Author: বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

  • নবীন সন্ন্যাসীর গুপ্তকথা

    নবীন সন্ন্যাসীর গুপ্তকথা

    যেমন ঘটে থাকে, আমার এক বন্ধু রয়েছে, যিনি মাঝে মাঝেই ইঙ্গিত দেন সীমাহীন নিদ্রা থেকে তুলে, তিনি আত্মা সকল আহ্বান করতে পারেন। অন্ততপক্ষে একটি আত্মা। এক ক্ষুদ্র আত্মা যার শক্তি সীমিত। তিনি মাঝেমধ্যে বলে থাকেন, অবশ্য তখনই, যখন স্কচ ও সোডার চতুর্থগ্লাসে পৌঁছান। এটি একটি স্পর্শকাতর সমতা রক্ষার বিষয়। তিনগ্লাস ও তিনি, আত্মা (অতি প্রাকৃত প্রকারে) সম্পর্কে কিছুই জানেন না। পাঁচ গ্লাস ও তিনি নিদ্রায় ঢলে পড়েন।

    আমার মনে হয়েছিল, সে সন্ধ্যায় তিনি সঠিকমাত্রায় পৌঁছেছিলেন, সে জন্য বললাম, ‘আপনার সেই আত্মাকে মনে পড়ে?’

    পানীয়ের দিকে তাকিয়ে জর্জ বলেন, ‘হ্যাঁ,’ যেন, কেন মনে করা দরকার, সে সম্পর্কে তিনি বিস্মিত।

    ‘না, আপনার পানীয়ের কথা বলছি না,’ আমি বললাম, ‘সেই যে দুই সে.মি. লম্বা ছোট্ট আত্মা, যার সম্বন্ধে বলেছিলেন, অন্য কোনো অস্তিত্ব থেকে তাকে আহ্বান করে এনেছেন। এমন একজন, যার অলৌকিক ক্ষমতা রয়েছে।

    ‘আ:’ জর্জ বললেন, ‘আজাজেল্।’ অবশ্য এটা তার নাম নয়। তার প্রকৃত নাম উচ্চারণ করতে পারলাম না। আমার ধারণা, তাকে আমি এই নামেই ডাকি, এই নামেই মনে রাখি।’

    ‘তাকে কি আপনি খুব বেশি ব্যবহার করেন?’

    ‘না, বিপজ্জনক। অত্যন্ত বিপজ্জনক। সব সময়ে শক্তির মোকাবিলা করতে সাধ যায় ঠিক। কিন্তু আমি নিজে সতর্ক, ভুলেও অসতর্ক হই না। আপনি জানেন, আমার নীতিবোধের মাত্রা উচ্চস্তরের। সে জন্য একবার এক বন্ধুকে সাহায্য করতে, তাকে আহ্বান করার প্রয়োজন অনুভব করেছিলাম।

    ‘কি ঘটেছিল?’

    ‘বোধকরি আমার বুক হাল্কা করার প্রয়োজন পড়েছে।’ চিন্তিতভাবে জর্জ বললেন, ‘না বলতে পেরে চিত্ত কলুষিত হতে শুরু করেছে- আমার বয়স তখন অনেকটাই কম, আর সেই সময়ে, নারী মানেই পুরুষের জীবনে এক বিশেষ ভূমিকা। এখন ভাবলে মুর্খামি মনে হয়, কিন্তু পিছু ফিরে তাকালে, আমি পরিষ্কার মনে করতে পারি, সে সময়ে বিশেষ একটি নারী পৃথক অর্থ নিয়ে প্রতিভাত হতো।

    আসলে সব মেয়েই হয়তো মোটামুটি এক ধাতুতে গড়া, তবু সেই সব দিনগুলোতে, আমার এক বন্ধু ছিল মর্টেনসন, অ্যান্ড্রু মর্টেনসন। আমার মনে হয় না আপনি তাকে চিনবেন। গত কয়েক বছরে আমিও তাকে দেখিনি বিশেষ।

    কথা হচ্ছে, সে বিশেষ একটি নারী সম্পর্কে আপ্লুত ছিল। তার চোখে মেয়েটি ছিল দেবদূতী। সে তাকে ছাড়া বাঁচবে না। এই ধরায় একমাত্র, অদ্বিতীয়া এবং সুস্বাদু খাদ্য চরকার তেলে ডোবালে যে অবস্থা হয়, মেয়েটি বিহনে তার জীবনেরও তদনুরূপ পরিণতি ঘটবে। আপনি জানেন, এভাবেই প্রেমিকেরা মনের ভাব ব্যক্ত করে থাকে।

    মুশকিল হল, মেয়েটি তাকে ছুঁড়ে ফেলে দিল এবং আপাতদৃষ্টিতে অত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে, ত র আত্মাভিমানকে এতটুকু মর্যাদা না দিয়ে। মেয়েটি তাকে ঘোরতর অপমান করল তার নাকের ডগা দিয়ে, চোখের সামনে দিয়ে অন্য একজনের হাত ধরে চলে গেল। মর্টেনসনের চোখের জলের পরোয়া করল না সে।

    আক্ষরিক অর্থে এভাবেই ঠিক বলতে চাইছি না, মর্টেনসন আমাকে যেমন ধারণা দিয়েছিল,’ আমি সেটাই উপস্থাপন করতে চাইছি। এই ঘরেই সে আমার সঙ্গে পান শুরু করেছিল। বন্ধুর জন্য আমার তখন বুকে রক্তক্ষরণ, বললাম, ‘দুঃখিত মর্টেনসন। তুমি এভাবে ভেঙো না। যখন তুমি মেয়েটি সম্পর্কে ভাবনা বন্ধ করে দেবে, দেখবে সে সাধারণ একটি মেয়ে মাত্র। পথের দিকে তাকাও সারে সারে মেয়ে চলেছে।’

    সে তিক্ত স্বরে বলল, ‘এখন তো আমি চাই রমণীবিহীন অস্তিত্ব। অবশ্যই আমার স্ত্রী ব্যতীত, যাকে আমি যখনতখন, কখনোই এড়িয়ে যেতে পারি না। শুধুমাত্র প্রতিদানে যদি মেয়েটির জন্য কিছু করতে পারতাম।’

    বললাম, ‘তোমার স্ত্রীর প্রতি?’

    ‘না-না, আমি কেন স্ত্রীর প্রতি কিছু করতে চাইব? আমি সেই নারীর কথা বল’ ই, যে আমাকে নির্দয়ভাবে ছুঁড়ে ফেলেছে।’

    ‘কার মতন?’

    ‘চুলোয় যাক… যদি নিজেই জানতাম!’ সে বলল।

    ‘হয়তো, আমি তোমার সাহায্যে আসতেও পারি,’ আমি বললাম, কারণ তখনে। আমার অন্তরে রক্তক্ষরণ হয়ে চলেছে। ‘আমি এক আত্মাকে ব্যবহার করতে পারি, যার অলৌকিক অসাধারণ ক্ষমতা রয়েছে, যদিও ক্ষুদ্র আত্মা।’ আমি একটা আঙুল আর বুড়ো আঙুল দিয়ে ইঞ্চিখানেক মাপ দেখালাম যাতে তার নিশ্চিত ধারণা জন্মায়। বললাম, ‘সেই কিন্তু কিছু করতে পারবে’

    আমি তাকে আজাজেলের কথা বললাম, ও বিশ্বাস করল। আমি প্রায়ই লক্ষ্য করেছি, আমি যখন কোনো গল্প বলি, শ্রোতার দৃঢ় প্রত্যয় জন্মায়। কিন্তু মশাই, আপনি যখন গল্প বলেন, ঘরে যে অবিশ্বাসের বাতাস নামে, তা এতই পুরু, যে কঠিন করাত দিয়ে কাটতে হবে। কিন্তু আমার ক্ষেত্রে তা নয়। নৈতিক দৃঢ়তার এবং এক ঝলক সততা ও স্বচ্ছতার কাছে কিছুই লাগে না।

    যখন আমি বললাম, মর্টেনসনের চোখ জ্বলজ্বল করে উঠল। সে বলল, ‘সে যদি মেয়েটিকে কিছু দিতে চায়, তার বন্দোবস্ত করতে আমার সাহায্য পাওয়া কি সম্ভব?’

    ‘যদি সত্যিই উপহারযোগ্য কিছু হয় মশাই। আশা করি, মেয়েটির শ্বাসে দুর্গন্ধ আনা অথবা কথা বলার সময় ব্যাঙ বেরিয়ে আসার মতন কোনো কিছু করার কথা আপনি মনে আছেন না।

    ‘নিশ্চয় নয়,’ সে ফুঁসে উঠল।

    ‘আপনি আমাকে কী মনে করেন! যতই হোক ও আমাকে দুটি সুখী বছর উপহার দিয়েছিল। আমি তার উপযুক্ত প্রতিদান দিতে ইচ্ছা করি। আপনি বলেন, আপনার আত্মার শক্তি সীমিত।’

    ‘সে এই একরত্তি।’ আমি বলি, আমার তর্জনী আর মধ্যমা ফাঁক করে দেখাই। ‘ওই আত্মা মেয়েটিকে সর্বোৎকৃষ্ট কণ্ঠস্বর দিতে পারে? কোনো একটু সময়ের জন্য! অন্ততপক্ষে একটি অনুষ্ঠানে গাইতে।’

    ‘আমি ওকে জিজ্ঞেস করে দেখব।’

    মর্টেনসনের প্রস্তাব সজ্জনসুলভ বলেই মনে হল (তার পূর্ব প্রণয়িনী স্থানীয় গীর্জায় গান গাইতো), এটিই যদি যথার্থ চুক্তি হয়। সে সব দিনে, সত্যিই আমার সুরের কান ছিল, আর প্রায়ই ঐ সব জায়গায় যেতাম (অবশ্যই কালেকশন বক্স থেকে দূরে থেকে)। আমি বরং তার গান উপভোগ করতাম এবং মনে হতো শ্রোতাগণ বিনয় সহকারে গ্রহণ করছে। সে সময়ে মনে হতো, মেয়েটির নীতিবোধ পরিপার্শ্বের সঙ্গে মানাচ্ছে না। কিন্তু মর্টেনসন বলত, সঙ্গীত পরিবেশনে মেয়েটিকে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

    অতএব আমি আজাজেলের সঙ্গে পরামর্শ করলাম। সাহায্য করতে সে সর্বতোভাবে উৎসুক ছিল। আপনি জানেন, কেউই বিনিময়ে আমার আত্মা দাবি করল না। আমার মনে পড়ে, একবার আজাজেল্‌কে বলেও ছিলাম, যদি সে আমার আত্মা চায়। সে জিজ্ঞেস করেছিল, সেটা আমার কি? সেটা যে কী তাতো আমি নিজেও জানতাম না। শুধু বলা যায়, এই আত্মা তার নিজের জগৎ থেকে আমাদের জগতে তার প্রভাব ছড়িয়ে বিরাট সাফল্য অর্জন করতে চাইছিল। তার ইচ্ছা, সে সহায় হবে।

    ওই আত্মার বক্তব্য, সাফল্যের সঙ্গে সে তিন ঘণ্টা পার করে দেবে, আর মর্টেনসনকে সে সংবাদটা দিতে, সে বলল, ‘চমৎকার।’

    আমরা একটা রাত বেছে নিলাম, যে রাতে মেয়েটি বাক্ বা হ্যান্ডেলের শাস্ত্রীয় সঙ্গীত অথবা পিয়ানোর কোনো প্রাচীন ধূন গাইতে চলেছে এবং দীর্ঘ সময়ব্যাপী একক সঙ্গীত পরিবেশনের প্রভাব বিস্তারের সুযোগ পাচ্ছে।

    সে রাতে, মর্টেনসন গীর্জায় গেল এবং অবশ্যই আমিও। যা ঘটতে চলেছে, তার জন্য নিজেকেই দায়ী ভাবছিলাম এবং মনে করলাম, পরিস্থিতির তত্ত্বাবধান আমার করাই মঙ্গল।

    বিষাদগ্রস্ত মর্টেনসন বলল, ‘আমি মহড়ায় গিয়েছিলাম, ও তো যেমন গায় তেমনই গাইছিল। জানেন মনে হচ্ছিল সে এক লেজবিশিষ্ট এবং কেউ তার লেজ মাড়িয়ে দিয়েছে। ঠিক এইভাবে অবশ্য মর্টেনসন মেয়েটির কন্ঠস্বর বাখ্যা করেনি। অবশ্য যদিও তাকে ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া হয়েছিল, যাতে পুরুষ বুদ্ধিভ্রষ্ট হতে পারে।

    আমি তার দিকে নিন্দার দৃষ্টি হানলাম। ‘একজন মহিলা সম্পর্কে এমন উক্তি করো না। বিশেষ করে তাকে যখন মহান দান দিতে চলেছ।’

    ‘ঠিক তাই! আমি চাই তার কণ্ঠস্বর হোক নিখাদ। সম্পূর্ণ শুদ্ধ। এখন আমার চোখ থেকে ভালবাসার কুয়াশা উঠে গেছে, আমি দেখছি, ওকে অনেক দূরে যেতে হবে এখনো। তোমার কি মনে হয়, ওই আত্মা এটা করে উঠতে পারবে?’

    ‘কিন্তু রাত ৮-১৫ মিনিটের আগে পরিবর্তন আসবে না।, একটা সন্দেহের ছুরি আমাকে আঘাত করল, ‘তুমি তো এমন চাইছ না, যে শুধু মহড়ার সময় তার কণ্ঠস্বর পরম শুদ্ধ হোক আর মূল অনুষ্ঠানের সময় শ্রোতারা হতাশ হোক! ‘

    ‘তুমি আমাকে ভুল ভাবছ,’ সে প্রতিবাদ করল।

    যাই হোক, অনুষ্ঠান শুরু হল এক মিনিট আগে। শুক্লবসনা মেয়েটি গান গাইতে উঠল, ঠিক রাত ৮-১৫ মিনিটে। আমার পকেট ঘড়ি দুমিনিটের বেশি এদিক ওদিক করে না।

    মেয়েটি ছোটখাটো গায়িকা ছিল না। সুরের মাত্রায় মাধুর্য ছিল, অনুরণনের বিস্তার ছিল, উচ্চগ্রামে পৌঁছলে অর্কেস্ট্রার সুরকে ছাপিয়ে যেতে পারত। যখন সে গানের সঙ্গে তাল রাখতে, প্রশ্বাস নিতে কয়েক গ্যালন বাতাস গ্রহণ করত, তখন আমি বুঝতে পারতাম মর্টেনসন তার মধ্যে দেখেছিল এক পোশাকসর্বস্ব নারীকে।

    ও তার চিরাচরিত স্বরগ্রামে গান শুরু করল এবং ঠিক ৮-১৫ মিনিটে মনে হলো আরেকটি কণ্ঠ যোগ দিয়েছে আমি যেন দেখলাম, মেয়েটি ছোট্ট একটি লাফ দিল। যেন কী শুনছে, নিজেই বুঝতে পারল না। যে হাতে মাইক ধরা ছিল, হাতটি কেঁপে উঠল। ওর কণ্ঠস্বর এত উচ্চগ্রামে পৌঁছেছে, যেন সে নিজেই একটা অর্গান, যা পরম শুদ্ধ সুর লয় তালে বেজে চলেছে। প্রতিটি অনুনাদ যথাযথ। সেই মুহূর্তে যেন অনন্য কোনো নবীন সুরের মূর্ছনা জন্ম নিল আর একই তালে লয়ে। একই গুণ মানের বাকি সুর মূর্ছনা সকল যেন মূল সুর মুর্ছনার অশুদ্ধ প্রতিফলন। প্রতিটি নাদ যথাযথ স্পন্দনে সুর সুধার অনুরণন। কণ্ঠস্বরের ওঠা-নামা স্পন্দিত হচ্ছে বলিষ্ঠ কুশলী নিয়ন্ত্রণে।

    প্রতিটি নাদে ওর সুরেলা কণ্ঠ উৎকৃষ্ট থেকে উৎকৃষ্টতর হয়ে চলেছে। অর্গান বাজিয়ের আর বাজনার দিকে মন নেই। সে শুধু ওরই দিকে তাকিয়ে রয়েছে। শপথ করে বলতে পারব না, তবে মনে হয় সে বাজনা থামিয়ে দিল। যদি সে বাজিয়ে চলতও, তবু তার বাজনা আমি শুনতে পেতাম না। যখন ও গাইছিল, আপনার অন্য কিছু শোনার উপায়ই ছিল না। কিচ্ছু না, শুধু ওর গান ছাড়া। ততক্ষণে ওর নিজের মুখ থেকেও বিস্ময়ের ছাপ অন্তর্হিত, নয়নে ঘনিয়েছে মহিমময় দৃষ্টি। তার গানের সঙ্গে আর বাজনার প্রয়োজন পড়ছে না। কণ্ঠে সুর খেলছে আপনিই, কোনো নির্দেশ বা নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই। সঞ্চালক স্থাণুবৎ আর সমবেত সঙ্গীত গাইয়ের দল একদম মূক।

    একক সঙ্গীত সমাপ্ত হল। সমবেত সঙ্গীত তখন সকলের কানে যেন ফিসফিসানি। গানের দল, তাদের কণ্ঠস্বরের জন্য লজ্জিত হয়ে পড়েছে। একই রাতে একই গীর্জায়, গীত পরিবেশনে তারা বিব্রত।

    পরবর্তী সমগ্র অনুষ্ঠানই ছিল ওর। সে যখন গাইছিল, তখন শুধু তার কন্ঠস্বরই শ্রবণগ্রাহ্য ছিল। অন্য সব কণ্ঠস্বর পুরোপুরি নিস্তব্ধ। সে যখন গাইছিল না, শ্রোতাদের মনে হচ্ছিল তারা সবাই অন্ধকারে ডুবে রয়েছে, আলোর অভাব তখন অসহ্য লাগছিল।

    আর যখন অনুষ্ঠান একেবারে শেষ হল, আপনি কি জানেন, গীর্জায় করতালি দেওয়া নিয়মবিরুদ্ধ। কিন্তু করতালি পড়তে লাগল। গীর্জায় উপস্থিত প্রত্যেকে এক সঙ্গে উঠে দাঁড়াল, যেন তাদের পা পুতুলনাচের দড়ি দিয়ে এক সঙ্গে বাঁধা। তারপর করতালির পর করতালি। স্পষ্ট বোঝা গেল শ্রোতারা সারারাত করতালি দেবে, যতক্ষণ না মেয়েটি আবার গাইছে।

    ও আবার শুরু করল, একক কণ্ঠস্বরে, আবহসঙ্গীত তখন দ্বিধাগ্রস্ত মেজাজের মৃদু সুরে বাজছে। ওর ওপর জোর স্পট লাইটের আলো পড়ছে। সমবেত গাইয়ের দলকে দেখাই গেল না। কোনো প্রয়াসের প্রয়োজন হচ্ছিল না ওর।

    আপনি ধারণা করতে পারবেন না, কোনো চেষ্টা ছাড়াই কি সাবলীল ছিল সেই সঙ্গীত। আমি নিজের কানে মোচড় দিলাম, ওই স্বর ছাপিয়ে লক্ষ্য করতে লাগলাম ওর শ্বাসপ্রশ্বাসের ওঠানামা। আশ্চর্য হলাম, এক নাদে উচ্চগ্রামে সুর ধরে রাখতে, তার দুজোড়া ফুসফুস কী কসরতে বাতাসের যোগান দিতে পারছে। কিন্তু তাকে থামতেই হল। এমন কি করতালিও থামল। আর তখনই খেয়াল করলাম, মর্টেনসন চকচকে চোখে বসে রয়েছে তার সমস্ত স্বত্তা দিয়ে সঙ্গীতে মগ্ন হয়ে। তখনই উপলব্ধি করলাম, কী ঘটে গেছে!

    আমি তো সত্যি বলতে গেলে, ইউক্লিডীয় জ্যামিতির সরলরেখা মাত্র। কোনো রকম বক্র তঞ্চকতা আমার মধ্যে ছিল না। তাই আমি বুঝতেই পারিনি মর্টেনসনের মতলব কী ছিল!

    মেয়েটি পরম শুদ্ধ স্বরে গেয়েছে, কিন্তু আর কখনো সে এমনটি পারবে না। যেন মেয়েটি জন্মান্ধ ছিল, তিন ঘণ্টার জন্য তার চোখে আলো এল। চারপাশের বস্তু, বর্ণ, আকার, আশ্চর্য সব কিছু ঘিরে আছে আমাদের। এসব দেখতে আমরা অভ্যস্ত, দেখতে যে পাচ্ছি সে সম্পর্কে সচেতন নই। কিন্তু আপনি মনে করুন, আপনি পূর্ণ গৌরবে সব কিছু দর্শন করলেন মাত্র তিন ঘণ্টার জন্য, তারপর আবার অন্ধ হয়ে গেলেন।

    আপনি অন্ধত্ব সহ্য করতে পারতেন, যদি কখনো দেখতে না পেতেন। কিন্তু সংক্ষিপ্ত সময়ে জ্ঞান লাভ করে, আবার অজ্ঞানে ফেরা? কেউ পারে নাকি?

    ঐ নারী অবশ্যই আর কখনোই গায়নি। কিন্তু এটি গল্পের একটি অংশ মাত্র প্রকৃত বিয়োগান্ত নাটক ছিল আমাদের জন্য, সব শ্রোতাদের জন্য। আমরা তিন ঘণ্টা ব্যাপী প্রকৃত সঙ্গীতের মাধুর্য উপভোগ করেছি। আপনি কি মনে করেন, ঐ অনন্য সঙ্গীত ছাড়া অন্য কোনো গান শোনা আমাদের সহ্য হবে!

    আমি তখন থেকে সুরবধির। হালে একটা রক সঙ্গীতের অনুষ্ঠানে গিয়েছিলাম। ইদানীং তা এত জনপ্রিয়, শুধুমাত্র নিজেকে পরীক্ষা করতে। বিশ্বাস করবেন না, একটি সুরও কানে লাগল না। সব কিছুই হট্টগোল।

    আমার একমাত্র সান্ত্বনা ছিল মর্টেনসন। সে অতি উৎসাহভরে, শ্রেষ্ঠ মনোযোগ দিয়ে শুনেছে, কিন্তু শ্রোতা সকলের মধ্যে নিকৃষ্টতম। কারণ সে সবসময় কানে ইয়ারপ্লাগ পরে থাকে। চুপি চুপির ঊর্ধ্বে, উচ্চগ্রামের শব্দ সে সহ্য করতে পারে না।

    উচিত শিক্ষা হয়েছে তার।

  • প্রথম খণ্ড : নারী না পরী

    প্রথম খণ্ড : নারী না পরী

    পাঁচকড়ি দে

    [book]

    প্রথম খণ্ড : নারী না পরী


    প্রথম পরিচ্ছেদ – নূতন সংবাদ

    একদিন অতি প্রত্যুষে দেবেন্দ্রবিজয় স্থানীয় থানায় আসিয়া ইনস্পেক্টর রামকৃষ্ণ বাবুর সহিত দেখা করিলেন।

    যাঁহারা আমার “মনোরমা” নামক উপন্যাস পাঠ করিয়া আমাকে অনুগৃহীত করিয়াছেন, তাঁহাদিগকে দেবেন্দ্রবিজয় মিত্রের পরিচয় আর নূতন করিয়া দিতে হইবে না। যে সময়কার ঘটনা বলিতেছি, তখনকার ইনি একজন সুপ্রসিদ্ধ, সুদক্ষ ও শ্রেষ্ঠ ডিটেক্‌টিভ। তাঁহার ভয়ে তখন অনেক চোর চুরি ছাড়িয়াছিল, অনেক ডাকাত ডাকাতি ছাড়িয়াছিল, অনেক জালিয়াৎ জালিয়াতী ছাড়িয়াছিল; স্ব স্ব ব্যবসায়ে এরূপ একটা অপরিহার্য্য ব্যাঘাত ঘটায় সকলে কায়মনোবাক্যে অহর্নিশ ইষ্টদেবতার নিকটে দেবেন্দ্রবিজয়ের মরণ আকাঙ্খা করিত। সকলেই ভয় করিত; ভয় করিত না—গর্বিত জুমেলিয়া। সে ইষ্টদেবতার নিস্ফলসহায়তার প্রতি উপেক্ষা প্রদর্শন করিয়া, সেই সময়ে স্বহস্তে দেবেন্দ্রবিজয়কে খুন করিবার জন্য ‘মরিয়া’ হইয়া উঠিয়াছিল। সে তাঁহাকে আন্তরিক ঘৃণা করিত। দেবেন্দ্রবিজয় যদি তেমন একজন ক্ষমতাবান, বুদ্ধিমান লোক না হইয়া একটি ক্ষুদ্র পিপীলিকা হইতেন, তাহা হইলে সে তাঁহাকে পদতলে দলিত করিয়া মনের সাধ মিটাইতে পারিত। তা’ না হইয়। দেবেন্দ্র কি না প্রতিবারেই তাহাকে হতদর্প করিল—ছিঃ—ছিঃ—ধিক্ ধিক্‌; এই সব ভাবিয়া জুমেলিয়া আরও আকুল হইয়া উঠিত। এই বর্তমান আখ্যায়িকা পাঠ করিবার পূৰ্ব্বে পাঠকের ‘মনোরমা’ নামক পুস্তকখানি পাঠ করিলে ভাল হয়; এখানিকে মনোরমা পুস্তকের পরিশিষ্ট বলিলেও চলে।

    যখন দেবেন্দ্রবিজয় রামকৃষ্ণ বাবুর সহিত দেখা করিলেন, তখন তিনি নিশ্চিন্তমনে বাঁশের সংক্ষিপ্ত সংস্করণের ন্যায় একটি চুরুট দন্তে চাপিয়া ধুমপান করিতেছিলেন; তেমনি পরম নিশ্চিন্তমনে দেখিতেছিলেন, সেই ধূমগুলি কেমন কুণ্ডলীকৃত হইয়া, উন্মুক্ত বাতায়ন পথ দিয়া, দল বাধিয়া বাহির হইয়া যাইতেছিল। তেমন প্রত্যুষে দেবেন্দ্রবিজয়কে সহস৷ সেই কক্ষমধ্যে প্রবিষ্ট হইতে দেখিয়া তিনি কিছু বিস্মিত হইলেন। সসম্মানে তাহাকে নিজের পার্শ্বস্থিত চেয়ারে বসাইয়া বলিলেন, “কি হে, ব্যাপার কি? আমাকে দরকার না কি? এত সকালে যে?”

    দেবেন্দ্রবিজয় কহিলেন, “ব্যাপার বড় আশ্চৰ্য্য; শুনলেই বুঝতে পারবে, ব্যাপারটা কতদূর অলৌকিক; তেমন অলৌকিক ঘটনা কেউ কখনও দেখে নাই—শুনে নাই।”

    রাম। এমন কি ঘটনা হে?

    দেবেন্দ্র। বড়ই অলৌকিক—একেবারে ভৌতিক-কাণ্ড–তুমি শুনলে তোমারও বিস্ময়ের সীমা থাকবে না।

    রাম। বেশ, আমিও বিস্মিত হইতে চাই। প্রায় দশ বৎসরের মধ্যে আমি একবারও বিস্ময়ান্বিত হইয়াছি কি না সন্দেহ; তোমার কথায় যদি এখন তা ঘটে, সে বিস্ময়টায় কিছু-না-কিছু নূতনত্ব আছেই।

    দেবেন্দ্র। ফুলসাহেবকে তোমার স্মরণ আছে?

    রাম। বিলক্ষণ!

    দেবেন্দ্র। জুমেলিয়াকে? যে এতদিন জাল-মনোরমা সেজে নিজের বাহাদুরী দেখাইতেছিল, শেষে হাজরার বাগান-বাড়ীতে আত্মহত্য করে, তাকে স্মরণ আছে কি?

    রাম। হা, সেই পিশাচী ত?

    দেবেন্দ্র। সত্যই সে পিশাচী বটে!

    রাম। তার কি হয়েছে?

    দেবেন্দ্র। তার মৃত্যুর বিবরণটা কি এখন তোমার বেশ স্মরণ আছে?

    রাম। বেশ আছে!

    দে। জুমেলিয়ার দেহ যতক্ষণ না কবরস্থ করা হয়েছিল, ততক্ষণ আমি তৎপ্রতি সতর্ক-দৃষ্টি রেখেছিলাম ব’লে, তুমি আর কালীঘাটের থানার ইনস্পেক্টর হেসেই অস্থির।

    রাম। শুধু কবরস্থ নয়—সেই শবদেহ কবরস্থ ক’রে কবর-স্মৃত্তিক পূর্ণ করা পৰ্য্যন্ত তোমার সতর্ক দৃষ্টি সমভাবে ছিল। ইহা ত হাসিবারই কথা, দেবেন্দ্র বাবু! [ হাস্য ]

    দেবেন্দ্র। এখন সেই ঘটনা, আমার সে সতর্কতা যে বৃথা নয়, তা’ প্রমাণ করেছে। তবু যতদুর সতর্ক হওয়া আবশ্যক, তা আমি হ’তে পারি নি; আরও কিছুদিন সেই কবরের প্রতি বিশেষ দৃষ্টি রাখাই আমার উচিত ছিল।

    রা। অ্যাঁ—বল কি হে! তোমার মাথাটা নিতান্ত বিগড়াইয়। গিয়াছে দেখছি। কবরের উপর এত সাবধানত কেন? তার পর তুমি জুমেলিয়ার কবরের উপর আর পাহারী দিয়াছিলে কি?

    লে। হ্যাঁ, এক সপ্তাহ।

    রা। যে লোক ম’রে গেছে—যাকে পাঁচ হাত মাটির নীচে কবর দেওয়া হয়েছে—তার উপর তুমি এক সপ্তাহ নজর রেখেছ; এখনও আবার বল্‌ছ যে, আরও কিছুদিন নজর রাখতে পারলে ভাল হ’ত, –এ সব কথার অর্থ কি? মাটির নীচে—এক সপ্তাহ—তবু যে কোন মানুষ বাঁচতে পারে, তা আমার বুদ্ধির অগম্য।

    দে। তা’ মিথ্যা বল নাই, এরূপ স্থলে সাধারণ লোকের পক্ষে জীবিত থাকা অসম্ভব।

    রা। দেবেন্দ্র বাবু, মৃত্যুর কাছে আবার সাধারণ আর অসাধারণ কি?

    দে। তুমি কি আরবদেশের ফকিরদিগের এরূপ পুনরুখান সংক্রান্ত কোন ঘটনার কথা কখনও শোন নাই?

    রা। অনেক সময়ে অনেক শুনেছি।

    দে। তারা কি করে জান?

    রা। হ্যাঁ, কিছু কিছু।

  • দ্বিতীয় খণ্ড : শঠে শাট্যং সমাচরেৎ

    দ্বিতীয় খণ্ড : শঠে শাট্যং সমাচরেৎ

    দ্বিতীয় খণ্ড – শঠে শাট্যং সমাচরেৎ

    প্রথম পরিচ্ছেদ
    সন্ধানে

    রেবতী যতই কেন বুদ্ধিমতী হউন না, জুমেলিয়ার প্রতারণ-জলে ছিন্ন করা তাহার সাধ্যাতীত। যে লোক সংবাদ আনিয়াছিল, সে পাহারাওয়াল-পুলিশের লোক—বিশেষতঃ সেখানকার থানার ও রামকৃষ্ণ বাবুর তাঁবের; তাহাকে রেবতী কি প্রকারে সন্দেহ করিবেন? যদি সন্দেহের কিছু পাকিত, শচীন্দ্র পূৰ্ব্বেই চুটিয়া আসিয়া তাহাকে প্রকৃত সংবাদ জানাইত; কিন্তু তাহা না করিয়া সেই শচীন্দ্রই যখন তাঁহাকে যাইবার জন্য পত্র লিথিয়াছে, তখন আর রেবতীর অবিশ্বাসের
    কারণ কোথায়?
    আরও একটা বিশেষ চিন্ত দেবেন্দ্রবিজয়ের মস্তষ্ক একেবারে অস্থির করিয়া তুলিল; শচীন্দ্র এখনও ফিরিল না কেন, জুমেলিয়া কি প্রকারে তাহার প্রত্যাগমনে বাধা ঘটাইল?
    পত্ৰখানি—যাহা শচীন্দ্রের লিখিত বলিয়া স্থিরীকৃত, সম্পূর্ণরূপে জাল; অবিকল শচীন্দ্রের হস্তলিপি, বেবতী তাহাতে সহজেই প্রবঞ্চিত হইয়াছেন। যাহাতে সামান্তমাত্র সন্দেহের সম্ভাবনা না থাকে, এইজন্য ষড়যন্ত্রকারীরা শচীন্দ্রের প্রস্থানের পর আরও একঘণ্টা সময় অপেক্ষা করিয়া, শচীন্দ্রের নামে জাল পত্র লিখিয়া আনিয়া রেবতীর হস্তে অর্পণ করিয়া থাকিবে।
    কি ভয়ানক জটিল চাতুরী! এখন—এমন –সময়ে—এই বিপৎকালে দেবেন্দ্রবিজয় অপেক্ষা করিয়া থাকা ভিন্ন আর কি করিবেন? গায়ের জোরে রাস্তার ছুটিয়া বাহির হইলেই বা কি হইবে – কি উপকার দর্শিবে? কাহাকে উপায় জিজ্ঞাসিবেন? দেবেন্দ্রবিজয় অপেক্ষা আর কে এ
    সম্বন্ধে বিশেষ জ্ঞাত আছে?
    কাজেই তখন তাঁহাকে অপেক্ষা করিতে এবং কি করিবেন, তাহাই ভাবিয়া ঠিক করিয়া লইতে হইল।
    দেবেন্দ্রবিজয় ভাবিতে লাগিলেন, “অসম্ভব। শচীন্দ্রকে জুমেলিয়া এই দিনের বেলায় কখনই নিজের করায়ত্ত করিতে সক্ষম হয় নাই, অন্ত কোন কৌশলে তাকে মিথ্যানুসরণে দুরে ফেলেছে; তাই সে এখনও ফিরে নাই; পিশাচী জুমেলিয়া সহজে স্বকাৰ্য্য সমাধা করেছে; আপাততঃ কোন সুবিধার অপেক্ষায় থাকা আমার কর্তব্য।”
    কিয়ৎক্ষণ পরে শ্ৰীশচন্দ্র ৩৫নং পাহারাওয়ালাকে সমভিব্যাহারে লইয়া উপস্থিত হইল।
    দেবেন্দ্রবিজয় সেই পাহারাওয়ালাকে “তুমি এইখানে বস; এখনই আমি আসছি, বলিয়৷ শ্ৰীশচন্দ্রকে লইয়া কক্ষান্তরে গমন করিলেন। দেবেন্দ্রবিজয় জিজ্ঞাসিলেন, “শ্ৰীশ, কি বুঝলে?”
    “এ সে লোক নয়।”
    “আমিও তা জানি।”
    “এর নাম আবদুল।”
    “তুমি একে চেন কি ?”
    “ভাল রকম চিনি, ছেলেবেলা থেকে ওকে দেখে আসছি।”
    “চেষ্টা করলে তোমার উপরে কিছু চালাকি চালাতে পারে কি?”
    “না।“
    * * * * *
    দেবেন্দ্রবিজয় বৈঠকখানাগৃহে তখনই ফিরিলেন। পাহারাওয়ালাকে জিজ্ঞাসিলেন, “আবদুল, আড়াইঘণ্টা পূৰ্ব্বে তুমি কোথায় ছিলে?”
    পাহারাওয়ালা বলিল, “বাড়ীতে মশাই।”
    “কোথায় তোমার বাড়ী?”
    “এই রাজার বাগানে ৷”
    “আজ কোন জিনিষ তুমি হারিয়েছ?”
    “ই মহাশয়, আমার চাপ্‌রাসখানা।”
    “কখন—কেমন ক’রে হারালে?”
    “তখন আমি ঘুমুচ্ছিলেম, একজন লোক এসে আমার স্ত্রীর নিকটে চাপ্‌রাসখানা চায়, তাতে আমার স্ত্রী তাকে জিজ্ঞাসা করে, কোন চাপ্‌রাস?”
    “যেখানা পাহরাওয়ালা সাহেব মেরামত করতে দিবে বলেছিল।”
    “তিনি এখন ঘুমাচ্ছেন’, আমার স্ত্রী তাকে বলে।”
    “তাতে সে বলে ‘আজ আমার হাত খালি আছে, চাপ্‌রাসথান ঠিকঠাক ক’রে ফেলব; এর পর পেরে উঠব না; আজ সন্ধ্যার পরেই অনেক কাজ আসবে; চাপ্‌রাস কি—একমাস আমি আর কোন কাজ হাতে করতে পারব না; যদি পার, খুঁজে বের করে এনে দাও, ছ’ঘণ্টার মধ্যে আমি ঠিক ক’রে দিয়ে যাব।’ আমার স্ত্রী তাকে তখন আমার চাপ্‌রাস খানা বের ক’রে দেয়।”
    দেবেন্দ্রবিজয় বলিলেন, “ইহার মধ্যে তুমি কোন লোককে তোমার চাপ্‌রাস মেরামতের কথা বলেছিলে?”
    পাহারাওয়ালা! হাঁ। এ বড় মজার কথা দেখছি।
    দেবেন্দ্র। কি রকম?
    পা। তার পর যখন আমার ঘুম ভাঙে, আমার স্ত্রী আমাকে সকল কথাই বললে। কিছুদিন হ’ল, আমি নীলু মিস্ত্রীকে আমার চাপ্‌রাসটা পালিস করে দিতে বলেছিলেম, তাতে ভাবলেম, নীলু মিস্ত্রীই চাপ্‌রাসখানা নিয়ে গেছে।
    দে। ভাল, তার পর?
    পা। আমি তখনই নীলু মিস্ত্রীর কাছে যাই, সে আমার কথা শুনে একেবারে আশ্চৰ্য্য হ’য়ে গেল; চাপরাসের কথা সে কিছুই জানে না।
    দে। যে লোকটা তোমার স্ত্রীর কাছ থেকে চাপ্‌রাসখানা নিয়ে গিয়ে ছিল, তার চেহারা কেমন—তোমার স্ত্রী সে বিষয়ে কিছু বলতে পারে?
    পা। তাই ত বলছি মশাই, বড়ই মজার কথা! আমি তাকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, সে যে চেহারার কথা বললে, তাতে নীলু মিস্ত্রীকেই বেশ বুঝায়।
    দে। তুমি এখন কি বুঝছ?
    পা। বুঝব আর কি? আমি দশ বৎসর নীলু মিস্ত্রীকে দেখে আসছি, সে খুব ভাল লোক; সে যেকালে কালীর দোহাই দিয়ে, ধৰ্ম্মের দোহাই দিয়ে বললে, সে আমার চাপ্‌রাসের কথা কিছুই জানে না, তাতে তার কথা আমি কি ক’রে অবিশ্বাস করি?
    দে। তোমার স্ত্রীর নিকট হ’তে চাপ্‌রাসখানা কেউ ফাকি দিয়ে নিয়েছে ব’লে বোধ হয় কি?
    পা। হাঁ, তাই এখন আমার বেশ বোধ হচ্ছে।

    দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ
    শচীন্দ্রের প্রবেশ

    দেবেন্দ্রবিজয় তখনই অনুসন্ধানে প্রবৃত্ত হইবার নিমিত্ত বন্দোবস্ত করিতে লাগিলেন; বুঝিলেন, শচীন্দ্রের অপেক্ষায় আর বিলম্ব করা শ্রেয়ঃ নহে। যখন তিনি আবশ্যক মত ছদ্মবেশ পরিধান করিয়া গমনোদ্যত হইয়াছেন, বহির্দ্বারে বানাৎ করিয়া কি একটা শব্দ হইল; কে যেন সজোরে দ্বার উন্মুক্ত করিয়া ফেলিল—তৎপরে অতিদ্রুত পদশব্দ। দেবেন্দ্রবিজয় বুঝিলেন, সে পদশব্দ শচীন্দ্রের। তখন শচীন্দ্র অতিদ্রুত সোপানারোহণ করিতেছে। দেবেন্দ্রবিজয় তাহার দুই হস্ত ধরিয়া টানিয়া লইয়া শয়নকক্ষে প্রবিষ্ট হইলেন; জিজ্ঞাসিলেন, “শচীন্দ্র, ব্যাপার কি! কি হয়েছিল তোমার?”
    শচীন্দ্র। এতক্ষণ আমি অজ্ঞান হ’য়ে পড়েছিলাম; একটা লোক পিছন দিক থেকে আমায় লাঠী মারে।
    দেবেন্দ্র। কখন, কোথায়?
    শ। পদ্মপুকুরের বড় রাস্তা ছেড়ে যেমন জেলে-পাড়ার ভিতর ঢুকেছি।
    দে। কোথায় লাঠী মেরেছে?
    শ। মাথার উপরে। ,
    দে। কে মেরেছে, জান?
    শ। আমি তাকে দেখি নি, তখুন সেখানে যারা ছিল, তাদের মুখে শুনলেম, একজন মুসলমান।
    দে। সে পালিয়েছে?
    শ। হাঁ।
    দে। কোথায় লাঠী মেরেছে দেখি, মাথা ফেটে যায় নাই ত?
    শ। না, উপরকার একটু চামড়া কেটে গিয়ে খানিকট রক্ত বেরিয়ে গেছে। আঘাত সাঙ্ঘাতিক নয়—ব্রজেন্দ্র ডাক্তারের ডিস্পেন্সারীর সম্মুখে অজ্ঞান হ’য়ে পড়ি; ডাক্তার-বাবু তখন তথায় ছিলেন। আমাকে তখনই তার ডিস্পেন্সারীতে তুলে নিয়ে গিয়ে যেখানটা কেটে গিয়েছিল, সেখানটায় ঔষধ দিয়ে রক্ত বন্ধ ক’রে দিয়েছেন। ষা’ই হ’ক, মামী-মা’র জন্যই আমার সন্ধান নিতে যাওয়া —মামী-মা কোথায়? .
    দে। নাই—বাড়ীতে নাই!
    শ। সে কি!
    দে। ষড়যন্ত্রকারীরা আবার লোক পাঠিয়েছিল; তোমার নাম জাল ক’রে একখানা পত্র লিখে পাঠায়।
    শ। তবে মামী-মা কি আবার জুমেলিয়ার হাতে পড়েছে?
    দে। জুমেলিয়া ভিন্ন কে আর এমন সাহস করবে? কার সাহস হবে? কে আর দেবেন্দ্রের উপর এমন চাতুরীর খেলা খেলতে পারে? আমি এখনই চললেম।
    শ। কোথায়?
    দে। রাজার বাগানে নীলু মিস্ত্রীর বাড়ীতে।
    শ। সেখানে কেন, মামা-বাবু? কি হয়েছে—আমায় সব কথা ভেঙে বলুন।
    দে। আবদুল পাহারাওয়ালার চাপ্‌রাস চুরি গেছে। নীলু মিস্ত্রীকে সে চাপ্‌রাস পালিস করতে দিব বলেছিল; তার অজ্ঞাতে তার স্ত্রীর কাছ থেকে নীলু মিস্ত্রী সে চাপ্‌রাস চেয়ে নিয়ে যায়; এখন অস্বীকার করছে—এখন আমাকে—
    দেবেন্দ্রবিজয়ের কথা সমাপ্ত হইবার পূৰ্ব্বে সদর দরজায় আবার একটা উচ্চ শব্দে আঘাত হইল; তৎক্ষণাৎ ছুটিয়া আসিয়া শ্ৰীশচন্দ্র একখানি পত্র হস্তে সেই কক্ষমধ্যে প্রবেশ করিল, পত্ৰখানি সে দেবেন্দ্র বিজয়ের হাতে দিল।

