Author: সুকান্ত ভট্টাচার্য

  • সিপাহী বিদ্রোহ

    সিপাহী বিদ্রোহ

    সিপাহী বিদ্রোহ

    হঠাৎ দেশে উঠল আওয়াজ— “হো-হো, হো-হো, হো-হো”

    চমকে সবাই তাকিয়ে দেখে— সিপাহী বিদ্রোহ!

    আগুন হয়ে সারাটা দেশ ফেটে পড়ল রাগে,

    ছেলে বুড়ো জেগে উঠল নব্বই সন আগে :

    একশো বছর গোলামিতে সবাই তখন ক্ষিপ্ত,

    বিদেশীদের রক্ত পেলে তবেই হবে তৃপ্ত!

    নানাসাহেব, তাঁতিয়াটোপি, ঝাঁসীর রাণী লক্ষ্মী—

    সবার হাতে অস্ত্র, নাচে বনের পশু-পক্ষী।

    কেবল ধনী, জমিদার, আর আগের রাজার ভক্ত

    যোগ দিল, তা নয়কো, দিল গরীবেরাও রক্ত!

    সবাই জীবন তুচ্ছ করে, মুসলমান ও হিন্দু,

    সবাই দিতে রাজি তাদের প্রতি রক্তবিন্দু;

    ইতিহাসের পাতায় তোমরা পড় কেবল মিথ্যে,

    বিদেশীরা ভুল বোঝাতে চায় তোমাদের চিত্তে।

    অত্যাচারী নয়কো তারা, অত্যাচারীর মুণ্ডু

    চেয়েছিল ফেলতে ছিঁড়ে জ্বালিয়ে অগ্নিকুণ্ডু।

    নানা জাতের নানান সেপাই গরীব এবং মূর্খ :

    সবাই তারা বুঝেছিল অধীনতার দুঃখ;

    তাইতো তারা স্বাধীনতার প্রথম লড়াই লড়তে

    এগিয়েছিল, এগিয়েছিল মরণ বরণ করতে!

    আজকে যখন স্বাধীন হবার শেষ লড়াইয়ের ডঙ্কা

    উঠেছে বেজে, কোনোদিকেই নেইকো কোনো শঙ্কা;

    জব্বলপুরে সেপাইদেরও উঠছে বেজে বাদ্য

    নতুন ক’রে বিদ্রোহ আজ, কেউ নয়কো বাধ্য,

    তখন এঁদের স্মরণ করো, স্মরণ করো নিত্য—

    এঁদের নামে, এঁদের পণে শানিয়ে তোলো চিত্ত।

    নানাসাহেব, তাঁতিয়াটোপি, ঝাঁসীর রাণী লক্ষ্মী,

    এঁদের নামে, দৃপ্ত কিশোর, খুলবে তোমার চোখ কি?

  • আজব লড়াই

    আজব লড়াই

    আজব লড়াই

    ফেব্রারী মাসে ভাই, কলকাতা শহরে

    ঘটল ঘটনা এক, লম্বা সে বহরে!

    লড়াই লড়াই খেলা শুরু হল আমাদের,

    কেউ রইল না ঘরে রামাদের শ্যামাদের;

    রাস্তার কোণে কোণে জড়ো হল সকলে,

    তফাৎ রইল নাকো আসলে ও নকলে,

    শুধু শুনি ‘ধর’ ‘ধর’ ‘মার’ ‘মার’ শব্দ

    যেন খাঁটি যুদ্ধ এ মিলিটারী জব্দ।

    বড়রা কাঁদুনে গ্যাসে কাঁদে, চোখ ছল ছল

    হাসে ছিঁচকাঁদুনেরা বলে, ‘সব ঢাল জল’।

    ঐ বুঝি ওরা সব সঙ্গীন উঁচোলো,

    ভয় নেই, যত হোক বেয়নেট ছুঁচোলো,

    ইট-পাটকেল দেখি রাখে এরা তৈরি,

    এইবার যাবে কোথা বাছাধন বৈরী!

    ভাবো বুঝি ছোট ছেলে, একেবারে বাচ্চা!

