Category: কাজী নজরুল ইসলাম

  • উৎসর্গ

    উৎসর্গ

    সুর-শিল্পী, বন্ধু

    দিলীপকুমার রায়

    করকমলেষু

    আমার শুধু এ বাণী হে বন্ধু, আমার শুধু এ গান।

    তুমি তারে দিলে রূপ-রঙ্গিমা, তুমি তারে দিলে প্রাণ।

    আমার ব্যথায় বেঁধেছিল নীড় যে গানের বুল্‌বুলি,

    আপনি আসিয়া আদরে তাহারে বক্ষে লইলে তুলি!

    আমার পাখির কণ্ঠে মিশালে তোমার দরদ লয়ে,

    আমার বেদনা বাজে আজ তাই সবার বেদনা হয়ে।

    যে গান গেয়েছি একাকী নিশীথে কুসুমের কানে কানে,

    ওগো গুণী, তুমি ছড়াইলে তারে সব বুকে, সবখানে।

    বুকে বুকে আজ পেয়েছে আশয় আমার নীড়ের পাখি,

    মুক্তপক্ষ উড়িতে যে চায়—কেন তারে বেঁধে রাখি?

    তোমার কাননে উড়ে গেল মোর বাগিচার বুল্‌বুলি,

    বড় ভীরু সে যে, দোস্ত, তাহারে দস্তে লইও তুলি!

    কলিকাতা,
    ১৫ আশ্বিন, ১৩৩৫
    তোমার প্রতিভা ও প্রাণমুগ্ধ
    নজরুল
  • বাগিচায় বুলবুলি তুই

    বাগিচায় বুলবুলি তুই

    ভৈরবী—কাহারবা

    বাগিচায়
    বুলবুলি তুই ফুলশাখাতে
    দিসনে আজি দোল।
    আজও তার
    ফুলকলিদের ঘুম টুটেনি
    তন্দ্রাতে বিলোল॥
    আজও হায়
    রিক্ত শাখায় উত্তরী-বায়
    ঝুরছে নিশিদিন,
    আসেনি
    দখ্‌নে হাওয়া গজল্-গাওয়া
    মৌমাছি বিভোল॥
    করে সে
    ফুলকুমারী ঘোমটা চিরি
    আসবে বাহিরে,
    শিশিরের
    স্পর্শ সুখে ভাঙবে রে ঘুম
    রাঙবে রে কপোল॥
    ফাগুনের
    মুকুল-জাগা দুকূল-ভাঙা
    আসবে ফুলের বান,
    কুঁড়িদের
    ওষ্ঠপুটে লুটবে হাসি,
    ফুটবে গালে টোল॥
    কবি তুই
    গন্ধে ভুলে ডুবলি জলে
    কূল পেলিনে আর,
    ফুলে তোর
    বুকে ভরেছিস আজকে জলে
    ভরবে আঁখির কোল॥
  • আমারে চোখ-ইশারায়

    আমারে চোখ-ইশারায়

    জৌনপুরী-আশাবরী—কাহারবা

    আমারে
    চোখ-ইশারায় ডাক দিলে হায় কে গো দরদী।
    খুলে দাও
    রং-মহলার তিমির-দুয়ার ডাকিলে যদি॥
    গোপনে
    চৈতি হাওয়ায় গুল-বাগিচায় পাঠালে লিপি,
    দেখে তাই
    ডাকছে ডালে কূ কূ বলে কোয়েলা ননদী॥
    পাঠালে
    ঘূর্ণি-দূতী ঝড়-কপোতী বৈশাখে সখী,
    বরষায়
    সেই ভরসায় মোর পানে চায় জল-ভরা নদী॥
    তোমারই
    অশ্রু ঝলে শিউলি-তলে সিক্ত শরতে,
    হিমানীর
    পরশ বুলাও ঘুম ভেঙে দাও দ্বার যদি রোধি॥
    পউষের
    শূন্য মাঠে একলা বাটে চাও বিরহিণী,
    দুহুঁ হায়
    চাই বিষাদে মধ্যে কাঁদে তৃষ্ণা-জলধি॥
    ভিড়ে যা
    ভোর-বাতাসে ফুল-সুবাসে রে ভোমর-কবি,
    উষসীর
    শিশ্‌মহলে আসতে যদি চাস নিরবধি॥
  • বসিয়া বিজনে কেন একা মনে