    তৃতীয় পরিচ্ছেদ
    জুমেলিয়ার দ্বিতীয় পত্র

    দেবেন্দ্রবিজয় তখনই সেই পত্র পাঠ করিলেন;–
    “দেবেন্দ্রবিজয়!
    তোমার স্ত্রী এখন আমার হাতে পড়িয়াছে ৷ আমি তাহাকে ছাড়িয়া দিতে পারি কি না, তাহ এখন তোমার উপর নির্ভর করিতেছে। সে এখন আমার কোন ঔষধ—কোন দ্রব্যগুণে অচেতন হইয়া আছে; যদি যথাসময়ে ঠিক সেই ঔষধের কাটান ঔষধ দেওয়া যায়, তাহ হইলে তোমার স্ত্রীর কোন ক্ষতি হইবে না। তার জীবন ও মৃত্যু তোমার হাতে; তুমি জান—তুমি বলিতে পার, সে বাচিবে কি মরিবে।
    যদি এখন আমি তাহাকে তাহার সেই অজ্ঞান অবস্থায় তোমার হাতে দিই; কোন ডাক্তার, কোন কবিরাজ, যত নামজাদা ভাল চিকিৎসক হউক না কেন, কেহই রক্ষা করিতে পরিবে না। সকলেই তাহাকে মৃত বলিয়াই বিবেচনা করিবে—কিন্তু সে জীবিত আছে।
    তোমার নিকটে আমার এক প্রস্তাব আছে; আমি জানি, তোমার কথা তুমি ঠিক বজায় রাখিয়া থাক ও রাখিতে পার। প্রস্তাব কি—পরে জানিতে পারিবে; আমার প্রাণের ভিতরে এখন আশা ও নৈরাপ্ত উভয়ে মিলিয়া বড়ই উৎপাত করিতেছে।
    অন্তরাত্রি ঠিক এগারটার পর বালিগঞ্জের বাগান-বাড়ীতে সাক্ষাৎ করিবে; লাহিড়ীদের বাগান, বাগানের পশ্চিম প্রান্তে যে কাঠের ঘর আছে, সেইখানে সাক্ষাৎ করিবে। আসিবার সময়ে সঙ্গে কোন অস্ত্রশস্ত্ৰ আনিয়ো না; আমার সঙ্গে দেখা হইলে বিনাবাক্যব্যয়ে আমার অনুসরণ করিবে; যেখানে আমি তোমাকে লইয়া যাইব, তোমাকে যাইতে হইবে; ইচ্ছা আছে, তোমার পত্নীকে মুক্তি দিবার জন্য একটা সুপরামর্শ ও সন্ধি স্থির করিব।
    যদি তুমি অপর কাহাকেও সঙ্গে লইয়া এস, আমার সহিত সাক্ষাৎ হইবে না—আমাকে দেখিতে পাইবে না; যদি তুমি আমাকে গ্রেপ্তার করিতে কি আমার কোন ক্ষতি করিতে চেষ্টা কর, তোমার স্ত্রী অসহায় অবস্থায় অতিশয় যন্ত্রণা • পাইরা দন্ধিয়া দন্ধিয়া মরিবে; কেহই তাহাকে বাঁচাইতে পারিবে না; ইতোমধ্যে যদি তুমি আমাকে হত্যা কর, তোমার স্ত্রীর মৃত্যু অনিবাৰ্য্য হইয়া উঠিবে—তুমি আমাকে জান।
    যেখানে যখন সাক্ষাৎ করিতে লিখিলাম, আমি ঠিক সেই সময়ে তোমার সহিত একা আসিয়া দেখা করিব। তোমার নিকটে আমি যে প্রস্তাব করিব, তাহাতে যদি তুমি অসম্মত হও, শেষ ফল কি ঘটে, জানিতে পারিবে। আমি তোমার প্রতিজ্ঞা করিয়া বলিতেছি, তোমার কোন বিষয়ে কিছুমাত্র অনিষ্ট ঘটিবে না। তুমি একাকী আসিয়ে, আশঙ্কা করিবার কোন কারণ নাই। আমার যাহা অনুরোধ, তোমার নিকটে বলা হইলে, তাহাতে তুমি সন্মত হও বা না হও, স্বচ্ছন্দে তোমার নিজের বাড়ীতে তুমি ফিরিবে। যতক্ষণ না তুমি বাড়ীতে ফিরিয়া যাও, ততক্ষণ জুমেলিয়া তোমার প্রতি শক্ৰতাচরণ করিবে না। তুমি গৃহে উপস্থিত হইলে—যেমন এখন আছ—তোমার যেমন অবস্থা হইতে তোমাকে আমি ডাকিতেছি, যতক্ষণ ঠিক তেমন অবস্থায় না ফিরিবে, ততক্ষণ জুমেলিয়া চুপ করিয়া থাকিবে—তোমার কোন অনিষ্ট করিবে না। এমন কি অপর কোন শক্র কর্তৃক যদি তোমার একটি কেশের অপচয় ঘটিবার কোন সম্ভাবনা দেখে, জুমেলিয়া প্রাণপণে তাহাও হইতে দিবে না।
    তুমিই এখনও তোমার পত্নীর জীবন রক্ষা করিতে পার; কি প্রকারে পার, তাহা এখন বলিব না; রাত এগারটার পর দেখা করিলে বলিব।
    স্মরণ থাকে যেন, তোমার স্ত্রী এখন বাইশ হাত জলে পড়িয়াছে।
    তুমি আমাকে জান—
    জুমেল।”

    চতুর্থ পরিচ্ছেদ
    ****

    পত্রপাঠ সমাপ্তে দেবেন্দ্রবিজয়ের মুখমণ্ডল বিবর্ণ হইয়া গেল—মলিন মুখ আরও মলিন হইয়া পড়িল; শ্রীশচন্দ্রকে দেবেন্দ্রবিজয় জিজ্ঞাসিলেন, “শ্রীশ, এ পত্র তুমি কোথায় পাইলে?
    শ্ৰীশ। বাড়ীর সামনে।
    দেবেন্দ্র। কে দিয়েছে?
    শ্ৰী। একটা ছোড়া।
    দে। সে কোথায় পাইল, জিজ্ঞাসা করেছিলে?
    শ্ৰী। ই, সে বললে, একটা বুড়ী এসে তার হাতে পত্ৰখানা দিয়ে আমাদের বাড়ী দেখিয়ে দেয়; বুড়ী তাকে একটা চকচকে টাকা দিয়ে গেছে।
    দে। আচ্ছ, এখন তুমি যাও।
    শ্ৰীশচন্দ্র প্রস্থান করিল।
    দেবেন্দ্রবিজয় বলিলেন, “পত্ৰখানি পড়িয়া দেখ।”
    শচীন্দ্র মনে মনে পত্ৰখানি আগাগোড়া পড়িয়া লইল। তৎপরে জিজ্ঞাসিল, “মামা-বাবু, আপনি কি তবে সেখানে যাবেন?”
    “হাঁ, যাইতে হইবে বৈকি।”
    “যাইয়া কি করিবেন?”
    “না যাইয়াই বা করিব কি?”
    “যাইয়াই বা করিবেন কি?”
    “জুমেলিয়া পত্রে সত্যকথাই লিখেছে।”
    “এ সত্য, তার অন্তান্ত সত্যের ন্যায়।”
    “আমার বিশ্বাস, এবার সে পত্রে সত্যকথাই লিখেছে।”
    “তবে আপনি যাইবেন?”
    “হাঁ।”
    “সে না প্রতিজ্ঞা করিয়াছে, আপনাকে হত্যা করিবে?”
    “হাঁ, তা? আমি জানি—মনে আছে।”
    “শুধু আপনাকে নয়, মামী-মাকে, শ্ৰীশকে আর আমাকে ৷”
    “হাঁ।”
    “মামা-বাবু, এ আবার জুমেলিয়ার নূতন ফাঁদ; এ ফাঁদে মামী-মাকে আর আপনাকে সে আগে ফেলিতে চায়।”
    “এ কথা আমি বিশ্বাস করি।”
    “তথাপি আপনি যাইবেন?”
    “তথাপি আমি যাইব।”
    “আমাকে সঙ্গে লইবেন না?”
    “না।”
    “কেন?”
    “তাহা হইলে আমার অভিপ্রায় পুর্ণ করিতে পারিব না।”
    “সে অভিপ্রায় কি?”
    “সময়ে সব জানিতে পারিবে, এখন এই যথেষ্ট; তবে এইটুকু জানিয়া রাখ, ডাকিনী আমাকে ডাকে নাই নিজের মৃত্যুকে ডাকিয়াছে—তার দিন ফুরাইয়াছে।”
    “মামা-বাবু, আপনি তার প্রস্তাবে সম্মত হবেন?”
    “কি তার প্রস্তাব, আগে জানি; তার পর সে বিষয়ের মীমাংসা হবে।”
    “আমি এখন কি করিব?”
    “কিছুই না।”
    “বড় শক্ত কাজ!”
    “তা আমি জানি; থাম—বলছি।”
    “বলুন।”
    “সন্ধ্যার একঘণ্টা পরে, তুমি ভিক্ষুকের বেশে ঐ বাগানের ভিতরে যাবে; যে কাঠের ঘরের কথা পত্রে আছে, সেই ঘরের কাছে কোন গাছের আড়ালে লুকাইয়া থাকিবে; দেখিবে, কে কি করে, কে কোথায় যায়। খুব সাবধান, কেউ যেন তোমায় দেখিতে না পায়। আমি রাত এগারটার সময় যাইব।”
    “নিরস্ত্র অবস্থায় যাবেন কি?”
    “অস্ত্রছাড়া তোমার মামা-বাবু কখনও বাড়ীর বাহির হন নাই— হবেনও না। আমি জুমেলিয়ার অনুসরণ করিব, তুমিও অলক্ষ্যে আমার অনুসরণ করিবে। কিন্তু দেখিয়ো—খুব সাবধান, যেন তোমাকে তখন সে দেখিতে না পায়। আমি যাইবার সময়ে পকেটে করিয়া কতকগুলি ধান লইয়া যাইব, যে পথে যাইব, সেই পথে আমি সেগুলি ছড়াইতে ছড়াইতে যাইব; সেগুলি ফেলিবার সময়ে বড় একটা শব্দ হ’বার সম্ভাবনা নাই; তুমি সেই ধানগুলির অনুসরণ করবে, তাহ হইলে আমার অনুসরণ করা হবে।”
    “বেশ—বেশ।”
    “জুমেলিয়া বড় সতর্ক—বড়ই চতুর; সে নিজের পথ আগে ভাল রকম পরিষ্কার না রেখে এ পথে পা দেয় নাই; আগে সে বুঝেছে, তার বিপদের কোন সম্ভাবনা নাই, তার পর আমাকে ডাকিয়ে পাঠিয়েছে। সে জানে, একবার আমার হাতে পড়িলে তাহার নিস্তার নাই; একবিন্দু দয়াও সে অামার কাছে আশা করিতে পারিবে না। তোমার এখন কাজ হইতেছে, তুমি দেখিবে, সে আত্মরক্ষার জন্য কিরূপ বন্দোবস্ত করিয়াছে; কে এখন তার সহযোগী হইয়াছে। আমার কথামত ধান দেখিয়া আমার সন্ধান লইবে; যখন সন্ধান পাইবে—যেখানে আমি থাকিব, জানিতে পরিবে, তখন তথায় অপেক্ষণ করিবে; যতক্ষণ না আমি তোমাকে ইঙ্গিতে জানাই, ততক্ষণ অপেক্ষা করিবে।”
    “কিরূপে ইঙ্গিত করিবেন?”
    “যখন উপর্যুপরি দুইবার পিস্তলের আওয়াজ হইবে, তখনই তুমি আমার নিকটে উপস্থিত হইবে। যতক্ষণ পৰ্য্যন্ত তুমি পিস্তলের শব্দ শুনিতে না পাও, ততক্ষণ তোমাকে আর কিছু করিতে হইবে না, কেবল অপেক্ষায় থাকিবে।”
    “বেশ, আমি আপনার আদেশমতই কাজ করিব।”
    “শচী! আমাদের জীবনের এ বড় সহজ উদ্যম নয়; এ উদ্যম বিফল হ’লে আমাদের মৃত্যু অনিবাৰ্য্য। এ পর্য্যন্ত আমরা যত ভয়ঙ্কর কার্য্যে প্রবৃত্ত হইয়াছি, সে সকলের অপেক্ষা এখন বেশি পরিশ্রম— বেশি বুদ্ধি—বেশি কৌশল আবশ্যক করে। তোমার মামী-মার জীবন ত এখন সঙ্কটাপন্ন; এমন কি আমার প্রাণও আজিকার রাত্রির কাৰ্য্যের উপর নির্ভর করিতেছে; প্রাণনাশের সম্পূর্ণ সম্ভাবনা। অথচ স্বেচ্ছায় সে কাৰ্য্য আমাদিগকে যে প্রকারে হউক, মাথা পাতিয়া লইতে হইবে। আর শচী, যদি সে নারী-দানবী আমাকে পরাস্ত করে—আমার প্রাণনাশ করে, তুমি রহিলে, তুমি প্রাণপণে চেষ্টা পাইবে; তোমার হাতে তখন আমার সকল কৰ্ত্তব্য অর্পিত হইবে। যাও শচী, ঈশ্বর তোমার মঙ্গল করুন। যাও শচী, আমার কথাগুলি যেন বেশ স্মরণ থাকে; সেগুলি যেন ঠিক পালন করিতে পার, আর যদি তোমায় আমায় আর এ জীবনে সাক্ষাৎ না ঘটে, ভাল —সুৰ্ব্বশক্তিমান পরমেশ্বর আছেন, তিনি তোমায় রক্ষা করিবেন—তিনি তোমার সহায় হইবেন—তিনি তোমার মঙ্গল করিবেন—যাও, শচী।”
    শচীন্দ্র স্নানমুখে—আর কোন কথা না বলিয়া—নয়নপ্রান্তের অশ্ররেখা মুছিয়া স্থান ত্যাগ করিল।

    পঞ্চম পরিচ্ছেদ
    সাক্ষাতে

    সেই দিবস রাত্রি সাড়ে দশটার পর দেবেন্দ্রবিজয় বাটী হইতে বাহির হইলেন। লাহিড়ীদের উদ্যানে উপস্থিত হইতে প্রায় অৰ্দ্ধঘণ্টা অতিবাহিত হইল। এগারটা বাজিতে আর বেশি বিলম্ব নাই। দেবেন্দ্রবিজয় উদ্যানের পশ্চিম-প্রান্তের নির্দিষ্ট ঘরের সান্নিধ্যে অপেক্ষা করিতে লাগিলেন। কেহই তথায় নাই।
    স্থানটি সম্পূর্ণরূপে নির্জন এবং নীরব। কেবল কদাচিৎমাত্র ভগ্নবিশ্রাম কোন বিহঙ্গের পক্ষস্পন্দনশব্দ—কোথায় ক্বচিৎ শুষ্কপত্রপাতশব্দ– অতি দুরস্থ কুক্কুররব। বায়ু বহিতেছিল—দেহস্নিগ্ধকর, অতিমন্দ নিঃশব্দবায়ুমাত্র। যামিনী মধুর, পূর্ণেন্দুবিভাসিত, একান্ত শব্দমাত্রবিহীনা। মাধবী ঘামিনীর পরিষ্কৃত সুনীলগগনে স্নিগ্ধকিরণময় সুধাংশু নীরবে, ধীরে ধীরে নীলাঙ্গরসঞ্চারী ক্ষুদ্র শ্বেতাম্বুদখণ্ডগুলি উত্তীর্ণ হইতেছিল।
    বৃক্ষমূলপার্শ্বে শচীন্দ্র লুকাইয়া ছিল; দেবেন্দ্রবিজয়ের তীক্ষ্ণদৃষ্টি সৰ্ব্বাগ্রে সেইদিকে পড়িল—শচীন্দ্রও তাহার মাতুল মহাশয়কে দেখিল। উভদে উভয়কে দেখিলেন, কেহ কোন কথা কহিলেন না, আবশ্যক বোধ করিলেন না।
    কিয়ৎক্ষণপরে—ঠিক যখন রাত্রি এগারটা, দেবেন্দবিজয় জ্যোংস্নালোকে কিয়দ্দূরে এক রমণীমূৰ্ত্তি দেখিতে পাইলেন। সে মূর্তি তাঁহার দিকে অতি দ্রুতগতিতে আসিতেছে। দেবেন্দ্রবিজয় বুঝিলেন, সে মূৰ্ত্তি আর কাহারও নহে—সেই পিশাচী জুমেলিয়ার।

    জুমেলিয়া দেবেন্দ্রবিজয়কে দুর হইতে দেখিবামাত্র জিজ্ঞাসিল, “এই যে দেবেন্দ্ৰ! এসেছ তুমি?”
    দেবেন্দ্রবিজয় কহিলেন, “হাঁ, এসেছি আমি।”
    জুমেলিয়া। মনে কিছুমাত্র ভয় হয় নাই?
    দে। না, কাহাকে ভয় করিব?
    জু। কেন, আমাকে?
    দে। তোমাকে? না।
    জু। তোমার মনে কি এখন কোন ভয় হইতেছে না?
    দে। না।
    জু। তোমার নিজের কথা বলছি না; অন্ত কাহারও জন্য তোমার ভয় হ’তে পারে হয়েছে কি?
    দে। জুমেলা, আমি তোমাকে ভয় করি না।
    জু। সঙ্গে কোন অস্ত্র আছে কি?
    দে। তুমি যে নিষেধ করিয়াছ।
    জু। ঠিক উত্তর হইল না।
    দে ৷ হইতে পারে।
    জু। তুমি কি সশস্ত্র?
    দে। তুমি?
    জু। হাঁ।
    দে। তবে আমাকেও তাহাই জানিবে।
    জু। কই, তা হ’লে তুমি আমার কথামত কাজ কর নাই।
    দে। তোমার কথামত আমি তোমার সঙ্গে দেখা করিতে আসিয়াছি—অস্ত্র থাক বা না থাক, তোমার সে কথায় এখন প্রয়োজন কি? যখন আমার হাতে কোন অস্ত্র দেখিবে, তখন জিজ্ঞাসা করিয়ো।
    জু। তুমি সঙ্গে অস্ত্ৰ আনিয়াছ কেন?
    দে। আবশ্যক হইলে তাহার সদ্ব্যবহার হইবে বলিয়া।
    জু। নিৰ্ব্বোধ!
    দে। নির্ববুদ্ধিতা আমার কি দেখিলে?
    জু। আমি কি পূৰ্ব্বে তোমায় বলি নাই—যদি তুমি আমার আদেশ মত কাৰ্য্য না কর, তোমার স্ত্রী মরিবে?
    দে। হাঁ, বলেছিলে।
    জু। তবে কেন তোমার এ মতিভ্রম হইল? আমি যদি এখন এখান হইতে চলিয়া যাই—তুমি আমার কি করিবে?
    দে। মনে করিলেই এখন আর যাইতে পার না।
    জু। কি করিবে?
    দে! এক পা সরিলে তোমাকে আমি হত্যা করিব।
    জু! নিৰ্ব্বোধ, আবার?
    দে। আবার কি?
    জু। তোমায় নিতান্ত মতিছন্ন ধরিয়াছে দেখিতেছি—আমাকে হত্য করিলে তুমি তোমার প্রিয়তম স্ত্রীকে হত্যা করিবে, স্মরণ আছে?
    দে। তথাপি আমি তোমাকে হত্যা করিব।

    ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ
    বনভূমিতে

    “কর, তোমার পদতলে—তোমার নিকটস্থ গুপ্ত অসির সম্মুখে এই বুক পাতিয়া দিতেছি; কোন অস্ত্র শাণিত কবিয়া আনিয়াছ—জুমেলিয়ার বুকে বসাইয়া দাও। নির্দয় দেবেন–নিষ্ঠুর দেবেন্‌! সুন্দর বক্ষ অস্ত্রে বিদ্ধ করিতে, একজন স্ত্রীলোকের বক্ষ অস্ত্রদীর্ণ করিতে যদি তুমি কিছুমাত্র কাতর না হও, তাহাতে যদি তোমার আনন্দ হয়—কর পার কর—এই তোমার সম্মুখে বুক পাতিয়া দিলাম!”
    এই বলিয়া জুমেলিয়া বক্ষের বসন ও কাঞ্চলী খুলিয়া দুরে ফেলিয়া দিল। জানু পাতিয়া বসিয়া দেবেন্দ্রবিজয়ের সমক্ষে সেই স্নিগ্ধ শশাঙ্ককরে কামদেবের লীলাক্ষেত্রতুল্য পীনোন্নত বক্ষ পাতিয়া দিল।
    পাঠক! একবার ভাবিয়া দেখুন, এ দৃশ্য কতদূর কল্পনাতীত! মাথার উপরে নীলানন্ত নিৰ্ম্মল গগনে থাকিয়া শশী অনন্তকিরণপ্লাবনে জগৎ ভাসাইয়া সুধাহাসি হাসিতেছিল; কাছে—দুরে—এখানে— ওখানে থাকিয়া নক্ষত্রগুলা ঝিকমিক্‌ করিয়া জলিতেছিল। বৃক্ষাবলীর অগ্রভাগারূঢ়পত্রগুলি ধীরে সমীরে হেলিতে-ফুলিতেছিল; নিম্নে—পার্শ্বে— পশ্চাতে—দুরে—অতিদূরে অনন্ত নিস্তব্ধতা; সেই ঘোর নীরবতার মধ্যে শশিকিরণে আভূমিপ্রণত শুামলতা নীরবে চলিতেছিল; নীরবে জ্ঞতা গুলুমধ্যে শ্বেত, পীত, লোহিত ফুল্লফুলদল বিকসিত ছিল। সেই নির্জন, নীরব উদ্যানমধ্যে দেবেন্দ্রবিজয় দণ্ডায়মান; তাঁহার সম্মুখে— দৃষ্টিতলে অদ্ধবিবস্ত্রভাবে জুমেলিয়া চন্দ্রকরোজ্জল অনাচ্ছাদিত পীনোন্নত পীবর বক্ষ পাতিয়া বসিয়া।
    দেবেন্দ্রবিজয় বিচলিত হইলেন, বারেক সৰ্ব্বাঙ্গ কঁপিয়া উঠিল; প্রত্যেক ধমনীর শোণিত-প্রবাহে যেন একটা অনুভূতপূৰ্ব্ব বৈদ্যুতিক প্রবাহ মিশিয়া সৰ্ব্বাঙ্গে অতি দ্রুতবেগে সঞ্চালিত হইতে লাগিল। কি বলিবেন,-স্থির করিতে না পারিয়া দেবেন্দ্রবিজর নীরবে রহিলেন।

    জুমেলিয়া দেবেন্দ্রবিজয়কে নীরবে এবং কিছু বা স্তম্ভিতভাবে থাকিতে দেখিয়া কহিল, “কি দেবেন, নীরব কেন? অস্ত্র বাহির কর; হাত ওঠে না কেন? ওঃ! যতদুর তোমাকে আমি নিষ্ঠুর মনে করেছিলাম, এখন বুঝিতে পারিতেছি, ততদুর তুমি নও; তবে অস্ত্র সঙ্গে আনিয়াছ কেন?”
    “সময়ে আবশ্যক হইলে সদ্ব্যবহার-করিব বলিয়া।”
    “বেশ, আপততঃ তোমার নিকটে যে-কোন অস্ত্র আছে, আমার হাতে দিতে পার?”
    “না।”
    “তবে তোমার নিকটে আমার কোন প্রস্তাব নাই; তোমার সঙ্গে তবে আমার সন্ধি হইল না।”
    “ক্ষতি কি?”
    “তবে কি দেবেন, তুমি আমার প্রতিদ্বন্দ্বিতাচরণ করিবে?”
    “না, আমার কার্য্যসিদ্ধ করিতে আসিয়াছি।”
    দেবেন্দ্রবিজয় এই কথাগুলি স্থির ও গম্ভীরস্বরে বলিলেন। এ স্থৈর্য্য, এ গাম্ভীৰ্য্য ঝটিকাপূৰ্ব্বে প্রকৃতি যেমন স্থির ও গম্ভীরভাব ধারণ করে, তদনুরূপ।
    জুমেলিয়া ইহা বিশদরূপে বুঝিতে পারিয়া মনে মনে অত্যন্ত অস্থির হইতে লাগিল; তাহার মনের ভাব তখন বাহিরে কিছু প্রকাশ পাইল না।

    জুমেলিয়া বলিল, “থাম, আর এক কথা, এখন তুমি আমার কাছে একটা প্রতিজ্ঞা করিবে?”
    “কি, বল?”
    “তুমি আজ তোমার অস্ত্র ব্যবহার করিবে না?”
    “যদি না করিতে হয়—করিব না।”
    “কি জন্য তুমি অস্ত্র ব্যবহার করিবে, স্থির করিয়াছ?”
    “তোমার পত্রে যে সকল কথা স্থিরীকৃত আছে, সেই সকলের মধ্যে যদি একটার ও কোন ব্যতিক্রম ঘটে।”
    “এই জন্য?”
    “হাঁ, আরও কারণ আছে।”
    “কি, বল।”
    “যদি আমার স্ত্রীর জীবনরক্ষার্থে অবশ্যক হয়।”
    “আবশ্যক হইবে না, আমি বলিতেছি—কোন আবশ্যক হইবে না, তোমার অস্ত্র ব্যবহারে তোমার স্ত্রীর জীবনরক্ষার্থে তুমি কোন ফল পাইবে না।”
    “তা হ’লে অস্ত্র ব্যবহার করিব না।”
    “নিশ্চয়?”
    “নিশ্চয়।”

    সপ্তম পরিচ্ছেদ
    ভিক্ষুক-বেশী

    জুমেলিয়া। দেবেন, কেহ তোমার সঙ্গে এসেছে?
    দেবেন্দ্র। না, তোমার কথামত কাজই করা হয়েছে।
    জু। শচীন্দ্র এ সকল বিষয়ের কিছু জানে না?
    দে। তুমি ত জান সে শয্যাশায়ী হয়েছে।
    জু। হঁ, জানি।
    দে। তবে জিজ্ঞাসা করিতেছ, কেন?
    জু। তুমি যে এখানে একাকী আসিয়াছ, এ কথা আমি কিছুতেই বিশ্বাস করিতে পারিতেছি না।
    দে। অবিশ্বাসের কারণ কি আছে? আমি একাকী আসিয়াছি।
    জু। দেবেন, তুমি যতই সতর্ক হও—যতই বুদ্ধিমান হও, কিছুতেই জুমেলিয়াকে ছাপাইয়া উঠিতে পরিবে না; আমি চক্ষের নিমেষে তোমায় খুন করিতে পারি।
    দে। পার যদি, করিতেছ না কেন? আমার প্রতি এত দয়া প্রকাশের হেতু কি?
    জু। আপাততঃ আমার সে ইচ্ছা নাই, আমিও প্রস্তুত নহি।
    দে। জুমেলিয়া, অনৰ্থক বিলম্বে তোমার অনর্থ ঘটিবার সম্পূর্ণ সম্ভাবনা ৷
    জু। [ সহাস্তে ] মাইরি!
    দে। শোন—মিথ্যা আমরা সময় নষ্ট করিতেছি, তুমি আমাকে কোথায় নিয়ে যাইবে বলিয়া পত্র লিখিয়াছিলে না?
    জু। হাঁ।
    দে। কোথায়?
    জু। এমন কোথাও নয়; এই ঘে– [অঙ্গুলি নির্দেশে] দোতলা বাড়ীখানা দেখিতে পাইতেছ, উহার মধ্যে—ঐখানে তোমার রেবতী আছে। দেখিবে?
    দে। চল, দেখিব।
    জু। আর একটা প্রতিজ্ঞা করিতে হইবে।
    দে। কি, বল?
    জু। আমার বিনানুমতিতে এমন কি তুমি তোমার স্ত্রীকে স্পর্শও করিতে পারিবে না;
    দে। তাহাই হইবে, সম্মত হ’লেম, চল।
    জু। যথেষ্ট।
    দে। তবে চল।
    জু। এস।

    * * * * *

    দেবেন্দ্রবিজয়কে সমভিব্যাহারে লইয়া উদ্যানভূমি অতিক্রম করিয়া জুমেলিয়া ক্রমশঃ সেই অট্টালিকাভিমুখে চলিল।
    সে অট্টালিকা উদ্যানের বাহিরে নয়, উদ্যানমধ্যে—পুৰ্ব্বপ্রান্তে; বহুদিন মেরামত না ঘটায় অনেক স্থলে জীর্ণ ও ভগ্নোমুখ—অনেক স্থানে বালি খসিয়া ইট বাহির হইয়া পড়িয়াছে—কোন কোন স্থান ইট খসিয়া একেবারে ভাঙ্গিয়া পড়িয়াছে।

    দেবেন্দ্রবিজয় ও জুমেলিয়া যখন ক্রমশঃ সেই অট্টালিকাভিমুখে অগ্রসর হইতে লাগিলেন, তখন ভিক্ষুকবেশী শচীন্দ্র বৃক্ষান্তরাল হইতে বাহির হইল; কোন পথে তাঁহারা কোন দিক্ দিয়া যাইতেছেন, তাহ স্থিরদৃষ্টিতে দেখিতে লাগিল; এইরূপে প্রায় পাঁচ মিনিট কাটিল। শচীন্দ্র সেইখানে দাঁড়াইয়া রহিল।
    যখন শচীন্দ্র সেইদিকে যাইবার জন্য একপদ সম্মুখে অগ্রসর হইয়াছে, আর এক ব্যক্তিকে সে সেইদিকে আসিতে দেখিল; তখনই তাড়াতাড়ি নিজের ছিন্ন শতগ্রন্থিযুক্ত উত্তরীয় বৃক্ষতলে পাতিয়া শয়ন করিল; কৃত্রিম নিদ্রার ভানে চক্ষু নিমীলিত করিয়া নাসিকা-স্বর আরম্ভ করিয়া সেই নীরব উদ্যানের নিদ্রিত পক্ষিবৃন্দকে ক্ষণেকের জন্য অত্যন্ত চমকিত ও মুখরিত করিয়া তুলিল।
    সে লোকটা অতি শীঘ্রই শচীন্দ্রের নিকটে আসিল; আসিয়া সজোরে তাহার স্কন্ধে একটা সোহাগের চপেটাঘাত করিল।
    শচীন্দ্র নিমীলিত নেত্রে পার্শ্বপরিবর্তন করিল। আবার সেই চপেটাঘাত। নিমীলিতনেত্রেই ভিক্ষুক বেশী শচীন্দ্র বলিল, “কে বাবা তুমি, পথ দেখ না, বাবা।”
    সোহাগের সেই চপেটাঘাতের শব্দটা পূৰ্ব্বাপেক্ষ এবার কিঞ্চিৎ পরিমাণে উচ্চে উঠিল। শচীন্দ্র বলিল, “কে বাবা, পাহারাওয়ালাজী নাকি? বাবা, গাছতলায় পড়ে একপাশে ঘুমাচ্ছি, তা’ তোমার কোমল প্রাণে বুঝি আর সইল না? আদর ক’রে যে গুরুগম্ভীর চপেটাঘাতগুলি আরম্ভ ক’রে দিয়েছ, তা আমার অপরাধটা দেখলে কি?”
    আগন্তুক বলিল, “আরে না, আমি পাহারাওয়াল নই।”
    শচীন্দ্র বলিল, “কে বাবা, তবে তুমি? উপদেবতা নাকি? কেন বাবা গরীব মানুষ একপাশে পড়ে আছি, ঘাটাও কেন, বাবা? ভদ্রলোকের ঘুমটা ভেঙে দিয়ে তোমার কি এমন চতুৰ্ব্বৰ্গ লাভ হবে?”
    আগন্তুক বলিল, “আমি তোমাকে একটা কথা জিজ্ঞাস করতে এসেছি।”
    শচীন্দ্র বলিল, “আমাকে জিজ্ঞাসা কেন? আমার চেয়ে মাথায় বড়, ভারিক্কেদরের তালগাছ রয়েছে, কিছু জিজ্ঞাসা করবার থাকে, তাকে কর গে; এখান থেকে পথ দেখ না, চাঁদ ”
    আগন্তুক। আমি এদিকে এসে পথটা ঠাওর করতে পারছি না; যদি তুমি বলে দাও, বড় উপকার হয়।
    শচীন্দ্র ৷ পথ দেখ; সিধে লোক-সিধে পথ দেখ।
    আ। আমি পদ্মপুকুরের দিকে যাব; কোন পথ জান কি?
    শ। কি, শ্বেতপদ্মের না নীলপদ্মের? আবার কি রামরাজা এই ঘোর কলিতে দুর্গোৎসব আরম্ভ করেছে না কি?
    আ। আমাকে পদ্মপুকুরের পথটা ব’লে দাও; আমি তোমাকে একটা পয়সা দিচ্ছি।
    শ। কেন বাপু, এতদিনের পর দাতাকর্ণের নামটা আজ হঠাৎ লোপ করবে?
    আ। পাগল না কি তুমি?
    শ। পাঁচজনে মিলে আমাকে তাই করেছে, দাদা; আর খোঁয়াড়ি ধরলে পাগল ত পাগল, সকল দিকেই গোল লেগে যায়। তবে চললেম মশাই, নমস্কার; ব্রাহ্মণ হও যদি—প্রণাম।
    আ। কোথায় যাচ্ছ, তুমি?
    শ। আর কোথায় যাব, শুঁড়ি-মামার সন্দর্শনে।
    শচীন্দ্র তথা হইতে প্রস্থান করিলে অপর দিক দিয়া আগন্তুক চলিয় গেল।

    * * * * *

    কিয়ৎপরে আবার উভয়ের উদ্যানের অপর পার্শ্বে সাক্ষাৎ ঘটিল।
    আগন্তুক জিজ্ঞাসা করিল, “কই, শুড়ি-মামার কাছে গেলে না?
    শচীন্দ্র সবিস্ময়ে বলিল, “তাই ত হে কৰ্ত্তা, আবার যে তুমি! আবার ঘুরেফিরে তোমারই কাছে এসে পড়েছি যে, নিশ্চয়ই পৃথিবী বেটী গোলাকার; নইলে ঘুরতে ঘুরতে ঠিক তোমার কাছে আবার এসে উপস্থিত হ’ব কেন? আসি মশাই, নমস্কার; ব্রাহ্মণ হও যদি—প্রণাম।”
    উদ্যান হইতে বহির্গমনের পথ ধরির শচীন্দ্র তথা হইতে প্রস্থান করিল। আগন্তুক অতি তীব্রভৃষ্টিতে—যতক্ষণ তাহাকে দেখিতে পাওয়ার গেল—দেখিতে লাগিল। না, এ লোককে ভয় করার কোন কারণ নাই; মাতাল—আধ-পাগল; যাক, আগে ভেবেছিলাম, বুঝি গোয়েন্দার কোন চর-টর হবে।” এই বলিয়া যে পথ দিয়া দেবেন্দ্রবিজয় ও জুমেলিয়া গমন করিয়াছিল, সেই পথে গমন করিতে লাগিল—
    লোকটা জুমেলিয়ার চর।
    ———– ———
    তখন ভিক্ষুক-বেশী শচীন্দ্র বেশীদূরে যায় নাই। যতক্ষণ না আগন্তক একেবারে দৃষ্টিপথ অতিক্রম করিল, ততক্ষণ শচীন্দ্র নিকটস্থ একটি বৃক্ষপার্শ্বে লুকাইয়া রহিল; তাহার পর সুবিধা মত গুপ্তস্থান হইতে বাহির হইল; যে পথ দিয়া আগন্তুক চলিয়া গিয়াছিল, সেই পথ ধরিয়া চলিল।
    শচীন্দ্রের গমনকালে বারংবার হস্তস্থিত ঘষ্টি হস্তচু্যত হইয়া ভূতলে পড়িয়া যাইতে লাগিল; বারংবার সে তাহা ভূতল হইতে প্রসন্নচিত্তে হাস্তমুখে তুলিয়া লইতে লাগিল।
    এ হাসির কারণ বুঝিয়াছেন কি? দেবেন্দ্রবিজয় যে সকল ধান ছড়াইয়া নিশান করিয়া গিয়াছিলেন, ‘শচীন্দ্র এক্ষণে যষ্টি উঠাইবার ছলে, সেই সকল ধান দেখিয়া গন্তব্যপথ ধরিয়া চলিয়াছে।

  • তৃতীয় খণ্ড : পিশাচীর প্রেম

    তৃতীয় খণ্ড : পিশাচীর প্রেম

    তৃতীয় খণ্ড – পিশাচীর প্রেম

    প্রথম পরিচ্ছেদ
    আর এক ভাব

    অনতিবিলম্বে জুমেলিয়া এবং তাহার অনুবর্তী হইয়া দেবেন্দ্রবিজয় সেই অসংস্কৃত অন্ধকারময় নিভৃত অট্টালিকা-সম্মুখে আসিয়া উপস্থিত হইলেন।
    জুমেলিয়া কহিল, “এই বাড়ীর ভিতরে তোমাকে আমার সঙ্গে যাইতে হইবে।”
    “স্বচ্ছন্দে,” দেবেন্দ্রবিজয় প্রত্যুত্তরে কহিলেন।
    “রেবতী এখানে আছে।”
    “বেশ, আমাকে তার কাছে লইয়া চল।”
    “এখন নয়, সুবিধা মত; আগে তোমার সঙ্গে আমার কতকগুলি কথা আছে, এস।”

