Author: কাজী নজরুল ইসলাম
-

জাগরণী
কোরাস :ভিক্ষা দাও! ভিক্ষা দাও!ফিরে চাও ওগো পুরবাসী,সন্তান দ্বারে উপবাসী,দাও মানবতা ভিক্ষা দাও!জাগো গো, জাগো গো,তন্দ্রা-অলস জাগো গো,জাগো রে! জাগো রে!১মুক্ত করিতে বন্দিনী মা-য়কোটি বীরসূত ওই হেরো ধায়মৃত্যুতোরণ-দ্বার-পানে –কার টানে?দ্বার খোলো দ্বার খোলো!একবার ভুলে ফিরিয়া চাও!কোরাস : ভিক্ষা দাও … …২জননী আমার ফিরিয়া চাও!ভাইরা আমার ফিরিয়া চাও!চাই মানবতা, তাই দ্বারেকর হানি মা গো বারে বারে–দাও মানবতা ভিক্ষা দাও।পুরুষসিংহ জাগো রে!সত্যমানব জাগো রে!বাধাবন্ধন-ভয়হারা হওসত্যমুক্তিমন্ত্র গাও!কোরাস : ভিক্ষা দাও … …৩লক্ষ্য যাদের উৎপীড়ন আর অত্যাচার,নর-নারায়ণে হানে পদাঘাতজেনেছে সত্য-হত্যা সার!অত্যাচার! অত্যাচার!!ত্রিশ কোটি নর-আত্মার যারা অপমান হেলাকরেছে রেশৃঙ্খল গলে দিয়েছে মা-র –সেই আজ ভগবান তোমার!অত্যাচার! অত্যাচার!!ছি— ছি— ছি ছি— ছি— ছি নাই কি লাজ–নাই কি আত্মসম্মান ওরে, নাই জাগ্রতভগবান কি রেআমাদেরও এই বক্ষোমাঝ?অপমান বড়ো অপমান ভাইমিথ্যার যদি মহিমা গাও!কোরাস : ভিক্ষা দাও … …৪আল্লায় ওরে হকতালায়পায়ে ঠেলে যারা অবহেলায়,আজাদ-মুক্ত আত্মারে যারা শিখায়ে ভীরুতাকরেছে দাস–সেই আজ ভগবান তোমার!সেই আজ ভগবান তোমার!সর্বনাশ! সর্বনাশ!ছি-ছি নির্জীব পুরবাসী আর খুলো না দ্বার!জননী গো! জননী গো!কার তরে জ্বালো উৎসব-দীপ?দীপ নেবাও! দীপ নেবাও!!মঙ্গল-ঘট ভেঙে ফেলো,সব গেল মা গো সব গেল!অন্ধকার! অন্ধকার!ঢাকুক এ মুখ অন্ধকার!দীপ নেবাও! দীপ নেবাও!কোরাস : ভিক্ষা দাও … …৫ছি ছি ছি ছিএ কী দেখিগাহিস তাদেরই বন্দনা-গান,দাস সম নিস হাত পেতে দান!ছি ছি ছি ছি ছি ছিওরে তরুণ ওরে অরুণ!নরসুত তুমি দাসত্বের এ ঘৃণ্য চিহ্নমুছিয়া দাও!ভাঙিয়া দাও,এ কারা এ বেড়ি ভাঙিয়া দাও!কোরাস : ভিক্ষা দাও … …৬পরাধীন বলে নাই তোমাদেরসত্য-তেজের নিষ্ঠা কি?অপমান সয়ে মুখ পেতে নেবে বিষ্ঠা ছি!মরি লাজে, লাজে মরিএক হাতে তোরে ‘পয়জার’ মারেঅপমান সে যে অপমান।জাগো জাগো ওরে হতমান।কেটে ফেলো লোভী লুব্ধ রসনা,আঁধারে এ হীন মুখ লুকাও।কোরাস : ভিক্ষা দাও … …৭ঘরের বাহির হোয়ো না আর,ঝেড়ে ফেলো হীন বোঝার ভার,কাপুরুষ হীন মানবের মুখঢাকুক লজ্জা অন্ধকার।পরিহাস ভাই পরিহাস সে যেপরাজিতে দিতে মনোব্যথা–যদিজয়ী আসে রাজ-রাজ সেজে।পরিহাস, এ যে নির্দয় পরিহাস!ওরে কোথা যাস্বল কোথা যাস ছি ছিপরিয়া ভীরুর দীন বাস?অপমান এত সহিবার আগেহে ক্লীব, হে জড়, মরিয়া যাও!কোরাস : ভিক্ষা দাও … …৮পুরুষসিংহ জাগো রে!নির্ভীক বীর জাগো রে!দীপ জ্বালো কেন আপনারই হীন কালো অন্তরকালামুখ হেন হেসে দেখাও।নির্লজ্জ রে ফিরিয়া চাও!আপনার পানে ফিরিয়া চাও!অন্ধকার! অন্ধকার!নিশ্বাস আজি বন্ধ মা-রঅপমানে নির্মম লাজে,তাই দিকে দিকে ক্রন্দন বাজে–দীপ নেবাও! দীপ নেবাও!আপনার পানে ফিরিয়া চাও!কোরাস : ভিক্ষা দাও … -

মিলন-গান
[গান]
ভাই হয়ে ভাই চিনবি আবার গাইব কি আর এমন গান।(সেদিন)দুয়ার ভেঙে আসবে জোয়ার মরা গাঙে ডাকবে বান॥(তোরা)স্বার্থ-পিশাচ যেমন কুকুর তেমনি মুগুর পাস রে মান।(তাই)কলজে চুঁয়ে গলছে রক্ত দলছে পায়ে ডলছে কান॥(যত)মাদি তোরা বাঁদি-বাচ্চা দাস-মহলের খাস গোলাম।(হায়)মাকে খুঁজিস? চাকরানি সে, জেলখানাতে ভানছে ধান॥(মা-র)বন্ধ ঘরে কেঁদে কেঁদে অন্ধ হল দুই নয়ান।(তোরা)শুনতে পেয়েও শুনলি নে তা মাতৃহন্তা কুসন্তান॥(ওরে)তোরা করিস লাঠালাঠি (আর) সিন্ধু-ডাকাত লুঠছে ধান!