Author: বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

  • বর্ষা

    বর্ষা

    সৈয়দ মুজতবা আলী

    [book-name]

    বর্ষা

    কাইরোতে বছরে ক’ইঞ্চি বৃষ্টি পড়ে এতদিন বাদে সে কথা আমার আর স্মরণ নেই। আধা হতে পারে সিকিও হতে পারে। দিনের পর দিন, মাসের পর মাস মেঘমুক্ত নীল আকাশ দেখে দেখে আমার তো প্রথমটায় মনে হয়েছিল, এদেশে বুঝি আদপেই বৃষ্টিপাত হয় না। আর গাছপালার কী দুরবস্থা, পাতাগুলোর কী অদ্ভূত চেহারা! সাহারার ধুলো উড়ে এসে চেপে বসেছে পাতাগুলোর গায়ে-সিন্দাবাদের কাঁধে যে রকম পাগলা বুড়ো চেপে বসেছিল-সে ধূলা সরানো দু-দশটা হৌজের কর্ম নয়। কাফেতে বসে বুলভারের গাছগুলোর দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে প্রায়ই ভাবতুম, এদের কপালে কি কোন প্রকারের মুক্তিস্নান নেই?

    সুদানের একটি ছেলের সঙ্গে আলাপ হল। সে বললে, তার দেশে নাকি ষাট বছরের পর একদিন হঠাৎ কয়েক ফোটা বৃষ্টি নেবেছিল। মেয়েরা, কাচ্চাব্বাচ্চারা, এমন কি গোটা কয়েক জোয়ান মদ্দরা পর্যন্ত হাউমাউ করে কান্নাকাটি জুড়েছিল, ‘আকাশ টুকরো টুকরো হয়ে আমাদের ঘাড়ে ভেঙে পড়লো গো। আমরা যাব কোথায়? কিয়ামতের (মহাপ্রলয়ের) দিন এসে গেছে। সব পাপের তওবা (ক্ষমা-ভিক্ষা) মাঙবার সময় পেলুম না, সবাইকে যেতে হবে নরকে। গাঁও-বুড়োরা নাকি তখন সান্ত্বনা দিয়ে বলেছিলেন, ‘এতে ভয় পাবার কিছু নেই। আকাশ টুকরো টুকরো হয়ে ভেঙে পড়ছে না। এ যা নাবিছে সে জিনিস জল। এর নাম মৎর (অর্থাৎ বৃষ্টি)।’ সুদানী ছেলেটি আমায় বুঝিয়ে বললে, ‘আরবী ভাষায় মৎর (বৃষ্টি) শব্দ আছে; কারণ আরব দেশে মাঝে মাঝে বৃষ্টি হয়, কিন্তু সুদানে যে-আরবী ভাষা প্রচলিত সেভাষায় মৎর শব্দ কখনো ব্যবহৃত হয় নি বলে সে শব্দটি সুদানী মেয়েছেলেদের সম্পূর্ণ অজানা।’

    সুদানে যাই হোক। কিন্তু একদিন যখন হঠাৎ কাইরোতে বৃষ্টি নাবল আমি তখন আনন্দে আত্মহারা হয়ে কাফে ছেড়ে রাস্তায় বেরিয়ে পড়লুম। বিরহী যক্ষ যেরকম দুই বাহু প্রসারিত করে উত্তরের বাতাস আলিঙ্গন করেছিল; আমি ঠিক সেইরকম ‘ঝড় নেমে আয়’ বেসুরা বেতালা করে গাইলুম আর আমার জোব্বাজাব্বা যে ভিজে কাঁই হল, সে কথা বলাই বাহুল্য।

    বৃষ্টি না থামার পূর্বেই ফিরে এলুম পাড়ার কাফেতে। সবাইকে বোঝাবো, বাঙলা দেশে কি রকম অদ্ভুত বর্ষা নামে, তার কি অপূর্ব জৌলুস। দেখি, আড্ডার সদস্যরা কেউ আধভেজা, কেউ ছ’আনা, কেউ দু’আনা। আমাকে দেখা মাত্ৰ সবাই তো মারমার করে। তেড়ে এল। আরে, বুঝিয়েই বলে না, কি ব্যাপার, চটছে কেন?

    সবাই এক সঙ্গে কথা কয়। কি মুশকিল: ভাবখানা অনেকটা;—এই ড্যাম নুইসেন্স বৃষ্টির প্রশংসা আমি রাস্কেল ইন্ডিয়ান কেন এতদিন ধরে করে আসছি? আর দ্যাটু পোয়েট টেগোর, যার নামে আমি অজ্ঞান, সেই বা এই বৃষ্টির নামে এত কবিতা লিখল কেন? সুট বরবাদ হয়ে গিয়েছে, হিম লেগে কেউ হাঁচ্ছে, কেউ কাঁদছে, কেউ বা পিছলে-পড়ে হাত ভেঙে ফেলেছে। আর সবচেয়ে মারাত্মক খবর, পাউলুসের বান্ধবী বৃষ্টির জন্য আসতে পারে নি বলে পাউলুস মর্মাহত হয়ে পটাশিয়াম সায়ানাইডের সন্ধানে বেরিয়ে গিয়েছে। মহা মুশকিলে পড়লুম। জুৎসই কি উত্তর দিই! মৃৎশকটিকায় বসন্তসেনা বৃষ্টিতে ভিজে যখন চারুদত্তের সামনে উপস্থিত হয়েছিলেন তখন যে কাব্য সৃষ্টি হয়েছিল, তার বর্ণনা এদের সামনে এই বেমক্কায় পেশ করলে এরা আমাকে খুন করবে; মেঘদূতের বয়ান, জয়দেবের ‘মেঘৈর্মেদুরস্বরং এদের সামনে গাইতে গেলে এরা আমাকে জ্যান্ত পুঁতে ফেলবে। তাই ভাবলুম, কার্ল মার্কসের স্মরণ নেওয়াই প্রশস্ত। অর্থনৈতিক কারণ দেখালে এরা হয়ত মোলায়েম হবে। বললুম, ‘বৃষ্টি না হলে গাছপালা, গম-ধান গজাবে কি প্রকারে?’

    সবাই আমার দিকে এমন ভাবে তাকালে যেন আমি বেহেড মাতাল অথবা বদ্ধ উন্মাদ। মিশরে পাগলা উটের কামড় খেয়ে বহু লোক মতিচ্ছন্ন হয়ে যায় বলে এরা পাগলকে কি ভাবে সায়েস্তা করতে হয় সে কথা বিলক্ষণ জানে। রমজান বললে, ‘কাইরো শহরের ভিতর কি যবগম। ফলে যে এখানে বৃষ্টির প্রয়োজন? যবগম ফলে গ্রামাঞ্চলে। সেখানে বৃষ্টি হোক না, কে র্যারণ করছে। কিন্তু শহরের ভিতরে কেন?’

    শরিফ মুহম্মদ বললো, ‘সেখানেই বা বৃষ্টি হবে কেন? আমাদের গম-ধান ফলে নাইলের জলে। এই যে বৃষ্টি কখন আসে কখন আসে না তার তো কিছু ঠিক-ঠিকানা নেই। এর উপর নির্ভর করলে মিশরীদের আর বাঁচতে হত না।’ আমি কি উত্তর দেব ভাবছি, এমন সময় গ্ৰীক সদস্য পাউলুস ফিরে এসে ঝুপ করে একটা চেয়ারে বসে টেবিলে মাথা রেখে নিঃশব্দে চোখের জল ফেলতে আরম্ভ করল। আমার সঙ্গে তর্কাতর্কির কথা সবাই ভুলে গিয়ে পাউলুসের চতুর্দিকে ঘিরে দাঁড়ালো।

    কি হয়েছে, কি ব্যাপার?

    অনেক ঝুলোকুলির পর পাউলুস মাথা না তুলেই ফুপিয়ে যা বললো তার অর্থ, মেঘ আর বৃষ্টিতে তার বান্ধবীর বিরহবেদনা তাকে কাবু করে ফেলেছে। এ যন্ত্রণা সে সইতে পারবে না। পটাসিয়াম সায়ানাইড রেশনড হয়ে গিয়েছে। মৃত্যুর অন্য কোনো প্রশস্ত পন্থা আড্ডা যদি থাকে না বাংলায়। তবে—ইত্যাদি।

    আমাকে তখন আর পায় কে? হুঙ্কার দিয়ে বললুম, ‘ওরে মুখের দল, জীবনের সবচেয়ে বড় সত্য বিরহী। আর বিরহ করে কয়, সে-কথা কি করে জানবি মেঘ না জমলে, বৃষ্টি না ঝরলো? আর শেষ তত্ত্বকথা কবিতা কি করে ওৎরাবে বিরহবেদনা যদি মানুষকে পাগল করে না তোলে?’

    * * *

    আজও ভাবি, আমাদের পদাবলী, জয়দেব, কালিদাস, শূদ্ৰক যে বিরহ বর্ণনা রেখে গিয়েছেন তার সঙ্গে তো অন্য কোন সাহিত্যের বিরহ বর্ণনার তুলনা হয় না। তার একমাত্র কারণ আমাদের বর্ষা।

    জিন্দাবাদ হিন্দুস্থানী বর্ষা!!

  • প্যারিস

    প্যারিস

    সৈয়দ মুজতবা আলী

    [book-name]

    প্যারিস

    [tab title=”এক”]

    প্রাতরাশ খেতে খেতে থিয়ো জিজ্ঞাসা করল—তাহলে আমার শেষ চিঠিটা পাওনি?

    মনে তো হয় না, ভিনসেন্ট বললে—কী লিখেছিলে সে-চিঠিতে?

    বাঃ, মস্ত সুখবর যে! গুপিলসের চাকরিতে আমার উন্নতি হয়েছে।

    তা-ই নাকি? আচ্ছা তো তুমি থিয়ো? কাল এ সম্বন্ধে একটা কথাও তুমি বলনি!

    যেরকম উত্তেজিত ছিলে তুমি কাল, বলবার ফুরসত পেলাম কোথায়? জান, মোমার্তে বুলেভার্দের দোকানটার ম্যানেজার হয়েছি আমি।

    অ্যাঁ! এ যে দারুণ খবর! আলাদা একটা আর্ট গ্যালারি এখন তোমার!

    আমার বললে বেশি কথা বলা হবে। কেননা গুপিলসের পলিসি আমাকে মেনে চলতেই হবে। তবে কিছুটা স্বাধীনতা রইল আমার। ইম্প্রেশনিস্টদের ছবি কিছু কিছু আমি রাখতে পারব। যেমন ধরো, মনে, ডেগা, পিসারো আর মানে…

    নামই শুনিনি আমি এঁদের!

    বেশ তো, চলো তাহলে আমার গ্যালারিতে। ছবি দেখবে এঁদের। তাড়াতাড়ি খেয়ে নাও। কফি দেব আর-একটু?

    হাত থেকে কফির শূন্য পেয়ালা নামিয়ে ভিনসেন্ট বললে—যা-ই বলো থিয়ো, আবার এক টেবিলে বসে তোমার সঙ্গে খাচ্ছি, ভারি ভালো লাগছে।

    থিয়ো বললে—আমি তো কতদিন থেকে বলে আসছি প্যারিসে তোমাকে আসতেই হবে। তবে জুন মাসটা পার করে এলেই ভালো হতো। এত ছোটো জায়গায় কাজের তোমার খুব অসুবিধে হবে। জুন মাসের পর আমি রু লেপিকে উঠে যাব। ফ্ল্যাট ঠিক করাই আছে সেখানে, বড়ো বড়ো তিনটে ঘর।

    থিয়োর এই ফ্ল্যাটটা বলতে একখানা ঘর আর আলাদা একটা রান্নাঘর। সঙ্গে বাজে জিনিসপত্র রাখার একটা কুঠরি। সুন্দর আসবাবপত্রে ঘরটি সাজানো, কিন্তু হাঁটাচলার জায়গাটুকু বিরল।

    ভিনসেন্ট বললে—এর মধ্যে আবার যদি আমাকে ইজেল পাততে হয়, তাহলে তোমার এমন চমৎকার আসবাবগুলো যাবে। কিছু-কিছুর ঠাঁই অবশ্য হবে নীচের উঠোনে।

    সত্যি, এগুলোর বড়ো ভিড়। কিন্তু এত সস্তায় পেলাম, লোভ সামলাতে পারিনি। চলো, নতুন ফ্ল্যাটে গেলে মানাবে ভালো।

    হ্যাঁ, সে তো বটেই।

    এবার তাড়া দিল থিয়ো—ওঠো, তাড়াতাড়ি চলো এখন। প্যারিসের ভোর বেলাকার সুরভিই যদি নাকে না নিলে, তাহলে এখানে এসে করলে কী?

    ভারী কালো কোটটা গায়ে চড়িয়ে নিল থিয়ো, ঠিক গলার নীচে বুকের ওপর ফুটে রইল কড়া ইস্ত্রি করা ধবধবে সাদা বো-টা। আরশির সামনে দাঁড়িয়ে কোঁকড়া চুলে ক-বার পরিপাটি করে বুরুশ চালিয়ে আর গোঁফটা একবার পাকিয়ে নিয়ে মাথায় চড়াল কালো সিল্কের টুপি, হাতে দস্তানা আর রুপো-বাঁধানো ছড়ি।

    কী হল? অ্যাঁ, এই নাকি তুমি তৈরি? সর্বনাশ, এ-জামাকাপড় পরে প্যারিসের রাস্তায় হাঁটাচলা করলে তোমাকে যে পুলিশে ধরবে!

    ভিনসেন্ট ফ্যালফেলে চোখে নিজেকে দেখে নিল দু-বার। তারপর বললে—কেন? হয়েছেটা কী? এই জামাকাপড় পরে আমি পুরো দুটো বছর কাটালাম, একটা কথাও কেউ তো বলেনি কোনোদিন!

    বলেনি? হো-হো করে হেসে উঠল থিয়ো—তা বেশ, চলো। প্যারিসের যারা বাসিন্দে, সবকিছু দেখবার অভ্যেস তাদের আছে। বিকেলে গ্যালারি বন্ধ হবার পর তোমার নতুন জামাকাপড় কেনবার ব্যবস্থা করা যাবে।

    ঘোরানো সিঁড়ি বেয়ে নীচে নেমে গেট পার হয়ে তারা পড়ল রু লাভাল রাস্তায়। বেশ চওড়া রাস্তা, দু-ধারে নানা রকমের বড়ো বড়ো দোকান, কোনটা ওষুধপত্রের, কোনটা ছবি বাঁধাইয়ের, কোনটা মনোহারী।

    থিয়ো হাত তুলে দেখাল—আমাদের বাড়ির মাথার মূর্তি তিনটে দেখছ?

    বুক পর্যন্ত তিনটি নারীমূর্তি, প্লাস্টার অব প্যারিসের। প্রথমটির নীচে লেখা স্থাপত্য, দ্বিতীয়টির নীচে ভাস্কর্য, তৃতীয়টির নীচে অঙ্কনকলা।

    ভিনসেন্ট বললে—বাঃ! কিন্তু অঙ্কনকলা মেয়েটি অমন কুৎসিত দেখতে কেন?

    তা বাড়িওয়ালাই জানে। কিন্তু এটা তো বুঝতে পারছ যে বেশ পাকা জায়গাতেই এসে উঠেছ!

    সে আর বলতে! শিল্পলক্ষ্মীরা তো সব মাথায় চড়ে বসে আছেন দেখছি!

    মনোরম আঁকাবাঁকা রাস্তাটি রু মোমার্ত। পাহাড়ের গা বেয়ে উঠেছে আভেন্যু ক্লিচি পর্যন্ত, তারপর গড়িয়ে গিয়েছে একেবারে শহরের কেন্দ্রস্থলে। রাস্তাভরতি জ্বলজ্বলে রোদ, ধারে ধারে কাফেতে বসে লোকে প্রাতরাশ খাচ্ছে, মাংস, সবজি আর পনিরের দোকানগুলোর পাল্লা খুলছে। সত্যি, সকাল বেলাকার গন্ধটি চমৎকার।

    সাধারণ লোকের পাড়া, সারি সারি ছোটো ছোটো দোকানপাট। কারিগররা চলেছে দিনের কাজে রাস্তার মাঝখান দিয়ে ভিড় করে। গৃহিণীরা বেরিয়েছে বাজার করতে।

    লম্বা একটা নিশ্বাস নিল ভিনসেন্ট—প্যারিস, শেষপর্যন্ত এসে পৌঁছোলাম!

    থিয়ো বললে—হ্যাঁ, এই প্যারিস, সারা ইয়োরোপের রাজধানী, শিল্পীর স্বর্গ।

    পাহাড়ের গায়ে চড়াই-উতরাইয়ের রাস্তা বেয়ে প্যারিসের জীবনস্রোত বয়ে চলেছে, ভিনসেন্ট যেন ভূষিত কণ্ঠ ভরে পান করছে এই তরঙ্গ। লাল কালো পোশাকের পুলিশ, শৌখিন পোশাক পরা তরুণ চাকুরে আর ব্যাবসাদার, বড়ো বড়ো রুটি বগলদাবা-করা মোটাসোটা গিন্নি, নরম চটি পায়ে রাত্রি-জাগা ঢুলুঢুলু চোখে কয়েকটি তরুণী… অসংখ্য দোকান আর পানশালা আর ঠেলাগাড়ি। পাহাড়ের উতরাই বেয়ে রু মোমার্ত এসে পৌঁছোল প্লেস চাতুদুনে। ছ-রাস্তার একটা মোড়। মোড় পার হয়েই পুরোনো একটি গির্জে—নতারদাম দ্য লোরেত। গির্জের দরজায় খোদাই করে লেখা ফরাসি বিপ্লবের বিখ্যাত বাণী—সাম্য মৈত্রী স্বাধীনতা।

    ভিনসেন্ট দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে লেখাটা পড়ল। জিজ্ঞাসা করলে থিয়োকে—এ–বাণীর কোনো দাম আছে আজকাল? বিশ্বাস করে কেউ?

    করে বই কী। তৃতীয় রিপাবলিক টিকে যাবে বলেই মনে হয়। রয়ালিস্টরা সব ফৌত হয়ে গেছে, সোশ্যালিস্টদের শক্তি বাড়ছে। এমিল জোলা আমাকে সে-দিন বলেছিল, এবার যে-বিপ্লব হবে তা আর রাজারাজড়ার বিরুদ্ধে নয়, পুঁজিবাদীদের বিরুদ্ধে।

    জোলা! তুমি তাকে চেন? আলাপ আছে তোমার সঙ্গে?

    পল সেজান আমার সঙ্গে জোলার আলাপ করিয়ে দিয়েছিল। সপ্তাহে একদিন করে আমরা একসঙ্গে বসি কাফে ৰাতিনোলসে। এবার যেদিন যার তোমাকে নিয়ে যাব সঙ্গে।

    প্লেস চাতুদুন পার হবার পর থেকেই রু মোমার্ত-এর মধ্যবিত্ত চেহারাটা ঘুচল, দেখা দিল বনেদিয়ানা। বড়ো বড়ো দোকান, উঁচু উঁচু বাড়ি, জমকালো কাফে আর হোটেল। লোকজনের গায়ের পোশাকও অনেক দামি, ঝকঝকে, গাড়িরও ইয়ত্তা নেই।

    জোরে পা চালাল দু-ভাই। হাঁটতে হাঁটতে থিয়ো বললে—বাড়িতে যখন তোমার কাজ করবার সুবিধে হবে না তখন মনে হয় করম্যানের স্টুডিয়োতে কাজ করাই তোমার ভালো।

    কেমন জায়গাটা?

    শিল্পের গুরুমশাই তো করম্যান, অতএব খুব রক্ষণশীল। তবে নিজের মতো একলা একলা যদি কাজ করে যেতে চাও তাহলে তোমাকে ঘাঁটাবে না।

    কিন্তু খরচ তো লাগবে?

    থিয়ো হাতের ছড়িটা দিয়ে ভিনসেন্টের ঊরুতে একটা টোকা মারল, বললে—বলিনি আমার চাকরিতে উন্নতি হয়েছে? জোলার মতে, আসছে বিপ্লবে যেসব লোক গিলোটিনে যাবে, আমি এখন তাদেরই একজন।

    শেষ পর্যন্ত রু মোমার্ত এসে মিশল মোমার্ত বুলেভার্দে। বিরাট রাজবÁ, মস্ত মস্ত দোকান, লম্বা লম্বা গাড়িবারান্দা। কয়েক পা এগিয়েই ইতালিয়ান বুলেভার্দ আর তার পরেই রাজধানীর সেরা রাস্তা প্লেস দ্য লা-অপেরা। চারদিক ফাঁকা, এখনও ঘুমিয়ে আছে রাজকীয় এলাকা। দোকানগুলোর মধ্যে মধ্যে কেরানিরা দিনের কাজের জন্যে প্রস্তুত হচ্ছে। জ্বলজ্বলে রৌদ্রে সামান্য শীতের মেজাজি আমেজ।

    গুপিল গ্যালারির যে-শাখাটির থিয়ো ম্যানেজার তার নম্বর ১৯, রু মোমার্তের ঠিক এই মোড়ে, ডানদিকে একখানা বাড়ির পরেই।

    ভিনসেন্ট আর থিয়ো রাস্তা পার হয়ে গ্যালারির দরজায় এসে পৌঁছোল।

    পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন সাজগোজ-পরা কেরানিরা উঠে দাঁড়িয়ে সশ্রদ্ধভাবে থিয়োকে অভিবাদন করতে লাগল। ভিনসেন্টের মনে পড়ল সেও যখন এমনি কেরানি ছিল কেমন করে ঘাড় হেলিয়ে সে টারস্টিগ আর ওবাককে প্রাত্যহিক অভিবাদন জানাত। সারা দোকান জুড়ে কেমন একটি যেন গন্ধ, গন্ধটা আভিজাত্য, ভব্যতা আর সংস্কৃতির, এই গন্ধটাকেও আবার তার মনে পড়ল। সালোঁর দেয়ালে বুর্গেরু, হেনার আর ডেলারোকের নানা পেন্টিং। প্রধান সালোঁটির ওপরে ছোট্ট একটি বারান্দা, পেছনদিকের সরু সিঁড়ি দিয়ে সেখানে ওঠা যায়।

    থিয়ো চাপা হাসি হেসে বললে—যে-ছবিগুলো তোমাকে দেখাব বলে এনেছি সেগুলো ওই বারান্দায়। আগে দেখে নাও, তারপর আমার আপিসে এসো। কেমন লাগল শুনব।

    চুপি চুপি হাসছ কেন থিয়ো?

    হাসিটা প্রকট হয়েই পড়ল। থিয়ো বললে—দেখেই এসো না!

    [tab title=”দুই”]

    কোথায় এলাম! পাগলাগারদে?

    ধাঁধা লেগে গেল দেখে। কোনো রকমে বারান্দার একটা চেয়ারে ধপ করে বসে পড়ল ভিনসেন্ট। দু-চোখ কচলাল কিছুক্ষণ। তারপর আবার সাহস করে চোখ খুলে হাঁ করে তাকাল দেয়ালের দিকে। বারো বছর বয়েস থেকে ছবি দেখা তার অভ্যাস—বনেদি ছবি, গভীর-গম্ভীর রং, তুলির একটি রুক্ষ আঁচড় পর্যন্ত যার গায়ে খুঁজে পাওয়া যায় না, একটা রঙের সঙ্গে আর-একটা রং আস্তে আস্তে মিশে রঙে রঙে একাকার হয়ে যায়।

    কিন্তু এসব কী? দেয়ালে দেয়ালে এসব যেগুলো ঝুলছে যেন দাঁত বার করে তার দিকে চেয়ে হাসছে, স্বপ্নেও সে এমনি ছবির কল্পনা করতে পারেনি! কোথায় গেল রঙের সঙ্গে অদৃশ্যভাবে রং মিলিয়ে দেবার রীতি, কোথায় গেল সেই বনেদি গাম্ভীর্য! যুগের পর যুগ ধরে যে ঘন বাদামি রঙে ইয়োরোপের সব ছবি নিত্য স্নান করেছে, সেই অতি পরিচিত রংটাই-বা কোথায় গেল? যে-শিল্প ছিল চিরকাল ছায়ার আশ্রয়ে মেদুর ধূসরতায়, সেই ছায়ার আস্তরণ টুকরো টুকরো করে কে ছিঁড়ে দিল? পলাতকা সেই চিরবিষণ্ণ মেঘমায়া, তার জায়গায় মাথা তুলে হাসি ঝিলকিয়ে খাড়া হয়ে দাঁড়িয়ে আছে সূর্যপাগল রংমাতাল সব ক্যানভাস। এরা কি ছবি? একটা ক্যানভাসে সে দেখল স্টেজের পেছনে দাঁড়ানো কয়েকটা ব্যালেনাচের মেয়ে। লজ্জা নেই ওদের! লাল সবুজ আর নীল রং আলাদা আলাদা হয়ে নির্লজ্জ স্পষ্টতায় আসর জমিয়েছে ওদের ঘিরে। লজ্জা নেই শিল্পীর। সে আবার নাম সই করেছে ক্যানভাসটার তলায়। নামটা পড়ল ভিনসেন্ট। ডেগা

    নদীতীরের কয়েকটি বহির্দৃশ্য। সূর্যকরোজ্জ্বল উষ্ণ বসন্ত-আকাশের সমস্ত আলো আর রং আর প্রগল্ভতা ছড়িয়ে পড়েছে প্রতিটি ছবির অঙ্গে অঙ্গে। শিল্পীর নাম—মনে। জ্বলন্ত প্রভাতের ছবি, সে-প্রভাতে কত সুগন্ধ কত গান, বাতাসে কত দোলা! হল্যান্ডের সারা মিউজিয়ামে যত ছবি আছে তার মধ্যে সবচেয়ে পাতলা রংটি যেখানে লাগানো হয়েছে, ঠিক সেইটিই মনের সবচেয়ে গভীর রং। তুলির প্রত্যেকটি রেখা নিলাজ নগ্নতায় স্পষ্ট হয়ে ফুটে ফুটে আছে, প্রকৃতির বলিষ্ঠ নির্লজ্জ আত্মপ্রকাশের মতো। পাকা ঘন ডেলা ডেলা রং কোনো পাগল শিল্পী ছুঁড়ে মেরেছে ক্যানভাসের ওপর, মোটা চটচটে চেহারা নিয়ে তারা ফুটে ফুটে আছে!

    আর-একটি ছবির সামনে দাঁড়াল ভিনসেন্ট। ছোট্ট একটি নৌকোয় একটি লোক, গায়ে পশমের শার্ট, হাতে নৌকোর দাঁড়, মুখে কেমন একটা নিবিষ্ট ভাব। পাশে চুপটি করে বসে রয়েছে তার স্ত্রী। সারা ছবিকে ঘিরে ছুটির দিনের বিকেল বেলাকার অনায়াস আলস্য। শিল্পীর নামটা পড়ল ভিনসেন্ট।

    মনে? একই শিল্পী? বাঃ কী আশ্চর্য! বহির্দৃশ্যের ছবিগুলোর সঙ্গে এ-ছবিটার কোনো মিল নেই তো!

    আবার নামটা দেখল। না, ভুল হয়েছে। মনে নয়, মানে। এই মানের ‘প্রান্তরে পিকনিক’ আর ‘অলিম্পিয়া’ ছবির কাহিনি সে শুনেছে। লোকে উন্মাদ হয়ে ছুরি হাতে নিয়ে এ-ছবি দুটোকে কেটে টুকরো টুকরো করতে ছুটেছিল, পুলিশ এসে ছবি দুটোকে রক্ষা করে।

    কী জানি কেন, মানের আঁকা ছবি দেখতে দেখতে জোলার রচনাবলি মনে পড়ল ভিনসেন্টের। একজন চিত্রশিল্পী আর-একজন কথাসাহিত্যিক। অথচ দুজনের মধ্যে মস্ত মিল যেন রয়েছে, একই নির্ভীক অনুসন্ধিৎসা, একই সত্যনিষ্ঠা, পঙ্ক–কলঙ্কের মধ্যেও সৌন্দর্য আবিষ্কারের একই সাধনা। মানের ছবি আঁকার পদ্ধতিটা সে ভালো করে লক্ষ করতে লাগল। দেখল মৌলিক রংগুলি বলিষ্ঠ আত্মপ্রকাশে পাশাপাশি উপস্থিত, এক রং নিজেকে বিলীন করেনি অপর রঙের মধ্যে, আঁকার মধ্যে নির্বিশেষ থেকে বিশেষে যাবার ক্লান্তিকর প্রচেষ্টা নেই। সব জায়গাতেই, কি রং কি রেখা, কি আলো কি ছায়া, শুধু আভাসে পৌঁছেই থেমে গিয়েছে, চূড়ান্ত সম্পূর্ণতায় পৌঁছোবার আয়াস নেই কোথাও।

    ভিনসেন্ট মনে মনে বললে—ঠিক তো, প্রকৃতি সব কথা একসঙ্গে বলে না, সব মানে একেবারে বুঝিয়ে দেয় না, শুধু আভাসটুকু দিয়েই তো তার ক্ষান্তি।

    মনে পড়ল মভের কথা—একটা রেখা সম্পূর্ণ করে আঁকা, এটুকু পর্যন্ত তুমি পার না ভিনসেন্ট?

    চুপ করে সে বসে রইল কিছুক্ষণ। ডুবুক, আস্তে আস্তে ডুবুক ছবিগুলো মনের মধ্যে। কী এগুলোর বৈশিষ্ট্য, কী করে চিত্রশিল্পের তার এতদিনের ধ্যানধারণায় এগুলো এমন ভয়ংকরভাবে নাড়া দিল, যে-বৈপ্লবিক নতুন ধারা এদের মধ্যে বেগবতী, তার উৎস কোথায়? হঠাৎ মাথাটা পরিষ্কার হয়ে গেল ভিনসেন্টের, মূল তথ্যটি সে যেন আঁকড়ে ধরতে পারল। চিত্রশিল্পবিশারদ যাঁরা, তাঁদের ছবির মধ্যে আবহাওয়া নেই বাতাস নেই, কেননা আবহাওয়া যে চর্মচোখের বাইরে। তাঁদের ছবির মধ্যে স্থান আছে আর স্থির বস্তু আছে। বস্তুর স্থাণুত্ব দিয়ে স্থানের পরিসরকে ভরতি করে করে ছবিকে সাজিয়ে তোলা হয়েছে। আলো আছে কিন্তু রৌদ্র নেই, ছায়া আছে কিন্তু নেই ছায়ার রং। কিন্তু এইসব শিল্পীরা তাদের ছবিকে মেলে ধরেছে খোলা আকাশের নীচে সূর্যের জ্বলজ্বলে আলোর তলায়, যেখানে বাতাসের এলোমেলো লীলা। এ-বাতাস জীবন্ত, উচ্ছলতায় ভরপুর। এ-আলো প্রত্যক্ষ সূর্যরশ্মির।

    আলো আর বাতাস যেন কোনো একটা জীবন্ত তরল তরঙ্গ, সেই তরঙ্গের এ কী বিচিত্র রূপ! ভিনসেন্টের মনে হল—চিত্রশিল্পের এই বৈপ্লবিক পরিবর্তনকে কেউ আর ঠেকিয়ে রাখতে পারবে না, কিছুতে বাধা পড়বে না এই বিপুল তরঙ্গলীলা। এ যেন এক নতুন শিল্প!

    টলতে টলতে নেমে এল সিঁড়ি বেয়ে। মাঝখানে সালোঁতে থিয়ো দাঁড়িয়ে। ভাইয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল—কী হল ভিনসেন্ট, কেমন দেখলে?—ও, থিয়ো! এই অস্ফুট উচ্চারণটির বেশি আর-কিছু ভিনসেন্টের মুখ দিয়ে বার হল না।

    গ্যালারি থেকে নিজেই সে ছুটে বার হয়ে গেল রাস্তায়।

    সারাদিন সে প্যারিসের অচেনা পথে পথে ঘুরে বেড়াল। কোথাও বড়ো বড়ো রাস্তা, কোথাও-বা গলিঘুঁজি। পথের ধারে বসল কিছুক্ষণ কখনও-বা।

    সন্ধে বেলা পুলিশকে প্রশ্ন করে পথ খুঁজে সে ফিরে এল থিয়োর বাড়িতে। সারা শরীরে ক্লান্তি, বুকের মধ্যে অত্যন্ত যন্ত্রণা। বান্ডিল খুলে নিজের আঁকা এতদিনের ছবিগুলো সে ছড়িয়ে দিল মেঝেতে

    কী সে করছে এতদিন? এত ক্যানভাস, এত রং, সব অপব্যয়। এত শ্রম, এত যন্ত্রণা, সব শুধু ব্যর্থতা। বিগত শতাব্দীর মৃত অন্ধকারে সে ডুবে ছিল এতদিন, খোঁজই পায়নি কোথায় বয়ে চলেছে নতুন যুগের বিপুল আলোকবন্যা।

    থিয়ো আপিস থেকে ফিরে এসে দেখে, তেমনি বসে আছে ভিনসেন্ট চারিদিকে ছড়ানো নিজের ছবির মাঝখানে প্রস্তরীভূত হয়ে। থিয়ো তাড়াতাড়ি এসে চুপ করে বসল তার পাশে।

    একটু পরে বললে—ভিনসেন্ট, তোমার যা মনে হচ্ছে তা আমি বুঝতে পারছি। সাংঘাতিক লাগছে, তাই না? যা ভেবেছ সবচেয়ে বড়ো, যা ভেবেছ অটল অনড়, ছবি আঁকার এতদিনের আইনকানুনের পবিত্র বিধিব্যবস্থা, সব যেন চুরমার–হয়ে গেল। ঠিক বলেছি কি না বলো?

    আর্ত আহত চোখে স্থির দৃষ্টিতে ভিনসেন্ট তাকাল থিয়োর চোখের দিকে। বললে—থিয়ো, তুমি আগে কেন আমাকে দেখাওনি? আগে কেন আমাকে আননি এখানে? আমার জীবনের ছ-ছটা বছর একেবারে নষ্ট হয়ে গেল!

    নষ্ট হয়ে গেল? পাগল নাকি! তোমার যা শিল্পরীতি তা তুমি নিজে হাতে গড়ে তুলেছ। তুমি যে-ছবি আঁক তা কেবল ভিনসেন্ট ভ্যান গকই আঁকতে পারে, দুনিয়ার আর দ্বিতীয় কেউ তা পারে না। এখানে আসবার আগে তোমার নিজস্ব প্রকাশরীতিকে খুঁজে পাওয়াটা দরকার ছিল বই কী!

    বাজে কথা থিয়ো, সব বাজে কথা। আমার আর কোনো উপায় নেই! বড়ো কালো একটা ক্যানভাসে পায়ের ধাক্কা মেরে ভিনসেন্ট করুণ গলায় বলে উঠল—কী করেছি আমি এতদিন! যত সব মৃত আবর্জনার স্তূপ!

    শোনো ভিনসেন্ট। করেছ তুমি অনেককিছু। বাকি কিছুটা কাজ কেবল এখন বাকি। শুধু আলো আর রং, এইটুকু এবার শুধু তোমাকে ইম্প্রেশনিস্টদের কাছ থেকে নিতে হবে। এর বেশি কিন্তু নয়। অনুকরণ তুমি করবে না, প্যারিসের কাছে বশ্যতা স্বীকার তুমি করবে না। আগে যদি আসতে, তাহলে নিজস্বতা বলে তোমার একবিন্দুও থাকত না।

    কিন্তু থিয়ো, আমাকে যে আবার গোড়া থেকে শিখতে হবে! যা-কিছু আমি এ পর্যন্ত করেছি, সব যে ভুল!

    না। সব ঠিক, কেবল আলো আর রং ছাড়া। এর বেশি ইম্প্রেশনিস্টদের কাছ থেকে নেবার তোমার কিছু নেই। তুমি নিজেই যে তা-ই। বরিনেজে প্রথম যে-দিন তুমি পেনসিল ধরেছিলে, ইম্প্রেশনিস্ট তুমি সে-দিন থেকেই। তোমার ড্রয়িং দেখো, তুলির আঁচড় দেখো। মানের আগে এমনি আর কেউ আঁকেনি। মুখ দেখো, গাছ দেখো, মাঠের মূর্তিগুলি দেখো। প্রকৃতির অন্ধ অনুকরণ তুমি করনি, প্রকৃতি যে-স্পর্শ রেখেছে তোমার মনে, তা-ই তুমি প্রকাশ করেছ। তোমার কাজে সূক্ষ্ম অনুকৃতি নেই, প্রকাশের তথাকথিত সম্পূর্ণতা নেই, আছে তোমার চেতনার তোমার অনুভূতির স্পর্শ, তোমার ব্যক্তিত্বের পরিচয়। এই তো ইম্প্রেশনিস্ট হওয়া, চিরাচরিত ব্যাকরণের বেড়াজাল ভেঙে ফেলে নিজের চেতনাকে উদ্ঘাটিত করা। কে বলে তুমি পিছিয়ে পড়ে আছ?

    সত্যি বলছ থিয়ো?

    প্যারিসের সমস্ত তরুণ আর্টিস্ট তোমার কাজের সঙ্গে পরিচিত। যারা সফল ছবিবিকিয়ে তারা নয়, যারা নতুন পথে চলেছে, ভাবছে, পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছে তারা। তারা সবাই তোমার সঙ্গে আলাপ করতে ইচ্ছুক। তাদের কাছ থেকে অনেক আশ্চর্য জিনিস তুমি শিখতে পারবে।

    তারা আমাকে চেনে? আমার আঁকা তারা দেখেছে?

    উদ্‌গ্রীব আগ্রহে উঁচু হয়ে বসল ভিনসেন্ট। হঠাৎ কেমন থিয়োর মনে পড়ে গেল তাদের ছেলেবেলাকার কথা। বললে—নিশ্চয়, নইলে এতদিন প্যারিসে বসে আমি করেছি কী? তারা জানে দৃষ্টি তোমার তীক্ষ্ণ, জানে তোমার ড্রয়িংয়ের ক্ষমতা। এবার শুধু আলোটুকু বাকি। মুক্ত আকাশের আলো আনো তোমার ছবিতে, তারপর আর তোমাকে মারে কে? ভিনসেন্ট, জানো, সারা চিত্রকলার ওপর সূর্যের নতুন আলো ঝরে পড়ছে এ-যুগে, এ-যুগ আমাদের যুগ!

    থিয়ো, থিয়ো!

    আর বলতে পারল না ভিনসেন্ট। দু-হাতে ভাইয়ের ডান হাতটা চেপে ধরল নিরুদ্ধ আবেগে।

    [tab title=”তিন”]

    পরদিন সকালে ভিনসেন্ট ড্রয়িংয়ের জিনিসপত্র নিয়ে করম্যানের স্টুডিয়োতে গেল। তিনতলার ওপরে মস্ত হলঘর, উত্তর দিক থেকে হাঁ-করা জানলা দিয়ে আলোর প্রবেশ। একধারে দরজার দিকে মুখ করে একটি নগ্ন পুরুষ মডেল। ছাত্রদের জন্যে প্রায় তিরিশটি চেয়ার আর ইজেল ইতস্তত। ভিনসেন্ট করম্যানের কাছে নাম রেজিস্ট্রি করে একটা ইজেলের অধিকার পেল।

    ঘণ্টা খানেক বোধ হয় সে ড্রয়িং করেছে, এমন সময় দরজা ঠেলে একটি মহিলা এসে ঘরে ঢুকল। কানে ব্যান্ডেজ জড়ানো, দু-হাতে মুখের থুতনিটা চাপা। একমুহূর্ত দাঁড়িয়ে নগ্ন মডেলটির দিকে চোখ পড়তেই ভয়ার্ত চিৎকার করে উঠল মহিলাটি। তারপর সটান দৌড় দিল বাইরে।

    ভিনসেন্ট পাশের লোকটিকে জিজ্ঞাসা করল—ব্যাপার কী?

    এ-ব্যাপার নতুন নয়। লেগেই আছে। পাশের ঘরের দাঁতের ডাক্তারের কাছে এসেছে, ভুলে ঢুকে পড়েছে এই ঘরে। হঠাৎ অমনি একটা উলঙ্গ পুরুষের ওপর চোখ পড়লেই অনেক সময় কী হয়, চট করে মেয়েদের দাঁতের ব্যথা সেরে যায়। ডাক্তার যদি আর কিছুদিন ও-ঘরে থাকে, তাহলে পসার একেবারে মাটি। আপনি আজ নতুন এসেছেন, না?

    হ্যাঁ, সবে তিন দিন হল আমি প্যারিসে এসেছি।

    নামটি আপনার জানতে পারি?

    ভ্যান গক। আপনার?

    হেনরি তুলস লোত্রেক। আচ্ছা, থিয়ো ভ্যান গক আপনার কেউ হয়?

    আমার ছোটোভাই।

    আঃ তাই বলুন! চেয়ার থেকে লাফিয়ে উঠে তুলস লোত্রেক হাত বাড়িয়ে দিল করমর্দনের জন্য, আপনি তাহলে ভিনসেন্ট, না? ভারি খুশি হলাম আলাপ হতে। আপনার ভাইয়ের মতো ছবিওয়ালা সারা প্যারিসে নেই। যারা তরুণ শিল্পী তাদের জন্যে লড়াই করে চলেছে থিয়ো। আমরা যদি কখনও শিল্পমহলে ঠাই পাই, সে পাব ওই থিয়োর জন্যে।

    ভিনসেন্ট বললে—আমি শুনেছি।

    ভালো করে নবপরিচিতকে দেখল ভিনসেন্ট। চ্যাপটা মতো মাথা, নাক. মুখ, চিবুক সব ভারী ভারী, সামনের দিকে যেন উঁচিয়েই আছে। গালভরতি দাড়ি, নীচের দিকে ঝোলা নয়, গালের দু-পাশে শুঁড়-তোলা যেন

    লোত্রেক জিজ্ঞাসা করলে—করম্যানের মতো ওঁচা জায়গায় এসে জুটলেন কেন?

    ভিনসেন্ট বললে—স্কেচ করবার একটা জায়গা তো চাই। আপনিই-বা কেন এখানে?

    ভগবান জানে কেন। গত মাস থেকে আছি মোমার্তের একটা বেশ্যাবাড়িতে। সবকটা মেয়ের পোর্ট্রেট এঁকেছি। সে-ই হচ্ছে আসল কাজ! স্টুডিয়োতে বসে স্কেচ করা তো শুধু ছেলেখেলা।

    ছবিগুলো আমাকে দেখাবেন একদিন?

    সত্যি দেখবেন!

    বাঃ দেখব না কেন? নিশ্চয়!

    ব্যাপারটা কী জানেন? অনেকেই আমাকে পাগল বলে, কারণ নাচঘরের মেয়ে, ভাঁড় আর বেশ্যা, ওদের আমি আঁকি। কিন্তু যে যাই বলুক, সত্যিকারের টাইপ চান তো ওদের মধ্যেই পাবেন।

    আমি জানি। অমনি একটা মেয়ের সঙ্গে হেগ-এ কিছুদিন ঘরও করেছি।

    বাঃ বাঃ, চমৎকার! এই নাহলে ভ্যান গক পরিবারের ছেলে! দেখি মডেলটার কেমন স্কেচ করলেন আপনি!

    ভিনসেন্ট কাগজগুলো বাড়িয়ে দিলে—এই দেখুন, গোটা চারেক করেছি।

    কিছুক্ষণ স্কেচ ক-টা ভালো করে নিরীক্ষণ করল লোত্রেক, তারপর পরিচয়টাকে ঘনিষ্ঠতার সূত্রে বেঁধে নিয়ে বললে—দেখো বন্ধু, তোমাতে আমাতে জমবে ভালো। আমাদের দুজনের মধ্যে মিল আছে অনেক। ভালো কথা, এগুলো করম্যানকে দেখিয়েছ?

    এখনও না।

    খুব ভালো। তাহলে দেখিয়ো না। করম্যানের সমালোচনা যদি একবার শোনো তাহলে দ্বিতীয় দিন আর এখানে আসতে প্রবৃত্তি থাকবে না। সে-দিন আমাকে কী বললে জান? বললে লোত্রেক, অতি রঞ্জন ছাড়া কি তুমি আঁকতে পার না? অতি রঞ্জনের ঠ্যালায় তোমার কাজ যে ভাঁড়ামিতে পৌঁছে গেছে!

    লোত্রেকের তীক্ষ্ণ চোখে বিচিত্র এক আলো ফুটে উঠল। বললে—সত্যি দেখবে আমার আঁকা মেয়েদের ছবিগুলো? ভদ্রতা করছ না তো?

    কী মুশকিল!

    বৎস, ওঠো। চলো তাহলে আমার সঙ্গে। এই কবরখানায় আর-এক মিনিট নয়!

    লোত্রেকের চেহারাটা কিম্ভূত। মোটা ঘাড়, চওড়া কাঁধ, পেশিবহুল দুই বাহু। কিন্তু আসলে সে পঙ্গু। কোমর পর্যন্ত স্বাভাবিক, তার পরেই আর-কিছু যেন নেই। শীর্ণ কয়েক আঙুল মাত্র লম্বা দুটি পা। দেহের ভার সে খেলনার পায়ে সয় না। লাঠির ওপর ভর দিয়ে সে হাঁটে। কয়েক পা চলার পরই বিশ্রাম করতে হয়।

    তুমি নিশ্চয়ই ভাবছ, পা দুটোর আমার কী হল। তা-ই না ভ্যান গক? শোনো তাহলে।

    কী দরকার লোত্রেক? না-ই বললে!

    না, না, সবাই তো জানে, তুমিও জানলে। লাঠির ওপর শরীরের ওপরদিককার ভার চেপে রাস্তার এককোণে দাঁড়িয়ে বলে চলল লোত্রেক—আমি যখন জন্মাই, শরীরের হাড়গুলো সব ঠুনকো ছিল। বারো বছর যখন আমার বয়েস তখন নাচঘরের মেঝেতে পড়ে ডান ঊরুর হাড়টা ভেঙে ফেলি। পরের বছরেই আবার দুর্ঘটনা। সে-বার পড়ে যাই একটা খাদের মধ্যে, বাঁ-ঊরুর হাড়টাও ভাঙে। তারপর থেকে আমার পা আর এক ইঞ্চিও বাড়ল না।

    দুঃখ আছে নাকি এজন্যে?

    মোটেও না ভায়া। স্বাভাবিক যদি চেহারাটা হতো, তাহলে কি আর ছবি আঁকতে পারতাম? আমার বাবা হচ্ছেন তুলস-এর কাউন্ট। তাঁর মৃত্যুর পর খেতাবটা আমারই পাওনা। হয়তো মার্শালের দণ্ড হাতে নিয়ে ফ্রান্সের রাজার পাশে পাশে ঘোড়ায় চড়ে বেড়াব, এই ছিল পূর্বজন্মের ফল! কিন্তু সে-রাজাও নেই, আর আমার পাও নেই! অতএব ছবি আঁকা আমার মারে কে? আচ্ছা তুমিই বলো, শিল্পী যদি হতে পারি তাহলে কাউন্ট হতে যাব কোন দুঃখে?

    ঠিক। কাউন্টদের দিন ফুরিয়েছে, শিল্পীর দিন অফুরান।

    চলো। ওই যে-গলিটা দেখছ, ওর মধ্যে ডেগার স্টুডিয়ো। লোকে বলে আমি নাকি ডেগার কপি করি, কেননা সে ব্যালেনাচিয়েদের আঁকে, আমি আঁকি মোলা রুজের মেয়েদের। যা বলে বলুক, আমার বয়েই গেছে। ওই ১৯ নং রু ফাঁতেন দেখছ? ওই আমার আস্তানা। ‘হ্যাঁ, ঠিক বুঝেছ, একতলাতেই আমি থাকি। সিঁড়ি ভাঙতে হয় না।

    দরজা খুলে সমাদর করে লোত্রেক ভিনসেন্টকে ঘরে আনল। বললে—কিছু ভেবো না, আমি একলা থাকি, যেখানে খুশি জায়গা করে বসে পড়ো।

    ভিনসেন্ট তাকাল চারদিকে। ঘরের কোণে কোণে গাদা গাদা ক্যানভাস, ফ্রেম, টুল, ছোটো ছোটো সিঁড়ি আর ঝলঝলে পর্দা, মাঝখানে সারা মেঝে জুড়ে দু-খানা বড়ো বড়ো টেবিল। একটি টেবিল জুড়ে দুষ্প্রাপ্য দামি দামি মদের বোতল, ডিকান্টার আর গ্লাসের মিছিল। অন্য টেবিলটার ওপর নানা জিনিস এলোমেলো, স্তূপাকার—নাচিয়ে মেয়েদের চটিজুতো, কাঁচুলি, ঘাঘরা, দস্তানা, মোজা, টুকিটাকি অলংকার, গাদা গাদা বই আর অশ্লীল ফোটোগ্রাফ, একগোছা চমৎকার জাপানি ছবির প্রিন্ট। পুঁজির পাহাড়ের এককোণে একটুখানি জায়গা। বোধ হয় লোত্রেকের কাজ করার জন্যে।

    কী হল ভ্যান গক, হেঁকে উঠল লোত্রেক–আরে? বসবার একটা জায়গা পাচ্ছ না? ওই দেখো, ওই চেয়ারটার ওপর যা আছে সব ছুড়ে ফেলে দাও মাটিতে! জানলার ধারে আলোর কাছে চেয়ারটা টেনে এনে বোসো।

    উত্তেজিত হাতে ছবি গোছাতে গোছাতে আবার সে বললে—এ-বাড়িতে সাতাশটা মেয়ে আছে ভ্যান গক। সবকটার স্কেচ আমি করেছি। শুধু তা-ই বললে কম বলা হবে, প্রত্যেকটার সঙ্গে আমি রাতও কাটিয়েছি। সত্যি বলো, যে-মেয়েকে আঁকতে চাও তার সঙ্গে শুতেই যদি না পারলে, তাহলে তাকে পুরোপুরি বুঝবে কী করে?

    ঠিক বলেছ।

    এই দেখো স্কেচগুলো। সে-দিন এক ছবিওয়ালার কাছে এগুলো নিয়ে গিয়েছিলাম। লোকটা কী বললে জান? বললে, লোত্রেক, যা কুৎসিত তার প্রতি তোমার এমনি আসক্তি কেন? অসচ্চরিত্র কদর্য সব মানুষ খুঁজে খুঁজে নিয়ে তুমি আঁক। এইসব মেয়েগুলো এত ঘৃণিত যে মুখে বলা যায় না, কুৎসিত পাপের ক্লেদ এদের মুখে মাখানো। যা কুৎসিত তাকে সৃষ্টি করার নামই কি তোমাদের আধুনিক শিল্প? তোমরা কি সব অন্ধ হয়ে গেছ? পৃথিবীতে যা মধুর যা সুন্দর, তা কি তোমাদের চোখে পড়ে না?

    তারপর?

    আমি বললাম—মাপ করুন মশিয়েঁ, আপনার কার্পেটটা ভারি সুন্দর, আমার বড্ড বমি আসছে, এটাকে নোংরা করা আমার পক্ষে সত্যি ঠিক হবে না!—‘দেখো, আলোটা ঠিক পাচ্ছ তো? বেশ ভালো করে দেখো। ওঃ, টানবে নাকি কিছু? না না, যা চাও তাই পাবে। মুখ ফুটে একবার হুকুম করলেই হল।

    ত্বরিত গতিতে সে টেবিল-চেয়ারের ভিড়ের মধ্যে খাটো পায়ে লাফিয়ে লাফিয়ে গিয়ে দু-গেলাস মদ ঢেলে নিয়ে এল। একটা গ্লাস ভ্যান গকের হাতে তুলে দিয়ে গ্লাসভরতি নিজের ডান হাতটা উঁচু করে তুলে চেঁচিয়ে উঠল—জয় হোক, যা কুৎসিত যা কদর্য, তার জয় হোক!

    আস্তে আস্তে পান করতে করতে ভিনসেন্ট লোত্রেকের স্কেচগুলো দেখতে লাগল। সাতাশটি ছবি, সাতাশজন আলাদা আলাদা মেয়ে, প্রত্যেকটি মোমার্তবাসিনী গণিকা। ছবিগুলির মৌলিক গুণ এগুলির বাস্তবতা। শিল্পী যেমন দেখেছে ঠিক তেমনই এঁকেছে, নীতি বা রুচির কৃত্রিম আবেশে এই স্বচ্ছ দৃষ্টির বাস্তবতাকে ঘোলাটে করা হয়নি। মেয়েগুলির মুখগুলি দেখবার মতো, নিরাবরণ স্বরূপে সে-মুখে ফুটে আছে অনাসক্ত কৃত্রিম কামুকতা, জান্তব লাম্পট্য, মনোবিহীন শরীরসর্বস্বতা আর অকপট দৈন্য-বেদনা।

    শুধোল সে― চাষিদের ছবি তোমার ভালো লাগে লোত্রেক?

    ভালো লাগে, যদি তার মধ্যে মিথ্যে ভাবালুতা না থাকে।

    বটে? কথাটা কী জান, আমি এই চাষিদের শিল্পী। তাদের ছবিই এতদিন এঁকেছি। আমার মনে হচ্ছে, তোমার এইসব মেয়েরা, এরাও কৃষাণ, কৃষি করে এরা মাংসের। মাটি আর মাংস একই পদার্থের দু-রকম রূপ, তা-ই নয়? জীবন্ত মানুষের মাংসের কর্ষণ এরা করে, ফসল ফলে বই কী। সেই ফসল জীবন। জীবনকে তুমি বাদ দাওনি লোত্রেক, বাস্তবকে তুমি এড়িয়ে যাওনি। কাজের মতো কাজ করেছ।

    তোমার কি মনে হয় ছবিগুলো কুৎসিত?

    এরা সত্য, এরা জীবনের সুগভীর পরিচিতি। সত্য বলেই এদের সৌন্দর্য খুব উঁচুদরের। এসব মেয়েদের তুমি যদি মিথ্যে আদর্শ আর ভাবালুতা দিয়ে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে আঁকতে, তাহলেই এগুলো হতো অসুন্দর অসত্য আর কাপুরুষতার কদর্য নিদর্শন। কিন্তু যে-সত্যকে তুমি দেখেছ, তাকে প্রকাশ করতে তুমি ডরাওনি। কার সাধ্য বলে সত্য অসুন্দর?

    হে প্রভু! হে যিশু! এই ভ্যান গকের মতো লোক এত কম পাঠাচ্ছ কেন পৃথিবীতে?—নাও, নাও, আর-একবার গলা ভিজিয়ে নাও। আর এই ছবিগুলোও ভায়া সব তোমার। যেখানা খুশি বেছে নাও।

    একটা স্কেচ উঁচু করে আলোতে তুলে ধরল ভিনসেন্ট, খানিকক্ষণ ভালো করে লক্ষ করার পর বলে উঠল—দামেয়ার! দ্যমেয়ারের কাজ মনে পড়ছে!

    জ্বলে উঠল লোত্রেকের চোখ। বললে—হ্যাঁ, দ্যমেয়ার। শিল্পীর রাজা! জীবনে যা শিখেছি ওই একজনের কাছ থেকেই। ঈশ্বর! ঘৃণা করবার কী অভূতপূর্ব ক্ষমতা ছিল লোকটার!

    ভিনসেন্ট বললে—এতে কিন্তু আমার আপত্তি আছে। ঘৃণাই যাকে করব, তাকে আঁকতে যাব কোন দুঃখে? যাকে ভালোবাসি তাকেই না আঁকতে মন চায়। ভুল ধারণা তোমার ভায়া, লোত্রেক উত্তর দিল—মহৎ শিল্প বলতে যা-কিছু, ঘৃণা থেকেই তার জন্ম।—কী হল? গগাঁর ছবিটা পছন্দ হল দেখছি আবার?

    কার ছবি এটা বললে?

    পল গগাঁ। আলাপ আছে নাকি?

    না।

    তাহলে তো আলাপ করতেই হবে। ছবির মেয়েটা মার্টিনিক দ্বীপের মেয়ে। গগাঁ ও-অঞ্চলে গিয়ে ছিল কিছুদিন। তারপর থেকে ওর মাথাটা একেবারে বিগড়ে গেছে, জংলি হবে, আদিম মানুষ হবে, এই ওর নেশা। তবে পাগল হলে কী হয়, শিল্পী হিসেবে অপূর্ব। স্ত্রী ছিল, তিনটি ছেলেপিলে ছিল, আর ছিল স্টক এক্সচেঞ্জে মোটা মাইনের চাকরি। বছরে তিরিশ হাজার ফ্র্যাঙ্ক আয়। পিসারো, মানে আর সিসলের কাছ থেকে ছবিই কিনেছিল পনেরো হাজার ফ্র্যাঙ্কের। বিয়ের দিন স্ত্রীর ছবি আঁকে। সবাই বলল, আহা, আহা! রবিবার ছুটির দিনে আঁকত, স্টক এক্সচেঞ্জ ক্লাবে শাঁসালো সভ্য বলে নামডাক ছিল। একবার নিজের আঁকা একটা ছবি মানেকে দেখায়। মানে প্রশংসা করে। ভদ্রতা করে মানেকে ও বলে—আমি তো নিতান্ত অ্যামেচার আঁকিয়ে।—অ্যামেচার? মানে উত্তর দেয়—যারা খারাপ আঁকে তারাই অ্যামেচার। তারা ছাড়া আবার অ্যামেচার কে? নির্জলা মদের মতো ক-টা কথা সেই যে ওর মাথায় গিয়ে চড়ল, আজ পর্যন্ত আর নামল না। চাকরি ছাড়ল, বউ-বাচ্চাদের বিদায় দিল শ্বশুরবাড়িতে, নেশা নিয়েই মেতে রইল তারপর থেকে। নেশা ছবি আঁকা।

    বাঃ, আশ্চর্য লাগছে! আলাপ করতেই হবে এমন লোকের সঙ্গে।

    তা করবে। তবে আগে থেকে একটা ব্যাপারে সাবধান করে দিই, বন্ধুদের খেপিয়ে দিতে ওর মতো ওস্তাদ কেউ নেই। ভালোকথা ভ্যান গক, অপরের কথাই যখন উঠল, একদিন তোমাকে মোলা রুজ আর ইলিসি মোমার্ত দেখিয়ে আনি চলো। কীসব মেয়ে—কিছু ভেবো না তুমি, সবকটাকে আমি চিনি। আপত্তি নেই তো তোমার মেয়েদের সঙ্গে আলাপ করতে?… হ্যাঁ, হ্যাঁ ওই হল, আলাপ করতে, নাড়াচাড়া করতে, যা প্রাণ চায় সব করতে। তাহলে একটা রাত্রি ফুর্তি করা যাক একদিন, রাজি তো?

    নিশ্চয় রাজি।

    বহুত আচ্ছা। কিছু ভেবো না, সে-ব্যবস্থা আমার। তারপর? আবার এখন করম্যানে যেতে হবে তো? তা ওঠবার আগে আর-এক পাত্র করে হোক! নাও, মেরে দাও এটুকু একচুমুকে। এই তো চাই! আর-একটু ঢালি, কেমন? আহা, তলানি রেখে কী হবে, বোতলটা শেষ করা চাই তো! ব্যাস, নাও ওঠো এবার। দেখো সাবধান, টেবিলের গায়ে ধাক্কা খেয়ো না যেন। নাঃ, বড্ড জিনিসপত্র জমেছে। ঘরটা আমাকে ছাড়তেই হবে এবার। বুঝেছ ব্রাদার, টাকায় আমাদের মরচে পড়েছে। বাবার আমার মেজাজ দিলদরিয়া, খোঁড়া ছেলে পাছে মনে মনে অভিশাপ দেয়, তাই চাইবার আগেই কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা পাঠায়। আমি খাইদাই ফুর্তি করি, ছবি আঁকি। যখন নতুন একটা স্টুডিয়ো ভাড়া নিই, বিলকুল খালি ঘর। তারপর জিনিসপত্র জমে। মালের ভিড়ে যখন মানুষের ঠাঁই থাকে না, তখন আবার সব ফেলে শুধু ছবিগুলো নিয়ে নতুন ফাঁকা ঘরে উঠে যাই। আবার নতুন ঘর, নতুন জিনিসপত্র, ঠিক নতুন মেয়েমানুষের মতো। ভালোকথা, কীরকম মেয়েমানুষ তোমার পছন্দ বলো, টকটকে গোলাপি রং? তোমার মতো লালচে চুল?

    [tab title=”চার”]

    এ আবার এমন একটা শক্ত কাজ নাকি? পুরোনো প্যালেটটা ফেলে দিয়ে কিছু হালকা রং কিনে নিলেই তো হল। তাহলেই তো এইসব ইম্প্রেশনিস্টদের মতো ছবি আঁকা যাবে! প্রথম দিনের চেষ্টার পরে কিন্তু কিছুটা ঘাবড়ে গেল ভিনসেন্ট। তার পরদিন মনে জাগল কেমন যেন দিশেহারা ভাব, তারপর বিরক্তি, রাগ, হতাশা। সপ্তাহ শেষ হতে-না-হতে ভয়, পিঠের শিরদাঁড়া শিরশিরিয়ে ওঠে, এমনি আতঙ্ক। রং নিয়ে বছরের পর বছর কত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছে, তার ফল শেষ পর্যন্ত কি এই! অবস্থা যে একেবারে প্রথম শিক্ষার্থীর মতো! ক্যানভাসের পর ক্যানভাসে রং চড়ায়, গাঢ় নিষ্প্রভ চটচটে রঙের প্রলেপ শুধু পড়ে। করম্যানের স্টুডিয়োতে বসে বসে সে আঁকে আর নিজের ব্যর্থতায় নিজেই গজগজ করে, লোত্রেক পাশে বসে বসে শুধু তার কাণ্ড দেখে, কোনো উপদেশ দিতে চায় না, চুপ করে থাকে।

    থিয়োর অবস্থা আরও দুঃসহ। থিয়ো অতি ঠান্ডা প্রকৃতির লোক, আচার–ব্যবহার ও অভ্যাস সবই মৃদু কোমল। পোশাকে পরিচ্ছদে গৃহসজ্জায় অতি খুঁতখুঁতে ধরনের শৌখিন। ভিনসেন্টের দুর্দাম জীবনীশক্তির নিতান্ত সামান্য অংশেরও সে অধিকারী নয়।

    রু লাভালের ফ্ল্যাটটি থিয়ো আর তার শৌখিন আসবাবগুলির পক্ষে যথেষ্ট। এর চেয়ে বেশি ভিড় তার সয় না। সপ্তাহ খানেকের মধ্যেই ভিনসেন্ট অমন সুন্দর ফ্ল্যাটটিকে পুরোনো মালের দোকানে পরিণত করে তুলল। মোটা বুট ঘষে ঘষে হেঁটে সে মেঝের কার্পেট নষ্ট করল, যে-আসবাব সামনে পড়ে লাথি মেরে এ-কোণে ও-কোণে হটাতে লাগল তাকে। ক্যানভাস, তুলি, রঙের খালি টিউব ছড়িয়ে-ছিটিয়ে নোংরা করল চারিদিক। টেবিলে চেয়ারে তার ময়লা জামাকাপড় জড়ো, ডিসের পর ডিস তার হাতে ভাঙে, রং ছিটিয়ে সে নোংরা করে দেয়াল। থিয়োর জীবনের প্রত্যেকটি ভব্য ধরনধারণ চুরমার করল সে।

    একটি সন্ধ্যার ঘটনা।

    ছোট্ট ঘরটায় লম্বা লম্বা পা ফেলে দ্রুত পায়চারি করছিল ভিনসেন্ট আর দাঁত কিড়মিড় করে আপনমনে রকবক করে চলেছিল। থিয়ো বললে—অত ছটফট করছ কেন? ডাকাতের মাঠ পেয়েছ নাকি ঘরখানা?

    হালকা একটা চেয়ারে শরীরের সমস্ত ওজন ধপ করে ফেলে ভিনসেন্ট ভীষণ কাণ্ড করল, আর্তনাদ করে উঠল পায়াগুলো।

    চিৎকার করে উঠল সে সঙ্গে সঙ্গে ব্যর্থ বেদনায়—আশা নেই, কোনো আশা নেই, বড্ড দেরি হয়ে গেছে! চেষ্টাও কি কম করেছি! পাগলের মতো খেটেছি, একটা নয় দুটো নয়, কুড়িটা ক্যানভাস, আমি শেষ করেছি। কিন্তু কোনো উপায় নেই। নতুন করে শুরু করতে হবে আবার। যা এতদিন করেছি সব বাতিল!

    থিয়ো ধমকে উঠল—কী পাগলের মতো বকছ?

    পাগল? পাগল হতে বাকি আছে? সর্বনাশ হয়ে গেছে আমার! এখানে যা দেখলাম এরপর হল্যান্ডে ফিরে গিয়ে ভেড়ার ছবি আঁকতে আর পারব না, নতুন পথে যাবারও সময় আর নেই। হায় ভগবান, আমার কী হবে এখন?

    চেয়ার থেকে লাফিয়ে উঠে ভিনসেন্ট দরজা খুলে বাইরের বাতাসে কয়েকটা লম্বা লম্বা শ্বাস টেনে নিল বুকে। তারপর দরজাটা বন্ধ করে জানলাটা খুলে রাস্তার দিকে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। হঠাৎ এমন জোরে জানলাটা বন্ধ করল যে ঝনঝন করে উঠল শার্সির কাচ। ছুটে গেল রান্নাঘরে। ঢকঢক করে জল খেল, সঙ্গে সঙ্গে খেল বিষম। ভিজে হাত-মুখ আর জামা নিয়ে আবার এসে ঢুকল বসবার ঘরে। সত্যি, বলো থিয়ো, কী করব আমি? এত আশা, এতদিনের পরিশ্রম, সব ছেড়েছুড়ে দেব? কোনো আশা আর আমার নেই, তা-ই না?

    ভিনসেন্ট, এ কেমন তোমার ব্যবহার? কচি খোকা নাকি তুমি? ঠান্ডা হয়ে যদি বসতে পারো তো কথা বলব। আবার পায়চারি করছ? ইস, এমন সুন্দর চেয়ারটি ভাঙবে নাকি লাথি মেরে মেরে! খুলে ফেলো, বুটজুতো খুলে বোসো চুপ করে!

    কিন্তু থিয়ো, ছ-বছর ধরে আমি তোমার ওপর আছি। বলো, কী প্রতিদান দিতে পেরেছি তার? একগাদা কালো চটচটে ছবি, যার দাম কানাকড়িও নয়! কিছু শিখিনি, কিছু করিনি, শুধু এতদিন মাসের পর মাস তোমার টাকা উড়িয়েছি। এ-লজ্জায় তো মরে যাওয়া উচিত আমার!

    শোনো ভিনসেন্ট, শোনো। মাথা খারাপ কোরো না। আচ্ছা বলো দেখি, যখন কৃষাণজীবন আঁকবে ভেবেছিলে, এক সপ্তাহেই কি আঁকতে শিখে গিয়েছিলে, না পুরো পাঁচটা বছর লেগেছিল?

    তা ঠিক; কিন্তু তখন সবে যে আরম্ভ করেছিলাম আমি!

    ঠিক আজও নতুন একটা আরম্ভ তোমার। রঙের কাজের আরম্ভ। এবং এর জন্যে আরও পাঁচটা বছর দিতে হবে বই কী!

    থিয়ো থিয়ো, এর কি আর কখনও শেষ হবে না? সারাজীবন কি এমনি শিক্ষানবিশি করেই কাটবে? তেত্রিশ বছর বয়েস হল, পরিণতি হবে আর কবে আমার?

    এই তোমার শেষ শিক্ষা ভিনসেন্ট। সারা ইয়োরোপে যা-কিছু আঁকা হচ্ছে সবকিছুর সঙ্গে আমার যোগাযোগ আছে। আমি জানি কোথায় আরম্ভ, কতদূরে গিয়ে শেষ। একবার যদি প্যালেটটা হালকা রঙের করতে পার—

    সত্যি বলছ থিয়ো? সত্যি বলছ আমার আশা আছে? পারব আমি শেষ পর্যন্ত? ব্যর্থ তাহলে নই আমি?

    না, তুমি আর-কিছু। তুমি একটা আস্ত গাধা। শিল্পের ইতিহাসে বিরাটতম একটা বিপ্লব ঘটে চলেছে, আর তুমি ভাবছ সাত দিনে তা তুমি রপ্ত করে নেবে! চলো, রাস্তায় একটু বেড়িয়ে আসি। তোমার সঙ্গে আর পাঁচ মিনিট যদি এই ঘরে আমাকে থাকতে হয়, তাহলে দম আটকে মরব আমি!

    পরদিন প্রায় সন্ধ্যা পর্যন্ত ভিনসেন্ট করম্যানের স্টুডিয়োতে কাজ করল, তারপর গেল গুপিলসে থিয়োকে ডাকতে। এপ্রিল মাসের গোধূলি, পাথরের উঁচু উঁচু সারি সারি বাড়ির মাথায় মাথায় পড়ন্ত বেলাশেষের গোলাপি আভা। সারা শহর জুড়ে বসন্তদিনান্তের ছুটির আমেজ। রু মোমার্তের পথের ধারের কাফেগুলিতে আড্ডাবাজদের ভিড়, মিষ্টি মধুর সংগীত। রাস্তায় রাস্তায় গ্যাসের আলো জ্বালানো হচ্ছে, রেস্তরাঁগুলোতে টেবিলে চাদর পাতছে ওয়েটাররা, বন্ধ হচ্ছে অন্য দোকানপাট।

    অলস পদক্ষেপে এগোল থিয়ো আর ভিনসেন্ট, প্লেস চাতুদুনের মোড় পার হয়ে চলল রু লাভালের পথে।

    থিয়ো বললে—একটু গলা ভিজোবে নাকি ভিনসেন্ট?

    হ্যাঁ, কোথাও বসলে হতো, এমন জায়গায়, যেখান থেকে ভিড় দেখা যায়।

    চলো তাহলে রাতেইল রেস্তরাঁতে, সেখানে বন্ধুও কয়েকজন জুটবে।

    রেস্তরাঁ বাতেইল প্যারিসের ছবি-আঁকিয়েদের অন্যতম আড্ডাক্ষেত্র। বাইরে রাস্তার ধারে চার-পাঁচখানা টেবিল, মধ্যে দু-খানা বেশ বড়ো বড়ো ঘর। একখানা ঘর মাদাম বাতেইল নির্দিষ্ট রেখেছেন শুধু শিল্পীদের জন্যে। অন্য ঘরটি সাধারণ খদ্দেরের। লোক দেখলেই তিনি চিনতে পারেন কে শিল্পী আর কে শিল্পী নয়।

    থিয়ো ওয়েটারকে ডাকল—এই যে, এক গ্লাস কুমেল এইখানে।

    ভিনসেন্ট বললে—আমি কী খাই বলো তো থিয়ো?

    একটা কোনত্রু চেখে দেখো। এমনি চেখে-চেখেই নিজের প্রিয় মদটা খুঁজে পেতে হবে।

    ডিসের ওপর গ্লাস বসিয়ে ওয়েটার টেবিলে সাজিয়ে রাখল। ডিসের গায়েই কালো হরপে দাম লেখা। থিয়ো ধরাল একটা সিগার, ভিনসেন্ট তার পাইপ সামনে কত বিচিত্র নরনারীর পথযাত্রা। বগলের তলায় ইস্ত্রি-করা জামাকাপড় নিয়ে কালো অ্যাপ্রন-পরা কয়েকটি ধোপানি, মুখে দড়ি-বাঁধা মাছ আঙুলে ঝুলিয়ে একটি শ্রমিক, ইজেলে ভিজে ক্যানভাস আটকে নিয়ে দু-একজন শিল্পী, চকচকে কালো জুতো আর ধূসর চেক-কাটা কাপড়ের কোট গায়ে ব্যাবসাদার, সওদাভরতি বাস্কেট হাতে নরম চটি পায়ে গিন্নির দল, আর কত সুদর্শনা তরুণী, সরু কোমরে লম্বা ঢেউ-খেলানো তাদের স্কার্ট, মাথায় বাঁকা করে বসানো রঙিন পালক-তোলা টুপি।

    অপূর্ব শোভাযাত্রা, তা-ই না থিয়ো!

    ঠিক। আপিরিটিফ পানের সময় যখন আসে, ঠিক তখনই প্যারিস জাগে।

    আমি ভেবে পাই না, এই প্যারিস শহরকে এত আশ্চর্য ভালো লাগে কেন!

    কে জানে! কেউ বোধ হয় জানে না। এ একটা চিরন্তন রহস্য। হয়তো ফরাসি চরিত্রের মধ্যেই কোনো একটা জাদু আছে। সত্যি, ফরাসি মেজাজ যাকে বলে তা বড়ো বিচিত্র। এর মধ্যে যেমন আছে স্বাধীনতার গোঁ, তেমনি আছে মেনে নেয়া আর মানিয়ে চলার আমেজ, বাস্তব ব্যস্ততার সঙ্গে মিশে আছে কেমন একটা ঢিলেঢালা জীবন। ওই দেখো, আমার এক বন্ধু আসছে। আলাপ করিয়ে দেব তোমার সঙ্গে।

    ভিনসেন্টের সঙ্গে কথা বন্ধ করে গলা চড়িয়ে ডাকল থিয়ো—পল, এসো এসো, কেমন আছ?

    ধন্যবাদ ধন্যবাদ, দিব্যি আছি, খুব ভালো আছি।

    বোসো এখানে, আবসাঁত খাও একটা। আলাপ করিয়ে দিতে পারি? আমার ভাই ভিনসেন্ট ভ্যান গক। ভিনসেন্ট, আমার বন্ধু পল গগাঁ।

    আবসাঁতের পাত্রে মুখ নামিয়ে জিভের ডগাটা ভিজিয়ে নিল পল গগাঁ, তারপর ভিনসেন্টের দিকে মুখ ফিরিয়ে বললে—প্যারিস কেমন লাগছে মশিয়েঁ ভ্যান গক?

    ভালো, খুব ভালো।

    সত্যি? হুঁ! কী বলব বলুন, আপনার মতো লোক অনেকেই। আমাকে যদি এ-প্রশ্নটা আপনি করতেন, আমি কী বলতাম জানেন? প্যারিস বিরাট একটা আঁস্তাকুড়। তামাম নোংরাভরতি একটা ডাস্টবিন। নোংরাটা কীসের জানেন? আপনাদের এই সভ্যতার।

    ভিনসেন্ট বললে—কোনক্রটা আর ভালো লাগছে না থিয়ো! এবার কী চাখি বলো তো?

    গগাঁ বলে উঠল—আবসাঁত খান, মশিয়েঁ। শিল্পীর একমাত্র পানীয় তো এটাই।

    কী বলো থিয়ো? আবসাঁত?

    তোমার খুশি। চেখে দেখো কেমন লাগে। ওয়েটার! মশিয়েঁর জন্যে আবসাত আনো।—তারপর পল! আজ যে খুব খুশি খুশি দেখাচ্ছে, ব্যাপার কী! ছবি বিক্রি হয়েছে একটা?

    কী যে বলো! ছবি বিক্রি? ও তো নিতান্ত একটা খেলো কথা বললে! আসলে আজ সকালে উঠেই চমৎকার একটা অভিজ্ঞতা হয়েছে আমার।

    ভিনসেন্টকে চোখ টিপল থিয়ো। বললে—তা-ই নাকি? বলো কী অভিজ্ঞতা, খুলে বলতেই হবে। ওয়েটার! মশিয়েঁ গগার জন্যে আর-একটা আবসাঁত লাগাও চটপট।

    মুখের ভেতরটা আবসাঁত দিয়ে ভিজিয়ে নিয়ে গগাঁ শুরু করল—আমার বাড়ির গায়ে একটা কানাগলি আছে দেখেছ? সেখানে একটা ঘর নিয়ে থাকে ফুরেল পরিবার। পুরুষমানুষটা গাড়ি চালায়। আজ ভোর পাঁচটার সময় ফুরেল–গিন্নির আর্ত চিৎকারে ঘুম ভেঙে গেল—কে আছ কোথায় আছ, বাঁচাও, আমার স্বামীকে বাঁচাও! কোনো রকমে একটা ট্রাউজার্সের মধ্যে পা দুটো গলিয়ে ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড়ে গিয়ে দেখি ফুরেল গলায় দড়ি দিয়েছে। লাফিয়ে উঠে ছুরি দিয়ে দড়িটা কাটতেই ধড়টা ধড়াস করে মাটিতে পড়ল। সবে প্রাণটা বেরিয়েছে, গা-টা তখনও গরম। তাড়াতাড়ি বিছানায় তুলতে গেলাম, স্বামী সত্যিই মরেছে দেখে হেঁকে উঠল তার বউ—খবরদার, আর নেড়ো না, আগে পুলিশ আসুক। উলটোদিকে থাকে একটা ফলওয়ালা। আমার বাড়ির গায়েই তার বাগান। এসে লোকটাকে ডেকে বললাম—ভায়া একটা পাকা দেখে ফুটি দিতে পার? প্রাতঃকালের সময় পুরো একটা আহামরি ফুটি খেতে খেতে ফুরেলের গলায় দড়ির কথাটা স্রেফ মুছে গেল মন থেকে। অতএব দেখো, দুঃখ আছে আবার সুখও আছে, বিষ আছে আবার বিষক্ষয়ের ব্যবস্থারও অভাব নেই।

    নীরবে মাথা নাড়ল থিয়ো।

    গগাঁ বলে চলল—দুপুর বেলা লাঞ্চ খাবার ভালো একটা নেমন্তন্ন ছিল। বেশ চোস্ত সাজগোজ করে বার হলাম। ভোজ্য বস্তু চমৎকার, দলটি মধুর। সবাইকে একটু চমক লাগাবার জন্যে ভোর বেলাকার আত্মহত্যার ঘটনাটা বললাম। নিরুদ্‌বেগে হাসতে হাসতে সবাই একটি অনুরোধ করল—মড়াটার গলার দড়িগাছাটা জোগাড় করতে পারি কি না, যাতে তার একটু একটু করে প্রত্যেকে নিয়ে আলমারিতে সাজিয়ে রাখতে পারে! কেয়াবাত! কে বলে তোমার সভ্য দুনিয়ায় বৈচিত্র্য নেই?

    ভিনসেন্ট একমনে দেখছিল পল গগাঁকে। বন্য লোকের মতো কুচকুচে কালো চুলেভরতি মস্ত একটা মাথা, বাঁ-চোখের কোণ থেকে মুখের ডান কিনার অবধি খাঁড়ার মতো নেমে এসেছে বিরাট একটা নাক। চোখ দুটো বড়ো বড়ো, সামনের দিকে টেনে বার হওয়া, দৃষ্টিতে কেমন একটা উন্মত্ত বেদনা। চোখের ওপরে, নীচে, গালে, থুতনিতে, চামড়া ঠেলে উঁচু উঁচু হাড়ের প্রকাশ। দানবের মতো দেহ, প্রতিটি অঙ্গে পাশবিক শক্তি আর কষ্টকৃত সংযমের পরিচয়।

    মুখে মৃদু হাসি টেনে উঠে দাঁড়াল থিয়ো। বললে—পল, তোমার যা মনোবৃত্তি শুদ্ধ কথায় তাকে কী বলে জান? বলে ধর্ষকাম। নিষ্ঠুরতা তোমার এতই ভালো লাগে যে, তার মধ্যে স্বাভাবিকতা না থাকলেও তোমার এসে যায় না। যাহোক, এখন উঠতে হল। ডিনারের নিমন্ত্রণ। উঠবে নাকি ভিনসেন্ট?

    গগাঁ বললে—থাকুক না আমার সঙ্গে। তোমার ভাইয়ের সঙ্গে তো আলাপই হল না ভালো করে।

    আমার আপত্তি নেই। তবে কিনা অভ্যেস তো নেই, খুব বেশি আবসাঁত চলো না ওর পেটে।

    বিদায় নিল থিয়ো।

    ঘনিষ্ঠ হয়ে এল গগাঁ। বললে—তোমার ভাইটি, ভিনসেন্ট, ভারি চমৎকার। অবশ্য একেবারে যারা তরুণ তাদের ছবি টাঙাতে ভয় পায়। কিন্তু কী করবে বেচারা? ওপরওয়ালা তো আছে!

    ভিনসেন্ট বললে—কেন? আমি তো দেখেছি ওর গ্যালারির বারান্দায় মনে, পিসারো, সিসলে, মানে—এদের ছবি আছে!

    তা আছে। কিন্তু সিউরাত কই, গগাঁ কই? সেজান কই, তুলস-লোত্রেক কই? যাদের আছে, তারা তো বুড়ো, দিন ফুরিয়েছে তাদের।

    ভিনসেন্ট জিজ্ঞাসা করলে– ওঃ, তুলস-লোত্রেককে চেন তাহলে?

    হেনরি? নিশ্চয়ই! হেনরিকে চেনে না কে? অদ্ভুত আঁকিয়ে, কিন্তু তেমনি অদ্ভুত পাগল। আধখানা তো মানুষ—ভাবে, যদি জীবনে পাঁচ হাজার মেয়েমানুষের সঙ্গে শুতে পারে, তাহলে পুরো মানুষ না হতে পারার ক্ষতিটার উশুল হবে। পা নেই, রোজ সকালে ওঠে বুকভরা দৈন্যবোধের জ্বালা নিয়ে। প্রতি রাত্রে সেই দৈন্যবোধকে সে ডোবায় মদে আর মেয়েমানুষের শরীরে। কিন্তু পা তো গজাবার নয়, এ-জ্বালাও নেভবার নয়। পাগল যদি না হতো তো প্যারিসে ওর মতো আঁকিয়ের জুড়ি খুঁজে পাওয়া ভার হতো।

    ভিনসেন্টকে গগাঁ নিয়ে গেল স্টুডিয়োয়। চারতলার ওপর একটা কুঠরি। একটা ইজেল, পেতলের একখানা খাট, একটা চেয়ার, একটা টেবিল। দরজার কাছে দেয়ালের একটা খুপরিতে কয়েকটা অত্যন্ত কুৎসিত অশ্লীল ফোটোগ্রাফ। ভিনসেন্ট বললে—এই ফোটোগুলো দেখে মনে হচ্ছে প্রেম সম্বন্ধে খুব উঁচু ধারণা তোমার নেই।

    গগাঁ বললে—আরে, আগে বোসো, তারপর তর্ক জুড়ো। কোথায় বসবে, খাটে, না চেয়ারটাতে? হ্যাঁ, এই নাও, পাইপে তামাক ভরে নাও। তারপর, কী বলছিলে? ও, প্রেম? হ্যাঁ নারী আমি ভালোবাসি বই কী, কে না ভালোবাসে—তবে সেই নারী যদি দেহে হস্তিনী আর মেজাজে গৃধিনি হয়! সূক্ষ্ম বুদ্ধি আর সূক্ষ্ম দেহ—এ যাদের তারা আবার স্ত্রীলোক নাকি? তুমি জান না, কতদিন ধরে বেশ থপথপে মোটাসোটা একটা মেয়েমানুষ আমি খুঁজছি, কিছুতে পাচ্ছিনে। যদি-বা কখনও পাই তো বোকা বনে যাই, দেখি—মেয়ে তো নয়, হাঁসফাঁস পোয়াতি। জোলার পুষ্যিপুত্তুর মোপাসাঁর গল্প বেরিয়েছে গত মাসে, পড়েছ? একটা লোক, আমারই মতো মোটা মেয়ে তার পছন্দ। ক্রিসমাসের দিন বাড়িতে দুজনের মতো খুব খাওয়াদাওয়ার আয়োজন করে মেয়ে খুঁজতে বার হয়েছে। দিব্যি মনের মতো একটি পছন্দ হয়েছে, বগলদাবা করে বাড়িতে এনে সঙ্গে নিয়ে খেতে বসেছে। মনে কত সাধ! হলে হবে কি, খাওয়াদাওয়া শেষ হবার আগেই হঠাৎ কিনা—ওঁয়া ওঁয়া—মেয়েটার পেট থেকে পড়ল ইয়া বড়ো ধড়কড়ে বাচ্চা!

