Author: বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

  • অনন্ত দ্রাঘিমা

    অনন্ত দ্রাঘিমা

    হলদিপোঁতা ধাওড়া একটি অখ্যাত জনপদের নাম যার বুক ছুঁয়ে চলে গিয়েছে জগৎখালি বাঁধ আর বুড়ি গাং। নির্দিষ্ট কোনও পেশা নেই ধাওড়া পাড়ার মানুষদের। এই জনগোষ্ঠীর বেশির ভাগ নর-নারীই শ্রমজীবী। প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম তারা শোষণ আর বৈষম্যের বাঘনখে আক্রান্ত। তাদের জীবনে অভাব মাঠ-কেঁচোর মতো সহজলভ্য, শিক্ষা সেখানে তেলহীন লম্ফর পোড়া সলতে। এক অসম লড়াইয়ের উত্তাপ এই সুদীর্ঘ উপন্যাসের গতিকে করেছে বেগবান মানুষ প্রকৃতি নদী ও নারী জীবনের চলমান ছবি হয়ে ঘুরে ফিরে এসেছে নানা অভিঘাতে। দু’ মুঠো ভাত কিংবা রুটির জন্য মানুষ স্বভূমি ছেড়ে অন্যত্র পাড়ি দিয়েছে। ‘অনন্ত দ্রাঘিমা’য় অভাব দুষ্টক্ষত এবং অভিশাপ। আর সেই অভাব এবং বঞ্চনাকে কেন্দ্র করে গ্রামের বাতাস কেঁপে উঠছে নানা সময়মুখী আন্দোলনে। শহর অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছে সেই আগুন উসকে দিতে। গ্রামের ধুলোওড়া বাতাসের ভেতর থেকে তারা অপসারিত করতে চেয়েছে অসাম্যের দানবকে। রঘুনাথ এই পোড় খাওয়া সমাজের একজন। গুয়ারাম, লুলারাম, চুনারাম কিংবা ভিকনাথ তার ব্যতিক্রম নয়। মানবিক মূল্যবোধ আর বিশ্বাসের পলিমাটি দিয়ে গড়া এই ধ্রুপদী উপন্যাস সাহিত্যিক অনিল ঘড়াইয়ের নিরপেক্ষ কলমে হয়ে উঠেছে চিরকালীন আখ্যান।

  • নবম কল্প : দারণ কলঙ্ক—কলঙ্কভঞ্জন

    নবম কল্প : দারণ কলঙ্ক—কলঙ্কভঞ্জন

    ভূবনচন্দ্র মুখোপাধ্যায়

    [book-name]

    নবম কল্প : দারণ কলঙ্ক—কলঙ্কভঞ্জন

    সপ্তাহ অতীত। এই সপ্তাহের মধ্যে একরাত্রেও ভূতের নৃত্য, ভূতের হুঙ্কার, ভূতের কুন্দন, ইত্যাকার কোন অদ্ভুত শব্দই শ্রুতিগোচর হয় নাই। কেবল আমার নিজের কথা বোলছি না, বাড়ীর কেহই কিছু শ্রবণ করেন নাই। অষ্টম দিবসে প্রাতঃকালে বড়বাবু প্রফুল্লবদনে আমার শয়নগৃহে প্রবেশ কোরে আমারে বাহাদুরী দিয়ে বোল্লে, “হরিদাস, তুমি বীরপুরুষ, যুদ্ধক্ষেত্রের বীরপুরুষের হস্তপদবিশিষ্ট সজীব মানুষের সঙ্গে যুদ্ধ করেন, সে যুদ্ধে জয়-পরাজয় উভয়ই আছে। তুমি ভূতের সঙ্গে যুদ্ধ কোরেছ, তোমার প্রতাপে ভূতেরা পরাজিত হয়ে পলায়ন কোরেছে। যথার্থই তুমি বীরপুরুষ! এখন অবধি আমি তোমাকে সহোদর তুল্য বিবেচনা কোরবো, তোমার পরামর্শ মতই কার্য কোরবো। লোকে যেমন নিরুপদ্রবে মনের সুখে নিজ বাড়ীতে বাস করে, এখন অবধি তুমি সেইরূপে মনের সাথে এই বাড়ীতে বাস কর। কর্তা ফিরে এসে যদি কোন বিরুদ্ধে কথা বলেন, আমি তাঁকে তোমার গুণের কথা বোলে ঠাণ্ডা কোরে রাখবো।”

    বাহাদুরী পেলেম; বীরপুরুষ হোলেম; কর্তা আমাদের সুনয়নে দেখবেন, সেরূপ আশ্বাসও পেলেম, কিন্তু একটি কথাও আমার ভাল লাগলো না। সে বাড়ীতে কি একটা যে গুপ্তকাণ্ড আছে, অনুমানে সেইটি চিন্তা কোরে আমি নীরব হয়ে থাকলেম; অকৃতজ্ঞ হোলেম না, মৌনভাবে দুইহাত তুলে বড়বাবুকে নমস্কার কোল্লেম।

    রামদাস আসে যায়, কত রকমের কত কথা কয়, রূপসী আসে যায়, অভ্যাসমত আপন মনে পাঁচ রকমের গল্প করে, যাবার সময় এক একবার আঁখি ঠেরে চোলে যায়। ছোটবাবু আসেন যান, আমার সঙ্গে বেশ আত্মীয়তা দেখান, এক একদিন আমারে সঙ্গে নিয়ে গ্রামের এক একদিক্ দেখিয়ে আনেন, এই রকমে দিন যায়। বড়বাবুর মুখে সেই উপদেবতার কথা ভিন্ন আর অন্যকথা প্রায়ই শুনতে পাই না; গতকথা নিয়ে অত আলোচনা কেন তাঁর, সেটাও ঠিক বুঝতে পারি না।

    আর এক সপ্তাহ অতীত। একদিন বৈকালে ছোটবাবুর সঙ্গে আমি একটি সরোবরতীরে ভ্রমণ কোচ্ছি, গুটিকতক হংস-হংসী সেই সরসীজলে খেলা কোরে বেড়াচ্ছে, দেখে দেখে মনে আমার একটা ভাব উদয় হলো। ছোটবাবুকে আমি জিজ্ঞাসা কোল্লেম, “আপনাদের গ্রামে পায়রাবাবু আছেন, মানুষের আকার ধারণ কোরে পায়রাবাবু সংসারধামে ক্রীড়া করেন, এই সকল হংসের মধ্যে কোন হংস নরমমূর্তি ধারণ কোরে হংসবাবু কেন হয় না; প্রণয়-সংসারে আমি সংসারী নই, বাস্তবিক প্রণয়পদার্থটি যে কি, তাও আমি বুঝি না। এ সংসারে বিহঙ্গকুলে হংস-হংসী আর কপোত-কপোতী বিমল প্রেমের দৃষ্টান্তে প্রসিদ্ধ পায়রাবাবুর ক্রীড়া দর্শনে একটি হংসবাবুর ক্রীড়া দর্শন কোত্তে আমার অভিলাষ হয়; হংসের বাক্যশ্রবণে কৌতূহল জন্মে। তার কি কোনরূপ উপায় হোতে পারে না?”

    ছোটবাবু বোল্লেন, “তোমার কথা আমি বুঝতে পাল্লেম না, হংসের বাক্য-শ্রবণে কৌতূহল, সে কৌতূহলের অর্থ কি? হংসেরা কি কথা কয়? সৃষ্টি কালাবধি হংসের মুখে কেহ কখন বাক্য শ্রবণ করে নাই।”

    সমান আগ্রহে তৎক্ষণাৎ আমি বোল্লেম, “কেহ কখন শ্রবণ না কোল্লে আমার মনে সে ভাবের উদয় হোতো না। শ্রীহর্ষ দেবের হংসের মুখে নলরাজা কথা শুনেছিলেন, দয়মতীদেবীও হংসমুখে পরিণয়-সম্বন্ধ শ্রবণ কোরেছিলেন, প্রণয়-বিজ্ঞানে অনভিজ্ঞ থাকলে আমি কেন হংসবাক্য শুনতে পাব না, তাই আমি ভাবি; বিশেষতঃ পায়রা যখন নরাকার ধারণ করে, তখন হংস অপারগ থাকে কেন? আচ্ছা, ছোটবাবু, সেই পায়রাবাবুটি আপনাদের গ্রামে কতদিন আছেন? এখানে তাঁদের কয়পুরুষের বাস?”

    খানিকক্ষণ বিস্মিতনেত্রে আমার মুখের দিকে চেয়ে থেকে কিঞ্চিৎ সঙ্কুচিতস্বরে ছোটবাবু বোল্লেন, “বংশাবলীর তত্ত্ব তুমি জানতে চাও? বেশী দিনের খবর আমি বোলতে পারবো না, পায়রাবাবুর পিত্রালয় এই গ্রামে বটে, কিন্তু এ গ্রামে পায়রাবাবুর জন্ম হয় নাই; মাতামহালয়ে জন্ম, মাতামহালয়েই তিনি প্রতিপালিত। জন্মাবধি এ গ্রামে তিনি আসেন নাই, সম্প্রতি এসেছেন। তাঁর প্রকৃত নামটি কি, তাও আমরা জানি না। কথা কবার সময় তাঁর গলাটি একটু ফুলে ফুলে উঠে, বক বকম, বক বকম শব্দের ন্যায় এক রকম ঘড় ঘড় শব্দ হয়, সেই জন্য দাদা রসিকতা কোরে তাঁর নাম দিয়েছেন ‘পায়রাবাবু’। দেখাদেখি— দাদার মুখে শুনে শুনে, গ্রামের পাঁচজনেও বলে পায়রাবাবু।”

    কথা শুনলেম, কি আমি ভাবলেম, আর একটি কথা জিজ্ঞাসা করবার ইচ্ছা হলো। জ্বলন্ত আগ্রহে, জ্বলন্ত কৌতুহলে আমি জিজ্ঞাসা কোল্লেম, “কোথায় পায়রাবাবুর মাতামহালয়?”— ছোটবাবু বোল্লেন, “বীরভূমজেলা।”

    আমার সর্বশরীর কেঁপে উঠলো। আর তখন ছোটবাবুর দিকে ভাল কোরে আমি চাইতে পাল্লেম না। বিস্ময়ের বিকাস হোলে মানুষের নয়নের দীপ্তি কেমন একপ্রকার দাঁড়ায়; বীরভূম জেলার নাম শ্রবণে আমার মনে এক মহাবিস্ময়ের উদয় হয়েছিল। সে সময় আমার চক্ষু দর্শন কোরে ছোটবাবু যদি কোন প্রকার বিস্ময়লক্ষণ বুঝতে পারেন, ভাল হবে না, সেই জন্যই ছোটবাবুর দিকে ভাল কোরে চাইতে পাল্লেম না; মাথা হেঁট কোরে মনে মনে বোল্লেম, “যা ভেবেছি, তাই, সেই লোক না হোলে এতদূর ধড়ীবাজী আর কার মাথায় যোগায়?”

    কি ভাব আমার মনে উদয়, নয়নে আমার কোন ভাবের বিকাস, ছোটবাবু সেটি অনুভব কোল্লেন না, আমার চক্ষের দিকেও চেয়ে দেখলেন না, হঠাৎ আমারে জিজ্ঞাসা কোল্লেন, “পায়রাবাবুর বংশপরিচয় জানতে তোমার এত আগ্রহ কেন?”

    বিভ্রাট! আগ্রহের হেতুবাদটা কি জানাই? অল্পক্ষণ চিন্তা কোরে একট উদাসীনভাবে আমি বোল্লেম, “এমন কিছু আগ্রহ নয়, বিশেষ কোন হেতুও নাই, তবে কি না, পায়রাবাবু একটি পাকালোক, কুকুর বশীভূত করবার বিশেষ ক্ষমতা তিনি ধরেন, কুকুরেরাও তাঁর সঙ্গে বেশ খেলা করে। পুরুষানুক্রমে কুকুরপোষার সখ না থাকলে এতটা দক্ষতা জন্মে না, এইজন্য আমি জিজ্ঞাসা কোরেছিলেম, এ গ্রামে তাঁর কয় পুরুষের বাস? জিজ্ঞাসা করবার আর কোন কারণ ছিল না।”

    আসল কথা আমি গোপন রাখলেম। কথাটা আমি উলটে নিলেম, ছোটবাবু কিন্তু ধোত্তে পাল্লেন না; ধরবার কোন সম্ভাবনাও ছিল না, আমার সংক্ষিপ্ত উত্তর শ্রবণ কোরেই তিনি সন্তুষ্ট হোলেন। বেলাও শেষ হয়ে এলো, বাড়ীতে আমরা ফিরে এলেম।

    সেই রাত্রে আর এক অভিনব কাণ্ড। রাত্রিকালে আমার আহারের পর প্রথম প্রথম ঘরের দরজায় চাবী বন্ধ হতো, এখন বড়বাবু আমার প্রতি সদয়, এখন আর চাবী বন্ধ হয় না। অন্দরেই আমি আহার করি, সামান্য সামান্য দুই একটা কাজের অছিলায় রূপসী আমার শয়ন-ঘরে আসে; নিত্য যেমন আসে, যে রাত্রের কথা আমি বোলছি, সে রাত্রেও সেইরূপ এসেছিল, রাত্রি দশটার পূর্বেই আবার চোলে গিয়েছিল। তার পর, রাত্রি যখন অনেক, বাড়ীর সকলে যখন নিদ্রাগত, সেই সময় রূপসী আবার চুপি চুপি দরজা ঠেলে, টিপি টিপি ঘরের ভিতর প্রবেশ কোল্লে, নিঃশব্দে দরজাটা ভেজিয়ে দিলে। আমি তখনো ঘুমাই নাই। যে রাত্রে কিছু বেশী চিন্তা থাকে কিম্বা কোন প্রকার নূতন চিন্তা উপস্থিত হয়, সে রাত্রে অনেকক্ষণ পর্যন্ত আমার ঘুম হয় না। আমি জেগেই ছিলেম; যা যা হোচ্ছে, ঘরে তখনো আলো ছিল, বেশ আমি দেখতে পাচ্ছি। রূপসী আমার বিছানার কাছে এসে দাঁড়ালো। কি করে, কি মতলব, জানবার জন্য কপটে সেই সময় আমি নয়ন মুদিত কোল্লেম; অনুমানে বুঝলেম, রূপসী আমার বিছানার উপর বোসলো। কিছু‍ই আমি বোল্লেম না, চক্ষু খুলে একবার চাইলেমও না। রূপসী ক্ষণকাল নিশ্চেষ্ট; তার পর ধীরে ধীরে একবার আমার বাহুমূল স্পর্শ কোল্লে, ধীরে ধীরে নাড়া দিলে, আমি জোরে জোরে নিশ্বাস ফেলতে লাগলেম, অঙ্গসঞ্চালন কোল্লেম না; কি ভেবে রূপসী তখন আমার হাত থেকে আপনার হাতখানা একবার সোরিয়ে নিলে, কিন্তু উঠলো না। ক্ষণকাল চুপ। আবার সেই রকম অঙ্গস্পর্শ।

    কোন প্রকার স্বপ্ন দর্শন কোরে কিম্বা ঘুমের ঘোরে কোন প্রকার শব্দ শ্রবণ কোরে মানুষ যেমন হঠাৎ শঙ্কিত-ভাবে জেগে উঠে, ভাণ কোরে সেই রকম ভাব দেখিয়ে, আমি সেই সময় একবার নয়ন উম্মীলন কোল্লেম; কেবল নেত্রোন্মীলন মাত্র নয়, চমকিতভাবে বিছানার উপর উঠে বোসলেম। কাঁচা ঘুমে আশু জাগরিত লোকে সম্মুখস্থ ব্যক্তিকে যেরূপ চমকিতভাবে ত্বরিত প্রশ্ন করে রূপসীকে সম্মুখে দেখে সেই ভাবে আমি ত্বরিত প্রশ্ন কোল্লেম, “রূপসি! এত রাত্রে তুমি এখানে কি জন্য?”

    শয্যা পরিত্যাগ না কোরেই দিব্য সপ্রতিভ ভঙ্গীতে একটু মৃদুস্বরে রূপসী উত্তর কোল্লে, “আমি তোমারে একটি কথা জিজ্ঞাসা কোত্তে এসেছি। সন্ধ্যার পর যখন এসেছিলেম, তখন মনে ছিল না, সেইজন্য আবার এসেছি।”

    সহসা আমার অন্তরে বিষম সন্দেহের সঞ্চার। সংশয়াকুললোচনে কিঙ্করীর মুখখানে চেয়ে আমি বোল্লেম “জিজ্ঞাসা করবার আর কি তুমি সময় পাও নাই? যখনি ইচ্ছা, তখনি আসছো, যতবার ইচ্ছা ততবার আসছো, একটা কথা জিজ্ঞাসা করবার আর কি সময় হয় না?”

    রূপসী।— সময় হয়, কিন্তু নির্জন হয় না। কথাটা নির্জনে জিজ্ঞাসা করবারই কথা। রোজ রোজ মনে করি, জিজ্ঞাসা কোরবো, এক একদিন ভুলে যাই, এক একদিন কেহ না কেহ এখানে উপস্থিত থাকে, অবসর পাই না।

    আমি।— বুঝলেম, বুঝলেম, আবশ্যকটা বুঝলেম, আচ্ছা, আচ্ছা, বল দেখি, এত রাত্রে কি তোমার জিজ্ঞাসা?

    রূপসী।— জিজ্ঞাসা— জিজ্ঞাসা— জিজ্ঞাসা—

    আমি।— (কিঞ্চিৎ উত্তেজিত-স্বরে) এত রাত্রে ঘুম ভাঙিয়ে বোলতে বোলতে আবার থামা মারো কেন? ঘোরফের আমি বুঝি না কথাটা কি, খোলসা কোরেই বল? কি তুমি জিজ্ঞাসা কোত্তে চাও?

    রূপসী।— কথা? চাই? একটি কথা; বেশী এমন কিছুই না, কেবল একটি মাত্র কথা। তুমি যদি—

    আমি।— (বিরক্ত হইয়া) গৌরচন্দ্রিকা ছেড়ে দাও, আসল কথাটা কি, বোলতে হয় তো বল, না হয় তো চোলে যাও।

    রূপসী।— (আমার দিকে একটু হেলিয়া মৃদুস্বরে) রাগ কর কেন? রাগ কর কেন? ভাল কথাই আমি বোলছি, ভাল কথা বোলতে আমি এসেচি। রোজ রাত্রে তুমি একলাটি এইখানে শুয়ে থাকো, ভয় করে না?

    আমি।— ভয়? —কিসের ভয়? —ভূতের?

    রূপসী।— না, না, না, সে ভয় তো তুমি এক রকম ঘুচিয়ে দিয়েচ সে কথা বোলচি না; বোলচি এই— ভয় অনেক রকম। এত বড় একটা বাড়ী, তাতে আবার লোকে বলে হানাবাড়ী— মানুষ কম, তারাও আবার অন্য মহলে, এ বাড়ীতে একা থাকতে রেতের বেলা তোমার ভয় করে না?

    আমি।— কিছুতেই আমার ভয় নাই। আমি ভয় পাই না, আমার ভয় হয় না, তুমি আবার কি নূতন ভয়ের কথা বোলতে এসেছ? আচ্ছা ধর, ভয় যদি থাকে, তুমিই বা তার কি উপায় কোতে পার?

    রূপসী।— আমি? —আমি? —ভয়ের? —না, —নূতন? —না, — নয়। দেখে অবধি তোমাকে আমি বড় ভালবেসেচি, তোমার জন্যই আমার ভয় হয়। ভালবেসেচি বোলেই সর্বক্ষণ যেন আমার মনে হয়, তুমি হয় তো ভয় পাও।

    আমি।— যেন তোমার মনে হয়, আমি হয় তো ভয় পাই, এ কথার উত্তর আমি কি দিব? তুমি এক জায়গায় চাকরী কর, আমি সেই জায়গায় নূতন এসেছি, তোমার সঙ্গে আমার দেখা-শুনা হয়, আমি ভয় পাই না, তুমি ভাব, হয় তো আমি ভয় পাই, এত টান কিসের? এত ভালবাসা কিসের?

    রূপসী।— টান? —ভালবাসা? এত কথা, এত কথা? —ভাব দেখি হরিদাস! আহাহা! কি সুন্দর নামটি তোমার! হরিদাস! —ইচ্ছে করে, নামটি লিখে মালা গেঁথে, গলায় পরি। —আহাহা! —কি সুন্দর রূপখানি তোমার! — কি সুন্দর মুখখানি তোমার! কি সুন্দর চক্ষু দুটি! —কি সুন্দর চুলগুলি! —আহাহা! রংটকু যেন কাঁচা সোণা! ইচ্ছা করে, সর্বকর্ম ত্যাগ কোরে রাতদিন ঐরূপখানি আমি দেখি! —আহাহা! কি মিষ্ট বচনগুলি তোমার! —কাণে যেন মধু ঢেলে দেয়! —ইচ্ছা করে, রাতদিন ঐ মধুমুখের মধু খেয়ে ভালবাসার ভাবে বিভোর হয়ে থাকি! —আচ্ছা, হরিদাস! কত ভালবাসি আমি তোমারে, আমার প্রাণ তা জানে; তুমি কি আমারে ভালবাস না? —একটুও ভালবাসতে পার না?

    আমি দেখলেম, বেগতিক। এতক্ষণ অতটা বুঝতে পারি নাই। এতক্ষণের পর স্বৈরিণীর মনের ভাব কি তা আমি বুঝে নিলেম। কথার ভাবেই মনের ভাব, কেবল তাও না— শেষকথাগুলো বলবার সময় ছুঁড়ি আমার মুখের কাছে মুখ আনবার উপক্রম কোরেছিল! সামান্য একটা চাকরাণীর এতদূর বুকের পাটা! ত্বরিত গতিতে বিছানা থেকে নেমে ঘরের মাঝখানে গিয়ে আমি দাঁড়ালেম। রূপসী তখন ফ্যাল-ফ্যাল-চক্ষে আমার দিকে চেয়ে থাকলো। আমি তখন একটু জোরে জোরে বোলতে লাগলেম, দেখ রূপসি! এখান থেকে চোলে যাও! এখনি এ ঘর থেকে বেরিয়ে যাও! একতিল যদি বিলম্ব কর, এখনি আমি গোলমাল বাধাব, এখনি আমি বড়বাবুকে ডাকবো। বাড়ীর সব ঘুমন্ত লোকগুলিকে এখনি আমি জাগাব, ভালমুখে এখনো বোলছি, গরীবের মেয়ে, কলঙ্কের ডালি মাথায় কোরে কেন এই চাকরিটি খোয়াবে? বেরিয়ে যাও, শিষ্টশান্ত হয়ে আপনার ঘরে গিয়ে শয়ন কর।”

    আমি ভেবেছিলেম, ঐ সব কথা শুনে চাকরাণীটা ভয় পাবে, ভয় পেয়েই হয় তো ছুটে পালাবে; কিন্তু কি আশ্চর্য, একটুও ভয় পেলে না, বিছানা থেকে লাফিয়ে পোড়ে উগ্রমূর্তিতে আমার দুহাত তফাতে এসে দাঁড়ালো। সেই রোগা শরীর যেন ফুলে উঠলো, কতই যেন দীর্ঘাকার দেখাতে লাগলো, ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র চক্ষু যেন জোনাকীর মত জ্বোলে উঠলো। স্বৈরিণী তখন আমার মুখের কাছে মুষ্টিবদ্ধ দক্ষিণহস্ত ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে গৰ্জনস্বরে বোল্লে, “আচ্ছা —আচ্ছা —আচ্ছা! থাকো থাকো —থাকো। থাকো তুমি! —এতখানি ভালবেসেছিলেম, সেই ভালবাসার তুমি এই প্রতিফল দিলে! —আচ্ছা দাও! — দেখবো আমি তোমাকে! কলঙ্কের ডালি! —আরে আমার কলঙ্কের ডালি রে! — দেখবো আমি, কেমন কোরে তুমি কলঙ্কের ডালি ঝেড়ে ফেলো! আমাকে তুমি চেনো না যাদু! —আগুন —আগুন! —আগুন! — উঃ! —বুকের ভিতর আগুন জ্বোলছে! — প্রাণের সঙ্গে ভালবেসে যৌবনধন ডালি দিতে চাইলেম, তার কি না এই ফল! এত অপমান! —এত যন্ত্রণা!— উঃ! দেখবো আমি তোমাকে! — মেয়েমানুষ আমি। দেখবো আমি তোমাকে! কেমন কোরে কলঙ্ক কাটাও, দেখবো আমি! — দেখবো দেখবো! দেখবো!”

    এই রকমে শাসিয়ে শাসিয়ে নাগিনী তখন যেন যষ্টি তাড়িতা নাগিনীর ন্যায় ফোঁস ফোঁস গর্জন কোত্তে কোত্তে চপলাগতিতে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। নিশ্বাস ফেলে, দরজা বন্ধ কোরে আমি শয়ন কোল্লেম। দুটি ভাবনা আমার নূতন সহচরী। পায়রাবাবুর মাতামহালয় বীরভূমজেলা। যে দিন আমি রাঙামামীর দূত হয়ে ঔষধের মোড়ক বিলী কোত্তে গিয়েছিলেম, সে দিন জানতেম না, বাবুটির নাম পায়রাবাবু; সে দিন জেনেছিলেম সেজোবাবু! মুখখানি দেখে সেজোবাবুকে আমি আর এক বাবু অনুমান কোরেছিলেম, বীরভূমজেলার নাম শুনে, এ রাত্রে সেই অনুমানটি ঠিক মনে হোচ্ছে। ঝাঁকড়া ঝাঁকড়া বাবরীচুল, সেই সব চুলে কাণদুটি ঢাকা। বাবুটি যে দিন তাজ মাথায় দিয়ে এসেছিলেন, সে দিনের ভঙ্গীতেও কতক কতক বুঝতে পারা গিয়েছিল। ছদ্মবেশী লোকের পরচুল খুলে দিলে আসল রূপ যেমন চেনা যায়, পায়রাবাবুকে নেড়া কোরে দিতে পাল্লে, সেইরূপ চেনা যেতে পারে। বরদারাজ্যে যে কথা আমার শুনা হয়েছে, সে কথা যে ঠিক নয়, এমন আমি মনে কোত্তে পাচ্ছি না। একটা গল্প মনে পোড়লো। একগ্রামে একটি বাবু ছিল; বাবুটি কুচকুচে কালো, লম্বে প্রায় চারি হাত, অঙ্গে মাংস অনেক, মস্তকটি অল্প অল্প চুলে ঢাকা, বাবুর মাথায় কি রকম রোগ ছিল, অধিক চুল রাখলে সেই রোগটা বাড়তো, সুতরাং হপ্তায় হপ্তায় বাবুটিকে নেড়া হোতে হতো। বাবুটির দুটি তিনটি মোসাহেব ছিল, বাবুর নেড়ামূর্তি দর্শন কোরে সেই মোসাহেবরা বৃহৎ বৃহৎ তারিফ কোত্তো। কেন কোত্তো, তার কারণ ছিল। গজকুম্ভের ন্যায় বাবুর মাথায় উঁচু নীচু দুটি তিনটি ঢিবি; কেশশূন্য হোলে সেই ঢিবিগুলি বেশ জেগে উঠতো, অত্যন্ত কদাকার দেখাতো। মোসাহেবেরা সেই সময় বাবুর মুখের কাছে হেঁট হয়ে পাঁচজনের সাক্ষাতে আমোদ কোরে বোলতো, “নেড়া হোলে আমাদের বাবুর চেহারার যেমন খোলতা হয়, আর কাহারো চেহারা তেমন খোলে না। অনেকেই ত সময়ে সময়ে নেড়া হয়ে থাকে, ছি ছি! কিম্ভুতকিমাকার দেখায়। আমাদের বাবু নেড়া হোলে কার্তিকের মত রূপ ফোটে।”

    গল্পের ভাব এইরূপে। পায়রাবাবুকে যদি সেইরূপ প্রশংসায় ফালিয়ে তুলে একবার নেড়া কোরে দেওয়া যায়, তা হোলেই রঙ-তামাসা ধরা পড়ে। সজ্জাপারিপাট্য ভদ্রলোকের মত;— “দেখি তোমার চুল কেমন, দেখি তোমার কাণ কেমন,” হঠাৎ ভদ্রলোককে এমন কথা বলা ভদ্রলোকের উচিত হয় না। ছোটবাবুকে সুপারিশ কোরে পায়রাটিকে একদিন নেড়া করাই সুপরামর্শ। প্রথম চিন্তাটার সেই পর্যন্তই বিরাম। দ্বিতীয় চিন্তা রূপসী দাসীর অভিসার। রূপসীর অত্যন্ত দুঃসাহস! কুপথে আমার প্রবৃত্তি লওয়াবার অভিলাষে দুশ্চারিণী ঘোর নিশীথসময়ে এই ঘরে প্রবেশ কোরেছিল, হতমনোরথ হয়ে প্রতিশোধের ভয় দেখিয়ে গেল। নাগিনী আমারে দেখবে, নাগিনী আমারে দেখাবে, আমার মাথায় কলঙ্কের ডালি চাপাবে, এই রকম ভয়প্রদর্শন। পারে তা, দুষ্টবুদ্ধিতে কুলটারা সব কোত্তে পারে, জানি; আমি কিন্তু ভয় পাচ্ছি না। মনে জানছি, সামান্য একটা চাকরাণীর কথায় আমার ভয় পাবার কোন কারণ নাই; চরিত্রের প্রতি আমার অধিক দৃষ্টি, চরিত্ররক্ষায় সর্বদা আমি সাবধান, পাপিনী আমার কি প্রকারে অপকার কোত্তে পারবে? —কিছুই পারবে না। এই বিশ্বাসে সে ভাবনাটা আমি মন থেকে দূরে কোরে দিলেম; সে পক্ষে একরকম নিশ্চিন্ত হয়েই থাকলেম।

    রূপসীকে আমি বার বার নাগিনী বোলে উল্লেখ কোচ্ছি; দৃষ্টান্তে নাগিনী বোলছি না, বাস্তবিক তার একটা নাম যেন নাগিনী, অনেকেই এইরূপে বিবেচনা কোরবেন, পাঠকের মনে সংশয় জন্মিবারও সম্ভাবনা; সে সংশয়ের হেতু আমি রাখবো না। চাকরাণীর কাজ করে, কিন্তু চেহারায় রূপসীকে চাকরাণী বোলে বোধ হয় না, এই কারণে রামদাসকে একদিন আমি জিজ্ঞাসা কোরেছিলেম, রূপসীটা কে?—রামদাস বোলেছিল “ছোটবাবুর জন্মের অগ্রে এই বাড়ীতে একজন চাকর ছিল, তার নাম লবকুমার লাগ; তারা স্ত্রীপুরুষে এই বাড়ীতে থাকতো, তাদেরই কন্যা ঐ রূপসী। ছোটবাবুর যখন জন্ম হয়, রূপসী তখন ছোট ছিল, বড় হয়ে এখন এই বাড়ীতেই দাসীবৃত্তি কোচ্ছে।”—বঙ্গের কোন কোন জেলার ইতরশ্রেণীর লোকেরা দন্ত্য “ন” স্থলে “ল” উচ্চারণ করে, সেই অভ্যাসে নবকুমার নাগকে রামদাস বোলেছিল, ‘লবকুমার লাগ’; সুতরাং নাগের কন্যাকে আমি নাগিনী বোলে পরিচয় দিলেম।

    সে রাত্রের দুটি চিন্তাকেই ঐ প্রকারে বিদায় দিয়ে আমি নিদ্রাভিভূত হয়েছিলেম। পরদিন প্রভাতে আমার ঘরের নিয়মিত কার্যগুলি রামদাস এসে নির্বাহ কোরে গেল, রূপসী এলো না। তদবধি রূপসী আর আমার সঙ্গে দেখা করে না, আমি যখন অন্দরে যাই, রূপসী তখন আমারে দেখে, মুচকে মুচকে দুষ্টহাসি হেসে, মুখ ঘুরিয়ে অন্য ঘরে প্রবেশ করে। ক্রমাগত একপক্ষ এই ভাব। কিছুই আমি গ্রাহ্য করি না।

    পক্ষান্তে এক রাত্রে আমি আপন কক্ষে শয়ন কোরে আছি, রাত্রি অনুমান দুই প্রহরের অধিক, অন্দরের ভিতর একটা গোলমাল উঠলো দুই তিনজনের কথা, একটি কণ্ঠস্বর কিছু উচ্চ উচ্চ। সে বাড়ীর সদর অন্দর একমহলে, অতি অল্পমাত্র ব্যবধান, এ কথা পূর্বেই আমি বোলেছি। যে ঘরে আমি শয়ন করি; সে ঘর থেকে অন্দরের উচ্চ উচ্চ কথা বেশ শুনা যায়; বিশেষতঃ গভীর রাত্রে। গোলমালটা ক্রমশই বাড়তে লাগলো। বিছানা থেকে আমি উঠলেম। রূপসীর দুর্বাসনা-প্রকাশের পর থেকে শয়ন-ঘরের দরজায় আমি রাত্রিকালে অর্গলবদ্ধ কোরে রাখি, নিঃশব্দে অর্গলমুক্ত কোরে চুপি চুপি বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালেম; এত রাত্রে বাড়ীর ভিতর কিসের গোলমাল, খানিকক্ষণ কান পেতে শুনলেম। স্ত্রীলোকের কন্ঠস্বর। স্বর বোলছে, “দেখ ঠাকুরপো, দেখ! তোমার দাদার কীর্তিখানা এসে দেখ; মামীর ঘরে রাসলীলা হোচ্ছে, তোমার দাদা দেই লীলার ঠাকুর হয়েছেন; দরজা খুলে একবার বেরিয়ে এসে দেখ!”

    এই কথার পর একটা বদ্ধ দরজায় গুম গুম কারে শব্দ হোতে লাগলো; একটা দরজার খিলখোলা শব্দও আমি শুনতে পেলাম। তার পর আবার সেই পূর্বস্বরের উচ্চ ধ্বনি। ভূত-শাসনের পরদিন থেকে বড়বাবুর অনুমতিক্রমে বাড়ির বৌমা দুটি আমার সঙ্গে কথা কন; স্বরে বুঝলেম, বড়-বৌমার কণ্ঠস্বর। ডেকে ডেকে তিনি বোলছেন, “ডাকো ঠাকুরপো, ডাকো! চক্ষের উপর দেখ, এই ঘরেই তোমার দাদা! যেদিন থেকে ভূতের উপদ্রব থেমেছে, সেইদিন থেকেই এই রকম হোচ্ছে। দরকার আছে, কার্য আছে, বন্ধুর বাড়ী নিমন্ত্রণ আছে, এই রকম এক একটা অছিলা কোরে বড়বাবু রোজ রোজ সন্ধ্যাকালে বেরিয়ে যান, অনেক রাত্রে ফিরে আসেন, কিছুই আমি জানতে পারি না, তক্কে তক্কে থেকে আজ রাত্রে আমি ধোরে ফেলেছি; জেগেছিলেম, রাঙামামীর ঘরে দুজন মানুষের কথা শুনে, দুজনের হাসির শব্দ পেয়ে, বারান্দায় আমি বেরিয়েছি, কথার আওয়াজে মানুষটিকেও চিনতে পেরেছি; ডাকাডাকি কোল্লেম, কতবার দরজা ঠেল্লেম, কত বকাবকী কোল্লেম, এখন আর সাড়া-শব্দ নাই। নিশ্চয়ই এই ঘরে তোমার দাদা আছেন। কি কেলেঙ্কার! কি কেলেঙ্কার! ডাকো তুমি! দাদাকে ডাকতে সাহস না হয়, মামীকে ডাকো। সব ভুর আজ ভেঙে দিব!”

    এই সব কথা আমি শুনলেম; শব্দে জানতে পাল্লেম, মামীর ঘরের দরজা খোলা হলো। বড়বাবু রেগে রেগে বোলতে লাগলেন, “কি— কিক্ক— কি? হয়েছে কি? অত হাঁকাহাঁকি ডাকাডাকি কিসের জন্য? রাঙামামীর পেটব্যথা কোচ্ছিল, যন্ত্রণায় ছটফট কোচ্ছিল, আমাকে ডেকেছিল, তাই আমি ওষুধের ব্যবস্থা কোত্তে এসেছিলেম; দেখো না এসে, ওষুধের শিশি! হয়েছে কি?”

    বড়-বৌমা আবার চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে ব্যঙ্গ কোরে বোল্লেন, “আহাহা! কি আমার ডাক্তার গো! রসের নাগর, গুণের সাগর! পেটের ব্যথার ওষুধ দিতে এসেছিলেন! শোনো ঠাকুরপো, শোনো। তোমার দাদাবাবুর ডাক্তারী বিদ্যার পরিচয়টা একবার শুনে রাখো! ছি ছি ছি! ভদ্রলোকের বাড়ীতে এ কি কারখানা! গলায় দড়ী দিয়ে মোত্তে ইচ্ছা হয়!”

    ছোটবাবুর কোন কথা আমি শুনতে পেলেম না; বড়বাবুও চাপ কোল্লেন, বোধ হলো যেন অন্যদিকে তিনি সোরে গেলেন। আবার বড়-বৌমার কণ্ঠস্বর। মামীকে লক্ষ্য কোরে তিনি বোলতে লাগলেন, “আর তোমাকেও বলি বাছা, তুমি রাঙামামী কুটুম্বুর মেয়ে, কুটম্বর বাড়ীতে রয়েছ, এ সব ঢলাঢলি কেমন কোরে কর? লজ্জা হয় না? ধিক্কি জীবন আর কি! মামী মায়ের সমান, ভাগ্নে সন্তান তুল্লি, ভাগ্নে নিয়ে এই সব কাণ্ড! দড়ী জোটে না? দড়ী কলসী নিয়ে আঘাটায় যাও। সব জ্বালা জুড়িয়ে যাবে; তোমারও যাবে, আমাদেরও যাবে। আমি না জানি কি? তোমাকে জানি, পায়রাকেও জানি, কি রকমে ভূতের নৃত্য হতো, তাও জানি, সব আমি জানি, হাঁস, পায়রা, হীরামন, পেঁচা, দাঁড়কাক, কত রকম ডাক্তার যে তোমার পেটের ব্যথার ওষধ দিতো, কিছুই আমার জানবার বাকী নাই! এখন কি না ঘরের ভিতর বৃন্দাবন বসালে! ভাগ্নে নিয়ে নীলে-খেলা! তুমি রাধা, তিনি শ্যাম! এইবার একটি কাঁদে বাড়ী বলরাম এলেই ঠিক হয়! কি ঠাকুরপো! বলরামের পালাটা গাইতে পারবে? ধিক— ধিক— ধিক! এখন আমাদের মরণই মঙ্গল!”

    এই সময় ছোটবাবু বোধ হয়, কোন রকম থাবাথুবি দিয়ে গোলমালটা থামিয়ে দিলেন, আর কোন উচ্চবাচ্য আমি শুনতে পেলেম না। খানিকক্ষণ সমস্তই চুপচাপ; চুপি চুপি ফিরে এসে ঘরের দরজা বন্ধ কোরে বিছানার উপর আমি বোসলেম। অনিচ্ছায় আমার নাসারন্ধ্র থেকে দুটি নিশ্বাস বহির্গত হলো। কি পাপের ভোগ! ভাগ্যশেষে এমন বাড়ীতেও আমি বাস কোচ্ছি! রক্তবিচার নাই! ওঃ! সেই কথাই বটে বড়-বৌমা ঠিক ধোরেছেন! আমার মনে মনেও একটা খটকা ছিল! ঔষধের মোড়ক নিয়ে আমি রাঙামামীর দৌত্যকার্য কোরেছিলেম! কিসের ঔষধ, এখন আমি বুঝলেম। পায়রাবাবুই রাঙামামীর প্রেমের নাগর! কেবল একটি নয়, বৌমার কথায় তাও আমি বুঝতে পাল্লেম। পালায় পালায় ছাদের উপর অনেক রকম ভূত এসে দক্ষযজ্ঞ ভোগ কোত্তো! ভূতের পালা এখন ফুরিয়ে গিয়েছে, এখন ঘরে ঘরেই বৃন্দাবন! ও! কত দিনে যে এই পাপপুরী থেকে আমি পরিত্রাণ পাব, কিছুই বুঝতে পাচ্ছি না। দুরাচার রক্তদন্ত কত রকম পাপের মূর্তি যে আমাকে দেখাচ্ছে, কত রকম পাপ-কথাই আমাকে শুনাচ্ছে, আমার অন্তরাত্মাই তা জানতে পাচ্ছেন। আবার আমার নাসারন্দ্রে অগ্নিশিখা তুল্য তিনটি দীর্ঘনিশ্বাস বহির্গত।

    বোসে বোসেই আমি রজনীপ্রভাত কোল্লেম। প্রভাতে রামদাস এসে ঘরের কাজগুলি সেরে দিয়ে গেল। রাত্রে কিছু আমি জেনেছি, কিছু আমি শুনেছি, রামদাসকে সে সব কথা কিছু আমি বোল্লেম না। ক্রমে ক্রমে বেলা হলো; কথায় কথায় আমি শুনলেম, শেষরাত্রে বড়বাবু কোথায় চোলে গিয়েছেন, কেহই কিছু বোলতে পারে না। দিন গেল, সন্ধ্যা হলো, রাত্রি এলো, বড়বাবু বাড়ী এলেন না। সকলেই উদ্বিগ্ন। কর্তাগৃহিণী বাড়িতে নাই, বড়বাবু কর্তৃত্ব কোচ্ছিলেন, তিনিও অদৃশ্য! আমার মনে কিছু ভয়ের সঞ্চার হলো! সর্বদাই আমি চিন্তাযুক্ত।

    এই ঘটনার পর আট দশ দিন অতিক্লান্ত। বড়বাবুর দেখা নাই। মামীর ঘরে বৃন্দাবন-লীলার রজনীতে যে সকল কাণ্ড হয়েছিল, এই আট দশ দিনের মধ্যে সে প্রকাণ্ড কাণ্ডের কোন কথা কাহার মুখে প্রকাশ পেলে না; তুষারাবৃত আগ্নেয়গিরির ন্যায় বাহিরে বাহিরে বাড়ীখানা এক রকম ঠাণ্ডা। বোল্লেম আমি ঠাণ্ডা, কিন্তু আমার ভাগ্য-চক্রের ঘর্ষণে এক অভাবনীয় অগ্নিস্ফুলিঙ্গের উৎপত্তি! সেই রুদ্রাক্ষগ্রামেই বড়-বৌমার পিত্রালয়। একটি ভ্রাতুষ্পুত্রের অন্নপ্রাশন উপলক্ষে বৌমা পিত্রালয়ে যাবেন, রামদাস তাঁর সঙ্গে যাবে, রামদাসের মুখে সেই কথা আমি শুনলেম। আমার মনটা কেমন খারাপ হয়ে গেল। এই দূরন্ত সংসারে বড়বাবু আমার প্রতি সদয়, ছোটবাবু আমার বন্ধু, আমার প্রতি বড়-বৌমার পুত্রতুল্য স্নেহ, রামদাসটিও আমার বিশেষ অনুগত, বাধ্য; বড়বাবু কোথায় চোলে গিয়েছেন, বড় বৌমাও বাড়ীতে থাকছেন না, রামদাসও থাকছে না। বোলতে গেলে আমি এক রকম অসহায় হব। কেন ভাবি অসহায়? —অকস্মাৎ যদি কোন বিপদ ঘটে, ছোটবাবুটি ছাড়া আর কাহাকেও আমি রক্ষাকর্তা পাব না— আর কেহই আমার সহায় হবে না। ছোট-বৌমাটি ছেলে-মানুষ, যদিও তাঁর স্বভাব অতি নির্মল, তথাপি সংসারের কোন কার্যে তাঁর তাদৃশ হাত নাই। কেন এটা আমি ভাবলেম, বিপৎপাতের ভাবী আশঙ্কা হঠাৎ কেন আমার মনে এলো, সে কথা আমি বোলতে পারি না। ঘুঘুর বাসায় আমি আগুন দিয়েছি, কুকুরের মুখোসে গুলী কোরে ভূতের বাসা ভেঙ্গে দিয়েছি, রাঙ্গামামী আমার শত্রু হয়ে আছেন, অভিসারিকার কুৎসিত অভিলাষে আমি উপেক্ষা কোরেছি, রূপসী আমার শত্রু হয়ে আছে, বড়-বৌমা বাড়ী থেকে চোলে গেলে কি জানি কে কোন দিক থেকে কি প্রকার ফ্যাঁসাদ বাধায়, সেই জন্যই আমার ভয়। ভয়ত্রাতা মধুসূদন। বিপদ্‌বারণ মধুসূদনকে স্মরণ কোরে সে ভয়টা তখন আমি চেপে রাখলেম।

    যে দিন আমি এই সব কথা ভাবলেম সত্য সত্যই রামদাসকে সঙ্গে কোরে বড়বৌমা সেইদিন বৈকালে ভ্রাতুষ্পুত্রের অন্নপ্রাশন দেখতে গেলেন। তিনদিন আসবেন না, রামদাসের মুখে সে কথাও আমি শুনেছিলেম। বেলাটুকু চোলে গেল, রামদাস নাই, রূপসী আসে না, সেই পাচিকাই সন্ধ্যাকালে আমার ঘরে আলো দিলেন, রাত্রিকালে আহারের পূর্বে যা কিছু আবশ্যক, সেই প্রাচীনার দ্বারাই অগত্যা আমি সেগুলি সাধন করাতে বাধ্য হোলেম। পরদিন প্রভাতেও তিনি আমার গৃহকার্য নির্বাহ কোরে দিলেন। বেলা দুই প্রহর পর্যন্ত আমি এক প্রকার গৃহশান্তি উপভোগ কোল্লেম; সন্ধ্যার পরে বিনামেঘে বজ্রপাত!

    আহারান্তে ছোটবাবুর সঙ্গে আমি বেড়াতে বেরিয়েছিলেম, সন্ধ্যার পর ফিরে এসে দেখি, যে ঘরে আমি থাকি, সেই ঘরে আমার বিছানার উপর দুটি লোক; —একটি যুবা, আর একটি অর্ধ বৃদ্ধ। দরজার কাছে বাড়ীর দাসী আর পাচিকা। লোক-দুটির বদন গম্ভীর। আমরা আসবার পূর্বে কি তাঁরা বলাবলি কোচ্ছিলেন, আমাদের দেখে হঠাৎ থেমে গেলেন। লোক-দুটিকে পূর্বে আমি দেখি নাই, গৃহে আমরা প্রবেশ করবামাত্র তাঁরা পরস্পর মুখে-চাহাচাহি কোরে কেমন একপ্রকার ভ্রকুটী-ভঙ্গীতে আমার দিকে চেয়ে রইলেন। তাঁদের সেই গম্ভীর বদনে সেই সময় একপ্রকার বিকৃতভাব লক্ষিত হলো। রূপসীর মুখে চক্ষে উল্লাসলক্ষণ দেখলেম, বিজয়োল্লাসে বীরপুরুষের মুখ-চক্ষু যেরূপ প্রফুল্ল হয়, ঠিক্ যেন সেইরূপ; ভাব আমি কিছুই বুঝতে পাল্লেম না।

    ছোটবাবুর দিকে চেয়ে সেই দুটি লোকের মধ্যে একটি লোক যেন কিছ উদাসীনভাবে বোলেন, “বসো মিহিরচাঁদ।—বস্,” এই পর্যন্ত কথা; আমারে কেহই কিছু, বোল্লেন না। ছোটবাবু বোসলেন। উদ্বেগযুক্ত হয়ে আমিও তাঁর কাছে বোসলেম। আমার দিকেই লোকদুটির ঘন ঘন দৃষ্টি। কিয়ৎক্ষণ সকলেই নীরব। নূতন লোকেরা কি জন্য এসেছেন, ছোটবাবু সেই কথা জিজ্ঞাসা কোরবেন, উপক্রম কোচ্ছেন, এমন সময় একটি বাধা। লোকটি এক নিশ্বাস ফেলে হঠাৎ বোলে উঠলেন, “দিন যায় ত ক্ষণ যায় না। কার মনে যে কি আছে, কে যে কখন কি করে, বুঝে উঠা ভার! দিনের বেলা বাড়ীতে চুরি হয়েছে, বড় আশ্চর্য কথা।”

    যে লোকটির বয়স অধিক, তিনি প্রথম বক্তা। ছোটবাবুর বিস্ময়সূচক প্রশ্নে তিনি উত্তর কোল্লেন, “হাঁ গো, তোমাদেরই বাড়ী,—তোমারই ঘরে! স্নান করবার সময় ছোট-বৌ-মা গলার হারছড়াটি খুলে একটা তাকের উপর রেখেছিলেন, বৈকালে চুলে বাঁধবার সময় খুঁজে দেখলেন হারছড়াটি নাই। তুমি বাড়ীতে ছিলে না, তোমার মামী, পাচিকা ব্রাহ্মণী, বৌমা নিজে আর ঐ রূপসী অনেক জায়গায় অনেক খুঁজেছে, কোথাও সে হার নাই। তোমার মামীর আদেশে রূপসী ছুটে গিয়ে আমাকে সংবাদ দিয়েছিল, বরদাকান্তকে সঙ্গে কোরে তাই আমি এখানে এসেছি। ব্যাপারখানা কি, কিছুতেই তো জানা যাচ্ছে না। ঘরের ভিতর থেকে জিনিস গেল, কেহই খোঁজে পেলে না, এ বড় আশ্চর্য কথা! এসে আবার শূনলেম, রূপসী বোল্লে, ‘সেই ঘরে পালঙের নীচে জলখাবার দুটি গেলাস ছিল, তাও পাওয়া যাচ্ছে না।’ তাজ্জব ব্যাপার! দিনের বেলা বাড়ীর ভিতর কি চোর প্রবেশ কোরেছিল? বাড়ীতে এখন বেশী লোক নাই, এ কাৰ্য কার তবে?”

    পূর্ণ বিশ্বাস না কোরে একটু তাচ্ছল্য-ভাবে ছোটবাবু বোল্লেন, “আছে হয় তো কোথায়, কে হয় তো কোথায় রেখেছে, এখন মনে কোত্তে পাচ্ছে না, একটা ভাল কোরে খুঁজলেই পাওয়া যাবে; চুরি কোত্তে কে আসবে?”

    তিন পা এগিয়ে এসে, হাত নেড়ে নেড়ে রূপসী বোলতে লাগলো “খুঁজতে কি আর আমরা বাকী কোরেছি? তন্ন তন্ন কোরে খুঁজেচি; কোথাও নাই! কোথাও নাই! নিশ্চয় চুরি গিয়েছে! ছোট ছোট সিকি আধূলি নয়, দুটো একটা পয়সা নয়, মস্ত একছড়া দামী হার, বড় বড় দুটো জলের গেলাস, কোথায় লুকিয়ে থাকবে? উড়ে যাবে কি?”