    উভয়ে সেই বাটিমধ্যে প্রবেশিলেন। দেবেন্দ্রবিজয় যেমন অন্ধকারময় প্রাঙ্গণে পড়িলেন, অমনি বস্ত্রাভ্যন্তরস্থ গুপ্তলণ্ঠন বাহির করিলেন, চতুর্দিক আলোকিত হইল; জুমেলিয়া, একবার চমকিত হইয়া উঠিল—কিছু বলিল না।
    তাহার পর উভয়ে উত্তরপার্শ্বস্থিত সোপানীতিক্রম করিয়া দ্বিতলে উঠিলেন; তথাকার একটি প্রকোষ্ঠের মধ্যে প্রবেশ করিলেন। জুমেলিয়া সেই প্রকোষ্ঠের এক কোণে একটি মোমের বাতি জালাইয়া রাখিল; রাখিয়া বলিল, “দেবেন্দ্রবিজয় জান কি, কেন আমি তোমাকে এখানে লইয়া আসিয়াছি?”
    “না—জানি না।”
    “তুমি জান, আমি প্রতিজ্ঞা করিয়াছি, তোমাকে হত্যা করিব?”
    “জানি।”
    “শুধু তোমাকে নয়—তোমার সংসর্গে যারা আছে, তাদেরও?”
    “তাহাও জানি।”
    “তুমি কি বিশ্বাস কর, আমি প্রতিজ্ঞা পূর্ণ করিতে পারিব?”
    “যদি পার—পূর্ণ করিবে।”
    “আমি পারি।”
    “ক্ষতি কি?”
    “কিন্তু এখন আমার সে ইচ্ছা নাই; আমি তোমার সঙ্গে একটা বন্দোবস্ত করিতে চাই।”
    “বটে! কোন বিষয়ে?”
    “তুমি সে বিষয়টা কিছু অভিনব, কিছু আশ্চৰ্য্য বোধ করিবে। আমি এখনই আমার প্রতিহিংসা হইতে তোমাকে—তোমার স্ত্রীকে — শচীন্দ্রকে মুক্তি দিতে প্রস্তুত আছি।”
    “বটে, এর ভিতরেও তোমার অবশ্যই কোন গুঢ় অভিপ্রায় আছে।” “ছ, যদি তুমি আমার কথা রাখ—আমাকে সাহায্য কর, আমি ইচ্ছা করিতেছি—যত পাপ কাজ-সমস্তই ত্যাগ করিব; এখন হইতে সৎস্বভাব হইব।”
    “সে সময় এখন আর আছে কি, জুমেলা?”
    “আছে, এখনও অনেক সময় আছে—শুধরাইবার অনেক সময় আছে।”
    “বল।”
    “দেখ দেবেন, তুমি মনে করিলে আমি যাদের প্রাণনাশ করিতে একান্ত ইচ্ছুক, সামান্ত উপায়ে তাদের তুমি আমার প্রতিহিংসা হইতে উদ্ধার করিতে পার। সে উপায় কি? তুমি আমার স্বভাবের গতি ফিরাও, আমার মতি ফিরাও—যাতে আমি এখন হইতে সচ্চরিত্ৰ হ’তে পারি—সেই পথে নিয়ে যাও। তুমি আমাকে সদা-সর্বদা ‘পিশাচী’ কখন বা ‘দানবী’ বলে থাক; সেই দানবীকে—সেই পিশাচীকে তুমি মনে করিলে দেবী করিতে পার।”
    “জুমেল, তোমার এ সকল কথার অর্থ কি?”
    “উত্তর দাও, দেবেন! আমার কথার ঠিক ঠিক উত্তর দাও। ঠিক ক’রে বল দেখি, আমি কি বড় সুন্দরী?” [মৃদুহাস্যে কটাক্ষ করিল]
    “হাঁ, তুমি সুন্দরী, এ কথা কে অস্বীকার করিবে?”
    “কেমন সুন্দরী?”
    “যদি তোমার অন্তরের জঘন্ততা তোমার মুখে প্রতিফলিত না হইত, দেখিতাম, তুমি সুন্দরী—তোমার মত সুন্দরী আমি কখনও দেখিয়াছি কি না, সে বিষয়ে সন্দেহ থাকিত।”
    “মনোরমার* চেয়ে সুন্দরী?”
    “রেবতীর চেয়ে?”
    “হাঁ।”
    “তুমি কি সুন্দরীর সৌন্দৰ্য্য ভালবাস না?”
    “প্রশংসা করি বটে!”
    “যদি আমার অন্তর হতে সমস্ত পাপের কালি মুছে যায়, তা’ হ’লে আমি তোমার মনোমত সুন্দরী হ’ব কি, দেবেন?”
    “না, আমি তোমাকে অত্যন্ত ঘৃণা করি।”
    “যদি কোন স্থানে তোমার মন বাধা না থাকিত, তা হ’লে তুমি কি আজ আমাকে ভালবাসিতে পারিতে, দেবেন?”
    “না।”
    এই কথাটাই চূড়ান্ত হইল, জুমেলিয়ার হৃদয় দুর দুর করিতে লাগিল, নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসের গতিবিধি বন্ধ হইল, মুখমণ্ডল একবার মুহূর্তের জন্য আরক্তিম হইয়া পরক্ষণেই একেবারে কালিমাছন্ন হইয় গেল। কিয়ৎপরে প্রকৃতিস্থ হইয়া পূৰ্ব্বাপেক্ষী মৃদুস্বরে, জুমেলিয়া বলিল, “তা’ হ’লেও তুমি আমাকে ভালবাসিতে পারিতে না, দেবেন—তা’ হ’লেও না?”
    “ন!—তা’ হ’লেও না।”
    “দেবেন্দ্রবিজয়! আমার বয়স এখন ছত্রিশ বৎসর। এই ছত্রিশ বৎসরের মধ্যে আমাকে অনেকে ভালবেসেছে; কিন্তু সে সকল লোকের মধ্যে আমি এমন কাহাকেও দেখি নাই, যাহাকে আমি তার ভালবাসার প্রতিদানেও কিছু ভালবাসিতে পারি; কিন্তু তুমি—তুমি— তোমাকে দেখে আমার মন একেবারে ধৈর্য্যহীন হ’য়ে পড়েছে। তুমি আমাকে ভালবাস না—ভালবাসা ত বহুদুরের কথা—তুমি আমার শক্ৰ—পরম শত্রু; তথাপি আমার প্রাণ তোমার পায়ে আশ্রয় পাবার জন্য একান্ত ব্যাকুল। আমি পুৰ্ব্বেই জানতে পেরেছিলাম, আমার এ লালসা আশাহীন, তাই আমি তোমাকে হত্যা করিতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হ’য়েছিলাম; স্থির করেছিলাম, তোমাকে হত্যা করতে পারলে হয় ত ভবিষ্যতে এক-সময়ে-ন-এক-সময়ে তোমাকে ভুলে যেতে পারব; আজ তোমাকে কেন ডেকেছি জান, দেবেন? তোমার সঙ্গে আমি একট। বন্দোবস্ত করতে চাই।”
    “কি, বল?”
    “আশা করি, তুমি আমার কথা রাখবে।”
    “হাঁ, তোমার কথা রাখতে যদি কোন ক্ষতি স্বীকার করতে না হয়, অবশ্যই রাখব।”
    “তুমি তোমার স্ত্রীকে ভালবাস?”
    “হাঁ, ভালবাসি।”
    “তুমি তার জীবন রক্ষা করতে ইচ্ছ। কর?”
    “হাঁ, করি।”
    “তার জীবন রক্ষা করতে তুমি কিছু ত্যাগ-স্বীকার করতে পার?”
    “হাঁ, পারি।”
    “তুমি তোমার ভালবাসা ত্যাগ করতে পার?”
    “আমি তোমার কথা বুঝতে পারলেম না।”
    “তুমি তোমার স্ত্রীকে পরিত্যাগ করতে পার?”
    “তাকে আমি পরিত্যাগ করিব।”
    “হাঁ, তাকে—তোমার স্ত্রীকে—তোমার সেই ভালবাসার সামগ্রীকে কেবল এক বৎসরের জন্য; এক বৎসর—বেশি দিন না—চিরকালের জন্য না;–তুমি তাকে মনে মনে যেমন ভাবেই রাখ, কিন্তু কেবল এক বৎসরের জন্য তুমি আমার হও। বৎসর ফুরালে তোমাকে আমি মুক্তি দিব; তখন অবাধে তোমার স্ত্রীর কাছে ফিরে যেতে পারবে। এক বৎসর– কেবল একটি মাত্র বৎসর; শেষে আমিও মরিব—তুমিও নিশ্চিন্ত হ’তে পারবে, আমি নিজের বিষে মরিব; তুমি তখন মুক্তি পাইবে. জুমেলিয়ার হাত হ’তে তুমি আজীবন মুক্ত থাকিবে।”
    এই বলিয়া জুমেলিয়া দেবেন্দ্রবিজয়ের দিকে একপদ অগ্রসর হইয়া, জানু পাতিয়া তাহার অতি নিকটে অতি দীনভাবে উপবেশন করিল— তখন সে প্রাণের আবেগে মহা উন্মাদিনী।
    দেবেন্দ্রবিজয় তাহার অভিনব অভিপ্রায় শুনিয়া চমকিত হইলেন। তাঁহার সৰ্ব্বাঙ্গ তখন প্রস্তর-প্রতিমুক্তির ন্যায় শীতল, নীরব ও নিশ্চল।

    ——————-
    [* জুমেলিয়ার জটিল রহস্তপূর্ণ অন্যান্য ঘটনাবলী গ্রন্থকারের “মনোরমা” ও “মায়াবী” নামক পুস্তকে লিখিত হইল। প্রকাশক।]

    দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ
    আবেগে

    জুমেলিয়া বলিতে লাগিল,-“দেবেন, কত সুখ তাতে; মরি! মরি! মরি! আমার হও, আমার হও তুমি—এক বৎসরের জন্য। দেখ দেবেন, আমি প্রাণের মধ্যে–হৃদয়-পটে কেমন মুখের সুন্দর ছবি এঁকেছি। এ কথা মনে করতে আমার আনন্দের সীমা থাকছে না। তোমাকে ভালবাসতে হবে না—তুমি আমাকে ভালবাস কি না, সে কথা জিজ্ঞাসা করতে চাই না; আমি জানি, আমি এত নিৰ্ব্বোধ নই, তুমি কখনই আমাকে ভালবাসবে না—ভালবাসতেও পারবে না। কিন্তু ছল—ছলনায় আমাকে বুঝায়ো, তুমি আমায় বড় ভালবাস; কেবল একটি বৎসরের জন্য। আমি সাধ ক’রে তোমার প্রতারণায় প্রতারিত হ’তে স্বীকার করছি—এ প্রতারণায়ও সুখ আছে। আমি জানি, আমি যা আশা করেছি, তা আশার অতীত। তুমি আমাকে ছলনায় ভুলায়ে যে, তুমি আমার ভালবাস, আর কিছু না, তাই যথেষ্ট। আমি নিজেকেই বুঝাব যে, তুমি প্রকৃতই আমাকে ভালবাস; তুমি আমার—আমার! রেবতী রক্ষা পাবে, সে তোমার বাড়ীতে নির্বিবঘ্নে পৌছিবে; সেখানে সে তোমার অপেক্ষায় থাকবে, সে কখনই জানতে পারবে না, তার জীবন-রক্ষার্থে তোমায়-আমার কি বন্দোবস্ত হয়েছে— সে তোমার এ বিষয়ের কোন প্রমাণই পাবে না। বৎসর শেষে তুমি স্বচ্ছন্দে তার কাছে ফিরে যেতে পারবে; তখন যা’ তোমার প্রাণ চায়— করিয়ো; ঘাতে তুমি সুখী হও—হইয়ো। কেবল একবার তুমি ক্ষণেকের জন্য স্বর্গের সুষমার আভাসটুকু আমায় দেখাও,—যা” আমি সারাজীবনে কখনও অনুভব করিতে পারি নাই। তোমার স্ত্রী কিছুই জানবে না, কেহই না; কেবল তুমি আর আমি। এক বৎসর পরে তুমি হাসতে হাসতে তার কাছে ফিরে যাবে; আমি মরিব, সত্যসত্যই মরিব; কেবল এ গুপ্তরহস্তা তোমারই জ্ঞাত থাকিবে—লোকের কাছে তোমাকে কলঙ্কের ভাগী হইতে হইবে না।” জুমেলিয়া উঠিল—আরও দুইপদ অগ্রসর হইয়া দেবেন্দ্রবিজয়কে বাহুবেষ্টিত করিতে চেষ্টা করিল। দেবেন্দ্রবিজয় ঘৃণাভরে তাহাকে সরাইয়া দিলেন।
    জুমেলিয়া উন্মাদিনীর ন্যায় বলিতে লাগিল—“শোন দেবেন, আমি বুঝেছি, আমি মরিব; এ কথা তুমি বিশ্বাস করতে পারছ না; আমি বৎসর ফুরালে তোমার সাক্ষাতে বিষপান করব। যখন আমি ম’রে যাব, কি সংজ্ঞাশুন্ত হ’য়ে পড়ব, তখন তুমি শতবার শাণিত ছুরিকা দিয়ে আমার বক্ষঃস্থল বিদ্ধ ক’রো, তা’ হ’লে ত তখন তোমার অবিশ্বাসের আর কোন কারণ থাকবে না। এখন আমরা একদিকে—বহুদূরে চলে যাব; কেবল এই এক বৎসরের জন্য; আমরা কামরূপেই চলে যাব। আমি যে সকল দ্রব্যগুণ জানি, তোমাকে সকলগুলিই শিখাব; শিখালে সহজেই শিখতে পারবে; ত’তে তোমার উপকার বৈ অনুপকার হবে না। তুমি যে দেশ ছেড়ে চলে যাবে, সেজন্য একটা কোন ওজর করলেই চলবে। তোমার স্ত্রীকে সদা-সৰ্ব্বদা তোমার ইচ্ছামত পত্রাদি লিখতে পারবে; কিন্তু তুমি প্রাণান্তেও তোমার স্ত্রীর নাম আমার কাছে এই এক বৎসরের জন্য ক’রো না; যাতে আমার মনে এমন একটা ধারণ হ’তে পারে যে, তুমি আমাকে ভালবাস ন—এমন কিছু আমাকে দেখিয়ে না—জানতে দিয়ে না। আমি ত বলেছি, আমি নিজেকে নিজেই প্রতারিত ক’রে রাখব; তুমি আমার হৃদয়ের রাজ্য হবে – তুমি আমার প্রাণের ঈশ্বর—তুমি আমার সৰ্ব্বস্ব! তার পর এক বৎসর কেটে গেলে আমি নরকের দিকে চ’লে যাব। তোমাকে এক বৎসর পেয়ে, তোমার বৎসরেক প্রেমালাপে আমি যে সুখ লাভ করব, ত’তে আমি হাসিমুখেই নরকের দিকে চলে যাব। এই এক বৎসর আমার জয়জয়কার, দেবেন। দেবেন—প্রাণের দেবেন্‌! তুমি কি আমার মনের কথা—প্রাণের বেদন বুঝতে পার্ছ না—আমি তোমাকে কতমতে আরাধনা করছি? তুমি মুখে আমার ভালবাস, তাতেও আমি মুখী হ’ব-আমি জোর করে বিশ্বাস ক’রে লইব, তুমি আমায় প্রকৃত ভালবাস। আমার কথার উত্তর দাও; বল-—স্বীকার পাও—প্রতিজ্ঞ কর, আমি তোমাকে যা বললেম, তা’তে তোমার আর অমত নাই; আমি এখনি তোমাকে রেবতীর কাছে নিয়ে যাচ্ছি—সে এখন মড়ার মত প’ড়ে আছে। যে ঔষধে তার জ্ঞান হবে, সে ঔষধ আমি তোমার হাতেই দিব, তুমি সেই ঔষধ তাকে খেতে দিয়ে; সেই মুহুর্তেই তা’র জ্ঞান হবে—শরীরের অবস্থা ফিরে যাবে; যেমন তাকে তুমি আগে দেখেছ, এখনও ঠিক তাকে তেমনি দেখ বে। অস্বীকার কর যদি, নিশ্চয় স্ত্রীর মৃত্যু হবে; ত’ হ’লে তোমার কাছে আমি যেমন সজলনয়নে দাঁড়িয়ে আছি—আর আমার সম্মুখে তুমি যেমন প্রস্তরপ্রতিমূৰ্ত্তির ন্যায়, নিশ্চলভাবে দাঁড়াইয়া আছ, ইহা যেমন নিশ্চয়— তেমনই নিশ্চয় তা’র মৃত্যু জানবে। জগতের কোন বিজ্ঞান তা’র চৈতন্ত সম্পাদন করতে পারবে না—কোন চিকিৎসক তার জীবন দান করতে পারবে না। যে ঔষধের প্রক্রিয়ায় সে এখন অচেতন, আমিই কেবল-তার প্রতীকারের উপায় জানি। এমন লোক দেখি না, আমার সাহায্য বিনা তাকে বাঁচাইতে পারে। যদি তুমি আমার হাত পা লোহশূঙ্খলবদ্ধ কর, এখনই এখানে সুতপ্ত লৌহখণ্ড দিয়ে আমার সৰ্ব্বাঙ্গ ঝলসিত কর, গোছায় গোছায় আমার মাথার চুলগুলি ছিড়িয়া ফেল, সাড়াশি দিয়ে এক-একটি ক’রে সকল দাত মূলোৎপাটিত কর, আমার কর্ণরন্ধে, সৰ্ব্বাঙ্গে গলিত সীসক ঢেলে দাও—ঘত প্রকার যন্ত্রণা আছে—যে সকল চিন্তার অতীত—আমাকে দাও, আমার মনের দৃঢ়তা কখনই তুমি নষ্ট করতে পারবে না; সে যাতে শীঘ্র শীঘ্র মৃত্যুমুখে পড়ে, তা আমি করব; তাতে আমি জানব, আমার প্রতিহিংসা সফল হয়েছে; তাতে তোমার মনে যে যন্ত্রণা হবে, সে যন্ত্রণার কাছে আমার শারীরিক যন্ত্রণা তুচ্ছ বিবেচনা করব। আমি তোমার কাছে প্রার্থনা করছি, বড় বেশি কিছু নয়—দেবেন, একটি বৎসর মাত্র; এই এক বৎসরের জন্য আমার হও—কেবল আমারই। তার পর তোমার সংসারে সানন্দে তুমি ফিরে যেয়ো—সুখী হ’য়ো। সম্মত হবে কি? তুমি ত বলিয়াছ, রেবতীর প্রাণরক্ষার্থ সকলই করিতে পার; কেবল এক বৎসরের জন্য আমি তোমার কাছে তোমাকেই চাহিতেছি। উত্তর দিবার আগে বেশ ক’রে ভেবে দেখ—দেবেন, বেশ ক’রে বিবেচনা ক’রে দেখ; আমার কথা আমি কিছুতেই লঙ্ঘন হ’তে দিই নাই; আমার অভিপ্লায়ের একবিন্দু পরিবর্তিত হবে
    না।”
    জুমেলিয়া উঠিয়া দাঁড়াইল, দেবেন্দ্রবিজয়ের সম্মুখে-সাশ্রনেত্ৰে— মানমুখে—স্থিরভাবে দাঁড়াইয়া রহিল।
    দেবেন্দ্রবিজয়ও সেইরূপ স্থিরভাবে রহিলেন। তাঁহার এখনকার মনের অতিশয় অধীরতা মুখে কিছুমাত্র প্রকাশ পাইল না।
    জুমেলিয়া জিজ্ঞাসিল, “কি বল দেবেন, সন্মত আছ?”
    দেবেন্দ্রবিজয় বলিলেন, “রেবতী কোথায়?”
    জুমেলিয়া। এইখানেই আছে।
    দেবেন্দ্র। তার কাছে আমাকে নিয়ে চল।
    জু। কি জন্য?
    দে। তোমাকে এখন কি উত্তর দিব? আমি তাকে দেখে সে সম্বন্ধে একটা বিবেচনা করতে পারব।
    জু। আমি এখনি তার কাছে নিয়ে যেতে পারি।
    দে | নিয়ে চল।
    জু। তার পর তুমি আমার কথার উত্তর দিবে?
    দে। হাঁ।
    জু। তবে আমার সঙ্গে এস, দেবেন; তুমি অবশ্যই স্বীকার পাবে : তুমি যেরূপ তাহাকে ভালবাস, তাতে তাকে দেখলে—তার মুখ দেখলে কখনই তুমি আমার প্রস্তাবে অস্বীকার করতে পারবে না—এস।

    * * * * *

    জুমেলিয়া দেবেন্দ্রবিজয়কে সঙ্গে লইয়া পার্শ্ববৰ্ত্তী কক্ষে গমন করিল। তথায় প্রকোষ্ঠতলে একথানি ছিন্ন গালিচার উপর মৃতপ্রায় রেবতী পড়িয়া।
    রেবতীর মুখমণ্ডল অতিস্নান—ঠিক মৃতের মুখের ন্যায়। দেখিয়া দেবেন্দ্রবিজয় হৃদয়ের মধ্যে একটা অননুভূতপূৰ্ব্ব, কম্পপ্রদ শৈত্য অনুভব করিলেন; তখনকার মত তাঁহার অৰ্দ্ধোন্মত্ত অবস্থা আর কখনও ঘটে নাই। তখন তাঁহার, প্রাণের ভিতরে যে কি অসহ যন্ত্রণা হইতেছিল, তাহার বর্ণনা হয় না; কিন্তু বাহিরে তাহার সকলই স্থির—প্রাণে যেন উদ্বেগের কোন কারণই নাই। অতি তীব্রভৃষ্টিতে বারেক জুমেলিয়ার মুখপানে চাহিলেন তার পর নিতান্ত রক্ষস্বরে বলিলেন, “জুমেলিয়া, আমার উত্তর, না।”

    তৃতীয় পরিচ্ছেদ
    “মরে —মরিবে”

    ‘না’ এই শব্দমাত্রটাতে সম্ভব জুমেলিয়া খুব বিচলিত ও চমকিত হইয়া উঠিত; কিন্তু তখনকার ভাব জুমেলিয়া অতিকষ্টে দমন করিয়া ফেলিল; কেবল মৃদু হাসিয়া মৃদুগুঞ্জনে বলিল, “ব্যস্ত হ’রো না, দেবেন; বেশ ক’রে ভেবে দেখ।”
    বাক্যশেষে তীক্ষকটাক্ষবিক্ষেপ।
    “তেবে দেখেছি, না।”
    “তুমি তবে স্বীকৃত হবে না?”
    “না।”
    “দেবেন, তুমি না বড় বুদ্ধিমান্‌! তোমার স্ত্রীর এই দশা দেখে তুমি কি এই উত্তর স্থির করলে, দেবেন?”
    “হাঁ।”
    “কি দেখে তুমি এমন ভরসা করছ?”
    “আমার স্ত্রীর কিছুই হয় নাই, মুখমণ্ডল যদিও ম্লান, তা’ ব’লে কালিমাময় বা জ্যোতির্হীন নয়! জুমেলা, যতদূর কদৰ্য্যত ঘটতে পারে— তা তোমাতে ঘটেছে। যতই তুমি পাপলিপ্ত হও না কেন, পবিত্রতা যে কি জিনিষ, অবশ্যই তা তুমি জান। তুমি এখনও বলিতেছ, তুমি আমার ভালবাস?”
    “হাঁ, ভালবাসি, দেবেন, এখনও বলছি, তোমার জন্য আমি পাগল হইয়াছি।”
    “হ’তে পারে; কিন্তু আমি তোমাকে আন্তরিক ঘৃণা করি।”
    “দেবেন, এই কি তোমার উত্তর? কঠিন!”
    “আমি অন্যায় কিছু বলি নাই; তুমি আমার কথা ঠিক বুঝিবে কি, জানি না; যদি তুমি প্রকৃত রমণী হইতে, তাহা হইলে নিশ্চয়ই বুঝিতে পারিতে; কিন্তু বিধাতা তোমাকে যদিও রমণী করিয়াছেন, রমণী-হৃদয় দিতে সম্পূর্ণ ভুল করিয়াছেন; আচ্ছ, তুমিই মনে কর, তুমি যেন রেবতী—”
    [বাধা দিয়া] “বল – বল—দেবেন, তোমার মুখে ফুলচন্দন পড়ুক; তোমার মুখে এ কথা শুনে আমার হৃদয়ে আনন্দ ধরছে না।”
    দেবেন্দ্রবিজয় বলিতে লাগিলেন, “তুমি যেন রেবতী, তোমার স্বামী তোমাকে অতিশয় ভালবাসেন, তুমি যেন কোন দুর্ঘটনায় ওখানে ঐরূপ মৃতপ্রায় পড়িয়া আছ, এমন সময়ে অন্য একটী স্ত্রীলোক তোমার এইরূপ অবস্থায় তোমার স্বামীর নিকটে এইরূপ একটা জঘন্ত অভিপ্রায় প্রকাশ করছে; অথচ তোমার সম্মুখে এখন বা যা ঘটছে, তুমি যেন তা মনে মনে জানতে পারছ; তুমি কি তখন তোমার জীবন-রক্ষার্থে তোমার স্বামীকে সেই রমণীর হাতে সমর্পণ করতে সন্মত হ’তে পার? পার কি জুমেলা?”
    “অ্যাঁ, – না—ন!—না—না! কখনই না! সহস্রবার না!”
    “তবে জুমেলা, তুমি কি তোমার প্রশ্নের উত্তর নিজে, নিজেরই মুখে পাচ্ছ না? যার প্রাণের পরিবৰ্ত্তে আমাকে তুমি চাও, সে আমাকে ছাড়িয়। তার প্রাণ চাহে না; আর আমার স্ত্রীকে যদি আমি যথার্থ হাঁ ভালবাসি, তবে তার অনভিপ্রেত কাজে আমার হস্তক্ষেপ কর ঠিক হয় না।”
    “তবে কি আমার কথার উত্তর না’? তুমি জান, তা’ হ’লে তুমিই তোমার সেই স্ত্রীরই হন্তারক হবে?”
    “তথাপি তুমি আমার মত কিছুতেই ফিরাতে পারবে না, জুমেলা।”
    “তবে তুমি আমাকে ঘৃণা কর?”
    “হাঁ, ভাল রকমে।”
    “তবে ভাল রকমে রেবতী ও মরিবে?”
    ‘মরে —মরিবে।”
    “নিশ্চয় মরিবে।”
    “তেমনি নিশ্চয়, সে একা মরিবে না।”
    “হোঃ—হোঃ—হোঃ [হাস্য] তুমি আমায় বড় ভয় দেখাচ্ছ!”
    “হাঁ।”
    জুমেলিয়া আবার হাসিল।
    সেই অমঙ্গলজনক—পৈশাচিক তীব্র অট্টহাস্য—নির্জ্জলদগগনবক্ষের গম্ভীরবজধ্বনিবৎ। জুমেলিয়া বলিল, “তোমাকে আমি ভয় করি না–করিতে শিখিও নাই।”
    দেবেন্দ্র। যদি না শিখিয়া থাক, আজ শিখিবে।
    জুমেলিয়া। কেন?
    দে। না শিখিলে আমার কাজ সফল হইবে কি প্রকারে?
    জু। তোমার কাজ?
    দে। হাঁ।
    জু। কি কাজ?
    দে। তুমি যে কাজ করিতে আমাকে বলিয়াছ।
    জু। আমি তোমায় কি কাজ করিতে বলিয়াছি – বল, তোমার কথা বুঝতে পারছি না।
    দে। তুমি তোমার জন্য পূৰ্ব্বে যে যে যন্ত্রণার উল্লেখ করেছ, সেই সকল যন্ত্রণাই তোমাকে আমি ভোগ করাইব। আমি যে মানুষ, এ কথা আমি এখন যতদুর ভুলে যেতে পারি, ভুলিব; তোমার উপযুক্ত— তোমারই মত হ’তে—পিশাচ হ’তে চেষ্টা করিব। আমি এখন একএকটি ক’রে তোমার মস্তকের সকল কেশ—যতক্ষণ না, তোমারই ওই ষড়যন্ত্রপূর্ণ মস্তক কেশলেশহীন হয়—ততক্ষণ মূলোৎপাটিত করব। তার পর আমার এই ছুরি পুড়িয়ে লাল করব, সেখান তোমার কপালে চেপে ধরব—দুই গালে চেপে ধরব—তা দিয়ে তোমার চক্ষু দুটা উৎপাটিত করব।
    জুমেলিয়া হাসিতে গেল—পারিল না।
    দেবেন্দ্রবিজয় পূৰ্ব্ববৎ বলিতে লাগিলেন, “পাছে তুমি নিজের জীবন নিজে বাহির কর, পাছে যদি তোমার কাছে কোন প্রকার বিষা থাকে, আগে তা কেড়ে নেব, তার পর তোমাকে সেই মুণ্ডিতমস্তক, ঝলসিত মুখ অবস্থা না ঘটে, ততক্ষণ তোমার কোন স্বাভাবিক অবস্থা না ঘটে, ততক্ষণ পথে পথে অনাহারে ঘুরিবে।”
    জু। [সচীৎকারে] তুমি! তুমি এই সকল করবে?
    দে। হাঁ, আমিই সব করব।
    জু। [ সচীৎকারে ] তুমি! তমি এই সকল করবে?
    জু। তুমি! দেবেন্দ্রবিজয়!
    দে। আঃ, ভুলে যাও কেন, জুমেলা, আমি কেন? দেবেন্দ্রবিজয় মরে গেছে, তার দেহে এক পিশাচের অধিষ্ঠান হয়েছে; সেই পিশাচ, যতক্ষণ না তুমি মর, ততক্ষণ তোমাকে নূতন নূতন যন্ত্রণা দেবে; যখন একটু সুস্থ হবে, আবার নূতন যন্ত্রণা।
    জু। [ সরোষে ] নিৰ্ব্বোধ! তুমি কি মনে করেছ, আমি এই সকল যন্ত্রণা সহ করবার জন্য তোমার কাছে ঠিক এমনি ভালমানুষটির মত চুপ্‌ ক’রে দাঁড়িয়ে থাকব?
    দে। কি করবে, মরবে? পারবে না। যদি তুমি আত্মহত্যা করবার জন্য কোন বিষ বাহির করিতে যাও, পিস্তলের গুলিতে তোমার হাত চুর্ণ-বিচূর্ণ ক’রে দিব; যদি পালাবার জন্য এক পা নড়বে, এখনই এই গুলিতে তোমার পা ভেঙ্গে দিব।
    জুমেলিয়া তিরস্কারব্যঞ্জক কৰ্কশ হাসি হাসিতে লাগিল।
    দেবেন্দ্রবিজয় বজ্রনাদে বলিলেন, “জুমেলা, হাসি নয়—আমি মিথ্য বলি না—শীঘ্র প্রমাণ পাবে।”
    “প্রমাণ দেখাও।”
    “দেখিবে? তোমার কাণে যে ঐ দুটা দুল আছে, ঐ দুটীর মধ্যেও তুমি কৌশলে বিষ সঞ্চয় ক’রে রেখেছ; তোমার ঐ ফুল দুটির অস্বাভাবিক গড়ন দেখেই তা বুঝতে পারছি—ও দুটি এখনই দূর করাই ভাল।”
    বাক্য সমাপ্ত হইতে-না-হইতে দেবেন্দ্রবিজয় উপর্য্যুপরি দুইবার পিস্তলের শব্দ করিলেন, জুমেলিয়ার কর্ণাভরণ দুটা পিস্তলের গুলিতে ভাঙ্গিয়া দুরে গিয়া পড়িল, এবং ঘরটি কিয়ৎকালের নিমিত্ত ধূম্রময় হইয়া উঠিল। ইত্যবসরে দেবেন্দ্রবিজয় পিস্তলটা লুকাইয়া ফেলিলেন।
    জুমেলিয়া সভয় চাৎকারে দশ পদ পশ্চাতে হটিয়া গিয়া এক কোণে দাঁড়াইল। যেমন সে হস্তোত্তোলন করিতে যাইবে, দেবেন্দ্রবিজয় কহিলেন, “সাবধান, হাত তুলিয়ে না; এখনি আমি পিস্তলের গুলিতে তোমার হাত ভাঙিয়া দিব। জুমেলা, এ হাস্যোদীপক প্রহসন নয়, পৈশাচিক ঘটনাপূর্ণ বিয়োগান্ত নাটক।”

    চতুর্থ পরিচ্ছেদ
    ধরা পড়িল

    দুবার উপর্যুপরি পিস্তলের শব্দ করিয়া দেবেন্দ্রবিজয় বুঝিতে পারিলেন, তখনই শচীন্দ্র তথায় উপস্থিত হইবে। পাঠক অবগত আছেন, দুইবার পিস্তলের শব্দ তাঁহীদের একটা নির্দিষ্ট সঙ্কেতমাত্র। শচীন্দ্র তখনই অতি নিঃশব্দে আসিয়া জুমেলিয়ার পশ্চাদ্ভাগে দাঁড়াইল। দেবেন্দ্রবিজয় তাহাকে দেখিতে পাইলেন; জুমেলিয়া কিছুই জানিতে পারিল না। এখন আর শচীন্দ্রের সে ভিক্ষুকের বেশ নাই, ইতোমধ্যে তৎপরিবর্তে পুলিশের ইউনিফর্ম ধারণ করিয়াছিল।
    দেবেন্দ্রবিজয় কহিলেন, “জুমেলা, তুমি একদিন বলেছিলে না যে, মৃত্যুর পরেও তুমি আমার অনুসরণ করবে? যদি আমি মরিতাম, আমিও তোমার পিছু নিতাম; ভূতের মত অলক্ষ্যে তোমারও পশ্চাতে দাঁড়াতেম; তুমি কিছুই জানতে পারতে না; তার পর তোমার হাত দুটা পিছু-মোড়া করে ধরতেম, তোমার আর নড় বার শক্তি থাকত না—বুঝতে পেরেছ?
    জু। না।
    দে। এইবার?
    তখন শচীন্দ্র জুমেলিয়ার হাত দুখান পিছু-মোড়া করিয়া ধরিল। জুমেলিয়া জোর করিতে লাগিল; চীৎকার করিয়া উঠিল, কিছুতেই শচীন্দ্রের হাত হইতে মুক্তি পাইল না।
    জুমেলিয়ার সহিত দেবেন্দ্রবিজয়ের উপযুক্তি কথোপকথনের যে কথাগুলি নিম্নে কৃষ্ণরেখা দ্বারা চিহ্নিত করা হইল, দেবেন্দ্রবিজয় জুমেলিয়াকে না বলিয়া প্রকারান্তরে শচীন্দ্রকেই বলিতেছিলেন। শচীন্দ্র আদেশ পালন করিল।
    দেবেন্দ্রবিজয় কহিলেন, “জুমেলিয়া, এইবার তুমি অসহায়— পলায়নের কোন উপায় নাই; এইবার আমি তোমার হাতে হাতকড়ী, পায়ে বেড়ী দিব; তার পর তোমারি মন্ত্রণা মত সেই সব যন্ত্রণা তোমাকেই দেওয়া হবে।”

    তখনই জুমেলিয়াকে হাতকড়ী ও বেড়ী পরাইয়া দেওয়া হইল। তাহার পর দেবেন্দ্রবিজয় তাহাকে একখানি চেয়ারে বসাইয়া চেয়ারের সহিত লৌহশৃঙ্খলে তাহাকে বন্ধন করিলেন। তখন জুমেলিয়া শচীন্দ্রকে দেখিতে পাইল—এতক্ষণ দেখিতে পায় নাই; বলিল, “পোড়ারমুখ আমার। কই, আমি ত আগে কিছুই জানতে পারি নাই।”
    শচীন্দ্র বলিল, “যাকে তুমি পাহারা দিতে বাগানে রেখেছিলে, তাকে যদি না হাত মুখ বেঁধে গাছতলায় আমি ফেলে রেখে আসতেম— জানতে পারতে, আমি এসেছি। জুমেলিয়া, এখন আমাদের দয়ার উপর তোমার পাপপ্রাণ নির্ভর করছে।”
    দেবেন্দ্রবিজয় বলিলেন, “হাঁ—জুমেলা, যাকে ভালবাস, এখন তারই দয়ার উপর তোমার জীবন নির্ভর করছে।”
    জুমেলিয়া। তবে দেবেন, তুমি তবে আমার সঙ্গে সন্ধি করতে চাও না?
    দেবেন্দ্র | সন্ধি? না—কেন করিব?
    জু। তুমি রেবতীকে রক্ষা করিবে না?
    দে। যদি পারি—করিব।
    জু। তবে কেন তুমি তাতে সাধ করিয়া ব্যাঘাত ঘটাইতেছ?
    দে। কি প্রকারে?
    জু। আমার সহিত সন্ধির কোন বন্দোবস্ত না করিয়া।
    দে। তুমি ত বলেছ, তাকে পরিত্রাণ দেবে না।
    জু। তখন আমি তোমার হাতে পড়ি নাই।
    দে। এ কথা নিশ্চয়—আমি ভুলে গেছ লেম; যাতে তার জ্ঞান হয়, এখন সে ঔষধ আমার হাতে দেবে কি?
    জু। দিতে পারি, যদি তুমি আমাকে ছেড়ে দাও—আমাকে এখান থেকে পালাবার জন্য আটচল্লিশ ঘণ্টা মাত্র সময় দাও—হাঁ, তাহা হইলে আমি দিতে পারি। .
    দে। সে আশা বৃথা।
    জু। তবে তুমি তোমার স্ত্রীর জীবন রক্ষা করতে অসম্মত?
    দে। সে যে রক্ষা পাবে না, এ বিশ্বাস আমার নাই। এবারে তোমার যন্ত্রণা আরম্ভ হবে। [ শচীন্দ্রের প্রতি ] শচী! এখনই এই ছুরি দিয়া জুমেলিয়ার চোখ দুটা উৎপাটন করিয়া ফেল।
    জু। [ সচীৎকারে ] বাঁচাও! দয়া কর!
    দে। কিসের দয়া?
    জু। আমি রেবতীকে বাঁচাতে পারি—বাঁচাব।
    দে। বাঁচাও তবে—তাকে।
    জু। ছেড়ে দাও আমায়।
    দে। সে আশা ক’রো না।
    জু। তুমি কি এখন আমার সে প্রস্তাবে সম্মত হবে?
    দে। আমি কিছুতেই সম্মত নই।
    জু। তবে আমি কখনই তাকে বাঁচাব ন—মরুক সে—চুলোয় যাক সে!
    দে। জুমেলা, বাঁচাও তাকে; সে যদি আমাকে তোমার ছেড়ে দিতে বলে, নিশ্চয় তোমাকে আমি মুক্তি দিব; মনে বুঝে দেখ, তোমার ভবিষ্যৎ তার হাতে।
    জু। রেবতীর? ভাল, যদি সে স্বীকার করে, তুমি আমাকে ছেড়ে দেবে? আমি এখনই তাকে বাঁচাব। ছেড়ে দাও আমায়; আমি মিথ্যা বলি না।
    দে। না।
    জু। তবে কি ক’রে তাকে বাঁচাতে পারি?
    দে। কি করলে তার জ্ঞান হবে, আমাকে ব’লে দাও—আমিই সে কাজগুলি করব—তুমি না। যদি তাতে তার জ্ঞান না হয়, তোমার সেই নিজের স্থিরীকৃত যন্ত্রণাগুলি তোমাকেই উপভোগ করতে হবে।
    জু। সে যদি বাঁচে, তা’ হ’লে তুমি আমাকে ছেড়ে দেবে?
    দে। যদি রেবতী স্বীকার পায়।
    জু। যে ঘরে তোমাকে আগে নিয়ে যাই, সেই ঘরে টেবিলের ভিতরে একটি ছোট কাঠের বাক্স আছে, নিয়ে এস—যেমন আছে, তেমনই নিয়ে আসবে; সাবধান, যেন খুলিয়ো না।
    তখনই দেবেন্দ্রবিজয় সেই বায়ু লইয়া আসিলেন।
    জু। ঐ বাক্সের ভিতর থেকে সতের নম্বরের শিশিট বাহির কর, পাঁচ ফোঁটা ঔষধ রেবতীকে খেতে দাও।
    দে। কোন ঔষধে তুমি রেবতীকে এখন অজ্ঞান ক’রে রেখেছ—কত নম্বর?
    জু। এ কথা জিজ্ঞাসা করছ কেন?
    দে। প্রয়োজন আছে।
    জু। নম্বর সাত।
    দে। বেশ, যদি এই সতের নম্বরের ঔষধে কিছু ফল না হয়, তোমাকে সাত নম্বরের ঔষধ জোর করিয়া খাওয়াইব।
    জু। ফল হবে।

    দেবেন্দ্রবিজয় ধীরে ধীরে রেবতীর অবসন্ন, তুষারশীতল মস্তক নিজের ক্রোড়ে গ্রহণ করিলেন। তখন তাঁহার মনে যে যন্ত্রণা হইতেছিল, তিনি তেমন যন্ত্রণা ইতিপূৰ্ব্বে কখনও ভোগ করেন নাই। তাঁহার সেই প্রাণের যন্ত্রণার কোন চিহ্ন মুখমণ্ডলে প্রকটিত হইল না। তাহার পর তিনি রেবতীর মুখ-বিবরে বিন্দু বিন্দু করিয়া সেই শিশিমধ্যস্থিত গাঢ় লোহিত বর্ণের তরল ঔষধ ঢালিতে লাগিলেন।
    মুহূর্তের পর মুহূৰ্ত্ত কাটিতে লাগিল, গৃহ নিস্তব্ধ—কোন শব্দ নাই।
    তাহার পর যখন প্রায় একদণ্ড উত্তীর্ণ হইয়া গেল, সহসা রেবতী চক্ষুরুন্মীলন করিলেন—নিতান্ত বিস্মিতের ন্যায় প্রকোষ্ঠের চতুর্দিকে চাহিতে লাগিলেন।

    পঞ্চম পরিচ্ছেদ
    একি ইন্দজাল!