(তাই)গোবর-গাদা মাথায় তোদের কাঁঠাল ভেঙে খায় সেয়ান॥(ছিলি)সিংহ ব্যাঘ্র, হিংসা-যুদ্ধে আজকে এমনি খিন্নপ্রাণ।(তোদের)মুখের গ্রাস ওই গিলছে শিয়াল তোমরা শুয়ে নিচ্ছ ঘ্রাণ॥(তোরা)কলুর বলদ টানিস ঘানি গলদ কোথায় নাইকো জ্ঞান।(শুধু)পড়ছ কেতাব, নিচ্ছ খেতাব, নিমক-হারাম বে-ইমান॥(তোরা)বাঁদর ডেকে মানলি সালিশ, ভাইকে দিতে ফাটল প্রাণ।(এখন)সালিশ নিজেই ‘খা ডালা সব’ বোকা তোদের এই দেখান॥(তোরা)পথের কুকুর দু-কান-কাটা মান-অপমান নাইকো জ্ঞান।(তাই)যে জুতোতে মারছে গুঁতো করছ তাতেই তৈল দান॥(তোরা)নাক কেটে নিজ পরের যাত্রা ভঙ্গ করিস বুদ্ধিমান।(তোদের)কে যে ভালো কে যে মন্দ সব শিয়ালই এক সমান॥(শুনি)আপন ভিটেয় কুকুর রাজা, তার চেয়েও হীন তোদের প্রাণ।(তাই)তোদের দেশ এই হিন্দুস্থানে নাই তোদেরই বিন্দু স্থান॥(তোদের)হাড় খেয়েছে, মাস খেয়েছে, (এখন) চামড়াতে দেয় হেঁচকা টান(আজ)বিশ্ব ভুবন ডুকরে ওঠে দেখে তোদের অসম্মান॥(আজ)সাধে ভারত-বিধাতা কি চোখ বেঁধে ওই মুখ লুকান।(তোরা)বিশ্বে যে তাঁর রাখিস নে ঠাঁই, কানা গোরুর ভিন বাথান॥(তোরা)করলি কেবল অহরহ নীচ কলহের গরল পান।(আজও)বুঝলি না হায় নাড়ি-ছেঁড়া মায়ের পেটের ভায়ের টান॥(ওই)বিশ্ব ছিঁড়ে আনতে পারি, পাই যদি ভাই তোদের প্রাণ।(তোরা)মেঘ-বাদলের বজ্রবিষাণ (আর) ঝড়-তুফানের লাল নিশান॥ -

পূর্ণ-অভিনন্দন
[গান]1
এসো অষ্টমী-পূর্ণচন্দ্র! এসো পূর্ণিমা-পূর্ণচাঁদ!
ভেদ করি পুন বন্ধ কারার অন্ধকারের পাষাণফাঁদ!
এসো অনাগত নব-প্রলয়ের মহাসেনাপতি মহামহিম!
এসো অক্ষত মোহান্ধ-ধৃতরাষ্ট্র-মুক্ত লৌহ ভীম!
স্বাগত ফরিদপুরের ফরিদ, মাদারিপুরের মর্দবীর,
বাংলা মায়ের বুকের মানিক, মিলন পদ্মা-ভাগীরথীর!
ছয়বার জয় করি কারা-ব্যূহ রাজ-রাহুগ্রাসমুক্ত চাঁদ!
আসিলে চরণে দুলায়ে সাগর নয়-বছরের মুক্ত বাঁধ।
নবগ্রহ ছিঁড়ি ফণি-মনসার মুকুটে তোমার গাঁথিলে হার,
উদিলে দশম মহাজ্যোতিষ্ক ভেদিয়া গভীর অন্ধকার!
স্বাগত ফরিদপুরের ফরিদ, মাদারিপুরের মর্দবীর,
বাংলা মায়ের বুকের মানিক, মিলন পদ্মা-ভাগীরথীর!
স্বাগত শুদ্ধ রুদ্ধপ্রতাপ, প্রবুদ্ধ নব মহাবলী!
দনুজদমন দধীচি-অস্থি, বহ্নিগর্ভ দম্ভোলি!
স্বাগত সিংহবাহিনী-কুমার! স্বাগত হে দেবসেনাপতি!
অনাগত রণ-কুরুক্ষেত্রে সারথি পার্থ মহারথী!
স্বাগত ফরিদপুরের ফরিদ, মাদারিপুরের মর্দবীর,
বাংলা মায়ের বুকের মানিক, মিলন পদ্মা-ভাগীরথীর!
নৃশংস রাজ-কংসবংশে হানিতে তোমার ধ্বংস-মার
এসো অষ্টমী-পূর্ণচন্দ্র, ভাঙিয়া পাষাণ-দৈত্যাগার!
এসো অশান্তি-অগ্নিকাণ্ডে শান্তিসেনার কাণ্ডারি!
নারায়ণী-সেনা-সেনাধিপ, এসো প্রতাপের হারা-তরবারি!
স্বাগত ফরিদপুরের ফরিদ, মাদারিপুরের মর্দবীর,
বাংলা মায়ের বুকের মানিক, মিলন পদ্মা-ভাগীরথীর!
ওগো অতীতের আজও-ধূমায়িত আগ্নেয়গিরি ধূম্রশিখ!
না-আসা-দিনের অতিথি তরুণ তব পানে চেয়ে নির্নিমিখ।
জয় বাংলার পূর্ণচন্দ্র, জয় জয় আদি-অন্তরীণ,
জয় যুগে-যুগে-আসা-সেনাপতি, জয় প্রাণ আদি-অন্তহীন!
স্বাগত ফরিদপুরের ফরিদ, মাদারিপুরের মর্দবীর,
বাংলা মায়ের বুকের মানিক, মিলন পদ্মা-ভাগীরথীর!
স্বর্গ হইতে জননী তোমার পেতেছেন নামি মাটিতে কোল,
শ্যামল শস্যে হরিৎ ধান্যে বিছানো তাঁহারই শ্যাম আঁচল।
তাঁহারই স্নেহের করুণ গন্ধ নবান্নে ভরি উঠিছে ওই,
নদীস্রোত-স্বরে কাঁদিছেন মাতা, ‘কই রে আমার দুলাল কই?’
স্বাগত ফরিদপুরের ফরিদ, মাদারিপুরের মর্দবীর,
বাংলা মায়ের বুকের মানিক, মিলন পদ্মা-ভাগীরথীর!