    এদের হাতেই পাবে শিক্ষাটা আচ্ছা;

    ঢিল খাও, তাড়া খাও, পেট ভরে কলা খাও,

    গালাগালি খাও আর খাও কানমলা খাও।

    জালে ঢাকা গাড়ি চড়ে বীরত্ব কি যে এর

    বুঝবে কে, হরদম সামলায় নিজেদের।

    বার্মা-পালানো সব বীর এরা বঙ্গে

    যুদ্ধ করছে ছোট ছেলেদের সঙ্গে;

    ঢিলের ভয়েতে ওরা চালায় মেশিনগান,

    “বিশ্ববিজয়ী” তাই রাখে জান, বাঁচে মান।

    খালি হাত ছেলেদের তেড়ে গিয়ে করে খুন;

    সাবাস! সাবাস! ওরা খেয়েছে রাজার নুন।

    ডাংগুলি খেলা নয়, গুলির সঙ্গে খেলা,

    রক্ত-রাঙানো পথে দু’পাশে ছেলের মেলা;

    দুর্দম খেলা চলে, নিষেধে কে কান দেয়?

    ও-বাড়ি ও ও-পাড়ার কালো, ছোটু প্রাণ দেয়।

    স্বচক্ষে দেখলাম বস্তির আলী জান,

    ‘আংরেজ চলা যাও’ বলে ভাই দিল প্রাণ।

    এমন বিরাট খেলা শেষ হল চটপট

    বড়দের বোকামিতে আজো প্রাণ ছটফট;

    এইবারে আমি ভাই হেরে গেছি খেলাতে,

    ফিরে গেছি দাদাদের বকুনির ঠেলাতে;

    পরের বারেতে ভাই শুনব না কারো মানা,

    দেবই, দেবই আমি নিজের জীবনখানা ॥

  • অভিযান

    অভিযান

    অভিযান

    খুব অল্প পরিসরে হলেও ‘সুকান্ত ভট্টাচার্য’ তাঁর বহুমুখী প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে গেছেন। কবিতা, গীতি, গল্প ও নাটিকা তাঁর প্রতিভার প্রমাণ রয়েছে। তবে কবিতার সংখ্যা কম হলেও গুণে ও মানে প্রতিভার যে বিস্ময়কর স্ফুরণ ঘটেছে সে জন্য আর সব খ্যাতিকে ছাড়িয়ে সুকান্ত কবি হিসেবেই সুখ্যাতি অর্জন করেছেন।

    ‘অভিযান’ বহুমুখী প্রতিভার সমাজ সচেতন কবি ‘সুকান্ত ভট্টাচার্যে’র একটি গীতিনাট্য। এই গ্রন্থ তিনি কবিতা ও গানের মাধ্যমে প্রতিবাদ ও অধিকার আদায়ের চিত্র এঁকেছেন। চরিত্রসমূহের সংলাপ, ঝগড়া-বিবাদ, চরিত্রের প্রকাশ এবং শেষে কাঙ্ক্ষিত ফলাফল— সব কিছুই কাব্যিক।

    ‘কালের যাত্রা’ নাটিকায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছেন— ‘যারা এতদিন মরেছিল, তারা উঠুক বেঁচে, যারা যুগে যুগে ছিল খাট হয়ে তারা দাঁড়াক একবার মাথা তুলে।’ সুকান্ত যেন প্রাণ ভরে রবীন্দ্রনাথের কথা শুনেছেন। রবীন্দ্রনাথের ‘রক্ত করবী’তে রাজা-প্রজার কথা আছে, ধনদৌলতের কথা আছে, শোষণ-বঞ্চণার কথা আছে। সুকান্তের ‘অভিযানে’ও আছে মহারাজ, আছে কোতোয়াল, আছে শোষণ, ক্ষুধা আর বঞ্চনার জ্বালা। অভিযানের ‘সঙ্কলিতা’ আর রক্ত করবীর নন্দিনীর চরিত্র হুবহু এক নয়, কিন্তু আছে লক্ষ্যণীয় কিছু ব্যাপার। কালের যাত্রার সাথেও আছে অভিযানের খানিক মিল। কালের যাত্রায় আছে,— ‘আমরাই তো যোগাচ্ছি অন্ন তাই খেয়ে তোমরা বেঁচে আছ, আমরাই বুনেছি বস্ত্র, তাতেই তোমাদের লজ্জা রক্ষা!’ অথবা ‘দরিদ্রের রক্ত করে শোষণ বিরাট অহঙ্কারকে কর পোষণ’…।

    অভিযানের শেষ সংলাপ হল—

    ‘চলবে না অন্যায়, খাটবে না ফন্দি,

    আমাদের আদালতে আজ তুই বন্দী!’