    চক্ষুরুন্মীলন করিয়া রেবতী যাহা দেখিলেন, তাহাতে তাঁহার বিস্ময়ের সীমা রহিল না।
    জুমেলিয়া রেবতীকে ক্লোরোফৰ্ম্ম করিয়া এখানে লইয়া আসে; সে ঘোর কাটিতে-না-কাটিতে সে আবার নিজের অমোঘ ঔষধ প্রয়োগ করে, তাহাতে রেবতী সেই অবধি সম্পূর্ণরূপে সংজ্ঞাহীন। প্রথমে তিনি দেখিলেন, তিনি যে কক্ষে শায়িত আছেন—সে কক্ষ তাহার অপরিচিত—তাহার সম্মুখে দেবেন্দ্রবিজয় দণ্ডায়মান—দেবেন্দ্রবিজয়ের পার্শ্বে ম্লানমুখে শচীন্দ্র এবং কিছুদূরে হাতে হাতকড়া, পায়ে বেড়ী দেওয়া লোহশূঙ্খলে আবদ্ধ জুমেলিয়া একখানি চেয়ারে বিনতমস্তকে বসিয়া।
    দেবেন্দ্রবিজয় রেবতীকে জিজ্ঞাসা করিলেন, “কেমন আছ?”
    রেবতী! ভাল আছি।
    দেবেন্দ্র। উঠিতে পরিবে কি?
    রে। পারিব। [ দণ্ডায়মান ]
    দে। চলিতে পারিবে?
    রে। হাঁ, কেবল মাথাটা একটু ভারি বোধ হচ্ছে।

    তাহার পর দেবেন্দ্রবিজয় দুই-একটি কথাতে অতি সংক্ষেপে এ পর্য্যন্ত যাহা যাহা ঘটিয়াছে, সকলই রেবতীকে বলিলেন; কেবল জুমেলিয়ার সেই অবৈধ প্রেম-প্রস্তাব সম্বন্ধে কোন কথার উল্লেখ করিলেন না; তজ্জন্য ডাকিনী জুমেলিয়া বারেক সন্তুষ্টনেত্রে দেবেন্দ্রবিজয়ের মুখপ্রতি দৃষ্টিপাত করিল।
    দেবেন্দ্রবিজয় রেবতীকে বলিলেন, “এখন তোমার হাতে জুমেলার ভবিষ্যতের ভালমন্দ নির্ভর করছে; আমি জুমেলার নিকট প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়েছি, তোমার কথামত আমি কাজ করব; তুমি উহাকে মুক্তি দিতে চাও—দিব, না চাও–না দিব, যা তোমার ইচ্ছা। স্বীকার করি, জুমেলাই তোমাকে মৃত্যুমুখ থেকে ত্রাণ করেছে; কিন্তু সেই জুমেলাই তোমাকে মৃত্যুমুথে তুলে দিয়েছিল; এখন আমি এখান হ’তে বাহিরে যাচ্ছি—এখন এখানে থাকা আমার আবশ্যক করে না; আমার সাক্ষাতে জুমেলা তোমার নিকটে কোন প্রার্থনা জানাতে লজ্জিত হবে; তুমিও কিছুই ভালরূপে মীমাংসা ক’রে উঠতে পারবে না; তবে বাহিরে যাবার আগে তোমাকে একটি কথা ব’লে রাখা প্রয়োজন। সাবধান, তুমি জুমেলিয়াকে স্পর্শ করিয়ো না!—এমন কি নিকটেও যাইয়ো না।”
    দেবেন্দ্রবিজয় শচীন্দ্রকে সঙ্গে লইয়া, তথা হইতে বহির্গত হইয়া বাহির হইতে কবাটে শিকল দিলেন। দেবেন্দ্রবিজয় ও শচীন্দ্র বাহিরে অপেক্ষায় রহিলেন।
    পনের মিনিট অতিবাহিত হইল, কোন সংবাদ নাই।

    আর দশ মিনিট কাটিল – তথাপি কোন সাড়াশব্দ নাই, একটিমাত্র ভিত্তি ব্যবধানে তাহারা দণ্ডায়মান; কোন শব্দ নাই। তখন দেবেন্দ্রবিজয় অস্থির হইতে লাগিলেন। বাহির হইতে উচ্চৈঃস্বরে বলিলেন, “অরি আমি পাঁচ মিনিট অপেক্ষা করিব, যা হয়, ঠিক করিয়া লও।” দেবেন্দ্রবিজয় পকেট হইতে ঘড়ী বাহির করিয়া দেখিতে লাগিলেন। সেইরূপ নিঃশব্দে আরও পাঁচ মিনিট কাটিল।
    দেবেন্দ্রবিজয় তখন সশব্দে সেই কক্ষদ্বার উদঘাটন করিলেন। যাহা দেখিলেন, তাহাতে তাঁহাকে স্তম্ভিত হইতে হইল, তাঁহার মাথা ঘুরিয়া গেল, মুখ দিয়া কথা বাহির হইতে অনেক বিলম্ব হইল।

    যে গৃহমধ্যে তিনি এই কতক্ষণ হস্তপদবদ্ধ জুমেলিয়া এবং রেবতীকে রাখিয়া বাহিরে গিয়াছিলেন, সে কক্ষ শূন্য পড়িয়া আছে।
    রেবতী নাই।
    জুমেলিয়া নাই।
    তাহাদের কোন চিহ্নও নাই।
    পাছে ভ্রম হইয়া থাকে, এই সন্দেহে নিদারুণোদ্বেগে দেবেন্দ্রবিজয় উভয় হস্তে উভয় নেত্ৰ মৰ্দ্দন করিতে লাগিলেন। একি স্বপ্ন! জুমেলিয়াকে যে চেয়ারে বন্ধন করা হইয়াছিল, সেই চেয়ারের নিকটে অগ্রসর হইলেন; দেখিলেন, যে শৃঙ্খলে জুমেলিয়া আবদ্ধ ছিল, সেটা চেয়ারের নীচে পড়িয়া রহিয়াছে; হাতকড়ী ও বেড়ী ও সেখানে আছে; তাহা অন্য চাবি দিয়া খুলিয়া ফেলা হইয়াছে í
    চেয়ারখানার উপরে এক টুকরা কাগজ পড়িয়া রহিয়াছে, তাহাতে লেখা ছিল;– .
    “কেমন মজা; বাহবা কি বাহব্বা-আবার যে-কে সেই! তুমি বোকারাম গোয়েন্দা। আমি আবার স্বাধীন—রেবতী আবার আমার হাতে পার-ক্ষমতা থাকে তাকে উদ্ধার করিয়ো।
    সেই
    জুমেলা।”
    দেবেন্দ্রবিজয় কহিলেন, “কিরূপে পলাইল? জুমেলা বাঁধা ছিল। কেবল বাঁধা নয়—তার সম্মুখে রেবতীও ছিল। একি ব্যাপার, শচী? শচী, তুমি যে লোকটাকে বাহিরে বেঁধে রেখে এসেছ, সে ত কোন রকমে এদিকে আসতে পারে নাই?”
    শচীন্দ্র সেই সন্ধান লইবার জন্য তখনই যেমন লাফাইয়া গৃহ হইতে বাহির হইতে যাইবেন, অমনি আগুনের একটা সুতীব্র ঝটকা আসিয়া তাহাকে তথায় ফেলিয়া দিল। সেই সঙ্গেই ‘ধ্রূম’ করিয়া একটা পিস্তলের শব্দ হইল। মৃতবৎ শচীন্দ্র দেবেন্দ্রবিজয়ের পদপার্শ্বে পতিত হইল। এখন দেবেন্দ্রবিজয় কি করিবেন? এ মুহূৰ্ত্ত চিন্তার নহে—কার্য্যের। তখনই পিস্তল বাহির করিলেন, যেদিক্ হইতে আগুনের ঝটুক আসিয়াছিল, সেইদিক্‌ লক্ষ্য করিয়া পিস্তল দাগিলেন। তখনই কোন একটা ভারযুক্ত দ্রব্যের পতন শব্দ এবং মানুষের গেঙানি শুনা গেল—তবে পিস্তলের গুলিটা ব্যর্থ যায় নাই।
    তখন দেবেন্দ্রবিজয় দ্বারদেশে নিপতিত শচীন্দ্রকে উল্লঙ্ঘন করিয়া কক্ষের বাহিরে আসিলেন; যেদিক্ হইতে গেঙানি শব্দ আসিতেছিল সেইদিকে দুই-চারিপদ যাইয়াই দেখিতে পাইলেন, একটা লোক মৃতবৎ পড়িয়া রহিয়াছে; বুঝিলেন, তখনও লোকটা মরে নাই।
    দেবেন্দ্রবিজয় নীরবে অপেক্ষা করিতে লাগিলেন।

    ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ
    শেষ উদ্যম

    যখন দেবেন্দ্রবিজয় দেখিলেন, লোকটা পূৰ্ব্বাপেক্ষ অনেকটা প্রকৃতিস্থ হইয়াছে; জিজ্ঞাসিলেন, “কি হে ভদ্রলোক! আমি এখন তোমাকে যা’ যা’ জিজ্ঞাসা করব, ঠিক ঠিক তার উত্তর দেবে কি? যদি না আমার হাত থেকে সহজে নিস্তার পাবে না—তোমার জিহ্বাটা টেনে ছিড়ে ফেলে দিব।”
    সেই লোকটা ভয়ে ভয়ে বলিল, “আপনি আমাকে কি জিজ্ঞাসা করতে চান?”
    দেবেন্দ্র। জুমেলা কি প্রকারে মুক্তি পাইল?
    লোক। আমি তাকে মুক্তি দিয়েছি।
    দে। সেখানে আর একটা যে স্ত্রীলোক ছিল, সে কিছু বলে নাই?
    লো। আমি আগেই তাকে তার অলক্ষ্যে ক্লোরফৰ্ম্ম ক’রে গাড়ীতে তুলে দিয়ে আসি।
    দে! গাড়ী! কোথাকার গাড়ী?
    লো। পুৰ্ব্বদিক্কার পথের ধারে আগে একখানা গাড়ী এনে ঠিক করে রেখেছিলেম।
    দে। কার আদেশে?
    লো। জুমেলিয়ার।
    দে! কি জন্য গাড়ী এনে রেখেছিলে?
    লো। জুমেলিয়ার মুখে শুনলেম, তার সঙ্গে আপনি কোথা যাবেন বলেছিলেন।
    দে। সে গাড়ীতে আর কে আছে?
    লো। গিরিধারী নামে আমারই একজন বন্ধু—আমার সেই বন্ধুকেই আপনার সঙ্গী লোকটা নীচে বেঁধে ফেলে রেখেছিল; আমি গিয়ে তাকে উদ্ধার করি; তার পর আপনাদের এখানকার ব্যাপার চুপিসারে এসে দেখি; সুবিধাক্রমে কাজ শেষ করি—তারা এখন সব চ’লে গেছে।
    দে। তুমি গেলে না কেন? তুমি যে বড় থেকে গেলে?
    লো। আপনাকে খুন করবার জন্য।
    দে। আমাকে খুন করিয়া তোমার লাভ?
    লো। জুমেলিয়ার লাভ।
    দে। তা’তে তোমার কি?
    লো। জুমেলিয়ার লাভে আমার লাভ।
    দে। গাড়ীখানা কোথায় গেল?
    লো। দমদমার দিকে।
    দে। দমদমার কোথায়—কোন ঠিকানায়?
    লো। ঠিকানা ঠিক জানি না—তবে বেলগাছি ছাড়িয়ে যেতে হবে।
    দে। বেলগাছি ছাড়িয়ে কত দূর যেতে হবে?
    লো। শুনেছি, বেশি দূর না—দু-চারখানা বাগানের পরেই একটা গেটওয়ালা বাগান আছে, সেই বাগানের ভিতরে।
    দে। ও বুঝেছি! হরেকরামের বাগান বুঝি?
    লো। হাঁ—হাঁ—ঠিক ঠাওরেছেন।
    দে। যদি তা’ না হয়—যদি মিথ্যা ব’লে থাক—তোমায় আমি—
    বাধা দিয়া আহত ব্যক্তি বলিল, “আমি মিথ্যাকথা বলি নাই।”
    দেবেন্দ্রবিজয় জিজ্ঞাসিলেন, “জুমেলিয়ার সঙ্গে তোমার আর তোমার বন্ধুর কতদিন পরিচয় হয়েছে?”
    “এক সপ্তাহ হ’বে।”
    “সে বাগানে আর কেউ আছে?”
    “একজন দরওয়ান—তার নাম পাহাড় সিং।”
    “জুমেলা আর তোমার বন্ধু গিরিধারী কতক্ষণ গেছে?”
    “আমি যখন আপনার সঙ্গীকে গুলি করি, তার একটু আগে।”
    “আমাকে খুন করতে তুমি থেকে যাও, কেমন? আমাকে খুন, করবার কারণ কি? জুমেলিয়ার লাভ কি রকম?”
    “জুমেলা যাবার সময় ব’লে গেছে, আপনাকে খুন করলে সে আমাকে বিবাহ করবে।”
    “তুমি কি তাকে বিশ্বাস কর?”
    “আগে করেছিলাম বটে।”
    শচীন্দ্রের ক্রমে জ্ঞান হইতে লাগিল; অল্পক্ষণ পরে উঠিয়া বসিল। দেবেন্দ্রবিজয় জিজ্ঞাসিলেন, ‘শচী, চলিতে পারিবে?”
    শ। পারিব।
    দে। জুমেলা এখন কোথায় যাইবে আমি জেনেছি – আমি এখনই তার সন্ধানে চললেম; তুমি এখন এখানে থাক—যতক্ষণ না আমি ফিরে আসি, ততক্ষণ তুমি এইখানেই থাক; সুবিধামত কোন পাহারাওয়ালাকে রাস্তায় পেলে তোমার সাহায্যার্থ তাকে এখানে পাঠিয়ে দিব।
    দেবেন্দ্রবিজয় এই বলিয়া ক্ষিপ্ৰপদে তথা হইতে প্রস্থান করিলেন।

    অতি অল্পক্ষণে তিনি ছুটিয়া আসিয়া জগুবাবুর বাজারের পথে পড়িলেন, তথায় দুই-একখানি ভাড়াটিয়া গাড়ী তখনও আরোহীর অপেক্ষায় ছিল। দেবেন্দ্রবিজয় লাফাইয়া একখানি- গাড়ীর কোচ বক্সে গিয়া উঠিলেন; ঘোড়ার লাগাম ও চাবুক স্বহস্তে গ্রহণ করিয়া গাড়ী জোরে হাঁকাইয়া দিলেন। গাড়োয়ান তাহার সেই অদৃষ্টপুৰ্ব্ব কাৰ্য্যকলাপ দেখিয়া অবাক হইয়া রহিল; দেবেন্দ্রবিজয়কে পাগল অনুমানে শঙ্কিত হইল।
    দেবেন্দ্রবিজয় তাহাকে বলিল, “গাড়ী দমদমায় যাবে, বিশেষ দরকার। বাধা দিয়ো না; বাধা দাও—গাড়ী থেকে ফেলে দিব; চুপ ক’রে বসে থাক; যদি দশ টাকা ভাড়া পেতে চাও- কোন কথাটি ক’রো না, চুপ্‌ ক’রে বসে থাক।”
    গাড়োয়ান অদৃষ্টের উপর নির্ভর করিয়া চুপ্‌ করিয়া বসিয়া রহিল। সে দুইদিনে কখন দশ টাকা রোজগার করিতে পারে নাই, এক রাত্রেই দশ টাকা পাইবে শুনিয়া মনে মনে অত্যন্ত আহ্লাদিত হইল।
    গাড়ী নক্ষত্ৰবেগে ছুটতে লাগিল।

    সপ্তম পরিচ্ছেদ
    উদ্যমের শেষ

    দেখিতে দেখিতে গাড়ীখানা শ্যামবাজার অতিক্রম করিয়া অতি অল্প সময়ের মধ্যে দমদমায় আসিয়া পড়িল। এখনও সেইরূপ তীরবেগে গাড়ী ছুটিতেছে।
    যখন সেই গাড়ী হরেক্‌রামের বাগানের নিকটবৰ্ত্তী হইয়াছে, তখন গাড়ীখানার সম্মুখের একখানি চাকা খুলিয়া গেল-গাড়ী দাঁড়াইল। দেবেন্দ্রবিজয় কি এখন চুপ করিয়া থাকিতে পারেন—লাফাইয়া ভূতলে পড়িলেন; নিৰ্ব্বাক্ গাড়োয়ানের হাতে একখানা দশ টাকার নোট ফেলিয়া দিয়া রুদ্ধশ্বাসে ছুটলেন।
    দেবেন্দ্রবিজয় মরুদ্বেগে ছুটিতে লাগিলেন—ক্ষণকালের মধ্যে হরেক্রামের উদ্যান-সম্মুখে আসিয়া উপস্থিত হইলেন। উদ্যানের মধ্যে আসিয়া পশ্চিমাভিমুখে চলিলেন, কিয়দর গমন করিয়া একটা দ্বিতল অট্টালিকা দেখিতে পাইলেন, তন্মধ্যে প্রবিষ্ট হইয়া বামপার্শ্বস্থ সোপানীতিক্রম করিয়া উপরে উঠিলেন। বারান্দার বসিয়া পরম নিশ্চিন্তমনে পাহাড় সিং তাম্রকুটধর্ম পান করিতেছিল—দেবেন্দ্রবিজয় নিঃশব্দে তাহার পশ্চাদ্ভাগে দাঁড়াইলেন। পাহাড় সিং হুঁকার যেমন একট লম্বা টান দিতে আরম্ভ করিয়াছে, দেবেন্দ্রবিজয় উভয় হস্তে তাহার গলদেশ টিপিয়া ধরিলেন। সুখটানে বাধা পড়িল—হু কার কলিকা ফেলিয়া পাহাড় সিং গোঁ গোঁ করিতে লাগিল—ক্রমে অজ্ঞান হইয়া পড়িল, চক্ষু উল্টাইয়া গেল। তখন দেবেন্দ্রবিজয় তাহার গলদেশ ছাড়িয়া দিলেন, তাহারই পরিহিত বস্ত্রে তাহার হস্তপদ বন্ধন করিলেন ও মুখবিবরে খানিকটা কাপড় প্রবেশ করাইয়া মুখ বন্ধ করিয়া দিলেন; তাহার পর দ্রুতপদে নিম্নে অবতরণ করিলেন।

    অষ্টম পরিচ্ছেদ
    শেষ

    বৈঠকখানা গৃহে দেবেন্দ্রবিজয় প্রবিষ্ট হইলেন, তথার কেহ নাই। একপার্শ্বে একটা অৰ্দ্ধমলিন শয্যা ছিল, তাহার উপরে ক্লান্তভাবে বসিয়া পড়িলেন। অনেকক্ষণ পরে উদ্যানের বাহিরে একটা সচল গাড়ীর ঘর্ঘর ধ্বনি উঠিল। দেবেন্দ্রবিজয় গবাক্ষ দিয়া জ্যোৎস্নালোকে দেখিলেন, একখানি গাড়ী ফটক দিয়া উদ্যান-মধ্যে আসিল; বুঝিতে পারিলেন, তন্মধ্যে জুমেলিয়া ও তাহার পত্নী আছে, উপরে যে ব্যক্তি বসিয়াছিল, সে সেই গিরিধারী সামন্ত।
    গাড়ীখান ক্রমে অট্টালিকার দ্বারসমীপ্লাগত হইয়া দাঁড়াইল—লাফাইয়া গিরিধারী সামন্ত অগ্ৰে ভূতলে অবতরণ করিল।
    “পাহাড় সিং! পাহাড় সিং!” জুমেলা চীৎকার করিয়া ডাকিল। পাহাড় সিং উত্তর করিল না। কে উত্তর দিবে?
    গিরিধারী সামন্ত বলিলেন, “মরুক্‌ ব্যাটা—হতভাগা পাজী! গেল কোথায়?”
    জুমেলিয়া বলিল, “হয় ত ব্যাট সিদ্ধি গাঁজা খেয়ে, বেহুস হয়ে পড়ে আছে—মরুক সে! গিরিধারী, তুমি আমার ভগিনীকে তুলে নিয়ে যাও।”
    “ভগিনী! জুমেলিয়ার?” মৃদুগুঞ্জনে ডিটেক্‌টিভ আপনা-আপনি বলিলেন–তাঁহার আপাদমস্তক বিকম্পিত হইল।
    গিরিধারী জিজ্ঞাসিল, “ম’রে গেছে না কি?”
    ঈষদ্ধান্তে জুমেলিয়া বলিল, “মরেছে? না—এখনও মরে নি; যাও ইহাকে তুলে নিয়ে যাও।”
    গিরি। কোথায় নিয়ে রাখব?
    জু। বৈঠকখানা ঘরে।
    বৈঠকখানার ভিতরে দেবেন্দ্রবিজয় তাহাদের অপেক্ষায় ছিলেন। গিরিধারী সেই কক্ষেই আসিবে জানিয়া, দ্বারপার্শ্বে লুক্কায়িত রছিলেন। তখনই সংজ্ঞাহীন রেবতীকে লইয়া গিরিধারী তথায় প্রবিষ্ট হইল। তথায় আলো না থাকায় সে দেবেন্দ্রবিজয়কে দেখিতে পাইল না। পশ্চিমপার্শ্বস্থিত অৰ্দ্ধোন্মুক্তবাতায়নপ্রবিষ্ট জ্যোৎস্নালোকে ঘরটি অস্পষ্টভাবে আলোকিত; তৎসাহায্যেই গিরিধারী শয্যাটী দেখিতে পাইল, তদুপরি রেবতীকে রাখিয়া বহির্গমনোদ্যোগ করিল।
    এমন সময়ে দেবেন্দ্রবিজয় নিঃশব্দে তাহাকে আক্রমণ করিলেন; যেরূপে তিনি পাহাড় সিংকে বন্দী করিয়াছিলেন, সেইরূপে গিরিধারীকেও বন্দী করিলেন; কোন শব্দ হইল না; অথচ কাৰ্য্যসিদ্ধ হইল। তাহার মৃতকল্পদেহ পালঙ্কের নিম্নে রাখিয়া দিলেন।
    তৎপরেই তিনি রেবতীর নিকটস্থ হইলেন, তাঁহার মুখের নিকট মুখ লইয়া সেই অস্পষ্টীলোকে দেখিয়া বুঝিতে পারিলেন, রেবতী এখন ক্লোরফৰ্ম্মের দ্বারাই অচেতন আছে মাত্র। আশঙ্কার কোন কারণ নাই। দেবেন্দ্রবিজয় মৃদুস্বরে বলিলেন, “হতভাগিনি! তোমার দুর্দিন এইবার শেষ হইবে।”
    বাহির হইতে জুমেলিয়া ডাকিল, “গিরিধারি! গিরিধারি!”
    দেবেন্দ্রবিজয় গিরিধারীর কণ্ঠস্বর অনুকরণ করিয়া বলিল, “আবার কি –কি হয়েছে? চ’লে এস না তুমি।”
    জুমেলিয়া বাহির হইতে বলিল, “এখান থেকে ঔষধের বাক্সট আর কাপড়গুলো নিয়ে যাও।”
    পূৰ্ব্ববৎ দেবেন্দ্রবিজয়, “রেখে দাও—তোমার কাপড় আর বাক্স, আমি তোমার বোনকে নিয়ে দস্তুরমত একটা আছাড় খেয়েছি।” শুনিতে পাইলেন, জুমেলিয়া তাহার কথা শুনিয়া অত্যন্ত হাসিতেছে; গবাক্ষ দিয়া দেখিলেন, জুমেলিয়া বাটীমধ্যে প্রবেশ করিল; তাহার হস্তে সেই কিরীচ উন্মুক্ত রহিয়াছে, চন্দ্ৰকরে সেটা বিদ্যুদ্ধত ঝক ঝক করিতেছে।
    ক্রমে জুমেলিয়া বৈঠকখানা গৃহের নিকটস্থ হইল; দ্বার-সম্মুখে দাঁড়াইয়া নিম্নকণ্ঠে ডাকিল, “গিরিধারী!”
    তখন দেবেন্দ্রবিজয় তাহার গুপ্ত লণ্ঠন বাহির করিয়া স্প্রীং টিপিয়া দিলেন; উজ্জল স্বতীব্র আলোকরশ্মিমালা জুমেলিয়ার চক্ষু ধাঁধিয়া তাহার মুখের উপরে পড়িল।
    কর্কশকণ্ঠে দেবেন্দ্রবিজয় বলিলেন, “গিরিধারী এখানে নাই; তোমার অপেক্ষায় আমিই আছি, জুমেলা।”
    “দে-বে-দ্র-বি-জ-য়!” জুমেলিয়া সবিস্ময়ে বলিল।
    “হাঁ, দেবেন্দ্রবিজয়—তোমার যম—তোমার শক্ৰ—তোমার পরম শক্ৰ ৷ এক পা যদি নড়বে, এখনই তোমাকে গুলি করব—এতদিন তুমি আমাকে নাস্তানাবুদ করে তুলেছিলে; তোমার জন্য কতদিন আমার অনাহারে কেটে গেছে; এমন কি নানাপ্রকার দুর্ঘটনায় আমার মস্তিক্ষও তুমি বিকৃত ক’রে দিয়েছ; আজ তোমার নিস্তার নাই; দেবেন্দ্রের হাতে তোমার কিছুতেই নিস্তার নাই—এক পা অগ্রসর হইলেই গুলি করব।” দেবেন্দ্রবিজয় ক্রোধে উন্মত্তপ্রায় হইয়া উঠিয়াছিলেন; তাঁহার চক্ষু দিয়া তখন যেন অগ্নিস্ফুলিঙ্গ নির্গত হইতেছিল।
    জুমেলিয়া ভয় পাইল না; তাহার অখণ্ড প্রতাপ অক্ষুণ্ণ রাখিয়া স্মিতমুখে বলিতে লাগিল, “মাইরি! গুলি করবে? তুমি! দেবেন্দ্রবিজয়! জুমেলিয়াকে? পার না—তোমার সাধ্য নয়—তোমার হাতে মৃত্যুতেও জুমেলিয়ার কলঙ্ক আছে। দেবেন! তোমার হাতে মরব! হায়! হ’য়ে কেন মরি নাই! মাতৃস্তন্য – কেন আমার বিষ হয় নাই! যাকে ভালবাসি, তার হাতে আমি মরব! কষ্টকর— বড় কষ্টকর—সে মৃত্যু বড় কষ্টকর, দেবেন! দেবেন, এখনও বলছি, তোমাকে আমি ভালবাসি—আগে বাসতাম, এখনও বাসি— – ম’রেও ভুলতে পারব, এমন বোধ হয় না। ভালবাসি বলিয়াই ত আমি আজ না এই বিপদগ্রস্ত; নতুবা এতদিন তোমাকে আমি কোন কালে এ সংসার থেকে বিদায় দিতাম। অনেকবার মনে করেছি— পারি নাই; ঐ মুখ দেখেছি—ভুলে গেছি—সব ভুলে গেছি। আপনাকে ভুলে গেছি, আপনার কর্তব্য ভুলে গেছি, জগৎ-সংসার ভুলে গেছি। শোন দেবেন, যদি তুমি আমার প্রতিদ্বন্দী না হ’তে, তোমার অপেক্ষ সহস্ৰগুণে শ্রেষ্ঠ কোন গোয়েন্দা আমার প্রতিদ্বন্দ্বিতাচরণ করিত, সে কখনই আমার কেশস্পর্শও করতে পারত না। অবলীলাক্রমে আমি তাহাকে নিহত করতেম। এই তুমি—তোমার রূপে—তোমার গুণে যদি না আমি ভুলতেম—তা’ হ’লে তুমি এতদিন কোথায় থাকতে—কি হ’ত তোমার, কে জানে? এতদিন তুমি আবার কোথায় নূতন জন্মগ্রহণুy করতে। তোমাকে ভালবাসিয়াই ত সৰ্ব্বনাশ করেছি—নিজের মৃত্যু— নিজের অমঙ্গল নিজে ডেকেছি। কি করব? মন আমার বশীভূত নয়। আমি মনের দাস। যখন তুমি তোমার গুরু অরিন্দম গোয়েন্দার সাহচৰ্য্য কর, আমার গুরুই বল, স্বামীই বল—ফুলসাহেবকে গ্রেপ্তার কর, তখন হ’তে তোমাকে আমি কি চোখে দেখেছি, তা জানি না। দেবেন, এটা যেন চিরকাল স্মরণ থাকে—যে জুমেলা তোমার পরম শক্ৰ, সেই জুমেলাই তোমার প্রেমাকাজিহ্মণী; যে জুমেলার তুমি পরম শক্ৰ, সেই জুমেলার তুমি প্রাণের রাজা। তোমার হাতে মৰ্বতে, মৃত্যুযন্ত্রণা বড় ভয়ানক হবে; নিজে মরি—দেখ—তোমার সামনে মরি—হাসতে হাসতে মরতে পারব। তুমিও জুমেলার মৃত্যু হাসিমুখে দেখতে থাক, জুমেলাও তোমাকে দেখতে দেখতে হাসিমুখে মরুক।” এই বলিয়া জুমেলিয়া সেই কিরীচ নিজের বক্ষে আমূল বিদ্ধ করিল। ভলকে ভলকে অজস্ৰ শোণিত নিঃসৃত হইতে লাগিল। বুকের ভিতরে অত্যন্ত যন্ত্রণা হইতে লাগিল, করতলে বুকের সেই ক্ষতস্থান চাপিয়া বাত্যাবিচ্ছিন্ন বল্লরীর ন্যায় জুমেলিয়া কাঁপিতে কাঁপিতে গৃহতলে পড়িয়া গেল। মুখ ও দৃষ্টি সৰ্ব্বাগ্রে মৃত্যুচ্ছায়ান্ধকারমান হইয়া আসিল। তখনও সেরূপ প্রবলবেগে তাহার সৰ্ব্বাঙ্গ পরিহিত বসন ও গৃহতল প্লাবিত করিয়া শোণিতপাত হইতে লাগিল। ছিন্নবিচ্ছিন্ন বাতবিকম্পিত, রক্তচন্দনাক্ত রক্তপদ্মবং জুমেলিয়া। সেইখানে পড়িয়া লুটাইতে লাগিল—তখনই তাহার মৃত্যু হইল।
    দেবেন্দ্রবিজয়ের পরম শত্রু এইখানে এইরূপে পরাভূত ও নিহত হইল।

    সে সময়ে কেহ যদি বিশেষ লক্ষ্য করিয়া দেবেন্দ্রবিজয়ের মুখের দিকে একবার চাহিয়া দেখিত, অবশ্যই সে দেখিতে প্লাইত, দেবেন্দ্রবিজয়ের চক্ষু, তখন নিরশ্রু বা শুষ্ক ছিল না। সেই সময়ে তাহার সেই বিস্ময়বিস্ফারিত চক্ষু দুটিতে দুইবিন্দু জল ছলছল করিতেছিল।

    সমাপ্ত।

  • দরজার ওপাশে

    দরজার ওপাশে

    হুমায়ূন আহমেদ

    দরজার ওপাশে

    ‘দরজার ওপাশে’ নন্দিত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ রচিত হিমু ধারাবাহিকের দ্বিতীয় উপন্যাস। নব্বই দশকে হিমুর প্রথম উপন্যাস ময়ূরাক্ষী প্রকাশিত হয়। প্রাথমিক সাফল্যের পর হিমু চরিত্র বিচ্ছিন্নভাবে হুমায়ুন আহমেদের বিভিন্ন উপন্যাসে প্রকাশিত হতে থাকে। ‘দরজার ওপাশে’ প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৯২ সালের মে মাসে জ্ঞানকোষ প্রকাশনী, ৩৮/ক বাংলাবাজার, ঢাকা থেকে।

    হিমুর বন্ধু রফিককে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হবে। চাকরি রক্ষা করতে রফিক হিমুর কাছে আসে। হিমুর এক বন্ধু জহির, তার পিতা একজন মন্ত্রী, হিমু ঠিক করে তার কাছেই যেতে হবে। এজন্য প্রথমে সে মন্ত্রীর নজর কাড়ার ব্যবস্থা করে যা থেকে বহু ঘটনা জন্ম নেয়।

    এভাবেই দরজার ওপাশের কাহিনী এগিয়ে চলে বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রী মোবারক হোসেন, কাহিনীচক্রে যিনি মন্ত্রিত্ব হারান; তার পালিয়ে যাওয়া পুত্র জহির; হিমুর চাকরি হারানো বন্ধু রফিক ও তার স্ত্রী যুথী; পুলিশের ওসি মোহাম্মদ সিরাজুল করিম ও তার অসুস্থ স্ত্রী; এবং হিমুর ছোট মামাকে নিয়ে। এছাড়া হিমু তো আছেই, সঙ্গে আছে হিমু ধারাবাহিকের নিময়িত চরিত্র বড় ফুপা, বড় ফুপু এবং বাদল।

    প্রস্তাবনা

    তার ডাক নাম হিমু। ভাল নাম হিমালয়। বাবা আগ্রহ করে হিমালয় নাম রেখেছিলেন, যেন বড় হয়ে সে হিমালয়ের মত হয়—বিশাল ও বিস্তৃত, কিন্তু ধরা-ছোঁয়ার বাইরে নয়। হাত দিয়ে স্পর্শ করা যায়। ইচ্ছে করলে তিনি ছেলের নাম সমুদ্র রাখতে পারতেন। সমুদ্রও বিশাল এবং বিস্তৃত। সমুদ্রকে হাত দিয়ে স্পর্শ করা যায়। তার চেয়েও বড় কথা, সমুদ্রে আকাশের ছায়া পড়ে। কিন্তু তিনি সমুদ্র নাম না রেখে রাখলেন হিমালয়। কঠিন মৌন পর্বতমালা, যার গায়ে আকাশের ছায়া পড়ে না ঠিকই কিন্তু সে নিজেই আকাশ স্পর্শ করতে চায়। হিমুর বাবা চেয়েছিলেন হিমু একজন মহাপুরুষ হবে যে মহাপুরুষ পরম সত্য জানেন। কিন্তু হিমু কি চেয়েছিল? আমরা তার বাবার আকাঙ্ক্ষার কথা জানি, হিমুর আকাঙ্ক্ষা জানি না। সে কিসের সন্ধান করে বা আসলেই সে কোন কিছুর সন্ধান করে কি-না তা নিয়েই লেখা হল ‘দরজার ওপাশে’। যদিও আমি খুব গুরুত্বের সঙ্গে লেখাটি লিখেছি তবু বিনীত অনুরোধ করছি কেউ যেন গুরুত্বের সঙ্গে লেখাটি গ্রহণ না করেন। মিসির আলী নামে আমার একটি চরিত্র আছে। সে কাজ করে লজিক নিয়ে। তার চিন্তাভাবনা গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করা যায় কিন্তু হিমু কাজ করে ‘এন্টি-লজিক’ নিয়ে। আমাদের এই জগতে ‘এন্টি-লজিকে’র স্থান নেই।

    ৫ই মে ১৯৯২
    হুমায়ূন আহমেদ
  • চোদ্দ শতকের বাঙালী

    চোদ্দ শতকের বাঙালী

    অতুল সুর

    [book]

    চোদ্দ শতকের বাঙালী – অতুল সুর। প্রথম প্রকাশ–শ্রাবণ, ১৪০১; জুলাই, ১৯৯৪। “চোদ্দ শতকের বাঙালী” গ্রন্থের ভূমিকায় অতুল সুর লিখেছেন–“বইখানা সদ্যপ্রয়াত বঙ্গীয় চোদ্দ শতকের ধারাবাহিক ইতিহাস নয়। ওই শতকের কতকগুলো গুরুত্বপূরণ ঘটনা সম্বন্ধে লিখিত প্রবন্ধের সমাহার মাত্র।”

    প্রথম প্রকাশ

    শ্রাবণ, ১৪০১

    জুলাই, ১৯৯৪

    প্রকাশিকা

    সুপ্রিয়া পাল

    উজ্জ্বল সাহিত্য মন্দির,

    সি-৩, কলেজ স্ট্রীট মার্কেট, কলিকাতা-৭০০০০৭

    পরিবেশক

    উজ্জ্বল বুক স্টোরস্

    ১৯ শ্যামাচরণ দে স্ট্রীট, কলিকাতা-৭৩

    প্রতিষ্ঠাতা

    শরৎচন্দ্র পাল ও কিরীটি কুমার পাল

    গ্রন্থস্বত্ব

    ড. অতুল সুর। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।

    মুদ্রাকর

    অনিলকুমার ঘোষ

    নিউ ঘোষ প্রেস

    ৪/১ই, বিডন রো, কলিকাতা-৬

    ISBN—81-7334-039-0


    ভূমিকা

    বইখানা সদ্যপ্রয়াত বঙ্গীয় চোদ্দ শতকের ধারাবাহিক ইতিহাস নয়। ওই শতকের কতকগুলো গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা সম্বন্ধে লিখিত প্রবন্ধের সমাহার মাত্র। কিন্তু প্রবন্ধগুলো পড়লে পাঠক ওই শতাব্দীর একটা সার্বিক চিত্র পাবেন। সে সার্বিক চিত্র, পাঠক অধিক পাবেন বইখানার মুখপাতের প্রবন্ধ— ‘শতক শিরহরণ’-এ। সেখানে গত ১০০ বছরের ইতিহাসের একটা কাকচক্ষু নিরীক্ষণ করা হয়েছে। ওই প্রবন্ধে বলা হয়েছে যে চোদ্দ শতকের সবচেয়ে বড় ঘটনা হচ্ছে ভারতের স্বাধীনতা লাভ ও ইংরেজের মহাপ্রস্থান। কি ভাবে সেটা ঘটল, তার বিবরণ দেওয়া হয়েছে দ্বিতীয় প্রবন্ধে। আরও, শতাব্দী চিহ্নিত হয়ে আছে এক বাঙালী প্রত্নতত্ত্ববিদের বৈপ্লবিক আবিষ্কারে,—যা যুগ যুগ যাবৎ প্রচলিত ধারণাকে নস্যাৎ করে দিয়ে প্রমাণিত করল হিন্দু সভ্যতার প্রাচীন ও তার শিকড় কোথায়। এটা আলোচিত হয়েছে বইখানার তৃতীয় প্রবন্ধে।

    বিগত শতাব্দী সম্পূর্ণভাবে ওলট-পালট করে দিয়েছে আমাদের সমাজজীবন ও জীবনচর্যার ধারাকে। ওলট-পালটটা এমন ধরনের হয়েছে যে শতাব্দীর গোড়ার দিকের মানুষগুলোকে শতাব্দীর শেষের দিকের মানুষ থেকে চেনা যায় না। সমাজ জীবনে বৈজ্ঞানিক পরিবর্তন ঘটেছে কৌলীন্য ও বহু বিবাহের অবসানে, বিবাহের ন্যূনতম বয়স নির্ধারণে, বিয়ে বাড়ির রীতিনীতির পরিবর্তনে। সেজনা এসব বিষয় সম্বন্ধে স্বতন্ত্র প্রবন্ধ গ্রথিত হয়েছে।

    এ শতাব্দীতে বাঙালী হিন্দু ও মুসলমান তাদের আগেকার যুগের সম্প্রীতি হারিয়েছে যার প্রতিক্রিয়ায় ঘটেছিল নোয়াখালী ও কলকাতার মর্মন্তুদ দাঙ্গা, যার জেরে স্বাধীনতার শর্ত হিসাবে বঙ্গদেশ দ্বিখণ্ডিত হয়েছে। কিন্তু মন্দির-মসজিদ সমস্যা আজ পর্যন্ত রয়ে গিয়েছে। বঙ্গদেশ দ্বিখণ্ডিত হবার পর পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশ নানা উৎকট সমস্যার সম্মুখীন হয়েছিল, কিন্তু ভগবান ও আল্লার কৃপায় সুপরিকল্পিত যোজনাসমূহের দ্বারা সেগুলির সমাধান হয়েছে। এ সমস্ত বিষয় এ বইয়ের স্বতন্ত্র প্রবন্ধসমূহে আলোচিত হয়েছে।

    শতাব্দীর প্রথম অর্ধাংশ ছিল বাঙালী জীবনের সুখময় যুগ। সস্তাগণ্ডার বাজারে দরিদ্রতা সত্ত্বেও বাঙালী হেসে খেলে তার নশ্বর জীবন কাটাতো। শেষের অর্ধাংশে সে জর্জরিত হয়ে গিয়েছে মূল্যস্ফীতি, অবাঙালীর অবাধ আগমনে ও নানারূপ ক্লেশময় ঘটনায়। বাঙালী জীবন আজ সবচেয়ে বেশি অভিশপ্ত হয়েছে বধূ নির্যাতন ও নারীনিগ্রহে। সেজন্য এসব বিষয়েও প্রবন্ধ যোগ করা হয়েছে। এই নৈরাশ্যের মধ্যেও বাঙালী আজও পাচ্ছে ‘অসকার’ ও ‘বিশ্বসুন্দরী’ খেতাব। তবে রবীন্দ্রনাথ-শরৎচন্দ্র-নজরুলের যুগের আর পুনরাবির্ভাব ঘটেনি। সেজন্য কামনা করি যে বাঙালী সংকল্প করুক চরিত্রবান হয়ে তার লুপ্ত গৌরব ফিরিয়ে আনার।

    ১০ জুলাই ১৯৯৪
    অতুল সুর
  • অতুলচন্দ্র গুপ্ত রচনাসংগ্রহ

    অতুলচন্দ্র গুপ্ত রচনাসংগ্রহ

    অতুলচন্দ্র গুপ্ত

    [book]

    অতুলচন্দ্র গুপ্ত স্বনামধন্য মনীষী। শিক্ষা, সাহিত্য, রাজনীতি, দর্শন—নানা ক্ষেত্রেই তাঁর পারদর্শিতা। পেশায় আইনজ্ঞ হলেও চিন্তাশীল প্রাবন্ধিক হিসেবে বিগত শতাব্দীতে তিনি বিশেষ প্রতিষ্ঠিত ছিলেন। ‘শিক্ষা ও সভ্যতা’ গ্রন্থের অধিকাংশ প্রবন্ধই প্রকাশিত হয়েছিল সেকালের প্রথিতযশা ‘সবুজপত্র’-এ। তাঁর বহুল-আলোচিত ‘কাব্যজিজ্ঞাসা’র প্রবন্ধগুলিও ‘সবুজপত্র’-এ প্রকাশিত। বাংলা ও আসামের নদীতে বেড়াবার সময় স্টিমার থেকে যেসব চিঠি লিখেছিলেন তিনি, তারই সংশোধিত রূপ ‘নদীপথে’ গ্রন্থ। এরকমই অসামান্য আরও তিনটি গ্রন্থ ‘জমির মালিক’, ‘সমাজ ও বিবাহ’, ‘ইতিহাসের মুক্তি’। আনন্দ থেকে প্রকাশিত হল অতুলচন্দ্র গুপ্তের ‘রচনাসংগ্রহ’, যেখানে উপরোক্ত মূল্যবান গ্রন্থসমূহের রচনাগুলি ছাড়াও অন্তর্ভুক্ত হয়েছে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা থেকে সংগৃহীত সাহিত্য-সমাজ-রাজনীতি-রবীন্দ্রনাথ, মহাত্মা গান্ধী বিষয়ক তাঁর একগুচ্ছ প্রবন্ধ। ঋজু অথচ সরস, গভীর অথচ, সহজবোধ্য প্রতিটি রচনাই মননশীল সৃজনের দুর্লভ দৃষ্টান্ত।

    ভূমিকা

    যাঁর লেখায় এই বই সমৃদ্ধ, তাঁর সম্বন্ধে লেখা সহজ নয়। সহজাত সফল বহুমুখী প্রতিভার বর্ণনা কেবল ওই ক্ষমতার অধিকারীই করতে পারেন। অতুলচন্দ্র গুপ্ত পেশায় ছিলেন আইনজ্ঞ, কিন্তু শিক্ষা, সাহিত্য, রাজনীতি, দর্শন অনেক ক্ষেত্রেই তাঁর সফল এবং অসাধারণ দক্ষতা ছিল। ইচ্ছে করলেই জীবিকা পরিবর্তন করতে পারতেন। অল্পবয়সে কিছুদিন রংপুরে ন্যাশনাল স্কুলে পড়িয়েছিলেন, পরে ল কলেজে। আমাকে একবার বলেছিলেন পড়ানোর কাজ নেওয়াই উচিত ছিল, আইন অত আনন্দের নয়।