    বিরসবদনে পাচিকা ঠাকুরাণী মৌনবতী। ছোটবাবু চিন্তাযুক্ত। আমি বিস্ময়াপন্ন। কথায় কথায় আমি জানতে পাল্লেম, দুটি আগন্তুক ভদ্রলোকের মধ্যে যিনি বয়োধিক, তিনি এই গ্রামের একজন বদ্ধির্ষ্ণু লোক; — দলপতি; বরদাকান্তটি তাঁর কনিষ্ঠ সহোদর। পল্লীগ্রামে কোন প্রকার অকু ঘটনা হোলে গ্রামের মোড়ল-চৌকিদারকে মধ্যস্থ রেখে তদারক করা হয়, সেই হিসাবে এই দলপতি-মহাশয় এই গ্রামের মোড়ল; নাম রূপচাঁদ ভঞ্জ। রূপসীর বাক্যাবসানে ছোটবাবুকে সম্বোধন কোরে ভঞ্জবাবু বোল্লেন, “কথাও ত ঠিক্ বটে; ছোট-খাটো জিনিস নয়, বড় বড় জিনিস, ঘরের ভিতর কোথাও থাকলে কেনই বা খুঁজে পাওয়া যাবে না? চল দেখি যাই, তুমিও চল, রূপসীও চলুক, ব্রাহ্মণীও চলুন, আমিও তোমাদের সঙ্গে যাচ্ছি। ভাল কোরে অন্বেষণ কোল্লে, বোধ হয়, পাওয়া যেতে পারে। তাতেও যদি না পাওয়া যায়, তবে নিশ্চয় চুরি; নিশ্চয়ই চোরের কাজ।”

    দলপতিবাবু এই কথাগুলি যখন বলেন, তখন কটমট চক্ষে বারকতক আমার দিকে চেয়েছিলেন; ভিতরে ভিতরে রেগেছিলেন, দন্তে দন্তঘর্ষণের কড় মড় শব্দও আমার কর্ণে এসেছিল। আমি কিন্তু এতক্ষণের মধ্যে একটিও কথা কই নাই, কেহ আমাকে কোন কথা জিজ্ঞাসাও করেন নাই, বাবুদের মুখের দিকে চেয়ে চুপ কোরে আমি বোসে ছিলেম। দলপতির অনুরোধে ছোটবাবু উঠে দাঁড়ালেন, দলপতিও উঠলেন, বরদাকান্ত বোসে থাকলেন। যাবার সময় পশ্চাতে একবার চেয়ে ছোটবাবু আমারে বোল্লেন, “যাবে হরিদাস? এসো!”

    মুখ ফিরিয়ে সচকিতে দলপতি জিজ্ঞাসা কোল্লেন, “কারে তুমি ডাকছো?— কে যাবে?—হরিদাস?— কে হরিদাস?”

    আমার দিকে হস্তনির্দেশ কোরে ছোটবাবু উত্তর দিলেন, “এই ছোকরার নাম হরিদাস; এটি এখন আমাদের বাড়ীতেই আছে; বেশ ছোকরা, স্বভাব-চরিত্র বড় ভাল; চরিত্রে কিছুমাত্র দোষ নাই।”

    মুখ ভারী কোরে বক্রদৃষ্টিতে আমার দিকে চেয়ে দলপতি-মহাশয় ছোটবাবুকে বোল্লেন, “না না, অন্যলোকের সেখানে যাবার কোন দরকার নাই; তোমাতে আমাতে গেলেই চোলবে; এসো তুমি।”

    দলপতির সঙ্গে ছোটবাবু অন্দরের দিকে গেলেন, ঘনপদক্ষেপে সর্বাঙ্গ সঞ্চালন কোরে রূপসী তাঁদের সঙ্গে সঙ্গে চোল্লো; সর্বপশ্চাতে ব্রাহ্মণী-ঠাকুরাণীও চোল্লেন। ঘরে থাকলেম আমি আর বরদাকান্ত।

    আমি আর বরদাকান্ত। উভয়ের নিকটে উভয়েই আমরা অপরিচিত। পরিচয়ের অবসর উপস্থিত। আমার পরিচয় যৎসামান্য। বিদেশী বালক, নানা বিপাকে ঠেকে নানা স্থান পর্যটন কোরে গ্রহগতিকে এই গ্রামে এসে উপস্থিত হয়েছি, এই বাড়ীতেই আছি, এই পর্যন্ত আমার পরিচয়; বরদাকান্তের পরিচয় পূর্বে একটু প্রকাশ হয়েছিল, দলপতিবাবুর সহোদর তিনি; কোথাও কাহারো চাকুরী করেন না, সর্বদা বাড়ীতেই থাকেন, পিতার একখানি তালুক আছে, সেই তালুক-সংক্রান্ত বিষয়কৰ্ম দেখেন শুনেন, স্বহস্তেও লেখাপড়া করেন। পরিচয় এই পর্যন্ত। অতঃপর আর কি কথা? —নূতন লোকের সঙ্গে নূতন কথা আমার কিছুই ছিল না, কিন্তু দুজনে এক স্থানে বোসে চুপ কোরেও থাকা যায় না; প্রসঙ্গ-শূন্য দুটি একটি ফাঁকা ফাঁকা কথা তাঁরে আমি বোলছি, তিনি এক একবার হু হাঁ দিচ্ছেন, এক একবার চুপ কোরে থাকছেন; এক একবার আমি তাঁর মুখের দিকে চাচ্ছি, দেখতে পাচ্ছি, কথার দিকে তাঁর মন নাই। কোন বিষয় শ্রবণ কোত্তে কোত্তে শ্রোতার মনে ঘৃণার সঞ্চার হোলে তাঁর মুখের ভাব যেমন হয়, বরদাকান্তের মুখের ভাব তখন সেই প্রকার। কটাক্ষভঙ্গীতে যখন তিনি আমার প্রতি দৃষ্টিপাত করেন, তখন সেই কটাক্ষে বিলক্ষণ ঘৃণার লক্ষণ প্রকাশ পায়। মনে মনে আমার সন্দেহের উদয়।

    কেন তিনি আমারে ঘৃণার চক্ষে দেখেন? তাঁর চক্ষে আমি নূতন, আমার চক্ষেও তিনি নূতন মানুষ, এ ক্ষেত্রে ঘৃণার ভাব কেন আসে? নূতন দর্শনে পরস্পর অনুরাগ-বিরাগ একপ্রকার অস্বাভাবিক। নাটক-নবন্যাসে দুই একটি নায়ক-নায়িকার প্রথম-দর্শনে অভাবনীয় অনুরাগলক্ষণ পাঠ করা যায় বটে, কিন্তু প্রকৃতির সঙ্গে সে লক্ষণের তাদৃশ মিলন অনুভূত হয় না। সেই কথাই আমি ভাবছি, ছোটবাবুর সঙ্গে দলপতি মহাশয় সেই ঘরে ফিরে এলেন। দলপতির মুখখানা তখন অত্যন্ত ভার ভার; ছোটবাবুর মুখে সংশয়মাখা। দরজার দিকে আমি চেয়ে দেখলেম, এক ধার থেকে কে একজন উঁকি মেরে মেরে দেখছে। ভাল কোরে দেখে চিনলেম, উঁকি মারছিল রূপসী, রূপসীর চক্ষু যেন তখন কি আহ্লাদে ফিক ফিক কোরে হাসছিল, ভাব কিছু আমি বুঝতে পাল্লেম না।

    একটা কর্তব্যকর্ম সমাধা কোরে যাঁরা ফিরে এলেন, তাঁদের মুখ দেখে সে কার্যের ফলাফল কিছুই বুঝা গেল না; ফলটা ভাল কি মন্দ, কিছুই প্রকাশ পেলে না। অনুমানে আমি যেন মন্দটাই ভেবে নিলেম। তাঁরা বোসলেন না, স্তম্ভিতভাবে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে গুটিকতক কথা বলাবলি কোল্লেন। সে সব কথার মর্ম এইরূপ:— “কর্তার ঘরে চাবি বন্ধ, বড়বাবুর ঘরেও চাবি বন্ধ, যে কয়েকটি ঘর খোলা আছে, সেই সব ঘরে তল্লাস করা হয়েছে, চোরা জিনিস পাওয়া যায় নাই। বরদাবাবুকে সম্বোধন কোরে রূপচাঁদবাবু বোল্লেন, তোমরা একবার নেমে দাঁড়াও; এই ঘরটা একবার অন্বেষণ কোত্তে হবে।” বরদাবাবু বিছানা থেকে নামলেন, আমারে কেহই কিছু বোল্লেন না, তথাপি আমিও নামলাম।

    রূপচাঁদবাবু স্বয়ং আমার বিছানাটী উলট-পালট কোরে বিশেষরূপে নিরীক্ষণ কোল্লেন, কিছুই দেখতে পেলেন না। শেষকালে আমার মাথার বালিশের ওয়াড় খুলে অন্বেষণ করবার সময়ে ওয়াড়ের ভিতর থেকে একছড়া হার সোরে পোড়লো। বিস্ময়ব্যঞ্জক চীৎকারস্বরে অনুসন্ধানকারী বোলে উঠলেন,— “এই বটে! এই বটে! দেখ দেখি তোমরা, এই সেই হার কি না?”

    ছোটবাবুর মুখখানি এই সময় অত্যন্ত ম্লান হয়ে এলো। ম্লাননয়নে তিনি একবার আমার মুখের দিকে চাইলেন। তাঁর চক্ষু দুটী যেন ছল ছল কোত্তে লাগলো। নেত্রপ্রান্তে অশ্রুবিন্দুও দেখা গেল। রূপসী সেই সময় ছুটে এসে হার-ছড়াটা হাতে কোরে নিয়ে ত্বরিতস্বরে বোল্লে, “এই সেই হার, এই সেই হার। বাপ্ রে! আমার প্রাণে যে ভয় হয়েছিল, সে কথা আর বোলতে পারি না; চাকরাণী-মানুষ আমি, গরীবের মেয়ে, বাড়ীর লোকেরা হয় তো মনে কোচ্ছিলেন, আমিই চুরি কোরেছি। ধর্ম আছেন কি না, চারিযুগের সাক্ষী তিনি; আমার কোন পুরুষে চোর নয়, ধর্মের কাছে আমি খাঁটী আছি। ধর্মের বিচারে ধর্মে ধর্মে আজ রক্ষা পেলেম।”

    এই সব কথা বোলতে বোলতে কেমন একপ্রকার নয়নভঙ্গী কোরে রূপসী বার বার আমার দিকে চাইতে লাগলো; খানিকক্ষণ কি একটু ভেবে ভেবে আবার বোলে উঠলো, “হার যখন এ ঘরে পাওয়া গিয়েছে, গেলাস-দুটোও তবে এই ঘরেই পাওয়া যাবে। দেখ তোমরা ভাল কোরে; খোঁজ তোমরা ভাল কোরে। এই ঘরেই পাওয়া যাবে। আমার যেন মনে নিচ্ছে, এই ঘরেই—”

    আর তারে বেশী কথা বোলতে না দিয়ে দলপতি-মহাশয় ঘরের এধার ওধার, শয্যাতল, গবাক্ষতল, সমস্ত স্থান অন্বেষণ কোল্লেন, পাকলচক্ষে ঘন ঘন আমার দিকে চাইলেন, অন্বেষণ বিফল হলো। গেলাস পাওয়া গেল না।

    ঘরের উত্তর দেয়ালে এক হাত লম্বা এক হাত চওড়া একখানা তক্তা ঢাকা; এ বাড়ীতে এসে অবধি সেই তক্তাখানা আমি দেখে আসছি। কেন যে সে তক্তা সেখানে আছে, তক্তার ভিতর কি বস্তু যে রক্ষিত আছে, একদিনের জন্যও সেটা আমার জানবার ইচ্ছা হয় নাই; খুলিও নাই, দেখিও নাই, জানিও না, জানতেমও না। হন হন কোরে চোলে গিয়ে রূপসী সেই তক্তাখানা খুলে ফেল্লে, একধারে কবজা আঁটা ছিল, তক্তাখানা ঘুরে এসে দেয়ালের গায়ে লাগলো, ভিতরটা ফাঁক হয়ে গেল;— ছোট একটী কুলুঙ্গী,— সেই কুলুঙ্গীর ভিতর দুটী বড় বড় কাঁসার গেলাস।

    “এই যে গেলাস! এই যে গেলাস! যা আমি মনে কোরেছিলাম, ঠিক তাই মিলে যাচ্ছে। কার মনে যে কি আছে, কে বোলবে? রাঙামামী বোলছিলেন, হরিদাস তেমন ছেলে নয়; আমি তো জানতেন, তেমন হরিদাস নয়; কিন্তু এখন, ধর্ম সে কথা শুনবেন কেন? হাতে নাতে ধোরিয়ে দিলেন।”

    রূপসীর কথা শুনে ঠক ঠক কোরে আমি কাঁপতে লাগলেম, হঠাৎ আমার যেন বাক্‌রোধ হয়ে এলো, একটী কথাও বোলতে পাল্লেম না; চেষ্টা কোল্লেম কিছু বলবার, কথা আসলে ফুটলোই না; ললাটে বিন্দু বিন্দু ঘর্ম। ভাবতে লাগলেম, একি আশ্চর্য ব্যাপার! এ সব জিনিস আমার ঘরে কেমন কোরে এলো? কে এমন শত্রুতাবাদ সাধলে? কার কাছে আমি কি অপরাধী হয়েছিলেম? ভগবান আমার ভাগ্যে কেন এমন ঘটালেন? ওঃ! বৃথা কলঙ্কের আগুনে কেন আর দগ্ধ হও? বাহির হও! রাত্রিকাল, অন্ধকারে অন্ধকারে এই বেলা বাহির হয়ে যাও! কল্যকার সূর্য যেন আমার এই কলঙ্কিত বদন দর্শন না করেন!

    ভাবলেম অনেক। কতই যে ভাবলেম, ভেবে কিছু কূল-কিনারা পেলেম না। ভাবলেই বা কি হবে? লোকে আমার কথা শুনবে কেন? এত বড় প্রমাণের সম্মুখে লোকে আমার মনোবেদনা বুঝবেই বা কেন? চুতুর্দিক যেন আমি অন্ধকার দেখতে লাগলেম। যেখানে দাঁড়িয়ে ছিলেম, সেখান থেকে আর এক পাও নড়তে পাল্লেম না। দুটী চক্ষু দিয়ে অনবরত জলধারা গড়াতে লাগলো।

    আমারও যেমন বাকরোধ, ছোটবাবুরও প্রায় সেইরূপই বাকরোধ হয়েছিল। মোড়লবাবুর উগ্রমমূর্তি দর্শন কোরে উগ্রমূর্তি শ্রবণ কোরে, তিনি তখন অল্প অল্প কম্পিত-কণ্ঠে বোল্লেন, “শুনলেম সব; শুনলেম সব, কিন্তু বুঝলেম না কিছুই, হরিদাস চোর, কিছুতেই আমার বিশ্বাস হোচ্ছে না। এতদিন রয়েছে, একদিনও হরিদাসের স্বভাবে বিন্দুমাত্রও দোষ আমি দেখি নাই; অকস্মাৎ চোর হবে, কিছুতেই আমার বিশ্বাস হয় না; বোধ হয়, এ কাণ্ডের ভিতর কাহার কুচক্র থাকতে পারে।”

    আমি সেই সময় একটু সাহস পেয়ে ছোটবাবুর দুটি পায়ে জোড়িয়ে ধোল্লেম, চক্ষের জলে পা-দুখানি ভিজিয়ে দিলেম, কম্পিত-স্তম্ভিত স্বরে বোল্লেম, “দোহাই ছোটবাবুর! দোহাই ধর্মের! আমি চোর নই; কিছুই আমি জানি না, আমারে নষ্ট করবার মতলবে কে যে এই কুচক্রের সৃষ্টি কোরেছে, কিছুই আমি বুঝতে পাচ্ছি না; আপনি আমারে রক্ষা করুন! দোহাই আপনার থানায় খবর দিবেন না, থানায় আমারে পাঠাবেন না! বহু যন্ত্রণা আমি সহ্য কোরেছি, তত যন্ত্রণা পেয়েও জন্মাবধি আমি নিষ্কলঙ্ক, থানার হাতে সোঁপে দিলে কখনই আমি বাঁচবো না; ঘৃণায়, অপমানে, মিথ্যা অপবাদে প্রাণ আমার আপনা হোতেই ঠিকরে বেরিয়ে যাবে!”

    আমার সকরুণ রোদনে অন্তরে ব্যথা পেয়ে, দলপতির দিকে চেয়ে, গদগদবচনে ছোটবাবু তখন বোল্লেন, “আপনি আমাকে ক্ষমা করুন, জিনিসগুলি হরিদাসের ঘর থেকে বেরিয়েছে, যদিও স্বচক্ষে আমি দেখলেম, তথাপি হরিদাসকে চোর বোলতে আমার মন চায় না। হরিদাসকে আমি থানায় দিতে পারবো না; যেখান থেকেই যা হোক, জিনিসগুলি পাওয়া গিয়েছে এই মঙ্গল, হরিদাসকে পীড়ন কোত্তে আদৌ আমার ইচ্ছা নাই।”

    মোড়লবাবু রেগে উঠলেন; আসনত্যাগ কোরে দাঁড়িয়ে উঠে সক্রোধে বোলতে লাগলেন, “ইচ্ছা নাই? যদি ইচ্ছা নাই, তবে তোমার বাড়ীর মেয়েরা আমাকে খবর দিয়েছিল কেন? ডেকে পাঠিয়েছিল কেন? ঘরে ঘরে মিটমাট কোরে ঘরের ভিতর চোর পুষে রাখলেই তো ঠিক হতো, ডেকে এনে অপমান করা কি জন্য? থানায় তুমি যাবে না? চোরকে তুমি থানায় তবে দিবে না? আচ্ছা! আচ্ছা! থাক তবে। তুমি বুঝি মনে কোচ্ছো, আমার কান ক্ষমতা নাই? থানার দারোগা আমার আজ্ঞাকারী, মেজেষ্টার সাহেবের ডান হাত আমি, আমার পরামর্শ নিয়ে মেজেষ্টার সাহেব কাজ করে। আমার কথায় চোরকে তুমি থানায় দিতে রাজী নও? —আচ্ছা, আমি তবে চোল্লেম, দেখি, চোরকে তুমি কেমন কোরে রক্ষা কর! এসো হে বরদা! ঝকমারী কোরেছিলেম— এসেছিলেম, এসো!”

    সরোষগর্জনে এই সব কথা বোলতে বোলতে মহাপ্রতাপশালী দলপতিমহাশয় চঞ্চলপদে ঘরের চৌকাঠ পর্যন্ত অগ্রসর হোলেন। চঞ্চলপদে পশ্চাতে ধাবিত হয়ে তাঁর দুখানি হাত ধোরে মিনতিবচনে ছোটবাবু বোল্লেন, “রাগ কোরবেন না মহাশয়, রাগের কথা নয়, যে সব কথা আমি বোল্লেম, ভাল কোরে আপনি বিবেচনা করুন। যদি ঠিক ঠিক প্রমাণ হয়, অগত্যা থানার সাহায্য গ্রহণে আমি অসম্মত হব না; এখনো আমার সন্দেহ দূর হয় নাই, বিষম সন্দেহ আছে। হরিদাসের চরিত্র আপনি জানেন না, সেইজন্যই এত ব্যস্ত হোচ্ছেন; আমরা সকলেই জানি, হরিদাসের স্বভাব নিষ্কলঙ্ক। কর্তা বাড়ী নাই, দাদা বাড়ীতে নাই, বড়-বৌটিও পিত্রালয়ে; তাঁরা আসুন, ইতিমধ্যে আমি আরও ভাল কোরে তত্ত্বটা জানি, যে তত্ত্ব আজ প্রকাশ পেলে, এ তত্ত্বের বিপরীত যদি কিছু প্রকাশ না হয়, তা হোলে—”

    বিরক্ত হয়ে ভঞ্জবাবু বোলে উঠলেন, “তত্ত্ব আবার জানবে কি? তত্ত্ব জানবার আর বাকী কি? তোমার মামীও বোল্লেন, এই দাসীটিও বোল্লে, আজ বৈকালে এই ছোকরা ছোট-বৌমার ঘরে প্রবেশ কোরেছিল, অনেকক্ষণ সেই ঘরে ছিল; স্বকর্ণেই শুনে এলে, সে প্রমাণের উপর বিপরীত প্রমাণ তুমি আর কি জানতে চাও? আমি বাপু, তোমাদের ওসব কথার ভিতর আর থাকতে চাই না, চোর-ডাকাত ধরা যাদের কাজ, তারা যা জানে, তাই কোরবে, আমি এখন রিপোর্ট দিয়ে—”

    শেষকথা না শুনেই অধিক ব্যগ্রতা জানিয়ে ছোটবাবু বোল্লেন, “না মহাশয়! ও কাজ আপনি কোরবেন না; রিপোর্ট এখন পাঠাবেন না। বাড়ীর ভিতর বৌমানুষের ঘরে দিনের বেলা চুরি, এ কথাটা অনেক রকমে ঘোরে; কলঙ্কের ভয় আছে, রিপোর্ট আপনি এখন পাঠাবেন না; হরিদাস বরং এখন এই ঘরের মধ্যেই আটক থাকুক, ঘরের দরজায় আমি সর্বদা চাবীবদ্ধ রাখবো, এই ঘরটাই এক রকম হাজত-গারদ হবে, হরিদাস কোথাও যেতে পাবে না, যদি পালায়, হাজির করবার জন্য আমি দায়ী থাকবো, থানা জানাজানিতে এখন দরকার নাই; অনুগ্রহ কোরে আপনি আমার এই প্রস্তাবে সম্মতিদান করুন।”

    কিঞ্চিৎ শুভগ্রহ। সরলমনে না হউক, আন্তরিক অনিচ্ছায় দলপতিমহাশয় কিঞ্চিৎ ক্রোধ সংবরণ কোল্লেন, ছোটবাবুর অনুরোধে তিনি আমারে তত শীঘ্র পুলিশে পাঠাতে জিদাজিদি কোল্লেন না, ঘরের গারদে আটক রাখাই সাব্যস্ত হলো, বরদাকান্তকে সঙ্গে নিয়ে ভঞ্জবাবু বিদায় হোলেন। ঘরের গারদেই আমি বন্দী হয়ে থাকলেন। আমি পালাবো না, ছোটবাবু, সেটি জানতেন, দিনের বেলায় চাবী দিতেন না, রাত্রিকালে আহারাদির পর চাবী বন্ধ হতো। তিন দিন তিন রাত্রি এই রকম।

    চতুর্থ দিবসে বড়বৌমা বাড়ী এলেন, রামদাসও এলো। রামাদাসকে দোসর পেয়ে আমি অনেকটা ভরসা পেলেম। চোর অপবাদে ঘরের ভিতর আমি কয়েদ, বড়বৌমা সে কথা শুনলেন। যেমন যেমন হয়েছিল, তার উপর দশটা ডালপালা দিয়ে সাজিয়ে রাঙামামী তাঁর কাণ ভারী করবার— মন ভারী করবার চেষ্টা পেলেন; রূপসীও তাতে বাতাস দিলে, বড়বৌমা সে সব কথায় কিরূপ উত্তর দিয়েছিলেন, সে সব আমি শুনতে পেলেম না। রামদাসের মুখে শুনলেম, ছোটবৌমা বোলেছেন, “যেদিনে চুরী হয়, সেদিন বৈকালে হরিদাস আমার ঘরে প্রবেশ করে নাই।” তিনি আরো বোলেছেন, “হরিদাস চুরী কোরবে, এমন কথা তিনি মনের কোণেও স্থান দেন না।” এ সংবাদেও আমার একটু ভরসা হলো। ধর্মে যার অকপট বিশ্বাস, ধর্ম তারে রক্ষা করেন, চিরদিন এইরূপে আমার ধারণা; শাস্ত্রে কবিবাক্যেরও সেইরূপ মর্ম; সেই বিশ্বাস উদ্দেশে ধর্মদেবকে নমস্কার কোরে ভক্তিভাবে ভগবান দীনবন্ধুর করুণাময় নাম আমি জপ কোত্তে লাগলেম।

    এক গৃহস্থের এক গৃহমধ্যে আমি কয়েদ; রামদাস ছিল না, কথার দোসর পেতেম না, পাচিকা ব্রাহ্মণী দুইবেলা আমার আহারসামগ্রী দিয়ে যেতেন, সর্বদাই তাঁর মুখখানি আমি বিষণ্ণ বিষণ্ন দেখতেম। বিষণ্ণনয়নে আমার মুখের দিকে তিনি চেয়ে চেয়ে থাকতেন, কথা কইতেন না; দিবারাত্রি আমি একাকী থাকতেম। তিন দিন এই রকমে কেটেছিল। এখন রামদাস এসেছে, রামদাস মাঝে মাঝে আমার ঘরে আসে, দুটি পাঁচটি কথা কয়, আমি চোর হয়েছি, রামদাস সে কথায় বিশ্বাস করে না, আমার অবস্থা দেখে বরং দুঃখ প্রকাশ করে। রাত্রিকালে যখন চাবী বন্ধ হয়, তখন আর রামদাস আসতে পায় না। রাত্রেই আমার ভীষণ যন্ত্রণা।

    চিন্তা করা আমার অভ্যাস। ভগবান আমারে যত চিন্তা দিয়েছেন, তত চিন্তা বোধ হয়, আর কাহাকেও দেন নাই। চিন্তা ভগবান দেন কি মানুষে দেয় কি আপনাআপনি আসে, সে তত্ত্ব আমি জানি না; কিন্তু শৈশবে যখন গুরগৃহে ছিলেম, তখন অবধিই আমার চিন্তা করা শিক্ষা হয়েছে; দুশ্চিতাই অধিক; স্বভাবতঃ শুভচিন্তা আসে বটে, কিন্তু শুভঘটনা আমার ভাগ্যে প্রায়ই ঘটে না, কাজে কাজে শুভচিন্তাগুলি জলবিম্বের ন্যায় অন্তরেই মিলিয়ে যায়। কিঞ্চিৎ জ্ঞানোদয় হবার সঙ্গে সঙ্গে চিন্তা আমারে অধিকার কোরেছে, অবিচ্ছেদে আমার হৃদয়ে আশ্রয় নিয়েছে, রাত্রিকালে অধিক পরাক্রম প্রকাশ করে। এখন আমার যেরূপ অবস্থা, এ অবস্থায় অন্য চিন্তা আমি ভুলে যাই। নাম নাই, পরিচয় নাই, আশ্রয় নাই, একটিও আপনার লোক জানা নাই; ছিল কেবল একটি চরিত্র, রেখেছিলেম কেবল একটি চরিত্র, সেই চরিত্র এখন সঙ্কটাপন্ন, প্রতি নিশাকালে সেই চিন্তাই এখন কেবল প্রবলা। রাত্রিতে শুয়ে শুয়ে ভাবি কেবল কি হলো? আমি চোর হোলেম! বিধাতার মনে কি এই ছিল? মানুষের কাছেও আমি অপরাধী নই, বিধাতার কাছেও আমি অপরাধী নই, তবে কেন আমার কপালে এমন ঘোটলো? আমি অদৃষ্টবাদী, অদৃষ্টকেই আমি বলবান জ্ঞান করি। দুই একখানি পুস্তকে আমি পাঠ কোরেছি, কোন কোন লোক অদৃষ্ট মানে না। যারা মানে না, তারা সুখে থাকে কি কষ্টে থাকে, তাও আমি বুঝে উঠতে পারিনে, বোধ হয় যেন তারা বেশী কষ্ট পায়। ভাগ্যফল আমি মানি, সেই কারণেই জন্মাবধি মানুষের অসহ্য কষ্ট আমি সহ্য কোত্তে পাচ্ছি, অদৃষ্টে আছে, ঘোটছে, এই আমার প্রবোধ; ভাগ্য যদি না মানতেম, তা হোলে বোধ হয়, কিছুতেই এ সকল কষ্ট আমি সহ্য কোত্তে পাত্তেম না। চিরজীবন কষ্টে যাবে, চিরজীবন বিপদগ্রস্ত হয়ে থাকতে হবে, কাহারো অদৃষ্টে এমন ফল লেখা থাকে না। কখন না কখন জীবনকালের মধ্যে আমার ভাগ্যে শুভদিনের উদয় হবে, মহাবিপদে পতিত হয়েও সেইটিই আমি ভাবি; সেই শুভ আশা আমার অবসর হৃদয়কে প্রফুল্ল কোরে দেয়, তাতেই আমি বেঁচে আছি। অদৃষ্টবাদে অবিশ্বাস থাকলে বোধ হয় কখনই আমি বাঁচতেম না। লোকে যেটিকে বিধাতার লিখন বলে, আমি সেটিকে বিধাতার ইচ্ছা মনে কোরেই আপনা আপনি সান্ত্বনা প্রাপ্ত হই।

    পাঁচ দিন গেল, চোর অপবাদে পাঁচ দিন আমি বন্দী; থানার গারদে অথবা রাজকারাগারে বন্দী হয়ে থাকলে লোকে যত যন্ত্রণা ভোগ করে, তত যন্ত্রণা আমার হয় না বটে তথাপি আমি যেন মনে করি, অপরাধী বন্দী অপেক্ষা আমার যন্ত্রণা অধিক। অপরাধীরা জানে অপরাধের দণ্ড; আমি জানি কি? —আমি জানি, বিনা অপরাধে বিষম কলঙ্কে অজ্ঞাত লোকের কুচক্রে অকারণে আমি কারাবাসী!

    অকারণ? —অসম্ভব! কারণ ব্যতিরেকে কোন কার্যই হয় না; অকারণে আমার কারাবাস, মূলতত্ত্ব অগ্রাহ্য কোরে কি সাহসে আমি এমন কথা বলি? অকারণে নয়, অবশ্যই কারণ আছে; সে কারণটা কি তবে? ষষ্ঠ যামিনীর অবসানকালে এই তর্ক আমার মনোমধ্যে সমূদিত। মিথ্যা অপবাদে আমার কারাবাসের কারণ কি তবে? ভাবলেম অনেক; যে ক-দিন কয়েদ আছি, সে ক-দিন নিত্য নিত্যই ঐ কথা ভাবি; মনে মনে একটা সন্দেহ জাগে। এই শেষের রাত্রে যেন কার উপদেশে অবধারণ কোল্লেম, কারণসূত্র দুটি মনুষ্য;— দুটি স্ত্রীলোক। বাবুদের রাঙামামী বহু নায়ক-বিলাসে কলঙ্কিনী ছিলেন, বাড়ীতে ভূতের উপদ্রবে সে কলঙ্কে এক রকম চাপা পোড়ে থাকতো; পিণ্ডদানে না হোক, মন্ত্রবলে না হোক, আগ্নেয়াস্ত্রের বলে সে সব ভূত আমি তাড়িয়েছি, রাঙামামী দারুণ মনঃপীড়া প্রাপ্ত হয়েছেন, তাঁর মনঃপীড়ার প্রধান হেতুই আমি; সেই কারণে আমার উপর রাঙামামীর মর্মান্তিক রাগ হওয়া সম্ভব। তিনি আমার এই কলঙ্কের— এই যন্ত্রণার একটি কারণ। আর এক কারণ রূপসী। —কুৎসিত অভিলাষে রূপসী আমার কাছে প্রেমভিক্ষা চাইতে এসেছিল, ঘৃণা পূর্বক আমি তাকে প্রত্যাখ্যান কোরেছি, প্রতিফল দিবে বোলে রূপসী আমারে ভয়প্রদর্শন কোরে রেখেছিল, অবসর বুঝে সেই কোপ— সেই আক্রোশ জাগিয়ে তুলেছে। রাঙামামী আর রূপসী, উভয়েই আমার শত্রু! কি সূত্রে তাদের সেই কুচক্র প্রকাশ পায়, আপন মনে তার উপায় কল্পনা কোত্তে আমি সচেষ্ট হোলেম। উপায় আমার কল্পনায় এলো না। কল্পনার সঙ্গে ঊষাসতী ধীরে ধীরে বিদায় হয়ে গেলেন। রজনী প্রভাত।

    প্রভাতে আমার কয়েদঘরের চাবী খুলে রামদাস প্রবেশ কোল্লে। গৃহকর্ম সমাধা কোরে ম্লানবদনে রামদাস আমার বিছানার ধারে এসে বোসলো। কাতরনয়নে রামদাসের মলিন বদন নিরীক্ষণ কোরে সন্দিগ্ধস্বরে আমি জিজ্ঞাসা কোল্লেম, “রামদাস! সর্বদা আমি তোমাকে প্রফুল্ল দেখি, আজকাল তুমি এমন হয়েছ কেন? যখন তোমাকে দেখি, তখনি তোমার মুখখানি শষ্ক শুষ্ক, মুখে হাসি নাই, বেশী কথা নাই, কি যেন ভাবো, এই রকম লক্ষণ দেখতে পাই; কারণ কি?”

    ম্লানবদনেই রামদাস উত্তর কোল্লে, “কারণ তুমি; তোমাকে এরা চোর বোলে আটক রেখেছে, বড় আশ্চর্য ব্যাপার! এই কথা শুনে আমি যেন আকাশ থেকে পোড়েছি। এ বাড়ীতে কারা তোমার শত্রু, তা আমি জানতে পাচ্ছিনে; শত্রু পক্ষের কুচক্র ভিন্ন তোমার নামে এত বড় কলঙ্ক আর কিছুতেই সম্ভব হয় না। বাড়ীর ভিতর আমি শুনলেম, বড়-বৌমা বোলছেন, হরিদাস কখনই চোর নয়; ছোট-বৌমা বোলছেন, হরিদাস কখনই চোর নয়; ব্রাহ্মণী বোলছেন, হরিদাসকে সোণার সঙ্গে ওজন করা যায়; সোণাতে বরং খাদ থাকে, হরিদাসে খাদ নাই। এই তো তিনজনের কথা, তবে আর কার কথাতে লোকে তোমাকে অপরাধী বোলে বিশ্বাস কোরবে?”

    রামদাসের কথায় কিঞ্চিৎ উৎসাহ পেয়ে রামদাসকেই আমি জিজ্ঞাসা কোল্লেম, “তোমার কি রকম বোধ হয়?” রামদাস বোল্লে, “আমার তোমাকে দেবতা বোলে বোধ হয়। কলিকালে দেবতা যদি থাকে, ধৰ্ম যদি থাকে, তারা তবে অবশ্য তোমার মত একটি ক্ষুদ্র দেবতাকে—”

    বারান্দার দিকে মানুষের পদশব্দ। কারা যেন শীঘ্র শীঘ্র সেই ঘরের দিকে চোলে আসছে, এই রকম দ্রুত পদবিক্ষেপের শব্দ। রামদাসের কথা সমাপ্ত হোতে না হোতেই ছোটবাবুর সঙ্গে সেই দলপতিবাবু গৃহমধ্যে প্রবেশ কোল্লেন। রামদাস আমার বিছানার ধারে বোসে ছিল, এই সময় সোরে গেল;—ঘর থেকে বেরিয়ে গেল না, একটু দূরে দেয়াল ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলো। উপবেশন করবার অগ্রেই আমারে সম্বোধন কোরে একটু কুণ্ঠিতম্বরে দলপতিবাবু বোল্লেন, “হরিদাস! আগে ঠিক বুঝতে না পেরে আমি তোমাকে অপরাধী বিবেচনা কোরেছিলেম, এখন জানতে পাল্লেম, বিষম কুচক্র। তোমাকে আমি কষ্ট দিয়েছি, সে জন্য তুমি কিছু মনে কোরো না, ভুলচুক সকলেরই আছে; প্রথমে আমার বুঝবার ভুল হয়েছিল; তুমি এখন রাহুগ্রাসমুক্ত পূর্ণচন্দ্রের ন্যায় সগৌরবে প্রকাশ পাবে, তার আয়োজন হয়েছে। ছোটবাবুর মুখে সকল কথা শ্রবণ কর।”

    উৎফুল্ল-নয়নে ভঞ্জমহাশয়ের মুখপানে আমি চাইলেম, মনের কথা তিনি বোল্লেন, কিম্বা ব্যঙ্গচ্ছলে আমার প্রাণে অধিক বেদনা দিচ্ছেন, সেই তত্ত্বটি জানবার জন্য তাঁর দুটি নয়ন আমি নিরীক্ষণ কোল্লেম। কথা কবার সময় মনের ভাব অনেকটা নয়নে প্রকাশ পায়; রূপচাঁদ ভঞ্জের নয়নে বদনে ব্যঙ্গের লক্ষণ কিছুই দেখা গেল না।

    আমি যেখানে বোসে ছিলেম, তার দুই হাত তফাতে ফুল্লবদনে ছোটবাবু বোসলেন, ছোটবাবুর পার্শ্বে ভঞ্জবাবু উপবেশন কোল্লেন। ছোটবাবুর মুখে কি আমি শুনবো, আগ্রহে আগ্রহে প্রতীক্ষা কোচ্ছি, চক্ষের জল মুছতে মুছতে পাচিকাঠাকুরাণী সেই সময় এসে দেখা দিলেন।

    ছোটবাবু বোল্লেন, “আপনাদের কথাতেই আপনারা ধরা দিয়েছেন, ‘ধৰ্ম্মের কল বাতাসে নড়ে’, এই একটা সাধারণ কথা আছে, উপস্থিত ক্ষেত্রে সেই কথাই মিলে গেল। হরিদাস চুরি করে নাই, সে কথা সপ্রমাণ করবার সাক্ষী-সাবুদ ছিল না, ধর্মই সাক্ষী হোলেন। রূপসী বোলেছে সেই দিন বৈকালে হরিদাস আমাদের শয়নঘরে প্রবেশ কোরেছিল, রাঙামামী সেই কথার পোষকতা কোরেছিলেন। বৈকাল কথাটা মাঝখানে যদি না থাকতো, তা হোলে শীঘ্র শীঘ্র সংশয়ভঞ্জনের সুবিধা হোতো না। রূপসীকে আমি গতরাত্রে অনেক সওয়াল কোরেছিলেম, প্রত্যেক সওয়ালের জবাবেই রূপসী ধরা পোড়েছে। রূপসী ধরা পোড়লেই রাঙামামীর ধরা পড়া হলো, তাতে আর সন্দেহমাত্র নাই। আচ্ছা হরিদাস! রূপসী তো তোমার কাজকর্ম কোরে দিত, তোমার নাম হোলেই ভাল কথা বোলতো, হঠাৎ ভাবান্তরের হেতু কি, তা কি তুমি কিছু বুঝতে পার? কিছু কি অনুমান কোত্তে পার?”

    ভাবতে ভাবতে আমি উত্তর কোল্লেম “পারি কিছু, কিছু, কিন্তু সে কথা এখানে বলবার নয়, সকল লোকের সাক্ষাতে সে কথা আমি বোলতে পারবো না। আপনাদের প্রসাদে যদি আমি কলঙ্কমুক্ত হোতে পারি, তা হোলে সময়ান্তরে আপনাকে আমি নির্জনে সেই কথাগুলি শুনিয়ে দিব। বস্তুতঃ রূপসীর ভাবান্তরের বিশিষ্ট কারণ আছে, এই পর্যন্ত এখন আমি বোলে রাখতে পারি।”

    দলপতির নয়নে ছোটবাবু নয়ন নিক্ষেপ কোল্লেন, ধীরে ধীরে মস্তকসঞ্চালন কোরে দলপতি যেন একটু শিউরে উঠলেন, উভয়ের ঐরূপে ভঙ্গী আর দৃষ্টিবিনিময় আমি দর্শন কোল্লেম; বোধ হলো যেন, ঐ দিন প্রাতঃকালেই দলপতির সঙ্গে ছোটবাবুর তৎসম্বন্ধে কোন প্রকার কথা হয়েছিল, লক্ষণেই সেটি বুঝা গেল; সেই কথা স্মরণেই দলপতির ঐ ভাবে মস্তক সঞ্চালন।

    পাচিকাঠাকুরাণী আমার মুখের দিকে চেয়ে দলপতিকে বোল্লেন “যে কথা রূপসী বলে, সেই কথাটা আমি আর এক রকমে জানি। হরিদাসের কিছুমাত্র দোষ নাই, চন্দ্রসূর্য সাক্ষী কোরে সে কথা আমি বোলতে পারি।”

    রামদাসের দিকে চক্ষু ফিরিয়ে ছোটবাবু আদেশ কোল্লেন, “যাও রামদাস! রূপসীকে এখানে আন!”— আদেশমাত্রেই রূপসীকে আনতে রামদাস অন্দরে গেল। আমি বুঝতে পাল্লেম, আজ আবার নূতন বিচার হবে; এই বিচারের ফলের উপর আমার ভাগ্যফলাফল নির্ভর কোত্তে লাগলো।

    রামদাসের সঙ্গে রূপসী এসে উপস্থিত। আমার দিকে রূপসী আর চায় না, কোন দিকেই চায় না, কতই যেন ভালমানুষ, সেইভাবে মাথাটি হেঁট কোরে আপনার পদনখগুলি নিরীক্ষণ কোত্তে লাগলো। দলপতির দিকে ছোটবাবু, একবার নয়ন ইঙ্গিত কোল্লেন, ইঙ্গিতের তাৎপর্য হৃদয়ঙ্গম কোরে দলপতিমহাশয় কেবল রূপসীকে জিজ্ঞাসা কোত্তে লাগলেন; “রূপসি! হরিদাস যখন সে দিন ছোট বৌ-মার ঘরে প্রবেশ কোরেছিল, তখন বেলা কত?”

    রূপসী।— বেলা? —বেলা বৈকাল।

    দল।— বৈকাল বোল্লে অনেকটা সময় বুঝায়। বেলা দুই প্রহরের পর সন্ধ্যার পূর্বক্ষণ পর্যন্ত বৈকাল। তার মধ্যে কোন সময় তুমি হরিদাসকে সে ঘরে যেতে দেখেছিলে, সেইটি আমি জানতে চাই। বৈকালে দেখেছিলে, সে কথায় কিছুই স্থির বুঝা যায় না।

    রূপসী।— তবে আমি কি বোলবো?

    দল।—হরিদাসকে যখন তুমি দেখেছিলে, তখন কতখানি বেলা ছিল?

    রূপসী।— বেলা ছিল আন্দাজ চার দণ্ড কি ছয় দণ্ড। আমি যখন—

    এই সময় আমি ভিতরদিকের বারান্দায় বস্ত্রঘর্ষণের খস খস শব্দ শুনতে পেলেম; বুঝতে পাল্লেম, বিচারফল কিরূপ দাঁড়ায়, সেইটি শুনবার জন্য বাড়ীর স্ত্রীলোকেরা, স্ত্রীলোকেরা মানে, বৌ-মা দুটি সেইখানে এসে লুকিয়ে দাঁড়িয়েছেন, উৎকণ্ঠিতা হয়ে অঙ্গবস্ত্র সঞ্চালন কোচ্ছেন। ছোটবাবুর কর্ণ অথবা চক্ষু, সে দিকে ছিল না, রূপসীর অসমাপ্ত কথায় বাধা দিয়ে তিনি একটু উচ্চকণ্ঠে বোলে উঠলেন, “চারি দণ্ড কি ছয় দণ্ড! ধন্য জগদীশ!— আচ্ছা রূপসী! ছয় দণ্ড বেলা থাকতে হরিদাস কোথায় ছিল, তা কি তোমার মনে আছে?”

    রূপসী।— কেন থাকবে না? সেই সময় বৌ-মার ঘর থেকে বেরিয়ে আপনার ঘরে এসেছিল।

    ছোট।— হার আর গেলাস তখন হরিদাসের হাতে ছিল, তা কি তুমি দেখেছিলে?

    রূপসী।— তখন দেখি নাই, তার পর এই ঘরে যখন তল্লাস করা হয়, তখন এই ঘরেই বেরিয়েছে।

    ছোট।— তা তো জানি, বেরিয়েছে। কিন্তু চার ছ দণ্ড বেলা থাকতে হরিদাস কোথায় ছিল, সে কথা তুমি বলতে পার না?

    রূপসী।— কোথায় আর থাকবে? যেখানে থাকে, সেইখানেই ছিল।

    ছোট।— (পাচিকার প্রতি) আপনি কি জানেন? রূপসী যে কথা বোলছে, এই কথাই কি সত্য?

    পাচিকা।— চার ছ দণ্ড বেলা থাকতে রূপসী দুবার হরিদাসের ঘরে এসেছিল। হরিদাস তখন ঘরে ছিল না, এই পর্যন্ত আমি জানি, ছোট বৌমাও তাই জানেন।

    ছোট।— হাঁ! ছোট-বৌ সে কথা আমাকে বোলেছে; সব আমি জানতে পাচ্ছি। রাঙামামী আর রূপসী একপক্ষ। আপনি আর ছোট-বৌ এক পক্ষ। যার বস্তু সে বলে না হরিদাস দোষী, রূপসী বলে হরিদাস চোর, এখনই এ তত্ত্বের মীমাংসা হবে।

    আমি সেই সময় দাঁড়িয়ে উঠে দলপতিকে আর ছোটবাবুকে বিনীতভাবে বোল্লেম, আমার ঘরে চোরা জিনিস বেরিয়েছে, আমি দোষী হয়েছি, রূপসীর সাক্ষ্যবাক্যে সেইটিই সপ্রমাণ হোচ্ছে। এই সঙ্গে আর একটি তত্ত্বের মীমাংসা হোক। ঐ যে দেয়ালের গায় কুলঙ্গী, ঐ কুলঙ্গী আমি কখন দেখি নাই তক্তা ঢাকা থাকতো, কি তো কি, ওদিকে আমি চাইতেম না। ঐ কুলঙ্গীর ভিতর গেলাস- দুটি কি রকমে এসেছিল, সেই কথা আমি—

    আর আমারে কিছু বোলতে না দিয়ে গম্ভীর বদনে ছোটবাবু বোল্লেন, “বাস! বাস! তোমাকে আর কিছু বেশী বোলতে হবে না, সমস্তই আমি বুঝতে পেরেছি, গোড়া ফাঁক।” — আমারে এই পর্যন্ত বোলে দলপতির দিকে চেয়ে তিনি একটু নম্রস্বরে বোল্লেন, “দেখুন রূপচাঁদ কাকা, সে দিন আহারের পর বেলা দুই প্রহরের পূর্বে হরিদাসকে সঙ্গে নিয়ে আমি বেড়াতে বেরিয়েছিলেম, সন্ধ্যার পর ফিরে আসি। রূপসী দেখেছে, বেলা চার দণ্ড কি ছয় দণ্ড থাকতে হরিদাস আমার ঘরে হার চুরি কোরে গিয়েছিল! রূপসীই ফরিয়াদী, রূপসীই সাক্ষী; যোগের সাক্ষী রাঙামামী। এখন আপনি বিবেচনা করুন, এ মামলার জোর কত।”

    ভঞ্জবাবু পূর্বে হোতেই সপ্রতিভ হয়েছিলেন, ছোটবাবুর শেষকথা শ্রবণ কোরে খানিকক্ষণ তিনি অবাক হয়ে থাকলেন। রূপসী সেই অবসরে পালাবার উপক্রম কোচ্ছিল, চৌকাঠ পর্যন্ত এগিয়েছিল; উগ্রস্বরে ধমক দিয়ে ছোটবাবু বোল্লেন, “যাস কোথা? —দাঁড়া! হরিদাসের নামে তুই নালিশ কোরেছিস, হরিদাসকে চোর বোলে ধোরিয়ে দিয়েছিস, তোর কথার প্রমাণেই হরিদাসকে আমরা কয়েদ কোরে রেখেছি, মোকদ্দমা এখনো চোকে নাই, তুই এখন যাস কোথা? —দাঁড়া! শেষকথাগুলো বোলে যা! কত বেলা থাকতে হরিদাসকে তুই আমার ঘরে প্রবেশ কোত্তে দেখেছিলি, রাঙামামীকে তুই কি কি কথা বোলেছিলি, ভাল কোরে মনে কর, ঠিক ঠিক কথা বল!”

    রূপসী কাঁপতে লাগলো; অধোমুখে জড়িতস্বরে আমতা আমতা কোরে বোল্লে, “আমি তো— বেলা— মামীমা— হরি— বৌ— মা—”

    ছোটবাবু তখন আর কি কথাই বা শুনবেন, মোড়লমহাশয়ই বা কি সিদ্ধান্ত কোরবেন? আসল কথা তাঁরা বিলক্ষণ বুঝতে পাল্লেন। পাচিকাঠাকুরাণী চক্ষের জল মার্জন কোরে এক পা এগিয়ে ছোটবাবুকে বোলছিলেন, “রুপসী যখন এই ঘরে আসে, আমি তখন সঙ্গে সঙ্গে আসতে আসতে—”

    “আপনাকে আর কিছু বোলতে হবে না, যা কিছু বোলতে হয়, রূপসী নিজেই বোলবে; নিজেই বলকে।” —ব্রাহ্মণীকে এই রকমে থামিয়ে ছোটবাবু পুনর্বার রূপসীকে বোলতে লাগলেন, “দেখ রূপসী! ছোটবেলা থেকে আমাদের বাড়ীতে তুই আছিস, তোর বাপ এ বাড়ীতে অনেক দিন ছিল, তোর উপরে আমাদের মায়া বোসেছে, সত্যকথা বোলে তোকে আমরা কিছুই বোলবো না, যা যা হয়েছিল, ঠিক ঠিক বল; কার পরামর্শে তুই হরিদাসকে চোর বোলে সাক্ষ্য দিয়েছিলি, ঠিক ঠিক বল; মিথ্যাকথা যদি বলিস, পুলিশে চালান হোতে হবে; মনে রাখিস, সাবধান! মিথ্যাকথা বোল্লে কিছুতেই নিস্তার পাবি নে।”

    পুলিশের নাম শুনে দুই হাতে দুই চক্ষু ঢেকে রূপসী কেঁদে ফেল্লে। ছোটবাবু তখন জোরে জোরে আরো অধিক ধমক দিতে লাগলেন। রূপসীর রোদনে কাহারো হৃদয়ে দয়ার সঞ্চার হলো না। ছোটবাবুর রুক্ষ প্রশ্ন, রুক্ষ আদেশ; মোড়লবাবুর উগ্র প্রশ্ন উগ্র আদেশ; মাগীটা তখন ফাঁপোরে পোড়ে গেল; কি করে! ছোটবাবুর মুখের দিকে একবার চাইলে, মোড়লের দিকেও চাইলে, দরজার দিকে মুখ ফিরিয়ে ভিতরের বারান্দার দিকেও একবার চেয়ে দেখলে, কোন দিক থেকেই একটি অভয়বাক্য এলো না। প্রথম অভিযোগে যে সকল মুখে হাসি এসেছিল, রূপসীর চক্ষে সে সকল মুখ তখন সক্রোধ বিস্ময়ে রক্তবর্ণ; ভাবদর্শনে নিরুপায় হয়ে কাঁদতে কাঁদতে রূপসী তখন বোলতে লাগলো— “আমার কোন দোষ নাই—আমি, ঠাকুর দেবতাসাক্ষী— আমি— না, আমার কোন দোষ নাই,” এই রকম খাপছাড়া কথা বলে, আর মাঝে মাঝে এ দিক ও দিক চায়। ধৈর্য ধারণ কোত্তে না পেরে চঞ্চলম্বরে ছোটবাবু বোল্লেন, “ভাল কথায় এখনো বোলছি, সত্যকথা বল। তোর যদি কোন দোষ নাই, তবে হরিদাসের বালিশের ভিতর হারছড়াটা কেমন কোরে এসেছিল? দেয়ালের গায়ে ক্ষুদ্র খোপের ভিতর গেলাস-দুটো কেমন কোরে গিয়েছিল? হরিদাস যখন ঘরে ছিল না, তখন হরিদাসের বিছানার মধ্যে হার রেখেছিল কে? গেলাস-দুটো লকিয়ে রেখেছিল কে?”

    জলপূর্ণ চক্ষু ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে, চতুর্দিকে চেয়ে চেয়ে, কড়িকাষ্ঠের দিকে চক্ষু তুলে গলা কাঁপিয়ে কাঁপিয়ে রূপসী উত্তর কোলে, “মামী-মা আমাকে— না না— মামী-মা একদিন— ভূত পালাবার পর পায়রা— না—”

    ভঞ্জবাবু এই সময় ছোটবাবুকে বোল্লেন, “সহজে কথা পাওয়া যাবে না, পুলিশের একজন লোককে—”

    চক্ষের জলে ভেসে, মোড়লবাবুর পায়ের কাছে আছাড় খেয়ে পোড়ে, লুটোপুটি খেতে খেতে রূপসীটা চিৎকার কোরে বোলতে লাগলো, “না বাবা! —বলি বাবা! পুলিশ বাবা! —আমি বাবা! — মামী-মা আমাকে বোলেছিল— তাই জন্যে আমি—”

    এই পর্যন্ত বোলেই রূপসী আবার কান্না আরম্ভ কোল্লে। মৃদু হাস্য কোরে ছোটবাবু বোল্লেন, “তাই জন্যে তুই কি কোরেছিলি? চুপি চুপি হার চুরি কোরে এই ঘরে ঢুকিয়ে রেখেছিলি? গেলাস চুরি কোরে খোপের ভিতর লুকিয়ে রেখেছিলি? কেমন, এই তো তোর কথা? সত্য বল। আমিও সত্য বোলছি, সত্যকথা বোল্লে আমি তোকে পুলিশে দিব না।”

    রোদনের সুরের সঙ্গে নূতন রকম সুর মিশিয়ে গড়াগড়ি খেতে খেতে রূপসী বোলতে লাগলো, “আমি নই—আমি নই; ওগো, আমি তেমন কাজ করি নাই, তেমন কাজ আমি কোত্তেম না—রাঙামামী—”

    বোলতে বোলতে রূপসী আবার থেমে গেল। ছোটবাবু বোল্লেন, “রাঙামামী তোরে কি বোলেছিল? চুরি কোত্তে বোলেছিল? জিনিসগুলি হরিদাসের ঘরে এনে রাখতে বোলেছিল? হরিদাসের মাথায় দোষ চাপাতে বোলেছিল?”