    যুগ যুগ ধরে সমাজে যে শোষণ চলে এসেছে তার চির অবসানের আন্দোলন ও বিপ্লবের জন্য চাই সমাজ সচেতন কর্মী বাহিনী। তারা ধাপে ধাপে এগিয়ে যাবে, ছিনিয়ে আনবে চূড়ান্ত বিজয়। সুকান্ত ভট্টাচার্য এই কথাটাই ভাল করে ফুটিয়ে তুলেছেন অভিযানে।

    অভিযান সাম্যবাদী প্রচারণার মোক্ষম হাতিয়ার নয়; ক্ষুধা ঘুচানোর অভিযান। এ অভিযান সমাপ্ত হলে অসহায় নারী-শিশু আর ক্ষুধায় কাতর হবে না, কাঁদবে না। অন্ধকারের চির অবসান হবে। এই জন্য চাই তাত্ত্বিক জ্ঞানে স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং ব্যাবহারিক দিকে পারঙ্গম জ্ঞানী ক্যাডার। যারা শাসকের রক্তচক্ষু, কোতোয়াল ও চরকে ভয় পাবে না, নির্ভয়ে এগিয়ে যাবে। প্রয়োজনে জীবন বাজী রাখবে। অভিযানে কোতোয়ালকে লক্ষ্য করে সঙ্কলিতার উক্তি—

    ‘তোমরা দেখাও শুধু শক্তি

    তাই তো করে না কেউ ভক্তি,

    কর না প্রজার কোন কল্যাণ,

    তোমরা অন্ধ আর জ্ঞান।’

    ‘চিরদিন তরুণেরা অন্যায়ের করে নিবারণ।’ তাই সত্যকাম কোতোয়ালকে বলতে পেরেছে—

    ‘তোমার মত দুর্জনকে করতে হলে ভয়।

    পৃথিবীতে বেঁচে থাকা মোটেই উচিত নয়।’

    ইন্দ্রসেন বলছে, তলোয়ারের ভয় দেখিয়ে কোন লাভ নেই। এভাবে চিরকাল শাসন করা যাবে না। শোষকের দিন আজ গত। সঙ্কলিতা তাই আর্তনাদ করে বলছে—

    ‘দরিদ্রের রক্ত করে শোষণ

    বিরাট অহঙ্কারকে কর পোষণ,

    তুমি পশু, পাষণ্ড, বর্বর

    অত্যাচারী, তোমার ও হাত কাঁপে না থরথর?’

    এরপর যা হবার তাই হল; সঙ্কলিতার প্রাণ গেল দেশপ্রেমিক বলে। কিন্তু এতে কী মুক্তিযুদ্ধ থেমে থাকে? হাত দিয়ে যেমনি সূর্যের আলোকে রোখা যায় না, থামানো যায় না। গণজোয়ারের ঢেউ, সত্যের জন্য অবশ্যম্ভাবী। পৃথিবীতে একদিন সত্যের জয়পতাকা উড়বেই।

    ‘চলবে না অন্যায় খাটবে না ফন্দি,

    আমাদের আদালতে আজ তুই বন্দী।’

    সেদিন আর বেশি দূরে নয়, যেদিন জনতার আদালতে সকল অপরাধীর বিচার হবে। বিচার হবে বিচারপতির, যিনি শাসকের স্বার্থে অন্যায় ও অবৈধ রায় প্রদান করেছেন। জনতার আদালত হবে বড় কঠিন ও নির্মম এক নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান। ‘সূর্যপ্রণামে’র সমবেত গান ‘আহ্বানে’ কবি বলেছেন—

    ‘আমাদের ডাক এসেছে

    এবার পথে চলতে হবে,

    ডাক দিয়েছে গগণ-রবি

    ঘরের কোণে কেই বা রবে।

    ডাক এসেছে চলতে হবে আজ সকালে

    বিশ্বপথে সবার সাথে সমান তালে।’

    যে কথা কবি বারবার বলতে চান, সে কথা অস্তাচলের ‘প্রান্তকে’ আছে এভাবে— ‘সেথায় কাদের আর্তনাদ বারংবার বৈশাখীর ঝড়ে।/… ক্ষীণদীপ উধর আলোতে/ চিরন্তন পথের সঙ্কেত-রেখে যায় প্রভাতের কানে।’

    রবীন্দ্রনাথের ‘যেতে নাহি দিব’ কবিতার সুর সুকান্তের ‘শেষ মিনতি’তে খুঁজে পাওয়া যায়—

    ‘ওকে যায় চলে কথা না বলে, দিও না যেতে

    আমি কেঁদে কই যেও না কোথাও,

    সে যে হেসে কয় মোরে যেতে দাও।’

    আর সোনার তরীর — কোন পাড়ে নিয়ে যাবে হে সুন্দরী/ কোন পাড়ে ভিড়িবে তোমার সোনার তরী’র সাক্ষাত মিলে সুকান্তের ‘আয়োজন’ বর্ণনায়—

    ‘তুমি যাবে আমাদের মথিত করে! কোন মহাদেশের

    কোন আসনে হবে তোমার স্থান?