    সপরিবারে দেশভ্রমণের শখ ছিল। আমাকে স্কুলের বইপত্র নিয়ে যেতে হত— প্রায়শই ইংরেজি কবিতা পড়াতেন। এখনও মনে আছে পুরীর সমুদ্রসৈকতের সামনে হোটেলের চওড়া বারান্দায় আমাকে পড়াচ্ছেন। ছোটদের মনঃসংযোগের ক্ষমতা থাকে, কিন্তু বেশিক্ষণ থাকে না। রীতি অনুসারে ঘণ্টাখানেক পরে ছুটি পেলাম। একপাক ঘুরে এসে দেখি পাশের ঘরের ভদ্রলোক যিনি বারান্দায় একটু দূরে বসেছিলেন, আনন্দবিভাসিত মুখে পাশের চেয়ারে বসে আছেন। কথাবার্তা যা কানে এল তাতে বুঝলাম তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপক। কবিতা পড়ানোর ধরন শুনে আমার অন্তর্ধানের পর কথা বলতে উঠে এসেছেন। এই দৃশ্য আমি বহুবার দেখেছি।

    কবিতা পড়ানো মানে যে কাব্যজিজ্ঞাসা তা নয়। রসের সন্ধানপথ অতি সহজে দিতে পারতেন। পুজোর ছুটিতে মধুপুরে বাড়ির পিছনের বারান্দায় সন্ধ্যার পর কাঠের টেবিলে মোমবাতি জ্বেলে আমাকে পড়াচ্ছেন। পাঠ্যবই থেকে Abou Ben Adhem। আরম্ভ করার আগে বলেছিলাম এই কবিতায় বিশেষ ছন্দ নেই, পড়তে ভাল লাগে না। শুনে হেসেছিলেন। আধঘণ্টা পড়িয়ে বলেছিলেন এইবার বুঝতে পারছিস তো কবিতাটা ভাল, আর ভাল কবিতার ধরন কী। চোদ্দো বছরের বালকের পক্ষে সেদিন স্বীকার করতে অসুবিধা হয়নি, কবিতাটা পাল্টে গেছে।

    অসাধারণ মনঃসংযোগের ক্ষমতা ছিল। যা পড়তেন, সঙ্গে থাকত। আরেকবার পুজোর ছুটিতে জামসেদপুর গিয়েছি। সকালে চা খাওয়ার পর বারান্দায় বসে লিখতেন। সেই লেখা অধরচন্দ্র মুখোপাধ্যায় বক্তৃতার জন্য— পরে প্রকাশিত ‘ইতিহাসের মুক্তি’র প্রথম দুই প্রবন্ধ। এইখানেই আছে। প্রথম খসড়া শীতের রৌদ্রে বারান্দায় বসে সামনের দলমা পাহাড়ের দিকে না চেয়ে ভাঁজ করা ফুলস্কেপ কাগজে কোনও বইপত্রের সাহায্য ছাড়া লেখা।

    যখন থেকে তাঁর কথা আমি মনে করতে পারি, তখন তাঁর বয়স প্রায় ষাট পেরিয়েছে। কোনও সফল আইনব্যবসায়ীর পক্ষে এত বিভিন্ন বিষয় চর্চার সময় পাওয়া অত্যন্ত দুষ্কর। কিছু সময়ের উপরে তাঁর অসাধারণ কর্তৃত্ব ছিল। সন্ধ্যা সাড়ে ছ’টা পর্যন্ত বারান্দায় বসে আলোচনায় যোগ দিতেন। ঠিক সাড়ে ছ’টা বাজলেই কাজের ঘরে গিয়ে বসতেন। মনকে অবলীলাক্রমে এক বিষয় থেকে অন্য বিষয়ে স্থানান্তরিত করতে অসুবিধা হত না। একমাত্র ব্যতিক্রম শুক্রবার সন্ধ্যায়। তখন তাঁর বন্ধু মিষ্টভাষী সৌম্যদর্শন কুশীপ্রসন্ন চট্টোপাধ্যায় আসতেন। সন্ধ্যার প্রাক্কালে রাসবিহারী অ্যাভিনিউর নীচের বারান্দায় দুইজনের আলাপ চলত। রাসবিহারী অ্যাভিনিউর সেই সময়ের বর্ণনা বুদ্ধদেব বসু করেছেন।

    স্মৃতিশক্তি এবং মনঃসংযোগের অনেক গল্প আমি কলকাতা হাইকোর্টের অন্যান্য আইনজ্ঞদের কাছে শুনেছি। আমি শুধু জানি বাংলা এবং ইংরেজি সাহিত্যের কী তাঁর স্মরণে থাকত না, বলা দুঃসাধ্য। ‘নদীপথে’র দ্বিতীয় সংস্করণ বেরোচ্ছে। আমি অর্বাচীন স্কুল-বালকের মতো বলেছিলাম ‘গতায়াত’ লিখেছ কেন? ওটা কি প্রকৃত বাংলা— ‘যাতায়াত’ লিখলেই তো পারতে। তৎক্ষণাৎ ভারতচন্দ্র থেকে উদ্ধৃতি— ভারতচন্দ্র খাঁটি বাঙালি কবি। প্রমাণ করার উপায় নেই, কিন্তু এখন আমার দৃঢ় ধারণা রবীন্দ্রনাথের প্রায় সব কবিতাই তাঁর মনে কোথাও-না-কোথাও স্তরে স্তরে সাজানো থাকত। ইচ্ছে করলেই অল্প প্রচলিত কবিতা স্মরণ করতে পারতেন।

    অতি সহজভাবে অন্তঃসলিলা পরিহাসের সঙ্গে গম্ভীর বিষয়ের অসাধারণ আলোচনা করতে পারতেন। প্রায় সব বিষয়ের লোকের সঙ্গেই। আমার জন্ম সবুজ পত্রের দলের বহু পরে, কিন্তু তাঁর বন্ধুদের কাউকে কাউকে দেখেছি। সত্যেন্দ্রনাথ বসু আসতেন, পিছনের বসবার ঘরে পাঞ্জাবি খুলে ফেলে সোফার উপরে পা মুড়ে বসে আলোচনায় যোগ দিতেন। আইনস্টাইনের মৃত্যুর পর তাঁকে বলা হল আইনস্টাইনের সম্বন্ধে কিছু বলতে। বাড়ির উঠোনে গোল করে বেতের চেয়ার পাতা হল। সত্যেন্দ্রনাথ বসু ঘণ্টাখানেক স্মৃতিচারণা করলেন। খুব সহজ করে বলেছিলেন সন্দেহ নেই, কিন্তু মনে হতে লাগল তিনি তাঁর বন্ধুর উদ্দেশেই বলছেন। আমরা কেবল চেয়ার অধিকার করে বসে আছি, ওই স্তরের সভ্য আলোচনায় অংশগ্রহণ আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। সাহিত্যিক আলোচনা যে কী পর্যায়ে পৌঁছত গৌরীশঙ্কর ভট্টাচার্যের লেখায় তার বর্ণনা রয়েছে। শ্বেতশুভ্র সন্দেশ এবং বৃহৎ আকারের রসের মিষ্টান্ন সেই আলোচনার মধ্যে নিয়মিত দেখা দিত।

    আমাকে তাঁর কলেজ জীবনের কাহিনি বলতেন। হ্যারিসন রোড এবং আমহার্স্ট স্ট্রিটের মোড়ে একটি মেসবাড়িতে থেকে প্রেসিডেন্সিতে পড়াশোনা করেছিলেন। যে মেসে অনেকেই ব্যবহারে না হোন, পরিচয়ে ছাত্র ছিলেন। বলতেন ঘরে প্রচণ্ড হই-চই-র মধ্যে বসে পড়াশোনা করতে হত, মনঃসংযোগের ক্ষমতা ওইখান থেকেই। বলা বাহুল্য যে সে মেসের সকলেরই পরীক্ষায় ফল শুভ হত না, তবে প্রতিকারের চেষ্টা হত। ডাক্তারি ছাত্ররা খাওয়ার উন্নতি বিধান করতেন। একবার সরস্বতী পূজার প্রয়োজন বোধ করা হল। যে পুরোহিতকে ধরে আনা হল, তিনি বিদ্যাস্থানে ভয়ে বচ বলে প্রস্থান করলেন, পরীক্ষার ফল একইরকম রয়ে গেল। এই গল্প বলে অত্যন্ত আনন্দ পেতেন।

    অবশ্য তাঁর সময়ের প্রেসিডেন্সি কলেজের কাহিনিও শুনেছি। একদিন সকালে কলেজে দেখেন তাঁর উপরের ক্লাসের হিন্দু হস্টেল নিবাসী একজন সিঁড়ি ভেঙে উঠছেন, পিছনে হস্টেলের চাকর খাবারের থালা হাতে। কী অবস্থা দাঁড়িয়েছে প্রিন্সিপাল সাহেবকে দেখাতে যাচ্ছেন। সাহেব একটা মাছভাজা খেয়ে ফেললেন, বললেন Not bad, properly roasted। তারপর বিজ্ঞানের জনৈক অধ্যাপককে ডেকে অনুসন্ধানের ভার দিলেন। অনুসন্ধানের ফলে খাওয়ার উন্নতি হল, কিন্তু যাঁকে ভার দেওয়া হয়েছিল তিনি উৎসাহিত হয়ে গবেষণায় রত হলেন। প্রকাশ্য জনসভায় বাঙালির খাদ্য বিষয়ে বক্তৃতা হল— যার নাম দেওয়া হয়েছিল: A plea for a rational diet। সেটা ছাপা হল A plea for a national diet। বক্তা বললেন এইটেই ঠিক নামকরণ হয়েছে। বাঙালিছাত্রের ডালের বাটিতে চুমুক দেওয়া উচিত, এই ধরনের স্লোগান তৈরি হল। সেই সময়ের কলেজজীবনের কিছু আভাস তাঁর রবীন্দ্রনাথের উপরে বিভিন্ন লেখায় ছড়িয়ে আছে।

    প্রেসিডেন্সি কলেজের রীতি অনুসারে কৃতী ছাত্র ছিলেন। দর্শনে প্রথম স্থান অধিকার করতেন। ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে পরীক্ষার মিটিং-প্রত্যাগত অধ্যাপকের মুখে নিজের নাম শুনেছিলেন। প্রায় অর্ধশতাব্দী পরে এই কাহিনি যখন আমাকে বলতেন মুখে আনন্দের আভাস দেখা দিত।

    প্রচুর অর্থ উপার্জন করতেন, সেটা অনেকেই করেন, কিন্তু অপরের প্রয়োজনে অর্থব্যয়ের তাঁর দৃষ্টান্ত আমি দেখিনি। স্থানীয় লাইব্রেরি, রাজনৈতিক পত্রিকা, থিয়েটারের ক্লাব, দুঃস্থ মানুষ, খ্যাতি ও খ্যাতিবিহীন সাহিত্যিক সকলের প্রতি তাঁর আকর্ষণ ছিল। এঁদের মধ্যে কারুর কারুর জীবনযাত্রার বর্ণনা তাঁর কাছে এসে হাজির হত। পরের মাস থেকে পাঠানো অর্থ তাঁদের স্ত্রীদের হাতে সোজাসুজি পৌঁছাত।

    বাঙালি হিন্দুর জীবনে মধ্যে মধ্যে ধর্মানুষ্ঠান পালন করতে হয়। সেটি করতেন, বলতেন এটি সমাজসংস্কৃতির অঙ্গ। কিন্তু বাড়াবাড়ি দেখলে অসন্তুষ্ট হতেন। তোমরা যদি মনে কর ভগবান ঘুষ নেন তা হলে করতে পার, এইকথা তাঁকে বলতে শুনেছি। আমার শৈশবে আমাকে বলেছিলেন রামায়ণ-মহাভারত বানানো গল্প। শুনে চমৎকৃত হয়েছিলাম।

    শেষ জীবনে একজন মানুষের পক্ষে যা পাওয়া উচিত তার চেয়ে অনেক বেশি শোক তাঁকে গ্রহণ করতে হয়েছিল। যে সম্মানের সঙ্গে তিনি তা বহন করতেন সে বর্ণনার ক্ষমতা আমার নেই। রবীন্দ্রনাথ তাঁর অবলম্বন, তাঁর অন্যকিছুর প্রয়োজন হয় না, এইকথা একবার বলেছিলেন।

    আইন, সাহিত্য, রাজনীতি সবই করেছেন, কিন্তু কখনও অন্যায়ের সঙ্গে সন্ধি করেননি। সত্যের প্রতি প্রবল আকর্ষণ ছিল; প্রয়োজনে অপ্রিয় সত্য অক্লেশে বলতেন, মধ্যে মধ্যে তার উপরে মিষ্টভাষের প্রলেপ পড়ত। এই সংকলনে তার বহু প্রমাণ পাবেন। প্রমথ চৌধুরীর লেখার ঋজু অথচ বিধ্বংসী বিদ্রূপ অত্যন্ত পছন্দ করতেন। সে অস্ত্র যে তাঁরও ছিল, এই সংকলনে তারও উদাহরণ আছে।

    পৃথিবী, পরিবেশ, বিজ্ঞান তাঁর ঔৎসুক্যের তালিকা থেকে কিছুই বাদ পড়েনি। কাজের টেবিলের দেরাজে বড় বাঁধানো পৃথিবীর মানচিত্রের বই ছিল। প্রচুর ব্যবহার হতে দেখেছি। বাংলার নদনদী, পশুপাখি, গাছ, ফুল চিনতেন এবং চেনাতেন। গভীররাত্রে ঘুমন্ত স্কুল-বালককে জাগিয়ে আকাশের নক্ষত্রমণ্ডল চেনার উৎসাহ সঞ্চার করে দিতেন।

    তাঁর কিছু সৃষ্টির কথা কালক্রমে বিস্মৃত হয়ে এসেছে! নিজের অভিজ্ঞতা দিয়ে শুরু করি। আমি স্কুলে ভরতি হয়েছিলাম তৎকালীন বাংলা পাঠ্যবই কিশলয় সংকলিত হবার বছরে। পাঠ্য বইয়ে আমার চেনা শিশুসাহিত্যের প্রবেশ দেখে অবাক হয়েছিলাম। তার পূর্বের বাংলা বই এবং তৎকালীন যে-সব ইংরেজি বই আমাদের পড়তে হত, তাতে ছাত্রমহলে সাহিত্যের প্রতি অনুরাগ সহজে জাগে না, বিপরীত ঘটার সম্ভাবনাই বেশি। এখন বহির্বিশ্বে বাস করি। সেখানে ইংরেজি ক্লাসে ছোটদের বই পড়ানো হয়। শিশুদের উপর স্নেহের আতিশয্যে বড়দের সাহিত্যের জলমেশানো টুকরো চাপিয়ে তাদের ভারাক্রান্ত করার দিন অতীত। আজ থেকে চল্লিশ বছর আগে কিশলয় সংকলনে তাঁর হাত ছিল। এখন যে পাঠ্য বই পড়ানো হয়, তার ফল অধুনারচিত সাহিত্য দেখলেই বোঝা যায়। তাঁর সময়ের রবীন্দ্রপুরস্কারের মর্যাদা এখনকার চেয়ে বেশি ছিল। তৎকালীন অখ্যাত সাহিত্যিকও সে পুরস্কার সাহিত্যগৌরবে পেতেন।

    ভবিষ্যৎকে অনুমান করার তাঁর অসাধারণ ক্ষমতা ছিল। একটি উদাহরণ দিই। আজকাল দেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিপ্রেক্ষিতে অনেকেই বিষণ্ণ। এই সংকলনে গান্ধীজির উপরে লেখা প্রবন্ধ দুটি তাঁদের পড়তে অনুরোধ করি। আজ থেকে প্রায় পঞ্চাশ বছর আগে লেখা।

    রেনেসাঁস কথাটা আমরা ব্যবহার করে থাকি। রেনেসাঁসের যাঁরা অংশীদার নানাবিষয়ে তাঁদের যোগাযোগ থাকে। বিদেশি এবং স্বদেশি উভয়ধারার একটি অপূর্ব সৃষ্টিসমৃদ্ধ সমন্বয় তাঁরা ঘটাতে পারেন। এই একজনকে বিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে দেখেছি যিনি প্ৰকৃত রেনেসাঁস পুরুষ ছিলেন। জ্ঞানের পরিধি ছিল অপরিসীম, কিন্তু সফল বহির্বিকাশ হত অত্যন্ত সংযমীভাবে। যা লিখতেন, যা বলতেন তা ছিল ঋজু অথচ সরস, গভীর অথচ সহজবোধ্য। এ লেখা যদি তিনি লিখতেন তা হলে লেখার দৈর্ঘ্য হত অর্ধেক, এবং অতুলচন্দ্র গুপ্তের প্রকৃত পরিচয় পাওয়া যেত। তা যখন সম্ভব নয়, তখন তাঁর নিজের লেখার মধ্যেই তাঁকে খুঁজতে হবে।

    কাব্য জিজ্ঞাসা, জমির মালিক এবং ইতিহাসের মুক্তি বইগুলি বিশ্বভারতী প্রকাশন বিভাগের অনুমতিক্রমে এই সংকলনে গৃহীত। এজন্য বিশ্বভারতীর কর্তৃপক্ষের নিকট আমি কৃতজ্ঞ। প্রয়াত শোভন বসু গ্রন্থটির সংকলনের প্রাথমিক পর্বে নিরলস পরিশ্রম করেছিলেন।

    অভিজিৎ গুপ্ত

  • শিক্ষা ও সভ্যতা

    শিক্ষা ও সভ্যতা

    অতুলচন্দ্র গুপ্ত

    [book]

    প্রথম সংস্করণ আশ্বিন, ১৩৩৪। ক্যালকাটা পাবলিশার্স, কলেজ ষ্ট্রীট মার্কেট, কলিকাতা। প্রকাশক শ্রীবারিদকান্তি বসু। পৃষ্ঠা সংখ্যা ৮ + ১৪৮। কলিকাতা, ৩১নং সেণ্ট্রাল এভিনিউ আর্ট প্রেসে শ্রীনরেন্দ্রনাথ মুখার্জ্জি, বি-এ কর্ত্তৃক মুদ্রিত। দাম দেড় টাকা। এই গ্রন্থে শিক্ষার লক্ষ্য, অন্নচিন্তা, রোম, আর্য্যামি, বৈশ্য, সবুজের হিন্দুয়ানী, ধর্ম্ম-শাস্ত্র, চাষী, ভারতবর্ষ, তুতান্-খামেন্, গণেশ — ইত্যাদি প্রবন্ধসমূহ সংকলিত হয়েছে।


    উৎসর্গ

    ৺পিতৃদেবের স্মরণে


    মুখবন্ধ

    এ বইএর প্রবন্ধগুলির বেশীর ভাগ ‘সবুজ পত্রে’, আর বাকী কয়েকটি কয়েকখানা সাপ্তাহিক পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। ‘সবুজের হিন্দুয়ানী’ প্রবন্ধটি নবপর্যায় ‘সবুজ পত্রের’ প্রথম সংখ্যার জন্য লেখা। উপলক্ষ্যের উপযোগী আকারটি বদলালে বক্তব্য বহাল থাকলেও রসটা ঠিক থাকে না দেখে ওর সে আকারটি আর বদলাইনি। প্রবন্ধগুলিকে পুঁথিতে গেঁথে কিছুদিন বাচিয়ে রাখার চেষ্টা উচিত হ’ল, না পুরণো মাসিক- সাপ্তাহিকের স্তূপের মধ্যে বিস্মৃতির কবর দেওয়াই সমীচীন হ’ত তাতে অবশ্য সন্দেহ আছে। তবে, “বিষবৃক্ষোঽপি সংবদ্ধ স্বয়ং চ্ছেত্ত মসাম্প্রতম্”।

    শ্রীঅতুলচন্দ্র গুপ্ত

    আশ্বিন, ১৩৩৪

  • পঞ্চতন্ত্র

    পঞ্চতন্ত্র

    সৈয়দ মুজতবা আলী

    [book]

    ‘পঞ্চতন্ত্র’ সৈয়দ মুজতবা আলী রচিত বৈচিত্রময় একটি গ্রন্থ। দুই খণ্ডে প্রকাশিত এই গ্রন্থটিকে বৈচিত্রময় বলছি, কেননা, কেউ এটিকে রম্যরচনার সঙ্কলন, কেউ গল্প সঙ্কলন, কেউ প্রবন্ধ সঙ্কলন বলে আখ্যায়িত করেছেন। মূলত, একের ভিতরে বহু, এই কারণেই হয়ত সৈয়দ সাহেব গ্রন্থটির নাম রেখেছিলেন ‘পঞ্চতন্ত্র’।

    গল্প শুনতে ও শোনাতে পছন্দ করতেন তিনি; এই কারণে, কলকাতায়, কাবুলে, প্যারিসে, বার্লিনে কিংবা কায়রোতে—যেখানেই সৈয়দ মুজতবা আলী, সেখানেই জমত গল্পের আসর, সাদামাটা কথায় আড্ডা। এই কারণেই নিশাচর শহরের প্রতি তাঁর ছিল দুর্মর পক্ষপাত; জনপরিসরে, আখড়ায় তাঁর আসর জমত নিয়মিত যাতে থাকত নানা সংস্কৃতির বহুবিচিত্র মানুষের সমাগম। আড্ডার শরিকেরা সবাই রসিক। রসের রসিক। উপভোগের রসিক। তথ্য-উপাত্ত আর পাণ্ডিত্যে তারা টইটম্বুর। কিন্তু মুজতবার আড্ডায় তথ্য আর পাণ্ডিত্য ভার হয়ে আসে না। প্রতিহত করে না। কারণ, সেখানে উপভোগের সাদর আমন্ত্রণ আছে। প্রধান শরিকদের পাশে আরও অনেকেই আছে। তারা কথা বলে না। কিন্তু আড্ডার রস উদ্যাপনে কোনও বাধা নেই। এরাই মূলত পাঠক। মুজতবার লেখা পড়া মানে আড্ডার সজীব সপ্রতিভ কথামালার অংশীদার হওয়া।

    মুজতবা এমন জমানার মানুষ, যখন কলকাতায় ‘সংস্কৃতি’ একটি উচ্চতম বর্গ হিসেবে পরম প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। ওই সংস্কৃতি-ধারণায় সংকীর্ণতা ছিল, সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ছিল। মুজতবা এই সংকীর্ণতা ও বিদ্বেষ ভাব থেকে বেশ অনেক দূর পর্যন্ত মুক্ত ছিলেন। তখন ভারতীয়রা কেবল আর পশ্চিমের কথা শুনছিল না, পশ্চিমকে ভারতের কথাও শোনানো শুরু করেছিল। মুজতবা নিজের আবিষ্কৃত আড্ডার ফর্মে একজন ভারতীয় প্রতিনিধি হিসেবে অংশ নিতেন। তাতে হীনম্মন্যতার লেশমাত্রও ছিল না। ছিল বহুজাতিক অভিজ্ঞতার মধ্যে নিজের হিস্যা উপস্থাপনের আর আদায়ের সক্রিয়তা। উদারনৈতিক ভাব-পরিসরে নিজেকে মজলিসি কেতায় উদ্‌যাপনের ভঙ্গিতে হাজির করতে পেরেছিলেন বলেই সহস্র ভ্রমণকাহিনী আর রম্য রচনার ভিড়ে মুজতবাকে সহজেই চিনে নেওয়া যায়।

    জীবনকে উদ্‌যাপনের মত যাপনের প্রতি সৈয়দ মুজতবা আলীর প্রবল আগ্রহ ছিল, কিন্তু হাহাকার ছিল না। হাহাকার না থাকার কারণ, জীবন স্বয়ং উদ্‌যাপনের বিচিত্র বর্ণিল সাজে ধরা দিয়েছিল তাঁর জীবনে। তাঁর কলম ছিল সেই জীবনের বিশ্বস্ত আজ্ঞাবাহক।

    অনেক দেশ ঘুরাঘুরি একই সাথে বিভিন্ন মানুষের কাছাকাছি থেকে তাদের সাথে নিজের ভাবের আদান প্রদান করে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করে তা নিজের কাছে রেখেদেন নাই লেখক সৈয়দ মুজতবা আলী। বিভিন্ন সময়ের ভ্রমণের সেই অভিজ্ঞতা লিখে রেখেছেন একই সাথে ভিন্ন দেশের মানুষের কাছাকাছি গিয়ে তাদের সেই গল্পও তিনি আমাদের শুনিয়েছেন।

    ‘পঞ্চতন্ত্রে’র কোন নির্দিষ্ট বিষয়ের উপর লেখা হয়নি; এর মধ্যে আছে ছোট ছোট গল্প, নিজের অভিজ্ঞতা, অন্যের কাছে শোনা কাহিনী, স্মৃতিকথা, সমসাময়িক বিষয়, ভ্রমণ কথা যাতে আছে নিজের ও অন্যদের গল্প।

  • প্রথম পর্ব

    প্রথম পর্ব

    সৈয়দ মুজতবা আলী

    [book]

    প্রথম পর্ব

    ‘পঞ্চতন্ত্র প্রথম পর্ব’ বেঙ্গল পাবলিশার্স, কলিকাতা থেকে আষাঢ়, ১৩৫৯ সালে প্রথম প্রকাশিত হয়। প্রথম সংস্করণের আকার ছিল ডবল মিডিয়ম ১/১৬ সাইজ, ১৬৪ পৃষ্ঠা। লেখক এই গ্রন্থ ‘সরলাবালা সরকার’কে উৎসর্গ করেন। প্রসঙ্গত বলা যায়, ‘সরলাবালা’ তখন জীবিত ছিলেন। লেখকের নিবেদন থেকে জানা যায়, পঞ্চতন্ত্র গ্রন্থের রচনাগুলির অধিকাংশ রবিবাসরীয় বসুমতী ও সাপ্তাহিক দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল; লেখকের বন্ধুভাজন অনুজপ্রতিম শ্রীযুক্ত কানাইলাল সরকার ও সুসাহিত্যিক মনোজ বসুর প্রচেষ্টায় এই সংকলনটি প্রকাশিত হয়। ‘পঞ্চতন্ত্র’ ‘দেশে-বিদেশে’র পর সৈয়দ মুজতবা আলীর দ্বিতীয় বিখ্যাত গ্রন্থ। ‘পঞ্চতন্ত্র’ প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই আলী সাহেবের খ্যাতি ও জনপ্রিয়তা অসামান্য বৃদ্ধি পায়। ‘পঞ্চতন্ত্র’র জন্য বাংলা সাহিত্যে রম্যরচনার পুনরায় সমাদর ও বহুল চর্চা শুরু হয় একথা বললে অসঙ্গত হয় না।

    নকুল চট্টোপাধ্যায়


    উৎসর্গ

    শ্রীযুক্তা সরলাবালা সরকার

    মহাশয়ার করকমলে—


    লেখকের নিবেদন

    এই পুস্তিকার অধিকাংশ লেখা রবিবারের ‘বসুমতী’ ও সাপ্তাহিক ‘দেশ’ পত্রিকায় বেরোয়। অনুজপ্রতিম শ্রীমান কানাই সরকার ও সুসাহিত্যিক শ্রীযুক্ত মনোজ বসু কেন যে এগুলো পুস্তাকাকারে প্রকাশ করার জন্য আমাকে বাধ্য করলেন সে কথা সহৃদয় পাঠকেরা বিবেচনা করে দেখবেন।

    মুজতবা আলী

  • বইকেনা

    বইকেনা

    সৈয়দ মুজতবা আলী

    [book-name]

    বইকেনা

    মাছি-মারা-কেরানী নিয়ে যত ঠাট্টা-রসিকতাই করি না কেন, মাছি ধরা যে কত শক্ত সে কথা পর্যবেক্ষণশীল ব্যক্তিমাত্ৰই স্বীকার করে নিয়েছেন। মাছিকে যেদিক দিয়েই ধরতে যান না কেন, সে ঠিক সময় উড়ে যাবেই। কারণ অনুসন্ধান করে দেখা গিয়েছে, দুটো চোখ নিয়েই মাছির কারবার নয়, তার সমস্ত মাথা জুড়ে নাকি গাদা গাদা চোখ বসানো আছে। আমরা দেখতে পাই শুধু সামনের দিক, কিন্তু মাছির মাথার চতুর্দিকে চক্রাকারে চোখ বসানো আছে বলে সে একই সময়ে সমস্ত পৃথিবীটা দেখতে পায়।

    তাই নিয়ে গুণী ও জ্ঞানী আনাতোল ফ্রাঁস দুঃখ করে বলেছেন, ‘হায়, আমার মাথার চতুর্দিকে যদি চোখ বসানো থাকতো, তাহলে আচক্ৰবালবিস্তৃত এই সুন্দরী ধরণীর সম্পূর্ণ সৌন্দর্য একসঙ্গেই দেখতে পেতুম।’

    কথাটা যে খাঁটি, সে-কথা চোখ বন্ধ করে একটুখানি ভেবে নিলেই বোঝা যায়। এবং বুঝে নিয়ে তখন এক আপশোস ছাড়া অন্য কিছু করবার থাকে না। কিন্তু এইখানেই ফ্রাঁসের সঙ্গে সাধারণ লোকের তফাৎ। ফ্রাঁস সান্ত্বনা দিয়ে বলেছেন, ‘কিন্তু আমার মনের চোখ তো মাত্র একটি কিংবা দুটি নয়। মনের চোখ বাড়ানো-কমানো তো সম্পূর্ণ আমার হাতে। নানা জ্ঞানবিজ্ঞান যতই আমি আয়ত্ত করতে থাকি, ততই এক-একটা করে আমার মনের চোখ ফুটতে থাকে।’

    পৃথিবীর আর সব সভ্য জাত যতই চোখের সংখ্যা বাড়াতে ব্যস্ত, আমরা ততই আরব্য-উপন্যাসের এক-চোখ দৈত্যের মত ঘোৎ ঘোৎ করি আর চোখ বাড়াবার কথা তুললেই চোখ রাঙাই।

    চোখ বাড়াবার পন্থাটা কি? প্রথমত-বই পড়া, এবং তার জন্য দরকার বই কেনার প্রবৃত্তি।

    মনের চোখ ফোটানোর আরো একটা প্রয়োজন আছে। বারট্রান্ড রাসেল বলেছেন, ‘সংসারে জ্বালা-যন্ত্রণা এড়াবার প্রধান উপায় হচ্ছে, মনের ভিতর আপন ভুবন সৃষ্টি করে নেওয়া এবং বিপদকালে তার ভিতর ডুব দেওয়া। যে যত বেশি ভুবন সৃষ্টি করতে পারে, যন্ত্রণা এড়াবার ক্ষমতা তার ততই বেশি হয়।’

    অর্থাৎ সাহিত্যে সান্ত্বনা না পেলে দর্শন, দর্শনে কুলিয়ে উঠতে না পারলে ইতিহাস, ইতিহাস হার মানলে ভূগোল—আরো কত কি।

    কিন্তু প্রশ্ন, এই অসংখ্য ভুবন সৃষ্টি করি কি প্রকারে?

    বই পড়ে। দেশ ভ্ৰমণ করে। কিন্তু দেশ ভ্ৰমণ করার মত সামৰ্থ্য এবং স্বাস্থ্য সকলের থাকে না, কাজেই শেষ পর্যন্ত বাকি থাকে বই। তাই ভেবেই হয়ত ওমর খৈয়াম বলেছিলেন,’–

    Here with a loaf of bread

    beneath the bough.

    A flash of wine, a book of

    verse and thou,

    Beside me singing in the wilderness

    And wilderness is paradise enow.

    রুটি মদ ফুরিয়ে যাবে, প্রিয়ার কালো চোখ ঘোলাটে হয়ে আসবে, কিন্তু বইখানা অনন্ত-যৌবনা—যদি তেমন বই হয়। তাই বোধ করি খৈয়াম তাঁর বেহেশতের সরঞ্জামের ফিরিস্তি বানাতে গিয়ে কেতাবের কথা ভোলেন নি।

    আর খৈয়াম তো ছিলেন মুসলমান। মুসলমানদের পয়লা কেতাব কোরানের সর্বপ্রথম যে বাণী মুহম্মদ সাহেব শুনতে পেয়েছিলেন তাতে আছে ‘আল্লামা বিল কলমি’ অর্থাৎ আল্লা মানুষকে জ্ঞান দান করেছেন ‘কলমের মাধ্যমে’। আর কলমের আশ্রয় তো পুস্তকে।

    বাইবেল শব্দের অর্থ বই — বই par excellence, সর্বশ্রেষ্ঠ পুস্তক — The Book.

    যে দেবকে সর্বমঙ্গলকার্মের প্রারম্ভে বিঘ্নহন্তারূপে স্মরণ করতে হয়, তিনিই তো আমাদের বিরাটতম গ্ৰন্থ স্বহস্তে লেখার গুরুভার আপনি স্কন্ধে তুলে নিয়েছিলেন। গণপতি ‘গণ’ অর্থাৎ জনসাধারণের দেবতা। জনগণ যদি পুস্তকের সম্মান করতে না শেখে, তবে তারা দেবভ্ৰষ্ট হবে।

    কিন্তু বাঙালি নাগর ধর্মের কাহিনী শোনে না। তার মুখে ঐ এক কথা ‘অত কাঁচা পয়হা কোথায়, বাওয়া, যে বই কিনব?’

    কথাটার মধ্যে একটুখানি সত্য—কনিষ্ঠাপরিমাণ—লুকনো রয়েছে। সেইটুকু এই যে, বই কিনতে পয়সা লাগে-ব্যস। এর বেশি আর কিছু নয়।

    বইয়ের দাম যদি আরো কমানো যায়, তবে আরো অনেক বেশি বই বিক্রি হবে সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। তাই যদি প্রকাশককে বলা হয়, ‘বইয়ের দাম কমাও’, তবে সে বলে ‘বই যথেষ্ট পরিমাণে বিক্রি না হলে বইয়ের দাম কমাবো কি করে?’

    ‘কেন মশাই, সংখ্যার দিক দিয়ে দেখতে গেলে বাঙলা পৃথিবীর ছয় অথবা সাত নম্বরের ভাষা। এই ধরুন ফরাসি ভাষা। এ-ভাষায় বাঙলার তুলনায় ঢের কম লোক কথা কয়। অথচ যুদ্ধের পূর্বে বারো আনা, চৌদ্দ আনা, জোর পাঁচ সিকে দিয়ে যে-কোন ভাল বই কেনা যেত। আপনারা পারেন না কেন?’

    ‘আজ্ঞে, ফরাসি প্রকাশক নিৰ্ভয়ে যে-কোন ভালো বই এক ঝট্‌কায় বিশ হাজার ছাপাতে পারে। আমাদের নাভিশ্বাস ওঠে দু’হাজার ছাপাতে গেলেই, বেশি ছাপিয়ে দেউলে হব নাকি?’

    তাই এই অচ্ছেদ্য চক্ৰ। বই সস্তা নয় বলে লোকে বই কেনে না, আর লোকে বই কেনে না বলে বই সস্তা করা যায় না।

    এ চক্র ছিন্ন তো করতেই হবে। করবে কে? প্রকাশক না ক্রেতা? প্ৰকাশকের পক্ষে করা কঠিন, কারণ ঐ দিয়ে পেটের ভাত যোগাড় করে। সে বঁটুকিটা নিতে নারাজ। এক্সপেরিমেন্ট করতে নারাজ—দেউলে হওয়ার ভয়ে।

    কিন্তু বই কিনে কেউ তো কখনো দেউলে হয় নি। বই কেনার বাজেট যদি আপনি তিনগুণও বাড়িয়ে দেন, তবু তো আপনার দেউলে হবার সম্ভাবনা নেই। মাঝখান থেকে আপনি ফ্রাঁসের মাছির মত অনেকগুলি চোখ পেয়ে যাবেন, রাসেলের মত এক গাদা নূতন ভুবন সৃষ্টি করে ফেলবেন।

    ভেবে-চিন্তে অগ্র-পশ্চাৎ বিবেচনা করে বই কেনে সংসারী লোক। পাঁড় পাঠক বই কেনে প্রথমটায় দাঁতমুখ খিচিয়ে, তারপর চেখে চোখে সুখ করে করে, এবং সর্বশেষে সে কেনে ক্ষ্যাপার মত, এবং চুর হয়ে থাকে তার মধ্যিখানে। এই একমাত্র ব্যসন, একমাত্র নেশা যার দরুন সকালবেলা চোখের সামনে সারে সার গোলাপী হাতি দেখতে হয় না, লিভার পচে পটল তুলতে হয় না।

    আমি নিজে কি করি? আমি একাধারে producer এবং consumer— তামাকের মিকশ্চার দিয়ে আমি নিজেই সিগারেট বানিয়ে producer এবং সেইটে খেয়ে নিজেই consumer: আরও বুঝিয়ে বলতে হবে? আমি একখানা বই produce করেছি।-কেউ কেনে না বলে আমিই consumer; অর্থাৎ নিজেই মাঝে মাঝে কিনি।

    * * *

    মার্ক টুয়েনের লাইব্রেরিখানা নাকি দেখবার মত ছিল। মেঝে থেকে ছাদ পর্যন্ত বই, বই, শুধু বই। এমন কি কর্পেটের উপরও গাদা গাদা বই স্তুপীকৃত হয়ে পড়ে থাকত-পা ‘ ফেলা ভার। এক বন্ধু তাই মার্ক টুয়েনকে বললেন, ‘বইগুলো নষ্ট হচ্ছে; গোটাকিয়েক শেলফ যোগাড় করছ না কেন?’

    মার্ক টুয়েন খানিকক্ষণ মাথা নিচু করে ঘাড় চুলকে বললেন, ‘ভাই, বলছে ঠিকই।—কিন্তু লাইব্রেরিটা যে কায়দায় গড়ে তুলেছি, শেলফ তো আর সে কায়দায় যোগাড় করতে পারিনে। শেলফ তো আর বন্ধুবান্ধবের কাছ থেকে ধার চাওয়া যায় না।’

    শুধু মার্ক টুয়েনই না, দুনিয়ার অধিকাংশ লোকই লাইব্রেরি গড়ে তোলে কিছু বই কিনে : আর কিছু বই বন্ধুবান্ধবের কাছ থেকে ধার করে ফেরৎ না দিয়ে। যে-মানুষ পরের জিনিস গলা কেটে ফেললেও ছোবে না। সেই লোকই দেখা যায় বইয়ের বেলা সর্বপ্রকার বিবেক-বিবর্জিত, তার কারণটা কি?

    এক আরব পণ্ডিতের লেখাতে সমস্যাটার সমাধান পেলুম।

    পণ্ডিত লিখেছেন, ‘ধনীরা বলে, পয়সা কামানো দুনিয়াতে সবচেয়ে কঠিন কর্ম। কিন্তু জ্ঞানীরা বলেন, না, জ্ঞানার্জন সবচেয়ে শক্ত কাজ। এখন প্রশ্ন, কার দাবিটা ঠিক, ধনীর না জ্ঞানীর? আমি নিজে জ্ঞানের সন্ধানে ফিরি, কাজেই আমার পক্ষে নিরপেক্ষ হওয়া কঠিন। তবে একটা জিনিস আমি লক্ষ্য করেছি, সেইটো আমি বিচক্ষণ জনের চক্ষুগোচর করাতে চাই। ধনীর মেহন্নতের ফল হ’ল টাকা। সে ফল যদি কেউ জ্ঞানীর হাতে তুলে দেয়, তবে তিনি সেটা পরমানন্দে কাজে লাগান, এবং শুধু তাই নয়, অধিকাংশ সময়েই দেখা যায়, জ্ঞানীরা পয়সা পেলে খরচ করতে পারেন ধনীদের চেয়ে অনেক ভালো পথে, ঢের উত্তম পদ্ধতিতে। পক্ষাস্তরে জ্ঞানচর্চার ফল সঞ্চিত থাকে পুস্তকরাজিতে এবং সে ফল ধনীদের হাতে গায়ে পড়ে তুলে ধরলেও তারা তার ব্যবহার করতে জানে না-বই পড়তে পারে না।’

    আরব পণ্ডিত তাই বক্তব্য শেষ করেছেন কিউ. ই. ডি দিয়ে ‘অতএব সপ্ৰমাণ হল জ্ঞানার্জন ধনার্জনের চেয়ে মহত্তর।’

    তাই প্রকৃত মানুষ জ্ঞানের বাহন পুস্তক যোগাড় করার জন্য অকাতরে অর্থব্যয় করে। একমাত্র বাঙলা দেশ ছাড়া।

    সেদিন তাই নিয়ে শোকপ্রকাশ করাতে আমার জনৈক বন্ধু একটি গল্প বললেন। এক ড্রইংরুম-বিহারিণী গিয়েছেন বাজারে স্বামীর জন্মদিনের জন্য সওগাত কিনতে। দোকানদার এটা দেখায়, সেটা শোকায়, এটা নাড়ে, সেটা কাড়ে, কিন্তু গরবিনী ধনীর (উভয়ার্থে) কিছুই আর মনঃপূত হয় না। সব কিছুই তাঁর স্বামীর ভাণ্ডারে রয়েছে। শেষটায় দোকানদার নিরাশ হয়ে বললে, ‘তবে একখানা ভাল বই দিলে হয় না?’ গরবিনী নাসিকা কুঞ্চিত করে বললেন, ‘সেও তো ওঁর একখানা রয়েছে।’

    যেমন স্ত্রী তেমনি স্বামী। একখানা বইই তাদের পক্ষে যথেষ্ট।

    অথচ এই বই জিনিসটার প্রকৃত সম্মান করতে জানে ফ্রান্স। কাউকে মোক্ষম মারাত্মক অপমান করতে হলেও তারা ঐ জিনিস দিয়েই করে। মনে করুন আপনার সবচেয়ে ভক্তিভালবাসা দেশের জন্য। তাই যদি কেউ আপনাকে ডাহা বেইজজৎ করতে চায়; তবে সে অপমান করবে। আপনার দেশকে। নিজের অপমান আপনি হয়ত মনে মনে পঞ্চাশ গুণে নিয়ে সয়ে যাবেন, কিন্তু দেশের অপমান আপনাকে দংশন করবে বহুদিন ধরে।

    আঁদ্রে জিদে’র মেলা বন্ধুবান্ধব ছিলেন–অধিকাংশই নামকরা লেখক। জিদ রুশিয়া থেকে ফিরে এসে সোভিয়েট রাজ্যের বিরুদ্ধে একখানা প্ৰাণঘাতী কেতাব ছাড়েন। প্যারিসের স্তালিনীয়ারা তখন লাগল জিদের পিছনে-গালিগালাজ কটুকটব্য করে জিদের প্রাণ অতিষ্ঠা করে তুললো। কিন্তু আশ্চর্য, জিদের লেখক বন্ধুদের অধিকাংশই চুপ করে সব কিছু শুনে গেলেন, জিদের হয়ে লড়লেন না। জিদের জিগরে জোর চোট লাগল–তিনি স্থির করলেন, এদের একটা শিক্ষা দিতে হবে।

    কাগজে বিজ্ঞাপন বেরল। জিদ তাঁর লাইব্রেরিখানা নিলামে বেচে দেবেন বলে মনস্থির করেছেন। প্যারিস খবর শুনে প্রথমটায় মূৰ্ছা গেল, কিন্তু সম্বিতে ফেরা মাত্রই মুক্তকচ্ছ হয়ে ছুটলো নিলাম-খানার দিকে।

    সেখানে গিয়ে অবস্থা দেখে সকলেরই চক্ষুস্থির।

    যে-সব লেখক জিদের হয়ে লড়েন নি, তাদের যে-সব বই তারা জিদকে স্বাক্ষর সহ উপহার দিয়েছিলেন, জিদ মাত্র সেগুলো নিলামে চড়িয়েছেন। জিদ শুধু জঞ্জালই বেচে ফেলছেন।

    প্যারিসের লোক তখন যে অট্টহাস্য ছেড়েছিল, সেটা আমি ভূমধ্যসাগরের মধ্যিখানে জাহাজে বসে শুনতে পেয়েছিলুম–কারণ খবরটার গুরুত্ব বিবেচনা করে রয়টার সেটা বেতারে ছড়িয়েছিলেন–জাহাজের টাইপ-করা একশো লাইনি দৈনিক কাগজ সেটা সাড়ম্বরে প্রকাশ করেছিল।

    অপমানিত লেখকরা ডবল তিন ডবল দামে আপন আপনি বই লোক পাঠিয়ে তড়িঘড়ি কিনিয়ে নিয়েছিলেন–যত কম লোকে কেনা-কাটার খবর জানতে পারে ততই মঙ্গল। (বাঙলা দেশে নাকি একবার এরকম টিকিট বিক্রি হয়েছিল!)

