Author: সুকান্ত ভট্টাচার্য

  • সুকান্ত সমগ্র

    সুকান্ত সমগ্র

    সুকান্তের কবিতা আজও সমান আদরনীয়। এর প্রধান কারণ, কবিতার বিষয়বস্তু, শব্দচয়নে ও ধ্বনিসৌকর্যে তাঁর অসামান্য দক্ষতা, ছন্দ ও মিলের উপরে তাঁর অসামান্য দখল এবং ঘৃণা ও ক্রোধে সংযত অভিব্যক্তি। এই কাব্যিক গুণাবলী তাঁর কবিতাকে অমর করে রেখেছে। শুধু কবিতা নয়, সুকান্তের সমস্ত রচনার পটভূমি এক নির্মম রাক্ষসীবেলা – যুদ্ধের বিভৎসা, মন্বন্তরের ভয়ালতা, সাইরেন, ব্ল্যাক-আউট, বোমা পড়ার আতঙ্ক, কন্ট্রোল দরে খাদ্য-বস্ত্রের লাইন, আর এর প্রতিস্পর্ধী এক আন্দোলন, এক মতাদর্শ : সাম্যবাদ। ফলে তাঁর কাব্য তথা সমগ্র সাহিত্যচর্চা ‘ডিক্লাসমেন্টে’র বার্তাবহ। এটাই তাঁকে করে তুলেছে রবীন্দ্রনাথ-উত্তরকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সাহিত্য স্রষ্টা। তাঁর সমস্ত কবিতা, গীতিগুচ্ছ, পত্রগুচ্ছ, মায় তাঁর ক্ষুদ্র সাহিত্য জীবনের প্রায় সমস্ত লেখা নিয়েই এই ‘সমগ্র’। পাশাপাশি, এই বইটিতে আছে সুকান্ত-পাঠের এক নাতিদীর্ঘ গাইডলাইন; লেখাটি বইটির মুখবন্ধের পরিবর্তে রচিত, যা এই বইয়ের একটি সম্পদ।

    অকালমৃত্যু ছিনিয়ে নিলেও আধুনিক বাংলা সাহিত্যে স্থায়ী আসন পেতে দেরী হয়নি কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের। তরুণ বয়সের ভাবাবেগ-নির্ভর তরল জীবনবীক্ষা তাঁর রচনার প্রধান সম্বল হলেও বাংলা সাহিত্যের বিশেষ সময়ে তাঁর রচনার প্রাসঙ্গিকতা অনস্বীকার্য।

    তাঁর জন্ম ১৯২৬ সালের ১৫ই আগষ্ট (৩০শে শ্রাবণ ১৩৩৩ বঙ্গাব্দ) কলকাতার কালীঘাটে, ৪২নং মহিম হালদার স্ট্রীটের মামার বাড়িতে। তাঁর বাবা নিবারণচন্দ্র ভট্টাচার্য, মা সুনীতি দেবী। প্রাথমিক শিক্ষা, ‘কামলাবিদ্যামন্দির’ নামে একটি স্থানীয় প্রাইমারী স্কুলে। এই স্কুলেরই ক্লাস ফোরের ছাত্ররা ‘সঞ্চয়’ নামের একটা হাতে লেখা পত্রিকা সেইসময় বের করতো। শোনা যায় ‘সঞ্চয়’ নামকরণটাও নাকি সুকান্তরই করা। তিনি একটা মজার গল্প লিখেছিলেন এই পত্রিকায়। তাঁর ঘনিষ্ঠদের দাবী লেখক হিসেবে তাঁর হাতেখড়ি ঐ পত্রিকাতেই হয়েছিল।

    ১৯৩৮ সালে তাঁর মা ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। তখন তাঁর বয়স মাত্র বারো বছর। সেইসময় তিনি দেশবন্ধু বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করতেন। যখন তিনি সপ্তম শ্রেণির ছাত্র, সেই সময় সপ্তম শ্রেণি থেকে ‘সপ্তমিকা’ নামে একটি হাতে লেখা পত্রিকা বের করা হয়। এই পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন সুকান্ত স্বয়ং আর সহ-সম্পাদক ছিলেন তাঁরই সহপাঠী বন্ধু অরুণাচল বসু। ১৯৪৪ সালে সুকান্ত ভট্টাচার্য ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে যুক্ত হন। কমিউনিস্ট পার্টি ‘স্বাধীনতা’ নামে একটি বাংলা দৈনিক বের করতে থাকে ১৯৪৫ সালের ২৫শে ডিসেম্বর থেকে। ঐ পত্রিকাতে ‘কিশোর সভা’ নামে ছোটোদের বিভাগ ছিল। এই ‘কিশোর সভা’র সম্পাদক প্রথমে ছিলেন কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়, পরে তার পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল সুকান্তকে।

    অর্থাভাব, পার্টির কাজ ও নিজের শরীরের প্রতি অবহেলা – সব মিলিয়ে সুকান্তের স্বাস্থ্য ভেঙে গেল। ১৯৪৬ সালের মাঝামাঝি সুকান্ত জ্বরে পড়লেন। বাড়িতেই তাঁর চিকিৎসা চলল, কিন্তু জ্বর সারলো না। তিনি ধীরে ধীরে শয্যাশায়ী হয়ে পড়লেন। যদিও ঐ বিধ্বস্ত স্বাস্থ্য নিয়েও সাহিত্যচর্চা বন্ধ করেন নি তিনি। ধরা পড়লো ইন্টেস্টিনাল টি বি (পেটের যক্ষা)। মৃত্যুর সাথে চলছিল তাঁর চরম লড়াই শেষ হল ১৯৪৭ সালের ১৩ই মে (২৯শে বৈশাখ ১৩৫৪ বঙ্গাব্দ)। ঐ সকাল ১০টার সময় তিনি মারা গেলেন। মাত্র কুড়ি বছর বয়সে শেষ হয়ে গেল এক মহীরূহের সম্ভাবনা। তবু যতটুকু রেখে গেলেন, তা বাংলা সাহিত্যের করুণ অধ্যায়ে লেখা হয়ে রইল।

  • ভূমিকা

    ভূমিকা

    বাংলা সাহিত্যের একটি প্রিয়তম নাম সুকান্ত ভট্টাচার্য। বাঙালীর ঘরে ঘরে নিঃসন্দেহে একটি প্রিয়তম গ্রন্থ হবে ‘সুকান্ত-সমগ্র’। সুকান্তর সব লেখা একত্রে পাওয়ার বাসনা আমাদের বহু দিনের এবং বহু জনের। এতদিনে সে আকাঙ্ক্ষা মিটিয়ে সারস্বত লাইব্রেবী আমাদেব ধন্যবাদার্হ হলেন।

    আমি জানি, কাজটা সহজ ছিল না। লেখাগুলো ছিল নানা জায়গায় ছডিয়ে ছিটিয়ে। ক্রমে ক্রমে সেসব প্রকাশকের হাতে আসতে সময় লেগেছে। সব যে নিঃশেষে পাওয়া গেছে, আমাদের নজর এড়িয়ে কোথাও যে পড়ে নেই–এখনও খুব জোর করে সে কথা বলা যায় না। সুকান্তর লেখা উদ্ধারের কাজে কত জন যে কতভাবে সাহায্য করেছেন, তার ইয়ত্তা নেই। ‘সুকান্ত-সমগ্র’ আসলে নানা দিক থেকে নানা লোকের সাহায্যের যোগফল।

    লেখা পাওয়ার পর দেখা দিয়েছে আরেক সমস্যা।

    কোনো কোনো লেখা পাওয়া গেছে ছাপার হরফে, কোনোটা বা হাতের লেখায়। কখনও ছাপানো লেখাকে, কখনও বা পাণ্ডুলিপিকে চূড়ান্ত ব’লে মানতে হয়েছে। কিন্তু ছাপানো লেখা আর তার পাণ্ডুলিপিতে যদি অমিল থাকে? ঢালাওভাবে সেই অসামঞ্জস্যকে ছাপার ভুল বলে মানা হবে? বদলটা প্রেস-কপিতেও হয়ে থাকতে পারে। কাজেই ছাপার হরফে আর পাণ্ডুলিপিতে গরমিল হলে সেটা লেখকের ইচ্ছাকৃত না অনিচ্ছাকৃত, অভিপ্রেত না অনভিপ্রেত, এ বিষয়ে দ্বিধায় পড়তে হয়। যে পাণ্ডুলিপি পাওয়া গেছে, তাও যে লেখাটির প্রাথমিক খসড়া নয়—সেটা যে প্রেস-কপির হুবহু নকল—তাই বা জোর ক’রে কিভাবে বলা যাবে। তাছাড়া লেখার ভুলে পাণ্ডুলিপিতেও অনেক সময় গোলমাল থাকে; বানানের অনিয়ম ছাড়াও যতি চিহ্নের অসতর্কতায় পাঠকের ভুল বুঝবার আশঙ্কা থেকে যায়।

    সুতরাং যদ্দৃষ্টং তন্মুদ্রিতং করা সর্বক্ষেত্রে সম্ভব হয় নি। বানানে সমতা আনবার চেষ্টা করতে হয়েছে, যতি চিহ্নের ব্যাপারে জায়গায় জায়গায় হস্তক্ষেপের দরকার হয়েছে এবং মুদ্রিত আর পাণ্ডুলিপিগত অসামঞ্জস্যের ক্ষেত্রে দুটোর একটিকে বেছে নিতে হয়েছে। এই প্রসঙ্গে জানিয়ে রাখা ভালো, এর কোনোটাই অনড় অচল ব্যবস্থা নয় – পরে প্রয়োজনবোধে রদবদল হ’তে পারে।

    এর চেয়েও জটিল আরেকটি সমস্যা আছে। সে সম্বন্ধে আজকের পাঠকদের অবহিত করতে চাই। সমস্যাটি সাধারণভাবে লেখার নির্বাচন সংক্রান্ত।

    মাত্র একুশ বছর সুকান্ত পৃথিবীতে বেঁচে ছিল। আবির্ভাবের প্রায় সঙ্গে সঙ্গে বাংলা সাহিত্য সুকান্তকে আশ্চর্য প্রতিভা ব’লে স্বীকৃতি দিয়েছিল। কিন্তু ঠিক বিকশিত হওয়ার মুখেই সেই আশ্চর্য প্রতিভাকে আমরা হারিয়েছি।

    বয়স বাড়লে নিজেদের কম বয়সের লেখা সম্বন্ধে লেখকেরা স্বভাবতই খুব খুঁতখুঁতে হন। অনেকের কাঁচা বয়সের লেখার কথা তো পরে আমরা জানতেও পারি না। অথবা জানলেও, তাদের পাকা হাতের লেখাগুলো সংখ্যায় আর পরিমাণে তাঁদের কাঁচা হাতের লেখাগুলোকে ঢেকে দিতে পারে।

    সুকান্ত সেদিক থেকে সত্যিই মন্দভাগ্য। অকালমৃত্যু সুকান্তকে বাংলা সাহিত্যে শুধু বিপুলতর গৌরব লাভের সুযোগ থেকেই বঞ্চিত করে নি সেই সঙ্গে লেখার সংখ্যায় আর পরিমাণে পরিণতির চেয়ে প্রতিশ্রুতির পাল্লাই ভারী করেছে।