    রূপসী উত্তর কোল্লে, “তাই তো আমি কোরেছিলেম, রাঙামামী শিখিয়ে দিয়েছিল, পায়রাবাবু আমাকে টাকা দিবে বোলেছিল, ভাল একটা চাকরী দিবে বোলেছিল, বুঝতে না পেরে—”

    “বুঝতে না পেরে সেই লোভে তুই আমার ঘরের জিনিস চুরি কোরেছিলি? একটি ভদ্রলোকের ছেলেকে চোর বোলে ধোরিয়ে দিয়েছিলি? পায়রা বাবু যদি তোকে আমার গলায় ছুরি দিবার পরামর্শ দিত, টাকার লোভে— চাকরীর লোভে তাও তুই দিতিস?”

    ছোটবাবুর এইরূপে তীব্র উক্তিতে দাসীটা কাঁপতে কাঁপতে দাঁড়িয়ে উঠে হাতযোড় কোরে বোলতে লাগলো, “না বাবা— না বাবা— না গো বাবা! তেমন কর্ম আর আমি কোরবো না। তুমি বরং আমার মাথা মুড়িয়ে দেশছাড়া কোরে দাও, পুলিশের হাতে আমারে ধোরিয়ে দিও না। হরিদাস চোর, এমন কথা আর আমি কখনই বোলবো না।”

    মোড়লবাবু হাসা কোল্লেন, ছোটবাবুও হাস্য কোল্লেন; আমারও হাসি পেয়েছিল, আমি সামলে গেলেম। আর একটা কথা উত্থাপন না কোল্লে সে সময় হাস্য সংবরণ করা যেতো না, সেই জন্য ছোটবাবুকে আমি বোল্লেম, “পায়রাবাবুকে যদি পাওয়া যায়, এই সময় তাঁকে একবার এইখানে হাজির কোত্তে পাল্লে ভাল হয়। একটা কথা এতদিন আমি আপনাকে বলি নাই, ঘটনার বৈচিত্র দেখে অগত্যা আজ সেই কথাটা বোলতে হলো। একদিন রাঙামামীর আমি একটি উপকার কোরেছিলেম, পায়রাবাবুরও উপকার কোরেছিলেম; রাঙামামী আমার মারফতে একদিন একটি ঔষধের মোড়ক পায়রাবাবুর কাছে পাঠিয়েছিলেন, পায়রাবাবুকে তখন আমি পায়রাবাবু বোলে চিনতেম না; রাঙামামী বোলেছিলেন, সেজোবাবু; আমিও জেনেছিলেম সেজোবাবু। সেই উপকার আমি কোরেছিলেম; সেই উপকারের প্রত্যুপকার এই। তাঁদের পরামর্শে, রূপসীর যোগাযোগে আমি চোরদায়ে ধরা পোড়েছিলেম; ভগবানের কৃপায়, আপনাদের অনুগ্রহে আজ আমি অব্যাহতি পেলেম; — নিষ্কলঙ্কে অব্যাহতি। এই সময় একবার পায়রাবাবুকে—”

    ছোটবাবু বোল্লেন, “সময় আছে, পায়রাকে এখন এখানে হাজির করবার দরকার নাই, ডেকে পাঠালেও পায়রা এখানে আসব না। কুকুরের খেলার সময় পায়রা এখানে বিলক্ষণ জব্দ হয়ে গিয়েছে, আমাদের উপর রাগ হয়েছে, সে কি আর এখন এখানে আসতে চায়? সময় আসুক, পাপের প্রায়শ্চিত্ত যে রকমে হয়, আর কিছুদিন যদি তুমি এখানে থাকো, চক্ষুই দেখতে পাবে। এখন তুমি একটা ভয়ানক অপকলঙ্ক থেকে মুক্ত হোলে, এইটিই আমাদের সন্তোষের বিষয়।”

    করযোড়ে নমস্কার কোরে আমি বোল্লেম, “আজ্ঞা হাঁ, আপনাদেরও সন্তোষের বিষয়, সেই সন্তোষে আমারও কলঙ্কভঞ্জন। নষ্টচন্দ্রদর্শনের কলঙ্ক। আমি তো আমি, নষ্টচন্দ্র দর্শনে দ্বারকানাথ শ্রীকৃষ্ণেরও ‘মণিচোরা’ কলঙ্ক হয়েছিল। আমার এই কলঙ্কভঞ্জনে আমি আপনার কাছে চিরজীবনের জন্য কৃতজ্ঞ থাকলেম।”

    এই কথাগুলি বলবার সময় মোড়লবাবুর দিকে আমি একবার বক্রনয়নে কটাক্ষপাত কোল্লেম। ভাব বুঝতে পেরে মিষ্টবচনে মোড়লবাবু আমাকে বোল্লেন, “দেখ হরিদাস! পুনরায় আমি বোলছি, তুমি কিছু মনে করো না; সে সব পূর্বকথা ভুলে যাও। মেয়েমহলে এত বড় একটা চক্র, চক্রের ভিতর এত সৃষ্টি, আগে আমি কিছুই বুঝতে পারি নাই, তোমাকে অনেক অপ্রিয় কথা বোলেছি, তজ্জন্য এখন আমার অনুতাপ আসছে, সে সব কথা তুমি ভুলে যাও; তোমার কলঙ্কভঞ্জনে আমি সুখী হোলেম।”

    প্রসন্নবদনে আমারে ঐ সব কথা বোলে, ছোটবাবুর কাছে বিদায় নিয়ে রূপচাঁদবাবু গাত্রোত্থান কোল্লেন, পুনঃ পুনঃ আত্মীয়তা জানিয়ে সে দিনের মত তিনি বিদায় হয়ে গেলেন। অধোবদনে নেত্রমার্জনা কোত্তে কোত্তে মৃদুপদসঞ্চারে রূপসীদাসী অন্দরে প্রবেশ কোল্লে; ভিতরবারান্দায় যাঁরা আমার মুক্তিমন্ত্র শ্রবণ কোরেছিলেন, তাঁরাও সেখান থেকে সোরে গেলেন। ঘরে আমরা তিনজনে থাকলেম— ছোটবাবু, আমি আর রামদাস।

    আমি কলঙ্কমুক্ত হোলেম, ছোটবাবু আনন্দিত হোলেন, রামদাসের শুষ্কমুখ প্রফুল্ল হয়ে উঠলো। খুসী হয়ে রামদাস বোলতে লাগলো, “মন যেন আগেই সব জানতে পারে। এই ঘটনার ভিতর রূপসী ছিল, ঘটনাটা শুনেই আমি সেটা বুঝতে পেরেছিলেম; রূপসীর সঙ্গে রাঙামামীর যোগ ছিল, তা আমি জানতে পারি নাই। ধর্মের কর্ম; ধর্ম হরিদাসকে রক্ষা কোল্লেন, মিথ্যা অপবাদ রটনার মূল যারা, ধৰ্মই তাদের চিনিয়ে দিলেন।”

    কিঞ্চিৎ অন্যমনস্কভাবে ছোটবাবু আমারে জিজ্ঞাসা কোল্লেন, “পায়রাবাবুকে এখানে একবার হাজির কোল্লে ভাল হয়, এ কথাটা তুমি কেন বোলছিলে?”

    কারণটা প্রকাশ করি কি না করি। প্রকাশে কোন প্রকার দোষ আছে, এইরূপ আমি ভাবলেম। সত্য যদি আমার অনুমানটি ঠিক না হয়, আমি অপ্রস্তুত হব, প্রথমে আমার মনোমধ্যে সেই ভাবের উদয় হলো; তার পর আবার বিবেচনা কোল্লেম, আসল কথা আগেই তো আমি ভাঙবো না, নিশ্চিতরূপে সন্দেহটা দূর হয়ে গেলে মনে কোল্লেম আমি খুলে দিব, স্থূলকথা প্রকাশে দোষ কি? এইরূপে ভেবে আমি উত্তর কোল্লেম “বোধ হয় যেন পায়রাবাবুকে আমি চিনি। ঐ নামে চিনি না, অন্য নামে চিনতেম, অন্যস্থানে দেখেছিলেম, এইরূপে যেন আমার মনে হয়। সত্য সত্য সেই লোকটি এই পায়রাবাবু কি না, একবার পরীক্ষা করবার ইচ্ছা হোচ্ছে; দেখেছিলেম, মুখোমুখি বোসে কথাবার্তা হয় নাই, কিন্তু লোকটির স্বভাব ভাল নয়, নানা প্রমাণে তা আমার জানা হয়েছিল। রাঙামামীর প্রেরিত দূত হয়ে পায়রাবাকে যে দিন আমি ঔষধের মোড়কটি দিতে যাই, সে দিন প্রায় সন্ধ্যা হয়ে এসেছিল, চেহারা ভাল কোরে দেখতে পাই নাই, তথাপি যেন পূর্বস্মৃতি একটু একটু জেগেছিল। তিনি তখন সেজোবাবু ছিলেন, এখন হয়েছেন পায়রাবাবু। যে রাত্রে আমি ভূত শীকার করি, সে রাত্রে সর্বাঙ্গ বসনাবৃত, রুমালে গালপাটা বাঁধা একটি লোক জনতামধ্যে দর্শন দিয়েছিলেন, বোধ করি, আপনারা সে দিকে ততটা লক্ষ্য রাখেন নাই, আকার-ইঙ্গিতে আমি কিন্তু বুঝেছিলেম, সেই সেজোবাবু। তার পর একরাত্রে এইখানে তাজপরা মূর্তি; সেই রাত্রে কুকুরগুলির কৌতুকাবহ ক্রীড়া। আর একবার সেই মূর্তি দর্শন কোল্লে মনের অভিপ্রায় আমি প্রকাশ কোত্তে পারবো, সেইজন্যই বোলেছিলেম, একবার হাজির কোত্তে পাল্লে ভাল হয়।

    ছোটবাবু বোল্লেন, “হাজির করা বোধ হয় সহজ হবে না; নিজে তিনি যে কথা অস্বীকার করেন, সেই কথাই ঠিক। তিনি বোলছিলেন কুকুর তাঁর নয়, কুকুরেরা দেখালে তারা তাঁরই। মিথ্যাকথা ধরা পড়াতে তিনি পালিয়ে গিয়েছেন, কুকুরেরা, তাঁর সঙ্গে সঙ্গে ছুটে গিয়েছে, সব আমরা বুঝেছি, তাও তিনি জানতে পেরেছেন। এখন যদি তাঁকে আমরা ডেকে পাঠাই, তা হোলে—”

    “রাধা-কৃষ্ণ! রাধা-কৃষ্ণ! মহাভারত! মহাভারত!” ছোটবাবুর কথা সায় হোতে না হোতে ঐরূপে পবিত্র নাম উচ্চারণ কোত্তে কোত্তে দ্রুতপদে একটি স্ত্রীলোক সেই ঘরে প্রবেশ কোল্লেন। চকিতনয়নে আমি চেয়ে দেখলেম, রাঙামামী! তাঁর বগলে একটি কাপড়ের পুঁটলী, হাতে একখানি ময়ূরপুচ্ছের পাখা। রোদনের সুরে ছোটবাবুকে তিনি বোলতে লাগলেন, “আর আমার এ বাড়ীতে থাকা হলো না! কর্তাকে বোলো, জন্মের মত আমি বিদায় হোলেম! রূপসী বোলে গেল, আমি তারে শিখিয়ে দিয়েছিলেম; হার চুরি কোরে হরিদাসের বালিশের ভিতর রাখা, সেটা আমারই পরামর্শ, এই কথাই রূপসী বোলেছে; তোমরাও তার কথাই বিশ্বাস কোরেছ, তোমাদের মোড়লবাবু— গাঁয়ের লক্ষ্মী ছেড়ে গিয়েছে কি না, গাঁখানা এখন ভাঙা গাঁ, মোড়লবাবটি সেই ভাঙা গাঁয়ের মোড়ল! প্রথম দিন তিনি বোলেছিলেন, হরিদাসকে থানায় দাও; আজ এসে বোলে গেলেন, হরিদাস ছোকরা রাহুমুক্ত পূর্ণচন্দ্র। দু রাত্রের বিচারের মূল সাক্ষী সর্বনাশী রূপসী। আমি সেই রূপসীর কথায় অপরাধিনী হয়েছি, ধর্মের বিচারে অপরাধিনী হব না, তোমাদের বিচারে আমি ধরা পোড়েছি, এ বাড়ীতে বাস করায় আর আমার মঙ্গল নাই, আমি বাপের বাড়ী চোল্লেম! আরো ভেবে দেখ, মিছামিছি, আমার সঙ্গে ঝগড়া বাধিয়ে তোমাদের বড়বৌটি সে রাত্রে কি কাণ্ডই না কোল্লেন! ছি! ছি! ছি! কি কেলেঙ্কার! গৃহস্থ-বাড়ীতে এমন কেলেঙ্কার ভাল কথা নয়, আমাকে নিমিত্তের ভাগী কোরে তোমার দাদাবাবুটি গাঁছাড়া হয়ে গিয়েছেন; গাঁ-ছাড়া কি দেশছাড়া, তাও ঠিক নাই, কর্তা ফিরে এসে আমাকেই দোষী কোরবেন; আসতেই আমি চাই নাই, কর্তাই জেদাজেদি কোরে আমাকে বাড়ীতে এনে রেখেছিলেন। আমার কপাল যখন ভেঙেছে তখনি আমি অকূল পাথারে ডুবেছি; ভাঙা কপাল নিয়ে যেখানে ইচ্ছা, সেইখানেই এখন আমি যেতে পারি। কর্তাকে এই সব কথা বোলো— আমি আমার বাপের বাড়ী চোল্লেম! সেখানে যদি আশ্রয় না পাই, পথের ভিখারিণী হয়ে দ্বারে দ্বারে ভিক্ষা কোরে বেড়াবো, তোমরা সুখে থাকো।”

    চক্ষের জলের সঙ্গে এই সব বিষাদবাক্য বর্ষণ কোত্তে কোত্তে অস্থিরপদে ঘর থেকে বেরিয়ে রাঙামামী সরাসরি সিঁড়ি দিয়ে নামতে আরম্ভ কোল্লেন, সঙ্গে সঙ্গে ছোটবাবু ছুটলেন, বাবুর সঙ্গে সঙ্গে রামদাসও ছুটলো; কি রঙ্গ হয়, দেখবার জন্য আমিও সিঁড়ির দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়ালেম। ছোটবাবু বিস্তর সাধ্যসাধনা কোল্লেন, “রূপসীর কথায় বিশ্বাস করি নাই” বোলে বিস্তর বুঝালেন, গোঁ ফিরাতে পারেন না। যুবতীমামীর হাত ধোরে টানাটানি কোত্তে পারেন না, পাল্লেনও না; রাঙামামী কত কি বোকতে বোকতে বাড়ী থেকে বেরিয়ে গেলেন।

    সে রাত্রের অভিনয় এই পর্যন্ত। পরদিন প্রাতঃকালে আমি শুনলেম রূপসী পালিয়ে গিয়েছে। উভয়েই আমার কলঙ্করটনার হেতু ছিল,— রাঙামামী আর রূপসী, উভয়েই পালালো। পায়রাটিও উড়েছে কি আছে, জানতে পারা গেল না। আমার নিজের জন্য যে উদ্বেগ জন্মেছিল, সে উদ্বেগটা দূর হয়ে গেল। নির্ভাবনায় দিবা অবসান। রাত্রিকালে আহারাদি কোরে আমি শয়ন কোল্লেম। পাঁচ দিন পাঁচ রাত্রি আমার নিশ্বাস পড়েছিল, সে নিশ্বাসে তীব্র তীব্র অগ্নিকণা আজ রাত্রে আমি স্বচ্ছলে নিশ্বাস ত্যাগ কোল্লেম। অমরকুমারীকে মনে পোড়লো; অমরকুমারী সর্বক্ষণ আমার মনের ভিতর জাগেন, এই রাত্রে মনে পোড়লো, কথাটা যেন অকৃতজ্ঞ হৃদয়ের কথা। তা নয়, চোর অপবাদে আমি প্রায় হতবুদ্ধি হয়েছিলেম, মনে যেন কোন বাসনা— কোন ধারণাই ছিল না; চিন্তাপথে অমরকুমারী আসতেন, চপলার মত চোলে যেতেন; চপলার সঙ্গে ছুটতে পাত্তেম না; নিজের ভাবনাতেই আমি আকুল হয়ে থাকতেম। মানুষের স্বভাবই এইরূপ। মানুষ যখন অভাবনীয় মহাবিপদে পতিত হয়, নিজের পরিত্রাণের চিন্তা ভিন্ন তখন তার মনে অন্যচিন্তা স্থান পায় না, নিজের চিন্তাই বলবতী হয়ে থাকে। সকল চিন্তার উপরেই চিন্তা। এই রাত্রে অমরকুমারীকে মনে পোড়লো, অমরকুমারী কোথায়? এখনো কি ঢাকায়? ঢাকার শাখা-মোকদ্দমা এখনো কি নিষ্পন্ন হয় নাই? আমার কথা কি অমরকুমারীর মনে আছে? লোকে আমারে চোর বোলেছিল, অমরকুমারীর মন কি সে অপবাদের কথা জানতে পেরেছে? আমার প্রতি কি অমরকুমারীর অশ্রদ্ধা জন্মেছে? কত দিনে আবার আমি অমরকুমারীকে দেখতে পাব?— নিৰ্জনে এক জায়গায় বোসে কবে আমি অমরকুমারীকে এই সব কথা জিজ্ঞাসা কোরবো? অমরকুমারীর নাম উচ্চারণ কোল্লে হৃদয় আমার শীতল হয়, দর্শনের আশায় প্রাণ আমার ব্যাকুল হয়; অন্য প্রকারে চিত্ত বিচলিত হয় না, এ রাত্রেও বিচলিত হোচ্ছে না। অমরকুমারী ভাল আছেন; কোন প্রকার অমঙ্গল ঘটনা হোলে বহুদূরে থেকেও অন্তরঙ্গ লোকের মন সে অমঙ্গল জানতে পারে; কোন অমঙ্গল ঘটে নাই, অমরকুমারী ভাল আছেন। অমরকুমারী হয় তো মুর্শিদাবাদে ফিরে গিয়েছেন, শান্তিরাম দত্ত হয় তো তাঁরে পুত্রীরূপে আশ্রয় দিয়েছেন। আবার কি রক্তদন্ত অমরকুমারীর উপর উপদ্রব কোরবে? —না, পারবে না; দীনবন্ধুবাবু অমরকুমারীর রক্ষার উপায়বিধান কোরবেন, পশুপতিবাবু সে কথা আমার কাছে মুক্তকণ্ঠে স্বীকার কোরেছেন। অমরকুমারীর ভয় নাই। আমার ভয় আছে, ভবসংসারের ভয়নিবারণ ভূতভাবন ভবানীপতি এ ভয় আমার ঘুচাবেন। পনেরায় আমি অমরকুমারীকে দেখতে পাব, দেখতে পেয়ে সখী হব, পদ্মমুখে হেসে হেসে পদ্মমুখী আমার সঙ্গে সুখর আলাপ কোরবেন, রজনী দেবী আজ আমারে সেই আশা প্রদান কোচ্ছেন। অমরকুমারীকে ভাবতে ভাবতে অন্যান্য হিতৈষী বন্ধুগণকে হৃদয়াসনে আমি আনয়ন কোল্লেম, হৃদয় জুড়াল; বিরামদায়িনী নিদ্রাদেবী এই সময় আমার প্রতি দয়া কোল্লেন, মঙ্গলময়ী আমাকে হৃদয়ে স্থান দান কোল্লেন। নিদ্রার ক্রোড়ে আমি অচেতন হোলেম।

    নিত্য আমার মনে নূতন নূতন আশার সঞ্চার। আশা সর্বত্র সর্বদা সর্বকার্যে ফলবতী হয় না, তথাপি আশা মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে, এই গুণে আশাকে আমি আদর করি। চোরদায় থেকে মুক্ত হয়ে আমি আশা সলিলে অবগাহন কোল্লেম। সে সময়ে আমার মনে কত রকমের কত আশা খেলা কোত্তে লাগলো, এখন সে সব স্মরণ কোত্তে পাচ্ছিনে। আমার প্রতি ছোটবাবুর যে রকম ভালবাসা ছিল বুঝলেম, সে ভালবাসা দিন দিন বেড়ে উঠলো। রামদাসের ভক্তিও দিন দিন বাড়তে লাগলো, বৌমা দুটিও দিন দিন আমারে বেশী আদর কোত্তে লাগলেন, পাচিকার স্নেহ-যত্নও দিন দিন আমি বেশী বেশী অনুভব কোত্তে লাগলেম। এই রকমে আর একমাস কেটে গেল।

    কর্তা বাড়ীতে এলেন। এসে তিনি সর্বাগ্রেই শুনলেন, বড়বাবু গৃহত্যাগী। কারণ-জিজ্ঞাসু হয়ে বাড়ীর পরিবারবর্গের কাছে কিরূপ তিনি শুনেছিলেন, সে সব কথা আমি শুনতে পেলেম না, তবু মনে মনে ভেবে নিয়েছিলেম, প্রাণগতিবাবু, তাঁর রাঙামামীর প্রাণগতি হয়েছিলেন, সেই গৌরবের কথা তিনি শুনতে পান নাই। রাঙামামী বাড়ীতে নাই, এ কথা যখন কর্তা শুনলেন, তখন তার কারণটিও অনলঙ্কৃতভাবে তাঁর কর্ণগোচর হয়েছিল। শুনে তিনি বিমর্ষ হয়েছিলেন; ক্রমে ক্রমে অপরাপর বিবরণ সমস্তই তিনি শুনলেন। ভূতের ক্রীড়ার অবসান। আমিই সেই অবসানের মূলাধার।

    রামদাস এসে আমারে সংবাদ দিলে, ঐ কথা যখন কর্তার কাণে যায়, তখন তিনি এক বিশাল নিশ্বাস পরিত্যাগ কোরেছিলেন; জানতে চেয়েছিলেন, কোন দিন কোন সময়ে ভৌতিকলীলার অবসান। দিনক্ষণ ছোটবাবুর একখানি খাতায় লেখা ছিল, ছোটবাবু সেই খাতাখানি কর্তার কাছে ধোরে দিলেন, কর্তা সেই অক্ষরগুলি দর্শন কোরে নিমীলিত-নয়নে ক্ষণকাল যেন কি গুটিকত মন্ত্র জপ কোল্লেন, এক দুই কোরে অঙ্গলীর পর্ব গণনা কোল্লেন, শেষে আর একটি দীর্ঘনিশ্বাস ত্যাগ কোরে বিস্মিতবদনে বোল্লেন, “ওঃ! তবে তো গয়ায় পিণ্ডদানের সপ্তাহপূর্বে সেই ঘটনা। আশ্চৰ্য।”

    এই সব কথা রামদাসের মুখে আমি শুনলেম। কর্তার সঙ্গে আমার যখন সাক্ষাৎ হলো, ভূতের কথা তখনো উঠেছিল, কর্তা কিন্তু আমার সাক্ষাতে তখন “আশ্চৰ্য” বাক্যটি উচ্চারণ কোল্লেন না। ভূতের তিরোধান, বড়বাবুর অদর্শন, রাঙামামীর পলায়ন, রূপসীর পলায়ন, এই সমস্ত প্রসঙ্গে অনেকটা সময় অতিবাহিত হয়ে গেল, “আমি কেমন আছি” কর্তা সে কথাটি পৰ্যন্ত জিজ্ঞাসা করবার সময় পেলেন না। সময় পেলেন না কিবা সে কথা জানবার তাঁর দরকার ছিল না, তিনিই তা বোলতে পারেন। গয়ায় গদাধরের পাদপদ্মে পিণ্ডদানের অগ্রে ও অন্য উপায়ে ভূত উদ্ধার হোতে পারে, কর্তার সেটা বিশ্বাস ছিল না, বন্দুকের গুলীতে আমি ভূত উদ্ধার কোরেছি, সে কথাটা তাঁর ভাল লাগলো না, তাঁর মুখের ভাব দেখে তা আমি বুঝতে পাল্লেম। রাঙামামী পালিয়েছে, রূপসী পালিয়েছে, আমিই তার হেতু, বাড়ীর লোকের মুখে সে কথা তিনি শুনেছিলেন, তাতেও যেন আমার উপর তাঁর একটা একটা মন ভার। মনোভাব গোপনে রেখে গুটিকত মিষ্টবচনে আমারে তিনি তুষ্ট করবার চেষ্টা কোল্লেন, আমি তুষ্ট হোতে পাল্লেম না। তাঁর পূর্ব ব্যবহার স্মরণ কোরে আমার দারুণ ভয় হোতে লাগলো।

    গৃহিণী ঠাকুরাণী আমার প্রতি সন্তুষ্ট। অজ্ঞাত লোকেরা আমারে যখন এই বাড়ীতে ফেলে দিয়ে যায়, কর্তা তখন আমারে নেশাখোর বিবেচনা কোরে কাৰ্যে বাক্যে ঘৃণা প্রকাশ কোরেছিলেন; গৃহিণী কিন্তু প্রথমাবধিই আমার প্রতি স্নেহবতী। বাড়ীতে যে কাজ আমি কোরেছি, ভূতগুলোকে তাড়িয়েছি, মিথ্যা মিথ্যা চোর অপবাদে অনেক কষ্ট পেয়েছি, সেই সব কথা শ্রবণ কোরে এবার আমার প্রতি গৃহিণীঠাকুরাণীর অধিক আদর, অধিক যত্ন, অধিক স্নেহ আমি অনুভব কোল্লেম। পুত্রের পরলোকপ্রাপ্তি হোলে জননীর পুত্রশোক উপস্থিত হয়; জ্যেষ্ঠপুত্রের অদর্শনে ততটা না হোক গৃহিণী-ঠাকুরাণী শোকসন্তাপ্ত হয়েছিলেন, কিন্তু আমার প্রতি কোন প্রকার অযত্ন হয় নাই। কর্তা-গিন্নীর প্রত্যাগমনে দিনকতক আমি বরং এক প্রকার সুখেই থাকলেম। কোন প্রকার অপ্রিয়বাক্য আমাকে শুনতে হলো না।

    একদিন সন্ধ্যার পর আমি আপনার ঘরে একাকী বোসে আছি, একজোড়া চসমা চক্ষে দিয়ে, হস্তে একগাছি যষ্টিধারণ কোরে কর্তা সেই সময় সেইখানে এসে উপস্থিত হোলেন; জড়সড় হয়ে বিছানার একধারে আমি সোরে বোসলেম। ঘরের চতুর্দিকে নেত্রপাত কোত্তে কোত্তে কর্তা আমার কাছে বোসলেন।

    কি তাঁর মতলব, কি কথা তিনি বলেন, ভাব বুঝতে না পেরে অবনতমস্তকে আমি ক্ষণকাল নীরব হয়ে থাকলেম। কর্তা হঠাৎ আমারে সম্বোধন কোরে গম্ভীরস্বরে বোল্লেন, “হরিদাস! পূর্বে কি তুমি বর্ধমানে ছিলে? মোহনলাল ঘোষ নামে একটি বাবুর সঙ্গে সেখানে তোমার সাক্ষাৎ হয়েছিল?” —দুই প্রশ্নেই আমি ‘হাঁ’ দিলেম। কর্তা বোল্লেন, “সেই মোহনলালবাবু এখন পাটনায়; তীর্থ কর্ম সমাধা কোরে আমি একবার পাটনায় গিয়েছিলেম, মোহনলালের সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হয়েছিল। তিনি একজন জমীদার। এই জেলায় তাঁর একখানি জমীদারী আছে, মধ্যে মধ্যে কোন কোন বিষয়কার্যের উপলক্ষে পূর্বে পূর্বে তিনি এখানে আসতেন, এইখানেই তাঁর সঙ্গে আমার দেখাশুনো ছিল, আলাপপরিচয় হয়েছিল। পাটনা সহরে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ কোরে অনেক নূতন নূতন কথা আমি জানতে পেরেছি। তিনি বেশ লোক; ভাললোকের প্রতি ভগবানের কৃপা হয়, ভগবানের কৃপা হোলে কমলাও প্রসন্না হন, মোহনলালের প্রতি কমলার শুভদৃষ্টি পতিত হয়েছে। ছিলেন তিনি বড়মানুষ, আছেন তিনি বড়মানুষ, তার উপর সম্প্রতি নূতন সৌভাগ্যের উদয়। তাঁর একটি মাতুলানী সম্প্রতি লোকান্তর প্রাপ্ত হয়েছেন; তিনি বিধবা ছিলেন, সন্তান-সন্ততি জন্মে নাই, প্রায় লক্ষ টাকা উপস্বত্বের বিষয় তাঁর অধিকারে ছিল, অন্য কোন নিকট উত্তরাধিকারী না থাকাতে মোহনলালবাবু সেই বিষয়ের অধিকারী হয়েছেন। কতকগুলি সৎকার্যের পুরস্কারস্বরূপ রাজদরবার থেকে তিনি রাজা উপাধি লাভ কোরেছেন। তাঁর মুখে আমি তোমার অনেক সুখ্যাতি শ্রবণ কোরেছি। ছেলেবুদ্ধিতে তুমি তাঁর অবাধ্য হয়েছিলে, সে জন্য তিনি আপসোস করেন; অন্তরে কিন্তু তোমার উপর তিনি দয়াশূন্য হন নাই। এই সময় তুমি যদি একবার তাঁর সঙ্গে দেখা কোত্তে পার, তা হোলে তোমার বিশেষ উপকার হোতে পারে। আর দেখ— অবস্থাগতিকে তোমার চরিত্রের প্রতি প্রথমে আমার কিছু সন্দেহ জন্মেছিল, তোমাকে আমি তিরস্কার কোরেছিলাম, সে সব কথা তুমি আর মনে কোরো না; প্রকৃত অবস্থা আমি বুঝতে পারি নাই; মোহনবাবুর মুখে তোমার চরিত্রের প্রশংসা শুনে আমি বিশেষ সন্তুষ্ট হয়েছি। চিরদিন এই বাড়ীতে রেখে তোমাকে আমি পুত্রবৎ পালন করি, এই আমার ইচ্ছা। কিন্তু কিছু দিনের জন্য একবার তোমার পাটনায় যাওয়া আবশ্যক। কি বল? — যাওয়ার তোমার ইচ্ছা আছে?”

    কথাগুলি আমি শুনলেম, প্রশ্নমাত্রেই কোন উত্তর দিলেম না। আমার মৌন দর্শন কোরে কর্তামহাশয় কি ভাবলেন, কি বুঝলেন, বোলতে পারি না, নীরবে কিয়ৎক্ষণ আমার দিকে চেয়ে থেকে সহসা তিনি গাত্রোত্থান কোল্লেন, ঘর থেকে বেরিয়ে চোল্লেন: যাবার সময় আমারে বোলে গেলেন, “আচ্ছা, বিবেচনা কর। পাটনায় যেতে তোমার ইচ্ছা আছে কি না, বিবেচনা কোরে স্থির কর, কল্য আমি তোমার মুখে এই বিষয়ের মীমাংসা শ্রবণ কোরবো।”

    কর্তা চোলে গেলেন, আমি ভাবতে বোসলেম। মোহনলালবাবু লক্ষ টাকার বিষয় পেয়েছেন, রাজা হয়েছেন, আমারে স্মরণ কোরেছেন, কি ভাব? অকস্মাৎ আমার প্রতি কেন তিনি এত সদয়? তাঁর সঙ্গে আমার শেষ দেখা কাশীধামে। প্রথম প্রথম দিনকতক আদর পেয়েছিলেম। শেষকালে আমি তাঁর বিষনয়নে পড়ি; বুদ্ধির দোষে অথবা আত্মবিশ্বাসে আমি তাঁর চরিত্রের গুটিকতক কথা রমণবাবুর নিকটে ব্যক্ত কোচ্ছিলেম, গোপনে অন্তরালে দাঁড়িয়ে সেই সব কথা শ্রবণ কোরে তিনি আমার উপরে খড়্গহস্ত হয়েছিলেন, তদবধি তাঁর সঙ্গে আর আমার দেখা-সাক্ষাৎ নাই। এত দিনের পর অকস্মাৎ তিনি আমারে স্মরণ কোরেছেন, ভাব কি?— আর কি তবে আমার উপর কোন প্রকার উৎপীড়ন হবে না? বৈরিবেষ্টিত হয়ে আর কি আমারে অহরহ যন্ত্রণা ভোগ কোত্তে হবে না? সমস্ত উপদ্রবই কি থেমে যাবে? তাই যদি সত্য হয়, থামে যদি সত্য, তবে তো আমার গ্রহ সুপ্রসন্ন; কিন্তু তাও কি সম্ভব? দুরাচার রক্তদত্ত তাঁর প্রধান চেলা; কেবল চেলা নয়, বেতনভোগী চাকর। মোহনবাবুর পরামর্শে রক্তদন্ত চলে, বলে, কুকার্য করে, আবশ্যক হোলে মানুষ খুন কোত্তেও প্রস্তুত হয়। আমি ভুক্তভোগী, আমার উপর রক্তদন্তের বিষম আক্রোশ; মোহনবাবু যদি তারে নিবারণ করেন, তা হোলে সংসারে আমি এক প্রকার নিরাপদে থাকতে পারবো। কাশীতে আমি জানতে পেরেছিলেম, মোহনবাবু, একখানি পত্র লিখে রক্তদন্তকে আমার উপর দৌরাত্ম্য কোত্তে নিষেধ কোরেছিলেন; তার পর আবার যে সেই। এখন আমার কি করা কর্তব্য? পাটনায় গিয়ে মোহনবাবুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করা; পাটনায় আমার পরিচিত লোক কেহই নাই, কায়দায় পেয়ে মোহনবাবু, যদি আমারে আটক কোরে ফেলেন, তা হোলে আমি কি উপায়ে রক্ষা পাব? এ দিকে আমার অনেক কাজ বাকী, দুই জেলায় দুই মোকদ্দমা দায়ের, অমরকুমারীর উদ্ধারসাধন আমারই উদযোগ-সাপেক্ষ, কি করি?—যাই কি না যাই? প্রবলপক্ষের মনস্তুষ্টিসাধন করাতে উপকার আছে; মোহনবাবু প্রবল, আমি দুর্বল, তাঁর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা আমার অসাধ্য। তিনি কুপিত হোলে আমার বিস্তর অনিষ্ট কোত্তে পারেন; তিনি প্রসন্ন থাকলে সংসারে সর্বদা আমারে শঙ্কিত থাকতে হয় না। এই সকল বিবেচনা কোরে, কিঞ্চিৎ সন্দেহ থাকলেও অবশেষে স্থির কোল্লেম, পাটনায় একবার যাওয়াই কর্তব্য।

    কর্তব্য স্থির কোরে বোসে আছি, ছোটবাবু এলেন। কর্তব্য স্থির হোলেও চিত্ত তখন আমার চিন্তাশূন্য ছিল না। আমারে চিন্তানিমগ্ন দর্শন কোরে উপবেশনের অগ্রেই ছোটবাবু জিজ্ঞাসা কোল্লেন, “কি ভাবছো হরিদাস? যখন আমি তোমাকে দেখি, তখনি তুমি বিমর্ষ থাকো; কত রকম আমোদজনক ঘটনা হয়, কত রকম আনন্দোৎসব উপস্থিত হয়, সে দিকে তোমার মন থাকে না, সর্বদাই তুমি যেন কি ভাব; এত অল্প বয়সে এত ভাবনা কি তোমার?”

    আমি উত্তর কোল্লেম, “আপনি কখন আসবেন, তাই আমি ভাবছিলেম। আপনি বসুন কতকগুলি কথা আছে।” ছোটবাবু বোসলেন। প্রথমেই আমি কর্তার কথা তুল্লেম, কর্তা আমারে পাটনায় যেতে অনুরোধ কোচ্ছেন; পাটনায় একটি বাবু আছেন, সেই বাবুর সঙ্গে পূর্বে আমার জানাশুনা ছিল— আপনাদের বাড়ীতে আমি আছি, গল্প প্রসঙ্গে কর্তার মুখে সেই কথা জানতে পেরে সেই বাবুটি আমারে স্মরণ কোরেছেন, পাটনায় যেতে বোলেছেন; আমিও এক রকম স্থির কোরেছি, যাওয়া কর্তব্য। আপনি কিরূপ পরামর্শ দেন?”

    ছোটবাবু বোল্লেন, “তোমাকে ছেড়ে দিতে আমার ইচ্ছা হয় না। পরামর্শ কি দিব? পাটনার বাবু কি প্রকৃতির বাবু, তোমার সঙ্গে তাঁর কিরূপ আলাপ, তাঁর কাছে তোমার কিরূপ প্রয়োজন, সে সব না জানলে কি প্রকারে পরামর্শ দেওয়া যায়?” সংক্ষেপে আমি গুটিকতক কথা বোল্লেম, মোহনবাবু আমার ভয়ের কারণ, সে কথা বোল্লেম না, সাক্ষাৎ কোত্তে পাল্লে কোন প্রকার উপকারের সম্ভাবনা আছে, কেবল এই পর্যন্তই ছোটবাবুকে আমি জানালেম। তিনি তখন একটু চিন্তা কোরে বোল্লেন, “কর্তা যদি ইচ্ছা করেন, তুমি যদি ইচ্ছা কর, তবে একবার যেতে পার, কিন্তু বেশী দিন সেখানে থেকো না, শীঘ্র আবার ফিরে এসো। কবে যাবে স্থির কোরেছ?”

    আমি তখন আর একখানা ভাবছিলেম, “কবে যাবে স্থির কোরেছ” এই প্রশ্নের উত্তরের ভূমিকায় আমি বোল্লেম, স্থির এখনো কিছুই করি নাই, আপনার অভিপ্রায় জানবার জন্য অপেক্ষা কোচ্ছিলেম। এখানে এসে আমি অনেক রকম কাজ করেছি। অনেক রকম তাজ্জব ব্যাপার দর্শন কোরেছি, অনেক রকম অদ্ভুত অদ্ভুত কথাও শ্রবণ কোরেছি, একটি কাজ আমার বাকী আছে।” — ছোটবাবু জিজ্ঞাসা কোল্লেন, কোন কার্য বাকী?”

    সেই পূর্বকথাই আমি পুনরোল্লেখ কোল্লেম,— পায়রাবাবুকে একবার এই বাড়ীতে হাজির করা। কি কারণে হাজির করা প্রয়োজন, স্পষ্ট কিছু ভাঙলেম না, কেবল এইমাত্র বোল্লেম, “ভূতের ব্যাপারের সঙ্গে পায়রাবাবুর অতি নিকট সম্বন্ধ। ভূতগুলি উদ্ধার হয়ে গিয়েছে, সেই দুঃখে পায়রাবাবু ম্রিয়মাণ আছেন; তাঁরে গুটিকত প্রবোধ বাক্য—”

    হাস্য কোরে ছোটবাবু বোল্লেন, “পায়রাকে প্রবোধ দিয়ে তুমি ঠাণ্ডা কোত্তে পারবে, এমন আমার বিশ্বাস হয় না। পায়রাবাবুটি তুখোড় লোক, বেশী চালাক, সকল রকমে সকল দিকেই তার বুদ্ধি খেলে; অল্পদিনে সে সব আমি বুঝতে পেরেছি। পায়রা এ দেশে ছিল না, নূতন এসেছে, সে কথা তুমি শুনেছ; নূতন লোকের সঙ্গে বেশী ঘনিষ্ঠতা না কোল্লে চরিত্র ধরা যায় না, তথাপি বিনা ঘনিষ্ঠতায় পায়রাকে আমি এক প্রকার চিনে নিয়েছি। পায়রার একটা রোগ আছে; ঔষধের মোড়ক নিয়ে তুমি—”

    হাঁপাতে হাঁপাতে ছুটে এসে রামদাস সেই সময় সংবাদ দিলে, “নূতন বিপদ উপস্থিত! পুলিশের লোক এসেছে! খুনের খবর এনেছে! আমাদের বাড়ীতে যিনি আগে আগে ঠাকুরপূজা কোত্তেন, সেই বামুনঠাকুর সঙ্গে আছেন। চাতালপুর গ্রামের এক মাঠের ধারে একটা গাছতলায় মেয়েমানুষ খুন! এই রকম কথা তারা বোলছে, উপরে আসতে চাচ্ছে, আমি তাদের কি বোলবো?”

    খুনের খবর শুনে চমকিতভাবে ছোটবাবু বোল্লেন, “কোথায় মাঠের ধারে খুন হয়েছে, আমাদের বাড়ীতে তার কি? আচ্ছা, দাঁড়াতে বল গে, আমি যাচ্ছি।”

    রামদাস নেমে গেল। একটু পরে একটি জামা গায়ে দিয়ে ছোটবাবু উপর থেকে নামলেন, অনিশ্চিত ভাবনায় কৌতূহলবশে আমিও সঙ্গে গেলেম; — গিয়ে দেখি, একজন ফাঁড়ীদার ব্রাহ্মণ, আর দুই জন বরকন্দাজ, সঙ্গে একজন ভট্টাচাৰ্য। ভট্টাচাৰ্যকে সম্বোধন কোরে ছোটবাবু জিজ্ঞাসা কোল্লেন, “কি মথুরে কাকা? ব্যাপার কি? আপনার সঙ্গে পুলিশ কেন?”

    ছোটবাবু বোল্লেন মথুর কাকা, আমি শুনলেম মথুর কাকা, এখন মথুর কাকা কি উত্তর দেন, সেই কথা শুনবার জন্য তাঁর মুখ-পানে আমি চেয়ে থাকলেম। মথুর কাকা একবার ফাঁড়ীদারের মুখের দিকে চাইলেন, ফাঁড়ীদার বোলতে লাগলো, “চাতালপুরের এক বাগানের এক বৃক্ষতলে একটি স্ত্রীলোকের মৃতদেহ পাওয়া গিয়েছে, গলায় দড়ী কিম্বা সর্পাঘাত কিম্বা বিষখাওয়া, তার কোন নিদর্শন পাওয়া যাচ্ছে না। কেহ তাকে খুন কোরেছে কি না, তাও প্রকাশ হোচ্ছে না, কে সেই স্ত্রীলোক, কোথা থেকে এসেছিল, সে কথাও কেহ বোলতে পারে না। গ্রামের কেহ নয়; গ্রামের লোকেরা চিনতে পাচ্ছিল না, দু একজন বোলেছিল, তিন চারি দিন গ্রামের রাস্তার ধারে সেই স্ত্রীলোককে তারা দেখেছে। আর কোন বিশেষ কথা তার কিছুই জানে না। আমি তদারক কোচ্ছিলেম, এমন সময় এই ব্রাহ্মণঠাকুর সেইখানে উপস্থিত হোলেন, লাশ দেখে ইনি চিনতে পাল্লেন। এরি মুখে আমি শুনলেম, সেই স্ত্রীলোক আপনাদের বাড়ীতে ছিল, তার নাম রাধারাণী। কি প্রকারে মোরেছে, চাতালপুরে কেন গিয়েছিল, এই সব কথা আমাদের জানা দরকার। আপনাকে একবার চাতালপুরে যেতে হবে, মোড়ল-চৌকিদার মোতায়েন রেখে আপনার কাছে আমি এসেছি।”

    দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই কথা। ফাঁড়ীদারকে কেহ বোসতে বোল্লে না, আমরাও কেহ বোসলেম না, বরকন্দাজেরা এক এক লাঠি ঘাড়ে কোরে প্রাচীর ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলো। ফাঁড়ীদারের কথায় ছোটবাবু বোল্লেন, “সে সব কাজ তোমাদের, আমাকে কেন চাতালপুরে নিয়ে যাবার আকিঞ্চন পাও? ভট্টাচাৰ্য মহাশয় চিনতে পেরেছেন, নাম রাধারাণী, সে কথাও বোলেছেন, এখন আমি বুঝতে পাচ্ছি। সে স্ত্রীলোক আমাদের বাড়ীর লোক নয়, কিছুদিন আমাদের বাড়ীতে ছিল, একমাসের বেশী হলো আপন ইচ্ছায় চোলে গিয়েছিল; তার পর কোথায় কি হয়েছে আমরা তার কি জানি? কোথায় কি রকমে মোরেছে, সরকারী ডাক্তারেরা পরীক্ষা কোল্লেই জানতে পারবে। সনাক্ত হয়ে গিয়েছে, তবে আর আমাকে কেন কষ্ট দিতে চাও? তোমরাই বা কষ্ট পেয়ে এতদূর কেন এসেছ? স্বস্থানে ফিরে যাও; ঐরূপ অপঘাতমৃত্যুর তদারকে যেমন যেমন তোমাদের কর্তব্য, আইন যেমন বলে, তাই তোমরা কর গে; আমার সেখানে যাবার কোন দরকার নাই; আমি যাব না।”

    পুলিশের লোক প্রায়ই জুলমবাজ হয়; ভদ্রলোককে অনর্থক কষ্ট দিয়ে ষটচক্র সৃজন কোরে আপনাদের স্বার্থসিদ্ধির চেষ্টা পায়। এই ফাঁড়ীদারটী কিছু ভালমানুষ ছিল; বোধ হয় নূতন লোক, পুলিশের কায়দা দস্তুরমত শিক্ষা করে নাই। ছোটবাবুর কাটা কাটা কথাগুলি শ্রবণ কোরে সে লোক আর কোন মারপেঁচের কথা বোল্লে না, আট গড়া পয়সা রাহাখরচ গ্রহণ কোরে অল্পে অল্পে বিদায় হয়ে গেল। কায়দার মধ্যে কেবল এইটুকু দেখলেম, মথুর ভট্টাচাৰ্যকে ছেড়ে গেল না।

    আমরা আবার উপরে গিয়ে উঠলেম; যে সব কথা শুনে এলেম, অননুচ্চস্বরে তারই আলোচনা কোত্তে লাগলেম। রামদাসকে সাবধান কোরে ছোটবাবু বোলে দিলেন, খবরদার, কর্তা যেন এ সব কথা না শোনেন। বাড়ীর মেয়েরাও যেন এ সব কথা শুনতে না পায়। কাহারো কাছে তুমি এ গল্প কোরো না।”

    স্বীকার কোরে রামদাস আপন কর্মে গেল, ছোটবাবুতে আমাতে নির্জনে থাকলেম। ছোটবাবু বোল্লেন, “দেখ হরিদাস, কোথাকার পাপ কোথায়? পাপের প্রায়শ্চিত্ত এই রকমেই হয়। রাঙামামী মোরেছে, আত্মঘাতিনী হয়েছে কিম্বা কেহ তারে খুন কোরে মাঠের ধারে ফেলে গিয়েছে, ঠিক জানা যাচ্ছে না বটে; কিন্তু প্রায়শ্চিত্ত ঠিক হয়েছে। যে রকম ঢলাঢলি আরম্ভ হয়েছিল, আমি তাতে ভয় পেয়েছিলেম; বাড়ীর ভিতর পাছে কোন কাণ্ড ঘটে, বাড়ীর ভিতর পাছে খুনোখুনী হয়, সেই ভয়ে সদাই আমি শঙ্কিত থাকতেম। ভূতের কাণ্ড গেল, দাদার কাণ্ড গেল, তার পর তোমার নামে চোর অপবাদ রটলো, আর কিছু দিন থাকলে আরো যে কত রকম কি কারখানা হোতো, কে বোলতে পারে? ভালোয় ভালোয় আপনাআপনি বিদায় হয়ে গিয়েছিল, জন্মের মত পৃথিবী হোতে বিদায় হয়ে গেল, এক রকম হলো ভাল। সকল পাপের যদি এই রকম হাতে হাতে প্রায়শ্চিত্ত হয়, তা হোলে সংসারের পাপ-তাপ অনেকটা কম হয়ে আসে।”

    ফাঁড়ীদারের কথা আমি শুনেছি, ছোটবাবুর কথাও শুনলেম, কিন্তু ছোটবাবুর শেষের কথাগুলি বিশেষ মনোযোগ দিয়ে শুনলেম না। নূতন একটা কল্পনা মনোমধ্যে সমূদিত হয়ে আমারে কিছু অন্যমনস্ক কোরে দিয়েছিল। ছোটবাবুর কথা সমাপ্ত হলো কিম্বা আরও কিছু, তাঁর বক্তব্য বাকী থাকলো, সে দিকে লক্ষ্য না রেখে হঠাৎ আমি মন্তব্য দিলেম, “হাতে হাতে প্রায়শ্চিত্ত হওয়া খুব ভাল। আর একজন যদি এই সময় একটা প্রায়শ্চিত্ত করে, তা হোলে আমার একটা মনস্কামনা পূর্ণ হয়, মস্ত একটা সন্দেহও জন্মে রয়েছে, সেটাও দূর হয়ে যায়।”

    তাৎপর্যগ্রহণে অসমর্থ হয়ে সকৌতুকে ছোটবাবু আমারে জিজ্ঞাসা কোল্লেন, “আবার কার কি রকম প্রায়শ্চিত্ত হরিদাস? যার পাপ, সে তো আপনার জীবন দিয়ে মহাপ্রায়শ্চিত্ত কোরে গেল, তবে আর তুমি অন্য কোন পাপীর প্রায়শ্চিত্তের কথা বোলছ?”

    আমি একটু ভাবলেম, সহসা যদি অকপটে মনের কথা প্রকাশ করি, তা হোলে হয় তো উপহাসেই ছোটবাবু আমার কথাটা উড়িয়ে দিবেন, একটু বাঁধনী রাখা আবশ্যক। মনে মনে বন্ধনের সূত্র কল্পনা কোরে ছোটবাবুকে আমি বোল্লেম, “আপনাদের গ্রামে অনেক রকম তামাসা আমি দেখলেম, তামাসা-দর্শনে প্রায় সকল লোকেই কৌতুক অনুভব করে, আমোদ অনুভব করে, যারা তামাসা দেখায়, তাদের অনেকের রঙ্গভঙ্গ দর্শনে প্রায় সকলেই অবিচ্ছেদে হাস্য করে; এখানকার তামাসায় আমি দুই প্রকার দেখলেম। হাস্যের উদয় হয়, কতক তামাসায় কষ্ট অনভূত হয়ে থাকে। কতক তামাসায় তামাসগীর লোক এখানে অনেক আছে বোধ হয়। একটি কথা আপনাকে আমি জিজ্ঞাসা কোত্তে চাই; এ গ্রামে কি দুই একজন বহুরূপী পাওয়া যায়? বহরূপীদের তামাসা বড় চমৎকার। একটি বহুরূপীর ক্রীড়াদর্শনে আমার অভিলাষ জন্মেছে, আছে কি কোন বহরূপী?”