    কতদূর তা কে জানে।’

    শেষ করছি সঙ্কলিতা ও কোতোয়ালের কিছু সংলাপ উল্লেখ করে।

    সঙ্কলিতা (আঁচল তুলে)

    ওগো রাজপ্রতিনিধি,

    তুমি রাজ্যের বিধি।

    তুমি দাও আমাদের অন্ন,

    আমরা যে বড়ই বিপন্ন।

    কোতোয়াল

    য চ’লে ভিখারী মেয়ে যা চ’লে

    দেব না কিছুই তোর আঁচলে।

    সঙ্কলিতা

    তুমি যদি না দেবে তো কে দেবে এ রাজ্যে?

    সবারে রক্ষা করা তোমাদের কাজ যে।

    কোতোয়াল

    চুপ কর হতভাগী, বড় যে সাহস তোর?

    এখুনি বুঝিয়ে দেব আমার গায়ের জোর।

    সঙ্কলিতা

    তোমরা দেখাও শুধু শক্তি,

    তাইতো করে না কেউ ভক্তি;

    করো না প্রজার কোনো কল্যাণ,

    তোমরা অন্ধ আর অজ্ঞান।

    কোতোয়াল

    চল তবে মুখপুড়ী, বেড়েছিস বড় বাড়–

    কপালে আছে রে তোর নির্ঘাত কারাগার।

  • অভিযান (নাট্য)

    অভিযান (নাট্য)

    অভিযান (নাট্য)

    নেপথ্যে (গান)

    ক্ষুধিতের সেবার সব ভার

    লও লও কাঁধে তুলে—

    কোটি শিশু নরনারী

    মরে অসহায় অনাদরে,

    মহাশ্মশানে জাগো মহামানব

    আগুয়ান হও ভেদ ভুলে।

    বৈজয়ন্তী নগর।    সকাল।     (দূরে কে যেন বলছে)

    হে পুরবাসী! হে মহাপ্রাণ,

    যা কিছু আছে করগো দান,

    অন্ধকারে হোক অবসান

    করুণা-অরুণোদয়ে!

    বালকদলের প্রবেশ

    উদয়ন

    ওই দ্যাখ, ওই দ্যাখ, আসে ওই

    আয় তোরা, ওর সাথে কথা কই।

    ইন্দ্রসেন

    নগরে এসেছে এক অদ্ভুত মেয়ে

    পরের জন্য শুধু মরে ভিখ্ চেয়ে!

    সত্যকাম

    শুনেছি ও থাকে দূর দেশে,

    সেইখান থেকে হেঁটে এসে

    দেশের জন্য ভিখ্ চায়

    আমাদের খোলা দরজায়।

    উদয়ন

    শুনেছি ওদের দেশে পথের ধারে

    মরছে হাজার লোক বিনা আহারে,

    নানান ব্যাধিতে দেশ গিয়েছে ছেয়ে,

    তাইতো ভিক্ষা মাগে ওদের মেয়ে।

    সংকলিতার প্রবেশ (গান ধরল)

    গান

    শোনো, শোনো, ও বিদেশে ভাই,

    এসেছি আজ বন্ধুজনের ঠাঁই ;

    দেশবাসই মরছে অনশনে

    তোমরা কিছু দাও গো জনে জনে,

    বাঁচাব দেশ অন্ন যদি পাই।

    উদয়ন

    শোনো ওগো বিদেশের কন্যা

    ব্যাধি দুর্ভিক্ষের বন্যা

    আমরাই প্রাণ দিয়ে বাঁধব—

    তোমাদের কান্নায় আমরাও যোগ দিয়ে কাঁদব।

    ইন্দ্রসেন

    আমরা তোমায় তুলে দেবো অন্ন বস্ত্র অর্থ

    তুমি কেবল গান শোনাবে এই আমাদের শর্ত।

    সত্যকাম

    ওই দ্যাখ আসে হেথা রাজ্যের কোতোয়াল

    ইয়া বড় গোঁফ তার, হাতে বাঁকা তরোয়াল;

    ওর কাছে গিয়ে তুমি পাতো দুই হস্ত

    ও দেবে অনেক কিছু ও যে লোক মস্ত!