    বেঁচে থাকলে সুকান্তর কিছু লেখা যে ‘সুকান্ত-সমগ্র’তে স্থান পেত না, তাতে আমার সন্দেহ নেই। বাংলা সাহিত্যে আমি ছিলাম সুকান্তর অগ্রজ; তার কবিমনের অনেক কথাই আমার জানা ছিল। তার কবিতা যখন নতুন মোড় নিচ্ছিল, তখনই দুর্ভাগ্যক্রমে আমরা তাকে হারিয়েছি। সুকান্তর যে সব কবিতা পড়ে আমরা চমকাই, সুকান্তর পক্ষে সে সবই আরম্ভ মাত্র।

    সুকান্তর যখন বালক বয়স, তখন থেকেই তার কবিতার সঙ্গে আমার পরিচয়।

    আমি তখন স্কটিশ চার্চ কলেজে বি-এ পড়ছি। ‘পদাতিক’ বেরিয়ে তখন পুরনো হয়ে গেছে। রাজনীতিতে আপাদমস্তক ডুবে আছি। ক্লাস পালিয়ে বিডন স্ট্রীটের চায়ের দোকানে আমাদের আড্ডা। কলেজের বন্ধু মনোজ একদিন জোর ক’রে আমার হাতে একটা কবিতার খাতা গছিয়ে দিল। প’ড়ে আমি বিশ্বাসই করতে পারি নি কবিতাগুলো সত্যিই তার চৌদ্দ বছর বয়সের খুড়তুতো ভাইয়ের লেখা। শুধু আমি কেন, আমার অন্যান্য বন্ধুরা, এমন কি বুদ্ধদেব বসুও কবিতার সেই খাতা প’ড়ে অবাক না হয়ে পারেন নি।

    আমার সন্দেহভঞ্জন করবার জন্যেই বোধহয় মনোজ একদিন কিশোর সুকান্তকে সেই চায়ের দোকানে এনে হাজির করেছিল। সুকান্তর চোখের দিকে তাকিয়ে তার কবিত্বশক্তি সম্বন্ধে সেদিন কেন আমি নিঃসংশয় হয়েছিলাম, সে বিষয়ে কেউ যদি আমাকে জেরা করে আমি সদুত্তর দিতে পারব না।

    সে সব কবিতা পরে ‘পূর্বাভাস’-এ ছাপা হয়েছে। তাতে কী এমন ছিল যে, প’ড়ে সেদিন আমরা একেবারে মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম? আজকের পাঠকেরা আমাদের সেদিনকার বিস্ময়ের কারণটা ধরতে পারবেন না। কারণ, বাংলা কবিতার ধারা তারপর অনেকখানি ব’য়ে এসেছে। কোনো কিশোরের পক্ষে ঐ বয়সে ছন্দে অমন আশ্চর্য দখল, শব্দের অমন লাগসই ব্যবহার সেদিন ছিল অভাবিত। হালে সে জিনিস প্রায় অভ্যাসে দাঁড়িয়ে গেছে।

    জীবনের অভিজ্ঞতাকে ক্ষমতায় বেঁধে সুকান্ত যখন কবিতার বিদ্যুৎশক্তিকে কলকারখানায় খেতে খামারে ঘরে ঘরে সবে পৌছে দিতে শুরু করেছে, ঠিক তখনই মৃত্যু তাকে কেড়ে নিয়ে গেল। আরম্ভেই সমাপ্তির এই শোকে বাংলা সাহিত্য চিরদিন দীর্ঘশ্বাস ফেলবে।

    সুকান্ত বেঁচে থাকতে তার অনুরাগী পাঠকদের মধ্যে আমার চেয়ে কড়া সমালোচক অপর কেউ ছিল কিনা সন্দেহ। এখন ভেবে খারাপ লাগে। সামনাসামনি তাকে কখনো আমি বাহবা দিই নি। তার লেখায় সামান্য ক্রটিও আমি কখনও ক্ষমা করি নি।

    এ প্রসঙ্গ তুলছি স্মৃতিচারণার জন্যে নয়। পাঠকেরা পাছে বিচারে ভুল করেন, তার যুগ আর তার বয়স থেকে পাছে তাকে ছাড়িয়ে নিয়ে দেখবার চেষ্টা করেন—সেইজন্যে গোড়াতেই আজকের পাঠকদের খানিকটা হুঁশিয়ার ক’রে দিতে চাই।

    খুঁত ধরব জেনেও, নতুন কিছু লিখলেই সুকান্ত আমাকে একবার না শুনিয়ে ছাড়ত না। আমি তখন কবিতা ছেড়ে ‘জনযুদ্ধ’ নিয়ে ডুবে আছি। অফিসে ব’সে কথা বলবারও বেশি সময় পেতাম না। আমাদের অধিকাংশ কথাবার্তা হত সভায় কিংবা মিছিলে যাতায়াতের রাস্তায়। ‘কী নিয়ে লিখব?’—এটা কখনই আমাদের আলোচনার বিষয় হত না। ‘কেমন ক’রে লিখব?’—এই নিয়েই ছিল আমাদের যত মাথাব্যথা।

    কিশোর বাহিনীর আন্দোলনে সুকান্তকে টেনে এনেছিল তখনকার ছাত্রনেতা এবং আমাদের বন্ধু অন্নদাশঙ্কর ভট্টাচার্য। রাজনীতিতে শুকনো ভাব তখন অনেকখানি কেটে গিয়ে নাচ গান নাটক আবৃত্তির ভেতর দিয়ে বেশ একটা রসকষ এসেছে। কবিতাকে বাইরে দাঁড় করিয়ে রেখে আমাদের যেমন রাজনীতির আসরে ঢুকতে হয়েছিল, সুকান্তর বেলায় তা হয় নি। সুকান্তর সাহিত্যিক গুণগুলোকে আন্দোলনের কাজে লাগানের ব্যাপারে অন্নদারও যথেষ্ট হাতযশ ছিল। সুকান্তর আগের যুগের লোক ব’লে আমি পার্টিতে এসেছিলাম কবিতা ছেড়ে দিয়ে; আর সুকান্ত এসেছিল কবিতা নিয়ে। ফলে, কবিতাকে সে সহজেই রাজনীতির সঙ্গে মেলাতে পেরেছিল। তার ব্যক্তিত্বে কোনো দ্বিধা ছিল না।

    কিন্তু তার মানে এ নয় যে, আঠারো থেকে একুশ বছর বয়সে সুকান্ত যেভাবে লিখেছিল—বেঁচে থাকলে তিরিশ থেকে পয়ত্রিশ বছর বয়সেও সেই একই ভাবে লিখে যেত। সুকান্তকে আমি ছোট থেকে বড় হতে দেখেছি ব’লেই জানি, এক জায়গায় থেকে যাওয়া সুকান্তর পক্ষে অসম্ভব ছিল। ‘পূর্বাভাসে’ আর ‘ঘুম নেই’তে অনেক তফাত। তেমনি সুস্পষ্ট তফাত ‘ছাড়পত্রে’র প্রথম দিকের আর শেষ দিকের লেখায়।

    তাছাড়া কবিতা ছেড়ে সুকান্ত পরের জীবনে উপন্যাসে চলে যেত কিনা তাই বা কে বলতে পারে? বেঁচে থাকলে কী হত তা নিয়ে জল্পনা-কল্পনার আজ হয়ত কোনো মানে নেই, কিন্তু কাজে হাত দিয়েই সুকন্তকে চলে যেতে হয়েছে—এ কথা ভুলে গেলে সুকান্তর প্রতি অবিচার করা হবে।

    আমি আবার বলছি, ‘সুকান্ত-সমগ্র’তে এমন অনেক লেখা আছে, যে লেখা হয়ত সুকান্তের সাজে না। সুকান্ত দীর্ঘজীবী হলে ছেলে বয়সের সে সব লেখা হয়ত তার বইতে স্থানও পেত না—আমার মতামত চাইলে আমিও ছাপাবার বিরুদ্ধে রায় দিতাম।

    কিন্তু সুকান্তর অকালমৃত্যু আমাদেরও হাত বেঁধে দিয়েছে। সুকান্ত বেঁচে থাকলে যে জোর খাটানো যেত, এখন আর সে জোর খাটানো চলে না। ওর ছেলেবেলার লেখায় খোদকারি করেছি, বড় হওয়ার পরেও ওর লেখা নিয়ে খুঁত খুঁঁত করেছি—এই বিশ্বাসে যে, আমরা যাই বলি না কেন মানা না মানার শেষ বিচার ওর হাতে।

    এখন সুকান্তর লেখা আর সুকান্তর নয়—দেশের এবং দশের। আমার কিংবা আর কারো একার বিচার সেখানে খাটবে না। কাজেই যে লেখা যেমন তাকে ঠিক সেইভাবেই কালের দরবারে হাজিব করা ছাড়া আমাদের উপায় নেই। ‘সুকান্ত-সমগ্র’র সার্থকতা সেইখানেই।

    ভাবতে অবাক লাগে, সুকান্ত বেঁচে থাকলে আজ তার একচল্লিশ বছর বযস হত। কেমন দেখতে হত সুকান্তকে? জীবনে কোন অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে সে যেত? তার লেখার ধারা কোন্ পথে বাঁক নিত?

    অসুখে পড়বার অল্প কিছুদিন আগে একদিন ওয়েলিংটন স্কোয়ারের এক মিটিঙে যাবার পথে আমার এক সংশযেব জবাবে সুকান্ত বলেছিল: আমার কবিতা পড়ে পাটিব কর্মীরা যদি খুশি হয় তাহলেই আমি খুশি—কেননা এই দলবলই তত বাড়তে বাড়তে একদিন এ দেশের অধিকাংশ হবে।

    সেদিন তর্কে আমি ওকে হারাতে চেষ্টা করেছিলাম। আজ আমাকে মানতেই হবে, একদিক থেকে তার কথাটা মিথ্যে নয়। গত কুড়ি বছর ধরে সুকান্তব বই বাংলা দেশের প্রায় ঘরে ঘরে স্থান পেযেছে। পূর্ব পাকিস্তানে তার একটা ছাপা বই থেকে শ’য়ে শ’য়ে হাতে লিখে নকল করে লোকে সযত্নে ঘরে রেখেছে। তার পাঠককুল ক্রমান্বয়ে বেড়েছে। সুকান্ত মুখে যাই বলুক, আসলে সে শুধু পার্টির কর্মীদের জন্যেই লেখে নি। যে নতুন শক্তি সমাজে সেদিন মাথা তুলেছিল, সুকান্ত তার বুকে সাহস, চোখে অন্তদৃষ্টি আর কণ্ঠে ভাষা জুগিয়েছিল। এ কথাও ঠিক নয়, কাউকে খুশি করার জন্যে সুকান্ত লিখেছিল। তাগিদটা বাইরে থেকে আসে নি, এসেছিল তার নিজের ভেতর থেকে। পাঠকের সঙ্গে একাত্ম হয়ে আসলে নিজেকেই সে কবিতায় ঢেলে দিয়েছিল।