    ভিনসেন্ট বললে—কিন্তু এসবের সঙ্গে ভালোবাসার সম্বন্ধ কী, গগাঁ?

    গগাঁ চিত হয়ে শুয়ে পড়ল বিছানায়, মাথার নীচে পেশিবহুল একখানা হাত রেখে। ছাদের কড়ির দিকে ছড়াল কড়া তামাকের কয়েক ঝলক ধোঁয়া।

    রূপ বলো, বলব অনুভূতি আছে, আসক্তি যত না থাক। কিন্তু প্রেম? তুমি ঠিক ধরেছ। প্রেম আমি বুঝিনে। তোমাকে ভালোবাসি, এ দুটো কথা কাউকে বলতে আমার দাঁত ভেঙে যাবে। তবে এ নিয়ে আমার কোনো অভিযোগ নেই। যিশুখ্রিস্টের যে-কথা, আমারও সেই কথা—মাংস হচ্ছে শুধু মাংসই আর আত্মা হচ্ছে আত্মা। মাংসের ক্ষুধা যখন কয়েকটা টাকা ফেললেই মেটে, তা-ই মিটুক। আত্মা আমার শান্তিতে থাক।

    বিষয়টাকে তুমি খুব সহজেই উড়িয়ে দিতে চাইছ।

    মোটেই না। শয্যাসঙ্গিনী নির্বাচন করা কি সহজ কথা! যে-নারী সুখ পায়, তাকে নিয়ে ডবল সুখ পাই আমি। যে শুধু সুখের পেশাদারি ভান করে, সেই মিথ্যে ভানটুকুই আমার যথেষ্ট, দেহানুভূতির সঙ্গে হৃদয়াবেগকে আমি জড়াতে চাইনে। হৃদয় থাক আলাদা শুধু আমার শিল্পসাধনার জন্যে, সৃষ্টির জন্যে।

    কথাটা ভুল নয়। সম্প্রতি আমারও ধারণা বদলাচ্ছে।—না, না, আর একটুও আবসাঁত ঢেলো না, নেশাটা একেবারে মাথায় চড়ে উঠবে। থিয়ো তোমার আঁকার খুব প্রশংসা করে। তোমার কয়েকটা স্টাড়ি আমাকে দেখাবে?

    নিশ্চয়ই না। স্টাডি? সে হল আমার গোপন জিনিস, নিতান্ত ব্যক্তিগত সম্পত্তি, ঠিক ব্যক্তিগত চিঠির মতো। হ্যাঁ, তবে, ছবি কয়েকটা তোমাকে দেখাতে আপত্তি নেই।

    হাঁটু গেড়ে বসে খাটের নীচ থেকে গগাঁ কয়েকখানা ক্যানভাস বার করল। আবসাঁতের বোতলগুলোর গায়ে ঠেসান দিয়ে একে একে সাজিয়ে রাখল তাদের। কিছুটা আশ্চর্য হবার জন্যে ভিনসেন্ট প্রস্তুতই ছিল, কিন্তু এ যে অভূতপূর্ব বিস্ময়! চোখের সামনে রৌদ্রজ্বলা প্রবালের রংমাতাল মরীচিকা, উদ্ভিদবিজ্ঞান কখনও আবিষ্কার করেনি এমনি সব বিচিত্র গাছের জটলা, বিচিত্র সব মানুষ আর জন্তু—অকল্পনীয় যাদের চেহারা, সমুদ্র যেন আগ্নেয়গিরি থেকে উৎসারিত, আকাশ যার সীমানা, ব্রহ্মার কল্পনার বাইরে। অদ্ভুতদর্শন আদিবাসীদের ছবি—যাদের নগ্ন আরণ্যক দৃষ্টির অন্তরালে অনন্তের অলৌকিক ইশারা, সবুজ আর বেগুনি আর ঘন লালের ছড়াছড়িতে অদেখা অধরা পরিরাজ্যের স্বপ্নদৃশ্য, বাদামি-হলুদ উত্তপ্ত সূর্যালোকে উদ্ভাসিত উজ্জীবিত বিচিত্র কত প্রাণী আর উদ্ভিদ।

    অনেকক্ষণ বিস্ফারিত চোখে ছবিগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকার পর বিড়বিড় করে ভিনসেন্ট বললে—হ্যাঁ, তুমিও ঠিক লোত্রেকের মতো। ভালোবাস না, ঘৃণা বর। মন-প্রাণের সমস্ত শক্তি দিয়ে সৃষ্টিকে খালি ঘৃণাই কর।

    গগাঁ হেসে উঠল। বললে—তা তো হল। আমার কাজ কেমন লাগল ভিনসেন্ট?

    সত্যি কথা বলতে, বুঝতে পারলাম না। ভাববার সময় দাও। তারপর আরও কয়েক বার দেখতে দাও।

    বেশ তো। যখন খুশি যতবার খুশি এসে দেখো। সারা প্যারিসে আর একটিমাত্র তরুণ শিল্পী আছে যার ছবি আমারই সমান সমান ভালো। জর্জেস সিউরাত, সেও আছে আদিমকে আঁকড়ে ধরে, বন্যতা নিয়ে তারও কারবার। আর যারা, তারা সভ্য গাধার পাল।

    জর্জেস সিউরাত? নাম শুনিনি তো!

    শোনবার কথা নয়। শহরের কোনো ছবিওয়ালা তার ছবি টাঙাবে না। তবু, হ্যাঁ, মস্ত বড়ো শিল্পী সে!

    তার সঙ্গে আমার আলাপ হয়নি, গগাঁ?

    বেশ তো। নিয়ে যাব তোমাকে। তার আগে চলো, রেস্তরাঁতে বসে ডিনারটা সেরে নিই। পকেটে কিছু—দাঁড়াও দাঁড়াও, দেখি। হ্যাঁ এই তো দু-ফ্র্যাঙ্ক আমার সম্বল। ওঠো। বোতলটা ফেলে দিয়ে কী হবে, নিয়ে চলো। সাবধান, আস্তে আস্তে মেব। পা ফসকালেই ঘাড়টি কিন্তু মটকাবে।

    [tab title=”পাঁচ”]

    সিউরাতের বাড়ির কাছাকাছি যখন দুজনে পৌঁছোল রাত তখন দুটো।

    ভিনসেন্ট স্খলিত কণ্ঠে শুধোলে—এত রাত্রে ডাকাডাকি করলে চটবে না তো?

    পাগল! যেমন সারাদিন তেমনি সারারাত্রিই তো ছবি আঁকে! ঘুমোয় কখন লোকটা? এই, এই বাড়ি। বাড়িটা সিউরাতের মা-র। ভদ্রমহিলাই ছেলেকে রেখেছেন, বলেন—আঁকতে চায় আঁকুক। আমি যতদিন আছি ভাবনা নেই। সিউরাতও ভারি ভালো ছেলে, একেবারে আদর্শ যাকে বলে। মদ খায় না, তামাক ফোঁকে না, মেয়েমানুষের পেছনে ঘোরবার বাতিক নেই, ছবি আঁকার মালপত্র ছাড়া বাজে একটি জিনিসে একটি পয়সা খরচ করে না। একটি কেবল মহৎ দোষ, সে হচ্ছে ছবি আঁকা।

    ভিনসেন্ট বললে—প্যারিসের তরুণ শিল্পীর পক্ষে এ যে একেবারে অবাক কাণ্ড!

    গগাঁ বললে—কানাঘুষোয় শুনেছি কাছাকাছি অন্য বাড়িতে একটি রক্ষিতা আছে, একটি ছেলেও নাকি আছে তার। প্রকাশ্যে ও নিয়ে কোনো কথা নেই।

    বাড়ির সামনে এসে দাঁড়াল দুজন। ভিনসেন্ট বললে—সব যে অন্ধকার। ডেকে তুলবে কী করে?

    গগাঁ বললে—পিছন দিকে চলো না। ওপরের জানলায় ঠিক আলো দেখবে। ইট মারলেই বেরিয়ে আসবে, তবে সাবধান, মা-র জানলায় যেন না লাগে।

    জর্জেস সিউরাত নেমে এসে দরজা খুলে দিল। ঠোঁটে আঙুল দিয়ে কথা বলতে বারণ করে চুপি চুপি সিঁড়ি বেয়ে আগন্তুকদের নিয়ে গেল ওপরের ঘরে। তারপর ঘরের দরজাটা দিল এঁটে বন্ধ করে।

    এতক্ষণে কথা বললে গগাঁ—তোমার সঙ্গে আলাপ করাতে নিয়ে এলাম, ভিনসেন্ট ভ্যান গক, থিয়োর ভাই। ছবি অবশ্য আঁকে ডাচম্যানের মতো, তবে বড়ো চমৎকার লোক।

    বাড়ির প্রায় সারা তিনতলাটা জুড়ে বিরাট ঘরখানা। দেয়াল জুড়ে বিরাট মাথা-ছাড়ানো উঁচু অসমাপ্ত ক্যানভাস টাঙানো, তাদের সামনে কাঠের মই আর মাচা। মাঝখানে ঝুলছে গ্যাসের গনগনে আলো। তার নীচেই মস্ত একটা টেবিল। টেবিলে ভিজে একটা ক্যানভাস চিত করে শোয়ানো।

    আসুন মশিয়েঁ ভ্যান গক, খুশি হলাম আলাপ করে। একটু সময় আমাকে দিন, শুকোবার আগে ছোট্ট একটা চৌখুপিভরতি করে নিই।

    একটা উঁচু টুলের ওপর উঁচু হয়ে বসে সিউরাত টেবিলের ক্যানভাসটার ওপর ঝুঁকে পড়ল। টেবিলের ধারে পরিচ্ছন্নভাবে সার করে প্রায় কুড়িটি রঙের বাটি। সূক্ষ্মতম একটি তুলির ডগা রঙে ডুবিয়ে নিয়ে ক্যানভাসের মাঝখানে একটি ফাঁকা চৌকো জায়গা সিউরাত বিন্দুর পর বিন্দু বসিয়ে ভরতি করতে লাগল। যন্ত্রের মতো কাজ করতে লাগল তার হাত। মুখে কোনো সৃষ্টির অভিব্যক্তি নেই, ভাবটা পুরোপুরি নৈর্ব্যক্তিক—শিল্পী নয়, ঠিক কারিগর। সোজা করে তুলিটা ধরে ক্যানভাসের ওপর, তারপর হাত চলে, ফুটকির পর ফুটকি। রং ফুরোলে তুলির ডগাটা রঙের পাত্র একবার ছোঁয় মাত্র, তারপর আবার ঘন সন্নিবিষ্ট রঙিন ফুটকির রাশি ঝাঁকে ঝাঁকে নামে ক্যানভাসের সাদার ওপর।

    ভিনসেন্ট হাঁ করে দেখতে লাগল।

    একটু পরে সিউরাত মুখ ফেরাল, বললে—ব্যাস, ফাঁকাটা ঠিক ভরাট হয়েছে এবার।

    গগাঁ বললে—ভিনসেন্টকে তোমার ছবিটা ভালো করে দেখাও না সিউরাত, ও যে-দেশ থেকে এসেছে সেখানে এখনও লোকে গোরু ভেড়া আঁকে, আধুনিক শিল্পের সঙ্গে ওর মাত্র দিন সাতেকের পরিচয়।

    সিউরাত বললে—তাহলে টুলটার ওপর উঠে বসুন, মশিয়েঁ ভ্যান গক।

    টুলের ওপর বসে টেবিলে শোয়ানো ছবিটা মন দিয়ে দেখতে লাগল ভিনসেন্ট। এমনি অদ্ভুত দৃশ্য সে জীবনে কখনও দেখেনি, না শিল্পে, না প্রকৃতিতে। গ্রান্ড জাট দ্বীপের দৃশ্য ছবিটি। গথিক গির্জের চুড়োর মতো খাড়া হয়ে দাঁড়িয়ে আছে কয়েকটা মানুষ। স্থপতি যেন তাদের সৃষ্টি করেছে অপরিমেয় ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বর্ণবিন্দু সাজিয়ে। প্রান্তর আর নদী, নৌকো আর বৃক্ষরাজি সবেরই যেন কেমন অস্পষ্ট দুরধিগম্য রূপ, অসংখ্য নিরবচ্ছিন্ন বর্ণোজ্জ্বল আলোকবিন্দু দিয়ে গড়া, এত তরল, এত উজ্জ্বল সব রঙের ব্যবহার যা মানে বা ডেগা বা গগাঁ পর্যন্ত ব্যবহার করতে সাহস করেনি। রঙের পর রং কেমন করে কোথায় মিশছে খুঁজে পাওয়া যায় না, বিন্দুর পর বিন্দুতে যান্ত্রিক কারুকার্যের নির্ভুল সংগতি, মনে হয় এ যেন শিল্পীমনের বিমূর্ত সমন্বয়ের নিস্পন্দ মৃত্যুরাজ্যে সক্রিয় পশ্চাদবর্তন। প্রাণ আছে, যে-প্রাণ প্রকৃতিতে নেই, সমুজ্জ্বল আলো আছে, নেই বায়ুহিল্লোল নেই একবিন্দু নিশ্বাস। প্রস্ফুট প্রকৃতির এ যেন স্তম্ভিত রূপ, চঞ্চল জীবনের মরণাহত শোভাযাত্রা।

    ভিনসেন্টের পাশে গগাঁ দাঁড়িয়েছিল। ভিনসেন্টের মুখের চেহারা দেখে সশব্দে হেসে উঠল সে। বললে—হ্যাঁ, সিউরাতের ছবি প্রথমবার দেখলে এইরকমই হাঁ হয়ে যেতে হয়। বলো বলো, কী ভাবছ খুলে বলোই না।

    ভিনসেন্ট বিমূঢ়ভাবে সিউরাতের দিকে তাকাল। বললে—আপনি আমাকে মাপ করবেন মশিয়েঁ, কিন্তু গত ক-দিন ধরে আমি বারে বারে এমন সব অভাবনীয় অভিজ্ঞতার ধাক্কা খাচ্ছি যে যেন আর তাল ঠিক রাখতে পারছিনে। হল্যান্ডের শিল্পরীতিতে আমি মানুষ। ইম্প্রেশনিস্ট কাদের বলে তা-ই আমি জানতাম না। এখন হঠাৎ দেখছি, এতদিন ধরে যা-কিছু বিশ্বাস করে এসেছি, সবকিছুই এখানে ধুলোয় লুটোচ্ছে।

    গম্ভীরভাবে সিউরাত বললে—আপনার মানসিক অবস্থা আমি বুঝতে পেরেছি। আমার শিল্পকর্ম সম্বন্ধে আপনাকে কয়েকটা কথা বুঝিয়ে বলা দরকার। আমার যা রীতি তা সমস্ত চিত্রকলার জগতে প্রচণ্ড একটা বিপ্লব ঘটাতে চলেছে। এমনি একটা রীতিকে একচোখ দেখেই বুঝে নেওয়া অসম্ভব। ভেবে দেখুন মশিয়েঁ, আজ পর্যন্ত চিত্রকলা যেখানে এসে পৌঁছেছে, তার মূলে রয়েছে কী? শিল্পীর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, নিতান্ত নিজস্ব কল্পনা। এই ব্যক্তিগত খেয়ালের বাইরে আমি চিত্রকলাকে নিয়ে যাব, একে আমি একটা বিমূর্ত বিজ্ঞানে পরিণত করব। আমাদের নানা মুহূর্তের নানা রকমের সব ব্যক্তিগত অনুভূতি, সেসবকে সারবন্দি করে রাখতে হবে, মনটাকে বাঁধতে হবে সূক্ষ্ম অথচ নির্ভুল গাণিতিক নিয়মের মধ্যে। মানুষের যা-কিছু ইন্দ্রিয়গোচর উপলব্ধি, তার প্রত্যেকটিকে আলাদা আলাদা করে বিচার করে দেখতে হবে, আর প্রত্যেকটির জন্যে ভিন্ন ভিন্ন শিল্পপ্রতীক তৈরি করতে হবে, রেখার প্রতীক, রঙের প্রতীক। টেবিলে এইসব ছোটো ছোটো রঙের বাটিগুলো দেখছেন?

    আজ্ঞে হ্যাঁ। অনেকগুলো বাটি।

    এই এক-একটি বাটিতে, মশিয়েঁ ভ্যান গক, মানুষের এক-একটি অনুভূতি ভরা আছে। আমার ফর্মুলা অনুসারে, এইসব বাটির আলাদা আলাদা রং কারখানায় · তৈরি হবে, দোকানে কিনতে পাওয়া যাবে। এলোমেলোভাবে এ-রঙের সঙ্গে ও-রঙ মেশাবার আর কোনো দরকার হবে না। ছবি-আঁকিয়ে সোজা দোকানে যাবে, ছবির বিষয় ও অনুভূতি অনুসারে নির্দিষ্ট রঙের কৌটোগুলি কিনে নিয়ে আসবে। এটা হচ্ছে বিজ্ঞানের যুগ, আমি চিত্রকলাকে বিজ্ঞানের পথে নিয়ে আসব। তবে ছাড়ব। ছবির ঘাড় থেকে ব্যক্তিত্বের ভূতটাকে আমি নামার। শিল্পকলাকে নিয়ে যাব স্থাপত্যের সুনির্দিষ্ট রাস্তায়। আমার কথা আপনি বুঝতে পারছেন, মশিয়েঁ?

    ঠিক বুঝছি বলে ভরসা হচ্ছে না।

    গগাঁ সিউরাতের অলক্ষে ভিনসেন্টের হাতে একটু খোঁচা মারল। তারপর বললে—দেখো সিউরাত, এই যে রীতি, এটাকে বারে বারে তোমার আবিষ্কার বলে চালাতে যাও কেন, বলো তো? এই তো শুনি তোমার অনেক আগে হাতে–কলমে পিসারো এটা বার করে গেছে!

    দপ করে জ্বলে উঠল সিউরাত—মিথ্যে কথা!

    সারা মুখটা চকচকে লাল হয়ে উঠেছে। হনহন করে দু-বার পায়চারি করে এসে সে টেবিলের ওপর বসাল বিরাট একটা ঘুসি।

    কে বলেছে পিসারো আমার আগে এটা আবিষ্কার করেছে? এটা আমার আবিষ্কার, এই পয়েন্টিলিজম। পিসারো শিখেছে আমার কাছ থেকে! আদি ইতালিয়ানদের যুগ থেকে আজ পর্যন্ত চিত্রকলার ইতিহাস আমি তন্নতন্ন করে পড়েছি। কেউ এ-জিনিস ভাবেনি আমার আগে। তোমার তো বড়ো সাহস যে আমার থিয়োরিটা

    ভাঁটার মতো জ্বলতে লাগল চোখ। রাগে মুখ দিয়ে ফেনা বার হয় আর কি!

    অবাক হয়ে চেয়ে রইল ভিনসেন্ট। আশ্চর্য! একটু আগে ল্যাবরেটরির বিজ্ঞানীর মতো যার শান্ত সমাহিত নিরাসক্ত দৃষ্টি, অধ্যাপকের মতো ধীর গম্ভীর কথাবার্তা, মুহূর্তে সে-লোকটা এমনি পাগলের মতো খেপে উঠে নিজের দাড়ি চুমরোয় আর ঝাঁকড়া চুল ছেঁড়ে কী করে?

    ভিনসেন্টের দিকে চোখ টিপে গগাঁ বললে—আরে থামো থামো, পাগল নাকি? বাজে লোকে কত কথা বলে! তুমি ছাড়া পয়েন্টিলিজম থাকত কোথায়! আমরা কি আর তা জানিনে?

    আস্তে আস্তে ঠান্ডা হল সিউরাত, টেবিলের কাছে এসে বসল।

    ভিনসেন্ট বললে—মশিয়েঁ সিউরাত, শিল্পকলার মূল কথাই হচ্ছে ব্যক্তিত্বের অভিব্যক্তি। তাকে ব্যক্তিনিরপেক্ষ বিজ্ঞানে পরিণত করা কি সম্ভব?

    নিশ্চয়ই! দাঁড়ান, আমি দেখিয়ে দিচ্ছি।

    এক বাক্স ক্রেয়ন হাতে নিয়ে সিউরাত বসে পড়ল মেঝের ওপরে। একপাশে বসল ভিনসেন্ট, আর-একপাশে গগাঁ। সিউরাতের গলায় তখনও উত্তেজিত ব্যস্ততা। বললে, আমার মতে ছবি আঁকাকে ফর্মুলার মধ্যে আনা সম্ভব। ধরুন, একটা সার্কাসের দৃশ্য আঁকছি। এখানে খালি ঘোড়ার পিঠে একজন সওয়ার, এখানে সার্কাস ম্যানেজার, আর এ-দিকে দর্শকের দল। কেমন? আচ্ছা, কী অনুভূতিটা আমি প্রকাশ করতে চাই? ফুর্তি, উত্তেজনা—তাই তো? এবার বলুন, ছবি আঁকার মূল উপাদান

    উপাদান কী? লাইন, টোন আর রং। বেশ, এবার আমাকে ওই ফুর্তির অনুভূতিটি ফোটাতে হবে। এই দেখুন, সবকটি রেখাকে আমি অনুভূমিকের ওপরে তুলে দিলাম, উজ্জ্বল রংগুলিকে আমি স্পষ্ট করলাম, সঙ্গে সঙ্গে আমি উত্তপ্ত টোনের ব্যবহার করলাম। কী পেলাম? ফুর্তি বলে যে-জিনিসটা আমাদের উপলব্ধিগোচর, পেলাম তার একটা অমূর্ত ধারণা। পেলাম না?

    তা হয়তো পেলাম, কিন্তু ফুর্তিটাকে পেলাম না।

    সিউরাত মাটি থেকে চোখ তুলে তাকাল। ভিনসেন্ট ভালো করে দেখল, কী সুদৰ্শন লোকটা!

    সিউরাত বললে—অনুভূতি ধরতে শিল্পীর মাথাব্যথা নেই, সে চায়, তারও পেছনে সেই অনুভূতির যে-সারাৎসার আছে, তাকে ধরতে। প্লেটো পড়েছেন?

    পড়েছি বটে।

    বেশ। শিল্পীরা বস্তু আঁকবে না, বস্তুর যে এসেন্স আছে, তাকে আঁকবে। আপনি যদি ঘোড়া আঁকতে চান, আর একটা ঘোড়াই আঁকেন, তাহলে চিত্রকর হয়ে ফোটোগ্রাফার হলেই তো পারতেন। আঁকতে হবে, একটা ঘোড়া দুটো ঘোড়া এমনি করে বিশ্বের সমস্ত ঘোড়ার পেছনে একটিমাত্র যে নির্বিশেষ ঘোটকচরিত্র আছে, তাকে। মানুষ যদি আঁকতে চান, তাহলে রাস্তার মোড়ের ওই পাহারাওয়ালাটাকে আঁকলে চলবে না, আঁকতে হবে চিরন্তন মানুষের নির্বিশেষ আত্মাটাকে। বুঝতে পারছেন?

    বুঝতে পারছি, তবে মানতে পারছিনে।

    বেশ, মানবেন পরে। মাটি থেকে সার্কাসের ছবিটা মুছে ফেলে উঠে দাঁড়াল সিউরাত।

    আচ্ছা এবার ধরুন, একটা শান্ত প্রকৃতির দৃশ্য আঁকতে হবে। এই দেখুন রেখাগুলি সব অনুভূমিক আর সমান্তরাল, টোনে দেখুন গরম-ঠান্ডার কেমন সমন্বয়, রং দেখুন, গভীর রং আর হালকা রং সমান সমান। দেখতে পাচ্ছেন?

    গগাঁ বললে—আজেবাজে প্রশ্ন করে বক্তৃতাটা নষ্ট কোরো না সিউরাত। বলে যাও—

    আচ্ছা বেশ। এবার ধরুন, দুঃখের অনুভূতি। চিত্রে এই অনুভূতিকে ফুটিয়ে তুলতে হবে। লাইনগুলি নামবে ওপর থেকে নীচে, এইরকম। টোন হবে ঠান্ডা, গভীর রংগুলো হবে স্পষ্ট। এই দেখুন, দুঃখের যা সারাৎসার তা ধরা পড়ে গেছে!! ক্যানভাসে কীভাবে জায়গা ছাড়তে হবে, কোথায় কোন বস্তু বসাতে হবে তা একেবারে জ্যামিতিক নির্ভুলতায় মেপেজুখে ঠিক করে ছোট্ট ছোট্ট বইয়ের আকারে বার করা যেতে পারে। আমি এমনি একটা বইয়ের মালমশলা জোগাড় করেও ফেলেছি। শিল্পীর কাজ হবে কেবল বই মুখস্থ করে নেওয়া, তারপর রঙের দোকানে গিয়ে নির্দিষ্ট রঙের পাত্রগুলি কিনে আনা। তারপর নিয়মগুলি মানলেই হল। চমৎকার ছবি-আঁকিয়ে হবে সে, বিজ্ঞানসম্মতভাবে সঠিক হবে তার কাজ। রৌদ্রেই আঁকুক কি ছায়াতেই আঁকুক, সাধুই হোক কি লম্পটই হোক, বয়স হোক সাত বা সত্তর, তার হাতের কাজে স্থপতিসুলভ বৈজ্ঞানিক সম্পূর্ণতা আসবেই। চোখ পিটপিট করতে লাগল ভিনসেন্ট। হেসে উঠল গগাঁ, বললে—জর্জেস, ও ভাবছে তুমি একটা আস্ত পাগল।

    তা-ই ভাবছেন নাকি, মশিয়েঁ ভ্যান গক?

    না না, তা ভাবব কেন? প্রতিবাদ জানিয়ে ভিনসেন্ট বলে–আমাকেই কত সময়ে কত লোকে বলেছে পাগল। কী এসে গেছে তাতে আমার? তবে কিনা, এটা বলবই যে আপনার এসব আইডিয়া খুবই অসাধারণ।

    গগাঁ বললে—ওই দেখলে তো? সোজা কথাটাকে একটু ঘুরিয়ে বলল যে তুমি শুধু পাগল নও, বদ্ধ পাগল।

    দরজায় ধাক্কা পড়ল। সিউরাতের মা-র ঘুম ভেঙেছে। আর আড্ডা নয়। এবার সরে পড়তে হবে।

    বাড়ির সদরদরজা পর্যন্ত বন্ধুদের পৌঁছে দিতে এসে সিউরাত বললে ভিনসেন্টকে—আপনাকে হয়তো আমার সব কথা খুব স্পষ্ট করে বোঝাতে পারলাম না, মশিয়েঁ ভ্যান গক। যখন খুশি আপনি আসবেন। দুজনে একসঙ্গে কাজ করব। কাজের মধ্যে দিয়েই বোঝাপড়া হবে। আমার যা পদ্ধতি তা যদি সম্যক উপলব্ধি করতে পারেন তাহলে চিত্রকলা সম্বন্ধে আপনার এতদিনের যা কিছু ধারণা সব বদলে যাবে। আচ্ছা চলি, ছবিটার আর-একটা চৌখুপি ফুটকি দিয়ে ভরতি করা এখনও বাকি আছে, সেরে ফেলি গে।

    আকাশে তখনও শেষ রাতের জড়িমা। ঘুমন্ত নগরী। ভিনসেন্ট আর গগাঁ খাড়াই বেয়ে মোমার্তের দিকে চলল। দু-ধারের ঘর-বাড়ি-দোকানের দরজা জানলা বন্ধ, রাস্তায় দু-একটি সবজি আর দুধের গাড়ি বার হয়েছে।

    গগাঁ বললে—চলো, খাড়াইয়ের মাথায় উঠে সূর্যোদয়ে প্যারিসের ঘুম-ভাঙ দেখি।

    চলো।

    বুলেভার্দ ক্লিচি থেকে রু লেপিক ধরে তারা এগোল। রাস্তাটা শেষ পর্যন্ত ঘুরে ঘুরে মোমার্ত পাহাড়ের চুড়ো পর্যন্ত গিয়েছে।

    বাড়িঘর বিরল হয়ে আসছে। রাস্তার দু-পাশে ফাঁকা মাঠ, গুল্মরাজি আর গাছপালা দেখা যাচ্ছে। রু লেপিক ছেড়ে পায়ে-চলা একটা কাঁচা রাস্তা নিল দুজন।

    ভিনসেন্ট বললে—আচ্ছা গগাঁ, খুলে বলো তো সিউরাত সম্বন্ধে তোমার কী ধারণা?

    জর্জেসের কথা বলছ? আমি ঠিক ভেবেছিলাম এ-কথা তুমি আমাকে জিজ্ঞাসা করবেই। রং যদি বল তো বলব, একমাত্র দেলাক্রোয়ার পর রং ওর মতো আর কেউ বোঝে না। তবে আর্টের যেসব থিয়োরি নিয়ে ও মাথা ঘামায়, সেগুলো বাজে। শিল্পী যে, সে কি বুদ্ধিজীবী? অত ভাববে কেন সে? মাস্টারি কেন সে করবে? আঁকাই তার কাজ, আঁকাই তার ধর্ম, সে শুধু আঁকবে। আর্টের যারা সমালোচক, তারা থিয়োরি কপচাক যত খুশি। রঙের দিক থেকে সিউরাতের নিজস্ব একটা অবদান থাকবে নিশ্চয়ই, আর ছবির মধ্যে স্থাপত্যের ভাবটা ওই যে ও এনেছে, আধুনিক শিল্পের আদিমতার প্রতি যে-আকর্ষণ দেখা যাচ্ছে, সেই আকর্ষণ হয়তো ওতে জোরালো হয়ে উঠবে। তবে এসব বাদ দিয়ে সোজা কথাটা যদি বলতে হয় ও হল বদ্ধপাগল, তুমি নিজেই তা দেখেছ।

    খাড়াইটা কম নয়, বেশ পরিশ্রম হল চুড়োয় উঠতে। সামনে ছবির মতো বিছিয়ে রয়েছে সারা শহরটা। সার সার অসংখ্য বাড়ির মাথা। মাঝে মাঝে কালো কুহেলির আবরণ ফুঁড়ে মাথা তুলেছে গির্ভের চুড়ো। বঙ্কিম আলোকরেখার মতো সিন নদীটাকে দেখাচ্ছে। শহরটাকে দু-ভাগে ভাগ করেছে এই নদী। মোমার্ত পাহাড়ের ঢালু বেয়ে বাড়িঘর নামতে নামতে সিন পার হয়ে আবার মোপার্নাসের দিকে ঠেলে উঠেছে।

    সূর্য উঠল, অন্ধকার ভেদ করে আকাশে মাথা তুলে খাড়া হয়ে দাঁড়াল শহরের তিন অতিকায় প্রহরী—পুবদিকে নতেরদাম, মাঝখানে অপেরা আর পশ্চিমদিকে আর্চ অব ট্রায়াঙ্ক।

    [tab title=”ছয়”]

    রু লেপিকের ছোট্ট ফ্ল্যাটটিতে শান্তি নেমেছিল ক-দিনের জন্যে। থিয়ো ভেবেছিল গ্রহভাগ্য সুপ্রসন্ন। কিন্তু নিতান্ত ক্ষণস্থায়ী তা। গাঢ় গ্যালেটের বদলে উজ্জ্বলতর রঙের পথে প্রকৃত অনুশীলন ও পরীক্ষার মধ্যে দিয়ে না গিয়ে একটা সোজা রাস্তা বেছে নিল ভিনসেন্ট। সে হচ্ছে নতুন শিল্পীবৃন্দদের অন্ধ অনুকরণ করা। ইম্প্রেশনিস্ট হবার মত্ত আগ্রহে সে এতদিন যা-কিছু শিখেছিল সব বিসর্জন দিল। তার নিজের আঁকা বলে আর-কিছু রইল না, যা আঁকে তা হয় সিউরাত, নাহয় গগা নাহয় লোত্রেকের বীভৎস কৃত্রিম অনুকৃতি। এতেই তার আনন্দ, ভাবে দারুণ কিছু একটা করছে, এগিয়ে চলছে জোর কদমে।

    একদিন রাত্রে থিয়ো বললে–তোমার নামটা কী বলো তো ভিনসেন্ট?

    কেন? ভিনসেন্ট ভ্যান গক।

    ঠিক বলছ? ভুল হয়নি তো? জর্জেস সিউরাত বা পল গগাঁ নয়?

    হঠাৎ এমনি ঠাট্টা কেন? কী বলতে চাও তুমি?

    বলছি, ধৈর্য ধরো। সত্যিই কি তুমি ভাব তুমি দু-নম্বর সিউরাত হতে পারবে? সত্যিই কি তুমি বোঝ না যে সৃষ্টির শুরু থেকে শেষের মধ্যে তুলস–লোত্রেক ওই একটিই জন্মাবে, আর ভগবানকে ধন্যবাদ যে ওই একটির পর দুটি গগাঁ আর গজাবে না? তাহলে? ওদের নকলনবিশি করে লাভ কী?

    নকলনবিশি আমি করছিনে, আমি শিক্ষানবিশি করছি।

    না, নকলনবিশি। তোমার যেকোনো একটা নতুন ক্যানভাস আমাকে দেখাও, আমি ঠিক বলে দেব সেটা আঁকবার আগের দিনের সন্ধেটা কার সঙ্গে তুমি কাটিয়েছ।

    কিন্তু এতে তো আমার উন্নতিই হচ্ছে। দেখো, কত হালকা হয়ে এসেছে আমার রং।

    উন্নতি হচ্ছে! দিনের পর দিন গড়িয়ে গড়িয়ে রসাতলে যাচ্ছ। রোজ একখানা করে ক্যানভাসে রং বোলাচ্ছ, প্রতিটি ছবিতে ভিনসেন্ট ভ্যান গকের পরিচয়টা মুছে মুছে যাচ্ছে। অত সস্তায় বাজিমাত হয় না। অনেক বছরের কঠোর পরিশ্রম এখনও বাকি। হ্যাঁ, এই পরিশ্রমের মধ্যে দিয়েই অপরের যা ভালো তা আত্মসাৎ করে নিতে পারো; অনুকরণ করে নয়।

    থিয়ো, আমি তোমাকে বলছি এ-ছবিগুলো ভালো হয়েছে।

    হ্যাঁ, আমিও তোমাকে বলছি ওগুলো জঘন্য হয়েছে।

    লড়াই চলল দিনের পর দিন।

    রোজ সন্ধ্যা বেলা সারাদিনের কর্মক্লান্তি নিয়ে ঘরে ফিরে থিয়ো নতুন ছবি-হাতে ভিনসেন্টের সম্মুখীন হয়। মারমুখো ভিনসেন্ট, হাতের ক্যানভাস যেন মারণাস্ত্র।

    থিয়োকে মাথার টুপিটা খোলবার সে অবসর দেয় না।

    নাও, দেখো এইবার। বলো এটা ভালো হয়নি? বলো রং ঠিক হয়নি, বলো সূর্যের আলোর প্রতিফলনটা ঠিক ফোটেনি, বলো–

    থিয়োর দুটো পথ। হয় মিথ্যে কথায় ভাইকে শান্ত করে নিজে কিছুটা শান্তি ভোগ করা, না-হয় রূঢ় সত্যি কথা বলে সারারাত্রি পাগলের পাগলামির সঙ্গে যুদ্ধ করা।

    ক্লান্ত শরীর সত্যি কথার ভার সয় না। তবু মন-ভোলানো মিথ্যে বলতে সে পারে না।

    কাল বুঝি অমুক প্রদর্শনীতে গিয়েছিলে?

    কেন? ও-কথা আসে কোত্থেকে?

    উত্তরই দাও না।

    অপ্রতিভ মুখে ভিনসেন্ট বলে—হ্যাঁ, গিয়েছিলাম, কাল বিকেলে।

    সুস্পষ্ট ভাষায় দৃঢ় কণ্ঠে এবার থিয়ো বলে—তুমি জান ভিনসেন্ট, এই প্যারিসে এই মুহূর্তে অন্তত পাঁচশোটা আঁকিয়ে আছে যারা প্রাণপণ চেষ্টা করছে শুধু এডোয়ার্ড মানেকে নকল করতে। আর তাদের অধিকাংশই এই নকলের কাজটা তোমার চাইতে অনেক ভালোই পারে।

    এরপর ভিনসেন্ট একটা নতুন কৌশল করল। সমস্ত ইম্প্রেশনিস্টদের এনে সে পুরল একটা ক্যানভাসে। এইবার ধরুক থিয়ো, বলুক দেখি কী বলে!

    থিয়ো বললে—চমৎকার! সব পড়া মুখস্থ করে ফেলেছ দেখছি! এককথায় ছবিটার নাম দেওয়া যাক—রোমন্থন, কেমন? তারপর ছবিটার নানান জায়গায় এটা-ওটা লেবেল মেরে দিলেই হবে এখন।….এই যে গাছটা, এটা হচ্ছে গগাঁ। কোণের ওই মেয়েটা, ওটা নির্ঘাত তুলস-লোত্রেক। নদীর জলের যেখানটায় রোদ এসে পড়েছে, ওখানটায় লেবেল পড়বে সিসলের। তারপর রংটা মনে, পাতাগুলো পিসারো, আকাশটা সিউরাত আর সামনের মূর্তিটা মানে।

    সে-দিন আর-একটি কথা বলল না ভিনসেন্ট।

    নিষ্ঠুর লড়াই শুরু হল দু-ভাইয়ের মধ্যে। সারাদিন প্রচণ্ড পরিশ্রম সে করে, আর সন্ধে বেলা থিয়ো এসে তাকে ধমকায় ছোটোছেলেকে শাসন করার মতো। কথায় কথা বাড়ে, তুমুল ঝগড়া চলে দুজনের। একটিমাত্র ঘর দুজনের, থিয়ো ঘুমোতে চায়, ভিনসেন্টের জ্বালা-ধরা চোখ, মাথার মধ্যে আগুন। তর্ক করতে করতে শেষ পর্যন্ত ক্লান্ত হয়ে থিয়ো গা এলিয়ে দিয়ে চোখ বোজে। দপদপ করে আলো জ্বলে, ভিনসেন্টের চিৎকার আর হাত-পা নাড়া তখনও থামে না। থিয়ো ভাবে কোনদিন সে পাগল হয়ে যাবে, একটিমাত্র আশা, তার আগে হয়তো রু লেপিকে নতুন বাসাটা মিলবে, সেখানে আলাদা একখানা শোবার ঘর থাকবে তার আর দরজায় লাগাতে পারবে শক্ত মোটা একটা তালা।

    নিজের ছবি নিয়ে তর্ক করতে করতে যখন ক্লান্ত হয়ে পড়ে ভিনসেন্ট, তখন সে আর্ট, আর্টের ব্যাবসা আর আর্টিস্টের জীবন নিয়ে হুহুংকৃত আলোচনায় থিয়োর নিদ্রাহীন রাত্রের ব্যর্থ প্রহরগুলোকে উত্যক্ত করে তোলে।

    বলে—এটা আমি বুঝতে পারিনে, প্যারিসের একটা সেরা গ্যালারির ম্যানেজার হয়েও তুমি কিনা তোমার নিজের ভাইয়ের একটা ছবি সেখানে টাঙাবে না!

    থিয়ো বুঝিয়ে বলতে চেষ্টা করে—দেখো, আমি তো মালিক নই। আমার মতের ওপরেও মালিকের মত তো আছে?

    একবারও চেষ্টা করেছ তুমি?

    হাজার বার।

    বেশ, স্বীকার করলাম আমার ছবি তোমার গ্যালারিতে স্থান পাবার উপযুক্ত নয়। কিন্তু সিউরাত? গগাঁ? লোত্রেক? তারাও বরবাদ?

    প্রত্যেক বার তারা নতুন ছবি শেষ করে, আর প্রত্যেক বারই আমি চেষ্টা করি, কিন্তু কারুর?

    বুঝেছি। একটা কথা জিজ্ঞাসা করি, গ্যালারিটা কার? তোমার, না আর

    মালিকের। আমি তো কর্মচারী।

    তার মানে, তোমার কোনো অধিকার নেই, কোনো ক্ষমতা নেই। কী লজ্জা! আমি হলে কিছুতেই সহ্য করতাম না, লাথি মেরে চলে আসতাম!

    কাল সকালে এ-আলোচনা হবে ভিনসেন্ট। আজ আমি বড়ো ক্লান্ত, ঘুমোতে দাও।

    ঘুমোলেই হল? এ-ব্যাপারটার এখুনি মীমাংসা হওয়া দরকার। মানে আর ডেগা—এদের ছবি টাঙিয়ে লাভ কী? এদের নাম তো হয়েছেই। যারা নবীন, যারা অপরিচিত, তাদের জন্যেই তো এখন লড়াই করা দরকার।

    সময় দাও আশকে। ধরো, আর বছর তিনেক পরে–

    তিন বছর! এতদিন অপেক্ষা করবে কে? শোনো থিয়ো, এ-চাকরিটা ছেড়ে দাও, নিজের একটা গ্যালারি ধরো। তা নয়তো কিনা পরের গোলামি? ছিঃ!

    নিজের গ্যালারি করতে হলে টাকা লাগে ভিনসেন্ট। মূলধন কোথায় পাব!

    যেখান থেকে পারি জোগাড় করব আস্তে আস্তে!

    আর ব্যাবসা? ব্যাবসা কি একদিনে হয়? বিশেষ করে ছবির ব্যাবসা জমতে কত দেরি লাগে তার কোনো ঠিক নেই।

    হোক দেরি। দিনরাত্রি আমরা খাটব। তোমার গ্যালারি দাঁড় করিয়ে তবে ছাড়ব শেষ পর্যন্ত। তার জন্যে যতদিন লাগে লাগুক।

    আর ততদিন পয়সা জুটবে কোথা থেকে? খাব কী?

    ও বুঝেছি! আমি রোজগার করিনে, আমি তোমার গলগ্রহ, তাই বুঝি খুঁড়ছ?

    দোহাই ভিনসেন্ট, শুয়ে পড়ো। আমি আর পারছিনে!

    না শোব না, কিছুতে শোব না! এ-কথাটার এক্ষুনি একটা মীমাংসা হোক। আমি তোমার গলায় পাথর হয়ে ঝুলছি, আমি তোমার ভানা বেঁধে রেখেছি, এই তো? আমি যদি না থাকতাম, তুমি মুক্তি পেতে, চাকরি ছাড়তে, ব্যাবসা করে বড়োলোক হতে পারতে, এই না? বলো বলো, ঢেকে রেখো না, সত্যি কথা খুলে বলো!

    নিতান্ত ক্লান্ত গলায় থিয়ো জবাব দিলে—দেখো, আমার গায়ে যদি আরও কিছুটা জোর থাকত, তোমাকে আমি আগাপাশতলা মার লাগাতাম। নিজে যখন তা পারব না, তখন গগাঁকে ডেকে তোমাকে একদিন ভালো করে পেটাব। একটা কথা কেন বোঝ না ভিনসেন্ট? তোমার আমার জীবন আলাদা, ভাগ্য আলাদা। আমি গুপিলে চাকরি করব, আজ যেমন করছি চিরদিনই তেমনি করব। তোমার কাজ ছবি আঁকা, আজ যেমন আঁকছ, চিরদিনই তেমনি আঁকবে। গুপিল থেকে যা আমি পাব, তার অর্ধেক তোমার। আর তুমি যা আঁকবে, তার অর্ধেক আমার। এই তো আমাদের মধ্যেকার চুক্তি। তা-ই নয়? বেশ, এখন লক্ষ্মীছেলের মতো ঘুমিয়ে পড়ো। আর যদি জ্বালাতন কর তো পুলিশ ডাকব।

    .

    পরদিন সন্ধ্যা বেলা থিয়ো একটা খাম দিল ভিনসেন্টের হাতে। বললে—চলো আমার সঙ্গে এই পার্টিতে।

    পার্টি! কে দিচ্ছে?

    হেনরি রুসো। আহা, নেমন্তন্নর চিঠিখানা খুলে দেখো একবার।

    সুন্দর একটি কবিতা। কার্ডের কোণে কোণে হাতে আঁকা পুষ্পগুচ্ছ।

    ভিনসেন্ট শুধোলে লোকটি কে?

    এককথায় বলা মুশকিল। চল্লিশ বছর বয়েস পর্যন্ত ছিল কাস্টমস-এর কালেকটর। মফস্সলে থাকত, গগার মতো রং তুলি নিয়ে খেলা করত রবিবার রবিবার। ক-বছর আগে একবার প্যারিসে এল, আর ফিরে গেল না। এখন বাস্টিলের কাছে শ্রমিকপল্লিতে থাকে। কোনোরকম শিক্ষা পায়নি, তবু ছবি আঁকে, কবিতা লেখে, সুর বাঁধে। বেহালা আর পিয়ানোর মাস্টারি করে ছোটো ছোটো ছেলেমেয়েদের, কটা বুড়োকে ড্রয়িং শেখায়।

    ছবি কী আঁকে?

    অদ্ভুত অদ্ভুত জঙ্গলের জটলা থেকে কিম্ভূত কিম্ভুত জানোয়ার। আসলে লোকটা চায়া, জঙ্গল দেখুক আর না দেখুক, আর গগাঁ ওকে যতই ঠাট্টা করুক, সত্যিকারের আদিম বন্যতা ওর রক্তে।

    কিন্তু আসলে আঁকে কেমন? তোমার মত কী?

    বলতে পারব না, বা বলব, বুঝতে পারিনে। সবাই বলে ও মাথামোটা পাগল।

    সত্যি?

    আসলে লোকটার মনটা একটা আরণ্যক শিশুর মতো। গেলেই বুঝবে। তা ছাড়া ছবিও দেখতে পাবে।

    কিন্তু এসব পার্টি-টার্টি দ্যায় কী করে? পয়সা আছে নিশ্চয়ই?

    সারা প্যারিসে যত আঁকিয়ে আছে ওর মতো গরিব কেউ নেই। বেহালাটা পর্যন্ত ভাড়া করা, কেননা কেনবার সামর্থ্য নেই। কিন্তু পার্টি দেবার ওর উদ্দেশ্য আছে, গেলেই টের পাবে।

    যে-বাড়িটাতে রুসো বাস করে সেটা একেবারে দিনমজুরদের আস্তানা। পাঁচতলার ওপরে রুসোর একখানা ঘর। রাস্তার ধারে ধারে বস্তি, বাড়িটার মধ্যে ঢুকলেই নাকে আসে রান্নাঘর আর নোংরা পায়খানার গন্ধের একাকার।

    থিয়ো ঘরের দরজায় টোকা দিল। দরজা খুলল রুসো, সম্ভ্রম-ভরা মৃদু গলায় বলল—আসুন, আসুন মশিয়েঁ ভ্যান গক, আমার আমন্ত্রণটা রেখেছেন, ধন্যবাদ আপনাকে।

    হৃষ্টপুষ্ট সমর্থ হেঁটে চেহারা। চৌকো মাথা, থ্যাবড়া নাক আর চিবুক। বড়ো বড়ো দুটি চোখে সরল চাউনি।

    থিয়ো ভিনসেন্টের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিল। চেয়ার টেনে বসল দুজনে। ঘরটি দিব্যি সাজানো, ঠিক যেন পার্টিরই জন্যে। জানলায় লাল-সাদা চৌখুপি কাপড়ের পর্দা, দেয়ালভরতি ছবি। একধারে পুরোনো পিয়ানোটার পাশে চারটি ছোটো ছোটো ছেলে বেহালা হাতে পাথরের মতো দাঁড়িয়ে। ফায়ার প্লেসের ওপরের তাকের ওপর নানা রঙের কেক আর পেস্ট্রি-পিঠে, রুসোর নিজের হাতে তৈরি। এ-দিকে ও-দিকে কয়েকটি বেঞ্চি আর চেয়ার।

    রুসো বললে—আপনারাই প্রথম এলেন মশিয়েঁ ভ্যান গক। চিত্রসমালোচক গিলুম পিলেও দয়া করে আসবেন বলেছেন তাঁর একটি দল নিয়ে

    পাথর বসানো রাস্তায় গাড়ির চাকার আওয়াজ, শিশুদের কলকণ্ঠ। মান্য অতিথিরা এলেন। রুসো তাড়াতাড়ি ঘরের দরজাটা খুলল। শোনা গেল কয়েকটি চপল অস্ফুট নারীকণ্ঠ। তাদের পেছনে ভারি একটা পুরুষের গলা—ওঠো, ওঠো, দাঁড়িয়ে পোড়ো না সিঁড়িতে। একটা হাত রেলিঙে, আর-একটা হাত নাকে, তাহলেই তো হল।

    খিলখিল শব্দে হাসল মেয়েরা।

    ঠাট্টাটা রুসোরও কানে এসেছিল স্পষ্ট। সে ভিনসেন্টের দিকে মুখ ফিরিয়ে মুচকি হাসল একটু। ভিনসেন্টের মনে হল এমনি বিদ্বেষহীন স্বচ্ছ সরল চোখ আর কারুর কখনও দেখেনি।

    হুড়মুড় করে ঘরে এসে ঢুকল দশ-বারোটি প্রাণী, মেয়ে-পুরুষ। পুরুষদের অঙ্গে সান্ধ্য পোশাক, মেয়েদের পরনে দামি দামি গাউন, হাতে সাদা সিল্কের দস্তানা, পায়ে নরম ভেলভেটের জুতো। ঘর ভরে গেল বিভিন্ন সুরভির সংমিশ্রণে।

    চিত্রসমালোচক পিলে দাম্ভিক গুরুগম্ভীর গলায় হেঁকে উঠলেন—কী হে রুসো, এই দেখো, তোমার নেমন্তন্ন রাখতে এলাম তো! বেশিক্ষণ কিন্তু থাকতে পারব না, একটা বলনাচের আসরে আবার যেতে হবে। নাও, তাড়াতাড়ি খাতির যত্ন করো আমার বন্ধুদের।

    বুকের ঊর্ধ্বাংশ খোলা সুদীর্ঘ গাউন পরা একটি পিঙ্গলকেশী তরুণী বলে উঠল—আমার সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিন শিল্পীর। আপনি মশিয়েঁ রুসো? সারা শহরে যাঁর নাম? আমার হাতটি আপনি চুশন করবেন না?

    আর কে একজন বলে উঠল—সাবধান ব্লাঞ্চ, এসব শিল্পীদের তুমি চেন না। এরা কিন্তু—

    রুসো মেয়েটির করচুম্বন করল। ভিনসেন্ট সরে গেল ঘরের এক কোণে। পিলে কথাবার্তা বলতে লাগলেন থিয়োর সঙ্গে। দলের অন্যান্য সকলে জোড়ায় জোড়ায় ঘুরতে লাগল সারা ঘরে, নাড়াচাড়া করতে লাগল জিনিসপত্র। বিদ্রুপভরা কথার ফাঁকে ফাঁকে উচ্ছ্বসিত হতে লাগল কুটিল রসিকতা তীক্ষ্ণ হাসির দমকে।

    রুসো বললে—ভদ্রমহোদয় ও মহিলারা, আপনারা দয়া করে বসুন। এখন অর্কেস্ট্রা শুরু হবে। আমারই একটি রচনা আপনারা শুনবেন, এটি আমি উৎসর্গ করেছি মশিয়েঁ পিলের নামে।

    বোসো, বোসো সবাই, পিলে হাঁকলেন—জিনি, ব্লাঞ্চ, জ্যাকেস, আর কথা নয়, গোলমাল কোরো না কেউ, চুপ করে বাজনা শোনো।

    চারটি বালক কম্পিত হাতে নিজের নিজের বেহালা বেঁধে নিল। রুসো পিয়ানোতে বসে দু-চোখ বন্ধ করল কয়েক মুহূর্তের জন্যে। তারপর বললে, রেডি।

    বাজনা শুরু হল। মন-মাতানো সরল গ্রাম্য সুর। ভিনসেন্ট কান পেতে ভালো করে শুনতে চেষ্টা করল, কিন্তু অতিথিদের চাপা হাসির শব্দে ডুবে গেল সংগীত। বাজনা শেষ হওয়ামাত্র সমস্বর কোলাহলে সকলে অভিনন্দন জানাল সুরকারকে। ব্লাঞ্চ পিয়ানোর কাছে উঠে গিয়ে রুসোর দু-কাঁধে হাত রেখে গুনগুন করে উঠল—কী মধুর, কী সুন্দর মশিয়েঁ, আমি একেবারে মুগ্ধ হয়ে গেছি!

    রুসো বললে—কিছুই না, আপনি আমাকে এতটা বাড়াবেন না মাদাম! খিলখিল হাসিতে ব্লাঞ্চ লুটিয়ে পড়ে আর কি।—শুনছ, শুনছ গিলুম শিল্পী কী বলছে? আহা, কী বিনয়!

    রুসো ঘোষণা করলে—এবার আর-একটি সুর আপনারা শুনুন।

    পিলে বললেন—না,’ শুধু বাজনা নয়, সেইসঙ্গে তোমার লেখা একটা গানও শোনাও।

    শিশুর হাসিতে উদ্ভাসিত রুসোর মুখ।

    বেশ, বেশ, গানও শুনুন।

    টেবিল থেকে গানের খাতাটি নিয়ে একটি গান বেছে রুসো আবার গিয়ে বসল পিয়ানোতে। বাজনা শুরু হল, সেইসঙ্গে রুসোর গান। ভিনসেন্টের মনে হল সুরটি ভালোই। কিন্তু বাজনার সঙ্গে রুসোর কণ্ঠ মিশে যে-রস পরিবেশিত হল, তা প্রায় বীভৎস রসেরই সামিল। হাঁটু চাপড়িয়ে অট্টহাস্য করতে লাগল শ্রোতারা।

    গান-বাজনা শেষ হবার পর রুসো রান্নাঘরে গিয়ে মোটা মোটা কাপভরতি কফি এনে অতিথিদের হাতে তুলে দিল। সঙ্গে ঘরোয়া খাবার

    পিলে বললেন—কই রুসো, নতুন কী সব ছবি আঁকলে দেখাও! ল্যুভর মিউজিয়ামে চালান হবার আগে তোমার স্টুডিয়োতে বসে সেগুলো দেখে কৃতার্থ হই!

    আর একজন বললে—হ্যাঁ হ্যাঁ, সেইজন্যেই তো আমাদের আসা!

    রুসো বললে—নিশ্চয়! চমৎকার কয়েকটা ছবি আছে। আপনাদের দেখাব বলেই তো আলাদা করে বেছে রেখেছি।

    ছবিগুলো একের পর এক সাজিয়ে রাখতে লাগল টেবিলের ধারে। সবাই ঘিরে দাঁড়াল। স্তুতিভাষণের প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গেল যেন।

    ব্লাঞ্চ বললে—এইটে! হ্যাঁ এই ছবিটা! ক্লী স্বর্গীয় রূপ! এমন সৃষ্টি পৃথিবীতে আর দ্বিতীয়টি হবে না! এটা আমার চাইই, এখনই চাই। নইলে রাত্রে ঘুমোব কী করে! কত হলে এটা আমাকে দেবেন মশিয়েঁ?

    দাম? কিছু না কিছু না। পঁচিশ ফ্র্যাঙ্ক।

    পঁচিশ ফ্র্যাঙ্ক মাত্র? শুনেছ, শুনেছ সবাই! এই অমর শিল্প, এর দাম পঁচিশটি ফ্র্যাঙ্ক খালি। মশিয়েঁ, আমাকে দিলেন—এই কথাটি ছবির নীচে লিখে দেবেন তো?

    সে আর বলতে? এ তো আমার ভাগ্যের কথা।

    পিলে বললেন—আমার প্রণয়িনীকে বলেছিলাম তার জন্যেও একটা ছবি আনব। কোনটা নিই বলো তো?

    দেয়াল থেকে একটি ছবি নামিয়ে রুসো বললে—এটি কিন্তু আমি আপনার কথা ভেবেই এঁকেছিলাম। এটা আপনার ভালো লাগবেই।

    সবাই ঝুঁকে পড়ল ছবিটির ওপর। রূপকথার জঙ্গলের ফাঁক দিয়ে মুখ বার করা প্রাগৈতিহাসিক একটি প্রাণী।

    পিলে মাথা নেড়ে বললেন—সত্যি, এত ভালো ছবি আর তুমি আঁকনি রুসো।

    চিৎকার করতে লাগল অন্য সবাই।

    ওটা আবার কী? ওঃ বাবা!

    তাই তো? ওটা কীসের মুখ!

    সিংহ নাকি ?

    যাঃ! সিংহ বুঝি অমনি হয়! ওটা বাঘ!

    রামো! ওটাকে আমি ঠিক চিনেছি। আমার ধোপানির মুখ ওটা।

    বললেই হল? ও তো আমার পাওনাদার, গুঁড়ি মেরে আসছে!

    হাত কচলিয়ে বিগলিত কণ্ঠে রুসো বললে—এটার দাম একটু বেশি হবে মশিয়েঁ পিলে। সাইজে একটু বড়ো কিনা! ধরুন, তিরিশ ফ্র্যাঙ্ক।

    বেশি কী বলছ হেনরি, জলের মতো সস্তা! আমার ভবিষ্যৎ বংশধর হয়তো কোনোদিন এটাকে তিরিশ হাজার ফ্র্যাঙ্কে বিক্রি করবে!

    আমি নেব, আমার একটা চাই! আরও অনেকে চেঁচামেচি করতে লাগল।

    উদার ভঙ্গিতে পিলে বললেন—বেশ, বেশ, যে যা নেবে নগদ দাম দিয়ে নাও। তারপর চটপট চলো, দেরি করলে মুশকিল হবে। …আচ্ছা আজকের মতো চলি হেনরি। শিগগির আবার একদিন এমনি পার্টি দিয়ো, কেমন? সুন্দর কাটল, তা-ই না?

    ভুরভুরে সুগন্ধি রুমালখানি রুসোর নাকের সামনে নাড়ল ব্লাঞ্চ, বললে—বিদায় শিল্পীপ্রবর, বিদায়! কিন্তু তোমাকে কখনও ভুলব না জীবনে। আমার স্মৃতিতে তোমার মুখটি চিরদিন জেগে থাকবে।

    পুরুষদের মধ্যে একজন বললে—আর জ্বালিয়ো না ব্লাঞ্চ, রাত্রে ঘুম হবে না বেচারির।

    অতিথিরা কলরব করতে করতে বিদায় নিল। বাতাসে ফেলে গেল কিছুটা বসনসুরভি।

    থিয়ো আর ভিনসেন্ট তারাও এগোল দরজার কাছে। দরজার কাছে গিয়ে ভিনসেন্ট নীচু গলায় বললে–তুমি একাই যাও থিয়ো। আমি আর-একটু থাকি, আলাপ করি ওর সঙ্গে।

    বিদায় নিল থিয়ো।

    রুসো লক্ষ করেনি ভিনসেন্ট দরজাটা বন্ধ করে কখন কাছে এসে দাঁড়িয়েছে। সে টেবিলের ওপর ছড়ানো ফ্র্যাঙ্কগুলো শুনছিল একমনে।

    আশি, নব্বই, একশো, একশো পাঁচ।

    মুখ তুলে তাকাতেই দেখল, ভিনসেন্ট একদৃষ্টে তার দিকে চেয়ে আছে। সেই শিশুসুলভ দৃষ্টিটা ফিরে এল তার চোখে। টাকাগুলো সরিয়ে বোকা বোকা হাসিমুখে ভিনসেন্টের দিকে তাকাল।

    ভিনসেন্ট স্থির গলায় বললে—মুখোশটা খুলে ফেলো রুসো। আমি তোমাদের শহুরে আদমি নই। তোমার মতো আমিও চাষা, আর আমিও ছবি–আঁকিয়ে।

    টেবিল থেকে ঘুরে ভিনসেন্টের সামনে এসে রুসো চেপে ধরল ভিনসেন্টের হাত।

    তোমার ভাইয়ের কাছে দেখেছি তোমার আঁকা ডাচকৃষাণদের সব ছবি ভালো ছবি, মিলেটের চেয়েও ভালো। একবার নয়, বার বার ছবিগুলো দেখেছি। না চিনলেও মনে মনে শ্রদ্ধা করেছি তোমাকে।

    আর তোমার ওইসব ওরা যখন ভাঁড়ামি করছিল, সেই অবসরে তোমার ছবিগুলোও আমি দেখেছি, রুসো। আমিও তোমাকে শ্রদ্ধা করি।

    ধন্যবাদ। বসবে না? তোমার পাইপে আমার তামাক একটু ভরবে না? দেখো, একশো পাঁচ ফ্র্যাঙ্ক জুটল। এ দিয়ে তামাক হবে, খাবার হবে, ছবি কিনবার জিনিসপত্র হবে।

    টেবিলের দু-ধারে মুখোমুখি দুজনে বসে নিঃশব্দে ধূমপান করতে লাগল। নীরবে চিন্তার রোমন্থন।

    কিছুক্ষণ পরে ভিনসেন্ট বললে—তুমি নিশ্চয় জান রুসো, ওরা সবাই তোমাকে পাগল ভাবে?

    জানি। এও আমি শুনেছি যে হেগ-এর লোকেরাও তোমাকে পাগল বলেই জানত।

    ঠিকই শুনেছ।

    ভাবুক না ওরা যা প্রাণ চায়। দিন আমার আসবে। আমার ছবি লুক্সেমবুর্গ গ্যালারিতে ঝুলবে একদিন-না-একদিন।

    আলবত! আর আমার ছবি ল্যুভরে।

    দুজনের মনের কথা এক লহমায় দুজনেই যেন একসঙ্গে ধরতে পারল। প্রাণখোলা খুশির উচ্ছ্বাসে হেসে উঠল হো-হো করে।

    ভিনসেন্ট বললে—ওদের কোনো দোষ নেই হেনরি। যাই বলো, সত্যিই আমরা পাগল।

    পাগল বলে পাগল! একেবারে বদ্ধ পাগল। এসো, এই পাগলামির আনন্দে একটু মদ ঢালি।

    [tab title=”সাত”]

    পরবর্তী বুধবার দিন সন্ধ্যা বেলা ভিনসেন্টের দরজায় ধাক্কা দিল পল গগাঁ।

    থিয়ো খবর পাঠিয়েছে গ্যালারি থেকে ফিরতে তার দেরি হবে। সোজা তোমাকে নিয়ে যেতে বলেছে বাতিনোলস কাফেতে। বাঃ, দেখি, দেখি ক্যানভাসগুলো!

    দেখো না। এসব পুরোনো ছবি। কিছু করেছিলাম হেগ-এ, বাকি ব্রাবান্টে। গগাঁ অনেকক্ষণ ধরে নিবিষ্ট দৃষ্টিতে ছবির পর ছবি দেখল। কথা বলবার জন্যে মুখ খুলেও মুখ বন্ধ করল কয়েক বার। ছবিগুলো সম্বন্ধে কোনো সিদ্ধান্তে চট করে পৌঁছোনো দুষ্কর।

    শেষপর্যন্ত বললে—প্রশ্নটার জন্যে কিছু মনে কোরো না। আচ্ছা, তোমার কি মৃগীরোগ আছে?

    ভেড়ার চামড়ার পুরোনো একটা কিম্ভূত ধরনের কোট কিনেছিল ভিনসেন্ট থিয়োর আপত্তি সত্ত্বেও। কোটটা সে গায়ে গলাচ্ছিল, গগাঁর দিকে মুখ ফিরিয়ে বললে—কী, কী রোগ?

    মৃগী, মৃগী। যাতে মাঝে মাঝে ফিট হয় আর কি!

    এরকম রোগ আমার আছে বলে তো জানিনে। রোগের এই উপসর্গের দেখাও কখনও পাইনি। এ-কথা কেন জিজ্ঞাসা করলে বলো তো?

    মানে, কী বলব….তোমার এই ছবিগুলো দেখলে মনে হয়…এগুলো যেন ক্যানভাস থেকে ছিটকে বার হয়ে এল বলে। তোমার ছবি আমি যখনই দেখি….শুধু আজ নয়, এর আগেও যতবার দেখেছি, আমার কেমন একটা দারুণ স্নায়বিক উত্তেজনা হয়, নিজেকে যেন ধরে রাখতে পারিনে। মনে হয়, হয় ছবিটা ফেটে পড়বে, নইলে আমি ফেটে পড়ব। তোমার ছবিগুলো ঠিক কোথায় আমাকে নাড়া দেয় জান?

    না। কোথায়?

    একেবারে আমার পেটের মধ্যে। আমার নাড়িভুঁড়ি সব যেন কাঁপতে থাকে। এমনি উত্তেজনা হয়, নিজেকে যেন সামলে রাখতে পারিনে।

    হেসে ফেলল ভিনসেন্ট। বললে—তাহলে আমার ছবিগুলো অন্তত জোলাপ হিসেবে বিকোবে বলো! পায়খানায় টাঙিয়ে রেখে দিনের মধ্যে কোনো নির্দিষ্ট সময়ে খানিকক্ষণ তাকিয়ে দেখলেই হল। নির্ঘাত ফললাভ–

    ঠাট্টা কোরো না ভিনসেন্ট! সত্যি কথা বলছি, তোমার ছবির সঙ্গে যদি আমাকে ঘর করতে হয় তাহলে সাত দিনের মধ্যে আমি পাগল হয়ে যাব।

    খুব হয়েছে, ভিনসেন্ট বললে—এবার চলো।

    মোমার্ত থেকে বুলেভার্দ ক্লিচির মোড় পর্যন্ত দুজনে পৌঁছোল।

    গগাঁ শুধোলে—ডিনার খেয়েছ?

    না। তুমি?

    না, আমিও খাইনি। বাতেইলে যাবে নাকি?

    মন্দ হয় না—ভিনসেন্ট বললে—পকেটে কিছু আছে?

    ফাঁকা মাঠ। তোমার?

    আমি তো কপর্দকহীন, যথাপূর্বং। আশায় ছিলাম থিয়ো বাড়ি ফিরে খাওয়াবে।

    তাহলে আজ রাত্তিরের মতো পেটে কিছু জুটবে না দেখছি!

    না জুটুক। তবু বাতেইলেই চলো। সন্ধ্যে বেলাকার মেনুটা দেখতে অন্তত মন্দ লাগবে না।

    মাদাম বাতেইলের হোটেলের দরজাতেই কালি দিয়ে কাঁচা হাতে লেখা মেনু ঝুলছে। ভিনসেন্ট পড়ে বললে—উম্‌ম্‌ম্! গোবৎস মাংসের কাবাব! ইস, আমার সবচেয়ে প্রিয় খাদ্য!

    গগাঁ মুখ বেঁকিয়ে বললে—হ্যাঁ, হ্যাঁ, ওটা নাকি আবার খাবার! আমার তো ভাবতেই বমি আসে! না খেয়ে ভালোই হয়েছে আজ। চলো, ঘুরি তো আর কোথাও।

    কয়েক পা এগিয়েই ছোট্ট ত্রিকোণ একটি পার্ক। গগাঁ চেঁচিয়ে উঠল—দেখছ কাণ্ড! ওই যে ওই বেঞ্চিটাতে। নাক ডাকিয়ে ঘুমুচ্ছে সেজান। ও যে জুতো মাথায় দিয়ে কেন ঘুমোয় তা বুঝিনে। চলো, ডেকে তুলি ওকে।

    প্যান্ট থেকে বেল্টটা খুলে গগাঁ সেটা দিয়ে সেজানের মোজা-পরা পায়ে সজোরে একটা বাড়ি মারল। হঠাৎ যন্ত্রণার চমকে চিৎকার করে লাফিয়ে উঠল সেজান।

    গগাঁ? শয়তান কোথাকার, সাডিস্ট কোথাকার! এই বুঝি তোমার ঠাট্টা? তোমার মাথার খুলি ভাঙব আমি একদিন!

    বেশ করেছি। পাবলিক পার্কে খালি পায়ে শুয়ে ঘুমুলে তার শাস্তি এইরকমই হয়। বাপু হে, এই কথাটা আমি কিছুতে বুঝিনে, নোংরা বুট জোড়াটা পা থেকে খুলে মাথায় পরে তোমার কী সুখটা হয়? ও দুটো কি তোমার বিছানার বালিশ?

    বালিশ কে বললে? ওগুলো কি আমি মাথায় পরি না মাথায় দিই? মাথার তলায় গুঁজে রাখি, যাতে ঘুমিয়ে পড়লে কেউ না চুরি করতে পারে।

    গগাঁ ভিনসেন্টের দিকে ফিরে বললে—মানুষটার কথা শুনে মনে হচ্ছে আমাদেরই মতো ভুখা শিল্পী, তা-ই না? আসলে বাপ হচ্ছে ব্যাঙ্কের মালিক আর প্রভেন্সের অর্ধেকটা অঞ্চলের জমিদার। পল; একে তুমি চেন না। আলাপ করো, ভিনসেন্ট ভ্যান গক, থিয়োর ভাই।

    নিঃশব্দে করমর্দন করল দুজনে।

    গগাঁ বললে—আহা, তোমার সঙ্গে ঠিক আধঘণ্টা আগে যদি দেখা হতো সেজান, তোমাকে নিয়ে একসঙ্গে ডিনার খেতে পারতাম। বাতেইলে আজ যা তোফা কোর্মা রান্না করেছে, কী বলব!

    তা-ই নাকি? খুব ভালো?

    ভালো বলে ভালো? মুখে তুলতে পারবে না হে! তার আগেই জিভের জলে প্লেট টেবিল সব একাকার হয়ে যাবে। কি হে ভিনসেন্ট, বলো–না!

    সত্যি, অত্যন্ত সুস্বাদু

    – তাহলে তো গিয়ে খেতেই হয় আমাকে! চলো না তোমরাও, আমার সঙ্গে

    নাহয় বসবে আর একবার!

    ওরে বাবাঃ! আমার পেটে আর এক গ্রাসও ঢুকবে না। তোমার চলবে নাকি ভিনসেন্ট?

    মনে তো হয় না। তবু মশিয়েঁ সেজান যখন জোর করছেন:

    একটু লক্ষ্মীছেলে হও না গগাঁ! জানোই তো একলা একলা খেতে আমার যাচ্ছেতাই লাগে! কোর্মা না খাও, নাহয় তো অল্পসল্প আর-কিছু খাবে। চলো, চলো–

    চলো, নিতান্তই যখন ছাড়বে না। এসো ভিনসেন্ট।

    কাফে বাতেইলে গিয়ে টেবিল জুড়ে তিনজন বসল। ওয়েটার প্রশ্ন করতে-না–করতেই গগাঁ অর্ডার দিল—তিনটে বাছুরের কোর্মা লাগাও।

    ওয়েটার জিজ্ঞাসা করল—পান করবেন কী?

    মদটাও তুমি পছন্দ করে অর্ডার দাও সেজান। ওটা তুমি আমাদের চাইতে ভালো বোঝ।

    আচ্ছা। কই মেনুটা দেখি?

    দু-একটা পানীয়ের নাম পড়তে-না-পড়তেই গগাঁ বাধা দিলে, বলে উঠল—পমার্ড খেয়ে দেখেছ এদের? আমার তো মনে হয় মদের মধ্যে পমার্ডই এদের সবচেয়ে ভালো।

    সেজান বললে ওয়েটারকে বেশ, এক বোতল পমার্ড।

    সেজানের তখন অর্ধেকও খাওয়া হয়নি। গগাঁ ডিস চেটেপুটে শেষ করে বললে—ভালো কথা পল, শুনছি নাকি জোলার ‘লে-ইভার’ বইখানা হাজার হাজার কপি বিক্রি হচ্ছে?

    সেজান চমকে উঠে গগার দিকে উগ্র হিংস্র দৃষ্টিতে তাকাল। ডিসটা ঠেলে সরিয়ে দিল সামনে থেকে। খাবার অভিরুচি তার ঘুচে গেল মুহূর্তে। তারপর ভিনসেন্টের দিকে ফিরে বললে—বইটা পড়েছেন মশিয়েঁ?

    না। আমি সবে ‘জার্মিনাল’ শেষ করেছি।

    ক্ষুব্ধ স্বরে সেজান বলে চলল–এই যে লে-ইভার বইখানা, মশিয়েঁ এটা অতি হীন বই, সম্পূর্ণ অসত্য বই। তা ছাড়া বন্ধুত্বের নামে কত বড়ো বিশ্বাসঘাতকতা যে লোকে করতে পারে, এই বইটাই তার জলজ্যান্ত প্রমাণ। ‘বইটা কাকে নিয়ে লেখা জানেন? একজন শিল্পীকে নিয়ে, সেই শিল্পী হচ্ছি. আমি। এমিল জোলা, বুঝলেন মশিয়েঁ, আমার সরচেয়ে পুরোনো বন্ধু। ছেলেবেলা থেকে এক্স-এ আমরা দুজনে একসঙ্গে বড়ো হয়েছি, একসঙ্গে স্কুলে পড়েছি। ও প্যারিসে এল, ওরই টানে আমিও এলাম এখানে। দুজনে ছিলাম ঠিক যেন দুটি ভাই। ছেলেবেলায় একসঙ্গে খেলেছি, পড়েছি, একসঙ্গে কল্পনা করেছি বড়ো হলে কী করব, কী হবে জীবনের সাধনা। আমি হব শিল্পী আর ও হবে লেখক, এ-পরিকল্পনা আমরা দুজনে একসঙ্গে করেছি সেই কতদিন আগে থেকে!

    ভিনসেন্ট বললে—তা, জোলা আপনার করেছেন কী?

    করেছে? ঠাট্টা করেছে, বিদ্রূপ করেছে, সারা প্যারিসের চোখে আমার সম্মান ধুলোয় লুটিয়ে দিয়ে দু-হাত তুলে নৃত্য করেছে! দিনের পর দিন আমি তার সঙ্গে কাটিয়েছি, কত গল্প করেছি, আমার নানা থিয়োরির বৈপ্লবিক সম্ভাবনা নিয়ে সুদীর্ঘ আলোচনা করেছি। বলেছি আমার শিল্পীজীবনের আদর্শ-বেদনার আশা–আকাঙ্ক্ষার কথা। বন্ধুর অভিনয় সে সমানে করে চলেছে, পেট থেকে কথা টেনে বার করেছে আমার। আসলে তার মতলব কী ছিল জানেন? তার এই ঘৃণিত বইখানার উপাদান সংগ্রহ করা, জগতের সামনে আমাকে বোকা বলে তুলে ধরার অভিসন্ধির ছুরিতে শান দেওয়া!

    মদের পাত্রটা এক চুমুকে শেষ করে জিঘাংসা-মাখা জ্বলজ্বলে দৃষ্টিতে ভিনসেন্টের দিকে তাকিয়ে আবার সে বলে চলল—আমাকে ব্যঙ্গ করে যে-চরিত্র সে বানিয়েছে, তার মধ্যে আবার কারসাজি কী করেছে জানেন? আমার সঙ্গে আর দুটো লোকের চরিত্র মিশিয়েছে। একজন হচ্ছে বেজিল, আর একটা হতভাগা ছেলে যার কাজ ছিল মানের স্টুডিয়ো ঝাঁট দেওয়া। ছেলেটার শিল্পী হওয়ার উদগ্র বাসনা ছিল, শেষ পর্যন্ত আত্মহত্যা করে। জোলা আমার কী পরিচয় দিয়েছে জানেন? আমি একটা মূর্খ স্বপ্নবিলাসী, কল্পনা করি আমি বুঝি বৈপ্লবিক শিল্পী, তার কারণ আসলে প্রচলিত টেকনিকে আঁকার ক্ষমতাটুকু আমার নেই। শেষ পর্যন্ত নিজের ব্যর্থতাবোধের মুখোমুখি করেছে আমাকে, আমার শ্রেষ্ঠ কীর্তির সামনে দাঁড়িয়ে ছাদের বরগা থেকে দড়ি ঝুলিয়ে আত্মহত্যা করিয়ে মেরেছে আমাকে। আমার পাশাপাশি এক্স-এর আর-একজন শিল্পীকে সে খাড়া করেছে যে প্যাঁচপেচে সেন্টিমেন্টের ফানুস, পুরোনো বস্তাপচা যার ধ্যানধারণা, আমার বিরূদ্ধে তাকেই সে খাড়া করেছে মস্ত একটা জিনিয়স করে।

    গগাঁ বললে—যাই বলো, ব্যাপারটা কিন্তু ভারি মজার। এডোয়ার্ড মানের বৈপ্লবিক শিল্পরীতিকে জোর গলায় সমর্থন এই জোলাই প্রথম করে। ইম্প্রেশনিস্টদের সপক্ষে এত কথা আর কেউ বলেনি, তাদের এত সাহায্য আর কেউ করেনি।

    হ্যাঁ, মানে যখন প্রাচীনপন্থীদের হটাল তখন জোলা একেবারে গদগদ হয়ে উঠল মানের ওপর। কিন্তু আমি যখন ইম্প্রেশনিস্টদেরও ছাড়িয়ে যেতে চাই, তখন সেটা আর তার সহ্য হয় না। জোলাকে আমার চেয়ে বেশি তোমরা চেন? প্রতিভা বলতে ঢু-ঢু, মানুষ বলতে ঘেন্না করে। মানেকে প্রশংসা করবে না কেন? আসলে দুজনেই যে বুর্জোয়া। দেখো না জীবনযাপনের নমুনা! বিরাট বাড়ি, মেঝেয় তুলতুলে কার্পেট, হাতে পায়ে ঝি-চাকর, আর খোদাই-করা টেবিলে বসে কাঁড়ি কাঁড়ি পয়সা কামানোর তালে শ্রমিকজীবনের কাহিনি লেখা। হুঁ, জানা আছে!

    কিন্তু আমরা যে শুনেছিলাম ক-বছর আগে তোমার একটা প্রদর্শনীর ব্যাপারে তোমার ছবির একটা সুন্দর পরিচয়পত্র জোলা লিখেছিল?

    …হ্যাঁ লিখেছিল বটে। কিন্তু তার পরের ইতিহাসটা জান? যেই সেটা ছাপাবার সময় এল, অমনি সে লেখাটাকে ছিঁড়ে ফেলল কুটি কুটি করে। কেন বলো তো? বন্ধুত্বের খাতিরে। ওটা ছাপা হলে পাছে বন্ধুর কিছুটা উপকার হয়, সেইজন্যে। তার বদলে সে ছাপাল লে-ইভার। আমার ছবি ছবি নয়, ঠাট্টার খোরাক। ডেগা, মনে, গিলামিনের ছবি ডুরাঁ-রুয়েল টাঙায়, কিন্তু আমার প্রবেশ নিষেধ। এই তো বন্ধুর কাজ ও করেছে! সারা প্যারিসে আমার ছবি যদি-বা কেউ কোথাও টাঙায়, সে পিয়ের ট্যাঙ্গি, তার দোকানে। কিন্তু তার হাতে একবার ছবি পড়লে বিক্রির দফা গয়া।

    ইচ্ছাকৃত ঔদাসীন্যে গগাঁ বললে—ভালোকথা সেজান, বোতলে পমার্ড আছে নাকি কয়েক ফোঁটা? ঢালো তাহলে এ-গ্লাসে। এই জোলার বিরুদ্ধে আমার আপত্তিটা কোথায় জান? তার ধোপানি মেয়েরা ঠিক ধোপানির মতোই কথা বলে, কিন্তু তাদের কথা ফুরোবার পর জোলা ভাষাটিকে আর বদলাতে পারে না।

    সেজান বললে—যাক, যথেষ্ট হয়েছে আমার প্যারিস বাস। আর এখানে নয়। এক্স-এ আমি ফিরে যাচ্ছি, একেবারে সারাজীবনের জন্য। শহর আর নয়, থাকব পাহাড়ের চুড়োয়। খোঁজ পেয়েছি, ঠিক পাহাড়ের মাথায় একটুকরো জমি বিক্রি আছে সেখানে। চারদিকে পাইন গাছের বন। সেইখানে আমি স্টুডিয়ো বানাব, আর বানাব আপেল বাগান। চারদিকে পাথরের উঁচু দেয়াল গেঁথে দেব, দেয়ালের ওপরে ভাঙা কাচ পুঁতে রাখব যাতে সারা দুনিয়ার কেউ দেয়াল ডিঙিয়ে ভেতরে ।ঢুকতে না পারে। আপনমনে নিশ্চিন্তে ছবি আঁকব সেখানে। জীবনে আর নড়ব না কোথাও।

    গ্লাসে মুখ ভরিয়ে গগাঁ বললে—অ্যাঁ, একেবারে মঠবাসী সন্ন্যাসী!

    হ্যাঁ, সন্ন্যাসী। মঠই ভালো।

    বাঃ! একেবারে সন্ন্যাসী! কে? না আমাদের সেজান। চমৎকার লাগছে ভাবতে! নাও, ওঠো। কাফে বাতিনোলসে চলো। এতক্ষণে সবাই সেখানে জুটেছে।

    [tab title=”আট”]

    সরগরম আসর। বাকি নেই আর কেউ। লোত্রেকের সামনে ডিসের এত উঁচু পাহাড় যে তার ওপর থুতনিটাকে বসিয়ে বিশ্রাম করা চলে। জর্জেস সিউরাত একধারে আঁকোয়েতিন নামে একজন রোগাপটকা চেহারার শিল্পীর সঙ্গে কথা বলছে। রুসো নিঃশব্দে গলা ভেজাতে ব্যস্ত। দুজন আধুনিক শিল্পসমালোচকের সঙ্গে দারুণ তর্ক জুড়েছে থিয়ো।

    বাতিনোলসের ইতিহাস আছে। শিল্পীদের আড্ডা এখানে নতুন নয়। এডুয়ার্ড মানে সমসাময়িক ও সমভাবাপন্ন শিল্পীদের নিয়ে বসতেন এইখানেই। তাঁর মৃত্যুর আগে পর্যন্ত লেগ্রো, ফাতিন-লাতুর, রেনোয়াঁ প্রভৃতি শিল্পীদের প্রতি সপ্তাহের অন্তত দুটি সন্ধ্যা কাটত এখানে, শিল্পের নতুন নতুন থিয়োরি নিয়ে কত আলোচনা হতো, কত তর্কবিতর্ক। আজকাল তাঁদের জায়গা নিয়েছে একেবারে তরুণ শিল্পী আর তাদের সমর্থকরা।

    ঢুকতেই সেজানের চোখ পড়ল এমিল জোলার ওপর। দল থেকে সরে গিয়ে দূরের একটা টেবিলে একলা বসে সে কফি অর্ডার দিল। গগাঁ জোলার সঙ্গে ভিনসেন্টের আলাপ করিয়ে দিয়ে লোত্রেকের পাশে গিয়ে বসল। একটি টেবিলে শুধু জোলা আর ভিনসেন্ট।

    আমি লক্ষ করলাম, মশিয়েঁ ভ্যান গক, আপনি সেজানের সঙ্গে ঢুকলেন। নিশ্চয়ই আমার সম্বন্ধে ও আপনাকে কিছু বলেছে। বলেনি?