মোছো আঁখি-জল, এসো বীর! আজ খুঁজে নিতে হবে আপন মা-য়,
হারানো মায়ের স্মৃতি-ছাই আছে এই মাটিতেই মিশিয়া, হায়!
তেত্রিশ কোটি ছেলের রক্তে মিশেছে মায়ের ভস্ম-শেষ,
ইহাদেরই মাঝে কাঁদিছেন মাতা, তাই আমাদের মা স্বদেশ।
স্বাগত ফরিদপুরের ফরিদ, মাদারিপুরের মর্দবীর,
বাংলা মায়ের বুকের মানিক, মিলন পদ্মা-ভাগীরথীর!
এসো বীর! এসো যুগ-সেনাপতি! সেনাদল তব চায় হুকুম,
হাঁকিছে প্রলয়, কাঁপিছে ধরণি, উদ্গারে গিরি অগ্নিধূম।
পরাধীন এই তেত্রিশ কোটি বন্দির আঁখি-জলে হে বীর,
বন্দিনী মাতা যাচিছে শক্তি তোমার অভয় তরবারির।
স্বাগত ফরিদপুরের ফরিদ, মাদারিপুরের মর্দবীর,
বাংলা মায়ের বুকের মানিক, মিলন পদ্মা-ভাগীরথীর!
গলশৃঙ্খল টুটেনি আজিও, করিতে পারি না প্রণাম পা-য়
রুদ্ধ কণ্ঠে ফরিয়াদ শুধু গুমরিয়া মরে গুরু ব্যথায়!
জননীর যবে মিলিবে আদেশ, মুক্ত সেনানী দিবে হুকুম,
শত্রুখড়্গ-ছিন্নমুণ্ড দানিবে ও-পায়ে প্রণাম-চুম।
স্বাগত ফরিদপুরের ফরিদ, মাদারিপুরের মর্দবীর,
বাংলা মায়ের বুকের মানিক, মিলন পদ্মা-ভাগীরথীর!
-

মোহান্তের মোহ-অন্তের গান
[গান]
জাগো আজ দণ্ড-হাতে চণ্ড বঙ্গবাসী।ডুবাল পাপ-চণ্ডাল তোদের বাংলা দেশের কাশী।জাগো বঙ্গবাসী॥তোরাহত্যা দিতিস যাঁর থানে, আজ সেই দেবতাই কেঁদেওরেতোদের দ্বারেই হত্যা দিয়ে মাগেন সহায় আপনি আসি।জাগো বঙ্গবাসী॥মোহের যার নাইকো অন্তপূজারি সেই মোহান্ত,মা বোনে সর্বস্বান্ত করছে বেদি-মূলে।তোদেরেপূজার প্রসাদ বলে খাওয়ায় পাপ-পুঁজ সে গুলে।তোরাতীর্থে গিয়ে দেখে আসিস পাপ-ব্যভিচার রাশি রাশি।জাগো বঙ্গবাসী॥পুণ্যের ব্যাবসাদারিচালায় সব এই ব্যাপারি,জমাচ্ছে হাঁড়ি হাঁড়ি টাকার কাঁড়ি ঘরে।হায়ছাই মেখে যে ভিখারি-শিব বেড়ান ভিক্ষা করে –ওরেতাঁর পূজারি দিনে-দিনে ফুলে হচ্ছে খোদার খাসি।জাগো বঙ্গবাসী॥এইসব ধর্ম-ঘাগিদেবতায় করছে দাগি,মুখে কয় সর্বত্যাগী ভোগ-নরকে বসে।সে যেপাপের ঘণ্টা বাজায় পাপী দেবদেউলে পশে।আরভক্ত তোরা পূজিস তারেই, জোগাস খোরাক সেবাদাসী!জাগো বঙ্গবাসী॥দিয়ে নিজ রক্তবিন্দুভরালি পাপের সিন্ধু –ডুবলি তায়ডুবলি হিন্দু ডুবালি দেবতারে।দেখভোগের বিষ্ঠা পুড়ছে তোদের বেদির ধূপাধারে।পূজারীরকমণ্ডলুর গঙ্গাজলে মদের ফেনা উঠছে ভাসি।জাগো বঙ্গবাসী॥দিতে যায় পূজা-আরতিসতীত্ব হারায় সতী,পুণ্য-খাতায় ক্ষতি লেখায় ভক্তি দিয়ে,তারভোগ-মহলের জ্বলছে প্রদীপ তোদের পুণ্য-ঘিয়ে।তোদেরফাঁকা ভক্তির ভণ্ডামিতে মহাদেব আজ ঘোড়ার ঘাসি।জাগো বঙ্গবাসী॥তোরা সব শক্তিশালীবুকে নয়, মুখে খালি!বেড়ালকে বাছতে দিলি মাছের কাঁটা যে রে!তোরাপূজারিকে করিস পূজা পূজার ঠাকুর ছেড়ে।মা-র অসুর শোধরা সে ভুল, আদেশ দেন মা সর্বনাশী।‘জয় তারকেশ্বর’ বলে পরবি রে নয় গলায় ফাঁসি।জাগো বঙ্গবাসী॥ -

আশু-প্রয়াণগীতি
কোরাস :বাংলার ‘শের’, বাংলার শির,বাংলার বাণী, বাংলার বীরসহসা ও-পারে অস্তমান।এপারে দাঁড়ায়ে দেখিল ভারত মহাভারতের মহাপ্রয়াণ॥বাংলার ঋষি বাংলার জ্ঞান বঙ্গবাণীর শ্বেতকমল,শ্যাম বাংলার বিদ্যাগঙ্গা অবিদ্যানাশী তীর্থজল!মহামহিমার বিরাট পুরুষ শক্তি-ইন্দ্র তেজ-তপন –রক্ত-উদয় হেরিতে সহসা হেরিনু সে রবি মেঘমগন।কোরাস :বাংলার ‘শের’, বাংলার শির,বাংলার বাণী, বাংলার বীরসহসা ও-পারে অস্তমান।এপারে দাঁড়ায়ে দেখিল ভারত মহাভারতের মহাপ্রয়াণ॥মদগর্বীর গর্বখর্ব বলদর্পীর দর্পনাশশ্বেতভীতুদের শ্যাম বরাভয় রক্তাসুরের কৃষ্ণ ত্রাস!!নব ভারতের নব আশা-রবি প্রাচী-র উদার অভ্যুদয়হেরিতে হেরিতে হেরিনু সহসা বিদায়গোধূলি গগনময়।