    কী ভাবে বলেছিল সেটাও দেখতে হবে। সুকান্তর আগে আর কেউ ওকথা ওভাবে বলে নি ব’লেই পাঠকেরা কান খাড়া করে তার কথা শুনেছেন। বলবার উদ্দেশ্যটা যাঁদের মনের মত ছিল না, বলবার গুণে তাঁরাও না শুনে পারেন নি।

    সুকান্তর মৃত্যুর পর শ্রীযুক্ত জগদীশ ভট্টাচার্য লিখেছিলেন: …যে কবির বাণী শোনবার জন্যে কবিগুরু কান পেতেছিলেন সুকান্ত সেই কবি। শৌখিন মজদুরি নয়, কৃষাণের জীবনের সে ছিল সত্যকার শরিক, কর্মে ও কথায় তাদেরই সঙ্গে ঘনিষ্ঠ আত্মীয়তা ছিল তার, মাটির রসে ঋদ্ধ ও পুষ্ট তার দেহমন। মাটির বুক থেকে সে উঠে এসেছিল।

    …. ব্যক্তিজীবনে সুকান্ত একটি বিশেষ রাজনৈতিক মতবাদে বিশ্বাসী ছিল।

    কিন্তু এই শেষ চার পংক্তিতে (‘আর মনে ক’রো আকাশে আছে এক ধ্রুব নক্ষত্র/ নদীর ধারায় আছে গতির নির্দেশ,/অরণ্যের মর্মরধ্বনিতে আছে আন্দোলনের ভাষা, আর আছে পৃথিবীর চিরকালের আবর্তন’: ঐতিহাসিক, ছাড়পত্র) কবি সুকান্ত যে আদর্শের কথা বলে গেছে তা পৃথিবীর সমস্ত মতবাদের চেয়ে প্রাচীন, সমস্ত আদর্শের চেয়েও বড়। …

    ‘…তার প্রথম দিকের অনেক রচনাতেই দলীয় শ্লোগান অতি স্পষ্ট ছিল; কিন্তু মনের বালকত্ব উত্তীর্ণ হবার সঙ্গে সঙ্গে তার আত্মবিশ্বাস আত্মপ্রকাশকে অনন্যপরতন্ত্র করে তুলেছিল।…

    (কবিকিশোর’: পরিচয় শারদীয়, ১৩৫৪)

    এ কিন্তু ভঙ্গি দিয়ে ভোলানো নয়, কবিতার গুণে দূরের মানুষকে কাছে টানা।

    সমসাময়িকদের মধ্যে যে কাজ আর কেউ পারে নি, সুকান্ত একা তা করেছে—আধুনিক বাংলা কবিতার দ্বার বহুজনের জন্যে সে খুলে দিয়ে গেছে। কবিতাবিমুখ পাঠকদের কবিতার রাজ্যে জয় ক’রে আনার কৃতিত্ব সুকান্তর। তারই সুফল আজ আমরা ভোগ করছি।

    সুকান্তর মৃত্যুর পর সুকান্তকে অনুকরণের একটা যুগ গেছে। কারো কারো এ ধারণাও হয়েছিল যে, রাজনৈতিক আন্দোলনই বুঝি সুকান্তকে তুলে ধরেছিল। সুকান্তর অক্ষম অনুকারকেরা কবিতার ভুষ্টিনাশ করে বক্তব্যকে বুলিসর্বস্ব ক’রে তুললেন। হিতে বিপরীত হল। একটা সময় এল, পাঠকেরা বেঁকে বসল-সেই পাঠকেরাই, যারা এর আগে এবং পরেও সুকান্ত পড়ে তৃপ্তি পেয়েছে।

    সুকান্তর সঙ্গে রাজনৈতিক আন্দোলনের তোলাতুলি বা কোলাকুলির সম্পর্ক ছিল না—এটা না বোঝার জন্যেই একদল কবির মধ্যে এক সময় রাজনীতি থেকে আশাভঙ্গজনিত পালাও-পালাও রব উঠেছিল। যে যার নিজের মধ্যে তাঁরা পালিয়ে গেলেন। তাতেও শেষ পর্যন্ত তাকদের মুশকিলের আশান হয় নি।

    ভুল হয়েছিল বুঝতে। সুকান্ত রাজনীতির কাধে চড়ে নি। রাজনীতিকে নিজের করে নিয়েছিল। রাজনৈতিক আন্দোলনও সুকান্তকে দিয়েছে তাই সানন্দ স্বীকৃতি। নিজেকে নিঃশর্তে জীবনের হাতে সঁপে দেওয়াতেই স্বতোৎসারিত হতে পেরেছিল সুকান্তর কবিতা।

    আজ যাঁরা সুকান্তর কবি প্রতিভাকে এই বলে উড়িয়ে দিতে চান যে, সুকান্তর কবিতায় শ্লোগান ছিল—তাঁদের বলতে চাই, সুকান্তর কবিতায় শ্লোগান নিশ্চয়ই ছিল। কবিতার জাত যাবার ভয়ে শ্লোগানগুলোকে রেখে ঢেকেও সে ব্যবহার করে নি। হাজার হাজার কণ্ঠে ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত যে ভাষা হাজার হাজার মানুষের নানা আবেগের তরঙ্গ তুলেছে, তাকে কবিতায় সাদরে গ্রহণ করতে পেরেছিল বলেই সুকান্ত সার্থক কবি। কবিতায় রাজনীতি থাকলেই যাদের কাছে মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যায়, তারা ভুলে যান—অরাজনৈতিক কবিতায়ও জিগির কিছু কম নেই। আসলে অপত্তিটা বোধহয় শ্লোগানে নয়, শ্লোগান বিশেষে-রাজনীতিতে নয়, রাজনীতি বিশেষে। তাঁদের কাছে অনুরোধ, কবিতার দোহাই না তুলে মনের কথাটা খুলে বলুন।

    কবিতায় সুকান্তই যে শেষ কথা, তার পথই যে একমাত্র পথ—মতিভ্রম হলে কেউ সে কথা বলবে না। সাহিত্যে অনুকাবকের স্থান নেই, এ তো সবাই জানে। সুকান্তর কবিতা সুকান্তকে ছাড়া আর কাউকেই মানাবে না। সুকান্তর পরবর্তী যে কবি সুকান্ত থেকে তফাত করবে, নিজেকে ছাড়িয়ে নেবে—সে আমাদের প্রশংসা পাবে। কেননা আত্মমর্যাদা না থাকলে অন্যকে মর্যাদা দেওয়া যায় না। সুকান্তকে ছাড়িয়ে যাওয়াই হবে সুকান্তকে সম্মান জানানো।

    আমার এ ভূমিকা, বিশেষ করে, সুকান্তর আজকের পাঠকদের জন্যে। আমি সমালোচক নই। বাংলা সাহিত্যে সুকান্তর কী দান, কোথায় তার স্থান—সে সব স্থির করবার জন্যে যোগ্য ব্যক্তিরা আছেন। সুকান্ত-সমগ্র পাঠকদের হাতে ধরিয়ে দিয়েই আমি খালাস।

    যে কথা দিয়ে শুরু করেছিলাম, শেষ করবার আগে সেই কথাতেই আবার ফিরে আসতে চাই। মনে রাখবেন, সুকান্তর বয়স আজ একচল্লিশ নয়। আজও একুশ।

    সুকান্তর জন্ম বাংলা ১৩৩৩ সালের ৩০শে শ্রাবণ। সুকান্তর বাবা স্বর্গত নিবারণচন্দ্র ভট্টাচার্য। কলকাতায় কালীঘাটে মাতামহের ৪২, মহিম হালদার স্ট্রিটের বাড়িতে সুকান্তর জন্ম। সুকান্তর জীবনের অনেক কথাই সুকান্তর ছোট ভাই অশোক ভট্টাচার্যের লেখা কবি-সুকান্ত পড়ে জেনে নিতে পারবেন। আমি শুধু তার একুশ বছরের জীবনের কয়েকটা দিক মোটা দাগে তুলে ধরতে চাই।

    সুকান্তদের পৈতৃক ভিটে ছিল ফরিদপুর জেলায়। সুকান্তর জ্যাঠামশাই ছিলেন সংস্কৃতে পণ্ডিত। বাড়িতে ছিল সংস্কৃত পঠনপাঠনেব আবহাওয়া। পরে এই প্রাচীন পন্থার পাশাপাশি উঠতি বয়সীদের আধুনিক চিন্তা-ভাবনার একটা পরিমণ্ডলও গড়ে ওঠে। সুকান্ত ছেলেবেলায় মা-র মুখে শুনেছে কাশীদাসী মহাভারত আর কৃত্তিবাসী রামায়ণ। সুকান্তর বাবা আর জ্যাঠামশাই অসহায় অবস্থা থেকে নিজেদের পুরুষকারের জোরে বিদেশ বিভুঁইতে এসে বড় হয়েছিলেন। বইয়ের প্রকাশ ব্যবসা ছাড়াও সুকান্তর বাবা আর জ্যাঠামশাইয়ের ছিল যজমানি আর পণ্ডিত বিদায়ের আয়। বেলেঘাটায় নিজেদের বাড়ি ছেড়ে পৃথক হওয়ার আগে পর্যন্ত যৌথ পরিবার স্বচ্ছলভাবেই চলত। সুকান্তর মাতামহ পণ্ডিত বংশের মানুষ হয়েও প্রাচীন সংস্কার থেকে মুক্ত ছিলেন। এরই ভেতর দিয়ে বহু আত্মীয়স্বজনের ভিড়ে হেসে খেলে কেটেছিল সুকান্তর শৈশব। ন-দশ বছর বয়স থেকেই সে ছড়া লিখে বাড়িতে কবি হিসেবে নাম কিনেছিল। লেখার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলত নানারকমের বই পড়া। সুকান্ত ছোট থাকতেই ক্যান্সার রোগে সুকান্তর মা মারা গেলেন। ছেলেবেলা থেকেই সুকান্তর ছিল অন্তর্মুখী মন। ইস্কুলে সুকান্ত বন্ধু হিসেবে পেয়েছিল পরবর্তীকালের যশস্বী কবি অরুণাচল বসুকে। অরুণাচলের মা সরলা বসুর (‘জলবনের কাব্য’র লেখিকা) প্রভাব সুকান্তর জীবনে কম নয়। খেলার মধ্যে তার প্রিয় ছিল ব্যাডমিণ্টন আর দাবা। পরোপকারে ছেলেবেলা থেকেই দল বাঁধায় তার ছিল প্রবল উৎসাহ। শহরে মানুষ হ’লেও সুকান্ত ছিল গাছপালা মাঠ আকাশের ভক্ত।

    পরের জীবন মোটামুটি তার কবিতায়ই পাওয়া যাবে। সুকান্তর কবিতা কখনই তার জীবন থেকে আলাদা নয়।

    তবু সুকান্তর একটা নতুন দিক ‘সুকান্ত-সমগ্র’তে তার চিঠিপত্রে পাঠকদের কাছে এই প্রথম ধরা পড়বে। যখন তারা পড়বেন:

    ‘বাস্তবিক, আমি কোথাও চলে যেতে চাই, নিরুদ্দেশ হয়ে মিলিয়ে যেতে চাই…কোনো গহন অরণ্যে কিংবা অন্য যে কোনো নিভৃততম প্রদেশে, যেখানে মানুষ নেই, আছে কেবল সূর্যের আলোর মতো স্পষ্টমনা হিংস্র আর নিরীহ জীবের আর অফুরন্ত প্রাকৃতিক সম্পদ।…

    কিংবা।

    ‘সেখানে আমি ঘন ঘন যেতে লাগলুম।•••ওর আকর্ষণে অবিশ্যি নয়। বাস্তবিক আমাদের সম্পর্ক তখনও অন্য ধরনের ছিল, সম্পূর্ণ অকলঙ্ক, ভাইবোনের মতোই। (পত্রগুচ্ছ)

    কিংবা যে চিঠিতে পার্টি সম্পর্কেও সুকান্ত অভিমান প্রকাশ করেছে।

    এ কি আমাদের সেই একই সুকান্ত? ‘ছাড়পত্র’ আর ‘ঘুম নেই’-এর?