    বসিয়া বিজনে কেন একা মনে

    ইমন-মিশ্র গজল—কাহারবা

    বসিয়া বিজনে
    কেন একা মনে
    পানিয়া ভরণে
    চল লো গোরী।
    চল জলে চল
    কাঁদে বনতল,
    ডাকে ছলছল
    জল-লহরী॥
    দিবা চলে যায়
    বলাকা-পাখায়,
    বিহগের বুকে
    বিহগী লুকায়!
    কেঁদে চখাচখি
    মাগিছে বিদায়
    বারোয়াঁর সুরে
    ঝুরে বাঁশরি॥
    সাঁঝ হেরে মুখ
    চাঁদ-মুকুরে
    ছায়াপথ-সিঁথি
    রচি চিকুরে,
    নাচে ছায়ানটী
    কানন পুরে
    দুলে লটপট
    লতা-কবরী॥
    ‘বেলা গেল বধূ’
    ডাকে ননদী
    চল জল নিতে
    যাবি লো যদি,
    কালো হয়ে আসে
    সুদূর নদী,
    নাগরিকা-সাজে
    সাজে নগরী॥
    মাঝি বাঁধে তরী
    সিনান-ঘাটে,
    ফিরিছে পথিক
    বিজন মাঠে,
    কারে ভেবে বেলা
    কাঁদিয়া কাটে
    ভর আখিঁ-জলে
    ঘট গাগরী॥
    ওগো বে-দরদী,
    ও রাঙা পায়ে
    মালা হয়ে কে গো
    গেল জড়ায়ে!
    তব সাথে কবি
    পড়িল দায়ে
    পায়ে রাখি তারে
    না গলে পরি॥
  • ভুলি কেমনে আজও যে মনে

