Blog

  • যা শত্রু পরে পরে

    যা শত্রু পরে পরে

    যা শত্রু পরে পরে

    রাজ্যে যাদের সূর্য অস্ত যায় না কখনও, শুনিস হায়,

    মেরে মেরে যারা ভাবিছে অমর, মরিবে না কভু মৃত্যু-ঘায়,

    তাদের সন্ধ্যা ওই ঘনায়!

    চেয়ে দেখ ওই ধূম্র-চূড়

    অসন্তোষের মেঘ-গরুড়

    সূর্য তাদের গ্রাসিল প্রায়!

    ডুবেছে যে পথে রোম গ্রিক প্যারি–সেই পথে যায় অস্ত যায়

    ওদের সূর্য!–দেখবি আয়!

    অর্ধ পৃথিবী জুড়ে হাহাকার, মড়ক, বন্যা, মৃত্যুত্রাস,

    বিপ্লব, পাপ, অসূয়া, হিংসা, যুদ্ধ, শোষণ-রজ্জুপাশ,

    অনিল যাদের ক্ষুধিত গ্রাস –

    তাদের সে লোভ-বহ্নি-শিখ

    জ্বালায়ে জগৎ, দিগ‍্‍বিদিক,

    ঘিরেছে তাদেরই গৃহ, সাবাস!

    যে আগুনে তারা জ্বালাল ধরা তা এনেছে তাদেরই সর্বনাশ!

    আপনার গলে আপন ফাঁস!

    এবার মাথায় দংশেছে সাপে, তাগা আর কোথা বাঁধবে বল?

    আপনার পোষা নাগিনি তাহার আপনার শিরে দিল ছোবল।

    ওঝা ডেকে আর বল কী ফল?

    ঘরে আজ তার লেগেছে আগুন,

    ভাগাড়ে তাহার পড়েছে শকুন,

    রে ভারতবাসী, চল রে চল!

    এই বেলা সবে ঘর ছেয়ে নেয়, তোরাই বসে কি রবি কেবল?

    আসে ঘনঘটা ঝড়-বাদল!

    ঘর সামলে নে এই বেলা তোরা ওরে ও হিন্দু-মুসলেমিন!

    আল্লা ও হরি পালিয়ে যাবে না, সুযোগ পালালে মেলা কঠিন!

    ধর্ম-কলহ রাখ দুদিন!

    নখ ও দন্ত থাকুক বাঁচিয়া,

    গণ্ডূষ ফের করিবি কাঁচিয়া,

    আসিবে না ফিরে এই সুদিন!

    বদনা-গাড়ুতে কেন ঠোকাঠুকি, কাছা কোঁচা টেনে শক্তি ক্ষীণ,

    সিংহ যখন পঙ্ক-লীন।

    ভায়ে ভায়ে আজ হাতাহাতি করে কাঁচা হাত যদি পাকিয়েছিস

    শত্রু যখন যায় পরে পরে – নিজের গণ্ডা বাগিয়ে নিস!

    ভুলে যা ঘরোয়া দ্বন্দ্ব-রিষ।

    কলহ করার পাইবি সময়,

    এ সুযোগ দাদা হারাবার নয়!

    হাতে হাত রাখ, ফেল হাতিয়ার, ফেলে দে বুকের হিংসা-বিষ!

    নব-ভারতের এই আশিষ!

    নারদ নারদ! জুতো উলটে দে! ঝগড়েটে ফল খুঁজিয়া আন।

    নখে নখ বাজা! এক চোখ দেখা! দুকাটি বাজিয়ে লাগাও গান!

    শত্রুর ঘরে ঢুকেছে বান!

    ঘরে ঘরে তার লেগেছে কাজিয়া,

    রথ টেনে আন আনরে তাজিয়া,

    পূজা দেরে তোরা, দেরে কোরবান!

    শত্রুর গোরে গলাগলি কর আবার হিন্দু-মুসলমান!

    বাজাও শঙ্খ, দাও আজান!