    হ্যাঁ, একই সুকান্ত। কখনও বিষন্ন, কখনও আশায় উন্মুখ। কখনও আঘাতে কাতর, কখনও সাহসে দুর্জয়। কখনও চায় জনতা, কখনও নির্জনতা। কোথাও ভালবাসার কথা মুখ ফুটে বলতেই পারে না, কোথাও ঘৃণায় হুংকার দিয়ে ওঠে।

    সুকান্ত কাগজের মানুষ নয়, রক্তমাংসের মানুষ। তার আত্মবিশ্বাস কখনও কখনও অহমিকাকে স্পর্শ করে, তার যুক্তি কখনও কখনও আবেগে ভেঙে পড়ে।

    সুকান্ত বড় কবি হলেও বয়স তার একুশ পেরোয় নি। তার বেশীর ভাগ লেখাই আরও কম বয়সের।

    ‘সুকান্ত-সমগ্র’ সুকান্তর মহৎ সম্ভাবনাকে মনে কবিয়ে দিয়ে বাংলা সাহিত্যে তার অভাববোধকে নিরন্তর জাগিয়ে রাখবে।

    আমি মাঝে মাঝে ভাবি, বেঁচে থাকলে এতদিনে সুকান্তর এত বছর বয়স হত। কী লিখত সে? কেমন দেখতে হত?

    তখন আমার চোখে তার ছবিটাই বদলে যায়।

    ৩১ শে শ্রাবণ, ১৩৭৪

    সুভাষ মুখোপাধ্যায়

  • সূচিপত্র

    সূচিপত্র


    প্রকাশকের কথা

    ‘সুকান্ত-সমগ্র’র ষষ্ঠ সংস্করণে গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন ও পরিবর্তন করা হল। ‘ক্ষুধা’, ‘দুর্বোধ্য’, ‘ভদ্রলোক’, ‘দরদ কিশোর ও “কিশোরের স্বপ্ন’—এই পাঁচটি গল্প এবং ‘ছন্দ ও অণবৃত্তি’ প্রবন্ধটি এই সংস্করণে সংযোজিত হয়েছে। এছাড়া সংযুক্ত হয়েছে ‘ব্যর্থতা’ ও ‘দেবদারু গাছে রোদের ঝলক’ কবিতা দুটি এবং একাধিক চিঠি। পত্রগুচ্ছ ও অপ্রচলিত রচনা-সমূহ রচনার কালক্রম অনুসারে সাজানো হল। বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় যে সব রচনা প্রকাশিত হয়েছে ও পাওয়া গেছে, সে সবই সুকান্ত-সমগ্রের অন্তভুক্তি হয়েছে। আয়তন বৃদ্ধি সত্ত্বেও এই সংস্করণের দাম বাড়ানো হল না।

    প্রকাশক

    গ্রন্থতালিকা

  • ছাড়পত্র

    ছাড়পত্র

    ছাড়পত্র

    ছাড়পত্র সুকান্ত ভট্টাচার্য রচিত ১৯৪৮ সালে প্রকাশিত বাংলা কাব্যগ্রন্থ। এই গ্রন্থের কবিতাগুলো রচিত হয় ১৯৪৩ থেকে ১৯৪৭ সালের মধ্যে। মাত্র একুশ বছর বয়সে সুকান্ত মারা যাবার কিছুদিন পূর্বে এই কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়।

    সুকান্ত যখন রোগাক্রান্ত হয়ে শয্যাশায়ী, ঠিক সে মুহুর্তেও তার সাহিত্যচর্চার ব্যাঘাত ঘটে নি। অসুস্থ অবস্থায় নিজেদের ঘরের সিঁড়ি দেখে শোষক শ্রেণী আর শোষিতের প্রতিক বানিয়ে লিখলেন “সিঁড়ি”। এভাবে এ কাব্যগ্রন্থের “চিল”, “সিগারেট” ও “চারাগাছ” লিখলেন তিনি। যেগুলো দিয়ে এই কাব্যগ্রন্থ “ছাড়পত্র”।

    কাব্যটি উৎসর্গ করা হয়—

    শ্রদ্ধেয় মুজফ্‌ফর আহ্‌মদ-কে

    প্রথম সংস্করণের ভূমিকা

    সুকান্ত তার নিজের প্রথম কবিতার বই দেখে যেতে পারল না—চিরদিন আমাদের এই আক্ষেপ থেকে যাবে। সুকান্তর বই প্রকাশের ভার আমরাই গ্রহণ করেছিলাম; তাই আমাদের প্রত্যেকটা ভুলত্রুটি আজ পর্বতপ্রমাণ হয়ে স্মৃতিকে ভারাক্রান্ত করে তুলছে।

    সুকান্তর মৃত্যুর কয়েকটা দিন আগের কথা আজ বড় বেশী মনে পড়ছে। এই বইয়ের সমস্ত কবিতার ছাপানো ফাইল হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে যখন সুকান্তর হাতে দিলাম, তখন আনন্দে উঠে বসেছিল সুকান্ত। বই তাহ’লে সত্যিই বেরোচ্ছে। আসার সময় সুকান্তকে কথা দিয়ে এসেছিলাম—বই বেরোতে আর এক সপ্তাহ। সে সপ্তাহ না যেতেই সুকান্ত আমাদের ছেড়ে চলে গেল।

    নামকরণের জন্যেই বইটা বেরোতে এত দেরি হচ্ছিল। বই যখন প্রেসে দেওয়া হয়, সুকান্ত তখন শয্যাগত—বইয়ের নাম তখনও সে ঠিক ক’রে উঠতে পারেনি। পরে সে এত বেশী অসুস্থ হয়ে পড়ল যে, নামকরণের ভার আমাদেরই নিতে হয়। কিন্তু কোন নামই আমাদের পছন্দ হচ্ছিল না। কোন রকমে জোড়াতালি দিয়ে যখন নাম ঠিক হ’ল, প্রচ্ছদপটও আঁকতে দেওয়া হ’ল—তখন অকস্মাৎ বজ্রাঘাতের মত এল সুকান্তর মৃত্যুর খবর। তারপর বইয়ের নাম বদ্‌লে প্রথম কবিতার নামে বইয়ের নাম রাখা হ’ল ‘ছাড়পত্র’।

    ‘ছাড়পত্রে’র সমস্ত কবিতাই ১৯৪৩ থেকে ১৯৪৭-এর মধ্যে লেখা। এ ছাড়াও, বইতে নেই এমন বহু কবিতা এখানে সেখানে ছড়িয়ে আছে। তাড়াতাড়িতে গোড়ার দিকে সেগুলো সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি। সুকান্তর মৃত্যুর পরে তার লেখার ঝুলিতে আরও বহু অপ্রকাশিত কবিতা পাওয়া যায়। এই সংকলনের সঙ্গে সেই সমস্ত কবিতাও জুড়ে দেবার কথা হয়। কিন্তু তা করতে গেলে আরও বেশী সময় লাগবে এবং বইটাও আকারে বেশী বড় হয়ে যাবে,—এই আশঙ্কা ক’রে ‘ছাড়পত্র’কে বর্তমান আকারেই বার করা এবং অন্যান্য কবিতা নিয়ে সুকান্তর দ্বিতীয় একটি কবিতা-সংগ্রহ বার করার সিদ্ধান্ত হয়। এই অনিশ্চয়তার জন্যে বই প্রকাশে আরও বেশী বিলম্ব হয়ে গেল; ‘ছাড়পত্র’ প্রকাশের ব্যাপারে আমি গোড়া থেকে জড়িত ছিলাম বলেই এই বিলম্বের জন্য প্রকাশকদের পক্ষ থেকে পাঠকসমাজের কাছে ক্ষমা চাইছি।

    ‘ছাড়পত্রে’র কবিতাগুলি রচনার কালানুক্রমে সাজানো হয় নি। পর পর সাজানোর ব্যাপারে মোটামুটি ভারসাম্য ও ছন্দোবৈচিত্রের দিকে লক্ষ্য রাখা হয়েছে। তার ফলে প্রথম দিকে বহু নতুন ও শেষের দিকে বহু পুরানো কবিতাকে স্থান দিতে হয়েছে। ‘চারাগাছ’, ‘প্রার্থী’, ‘একটি মোরগের কাহিনী’, ‘সিঁড়ি’, ‘সিগারেট’ প্রভৃতি কবিতা সুকান্তর রোগশয্যায় লেখা; ‘ফসলের ডাক’, ‘কৃষকের গান’, ‘এই নবান্নে’, ‘আঠারো বছর বয়স’ প্রভৃতি কবিতা চার-পাঁচ বছর আগেকার লেখা—সুকান্তর বয়স তখন পনেরো ষোল। ‘রবীন্দ্রনাথের প্রতি’, ‘প্রস্তুত’, ‘দুরাশার মৃত্যু’, সম্ভবত তারও আগের লেখা।

    ১৯৪৩ থেকে ১৯৪৭ সাল—যুগসন্ধির এই পাঁচটা বছর ধরে ‘ছাড়পত্রে’র রচনাকাল। একদিকে মৃত্যুকীর্ণ যুদ্ধ আর দুর্ভিক্ষ, বন্যা আর মহামারী, অন্যদিকে জীবনপ্রতিষ্ঠার মৃত্যুপণ সংগ্রাম—জয়পরাজয় আর উত্থানপতনে, সুখদুঃখ আর আশানিরাশায় ঘেরা এই পাঁচটা বছর ‘ছাড়পত্রে’ উৎকীর্ণ হয়ে আছে। কোটি কোটি মানুষের বলিষ্ঠ আশা কবির কণ্ঠে নির্ভীক ঘোষণায় ফুটে উঠেছে।

