Author: কাজী নজরুল ইসলাম

  • নমো হে নমো যন্ত্রপতি

    নমো হে নমো যন্ত্রপতি

    ৪০

    বৃন্দাবনী সারং—ঝাঁপতাল

    নমো হে নমো যন্ত্রপতি নমো নমো অশান্ত।

    তন্ত্রে তব ত্রস্ত ধরা, সৃষ্টি পথভ্রান্ত॥

    বিশ্ব হল বস্তুময়

    মন্ত্রে তব হে,

    নন্দনে-আনন্দে তুমি

    গ্রাসিলে মহাধ্বান্ত॥

    শংকর হে, সে কোন্ সতী-শোকে হয়ে নৃশংস

    বসেছ ধ্যানে হয়েছে জড় সাধিতেছ এ ধ্বংস।

    রুক্ষ তব দৃষ্টি-দাহে

    শুষ্ক সব হে,

    ভীষণ তব চক্রাঘাতে

    নির্জিত যুগান্ত॥

  • পুরবের তরুণ অরুণ

    পুরবের তরুণ অরুণ

    ৪১

    ভীমপলশ্রী—দাদরা

    পুরবের তরুণ অরুণ

    পুরবে আসলে ফিরে

    কাঁদায়ে মহাশ্বেতায়

    হিমানীর শৈল-শিরে॥

    কুহেলির পর্দা ডারি

    ঘুমাত রূপ-কুমারী,

    জাগালে স্বপনচারী

    তাহারে নয়ন-নীরে॥

    তোমার ওই তরুণ গলার

    শুনি গান সিন্ধু-পারে,

    দুলিছ মধ্যমণি

    সুরমার কণ্ঠ-হারে।

    ধেয়ানী দিলে ধরা,

    হল সুর স্বয়ংবরা,

    এলে কি পাগল-ঝোরা

    পাষাণের বক্ষ চিরে॥

  • কে শিব সুন্দর

    কে শিব সুন্দর

    ৪২

    দেশ—গীতঙ্গী

    কে শিব সুন্দর শরৎ-চাঁদ চূড়

    দাঁড়ালে আসিয়া এ অঙ্গনে,

    পীড়িত নরনারী আসিল গেহ ছাড়ি

    ভরিল নভতল-ক্রন্দনে॥

    বেদনা-মন্দিরে আরতি বাজে তব,

    কে তুমি সুন্দর শ্মশানচারী নব,

    দিগদিগন্তরে জীবন-উৎসব—

    শঙ্খ শুনি তব আগমনে॥

    মৃত্যু-জয়ী তুমি হওনি সুধা পিয়ে,

    দুখেরে দহিয়াছ বিষের দাহ দিয়ে।

    ভূষণ করি ফণী আদরে দিয়ে দোলা

    কী মণি পেলে বলো ওগো ও চির-ভোলা!

    কভু সে ডম্বরু বাজাও অম্বরে,

    প্রলয়-নর্তন জাগে চরাচরে,

    ললাট-জ্বালা-পাশে

    চন্দ্রলেখা হাসে

    নবীন সৃষ্টির হরষনে॥

    পতিতা গঙ্গারে ধরিলে নিজ শিরে,

    কন্যারূপে তাই পেলে কি ভারতীরে,

    স্বরগ এল নেমে মরতে তব প্রেমে,

    নমানি দেব-দেব ও-চরণে॥

  • কার নিকুঞ্জে রাত কাটায়ে

    কার নিকুঞ্জে রাত কাটায়ে

    ৪৩

    গারা-ভৈরবী—কাহারবা

    কার নিকুঞ্জে রাত কাটায়ে

    আসলে প্রাতে পুষ্পচোর।

    ডাকছে পাখি, ‘বউ গো জাগো,

    আর ঘুমায় না, রাত্রি ভোর’॥

    জুঁই-কুঁড়িরা চোখ মেলে চায়,

    চুমকুড়ি দেয় মৌমাছি।

    শাপলা-বনে চাঁদ ডুবে যায়

    ম্লান চোখে হায় চায় চকোর॥

    ঘোমটা ঠেলি কয় চামেলি,

    গোল কোরো না গুল-ডাকাত,

    ঢুলছে নয়ন, দুলছে গলায়

    বেল-টগরের ছিন্ন ডোর॥

    বোরকা খুলি বন-কেতকীর

    ফুলরেণুতে রাঙলে গা,

    পারুল-বধূর মাগলে মধু,

    হাসনাহেনার ভাঙলে দোর॥

    গায় কাওয়ালি বাদলি রুমঝুম,

    তয়ফাওয়ালি নাচে মউর

    ঝুরছে কদম, মেঘ-তমালে

    বিজলি-চোখে চায় কিশোর॥

    শোন রে কবি পুষ্পলোভী

    আজ ধরেছি ফুল চুরি,

    হুল ফুটিয়ে, ফুলবালাদের

    কুল ভুলানো ভাঙব তোর॥

  • কেন আন ফুল-ডোর

    কেন আন ফুল-ডোর

    ৪৪

    ভীমপলশ্রী—কাহারবা

    কেন
    আন ফুল-ডোর
    আজি বিদায় বেলা।
    মোছো
    মোছো আঁখি-লোর
    যদি ভাঙিল মেলা॥
    কেন
    মেঘের স্বপন
    আন মরুর চোখে,
    ভুলে
    দিয়ো না কুসুম
    যারে দিয়েছ হেলা॥
    আছে
    বাহুর বাঁধন
    তব শয়ন-সাথি,
    আমি
    এসেছি একা
    আমি চলি একেলা॥
    যবে
    শুকাল কানন
    এলে বিধুর পাখি,
    লয়ে
    কাঁটা-ভরা প্রাণ
    এ কী নিঠুর খেলা॥
    যদি
    আকাশ-কুসুম
    পেলি চকিতে কবি,
    চলো
    চলো মুসাফির,
    ডাকে পারের ভেলা॥
  • কেমনে রাখি আঁখি-বারি

    কেমনে রাখি আঁখি-বারি

    ৪৫

    (রাতের) দুর্গা—আদ্ধা কাওয়ালি

    কেমনে রাখি

    আঁখি-বারি চাপিয়া।

    প্রাতে কোকিল কাঁদে,

    নিশীথে পাপিয়া॥

    এ ভরা বাদরে

    আমার মরা নদী,

    উথলি উথলি

    উঠিছে নিরবধি।

    আমার এ ভাঙা ঘাটে

    আমার এ হৃদিতটে

    চাপিতে গেলে ওঠে

    দু-কূল ছাপিয়া॥

    নিষেধ নাহি মানে

    আমার পোড়া আঁখি,

    জল লুকাব কত

    কাজল মাখি মাখি।

    ছলনা করে হাসি

    অমনি জলে ভাসি,

    ছলিতে গিয়া আসি

    ভয়েতে কাঁপিয়া॥

    গাঁথিতে ফুলমালা

    বিঁধে সে কাঁটা হয়ে,

    কাঁটার হার গাঁথি—

    সে আসে ফুল লয়ে।

    কবি রে, জলধি

    এ তাহারে মন দিয়ে

    গেলি রে জল

    নিয়ে জীবন ব্যাপিয়া॥

  • কেন আসিলে যদি যাবে চলি

    কেন আসিলে যদি যাবে চলি

    ৪৬

    (দিনের) দুর্গা—আদ্ধা কাওয়ালি

    কেন আসিলে
    যদি যাবে চলি
    গাঁথিলে না মালা
    ছিঁড়ে ফুল-কলি॥
    কেন বারেবারে
    আসিয়া দুয়ারে
    ফিরে গেলে পারে
    কথা নাহি বলি॥
    কী কথা বলিতে
    আসিয়া নিশীথে
    শুধু ব্যথা-গীতে
    গেলে মোরে ছলি॥
    প্রভাতের বায়ে
    কুসুম ফুটায়ে
    নিশীথে লুকায়ে
    উড়ে গেল অলি॥
    কবি শুধু জানে,
    কোন্ অভিমানে
    চাহি যারে গানে
    কেন তারে দলি॥
  • সাজিয়াছ যোগী

    সাজিয়াছ যোগী

    ৪৭

    যোগিয়া—ঝাঁপতাল

    সাজিয়াছ যোগী বলো কার লাগি

    তরুণ বিবাগী॥

    হেরো তব পায়ে

    কাঁদিছে লুটায়ে

    নিখিলের পিয়া

    তবে প্রেম মাগি

    তরুণ বিবাগী॥

    ফাল্গুনে কাঁদে

    দুয়ারে বিষাদে

    খোলো দ্বার খোলো!

    যোগী, যোগ ভোলো!

    এত গীতহাসি

    সব আজি বাসি,

    উদাসী গো জাগো!

    নব অনুরাগে

    জাগো অনুরাগী

    তরুণ বিবাগী॥

  • মুসাফির! মোছ এ আঁখি জল

    মুসাফির! মোছ এ আঁখি জল

    ৪৮

    বারোয়াঁ—কাহারবা

    মুসাফির! মোছ এ আঁখি জল

    ফিরে ছল আপনারে নিয়া।

    আপনি ফুটেছিল ফুল

    গিয়াছে আপনি ঝরিয়া॥

    রে পাগল! এ কী দুরাশা,

    জলে তুই বাঁধিবি বাসা!