    শুনতে পাই, এঁরা নাকি জিদকে কখনো ক্ষমা করেন নি।

    * * *

    আর কত বলবো? বাঙালির কি চেতনা হবে?

    তাও বুঝতুম, যদি বাঙালির জ্ঞানতৃষ্ণা না থাকতো। আমার বেদনাটা সেইখানে! বাঙালি যদি হটেনটট হত, তবে কোনো দুঃখ ছিল না। এরকম অদ্ভুত সংমিশ্রণ আমি ভূভারতের কোথাও দেখি নি। জ্ঞানতৃষ্ণ তার প্রবল, কিন্তু কেনার বেলা সে অবলা! আবার কোনো কোনো বেশিরম বলে, ‘বাঙালির পয়সার অভাব’ বটে? কোথায় দাঁড়িয়ে বলছে লোকটা এ-কথা? ফুটবল মাঠের সামনে দাঁড়িয়ে, না সিনেমার টিকিট কাটার ‘কিউ’ থেকে।

    থাক্‌ থাক্‌। আমাকে খামাখা চটাবেন না। বৃষ্টির দিন। খুশ গল্প লিখব বলে কলম ধরেছিলুম। তাই দিয়ে লেখাটা শেষ করি। গল্পটা সকলেই জানেন, কিন্তু তার গূঢ়াৰ্থ মাত্র কাল বুঝতে পেরেছি। আরব্যোপন্যাসের গল্প।

    এক রাজা তাঁর হেকিমের একখানা বই কিছুতেই বাগাতে না পেরে তাঁকে খুন করেন। বই হস্তগত হল। রাজা বাহ্যজ্ঞান হারিয়ে বইখানা পড়ছেন। কিন্তু পাতায় পাতায় এমনি জুড়ে গিয়েছে যে, রাজা বার বার আঙুল দিয়ে মুখ থেকে থুথু নিয়ে জোড়া ছাড়িয়ে পাতা উল্টোচ্ছেন। এদিকে হেকিম আপন মৃত্যুর জন্য তৈরি ছিলেন বলে প্রতিশোধের ব্যবস্থাও করে গিয়েছিলেন। তিনি পাতায় পাতায় কোণের দিকে মাখিয়ে রেখেছিলেন মারাত্মক বিষ। রাজার আঙুল সেই বিষ মেখে নিয়ে যাচ্ছে মুখে।

    রাজাকে এই প্ৰতিহিংসার খবরটিও হেকিম রেখে গিয়েছিলেন কেতাবের শেষ পাতায়। সেইটে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে রাজা বিষবাণের ঘায়ে ঢলে পড়লেন।

    বাঙালির বই কেনার প্রতি বৈরাগ্য দেখে মনে হয়, সে যেন গল্পটা জানে, আর মরার ভয়ে বই কেনা, বই পড়া ছেড়ে দিয়েছে।

  • কাইরো

    কাইরো

    সৈয়দ মুজতবা আলী

    [book-name]

    কাইরো

    কাইরো যাওয়ার জন্য আলাদা করে কাঠখড় পোড়াবার প্রয়োজন হয় না। ইয়োরোপ যাবার সময় জাহাজ সুয়েজ বন্দরে থামে। সেখানে নেবে সোজা কাইরো চলে যাবেন। এদিকে আপনার জাহাজ অতি ধীরে মন্থরে সুয়েজ খালের ভিতর দিয়ে পোর্ট সইদের দিকে রওয়ানা হবে। খালের দুদিকে বালুর পাঁড় যাতে ভেঙে গিয়ে খালটাকে বন্ধ না করে দেয়, তার জন্য কড়া আইন, জাহাজ যেন গরুরগাড়ির গতিতে এগোয়। কাজেই জাহাজ সইদ বন্দর পৌঁছতে না পৌঁছতে আপনি কইরোতে ঢু মেরে ট্রেনে করে, সেই সাইদ বন্দরেই পৌঁছে যাবেন। সেই জাহাজেই চেপে, সেই কেবিনেই শুয়ে ইয়োরোপ চলে যাবেন-ফালতো কোনো খরচ লাগবে না।

    অবশ্য তাতে করে কইরোর মত শহরের কিছুই দেখা হয় না-আর কইরোতে দেখবার মত জিনিস আছে বিস্তর। পিরামিড দেখা হয়ে যাবে নিশ্চয়ই, এইটুকু যা সাত্ত্বিনা। জাহাজের অনেকেই আপনাকে বললেন, ঘণ্টা দশেকের জন্য কইরোতে ওরকমধারা ঢু মেরে বিশেষ কোন লভ্য নেই। আমারও সেই মত; কিন্তু তবু যে যেতে বলছি তার কারণ যদি আপনার পছন্দ হয়ে যায়, তবে হয়ত বিলেত থেকে ফেরার মুখে ফেরা কইরোতে নেবে দু’চার সপ্তাহ কাটিয়ে আসতে পারেন। ইয়োরোপে তো দেখবেন কুল্পে এক ইয়োরোপীয় সভ্যতা (ফরাসি, জর্মন, ইংরেজ যত তফাৎই থাক না কেন, তবু তো তারা আপোসে একটা সভ্যতাই গড়ে তুলেছে), আর দেখেছেন ভারতীয় সভ্যতা-তার উপর যদি আরেক তৃতীয় সভ্যতার সঙ্গে মোকাবেলা হয়ে যায়, তবে তাতে নিশ্চয়ই বিস্তর লভ্য।

    আমার লেগেছিল কইরো দেখতে পাক্কা একটি বচ্ছর! অতদিন আপনি থাকবেন না সে আমি জানি। আপনার অতটা সময় লাগবে না—সে কথাও জানি। কারণ আমি কাটিয়েছিলুম প্রথম ছ’টি মাস শুধু আডা মেরে মেরে—বাড়ির ছাতের উপর থেকে পিরামিড স্পষ্ট দেখা যায়, ট্রামে করে হুশ করে সেখানে যেতে কোনোই বাধা নেই, পূর্ণিমায় আবার ইম্পিশাল সার্ভিস, তৎসত্ত্বেও ছাটি মাস কেটে গেল এ-কাফে ও-কাফে করে করে, পিরামিড দেখার ফুরসৎ আর হয়ে ওঠে না। বন্ধুরা কেউ জিজ্ঞেস করলে দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে বলতুম, ‘সবই ললাটঙ্ক লিখন। কলকাতায় দশ বছর কাটিয়ে ‘গঙ্গাস্তান’ যখন হয়ে উঠেনি, তখন বাবা-পিরামিড দর্শন কি আমার কপালে আছে?’ (আসল কারণটা চুপেচুপে বলি;–এক গাদা পাথর দেখায় যে কি তত্ত্ব তা আমি পিরামিড দেখার আগে এবং পরে কোনো অবস্থাতেই ঠিক ঠাহর করে উঠতে পারি নি।)

    সে কথা থাক; সভ্যতা, পিরামিড এ-সব জিনিস নিয়ে অন্য জায়গায় পাণ্ডিত্য ফলাব। ‘বসুমতী’র পাঠকরা এতদিনে আমাকে বিলক্ষণ চিনে গিয়েছেন, আমার মুখে পাণ্ডিত্যের কথা শুনলে ঠা-ঠা করে হেসে উঠবেন, তাই সেই আড্ডাতেই ফিরে যাই।

    আমি ভালোবাসি হেদো, হাতিবাগান, শ্যামবাজার। ও-সব জায়গায় তাজমহল নেই, পিরামিড নেই। তাতে আমার বিন্দুমাত্র খেদও নেই। আমি ভালোবাসি আমার পাড়ার চায়ের দোকানটি। সেখানে সকাল-সন্ধ্যা হাজিরা দিই, পাড়ার পটলা, হাবুল আসে, সবাই মিলে বিড়ি ফুঁকে গুষ্ঠীসুখ অনুভব করি আর উজির-নাজির মারি। আমার যা কিছু জ্ঞান-গম্মি তা ঐ আড্ডারই ঝড়তি-পড়তি মাল কুড়িয়ে নিয়ে।

    তাই যখন কপালের গর্দিশে কাইরোতে বাসা বাঁধতে হল, তখন আড্ডাভাবে তিনদিনেই আমার নাভিশ্বাস উপস্থিত হল। ছন্নের মত শহরময় ঘুরে বেড়াই আর পটলাহাবলুর বসন্ত রেস্টুরেন্টের জন্য সাহারার উষ্ণ নিশ্বাসের সঙ্গে আপনি দীর্ঘ নিশ্বাস মেশাই। এমন সময় সদগুরুর কৃপায় একটা জিনিস লক্ষ্য করলুম—পাড়ার কফিখানাতে রোজই দেখতে পাই গোটা পাঁচেক লোক বসন্ত রেস্টুরেন্টেরই মত চেঁচামেচি কাজিয়া-ঝগড়া করে আর নেচার কফি খায়, বিস্তর সিগারেট পোড়ায়।

    দিন তিনেক জিনিসটা লক্ষ্য করলুম, কখনো কফিখানায় বসে, কখনো ফুটপাথে দাঁড়িয়ে। নূতন শহরের সব কিছুই গোড়ার দিকে সুর-রিয়ালিস্টিক ছবির মতো এলোপাতাড়ি ধরনের মনে হয়? অর্থ খাড়া হতে হতে কয়েকদিন কেটে যায়। যখন ব্যাপারটা বুঝতে পারলুম। তখন আমেজ করলুম, আমাদের বসন্ত রেস্টটুরেন্টের আডডা যখন গুরুচণ্ডাল সক্কলের জন্যই অবারিত দ্বার, তখন এরাই বা আমাকে ব্রাত্য করে রাখবে কেন? হিম্মৎ করে তাদের টেবিলের পাশে গিয়ে বসলুম আর করুণ নয়নে তাদের দিকে মাঝে মাঝে তাকালুম। শকুন্তলার হরিণও বুঝি ওরকম ধারা তাকাতে পারত না।

    দাওয়াই ধরলো। এক ছোকরা এসে অতিশয় বিনয়ের সঙ্গে আমার পরিচয় নিল এবং জানালো তাদের আড়ায় বিস্তর সীট ভেকেন্ট, আমি যদি ইত্যাদি। আমাকে তখন আর পায় কে? ভাঙা ফরাসি, টুটাফুটা আরবী, পিজন ইংরিজি সবকিছু জড়িয়ে-মাড়িয়ে দু’মিনিটের ভিতরেই তাঁদের সবাইকে বসন্ত রেস্টুরেন্টে নেমেন্তন্ন করলুম পটলা-হাবলুর ঠিকানা দিলুম, বসন্ত যে ভেজাল তেল আর পচা হাঁসের ডিম দিয়ে খাসা মামলেট বানায় তার বর্ণনা দিতেও ভুললুম না।

    কিন্তু কোথায় লাগে আমাদের আড কইরোর আডডার কাছে। বাঙালি আড্ডার সব কটা সুখ কইরোর আডডাতে তো আছেই; তার উপর আরেকটা মস্ত সুবিধার কথা এই বেলা বলি, যার জন্য এতক্ষণ ধরে ভূমিকা দিলুম।

    দুনিয়ার যত ফেরিওলা কইরোর কাফেতে চক্কর মেরে যায়। টুথব্রাশ, সাবান, মোজা, আরশি, চিরুনি, নোটবুক, পেন্সিল, তালাচাবি, ফাউন্টেন পেন, ঘড়ি—হেন বস্তু নেই যা ফেরিওলা নিয়ে আসে না! আমি জানি, আপনি সহজে বিশ্বাস করবেন না, কিন্তু ধর্মসাক্ষী, দর্জি পর্যন্ত বস্তা বস্তা কাপড় মুটের ঘাড়ে চাপিয়ে কাফের ভিতর চক্কর মেরে যায়। কাইরোর লোক দোকানে যেতে ভালোবাসে না। তাতে নাকি সময় নষ্ট হয়, আর দোকানী এক পেয়ে আপনাকে ঠকাবেও নিশ্চয়। আড্ডাতে বন্ধু-বান্ধব রয়েছেন। পাঁচজনে মিলে বরং ফেরিওয়ালাকে ঘায়েল করার সম্ভাবনা অনেক বেশি।

    একপ্রস্ত সুট বানাবার বাসনা ছিল। আড্ডাতে সেটা সবিনয় নিবেদন করলুম। পাশ দিয়ে দর্জি যাচ্ছিল-ডাক দিতে সবাই হাঁ হাঁ, করো কি করো কি?’ বলে বাধা দিলেন! ‘ও ব্যাটা সুট বানাবার কি জানে? প্লাস্তিরাস আসুক। গ্ৰীক বটে, ঠিকাবার চেষ্টা করবে, কিন্তু আমরাও তো পাঁচজন আছি। ও কাপড় আনে ঠকিয়ে, কাস্টম না দিয়ে। আমরাও ওকে ঠকাতে পারলে টাকায় আট আনা লাভ। ঠাকলে দু আনা লাভ। অথবা কুইট্‌স।’ তারপর আড়া আমায় বুঝিয়ে বলল, যে সুট বানাতে চায় সে যেন বর। তার কথা কওয়া ভালো দেখায় না। সে কনেপক্ষের প্যাচে পড়ে বানচাল হয়ে যাবে, গয়নাগুলো যাচাই না করে নিয়ে ফেলে আখেরে পস্তাবে।

    প্লাস্তিরাস এল। তারপর বাপরে বাপ। সে কী অসম্ভব দরদস্তুর, বকবকি,-শেষটায় হাতাহাতির উপক্রম। আড্ডা বলে, ‘ব্যাটা তুমি দুনিয়া ঠকিয়ে খাও, তোমাকে পুলিশে দেব।’ প্লাস্তিরাস বলে, ‘ও দামে সুট বানালে আমাকে আপনি পাতলুন বন্ধক দিয়ে কাচ্চা-বাচ্চার জন্য আন্ডারুটি কিনতে হবে।’

    পাক্কা তিনঘণ্টা লড়াই চলেছিল। এর ভিতর প্লাস্তিরাস তিনবার রাগ করে কাপড়ের বস্তা নিয়ে চলে এল, তিনবার ফিরে এল। আড্ডাও দল বাড়াবার জন্য কাফের ছোকরাকে পাঠিয়ে আমাদের গ্ৰীক সভ্য পাউলুসকে ডেকে আনিয়েছে। তখন লাগিল গ্ৰীকে গ্ৰীকে লড়াই। সূড-এটেন নিয়ে হিটলার চেম্বারলেনে এর চেয়ে বেশি দর-কষাকষি নিশ্চয়ই হয় নি। যখন রাফারফি হল তখন রাত এগারোটা। আমি বাড়ি ফিরে শুয়ে পড়েছিলুম-আডডা তাতে আপত্তি জানান নি, বরের উপস্থিতি অপরিহার্য নয়। কাফের ছোকরা আমাকে বিছানা থেকে টেনে নিয়ে গেল। মাপ দেওয়া হল। তিন দিন বাদে পয়লা ট্রায়েল-অবশ্য কাফেতেই।

    তিন দিন বাদে আড্ডা ফুল ষ্ট্রেনাথে হাজির। আমি কাফের পিছনের কামরায় গিয়ে নূতন সুট পরে বেরিয়ে এলুম। সর্বত্র চকের দাগ আর তাঁতীবাড়ির মত আমার সর্বাঙ্গ থেকে সূতো বুলছে। সুটের চেহারা দেখে সবাই চেচিয়ে উঠলেন, ‘মার লাগাও ব্যাটা প্লাস্তিরাসকে; এ কি সুট বানিয়েছে, না মৌলবী সাহেবের জোব্বা কেটেছে? ও কি পাতলুন, না চিমনির চোঙা? প্লাস্তিরাস দজি না হাজাম? ইত্যাদি সর্বপ্রকারের কটুকটব্য। প্লাস্তিরােসও হেঁকে বলল, সে স্বয়ং বাদশার সুট বানায়। সবাই বললে, ‘কোন বাদশা? সাহারার?’

    তারপর এ বলে আস্তিন কাটো, ও বলে কলার ছাঁটো। কেউ বলে পাতলুন নামাও, কেউ বলে কোট তোলো। প্লাস্তিরাসও পয়লা নম্বরের ঘড়েল–সকলের কথায় কান দেয় আবার কারো কথায় কান দেয়ও না, অর্থাৎ যা ভালো বোঝে। তাই করে।

    এই করে করে কাফেতে আডা জমানোর সঙ্গে সঙ্গে তিনটে ট্রায়েল পেরলুম। সুট তৈরি হল। আমি সেইটে পরে বরের মত লাজুক হাসি হেসে সবাইকে সেলাম করলুম। সুন্ট দীর্ঘজীবী হোক বলে সবাই আশীৰ্বাদ করলেন। কাফের মালিক পর্যন্ত আমাদের পরিবে: সামিল হল। আমি সব্বাইকে একপ্রস্থ কফি খাওয়ালুম। সে-সুট পরে আজও যখন ফার্পোতে যাই গুণীরা তারিফ করেন।

  • পুলিনবিহারী

    পুলিনবিহারী

    সৈয়দ মুজতবা আলী

    [book-name]

    পুলিনবিহারী

    ছেলেবেলায় যে-রকম গলাজল ঠেলে ঠেলে খাল পেরতুম, ঠিক সেইরকম পূবের হাওয়া ঠেলে ঠেলে সমুদ্রপারে পৌঁছতে হল।

    অন্য দিন সমুদ্র থেকে থেকে এক-একখানা করে ঢেউ পাঠায়। সে অনেক দূর থেকে পায়তারা কষে কষে দড়ি পাকিয়ে পাকিয়ে কোমর বেঁধে শেষটায় পড়ে এসে আছাড় খায়। আজ বিশাল আয়োজন। একসঙ্গে অনেকগুলো পালোয়ান; একজনের পিছনে আরেকজন পায়তারা কষে কষে আসছে। তারপর পাড়ে এসে হুটোপুটি-দোস্ত-দুশমনের সনাক্ত হওয়ার গোলমালে আপসে হানাহানি। শেষটায় কোলাকুলিতে মিলে গিয়ে ছোট ছোট দ’য়ে জমে যাওয়া।

    সমস্ত আকাশ জুড়ে ছেঁড়া ছেড়া রঙিন মেঘ-এলোমেলো, যেন আর্টিস্টের পেলেটে, এলোপাতাড়ি হেথা হোথায় এবড়ো-থেবড়ো রঙ। কিন্তু তবু সবসুদ্ধ মিলে গিয়ে যেন কেমন একটা সামঞ্জস্য রয়েছে—মনে হয় না অদলবদল করলে কিছু ফেরফার হবে।

    বসেছিলুম জলের আর জেলেপাড়ার মাঝখানে। পিছনে নারকেল বন—তাতে আগুন লাগিয়ে সূর্য প্রচণ্ড মহিমায় অস্ত গেলেন-গরবিনীর সতীদাহ। সমুদ্রের গর্জন আর ঢেউয়ে-ভেসে-আসা-পোনা-মাছ-লুব্ধ কাকের কর্কশ চিৎকার, নারকেল গাছের উস্কো খুস্কো মাথার অবিশ্রান্ত আছাড় খাওয়া—অশান্তির চরম আয়োজন।

    তাই বোধ করি একটি জেলে-ডিঙিও জলে নামে নি। লম্বা সারি বেঁধে কাৎ হয়ে পড়ে আছে ডাঙায়, যেন ডিসেকশান টেবিলের সারি সারি মড়া। সমস্ত তীরে মাত্র দুটি জেলে সূতো ফেলে গভীর ধৈর্যে মাছ ধরার চেষ্টাতে আছে। জোয়ারের জোর টোপ ধুয়ে নিয়ে যায় ক্ষণে ক্ষণে, নূতন টোপ সাজতে হয়—তবু তাদের ধৈর্য অসীম। বাদবাকি ছেলেবুড়ো বালুপাড়ে বসে আছে-এত মেহন্নত করে লাভ নগণ্য।

    অন্ধকার নামল অতি ধীরে ধীরে। পাটরাণী তো চিতেয় উঠলেন লাল টকটকে হয়ে। আকাশ সিঁদুর মুছলেন অতি অনিচ্ছায়—এ মেঘে ওমেঘে হাত বুলিয়ে বুলিয়ে। সকলের শেষ পান্না জল লালে-নীলে মেশা বেগুনি ঝিলিকটুকু মুছে ফেলে আস্তে আস্তে শ্যামলা সবুজ হলেন।

    কোনদিন আবার রঙের রাজা মাত্র তিনটি রঙ নিয়ে খেলায় বসেন। সমুদ্র আর পূবের আকাশকে দেন কালো-নীল, পশ্চিম আকাশকে একটুখানি গোলাপী আর মাথার উপর বাকি সমস্ত আকাশ পায় ফিকে ফিরোজা। যতক্ষণ না কালে পরদায় সব কিছু ঢাকা পড়ে যায়, ততক্ষণ শুধু এই তিন রঙের ফিকে ঘন’র খেলা। তাতে কতই না। কারচুপি। এদিকে কালো-নীল যন্ত ঘনিয়ে ঘনিয়ে নীলের রেশ কমাতে লাগল, ওদিকে তেমনি গোলাপী ফিকে হতে হতে শিরিষ রঙের আমেজ নিতে আরম্ভ করল। মাঝখানের আকাশ ফিরোজাতে শ্বেত-চন্দনের প্রলেপ লাগিয়েই যাচ্ছে। এ যেন তিন স্বর নিয়ে খেলা। আর তবলাও ঠিক বাঁধা। পশ্চিমের আকাশ যদি দ্রুত লয়ে রঙ বদলান। তবে পূবও সঙ্গে সঙ্গে পাল্লা দিয়ে তাল রাখেন। আর সমুদ্রের গর্জনে যেন তানপুরোর আমেজ।

    সমে এসে যখন পূব-পশ্চিম মিলে গেল অন্ধকারে, তখন তানপুরোর রেশটুকুমাত্র রইল সাগরপারে। মশালাচি এসে আসমানের ফরাসে এখানে-ওখানে তারার মোমবাতি জুলিয়ে রেখে গেল। এবার রাত্রির মুশায়েরা (কবিসঙ্গম) বসবে। নারকেল গাছ মাথা দোলাবে, ঝিঝি নুপুর বাজিয়ে নাচবে, পূবের বাতাস সভার সর্বাঙ্গে গোলাপজল ছিটিয়ে ঠাণ্ডা করে যাবে। তারপর দূর সাগরের ওপারে লাল মদের ভাঁড় থেকে মাতাল চাঁদ উঠবেন। ধীরে ধীরে গা টেনে টেনে, একটুখানি কাৎ হয়ে। মোসাহেবদের মুখে হাসি ফুটবেঅন্ধকারে যারা গা-ঢাকা দিয়ে বসেছিল, তাদের সবাইকে তখন চেনা যাবে।

    * * *

    সমুদ্রপারে, নীল গম্বুজের তলে, বিশ্ব-সংসারের ঠিক মাঝখানে যখনি বসি তখন মনে হয়, যেন সার্কসের গোল তাবুর মাঝখানে আমাকে কে যেন বসিয়ে দিয়েছে আর চতুর্দিকে গ্যালারিতে লাল হলদে সোনালি মেঘের পাল অপেক্ষা করছে আমি কখন বাঁদর-নাচ আরম্ভ করব।

    ভারি অস্বস্তি বোধ হয়।

    এই সব রঙচঙা মেঘের দল অত্যন্ত অভদ্র চার-আনী দৰ্শক।

    হঠাৎ একজন যেন হেসে হেসে লাল হয়ে ফেটে পড়ার যোগাড় করে পাশের আরেক চার-আনীকে কি বলে। সেও তখন লাল হয়ে উঠে তার পাশের জনকে সে কথা বলেদেখতে দেখতে সমস্ত র্তাবুর সবাই লাল হয়ে ওঠে। যেদিকে তাকাই সেদিকেই হাসির লুটোপুটি।

    লুকোবার জায়গা নেই।

    বাড়ির দিকে রওয়ানা দিলুম বিরক্ত হয়ে।

    কিন্তু তবু সেই মাঝখানেই। তবু যেন তার চার-আনীর দলকে সঙ্গে নিয়ে আমারই চতুর্দিকে ঠিক তেমনি ঘিরে দাঁড়াতে চায়।

    বিশ্বসংসার আমাকে বাঁদর-নাচ না নাচিয়ে ছাড়বে না।

    * * *

    দু’জোড়া কপোত-কপোতী নিত্যি নিত্যি দেখতে পাই। একে অন্যকে পেয়েই তারা খুশি। সে খুশি তাদের বসাতে, চলাতে, তাদের হাত-পা নাড়াচাড়াতে যেন উপচে পড়ে। এক জোড়া সমুদ্রের পারে পারে পা-চারী করে–ছেলেটা যেমন ছ’ফুট ঢাঙা, মেয়েটিও তেমনি পাঁচ ফুটের কমতি। ছেলেটার কর্ম, মেয়েটার দুই জুতো এক ফিতেতে বেঁধে কড়ে আঙ্গুলে বুলিয়ে দোলাতে দোলাতে লম্বা-লম্বা পা পেলে এগিয়ে চলা; মেয়েটা শুধু-পায়ে ভিজে বালির উপর দিয়ে চড়ুই পাখির মত লাফ দিয়ে দিয়ে নেচে যায়-কেউ তাড়া করে এলে লাফ দিয়ে এক পাশে সরে যায়, চলে গেলে বেঁকে গিয়ে জলের দিকে এগোয়। খাটো করে। পরা ফ্রক, পা দুটি সুডোল ঘন শ্যামবর্ণ। কথাবার্তা কখনো কইতে শুনি নি—একে অন্যের দিকে তাকায় পর্যন্ত না। এগুতে এগুতে তারা আডায়ার পর্যন্ত চলে যায়, তবু দূর থেকেও তাদের চেনা যায়-ঢ্যাঙ আর বেঁটে। ঢাঙা নাক-বরাবর সোজা চলেছে, মেয়েটি এঁকে-বেঁকে।

    আরেক জোড়া সমস্তক্ষণ বসে থাকে ডাঙায়-তোলা একটা নৌকের আড়ালে কুণ্ডলীপাকানো জালের বস্তায় হেলান দিয়ে। সমুদ্রের দিকে তাকায় না, পিছনের সূর্যস্তও জালের বস্তায় ঢাকা পড়ে। সমস্তক্ষণ গুজুর গুজুর। কখনো খুব পাশাপাশি ঘেঁষে বসে, ছেলেটা মেয়েটির কোলে হাত রেখে, কখনো দেখি মেয়েটির হাত ছেলেটির কোমর জড়িয়ে। বেড়ায় না, ডাইনে-বঁয়ে তাকায় না। রাত ঘনিয়ে এলে একই সাইকেলে চড়ে উত্তর দিকে চলে যায়।

    * * *

    দূর থেকে রোষে-ক্ৰোধে তর্জন-গৰ্জনে আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত করে সিন্ধুপারে লুটিয়ে পড়ে অবশেষে এ কী বিগলিত আত্মনিবেদন।

    তাণ্ডবের ডমরু বাজিয়ে, ছিন্নমস্তার আত্মঘাতে নিজেকে বারে বারে দ্বিখণ্ডিত করে, পাড়ে এসে অবশেষে লক্ষ কিঙ্কিণীর এ কী মৃদু শান্ত নূপুর-গুঞ্জরণ!

    সূর্যোদয়ের লোহিতোজ্বল রক্ত-টিপ, দ্বিপ্রহরের অতি ঘন নীলাম্বরী, সন্ধ্যার গৈরিক পট্টবাস, সর্বশেষে অন্ধকারে সর্বস্ব ত্যাগ করে অভিসারে সিন্ধুপারে মৃদু পদসঞ্চারণ!

  • আহারাদি

    আহারাদি

    সৈয়দ মুজতবা আলী

    [book-name]

    আহারাদি

    যে লোক উদ্ভিদতত্ত্ব জানে না, সে দেশী-বিদেশী যে-কোন গাছ দেখলেই মনে করে, এও বুঝি এক সম্পূর্ণ নূতন গাছ। তখন নূতন গাছের সঙ্গে তার চেনা কোনো গাছের কিছুটা মিল সে যদি দেখতে পায়। তবে অবাক হয়ে ভাবে, এই চেনা-অচেনায় মেশানো গাছের কি অন্ত নেই। কিন্তু শুনেছি, উদ্ভিদ-বিদ্যা নাকি পৃথিবীর বেবাক গাছকে এমন কতকগুলো শ্রেণীতে ভাগ করে ফেলেছে যে, নূতন কোনো গাছ দেখলে তাকে নাকি কোনো একটা শ্রেণীতে ফেলে নামকরণ পর্যন্ত করা যায়। আশ্চর্য নয়, কারণ ধ্বনির বেলা তো তাই দেখতে পাচ্ছি। ইংরিজি শুনে মনে হয় যে, এই বিকট ভাষায় স্বর-ব্যঞ্জনের বুঝি অন্ত নেই। কিন্তু ডেনিয়েল জোনস এবং পূর্বাচার্যগণ এমনি উত্তম শ্রেণীবিভাগ করে ফেলেছেন যে, আজ আমরা বাপঠাকুরদার চেয়ে বহু কম মেহন্নতে ইংরিজি উচ্চারণ শিখতে পারি।

    আহারাদির বেলাও তাই। আপনার হয়ত কোনো কাবুলীওয়ালার সঙ্গে মিতালি হল। সে আপনাকে দাওয়াত করে খাওয়াল। প্রথমটায় আপনি হয়ত ভেবেছিলেন যে, হাতুড়ি বাটালি সঙ্গে নিয়ে যেতে হবে। গিয়ে দেখেন, খেতে দিল তোফা পোলাও আর খাসা মুরগীর ঝোল। তবে ঠিক জাকারিয়া স্ট্রীটের মত রান্না নয়, কলকাতাবাসী পশ্চিমা মুসলমানরা যে রকম রান্না করে ঠিক সে রকম নয়। কেমন যেন একটুখানি আলাদা, কিন্তু খেতে উমদা।

    অথবা মনে করুন। আপনাকে প্যারিসের কোনো রেস্তোরাঁয় আপনার ভারতীয় বন্ধু হাঙ্গেরিয়ান গুলশ খেতে দিলেন। হয়তো আপনি ইয়োরোপে এসেছেন মাত্র কয়েকমাস হল—নানা প্রকার যাবনিক খাদ্য খেয়ে খেয়ে আপনার পিত্তি (উভয়ার্থে) চটে আছে। তখন সেই ‘গুলাশ’ দেখে আপনি উদ্বাহু হয়ে নৃত্য করবেন। সেই রাত্রেই আপনি গিন্নিকে চিঠি লিখলেন, ‘বহুকাল পরে মাংসের ঝোল খেয়ে বিমলানন্দ উপভোগ করলুম।’ কারণ হাঙ্গে রিয়ান গুলাশ’ আর সাদা-মাটা মাংসের ঝোলে কোনো তফাৎ নেই।

    আর আপনার বন্ধু যদি ন’সিকে গুণী হন এবং সেই গুলাশের সঙ্গে খেতে দেন ইতালিয়ান রিসোত্তো’, তাহলে আপনাকে হাতি দিয়ে বেঁধেও সেই রেস্তোরা থেকে বের করা যাবে না। ইয়োরোপের বাকি কটা দিন আপনি সেই রেস্তোরার টেবিল বেড়ালছানার মত আঁকড়ে ধরে পড়ে থাকতে চাইবেন। কারণ বহুকাল যাবনিক আহারাদির পর মাংসের ঝোল আর রুটি মুখরোচক বটে, কিন্তু তার সঙ্গে কি পোলাও আর মাংসের ঝোলের তুলনা হয়? ঘড়েল পাঠক নিশ্চয়ই এতক্ষণে ধরে ফেলেছেন যে, ইতালিয়ান রিসোত্তো’ মানে পোলাও, তবে ঠিক, ভারতীয় পোলাও নয়। কোপ্তা-পোলাওয়ের কোপ্তাগুলোকে যদি ছোট্ট ছোট্ট টুকরো করে পোলাওয়ে মিশিয়ে দেওয়া হয়, তবে তাই হবে রিসোত্তো।

    অথবা মনে করুন, দেশে ফেরার সময় আপনি একদিনের তরে কাইরোতে ঢু মেরে এলেন। কিছু কঠিন কর্ম নয়, পোর্ট সাইব্দে জাহাজ থেকে নেমে ট্রেনে কাইরো, সেখানে ঘণ্টা বারো কাটিয়ে মোটরে করে সুয়েজ বন্দরে পৌঁছে ফের সেই জাহাজই ধরা যায়—কারণ জাহাজ সুয়েজ খাল পেরোয় অতি ধীরে ধীরে।

    কাইরোতে খেলেন মিশরী রান্না। চাক্তি চাক্তি মাংস খেতে দিল, মধ্যিখানে ছ্যাদা। দাঁতের তলায় ক্যাঁচ ক্যাঁচ করে বটে, কিন্তু সোওয়াদ খাসা। খাচ্ছেন আর ভাবছেন বস্তুটা কি, কিন্তু কোন হদিস পাচ্ছেন না। হঠাৎ মনে পড়ে যাবে, খেয়েছি বটে আমজাদিয়ায় এইরকম ধারা জিনিস-শিককাবাব তার নাম। তবে মশলা দেবার বেলা কঞ্জসী করেছে বলে ঠিক শিককাবাবের সুখটা পেলেন না।

    এতক্ষণে আপনার শাস্ত্ৰাধিকার হল। এই যে মশলার তত্ত্বটা আবিষ্কার করতে পেরেছেন, এরই খেই ধরে আপনি রান্নার শ্রেণী বিভাগ নিজেই করে ফেলতে পারবেন।

    পৃথিবীতে কুল্লে দুই রকমে রান্না হয়। মশলাযুক্ত এবং মশলাবর্জিত। মশলা জন্মে প্রধানত ভারতবর্ষে, জাভায়, মালয়ে। ইউরোপে মশলা হয় না। তাই ইউরোপীয় রান্না সাধারণত মশলাবর্জিত।

    এবার ঈষৎ ইতিহাসের প্রয়োজন। তুর্ক পাঠানরা যখন এদেশে আসে তখন পশ্চিম এবং উত্তর ভারত নিরামিষ খেত। তুর্ক পাঠানরা মাংস খেত বটে, কিন্তু সে রান্নায় মশলা থাকত না। তুর্ক-পাঠান-মোগলরা যে রকম ভারতবর্ষের অলঙ্কার কারুকার্যের সঙ্গে তুর্কিস্থানী ইরানী স্থাপত্য মিলিয়ে তাজমহল বানালো, ঠিক সেইরকম ভারতীয় মশলার সঙ্গে তাদের মাংস রান্নার কায়দা মিলিয়ে এক অপূর্ব রান্নার সৃষ্টি করল। আপনারা তাজমহল দেখে আহা ‘আহা।’ করেন, আমি করি না। কারণ তাজমহল চিবিয়ে খাওয়া যায় না। আর খাস মোগলাই রান্না পেলেই আমি খাই এবং খেয়ে জিন্দাবাদ বাবুর আকবর’ বলি-যদিও তারা বহুকাল হল এ-জিন্দেগীর খাওয়াদাওয়া শেষ করে চলে গিয়েছেন।

    ***

    এই ‘মোগলাই রান্না ক্ৰমে ক্ৰমে ভারতবর্ষের তাবৎ মাংস-খেকোদের ভিতর ছড়িয়ে পড়ে। (বাঙালি আর দ্রাবিড়ের কথা আলাদা; এরা মাংস খায় কম, আর খাস মোগলপাঠানের সংস্পর্শে এসেছে তারও কম। পিরালী ঠাকুরবাড়ি ব্যত্যয়, তারা মোগলের সঙ্গে খানিকটা মিশেছিলেন বলে তাঁদের রান্নায় বেশ মোগলাই খুশবাই পাওয়া যায়)। এমন কি মোগলের দুশমন রাজপুত মারাঠারা পর্যন্ত মোগলাই খেতে আরম্ভ করল। এখনো রাজপুতানা, বরোদা, কোল্‌হাপুর রাজ্যের সরকারি অতিথিশালায় উঠলে বাবুর্চি প্রথম দিনই শুধায় ‘মোগলাই’ না নিরামিষ খাবে। আমার উপদেশ–মোগলাইটাই খাবেন–তাতে করে পরজন্মে অজ-শিশু হয়ে জন্মালেও আপত্তি নেই।

    মোগল-পাঠানরা এই রান্না আফগানিস্থান-তুর্কীস্থানে প্রচলিত করল। আস্তে আস্তে সেই রান্নাই তাবৎ মধ্যপ্রাচ্য ছেয়ে ফেলল। তবে যত পশ্চিম পানে যাবেন, ততই মশলার মেকদার কমে আসবে। অর্থনীতিতে নিশ্চয়ই পড়েছেন, উৎপত্তিস্থল থেকে কোন বস্তু যতদূরে যাবে ততই তার দাম বেড়ে যায়। আফগানিস্থানের রান্নায় যে, হলুদ (কাবুলীরা বলে ‘জীরদ চোপ’ অর্থাৎ হলদে কাঠ) পাবেন, ইস্তাম্বুল পর্যন্ত সে হলুদ পৌঁছয় নি।

    তুর্করা বল্কান জয় করে, হাঙ্গেরি পেরিয়ে ভিয়েনার দরজায় হানা দেয়। হাঙ্গেরিতে মোগলাই মাংসের ঝোল ‘হাঙ্গেরিয়ান গুলাশে’ পরিবর্তিত হল এবং মিশরী এবং তুর্কদের সঙ্গে যোগাযোগের ফলে ভেনিসের কারবারীরা মিনসট-মীটে’র পোলাও বা রিসোত্তো বানাতে শিখল। গ্ৰীস সেদিন পর্যন্ত তুর্কীর তীব্বেতে ছিল, তাই গ্ৰীসের পোশাকী রান্না আজও চেগা-চাপকন পরে থাকে।

    পৃথিবীতে দ্বিতীয় উচ্চাঙ্গের রান্না হয়। প্যারিসে কিন্তু মশলা অতি কম, যদিও ইংরেজি রান্নার চেয়ে ঢের ঢের বেশি। এককালে তামাম ইয়োরোপ ফ্রান্সের নকল করত, তাই বন্ধান গ্ৰীসেও প্যারিসি রান্না পাবেন। গ্ৰীস উভয় রান্নার সঙ্গমস্থল। বাকি জীবনটা যদি উত্তম আহারাদি করে কাটাতে চান, তবে আস্তানা গাড়ন গ্ৰীসে (দেশটা বেজায় সস্তা)। লঞ্চ, ডিনার, সাপার খাবেন ফরাসী মোগলাই এবং ঘরোয়া গ্ৰীক কায়দায়। ভূড়ি কমাবার কোমরবন্দ সঙ্গে নিয়ে যাবেন—গ্ৰীসে এ জিনিসের বড় বেশি চাহিদা বলে বস্তুটা বেজায় আক্রা।

    সুশীল পাঠক, স্পষ্ট বুঝতে পারছি, আপনি অতিষ্ট হয়ে উঠছেন। আপনার মনে আঁকুবাবু প্রশ্ন, রান্না-জগতে বাঙালির অবদান কি?