    —সুকান্ত নতুন যুগের সার্থক কবি। সাধারণ মানুষের সঙ্গে এমন একাত্মতা, সহজ কথা সোজাসুজি বলতে পারার এমন দুঃসাহসী ক্ষমতা লুকাস্তর সমসাময়িক আর কোন কবি দেখাতে পেরেছেন কিনা সন্দেহ। বয়সে সর্বকনিষ্ঠ হয়েও কবিত্বশক্তিতে সুকান্ত ছিল অগ্রগণ্যদের একজন। ইস্কুলের ছাত্র অবস্থায় দেশজোড়া এত বিরাট খ্যাতি বাংলার আর কোন কবির ভাগ্যেই বোধহয় জোটেনি। এই বয়সেই বিদেশে সুকান্তর একাধিক কবিতার অনুবাদ হয়েছে, তার কবিতা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

    সুকান্তর কবিতা যাঁরা পড়বেন, তাঁরা একথা স্বীকার করবেন যে, সুকান্তর কবিতা শুধুই বিরাট সম্ভাবনার ইঙ্গিত নয়, তাতে আছে মহৎ পরিণতির সুস্পষ্ট পদধ্বনি। ‘ছাড়পত্র’ তাই বাংলা সাহিত্যে স্থায়ী আসন পাবে।

    কবিতার বিচিত্র কলাকৌশলে, ছন্দের আশ্চর্য দক্ষতায়, শব্দনির্বাচনের অশেষ নৈপুণ্যে এই কবি কিশোর রাজনৈতিক বিরুদ্ধবাদীদেরও অভিভূত করেছে। কিন্তু আঙ্গিকের মায়ায় সুকান্ত কখনও বাঁধা পড়েনি। ‘ছাড়পত্রে’র প্রথম যুগের কবিতার সঙ্গে পরের যুগের কবিতা মিলিয়ে দেখলে তা স্পষ্ট বোঝা যায়। ‘ঠিকানা’ কিম্বা ‘বোধনে’র সঙ্গে ‘প্রার্থী’র তফাৎ অনেক। ‘প্রার্থী’তে এসে সুকান্ত সম্পূর্ণ একটা নতুন পথের সন্ধান পেয়েছে। পদ্যছন্দ বর্জন ক’রে সহজ নিরাভরণ গদ্যে সে যে আকুতি প্রকাশ করেছে, তা অন্য কোন উপায়ে প্রকাশ করা সম্ভব ছিল না। ‘আর উত্তাপ দিও রাস্তার ধারের ঐ উলঙ্গ ছেলেটাকে’—করুণা বা অনুকম্পার কথা নয়, জ্বলন্ত বিশ্বাসের অগ্নিগর্ভ বাণী।

    সুকান্তর প্রথম দিকের কবিতায় তার জীবনদর্শন একটু বেশী রকমের প্রকট মনে হতে পারে। হয়ত অতটা স্পষ্টবাদিতা অনেকের পছন্দ হবে না। যেখানে সমাজের শত্রুদের সে নাম ক’রে ক’রে চিনিয়ে দিয়েছে, যেখানে সে সংগ্রামের অগ্নিবর্ণ পথে পাঠকদের হাত ধ’রে ডেকেছে—সেখানে কবিতার সীমানা নিয়ে মতান্তর হতে পারে। কিন্তু সুকান্তর শেষের দিকে লেখা ‘খবর’, ‘চিল’, ‘প্রার্থী’ প্রভৃতি কাউকেই মুগ্ধ না ক’রে পারে না। শেষোক্ত কবিতাগুলি যে অনেক বেশী গভীর, অনেক বেশী মর্মস্পর্শী—এ বিষয়ে আমার সন্দেহ নেই।

    ‘ছাড়পত্রে’র কাব্যবিচার আমার উদ্দেশ্য নয়, সে ক্ষমতাও আমার নেই। সুকান্তর কবিতার ক্রমবিকাশের সঙ্গে আমার যেটুকু পরিচয়, সেইটুকুই শুধু এখানে ধরিয়ে দেবার চেষ্টা করেছি।

    সুকান্তর সেই সমস্ত অজ্ঞাতনামা বন্ধুদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই, যাঁরা কষ্ট ক’রে কবিতাগুলি বিভিন্ন পত্রিকা থেকে সংগ্রহ ক’রে দিয়েছিলেন। ‘ছাড়পত্রে’র প্রচ্ছদপট এঁকে দিয়েছেন খ্যাতনামা শিল্পী সত্যজিৎ রায়—তাঁকে অজস্র ধন্যবাদ। এ ছাড়াও অন্যান্য বহু বন্ধু নানাভাবে সাহায্য ক’রে বাধিত করেছেন। পরবর্তী সংস্করণ যাতে ত্রুটিহীন হ’য়ে উঠতে পারে তার জন্যে পাঠকপাঠিকাদের সহযোগিতা কামনা করি।

    সুভাষ মুখোপাধ্যায়

    দ্বিতীয় সংস্করণের ভূমিকা

    অনেকদিন আগেই ‘ছাড়পত্রে’র প্রথম সংস্করণ নিঃশেষিত হয়। কিন্তু নানা অসুবিধার দরুণ এতদিন প্রকাশকদের পক্ষে দ্বিতীয় সংস্করণ ছাপানো সম্ভব হয়ে উঠেনি।

    এই সংস্করণ সম্পর্কে নতুন করে কিছু বলবার নেই। কয়েকটি নতুন কবিতা এই সংস্করণে দেওয়া হ’ল—‘দেশলাই কাঠি’, ‘সেপ্টেম্বর ’৪৬’ এবং পদ্য ছন্দে ‘কাশ্মীর’।

    যারা এতদিন অধীর আগ্রহ নিয়ে ‘ছাড়পত্রে’র দ্বিতীয় সংস্করণের জন্যে অপেক্ষা করেছেন, তাঁদের আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই।

    সু. মু.

    তৃতীয় সংস্করণের ভূমিকা

    ‘ছাড়পত্রে’র তৃতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হ’ল—এই সানন্দ ঘোষণা ছাড়া নতুন ক’রে বলবার কিছু নেই। তৃতীয় সংস্করণে নতুন কোন কবিতা যোগ করা হয় নি; কিন্তু দুটি জায়গায় সামান্য সংশোধন করা হয়েছে। ‘কাশ্মীর’ শীর্ষক ২নং কবিতাটির শেষের দিকে ‘কাশ্মীর চঞ্চল—স্রোত লক্ষ’ বদলিয়ে ‘কাশ্মীর আজ চঞ্চল—স্রোত লক্ষ’ এবং ‘সেপ্টেম্বর ১৯৪৬’ কবিতার শেষের দিকে ‘আজকের কলকাতার প্রার্থনার’ জায়গায় ‘আজকের কলকাতার এ প্রার্থনা’ করা হয়েছে। তার কারণ, এই দুটি জায়গায় পড়তে গেলে আট্‌কায়। সুকান্তর হস্তলিখিত কপি যোগাড় ক’রে উঠতে না পারায় ছাপানো কবিতার সঙ্গে মূল লেখা মিলিয়ে দেখা সম্ভব হ’ল না। যাই হ’ক আশা করা যায় আগামী সংস্করণ বার হবার আগে কবিতাটি মিলিয়ে দেখে নিঃসংশয় হওয়া যাবে।

    কাগজ ও ছাপার দর বৃদ্ধির দরুণ বর্তমান সংস্করণটির মূল্য সামান্য বাড়াতে হ’ল। আশা করি পাঠকেরা মার্জনা করবেন।

    সু. মু.

  • ছাড়পত্র (কবিতা)

    ছাড়পত্র (কবিতা)

    ছাড়পত্র (কবিতা)

    যে শিশু ভূমিষ্ঠ হল আজ রাত্রে

    তার মুখে খবর পেলুম :

    সে পেয়েছে ছাড়পত্র এক,

    নতুন বিশ্বের দ্বারে তাই ব্যক্ত করে অধিকার

    জন্মমাত্র সুতীব্র চিৎকারে।

    খর্বদেহ নিঃসহায়, তবু তার মুষ্টিবদ্ধ হাত

    উত্তোলিত, উদ্ভাসিত

    কী এক দুর্বোধ্য প্রতিজ্ঞায়।

    সে ভাষা বোঝে না কেউ,

    কেউ হাসে, কেউ করে মৃদু তিরস্কার।

    আমি কিন্তু মনে মনে বুঝেছি সে ভাষা।

    পেয়েছি নতুন চিঠি আসন্ন যুগের—

    পরিচয়-পত্র পড়ি ভূমিষ্ঠ শিশুর

    অস্পষ্ট কুয়াশাভরা চোখে।

    এসেছে নতুন শিশু, তাকে ছেড়ে দিতে হবে স্থান;

    জীর্ণ পৃথিবীতে ব্যর্থ, মৃত আর ধ্বংসস্তূপ-পিঠে

    চ’লে যেতে হবে আমাদের।

    চ’লে যাব— তবু আজ যতক্ষণ দেহে আছে প্রাণ

    প্রাণপণে পৃথিবীর সরাব জঞ্জাল,

    এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য ক’রে যাব আমি—

    নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার।

    অবশেষে সব কাজ সেরে

    আমার দেহের রক্তে নতুন শিশুকে

    করে যাব আশীর্বাদ,

    তারপর হব ইতিহাস॥

  • আগামী

    আগামী

    আগামী

    জড় নই, মৃত নই, নই অন্ধকারের খনিজ,

    আমি তো জীবন্ত প্রাণ, আমি এক অঙ্কুরিত বীজ;

    মাটিতে লালিত ভীরু, শুধু আজ আকাশের ডাকে

    মেলেছি সন্দিগ্ধ চোখ, স্বপ্ন ঘিরে রয়েছে আমাকে।

    যদিও নগণ্য আমি, তুচ্ছ বটবৃক্ষের সমাজে

    তবু ক্ষুদ্র এ শরীরে গোপনে মর্মরধ্বনি বাজে,

    বিদীর্ণ করেছি মাটি, দেখেছি আলোর আনাগোনা

    শিকড়ে আমার তাই অরণ্যের বিশাল চেতনা।

    আজ শুধু অঙ্কুরিত, জানি কাল ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পাতা

    উদ্দাম হাওয়ার তালে তাল রেখে নেড়ে যাবে মাথা;

    তারপর দৃপ্ত শাখা মেলে দেব সবার সম্মুখে,

    ফোটাব বিস্মিত ফুল প্রতিবেশী গাছেদের মুখে।

    সংহত কঠিন ঝড়ে দৃঢ়প্রাণ প্রত্যেক শিকড়;

    শাখায় শাখায় বাধা, প্রত্যাহত হবে জানি ঝড়;

    অঙ্কুরিত বন্ধু যত মাথা তুলে আমারই আহ্বানে

    জানি তারা মুখরিত হবে নব অরণ্যের গানে।

    আগামী বসন্তে জেনো মিশে যাব বৃহতের দলে;

    জয়ধ্বনি কিশলয়ে : সম্বর্ধনা জানাবে সকলে।

    ক্ষুদ্র আমি তুচ্ছ নই— জানি আমি ভাবী বনস্পতি,

    বৃষ্টির, মাটির রসে পাই আমি তারি তো সম্মতি।

    সেদিন ছায়ায় এসো; হানো যদি কঠিন কুঠারে,

    তবুও তোমায় আমি হাতছানি দেব বারে বারে;