    ভিনসেন্ট বললে—হ্যাঁ সেজান বলছিলেন ওঁকে নিয়ে আপনি যে-বই লিখেছেন, তাতে উনি খুবই আহত হয়েছেন।

    একটু চুপ করে জোলা উত্তর দিলে—পল সেজানকে নিয়ে বইটি লিখতে আমিও মনে মনে কম ব্যথা পাইনি মশিয়েঁ। কিন্তু ও-বইয়ের প্রতিটি কথা সত্যি। ধরুন, বন্ধুর একটা ছবি আঁকছেন আপনি। তার সত্যিকারের প্রতিকৃতি দেখে সে দুঃখ পাবে, এইজন্যে আপনি মিথ্যে আঁকবেন? চমৎকার মানুষ পল। আমরা বহুদিনের বন্ধু। কিন্তু ছবি-আঁকিয়ে হিসেবে ও উপহাসের পাত্র। আমার বাড়িতে আমি ওর ছবি টাঙিয়েছি, কিন্তু জানেন মশিয়েঁ ভ্যান গক, বাড়িতে বন্ধুবান্ধব আসার কথা থাকলে ছবিগুলো আমাকে দেয়াল থেকে খুলে রাখতে হয়, নইলে তাদের ঠাট্টা আমাকে বাজে।

    কিন্তু যা-ই বলুন, ওঁর কাজ অত খারাপ নিশ্চয়ই হতে পারে না।

    আপনি যতটা খারাপ ভাবতে পারেন তার চাইতেও খারাপ। দেখেননি বুঝি নিজে? বুঝেছি, সেইজন্যেই। পাঁচ বছরের একটা শিশুও ওর চাইতে ভালো আঁকে। সত্যি, আমার কী মনে হয় জানেন? মনে হয় ওর মাথা একেবারে খারাপ হয়ে গেছে।

    কিন্তু গগাঁ তো ওঁকে খুব খাতির করে।

    এইভাবে যে সেজান জীবনটা নষ্ট করছে, জোলা বলে চলল–ভাবতে আমার বুক ফেটে যায়। দেশে দেখুন কত মান সম্মান পরিবারটার, বাবার ব্যাঙ্কে গিয়ে যদি লাগে সত্যি হয়তো উন্নতি করতে পারে, কিন্তু তা নয়, ছবি-আঁকিয়ে হব! কত বড়ো পাগলামি, আর কত বড়ো ধৃষ্টতা! আপনি দেখবেন, আমি যা লিখেছি ঠিক তা-ই ওর ভাগ্যে হবে, আত্মহত্যা করবে শেষ পর্যন্ত। পড়েছেন বইটা?

    আজ্ঞে না, এই তো সবে আপনার জার্মিনাল শেষ করলাম।

    পড়েছেন জার্মিনাল? বেশ, বেশ! কেমন লাগল বলুন?

    আমার মতে বালজাকের পরে এর চেয়ে শ্রেষ্ঠ সাহিত্য আর রচিত হয়নি।

    নিশ্চয়ই! এই জার্মিনালই হল আমার মাস্টারপিস। মাসিকপত্রে যখন বার হয়, তখন মন্দ সাড়া পাইনি। তারপর দেখুন, বই আকারে ষাট হাজার কপির বেশি বিক্রি হয়ে গেছে একবছরের মধ্যে। এত আয় আমার আগে কখনও ছিল না। জমিয়েও ফেলেছি অনেকটা, মেডানে আমার বাড়িটা কিছু বড়ো করব এবার ভাবছি। তা ছাড়া বইটার কী ক্ষমতা দেখুন! ওটা লেখার ফলে ফ্রান্সের খনি অঞ্চলে তিন-চারটে বড়ো বড়ো ধর্মঘট হয়ে গেছে। আপনি দেখবেন, এই জার্মিনালই বিপ্লবকে ডেকে আনবে, কবর খুঁড়বে পুঁজিবাদের। ভালো কথা, আপনি কেমন ছবি আঁকেন বলুন তো মশিয়েঁ? আহা! গগাঁ যেন কী আপনার প্রথম নামটা, বলল?

    ভিনসেন্ট। ভিনসেন্ট ভ্যান গক। থিয়ো ভ্যান গক আমার ভাই। চমকে ভিনসেন্টের মুখের দিকে তাকাল জোলা। কিছুক্ষণ স্থিরদৃষ্টে তাকিয়ে থেকে বলল—এ তো ভারি আশ্চর্য!

    আশ্চর্য হলেন কীসে?

    আপনার নামটা। কোথায় যেন আগে শুনেছি!

    থিয়োর কাছেই বোধ হয়।

    থিয়োর কাছে? তা হবে। না, দাঁড়ান, দাঁড়ান। ব্যাপারটা জার্মিনালে নিয়েছি যেন। আচ্ছা, আপনি কখনও কয়লাখনি অঞ্চলে ছিলেন?

    হ্যাঁ, প্রায় দু-বছর ছিলাম বেলজিয়ামের বরিনেজ অঞ্চলে।

    বরিনেজ! ওয়ামস! মার্কাস! জোলার বড়ো বড়ো চোখ দুটো কোটর থেকে ঠেলে বেরিয়ে আসে আর কি!

    তাহলে, তাহলে, আপনিই সেই পুনরাগত যিশুখ্রিস্ট!

    লাল হয়ে উঠল ভিনসেন্ট। বললে—তার মানে?

    জোলা বললে—এই জার্মিনালের মালমশলা সংগ্রহের জন্যে আমি প্রায় পাঁচ সপ্তাহ বরিনেজে ছিলাম। লোকমুখে শুনেছিলাম, ধর্মযাজকের রূপ ধরে স্বয়ং যিশুখ্রিস্টের মতো কে একজন রিদেশি সেখানে বাস করে গেছেন। নামটা মনে পড়ল হঠাৎ, আপনিই সেই লোক, তা-ই না?

    ভিনসেন্ট বললে—আস্তে, আস্তে, গলাটা একটু নামান।

    কাছাকাছি এগিয়ে এল জোলা। আন্তরিকতার ভাষায় বললে—তোমাকে চিনেছি ভিনসেন্ট। কিন্তু আমার কথায় লজ্জা পাবার কী আছে? তুমি যা করতে চেষ্টা করেছিলে. সে তো মূল্যহীন নয়! কম নয় তার সার্থকতা। পথটা তুমি ভুল বেছে নিয়েছিলে, এইমাত্র। মনুষ্যত্ব যার নেই সেই মানুষই পরজন্মের ভরসার বিনিময়ে এ-জন্মের হতাশা বঞ্চনাকে স্বীকার করে নেয়।

    আপনার কথা ঠিক। আমার বুঝতে দেরি হয়েছিল।

    দুটি বছর তুমি বরিনেজে কাটিয়েছিলে। সর্বস্ব তুমি বিলিয়ে দিয়েছিলে, টাকাকড়ি, গায়ের জামাকাপড়, মুখের খাবারটুকু পর্যন্ত। খেটেছিলে তুমি আপ্রাণ। না না, বাধা দিয়ো না, সব আমি জানি। কিন্তু বলো, কী পেয়েছিলে বিনিময়ে? কিচ্ছু না। তোমার মতো ধর্মপ্রচারককে ওরা পাগল বলে গির্জে থেকে বিদায় করেছিল। তুমি যখন বরিনেজ থেকে চলে আস, শ্রমিকদের অবস্থা আগের চেয়ে ভালো দেখে আসনি।

    ভালো? তার উলটো। অনেক, খারাপ।

    তাই তো বলছি ভিনসেন্ট, তোমার সাধনা ছিল, কিন্তু সে-সাধনা চলেছিল ভুল পথে। ভুল সহায় করেছিলে ধর্মকে। আমার সহায় ভাষা, আমার অস্ত্র আমার লেখনী। এই অস্ত্রেই জয় হবে। বেলজিয়াম আর ফ্রান্সের প্রত্যেকটি খনিমজুর, অক্ষর পরিচয় যার হয়েছে, আমার লেখা সে পড়েছে। এমন একটা নগণ্য কাফে বা হোটেল নেই ও-অঞ্চলে যেখানে বহুবার পড়া ছেঁড়াখোঁড়া এক কপি জার্মিনাল পাওয়া যাবে না। যারা নিরক্ষর, অপরে পড়েছে, তারা বারে বারে শুনেছে। চার-চারটে ধর্মঘট ইতিমধ্যে হয়েছে, গোটা বারো হল বলে। সমস্ত দেশ জেগে উঠছে, নতুন সমাজ সৃষ্টির পথে সর্বহারা মানুষকে এগিয়ে নিয়ে চলেছে জার্মিনালই। তোমার ধর্ম তা পেরেছিল? আর দেখো আমি কী পাচ্ছি!

    কী পাচ্ছেন আপনি?

    টাকা হে, টাকা। হাজারের ওপর হাজার ফ্র্যাঙ্ক। বুঝেছ? এসো, এক গ্লাস খাও আমার সঙ্গে।

    ও-দিকে লোত্রেকের টেবিল ঘিরে আড্ডা তখন গরম হয়ে উঠেছে। সবাইয়ের কান সে-দিকে।

    সিউরাতকে ঠাট্টা করে লোত্রেক বলছে—কী গো পদ্ধতিবিশারদ, খবর কী? লোত্রেকের বিদ্রূপকে উপেক্ষা করে সিউরাত বলে চলল—রঙের বিশ্লেষণ সম্বন্ধে একটা বই বেরিয়েছে। অগডেন রুড বলে একজন আমেরিকানের লেখা। বইটা তোমাদের সকলেরই মন দিয়ে পড়া উচিত।

    লোত্রেক বললে—চিত্রকলা সম্বন্ধে কোনো বই আমি পড়িনে। ওটা রেখে দিই যারা শিল্পী নয় এমনি সব সাধারণ লোকদের জন্যে। আঁকে যে, সে আবার পড়বে কী?

    সিউরাত সাদা কালো চেক-কাটা কোটের সামনের বোতামটা খুলে নীল টাই–এর নট-টা একটু সোজা করে নিল। বললে—যতদিন আন্দাজে আন্দাজে রং মেশাবে, ততদিন ওই সাধারণ লোকই থেকে যাবে।

    আজ্ঞে না স্যার, আন্দাজে আন্দাজে আমি রং মেশাইনে, বুদ্ধি দিয়ে মেশাই। অভ্যাস আর অভিজ্ঞতা দুইয়ে মিলে এই বুদ্ধি

    গগাঁ তর্কে ইন্ধন জোগাল—আমি কিন্তু বলব, বিজ্ঞান তো আর একটা অতীন্দ্রিয় ব্যাপার কিছু নয়! আমরা যেভাবে রং ব্যবহার করি তাকে অবৈজ্ঞানিক বলব কী করে? বহু বছরের শত শত শিল্পীর গবেষণা আর পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্যে দিয়েই তো আমাদের পদ্ধতিটা পাকা হয়ে উঠেছে!

    সিউরাত বললে—ওতেই সব হল না বন্ধু। আধুনিক যুগ চলেছে নৈর্ব্যক্তিক অথচ ত্রুটিহীন উৎপাদনের দিকে। শিল্পসৃষ্টির মধ্যেও ব্যক্তিগত অনুভূতি আর ব্যক্তিগত ভুলভ্রান্তি নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষার দিন আর নেই।

    তর্কটায় পরিসমাপ্তির দাঁড়ি টানল রুসো। সে বলে উঠল—যাই বলুন আপনি, ওসব বইটই আমি পড়তে পারিনে। পড়লেই মাথা ধরে, আর সারা দিনরাত ছবি এঁকে সেই মাথা ধরাকে মাথা থেকে তাড়াতে হয়।

    হেসে উঠল সবাই।

    আঁকোয়েতিন জোলার দিকে গিয়ে বললে—আজকেই সন্ধে বেলাকার কাগজে আপনার জার্মিনালকে কীরকম আক্রমণ করেছে দেখেছেন?

    না দেখিনি। কী বলেছে কাগজে?

    সমালোচক বলেছে, ঊনবিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে দুর্নীতিপূর্ণ লেখার লেখক হচ্ছেন আপনি।

    সেই পুরোনো কান্না! আর নতুন কিছু কথা ওরা খুঁজে পায় না?

    কথাটা মিথ্যে নয় জোলা, লোত্রেক বললে—তোমার লেখা সত্যিই দুর্নীতিপূর্ণ আর অশ্লীল।

    অশ্লীল? অশ্লীলতা কাকে বলে দেখে তুমি চিনতে পার?

    বেশ বলেছ! এইবার লোত্রেক জব্দ। তারিফ করল গগাঁ।

    জোলা মেজাজি ভঙ্গিতে হাঁক দিলে—ওয়েটার, এক গ্লাস করে লাগাও সবাইয়ের সামনে।

    সেজান আঁকোয়েতিনের কানে কানে বললে—ব্যাস, আর নিস্তার নেই। জোলা যখন গাঁটের পয়সা খরচ করে বন্ধুদের খাওয়াচ্ছে তখন ওর ঝাড়া একটা বক্তৃতা শুনতেই হবে।

    ওয়েটার গ্লাসভরতি মদ নামিয়ে রেখে গেল প্রত্যেকের সামনে। পাইপ ধরিয়ে শিল্পীরা গোল হয়ে বসল জোলাকে ঘিরে। দেয়ালে দেয়ালে গ্যাসের দেয়ালগিরি, টেবিলের কাছটা আবছায়া অন্ধকার। অন্যান্য টেবিলে টেবিলে আড্ডার গুঞ্জন।

    জোলা শুরু করল—যে-কারণে ওরা আমার লেখাকে দুর্নীতিপূর্ণ বলে, সে-কারণে ওরা তোমার ছবিকেও দুর্নীতিপূর্ণ বলে হেনরি। সাধারণ লোকের মাথায় এটা ঢোকে না যে শিল্পের ক্ষেত্রে নীতি-দুর্নীতির কোনো বিচার নেই। আর্ট নীতি-দুর্নীতির ঊর্ধ্বে। জীবনও ঠিক তেমনি। আমার মতে অশ্লীল বলে কোনো ছবি বা বই নেই, দুর্বল হাতের আঁকা বা দুর্বল হাতের রচনা আছে। জীবনকে প্রকৃত উপলব্ধি না করতে পারলে জীবনকে প্রকাশের চেষ্টায় ব্যর্থতা থাকে। সেইটেই দুর্বলতা। সেইটেই নিন্দে করার। তুলস লোত্রেক বেশ্যার ছবি আঁকে, কে বলে সে-ছবি দুর্নীতিপূর্ণ যদি সে সেই বেশ্যারই রূপকে প্রকাশ করতে পারে সত্যের তুলিতে এঁকে? কিন্তু বুর্গেরুর আঁকা পবিত্র একটি গ্রাম্য মেয়ের ছবি অশ্লীল, কেননা সেই মেয়ের চেহারা এমনি নোংরা ভাবালুতার সঙ্গে চটচটে মিষ্টি করে আঁকা যে দেখেই গা-বমি-বমি করে ওঠে।

    ঠিক বলেছ, অতি খাঁটি কথা—থিয়ো মাথা নাড়ল।

    ভিনসেন্ট দেখল, শিল্পীরা সকলেই জোলাকে সম্মান করে। এর মানে এ নয় যে জোলা নাম করেছে, টাকা করেছে, কারণ এই সাহিত্য তার মাধ্যম। এ-মাধ্যম চিত্রশিল্প নয়, চিত্রশিল্পীর কাছে এ-মাধ্যম দুয়ে। মন দিয়ে শুনতে লাগল সবাই।

    জোলা বলে চলল—সাধারণ মানুষের অনুভূতি এটা কিংবা ওটা, এইভাবে চলে। হয় এটা নাহয় ওটা, ধারণাকে সরাসরি এমনি দু-ভাগে ভাগ করতেই সে অভ্যস্ত। আলো কিংবা ছায়া, মিষ্টি কিংবা তেতো, জীবিত কিংবা মৃত, ভালো নাহয় মন্দ। কিন্তু প্রকৃতির মধ্যে এতটা সোজাসুজি ভাগাভাগি নেই, না বিশ্বপ্রকৃতিতে, না মানবপ্রকৃতিতে। পৃথিবীতে ভালোও নেই, মন্দও নেই। পাশাপাশি শুধু হওয়া আর করা। এই হওয়া আর করার মধ্যে দিয়েই জীবনের সমস্ত অভিব্যক্তি প্রতিভাত হয়ে চলেছে। এই অভিব্যক্তির গায়ে যখন আমরা ভালো কিংবা মন্দর লেবেল আঁটি, কোনোটাকে বলি সুনীতিপূর্ণ আর কোনোটাকে দুর্নীতিপূর্ণ, তখন আমরা জীবনের সত্যকে অস্বীকার করি, নিজের নিজের ব্যক্তিগত কুসংস্কারকেই বড়ো করে তুলে ধরি।

    থিয়ো প্রশ্ন করল—কিন্তু এমিল, নৈতিকতার একটা নির্দিষ্ট মান যদি না থাকে তাহলে সাধারণ সামাজিক মানুষ চলবে কী করে?

    লোত্রেক বললে—নীতিবাদ আসলে ঠিক ধর্মেরই মতো, আফিমের নেশায় মানুষকে আচ্ছন্ন করে রাখে, জীবনের কুশ্রীতার দিকে যাতে নজর না পড়ে।

    আমি কিন্তু বলব, জোলা, সিউরাত বললে এবার–তোমার এই নীতিকে নেতি করার যে-দর্শন, এটা নৈরাজ্যবাদ। নিহিলিস্টরাও এমনি করেই নীতিকে ঘায়েল করবার তালে ছিল, কিন্তু ধোপে টেকেনি।

    জোলা বলল—ভুল বুঝো না। নীতি থাকবে বই কী। নীতি থাকবে, আইন থাকবে কানুন থাকবে—থাকবে না? সামাজিক জীবনের প্রয়োজনে ব্যক্তিগত জীবনের কিছু-না-কিছু ক্ষুণ্ণ হবেই। সামাজিক জীবনে নীতিবোধ বলে যে-কথাটা আছে, তা আমিও বিশ্বাস করি। কিন্তু নীতির নামে বাজারে যে-ন্যাকামি আর ভাঁড়ামি চলে, যার জন্যে অলিম্পিয়ার মতো ছবির গায়ে থুতু ফেলতে লোক দৌড়োয় আর মোপাসাঁর মতো সাহিত্যিকের কণ্ঠরোধ করতে চায়, তাকে আমি মানিনে। দুঃখের কথা কী জান, এই ফরাসি দেশের নীতিবোধটা একেবারে যৌন এলাকার চৌহদ্দির মধ্যে সীমাবদ্ধ। কোন পুরুষের সঙ্গে কোন স্ত্রীলোক শুচ্ছে তা নিয়ে আমার বয়েই গেছে। এর চাইতে অনেক উন্নততর নীতিবোধের সঙ্গে আমার পরিচয় আছে।

    গগাঁ বললে—বছর দুই আগেকার একটা ডিনার খাওয়ানোর কথা মনে পড়ে গেল। কাহিনিটা শোনো। নিমন্ত্রিতদের মধ্যে এক ভদ্রলোক আমাকে বললেন—আপনার বাড়িতে সান্ধ্যভোজ, এ তো বড়ো খুশির কথা, তবে কিনা, আপনার রক্ষিতা থাকতে আমার স্ত্রীকে তো আপনার ওখানে নিয়ে যেতে পারিনে! আমি বললাম—তাতে কী? একটা রাত্তিরের জন্যে রক্ষিতা নাহয় অন্যত্রই থাকবে। খাওয়াদাওয়া শেষ হল। ভদ্রলোকের স্ত্রীটি পার্টিতে একটি কথা বলেননি, হয় খেয়েছেন নাহয় কখনও ঢেঁকুর আর হাই তুলেছেন। ঘরে ফিরে হাই তোলা বন্ধ করে স্ত্রী স্বামীকে বললেন—এসো, দু-চারটে রসের গল্প শোনাও, তারপর ওটা করা যাবে। স্বামী বললেন—না আজ ওটা থাক। পেট বড়ো ভরতি। খালি গল্পই হোক।

    সমবেত অট্টহাস্যের মাঝখানে জোলা বললে—খাসা গল্প, একেবারে আদর্শ চরিত্রবান আর চরিত্রবতীর কাহিনি।

    ভিনসেন্ট এতক্ষণে কথা বললে—শ্লীলতা অশ্লীলতার কথা রাখুন। আমার ছবিকে অশ্লীল কেউ বলে না, কিন্তু দুর্নীতির অভিযোগ আছে। এ-দুর্নীতি আরও সাংঘাতিক, এর নাম কুশ্ৰীতা।

    ঠিক কথা, গগাঁ বললে—দুর্নীতির নতুন সংজ্ঞা হচ্ছে এই। মার্কুরি কাগজে আমাদের নামে কী লিখেছে জান? আমরা নাকি কুশ্রীতার উপাসক সবাই।

    এ-অভিযোগ আমার বিরুদ্ধেও। সে-দিন একজন কাউন্টেস আমাকে বললেন—মশিয়েঁ জোলা, এমনি অসামান্য শক্তিধর হয়ে আপনি আবর্জনার কীট ঘেঁটে ঘেঁটে বেড়াচ্ছেন কেন?

    লোত্রেক পকেট থেকে পুরোনো খবরের কাগজের এক টুকরো বার করে বললে—শোনো, সালোঁ দ্য ইনডিপেন্ডেন্টস-এ টাঙানো আমার ছবিগুলোর সম্বন্ধে সমালোচকের অভিমত শোনো। ইনি বলছেন—অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে বলতে হচ্ছে, দূষিত আবহাওয়ায় ঘৃণ্য আমোদপ্রমোদ আর নিম্নরুচির বিষয় নিয়েই তুলস লোত্রেকের কারবার। মার্জিত রূপ ও মনোজ্ঞ সুন্দর ভঙ্গিমার প্রতি আকর্ষণ, এককথায় প্রকৃত সৌন্দর্যের অনুভূতি তার নেই। কুশ্রী মুখ, পঙ্গু বিকল দেহ আর বীভৎস অঙ্গভঙ্গির প্রতি তার ঔৎসুক্য, বিকৃত যৌনরুচি থেকেই এই কুৎসিত বীভৎসতার প্রতি বিজাতীয় আগ্রহের জন্ম।

    সিউরাত বললে—ঠিক বলেছে। বিকৃত রুচি তোমাদের হোক বা না-হোক তোমরা যে উন্মার্গগামী তাতে কোনো ভুল নেই। যা নিত্য যা মৌলিক, যেমন রং রেখা টোন, এই নিয়েই আর্টের কারবার। কুশ্রীতার অনুসন্ধান কিংবা সমাজ–বিদ্রোহের জয়গান, কোনোটাই আর্টের পর্যায়ে পড়ে-না, আর্ট দিয়ে এসব করতে যাওয়াও বাতুলতা। চিত্রশিল্প হবে সংগীতের মতো, পৃথিবীর সবকিছু বাস্তবতার অনেক উঁচুতে হবে তার স্থান।

    এ-কথার উত্তর দেবার কোনো প্রয়োজন স্বীকার না করে জোলা আবার শুরু করল—গত বছর ভিক্টর হিউগোর মৃত্যু হয়েছে। সেইসঙ্গে সম্পূর্ণ একটা সভ্যতার মৃত্যু হয়েছে। সরস মিথ্যাচার, ঝুটো রোমান্স আর চতুর পলায়নী বৃত্তির সে–সভ্যতা। আমার সাহিত্য নতুন এক সভ্যতার সাহিত্য, এ-সভ্যতা সুনীতি-দুর্নীতি আর সুলভ মিথ্যাচারের মোহজাল এড়িয়ে সত্যের শক্ত বনিয়াদের ওপর প্রতিষ্ঠিত। তোমাদের ছবিও এই নতুন যুগেরই ছবি। বুর্গের এখনও তার মৃতদেহটাকে প্যারিসের রাস্তায় টেনে নিয়ে বেড়াচ্ছে, কিন্তু মানে যে-দিন পিকনিক-অন-দি-গ্রাস এঁকেছিল সেই দিনই সেই সভ্যতার মৃত্যুরোগ ধরেছিল, আর নাভিশ্বাস উঠেছিল ওই মানেই যে-দিন অলিম্পিয়া ছবিটা শেষ করে। মানে নেই, দ্যমিয়ারও নেই, কিন্তু নতুন সভ্যতার ধারা তাতে শুকিয়ে যায়নি, সেই সভ্যতার জয়পতাকা কাঁধে নিয়ে চলেছ তোমরা—ডেগা, লোত্রেক আর গগাঁ।

    তুলস লোত্রেক বললে—তোমার লিষ্টিতে ভিনসেন্ট ভ্যান গকের নামটাও জুড়ে দাও।

    চেঁচিয়ে উঠল রুসো—হ্যাঁ, হ্যাঁ, একেবারে লিষ্টির মাথায়!

    জোলা হেসে বললে—বহুত আচ্ছা! কী হে ভিনসেন্ট, কুশ্রীতার উপাসকদের দলে তোমার নাম প্রস্তাব করা হল। রাজি আছ নাম লেখাতে?

    ভিনসেন্ট বললে—হায় হায়, কুশ্রীতা তো আমার জন্মতিলক, আমার ললাটলিখন!

    চমৎকার, চমৎকার!

    চেয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে উঠল জোলা। দৃপ্তকণ্ঠে বললে—তাহলে ভদ্রমহোদয়গণ, আমাদের ঘোষণাপত্রের খসড়াটা এইখানেই হয়ে যাক। প্রথমত, আমরা বিশ্বাস করি যে সত্য মাত্রেই সুন্দর, আপাতদৃষ্টিতে এই সত্যকে যত কদর্যই লাগুক না কেন। প্রকৃতির সবকিছুকেই আমরা সমানভাবে গ্রহণ করি, পছন্দ–অপছন্দের সংস্কারে দূরে সরিয়ে রাখিনে কিছুই। আমরা বিশ্বাস করি যে মধুর মিথ্যার চেয়ে নিষ্ঠুর সত্য অনেক বেশি সুন্দর, প্যারিসের সমস্ত সালোঁর চেয়ে একমুঠো উলঙ্গ মাটি অনেক বেশি কাব্যময়। আমরা মনে করি বেদনা মনোহর, কেননা পরমতম অনুভূতির প্রকাশ এই বেদনার মধ্যেই। আমরা বিশ্বাস করি যৌন-অভিজ্ঞতা সুন্দর কেননা তা সত্য, সেই অভিজ্ঞতার আধার বাজারের বারবনিতা বা তার লম্পট প্রেমিক হোক না কেন। কুশ্রীতার ওপরে আমরা চরিত্রকে স্থান দিই, সুলভ আরামের ওপরে স্থান দিই দুর্লভ বেদনাকে, দুনিয়ার সমস্ত ধনদৌলতের চেয়ে মহান বলে গ্রহণ করি গণজীবনের রূঢ় বাস্তবকে। জীবনকে আমরা তার সমগ্রতা নিয়ে স্বীকার করি, নীতির বেড়াজাল তুলে তার কোনো অংশকে আমরা অভিজ্ঞতা থেকে দূরে সরিয়ে রাখিনে। আমাদের দৃষ্টিতে সম্ভ্রান্ত মহিলা আর বারাঙ্গনায় কোনো পার্থক্য নেই, পথের পুলিশ আর জবরদস্ত জেনারেল, রাজার মন্ত্রী আর মাঠের কৃষাণ—দুইই আমাদের চোখে সমান, কেননা প্রকৃতির বিচিত্র লীলায় উভয়েরই স্থান, জীবনের রথের দড়ি উভয়েই পাশাপাশি টেনে চলেছে।

    চেঁচিয়ে উঠল তুলস লোত্রেক—বন্ধুগণ, গ্লাস হাতে নিন। এই অপরূপ কুশ্রীতার আর এই নবীন সভ্যতার নামে আসুন আমরা একচুমুক পান করি। সুন্দরের নবজন্ম হোক, নবসৃষ্টি হোক পৃথিবীর

    জয় কুশ্রীতার জয়!

    ছোঃ—বললে সেজান।

    সিউরাত বললে—ছোঃ বলে ছোঃ!

    [tab title=”নয়”]

    জুন মাসের গোড়ায় থিয়ো আর ভিনসেন্ট তাদের নতুন বাসায় উঠে গেল। এ-বাড়ির ঠিকানা—৫৪, রু লেপিক মোমার্ত। তিনতলার ওপরে ফ্ল্যাট। তিনখানা বেশ বড়ো বড়ো ঘর, একখানা ছোটো ঘর আর রান্নাঘর। বসবার ঘরের পাশের ঘরখানা থিয়োর শোবার ঘর হল, ভিনসেন্টের স্টুডিয়ো হল আর-একটা বড়ো ঘরে, ছোটো ঘরখানা তার শোবার। সুন্দর করে বাড়ি সাজাবার নেশা ছিল থিয়োর। তার চমৎকার আসবাবগুলি নতুন বসবার ঘরে খুব মানাল এবার

    থিয়ো বললে—তোমাকে আর এবার থেকে করম্যানের স্টুডিয়োতে গিয়ে আঁকতে হবে না।

    ভিনসেন্ট বললে—যা বলেছ, বাঁচলাম এতদিনে! তবু অবিশ্যি আরও কিছুটা নগ্ন নারীদেহ মকশো করার দরকার ছিল।

    আসবাবপত্র নিয়ে টানাটানি করে সাজাচ্ছিল দুজনে। ভিনসেন্টের স্টুডিয়োতে একটা নরম সোফা পেতে থিয়ো বললে–অনেকদিন তুমি একটা পূর্ণাঙ্গ ছবি আঁকনি, তা-ই না?

    না, কী হবে এঁকে? যতদিন না ঠিকমতো রং মিশিয়ে তৈরি করতে শিখছি! তবে হ্যাঁ, এতদিন পরে যখন আমার সত্যিকারের একটা স্টুডিয়ো হল—

    পরদিন ভোর বেলা সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে ভিনসেন্ট উঠল। নতুন স্টুডিয়োতে জানলার ধারে ইজেলটা পেতে তাতে নতুন একটা ক্যানভ্যাস চড়াল। ক-দিন আগে থিয়োর কেনা নতুন প্যালেটটা বার করল, তুলিগুলো ভিজতে দিল জলে। থিয়োর ঘুম ভাঙবার সময় বুঝে সে ব্রেকফাস্ট সাজাল, জল চড়াল কফির!

    প্রাতরাশের টেবিলে বসে থিয়ো সহজেই টের পেল ভিনসেন্টের বুকের মধ্যে কী তুমুল উত্তেজনা জমে উঠেছে।

    থিয়ো বললে—তাহলে ভিনসেন্ট, এতদিনে তুমি তৈরি হলে, কী বলো? পুরো তিনমাস তুমি স্কুলের শিক্ষা পেলে, মানে করম্যানের স্কুলের কথা বলছিনে, প্যারিসের স্কুলের গত তিনশো বছর ধরে যা-কিছু শ্রেষ্ঠ ছবি ইয়োরোপে আঁকা হয়েছে তাও তুমি দেখলে। এবার তোমার নিজের কাজ শুরু করার পালা।

    সামনের প্লেটটাকে টেনে সরিয়ে এক লাফে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল ভিনসেন্ট—ঠিক বলেছ, আর এক মুহূর্ত দেরি নয়, এখুনি আরম্ভ করতে হবে। আরে বোসো বোসো, খেয়ে নাও। সময় কি পালিয়ে যাচ্ছে নাকি? যে-কথা বলছিলাম। প্রাণের আনন্দে এবার থেকে জোর কাজ করে যাও। কোনো ভাবনা রেখো না মনে। তোমার রং আর ক্যানভাস আমি পাইকারি হারে কিনে রেখে দেব, যাতে কোনো অভাব তোমার কখনও না হয়। শরীরটারও যত্ন এখন থেকে করবে। ডাক্তার দেখিয়ে দাঁতগুলোর একটা ব্যবস্থা করে ফেল এবার। আর সবচেয়ে বড়োকথা, ছটফট করবে না। তাড়াহুড়োর দরকার নেই, বেশ ধীরেসুস্থে কাজ করে চলো।

    বাজে কথা বোলো না থিয়ো। জীবনে কোন কাজটা আজ পর্যন্ত মাথা ঠান্ডা রেখে ধীরেসুস্থে আমি করেছি?

    রাত্রি বেলা থিয়ো বাড়ি ফিরে দেখে, ভিনসেন্টের অবস্থা সাংঘাতিক। সুদীর্ঘ, ছ-বছরের শিল্পীজীবনে সে সুখের মুখ একদিনের জন্যেও দেখেনি, দুর্দশার চরম অবস্থার মধ্যে বসে দিনের পর দিন ছবি এঁকে গেছে। আজ তার সব দুঃখ ঘুচেছে, স্বাচ্ছন্দ্য আর সুযোগের সবকিছু চাহিদা আজ তার করায়ত্ত। তবু হঠাৎ যেন সে পঙ্গু হয়ে গেছে, মাথার মধ্যেটা খালি, আঙুলে জড়তা, সমস্ত দিনটা কেটেছে অসহায় অকর্মণ্য ব্যর্থতায়। মুখখানা পুঞ্জিত হতাশার আঘাতে পাণ্ডুর।

    অনেক বুঝিয়ে সে-রাত্রে থিয়ো ভাইকে ঠান্ডা করল, ফিরিয়ে আনল তার আত্মবিশ্বাস।

    কয়েক সপ্তাহ কাটল এমনিভাবেই। কোনো কাজ করতে পারে না, যা করে তা-ই ভুল হয়। শুকিয়ে উঠল শরীর, কোটরগত চক্ষু, দিনরাত্রি আগুন জ্বলছে মাথায়। থিয়ো সারাদিন পরে বাড়ি ফিরে যেন পাগল নিয়ে পড়ে। ধমক দেয়, হাত থেকে আবসাতের বোতল কেড়ে নেয়, শেষ পর্যন্ত ঘরে খিল দিয়ে নিজেকে পাগলামির হাত থেকে বাঁচাতে চেষ্টা করে শেষ রাতটুকুর জন্যে। তাও কি রোজ পারে!

    গ্রীষ্মকাল এল। রাস্তায় রাস্তায় ঝাঁঝালো সূর্যালোক। পথের ধারে ধারে রংবাহার মৌসুমি ফুলের মেলা, সিন নদীর জল নীল থেকে আরও নীল। সময় এল পথে বার হবার। ভিনসেন্ট পিঠে ইজেল বেঁধে ছবির খোঁজে রোজ প্রত্যুষে বার হয়। এমনি সূর্য সে হল্যান্ডে দেখেনি, প্রকৃতির নতুন বর্ণাঢ্যতায় সে অবাক হয়ে যায়। সন্ধে বেলা ফিরে আসে ব্যর্থতার প্রতিমূর্তি, অপেক্ষা করে থাকে কখন থিয়ো ফিরবে। সারাদিনের রৌদ্র তার মাথায় বাসা বেঁধে থাকে, এবার থিয়ো ফিরলেই হয়!

    একদিন গগাঁ এল তার রং তৈরিতে সাহায্য করতে। কথায় কথায় জিজ্ঞাসা করল—কোত্থেকে তুমি রং কেন?

    জানিনে। থিয়ো একসঙ্গে একগাদা কিনে আনে।

    বাঃ, পিয়ের ট্যাঙ্গির কাছ থেকে কেনে না কেন? সারা প্যারিসে ওর চাইতে সস্তায় কেউ দেবে না, আর পয়সা না থাকলে বিশ্বাস করে ধারেও দেবে না ওর মতো আর কেউ।

    কে হে এই পিয়ের ট্যাঙ্গি? এর নাম তোমার মুখে আগেও যেন শুনেছি!

    আরে, ওকে চেন না? আলাপ হয়নি এখনও? কী সর্বনাশ! আর এক মুহূর্ত দেরি নয়। কোটটা চাপিয়ে নাও এক্ষুনি। রু ক্লজেলে যেতে হবে।

    পথে যেতে যেতে গগাঁ পিয়ের ট্যাঙ্গির কাহিনি বলল।

    প্যারিসে আসার আগে লোকটা প্লাস্টারের কাজ করত। প্যারিসে এসে শুরু করল রং ফেরি করার ব্যাবসা। শিল্পীপাড়ার রাস্তায় রাস্তায় রং ফেরি করে বেড়াত। আলাপ হল পিসারো, মনে আর সেজানের সঙ্গে। সকলেরই পছন্দ হল ওকে, আমরা সবাই ঠিক করলাম ওর কাছ থেকেই রং কিনব। এ-দিকে সে আবার পুলিশের চাকরি নিয়েছে। কম্যুনিস্টদের সঙ্গেও যোগাযোগ। হাতে বন্দুক, কিন্তু গুলি করে মানুষ খুন করার মতো সদ্গুণ নেই মনে। ধরা পড়ল, বিশ্বাসঘাতক বলে শাস্তি হল, দু-বছরের পাথর ভাঙার কয়েদ। আমরা সবাই মিলে অনেক চেষ্টায় ছাড়িয়ে আনি।

    তারপর?

    হাতে কয়েকটা ফ্র্যাঙ্ক ছিল। সেই পুঁজি নিয়ে রু ক্লজেলে ছোট্ট দোকান খুলল একটা। দোকানের সামনের নীল রংটা বুলিয়ে দিল লোত্রেক। সেজানের প্রথম ছবি সে ঝুলিয়েছে তার ওই রঙের দোকানে। তারপর থেকে আমরাও ওকে ছবি দিয়েছি। বিক্রির জন্যে অবশ্য নয়, ছবি বিক্রি ও প্রাণ থেকে করতে পারে না। রং বেচে, তাও অর্ধেকের বেশি ধারে। আসলে পিয়ের ট্যাঙ্গির মতো আর্টের ভক্ত প্যারিসে দুটি নেই। গরিব, পয়সা দিয়ে ছবি কিনতে তো পারে না, তাই সারা দোকানের দেয়াল জুড়ে ছবির একজিবিশন সাজিয়েছে, চারিদিকে ছবি নিয়ে সারাদিন বসে থেকেই ওর আনন্দ।

    তার মানে? খদ্দের এলেও, ভালো দাম পেলেও বেচে না? তাহলে তো মুশকিল!

    মুশকিল বই কী। আসলে ছবির ও প্রেমিক। কোনো ছবিতে একবার যদি নেশা ধরে যায়, সে-ছবি ওর কাছ থেকে ছিনিয়ে নেওয়া শক্ত। একদিনকার ঘটনা বলি। আমি তখন ওর দোকানে ছিলাম। দামি পোশাক পরা এক ভদ্রলোক এল। সেজানের একটা ছবি পছন্দ হল, জিজ্ঞেস করলে—দাম কত। প্যারিসের যেকোনো ছবিওয়ালা ষাট ফ্র্যাঙ্কে ছবিটা বেচতে পারলে কৃতার্থ হয়ে যেত। ট্যাঙ্গি ছবিটার দিকে বেশ কিছুক্ষণ একদৃষ্টে তাকিয়ে হাঁকলে—ছশো ফ্র্যাঙ্ক। খদ্দের সরে পড়ল। দেয়াল থেকে ছবিটা নামিয়ে ট্যাঙ্গি কোলের ওপর দু-হাতে চেপে ধরল, চোখে ওর জল।

    তাহলে ওর দোকানে ছবি টাঙিয়ে লাভ?

    ওই তো মজা! রং গুঁড়োনো লোকটার পেশা, কিন্তু নজর ওর আশ্চর্য! কোন ছবি সত্যি ভালো তা ওর মতো বোঝদার দুটি নেই। ও যদি তোমার কোনো ছবি চায়, দিলে ধন্য হবে। বুঝবে প্যারিসের চিত্রশিল্পের দরজা তোমার জন্যে খুলল, এবার তুমি জাতে উঠলে।

    এসে পড়ল ব্লু ক্লজেল। রাস্তাটা খুব চওড়া নয়, দু-ধারে দোতলা তিনতলা বাড়ি, একতলার ঘরগুলো অধিকাংশই ছোটো ছোটো দোকান। ওপরতলাগুলো বাসিন্দাদের। পিয়ের ট্যাঙ্গি কয়েকটা জাপানি প্রিন্ট দেখছিল। এগুলোর এখন প্যারিসের শিল্পীমহলে খুব আদর।

    গগাঁ বললে—পিয়ের, আমার একজন বন্ধুকে তোমার সঙ্গে আলাপ করাতে নিয়ে এলাম। ভিনসেন্ট ভ্যান গক, এও তোমারই মতো দারুণ কম্যুনিস্ট।

    নরম মেয়েলি গ্লায় ট্যাঙ্গি বললে—আসুন আসুন, কৃতার্থ হলাম মশিয়েঁ।

    বেঁটেখাটো চেহারা, গোলগাল মুখ, পোষ-মানা কুকুরের মতো চোখের দৃষ্টি করুণ। চওড়া কিনারওয়ালা একটা খড়ের টুপি দিয়ে কপালটা ঢাকা। বেঁটে বেঁটে হাত দুখানা, মোটা মোটা আঙুলগুলো, শক্ত খোঁচা খোঁচা দাড়ি। ডান চোখটা আধবোজা।

    সলজ্জ স্বরে পিয়ের ট্যাঙ্গি ভিনসেন্টকে শুধোলে—সত্যি আপনি কম্যুনিস্ট, মশিয়েঁ ভ্যান গক?

    কম্যুনিজম বলতে তুমি ভাই কী বোঝো আমি জানিনে। তবে হ্যাঁ, এ আমি বিশ্বাস করি যে প্রত্যেক মানুষই যে-কাজের সে উপযুক্ত সেই কাজ প্রাণপণ করবে আর তার বিনিময়ে যা-কিছু তার প্রয়োজন তা পাবে।

    হেসে উঠল গগাঁ—বাঃ বাঃ, এ তো একেবারে সোজা হিসেব দেখছি!

    ট্যাঙ্গি বললে—আঃ পল, তুমি তো স্টক এক্সচেঞ্জ করে এসেছ। টাকাই মানুষকে পশু করে। ঠিক কি না বলো।

    হ্যাঁ, বললে গগাঁ—কিংবা টাকার অভাব।

    না টাকার অভাব নয়। যে-অভাবে মানুষ পশুর সমান হয়, সে হল খাদ্যের অভাব, জীবনের সামান্যতম চাহিদাগুলির অভাব।

    ঠিক বলেছ পিয়ের ট্যাঙ্গি—বললে ভিনসেন্ট।

    পিয়ের ট্যাঙ্গি বললে—আমাদের বন্ধু পল যারা পয়সা করে তাদের ঘৃণা করে, আর আমরা যারা পয়সা করিনে তাদেরও ঘৃণা করে। তবে ওই পয়লা দলে না হয়ে আমি যে দোসরা দলে আছি, এই ভালো। দিনে পঞ্চাশ সেন্টিমের বেশি যে খরচ করে, সে ব্যাটা শয়তান!

    গগাঁ বললে—ব্যাস, তাহলে আর আমার মতো সাধু কে, যদিও বাবা ঠ্যালায় পড়ে সাধু বনেছি। এই দেখো ভায়া, তোমার পুরোনো দেনা শোধ দিতে পারছিনে, তবু যদি আর-একটু রং ধার না দাও তাহলে ছবি আঁকা তো শিকেয় উঠবে!

    দেব বই কী ভায়া, দেব বই কী! তোমাকে ধার দেব না? তবে ধরো এই দুনিয়ার মানুষকে আমি যদি একটু কম বিশ্বাস করতাম আর তুমি যদি আর-একটু বেশি বিশ্বাস করতে তাহলে তোমার আমার দুজনের অবস্থাটাই আর-একটু ভালো হতো। ছবি দেবে যে বলেছিলে, তার কী হল? তোমার ছবি দু-একটা বেচেও তো রঙের দামটা কিছু কিছু তুলতে পারি।

    গগাঁ চোখ টিপল অলক্ষে ভিনসেন্টকে উদ্দেশ্য করে। উত্তরে বললে—নিশ্চয়! একখানা কেন, দুখানা ছবি আনব। পাশাপাশি ঝুলিয়ে রাখবে। বেশি রং আমি চাইনে। এই ধরো, এক টিউব কালো, এক টিউব হচ্ছে হলুদ।

    হ্যাঁ হ্যাঁ, পাবে বই কী, খুব পাবে, একশো বার পাবে! পুরোনো ধারটা শোধ দাও, তবে তো?

    তীব্র তীক্ষ্ণ নারীকণ্ঠ। চমকে তিনজনেই পেছন ফিরে তাকাল। ভেতর দিকের দরজাটা দড়াম করে খুলে দোকানের মধ্যে ঢুকল পিয়ের ট্যাঙ্গির স্ত্রী। একেবারে ঝাঁপিয়ে পড়ল গগাঁর ওপর—

    বলি, ভেবেছ কী? আমরা কি ব্যাবসা করছি না দানখয়রাত করতে বসেছি? কথায় কথায় কেবল কম্যুনিজমের কচকচি! ওই কম্যুনিজম ধুয়ে খাব? পেট ভরবে তাতে? দাও দাও, পুরোনো পাওনাটা মিটিয়ে দাও দিকি, নইলে পুলিশ ডাকব!

    গগাঁ একগাল মিষ্টি হেসে ট্যাঙ্গির স্ত্রীর সামনে নীচু হয়ে তার করচুম্বন করল। বললে—আঃ জানটিপে, আজ সকাল বেলায় কী মিষ্টিই না তোমাকে দেখাচ্ছে!

    এই সুন্দর চেহারার শয়তানটা কেন যে তাকে সর্বদা জানটিপে বলে ডাকে তা ট্যাঙ্গির স্ত্রী বোঝে না, তবে গালভরা ডাকনামটা শুনতে তার ভালোই লাগে। বললে—ওঃ! ভেবেছ, এমনি মিষ্টি কথা বলে আমার কাছ থেকে পার পাবে, তা-ই না? সারাটা জীবন গেল আমার রং গুঁড়ো করে করে, আর সেই রং কিনা তুমি বিনিপয়সায় চুরি করে নিয়ে যাবে! ইঃ, রঙ্গ দেখে আর বাঁচিনে!

    জানটিপে, আমার সোনার জানটিপে! অত নিষ্ঠুর হোয়ো না আমার ওপর। আমি জানি তোমার মনটা আর্টিস্টের মন। তোমার মুখেই তার ছাপ রয়েছে। আর্টিস্টের দুঃখ তুমি না বুঝলে বুঝবে কে?

    অ্যাপ্রন নিয়ে আর্টিস্টের কল্পিত ছাপটা ঘামের সঙ্গে সঙ্গে মুছে নিল পিয়ের গৃহিণী। ঝংকার দিয়ে উঠল—আবার আর্টিস্ট? ঘরে এক আর্টিস্টেই আমার রক্ষে নেই! কী বলেছে ও তোমাদের, পঞ্চাশ সেন্টিমেই দিন চলবে—তা-ই না? বলুক তো, আমি কোমর বেঁধে রোজগার না করলে ওই পঞ্চাশটা সেন্টিমই-বা জোটে কোথা থেকে?

    আহা, লক্ষ্মী, লক্ষ্মী মাদাম, তুমি যে কীরকম পটিয়সী ব্যাবসাদারনি, সারা প্যারিস তা জানে। এ কি .একটা নতুন কথা হল?

    মাদাম ট্যাঙ্গির রুক্ষ কর্কশ ডান হাতটায় আবার গগী সাদরে চুমু খেল।

    হাজার হোক স্ত্রীলোক তো! মাদাম ট্যাঙ্গির হৃদয় গলল—বুঝেছি, যেমন শয়তান তেমনি খোশামুদে। আচ্ছা এবারকার মতো ধারে দিচ্ছি। বেশি কিন্তু নিয়ো না। পুরোনো হিসেবটা তাড়াতাড়ি মিটিয়ে দিতে হবে, সেটা কিন্তু যেন মনে থাকে।

    এই যে করুণা করলে, লক্ষ্মী জানটিপে, এর প্রতিদান তুমি পাবে। তোমার একখানা পোর্ট্রেট আমি আঁকব। সেই পোর্ট্রেট একদিন না একদিন লাভর-এ স্থান পাবে, অমর হব তুমি আর আমি দুজনেই।

    সদর দরজায় ঘণ্টা বাজল। অপরিচিত একটি লোক দোকানে প্রবেশ করল। লোকটির জিজ্ঞাসা—ওই সামনে জানলার ধারে স্টিল লাইফখানা কার আঁকা?

    খরিদ্দার হয়তো! ট্যাঙ্গি অল্প কথায় সারতে চাইলে, বললে—পল সেজানের।

    পল সেজান? নামই তো কখনও শুনিনি! যা হোক, বিক্রি আছে?

    আজ্ঞে না, মানে কিনা, দুঃখের বিষয় ওখানা আগেই—

    অ্যাপ্রনটা ছুঁড়ে ফেলে ট্যাঙ্গিকে এক ধাক্কায় সরিয়ে সামনে এগিয়ে এল ট্যাঙ্গির স্ত্রী। বললে—নিশ্চয় বিক্রি আছে মশিয়েঁ! চমৎকার ছবি, তা-ই না? আপনার যদি পছন্দ হয় তো খুব সস্তায় দেব।

    দাম কত?

    মাদাম হাঁকল সঙ্গে সঙ্গে—কত, কত দাম ট্যাঙ্গি?

    ঢোক গিলল ট্যাঙ্গি। অস্ফুট স্বরে বললে—তিনশো—

    ট্যাঙ্গি!

    তা, ধরুন দুশো।

    ট্যাঙ্গি!

    না, তবে কিনা ঠিক দাম এই একশো ফ্র্যাঙ্ক।

    একশো ফ্রাঙ্ক? বিরস গলায় খরিদ্দার বললে—তাও আবার কেউ নাম জানে না এমনি লোকের আঁকা! অসম্ভব। গোটা পঁচিশ ফ্র্যাঙ্ক আমি দিতে পারি।

    ট্যাঙ্গির স্ত্রী জানলা থেকে ছবিটা নামিয়ে খরিদ্দারের নাকের সামনে ধরে বললে–দেখুন মশিয়েঁ, কত বড়ো ছবিটা! চার চারটে আপেল। এক গণ্ডার দাম একশো ফ্র্যাঙ্ক, আপনি দিতে চাইছেন মোটে পঁচিশ—ওতে চারটে হবে না, একটা হবে।

    লোকটা ছবিটা নিরীক্ষণ করে দেখল কয়েক মুহূর্ত। তারপর বললে—বেশ তাহলে একটা আপেলই দিন, তাতেই আমার চলবে।

    বেশ, তা-ই দেব, আমার আপত্তি নেই। এই একটাই নিন আপনি।

    কাঁচি দিয়ে কচকচ করে ক্যানভাসটা কেটে একদিকের একটা আপেল আলাদা করে নিল ট্যাঙ্গির স্ত্রী। ছবির বাকি অংশটা কাগজে মুড়ে রেখে দিয়ে আপেলটা খরিদ্দারের হাতে দিয়ে পঁচিশ ফ্র্যাঙ্ক হাত পেতে নিল।

    খরিদ্দার দরজার বাইরে অন্তর্হিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আর্তনাদ করে উঠল ট্যাঙ্গি—হায় হায়! আমার এত সাধের সেজানখানা!

    ট্যাঙ্গির স্ত্রী ছবির বাকি অংশটা কাউন্টারের ওপর রাখল।

    ইঃ, ভারি আমার সাধের সেজান! এর পরে আবার যদি কোনো এমনি খদ্দের তোমার সাধের সেজান কিনতে চায়, আর তাতেও যদি এমনি সস্তা চায়, আর-একটা আপেল কেটে দিয়ো, দাঁত বার করে হাসছ কী পল গগাঁ! তোমারও এমনি দশা হবে। তোমার ওই জংলি ন্যাংটো মেয়ের পালকে দেয়াল থেকে নামিয়ে পাঁচ ফ্র্যাঙ্ক করে এক-একটা আমি বেচব।

    গগাঁ বললে—মরি মরি জানটিপে, তোমাকে যদি স্টক এক্সচেঞ্জে পার্টনার পেতাম তাহলে এতদিন সারা ব্যাঙ্ক অব ফ্রান্সের মালিক হতাম দুজনে!

    মাদাম অন্তর্ধান করল। পিয়ের ট্যাঙ্গি ভিনসেন্টকে জিজ্ঞাসা করল—আপনিও তো শিল্পী, তা-ই না মশিয়েঁ? আমার এখান থেকেই তাহলে রং-টং কিনবেন। দু–একটা ছবিও দেখাবেন আপনার, কেমন?

    ঘাড় নাড়ল ভিনসেন্ট।

    নিশ্চয়। তোমার এই জাপানি প্রিন্টগুলো কিন্তু ভারি চমৎকার। এগুলোও বিক্রির জন্যে তো?

    হ্যাঁ, এগুলোর চাহিদা খুব আজকাল। জাপানি ছবির প্রভাব আমাদের তরুণ শিল্পীদের ওপরও খুব পড়েছে।

    এ দুটো আমি নেব। দেখব স্টাডি। কত দাম?

    এক-একটা তিন ফ্র্যাঙ্ক করে।

    আচ্ছা, আমি নিচ্ছি। ওই যাঃ! পকেটে তো কিছু নেই! গগাঁ, ছটা ফ্র্যাঙ্ক ধার দেবে নাকি?

    কী পাগলের মতো বলছ!

    ভিনসেন্ট প্রিন্ট দুটো নামিয়ে রাখল—বড়ো দুঃখিত ট্যাঙ্গি। এখন থাক। ট্যাঙ্গি প্রিন্ট দুটো ভিনসেন্টের হাতের ওপর চেপে ধরল। ভীতু ভীতু সলজ্জ মুখে বললে—কী যে বলেন! আপনার কাজের জন্যে এগুলো দরকার, নিয়ে যান। দাম? পরে দেবেন এখন। কী হয়েছে তাতে?

    [tab title=”দশ”]

    থিয়ো আর ভিনসেন্ট শিল্পীবন্ধুদের একদিন পার্টি দিল। চার ডজন সেদ্ধ ডিম, একগাদা কেক-পেস্ট্রি আর এক পিপে বিয়ার। বসবার ঘরটা তামাকের ধোঁয়ায় অন্ধকার হয়ে গেল, বিরাট চেহারাটা নিয়ে হাঁটাচলা করছিল গগাঁ, দেখাতে লাগল কুয়াশার মধ্য দিয়ে একটা জাহাজ যেন সমুদ্রে ভেসে চলেছে। লোত্রেক এক কোণে বসে থিয়োর সুন্দর চেয়ারের হাতলে ঠুকে ঠুকে ডিম ফাটিয়ে কার্পেটের ওপর খোলার টুকরোগুলো ছড়াতে লাগল। রুসো অত্যন্ত উত্তেজিত হয়ে ঘোষণা করল, একজন মহিলাভক্ত গন্ধমাখা চিঠিতে তাকে নিমন্ত্রণ পাঠিয়েছে। সিউরাতের মাথায় আবার নতুন থিয়োরি গজিয়েছে, সেজানের সঙ্গে সে সমানে তা-ই নিয়ে বকবক করতে লাগল। ভিনসেন্ট মদ চালাতে লাগল। গগার অশ্লীল গল্প শুনে হাসল কিছুটা, তর্ক করল কিছুক্ষণ লোত্রেকের সঙ্গে, শেষপর্যন্ত সিউরাতের কবল থেকে উদ্ধার করে আনল সেজানকে।

    ছোট্ট ঘরটা উত্তেজিত হইহল্লায় ফেটে পড়ছে। শিল্পী জাতটাই ভয়ংকর, ব্যক্তিত্বে সবাই এক-একজন গৌরীশংকর, পরমত অসহিষ্ণুতায় প্রত্যেকেই কালাপাহাড়। থিয়োর মতে প্রত্যেকেই আমি-উন্মাদ; তর্ক করতে, লড়াই করতে, নিজের থিয়োরিকে সদম্ভে ঘোষণা করতে আর পরের মতকে ভাঙতে-চুরতে সবাই ওস্তাদ।

    গলা তাদের রুক্ষ, চেঁচাতে তাদের জুড়ি নেই। যা-কিছু অপছন্দ করে, তারই বিরুদ্ধে চ্যাচানি। অপছন্দের তো আর শেষ নেই। ঘরটা যদি কুড়িগুণ বড়ো হতো তাহলেও বোধ হয় এসব তরুণ শিল্পীদের সরব উচ্ছ্বাসের পক্ষে ছোটোই মনে হতো।

    ভিনসেন্টেরও মেজাজে বান ডেকেছে। চেঁচাচ্ছে সেও, হাত পা নাড়ছে প্রাণপণ। থিয়োর অবস্থা অন্যরকম। এদের জন্যেই সে গুপিলসে নীরবে যুদ্ধ করে যাচ্ছে, এদের প্রতিষ্ঠা করাই তার লক্ষ্য। কিন্তু এদের এই ব্যক্তিত্বের ঠোকাঠুকির মাঝখানে পড়ে সে মারা যায়। স্বভাব তার শান্ত, অনেকটা মেয়েলি, এই রুক্ষ কর্কশ কোলাহলে সে কষ্ট পায়, তার মাথা ধরে ওঠে।

    উদ্দেশ্যবিহীন অথচ তিক্ত বিদ্রূপ হানতে লোত্রেক মহাপটু। হঠাৎ নানা কথার মাঝখানে সে ছাড়ল—সত্যি, থিয়ো যদি ভিনসেন্টের ভাই না হয়ে বউ হতো তাহলেই হতো ভালো।

    থিয়ো চুপ করে এক কোণে বসে ভাবছিল—দিন আসবে। একদিন-না-একদিন সে তার সালোঁতে একখানা সেজান ঝোলাতে পারবেই। শিল্পের এই নব জোয়ারকে কতদিন ওরা ঠেকিয়ে রাখবে? তারপর গগাঁ, লোত্রেক, শেষ পর্যন্ত ভিনসেন্ট ভ্যান গক। সফল হবে তার স্বপ্ন।

    আস্তে আস্তে সে বার হয়ে গেল ঘর থেকে। নেমে গেল একলা রাস্তায়, চুপটি করে দাঁড়িয়ে দেখতে লাগল প্যারিসের আলোকমালা।

    গগাঁ তখন তর্ক জুড়েছিল সেজানের সঙ্গে। এক হাতে তার ডিম, আর-এক হাতে বিয়ারের গ্লাস, মুখে পাইপ। গগাঁর গর্ব ছিল, পাইপ মুখে দিয়ে বিয়ারের গ্লাসে চুমুক দিতে প্যারিসে সে অদ্বিতীয়।

    চিৎকার করে গগাঁ বললে তোমার ছবিগুলো একেবারে ঠান্ডা সেজান, একেবারে নিষ্প্রাণ। ওগুলো দেখলে আমার রক্ত হিম হয়ে যায়। শুধু রং বুলোলেই কি চলে! রঙের সঙ্গে একটু আবেগ মিশিয়ে দিতে হয় ভায়া, নইলে কি ছবি!

    সেজান ঠুকল উত্তরে—মাপ করো, আমি আবেগ আঁকিনে। আবেগ মানে ভাবালুতা। ওটা আমি ঔপন্যাসিকদের জন্যে ছেড়ে রেখেছি, আমি আপেল আঁকি, দৃশ্য আঁকি, যা আঁকবার, তা-ই।

    আজ্ঞে না, ভাবালুতার কথা বলছিনে, আমি বলছি অনুভূতির কথা অনুভূতি নেই তোমার, আঁকবে কী করে? আঁক তো খালি চোখ দিয়ে।

    তা, চোখ দিয়ে ছাড়া আর কী দিয়ে লোকে আঁকে?

    অনেককিছু দিয়ে আঁকে। গগাঁ বলে চলল—এই যে লোত্রেক, ও আঁকে ওর পিত্তি দিয়ে। ভিনসেন্ট আঁকে হৃদয় দিয়ে। সিউরাত আঁকে তার মন দিয়ে, সেটা অবশ্য চোখ দিয়ে আঁকার মতনই খারাপ। রুসো আঁকে তার কল্পনা দিয়ে।

    বটে? আর তুমি কী দিয়ে আঁক?

    আমি? তা জানিনে। ভেবে দেখিনি কখনও।

    বলব আমি? লোত্রেক বললে—তুমি আঁক তোমার ওইটে দিয়ে।

    হো-হো করে হেসে উঠল সবাই। হাসি আর থামে না। আচ্ছা জব্দ হয়েছে!

    হাসি থামতে না থামতেই সিউরাত একটা সোফার হাতলের ওপর চড়ে বসে চড়া গলায় শুরু করল—মন দিয়ে বুদ্ধি দিয়ে যে ছবি আঁকে তাকে তুমি ঠাট্টা

    করতে পার, কিন্তু বুদ্ধিই পথ দেখায়। এই বুদ্ধি দিয়েই আমি আবিষ্কার করেছি ছবির আকর্ষণকে কেমন করে ডবল করে তোলা যায়।

    ডুকরে উঠল সেজান—ওরে বাবা! আবার সেই বস্তাপচা বক্তৃতা শুরু হল।

    চুপ চুপ, সেজান। এই গগাঁ, ছটফট করে বেড়িয়ো না, এক জায়গায় স্থির হয়ে বোসো। রুসো, তোমার ভক্তের কাহিনি দয়া করে থামাবে? লোত্রেক, একটা কেক এগিয়ে দাও তো! কই ভিনসেন্ট, কী করছ, ভরে দাও না গেলাসটা। নাও, শোনো এবার সবাই।

    লোত্রেক তবু ছাড়ল না—ব্যাপার কী সিউরাত? সেই যে একবার তোমার ছবির ওপর একটা লোক থুতু ফেলেছিল, তারপর থেকে এতটা উত্তেজিত হতে তো কোনোদিন দেখিনি তোমাকে?

    শোনো। আজকের দিনের চিত্রশিল্পের মূল জিনিসটা কী? আলো, তা-ই নয়? বস্তুর কোনো রং নেই। বস্তুর ওপর আলোর বিকিরণে যে-রং ফুটে ওঠে সেই রংই ছবির রং। বস্তুকে ভাগ করো বিন্দুতে, তাহলে ছবি দাঁড়াচ্ছে অসংখ্য বর্ণবিন্দুর সমষ্টি, তা-ই নয়?

    ও বাবা! তোমার বিন্দুপ্রকরণ থামাও, ছবির কথা বলবে তো বলো!

    ও জর্জেস, আবার পণ্ডিতি শুরু করলে! আর যে পারিনে দাদা!

    চুপ চুপ, গোলমাল করো না, বলছি। আচ্ছা, ছবির কথাই যদি বললে, ধরো ছবি একটা আঁকলাম। সেটা পড়ল গিয়ে কোনো মূর্খের হাতে, সে সেটাকে বাঁধাল একটা বীভৎস সোনালি ফ্রেমে, ছবিটার যা-কিছু সৌন্দর্য ছিল তা ফ্রেমে এঁটেই খতম করে দিলে। অতএব এই কথাটা মনে রাখবে যে ছবি কখনও ফ্রেমে না বাঁধিয়ে ছাড়বে না। ফ্রেমটা রং করবে নিজের হাতে, যাতে করে ওই ফ্রেমটাও ছবিরই অঙ্গ হয়ে ওঠে।

    তারপর সিউরাত, থামলে কেন? ছবিটা নিশ্চয়ই কোনো ঘরে টাঙানো হবে। দেওয়ালের রংটা যদি ঠিক না হয়, তাহলে ছবিও গেল, ফ্রেমও গেল। তাহলে ছবি আঁকার সঙ্গে সঙ্গে দেয়াল রং করাও ধরব নাকি?

    সিউরাত বললে–নিশ্চয়! চমৎকার আইডিয়া!

    তারপর? ঘরটা যে-বাড়ির সেই বাড়িটা?

    আর-একটু এগোও। বাড়িটা যে শহরে সেই শহরটা? তাই-বা বাদ যায় কেন?

    জ্বালালে জর্জেস, কী যে তোমার সব বিদঘুটে আইডিয়া!

    ওই! বুদ্ধি খাটিয়ে ছবি আঁকব বললে ওইরকম বিদঘুটে খেয়ালই মাথায় গজায়!

    সিউরাত আকাশে দু-হাত ছুড়ে চেঁচিয়ে উঠল—আঁকবে কোথা থেকে বুদ্ধি দিয়ে? মাথার খুলির নীচে কিছু থাকলে তো? যতসব গোমুখ্যুর দল!

    দেখো দেখো, মুখখানা দেখো জর্জেসের! বুদ্ধিওয়ালার গালফুলো মুখখানা একবার সবাই দেখে নাও চট করে।

    এতক্ষণে ভিনসেন্ট গলা চড়ালে—আচ্ছা, এই কথাটা আমি বুঝিনে, নিজেদের মধ্যে এমনি মারামারি করে কী লাভ হয়! আমরা কি সবাই মিলে একসঙ্গে কাজ করার চেষ্টা করতে পারিনে?

    গগাঁ বললে—ব্যাস, চুপ, এইবার সত্যি-সত্যি চুপ সবাই! ভিনসেন্ট আমাদের মধ্যে খাঁটি কম্যুনিস্ট সবাই শোনো তার কথা।

    ভিনসেন্ট বললে—আমার মাথায় একটা প্ল্যান আছে। আসলে ভেবে দেখো, আমরা কারা? কেউ না, কোনো দর নেই আমাদের। মানে, ডেগা, সিসলে আর পিসারো আমাদের পথপ্রদর্শক। ওদের ছবি লোকে স্বীকার করেছে, বড়ো বড়ো গ্যালারিতে টাঙিয়েছে। ওরা সব বড়ো রাস্তার শিল্পী। বেশ, আমরা হলাম গলিঘুঁজির ছবি-আঁকিয়ে। তাই বলে আমাদের একজিবিশন থাকবে না কেন? আমাদের ছবির গ্যালারি আমরা নিজেরাই করে নেব, ছোটো ছোটো রেস্তরাঁয়, শ্রমিকদের কারখানায়। প্রত্যেকে আমরা ধরো পাঁচখানা করে ছবি দেব, নিত্য নতুন জায়গায় টাঙানো হবে। সাধারণ লোক যে-দাম দিতে পারে, সেই দামেই বেচব। তা ছাড়া ছবিগুলো সর্বদা লোকের চোখে পড়বে, যারা গরিব তারা ভালো ছবি দেখে প্রসন্ন হবে।

    ঔৎসুক্যে রুসোর চোখ দুটো বড়ো বড়ো হয়ে উঠল, বললে—চমৎকার!

    সিউরাত মুখ গোঁজ করে বললে—একটা ছবি শেষ করতে আমার এক বচ্ছর লাগে। তুমি ভাবছ পাঁচ কড়ির বিনিময়ে কোনো বোকা কারিগরকে আমি তা বেচব?

    বড়ো ছবি না দাও, তোমার ছোটো ছোটো স্টাডি দিতে পার।

    কিন্তু ধরো এসব রেস্তরাঁ যদি আমাদের ছবি না টাঙায়?

    আলবত টাঙাবে। লোকসানটা কী তাদের? লাভই বরং, সুন্দর দেখাবে দেয়ালগুলো।

    কিন্তু এসবের ব্যবস্থা করবে কে? নতুন নতুন রেস্তরাঁ জোগাড়ের ভার থাকবে কার ওপার?

    উল্লসিত ভিনসেন্ট বললে—সেও আমি ভেবে রেখেছি। পিয়ের ট্যাঙ্গি হবে আমাদের ম্যানেজার। সে রেস্তরাঁ ঠিক করবে, ছবি টাঙাবে, ছবি বিক্রির টাকা আদায় করবে আমাদের হয়ে।

    ঠিক বলেছ। পিয়ের ট্যাঙ্গিই এ-কাজের উপযুক্ত লোক।

    রুসো, লক্ষ্মীটি, দৌড়ে গিয়ে ট্যাঙ্গিকে ডেকে নিয়ে এসো তো! বলো জরুরি দরকার।

    সেজান বললে—তোমাদের এই স্কিম থেকে আমাকে বাদ দাও।

    চটে উঠল গগাঁ। বললে—কেন? সাধারণ লোকের চোখ লেগে লেগে কি তোমার ছবি ক্ষয়ে যাবে?

    না, তার কারণ আমি এখানে থাকব না। মাস খানেকের মধ্যেই আমি এক্স-এ চলে যাচ্ছি।

    ভিনসেন্ট অনুরোধ করলে—বেশ তো, তার আগে একটি বার আমাদের সঙ্গে চেষ্টা করো। তারপর যেতে চাও তো যেয়ো।

    বেশ, রাজি আছি।

    পিয়ের ট্যাঙ্গি হাঁপাতে হাঁপাতে ছুটে এল। রুসো তাকে ব্যাপারটার আভাস দিয়েছে মাত্র, তাতেই ঔৎসুক্যে আর উত্তেজনায় ফেটে পড়ছে সে।

    পরিকল্পনাটা পুরোপুরি শুনে ট্যাঙ্গি বললে—নিশ্চয়! রেস্তরাঁও আমার চেনা আছে। নরভিনস রেস্তরাঁ, মালিক আমার বন্ধু। তার খালি দেওয়ালে আমরা ছবি টাঙালে খুশি বই অখুশি হবে না। ওখানে প্রদর্শনী শেষ করে আর-একটা রেস্তরাঁয় আমরা যাব। রু পিয়েরে আর-একটাকেও আমি চিনি। সারা প্যারিসে হাজারটা রেস্তরাঁ আছে, ভাবনা কী?

    গগাঁ শুধোলে—তাহলে কবে থেকে শুরু?

    ভিনসেন্ট বললে—দেরি কীসের? কাল থেকে শুরু হতে আপত্তি কী?

    ট্যাঙ্গি বললে—হ্যাঁ হ্যাঁ, কাল থেকেই। কাল তোমরা সবাই আমার ওখানে তোমাদের ছবি পৌঁছে দিয়ে আসবে। আমি বিকেল বেলা সেগুলো রেস্তরাঁ নরভিনসে টাঙিয়ে দেব। লোকেরা ডিনার খেতে এসে রেস্তরাঁর চেহারা দেখে অবাক হয়ে যাবে। কীরকম বিক্রি দেখো, ঠিক একেবারে যেন ইস্টারের মোমবাতির মতো!—এ কি? গ্লাসটা ধরব? কী আছে এতে? বিয়ার? চমৎকার! ভদ্রমহোদয়গণ, ভ্যান গক বলেছেন আমরা অলিগলির শিল্পী, তা-ই না? তা-ই বেশ, পেতিত বুলেভার্দের কম্যুনিস্ট আর্ট ক্লাবের জয় হোক! সফল হোক তার প্রথম প্রদর্শনী!

    [tab title=”এগার”]

    পরদিন দুপুর বেলা ট্যাঙ্গি ভিনসেন্টের কাছে এল।

    বললে—নরভিনসে ছবির প্রদর্শনীর ব্যবস্থা ঠিক হয়েছে। তবে কথা আছে, ডিনারটাও ওখানেই খেতে হবে এই শর্তে। রাজি তো?

    আপত্তি কী?

    তোমাকে নিয়ে সকলকেই বলা হল। সকলেই রাজি। তাহলে ঠিক চারটে নাগাদ আমার দোকানে আসবে। একসঙ্গে সবাই যাব। সাড়ে চারটের মধ্যে ছবিগুলো টাঙিয়ে ফেলতে হবে।

    বিকেল বেলা পৌঁছে দেখে ট্যাঙ্গি এরই মধ্যে একটা হাতগাড়ি ছবি-বোঝাই করে ফেলেছে। দলের সবাই তৈরি।

    পিয়ের হাঁকল—রেডি, এবার চলো সবাই।

    ভিনসেন্ট বললে—গাড়িটা আমি ঠেলব ট্যাঙ্গি!

    না না, এ আমার কাজ। আমি যে ম্যানেজার!

    ছবিভরতি গাড়ি ঠেলে চলল ট্যাঙ্গি, পেছনে শিল্পীর দল। প্রথমে পাশাপাশি গগাঁ আর লোত্রেক, একজন যেমন লম্বা, আর-একজন তেমনি বেঁটে। তাপের সিউরাত আর রুসো। সবার পেছনে সেজান আর ভিনসেন্ট।

    বেশ কিছুটা চড়াই রাস্তা ওঠবার পর গগাঁ বললে—ওহে ট্যাঙ্গি, এবার আমি একটু ঠেলি। গাড়িভরতি সব অমর প্রতিভার নিদর্শন, হাত লাগিয়ে আমিও একটু জন্ম সার্থক করি।

    খবরদার! ট্যাঙ্গি চেঁচিয়ে উঠল—ছুঁয়ো না বলছি! বিপ্লবের নিশান নিয়ে আমি চলেছি, প্রথম গুলিটা আমার বুকে এসেই বিঁধুক!

    কৌতুককর শোভাযাত্রা। হাতগাড়িতে আর্টের পাজা, পেছনে পদাতিক শিল্পীর দল। হাসে হাসুক পথের লোক, লজ্জা কী তাতে? সংকোচে সংকুচিত হবার পাত্রই নয় কেউ। চলেছে হইহই করতে করতে।

    চিৎকার করে বললে রুসো—ওহে ভিনসেন্ট, আজ কী পেয়েছি জান? আবার একখানা চিঠি সেই মহিলাটির কাছ থেকে! খামে ভুরভুরে গন্ধ!

    দৌড়ে ভিনসেন্টের পাশে গিয়ে তার নাকের কাছে খামটা ধরল। উত্তেজনায় থরোথরো মুখখানা।

    রুসো আবার ফিরে গেল সিউরাতের পাশে। লোত্রেক ভিনসেন্টকে কাছে ডাকল। কানে কানে বললে—রুসোর প্রেমিকাটি কে জান?

    না। কী করে জানুর?

    খুকখুক করে হাসল লোত্রেক। বললে—গগাঁ। গগাঁই ওকে প্রেমের স্বাদ জোগাচ্ছে। বেচারি আজ পর্যন্ত কোনো মেয়ে জোটাতে পারেনি। বুকজোড়া তৃষ্ণা নিয়ে সারাজীবন ঘুরছে। গগাঁ এখন ওর নামে কয়েকটা চিঠিপত্র ছাড়বে, তারপর অভিসারের দিন আসবে। মেয়েমানুষ সেজে রুসোকে নিয়ে তুলবে ও পাড়ার একটা খালি ঘরে। ফুটোওয়ালা জানলার ফুটো দিয়ে আমরা দেখব রুসো ভায়া কেমন প্রথম প্রেমের পাঠ নেয়।

    কী কাণ্ড! ছি ছি গগাঁ, তুমি একটা শয়তান!

    আরে চটো কেন? আসলে ঠাট্টা। ঠাট্টায় আবার দোষ আছে নাকি?

    শেষপর্যন্ত শোভাযাত্রা পৌঁছোল নরভিনস রেস্তরাঁর সামনে। সরু গলিতে ছোট্ট ভোজনাগারটি। একপাশে মদের দোকান। নীল রঙের দেয়াল, ঘর জুড়ে গোটাকুড়ি টেবিল, তাতে লাল সাদা চেক-কাটা কাপড়ের টেবিল ক্লথ। এককোণে মালিকের বসবার জন্যে উঁচু ঘেরা একটা জায়গা।

    কোনখানে কার কোন ছবিটা টাঙানো হবে তা-ই নিয়ে তুমুল তর্ক শুরু হল। পিয়ের ট্যাঙ্গির মাথা খারাপ হবার জোগাড়, রেস্তরাঁর মালিক চটেই আগুন। ডিনারের সময় ঘনিয়ে এসেছে, একটু পরেই খরিদ্দাররা আসতে শুরু করবে।

    পিয়ের ট্যাঙ্গি ভিনসেন্টের কাছে এল। বললে—এই নাও দুটো ফ্র্যাঙ্ক, আর কিছু পয়সা নিয়ে এদের সব ওই মদের দোকানে টেনে নিয়ে যাও। পনেরো মিনিট হাতে পেলে আমি সব ছবি টাঙিয়ে ফেলব।

    বুদ্ধিটা কাজে লাগল। মদের দোকানে গলা ভিজিয়ে যখন সবাই রেস্তরাঁয় ফিরে এল, তার মধ্যে সব ছবি দেয়ালে উঠে গেছে। আর ঝগড়ার উপায় নেই। সবাই দরজার সামনে একটা বড়ো টেবিল জুড়ে বসল। পিয়ের্ ট্যাঙ্গি দেয়ালে নোটিশ টাঙিয়ে দিয়েছে—এসব ছবি জলের দামে বিক্রি হবে। মালিকের সঙ্গে কথা বলুন।

    সাড়ে পাঁচটা বেজেছে। ডিনার আরম্ভ হতে আর আধঘণ্টা দেরি। স্কুলের মেয়ের মতো মনে মনে অস্থির সকলে, কখন দরজা ঠেলে প্রথম খরিদ্দারটি আসবে। রেস্তরাঁর ছবিভরতি নতুন চেহারাটা দেখে হাঁ হয়ে যাবে না!

    সিউরাতের কানে কানে গগাঁ চুপি চুপি বললে—ভিনসেন্টের অবস্থাটা দেখো! এই বুঝি প্রথম স্টেজে নামছে?

    লোত্রেক বললে—একটা পুরো ডিনার বাজি রাখছি গগাঁ, তোমার ছবির আগে আমার ছবি বিক্রি হবে।

    আচ্ছা, আমিও রাখলাম।

    সেজান বললে—ইঃ, ভারি তো শিল্পী!

    অ্যাঁ! কার গলা? সেজান নাকি? তা তোমার সঙ্গে একটা কেন, তিন–তিনটে ডিনার বাজি রাখতে রাজি আছি। তোমার এক, আমার তিন।

    লাল হয়ে উঠল সেজান। হাসল আর সবাই।

    ভিনসেন্ট বললে—একটা কথা সবাই মনে রেখো। বিক্রির ভারটা ট্যাঙ্গির ওপর। নিজেরা যেন কেউ দরাদরি করতে যেয়ো না।

    হ্যাঁ হ্যাঁ, মনে আছে। কিন্তু আসছে না তো কেউ! কটা বাজে?

    ঘড়ির কাঁটা চলল ছ-টার দিকে। আর কোলাহল নেই। সবাইকার নিশ্চল চোখ ঘড়ির কাঁটারই মতো দরজার দিকে।

    অস্ফুট স্বরে সিউরাত বললে—প্যারিসের সমস্ত সমালোচকদের সামনে ছবি মেলে ধরতেও আমার এমনিধারা লাগেনি!

    চুপ চুপ, ফিসফিসিয়ে উঠল রুসো—ওই দেখো রাস্তা পার হচ্ছে একটা লোক, ঢুকবে বোধ হয়!

    ঢুকল না, চলে গেল পাশ কাটিয়ে। রেস্তরাঁর গড়িতে ঢং ঢং করে ছ-টা বাজল। শেষ ঢং-টার সঙ্গে সঙ্গে দরজা ঠেলে ঢুকল একজন শ্রমিক। নোংরা পোশাক, মুখের ও দেহের প্রতিটি রেখায় দিনান্তের ক্লান্তির সুস্পষ্ট পরিচয়।

    ভিনসেন্ট চাপা গলায় ঘোষণা করল—এইবার!

    লোকটি সোজা গিয়ে বসল কোণের একটা টেবিলে। মাথার টুপিটা ছুড়ে রাখল আর-একটা চেয়ারে। ঝোল-রুটি এল, মাথা নীচু করে চিবুতে লাগল। একবার মুখ তুলে দেয়ালগুলির দিকে তাকাল না পর্যন্ত।

    ভিনসেন্ট মনে মনে বললে—আশ্চর্য!

    এবার ঢুকল আর-দুজন শ্রমিক একসঙ্গে। টেবিলে মুখোমুখি বসেই আর-কোনো দিকে না তাকিয়ে দিনের কোনো একটা ব্যাপার নিয়ে তারা তুমুল বচসা শুরু করল।

    ক্রমে ঘর ভরতি হতে লাগল। মেয়ে পুরুষ দুইই আসতে লাগল। অধিকাংশ‍ই পুরোনো খরিদ্দার, টেবিলগুলো পর্যন্ত চেনা। ক্লান্ত শরীরে চেয়ারে বসে, টেবিলের ওপর খাবার আসা মাত্র ঝাঁপিয়ে পড়ে, একমনে চিবোয়, খাওয়া শেষ হলে পাইপ ধরিয়ে সন্ধে বেলাকার কাগজে মুখ ঢাকা দেয়। চোখ তুলে ওপর দিকে তাকাবার সময় কোথায়?

    সাতটা নাগাদ ওয়েটার এসে জিজ্ঞাসা করল—আপনাদের এখন দেব কি?

    উত্তর দিল না কেউ।

    একটু পরে একজোড়া স্ত্রী-পুরুষ একসঙ্গে ঢুকল। কোণের আলনায় টুপিটা রাখার সময় পুরুষটির চোখে পড়ল জঙ্গল থেকে উঁকি মারা বাঘের একটা মুখ। রুসোর সেই ছবিখানা। স্ত্রীলোকটিকে সে দেখাল। শিল্পীদের টেবিলে তখন তটস্থ অবস্থা। রুসো তো উঠে দাঁড়ায় আর কি! মেয়েটি নীচু গলায় কী যেন বলতেই দুজনে হাসল। ব্যাস, এই পর্যন্ত। তারপর মুখোমুখি টেবিলে বসে মাথা নীচু করে দুজনে খেতে শুরু করল গোগ্রাসে।

    পৌনে আটটার সময় দ্বিতীয় বার আর জিজ্ঞাসা না করেই ওয়েটার সুপের পাত্র বসিয়ে গেল শিল্পীদের সামনে সামনে। স্পর্শ করল না কেউ। যখন ঠান্ডা জল হয়ে গেল তখন ওয়েটার আবার পাত্রগুলো সরিয়ে নিয়ে গেল। এবার এল মাংসের কোর্মা। একমাত্র রুসো ছাড়া কারও মুখে রুচল না এমনি সুখাদ্য। সকলেই, এমনকী সিউরাত পর্যন্ত বসে বসে মদ টানল চুমুকের পর চুমুক। তাও বিস্বাদ। চারদিকে খাবারের আর মেহনতি মানুষের ঘামের গন্ধ।

    একে একে খরিদ্দাররা দাম মিটিয়ে বিদায় নিতে লাগল। শেষ পর্যন্ত ওয়েটার বললে—মাপ করবেন, সাড়ে আটটা বেজে গেছে কিন্তু, এইবার বন্ধ করতে হবে। ট্যাঙ্গি দেয়াল থেকে ছবিগুলো একে একে নামিয়ে বাইরে ঠেলাগাড়িতে ভরতি করল। তারপর গাড়িটা ঠেলে নিয়ে চলল ফিরতি রাস্তায়।

    [tab title=”বার”]

    মাড়ে মোড়ে তখন আসন্ন বিষণ্ণ অন্ধকার।

    গুপিল কোম্পানির পুরোনো আদর্শবাদ আর নেই, কাকা ভিনসেন্ট ভ্যান গকের ঈন গত। এখনকার লক্ষ্য শুধু বিক্রির দিকে, বাজে ছবি বেচা আর বেশি লাভ করা। ছবি যেন আর ছবি নয়, জুতোর দোকানের বা মাছের বাজারের মাল। থিয়োর এটা লাগে সবচেয়ে বেশি।

    ভিনসেন্ট বলে—থিয়ো, নতুন মনিবদের আর কত তোষণ করবে? ছেড়ে মও না তোমার চাকরি!

    ক্লান্ত গলায় থিয়ো উত্তর দেয়—সব ছবির ব্যাবসাদারই সমান আজকাল। এতদিন আছি, কোথায় যাব এদের ছেড়ে?

    চুলোয় যাবে। দিনের পর দিন ওদের ওখানে তুমি শুকিয়ে উঠছ। ছাড়তেই হবে তোমার এই সর্বনেশে চাকরি। আমার কথা? ভেবো না ভেবো না, ঠিক ভেসে থাকব আমি। আচ্ছা থিয়ো, সারা প্যারিসে তরুণ ছবিওয়ালাদের মধ্যে সবচেয়ে তোমার নাম! নিজে একটা দোকান করো না কেন তুমি?

    নাঃ, আবার গোড়া থেকে সেই আলোচনা করতে হবে তোমার সঙ্গে!