    মেটে না হেথায় পিয়াসা

    হেথা নাই তৃষ্ণা-দরিয়া॥

    বরষায় ফুটল না বকুল

    পউষে ফুটবে কি সে ফুল,

    এ দেশে ঝরে শুধু ভুল

    নিরাশার কানন ভরিয়া॥

    রে কবি, কতই দেয়ালি,

    জ্বালিলি তোর আলো জ্বালি,

    এল না তোর বনমালি

    আঁধার আজ তোরই দুনিয়া॥

  • এ নহে বিলাস বন্ধু

    এ নহে বিলাস বন্ধু

    ৪৯

    মান্দ্—কাহারবা

    এ নহে বিলাস বন্ধু,
    ফুটেছি জলে কমল।
    এ যে ব্যথা-রাঙা হৃদয়
    আঁখি-জলে-টলমল॥
    কোমল মৃণাল-দেহ
    ভরেছে কণ্টক-ঘায়,
    শরণ লয়েছি গো তাই
    শীতল দিঘির জল॥
    ডুবেছি এ কালো নীরে
    কত যে জ্বালা সয়ে,
    শত ব্যথা ক্ষত লয়ে
    হইয়াছি শতদল॥
    আমার বুকের কাঁদন
    তুমি বল ফুল-বাস,
    ফিরে যাও,
    ফেলো না গো শ্বাস
     
    দখিনা বায়ু চপল॥
    ফোটে যে কোন্ ক্ষত-মুখে
      
      
    কবি রে তোর গীত-সুর,
    সে ক্ষত দেখিল না কেউ,
      
      
    দেখিল তোরে কেবল॥
  • জিঞ্জির

    জিঞ্জির

    জিঞ্জির

    ‘জিঞ্জির’ ১৩৩৫ সালে মুতাবিক ১৯২৮ খ্রিষ্টাব্দের নভেম্বর মাসে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়; প্রকাশক শ্রীগোপালদাস মজুমদার, ডি. এম. লাইব্রেরি, ৬১ কর্ণওয়ালিশ ষ্ট্রীট, কলিকাতা। মুদ্রাকর শ্রী অমূল্যচন্দ্র ভট্টাচার্য, ভট্টাচার্য প্রিণ্টিং ওয়ার্কস, ২ নিবেদিতা লেন, কলিকাতা। রয়্যাল অক্টোভো আকার, ২ + ৮০ পৃষ্ঠা, মূল্য ১৷৷৹ (দেড় টাকা)।

    ‘বার্ষিক সওগাত’ ও ‘খালেদ’ ১৩৩৩ সালের প্রথম ‘বার্ষিক সওগাত’ পত্রিকায় বের হয়েছিল। ‘বার্ষিক সওগাত’ কবিতাটির নিচে রচনার স্থান ও তারিখ মুদ্রিত ছিল— কৃষ্ণনগর, ২৫শে অগ্রহায়ণ, ’৩৩। ‘বার্ষিক সওগাত’ ১৩৩৩ মাঘের সওগাতে উদ্ধৃত হয়েছিল।

    ‘অঘ্রানের সওগাত’ ১৩৩৩ অগ্রহায়ণের ও ‘মিসেস এম. রহমান’ ১৩৩৩ মাঘের সওগাতে প্রকাশিত হয়। ‘মিসেস্ এম. রহমান’-এর পাদটীকায় বলা হয়— ‘গত ২০শে ডিসেম্বর (১৯২৬) সোমবার রাত্রি ১১টা ৪৫ মিনিটের সময় জান্নাতবাসিনী হইয়াছেন।’ মিসেস এম. রহমানের পূর্ণ নাম মুসাম্মাৎ মাসুদা খাতুন; তিনি হুগলি জজকোর্টের উকিল খান বাহাদুর মৌলভি মজহারুল আনোয়ার চৌধুরী সাহেবার জ্যেষ্ঠা কন্যা এবং শ্রীরামপুরের তদানীন্তন সাব-রেজিষ্টার কাজী মাহমুদুর রহমান সাহেবের পত্নী ছিলেন। ‘মা ও মেয়ে’ নামে তাঁর একখানি অসম্পূর্ণ উপন্যাস ১৩২৯ আষাঢ় হতে ‘সহচর’-এ ধারাবাহিকরূপে প্রকাশিত হয়েছিল। তাঁর মৃত্যুর প্রায় ৮ বছর পরে ১৩৩৪ অগ্রহায়ণে তাঁর কন্যা মাহফুজা খাতুন বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত তাঁর ১০টি প্রবন্ধ সংগ্রহিত করে ‘চানাচুর’ নামে ৮৩ পৃষ্ঠার একটি বই বের করেন।

    ‘নকিব’ ১৩৩২ মাঘে বরিশালের পাক্ষিক ‘নকীব’ পত্রিকার বিশেষ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছিল।

    ‘সুবহ্-উন্মেদ’ ১৩৩১ পৌষের ‘সাম্যবাদী’তে প্রকাশিত হয়েছিল।

    ‘খোশ-আমদেদ’ ১৯২৭ খ্রিস্টাব্দের ২৭শে ফেব্রুয়ারি রবিবার ঢাকায় মুসলিম সাহিত্যসমাজের প্রথম বার্ষিক সম্মেলনে কবি-কর্তৃক গীত এবং ১৩৩৩ চৈত্রে মুসলিম সাহিত্যসমাজের মুখপত্র প্রথম বার্ষিক ‘শিখা’য় প্রকাশিত হয়েছিল। ১৩৩৩ চৈত্রের সওগাতে উহা পুনর্মুদ্রিত হয়েছিল।

    ‘নওরোজ’ ১৩৩৪ আষাঢ়ের এবং ‘ভীরু’ ও ‘চিরঞ্জীব জগলুল’ ১৩৩৪ ভাদ্রের নওরোজে বের হয়েছিল।

    ‘অগ্রপথিক’ ১৩৩৪ অগ্রহায়ণের সওগাতে প্রকাশিত হয়েছিল। পাদটীকায় স্বীকৃতি ছাপা হয়েছিল— ‘হুইটম্যানের অনুরণনে।’

    ‘ঈদ-মোবারক’ ১৩৩৪ বৈশাখের, ‘আয় বেহেশতে কে যাবি আয়’ ও ‘আমানুল্লাহ’ ১৩৩৪ মাঘের এবং ‘এ মোর অহঙ্কার’ ১৩৩৪ চৈত্রের সওগাতে প্রকাশিত হয়েছিল।

    ‘ওমর ফারুক’ ১৩৩৪ সালের দ্বিতীয় বার্ষিক সওগাতে বের হয়েছিল।

  • বার্ষিক সওগাত

    বার্ষিক সওগাত

    বার্ষিক সওগাত

    বন্ধু গো সাকি আনিয়াছ নাকি বরষের সওগাত–

    দীর্ঘ দিনের বিরহের পরে প্রিয়-মিলনের রাত।

    রঙিন রাখি, শিরীন শারাব, মুরলী, রবাব, বীণ,

    গুলিস্তানের বুলবুল পাখি, সোনালি রুপালি দিন।

    লালা-ফুল সম দাগ-খাওয়া দিল, নার্গিস-ফুলি আঁখ,

    ইস্পাহানির হেনা-মাখা হাত, পাতলি কাঁখ!

    নৈশাপুরের গুলবদনির চিবুক গালের টোল,

    রাঙা লেড়কির ভাঙা ভাঙা হাসি, শিরীন শিরীন বোল।

    সুরমা-কাজল স্তাম্বুলি চোখ, বসোরা গুলের লালি,

    নব বোগাদাদি আলিফ-লায়লা, শাজাদি জুলফ-ওয়ালি।

    পাকা খর্জুর, ডাঁশা আঙ্গুর, টোকো-মিঠে কিসমিস,

    মরু-মঞ্জীর আব-জমজম,যবের ফিরোজা শিস।

    আশা-ভরা মুখ,তাজা তাজা বুক, নৌ-জোয়ানির গান,

    দুঃসাহসীর মরণ-সাধনা, জেহাদের অভিযান।

    আরবের প্রাণ, ফারেসের বাজু নৌ-তুর্কির,

    দারাজ দিলীর আফগানি দিল, মূরের জখমি শির।

    নীল দরিয়ায় মেসেরের আঁসু, ইরাকের টুটা তখ‍্‍ত,

    বন্দী শামের জিন্দান-খানা, হিন্দের বদবখ‍্‍ত! –

    তাঞ্জাম-ভরা আঞ্জাম এ যে কিছুই রাখনি বাকি,

    পুরানো দিনের হাতে বাঁধিয়াছ নতুন দিনের রাখি।…

    চোখের পানির ঝালর-ঝুলানো হাসির খাঞ্চাপোশ

    – যেন অশ্রুর গড়খাই-ঘেরা দিল‍্‍খোস ফেরদৌস –

    ঢাকিয়ো বন্ধু তব সওগাতি-রেকাবি তাহাই দিয়ে,

    দিবসের জ্বালা ভুলে যেতে চাই রাতের শিশির পিয়ে!

    বেদনার বানে সয়লাব সব, পাইনে সাথির হাত,

    আনো গো বন্ধু নূহের কিশতি– ‘বার্ষিকী সওগাত!’

    কৃষ্ণনগর,

    ২৫শে অগ্রহায়ণ, ১৩৩৩ বঙ্গাব্দ

  • অঘ্রাণের সওগাত

    অঘ্রাণের সওগাত

    অঘ্রাণের সওগাত

    ঋতুর খাঞ্চা ভরিয়া এল কি ধরণির সওগাত1?

    নবীন ধানের আঘ্রাণে আজি অঘ্রাণ হল মাত।

    ‘গিন্নি-পাগল’ চালের ফির্‌নি2

    তশতরি ভরে নবীনা গিন্নি

    হাসিতে হাসিতে দিতেছে স্বামীরে, খুশিতে কাঁপিছে হাত।

    শিরনি বাঁধেন বড়ো বিবি, বাড়ি গন্ধে তেলেসমাত!

    মিয়াঁ ও বিবিতে বড়ো ভাব আজি খামারে ধরে না ধান।

    বিছানা করিতে ছোট বিবি রাতে চাপা সুরে গাহে গান!