    কৃষ্ণনগর,

    আশ্বিন, ১৩৩৩

  • পথের দিশা

    পথের দিশা

    পথের দিশা

    চারিদিকে এই গুণ্ডা এবং বদমায়েসির আখ্‌ড়া দিয়ে

    রে অগ্রদূত, চ’লতে কি তুই পারবি আপন প্রাণ বাঁচিয়ে?

    পারবি যেতে ভেদ ক’রে এই বক্র-পথের চক্রব্যুহ?

    উঠবি কি তুই পাষাণ ফুঁড়ে বনস্পতি মহীরুহ?

    আজকে প্রাণের গো-ভাগাড়ে উড়ছে শুধু চিল-শকুনি,

    এর মাঝে তুই আলোকে-শিশু কোন্‌ অভিযান ক’রবি, শুনি?

    ছুঁড়ছে পাথর, ছিটায় কাদা, কদর্যের এই হোরি-খেলায়

    শুভ্র মুখে মাখিয়ে কালি ভোজপুরীদের হট্ট-মেলায়

    বাঙলা দেশও মাত্‌ল কি রে? তপস্যা তার ভুললো অরুণ?

    তাড়িখানার চীৎকারে কি নাম্‌ল ধুলায় ইন্দ্র বরুণ?

    ব্যগ্র-পরান অগ্রপথিক,কোন্‌ বাণী তোর শুনাতে সাধ?

    মন্ত্র কি তোর শুন্‌তে দেবে নিন্দাবাদীর ঢক্কা-নিনাদ?

    নর-নারী আজ কন্ঠ ছেড়ে কুৎসা-গানের কোরাস্‌ ধ’রে

    ভাবছে তা’রা সুন্দরেরই জয়ধ্বনি ক’রছে জোরে?

    এর মাঝে কি খবর পেলি নব-বিপ্লব-ঘোড়সাওয়ারী

    আসছে কেহ? টুট্‌ল তিমির, খুল্‌ল দুয়ার পুব-দয়ারী?

    ভগবান আজ ভূত হ’ল যে প’ড়ে দশ-চক্র ফেরে,

    যবন এবং কাফের মিলে হায় বেচারায় ফিরছে তেড়ে!

    বাঁচাতে তায় আসছে কি রে নতুন যুগের মানুষ কেহ?

    ধুলায় মলিন, রিক্তাভরণ, সিক্ত আঁখি, রক্ত দেহ?

    মসজিদ আর মন্দির ঐ শয়তানদের মন্ত্রণাগার,

    রে অগ্রদূত, ভাঙতে এবার আসছে কি জাঠ কালাপাহাড়?

    জানিস যদি, খবর শোনা বন্ধ খাঁচার ঘেরাটোপে,

    উড়ছে আজো ধর্ম-ধ্বজা টিকির গিঁঠে দাড়ির ঝোপে!

    নিন্দাবাদের বৃন্দাবনে ভেবেছিলাম গাইব না গান,

    থাকতে নারি দেখে শুনে সুন্দরের এই হীন অপমান।

    ক্রুদ্ধ রোষে রুদ্ধ ব্যথায় ফোঁপায় প্রাণে ক্ষুদ্ধ বাণী,

    মাতালদের ঐ ভাঁটিশালায় নটিনী আজ বীণাপাণি!

    জাতির পারণ-সিন্ধু মথি’ স্বার্থ-লোভী পিশাচ যারা

    সুধার পাত্র লক্ষ্মীলাভের ক’রতেছে ভাগ-বাঁটোয়ারা,

    বিষ যখন আজ উঠল শেষে তখন কারুর পাইনে দিশা,

    বিষের জ্বালায় বিশ্ব পুড়ে, স্বর্গে তাঁরা মেটান তৃষা!

    শ্মাশন-শবের ছাইয়ের গাদায় আজকে রে তাই বেড়াই খুঁজে,

    ভাঙন-দেব আজ ভাঙের নেশায় কোথায় আছে চক্ষু বুঁজে!

    রে অগ্রদূত, তরুণ মনের গহন বনের রে সন্ধানী,

    আনিস্‌ খবর, কোথায় আমার যুগান্তরের খড়্‌পপাণি!