    একদৃষ্টে আমার নয়ন নিরীক্ষণ কোরে ছোটবাবু বোপ্পেন, “এ যে দেখছি তোমার অদ্ভুত অভিলাষ। সকল জায়গায় কি বহরূপী থাকে? সকল পল্লীগ্রামে কি বহুরূপী পাওয়া যায়? আমাদের গ্রামে বহুরূপী নাই; তবে মধ্যে মধ্যে দুই একটা মেলার স্থলে দুই একজন বহুরূপী আসে। মধ্যে মধ্যে কখন কখন গৃহস্থ লোকের বাড়ীতেও এক একজন বহুরূপী দেখা দেয়, এই পর্যন্ত আমি জানি। এ গ্রামে বহুরূপী নাই।”

    আবার আমি একটু ভাবলেম; ভেবে ভেবে জিজ্ঞাসা কোল্লেম, “বহরূপীদের কোনপ্রকার সজ্জা এখানকার নিকটবর্তী কোন স্থানে কাহারো নিকটে পাওয়া যেতে পারে না?”— ছোটবাবু বোল্লেন, “যেখানে বহুরূপী নাই, সেখানে বহুরূপীর সাজ পাওয়া অসম্ভব; তবে এখানে যাত্রার দল আছে তাদের কোন রকম সাজ পেলে যদি তোমার কোন কাজে লাগে, তা বরং যোগাড় করা যেতে পারে।”

    না পাওয়ার চেয়ে বরং তা পাওয়াও ভাল, এই বিবেচনা কোরে আমি বোল্লেম, “যাত্রার দলে যারা মুনিগোঁসাই সাজে, তাদের সেই রকমের একটা সাজ পেলে একটি লোকের উপকার হয়। আপনি যদি দয়া কোরে সেই সাজ আমারে আনিয়ে দেন, তা হোলে আমি উপকৃত হই।”

    ছোটবাবু সম্মত হোলেন। আর তখন আমাদের বেশী কথা কিছু হলো না। ছোটবাবু অন্দরে প্রবেশ কোল্লেন। উপর থেকে নেমে গিয়ে আমি রামদাসের অন্বেষণ কোল্লেম, রামদাসকে পেলেম, চুপি চুপি তারে একটি পরামর্শ দিলেম। যেন একটু ভয় পেয়ে রামদাস বোল্লো, “আমায় ও কথা কেন বল? সে কি আমার কর্ম? আমি পারব না। তুমি যদি নিজে পার, চেষ্টা কোরে দেখ; আমি বরং তোমার সঙ্গে থাকবো।”

    রামদাসের শঙ্কিতভাব অনুভব কোরে, মনে মনে হেসে পুনর্বার আমি তারে বোল্লেম “ভয় পাও কেন? সরপট তোমারে কোন কাজ কোত্তে হবে না, সে বাড়ীতে যেতে হবে না, পল্লীর অপর কোন লোককে জিজ্ঞাসা কোরে শুধু কেবল জেনে আসবে সেই লোক এখন এ গ্রামে আছে কি না? সর্বদা বাড়ীতে থাকে কি না? সর্বদা যদি না থাকে, কোন সময় তার দেখা পাওয়া যায়, শুধু কেবল সেইটুকু জেনে আসতে পার আমার কাজ হবে।”

    গণগণেশ্বরে আপন মনে কিয়ৎক্ষণ গুঞ্জন কোরে রামদাস শেষকালে বোল্লে, “তোমার খেলা তুমিই বুঝতে পার, খেলার ভাল-মন্দ তুমিই জানো; আমি তোমাদের হুকমের চাকর, কাজেই আমাকে সব রকম হুকুম তামিল কোত্তে হয়। এখন তুমি যে কথা বোল্লে, সে কাজটা হয় তো আমি পারবো। রাত্রের কথা নয়, প্রভাত হোক, আমি একবার চেষ্টা কোরে দেখে আসবো।”

    কাৰ্যসিদ্ধির আভাষ পেয়ে পুনর্বার আমি বোল্লেম, “প্রভাতে হোক, বেলা এক প্রহরে হোক, দ্বিপ্রহরে হোক, সন্ধ্যার মধ্যে সংবাদটা পেলেই আমি যথাকর্তব্য অবধারণ কোত্তে পারবো; কেবল কথাটিমাত্র এনে দিবে, এই তোমার কাজ।”

    কি একটা চিন্তা কোরে রামদাস বোল্লে, “ঐ পর্যন্ত আমার কাজ, তা আমি বুঝলেম, ভাবতে কথাটা খুব সহজ বটে, কিন্তু আমার মনে যেন কোন প্রকার গোলমাল ঠেকছে। দেখ বাপু, আর যেন কিছু বাড়াবাড়ি করো না; যা করবার, ঢের কোরেছ, তার উপর আর কিছু বেশী হোলে ঢলাঢলি আরো বেশী হবে, আমি কেবল সেই ভয় করি, যে সব কাজ তুমি কোরেছ, এক রকম মানিয়ে গিয়েছে; সে সময় কর্তা বাড়িতে ছিলেন না, ততটা গোলমাল হয় নাই; কর্তা এখন ফিরে এসেছেন, সাবধান হয়ে কাজ কোরো। খবরটা আমি তোমাকে এনে দিব, তুমি নিশ্চিন্ত থাকো।”

    রামদাসের তখন বাড়ির ভিতর কাজ ছিল, রামদাস অন্দরে গেল, আমি আপনার ঘরে গিয়ে এক প্রকার নিশ্চিন্ত হয়ে বোসলেম।

    রাত্রের কার্য এই পর্যন্ত। আহারান্তে ঘরের দরজা বন্ধ কোরে আমি শয়ন কোল্লেম। যেটি আমার নূতন সংকল্প, মনে মনে খানিকক্ষণ সেইটি আলোচনা কোরে, পাকিয়ে রেখে, ভবিষ্যৎ কর্তব্য অবধারণ কোতে লাগলেম। বাধা পোড়ে গেল। আমার গৃহদ্বারে দুই তিনবার জোরে জোরে করাঘাত। শুয়ে শুয়েই আমি জিজ্ঞাসা কোল্লেম, কে?— উত্তর পেলেম না। সদরদরজা বন্ধ হয়েছিল, বাহিরের লোক আসবে না; রূপসী পালিয়ে গিয়েছে, রূপসীর ভয়ও ছিল না; আমি উঠলেম। পুনর্বার দ্বারে করাঘাত। ধীরে ধীরে দরজা খুলে আমি পাশ কাটিয়ে সোরে দাঁড়ালেম: গৃহের দীপ তখনো নির্বাপিত হয় নাই; সম্মুখে দেখি— কর্তা।

    অকস্মাৎ আমার তখন কেমন একটা আতঙ্ক এলো। এত রাত্রে কর্তা এ ঘরে কেন? রামদাস বুঝি আমার পরামর্শের কথা কর্তাকে কিছু জানিয়েছে. তাই শুনে কর্তা বুঝি আমারে ধমক দিতে এসেছেন, এইরূপ ভাবনাই আমার আতঙ্কের কারণ। শেষে বুঝলেম; তা নয়; বিছানার উপর উপবিষ্ট হয়ে, নিকটে আমারে ডেকে, প্রফল্লবদনে কর্তা জিজ্ঞাসা কোল্লেন, “সে কথা মনে আছে হরিদাস? বিবেচনা কোরে কিরূপে স্থির কোরেছ? পাটনায় যেতে ইচ্ছা হয়; মোহনলালবাবু বেশ লোক, তিনি একবার তোমাকে দেখতে চান; দেখা কোল্লে বোধ করি তোমার পক্ষে ভাল হবে; তুমি তোমার নিজের জাতিকুল জানতে না, এখনো জান না; কিন্তু মোহনলালবাবু বোলেছেন, তিনি তোমার জাতিকুল অবগত আছেন। কথার ভাবে আমি বুঝেছি, তুমি তাঁর স্বজাতীয় কোন ভদ্রলোকের সন্তান। তার সময় এখন খুব ভাল, তোমার প্রতিও তিনি বেশ সদয়, এই সময় একবার যদি তুমি দেখা কর, খুব ভালই হবে, এইরূপ আমি বুঝতে পাচ্ছি। যাওয়া যদি তোমার মত হয়, বিলম্ব কারো না, বেশী দিন আর তিনি পাটনায় থাকবেন না; এক মাসের ভিতরেই তিনি শ্রীবৃন্দাবন- যাত্রা ’কারবেন, এইরূপে আমি শুনে এসেছি। কেন আমি তোমাকে এত কথা বোলছি, তা তুমি বুঝতে পেরেছ? তোমার উপকার হোলে, আমি সন্তুষ্ট হব, সেই জন্যই বলা। সন্ধ্যাকালে আমি পাঁজি দেখেছি, আগামী কল্য শুভদিন, কল্যই তুমি যাত্রা কোত্তে পার। রাহাখরচ ইত্যাদি যাহা কিছু প্রয়োজন, সব আমি দিব, কল্যই তুমি যাও, এই আমার ইচ্ছা।”

    কর্তার ইচ্ছায় আমার একটা বড় ইচ্ছা চরিতার্থ করবার বাধা পড়ে, তাই ভেবে, বিনীতভাবে মৃদুস্বরে আমি বোল্লেম, “আজ্ঞা! আপনার ইচ্ছার অবাধ্য হওয়া আমার উচিত হয় না, কিন্তু এখানে আমার একটি বিশেষ কার্য আছে. সপ্তাহের মধ্যে সেকার্য আমি সিদ্ধ কোত্তেও পারবো, এমন আশা রাখি; অনুগ্রহ পূর্বক সপ্তাহের পরে আপনি আর একটি শুভদিন স্থির কোরে দিবেন, সেই দিনেই আমি রওনা হবো। মোহনলালবাবু একমাস পাটনায় থাকবেন, তার মধ্যে আমি সেখানে উপস্থিত হয়ে দেখা কোত্তে পারবো, তাতে আর কোন সন্দেহ থাকবে না।

    কর্তা বোল্লেন, “আচ্ছা, তবে তাই কোরো, কিন্তু দেখো, বেশী বিলম্ব যেন না হয়।  এখানকার কাজটা সপ্তাহের অগ্রে যাতে সমাধা কোত্তে পার, চেষ্টা কোরো।”

    এইরূপ উপদেশ দিয়ে কর্তা উঠে গেলেন, আবার আমি দরজা বন্ধ কোরে শয়ন কোল্লেম। পাটনায় আমি যাব, ভেবে আমার ভয় হলো কি আহ্লাদ হলো, নিজেই যেন আমি সে ভাবটা স্থির কোত্তে পাল্লেম না। মোহনলালবাবু বর্ধমানে আমার প্রতি যেরূপ সদয়ভাব—নির্দয়ভাব দেখিয়েছিলেন, স্মরণ হলো; ভেলুয়া-চটিতে গৃহদাহের সময় তিনি আমারে যেরূপে আদর কোরেছিলেন, স্মরণ হলো; বারাণসীধামে প্রথম দর্শনে তাঁর প্রসন্নতা আমি লাভ কোরেছিলেম, তার পর অপ্রসন্নতার আক্রমণ, সে কথাও স্মরণ হলো। এখন পাটনায় গিয়ে আদর পাব কিম্বা তাঁর রক্তচক্ষু দর্শন কোরবো, নিশ্চয়তা নাই, এইরূপ আমি ভাবলেম। রক্তচক্ষু দর্শন সত্যই যদি আমার ভাগ্যে ঘটে, তাতেই বা এত কি ভয়? মোহনবাবু মনুষ্য, রাক্ষস নন, রাগের বশে টপ কোরে তিনি আমারে খেয়ে ফেলবেন না; যদি বেগতিক দেখি, পালিয়ে গিয়ে আত্মরক্ষা কোত্তে পারবো। পাটনায় আমি যাব। মোহনবাবু যেতে বোলেছেন, সেই জন্যই আমারে যেতে হবে, কর্তা যদি এমন কথা বোলতেন, তা হোলে আমি যেতেম না। আজ রাত্রে যে কথা শুনলেম, সেই কথার উপরেই আমার ভবিষ্যৎ আশার প্রধান একটি অংশ নির্ভর কোচ্ছে, সেই জন্যই আমি যাব।

    কর্তা বোলে গেলেন, মোহনলালবাবু বোলেছেন, আমি তাঁর স্বজাতি; এ কথা যদি সত্য হয়, তা হোলে মোহনলালবাবু আমার অপরাপর পরিচয়ও অবশ্য জানেন। যে পরিচয় আমি জন্মাবধি জানি না, সেই পরিচয় আমি তাঁর মুখে শুনতে পাব; মনে একটি উল্লাস জন্মিল; সেই জন্যই আমি যাব।

    একরকম সংকল্প আমি স্থির কোল্লেম, নিশ্চিন্ত হোলেম না; মনে আবার একটা তর্ক উঠলো। পাটনায় আমার কথাটা কেন উঠেছিল? কে তুলেছিলেন? মোহনবাবু কিম্বা জয়শঙ্করবাবু? মোহনবাবু হঠাৎ একজন অপর লোকের কাছে আমার কথা তুলবেন, এমন তো সম্ভব বোধ হয় না; জয়শঙ্করবাবুই তুলে থাকবেন; কিন্তু কেন? আবার মনটা আমার অন্যদিকে ঘুরে গেল; যে সন্দেহটা মনে মনে চাপা ছিল, সেই সন্দেহ আবার জাগলো। অজ্ঞান অবস্থায় ত্রিপুরা জেলায় যারা আমারে ফেলে রেখে গিয়েছে কর্তা সে কথা অস্বীকার কোল্লেও অন্য সূত্রে সে তত্ত্ব আমি জেনেছি। সূত্র কিছু না থাকলেও তাই-ই আমি জানতেম; কেন না অচেতন লোকেরা নিজের চেষ্টায় হেঁটে আসতে পারে না। আমি অচেতন ছিলেম, সেই অবস্থায় জয়শঙ্করবাবু এখানে আমারে দেখেছেন; তাতেই বুঝা গিয়েছে, আমার সঙ্গে অন্য লোক ছিল, আমারে এখানে রেখেই তারা পালিয়েছে। কারা তারা, প্রথমেই আমি অনুমান কোরেছিলেম। বনের ভিতর যারা আমারে ধোরে রেখেছিল, দুশ্চারিণী নবীনকালী যাদের সঙ্গিনী, তারাই ঢাকা থেকে ত্রিপুরায় আমারে এনেছিল, তাতে আর সন্দেহ নাই। তারা যদি নূতন লোক হতো, আমার বিপক্ষদলের সঙ্গে তাদের যদি কোন সংস্রব না থাকতো, তা হোলে এমন ঘটতো না। পূর্বেই আমি স্থির কোরেছিলেম, রক্তদন্তের চক্রের সঙ্গে সঙ্গে নানা দিকে নানা লোক ঘোরে। ঢাকায় যারা আমারে ধোরেছিল, তারা যে রক্তদন্তের লোক কিম্বা রক্তদন্তের শিক্ষিত গুপ্তচরের সহকারী লোক, সেটা নিঃসন্দেহ। রক্তদন্ত মোহনবাবুর পেটাও লোক।

    রক্তদন্ত অথবা রক্তদন্তের চরেরা আমার সম্বন্ধে যে সব কাজ করে, মোহনবাবু অবশ্য সে সব কাজের খবর পান। জয়শঙ্করবাবু ইচ্ছায় অথবা অনিচ্ছায় মোহনবাবুর কাছে আমার নাম কোরেছিলেন, মোহনবাবু অমনি সদয় হয়ে আমারে দেখতে চেয়েছেন, পাটনায় আমারে যেতে বোলেছেন, কথা কিছু আশ্চৰ্য বটে! কথার ভিতর কিছু, গোলমাল আছে, তাও যেন আমি বুঝতে পাচ্ছি, তত্ত্বও আমি যাব। কোন গতিকে মোহনবাবুর মূখে আমি আমার নিজের পরিচয়টা যদি জেনে নিতে পারি, তা হোলে আমার একটা বিশেষ উপকার হবে, বুকের উপর থেকে ভারী একটা বোঝা নেমে যাবে; অজ্ঞ পরিচয় সর্বদা আমারে অপর লোকের কাছে সঙ্কুচিত হয়ে থাকতে হয়, সে অসঙ্কোচটা দূরে হবে, মাথা উচুঁ কোরে পূর্ণ সাহসে বুক ফুলিয়ে সব জায়গায় আমি বেড়াতে পারবো, সকল লোকের কাছে সপ্রতিভ থাকবো; কেহ পরিচয় জিজ্ঞাসা কোল্লে বোবা হয়ে থাকতে হবে না, কোথাও কাহার কাছে মাথাও হেঁট হবে না। পরিচয় জানবার জন্যই পাটনায় আমি যাব।

    আর একটা কথা আমার মনে হলো। জয়শঙ্করবাবু বোলেছেন, মোহনলালের সঙ্গে তাঁর পূর্বাবধি পরিচয়। ত্রিপুরায় জয়শঙ্করবাবুদের বাড়ীতে আমি আছি, চক্ৰঘূর্ণনে মোহনবাবু হয় তো সে সংবাদ রাখতেন, জয়শঙ্করের মুখে আমার নাম শুনেই হয় তো আর কোন মতলব তিনি স্থির কোরেছেন; সেই মতলব সিদ্ধ করবার অভিপ্রায়েই পাটনায় আমারে যেতে বোলেছেন, এইটাই যেন সম্ভব বোধ হোচ্ছে। হয় হোক, তাই হোক; তবু, আমি যাব।

    রাত্রে আর নিদ্রা হলো না; চিন্তায় চিন্তায় সারা রাত্রিজাগরণ। ঊষাপক্ষিগণ বৃক্ষে বৃক্ষে কলরব আরম্ভ কোল্লে; যে সকল পক্ষী গীত গায়, তাঁদের সুরে তারা ঊষাবন্দনা আরম্ভ কোল্লে; পল্লীবাসী শ্রমজীবী লোকেরাও একে একে জেগে উঠলো, নিকটে নিকটে কত লোকের কত প্রকার অস্পষ্ট কথা আমার শ্রবণগোচর হোতে লাগলো; গবাক্ষপথ দিয়ে ঘরের ভিতর আলো এলো, রজনীপ্রভাত।

    বেলা দুই প্রহরের মধ্যে নূতন ঘটনা কিছুই হলো না। অপরাহ্ণে। রামদাস এসে আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ কোল্লে।

    রামদাসকে আমি একটি দৌত্যকার্যে নিযুক্ত কোরেছিলেম, সেই কার্যে সিদ্ধমনোরথ হয়ে চুপে চুপে রামদাস আমারে সংবাদ দিলে, “সে লোক এ গ্রামে আছে, আরো তিন দিন থাকবে, তিন দিন পরে স্থানান্তরে চোলে যাবে।” রামদাসকে তখন আমি আর কোন কথা জিজ্ঞাসা কোল্লেম না, রামদাস চোলে গেল।

    ঠিক সন্ধ্যার সময় একজন ছোকরাকে সঙ্গে কোরে ছোটবাবু এলেন। ছোকরার হাতে একটা পুঁটলী। ছোটবাবুর আদেশে সেই পুঁটলীটি আমার বিছানার উপর রেখে প্রণাম কোরে ছোকরা শীঘ্র শীঘ্র বিদায় হয়ে গেল। পুঁটলীটি খুলে ছোটবাবু আমারে কতকগুলি জিনিস দেখালেন। একখানি গেরুয়া বসন, একখানি নামাবলী, পরচুলা, শ্বেতবর্ণ দীর্ঘ দাড়ী, শ্বেতবর্ণ গোঁপ, পিঙ্গলবর্ণ জটা, আর একছড়া হরিনামের জপমালা; জিনিসগুলি দর্শন কোরে আমি হাস্য কোল্লেম।

    হাস্য কোরে ছোটবাবু আমারে জিজ্ঞাসা কোল্লেন, “এই তো বহুরূপীর সজ্জা এলো, এ সজ্জাগুলি নিয়ে তুমি কি কোরবে? —আমি উত্তর কোল্লেম, কি আমি কোরবো আজ রাত্রে তা আপনি শুনতে পাবেন না; কাৰ্যসিদ্ধির পর কল্য কিম্বা পরশু সমস্তই আপনি জানতে পারবেন। সে প্রসঙ্গে ছোটবাবু আর কোন কথা বোল্লেন না; অন্য কথা উত্থাপন কোরে আমার গায়ে হাত দিয়ে বোল্লেন, “তুমি কি নিমন্ত্রণে যেতে ভালবাস? আজ আমাদের গ্রামের দক্ষিণপাড়ায় এক বাড়ীতে সত্যনারায়ণের সিন্নী; — সত্যনারায়ণের কথা হবে, কৃষ্ণমঙ্গল গীত হবে, কৃষ্ণভক্তি যাত্রা হবে, খুব ঘটা। আমাদের নিমন্ত্রণ আছে, আমি যাব, কর্তাও যাবেন, তোমার কি যাবার ইচ্ছা আছে?”

    উল্লাসপ্রাপ্ত হয়ে মনে মনে আমি বোল্লেম, সত্যনারায়ণ দীর্ঘজীবী হয়ে থাকুন, ভালই হলো; যে ভাবনা আমি ভাবছিলেম, সত্যনারায়ণের ইচ্ছায় সে ভাবনা অন্তরে গেল, ছোটবাবুর প্রশ্নে উত্তর কোল্লেম, “আজ্ঞা না; আজ আমার শরীর বড় ভাল নয়, নিমন্ত্রণে আমি যেতে পারবো না।”

    ছোটবাবু আমারে আর কিছু বোল্লেন না, খানিকক্ষণ সেইখানে বোসে অন্য প্রসঙ্গে দুইটি চারিটি কথা কোয়ে, তিনি অন্দরে প্রবেশ কোল্লেন, আমি এদিকেও প্রস্তুত হোলেম। নিমন্ত্রণে যাব না, তবে আমার প্রস্তুত হওয়া কিসের জন্য, কিঞ্চিৎ পরে তাহার পরিচয়।

    রামদাসকে সঙ্গে নিয়ে কর্তা আর ছোটবাবু বাড়ী থেকে বেরলেন; যে বাড়ীতে নিমন্ত্রণ, সেই বাড়ীতেই গেলেন। কথা আছে, গীত আছে, যাত্রা আছে শীঘ্র তাঁরা ফিরে আসবেন না, তা আমি জানতে পাল্লেম। পাচিকা-ঠাকুরাণী সেই সময় একবার আমার ঘরে এসেছিলেন, তাঁরে আমি বোল্লেম, অসুখ আছে, রাত্রে আজ আমি কিছু আহার কোরবো না। সেই কথা শুনে, তিনি একবার আমার কপালে হাত দিয়ে বিষণ্ন বদনে বোল্লেন, “তাই তো! গা গরম হয়েছে! কপালের শির লাফাচ্ছে। মাথা ব্যথা কোচ্ছে বুঝি? চুপ কোরে শুয়ে থাক; বেশী রাত জেগো না। শীঘ্র যাতে ঘুম হয়, সেই চেষ্টা কর।”

    শয়নের উপদেশ দিয়ে পাচিকা-ঠাকুরাণী অন্তঃপুরে প্রবেশ কোল্লেন। আমি আপনি আপনি হাস্য কোল্লেম। কতকগুলি স্ত্রীলোকের স্বভাব এইরূপে যে, কোন প্রকার অসুখের কথা শুনলে—  অসুখটা সত্যই হউক বা মিথ্যাই হোক— স্নেহ জানিয়ে সেই কথারই পোষকতা করেন, সাবধান থাকবার পরামর্শ দেন। এই পাচিকাটিও তাই কোল্লেন; বাস্তবিক আমার কোন অসুখ ছিল না। ঘরের দরজা বন্ধ কোরে আমি আপনার ইচ্ছামত কাৰ্য কোল্লেম, দর্পণে মুখ দেখলেম, গৃহের প্রদীপটি নির্বাণ কোরে দরজা ভেজিয়ে বারান্দায় বেরুলেম। সে দিকটা অন্ধকার; সদরবাড়ীতে কেহই ছিল না, সিঁড়ির দরজাটি ভেজিয়ে রেখে নিঃশব্দে উপর থেকে নেমে এলেম, বাড়ী থেকে বেরুলেম। বাবুরা নিমন্ত্রণে গিয়েছেন, শীঘ্র শীঘ্র সদরদরজা বন্ধ হবে না, মনে ভরসা থাকলো, ধীরে ধীরে গন্তব্য স্থানে আমি চল্লেম।

    সেই নদীতীর, সেই আম্রবৃক্ষ, নিকটে সেই বাড়ী, বৃক্ষতলে আমি। সত্য বটে আমি; কিন্তু তখন আমারে হরিদাস বোলে চিনতে পারে, তেমন চক্ষু সে অঞ্চলে ছিল না। আমি তখন একজন শ্বেতশ্মশ্রুবিশিষ্ট জটাধারী সন্ন্যাসী। কৌপীন অথবা ব্যাঘ্রচর্মপরিধান করা নাই, অঙ্গে ভস্মলেপন নাই, কেবল মুখের ঠাঁই ঠাঁই শ্বেতচন্দনের রেখা একেছিলেম। সজ্জিত সন্ন্যাসীতে আর আমাতে অতি অল্পমাত্র প্রভেদ। আমার পরিধান গৈরিকবসন, কৃষ্ণ নামাবলীচিত্রিত গৈরিকবসনে সর্বাঙ্গ আচ্ছাদিত, হস্তে জপমালা, মুখে অবিরাম হরিনাম।

    সেই বাড়ীখানির সম্মুখ দরজার কাছে গিয়ে আমি দাঁড়ালেম; উচ্চকণ্ঠে হরিনাম গান কোচ্ছিলেম, একটি স্ত্রীলোক এসে আমারে দেখে গেল। ঔষধের মোড়ক সমর্পণ করবার দিন যে স্ত্রীলোকটি আমার দূতী হয়েছিল, সেই স্ত্রীলোক। আমারে তখন চিনতে পারে কার সাধ্য? সজ্জা সমাপ্ত কোরে দর্পণে যখন আমি মুখ দেখি, তখন আমি নিজেই আমারে চিনতে পারি নাই। স্ত্রীলোকটি আমারে দেখে গেল, অব্যবহিত পরেই বাবু এলেন। আমি সন্ন্যাসী, বাবু আমারে প্রণাম কোল্লেন। যে বাবুকে আমার দরকার, সেই বাবুই তিনি। জয়োচ্চারণ কোরে বাবুকে আমি বোল্লেম আপনার মঙ্গলের জন্যই আমার এখানে আসা; জন্মাবধি আপনি দেশে ছিলেন না, পৈতৃক ভদ্রাসনে নূতন এসেছেন, আপনার মনে কোন প্রকার অশান্তি আছে, গণনা কোরে সে সব আমি জানতে পেরেছি। কিছু দিন এই গ্রামে আমি আছি। গোটাকতক কুকুর সঙ্গে কোরে যে রাত্রে আপনি শিবের মন্দিরের সম্মুখে দিয়ে চোলে আসেন, সেই রাত্রে আপনারে আমি দেখেছিলেম, আপনারে দেখেই আমার দুঃখ উপস্থিত হয়েছিল। বুঝতে পেরেছেন আমার কথা? আপনার মনে কোন প্রকার দুশ্চিন্তা আছে; স্বকৃত কার্যের জন্যই সেই চিন্তা। এখানে আপনার নাম পায়রাবাবু। এখানে আপনার গুটিকতক বন্ধু আছেন, গুটিকতক শত্রুও আছেন, যাতে কোরে বন্ধুবিচ্ছেদ ঘটে, যারা শত্রুপক্ষ, তারা সেই চেষ্টাই কোচ্ছে। আপনি কোন প্রকার উৎকট পাপে— না না, সে কথা এখানে বলা হবে না, আপনার কোন ভয় নাই, শান্তি আছে, হরি আপনাকে শান্তি দিবেন। আপনি আমার সঙ্গে ঐ শিবালয়ে চলুন, আমি আপনার গ্রহশান্তির সুব্যবস্থা কোরে দিব।

    বাবু একটু মুখে বাঁকালেন। হরিনামে তাঁর বিশ্বাস নাই, ধর্মেকর্মে আস্থা নাই, বাড়ীর ভিতর ফিরে যাবার উপক্রম কোল্লেন। আমি তাঁর একখানি হাত ধোরে নরম কথায় চুপে চুপে তাঁর কাণের কাছে বোল্লেম, আমার সম্মুখে থেকে পালিয়ে গেলে তুমি পরিত্রাণ পাবে না, কার্য বড় শক্ত। কুলস্ত্রীর —–সে সব কথা এখানে যদি তুমি শুনতে চাও, ঘরে বাহিরে মহাকলঙ্ক বেঁধে উঠবে; আমি তোমারে চাই। গ্রামে এত লোক থাকতে, খুঁজে খুঁজে তোমাকেই আমি সুপাত্র বোলে ধোরেছি, আমি তোমার ভাল কোরবো; পালিয়ে যাবার চেষ্টা কোরো না; সব কথা আমি জানি। বীরভূমের কথাও জেনেছি, কাশীর কথাও জেনেছি, এখানকার কথাও জানতে পেরেছি। পাপের আগুন হু হু কোরে জ্বোলছে, লুকিয়ে থাকলে সে অগ্নিনির্বাপিত হবে না। আমার সঙ্গে তুমি শিবমন্দিরে চল, শান্তিজলে আমি তোমার অশান্তি-বহ্নি নির্বাণ কোরে দিব।

    পাঠক মহাশয়! বুঝতে পারেন, এই বাবুটিই সেই পায়রাবাবু। আমার মুখে শেষের কথাগুলি শুনে, মনে মনে কি তিনি ভাবলেন, তাঁর জীবনের সমস্ত খবর আমি রাখি, সেটিও যেন বুঝতে পাল্লেন; সেখানে আর আমি বেশী কথা না বলি, সেইরূপে সাবধান হয়ে আমার সঙ্গে শিবমন্দিরে আসতে সম্মত হোলেন।

    নদীতীরে একটি শিবমন্দির; বাবুকে সঙ্গে নিয়ে সেই মন্দিরে আমি এলেম। মন্দিরের দ্বারে চাবি দেওয়া ছিল; মন্দিরের একদিকের বারান্দায় উপবেশন কোরে সংক্ষেপে সংক্ষেপে সমস্ত কথার সারমর্ম তাঁকে আমি শুনিয়ে দিলেম। বাবু ঘন ঘন কেঁপে কেঁপে উঠলেন। ভূতভবিষ্যৎ গণনায় আমি পরম পণ্ডিত, বাবু যেন সেটি বেশ বুঝতে পাল্লেন; আমার কথাগুলি যেন তাঁর অস্থিতে অস্থিতে বিঁধে গেল। আরো একটু খোলসা কোরেই আমি বোল্লেম রাধারাণী মরেছে। আত্মঘাতিনী হয়েছে! তোমার জন্যই রাধারাণীর অপঘাত মৃত্যু। পুলিশ পর্যন্ত জানাজানি হয়েছে, পুলিশে এখনো তোমার নামটা উঠে নাই; কার মনে কি আছে, কে জানে? তদন্তমুখে উঠতে পারে, গণনাতে তাও আমি জানতে পেরেছি, এই বেলা প্রতীকারের চেষ্টা পাওয়া ভাল। বীরভূমে যা তুমি কোরেছ, তার ভিতরেও একটি কুলকন্যা ছিল; সেই কুলকন্যা এখন গুজরাটে, গণনায় সব আমি নখদর্পণে দেখতে পাচ্ছি। সে নায়িকা বেঁচে আছে, রাধারাণী ইহসংসার থেকে বিদায় হয়েছে। মহাপাপ! মহাপাপ!! এ পাপের প্রায়শ্চিত্ত শীঘ্র শীঘ্র যদি তুমি না কর, পুলিশের হস্তে শীঘ্র তুমি ধরা পোড়বে, ইহলোকে রাজবিচারে শাস্তি পাবে। তার পর পালিশের উপর পুলিশ, সর্বশক্তিমান পরমেশ্বর—

    এই পর্যন্ত শুনে পায়রাবাবু খানিকক্ষণ নির্বাক হয়ে থাকলেন, চঞ্চল-নয়নে চতুর্দিকে চাইলেন, কাতরবচনে আমারে বোল্লেন, “কি প্রকার প্রায়শ্চিত্ত কোল্লে আমি নিস্তার পাই, দয়া কোরে আপনি আমারে আজ্ঞা করুন।”

    কথার ভাবে আমি বুঝলেম, প্রায়শ্চিত্ত কোত্তে পায়রাবার ইচ্ছা আছে। কিরূপে প্রায়শ্চিত্ত, আমি তা মনে জানতেম; মনে রেখেই প্রকাশ্যে বোল্লেম, এখানে সে কথা বলা হবে না। রাধারাণী মরেছে, দেহ এখন শ্মশানে ভস্ম হয় নাই, সেই দেহ যদি তুমি দর্শন কর, তা হোলেই একরকম প্রায়শ্চিত্ত হয়। দর্শন কোত্তে পারবে কি? পুলিশের সম্মুখে তোমার প্রেমনায়িকার মৃতদেহ দর্শন কোত্তে তোমার সাহস হবে কি?

    আমি সন্ন্যাসী; সংসারের কোন কথাই যেন আমি জানি না, বিশ্বাসে একটু কপট বিস্ময় প্রকাশ কোরে তিনি বোল্লেন, “রাধারাণী? —কে রাধারাণী? রাধারাণীর মৃতদেহ আমি কেন দেখতে যাব? পুলিশ! পুলিশের সঙ্গে আমি কেন দেখা কোরবো? আমি যাব না।”

    মৃদুহাস্য কোরে আমি বোল্লেম, প্রায়শ্চিত্ত কোত্তে রাজী আছ, অথচ রাধারাণীকে জান না; পুলিশের নামে ভয় হয়, কার কাছে তুমি এ চাতুরী খেলাচ্ছ? মানুষের কাছে বরং চাতুরী খাটে, বিদ্যার কাছে খাটে না; জ্যোতির্বিদ্যা প্রভাবে সমস্তই আমি জানতে পেরেছি। একটি বালক একদিন তোমার হস্তে রাধারাণীর প্রেমপত্রিকা প্রদান কোরেছিল, তার পর রাধারাণীর প্রেমাশ্রমের উপদেবতানিপাত; আমার কাছে তুমি এ সব কথা অস্বীকার কোত্তে পার না। যদি কর, অস্বীকার করবার যদি চেষ্টা পাও, পুলিশের সঙ্গে সাক্ষাৎ কর।

    বাবুটির অন্তরে ভয় ছিল, বদনেও ভয়ের চিহ্ন উদিত হয়েছিল। দুই তিনবার আমার মুখে পুলিশের কথা শুনে, সেই ভয়টা এই সময়ে ঘনীভূত হয়ে উঠলো। তখন তিনি আমার প্রসাদভিখারী হয়ে মৃদুবচনে বোল্লেন, “ঐরূপ প্রায়শ্চিত্ত ছাড়া আর আপনি যেরূপে প্রায়শ্চিত্তের বিধি দেন, তাতে আমি প্রস্তুত আছি। আপনি দৈবজ্ঞ, ভূতভবিষ্যৎ উভয় তত্ত্ব আপনি পরিজ্ঞাত, আপনি আমাকে রক্ষা করুন!”

    আমার মনোবাসনা পূর্ণ হবার পূর্বলক্ষণ। রাত্রি প্রায় এক প্রহর। সত্যনারায়ণের সিন্নী রাত্রি এক প্রহর পর্যন্ত, শেষ হোতে বাকী থাকে না; ছোটবাবু যদি যাত্রাগীতি শোনবার আশা না রাখেন, শীঘ্রই ফিরে আসবেন; শীঘ্র শীঘ্র প্রস্থান করাই আমার আবশ্যক। পায়রাকে বোল্লেম, তোমার প্রায়শ্চিত্তটা যাতে অন্য লোকের চক্ষে না পড়ে, তেমন উপায় আমি কোত্তে পারি; তুমি নারীবেশ ধারণ কর। তোমাদের গ্রাম, পাল্কীবেহারা কোথায় পাওয়া যায়, তা তুমি জানো, নারীবেশধারণের অগ্রে একখানা পাল্কী ডাকাও, তার পর যা যা কোত্তে হয়, সে সব আমার ভার। এইখানে আমি থাকলেম, নারীবেশের উপকরণ বাড়ীর ভিতর থেকে সংগ্রহ কোরে আমার কাছে রেখে যাও, তার পর পাল্কী-বেহারা ডাকো। আমি তোমাকে নারী সাজাব; যাও, দুই কার্য কোরে এসো! পালিও না, পালিয়ে নিস্তার পাবে না। ধর্মের চক্ষু সর্বদর্শী, সর্বত্রদর্শী—জলধিজলে ডুবে থাকলেও সে চক্ষু তোমাকে দেখতে পাবে, নিবিড় বনে প্রবেশ কোল্লেও সে চক্ষু তোমাকে আকর্ষণ কোরবে, কিছুতেই পরিত্রাণ পাবে না! যাও, পালিও না!

    ধর্মের কর্ম, পায়রাবাবুকে আমি আপন কায়দায় আনলেম, যা যা বোল্লেম, সমস্তই ঠিকঠাক হলো। বস্ত্রালঙ্কার আর একখানি শিবিকা উপস্থিত। পায়রাকে আমি বধূসজ্জায় সজ্জিত কোল্লেম, পাল্কীর ভিতর বসালেম, সর্দার বেহারার কাণে কাণে ঠিকানা বোলে দিয়ে শিবিকার দ্বার রুদ্ধ কোরে দিলেম। শিবিকা সরাসর বাবুদের বাড়ীর ফটকের কাছে উপস্থিত হলো, শিবিকার সঙ্গে সঙ্গে পদব্ৰজে আমি।

    অবগুণ্ঠনে কপোতীর বচন আবৃত কোরে আমি সেটিকে উপরে নিয়ে তুল্লেম। যে ঘরে আমি থাকি, সে ঘরে তখন আলো ছিল না, অন্ধকারেই নববধূটিকে ঘরের একধারে আমি বসালেম, কথাবার্তা কিছুই নয়। কোথায় আমি এনেছি, পায়রা সেটা বুঝতে পারে না। মন্দিরে বোসে যা আমি ভেবেছিলেম, তাই ঠিক হলো। একটু পরেই ছোটবাবু ফিরে এলেন; হরিভক্তির আকর্ষণে হরিগুণগান শ্রবণের অভিলাষে কর্তা সেই নিমন্ত্রণকর্তার বাড়ীতেই থাকলেন। প্রায়শ্চিত্তের আয়োজনে আমি সুবিধা পেলেম।

    ছোটবাবু এসেছেন, জানতে পেরে, সিঁড়ির পথেই তাঁর সঙ্গে আমি সাক্ষাৎ কোল্লেম। তাঁর সঙ্গে আলো ছিল, সম্মুখে আমারে দেখে ছোটবাবু স্তম্ভিত হয়ে সিঁড়ির উপর দাঁড়ালেন। আমারে চিন্তে পাল্লেন না। আমি চুপি চুপি তাঁরে বোল্লেম, চমকিত হবেন না; ভাল কোরে আমারে দেখুন; আমি সন্ন্যাসী নয়, আমি হরিদাস। আপনি আমারে বহুরূপীর সাজ এনে দিয়েছিলেন, সেই সজ্জার অভ্যন্তরে আমি হরিদাস। আমি একটি কপোতী ধোরে এনেছি, সেই কপোতীও বহুরূপী; কখন কপোত হয়, কখন কপোতী সাজে। কপোত-কপোতীর প্রেম কবিকূলের প্রেম-সংসারের আদর্শ। কপোতবেশে আমার কপোতী বিশুদ্ধ প্রেমশিক্ষা করে নাই, পাপ হয়েছিল; সেই পাপের প্রায়শ্চিত্ত—”

    আমার হিঁয়ালীর অর্থ ছোটবাবু শীঘ্র বুঝলেন না; কি রকম কপোতী, দর্শনের কৌতূহলে তিনি আমার সঙ্গে গৃহমধ্যে প্রবেশ কোল্লেন। ঘরের অন্ধকার ঘুচে গেল; দীপাধারে উজ্জ্বল দীপ সংস্থাপিত, অন্ধকার দূরে গেল। ঘরের অন্ধকার গেল, ছোটবাবুর মনের অন্ধকারও দূর হলো; ঘোমটা খুলে কপোতীর মুখখানি তাঁরে আমি দেখালেম। ছোটবাবু বিস্ময়াপন্ন। বিস্ময়ের সঙ্গে হাস্যের সম্বন্ধ অল্প, কিন্তু সবিস্ময়ে ছোটবাবু হাস্য কোলেন। পায়রাবাবু কাঁপতে লাগলেন। ছদ্মবেশ খুলে নিয়ে পায়রাটিকে আমি আবার পায়রাবাবু সাজালেম।

    পরামর্শ স্থির হলো। অতি সহজেই প্রায়শ্চিত্ত হয়ে যাবে, লোক-জানা-জানি হবে না, এরূপ আশা দিয়ে, পায়রার মুখে আমি পাপস্বীকার করালেম। পূর্বকথা সে ক্ষেত্রে প্রকাশ পেলে না। রুদ্রাক্ষগ্রামের ভৌতিক ক্রীড়া পায়রাবাবু কথায় কথায় স্বীকার কোল্লেন; রাধারাণীর সঙ্গে গুপ্তপ্রেম, নিজমুখে তাঁকে স্বীকার কোত্তে হলো।

    ছোটবাবু আমারে জিজ্ঞাসা কোল্লেন, “এ পাপের প্রায়শ্চিত্ত কি?” আমি ব্যবস্থা দিলেম, মস্তক মুণ্ডন। মন্ত্র পাঠ হয়ে গেল; পাপীর নিজ মুখেই মন্ত্রপাঠ— পাপস্বীকার; বাকী কেবল মস্তকমুণ্ডন। আর কোন প্রকার ক্রিয়া-প্রক্রিয়ার আবশ্যক হবে না, কেবল মস্তকমুণ্ডনেই ইহলোকে পূর্ণাঙ্গ প্রায়শ্চিত্ত সম্পাদিত হবে। এই রাত্রের মধ্যেই সে কার্যটি সম্পন্ন হোলে ভাল হয়। অন্য লোকে দেখবে না, গ্রামের লোকে জানবে না, রাত্রের কার্য রাত্রের মধ্যেই শেষ হয়ে যাবে; পায়রাবাবু যেখানে ইচ্ছা, রাত্রের মধ্যে সেইখানেই চোলে যেতে পারবেন।

    ব্যবস্থা মঞ্জুর। ছোটবাবুও মঞ্জর কোল্লেন, পায়রাবাবু ও মঞ্জুরী জানালেন। রাত্রের মধ্যেই প্রায়শ্চিত্ত হওয়া স্থির। স্থির বটে, কিন্তু এ রাত্রে নাপিত কোথায় পাওয়া যায়? আমি সন্ন্যাসী; ক্ষৌরকারের কার্যে আমার পাণ্ডিত্য ছিল না, আমি কিঞ্চিৎ উদ্বিগ্ন হোলেম; উদ্বেগের কারণ ছোটবাবকে জানালেম। ছোটবাবু বোল্লেন, “চিন্তা কি? আমাদের রামদাসটি ক্ষৌরকার,— প্রামাণিক বংশসম্ভূত। কর্তা বোধ হয় প্রভাতের অগ্রে ফিরে আসবেন না, আমাদের সম্মুখে অনেকটা সময়; রামদাস নির্বিঘ্নে মুণ্ডনকার্য সমাধা কোরে দিতে পারবে।”

    রামদাসকে আহ্বান করা হলো, গৃহমধ্যে রামদাস উপস্থিত। পায়রা-দর্শনে রামদাসের বিস্ময়-কৌতুক একত্র। বিস্ময়ে নিস্তব্ধ, কৌতুকে হাস্য। ছোটবাবু তারে পায়রাটির মুণ্ডনকার্য নির্বাহ করবার আদেশ দিলেন। আর এক অভাব। রামদাসের ক্ষুর নাই। সে অভাবটাও অধিকক্ষণ থাকলো না, ছোটবাবুর নিজের একখানি ক্ষুর ছিল, অন্দরে প্রবেশ কোরে সেই ক্ষুরখানি তিনি বাহির কোরে এনে রামদাসের হাতে দিলেন; রামদাস তখন পায়রার সম্মুখে হাঁটু গেড়ে বোসলো।

    এইখানে আর এক রঙ্গ! উপনয়নের অগ্রে বিপ্রবালক এক নতুন আহ্লাদে আমোদিত হয়, কর্ণবেধ ও কেশমণ্ডনের সময় সেই আহ্লাদের সঙ্গে সে যেমন একটু একটু ভয় পায়, বিস্ফোটকে অস্ত্র করবার সময় তীক্ষ্ণছুরিকাধারী ডাক্তার সম্মুখে উপবিষ্ট হোলে রোগী যেমন নূতন যন্ত্রণার ভয়ে আকুল হয়, ক্ষুরাস্ত্রধারী রামদাসকে সম্মুখে দেখে যুগল হস্তে যুগলকর্ণ আচ্ছাদন কোরে পায়রাবাবু সেই রকম আতঙ্ক প্রকাশ কোত্তে লাগলেন; কাঁদো কাঁদো মুখে বোলতে লাগলেন, “মাথার মাঝখানটা কামিয়ে দিলেই ঠিক হয়, বাকী চুলগুলি থাক; সব চুল কামিয়ে দিলে মানুষকে কদাকার দেখায়, এ রকম হোলে লোকের কাছে আমি মুখ দেখাতে পারবো না। মাঝখানটি ছাড়া বাকী চুলগুলি আপনারা রেখে দিতে বলুন। আমি শুনেছি, মস্তকমুণ্ডন না কোরে চুলের মূল্য ধোরে দিলে ভট্টাচার্যেরা তুষ্ট হন। আমার প্রতি সদয় হয়ে তাই করুন, আমি মূল্য দিব।”

    ছোটবাবু আমার মুখের দিকে চাইলেন, অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে আমি হাস্য কোল্লেম। সম্মুখদিকে ফিরে আমি অভিপ্রায় দিলেম, “এ পাপের সে-রূপ প্রায়শ্চিত্ত নয়, সম্পূর্ণ মুণ্ডন আবশ্যক।” আমার কথাই গ্রাহ্য হলো, ছোটবাবু রামদাসের প্রতি পূর্ণমুণ্ডনের আদেশ দিলেন, উৎসাহযুক্ত হয়ে দশমিনিটের মধ্যে রামদাস সেই আদেশ পালন কোল্লে। পায়রাবাবুর বাবরীচুলগুলি তার পদতলে লুণ্ঠিত হোতে লাগলো। তখনো হস্তদ্বারা পায়রাবাবু আপনার কাণ-দুটি ঢেকে ঢেকে রাখবার চেষ্টা পেলেন, চেষ্টা ফলবতী হলো না। আমি নিকটবর্তী হয়ে, তাঁর হাত দুখানি ধোরে চাঁদমুখখানি ভাল কোরে দেখলেম। পায়রার চক্ষে জল, গাত্রে কম্প, রসনা বাকশূন্য। কারণ কি? —বামকর্ণ অর্ধচ্ছিন্ন, দক্ষিণকর্ণ নাই। এই গ্রামে প্রথম দর্শনাবধি যে সন্দেহ আমার মনে ছিল, সেই সন্দেহই ঠিক। সন্দেহ আর থাকলো না, স্পষ্টই দেখলেম, কাণকাটা কানাই! আর একটি ছোট কথায় বোঁচা কানাই! পাঠকমহাশয় স্মরণ কোত্তে পারবেন, বীরভূমের কানাইবাবু, আপন মাতুলকন্যার সতীত্বরত্ন হরণ কোরে, সেই ভগিনীটিকে কুলের বাহির কোরেছিলেন; কত জায়গায় কত খেলা খেলিয়েছিলেন; এই সেই কানাইবাবু। কত রাজ্য ঘুরে ঘুরে সেই কানাইবাবু এখন ত্রিপুরায় এসে ধরা পোড়লেন। কানাইকে আমি বোল্লেম, “চিনেছি আমি তোমাকে, সত্য তুমি পায়রাবাবু নও, বীরভূমের কানাইবাবু। তোমার নূতন নাম কাণকাটা কানাই! এই তোমার প্রায়শ্চিত্ত হয়ে গেল, এখন তুমি স্বাধীন, এখানে এখন তুমি নিষ্পাপ, এখন তুমি বিদায় হোতে পার। রাতারাতি প্রস্থান কোল্লে কেহই কিছু জানতে পারবে না। আমার কার্য শেষ হয়ে গেল, আমি এখন চোল্লেম।”

    ছোটবাবুর দিকে চাইতে চাইতে ঘর থেকে আমি একবার বেরিয়ে গেলেম, বাহিরে ছদ্মবেশ পরিত্যাগ কোরে, হরিদাস হয়ে গৃহমধ্যে পুনঃ প্রবেশ কোল্লেম। আমিই সেই সন্ন্যাসী, কানাইবাবু সেটি জানতে পাল্লেন না। দুই হস্তে কর্ণ আবৃত কোরে অধোবদনে তিনি বাড়ী থেকে বেরিয়ে গেলেন।

    কানাইকে কানাই সাজিয়ে একটা সংকল্প আমি সিদ্ধ কোল্লেম। তিন দিন পর আমার পাটনা যাত্রার আয়োজন। একাকী আমি যেতে পারবো না কিম্বা হয় তো অন্য দিকে চোলে যাব এইরূপ সন্দেহ কোরে কর্তা আমার সঙ্গে ছোটবাবুকে পাঠাবেন। ছোটবাবুর হস্তেই আমাদিগের রাহাখরচের টাকা দিবেন, এইরূপে স্থির হলো। চতুর্থ দিবসে ছোটবাবুর সঙ্গে আমি পাটনা যাত্রা কোল্লেম।

  • প্রথম কল্প : পাটলীপুত্র

    প্রথম কল্প : পাটলীপুত্র

    ভূবনচন্দ্র মুখোপাধ্যায়

    [book-name]

    প্রথম কল্প : পাটলীপুত্র

    যত অল্প সময়ে পৌঁছান যেতে পারে, বিশেষ চেষ্টা কোরে আমরা পাটনা-সহরে পৌঁছিলাম। পাটনার প্রাচীন নাম পাটলীপুত্র। এক সময়ে পাটলীপুত্রের সবিশেষ সমৃদ্ধি ছিল। বুদ্ধাধিকার সময়ে এখানে বৌদ্ধধর্মের বিশেষ আলোচনা হতো। পাটনায় উপস্থিত হয়ে অনেক লোকের মুখে আমরা শুনলেম, পূর্বের সে শ্রীসমৃদ্ধি এখন কিছু নাই। গঙ্গা আছেন, পাটনা নামে সেই পাটলীপুত্র বিদ্যমান আছে, ব্যবসায়ী মহাজনমণ্ডলীর কলরব আছে, ভূমির উর্বরতাশক্তির অধিক লাঘব হয় নাই, কিন্তু পূর্বে পূর্বে এই নগরী সন্দর্শন কোরে লোকে যেমন প্রীতি প্রাপ্ত হতো, আজকাল সেই প্রীতিকর দৃশ্য বিলুপ্ত। ঠিকানায় পৌঁছিবার অগ্রে অনেকক্ষণ আমরা নগর দর্শন কোল্লেম। বড় বড় মহাজন, প্রসিদ্ধ প্রসিদ্ধ মহাজনী গদী, বিবিধ পণ্যদ্রব্য সেখানে বিস্তর। খাপরেলের ঘর অসংখ্য; দেশপর্যটকেরা সকলেই বলেন, পাটনায় যত খোলার ঘর, এত খোলার ঘর আর কোথাও নাই; দর্শন কোরে আমরাও জানতে পাল্লেম, পর্যটকবর্গের কথাই সত্য, এত খোলার ঘর আর কোথাও নাই।

    যে পল্লীতে মোহনলাল বাবুর কুঠী, অন্বেষণ কোরে সেই পল্লীতে আমরা উপস্থিত হোলেম। পল্লীর মধ্যে অধিক লোকের কুঠী দেখা গেল না। একটি লোককে জিজ্ঞাসা কোরে জানলেম, রাজা মোহনলাল ঘোষ বাহাদুর সম্প্রতি স্থানান্তরে গিয়েছেন, শীঘ্রই ফিরে আসবেন; কুঠীবাড়ীতে লোকজন আছে, সেইখানে গেলেই বিশেষ বৃত্তান্ত জানতে পারা যাবে। কোথায় সেই কুঠীবাড়ী, সেই লোকটিকে আমরা জিজ্ঞাসা কোল্লেম, লোকটি আমাদের সঙ্গে কোরে বাড়ীখানি দেখিয়ে দিলো। বাড়ীখানি অতি সুন্দর; আমরা বাড়ীর মধ্যে প্রবেশ কোল্লেম।

    বাড়ীখানি অতি সুন্দর; জায়গা অনেক, চারিদিক প্রাচীর দিয়ে ঘেরা, মধ্যস্থলে ইমারত; ধারে ধারে ফুলবাগান, মধ্যে মধ্যে অপরাপর ফলকর বৃক্ষ; স্থানটি রমণীয়। দোতালা কুঠী; আমরা দোতালায় গিয়ে উঠলেম; একটি ঘরের সম্মুখে গিয়ে দেখি, ঘরের মধ্যে ঢালা বিছানা, সারি সারি পাঁচ সাতটি তাকিয়া, প্রত্যেক তাকিয়ার পার্শ্বে সুন্দর সুন্দর বৈঠকোবিষ্ট এক একটি হুঁকা। একটি তাকিয়ার কাছে একটি লোক; —দিব্য স্থূলাকার, শ্যামবর্ণ, গলদেশে যজ্ঞোপবীত, কণ্ঠে ছোট ছোট সোণার মাদুলী-গাঁথা তিন-নর তুলসী-মাল্য; মস্তকের মধ্যস্থলে টাক পড়া, পার্শ্বের চুলগুলি অল্প পক্ক, অল্প অপক্ক, বয়স অনুমান পঁয়তাল্লিশ কি ছচল্লিশ বৎসর। লোকটির সম্মুখে বৃহৎ একটা লাল কাপড়ের দপ্তর, দপ্তরের পার্শ্বে বৃহৎ একটা বাকস, বাকসের উপর অনেকগুলি কাগজপত্র ছড়ানো। লোকটি একখানি পত্রিকা চক্ষের নিকটে ধারণ কোরে মনে মনে পাঠ কোচ্ছিলেন; পাঠে তন্মনস্ক। অন্য বিষয়ে অন্য মনস্ক ছিলেন, অন্য দিকে দৃষ্টি ছিল না, আমরা গিয়ে চৌকাঠের কাছে দাঁড়িয়েছিলেম, প্রথমে তিনি দেখতে পান নাই; তার পর পত্রিকার উপর থেকে চক্ষু তুলে, আমাদের দেখে, গম্ভীরবদনে জিজ্ঞাসা কোল্লেন, “কে আপনারা? কোথা থেকে আসছেন? কি চান?”