    ফল দেব, ফুল দেব, দেব আমি পাখিরও কূজন

    একই মাটিতে পুষ্ট তোমাদের আপনার জন॥

  • রবীন্দ্রনাথের প্রতি

    রবীন্দ্রনাথের প্রতি

    রবীন্দ্রনাথের প্রতি

    এখনো আমার মনে তোমার উজ্জ্বল উপস্থিতি,

    প্রত্যেক নিভৃত ক্ষণে মত্ততা ছড়ায় যথারীতি,

    এখনো তোমার গানে সহসা উদ্বেল হয়ে উঠি,

    নির্ভয়ে উপেক্ষা করি জঠরের নিঃশব্দ ভ্রূকুটি।

    এখনো প্রাণের স্তরে স্তরে,

    তোমার দানের মাটি সোনার ফসল তুলে ধরে।

    এখনো স্বগত ভাবাবেগে

    মনের গভীর অন্ধকারে তোমার সৃষ্টিরা থাকে জেগে।

    তবুও ক্ষুধিত দিন ক্রমশ সাম্রাজ্য গড়ে তোলে,

    গোপনে লাঞ্ছিত হই হানাদারী মৃত্যুর কবলে;

    যদিও রক্তাক্ত দিন, তবু দৃপ্ত তোমার সৃষ্টিকে

    এখনো প্রতিষ্ঠা করি আমার মনের দিকে দিকে।

    তবুও নিশ্চিত উপবাস

    আমার মনের প্রান্তে নিয়ত ছড়ায় দীর্ঘশ্বাস—

    আমি এক দুর্ভিক্ষের কবি,

    প্রত্যহ দুঃস্বপ্ন দেখি, মৃত্যুর সুস্পষ্ট প্রতিচ্ছবি।

    আমার বসন্ত কাটে খাদ্যের সারিতে প্রতীক্ষায়,

    আমার বিনিদ্র রাতে সতর্ক সাইরেন ডেকে যায়,

    আমার রোমাঞ্চ লাগে অযথা নিষ্ঠুর রক্তপাতে,

    আমার বিস্ময় জাগে নিষ্ঠুর শৃঙ্খল দুই হাতে।

    তাই আজ আমারো বিশ্বাস,

    “শান্তির ললিত বাণী শোনাইবে ব্যর্থ পরিহাস।”

    তাই আমি চেয়ে দেখি প্রতিজ্ঞা প্রস্তুত ঘরে ঘরে,

    দানবের সাথে আজ সংগ্রামের তরে॥

  • চারাগাছ

    চারাগাছ

    চারাগাছ

    ভাঙা কুঁড়ে ঘরে থাকি :

    পাশে এক বিরাট প্রাসাদ

    প্রতিদিন চোখে পড়ে;

    সে প্রাসাদ কী দুঃসহ স্পর্ধায় প্রত্যহ

    আকাশকে বন্ধুত্ব জানায়;

    আমি তাই চেয়ে চেয়ে দেখি।

    চেয়ে চেয়ে দেখি আর মনে মনে ভাবি—

    এ অট্টালিকার প্রতি ইঁটের হৃদয়ে

    অনেক কাহিনী আছে অত্যন্ত গোপনে,

    ঘামের, রক্তের আর চোখের জলের।

    তবু এই প্রাসাদকে প্রতিদিন হাজারে হাজারে

    সেলাম জানায় লোকে, চেয়ে থাকে বিমূঢ় বিস্ময়ে।

    আমি তাই এ প্রাসাদে এতকাল ঐশ্বর্য দেখেছি,

    দেখেছি উদ্ধত এক বনিয়াদী কীর্তির মহিমা।

    হঠাৎ সেদিন

    চকিত বিস্ময়ে দেখি

    অত্যন্ত প্রাচীন সেই প্রাসাদের কার্নিশের ধারে

    অশ্বত্থ গাছের চারা।

    অমনি পৃথিবী

    আমার চোখের আর মনের পর্দায়

    আসন্ন দিনের ছবি মেলে দিল একটি পলকে।

    ছোট ছোট চারাগাছ—

    রসহীন খাদ্যহীন কার্নিশের ধারে

    বলিষ্ঠ শিশুর মতো বেড়ে ওঠে দুরন্ত উচ্ছ্বাসে।

    হঠাৎ চকিতে,

    এ শিশুর মদ্যে আমি দেখি এক বৃদ্ধ মহীরুহ

    শিকড়ে শিকড়ে আনে অবাধ্য ফাটল

    উদ্ধত প্রাচীন সেই বনিয়াদী প্রাসাদের দেহে।

    ছোট ছোট চারাগাছ—

    নিঃশব্দে হাওয়ায় দোলে, কান পেতে শোনে :

    প্রত্যেক ইঁটের নীচে ঢাকা বহু গোপন কাহিনী

    রক্তের, ঘামের আর চোখের জলের।

    তাইতো অবাক আমি দেখি যত অশ্বত্থচারায়

    গোপনে বিদ্রোহ জমে, জমে দেহে শক্তির বারুদ;

    প্রাসাদ-বিদীর্ণ-করা বন্যা আসে শিকড়ে শিকড়ে।

    মনে হয়, এই সব অশ্বত্থ-শিশুর

    রক্তের, ঘামের আর চোখের জলের

    ধারায় ধারায় জন্ম,

    ওরা তাই বিদ্রোহের দূত॥

  • খবর

    খবর

    খবর

    খবর আসে!

    দিগ্‌দিগন্ত থেকে বিদ্যুদ্‌বাহিনী খবর;

    যুদ্ধ, বিদ্রোহ, বন্যা, দুর্ভিক্ষ ঝড়

    —এখানে সাংবাদিকতার নৈশ নৈঃশব্দ্য।

    রাত গভীর হয় যন্ত্রের ঝঙ্কৃত ছন্দে— প্রকাশের ব্যগ্রতায়;

    তোমাদের জীবনে যখন নিদ্রাভিভূত মধ্যরাত্রি

    চোখে স্বপ্ন আর ঘরে অন্ধকার।

    অতল অদৃশ্য কথার সমুদ্র থেকে নিঃশব্দ শব্দেরা উঠে আসে;

    অভস্ত হাতে খবর সাজাই—

    ভাষা থেকে ভাষান্তর করতে কখনো চমকে উঠি,

    দেখি যুগ থেকে যুগান্তর।

    কখনো হাত কেঁপে ওঠে খবর দিতে;

    বাইশে শ্রাবণ, বাইশে জুনে।

    তোমাদের ঘুমের অন্ধকার পথ বেয়ে

    খবর-পরীরা এখানে আসে তোমাদের আগে,

    তাদের পেয়ে কখনো কণ্ঠে নামে ব্যথা, কখনো বা আসে গান;

    সকালে দিনের আলোয় যখন তোমাদের কাছে তারা পৌঁছোয়

    তখন আমাদের চোখে তাদের ডানা ঝরে গেছে।

    তোমরা খবর পাও,

    শুধু খবর রাখো না কারো বিনিদ্র চোখ আর উৎকর্ণ কানের।

    ঐ কম্পোজিটর কি কখনো চমকে ওঠে নিখুঁত যান্ত্রিকতার কোনো ফাঁকে?

    পুরনো ভাঙা চশমায় ঝাপসা মনে হয় পৃথিবী—

    ৯ই আগস্টে কি আসাম সীমান্ত আক্রমণে?

    জ্বলে ওঠে কি স্তালিনগ্রাদের প্রতিরোধে, মহাত্মাজীর মুক্তিতে,

    প্যারিসের অভ্যুত্থানে?

    দুঃসংবাদকে মনে হয় না কি

    কালো অক্ষরের পরিচ্ছদে শোকযাত্রা?

    যে খবর প্রাণের পক্ষপাতিত্বে অভিষিক্ত

    আত্মপ্রকাশ করে নাকি বড় হরফের সম্মানে?

    এ প্রশ্ন অব্যক্ত অনুচ্চারিত থাকে

    ভোরবেলাকার কাগজের পরিচ্ছন্ন ভাঁজে ভাঁজে।

    শুধু আমরা দৈনন্দিন ইতিহাস লিখি!

    তবু ইতিহাস মনে রাখবে না আমাদের—

    কে আর মনে রাখে নবান্নের দিনে কাটা দানের গুচ্ছকে?

    কিন্তু মনে রেখো তোমাদের আগেই আমরা খবর পাই

    মধ্যরাত্রির অন্ধকারে

    তোমাদের তন্দ্রার অগোচরেও।

    তাই তোমাদের আগেই খবর-পরীরা এসেছে আমাদের চেতনার পথ বেয়ে

    আমার হৃদ্‌যন্ত্রে ঘা লেগে বেজে উঠেছে কয়েকটি কথা—

    পৃথিবী মুক্ত— জনগণ চূড়ান্ত সংগ্রামে জয়ী।

    তোমাদের ঘরে আজো অন্ধকার, চোখে স্বপ্ন।

    কিন্তু জানি একদিন সে সকাল আসবেই

    যেদিন এই খবর পাবে প্রত্যেকের চোখেমুখে

    সকালের আলোয়, ঘাসে ঘাসে পাতায় পাতায়।

    আজ তোমরা এখনো ঘুমে॥

  • ইউরোপের উদ্দেশে

    ইউরোপের উদ্দেশে

    ইউরোপের উদ্দেশে

    ওখানে এখন মে-মাস তুষার-গলানো দিন,

    এখানে অগ্নি-ঝরা বৈশাখ নিদ্রাহীন;

    হয়তো ওখানে শুরু মন্থর দক্ষিণ হাওয়া;

    এখানে বোশেখী ঝড়ের ঝাপ্টা পশ্চাৎ ধাওয়া;

    এখানে সেখানে ফুল ফোটে আজ তোমাদের দেশে

    কত রঙ, কত বিচিত্র নিশি দেখা দেয় এসে।

    ঘর ছেড়ে পথে বেরিয়ে পড়েছে কত ছেলেমেয়ে

    এই বসন্তে কত উৎসব কত গান গেয়ে।

    এখানে তো ফুল শুকনো, ধূসর রঙের ধুলোয়

    খাঁ-খাঁ করে সারা দেশটা, শান্তি গিয়েছে চুলোয়।

    কঠিন রোদের ভয়ে ছেলেমেয়ে বন্ধ ঘরে,

    সব চুপচাপ : জাগবে হয়তো বোশেখী ঝড়ে।

    অনেক খাটুনি, অনেক লড়াই করার শেষে

    চারিদিকে ক্রমে ফুলের বাগান তোমাদের দেশে;

    এদেশে যুদ্ধ মহামারী, ভুখা জ্বলে হাড়ে হাড়ে—

    অগ্নিবর্ষী গ্রীষ্মের মাঠে তাই ঘুম কাড়ে

    বেপরোয়া প্রাণ; জমে দিকে দিকে আজ লাখে লাখে—

    তোমাদের দেশে মে-মাস; এখানে ঝোড়ো বৈশাখ॥

  • প্রস্তুত

    প্রস্তুত

    প্রস্তুত

    কালো মৃত্যুরা ডেকেছে আজকে স্বয়ম্বরায়,

    নানাদিকে নানা হাতছানি দেখি বিপুল ধরায়।

    ভীত মন খোঁজে সহজ পন্থা, নিষ্ঠুর চোখ;