কোরাস :বাংলার ‘শের’, বাংলার শির,বাংলার বাণী, বাংলার বীরসহসা ও-পারে অস্তমান।এপারে দাঁড়ায়ে দেখিল ভারত মহাভারতের মহাপ্রয়াণ॥পড়িল ধসিয়া গৌরীশংকর হিমালয়-শির স্বর্গচূড়,গিরি কাঞ্চনজঙ্ঘা গিরিল – বাংলার যবে দিনদুপুর।শক্তিহাঙর শোষিছে রক্ত, মৃত্যু শোষিছে সাগরপ্রাণ, –পরাধীন মা-র স্বাধীন সুতের মেদ-ধূমে কালো দেশ শ্মশান।কোরাস :বাংলার ‘শের’, বাংলার শির,বাংলার বাণী, বাংলার বীরসহসা ও-পারে অস্তমান।এপারে দাঁড়ায়ে দেখিল ভারত মহাভারতের মহাপ্রয়াণ॥অরাজক মারি মড়াকান্নায় দেশজননীর বদ্ধ শ্বাস,হে দেব-আত্মা! স্বর্গ হইতে দাও কল্যাণ, দাও আভাস,কেমন করিয়া মৃত্যু মথিয়া মৃত্যুঞ্জয় হয় মানব।শব হয়ে গেছ, শিব হয়ে এসো দেবকী-কারার নীল কেশব।কোরাস :বাংলার ‘শের’, বাংলার শির,বাংলার বাণী, বাংলার বীরসহসা ও-পারে অস্তমান।এপারে দাঁড়ায়ে দেখিল ভারত মহাভারতের মহাপ্রয়াণ॥ -

ল্যাবেন্ডিশ বাহিনীর বিজাতীয় সংগীত
ল্যাবেন্ডিশ2 বাহিনীর বিজাতীয় সংগীত
কোরাস :কে বলে মোদেরে ল্যাডাগ্যাপচার? আমরা সিভিল গাড়,অরাজক এই ভারত-মাঠে হে আমরা উদ্মো ষাঁড়॥মোরা লাঙল জোয়াল দড়াদড়ি-ছাড়া,বড় সুখে তাই দিই শিং-নাড়া,অসহ-যোগীও করিবে না তাড়া রে–ওরেভয় নাই, ওরা বৈষ্ণব বাঘ, খাবে না মোদের হাড়!চলোব্যাং-বীর বলো ঠ্যাং নেড়ে জোর, ছেডেডে ডেডেং হার্র্!কোরাস :কে বলে ইত্যাদি–মোরা গলদঘর্ম যদিও গলিয়া,বড় বেজুত করেছে লেজুড় ডলিয়া,তবু গলদ কোরো না বলদ বলিয়া হে,মোরাবড়ো দরকারি সরকারি গোরু, তরকারি নহি তার!তবেগতিক দেখিয়া অধিক না গিয়া সটান পগার পার!কোরাস :কে বলে ইত্যাদি –আজ গোবরগণেশ গোবরমন্তল্যাজে ও গোবরে খিঁচেন দন্ত,তবু করুণার নাহিকো অন্ত হে,যতমামাদের কড়ি ধামা-ধরে দিয়া আমাদেরই ভাঙে ঘাড়!আরবাবাদেরে বেঁধে ঠ্যাঙাতে মোরাই কেটে দি বাঁশের ঝাড়।কোরাস :কে বলে ইত্যাদি –হয়ে ইভিলের গুরু ডেভিল পশুর –সিভিল-বাহিনী, কী এত কসুরকরেছি মাইরি? বলো তো শ্বশুর হে!ওইরাঙামুখে বাবা অন্ন দিয়ে তুলি নিজে খাই জোলো মাড়,তবুসেলাম ঠুকিতে মলাম বাবা গো বক্র মাজা ও ঘাড়!কোরাস :কে বলে ইত্যাদি –বহে কালাতে ধলাতে গঙ্গা-যমুনাআমরা তাহারই দিব্যি নমুনা,এ-রীতি পিরিতি বুঝিবে কভু না হে,তাইকালামুখ প্রেমে আলা করি হাঁকি – ‘তাড় রে, নেটিভ তাড়’!তবেকোপন-স্বভাব দেখিলে অমনি গোপন খাম্বা-আড়!কোরাস :কে বলে ইত্যাদি –এবে কাঁপিবে মেদিনী শত উৎপাতেচিৎপটাং সে কত ‘ফুটপাথে’হবে আমাদেরই ভীম-কোঁৎকাতে হে!তবেপরোয়া কী দাদা? ক্যাঁকড়ার সম নিসপিস নাড়ো দাঁড়,যদিনিশ্চল হাতে পিস্তল কাঁপে তবু গোঁফে দাও চাড়।কোরাস :কে বলে ইত্যাদি –বাবা! যদিও এ-দেহ ঝুনো ঠনঠনতবু লোকে ভাবে ঠুঁটো পলটন!আরে ঘোড়া নাই! বাস, পায়ে হন্টন হে!বাজেকরতাল – আজ হরতাল। ডাকে আত্মা যে খাঁচা ছাড়!ওরে‘ওয়ান পেস স্টেপ ফরওয়ার্ড মার্চ, থুড়ি থুড়ি ব্যাকওয়ার্ড।’ -

সুপার (জেলের) বন্দনা
[ব্যঙ্গ-অনুকৃতি]
তোমারই জেলে পালিছ ঠেলে, তুমি ধন্য ধন্য হে।
আমার এ গান তোমারই ধ্যান, তুমি ধন্য ধন্য হে॥
রেখেছ সান্ত্রি পাহারা দোরে
আঁধার-কক্ষে জামাই-আদরে
বেঁধেছ শিকল-প্রণয়-ডোরে
তুমি ধন্য ধন্য হে॥
আ-কাঁড়া চালের অন্ন-লবণ
করেছ আমার রসনা-লোভন,
বুড়ো ডাঁটা-ঘাঁটা লাপসি শোভন,
তুমি ধন্য ধন্য হে॥
ধরো ধরো খুড়ো চপেটা মুষ্টি,
খেয়ে গয়া পাবে সোজা স-গুষ্টি,
ওল-ছোলা দেহ ধবল-কুষ্টি
তুমি ধন্য ধন্য হে॥
-

দুঃশাসনের রক্ত-পান
বল রে বন্য হিংস্র বীর,
দুঃশাসনের চাই রুধির।
চাই রুধির, রক্ত চাই,
ঘোষো দিকে দিকে এই কথাই
দুঃশাসনের রক্ত চাই!