    আমরা তখন গৃহমধ্যে প্রবেশ কোল্লেম। আমি বোল্লেম, “রাজা বাহাদুরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবার অভিলাষ; তিনি আসতে বোলেছিলেন, তন্নিমিত্তই আমাদের আসा।”

    লোকটি আমাদের বোসতে বোল্লেন; দুটি তাকিয়ার নিকটে পাশাপাশি হয়ে আমরা দুইজনে বোসলেম। যেরূপ গদিয়ানীভাবে সেই লোকটি সেইখানে বোসে ছিলেন, তাতে কোরে আমার বোধ হলো, তিনি হয় তো একজন সরকার অথবা মহুরী অথবা খাতাঞ্জী। যাই তিনি হোন, স্থূলাঙ্গদর্শনে আমি তাঁরে দেওয়ানজী বোলেই অনুমান কোল্লেম? জমিদারী সেরেস্তার নিম্নপদস্থ কর্মচারীকে দেওয়ানজী বোলে সম্মান দিলে খাতির পাওয়া যায়, তাই মনে কোরে আমি তারে দেওয়ানজী বোলে সম্বোধন কোরবো, এইরূপ ভাবছি, এমন সময় আর একটি লোক সেই গৃহে প্রবেশ কোরে সসম্ভ্রমে বোল্লে, “দেওয়ানজী মশায়! একজন ঘোড়সোয়ার এসেছে, একখানা চিঠি এনেছে, যদি বলেন, সেই লোককে আমি এখানে নিয়ে আসি। চিঠিখানি আমি চাইলেম, দিলে না;— বোল্লে, মহারাজের হাতে দিবার আদেশ। আমি বোল্লেম, ‘মহারাজ বাড়ীতে নাই,’ কথাও শুনলে না। চিঠি আমাকে দিলে না।”

    দেওয়ানজী মহাশয় গাত্রোত্থান কোল্লেন; আমাদিগের দিকে চেয়ে আর একবার বোল্লেন, “বসুন আপনারা, আমি আসছি।” যে লোক খবর দিতে এসেছিল, তার দিকে ফিরে তিনি আদেশ দিলেন, “বাবুদের তামাক দে রে!”— বোলেই তিনি ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। চাকরটি সেইখানেই দাঁড়িয়ে থাকলো।

    তামাক আমিও খাই না, ছোটবাবুও খান না; তামাক আনতে নিষেধ কোরে চাকরটিকে আমি জিজ্ঞাসা কোল্লেম, “রাজাবাহাদুর কোথায় গিয়েছেন? কবে আসবেন?” চাকর উত্তর কোল্লে, “কোথা গিয়েছেন, তা আমি জানি না; গত রাত্রে আসবার কথা ছিল, আসেন নাই; আজ রাত্রে আসতে পারেন; যদি না আসেন, কল্য নিশ্চয়।”

    চাকরের সঙ্গে আর আমাদের কোন কথা ছিল না; সে চোলে গেল, আমরা দুইজনে দেওয়ানজীর অপেক্ষায় সেইখানে বোসে থাকলেম।

    দেওয়ানজী ফিরে এলেন। কোথাকার সোয়ার, কিসের পত্র, সে কথা জিজ্ঞাসা করা আমাদের অনধিকারচর্চা; আমরা আগন্তুক, সে কথার সঙ্গে আমাদের কোন সম্বন্ধই ছিল না; সুতরাং আমরা পূর্ববৎ নিস্তব্ধভাবেই বোসে থাকলেম। নিজাসনে আসীন হয়ে দেওয়ানজী তখন আমাদের পরিচয় জিজ্ঞাসা কোল্লেন। আমার পরিচয় আমি। আমি হরিদাস, রাজাবাহাদুরের আহ্বানে আমি এখানে উপস্থিত, এই পর্যন্ত আমার পরিচয়। ছোটবাবুর পরিচয়ে কিছু বেশী কথা। তিনি পরিচয় দিলেন, “নাম মিহিরচাঁদ চৌধুরী, পিতা জয়শঙ্কর চৌধুরী, নিবাস ত্রিপুরা; আমার পিতাঠাকুর মহাশয় সম্প্রতি পাটনায় এসেছিলেন, রাজাবাহাদুরের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়েছিল, এই হরিদাস, আমাদের বাড়ীতে ছিল, আমার পিতার মুখে রাজাবাহাদুর সে কথা শুনেছিলেন, হরিদাসকে এখানে পাঠাবার জন্য পিতাকে অনুরোধ কোরেছিলেন, হরিদাস চিনবে না, একাকী আসতে পারবে না, সেই কারণে হরিদাসের সঙ্গে তিনি আমারে পাঠিয়ে দিয়েছেন।”

    শান্তদর্শনে দেওয়ানজী আমাদের উভয়ের বদন নিরীক্ষণ কোরে, কি যেন পূর্বকথা স্মরণ কোরে প্রশান্তস্বরে বোল্লেন, “ঠিক কথা বটে; এখন আমার মনে পোড়লো। রাজাবাহাদুর আপনার পিতার কাছে হরিদাসের নাম কোরেছিলেন বটে, হরিদাসকে এখানে পাঠাবার কথা বোলেছিলেন বটে, এই বালকটির নাম হরিদাস?”

    মিহিরবাবু উত্তর কোল্লেন, “হরিদাসের পরিচয় হরিদাস নিজ মুখেই প্রদান কোরেছে; আমিও পুনরায় বোলছি, এই বালকের নাম হরিদাস। বালকটি খুব ভাল; হরিদাসের শরীরে অনেক গুণে।”

    দেওয়ানজী বোল্লেন, “সন্তুষ্ট হোলেম, আপনারা থাকুন, রাজাবাহাদুর একটি বিশেষ কার্যের নিমিত্ত আজ তিন দিন হলো, একটি বন্ধুলোকের সঙ্গে সাক্ষাৎ কোত্তে গিয়েছেন, আজ রাত্রে প্রত্যাগমন করবার কথা। এইমাত্র মাজিষ্ট্রেট সাহেবের এক পত্র নিয়ে একজন সওয়ার এসেছিল, ম্যাজিষ্ট্রেট সাহেব আগামী কল্য এইখানে উপস্থিত হয়ে রাজাবাহাদুরের সঙ্গে সাক্ষাৎ কোরবেন, পত্রের মর্ম এইরূপ। পত্রের উত্তরে রাজাবাহাদুরের অনুপস্থিতির কথা আমি লিখে দিয়েছি। আপনারা থাকুন, আজ রাত্রে না হয়, কল্য আমি হরিদাসকে রাজসমীপে পরিচিত কোরে দিব।”

    আমরা থাকলেম। দেওয়ানজীর সুবন্দোবস্তে, সম্ভবমত আদর-যত্নে আমাদের কিছুমাত্র কষ্ট হলো না। রাত্রে রাজাবাহাদুর এলেন না, পরদিন বেলা দশটার সময় প্রত্যাগত হোলেন। দেওয়ানজীকে পুরোবর্তী কোরে রাজার সঙ্গে আমরা সাক্ষাৎ কোল্লেম। মিহিরচাঁদের পরিচয় পেয়ে রাজাবাহাদুর হর্ষ প্রকাশ কোল্লেন। নতুন কোরে আমার পরিচয় দিতে হলো না, আমারে তিনি চিনতেন; অনেক দিনের পর সাক্ষাৎ হোলে পরিচিত লোককে যে ভাবে জিজ্ঞাসা কোত্তে হয়, সেইভাবে তিনি আমারে জিজ্ঞাসা কোল্লেন, “কেমন আছ হরিদাস? দীর্ঘকালের পর তোমাকে আমি দেখলেম। এত দিন তুমি কোথায় ছিলে। তোমার জন্য আমার বড় কষ্ট হয়। তুমি আমার অবাধ্য, সেই জন্যই নিজের দোষে তুমি কষ্ট পাও। এখন অবধি আমার কাছেই তুমি থাকো; আমার বাধ্য থাকলেই তোমার ভাল হবে।”

    নম্রভাবে উচিতমত উত্তর প্রদান কোরে আমি মৌন অবলম্বন কোল্লেম। অনেক দিনের অনেক পূর্বকথা আমার স্মরণ হলো। বাবু মোহনলালের শ্রীবৃদ্ধি হয়েছে, তিনি রাজা হয়েছেন, আমার প্রতি তাঁর মনোভাবেরও পরিবর্তন হয়েছে, এইরূপ আমি ভাবলেম। বারাণসীধামে দুখানি পত্রিকা দর্শন কোরে আমার উপর তিনি যেরূপ রুষ্ট হয়েছিলেন, সে ভাব এখন নাই, ইহাই যেন আমি বুঝলেম।

    যতক্ষণ আমি ঐ সকল কথা আলোচনা কোল্লেম, রাজাবাহাদুর ততক্ষণ নিস্তব্ধ ছিলেন; সহসা মৌনভঙ্গ কোরে আমারে তিনি বোল্লেন, “ত্রিপুরায় জয়শঙ্করবাবুর বাড়ীতে তুমি ছিলে, তিনি মহৎ লোক, তাঁর কাছে তোমার কোন প্রকার অযত্ন ছিল না, সে সব আমি শুনেছি। তিনি এখানে এসেছিলেন; তাঁর মুখেই আমি তোমার সমাচার পেয়েছিলেম; পেয়েছিলেম বটে, কিন্তু কি প্রকারে কার সঙ্গে তুমি ত্রিপুরায় উপস্থিত হয়েছিলে, সেটা আমি জানতে পারি নাই, তিনিও কিছু বলেন নাই। ত্রিপুরায় তুমি কেন গিয়েছিলে? —সেখানে তোমার কি কোন বিশেষ প্রয়োজন ছিল?”

    কেন জানি না, রাজার প্রশ্ন শুনে হঠাৎ আমি চোমকে উঠলেম; ভাব গোপন কোরে উত্তর কোল্লেম, “আজ্ঞা না; বিশেষ অবিশেষ কোন প্রয়োজনই আমার সেখানে ছিল না; কি জন্য গিয়েছিলেম, কিরূপে গিয়েছিলেম, তাও আমি বোলতে পারি না। যে দিন আমি—”

    বোলতে বোলতে একবার আমি থাকলেম; ত্রিপুরার প্রথমদিনের কথা আমার মনে পোড়লো, আমি কাঁপলেম। প্রথমদিন জয়শঙ্করবাবু আমারে নেশাখোর বোলে তিরস্কার কোরেছিলেন; রাজাবাহাদুরের সঙ্গে তাঁর আত্মীয়তা আছে, ‘আমি নেশাখোর’ এ কথাটা যদি তিনি রাজাকে বোলে গিয়ে থাকেন, হয় তো বোলে থাকবেন, এমন যদি হয়, তা হোলে আমার উপর রাজাবাহাদুরের একটা কুসংস্কার জন্মেছে, ইহাই সম্ভব। সত্যকথা কি, জয়শঙ্করবাবু সে সবও হয় তো বোলে থাকবেন, রাজা হয় তো সেই কথা চেপে রেখে আমার মুখে কোন প্রকার নূতন কথা শ্রবণ করবার কৌশল প্রকাশ কোচ্ছেন, এইরূপ আমি ভাবলেম। প্রথমে যা ভেবেছিলেম, জয়শঙ্করবাবুদের তিরস্কার সহ্য করবার পর যে সব কথা আমার মনে হয়েছিল, সেই সব কথা যদি ঠিক হয়, তবে তো মোহনলালবাবুর কাছে আমাকে সর্বদা সাবধান হয়ে থাকতে হবে, পদে পদে কুণ্ঠিত হয়ে চোলতে হবে, সেটা নিশ্চয়। মনের কথা মোহনবাবুকে আমি, বোলবো কি না, একটু চিন্তা কোল্লেম। কৌশলক্রমে কিঞ্চিৎ আভাস দেওয়া ভাল; পরিশেষে সেই সিদ্ধান্তই অবধারিত হলো।

    কথাগুলি লিখতে যতক্ষণ গেল, ভাবতে ততক্ষণ লাগে নাই। যে পর্যন্ত বোলতে বোলতে আমি থেমেছিলেম, সেই সূত্র ধারণ কোরে রাজাকে আমি বোল্লেম, যে দিন আমি জয়শঙ্করবাবুর বাড়ীতে উপস্থিত হই, সে দিন আমি অজ্ঞান ছিলেম। কে আমারে অজ্ঞান কোরেছিল, তা আমি জানি না; অজ্ঞান অবস্থায় কারা আমারে ত্রিপুরায় ফেলে গিয়েছিল, তাও আমি বোলতে পারি না; জয়শঙ্করবাবু যত্ন কোরে আমারে আশ্রয় দিয়েছিলেন, এই পর্যন্ত আমি বোলতে পারি।”

    তাচ্ছল্যব্যঞ্জক হাস্য কোরে রাজাবাহাদুর বোল্লেন, “ওটা তোমার বুদ্ধির ভ্রম। মাঝে মাঝে তোমার এক একটা খেয়াল হয়, এটাও সেই প্রকার একটা খেয়াল। কে তোমাকে অজ্ঞান কোরে একটা জায়গায় ফেলে দিয়ে যাবে? কার এত দায় পোড়েছিল? কেনই বা তোমাকে অন্যলোকে একটা অজানা জায়গায় নিয়ে যাবে? ও সব কথা মনে কোরো না। ভাল লোকের আশ্রয়ে ছিলে, আমার কাছে এসেছ, শান্ত হয়ে থাকো, ও সব খেয়াল ছেড়ে দাও। শিষ্টশান্ত হয়ে কাজকর্ম কর, আমার পরামর্শ মত চল, সংসারে একজন মনুষ্য বোলে গণ্য হোতে পারবে। চিরদিন কি এইরূপে ছেলেমানুষ থাকবে? উদাসীনের মত চিরদিন কি দেশে বিদেশে পথে পথে ঘুরে ঘুরে বেড়াবে? ঐ রকম হয়ে ঘুরে বেড়ানো কি ভাল? স্থির হয়ে আমার কাছে থাকো; কাজকর্ম শিক্ষা কর, মঙ্গল হবে।”

    আর আমি কিছু বোল্লেম না; ভাগ্য বিরূপ থাকলে মনে সর্বদাই কু-গায়; কু-ভাবনা আমার গেল না। রাজাবাহাদুর আমাদের সেইখানে বোসতে বোলে গৃহান্তরে প্রবেশ কোল্লেন, চাকরেরা গৃহপরিষ্কারাদি নানা কার্যে ব্যস্ত হয়ে বেড়াতে লাগলো; দেওয়ানজী মহাশয় মরুব্বী আনা জানিয়ে এটা ওটা সেটা পাঁচ প্রকার হকুমজারী কোত্তে লাগলেন; রাজাও ব্যস্ত। ফল, ফুল, মাখন, মিছরি প্রভৃতি বিবিধ দ্রব্য আমদানী হোতে লাগলো। সেই সব আয়োজন দর্শন কোত্তে কোত্তে ভগবান মরীচিমালী অস্তাচল-শিখরে প্রস্থান কোল্লেন : সন্ধ্যা হলো; ঘরে ঘরে পরিষ্কার পরিষ্কার দীপাধারে পরিষ্কার পরিষ্কার বার্তী জ্বোলে উঠলো : বিচিত্র নাচঘরের ন্যায় একটি প্রশস্ত ঘরে ইংরাজী ধরণের মজলীস সাজানো হলো। বাড়ীতে কি একটা উৎসব আছে, কারা যেন আসবেন, অনেকেই এইরূপ বিবেচনা কোল্লেন।

    রাত্রি যখন আটটা, কি নয়টা, সেই সময় ফটকে একখানা গাড়ী এসে লাগলো। গাড়ীর পশ্চাতে একজন ঘোড়সওয়ার। একজন খানসামা দ্রুতগতি উপরে এসে সংবাদ দিলে, ম্যাজিস্ট্রেট সাহেব। রাজাবাহাদুর উপরে ছিলেন, তাড়াতাড়ি নেমে গেলেন, অভ্যাগত দুটি সাহেবকে সঙ্গে নিয়ে উপরে এসে উঠলেন। শেষে আমরা জানত পাল্লেম, একজন ম্যাজিস্ট্রেট আর একজন ম্যাজিস্ট্রেট সাহেবের নবাগত বন্ধু। যেখানে মজলীস হয়েছিল, আমরা সে ঘরে প্রবেশ কোল্লেম না; ঘরের দুইধারে রঙ্গিন উদ্দীপরা দুইজন আরদালী দাঁড়ালো, দ্বারের কপাট রুদ্ধ হয়ে গেল।

    কি প্রয়োজনে ম্যাজিস্ট্রেটের আগমন, সেটি আমি জানলেম না, জানবার জন্য আগ্রহও প্রকাশ কোল্লেম না। গৃহমধ্যে পান-ভোজন, কথোপকথন ও অন্যান্য কার্য সমাপ্ত হোলে, সাহেবেরা বিদায় হোলেন, ভোজনান্তে আমরাও বিশ্রাম করবার অবকাশ পেলেম।

    পাঁচদিন অতীত। মোহনবাদকে বারংবার রাজাবাহাদুর বোলে উল্লেখ করা আমার বেশ কিছু কষ্টকর বোধ হোতে লাগলো; বলি রাজাবাহাদুর, কিন্তু যেন বাধ বাধ করে। সম্বোধনে রাজাবাহাদুর কেন, অবাধে মহারাজ বলা যায়; কিন্তু অপরের কাছে পরিচয় দিবার সময় একটু থেমে থেমে সাবধান হোতে হয়। মোহনরাজা অথবা মোহনলাল রাজা, এরূপ উচ্চারণ শ্রবণে নীরস। যত দিনের জানানো, তত দিন আমি মোহনবাবু অথবা মোহনলালবাবু বোলে এসেছি। এখন তিনি নূতন রাজা হয়েছেন, রাজাবাহাদুর বোলতে হবে, না বলাটা ধৃষ্টতা, বলা চাই, ক্রমে ক্রমে অভ্যাস করা আবশ্যক। এই পাঁচদিন রাজাবাহাদুর আমারে বেশ আদর-যত্ন কোল্লেন, স্নেহ-মমতা জানালেন মিষ্টকথা বোল্লেন; তুষ্ট হয়েও আমি তুষ্ট হোতে পাল্লেম না। অতুষ্টির কি কারণ, পাঠক মহাশয় সেটি অনুভবে হৃদয়ঙ্গম কোরবেন। রাজার কাছে আমি আদর-যত্ন পেলেম আমার অপেক্ষা মিহিরবাবু কিছু বেশী পেলেন; পাওয়াই উচিত। একে তিনি নূতন তাতে আবার ব্রাহ্মণ, তার উপর আবার মিত্রকুমার। আমার অপেক্ষা মিত্রকুমারের অধিক সমাদর অবশ্যই সামাজিক রীতির গৌরববর্ধক; সমাজের প্রথাই এইরূপ; সমাদরে বাস্তবিক আমি সন্তোষলাভ কোল্লেম।

    পাঁচদিন পরে মিহিরচাঁদবাবু বিদায় হোলেন; তাঁরে প্রণাম কোরে রাজা-বাহাদুর বোলে দিলেন, “তোমার পিতাঠাকুরকে আমার প্রণাম দিও; হরিদাস এসেছে, ভাল আছে, থাকতে থাকতে ভাল হবে, এ কথাও তাঁরে বোলো।” মিহিরবাবু আশীর্বাদ কোল্লেন। আমাদের আসবার রাহাখরচ আর মিহিরবাবুর প্রতিগমনের রাহাখরচ রাজাবাহাদুর দিলেন। আমার সঙ্গে প্রিয়সম্ভাষণ কোরে মিহিরবাবু স্বদেশে প্রস্থান কোল্লেন। এইখানে আর একটি কথা বোলে রাখা আবশ্যক। প্রায়শ্চিত্তের ছলে পায়রাবাবুকে নেড়া করা, ‘কানকাটা কানাই’ প্রকাশ করা, কি প্রকার রহস্য, পাটনায় উপস্থিত হয়ে মিহিরবাবু নিৰ্জনে একদিন আমারে সেই কথা জিজ্ঞাসা কোরেছিলেন। কানাইয়ের স্থূল স্থূল পরিচয় তাঁর কাছে আমি ব্যক্ত কোরেছিলেম। শুনে তিনি ঘৃণার সঙ্গে বিস্ময় প্রকাশ কোরে বোলেছিলেন, “তবে আর রুদ্রাক্ষ-খোপে বাসা কোরে থাকতে পারবে না, লোকের কাছে বোঁচা-মুখ দেখাতে লজ্জা হবে, পায়রা অচিরেই রুদ্রাক্ষের বাসা ছেড়ে উড়ে পালাবে!” হাস্য কোরে আমি বোলেছিলেম, “সেটাও একপ্রকার দ্বিতীয় প্রায়শ্চিত্ত। তাদৃশ নরাধমের পনঃ পূনঃ প্রায়শ্চিত্ত হওয়াই কৃষ্ণের ইচ্ছা।”

    মিহিরবাবু চোলে গেলেন, আমি থাকলেম। আদর পাই, যত্ন পাই, রাজার মুখের মিষ্ট মিষ্ট বাক্য পাই, রাজাদেশে সামান্য সামান্য কাজ-কর্ম ও নির্বাহ করি, এই রকমে একমাস। নিত্য নিত্য মনে করি, রাজাকে আমি মনের কথা জানাব; চিরজীবনের ঘোর অন্ধকার সংশয়টা ভঞ্জন করবার প্রয়াস পাব, অবকাশ পাই না। তিনি বড়লোক, আমি গরীব, শীঘ্র কোন কথা জিজ্ঞাসা কোত্তেও সাহস হয় না। রাজাকে নিৰ্জনে না পেলে সে সব কথা জিজ্ঞাসা করা ভাল নয়, নিৰ্জনে পাবারও অবসর ঘটে না। আরও একপক্ষ অপেক্ষা কোল্লেম।

    বসন্তকাল উপস্থিত। বসন্তে আকাশমণ্ডল নিৰ্মল, প্রকৃতি প্রসন্নমুখী, তরুলতা প্রফুল্ল, বিহঙ্গকুল প্রফুল্ল, সুখলালিত মানবকুলও প্রফুল্ল। আমার মত অভাগা চিরদুঃখী ব্যতীত সকলেই প্রফুল্ল।

    একদিন অপরাহ্ণে রাজাবাহাদুর মোহিনীমোহন বসন-ভূষণে সজ্জিত হয়ে উপর থেকে নেমে আসছেন, আমি সেই সময় একটা কাজের জন্য তাড়াতাড়ি নীচে থেকে উপরে উঠছিলেম, সিঁড়ির পথে দেখা হলো। থোমকে দাঁড়িয়ে সস্নেহ-সম্ভাষণে রাজা আমারে বোল্লেন, “এসো হরিদাস! আমি তোমার তত্ত্ব কোচ্ছিলেম, কোথায় ছিলে তুমি? এসো!”

    বোলেই তিনি অগ্রে অগ্রে সোপানাবলী অতিক্রম কোত্তে লাগলেন, কথার ভাবনা বুঝতে না পেরে পূর্বস্থানেই আমি দাঁড়িয়ে থাকলেম। পশ্চাতে মুখ ফিরিয়ে রাজা পুনরায় আমারে আহ্বান কোরে বোল্লেন, “ভাবছ কি? এসো!”

    তখন আমি তাঁর মনের কথা বুঝতে পাল্লেম; যে কার্যে যাচ্ছিলেম, সে কার্যে আর যাওয়া হলো না, সন্দিগ্ধচিত্তে রাজার সঙ্গে সঙ্গে নেমে ফটক পর্যন্ত এলেম। ফটকে গাড়ী ছিল, রাজাবাহাদুর আরোহণ কোল্লেন, আমারেও আরোহণ কোত্তে বোল্লেন; নতবদনে আমি রাজাজ্ঞা পালন কোল্লেম।

    গঙ্গাতীরের রাস্তার অদূরে একটি মনোহর উদ্যান; সেই উদ্যানে শকট পৌঁছিল; আমরা অবরোহণ কোল্লেম। গাড়ীতে যতক্ষণ ছিলেম, ততক্ষণের মধ্যে আমি একটিও কথা কহি নাই, একখানা ইংরাজী খবরের কাগজে চক্ষু রেখে রাজাবাহাদুর অন্যমনস্ক ছিলেন, তিনিও আমারে কোন কথা জিজ্ঞাসা করেন নাই। গাড়ী থেকে নেমে রাজা যখন উদ্যানের পুষ্পবাটিকায় পরিক্রমণ করেন, আমি তখন তাঁর পশ্চাতে ছিলেম। রৌদ্রের উত্তাপ ছিল না, সুখস্পর্শ সমীরণ আমাদের অঙ্গস্পর্শ কোচ্ছিল, নানা কুসমের সৌরভে চিত্ত প্রমোদিত হোচ্ছিল, উদ্যানের শোভা দর্শনে আমি পরিতৃপ্ত হোচ্ছিলেম, উদ্যানপালেরা দূরে দূরে স্ব স্ব কার্যে নিযুক্ত ছিল, নিকটে কেহই ছিল না; নির্জন-আলাপের উত্তম অবসর।

    উদ্যানের স্থানে স্থানে উপবেশনযোগ্য সুন্দর সুন্দর বেদী; বেদীর ধারে ধারে শ্বেতপ্রস্তর নির্মিত-চীনের মৃত্তিকানির্মিত নানা প্রকার সুন্দর সুন্দর পুতুল; দিব্য সুদৃশ্য! কুসমকাননের মধ্যস্থলে একটি শ্বেতবর্ণ ধারাযন্ত্র; সেই ফোয়ারার একদিকে ময়ূরের মুখ, একদিকে সিংহমুখ, একদিকে হংসমুখ, একদিকে এক অসুরের মুখ, উপরিভাগে বিচিত্র পক্ষযুক্ত একটি সুন্দরী পরী; যন্ত্রগাত্রের চারিমুখ দিয়ে নির্ঝরের ন্যায় ঝর ঝর শব্দে স্নিগ্ধ সলিল বর্ষিত হোচ্ছিল। সেই সকল শোভা দর্শন কোত্তে কোত্তে রাজাবাহাদূর নিকটস্থ একটি বেদীর উপর উপবেশন কোল্লেন, প্রসন্ন-নয়নে আমার দিকে চেয়ে আমারেও বোসতে বোল্লেন। যে বেদীতে রাজা, সে বেদীতে না বোসে নিকটবর্তী আর একটি বেদীতে আমি উপবেশন কোল্লেম।

    প্রতিদিন মনোমোহিনী শোভা দর্শনে আমার চিত্ত পুলকিত হোচ্ছিল, কিন্তু আমার অন্তরসাগরে অহরহ অনুক্ষণ যেরূপ চিন্তা-তরঙ্গের খেলা, সে খেলার বিরাম ছিল না। রাজাকে একটি কথা জিজ্ঞাসা করা আমার ইচ্ছা; স্থান নির্জন, সময় রমণীয়; রাজাবাহাদুরের মেজাজ তখন বেশ ঠাণ্ডা, মনোগত কথা জিজ্ঞাসা করবার উপযুক্ত অবসর বটে; কিন্তু সহসা কি কথা বোলে মনের কথা উত্থাপন করি, তাই আমি ভাবতে লাগলেম। অবসর হয়েও অবসর হয় না; রাজার দৃষ্টি তখন অন্যদিকে ছিল, অপাঙ্গে তাঁর মুখের ভাব নিরীক্ষণ কোরে আমি বুঝলেম, আমার ন্যায় তিনিও যেন কোন প্রকার চিন্তায় অন্যমনস্ক। সেই ভাবে রাজার মুখের দিকে আমি চেয়ে আছি, হঠাৎ আমার দিকে ফিরে, কি যেন ভেবে তিনি আমারে জিজ্ঞাসা কোল্লেন, “কি ভাবছো হরিদাস?”

    কি আমি ভাবছি, আমিই তা জানতেম। শৈশবে জ্ঞানের সঞ্চার হওয়া অবধি সর্বদা যে কথা আমি ভাবি, সেই ভাবনা আমার সহচরী। ভাবনাকে অন্তরে রেখে আমি উত্তর কোল্লেম, “উদ্যানটী অতি সুন্দর। এ উদ্যানে যা কিছ দর্শন কোচ্ছি, সমস্তই যেন আমার চক্ষে নতুন বোধ হোচ্ছে; পুতুলগুলি যেন সজীব বিবেচনা কোচ্ছি; পুতুলেরা যেন বাতাসের সঙ্গে কথা কোচ্ছে, এই ভাব আমার মনে আসছে; বাতাসে দলে দলে ফুলগুলি যেন আহ্লাদে আহ্লাদে ঢোলে ঢোলে পোড়ছে, পবনদেবের সঙ্গে যেন খেলা কোচ্ছে তাই আমি দেখছি।”

    ঈষৎ হাস্য কোরে রাজাবাহাদুর বোল্লেন, “তা তো দেখছো, কিন্তু ভাবছো কি? দেখতে পাই, সর্বদাই কি তুমি ভাবো। পূর্বেও দেখেছি, এখনো দেখছি, একই ভাব। এখন আর তুমি নিতান্ত ছেলেমানুষটি নও, ক্রমেই বয়স বাড়ছে, উদাসীনের মত সর্বক্ষণ ভেবে ভেবে তোমার বুদ্ধিশক্তি দুর্বল হয়ে আসছে; ও সব ভাবনা ছেড়ে দাও। তোমাকে সংসারী হোতে হবে, সংসারী হবে, সংসারের মানুষগুলিকে চিনতে হবে, সংসারের প্রকৃতি বুঝতে হবে, সেগুলি কি তুমি একবারও ভাবো না? অন্য ভাবনা ছেড়ে দাও। যাতে কোরে মানুষের মত হোতে পার, সেই চেষ্টা কর; আমার কাছে যথেষ্ট সহায়তা পাবে।”

    সুরে সুরে সুর মিলে গেল; ঠিক সুরে আমার হৃদয়-বীণা বেজে উঠলো। সূত্র অন্বেষণ কোচ্ছিলেম, উত্তম সূত্র পেলেম; উত্তম সুবিধা; ভাগ্যে যা থাকে, তাই হবে, এই সূত্রে মনের কথা আমি প্রকাশ করি। রাজা যদি সদয় হন, আশা পূর্ণ হবে; কথা শুনে রাজা যদি রুষ্ট হন, আশা ভেসে যাবে; যত দিন বাঁচবো, এই রকমে অকূলপাথারে ভেসে ভেসে বেড়াবো। আজ আমার ভাগ্যপরীক্ষার শেষদিন, মনের কথা প্রকাশ করা কর্তব্য। ভেবে ভেবে দৃঢ়সঙ্কল্প হয়ে ধীরে ধীরে আমি বোল্লেম, “যা আপনি আজ্ঞা কোচ্ছেন, তা ঠিক। সংসারে যখন এসেছি, তখন সংসারের পদ্ধতিতে সংসারী হওয়াই উচিত; কিন্তু পন্থা অবলম্বনের মূলতত্ত্ব আমি অপরিজ্ঞাত। এ সংসারে কে আমি, কে আমার জন্মদাতা, কে আমার জননী, এত বড় বিশ্বসংসারে আমার আপনার লোক কেহ আছেন কি না জন্মাবধিই সেটী আমি জানলেম না। আমি আছি কেবল এইটুকু মাত্র জানি, আর কিছুই আমি জানি না। আপনি বোলছেন, ‘উদাসীনের মত সর্বক্ষণ ভেবে ভেবে বুদ্ধিশক্তি দুর্বল হয়ে আসছে’; যথার্থই তাই, যথার্থই আমি উদাসীন; সংসারে আমি এসেছি, সংসারে আমি আছি সংসারেই ভ্রমণ কোচ্ছি, কিন্তু সংসারটী কি, তা আমি জানি না। এমন অবস্থায় জীবন আমার বিড়ম্বনা জ্ঞান হয়। কেন বেঁচে আছি, তাও আমি বুঝতে পাচ্ছি না। আপনি যদি সদয় হয়ে আমার পরিচয়টি আমারে বোলে দেন, তা হোলে—”

    অকস্মাৎ রাজার মুখের সেই প্রফুল্লভাব তিরোহিত। আমার ঐ অর্ধোক্তি শ্রবণে যেন কতই বিস্ময়ভাব প্রকাশ কোরে রুক্ষস্বরে তিনি বোল্লেন, “পরিচয়? —তোমার? তোমার পরিচয় আমি কি জানি? পাগলের মত তুমি কি কথা কও? কোথাকার কে তুমি কিছুই আমি জানতেম না; আমার শ্বশুরের বাড়ীতে তোমাকে আমি প্রথম দেখি, দেখে তোমার প্রতি আমার দয়া হয়েছিল, নিজ বাড়ীতে নিয়ে গিয়ে যত্ন কোরে রাখবো, লেখাপড়া শিখাবো, কাজকর্ম শিক্ষা দিব, ঐরূপ আমার ইচ্ছা হয়েছিল; সে কথা তোমাকে আমি বোলেছিলেম। তুমি শুনলে না, আমার সৎপরমর্শ গ্রাহ্য কোল্লে না, আপন বুদ্ধিতে পথে পথে ঘুরে বেড়াতে লাগলে, তথাপি চৈতন্য হলো না। তার পরেও দুবার তোমার সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল, তখনো আমি তোমার ভাল চেষ্টা করেছিলেম, তাও তোমার ভাল লাগলো না। লোকের কাছে অকারণে তুমি আমার নিন্দা কোল্লে তাও আমি ভুলে গিয়েছিলেম, ছেলেমানুষ বোলে ক্ষমা কোরেছিলেম; তদবধি তুমি আর আমার সঙ্গে দেখা কোল্লে না। নিরাশ্রয় দেখে তোমাকে আশ্রয় দিবার নিমিত্ত কত চেষ্টা আমি কোরেছি, সমস্তই বিফল হয়েছে। দয়াবশে কত সন্ধানের পর সন্ধান পেয়ে এখানে তোমাকে আমি আনিয়েছি, ভবিষ্যতে আর কোন কষ্ট না পাও, তার উপায় আমি কোরবো, স্বীকার কোরেছি, তাতেও তুমি সন্তুষ্ট থাকছো না। কোথাকার কথা কোথায়! আমার কাছে তুমি তোমার পরিচয় চাও! তোমার পরিচয় আমি কিরূপে জানবো?”

    কঠোর কর্কশকণ্ঠে রাজাবাহাদুর এই সব কথা বোল্লেন, আমি কিন্তু ভয় পেলেম না; মনের উপদেশে আরো বরং অধিক সাহসে তৎক্ষণাৎ আমি বোল্লেম, “সব আপনি জানেন, কেন প্রতারণা করেন? গরীব দেখে কেন আমার কথাগুলি উড়িয়ে উড়িয়ে দেন? সমস্তই আপনি জানেন; দয়া করুন। দয়া কোরে বলুন, কে আমি, কোথা আমার জন্ম, কোথায় আমার জনক-জননী, কোথায় কোথায় কে আমার আপনার লোক বর্তমান আছেন, অনুগ্রহ কোরে সেই কথাগুলি আমারে বলুন! সমস্তই আপনি জানেন।”

    পূর্ববৎ রুক্ষস্বরে রাজাবাহাদুর বোলে উঠলেন, “কি আমি জানি? তুমি একজন বিদেশী বালক, তোমার পরিচয় আমি কেমন কোরে জানবো? কোথায় তোমার জন্ম, কে তোমার বাপ, কে তোমার মা, সে সব কথা আমি কি জানি? আমাকে তুমি ও রকমে বিরক্ত কোরো না। যদি ভাল চাও, ঠাণ্ডা হয়ে কিছুদিন আমার কাছে থাকো, পাগলামী দেখিও না। আমি অঙ্গীকার কোচ্ছি, সেই রকমে থাকলে আমি তোমার ভাল চেষ্টা করব; ও রকম পাগলামী দেখালে এখানে তুমি জায়গা পাবে না। বার বার আমি বোলছি, তোমার পরিচয়ের কোন কথাই আমি জানি না।”

    রাজা মোহনলাল আমারে ভয় দেখালেন, “পাগলামী দেখালে এখানে জায়গা পাবে না” বোল্লেন। যেটা আমার সত্যকথা, রাজা বোল্লেন, সেইটি আমার পাগলামী। আমি ভয় পেলেম না;  কোন প্রকার ভয়ের লক্ষণ না দেখিয়ে তৎক্ষণাৎ আমি বোল্লেম, “কেন আপনি গোপন করেন? গরীব বোলে কেন আপনি আমারে অন্ধকারে রাখতে চান? কিছুই যদি আপনি জানেন না, তবে রুদ্রাক্ষগ্রামের জয়শঙ্করবাবুকে সে কথা আপনি কিরূপে বোলেছিলেন?”

    কিঞ্চিৎ চমকিতভাবে রাজাবাহাদুর বোল্লেন, “কি আমি বোলেছিলেম? জয়শঙ্করের মুখে কি কথা তুমি শুনেছ? তোমার পরিচয় জয়শঙ্কর যেমন জানেন, আমিও সেইরূপে জানি। জয়শঙ্করের কাছে কি কথা আমি বোলেছিলেম? কিছুই ত আমার মনে হয় না। তুমি যদি—”

    সত্য সত্যই আমি যেন তখন পাগলের মত হোলেম। যদিও অশিষ্টতা, যদিও অনুচিত, তথাপি আমি রাজার কথায় বাধা দিয়ে উত্তেজিতস্বরে বোল্লেম, “কিছুই আপনার মনে হয় না? আচ্ছা, আমিই মনে কোরে দিচ্ছি। জয়শঙ্করবাবুর মুখে আমি শুনেছি, তাঁরে আপনি বোলেছিলেন, আমি আপনার জাতি; আপনিও যে জাতি, আমিও সেই জাতি। জাতির কথা যদি আপনি জানেন, তবে আমার জন্মের কথাও অবশ্য আপনার জানা আছে, এই আমার বিশ্বাস। সেই বিশ্বাসেই এখানেই আমি এসেছি। কেন আপনি অস্বীকার করেন? কেন আর আমারে অন্ধকারে রাখেন? জাতি-জন্ম সম্বন্ধে চিরদিন আমি অন্ধকারে থাকি, সেইটিই কি অপনার ইচ্ছা? আপনার তুল্য মহৎলোকের সে রকম ইচ্ছা থাকা শোভা পায় না। দয়া করুন! যদি আমি আপনার কাছে কোন অপরাধ কোরে থাকি, ক্ষমা করুন! দয়া কোরে সত্যকথা বলুন! বিস্তর কষ্ট আমি পেয়েছি, আর কষ্ট সহ্য হয় না! আমার কষ্টের অনেক কথা আপনি জ্ঞাত আছেন। যারা আমার উপর দৌরাত্মা করে, তাদের মধ্যে কোন কোন লোককে আপনি জানেন। আপনার উপদেশে একজন—”

    রাজা যেন কেমন এক রকম অস্থির হোলেন; অস্থির হয়েই বেদীর উপর থেকে নেমে দাঁড়ালেন; দুই চক্ষু রক্তবর্ণ কোরে সরোষে আমারে বোল্লেন, “আমি কি তবে মিথ্যাকথা বোলছি? যারা যারা তোমার উপর দৌরাত্মা করে, তাদের কি আমি জানি? আমার উপদেশে তোমার উপর দৌরাত্ম্য হয়? আমি কি তোমারে অন্ধকারে রাখছি? কি সব কথা তুমি বল? এ সব কথা শুনলে লোকে আমাকে কি বোলবে? তোমাকেই বা কি ঠাওরাবে? ও সব কথা তুলো না, ও সব কথা বোলো না; যা যা আমি বলি, আমার বাধ্য হয়ে তাই তুমি কর, বাচালতা দেখিও না; আমি যেন বুঝতে পাচ্ছি, দেশে দেশে ঘুরে ঘুরে তোমার মাথা খারাপ হয়ে গিয়েছে। হোতেই পারে; হোতেই পারে; অনেক লোকের এই রকম হয়। আমি বরং তোমার চিকিৎসা করাবো; এখানে ভাল ভাল কবিরাজ আছে, ডাক্তার আছে, ভাল ভাল ঔষধ আছে, চিকিৎসকের ব্যবস্থামত চোল্লে শীঘ্রই তুমি আরাম হোতে পারবে।”

    এই সব কথা বোলতে বোলতে একবার আকাশপানে চেয়ে রাজাবাহাদুর বোল্লেন, “আর বেলা নাই, চল আমরা কুঠীতে ফিরে যাই। যে সব কথা আজ তুমি আমাকে বোল্লে, নিকটে লোকজন থাকলে, ও রকম কথা বোলো না; লোকে কেবল প্রলাপ মনে কোরবে, তোমাকে উপহাস কোরবে, পাগল মনে কোরে হাততালি দিবে, গায়ে ধূলা দিবে; সাবধান! চল এখন!”

    আমার মনের ভিতর তখন কিরূপ ভাবের উদয় হলো, বিশ্ববিধাতা ভিন্ন আর কেহ সে ভাব জানতে পারেন না। রাজা চোল্লেন, নিস্তব্ধ হয়ে আমিও তাঁর সঙ্গে সঙ্গে চোল্লেম। অতঃপর শকটারোহণে কুঠীতে গিয়ে উপস্থিত হোলেম। সে রাত্রে সকল রাত্রি অপেক্ষা আমি অধিক অসুখী। বাবু মোহনলাল রাজা উপাধি পেয়েছেন, সম্প্রতি তাঁর ঐশ্বর্য বৃদ্ধি হয়েছে। আমি ভেবেছিলেম, পদমর্যাদা ও ধনমর্যাদার সঙ্গে তাঁর পূর্বপ্রকৃতির পরিবর্তন হয়ে থাকবে; কিন্তু পুষ্পকাননে আজ তিনি যেরূপ অভিনয় কোল্লেন, তাতে বুঝলেম, কপটতা আরো যেন বেশী পরিমাণে বর্ধিত হয়েছে। নিশ্চয় আমি বুঝতে পাচ্ছি, আমার পরিচয় তিনি জানেন; পূর্বে যতটকু বুঝেছিলেম, এখন তদপেক্ষা অনেকটা পরিষ্কার বুঝেছি; কিন্তু সেই পরিচয়টি তিনি আমার কাছে প্রকাশ কোরবেন না, অপ্রকাশ রাখতে তিনি যেন দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, লক্ষণে এইরূপ বুঝা গেল কিন্তু কেন? আমার পরিচয় আমার কাছে প্রকাশ কোল্লে তাঁর কি কোন প্রকার ক্ষতির সম্ভাবনা আছে? আমি আমার পরিচয় জানতে পাল্লে তাঁর কি কোন প্রকার ইষ্টসিদ্ধির আঘাত হবে? গরীবের পরিচয় বোলে দিলে তাঁর অভিনব রাজা উপাধিতে কি কোন প্রকার আঘাত পাবে? বহু-চিন্তা কোরেও কিছুই আমি অবধারণ কোত্তে পাল্লেম না, হতাশে কেবল এইটুকুমাত্র অবধারণ কোল্লেম যে, চিরদিন আমারে জাতি-জন্মের পরিচয়ে অন্ধকারেই থাকতে হবে। কেন না, ঐ মোহনলালবাবু ভিন্ন আর কেহ এই হতভাগ্য হরিদাসের সত্য পরিচয় জ্ঞাত আছে, এমন বোধ হয় না, বোধ হয়, রক্তদন্ত কিছু কিছু, জানতে পারে; কিন্তু তার মুখে সত্যকথা বাহির করা দূরাশামাত্র। এত বড় একজন সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি এই বাবু, মোহনলাল,— অভিনব রাজা মোহনলাল, ইনি যখন এতদূর কৃপণতা কোচ্ছেন, তখন সেই একটা ধড়ীবাজ ডাকাত,— নরহন্তা অনুমান কোল্লেও মিথ্যা অনুমান হয় না, — সেই পাষণ্ড দস্যু আমার সম্বন্ধে সত্যকথা বোলবে কোনক্রমেই সেটা সম্ভব মনে করা যায় না; তবে আর কার কাছে আমার অভীষ্টসিদ্ধির আশা?— আশা নাই! সূতিকাগারে আমি যেমন ছিলেম, কোথায় এলেম, কোথায় ছিলেম, কে আমি কিছুই জানতেম না, মৃত্যুকাল পর্যন্ত সেইরূপেই আমারে ঘোর অন্ধকারে থাকতে হবে, বিধাতার হয় তো ইচ্ছাই তাই। এখন আমি কি করি? পরিচয়প্রাপ্ত হবার আশা তো দূরে গেল! বিনা পরিচয়ে যাঁদের কাছে আমি এক রকমে পরিচিত হয়েছিলেম, যাঁদের কাছে আমি ভালবাসা পেয়েছিলেম, যাঁরা আমারে আদর-যত্নে আশ্রয় দিয়েছিলেন, তাঁরাই বা কে কোথায় থাকলেন? অমরকুমারী কোথায় রইলেন? অমরকুমারীর কাছে জীবনঋণে ঋণী আমি, সে ঋণ পরিশোধ কোত্তে পাল্লেম না। দুই জেলার দুই জায়গায় দুই মোকদ্দমা; সে দুই মোকদ্দমার কিরূপ নিষ্পত্তি হলো, জানতে পাল্লেম না। ত্রিপুরায় যখন ছিলেম, বন্ধুবান্ধবগণকে চিঠি লিখে তত্ত্ব জানবার আশা কোরেছিলেম, জয়শঙ্কর চৌধুরী বাধা দিয়াছিলেন, আশা ফলবতী হয় নাই। এখন আমি পাটনায়, এখন আমি সে বিষয়ে স্বাধীন; চিঠি আমি লিখবো, সে কথা রাজাকে জানাব না। কি জানি, যে রকম প্রকৃতি, তাতে কোরে রাজা যদি জয়শঙ্করের মত আমার অভিলাষের পথে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ান; তা হোলে মনোরথসিদ্ধি হবে না। রাজাকে জানাব না, সেই পরামর্শই ভাল। আপন সংকল্প আপনিই জানবো আর কাহাকেও জানতে দিব না;  দিনমানেও লিখবো না; কল্য রাত্রিতে বাড়ীতে নিশুতি হবে, বাড়ীর সকলে যখন ঘুমাবে, সেই সময় আমি পত্রগুলি লিখে রাখবো।

    এই আমার সংকল্প; দৃঢ়সংকল্প। দিবসের শেষভাগে সুখীলোকে সুখময় স্থানে ভ্রমণ করে; শরীর সুস্থ হয়, মন সুস্থ হয়, নিশাকালে সুখে নিদ্রা যায়। অসুখী লোকে তাদৃশ রমণীয় স্থান পরিভ্রমণ কোরে সুস্থ হোতে পারে না, নিদ্রাও তারে আলিঙ্গন করে না। আমি অসুখী, রাজার সঙ্গে পুষ্পকুঞ্জ পরিভ্রমণ কোরে এলেম, উপকার পেলেম? —দুশ্চিন্তা বেড়ে গেল, প্রাণের ভিতর আঘাত লাগলো, নিদ্রাদেবী আমারে একবারও দয়া কোল্লেন না; সমস্ত রজনী আমি অসুখী হয়েই জাগরণ কোল্লেম। একটি সুখ, ঐ কল্পনা; — বন্ধবান্ধনগণকে চিঠি লিখবো।

    রজনী প্রভাত। সূর্যোদয়ের পূর্বে গাত্রোত্থান কোরে আমি একবার নীচে নেমে এলেম, সম্মুখের রাস্তাটি উদাসনয়নে দর্শন কোল্লেম; সে ভাব আমার মনে কেন উদয় হয়েছিল, আমি নিজেই তা জানতেম না। অপরাপর স্থানে, অপরাপর সময়ে, যে যে বাড়ীতে আমি আশ্রয় পেয়েছিলেম, সেই সকল বাড়ীতে একটি না একটি অনুগত লোকের সঙ্গে আমার আত্মীয়তা ঘোটেছিল। বাবু হোক, সরকার হোক, সামান্য একজন চাকর হোক, যেই হোক, একটি না একটি লোকের সঙ্গে আমার সম্ভাব সঞ্চারিত হতো; কথা কহিবার দোসর পেতেম; এখানে সেটি ঘটে নাই। প্রথমে দেখেছিলেম, দেওয়ান।

    আমার সঙ্গে কথা কোয়েছিলেন, এখনো কথা হয়, কিন্তু সে সকল কথা যেন ফাঁকা ফাঁকা লাগে। অপরাপর লোকের সঙ্গেও কথা হয়, সে সকল কথাতেও কোন রস থাকে না। রাজার সঙ্গেও কথা চলে, কিন্তু সেই সকল কথায় আমার হৃদয়ের ভার যেন আরো বেশী বেশী গুরুভার মনে হয়। মনের কথা বোলতে পারি, পাটনার রাজবাড়ীতে তেমন সুখের সুখী, দুঃখের দুঃখী একটি লোকও পাই না, বাড়ী থেকে বেরিয়ে সহর দেখতে যাই না, সর্বদাই আমারে বাড়ীর মধ্যে বাস কোত্তে হয়। রাজাবাহাদুর আমারে গত কল্য উদ্যানে নিয়ে গিয়েছিলেন, সুখী হব ভেবেছিলেম, বিপরীত হয়ে গেল।

    আজ আমি রাস্তা দেখছি কেন? পালিয়ে যাবার জন্য কি?—তা নয়; চিঠি লিখতে হবে। কাগজ, কলম, কালি, ডাকের টিকিট আবশ্যক আছে। রাজবাড়ীতে সমস্যা আছে, সমস্তই হয় তো পেতে পারি, কিন্তু আমি চাইবো না; মনের কথা কাহাকেও জানতে দিব না; রাজকিঙ্করগণের মধ্যে কাহাকেও সেই উপকরণগুলি সংগ্রহ কোরে দিবার অনুরোধ কোরবো না, বাজার থেকে নিজেই সেইগুলি খরিদ কোরে আনা আমার অভিলাষ; সেই নিমিত্তই রাস্তা-দর্শন। কোন দিক দিয়ে কোথায় যেতে হবে সেইটি আমি ঠিক কোরে রাখলেম। অপর হেন কাহাকেও কিছু না বোলে রাজবাড়ী থেকে আমি বেরুলেম। এ বাড়ীকে বারম্বার আমি রাজবাড়ী বোলছি কেন? ভদ্রাসন না হোলেও মোহনবাবু এখন রাজা; অতএব বাড়ীর নাম এখন রাজবাড়ী।

    প্রয়োজন সিদ্ধ কোরে সন্ধ্যার মধ্যেই আমি ফিরে এলেম। দিনমানেও রাজার সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হয়েছিল, সন্ধ্যার পরেও সাক্ষাৎ হলো, পূর্বদিনের কোন কথাই তিনি উত্থাপন কোল্লেন না, তাঁর মুখের ভাবেও কোন প্রকার বিরক্তিলক্ষণ লক্ষিত হলো না, আমি সে প্রসঙ্গে তাঁরে কোন কথা বোল্লেম না। নিত্য যেমন হয়ে থাকে, সেই রকম পাঁচ প্রকার মজলিসী কথায় সম্ভবমত পরিতৃপ্ত হওয়া গেল। রাত্রি দশটা। আহারাদির পর সকলে স্ব স্ব স্থানে শয়ন কোল্লেন, আমার শয়নের জন্য যে ঘরটি নির্দিষ্ট হয়েছিল, সেই ঘরে আমি বোসলেম।

    এক ঘণ্টাকাল অনেক রকম আমি ভাবলেম, তার পর চিঠি লেখা আরম্ভ কোল্লেম। ঘরের দরজা বন্ধ করা হয়েছিল; কি আমি কোচ্ছি, হঠাৎ কেহ এসে দেখতে পাবে, সে ভয় ছিল না, নির্ভয়ে আমি চিঠি লিখতে লাগলেম। সাতখানি চিঠি; কাশীতে রমণবাবুর নামে একখানি, বরদায় রাজকুমার রণেন্দ্ররাও বাহাদুরের নামে একখানি; মুর্শিদাবাদে দীনবন্ধু বাবু, পশুপতিবাবু, শান্তিরাম দত্ত, মণিভূষণ দত্ত, এই চারি নামে চারিখানি আর মাণিকগঞ্জে হরিহরবাবুর নামে একখানি, এই সাতখানি। মোড়ক কোরে শিরোনাম লিখে, সেই পত্রগুলি আমি শয্যাতলে রেখে দিলেম; পরদিন প্রভাতে প্রভাতী-বায়ু সেবন-ব্যাপদেশে সেগুলি আমি স্বয়ং ডাকঘরের ডাকবাক্সে দিয়ে এলেম। একটা ভাবনা দূর হলো।

  • দ্বিতীয় কল্প : হায় হায়! আমি পাগল!