    কোতোয়ালের প্রবেশ

    সংকলিতা

    (আঁচল তুলে)

    ওগো রাজপ্রতিনিধি,

    তুমি রাজ্যের বিধি।

    তুমি দাও আমাদের অন্ন,

    আমরা যে বড়ই বিপন্ন।

    কোতোয়াল

    যা চ’লে ভিখারী মেয়ে যা চ’লে

    দেব না কিছুই তোর আঁচলে।

    সংকলিতা

    তুমি যদি না দেবে তো কে দেবে এ রাজ্যে ?

    সবারে রক্ষা করা তোমাদের কাজ যে।

    কোতোয়াল

    চুপ কর হতভাগী, বড় যে সাহস তোর ?

    এখুনি বুঝিয়ে দেব আমার গায়ের জোর।

    সংকলিতা

    তোমরা দেখাও শুধু শক্তি,

    তাইতো করে না কেউ ভক্তি ;

    করো না প্রজার কোনো কল্যাণ,

    তোমরা অন্ধ আর অজ্ঞান।

    কোতোয়াল

    চল্ তবে মুখপুড়ী, বেড়েছিস বড় বাড়—

    কপালে আছে রে তোর নির্ঘাত কারাগার।

    (সংকলিতাকে পাকড়াও করে গমনোদ্যত, এমন সময় জনৈক পথিকের প্রবেশ)

  • সূর্য-প্রণাম : উদয়াচল

    সূর্য-প্রণাম : উদয়াচল

    সূর্য-প্রণাম
    উদয়াচল

    আগমনী

    সমবেত গান

    পূব সাগরের পার হতে কোন পথিক তুমি উঠলে হেসে,

    তিমির ভেদি ভুবন-মোহন আলোর বেশে।

    ওগো পথিক, তোমার আলোয় ঘুচুক জরা

    ছন্দে নাচুক বসুন্ধরা।

    গগনপথে যাত্রা তোমার নিরুদ্দেশে।

    তুমি চিরদিনের দোলে দোলাও অনন্ত আবর্তনে,

    নৃত্যে কাঁপুক চিত্ত মোদের নটরাজের নর্তনে।

    আলোর সুরে বাজাও বাঁশি,

    চিরকালের রূপ-বিকাশি’

    আঁধার নাশে সুন্দর হে তোমার বাণীর মূক আবেগে॥

  • সূর্য-প্রণাম : অস্তাচল

    সূর্য-প্রণাম : অস্তাচল

    সূর্য-প্রণাম
    অস্তাচল

    প্রান্তিক

    আবৃত্তি

    বেলাশেষে শান্তছায়া সন্ধ্যার আভাসে

    বিষন্ন মলিন হয়ে আসে,

    তারি মাঝে বিভ্রান্ত পথিক

    তৃপ্তিহীন খুঁজে ফেরে পশ্চিমের দিক।

    পথপ্রান্তে

    প্রাচীন কদম্বতরুমূলে,

    ক্ষণতরে স্তব্ধ হয়ে যাত্রা যায় ভুলে।

    আবার মলিন হাসি হেসে

    চলে নিরুদ্দেশে।

    রজনীর অন্ধকারে একটি মলিন দীপ হাতে

    কাদের সন্ধান করে উষ্ণ অশ্রুপাতে

    কালের সমাধিতলে।

    স্মৃতির সঞ্চয় করে জীবন-অঞ্চলে;

    মাঝে মাঝে চেয়ে রয় ব্যথা ভরা পশ্চিমের দিকে,

    নির্নিমিখে।

    যেথায় পায়ে চিহ্ন পড়ে আছে অমর অক্ষরে

    যেথায় কাদের আর্তনাদ বারংবার বৈশাখীর ঝড়ে।

    আবার সম্মুখপানে

    যাত্রা করে রাত্রির আহ্বানে।

    ক্ষীণদীপ উর্বর আলোতে

    চিরন্তন পথের সংকেত

    রেখে যায় প্রভাতের কানে।

    অকস্মাৎ আত্মবিস্মৃতির অন্তঃপুরে,

    ভেসে ওঠে মানসমুকুরে

    উত্তরকালের আর্তনাদ,—

    “কবিগুরু

    আমাদের যাত্রা শুরু

    কালের অরণ্য পথে পথে

    পরিত্যক্ত তব রাজ-রথে

    আজি হতে শতবর্ষ আগে

    অস্ত গোধূলির সন্ধ্যারাগে

    যে দিগন্ত হয়েছে রক্তিম,

    সেথা আজ কারো চিত্তবীণা

    তন্ত্রীতে বাজে কিনা

    সে কথা শুধাও?