    না, শোনো থিয়ো। চমৎকার একটা আইডিয়া আমার মাথায় এসেছে। এসো আমরা সবাই মিলে একটা কম্যুনিস্ট আর্টের দোকান খুলি। আমাদের সব ছবি আমরা তোমাকে দেব, তুমি দোকান চালাবে, আর যা লাভ হবে সকলে সমান ভাগে ভাগাভাগি করে নেব। প্যারিসে একটা দোকান খোলার মূলধন শিল্পীরাই জোগাড় করে দেবে, আর গ্রামে সস্তায় সবাই এক জায়গায় বসবাস করবে। কত কম খরচে থাকা যাবে ভাবো! আর এমনি একটা দোকান খুললে নতুন নতুন ছবিবিলাসীদের খদ্দের করা যাবেই।

    ভিনসেন্ট, ভয়ংকর মাথা ধরেছে আমার, শুতে চললাম এখন।

    ঘুমুতে চাও তো রবিবার আছে। আজ আমার কথা মন দিয়ে শোনো। কী, জামাকাপড় ছাড়বে? তা ছাড়ো, কিন্তু কানটা আমার কথায় রাখো। গুপিলের চাকরিতে তোমার প্রাণ ওষ্ঠাগত, এ-দিকে প্যারিসের এতগুলো তরুণ শিল্পী তোমার হাতের মুঠোয়, তবুও এ-সুযোগ তুমি নেবে না?

    পরদিন সন্ধ্যা বেলা লোত্রেক আর পিয়ের ট্যাঙ্গিকে নিয়ে ভিনসেন্ট বাড়ি ঢুকল। থিয়ো আসা করেছিল ভিনসেন্ট হয়তো রাত করেই ফিরবে, সে-আশায় পড়ল জলাঞ্জলি।

    পিয়ের ট্যাঙ্গির ছোটো ছোটো চোখ দুটো উৎসাহে পিটপিট করছে। থিয়োর হাত চেপে ধরে সে বলে উঠল—মশিয়েঁ ভ্যান গক, মশিয়েঁ ভ্যান গক, অপূর্ব আইডিয়া! এমনটি আর হয় না! কী মহৎ, কী বিরাট! করতেই হবে আপনাকে! আমি দোকান তুলে দিয়ে আপনাদের সঙ্গে থাকব। রং গুলব, ক্যানভাস ইস্ত্রি করব, ছবি বাঁধাই করব আমি। শুধু দু-বেলা দুটি খাবার আর থাকবার আশ্রয়টুকু দেবেন। আর কিছু চাইনে।

    দীর্ঘশ্বাস ফেলে হাতের বইটা নামিয়ে রাখল থিয়ো, বললে—আইডিয়া তো ভালো, কিন্তু টাকা কোথায় পাব? দোকান খোলা, বাড়ি ভাড়া নেওয়া, খোরাক জোগাড় করা, এসব হবে কোত্থেকে?

    চেঁচিয়ে উঠল ট্যাঙ্গি—এই তো আমি এনেছি! ধরুন, ধরুন হাত পেতে। দুশো কুড়ি ফ্র্যাঙ্ক, এতদিন যা-কিছু জমিয়েছি, সব। এই দিয়ে শুরু করুন।

    থিয়ো বললে—লোত্রেক, তুমি তো বেশ বিচক্ষণ লোক একজন, বলো তো, এমনি পাগলামির কোনো মানে হয়?

    পাগলামি কেন? আমার তো পরিকল্পনাটা খুব ভালোই লাগছে। পুরোনো সংস্কারের বিরুদ্ধে লড়াই না করে এখন তো আমরা নিজেদের মধ্যেই লড়াই করছি। কিন্তু একবার যদি আমরা সংঘবদ্ধ হতে পারি—

    বেশ তো। তোমার তো অনেক পয়সা। আরম্ভের খরচটা তুমিই দাও।

    তাহলে কী করে হবে? পরিকল্পনার মূলমন্ত্র হল সাম্য। আমি দেব, তবে ওই ট্যাঙ্গি যা দিয়েছে তা-ই, দুশো কুড়ি ফ্র্যাঙ্ক।

    পরিকল্পনা না হাতি! ব্যাবসার বাজারের কিছুটা ধারণা যদি তোমাদের থাকত—

    আবার থিয়োর দু-হাত চেপে ধরল ট্যাঙ্গি—মশিয়েঁ ভ্যান গক, অনুরোধ করছি আপনাকে, এমন আইডিয়াটাকে পাগলামি বলে উড়িয়ে দেবেন না। এটা আপনাকে সফল করে তুলতে হবেই হবে।

    ভিনসেন্ট বললে—আর তোমার পালাবার রাস্তা নেই থিয়ো, বাঁধা পড়েছ আষ্টেপৃষ্ঠে। আমরা সবাই মিলে যতটা সম্ভব টাকা তুলে তোমার হাতে দিচ্ছি। তোমাকে কর্তা বানাচ্ছি আমাদের। গুপিলের কথা ভুলে যাও। ওখানকার কাজ তোমার খতম। এখন থেকে তুমি আমাদের কম্যুনিস্ট আর্ট কলোনির ম্যানেজার। ঘর্মাক্ত কপালটায় থিয়ো একবার হাত বুলিয়ে নিল, ভালো করে কচলে নিল চোখ দুটো।

    বললে—কলোনি না চিড়িয়াখানা! মানসচক্ষে দেখতে পাচ্ছি, তোমাদের মতো বুনো জানোয়ার চরিয়ে আমি বেড়াচ্ছি দিনের পর দিন।

    পরদিন সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে থিয়ো দেখে, মস্ত মিটিং বসেছে। শিল্পীদের ভিড়। তামাকের ধোঁয়ায় ঘর অন্ধকার, হট্টগোলে প্রায় চিড় ধরে ঘরের দেয়ালে। হালকা একটা টেবিলের ওপর চড়ে বসেছে ভিনসেন্ট, সে-ই এই সভার মূল গায়েন।

    ঢুকতেই সে শুনল ভিনসেন্টের চিৎকার—না না, মাইনে আবার কী? টাকা ছোঁবে না কেউ অন্তত একটি বছর! থিয়ো শুধু ছবি বেচবে, আমরা পাব আহার, আশ্রয় আর ছবি আঁকার জিনিসপত্র।

    সিউরাত হাঁকলে—আর যাদের ছবি বিক্রি হবে না কোনোকালে? কতদিন তাদের আমরা পুষব?

    যতদিন তারা আমাদের সঙ্গে থাকতে চায়, একসঙ্গে কাজ করতে চায়। গগাঁ বললে—চমৎকার! সত্যিকারের চিড়িয়াখানা! সারা ইয়োরোপের যত অ্যামেচারের দল দোরগোড়ায় ভিড় করে আসবে তাহলে! এমন তোফা আরাম আর নিখরচায় মিলবে কোথায়?

    থিয়োর ওপর প্রথম চোখ পড়ল পিয়ের ট্যাঙ্গির। চিৎকার করে উঠল সে—এই তো মশিয়েঁ ভ্যান গক এসে গেছেন, জয়, আমাদের ম্যানেজারের জয়!

    জয়, ম্যানেজারের জয়! জয় বন্ধুপ্রবর থিয়ো ভ্যান গকের জয়!

    প্রত্যেকের অত্যন্ত উত্তেজিত অবস্থা। প্রত্যেকেরই কিছু-না-কিছু বলবার আছে। রুসোর প্রশ্ন, কলোনিতে গিয়ে সেখানে সে বেহালা বাজানো শেখাতে পারবে কি না, কেননা সেটা তার উপরি আয়ের পথ। আঁকোয়েতিন বললে—তাড়াতাড়ি চলো, কেননা তার তিন মাসের বাকি ভাড়া পড়ে আছে। সেজানের মত—কারও যদি অতিরিক্ত নিজস্ব টাকা থাকে, সে-টাকা খরচ করবার অধিকারও থাকবে। ভিনসেন্ট বললে—না, এ হলে সাম্যবাদের মৃত্যু। সবাইকার ভাগ সমান, আলাদা কিছু কারুর থাকলে চলবে না। লোত্রেক জানতে চায়—কলোনিতে থাকতে হলে ইচ্ছেমতো মেয়েমানুষ আমদানি করা চলবে কি না, সেখানেও সাম্যবাদ কি না? গগাঁ বললে—প্রত্যেকের অন্তত মাসে দুটো করে ছবি আঁকা চাই-ই চাই। সিউরাত বললে—মাপ করো তাহলে আমাকে, আমার একটা ছবি শেষ করতে এক বছর লাগে।

    পিয়ের ট্যাঙ্গি নতুন একটা প্রশ্ন তুলল—–আচ্ছা, রং আর ক্যানভাসও কি প্রত্যেকে হপ্তায় সমান ভাগে পাবে?

    ভিনসেন্ট বললে—তা কেন? সত্যিকারের যার যতটা আঁকার জিনিসপত্র দরকার ঠিক ততটাই পাবে। খাবারের মতো আর কি।

    বেশ, কিন্তু বাড়তি টাকাটা কী হবে? মানে, ছবি বিক্রি শুরু হবার পর টাকা তো আসবে, লাভ তো হবে, লাভটা পাবে কে?

    কেউ না। যেই হাতে কিছু টাকা জমবে, অমনি আর-একটা বাড়ি নেব ব্রিটানিতে। আরও কিছু জমলে প্রভেন্সে। এমনি করে আমাদের কেন্দ্রের সংখ্যা

    বেড়েই চলবে। ঘুরে ঘুরে বেড়াব আমরা যখন যেখানে খুশি।

    আচ্ছা, রেলভাড়াটা কে দেবে শুনি?-সেও কি ওই লাভ থেকেই? তা ছাড়া কে কতটা বেড়াবে, তার হিসেব করবে কে?

    ধরো, খুব ভালো সময়ে কোনো একটা কেন্দ্রে শিল্পীদের গাদাগাদি ভিড়। কে জায়গা পাবে, আর কে জায়গা না পেয়ে অন্য কেন্দ্রের সন্ধানে রেলে চাপবে এর হুকুম দেবে কে?

    থিয়ো আমাদের ম্যানেজার, থিয়ো জবাব দিক এসব প্রশ্নের। এই ধরো না কেন, সভ্য হবে কারা, নতুন সভ্য নেওয়া হবে কি না, যা খুশি আঁকবার স্বাধীনতা থাকবে কি না, যার যেমন খুশি মডেল আনতে পারবে কি না—এসব এখুনি ঠিক করে নিতে হবে বই কী।

    সভা ভঙ্গ হল শেষরাত্রে। থিয়ো শুতে গেল চারটের সময়, ভিনসেন্ট পিয়ের ট্যাঙ্গি প্রভৃতি সবচেয়ে উৎসাহীদের নির্দেশ কানে নিয়ে যে আগামী মাসের পয়লা তারিখেই তাকে গুপিলসয়ের চাকরিতে নোটিশ দিতে হবে।

    দিন যায়, উত্তেজনা বাড়ে। খবরটা ছড়িয়ে পড়ল সারা শহরে। সুপ্রতিষ্ঠিত শিল্পীরা যেমন সমালোচনায় মুখর হয়ে উঠছিল, তেমনি মুখর হল তরুণ শিল্পীরা উৎসাহদীপ্ত আলোচনায়। ভিনসেন্ট দিনরাত পাগলের মতো বকতে আর খাটতে লাগল। ব্যবস্থার, আর শেষ নেই, হাজার রকমের ব্যবস্থা। কোথা থেকে টাকা আসবে, কোথায় দোকান করা হবে, কীরকম দাম ধরা হবে এক-একটা ছবির, কারা কারা সভ্য হবে, গ্রামের আস্তানা কোথায় হবে, কারা পরিচালনা করবে ইত্যাদি ইত্যাদি। থিয়ো অনেকটা ইচ্ছার বিরুদ্ধেও শেষপর্যন্ত এই উত্তেজনায় গা ভাসিয়ে দিল। প্রত্যেক সন্ধ্যায় তার ফ্ল্যাটে ভিড় আর ভিড়। খবরের কাগজের রিপোর্টার আসে খবর কুড়োতে, চিত্রসমালোচকরা আসে নতুন আন্দোলন নিয়ে আলোচনা করতে, সারা ফ্রান্সের যত তরুণ শিল্পী প্যারিসে পৌঁছে আসে সভ্য হবার আবেদন জানাতে।

    থিয়ো যদি এই নব-আন্দোলনের রাজা, ভিনসেন্ট তাহলে রাজমন্ত্রী। সে-ই আসল সংগঠক। অসংখ্য পরিকল্পনা, প্রচারপত্র, হিসেব, আবেদন, ইতিহাস সে বার করতে লাগল, সারা ইয়োরোপে ছড়িয়ে দিল এই নতুন কম্যুনিস্ট আর্ট কলোনির খবর।

    এত কাজের মধ্যে একটি কাজ সে ভুলে গেল, সে-কাজ ছবি আঁকার কাজ।

    প্রতিষ্ঠানের তহবিলে প্রায় তিন হাজার ফ্র্যাঙ্ক জমা হল। শিল্পীরা তাদের শেষ কপর্দক পর্যন্ত তুলে দিল। বুলেভার্দ ক্লিচিতে একটা শিল্পমেলা বসল, প্ৰত্যেক শিল্পী সেখানে নিজের নিজের ছবি বিক্রি করতে বসল। ইয়োরোপের সব জায়গা থেকে চিঠি আসতে লাগল, কিছু কিছু অর্থসাহায্যও। প্যারিসের শিল্পরসিকরাও অনেকেই ভিক্ষার ঝুলিতে কিছু কিছু ফেলতে লাগলেন। এত সব ব্যাপারের প্রকৃত সম্পাদক বলতে ভিনসেন্ট, কোষাধ্যক্ষ বলতেও ভিনসেন্ট।

    থিয়ো জোর করল, পাঁচ হাজার ফ্র্যাঙ্ক সংগ্রহ হবার আগে সে নামতে রাজি নয়। রু ট্রঞ্চেটে একটা চমৎকার দোকানঘর সে ইতিমধ্যেই দেখে রেখেছে। মফস্সলে একটা বিরাট বাড়িও খুঁজে বার করেছে ভিনসেন্ট, স্বল্পতম ভাড়ায় যেটা মিলবে। সভ্যনামলোভীদের আবেদনের সঙ্গে সঙ্গে অসংখ্য ছবিও আসতে লাগল, রু লোপেকের ঘর ক-খানায় হাঁটাচলার জায়গা আর রইল না। এত স্বল্প পরিসরের মধ্যেই ওই ছোট্ট ফ্ল্যাটটিতে প্রতিদিন শত শত লোকের আনাগোনা। থিয়োর অত সাধের আসবাবগুলোর আর-কিছু রইল না। বাড়িওয়ালা এত হট্টগোল দেখে নোটিশ দিল থিয়োকে।

    দিনান্তে ভিনসেন্টের তার প্যালেটের কথা মনে পড়ে না। সময় কোথায়? মুহূর্তের বিশ্রাম নেই যে! কত চিঠি লিখতে হচ্ছে, কত লোকের সঙ্গে দেখাসাক্ষাৎ করতে হচ্ছে, প্রতিটি নতুন শিল্পীর প্রাণে যে জাগিয়ে তুলতে হচ্ছে এই নব শিল্প–আন্দোলনের উদ্দীপনা! চিৎকার করে করে গলা তার ভেঙে গেল, চোখে ফুটে উঠল জ্বরাক্রান্তের দৃষ্টি। আহার নিদ্রা ঘুচল। কেবল কাজ আর কাজ।

    বসন্তকালের গোড়ার দিকে পাঁচ হাজার ফ্র্যাঙ্ক জমল। থিয়ো ঠিক করল এবার চাকরিতে ইস্তফা দেবার সময় এসেছে। দোকানটা নেওয়া সে স্থির করল। ভিনসেন্ট গ্রামের বাড়িটার জন্যে অগ্রিম ভাড়া পাঠিয়ে দিল কিছু টাকা। থিয়ো, ভিনসেন্ট, পিয়ের ট্যাঙ্গি, গগাঁ আর লোত্রেক—এই পাঁচজনে মিলে প্রাথমিক সভ্যদের তালিকা প্রণয়ন করল। ছবির পাহাড় ঘেঁটে থিয়ো তার প্রথম প্রদর্শনীর চিত্র নির্বাচন করল। দোকানের ভেতরটা কে সাজাবে আর বাইরেটাই-বা কে—এই নিয়ে রুসো আর আঁকোয়েতিনের মধ্যে যাচ্ছেতাই ঝগড়া হয়ে গেল একদিন। থিয়োরও ঘুম নেই, ঘুম নেই বলে দুঃখও নেই। ভিনসেন্টের মতো সেও লেগেছে প্রাণপণে আহার নিদ্রা ত্যাগ করে। গরমকাল পড়তে-না-পড়তেই কলোনির প্রতিষ্ঠা হবে, সেইসঙ্গে প্যারিসের দোকানেরও।

    একদিন সারারাত্রির পরিশ্রমের পর একান্ত ক্লান্তিতে ভিনসেন্ট ভোরের দিকে ঘুমিয়ে পড়ল। থিয়ো অফিসে বার হবার সময় তাকে ডাকল না। ঘুম ভাঙল, একেবারে দুপুর বেলা। পায়ে পায়ে সে তার স্টুডিয়োতে গেল। ইজেলের ওপর কতদিন থেকে একটা ক্যানভাস লটকে রয়েছে। প্যালেটের রংগুলো শুকনো, ধুলোপড়া। রঙের টিউবগুলো ছত্রাকার হয়ে পড়ে রয়েছে ঘরের এক কোণে মেঝেতে। শুকনো রংমাখা নোংরা তুলিগুলো এদিক-ওদিক ছড়ানো

    অন্তরের অন্তস্তল থেকে উঠল একটি নীরব প্রশ্ন—শোনো একটি কথা। বলো তো, কে তুমি? শিল্পী? না সাম্যবাদী সংগঠক?

    গাদা গাদা ক্যানভাস সারা ঘরে। শিল্পীনামলোভী সভ্যপদপ্রার্থীদের আঁকা। সব ছবি সে কুড়িয়ে নিয়ে থিয়োর শোবার ঘরে ফেলে রেখে এল। রইল শুধু নিজের আঁকা ছবিগুলো। একটা একটা করে ছবিগুলো সে ইজেলে দাঁড় করিয়ে দেখতে লাগল নিবিষ্ট মনে, সমালোচকের দৃষ্টিতে। ব্যস্ততার তার শেষ নেই, তবু একলা ঘরে নির্জন দুপুরে বয়ে যেতে লাগল হিসাববিহীন সময়

    হ্যাঁ, সত্যি সে উন্নতি করছিল বই কী, এগিয়ে চলছিল নির্ভুল পথে। রং তার হালকা হয়ে আসছিল, ক্রমে যেন তার সৃষ্টির দিগন্তে নেমে আসছিল আকাশের ঔজ্জ্বল্য। অনুকরণের চিহ্নও তো নেই। যে-লোক একদা ভেবেছিল অন্য শিল্পীদের অনুকৃতির মধ্যে দিয়েই সুলভ শিক্ষাকে সম্পূর্ণ করবে, তার সৃজনশৈলীতে একাত্ত ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্যের সুস্পষ্ট প্রকাশ। এর নবীনত্বে নিজেই সে বিস্মিত হয়ে গেল। এসব কার হাতের কাজ? তার নিজের!

    ইম্প্রেশনিজময়ের যা মৌলিক গুণ তা সে নিজের মধ্যে গ্রহণ করেছে, কিন্তু নিজেকে হারিয়ে ফেলেনি তারই মধ্যে। তার অঙ্কনপদ্ধতি ক্রমে ক্রমে প্রকাশিত হচ্ছে বিচিত্র একটা ধরনে, একান্ত স্বকীয় বিশিষ্টতায়।

    একেবারে শেষের দিকে আঁকা ক্যানভাসগুলো ইজেলে রেখে প্রায় চিৎকার করে উঠল সে। প্রায় সে ধরে ফেলেছে নিজের একটা বিশিষ্ট পদ্ধতিকে, সুপ্ত প্রতিভার উন্মেষের নীরব সাড়া যেন চুপি চুপি প্রকাশ হয়ে চলেছে ওই ছবিগুলোর মধ্যে।

    অনেকদিন সে কাজ করেনি। নৈর্ব্যক্তিক দৃষ্টি দিয়ে সে তাই তার কাজ দেখতে পারছে। বুঝতে পারছে, পথ সে পেয়েছে, হবে তার।

    আরশিতে ভালো করে নিজের চেহারাটা দেখল ভিনসেন্ট। দাড়ি ছাঁটা দরকার, চুল কাটা দরকার, বদলানো দরকার ময়লা পোশাক। পরনের সুটটা সে ভালো করে ইস্ত্রি করে নিল, পরল থিয়োর একটা ফরসা শার্ট। পকেটে পাঁচটা ফ্র্যাঙ্ক নিয়ে গেল নাপিতের দোকানে। পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন হয়ে আস্তে আস্তে হাঁটতে শুরু করল মোমার্ত বুলেভার্দ, একেবারে থিয়োর গুপিল গ্যালারি পর্যন্ত।

    থিয়ো, আমার সঙ্গে একটু সময়ের জন্যে বাইরে আসতে পারবে?

    কী হল তোমার?

    কিছু না। টুপিটা নাও, বাইরে চলো। কাছাকাছি কোথাও একটা কাফে-নেই যেখানে নিরিবিলি কথা বলা যায়?

    কাফের পেছন দিকের নিভৃত কোণের বেঞ্চিতে বসে থিয়ো বললে, জানো ভিনসেন্ট, বোধ হয় মাস খানেক পরে তোমার সঙ্গে এই একলা বসে কথা বলছি!

    জানি, জানি। বোকা আমি!

    এ-কথা কেন বললে?

    থিয়ো, একটা প্রশ্নের জবাব দাও। আমি কী? শিল্পী, না সাম্যবাদী সংগঠক?

    তার মানে?

    শিল্পীদের এই কলোনিটা বানাতে এত আমি খাটছি যে, আমিও যে আঁকি সে-কথা ভুলে গেছি। আর, একবার যদি বাড়িটা নেওয়া হয়, তারপর তো আর

    রক্ষা থাকবে না!

    তা বটে, কথাটা সত্যি।

    থিয়ো, আমার কথা শোনো। আমি শিল্পী, আমি আঁকতে চাই। গত ক-বছর ধরে যে-পরিশ্রম আমি করেছি, তা অপর আঁকিয়েদের মেস-ম্যানেজার হবার জন্যে নয়। নিজের রং, নিজের তুলির তৃষ্ণায় বুক আমার শুকিয়ে এসেছে। ইচ্ছে হচ্ছে কালই আমি প্যারিস ছেড়ে পালাই।

    কিন্তু ভিনসেন্ট, এতটা এগিয়ে—

    বলিনি তোমাকে, বোকা আমি! নিরেট বোকা। শুনবে পুরোপুরি আমার স্বীকারোক্তি?

    বলো।

    এই শহর আমার অসহ্য হয়ে উঠেছে, এখানকার অন্য সব শিল্পীদের আমার অসহ্য লাগছে। আর একমুহূর্ত যেন আমি সইতে পারছিনে তাদের বক্তৃতা, তাদের থিয়োরি, তাদের ঝগড়াঝাঁটি, আত্মপ্রশংসা আর পরনিন্দা। হেসো না থিয়ো, জানি, আমিও এদেরই দলে নাম লিখিয়েছি। কিন্তু চোখ আমার ফুটেছে। মভ একটা দামি কথা বলেছিল—কেউ হয়তো ছবি আঁকে, আর কেউ ছবি নিয়ে কথা বলে, কিন্তু দু-কাজ একসঙ্গে কেউ পারে না। থিয়ো, তুমিই বলো, এই সাতটা বছর তুমি যে আমার ভরণ-পোষণ করছ, সে কি আর্ট নিয়ে খুব মাতব্বরি তর্ক করতে আমি শিখব তাই বলে?

    কিন্তু এই কলোনির জন্যে তুমি অনেক দামি কাজ করেছ ভিনসেন্ট!

    হ্যাঁ, এইবার সময় এসেছে কলোনিতে উঠে যাবার। ঠিক এই মুহূর্তে আমার মনকে আমি বুঝতে পারছি। আমি যেতে চাইনে। ওই আড্ডায় থেকে আর কোনো কাজ আমি করে উঠতে পারব না। থিয়ো, আমার মনের কথা তোমাকে বুঝিয়ে বলতে পারব কি না জানিনে….কিন্তু যে করে হোক, বুঝতে তোমাকে হবেই।…পারবে না? মনে করো আমি যখন একলা হেগ-এ বা ব্রাবান্টে থাকতাম, সঙ্গীসাথি কেউ ছিল না, নিজেকে মনে হতো একটা প্রয়োজনীয় লোক। আমি যেন একলা একটা মানুষ, সারা দুনিয়ার সমস্ত শত্রুতার বিরুদ্ধে লড়াই করছি। আমি শিল্পী, একমাত্র শিল্পী। যা-কিছু আঁকছি তার প্রত্যেকটির দাম আছে, একদিন-না-একদিন পৃথিবী আমাকে স্বীকার করতে বাধ্য হবেই, মানতেই হবে, হ্যাঁ, লোকটা অপূর্ব একটা আঁকিয়ে।

    আর এখন?

    হায় রে হায়! এখন আমি কোথায়? অগণিতের ভিড়ে হারিয়ে গেছি। আমার চারদিকে প্রতিমুহূর্তে একশো ছবি-আঁকিয়ের ভিড়, ওরা সবাই যেন আমাকে বিদ্রুপ করছে। ভেবে দেখো, আমাদের কলোনিতে যোগ দেবার জন্যে কত আঁকিয়ে কত গাদা গাদা ছবি পাঠিয়েছে। ওরা সবাই ভাবছে মস্ত শিল্পী হবে প্রত্যেকে। আজ আমার আর কোনো নিজস্ব সত্তা নেই, ওদেরই অন্যতম হয়ে গেছি। আমিও কি মস্ত শিল্পী হব কোনোদিন? কে জানে? আমিও তো ওদেরই একজন। ভরসা কোথায় আর আমার? এত মূর্খ যে আছে, যারা অলীক স্বপ্ন দেখে ব্যর্থ জীবনের বোঝা বয়ে চলে, আগে আমি জানতাম না। প্যারিসে এসে জানলাম। তাই এত আশঙ্কা, এত আতঙ্ক।

    কীসের ভয় তোমার? ওদের সঙ্গে কী সম্বন্ধ তোমার?

    কিছুই না। তবু ভয়। একবার আত্মবিশ্বাসের ভিত নড়েছে, সেই দুর্বলতাটা ঘুচবে না কিছুতেই। গ্রামের মধ্যে একলা যখন থাকি, ভুলে থাকি যে পৃথিবীতে প্রতিদিন হাজার হাজার ছবি আঁকা হচ্ছে। ভাবি যে-ছবিটি আমি আঁকছি শুধু সেইটির কথা, মনে হয় আমার শিল্প পৃথিবীর হাতে সুন্দরতম* উপহার। যত খারাপই হোক না আমার কাজ, তবু গ্রামে বসে মায়া নিয়ে মতিভ্রম নিয়েই হয়তো কাজ করে যেতে পারতাম। কিন্তু এখন? বুঝতে পারছ না আমার কথা, থিয়ো?

    বুঝছি বই কী ভিনসেন্ট।

    তা ছাড়া দেখো, শহরের শিল্পী আমি নই। এখানকার কেউ আমি নই। কৃষাণজীবন নিয়ে আমার কারবার, আমার সেই দিগন্তজোড়া শস্যের খেতে আমি ফিরে যেতে চাই। সেখানকার মুক্ত আকাশের দুরন্ত রোদ আমার মনের সবকিছু আবর্জনা জ্বালিয়ে পুড়িয়ে খাক করে দেবে, শুধু শিল্পসাধনার একান্ত আগ্রহটি ছাড়া। আস্তে আস্তে থিয়ো বললে—তার মানে….তুমি….এই প্যারিস থেকে চলে যেতে চাও?

    হ্যাঁ, যেতেই হবে আমাকে, থিয়ো।

    আর, এই কলোনির কী হবে?

    আমি নাম কাটিয়ে দেব। তুমি এটাকে গড়ে তোলো।

    থিয়ো মাথা নাড়ল—না, তুমি না থাকলে আমি নেই।

    কেন থিয়ো?

    জানিনে। তোমার জন্যেই আমি এর পেছনে খেটে চলেছিলাম, তুমি চেয়েছিলে বলেই।

    কিছুক্ষণ চুপ করে রইল দুজনে, একটু পরে ভিনসেন্ট বললে—তুমি এখনও চাকরিতে নোটিশ দাওনি, না?

    না। পয়লা তারিখে দেব ভেবেছিলাম।

    যে যে টাকা দিয়েছে, তাদের তাদের টাকা ফিরিয়ে দিলেই চলবে।

    হ্যাঁ, তা চলবে। কবে তুমি যেতে চাও?

    দেরি করব না, প্যালেটটা আর-একটু হালকা হলেই বিদায় নেব।

    ও!

    কোথায় যাব জানিনে। হয়তো দক্ষিণে। সমুদ্রের ধারে কোনো অজানা জায়গায়। যেখানে আমি আবার একলা হতে পারব, সবকিছু ছেড়েছুড়ে আবার শুধু আঁকতে পারব, সেখানে খুঁজে খুঁজে আবার ফিরে পাব নিজেকে।

    ভিনসেন্ট দু-হাত বাড়িয়ে থিয়োর কাঁধ দুটো জড়িয়ে ধরল—থিয়ো, বলো, তুমি আমাকে ঘেন্না করো না? তোমাকে এতদূর টেনে এনে সব নষ্ট করে দিয়ে আমি সরে পড়ছি, বলো রাগ করবে না এতে আমার ওপর?

    ম্লান করুণ হাসি হাসল থিয়ো—ঘেন্না করব! তোমাকে? রাগ করব তোমার ওপর?

    ভিনসেন্টের ডানহাতটিতে ছোট্ট একটু চাপড় মেরে সে উঠে দাঁড়াল। বললে—পাগল! বুঝেছি বই কী আমি! তুমিই ঠিক। চলে যাবে বই কী। নিশ্চয়! নাও, গেলাটা শেষ করে নাও। আমাকে গুপিলসে আবার ফিরে যেতে হবে।

    [tab title=”তের”]

    কোথায় যাব? কোথায় গেলে আবার ফিরে পাব আমাকে? শিল্পলক্ষ্মী কেন ছুঁয়ে ছুঁয়ে দূরে সরে যায় অধরা মায়াবিনীর মতো? কবে সে ধরা পড়বে আমার রেখার বন্ধনে, রঙের ইন্দ্রজালে!

    ছটফট করে ভিনসেন্ট। একমাস কেটে গেল, একমাস আগে আহ্বান এসেছে, তবু সে এখনও বন্দি।

    থিয়োই কথা বললে—বুঝেছি, পেয়েও হারাচ্ছ যেন, তা-ই না? কী যেন পথ আগলে দাঁড়িয়ে আছে, তা-ই না! আমি জানি এর কারণ

    জানো? জানো থিয়ো? কী বলো তো?

    যা ভেবেছিলে তা-ই। প্যারিস।

    প্যারিস?

    হ্যাঁ! প্যারিস তোমার আঁকা শেখার ইস্কুল। যতদিন এখানে থাকবে ইস্কুলের ছাত্র হয়েই থাকবে। আমাদের হল্যান্ডের ইস্কুলের কথা মনে আছে? সেখানে শুধু শিখেছিলাম কী করে কী করতে হয় আর লোকে কী কী করে। নিজেরা কিন্তু কিছু করিনি।

    আর-একটু স্পষ্ট করে বলো।

    নিজে যখন সত্যিকারের কিছু করবে তার আগে মাস্টারের সাহচর্য ঘুচিয়ে দিতে হবে। যতদিন ছাত্রবৃত্তি, ততদিন শিক্ষা, সাধনা নয়, সৃষ্টি তো নয়ই। তুমি চলে গেলে কতটা ফাঁকা লাগবে আমার সে আমিই জানি, তবু তোমাকে যেতে হবে। পৃথিবীতে তোমার নিজের একটা জায়গা তুমি পাবেই, আর সে জায়গা তোমার নিজেকেই খুঁজে নিতে হবে। কিন্তু যত শীঘ্র পারো এই পাঠশালার গলি তোমার না ভুললে চলবে না।

    জান ভাই, কোন দেশের কথা আজকাল আমার কেবলই মনে পড়ছে?

    বলো।

    আফ্রিকা।

    আফ্রিকা!

    হ্যাঁ। সেখানকার আকাশে জ্বলন্ত সূর্য, কুয়াশা-জড়ানো নয় সেখানকার রোদ। এই জঘন্য দীর্ঘ শীত সেখানে অজানা। সেখানেই দেলাক্রোয়া তার রং খুঁজে পেয়েছিল, আমিও সেখানে হয়তো খুঁজে পাব আমাকে।

    আফ্রিকা, সে যে অনেক দূর!

    শোনো থিয়ো, সূর্যকে আমি চাই, যে-সূর্যের প্রচণ্ড উত্তাপ আর প্রচণ্ড শক্তি, সমস্ত সৃষ্টি সমস্ত জীবন যে-শক্তিতে নিত্য উদ্ভাসিত। প্যারিসের এই শীত, এ আমার প্যালেটে বাসা বেঁধেছে। সারা শীতকাল ধরে আমি খালি দক্ষিণ দেশের কথা ভেবেছি, বিষুবরেখা আমাকে যেন চুম্বকের মতো টেনেছে। তুমি বলছ প্যারিসে আমার আত্মবিকাশের কোনো রাস্তা নেই। জ্বলন্ত সূর্যের নীচে সূর্যমুখীর মতো বিকশিত হতে চাই আমি। আমার বুকের মধ্যে শীত জমে আছে, সেই শীতকে আফ্রিকার সূর্য ছাড়া কে তাড়াবে? আগুন লাগিয়ে কে দেবে আমার প্যালেটে?

    আমার মনে হচ্ছে তোমার কথাই ঠিক। দাঁড়াও, ভেবে দেখি—বললে থিয়ো।

    .

    পল সেজান প্যারিস থেকে বিদায় উপলক্ষ্যে বন্ধুদের একটা পার্টি দিল। বাপের আনুকূল্যে এক্সের পাহাড়ে সে কিছুটা জমি কিনেছে, সেখানে স্টুডিয়ো বানিয়ে থাকবে।

    ভিনসেন্টকে সে বললে—তুমি প্যারিস ছাড়ো ভিনসেন্ট, প্রভেন্সে চলো। অবশ্য এক্স নয়, সেটা আমার এলাকা, তবে কাছাকাছি আর কোনো জায়গায়। অমন রোদ আর দুনিয়ায় কোথাও পাবে না। আমি এই যে যাচ্ছি, আর ফিরছিনে।

    গগাঁ বললে–এর পরে আমার পালা। আমি আবার ট্রপিকসে ফিরে যাব। প্রভেন্সের রোদের কথা বলছ, মারকোয়েসাসের সূর্যকে তোমার ওই প্রভেন্সে বসে কল্পনাও করতে পারবে না। ওখানকার যারা অধিবাসী তারা যেমন আদিম, ওখানকার সূর্যও তেমনি আদিম।

    সিউরাত বললে—আমিও তো দেখছি তোমাদের মতো সূর্য-উপাসকদের দলে যোগ দিলেই ভালো হয়!

    ভিনসেন্ট বললে—আমিও চলছি, আমি যাব আফ্রিকায়।

    লোত্রেক বললে অস্ফুট স্বরে—বটে, বটে! তাহলে দু-নম্বর দেলাক্রোয়া গজাবে আর কি!

    গগাঁ শুধোলে—ভিনসেন্ট, সত্যি?

    সত্যি। আজ না হোক, দু-দিন পরে, যাবই। সূর্যটাকে সইয়ে নেবার জন্যে ক-দিন ওই প্রভেন্সেই কোথাও গিয়ে থাকা উচিত, তা-ই না?

    সিউরাত বললে—মার্সাই বাদ দিয়ে, ওটা মস্তিচেলির জায়গা।

    ভিনসেন্ট বললে—ওই তো মুশকিল। এক্স বাদ দিয়ে, ওটা সেজানের। আম্ভিবিসয়ে যাবার উপায় নেই, ওটা মনে-র জায়গা বলে বিখ্যাত। কোথায় যাই তাহলে?

    দাঁড়াও! লোত্রেক বলে উঠল—আমি একটা জায়গার নাম বলতে পারি। আর্লস-এর কথা ভেবে দেখেছ?

    আর্লস? পুরোনো একটা রোমান জনপদ, তা-ই না?

    হ্যাঁ, ঠিক রোন নদীর ওপর। মার্সাই থেকে ঘণ্টা দুয়েকের রাস্তা। আমি একবার গিয়েছিলাম। ওখানকার ল্যান্ডস্কেপের রং দেলাক্রোয়ার রংকে লজ্জা দেবে।

    সত্যি বলছ? সূর্যটা কেমন?

    সূর্য? তোমাকে পাগল বানাবার মতো। আর তা ছাড়া আর্লস-এর মেয়ে! আহা! সারা দুনিয়ায় এমন জবর মেয়ে আর কোথাও মিলবে না ভায়া! মুখে-চোখে সেই প্রাচীন গ্রিক ভাস্কর্য, যেন চিকন করে পাথর কুঁদে কাটা। চেহারাটা কিন্তু ঠিক রোমানদের মতো—হাত, পা, বুক–একেবারে খাসা জিনিস! এদিকে আবার গায়ের গন্ধ কেমন জান? একেবারে পূর্ব দেশের। সত্যিকারের যে ভেনাস তার দেখা আজও ওই আর্লসেই মিলবে।

    খুব লোভ দেখাচ্ছ যে! ভিনসেন্ট বললে।

    বাপু, তোমার আমার নয়, দেবতাদের লোভ লাগে। এর ওপর আবার যখন ঝড়ের ঝাপট খাবে, তখন তো বুঁদ হয়ে যাবে!

    ঝড়ের ঝাপট! সেটা কীরকম?

    আগে যাও। গেলেই টের পাবে।

    তা ছাড়া থাকা-খাওয়া কেমন? সস্তা?

    ওই থাকা আর খাওয়া। তা ছাড়া আর খরচ নেই। অতএব এর চাইতে সস্তা আর কী চাও?

    আর্লস—বিড়বিড় করে ভিনসেন্ট বললে—আর্লস, আর আর্লসের মেয়ে মন্দ কী?

    জ্বালা ধরানো মদের মতো প্যারিস, যেন উত্তেজক নেশা। আবসাঁতের পর আবসাঁত, আড্ডার পর আড্ডা, তর্কের পর তর্ক। আর, কত কাজ! প্যারিসের জীবন যেন স্নায়ুবিকার

    মন বলে, পালাও, চলো কোনো নিভৃত নির্জনে যেখানে জীবনের সমস্ত আবেগকে একটি স্রোতে ঢেলে দিতে পারবে, সে-স্রোত শিল্পধারার। প্যারিসের জীবন যেন অপরিণত ফল। চলো সূর্যের দেশে, এ-ফল রসালো হয়ে উঠুক সুপক্ক পরিপূর্ণতায়। এত দীর্ঘদিনের সাধনা, এত দুঃখদৈন্যব্যথিত তপশ্চর্যা, এর প্রতিদান আর দূরে নেই, ভাগ্যের সার্থক প্রসাদ আসন্ন। তবে কেন পথভ্রষ্ট হওয়া, তবে কেন লক্ষ্যহীনতার কাছে আত্মসমৰ্পণ!

    ছেড়েই যাব প্যারিস, যাব তপস্যার অরণ্যে। এখানে নিশ্চিন্ত জীবনযাত্ৰা, আছে নিৰ্ভয়, আছে বন্ধুত্ব, ভালোবাসা, থিয়োর কাছে একান্ত নির্ভর আশ্রয় আছে। ক্ষুধার অন্ন আর ছবি আঁকার জিনিসপত্রের অভাব কখনও হবে না। কখনও ভাটা পড়বে না থিয়োর সহানুভূতিতে।

    কিন্তু প্যারিস থেকে যদি বিদায় নিই আবার জীবনের পথ হবে বন্ধুর। আবার অভাব। দু-বেলা আহার হয়তো জুটবে না, হাতে পয়সা থাকবে না রং কিনবার মতো, নোংরা হোটেলে কাফেতে যাযাবরের মতো দিন কাটবে, শুষ্ক দুটি ঠোঁট বন্ধুহীন জগতে ভাষা খুঁজে মরবে।

    পরদিন লোত্রেক আবার বললে—দ্বিধা কোরো না ভায়া, সত্যিই যদি যাবে তো আর্লসেই যাও। শিল্পীর স্বর্গ ও-জায়গাটা। এই প্যারিস যদি আমাকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে না রাখত, আমিও যেতাম।

    সে-দিন সন্ধে বেলা দু-ভাই গেল ভাগনারের একটা কনসার্ট শুনতে। সকাল-সকাল বাড়ি ফিরে এল, নিরালা ঘরে মুখোমুখি বসে গল্প করল অনেকক্ষণ। ছেলেবেলাকার কত স্মৃতি নিয়ে টুকরো টুকরো গল্প।

    পরদিন ভোর বেলা উঠে ভিনসেন্ট ব্রেকফাস্ট তৈরি করল। থিয়ো খেয়েদেয়ে অফিস যাবার পর সে সারা বাড়িটাকে খুব ভালো করে ধুয়ে মুছে পরিষ্কার করল। সযত্নে দেয়ালে টাঙাল নিজের আঁকা কয়েকটি ছবি।

    দিনের শেষে থিয়ো শূন্য ঘরে ফিরে দেখল, টেবিলের ওপর একখানা চিঠি–

    ভাই থিয়ো,

    আর্লসেই গেলাম। পৌঁছে চিঠি দেব আবার। দেয়ালে ক-টি ছবি টাঙিয়ে গেলাম, যাতে আমাকে না ভোল।

    মনে মনে আমার আলিঙ্গনটি নাও।

    ভিনসেন্ট

    [tabend]

  • বুদ্ধ অথবা কার্ল মার্কস

    বুদ্ধ অথবা কার্ল মার্কস

    [book-name]

    ড. বি. আর. আম্বেদকর

    অনুবাদ : অদিতি ফাল্গুনী

    প্রকাশক – ঐতিহ্য

    রুমী মার্কেট ৬৮-৬৯ প্যারীদাস রোড

    বাংলাবাজার ঢাকা ১১০০

    প্রকাশকাল – মাঘ ১৪২৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৩

    প্রচ্ছদ – ধ্রুব এষ

    BUDDHU OTHOBA KARL MARX by Dr. B. R.Ambedkar

    Translated by Audity Falguni

    Published by Oitijjhya

    Date of Publication : February 2023

    উৎসর্গ

    শারমিন মুরশিদ

    এদেশের উন্নয়ন সংগ্রামে যিনি নিরন্তর ব্রতী

    তাপস রায়

    নিষ্ঠাবান সাংবাদিক ও প্রিয় অনুজ

  • তিতাস একটি নদীর নাম

    তিতাস একটি নদীর নাম

    অদ্বৈত মল্লবর্মণ

    [book]

    তিতাস একটি নদীর নাম অদ্বৈত মল্লবর্মণ রচিত বিখ্যাত উপন্যাস। এই একটি উপন্যাস লিখে লেখক খ্যাতি অর্জন করেন। এই উপন্যাসে গ্রামের দরিদ্র মালো শ্রেণীর লোকজনের দুঃখ-দুর্দশার কাহিনী ফুটিয়ে তুলেছেন। পরবর্তীকালে এই উপন্যাস অবলম্বনে চলচ্চিত্র নির্মিত হয়।

    ইতিহাস

    প্রথম প্রকাশ আশ্বিন ১৩৬৩

    ২০৬, বিধান সরণি, কলিকাতা-৬, পুথিঘরের পক্ষে শ্রীঅনিলকুমার ভট্টাচার্য কর্তৃক প্রকাশিত ও ৬ শিবুবিশ্বাস লেন, কলিকাতা-৬, তাপসী প্রিণ্টিং ওয়ার্কস হইতে অসিত সরকার কর্তৃক মুদ্রিত।

    দ্বিতীয় প্রকাশ আশ্বিন, ১৩৬৫

    প্রচ্ছদশিল্পী রণেন আয়ন দত্ত

    (ব্লকনির্মাতা রণজিৎ প্রসেস এ্যাণ্ড প্রিণ্টিং ইণ্ডাষ্ট্রিজ)

    ইণ্ডিয়ান ফোটো এনগ্রেভিং কোং প্রাইভেট লিঃ, ২৮ বেনিয়াটোলা লেন, কলিকাতা-৯ হইতে শ্রীদ্বিজেন্দ্রলাল বিশ্বাস কর্তৃক মুদ্রিত ও ২২ কর্ণওয়ালিস ষ্ট্রীট, কলিকাতা-৬ পুথিঘরের পক্ষ হইতে শ্রীসতীশ রায় কর্তৃক প্রকাশিত। দাম সাড়ে ছয় টাকা।

    প্রথম সংস্করণ হইতে পুনর্মুদ্রিত

    তিতাস একটি নদীর নাম উপন্যাসটি প্রথমে মাসিক পত্রিকা মোহাম্মদীতে প্রকাশিত হয়েছিল। কয়েকটি অধ্যায় মোহাম্মদীতে মুদ্রিত হবার পর উপন্যাসটির মূল পাণ্ডুলিপি রাস্তায় হারিয়ে যায়। বন্ধু-বান্ধব ও অত্যাগ্রহী পাঠকদের আন্তরিক অনুরোধে তিনি পুনরায় কাহিনীটি লেখেন। কাঁচড়াপাড়া হাসপাতালে ভর্তির আগে এই গ্রন্থের পাণ্ডুলিপি বন্ধু-বান্ধবকে দিয়ে যান।1 অদ্বৈত মল্লবর্মণের মৃত্যুর কয়েক বছর পর তিতাস একটি নদীর নাম শিরোনামের এই উপন্যাসটি প্রথম গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। উপন্যাসের কাহিনীকে উপজীব্য করে চলচ্চিত্রস্রষ্টা ঋত্বিক কুমার ঘটক ১৯৭৩ খ্রিষ্টাব্দে তিতাস একটি নদীর নাম শিরোনামে চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। এ চলচ্চিত্র নির্মাণে আগ্রহের কারণ হিসেবে ঋত্বিক ঘটক বলেন:

    তিতাস পূর্ব বাংলার একটা খণ্ডজীবন, এটি একটি সৎ লেখা। ইদানীং সচরাচর বাংলাদেশে (দুই বাংলাতেই) এ রকম লেখার দেখা পাওয়া যায় না। এর মধ্যে আছে প্রচুর নাটকীয় উপাদান, আছে দর্শনধারী ঘটনাবলী, আছে শ্রোতব্য বহু প্রাচীন সঙ্গীতের টুকরো – সব মিলিয়ে একটা অনাবিল আনন্দ ও অভিজ্ঞতার সৃষ্টি করা যায়। ব্যাপারটা ছবিতে ধরা পড়ার জন্য জন্ম থেকেই কাঁদছিল। … অদ্বৈতবাবু অনেক অতিকথন করেন। কিন্তু লেখাটা একেবারে প্রাণ থেকে, ভেতর থেকে লেখা। আমি নিজেও বাবুর চোখ দিয়ে না দেখে ওইভাবে ভেতর থেকে দেখার চেষ্টা করেছি। অদ্বৈতবাবু যে সময়ে তিতাস নদী দেখেছেন, তখন তিতাস ও তার তীরবর্তী গ্রামীণ সভ্যতা মরতে বসেছে। বইয়ে তিতাস একটি নদীর নাম। তিনি এর পরের পুণর্জীবনটা দেখতে যাননি। আমি দেখাতে চাই যে, মৃত্যুর পরেও এই পুণর্জীবন হচ্ছে। তিতাস এখন আবার তারুণ্যে উজ্জীবিত। আমার ছবিতে গ্রাম নায়ক, তিতাস নায়িকা।2

    কাহিনী

    উপন্যাসটি ৪টি অংশে বিভক্ত এবং প্রত্যেকটি অংশে ২টি করে উপ-অংশ রয়েছে। অর্থাৎ মোট ৮টি অংশে উপন্যাসটি বিস্তৃত।

    তিতাস একটি নদীর নাম

    তিতাস নদীর উৎপত্তি মেঘনা নদী থেকে। মেঘনার জল নদীর এক পাড় ভেঙে জঙ্গল, মাঠ, ময়দানের ভেতর দিয়ে ঘুরে আবার মেঘনায় এসে পড়েছে। মেঘনা থেকে উদভূত এই ধারাই তিতাস নদী নামে পরিচিত। কাহিনীর সুচনাকালে তিতাসকে একটি জলভরা নদী হিসেবে লেখক বর্ণনা করেছেন। সারা বছরেই তিতাসের বুকে জল থাকে। তিতাস থেকে তেরো মাইল দূরে একটি নদী আছে বিজয় নামে। বিজয় নদীতে বর্ষাকাল ছাড়া জল প্রায় থাকে না এবং সেই কারণে বিজয় নদীর তীরে বসবাসকারী মালোদের আর্থিক ও শারীরিক অবস্থা খুবই দৈন্য। এইরকমই আর্থিক অনটনে ক্লিষ্ট দুই ভাই গৌরাঙ্গ ও নিত্যানন্দ বিজয়নদীর তীরে বাস করত। গৌরাঙ্গের বউ অনাহারে মারা গিয়েছিল। নিত্যানন্দের বউ ও দুই ছেলেমেয়ে ছিল। গৌরাঙ্গ তার দাদাকে পরামর্শ দেয় নয়ানপুরের ধনী বোধাই মালোর হয়ে খাটার জন্য। অন্যদিকে জমিলা বলে একজন নববধু তার স্বামী ছমির মিয়ার সঙ্গে বাপের বাড়ি থেকে শ্বশুর বাড়িতে ফেরে নৌকা করে। আসবার পথে সে মালোপাড়ার ঘাটে একটি মেয়েকে দেখে এবং সই হিসেবে বন্ধুত্ত্ব পাতানোর আশা করে।

    প্রবাস খণ্ড

    বাসন্তী তার মাকে ডেকে বলে, “মা, ওমা, দেখ সুবলদাদা কিশোরদাদার কাণ্ড! আমি চৌয়ারি জলে ছাড়তে না ছাড়তে তারা দুইজনে ধরতে গিয়ে কি কাইজ্যা। এ কয় আমি নিমু, হে কয় আমি নিমু। ডরে আর কেউ কাছেও গেল না। শেষে কি মারামারি। আমি কইলাম, দুই জনে মিল্যা বানাইছ দুই জনে নিয়া রাইখ্যা দাও। মারামারি কর কেনে?”

    — “তিতাস একটি নদীর নাম”

    তিতাসের পাড়ে বসবাসী মালোদের মধ্যে একজন ছিল দীননাথ মালোর কমবয়েসী মেয়ে বাসন্তী। বাসন্তীর গ্রামেই ছিল কিশোর আর সুবল নামে দুজন ডানপিটে কমবয়েসি ছেলে। তারা দুইজনে মিলে বাসন্তীর মাঘমণ্ডল ব্রতর জন্য চৌয়ারির বানিয়ে দেয়।3 সুবলের বাবা মারা যাওয়ায় সে কিশোরের সঙ্গে নদীতে জাল বাইতো। কিশোর সুবলের থেকে তিন বছরের বড় ছিল। কিন্ত তারা ছোটবেলা থেকেই পরস্পরের বন্ধু। একদিন কিশোরের বাবা কিশোর ও সুবলকে প্রবীণ জেলে তিলকচাঁদের সঙ্গে উত্তরে শুকদেবপুর গ্রামে পাঠায়। তখন বাসন্তীর বয়স ১১ বছর। কিশোররা শুকদেবপুরের মোড়ল বাঁশিরামের বাড়ি পৌঁছায় মাছ ধরার অনুমতি আদায়ের জন্য। এর মধ্যে চৈত্র মাসের মাঝামাঝিতে দোল পূর্ণিমা এসে যায়। শুকদেব পুরের খলাতে দোল খেলার জন্য শুকদেবপুরের সকলের আমন্ত্রণ পড়ে এবং বাঁশিরাম মোড়লের গাঙের রায়ত হিসেবে কিশোর-সুবলরাও ডাক পায়। দোল খেলার সময় তরুণীরা কিশোরকে রঙ মাখায়। কিন্তু তাকে রঙ মাখাতে গিয়ে একটি অবিবাহিতা তরুণীর হাত কাঁপতে থাকে। দোলের অনুষ্ঠান চলার সময় মেয়েটির সঙ্গে কিশোরের চোখাচোখি হয়। হঠাৎই বাসুদেবপুরের লোকেরা ওখানে আক্রমণ চালায় পুরানো গন্ডগোলের রেশ ধরে। একজন আক্রমণকারী ওই তরুণীর দিকে অগ্রসর হয়, কিশোর তাকে বাঁচাবার জন্য এগিয়ে যায়। মেয়েটি অজ্ঞান হয়ে গেলে কিশোর মেয়েটিকে পাঁজকোলা করে নিয়ে মেয়েটির মার কাছে নিয়ে যায়। এরপরে বাঁশিরাম মোড়লেরর বউয়ের পৌরোহিত্যে কিশোর ওই মেয়েটির সঙ্গে মালা বদল করে এবং মেয়েটির বাবা ও মা তাকে কিশোরের নৌকায় তুলে দেয়। কিশোরদের নৌকা যাত্রাপথে দুর্যোগের মধ্যে পড়ে, শেষে তারা নয়া গাঙের খাঁড়িতে নৌকা বাঁধে। সেখানে তারা রাতে ঘুমিয়ে পড়ে, কিন্তু ঘুম ভেঙে দেখে যে তাদের নৌকায় ডাকাতি হয়ে গেছে এবং ডাকাতরা কিশোরের বউকে তুলে নিয়ে গেছে। তাদের নৌকা যখন তিতাসের মোহনায় পৌঁছায় তখন কিশোর জলে একজন মহিলাকে ভাসতে দেখে এবং বুঝতে পারে যে ওটা কিশোরেরই বউ এবং তারা মনে করে যে মেয়েটি মারা গেছে। কিশোরের চোখ লাল হয়ে ওঠে; তিলক সুবলকে বলে যে কিশোর পাগল হয়ে গেছে।

    নয়া বসত

    কিশোরের জালে অনেক মাছ উঠিয়াছে। বাঁশের গোড়ায় পা দিয়া, জলের হাতায় টান মারিয়া সে বুক চিতাইল, তার পিঠ ঠেকিল বেদিনীর বুকে। বেদিনী তরুণী, স্বাস্থ্যবতী। তার স্তন দুটি দুর্বিনীতভাবে উচাইয়া উঠিয়াছে। তার কোমল উন্নত স্পর্শ কিশোরের সর্ব শরীরে বিদ্যুতের স্পর্শ তুলিল। … … বেদিনী এক হাত ডান বগলের তলায় ও অন্য হাত বাম কাঁধের উপরে দিয়া বুক পর্যন্ত বাড়াইয়া কিশোরকে নিজের বুকে চাপিয়া ধরিল। অবলম্বন পাইয়া কিশোর পড়িয়া গেল না, কিন্তু দিশা হারাইল …

    — “তিতাস একটি নদীর নাম”

    এরপর চার বছর কেটে যায়। গৌরাঙ্গ ও নিত্যানন্দ দুই বুড়ো একটি বাচ্চা ছেলে অনন্ত ও তার মাকে নিয়ে নৌকায় বের হয়। গৌরাঙ্গ স্বগতোক্তি করে যে অনন্তর মা সে পেটে থাকা অবস্থায় ডাকাতের নৌকা থেকে নদীতে ঝাঁপ দিয়ে একটা বালুচরে ওঠে এবং ঘটনাক্রমে এই দুই বুড়োর আশ্রয়ে ভবানীপুরে আসে। তারা ভাবে যে অনন্তর মার বরকে ডাকাতে মেরে ফেলেছে তাই তারা অনন্তর মাকে বিধবার পোশাকেই রাখত। কিন্তু অনন্তর মা জানত যে সে কিশোরের বউ এবং কিশোরের গ্রামের নামও তার মনে ছিল, কিন্তু সে কিশোর অথবা সুবলের নাম জানত না। তাই শেষে তারা অনন্তর মাকে সেই গ্রামে পৌঁছাতে আসে। গ্রামের ঘাটে অনন্তর মা দেখে একজন বুড়ো একটা পাগলকে জোর করে চান করানোর চেষ্টা করছে। গ্রামে অনন্তর মার সঙ্গে সুবলার বউয়ের পরিচয় হয়। অনন্তর মা তার কাছে সূতা কাটা শেখে। অনন্তর মার সঙ্গে আরেকজনের আলাপ হয় সে হল গ্রামের ধনী কালোবরণের মা। কালোর মার কথা থেকে জানা যায় সুবলার বউয়ের আসল নাম বাসন্তী, তার বিয়ে সুবলার সঙ্গে হয় এবং সুবলা মারা যাওয়ার পরে সে সুবলার বউ নামেই পরিচিত হয়। একজন বড় মাতব্বর রামপ্রসাদের পৌরোহিত্যে মঙ্গলা তার সমাজে, যার মধ্যে সুবলার শ্বশুর আর কিশোরের বাবা ছিল, তাতে অনন্তর মাকে অন্তর্ভুক্ত করে। রামপ্রসাদ একদিন রাতে ঘুরতে ঘুরতে বুড়ো রামকেশবের বাড়ি যায়, সেখানে রামকেশবের পাগল ছেলে তাকে মাটিতে গর্ত কেটে বলে “এই তোমার মেঘনা গাঙ, অইখানে খাড়ি। … জাইগ্যা দেখি মাইয়া চুরি হইতাছে।”

    জন্ম মৃত্যু বিবাহ

    গ্রামে কালীপূজা হয়, পূজোতে সবাই চাঁদা দেয়, কিন্তু রামকেশবের চাঁদা মাফ হয়ে যায় তার ছেলে পাগল বলে। রামকেশব চাঁদা না দেওয়ার জন্য সে সঙ্কোচে প্রসাদ খায় না এবং তার ছেলে কিশোরকেও ঘরে বন্ধ করে রাখে পূজোর চারদিন। উত্তরায়ণ সংক্রান্তির দিন মালোরা প্রচুর খরচ করে খাওয়া দাওয়া করে। তাতে রামকেশব ঠিক করে সেও রামপ্রসাদ, মঙ্গলা ও তার ছেলে মোহন, সুবলার শ্বশুরবাড়ির লোকজন আর গ্রামের নতুন বাসিন্দা অনন্তর মাকে নিমন্ত্রণ করে খাওয়াবে। সুবলার বউ অনন্তর মাকে রামকেশবের বাড়িতে রান্নাঘরে পিঠা বানাতে নিয়ে যায়। সেখানে দুজনের কথোপকথনে জানা যায় যে কিশোর পাগল হয়ে বাড়ি আসার পর, বাসন্তীর বাবা কিশোরের বদলে সুবলের সাথে বাসন্তীর বিয়ে দেয়। সুবল একদিন কালোবরণের নৌকায় জিয়লের ক্ষেপ দিতে যায়। যখন নদীতে হঠাৎ তুফান আসে তখন সবাই নৌকা থেকে ঝাঁপ দিলেও সুবলের উপর নির্দেশ আসে লগি ঠেকিয়ে নৌকা বাঁচানোর জন্য। কিন্তু তা করতে গিয়ে সে নৌকার তলায় চাপা পড়ে মারা যায়। এরপর থেকে অনন্তর মা প্রায় লুকিয়ে কিশোরকে দেখত। শীতে কিশোরের পাগলামি বেড়ে যায়। এরপর আরেক পাগলের সঙ্গে পড়ে নিজেকে জখম করতে থাকে। শেষে অনন্তর মা বাধ্য হয়ে কিশোরের সেবা করতে শুরু করে এবং কিশোর খানিকটা ভালো হয়ে ওঠে। এরপর দোলের দিন আসে; অনন্তর মা কিশোরকে রঙ মাখাতে যায়। কিন্তু রঙ মাখানোর পর কিশোর হঠাৎ অনন্তর মাকে পাঁজকোলা করে তুলে নেয় আর মূর্ছা যাওয়া অনন্তর মার আবরণ সরে যাওয়া বুকে মুখ ঘষতে থাকে। এসব দেখে গ্রামের মানুষ কিশোরকে প্রচন্ড মারধর করে। মারের চোটে কিশোর পরদিন ভোরে মারা যায়। আর তার চারদিন পরে অনন্তর মা মারা যায়।

    রামধনু

    সুবলের বউকে পাইয়া অনন্তের মা মনের আবেগ ঢালিয়া দেয়, তুমি না কইছিলা ভইন আমার একজন পুরুষ চাই! হ; চাই-ই ত। পুরুষ ছাড়া নারীর জীবনে কানাকড়ি দাম নাই।

    পুরুষ একটা ধর না।

    কই পাই?

    পাগলারে ধর।

    ধরতে গেছলাম। ধরা দিল না।

    ঠিসারা কইর না দিদি।

    আমি ভইন ঠিসারা করি না। সত্য কথাই কই। পাগলা যদি আমারে হাতে ধইরা টান দেয়, আমি গিয়া তার ঘরের ঘরনি হই। আর ভাল লাগে না।… … একলা জীবন চলে না। পাগলেরে পাইলে তারে লখ কইরা জীবন কাটাই।

    — “তিতাস একটি নদীর নাম”

    কাদির মিয়া ও তার ছেলের সকরকন্দ আলু বোঝাই নৌকা ভারী বর্ষণে ও জোড়ালো বাতাসে ডুবে যাওয়া উপক্রম হলে বনমালী ও ধনঞ্জয় তাদের ও তাদের আলু উদ্ধার করে নিজেদের জেলে নৌকাতে তুলে নেয়। বনমালী ও কাদির মিয়ার সৌভ্রাতৃত্ব গড়ে ওঠে। বনমালী জানায় মালোপাড়ায় তার বোনের বিয়ে হয়েছে, তার পরামর্শে সে ও কাদির মালোপাড়ায় আলু বেচতে যায়। ওখানে অনন্ত কাদির মিয়ার আলুর পসরার সামনে ঘোড়াঘুড়ি করে। বনমালী ও কাদির মিয়া দুইজনেই দেখে অনন্ত বিস্ময় দৃষ্টিতে রামধনুর দিকে তাকিয়ে আছে। বনমালীর অনন্তকে খুব পছন্দ হয়, তাকে নিয়ে একটু ঘুড়ে বেড়ায় ও তাকে একদিন নিজের সঙ্গে নিয়ে যাবার প্রতিশ্রুতি দেয়। এদিকে সুবলার বউ অনন্তর পক্ষ থেকে অনন্তর মার শ্রাদ্ধের ব্যবস্থাদি করে। শ্রাদ্ধানুষ্ঠানে বনমালীর বোন তদারকি করে, তার ছড়া কাটার ভালো ক্ষমতা ছিল। একদিন ঝড়ে সুবলার বউয়ের, মানে অনন্তর মাসীর, বাবার বাড়ি ভেঙে যায়। বাড়ি পুনরায় বানাতে প্রচুর খরচ হওয়ায় তার বাবা ও মা অনন্তকে, যে ওই বাড়িতেই থাকত, তাকে বিদায় দেওয়ার ইচ্ছা করতে থাকে। কালোবরণের মাও অনন্তকে রাখতে অস্বীকার করে কারণ তাদের বড় নৌকা ঝড়ে ভেঙে যাওয়ায় খুব ক্ষতি হয়েছে। একদিন বাসন্তীর, মানে সুবলার বউয়ের, মা অনন্তকে মারতে যায়, তাই নিয়ে মায়ে মেয়েতে ধ্বস্তাধ্বস্তি শুরু হয়। এইসব কিছুতে বাসন্তীর মাথা গরম হয়ে যায় ও অনন্তকে বাড়ি থেকে দূর করে দেয়। অনন্ত গামছায় মাছ ধরে, একা ঘুড়ে বেড়ায়, একদিন বনমালীর বোন অর্থাৎ লবচন্দ্রের বউয়ের বাড়ি যায়, কিন্ত পরে নিজেই বেড়িয়ে যায়। কেউ জানত না সে কোথায় থাকে। শেষে বনমালী তাকে খুঁজে বার করে নিজের সঙ্গে ও বোন উদয়তারা অর্থাৎ লবচন্দ্রের বউ কে নিয়ে দেশের বাড়ি চলে যায়। অনন্ত সেখানে বনমালীর পদ্মাপুরাণ পড়া এবং অন্যান্য লোকাচার ও অনুষ্ঠান অবলোকন করে। বনমালীর গ্রামে অনন্তর সঙ্গে একটি ছোট্ট মেয়ের পরিচয় হয়, সে জানায় তার নামও অনন্ত।

    রাঙা নাও

    বিরামপুর গ্রামে কাদির তার ছেলে ছাদির, ছাদিরের ছেলে রমু ও বউ খুশিকে নিয়ে বাস করে। কাদির তার ছেলেকে জানায় যে উজানচরের মাগন সরকার তার নামে ধারের মিথ্যে মামলা লাগিয়ে জমি দখল করে নিতে চায় যদিও কাদিররা পাট বেচে ধারের টাকাটা মিটিয়ে দিয়েছিল। এরমধ্যে খুশির বাবা তাদের বাড়িতে আসে মেয়েকে বাপের বাড়ি কয়েক দিনের জন্য নিয়ে যাবার জন্য। খুশির বাবা মুহুরী ছিল, সে বলে সে মামলা জিতিয়ে দেবে কাদিরকে, কিন্ত তাদের মধ্যে বচসা হয়ে যায়। এরপর কাদির মিয়া চোখ লাল করে মাগন সরকারের কাছে যায়, কিন্ত মাগন সরকার তাকে বলে যে এই শেষ বারের জন্য যেন তাকে এই সর্বনাশ করতে দেওয়া হয়, তারপর সে ভাল হয়ে যাবে। কাদিরও হতভম্ব হয়ে মেনে নেয়। কিন্ত পরদিনই মাগন সরকার নারকেল গাছ থেকে ঝাঁপ দিয়ে মরে যায়। কাদির তা শুনে উদাস হয়ে যায়। ছাদির শ্রাবণে নৌকা দৌড়ে চালানোর জন্য বড় নৌকা বানানোর ইচ্ছা প্রকাশ করে কাদিরের কাছে টাকা চাইলে কাদির দুহাত খুলে টাকা দিয়ে দেয়। দুজন মালো এসে ছাদিরের নৌকা বানিয়ে দিয়ে যায়। ভাদ্রের ১লা তারিখে সেই নৌকা জলে ভাসে। সেই দিন তিতাসে অনেক নৌকার সমাগম হয়। উদয়তারা, অনন্ত, অনন্তবালা, বনমালী একটা নৌকায় ছিল। আরেকটি নৌকা থেকে সুবলার বউ অনন্তকে দেখতে পেয়ে, তার নৌকায় গিয়ে ওঠে। কিন্ত সেখানে উদয়তারার সঙ্গে তার কথা কাটাকাটি হয় এবং সবাই মিলে সুবলার বউকে মারধর করে।

    দুরঙা প্রজাপতি

    — কিরে গোলাম! বিয়া করবি?

    — করমু।

    — ক দেখি বিয়া কইরা কি করে?

    — ভাত রান্ধায়

    — হি হি হি, কইতে পারলি না গোলাম, কইতে পারলি না। বিয়া কইরা লোকে বউয়ের ঠ্যাং কান্ধে লয়, বুঝলি হি হি হি। … … আমারে বিয়া করবি?

    মোটাসোটা ঠ্যাং দুটির ভয়ে ভয়ে তাকাইয়া অনন্ত বলিল, না।

    — “তিতাস একটি নদীর নাম”

    উদয়তারাদের হাতে মার খাবার পর সুবলার বউ অপমানে ঘরের মধ্যেই বেশীরভাগ সময় থাকতে শুরু করে। কিন্তু বামুন কায়েতের যুবকরা তার বাড়ির দিকে উঁকি ঝুঁকি মারা শুরু করে আর তার নামে কুৎসা রটায়। সুবলার বউ এর প্রতিবাদে চিৎকার চেঁচামেচি শুরু করে তামসীর বাবার বাড়ির সামনে, ওখানেই বামুন, কায়েতদের বেশি যাতায়াত ছিল। সুবলার বউয়ের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে অন্য মালো ছেলেরা একদিন তিনজন তবলা বাদককে মার দেয়। অন্যদিকে দৌড়ের সময় ছাদিরের নৌকাকে অন্য এক নৌকা ধাক্কা মেরে ভেঙে দেয়। বনমালী ছাদিরকে উদ্ধার করে। কাদির বনমালীকে আগেই চিনত, সে বনমালীকে আপ্যায়ণ করে। কাদিরের মেয়ে জমিলা উদয়তারাকে বলে সে তাকে শ্বশুরবাড়ি যাবার সময় দেখেছিল এবং সই পাতানোর ইচ্ছা করেছিল। অনন্ত গ্রামে ফিরে পড়াশোনায় মন দেয় ও পড়াশোনাকে ভালোবাসে। এদিকে মালোপাড়ায় যাত্রাদলের রমরমাতে মালোরা দুদলে ভাগ হয়ে যেতে থাকে তাদের সংস্কৃতির সংরক্ষণের উপর চিন্তাধারা ভিত্তিতে। সুবলার বউ মোহনকে সঙ্গে নিয়ে হরিবংশ, ভাটিয়ালি প্রভৃতি মালো সংস্কৃতির গান গেয়ে অন্য মালোদের যাত্রাদল থেকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করে, কিন্তু সফল হয় না।

    ভাসমান

    যাত্রাদলের কাছে আত্মসমর্পণের পর মালোদের নিজস্ব সংস্কৃতি ধীরে ধীরে লোপ পেতে থাকে এবং মেয়েদের বিলাসিতা বাড়তে থাকে। এরমধ্যে একদিন মালোরা বিস্ময়ে আবিষ্কার করে যে তিতাসের বুকে ভাসমান চর গজিয়ে উঠেছে। দূরদূরান্তের চাষিরা ওই চরের দখলের জন্য মারামারি শুরু করে। মালোরা বর্ষাকালের জলের উপরই নির্ভর করে থাকে। রামপ্রসাদ জেলেদের উজ্জীবিত করার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। নিজে চর দখল করতে গিয়ে মারা যায়। এদিকে অনন্তবালার বিয়ের বয়স হয়ে যায়, কিন্ত সে অনন্তের আশায় বসে থাকে, যে কুমিল্লা শহরে চলে গিয়েছিল। অনন্তবালার বাবার পরামর্শে বনমালী অনন্তর শহরে যায় এবং অনন্তের সঙ্গে তার দেখা হয়। বনমালী এখন মাছের পোনার মজুরি খাটে। উদয়তারা বনমালীর বাড়ি থেকে অনেকদিন পরে শ্বশুরবাড়ীতে আসে এবং এসে বাসন্তীর, মানে সুবলার বউয়ের, সঙ্গে তার পুরনো ঝাগড়া মিটিয়ে ফেলে। মালোদের অবস্থা ধীরে ধীরে আরও খারাপ হতে থাকে এবং একে একে উদয়তারার বর, বাসন্তীর বাবা-মা, মোহনের বাবা মারা যায়। সুবলার বউ অত দু:খের মধ্যেও অনন্তর খোঁজ নিত। সে জানতে পারে অনন্তের সাক্ষাৎ বিরামপুরের কাদিরের সঙ্গে হয়। সেদিন বনমালী মারা যায়, তা দেখে কাদির তার ধানের গোলা খুলে দেয় বিতরণ করার জন্য। অনাহারে সুবলার বউ সবাইকে নিয়ে চিন্তায় দিবাস্বপ্ন দেখতে থাকে এবং একসময় তার শিথিল হাত থেকে জলভরা লোটা পড়ে যায়।

  • প্রবাস খণ্ড

    প্রবাস খণ্ড

    অদ্বৈত মল্লবর্মণ

    [book-name]

    প্রবাস খণ্ড

    প্রথম পরিচ্ছেদ

    তিতাস নদীর তীরে মালোদের বাস। ঘাটে-বাঁধা নৌকা, মাটিতে ছড়ানো জাল, উঠানের কোণে গাবের মট্‌কি, ঘরে ঘরে চরকি, তেক,তক্‌লি – সুতা কাটার, জাল বোনার সরঞ্জাম। এই সব নিয়াই মালোদের সংসার।

    নদীটা যেখানে ধনুকের মত বাঁকিয়াছে, সেইখান হইতে গ্রামটার শুরু। মস্ত বড় গ্রামটা, – তার দিনের কলরব রাতের নিশুতিতেও ঢাকা পড়ে না। দক্ষিণ পাড়াটাই গ্রামের মালোদের।

    মাঘ মাসের শেষ তারিখে সেই মালোপাড়াতে একটা উৎসবের ধুম পড়িল। এটা কেবল কুমারীদের উৎসব। নাম মাঘমণ্ডলের ব্রত।

    এ-পাড়ার কুমারীরা কোনকালে অরক্ষণীয়া হয় না। তাদের বুকের উপর ঢেউ জাগিবার আগে, মন যখন থাকে খেলার খেয়ালে রঙিন, তখনই একদিন ঢোল সানাই বাজাইয়া তাদের বিবাহ হইয়া যায়। তবু বিবাহের জন্যে তারা দলে-দলে মাঘমণ্ডলের পূজা করে।

    মাঘ মাসের ত্রিশদিন তিতাসের ঘাটে প্রাতঃস্নান করিয়াছে; প্রতিদিন স্নানের শেষে বাড়িতে আসিয়া ভাঁটফুল আর দূর্বাদলে বাঁধা ঝুটার জল দিয়া সিঁড়ি পূজিয়াছে, মন্ত্রপাঠ করিয়াছেঃ ‘লও লও সুরুজ ঠাকুর লও ঝুটার জল, মাপিয়া জুখিয়া দিব সপ্ত আঁজল।’ আজ তাদের শেষ ব্রত।

    তরুণ কলাগাছের এক হাত পরিমাণ লম্বা করিয়া কাটা ফালি, বাঁশের সরু শলাতে বিঁধিয়া ভিত করা হয়। সেই ভিতের উপর গড়িয়া তোলা হয় রঙিন কাগজের চৌয়ারি-ঘর। আজিকার ব্রত শেষে ব্রতিনীরা সেই চৌয়ারি মাথায় করিয়া তিতাসের জলে ভাসাইবে, সঙ্গে সঙ্গে ঢোল-কাঁসি বাজিবে, নারীরা গীত গাহিবে।

     দীননাথ মালোর মেয়ে বাসন্তী পড়িল বিষম চিন্তায়। সব বালিকারই কারো দাদা, কারো বাপ চৌয়ারি বানাইতেছে,— ফুলকাটা, ঝালরওয়ালা, নিশানা-উড়ানো কত সুন্দর চৌয়ারি, সংসারে তার একটি ভাইও নাই যে কোনরকমে একটা চৌয়ারি খাড়া করিয়া তার মাঘব্রতের শেষ-দিনের অনুষ্ঠানটুকু সফল করিয়া তুলিবে। বাপের কাছে বলিতে গিয়াছিল, কিন্তু বাপ গম্ভীর মুখে আগুন-ভরা মালসা, টিকা-তামাক-ভরা বাঁশের চোঙা, আর দড়িবাঁধা-কলকে-ওয়ালা হুকা লইয়া নৌকায় চলিয়া গিয়াছে। ‘কাঠায়’ লাগিয়া কাল তার জাল ছিঁড়িয়াছে, আজ সারা দুপুর বসিয়া গড়িতে হইবে।

    মেয়ের এই মর্মবেদনায় মার মন দয়ার্দ্র হইল। তার মনে পড়িয়া গেল কিশোর আর সুবলের কথা। দুইটি ছেলেতে গলায় গলায় ভাব। এইটুকু বয়সেই ডানপিটে বলিয়া পাড়াতে নামও করিয়াছে। বাসন্তীর মার ভালই লাগে এই ডানপিটে ছেলেদের। ভয় ডর নাই, কোন কাজের জন্য ডাকিলে উড়িয়া আসে, মা বাপ মানা করিলেও শোনে না। বিশেষতঃ কিশোর ছেলেটি অত্যন্ত ভাল, যেমন ডানপিটে তেমনি বিবেচক।

    বাসন্তীর মার আহবানে কিশোর আর সুবল বাসন্তীর দাওয়ায় বসিয়া এমন সুন্দর চৌয়ারি বানাইয়া দিল যে, যারা দেখিল তারাই মুগ্ধ হইয়া বলিল, – বাসন্তীর চৌয়ারি যেন রূপে ঝলমল করিতেছে। নিশানে ঝালরে ফুলে উজ্জ্বল চৌয়ারিখানার দিকে গর্বভরে চাহিতে চাহিতে বাসন্তী উঠান-নিকানো শেষ করিলে, তার মা বলিল, ‘উঠান-জোড়া আলিপনা আকুম; অ বাবা কিশোর, বাবা সুবল, তোমরা একটা হাতী, একটা ঘোড়া, আর কয়টা পক্ষী আইক্যা দেও।’

    বাল্যশিক্ষা বই খুলিয়া তাহারা যখন উঠানের মাটিতে হাতী ঘোড়া আঁকিতে বসিল, বাসন্তীর তখন আনন্দ ধরে না। সারা মালোপাড়ার কারো উঠানে হাতীঘোড়া নাই, কেবল তারই উঠানে থাকিবে। শিল্পীদের অপটু হস্তচালনার দিকে মুগ্ধ দৃষ্টিতে চাহিয়া বাসন্তী এক সময় খুশিতে হাসিয়া উঠিল।

    আলিপনার মাঝখানে বাসন্তী ছাতা মাথায় দিয়া একখানি চৌকিতে বসিল। ছাতাখানা সে আস্তে আস্তে ঘুরাইতে লাগিল এবং তার মা ছাতার উপর খই আর নাড়ু ঢালিয়া দিতে লাগিল; হরির লুটের মত ছেলেরা কাড়াকাড়ি করিয়া সে-নাড়ু ধরিতে লাগিল। সবচেয়ে বেশি ধরিল কিশোর আর সুবল।

    নারীরা গীত গাহিতেছেঃ ‘সখি ঐ ত ফুলের পালঙ রইলো, কই কালাচাঁদ আইলো।’ বহুদিনের পুরানো গীত। সাত বছর আগে বাসন্তী যখন পেটে আসে, তখনও তারা এই গানই গাহিত উৎসবের এই দিনটিতে। আজও উহাই গাহিতেছে; সঙ্গে সঙ্গে দুখাই বাদ্যকর ঢোল ও তার ছেলে কাঁসি বাজাইতেছে। প্রতি বছর একই রকম তালে তারা ঢোল আর কাঁসি বাজায়। আজও সেই রকমই বাজাইতেছে। সবই একই রকম আছে, পরিবর্তনের মাঝে কেবল দুখাইর ঢোলটা আরো পুরানো হইয়াছে, তার ছেলেটা আরো বড় হইয়াছে।

    বাসন্তীর মাথায় জবজবে তেল, পরনে মোটা শাড়ি। এই কালকের থেকেই যেন আজ তাকে অনেকখানি বড় দেখাইতেছে। এই ভাবেই বাসন্তী আরো বাড়িয়া উঠিবে, এই ভাবেই কিশোরও বড় হইয়া উঠিবে, সুবলও বড় হইয়া উঠিবে। তবে কিশোর ছেলেটি অনেক ভাল, বাসন্তীকে তার পাশেই ঠিক মানাইবে। – বাসন্তীর মার চিন্তায় বাধা পড়িল মেয়ের ডাকেঃ ‘মা, ওমা, দেখ সুবলদাদা কিশোরদাদার কাণ্ড। আমি চৌয়ারি জলে ছাড়তে-না-ছাড়তে তারা দুইজনে ধরতে গিয়া কি কাইজ্যা। এ কয় আমি নিমু, হে কয় আমি নিমু। ডরে আর কেউ কাছেঅ গেল না। শেষে কি মারামারি! আমি কইলাম, দুইজনে মিল্যা বানাইছ, দুইজনেই নিয়া রাইখ্যা দেও। মারামারি কর কেনে? শুইন্ন্যা কিশোর দাদা ভালামানুষের মত ছাইড়া দিল। আর সুবলদাদা করল কি – মাগ্ গো মা, দুই হাতে মাথাত তুইল্যা দৌড়!’

    সেদিন মালোপাড়ার ঘাটে ঘাটে সমারোহ। ঢোল সানাই বাজিতেছে, পুরনারীরা গান গাহিতেছে, দুপুরের রোদে তিতাসের জল চিক্ চিক্ করিতেছে। মালোর কুমারীরা আনকোরা শাড়ি পরিয়া, তেল-জবজবে মাথায় চিত্র-বিচিত্র চৌয়ারি তুলিয়া, জলে ভাসাইয়া দিবার উদ্যোগ করিতেছে। কিন্তু মালোর ছেলেদের তর সহিতেছে না। মেয়েরা অনুনয় করিতেছে, এখনই ধরিও না, জলে আগে ভাসাই, তখন ধরিও।

    সব চৌয়ারিই জলে ভাসিল। ছেলেরা দৌরাত্ম করিয়া প্রায় সব কটাকেই ধরিল, কাড়াকাড়ি করিয়া ছিঁড়িল, এবং ভাঙ্গাচোরা অবস্থায় মাথায় করিয়া বাড়িতে ফিরিল। কিন্তু তাহাদের দস্যুতামুক্ত হইয়া কয়েকখানা চৌয়ারি তিতাসের মন্দ স্রোতে আর মৃদু তরঙ্গে অনেক বাহির-জলে চলিয়া গেল। তীর হইতে দেখা গেল যেন জলের উপর এক একটা ময়ূর পেখম ধরিয়াছে। কিন্তু তাদের যারা ভাসাইল, তারা সুখী হইল কি? ছেলেরাই যদি ধরিতে না পারিল, তবে মেয়েদের উহা ভাসাইবার সার্থকতা কই?

    কিশোরের জন্য বাসন্তী মনে বড় ব্যথা পাইল! এমন সুন্দর চৌয়ারিটা সে পাইল না, পাইল সুবলে। কিন্তু সে ছাড়িয়া দিল কেন? এমন নির্বিবাদে, ভালমানুষের মত ছাড়িয়া দিল! কিন্তু মনে যে কষ্ট পাইয়াছে তা ঠিক। মানুষটাই এই ধাচের। বন্ধু যেন আর লোকের থাকে না! মানি, বন্ধু নিতে চাহিলে কোন জিনিস নিজে আঁকড়াইয়া থাকে না। কিন্তু বন্ধুর জন্য চোখ বুজিয়া ভাল জিনিস এমন ছাড়িয়াও কেউ দেয় না!

    সুবলের বাপ গগন মালোর কোনকালে নাও-জাল ছিল না। সে সারাজীবন কাটাইয়াছে পরের নৌকার জাল বাহিয়া। যৌবনে সুবলের মা ভৎসনা করিত, ‘এমন টুলাইন্যা গিরস্তি কত দিন চালাইবা! নাও করবা, জাল করবা, সাউকারি কইরা সংসার চালাইবা! এই কথা আমার বাপের কাছে তিন সত্য কইরা তবে ত আমারে বিয়া করতে পারছ। স্মরণ হয় না কেনে?’

