সুবহ্-উম্মেদ

[পূর্বাশা]

সর্বনাশের পরে পৌষ মাস

এল কি আবার ইসলামের?

মন্বন্তর-অন্তে কে দিল

ধরণীরে ধন-ধান্য ঢের?

ভুখারীর রোজা রমজান পরে

এল কি ঈদের নওরোজা?

এল কি আরব-আহবে আবার

মূর্ত মর্ত-মোর্তজা?

হিজরত করে হজরত কি রে

এল এ মেদিনী-মদিনা ফের?

নতুন করিয়া হিজরি গণনা

হবে কি আবার মুসলিমের?

* * *

বরদ-বিজয়ী বদরুদ্দোজা

ঘুচাল কি অমা রৌশনিতে?

সিজাদ করিল নিজ‍্‍দ হেজাজ

আবার ‘কাবা’র মসজিদে।

আরবে করিল ‘দারুল-হারব’—

ধসে পড়ে বুঝি ‘কাবা’র ছাদ!

‘দীন দীন’রবে শমশের-হাতে

ছুটে শের-নর ‘ইবনে সাদ’!

মাজার ফাড়িয়া উঠিল হাজার

জিন্দান-ভাঙা জিন্দা বীর!

গারত হইল করদ হুসেন,

উঁচু হল পুন শির নবীর!

আরব আবার হল আরাস্তা,

বান্দারা যত পড়ে দরুদ।

পড়ে শুকরানা ‘আরবা রেকাত’

আরফাতে যত স্বর্গ-দূত।

ঘোষিল ওহদ, ‘আল্লা আহদ!’

ফুকারে তূর্য তুর পাহাড়

মন্দ্রে বিশ্ব-রন্ধ্রে-রন্ধ্রে

মন্ত্র আল্লা-হু-আকবার!

জাগিয়া শুনিনু প্রভাতি আজান

দিতেছে নবীন মোয়াজ্জিন।

মনে হল এল ভক্ত বেলাল

রক্ত এ-দিনে জাগাতে দীন!

জেগেছে তখন তরুণ তুরাণ

গোর চিরে যেন আঙ্গোরায় ।

গ্রীসের গরুরী গারত করিয়া

বোঁও বোঁও তলোয়ার ঘোরায়।

রংরেজ যেন শমশের যত

লালফেজ-শিরে তুর্কিদের।

লালে-লাল করে কৃষ্ণসাগর

রক্ত-প্রবাল চূর্ণি ফের।

মোতি হার সম হাথিয়ার দোলে

তরুণ তুরাণি বুকে পিঠে!

খাট্টা-মেজাজ গাঁট্টা মারিছে

দেশ-শত্রুর গিঁঠে গিঁঠে!

মুক্ত চন্দ্র-লাঞ্ছিত ধ্বজা

পতপত ওড়ে তুর্কিতে,

রঙিন আজি ম্লান আস্তানা

সুরখ রঙের সুর্খিতে

* * *

বিরান মুলুক ইরানও সহসা

জাগিয়াছে দেখি ত্যজিয়া নিদ!

মাশুকের বাহু ছাড়ায়ে আশিক

কসম করিছে হবে শহীদ!

লায়লীর প্রেমে মজনুন আজি

‘লা-এলা’র তরে ধরেছে তেগ।

শিরীন শিরীরে ভুলে ফরহাদ

সারা ইসলাম পরে আশেক!

পেশতা-আপেল-আনার-আঙুর—

নারঙ্গি-শেব-বোস্তানে

মুলতুবি আজ সাকি ও শরাব

দীওয়ান-ই-হাফিজ জুজদানে!

নার্গিস লালা লালে-লাল আজি

তাজা খুন মেখে বীর প্রাণের,

ফিরদৌসীর রণ-দুন্দুভি

শুনে পিঞ্জরে জেগেছে শের!

হিংসায়-সিয়া শিয়াদের তাজে

শিরাজী-শোণিমা লেগেছে আজ।

নৌ-রুস্তম উঠেছে রুখিয়া

সফেদ দানবে দিয়াছে লাজ?

* * *

মরা মরক্কো মরিয়া হইয়া

মাতিয়াছে করি মরণ-পণ,

স্তম্ভিত হয়ে হেরিছে বিশ্ব–

আজও মুসলিম ভোলেনি রণ!

জ্বালাবে আবার খেদিব-প্রদীপ

গাজী আবদুল করিম বীর,

দ্বিতীয় কামাল রীফ-সর্দার—

স্পেন ভয়ে পায়ে নোয়ায় শির!

রীফ শরিফ সে কতটুকু ঠাঁই

আজ তারই কথা ভুবনময়!—

মৃত্যুর মাঝে মৃত্যুঞ্জয়ে

দেখেছে যাহারা, তাদেরই জয়!

মেষ-সম যারা ছিল এতদিন

শের হল আজ সেই মেসের!

এ-মেষের দেশ মেষ-ই রহিল

কাফ্রির অধম এরা কাফের!

নীল দরিয়ায় জেগেছে জোয়ার

‘মুসা’র উষার টুটেছে ঘুম।

অভিশাপ-‘আসা’ গর্জিয়া আসে

গ্রাসিবে যন্ত্রী-জাদু-জুলুম।

ফেরাউন আজও মরেনি ডুবিয়া?

দেরি নাই তার, ডুবিবে কাল!

জালিম-রাজার প্রাসাদে প্রাসাদে

জ্বলেছে খোদার লাল মশাল!

* * *

কাবুল লইল নতুন দীক্ষা

কবুল করিল আপনা জান।

পাহাড়ী তরুর শুকনো শাখায়

গাহে বুলবুল খোশ এলহান!

পামির ছাড়িয়া আমীর আজিকে

পথের ধুলায় খোঁজে মণি!

মিলিয়াছে মরা মরু-সাগরে রে

আব-হায়াতের প্রাণ-খনি!

খর-রোদ-পোড়া খর্জুর তরু—

তারও বুক ফেটে ক্ষরিছে ক্ষীর!

“সুজলা সুফলা শস্য-শ্যামলা”

ভারতের বুকে নাই রুধির!

জাগিল আরব ইরান তুরান

মরক্কো আফগান মেসের।–

সর্বনাশের পরে পৌষমাস

এল কি আবার ইসলামের?

* * *

কসাই-খানার সাত কোটি মেষ

ইহাদেরই শুধু নাই কি ত্রাণ

মার খেয়ে খেয়ে মরিয়া হইয়া

উঠিতে এদের নাই প্রাণ?

জেগেছে আরব ইরান তুরান

মরক্কো আফগান মেসের।

এয়্ খোদা! এই জাগরণ-রোলে

এ-মেষের দেশও জাগাও ফের!

হুগলী,

অগ্রহায়ণ, ১৩৩১