» » অঘ্রাণের সওগাত

অঘ্রাণের সওগাত

ঋতুর খাঞ্চা ভরিয়া এল কি ধরণির সওগাত[১]?

নবীন ধানের আঘ্রাণে আজি অঘ্রাণ হল মাত।

‘গিন্নি-পাগল’ চালের ফির্‌নি[২]

তশতরি ভরে নবীনা গিন্নি

হাসিতে হাসিতে দিতেছে স্বামীরে, খুশিতে কাঁপিছে হাত।

শিরনি বাঁধেন বড়ো বিবি, বাড়ি গন্ধে তেলেসমাত!

মিয়াঁ ও বিবিতে বড়ো ভাব আজি খামারে ধরে না ধান।

বিছানা করিতে ছোট বিবি রাতে চাপা সুরে গাহে গান!

‘শাশবিবি[৩]’ কন, “আহা, আসে নাই

কতদিন হল মেজলা জামাই।”

ছোট মেয়ে কয়, “আম্মা গো, রোজ কাঁদে মেজো বুবুজান!”

দলিজের[৪] পান সাজিয়া সাজিয়া সেজো-বিবি লবেজান!

হল্লা করিয়া ফিরিছে পাড়ায় দস্যি ছেলের দল।

ময়নামতীর শাড়ি-পরা মেয়ে গয়নাতে ঝলমল!

নতুন পৈঁচি-বাজুবন্দ পরে

চাষা-বউ কথা কয় না গুমোরে,

জারিগান আর গাজির গানেতে সারা গ্রাম চঞ্চল!

বউ করে পিঠা ‘পুর’-দেওয়া মিঠা, দেখে জিভে সরে জল!

মাঠের সাগরে জোয়ারের পরে লেগেছে ভাটির টান।

রাখাল ছেলের বিদায়-বাঁশিতে ঝুরিছে আমন ধান!

কৃষক-কণ্ঠে ভাটিয়ালি সুর

রোয়ে রোয়ে মরে বিদায়-বিধুর!

ধান ভানে বউ, দুলে দুলে ওঠে রূপ-তরঙ্গে বান!

বধূর পায়ের পরশে পেয়েছে কাঠের ঢেঁকিও প্রাণ!

হেমন্ত-গায় হেলান দিয়ে গো রৌদ্র পোহায় শীত!

কিরণ-ধারায় ঝরিয়া পড়িছে সূর্য–আলো-সরিৎ!

দিগন্তে যেন তুর্কি কুমারী

কুয়াশা-নেকাব[৫] রেখেছে উতারি।

চাঁদের প্রদীপ জ্বালাইয়া নিশি জাগিছে একা নিশীথ!

নতুনের পথ চেয়ে চেয়ে হল হরিত পাতারা পীত।

নবীনের লাল ঝাণ্ডা উড়ায়ে আসিতেছে কিশলয়,

রক্ত-নিশান নহে যে রে ওরা রিক্ত শাখার জয়!

‘মুজ‍্দা[৬]’ এনেছে অগ্রহায়ণ—

আসে নওরোজ খোলো গো তোরণ!

গোলা ভরে রাখো সারা বছরের হাসি-ভরা সঞ্চয়।

বাসি বিছানায় জাগিতেছে শিশু সুন্দর নির্ভয়!

কলিকাতা

১০ কার্তিক ১৩৩৩

টীকা

  1. সওগাত—উপহার।
  2. ফির্‌নি—পায়স।
  3. শাশবিবি—শাশুড়ি।
  4. দলিজ—দহলিজ, বহির্বাটী।
  5. নেকাব—আবছা ঘোমটা।
  6. মুজ্‌দা—খোশ্‌খবর।