    কিন্তু নিশ্চেষ্ট লোককে ভৎসনা করিয়া ফল পাওয়া যায় না।

    ‘খাইবা বুড়াকালে পরের লাথি উষ্ঠা; যেমন মানুষ তুমি।’ গগন এসব কথায়ও কর্ণপাত করে নাই।

    বুড়া কাল যখন সত্যই আসিল, তখন বলিত, ‘অখন বুঝ নি?’ ইহার উত্তরে গগনচন্দ্র বলিত, ‘আমার সুবল আছে। আমি ত করতাম পারলাম না, নাও-জাল আমার সুবলে করব। অত ভেন্ ভেন্ করিস্ না।’

    কাজেই সুবলের বাপ যখন মারা যায়, সুবলকে নৌকা গড়াইয়া দিয়া যাইতে পাড়ে নাই। সুবল ‘মাথা-তোলা’ হইয়া কিশোরের নৌকায় গিয়া উঠিল। এবং তার সঙ্গেই জাল বাহিয়া চলিল। নিজের নাও-জাল করার কথা আর তার মনেই আসিল না। কিশোর বয়সে তার মাত্র তিন বছরের বড়। আশৈশব বন্ধু তারা। তাদের মধ্যে ভাব ছিল গলায় গলায়। শৈশবে দুইজনে বর্ষাকালে সাপেভরা বটের ঝুড়িতে বসিয়া খোপের মধ্য দিয়া বঁড়শি ফেলিত। শিং মাছের জাল বুনিয়া আঁধার রাতে বুকজলভরা পাটক্ষেতের আল ধরিয়া অনেক দূরে গিয়া পাতিয়া আসিত। রাত থাকিতে উঠিয়া শিংমাছ-কৈমাছ-গাঁথা জাল তুলিয়া আনিত। এসব জালে অনেক সময় সাপ গাঁথা পড়ে। কিন্তু মালোর ছেলেরা তাতে ভয় পায় না। অনেক মালোর ছেলে এভাবে মারা পড়ে দেখিয়াও ভয় পায় না। কেননা অনেক মরিয়া গিয়াও তারা অনেক বাঁচিয়া থাকে।

    একদিন দুইজনেরই বাপ তাদের পাঠশালায় পাঠাইল। প্রথম দিন তারা চুপচাপ কাটাইল। পরের দিন ভিন্নপাড়ার ছেলেদের সঙ্গে মারামারি করিয়া শিক্ষকের মার খাইল। তার পরের দিন নিজেদের মধ্যে মারামারি করিয়া শিক্ষকের হাতে যে মার খাইল, তাহার মাত্রা সহনাতীত হইয়াছে বিবেচনা করিয়া দুইজনেই এক সঙ্গে বাহির হইয়া পড়িল। পাঠশালায় আর গেল না। গুরুজনের মার খাইল, তবু গেল না, বরং সেদিন কিশোর কলাগাছের খোল কাটিয়া চটি জুতার মত পরিল, সাথীকে ধমকাইয়া বলিল, ‘হেই সুবলা, দেখ্, আমি বৈকণ্ঠ চক্রপত্তি, তুই আমারে ভক্তি দে।’

    শিক্ষকের কাকা বৈকণ্ঠ চক্রবর্তী চটিপায়ে উঠানে রোদে বসিয়া তামাক টানিত আর পালেরা বণিকেরা পথ চলিতে তাঁহাকে পা ধরিয়া প্রণাম করিয়া যাইত। কিশোর ইহা লক্ষ্য করিয়াছিল।

    তারপর একদিন দুইজনেরই উপর তাগিদ আসিল- সুতা পাকাও, জাল বোনো।

    তিতাস নদীর প্রশস্ত তীর। সেখানে এক দৌড়ের পথ লম্বা করিয়া সুতা মেলিত। বাঁশের চরখিতে কাঠি লাগাইয়া দুইজনে এক দুই তিন বলিয়া এমন জোরে পাক লাগাইত যে, কাঠি ভাঙ্গিয়া চরখি কাত হইয়া মাটিতে পড়িয়া যাইত। বর্ষায় যে বটের ঝুরিতে বঁড়শি  ফেলিত, সুদিনে তারই তলা ছিল গরমের দুপুর কাটাইবার উত্তম স্থান। জাল লইয়া দুইজনে সেখানে গিয়া বসিত। জাল পায়ের বুড়া আঙ্গুলে ঠেকাইয়া দুইজনেই সমান গতিতে তকলি চালাইত। তাতে জালে অনেক বাজে গিট পড়িত সত্য কিন্তু বোনা খুব আগাইত।

    তারপর এক সময়ে কিছুদিন আগেপিছে দুইজনেরই নাও-জালে হাতেখড়ি হইল। অল্প দিনের মধ্যেই পাকা জেলে বলিয়া পাড়ার মধ্যে নাম হইয়া গেল।

    মাছের জো ফুরাইয়া গিয়াছে। মালোদের অফুরন্ত চাহিদা মিটাইতে গিয়া, দিতে দিতে তিতাস ক্লান্ত হইয়া পড়িয়াছে।

    দুপুর পর্যন্ত জাল-ফেলা জাল-তোলা চলিল, কিন্তু একটি মাছও নৌকায় ফেলিতে পারিল না। জালের হাতায় হ্যাঁচকা একটা টান মারিয়া কিশোর বলিল, ‘জগৎপুরের ডহরে যা সুবনা, ইখানে ত জালে-মাছে এক করা গেল না।’

    কিন্তু ডহরের অতলস্পর্শী জল জালের খুঁটিতে দীর্ণ-বিদীর্ণ করিয়াও মাছের হদিস মিলিল না। কিশোর পায়ের তলা হইতে বাঁশের গুড়ি ছাড়িয়া দিয়া একটানে বাঁধ খুলিয়া ফেলিল। আচমকা আঘাতে ডহরের নিস্তরঙ্গ জল কাঁপিয়া উঠিল। তারই দিকে চাহিয়া কিশোর বলিল, ‘জান্ বাঁচাইতে চাস্ ত, উত্তরে চল্ সুবলা।’

    একদিন কয়েকখানা নৌকা সাজিল। উত্তরে যাইবে। প্রবাসে। তাদের সঙ্গে কিশোরের নৌকাও সাজিল।

    তারা পুরাণো ছই নূতন করিল, নৌকা ডাঙ্গায় তুলিয়া গাবকালি মাখাইল। জালগুলিকে কড়া গাব খাওাইয়া তিনদিন বিশ্রাম দিল। অতিরিক্ত কিছু বাঁশ আর দড়াদড়িও যোগাড় করিল।

    কিশোরের বাপ সঙ্গে গেলে বাড়িতে থাকিবার কেউ থাকে না। বুড়া মানুষ বাড়িতে থাকিয়া সকাল সন্ধ্যা ঘাটে কিনিয়া-বেচিয়া যা পাইবে, সংসার চালাইবে। আরেকজন ভাগীদার দেখা দরকার।

    কিশোরের বাপ ভাবিয়া দেখিল, দুইজনই বালক, কোনদিন বড় নদী দিয়া বিদেশ যায় নাই। সেখানে গিয়া অনেক কথা বলিতে হইবে। বুদ্ধি বিবেচনা খরচ করিতে হইবে। ডাকাতে ধরিয়া জাল ছিনাইয়া নিতে চাহিলে, সামান্য জাল নিয়া কেবল গরীবকেই মারা হইবে, আর কোন লাভ হইবে না বলিয়া ডাকাতের মন ভিজাইতে হইবে। একজন বয়স্ক লোকের দরকার। জলের উপর ছয় মাস চরিয়া বেড়াইতে হইবে। তিলকচাঁদ প্রবীণ জেলে। একটু বেশী বুড়া। তা হোক। সঙ্গে দুইজন জোয়ান মানুষ ত রহিলই।

    রাব-তামাক মাখিয়া গুল করিতে করিতে কিশোরের বাপ বলিল, ‘তিলকচাঁদ জানেশুনে। তারে নে। গাঁওএর নাম শুকদেবপুর। খলার নাম উজানিনগরের খলা। মোড়লের নাম বাশিঁরাম মোড়ল।’

    একদিন ঊষাকালে তিনজন নৌকায় উঠিল।

    বিদায় দিবার জন্য নদীর পারে যারা গেল, তাদের সংখা সামান্য। একজন আধবুড়ি – কিশোরের মা। আর একজন বাসন্তীর মা, আর তার মেয়ে বাসন্তী – এগারো বছরের কুমারী কন্যা।

    বুড়ি বলিল, ‘অ মাইয়ার মা, জোকার দেও না।’

    বুড়ির ঠোঁটে জোকার বাজে না। বাসন্তীর ও তার মা জোকার দিল। দেড়জনের উলুধ্বনি বলিয়া তাহা ঊষার বাতাসকে কাঁপাইল মাত্র। কলরব তুলিল না। কিশোরের বাপ নদীতীরে যায় নাই। ঘরে বসিয়া ঘনঘন কেবল তামাক টানিতেছিল। ছেলেকে বিদায় দিয়া ঘরে আসিয়া বুড়ি কাঁদিয়া উঠিল।

    পাঁচপীর বদরের ধ্বনি দিয়া প্রথম লগি-ঠেলা দিল তিলক। সুবল হালের বৈঠা ধরিল। তার জোর টানে নৌকা সাপের মত হিস্ হিস্ করিয়া ঢেউ তুলিয়া ঢেউ ভাঙ্গিয়া চলিল। তিলকচাঁদ গলুইয়ে গিয়া দাঁড় ফেলিয়াছে। কিন্তু তার দাঁড়ে জোর বাঁধিতেছেনা। শুধু পড়িতেছে আর উঠিতেছে। ছইএর উপর একখানা হাত রাখিয়া কিশোর মাঝ-নৌকায় দাঁড়াইয়া ছিল। দেখিতেছিল তাদের মালোপাড়ার ঘরবাড়ি গাছপালা-গুলি, খুঁটিতে বাধা নৌকাগুলি, অতিক্রান্ত ঊষার স্বচ্ছ আলকেও কেমন অদৃশ্য হইয়া যাইতেছে। অদৃশ্য হইয়া যাইতেছে সারাটি গ্রাম, আর গোচারণের মাঠ। অদৃশ্য হইতেছে কালীসীমার ময়দান আর গরীবুল্লার বটগাছ দুইটি। জলের উষ্ণতায় শীতের প্রভাতী হাওয়াও কেমন মিষ্টি। গলুইর দিকে আগাইয়া গিয়া কিশোর বলিল, ‘ যাও তিলক, তামুক খাও গিয়া। দাঁড়টা দেও আমার হাতে।’

    তিতাস যেখানে মেঘনাতে মিলিয়াছে, সেইখানে গিয়া দুপুর হইল। কিশোর দাঁড় তুলিয়া খানিক চাহিয়া দেখিল। অনুভব করিল মেঘনার বিশালত্বকে, আর তার অতলস্পর্শী কালো জলকে। এপারের শক্ত মাটিতে এক সময়ে ভাঙ্গন হইয়া গিয়াছে। এখন আর ভাঙিতেছে না। কিন্তু ভাঙনের জয়পতাকা লইয়া দাঁড়াইয়া আছে পর্বতের মত খাড়া পাড়টা। ছোট ছোট ঢেউয়ে মসৃণ হইয়া রহিয়াছে বড় বড় মাটির ধ্বস্। ওপারে – অনেক দূরে, যেখানে গড়ার সমারোহ – দেখা যায় সাদা বালির ঢালা রূপালি বিছানা, ভাঙিয়াছে গাছে-ছাওয়া জনপদ, গড়িয়াছে নিষ্ফলা ধু ধু বালুচর।

    তিলককে ভাত চাপাইতে বলিয়া কিশোর গলুইয়ে একটু জল দিয়া প্রণাম করিল। তারপর আবার দাঁড় ফেলিল।

    সন্ধ্যা হইল ভৈরবের ঘাটে আসিয়া।

    এখানে কয়েকঘর মালো থাকে। ঘাটে খুঁটি-বাঁধা কয়েকটি নৌকা, পাড়ে বাঁশের উপর ছড়াইয়া দেওয়া কয়েকটি জাল, পাশে গাবের মটকি গামলা বেতের ঝুড়ি – দেখিতেই চেনা যায় এখানে মালোরা থাকে।

    গ্রামের পাশে সূর্য ঢাকা পড়িলেও আকাশে একটু একটু বেলা আছে। নৌকা বাহিলে আরো একটা বাঁক ঘোরা যাইত কিন্তু সম্মুখে রাত কাটাইবার ভাল জায়গা তিলক স্মরণ করিতে না পারায় কিশোর বলিল, ‘এই জাগাতই রাইত থ্যাইক্যা যাই রে সুবলা।’

    এখান হইতে বাড়িগুলিও দেখা যায়। গ্রাম আগে বড় ছিল। মালোদের অনেক জায়গা রেলকোম্পানি লইয়া গিয়াছে। বৃহত্তর প্রয়োজনের পায়ে ক্ষুদ্র আয়োজনের প্রয়োজন অগ্রাহ্য হইয়া গিয়াছে। তবু এ গাঁয়ের মালোরা গরীব নয়। বড় নদীতে মাছ ধরে। রেলবাবুদের পাশে থাকে। গাড়িতে করিয়া মাছ চালান দেয়। তারা আছে মন্দ-না।

    ‘কিশোরদা, ভৈরবের মালোরা কি কাণ্ড করে জান কি? তারা জামা-জুতা ভাড়া কইরা রেলকম্পানির বাবুরার বাসার কাছ দিয়া বেড়ায়, আর বাবুরাও মালোপাড়ায় বইআ তামুক টানে আর কয়, পোলাপান ইস্কুলে দেও, – শিক্ষিৎ হও, শিক্ষিৎ হও।’

    তিলক ক্ষেপিয়া উঠিয়া বলিল, ‘হ, শিক্ষিৎ হইলে শাদি-সম্বন্দ করব্ কি না! আরে সুবলা, তুই বুঝবি কি! তারা মুখে মিঠা দেখায়, চোখ রাখে মাইয়া-লোকের উপর।’

    ব্যাপারটার মীমাংসা করিয়া দিল কিশোর; হাসিয়া বলিল, ‘না তিলকচাঁদ, না। চোখ রাখে বড় মাছের উপর। যা শোনা যায় তা না। তা হইলে কি জাইন্যাশুইন্যা নগরবাসী এই গাঁওএ সমন্দ ঠিক করত।’

    ‘কিশোরদাদা, চল মাইয়ারে একবার দেইখ্যা যাই। বাড়ি বাড়ি।’

    মেয়েরা দিনের শেষে জল ভরিতে আসিয়াছে। দলে দেখা গেল কয়েকটি কুমারী কন্যাকে।

    কিশোর চোখ টিপিয়া বলিল, ‘গিয়া কি করবি? এর মধ্যে থাইক্যা দেইখ্যা রাখ।’

  • নয়া বসত

    নয়া বসত

    অদ্বৈত মল্লবর্মণ

    [book-name]

    নয়া বসত

    প্রথম পরিচ্ছেদ

    চার বছর পরের কথা। শীতের সকালে একটা মরানদীতে অল্প জলটুকু যাই-যাই করিতেছিল। রাতের জোয়ার যে-টুকু জল ভরিয়া দিয়াছিল, ভোরের ভাঁটা তাহা টানিয়া খসাইয়া নিতেছে। স্রোত চলিয়াছে শিকারীর তীরের মত। একটু পরেই শুখাইয়া ঠনঠনে হইয়া যাইবে। দুই বুড়ার ব্যস্ততার শেষ নাই। ডিঙ্গি নৌকায় বাঁশের মাচান পাতিতে পাতিতে একজন রুক্ষকণ্ঠে বলিয়া উঠিল, ‘অ গৌরা!’

    গৌরার হাতের মোটামোটা আঙ্গুলগুলি শীতে কুঁকড়াইয়া আসিতেছিল। একরাশ এলোমেলো দড়াদড়ি। তার গিঁট খুলিয়া ওঠা এ আঙ্গুলের সাধ্যের বাইরে। তবু খুলিতে হইবে। বারবার চেষ্টা করে, পারে না; মনে মনে বিরক্ত হইয়া উঠে। রোদ উঠিতে এখনো ঢের দেরি, মালসার আগুনে হাতত্ত্বটি তাতাইয়া নেওয়া দরকার। কিন্তু মালসা কোথায়।

    ‘তুই একবার যা গৌরা, বরুণ-গাছের তলাত গিয়া ডাক দে।’

    স্রোত থাকিতে নৌকা খুলিতে না পারিলে, নদীর জল নিঃশেষ হইয়া যাইবে। তখন কোমরে দড়ি বাঁধিয়া কাদার উপর দিয়া টানিয়া নিতে হইবে, আর নৌকায় কাঁধ ঠেকাইয়া ঠেলিতে হইবে।

    ওদিকের ঘাটে আরেকখানা ডিঙ্গি খুলিতেছে। সেখান হইতে ডাক আসে, ‘অ, নিত্যানন্দ দাদা, আ গৌরাঙ্গ দাদা?’

    কান পর্যন্ত ঢাকিয়া মাথায় জড়ানো নেকড়ার রাশ। দুই বুড়া শুনিতে পায় না। কাছে আসিয়া ডাকিতে দৃষ্টি আকৃষ্ট হইল! কিন্তু সে নৌকাতেও মালসা নাই দেখিয়া গৌরাঙ্গ বিমর্ষ মুখে দড়ির গিঁট খোলাতে মন দিল। যত খোলে, আবার জট লাগে। মাচান পাতা শেষ করিয়া দড়ির গেরোয় দাঁড় ঢুকাইতে গিয়া নিত্যানন্দ মুখ তুলিয়া চাহিল, ‘কি রে ছিনিবাস, বেপারে যাইবি?

    ‘হ দাদা। গাঙে মাছ পড়ছে। অখন কি না গিয়া পারি? তোমরা যাইবা না?’

    ‘যামু। আইজ না, কাইল। আইজ রাজার ঝিরে লইয়া গোকনঘাট যামু কিনা?’

    দড়ি-খোলা ও বৈঠা-বাঁধা শেষ করিয়া গৌরাঙ্গ কাঁপিতে কাঁপিতে বাড়ির দিকে পা বাড়াইল। তার মুখে রাগে ও বিরক্তিতে কথা ফুটিতেছিল না। সে শুধু বিড় বিড় করিয৷ ‘রাজার ঝি,’ ‘রাজার ঝি’ করিতে লাগিল। উঠানে পা দিয়া গৌরাঙ্গের যত রাগ জল হইয়া গেল।

    রাজার ঝি পা মেলিয়া বসিয়া বিলাপ করিতেছে।

    বুড়ার চোখে জল আসিয়া পড়িল। সত্যি এই দুঃখী মেয়েটাকে দুই ভাই বড় স্নেহ করে। কিন্তু তার বুকভরা কান্না জুড়াইতে তাদের বুড়া হৃদয়ের স্নেহই যথেষ্ট নয়। ছেলেটা ঘরের এক কোণে মলাটের বাক্সে তার রূপকথার রাজ্য সাজাইতেছে। কয়েকটি ছবির টুকরা, দেশলাইর খালিবাক্স, জাল বুনিবার দুই একটা ভাঙা উপকরণ, কিছু সূতা, ছেঁড়া একখানা ভক্তিতত্ত্বসার, একটুকরা পেন্সিল। মলাটের বাক্সে সযত্বে সাজানো হইলে মাকে হাত ধরিয়া উঠাইল। বোগা, একটুকরা ছেলেটাব ইচ্ছার নিকট পরাজয় মানিয়াই যেন যুবতী মা কান্না থামাইয়া উঠিয়া পড়িল। এবার যাত্রা করিবার পালা।

    ধরা গলায় গৌরাঙ্গ বলিল, ‘আর কিছু বাকি নাই ত?’

    আর একটি কাজ বাকি আছে। তারা তুলসীতলায় প্রণাম করিতে গেল।

    নৌকা কতক্ষণ স্রোতের টানে বেশ চলিল। গ্রাম্য নদী। খাল বলিলেও চলে। দুই পারে যেন ছবি আঁকা। রোদ উঠিয়াছে। তুই পারে গ্রামের পর মাঠ, তার পর গ্রাম। গ্রাম ছাড়াইয়া নৌকা চলিয়াছে।

    অনন্ত মার কোল ঘোঁসিয়া বসিয়াছিল। নৌকাতে এই প্রথম উঠিয়াছে। আজ তার আনন্দের সীমা নাই। তুই চোখে এক রাজ্যের বিস্ময়। নদীর দুইটি তীরই এত কাছে! দুইদিকেই যখন গ্রাম থাকে তখন দুইটি গ্রামই কত কাছে। গ্রাম ছাড়াইয়া যখন মাঠে পড়ে,–জমির আলের উপর ক্ষেতের লোকে তামাক টানে, লাঙ্গলে-বাঁধা গরু ছুটি তার দিকে তাকায়।

    নৌকাটা এক সময়ে আটকাইয়া গেল। ভাঁটার তখন শেষ টান। সবটুকু জল শুষিয়া নিয়া স্রোতের বেগ মন্দা হইয়া পড়িয়াছে। অনেক পিছনে, নদীর মরিবার পালা আরম্ভ হইয়া গিয়াছে। রোগীর যেমন পা হইতে মরিতে মরিতে সবশেষে মাথায় আসিয়া শেষ মৃত্যু হয়, তাদের এ পোড়া গাঙেরও সেই দশা। যে-নৌকা যেখানে থাকে সেইখানেই আটকাইয়া থাকে।

    গৌরাঙ্গ তখন হতাশ হইয়া হালের দাঁড় খুলিয়া ফেলিল। ইহার পর যে-কাজ করিতে হইবে, শীতের দিনে তাহা একান্ত বিরক্তিকর।

    অনন্তর মা আগেই কলকেতে তামাক দিয়াছিল। মালসা হইতে এইবার জ্বলন্ত টিকাটি তুলিয়া গৌরাঙ্গের দিকে হাত বাড়াইয়া দিল। হুকা  হাতে করিয়া সামনের দিকে চাহিতে গৌরাঙ্গ দেখে তিতাসে পড়িতে আর বেশি দেরি নাই। এবার অনন্তর দিকে চাহিয়া তার মনে মমতা উছলিয়া উঠে। অনন্তর বড় গাঙ দেখার অত সাধ। বড় গাঙের কথা, তার বুকে মাছধরার কথা, রাত জাগার কথা, ভাসিয়া থাকার কথা, শুনিতে শুনিতে তার চোখ দুটি উজ্জ্বল হইয়া উঠে। এ ছেলে বড় হইলে খুব বড় জেলে না হইয়া যায় না। তখন কি সে এই গৌরাঙ্গ, নিত্যানন্দের মত এই মরা নদীর হাঁটুজলে টেংড়াপুটির জাল ফেলিবে। সে তখন তিতাসের অগাধ জলে ভেসাল জাল, ভৈরব জাল, ছান্দি জাল পাতিয়া বসিবে। কে জানে আরো বা’র গাঙে, মেঘনার বুকে গিয়া জগৎ-বেড়ই হয়ত ফেলিবে। তখন কি এই গৌরাঙ্গ নিত্যানন্দর কথা তার মনে থাকিবে! কুড়াইয়া-পাওয়া তার মা হয়ত হইবে বড় নদীর বড় জেলের মা, সেও কি তখন অনন্তকে মনে করাইয়া দিবে যে, অনন্ত, তোর মা ডাকাতের নৌকা হইতে জলে ঝাঁপ দিয়া এক দুদিনের রাতে বড় নদীতে পড়িয়াছিল, তুই তখন পেটে। তোর মা মরি-বাঁচি করিয়া একটা বালুচরে উঠিয়াছিল মাত্র। আর কিছু মনে নাই। তারপর এই দুই বুড়া, তোর দুই দাদা, কোথা থেকে কোথায় নিয়া আসিল। কোথায় ভবানীপুর গ্রাম, কোথায় কি। দেখ, অনন্ত, আ-ঘাটাতে ঘাট হয়, আ-পথে পথ হয়, আ-কুটুমে কুটুম হয়। এই দুই বুড়া যদিও কেউ না, তবু এরা সব-কিছু। এরা ছজন আমার বাপ আর খুড়া। এ দুইজনকে তুই কোনদিন ভুলিস না।

    শীত ছাড়িয়া যাওয়ায় নিতানন্দ তাজা হইয়া উঠিয়াছে। প্রসন্ন মুখে বলে, ‘অনন্তরে ভাই, তুই না বড় গাঙের পাগল, ঐ দেখ বড় গাঙ্‌।

    অনন্তর ছোট শরীর। তারপক্ষে এত দূরে থাকিতে বড় নদী দেখা সম্ভব নয়। বুড়োর বুকে-পিঠে কাপড় জড়ানো। তার উপর দিয়া টানিয়া তুলিয়া সে অনন্তকে বড় নদী দেখাইল।

    এইখান হইতে বৈঠা আচল। গৌরাঙ্গ কোমরে দড়ি বাঁধিয়া জলে নামিল। সে টানিবে। নিত্যানন্দ নামিল পিছনের দিকে। সে কাঁধ ঠেকাইয়া ঠেলিবে। নৌকা হাল্কা করিবার জন্য অনন্তকে লইয়া তার মাও তীরে নামিল। তারা বাঁক ঘুরিয়া বড় গাঙে নামাইবে।

    এইবার বড় নদী।

    অনন্ত কোল হইতে নামিয়া পড়িল। একটা নেংটি ইঁদুর বুঝি ধানক্ষেতের প্যাঁচ হইতে বাহির হইয়া রূপকথার দেশের এক নদীর পারে গিয়া দেখিল সামনে রূপার নদী। গলানো উপছানো রূপার নদী, সে তো নদী নয়, হাজার বছরের না শোনা গল্প দুই তীরের বাঁধনে পড়িয়া একদিকে বহিয়া চলিয়াছে।

    অনন্তর মুখে কথা নাই। সে নীরবে মায়ের সঙ্গে সঙ্গে জলে নমস্কার করিল। তারপর মায়ের দেখাদেখি হাত পা মুখ ধুইয়া নৌকায় উঠিয়া বসিল।

    মা হুঁকা জ্বালাইয়া নিত্যানন্দ বুড়ার দিকে হাত বাড়ায়। বুড়ার দিকে সে চাহিতে পারে না। চোখ ফাটিয়া জল বাহির হয়। অসহায় দুই বুড়া। দুজনেরই বউ কোন যৌবন কালেই মরিয়া গিয়াছে।

    স্ফটিকস্বচ্ছ জলের দিকে অনন্ত একবার মুখ বাড়াইয়া দেখিল। জলে তার ছোট মুখের ছায়া পড়িয়াছে। তারই ভিতর দিয়া দেখা যায় জলের স্বচ্ছত ভেদ করিয়া জাগিয়া আছে বালিময় তলদেশ। দুই একটা শামুক হাঁটিয়াছে, তার রেখা বালির বুকে আঁচড় কাটিয়াছে। ছোট ছোট বেলেমাছ সে বালিতে বুক লাগাইয়া চুপ করিয়া আছে, যেন হাত বাড়াইলেই ধরা যাইবে। একটুও নড়িবে না। আর সেই শামুক চলার দাগ, কম জল হইতে ক্রমে বেশি জলের দিকে চলিয়া গিয়াছে। জলের নীচে বালিমাটি ক্রমে ঢালু হইয়া চলিয়াছে—এখানটা স্পষ্ট দেখা যায়, ওখানটা একটু একটু করিয়া অস্পষ্ট হইয়াছে, তারপর ওখানটাতে কিছুই আর দেখা যায় না। জল ওখানে বেশি কিনা। শামুকগুলি ওখানটাতেই গিয়াছে, সঙ্গে সঙ্গে তাদের পায়ে চলার দাগগুলিও অদৃশ্য হইয়াছে। ওখানটাতে কি রহস্য! নামিলে পায়ে মাটি ঠেকিবে না। আরও একটু দূরে বুঝি ঐ দাঁড় দিয়াও মাটি ছোঁয়া যাইবে না। সেখানটাতে আরও কত রহস্য! কত কি যে আছে সেখানে, হাজার চেষ্টা করিলেও অনন্ত কোনদিন দেখিতে পাইবে না। তার চোখ আবার নিকটে ফিরিয়া আসিল। বেলে বাচ্চাগুলি এখনো শুইয়া আছে। হাত দিয়া জল নাড়িতেই মাছ ক’টা চড় চড় করিয়া চলিয়া যাইতে লাগিল। জলের উপর ভাসিয়া উঠিল না। বালিমাটিতে বুক লাগাইয়াই ক্রমে অস্পষ্ট হইয়া মিলাইয়া গেল, কোথায় জলের গভীরতার দিকে, যেখানে অনস্তু অনেক কিছুর মতই তাহাদিগকেও দেখিতে পাইবে না সেখানে।

    শামুকের দাগগুলি দৃষ্টিসীমার যেখান থেকে উধাও হইয়াছে, সেখানটাতে অনন্ত আরো অনেক্ষণ চাহিয়া থাকিত, মা তাকে টানিয়া কোলের কাছে বসাইল, চুলের ভিতর আঙ্গুল চালাইবার জন্য।

    মাতাপুত্রের দিকে স্নেহদৃষ্টিতে চাহিয়া নিত্যানন্দ বলে, ‘তিতাসের জল এত ফরসা! মাছ ত এই জলে মারা পড়ে না, মারা পড়ে ঘোলা জলে। এই সংকটকালে কি খাইয়া বাঁচবি মা, আমি তাই ভাবি?’

    মাছের জো সামনে। তারজন্যে জেলেরা এখন থেকেই শক্ত জাল বোনে। তার জন্য চাই শণসূতা। সে-গাঁয় গিয়া বসিতে পারিলে এখন থেকেই সে মিহি ও মোটা দুই রকমের সূতা কাটিবে। বেচিবে। তাতে মা ছেলেতে দুর্দিন কাটাইবে।

    খাই না-খাই দিন আমার যাইব, রাইত আমার পোহাইব। কিন্তু তোমরা ত জন্মের লাগি পর হইয়া গেল।’ তারাও যদি এ-নদীর পারে ঘর বাধিত। কিন্তু জন্ম-ভিটার এমনি তাদের মায়া, বুড়া হইয়াছে, সব ছাড়িবে, তবু জন্ম-ভিটা ছাড়িবে না।

    তিতাসের জলের মতই অনন্তর মার চোখের ফরসা জল হু হু করিয়া ছুটিয়া আসিতে চায়।

    হালে দড়ি পরাইয়া নিত্যানন্দ যৌবন-বেগে দুই-তিন টান দিয়া বলিল, ‘গৌরাঙ্গসুন্দর!’

    ‘কি দাদা?’

    ‘আমার গাতিটা খুইল্যা দে। শীত পলাইছে।’

    গৌরাঙ্গমুন্দর নৌকার গলুই ধুইতেছিল। দাদার আদেশ পাইয়া তার পিঠের বড় গেরো খুলিয়া পরতে পরতে পেঁচানো কাপড়ের নিবিড় বন্ধন হইতে দাদাকে মুক্ত করিল। গাতি তাদের শীতের পোষাক।

    এবার গৌরাঙ্গসুন্দর গঙ্গামার নাম স্মরণ করিয়া লগি ঠেলিয়া নৌকা ভাসাইল।

    অনন্তকে মা আরো কাছে টানিয়া নিল। সে নীরবে মার বাহুর বেড়ায় বাঁধা পড়িল, কিন্তু তখন তার মন না ছিল মার দিকে না ছিল দাদাদের দিকে। নৌকাখানার অস্তিত্ব পর্যন্ত সে ভুলিয়া গেল। তার চোখের সামনে জাগিয়া রহিল শুধু একটা নদী। সে নদী তার সকল সত্তাকে, সারা অনুভূতিকে, লুতাতন্তুর মত টানিয়া লইয়া চলিয়াছে। ভূত-ভবিষ্যত বিস্মৃত হইয়া সে এই সদাজাগ্রত মুখর বর্তমানের স্রোতে ভাসিয়া চলিয়াছে। তার প্রকৃত যাত্রা শুরু যেন হইয়াছে এইখান থেকে।

    দুপুর গড়াইয়া গেল। একটু পরেই বিকাল হইবে। অনন্তর মা সে গাঁ কোন দিন চোখে দেখে নাই। শুধু জানে গাঁ খানা তিতাস নদীর তীরে। নদী সোজা উত্তর দিকে আসিয়া এ গাঁয়ের গাঁ ঘোঁসিয়া পশ্চিম দিকে মোড় ঘুরিয়াছে। এক একটা গ্রামের ছায়ায় নৌকা আসিলে চমকাইয়া উঠিয়াছে, বিহালের মত চাহিয়াছে, এই বুঝি সেই গাঁ। গাঁ খানা তার মনকে টানিয়াছে শুধু আজ নয়, অনন্ত যখন পেটে, তখন থেকে। অত বিস্মৃতির মাঝেও, বিপদের অত ঝড়তুাফানের মাঝেও, গাঁ খানার নাম সে মনে রাখিয়াছে। আর কিছু তার মনে নাই। এই গাঁ হইতেই সে প্রবাসে গিয়াছিল। তার নামও মনে নাই, দেখিতে যেন কি রকম ছিল তাও তার মনে নাই। কতবারই বা দেখিয়াছে। সেই প্রথম দিনের দেখা। সারা অন্তর তাকে চাহিয়াছিল, কিন্তু ভাল করিয়া কি তার দিকে চাহিতে পারিয়াছে। অত লোকের সামনে গানবাজনা, হৈ চৈ, মারামারি সব কিছু মিলিয়া সেদিন তাকে মূৰ্ছিত করিয়াছিল না? সেইত তখন আমাকে তুলিয়া ধরিয়াছিল, না হইলে মাটিতে গড়াইয়া পড়িতাম, যারা মারামারি করিতেছিল তাদের পায়ের তলায় পড়িয়া মরিয়া যাইতাম। মনে পড়ে যেদিন তাকে একান্তভাবে পাইলাম। আমার বড় ভয় করিতেছিল। হুরু হুরু বুকে তার জন্য প্রতীক্ষা করিতেছিলাম। সে আসিয়া বাহুর বাঁধনে বাঁধিয়া ভয় দূর করিল। এ যেন একটা পুতুলখেলার মত খেলা হইয়া গেল। আরো দুই একবার দেখিয়াছি; কিন্তু লোকের সামনে তার দিকে চাহিতে কেমন লজ্জ করিত, এজন্য পরিপূর্ণভাবে কি তাকে দেখিতে পারিয়াছি যে, চেহারা মনে থাকিবে। মনে পড়ে নৌকাতে যখন মাচানের তলে ছিলাম বন্দী, তার বন্ধু আসিয়া খাওয়াইত, কিন্তু সে থাকিত দূরে দূরে। বন্ধুকে সে বলিয়াছিল, আমি দেখিতে কেমন সে তা ভুলিয়াই গিয়াছে। আমার না হয় চাহিতে বাধা, তার চাহিতে বাধাটা ছিল কোথায়। এত ভোলা যার মন, সে কি এখনো দেখিলে চিনিতে পারিবে? চিনিতে পারা না পারা আমার কাছে দুইই সমান। চিনিতে পারিলে বলিবে, ডাকাতে যাকে ছু ইয়াছে, তার সঙ্গে আমার কি সম্বন্ধ। আর চিনিতে পারিলে বলিবে, অনাথা বিধবা, তাই সম্বন্ধ জড়াইয়া ঠাঁই করিয়া লইতে চায়। সামনে পতি নাই; হাতে নোয়া কপালে সিঁদুর পরণে শাড়ি মানায় না। বাপ জোর করিয়া বিধবার বেশ পরাইয়াছে। আপত্তি করিলে বলিয়াছে, ডাকাতে যখন ধরিয়াছিল, নিশ্চয়ই কাটিয়া ফেলিয়াছে, তা না হইলে, মোহানার স্রোতের পাকে যখন পড়িয়াছিল, নৌকা কি আর ছিল, নিশ্চয়ই ডুবিয়া গিয়াছিল। আমার সকল বন্ধন ছিন্ন করিয়া চিরদিন আমাকে মেয়ের মত কাছে রাখিবে বুড়ার মতলব ছিল এই। প্রতিবেশীদের কাছে তখন পরিচয় দিয়াছে, এর স্বামীকে ডাকাতে মারিয়া ফেলিয়াছে; একেও মারিয়া ফেলিত, জলে ঝাঁপ দিয়া বাঁচিয়াছে। সেই থেকে বিধবার বেশ। কিন্তু সে তে৷ বাহিরের। মনে মনে জানি সে আছে। সে ঐ গাঁয়েই আছে। কিন্তু না জানি তার নাম, না জানি তার বন্ধুর নাম।

    রোদ কড়া হইয়া উঠিয়াছে। নৌকাখানা তাতিয়া উঠিয়াছে। দুই বুড়ার শক্ত চামড়াও তাতিয়া উঠিয়াছে। অনন্তর মার স্নেহ উথলিয়া উঠিল। বার বার ইচ্ছা করিল তার শাদা কাপড়ের আঁচল দিয়া তাদের গায়ে ছায়৷ দেয়। কিন্তু সে অসম্ভব। একটা বালিকাবয়সী নারীর আঁচলে গাঁ ঢাকা দেওয়ার বয়স তাদের নাই। সে-আঁচলে সে অনন্তর রোদে-তাতা ছোট শরীরখানা সূর্যের আড়াল করিল। কড়া রোদে, মায়ের মিষ্টি ছায়ার আড়ালে থাকিয়া অনন্ত কোন এক সময়ে ঘুমাইয়া পড়িয়াছে। অনেক কিছু দেখিতে পারিত, ঘুমাইয়া পড়াতে দেখিতে পারে নাই। হয়ত স্বপ্নে তাহার সবই দেখিতে পাইয়াছে।

    ঘাটে গিয়া নৌকাখানা শব্দ করিয়া ঠেকিল। চলতি নৌকা। গৌরাঙ্গ দাঁড় ঠেকাইয়া গতিরোধ করিল, কিন্তু সবটুকু গতি রদ্ধ হইল না। মাটিতে ঠেকিয়া অবশিষ্ট গতিটুকু রুদ্ধ হইতেই নৌকাটা ঝাকুনি খাইল। সেই বাকুনিতে অনন্তর মার চমক ভাঙ্গিল। এতক্ষণ সেও বুঝি স্বপ্ন রাজ্যেই ছিল। এখন ধড়ফড় করিয়া উঠিয়া, কাপড় চোপড় সামলাইল, অনন্তকে ডাকিয়া উঠাইল। অনন্ত জাগিয়া চোখ কচলাইয়া ঘাটখানা একবার দেখিয়া লইল। তারপর নদীর দিকে ঘাটের লোকজনের দিকে আর ঘাটের অদূরবর্তী ছায়াঢাকা গ্রামখানার দিকে চাহিয়া দেখিল। ছোট চোখের দৃষ্টি যতদূর যায়, দেখিল, একটির পর একটি করিয়া বাঁধা নৌকা। সব নৌকা একই আকারের, একই গড়নের। সারি সারি বাঁশের খুঁটি পোঁতা আছে। তারই একটির সঙ্গে একটি করিয়া নৌকা বাঁধা। নৌকার পেছনের দিকে এক একটা ছই। ছইয়ের দুই দিকই খোলা।

    দুপুর গড়াইয়া গিয়াছে। বেলা করিয়া যারা স্নান করিতে আসিয়াছে, ঘাটে নূতন নৌকাতে নূতন মানুষ দেখিয়া তারা কৌতুহলী চোখে চাহিয়া দেখিতেছে। অনন্তর মা এদের কাউকে চিনে না। কোন দিন দেখে নাই। কিন্তু এরাই হইবে তার পড়শী। এদের বাড়ির পাশ দিয়াই উঠিবে তার কুটির। এদেরই সঙ্গে কাটাইতে হইবে তার মুখ দুঃখের দিনগুলি। পারে উঠিয়া দৈনন্দিন কাজেকর্মে এদেরই সঙ্গে সে মিশিয়া যাইবে। তার খুব আনন্দ হইল, এরা যেন কত আপন। তিতাসের ছোট ঢেউ তীরে আসিয়া মাথা রাখিতেছে। আমার বুকের ঢেউ বুঝি ঐ নারীদের বুকে মাথা রাখিবার জন্য উদাম হইয়া উঠিয়াছে।

    একটা পাগলকে দুই বুড়াবুড়ি টানিতে টানিতে ঘাটের দিকে লইয়া আসিতেছে। পাগল একটা যুবক। হয়ত সুন্দরই ছিল। এখন কদাকার হইয়া গিয়াছে। হাড় দেখা দিয়াছে, চামড়ায় খড়ি উঠিতেছে। বিড়বিড় করিয়া কত কি যে বকিতেছে। বুড়াবুড়ির হাত ছাড়াইবার জন্য হুমড়ি খাইয়া পড়িতেছে। বুড়া তার শীর্ণ হাতখানা তুলিয়া গায়ের সব জোর একত্র করিয়া ঠাস-ঠাস পাগলটাকে মারিতেছে। মার খাইয়া পাগলটা ককাইয়া উঠিতেছে। কিছুতেই জলে নামিবে না। তারাও জলে না নামাইয়া ছাড়িবেনা। স্নান তাকে করাইবেই। পাগলের গায়ে এবার যেন হাতীর জোর আসিল। এক ঝটুকায় বুড়ার হাত ছাড়াইয়া দৌড় দিতে যাইতেছিল সে। হাতের কাছে একখণ্ড কঞ্চি পাইয়া বুড়ি সপাং সপাং করিয়া পাগলটাকে মারিল। পাগল এবার গলা ছাড়িয়া কাঁদিতে লাগিল। বুড়ার চোখেও জল আসিয়া পড়িয়াছে। বুক জোড়া নিশ্বাস ফেলিয়া সে আক্ষেপ করিতে লাগিল, ‘হায়রে বিধাতা, হায়রে উপরোল্লা, এ কি করলে, কোন পাপে তুই আমারে এ শাস্তি দিলে। সাধ করছিলাম জোয়ান পুতের কামাই খামু, তারে বিয়া-শাদি করামু, বউ ঘরে আমুম, নাতি কোলে নেমু। হায়রে আমার কপাল।’

    বুড়া ছেলের গলা জড়াইয়া ধরিয়া ভেউ ভেউ করিয়া কাঁদিয়া উঠিল। আর ছেলেও বাপের গলা জড়াইয়া একটানা বিলাপ করিতে করিতে জলে নামিল। কাঁদিতেছে না কেবল বুড়িটা। হয়ত তার মা। কিন্তু কি পাষাণ। সব কান্না তার শুখাইয়া গিয়া বুঝি বা জমাট বাঁধিয়াছে। সে কেবল দুই হাতে জল তুলিয়া গামছা দিয়া পাগলের দেহটা ঘসিয়া দিতেছে। ঘাটের নারীরা স্তব্ধ হইয়া দেখিতেছে। তাদের দৃষ্টিতে দরদ ঝরিয়া পড়িতেছে। কারো কারো চোখ সজল হইয়া উঠিতেছে। অনন্তর মার মনে হইল এই সকল নারীর সবাই তার আপন। এদের বুকের মধ্যে মাথা রাখিয়া সেও পাগলটার দিকে দরদভরা দৃষ্টিতে তাকায়, সেও ঘরে যাওয়ার কথা ভুলিয়া পাগলটার দিকে জলভরা চোখে চাহিয়া থাকে। ইচ্ছা হইল পাগলটার গলা জড়াইয়া ধরিয়া সেও খানিক গলা ছাড়িয়া কাঁদে।

    অনন্তর মা অনন্তকে শক্ত করিয়া বুকে চাপিয়া ধরিল।

  • জন্ম মৃত্যু বিবাহ

    জন্ম মৃত্যু বিবাহ

    অদ্বৈত মল্লবর্মণ

    [book-name]

    জন্ম মৃত্যু বিবাহ

    প্রথম পরিচ্ছেদ

    জন্ম মৃত্যু বিবাহ তিন ব্যাপারেই মালোরা পয়সা খরচ করে। পাড়াতে ধুমধাম হয়।

    অবশ্য সকলেই খরচ করিতে পারে না। যাদের পয়সা কড়ি নাই তারা পারে না।

    তবু প্রতি ঘরেই জন্ম হয়, বিবাহ হয়, মৃত্যু হয়। এ তিনটি নিয়াই সংসার। এ তিনের সাহায্যেই প্রকৃতি তার ভারসাম্য রক্ষা করিয়া চলিয়াছে। জন্মের পরে দীর্ঘ ব্যবধান অস্তে বিবাহ এবং তারপরে দীর্ঘ ব্যবধান অন্তে মৃত্যু হইয়া থাকে। ইহাই প্রকৃতির নিয়ম। কিন্তু যে সমস্ত ঘরে জন্মের পরেই মৃত্যু হইয়া যায় তারা দুর্ভাগ। কারণ তিনটি ব্যাপারেই খরচপাতি করা হইলেও বিবাহ ব্যাপারের খরচই সবচেয়ে আনন্দ ও অর্থপূর্ণ। বিবাহে যৌবনের স্মৃষ্টির যে নিশ্চিত সম্ভাবনা রহিয়াছে, সে-লোকে পৌঁছানোর পথ যেমন খাটো, তেমনি পথের দুই পাশে থাকে ফুলের বন, প্রজাপতি আর রামধনু। সে পথের শুরু হয় বসন্তের হরিৎ উত্তরীয়-বিছানো রঙিন সিড়ির প্রথম ধাপে। শেষ যখন হয় তখন দেখা যায় সবুজ তরুর ফুলের সমারোহ শেষ হইয়া সে-তরুতে ফল ধরিয়াছে।

    কিন্তু সে ফল পাকিয়া শুখাইয়াও তো যায় না। তখন তার ঝরিয়া না পড়িয়া উপায় কি। কালক্রমে সে তরু বন্ধ্যা হইয়া পত্রগুচ্ছ খসিয়া শিথিল হইয়াও তো যায়। তখন তার মূল উপড়াইয়া পড়িয়া না যাইয়া উপায় কি? সেরূপ ফলের জন্যও মানুষের ক্ষোভ নাই। সেরকম তরুর জন্যও মানুষের রোদন নাই।

    কেন না, জন্ম, বিবাহ, মৃত্যু এ তিন নিয়াই সংসার।

    এ তিন বস্তু প্রতিঘরেই স্বাভাবিক ঘটনা হইলেও এমনও ঘর দেখা যায় যে-ঘরে কোনকালে হয়ত বস্তু তিনটিকে দেখা গিয়াছিল, কিন্তু বর্তমান হইতে দৃষ্টি করিয়া সুদূর ভবিষ্যৎ পর্যন্ত চোখ মেলিয়া যতক্ষণই চাহিয়া থাকি না কেন—তিনটিই পর পর আসিবে এমন সম্ভাবনা দেখিতে পাই না। অতীতকে নিয়া হাসিতে পারি র্কাদিতে পারি, স্বপ্ন সাজাইতে পারি, কিন্তু ফিরিয়া তাকে পাইতে পারি না। হাতের মুঠায় পাইতে চাই তো বৰ্ত্তমান, আশায় আশায় বুক বাধিতে চাই তো ভবিষ্যৎ। কোনকালে কি হইয়াছিল সে-কথা তুলিয়া লাভ দেখি না।

    একবার যে জম্মিয়াছে সে একদিন মরিবেই। কাজেই যে ঘরে মানুষ আছে মৃত্যু সে ঘরে ঘটিবেই। কিন্তু ঘরে মানুষ আছে বলিয়াই এবং সে ঘরে মৃত্যু একদিন ঘটিবে বলিয়াই জন্ম এবং বিবাহও সে ঘরে ঘটিবেই এ কথার অর্থ হয় না। তবে এমন ঘর চোখে পড়ে খুব কম এই যা।

    মালোপাড়ায় এই দুর্ভাগ্যের অধিকারী একমাত্র রামকেশবের ঘর। বুড়াবুড়ির এখন ঝরিয়া পড়ার পালা। এ শুষ্ক তরুতে কখনো ফল ধরিবে, পাগলেও এ আশা পোষণ করিতে দ্বিধাবোধ করিবে। আর বিবাহ? জন্মিয়া পরে বিবাহ না করিয়া যে ব্যক্তি পাগল হইয়া গিয়াছে তার বিবাহের কথা ভাবিতে দ্বিধাবোধ করিবে স্বয়ং পাগলেও।

    কোনকালে এঘরে না পড়িবে জন্মিবার উলুধ্বনি, না শোনা যাইবে গায়ে-হলুদের গান। কিছুদিন পরে হোক অধিকদিন পরে হোক সে-ঘরে শোনা যাইবে শুধু একটি মাত্রই ধ্বনি। সে ধ্বনি শুনিয়া কেবল বুক কাঁপিবে, মনে এক ফোঁটা আনন্দ জাগিবে না।

    কিন্তু রামকেশবের ঘর লইয়াই মালোপাড়ার সব নয়। এখানে কালোবরণের ঘরও আছে। এ-ঘর অল্পদিনের ব্যবধানে তিনতিনটা বিবাহের চেলিপর মুখ দেখিয়াছি। তিন বউ-ই ফলন্ত লতা। তিনজনেরই পাল্লা দিয়া ছেলেমেয়ে হইতেছে। এক একটি শিশুর জন্মের উৎসবও করে জাঁকজমকের সঙ্গে। অন্নপ্রাশন করে আরও জাঁকাইয়া।

    কিছুদিন আগে মেজবে সন্তানসম্ভবা হইয়াছিল। কোনদিন স্বামীর ও নিজের খাওয়ার পর এঁটোকাঁটা ফেলিবার জন্য যদি আস্তাকুড়ের নিকটে আসিত, সেখান হইতে অনন্তর মার ঘরের সবটা চোখে পড়িত। অনন্ত তখন কতকগুলি বাঁশ বেত, একটা দা, আরো কিছু নগণ্য খেলার সামগ্ৰী লইয়া নিবিষ্ট মনে তুচ্ছ বস্তুকে প্রার্থনাতীত মর্যাদা দিবার কাজে আত্মনিয়োগ করিয়া আছে।

    মেজবউর ক্লান্তিবিকৃত মুখ আর অস্বাভাবিক রকমের দৈহিক স্ফীতির কোন কিনারা সে করিতে পারিত না।

    একদিন কালোর মাকে খুব ব্যস্ত দেখা গেল। এক দৌড়ে অনন্তদের উঠানে আসিয়া হাক দিল, ‘অনন্তর মা, জোকার দিয়া যা?’

    অনন্তর মা গেল। আরো পাঁচ বাড়ির পাঁচ নারী আসিয়া মিলিত হইল। একখানা ছোট ঘরের দরজার মুখে তারা সকলে মিলিয়া দাঁড়াইয়া আছে। সকলের মুখেই উৎকণ্ঠা। তাদের মাঝে অনন্তর মাও গিয়া দাঁড়াইল। মার কাছ ঘেঁষিয়া দাঁড়াইল গিয়া অনন্ত। কোথা দিয়া কি হইয়া গেল, অনন্ত জানিল না। একজনে মনে করাইয়া দিবার ভঙ্গিতে বলিল, ‘ছাইলা হইলে পাঁচ ঝাড় জোকার, মাইয়া হইলে তিন ঝাড়।’ অনন্তর নিকট একথাও অর্থহীন।

    কালোর মা ঘরখানার ভিতরে থাকিয়া কি সব হুলুস্কুলু করিতেছিল, গলা বাড়াইয়া বলিল, ‘বিপদ সাইরা গেছে সোনাসকল। মন খুশি কইরা জোকার দেও।’

    নারীরা উঠান ফাটাইয়া পাচবার উলুধ্বনি করিল।

    নবাগতকে মাঙ্গলিক অভ্যর্থনা জানানো শেষ করিয়া নারীরা উকি দিয়া ঘরের ভিতরটা দেখিতে চেষ্টা করিতেছে। অনন্তও সকৌতুহলে দেখিল। মেজবউর সে স্ফীতি আর নাই। শীর্ণ। উপুড় হইয়া মাটিতে পড়িয়া আছে। চুল আলুথালু। চূড়ান্ত সময়ের প্রাক্কালে তার মুখের ভিতর নিজের চুল পুরিয়া দেওয়া হইয়াছিল। সে চুল এখনো কতক কতক মুখে করিয়া বে। বেহু স হইয়া পড়িয়া আছে। রক্তে একাকার। তারই মধ্যে রক্তের চেলির মত একফালি মানুষ। ননীর মত নরম, পুতুলের মত দুর্বল। বউর পেট ফাঁড়িয়া এত দুর্বল ছোট মানুষটি বাহির হইল কি করিয়া!

    একটা নেকড়ার সাহায্যে তুলিয়া কালোর মা দরজার কাছে আনিল সমাগতা নারীদিগকে দেখাইবার জন্ত। সকলেই দেখিবার জন্য ঝুঁকিয়া পড়িল। অনন্ত একবার দেখিয়া পিছাইয়া গেল।

    ছয় দিনের দিন ঘরে দোয়াত কলম দেওয়া হইল। এই রাতে চিত্রগুপ্ত আসিয়া সেই দোয়াত হইতে কালি তুলিয়া সেই কলমের সাহায্যে শিশুর কপালে লিখিয়া যায় তার ভাগ্যলিপি।

    অষ্টমদিনে আট-কলাই। পাড়ার ছেলেদের সঙ্গে অনন্তরও ডাক পড়িল। খই, ভাজ-কলাই, বাতাসা সেও কোচড় ভরিয়া পাইল।

    তের দিন পরে অশৌচ-অন্ত। সব কিছু ধোঁয়া-পাখ্‌লার পর নাপিত আসিয়া কালোবরণাদি তিন ভাইয়ের তের দিনের খাপছাড়া দাড়ি কামাইয়া গেল। মন্ত্র পড়িয়া পুরোহিত উঠিয়া গেলে, উঠানে একটি চাটাই পাতিয়া তাতে ধান ছড়াইয়া দেওয়া হইল। নূতন একটা শাড়ি পরিয়া, নূতন একটা রঙিন বড় রুমালে জড়াইয়া ছেলেকোলে মেজবে বাহির হইল! চাটাইর উপর উঠিয়া ধানগুলি পা দিয়া সারা চাটাইয়ে ছড়াইয়া দিল। এদিকে পুরনারীরা এক সঙ্গে গলা মিলাইয়া গাহিয়া চলিল, ‘দেখ রাণী ভাগ্যমান, রাণীর কোলেতে নাচে দয়াল ভগবান। নাচ রে নাচ রে গোপাল খাইয়া ক্ষীর ননী, নাচিলে বানাইয়া দিব হস্তের পাচনি। একবার নাচ দুইবার নাচ তিনবার নাচ দেখি, নাচিলে গড়াইয়া দিব হস্তের মোহন বাশি।’

    দক্ষিণা দিয়া বিদায় করিতে করিতে কালোবরণ পুরোহিতকে বলিল, দেখেন ত কর্ত, মুখে-পস্‌সাদের ভাল দিন নি আছে। দুই কাম এক আয়োজনেই সারা করতে চাই, কি কন।’

    পঞ্জিকা দেখিয়া পুরোহিত বলিয়া দিল, পরশুই একটা ভাল দিন অন্নপ্রাশনের।

    ছোটবউর ছেলে বাড়িয়া উঠিতেছে। বসিয়া নিজের চেষ্টাতে মাথা ঠিক রাখিতে পারে। কিন্তু ইদানীং অত্যন্ত পেটুক হইয়া উঠিয়াছে। যাহা পায় খাদ্যাখাদ্য বিচার না করিয়া মুখে পুরিয়া দেয়। কালোর মা বলে, মুখে-প্রসাদ দেওয়ার এখনই উপযুক্ত সময়।

    কাজেই দুইদিন পরেই বাড়িতে আরো একটা উৎসবের আয়োজন হইল।

    সেদিনও অনস্তর মার ডাক পড়িল। আরো অনেক নারীর ডাক পড়িল। গীত গাহিবার জন্য।

    প্রথমে স্নানযাত্রা। ছেলেকোলে ছোটবোঁকে মাঝখানে করিয়া গান গাহিতে গাহিতে নারীরা তিতাসের ঘাটে গেল। ছোট বোঁ তিতাসকে নিজে তিনবার প্রণাম করিল, ছেলেকেও তিনবার প্রণাম করাইল। এক অঞ্জলি জল লইয়া তার মাথ৷ ধোঁয়াইল। শাড়ির আঁচল দিয়া মুছিয়া নদীকে আবার নমস্কার করিয়া বাড়ি ফিরিয়া আসিল।

    এক মুহূর্ত বিশ্রাম করিয়া তার চলিল রাধামাধবের মন্দিরে। সঙ্গে একথালা পরমান্ন। সেখানে পরমান্নকে নিবেদন করিয়া প্রসাদ করা হইল। ছোট বউ একটুখানি তুলিয়া ছেলের মুখে পুরিয়া দিল, বাকি সবটাই উপস্থিত ছেলেদের মধ্যে বিতরণ করা হইল।

    মালোর বিবাহে সবচেয়ে বেশি উল্লাস পায়। বিবাহ করিয়া সুখ, দেখিয়া আনন্দ। বিবাহ যে করিতেছে তার তো সুখের পার নাই। পাড়ার আর সব লোকেরাও মনে করে, আজকের দিনটা অতি উত্তম।

    যারা সবচেয়ে প্রিয়, যারা সবচেয়ে নিকটের, তাদের বিবাহ করিয়া বউ লইয়া আমোদ-আহ্লাদ করিতে দেখিলে মালোর খুব খুশি হয়। যে বিবাহও করিতে পারে না, সে রাত কাটায় নৌকাতে। এ পাড়ার গুরুদয়াল সেই দলের। বয়স চল্লিশের উপর।

    তার সঙ্গে একদিন নৌকাতে কালোবরণের ছোট ভাইয়ের ঝগড়া হইয়া গেল।

    গুরুদয়াল বলিয়াছিল সেদিন বাজারের ঘাটে, তিন বিবাহের তিন ছেলের বাপ হইয়া শ্যামসুন্দর বেপারি আবার যদি বিবাহ করে তো পুবের চাঁদ পশ্চিমে উদয় হইবে।

    কালোর ভাই প্রতিবাদ করিয়াছিল, রাখিয়া দেও। কাঠের কারবার করিয়া অত টাকা জমাইয়াছে কোন দিনের জন্তে। শেষকালে স্ত্রী কাছে না থাকিলে বেপারি কি রাত কাটাইবে তুলার বালিশ বুকে লইয়া? একবার যখন মুখ দিয়া কথা বাহির করিয়াছে, তখন বিবাহ একটা না করিয়া ছাড়াছাড়ি নাই।

    ‘হ। কইছ কথা মিছা না। শেষ-কাটালে ইস্তিরি কাছে না থাকলে মরণ-কালে মুখে একটু জল দিবে কেডায়? পুত ত কুত্তার মুত।’

    কালোর ভাই সম্প্রতি একটি পুত্র লাভ করিয়াছে। সে এখন পুত্রগর্বে গর্বিত। পুত্র জাতটার উপর এই একচেটিয়া অপবাদ দিতে দেখিয়া সে চটিয়া উঠিল, “তুমি যেমুন আঁটকুড়ার রাজা, কথাখানও কইছ সেই রকম।

    পিতৃত্বহীনতার অপবাদ। অসহ। গুরুদয়ালের মুখ দিয়া অভিশাপ বাহির হইল, ‘অখন থাইক্যা তোরেও যেন ঈশ্বরে আঁটকুড়া বানাইয়া রাখে।’

    ‘দূর হ, শ্যাওড়াগাছের কাওয়া, এর লাগি-ঐ তোর চুল পাকছে, দাড়ি পাকছে, তবু শোলার মুটুক মাথায় উঠ্‌ল না।’

    ‘নইদার পুতে কি কয়! আমার মাথায় শোলার মুটুক উঠ্‌ল না, তার লাগি কি তোর মাথা মুয়ান লাগছে দশজনের বৈঠকে? আমি কি রাইতকালে গিয়া তোর ঘরের বেড়া ভাঙছি কোনদিন, কইতে পারবে?’

    ‘খাড় হেই শালা গুরু-দাওয়াল, অখনই বাপের বিয়া মার সাঙ দেখাইয়া দেই।’

    এ নৌকা হইতে কালোর ভাই লগির গোড়া গুরুদয়ালের মাথা লক্ষ্য করিয়া ঘুরাইল। ও নৌকা হইতে গুরুদয়ালও একটি লগি তুলিয়া আঘাত করিতে উদ্যত হইল।

    নৌকার অন্যান্য লোক ব্যতিব্যস্ত হইয়া উঠিল। কেউ বলিল, ‘আরে রামনাথ ক্ষেমা দে।’ কেউ বলিল, ‘ও গুরুদওয়াল, ভাটি দেও। রামনাথ অবুজ হইতে পারে, তুমি ত অবুজ না।’

    শেষে কালোর ভাইয়ের কথাই ঠিক হইল। শ্যামসুন্দর বেপারি উত্তর মুলুক হইতে কাঠ আনাইয়া এখানে কারবার করে। সেই মুলুক হইতে একটা লোক রেলগাড়িতে করিয়া বউ-নিয়া তার বাড়িতে আসিল। শামসুন্দরের নিজে যাইতে হইল না। চিঠিপত্রেই সব হইয়া গেল।

    যেদিন বিবাহ হইবে সেদিন বৈকালে কয়েকজন বর্ষীয়সী অনন্তর মার বাবান্দায় পাড়া-বেড়াইতে আসিল। তারা প্রথমেই তুলিল আজকের বিবাহের কথা।

    একজন বলিল, ‘নন্দর-মা আছিল বেপারির পয়ল বিয়ার বউ আমার বাপের দেশে আছিল তারও বাপের বাড়ি। এক বছরই দুইজনার জন্ম, বিয়াও হইছে একই গাওয়ে। সে পড়ল বড় ঘরে আমি পড়লাম গরীবের ঘরে। তার হাতে উঠল সোনার কাঠি আমার হাতে ভাতের কাঠি। থাউক সেই কথা কই না, কই ভইন এই কথা, আজ যার সাথে বিয়া হইতাছে—এযে নন্দর-মার নাতিনের সমান। এরে লইয়া বুড়া করব কি গো? এর যখন কলি ছিট্‌ব বুড়া তখন ঝইরা পড়ব।’

    অন্যমনস্ক অনন্তর মার দৃষ্টি আকর্ষণ করিয়া অন্ত একজন বলিল, ‘কাকের মুখে সিন্দুইরা-আম লো মা।’

    তৃতীয়ার মনের বনে রঙের ছোঁয়া লাগিয়াছে। প্রবীনা হইলেও মন বুঝি তার মস্‌গুল। পরের বিবাহের বাজনা শুনিলেই নিজের বিবাহের দিনটির কথা মনে পড়ে। মনের খুশি চাপিতে না পারিয়া অনন্তকে লইয়া পড়িল, ‘কিরে গোলাম! বিয়া করবি?’

    বিবাহের কথা অনন্ত তিন চার দিন ধরিয়া শুনিতেছে। কথাবার্তার ধরণ হইতে আসলবস্তু কিছু বুঝিতে না পারিলেও এটুকু বুঝিয়াছে বিবাহ করা একটা খারাপ কিছু নয়। অতি সহজভাবে সে উত্তর দিল, ‘করমু।’

    ‘ক দেখি, বিয়া কইরা কি করে।’

    প্রশ্নটা একটু জটিল ঠেকিল। কিন্তু খানিক বুদ্ধি চালনা করিয়া বেশ সপ্রতিভ ভাবেই জবাব দিল, ‘ভাত রান্ধায়।’

    ‘হি হি হি, কইতে পারলি না গোলাম, কইতে পারলি না। বিয়া কইরা লোকে বউয়ের ঠ্যাং কান্ধে লয়, বুঝলি, হি হি হি।’

    উত্তরটা অনন্তর মনঃপুত হইল না মোটেই। ভাবিল উহু, এ হইতেই পারে না। কিন্তু সত্য হইলে ত বিপদ।

    ‘আমারে বিয়া করবি?’

    মোটা মোটা ঠ্যাং দুটির দিকে ভয়ে ভয়ে তাকাইয়া অনন্ত বলিল, ‘না।’

  • রামধনু

    রামধনু

    অদ্বৈত মল্লবর্মণ

    [book-name]

    রামধনু

    প্রথম পরিচ্ছেদ

    তিতাস নদী এখানে ধনুর মত বাকিয়াছে।

    তার নানা ঋতুতে নানা রঙ, নানা রূপ। এখন বর্ষাকাল। এখন রামধনুর রূপ। তুই তীরে সবুজ পল্লী। মাঝখানে শাদা জল। উপরের ঘোলাটে আকাশ হইতে ধারাসারে বর্ষণ হইতে থাকে। ক্ষেতের গৈরিক মাটিমাখা জল শতধারে সহস্রধারে বহিয়া আসে। তিতাসের জলে মিশে। সব কিছু মিলিয়া সৃষ্টি করে একটা মায়ালোকের। একটা আবেশমধুর মরমী রামধনুলোকের।

    বর্ষাকাল আগাইয়া চলে।

    আকাশ ভাঙ্গিয়া বর্ষণ সুরু হয়। সে বর্ষণ আর থামে না। তিতাসের জল বাড়িতে শুরু করে। নিরবধি কেবল বাড়িয়া চলে।

    হু হু করিয়া ঠাণ্ডা বাতাস বহে। নদীর ঘোলা জলে ঢেউ তোলে। সে-ঢেউ জেলেদের নৌকাণ্ডলিকে বড় দোলায়। তার চাইতে বেশি দোলায় আলুর নৌকাণ্ডলিকে।

    সকরকন্দ আলু বেচিতে রওয়ানা হইয়াছিল একটি নৌকা। পথে নামিয়াছে ঢল। ছোট নৌকা। তাতে কানায় কানায় বোঝাই। বড় বড় আলু। আধসের থেকে একসের এক একটার ওজন। নৌকার বাত ডুবে-ডুবে। তার উপর বৃষ্টির জল। এখনি না সেচিতে পারিলে হয়ত কোন এক সময় টুপ করিয়া ডুবিয়া যাইবে। বোঝাই নাও, সেউতি ঢুকে না। কাদির মিয়া হতবুদ্ধি হইয়া যায়। শুকনো বাঁশপাতার মাথালটা চিবুক বেড়াইয়া মাথায় আঁটা। তাতে কেবল মাথাটাই বাঁচে। সমস্ত শরীরে লাগে বৃষ্টির অবারণ ছাট। মাথাল শুদ্ধ মাথা বাকাইয়া কাদির তাকায় আকাশের দিকে আর কাদিরের ছেলে চায় বাপের মুখের দিকে। চার দিক একেবারেশূন্যদেখা যায়, মাথায় কোন বুদ্ধি জোগায় না। বাপ বলিতে থাকে, ‘অত মে’ন্নতের সাগরগঞ্জ আলু, বেবাক বুঝি যায় রসাতলে।’ ছেলে বলে, ‘বা-জান তুমি সাঁতার দিয়৷ পারে যাও। গরীবুল্লার গাছের তলায় গিয়া জান বাঁচাও, আমার যতক্ষণ শ্বাস ততক্ষণ আশ। যখন দেখুম নাও ডুবতাছে, দিমু সব আলু ঢাইল্যা তিতাসের পানিত। তারপর ডুবা নাও পারে লাগাইয়া তোমারে ডাক দিমু।’

    এমন সময় দেখা গেল পরিচিত জেলেনৌকা, সন্ধ্যায় ঘরেফের সাপের মত তিতাসের দীঘল বুকে সাঁতার দিয়াছে। দুই দাঁড় এক কোরা মচ মচ ঝুপ ঝাপ, করিয়া চলিয়াছে, জল কাটিয়া, ঢেউ তুলিয়। তার ঢেউ লাগিয়াই বুঝিবা ছোট আলুর নৌকা ডুবিয়া যায়। কাদির ডাকিয়া বলে, ‘কার নাও!’

    পাছার কোরা হইতে ধনঞ্জয় ডাকিয়া বলে, ’অ বনমালী, সেওতখান তাড়াতাড়ি বাইর কর। একটা অলুর নাও ডুব তাছে।’

    চট্‌পট দু’খানা দাঁড় উঠিয়া গেলে ধনঞ্জয় হাতের কোরা চিত করিয়া চাপিয়া ধরিল। সাপের ফণার মত নৌকাখানা বা দিকে চির খাইয়া কাদিরের নৌকা বরাবর রুদ্ধগতি হইয়া গেল।

    ধনঞ্জয়ের বুদ্ধি অপরূপ। তার বুদ্ধি খেলিয়া গেল একান্তই ঠিক সময়ে। একটু দেরি হইলে সর্বনাশ হইয়া যাইত।

    তারপর জেলে নৌকার তিনজন, আলুর নৌকার দুইজন, পাঁচ জনের হাত চলিল সেলাইকলের সূচের মত ফর ফর করিয়া। দেখিতে দেখিতে জেলে নৌকার প্রশস্ত ডরা এক বোঝাই আলুতে ভরিয়া গেল। আর আলুর নৌকা খালি হইয়া ভাসিয়া উঠিল।

    কাদিরের মাথার টোকা তখনও অবিশ্রান্ত বৃষ্টি হইতে তার মাথা বাঁচাইয়া চলিয়াছে। বিপদমুক্তির পরের অবসন্নতা তাকে কাবু করিল। মাচনের উপর বসিয়া পড়িয়া বলিল, ‘মালোর পুত, বড় বাঁচানটাই আজ বাঁচাইলা।’

    এতক্ষণ বৃষ্টি ছিল রিমঝিমে, ছন্দমধুর। সহসা সে-বৃষ্টি ক্ষেপিয়া গেল। মার মার কাট্‌ কার্টু শব্দে বৃষ্টি আকাশ ফাড়িয়া পড়িতে লাগিল। সাঁ সাঁ ঝম্ ঝম্ সাঁ সাঁ ঝম্ ঝম্‌ শব্দে কানে বুঝি তালা লাগিয়া যায়। তীর-ভূমি, তীরের মাঠ-ময়দান, ‘গাঁ-গেরাম’ আর চোখে দেখা যায় না। ধোঁয়াটে শাদা আবছায়ায় চারিদিক ঝাপসা হইয়া গিয়াছে।

    বনমালী মনে করিয়াছিল তারা তীরে নাও ঠেকাইয়া বসিয়া থাকিবে। কিন্তু তীর কোথায়। কাছেই তীর; তবু চোখে দেখা যায় না। ধনঞ্জয় ছইয়ের পেছনের মুখ ধাপর দিয়া ঢাকিতে ঢাকিতে বলিল, ‘বনমালী ভাই, গাঙ দীঘালে নাও চালাইয়া কোন লাভ নাই। ইখানেই পাড়া দে।’

    ভারী মোট একটা বাঁশ জলে নামাইয়া নদীর মাঝখানেই দুই জনে পাড় দিতে দিতে পুতিয়া ফেলিল। তার সঙ্গে শক্ত দড়ি দিয়া নৌকাখানা বাঁধিয়া ধনঞ্জয় বলিল, থাউক, নাও অখন বাতাসের সাথে সাথে ঘুরুক। কই অ মিয়ার পুত, ছইয়ের তলে গিয়া বও। ’

    কাদির মাথা ঢুকাইতে ঢুকাইতে থামিয়া গেল দেখিয়া বনমালী বলিল, ‘ছইয়ের তলে কিছু নাই, ভাত ব্যানুন সব খাওয়া হইয়া গেছে।’

    পাঁচজনেরই ভিজা গা। সঙ্গে একাধিক কাপড় নাই যে বদলায়। ছোট ছইখানার ভিতরে তারা গা-ঠেকাঠেকি করিয়া বসিয়া রহিল। কাদিরের ভিজা চুল এলোমেলো হইয়া গিয়াছে। তার শাদা দাড়ি হইতে বিন্দু বিন্দু জল ঝরিয়া পড়িতেছে বনমালীর কাঁধের উপর। কাদির এক সময় টের পাইয়া হাতের তালুতে বনমালীর কাঁধের জলবিন্দুগুলি মুছিয়া দিল। বনমালী ফিরিয়া চাহিল কাদিরের মুখের দিকে। বড় ভাল লাগিল তাকে দেখিতে। লোকটার চেহারায় যেন একটা সাদৃশ্ব আছে যাত্রাবাড়ির রামপ্রসাদের সঙ্গে। তারও মুখময় এমনি শাদ সোণালি দাড়ি। এমনি শান্ত অথচ কর্মময় মুখভাব। রামায়ণ মহাভারতে পড়া বাল্মীকি ও অন্যান্য মুনিঋষিদের যেন রামপ্রসাদ একজন উত্তরাধিকারী। আর এই কাদির মিয়া? হা, তার মনে পড়িতেছে। সেবার গোকনঘাটের বাজারে মহরমের লাঠিখেলা হয়। বনমালী দেখিতে গিয়াছিল। ফিরিবার সময় তাদেরই গায়ের একজন মুসলমানের সঙ্গে পথে তার দেখা হয়। তারই মুখে কারবালার মর্মবিদারক কাহিনী শুনিতে শুনিতে বনমালী প্রায় র্কাদিয়াই ফেলিয়ছিল। এর সঙ্গে আরও শুনিল তাদের প্রিয় পয়গম্বরের কাহিনী। সজন বীরত্বে ছিল বিশাল, কিন্তু তবু তার আপন জনকে বড় ভালবাসিত। কাদির যেন সেই বিরাটেরই একটুখানি আলোর রেখা লইয়া বনমালীর কাঁধে দাড়ি ঠেকাইয়া চুপচাপ বসিয়া আছে। বনমালীর বড় ভাল লাগিতেছে। বাস্তবিক, যাত্রাবাড়ির রামপ্রসাদ, বিরামপুর গায়ের এই কাদির মিয়া—এরা এমনি মানুষ, যার সামনে হোচট খাইলে হাত ধরিয়া তুলিয়৷ অনেক কাটাঘেরা পথ পার করাইয়া দিবে; আবার দাড়ির নিচে প্রশান্ত বুকটায় মুখ গুঁজিয়া, দুই হাতে কোমর জড়াইয়া ধরিয়া ফু পাইয়া কাদিলেও ধমক দিবে না, কেবল অসহায়ের মত পিঠে হাত বুলাইবে। বনমালীর চোখ সজল হইয় উঠে। তার বাপও ছিল এমনি একজন। কিন্তু সে আজ নাই। একদিন রাতের মাছধরা শেষে ভিজা জাল কাঁধে করিয়া বাড়ীফিরিতেছিল। পথের মাঝে তুফানে গাছ-চাপা পড়িয়া মারা গিয়াছে।

    ছইয়ের বাহিরে বাঁশের মাচানগুলিতে বৃষ্টির বড় বড় ফোট। পড়িয়া ভাঙ্গিয়া চৌচির—শতচির হইয়া পড়িতেছে। নৌকার বাহিরে যতদূর চোখ যায় সবটাই তিতাস নদী। তার জলের উপর বৃষ্টির লেখা-জোখাহীন ফোটাগুলি পাথরের কুচির মত, তার বুকে গিয়া বিধিতেছে আর তারই আঘাত খাইয়া ফোটার চারিপাশটুকুর জল লাফাইয়া উঠিতেছে। হাওয়া নাই, জলে ঢেউ নাই। তবু নদীর বুকময় আলোড়ন। আর, একটানা ঝ ঝ। ঝিম্ ঝিম শব্দ। ছইয়ের সামনের দিক খোল। এদিক দিয়া বাতাস ঢোকে না। বলিয়া জলের ছাটও ঢোকে না। যে দিক দিয়া ঢুকিবার, সে পিছনের দিক। সেদিক বন্ধ আছে। কাদিরের চক্ষু ছিল নৌকার বাতার বাহিরে, যেখানে কোন সুদূর হইতে তীরের বেগে ছুটিয়া আসা ফোটাগুলি তীরের মতই তিতাসের বুকে বিধিয়া আলোড়ন জাগাইতেছে। বনমালী তার গামছাখানা খানিক বৃষ্টির জলে ধরিয়া রাখিয়া, চিপিয়া জল নিংড়াইয়া কাদিরের হাতে দিয়া বলিল, ‘নেও বেপারী, গতর মোছ। কাদির সস্নেহে তার মুখের দিকে চাহিয়া দেখিল, বনমালীকে নিতান্ত ছেলেমানুষটির মত দেখাইতেছে, অথচ মালোর বেটার দেহের পেশীগুলি কেমন মজবুত।

    ‘বেপার আমার বংশের কেউ করে নাই বাবা। চরের জমিতে আলু করছি। শনিবারে শনিবারে হাটে গিয়া বেচি। বেপারীর কাছে বেচি না। বড় দরাদরি করে আর বাকি নিলে পয়সা দেয় না।’

    ‘মাছ-বেপারীরাও এই রকম। জাল্লার সাথে মুলামুলি কইরা দর দেয় টেকার জাগায় সিকা। শহরে নিয়া বেচে সিকার মাল টেকায়।’

    কাদিরের দৃষ্টি সামনের দিকে, যেখানে বৃষ্টির বেড়াজালে সব কিছু ঢাকা পড়িয়া গিয়াছে। খানিক চাহিয়া থাকিয়া বলিল, ‘কি ঢল নামৃছে রে বাবা, গাও-গেরাম মালুম হয় না। তাহার তামাক খাইতে ইচ্ছা করিতে লাগিল। এই সময়েই অন্তর্যামী বনমালী নামক ছেলেটা তামাকের ব্যবস্থায় হাত দিল। বাঁশের চোঙ্গার এক দিকে টিকা, আর এক দিকে তামাক রাখার ব্যবস্থা – কাদিরের ছেলে এইবার ভাবনায় পড়িল। সে যখন আরও ছোট ছিল, তখন বাপের সঙ্গে গ্রাম গ্রামান্তরের কত বামুন কায়েতের বাড়িতে দুধ বেচিতে গিয়াছে।

    তারা তার বাপকে আদর করিয়া ডাকিয়া বসায়। নিজের চেয়ারে বসিয়া ছেলেপুলের হাতে একখানা ধূলিধূসর তক্ত আনাইয়া মুখে মিষ্টি ঢালিয়া দিয়া বলে, ‘বও বও, কাদির বও। তামুক খাও। তাদের নিজেদের হাতে তেলকুচ্‌কুচে মস্থণ ইকী! কাদিরের জন্য বাহির করিয়া দেয় মাচার তলায় হেলান-দিয়া-রাখা সরু খামচাখানেক আকারের থেলে। কাদির আলাপী মানুষ। বলিতে যেমন ভালবাসে শুনিতেও তেমনি ভালবাসে। আলাপে মজিয়া গিয়া লক্ষ্যই করে না কোথায় বসিল আর কি হাতে লইল। ফু দিয়া ধূলা উড়াইয়া ইকার মুখে মুখ লাগায়। তার বাপ মাটির মানুষ, তাই অমন পারে। ওরা বড় লোক। তেলে জলে যেমন মিশে না, তাদের সঙ্গেও তেমনি কোনদিন মেশার সম্ভাবনা নাই। কিন্তু এরা জেলে। চাষার জীবনের মতই এদের জীবন। উঁচু বলিয়া মানের ধুলি নিক্ষেপ করা যায় না এদের উপর; বরং সমান বলিয়া গলা জড়াইয়া ধরিতেই ভাল লাগে। কাটিলে কাটা যাইবে না, মুছিলে মুছা যাইবে না, এমনি যেন একট সম্পর্ক আছে জেলেদের সঙ্গে চাষীদের। বনমালী তামাক সাজার আয়োজন করিতেছে। নিজের হুকায় স্থখের টান দিয়া, সে যদি কলকেখানা খুলিয়া তার বাপের দিকে হাত বাড়ায়, সে তখন কি করিবে; বড়লোকের হাতের অপমানে চটা যায়, কিন্তু সমান লোকের হাতের অপমানে চটা যায় না, খালি ব্যথার ছুরিতে কলিজা কাটে।

    এই ঘনঘোর বাদলের মাঝখানে বসিয়া মাথা বাঁচাইতে বাঁচাইতে কাদির হয়ত বনমালীর হুকা-বিচ্যুত কলিকাখান খুশি মনে হাতে লইত। কিন্তু বনমালী মালসায় হাত দিয় দেখে জলের ছাট লাগিয়া আগুনটুকু নিবিয়া গিয়াছে।

    নদীর মোড় ঘুরিতে বাজার দেখা গেল। একটু আগে বৃষ্টি হইয়া গিয়াছে। এখন চারিদিক ফর্সা। কিন্তু রোদ উঠে নাই। আকাশের কোন কোন দিক গুমোটে আচ্ছন্ন। মনে হয় কোথায় কোথায় যেন এখনও বৃষ্টি হইতেছে। এক একবার দমকা হাওয়া আসে। ঠাণ্ডা লাগে শরীরে। মেহনতের সময় এই বাতাস গায়ে বড় মিঠা লাগে। নৌকা একেবারে তাঁর ঘেঁষিয়া না চলিলেও, তীরের গাছ-গাছড়ার সবুজ ছায়া কাদিরের নৌকার ধমকে জলের ভিতর কাঁপিয়া মরিতেছে। ছায়াগুলি এত কাছে থাকিয়া কাঁপিতেছে, আর কাদিরের ছেলের বৈঠার আঘাত খাইয়া ভাঙ্গিয়া শতটুকরা হইয়া যাইতেছে।

    নদীর এ বাম তীর। দক্ষিণ তীর ফাঁকা। গ্রাম নাই, ঘর বাড়ি নাই, গাছ-গাছড়া নাই। খালি একটা তীর। তীর ছাড়াষ্টয়া কেবল জমি আর জমি। অনেক দূর গিয়া ঠেকিয়াছে ধোঁয়াটে কতকগুলি পল্লীর আবছায়ায়। যে সব খোলা মাঠ বাহিয়া বাতাস আসে, নদী পার হইয়া লাগে আসিয়া এ পারের গাছগুলির মাথায়।

    ছোটবড় দুইটি নৌকাই একসঙ্গে গিয়া হাটের মাটিতে ধাক্কা খাইল।

    পশ্চিম ইষ্টতে সোজা পূবদিকে আসিয়া এইখানটায় নদী একটা কোণ তুলিয়া দক্ষিণ দিকে বাকিয়া গিয়াছে। সেই কোণের মাটিই বাজারের ‘টেক’। তারই পূবদিক দিয়া একটা খাল গিয়াছে সোজা উত্তর দিকে সরল রেখার মত। নদীর বাক থেকে খালটা গিয়াছে, দেখিয়া মনে হয় নদী চলিতে চলিতে এখানে দক্ষিণদিকে মুখ ঘুরাইয়াছে আর উত্তরদিকে কোথায় অদৃশ্য হইয়া গিয়াছে তার মাথার লম্বা বেণীটা।

    সেই খালের পূব পারে একটা পল্লী। নাম আমিনপুর। একদিকে কয়েকটা পাটের অফিস, আরেক দিকে কতকগুলি ঘরবাড়ি গাছ-গাছালি। খালের এপারে হাট বসিতেছে, তার ওপারে গাছ-গাছালির মাথার উপর দিয়া আকাশে উঠিয়াছে একটা রামধন্থ। সূর্য পশ্চিমদিকে ঢলিয়া পড়িয়াছে। পূবের আকাশে কণাকণা বৃষ্টির আভাসে ঝাপসা একটা ঠাণ্ডা ছায়া লাগানো। পশ্চিমের সূর্যের সাত রঙ পূবের আকাশের মেঘলার ফাদে ধরা পড়িয়া গিয়া উঠাইয়াছে এই রামধনু।

    মাত্র ঘণ্টা দুই আগে যে বৃষ্টি হইয়াছে তেমন প্রচণ্ড বৃষ্টি খুব কমই দেখা যায়। নৌকাতে থাকিয়া ততটা বোঝা যায় না। বাড়িতে থাকিলে দেখা যাইত ঘরের চালের ঝমাম শব্দে কান ফাটিয়া যাইতেছে; চাল-বাহিয়া-পড়া একটানা বৃষ্টির জলে ছাচে লম্বা এক সারি গত হইয়া গিয়াছে। কোথায় কোন নালা আটকাইয়া গিয়া উঠান জলে ভরিয়া গিয়াছে, তুলসীতলার উঁচু মাটিটুকু বাদে ভিটার নিচের সবটুকু জায়গাডুবিয়া গিয়াছে: উঠানের কোণে অযত্নে যে-সব দূৰ্বাঘাস গজাইয়াছিল, সেগুলি জলে সাঁতার কাটিতেছে।

    খালটা শুকনা ছিল। আজিকার ঢলে মাঠময়দান ভাসিয়াছে, হালদেওয়া ক্ষেতগুলির ভাঙ্গা ভাঙ্গ মাটি ঢলে গুলিয়া গিয়া কাদা হইয়াছে। সেই কাদাগোলা জল তাল উপছাইয়া পড়িয়াছে আসিয়া খালে। শতদিক হইতে শত বাহু বাড়াইয়া দিয়া ক্ষেতের খালের দৈন্যদশা প্রাচুর্যে পূর্ণ করিয়া দিয়াছে। খালে তখন উজানের ঠেলা। যে-খাল আগে নদীর জল টানিয়া নিয়া কোনরকমে শুকনা গলা ভিজাইয়া রাখিত, আজ সে খাল উল্লোলিত, কল্লোলিত, উথলিত হইয়া স্রোত বাকাইয়া ঢেউ খেলাইয়া বুক ফুলাইয়া তার ভরা বুকের উপচানো জল তিতাসের বুকে ঢালিয়া দিয়াছে। বৃষ্টি থামিয় গিয়াছে অনেকক্ষণ, কিন্তু সে দেওয়া এখনও থামে নাই। এখনও ধারায় ছুটিয়া আসিতেছে সেই কাদাগোলা জল।

    কাদিরের পিপাসা হইয়াছিল। আজলী ভরিয়া তুলিয়া মুখে দিতে গিয়া দেখে অর্ধেক তার মাটি। বনমালী দেখিতে পাইয়া দয়ার্জ হইয়া উঠিল; ‘থইয়া দেও, খাইতে পারব না। খালের জলে গাঙের জলেরে খাইছে। মালো-পাড়ায় আমার কুটুম আছে। আলু তোলার পর নিয়া যামু তোমারে।’

    ‘কি কুটুম? সাদি সম্বন্ধ করচ, না কি?’