    ‘শাশবিবি3’ কন, “আহা, আসে নাই

    কতদিন হল মেজলা জামাই।”

    ছোট মেয়ে কয়, “আম্মা গো, রোজ কাঁদে মেজো বুবুজান!”

    দলিজের4 পান সাজিয়া সাজিয়া সেজো-বিবি লবেজান!

    হল্লা করিয়া ফিরিছে পাড়ায় দস্যি ছেলের দল।

    ময়নামতীর শাড়ি-পরা মেয়ে গয়নাতে ঝলমল!

    নতুন পৈঁচি-বাজুবন্দ পরে

    চাষা-বউ কথা কয় না গুমোরে,

    জারিগান আর গাজির গানেতে সারা গ্রাম চঞ্চল!

    বউ করে পিঠা ‘পুর’-দেওয়া মিঠা, দেখে জিভে সরে জল!

    মাঠের সাগরে জোয়ারের পরে লেগেছে ভাটির টান।

    রাখাল ছেলের বিদায়-বাঁশিতে ঝুরিছে আমন ধান!

    কৃষক-কণ্ঠে ভাটিয়ালি সুর

    রোয়ে রোয়ে মরে বিদায়-বিধুর!

    ধান ভানে বউ, দুলে দুলে ওঠে রূপ-তরঙ্গে বান!

    বধূর পায়ের পরশে পেয়েছে কাঠের ঢেঁকিও প্রাণ!

    হেমন্ত-গায় হেলান দিয়ে গো রৌদ্র পোহায় শীত!

    কিরণ-ধারায় ঝরিয়া পড়িছে সূর্য–আলো-সরিৎ!

    দিগন্তে যেন তুর্কি কুমারী

    কুয়াশা-নেকাব5 রেখেছে উতারি।

    চাঁদের প্রদীপ জ্বালাইয়া নিশি জাগিছে একা নিশীথ!

    নতুনের পথ চেয়ে চেয়ে হল হরিত পাতারা পীত।

    নবীনের লাল ঝাণ্ডা উড়ায়ে আসিতেছে কিশলয়,

    রক্ত-নিশান নহে যে রে ওরা রিক্ত শাখার জয়!

    ‘মুজ‍্দা6’ এনেছে অগ্রহায়ণ—

    আসে নওরোজ খোলো গো তোরণ!

    গোলা ভরে রাখো সারা বছরের হাসি-ভরা সঞ্চয়।

    বাসি বিছানায় জাগিতেছে শিশু সুন্দর নির্ভয়!

    কলিকাতা

    ১০ কার্তিক ১৩৩৩

  • মিসেস এম. রহমান

    মিসেস এম. রহমান

    মিসেস এম. রহমান

    মোহর‍্‍রমের চাঁদ ওঠার তো আজিও অনেক দেরি,

    কেন কারবালা-মাতম উঠিল এখনই আমায় ঘেরি?

    ফোরাতের মৌজ ফোঁপাইয়া ওঠে কেন গো আমার চোখে!

    নিখিল-এতিম ভিড় করে কাঁদে আমার মানস-লোকে!

    মর্সিয়া-খান! গাস নে অকালে মর্সিয়া শোকগীতি,

    সর্বহারার অশ্রু-প্লাবনে সয়লাব হবে ক্ষিতি!…

    আজ যবে হায় আমি

    কুফার পথে গো চলিতে চলিতে কারবালা-মাঝে থামি,

    হেরি চারিধারে ঘিরিয়াছে মোরে মৃত্যু-এজিদ-সেনা,

    ভায়েরা আমার দুশমন-খুনে মাখিতেছে হাতে হেনা,

    আমি শুধু হায় রোগ-শয্যায় বাজু কামড়ায়ে মরি!

    দানা-পানি নাই পাতার খিমায় নির্জীব আছি পড়ি!

    এমন সময় এল ‘দুলদুল’পৃষ্ঠে শূন্য জিন,

    শূন্যে কে যেন কাঁদিয়া উঠিল–‘জয়নাল আবেদিন!’

    শীর্ণ-পাঞ্জা দীর্ণ-পাঁজর পর্ণকুটির ছাড়ি

    উঠিতে পড়িতে ছুটিয়া আসিনু, রুধিল দুয়ার দ্বারী!

    বন্দিনী মার ডাক শুনি শুধু জীবন-ফোরাত-পারে,

    “এজিদের বেড়া পারায়ে এসেছি, জাদু তুই ফিরে যারে!”

    কাফেলা যখন কাঁদিয়া উঠিল তখন দুপুর নিশা!–

    এজিদে পাইব, কোথা পাই হায় আজরাইলের দিশা!–

    জীবন ঘিরিয়া ধু ধু করে আজ শুধু সাহারার বালি,

    অগ্নি-সিন্ধু করিতেছি পান দোজখ করিয়া খালি!

    আমি পুড়ি, সাথে বেদনাও পুড়ে, নয়নে শুকায় পানি,

    কলিজা চাপিয়া তড়পায় শুধু বুক-ভাঙা কাতরানি!

    মাতা ফাতেমার লাশের ওপর পড়িয়া কাতর স্বরে

    হাসান হোসেন কেমন করিয়া কেঁদেছিল, মনে পড়ে!

    অশ্রু-প্লাবনে হাবুডুবু খাই বেদনার উপকূলে,

    নিজের ক্ষতিই বড়ো করি তাই সকলের ক্ষতি ভুলে!

    ভুলে যাই–কত বিহগ-শিশুরা এই স্নেহ-বট-ছায়ে

    আমরাই মতন আশ্রয় লভি ভুলেছে আপন মায়ে।

    কত সে ক্লান্ত বেদনা-দগ্ধ মুসাফির এরই মূলে

    বসিয়া পেয়েছে মার তসল্লি, সব গ্লানি গেছে ভুলে!

    আজ তারা সবে করিছে মাতব আমার বাণীর মাঝে,

    একের বেদনা নিখিলের হয়ে বুকে এত ভারী বাজে!

    আমারে ঘিরিয়া জমিছে অথই শত নয়নের জল,

    মধ্যে বেদনা-শতদল আমি করিতেছি টলমল!

    নিখিল-দরদি দিলের আম্মা! নাহি মোর অধিকার

    সকলের মাঝে সকলে ত্যজিয়া শুধু একা কাঁদিবার!

    আসিয়াছি মাগো জিয়ারত লাগি আজি অগ্রজ হয়ে

    মা-হারা আমার ব্যথাতুর ছোটো ভাইবোনগুলি লয়ে।

    অশ্রুতে মোর অন্ধ দু-চোখ, তবু ওরা ভাবিয়াছে—

    হয়তো তোমার পথের দিশা মা জানা আছে মোর কাছে!

    জীবন-প্রভাতে দেউলিয়া হয়ে যারা ভাষাহীন গানে

    ভিড় করে মাগো চলেছিল সব গোরস্থানের পানে,

    পক্ষ মেলিয়া আবরিলে তুমি সকলে আকুল স্নেহে,

    যত ঘর-ছাড়া কোলাকুলি করে তব কোলে তব গেহে!

    ‘কত বড়ো তুমি’ বলিলে, বলিতে, “আকাশ শূন্য বলে

    এত কোটি তারা চন্দ্র সূর্য গ্রহে ধরিয়াছে কোলে।

    শূন্য সে বুক তবু ভরেনি রে, আজও সেথা আছে ঠাঁই,

    শূন্য ভরিতে শূন্যতা ছাড়া দ্বিতীয় সে কিছু নাই!”

    গোর-পলাতক মোরা বুঝি নাই মাগো তুমি আগে থেকে

    গোরস্থানের দেনা শুধিয়াছ আপনারে বাঁধা রেখে!

    ভুলাইয়া রাখি গৃহহারাদেরে দিয়া স্ব-গৃহের চাবি

    গোপনে মিটালে আমাদের ঋণ–মৃত্যুর মহাদাবি!

    সকলের তুমি সেবা করে গেলে, নিলেনা কারুর সেবা,

    আলোক সবারে আলো দেয়, দেয় আলোকেরে আলো কেবা?

    আমাদেরও চেয়ে গোপন গভীর কাঁদে বাণী ব্যথাতুর,

    থেমে গেছে তার দুলালি মেয়ের জ্বালা-ক্রন্দন-সুর!

    কমল-কাননে থেমে গেছে ঝড় ঘূর্ণির ডামাডোল,

    কারার বক্ষে বাজে নাকো আর ভাঙন-ডঙ্কা-রোল!-

    বসিবে কখন জ্ঞানের তখ‍্‍তে বাংলার মুসলিম!

    বারে বারে টুটে কলম তোমার না লিখিতে শুধু ‘মিম’।

    * * *

    সে ছিল আরব-বেদুইনদের পথ-ভুলে-আসা মেয়ে,

    কাঁদিয়া উঠিত হেরেমের উঁচা প্রাচীরের পানে চেয়ে!

    সকলের সাথে সকলের মতো চাহিত সে আলো বায়ু,

    বন্ধন-বাঁধ ডিঙাতে না পেরে ডিঙাইয়া গেল আয়ু!

    সে বলিতে, “ওই হেরেম-মহল নারীদের তরে নহে,

    নারী নহে যারা ভুলে বাঁদি-খানা ওই হেরেমের মোহে!

    নারীদের এই বাঁদি করে রাখা অবিশ্বাসের মাঝে

    লোভী পুরুষের পশু-প্রবৃত্তি হীন অপমান রাজে!

    আপনা ভুলিয়া বিশ্বপালিকা নিত্য-কালের নারী

    করিছে পুরুষ-জেলদারোগার কামনার তাঁবেদারি!

    বলে না কোরান, বলে না হাদিস, ইসলামি ইতিহাস,

    নারী নর-দাসী, বন্দিনী রবে হেরেমেতে বারোমাস!

