেই চাই!’ সে অচিন সাথি বলিয়া উঠিল,–‘আমাকে পেতে হলে ঐ সামনের বুলন্দ-দরওয়াজা পার হতে হয়!’ দুরন্ত পথিক তাহার চলায় দুর্বার বেগের গতি আনিয়া বলিল–‘হ্যাঁ ভাই, তাহাই আমার লক্ষ্য!’ দূরে বনের ফাঁকে মুক্ত গগন একবার চমকাইয়া গেল, পেছন হইতে নিযুত তরুণ কণ্ঠের বাণী শোর করিয়া বলিয়া উঠিল,–‘আমাদেরও লক্ষ্য ঐ, চলো ভাই, আগে চলো,–তোমারই পায়ে-চলা পথ ধরে আমরা চলেছি!’ পথিক আগে চলার গৌরবের তৃপ্তি তাহার কণ্ঠে ফুটাইয়া হাঁকিয়া উঠিল, ‘এ পথে যে মরণের ভয় আছে!’ বিক্ষুব্ধ তরুণ কন্ঠে প্রদীপ্ত আগুন যেন গর্জিয়া উঠিল,–‘কুছ পরওয়া নেই! ও তো মরণ নয়, ও যে জীবনের আরম্ভ!’ … অনেক পিছন পাঁজর-ভাঙা বৃদ্ধেরা মরণের ভয়ে কাঁপিয়া মরিতেছিল! তাহাদের স্কন্ধদেশে চড়িয়া একজন মুখ-চোখ ভ্যাঙচাইয়া বলিতেছিল,–‘এই দেখো মরণ! একটু দূরে চন্দন-কুণ্ডলী ধোঁয়া-ভরা আগুন জ্বালাইয়া বৃদ্ধের দৃষ্টি-চাহনি প্রতারিত করার চেষ্টা করা হইতেছিল! হাসি চাপিতে চাপিতে একজন ইহাদিগকে সম্মুখের ধুলায় আগুনের দিকে খেদাইয়া লইয়া যাইতে যাইতে বলিতেছিল,–‘ঐ তো সামনে তোমাদের নির্বাণ কুণ্ড; এ বৃদ্ধ বয়সে কেন বন্ধুর পথে ছুটতে গিয়ে প্রাণ হারাবে? ও দুরন্ত পথিকদল মোলো বলে।’ বৃদ্ধের দল দুই হাত উপরে উঠাইয়া বলিল,–‘হাঁ হুজুর, আলবত। তাহার আশে পাশে কাহার দুষ্ট কণ্ঠে বারে বারে সতর্ক করিতেছিল,–‘ওহে বেকুবদল, ভিক্ষায়াং নৈব নৈব চ। তোদের এরা নির্বাণ-কুণ্ডে পুড়িয়ে তিল তিল করে মারবে।’ তাদের রাখাল হাসি চাপিয়া বলিয়া উঠিল,–‘না না, ওদের কথা শুনো না। ওদের পথ ভীতি-সংকুল আর অনেক দূর, তাও আবার দুঃখ-কষ্ট-কাঁটা-পাথর-ভরা, তোমাদের মুক্তি ওই সামনে।’

    দুরন্ত পথিক চলিয়াছিল, সেই মুক্ত দেশের উদ্‌বোধন-বাঁশির সুর ধরিয়া। … এইসব তাহার পথের বিভীষিকা জুলুম আরম্ভ করিল। পথিক দেখিল, ঐ পথ বাহিয়া যাওয়ার এক-আধটুকু অস্ফুট পদচিহ্ন এখনও যেন জাগিয়া রহিয়াছে। পথের বিভীষিকা তাহাদেরই মাথার খুলি এই নতুন পথিকের সামনে ধরিয়া বলিল,–‘এই দেখো এদের পরিণাম।’ সেই খুলি মাথায় করিয়া নতুন পথিক আর্তনাদ করিয়া উঠিল,–‘আহা, এরাই তো আমায় ডাক দিয়েছে! আমি এমনই পরিণাম চাই–আমার মৃত্যুতেই তো আমার শেষ নয়, আমার পশ্চাতে ওই যে তরুণ যাত্রীর দল, ওদের মাঝখানেই আমি বেঁচে থাকব!’ বিভীষিকা বললে,–‘তুমি কে?’ পথিক হেসে বললে,–‘আমি চিরন্তন মুক্তিকামী। এই যাদের খুলি পড়ে রয়েছে তারা কেউ মরেনি, আমার মাঝেই তারা নূতন শক্তি, নূতন জীবন, নূতন আলোক নিয়ে এসেছে। এ মুক্তের দল অমর!’ বিভীষিকা কাঁপিয়া উঠিয়া বলিল,–‘আমার চেন না? আমি শূঙ্খল। তুমি যাই বল, তোমাকে হত্যা করাই আমার ব্রত, মুক্তিতে বন্ধন দেওয়াই আমার লক্ষ্য। তোমাকে মরতে হবে!’ দুরন্ত পথিক দাঁড়াইয়া বলিল,–‘মারো,–বাঁধো,–কিন্তু আমাকে বাঁধতে পারবে না; আমার তো মৃত্যু নাই! আমি আবার আসব!’ বিভীষিকা পথ আগুলিয়া বলিল,–‘আমার যতক্ষণ শক্তি আছে, ততক্ষণ তুমি যত বারই আস তোমাকে বধ করব। শক্তি থাকে আমায় মার, নতুবা আমার মার সহ্য করতে হবে।’

    অনেক দূরে মুক্ত দেশের অলিন্দে ঐ পথেরই বিগত শহীদেরা চিরতরুণ জ্যোর্তিময় দেহ লইয়া দাঁড়াইয়া তাহাকে আহ্বান করিতে লাগিল। পথিক বলিল,–‘কিন্তু এই জীবন দেওয়াটাই কী জীবনের সার্থকতা? মুক্ত বাতায়ন হইতে মুক্ত আত্মা স্নিগ্ধ-আর্দ্র কণ্ঠে কহিয়া উঠিল,–হাঁ ভাই! যুগ যুগ জীবন তো এই মৃত্যুরই বন্দনা গান গাইছে। সহস্র প্রাণের উদ্‌বোধনই তো তোমার মরণের সার্থকতা। নিজে মরিয়া জাগানোতেই তোমার মৃত্যু যে চিরজাগ্রত অমর!’ নবীন পথিক তাহার তরুণ বিশাল বক্ষ উন্মোচন করিয়া অগ্রে বাড়াইয়া দিয়া কহিল,–‘তবে চালাও খঞ্জর!’ পিছন হইতে তরুণ যাত্রীর দল দুরন্ত পথিকের প্রাণশূন্য দেহ মাথায় তুলিয়া কাঁদিয়া উঠিল–‘তুমি আবার এসো!’ অনেক দূরে দিগ্‌বলয়ের কোলে কাহাদের একতা-সংগীত ধ্বনিয়া উঠিতে লাগিল,–

    ‘দেশ দেশ নন্দিত করি মন্দ্রিত তব ভেরি,

    আসিল যত বীরবৃন্দ আসন তব ঘেরি।’