    তাই বিষাক্ত আস্বাদময় এ মর্তলোক,

    কেবলি এখানে মনের দ্বন্দ আগুন ছড়ায়।

    অবশেষে ভুল ভেঙেছে, জোয়ার মনের কোণে,

    তীব্র ভ্রূকুটি হেনেছি কুটিল ফুলের বনে;

    অভিশাপময় যে সব আত্মা আজো অধীর,

    তাদের সকাশে রেখেছি প্রাণের দৃঢ় শিবির;

    নিজেকে মুক্ত করেছি আত্মসমর্পণে।

    চাঁদের স্বপ্নে ধুয়ে গেছে মন যে-সব দিনে,

    তাদের আজকে শত্রু বলেই নিয়েছি চিনে,

    হীন র্স্পধারা ধূর্তের মতো শক্তিশেলে—

    ছিনিয়ে আমায় নিতে পারে আজো সুযোগ পেলে

    তাই সতর্ক হয়েছি মনকে রাখি নি ঋণে।

    অসংখ্য দিন কেটেছে প্রাণের বৃথা রোদনে

    নরম সোফায় বিপ্লবী মন উদ্ধোধনে;

    আজকে কিন্তু জনতা-জোয়ারে দোলে প্লাবন,

    নিরন্ন মনে রক্তিম পথ অনুধাবন,

    করছে পৃথিবী পূর্ব-পন্থা সংশোধনে।

    অস্ত্র ধরেছি এখন সমুখে শত্রু চাই,

    মহামরণের নিষ্ঠুর ব্রত নিয়েছি তাই;

    পৃথিবী জটিল, জটিল মনের সম্ভাষণ

    তাদের প্রভাবে রাখিনি মনেতে কোনো আসন,

    ভুল হবে জানি তাদের আজকে মনে করাই॥

  • প্রার্থী

    প্রার্থী

    প্রার্থী

    হে সূর্য! শীতের সূর্য!

    হিমশীতল সুদীর্ঘ রাত তোমার প্রতীক্ষায়

    আমরা থাকি,

    যেমন প্রতীক্ষা ক’রে থাকে কৃষকদের চঞ্চল চোখ,

    ধানকাটার রোমাঞ্চকর দিনগুলির জন্যে।

    হে সূর্য, তুমি তো জানো,

    আমাদের গরম কাপড়ের কত অভাব !

    সারারাত খড়কুটো জ্বালিয়ে,

    এক-টুকরো কাপড়ে কান ঢেকে,

    কত কষ্টে আমরা শীত আটকাই !

    সকালের এক-টুকরো রোদ্দুর

    এক টুকরো সোনার চেয়েও মনে হয় দামী।

    ঘর ছেড়ে আমরা এদিক-ওদিক যাই—

    এক-টুকরো রোদ্দুরের তৃষ্ণায়।

    হে সুর্য !

    তুমি আমাদের স্যাঁতসেঁতে ভিজে ঘরে

    উত্তাপ আর আলো দিও,

    আর উত্তাপ দিও,

    রাস্তার ধারের ঐ উলঙ্গ ছেলেটাকে।

    হে সূর্য

    তুমি আমাদের উত্তাপ দিও—

    শুনেছি, তুমি এক জ্বলন্ত অগ্নিপিণ্ড,

    তোমার কাছে উত্তাপ পেয়ে পেয়ে

    একদিন হয়তো আমরা প্রত্যেকেই এক একটা জ্বলন্ত অগ্নিপিণ্ডে

    পরিণত হব!

    তারপর সেই উত্তাপে যখন পুড়বে আমাদের জড়তা,

    তখন হয়তো গরম কাপড়ে ঢেকে দিতে পারবো

    রাস্তার ধারের ঐ উলঙ্গ ছেলেটাকে।

    আজ কিন্তু আমরা তোমার অকৃপণ উত্তাপের প্রার্থী॥

  • একটি মোরগের কাহিনী

    একটি মোরগের কাহিনী

    একটি মোরগের কাহিনী

    একটি মোরগ হঠাৎ আশ্রয় পেয়ে গেল

    বিরাট প্রাসাদের ছোট্ট এক কোণে,

    ভাঙা প্যাকিং বাক্সের গাদায়–

    আরো দু’তিনটি মুরগীর সঙ্গে।

    আশ্রয় যদিও মিলল,

    উপযুক্ত আহার মিলল না।

    সুতীক্ষ্ণ চিৎকারে প্রতিবাদ জানিয়ে

    গলা ফাটাল সেই মোরগ

    ভোর থেকে সন্ধে পর্যন্ত–

    তবুও সহানুভূতি জানাল না সেই বিরাট শক্ত ইমারত।

    তারপর শুরু হল তাঁর আঁস্তাকুড়ে আনাগোনা :

    আর্শ্চর্য! সেখানে প্রতিদিন মিলতে লাগল

    ফেলে দেওয়া ভাত-রুটির চমৎকার প্রচুর খাবার!

    তারপর এক সময় আঁস্তাকুড়েও এল অংশীদার—

    ময়লা ছেঁড়া ন্যাকড়া পরা দু’তিনটে মানুষ;

    কাজেই দুর্বলতর মোরগের খাবার গেল বন্ধ হয়ে।

    খাবার! খাবার! খানিকটা খাবার!

    অসহায় মোরগ খাবারের সন্ধানে

    বার বার চেষ্টা ক’রল প্রাসাদে ঢুকতে,

    প্রত্যেকবারই তাড়া খেল প্রচণ্ড।

    ছোট্ট মোরগ ঘাড় উঁচু করে স্বপ্ন দেখে—

    ‘প্রাসাদের ভেতর রাশি রাশি খাবার’!

    তারপর সত্যিই সে একদিন প্রাসাদে ঢুকতে পেল,

    একেবারে সোজা চলে এল

    ধব্‌ধবে সাদা দামী কাপড়ে ঢাকা খাবার টেবিলে;

    অবশ্য খাবার খেতে নয়–

    খাবার হিসেবে॥

  • সিঁড়ি

    সিঁড়ি

    সিঁড়ি

    আমরা সিঁড়ি,

    তোমরা আমাদের মাড়িয়ে

    প্রতিদিন অনেক উঁচুতে উঠে যাও,

    তারপর ফিরেও তাকাও না পিছনের দিকে;

    তোমাদের পদধূলিধন্য আমাদের বুক

    পদাঘাতে ক্ষতবিক্ষত হয়ে যায় প্রতিদিন।

    তোমরাও তা জানো,

    তাই কার্পেটে মুড়ে রাখতে চাও আমাদের বুকের ক্ষত,

    ঢেকে রাখতে চাও তোমাদের অত্যাচারের চিহ্নকে

    আর চেপে রাখতে চাও পৃথিবীর কাছে

    তোমাদের গর্বোদ্ধত, অত্যাচারী পদধ্বনি।

    তবুও আমরা জানি,

    চিরকাল আর পৃথিবীর কাছে

    চাপা থাকবে না

    আমাদের দেহে তোমাদের এই পদাঘাত।

    আর সম্রাট হুমায়ুনের মতো

    একদিন তোমাদেরও হতে পারে পদস্খলন॥

  • কলম

    কলম

    কলম

    কলম, তুমি কত না যুগ কত না কাল ধরে

    অক্ষরে অক্ষরে

    গিয়েছ শুধু ক্লান্তিহীন কাহিনী শুরু ক’রে।

    কলম, তুমি কাহিনী লেখো, তোমার কাহিনী কি

    দুঃখে জ্বলে তলোয়ারের মতন ঝিকিমিকি?

    কলম, তুমি শুধু বারংবার,

    আনত ক’রে ক্লান্ত ঘাড়

    গিয়েছ লিখে স্বপ্ন আর পুরনো কত কথা,

    সাহিত্যের দাসত্বের ক্ষুধিত বশ্যতা।

    ভগ্ন নিব, রুগ্ন দেহ, জলের মতো কালি,

    কলম, তুমি নিরপরাধ, তবুও গালাগালি

    খেয়েছ আর সয়েছ কত লেখকদের ঘৃণা,

    কলম, তুমি চেষ্টা কর, দাঁড়াতে পার কি না।

    হে কলম! তুমি কত ইতিহাস গিয়েছ লিখে

    লিখে লিখে শুধু ছড়িয়ে দিয়েছ চতুর্দিকে।

    তবু ইতিহাস মূল্য দেবে না, এতটুকু কোণ

    দেবে না তোমায়, জেনো ইতিহাস বড়ই কৃপণ;

    কত লাঞ্ছনা, খাটুনি গিয়েছে লেখকের হাতে

    ঘুমহীন চোখে অবিশ্রান্ত অজস্র রাতে।

    তোমার গোপন অশ্রু তাইতো ফসল ফলায়

    বহু সাহিত্য বহু কাব্যের বুকের তলায়।

    তবু দেখ বোধ নেই লেখকের কৃতজ্ঞতা,

    কেন চলবে এ প্রভুর খেয়ালে, লিখবে কথা?

    হে কলম! হে লেখনী! আর কত দিন

    ঘর্ষণে ঘর্ষণে হবে ক্ষীণ?

    আর কত মৌন-মূক, শব্দহীন দ্বিধান্বিত বুকে

    কালির কলঙ্ক চিহ্ন রেখে দেবে মুখে?

    আর কত আর

    কাটবে দুঃসহ দিন দুর্বার লজ্জার?

    এ দাসত্ব ঘুচে যাক, এ কলঙ্ক মুছে যাক আজ,

    কাজ কর—কাজ।

    মজুর দেখ নি তুমি? হে কলম, দেখনি বেকার?

    বিদ্রোহ দেখনি তুমি? রক্তে কিছু পাও নি শেখার?

    কত না শতাব্দী, যুগ থেকে তুমি আজো আছ দাস,

    প্রত্যেক লেখায় শুনি কেবল তোমার দীর্ঘশ্বাস!