    কলিকাতা,

    ১৬ই চৈত্র, ১৩৩৩

  • যুগের আলো

    যুগের আলো

    যুগের আলো

    নিদ্রা-দেবীর মিনার-চুড়ে মুয়াজ্জিনের শুনছি আরাব,–

    পান করে নে প্রাণ-পেয়ালায় যুগের আলোর রৌদ্র-শারাব!

    উষায় যারা চমকে গেল তরুণ রবির রক্ত-রাগে,

    যুগের আলো! তাদের বলো, প্রথম উদয় এমনি লাগে!

    সাতরঙা ওই ইন্দ্রধনুর লাল রংটাই দেখল যারা,

    তাদের গাঁয়ে মেঘ নামায়ে ভুল করেছে বর্ষা-ধারা।

    যুগের আলোর রাঙা উদয়, ফাগুন-ফুলের আগুন-শিখা,

    সীমন্তে লাল সিঁদুর পরে আসছে হেসে জয়ন্তিকা!

    ঢাকা,

    ১৭ ফাল্গুন, ১৩৩৩

  • জাগর-তূর্য

    জাগর-তূর্য

    জাগর-তূর্য

    [ শেলির ভাব-অবলম্বনে ]

    ওরে ও শ্রমিক, সব মহিমার উত্তর-অধিকারী!

    অলিখিত যত গল্প-কাহিনি তোরা যে নায়ক তারই॥

    শক্তিময়ী সে এক জননির

    স্নেহ-সুত সব তোরা যে রে বীর,

    পরস্পরের আশা যে রে তোরা, মার সন্তাপ-হারী॥

    নিদ্রোত্থিত কেশরীর মতো

    ওঠ ঘুম ছাড়ি নব জাগ্রত!

    আয় রে অজেয় আয় অগণিত দলে দলে মরুচারী॥

    ঘুমঘোরে ওরে যত শৃঙ্খল

    দেহ মন বেঁধে করেছে বিকল,

    ঝেড়ে ফেল সব, সমীরে যেমন ঝরায় শিশির বারি।

    উহারা কজন? তোরা অগণন সকল শক্তি-ধারী॥

    কলিকাতা,

    ১ বৈশাখ, ১৩৩৪

  • অন্তর-ন্যাশন্যাল সঙ্গীত

    অন্তর-ন্যাশন্যাল সঙ্গীত

    অন্তর-ন্যাশন্যাল সঙ্গীত

    জাগো—
     
    জাগো
    অনশন-বন্দী, ওঠো রে যত
    জগতের লাঞ্ছিত ভাগ্যহত!
    যত
    অত্যাচারে আজি বজ্র হানি
    হাঁকে
    নিপীড়িত-জন-মন-মথিত বাণী,
    নব
    জনম লভি অভিনব ধরণি
    ওরে ওই আগত॥
    আদি
    শৃঙ্খল সনাতন শাস্ত্র-আচার
    মূল
    সর্বনাশের, এরে ভাঙিব এবার!
    ভেদি দৈত্য-কারা
    আয় সর্বহারা!
    কেহ
    রহিবে না আর পর-পদ-আনত॥
    কোরাস :
     
    নব ভিত্তি পরে
    নব
    নবীন জগৎ হবে উত্থিত রে!
    শোন
    অত্যাচারী! শোন রে সঞ্চয়ী!
    ছিনু সর্বহারা, হব সর্বজয়ী॥
    ওরে
    সর্বশেষের এই সংগ্রাম-মাঝ
    নিজ
    নিজ অধিকার জুড়ে দাঁড়া সবে আজ!
    এই
    “অন্তর-ন্যাশন্যাল-সংহতি” রে
    হবে
    নিখিল মানব জাতি সমুদ্ধত॥

    কলিকাতা,

    ১ বৈশাখ, ১৩৩৪

  • রক্ত-পতাকার গান

    রক্ত-পতাকার গান

    রক্ত-পতাকার গান

    ওড়াও ওড়াও লাল নিশান!….

    দুলাও মোদের রক্ত-পতাকা

    ভরিয়া বাতাস জুড়ি বিমান!