    আছে, আছে। মাছ, ছানা এবং বাঙালি বিধবার নিরামিষ রান্না।

    কিন্তু তার আগে তো চীনা রান্নার বয়ান দিতে হয়। মোগলাই, ফরাসী এবং চীনা এই ত্রিমূর্তির বর্ণনা না করে আমি ‘প্রাদেশিক সঙ্কীর্ণতা’র প্রশ্রয় দিতে চাইনে।

    আরেকদিন হবে। বৈদ্যরাজ বলেছেন, দীর্ঘজীবী হয়ে যদি বহুকাল ধরে উদরামার্গের সাধনা করতে চাও, তবে বীজমন্ত্র হচ্ছে জীৰ্ণে ভোজনং’। অর্থাৎ হজম না করা পর্যন্ত পুনরায় আর বসবে না। তাও যদি না মানেন, তবে চটে গিয়ে সুকুমার রায়ের ভাষায় বলব (দোষটা তীর, কটু বাক্যটা তিনিই কয়েছেন)–

    এত খেয়ে তবু যদি নাহি ওঠে মনটা।
    খাও তবে কচু পোড়া, খাও তবে ঘণ্টা।

  • নেতাজী

    নেতাজী

    সৈয়দ মুজতবা আলী

    [book-name]

    নেতাজী

    আমাদের মত সাধারণ লোকের পক্ষে সুভাষচন্দ্রের মত মহাপুরুষের জীবনী আলোচনা করা অন্ধের হস্তী-দর্শনের ন্যায়। তৎসত্ত্বেও যে আমরা সুভাষচন্দ্রের জীবনী দর্শনে প্রবৃত্তি হয়েছি তার প্রধান কারণ, আমাদের মত অর্বাচীন লেখকেরা যখন মহাপুরুষকে শ্রদ্ধাঞ্জলি দেবার জন্য ঐ একমাত্র পন্থাই খোলা পায়, তখন তার শ্রদ্ধাবেগ তাকে অন্ধত্বের চরমে পৌঁছিয়ে দেয়-শ্রদ্ধা ও ভক্তির আতিশয্যা তখন আমাদের চেয়ে সহস্ৰগুণে উত্তম লেখককেও বাচাল করে তোলে।

    দ্বিতীয় কারণ, এক চীনা গুণী জনৈক ইংরেজকে ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে বুঝিয়ে বলছিলেন, ‘সরোবরে জল বিস্তর কিন্তু আমার পাত্র ক্ষুদ্র। জল তাতে ওঠে অতি সামান্য। কিন্তু আমার শোক নেই-মই কাপ ইজ স্মল-বাট আই ড্রিঙ্ক অফতেনার (My cup is small but I drink oftener)।’

    আমাদের পাত্র ছোট, কিন্তু যদি সুভাষা-সরোবর থেকে আমরা সে পাত্র ঘন ঘন ভরে নিই তাহলে শেষ পর্যন্ত সরোবর নিঃশেষ হোক আর নাই হোক, আমাদের তৃষ্ণা নিবৃত্তি নিশ্চয়ই হবে। আমার পাত্রে উঠেছে দুই গণ্ডুষ জল, অথবা বলব, আমি অন্ধ, হাত দিয়ে ফেলেছি সৌভাগ্যক্রমে দুটি দাঁতেরই উপর। অবশ্য সব অন্ধই ভাবে, সেই সবচেয়ে মহামূল্যবান স্থলে হাত দিয়ে ফেলেছে, কাজেই এ-আন্ধের অভিমত আত্মম্ভরিতাপ্রসূতও হতে পারে।

    প্রথম, বর্মায় সুভাষচন্দ্ৰ কি কৌশলে হিন্দু-মুসলমান-শিখকে এক করতে পেরেছিলেন? এবং শুধু তাই নয়, ভারতবর্ষে ফেরার পরও এদের অধিকাংশ অখণ্ডবাহিনীরূপে আত্মপরিচয় দিতে চেয়েছিলেন। আমরা জানি, সুভাষচন্দ্রের সাইগন আসার বহুপূর্বে রাসবিহারী বসু অনেক চেষ্টা করেও কোনো আজাদ হিন্দ ফৌজ গড়ে তুলতে পারেন নি। অথচ রাসবিহারী বসু, সুভাষচন্দ্রের তুলনায় জাপানীদের কাছে অনেক বেশি পরিচিত ছিলেন—জাপান-ফের্তা ভারতীয়দের মুখে শুনেছি। রাসবিহারী বসুকে জিজ্ঞাসা না করে জাপান সরকার কখনো কোনো ভারতীয়কে জাপানে থাকবার ছাড়পত্র মঞ্জুর করত না।

    একদিকে যেমন দেখতে পাই, সুভাষচন্দ্ৰ ‘আজাদ হিন্দ’ নামটি অনায়াসে সর্বজনপ্রিয় করে তুললেন, অন্যদিকে দেখি, কৃতজ্ঞ মুসলমানেরা তাঁকে ‘নেতাজী’ নাম দিয়ে হৃদয়ে তুলে নিয়েছে-‘কাইদ-ই-আকবর’ বা ঐ জাতীয় কোনো দুরূহ আরবী খেতাব র্তাকে দেবার প্রয়োজন তারা বোধ করে নি। পাঠকের স্মরণ থাকতে পারে, তখন এ-দেশে হিন্দি-উর্দু সমস্যা কংগ্রেসকে প্রায়ই বিচলিত করত, অথচ দেখি সুভাষচন্দ্ৰকে এ সমস্যা একবারের তরেও কাতর করতে পারে নি। বেতারে আমি সুভাষচন্দ্রের প্রায় সব বক্তৃতাই শুনেছি এবং প্রতিবারই বিস্ময় মেনেছি হিন্দি-উর্দুর অতীত এ ভাষা নেতাজী শিখলেন কি করে? নেতাজী তো শব্দ তাত্ত্বিক ছিলেন না, ভাষার কলাকৌশল আয়ত্ত করবার মত অজস্র সময়ও তো তাঁর ছিল না। এ-রহস্যের একমাত্র সমাধান এই যে, রাজনৈতিক অন্তদৃষ্টি যে মহাত্মার থাকে, দেশকে সত্যই যিনি প্রাণ মন সর্বচৈতন্য সর্বানুভূতি দিয়ে ভালোবাসেন, সাম্প্রদায়িক কলহের বহু ঊর্ধ্বে নিৰ্দ্ধন্দ্ব পূণ্যলোকে যিনি অহরহ বিরাজ করেন, যে মহাপুরুষ দেশের অখণ্ড সত্যরূপ ঋষির মত দর্শন করেছেন, বাক্যব্ৰহ্মা তার ওষ্ঠাগ্রে বিরাজ করেন। তিনি যে ভাষা ব্যবহার করেন, সে-ভাষা সত্যের ভাষা, ন্যায়ের ভাষা, প্রেমের ভাষা। সে-ভাষা শুদ্ধ হিন্দি অপেক্ষাও বিশুদ্ধ হিন্দি, শুদ্ধ উর্দু অপেক্ষাও বিশুদ্ধ উর্দু। সে-ভাষা তার নিজস্ব ভাষা। এই ভাষাই মহাত্মাজীর আদর্শ ভাষা ছিল।

    নিজের মনকে বহুবার প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করেছি, সুভাষচন্দ্র না হয় সর্বদ্বন্দ্বের ঊর্ধ্বে উডভীয়মান ছিলেন, কিন্তু সাধারণ সৈন্যকে তিনি কি করে সাম্প্রদায়িকতা থেকে মুক্ত করলেন? যে উত্তর শেষ পর্যন্ত গ্ৰহণ করেছি, সেটা ঠিক কি না জানি না; আমার মনে হয়, সুভাষচন্দ্ৰ শুদ্ধ মাত্র সাম্প্রদায়িকতা দূর করার জন্য কখনো কোমর বেঁধে আসরে নামেন নি। আমার মনে হয়, সুভাষচন্দ্র এমন এক বৃহত্তর জাজ্জ্বল্যমান আদর্শ জনগণের সম্মুখে উপস্থিত করতে পেরেছিলেন, এবং তার চেয়েও বড় কথা, এমন এক সৰ্ব্বজনগ্রহণীয় বীর্যজনকাম্য পন্থা দেখাতে পেরেছিলেন যে, কি হিন্দু, কি মুসলমান কি শিখ সকলেই সাম্প্রদায়িক স্বার্থের কথা সম্পূর্ণ ভুলে গিয়ে দেশের স্বাধীনতাসংগ্রামে যোগদান করেছিলেন। আমি যেন চোখের সামনে দেখতে পাই, সুভাষচন্দ্র বলছেন, ‘আগুন লেগেছে, চল আগুন নেভাই, এই আমার হাতে জল। তোমরাও জল নিয়ে এসো।’ সুভাষচন্দ্ৰ কিন্তু এ কথা বলছেন না, ‘আগুন নেভাতে হলে হিন্দু-মুসলমানকে প্রথম এক হতে হবে, তারপর আগুন নেভাতে হবে। এস প্রথমে মিটিং করি, প্যাক্ট বানাই, শিলমোহর লাগাই তারপর স্বরাজ।’

    বৃহত্তর আদর্শের সামনে দাঁড়িয়ে মানুষ ক্ষুদ্র স্বাৰ্থ ত্যাগ করেছে—তা সে ব্যক্তিগত স্বাের্থই হোক আর সাম্প্রদায়িক স্বার্থই হোক-এ তো কিছু অভূতপূর্ব জিনিস নয়। স্বীকার করি এ জিনিস বিরল। তাই এ রকম আদর্শ দেদীপ্যমান করতে পারেন অতি অল্প লোকই, তাই সুভাষচন্দ্রের মত নেতা বিরল।

    দ্বিতীয় যে গজদন্ত আমি অনুভব করতে পেরেছি, সেটি এই :–

    দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের মাঝামাঝি তিনজন নেতা স্বেচ্ছায় নির্বাসন বরণ করে দেশোদ্ধারের জন্য মার্কিন-ইংরেজের শত্রুপক্ষকে সাহায্য করতে প্ৰস্তুত ছিলেন। এদের মধ্যে প্রথম জেরুজালেমের গ্র্যান্ডমুফতী এবং দ্বিতীয় ইরাকের আবদুর রশীদ। এদের দুজনই আপন আপন দেশের একচ্ছত্র নেতা ছিলেন। তৃতীয় ব্যক্তি আমাদের নেতাজী। তিনি ভারতবর্ষের সর্বপ্রধান নেতা ছিলেন না।

    তিনজনই কপৰ্দকহীন, তিনজনই সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলেন আপন আপনি যশ এবং চরিত্রবল। প্রথম দুজনের স্বজাতি ছিল উত্তর আফ্রিকায়, অথচ শেষ পর্যন্ত দেখা গেল এঁদের কেউই কোনো সৈন্যবাহিনী গঠন করে তুনিসিয়া আলজেরিয়ায় ইংরেজের সঙ্গে লড়তে পারলেন না; শুধু তাই নয়, জর্মন রমেল যখন উত্তর আফ্রিকায় বিজয় অভিযানে বেরুলেন, তখন এঁদের কাউকে সঙ্গে নিয়ে যাবারও প্রয়োজন তিনি অনুভব করলেন না। এদের কেউই জর্মন সরকারকে আপনি ব্যক্তিত্ব দিয়ে অভিভূত করতে পারলেন না। শেষ পর্যন্ত তাদের গতি হল। আর পাঁচজনের মত ইতালি থেকে বেতারযোগে আরবীতে বক্তৃতা দিয়ে ‘প্রোপাগ্যান্ডা’ করার।

    অথচ, পশ্য, পশ্য সুভাষচন্দ্ৰ কি অলৌকিক কর্ম সমাধান করলেন। স্বাধীন রাষ্ট্র নির্মাণ করে, ইংরেজের ‘গৰ্ব্ব ভারতীয় সৈন্যদের।’ এক করে, আজাদ হিন্দ ফৌজ গঠন করে তিনি ভারতবর্ষ আক্রমণ করলেন। বর্ম-মালয়ের হাজার হাজার ভারতবাসী সর্বস্ব তাঁর হাতে তুলে দিল, স্বাধীনতা-সংগ্রামে প্রাণ দেবার জন্য কড়াকড়ি পড়ে গেল।

    আমরা জানি, জাপান চেয়েছিল সুভাষচন্দ্র ও তাঁর সৈন্যগণ যেন জাপানী ঝাণ্ডার নীচে দাঁড়িয়ে লড়েন (মুফতী এবং আবদুর রশীদ জর্মনীকে সে সুযোগ দিয়েও বাধ্য করাতে পারেন নি)। সুভাষচন্দ্ৰ কবুল জবাব দিয়ে বলেছিলেন, ‘আমি আজাদ হিন্দ ও তার ফৌজের নেতা। আমার রাষ্ট্র নির্বাসনে বটে, কিন্তু সে-রাষ্ট্র স্বাধীন এবং সার্বভৌম! যদি চাও, তবে সে রাষ্ট্রকে স্বীকার করার গৌরব তোমরা অর্জন করতে পারো। যদি ইচ্ছা হয়, তবে অস্ত্রশস্ত্ৰ এবং অর্থ দিতে পারো-এক স্বাধীন রাষ্ট্র যে রকম অন্য স্বাধীন রাষ্ট্রকে মিত্রভাবে ধার দেয়, কিন্তু আমি কোনো ভিক্ষা চাই না এবং আমার সৈন্যগণ আজাদ হিন্দ’ ভিন্ন অন্য কোনো রাষ্ট্রের বশ্যতা স্বীকার করে যুদ্ধ করবে না।’

    এই ইন্দ্রজাল কি করে সম্ভব হল? সুভাষচন্দ্রের আত্মাভিমান যেমন তাঁকে বাঁচিয়েছিল জাপানের বশ্যতা না করা থেকে, তেমনি তার গভীর অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে তিনি দেখতে পেয়েছিলেন যে, জাপান তার কথামত চলতে বাধ্য হবে। তার সঙ্গে সঙ্গে আরো কত গুণ, কত কুটবুদ্ধি, কত দুঃসাহস, কত নির্বিকার ধৈর্য, কত চরিত্রবলের প্রয়োজন হয়েছিল, আমাদের মত সাধারণ লোক কি তার কল্পনাও করতে পারে।

    কপর্দকহীন, সামৰ্থ্যসম্বলহীন সুভাষচন্দ্ৰ টোকিয়োতে এক দাঁড়িয়ে–প্রথম দেখি এই ছবি। তারপর দেখি, সেই সুভাষচন্দ্ৰ নেতাজীরূপে স্বাধীন রাষ্ট্রের স্বাধীন সৈন্যবাহিনীর পুরোভাগে দাঁড়িয়ে, ভারতেরই এক কোণে।

    যতই বিশ্লেষণ করি না কেন, এই দুই ছবির মাঝখানের পর্যয়গুলো ইন্দ্ৰজাল–ভানুমতীই থেকে যায়। এ যুগে না জন্মে। এ কাহিনী ইতিহাসে পড়লে কখনই বিশ্বাস করতুম

    ‘জিন্দাবাদ নেতাজী’।

  • রোগক্ষয়—শিক্ষালাভ

    রোগক্ষয়—শিক্ষালাভ

    সৈয়দ মুজতবা আলী

    [book-name]

    রোগক্ষয়—শিক্ষালাভ

    মানুষ যেমন বিষের ধুঁয়ো এটম বম বানিয়ে তার আপন ভাইকে অসহ্য যন্ত্রণা দিয়ে মারতে শিখেছে—ঠিক তেমনি এমন মানুষেরও অভাব নেই যাঁরা মানুষের দুঃখ-কষ্ট লাঘব করার জন্য সমস্ত কল্পনাশক্তি, সর্বশেষ রক্তবিন্দু ক্ষয় করতে প্ৰস্তুত আছেন। কেন জানিনে, আজ হঠাৎ এঁদেরই একজনের কথা মনে পড়লো। এই প্ৰাতঃস্মরণীয় পুরুষের নাম মসিয়ো লুই ভোতিয়ে।

    আমি তখন জিনীভায়। এক অচেনা ভদ্রলোক এসে আমার সঙ্গে দেখা করে অনুরোধ করলেন, লেজাঁয় তাঁর যক্ষ্মারোগীর সানাটোরিয়ামটি আমি যদি দেখতে যাই তবে তিনি অত্যন্ত খুশি হবেন। ফ্রান্স, জর্মনি, সুইটজারল্যান্ডে বিস্তর সানাটরিয়া দেখেছি, সর্বত্রই সব গুণীর মুখে একই কথা, যক্ষ্মার বিশেষ কোনো চিকিৎসা নেই, তবে রোগী যদি মনস্থির করে ফেলে যে, যমকে চোখের জলে নাকের জলে না করা পর্যন্ত সে মরবে না, অর্থাৎ বিছানায় শুয়ে শুয়েই সে হিম্মৎ নামক অস্ত্রখানি দিয়ে তার সঙ্গে লড়াই দেবেই দেবে, তবে হয়ত, হয়ত কেন, নিশ্চয়ই সে বীরকে বাঁচাবার একটা চেষ্টা করাতে কিছুমাত্র আপত্তি নেই।’

    আমি ডক্টর ভোতিয়েকে এ-কথাটি স্মরণ করিয়ে দিতে তিনি ভারী খুশি হলেন। বললেন, ‘আপনি যখন এ তত্ত্বটা জানেন আপনারই বিশেষ করে লেজাঁতে আসা উচিত।’ তবু আমার যেতে ইচ্ছা করছিল না; কারণ যক্ষ্মার হাসপাতাল দেখা কিছুমাত্র আনন্দদায়ক অভিজ্ঞতা নয়। কিন্তু ভোতিয়ে সেই শ্রেণীর লোক যাঁরা খানিকটে হোসে, খানিকটে যুক্তিতর্ক দিয়ে, খানিকটে অনুনয়-বিনয় করে গররাজি লোককে নিমরাজি নিজের পারে পটিয়ে টেনে নিয়ে যেতে পারেন। আমি খানিকটে ধস্তাধস্তি করেছিলুম, কিন্তু তখন যদি জানতুম যে ভোতিয়ে মুসসোলীন এবং লয়েড জর্জের কাছ থেকে আপন হাসপাতালের জন্য টাকা বাগাতে সমর্থ হয়েছেন, তাহলে নিশ্চয়ই আপত্তি না করে সুবোধ ছেলেটির মত সুড়সূড় করে লেজ চলে যেতুম।

    লেজাঁ যেতে হয় চেন-রেলওয়ে ধরে। এমনই ভয়ঙ্কর খাড়া পাহাড়ের উপর যক্ষ্মা সানাটরিয়ামগুলো বানানো হয়েছে যে সাধারণ ট্রেন, এমন কি মোটরও সেখানে পৌঁছতে পারে না।

    হোটেল আছে; কিন্তু যখন নিতান্ত এসেই গিয়েছি তখন সানাটরিয়ামের ভিতর থাকলেই তো দেখতে পাবো বেশি।

    মসিয়ো ভোতিয়ে, মাদাম, এমন কি বাচ্চা দুটো পর্যন্ত আমাকে দিল-খোলা অভ্যর্থনা জানালেন। বাচ্চা দুটোর বয়স ছয় আর আট। এদের জন্ম হয়েছে এই সানাটরিয়ামেই। তারা সুস্থ। শাঁখানেক যক্ষ্মরোগীর সঙ্গে তারা খায়-দায় খেলাধূলা গল্পগুজব করে-বাপ-মা’র তাতে কোনো ভয় নেই। আমিই তাহলে ডির্যাব কেন?

    মসিয়ো ভোতিয়ে বললেন, ‘আপনি নিশ্চয়ই লক্ষ্য করেছেন, যক্ষ্মা রোগটা ছেলেছোকরাদেরই হয় বেশি। বরং এ রোগটার সবচেয়ে বড় ডেরা খাটানো রয়েছে কলেজে কলেজে। কলেজের ছোকরারা এ রোগে মরেও সবচেয়ে বেশি। অপেক্ষাকৃত বয়স্ক রোগী কিংবা নিতান্ত বাচ্চাকে বাঁচানো অনেক সহজ।

    ‘তার প্রধান-প্রধান কেন, একমাত্র কারণ, যক্ষ্মা হলেই তাদের পড়াশোনা ছেড়ে দিতে হয়। তারা তখন ভবিষ্যৎ অন্ধকার দেখে। ভাবে, পড়াশোনা যদি নাই করতে পারলুম তবে দু’পাঁচ বৎসর পরে সেরে গিয়েই বা করব কি? খাবো কি? সংসারই বা পাতবো কি দিয়ে?

    ‘তাই তারা রোগের সঙ্গে লড়বার আর কোনো প্রয়োজন দেখতে পায় না, সব হিম্মত হারিয়ে ফেলে, এগিয়ে মৃত্যুর হাতে আপন জানটি ভেট দেয়।’

    মসিয়ো ভোতিয়ে বললেন, যাবে থেকে আমি যক্ষ্মা রোগ নিয়ে কাজ আরম্ভ করেছি তখন থেকেই আমি কাজে, কাজের ফাঁকে ফাঁকে, অবসর সময়ে অহরহ ভেবেছি। এর কোনো প্ৰতিকার করা যায়। কিনা? শেষ পর্যন্ত আমি যে প্ৰতিকার আবিষ্কার করতে সক্ষম হয়েছি তারই ভিতরে আজ আপনি আমি বসে কথা বলছি—তার নাম ‘সানাটরিয়া ইউনিভেসিতের’, অর্থাৎ ‘বিশ্ববিদ্যালয় আরোগ্যায়তন’।

    ‘এখানে শুদ্ধৃমাত্র কলেজের ছেলেমেয়েদের নেওয়া হয়। এবং জিনীভা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে আমাদের বন্দোবস্ত, যেন আমাদের রোগীদের টার্ম হিসেবে নেওয়া হয় অর্থাৎ এরা জিনীভায় ক্লাস না করে ক্লাস করছে এই সানাটোরিয়ামে। এরা এখানেই পড়াশোনা করে, সুইটজারল্যান্ডের সব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অধ্যাপকরা এখানে এসে মাঝে মাঝে লেকচার দিয়ে যান, তাছাড়া যক্ষ্মবৈরী বহু নিমন্ত্রিত রবাহুত গুণী এখানে এসে দু’দশ দিন থেকে ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ায় নানাপ্রকারে সাহায্য করে যান।

    ‘বুঝতেই পারছেন, ‘যে-সব বিষয় নিলে ভয়ঙ্কর বেশি খাটতে হয়, সেগুলোর ব্যবস্থা এখানে নেই। তাই নিয়ে ছেলেমেয়েরাও বেশি কান্নাকাটি করে না, তারা জানে, সে ধরনের পড়াশোনা করলে তাদের শরীর কখনো সারবে না। তারা খুশি কোনো কিছু একটা নিয়ে পাশ দিতে পারলেই; কাজেই বিজ্ঞানের ছেলে দর্শন নিতে আপত্তি করে না, ইঞ্জিনিয়ারিঙের ছেলে ইতিহাস উৎসাহের সঙ্গেই পড়ে।

    ‘অবশ্য স্বাস্থ্যের অবস্থার উপর পড়াশোনার মেকদার নির্ভর করে। আমাদের সব সময় কড়া নজর, কেউ যেন বড্ড বেশি না খাটে। কিছুদিন থাকার পর রোগীরাও তত্ত্বটা বুঝে ফেলে, আর নূতন রোগীদের ধমক দিয়ে ব্যাপারটা তাদের কাছে জলের মত তরল করে দেয়। আমাকে তো আজকাল এ-নিয়ে বিলকুল মাথা ঘামাতে হয় না। ওদের চিকিৎসার দিকে এখন আমি আরো বেশি সময় দিতে পারি।’

    একটুখানি চোখ টিপে মুচকি হেসে বললেন, ‘পড়াশোনা বিশেষ হয় না, সে তো বুঝতেই পারছেন। তা নাই বা হল। ছেলেমেয়েরা সাহস তো পায় বেঁচে থাকবার, সেইটেই হল আসল কথা। জিনীভা বিশ্ববিদ্যালয়ও আমার কলটা বেশ বুঝতে পেরেছেন, আমিই তাদের খোলাখুলি বলে রেখেছি, এখানে মধ্যযামিনীর তৈল ক্ষয় নিষিদ্ধ, বেশি পড়াশোনা এখানে হতেই পারে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষেরা তো আর হৃদয়হীন পাষাণ নন; এখান থেকে যারা পরীক্ষা দেয়, তাদের প্রতি তারা সদয়, আর যারা সেরে উঠে বাকি টার্মগুলো জিনীভায় কাটায় তাদের প্রতিও মোলায়েম ব্যবহার করেন।’

    দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে বললেন, ‘কিন্তু টাকা পাই কোথায়? অঢেল টাকার দরকার। আমি পনেরো বছর ধরে তামাম ইয়োরোপ চষে বেড়াচ্ছি। টাকার জন্য। মুসসোলীনি, লয়েড জর্জ থেকে আরম্ভ করে যেখানে যে আমাকে সামান্যতম সাহায্য করতে পারে তারই দরজায় হ্যাট পেতে ভিক্ষা মেঙেছি।

    ‘এখন আমার ইচ্ছা এ-প্রতিষ্ঠানটিকে ইন্টারনেশনাল–সার্বজনীন সার্বভৌমিক করার। ভারতবর্ষ থেকে যদি রোগী ছাত্র আসে। তবে তার জন্য যেন এখানে আমি ব্যবস্থা করতে পারি, সেও যেন নিরাময় হয়, সঙ্গে সঙ্গে জিনীভা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাধি নিয়ে ফিরতে পারে। আপনাদের দেশে তো রাজা মহারাজদের অনেক টাকা-দানখয়রাতও তারা করেন। শুনেছি।’

    আমি মনে মনে দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে বললুম, ‘এককালে রাজ-রাজড়ারা বিস্তর দান-ধ্যান করতেন এ-কথা সত্যি, আজকালও যে একেবারেই নেই সে-কথা আমি বলব না। আপনি যদি স্বয়ং ভারতবর্ষে আসেন তবে একটা চেষ্টা দিয়ে দেখতে পারি। আমার দ্বারা যোগসূত্র স্থাপনের যেটুকু সামান্য সাহায্য সম্ভবপর–

    ডক্টর ভোতিয়ে আমার দু’খানা হাত চেপে ধরে নীরবে আমার চোখের দিকে সকৃতজ্ঞ নয়নে তাকিয়ে রইলেন।

    আমি দেশে ফিরে এলুম। তারপর লেগে গেল ১৯৩৯-এর লড়াই। সুইটুজারল্যান্ড ছোট্ট দেশ। সীমান্ত রক্ষার জন্য ভোতিয়ের মত ডাক্তারকে উর্দি পারে ব্যারাকে ঢুকতে হল–অবশ্য ডাক্তারের উর্দি। কিন্তু তার এ-দেশে আসাটা আর হয়ে উঠল না।

    * * *

    মসিয়ো লুই ভোতিয়ে সুইটুজারল্যান্ডের লেজাঁ নামক স্থানে যে ‘আরোগ্যায়তন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত করেছেন, সেখানে যক্ষ্মা সারানোর সঙ্গে সঙ্গে লেখাপড়া শেখানোর অভিনব সমন্বয় বহু সুইজারল্যান্ডবাসীর হৃদয়মন আকৃষ্ট করেছে। তারা অকৃপণ হস্তে এপ্রতিষ্ঠানে অর্থদান করেছেন এবং তাদেরও ইচ্ছা। এ-প্রতিষ্ঠানটি ক্রমে ক্রমে বিশ্বজনের সম্পদ হয়ে উঠুক। কিন্তু উপস্থিত জাতীয়তাবাদ নামে যে বর্বরতা পৃথিবীকে শতধা বিভক্ত করে দিচ্ছে, তার সামনে মসিয়ো ভৌতিয়ে নিরূপায়। তাই আমার বিশ্বাস, যতদিন সুইটজারল্যান্ডে বিশ্বকল্যাণের জন্য সর্বাঙ্গসুন্দর ব্যবস্থা না হয়, ততদিন এ দেশে আমাদেরও চুপ করে বসে থাকা অনুচিত হবে। লেজাঁতে যে প্রতিষ্ঠান সম্ভবপর হয়েছে, এদেশেই বা তা হবে না কেন? বরঞ্চ এদেশে তার প্রয়োজন অনেক বেশি; কারণ এদেশের ছাত্র-সমাজে যক্ষ্মরোগের যে প্রসার তার সঙ্গে অন্য কোন দেশেরই তুলনা হয় না। অম্মদেশীয় যক্ষ্মবৈরী সজ্জন সম্প্রদায় আশা করি কথাটা ভেবে দেখবেন।

    কিন্তু এ-হেন গুরুতর বিষয় নিয়ে মাদৃশ অর্বাচীন জনের অত্যধিক বাগাড়ম্বর অশোভনীয়। আমার উচিত, যোগাযোগের ফলে আমার যে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা হয়েছে সেইটে পাঁচজনকে শুনিয়ে দেওয়া। তারপর কে কি করল না করল তা নিয়ে আমার মাথা ঘামাবার প্রয়োজন নেই।

    লেজাঁয় যক্ষ্মরোগের জন্য কি চিকিৎসা করা হয়, সে সম্বন্ধে সালঙ্কার বিবৃতি দেবার প্রয়োজন নেই। দক্ষিণ ভারতের মদনপল্লীর আরোগ্য-বরমে’ যে-সব ব্যবস্থা আছে, সেগুলো তো আছেই তার উপর লেজ এবং ডাভোসের অন্যান্য মামুলী সানাটরিয়াতে যক্ষ্মরোগ বাবদে যে-সব গবেষণা অষ্টপ্রহর করা হচ্ছে, তার ফলও মসিয়ো ভোতিয়ে অহরহ পাচ্ছেন।

    সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষাদান। এবং তার এক প্রধান অঙ্গ নানা দেশের নানা গুণীকে লেজাঁতে নিমন্ত্রণ করে তাদের কাছ থেকে জ্ঞান আহরণ করা। তার জন্য ভোতিয়ের প্রতিষ্ঠানে একটি চমৎকার লেকচার থিয়েটার আছে। অন্যান্য সানাটরিয়াতে এরকম হলের প্রয়োজন হয় না।

    আমার দৃঢ় বিশ্বাস, আমি লেজাঁ পৌঁছবার ঠিক কয়েকদিন আগে দু-তিনজন বড় বড় ‘পণ্ডিতের গুরু গুরু ভাষণের গুরুভোজনের ফলে ছেলেমেয়েরা ঈষৎ কাতর হয়ে পড়েছিল। তাই বোধ করি, মসিয়ো ভোতিয়ে একটা জব্বর রকমের জোলাপের ব্যবস্থা করেছিলেন। মসিয়ো ভোতিয়ে আমাকে সোজাসুজি বললেন, ‘আপনি একটা লেকচার দিন। জর্মন কিংবা ফ্রেঞ্চ, যে-কোনো ভাষায়!

    আমি বললুম, ‘আপনি যদিও জাতে সুইস, আপনার মাতৃভাষা ফরাসি এবং আপনি ফরাসি ঐতিহ্যে গড়ে-ওঠা বিদগ্ধজন। কাজেই আপনিও নেপোলিয়নের মত ‘অসম্ভব’ কথাটায় বিশ্বাস করেন না এবং তাই আপনার পক্ষে এ অনুরোধ করাটা অসম্ভব নয়; আমি কিন্তু ফরাসি নয়, আমি অসম্ভব’ কথাটা জানি এবং মানি। আমার পক্ষে বক্তৃতা দেওয়া অসম্ভব।

    এগারো বৎসর হয়ে গিয়েছে, সম্পূর্ণ কথোপকথনটা আমার আজ আর মনে নেই। তবে চোখ বন্ধ করলে যে ছবিটি এখনো মনের ভিতর দেখতে পাই, তাতে আছে-এক বিরাট ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন যেন আমার দিকে দু’বাহু বাড়িয়ে এগিয়ে আসছে আর আমি ক্রমেই পিছু হটে হটে শেষটায় দেয়ালের সঙ্গে মিশে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছি। আর পিছু হটবার জায়গা নেই। ফ্রাঙ্কেনস্টাইনের দুহাত আমার গলা টিপে ধরেছে। হাত দুখানি বলছে, ‘এতগুলো রোগীকে আপনি নিরাশ করবেন?’

    আমি অস্ফুট কণ্ঠে বলেছিলুম,

    ‘পড়েছি যবনের হাতে
    খানা খেতে হবে সাথে।’

    * * *

    ঝটপট ইশতিহার বেরিয়ে গেল ‘ভারতীয় অমুক কাল সন্ধ্যায় লেজাঁর ‘সানাতরিয়াঁ ইউনিভের্সিতের সুইসে’ একখানা ভাষণ দেবেন। বিষয়…। লেজাঁর তাবৎ সানোতরিয়ার অধিবাসিকৃন্দকে সাদর নিমন্ত্রণ করা হচ্ছে। অর্থাৎ ভোতিয়ে সাহেবের প্রতিষ্ঠানের পাঁচজন তো আসবেনই, অন্যান্য সানাতরিয়াঁর আরো বহু দুশমনকে ডাকা হয়েছে আমার মুখোশ খসাবার জন্য-কিন্তু ধর্ম সাক্ষী, আমি অনেক মুখোশ পরেছি বটে, পাণ্ডিত্যের মুখোশ কখনো পরি নি।

    ভোতিয়ে বললেন, ‘চলুন, হলটার ব্যবস্থা কি রকম হল দেখবেন।’

    লোকটা নিশ্চয়ই স্যাডিস্ট। এই যে সামনে পুজো আসছে, আমরা তো কখনো বলির মোষটাকে হাড়িকাঠ। দেখিয়ে চ্যাটাস চ্যাটাস করে ঠোঁট চাটিনে।

    গিয়ে দেখি মধ্যিখানে বেশ খানিকটে জায়গা ফাঁকা রেখে চতুর্দিকে চেয়ার বেঞ্চি পাতা হয়েছে। তবে কি আমাকে ওখানে ফেলে জবাই করা হবে-আমার ছট্‌ফটানির জন্য ব্যাপক ব্যবস্থা করা হয়েছে? কি হবে বৃথা প্রশ্ন জিজ্ঞেস করে? গর্দিশ, গর্দিশ, সবই কপালের গর্দিশ।

    তোতিয়ে ব্যবস্থাটা দেখে চ্যাটাস চ্যাটাস করলেন, অদৃশ্য সাবানে হাত দুটো কচলালেন। বুঝলুম, আমার অনুমান ভুল নয়। জবাইটা জব্বর ধরনেরই হবে।

    ফ্রম থর্ন টু থর্ন অর্থাৎ কাঁটায় কাঁটায় সাতটায় ভোতিয়ে আমাকে সেই হলে নিয়ে ঢোকালেন।

    দেখি ফাঁকা জায়গাটা ভরে গিয়েছে বিস্তর হুইল-চেয়ারে। যে-সব রোগীর পায়ের হাড়ে যক্ষ্মা অথবা যাদের নড়াচড়া করা বারণ, তাদের আনা হয়েছে হুইল-চেয়ারে করে। জন দুই শুয়ে আছে লম্বা লম্বা কৌচ সোফায়। পরে জানলুম, যারা নিতান্তই খাট ছাড়তে পারে না তাদের জন্য ঘরে ঘরে ইয়ার ফোনে’র ব্যবস্থা করা হয়েছে।

    একজন দেখি হুইল-চেয়ারে বসে পাইপ টানছে। তখন আমার গর্দানে ঘি মালিস করা হচ্ছে—অর্থাৎ কে যেন যা-তা আবোল-তাবোল বকে আমার পরিচয় দিচ্ছে। ভোতিয়ে আমার পাশে বসে-পাছে আমি শেষমূহুর্তে পালাবার চেষ্টা করি। কানে কানে জিজ্ঞেস করলুম, ‘পাইপ সিগারেট খাওয়া যক্ষ্মরোগীদের বারণ নয়?’ ভোতিয়ে বললেন, ‘ভিতরে তামাক না থাকলে নিশ্চয়ই বারণ নয়।’ আমি বললুম, অর্থাৎ?’ অর্থাৎ বেচারীর যক্ষ্মা হওয়ার পূর্বে সে দিনরাত পাইপ টানত। অভ্যাসটা সম্পূর্ণ ছাড়তে পারে নি বলে এমন খালি-পাইপ কামড়ায়। ধুঁয়ো বেরুচ্ছে না বলে দাঁত কিড়ি মিড়ি খায়, আর হরেন্দরে প্রতি মাসে গোটা সাতেক ভাঙে। কিন্তু ছেলেটা পাইপ বাবদে জিউরি। ‘ব্রায়ার’ ছাড়া অন্য কোনো পাইপ চিবোতে রাজী হয় না।’

    আপনি ভাবছেন, শ্রোতারা যক্ষ্মরোগী, তাই তাদের বিবৰ্ণ বিশীর্ণ মুখচোখ। আদপেই না। আপেলের মত লাল গাল প্রায় সব্বায়ের, চোখে মুখে উৎসাহ আর উত্তেজনা। যার দিকে তাকাই সেই যেন আমায় হাসিমুখে অভ্যর্থনা করে নিচ্ছে, সবাই যেন বলছে, ‘কি ভয় তোমার? এত দূর দেশ থেকে এসেছে, যা-ই বলো না কেন আমরা কান পেতে শুনবো।’

    তবু আমি মনে মনে গুরুদেবকে স্মরণ করলুম আমাকে ত্ৰাণ করার জন্য।

    তারপর কি হল?

    তারপর কি হল? ভয়ে আমার হাত-পা পেটের ভিতর সেঁধিয়ে গিয়েছে; আর আজ যদি আপনাদের কাছে স্বীকারও করি যে তারা বক্তৃতা-শেষে আমার দিকে পচা ডিম আর পচা টমাটো ছুড়েছিল, তাহলেও আপনাদের চারখানা হাত গজাবে না।

    আমি কি বলেছিলুম?

    সে বকবকানি আপনারা তো প্রতি হপ্তায় শোনেন। নূতন ক’রে বলে আর কি লাভ?

  • ইস্কিলাস—শেলি—স্পিটলার

    ইস্কিলাস—শেলি—স্পিটলার

    সৈয়দ মুজতবা আলী

    [book-name]

    ইস্কিলাস—শেলি—স্পিটলার

    বিদ্রোহী মানুষকে সমাজের কড়া বাঁধন মেনে নেবার জন্য গ্ৰীক নাট্যকার ইস্কিলাস যে নাটকখানি লেখেন তার নাম প্রমিথিয়ুস বাউন্ড—শুঙ্খলবদ্ধ প্রমিথিয়ুস। ইস্কিলাস ইচ্ছে করেই নাটকের পাত্র-পাত্রী দেবসমাজ থেকে বেছে নিয়েছিলেন। ভাবখানা অনেকটা এই :— খুদ দেবতারাই যখন নিয়ম কানুন না মেনে চলতে পারেন না তখন তুমি আমি কোন ছার। নাটকের মূল গল্প হচ্ছেঃ প্রমিথিয়ুস দেবতাদের পরম যত্নে লুকিয়ে-রাখা সাতরাজার-ধন-মাণিক অগ্নি জিনিসটি চুরি করে মানুষের হাতে তুলে ধরেন, তাই দিয়ে মানবসভ্যতা গড়ে ওঠে। দেবরাজ জুপিটার ভয়ঙ্কর চটে গিয়ে প্রমিথিয়ুসকে পাহাড়ের গায়ে পেরেক পুঁতে বেঁধে রাখলেন, শকুনি দিয়ে বুকের কলিজা, চোখের পাতা খাওয়ালেন, যাতে করে প্রমিথিয়ুস আপন পাপ স্বীকার করে সোজা রাস্তায় চলেন। প্রমিথিয়ুস সে নিপীড়ন সহ্য না করতে পেরে শেষটায় হার মানলেন। জুপিটার খুশি, ইস্কিলাস আরো বেশি খুশি— স্বৰ্গরাজ্য ধর্মরাজ্যে পরিণত হল।

    আমাদের কবিগুরু রামায়ণে এরকম কোনো ধর্মনীতি প্রচার করতে চেয়েছিলেন কি না জানিনে কিন্তু সেখানেও রাবণকে শেষ পর্যন্ত হার মানতে হয়েছিল।

    তারপর প্রায় দু’হাজার বছর কেটে গেল। দেবতাদের হুমকির ভয়ে কি গ্ৰীস, কি ভারতবর্ষ কেউই প্রমিথিয়ুসের মত তাঁদের সামনে মাথা খাড়া করে দাঁড়াতে সাহস পেল না। কিন্তু তবু প্রশ্ন জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করে, এই দু’হাজার বৎসর ধরে যাদের বুকের কলিজা, চোখের পাতা খাওয়ানো হল, তারা কি সব সময়ই ভিতরে বাইরে দুদিকেই আপন ‘পাপ’ স্বীকার করে নিয়েছিল? তাদের ভিতর কি এমন কেউ ছিল না যে বাইরে ক্ষমা চেয়েছে হয়ত, কিন্তু ভিতরে দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে মরেছে যে দেবতার অনুশাসনই চিরন্তন ধর্ম নয় : যেখানে নিপীড়ন দিয়ে ক্ষমা-ভিক্ষা বের করতে হয় সেখানে নিশ্চয়ই কোনো দুর্বলতা, কোনো ত্রুটি লুকানো রয়েছে।

    এই কথাটি জোর গলায় বলবার মত সাহস প্রথম দেখালেন ইংরেজ কবি শেলি। তখনকার দিনে রূঢ়ার্থে ভগবান বলতে যা বোঝােত শেলি সে পুরুষকে স্বীকার করলেন, আর সেই ভগবানের নামে গড়া তখনকার দিনের সমাজের আইন-কানুন ভাঙতে কসুর করলেন না। ভগবানের পুলিশমেন অর্থাৎ পাদ্রী পুরুতরা তখন শেলির পিছনে জুপিটারের মতনই শকুনি লাগিয়ে দিলে : শেলির অনেকখানি কলিজা খাওয়ানো হয়, শেলি অসহ্য যন্ত্রণায় বহু বিনিদ্র রজনী যাপন করলেন, শেলিরও চোখের পাতার অনেকখানি শকুনির পেটে গিয়েছিল। কিন্তু তবু শেলি হার মানেন নি।

    এবং সেই না-মানা অজরােমর রূপ নিয়ে বেরল তার নাট্যকাব্য ‘প্রমিথিয়ুস আনবাউন্ড-মুক্ত প্রমিথিয়ুস। শুনেছি, এক জাপানী চিত্রকর নাকি তাঁর বুকের জখমের রক্ত দিয়ে তুলি ভিজিয়ে ভিজিয়ে ছবি আঁকতেন বলে তাঁর ছবি সমস্ত জাপানের চিত্ত জয় করতে সমর্থ হয়েছিল। হয়ত রূপক, হয়ত সত্য; কিন্তু এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই, শেলির প্রমিথিয়ুস নাট্য বুকের রক্ত দিয়ে আঁকা। অত্যাচার-জর্জরিত মানবাত্মার তীক্ষতম চিৎকার, ধর্ম-প্রতিষ্ঠান সমাজবিধির বিরুদ্ধে মানবের গভীরতম হুঙ্কার এ কাব্যে যে রূপ, যে রস পেয়েছে তার সঙ্গে তুলনা দেবার মত দ্বিতীয় কাব্য তো সহজে খুঁজে পাইনে।

    (আর পাঁচজন হয়ত স্বীকার করবেন না, কিন্তু আমার মনে হয় মধুসূদনের রাবণ চরিত্রে যেন আমি খানিকটা সেই সুর শুনতে পাই। কিন্তু হিন্দু সমাজ তো মধুসূদনের উপর কোনো অত্যাচার করে নি—তাঁর তুলনায় হিন্দু ঈশ্বরচন্দ্ৰকে তো অনেক বেশি কটুবাক্য শুনতে হয়েছে। তখনকার দিনের কলকাতার বিদগ্ধ ইতর কোনো সমাজই তো মধুসূদনের পিছনে শকুনির পাল চালিয়ে দেয় নি। তবু হয়তো হৃদ্যতার অভাব দেখতে পেয়েছিলেন এবং হয়তো মনে মনে আপনি সনাতন ধর্ম বর্জন সম্বন্ধে ঈষৎ বিবেকদংশনে কাতর। হয়েছিলেন। তাই বোধ হয়। তিনি অন্য চরিত্র না নিয়ে রাবণকে বেছে নিয়েছিলেন, অর্থাৎ রাবণের যে গোড়ার দিকে খানিকটা দোষ আছে একথা স্বীকার করে নিয়েছিলেন। তাই হয়ত প্রমিথিয়ুস ও রাবণ এক পাত্র নয়। শেলির প্রমিথিয়ুস বলে, আমি কোন দোষ করিনি। মধুসূদনের রাবণ বলে, ‘একবার দোষ করেছিলুম বলেই কি আমাকে বিনষ্ট করার জন্য দেবনরবানর সবাই একজোট হয়ে সৰ্ব্ব ধর্ম সর্ব ক্ষাত্ৰনীতি বিসর্জন দেবো?’)