    শুধু দিয়ে যাও

    ক্ষণিকের দক্ষিণ বাতাসে তোমার সুবাস

    বাণীহীন অন্তরের অন্তিম আভাস।

    তাই আজ বাধামুক্ত হিয়া

    অজস্র উপেক্ষাভরে বিস্মৃতিরে পশ্চাতে ফেলিয়া

    ছিন্নবাধা বলাকার মতো

    মত্ত অবিরত,

    পশ্চাতের প্রভাতের পুষ্প-কুঞ্জবনে

    আজ শূণ্য মনে।”

    তাই উচ্চকিত পথিকের মন

    অকারণ

    উচ্ছলিত চঞ্চল পবনে

    অনাগত গগনে গগনে।

    ক্লান্ত আজ প্রভাতের উৎসবের বাঁশি;

    পুরবাসী নবীন প্রভাতে

    পুরাতন জয়মাল্য হাতে

    অস্তাচলে পথিকের মুখে মূর্ত হাসি॥

  • গীতিগুচ্ছ

    গীতিগুচ্ছ

    গীতিগুচ্ছ

    সুকান্ত ভট্টাচার্য রচিত গানের সংকলন গীতিগুচ্ছ প্রকাশিত হল। এতে উনিশটি গান রয়েছে। নিম্নে উনিশটি গানের প্রথম পঙ্‌ক্তি উল্লেখ করা হল—

    1. ওগো কবি তুমি আপন ভোলা।
    2. এই নিবিড় বাদল দিনে।
    3. গানের সাগর পাড়ি দিলাম।
    4. হে মোর মরণ, হে মোর মরণ।
    5. দাঁড়াও ক্ষণিক পথিক হে।
    6. শয়ন শিয়রে ভোরের পাখির রবে।
    7. ও কে যায় চলে কথা না বলে দিও না যেতে।
    8. হে পাষাণ, আমি নির্ঝরিণী।
    9. শীতের হাওয়া ছুঁয়ে গেল ফুলের বনে।
    10. কিছু দিয়ে যাও এই ধূলিমাখা পান্থশালায়।
    11. ক্লান্ত আমি, ক্লান্ত আমি কর ক্ষমা।
    12. সাঁঝের আঁধার ঘিরল যখন।
    13. কঙ্কণ-কিঙ্কিণী মঞ্জুল মঞ্জীর ধ্বনি।
    14. মেঘ-বিনিন্দিত স্বরে।
    15. গুঞ্জরিয়া এল অলি।
    16. কোন অভিশাপ নিয়ে এল এই।
    17. ভুল হল বুঝি এই ধরণীতলে।
    18. মুখ তুলে চায় সুবিপুল হিমালয়।
    19. ফোটে ফুল আসে যৌবন।
  • ওগো কবি তুমি আপন ভোলা

    ওগো কবি তুমি আপন ভোলা

    ওগো কবি তুমি আপন ভোলা,

    আনিলে তুমি নিথর জলে ঢেউয়ের দোলা!

    মালাখানি নিয়ে মোর

    একী বাঁধিলে অলখ ডোর!

    নিবেদিত প্রাণে গোপনে তোমার কী সুর

    তোলা!

    জেনেছ তো তুমি অজানা প্রাণের

    নীরব কথা।

    তোমার বাণীতে আমার মনের

    এ ব্যাকুলতা—

    পেয়েছ কী তুমি সাঁঝের বেলাতে;

    যখন ছিলাম কাজের খেলাতে

    তখন কি তুমি এসেছিলে—

    ছিল দুয়ার খোলা॥

  • এই নিবিড় বাদল দিনে

    এই নিবিড় বাদল দিনে

    এই নিবিড় বাদল দিনে

    কে নেবে আমায় চিনে,

    জানিনে তা।

    এ নব ঘন ঘোরে,

    কে ডেকে নেবে মোরে

    কে নেবে হৃদয় কিনে,

    উদাসচেতা।

    পবন যে গহন ঘুম আনে,

    তার বাণী দেবে কি কানে,

    যে আমার চিরদিন

    অভিপ্রেতা!