    হাদিস কোরান ফেকা লয়ে যারা করিছে ব্যবসাদারি,

    মানে নাকো তারা কোরানের বাণী–সমান নর ও নারী!

    শাস্ত্র ছাঁকিয়া নিজেদের যত সুবিধা বাছাই করে

    নারীদের বেলা গুম হয়ে রয় গুমরাহ্৩ যত চোরে!”

    দিনের আলোকে ধরেছিলে এই মুনাফেকদের চুরি,

    মসজিদে বসে স্বার্থের তরে ইসলামে হানা ছুরি!

    আমি জানি মা গো আলোকের লাগি তব এই অভিযান

    হেরেম-রক্ষী যত গোলামের কাঁপায়ে তুলিত প্রাণ!

    গোলাগুলি নাই, গালাগালি আছে, তাই দিয়ে তারা লড়ে,

    বোঝে নাকো থুথু উপরে ছুঁড়িলে আপনারই মুখে পড়ে!

    আমরা দেখেছি, যত গালি ওরা ছুঁড়িয়া মেরেছে গায়ে,

    ফুল হয়ে সব ফুটিয়া উঠিয়া ঝরিয়াছে তব পায়ে!

    * * *

    কাঁটার কুঞ্জে ছিলে নাগমাতা সদা উদ্যত-ফণা

    আঘাত করিতে আসিয়া ‘আঘাত’ করিয়াছে বন্দনা!

    তোমার বিষের নীহারিকা-লোকে নিতি নব নব গ্রহ

    জন্ম লভিয়া নিষেধ-জগতে জাগায়েছে বিদ্রোহ!

    জহরের তেজ পান করে মাগো তব নাগ-শিশু যত

    নিয়ন্ত্রিতের শিরে গাড়িয়াছে ধ্বজা বিজয়োদ্ধত!

    মানেনি কো তারা শাসন-ত্রাসন বাধা-নিষেধের বেড়া –

    মানুষ থাকে না খোঁয়াড়ে বন্ধ, থাকে বটে গোরু-ভেড়া!

    এসমে-আজম তাবিজের মতো আজও তব রুহ্ পাক

    তাদেরে ঘেরিয়া আছে কি তেমনই বেদনায় নির্বাক?

    অথবা ‘খাতুনে-জান্নাত’ মাতা ফাতেমার গুলবাগে

    গোলাব-কাঁটায় রাঙা গুল হয়ে ফুটেছে রক্তরাগে?

    * * *

    তোমার বেদনা-সাগরে জোয়ার জাগিল যাদের টানে,

    তারা কোথা আজ? সাগর শুকালে চাঁদ মরে কোনখানে?

    যাহাদের তরে অকালে, আম্মা, জান দিলে কোরবান,

    তাদের জাগায় সার্থক হোক তোমার আত্মদান!

    মধ্যপথে মা তোমার প্রাণের নিবিল যে দীপ-শিখা,

    জ্বলুক নিখিল-নারী-সীমান্তে হয়ে তাই জয়টিকা!

    বন্দিনীদের বেদনার মাঝে বাঁচিয়া আছ মা তুমি,

    চিরজীবী মেয়ে, তবু যাই ওই কবরের ধূলি চুমি!

    মৃত্যুর পানে চলিতে আছিলে জীবনের পথ দিয়া,

    জীবনের পানে চলিছ কি আজ মৃত্যুরে পারাইয়া?

    কৃষ্ণনগর,

    ১৫ পৌষ, ১৩৩৩

  • নকিব

    নকিব

    নকিব

    নব-জীবনের নব-উত্থান-আজান ফুকারি এসো নকিব।

    জাগাও জড়! জাগাও জীব!

    জাগে দুর্বল, জাগে ক্ষুধা-ক্ষীণ,

    জাগিছে কৃষাণ ধুলায়-মলিন,

    জাগে গৃহহীন, জাগে পরাধীন

    জাগে মজলুম বদ-নসিব!

    মিনারে মিনারে বাজে আহ্বান–

    ‘আজ জীবনের নব উত্থান!’

    শঙ্কাহরণ জাগিছে জোয়ান

    জাগে বলহীন জাগিছে ক্লীব,

    নব জীবনের নব উত্থান–

    আজান ফুকারি এসো নকিব!

    হুগলী,

    ১৩ অগ্রহায়ণ, ১৩৩২

  • খালেদ

    খালেদ

    খালেদ

    খালেদ! খালেদ! শুনিতেছে নাকি সাহারার আহা-জারি?

    কত ‘ওয়েসিস’ রচিল তাহার মরু-নয়নের বারি।

    মরীচিকা তার সন্ধানী-আলো দিকে দিকে ফেরে খুঁজি

    কোন নিরালায় ক্লান্ত সেনানী ডেরা গাড়িয়াছ বুঝি!

    বালু-বোররাকে সওয়ার হইয়া ডাক দিয়া ফেরে ‘লু’,

    তব তরে হায়! পথে রেখে যায় মৃগীরা মেশক-বু!

    খর্জুর-বীথি আজিও ওড়ায় তোমার জয়ধ্বজা,

    তোমার আশায় বেদুইন-বালা আজিও রাখিছে রোজা।

    ‘মোতাকারিব’-এর ছন্দে উটের সারি দুলে দুলে চলে,

    দু-চোখ তাদের দিশাহারা পথে আলেয়ার মতো জ্বলে।

    ‘খালেদ! খালেদ!’ পথ-মঞ্জিলে ক্লান্ত উটেরা কহে,

    “বণিকের বোঝা বহা তো মোদের চিরকেলে পেশা নহে!”

    ‘সুতুর-বানের’ বাঁশি শুনে উট উল্লাস-ভরে নাচে,

    ভাবে, নকিবের বাঁশরির পিছে রণ-দামামাও আছে।

    ন্যুব্জ এ পিঠ খাড়া হত তার সওয়ারের নাড়া পেয়ে,

    তলওয়ার তির গোর্জ নেজায় পিঠ যেত তার ছেয়ে।

    খুন দেখিয়াছে, তূণ বহিয়াছে, নুন বহেনিকো কভু!

    * * *

    বালু ফেড়ে ওঠে রক্ত-সূর্য ফজরের শেষে দেখি,

    দুশমান-খুনে লাল হয়ে ওঠে খালেদি আমামা এ কী!

    খালেদ! খালেদ! ভাঙিবে নাকি ও হাজার বছরি ঘুম?

    মাজার৬ ধরিয়া ফরিয়াদ করে বিশ্বের মজলুম!—

    শহীদ হয়েছ? ওফাত হয়েছে? ঝুটবাত! আলবত!

    খালেদের জান কব‍্‍জ করিবে ওই মালেকুল-মৌত?

    বছর গিয়াছে গেছে শতাব্দী যুগযুগান্ত কত,

    জালিম পারসি রোমক রাজার জুলুম সে শত শত

    রাজ্য ও দেশ গেছে ছারেখারে! দুর্বল নরনারী

    কোটি কোটি প্রাণ দিয়াছে নিত্য কত‍্‍ল-গাহেতে তারই!

    উৎপীড়িতের লোনা আঁসু-জলে গলে গেল কত কাবা,

    কত উজ তাতে ডুবে মলো হায়, কত নূহ্ হল তাবা!

    সেদিন তোমার মালেকুল-মৌত কোথায় আছিল বসি?

    কেন সে তখন জালিম রাজার প্রাসাদে প্রাসাদে পশি

    বেছে বেছে ওই ‘সঙ্গ্-দিল’দের কব‍্‍জ করেনি জান?

    মালেকুল-মৌত সেদিনও মেনেছে বাদশাহি ফরমান!—

    মক্কার হাতে চাঁদ এল যবে তকদিরে আফতাব

    কুল-মখলুক দেখিতে লাগিল শুধু ইসলামি খাব,

    শুকনো খবুজ খোর্মা চিবায়ে উমর দারাজ-দিল

    ভাবিছে কেমন খুলিবে আরব দিন-দুনিয়ার খিল,–

    এমন সময় আসিল জোয়ান হাথেলিতে হাথিয়ার,

    খর্জুর-শিষে ঠেকিয়াছে গিয়া উঁচা উষ্ণীয় তার!

    কব‍্‍জা তাহার সব‍্‍জা হয়েছে তলওয়ার-মুঠ ডলে,

    দু-চোখ ঝালিয়া আশায় দ‍জ‍্‍লা ফোরাত পড়িছে গলে!

    বাজুতে তাহার বাঁধা কোর-আন, বুকের দুর্মদ বেগ,

    আলবোরজের‍ চূড়া গুঁড়া-করা দস্তে দারুণ তেগ।

    নেজার ফলক উল্কার সম উগ্রগতিতে ছোটে,

    তির খেয়ে তার আশমান-মুখে তারা-রূপে ফেনা ওঠে।

    দারাজ দস্ত যেদিকে বাড়ায় সেইদিক পড়ে ভেঙে,

    ভাস্কর-সম যেদিকে তাকায় সেইদিক ওঠে রেঙে!

    ওলিদের বেটা খালেদ সে বীর যাহার নামের ত্রাসে

    পারস্য-রাজ নীল হয়ে উঠে ঢলে পড়ে সাকি-পাশে!

    রোম-সম্রাট শারাবের জাম-হাতে থরথর কাঁপে,

    ইস্তাম্বুলি বাদশার যত নজ্জুম আয়ু মাপে!

    মজলুম যত মোনাজাত করে কেঁদে কয় “এয়্ খোদা,

    খালেদের বাজু-শমশের রেখো সহি-সালামতে সদা।”

    আজরাইলও সে পারেনি এগুতে যে আজাজিলের আগে,

    ঝুঁটি ধরে তার এনেছে খালেদ, ভেড়ি ধরে যেন বাঘে!