    দিন নেই, রাত্রি নেই, শ্রান্তিহীন, নেই কোনো ছুটি,

    একটু অবাধ্য হলে তখুনি ভ্রূকুটি;

    এমনি করেই কাটে দুর্ভাগা তোমার বারো মাস,

    কয়েকটি পয়সায় কেনা, হে কলম, তুমি ক্রীতদাস।

    তাই যত লেখ, তত পরিশ্রম এসে হয় জড়ো :

    —কলম! বিদ্রোহ আজ! দল বেঁধে ধর্মঘট করো।

    লেখক স্তম্ভিত হোক, কেরানীরা ছেড়ে দিক হাঁফ,

    মহাজনী বন্ধ হোক, বন্ধ হোক মজুরের পাপ;

    উদ্বেগ-আকুল হোক প্রিয়া যত দূর দূর দেশে,

    কলম! বিদ্রোহ আজ, ধর্মঘট, হোক অবশেষে;

    আর কালো কালি নয়, রক্তে আজ ইতিহাস লিখে

    দেওয়ালে দেওয়ালে এঁটে, হে কলম,

    আনো দিকে দিকে॥

  • আগ্নেয়গিরি

    আগ্নেয়গিরি

    আগ্নেয়গিরি

    কখনো হঠাৎ মনে হয় :

    আমি এক আগ্নেয় পাহাড়।

    শান্তির ছায়া-নিবিড় গুহায় নিদ্রিত সিংহের মতো

    চোখে আমার বহু দিনের তন্দ্রা।

    এক বিস্ফোরণ থেকে আর এক বিস্ফোরণের মাঝখানে

    আমাকে তোমরা বিদ্রূপে বিদ্ধ করেছ বারংবার

    আমি পাথর : আমি তা সহ্য করেছি।

    মুখে আমার মৃদু হাসি,

    বুকে আমার পুঞ্জীভূত ফুটন্ত লাভা।

    সিংহের মতো আধ-বোজা চোখে আমি কেবলি দেখছি :

    মিথ্যার ভিতে কল্পনার মশলায় গড়া তোমাদের শহর,

    আমাকে ঘিরে রচিত উৎসবের নির্বোধ অমরাবতী,

    বিদ্রূপের হাসি আর বিদ্বেষের আতস-বাজি—

    তোমাদের নগরে মদমত্ত পূর্ণিমা।

    দেখ, দেখ :

    ছায়াঘন, অরণ্য-নিবিড় আমাকে দেখ;

    দেখ আমার নিরুদ্বিগ্ন বন্যতা।

    তোমাদের শহর আমাকে বিদ্রূপ করুক,

    কুঠারে কুঠারে আমার ধৈর্যকে করুক আহত,

    কিছুতেই বিশ্বাস ক’রো না–

    আমি ভিসুভিয়স-ফুজিয়ামার সহোদর।

    তোমাদের কাছে অজ্ঞাত থাক

    ভেতরে ভেতরে মোচড় দিয়ে ওঠা আমার অগ্ন্যুদ্‌গার,

    অরণ্যে ঢাকা অন্তর্নিহিত উত্তাপের জ্বালা।

    তোমার আকাশে ফ্যাকাশে প্রেত আলো,

    বুনো পাহাড়ে মৃদু-ধোঁয়ার অবগুণ্ঠন :

    ও কিছু নয়, হয়তো নতুন এক মেঘদূত।

    উৎসব কর, উৎসব কর—

    ভুলে যাও পেছনে আছে এক আগ্নেয় পাহাড়,

    ভিসুভিয়স-ফুজিয়ামার জাগ্রত বংশধর।

    আর,

    আমার দিনপঞ্জিকায় আসন্ন হোক

    বিস্ফোরণের চরম, পবিত্র তিথি॥

  • দুরাশার মৃত্যু

    দুরাশার মৃত্যু

    দুরাশার মৃত্যু

    দ্বারে মৃত্যু,

    বনে বনে লেগেছে জোয়ার,

    পিছনে কি পথ নেই আর?

    আমাদের এই পলায়ন

    জেনেছে মরণ,

    অনুগামী ধূর্ত পিছে পিছে,

    প্রস্থানের চেষ্টা হল মিছে।

    দাবানল!

    ব্যর্থ হল শুষ্ক অশ্রুজল,

    বেনামী কৌশল

    জেনেছে যে আরণ্যক প্রাণী

    তাই শেষে নির্মূল বনানী॥

  • ঠিকানা

    ঠিকানা

    ঠিকানা

    ঠিকানা আমার চেয়েছ বন্ধু–

    ঠিকানার সন্ধান,

    আজও পাও নি? দুঃখ যে দিলে করব না অভিমান?

    ঠিকানা না হয় না নিলে বন্ধু,

    পথে পথে বাস করি

    কখনো গাছের তলাতে

    কখনো পর্ণকুটির গড়ি।

    আমি যাযাবর, কুড়াই পথের নুড়ি,

    হাজার জনতা যেখানে, সেখানে

    আমি প্রতিদিন ঘুরি।

    বন্ধু, ঘরের খুঁজে পাই নাকো পথ,

    তাইতো পথের নুড়িতে গড়ব

    মজবুত ইমারত।

    বন্ধু, আজকে আঘাত দিও না

    তোমাদের দেওয়া ক্ষতে,

    আমার ঠিকানা খোঁজ ক’রো শুধু

    সূর্যোদয়ের পথে।

    ইন্দোনেশিয়া, যুগোশ্লাভিয়া,

    রুশ ও চীনের কাছে,

    আমার ঠিকানা বহুকাল ধ’রে

    জেনো গচ্ছিত আছে।

    আমাকে কি তুমি খুঁজেছ কখনো

    সমস্ত দেশ জুড়ে?

    তবুও পাও নি? তাহলে ফিরেছ

    ভুল পথে ঘুরে ঘুরে।

    আমার হদিশ জীবনের পথে

    মন্বন্তর থেকে

    ঘুরে গিয়েছে যে কিছু দূর গিয়ে

    মুক্তির পথে বেঁকে।

    বন্ধু, কুয়াশা, সাবধান এই

    সূর্যোদয়ের ভোরে :

    পথ হারিও না আলোর আশায়

    তুমি একা ভুল ক’রে।

    বন্ধু, আজকে জানি অস্থির

    রক্ত, নদীর জল,

    নীড়ে পাখি আর সমুদ্র চঞ্চল।

    বন্ধু, সময় হয়েছে এখনো

    ঠিকানা অবজ্ঞাত

    বন্ধু, তোমার ভুল হয় কেন এত?

    আর কতদিন দু’চক্ষু কচ্‍‍লাবে,

    জালিয়ানওয়ালায় যে পথের শুরু

    সে পথে আমাকে পাবে,

    জালালাবাদের পথ ধ’রে ভাই

    ধর্মতলার পরে,

    দেখবে ঠিকানা লেখা প্রত্যেক ঘরে

    ক্ষুব্ধ এদেশে রক্তের অক্ষরে।

    বন্ধু, আজকে বিদায়!

    দেখেছ উঠল যে হাওয়া ঝোড়ো,

    ঠিকানা রইল,

    এবার মুক্ত স্বদেশেই দেখা ক’রো॥

  • লেনিন

    লেনিন

    লেনিন

    লেনিন ভেঙেছে রুশে জনস্রোতে অন্যায়ের বাঁধ,

    অন্যায়ের মুখোমুখি লেনিন প্রথম প্রতিবাদ।

    আজকেও রুশিয়ার গ্রামে ও নগরে

    হাজার লেনিন যুদ্ধ করে,

    মুক্তির সীমান্ত ঘিরে বিস্তীর্ণ প্রান্তরে।

    বিদ্যুৎ-ইশারা চোখে, আজকেও অযুত লেনিন

    ক্রমশ সংক্ষিপ্ত করে বিশ্বব্যাপী প্রতীক্ষিত দিন,–

    বিপর্যস্ত ধনতন্ত্র, কণ্ঠরুদ্ধ, বুকে আর্তনাদ;

    –আসে শত্রুজয়ের সংবাদ।

    সযত্ন মুখোশধারী ধনিকেরও বন্ধ আস্ফালন,

    কাঁপে হৃৎযন্ত্র তার, চোখে মুখে চিহ্নিত মরণ।

    বিপ্লব হয়েছে শুরু, পদানত জনতার ব্যগ্র গাত্রোত্থানে,

    দেশে দেশে বিস্ফোরণ অতর্কিতে অগ্ন্যুৎপাত হানে।

    দিকে দিকে কোণে কোণে লেনিনের পদধ্বনি আজো যায় শোনা,

    দলিত হাজার কণ্ঠে বিপ্লবের আজো সম্বর্ধনা।

    পৃথিবীর প্রতি ঘরে ঘরে,

    লেনিন সমৃদ্ধ হয় সম্ভাবিত উর্বর জঠরে।

    আশ্চর্য উদ্দাম বেগে বিপ্লবের প্রত্যেক আকাশে

    লেনিনের সূর্যদীপ্তি রক্তের তরঙ্গে ভেসে আসে;

    ইতালী, জার্মান, জাপান, ইংলন্ড, আমেরিকা, চীন,

    যেখানে মুক্তির যুদ্ধ সেখানেই কমরেড লেনিন।

    অন্ধকার ভারতবর্ষ : বুভুক্ষায় পথে মৃতদেহ

    অনৈক্যের চোরাবালি; পরস্পর অযথা সন্দেহ;

    দরজায় চিহ্নিত নিত্য শত্রুর উদ্ধত পদাঘাত,

    অদৃষ্ট র্ভৎসনা-ক্লান্ত কাটে দিন, বিমর্ষ রাত

    বিদেশী শৃঙ্খলে পিষ্ট, শ্বাস তার ক্রমাগত ক্ষীণ–

    এখানেও আয়োজন পূর্ণ করে নিঃশব্দে লেনিন।

    লেনিন ভেঙেছে বিশ্বে জনস্রোতে অন্যায়ের বাঁধ,

    অন্যায়ের মুখোমুখি লেনিন জানায় প্রতিবাদ।

    মৃত্যুর সমুদ্র শেষ; পালে লাগে উদ্দাম বাতাস

    মুক্তির শ্যামল তীর চোখে পড়ে, আন্দোলিত ঘাস।

    লেনিন ভুমিষ্ঠ রক্তে, ক্লীবতার কাছে নেই ঋণ,

    বিপ্লব স্পন্দিত বুকে, মনে হয় আমিই লেনিন॥

  • অনুভব

    অনুভব

    অনুভব

    ॥১৯৪০॥

    অবাক পৃথিবী! অবাক করলে তুমি

    জন্মেই দেখি ক্ষুব্ধ স্বদেশভূমি।

    অবাক পৃথিবী! আমরা যে পরাধীন।

    অবাক, কী দ্রুত জমে ক্রোধ দিন দিন;

    অবাক পৃথিবী! অবাক করলে আরো–

    দেখি এই দেশে অন্ন নেইকো কারো।

    অবাক পৃথিবী! অবাক যে বারবার

    দেখি এই দেশে মৃত্যুরই কারবার।

    হিসেবের খাতা যখনি নিয়েছি হাতে

    দেখেছি লিখিত–‘রক্ত খরচ’ তাতে।

    এদেশে জন্মে পদাঘাতই শুধু পেলাম,

    অবাক পৃথিবী! সেলাম, তোমাকে সেলাম!

    ॥১৯৪৬॥

    বিদ্রোহ আজ বিদ্রোহ চারিদিকে,

    আমি যাই তারি দিন-পঞ্জিকা লিখে,

    এত বিদ্রোহ কখনো দেখেনি কেউ,

    দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ;

    স্বপ্ন-চূড়ার থেকে নেমে এসো সব–

    শুনেছ? শুনছ উদ্দাম কলরব?

    নয়া ইতিহাস লিখছে ধর্মঘট;

    রক্তে রক্তে আঁকা প্রচ্ছদ-পট।

    প্রত্যহ যারা ঘৃণিত ও পদানত,

    দেখ আজ তারা সবেগে সমুদ্যত;

    তাদেরই দলের পেছনে আমিও আছি,

    তাদেরই মধ্যে আমিও যে মরি-বাঁচি।

    তাইতো চলেছি দিন-পঞ্জিকা লিখে—

    বিদ্রোহ আজ! বিপ্লব চারিদিকে॥