দুঃশাসনের রক্ত চাই!!
অত্যাচারী সে দুঃশাসন
চাই খুন তার চাই শাসন,
হাঁটু গেড়ে তার বুকে বসি
ঘাড় ভেঙে তার খুন শোষি।
আয় ভীম আয় হিংস্র বীর,
কর আ-কণ্ঠ পান রুধির।
ওরে এ যে সেই দুঃশাসন
দিল শত বীরে নির্বাসন,
কচি শিশু বেঁধে বেত্রাঘাত
করেছে রে এই ক্রূর স্যাঙাত।
মা বোনেদের হরেছে লাজ
দিনের আলোকে এই পিশাচ।
বুক ফেটে চোখে জল আসে,
তারে ক্ষমা করা? ভীরুতা সে!
হিংসাশী মোরা মাংসাশী,
ভণ্ডামি ভালোবাসাবাসি!
শত্রুরে পেলে নিকটে ভাই
কাঁচা কলিজাটা চিবিয়ে খাই!
মারি লাথি তার মড়া মুখে,
তাতা-থই নাচি ভীম সুখে।
নহি মোরা ভীরু সংসারী,
বাঁধি না আমার ঘরবাড়ি।
দিয়াছি তোদের ঘরের সুখ,
আঘাতের তরে মোদের বুক।
যাহাদের তরে মোরা চাঁড়াল
তাহারাই আজি পাড়িছে গাল!
তাহাদের তরে সন্ধ্যা-দীপ,
আমাদের আন্দামান দ্বীপ
তাহাদের তরে প্রিয়ার বুক
আমাদের তরে ভীম চাবুক।
তাহাদের ভালোবাসাবাসি
আমাদের তরে নীল ফাঁসি।
বরিছে তাদেরে বাজিয়া শাঁখ,
মোদের মরণে নিনাদে ঢাক।
জীবনের ভোগ শুধু ওদের,
তরুণ বয়সে মরা মোদের।
কার তরে ওরে কার তরে
সৈনিক মোরা পচি মরে?
কার তরে পশু সেজেছি আজ,
অকাতরে বুক পেতে নিই বাজ।
ধর্মাধর্ম কেন যে নাই
আমাদের, তাহা কে বোঝে ভাই?
কেন বিদ্রোহী সব-কিছুর?
সব মায়া কেন করেছি দূর?
কারে কস মন সে ব্যথা তোর?
যার তরে চুরি সে বলে চোর।
যার তরে মাখি গায়ে কাদা,
সেই হয় এসে পথে বাধা।
ভয় নাই গৃহী! কোরো না ভয়,
সুখ আমাদের লক্ষ্য নয়।
বিরূপাক্ষ যে মোরা ধাতার,
আমাদের তরে ক্লেশ-পাথার।
কাড়ি না তোদের অন্ন-গ্রাস
তোমাদের ঘরে হানি না ত্রাস,
জালিমের মোরা ফেলাই লাশ,
রাজা-রাজড়ার সর্বনাশ!
ধর্মচিন্তা মোদের নয়,
আমাদের নাই মৃত্যুভয়!
মৃত্যুকে ভয় করে যারা,
ধর্মধ্বজ হোক তারা।
শুধু মানবের শুভ লাগি
সৈনিক যত দুখভাগী।
ধার্মিক! দোষ নিয়ো না তার,
তোমাদের তরে মুক্ত দেশ
মোদের প্রাপ্য তোদের শ্লেষ।
জানি জানি ওই রণাঙ্গণ
হবে যবে মোর মৃৎ-কাফন6
ফেলিবে কি ছোটো একটি শ্বাস?
তিক্ত হবে কি মুখের গ্রাস?
কিছুকাল পরে হাড্ডি মোর
পিষে যাবে ভাই জুতিতে তোর!
এই যারা আজ ধর্মহীন
চিনে শুধু খুন আর সঙিন;
তাহাদেরে মনে পড়িবে কার
ঘরে পড়ে যারা খেয়েছে মার?
ঘরে বসে নিস স্বর্গ-লোক,
মেরে মরে তারে দিস দোজখ7।
ভয়ে-ভীরু ওরে ধর্মবীর!
আমরা হিংস্র চাই রুধির!
শয়তান মোরা? আচ্ছা, তাই।
আমাদের পথে এসো না ভাই।
মোদের রক্ত-রুধির-রথ,
মোদের জাহান্নামের পথ,
ছেড়ে দাও ভাই জ্ঞান-প্রবীণ,
আমরা কাফের ধর্মহীন!
এর চেয়ে বেশি কী দেবে গাল?
আমরা পিশাচ খুন-মাতাল।
চালাও তোমার ধর্ম-রথ,
মোদের কাঁটার রক্ত-পথ,
আমরা বলিব সর্বদাই –
দুঃশাসনের রক্ত চাই!
দুঃশাসনের রক্ত চাই!!
চাই না ধর্ম, চাই না কাম,
চাই না মোক্ষ, সব হারাম
আমাদের কাছে; শুধু হালাল8
দুশমন-খুন লাল-সে-লাল॥
-

শহীদী-ঈদ
(১)
শহিদের ইদ এসেছে আজ
শিরোপরি খুন-লোহিত তাজ,
আল্লার রাহে চাহে সে ভিখ;
জিয়ারার চেয়ে পিয়ারা যে
আল্লার রাহে তাহারে দে,
চাহি না ফাঁকির মণিমানিক।
(২)
চাহি নাকো গাভি দুম্বা উট
কতটুকু দান? ও দান ঝুট।
চাই কোরবানি, চাই না দান।
রাখিতে ইজ্জত ইসলামের
শির চাই তোর, তোর ছেলের,
দেবে কি? কে আছ মুসলমান?
(৩)
ওরে ফাঁকিবাজ, ফেরেব-বাজ,
আপনারে আর দিসনে লাজ, –
গোরু ঘুষ দিয়ে চাস সওয়াব?