    দ্বিতীয় কল্প : হায় হায়! আমি পাগল!

    ভূবনচন্দ্র মুখোপাধ্যায়

    [book-name]

    দ্বিতীয় কল্প : হায় হায়! আমি পাগল!

    অষ্টাহ অতীত। রাজাবাহাদুরের সঙ্গে নিত্য আমার দেখা হয়, নিত্য তিনি আমারে উৎসাহবাক্যে আশা প্রদান করেন; আশ্রিতের প্রতি আশ্রয়দাতার যেরূপ স্নেহ থাকা সম্ভব, আমার প্রতি রাজা মোহনলাল সেইরূপ স্নেহ প্রদর্শন করেন; তাঁর কপট ব্যবহার জেনে শুনেও ঐ প্রকার বাহ্য ব্যবহারে আমি তুষ্ট থাকি। খেলাঘরের খেলার ন্যায় মিথ্যাবস্তুগুলিকে মনে মনে আমি সত্য সাজে সাজাই। কাজকর্ম কোরবো, রাজাবাহাদুর আমারে ভাল ভাল কাজকর্ম দিবেন, এইরূপ আশা করি, এইরূপ আশা পাই। যে সব কথা অন্তরে জাগে, এক এক সময় সে সব কথা ভুলে ভুলে থাকি।

    দিবসে উপবেশনের নিমিত্ত আমার একটি স্বতন্ত্র গৃহ নিদিষ্ট ছিল, প্রয়োজন ব্যতিরেকে কেহ সে গৃহে হঠাৎ প্রবেশ কোত্তেন না। একদিন অপরাহ্ণে একটি ভদ্রলোক সহাস্যবদনে সহসা আমার সম্মুখে উপস্থিত হোলেন। কথাবার্তা কিছুই নাই, লোকটি আপন মনে হাসতে হাসতে আমার বিছানার উপর বোসলেন, হাসতে হাসতে খানিকক্ষণ অনিমেষনেত্রে আমার মুখের দিকে চেয়ে থাকলেন; ভাব আমি কিছুই বুঝতে পাল্লেম না। তাঁর উপস্থিতির কারণ জানবার অভিলাষে কোন কথাই আমি জিজ্ঞাসা কোল্লেম না। তিনিও নিস্তব্ধ, আমিও নিস্তব্ধ। বিশেষের মধ্যে তাঁর মুখে হাস্য ছিল, আমার মুখ বিস্ময়ভাব প্রকাশক।

    লোকটির পরিচ্ছদ ভদ্রলোকের ন্যায়, চেহারায় কিন্তু তদ্রূপ ভদ্রতার কোন লক্ষণ প্রকাশ পায় না। সচরাচর বড়লোকের দরবারে মোসাহেব লোকের যেরূপ ভাব-ভঙ্গী দৃষ্ট হয়, এই লোকের ভাব-ভঙ্গী সেই প্রকার। বাক্যশ্রবণ না কোল্লে প্রকৃতি বুঝা যায় না; প্রকৃতির বিচারে আমি অক্ষম থাকলেম। লোকটির চক্ষু আমার মুখের দিকে, আমার চক্ষু তাঁর মুখের দিকে। এই ভাবে থাকতে থাকতে হেসে হেসে তিনি আমারে জিজ্ঞাসা কোল্লেন, “তোমার কি কোন প্রকার অসুখ আছে?”

    অদ্ভুত প্রশ্ন! কস্মিনকালেও দেখা-সাক্ষাৎ নাই, আমার সুখাসুখের কথা কেহ তাঁরে বলেও নাই, অকস্মাৎ তিনি আমারে অমন কথা কেন জিজ্ঞাসা করেন? আমি উত্তর কোল্লেম না; দুই তিনবার মস্তকসঞ্চালন কোরে পুনরায় তিনি আপনা আপনি বোল্লেন, “ওহো! সেই কথাই ঠিক বটে। সে রকম না হোলে এ রকমটা হয় না সেই কথাই ঠিক বটে! আত্মগত বাক্যে এইরূপ মন্তব্য দিয়ে পূর্ববৎ হাসতে হাসতে আমারে তিনি বোল্লেন, “দেখি দেখি, তোমার হাতখানি একবার দেখি।”

    আমি মনে কোল্লেম, হয় তো গণকঠাকুর; সামুদ্রিকবিদ্যায় পণ্ডিত; এই মনে কোরে আমি আমার দক্ষিণ করতলটি তাঁর সম্মুখে বিস্তার কোল্লেম। হাস্য কোরে তিনি বোল্লেন, “ও রকম নয়, ও রকম নয়, নাড়ী পরীক্ষা করা আবশ্যক।”

    হাতখানি সরিয়ে নিয়ে বিরক্তভাবে আমি বোল্লেম, “শরীরে আমার কোন পীড়া নাই নাড়ী-পরীক্ষার কিছুই প্রয়োজন আমি দেখছি না।”— আমার কথা তিনি শুনলেন না নিকটে সোরে এসে আমার হাতখানি ধোরে তিনবার তিনি টিপে টিপে দেখলেন, মাথা হেলিয়ে হাতের কাছে কাণ পাতলেন, তার পর হুঁ হুঁ শব্দ উচ্চারণ কোরে পূর্বের ন্যায় তিনবার মস্তকসঞ্চালন কোল্লেন; হাসতে হাসতে বোলতে লাগলেন, “সে রকম কিছু নয় বটে কিন্তু কোথা থেকে তুমি এসেছ? কোন কোন লোক তোমাকে বুঝি অনেক কষ্ট দিয়েছে? তুমি বুঝি দেশে দেশে বেড়িয়ে বেড়িয়ে অতিশয় ক্লান্ত হয়ে পোড়েছ? লোকেরা বুঝি তোমার অন্বেষণে যেখানে সেখানে ঘুরে বেড়াচ্ছে? কোথাও বুঝি তুমি স্থির হোতে পাচ্ছো না? নাড়ীর লক্ষণে সেই রকম আমি দেখছি। অজ্ঞাত লোকেরা তোমার পরম শত্রু। কেন তারা তোমার উপর সে রকম দৌরাত্মা করে? কেন তারা তোমার পাছে পাছে দেশে দেশে ঘোরে?”

    যখন তিনি আমার নাড়ী-পরীক্ষা করেন, সে সময় আমি ভেবেছিলেম, তিনি হয় তো বৈদ্যরাজ, শেষের কথাগুলি শুনে মনে কোল্লেম, তা নয়; কেবল বৈদ্যরাজ নয়, গণনাবিদ্যায় তাঁর দক্ষতা আছে। যে সব কথা তিনি বোল্লেন, যদি অন্য কারো মুখে না শুনে থাকেন, তবে তো সে সব কথায় তাঁর পাণ্ডিত্যের পরিচয় পাওয়া যাচ্ছে। পূর্বে যতটা বিরাগ জন্মেছিল, ততটা থাকলো না, গণকঠাকুর মনে কোরে তাঁর গুণপণার উপর আমার কিঞ্চিৎ ভক্তির সঞ্চার হলো। তখনো তিনি মুখ টিপে টিপে হাসছিলেন। হাসে কেন? আমি কষ্টে পোড়েছি, লোকের উপদ্রবে কষ্ট পেয়েছি, সে সব কথা জানতে পেরে কাহার মুখে হাসি আসে? লোকটির স্বভাব বুঝি ঐ রকম, সর্বদাই হাস্য করা বুঝি তাঁর অভ্যাস, এইরূপে বিবেচনা কোরে দুই চারি কথায় আমি বোল্লেম, “আজ্ঞা হাঁ লোকে অকারণে আমার শত্রু হয়েছে, তারা আমারে বিস্তর কষ্ট দিয়েছে, এখনো পৰ্যন্ত ক্ষান্ত হয় নাই, বেশী কথা কি, বাগে পেলে তারা আমারে প্রাণে মাত্তে পারে, সে সব আমি জানতে পেরেছি।”

    গণক, বৈদ্য অথবা সামুদ্রিক এই তিনের মধ্যে লোকটি যাই হোন, বিশ্বাস কোরে আমি তাঁরে বোল্লেম, “শত্রুর কুচক্রে সর্বদাই আমি বিপদাপন্ন।” সেই কথা শুনে সেইভাবে তিনি বোল্লেন, “হোতেই পারে, হোতেই পারে; তুমি মিথ্যাকথা বোলছো না। সত্য সত্যই তোমার পাছে শত্রু লেগেছে। তুমি বেশ ছেলে, কেন তারা তোমার শত্রু হলো, আমি বুঝতে পাচ্ছি না। আচ্ছা, তোমার বাড়ী কোন গ্রামে? তোমার পিতার নাম কি?”

    বিশ্বস্তভাবে আমি উত্তর কোল্লেম, “তা আমি জানি না, বাড়ী-ঘর আমার নাই, মাতা-পিতার পরিচয় আমি অজ্ঞাত, যেখানে যখন আমি যাই, এক একটি মহৎলোকের কাছে আশ্রয় পাই, আমার দুর্দশা শুনে তাঁরা দুঃখপ্রকাশ করেন; সেখানেও আমার সঙ্গে সঙ্গে শত্রু ঘোরে, কোথাও আমি শান্তি পাই না। এই রাজাবাহাদুর পূর্বে আমারে দেখেছিলেন, নিরাশ্রয় দেখে আশ্রয় দিতে চেয়েছিলেন, তাঁর কাছে থাকতে আমি সম্মত হই নাই; মধ্যে কিছুদিন দেখা-শুনা ছিল না, সম্প্রতি তিনি আমারে এইখানে আনিয়াছেন; এখন এইখানেই আমি আছি।”

    একবার ঊর্ধ্ব দিকে দৃষ্টিপাত কোরে লোকটি বোল্লেন, “হাঁ হাঁ; সেই কথাই তো আমি বোলছি, শত্রুর ভয়ে, শত্রুর উপদ্রবে কোথাও তুমি স্থির হোতে পাচ্ছো না। রাজাবাহাদুর আনিয়েছেন, এইখানেই তুমি আছ, সে কথা আমি জানতে পেরেছি; কিন্তু আচ্ছা, কারা তোমার শত্রু, কি কারণে তারা তোমার শত্রু, সে কথা তুমি বোলতে পার? শত্রু পক্ষের নাম তুমি জানো?”

    তাৎক্ষণাৎ আমি কোন উত্তর দিলেম না, মনে কোল্লেম, এ সকল কি কথা? আমার অবস্থার কথা ইনি জানেন; শত্রু লেগেছে, সে কথাও বোলছেন, বোলতে বোলতে শত্রু পক্ষের নাম জিজ্ঞাসা করেন কেন? নাম যদিও আমি জানি, কিন্তু সেই নামের সঙ্গে কতদূরে টান পড়ে সেটা ভাবতে গেলে প্রকাশ কোত্তে সাহস হয় না। শত্রু, আমার একটি নয়, অনেক; কার নাম বোলতে কার নাম আনবো, কোথায় গিয়ে পরিণাম দাঁড়াবে, ঠিক নাই, ফল বরং বিপরীত দাঁড়াবার সম্ভাবনা। এইরূপে চিন্তা কোরে আমি উত্তর কোল্লেম, “গুপ্তশত্রুর নাম নিঃসন্দেহে জানা যেতে পারে না। যাদের উপর আমার সন্দেহ হয়, তারা আমারে কিরূপ বিবেচনা করে, তাও আমি জানি না। অমুক অমুক আমার শত্রু, অমুক অমুক আমার প্রাণবিনাশে উদ্যত, ঠিক ঠিক তা যদি আমি জানতেম তা হোলে আদালতের সাহায্য নিতে পাত্তেম। যারা গোপনে থেকে যুদ্ধ করে, তাদের নাম বোলতে আমি ভয় পাই।”

    লোকটি আমার কথার প্রতিধ্বনি কোরে বোল্লেন, “তা তো বটেই! তা তো বটে! ঠিক কথাই তুমি বোলেছ! নাম বোলতে তুমি ভয় পাও! আমরাও ভয় পাই। আহা! বিস্তর কষ্ট তুমি পেয়েছ! যারা তোমাকে কষ্ট দিচ্ছে, তারা শাস্তি পাবে; এখানে না পায়, মরণান্তে যমলোকে অথবা অপর কোন পরলোকে অবশ্যই তারা শাস্তি পাবে। ও কি? তুমি অমন কোরে কাঁদ কেন? অসুখ হয়েছে, সেরে যাবে; শত্রু হয়েছে, ধরা পোড়বে; ভয় কি? রাজার বাড়ীতে এসেছ, রাজার বাজী আছ, কিসে তোমার ভয়? রোদন সংবরণ কর; শীঘ্রই আবার আমি তোমার কাছে আসছি, এখান থেকে তুমি কোথাও যেয়ো না।”

    এই সব কথা বোলে, মুখে টিপে হাসতে হাসতে সে লোকটি আমার ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। কোথাকার লোক?— কে সে? —কি সব কথা বোলে গেল? আমি কাঁদছি! কে তারে বোল্লে আমি কাঁদছি? লোকটা কোন চক্ষে দেখলে আমি কাঁদছি? প্রথমেই তারে দেখে, তার কথা শুনে, আমি মনে কোরেছিলেম, গণকঠাকুর, তার পর ভেবেছিলেম বৈদ্যরাজ, এখন বুঝতে পাচ্ছি, কিছুই না। ভণ্ডলোক! যে সকল লোক কেবল কথা বেচে খায়, পাঁচ রকম কথা বোলে লোকের মন ভুলাবার চেষ্টা পায়, ‘অসাধ্য রোগের অব্যর্থ ঔষধ জানি’ বোলে যারা অবোধ লোকের পয়সা ফাঁকি দেয়, ঐ লোক হয় তো সেই দলের লোক হবে, এইরূপে আমার সন্দেহ হলো।

    সন্দেহের কথাটা মনে মনে আলোচনা কোচ্ছি, সম্মুখে দেখি, আর একটি লোক। যে লোকটিরও অধর ওষ্ঠে মৃদু হাস্য। যে আসে, সেই হাসে, ব্যাপার কি? আমারে দেখলে নূতন লোকের হাসি পায়, পাটনায় এসে আমি কি সেই রকমের কোন আশ্চর্য বস্তু হয়ে পোড়েছি? লোকটি এলো, কৃষ্ণঠাকুরের মত পায়ের উপর পা দিয়ে আমার সম্মুখে দাঁড়ালো, হাসতে হাসতে জিজ্ঞাসা কোল্লে, “কি হে বালক! তোমারই নাম হরিদাস? জায়গায় জায়গায় তুমি না কি বিস্তর কষ্ট পেয়েছ? অজানা লোকেরা বা কি তোমার উপর বেজায় দৌরাত্ম্য কোরেছে? হায় হায়! এমন লক্ষ্মীছেলে তুমি, এমন চমৎকার রূপ তোমার, হায় হায়। তোমার উপর দৌরাত্ম্য? কেন তারা তোমার উপর দৌরাত্ম্য করে? মানুষ? না ভূত? হাঃ। হাঃ হাঃ! ভূতেরাই তোমার মত ছোট ছোট ছেলেদের উপর প্রতাপ দেখায়! নিশ্চয় তারা ভূত!”

    লোকটি ঝড়ের মত একসঙ্গে কত কথাই বোলে গেল, একটি কথাতেও আমি কোন উত্তর দিলেম না। নূতন লোকে অত কথা কেন বলে, কোন কথার সঙ্গে কোন কথার মিল নাই, বিকারগ্রস্ত রোগীর প্রলাপের ন্যায় প্রায় সকল কথাই অসম্বদ্ধ। লোকটির উদ্দেশ্য কি বুঝা গেল না। তার মুখপানে আমি চেয়ে দেখলেম, কেবল হাস্য; মাঝে মাঝে যতবার চেয়ে দেখেছি, ততবারই দেখেছি, সমভাবে হাস্য। শেষবার যখন আমি দেখলেম, তখন সেই মুখে একটু গাম্ভীৰ্য অনুভূত হলো। গম্ভীরভাব ধারণ কোরে লোকটি তখন আপন মনে বোল্লে, “তাই তো! তাই তো দেখছি! কাণ্ডখানা কি? এত অল্পবয়সে— আচ্ছা, আচ্ছা, —এখনো উপায় আছে।”

    “উপায় আছে” বোলতে বোলতে সেই লোক ধীরে ধীরে বাহির হয়ে গেল। কিসের উপায় আছে, আমি কিছু অনভব কোত্তে পাল্লেম না। সন্ধ্যার পর আর একজন? সেই তৃতীয় ব্যক্তিও পূর্বোক্ত দুইজনের ন্যায় অভিনয় কোরে গেল। প্রথম লোকটির কথায় বরং আমি দুই চারিটি উত্তর দিয়েছিলেম, এদের দুইজনের বক্তৃতার সময় উদাসভাবে আমি মৌন। কেন তারা এসেছিল, কেন তারা ঐ সব কথা বোল্লে, “আহা! আহা!” বোলে কেন তারা দুঃখপ্রকাশ কোল্লে, তারাই তা বোলতে পারে, আমি বোলতে পারি না। তারা নূতন; পরিচ্ছদ-পারিপাট্যে ভদ্রলোক, কথাগুলো কিন্তু ভদ্রলোকের কথার মত বোধ হলো না। আমার কষ্টের কথা উত্থাপন কোরে কেন তারা ততটা বাগাড়ম্বর বিস্তার কোরে গেল, আমার কষ্টের কথায় কেন তারা কষ্ট জানালে, সন্দেহে সন্দেহে তাই আমি ভাবতে লাগলেম।”

    এই ঘটনার পর দশদিন অতিক্রান্ত। যারা ঐরূপে আমার বিস্ময় উৎপাদন কোরেছিল, এই দশদিনের মধ্যে তারা কেহই আর একদিনও আমার সঙ্গে দেখা কোত্তে এলো না। রাজার সঙ্গে আমি দেখা করি, রাজা মিষ্ট মিষ্ট কথা কন, হিতোপদেশ শিক্ষা দেন, হাসির কথা উত্থাপিত হোলে একটু একটু হাস্য করেন, বাগানের কথাটা একবারও আমার সাক্ষাতে আর উত্থাপন করেন না; এই রকমে দিন যায়। একদিন সন্ধ্যার পর রাজা আমারে ডেকে পাঠালেন। যে ঘরে তিনি বসেন, সেটির নাম খাসকামরা, সেই ঘরে গিয়ে আমি উপস্থিত হোলেম।

    দেড় হাত উচ্চ গদীর উপর রাজাবাহাদুর উপবিষ্ট। আশেপাশে অনেক লোক। রাজার অতি নিকটে পাঁচজন; সেই পাঁচজনের মধ্যে একজন রাজগদীস কিনারার উপর হাতের কনুই রেখে, রাজার দিকে একটু হেলে, তাঁর কাণের কাছে কি যেন পরামর্শ দিচ্ছিল। বড় বড় লোকের মজলীসে ঐ রকমের লোক অনেক থাকে। গদীর গায়ে জানু রাখা, কণুই রাখা, মাথা রাখা সেই সব লোকের শ্লাঘাজনক দাম্ভিকতার পরিচয়; তারা ভাবে, আমাদের এইরূপ ভঙ্গী দেখে লোকে ভাবুক, আমরাও এক একজন বড়দলের লোকের মধ্যে গণ্য। বড়লোকের কাণের কাছে মুখ রেখে মিছামিছি মন্ত্র পড়াও ঐরূপ শ্লাঘাবিজ্ঞাপক; অমুক লোক অমুক রাজার অথবা অমুক বাবুর পরম প্রিয়পাত্র, দর্শকলোকের মনে এইরূপ বিশ্বাস উৎপাদন করা সেই সকল অভিমানী লোকের গূঢ় অভিপ্রায়। বড় বড় মজলীসে সর্বদা যাঁরা গতিবিধি করেন, তাঁদের মধ্যে যাঁরা সূক্ষ্মদর্শী, তাঁরা সকলেই জানেন, অনেক লোকেরই ঐ প্রকার অভ্যাস।

    আমি উপস্থিত হোলেম। বেদীর উপর পুরাণবক্তা কথকঠাকুর, মঞ্চোপরি রাজনীতিবক্তা বাগ্মীবাবু, নাট্যশালার রঙ্গমঞ্চে নান্দীপাঠক রসিক নট,—সঙযাত্রার আসরে রাক্ষস-বানররূপী নূতন সং, এই সকল মূর্তির প্রতি দর্শকলোকের চক্ষু যেমন সুস্থিরভাবে আকৃষ্ট থাকে, রাজমজলীসের সমস্ত লোকের চক্ষু সেইরূপে আমার প্রতি সমাকৃষ্ট। সমস্ত চক্ষুর সঙ্গে রাজার চক্ষু প্রথমে আমার দিকে নিক্ষিপ্ত হয় নাই, একটু পরে নেত্রোত্তোলন কোরে আমারে দেখে প্রসন্নবদনে রাজা বোল্লেন, “এসো হরিদাস, বোসো।”

    একটি পাশে চুপটি কোরে আমি বোসলেম। লোকেরা খানিকক্ষণ সমভাবে আমার দিকে চেয়ে থাকলো; দুই একজন একটু একটু হেলে হেলে পরস্পর ফুস ফুস কোরে কি যেন বলাবলি কোত্তে লাগলো, ভাব আমি অনুভব কোত্তে পাল্লেম না। হাঁ, একটি কথা বোলতে আমি ভুলেছি। ইতিপূর্বে তিন সময়ে যে তিনটি লোক আমার কষ্টে সমবেদনা জানাতে আমার ঘরে গিয়েছিল, তাদের মধ্যে একজনকে ঐ মজলীসে আমি দেখেছিলেম; রাজার অতি নিকটে যে পাঁচটি লোক উপবিষ্ট ছিল। তাদেরই মধ্যে সেই লোক। সেই পাঁচজনের দিকে অঙ্গুলিনির্দেশ কোরে রাজাবাহাদুর আমারে বোল্লেন, “দেখ হরিদাস! এখানে এসে অবধি তুমি যে প্রকার উন্মনা উন্মনা ভাব দেখাচ্ছো, মাঝে মাঝে লোকের সঙ্গে,— কেবল লোকের সঙ্গে কেন, মাঝে মাঝে আমার কাছেও তুমি যে প্রকার অর্থশূন্য তাৎপৰ্যশূন্য কথা কও, তাতে যেন বুঝা যায়, নানা কষ্টে, নানা ভাবনায় তোমার বুদ্ধি বিচলিত হয়েছে, মাথা যেন কেমন খারাপ হয়ে গিয়েছে চাউনীতেও এক এক সময় সেইরূপ লক্ষণ প্রকাশ পায়। এই পাঁচটি বাবু এখানকার লব্ধপ্রতিষ্ঠ ডাক্তার; পরীক্ষা কোরে এই ডাক্তারবাবুরা যেরূপ ব্যবস্থা দিবেন, সেই ব্যবস্থামতেই তোমাকে চোলতে হবে। আমার কাছে তুমি এসেছ, তুমি পীড়িত, যাতে কোরে তোমার চিকিৎসা হয়, সেরূপ বন্দোবস্ত করা আমারই কর্তব্য।”

    পাঁচজনের মুখের দিকে এক একবার চেয়ে, রাজার মুখের দিকে দুটি চক্ষু আমি স্থির কোরে রাখলেম। ডাক্তারের মধ্যে একজন সেই সময় মন্তব্য দিলেন, “পরীক্ষা নিষ্প্রয়োজন, মুখে-চক্ষের ভাব দেখেই প্রকৃত অবস্থা আমরা বুঝতে পেরেছি। বিশেষ, এই নীলাম্বরবাবু যে সব কথা বোলেছেন, তাতে আর নূতন পরীক্ষা করা আমরা আবশ্যক বিবেচনা কোচ্ছি না। রোগ এখনো প্রবল হয় নাই, দুই একটা লক্ষণ প্রকাশ পাচ্ছে মাত্র, সামান্য ঔষধেই আরাম হয়ে যাবে।”

    নীলাম্বরবাবুর কথার উপরেই ডাক্তারগুলির পূর্ণ বিশ্বাস। নীলাম্বরবাবু কে? যে তিনটি লোক পূর্বে আমারে ছলনা কোরে এসেছিলেন, তাদের মধ্যে যাঁকে আমি এই মজলীসে চিনেছি তাঁরই নাম নীলাম্বরবাবু; মোটামুটি পরিচয় পেয়ে এখন আমি চিনলেম, ইনি একজন ডাক্তার। হা জগদীশ্বর! ডাক্তারের সঙ্গে আমার কিসের সম্পর্ক? শরীর আমার বিলক্ষণ সুস্থ, অবস্থাচিন্তনে মন চাঞ্চল্য, কি কারণে চাঞ্চল্য, আমিই তা জানি, সে চাঞ্চল্যের কারণ নিরূপণ করা ডাক্তার-কবিরাজের সাধ্য নয়। তবে কেন আমি ডাক্তারের চক্রে নিক্ষিপ্ত হোলেম?

    উদ্বিগ্ন হয়ে এই রকম আমি ভাবছি, দলের ভিতর থেকে আর একটি লোক একটু মাথা উঁচু কোরে সেই সময় বোলে উঠলেন, “ততদূর বোধ হয় যেতে হবে না; রঘুনাথবাবু বোলছেন, সামান্য ঔষধেই আরাম হবে। আমি শুনেছি, ইংরাজীমতের ডাক্তারখানায় সামান্য ঔষধ থাকে না; যতই সামান্য হোক, সমস্ত ঔষধের শক্তি গরম; এ ছোকরাকে গরম ঔষধ দিবার দরকার নাই। আমার ঘরে পঞ্চানন্দের বিল্বপত্র আছে, সেই বিল্বপত্র ধরে একটু খাইয়ে দিলেই এক রাত্রির মধ্যে এ রোগটা সেরে যাবে।”

    হো হো শব্দে সকলেই হেসে উঠলেন, ম্রিয়মাণ হয়ে আমি মাথা হেঁট কোল্লেম; মনে ভাবলেম, এই জন্য কি রাজাবাহাদুর আমারে পাটনায় আনালেন? গুপ্তরথীরা গুপ্তশর সন্ধান কোরে আমারে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছিল, সে এক রকম ছিল ভাল, এখন কি না বহুরথী একত্র হয়ে আমার এই ক্ষুদ্রপ্রাণ সংহার কোত্তে উদ্যত। বিদ্রূপের অগ্নিবাণে আমার অন্তরাত্মা যেন জ্বোলে যাচ্ছে! ভাবলো এই রকম, মুখে কিছু বোল্লেম না। বুঝলেম রঘুনাথবাবু একজন ডাক্তারের নাম, রঘুনাথের ব্যবস্থা খণ্ডন কোরে কিম্বা খণ্ডন করবার চেষ্টা কোরে যিনি পঞ্চানন্দের বিল্বপত্রের ব্যবস্থা দিলেন, তিনি একজন কবিরাজ। ধর্মজ্ঞানে জলাঞ্জলি দিয়ে যাঁরা কেবল অর্থ লোভে ডাক্তার-কবিরাজের নাম কলঙ্কিত করেন, তাঁদের অসাধ্য কাৰ্য কিছুই নাই। একবার আমি শুনেছিলেম, একজন অর্থলোভী জমীদার তুচ্ছ বিষয়লোভে আপনার বাড়ীর একটি স্ত্রীলোককে পৃথিবী থেকে তফাৎ করবার অভিপ্রায়ে একজন ডাক্তারের আর দুজন বৈদ্যবংশীয় কবিরাজের গুপ্তসাহায্য গ্রহণ করেন, বিসূচিকা রোগ, এইরূপ প্রকাশ কোরে চিকিৎসকেরা সেই বিধবা বধূটিকে প্রাণঘাতক ঔষধ সেবন করান। অনবরত ঘর্ম হয়; আবীরে ঘর্ম নিবারণ করে, সেই ছলে বিধবার সর্বাঙ্গে সাত সের আন্দাজ আবীর মাখানো হয়; আবীর সেই আবীরাকে অতি শীঘ্র যমালয়ে প্রেরণ করে। ধর্মশীল চিকিৎসকেরা সেই মহৎ কার্যে লক্ষাধিক মুদ্রা পুরস্কার পেয়েছিলেন এইরূপ আমার শুনা আছে, যখন এই পাটনাসহরে বিনা রোগে ডাক্তার-কবিরাজের চিকিৎসায় আমার অদৃষ্টে কি ঘটে, ভগবান কি করেন, কিছুই আমি বোলতে পারি না।”

    মজলীসে অনেক প্রকার পরামর্শ হলো; চুপি চুপি পরামর্শই অনেক, সকলের সকল কথা আমি শুনতে পেলেম না। মজলীস থেকে উঠে আমি আসি আসি মনে কোচ্ছি, এমন সময় রাজাবাহাদুর বোল্লেন, “দেখ হরিদাস! আমার কথায় তুমি অবহেলা কোরো না; যা আমি বুঝেছি, তাই তোমাকে বোলেছি; তোমার চিকিৎসার জন্যই এই বিজ্ঞ বিজ্ঞ ডাক্তারগুলিকে আমি ডেকেছি। অবহেলা কোরো না, অবাধ্য হয়ো না; ডাক্তার-কবিরাজের অবাধ্য হোলে রোগ তো সারেই না, বরং বিপরীত হয়ে দাঁড়ায়। আমার এই কথাগুলি তুমি মনে রেখো।”

    আমি বিবেচনা কোল্লেম, যাঁর যা কিছু বলবার ছিল, শেষ হয়ে গেল, তবে আর কেন সেখানে বোসে থাকা। ধীরে ধীরে আমি উঠলেম; মজলীসকে নমস্কার কোরে ভগ্নান্তঃকরণে বিদায় চাইলেম। প্রায় আধ ঘণ্টা মজলীসে ছিলেম, অতক্ষণের মধ্যে একটি কথাও আমার রসনা থেকে নির্গত হয় নাই, বিদায়-প্রার্থনাই সে মজলীসে আমার প্রথম কথা।

    কতকগুলি লোক হো হো শব্দে হেসে উঠলেন। হাস্যের কারণ বুঝতে না পেরেও আমি অপ্রতিভ হোলেম। পূর্বে যাঁরা কথা কয়েছিলেন, জানা হয়েছে, তাঁদের মধ্যে একজনের নাম রঘুনাথ। যিনি রঘুনাথ, তিনি একজন ডাক্তার; আমার প্রস্থানের উপক্রমে বাধা দিয়ে, রাজার নিকট থেকে উঠে এসে তিনি আমারে বোল্লেন, “সত্য সত্যই বুদ্ধির স্থিরতা নাই; কোথায় চোলেছ?— বোসো; তোমার রূপদর্শনের জন্য এখানে তোমাকে আহ্বান করা হয় নাই, তোমার প্রতি আমাদের গুটিকতক জিজ্ঞাস্য আছে বোসো; অত ব্যস্ত হোচ্ছ কেন? তোমার চিকিৎসার জন্য রাজাবাহাদুরের আহ্বানে আমরা এখানে এসেছি;: ব্যাধিটা অগ্রে নির্ণয় করা হোক, তার পর তোমার ছুটি।”

    অপ্রস্তুত হয়ে পুনরায় আমি আসন গ্রহণ কোল্লেম। রাজাবাহাদুর একবার আমার দিকে চাইলেন; কিন্তু মুখে কিছু বোল্লেন না। দশদিন পূর্বে যে তিনটি লোক এসে আমার গৃহে উপস্থিত হয়েছিলেন, তাঁদের মধ্যে একজন এই মজলীসে উপস্থিত আছেন এ কথা আমি পূর্বে বোলেছি। সেই লোকটি ছাড়া ডাক্তারের দলের অপর চারিটি লোক সে সময় রাজার নিকট থেকে সোরে এসে আমারে ঘিরে বোসলেন; সুস্থির নয়নে ক্ষণকাল আমার মুখের দিকে চেয়ে থাকলেন। দর্শনকার্যের অবসানে একজন একটউ বিস্ময় প্রকাশ কোরে বোল্লেন, “এ ছোকরা যথার্থ অনেক কষ্টভোগ কোরেছে, অনেক লোক এই ছোকরার শত্রু হয়েছে, এক একটা শত্রুর চেহারার ছায়া এই ছোকরার নেত্র পুতুলীতে দেখা যাচ্ছে।”— প্রতিধ্বনি কোরে আর একজন বোল্লেন, “ঠিক, ঠিক, আমিও যেন তাই দেখতে পাচ্ছি। মানুষ চিনতে পাচ্ছি না, কিন্তু ছায়াগুলো ঘরে ঘরে বেড়াচ্ছে, বেশ দেখা যাচ্ছে।”— তৃতীয় ব্যক্তি বোল্লেন, “শুধু তাই নয়, এ ছোকরা এত বয়স পর্যন্ত নিজের পরিচয় নিজে জানে না, সেই জন্য চক্ষুর পুতুলীতে স্পষ্ট কাহার মুখ দেখা যায় না, কেবল ছায়া দেখা যায়।”—চতুর্থ ব্যক্তির প্রকৃতি কিছু গম্ভীর, মুখের আকৃতিও গম্ভীর। তাঁর মুখে দাড়ী ছিল; দুই হস্তে সেই দীর্ঘ দাড়ীতে ঢেউ খেলিয়ে খেলিয়ে তিনি বোল্লেন, “আপনারা করেন কি? ছায়াবাজীখেলার আলোচনার মত ওসব আপনারা বলেন কি? সাক্ষাতে ওসব কথা বোলতে নাই;  ছোকরাকে বোলতে দিন, পরিচয় অজ্ঞাত থেকে কোন কোন চক্রে কি প্রকারে ঘুরে ঘুরে কি প্রকার কষ্ট পেয়েছে কিম্বা পাচ্ছে, বোলতে দিন। কেমন হে ছোকরা!” আমারে সম্বোধন কোরে সেই গম্ভীর লোকটি বোল্লেন, “কেমন হে ছোকরা! সেই কথাই ঠিক নয়? নিজের পরিচয় তুমি জানো না, অনেক কষ্ট পেয়েছ, অনেক শত্রু তোমার আছে, এই সব কথা ঠিক নয়?”

    বার বার এক কথা; সকলের মুখেই এক কথা; এ সব কথার মানে কি, বক্তাগুলির উদ্দেশ্যই বা কি, কিছুই আমি স্থির কোত্তে পাল্লেম না; মাঝে মাঝে রোগের কথা বলে, এটাও একটা বিষম সমস্যা! যাই হোক, উত্তর দেওয়া কর্তব্য। মজলীস সরগরম, অনেক লোক একত্র,— রাজসভা, রাজা মোহনলাল ঘোষ বাহাদুর স্বয়ং সভাপতি, এ মজলীসে আমার ভাগ্যের কথা প্রকাশ কোল্লে মন্দ হবে না; সকল লোক দয়াশূন্য হবে এমন কখনই সম্ভব নয়। আমার দুঃখের কথা শুনে অবশ্যই কাহার কাহার হৃদয়ে দয়ার সঞ্চার হোলেও হোতে পারবে, আমার অনুকূলে রাজাবাহাদুরকে তাঁরা দুটি একটি কথা বোল্লেও বোলতে পারবেন, এই ভেবে সেই গম্ভীর লোকটির প্রশ্নের উত্তরে আমি বোল্লেম, “হাঁ মহাশয়! কষ্ট আমি অনেক পেয়েছি। আমার জাতি-জন্মের পরিচয় আমি জানি না;  শৈশবে আমি গুরুগৃহে বাস কোত্তেম, গুরুগৃহে বাস কোত্তেম, গুরুদেবের মৃত্যুর পর একটা বদমাসলোক আমারে দেশান্তরে নিয়ে যায়, তার পর একটি ভাল জায়গায় আমি আশ্রয় পাই, এই রাজাবাহাদুর সে কথা জানেন। তার পর আমার পশ্চাতে শত্রু লাগে, শত্রু একটা নয়, অনেক জায়গায় অনেক; এক একটা শত্রুর নাম আমি জানি, কিন্তু বোলতে ভরসা হয় না। ভগবান যদি—”

    যাঁরা আমারে ঘিরে বোসেছিলেন, আমার মুখে ভগবানের নাম শুনে তাঁরা হো হো কোরে হেসে উঠলেন। একজন বোল্লেন, “তা তো হোতেই পারে! আমাদেরও ও রকম হয়; শত্রুর নাম কোত্তে আমাদেরও ভরসা হয় না। ভগবান যদি সে সব নাম বোলে দেন, তা হোলেই প্রকাশ পায়, তা না হোলে চিরকাল কষ্টভোগ কোরে ছটফট কোরে বেড়াতে হয়। আহা! এ ছোকরা বড়ই কষ্ট পাচ্ছে! আপনার পরিচয়টা পর্যন্ত জানতে পাচ্ছে না, যাকে তাকে পরিচয়ের কথা জেজ্ঞাসা করে; প্রাণ সর্বদা হু হু করে কি না, কাজে কাজেই ঐ রকম; ঐ রকমেই এই দশা ঘোটেছে।”

    ঐ কথাগুলি যিনি বোল্লেন, তিনি আমার দিকে চাইলেন না, শেষে আমার দিকে চেয়ে যেন কতই সদয়ভাবে বোল্লেন, “ভয় পেয়ো না তুমি, অনেক লোকের ওরকম হয়; অল্পদিন চিকিৎসা কোল্লেই আরাম হয়ে যায়, ভয় কিছু নাই। দিবারাত্রি অত ভেবো না, সকল লোকের কাছে ওরকম গল্প কোরো না; তোমার মাথার ঠিক নাই, লোকে সেটা বুঝবে না, বৃথা তুমি ঐ রকম বোকে বোকে ক্লান্ত হয়ে পোড়বে, মাথাটা আরো খারাপ হবে। চুপ কোরে থেকো, আমরা যে রকম ব্যবস্থা কোরে দিব, সেই রকম ব্যবস্থা মতে দিনকতক থাকতে থাকতেই সমস্ত উপসর্গ সেরে যাবে। আচ্ছা, এখন তুমি যেতে পার, দু-দিন পরে আমরা আবার আসবো, সে দিন যদি এই রকম দেখি, তা হোলে চিকিৎসার বন্দোবস্ত ঠিক হবে।”

    রাজাবাহাদুর ঐ সকল কথা শুনলেন, কোন প্রকার অভিপ্রায় প্রকাশ কোল্লেন না। তিনি আমারে আহ্বান কোরেছিলেন, প্রয়োজন কি ছিল, ডাক্তারমহাশয়েরাই সেটি ব্যক্ত কোল্লেন। ডাক্তারগণের বক্তৃতার তাৎপর্য আমার চিকিৎসা করা। কি রোগের চিকিৎসা হবে, আমি বুঝলেম না, অথচ চিকিৎসা হবে আমার। রহস্য ভেদ করা আমার অসাধ্য। আমার জীবনের ঘটনায় প্রায় পদে পদেই রহস্য। একটা রহস্যেরও মর্মভেদে আমি সমর্থ হোলেম না, এটা সামান্য আশ্চর্য ব্যাপার নয়!

    বিদায়কালে রাজাবাহাদুরের দিকে আমি চাইলেম; মুখে যেন একটু একটু হাসি ছিল, আমার দৃষ্টিপাতমাত্রেই সে হাসি লুকালো। —মন্দ নয়! অনেক বড়লোকের এইরূপ অভ্যাস আছে; অনেক অভিমানিনী রমণীরও এইরূপ প্রশংসনীয় অভ্যাস আছে; ক্ষণমাত্রে হাস্য, ক্ষণমাত্রেই গাম্ভীর্য, ক্ষণমাত্রেই বিষণ্ণতা, ক্ষণমাত্রেই চক্ষে জল। হাসা কোত্তে কোত্তে রাজাবাহাদুর গম্ভীরভাব ধারণ কোল্লেন, সেই সময় আমি নমস্কার কোল্লেম। যাও কি থাকো, একটি কথাও তিনি আমারে বোল্লেন না। মজলীসের দিকে চাইতে চাইতে রাজার খাসকামরা থেকে আমি বাহির হোলেম। মজলীসভঙ্গ হলো না, আমারে উপলক্ষ্য কোরে যেরূপ অভিনয় হয়ে গেল, মজলীসী লোকেরা সেই অভিনয় সমালোচনা আরম্ভ কোল্লেন। নিকটে দাঁড়িয়ে থাকলে কথাগুলি আমার কাণে আসতো কিন্তু আমি মনের উদ্বেগে দ্রুতগতি চোলে আসছিলেম, কথা কাণে এলো না, একটা মহোচ্চ হাস্য কোলাহল শ্রবণ কোল্লেম মাত্র। আমারে উপলক্ষ্য কোরেই সেই হাস্য, সেটি বুঝতে আমার বাকী থাকলো না।

    খেলা আমি অনেক রকম দেখেছি, রাজ-মজলীসের ডাক্তারমহাশয়েরা যেরূপ খেলা দেখালেন, সেরূপ খেলা আর কখন কোথাও দেখি নাই। খেলার সামগ্রী হরিদাস। —সত্যই এ সংসারে অনেক লোকের খেলার সামগ্রী হরিদাস। ডাক্তারের মুখে যে কথাগুলি আমি শুনলেম, নিজের চিন্তাগারে প্রবেশ কোরে মনে মনে সেইগুলি আলোচনা কোল্লেম। কথাগুলি যখন কাজে দাঁড়াবে, তখন যে রঙ্গ হবে, তাই ভেবে বড় দুঃখে আমার মুখে একটু হাসি এলো।

    দুদিন গেল। ডাক্তার রঘুনাথ সেইকালে বোলেছিলেন, দুদিন পরে আবার তাঁরা আমার কাছে আসবেন; আমি প্রস্তুত হয়ে থাকলেম। তৃতীয় দিবসের প্রাতঃকাল থেকে বেলা দুই প্রহর পর্যন্ত কেহই এলেন না, রাজাও আমারে ডেকে পাঠালেন না। আড়াই প্রহর, তৃতীয় প্রহর অতীত হয়ে গেল, তখনো পৰ্যন্ত কেহ দেখা দিলেন না, আমিও ঘর ছেড়ে কোথাও গেলেম না। সূৰ্য বোধ হয় আমার নূতন চিকিৎসার ব্যবস্থা দর্শন করা কষ্টকর বিবেচনা কোরে অস্তগমনের উপক্রম কোল্লেন। সন্ধ্যা হয় হয় এমন সময় নূতন ধরণের পোষাকপরা দুটি ভদ্রলোক ধীরে ধীরে ঘরে প্রবেশ কোরে আমার সম্মুখে দাঁড়ালেন। পোষাকের ধরণ নূতন হোলেও মুখের ধরণ পুরাতন দেখেই আমি চিনলেম। পঞ্চমমূর্তির মধ্যে যে দুই মূর্তির নাম পাওয়া গিয়েছিলো, তারাই তারা, নীলাম্বরবাবু আর রঘুনাথবাবু দুজনই ডাক্তার, এ পরিচয় বাহুল্য।

    ডাক্তারেরা আমার বিছানার উপর বোসলেন, গম্ভীরবদনে ক্ষণকাল আমার মুখপানে চেয়ে থাকলেন। দর্পণের সাহায্য ব্যতিরেকে নিজের মুখে নিজে দেখা যায় না, আমার মুখের ভাব তখন কি রকম ছিল কিম্বা ডাক্তার দর্শনে কি রকম হয়েছিল, আমি আর জানতে পাল্লেম না; যাঁরা দেখলেন, তারা অল্পক্ষণ নিস্তব্ধ থেকে, পরস্পর মুখচাহাচাহি কোরে অস্পষ্ট ইংরাজী ভাষায় কি দুই একটি কথা বোল্লেন, ঠিক আমি বুঝতে পাল্লেম না। তাদের উভয়ের নাম আমার শূনা হয়েছিল, চেহারাও বেশ মনে ছিল। যাঁর নাম নীলাম্বরবাবু, আমারে সম্বোধন কোরে তিনি বোল্লেন “তোমার মস্তিষ্কবিকারের একটা প্রধান হেতু আমি বুঝতে পেরেছি; শুনলেম, বাড়ী থেকে তুমি একবারও বাহির হও না। নিয়ত অষ্ট প্রহর এক জায়গায় আবদ্ধ থাকলে, সহজ মানুষেরও চিত্তবিকার ঘটে। আমি বোধ করি, ঔষধসেবনের অগ্রে তুমি যদি প্রতিদিন সকাল বিকাল— সূৰ্যকিরণ যখন প্রখর হয় না,— প্রখর থাকে না, সেই সময়—দুবেলা দুবার খানিক বেড়িয়ে আসতে পার, তা হোলে প্রভাতসমীর আর সন্ধ্যাসমীর সেবনে অনেকটা উপকার হোতে পারে। আমার ইচ্ছা, আজ থেকেই তুমি সেই অভ্যাস সুরু কর।”

    সেই সুপারিসের প্রতিধ্বনি কোরে রঘুনাথবাবু, তৎক্ষণাৎ বোল্লেন, “ঠিক আমার মুখের কথাটা তুমি কেড়ে নিয়েছ, আমিও ঐ কথাটা বোলবো বোলবো মনে কোচ্ছিলেম; আজ থেকে সুরু করাই ভাল।” —বন্ধুবাবুকে এই কথা বোলে, নূতন একটা চুরুট ধোরিয়ে মুখে দিয়ে, আমার দিকে ফিরে, কি যেন ভেবে গলা কাঁপিয়ে কাঁপিয়ে তিনি বোল্লেন, “তোমার নামটি কি ভাল? —হরি —হাঁ —হরিদাস। —হাঃ হাঃ হাঃ! হরিদাস-নামটা কিছুতেই আমার মনে থাকে না! হাঃ হাঃ হাঃ! যতগুলি হরিদাসকে আমি চিনি, মাঝে মাঝে আমার সঙ্গে দেখা হয়,—দেখা হোলেই নাম ভুলে যাই!—ওটা হোচ্ছে বাবুজী বৈরাগীদের মুখস্থ করা নাম; আমার মত ইংরাজীওয়ালাদের নয়; আমার মধ্যে ওনামটা যেন কেমন বাধো বাধো ঠেকে।”

    “বাধো বাধো ঠেকে” এই কথা বোলেই বক্তা ডাক্তারটি এক গাল ধূম উদ্গীরণ কোরে আমার মুখের কাছে ছেড়ে দিলেন। দোক্তার দুর্গন্ধ সহ্য কোত্তে না পেরে অন্যদিকে আমি মুখ ফিরালেম। বক্তার মুখের কাছে হাত ঘুরিয়ে ডাক্তার নীলাম্বর হাসতে হাসতে বোল্লেন, “কিছুদিন তুমি চৈতন্যচরিতামৃত পাঠ কর, হরিনাম মুখস্থ হবে, হরিদাস নামটিও আয়ত্ত কোরে রাখতে পারবে। আর একটা পরমার্শ আছে, আর এক সময়ে সে কথা হবে, এখন তুমি হরিদাসকে কি কথা বোলছিলে, বোলে যাও।”

    আর একবার চুরুটের ধূম্র উদ্গীরণ কোরে রঘুনাথবাবু আমারে বোল্লেন, “দেখ হরিদাস! খোলা জায়গার হাওয়া খাওয়া একটা পরম ঔষধ, —সকাল বিকাল দুবেলা। ঠিক সময় হয়েছে, আমাদের সঙ্গে গাড়ী আছে, তুমি প্রস্তুত হও। আজ আমরা তোমাকে হাওয়া খাওয়া ঔষধের প্রথম ফল দেখাব; মনে কর, আজ তোমার হাওয়া খাওয়া বিদ্যার হাতে খড়ী; প্রস্তুত হও।”

    কি আমি শুনলেম, কি আমি বুঝলেম, হঠাৎ যেন একটা সংশয়ের অন্ধকারমূর্তি আমার সম্মুখে এসে দাঁড়ালো। হাওয়া খাওয়া বিদ্যার হাতেখড়ী! ডাক্তারদের মুখের দিকে চেয়ে আমি নীরব হয়ে থাকলেম। ডাক্তারেরা উভয়েই দুই তিনবার আমারে বোল্লেন, “শুভক্ষণ, শুভক্ষণ প্রস্তুত হও, প্রস্তুত হও।” আর আমি অপ্রস্তুত থাকতে পাল্লেম না, ডাক্তারবাবুর অনুরোধ রক্ষা কোত্তে বাধ্য হোলেম। প্রস্তুত হওয়া কি রকম, তা আমি ভাবলেম না, অবসর চাইলেম না, কাপড়ও ছাড়লেম না, যে কাপড়খানি তখন আমার পরা ছিল, সেই কাপড়েই বাবুদের সঙ্গে আমি হাওয়া খেতে বেরুলেম, রাজাবাহাদুরের অনুমতি লওয়াও আবশ্যক বোধ কোল্লেম না।

    সূৰ্যদেব অস্তাচলে গিয়েছিলেন, অল্প অল্প অন্ধকার হয়ে আসছিল, ঘোর অন্ধকার হয় নাই, সময়টা গোধূলি; গোধূলি লগ্নে যাত্রা; —উপর থেকে আমরা নেমে এলেম। দরজার সম্মুখে দিব্য একখানি গাড়ী, দিব্য দুটি কৃষ্ণবর্ণ অশ্ব। রঘুনাথ ডাক্তার আমার একখানি হাত ধোরে গাড়ীতে তুলে দিলেন, তার পর তাঁরা দুজনে আরোহণ কোল্লেন। গাড়ী উত্তরমুখে চোল্লো। অশ্বেরা টপাটপ শব্দে দ্রুতবেগে ছুটে ছুটে যেতে লাগলো।

    কতদূরে গেলেম, ঠিক বুঝতে পাল্লেম না, অনুমানে বুঝলেম, এক কোশের বেশী। গাড়ীর ভিতর ডাক্তারেরা নানা রকম গল্প জুড়েছিলেন; গল্পের দিকে আমার কাণ ছিল না, মন ছিল না, সারা পথ আমি অন্যমনস্ক।

    সমবেগে আর খানিক দূরে এগিয়ে গিয়ে গাড়ীখানা থামলো, ডাক্তারেরা নামলেন, আমারেও নামালেন। সেই সময় আমি একবার চতুর্দিকে চেয়ে চেয়ে দেখলেম, অন্ধকার। বেশী দূর দেখা গেল না, তথাপি আমি বুঝতে পাল্লেম, পাটনায় এসে অবধি সে পথে আর কখনো আমি আসি নাই। রাস্তার বামদিকে প্রকাণ্ড একখানা বাড়ী; ফটকে প্রকাণ্ড একটা লণ্ঠন জ্বলছিল, পাথরের পুতুলের মত দুইজন দ্বারপাল বড় বড় দুটো বন্দুক ঘাড়ে কোরে দরজার দুই ধারে দাঁড়িয়ে ছিল। তারা নিষ্পন্দ। পথ দেখিয়ে দেখিয়ে ডাক্তারেরা আমারে সেই বাড়ীর ভিতর নিয়ে গেলেন। অকস্মাৎ দূর দূর কোরে আমার বুক কেঁপে উঠলো! কেন বোলতে পারি না, আমার মনে তখন যেন কোন প্রকার অমঙ্গল আশঙ্কার সঞ্চার হলো! গোধূলিলয়ে যাত্রা; এরূপ যাত্রাতে মঙ্গলফল হয়, এই কথাই লোকে বলে, আমার মন কেন বলে অমঙ্গল, কেমন কোরে জানবো?