    ভুলি কেমনে আজও যে মনে

    পিলু—কাহারবা-দাদরা

    ভুলি কেমনে
    আজও যে মনে
     
    বেদনা-সনে রহিল আঁকা।
    আজও সজনি
    দিন রজনি
     
    সে বিনে গণি তেমনই ফাঁকা॥
    আগে মন
    করলে চুরি,
     
    মর্মে শেষে হানলে ছুরি,
    এত শঠতা
    এত যে ব্যথা
     
    তবু যেন তা মধুতে মাখা॥
    চকোরী
    দেখলে চাঁদে
     
    দূর হতে সই আজও কাঁদে,
    আজও বাদলে
    ঝুলন ঝোলে
     
    তেমনই জলে চলে বলাকা॥
    বকুলের
    তলায় দোদুল
     
    কাজলা মেয়ে কুড়োয় লো ফুল
    চলে নাগরী
    কাঁধে গাগরি
     
    চরণ ভারী কোমর বাঁকা॥
    তরুরা
    রিক্ত পাতা
     
    আসল লো তাই ফুল-বারতা,
    ফুলেরা গলে
    ঝরেছে বলে
     
    ভরেছে ফলে বিটপী-শাখা॥
    ডালে তোর
    হানলে আঘাত
     
    দিস রে কবি ফুল-সওগাত
    ব্যথা-মুকুলে
    অলি না ছুঁলে
     
    বনে কি দুলে ফুল-পতাকা॥
  • কেন কাঁদে পরান

    কেন কাঁদে পরান

    মিশ্র বেহাগ-খাম্বাজ — দাদরা

    কেন
    কাঁদে পরান কী বেদনায় কারে কহি
    সদা
    কাঁপে ভীরু হিয়া রহি রহি॥

    সে থাকে নীল নভে আমি নয়ন-জল-সায়রে,

    সাতাশ তারার সতিন-সাথে সে যে ঘুরে মরে,

    কেমনে ধরি সে চাঁদে রাহু নহি॥

    কাজল করি যারে রাখি গো আঁখি-পাতে,

    স্বপনে যায় সে ধুয়ে গোপন অশ্রু সাথে।

    বুকে তায় মালা করি রাখিলে যায় সে চুরি,

    বাঁধিলে বলয়-সাথে মলয়ায় যায় সে উড়ি,

    কী দিয়ে সে উদাসীর মন মোহি॥

  • মৃদুল বায়ে বকুল ছায়ে

    মৃদুল বায়ে বকুল ছায়ে

    সিন্ধু-ভৈরবী—কাহারবা

    মৃদুল বায়ে বকুল ছায়ে

    গোপন পায়ে কে ওই আসে।

    আকাশ-ছাওয়া চোখের চাওয়া

    উতল হাওয়া কেশের বাসে॥

    উষার রাগে সাঁঝের ফাগে

    যুগল তাহার কপোল রাঙে,

    কমল দুলে সূরয শশী

    নিশীথ-চুলে আঁধার-রাশে॥

    চরণ-ছোঁয়ায় পাতার ঠোঁটে

    মুকুল কাঁপে কুসুম ফোটে,

    আঁখির পলক- পতন-ছাঁদে

    নিশীথ কাঁদে দিবস হাসে॥

    গ্রহের মালা অলখ-খোঁপায়,

    কপোল শোভে তারার টোপায়,

    কুসুম-কাঁটায় আঁচল বাধে

    রুমাল লুটায় সবুজ ঘাসে॥

    সাঁঝের শাখায় কানন মাঝে

    বালার বিহগ- কাঁকন বাজে,

    জীবন তাহার সোনার স্বপন

    দোলায় ঘুমায় শিশুর পাশে॥

    তোমার লীলা- কমল করে

    নিখিল-রানি! দুলাও মোরে।

    ঢুলাও আমার সুবাসখানি

    তোমার মুখের মদির-শ্বাসে॥

  • কে বিদেশি মন-উদাসী

    কে বিদেশি মন-উদাসী

    ভৈরবী-আশাবরী — কাহারবা

    কে বিদেশি মন-উদাসী

    বাঁশির বাঁশি বাজাও বনে।

    সুর-সোহাগে তন্দ্রা লাগে

    কুসুম-বাগের গুল্-বদনে॥

    ঝিমিয়ে আসে ভোমরা-পাখা,

    যূথীর চোখে আবেশ মাখা,

    কাতর ঘুমে চাঁদিমা রাকা

    (ভোর গগনের দর-দালানে)

    দর-দালানে ভোর গগনে॥

    লজ্জাবতীর লুলিত লতায়

    শিহর লাগে পুলক-ব্যথায়,

    মালিকা সম বঁধুরে জড়ায়

    বালিকা-বধূ সুখ-স্বপনে॥

    সহসা জাগি আধেক রাতে

    শুনি সে বাঁশি বাজে হিয়াতে,

    বাহু-শিথানে কেন কে জানে

    কাঁদে গো পিয়া বাঁশির সনে॥

    বৃথাই গাঁথি কথার মালা

    লুকাস কবি বুকের জ্বালা,

    কাঁদে নিরালা বনশিওয়ালা

    তোরই উতলা বিরহী মনে॥

  • করুণ কেন অরুণ আঁখি

    করুণ কেন অরুণ আঁখি

    সিন্ধু—কাওয়ালি

    করুণ কেন অরুণ আঁখি

    দাও গো সাকি দাও শারাব।

    হায় সাকি এ আঙ্গুরি খুন,

    নয় ও হিয়ার খুন-খারাব॥

    দুর্দিনের এই দারুণ দিনে

    শরণ নিলাম পানশালায়,

    হায় শাহারার প্রখর তাপে

    পরান কাঁপে দিল্-কাবাব॥

    আর সহে না দিল্ নিয়ে এই

    দিল্-দরদির দিল্‌লগি

    তাই তো চালাই নীল পিয়ালায়

    লাল শিরাজি বে-হিসাব॥

    এই শারাবের নেশার রঙে

    নয়ন-জলের রং লুকাই,

    দেখছি আঁধার জীবন ভরি

    ভর-পিয়ালার লাল খোয়াব॥

    আমার বুকের শূন্যে কে গো

    ব্যথার তারে ছড় চালায়,

    গাইছি খুশির মহ্‌ফিলে গান

    বেদন-গুণীর বীণ-রবাব॥

    হারাম কি এই রঙিন পানি,

    আর হালাল এই জল চোখের?