যদিই রে তুই গোরুর সাথ
পার হয়ে যাস পুলসেরাত,
কী দিবি মোহাম্মদে (দঃ) জওয়াব!
(৪)
শুধাবেন যবে – ওরে কাফের,
কী করেছ তুমি ইসলামের?
ইসলামে দিয়ে জাহান্নম
আপনি এসেছ বেহেশ্ত পর –
পুণ্য-পিশাচ! স্বার্থপর!
দেখাসনে মুখ, লাগে শরম।
(৫)
গোরুরে করিলে সেরাত পার,
সন্তানে দিলে নরক-নার!
মায়া-দোষে ছেলে গেল দোজখ।
কোরবানি দিলি গোরু-ছাগল,
তাদেরই জীবন হল সফল
পেয়েছে তাহারা বেহেশ্ত-লোক!
(৬)
শুধু আপনারে বাঁচায় যে,
মুসলিম নহে, ভণ্ড সে!
ইসলাম বলে – বাঁচো সবাই!
দাও কোরবানি জান ও মাল,
বেহেশ্ত তোমার করো হালাল।
স্বার্থপরের বেহেশ্ত নাই।
(৭)
ইসলামে তুমি দিয়ে কবর
মুসলিম বলে কর ফখর!
মোনাফেক তুমি সেরা বে-দীন!
ইসলামে যারা করে জবেহ্,
তুমি তাহাদেরই হও তাঁবে।
তুমি জুতো-বওয়া তারই অধীন।
(৮)
নামাজ-রোজার শুধু ভড়ং,
ইয়া উয়া পরে সেজেছ সং,
ত্যাগ নাই তোর এক ছিদাম!
কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা করো জড়ো,
ত্যাগের বেলাতে জড়সড়ো!
তোর নামাজের কী আছে দাম?
(৯)
খেয়ে খেয়ে গোশ্ত রুটি তো খুব
হয়েছ খোদার খাসি বেকুব,
নিজেদের দাও কোরবানি।
বেঁচে যাবে তুমি, বাঁচিবে দ্বীন,
দাস ইসলাম হবে স্বাধীন,
গাহিছে কামাল এই গানই!
(১০)
বাঁচায়ে আপনা ছেলে-মেয়ে
জান্নাত পানে আছ চেয়ে
ভাবিছ সেরাত হবেই পার।
কেন না, দিয়েছ সাত জনের
তরে এক গোরু! আর কী ঢের!
সাতটি টাকায় গোনাহ্ কাবার!
(১১)
জান না কি তুমি, রে বে-ইমান
আল্লা সর্বশক্তিমান
দেখিছেন তোর সব কিছু?
জাব্বা-জোব্বা দিয়ে ধোঁকা
দিবি আল্লারে, ওরে বোকা!
কেয়ামতে হবে মাথা নিচু!
(১২)
ডুবে ইসলাম, আসে আঁধার!
ইব্রাহিমের মতো আবার
কোরবানি দাও প্রিয় বিভব!
‘জবীহুল্লাহ্’ ছেলেরা হোক,
যাক সব কিছু – সত্য রোক!
মা হাজেরা হোক মায়েরা সব।
(১৩)
খাবে দেখেছিলেন ইব্রাহিম –
‘দাও কোরবানি মহামহিম!’
তোরা যে দেখিস দিবালোকে
কী যে দুর্গতি ইসলামের!
পরীক্ষা নেন খোদা তোদের
হবিবের সাথে বাজি রেখে!
(১৪)
যত দিন তোরা নিজেরা মেষ,
ভীরু দুর্বল, অধীন দেশ, –
আল্লার রাহে ততটা দিন
দিয়ো নাকো পশু কোরবানি,
বিফল হবে রে সবখানি!
(তুই) পশু চেয়ে যে রে অধম হীন!
(১৫)
মনের পশুরে কর জবাই,
পশুরাও বাঁচে, বাঁচে সবাই।
কশাই-এর আবার কোরবানি! –
আমাদের নয়, তাদের ইদ,
বীর-সুত যারা হল শহিদ,
অমর যাদের বীরবাণী।
(১৬)
পশু কোরবানি দিস তখন
আজাদ মুক্ত হবি যখন
জুলুম-মুক্ত হবে রে দীন। –
কোরবানির আজ এই যে খুন
শিখা হয়ে যেন জ্বালে আগুন,
জালিমের যেন রাখে না চিন॥
আমিন রাব্বিল আলমিন!!
আমিন রাব্বিল আলমিন!!

রিক্তের বেদন
‘রিক্তের বেদন’ কাজী নজরুল ইসলামের রচিত একটি গল্পগ্রন্থ। এতে মোট ৮টি গল্প রয়েছে। গ্রন্থটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯২৪ খ্রিষ্টাব্দের ডিসেম্বর মাসে। প্রকাশক ওরিয়েণ্টল প্রিণ্টার্স এণ্ড পাবলিশার্স লিমিটেড; ২৬/৯/১-এ, হ্যারিসন রোড, কলিকাতা। পৃষ্ঠা সংখ্যা ৪+১৬০; মূল্য দেড় টাকা। প্রকাশকের পক্ষে কবি মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক ‘নিবেদন’-এ বলেন—
“রণকোলাহলের মত্ততার মাঝে জন্মেছিল তরুণ কবির ভাবরাজ্যের দ্যোতনা-করা এই উচ্ছ্বাস। মেসোপটেমিয়ার ধূলি ঝেড়ে আমার ন্যায় অযোগ্য ব্যক্তিকেই একে কোল দিতে হয়েছিল। আমার অযোগ্যতাই এতদিন কবির হৃদয়োচ্ছ্বাসকে চেপে রেখে সহৃদয় পাঠকবর্গের সহিত তার পরিচয়ের ব্যাঘাত জন্মিয়েছে। এতে কবি এবং তার পাঠকবর্গের প্রতি অন্যায়-অত্যাচারের জন্য আমি দায়ী। অদ্য প্রায়শ্চিত্ত করলাম।”
কলিকাতা,
বড়দিন, ১৯২৪।
‘রিক্তের বেদন’ গল্পটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৩২৭ বঙ্গাব্দের বৈশাখ মাসের ‘নূর’ পত্রিকায়।