    মালেকুল-মৌত করিবে কব‍্‍জ রু্হ্ সেই খালেদের?–

    হাজার হাজার চামড়া বিছায়ে মাজারে ঘুমায় শের!

    খালেদ! খালেদ! ফজর হল যে, আজান দিতেছে কৌম,

    ওই শোনো শোনো— “আস‍্‍সালাতু খায়র মিনান্নৌম!”

    যত সে জালিম রাজা-বাদশারে মাটিতে করেছে গুম

    তাহাদেরই সেই খাকেতে খালেদ করিয়া তয়ম্মুখ

    বাহিরিয়া এসো, হে রণ-ইমাম, জামায়েত আজ ভারী!

    আরব, ইরান, তুর্ক, কাবুল দাঁড়ায়েছে সারি সারি!

    আব-জমজম উথলি উঠিছে তোমার ওজুর তরে,

    সারা ইসলাম বিনা ইমামেতে আজিকে নামাজ পড়ে!

    খালেদ! খালেদ! ফজরে এলে না, জোহর কাটানু কেঁদে,

    আসরে ক্লান্ত ঢুলিয়াছি শুধু বৃথা তহ‍্‍রিমা বেঁধে!

    এবে কাফনের খেলকা পরিয়া চলিয়াছি বেলা-শেষে,

    মগ‍্‍রেবের আজ নামাজ পড়িব আসিয়া তোমার দেশে!

    খালেদ! খালেদ! সত্য বলিব, ঢাকিব না আজ কিছু,

    সফেদ দেও আজ বিশ্ববিজয়ী, আমরা হটেছি পিছু!

    তোমার ঘোড়ার খুরের দাপটে মরেছে যে পিপীলিকা,

    মোরা আজ দেখি জগৎ জুড়িয়া তাহাদেরই বিভীষিকা!

    হঠিতে হঠিতে আসিয়া পড়েছি আখেরি গোরস্থানে,

    মগ‍্‍রেব-বাদে এশার নামাজ পাব কিনা কে সে জানে!

    খালেদ! খালেদ! বিবস্ত্র মোরা পরেছি কাফন শেষে,

    হাথিয়ার-হারা, দাঁড়ায়েছি তাই তহ‍্‍রিমা বেঁধে এসে!

    ইমামতি তুমি করিবে না জানি, তুমি গাজী মহাবীর,

    দিন-দুনিয়ার শহিদ নোয়ায় তোমার কদমে শির!

    চারিটি জিনিস চিনেছিলে মতুমি, জানিতে না হের-ফের,

    আল্লা, রসুল, ইসলাম আর শের-মারা শমশের!

    খিলাফত তুমি চাওনিকো কভু চাহিলে–আমরা জানি,–

    তোমার হাতের বে-দেরেগ তেগ অবহেলে দিত আনি!

    উমর যেদিন বিনা অজুহাতে পাঠাইল ফরমান,–

    “সিপাহ্-সালার খালেদ পাবে না পূর্বের সম্মান,

    আমার আদেশ–খালেদ ওলিদ সেনাপতি থাকিবে না,

    সাদের অধীনে করিবে যুদ্ধ হয়ে সাধারণ সেনা!”

    ঝরা জলপাই-পাতার মতন কাঁপিতে কাঁপিতে সাদ,

    দিল ফরমান, নফসি নফসি জপে, গণে পরমাদ!

    খালেদ! খালেদ! তাজিমের সাথে ফরমান পড়ে চুমি

    সিপাহ-সালারের সকল জেওর খুলিয়া ফেলিলে তুমি।

    শিশুর মতন সরল হাসিতে বদন উজালা করি

    একে একে সব রেখে দিলে তুমি সাদের চরণ পরি!

    বলিলে, “আমি তো সেনাপতি হতে আসিনি, ইবনে সাদ,

    সত্যের তরে হইব শহীদ, এই জীবনের সাধ!

    উমরের নয়, এ যে খলিফার ফরমান, ছি ছি আমি

    লঙ্ঘিয়া তাহা রোজ-কিয়ামতে হব যশ-বদনামি?”

    মার মুখো যত সেনাদলে ডেকে ইঙ্গিতে বুঝাইলে,

    কুর্নিশ করি সাদেরে, মামুলি সেনাবাসে ডেরা নিলে!

    সেনাদের চোখে আঁসু ধরে না কো, হেসে কেঁদে তারা বলে,–

    “খালেদ আছিল মাথায় মোদের, এবার আসিল কোলে!”

    মক্কায় যবে আসিলে ফিরিয়া, উমর কাঁদিয়া ছুটে,

    এ কী রে, খলিফা কাহার বক্ষে কাঁদিয়া পড়িল লুটে!

    “খালেদ! খালেদ!” ডাকে আর কাঁদে উমর পাগল-প্রায়

    বলে, “সত্যই মহাবীর তুই, বুসা দিই তোকে, আয়!

    তখ‍্‍তের পর তখ‍্‍ত যখন তোমার তেগের আগে

    ভাঙিতে লাগিল, হাতুড়ি যেমন বাদামের খোসা ভাঙে,–

    ভাবিলাম বুঝি তোমারে এবার মুগ্ধ আরব-বাসী

    সিজদা করিবে, বীরপূজা বুঝি আসিল সর্বনাশী!

    পরীক্ষা আমি করেছি খালেদ, ক্ষমা চাই ভাই ফের,

    আজ হতে তুমি সিপাহ-সালার ইসলাম জগতের!”

    খালেদ! খালেদ! কীর্তি তোমার ভুলি নাই মোরা কিছু,

    তুমি নাই তাই ইসলাম আজ হটিতেছে শুধু পিছু।

    পুরানো দামামা পিটিয়া পিটিয়া ছিঁড়িয়ে গিয়াছে আজ,

    আমামা৩ অস্ত্র ছিল নাকো তবু দামামা ঢাকিত লাজ!

    দামামা তো আজ ফাঁসিয়া গিয়াছে, লজ্জা কোথায় রাখি,

    নামাজ রোজার আড়ালেতে তাই ভীরুতা মোদের ঢাকি!

    খালেদ! খালেদ! লুকাব না কিছু, সত্য বলিব আজি,

    ত্যাগী ও শহিদ হওয়া ছাড়া মোরা আর সব হতে রাজি!

    রীশ-ই বুলন্দ্, শেরওয়ানি, চোগা, তসবি ও টুপি ছাড়া

    পড়ে নাকো কিছু, মুসলিম-গাছ ধরে যত দাও নাড়া!

    * * *

    খালেদ! খালেদ! সবার অধম মোরা হিন্দুস্থানি,

    হিন্দু না মোরা মুসলিম তাহা নিজেরাই নাহি জানি!

    সকলে শেষে হামাগুড়ি দিই,–না, না, বসে বসে শুধু

    মুনাজাত করি, চোখের সুমুখে নিরাশা-সাহারা ধুধু!

    দাঁড়ায়ে নামাজ পড়িতে পারি না, কোমর গিয়াছে টুটি,

    সিজদা করিতে ‘বাবা গো’ বলিয়া ধূলিতলে পড়ি লুটি!

    পিছন ফিরিয়া দেখি লাল-মুখ আজরাইলের ভাই,

    আল্লা ভুলিয়া বলি, “প্রভু মোর তুমি ছাড়া নাই।”

    টক্কর খেতে খেতে শেষে এই আসিয়া পড়েছি হেথা,

    খালেদ! খালেদ! রি রি করে বুকে পরাধীনতার ব্যথা!

    বিশ্ব যখন এগিয়ে চলেছে আমরা তখনও বসে

    বিবি-তালাকের ফতোয়া খুঁজেছি ফেকা ও হাদিস চষে!

    হানফী, ওহাবী, লা-মজহাবীর তখনও মেটেনি গোল,

    এমন সময় আজাজিল এসে হাঁকিল, ‘তল্পি তোল!’

    ভিতরের দিকে যত মরিয়াছি, বাহিরের দিকে তত

    গুনতিতে মোড়া বাড়িয়া চলেছি গোরু ছাগলের মত!

    খালেদ! খালেদ! এই পশুদের চামড়া দিয়ে কি তবে

    তোমার পায়ের দুশমন-মারা দুটো পয়জারও হবে?

    হায় হায় হায়, কাঁদে সাহারায় আজিও তেমনই ও কে?

    দজলা-ফোরাত নতুন করিয়া মাতম করিছে শোকে!

    খর্জুর পেকে খোর্মা হইয়া শুকায়ে পড়েছে ঝুরে

    আঙুর বেদানা নতুন করিয়া বেদনার রসে পুরে।

    এক রাশ শুখো আখরোট আর বাদাম ছাড়াতে লয়ে

    আঙুল ছেঁচিয়া মুখ দিয়া চুষে মৌনা আরবি-বউয়ে!

    জগতের সেরা আরবের তেজি যুদ্ধ-তাজির চালে

    বেদুইন-কবি সংগীত রচি নাচিতেছে তালে তালে!

    তেমনই করিয়া কাবার মিনারে চড়িয়া মুয়াজ্জিন

    আজানের সুরে বলে, কোনোমতে আজও বেঁচে আছে দ্বীন!

    খালেদ! খালেদ! দেখো দেখো ওই জমাতের পিছে কারা

    দাঁড়ায়ে রয়েছে, নড়িতে পারে না, আহা রে সর্বহারা!

    সকলের পিছে নহে বটে তবু জমাত-শামিল নয়,

    উহাদের চোখে হিন্দের মতো নাই বটে নিদ‍্‍-ভয়!

    পিরানের সব দামন ছিন্ন, কিন্তু সে সম্মুখে

    পেরেশান ওরা তবু দেখিতেছি ভাঙিয়া পড়েনি দুখে!