    ‘না। ভইন বিয়া দিছি।’

    বনমালীর সাহায্য পাইয়া কাদিরের সব আলু একদণ্ডের মধ্য হাটে গিয়া উঠিল। চারিদিকে ছড়াইয়া না পড়ে এইজন্য কাদিরের ছেলে জলো-ঘাসের ন্যাড়া বানাইয়া আলুর গাদার চারিপাশে গোল করিয়া বাধ দিল। সেই বাধ ডিঙ্গাইয়া দুই চারিট ছোট ছোট আলু এ-পাশে ও-পাশে ছিটকাইয়া পড়িতে লাগিল। আর সেগুলি মালিকের অধিকারের বাইরে মনে করিয়া ঝাপাইয়া পড়িয়া ধরিতেছিল কতকগুলি ছোট ছোট ছেলেমেয়ে। ভিখারীর ছেলে নয়, কিন্তু দেহের আকারে, বসনের অপরিচ্ছন্নতায় ও অপ্রাচুর্যে এবং অস্বাভাবিক কাঙ্গালপনায় সেগুলিকে মনে হইল যেন ভিখারীর বাড়া। ইহার সবখানেই আছে, সব দেশে সব গায়ে আর সব গায়ের বাজারে। কাদিরের যারা আলু বেচিতে আসে তারা অমন দুই চারিট আলুর জন্য ইহাদিগকে ধমক দেয় না, কিছু বলেও না। তাদের কত আলু, নিক না তুইচারিটা এই সব দুঃখীর ছেলেপিলে। পয়সা দিয়া ত কিনিতে পারে না। কিন্তু ধমক দেয় বেপারীরা। আলুতে হাত দিলে চড়-চাপড় মারে, আলু কাড়িয়া নেয়; শুধু তাদের থেকে নেওয়া আলু নয়, অপর জায়গা থেকে সংগ্রহ করা আলুও কাড়িয়া নেয় বেপারীরা। আর ছোট ছোট কচি গালগুলিতে মারে ঠাস করিয়া চড়। চড় খাইয়া উহারা চীৎকার করিয়া কাঁদে না, গাল-মুখ চাপিয়া ধরিয়া এখান হইতে সরিয়া পড়ে আরও মার খাওয়ার ভয়ে। কেবল যখন তাদের নিজের সঞ্চয় সুদ্ধ কাড়িয়া নেয়, কাকুতি করিয়া ফল হয় না, অনুরোধ করিলে উল্টা গাল খায় মা-বাপ সম্পর্কিত অশ্রাব্য ভাষায়, তখন কেবল অনুচ্চকণ্ঠে ফুপাইয় ফুপাষ্টয়া কাঁদে। কাদির এ হাটে অনেক আলু বেচিয়াছে আর অনেক দিন হইতে ইহাদিগকে দেখিয়া আসিতেছে। বছরের পর বছর ইহারা আলু কুড়াইয়া চলিয়াছে, কতক মরিয়াছে, কতক বড় হইয়া সংসারে ঢুকিয়াছে, না হয়ত পুঁজিদার কারবারী নয়তো জমি-মালিক মজুরখাটানেওয়ালা বড়-চাষীর গোলামি করিয়া জানপ্রণ খুয়াইতেছে। কাদিরকে ইহারা আর চিনিতে পরিবে না, কাদির ও ইহাদের কাউকে সামনে দেখিলে ঠাহর করিতে পারিবে না। কিন্তু তার বেশ মনে পড়ে, হাটের মাটিতে আলু ঢালিতে গিয়া ইচ্ছা করিয়া দশটা-বিশট। আলু এইসব কৃপা-প্রার্থীর দিকে ঠেলিয়া দিয়াছে। এখনও দিতে কৃপণত। করে না। হাটে এই প্রথম আলু উঠিয়াছে দেখিয়া এই খুদে ডাকাতের দল সবগুলি জোট পাকাইয়া আসিয়া এইখানে মিলিয়াছে। কারে হাতে স্যাকুড়ার একখানা ছোট থলে; পুরানো কাপড়ের লাল নীল পাড়ের সূতা দিয়া অপটু হাতের সূচের ফোড়ে তৈয়ারী। কারে হাতে মালসা কারো বা র্কোচড়মাত্র সম্বল।

    কি ভাবিয়া সহসা কাদির কল্পতরু হইয়া উঠিল। তাহার হয়ত ইচ্ছা হইয়াছিল ওদের হাতে হাতে অনেকগুলি আলু সে বিলাইয়া দেয়। কিন্তু সাবালক বড় ছেলে সামনে। কি মনে করিবে। বিক্ৰী করিতে হাটে আসিয়াছে, খয়রাত করিবার কোন অর্থ হয় না। ইচ্ছা করিয়া খুশি মনে নড়াচাড়া করিতে করিতে ঘাসের বাধ উপচাইয়া কতকগুলি আলু চারিপাশে ছড়াইয়া দিল ওদের জন্য। ছেলের দৃষ্টি এড়াইলন, ‘না করলাম বোয়ানি, না করলাম সাইত; তুমি বাপ অখনই এইভাবে দিতে লাগছে!’

    কাদির অজুহাত পাইল সঙ্গে সঙ্গেই, ‘কাট-আলু খরিদারে নেয় না, বাছাবাছি কইরা থুইয়া রাখে। দিয়া দিলাম।’

    ছেলে খুঁতখুঁত করিতে লাগিল, কিন্তু সাইত করলাম না।’ কাদির দিল খোলা ভাবে হাসিয়া বলিল, ‘করলাম এই এতিম ছাইলা-মাইয়ার হাতেই পরথম সাইত। খাইয়া দোয়৷ করব। আল্লা বড় বাচন বাঁচাইছে আইজ।’

    কাদিরের এই কাজকর্ম বনমালীর খুব ভাল লাগিতেছিল। বিস্ময়ের সহিত সে কাদিরের মুখের দিকে চাহিয়া রহিল। কাদির বনমালীর দিকে চাহিয়া তার ছেলেকে লক্ষ্য করিয়া বলিল, বড় আভাগ্য। এরা। কেউর মা নাই, বাপ নাই, লাথি ঝাটা খায়; কেউর মা আছে, কিন্তু দানা দিতে পারে না। কেউর বাপ আছে মা নাই। লোকে কয়, মা মরলে বাপ তালই, ভাই বনের পশু।’

    তামাক জ্বালাইয়া আনিয়াছিল। টিকায় ফু দিতে দিতে বনমালী বলিল, ‘একজনের যে মা মরছে, চোখের সামনেই দেখ তাছি।’

    কাদিরের দৃষ্টি পড়িল ছেলেটার দিকে। লম্বা, কৃশ, হাড় জিরজির করিতেছে। শিশুমুখে ও মলিনতার ছাপ বেয়াড় রকমের স্পষ্ট। দলের বাহিরে দাঁড়াইয়া বড় বড় চোখ দুইটি মেলিয়া রাখিয়াছে কাদিরের মুখের উপর। ছেলের কাড়াকড়ি করিয়া হরির লুটের বাতাসার মত আলু ধরিতেছিল, আর সে নীরবে দাঁড়াইয়া আশাপূর্ণ মনে কামনা করিতেছিল কাদির বুড়ার মনের একটুখানি ছোয়া। যেন তাকে দেখিতে পাইলে অন্যান্য ছেলেদের থেকে আলাদা করিয়া শুধু তার একার জন্য বুড়া করুণার ধারা বহাইয়া দিবে। এ যেন তার দাবি। চিরদিনের নির্ভরতা মাখানে এই দাবি দুনিয়া যদি পূর্ণ করে তবে ভাল কাজ করা হইবে, যদি না করে তো না করিবে, সে শুধু একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিয়া এখান থেকে চলিয়া যাইবে।

    কাদির দুই মুঠ আলু তুলিয়া তার চোখের দিকে চাহিয়া একদিকে সরিয়া আসার ইঙ্গিত করিল। তার মুখে হাসি ফুটিয়া উঠিল। স্বচ্ছ আবদেরে হাসি; কিন্তু বড় মান। সর্বাঙ্গে মাতৃরিষ্টির ধ্বজ ধারণ করিয়া সে ছিল নীরবে দণ্ডায়মান। কাদিরের ডাকে সহসা সে আগাইয়া আসিল না।

    দান প্রত্যাখ্যানের ভব্যতা।’আরে নে, আগাইয়া ধর; না তাইলে তারা নিয়া যাইব।’

    ছেলেটা আদরে গলিয়া গিয়া ঘাড় নিচু করিল, তারপর ঘাড় ঘুরাইয়া অর্থহীন ভাবে এদিক ওদিক চাহিল, আর চাহিল মাথা তুলিয়া একবার সামনের, খাল পারের, আমিনপুর গ্রামের উপরের পূব আকাশের দিকে। কাদিরের অযাচিত দানের ধনগুলি তখন তার পায়ের কাছে মাটিতে লুটাইতেছে। আর সেই যে সে আকাশের দিকে চাহিল, একভাবে চাহিয়াই রহিল, মাথা আর নামাইতে পারিল না। কাদির তার চাওয়ার বস্তুর খোজে তাকাইল, কিছু বুঝিতে পারিল না। বনমালী তার চোখের দৃষ্টি অনুসরণ করিয়া দেখিল, আমিনপুরের গাছগাছালির মাথার উপর দিয়া আকাশে রামধনু উঠিয়াছে। ছেলেটা তারই দিকে চাহিয়া আছে।

    ‘অ, ধেনু উঠছে। তাই দেখ তাছে। বলিল বনমালী। জেলে সে। জেলেরা আর চাষীরা জল আর মাটি চষিয়া বেড়ায় মুক্ত আকাশের নিচে। উদয়ের মাধুরী আর অস্তের বিধুরতা কোনদিন গোপন থাকে না তাদের কাছে। কিন্তু তারা কি সে সব কখনো চাহিয়া দেখিয়াছে? দেখিয়াছে কেবল দুপুরের খরাটাকে, যখন মাথার উপর আগুনের মত আসিয়া পড়িয়াছে তখন। শীতে শরতে সকালে বিকালে আকাশের গায়ে খামচা খামচা কত রঙীন মেঘ ভাসিয়া বেড়াইয়াছে। বৃষ্টির ফাঁকে ফাঁকে সূর্য চোখ মেলিলে তার বিপরীত দিকের আকাশে জাগিয়াছে কতদিন কত রামধনু। তারা কি কোনদিন তাহা  চাহিয়া দেখিয়াছে? হয়ত দেখিয়াছে। কিন্তু নূতন কিছু লাগে নাই চোখে। উঠে, মিলাইয়া যায়। চাহিয়া থাকিয়া দেখিবার কিছু নাই রামধনুতে। শিশুরা মায়ের কোলে থাকিয়া আকাশে চাঁদ দেখিয়া হাসে, হাততালি দেয়। কই বনমালীরা তো কোনদিন চাঁদের দিকে চাহিয়া হাসেও নাই হাততালিও দেয় নাই। কাদির মিয়াদের ঈদের চাঁদ দেখিবার কত আগ্রহ। কত আনন্দ আর পুণ্যের বাণী লইয়া আকাশের এক কোণে উঁকি দেয় রমজানের চাঁদ। একফালি তুর্বল, প্রভাহীন চাঁদ—চাঁদের কণা বলিলেই চলে। কিন্তু সে চাঁদ যখন বড় হইয়া আকাশে সাঁতার কাটে তখন তো কই তারা চাহিয়াও দেখে না। তেমনি রামধনু দেখিবে বালকে, দেখিবে এই বোকা অর্বাচীন ভিখারী ছেলেট। দেখুক সে রামধনু; আর এদিকে তার পায়ের কাছে থেকে ছড়ানো আলুগুলি আর আর ছেলেরা কুড়াইয়া নিয়া যাক। বনমালীর ইচ্ছা হইল আলুগুলি কুড়াইয়া দেয়। কিন্তু নাবালকের দেখাদেখি রামধনুর দিকে চাহিয়া সেও নাবালক হইয়া গেল। সত্যই ত, রামধনু দেখিতে অত সুন্দর। তার বোনটি যখন ছোট ছিল, সেও একদিন তেমনি করিয়া রামধন্থর দিকে চাহিয়াছিল। কিন্তু সে আমন বোকার মত সব ভুলিয়া চাহিয়া থাকে নাই। হাতে নূতন ছগাছ। কাচের চুড়ি কিনিয়া দেওয়া হইয়াছিল। তাহাই বাজাইয়া হাততালি দিতেছিল আর একটা ছড়া কাটিতেছিল, ‘রামের হাতের ধেনু, লক্ষ্মণের হাতের ছিল, যেইখানের ধেনু সেইখানে গিয়া মিলা।’ মেয়েদের ধারণা, এই মন্ত্র পড়িলে রামধনু মিলাইয়া যাইবে। বোনটিকে কতদিন ধরিয়া দেখিতে যাওয়া হয় নাই। এই গায়েই তার বিবাহ হইয়াছে। এই হাটের অল্প দূরেই তার স্বামীর বাড়ি।

  • রাঙা নাও

    রাঙা নাও

    অদ্বৈত মল্লবর্মণ

    [book-name]

    রাঙা নাও

    প্রথম পরিচ্ছেদ

    চৈত্র মাসের খরায় যখন মাঠঘাট তাতিয়া উঠিয়াছিল, তখন বিরামপুর গ্রামের কিনারা হইতে তিতাসের জল ছিল অনেকখানি দূরে। পল্লীর বুক চিরিয়া যে-পথগুলি তিতাসের জলে আসিয়া মিশিয়াছে, তারা এক একটা ছিল এক-দৌড়ের পথ। কাদিরের ছেলে ছাদির তার পাঁচ বছরের ছেলে রমুকে তেল নাখাইয়া রোজ দুপুরে এই পথ দিয়া তিতাসে গিয়া স্নান করিত। ছাদির তাহাকে কোলে করিয়া ঘাটে যাইত আর তার পেটের ও মুখের জবজবে তেল বাপের কাঁকালে ও কাঁধে লাগিত। বাঁ হাতে বাপের কাঁধ ধরিয়া ডান হাতে সেই তেল মাখাইয়া দিতে দিতে মাঝ পথে রমু জেদ ধরিত, ‘বাজান, তুই আমারে নামাইয়া দে।’ কিন্তু বাপ কিছুতেই নামাইত না। বরং তার নরম তুলতুলে শরীরখানা দিয়া নিজের শক্ত পেশীবহুল শরীরে রগড়াইতে থাকিত, আর মনে মনে বলিত, কি যে ভাল লাগে।

    তারপর ঘাটে গিয়া এক খামচা বালি তুলিয়া নিজের দাঁত মাজিত এবং ছেলের দাঁতও মাজিয়া দিত। গামছা দিয়া ছেলের গা, নিজের গা রগড়াইয়া ছেলেকে লইয়া গলা-জলে গিয়া ডুব দিত। কখনও একটু আলগা করিয়া ধরিয়া বলিত, ‘ছাইড়া দেই?’ রামু তার কাঁধ জড়াইয়া ধরিয়া বলিত, ’দে ছাইড়া।’

    পরিষ্কার জল ফট্ ফট্‌ করে, তাতে মৃদুমন্দ স্রোত। কাটারিমাছ ভাসিয়া ভাসিয়া খেলা করে। বাপ-ব্যাটার গায়ের তেল জলের উপর ভাসিয়া বেড়ায়, তারই নিচে থাকিয়া ছোট ছোট মাছেরা ফুট ছাড়ে; রমু হাত বাড়াইয়া ধরিতে চেষ্টা করে, পারে না।

    ধরিত্রীর সারাটি গ৷ ভীষণ গরম। একমাত্র ঠাণ্ডা এই তিতাসের তলা। জল তার বহিরবয়বে ধরিত্রীর উত্তেজনা ঠেলিয়া নিজের বুকের ভিতরটা সুশীতল রাখিয়াছে এই দুষ্ট বাপ-ব্যাটার জন্য। অনেকক্ষণ ঝাপাইয়া বুপাইয়াও তৃপ্তি হয় না, জল হইতে ডাঙ্গায় উঠিলেই আবার সেই গরম। ছাদির শেষে ছেলেকে বলিল, ‘তুই কান্ধে উঠ, তরে লইয়া পাতাল যামু।’ রমু কার কাছে যেন গল্প শুনিয়াছে, জলের তলে পাতাল-নাগিনী সাপ থাকে। বলিল, ‘না বা’জান, পাতাল গিয়া কাম নাই, শেষে তরে সাপে খাইলে আমি কি করুম ক’।’

    ছেলেপিলের ভয়-ডর ভাঙ্গাইতে হয়। তাই ধমক দিয়া বলিল, ‘সাপের গুষ্টিরে নিপাত করি, তুই কান্ধে উঠ্‌। বাপের দুই হাতের আঙ্গুলে শক্ত করিয়া ধরিয়া রমু তার কাঁধে পা রাখিয়া এবং কাঁপিয়া কাঁপিয়া শরীরের ভারসাম্য রাখিতে রাখিতে অবশেষে সটান স্থির হইয়া দাঁড়াইতে পারিল। শেষে খুশির চোটে হাততালি দিতে দিতে বলিল, ‘বাজান, তুই আমারে লইয়া এইবার পাতাল যা।’

    ছেলের খুশিতে তারও খুশি উপ্‌চাইয়া উঠিল, সেও হাত দুইটা জলের উপর তুলিয়া তালি বাজাইতে বাজাইতে বলিল, ‘দম্ব দম্ব তাই তাই, ঠাকুর লইয়া পুবে যাই।’

    ঘাটে নানা বয়সের স্ত্রীলোকেরা নাইতে ধুইতে আসিয়াছিল, কেউ কেউ বলিল— ‘কি রকম কুয়ারা করে দেখ্‌।’

    — ‘হইব না? কম বয়সে পুলা পাইছে, পেটে থুইব না পিঠে থুইব দিশ্‌ করতে পারে না।’

    জল হইতে উঠিয়া ছেলের গা মুছাইয়া ছোট দুই-হাতি লুঙ্গিখানা পরাইয়া বলিল, ‘এইবার হাইট্যা যা।’

    কয়েক পা আগাইয়া শক্ত মাটিতে পা দিয়া দেখে আগুনের মত গরম। পা ছোয়াইলে পুড়িয়া যাইতে চায়। করুণ চোখে বাপের মুখের দিকে চাহিয়া বলে, ‘বাপ, আমারে কোলে নে, হাঁটতে পারি না।’

    বাপের কোলে চড়িয়া তার বুকের লোমগুলির মধ্যে কচি গালটুকু ঘষিতে ঘষিতে রমু বলিল, ‘বাপ, তুই আমারে খড়ম কিন্যা দে। এমুন ছোট্ট ছোট্ট দুইখান খড়ম, তা হইলে আর ত’র কোলে উঠতে চামু না।’

    ‘পাওয়ে গরম লাগে! ওরে আমার মুনশীর পুত্‌ রে! পাওয়ে গরম লাগলে জমিনে কাম করবি কেমনে?’

    উঠানে পা দিবার আরেকটু বাকি আছে। তিতাস হইতে এক চিলতা খাল গ্রামখানাকে পাশ কাটাইয়া সোজা উত্তর দিকে গিয়াছে। মেটে হাঁড়ি-কলসী বোঝাই একটা নৌকা জোয়ারের সময় খালে ঢুকিয়া পড়িয়াছিল, ভাঁটায় আটকা পড়িয়াছে। লাল-কালো হাঁড়িগুলি খালের পাড় ছাড়াইয়া উঁচু হইয়া উঠিয়াছে। এখান হইতে দেখা যায়, রোদে সেগুলি চিক্‌ চিক্‌ করিতেছে। সেদিকে আঙ্গুল বাড়াইয়া রমু বলিল, জমিনে কাজ করিবে না, পাতিল বেপার করিবে।

    ‘ঠুন্‌কা জিনিস লইয়া তারা গাঙে গাঙে চলা-ফিরা করে, নাওয়ে নাওয়ে ঠেস-টাক্কুর লাগলে, মাইট্যা জিনিস ভাইঙ্গা চুরমুচুর হইয়া যায়। তুই যে রকম উটমুইখ্যা, তুই নি পারবি পাতিলের বেপার করতে?’

    —‘তা আইলে আম-কাঠালের বেপার করুম।’

    ‘নাওয়ে আম-কাঠাল বড় পচে। কোন গতিকে দুই একটাতে পচন লাগলে, এক ডাকে সবগুলিতে পচন লাগে, তখন নাও ভরতি আম-কাঠাল জলে ফালাইতে হয়। লাভে-মূলে বিনাশ। তুই যে রকম হুঁস-দিশা ছাড়া মানুষ, পচা লাগলে টের নি পাইবি; শেষে আমার বাপের পুঁজি মজাইয়া বাপেরে আমার ফকির বানাইবি।’

    —‘তা হইলে বেপার কইরা কাম নাই।’

    —‘হ বাজি। বেপারীরা বড় মিছা কথা কয়। সাত পাঁচ বারো কথা কইয়া লোকেরে ঠকায়; কিনবার সময় বাকি, আর বেচবার সময় নগদ। আর যে পাল্লা দিয়া জিনিস মাপে, তারে কিনবার সময় রাখে কাইত কইরা, আর বেচবার সময় ধরে চিত কইরা। এর লাগি ত’র নানা বেপারীরে দুই চক্ষে দেখতে পারে না। তুই যদি বড় হইয়া ময়-মুরুব্বির হাল্‌-গিরস্তি ছাইড়া দিয়া বেপারী হইয়া যাস তা হইলে ত’র নানা ত’রেও চোর ডাকব, আর—’

    ‘আর কি—’

    ‘শালা ডাকব।’ রমু একটু হাসিয়া ফেলিল; অপমানাহত হইয়া বলিল, ‘অখন আমারে নামাইয়া দে।’ মুখে তার কৃত্রিম ক্ষোভের চিহ্ন।

    ক্ষেতে কাজের ধুম পড়িয়াছে। ছাদিরের মোটে অবসর নাই। ছেলের দিকে চাহিবার সময় নাই। ছেলের মার হাতেও এত কাজ যে, দুই হাতের দশগাছ বাঙ্‌রীর মধ্যে দুইখানা ভাঙ্গিয়া ফেলিল। ছেলের মা হওয়ার পর হইতে সংসারে তার গৌরব বাড়িয়াছে, কিন্তু শ্বশুর কাদির মিয়া তাহাকে ছাড়িয়া কথা কহিলেও তার বাপকে ছাড়িয়া কথা কহিবে না। কোন একবার খাইতে বসিয়া যদি দেখে বেটার বউর হাতের অতগুলি বাঙ্‌রীর মধ্যে কয়েকটা কম দেখা যাইতেছে, তবে নিশ্চয়ই শালার বেটি বলিয়া গালি দিবে, কেহ আট্‌কাইতে পারিবে না। সন্ধ্যায় বেদেনী আসিলে তাহার নিকট হইতে দুই পয়সার দুইটি বাঙ্‌রী কিনিয়া পুরাইয়া রাখা যাইতে পারে, কিন্তু পয়সা ছাদির দিলে ত! নিজেকে তাহার যেন বড়ই অসহায় মনে হইতে লাগিল। এই রকম মাঝে মাঝে হয়; তখন সে পুত্র রমুর দিকে তাকায়, তাকে আদর করে, কোলে নেয়, ভাবে, সে বড় হইয়া যখন সংসারের দায়িত্বের অংশ লইবে তখন কি তার মীর কিছু কিছু স্বাধীনতা এ সংসারে বর্তাইবে না? এখনও রমুর দিকে চাহিবার জন্য তাহার চোখ দুইটি সতৃষ্ণ হইয়া উঠিল, কিন্তু কোথায় রমু?

    রমু ততক্ষণে খালের পাড়ে। হাঁড়ি-বোঝাই নৌকাটির জন্য সারাক্ষণ তার মন কৌতুহলী হইয়া থাকিত। বিকাল পড়িতে বাপকে অনুপস্থিত ও মাকে কাজে ব্যস্ত দেখিয়া সে একবার হাঁড়ির নৌকাখানা দেখিতে আসিয়াছে।

    হাঁড়ির একটা পাহাড় যেন ঠেলিয়া মাথা উঁচু করিয়াছে। নৌকাখানা বড়। চারিদিকে খুঁটি গাড়িয়া খোয়াড় বানাইয়া হাঁড়ির কাড়ি পরতে পরতে বড় করিয়াছে। সকালে ঝুড়ি-ঝুড়ি হাঁড়ি বিক্রয় করিতে গায়ে গিয়াছিল। ধান-কড়ি লইয়া ফিরিয়া আসিয়া রাঁধিয়াছে, খাইয়াছে,—এখন উহারা বিশ্রামে ব্যস্ত।

    বিরাট একটা দৈত্যের মত নৌকাখান। এখানে আটক পড়িয়াছে। জল শুক্‌না। নড়িবার চড়িবার ক্ষমতা নাই। কিন্তু লোকগুলির মনে সেজন্য কোনই দুশ্চিন্তা দেখা যাইতেছে না। তারা যেন দিনের পর দিন এইভাবে ঝুড়ি ঝুড়ি হাঁড়ি লইয়া গাঁওয়াল করিতে যাইবে। তারপর সব হাঁড়ি কলসী বিক্রয় হইয়া গেলে একদিন জোয়ার আসিবে, তিতাসের জল ঠেলিয়া খালে আসিয়া ঢুকিবে, এবং বহুদিন পর এই বিরাট দৈত্য গাঁ নাড়া দিয়া উঠিবে। ইহার পর আর তাহাদিগকে কোন দিন দেখা যাইবে না। প্রতি বারে নূতন নূতন গায়ে গিয়া ইহারা পাড়ি জমাইবে। তাই কি তাহাদের মনে স্ফূর্তি? ঠাণ্ডা হাওয়া দিয়াছে, একজন বারমাসী গান তুলিয়াছে— ‘হায় হায়রে, এহিত চৈত্রি না মাসে গিরস্তে বুনে বীজ। আন গো কটোরা ভরি খাইয়া মরি বিষ ॥ বিষ খাইয়া মইরা যামু কানবে বাপ মায়। আর ত না দিবে বিয়া পরবাসীর ঠাঁই ॥’

    রমু তীরে দাঁড়াইয়া মুগ্ধ হইয়া শুনিতেছিল। খালের ওপারে কাঁচি হাতে দাঁড়াইয়া আরও একজন শুনিতেছিল সেই গান। সে ছাদির। কি একটা কাজের কথা মনে পড়ায় সকাল সকাল কাজ সারিয়া বাড়ি ফিরিতেছিল সে।

    গান চলিতে লাগিল স্তবকের পর স্তবক—পদের পর পদ। বিরহ-বেদনাচ্ছন্ন করুণ সুরের গানখান বৈকালিক ঠাণ্ডা হাওয়াকে বিষাদে ভারী করিয়া তুলিতেছিল। এক বিচ্ছেদকুলা নারীর এক বুক-সেঁচা ফরিয়াদ পাতিল-ব্যাপারীর কণ্ঠস্বরে যেন ধরা দিয়াছে। সে-নারী মাসের পর মাস প্রিয়-বিচ্ছেদের দুঃখভার গানের তানে হালকা করিয়া দিতেছে।

    ‘আসিল আষাঢ় মাস হায় হায়রে, এহিত আষাঢ় মাসে গাঙে নয়া পানি। যেহ সাধু পাছে গেছে সেহ আইল আগে। হাম নারীর প্রাণের সাধু খাইছে লঙ্কার বাঘে॥’

    অবশেষে আসিল পৌষ মাস — ‘হায় হায়রে, এহিত পৌষ না মাসে পুষ্প অন্ধকারী। এমন সাধের যৈবন রাখিতে না পারি। কেহ চায় রে আড়ে আড়ে কেহ চায় রে রইয়া। কতকাল রাখিব যৈবন লোকের বৈরী হইয়া ॥’

    একটু পরে সন্ধ্যা নামিবে। বউ-ঝির ওপারের ওই পথ দিয়া নদীতে যাইতেছে, কেহ কেহ ফিরিয়া আসিতেছে। গানের কথাগুলি শুনিয়া ছাদির ব্যথিত হইল। ডাকিয়া বলিল, ‘অ পাতিলের নাইয়া, এই গান তোমরা ইখানে গলা ছাইড়া গাইও না, মানা করলাম।’

    পলকে গান থামিয়া গেল। বাধা পাইয়া গায়কের মুখ বেদনায় মলিন হইয়া গেল। কোন উত্তর না দিয়া সে মাথ৷ নিচু করিল।

    ছাদিরের মনে বড় কষ্ট হইল। তাই তো, ওতো কেবল গানই গাহিয়াছে, গানের কথার ভিতর কি আছে না আছে সেদিকে তো তার লক্ষ্য ছিল না। আপন সুরে আপনি মাতোয়ারা হইয়া সে তো কেবল কোন বিস্মৃত যুগের কোন বিরহিণী নারীর কথাগুলি বৈকালী-হাওয়ায় মাঠের বুকে ঢালিয়া দিয়াছে মাত্র। তার দোষ কোথায়? হাঁটুজলে খাল পার হইয়া ছাদির এপারে আসিল, তারপর ছেলের হাত ধরিয়া ফিরিতে ফিরিতে ঘাড় বাঁকাইয়া বলিল, ‘গান থামাইলা কেনে, গুন্‌গুনাইয়া গাও, গুন্‌গুনাইয়া গাও।’

    উঠানের বুকটা চিতানে। জল জমিতে পারে না, সব সময় শুক্‌না, ঠন্‌ঠনে। বিকালে একপাল হাঁসমুরগী সেখানে ঝি-পুত লইয়া চরিয়া বেড়াইয়াছে এবং সারাটা উঠান নোংরা করিয়াছে। গোলায় অজস্র ধান। সারা বছর খাইয়া বিলাইয়া, হাঁড়ি-পাতিল খইয়ের-মোয়া রাখিয়াও সে-ধান কমে না, এমনি অজস্র। ঢেঁকিঘরে সাপের গর্ত ধরা পড়িয়াছে। মাটি খুঁড়িয়া নিঃসন্দেহ না হওয়া পর্যন্ত সেখানে গিয়া ধান ভানা চলে না। জ্যোৎস্না রাতের সাঁঝ। সেই উঠানেরই একদিকে ননদদের লইয়া ধান ভানিতে হইবে। মস্তবড় ঝাটাখানা দুই হাতে ধরিয়া কোমর বাঁকাইয়া অতবড় উঠানখানা ঝাড় দিয়া শেষ করিতে করিতে বেলাটুকু ফুরাইল; নবমী তিথির ঝাপসা চাঁদের আলোয় সেই উঠান চক্‌চক্ করিয়া উঠিল। এমন সময় দেখা গেল খালের কিনারা হইতে গোপাটের পথ ধরিয়া একটা লোক আগাইয়া আসিতে আসিতে একেবারে উঠানের কোণে আসিয়া পা দিল। চার ভিটায় চারখানা বড় ঘর। কোণাখামচিতে আরো ছোট ছোট ঘর কয়েকখানা আছে। উঠানের পূর্ব-দক্ষিণ কোণ দিয়া তুষ্টঘরের ছায়ায় আসিয়া লোকটা থমকিয়া দাঁড়াইল, চাপা গলায় ডাক দিল— ‘পেশ্‌কারের মা, অ, খুশী!’

    খুশী ঝাঁটা নামাইয়া আগাইয়া আসিল, ‘বা’জান তুমি?’

    ‘হ, আমি।’

    ‘ঘরে আইঅ।’

    ‘হাঁ, ঘরেই আসিব, এবার আর বাহিরে থাকিব না। পিঠে ‘গাতি’ বাঁধিয়া আসিয়াছি; গালাগালি করিলে আমিও করিব; মারামারি করিলে আমি ও মারিব। আমি তৈয়ার।’

    খুশী অপমানে মাথা নিচু করিল। গহনার দেন মিটাইতে পারে নাই বলিয়া তার বাপ এমন চোরের মত আসে।

    ‘তোর পেশ্‌কার কই?’

    ‘উত্তরের ঘরে বাপের সাথে কিচ্ছা শুনিতেছে।’

    ‘ও, বড় পেশ কার কই?’

    খুশী ফিক্‌ করিয়া একটু হাসিল, ‘হউরের কথা কও! বাজারে গেছে।’

    কাদির বাজার হইতে আসিলে তিনজনে তাহার নিকট তিন রকমের তিনপ্রস্ত নালিশ জানাইবে, স্থির হইয়া রহিল। খুশীর পেটে রমুর কোন ভাই-বোন আসিতেছে। এই বিরাট সংসার হইতে সে কিছুদিনের জন্য ছুটি নিয়া বাপের বাড়িতে যাইতে চায়। বাপ মুহুরী। তার বাড়িতে হাল নাই গিরস্তি নাই, সারাদিন কাজের ঝামেলা নাই। এই হাজার কাজের ঝামেলা হইতে দিন কয়েকের ছুটি নিয়া সেখানে একটু নিশ্বাস ফেলিতে চায় সে। বাপ এ কথাই জানাইতে আসিয়াছে কাদিরকে। কিন্তু তাহার নিজে বলার সাহস নাই। এতো আর আদালত নয় যে ধমক দিয়া মক্কেল দাবকাইবে। এ কাদির মিয়ার সংসার, এখানে তারই একচ্ছত্র অধিকার। বাপের অসহায়তা দেখিয়া খুশী নিজেই বিদ্রোহী হইয়া উঠিল। সে নিজেই বলিবে শ্বশুরকে, যে-কথা বাপ বলিতে আসিয়াও বলিতে পারিতেছে না, চোরের মত এক কোণে লুকাইয়া আছে।

    আর এক আবেদন ছাদিরের। গত বছরের পাট বিক্রির চারশ টাকা তার চাই, দৌড়ের নৌকা গড়াইবে। শৈশব হইতে বাপের সঙ্গে খাটিতে খাটিতে সে জান কালি করিতেছে। কোনদিন কোন সাধ-আহ্লাদ পুরণের জন্য বাপের কাছে নালিশ জানায় নাই। আজ সে এ নালিশটুকু জানাইবেই। তাতে বাপ রাগিয়া উঠুক আর যাই করুক।

    তৃতীয় নালিশ রমুর। নানা তাহাকে শালা বলিবে, একথা শুনাইয়া তার বাপ প্রায়ই তাহাকে অপমান করে। আজ এর একটা হেস্তনেস্ত সে করিবে।

    ছোট একটা ঝড়ই বুঝি-বা আসিল। কাদির মিয়া ঘরে ঢুকিলে তেমনি সকলে সন্ত্রস্ত হইয়া উঠিল। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই তিনজন নালিশকারীই তাহার নিকট আসিয়া উপস্থিত হইল। প্রথমতঃ কাহারও মুখে কোন কথাই জোয়াইল না। একটু দম নিয়া ছাদিরই কথা বলিতে আগাইয়া আসিল। নতুবা স্ত্রী ও পুত্রের নিকট তাহার মর্যাদা থাকে না।

    ‘বা’জী তোমার হাতে কি?’

    ‘হাতে খাইয়া-নাচুনী।’

    —পরিষ্কার রাগের কথা। ছাদির নিঃশব্দে বাহির হইয়া গেল। খুশী ঘোমটা টানিয়া ঘরের এক কোণে সরিয়া গেল। রমু নিকটে বসিয়া প্রদীপের আলোয় নানার চক্‌চকে দাড়িগুলোর ফাঁকে রাগেকম্পিত ঠোঁট দুইটি লক্ষ্য করিতে লাগিল। খড়ম পায়ে দিয়া হাত মুখ ধুইয়া আসিয়া তামাক টানিতে টানিতে কাদির মিয়া ডাকিল, ‘অ ছাদির, অ ছাদির মিয়া!’

    ছাদির উঠানে স্ত্রীর নিকট এক ঝুড়ি ধান নামাইয়া দিয়া ছুটিয়া আসিয়া বলিল, ‘বা’জি আমারে ডাক্‌ছ?’

    ‘হ, এক বিপদের কথা কই। উজানচরের মাগন সরকার মিছা মামলা লাগাইছে।’

    ‘মামলা লাগাইছে?’

    ‘হ, মিছা মামলা। বাপ দাদার আমলের জমি-জিরাত। নেয্য মতে চইয়া খাই! দরকার হইলে ধারকর্জ করি, পাট বিক্রির পর শোধ করি। কারে ফসলের ক্ষেতে পাড়া দেই না, আমারো ফসলের ক্ষেতে কেউ পাড়া দেয় না। তার মধ্যে এমুন গজব!’

    ‘কি বইলা লাগাইল মামলা?’

    ‘তিসরা সনের তুফানে বড় ঘর কাইত হইয়া পড়ে, তখন দুই শ টাকা ধার করি। পরের বছর পাট বেচি বার টাকা মণে। কাঁচা টাকা হাতে। আমার বাড়ির গোপাট দিয়া মাইয়ার বাড়ি যাইবার সময় ডাক দিয়া আইন্যা সুদে আসলে দিয়া দিলাম। টাকা নিয়া যাইতে যাইতে কইয়া গেল, গিয়াই তমসুকের কাগজ ছিঁড়া ফালামু, কোন ভাবনা কইর না। এতদিন পরে সেই কাগজ লইয়া আমার নামে নালিশ করছে।’

    ‘বা’জান তুমি বড় কাচা কাম কর।’

  • দুরঙা প্রজাপতি

    দুরঙা প্রজাপতি

    অদ্বৈত মল্লবর্মণ

    [book-name]

    দুরঙা প্রজাপতি

    প্রথম পরিচ্ছেদ

    সুবলার-বউয়ের জীবনে একটা প্রচণ্ড ঝড় বহিয়া গিয়াছে। ছেলেবেলা মা বাবা তাকে অত্যন্ত ভালবাসিত। কোনদিন তারা তার গায়ে হাত তোলে নাই। মালোদের পাড়ার মেয়েতে মেয়েতে ঝগড়া হয়, গালাগালি করে। কিন্তু পাড়ার পাঁচজনের কেউ কোনদিন তার প্রতি কটুবাক্য প্রয়োগ করে নাই। পাড়ার মধ্যে তার নিজের একটা মর্যাদা ছিল। একটা গর্ব ছিল। আজ তাহা একেবারে খর্ব হইয়া গিয়াছে।

    আজ সে দেহে মনে বিপর্যস্ত। সমস্ত শরীরে ব্যথা; এখানে-ওখানে ফুলিয়া গিয়াছে। নৌকা হইতে নামিয়া কোন রকমে বাড়ি আসিল। কাহাকেও কিছু না বলিয়া একটা পাটি বিছাইয়া শুইয়া পড়িল। নৌকাতে অন্যান্য মেয়ে যারা ছিল, তাদের নিকট হইতে সকল প্রতিবেশীরা অগোঁণে ঘটনাটা জানিতে পারিল। সকল কথা শুনিয়া তার মা একবাটি হলুদ-বাট গরম করিয়া আনিয়া বলিল, ‘কাপড় তোল, কুনখানে কুনখানে বেদনা করে ক’। দেখি। ইস, গাও যে আগুনের মত ততা।’

    আদর পাইয়া তার চোখে জল আসিয়া পড়িল।

    মা তার তুই চোখ মুছাইয়া দিয়া বলিল, আ-লো নিশত্তুরি, তর নি এই দশা। তর বুকের না, পেটের না, তার লাগি তর কি!’

    সুবলার বউ কোন কথা বলিল না।

    —ঐ কলিজা-খেকোকে তুই কেন আদর জানাইতে গেলি, দশজনের মাঝে তুই বেইজ্জত হইলি!

    সে এবারও নিরুত্তর রহিল।

    তার মা আর কথা না বাড়াইয়া, তারই কাছে শুইয়া পড়িল। বুড়া রাতের জালে গিয়াছে।

    বুড়ি শুইয়া শুইয়াই তামাক টানিল, তারপর বাতি নিভাইল এবং সারারাত মেয়েকে বুকে করিয়া রাখিল। তার স্তন ফুটি শুখাইয়া দড়ির মত হইয়া গিয়াছে। মেয়ে তারই মধ্যে তার অলস স্তনদুটি ডুবাইয়া দিয়া গভীর আরাম পাইল। মা তার তোবড়ানো গালের সঙ্গে মেয়ের মসৃণ গৌরবর্ণ গালখানা মিশাইলে, মেয়ের দুই চোখ ঘুমে জড়াইয়া আসিল। শরীরের ব্যথায় মাঝে মাঝে ঘুম ভাঙ্গে, আবার ঘুম আসে। এই চেতন-অচেতনের ফাঁকে ফাকে কেবলই তার মনে হইতে থাকে, এ সংসারে কেবল মা-ই সত্য, আর কিছু না।

    পরের দিন তার শরীরের ফোলা কমিয়া গেল, ব্যথা কমিয়া গেল। মনও অনেকট হালকা হইয়া আসিল। মনে তখনো যেটুকু দাহ ছিল, জুড়াইবার জন্য সূতা-কাটা আর জাল-বোনাতে আত্মনিয়োগ করিল। কিন্তু পাড়াতে তার হারানো মর্যাদা আর ফিরিয়া পাইল না।

    পাড়ার পাঁচজনের মুখ হইতে ঘটনাটা ভিনজাতের পাড়াতেও ছাপাইয়া পড়িল। এঘটনার পর পাড়ার যুবকদের নিকটই তার মুখ দেখাইতে লজ্জা করিত। তার উপর বামুন কায়েতের যুবকরা পর্যন্ত উঠান দিয়া যাইবার সময় তার ঘরের দিকে উঁকি মারিতে থাকিত। এভাবে লাঞ্ছিত হইয়া শেষে সে ঘরের দরজা বন্ধ করিয়া রাখিত, সারাদিন আর খুলিত না। কিন্তু তবু তার নিস্কৃতি হইল না। একদিন থালা ধুইবার জন্য ঘাটে যাওয়ার সময়ে মঙ্গলার বউ তাকে পথে দেখিতে পাইয়া বলিল, ‘কি গ ভইন, বাড়ির কাছে বাড়ি, ঘরের কাছে ঘর, তবু যে দেখা পাওয়া যায় না, কারণ কি?’

    ‘শরীর ভাল থাকে না দিদি ৷ মধ্যে মধ্যে জ্বর জ্বর লাগে। আর বাপের জালখান পুরান হইয়া গেছে। মাছের গুতায় টিকে না। নতুন একখান জালও চাই। ঘরে কি পাঁচটা ভাই আছে না ভাই-বউ আছে। একলা আমারই ত বেবাক করন লাগে।’

    ‘ত দরজা বন্ধ থাকে কিয়ের লাগি?’

    সুবলার বউ ইহার কোন উত্তর দিল না।

    ‘তা, দুয়ার বন্ধই কর আর যাই কর ভইন, কথাখান নগরে বাজারে জানাজানি হইয়া গেছে।’

    সুবলার বউ আগুনের মত জ্বলিয়া উঠিল, ‘কোন কথাখান, কি গ মহনের মা, কোন কথাখান।’

    —আমার কোন দোষ নাই ভইনসকল। বাজারের লোক যারা তামসীর বাপের বাড়ি তবলা বাজায় তারা কহিয়াছে। তারা বামুন, তার কায়েত। তারা শিক্ষিত লোক। মালোদের চেয়ে তারা বুঝে শুনে বেশি। তাদের দোকান থেকে মালোর জিনিস বাকি আনে। জিয়লের ক্ষেপে, যাইবার সময় তমলুক দিয়া তাদের নিকট হইতে টাকা আনে। বিয়া-শাদিতেও টাকা ধার দেয় তারা। গ্রামের অধিক মালো তাদের বশ। তাদের কথা মালোরা কি গ্রাহ্য না করিয়া পারে। তারা যা বলিয়াছে মালোদের কাছে তা ব্রহ্মার লেখ্‌। তারা বলিতেছে, বিধবামানুষ দরজা বন্ধ করিয়া থাকে, লাজে মুখ দেখায় না, কি হইয়াছে আমরা কি তাহা বুঝিতে পারি না?

    শুনিয়া সুবলার বউ স্তম্ভিত হইয়া গেল। পায়ের তলা হইতে তার যেন মাটি সরিয়া যাইতেছে। কিন্তু সন্ধিৎ হারাইল না। পড়ি পড়ি করিয়া সে বাড়ি চলিয়া আসিল।

    ইহার পর যে-কেহ তার দিকে তাকাইত, সে চক্ষু রক্তবর্ণ করিয়া তার দিকে এমনি জ্বলন্ত দৃষ্টি নিক্ষেপ করিত যে, সেখানে তার তিষ্টিবার উপায় থাকিত না। একদিন তামসীর বাপের বাড়ির কাছে দাঁড়াইয়া যারা তবলা বাজায় গান গায়, তাদের লক্ষ্য করিয়া এমন গালি শুরু করিল যে, একঘণ্টার আগে থামিল না। পাড়ার আর আর সব মেয়ের বলিতে লাগিল, মাগো মা, রাঁড়ি যেন একবারে ‘বান্ধে খাড়া’ হইয়াছে।

    সে মালোপাড়া হইতে উহাদের পাট উঠাইবাব চেষ্টা করিতে লাগিল। কিন্তু কোন পথ পাইল না। আগের মাতবররা এখন আর তেমন নাই, থাকিলে অনায়াসে একটা বিহিত করা যাইত। যাত্রাবাড়ির রামপ্রসাদ মালো-সমাজে বিধবাবিবাহ চালাইতে গিয়া জব্দ হইয়াছে। গ্রামের চক্রবর্তী ঠাকুর পুরোহিত দর্পণ খুলিয়া মালোদিগকে বুঝাইয়াছে, বিধবার বিবাহ দিলে নরকে যাইতে হইবে। কাজেই ব্রাহ্মণ পণ্ডিতের কথা শিরোধার্য করিয়া রামপ্রসাদকে তাঁরা অগ্রাহ করিয়াছে। এখন আর মালো-সমাজে তার তত প্রভাব নাই। দয়ালচাঁদ আগে উচিত কথা বলিত। তাদের যাত্রা দলে সেজন্য মুনিঋষি সাজিত। শহরে যাত্রা গাহিয়া তারা তাকে বড়লোকের কাছ থেকে সোনারূপার মেডেল পাওয়াইয়াছে। ইহার পর দয়ালচাঁদও আজকাল ইহাদের দিকেই ঝুকিয়া পড়িয়াছে। এখন আর আগের মত উচিত কথা কহিবে না। কিন্তু সুবলার বউয়ের মধ্যে বিপ্লবী নারী বাস করে। সে দমিতে জানে না।

    ‘মহনের মা, এই গাঁওয়ের মাইয়া আমি, বিয়া হইছে এই গাওয়ে। আমি নি ডরাই বাজাইরা লোকেরে গো।’

    মঙ্গলার বউ বলে, ‘তুমি মাইয়া-মানুষ। তুমি কি করতে পার ভইন।’

    ‘আমি সব পারি। আর কিছু না পারি আগুন লাগাইয়া গাঁও জ্বালাইয়া দিতে পারি।’

    ‘গাঁওয়ের একঘরে আগুন লাগলে সহস্ৰেক ঘর পুড়া যায়। বাজাইরা পাড়া যেমুন পুড়ব মালোপাড়াও পুড়ব। তোমার ঘর পুড়ব, আমার ঘর পুড়ব। তারা যেমুন মরব, আমরাও ত মারা যামু ভইন।’

    ‘অপমানের বাঁচনের থাইক্যা সম্মানের মরণও ভাল। দিদি।’

    কথাটা মালোর ছেলেদেরও মনে ধরিল। তিনজন লোক তবলা বাজাইয়া বেশি রাতের পর উঠিয়া বাড়ি যাইবার সময় মালোর ছেলেরা পথে পাইয়া তাহাদিগকে শুধু হাতে অনেক মার মারিল। মার খাইয়া দলের লোকজন ডাকাইয়া তারা একত্র মিলিত হইল, কি করা যায় তাহা  স্থির করার জন্য। অনেক বাদানুবাদের পর স্থির হইল তারা সামনাসামনি প্রতিশোধ নিবেন। মালোদের জানমাল বলিতে গেলে তাহাদেরই হাতে। মালোদিগকে তার হাতে না মারিয়া অন্য উপায়ে মারিবে।

    সেই দিন হইতে মালোপাড়ার আকাশে একখণ্ড কাল মেঘ ভাসিয়া থাকিল। কেউ জানিল না তার ছায়া কালক্রমে কতখানি আতঙ্কের বিষয় হইয়া দাঁড়াইবে।

    সেদিন কাদিরের ছেলের নূতন যে নৌকা দৌড়াইবার জন্য খলায় গিয়াছিল, সে নৌকা আর ফিরিল না। প্রতি বৎসরই এমন হয়। কোন-না কোন গায়ের নৌকার সঙ্গে কোন না কোন গায়ের নৌকার সংঘর্ষ লাগেষ্ট। পুরানো ঝগড়া থাকিলে তো কথাই নাই। সুযোগ দেখিয়া নৌকাখানা সটান শক্রনৌকার পেটে ঢুকাইয়া দেয়। বিদীর্ণ হইয়া যায় সে নৌকা। মারের উপকরণ নৌকাতেই প্রস্তুত থাকে। শুরু হইয়া যায় মারামারি। কত লোকের মাথা ভাঙ্গে, হাত, পা, কোমর ভাঙ্গে। কত লোক জলে পড়িয়া গিয়া আর উঠে না। প্রতিবৎসরই এমন একটা দুটা মারামারি হয়। প্রতিযোগিতার সময় প্রতি বৎসরই কোন না একটা নৌকা আর একটা নৌকার উপরে উঠিয়া পড়ে। এবৎসর উঠিল ছাদিরের নৌকার উপরে।

    ছাদিরের নৌকাখানাকে বিদীর্ণ করিয়া দিল যে নৌকাখানা, ছাদিরের লোক তাদের চেনে না। ঘটনাটা চক্ষুর নিমেষে ঘটয়া গেল! একমুহূর্ত আগেও তার নৌকা ময়ূরের মত বৈঠার পেখম উড়াইয়া সর্পের গতিতে চলিতেছিল। পলক ফেলিতে দেখে তারা বিক্ষিপ্ত হইয়া জলে পডিয়া গিয়াছে।

    ঘর নিস্তব্ধ! কাহারো মুখে কথা নাই। সকলে রুদ্ধ নিশ্বাসে শুনিতেছে। এবাড়ির সকলের ভাগ্যে যেন একটা ঝড় বহিয়া এখন সবকিছু স্তব্ধ হইয়া গিয়াছে। কেরোসিনের বাতিটা টিমটিম করিয়া ঘরটাকে আলো দিয়া রাখিয়াছে মাত্র। আসলে সব কিছুই যেন আঁধারে জমাট বাঁধিয়া গিয়াছে। সকলের আগে রমু। সে তার বাপের প্রত্যেকটি কথা গিলিতেছে। বাপকে তার কাছে খুব বড় বোধ হইতে লাগিল। এতবড় একটা বিপদ ঘাড়ে লইয়া বঁচিয়া আসিল যে মানুষ, সে এত বড় যে নাগাল পাওয়া যায় না।

    দীর্ঘনিশ্বাস ছাড়িয়া কাদির মিয়া বলিল, ‘খোদা মেহেরবান, তোরে বাঁচাইছে। আর সব লোকের না-জানি কি গতি হইয়াছে।’

    ‘জানি না বাপ। আমিই কি বাঁচতাম। জলে পইড়া দেখি, শতে বিশতে নাও। কোনটা গেল মাথার উপর দিয়া, কোনটা গেল ডাইনে দিয়া, কোনটা গেল বায়ে দিয়া। কোনটার লাগল ছিটাপানি, কোনটার লাগল বৈঠার বাড়ি। শেষে আমি দুই চক্ষে অন্ধকার দেখলাম। এমন সময় দেখলাম তারে। চিনলাম। হাত বাড়াইলাম। ঝাঁপ দিয়া পানিতে পড়ল। আমারে পাছড়াইয়া শেষে তার নাওয়ে নিয়া তুলল। ঐ যে আলুর নাও ডুববার কালে যেজন বাঁচাইছিল সেই জাল্লা ভাই।’

    সকৃতজ্ঞ চোখে সকলেই আর একবার বনমালীকে দেখিল। তার উপর রমুর অসীম শ্রদ্ধা হইল।

    পাড়াতে একটা কান্নাকাটির রোল উঠিবার উপক্রম হইয়া ছিল। পাড়ার যুবক বলিতে যারা ছিল সকলেই ছাদিরের নৌকাতে গিয়াছিল। এই বিপদের কথা শুনিয়া সকলেই অভিভূত হইয়া পড়িল। এমন সময় তাদের দুই একজন করিয়া আসিয়া উপস্থিত হইতেছে দেখিয়া কাদির বলিল : এখন চঞ্চল হইও না, আর কতকক্ষণ বিলম্ব কর, খোদা আনিলে দেখিবে, সকলেই আসিয়া পড়িবে।

    তার কথাই ঠিক হইল। এই পথে যত নৌকা আসিতেছে প্রায় সবগুলিতেই দুইজন চারিজন করিয়া তারা সকলেই প্রায় নিরাপদে ফিরিয়া আসিল।

    রমুর ভাবনা হইল, যখন সকলেই আসিল, তখন নৌকাখানাও ফিরিয়া আসিলে ভাল হইত। এক সময়ে ছাদির সহসা অভিভূত হইয়া বলিল, ‘বাজান, তোমার পাঁচশ টাকা দিয়া আইলাম তিতাসের তলায়।’ কাদির অনেক সান্তনা বাক্যে তার মনের ভার লাঘব করিলে সে বনমালীর হাত ধরিয়া বলিল, ‘তুমি ভাই হইলেও আছ, বন্ধু হইলেও আছ। চাইরটা জলচিড়া না খাওয়াইয়া ছাড়ছি না।’

    কাদিরেরও মনে হইল, ঠিক কথা, ইহাদিগকে আপ্যায়ন করিতেই হইবে।

    বাপ-বেটার মিলিত অনুরোধ তারা কিছুতেই এড়াইতে পারিল না।

    রমুর মার বাপের-বাড়ি হিন্দুপাড়ার নিকটে। সে প্রশস্ত গোয়াল ঘরখানা বেশ করিয়া নিকাইয়া দিল। কলসী হইতে চিড়া বাহির করিয়া ক্ষিপ্রহস্তে কুলাতে করিয়া ঝাড়িয়া দিল। ছাদির ক্ষিপ্রহস্তে গাই দুহিয়া অনেক দুধ আনিয়া দিল। কাদির মিয়া কুমার পাড়া হইতে একদৌড়ে নিয়া আসিল একটি নূতন হাঁড়ি।

    উদয়তারা তিনখানা মাটির ঢেলার উপর হাঁড়ি বসাইয়া কাঠের আগুনে দুধ জ্বাল দিতেছে। আগুনটা একেকবার কমে, আবার দপ, করিয়া বাড়িয়া উঠে। যখন বাড়িয়া উঠে তখন উদয়তারার মুখটা লাল দেখায়। যখন নিভিয়া যায়, মুখটা নিচু করিয়া ফু দেয়। তখনি সহসা জ্বলিয়া উঠে। সে আগুনে উদয়তারার মুখটা আবার লাল দেখায়। দূরে দাঁড়াইয়া অনেকক্ষণ ধরিয়া দেখিতেছিল জমিলা। কাদিরের একমাত্র মেয়ে সে। শেষে নিশ্চিত ভাবে চিনিয়া ফেলিল রমুর মাকে বারান্দা হইতে টানিয়া নামাইয়া কহিল, “অ ভাবী, এ যে সেই মানুষ। আমার পয়লা নাই ওরের সময় পথে যারে দেখছিলাম। ডুবাইয়া ডুবাইয়া কলসী ভরছে সেই মানুষ। যার কথা কতবার কইছি।’

    সারা দিনের শ্রান্তি। ঝগড়ার ঝামেলা। তার উপর ক্ষুধা। গোয়ালঘরে বসিয়া কলাপাতায় তুধবাতাস মিশাইয়া তার সেদিন পরিতৃপ্তির সহিত ‘জলচিড়া’ খাইল। খাওয়ার পর জমিলা উদয়তারাকে টানিয়া অন্দরে নিয়া বসাইল, বলিল : বিয়ার পর আমার পয়লা নাইওর। আমি ছিলাম নৌকার ছইয়ের ভিতরে। ছইয়ের মুখ ছিল একখানা শাড়ি গুজিয়া বন্ধ করা। বাতাসে শাড়ির গোজাটা খুলিয়া গেল। তুমি তখন ঘাটে ঢেউ দিয়া জল ভরিতেছিলে। আমি তোমাকে দেখিলাম। মনে হইল যেন কতকালের চেনা। জানা নাই শোনা নাই, কি জানি কেন একজনকে দেখিয়া এত ভাল লাগে। তাই আমি বারে বারে দেখিলাম। কিন্তু তুমি আমাকে দেখিলে না। পরের বারে এখানে আসিয়া বাপকে বলিয়াছিলাম, সই পাতিব। বাপ বলিল, নাম জানিনা নিশানা জানিনা, কি করিয়া খুঁজিয়া পাইব। তারপর কতবার তোমার ঘাট দিয়া নাইওরে গিয়াছি। তখন আমি পুরান। শাড়ির বেড়া নিজ হাতে খুলিয়া আতিপাতি করিয়া চাহিয়াছি, তোমাকে দেখিতে পাই কিনা। দেখিতে পাই নাই। আর কি কাণ্ড, আজ তুমি নিজে যাচিয়া আসিয়াছ। আসিয়াছ যখন, তুমি এখানে দুইদিন বেড়াও, তোমার বাড়িতে আমারে নিয়া দুইদিন রাখ।

    শুনিয়া উদয়তার শুধু একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিল। তার জমিলা নামটা খুব ভাল লাগিল, কিন্তু সে সংসারের সম্বন্ধে এত অনভিজ্ঞ দেখিয়া বেদনাবোধ করিল।

    কালোমেঘ সরিয়া গিয়া চাঁদ উঠিলে দেখিতে কেমন সুন্দর হয়; তেমনি একটা খুববড় বিপদ কাটিয়া গিয়া মনের মুখের উদয় হইলে সে মুখ কত মধুর হয়, তাহা কাদিরের বাড়িতে তখন যে না দেখিয়াছে তাহাকে কি বলিয়া বুঝানো যায়।

    নৌকায় ঝগড়া মারামারির দরুণ মনে যে অস্বস্তিটুকু ছিল কাদিরের বাড়ি অতিথি হইয়া তারা তাহা  সম্পূর্ণরূপে ভুলিয়া গেল। মনে স্নেহ ও প্রীতির অনুপম এক ছোপ লইয়া তারা নৌকাতে গিয়া উঠিল।

    আকাশে তখন চাঁদ উঠিয়াছে। তারই আলোকে তিতাসের ছোট ছোট ঢেউগুলি চিক্‌মিক্‌ করিতেছে। সেই ঢেউ ভাঙ্গিয়া নৌকা আগাইয়া চলিল। গেল না কেবল বনমালী আর অনন্ত। গৃহকর্তার নির্বন্ধাতিশয্যে তারা আজ এখানে রহিয়া গিয়াছে।

    পরদিন সকালে অনন্তর ঘুম ভাঙ্গিলে বাহিরে গেল। গোয়ালঘরে একপাল গরু ডাকাডাকি করিতেছে। বাছুরগুলি ছাড়া পাইয়া অকারণে লাফাইতেছে। অদূরেই বর্ষার জল থই থই করিতেছে। ছোট বড় নানা জাতের গাছগুলি কোমর-জলে আটকা পড়িয়াছে। তারই সঙ্গে এক একটা ডিঙ্গি বাঁধা। একটা খোলা জায়গাতে বাঁশের লম্বা ‘আড়া’ বাঁধিয়া তার উপর ঝুলাইয়া পাট শুখাইতে দিয়াছে। যেন খুব বড় একটা পাটের দেওয়াল বানাইয়া রাখা হইয়াছে। ভিজ পাটের গন্ধ দিগ্বিদিকে ছাইয়া ফেলিয়াছে। আকৃষ্ট হইয়া ঝাঁকে ঝাঁকে ফড়িং উড়িতেছে বসিতেছে। অনন্ত নিবিষ্ট মনে সেগুলি দেখিয়া চলিয়াছে। দেখিতে দেখিতে একখানে মোড় ঘুড়িবার সময় দেখিল রমু দাঁড়াইয়া আছে। অনন্তর মত তারও চোখেমুখে বিস্ময়। তার সঙ্গে কথা বলিবার জন্য রমুর প্রাণ ছটফট করিতেছিল। সে শুধু ভাবিতেছিল তাহাদের বাড়িতে এরা রহিয়া গিয়াছে, তাদের আপন হইয়া গিয়াছে, কি মজা। কথা বলার উপলক্ষ্য খুঁজিতে খুঁজিতে এক সময়ে রমু বলিল, ‘তুমি ফড়িং ধরনা?’

    অনন্ত বলিল, ‘না।’

    রমু আবার বলিল : ওই বাঁশের পুল পার হইয়া যে-বাড়ি, সে-বাড়িতে থাকে গফুর, আমার চাচাত ভাই। সে খুব ফড়িং ধরে আর আড়কাঠি বিঁধাইয়া ছাড়িয়া দেয়, তারা ছটফট করিয়া মরিয়া যায়। দেখিয়া আমার মনে বড় কষ্ট লাগে। তুমি ফড়িং ধরনা, তুমি কত ভাল।

    এমন সময় রমুর মা গাদায় ফেলিবার জন্য গোয়ালঘর হইতে এক ঝুড়ি গোবর লইয়া যাইতেছিল। তারা দুইজনকে একসঙ্গে পরিচিতের মত কথা বলিতে দেখিয়া তার মাতৃহৃদয় উচ্ছসিত হইয়া উঠিল। যাইবার সময় শশী গাছ হইতে টুক্‌ করিয়া একটি শশা পাড়িয়া অনন্তর হাতে দিয়া বলিল, ‘ধর বা’জি, খাও।’

    শশাটা হাতে লইয়া অনন্ত বিস্মিতভাবে চাহিয়া রহিল। রমু বলিয়া দিল, মা।

    মা নাম শুনিয়াই অনন্ত তার পায়ে ঢিপ করিয়া একটা প্রণাম করিয়া আসিল।

  • ভাসমান

    ভাসমান

    অদ্বৈত মল্লবর্মণ

    [book-name]

    ভাসমান

    প্রথম পরিচ্ছেদ

    এই পরাজয়ের পর মালোরা একেবারেই আত্মসত্তা হারাইয়া বসিল। তাদের ব্যক্তিত্ব, বৈশিষ্ট্য, সংস্কৃতি ধীরে ধীরে সবই লোপ পাইতে লাগিল। তাদের নিজস্ব একটা সামাজিক নীতির বন্ধন ছিল, সেইটিও ক্রমে ক্রমে শ্লথ হইয়া আলগা হইয়া গেল। একসঙ্গে কোন কাজ করিতেই তারা আর তেমন জোর পাইত না। সামান্ত বিষয় নিয়া তারা পরস্পর ঝগড়া করিত। এমন কি, ঘাটে নৌকা ভিড়াইবার সময়, কে আগে ভিড়াইবে এই লইয়া মারামারি পর্যন্ত হইত। জাল ফেলিবার সময় কার আগে কে ফেলিবে এ নিয়া তীব্র প্রতিযোগিতা হইত। তারই পরিণতিতে তাদের প্রধান দুইটি দলের মধ্যে মাথা ফাটাফাটিও হইত। অথচ এর আগে এসব কোনকালেই হইত না।

    তাদের ছেলেরা হুকা  ছাড়িয়া সিগারেট ধরিল। তারা আগের মত গুরুজনদিগকে মানিত না। বাপখুড়াদের প্রতি তাদের ভক্তি যেমন হ্রাস পাইল, তেমনি সহানুভূতিও কমিয় গেল। রোজগারের প্রতি তাদের মনও আর আগের মত রহিল না। তিতাসের মাছ ফুরাইয়া গেলে মালোর আগে তোড়জোড় করিয়া প্রবাসে যাইত। এখন আর যায় না।

    তাদের পাড়াতে তখন যাত্রাওয়ালাদেরই আধিপত্য। তারা যখন যার বাড়িতে খুশি, গিয়া বসিত। আলাপ জমাইত। সে আলাপে শেষে মেয়েরাও যোগ দিত। ইহা মালোদের কখনো কখনো অস্বস্তিকর লাগিত; কিন্তু ইহার প্রতিবাদ করার জোর পাইত না। মেয়েদের কাছে এই সব রাজা, রাজপুত্র, সেনাপতি, বিবেক এক একটা অসাধারণ পুরুষ। মালোরা বড় ভাইয়ের বউদের ডাকে শুধু বউ বলিয়া আর এর ডাকে, বউদি বলিয়া। মেয়েরা আরও খুশি হয়। ইহারা মালোপাড়ার বউঝিদের সম্বন্ধে নিজেদের পাড়ার যুবকদের কাছে নানা রসাল গল্প বলিত। ঐসব যুবকরাও কৌতুহলের বশে তাদের সঙ্গে আসিয়া মালোদের বাড়িতে বসিত। কথা বলিত। বলিত ভাল কথাই। কিন্তু মেয়েরা যখন ঘাটে যাইত, তারা তখন সুযোগ দেখিয়া শিষ দিত কিংবা আচমকা কোন বিচ্ছেদের গানে টান দিত। এইভাবে মালোর অন্তঃপুরের শুচিতা পর্যন্ত হারাইতে বসিল।

    মালোর এ সবই দেখিত এবং ইহার ফলাফলও বুঝিতে পারিত। কিন্তু প্রতিবাদ করার জোর পাইত না। চুপ করিয়া থাকিত এবং সময়ে সময়ে নিজেরাও এই গডডালিকা প্রবাহে গাঁ ভাসাইয়া দিত। মাঝে মাঝে এ নিয়াও ঝগড়া হইত। এবাড়ির লোক ওবাড়ির লোককে খোঁটা দিত। ওবাড়ির লোক রাগিয়া বলিত, ভেন্‌ভেন্‌ করিস না ত। আগে নিজের ঘর সামলা। তারপর পরের তরকারিতে লবণ দিতে আসিস। সত্য কথাই। তার নিজের ঘরের লোককে সামলাইতে গেলে, সেখানেও রাগারাগি হইত।

    শেষে মেয়েদের বিলাসিতাও খুব বাড়িয়া গেল। সুযোগ পাইয়া স্যাকরারা নানারকম গহনার নমুনা লইয়া, মনোহারী দোকানের লোকের তেল গামছা সাবান লইয়া ঘনঘন আসা যাওয়া করিতে লাগিল। রোজগারের সময় যা রোজগার করিত এইভাবে অপব্যয় হইয়া যাইত। দুর্দিনের জন্য এক পয়সাও সঞ্চয় থাকিত না। তখন তারা উপবাসে দিন কাটাইত। ছেলেমেয়েরা খাইতে না পাইয়া কাঁদিত। মেয়েরা অনেক কাণ্ড করিবে বলিয়া ভয় দেখাইত। খাইতে দিতে পারিতেছে না বলিয়া লজ্জা পাইয়া পুরুষরা চুপ করিয়া থাকিত এবং নিরুপায়ের মত কেবল একদিকে চাহিয়া থাকিয়া জোরে জোরে হুকা  টানিত।

    ক্রমে মনুষ্যত্বের পর্যায় হইতে তারা অনেক নিচে নামিয়া গেল। এত নিচে নামিয়া গেল যে, শত্রু নাকের ডগায় বসিয়া শক্ৰতা করিয়া গেলেও মুখ তুলিয়া চাহিতে পারিত না। রোষকষায়িত চক্ষু ভূমির উপর নিবদ্ধ রাখিয়া এক দল থুথু মাটিতে ফেলিয়া বলিত, দূর হ কুত্তা, দূর হ কাওয়া। দিনে দিনে তারা আরও নিচে তলাইয়া গেল। শেষে এমন হইল যে, লোন কোম্পানির বাবুর বন্দুকধারী পেয়াদা লইয়া আসিয়া টাকা আদায়ের জন্য মালোদের উপর যখন অকথ্য অত্যাচার চালাইয়া যথাসর্বস্ব লইয়া গেল, তখনও তারা কিছুই বলিতে পারিল না। গ্রামের কয়েকজন উৎসাহী ধনী ব্যক্তি মালোদের জন্য এখানে শহর হইতে ঋণদান কোম্পানির একটা শাখা আনিয়াছিল। সুদ খুব কম দেখিয়া মালোরা সকলেই হুজুগে মাতিয়া টাকা ধার করিয়াছিল। সে অনেক দিনের কথা। সেই থেকে প্রতি বৎসর চক্রবৃদ্ধি হারে কেবল সুদই যোগাইয়া আসিতেছে, আসল তেমনি অটুট আছে। এখন কোম্পানি উঠিয়া যাইতেছে। আসল আদায় হওয়া দরকার। তাই তারা পেয়াদী-সঙ্গে জবরদস্ত বাবু পাঠাইয়াছে। তার নাম বিধুভুষণ পাল। গ্রামের পালেদের সঙ্গে তার আত্মীয়তা ছিল। তাদের নিকট মালোদের প্রকৃত অবস্থা জানিয়া লইয়া মালোপাড়াতে আসিয়া রুদ্রমূর্তি ধরিল। বুড়াবুড়া মালোদের দাড়ি ধরিয়া টানিয়া জলে নামাইল। চোখ ঘুরাইয়া বলিল, ‘ক’ তোর কাছে কত আছে।’ শীতকাল। তিতাসের জলে দাঁড়াইয়া ঠক ঠক করিয়া কাঁপিতে কাঁপিতেও তাদের মুখ দিয়া মিথ্যা কথা বাহির হইত না। সর্বত্র মিথ্যা কথা বলিতে পারিলেও তিতাসের জলে নামিয়া মিথ্যা বলা তাদের পক্ষে অসম্ভব ছিল। কেউ বলিত দুই টাকা আছে; কেউ বলিত এক টাকা বার আনা আছে। কেউ বলিত কিছুই নাই। সব ছাঁকিয়া তুলিয়াও তেমন কিছুই আদায় হইল না দেখিয়া শেষে তারা ঘরের থালা ঘটি বাটি, সূতার হাঁড়ি জালের পুঁটুলি বাহির করিয়া নিয়া ঘোড়ার গাড়িতে তুলিয়া চলিয়া যাইত। এর পর পড়িয়া যাইত কান্নাকাটির ধুম। এমন যে গ্রামের সবচেয়ে বুড়া রামকেশব, যার ছেলে পাগল হইয়া মরিয়াছে, যাকে জীর্ণ দেহ টানিয়া টানিয়া প্রতিদিন নদীতে মাছ ধরায় যাইতে হয়, তাকেও তারা রেহাই দিল না। তার দাড়ি ছিল লম্বা। ধরিবার বেশি সুবিধা হওয়ায় বিধু পাল তাকেই জলে নামাইয়া পাক খাওয়াইয়াছিল সব চাইতে বেশি। কিন্তু সে কাঁদে নাই। নিজেরা কাঁদিয়া ও চোখ মুছিয়া মালোরা যখন তাকে সান্ত্বনা দিতে আসিল, সে বলিল, উপরওয়ালা ফেলিয়াছে চৌদ্দসানকির তলায়, কাঁদিয়া কি করিব।

    পালেরা বাজারের দোকানি। মালোদের অনেক জিনিসপত্র বাকি দিয়া রাখিয়াছে। তাদেরও আদায় হওয়া দরকার। তাই রোরুদ্যমান মালোদের প্রবোধ দিতে আসিয়া তারা বলিল, বিধু পাল কড়া মেজাজের লোক। কিন্তু লোক ভাল। সব নিয়াছে, কিন্তু তোমাদের নৌকাণ্ডলিতে হাত দেয় নাই।

    কিন্তু এ দুঃসময় বেশিদিন থাকে নাই। আবার তিতাস নদীতে মাছ পড়ে। আবার তাদের হাতে পয়সা আসে। হারানো থালা ঘটি বাটি নূতন হইয়া ফিরিয়া আসে। ঘরে ঘরে সুতাকাটার ধুম পড়ে। নূতন নূতন জাল তৈয়ার হয়।

    সে জালে নানাজাতের মাছ পড়ে। মালোদের মুখে আবার হাসি ফোটে।

    কিন্তু বৎসর ঘুরিতে সে হাসিও একদিন মিলাইয়া গেল।

    এই পাড়ারই রাধাচরণ মালো কি একটা স্বপ্ন দেখিয়াছে। মালোরা তাহাই আগ্রহভরে শুনিতেছে। শুনিয়া কেউ কেউ বলিতেছে, আরে দূর বোকা, তা কি হইতে পারে। আবার কেউ কেউ শুকনা মুখে বলিল, হইতে ত পারে না। কিন্তু যদি হয়।

    রাতে দেখে, রাতে ফুরাইয়া যায়। স্বপ্ন আবার কোনদিন সত্য হয় নাকি?

    হয়। যশোদারাণী স্বপ্ন দেখিয়াছিল গোপাল মথুরার মোকামে চলিয়া যাইবে। গেল না? সুবলার শাশুড়ী স্বপ্ন দেখিয়াছিল, জিয়লের ক্ষেপে গিয়া সুবল নাও-চাপ পড়িয়া মরিবে। মরিল না?

    আরে, সে ত স্বপ্নের কথা বলিয়াছিল সুবল মারা যাওয়ার পর। আগে ত বলিতে পারে নাই। তবেই বোঝ্‌। তুইও এসব কথা প্রকাশ করিবি এখন না, স্বপ্ন ফলিয়া যাওয়ার পরে। এখন চুপ করিয়া থাক।

    কিন্তু স্বপ্নদ্রষ্টা চুপ করিল না। তার স্বপ্ন যে কেবল নিশার স্বপ্নমাত্র নয়, সে স্বপ্নের আনুমানিক অনেক কিছুই যে দিনের বেলাতে স্বচক্ষেও লক্ষ্য করিয়াছে এসব কথা খুলিয়া বলিল।

    ‘এতদিন আমি কিছু কইনা তোরা বিশ্বাস করবি না এর লাগি। যাত্রাবাড়ির টেক ছাড়াইয়া কুড়ুইলা খালের মুখ হইতে বেওসাতেক উজানে একটা কুড় আছে না? বাপ দাদার আমল হইতে দেখি সোত সিধা চলে। না কি! সেইদিন জাল ধইরা দেখি জালখানা উল্টাইয়া নিল। সোত ঘুইরা গেছে। এমুন আচানক কাণ্ড! তোমরা ত অখন রাতের জাল বাও না, খোঁজখবরও রাখ না। সারারাত জাল লাগাইয়া উজানভাটি ঘুরি। গাঙের অন্ধিসন্ধি ভাল কইরা জানি। কয়দিন ধইরা দেখ তাছি, গাঙের হিসাবে কেমন একটা লড়চড় হইয়া গেছে। সোত যেখানে আড়, হইয়া গেছে সিধা; যেখানে সিধা, হইয়া গেছে আড়। সেই দিন হইতে মনে বিষম ভাবনা। কি জানি কি একটা হইব। মনে শান্তি নাই, চক্ষে নিদ্রা নাই। আছে খালি ভাবনা। কাল রাইতে মড়াপোড়ার টেকে জাল পাতলাম, মাছ উঠল না; গেলাম পাঁচভিটার টেকে, মাছ নাই; গেলাম গরীবুল্লার গাছের ধারে, কিন্তু জালে-মাছে এক করতে পারলাম না। ( যেখানেই যাই, দেখি সোত মন্দা। মাছের দূরে দূরে লাফায়, জালে পড়ে না। শেষে গেলাম কুড় ইলার খালের মুখে। দেখলাম, সোত খালি লাটুমের মত ঘোরে। জাল নামাইয়া পাটাতনের উপর কাত হইলাম। চোখে ঘুম নাই। কেবল একই চিন্তা, তিতাসের কি জানি কি যেন একটা হইতাছে। কোন একসময় চোখের পাতা জোড়া লাগল টের পাইলাম না। এমন সময় দেখলাম স্বপ্ন, তিতাস শুখাইয়া গেছে। এই স্বপ্ন কি মিছা হইতে পারে। দেখলাম, যে-গাঙে বিশ-হাতি বাঁশ ডুবাইয়া তলা ছোঁয়া যায় না, সেই গাঙের মাঝখান দিয়া ছোট একটা মানুষ হাঁইট্যা চলছে। যে যে জায়গা দিয়া সে গেছে, একটু পরেই দেখলাম সেই সগল জায়গায় আর জল নাই; শুক্‌না ৷ ঠন্‌ ঠন্‌ করতাছে। বুকটা ছাৎ কইরা উঠল। হাত পাও কাপতে লাগল। নাওয়ে আমি একলা। এমুন ডর করতে লাগল যে একবার চিৎকার দিয়া উঠলাম। শেষে তিনবার রাম নাম লওয়াতে ডর কমল। এমন স্বপ্ন দেখলে নি আর ঘুম হয়। ঘুমাইলাম না।’

    শ্রোতারা সমবেদন জানাইল, আহা বড় দুঃস্বপ্ন দেখিয়াছে রাধাচরণ। মাথায় তেল দিয়া স্নান কর গিয়া।

    তার স্বপ্নকে স্বপ্ন বলিয়াই সকলে উড়াইয়া দিল। কেউ বিশ্বাস করিল না। কিন্তু একটা কালোছায়ার মত কৌতুহলমিশ্ৰিত আশঙ্কা তাহাদিগকে পাইয়া বসিল। কুড়াইল৷ খালের মুখ হইতে উজানের দিকে যখনই জাল ফেলিতে যায়, ভয়ে ভয়ে বাঁশ দুটিকে খাড়া করিয়া একটু বেশি করিয়া ডোবায়। আর দুরু হুরু বুকে মুহূর্ত গোণে মাটিতে ঠেকিল কি না। আর কোথায় স্রোতের কি নড়চড় হইল পই পই করিয়া খোজে। খুঁজিতে খুঁজিতে সত্যই দেখিল, হিসাবে মিলে না, কোথায় যেন গোলমাল হইয়া গিয়াছে। তারা বহুপুরুষ ধরিয়া এই নদীর সঙ্গে পরিচিত। তাদের দিনেরাতের সার্থী বলিতে এই নদী। এর মনের অলিতে-গলিতে তাদের অবাধ পথ-চলা। এর নাড়ি-নক্ষত্র তাদের নখদপণে। কাজেই স্রোতের একটুখানি আড় টিপিয়াই বুঝিতে পারে কোথায় এর ব্যাধি ঢুকিয়াছে। বুঝিতে পারে এর বুকে কাছেই কোথাও খুব বড় একটা চর ভাসিতেছে।

    তাদের হিসাব ভুল হয় না।

    ভাসমান চরটা একদিন মোহনের জালের খুঁটিতে ধরা পড়িয়া গেল। সেটা ছিল ভাঁটার শেষ দিন। বড় নদী তার বহু জল টানিয়া নিয়াছে। এমন সব ভাঁটাতেই নেয়। আবার জোয়ারে ফিরাইয়া দেয়। যত ইচ্ছা দিয়াও যা থাকে, তিতাস তাকে নিয়াই থমথম করে। জলগৌরব তার কোন কালে ম্লান হয় না।

    মোহনের বুক ধড়াস ধড়াস করিতে লাগিল।

    সে ছোটবেলা গল্প শুনিয়াছে। কোন এক সাধু খড়ম পায়ে দিয়া এই তিতাসের বুকের উপর দিয়া হাঁটিয়া পার হইয়া যাইত। সেটা শুধু মন্ত্রবলেই সম্ভব হইয়াছিল। পাঠকের নিকট শুনিয়াছে, বিশাল যমুনা নদী, অগাধ তার জলরাশি; আর ঝড়ে বৃষ্টিতে দুর্যোগপূর্ণ রাত। বাসুদেব কৃষ্ণকে লইয়া জলে নামিল এবং খাপুর খুপুর করিয়া হাঁটিয়া পার হইয়া গেল। সেটা শুধু তারা দেবতা বলিয়াই সম্ভব হইয়াছিল।

    আর এখানে দিনে-দুপুরে। চর্ম-চোখের সামনে। জালট ফেলিতেই তার বাঁশ এই মাঝগাঙেও খুচ করিয়া তলার মাটিতে ঠেকিল। নৌকাটা কাঁপিয়া উঠিল, আর কাঁপিয়া উঠিল মোহন নিজে।

    মোহন বাড়িতে আসিয়া স্তব্ধ হইয়া রহিল। পাড়ার লোকের ডাকাডাকি করিলে সহসা সে রাগে ফাটিয়া পড়িল, ‘মালোগুষ্টি যাত্রা করুক, কবি করুক, নাচুক, মারামারি কামড়াকামড়ি যা মন চায় করুক। আর ভাবনা নাই। গাঙ শুখাইছে।’

    ‘কি কইলি, আরে মহন কি কইলি? আরে আ মন-মোহন কি কইলি?