    শ্যাম রঙ বনে বনে,

    উদাস সুর মনে মনে,

    অদেখা বাঁধন বিনে

    ফিরে কি আসবে হেথা?

  • গানের সাগর পাড়ি দিলাম

    গানের সাগর পাড়ি দিলাম

    গানের সাগর পাড়ি দিলাম

    সুরের তরঙ্গে,

    প্রাণ ছুটেছে নিরুদ্দেশে

    ভাবের তুরঙ্গে।

    আমার আকাশ মীড়ের মূর্ছনাতে

    উধাও দিনে রাতে;

    তান তুলেছে অন্তবিহীন

    রসের মৃদঙ্গে

    আমি কবি সপ্তসুরের ডোরে,

    মগ্ন হলাম অতল ঘুম-ঘোরে;

    জয় করেছি জীবনে শঙ্কারে,

    মোর বীণা ঝংকারে :

    গানের পথের পথিক আমি

    সুরেরই সঙ্গে॥

  • হে মোর মরণ

    হে মোর মরণ

    হে মোর মরণ, হে মোর মরণ!

    বিদায় বেলা আজ একেলা

    দাও গো শরণ।

    তুমি আমার বেদনাতে

    দাও আলো আজ এই ছায়াতে

    ফোটার গন্ধে অলস ছন্দে

    ফেলিও চরণ॥

    তোমার বুকে অজানা স্বাদ,

    ক্লান্তি আনো, দাও অবসাদ;

    তোমায় আমি দিবসযামী

    করিনু বরণ।

    তোমার পায়ে কী আছে যে,

    জীবনবীণা উঠেছে বেজে?

    আমায় তুমি নীরব চুমি

    করিও হরণ॥

  • দাঁড়াও ক্ষণিক পথিক হে

    দাঁড়াও ক্ষণিক পথিক হে

    দাঁড়াও ক্ষণিক পথিক হে

    যেয়ো না চলে,

    অরুণ-আলো কে যে দেবে

    যাও গো বলে।

    ফেরো তুমি যাবার বেলা,

    সাঁঝ আকাশে রঙের মেলা

    দেখেছ কী কেমন ক’রে

    আগুন হয়ে উঠল জ্বলে।

    পুব গগনের পানে বারেক তাকাও

    বিরহেরই ছবি কেন আঁকাও?

    আঁধার যেন প্লাবন সম আসছে বেগে

    শেষ হয়ে যাক তারা তোমার

    ছোঁয়াচ লেগে।

    থামো ওগো, যেয়ো না হয়

    সময় হলে॥

  • শয়ন শিয়রে ভোরের পাখির রবে

    শয়ন শিয়রে ভোরের পাখির রবে

    শয়ন শিয়রে ভোরের পাখির রবে

    তন্দ্রা টুটিল যবে।

    দেখিলাম আমি খোলা বাতায়নে

    তুমি আনমনা কুসুম চয়নে

    অন্তর মোর ভরে গেল সৌরভে।

    সন্ধ্যায় যবে ক্লান্ত পাখিরা ধীরে,

    ফিরিছে আপন নীড়ে,

    দেখিলাম তুমি এলে নদীকূলে

    চাহিলে আমায় ভীরু আঁখি তুলে

    হৃদয় তখনি উড়িল অজানা নভে॥

  • ও কে যায় চলে

    ও কে যায় চলে

    ও কে যায় চলে কথা না বলে দিও না যেতে

    তাহারই তরে আসন ঘরে রেখেছি পেতে।

    কেন সে সুধার পাত্র ফেলে

    চলে যেতে চায় আজ অবহেলে

    রামধনু রথে বিদায়ের পথে উঠিছে মেতে॥

    রঙে রঙে আজ গোধূলি গগন

    নহেকো রঙিন, বিলাপে মগন।

    আমি কেঁদে কই যেয়ো না কোথাও,

    সে যে হেসে কয় মোরে যেতে দাও,

    বাড়ায়ে বাহু বিরহ-রাহু চাহিছে পেতে॥

  • হে পাষাণ, আমি নির্ঝরিণী

    হে পাষাণ, আমি নির্ঝরিণী

    হে পাষাণ, আমি নির্ঝরিণী

    তব হৃদয়ে দাও ঠাঁই।

    আমার কল্লোলে

    নিঠুর যায় গ’লে

    ঢেউয়েতে প্রাণ দোলে,

    ―তবু নীরব সদাই!