    ওড়াও ওড়াও লাল নিশান॥

    শীতের শ্বাসেরে বিদ্রুপ করি ফোটে কুসুম,

    নব-বসন্ত-সূর্য উঠিছে টুটিয়া ঘুম,

    অতীতের ওই দশ-সহস্র বছরের হানো মৃত্যু-বাণ

    ওড়াও ওড়াও লাল নিশান॥

    চির বসন্ত যৌবন করে ধরা শাসন,

    নহে পুরাতন দাসত্বের ওই বদ্ধ মন,

    ওড়াও ওড়াও লাল নিশান!

    ভরিয়া বাতাস জুড়ি বিমান।

    বসন্তের এই জ্যোতির পতাকা ওড়াও ঊর্ধ্বে

    গাহোরে গান!

    লাল নিশান! লাল নিশান!

    কলিকাতা,

    ১ বৈশাখ, ১৩৩৪

  • সুর-কুমার

    সুর-কুমার

    সুর-কুমার

    [দিলীপকুমারের ইউরোপ যাত্রা উপলক্ষ্যে]

    বন্ধু, তোমায় স্বপ্ন-মাঝে ডাক দিল কি বন্দিনী

    সপ্ত সাগর তেরো নদীর পার হতে সুর-নন্দিনী!

    বীণ-বাদিনী বাজায় হঠাৎ যাত্রা-পথের দুন্দুভি,

    অরুণ আঁখি কইল সাকি, ‘আজকে শরাব মুলতুবি!’

    সাগর তোমায় শঙ্খ বাজায়, হাতছানি দেয় সিন্ধু-পার,

    গানের ভেলায় চললে ভেসে রূপকথারই রাজকুমার!

    গানের ভেলায় চললে ভেসে রূপকথারই রাজকুমার!

    লয়ে সুরের সোনার কাঠি দিগ‌্‌বিজয়ে যাও সেথায়।

    বন্দী-দেশের আনন্দ-বীর! আনবে তুমি জয় করি

    ইন্দ্রলোকের উর্বশী নয় – কণ্ঠলোকের কিন্নরী।

    শ্বেতদ্বীপের সুর-সভায় আজকে তোমার আমন্ত্রণ,

    অস্ত্রে যারা রণ জেতেনি বীণায় তারা জিনল মন।

    কণ্ঠে আছে আনন্দ-গান, হস্ত-পদে থাক শিকল;

    ফুল-বাগিচায় ফুলের মেলা, নাই-বা সেথা ফলল ফল।

    বৃত্ত-ব্যাসে বন্দী তবু মোদের রবির অরুণ-রাগ

    জয় করেছে যন্ত্রাসুরের মানব-মেধের লক্ষ যাগ।

    ছুটছে যশের যজ্ঞ-ঘোড়া স্পর্ধা-অধীর বিশ্বময়,

    তোমার মাঝে দেখব বন্ধু নূতন করে দিগ‍্‍বিজয়।

    বীণার তারে বিমান-পারের বেতার-বার্তা শুনছি ওই

    কণ্ঠে যদি গান থাকে গো পিঞ্জরে কেউ বন্ধ নই।

    চলায় তোমার ক্লান্তি তো নাই নিত্য তুমি ভ্রাম্যমান,

    তোমার পায়ে নিত্য নূতন দেশান্তরের বাজবে গান।

    বধূর মতন বিধুর হয়ে সুদূর তোমায় দেয় গো ডাক,

    তোমার মনের এপার থেকে উঠল কেঁদে চক্রবাক!

    ধ্যান ভেঙে যায় নবীন যোগী, ওপার পানে চায় নয়ন,

    মনের মানিক খুঁজে ফের বনের মাঝে সর্বক্ষণ।

    দূর-বিরহী, পার হয়ে যাও সাত সাগরের অশ্রুজল,

    আমরা বলি – যাত্রা তোমার সুন্দর হোক, হোক সফল!