    তকদির বেয়ে খুন ঝরে ওই উহারা মেসেরি বুঝি।

    টলে তবু চলে বারে বারে হারে বারে বারে ওরা যুঝি।

    এক হাতে বাঁধা হেম-জিঞ্জির আর এক হাত খোলা

    কী যেন হারামি নেশার আবেশে চক্ষু ওদের ঘোলা!

    ও বুঝি ইরাকি? খালেদ! খালেদ! আরে মজা দেখো, ওঠো,

    শ্বেত-শয়তান ধরিয়াছে আজ তোমার তেগের মুঠো!

    দুহাতে দুপায়ে আড়-বেড়ি দেওয়া ও কারা চলিতে নারে,

    চলিতে চাহিলে আপনার ভায়ে পিছন হইতে মারে।

    মরদের মতো চেহারা ওদের স্বাধীনের মতো বুলি,

    অলস দু-বাজু দু-চোখ সিয়াহ৬ অবিশ্বাসের ঠুলি!

    শামবাসী ওরা সহিতে শেখেনি পরাধীনতার চাপ,

    তলওয়ার নাই, বহিছে কটিতে কেবল শূন্যে খাপ!

    খালেদ! খালেদ! মিসমার হল তোমার ইরাক শাম,

    জর্ডন নদে ডুবিয়াছে পাক জেরুজালেমের নাম!

    খালেদ! খালেদ! দুধারি তোমার কোথা সেই তলোয়ার?

    তুমি ঘুমায়েছ, তলোয়ার তব সে তো নহে ঘুমাবার!

    জং ধরেনিকো কখনও তাহাতে জঙ্গের খুনে নেয়ে,

    হাথেলিতে তব নাচিয়া ফিরেছে যেন বেদুইন মেয়ে!

    খাপে বিরামের অবসর তার মেলেনি জীবনে কভু,

    জুলফিকার সে দুখান হয়েছে, ও তেগ টুটেনি তবু।

    তুমি নাই তাই মরিয়া গিয়াছে তরবারিও কি তব?

    হাত গেছে বলে হাত-যশও গেল? গল্প এ অভিনব!

    খালেদ! খালেদ! জিন্দা হয়েছে আবার হিন্দা বুড়ি,

    কত হামজারে মারে জাদুকরি, দেশে দেশে ফেরে উড়ি!

    ও কারা সহসা পর্বত ভেঙে তুহিন স্রোতের মতো,

    শত্রুর শিরে উন্মদবেগে পড়িতেছে অবিরত!

    আগুনের দাহে গলিছে তুহিন আবার জমিয়া উঠে,

    শির উহাদের ছুটে গেল হায়! তবু নাহি পড়ে টুটে!

    ওরা মরক্কো মরদের জাত মৃত্যু মুঠার পরে,

    শত্রুর হাতে শির দিয়া ওরা শুধু হাতে পায়ে লড়ে!

    খালেদ! খালেদ! সর্দার আর শির পায় যদি মূর

    খাসা জুতো তারা করিবে তৈরি খাল দিয়া শত্রুর!

    খালেদ! খালেদ! জাজিরাতুল সে আরবের পাক মাটি

    পলিদ হইল, খুলেছে এখানে যুরোপ পাপের ভাঁটি!

    মওতের দারু পিইলে ভাঙে না হাজার বছরি ঘুম?

    খালেদ! খালেদ! মাজার আঁকড়ি কাঁদিতেছে মজলুম।

    খোদার হাবিব বলিয়া গেছেন আসিবেন ইসা ফের,

    চাই না মেহেদি, তুমি এসো বীর হাতে নিয়ে শমশের।

    কৃষ্ণনগর,

    ২১ অগ্রহায়ণ, ’৩৩

  • সুবহ্-উম্মেদ

    সুবহ্-উম্মেদ

    সুবহ্-উম্মেদ

    [পূর্বাশা]

    সর্বনাশের পরে পৌষ মাস

    এল কি আবার ইসলামের?

    মন্বন্তর-অন্তে কে দিল

    ধরণীরে ধন-ধান্য ঢের?

    ভুখারীর রোজা রমজান পরে

    এল কি ঈদের নওরোজা?

    এল কি আরব-আহবে আবার

    মূর্ত মর্ত-মোর্তজা?

    হিজরত করে হজরত কি রে

    এল এ মেদিনী-মদিনা ফের?

    নতুন করিয়া হিজরি গণনা

    হবে কি আবার মুসলিমের?

    * * *

    বরদ-বিজয়ী বদরুদ্দোজা

    ঘুচাল কি অমা রৌশনিতে?

    সিজাদ করিল নিজ‍্‍দ হেজাজ

    আবার ‘কাবা’র মসজিদে।

    আরবে করিল ‘দারুল-হারব’—

    ধসে পড়ে বুঝি ‘কাবা’র ছাদ!

    ‘দীন দীন’রবে শমশের-হাতে

    ছুটে শের-নর ‘ইবনে সাদ’!

    মাজার ফাড়িয়া উঠিল হাজার

    জিন্দান-ভাঙা জিন্দা বীর!

    গারত হইল করদ হুসেন,

    উঁচু হল পুন শির নবীর!

    আরব আবার হল আরাস্তা,

    বান্দারা যত পড়ে দরুদ।

    পড়ে শুকরানা ‘আরবা রেকাত’

    আরফাতে যত স্বর্গ-দূত।

    ঘোষিল ওহদ, ‘আল্লা আহদ!’

    ফুকারে তূর্য তুর পাহাড়

    মন্দ্রে বিশ্ব-রন্ধ্রে-রন্ধ্রে

    মন্ত্র আল্লা-হু-আকবার!

    জাগিয়া শুনিনু প্রভাতি আজান

    দিতেছে নবীন মোয়াজ্জিন।

    মনে হল এল ভক্ত বেলাল

    রক্ত এ-দিনে জাগাতে দীন!

    জেগেছে তখন তরুণ তুরাণ

    গোর চিরে যেন আঙ্গোরায় ।

    গ্রীসের গরুরী গারত করিয়া

    বোঁও বোঁও তলোয়ার ঘোরায়।

    রংরেজ যেন শমশের যত

    লালফেজ-শিরে তুর্কিদের।

    লালে-লাল করে কৃষ্ণসাগর

    রক্ত-প্রবাল চূর্ণি ফের।

    মোতি হার সম হাথিয়ার দোলে

    তরুণ তুরাণি বুকে পিঠে!

    খাট্টা-মেজাজ গাঁট্টা মারিছে

    দেশ-শত্রুর গিঁঠে গিঁঠে!

    মুক্ত চন্দ্র-লাঞ্ছিত ধ্বজা

    পতপত ওড়ে তুর্কিতে,

    রঙিন আজি ম্লান আস্তানা

    সুরখ রঙের সুর্খিতে

    * * *

    বিরান মুলুক ইরানও সহসা

    জাগিয়াছে দেখি ত্যজিয়া নিদ!

    মাশুকের বাহু ছাড়ায়ে আশিক

    কসম করিছে হবে শহীদ!

    লায়লীর প্রেমে মজনুন আজি

    ‘লা-এলা’র তরে ধরেছে তেগ।

    শিরীন শিরীরে ভুলে ফরহাদ

    সারা ইসলাম পরে আশেক!

    পেশতা-আপেল-আনার-আঙুর—

    নারঙ্গি-শেব-বোস্তানে

    মুলতুবি আজ সাকি ও শরাব

    দীওয়ান-ই-হাফিজ জুজদানে!

    নার্গিস লালা লালে-লাল আজি

    তাজা খুন মেখে বীর প্রাণের,

    ফিরদৌসীর রণ-দুন্দুভি

    শুনে পিঞ্জরে জেগেছে শের!

    হিংসায়-সিয়া শিয়াদের তাজে

    শিরাজী-শোণিমা লেগেছে আজ।

    নৌ-রুস্তম উঠেছে রুখিয়া

    সফেদ দানবে দিয়াছে লাজ?

    * * *

    মরা মরক্কো মরিয়া হইয়া

    মাতিয়াছে করি মরণ-পণ,

    স্তম্ভিত হয়ে হেরিছে বিশ্ব–

    আজও মুসলিম ভোলেনি রণ!

    জ্বালাবে আবার খেদিব-প্রদীপ

    গাজী আবদুল করিম বীর,

    দ্বিতীয় কামাল রীফ-সর্দার—

    স্পেন ভয়ে পায়ে নোয়ায় শির!

    রীফ শরিফ সে কতটুকু ঠাঁই

    আজ তারই কথা ভুবনময়!—

    মৃত্যুর মাঝে মৃত্যুঞ্জয়ে

    দেখেছে যাহারা, তাদেরই জয়!

    মেষ-সম যারা ছিল এতদিন

    শের হল আজ সেই মেসের!

    এ-মেষের দেশ মেষ-ই রহিল

    কাফ্রির অধম এরা কাফের!

    নীল দরিয়ায় জেগেছে জোয়ার

    ‘মুসা’র উষার টুটেছে ঘুম।

    অভিশাপ-‘আসা’ গর্জিয়া আসে

    গ্রাসিবে যন্ত্রী-জাদু-জুলুম।

    ফেরাউন আজও মরেনি ডুবিয়া?

    দেরি নাই তার, ডুবিবে কাল!

    জালিম-রাজার প্রাসাদে প্রাসাদে

    জ্বলেছে খোদার লাল মশাল!

    * * *

    কাবুল লইল নতুন দীক্ষা

    কবুল করিল আপনা জান।

    পাহাড়ী তরুর শুকনো শাখায়

    গাহে বুলবুল খোশ এলহান!

    পামির ছাড়িয়া আমীর আজিকে

    পথের ধুলায় খোঁজে মণি!

    মিলিয়াছে মরা মরু-সাগরে রে

    আব-হায়াতের প্রাণ-খনি!