    আমার মর্মেতে কী গান ওঠে মেতে

    জানো না তুমি তা,

    তোমার কঠিন পায় চির দিবসই হায়

    রহিনু অবনতা।

    যতই কাছে আসি

    আমারে মৃদু হাসি

    করিছ পরবাসী,

    তোমাতে প্রেম নাই॥

  • শীতের হাওয়া ছুঁয়ে গেল

    শীতের হাওয়া ছুঁয়ে গেল

    শীতের হাওয়া ছুঁয়ে গেল ফুলের বনে,

    শিউলি-বকুল উদাস হল ক্ষণে ক্ষণে,

    ধূলি-ওড়া পথের ‘পরে

    বনের পাতা শীতের ঝড়ে

    যায় ভেসে ক্ষীণ মলিন হেসে আপন মনে

    রাতের বেলা বইল বাতাস নিরুদ্দেশে,

    কাঁপনটুকু রইল শুধু বনের শেষে।

    কাশের পাশে হিমের হাওয়া,

    কেবল তারি আসা-যাওয়া―

    সব-ঝরাবার মন্ত্রণা সে দিল শুধু সংগোপনে॥

  • কিছু দিয়ে যাও

    কিছু দিয়ে যাও


    ১০

    কিছু দিয়ে যাও এই ধূলিমাখা পান্থশালায়,

    কিছু মধু দাও আমার বুকের ফুলের মালায়।

    কত জন গেল এ পথ দিয়ে

    আমার বুকের সুবাস নিয়ে

    কিছু ধন তারা দিয়ে গেল মোর সোনার থালায়।

    পথ চেয়ে আমি বসে আছি হেথা তোমার আশে

    তুমি এলে যদি কাছে বসো প্রিয় আমার পাশে।

    কিছু কথা বল আমার সনে,

    ঢেউ তুলে যাও নীরব মনে,

    এইটুকু শুধু দাও তুমি ওগো আমার ডালায়॥

  • ক্লান্ত আমি কর ক্ষমা

    ক্লান্ত আমি কর ক্ষমা

    ১১

    ক্লান্ত আমি, ক্লান্ত আমি কর ক্ষমা,

    মুক্তি দাও হে এ-মরু তরুরে, প্রিয়তমা।

    ছিন্ন কর এ গ্রন্থিডোর

    রিক্ত হয়েছে চিত্ত মোর

    নেমেছে আমার হৃদয়ে শ্রান্তি ঘন-অমা।

    যে আসব ছিল তোমার পাত্রে,

    শোষণ করেছি দিনে ও রাত্রে।

    রসের সিন্ধু মন্থন শেষে,

    গরল উঠেছে তব উদ্দেশে,

    তুমি আর নহ আমার অতীত, হে মনোরমা॥

  • সাঁঝের আঁধার ঘিরল যখন

    সাঁঝের আঁধার ঘিরল যখন

    ১২

    সাঁঝের আঁধার ঘিরল যখন

    শাল-পিয়ালের বন,

    তারই আভাস দিল আমায়

    হঠাৎ সমীরণ।

    কুটির ছেড়ে বাইরে এসে দেখি

    আকাশকোণে তারার লেখালেখি

    শুরু হয়ে গেছে বহুক্ষণ।

    আজকে আমার মনের কোণে

    কে দিল যে গান,

    ক্ষণে ক্ষণে চমকে উঠি

    রোমাঞ্চিত প্রাণ।

    আকাশতলে বিমুক্ত প্রান্তরে,

    উধাও হয়ে গেলাম ক্ষণতরে!

    কার ইশারায় হলাম অন্যমন॥

  • কঙ্কণ-কিঙ্কিণী মঞ্জুল মঞ্জীর ধ্বনি

    কঙ্কণ-কিঙ্কিণী মঞ্জুল মঞ্জীর ধ্বনি

    ১৩

    কঙ্কণ-কিঙ্কিণী মঞ্জুল মঞ্জীর ধ্বনি,

    মন অন্তর-প্রাঙ্গণে আসন্ন হল আগমনী।

    ঘুমভাঙা উদ্বেল রাতে,

    আধ-ফোটা ভীরু জ্যোৎস্নাতে

    কার চরণের ছোঁয়া হৃদয়ে উঠিল রণরণি

    মেঘ-অঞ্জন-ঘন কার এই আঁখি পাতে লিখা,

    বন্দন-নন্দিত উৎসবে জ্বালা দীপশিখা।

    মুকুলিত আপনার ভারে

    টলিয়া পড়িছে বারে বারে

    সংগীত হিল্লোলে কে সে স্বপনের অগ্রণী॥