    নরক আমার হউক মঞ্জুর,

    বিদায় বন্ধু, লও আদাব॥

    দেখ রে কবি, প্রিয়ার ছবি

    এই শারাবের আরশিতে,

    লাল গেলাসের কাচ-মহলার

    পার হতে তার শোন জওয়াব॥

  • এত জল ও-কাজল-চোখে

    এত জল ও-কাজল-চোখে

    মান্দ্—কাওয়ালি

    এত জল ও-কাজল-চোখে

    পাষাণী, আনলে বল কে।

    টলমল জল-মোতির মালা

    দুলিছে ঝালর-পলকে॥

    দিল কি পুব্-হাওয়াতে দোল,

    বুকে কি বিঁধিল কেয়া?

    কাঁদিয়া কুটিলে গগন

    এলায়ে ঝামর-অলকে॥

    চলিতে পৈচি কি হাতের

    বাধিল বৈঁচি-কাঁটাতে?

    ছাড়াতে কাঁচুলির কাঁটা

    বিঁধিল হিয়ার ফলকে॥

    যে দিনে মোর দেওয়া মালা

    ছিঁড়িলে আনমনে সখী,

    জড়াল জুঁই-কুসুমি-হার

    বেণিতে সেদিন ও লো কে॥

    যে-পথে নীর ভরণে যাও

    বসে রই সেই পথ-পাশে,

    দেখি, নিত্ কার পানে চাহি

    কলসির সলিল ছলকে॥

    মুকুলি মন সেধে সেধে

    কেবলই ফিরিনু কেঁদে

    সরসীর ঢেউ পলায় ছুটি

    না ছুঁতেই নলিন-নোলকে॥

    বুকে তোর সাত সাগরের জল,

    পিপাসা মিট্‌ল না কবি,

    ফটিক-জল! জল খুঁজিস যেথায়

    কেবলই তড়িৎ ঝলকে॥

  • আসে বসন্ত ফুলবনে

    আসে বসন্ত ফুলবনে

    ১০

    ভীমপলশ্রী—দাদরা

    আসে বসন্ত ফুলবনে

    সাজে বনভূমি সুন্দরী।

    চরণে পায়েলা রুমুঝুমু

    মধুপ উঠিছে গুঞ্জরি॥

    ফুলরেণু-মাখা দখিনা বায়

    বাতাস করিছে বনবালায়,

    বনকরবী-নিকুঞ্জছায়

    মুকুলিকা ওঠে মুঞ্জরি॥

    কুহু আজি ডাকে মুহুমুহু,

    ‘পিউ কাঁহা’ কাঁদে উহু উহু

    পাখায় পাখায় দোঁহে দুহুঁ

    বাঁধে চঞ্চর-চঞ্চরী॥

    দুলে আলোছায়া বন-দু-কূল,

    ওড়ে প্রজাপতি কলকা ফুল,

    কর্ণে অতসী স্বর্ণদুল

    আলোকলতার সাতনরী॥

    পদ্ম ডালিয়া পায়ে বালা

    করিয়াছে সারা বন আলা,

    দ্বারে মঞ্জরী-দীপ জ্বালা,

    ডালপালা রচে ফুলছড়ি॥

    কবি, তোর ফুলমালি কেমন,

    ফাগুনে শূন্য পুষ্পবন,

    বরিবি বঁধুরে এলে কানন

    রিক্ত হাতে কি ভুল ভরি॥

  • দুরন্ত বায়ু পুরবৈয়াঁ

    দুরন্ত বায়ু পুরবৈয়াঁ

    ১১

    কাফি-সিন্ধু — কাহারবা

    দুরন্ত বায়ু পুরবৈয়াঁ

    বহে অধীর আনন্দে।

    তরঙ্গে দুলে আজি নাইয়া

    রণ-তুরঙ্গ-ছন্দে॥

    অশান্ত অম্বর-মাঝে

    মৃদঙ্গ গুরুগুরু বাজে,

    আতঙ্কে থরথর অঙ্গ

    মন অনন্তে বন্দে॥

    ভুজঙ্গী দামিনীর দাহে

    দিগন্ত শিহরিয়া চাহে,

    বিষণ্ণ-ভয়-ভীতা যামিনী

    খোঁজে সে তারা চন্দে॥

    মালঞ্চে এ কী ফুল-খেলা

    আনন্দ ফোটে যূথী-বেলা,

    কুরঙ্গী নাচে শিখী-সঙ্গে

    মাতি কদম্ব-গন্ধে॥

    একান্তে তরুণী তমালী

    অপাঙ্গে মাখে আজি কালি,

    বনান্তে বাঁধা পল দেয়া

    কেয়া-বেণীর বন্ধে॥