    ‘কইলাম। গাঙে নাইম্যা দেখ গিয়া।’

    এখান হইতে আধ মাইল দূরে যাত্রাবাড়ির টেক। নৌকা লইয়া তারা সেখানে গিয়া বাঁশ ফেলিল। এই টেক হইতে শুরু করিয়া এই অভাসিত চর উজানে কোথায় যে শেষ হইয়াছে, তার কিনারা করিতে পারিল না। যারা স্নান করিতে নামিয়াছে, তাদেরই একজন বার-পানির নেশায় পা টিপিয়া টিপিয়া একেবারে মাঝ নদীতে আসিয়াছে দেখা গেল। মাঝ নদীতে তার মোটে গলাজল। এমন আশ্চর্য ঘটনা তারা জীবনে এই প্রথম দেখিয়াছে।

    বড় বড় নদীতে এক তীর ভাঙে, অপর তীরে চর পড়ে। ইহাই ধর্ম। কিন্তু তিতাসের ধর্ম তা নয়। এ নদীর কোন তীরই ভাঙে না। কাজেই তার বুকে যখন চর পড়িল, সে চর দিনে দিনে জাগিতে থাকে আয়তনে বাড়িয়া, চৌড় বুক চিতাইয়া।

    বর্ষাকালে জল বাড়িয়া তিতাস কানায় কানায় পূর্ণ হইল। বর্ষা অস্তে সে জল সরিয়া যাওয়াতে সেই চর ভাসিয়া বুক চিতাইয়া দিল। কোথায় গেল এত জল, কোথায় গেল তার মাছ। তিতাসের কেবল তুই তীরের কাছে দুইটি খালের মত সরু জলরেখা প্রবাহিত রহিল, তিতাস যে এককালে একটা জলেভরা নদী ছিল তারই সাক্ষী হিসাবে।

    দুই তীরের উচ্চতা ডিঙ্গাইয়া একদিন দূরদূরাস্তের কৃষকের লাঠি-লাঠা লইয়া চরের মাটিতে ঝাঁপাইয়া পড়িল। পরস্পর লাঠালাঠি করিয়া চরটিকে তারা দখল করিয়া লইল। জেলেরা তীর হইতে কেবল তামাসা দেখিল। এ জায়গা যতদিন জলে ছিল ডোবানো, ততদিনই ছিল মালোদের। যেই জল সরাইয়া ভাসিয়া উঠিয়াছে, তখনি হইয়া গেল চাষাদের। এখানে তারা বীজ বুনিবে, ফসল কাটিয়া ঘরে তুলিবে। তাদের এ দখল চিরকাল বর্তাইয়া রহিবে, কোনদিন কেউ এ দখল হরণ করিয়া লইবে না। তাদের এ দখল যে বাস্তবের উপর; তা যে মাটির গভীরে অনুপ্রবিষ্ট। আর মালোদের দখল ছিল জলে; তরলতার নিরবলম্ব নিরবয়বের মধ্যে। কোনদিন সেটা বাস্তবের গভীর স্পর্শ খুঁজিয়া পাইল না। পাইল না শক্ত কোন অবলম্বন। কঠিন কোন পা রাখিবার স্থান। তাই তারা ভাসমান। পৃথিবীর বুকে মিশিয়া যতই তারা, জেলেরা, গাছপালা বাড়িঘরের সঙ্গে মিতালি করুক, তারা বাম্পের মত ভাসমান। যতই তারা পৃথিবীর বুক আঁকড়াইয়া ধরিয়া থাকুক, ধরার মাটি তাহাদিগকে সর্বদা দুই হাতে ঠেলিয়া দিতেছে, আর বলিতেছে, ঠাঁই নাই, তোমাদের ঠাঁই নাই। যতদিন নদীতে থাকে জল, ততদিন তারা জলের উপর ভাসে। জল শুখাইলে তারা জলের সঙ্গে বাম্প হইয়া উড়িয়া যায়।

    এখনো জোয়ার আসে। চরটা তখন ডুবিয়া যায়। সার তিতাস তখন জলে জলময়। নদীর দিকে দৃষ্টি প্রসারিত করিয়া মালোরা ভাবিতে চেষ্টা করে; এই তো জলে-ভরা নদী। ইহাই সত্য। একটু আগে যাহা দেখা গিয়াছিল ওটা দুঃস্বপ্ন। কিন্তু ভাঁটা আসিলেই সত্যটা নগ্ন হইয় উঠে। মালোদের এক একটা বুক জোড়া দীর্ঘনিশ্বাস বাহির হয়। তিতাস যেন একটা শত্রু। নির্মম নিষ্ঠুর হইয়া উঠিয়াছে সেইশত্রু। এতদিন ভালবাসিয়া আসিয়াছে। আজ সম্পূর্ণ অনাত্মীয় হইয়া গিয়াছে। এতদিন সোহাগে আহ্লাদে বুকে করিয়া রাখিয়াছিল। আজ যেন ঠেলিয়া কোন গহীন জলে ফেলিয়া দিতেছে। যেন মালোদের সঙ্গে তার সব সম্পর্ক চুকাইয়া নিক্ষরুণ কণ্ঠে বলিয়া দিতেছে, আমার কাছে আর অtসিও না। আমি আর তোমাদের কেউ না। বর্ষাকালে আবার সে কানায় কানায় পূর্ণ হইয় উঠে। সুদূরবর্তী স্থান হইতে ভাসিয়া আসে তার ঢেউ। তখন তার স্রোতের ধারা কলকল করিয়া বহিতে থাকে। আবার প্রাণচঞ্চল মাছের সেই স্রোতের তরী বাহিয়া পুলকের সঙ্গে উজাইয়া চলে। নূতন জলে মালোর প্রাণ ভরিয়া ঝাপবাপি করে। গাঁ ডোবায়, গাঁ ভাসায়। নদীর শীতল আলিঙ্গনে আপনাদের ছাড়িয়া দিয়া বলে, তবে যে বড় শুখাইয়া গিয়াছিলে। বলিতে বলিতে চোখে জল আসিয়া পড়ে, বড় যে তোমাকে পর পর লাগিত; এখন ত লাগে না। এত যদি স্নেহ, এত যদি মমতা, তবে কেন সেদিন নির্মম হইয়া উঠিয়াছিলে। এ কি তোমার খেলা! এ খেলা আর যার সঙ্গে খুশি খেলাও, কিন্তু জেলেদের সঙ্গে নয়। তারা বড় অল্পেতে অভিভূত হইয়া পড়ে। তোমার ক্ষণিকের খেয়ালকে সত্য বলিয়া মানিয়া নিয়া তারা নিজেরাই আত্মনির্যাতন ভোগ করে। তারা বড় দীন। দয়াল তুমি, তাদের সঙ্গে ঐ খেলা খেলাইও না। ঐ রূপ দেখাইও না। তারা তোমার প্রসন্ন দৃষ্টি দেখিয়াই অভ্যস্ত।

    বিধির বিধানে বর্ষার স্থায়িত্বের একটা সীমারেখা আছে। তার দিন ফুরাইলে তিতাস আবার সেই রকম হইয়া গেল। তার বুকের চরটা নগ্ন হইয়া জাগিয়া উঠিল। এবার সেটা আয়তনে আরো বাড়িয়াছে। উজানের দূরদূরান্তর হইতে একেবারে মালোপাড়ার ঘাট পর্যন্ত সেটা প্রসারিত হইয়া পড়িয়াছে।

    এবারও কৃষকেরা লাঠি লইয়া দখল করিতে আসিবে। রামপ্রসাদ ঘুরিয়া ঘুরিয়া জেলেদের উত্তেজিত করিতে চেষ্ট৷ করিল, ওরা কৃষক। ওদের জমি আছে। ওরা আরো দখল করিবে। যতদিন জল ছিল, আমাদের ছিল দখল। এখন জল গিয়াছে। তার মাটিও এখন আমাদেরই। ওরা অতদূর হইতে আসিয়া দখল করিয়া নিবে, আর এত নিকটে থাকিয়া আমরা জেলেরাই বা নিশ্চেষ্ট থাকিব কেন।

    নিজেদের মধ্যে দীর্ঘকাল দলাদলির ফলে তারা একযোগে কাজ করার ক্ষমতা একেবারেই হারাইয়া ফেলিয়াছিল। তাই মারামারির নাম শুনিয়া আঁতকাইয়া উঠিল। বলিল; গাঙ শুখাইয়া জল গিয়াছে, তার সঙ্গে আমরাও গিয়াছি, এখন মাটি নিয়া কামড়াকামড়ি করিতে আমরা যাইব না। তোমার সাধ হইয়াছে তুমি একলা যাও।

    রামপ্রসাদ একলাই গিয়াছিল। তার বাড়ি-সোজা চরের মাটি দখল করিবার জন্য নিশ্চিত মৃত্যু জানিয়াও ঝাঁপাইয়া পড়িল। জোয়ান ভাইদের পাশে রাখিয়া লড়াই করিতে করিতে বৃদ্ধ সেই মৃত্যুও বরণ করিল। করম আলি বন্দে আলি প্রভৃতি ভূমিহীন চাষীরাও আসিয়াছিল, কিন্তু মার খাইয়া ফিরিয়া গিয়াছে। কেহ এক খামচা মাটিও পাইল না। তবে পাইল কে। দেখা গেল, যারা অনেক জমির মালিক, যাদের জোর বেশি, তিতাসের বুকের নয়-মাটির জমিনের মালিকও হইল তারাই।

    তাতে জেলেদের কিছু যায় আসে না। কারণ যেদিন

    থেকে জল গিয়াছে সেদিন থেকে তারাও গিয়াছে।

    উপরি উপরি কয়েকটা বছর ঘুরিয়া গেল। এবারের বর্ষার পর নবীনাগর গ্রামের জেলেদেরও টনক নড়িল। ভাসমান চরটা ভাসিতে ভাসিতে তাদের গ্রাম পর্যন্ত ছড়াইয়া গিয়াছে। অনন্তবালার বাপ বিষম ভাবনায় পড়িয়াছে। একদিন বনমালীকে ডাকিয়া বলিল, ‘একবার দেখনা, তার নি খোঁজ পাও।’

    অনন্তবালার বয়স বাড়িয়াছে। তার বয়সের অন্যান্য মালোর মেয়েরা সকলেই স্বামীর ঘর করিতে চলিয়া গিয়াছে। সে এখনো মাঘমণ্ডলের পুজা করে। অনন্ত নাকি তাকে বলিয়া গিয়াছে। লেখাপড়া শিখিয়া সে যেদিন ফিরিয়া আসিবে, সেদিন সে যাহা বলিবে অনন্ত তাহাই করিবে।’আমি আর কি বলিব। মা খুড়িমা যে-কথা অহৰ্নিশি বলে, আমিও সে কথাই বলিব, বলিয়াছিল অনন্তবালা। সেটা ছিল অবোধ বয়সের ছেলেমানুষি। এখন বয়স বাড়িয়া সে চিন্তাটা আরো প্রবল হইয়াছে। তার বয়সের অন্য মেয়েদের যখন একে একে বর আসিল, অনন্তবালা দেখিয়াছে, কিন্তু মনে করিয়া রাখিয়াছে, তারও একদিন বর আসিবে। সে বর আর কেউ নয়। সে অনন্ত।

    দিনদিনই তাকে একটু একটু করিয়া বড় দেখায়। শেষে মা খুড়িমাদের চোখেও সে দৃষ্টিকটু হইয়া পড়িল। তার চাইতে ছোট মেয়েরা দেখিয়া মাঝে মাঝে ছড়া কাটে, ‘অনন্তবালা ঘরের পালা, তারে নিয়া বিষম জ্বালা।’ তার মা একদিন তার বাপকে তিরস্কার করিয়া বলিয়াছিল, ‘মাইয়া রে যে বিয়া দেও না, সে কি কাঠের পালা যে ঘরে লাগাইয়া রাখবা।’

    ‘কথা শুন, বনমালী। তোমারে রেলের ভাড়া দেই, তুমি কুমিল্লা শহরে যাও, দেখ গিয়া, তার নি খোঁজ পাওয়া যায়।’

    বনমালী গিয়াছিল। দুইদিন হোটেলে বাস করিয়া রাস্তায় রাস্তায় ঢুঁড়িয়াছে। কোন হদিস মিলে নাই।

    হদিস মিলিয়াছিল সাত বছর পরে। অনন্তবালা তখন ষোল ছাড়াইয়া সতরোয় পা দিয়াছে। মালোর ঘরে অত বড় আইবুড়ে মেয়ে কেউ দেখে নাই বলিয়া সকলেই তার বাপখুড়াকে ছি ছি করিত। বয়স যতদিন কম ছিল, ভাল বর আসিলে অনন্তর আশায় তার প্রত্যাখ্যান করিয়াছে। এখন অনন্তর আশা গিয়াছে; বর আসে তৃতীয় কিংবা চতুর্থ পক্ষ। তার উপর মূর্খ, দেখিতে কদাকার। তারই একটার সঙ্গে জুড়িয়া দিব, আর উপায় নাই, বলিয়া তার বাপ একদিন নিৰ্মম হইয়া উঠিলে, সে দুঃখে অপমানে মরিতে চাহিল এবং বিস্তর কাঁদিয়া মা খুড়িমাদের তিরস্কারে ও অনুরোধে মন স্থির করিল। এমন সময় খবর নিয়া আসিল বনমালী।

    —গাড়ি যখন কুমিল্লার ইষ্টিশনে লাগিল, তখন সন্ধ্যা হইতেছে। এদিক দিয়া চেকার উঠিতেছে দেখিয়া আমি ওদিক দিয়া নামিয়া গেলাম। কাঁধে পোনার ভার। দৌড়াইতে পাড়ি না। হাঁড়ি দুইটা ভাঙ্গিয়া গেলে তুলেমূলে বিনাশ। ইষ্টিশনের পশ্চিমে ময়দান। ঠাকুর ডুবিতেছে। লুকাইতে গিয়া দেখি অনন্ত। আরো তিনজনের সঙ্গে ঘাসের উপর বসিয়া তর্ক করিতেছে। পরণের ধুতি ফরসা, জামা ফরসা। পায়ের জুতা পর্যন্ত পালিশ করা। আমার এ বেশ লইয়া তার সামনে দাঁড়াইতে ভয়ানক লজ্জা করিতে লাগিল। তবু সামনে গিয়া দাঁড়াইলাম। চিনিল না। শেষে পনার হাঁড়ির দিকে মুখ রাখিয়া নিজে নিজে বলিলাম, আমাদের অনন্ত না জানি কোথায় আছে। সে কি জানে না তিতাস নদী শুখাইয়া গিয়াছে, মালোর জল ছাড়া মীনের মত হইয়াছে। খাইতে পায় না। মাথারও ঠিক নাই। অনন্ত লেখাপড়া শিখিয়াছে। সে কেন আসিয়া গরমেন্টের কাছে চিঠি লিখিয়া মালোদের একটা উপায় করিয়া দেয় না। হায় অনন্ত, যদি তুমি একবার আসিয়া দেখিতে তিতাস-তীরের মালোদের কি দশা হইয়াছে। দেখি অষুধে ধরিয়াছে। উঠিয়া কাছে আসিল। মুখের দিকে কতক্ষণ চাহিয়া রহিল। চিনিতে পারিয়া বুকে জড়াইয়া ধরিয়া কহিল, বনমালী দা, তুমি এই রকম হইয়া গিয়াছ। আমি একলা হই নাই রে ভাই, সব মালোরাই এইরকম হইয়া গিয়াছে। তবু ত আমি বাঁচিয়া আছি, মাছের পোনার ভার কাঁধে লইয়া ঘোরাফেরা করিতে পারি; কত মালো যে মরিয়া গিয়াছে; কত মালো যে খাইতে না পাইয়া একেবারে বলবুদ্ধি হারাইয়া ঘর-বৈঠক হইয়া গিয়াছে। সে দেখি ধ্যানস্থ হইয়া গেল। ধ্যান ভাঙ্গিলে বলিল, বনমালী দা, তুমি কি কর আজ কাল। বলিলাম, নদী শুখাইয়াছে, মালোদের মাছ ধরাও উঠিয়াছে। ব্যবসা ছাড়িয়া তারা দলেদলে মজুরি ধরিয়াছে। আমিও মজুরি ধরিয়াছি। একদিন চাঁটগাও হইতে এক মহাজন গেল মালোপাড়ায়। নাম কমল সরকার। বলিল, আমি এদেশে মাছের পোনা চালান দিব। এখানে দালাল থাকিবে। নানা গ্রামের পুকুরে সে পোনা ফেলিবে। তোমরা ত আর কোন কালে মাছ ধরিতে পারিবে না। মজুরি কর। হাঁড়িতে জল দিয়া পোনা জিয়াইয়া ভার কাঁধে তুলিয়া দেয়, গামছায় বাঁধিয়া চিড়া দেয়, একখানা টিকেট কাটিয়া দেয়। দেশে গিয়া দালালকে বুঝাইয়া দেই। ক্ষেপ-পিছে একটা করিয়া টাকা দেয়। আমার গায়ে জোর আছে আমি পারি। অন্য মালোরা কি তা পারে। এবার আবার টিকেট কাটিয়া দিল না, বলিল, তোর পরণে ছোড়া গামছা, কাঁধে ছোড়া গামছা; মুখে লম্বা লম্বা দাড়ি। তোকে ঠিক ভিখারীর মত দেখায়। চেকারবাবু তোকে কিছুই বলিবে না। তুই বিনা টিকেটেই যা। একটাকার জায়গাতে না হয় পাঁচসিক দিব। এতদূর আসিয়াছিলাম। কিন্তু এখানে আসিয়া এত ভয় করিতে লাগিল যে নামিয়া পড়িলাম। আমার শরীরের দিকে কাপড়চোপড়ের দিকে, দাড়ির দিকে, চুলের দিকে চাহিয়া রহিল। এক সময়ে বলিল, বনমালী দা, তোমার একখানা ভাল গামছাও নাই। বলিলাম, আছে রে ভাই আছে। ভাল ধুতিও একটা আছে, কিন্তু তুলিয়া রাখিয়াছি। আর বিদেশ চলিতে এই পোষাকই ভাল। আমাকে হোটেলে নিয়া খাওয়াইল। দোকান হইতে আমাকে একটা, গোকনঘাটের তার মাসী সুবলার বউকে একটা আর উদয়তারাকে একটা কাপড় কিনিয়া দিল। নিজের কাছে নিজের বিছানায় শোয়াইল। পরদিন সকালে টিকেট কাটিয়া গাড়িতে তুলিয়া দিয়া গেল। বলিয়া দিল, বি-এ পরীক্ষার আর ছমাস বাকি। পরীক্ষা দিয়াই আমাদের দেখিতে আসিবে।

    অনন্তবালা চুপি চুপি তাকে আসিয়া বলিল, ‘অ বনমালী দা, কাপড় দিল তোমারে একখান, মাসীরে একখান, উদি বোনদিরে একখান, আমারে একখান দিল না?’

    —নিশ্চয়ই দিত। আমি যে তোমার কথা তাকে বলিই নাই।

    — বল নাই। কেন বল নাই।

    —চিনিতে পারিবে না যে। আমারেই কত কষ্টে চিনিয়াছে।

    —চিনিতে পারিবে না কেন। আমার কি তোমার মত দাড়ি হইয়াছে, না, আমি তোমার মত বুড়া হইয়া গিয়াছি।

    বনমালীর বোন উদয়তারারও বয়স বাড়িয়াছে। শরীরের লাবণ্য গিয়াছে। কিন্তু মনের রঙ মুছিয়া যায় নাই। নূতন বর্ষায় তিতাসে আবার নূতন জল আসিয়াছে। স্বপ্নের মত অভাবিত এই জল। কি স্বচ্ছ। বুকজলে নামিয়া মুখ বাড়াইলে মাটি দেখা যায়। এই মাটিটাই সত্য। এই মাটিই যখন জাগিয়া উঠিত প্রথম প্রথম দুঃস্বপ্ন বলিয়া মনে হইত। এখন ঐ মাটিই স্বাভাবিক। জল যে আসিয়াছে ইহা একটা স্বপ্নমাত্র। মনোহর। কিন্তু যখন চলিয়া যাইবে ঘোরতর মরুভূমি রাখিয়া যাইবে। সে মরুভূমি রেণু রেণ, করিয়া খুঁজিলেও তাতে একটি মাছ থাকিবে না। তবু সেই জলেই গাঁ ডুবাইয়া উদয়তারার খুশি উপছাইয়া উঠিল। সেই ঘাটে অনন্তবালাও গাঁ মেলিয়া ধরিয়াছে। ছোট ঢেউগুলি তার চুলগুলিকে নাড়াচাড়া করিতেছে দেখিয়া উদয়তারা বলিয়া উঠিল, ‘জিলাপির পেচে-পেচে রসভরা, মগু কি ঠাণ্ডা লাগে জল ছাড়া। যতই দেখ মেওয়া-মিছরি কিছু এই জলের মতন ঠাণ্ডা লাগে না। অনন্তর ত অস্ত নাই। জলের তবু অস্ত আছে। লও, ভইন ডুব দেই।’

    ‘কেন গো দিদি। আমরা কি বাজারের গামছা না সাবান যে ডুইব্যা তলায় পইড়া ক্ষয় হমু। তোমার যদি জ্বালা হইয়া থাকে, জুড়াইতে চাও, তবে তুমি ডোব।’

    ‘আমার ত ভইন কেশটি পড়িল দন্তটি নড়িল যৈবনে পড়িল ভাটি। আমার আবার জ্বালা কি?’

    এইবার কথায় তার বয়সের খোঁটা আসিয়া পড়িবে আশঙ্কা করিয়া অনন্তবালা জল হইতে উঠিয়া পড়িল। কাপড়খানা বুকের উপর দুই তিন ভাজে বিছাইয়া বাড়িমুখে হইল।

    ‘আহা আমি যেন মারছি না ধরছি’ বলিয়া উদয়তারাও উঠিয়া পড়িল।

    ভিজা কাপড়। আলুলায়িত চুল। কয়েক পা যাইতেই পাশের ঘাট হইতে দুইজনের কথাবার্তা তার কানে গেল। একটা লোক নৌকা ভিড়াইয়া খুঁটি পুতিল এবং দড়ি দিয়া নৌকা বাধিল। অন্য লোকটি ঘাটে দাঁড়াইয়া বলিতেছে, নিতে আসিয়াছ বুঝি? হাঁ। না দেখিলে বুঝি অন্তর দাহনি করে? করে। তা বেশ। বুদ্ধিমানের মতই কাজ করিয়াছ। গাঙে জল থাকিতে থাকিতে নিয়া যাও। সুদিনে গাঙ যতদিন শুকনা ছিল, ততদিন তুমি আস নাই। জল শুখাইবার সঙ্গে সঙ্গে তোমার প্রেমও শুখাইয়া গিয়াছিল, কেমন কহিলাম? হা, কথা কিছু মিছা বল নাই। তা শুক্‌না গাঙে তুমি কেমন করিয়াই আসিতে! নৌকা ত আর কাঁধে করিয়া আনিতে পারিতে না? না। তা তুমি যাই কও আর তাই কও, আমি কিন্তু সাঁচা কথাখান কই, ‘যদি থাকে বন্ধুর মন, গাঙ পার হইতে কতক্ষণ?’ মনে থাকিলে গহীন গাঙে কি করিবে। মনে থাকিলে মরাগাঙেও আটকাইতে পারে না; গানে আছে না, ‘ভেবে রাধারমণ বলে, পিরিতের নাও শুকনায় চলে।’ কেমন কহিলাম। হাঁ, কথা তুমি কিছু মিছা কও নাই।

    উদয়তারাকে তার স্বামী নিতে আসিয়াছে।

  • মার্ক টোয়েন গল্পসমগ্র

    মার্ক টোয়েন গল্পসমগ্র

    [book-name]

    The Complete Short Stories Of MARK TWAIN

    মণীন্দ্র দত্তমার্ক টোয়েন

    অখণ্ড রাজ সংস্করণ

    তুলি-কলম

    ১, কলেজ রো, কলকাতা-৯

    প্রথম সংস্করণ : বৈশাখ ১৪০২, এপ্রিল ১৯৯৫

    দ্বিতীয় সংস্করণ : বইমেলা ১৪১৪, ফেব্রুয়ারী ২০০৮

    প্রকাশক : কল্যাণব্রত দত্ত॥ তুলি-কলম ॥ ১এ, কলেজ রো, কলকাতা-৯

    অক্ষর বিন্যার : এস টি লেজার ইউনিট, কলকাতা-৭৩

    মুদ্রক : এসার গ্রাফিক, ১ সি, গৌর লাহা স্ট্রিট, কলকাতা-৬

    প্রচ্ছদ: নীল দত্ত॥ অলংকরণ : রাজা দত্ত

    প্রাপ্তিস্থান : সাহিত্য তীর্থ॥ ৮/১ বি, শ্যামাচরণ দে স্ট্রিট, কলকাতা-৭৩

    মার্ক টোয়েন প্রসঙ্গে

    আসল নাম স্যামুয়েল ল্যাংহর্ণ ক্লিমেন্স; কিন্তু যে নামে তাঁর বিশ্ব-জোড়া খ্যাতি সেটি ছদ্মনাম মার্ক টোয়েন। এই ছদ্মনাম গ্রহণের একটু ইতিহাস আছে। ১৮৬৩ খৃষ্টাব্দের গোড়ার কথা। ক্লিমেন্স তখন সাংবাদিকতা ও রস-রচনার ক্ষেত্রে যথেষ্ট প্রতিষ্ঠা লাভ করেছেন। বিখ্যাত সংবাদপত্র “এন্টারপ্রাইজ”-এর সঙ্গে জড়িত। একদিন তাঁর মনে হল একটি ভাল ছদ্মনাম চাই। ঘটনাক্রমে ঠিক সেই সময়ই তাঁর পূর্ব-পরিচিত বৃদ্ধ নৌ-চালক ক্যাপ্টেন সেলার্স-এর মৃত্যুসংবাদ এসে পৌঁছল। ক্লিমেন্স-এর মনে পড়ে গেল, ক্যাপ্টেন সেলার্স নিজের নাম স্বাক্ষর করতেন—”মার্ক টোয়েন।” নামটি তাঁর মনে ধরল। এর একটি নিজস্ব ঐশ্বর্য আছে। কথাটার অর্থ “নিরাপদ জলরাশি।” অন্ধকার সমুদ্রের বুকে চলতে চলতে যে কোন নাবিকের কানে নামটি বড়ই শ্রুতিসুখকর। ২রা ফেব্রুয়ারি তারিখে প্রকাশিত একটি রচনাতেই ক্লিমেন্স-এর এই ছদ্মনাম সর্বপ্রথম স্বাক্ষরিত হয়েছিল। মহাকালের পথ ধরে সেই ছদ্মনাম আজ আসল নামের গণ্ডীকে অতিক্রম করে সর্বমানবের স্মৃতিতে অমর হয়ে আছে।

    স্যামুয়েল ল্যাংহর্ণ ক্লিমেন্স-এর জন্ম ১৮৩৫ খৃস্টাব্দের ৩০শে নভেম্বর, আমেরিকার ফ্লোরিডা শহরে। ছোট বেলায় সকলে তাকে ডাকত “ক্ষুদে স্যাম” বা “স্যামি” বলে। নদীতীরবর্তী ছোট শহর হ্যানিবল্-এ তার শৈশব কেটেছে। নদী, নৌকো ও স্টিমার নিয়ে সে এক আশ্চর্য সুন্দর জগৎ। ছোট্ট স্যামির চোখে স্বপ্নের অঞ্জন। পরবর্তী কালে মার্ক টোয়েন লিখেছেন: “যখন সে দেখে বাষ্পীয় যানগুলি অনবরত যাতায়াত করছে অথচ একবারও সে তাতে চড়তে পারছে না, তখন একটি ছোট ছেলের মনের অবস্থা কি রকম হয় তা কল্পনাও করা যায় না।” সেই কল্পনা কিন্তু একদিন বাস্তবে রূপ নিল। ক্ষুদে স্যামের জীবনের অন্য অনেক দুঃসাহসিক ঘটনার মধ্যে সেও একটি। তাঁর বয়স তখন সবে ন’বছর। বেশ কতকগুলি যাত্রীবাহী স্টিমার হ্যানিবল-এ এসে ভিড়ল। স্যামিও চুপি চুপি তার একটি তে উঠে পড়ল। হামাগুড়ি দিয়ে সোজা হাজির হল ডেকে। স্টিমার ছাড়ার ঘণ্টা পড়ল। ঘাট ছেড়ে স্টিমার মাঝ নদীতে পড়ল। স্যামির স্টিমারে চড়ার স্বপ্ন সফল হল। হামাগুড়ি দিয়ে ডেকের তলা থেকে বেরিয়ে এসে প্রাণভরে দেখতে লাগল প্রকৃতির অপরূপ শোভা। মুষলধারে শুরু হল বৃষ্টি। হামাগুড়ি দিয়ে ফের ঢুকল ডেকের তলায়। কিন্তু পা-জোড়া বেরিয়ে রইল। একটি খালাসি দেখতে পেয়ে হিড়-হিড় করে তাকে টেনে বের করল। আর ঠিক পরের ঘাটেই স্টিমার থেকে নামিয়ে দিল। হ্যাঁ, মার্ক টোয়েনের “দি অ্যাডভেঞ্চার্স অব টম সইয়ার” বইয়ের বেশীর ভাগ পাঠকই যা অনুমান করেন সেটাই ঠিক—স্যাম ক্লিমেন্সই টম সইয়ার—একেবারে হুবহু এক।

    ঘটনার বিপুল বৈচিত্র্যের যে নক্ষত্র-দীপ্তিতে মার্ক টোয়েনের জীবনের আকাশ ঝলমল করে, তারই প্রতিফলন আমরা দেখি তার সাহিত্য-কৃতিতে। Gilded Edge, The Adventures of Tom Sawyer, Huckleberry Fin, Life on the Mississipi, The Innocents Abroad, A Tramp Abroad, Roughing it প্রভৃতি বইয়ের পাতা ওল্টালে তার বিচিত্র রস ও রসিকতার অন্তরালে মার্ক টোয়েনের কটাক্ষ-রসায়িত হাস্যোজ্জ্বল মুখখানি কোন চক্ষুষ্মান পাঠকেরই দৃষ্টিকে এড়িয়ে যেতে পারে না।

    বিচিত্র মার্ক টোয়েনের জীবনের ইতিহাস। আট বছর ছাপাখানার শিক্ষানবীশ, চার বছর মিসিসিপি নদীতে স্টিমারের পাইলট, নেভাদার দুর্গম অঞ্চলে খনির সন্ধানে অক্লান্ত অভিযাত্রী, ভার্জিনিয়া সিটিতে সংবাদপত্রের প্রতিবেদক হিসাবে আর্থিক স্বচ্ছলতা ও প্রতিষ্ঠা লাভ, ক্যালিফোর্নিয়ার অভিজাত মহলে যাতায়াত ও সাহিত্য-রচনার পাথেয় সঞ্চয় চুয়াত্তর বছরের দীর্ঘ জীবন বৈচিত্র্যে ও সাফল্যে সমান সমুজ্জ্বল। চল্লিশ বছর ধরে তার সৃষ্টিশীল লেখনী থেকে অজস্র ধারায় ঝড়ে পড়েছে উপন্যাস, ছোট গল্প, ভ্রমণ-কাহিনী ও রম্যরচনার রসমধুর ফসল। লেখনীর মত তার রসনায়ও ছিল নিকষে কণক-দীপ্তির আশ্চর্য বিচ্ছুরণ সভাকক্ষে বক্তা হিসাবে যেমন ছিলেন জনপ্রিয়, তেমনি ছিলেন ভোজসভার বৈঠকী বাচন-ভঙ্গীতে পারঙ্গম। ছিলেন একাধারে অনেক রাষ্ট্রপ্রধানের সুহৃদ, অনেক রাজার সহচর, বিশ্বপর্যটক, খ্যাতিমান গল্পকার, প্রেমিক স্বামী ও স্নেহময় পিতা।

    অনেকের মতেই মার্ক টোয়েন আমেরিকার সাহিত্য-কুল-তিলক। “A man, a very great man, a national monument.” আমেরিকার নোবেল-পুরুস্কারপ্রাপ্ত বিখ্যাত সাহিত্যিক আর্নেস্ট হেমিংওয়ে বলেছেন, “হাবেরি ফিন” থেকেই মার্কিন সাহিত্যের যাত্রা শুরু হয়েছে। তাঁর সাহিত্য-কীর্তির সমালোচনায় অগ্রসর হবার আগে জনৈক বিদগ্ধ সমালোচকের সতর্ক-বাণী অবশ্য স্মর্তব্য: “Twain is a dangerous man to write about. Unless you approach him With a sense of humour, you are lost. You cannot dissect a humorist upon a table. Your first stroke will kill him and make him a tragedian. You must come to Twain with a smile. That is his prerogative: that he can make you do so or fail. A great American critic wrote a study of Twain which was brilliant. The only trouble With it was he thought he was describing somebody else-himself, probably. The critie did not have a sense of humour, and his error was comparable to that of the tone-deaf critic who wrote on Beethoven God forbid that I should try to dissect Mark Twain. “ঈশ্বর দয়া করুন, সে দুঃসাহসিক প্রচেষ্টায় যেন আমরাও না ব্রতী হই। তার পরিবর্তে মার্ক টোয়েনের প্রথম বিখ্যাত গল্প “কালাভেরাস জেলার কুখ্যাত লাফানে ব্যাঙ” থেকে শুরু করে “যে-মানুষ হ্যাড্‌ লিবুগ-এর চরিত্র হনন করেছিল” পর্যন্ত মোট তেতাল্লিশটি গল্পের পূর্ণাঙ্গ ভাষান্তর আমরা রসিক পাঠকদের সামনে উপস্থিত করলাম। এই সব গল্পের গুণাগুণ যার যার মনের নিকষ-পাষাণে ঘসে তারাই পরখ করে দেখুন। আমরা শুধু প্রসঙ্গত এইটুকুই বলতে পারি উল্লিখিত দুটি বিশ্ববিখ্যাত গল্প ছাড়াও “Cannibalism in the cars.” “Legend of Capitolive Venus.” “The Esquimau Maiden’s Romance” “The Death Disk.” “Was it Heaven or Hell.” ও “A Dog’s Tale”-এর মত গল্প কোন দেশের সাহিত্যের খুব বেশী লেখা হয় নি। একটি উদ্ধৃতি দিয়েই এ-প্রসঙ্গ শেষ করছি: “His stories are an important part of our literary heritage…Twain is our writer closest to folklore, our teller of fairy tales. The Jumping Frog story is a living American fairy tale acted out annually in Calaveras Country…Who are our short-story writers? Irving, Hawtharne, Poe. James, Melville, O. Henry, Bret Harte, Hemingway, Faulkner, Porter… Twain ranks high among them.

    এবার মার্ক টোয়েন প্রসঙ্গের শেষ কথা—একটি মহৎ জীবনের অবসান মুহূর্তের কথা। তাঁর জীবনীকার আলবার্ট বিজেলো পাইন-এর জবানীতেই সে বিবরণ শোনা যাক … ১৯১০ খৃস্টাব্দের ২১শে এপ্রিল সকাল বেলা। তাঁর মন তখনও পর্যন্ত বেশ পরিষ্কার। বিছানায় শুয়ে নিজের বই থেকে খানিকটা পড়লেন। আমাকে বললেন দুটি অসমাপ্ত পাণ্ডুলিপি ফেলে দিতে। তাঁকে সান্ত্বনা দিলাম। তিনি আমার হাতটা চেপে ধরলেন। আমার প্রতি এই তাঁর শেষ কথা। … সারাটা বিকেল তন্দ্রায় ডুবে রইলেন; ক্রমে গভীর ঘুমে তলিয়ে গেলন; আর কখনও আমাদের দেখলেন না। সাড়ে ছ’টা নাগাদ ডাঃ কুইণ্টার্ড লক্ষ্য করলেন, শ্বাস-প্রশ্বাস ক্রমেই মৃদু হয়ে আসছে। যন্ত্রণার চিহ্নমাত্র নেই। মাথাটা একপাশে হেলে পড়ল; একটি দীর্ঘনিঃশ্বাস কাঁপতে কাঁপতে বাতাসে মিলিয়ে গেল— চুয়াত্তরটি ঘটনাবহুল বছর ধরে যে শ্বাস-প্রশ্বাস বইছিল তা চিরকালের মত থেমে গেল!

    পরিশেষে বলি, মার্ক টোয়েনের অনুকরণীয় তথা অসরল বাক্য-ভঙ্গীকে বাংলায় ভাষান্তরিত করতে সাধ্যমত চেষ্টা করেছি; কতটা সফল হয়েছি সে বিচার পাঠকের। ভাষান্তরের অনিবার্য ত্রুটি যেন গল্পকারকে স্পর্শ না করে, আমার শুধু এইটুকুই প্রার্থনা।

    “মার্ক টোয়েন গল্পসমগ্র” প্রকাশ প্রসঙ্গে বন্ধুবর ডক্টর বিষ্ণু বসুর সহায়তার কথা কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করছি; কল্যাণীয়া ঈশিতার সহায়তার কথাও এখানে উল্লেখ্য।

    —শ্রীম

    ৷৷ সুদৰ্শন ৷৷

    ৭৮/১২, আর. কে. চ্যাটার্জি রোড,

    কলকাতা-৪২

  • আদিম আতঙ্ক

    আদিম আতঙ্ক

    অদ্রীশ বর্ধন

    আদিম আতঙ্ক

    কল্পবিজ্ঞান থ্রিলার

    ফ্যানট্যাস্টিক ও কল্পবিশ্ব পাবলিকেশনস যৌথ প্রয়াস

    প্রথম প্রকাশ – জানুয়ারি ২০০১

    .

    উৎসর্গ

    গ্রন্থকীট কিশোর বন্ধু

    মেহবুব রহমানকে

    —অদ্রীশ জ্যেঠু

    ফ্যান্টাসটিকের দিনে পাশে থাকা

    সুরজিৎ দে-কে

    প্রকাশকের কথা

    বাংলায় ‘কল্পবিজ্ঞান’-এর জয়যাত্রা কিন্তু অনেকদিনের। ১৯৬৩ সালে অদ্রীশ বর্ধনের আশ্চর্যের হাত ধরে শুরু যে স্বর্ণযুগের, কালের নিয়মে তা আজ হারিয়েছে বিস্মৃতির অন্তরালে। উপযুক্ত প্রকাশক ও গবেষণার অভাবে তা দ্রুত মুছে যাচ্ছে ইতিহাসের পাতা থেকে। কল্পবিশ্ব প্রকাশনীর উদ্দেশ্য শুধু নতুন লেখক প্রতিভাকে সামনে আনাই নয়, কল্পবিজ্ঞানের ঐতিহ্যকে পাঠকের সামনে তুলে ধরা।

    ‘আদিম আতঙ্ক’ একটি শ্বাসরোধী কল্পবিজ্ঞান থ্রিলার। এটি আমেরিকান লেখক ডিন কুন্‌জ এর লেখা ‘ফ্যান্টমস’ উপন্যাস থেকে অনুপ্রাণিত। উপন্যাসটি প্রথমে ধারাবাহিক আকারে প্রকাশিত হয়েছিল শুকতারার পাতায় ১৯৯৮ সালের নভেম্বর মাস থেকে ২০০০ সালের জানুয়ারি মাস অবধি। ২০০১ সালে উপন্যাসটি প্রথম বই আকারে প্রকাশিত হয়েছিল ‘আরুণি পাবলিকেশনস’ থেকে। বাংলা কল্পবিজ্ঞানের আগ্রহী পাঠকদের জন্যে প্রায় ঊনিশ বছর পরে কল্পবিশ্ব ফ্যান্টাসটিক প্রকাশনের সঙ্গে যৌথভাবে উপন্যাসটি পুনঃপ্রকাশের দায়িত্ব নিল। বইটি প্রকাশের দায়িত্ব ও অনুমতি দেবার জন্যে অদ্রীশ বর্ধন ও তাঁর পুত্র অম্বর বর্ধনের কাছে আমরা কৃতজ্ঞ।

    আশা করি, কল্পবিশ্ব ও ফ্যান্টাসটিক এর যৌথ উদ্যোগে প্রকাশিত ‘অপার্থিব সিরিজ’ এর অন্তর্গত এই কল্পবিজ্ঞান থ্রিলারটি কল্পবিজ্ঞানের ইতিহাসের পাতায় যোগ্য সমাদর পাবে।

    নভেম্বর ২০১৯

    প্রকাশক

    বিশেষ কৃতজ্ঞতা

    অম্বর বর্ধন, কেয়া বর্ধন, জয়া ঠাকুর, সঞ্জীব মিত্র

    সুমিত বর্ধন, সুদীপ দেব, সৌরভ দে, সুপ্রিয় দাস

  • শতক বিহরণ

    শতক বিহরণ

    অতুল সুর

    [book-name]

    শতক বিহরণ

    কালের অনন্ত প্রবাহে একশ’ বছর এক অতি সামান্য বিন্দুমাত্র। কিন্তু বঙ্গাব্দ চোদ্দ শতকের এই সামান্য সময়কালের মধ্যেই ঘটে গিয়েছে বৈপ্লবিক ঘটনাসমূহ যথা, দুই মহাযুদ্ধ, এক মন্বন্তর, স্বাধীনতা লাভ ও দেশ বিভাগ, গগনস্পর্শী মূল্যস্ফীতি, নৈতিক শৈথিল্য, মানবিক সত্তার অবনতি, নারী নির্যাতন-ধর্ষণ ও বাঙালীর আত্মহনন। তার মধ্যে সবচেয়ে বড় ঘটনা হচ্ছে ১৯৪৭ খ্রীস্টাব্দে ভারত থেকে ইংরেজের মহাপ্রস্থান ও ভারতের স্বাধীনতা লাভ। সেই ঘটনাই শতাব্দীর ইতিহাসকে বিভক্ত করে দুভাগে। সেই ঘটনা ঘটবার আগে আমরা কিরকম ছিলাম ও পরে কি হয়েছি, সেটাই আমাদের আলোচনার বিষয়বস্তু।

    বঙ্গাব্দ ১৩০০-র আগের একশ’ বছরে বাঙলায় ঘটে গিয়েছিল নবজাগরণ বা রেনেসাঁ। যদিও রেনেসাঁর প্রধান হোতাদের মধ্যে মাইকেল মধুসূদন দত্তের মৃত্যু ঘটেছিল ১২৮০ বঙ্গাব্দে, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের ১২৯৮ বঙ্গাব্দে ও বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ১৩০০ বঙ্গাব্দে, তা হলেও তাঁদের তিরোধানের সঙ্গে রেনেসাঁর ধারা শুকিয়ে যায়নি। পূর্ণমাত্রায় চলেছিল সেই ধারা। দেশকে বড় ও মহৎ করাই ছিল রেনেসাঁর হোতাদের প্রধান লক্ষ্য। ১৩০০ বঙ্গাব্দেই আমরা স্বামী বিবেকানন্দকে দেখি আমেরিকার শিকাগো শহরে অনুষ্ঠিত ধর্ম মহাসভায় ভারতীয় সংস্কৃতির মহান আদর্শ সম্বন্ধে বক্তৃতা দিয়ে বিশ্বজনের মন জয় করতে। ভারত সেদিন গর্বিত হল, যখন পড়ল ‘নিউ ইয়র্ক হেরালড্’-এর স্তম্ভে বিবেকানন্দ সম্বন্ধে লিখিত প্রশস্তি—’ভারতের বাত্যাসৃজনী ঋষি ধর্মমহাসভার বৃহত্তম মানুষ।’

    বস্তুত শতাব্দীর প্রথম পাদটা ছিল ভারতের এক অত্যাশ্চর্য ও আনন্দমুখের যোগ। মোহনবাগান জয় করল আই এফ এ শিল্ড। রবীন্দ্রনাথ পেলেন নোবেল পরিস্কার। শরৎচন্দ্র শুরু করলেন তাঁর আবিস্মরণীয় উপন্যাসসমূহ। আমেরিকায় গিয়ে ধনগোপাল মুখোপাধ্যায় পেলেন তাঁর ‘গ্ৰে নেক’ গ্রন্থের জন্য মার্কিন মুলুকের বিখ্যাত পুরস্কার ‘জন নিউবেরি পদক’। প্রথম মহাযুদ্ধের সময় বাঙালী দূর করল সাহেবদের দেওয়া অপবাদ যে বাঙালীর সামরিক শৌর্যবীর্য নেই। সামরিক বাহিনীতে যোগদান করে এক দল বাঙালী বীর সেদিন বিশ্বকে চমৎকৃত করল। পশ্চিম রণাঙ্গনে জার্মানদের গোলাবর্ষণের ব্যূহ ভেদ করে কেড়ে নিয়ে এল জার্মানদের কামানগুলো। বস্তুত, ধর্ম, ক্ৰীড়া, সাহিত্য, সামরিক শৌর্যবীর্য, সব ক্ষেত্রেই স্বীকৃত হল বাঙালীর শ্রেষ্ঠত্ব।

    ৷৷ দুই ৷৷

    চিন্তাশীলতার ক্ষেত্রে বাঙালী সেদিন ছিল অদ্বিতীয়। গোপালকৃষ্ণ গোখলে উদাত্তকণ্ঠে ঘোষণা করলেন–’হোয়াট বেঙ্গল থিংকস টুডে, ইণ্ডিয়া থিংকস টুমরো।’ গোপালকৃষ্ণ গোখলের এই উক্তির মধ্যে কোন অতিরঞ্জন ছিল না। আগের শতকে বাঙলাই ছিল নবজাগৃতির প্রসূতিগার। সব বিষয়ে বাঙালী ছিল এগিয়ে। ১৮৮৫ খ্রীস্টাব্দে (১৩০০ বঙ্গাব্দ শুরু হয়েছিল ১৩ এপ্রিল ১৮৯৩ খ্রীস্টাব্দে) বোম্বাইয়ে যখন ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের প্রথম অধিবেশন হয়, তখন তার সভাপতিত্ব করলেন একজন বাঙালী–উমেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়। আবার প্রথম বাঙালী সিভিলিয়ান নিযুক্ত হলেন সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর। সাহেবদের ইংরেজি লেখার ভুল ধরতে লাগলেন রেভারেণ্ড লালবিহারী দে।

    চিন্তাশীলতার ক্ষেত্রে শতাব্দীর প্রথমার্ধে আমরা যেসব অনন্যসাধারণ বাঙালীকে দেখি, তাঁদের মধ্যে জনাকয়েকের আমরা এখানে নাম করছি–বিবেকানন্দ, রবীন্দ্রনাথ, গিরীশচন্দ্র, সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, বিপিন চন্দ্ৰ পাল, রামেন্দ্ৰসুন্দর ত্ৰিবেদী, শিশির কুমার ঘোষ, মতিলাল ঘোষ, অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, নন্দলাল বসু, প্রফুল্লচন্দ্র রায়, জগদীশচন্দ্র বসু, ব্রজেন্দ্রনাথ শীল, বিনয়কুমার সরকার, রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, রাসবিহারী ঘোষ, তারকচন্দ্র পালিত, ব্যোমকেশ চক্রবর্তী, যোগেশচন্দ্র রায়, রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, উপেন্দ্রনাথ ব্রহ্মচারী, যদুনাথ সরকার, আশুতোষ মুখোপাধ্যায়, রাজেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়, শিশির কুমার ভাদুড়ি, অরবিন্দ ঘোষ, বারীন্দ্রনাথ ঘোষ, ক্ষুদীরাম বসু, কানাইলাল দত্ত, সূর্য সেন, দীনেশচন্দ্র সেন, সত্যেন্দ্রনাথ বসু, মেঘনাদ সাহা, হেমেন্দ্ৰ প্ৰসাদ ঘোষ, সত্যেন্দ্রনাথ মজুমদার, সুরেশচন্দ্র মজুমদার, চিত্তরঞ্জন দাশ, যতীন্দ্রমোহন সেনগুপ্ত, সুভাষচন্দ্র বসু, বিধানচন্দ্র রায়, নীলরতন সরকার, নলিনীরঞ্জন সরকার, শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় প্রমুখ। শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে এদের সমতুল্য কোন ব্যক্তিকে আর দেখি না। শতাব্দীর প্রথমার্ধের মানুষেরা ছিলেন চিন্তাশীল ও প্রতিভাবান। চিন্তাশীলতাই ছিল তাঁদের মূলধন। দ্বিতীয়ার্ধের মানুষদের মূলধন হচ্ছে চালাকি। চালাকির দ্বারাই তাঁরা সবকিছু সমাধা করতে চান। প্ৰতিভার আজ আর কোন কদর নেই। যারা চালাকিতে ওস্তাদ, পাঁচজনের বই থেকে বিনা স্বীকৃতিতে উপাদান চুরি করে বই ছাপাতে জানে, তারাই আজকের চিন্তাশীল ও প্রতিভাবান পুরুষ। তারাই আজকের পণ্ডিতপ্রবর ও তারাই পায় সাম্মানিক ডি. লিট। সব দেখে শুনে বলতে ইচ্ছে করে—’ডক্টরেটস আর অ্যাওয়াডেড বাই দ্য ফুলস ফর দ্য বেনিফিট অফ দ্য ফুলস।’

    ৷৷ তিন ৷৷

    শতাব্দীর প্রথমার্ধটা ছিল অত্যন্ত সুখস্বাচ্ছন্দ্যের যুগ। জিনিসপত্তরের দাম ছিল খুবই সস্তা। শতাব্দীর সূচনায় চালের দাম ছিল এক টাকা মন। তবে বঙ্গাব্দ প্রথম দশকের গোড়ার দিকে বুয়ার যুদ্ধের জন্য দাম বেড়ে দেড় টাকা থেকে দু’টাকা হয়েছিল। চল্লিশের দশকে (দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের গোড়ার দিকে গুণাগুণ অনুযায়ী) চালের দাম ছিল আড়াই টাকা থেকে সাড়ে তিন টাকা মন। অধিকাংশ ডালের দাম ছিল ছ’ পয়সা সের। আটা দু’ পয়সা সের, ময়দা চার পয়সা সের, সর্ষের তেল দশ পয়সা সের, চিনি দু’ আনা সের, আর ভাল ভয়সা ঘি দশ আনা সের। মাখন আট আনা সের, মাংস ছ’ আনা সের। বাগদা, ট্যাংরা, পারসে ইত্যাদি মাছ চার আনা সের। কাটা রুই মাছ ছ’ আনা সের। দশ হাতি লাট্‌টূ মার্কা ভাল বিলিতি কাপড় দেড় টাকা থেকে সাত সিকা জোড়া। এখনকার এক টাকা দামের রসগোল্লার নাম ছিল ‘রসমুণ্ডি’। এক পয়সায় চারটে রসমুণ্ডি পাওয়া যেত। ফাউ চাইলে দোকানদার আরও একটা ফাউ দিত। আর বাকি সব রকম খাবার ছিল ছ’ আনা সের। এসব দাম ১৯৪২ খ্রীস্টাব্দ পর্যন্ত (বঙ্গাব্দ শতকের প্রথমার্ধ পর্যন্ত) চালু ছিল। তখনও কলকাতা শহরে ‘পাইস হোটেল’- এর অস্তিত্ব ছিল। এসব হোটেলে এক পয়সার বিনিময়ে ভাত, ডাল, তরকারী, চাটনি পাওয়া যেত। কাপড়চোপড়ও ১৯৪২ খ্রীষ্টাব্দ পর্যন্ত আগেকার মতই ছিল। তবে তখন বিলিতি কাপড়ের পরিবর্তে এখানকার মিলের কাপড় পরার রীতি হয়েছিল। ১২০-কাউণ্ট সুতোর মিহি ধুতির দাম ছিল সাত সিকে ও শাড়ীর দাম দু’টাকা চার আনা জোড়া। আর ধনেখালির উৎকৃষ্ট শাড়ী তিন টাকা থেকে সাড়ে তিন টাকায় পাওয়া যেত।

    ছেলেদের লেখাপড়ার খরচও ছিল খুব কম। স্কুলের মাইনে ছিল মাসিক এক আনা থেকে শুরু করে ম্যাট্রিকুলেশন (স্কুল ফাইনাল) ক্লাসে দু’টাকা। কলেজের মাইনে এক টাকা (ক্ষুদিরাম বাবুর সেনট্রাল কলেজে) থেকে শুরু করে পাঁচ টাকা (স্কটিশ চার্চ কলেজে)। বিশ্ববিদ্যালয়ের এম. এ ক্লাসের মাইনে ছিল আট টাকা। পরীক্ষার ফি ছিল পনের থেকে পঁচিশ টাকা। আমার প্রথম বছরে লেখাপড়া করতে মোট খরচ হয়েছিল চোদ্দ আনা পয়সা–মাসিক এক আনা হিসাবে এক বৎসরের মাইনে বারো আনা, একখানা বর্ণপরিচয় দু’পয়সা, একখানা ধারাপাত দু’ পয়সা, একখানা শ্লেট তিন পয়সা ও শ্লেট-পেনসিল এক পয়সা। আজকালকার মত বছরে বছরে পাঠ্যপুস্তক পরিবর্তিত হত না। একবার পাটিগণিত, বীজগণিত ও জ্যামিতির বই কিনলে দু-চার পুরুষ তা পড়ত।

    ডাক মাসুলের খরচও খুব কম ছিল। পোস্টকার্ড এক পয়সা, খাম দু’ পয়সা, রেজিস্ট্রেশন খরচ দু’ আনা ও বিলেতে চিঠি পাঠাতে খরচ হত দশ পয়সা। পোস্ট আপিসের কর্মকুশলতা ছিল অদ্ভূত। আজ সকালে আটটার মধ্যে কলকাতা থেকে ব্যারাকপুরের ঠিকানায় চিঠি পোস্ট করলে, তা বেলা তিনটার সময় সেখানে বিলি হত, এবং সেখান থেকে তার জবাব পাঁচটার মধ্যে পোস্ট করলে কাল সকালে আটটার মধ্যে তা কলকাতায় বিলি হত। আর আজকের একটা নমুনা দিচ্ছি। একখানা চিঠি আমার নামে এবছর ২ ফেব্রুয়ারি তারিখে লেনিন সরণী থেকে পোস্ট করা হয়েছে। ষোল আনা শুদ্ধ ঠিকানা থাকা সত্ত্বেও চিঠিখানা পেলাম ১০ এপ্রিল তারিখে।

    ৷৷ চার ৷৷

    দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় আবির্ভূত হল মহামন্বন্তর। যুদ্ধ দেশের দোরগোড়া পর্যন্ত প্রসারিত হওয়ার ফলে, সৈন্যবাহিনীকে খাওয়ানোর জন্য সরকার চাল ‘কর্ণার’ করল। দেশে চাল দুষ্প্রাপ্য হওয়ায় অন্নাভাবে গ্রাম থেকে ভূমিহীন কৃষকের দল ছুটে এল রাজধানী শহরের দিকে। এখানে অনাহারে কলকাতার রাজপথে শেষনিশ্বাস ত্যাগ করল হাজার হাজার নরনারী ও শিশু। তারই পদাঙ্কে রেশনিং প্রথা চালু করা হল। সঙ্গে সঙ্গে চোরাবাজারীদের আবির্ভাব ঘটল। ফলে জিনিসপত্তরের দামের সামান্য কিছু হেরফের হতে লাগল। পণ্ডিত নেহরু, তখন গদি পাননি। জিনিসপত্তরের মূল্যের উর্দ্ধগতি দেখে তিনি তো চটে লাল। উত্তেজিত হয়ে তিনি বললেন–’আমি যদি কোনদিন ক্ষমতায় আসি, তাহলে চোরাবাজারীদের ল্যাম্প-পোস্টে ঝুলিয়ে তাদের গলা কেটে দেব।’ ১৯৪৭ খ্রীস্টাব্দের পনের আগস্ট ভারত স্বাধীনতা পেল। পণ্ডিত নেহেরুই প্রধানমন্ত্রী হলেন। পনেরো আগস্টের মধ্যরাত্রে তিনি জাতির প্রতি ভাষণে বললেন, ‘আমাদের দীর্ঘদিনের অধীনতা, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ ও তার অনুবর্তী ঘটনাসমূহের ফলে, আমরা জীবনের অনেক পুঞ্জীভূত গুরুতর সমস্যার উত্তরাধিকারী হয়েছি। আজ আমাদের দেশের লোকের খাদ্য, বসন, ও নিত্য আবশ্যকীয় দ্রব্যসামগ্রীর অভাব রয়েছে। আমরা মুদ্রাস্ফীতি ও মূল্যবৃদ্ধির নাগপাশে বদ্ধ হয়েছি। আমরা বিচক্ষণতার সঙ্গে এসব সমস্যার সমাধান করতে চাই, যাতে সাধারণ লোকের ক্লেশের বোঝা হ্রাস পায় ও তাদের জীবনযাত্রার মানবৃদ্ধি পায়।’

    নেহরুর এই প্রতিশ্রুতি সাফল্যমণ্ডিত করবার জন্য ১৯৫১ সাল থেকে শুরু করে আমরা সাতটি পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা ও তিনটি বার্ষিক যোজনা ইতিমধ্যে রচিত ও রূপায়িত করেছি। বর্তমানে অষ্টম পরিকল্পনা রূপায়িত হচ্ছে। সপ্তম পরিকল্পনার শেষ পর্যন্ত আমরা খরচ করেছি ৫৪৪,২৭৬ কোটি টাকা। অষ্টম পরিকল্পনার জন্য বরাদ্দ হয়েছে ৮,৭২,১০০ কোটি টাকা। কিন্তু এই বিপুল অর্থব্যয় করেও আমরা দরিদ্র দেশবাসীর অদৃষ্ট ফেরাতে পারিনি। বরং পুষ্টিকর খাদ্যের অভাবে আমরা আরও দরিদ্র হয়ে পড়েছি। মূল্যস্ফীতি সাধারণ লোকের জীবনকে অতিষ্ট করে তুলেছে। সরকার অবশ্য বলবেন যে আমরা অনেক বিষয়ে এগিয়ে গেছি। কিন্তু সাধারণ লোকের জীবন যে আগেকার তুলনায় সুখময় হয়নি, সে সম্বন্ধে কোন বিতর্কই নেই। দেশের একপ্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত পর্যন্ত একই রব অনুরাণিত হচ্ছে–’ম্যায় ভুখা হুঁ।’ ধনী আরও বেশি ধনী হয়েছে, দরিদ্র হয়েছে দরিদ্রতর। মধ্যবিত্ত সমাজের অবলুপ্তি ঘটেছে।

    ৷৷ পাঁচ ৷৷

    সবচেয়ে বড় দুর্গতি যা আজ মানুষেকে অভিভূত করেছে তা হচ্ছে মূল্যস্ফীতি। যারা মূল্যস্ফীতি ঘটাচ্ছে, নেহেরু তাদের ল্যাম্প-পোস্টে ঝুলিয়ে মারতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ক্ষমতায় আসবার পর দেখা গিয়েছিল যে তাদের সঙ্গেই তিনি হাত মিলিয়ে ফেলেছেন। তাঁর উত্তরাধিকারীরা সেই একই নীতি অনুসরণ করে এসেছেন, কেননা সেই ব্যবসায়ীদের বদন্যতার ওপরেই দলের পুষ্টি ও নির্বাচনের সাফল্য নির্ভর করে। কিন্তু ব্যবসায়ীদের দোষ দিলে হবে না। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সরকার নিজেও মূল্যস্ফীতি ঘটাচ্ছেন। প্রত্যক্ষভাবে সরকার মূল্যস্ফীতি ঘটাচ্ছেন পণ্যদ্রব্যের ওপর কর বসিয়ে, রেলের মাসুল বাড়িয়ে ও পণ্যদ্রব্যের ঊর্ধ্বমূল্য নির্ধারণ করে দিয়ে। আর পরোক্ষভাবে মূল্যস্ফীতি ঘটাচ্ছেন পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা সমূহের রূপায়নের জন্য ঘাটতি ব্যয়নীতি অনুসরণ করে। এ সবের ফলে বর্তমানে পণ্যদ্রব্যমূল্য এমন স্তরে গিয়ে দাঁড়িয়েছে যে তুলনা করলে শতাব্দীর প্রথমার্ধের পণ্যদ্রব্যের মূল্যসমূহ রূপকথার কাহিনী বলে মনে হবে। নেহেরু পণ্যমূল্যের উর্দ্ধগতি দমন করে সাধারণ লোকের জীবন সুখময় করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে পণ্যমূল্য গগনস্পর্শী হয়ে সাধারণ লোকের জীবন কিরকম ক্লেশকর করেছে তা নীচে শতকের দুই অংশের পণ্যমূল্যের তালিকা থেকে প্রতীয়মান হবে।

    পণ্যদ্রব্য শতকের প্রথমার্ধের মূল্য শতকের শেষের মূল্য
    চাল (প্রতি মন) দু’ টাকা ৫০ পয়সা ৩২০ টাকা
    ডাল (প্রতি সের) ছ’ পয়সা ২০ টাকা
    সরষের তেল (প্ৰতি সের) দশ পয়সা ৩০ টাকা
    চিনি (প্ৰতি সের) আট পয়সা ১৫ টাকা
    ঘি (প্ৰতি সের) দশ আনা ২০০ টাকা
    মাংস (প্রতি সের) ছ’ অনা ৭২ টাকা
    মাছ (কাটা রই প্রতি সের) ছ’ আনা ৭০ টাকা
    ধুতি (মিহি কাপড়) দু’ টাকা ৮০ টাকা
    ধনেখালির শাড়ি তিন টাকা ২৫০ টাকা

    গত দশ বছরেই দ্রব্যমূল্য দ্বিগুণ হয়ে গিয়েছে। এটা সরকারী ‘কনস্যুমার প্রাইস ইনডেকস’ থেকে বুঝতে পারা যাবে। ১৯৮২ সালে সূচকসংখ্যা ছিল ১০০, আর ১৯৯২-তে ২১৯। মূল্যস্ফীতি দেশের মধ্যে ধনবৈষম্য ঘটিয়েছে। ষাটের দশকে মহলানবীশ কমিটি এই প্রবণতা লক্ষ্য করেছিলেন এবং এ সম্বন্ধে আমাদের সতর্ক করে দিয়েছিলেন। সে সতর্ক বাণীতে আমরা কর্ণপাত করিনি। ফলে মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সঙ্গে ধনবৈষম্য বিরাট আকারে প্রকট হয়েছে।

    ৷৷ ছয় ৷৷

    শতাব্দীর পূর্বার্ধের রাজনৈতিক পরিস্থিতি পরবর্তী প্রবন্ধে আলোচিত হয়েছে। এবার শতাব্দীর শেষার্ধের রাজনৈতিক পরিস্থিতিটার দিকে তাকানো যাক। ১৯৪৭ খ্রীস্টাব্দের স্বাধীনতা লাভের শোচনীয় শর্ত হিসাবে বঙ্গদেশ দ্বিখণ্ডিত হয়–পশ্চিমবঙ্গ ও পূর্বপাকিস্তান। পশ্চিমবঙ্গ জন্মগ্রহণ করেছিল অনেক সমস্যা নিয়ে। যুক্তবাঙলার অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে ছিল একটা ভারসাম্য। পূর্ববাঙলা ছিল কৃষিপ্রধান, সেজন্য পূর্ববাঙলা ছিল খাদ্যশস্য ও কাঁচামালের আড়ত। আর পশ্চিমবঙ্গ ছিল শিল্প প্রধান। পশ্চিমবঙ্গকে খাদ্যশস্য ও কাঁচামালের জন্য পূর্ববাঙলার ওপর নির্ভর করতে হত। দ্বিখণ্ডিত হবার পর এই আৰ্থিক ভারসাম্য ভেঙে পড়ে। তারপর পশ্চিমবঙ্গ ছিল ঘনবসতিবহুল অংশ। তার মানে, আগে থেকেই এখানে ছিল বাসস্থানের অভাব। সে অভাবকে ক্রমশই তীব্রতর করে তুলেছিল অন্য প্রদেশ থেকে আগত জনসমুদ্র। এই সমস্যাকে আরও উৎকট করে তুলল যখন নিরাপত্তার কারণে লক্ষ লক্ষ হিন্দু পূর্ববাঙলা থেকে পশ্চিমবাঙলায় এল।

    যখন পশ্চিমবঙ্গ সৃষ্টি হল, তখন প্ৰফুল্ল চন্দ্র ঘোষের নেতৃত্বে এক ‘ছায়া মন্ত্রি পরিষদ’ রাজ্যের শাসনভার গ্রহণ করল। কিন্তু চার-পাঁচ মাসের মধ্যেই সেই মন্ত্রিসভা ভেঙে পড়ল। ১৯৪৮ খ্রীস্টাব্দের জানুয়ারি মাসে ডাক্তার বিধানচন্দ্র রায় নতুন মন্ত্রিসভা গঠন করলেন। স্বাভাবিক ভাবে পশ্চিমবঙ্গ যেসব উৎকট সমস্যার সম্মুখীন হয়েছিল, সেগুলির সমাধান এই নতুন মন্ত্রিসভার ঘাড়ে চেপে বসল। নিরবিচ্ছিন্নভাবে তাঁর মৃত্যুকাল পর্যন্ত আঠারো বছর মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন বিধানচন্দ্র পশ্চিমবঙ্গের সমস্যাগুলি একে একে সমাধান করে ফেললেন।

    ১৯৬২ খ্রীস্টাব্দের ১ জুলাই বিধান রায়ের মৃত্যুর পর কংগ্রেস নেতা প্রফুল্লচন্দ্র সেন নতুন মন্ত্রিসভা গঠন করেন। কিন্তু তাঁর অনুসৃত খাদ্যনীতি জনমতের বিরুদ্ধে যাওয়ায়, ১৯৬৭ খ্রীস্টাব্দের নির্বাচনে তিনি পরাজিত হন ও অজয় মুখার্জির নেতৃত্বে এক যুক্তফ্রন্ট সরকার গঠিত হয়। কিন্তু তা ক্ষণস্থায়ী হওয়ায় ড. প্রফুল্ল চন্দ্র ঘোষ এক নতুন মন্ত্রিসভা গঠন করেন। তা-ও স্বল্পকালস্থায়ী হওয়ায় ১৯৬৮ খ্রীস্টাব্দের ২০ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রপতির শাসন জারি হয়। ১৯৬৯ খ্রীস্টাব্দের ফেব্রুয়ারি মাসে অজয় মুখার্জির নেতৃত্বে বামফ্ৰণ্ট সরকার গঠিত হয়। মাত্র এক বছরের বেশি এ-সরকার স্থায়ী হয় না। ১৯৭০ খ্রীস্টাব্দের ১৯ মার্চ আবার রাষ্ট্রপতির শাসন প্রবর্তিত হয়। ১৯৭১ খ্রীস্টাব্দের এপ্রিল মাসে অজয় মুখার্জির নেতৃত্বে এক ডেমোক্ৰেটিক কোয়ালিশন সরকার গঠিত হয়। কিন্ত দু’মাস পরে (জুন ১৯৭১) তা ভেঙে পড়ে। তখন (৩০ জুন ১৯৭১) আবার রাষ্ট্রপতির শাসন জারি করা হয়। ১৯৭২-এর মার্চ মাসে সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায়ের নেতৃত্বে কংগ্রেস সরকার গঠিত হয়। ১৯৭৭ খ্রীস্টাব্দের নির্বাচনে ‘বামফ্রন্ট’ দল সাফল্য অর্জন করাতে জ্যোতি বসু, ‘বামফ্রন্ট সরকার’ গঠন করেন। এই বামফ্রন্ট সরকারই এখনও পর্যন্ত ক্ষমতাসীন আছে।

    বৈষয়িক সম্পদ বৃদ্ধির অন্তরালে বামফ্ৰণ্ট সরকারের আমলে ঘটেছে শান্তিশৃঙ্খলার অবনতি, রাজনৈতিক দলাদলি, দ্বন্দ্ব ও সংঘর্ষ, পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা ও নির্যাতন, মধ্যবিত্ত সমাজের অবলুপ্তি, শিক্ষার সংকট, বাঙলায় অবাঙালীর অবারিত আগমন ও কর্মসংস্থানের ওপর তার প্রতিঘাত, বেকারের সংখ্যাবৃদ্ধি ও জীবনের সর্বক্ষেত্রে বিশৃঙ্খলতা ও নৈতিক শৈথিল্য। তাছাড়া বাঙালীর মানবিক সত্তা ক্রমশই হ্রাস পাচ্ছে। নারীনিগ্রহ ও বধূ-নির্যাতনের ক্রমবৃদ্ধিতার দৃষ্টান্ত।

    বস্তুত, সমকালীন সামাজিক বিশৃঙ্খলতা, মানবিক সত্তার হ্রাস ও নৈতিক শৈথিল্যের প্রতি দৃষ্টি রেখে মনে স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে যে বাঙালীর জীবনচর্যা ও সংস্কৃতির স্বকীয়তা অবক্ষয়ের পথে চলেছে কিনা? অশন-বসনে, আচার-ব্যবহারে বাঙালী আজ যেমন নিজেকে বহুরূপী করে তুলেছে, তেমনই বর্ণচোরা করেছে তার সংস্কৃতিকে। অতীতের গৌরবময় সংস্কৃতির পরিবর্তে এক জারজ সংস্কৃতির প্রাবল্যই লক্ষিত হচ্ছে।

    ৷৷ সাত ৷৷

    এরই মধ্যে ঘটে গিয়েছে বিজ্ঞানের অত্যাশ্চর্য অগ্রগতি। আগের শতকে আমরা পেয়েছিলাম টেলিগ্রাফ, টেলিফোন, বৈদ্যুতিক আলো, পাখা ইত্যাদি। বিংশ শতাব্দীতে আমরা পেয়েছি বেতার, বিমান, খনিজতৈল, মোটরগাড়ি, পরমাণুর ব্যবহার, ইলেকট্রনিকস্‌, টেলিভিসন, প্লাস্টিকস্‌ ইত্যাদি। বস্তুত বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিদ্যার সাহায্যে আমরা এমনভাবে এগিয়ে গেছি যে মনে হবে বিজ্ঞানই বুঝি বা স্বয়ং ভগবান। ভগবানের দুই সত্ত্বা আছে–তিনি যুগপৎ স্রষ্টা ও সংহারকর্তা। বিজ্ঞানও তাই। বিজ্ঞান যেমন একদিকে মানুষের কল্যাণ সাধন করছে, অপরদিকে মানুষেকে ধ্বংসের পথে নিয়ে যাচ্ছে। জানিনা আগামীকালে মানুষের কপালে কি আছে। কেননা এখন চলেছে প্রকৃতির ওপর আধিপত্যের জন্য বিজ্ঞানের লড়াই। এই বিজ্ঞান বনাম প্রকৃতির লড়াইয়ের ফলাফলের ওপর নির্ভর করছে, হয় মানবসভ্যতার আরও অগ্রগতি, আর তা নয়তো মানুষের সম্পূর্ণ বিলুপ্তি। (অতুল সুর, ‘মানব সভ্যতার নৃতাত্ত্বিক ভাষ্য’ দ্রঃ)

  • বিপ্লববাদী সমাজের অভ্যুত্থান

    বিপ্লববাদী সমাজের অভ্যুত্থান

    অতুল সুর

    [book]

    বিপ্লববাদী সমাজের অভ্যুত্থান

    বিগত শতকের সবচেয়ে বড় ঘটনা হচ্ছে ১৯৪৭ খ্রীস্টাব্দে ভারত থেকে ইংরেজের মহাপ্রস্থান ও ভারতের স্বাধীনতা লাভ। সেটা কি করে ঘটেছিল, সেটাই এখানে বলছি।

    যদিও স্বাধীনতা লাভের উদ্দেশ্যে জনমত গঠনের জন্য ১৮৮৫ খ্রীস্টাব্দেই ‘ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস’ স্থাপিত হয়ে গিয়েছিল, তা হলেও ওটা বিপ্লববাদী সংস্থা ছিল না। জাতীয় কংগ্রেস স্থাপনের পূর্বে সংঘটিত যে সব ঘটনাকে আমরা স্বাধীনতা লাভের পদক্ষেপ বলে চিহ্নিত করি সেগলো বিপ্লব নয়, বিদ্রোহ মাত্র। প্রকৃত বিপ্লববাদের আগুন জ্বলে ওঠে বঙ্গভঙ্গকে উপলক্ষ করে। বঙ্গদেশের আয়তন এককালে অনেক বড় ছিল। কিন্তু তাকে ছোট করে আনা হয়েছিল বঙ্গ, আসাম, বিহার, ওড়িষা ও ছোটনাগপুরে। তারপর আসাম প্রদেশকে পৃথক করে একজন চীফ কমিশনারের শাসনাধীনে ন্যস্ত করা হয়। মোট কথা নানারকম রাজনৈতিক কারণে ব্রিটিশ সরকার বঙ্গদেশকে খর্ব করবার অপচেষ্টায় ব্যস্ত ছিল। ১৯০৩ খ্রীস্টাব্দে মধ্যপ্রদেশের চীফ কমিশনার স্যার অ্যানড্রু ফ্লেজার প্রস্তাব করেন যে বঙ্গদেশকে দু’খণ্ডে বিভক্ত করা হউক। প্রস্তাবটা বঙ্গদেশের সবার গভীর অসন্তোষ সৃষ্টি করে। এমন কি ইংরেজ মালিকানাবিশিষ্ট ও ইংরেজ কর্তৃক সম্পাদিত ‘ইংলিশম্যান’ পত্রিকাতেও বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে লেখা হয়। কিন্তু এসব সত্বেও ১৯o৫ খ্রীস্টাব্দের ১৭ অক্টোবর তারিখে বঙ্গদেশকে দ্বিখণ্ডিত করে দেওয়া হয়। পূর্বদিকে সৃষ্টি হল আসাম ও পূর্ব বঙ্গ প্রদেশ ও পশ্চিমে বাকি অংশ। চতুর্দিকে বিদ্বেষের বহ্নি জ্বলে উঠল। বিলাতী পণ্য বর্জন করা হল। যারা বিলাতী জিনিষের দোকানে পিকেটিং করল, তাদের ওপর পুলিশ নিষ্ঠুর অত্যাচার করল। এর প্রতিক্রিয়ায় শিক্ষিত সমাজের মধ্যে ভীষণ অসন্তোষ প্রকাশ পেল।

    আন্দোলন থেকে উদ্ভূত হল জাতীয়তাবাদ, আর জাতীয়তাবাদ এক শ্রেণীর মধ্যে বীজ বপন করল বিপ্লববাদের। বিপ্লববাদ প্রসারের জন্য প্রথম যে সমিতি গঠিত হল, তা হচ্ছে অনুশীলন সমিতি। এর শাখা প্রশাখা চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ল। এদিকে শ্রীঅরবিন্দের ছোট ভাই বারীন্দ্রের নেতৃত্বে গঠিত হল এক সশস্ত্র বিপ্লবীদল। তারা তাদের গোপন কেন্দ্র করল মানিকতলার খালের ওপারে মুরারীপুকুরে এক নিভৃত বাগানবাড়িতে। বারীন্দ্রের নেতৃত্বে যে দল গঠিত হল, তারা দু’জন সদস্যকে বিদেশে পাঠাল বোমা তৈরী করবার প্রণালী শিখে আসবার জন্য। তারপর মুরারীপুকুরের বাগানবাড়িতে বোমা তৈরির আয়োজন চলতে লাগল। বারীন্দ্রের দলের দুজন প্রফুল্ল চাকী ও ক্ষুদিরাম বসু মজফরপুরের দিকে রওনা হল কলকাতার প্রাক্তন প্রেসিডেন্সী ম্যাজিস্ট্রেট কিংসফোর্ডকে হত্যা করবার জন্য। ভুল করে তারা কিংসফোর্ডের গাড়ির মত দেখতে অন্য একখানা গাড়ির ওপর বোমা নিক্ষেপ করে। নিহত হয় মিস্টার কেনেডি নামে এক আইনবিদের স্ত্রী ও কন্যা। প্রফুল্ল ধৃত হয় বটে কিন্তু সে আত্মঘাতী হয়। ক্ষুদিরামের বিচার হয় এবং তাকে ফাঁসি দেওয়া হয়।

    এরপর আসে বিশ্বাসঘাতকের পালা। নরেন্দ্ৰ গোস্বামী নামে দলের একজন সদস্য পুলিসের কাছে গোপন তথ্য সরবরাহ করে বারীন্দ্রের দলকে ধরিয়ে দিয়েছিল। কানাইলাল দত্ত ও সত্যেন বসু নামে দলের দু’জন বন্দী জেলখানার মধ্যেই নরেন্দ্রকে হত্যা করে। বিচারে বারীন্দ্র সমেত ১৪ জন অপরাধী সাব্যস্ত হয়। তাদের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়। কিন্তু এই সঙ্গে বিপ্লববাদের পরিসমাপ্তি ঘটে না। ১৯০৭ থেকে ১৯১৭ খ্রীস্টাব্দের মধ্যে ন্যুনাধিক ৬৩ জন নিহত হয়। সংগ্রামের জন্য অর্থসংগ্রহের প্রয়াসে বিপ্লবীদল রাজনৈতিক ডাকাতি শুরু করে। ১৯০৭ থেকে ১৯১৭ খ্রীস্টাব্দের মধ্যে ১১২টা ডাকাতি হয় এবং ডাকাতরা এভাবে সাত লক্ষ টাকা সংগ্রহ করে।

    ৷৷ দুই ৷৷

    বিপ্লবের জন্য বিদেশে হরদয়ালের নেতৃত্বে এক দল গঠিত হয়। এই দল বিদেশ থেকে ভারতে অস্ত্রশস্ত্ৰ পাঠাবার ব্যবস্থা করে। অস্ত্রশস্ত্র আসছে, এই খবর পেয়ে সেগুলো কোন নিভৃত স্থানে নামাবার জন্য যাদুগোপাল মুখুজ্যে যান সুন্দরবনে ও যতীন মুখুজ্যে যান বালেশ্বরে। বালেশ্বরে যতীন মুখুজ্যের কাছে বাটাভিয়ায় অবস্থিত সহানুভূতিশীল জারমান সরকারের প্রতিভূরা বিপ্লবে সাহায্য করবার জন্য টাকা পাঠাতে থাকে। কিন্তু শেষ কিস্তির দশ হাজার টাকা ব্রিটিশ সরকারের হাতে গিয়ে পড়ে। সেই সূত্র ধরে পুলিস যতীন মুখুজ্যের তল্লাসে বেরিয়ে পড়ে। বুড়িবালামের তীরে যতীন মুখুজ্যে ও তার সহকর্মীদের সঙ্গে পুলিশের এক ভীষণ যুদ্ধ হয়। পুলিশের সঙ্গে সর্ব শক্তি দিয়ে যতীন মুখুজ্যে লড়ে যান। তিনি আহত হন। আহত অবস্থায় হাসপাতালে তাঁর মৃত্যু হয়।

    এদিকে রাসবিহারী বসু, ভারতীয় সৈন্যবাহিনীকে ব্রিটিশের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে উদ্বুদ্ধ করে। বিদ্রোহের দিন নিদিষ্ট হয় ১৯১৫ খ্রীস্টাব্দের ১৯ ফেব্রুয়ারী তারিখে। কিন্তু রাসবিহারীর দলে কিরপাল সিং নামে পুলিশের একজন গুপ্তচর যোগদান করে। তার মারফত সরকার আগে থাকতেই খবর পেয়ে এ চেষ্টা বিফল করে দেয়।

    ৷৷ তিন ৷৷

    রাউলাট আইন ও জালিওয়ানাবাগের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পদাঙ্কে ১৯২০ খ্রীস্টাব্দের পর থেকে গান্ধীজী হন ভারতীয় কংগ্রেসের অপ্রতিদ্বন্দ্বী নেতা। গান্ধীজী অসহযোগ আন্দোলনের মাধ্যমে স্বাধীনতা লাভের পথ ঘোষণা করেন। কিন্তু বিধানসভার মাধ্যমে স্বরাজ লাভের আন্দোলন পরিচালনা করবার জন্য দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ গঠিত করলেন ‘স্বরাজ্য পার্টি’। তাঁরা বিধানসভার মধ্যে নানাভাবে সরকারকে বিপর্যস্ত করে তোলেন।

    এর মধ্যে কংগ্রেসের মধ্যে বামপন্থী দলের প্রাদুর্ভাব ঘটল। চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠিত হল। বিনয়, বাদল, দীনেশ রাইটাস বিল্ডিং-এর অভ্যন্তরে সিম্পসন সাহেবকে হত্যা করল। ঢাকায় পুলিশ সুপারিনটনডেণ্ট লোম্যান সাহেবও নিহত হল।

    আইন অমান্য করে লবণ প্রস্তুতের উদ্দেশ্যে গান্ধীজী ১৯৩০ খ্রীস্টাব্দে ডাণ্ডি অভিমুখে যাত্রা করলেন। ১৯৩২ খ্রীস্টাব্দের মধ্যে আইন অমান্য আন্দোলন দেশের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ল। দলে দলে লোক কারারুদ্ধ হল।

    ৷৷ চার ৷৷

    তারপর এল দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ। কংগ্রেস প্রথমে যুদ্ধে সহযোগিতার প্রস্তাব করেছিল। কিন্তু সরকার তাতে সাড়া না দেওয়ায় ১৯৪২ খ্রীস্টাব্দে আবার সত্যাগ্ৰহ আন্দোলন শুরু হল। সেদিন সমস্ত দেশবাসী আত্মবলে বলীয়ান হয়ে উচ্চকণ্ঠে বলে উঠল—’করেংগে ইয়া মরেংগে।’ সরকার নেতৃবৃন্দকে কারারদ্ধ করল। বিক্ষুব্ধ দেশবাসী সংগ্রাম শুরু করল ইংরেজের বিরুদ্ধে। ‘আগস্ট বিপ্লব’ নামে আখ্যাত এই সংগ্রাম তীব্র আকার ধারণ করল মেদিনীপুর জেলায়। সতীশচন্দ্র সামন্তের অধিনায়কত্বে বিপ্লবীরা সেখানে প্ৰতিষ্ঠিত করল এক স্বাধীন সরকার। প্রায় দেড় বৎসর ইংরেজ শাসন সেখানে বিলুপ্ত হল। ইংরেজ চালালো অমানুষিক অত্যাচার ও ব্যাপক নারীধর্ষণ, পুলিশের গুলি অগ্রাহ্য করে অপূর্ব দেশপ্রেম ও সাহস দেখাল মাতঙ্গিনী হাজরা। সত্তর বৎসর বয়স্কা এই বীরাঙ্গনা মহিলা ললাটে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় জাতীয় পতাকা দৃঢ়মুষ্টিতে ধরে মৃত্যুবরণ করল। বাঙলার সর্বত্রই চলল উত্তেজনা ও পুলিশের অকথ্য অত্যাচার।

    ইতিমধ্যে লড়াইয়ের মধ্যেই ঘটে গেল এক চমকপ্রদ ঘটনা। ‘আগস্ট বিপ্লব’-এর সময় সুভাষ চন্দ্র বসুকে কারারুদ্ধ করা হয়েছিল। কিন্তু অসুস্থতার কারণে তাঁকে জেলখানা থেকে এনে নিজগৃহে অন্তরীণ করা হল। কিন্ত ইংরেজের চোখে ধুলো দিয়ে তিনি অন্তর্হিত হলেন ১৯৪১ খ্রীস্টাব্দের ১৮ জানুয়ারী তারিখে। আফগানিস্তানের ভিতর দিয়ে তিনি গিয়ে পৌঁছালেন জারমানীতে। সেখান থেকে জাপানে গিয়ে তিনি গঠন করলেন আজাদ হিন্দ ফৌজ। জাপানী সৈন্যবাহিনীর সঙ্গে আজাদ হিন্দ ফৌজ আক্ৰমণ হানল ব্ৰহ্মদেশের ওপর। তাসের বাড়ির মত টলমল করে পড়ে যেতে লাগল শহরের পর শহর ও গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটিসমূহ। নেতাজী এসে উপনীত হলেন আসাম সীমান্তে। ধ্বনি তুললেন–’দিল্লী চল’, ‘লালকেল্লায় গিয়ে স্বাধীন ভারতের পতাকা তোল।’ কিন্তু যুদ্ধের পর নেতাজী আবার হলেন অদৃশ্য।

    দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের অবসান ঘটে ১৯৪৫ খ্রীস্টাব্দের মে মাসে। যুদ্ধে জয়লাভ করলে ভারতকে পূর্ণ স্বাধীনতা দেবে, এ প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল ইংরেজ। কিন্ত স্বাধীনতার ব্যাপার নিয়ে বিবাদ বাঁধল কংগ্রেস ও মুসলিম লীগে। ১৯৪৬ সালের মাৰ্চ মাসে এল ক্যাবিনেট মিশন, হিন্দু মুসলমানের মধ্যে মীমাংসা করবার জন্য। কিন্ত মীমাংসার সব চেষ্টাই ব্যর্থ হল। ওরই পদাঙ্কে লাগল হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে দাঙ্গা। নোয়াখালি ও পূর্ব বঙ্গের অন্যত্র দাঙ্গা চরম আকার ধারণ করল। কলকাতাতে দাঙ্গার হাঙ্গামা তরঙ্গে উঠল। ওই দাঙ্গার পদাঙ্কেই দেশ-বিভাগ ও স্বাধীনতা লাভ ঘটল।

  • হিন্দু সভ্যতার শিকর আবিষ্কার

    হিন্দু সভ্যতার শিকর আবিষ্কার

    অতুল সুর

    [book-name]

    হিন্দু সভ্যতার শিকর আবিষ্কার

    হিন্দু সভ্যতার ক্ষেত্রে বিগত শতাব্দী চিহ্নিত হয়ে আছে এক অত্যাশচর্য আবিষ্কারের জন্য। সেটা হচ্ছে ১৯২২ খ্রীস্টাব্দে রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় কর্তৃক সিন্ধু সভ্যতার আবিষ্কার। এই আবিষ্কারের পূর্বে পণ্ডিতমহলের বিশ্বাস ছিল যে আগন্তুক আর্যরাই ভারতীয় সভ্যতার স্রষ্টা। তাঁরা মনে করতেন যে খ্রীস্টপূর্ব ১৫০০ অব্দে আর্যরা পঞ্চনদের উপত্যকায় আসবার পূর্বে, ভারতের লোকরা ছিল অসভ্য ও বর্বর এবং আর্যরাই তাদের সভ্য করে তুলেছিল। কিন্তু সিন্ধু সভ্যতার আবিষ্কার এক লহমায় প্রমাণ করে দিয়েছিল যে ওই ধারণা একেবারেই ভুল। আর্যরা এদেশে আসবার হাজার বৎসর পূর্বেই এদেশে প্রাদর্ভূত হয়েছিল এক শিক্ষিত নগর সভ্যতা, যার বাহকরা আর্যদের চেয়ে অনেক বেশি সভ্য ছিল। বরং বলা যেতে পারে যে সিন্ধু সভ্যতার বাহকদের তুলনায়, আর্যরাই ছিল এক বর্বর জাতি।

    সিন্ধু সভ্যতার সঙ্গে আমার পরিচয় প্রত্যক্ষ। ১৯২৮ খ্রীস্টাব্দে ভারতের প্রত্নতত্ত্ব সমীক্ষা অধিকরণের সর্বময় কর্তা স্যার জন মারশাল আমাকে নিয়োজিত করেন ‘হিন্দু-সভ্যতার গঠনে সিন্ধু সভ্যতার অবদান’ সম্বন্ধে গবেষণা করবার জন্য। এই গবেষণার কাজটা দু পর্যায়ে সমাপ্ত হয়েছিল। প্রথম পর্যায়ে মহেঞ্জোদারোয় ও দ্বিতীয় পর্যায়ে কলকাতায়। প্রথম পর্যায়ে আমি যখন মহেঞ্জোদারোতে সরেজমিনে গবেষণা চালাচ্ছি, তখন এক বাঙালী-বিদ্বেষী অফিসারের হাতে নিপীড়িত হবার ভয়ে আমাকে কলকাতাতে পালিয়ে আসতে হয়েছিল। সে কথাটা যখন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের পোস্ট-গ্রাজুয়েট ডিপার্টমেন্টের প্রেসিডেন্ট ডঃ সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণন ও সেনেটের সবচেয়ে প্রভাবশালী সদস্য শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের কানে গেল, তখন তাঁরা আমাকে বৈতনিক গবেষক নিযুক্ত করে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে অনুশীলন চালিয়ে যেতে বললেন। দু’ বৎসর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে অনুশীলন চালিয়ে এই তথ্য উত্থাপন করলাম যে হিন্দু সভ্যতার গঠনের মূলে বারো-আনা ভাগ আছে সিন্ধু উপত্যকার প্রাক-আর্য সভ্যতা; আর মাত্র চার-আনা ভাগ মণ্ডিত আর্য সভ্যতার আবরণে। আমার গবেষণা-লব্ধ তথ্যসমূহ আমি স্যার জন মারশালের কাছে পাঠাতাম। আর বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে বিশদ প্রতিবেদন পেশ করতাম। আমার সতীৰ্থ ডঃ নীহাররঞ্জন রায় ১৯৩১ খ্রীস্টাব্দে যখন বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত ‘ক্যালকাটা রিভিউ’ পত্রিকার সম্পাদনার ভার গ্রহণ করেন, তখন তিনি আমার গবেষণা সম্পর্কিত প্রতিবেদনের অংশবিশেষ ওই পত্রিকায় প্রকাশ করেন। কিছু অংশ ‘ইণ্ডিয়ান হিসটরিক্যাল কোয়াটারলি’ পত্রিকাতেও প্রকাশিত হয়েছিল। পরে এগুলি পুস্তকাকারে প্রকাশিত হয়। ১৯৩৬ খ্রীস্টাব্দে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের প্রধান ডঃ দেবদত্ত রামকৃষ্ণ ভাণ্ডারকার ইণ্ডিয়ান কালচারেল কনফারেনসে প্রদত্ত তাঁর সভাপতির ভাষণে বললেন—’হিন্দু সভ্যতা যে আর্য ও অন্যান্য সভ্যতার মিশ্রণে উদ্ভুত এটা যে চারজন বিশিষ্ট প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ করেছেন তাঁরা হচ্ছেন স্যার জন মারশাল, রায়বাহাদুর রমাপ্রসাদ চন্দ, ডঃ স্টেলা ক্রামরিশ ও শ্ৰীঅতুলকৃষ্ণ সুর।’

    তারপর অনেক বছর কেটে গেল; ভারতের ইতিহাসের ওপর প্রাকবৈদিক সভ্যতার প্রভাব যে কতখানি, তা আমাদের ঐতিহাসিকরা বুঝলেন না। গতানুগতিক ভাবে ভারতের ইতিহাস রচিত হতে লাগল, মাত্র বৈদিক যুগের আগে সিন্ধু সভ্যতা সম্বন্ধে একটা অধ্যায় যোগ করে দিয়ে।

    আমি যখন মহেঞ্জোদারোয় যাই, তখন নগরীর যে অঞ্চলে খননকার্য চলছিল, তার নামকরণ করা হয়েছিল : DK Area-Intermediate III period। মহেঞ্জোদারোর প্রশস্ত রাজপথ ও সমান্তরাল রাস্তাগলি সে বৎসরই আবিস্কৃত হয়েছিল। প্রশস্ত রাজপথটি উত্তর-দক্ষিণমুখী। রাজপথটি তখন মাত্র এক কিলোমিটার পর্যন্ত খুড়ে বের করা হয়েছে। রাজপথটি ৩১ থেকে ৩৬ ফুট প্রশস্ত, আর সমান্তরাল পথগুলি ২০ থেকে ২৫ ফুট। সে বৎসর আরও আবিস্কৃত হয়েছিল নগরীর পয়ঃপ্ৰণালী। পোড়া ইট দিয়ে তৈরী এই পয়ঃপ্রণালী অনেকটা পথ রাস্তার পশ্চিম ধার দিয়ে এসে, এক জায়গায় রাস্তা অতিক্রম করে, রাস্তার পূর্ব পাশ ধরে চলে গিয়েছিল। বাড়ির দূষিত জল এই পয়ঃপ্রণালীতে এসে পড়ত, তবে অনেক বাড়িতে ‘সোক্‌পিট’ও ছিল। প্রতি বাড়ির প্রবেশ পথ দিয়ে ঢুকলেই সামনে পড়ত বাড়ির প্রাঙ্গণ। প্রবেশ পথের নিকট প্রাঙ্গণের এক পাশে থাকত বাড়ির কূপ। স্নানের সময় আবরু রক্ষার জন্য কূপগুলিকে দেওয়াল দ্বারা বেষ্টিত করা হত। রাজপথের দিকে বাড়ির যে দোকানঘরগুলি ছিল, তার অনেকগুলির সামনে আমরা আবিষ্কার করেছিলাম ইটের গাঁথা পাটাতন। বোধহয় এই পাটাতনগুলির ওপর বিক্ৰেতারা দিনের বেলা তাদের পণ্যসম্ভার সাজিয়ে রাখত, এবং রাত্রিকালে সেগুলিকে দোকান-ঘরে তুলে রাখত। ছোট ছোট যে সব দ্রব্যসামগ্ৰী আমরা সে বৎসর পেয়েছিলাম, তার মধ্যে ছিল মেয়েদের মাথার কাঁটা। তা থেকে আমরা সহজেই অনুমান করেছিলাম যে, মেয়েরা খোঁপা বাঁধত ও খোঁপায় কাঁটা গুঁজত। তবে মেয়েরা যে বেণী ঝুলিয়েও ঘুরে বেড়াত, তার প্রমাণও আমরা পেয়েছিলাম।

    ব্যাপকভাবে খননকার্যের ফলে এখন হরপ্পা ও মহেঞ্জোদারো ছাড়া তামাশ্ম যুগের সভ্যতার আরও অনেক কেন্দ্র খুঁজে বের করা হয়েছে। এর ফলে আমরা জানতে পেরেছি যে এই সভ্যতার বিকাশ পনেরো লক্ষ বর্গ মাইল ব্যাপী এক বিস্তৃত এলাকায় ঘটেছিল। ১৯৪৭ খ্রীস্টাব্দে দেশ-বিভাগের পর এই সকল কেন্দ্রের কিছু পাকিস্তানে ও কিছু ভারতের মধ্যে পড়েছে। সিন্ধু সভ্যতার যেসব কেন্দ্র ভারতের মধ্যে পড়েছে সেগুলি হচ্ছে–কালিবঙ্গান, লোথাল, রূপার, চণ্ডীগড়, সুরকোটড়া, দেশলপুর, নবিনাল, রঙপুর, ভগৎরাও, মাণ্ড, বরা, বরগাওন, বাহাদারাবাদ, শিশওয়াল, মিটাথাল, আলমগিরপুর, কায়াথা, গিলাণ্ড, টড়িও, দ্বারকা, কিনডারখেদ, প্রভাস, মাটিয়ালা, মোটা, রোজড়ি, আমরাফলা, জেকডা, সুজনপুর, কানাসুতারিয়া, মেহগাওন, কাপড়খেদা ও সবলদা। এছাড়া তামাশ্ম যুগের সভ্যতার নিদর্শন আমরা পেয়েছি–লালকিলা, নোয়া, মানোটি, দৈমাবাদ, মহিষদল, বানেশবরডাঙ্গা, পাণ্ডুরাজার ঢিবি প্রভৃতি স্থান থেকেও। ১৯২৯-৩১ খ্রীস্টাব্দে আমি যখন কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বৈতনিক গবেষক হিসাবে সিন্ধু সভ্যতা সম্বন্ধে অনুশীলন করেছিলাম, তখন আমার প্রতিবেদনের প্রথম অনুচ্ছেদেই বলেছিলাম—’এ সম্পর্কে ঝুঁকি নিয়ে একথা বলা যেতে পারে যে পরবর্তীকালে অনুরূপ সভ্যতার নিদর্শন গঙ্গা উপত্যকাতেও পাওয়া যেতে পারে, যার দ্বারা প্রমাণিত হবে যে এ সভ্যতা উত্তর ও প্রাচ্য ভারতেও বিস্তার লাভ করেছিল।’ আজ খননকার্যের ফলে আমার সেই অনুমান বাস্তবে পরিণত হয়েছে।

    ৷৷ দুই ৷৷

    অনেকেই বলেন যে সিন্ধুসভ্যতা ও আর্যসভ্যতা অভিন্ন। কিন্তু এটা যে ভ্ৰান্ত মত সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। দুই সভ্যতার মৌলিক বৈশিষ্ট্যগুলি আলোচনা করলেই এটা বুঝতে পারা যাবে। দুই সভ্যতার মূলগত পার্থক্যগুলি আমি নীচে দিচ্ছি–

    (১) সিন্ধু সভ্যতার বাহকরা শিশ্ন-উপাসক ছিল মাতৃকাদেবীর আরাধনা করত। আর্যরা শিশ্ন-উপাসক ছিল না ও শিশ্ন-উপাসকদের ঘৃণা ও নিন্দা করত। আর্যরা পুরুষ দেবতার উপাসক ছিল। মাতৃকাদেবীর পূজার কোন আভাসই আমরা ঋগ্বেদে পাই না!