    কলিকাতা,

    ৪ ফাল্গুন, ১৩৩৩

  • সত্যেন্দ্র-প্রয়াণ-গীতি

    সত্যেন্দ্র-প্রয়াণ-গীতি

    সত্যেন্দ্র-প্রয়াণ-গীতি

    চল-চঞ্চল বাণীর দুলাল এসে ছিল পথ ভুলে,
    ওগো
     এই গঙ্গার কূলে।
    দিশাহারা মাতা দিশা পেয়ে তাই নিয়ে গেছে কোলে তুলে
    ওগো
     এই গঙ্গার কূলে॥
    চপল চারণ বেণু-বীণে তার
    সুর বেঁধে শুধু দিল ঝংকার,
    শেষ গান গাওয়া হল নাকো আর
    উঠিল চিত্ত দুলে,
    তারই
    ডাক-নাম ধরে ডাকিল কে যেন অস্ত-তোরণ-মূলে,
    ওগো
     এই গঙ্গার কূলে॥
    ওরে
    এ ঝোড়ো হাওয়ায় কারে ডেকে যায় এ কোন সর্বনাশী
    বিষাণ কবির গুমরি উঠিল, বেসুরো বাজিল বাঁশি।
    আঁখির সলিলে ঝলসানো আঁখি
    কূলে কূলে ভরে ওঠে থাকি থাকি,
    মনে পড়ে কবে আহত এ-পাখি
    মৃত্যু-আফিম-ফুলে
    কোন
    ঝড়-বাদলের এমনই নিশীথে পড়েছিল ঘুমে ঢুলে
    এই গঙ্গার কূলে॥
    তার
    ঘরের বাঁধন সহিল না সে যে চির-বন্ধনহারা,
    তাই
    ছন্দ-পাগলে কোলে নিয়ে দোলে জননি মুক্তধারা!
    ও সে
    আলো দিয়ে গেল আপনারে দহি,
    অমৃত বিলাল বিষ-জ্বালা সহি,
    শেষে
    শান্তি মাগিল ব্যাথা-বিদ্রোহী
    চিতার অগ্নি-শূলে!
    পুনঃ
    নব-বীণা-করে আসিবে বলিয়া এই শ্যাম তরুমূলে।
    ওগো
     এই গঙ্গার কূলে॥

    কলিকাতা

    শ্রাবণ, ১৩২৯

  • সত্য-কবি

    সত্য-কবি

    সত্য-কবি

    অসত্য যত রহিল পড়িয়া, সত্য সে গেল চলে

    বীরের মতন মরণ-কারারে চরণের তলে দলে।

    যে-ভোরের তারা অরুণ-রবির উদয়-তোরণ-দোরে

    ঘোষিল বিজয়-কিরণশঙ্ক-আবার প্রথম ভোরে,

    রবির ললাট চুম্বিল যার প্রথম রশ্মি-টিকা,

    বাদলের বায়ে নিভে গেল হায়, দীপ্ত তাহারই শিখা!

    মধ্য গগনে স্তব্ধ নিশীথ, বিশ্ব চেতন-হারা,

    নিবিড় তিমির, আকাশ ভাঙিয়া ঝরিছে আকূল ধারা,

    গ্রহ শশী তারা কেউ জেগে নাই, নিভে গেছে সব বাতি,

    হাঁক দিয়ে ফেরে ঝড়-তুফানের উতরোল মাতামাতি!

    হেন দুর্দিনে বেদনা-শিখার বিজলি-প্রদীপ জ্বেলে

    কা্হারে খুঁজিতে কে তুমি নিশীথ-গগন-আঙনে এলে?

    বারে বারে তব দীপ নিবে যায়, জ্বালো তুমি বারে বারে,

    কাঁদন তোমার সে যেন বিশ্বপাতারে চাবুক মারে!

    কী ধন খুঁজিছ? কে তুমি সুনীল মেঘ-অবগুন্ঠিতা?

    তুমি কি গো সেই সবুজশিখার কবির দীপান্ধিতা?

    কী নেবে গো আর? ঐ নিয়ে যাও চিতার দু মুঠো ছাই!

    ডাক দিও নাকো, শূন্য এ ঘর, নাই গো সে আর নাই!

    ডাক দিযো নাকো, মূর্ছিতা মাতা ধুলায় পড়িয়া আছে,

    কাঁদি ঘুমায়েছে কান্তা কবির, জাগিয়া উঠিবে পাছে!