    বাড়ীর ভিতর আমরা প্রবেশ কোচ্ছি, ঠাঁই ঠাঁই আলো জ্বোলছে দেখছি, শারি শারি কতই ঘর। যে দিক দিয়ে আমরা যাচ্ছি, সে দিকের দরজা বন্ধ। দুই ধারেই ঘর, মধ্যস্থলে সুঁড়ী পথ। প্রকাণ্ড বাড়ী, কোন দিকে কত ঘর, একদিক দর্শনে সেটা জানা গেল না। যাচ্ছি, এক একবার বামে দক্ষিণে চক্ষু ফিরাচ্ছি, মাঝে মাঝে এক একদিকে সেই রকমের অপ্রশস্ত এক একটা সুঁড়ীপথ দেখতে পাচ্ছি। ডাক্তারেরা আমারে সোজা পথেই নিয়ে চোলেছেন। বাতাসের লেশমাত্র নাই। অনেক দূর গিয়ে দক্ষিণধারে দেখলেম, একটা ঘরের দরজা খোলা। ঘরে আলো ছিল; দেখলাম ঘরটা দিব্য পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। আমারে অগ্রবর্তী কোরে ডাক্তারেরা সেই ঘরে প্রবেশ কোল্লেন। ঘরের একধারে একটি পরিষ্কার বিছানা, আর কোন আসবাবপত্র ছিল না। কেবল একদিকে দুটি বড় বড় মাটির কলসী, মুখে দুখানা কাচের বাসন ঢাকা; বোধ হলো, জলের কলসী। বিছানার উপর আমারে বোসতে বোলে নীলাম্বরবাবু আমার নিকটেই বোসলেন, রঘুনাথবাবু বেরিয়ে গেলেন।

    ঘরটি পরিষ্কার বটে, কিন্তু কেমন একটা দুর্গন্ধ আমার নাসারন্ধ্রে প্রবেশ কোত্তে লাগলো। ঘরেই গন্ধ অথবা বাহিরের দুর্গন্ধ এসে ঘরটিকে দুর্গন্ধময় কোচ্ছিল, সেটা আমি অনুভব কোত্তে পাল্লেম না। কিয়ৎক্ষণ নীরবে বোসে থেকে, মৃদুস্বরে আমি জিজ্ঞাসা কোল্লেম, এ আমি কোথায় এলেম? আমারে কোথায় নিয়ে এলেন?” মাথা নেড়ে নেড়ে নীলাম্বরবাবু একটু হাসলেন; আমার কথার কোন উত্তর দিলেন না। হাওয়া খাবার প্রস্তাব যখন হয়, তখন আমার মনে একটা সংশয় এসেছিল, সেই সংশয় এখন প্রবল হয়ে উঠলো। অমঙ্গল আশঙ্কাই বড় বেশী। বাম অঙ্গের ঘন ঘন স্পন্দন। কি যে সেই আশঙ্কা, কেন যে সেই আশঙ্কা, তার মূল কারণ তখন আমি কিছু স্থির কোত্তে পাল্লেম না; সন্দেহই প্রবল।

    রঘুনাথবাবু পুনঃপ্রবেশ কোল্লেন; সঙ্গে একটি লোক। কৃষ্ণযাত্রার আসরে বাসুদেবের যেমন সজ্জা, সেই লোকটির সজ্জাও সেইরূপে। লোকটি দীর্ঘাকার, কৃষ্ণবর্ণ, একহারা, মুখখানা কিছু গোল, চক্ষু ছোট, নাসিকা খর্ব, ঠোঁট পুরু, চোমরা গোঁফ, মাথার ঝাঁকড়া চুল, একখানা হাত একটু ছোট, সে হাতের অঙ্গুলি খুব মোটা মোটা, গণনায় একটি কম, বয়স অনুমান চল্লিশ বৎসর। অঙ্গুলিনির্দেশে আমারে দেখিয়ে দিয়ে ডাক্তার রঘুনাথ সেই লোকটিকে বোল্লেন, “দেখ অনাদি! এই বালকটি কিছুদিন এই বাড়ীতে থাকবে, যেন কোন অযত্ন না হয়; আহারে, শয়নে, ভ্রমণে বালক যেন কোন প্রকার কষ্ট না পায়। তোমার হস্তে এটিকে আমরা সমর্পণ কোল্লেম, আমাদের উপদেশমত কাজ কোল্লে তুমি প্রচুর পুরস্কার পাবে। বড়লোকের ছেলে, এখানে থেকে এ ছেলে যদি আরাম হয়, —বুঝলে অনাদি, —এখানে থেকে এ ছেলে যদি আরাম হয়, আরাম হবেই নিশ্চয়, —যদি বেশ আরাম হয়, তা হোলে তোমাকে আর এখানে চাকরী কোত্তে হবে না। সে কথাই বা কেন, একেবারেই হয় তো চাকরী কোত্তে হবে না; বাড়ী পাবে, পুকুর পাবে, আম-কাঁঠালের বাগান পাবে, দিব্য সুন্দরী একটি বৈষ্ণবীকে বিয়ে কোত্তে পারবে। সেবা-যত্নে এ ছোকরাকে খুসী রাখতে পাল্লে দু-একখানি কোম্পানীর কাগজও পাবে, কোন কষ্টই থাকবে না;— বুঝলে কি না?”

    রঘুনাথের সঙ্গে যে লোকের নবপ্রবেশ, সে লোকটার নাম অনাদি। ঘন ঘন চক্ষের পলক ফেলে। অনাদিকে ঐরূপ উপদেশ দিয়ে, আশ্বাস দিয়ে, আমার দিকে চেয়ে রঘুনাথ বোল্লেন “দেখ ছোক— ঐ দেখ! আবার ভুলে গিয়েছি! কতবার মনে করি, ইষ্টমন্ত্রের মত জপ করি, তবু মনে থাকে না! —ইষ্টমন্ত্র! —হাঁ হাঁ— দেখ হরিদাস! এইখানেই তোমার চিকিৎসা হবে; এই অনাদি ঠাকুরটি অহরহ তোমার সেবায় নিযুক্ত থাকবে। অনাদি ঠাকুর বেশ লোক, তোমাদের মত ছেলেদের আদর-যত্ন কোত্তে অনাদি যেমন জানে, এমন তার এ বাড়ীর একটা লোকও না। অনাদিঠাকুর ব্রাহ্মণ বুঝতে পেরেছ আমার কথাটা? —জাতিতে এই অনাদিঠাকুর একটি ব্রাহ্মণ; ব্রাহ্মণের যত প্রকার কর্তব্য কাৰ্য আছে, অনাদিঠাকুর সব জানে। তুমি বেশ থাকবে, এইখানেই তুমি থাকো, স্বচ্ছন্দে থাকো, বেপরোয়া থাকো; আমরা মাঝে মাঝে এসে দেখে যাব, নূতন ব্যবস্থা কোরে যাব, কোন ভয় নাই।”

    আমার চক্ষে জল এলো, অন্তরে অন্তরে আমি কাঁপছিলেম, এই সময় বাহ্য অবয়বে বিলক্ষণ কম্প! কাঁপতে কাঁপতে নীলাম্বরবাবুর দিকে আমি চাইলেম। হা অদৃষ্টে! নীলাম্বরবাবুও রঘুনাথের কথায় সায় দিলেন। হায় হায়! আর আমি কার মুখ চাই? এ দুটো লোক কে? সত্যই কি ডাক্তার? উঃ! ডাক্তার সেজে এ দুটো লোক আমারে এই বাড়ীতে কয়েদ কোরে রেখে যাচ্ছে! এটা কিসের বাড়ী? কাদের বাড়ী? জনমানবের সঞ্চার নাই, এত বড় বাড়ীতে কেবল এই একটা অনাদি দেখলেম, আর কোন লোকের সাড়া-শব্দ পাওয়া গেল না, মূর্তিও দেখা গেল না। কি ব্যাপার! না না, অবশ্যই লোক আছে। লোক না থাকলে ফটকে পাহারা থাকবে কেন? এতগুলো আলো জ্বোলবে কেন? অবশ্যই লোক আছে। কি রকম লোক তারা?

    কত যে আমি ভাবলাম, কিছুই এখন মনে নাই; সত্য সত্যই আমি কেঁদে ফেল্লেম! বিস্তর মিনতি কোরে নীলাম্বরবাবুকে বোল্লেম, “কেন আপনারা আমারে এই বিজন বাড়ীতে ফেলে যাচ্ছেন? আমি আপনাদের কাছে কি অপরাধ কোরেছি? হাওয়া খেলে শরীর সুস্থ হবে; আপনাদের সঙ্গে আমি হাওয়া খেতে এলেম, আপনারা আমারে ভাল হাওয়া খাওয়ালেন! হাওয়া খাওয়ার সাধ আমার মিটেছে, আর হাওয়া খাব না, দোহাই আপনার, দয়া কোরে আমারে এখান থেকে নিয়ে চলুন! আমার যেন মনে হোচ্ছে, উপর থেকে কে যেন আমারে বোলে দিচ্ছে, এটা রাক্ষসের পুরী; এ পুরীতে কিছুতেই আমি থাকতে পারবো না! দু-দিন থাকলেই হয় তো আমার প্রাণ যাবে! পায়ে ধরি, আপনি আমারে সঙ্গে কোরে নিয়ে চলুন!”

    মৃদুহাস্য কোরে নীলাম্বরবাবু বোল্লেন, “ভয় কর কেন? এখানে তোমার কোন ভয় নাই, এইখানেই তোমার চিকিৎসা হবে। রাজবাড়ীতে বেশী লোকের গোলমাল সেখানে তুমি শীঘ্র শীঘ্র আরাম হোতে পারবে না, এখানে থাকলে শীঘ্রই আরাম হবে, রঘুনাথবাবু যে যে কথা বোল্লেন, সমস্তই সত্যকথা; এখানে তোমার সেবাযত্ন বেশ হবে, ছেলেমানুষী কোরো না, পাগলের মত বোকো না, শান্ত হয়ে থাকো, কেঁদো না, চুপ কর, কাল আবার আমি আসবো।”

    এই সব কথা বোলে ব্যস্তভাবে নীলাম্বরবাবু উঠে দাঁড়ালেন, রঘুনাথ দাঁড়িয়েই ছিলেন, দুজনে একসঙ্গে বেরিয়ে যেতে লাগলেন। “যাবেন না, যাবেন না, যাবেন না! আমারে এখানে একা ফেলে রেখে আপনারা চোলে যাবেন না! দোহাই আপনাদের আমি আপনাদের সঙ্গে যাব, কখনই আমি এখানে থাকবো না! এ জীবনে কষ্ট আমি অনেক ভুগেছি, আবার এই নূতন কষ্টের মুখে আমারে নিক্ষেপ কোরে আপনারা যাবেন না, যাবেন না, যাবেন না!” কাঁদতে কাঁদতে এই সব কথা বোলতে বোলতে ঘরের চৌকাঠের ধার পর্যন্ত আমি ছুটে গেলেম; চৌকাঠ পার হয়ে তাঁরা তখন বাইরে গিয়েছিলেন। অনাদিটা ঘরের মধ্যেই ছিল, দাঁত-মুখ খিচিয়ে দু-হাত দিয়ে সে আমারে জাপটে ধোল্লে! লোকটা রোগা বটে, কিন্তু জোর খুব; ধস্তাধস্তি কোরেও আমি তার হাত ছাড়াতে পাল্লেম না। বাহির থেকে মুখ ফিরিয়ে নীলাম্বরবাবু বোল্লেন, “ঐ কথাই তো কথা, ঐ তো তোমার রোগ; অনেক কষ্ট ভুগেছ, এখানে থাকতে পারবে না, লোকের কথা শুনবে না, ঐ তো তোমার রোগ। সেই জন্যই তো তোমাকে এখানে আনা হয়েছে। ও রকম যদি কর, এ জন্মে তোমার ও রোগ সারবে না। থাকো, গোলমাল কোরো না। অনাদির সঙ্গে লড়ালড়ি কোরো না, আমরা চোল্লেম!”

    ডাক্তারেরা চোলে গেলেন, অনাদি আমারে আটকে রাখলে। ঝাড়া এক ঘণ্টাকাল আমি চীৎকার কোরে কাঁদলেম, ধমক দিয়ে দিয়ে অনাদি আমারে বশে আনবার চেষ্টা কোল্লে, কিছুতেই আমি শান্ত হোতে পাল্লেম না। খানিক পরে সেই ঘরে একটা স্ত্রীলোক এলো তার হাতে একটা চাবীর তাড়া। হেসে হেসে চাবীওয়ালা মুখ-চক্ষু ঘুরিয়ে অনাদিকে বোল্লে, “এই যে গো! এই যে তুমি দিব্য একটি নূতন শীকার পেয়েছ! বেশ হয়েছে; সদরদরজায় চাবী পোড়েছে, দরোয়ান এসে আমার হাতে এই চাবীর তাড়াটা দিয়ে গেল। ছেড়ে দাও, শীকারটিকে অমন কোরে ধোরে রেখেছ কেন? ছেড়ে দাও! আর পালাবার উপায় নাই।”

    মানুষের গন্ধ পেয়ে যে সকল বিষধর সর্প ফণা তুলে গর্জন করে, ওঝাদের কাছে সেই সকল সৰ্প যেন কেঁচো হয়। এখানেও আমি সেই রকম দেখলেম। অনাদিঠাকুর এতক্ষণ আমার উপর তর্জন-গর্জন কোচ্ছিল, সেই স্ত্রীলোকের দুটি একটি কথা শুনে একেবারে ঠাণ্ডা; আমারে ছেড়ে দিয়ে কতই যেন ভাল-মানুষ হয়ে, সেই স্ত্রীলোকের সঙ্গে রহস্যালাপ আরম্ভ কোল্লে। আমি সেই অবসরে ধীরে ধীরে পাশ কাটিয়ে বিছানার উপরে গিয়ে বোসলেম। হৃদয় অত্যন্ত ভারী, মনে যেন কিছুই নাই, কিছুই যেন চিন্তা কোত্তে পাচ্ছি না, সম্মুখে আলো আছে, তবুও যেন আমি চারিদিকে অন্ধকার দেখছি, তখন আমার এই রকম অবস্থা। ভাগ্যক্রমে আপনা আপনি আমি এক একটা প্রবোধ প্রাপ্ত হই; যতই কেন মহাবিপদ উপস্থিত হোক না, তাদৃশ বিপদে আমি বড় একটা অবসন্ন হই না। বাল্যাবধি পরমেশ্বরে আমার অচল বিশ্বাস; যা যখন হবার হয়, নিশ্চয়ই তা তখন হয়, যা হবার নয়, তা কখন হয় না, সংসারে মানুষের ভাগ্যে যা যখন ঘটে, সমস্তই সেই ইচ্ছাময়ের ইচ্ছা, এইরূপে আমার ধারণা; সেই ধারণাই আমার প্রবোধ। সংসারচক্রের এক এক আবর্তনে আমি এক এক প্রকার অবস্থা প্রাপ্ত হোচ্ছি; পাটনায় এই এক নূতন অবস্থা! এ অবস্থা আমার চিরদিন থাকবে না, দয়াময় অবশ্যই একদিন আমার প্রতি সদয় হবেন, সেই বিশ্বাসে, সেই আশ্বাসে আপন মনে আমি এক প্রকার সান্ত্বনা পেলেম। গৃহমধ্যে অনাদি আর সেই চাবীওয়ালী। অলক্ষিতে সেই যুগলমূর্তির দিকে কটাক্ষপাত কোরে আমি তাদের রহস্যালাপ শ্রবণ কোত্তে লাগলেম।

    অনাদি বোল্লে, “তুই ভাই আজ আমাকে যে হাসান হাসিয়েছিস জন্মেও আমি তেমন হাসি হাসি নাই; লোকেরা যখন চুপচাপ কোরে থাকে, তোর হাসিটা তখন খুব বাড়ে; তাই চিত্তোরি। তুই আমার প্রাণের সহচরী। তুই হাসিস, তুই হাসাস, তাতেই আমি বেঁচে থাকি। তোর হাসি যেন বরফের মত ঠাণ্ডা; হাটের কলরবের আগুনে আমার প্রাণ যখন জ্বোলে পুড়ে যায়, সেই সময় তুই হাসির ফোয়ারা খুলে দিস, জ্বালা-যন্ত্রণা সব আমি ভুলে যাই, হৃদয় জুড়িয়ে যায়; শুভক্ষণে বিধাতা তোর সঙ্গে আমার— বুঝলি চিতোরি,— তোর সঙ্গে আমার মিলন কোরে দিয়েছেন, জন্মেও আর ছাড়াছাড়ি হবে না। তুই বুঝলি? তুই আমার মাথার চুল, মুখের গোঁফ, চক্ষের তারা, বুকের মাংস, গায়ের লোম, তুই আমার সব। সেই একদিন তারা যখন—”

    এই পর্যন্ত বোলতে বোলতে অনাদিঠাকুর হঠাৎ থেমে গেল। যতগুলি কথা তার মুখে উচ্চারিত হলো, তার প্রকৃত তাৎপৰ্য আমি হৃদয়ঙ্গম কোত্তে পাল্লেম না; অনেক কথার অর্থ নাই; বুঝলেম, কেবল তাদের দুজনের প্রেমসম্বন্ধ। স্ত্রীলোকটির নামও পাওয়া গেল, নামটা খুব নূতন বটে; নতুন পুরাতন বিচার করা অনাবশ্যক, নামটি কিন্তু পাওয়া গেল; নাম হোচ্ছে চিতোরী। আমার দিকে চেয়ে, পুনরায় চিতোরীকে সম্বোধন কোরে অনাদিঠাকুর বোল্লে, “দেখ চিতোরী! সেই একদিন তারা যখন সেই রকম বাড়াবাড়ি কোচ্ছিল না, থাক সে কথা—” আবার এইখানে থেমে, আবার আমার দিকে চেয়ে একটু একটু চুপি চুপি বোলতে লাগলো, এই নূতন ছোকরাটা দেখছি অকালপক্ক; ভূতে পেয়েছে; সেই যে দুটি বাবু এসেছিল, ছোকরাকে তারা আমার হাতেই সোঁপে দিয়ে গেল, সেবা কোত্তে বোলে গেল; হো হো হো! কিন্তু ভাই চিতোরী! সেবা যদি তুই কোত্তে পারিস, খুব বড় একটা দাঁও মারা যাবে। দেখিস কিন্তু, কোন রকমে যেন না পালায়! সব সময় আমি—”

    এই সময় কে যেন কারে খুব চীৎকার কোরে ডাকলে। কাণ খাড়া কোরে শুনে, তাড়াতাড়ি চোলতে চোলতে অনাদিঠাকুর তাড়াতাড়ি বোলে গেল, “থাক তুই এইখানে, যেমন যেমন বন্দোবস্ত কোত্তে হয়, করিস; সব তুই জানিস, আমি যাই; আবার কে কোথায় কি হাঙ্গামা বাধিয়েছে, থামাই গিয়ে; ভাল ঝকমারীতেই পোড়েছি! রাত্রেও দু-দণ্ড স্থির হবার যো নাই।”

    অনাদিঠাকুর কোথাকার হাঙ্গামা থামাতে গেল, চিতোরী এসে আমার বিছানার উপর বোসলো; গা ঘেঁষে বোসলো না, হাতখানেক তফাতে। যে সুরে চিতোরী প্রথমে অনাদির সঙ্গে কথা কোয়েছিল সে সুরটা বদল কোরে আর এক রকম নূতন সুরে কি গোটা কতক কথা আমারে বোল্লে, আমার মন তখন অন্যদিকে ছিল, অর্থ বুঝলেম না, উত্তর দিতেও পাল্লেম না; চিতোরী আমার মুখপানে চেয়ে রইলো। আমি তখন আর একখানা ভাবছিলেম; অনাদিঠাকুর হাঙ্গামা থামাতে গেল, কিসের হাঙ্গামা? এ বাড়ীতে কি হাঙ্গামা হয়? কি রকম জায়গা? যে একটা চীৎকার শুনলেম, সেটাও কেমন বিকট। অনাদি ইতিপূর্বে একবার বোলেছিল, “হাটের কলরব”, এখানে কি হাট আছে? রাত্রেই কি হাট বসে? একটা লোকের চীৎকারেই কি হাট হয়? বোধ হয়, সে রকম হাট না হবে। কেন না, অনাদি বোলেছিল, “হাটের কলরবের আগুন”, সে আগুন আবার কি প্রকার? ভাল হাওয়া খেতে বেরিয়েছিলেম, হাওয়ার বদলে আগুনের ভিতরে এসে পোড়েছি; সত্যই আগুন! শরীর যেন সেই আগুনে দগ্ধ হয়ে যাচ্ছে!

    এই সব আমার মনের কথা। মনের কথা মনে মনে, মুখে কিছুই ফুটলো না। মুখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে চিতোরী সেই সময়ে আবার বোল্লে, “কথা কও না কেন? বোবা না কি? অত কথা জিজ্ঞাসা কোল্লেম, খাতির নাই, কোথাকার ছোকরা? এটা বুঝি তোমার শ্বশুরবাড়ী? কথা কোইতে বুঝি লজ্জা হয়? পাঠশাল কখনো দেখেছো? পাঠশালে বজ্জাতী কোল্লে ঘোড়া বেত পিঠে পড়ে, নাড়ুগোপাল হোতে হয়, জানো সে সব শাস্তি? এটাও একটা পাঠশালা; এখানেও সেই রকম শাস্তি আছে, এখানেও সেই রকম হবে; কথা শোনো, কথা কও, রাত্রি অনেক, খাবে কি? পেট তোমার কি চায়? পেট তোমার সঙ্গে আছে, না আর কোথাও রেখে এসেছো? কথা কও, উত্তর কর, বল, রাত্রে তুমি খাবে কি?”

    অনাদি চোলে যাবার পর চিতোরী প্রথমে আমারে যে সব কথা বোলেছিল, সে সব কোন ভাষার কথা, আমি বুঝি নাই, চিতোরী নামটা যেমন আমার কর্ণে নূতন, চিতোরীর ভাষাও সেই রকমের নূতন বোধ হয়েছিল। চিতোরী কি? রাজপুতানার চিতোর রাজ্যের মেয়েমানুষেরা কি চিতোরী নামে পরিচিতা হয়? এ চিতোরীর বাড়ী কি তবে চিতোরে?—তাই যেন বোধ হয়।

    চিতোরীর প্রথমবারের কথাগুলোও বোধ হয় চিতোরী ভাষা; এবারের কথাগুলো হিন্দী বাঙ্গলা মিশানো? জিহ্বার একটু একটু আড়ষ্ট আছে, এইমাত্র তফাৎ।

    কথাগুলো রুক্ষ রুক্ষ; চিতোরী কিন্তু দেখতে দিব্য সুশ্রী। তাদৃশী সুশ্ৰী রমণীর এ প্রকার কর্কশ কথা, এটাও আমার আশ্চৰ্য বোধ হলো। সুস্থিরনয়নে চিতোরীর অস্থিরনয়ন দর্শন কোরে আমি তার পূর্ব-প্রশ্নের উত্তর কোল্লেম, “রাত্রে আমি কিছুই খাব না, কিছুমাত্র ক্ষুধা নাই; তোমার যদি অন্য কাৰ্য থাকে, স্বচ্ছন্দে চোলে যাও, আমারে একটু বিশ্রাম কোত্তে দাও; আমার শরীর অসুস্থ, মন অসুস্থ, আমি অতিশয় পরিশ্রান্ত, অত্যন্ত ক্লান্ত, কিছুই আমি খাব না।”

    চক্ষু ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে মুচকে মুচকে হেসে, একখানা হাত নেড়ে চিতোরী বোল্লে “তা হবে না যাদুধন! খেতেই হবে, এখানকার নিয়ম সে রকম নয়; মানুষকে আরাম করবার জন্য এখানে আনা হয়। তুমি তো তুমি, তোমার মত কত ছোকরা, কত ছুকরী, কত পুরুষমানুষ, কত মেয়েমানুষ এখানে বাস করে, সকলকেই দুবেলা পেট ভোরে খেতে হয়। সহজে না খেলে, জোর কোরে খাওয়ানো হয়, আমি তোমাকে ভাল ছেলে দেখছি। সেই জন্যই ভালকথা বোলছি, ভালমুখে জিজ্ঞাসা কোচ্ছি, কি খেতে ইচ্ছা হয়; কি খাবে বল, আমি এনে দিব, না যদি বল, অনাদিঠাকুরের যে রকম ইচ্ছা হবে, সেই রকম জিনিস তোমাকে খেতে হবে— খেতেই হবে।”

    বড় দায়েই আমি ঠেকলেম। ক্ষুধা না থাকলেও খেতে হবে, না খেলে এরা জোর কোরে খাওয়াবে, কথা না শুনলে বেত লাগাবে, চিতোরী এই রকম ভয় দেখালে। চিতোরী মেয়েমানুষ, চিতোরীর মুখে যখন ঐ রকম কথা, তখন না জানি, অনাদিঠাকুর আরো কত উগ্রমূর্তি ধারণ কোরবে। সেটা ভাল নয়। মনে মনে এই রকম আলোচনা কোরে চিতোরীকে আমি বোল্লেম “একান্তই তোমরা যদি না ছাড়, এখানে যদি দুষ্প্রাপ্য না হয়, তবে আমারে কিঞ্চিৎ দুধ আর একপাত্র জল দিও, তাই দিলেই ঠিক হবে, তাই খেয়েই আমি শুয়ে থাকবো। চিতোরী উঠলো না; একটু পরে অনাদি এলো; আমার মুখের কথাগুলি চিতোরীর মুখে অনাদি শ্রবণ কোল্লে। ব্যবস্থা মঞ্জুর। অল্পক্ষণ পরে দুধ-জল পান কোরে আমি শয়ন কোল্লেম। কি বোলবো? —প্রকৃতই হোক কিম্বা কল্পিতই হোক, রহস্যালাপের ভাবে আমি বুঝলেম, এরা স্ত্রী-পুরুষ,—দম্পতী; ঘরের দরজায় চাবী দিয়ে অনাদিদম্পতি নিজস্থানে চোলে গেল।

    সে সময় যদি আমার নিদ্রা আসতো, তবে এক প্রকার ভালই হোতো; তা হলো না; তেমন অবস্থায় শীঘ্র নিদ্রা হয়ও না। পাটনায় আসা অবধি এই দিনের হাওয়া খাওয়ার ব্যবস্থা পর্যন্ত আলোচনা কোত্তে কোত্তে প্রায় এক ঘণ্টা পরে নিদ্রা এলো, আমি ঘুমালেম। শেষরাত্রে কিম্বা ঊষাকালে বহুকণ্ঠমিশ্রিত একটা ভয়ঙ্কর কলরব শুনে আমি জেগে উঠলেম। বিভীষণ চীৎকার! চীৎকারধ্বনিতে অত বড় বাড়ীখানা যেন ভূমিকম্পনের মত কেঁপে উঠলো! কত দূর পর্যন্ত সেই চীৎকারধ্বনির প্রতিধ্বনি হোতে লাগলো। অনাদির একটা কথা সার্থক বোধ হলো, হাটের কলরব;— সত্যই যেন হাটের কলরব! অনুমান কোল্লেম, সত্যই এখানে হাট আছে।

    পুনরায় সেই প্রকার কলরব! বোধ হলো যেন গগনভেদী চীৎকারধ্বনি! রুদ্ধদ্বার শিবমন্দিরমধ্যে চীৎকার কোল্লে যেমন গম্ভীর আওয়াজ হয়, মধ্যে মধ্যে সেইরূপ ভয়ঙ্কর ভয়ঙ্কর আওয়াজ আমার শ্রবণকুহরে প্রবেশ কোত্তে লাগলো। রাত্রি দুই প্রহরের পর আমার নিদ্রা হয়েছিল, ঊষাকালে ভীম চীৎকারে জাগরণ। যতক্ষণ আমি ঘুমিয়েছিলেম, ততক্ষণের মধ্যে সে প্রকার চীৎকার হয়েছিল কি না, বোলতে পারি না; জাগরণ কোরে অবধি দুই তিনবার সেইরূপে হৃদয়কম্পন, গৃহ কম্পন, ভীষণ চীৎকারধ্বনি আমি শুনলেম! কোথা থেকে সেই সকল চীৎকার আসছে, কারা চীৎকার কোচ্ছে, ঠিক নির্ণয় কোত্তে পাল্লেম না; অনুমানে বোধ হলো, বাড়ীর মধ্যেই চীৎকার; শত শত লোকের চীৎকার! দেশে বিদেশে, অনেক স্থানে আমি ভ্রমণ কোরেছি, চীৎকারও অনেক প্রকার শুনেছি, কিন্তু এমন চীৎকার কখনো আমার কর্ণে প্রবেশ করে নাই। একবার মনে হয় মানুষে, একবার মনে হয় জানোয়ার। কত লোক এ বাড়ীতে থাকে, কত লোক আছে, কেন আছে, তারা এখানে কি করে, কেন তারা ঐ রকম রণরঙ্গ-উত্তেজন সিংহনাদ করে, তাও আমি বুঝলেম না। যে ঘরে আমি ছিলেম, এই সময় সেই ঘরের দ্বার উদ্ঘাটিত হয়ে গেল।

    প্রবেশ কোলে অনাদি, চিতোরী আর একজন দীর্ঘাকার লোক। নূতন লোকের পরিধান খুব চোস্ত চুড়ীদার পায়জামা, ফরাসীছিটের চিত্র-বিচিত্র বুকবন্ধ চাপকান, মাথায় একটা সবুজবর্ণের বাধা পাগড়ী, হাতে একগাছা মনুষ্যপ্রমাণ প্রকাণ্ড যষ্টি। লোকটার মুখ দেখলে ভয় হয়। মুখখানা চৌগোঁফফা; বড় বড় রক্তবর্ণ দুই চক্ষু।

    তখন প্রভাত। কিছু পূর্বেই আমি জেগেছিলেম, চীৎকার শুনে ভয় পেয়েছিলেম, নিশ্চয়ই আমার চক্ষে আতঙ্কলক্ষণ ছিল, নূতন লোকটা আমার আপাদমস্তক রক্তচক্ষে নিরীক্ষণ কোল্লে; অনাদির দিকে চেয়ে, গভীরগৰ্জনে বোল্লে, “ঠিক বটে! কিন্তু ঠাণ্ডা আছে। চক্ষু দেখে বোধ হয়, রক্ত খুব গরম! তোমরা এই বালককে ঠাণ্ডা জিনিষ খেতে দিও, পাঁচ সাতটা ডাব নারিকেল পুকুরের পাঁকের ভিতর পুতে রেখে, সাত আট ঘণ্টা পরে তুলে সেই সকল ডাবের জল ঘণ্টায় ঘণ্টায় খাইয়ে দিও, আট দশ কলসী ঠাণ্ডা জলে স্নান করিও, আহারের ব্যবস্থা খাতাপত্রে যেরূপ লেখা আছে, সেইরূপে চোলবে। খবরদার! নূতন নূতন এ ছোকরাকে ঘরের বাহিরে নিয়ে যেয়ো না; সকলের পক্ষে যে রকম ব্যবস্থা। এ ছোকরার পক্ষে সে রকম ব্যবস্থা হবে না, ডাক্তারমহাশয়েরা সেই কথা বোলে গিয়েছেন; সে রকম ব্যবস্থা হবে না কিম্বা এ ছোকরার পক্ষে খাটবে না, সেটা আমি বুঝি নাই, ডাক্তারদুটিকে সে কথা আমি জিজ্ঞাসাও করি নাই। ছেলেটির বয়স কম, চেহারাও ভাল, কিন্তু রক্ত খারাপ। এখন বাহিরে বেড়াবার সময় নয়, যখন সময় হবে, সময় যখন আমি ঠিক বুঝবো, তখন ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে উচিতমত বন্দোবস্ত করা যাবে।”

    ব্যবস্থা বন্দোবস্তের এইরূপ উপদেশ দিয়ে, যষ্টিধারী নূতন লোক পুনর্বার আমার দিকে চাইতে চাইতে ঘর থেকে বেরুলো; ভাবে আমি বুঝলেম, সে লোকের ক্ষমতা কিছু অধিক; এখানে সেই লোকের প্রভুত্ব চলে, হুকুম চলে, বাসিন্দালোকের আহারাদির ব্যবস্থা করার ভারও সেই লোকের উপর।

    লোক চোলে গেল; অনাদি থাকলো, চিতোরীও থাকলো। আমার মাথার উপর খিলানকরা ছাদ, সেই ছাদের উপর গুম গুম কোরে অনেক মানুষের পায়ের শব্দ হোতে লাগলো। মানুষেরা যেন লাফিয়ে লাফিয়ে ছুটাছুটি কোচ্ছে কিম্বা আহ্লাদে উন্মত্ত হয়ে নৃত্য কোচ্ছে, সেইরূপ শব্দ। ভয় আছে, সন্দেহ আছে, বিস্ময় আছে, সেই তিন ভাবের মধ্যবর্তী হয়ে অন্যদিকে আমি জিজ্ঞাসা কোল্লেম, “ও সকল কিসের শব্দ! আমার মাথার উপর মানুষেরা ও সব কি কোচ্ছে? একটু আগে দুই তিনবার আমি ভয়ঙ্কর ভয়ঙ্কর চীৎকার শব্দ শুনেছি, একসঙ্গে বহু লোকের চীৎকার। কারা এখানে তেমন কোরে চীৎকার করে? কেন করে? বাড়ীতে কারা থাকে? বাড়ীখানা কার? এ বাড়ীতে কি হয়?”

    “কিসের চীৎকার, তাও বুঝি তোমাকে বোলতে হবে? কিছু‍ই বোলতে হবে না; থাকো কিছুদিন এখানে, থাকতে থাকতে সমস্তই জানতে পারবে; থাকতে থাকতে তোমাকেও এই রকম কোত্তে হবে। জায়গাটা বড় মজার জায়গা। দুনিয়ার মজা দেখতে যাদের সাধ হয়, তারাই এই বাড়ীতে আসে। দেখে যায়, শিখে যায়, ঐ রকম নেচে কুঁদে আমোদ করে যায়, শেষকালে আরাম হয়ে, দূরস্ত হয়ে ঘরে চোলে যায়।” —আমার বিস্ময়সূচক প্রশ্নে কৌতুকে উপরপড়া হয়ে চিতোরী এই সকল কথা বোলে উঠলো।

    কি উৎপাত! জিজ্ঞাসা কোল্লেম অনাদিকে, ব্যঙ্গ কোরে উত্তর কোল্লে, চিতোরী। উত্তরের কোন কথার মর্ম আমি বুঝে উঠতে পাল্লেম না; রাত্রে চিতোরীকে এক রকম দেখেছিলেম, এখন দেখলেম আর এক রকম। চিতোরী আমার সঙ্গে ঐ রকম পরিহাস কোত্তে লাগলো, অনাদিঠাকুর মুখে টিপে টিপে হাসতে আরম্ভ কোল্লে। আমি বিরক্ত হোলেম; আর কোন কথা আমি তখন জিজ্ঞাসা কোল্লেম না, মাথা হেঁট কোরে মৌনভাবে বোসে থাকলেম।

    রৌদ্রের তেজ বৃদ্ধি হবার অগ্রেই সেখানকার লোকেরা আমারে বাসী জলে স্নান করিয়ে দিলে, তত শীঘ্র পাঁকে পোতা হলো না, বড় বড় দুটো তাজা ডাবের শীতল জল আমারে খাইয়ে দিলে, উদর যেন পরিপূর্ণ হয়ে গেল। ভোরে একটু ক্ষুধাবোধ হয়েছিল, এখন আর কিছুমাত্র ক্ষুধা থাকলো না। অনাদিঠাকুর ঘণ্টাখানেক পরে আমার আহারসামগ্রী এনে হাজির কোল্লে; আমি বোল্লেম, “খাব না”, অনাদিঠাকুর সে কথা শুনলে না, কাজে কাজে যৎকিঞ্চিৎ মুখে দিয়ে বড় বড় ঢেঁকুর তুলে আমি আচমন কোল্লেম। আমার আচমন করা দেখে অনাদি চিতোরী উভয়েই যেন একটু চোমকে গেল। অনাদি চাইলে চিতোরীর মুখের দিকে, চিতোরী চাইলে অনাদির মুখের দিকে; শেষকালে দুইজনই চাইলে আমার মুখের দিকে। আমি ভ্রূক্ষেপ কোল্লেম না।

    এই রকমে আট দিন। এক ভাব। প্রথম রজনী প্রভাতে যেমন চীৎকার আমি শুনেছিলেন, যে রকম শব্দ পেয়েছিলেম, অবিচ্ছেদে ঐ আট দিন ঠিক সেই রকম শুনলাম। বোলতে হয় সেই রকম। বোল্লেমও সেই রকম; বাস্তবিক দিন দিন বরং উচ্চমাত্রার শ্রীবৃদ্ধি! একদিন জিজ্ঞাসা কোরে চিতোরীর মুখে পরিহাস শুনেছিলেম, অনাদিকে নিস্তব্ধ দেখেছিলেম, তদবধি আর কোনদিন আমি সে সকল উপসর্গের কারণ জিজ্ঞাসা করি নাই;— জিজ্ঞাসা করি নাই বটে, কিন্তু মনে মনে ভয়বিস্ময়ের অবিচ্ছেদ ক্রীড়া। সে সকল ক্রীড়া কেবল আমিই অনুভব কোল্লেম।

    অষ্টম রজনীতে বিশ্রামের জন্য যখন আমি শয়ন কোল্লেম, গৃহদ্বারে যখন চাবী বন্ধ হলো, সেই সময় আমার মনের সঙ্গে আমার প্রাণের কথা। রাজা মোহনলাল ঘোষ বাহাদুর আমারে পাটনায় আনালেন, ফলবাগানে যা কিছু বলবার, তা আমারে বোল্লেন, তার পর তিনবার তিন জন লোক এসে আমারে পরীক্ষা কোরে গেল। পরীক্ষার পর রাজাবাহাদুর একদিন এক সভা কোল্লেন, সভায় আমারে বিলক্ষণ অপ্রস্তুত হোতে হলো। লোকেরা জিজ্ঞাসা কোল্লে আমার কষ্টের কথা, আমিও বার বার বোল্লেম আমার কষ্টের কথা। বার বার কেহ যদি ঘুরিয়ে ফিরিয়ে এক কথা কয়, লোকে তারে পাগল মনে করে; রাজসভার লোকেরা আমারে পাগল বিবেচনা কোল্লে। ডাক্তার বোলে যারা পরিচয় দিয়েছিল, তারা আমার চিকিৎসা করবার ব্যবস্থা দিলে। চিকিৎসা! —কিসের চিকিৎসা;— তারা ভাবলে আমি পাগল; যে ঔষধে পাগল ভাল হয়, সেই রকম ঔষধ তারা আমার জন্য ব্যবস্থা কোরবে, এইরূপ আভাষ দিলে। তার পর দুটি ডাক্তার আমার কাছে গিয়ে নূতন রকম আত্মীয়তা জানালে; আমারে সন্ধ্যাকালের হাওয়া খাওয়াবে বোলে ফাঁকি দিয়ে এই বাড়ীতে নিয়ে এলো। আবার এসে দেখে যাবে বোলে, অনাদির হাতে আমারে সোঁপে দিয়ে হাসতে হাসতে তারা প্রস্থান কোল্লে; আর এলো না। নীলাম্বর আর রঘুনাথ।

    কোথায় তারা আমারে রেখে গেল? লক্ষণে যে রকম আমি বুঝতে পাচ্ছি, লাফালাফি, হাঁকাহাঁকির যে রকম ঘটা, তাতে আমার যেন মনে হোচ্ছে, এ বাড়ীতে যারা আছে, তারা সকলেই পাগল! এটা পাগলাগারদ! ধূর্ত ডাক্তারেরা ধূর্ততা কোরে আমারে বাতুলালয়ে রেখে গিয়েছে! আমি পাগল! হায় হায়! লোকের চক্রেই আমি পাগল। ভাঁড়ের গল্পে শুনেছিলেম, “দশচক্রে ভগবান ভূত!” মোহনলালের ডাক্তারেরা পাঁচজন, পঞ্চচক্রে আমিও এক রকম ভূত হয়েছি! সহজ মানুষে যদি পাগল হোতে পারে, তবে ভূত হওয়া বড় আশ্চৰ্য নয়! আমি ভূত।— আমি পাগল!— পাগলা গারদে আমি বন্দী! লোকের কুচক্রে কি যে হোতে পারে না, বিশ্বাসী জ্ঞানবান পণ্ডিতেরাও সে তত্ত্বের মীমাংসা কোত্তে অক্ষম।

    আমি পাগল! মানুষের চক্রান্তেই আমি পাগল! পর্যায়ে পর্যায়ে যে যে স্থানে যতপ্রকার বিপদের মুখে আমি নিক্ষিপ্ত হয়েছি, মানুষের চক্রান্তই সেই সমস্ত বিপদের মূল। আমার সম্বন্ধে একটিও দৈব বিপদ নয়, পূর্ণবিশ্বাসে এ কথা আমি বোলতে পারি। এখন আমি পাগল;— পাটনার পাগলাগারদে বন্দী। অমরকুমারী কি আমার এ অবস্থা জানতে পাচ্ছেন? অমরকুমারী এখন কোথায়!— ঢাকায় কিম্বা মাণিকগঞ্জে কিম্বা মুর্শিদাবাদে? আমি কোথায় আছি, অমরকুমারী কি তা জানেন?

    এই সব কথা ভাবতে ভাবতে আর একটা বড় কথা আমার মনে পোড়লো। ত্রিপুরায় জয়শঙ্করবাবু আমার বন্ধুবান্ধবগণকে চিঠি লেখার সংকল্পের পথে প্রবল বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন, পাটনায় এসে সেই বাধা অতিক্রম কোরে, সাতখানি পত্র লিখে ডাকযোগে ভিন্ন ভিন্ন স্থানে আমি প্রেরণ কোরেছি। যাঁর যাঁর নামে শিরোনাম, নিশ্চয়ই তাঁরা যথা সময়ে সেই সকল পত্র প্রাপ্ত হয়েছেন। উত্তরপ্রাপ্তির ঠিকানা আছে, রাজা মোহনলাল ঘোষ বাহাদুরের বাটী,— পাটনা। অমরকুমারী যদি মুর্শিদাবাদে থাকেন, শান্তিরামের মুখে অথবা মণিভূষণের মুখে আমার বর্তমান ঠিকানা তিনি জানতে পেরেছেন — অবশ্য জানতে পেরেছেন; জানতে পেরে এখন তিনি কি মনে কোচ্ছেন? যে “ভাব” তাঁর মনে উদয় হয়েছে, মনে মনে আমিও তা জানতে পাচ্ছি। কেবল জানামাত্র, ফলাংশে নূতন গোলমাল।

    পত্রগুলি যাঁরা পেয়েছেন, তাঁরা অবশ্যই উত্তর লিখে পাঠাবেন। কোথায় পাঠাবেন। রাজা মোহনলালের বাড়ীতে, রাজা মোহনলাল দয়া কোরে সে সকল পত্র আমার কাছে পাঠাবেন, সে আশা নাই;— পত্রগুলি আমি পাব না। পাগলাগারদে আমি কয়েদ আছি, ডাকঘরের লোকেরা এ অদ্ভুত ঠিকানা জানবে না, এখানে এসে আমার সঙ্গে দেখাও কোরবে না, পত্রগুলি আমি পাব না। বন্ধুলোকগুলির শারীরিক মানসিক শুভ সমাচার, অমরকুমারীর শারীরিক মানসিক অবস্থাও আমি জানতে পাব না। তাঁদেরও উদ্বেগবুদ্ধি হবে, আমারও উদ্বেগ দিন দিন বাড়তে থাকবে। দ্বিতীয়বার পত্র-লিখনেরও আর এখন আমার সুবিধা নাই। কতদিন যে এই রকমে যাবে, গণনা কোরে তার সীমাও আমি নিরূপণ কোত্তে পাচ্ছি না।

    বাতুলালয়ে অষ্টম রজনীতে আমার মনোমধ্যে এই সকল ভাবনা সমূদিত। এই সকল ভাবনার সঙ্গে হঠাৎ একটা তর্ক আমার মনে উঠলো। পূর্বে আমি শুনেছিলেম, যে সকল লোককে সরকারী লোকেরা পাগলাগারদে রাখে, সে সকল লোকের চিকিৎসা নতুন প্রকার। গারদের লোকেরা পাগলগুলিকে ধরে, মারে, বাঁধে, যন্ত্রণা দেয়, ভয় দেখায়, ফস্ত খোলে, এক এক জনের সম্মুখে পুতিগন্ধযুক্ত ঘৃণাকর বস্তু রেখে দেয়;— আরো কত কি করে, সব কথা আমি শুনি নাই। এরা আমারে কয়েদ কোরে রেখেছে, একজন পুরুষ আর একজন স্ত্রীলোক নিত্য নিত্য আমার সেবা-শুশ্রূষা কোচ্ছে, একজন একদিন এসে তদারক কোরে গিয়েছে, চিতোরী, মধ্যে মধ্যে ঠাট্টাতামাসার কথা কয়, এই পর্যন্ত; তা ছাড়া কেহই আমার উপর কোন প্রকার দৌরাত্ম্য করে না। কেন করে না, তাও আমি মনে মনে এক রকম অনুমান কোল্লেম। এখন সেটা বলা হবে না; ভাগ্যক্রমে কোন লোকের অনুগ্রহে যখন আমি এই পিশাচপুরী থেকে খালাস পাব, তখন সে অনুমানের কথাটা সকল লোককে জানাবো।

    রাত্রের কার্য নিদ্রা। আমার কার্য চিন্তা। বিশেষতঃ এই গারদঘরে। নানা দুর্ভাবনায়, দু-একটা সু-ভাবনায় সমস্ত রজনী আমি জাগরণ কোল্লেম। রজনী অবসানে। প্রভাতে—ঠিক প্রভাতে না, অথবা অল্পে অন্ধকার থাকতে দরজার চাবী খুলে এক জোড়া নর-নারী গৃহমধ্যে প্রবেশ কোল্লে; অনাদি আর চিতোরী। নিত্যনিয়মিত কাজগুলি সমাপ্ত হবার পর তারা দুজনে আমার নিকটে এসে বোসলো। অনাদিঠাকুর সত্য সত্য চিতোরীর স্বামী কি না, জানি না, কিন্তু আমি অনুমান কোরেছি স্বামী; অনুমানমতেই পূর্বে পরিচয় দিয়েছি “দম্পতি।” স্বামীর মুখপানে চেয়ে চিতোরী একটু মুচকে মুচকে হেসে আমার দিকে ফিরে বোল্লে, “হরিদাস।— এই দেখ, আমি তোমার নাম পেয়েছি! — হরিদাস! আজ তোমারে একটা সুসংবাদ দি! — আজ বৈকালে এক জায়গায় তোমার নিমন্ত্রণ হবে; সেখানে তুমি অনেক রকম নূতন নূতন মজা দেখতে পাবে।” এই কটী কথা বোলে, উঠে দাঁড়িয়ে তিনবার করতালি দিয়ে, কতই যেন উল্লাসে চিতোরী আপনা আপনিই বোল্লে, “ভারী মজা! ভারী মজা! ভারী মজা!”

    কতই যেন আহ্লাদে ঐ কথাগুলি বোলে, বেশ আড়খেমটা তালে, চিতোরী সেইখানে হেলে দুলে নৃত্য আরম্ভ কোরে দিলে! অনাদিঠাকুর একটিও কথা বোল্লে না, আমার মুখের দিকে চাইতে চাইতে চঞ্চলভাবে উঠে দাঁড়ালো; উভয়েই একসঙ্গে বেরিয়ে গেল। আর একবার তারা এসেছিল; আমার আহারের আয়োজন কোরে দিয়ে খানিকক্ষণ সেখানে থাকলো, আমি আহার কোল্লেম; প্রাণধারণের জন্য আমার আহার করার অনিচ্ছায় যৎকিঞ্চিৎ খাদ্যসামগ্রী গ্রহণ কোরে বিছানার ধারে আমি বোসলেম। পুনর্বার পূর্বরূপ করতালি দিয়ে, কোমর দুলিয়ে দুলিয়ে পূর্বরূপ স্বরেই চিতোরী তিনবার বোল্লে “ভারী মজা! ভারী মজা! ভারী মজা!” কিছুই ভাব বুঝতে না পেরে আমি ভাবতে লাগলেম, না জানি, কি মজাই এরা আমারে দেখাবে!