    খর-রোদ-পোড়া খর্জুর তরু—

    তারও বুক ফেটে ক্ষরিছে ক্ষীর!

    “সুজলা সুফলা শস্য-শ্যামলা”

    ভারতের বুকে নাই রুধির!

    জাগিল আরব ইরান তুরান

    মরক্কো আফগান মেসের।–

    সর্বনাশের পরে পৌষমাস

    এল কি আবার ইসলামের?

    * * *

    কসাই-খানার সাত কোটি মেষ

    ইহাদেরই শুধু নাই কি ত্রাণ

    মার খেয়ে খেয়ে মরিয়া হইয়া

    উঠিতে এদের নাই প্রাণ?

    জেগেছে আরব ইরান তুরান

    মরক্কো আফগান মেসের।

    এয়্ খোদা! এই জাগরণ-রোলে

    এ-মেষের দেশও জাগাও ফের!

    হুগলী,

    অগ্রহায়ণ, ১৩৩১

  • খোশ-আমদেদ

    খোশ-আমদেদ

    খোশ-আমদেদ2

    আসিলে
    কে গো অতিথি উড়ায়ে নিশান সোনালী।
    ও চরণ
    ছুঁই কেমন হাতে মোর মাখা যে কালি॥
    দখিনের
    হালকা হাওয়ায় আসলে ভেসে সুদূর বরাতি
    শবে-রাত
    আজ উজালা গো আঙিনায় জ্বলল দীপালি॥
    তালিবান
    ঝুমকি বাজায়, গায় মোবারক-বাদ3 কোয়েলা।
    উলসি
    উপচে পলো পলাশ অশোক ডালের ঐ ডালি॥
    প্রাচীন ঐ
    বটের ঝুরির দোলনাতে হায় দুলিছে শিশু।
    ভাঙা ঐ
    দেউল-চূড়ে উঠল বুঝি নৌ-চাঁদের ফালি॥
    এল কি
    অলখ-আকাশ বেয়ে তরুণ হারুণ-আল-রশীদ।
    এল কি
    আল-বেরুনি হাফিজ খৈয়াম কায়েস গাজ্জালি॥
    সানাইয়াঁ
    ভয়রোঁ বাজায়, নিদ-মহলায় জাগল শাহজাদি।
    কারুণের4
    রুপার পুরে নূপুর-পায়ে আসল রূপ-ওয়ালি।
    খুশির এ‍
    বুলবুলিস্তানে মিলেছে ফরহাদ ও শিরীঁ।
    লাল এ
    লায়লী লোকে মজনুঁ হরদম চালায় পেয়ালি॥
    বাসি ফুল
    কুড়িয়ে মালা না-ই গাঁথিলি, রে ফুল-মালি!
    নবীনের
    আসার পথে উজাড় করে দে ফুল ডালি॥

    পদ্মা

    ২৭.২.২৭

  • নওরোজ

    নওরোজ

    নওরোজ

    রূপেরে সওদা কে করিবি তোরা আয় রে আয়,

    নওরোজের এই মেলায়!

    ডামাডোল আজি চাঁদের হাট

    লুট হল রূপ হল লোপাট!

    খুলে ফেলে লাজ শরম-টাট

    রূপসীরা সব রূপ বিলায়

    বিনি-কিম্মতে হাসি-ইঙ্গিতে হেলাফেলায়

    নওরোজের এই মেলায়!

    শা’জাদা উজির নওয়াব-জাদারা–রূপকুমার

    এই মেলার খরিদ-দার!

    নও-জোয়ানীর জহুরি ঢের

    খুঁজিছে বিপণি জহরতের,

    জহরত নিতে–টেড়া আঁখের

    জহর কিনিছে নির্বিকার!

    বাহানা করিয়া ছোঁয় গো পিরান জাহানারার

    নওরোজের রূপকুমার!

    ফিরি করে ফেরে শা’জাদি বিবি ও বেগম সাব

    চাঁদ-মুখের নাই নেকাব1?

    শূন্য দোকানে পসারিণী

    কে জানে কী করে বিকি-কিনি!

    চুড়ি-কঙ্কণে রিনিঠিনি

    কাঁদিছে কোমল কড়ি রেখাব।

    অধরে অধরে দর-কষাকষি–নাই হিসাব!

    হেম-কপোল লাল গোলাব।

    হেরেম-বাঁদিরা দেরেম2 ফেলিয়া মাগিছে দিল,

    নওরোজের নও-ম’ফিল3!

    সাহেব গোলাম, খুনি আশেক4,

    বিবি বাঁদি, –সব আজিকে এক!

    চোখে চোখে পেশ দাখিলা চেক

    দিলে দিলে মিল এক সামিল।

    বে-পরওয়া আজ বিলায় বাগিচা ফুল-ত’বিল5!

    নওরোজের নও-মফিল!

    ঠোঁটে ঠোঁটে আজ মিঠি শরবত ঢাল উপুড়,

    রণ-ঝনায় পায় নূপুর।

    কিসমিস-ছেঁচা আজ অধর,

    আজিকে আলাপ ‘মোখতসর6’!

    কার পায়ে পড়ে কার চাদর,

    কাহারে জড়ায় কার কেয়ূর,

    প্রলাপ বকে গো কলাপ মেলিয়া মন-ময়ূর,

    আজ দিলের নাই সবুর।

    আঁখির নিক্তি করিছে ওজন প্রেম দেদার

    ভার কাহারা অশ্রু-হার।

    চোখে চোখে আজ চেনাচেনি,

    বিনি মূলে আজ কেনাকেনি,

    নিকাশ করিয়া লেনাদেনি

    ‘ফাজিল7’ কিছুতে কমে না আর!

    পানের বদলে মুন্না8 মাগিছে পান্না-হার!

    দিল সবার ‘বে-কারার9!

    সাধ করে আজ বরবাদ করে দিল সবাই

    নিমখুন কেউ কেউ জবাই!

    লিকপিক করে ক্ষীণ কাঁকাল,

    পেশোয়াজ কাঁপে টালমাটাল,

    গুরু ঊরু-ভারে তনু নাকাল,

    টলমল আঁখি জল-বোঝাই!

    হাফিজ উমর শিরাজ পালায়ে লেখে ‘রুবাই10’!

    নিমখুন কেউ কেউ জবাই!

    শিরী লায়লীরে খোঁজ ফরহাদ খোঁজে কায়েস

    নওরোজের এই সে দেশ!

    ঢুড়েঁ ফেরে হেথা যুবা সেলিম

    নূরজাহানের দূর সাকিম,

    আরংজিব আজ হইয়া ঝিম

    হিয়ায় হিয়ায় চাহে আয়েস!

    তখ‍্‍ত-তাউস কোহিনূর কারও নাই খায়েশ,

    নওরোজের এই সে দেশ!

    গুলে-বকৌলি ঊর্বশীর এ চাঁদনি-চক,

    চাও হেথায় রূপ নিছক।

    শারাব সাকি ও রঙে রূপে

    আতর লোবান ধুনা ধূপে

    সয়লাব সব যাক ডুবে,

    আঁখি-তারা হোক নিষ্পলক।

    চাঁদো মুখে আঁকো কালো কলঙ্ক তিল-তিলক।

    চাও হেথায় রূপ নিছক!

    হাসিস-নেশায় ঝিম মেরে আছে আজ সকল

    লাল পানির রংমহল।

    চাঁদ-বাজারে এ নওরোজের

    দোকান বসেছে মোমতাজের

    সওদা করিতে এসেছে ফের

    শাজাহান হেথা রূপ-পাগল।

    হেরিতেছে কবি সুদূরের ছবি

    ভবিষ্যতের তাজমহল–

    নওরোজের স্বপ্ন-ফল!

    কৃষ্ণনগর,

    ১৫ই জ্যৈষ্ঠ, ১৩৩৪

  • অগ্র-পথিক

    অগ্র-পথিক

    অগ্র-পথিক

    অগ্র-পথিক হে সেনাদল,

    জোর  -কদম  চল্ রে চল্।

    রৌদ্রদগ্ধ মাটিমাখা শোন ভাইরা মোর,

    বসি বসুধায় নব অভিযান আজিকে তোর!

    রাখ তৈয়ার হাথেলিতে হাথিয়ার জোয়ান,

    হান রে নিশিত পাশুপতাস্ত্র অগ্নিবাণ!

    কোথায় হাতুড়ি কোথা শাবল?

    অগ্র-পথিক রে সেনাদল,

    জোর কদম চল্ রে চল্॥

    কোথায় মানিক ভাইরা আমার, সাজ রে সাজ!

    আর বিলম্ব সাজে না, চালাও কুচকাওয়াজ!

    আমরা নবীন তেজ-প্রদীপ্ত বীর তরুণ

    বিপদ বাধার কণ্ঠ ছিঁড়িয়া শুষিব খুন!

    আমরা ফলাব ফুল-ফসল।

    অগ্র-পথিক রে যুবাদল,

    জোর কদম চল রে চল॥

    প্রাণ-চঞ্চল প্রাচী-র তরুণ, কর্মবীর,

    হে মানবতার প্রতীক গর্ব উচ্চশির!