‘বাউণ্ডেলের আত্মকাহিনী’ প্রথম প্রকাশিত হয় ১৩২৬ বঙ্গাব্দের জ্যৈষ্ঠের ‘সওগাত’ পত্রিকায়। এই গল্পটি কাজী নজরুল ইসলামের প্রথম প্রকাশিত রচনা।
‘মেহের নেগার’ প্রথম প্রকাশিত হয় ১৩২৬ বঙ্গাব্দের মাঘের ‘নূর’ পত্রিকায়।
‘সাঁঝের তারা’ প্রথম প্রকাশিত হয় ১৩২৭ বঙ্গাব্দের মাঘের ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য-পত্রিকা’য়।
‘রাক্ষুসী’ প্রথম প্রকাশিত হয় ১৩২৭ বঙ্গাব্দের মাঘের ‘সওগাত’ পত্রিকায়।
‘সালেক’ ১৩২৭ বঙ্গাব্দের আষাঢ়ের ‘বকুল’ পত্রিকায় ‘সালিক’ শিরোনামে প্রথম প্রকাশিত হয়।
‘স্বামীহারা’ ১৩২৬ বঙ্গাব্দের ভাদ্রের ‘সওগাত’ পত্রিকায় প্রথম প্রকাশিত হয়।
‘দুরন্ত পথিক’ দৈনিক ‘নবযুগ’ হতে ১৩২৭ বঙ্গাব্দের আশ্বিনের ‘মোসলেম ভারত’ পত্রিকায় সঙ্কলিত হয়েছিল।

নিবেদন
রণ কোলাহলের মত্ততার মাঝে জন্মেছিল, তরুণ কবির ভাবরাজ্যের দ্যোতনা-ভরা এই উদ্ভাস। মেসোপটেমিয়ার ধূলি ঝেড়ে আমার ন্যায় অযোগ্য ব্যক্তিকেই একে কোল দিতে হয়েছিল। আমার অযোগ্যতাই এতদিন কবির হৃদয়োচ্ছ্বাসকে চেপে রেখে সহৃদয় পাঠকবর্গের সহিত তার পরিচয়ের ব্যঘাত জন্মিয়েছে। এতে কবি ও তার পাঠকবর্গের প্রতি অন্যায়-অত্যাচারের জন্য আমি দায়ী। অদ্য প্রায়শ্চিত্ত করলাম।
কলিকাতা
বড়দিন, ১৯২৪মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক
দুরন্ত পথিক
[কথিকা]
সে চলিতেছিল দুর্গম কাঁটা-ভরা পথ দিয়ে। পথ চলিতে চলিতে সে একবার পিছন ফিরিয়া দেখিল, লক্ষ আঁখি অনিমিষে তাহার দিকে চাহিয়া আছে। সে-দৃষ্টিতে আশা-উন্মাদনার ভাস্বর জ্যোতি ঠিকরাইয়া পড়িতেছিল। তাহাই দুরন্ত পথিকের বক্ষ এক মাদকতা-ভরা গৌরবে ভরপুর করিয়া দিল। সে প্রাণ-ভরা তৃপ্তির হাসি হাসিয়া বলিল, ‘হাঁ ভাই! তোমাদের এমন শক্তি-ভরা দৃষ্টি পেলে কোথায়?’ অযুত আঁখির অযুত দীপ্ত চাউনি বলিয়া উঠিল,–‘ওগো সাহসী পথিক, এ দৃষ্টি পেয়েছি তোমারই চলার পথ চেয়ে!’ উহারই মধ্যে কাহারও স্নেহ-করুণ চাউনি বাণীতে ফুটিয়ে উঠিল,–‘হায়! এ দুর্গম পথে তরুণ পথিকের মৃত্যু যে অনিবার্য’ অমনি লক্ষ কণ্ঠের আর্ত ঝংকার গর্জন করিয়া উঠিল, ‘চোপরাও ভীরু! এই তো মানবাত্মার সত্য শাশ্বত পথ!’ পথিক দু-চোখ পুরিয়া এই কল্যাণ-দৃষ্টির শক্তি হরণ করিয়া লইল। তাহার সুপ্ত যত কিছু অন্তরের সত্য, এক অঙ্গুলি-পরশে সাধা বীণার ঝঞ্ঝনার মতো সাগ্রহে সাড়া দিয়ে উঠিল,–‘আগে চল।’ বনের সবুজ তাহার অবুঝ তারুণ্য দিয়া পথিকের প্রাণ ভরিয়া দিয়া বলিল–‘এই তোমায় যৌবনের রাজটিকা পরিয়ে দিলাম; তুমি চির-যৌবন, চির অমর হলে।’ দূরের আকাশ আনত হইয়া তাহার শিরশ্চুম্বন করিয়া গেল। দূরের দিগ্বলয় তাহাকে মুক্তির সীমারেখার আবছায়া দেখাইতে লাগিল। দুই পাশে তাহার বনের শাখী শাখার পতাকা দুলাইয়া তাহাকে অভিনন্দন করিতে লাগিল। স্বাধীন দেশের তোরণ-দ্বার পারাইয়া বোধন-বাঁশির অগ্নি-সুর হরিণের মত তাহাকে মুগ্ধ মাতাল করিয়া ডাক দিতেছিল। বাঁশির টানে মুক্তির পথ লক্ষ্য করিয়া সে ছুটিতে লাগিল।–‘ওগো কোথায় তোমার সিংহদ্বার? দ্বার খোলো, দ্বার খোলো,–আলো দেখাও, পথ দেখাও! … বিশ্বের কল্যাণের মন্ত্র তাহাকে ঘিরিয়া বলিল,–‘এখনও অনেক দেরি, পথ চলো!’ পথিক চমকিয়া উঠিয়া বলিল,—‘ওগো আমি যে তোমাকেই চাই!’ সে অচিন সাথি বলিয়া উঠিল,–‘আমাকে পেতে হলে ঐ সামনের বুলন্দ-দরওয়াজা পার হতে হয়!’ দুরন্ত পথিক তাহার চলায় দুর্বার বেগের গতি আনিয়া বলিল–‘হ্যাঁ ভাই, তাহাই আমার লক্ষ্য!’ দূরে বনের ফাঁকে মুক্ত গগন একবার চমকাইয়া গেল, পেছন হইতে নিযুত তরুণ কণ্ঠের বাণী শোর করিয়া বলিয়া উঠিল,–‘আমাদেরও লক্ষ্য ঐ, চলো ভাই, আগে চলো,–তোমারই পায়ে-চলা পথ ধরে আমরা চলেছি!’ পথিক আগে চলার গৌরবের তৃপ্তি তাহার কণ্ঠে ফুটাইয়া হাঁকিয়া উঠিল, ‘এ পথে যে মরণের ভয় আছে!’ বিক্ষুব্ধ তরুণ কন্ঠে প্রদীপ্ত আগুন যেন গর্জিয়া উঠিল,–‘কুছ পরওয়া নেই! ও তো মরণ নয়, ও যে জীবনের আরম্ভ!’ … অনেক পিছন পাঁজর-ভাঙা বৃদ্ধেরা মরণের ভয়ে কাঁপিয়া মরিতেছিল! তাহাদের স্কন্ধদেশে চড়িয়া একজন মুখ-চোখ ভ্যাঙচাইয়া বলিতেছিল,–‘এই দেখো মরণ! একটু দূরে চন্দন-কুণ্ডলী ধোঁয়া-ভরা আগুন জ্বালাইয়া বৃদ্ধের দৃষ্টি-চাহনি প্রতারিত করার চেষ্টা করা হইতেছিল! হাসি চাপিতে চাপিতে একজন ইহাদিগকে সম্মুখের ধুলায় আগুনের দিকে খেদাইয়া লইয়া যাইতে যাইতে বলিতেছিল,–‘ঐ তো সামনে তোমাদের নির্বাণ কুণ্ড; এ বৃদ্ধ বয়সে কেন বন্ধুর পথে ছুটতে গিয়ে প্রাণ হারাবে? ও দুরন্ত পথিকদল মোলো বলে।’ বৃদ্ধের দল দুই হাত উপরে উঠাইয়া বলিল,–‘হাঁ হুজুর, আলবত। তাহার আশে পাশে কাহার দুষ্ট কণ্ঠে বারে বারে সতর্ক করিতেছিল,–‘ওহে বেকুবদল, ভিক্ষায়াং নৈব নৈব চ। তোদের এরা নির্বাণ-কুণ্ডে পুড়িয়ে তিল তিল করে মারবে।’ তাদের রাখাল হাসি চাপিয়া বলিয়া উঠিল,–‘না না, ওদের কথা শুনো না। ওদের পথ ভীতি-সংকুল আর অনেক দূর, তাও আবার দুঃখ-কষ্ট-কাঁটা-পাথর-ভরা, তোমাদের মুক্তি ওই সামনে।’
দুরন্ত পথিক চলিয়াছিল, সেই মুক্ত দেশের উদ্বোধন-বাঁশির সুর ধরিয়া। … এইসব তাহার পথের বিভীষিকা জুলুম আরম্ভ করিল। পথিক দেখিল, ঐ পথ বাহিয়া যাওয়ার এক-আধটুকু অস্ফুট পদচিহ্ন এখনও যেন জাগিয়া রহিয়াছে। পথের বিভীষিকা তাহাদেরই মাথার খুলি এই নতুন পথিকের সামনে ধরিয়া বলিল,–‘এই দেখো এদের পরিণাম।’ সেই খুলি মাথায় করিয়া নতুন পথিক আর্তনাদ করিয়া উঠিল,–‘আহা, এরাই তো আমায় ডাক দিয়েছে! আমি এমনই পরিণাম চাই–আমার মৃত্যুতেই তো আমার শেষ নয়, আমার পশ্চাতে ওই যে তরুণ যাত্রীর দল, ওদের মাঝখানেই আমি বেঁচে থাকব!’ বিভীষিকা বললে,–‘তুমি কে?’ পথিক হেসে বললে,–‘আমি চিরন্তন মুক্তিকামী। এই যাদের খুলি পড়ে রয়েছে তারা কেউ মরেনি, আমার মাঝেই তারা নূতন শক্তি, নূতন জীবন, নূতন আলোক নিয়ে এসেছে। এ মুক্তের দল অমর!’ বিভীষিকা কাঁপিয়া উঠিয়া বলিল,–‘আমার চেন না? আমি শূঙ্খল। তুমি যাই বল, তোমাকে হত্যা করাই আমার ব্রত, মুক্তিতে বন্ধন দেওয়াই আমার লক্ষ্য। তোমাকে মরতে হবে!’ দুরন্ত পথিক দাঁড়াইয়া বলিল,–‘মারো,–বাঁধো,–কিন্তু আমাকে বাঁধতে পারবে না; আমার তো মৃত্যু নাই! আমি আবার আসব!’ বিভীষিকা পথ আগুলিয়া বলিল,–‘আমার যতক্ষণ শক্তি আছে, ততক্ষণ তুমি যত বারই আস তোমাকে বধ করব। শক্তি থাকে আমায় মার, নতুবা আমার মার সহ্য করতে হবে।’
অনেক দূরে মুক্ত দেশের অলিন্দে ঐ পথেরই বিগত শহীদেরা চিরতরুণ জ্যোর্তিময় দেহ লইয়া দাঁড়াইয়া তাহাকে আহ্বান করিতে লাগিল। পথিক বলিল,–‘কিন্তু এই জীবন দেওয়াটাই কী জীবনের সার্থকতা? মুক্ত বাতায়ন হইতে মুক্ত আত্মা স্নিগ্ধ-আর্দ্র কণ্ঠে কহিয়া উঠিল,–হাঁ ভাই! যুগ যুগ জীবন তো এই মৃত্যুরই বন্দনা গান গাইছে। সহস্র প্রাণের উদ্বোধনই তো তোমার মরণের সার্থকতা। নিজে মরিয়া জাগানোতেই তোমার মৃত্যু যে চিরজাগ্রত অমর!’ নবীন পথিক তাহার তরুণ বিশাল বক্ষ উন্মোচন করিয়া অগ্রে বাড়াইয়া দিয়া কহিল,–‘তবে চালাও খঞ্জর!’ পিছন হইতে তরুণ যাত্রীর দল দুরন্ত পথিকের প্রাণশূন্য দেহ মাথায় তুলিয়া কাঁদিয়া উঠিল–‘তুমি আবার এসো!’ অনেক দূরে দিগ্বলয়ের কোলে কাহাদের একতা-সংগীত ধ্বনিয়া উঠিতে লাগিল,–
‘দেশ দেশ নন্দিত করি মন্দ্রিত তব ভেরি,
আসিল যত বীরবৃন্দ আসন তব ঘেরি।’