    দিনান্তে বসি কবি একা

    পড়িস কি জলধারা-লেখা,

    হিয়ায় কি কাঁদে কুহু-কেকা

    আজি অশান্ত দ্বন্দ্বে॥

  • চেয়ো না সুনয়না

    চেয়ো না সুনয়না

    ১২

    বাগেশ্রী-পিলু—কাহারবা

    চেয়ো না সুনয়না

    আর চেয়ো না এ নয়ন পানে।

    জানিতে নাইকো বাকি

    সই ও আঁখি কী জাদু জানে॥

    একে ওই চাউনি বাঁকা

    সুরমা-আঁকা, তায় ডাগর আঁখি।

    বধিতে তায় কেন সাধ

    যে মরেছে ওই আঁখি-বাণে॥

    কাননে হরিণ কাঁদে,

    সলিল-ফাঁদে ঝুরছে শফরী,

    বাঁকায়ে ভুরুর ধনু

    ফুল-অতনু কুসুম-শর হানে॥

    কুণাল কি পড়ল ধরা

    পীযূষ-ভরা ওই চাঁদ মুখে,

    কাঁদিছে নার্গিসের ফুল

    লাল কপোলের কমল-বাগানে॥

    জ্বলিছে দিবস রাতি

    মোমের বাতি রূপের দেওয়ালি,

    নিশিদিন তাই কি জ্বলি

    পড়ছ গলি অঝোর নয়ানে॥

    মিছে তুই কথার কাঁটায়

    সুর বিঁধে হায় হার গাঁথিস কবি,

    বিকিয়ে যায় রে মালা

    আয় নিরালা আঁখির দোকানে॥

  • পরান-প্রিয়! কেন এলে অবেলায়

    পরান-প্রিয়! কেন এলে অবেলায়

    ১৩

    পিলু — দাদারা

    পরান-প্রিয়! কেন এলে অবেলায়।

    শীতল হিমেল বায়ে ফুল ঝরে যায়॥

    সেদিনও সকাল বেলা

    খেলেছি কুসুম-খেলা,

    আজি যে কাঁদি একেলা

    এ ভাঙা মেলায়,

    কেন এলে অবেলায়॥

    ক্লান্ত দিবস দূরে

    কাঁদিছে পিলুর সুরে,

    কেন শত পথ ঘুরে

    আসিলে হেথায়॥

  • সখী জাগো, রজনী পোহায়

    সখী জাগো, রজনী পোহায়

    ১৪

    ভৈরবী—যৎ

    সখী জাগো, রজনী পোহায়।

    মলিন কামিনী-ফুল যামিনী-গলায়॥

    চলিছে বধূ সিনানে

    বসন না বশ মানে,

    শিথিল আঁচল টানে

    পথের কাঁটায়॥

  • নিশি ভোর হল জাগিয়া

    নিশি ভোর হল জাগিয়া

    ১৫

    ভৈরবী — কাহারবা

    নিশি ভোর হল জাগিয়া

    পরান-পিয়া।

    কাঁদে ‘পিউ কাঁহা’ পাপিয়া

    পরান-পিয়া॥

    ভুলি বুলবুলি-সোহাগে

    কত গুলবদনী জাগে,

    রাতি গুলশনে যাপিয়া

    পরান-পিয়া॥

    জেগে রয় জাগার সাথী

    দূরে চাঁদ, শিয়রে বাতি,

    কাঁদি ফুল-শয়ন পাতিয়া,

    পরান-পিয়া॥

    কত আর সাজাব ডালা,

    বাসি হয় নিতি যে মালা,

    কত দূর যাব ভাসিয়া,

    পরান-পিয়া

    গেয়ে গান চেয়ে কাহারে

    জেগে রস কবি এপারে

    দিলি দান কারে এ হিয়া,

    পরান-পিয়া॥

  • এ বাসি বাসরে আসিলে

    এ বাসি বাসরে আসিলে

    ১৬

    বৃন্দাবনী সারঙ—মিশ্র দাদরা

    এ বাসি বাসরে আসিলে কে গো ছলিতে।

    কেন পুন বাঁশি বাজালে কাফি-ললিতে॥

    নিশীথ গভীরে

    কেন আঁখি-নীরে

    এলে ফিরে ফিরে

    গোপনকথা বলিতে॥

    দলিত কুসুম-দলে রচিয়াছি শয়ন

    অন্ধ তিমির রাতি, নিবু-নিবু নয়ন!