    (২) আর্যরাই প্রথম ঘোড়াকে পোষ মানিয়েছিল। ঘোড়াই ছিল তাদের সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ জন্তু। এখানে বলা দরকার যে ঘোড়ার কোন অশ্মীভূত (fossilized) অস্থি আমরা সিন্ধুসভ্যতার কোন কেন্দ্রে পাইনি। সিন্ধুসভ্যতার বাহকদের কাছে বলীবর্দই প্রধান জন্তু ছিল। এটা শীলমোহরসমূহের ওপর পুনঃ পুনঃ বলীবর্দের প্রতিকৃতি খোদন থেকে বুঝতে পারা যায়। পশুপতি শিব আরাধনার প্রমাণও মহেঞ্জোদারো থেকে পাওয়া গিয়েছে। বলীবর্দ শিবেরই বাহন। সুতরাং সিন্ধুসভ্যতার কেন্দ্রসমূহে বলীবর্দের প্রাধান্য সহজেই অনুমেয়।

    (৩) সিন্ধুসভ্যতার বাহকরা নগরবাসী ছিল। আর্যরা নগর নির্মাণ করত না। তারা নগর ধ্বংস করত। সেজন্য তারা তাদের দেবতা ইন্দ্রর নাম পুরন্দর রেখেছিল।

    (৪) আর্যরা মৃত ব্যক্তিকে দাহ করত। সিন্ধু সভ্যতার ধারকরা মৃতকে সমাধিস্থ করত।

    (৫) আর্যদের মধ্যে লিখন প্রণালীর প্রচলন ছিল না। কিন্তু সিন্ধু সভ্যতার ধারকদের মধ্যে লিখন প্রণালী সুপ্রচলিত ছিল।

    (৬) সিন্ধুসভ্যতা যে আর্যসভ্যতা নয়, তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ হচ্ছে মৃৎপাত্র। কুরু-পঞ্চাল দেশ, তার মানে যেখানে আর্যসভ্যতা বিস্তার লাভ করেছিল, সেখানকার বৈশিষ্ট্যমূলক মৃৎপাত্রের রঙ ছিল ধূসর বর্ণ। সিন্ধুসভ্যতার কেন্দ্র সমূহ থেকে যে সব মৃৎপাত্র পাওয়া গিয়েছে সেগুলির রঙ হচ্ছে ‘কালো-লাল’।

    (৭) সিন্ধু সভ্যতা ছিল কৃষিভিত্তিক সভ্যতা। আর্যরা প্রথমে কৃষিকাষ জানত না। এটা আমরা শতপথব্রাহ্মণের এক উক্তি থেকে জানতে পারি। (এ সম্বন্ধে বিশদ বিবরণের জন্য আমার ‘হিন্দু সভ্যতার নৃতাত্ত্বিক ভাষ্য’ দ্রষ্টব্য।)

    (৮) সিন্ধুসভ্যতার লোকেরা হাতির সঙ্গে বেশ সুপরিচিত ছিল। আর্যদের কাছে হাতি এক নতুন জীববিশেষ ছিল। সেজন্য তারা হাতিকে ‘হস্তবিশিষ্ট মৃগ’ বলে অভিহিত করত। বস্তুতঃ হাতিকে প্রাচ্য ভারতের পালকপ্য নামে এক ঋষিই প্রথম পোষ মানিয়েছিল।

    এসব প্রমাণ থেকে সহজেই বুঝা যাবে যে আর্যসভ্যতা ও সিন্ধুসভ্যতা এক নয়।

    গোড়ার দিকে আর্যরা সিন্ধুসভ্যতার বাহকদের সঙ্গে তুমুল সংগ্রাম চালিয়েছিল। কিন্তু তাদের এই গোড়ার দিকের বৈরিতা পরবর্তীকালে আর স্থায়ী হয়নি। পঞ্চনদ থেকে তারা যতই পূর্বদিকে অগ্রসর হল, ততই তারা এদেশের লোকের সংস্পর্শে এল। তারা এদেশের মেয়েদেরও বিয়ে করল। যখন অনার্য রমণী গৃহিণী হল, তখন আর্যদের ধর্মকর্মের ওপর তার প্রতিঘাত পড়ল। ক্ৰমশঃ তারা বৈদিক যজ্ঞাদি ও বৈদিক দেবতাগণকে পশ্চাদভূমিতে অপসারণ করল। আর্য ও অন্যান্য সংস্কৃতির সংশ্লেষণে পৌরাণিক দেবতামণ্ডলীর সৃষ্টি হল।

    আর্য ও অনার্য সভ্যতার সংশ্লেষ ঘটেছিল সেখানে, যেটাকে আগে আমরা ‘কুরু-পাঞ্চাল’ দেশ বলতাম বা গঙ্গা ও যমুনার অন্তবর্তী অঞ্চল। সেখানে আর্যদের আপোষ করতে হয়েছিল অনার্যদের ভাষা, সভ্যতা ও লোকযাত্রার সঙ্গে। এটা বিবর্তনের ক্ৰমিক ধারাবাহিকতার ভিতর দিয়ে সম্পূর্ণতা লাভ করেছিল পৌরাণিক যুগে। এই সংশ্লেষণের পর আমরা ভারতীয় সভ্যতার সম্পূর্ণ ভিন্ন রূপ দেখি, যেটা বৈদিক সভ্যতা থেকে সম্পূর্ণ পৃথক। লোকে আর ইন্দ্র, বরুণ প্রভৃতি বৈদিক দেবতার স্তুতিগান করে না। বৈদিক যজ্ঞ সম্পাদন করে না। নতুন দেবতামণ্ডলীর পত্তন ঘটে। যজ্ঞের পরিবর্তে আসে পূজা ও উপাসনা। বৈদিক আত্মকেন্দ্রিক স্তুতিগানের পরিবর্তে আসে ভক্তি। এর ওপর প্রাগার্য, তান্ত্ৰিক ধর্মেরও প্রভাব পড়ে। বৈদিক যুগের আর্যরা যাদের ঘৃণার চক্ষে দেখতেন ও যাদের সঙ্গে অবিরাম সংগ্রাম করতেন, শেষ পর্যন্ত সেই অনার্য নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীসমূহেরই জয় হল। বেদ সংকলন ও মহাভারত পুরাণ ইত্যাদি রচনার ভার ন্যস্ত হল এক অনার্য রমণীর জারজ সন্তানের ওপর। এ সবই আমরা বঙ্গাব্দ চতুর্দশ শতকের আবিষ্কার ও অনুশীলনের ফলে জানতে পেরেছি।

  • কুলীনের মেয়ের মুক্তি

    কুলীনের মেয়ের মুক্তি

    অতুল সুর

    [book-name]

    কুলীনের মেয়ের মুক্তি

    বঙ্গাব্দ চতুর্দশ শতাব্দী স্মরণীয় হয়ে আছে কুলীন ব্রাহ্মণ সমাজে বহুবিবাহ নিরোধের জন্য। মধ্যযুগের বাঙালী সমাজ কলঙ্কিত হয়েছিল এই অপপ্রথার জন্য।

    আগের শতাব্দীতে কৌলীন্য প্রথা নিরোধের জন্য নিরলস প্রয়াস চালিয়েছিলেন রামনারায়ণ তর্করত্ন ও পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। যদিও বিধবা বিবাহ বৈধ করবার জন্য বিদ্যাসাগর মহাশয়ের প্রচেষ্টা সফল হয়েছিল (১৮৫৬ সালের ১৫ নম্বর আইন দ্বারা), কিন্তু কৌলীন্য প্রথা নিরোধের জন্য তাঁর নিরলস প্রচেষ্টা ফলবতী হয়নি। সরকার এ সম্বন্ধে কোন আইন প্রণয়ন করেন নি। সরকার কর্তৃক প্রণীত না হলেও বিদ্যাসাগর মহাশয়ের প্রচেষ্টার ফলে যে জনমত গড়ে ওঠে তারই প্রভাবে বঙ্গাবাদ চতুর্দশ শতাব্দীতে কৌলীন্য প্রথার অবলুপ্তি ঘটে।

    কুলীনের মেয়ের ছিল অভিশপ্ত ও কলঙ্কিত জীবন। ‘কুলীনের মেয়ে’ বলতে বোঝাত কুলীন ব্রাহ্মণকন্যা। যে সকল ব্রাহ্মণ ‘কুলীন’ নামে আখ্যাত হতেন, তাঁদের পদবী ছিল বন্দ্যোপাধ্যায়, চট্টোপাধ্যায়, গঙ্গোপাধ্যায় ও মুখোপাধ্যায়। সামাজিক মর্যাদায় তাঁরা ছিলেন অন্যান্য ব্ৰাহ্মণের তুলনায় উচ্চ ও শ্রেষ্ঠ। বিবাহ সম্বন্ধে তাঁদের মধ্যে যে বিধান প্রচলিত ছিল সেই বিধান অনুযায়ী কুলীন ব্রাহ্মণসন্তান কুলীন বা অকুলীন ব্রাহ্মণ বংশে বিবাহ করতে পারত, কিন্তু কুলীন ব্রাহ্মণকন্যারা তা পারত না। যদি সেরূপ মেয়ের বিবাহ অকুলীনের সঙ্গে হতো, তাহলে তার বাবার কৌলীন্য ভঙ্গ হতো। সামাজিক মর্যাদায় সেরূপ বংশ হীন বলে পরিগণিত হতো। সেজন্য কুলীন ব্রাহ্মণরা কন্যাদান কুলীন পাত্রেই করত। এছাড়া আরও বিধিনিষেধ ছিল। ফলে কুলীন কন্যার বিবাহ সম্বন্ধে সমাজে এক জটিল অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল।

    বস্তুত মধ্যযুগের বাঙালী ব্রাহ্মণ সমাজে কৌলীন্য প্রথা যে জটিল অবস্থার সৃষ্টি করেছিল, তাতে কুলীন কন্যাদের বিবাহ যে মাত্ৰ দণ্ডকর হয়ে উঠেছিল তা নয়; বিভ্রাটে ও সামাজিক অশুচিতায় পরিণত হয়েছিল। অর্থগৃধ্নতা একশ্রেণীর কুলীন ব্রাহ্মণকে প্রলুব্ধ করেছিল বিবাহকে একটা বাণিজ্যিক পেশায় পরিণত করতে। রামনারায়ণ তর্করত্ন তাঁর ‘কুলীনকুলসর্বস্ব’ নাটকে তাদের ‘বিবাহ বণিক’ বলে বর্ণনা করেছেন। গ্রামে গ্রামে ঘরে অর্থের বিনিময়ে তারা কুলীন কন্যার পিতাদের কন্যাদায় হতে মুক্ত করত। তারপর বিবাহান্তে ওই সকল বিবাহবণিক নিজেদের খাতায় কন্যার ও তার পিতার নামধাম লিখে নিয়ে অন্তর্হিত হতো। ফলে সেরূপ ‘বিবাহিতা’ কুলীন কন্যাকে পিতৃগৃহেই থাকতে হতো। অনেক সময় কুলীন পিতা কুলরক্ষার জন্য শ্মশানঘাটে ‘গঙ্গাজলী’র জন্য আনীত কুলীন ব্রাহ্মণের সঙ্গেই কন্যার বিবাহ দিতেন। অচিরেই সেই কন্যা বিধবা হতো। এরূপ বিধবা কুলীন কন্যারাও পিতৃগৃহেই থেকে যেত। আবার গরীব কুলীন কন্যাদের অনেক সময় বিবাহই হতো না। সারা জীবন তাদের অনূঢ়া হয়েই পিতৃগৃহে থেকে যেতে হতো।

    যারা কুলীন কন্যাদের বিবাহ করা পেশা রূপে গ্রহণ করেছিল, সে-সব কুলীন ব্রাহ্মণ খাতা দেখে নামধাম সংগ্রহ করে মাঝে মাঝে শ্বশুরবাড়িতে পদার্পণ করত এবং এক রাত্রি জামাই আদরে থেকে সালিয়ানা দক্ষিণা আদায় করে, কুলীন কন্যার পিতার বংশকে কৃতাৰ্থ করে, সত্বর অপর গ্রামে অপর শ্বশুরবাড়িতে পদার্পণ করবার জন্য যাত্রা করত। অনেকে আবার রাত্রিকালে নিদ্রিতা স্ত্রীর অলঙ্কার অপহরণ করেও সরে পড়ত।

    অনেক সময়ই এরূপ বিবাহ-পেশাদারী কুলীন ব্রাহ্মণরা শ্বশুরবাড়ির পথঘাটের সঙ্গে সম্যক পরিচিত থাকত না। কথিত আছে এরূপ এক কুলীন ব্রাহ্মণ এক গ্রামে গিয়ে শ্বশুরবাড়ি চিনতে না পেরে, পথে পুঙ্করিণী থেকে স্নানান্তে প্রত্যাগতা এক যুবতীকে দেখে তাকে সম্বোধন করে জিজ্ঞাসা করে–মা, অমুকের বাড়ি এ গ্রামের কোথায় বলতে পার? তিনি কেন সন্ধান করছেন জানতে চাইলে ব্রাহ্মণ বলে—’আমি তাঁর জামাই।’ সে কথা শুনে সেই কন্যা বুক পর্যন্ত অবগুণ্ঠিত হয়ে, তাকে নিজ গৃহে নিয়ে যায়।

    আগেই বলেছি যে এ-সমাজের মেয়েরা বিয়ের পর বাপের বাড়িতেই থেকে যেত। স্বামী ক্বচিৎ কদাচিৎ শ্বশুরবাড়ি আসত। কিন্তু শ্বশুরবাড়ি এলে কি হবে! বিনা দক্ষিণায় তারা কখনও স্ত্রীর সহিত মিলিত হতো না। ভারতচন্দ্র তাঁর ‘অন্নদামঙ্গল’ কাব্যে এর এক সুন্দর বর্ণনা দিয়েছেন। সেখানে এক কুলীনের মেয়ের মুখ দিয়ে তিনি বলিয়েছেন—

    আর রামা বলে আমি কুলীনের মেয়ে

    যৌবন বহিয়া গেল বর চেয়ে চেয়ে॥

    যদি বা হইল বিয়া কত দিন বই।

    বয়স বুঝিলে তার বড় দিদি হই॥

    বিয়াকালে পণ্ডিতে পণ্ডিতে বাদ লাগে।

    পুনর্বিয়া হবে কিনা বিয়া হবে আগে॥

    দু-চারি বৎসরে যদি আসে একবার।

    শয়ন করিয়া বলে কি দিবি ব্যাভার॥

    সুতা বেচা কড়ি যদি দিতে পারি তায়।

    তবে মিষ্টি মুখ নতুবা রুষ্ট হয়ে যায়॥

    সুতরাং এরূপ সমাজে যে-সব মেয়ের যৌনক্ষুধা প্রবল, তাদের ক্ষেত্রে যা ঘটত তা সহজেই অনুমেয়। গোপন অভিসার কুলীন কন্যাদের স্বভাবে দাঁড়িয়েছিল। আদিম যৌনক্ষুধাকে তারা অস্বীকার করতে পারত না। অবৈধ সহবাসে তারা লিপ্ত হতো। বস্তুতঃ খ্রীস্টীয় উনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে রামনারায়ণ তর্করত্ন ও ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর সেটা খোলাখুলিই বলেছিলেন। রামনারায়ণ তাঁর ‘কুলীনকুলসর্বস্ব’ নাটকের চতুর্থ অঙ্কে পিতা-পুত্রের সংলাপের ভিতর দিয়ে সেটা বলেছেন। পুত্র তিন বৎসর শ্বশুরবাড়ি যায়নি। হঠাৎ খবর এল তার একটি কন্যাসন্তান হয়েছে। পুত্র আশ্চর্য হয়ে পিতাকে যখন এ কথা বলছে, তখন পিতা বলছেন–বাপু হে, তাতে ক্ষতি কি? আমি বিবাহ করবার পর একবারও শ্বশুর বাড়ি যাইনি। শুভদৃষ্টির পর একেবারে তোমার সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হয়।’

    কুলীন কন্যাদের যখন স্বামী ব্যতীতই গর্ভ হতো, তখন মেয়ের মায়েরা কি কৌশল অবলম্বন করে সেই সন্তানের বৈধতা পাড়াপাড়শীদের কাছে জানাতো, তা বিদ্যাসাগর মশাই তাঁর ‘বহুবিবাহ’ নিবন্ধে বিবৃত করেছেন। বিদ্যাসাগর মশাই লিখেছেন–

    ‘কোনও কারণে কুলীন মহিলার গর্ভসঞ্চার হইলে, তাহার পরিপাকার্থে কন্যাপক্ষীয়দিগকে বিবিধ উপায় অবলম্বন করিতে হয়। প্রথম সবিশেষ চেষ্টা ও যত্ন করিয়া জামাতাকে আনয়ন। তিনি আসিয়া শ্বশুরালয়ে দু-একদিন অবস্থিতি করিয়া, প্রস্থান করেন। ঐ গর্ভ তৎসহযোগে সম্ভুত বলিয়া পরিগণিত হয়। দ্বিতীয়, জামাতার আনয়নে কৃতকার্য হইতে না পারিলে, ব্যভিচার সহচরী ভ্রূণহত্যাদেবীর আরাধনা। এ অবস্থায় এতদ্ব্যাতিরিক্ত নিস্তারের আর পথ নাই। তৃতীয় উপায় অতি সহজ, অতি নির্দোষ ও সাতিশয় কৌতুকজনক। তাহাতে অর্থব্যয়ও নাই এবং ভ্রূণহত্যাদেবীর উপাসনাও করিতে হয় না। কন্যার জননী বা বাটির অপর কোন গৃহিণী একটি ছেলে কোলে করিয়া, পাড়ায় বেড়াইতে যান, এবং একে একে প্রতিবেশীদিগের বাটি গিয়া, দেখ মা, দেখ বোন অথবা দেখ বাছা, এইরূপ সম্ভাষণ করিয়া, কথা প্রসঙ্গে বলিতে আরম্ভ করেন, অনেক দিনের পর কাল রাত্ৰিতে জামাই আসিয়াছিলেন, হঠাৎ আসিলেন, রাত্রিকাল কোথায় কি পাব, ভাল করিয়া খাওয়াতে পারি নাই। অনেক বলিলাম একবেলা থাকিয়া, খাওয়া দাওয়া করিয়া যাও। তিনি কিছুতেই রহিলেন না, বলিলেন, আজ কোন মতে থাকিতে পারিব না; সন্ধ্যার পরই অমুক গ্রামের জমিদারের বাটিতে একটা বিবাহ করিতে হইবেক; পরে অমুক দিন, অমুক গ্রামের হালদারের বাটীতেও বিবাহের কথা আছে; সেখানেও যাইতে হইবেক। যদি সুবিধা হয়, আসিবার সময় এই দিক দিয়া যাইব। এই বলিয়া ভোর ভোর চলিয়া গেলেন। স্বর্ণকে বলিয়াছিলাম, ত্রিপুরা ও কামিনীকে ডাকিয়া আন, তারা জামাইয়ের সঙ্গে খানিক আমোদ আহ্লাদ করিবে। একলা যেতে পারব না, বলিয়া ছুঁড়ী কোন মতেই এল না। এই বলিয়া সে ঐ দুই কন্যার দিকে চাহিয়া বলিলেন, এবার জামাই এলে মা তোরা যাস ইত্যাদি। এইরূপে পাড়ায় বাড়ি বাড়ি বেড়াইয়া জামাতার আগমনবার্তা কীর্তন করেন। পরে স্বর্ণমঞ্জরীর গর্ভসঞ্চার প্রচার হইলে, ঐ গর্ভ জামাতাকৃত বলিয়া পরিপাক পায়।’

    এবার শুনুন শরৎচন্দ্র তাঁর ‘বামনের মেয়ে’ উপন্যাসে কি বলেছেন। ‘পরম কুলীনের পরমা কুলীন কন্যা হিসাবে সন্ধ্যা বলল—আমি বামুনের মেয়ে নই।…আমার মা আমাকে সম্প্রদান করতে বসেছিলেন। এমন সময় মৃত্যুঞ্জয় ঘটক দু’জন লোক সঙ্গে নিয়ে উপস্থিত হল। বলল, তোমরা শোন, এই যাকে তোমরা পরম কুলীন প্রিয় মুখুজ্যে বলে জান সে বামন নয়, মিহির নাপিতের ছেলে। তারপর মৃত্যুঞ্জয় ঘটক গঙ্গাজলের ঘটটা ঠাকুরমার সামনে বসিয়ে দিয়ে জিজ্ঞাসা করল, বলুন সত্যি কিনা? বলুন ও কার ছেলে? মকুন্দ মুখুজ্যের না হীরা নাপিতের? আমার সন্ন্যাসিনী ঠাকুরমা মাথা হেঁট করে রইলেন। কিছুতেই মিথ্যা কথা বলতে পারলেন না। একজন তখন সমস্ত ঘটনা খুলে বলল। সে তাদের গ্রামের লোক। বলল, আট বছর বয়সে ঠাকুরমার বিয়ে হয়, তারপর দশ-পনের বছর পরে একজন এসে জামাই মুকুন্দ মুখুজ্যে বলে পরিচয় দিয়ে বাড়ি ঢোকে। পাঁচ টাকা আর একখানা কাপড় নিয়ে সে দুদিন বাস করে চলে যায়। তারপর থেকে লোকটা প্রায়ই আসত। ঠাকুরমা খুব সুন্দরী ছিলেন–আর সে টাকা নিত না। তারপর যখন সে একদিন হঠাৎ ধরা পড়ে গেল, তখন বাবা জন্মেছেন। তারপর লোকটা বলল, ও কুকাজ সে নিজের ইচ্ছায় করেনি, তার মনিব মুকুন্দ মুখুজ্যের আদেশেই করেছে। একে বুড়ো মানুষ, তারপর পাঁচ-সাত বছর বাতে পঙ্গু, তাই অপরিচিত স্ত্রীদের কাছ থেকে টাকা আদায়ের ভার তার ওপর দিয়েছিল। হিরু নাপিত ঐ বামনের পরিচয় মুখস্থ করে, একটা উপায় তৈরি করে রাখে। তখন থেকে যা কিছ রোজগার করে অর্ধেক ভাগ পায়। আরো দশ-বারো জায়গা থেকে সে এমনি করে প্রভুর জন্য রোজগার করে নিয়ে যেত।’

    রামনারায়ণ তর্করত্ন, পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্ৰ বিদ্যাসাগর ও শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় প্রমুখদের রচনা থেকে আমরা বাঙলার কুলীন ব্রাহ্মণদের পরিচয় পাই। তারাই কুলীনের মেয়েদের পিতা, এবং তাদের মেয়েরাই কুলীন ব্রাহ্মণ ছাড়া বিবাহ করতে পারত না। এই প্রথা নিবর্তনের জন্য বিদ্যাসাগর মশাই যথেষ্ট আন্দোলন করেছিলেন, কিন্তু সরকারী সমৰ্থন পাননি। তবে তা সত্ত্বেও তাঁর আন্দোলনের ফলেই এই কুপ্রথা বাঙালী সমাজ থেকে গত শতাব্দীতে বিলুপ্ত হয়। তার ফলে কুলীনের মেয়েরা বিবাহিত জীবনে আজ সম্মান ও শুচিতা লাভ করেছে।

  • হিন্দু বিবাহ-বিধান

    হিন্দু বিবাহ-বিধান

    অতুল সুর

    [book-name]

    হিন্দু বিবাহ-বিধান

    গত শতাব্দীতে হিন্দু মেয়েরা পেয়েছে বিবাহ বিচ্ছেদের অধিকার। আর পুরুষ বঞ্চিত হয়েছে তার একাধিক বিবাহ করবার অধিকার। এছাড়া বিবাহের ন্যূনতম বয়স এখন বর্ধিত করা হয়েছে। এ সবই বিবাহের ওপর গণতান্ত্ৰিক চিন্তাধারার ফসল। এ সম্বন্ধে বিস্তারিত আলোচনার পূর্বে দেখা যাক বিবাহ সম্বন্ধে আমাদের আগে কি প্রথা ও নিয়মকানুন ছিল।

    আর্যরা এদেশে আসবার আগে যে সব বর্গের বিবাহপ্রথা প্রচলিত ছিল তা হল যথাক্রমে রাক্ষস, গন্ধব ও অসুর বিবাহ। কেননা এই সব বর্গের বিবাহের কোন উল্লেখ ঋগ্বেদে নেই, অথচ এগুলি বর্তমানের আদিবাসী সমাজে প্রচলিত আছে। বৈদিক যুগে মাত্ৰ এক রকম বর্গের বিবাহই (ব্রাহ্ম বিবাহ) প্রচলিত ছিল, এবং তারপ্রাপ্তবয়স্ক যুবক যুবতীদের মধ্যেই হত। এছাড়া তাদের অধিকাংশই নিজের পতি নিজেই নির্বাচন করতে পারত। এটা আমরা জানতে পারি ঋগ্বেদের সপ্তম মণ্ডলে বর্ণিতে ‘সমন’ উৎসব থেকে। এই উৎসবে যুবতীরা মনোমত পতি লাভের আশায় সুসজ্জিত হয়ে যোগদান করত। পরে দিদিষুর (মধ্যগ বা ঘটকের) আবির্ভাব ঘটে। তখন থেকেই ‘সমন’ উৎসবে পতিনির্বাচনের প্রচলন কমে যায়।

    বৈদিক যুগে বিবাহ কোন বিশেষ ব্যক্তির সঙ্গে হত না, হত তার সমস্ত ভ্ৰাতাদের সঙ্গে। অন্তত আপস্তম্ভধর্মসূত্রে পরিষ্কার বলা হয়েছে যে, কন্যাকে দান করা হয় কোন এক বিশেষ ভ্রাতাকে নয়, বংশের সমস্ত ভ্ৰাতাকে। এজন্য পরবর্তীকালে মনু বিধান দিয়েছিলেন যে, কলিযুগে কন্যার বিবাহ যেন সমগ্র পরিবারের সঙ্গে যৌথভাবে দেওয়া না হয়। ঋগ্বেদ এবং অথবা বেদে কয়েকটি স্তোত্ৰ আছে যা থেকে পরিষ্কার বোঝা যায় যে, যদিও বধূকে জ্যেষ্ঠভ্ৰাতাই বিবাহ করত, তা হলেও তার কনিষ্ঠ সহোদরদের তার ওপর যৌনমিলন বা রমণের অধিকার থাকত। এই দুই গ্রন্থেই স্বামীর কনিষ্ঠ ভ্রাতাকে ‘দেবৃ’ বা দেবর বলা হয়েছে। কেননা, ‘দেবর’ মানে ‘দ্বিবর’ বা দ্বিতীয় বর। ঋগ্বেদের এক স্থানে বর্ণিত হয়েছে যে বিধবা বৌদি দেবৃকে তার দাম্পত্য শয্যায় নিয়ে যাচ্ছে।

    ঋগ্বেদে যম-যমীর কথোপকথনে দেখা যায় যে যমের যমজ-ভগনী যমী যমের সঙ্গে যৌনমিলন প্ৰার্থনা করছে। বৌদ্ধ জাতক গ্রন্থেও সহোদর-সহোদরা বিবাহের বহু দৃষ্টান্ত আছে। পরবর্তী কালে যখন গোত্র-প্রবর-সপিণ্ড বিধানের উদ্ভব হয়, তখন এটা বন্ধ হয়ে যায়। তবে দক্ষিণ ভারতে পিসতুতো বোন ও মামাতো বোনের সঙ্গে বিবাহ এখনও বাঞ্ছনীয়। বর্তমানে উত্তর ভারতে নিকট আত্মীয়ের সঙ্গে বিবাহ নিষিদ্ধ, যদিও আদিবাসী সমাজে এটার প্রচলন আছে। যেমন উত্তর-পূর্ব সীমান্তের আদিবাসী সমাজভুক্ত লাখের, বাগনী ও ডাফলা জাতির লোকরা বিধবা বিমাতাকে বিবাহ করে। আসামের গারো জাতির লোকেরা বিধবা শাশুড়িকে বিবাহ করে। ওড়িশার আদিবাসী সমাজে শবর জাতির লোকেরা বিধবা খুড়িকে বিবাহ করে।

    মহাভারতীয় যুগে আমরা চার রকমের বিবাহের উল্লেখ পাই, যথা ব্রাহ্ম, গান্ধব, অসুর ও রাক্ষস। কিন্তু সূত্ৰগ্রন্থসমূহে আট রকম বিবাহের উল্লেখ আছে। উপরোক্ত চার রকম ছাড়া, আর্য, প্রাজাপত্য, দৈব ও পিশাচ। এই সকল বিবাহের বর্ণনা আমার ‘ভারতের বিবাহের ইতিহাস’ বইয়ে দেওয়া আছে। তবে এখানে মাত্র একথাই বলতে চাই যে মহাভারতীয় ও রামায়ণী যুগের স্বয়ম্বরা বিবাহ রাক্ষস বিবাহেরই একটা সুষ্ঠ সংস্করণ।

    বেদোত্তর যুগে নিষ্ঠাবান হিন্দুসমাজে বিবাহ নিয়ন্ত্রিত হয়েছিল স্মৃতিশাস্ত্রসমূহ দ্বারা। তাদের মধ্যে প্রাধান্য লাভ করে মনুর মানবধর্মশাস্ত্র। মনুর বিধানসমূহের ভিত্তিতে যে আদর্শ প্রতিষ্ঠা লাভ করেছিল, সে আদর্শ গঠিত হয়েছিল নিম্নলিখিত বিধানসমূহ নিয়ে।

    (১) বিবাহ নিম্পন্ন হবে মন্ত্রপাঠ, যজ্ঞ সম্পাদন ও সপ্তপদীগমন দ্বারা।

    (২) জাতি নির্বিশেষে সকলকেই পুত্র উৎপাদনের জন্য বিবাহ অবশ্যই করতে হবে।

    (৩) কন্যার বিবাহ দিতে হবে সে ঋতুমতী হবার পূর্বে।

    (৪) বিবাহ সংঘটিত হবে জাতির মধ্যে।

    (৫) বিবাহ সগোত্রে, সপ্রবরে ও সপিণ্ডদের মধ্যে হতে পারবে না।

    (৬) বিবাহিতা নারীকে সতীত্বের সমস্ত বিধান অনুসরণ করে পতিব্ৰতা হয়ে থাকতে হবে।

    (৭) স্বামীর মৃত্যুর পর বিধবাকে সধবার ভূষণ পরিহার করে ব্রহ্মচর্য পালন করতে হবে (পরে সহমরণ অনুসৃত হত)।

    (৮) পরস্ত্রীগমন ব্যাভিচার বলে গণ্য হবে এবং তার জন্য ব্যভিচারীকে গুরুদণ্ড পেতে হবে।

    ৷৷ দুই ৷৷

    সাম্প্রতিককালে, গণতন্ত্রের প্রভাবে হিন্দুরর বিবাহ জীবনে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটেছে। এর সূচনা করেছিলেন রাজা রামমোহন রায়। সনাতনী হিন্দু সমাজের ঘোর বিরোধিতা সত্ত্বেও তিনি সক্ষম হয়েছিলেন সতীদাহ প্রথা নিবারণ করতে। তিনি বড়লাট লর্ড উইলিয়াম বেনটিঙ্ককে সম্মত করেন ১৮২৯ সালে ২৭ নং আইন বিধিবদ্ধ করতে। এই আইন দ্বারা সতীদাহ চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়। তারপর ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের আন্দোলনের ফলে ১৮৫৬ সালে ১৫ নং আইন বিধিবদ্ধ হয়। এই আইন দ্বারা বিধবার বিবাহ বৈধ করা হয়। তারপর ১৮৭২ সালের ৩ নং আইন দ্বারা অসবৰ্ণ বিবাহের বাধাও দূর করা হয়। তবে এই আইন অনুযায়ী বিবাহ করতে হলে বিবাহ ইচ্ছুক উভয় পক্ষকেই শপথ করতে হত যে তারা হিন্দু নন। কিন্তু ১৯২৩ সালের ৩০ নং আইন দ্বারা বিধান দেওয়া হয় যে অহিন্দু বলে ঘোষণা না করেও অসবৰ্ণ বিবাহ করা যাবে। ১৮৯১ সালের ‘এজ অফ কনসেন্ট অ্যাক্ট’ দ্বারা বিবাহে সঙ্গমের ন্যুনতম বয়স নির্ধারিত হয়। এরপর বর্তমান শতাব্দীর বিশের দশকে রায় বাহাদুর হরবিলাস সরদা বদ্ধপরিকর হন হিন্দু সমাজে বাল্যবিবাহ রোধ করবার জন্য। ১৯২৯ সালের ১৯ নং আইনে নির্দেশ দেওয়া হয় যে হিন্দু বিবাহে ছেলের উপযুক্ত বয়স ন্যূনপক্ষে ১৮ ও মেয়ের বয়স ১৫ হওয়া চাই। (বর্তমানে ইহা বৃদ্ধি করে ২১ ও ১৮ করা হয়েছে)।

    হিন্দু বিবাহ সংস্কারের জন্য দুটি বড় রকমের আইন বিধিবদ্ধ হয় ১৯৪৬ সালে। ওই বৎসর ১৯ নং আইন দ্বারা, স্ত্রীকে অধিকার দেওয়া হয় অবস্থাবিশেষে স্বামী ত্যাগের জন্য। স্বামী যদি কুৎসিত ব্যাধিতে ভোগেন, বা স্বামী স্ত্রীর প্রতি এমন নিষ্ঠুর ব্যবহার করেন যাতে স্ত্রীর নিরাপত্তার অভাব ঘটে, বা স্ত্রীকে পরিত্যাগ করেন অথবা আবার বিবাহ করেন বা নিজ বাসগৃহে রক্ষিতা এনে রাখেন, বা ব্যভিচারে লিপ্ত হন কিংবা ধর্মান্তর গ্রহণ করেন, তাহলে ওই আইনের বলে স্ত্রী স্বচ্ছন্দে স্বামী ত্যাগ করে স্বতন্ত্র বসবাস করতে পারে। আর ২৮ নং আইনে নির্দেশ দেওয়া হয় যে সগোত্রে ও সমপ্রবারে বিবাহ বৈধ। স্বাধীনতা লাভের পর ১৯৪৯ সালের ২১ নং আইন দ্বারা বিবাহ ক্ষেত্রে জাতিগত, বর্ণগত, শ্রেণীগত ও সম্প্রদায়গত যত রকম বাধা-বৈষম্য ছিল, তা দূরীভূত করা হয়।

    বিবাহ সম্পর্কে শেষ আইন বিধিবদ্ধ হয়েছে ১৯৫৫ সালে। এটাই হচ্ছে বিবাহ সম্বন্ধে সবচেয়ে গুরুত্বপণ আইন। এই আইনটিকে হিন্দু বিবাহ বিধি বা ১৯৫৫ সালের ২৫ নং আইন বলা হয়। বৈধ বিবাহের যে সকল শর্ত এতে নির্দিষ্ট হয়েছে সেগুলি হচ্ছে—

    (১) বিবাহকালে স্বামীর স্ত্রী বা স্ত্রীর অন্য স্বামী জীবিত থাকবে না।

    (২) উভয়পক্ষের কেহই পাগল বা জড়বুদ্ধিসম্পন্ন হবে না।

    (৩) ন্যূনপক্ষে বরের ১৮, (এখন ২১) ও কনের ১৫ (এখন ১৮) বৎসর বয়স হওয়া চাই।

    (৪) উভয়পক্ষের কেহই নিষিদ্ধ নিকট আত্মীয়ের মধ্যে হবে না।

    (৫) উভয়ের কেহই সপিণ্ড হবে না।

    (৬) যেখানে কনের বয়স ১৫ (এখন ১৮) বছরের কম, সেখানে অভিভাবকের সন্মতির প্রয়োজন হবে।

    এই আইনে আরও বলা হয়েছে যে সিদ্ধ বিবাহ অসিদ্ধ বলে সাব্যস্ত হবে–

    (১) যদি স্বামী পুরুষত্বহীন হয়।

    (২) যদি বিবাহের সময় কোন পক্ষ পাগল বা জড়বুদ্ধিসম্পন্ন হয়।

    (৩) যদি প্রতারণা দ্বারা বা বলপূর্বক অভিভাবক দ্বারা দরখাস্তকারীর সম্মতি নেওয়া হয়ে থাকে।

    (৪) যদি বিবাহের পূর্বে স্ত্রী স্বামী ব্যতীত অন্য কারোর দ্বারা গর্ভবতী হয়ে থাকে।

    (৫) যদি অন্য স্ত্রী বা স্বামী বিদ্যমান থাকায় বিবাহ হয়ে থাকে।

    (৬) যদি নিষিদ্ধ নিকট আত্মীয়ের মধ্যে বিবাহ হয়ে থাকে।

    এছাড়া নিম্নলিখিত কারণগুলির মধ্যে যে কোন একটি কারণ দেখাতে পারলে আদালত বিবাহ বিচ্ছেদের আদেশ দিতে পারে–

    (১) স্বামী বা স্ত্রী কেউ ব্যভিচারে লিপ্ত হয়।

    (২) ধর্মান্তর গ্রহণের ফলে যদি আর হিন্দু না থাকে।

    (৩) আদালতের কাছে বিবাহ ভঙ্গের জন্য দরখাস্ত করবার পূর্বে ক্ৰমান্বয়ে তিন বৎসর স্বামী বা স্ত্রী কেউ যদি বিকৃত মস্তিষ্ক হয়।

    (৪) ওই রকম তিন বৎসর কাল যদি স্বামী বা স্ত্রী অনারোগ্য কুষ্ঠব্যাধিতে আক্ৰান্ত হয়ে থাকে।

    (৫) ওই রকম তিন বৎসর কাল স্বামী বা স্ত্রী কেউ যদি কোন সংক্ৰামক যৌন ব্যাধিতে আক্ৰান্ত হয়।

    (৬) স্বামী বা স্ত্রীর কেউ যদি অন্য কোন ধর্ম সম্প্রদায়ে যোগদান করে সংসার ত্যাগ করে।

    (৭) স্বামী বা স্ত্রীর মধ্যে কেউ যদি ক্ৰমান্বয়ে সাত বৎসর নিরুদিষ্ট থাকে।

    (৮) যেখানে জুডিশিয়াল সেপারেশনের ডিক্রির পর উভয়পক্ষ আর স্বামী-স্ত্রীরূপে সহবাস করেনি।

    (৯) যদি রেস্টিটিটিউশন অভ কনজুগাল রাইটস-এর ডিক্রি হবার পর কোন একপক্ষ সেই ডিক্রি অমান্য করে অপর পক্ষ থেকে ক্ৰমান্বয়ে দু’বৎসর পৃথক বসবাস করে।

    এছাড়া আরও দু’টি কারণে স্ত্রী আদালতের কাছে বিবাহ-বিচ্ছেদের জন্য প্রার্থনা করতে পারে। এ দুটি কারণের প্রথমটি হচ্ছে—যদি এক স্ত্রী বিদ্যমান থাকতে স্বামী অন্য স্ত্রী গ্রহণ করে থাকে এবং আদালতে প্রার্থনা করবার সময় সেই স্ত্রী জীবিত থাকে। দ্বিতীয় কারণ হচ্ছে–স্বামী যদি বলাৎকরণ, পুংমৈথুন বা কোনরূপে অস্বাভাবিক যৌনকর্মে লিপ্ত হয়ে থাকে।

    ১৯৫৫ সালের বিবাহ আইন সম্পর্কে তিনটি কথা বলা প্রয়োজন। প্রথম, বিবাহ সিদ্ধ হবার সময় থেকে তিন বৎসরের পূর্বে কোন পক্ষ আদালতে বিবাহ-বিচ্ছেদের কোন দরখাস্ত করতে পারবে না, দ্বিতীয়, আদালত কর্তৃক বিবাহ-বিচ্ছেদের নির্দেশ দেবার পর যদি তার বিপক্ষে কোন আপীল না করা হয়ে থাকে তাহলে এক বছর অপেক্ষা করে উভয় পক্ষই পুনরায় বিবাহ করতে পারে। (যদি বিবাহ না করে তাহলে আদালত খোরপোষের দাবি গ্রাহ্য করতে পারে), এবং তৃতীয়, আদালত কর্তৃক বিবাহ-বিচ্ছেদের নির্দেশ দেওয়া সত্ত্বেও ওই নির্দেশের পূর্বে স্ত্রী যে সন্তান গর্ভে ধারণ করেছে সে সন্তান বৈধ বলে গণ্য হবে।

    আশা করা হয়েছিল যে এই আইন প্রণয়নের ফলে হিন্দু-বিবাহ যে শুধু গণতান্ত্রিকতা লাভ করবে তা নয়, বিবাহিতা হিন্দু নারী সামাজিক ও পারিবারিক নিষ্ঠুরতা ও অন্যায়ের হাত থেকে নিষ্কৃতি লাভ করবে। কিন্তু আমাদের সে আশা আজ বিনষ্ট। নারী-মুক্তির পরিবর্তে এসেছে নারী নির্যাতন। প্রতিদিনই খবরের কাগজে একটি-দু’টি বধূ নিধনের খবর প্রকাশিত হয়। আদিম বর্বরতার বশীভূত হয়ে শ্বশুর শাশুড়ি, ননদ-দেবর, এমন কি স্বামী সকলেই হয় আগুনে পুড়িয়ে নয়তো গলায় ফাঁস লাগিয়ে বা বিষ খাইয়ে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে। শিক্ষিত, অশিক্ষিত সব ধরনের মেয়েই এর শিকার। তাই আজ অধিকাংশ মেয়ের কাছে পবিত্র বিবাহবন্ধন একটা বিভীষিকা হয়ে উঠেছে।

    অন্যান্য রাজ্যের তুলনায় বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গেই বধূ হত্যার সংখ্যা ভয়াবহভাবে বেড়ে যাচ্ছে। বধূনিধন যেন একটা খেলাধূলার সামিল হয়ে দাঁড়িয়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রতিশ্রুত বা প্রত্যাশিত পণ দিতে না পারাই বধূ হত্যার প্রধান কারণ। তবে সমাজ থেকে পণপ্রথা উঠছে না! আইন হয়েছে, কিন্তু সে আইন কেউ মানছে না। পণ দেওয়া-নেওয়া পুর্ণোদ্যমেই চলেছে। কেবল তার জন্য কিছু নিরীহ মেয়ের জীবনাবসান ঘটছে।

    বধূহত্যা না করে, বনিবনা না হলে অনায়াসেই বিবাহ-বিচ্ছেদের পথ বেছে নেওয়া যায়। তার জন্য আইনও রয়েছে। কিন্তু সে রাস্তায় কেউ পা বাড়বে না। কারণ সেটা ব্যয়সাপেক্ষ ব্যাপার। তার চেয়ে অনেক সুবিধাজনক ও সস্তা হচ্ছে মেয়েটিকে মেরে ফেলা। আজ স্ত্রী শিক্ষার প্রসার যতটা ঘটেছে, তার চেয়ে বেশি প্রবল হয়েছে বধূ নিধনের মত অমানুষিক নৃশংসতা।

  • মুসলিম বিবাহ ও তিন তালাক

    মুসলিম বিবাহ ও তিন তালাক

    অতুল সুর

    [book]

    মুসলিম বিবাহ ও তিন তালাক

    বিগত শতকের শেষার্ধে গণতান্ত্রিক প্রভাব যে মাত্র হিন্দুর বিবাহের ওপরই পড়েছে, তা নয়। মুসলিম বিবাহের ওপরও পড়েছে। তবে মুসলমানরা হিন্দুদের তুলনায় অনেক বেশি মৌলবাদী। মৌলবাদীদের মতে মুসলিম সমাজের বিবাহ কোরান বা শরিয়াত অনুযায়ী হওয়া চাই।

    মুসলিমসমাজে বিবাহ সম্পর্কে বাধানিষেধ হিন্দু সমাজের তুলনায় অনেক কম। তবে প্রথম বিবাহ নিজ সম্প্রদায়ের মধ্যে অনূঢ়া মেয়ের সঙ্গে হওয়া চাই। পরবর্তী বিবাহ সম্বন্ধে কোন বাধানিষেধ নেই। হিন্দুদের মত মুসলমানসমাজে কোন গোত্রবিভাগ নেই। সেই কারণে বহির্বিবাহের কোন নিয়ম-কানুনও নেই। নিজ সম্প্রদায়ের মধ্যে যে কোন পুরুষ যে কোন স্ত্রীলোককে বিবাহ করতে পারে। ঘনিষ্ঠ আত্মীয়ের মধ্যে বিবাহ হয় না তবে বাঞ্ছনীয় বিবাহ হিসাবে খড়তুতো, জাঠতুতো, মাসতুতো, মামাতো, পিসতুতো ভাইবোনের মধ্যে বিবাহ প্রচলিত আছে। এরূপে ভাইবোন থাকলে তাদের মধ্যে বিবাহই অগ্রাধিকার পায়। তা না হলে অন্য পরিবারে বিবাহ হয়। এরূপ বিবাহের সমর্থনে বলা হয় যে, এতে রক্তের বিশুদ্ধতা রক্ষা হয় ও সম্পত্তি অবিভক্ত অবস্থায় থাকে। তবে কোন কোন জায়গায় ভাই-বোনের মধ্যে বিবাহের বিরোধিতাও লক্ষিত হয়।

    হিন্দুসমাজের মত মুসলিমসমাজেও বিবাহ সর্বজনীন ব্যাপার। সকলকেই বিবাহ করতে হয় এবং ‘চিরকৌমার্য’ কখনও উৎসাহিত করা হয় না। মুসলিমসমাজে ১৫ বৎসরের অধিক বয়স্ক যে কোন পুরুষ বিবাহ করতে পারে। অভিভাবকদের সম্মতি নিয়ে ১৫ বৎসরের কম বয়স্ক ছেলেমেয়েদের মধ্যেও বিবাহ চলে। মুসলিমসমাজে বিবাহে বর ও কনে উভয়েরই সম্মতির প্রয়োজন হয় এবং তা বিশেষভাবে স্পষ্টতার সঙ্গে প্রকাশ করতে হয়। দু’জন পুরুষ বা একজন পুরুষ ও একজন স্ত্রীলোকের সামনে বিবাহের প্রস্তাব ও স্বীকৃতি একই সময় করতে হয়।

    প্রতারণা বা বলপ্রয়োগ দ্বারা বিবাহ অবৈধ বলে গণ্য হয়। মুসলিমসমাজে কোন স্ত্রীলোক মুসলমান ব্যতীত অপর কাহাকেও বিবাহ করতে পারে না। তবে পুরুষরা মুসলমান ব্যতীত “কিতাবিয়া” ( ক্লীশ্চান বা ইহুদী) নারীকেও বিবাহ করতে পারে। মুসলিমসমাজে বহুপত্নী গ্রহণের কোন বাধা নেই। তবে চারটির বেশি পত্নী গ্রহণ নিয়মবিরুদ্ধ বলে ধরা হয়।

    যদি বিদ্যমান সম্পর্ক অবৈধ বলে গণ্য না হয় তাহলে মুসলিমসমাজে স্ত্রী-পুরুষ যেখানে স্থায়ীভাবে স্বামী-স্ত্রীরূপে বাস করে আসছে কিংবা পুরষ যদি স্বীকার করে যে সে নারী তার স্ত্রী তাহলে সে সম্পর্ক কে বিবাহের পর্যায়ে ফেলা হয়। ইসলামধর্মাবলম্বী কোন কোন শাখার মধ্যে “মোতা” নামে একরকম বিবাহ প্রচলিত আছে। “মোতা” বিবাহ হচ্ছে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য সাময়িক বিবাহ। অনেক সময় এরূপ বিবাহ মাত্র একদিনের জন্যও স্থায়ী হয়। এরূপ বিবাহে স্ত্রীধনও দেওয়া হয়। কিন্তু এরূপ বিবাহের ফলে উৎপন্ন সন্তানের কোন উত্তরাধিকার থাকে না। তবে পরস্পরের মধ্যে চুক্তি করে এরূপ সন্তানের উত্তরাধিকার দেওয়া চলে। অবশ্য উত্তরাধিকার না থাকলেও সন্তানের বৈধতা সম্বন্ধে কোন প্রশ্ন বা বিবাদ ওঠে না। বিচ্ছেদের পর এরূপ বিবাহে স্ত্রী কোনরূপ ভরণপোষণ পায় না। সাধারণতঃ নির্দিষ্ট সময় উত্তীর্ণ হলে বা তার পূর্বে উভয়ের মধ্যে কেউ মারা গেলে বা স্বামী যদি মেয়াদ উত্তীর্ণ হবার আগেই সময়ের মকুব করে তাহলে এরূপ বিবাহের ছেদ ঘটে। কিন্তু তা সত্ত্বেও স্ত্রীকে “ইদ্দত” উদ্‌যাপন করতে হয়। মুসলিমসমাজে “ইদ্দত” বলতে বোঝায় এক বিবাহ বিচ্ছেদের সময় থেকে অপর বিবাহের মধ্যবর্তীকালীন অপেক্ষা করবার সময়।

    আদালতের সাহায্য ব্যতিরেকে মুসলিমসমাজে সহজে বিবাহ বিচ্ছেদ করা যায়। এ সম্পর্কে প্রথাগত রীতি অনুযায়ী ছ’রকম পদ্ধতি আছে। প্রথম পদ্ধতি হচ্ছে “তালাক” উচ্চারণ করে দাম্পত্য সম্পর্কের ছেদ ঘটানো। যদি “তালাক” একবার উচ্চারণ করা হয় তাহলে তালাকের পর “ইদ্দত” পালন করতে হয়। আর এক রকমের “তালাক” হচ্ছে স্ত্রীলোকের ক্রমান্বয় তিনটি “তুড়”-এর (মাসিক ঋতু) সময় তিনবার “তালাক” উচ্চারণ করা। তবে প্রত্যাহার না করবার দৃঢ় সঙ্কল্প নিয়ে একই সঙ্গে তিনবার “তালাক” উচ্চারণ করা যেতে পারে। “তালাক” উচ্চারণের সময় কোন সাক্ষী বা স্ত্রীর উপস্থিতির প্রয়োজন হয় না। স্ত্রী নেপথ্যে থাকলেও “তালাক” দেওয়া যেতে পারে। বিবাহ-বিচ্ছেদের দ্বিতীয় পদ্ধতি হচ্ছে ‘ইলা’। ‘ইলা’ হচ্ছে ব্রত গ্রহণ করে চারমাস স্ত্রীর সঙ্গে সঙ্গম না করা। তৃতীয় পদ্ধতি হচ্ছে ‘জিহার’। ‘জিহার’ হচ্ছে স্বামী যদি বিবাহের জন্য সম্পর্কিত কোন আত্মীয়ার নাম উচ্চারণ করে, তাহলে স্ত্রী তাকে ‘তালাক’ উচ্চারণ করতে বাধ্য করাতে পারে। স্বামী যদি অস্বীকৃত হয় তাহলে স্ত্রী আদালতে গিয়ে বিবাহ-বিচ্ছেদ প্রার্থনা করতে পারে। চতুর্থ পদ্ধতি হচ্ছে ‘খোলা’। যেখানে স্ত্রী স্বামীকে রাজি করিয়ে এবং তার জন্য ক্ষতিপূরণ দিয়ে দাম্পত্য বন্ধন থেকে মুক্ত হতে চায় সেখানে বিবাহ-বিচ্ছেদকে ‘খোলা’ বলা হয়। পঞ্চম পদ্ধতিকে ‘মুবারত’ বলা হয়। ‘মুবারত’ হচ্ছে স্বামী-স্ত্রী পরস্পরের সম্মতিক্রমে বিবাহ-বিচ্ছেদ। ‘মুবারতে’র সঙ্গে ‘খোলা’-র প্রভেদ হচ্ছে এই যে, ‘খোলা’ পদ্ধতিতে স্ত্রী-ই বিবাহ-বিচ্ছেদ চায় আর ‘মুবারত’ পদ্ধতিতে স্বামী- স্ত্রী উভয়েই বিবাহ-বিচ্ছেদ চায়। বিবাহ-বিচ্ছেদের ষষ্ঠ পদ্ধতি হচ্ছে ‘তালাক-ই-তাফয়ূজ’। এ ক্ষেত্রে স্বামী দ্বারা আদিষ্ট হয়ে স্ত্রী-ই ‘তালাক’ উচ্চারণ করে।

    আদালতের আশ্রয় নিয়েও মুসলিমসমাজে বিবাহ-বিচ্ছেদ করা যায়। এ সম্বন্ধে ১৯৩৯ সালে মুসলিম বিবাহ-বিচ্ছেদ আইন প্রণীত হয়েছে। এই আইনের ২নং ধারায় যে সকল কারণে আদালতকে বিবাহ-বিচ্ছেদ গ্রাহ্য করবার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে তার মধ্যে আছে :

    (১) চার বৎসর যদি স্বামীর কোন খোঁজ-খবর না পাওয়া যায়। এক্ষেত্রে আদালতের রায় ছ’মাসের জন্য মূলতবী রাখা হয় এবং ওই সময়ের মধ্যে স্বামী যদি প্রত্যাবর্তন করে তাহলে ওই রায় বাতিল হয়ে যায়;

    (২) দু বৎসর যদি স্বামী স্ত্রীর ভরণপোষণে অমনোযোগী হয়;

    (৩) সাত বা ততোধিক বৎসরের জন্য যদি স্বামীর কারাদণ্ড হয়;

    (৪) তিন বৎসর যদি স্বামী তার “দাম্পত্যধর্ম” না পালন করে;

    (৫) স্বামী যদি নপুংসক হয়। এক্ষেত্রে তার প্রজননশক্তি প্রমাণ করবার জন্য স্বামীকে এক বৎসরের জন্য সময় দেওয়া হয়;

    (৬) দু বৎসর ব্যাপী স্বামী যদি উন্মাদ রোগাক্রান্ত হয়;

    (৭) স্বামী যদি কুষ্ঠ বা কোন কুৎসিত যৌনব্যাধিগ্রস্ত হয়;

    (৮) ১৫ বৎসর বয়স উত্তীর্ণ হবার আগেই যদি পিতামাতা বা অভিভাবকের সম্মতি অনুসারে তার বিবাহ হয়ে থাকে তাহলে স্ত্রী ১৮ বৎসর বয়স উত্তীর্ণ হবার পর স্বামীকে পরিহার করতে পারে;

    (৯) স্বামী যদি স্ত্রীকে দৈহিক বা মানসিক কোনরূপে পীড়া দেয়।

    যদিও কারণ বিশেষে আদালতের আশ্রয় নিয়ে মুসলিমসমাজে বিবাহ-বিচ্ছেদ করা যায় তা হলেও ‘তালাক’ দ্বারা বিবাহ-বিচ্ছেদ করা মুসলিম-সমাজের প্রথাগত পন্থা। তালাক দ্বারা বিবাহ-বিচ্ছেদের বৈশিষ্ট্য এই যে তালাক দেবার পর স্বামীর স্ত্রী সম্বন্ধে আর কোন দায়িত্ব থাকে না। এ সম্বন্ধে মুসলিমসমাজের ব্যক্তিগত আইন (Personal Law) বলবৎ থাকে। এই আইন অনুযায়ী তালাক প্রাপ্তা স্ত্রীর ভরণপোষণের দায়িত্ব স্বামীর নয়; তার পুত্রদের কিংবা তার পিতামাতার বা পিতৃকুলের আত্মীয়দের। তারা যদি এ দায়িত্ব পালন না করে, তাহলে এ দায়িত্ব ওয়াকফ বোর্ডের ওপর ন্যস্ত হয়। কিন্তু ১৯৮৬ খ্রীষ্টাব্দে সুপ্রিম কোর্ট শাহবানু মামলায় তালাক প্রাপ্তা স্ত্রীর ভরণপোষণের ভার তার প্রাক্তন স্বামীর ওপরই ন্যস্ত করে। এই নিয়ে মুসলিম সমাজে ভীষণ আলোড়ন সৃষ্ট হয়। চতুর্দিকে রব তোলা হয় যে সুপ্রিম কোর্ট প্রাক্তন স্বামীর ওপর তালাক প্রাপ্তা স্ত্রীর খোরপোষের দায়িত্ব অর্পণ করে শরিয়াতের বিধান লঙ্ঘন করেছে। বলা হয় যে এই রায় দ্বারা সুপ্রিম কোর্ট মুসলিম ধর্মের ক্ষেত্রে হস্তক্ষেপ করেছে।

    এর পদক্ষেপে ভারত সরকার সংসদে ‘মুসলিম মহিলা (তালাকের পর অধিকার সংরক্ষণ) বিল’ আনে। এই বিলের বিরুদ্ধে ১০২টি সংশোধনী প্রস্তাব আনা হয়। সংসদে অনেক আলোচনা ও বিতর্কের পর বিলটি ৮ মে ১৯৮৬ তারিখে বিধিবদ্ধ হয়। সংশোধনের পর আইনটি যে রূপ নিয়েছে তাতে তালাক প্রাপ্তা স্ত্রী ইদ্দত-এর (শরিয়াত অনুযায়ী পুনরায় বিবাহের নিষিদ্ধ কাল) সময় পর্যন্ত স্বামীর কাছ থেকে খোরপোষ পাবে; তারপর তার ভরণপোষণের ভার নিতে হবে তার পিতৃ-পরিবার বা অন্য আত্মীয়বর্গকে; তারা যদি সে দায়িত্ব নিতে অস্বীকার করে, তাহলে দায়িত্ব গ্রহণ করবে ‘ওয়াকফ বোর্ড’।

    সবশেষে মুসলিম সমাজে তালাক বা বিবাহবিচ্ছেদ সম্বন্ধে উচ্চ আদালতের দুই রায়ের কথা বলব। গুয়াহাটি হাইকোর্টের দুই বিচারপতি এস. বি. রায় ও আর. কে. মানিসেনাকে নিয়ে গঠিত এক ডিভিসন বেঞ্চ রায় দেন যে স্বামী স্ত্রী উভয় পক্ষের লোকজন প্রথমে ভালরকম আলোচনা করে বুঝে নেবেন, তারপর তালাক কার্যকর হবে। মামলাটা ছিল বিবাহবিচ্ছেদ সংক্রান্ত। শেষ পর্যন্ত হাইকোর্টের রায়ে তালাক কার্যকর হয়নি।

    শেষ সংবাদ। ১৯৯৪ খ্রীষ্টাব্দে এলাহাবাদ হাইকোর্টের বিচারপতি হরিনাথ তিলহরি এক ঐতিহাসিক রায়ে বলেছেন ‘একবাক্যে তিন বার তালাক বে-আইনী। এটা অসংবিধানিক ও অমানবিক।’

    সুপ্রিম কোর্টের শাহবানু মামলায় বলা হয়েছিল ফৌজদারী আইনের আওতায় পরিত্যক্তার ভরণপোষণের দায়িত্ব নিতে হবে তার প্রাক্তন স্বামীকে। কিন্তু তালাককে বে-আইনী বা অসাংবিধানিক বলা হয়নি।

    পরিশেষে মুসলমান সমাজে বিবাহের আচার-অনুষ্ঠান সম্বন্ধে কিছু বলে এ অধ্যায় শেষ করব। ধর্মান্তরিত অন্যান্য সমাজের ন্যায় বাঙালী মুসলমান সমাজেও চিরাচরিত হিন্দুসমাজের অনেক লোকাচার পালিত হয়। যেমন বিবাহের পূর্বে বরকনেকে আশীর্বাদ করা, আইবুড়োভাত বা থা দেওয়া, গায়ে হলুদ দেওয়া, জল আনা, লৌকিক গীত গাওয়া, বরের সঙ্গে নিতবরের যাওয়া, বিয়েতে বরকনের গাঁটছড়া বাঁধা, বাসর ঘরের কৌতুক, নাপিতের ভূমিকা (নাপিতকে সিদে দেওয়া), ‘দুধভাত’ যেটা হিন্দু বিবাহের কনকাঞ্জলির সমতুল, কোন কোন জায়গায় সিন্দুর দান ইত্যাদি। বলা বাহুল্য এসব লোকাচার ছাড়া মূল মুসলমান বিবাহ অনুষ্ঠান সাক্ষীর সমক্ষে মৌলবীর দ্বারা সম্পাদিত হয় ও মৌলবী এজন্য দক্ষিণা পান।

  • বিয়ে বাড়ির আদব

    বিয়ে বাড়ির আদব

    অতুল সুর

    [book]

    বিয়ে বাড়ির আদব

    গত একশ বছর সময়কালের মধ্যে বাঙালীর বিয়ে বাড়ির অভূতপূর্ব পরিবর্তন ঘটেছে। পঁচিশ ত্রিশ বছর আগে পর্যন্ত বিয়ে বাড়িতে সানাই বাজত। আজ আর তা বাজে না। তার স্থান দখল করে নিয়েছে মাইক-নিনাদিত গান। বিয়ের শাস্ত্রীয় আচারসমূহ ও মেয়েদের কৃত মাঙ্গলিক অনুষ্ঠানসমূহে এখনও বজায় আছে বটে, কিন্তু বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটেছে বিয়ে বাড়ির নেমন্তন্ন ও ভোজনের ব্যাপারে। খাওয়া দাওয়ার ব্যাপারে শতাব্দীর একেবারে গোড়ায় ভোজপণ্ডিদের যুগ শেষ হয়ে গিয়েছিল। বিয়ে বাড়িতে ফলার ও ভাতের পরিবর্তে লুচি খাওয়ানো প্রবর্তিত হয়েছিল। বিয়েবাড়ির রান্নাবান্নার ব্যাপারেও পাঁচ বাড়ির গিন্নিবান্নিদের আধিপত্যেরও অবলুপ্তি ঘটেছিল। তাদের স্থান দখল করে নিয়েছিল উড়িয়া বামনের দল।

    এই পরিবর্তিত পরিবেশেই আমি আমার ছেলেবেলার বিয়েবাড়ির রীতিনীতি দেখেছি। তখন সামাজিক রীতিনীতি ও জাতপাতের প্রাবল্য ছিল খুব কঠোর। তার একটা এদিক-ওদিক হবার উপায় ছিল না। আমার যখন পঁচিশ-ত্রিশ বছর বয়স, তখন পর্যন্তও ব্রাহ্মণদের নিমন্ত্রণ, পুরোহিতকে সঙ্গে নিয়ে, কর্মকর্তাকে নিজে কিংবা তাঁর কোন আত্মীয়কে নিমন্ত্রিত ব্রাহ্মণবাড়িতে গিয়ে করে আসতে হত। শহরে এ প্রথা এখন উঠে গিয়েছে। জানি না পল্লীগ্রামে এখনও প্রচলিত আছে কিনা।

    ৷৷ দুই ৷৷

    ভোজনের ব্যাপারে জাতপাতের ব্যাপারটা অত্যন্ত কঠোর ছিল। ব্রাহ্মণদের সর্বাগ্রে ভোজন করাতে হত। গৃহকর্তাকে সমবেত অতিথিদের সামনে গিয়ে বলতে হত—‘আপনাদের মধ্যে যাঁরা ব্রাহ্মণ আছেন, তাঁদের গাত্রোত্থান করতে আদেশ হউক।’ তাছাড়া ভোজ্যাদি ব্রাহ্মণদের দ্বারা পরিবেশিত করতে হত। ভোজনের শেষে ব্রাহ্মণরা দক্ষিণা পেতেন। ভোজন দক্ষিণার হার ছিল চার আনা থেকে এক টাকা। ব্রাহ্মণ ভোজন হয়ে গেলে, তারপর ব্রাহ্মণেতর জাতিদের ডাকা হত।

    আত্মীয়স্বজনদের বাড়ির মেয়েদের নিমন্ত্রণ বাড়ির মেয়েদের গিয়ে করতে হত। তা না হলে মেয়ে-নিমন্ত্রণ গ্রাহ্য হত না। এছাড়া নিমন্ত্ৰিতা মেয়েদের তাদের বাড়ি থেকে গাড়ি করে নিয়ে আসতে হত, এবং ভোজন পর্বের পর তাঁদের আবার গাড়ি করে নিজ নিজ বাড়িতে পৌঁছে দিতে হত। গত ষাট-সত্তর বছরের মধ্যে এ প্রথা উঠে গেছে। আর যে সব নিমন্ত্রিত ব্যক্তি দূর থেকে আসতেন, তাঁরা কর্মকর্তার কাছ থেকে গাড়ি ভাড়া বাবদ বেশ কিছু টাকা আদায় করে নিতেন। তাও উঠে গেছে।

    ৷৷ তিন ৷৷

    আর একটা প্রথাও এই সময়কালের মধ্যে উঠে গেছে। সেটা হচ্ছে বিবাহ বাসরে ‘প্রীতি উপহার’ বিতরণ করা। এগুলো কবিত্বপূর্ণ কাগজ। এগুলো হয় গোলাপী রঙের বা রুমাল-সদৃশ এক রকম কাগজে লাল কালিতে বা সোনার জলে ছাপা হত। এগুলো বিয়ে বাড়ির মর্যাদার একটা মাপকাঠি ছিল। কেননা, লোক বিচার করত বরপক্ষ ও কন্যাপক্ষ কে ক’খানা ‘প্রীতি উপহার’ বিলি করেছে।

    মনে রাখতে হবে যে আমার ছেলেবেলাটা ইলেকট্রিক আলোর যুগ ছিল না। সেজন্য বিবাহ বাসর আলোকিত করবার জন্য ‘খাস গেলাস’ ও ঝোলানো ঝাড়লণ্ঠন ব্যবহৃত হত। এগুলো রেড়ির তেল বা মোমবাতির সাহায্যে জ্বালানো হত। পরে ছাদের ওপর হোগলার মেরাপের তলায় যেখানে নিমন্ত্রিত ব্যক্তিদের খাওয়ানো হত, সেখানে থাকত কারবাইড গ্যাসের আলো।

    শতাব্দীর গোড়ায় সম্পন্ন গৃহস্থ বাড়ির বর আসত চতুর্দোলায় চেপে। ব্যাণ্ড বাজত ও দুধারে আলোর শোভা থাকত। ফিরে যাবার সময় কনে যেত মহাপায়ায় করে। ১৯২০ সাল নাগাদ এগুলো সব উঠে যায়।

    বর এলে বরযাত্রীদের গায়ে গোলাপ জল ছিটানো হত। বরকে বসানো হত বরের আসনে। দুধারে থাকত দুটো ফুলের তোড়া ও দুটো বাতিদান। বরযাত্রীদের গলায় মালা পড়িয়ে দেওয়া হত। এটাই ছিল বরযাত্রীদের লক্ষণ। কেননা বরযাত্রীদের বিশেষ সমাদর করে কন্যাপক্ষীয়দের আগে খাওয়ানো হত।

    ৷৷ চার ৷৷

    এবার বলি বিয়ের নিমন্ত্রণে কি খাওয়ানো হত। নিমন্ত্রিত ব্যক্তিদের সাধারণত খাওয়ানো হত কর্মকর্তার নিজবাড়িতে, এখনকার মত “বিয়েবাড়ি’ ভাড়া করে নয়। এর জন্য বাড়ির ছাদে হোগলা দিয়ে একটা মণ্ডপ তৈরি করা হত। তারপর ১৯৪২ খ্রীষ্টাব্দের হালসীবাগানের সেই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর হোগলা দিয়ে মণ্ডপ তৈরি করা বন্ধ করে দেওয়া হয়। এর পদাঙ্কে নানারকম উপায় অবলম্বিত হয়, যার শেষ ফলশ্রুতি হচ্ছে ভাড়াকরা ‘বিয়েবাড়ী’। আরও যা পরিবর্তন ঘটেছে তা হচ্ছে, সেকালে বিয়েবাড়িতে মেঝের ওপর কুশাসন পেতে বসিয়ে কলাপাতার ওপর খেতে দেওয়া হত। কলাপাতার ডানদিকের সর্বোচ্চ কোণে থাকত লবণ ও একখণ্ড পাতিলেবু, আর কলাপাতার সামনে থাকত জলপূর্ণ মাটির গেলাস ও দই ও ক্ষীর দেওয়ার জন্য মাটির খুরি। ভোজনপর্ব শুরু হত দু’খানা গরম লুচি ও বেগুন বা পটল-ভাজা দিয়ে। ক্রমে ক্রমে আসত কুমড়ার ছক্কা (বা শীতকালে বাঁধাকপির তরকারী), ডাল, ধোঁকা বা আলুর দম, মাছের কালিয়া, চাটনি, পাঁপড় ভাজা ও মিষ্টান্ন। মিষ্টান্নের মধ্যে দেওয়া হত মিহিদানা, লেডিকেনী, রসগোল্লা, সন্দেশ, দই, ক্ষীর। সকলের শেষে দেওয়া হত পান। এটা সাধারণ গৃহস্থবাড়ির বিয়ের ভোজ্যের ফর্দ। এটাই ছিল মধ্যবিত্ত গৃহস্থবাড়িরও বিয়ের ভোজ্যদ্রব্যের তালিকা। অবস্থাপন্ন গৃহস্থবাড়িতে এর সঙ্গে যুক্ত হত পোলাও, মাংস, আরও অনেক রকম মিষ্টান্ন ও রাবড়ি। ভোজনের সময় পরিবেশনকারীরা দফায় দফায় আনত সবরকমই ভোজ্যদ্রব্য। তার মানে আগেকার দিনের বিয়ে বাড়িতে যে যত খেতে চাইত, সে তা পেত।

    সেকালের বিয়ে বাড়িতে ছাঁদা বাঁধার একটা রেওয়াজ ছিল। ছাঁদা-বাঁধা হচ্ছে বাড়িতে নিয়ে যাবার জন্য একখণ্ড কাপড়ে পরিবেশিত সমস্ত রকম দ্রব্যসামগ্রী, বিশেষ করে লুচি ও মোণ্ডা বেঁধে নেওয়া।

    আর একটা রীতি ছিল। ভোজন সমাপ্তির পূর্বে কর্মকতা সমস্ত নিমন্ত্রিত ব্যক্তির সামনে দাঁড়িয়ে, ভোজনে তাঁরা সন্তুষ্ট হয়েছেন কিনা তা জিজ্ঞাসা করতেন।

    মেয়েদের খাওয়ানো পৃথক পংক্তিতে করা হত এবং সেখানে মেয়েরাই পরিবেশন করত। সেখানে ভোজনের শেষে গৃহকর্ত্রী এসে প্রত্যেককে ভোজনে সন্তোষ লাভ করেছে কিনা জিজ্ঞাসা করত।

    এখন বিয়ে বাড়ির খাওয়ানোর ব্যাপারটা ঠিকেদার ক্যাটারারদের হাতে ন্যস্ত হয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে সমাদারও হ্রাস পেয়েছে।

    ৷৷ পাঁচ ৷৷

    সেকালে লৌকিকতা করা হত আট আনা বা এক টাকা দিয়ে। বিশিষ্ট অতিথিরা বা আত্মীয়রা চার টাকা পর্যন্ত দিতেন। পরে টাকার বদলে বই উপহার দেবার প্রথা প্রচলিত হয়েছিল। এখন দামী কাপড় বা অন্য দ্রব্যসামগ্রী দেওয়া হয়। শধু তাই নয়। এ বিষয়ে এক পরিবার অপর পরিবারের সঙ্গে পাল্লা দেয়। আজ মধ্যবিত্ত সমাজের অবনতির এটাও একটা কারণ। লৌকিকতাটা আজ সমাজ থেকে উঠে যাওয়া উচিৎ।