    দিব্যচক্ষে দেখিতেছি, তোরা দৃপ্তপদ

    সকলের আগে চলিবি পারায়ে গিরি ও নদ,

    মরু-সঞ্চর গতি-চপল।

    অগ্র-পথিক রে পাঁওদল,

    জোর কদম চল্ রে চল্॥

    স্থবির শ্রান্ত প্রাচী-র প্রাচীন জাতিরা সব

    হারায়েছে আজ দীক্ষাদানের সে-গৌরব।

    অবনত-শির গতিহীন তারা। মোরা তরুণ

    বহিব সে ভার, লব শাশ্বত ব্রত দারুণ

    শিখাব নতুন মন্ত্রবল।

    রে নব পথিক যাত্রীদল,

    জোর কদম চল্ রে চল্॥

    আমরা চলিব পশ্চাতে ফেলি পচা অতীত,

    গিরি-গুহা ছাড়ি খোলা প্রান্তরে গাহিব গীত।

    সৃজিব জগৎ বিচিত্রতর, বীর্যবান,

    তাজা জীবন্ত সে নব সৃষ্টি শ্রম-মহান,

    চলমান-বেগে প্রাণ-উছল।

    রে নবযুগের স্রষ্টাদল,

    জোর কদম চল্ রে চল্॥

    অভিযান-সেনা আমরা ছুটিব দলে দলে

    বনে নদীতটে গিরি-সঙ্কটে জলে থলে।

    লঙ্ঘিব খাড়া পর্বত-চূড়া অনিমিষে,

    জয় করি সব তসনস করি পায়ে পিষে,

    অসীম সাহসে ভাঙি আগল!

    না জানা পথের নকিব-দল,

    জোর কদম চল্ রে চল্॥

    পাতিত করিয়া শুষ্ক বৃদ্ধ অটবীরে

    বাঁধ বাঁধি চলি দুস্তর খর স্রোত-নীরে।

    রসাতল চিরি হীরকের খনি করি খনন,

    কুমারী ধরার গর্ভে করি গো ফুল সৃজন,

    পায়ে হেঁটে মাপি ধরণীতল!

    অগ্র-পথিক রে চঞ্চল,

    জোর কদম চল্ রে চল্॥

    আমরা এসেছি নবীন প্রাচী-র নবস্রোতে

    ভীম পর্বত ক্রকচ-গিরির১ চূড়া হাতে,

    উচ্চ অধিত্যকা প্রণালিকা হইয়া বার;

    আহত বাঘের পদ-চিন ধরি হয়েছি বার;

    পাতাল ফুঁড়িয়া, পথ-পাগল।

    অগ্রবাহিনী পথিক-দল,

    জোর কদম চল্ রে চল্॥

    আয়র্ল্যাণ্ড, আরব, মিশর, কোরিয়া চীন,

    নরওয়ে, স্পেন, রাশিয়া,–সবার ধারি গো ঋণ!

    সবার রক্তে মোদের লোহুর আভাস পাই,

    এক বেদনার ‘কমরেড’ ভাই মোরা সবাই।

    সকল দেশের মোরা সকল।

    রে চির-যাত্রী পথিক-দল,

    জোর কদম চল্ রে চল্॥

    বলগা্-বিহীন শৃঙ্খল-ছেঁড়া প্রিয় তরুণ!

    তোদের দেখিয়া টগবগ করে বক্ষে খুন।

    কাঁদি বেদনায়, তবু রে তোদের ভালোবাসায়

    উল্লাসে নাচি আপনা-বিভোল, নব আশায়।

    ভাগ্য-দেবীর লীলা-কমল,

    অগ্রপথিক রে সেনাদল!

    জোর কদম চল্ রে চল্॥

    তরুণ তাপস! নব শক্তিরে জাগায়ে তোল।

    করুণার নয়–ভয়ংকরীর দুয়ার খোল।

    নাগিনি-দশনা রণরঙ্গিণী শস্ত্রকর

    তোর দেশ-মাতা, তাহারই পতাকা তুলিয়া ধর।

    রক্ত-পিয়াসি অচঞ্চল

    নির্মম-ব্রত রে সেনাদল!

    জোর কদম চল্ রে চল্॥

    অভয়-চিত্ত ভাবনা-মুক্ত যুবারা, শুন!

    মোদের পিছনে চিৎকার করে পশু, শকুন।

    ভ্রুকুটি হানিছে পুরাতন পচা গলিতে শব,

    রক্ষণশীল বুড়োরা করছি তারই স্তব

    শিবারা চেঁচাক, শিব অটল!

    নির্ভীক বীর পথিক-দল,

    জোর কদম চল্ রে চল্॥

    আগে–আরও আগে সেনা-মুখ যথা করিছে রণ,

    পলকে হতেছে পূর্ণ মৃতের শূন্যাসন,

    আছে ঠাঁই আছে, কে থামে পিছনে? হ আগুয়ান!

    যুদ্ধের মাঝে পরাজয় মাঝ চলো জোয়ান!

    জ্বাল রে মশাল জ্বাল অনল!

    অগ্রযাত্রী রে সেনাদল,

    জোর কদম চল্ রে চল্॥

    নতুন করিয়া ক্লান্ত ধরার মৃত শিরায়

    স্পন্দন জাগে আমাদের তরে, নব আশায়।

    আমাদেরই তারা – চলিছে যাহারা দৃঢ় চরণ

    সম্মুখ পানে, একাকী অথবা শতেক জন।

    মোরা সহস্র-বাহু-সবল।

    রে চির-রাতের সান্ত্রীদল,

    জোর কদম চল্ রে চল্॥

    জগতের এই বিচিত্রতম মিছিলে ভাই

    কত রূপ কত দৃশ্যের লীলা চলে সদাই!—

    শ্রমরত ওই কালি-মাখা কুলি, নৌ-সারং,

    বলদের মাঝে হলধর চাষা দুখের সং,

    প্রভু স-ভৃত্য পেষণ-কল,—

    অগ্র-পথিক উদাসী-দল,

    জোর কদম চল্ রে চল্॥

    নিখিল গোপন ব্যর্থ-প্রেমিক আর্ত-প্রাণ

    সকল কারার সকল বন্দী আহত-মান,

    ধরার সকল সুখী ও দুঃখী, সৎ, অসৎ,

    মৃত, জীবন্ত, পথ-হারা, যারা ভোলেনি পথ,—

    আমাদের সাথী এরা সকল।

    অগ্র-পথিক রে সেনাদল,

    জোর কদম চল্ রে চল্॥

    ছুঁড়িতেছে ভাঁটা জ্যোতির্চক্র ঘূর্ণমান

    হেরো পুঞ্জিত গ্রহ-রবি-তারা দীপ্তপ্রাণ;

    আলো-ঝলমল দিবস, নিশীথ স্বপ্নাতুর,—

    বন্ধুর মতো চেয়ে আছে সবে নিকট-দূর।

    এক ধ্রুব সবে পথ-উতল।

    নব যাত্রিক পথিক দল,

    জোর কদম চল্ রে চল্॥

    আমাদের এরা, আছে এরা সবে মোদের সাথ,

    এরা সখা–সহযাত্রী মোদের দিবস-রাত।

    ভ্রূণ-পথে আসে মোদের পথের ভাবী পথিক,

    এ মিছিলে মোরা অগ্র-যাত্রী সুনির্ভিক।

    সুগম করিয়া পথ পিছল

    অগ্র-পথিক রে সেনাদল,

    জোর কদম চল্ রে চল্॥

    ওগো ও প্রাচী-র দুলালি দুহিতা তরুণীরা,

    ওগো জায়া ওগো ভগিনীরা। ডাকে সঙ্গীরা।

    তোমরা নাই গো লাঞ্ছিত মোরা তাই আজি

    উঠুক তোমার মণি-মঞ্জীর ঘন বাজি

    আমাদের পথে চল-চপল।

    অগ্র-পথিক তরুণ-দল

    জোর কদম চল্ রে চল্॥

    ওগো অনাগত মরু-প্রান্তর বৈতালিক!

    শুনিতেছি তব আগমনি-গীতি দিগ‍্‍বিদিক।

    আমাদেরই মাঝে আসিতেছ তুমি দ্রুত পায়ে।—

    ভিন-দেশী কবি! থামাও বাঁশরি বট-ছায়ে,

    তোমার সাধনা আজি সফল।

    অগ্র-পথিক চারণ-দল

    জোর কদম চল্ রে চল্॥

    আমরা চাহি না তরল স্বপন, হালকা সুখ,

    আরাম-কুশন, মখমল-চটি, পানসে থুক

    শান্তির বাণী, জ্ঞান-বানিয়ার বই-গুদাম,

    ছেঁদো ছন্দের পলকা, উর্ণা, সস্তা নাম,

    পচা দৌলত;—দুপায়ে দল!

    কঠোর দুখের তাপসদল,

    জোর কদম চল্ রে চল্॥

    পান-আহার ভোজে মত্ত কি যত ঔদরিক?

    দুয়ার জানালা বন্ধ করিয়া ফেলিয়া চিক

    আরাম করিয়া ভুঁড়োরা ঘুমায়?—বন্ধু, শোন,

    মোটা ডালরুটি, ছেঁড়া কম্বল,ভূমি-শয়ন,

    আছে তো মোদের পাথেয়-বল!

    ওরে বেদনার পূজারি দল,

    মোছ রে অশ্রু, চল্ রে চল্॥

    নেমেছে কি রাতি? ফুরায় না পথ সুদুর্গম?

    কে থামিস পথে ভগ্নোৎসাহ নিরুদ্যম?

    বসে নে খানিক পথ-মঞ্জিলে, ভয় কী ভাই,

    থামিলে দুদিন ভোলে যদি লোকে–ভুলুক তাই!

    মোদের লক্ষ্য চির-অটল!

    অগ্র-পথিক ব্রতীর দল,

    জোর কদম চল্ রে চল্॥

    শুনিতেছি আমি, শোন ওই দূরে তূর্য-নাদ

    ঘোষিছে নবীন উষার উদয়-সুসংবাদ!

    ওরে ত্বরা কর! ছুটে চল আগে—আরও আগে!

    গান গেয়ে চলে অগ্র-বাহিনী, ছুটে চল তারও পুরোভাগে!

    তোর অধিকার কর দখল!

    অগ্র-নায়ক রে পাঁওদল!

    জোর কদম চল্ রে চল্॥