    মরণ-বেলায় প্রিয়

    আনিলে কি অমিয়

    এলে কি গো নিঠুর

    ঝরা ফুল দলিতে॥

  • বসিয়া নদীকূলে

    বসিয়া নদীকূলে

    ১৭

    কালাংড়া — কাওয়ালি

    বসিয়া নদীকূলে এলোচুলে

    কে উদাসিনী।

    কে এলে পথ ভুলে

    এ অকূলে বন-হরিণী॥

    কলসে জল ভরিয়া চায়

    করুণায় কুলবধূরা

    কেঁদে যায় ফুলে ফুলে

    পদমূলে সাঁঝ-তটিনী॥

    নিশিদিন চাহি তোমারে

    ওপারে বাজিছে বাঁশি,

    এপারে বাজে বধূর মল—

    নূপুর মধু-ভাষিণী॥

    আকাশে মেলিয়া আঁখি

    লেখা কি পড়িছ পিয়ার,

    কে গো সে রূপ-কুমার

    তুমি গো যার অনুরাগিণী॥

    দলিয়া কত ভাঙা মন

    ও চরণ করেছ রাঙা,

    কাঁদায়ে কত না দিল্

    এলে নিখিল-মনোমোহিনী॥

    হারালি গোধূলি-লগন

    কবি, কোন্ নদী-কিনারে,

    এ কি সেই স্বপন-চাঁদ

    পেতেছে ফাঁদ প্রিয়ার সতিনী॥

  • কেন দিলে এ কাঁটা

    কেন দিলে এ কাঁটা

    ১৮

    বেহাগ—দাদরা

    কেন দিলে এ কাঁটা

    যদি গো কুসুম দিলে

    ফুটিত না কি কমল

    ও কাঁটা না বিঁধিলে॥

    কেন এ আঁখি-কূলে

    বিধুর অশ্রু দুলে,

    কেন দিলে এ হৃদি

    যদি না হৃদয় মিলে॥

    শীতল মেঘ-নীরে

    ডাকিয়া চাতকীরে

    নীর ঢালিতে শিরে

    বাজ কেন হানিলে॥

    যদি ফুটালে মুকুল

    কেন শুকাইলে ফুল,

    কেন কলঙ্ক-টিপে

    চাঁদের ভুরু ভাঙিলে॥

    কেন-কামনা-ফাঁদে

    রূপ-পিপাসা কাঁদে,

    শোভিত না কি কপোল

    ও কালো তিল নহিলে॥

    কাঁটা-নিকুঞ্জে কবি

    এঁকে যা সুখের ছবি,

    নিজে তুই গোপন রবি,

    তোরই আঁখির সলিলে॥

  • সখী, বোলো-বঁধূয়ারে

    সখী, বোলো-বঁধূয়ারে

    ১৯

    বিহারী খাম্বাজ মিশ্র—দাদরা

    সখী, বোলো-বঁধূয়ারে নিরজনে

    দেখা হলে রাতে ফুলবনে॥

    কে করে ফুল চুরি জেনেছে ফুলমালি,

    কে দেয় গহীন রাতে ফুলের কুলে কালি

    জেনেছে ফুলমালি গোপনে॥

    কাঁটার আড়ালে গোলাবের বাগে

    ফুটায়েছে কুসুম কপট সোহাগে,

    সে কুসুম-ঘেরা মেহেদির বেড়া,

    প্রহরী ভোমোরা সে কাননে॥

    ও পথে চোর-কাঁটা, সখী, তায় বলে দিয়ো,

    বেঁধে না বেঁধে না লো যেন তার উত্তরীয়!

    এ বনফুল লাগি না আসে কাঁটা দলি,

    আপনি যাব আমি বঁধুয়ার কুঞ্জ-গলি!

    বিকাব বিনিমূলে ও-চরণে॥