  • সোনার ঘণ্টা

    সোনার ঘণ্টা

    অনিল ভৌমিক

    [book-name]

    প্রথম প্রকাশ : শুভ দীপাবলী, ১৩৮৬; নভেম্বর, ১৯৭৯।

    অষ্টম মুদ্রণ : শুভ অক্ষয় তৃতীয়া, ১৩৯৪; মে, ১৯৮৭।

    প্রকাশনায়: সুপ্রিয়া পাল; উজ্জ্বল সাহিত্য মন্দির, সি-৩, কলেজ স্ট্রীট মার্কেট, কলিকাতা, ৭০০০০৭ (প্রথম তলা)। প্রতিষ্ঠাতা: শরচ্চন্দ্র পাল; কিরীটিকুমার পাল।

    মুদ্রাকর: সন্তোষী প্রিণ্টার্স, তাপস সাঁতরা; ১৪৩, গুরুপ্রসাদ চৌধুরী লেন, কলিকাতা-৯।

    প্রচ্ছদচিত্র : নারায়ণ দেবনাথ; পরিকল্পনায় : দিব্যদ্যুতি পাল।

    * * *

    সোনার ঘণ্টা প্রসঙ্গে

    ঘণ্টা সোনার কি রূপোর কি নেহাৎই তামার বা পিতলের, সেটা কোন বিচারের কথাই নয়। আসল যা হ’ল বিচার্য তা হচ্ছে ঘণ্টার ধ্বনি। সে ধ্বনি দিয়েই ঘণ্টার সত্যকার পরিচয়।

    ‘সোনার ঘণ্টা’ নামটির দরুণ যে কথাগুলি বলবার সুযোগ পেলাম শ্রীঅনিল ভৌমিকের সেই কিশোর উপন্যাসটি সম্বন্ধে সেগুলি বিশেষভাবে খাটে। বাংলা ভাষায় ছোটদের জন্য লেখা বই-এর সংখ্যা ইদানীং যথেষ্ট বাড়লেও সত্যিকার সার্থক লেখার দেখা খুব কমই মেলে। ‘সোনার ঘণ্টা’ তার মধ্যে একটি বিশেষভাবে সমাদর পাবার বই, একথা অসঙ্কোচে বলতে পারি। গল্পের বিষয় ও বলবার মুন্সিয়ানা সব দিক দিয়েই বইটি মনে রাখবার মত।

    প্রেমেন্দ্র মিত্র

    * * *

    ‘কসবা জগদীশ বিদ্যাপীঠ’-এর

    প্রাক্তন, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ

    ছাত্রদের উদ্দেশ্যে–


    নিবেদন

    একটি চিত্রকাহিনীই “সোনার ঘণ্টা” উপন্যাসটির মূল প্রেরণা। সেই কাহিনী ঢেলে সাজাতে গিয়ে ঘটনা, চরিত্র সবকিছু আমাকে নতুন ক’রে ভাবতে হয়েছে। উদাহরণ স্বরূপ– ইহুদী জ্যাকব, কাসেম, মকবুল, ফজল, হ্যারি প্রভৃতি চরিত্রগুলো আমারই চিন্তার ফসল। কুয়াশা, ঝড় আর ডুবো পাহাড়ের প্রতিকুলতা পেরিয়ে সোনার ঘণ্টার দ্বীপে যাওয়া ও ফেরা, দু’টো মোহরে খোদিত নক্সার কাহিনী ইত্যাদি ঘটনাগুলিকে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলার মতো  ক’রে আমাকে সাজাতে হয়েছে। অনেকস্থলে চিত্রকাহিনীর ফাঁকও পূরণ করতে হয়েছে। এইভাবে বর্তমান উপন্যাসের পূর্ণরূপ গড়ে উঠেছে।

    সবিশেষ নিবেদন– উপন্যাসটি কিশোরদের জন্য রচিত। তাই কাহিনীর নায়ক ফ্রান্সিসকে নিচক এ্যাডভেঞ্চার বিলাসীরূপে অঙ্কন না ক’রে তাকে একটা জীবন-দর্শনের ভিত্তিভূমিতে প্রতিষ্ঠিত করবার চেষ্টা করেছি। কিশোরদের মনে এই দৃষ্টিভঙ্গীটুকু স্বীকৃতি পেলেই “সোনার ঘণ্টা” রচনা সার্থক ব’লে মনে করবো।

    প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য–  “সোনার ঘণ্টা” প্রথমে ‘শুকতারা’ পত্রিকায় ধারাবাহিক উপন্যাসরূপে প্রকাশিত হয়েছিল।

    দীপাবলী, ১৩৮৬
    অনিল ভৌমিক

    * * *

    আজকের দিনে যেসব জাতি পৃথিবীর উপর প্রভাব বিস্তার করেছে, সমস্ত পৃথিবীর সবকিছুর উপরেই তাদের অপ্রতিহত উৎসুক্য। এমন দেশ নেই, এমন কাল নেই, এমন বিষয় নেই যার প্রতি তাদের মন ধাবিত না হচ্ছে।

  • আজাজেল

    আজাজেল

    আইজাক আসিমভ কল্পবিজ্ঞানের সুবিখ্যাত কথাশিল্পী, অসীম কল্পনাশক্তিতে তার খেয়ালী কলম মেলে। ধরেছেন রূপক কাহিনী গ্রন্থনে। আঠারােটি গল্পকে সংকলনে বন্দী করে আমাদের উপহার দিয়েছেন। যারা রূপক কাহিনী ভালবাসেন এবং আসিমভের অনুরাগী ভক্তবাহিনী, সকলকেই অভিভূত করবে। আজাজেলের সঙ্গে সাক্ষাৎ করুন, দুই সে.মি. দীর্ঘ। আগুন-লাল-রঙা এক জিন প্রচণ্ড ব্যক্তিত্বসম্পন্ন ও চমৎকার জাদুশক্তির অধিকারী। শুধুমাত্র জর্জ। বিটারনাট, যিনি এক খামখেয়ালী ভাষাবিদ, জিন ও আত্মা আহ্বানের জাদুমন্ত্রে পারদর্শী এবং তারই ইচ্ছায় আজাজেল আবির্ভূত হয়। কিন্তু, আজাজেল তার বিস্ময়কর জাদুবিদ্যা, জর্জের ব্যক্তিগত লাভের খাতিরে ব্যবহৃত হতে অনুমতি দেবে না। জর্জের বন্ধুদের প্রয়ােজন পড়লে, তারা অনুগ্রহ পেতে পারে। কিন্তু একটাই সমস্যা। এই অন্য পার্থিব চমৎকার করিৎকর্মার, পার্থিবব্যঞ্জনা এবং মানবিক দুর্বলতা সম্পর্কে স্বল্পই জ্ঞান আর তার সদিচ্ছাপ্রসূত অবৈধ হস্তক্ষেপ যারপরনাই তামাসা ও অপ্রত্যাশিত বিশৃঙ্খলায় পর্যবসিত হয়। এই কাহিনীগুলির শ্রমসাধ্য সংকলন আজাজেল ও বেচারি বিটারনাটের উদ্ভট ও ব্যর্থ অভিযানসমূহ অনুসরণ করেছে, যখন তারা ভালমনেই কিছু পরিচিত দুর্ভাগাদের ভাগ্য পরিবর্তনের চেষ্টা করছিল। আসিমভের নিজস্ব ভঙ্গিতে এবং বিষমই মজা করে বর্ণিত আজাজেল ঘণ্টার পর ঘণ্টা নির্মল দুষ্টুমি-মাখা আনন্দ দেওয়ার দাবি রাখে। আজাজেল এর সতেরটি গল্প, প্রথম ‘দ্য ফ্যান্টাসি অ্যাণ্ড সায়েন্স ফিকশন’ ও ‘আইজাক আসিমভস সায়েন্স ফিকশন ম্যাগাজিন’-এ প্রকাশিত হয়েছিল। এই সংকলনিটর প্রথম গল্প ‘দুই সে.মি. জিন’ বিশেষ করে এই বইটির জন্যই লেখা।

    [book-name]

    অনিশা দত্তআইজাক আসিমভ

    Azazel by Isaac Asimov

    অনুবাদ : অনিশা দত্ত

    প্রথম প্রকাশ : বইমেলা, ফেব্রুয়ারি ২০০৯

    প্রচ্ছদ : ধ্রুব এষ

    অনুবাদকের উৎসর্গ

    সন্দেশ প্রকাশনার লুৎফর রহমান চৌধুরী প্রীতিভাজনেষু

    সূচনা

    ১৯৮০তে এরিক প্রর্টার নামে এক ভদ্রলোক আমাকে, তার সম্পাদনায় একটি পত্রিকার জন্য মাসিক রহস্য কাহিনী লিখতে অনুরোধ করেন। আমি সম্মত হই, কারণ আমি সজ্জনদের ‘না’ বলতে পারি না আর আমি এ যাবৎ যত সম্পাদকের সংস্পর্শে এসেছি, তারা যথাযথ সজ্জন।

    প্রথম কাহিনী আমি লিখি, এক ধরনের কল্পরহস্য যেখানে দুই সে.মি. লম্বা এক ক্ষুদ্র জিনের কথা বলেছি, নাম দিয়েছিলাম, ‘শঠে শাঠং।’ এরিক প্রর্টারের মনে ধরেছিল ও তিনি তা প্রকাশ করেন। এতে গ্রিসওল্ড নামে এক ভদ্রলোকের কথা বলেছিলাম যিনি ছিলেন মূল বক্তা আর সাথে ছিলেন তিন শ্রোতা। যার মধ্যে আমি নিজেও ছিলাম, যদিও নিজের পরিচয় দিইনি। চারজনে প্রতি সপ্তাহে ইউনিয়ন ক্লাবে মিলিত হতাম, আর আমি ইউনিয়ন ক্লাবেই গ্রিসওল্ডের গল্পের পরিকল্পনা করেছিলাম। যাই হোক, যখন আমি ছোট্ট জিনকে নিয়ে ‘শঠে শাঠং’ নামে দ্বিতীয় কাহিনীর সূচনার চেষ্টা করছিলাম (নতুন কাহিনীর নাম দিলাম, ‘সঙ্গীতের এক রজনী’)।

    এরিক বললেন, ‘না!’ হয়তো বা, এক বাক্যে, উদ্ভট কল্পনার আশ্রয় নিয়েছিলাম। কিন্তু সে চায়নি, আমি সেটা অভ্যাসে রপ্ত করে ফেলি।

    অতএব, আমি ‘সঙ্গীতের এক রজনী’কে এক পাশে সরিয়ে রেখে রহস্য কাহিনীর ধারাবাহিক শুরু করলাম, যাতে কোনো উদ্ভট কল্পনার মিশেলই দিলাম না। এদের মধ্যে তিনটি গল্প (যা এরিক চেয়েছিলেন দুই হাজার থেকে দুই হাজার দুশো শব্দের মধ্যে) ঘটনাক্রমে আমার বই ‘দ্য ইউনিয়ন ক্লাব মিস্ট্রি’তে (ডাবল ডে, ১৯৮৩) সংগৃহীত হয়েছিল। এর মধ্যে ‘শঠে শাঠং’কে অন্তর্ভুক্তি করিনি, কারণ ছোট্ট জিনের বিবৃতি, বাকি গল্পগুলোর সঙ্গে খাপ খেত না।

    ইতিমধ্যে আমি ‘সঙ্গীতের এক রজনী’ নিয়ে মেতেছিলাম। অপচয়কে আমি ঘৃণা করি। আমার কোনো লেখা অপ্রকাশিত থাকুক, আমার সহ্য হয় না। পরিস্থিতি সামলাতে, যাহোক করতে আমি প্রস্তুত। অতএব এরিকের দ্বারস্থ হয়ে বললাম, ‘সেই গল্পটা, ‘সঙ্গীতের এক রজনী’ যেটা তোমার পছন্দ হয়নি, আমি কি অন্য কোথাও প্রকাশ করতে পারি?’

    তিনি বললেন, ‘নিশ্চয়ই পারেন। কিন্তু শর্ত থাকবে, চরিত্রগুলোর নাম বদলে ফেলতে হবে। আমি চাই গ্রিসওল্ড ও তার সঙ্গীসাথীরা বিশেষভাবে আমার পত্রিকাতেই বিরাজ করুক।’

    তাই-ই করলাম। গ্রিসওল্ডের নাম বদলিয়ে, ‘জর্জ’ দিলাম আর শ্রোতা হিসেবে রাখলাম একজনকেই। প্রথম পুরুষ হিসেবে, আমি নিজে। সেটা তো হল। আমি ফ্যান্টাসি ও সায়েন্স ফিকশন-এর পত্রিকাতে সেটি বিক্রি করে দিলাম। এরপর ঐ ধরনের এক কাহিনী লিখলাম, ভাবধারা হল জর্জ ও আজাজেলের কাহিনী। জিনের নাম দিলাম আজাজে। এই বইটি (যে হাসি হেরে যায়, ঐ পত্রিকাতেই প্রকাশিত হয়। কিন্তু আমার নিজেরও কল্পবিজ্ঞানের এক পত্রিকা ছিল, ‘আইজাক আসিমভের কল্পবিজ্ঞান পত্রিকা’ আর শাওনা ম্যাককার্থি, তৎকালীন সম্পাদক ‘এফ্‌ অ্যান্ড এসএফ’ পত্রিকায় দেওয়ার বিরোধিতা করলেন। তিনি প্রস্তাব দিলেন, ‘ছোট্ট জিন আর তার যাদুকে, উন্নত প্রযুক্তির অপার্থি। প্রাণীতে বদলে দিন আর সকল কাহিনী আমার কাছে বিক্রি করে দিন।

    তাই-ই করলাম। আর তখন থেকেই আমার জর্জ ও আজাজেলের কাহিনীগুলো নিয়ে খ্যাপামি ছিল। আমি লিখতে শুরু করলাম আর বর্তমানে আমি এই গল্পগুলো থেকে আঠারোটি নিয়ে ‘আজাজেল্‌’-এ সংকলিত করেছি। মোট আঠারোটি গল্পের অন্তর্ভুক্তি সম্ভব হল। কারণ গল্পগুলো আয়তনে কমাবার তাগিদ ছিল না এরিকের পক্ষে। তাই আমি জর্জ ও আজাজেলের গল্পগুলো দ্বিগুণ দীর্ঘ করতে পেরেছি।

    কিন্তু এবারেও আমি শঠে শাঠংকে এর মধ্যে ঢোকাতে পারলাম না। কারণ পরবর্তী গল্পগুলোর সঙ্গে এর সুর তাল মিলত না। দুটি বিভিন্ন ধারাবাহিকের ধারণার মূল অনুপ্রেরণা থাকায়, শঠে শাঠং-এর বিরূপ ভাগ্যে, দুটি পৃথক ধারায়, কোনোটাতেই খাপ খাওয়ানো গেল না (যাক গে, সঞ্চয়ন তো হয়েই রইল, ভবিষ্যতে কোনো না কোনো রূপে আত্মপ্রকাশ করবে। এর জন্য খুব দুঃখ করার প্রয়োজন নেই)।

    গল্পগুলো সম্পর্কে আমি কিছু যুক্তির অবতারণা করতে চাই, হয়তো আপনারা লক্ষ্য করে থাকবেন। কিন্তু আমি এক প্রকার বাচাল।

    1. যেমন আমি বলেছি, প্রথম গল্পটি বাদ দিই, ছোট্ট জিনের গল্পটি অন্যগুলোর সঙ্গে মিলছিল না। আমার সুন্দরী সম্পাদিকা জেনিফার ব্রেল জোর দিয়েছিলেন কিভাবে আমি ও জর্জ পরস্পরের সাথে পরিচিত হই, এবং জর্জের জীবনে কীভাে ছোট্ট জিনের অনুপ্রবেশ ঘটে। সেই প্রসঙ্গের অবতারণা আবশ্যিক।

      যদিও জেনিফার মধুর স্বভাব, তথাপি সে যখন দৃঢ় মুষ্টিবদ্ধ হয়, তখন তার সঙ্গে পেরে ওঠা কঠিন।

      আমি দুই সে.মি. জিনের গল্প লিখে ফেললাম এবং তার কথামতো বইটিতে প্রথম গল্প হিসাবে অন্তর্ভুক্তি ঘটল। এর পরেও কথা ছিল, জেনিফার চেয়েছিলেন, আজাজেল্‌ সংশয়াতীতভাবে জিনই হোক, অপার্থিব কোনো প্রাণী নয়। অতএব আমরা উদ্ভট রূপকথায় ফিরে এলাম। ‘আজাজেল্’ বাইবেলে উল্লিখিত এক নাম, পাঠকরা একে জিন হিসাবেই গ্রহণ করে থাকেন, যদিও বিষয়টি অপেক্ষাকৃত জটিলতর।

    2. জর্জকে খানিক বিষাদগ্রস্ত হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। যদিও আমি নির্জীব ব্যক্তি পছন্দ করি না। তবু জর্জকে আমি ভালবাসি, আপনারাও বাসবেন। প্রথম পুরুষটি (আদতে আইজাক্ আসিমভ্) প্রায়শই জর্জ দ্বারা অপমানিত হয়েছেন এবং অবধারিত কয়েক ডলার খোয়াতে হয়েছে। কিন্তু আমি কিছু মনে করি নি। প্রথম গল্পের শেষে আমি বিশ্লেষণ করেই দিয়েছি, তার গল্পগুলো উৎকৃষ্ট ছিল এবং সেগুলো থেকে আমি যথেষ্ট অর্থ উপার্জন করেছি। বিশেষত জর্জকে যা দিয়েছি (অবশ্যই কল্পনায় নয়), তার থেকে অনেক বেশি।
    3. অনুগ্রহ করে সতর্ক থাকুন, গল্পগুলো একাধারে হাস্যরস-স্নিগ্ধ ও শ্লেষাত্মক। যদি গল্পের ধরন অতিরঞ্জিত ও ‘আসিমভোচিত’ না হয়, তবে তা উদ্দেশ্যমূলক। একে সতর্কবাণী মনে করবেন। অতিরিক্ত কিছুর প্রত্যাশা করে বইটি কিনবেন না ও পরে পস্তাবেন না। যাক গে, যদি পিজি উডহাউসের সামান্যতম প্রভাবও লক্ষ্য করে থাকেন, তবে বিশ্বাস রাখবেন এটি দৈবক্রমে ঘটেনি।

      আজাজেল্‌ বল খেলা দেখতে যায়।

      সে রাতে আমি বাস্কেট বল খেলা দেখতে গিয়েছিলাম আর আজাজেল্‌ ছিল আমার পকেটে। খেলা দেখার জন্য সে পকেট থেকে মাথাটি উঁচিয়ে রাখছিল, আর কেউ তাকে দেখে ফেললে, মস্ত প্রশ্ন উঠত। তার ত্বক উজ্জ্বল লাল আর তার কপালে সিং- এর দুটি ছোট্ট দলা। ভাগ্যিস, সে সবসুদ্ধ বেরিয়ে আসেনি, কারণ তার সবচেয়ে প্রকট আর সবচেয়ে বিরক্তিকর ছিল এক সে.মি. লম্বা মাংসল লেজ। খেলার শেষে সে মন্তব্য করল, ‘বিশালবপু জবরজং যাচ্ছেতাই মানুষগুলোর, খেলার মাঠে উদ্যম দেখে আমার যতদূর মনে হল, যখনই গর্তের মধ্যে দিয়ে বলটি গলিয়ে ফেলে দেওয়া যাচ্ছে, তখনই ভরপুর উত্তেজনা।

      ‘ঠিক তাই!’ আমি বলি, ‘তুমি এক বাস্কেট জিতলে।

      ‘তাহলে, এই বোকা-বোকা খেলায় তোমার এই আশ্রিত এক বীরোচিত খেলোয়াড় হতে পারত, যদি প্রতিবারই সে গর্তের মধ্যে দিয়ে বলটাকে গলিয়ে দিতে পারত।’

      ‘একদম ঠিক!’

      পরবর্তী নির্ধারিত খেলার জন্য অপেক্ষা করতে করতে, আমি খানিক উত্তেজিত হয়ে পড়লাম। ছোট্ট জুনিপারকে আমি একটা কথাও বলিনি, কারণ তখনো পর্যন্ত আমি আজাজেলের দানবিক শক্তি ব্যবহার করিনি এবং তার কথাবার্তার সঙ্গে কার্যকলাপের সঙ্গতি থাকবে, সে সম্পর্কেও সম্পূর্ণ নিশ্চিত ছিলাম না।

      তাছাড়াও, আমি তাকে চমকে দিতে চেয়েছিলাম। (এবং তার পর যা ঘটেছিল, আমরা দুজনেই যারপরনাই অবাক হয়েছিলাম)

  • দুই সে.মি. দীর্ঘ জিন

    দুই সে.মি. দীর্ঘ জিন

    অনিশা দত্তআইজাক আসিমভ

    [book-name]

    দুই সে.মি. দীর্ঘ জিন

    বেশ কয়েক বছর পূর্বে, এক সাহিত্যসভায় জর্জের সঙ্গে আমার দেখা হয়। আর আমি তার মধ্যবয়সী সুগোল মুখের অকপট সরল দৃষ্টি দেখে মোহিত হয়েছিলাম। তিনি এমনই এক ব্যক্তি ছিলেন, যার হাতে নিশ্চিন্তে ওয়ালেট সমর্পণ করে, সাঁতারে নামা যায়।

    আমার বই-এর পেছনে আমার ফটো থেকে আমাকে দেখামাত্রই তিনি চিনেছিলেন। বলেছিলেন, আমার গল্প, উপন্যাস তাকে কতটা মুগ্ধ করেছে এবং অবশ্যই তাতে তার বুদ্ধিমত্তা ও রুচির পরিচয় পাচ্ছিলাম। আমরা আন্তরিক আগ্রহে করমর্দন করলাম। তিনি জানালেন, ‘আমার নাম জর্জ বিটারনাট। বিটারনাট! মনে রাখার জন্য আমি পুনর্বার উচ্চারণ করলাম, ‘ভারি অসাধারণ নাম!’

    ‘ড্যানিস।’ তিনি জানালেন, ‘এবং অভিজাত। আমি ক্লান্ট বংশোদ্ভূত যিনি ক্যানিউট নামে সুপরিচিত। ড্যানিশ সম্রাট একাদশ শতকে ইংল্যান্ড জয় করেন। আমার পূর্বপুরুষ তার পুত্র ছিলেন। কিন্তু সনাতন বৈধরীতিতে জন্মাননি।’

    ‘অবশ্যই,’ আমি বললাম, যদিও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হিসেবে মনে করার কোনো কারণ দেখলাম না।

    ‘পিতার পদবী অনুসারে তিনিও ক্লান্ট,’ জর্জ বলে চললেন, ‘আর যখন তাকে রাজার কাছে নিয়ে আসা হল, রাজাধিরাজ ডেন বললেন, ‘আমার পবিত্র ধামে, এই কী আমার উত্তরাধিকারী?’

    ‘না,’ পুরোটা নয়, দ্বারী ছোট্ট ক্লান্টকে কোলে নিয়ে দোলাতে দোলাতে বলল, ‘কারণ এতো অবৈধ সন্তান। মা হচ্ছে রজকিনী, যাকে আপনি —’

    ‘আঃ’ রাজা থামিয়ে দিলেন, ‘সেটাই বেটার।’ এবং তারপর থেকেই তার নাম চালু হয় ‘বেটারক্লান্ট।’ সেটিই একমাত্র নাম। পুরুষানুক্রমে আমার নামেও এসে গেছে। কালের যাত্রায়, উচ্চারণের ফারাকে দাঁড়িয়ে গেল ‘বিটারনাট।’

    এবং জর্জের নীল চোখ আমার দিকে ছলাকলাহীন এক সম্মোহনী দৃষ্টি হানল, যাতে সংশয়ের অবকাশ ছিল না।

    আমি বললাম, ‘আপনি কি দুপুরে আমার সঙ্গে লাঞ্চ করবেন?’ আমি জাঁকজমকের একটি রেস্তোরাঁর দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করলাম, যা সত্যিই পকেটভারীদের জন্য নির্দিষ্ট ছিল।

    জর্জ বললেন, ‘আপনার কি মনে হয় না ভোজনশালাটি একটু বেশি উঁচুদরের? অন্য দিকে লাঞ্চ কাউন্টারে হয়তো বা–’

    ‘আরে, আমার অতিথি হয়ে,’ আমি বিশদ হলাম। এবার জর্জ ঠোঁট টিপে বললেন, ‘আমি এখন ভোজনশালাটি ভালর দিকে দেখছি, মনে হচ্ছে, ঘরোয়া আবহাওয়াই পাওয়া যাবে। আচ্ছা ঠিক আছে, চলবে।’

    খেতে খেতে জর্জ বললেন, ‘আমার পূর্বপুরুষ বেটারক্লান্টের এক ছেলে ছিল, যার নাম তিনি রেখেছিলেন ‘স্বোয়েন’ একটি সুন্দর ডেনিস নাম।’

    ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, আমি জানি,’ আমি বললাম, ‘রাজা ক্লান্ট এর পিতার নাম ছিল স্বোয়েন ফর্কবার্ড। এখনকার দিন হলে নামটার বানান হতো স্বেন।’

    জর্জ ভ্রূ কুচকিয়ে বললেন, ‘আমি স্বীকার করে নিচ্ছি, শিক্ষার প্রাথমিক ধাপ আপনি পার হয়ে এসেছেন।

    অপ্রতিভ হয়ে বললাম, ‘দুঃখিত’।

    জর্জ মহান ক্ষমার ভঙ্গিতে হাত নেড়ে সুরার গ্লাসের অর্ডার দিলেন। বলে চললেন, ‘স্বোয়েন বেটারক্লান্ট সুন্দরীদের ভালবাসতেন। সেদিকে তিনি সফল পুরুষ ছিলেন, যেমন আমরা সকলেই। সর্বজনবিদিত রয়েছে, তাকে ছেড়ে আসার সময়, অধিকাংশ মহিলাই মাথা নাড়তেন, বলতেন, ‘উনি এক মহাশক্তিধর উপাসক’! একটু থেমে বললেন, ‘মানে বুঝলেন?’

    ‘না।’ মিথ্যা করে বললাম আমি। ওনার সামনে আর নিজের জ্ঞান জাহির করতে ইচ্ছা করলো না।

    ‘মহাশক্তিধর উপাসক অর্থে এক মহান জাদুকর। সাথে সাথে স্বস্তির নিঃশ্বাস পড়ল, ‘স্বোয়েন গোপন তন্ত্র-মন্ত্রের সাধনা করছিলেন। সে সময়ে সবই সম্ভব ছিল। আধুনিক নোংরা নাস্তিকতাবাদ তখন ছিল না। তিনি তরুণীদের কোমল বিনম্র ব্যবহারে বিশ্বাসী ছিলেন। যা ছিল নারীত্বের গরিমা। এবং স্বেচ্ছাচার ও কলহপ্রিয়তা সতত বর্জনীয় ছিল।’

    ‘তা বেশ।’ সহানুভূতির সুরে বললাম আমি।

    ‘আর এ জন্য দরকার পড়ত জিনের। কিছু কিছু মিষ্টি জড়িবুটি পুড়িয়ে, কিছু ভুলে যাওয়া শক্তিদের আহ্বান করার রীতি তার জানা ছিল।

    ‘এতে কি সত্যিই কাজ হত মি. বিটারনাট?’

    ‘অনুগ্রহ করে আমাকে ‘জর্জ’ নামে সম্বোধন করবেন। হ্যাঁ, অবশ্যই কাজ হতো। আর তার প্রায়শ অভিযোগ ছিল, সে সময়কার মেয়েরা ছিল মাথা মোটা গোঁয়ার, যারা তাকে রাজার নাতি হিসেবে মান্য করত না, কটু মন্তব্য করত, তার জন্মসূত্র নিয়ে। একদা এক জিন তার পক্ষে ছিল, যাতে তিনি স্বাভাবিক গুণের স্বীকৃতি পেতে পারতেন।

    আমি বললাম, ‘আপনি কি এসব বিষয়ে নিশ্চিত জর্জ?’

    ‘নিশ্চয়ই, গত গ্রীষ্মেই আমি তার নির্দেশিত যাবতীয় গুণাবলী সম্বলিত বইটি পেয়েছি, যার সাহায্যে জিনদের আহ্বান করা হতো। আমি একটা পুরনো ইংরেজদের কেল্লার ধ্বংসাবশেষের মধ্যে থেকে বইটি পাই। তখন থেকে বইটি আমাদের পারিবারিক সম্পত্তি। ঠিক কি কি গাছ-গাছড়া পোড়াতে হবে, কোথায় কীভাবে রাখতে হবে, বিভিন্ন শক্তিরূপীর নাম, ভজন-পূজনের রীতিনীতি সব তাতে তালিকাভুক্ত করা আছে। প্রাচীন অ্যাংলো-স্যাক্সন ভাষাতে লেখা, কিন্তু আপনি তো জানেন, আমি বহু ভাষাবিদ। তাই—’

    মৃদু সন্দেহের অবকাশে আমি বলে ফেলি, ‘ঠাট্টা করছেন!’

    ওঁর চাহনি উগ্র হয়ে উঠল, ‘এ রকম ভাবছেন কেন? আমি কি মজা করছি, নাকি? এটা একটি প্রামাণ্য পুস্তক। আমি পদ্ধতি-প্রণালী সকল নিজে পরীক্ষা করেছি।’

    ‘আর, একটা জিন পেয়ে গেছেন!’

    ‘হ্যাঁ, যথার্থ’ স্যুটের বুকপকেট নির্দেশ করে বললেন জর্জ।

    ‘ওইখানে?’

    জর্জ পকেট স্পর্শ করলেন আর মাথা নাড়তে নাড়তে, কোনো কিছু অনুভব করতে চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে ভেতরে উঁকি দিলেন। হতাশ হয়ে বললেন, ‘ইস্ চলে গেছে। সব খতম। কিন্তু তাকে দুষতে পারেন না হয়তো। গতকাল রাতেও সে আমার সঙ্গে ছিল। কারণ, জানেন, সে এই সভা সম্বন্ধে কৌতূহলী ছিল। আমি একটা আই ড্রপারে করে তাকে হুইস্কি খাইয়েছিলাম। তার পছন্দও হয়েছিল হয়তো, একটু বেশিই ভাল লেগে থাকবে। কারণ পানশালার খাঁচায় রাখা কাকাতুয়ার সঙ্গে সে লড়তে চাইছিল আর চিৎকার করে তাকে গালাগাল দিচ্ছিল। ভাগ্যক্রমে জিনের ঘুম এসে গেল, নয়তো অসন্তুষ্ট পাখিটি প্রতিশোধ নেওয়ার চেষ্টা করতে পারত। আজ সকালে হয়তো তার মেজাজ ভাল ছিল না। মনে হয় নিজের বাড়ি গেছে, নিজের শক্তি ফিরে পেতে।

    মনে মনে আমি খানিক বিদ্রোহী হয়ে উঠলাম। জর্জ কি আশা করছে, তার এই সব আজগুবি বকুনি আমি বিশ্বাস করব! ‘আপনি কি বলতে চান, আপনার বুকপকেটে এক জিন ছিল?’

    ‘বাঃ, বেশ তো চটজলদি বুঝে ফেললেন,’ জর্জ বললেন, ‘বাঃ বাঃ বাঃ।’

    ‘কত বড় ছিল সেই জিন?’

    ‘দুই সেন্টিমিটার।’

    ‘বাঃ বাঃ, এক ইঞ্চিরও কম!’

    ‘ঠিক বলেছেন। এক ইঞ্চি মানে আড়াই সেন্টিমিটার।’

    ‘আমি বলতে চাইছি, কী ধরনের জিন? মাত্র দু সে.মি. লম্বা!’

    ‘এক রত্তি জিন!’ জর্জ বলেন, কিন্তু বোঝেন তো, একদম না থাকার চেয়ে ছোট্ট জিনই সই!’

    ‘ওতো নিজের মর্জির ওপর নির্ভর করে।’

    ‘ওঃ, আজাজেল্ হচ্ছে তার নাম। এক বন্ধু জিন। আমার সন্দেহ হয়, নিজের ভুতুড়ে জগতে তাকে হয়তো একটু নিচু নজরে দেখা হয়। কারণ, সে অসাধারণভাবে তার শক্তি দিয়ে আমাকে মোহিত করতে উৎসুক। তবে সেই শক্তি, সে আমাকে ধনী করে তুলতে ব্যবহার করবে না, যদিও সুন্দর বন্ধুত্বের নজির হিসেবে সেটুকু করা তার উচিত ছিল। তার বক্তব্য, তার শক্তি শুধু অপরের মঙ্গল সাধনের জন্য।

    ‘আরে রাখুন তো জর্জ! এটা তো নরকের দর্শন হতেই পারে না।’

    জর্জ ঠোঁটে আঙুল রাখল। ‘একথা বলবেন না দাদু। আজাজেল্‌ যারপর নাই অসন্তুষ্ট হবে। সে বলে, তার দেশ মিত্রভাবাপন্ন, সুন্দর উচ্চদৃষ্টিসম্পন্ন এবং সে তার শাসক সম্পর্কে পরম শ্রদ্ধাবান, যার নাম সে জানে না বটে, তবে তাঁকে সর্বেসর্বা বলে উল্লেখ করে।’

    ‘আর, সত্যিই কি সে দয়াপরবশ?’

    ‘যখন সে সক্ষম। এই ধরুন না, আমার ধর্ম মেয়ে জুনিপার পেন্ এর কথা। ‘জুনিপার পেন?’

    ‘হ্যাঁ। আমি আপনার চোখে ঘোর কৌতূহল দেখছি, আপনি যদি তার গল্প শুনতে আগ্রহী হন, তবে সানন্দে আমি বলতে রাজী।’

    ‘জুনিপার পেন’ জর্জ শুরু করলেন, ‘সে ছিল আয়ত নয়না ও সে সময়ে কলেজে দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী, যখনকার গল্প আপনাকে শোনাচ্ছি। একটি সরল মিষ্টি মেয়ে এবং বাস্কেটবল টিমের অনুরাগিনী। বিশেষভাবে কেউ অথবা দীর্ঘকায় তরুণ দল। দলের একজনের প্রতি তার তরুণীসুলভ আকর্ষণ গাঁথা হয়ে গিয়েছিল। সে হল লিয়েন্ডার টমসন। লম্বা, কৃশকায়। তার দীর্ঘ হাতে বাস্কেটবলের বেষ্টন বা অন্য কিছু যা বাস্কেটবলের আকার আয়তনতূল্য, জুনিপারের মনে এমন দৃশ্য, অহরহ আনাগোনা করত। কোনো খেলা চলাকালীন, জুনিপার যদি দর্শকের আসনে থাকত, তবে তার উল্লসিত চিৎকার ছিল, লিয়েন্ডারের লক্ষ্যে।

    জুনিপার আমাকে তার ছোট্ট ছোট্ট মিষ্টি স্বপ্নের কথা বলত, অন্য সমস্ত তরুণীদের মতোই (আমার ধর্ম মেয়ে ছাড়াও)। তার আবেগ সে মন খুলে আমার কাছে প্রকাশ করত। আমার সস্নেহ সাদর আচরণ তার আস্থা জিতে নিয়েছিল।

    ‘ওঃ আঙ্কেল জর্জ, লিয়েন্ডারকে নিয়ে যদি ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখি, সেটা কি দোষের? আমি তাকে দেখি, বিশ্বের শ্রেষ্ঠ বাস্কেটবল খেলোয়াড় হিসেবে। দীর্ঘমেয়াদী বড় রকমের চুক্তিতে আবদ্ধ পেশাদারী খেলোয়াড়দের উচ্চতম আসনে। এটা কি আমার অতিরিক্ত কিছু চাওয়া! জীবনে যা কামনা করি, তা হল আঙুর লতা ছাওয়া এক প্রাসাদ, যত দূর দেখা যায়, একটি ছোট লাগোয়া বাগান। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ভৃত্যগোষ্ঠি, সারা সপ্তাহে ও সারা মাসের পোশাক-আশাক পর পর গোছানো রয়েছে আর…

    আমি তার মজাদার বকবকানি থামিয়ে বললাম, ‘ছোট্ট খুকি, একটা ছোট্ট ত্রুটি থেকে গেছে, তোমার পরিকল্পনায়। লিয়েন্ডার কিন্তু মোটেই খুব বড় বাস্কেটবল খেলোয়াড় নয় আর এটা খানিক অসম্ভবই, যে সে বিশাল অর্থের চুক্তি স্বাক্ষর করতে পারবে!’

    ‘খুব খারাপ কথা,’ জুনিপার ঠোঁট ফোলাল, ‘কেন ও খুব ভাল বাস্কেটবল খেলোয়াড় নয়?’

    ‘কারণ এভাবেই জগৎ চলে। তুমি কেন না, তোমার নবীন প্রেম এক ভাল বাস্কেটবল খেলোয়াড়কে সমর্পণ কর না! কিংবা এসবের জন্য ওয়াল স্ট্রীটের দালালদের শরণাপন্ন হতে পার, যারা এ বিষয়ে খোঁজ খবর রাখে!’

    ‘আসলে, আমি নিজের সম্পর্কে ভেবে রেখেছি, আঙ্কেল জর্জ। কিন্তু আমি যে লিয়েন্ডারকেই পছন্দ করি। অবশ্য সময়ে সময়ে মনে হয়, জীবনে টাকাটা কি খুবই জরুরী!’

    ‘চুপ কর খুকি,’ আমি আহত হই, ‘আজকালকার মেয়েরা বড় বাচাল। ‘কিন্তু আমি টাকাটা পাবই না বা কেন? ওটা কি খুব বেশি চাওয়া?’

    সত্যিই কি তাই! যাহোক আমার নিজের এক জিন রয়েছে। যদিও সে আমার একরত্তি, তবু মস্ত দিলদার। সে নিশ্চয়ই প্রকৃত প্রেমকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসবে, দুটি আত্মা যাদের অন্তরে সমস্পন্দন, দ্বৈত চুম্বন ও যৌথ সম্পদের আকাঙ্ক্ষা।

    যখন আমি যথার্থ শক্তির নামে আজাজেকে তলব করলাম, সে মন দিয়ে শুনল। সেই শক্তি কি, তা আমি আপনাকে বলতে পারি না, আপনার কি প্রাথমিক নীতিজ্ঞান নেই? আজাজেল্‌ শুনল, কিন্তু তার মধ্যে প্রকৃত সহানুভূতির অভাব লক্ষ্য করলাম। স্বীকার করছি, আমি তাকে আমাদের গণ্ডীর মধ্যে টেনে এনেছিলাম, সম্ভবত তার তুর্কীয় স্নানের সময়ে। কারণ তার দেহে তখন ছোট্ট তোয়ালে জড়ানো ছিল আর সে কাঁপছিল। চড়া কণ্ঠস্বরে আগের চেয়ে চিৎকার করছিল। (আসলে, আমার মনে হয় না, সেটা সত্যিই তার কণ্ঠস্বর ছিল।) আমার ধারণা, সে যোগাযোগ করছিল কিছুটা অন্তরে অন্তরে টেলিপ্যাথি বা ঐ ধরনের কিছু। কিন্তু তার ফল হয়েছিল আমি শুনেছিলাম বা কল্পনা করেছিলাম এক তারস্বর।

    ‘বাস্কেটবল কি?’ সে জিজ্ঞাসা করল, ‘বাস্কেটের গড়নে একটা বল? তাহলে বাস্কেট কি রকম?’

    আমি তাকে বোঝাতে চেষ্টা করতে লাগলাম, কিন্তু জিন তারও গভীরে যেতে চায়। সে আমার দিকে এমনভাবে তাকিয়ে রইল, যেন খেলার পুঙ্খানুপুঙ্খ ছবি তার কাছে স্পষ্ট তুলে ধরছি না। শেষ পর্যন্ত সে বলল, ‘আমাকে বাস্কেট বল খেলা দেখাতে পার?’

    ‘নিশ্চয়ই’ আমি বললাম, ‘আজ রাতেই এক খেলা রয়েছে। আমাকে লিয়েন্ডার টিকেট দিয়েছে। আর তুমি তো আমার পকেটে আসতেই পার।’

    ‘বেশ’ আজাজেল্‌ বলে ‘যখন তুমি খেলা দেখতে যাওয়ার জন্য তৈরি হবে, তখন ডেকে নিও আমায়। এক্ষুনি আমাকে জিগমিগ শেষ করতে হবে।’ জিগমিগ মানে বোধ হয় তুর্কীর স্নান। এবং পরক্ষণেই সে অদৃশ্য হল।

    মানতেই হবে, আমার জোর বিরক্তি ধরে গেল, আজাজেলের এমন নিরাসক্ত অনুদার আচরণে। আমার কাছে আমার ব্যাপারটা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। … দাদু, আমার মনে হচ্ছে, ওয়েটার বিল দেওয়ার জন্য আপনার দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করছে। ওর কাছ থেকে ওটা নিয়ে, আবার গল্পকে এগিয়ে নিতে দিন।

    আমি তো সে রাতে বাস্কেট বল খেলা দেখতে গেলাম, আজাজেকে পকেটে পুরে। খেলা দেখার জন্য সে পকেট থেকে মাথাটি উঁচুতে রাখছিল আর কেউ যদি তাকে দেখে ফেলত তো মস্ত জিজ্ঞাসা! তার ত্বক উজ্জ্বল লাল ও কপালের ওপর দুটি শিং-এর ছোট্ট ছোট্ট দলা। ভাগ্যিস, সে সবসুদ্ধ বেরিয়ে পড়েনি, কারণ তার গঠনে সবচেয়ে প্রকট আর সবচেয়ে বিশ্রী ছিল তার এক সে.মি. লম্বা মাংসল পুচ্ছ।

    আমি নিজে বাস্কেটবলের সূক্ষ্ম গুণগ্রাহী ভক্ত নই, বরং কী ঘটছে, তা বুঝে নেওয়ার ভার আজাজেলের ওপরই ছেড়ে দিয়েছিলাম। তার বুদ্ধি মানুষের মতন না হয়ে, জিনের বুদ্ধি হলেও তা যথেষ্ট তীক্ষ্ণ ছিল।

    খেলার শেষে সে মন্তব্য করল, খেলার মাঠে গাব্দা-গোব্দা জবরজং, যাচ্ছেতাই মানুষগুলোর ঝাঁপাঝাঁপি থেকে আমার যতদূর মনে হল, যখনই গর্তের মধ্য দিয়ে বলটি গলিয়ে দেওয়া যাচ্ছে, তখনই ভরপুর উত্তেজনা।

    ‘ঠিক তাই’ আমি বলি, ‘তুমি এক বাস্কেট জিতলে।’

    ‘তাহলে, তোমার এই আশ্রিত, এই বোকা বোকা খেলায় এক বীরোচিত খেলোয়াড় হতে পারত, যদি সে প্রতিবারই গর্তের মধ্যে দিয়ে বলটাকে গলিয়ে দিতে পারত।’

    ‘একদম ঠিক।’

    আজাজেল্ চিন্তিত হয়ে লেজ দোলাল। ‘সেটা খুব বেশি কঠিন হবে না। আমাকে শুধু ওর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়াগুলি নিয়ন্ত্রিত করে দিতে হবে, যাতে সে দিক নির্ণয়, উচ্চতা, কতটা জোর দিতে হবে ইত্যাদি সঠিক বিচার করতে পারে। এক মুহূর্তের জন্য ফের চিন্তামগ্ন হয়ে চুপ করে রইল। তারপর বলল, ‘দেখা যাক! আমি, খেলা চলাকালীন ওর নিজস্ব ক্রিয়া প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করে বুঝে নিয়েছি। …

    হ্যাঁ হয়ে যাবে। আসলে হয়েই গেছে। তোমার লিয়েন্ডারের বিন্দুমাত্র অসুবিধা হবে না, বল গর্তের মধ্য দিয়ে গলবেই গলবে।…’

    পরবর্তী নির্ধারিত খেলার জন্য অপেক্ষা করতে করতে আমি খানিক উত্তেজিত হয়ে পড়লাম। ছোট্ট জুনিপারকে একটা কথাও বলিনি। কারণ সে পর্যন্ত আমি আজাজেলের দানবিক শক্তি ব্যবহার করিনি এবং ওর কথাবার্তার সঙ্গে কার্যকলাপের কতটা সঙ্গতি থাকছে, সে সম্পর্কেও সম্পূর্ণ নিশ্চিত ছিলাম না। তাছাড়া আমি তাকে চমকে দিতে চেয়েছিলাম। (এবং তার পর যা ঘটেছিল, তাতে জুনিপার বিষম বিস্মিত হয়েছিল, আমিও।’)

    অবশেষে খেলার দিন এসেই গেল, এবং খেলা শুরু হল। আমাদের স্থানীয় কলেজ নাদসভিলে টেক, যার বাস্কেটবল টিমে লিয়েন্ডার ছিল নিভু নিভু জ্যোতিষ্ক, আল্ কাপোন রিফর্মেটরি সংস্থার ঢ্যাঙঢেঙে লম্বা ও গাট্টাগোট্টা খেলোয়াড়দের মোকাবিলা করছিল এবং দর্শকদের প্রত্যাশা ছিল অভাবনীয় কিছু ঘটার।

    কিন্তু কতটা অভাবনীয়, এ বিষয়ে আন্দাজ ছিল না। কাপোন-এর পাঁচজন অগ্রণী ভূমিকা নিল আর আমি লিয়েন্ডারকে তীক্ষ্ণ নজরে রাখলাম। মনে হল, কি করে উঠবে, বুঝতে লিয়েন্ডারের কষ্ট হচ্ছে এবং প্রথমে মনে হল, বলকে গর্তে গলিয়ে দিতে তার হাত ঠিক নাগাল পাচ্ছে না। তার তাৎক্ষণিক সাড়া দেওয়ার ক্ষমতা এতটাই পাল্টে গিয়েছিল, সে প্রথম প্রথম সমস্ত পেশী, নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারছিল না। কিন্তু পরক্ষণেই দেখলাম, সে যেন নবীন দেহে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে। বল ধরতেই তার হাত থেকে বল যেন পিছলিয়ে গেল। এ এক অদ্ভুত পিছলানো। বেঁকে গেল আকাশে, উঁচুতে এবং টুপ্ করে সিঁধিয়ে গেল গর্তে। দর্শকদের ভিতর বন্য উল্লাস আর লিয়েন্ডার চিন্তিতভাবে গোলের গর্তে তাকিয়ে রইল, কি যে ঘটে গেল, তাতে সে নিজেই বিস্মিত। যাই-ই ঘটুক, পুনরাবৃত্তি হতে থাকল বারংবার। লিয়েন্ডার বল ছোঁয়ামাত্র, বল ফকিয়ে বেঁকে যাচ্ছে। আর বাঁকতে বাঁকতে ঘুরতে ঘুরতে আশ্রয় নিচ্ছে গোলের গর্তে। ঘটনাগুলো এতই দ্রুত ঘটে চলল, কেউ লিয়েন্ডারকে বলের লক্ষ্যে একাগ্র হতে বা কোনো চেষ্টা করতেই দেখতে পেল না। স্পষ্ট এক অদ্ভুত কৌশল মনে করে দর্শক জনতা উত্তরোত্তর উন্মত্ত হয়ে উঠল।

    কিন্তু ততক্ষণে সাংঘাতিক গোলমাল যা ঘটার ঘটেই গেছে। সমগ্র খেলা চরম বিশৃঙ্খলায় পর্যবসিত। দর্শকমণ্ডলী থেকে সিটি মারার সাথে সাথে তীব্র ধিক্কার উঠছে। আমি আজাজেকে যা বলতে ভুলেছিলাম। আসলে, যা সাধারণ বুদ্ধিতেই বুঝে নেওয়া উচিত। আজাজেল্ সেটাই বোঝেনি। আজাজেল্ বোঝেনি দুটি বাস্কেটের একটি নিজের দল ও অন্যটি বিপরীত দলে। প্রতিটি খেলোয়াড়কে অন্য পক্ষের সঠিক বাস্কেটে বলটি ছুঁড়তে হবে। অচেতন বস্তুর শোচনীয় অজ্ঞতা নিয়ে, লিয়েন্ডারের ছোঁয়া বল, বেঁকে যাচ্ছিল সেই বাস্কেটের গর্তে, যেটি লিয়েন্ডারের কাছে রয়েছে। লিয়েন্ডার গোল করছিল, নিজেদের বাস্কেটেই। বল তার হাতের স্পর্শ পাওয়া মাত্র ধাবিত হচ্ছিল, তার নিকটতম বাস্কেটে।

    নার্দস ভিলেরকাচের মিনতিপূর্ণ নিষেধ সত্ত্বেও, লিয়েন্ডারকে বারবার এই কাজটি করতে হচ্ছিল। কোচ ক্লজ (পপ্) ম্যাক ফাং, নরম ওষ্ঠ-আবরণীর আড়াল থেকেই চিৎকার করছিলেন। ফল হয়নি, দীর্ঘশ্বাস ফেলে পপ ম্যাক ফাং দাঁত কিড়মিড় করে উঠলেন আর সর্বসমক্ষে কেঁদেই ফেললেন। কারণ লিয়েন্ডারকে খেলা থেকে বার করে দিতে হবে। লিয়েন্ডারের গলা থেকে সকলে তাঁর আঙুল সরিয়ে দিল, যাতে লিয়েন্ডারকে তখনই বহিস্কার করা যায়।

    বন্ধু, লিয়েন্ডার আর সে লিয়েন্ডার রইল না। স্বভাবতই আমি ভেবেছিলাম, সে সুরার মধ্যে মুক্তি খুঁজবে এবং কঠোর চিন্তামগ্ন সুরাসক্ত মানুষে পরিণত হবে। কিন্তু তা হয়নি। সে অন্তরের অন্তস্তলের গহীনে গেল। পড়াশোনায় ডুবে রইল। সহপাঠীদের অবজ্ঞা ও করুণার দৃষ্টি মাথায় নিয়ে, সে নিয়মিত ক্লাস করে চলল। বইতে মাথা গুঁজে, অহরহ পাঠচর্চায় নিবেদিত হয়ে গেল।

    এত কাণ্ডের পরও কিন্তু জুনিপার তার সঙ্গে ছিল। অশ্রুবর্ষণ না করে ঝাপসা চোখে জুনিপার বলত ‘ওর আমাকে প্রয়োজন।’ স্নাতক হওয়ার পর সব ছেড়ে জুনিপার, লিয়েন্ডারকে বিবাহ করেছিল। জুনিপার লিয়েন্ডারের সঙ্গেই জীবন কাটাচ্ছে। লিয়েন্ডার এখন পদার্থ বিদ্যায় পিএইচডি করে পরিচয়যোগ্য জ্ঞানী পুরুষ।

    তারা দুজন পশ্চিমের দিকে একটা ছোট কো-অপারেটিভে বাস করে। যতদূর জানি, লিয়েন্ডার ফিজিক্স পড়ায়। আর লিয়েন্ডারকে যারা আগে থেকে চিনত স্কটল্যান্ডবাসী সৈনিক হিসেবে, তারা কিন্তু নিজেদের মধ্যে কানাকানি করে বলে, লিয়েন্ডার নোবেল পুরস্কারের জন্য এক সম্ভাব্য প্রার্থী।

    জুনিপার কখনো অনুযোগ জানায় না, সে তার আদর্শ প্রেমিকের প্রতি বিশ্বস্ত। কথায় বা কাজে তার কোনো কিছু খোওয়ানোর আক্ষেপ নেই। তাই বলে, সে বুড়ো ধর্মবাপকে বোকা বানাতে পারবে না।

    আমি খুব ভাল করে জানি, কখনো কখনো তার ঐকান্তিক ভাবনায় ভাসে, এক আঙ্গুরলতাঘেরা প্রাসাদ, যা কখনো তার আয়ত্তে আসবে না। আর পাহাড় ঘেরা দূর দিগন্ত বিস্তৃত তার স্বপ্নের ছোট্ট তালুক, যা তার নাগালের বাইরে।

    ‘এই হল গল্প,’ থামলেন জর্জ। ওয়েটার যা ফেরত এনেছিল, তা তুলে নিয়ে জর্জ, ক্রেডিট কার্ড রসিদের মোট ডলারের পরিমাণটা লিখে নিলেন (হয়তো, তার আয়কর ছাড়ের কাজে লাগবে, মনে হল আমার) তারপর আরো বললেন, ‘আমি যদি আপনি হতাম, তবে বড় রকমের বকশিস ছেড়ে যেতাম।’

    তাই-ই করলাম আমি, তবে খানিক হতবুদ্ধির মতন। জর্জ হেসে বের হয়ে গেলেন। অবশ্য, ফেরত ডলার না নিয়ে, ক্ষতি হয়েছে বলে, আমার অনুতাপ হল না। আমার মনে হল, জর্জের মাত্র একবার মুফতে আহার মিলেছে আর আমি পেয়েছি একটা গল্প। যা আমার মতো করে বলতে পেরে, আহারের তুলনায় অনেক গুণ অর্থ আমি উপার্জন করব। আসলে, আমি স্থির করেই ফেললাম, এখন থেকে মাঝে মাঝেই জর্জের সঙ্গে আমি রাতের খাবার চালু করবো।