    তারপর উনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে ধর্মের বাঁধন টিলে হয়ে গেল, এমন কি বড় বড় শহরে সমাজের তিরস্কারও গাড়িঘোড়ার শব্দের নীচে চাপা পড়ে গেল। প্যারিস তো এমন জায়গায় গিয়ে পৌঁছল যে, সেখানে যে শুধু সমস্ত পৃথিবীর মুক্তিকামী নর-নারী সম্মিলিত হল। তাই নয়, আধা-পাগল বদ্ধপাগল এমন সব চিৎকার কলাবৎকে প্যারিস সয়ে নিল যাঁরা আপন দেশে থাকলে আর কিছু না হোক অন্তত পাগলা গারদের ভিতর জীবনের বেশির ভাগ কাটাতেন।

    কিন্তু এ সব মুক্তির বদলে মানুষ তখন আরেক দেবতার বশ্যতা স্বীকার করে নিয়েছে। অর্থের এবং সঙ্ঘের অত্যাচার।

    না খেয়ে মানুষ যে পূর্বে কখনো মরে নি একথা বলা আমার উদ্দেশ্য নয়, কিন্তু এবারে কলকারখানার জোরে, মানুষের পয়সা কামাবার হাতিয়ার কেড়ে নিয়ে যে প্রতিষ্ঠান যে সঙ্ঘ গড়ে উঠল তার অত্যাচার দেশ-বিদেশে সর্বত্র ছড়িয়ে পড়তে লাগল। লুণ্ঠন যেক আগে ছিল না তা নয়, কিন্তু এখন সাম্রাজ্যবাদের নামে যে শোষণ আরম্ভ হল। তার শেষ নেই। চেঙ্গিস নাদির আট্টিলা আসত দুদিনের তরে; কিন্তু এখন যে পাদ্রী কামান রাজপুরুষ বণিক পুলিশ আসতে লাগল তার আর অন্ত নেই। তাদের শোষণ দিনযামিনী, সায়ং প্রাতঃ, শিশির বসন্তু, যুগ যুগ ধরে। জমিদার ব্যারন যে সুন্দরী ধরে নিয়ে যেত সে তো অজানা নয়। কিন্তু এখন বড় বড় দোকানের চাকরিতে তরুণীদের আর নিস্তার নেই। বড় সায়েবদের বিলাস লালসায় যে নারীমেধ যজ্ঞ জুলে তার ইন্ধন অষ্টপ্রহর দেদীপ্যমান রাখবার জন্য আর কোনো তরুণীর বসনভূষণ বাঁচিয়ে রাখবার উপায় নেই।

    এই অত্যাচারের বিরুদ্ধে মহাকাব্য রচনা করলেন সুইটজারল্যান্ডের মহাপুরুষ কার্ল স্পিটলার। সে কাব্যের নাম প্রমেটয়েস উন্ট এপিমেটয়েস (Prometheus und Epimetheus)। এ কাব্যের সঙ্গে তুলনা দিতে পারি। এমন আর কোনো কাব্য আমার জানা নেই। গুরুগম্ভীর গদ্যচ্ছন্দে লেখা সে কাব্য, পদ্যের সর্বোচ্চ শিখরে জ্যোতিষ্মান ভাস্করের ন্যায় সে গদ্য। এ গদ্য ছন্দ পাই উপনিষদ, বাইবেল এবং কুরানে। এবং উপনিষদ, বাইবেল, কুরানের অনুবাদ যে-রকম অসম্ভব, এ কাব্যের অনুবাদও মানুষের সাধ্যের বাইরে। এ-কাব্য রচনা করে স্পিটলার নোবেল প্রাইজ পান, তৎসত্ত্বেও এখন পর্যন্ত এ-কাব্যের অনুবাদ হয় নি।

    স্পিটলার যে অত্যাচার অবিচার নিপীড়নের বিরুদ্ধে প্রমিথিয়ুসের কণ্ঠে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছেন, সে অত্যাচার ইতিমধ্যে আরও রুদ্ররূপ ধারণ করেছে। কলকাতার বুকের উপরই তার নব নব তাণ্ডব আমরা দেখতে পাচ্ছি। মানুষের গড়া দুর্ভিক্ষ, দৈনন্দিন অনশন, অশিক্ষা-কুশিক্ষা, দৈন্যের দায়ে দেহ বিক্রয়, নিরপরাধের উপর গুলিবর্ষণ, সাম্প্রদায়িক বর্বরতা, মানুষের প্রাণ নিয়ে বিবেকহীন রাজনৈতিকদের ছিনিমিনি খেলা, অরক্ষণীয়ার অন্ধকার ভবিষ্যৎ, অর্থের জোরে সমাজের বুকের উপরে বসে অন্নাভাবে মৃত্যুভয়ে কাতর পিতামাতার সম্মুখে তাদের কুলকামিনীর সর্বনাশ, ভ্রূণহত্য-সবই তো চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি।

    কিন্তু কই সে বাঙালি স্পিটলার??

  • মোসাপাঁ—চেখফ্‌—রবীন্দ্রনাথ

    মোসাপাঁ—চেখফ্‌—রবীন্দ্রনাথ

    সৈয়দ মুজতবা আলী

    [book-name]

    মোসাপাঁ—চেখফ্‌—রবীন্দ্রনাথ

    বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে অদ্ভুত যোগাযোগের ফলে অনেক তথ্য ও অনেক প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি আবিষ্কৃত হয়েছে। শুনেছি র্যোনটগেনের রঞ্জনরশ্মি আবিষ্কার, ফ্যারাডের বৈদ্যুতিক শক্তির আবিষ্কার এ রকম যোগাযোগের ফল। সাহিত্যে এ রকম ধারা বড় একটা হয় না। শুধু ছোট গল্পের বেলা তাই হয়েছে। কিন্তু একথাও স্মরণ রাখা উচিত যে, র্যোনাটুগেন ও ফ্যারাডে যদি বহু বৎসর ধরে আপনি আপন জ্ঞানচর্চায় নিবিষ্ট না থাকতেন, তাহলে যে-সব যোগাযোগের ফলে রঞ্জনরশ্মি ও বৈদ্যুতিক শক্তি আবিষ্কার হল সে সব.যোগাযোগ বন্ধ্যাই থেকে যেত। ছোট গল্পের বেলাও তাই—মোপাসঁ যদি সাহিত্য সাধনায় পূর্বের থেকেই নিযুক্ত না থাকতেন, তবে ফ্লবেরের সঙ্গে তার যোগাযোগ সম্পূর্ণ নিৰ্ম্মফল হত।

    ফ্লবের যে কি অদ্ভুত সুন্দর ফরাসি লিখে গিয়েছেন, তার বর্ণনা দিতে পারেন। শুধু ফ্লবেরই ভলতেরের পরেই ফ্লবেরের নাম করতে হয় এবং এদের মাঝখানের যে-কোনো দ্বিতীয় শ্রেণীর লেখক পেলেও বাংলা ভাষা বর্তে যাবে। আর ফ্লবেরের আশা শিকেয় তুলে রাখাই ভালো, তাঁর মত লেখক জন্মাবার পূর্বে এদেশের গঙ্গায় বিস্তর চড়া পড়ে যাবে। তার কারণ এ নয় যে আমাদের দেশে শক্তিমান লেখকের অভাব, বেদনোটা সেখানে নয়, আসল বেদনা হচ্ছে আমাদের লেখকেরা খাটতে রাজী নন। ফ্লবেরের লেখা পড়ার সময় বোঝাই যায় না। তার পিছনে কি অসম্ভব পরিশ্রম রয়েছে, কারণ সে পরিশ্রমের উপরে ফ্লবেরকে আরো পরিশ্রম করতে হয়েছে গোড়ার পরিশ্রমটা ঢাকবার জন্য। ভলতেরের সরল স্বচ্ছ শৈলীর প্রশংসা করলে তিনি নাকি করুণ হাসি হেসে বলতেন, ফরাসি জাতটা কি আর জানে তাদের কষ্ট বাঁচাবার জন্য আমি নিজে কতটা কষ্ট স্বীকার করি?’ ফ্লবের এ কথাটা বললে মানাতো আরো বেশি-তিনি তো শেষটায় সে পরিশ্রম সইতে না পেরে লেখাই ছেড়ে দিলেন।

    ধুয়ে মুছে কেচে ইন্ত্রি করে পাট না করা পর্যন্ত ফ্লবের ভাষাকে রেহাই দিতেন না। তাই যখন শাগরেদ। মোপাসীর ভিতর ফ্লবের গুণের সন্ধান পেলেন তখন মোপাসঁর লেখার উপর নির্মম র্যাদা চালাতে আরম্ভ করলেন। আর কী সব অদ্ভূত ফরমায়েশ-দশ লাইনে করুণ বৰ্ণনা লেখে, পনেরো লাইনে বীররস বাংলাও, এটা ছিড়ে ফেলে দাও, ওটা ছাপিয়ো না-অৰ্থাৎ ফ্লবের শাগরেদ। মোপাসাঁকে ধুয়ে মুছে কোচে তৈরি করে প্রায় পকেটস্থ করে ফেলেছেন, এমন সময় তাঁর ডাক পড়লো সেই লোক থেকে যেখানে রসসৃষ্টি করা যায় বিনা পরিশ্রমে-স্বৰ্গলোকে পরিশ্রম নেই বলেই মর্ত্যলোকের সৃষ্টি হয়েছিল। এ-কথা বাইবেলে লেখা আছে।

    এই তালিমের ফলেই ছোট গল্পের সৃষ্টি? মোপাসঁর পূর্বের লেখকরা কি বৰ্ণনা, কি চরিত্র-বিশ্লেষণ, কি ঘটনার ঘাত-প্রতিঘাত সব কিছুই লিখতেন। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে। ছোট গল্প লিখতে হলে যে বাকসংযম দরকার, বিস্তর কথা অল্প কথায় প্রকাশ করবার যে কেরামতির প্রয়োজন, প্রকাণ্ড আলোটার চতুর্দিক কালো কাপড়ে ঢেকে তার সামনের দিকে পুরু কঁচ লাগালে যে রশ্মির তীব্রতা বাড়ে সেই জ্ঞান মোপাসঁর পূর্বে কারো ছিল না, অথবা তাই নিয়ে মাথা ঘামাবার প্রয়োজন কেউ অনুভব করেন নি। সর্বাঙ্গ বেনারসীতে ঢেকে মুখ থেকে শুধু ঘোমটা সরিয়ে ফিক করে এক ঝলক হেসে সুন্দরী চলে গেল—মোপাসার পূর্বে ফরাসিরা যেন এ-অভিজ্ঞতার কল্পনাই করতে পারেন নি। তাদের কায়দাটা কি ছিল সে কথা ফেনিয়ে বলার সাহস আমার নেই-কলকাতা এ সব বাবদে প্যারিসের মত উদার’ নয়।

    এ সব নিছক যোগাযোগের কথা। মোপাসার আপনি কৃতিত্ব। তবে কোনখানে? গল্পটাকে বিশেষ এক জায়গায় এনে অকস্মাৎ ছেড়ে দেওয়া, এবং সেই অকস্মাৎ ছেড়ে দেওয়াটাই গল্পের সম্পূর্ণতাকে প্রকাশ করল—ইংরিজিতে যাকে বলে ক্লাইমেক্স’— এইখানে মোপাসঁর বিশেষত্ব। মোপাসঁর পূর্বের ঔপন্যাসিকেরা তাবৎ নায়ক নায়িকাদের জন্য একটা পাকাপাকি বন্দোবস্ত না করে উপন্যাস বন্ধ করতেন না। নটে গাছটি তারা এমনি কায়দায় মুড়তেন যে, পাঠকের মনে আর কোনো সন্দেহ থাকত না যে এদের জীবনে আর কিছু ঘটতে পারে না, এরা এখন থেকে ‘পুত্র কন্যা লাভ করতঃ পরমানন্দে জীবন যাপন করিল’ অথবা অনুতাপের তুষানলে তিলে তিলে দগ্ধ হইতে লাগিল’।

    ক্লাইমেকস আবিষ্কার মোপাসাঁর একান্ত নিজস্ব।

    মোপাসার পর বিস্তর লেখক এস্তার ছোট গল্প লিখেছেন, কেউ কেউ মোপাসার চেয়েও ভালো লিখেছেন; কিন্তু অস্বীকার করবার উপায় নেই যে সব গল্পই মোপাসার ছাঁচে ঢেলে গড়া। মোপাসা যে কাঠামোটি গড়ে দিয়ে গিয়েছিলেন, সেই কাঠামোটিতে কোন ফেরফার করার সাহস কারোরই হল না।

    চেখফই (Chekhov, Tschehoff ইত্যাদি নানা বানানে নামটি লেখা হয়, কিন্তু উচ্চারণ ‘চেখফ্‌’) প্রথম এ কাঠামোতে হাত দিয়ে দেখিয়ে দিলেন যে ক্লাইমেক্স বাদ দিয়েও সরেস ছোট গল্প লেখা যায়। শুধু তাই নয়, মানুষের দৈনন্দিন জীবনে খুব কম ঘটনাই এ রকম ধারা ‘বুমস-প্যাঙ’ করে সশব্দে ক্লাইমেকসে এসে অরকেস্ট্র শেষ করে। চেখফের অনেক গল্প ক্লাইমেকসে শেষ হয়। সত্য; কিন্তু সেটা গল্পের নিজস্ব প্রকৃতির উপর নির্ভর করে। সব গল্পেই যদি পাঠক ক্লাইমেকসের প্রত্যাশা করে করে পড়ে, তবে সেগুলো একঘেয়ে হয়ে যেতে বাধ্য, সব কবিতাই তো আর সনেট নয় যে শেষের দুই ছত্রে কবিতার সারাংশ জোর গলায় বলে দেওয়া হবে। তাই চেখফের বহু ক্লাইমেক্‌স-বৰ্জিত গল্পের ভরকেন্দ্র এমন ভাবে সমস্ত গল্পে ভাগ করে দেওয়া হয়েছে যে, পাঠক রসিয়ে রসিয়ে নিশ্চিন্ত মনে গল্পগুলো পড়তে পারে—ক্লাইমেক্‌সের আচমকা ইলেকট্রিক শকের জন্য নাক কান খাড়া করে থাকতে হয় না।

    আর ভাষার দিক দিয়ে চেখফ মোপাসঁকেও ছাড়িয়ে যান। টলস্টয় ফ্লবেরের চেয়ে অনেক বড় স্রষ্টা এবং চেখফ যদিও টলস্টয়ের শিষ্য নন তবু তিনি বহু বৎসর ধরে টলস্টয়ের সাহচর্য ও উপদেশ পেয়েছিলেন। টলস্টয় স্বয়ং গর্কির চেয়ে চেখফকে পছন্দ করতেন বেশি-তিনি নাকি একবার গর্কিকে বলেছিলেন, চেখফ মেয়ে হলে তিনি তাঁর কাছে নিশ্চয়ই বিয়ের প্রস্তাব পাড়তেন।

    রবীন্দ্রনাথের গোড়ার দিকের গল্পগুলি বড় ঢ়িলে। প্রমাণ করা কঠিন, কিন্তু আমার মনে হয়, এই ঢ়িলে ভাব তার প্রথম কাটল মোপাসঁর গল্পের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার পর। তখন থেকে রবীন্দ্রনাথের গল্পে মোপাসঁরই মত ঠাস বুনুনি দেখতে পাওয়া যায়, আর কাঠামোটাও হরেন্দরে মোপাসার। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের মত লেখক আপনি বৈশিষ্ট্য বর্জন করে লিখবেন-তা সে কাচা লেখাই হোক আর পাকা লেখাই হোক—সে কথা অনায়াসে অস্বীকার করা যায়। রবীন্দ্রনাথের গল্প মোপাসঁ, চেখফ দুজনের গল্পকেই হার মানায় তার গীতিরস দিয়ে। রবীন্দ্রনাথের সমস্ত গল্পটি কেমন যেন সঙ্গীতের কোনো এক রাগে বঁধা। এখানে সংস্কৃত নাটকের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের মিল রয়েছে। মৃৎশকটিকা, শকুন্তলা, রত্নাবলী নাটক গ্ৰীক কাঠামোতে ফেলা যায়। সত্য; কিন্তু এগুলিতে যে গীতিরস রয়েছে, গ্ৰীক নাটকে তো নেই-তই আমরা সংস্কৃত নাটকে যে আনন্দ পাই, গ্ৰীক নাটকে সেটি পাই নে।

    রবীন্দ্ৰনাথ বিশেষ বয়সে শেলি, কীটসের প্রভাবে পড়েছিলেন সত্য, কিন্তু তার চেয়েও বড় সত্য, রবীন্দ্রনাথ সে প্রভাব একদিন সম্পূর্ণ কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হয়েছিলেন। গল্পের বেলাতেও রবীন্দ্রনাথ একদিন মোপাসার প্রভাব ঝেড়ে ফেলে দিতে সমর্থ হয়েছিলেন। রবীন্দ্ৰনাথ শেষের দিকের গল্পগুলিতে কি যেন এক অনির্বচনীয়ের প্রকাশ করতে চেয়েছিলেন। ‘মিস্টিক’ কথাটাতে সব কিছুই ঢাকা পড়ে যায় বলে শব্দটা ব্যবহার করতে বাধো বাধো ঠেকে; কিন্তু মানব-চরিত্রের আলো-অন্ধকারের আবছায়া আঁকুবীকু, মানব-চরিত্রের যে দিক দৈনন্দিন জীবনে আমাদের চোখে পড়ে না, মানুষকে যে সব সময় তার বাক্য আর আচরণ দিয়েই চেনা যায় না মানুষের সেই দুজ্ঞেয় অন্তঃস্তল রবীন্দ্রনাথ চেষ্টা করেছিলেন আধা-আলোরই ভাষা এবং ভঙ্গি দিয়ে প্রকাশ করতে। সেখানে রবীন্দ্ৰনাথ এক, মোপাসঁ, চেখফের সঙ্গে তাঁর যোগসূত্র সেখানে সম্পূর্ণ ছিন্ন হয়ে গিয়েছে।

  • অনুবাদ সাহিত্য

    অনুবাদ সাহিত্য

    সৈয়দ মুজতবা আলী

    [book-name]

    অনুবাদ সাহিত্য

    বাঙলা সাহিত্যের মত অদ্ভুত এবং বেতালা সাহিত্য পৃথিবীতে কমই আছে। রবীন্দ্রনাথ গান আর কবিতা দিয়ে যে বাঙলা গীতিসাহিত্য রচে গিয়েছেন তার কাছে এসে দাঁড়াতে পারে, এমন গীতিসাহিত্য পৃথিবীতে আর নেই বললেও চলে। মেঘদূতের মত গীতিকাব্য পৃথিবীতে নেই-রবীন্দ্রনাথের বর্ষার গান অনেক স্থলে কালিদাসের মেঘদূতকেও ছাড়িয়ে গিয়েছে। রবীন্দ্ৰনাথ তার গীতিকাব্য দিয়ে বাঙলা সাহিত্যকে যেন একসঙ্গে তেইশটা ডবল প্রমোশন পাইয়ে দিয়েছেন।

    রবীন্দ্রনাথের ছোট গল্পও বিশ্বসাহিত্যের যে-কোন কথাসাহিত্যের সঙ্গে। কঁধ মিলিয়ে চলতে পারে। আরো বিস্তর অতুলনীয় সৃষ্টি রবীন্দ্রনাথের কলম দিয়ে বেরিয়েছে, তার উল্লেখ এখানে অবাস্তর।

    কিন্তু রবীন্দ্রনাথ ছিলেন সৃষ্টিকার। তাঁর পক্ষে অন্য লেখকের রচনা অনুবাদ করবার কোন প্রয়োজন ছিল না। এমন কি এ-কথা বললে ভুল বলা হবে না, যেটুকু অনুবাদ তিনি করেছেন তাতে সময় নষ্ট হয়েছে মাত্র। কদমফুলের কেশর ছাড়িয়ে লাট্টু বানিয়ে ছেলেরা জিনিসটাকে কাজে লাগায় বটে, তবু নিষ্কর্মা কদম-ফুলেরই দাম বেশি।

    অনুবাদ-চর্চা দিয়ে রবীন্দ্রনাথ বেশি সময় নষ্ট করেন নি বলেই বোধ করি বাঙলা সাহিত্য অনুবাদের দিক দিয়ে এত হীন। তাই বলছিলুম বাঙলা সাহিত্য বেতালা সাহিত্য, গীতিকাব্যে যেন যে পক্ষীরাজের পিঠে চড়ে বিশ্বব্ৰহ্মাণ্ডময় উড়ে বেড়ায় আর অনুবাদ সাহিত্যের বেলা সে যেন এদেী কুয়োর ভেতরে খাবি খায়।

    অথচ উনবিংশ শতকের শেষের দিকে বাঙলা ভাষায় যে অনুবাদ সাহিত্যের রচনা দানা বাঁধতে আরম্ভ করে, তার তুলনায় আজকের দিনে তাকিয়ে দেখি সে দানা দিয়ে মিঠাই মণ্ডা তো হলই না, তলানির চিনিটুকু দিয়ে আজ যেন সাহিত্য-সভায় পানসে শরবৎ বিলানো হচ্ছে। গীতকাব্যে যে সাহিত্য তেইশটে ডবল প্রমোশন পেয়েছিল, অনুবাদে সেই সাহিত্যকেই বাহান্নটা ডিগ্রেডেশন দিয়ে দেওয়া হয়েছে।

    অনুবাদ করতে হলে বিদেশী ভাষা জানার প্রয়োজন। আজকের দিনে কলকাতা শহরে শুধু ফরাসি বই বিক্রয়ের জন্যে দোকান হয়েছে-সত্তর বৎসর আগে, ছিল না।—তবু আমাদের অনুবাদ-সাহিত্যের যেটুকু শরবৎ আজ বিলানো হচ্ছে তার আগাগোড়া ইংরেজি থেকে।

    অথচ উনবিংশ শতকের শেষের দিকেই জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর ফরাসি সাহিত্যের উত্তম রস-সৃষ্টি বাঙলায় অনুবাদ করতে আরম্ভ করেন। বিংশ শতকেও তিনি এই কর্মে লিপ্ত এবং মৃত্যুর কিছুদিন পূর্ব পর্যন্ত তিনি একাজে ক্ষাস্ত দেন নি। ঠিক স্মরণ নেই, তবে খুব সম্ভব লোকমান্য বালগঙ্গাধর তিলকের বিরাট মারাষ্ঠী গীতার অনুবাদই তার শেষ দান।

    আশ্চর্য বোধ হয় যে, বাঙালি জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরকে ভুলে গিয়েছে। সংস্কৃত থেকে তিনি যে সব নাটক অনুবাদ করেছিলেন সেগুলোর কথা আজ থাক। উপস্থিত পিয়ের লোতির একখানা বইয়ের কথা স্মরণ করছি।

    পিয়ের লোতির মত লেখক পৃথিবীতে কমই জন্মেছেন। শুদ্ধমাত্র শব্দের জোরে, সম্পূর্ণ অজানা, অদেখা প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের বর্ণনা গড়ে তোলা যে কি কঠিন কর্ম, তা শুধু র্তারাই বুঝতে পারবেন, যারা কখনো এ-চেষ্টায় দণ্ডমাত্র কালক্ষেপ করেছেন। রবীন্দ্রনাথের প্রতি অশ্রদ্ধা প্রকাশ করার মত দুৰ্মতি কোনো বাঙালির হওয়ার কথা নয়, তাই বলতে আপত্তি নেই যে, স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ বাঙালির অদেখা বা অল্প দেখা জিনিস নিয়ে কাব্য সৃষ্টি করাটা পছন্দ করতেন না। সাধারণ বাঙালির সঙ্গে পাহাড় এবং সমুদ্রের পরিচয় অতি কম-তাই বোধ করি রবীন্দ্রনাথ এ দুটো জিনিস নিয়ে নাড়াচাড়া করেছেন যতদূর সম্ভব কম। শীতপ্রধান দেশের পাতা-ঝরা হেমন্ত ঋতু, শুভ্ৰমল্লিকা বর্ষণের মত বরফ-পাত যে কি দর্শনীয় বস্তু, সিনেমা থেকেও তার খানিকটে আন্দাজ করা যায়,-রবীন্দ্ৰনাথ এসব দেখেছেন, উপভোগ করেছেন বহুবার; কিন্তু কোথাও তার বর্ণনা করেছেন বলে তো মনে পড়ে না।

    পিয়ের লোতির বৈশিষ্ট্য এইখানেই। তিনি জাপান, তুর্কী, আইসল্যান্ড এবং আরও নানাদেশের যে সব ছবি ফরাসি ভাষায় একে দিয়ে গিয়েছেন, সে-সব পড়ে মনে হয় ভাষার সঙ্গীত, বর্ণ, গন্ধ একসঙ্গে মিলে গিয়ে কি করে এইরূপ রসবস্তু নির্মাণ হতে পারে! মনে হয়, একসঙ্গে যেন পঞ্চেন্দ্ৰিয় রস গ্রহণ করছে, মনে হয়। কারো কলম যদি নিতান্ত অরসিক জনকে দেশ-কাল-পাত্র ভোলাতে সক্ষম হয়, তবে সে কলম পিয়ের লোতির।

    ভারতবর্ষ সম্বন্ধে লোতি যে বইখানা লিখেছেন তার নাম ল্যাদ, সাজাংলো’। অর্থাৎ ‘ভারতবর্ষ, কিন্তু ইংরেজকে বাদ দিয়ে’। অর্থাৎ তিনি ভারতবর্ষের ছবি আঁকতে বসেছেন। কিন্তু মনস্থির করে ফেলেছেন যে, এ-দেশের ইংরেজদের সম্বন্ধে তিনি কিছু বলবেন না।

    স্বীকার করি, ইংরেজ-বর্জিত-ভারত’ (‘বসুমতী’ কর্তৃক প্রকাশিত জ্যোতিরিন্দ্র গ্রন্থাবলী দ্রষ্টব্য) ‘ল্যাদ, সঁজাংলে’র ঠিক অনুবাদ নয়, কিন্তু জ্যোতিরিন্দ্রনাথের অনুবাদশশাঙ্কে ঐ একটি মাত্র কলঙ্ক। বাদবাকি পুস্তকখানা অনুবাদ-সাহিত্যে যে কি আশ্চর্য কুতুব-মিনার, তার বর্ণনা দিতে হলে লোতির কলমের প্রয়োজন।

    ত্ৰিবাঙ্কুরে লোতি ভারতীয় সঙ্গীত শুনে বিস্ময়ের উচ্ছাসে সে-সঙ্গীতের বর্ণনাতে কত না। স্বর কত না ধ্বনি মিশিয়ে দিয়েছেন; জ্যোতিরিন্দ্রনাথের বাংলা সে-সব সে—ধ্বনি অবিকল বাজিয়ে চলেছে। মাদ্রাজে লেতি ভরত-নাট্যম দেখে ভাবাবেগে অভিভূত হয়ে মানবহৃদয়ের যত প্রকারের আশা-নৈরাশ্য, ঘূণা-ক্ৰোধ, আকুলি-বিকুলি সম্ভব হতে পারে, সব কটি প্রকাশ করেছেন কখনো গভীর মেঘমন্দ্রে, কখনো মধুর বীণা ঝঙ্কারে, কখনো শব্দ সমন্বয়ের চটুল নৃত্যে—জ্যোতিরিন্দ্রনাথের বাংলা-বীণা যেন প্রতি মন্দ্ৰ, প্রতি ঝঙ্কার, প্রতি ব্যঞ্জনা ঠিক সেই সুরে রসসৃষ্টি করেছে। ইলোরার স্থাপত্য-ভাস্কর্য লোতিকে বিহ্ল ভয়াতুর করে ফেলেছে, অনির্বাচনীয় চিরন্তন সত্তার রসস্বরূপে স্বপ্রকাশ দেখিয়ে-জ্যোতিরিন্দ্রনাথের লেখনী লোতির বিহ্বল ভয়ার্ত হৃদয়ের প্রতি কম্পন প্রতি স্পন্দন ধরে নিয়ে যেন বীণাযন্ত্রের চিকণ কাজের সঙ্গে মৃদঙ্গর নিপুণ বোল মিশিয়ে দিয়েছে।

    এরূপ অদ্ভুত সঙ্গত দিয়ে বাঙলা সাহিত্যের মজলিসে যে অনুবাদ সাহিত্য আরম্ভ হয়েছিল, আজ তার সমাপ্তি দেখতে পাচ্ছি সস্তা, রগরগে ইংরিজি উপন্যাসের অনুবাদে। খেমটা আর ফিলমি গানের’ সঙ্গে তার মিতালি।

  • কলচর

    কলচর

    সৈয়দ মুজতবা আলী

    [book-name]

    কলচর

    ‘পরশুরামে’র কেদার চাটুজ্যেকে বাঘ তাড়া করেছে, ভূত ভয় দেখিয়েছে, হনুমান দাঁত খিচিয়েছে, পুলিশ কোর্টের উকিল জেরা করেছে, তবু তিনি ভয় পান নি। কিন্তু শেষটায় এক আমেরিকান মেমসায়েবের পাল্লায় পড়ে হিমসিম খেয়ে যান। কেদার চাটুজ্যের প্রতি আমার অগাধ ভক্তি কিন্তু তৎসত্ত্বেও আমাকে সবিনয় বলতে হবে তার তুলনায় আমি দেশভ্রমণ করেছি অনেক বেশি, কাজেই আমাকে ভয় দেখিয়েছে আরো অনেক বেশি ভূত, অদ্ভুত, নাৎসী, কম্যুনিস্ট, মিশনারী, কলাবৎ, সম্পাদক, দারোয়ান ইত্যাদি। কিন্তু তবু যদি তামাতুলসী-গঙ্গাজল নিয়ে শপথ কাটতে হয়, তবে বলব আমি বেশি ভয় পেয়েছি ‘কলচরে’র সামনে।

    বাঙলা দেশে ‘কলচর’ আছে কিনা জানিনে; যদি বা থাকে। তবে আমি নিজে বাঙালি বলে সে জিনিস এড়িয়ে যাবার অন্ধিসন্ধি জানি। কিন্তু বিদেশ-বিভূইয়ে হঠাৎ বেমক্কা এ জিনিসের মুখোমুখি হয়ে পড়লে যে কী দারুণ নাভিশ্বাস ওঠে তার বর্ণনা দেবার মত ভাষা এবং শৈলী আমার পেটে নেই।

    পশ্চিম ভারতে একবার এই কলচর।’ অথবা ‘কলচরড়া সমাজের পাল্লায় পড়েছিলুম। তার মর্মন্তব্দ কাহিনী নিবেদন করছি।

    এক যুবতীর সঙ্গে কোনো এক চায়ের মজলিসে আলাপ হল। তিনি আমাকে তার বাড়িতে যাবার নিমন্ত্রণ করলেন। সুন্দরী রমণী। প্রত্যাখ্যান করি কি প্রকারে? তখন যদি জানতুম তিনি আমাকে বাঙালি অতএব ‘কলচরড়া’ ঠাউরে নিমন্ত্রণ করেছেন তাহলে ধর্ম সাক্ষী আমি কেটে পড়তুম। কারণ, আমি কলচরড়’ নই এবং পূর্বেই বলেছি। ও-জিনিসটাকে আমি বড্ড ডরাই।

    সুন্দরী মোটর পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। কাজেই বাড়ি খুঁজে বের করার মেহন্নত থেকে রেহাই পেলুম। গাড়ি এসে এক বিপুলায়তন বাড়ির সামনে দাঁড়াল। বাড়ি বলা হয়ত ভুল হল। সংস্কৃতে খুব সম্ভব এই বস্তুকেই ‘প্রাসাদ’ বলে।

    কিন্তু সে কী অদ্ভুত বিভীষিকা। সঁচীর স্তুপ, অজন্তার প্রবেশদ্বার, অশোকের স্তম্ভ, মাদুরার মণ্ডপ, তাজের জালির কাজ, জামি মসজিদের আরাবেসক, ভারতবর্ষের তাবৎ সৌন্দর্য সেখানে যেন এক বিরাট তাণ্ডব নৃত্য লাগিয়েছে। যে ফিরিস্তিটা দিলুম সেটা পূর্ণাবয়ব কি না জানি নে এবং এসব স্থাপত্য কলার মর্ম এ অধম জানে না সেটাও সে সবিনয় স্বীকার করে নিচ্ছে। আমি সাহিত্য নিয়ে ঈষৎ নাড়াচাড়া করি, কারণ ঐ একমাত্র জিনিসই মাস্টার অধ্যাপকেরা আমাকে স্কুল-কলেজে ঠেঙিয়ে ঠেঙিয়ে কিছুটা শিখিয়েছেন। সাহিত্যের দৃষ্টিবিন্দু দিয়ে তাই যদি সে-প্রাসাদের বর্ণনা দিই। তবে বলতে হবে, আমি যেন এক কবিতার সামনে দাঁড়ালুম যার প্রথম লাইন চর্যাপদী, দ্বিতীয় লাইন চণ্ডীদাসী, তৃতীয় লাইন মাইকেলী, চতুর্থ লাইন রঙ্গলালী, পঞ্চম লাইন ঠাকুরী এবং শেষ লাইন নজরুলী। জানি, আজ যদি কেউ এই সব ক’জন মহাজনের শৈলী এবং ভাষা আয়ত্ত করে কাব্য সৃষ্টি করতে পারেন। তবে তিনি কি কালিদাস, কি সেক্সপীয়ার, কি গ্যেটে সর্ব যুগের সর্ব কবিরাজকে ছাড়িয়ে যেতে পারবেন। কিন্তু আমি যে বিভীষিকার সামনে দাঁড়ালুম সে তো তা নয়। এ যেন কেউ কঁচি দিয়ে নানান কবির লেখা নিয়ে হেথা থেকে দু’ছত্ৰ হোথা থেকে তিন পংক্তি কেটে গদ দিয়ে জুড়ে দিয়ে বলছে, পশ্য, পশ্য, কী অপূর্ব কবিতা; এ-কবিতা মাইকেল, রবীন্দ্রনাথ যে-কোনো কবির লেখাকে হার মানায় কারণ এ-কবিতা দুনিয়ার তাবৎ কবির বারোয়ারী চান্দা দিয়ে গড়া। বাঁদর হারালেও এখানে খুঁজে পাবে।’

    তখনও পালাবার পথ ছিল, কিন্তু সুন্দরীর-যাকগে। না পালাবার জন্য আরেকটা কারণও মজুদ ছিল। এ বিভীষিকা দেখে গাঙ্গুলি মশাই অথবা ক্রামরিস বীবী পালাবেন, কিন্তু আমি তো ‘কলচরড়’ নই। আমি পালাব কেন?

    ততক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছি লিফটের সামনে। অপূর্ব সে খাঁচা। এতদিন বাদে আজ আর মনে নেই কোন কোন শৈলীর ঘুষোঘুষিতে (কোলাকুলিতে নয়) সে লিফটের চারখানা কাঠের পাট নির্মিত ছিল। প্রত্যেক পাটে অতি সূক্ষ্ম নাজুক, মোলায়েম দারুশিল্প। জয়পুরের মিনা যেন সূক্ষ্মতায় তার কাছে হার মানে।

    ভিতরে ঢুকলুম। তখন লক্ষ্য করলুম। লিফটবয় দরজাখানা বন্ধ করল অতিশয় সন্তৰ্পণে—পাছে কাঠের চিকন কাজে কোনো জখম হয়। কিন্তু ফল হল এই যে লিফট আর উড্ডীয়মান হতে চায় না। বয় ধীরে ধীরে চাপ বাড়ায় কিন্তু লিফট নড়তে চায় না। তারপর হুস করে বলা নেই কওয়া নেই, লিফট উপরের দিকে চলল, পক্ষীরাজের বাচ্চা ঘোড়ার পিঠে হঠাৎ জিন লাগালে সে যে-রকম ধারা আচমকা লম্ফ দিয়ে ওঠে।

    তারপর দোতলায় নামবার কথা—লিফট সেখান থামে না। থামলো গিয়ে আচম্বিতে দোতলা আর তেতলার মধ্যিখানে।

    একে ত গাঁয়ের ছেলে, বয়স হওয়ার পর শহরে এসে প্রথম লিফট দেখেছি এবং তখনকার দিনে ধুতিকুর্তা পরা থাকলে লিফট চড়তে দিত না বলে এ ফাঁড়া থেকে প্রাণ বঁচাতে পেরেছি, তার উপর জানি দাড়াম করে দরজা বন্ধ না করলে ভালো লিফটও নড়তে চায় না এবং তার উপর দেখি এই ছোকরা চাকরি যাবার ভয়ে দরজার উপর জোর লাগাতেও রাজী হয় না। এই কলচরডু লিফটটাকে জখম চোটের হাত থেকে বাঁচাবার জন্য আমার প্রাণটা বলি দিতে হবে নাকি?

    আমি তখন হন্যে হয়ে উঠেছি। ধমক দিয়ে বললুন, দরজা জোরে বন্ধ করো।’

    সে করে না। এই মাগ্‌গীর বাজারে প্রেমের চেয়ে চাকরি বড়। প্রাণ জিনিসটা জন্মে জন্মে বিনা খরচে, বিনা মেহন্নতে পাওয়া যায়; কিন্তু চাকরির জন্য বিস্তর বেদরদ বেইজাতী সইতে হয়।

    আমি আর কি করি? ধাক্কা দিয়ে ছোঁড়াটাকে পথ থেকে সরিয়ে দরজায় দিলুম বিপুল এক ধাক্কা। হুস করে লিফট উঠে গেল। তেতলায়। আমি দরজা খুলে নাবিতে যাচ্ছি, বয় চেচিয়ে বললে, ‘আপনি যাবেন দোতলায়, তেতলায় নয়।’ আমি বললুম, ‘তুমি যাও, চুলোয়।’ ছোকরা বাঙলা বোঝে না।

    তেতলা থেকে সিঁড়ি ভেঙে নোমলুম দোতলায়।

    ততক্ষণে লিফটের ধড়াধড় শব্দ শুনে সুন্দরীর ভাই-বেরাদর দু’একজন সিঁড়ির কাছে জমায়েত হয়ে গিয়েছেন। আমি ছোকরার চাকরি বাঁচাবার জন্য নিজের অপরাধ স্বীকার করলুম। ওঁরা যে-রকম ভাবে আমার দিকে তাকালেন তাতে মনে হল আমি যেন তাজমহলের উপর এটম বাম মেরেছি। অথবা ওস্তাদ ফৈয়াজ খানের গলা কেটে ফেলেছি।

    ‘কলচরড’ নই, তাই বলতে পারব না, ‘কলচর’ দেশ-কাল-পাত্র মেনে নিয়ে স্বতঃস্ফূর্ত হয় কি না। কিন্তু লিফটের ভিতরকার ‘কলচর’কে সম্মান দেখাতে গিয়ে আমি প্ৰাণটা দিতে রাজী নই। তাই বলছিলুম, আমি ‘কলচর’ জিনিসটাকে ডরাই।