    ডাক দিও নাকো, শূন্য এ ঘর, নাই গো সে আর নাই,

    গঙ্গা-সলিলে ভাসিয়া গিয়াছে তাহার চিতার ছাই!

    আসিলে তড়ি়ৎ-তাঞ্জামে কে গো নভোতলে তুমি সতী?

    সত্য কবির সত্য জননি ছন্দ-সরস্বতী?

    ঝলসিয়া গেছে দুচোখ মা তার তোরে নিশিদিন ডাকি,

    বিদায়ের দিনে কন্ঠের তার গানটি গিয়াছে রাখি

    সাত কোটি এই ভগ্ন কন্ঠে; অবশেষে অভিমানী

    ভর-দুপুরেই খেলা ফেলে গেল কাঁদায়ে নিখিল প্রাণী!

    ডাকিছ কাহারে আকাশ-পানে ও ব্যাকুল দুহাত তুলে?

    কোল মিলেছে মা, শ্মশান-চিতায় ঐ ভাগীরথী-কূলে!

    ভোরের তারা এ ভাবিয়া পথিক শুধায় সাঁঝের তারায়,

    কাল যে আছিল মধ্য-গগন, আজি সে কোথায় হারায়?

    সাঁঝের তারা সে দিগন্তরের কোলে ম্লান চোখে চায়,

    অস্ততোরণপার সে দেখায় কিরণের ইশারায়।

    মেঘ-তাঞ্জাম চলে কার আর যায় কেঁদে যায় দেয়া,

    পরপার-পারাপারে বাঁধা কার কেতকী-পাতার খেয়া?

    হুতাশদিয়া ফেরে পুরবির বায়ু হরিৎ-হুরির দেশে

    জর্দা-পরির কনক-কেশর কদম্ববন-শেষে!

    প্রলাপ প্রলাপ প্রলাপ কবি সে আসিবে না আর ফিরে

    ক্রন্দন শুধু কাঁদিয়া ফিরিবে গঙ্গার তীরে তীরে!

    ‘তুলির লিখন’ লেখা যে এখনও অরুণ-রক্ত-রাগে,

    ফুল্ল্ হাসিছে ‘ফুলের ফসল’ শ্যামার সবজি-বাগে,

    আজিও ‘তীর্থরেণু ও সলিলে’ ‘মণি-মঞ্জুষা’ ভরা,

    ‘বেণু-বীণা’ আর ‘কুহু-কেকা’-রবে আজও শিহরায় ধরা,

    জ্বলিয়া উঠিল ‘অভ্র-আবিরি’ ফাগুয়ায় ‘হোমশিখা’,-

    বহ্নি-বাসরে টিটকিরি দিয়ে হাসিল ‘হসন্তিকা’—

    এত সব যার প্রাণ-উৎসব সেই আজ শুধু নাই,

    সত্যপ্রাণ সে রহিল অমর, মায়া যাহা হল ছাই!

    ভুল যাহা ছিল ভেঙে গেল মহাশূন্যে মিলাল ফাঁকা,

    সৃজন-দিনের সত্য যে, সে-ই রয়ে গেল চির-আঁকা!

    উন্নতশির কালজয়ী মহাকাল হয়ে জোড়াপাণি

    স্কন্ধে বিজয়-পতাকা তাহারই ফিরিবে আদেশ মানি!

    আপনারে সে যে ব্যাপিয়া রেখেছে আপন সৃষ্টি-মাঝে,

    খেয়ালি বিধির ডাক এল তাই চলে গেল আন- কাজে।

    ওগো যুগে-যুগে কবি, ও-মরণে মরেনি তোমার প্রাণ,

    কবির কন্ঠে প্রকাশ সত্য-সুন্দর ভগবান।

    ধরায় যে-বাণী ধরা নাহি দিল, যে-গান রহিল বাকি

    আবার আসিবে পূর্ণ করিতে, সত্য সে নহে ফাঁকি!

    সব বুঝি ওগো, হারা-ভীতু মোরা তবু ভাবি শুধু ভাবি,

    হয়ত যা গেল চিরকাল-তরে হারানু তাহার দাবি।

    তাই ভাবি,আজ যে-শ্যামার শিস খঞ্জন-নর্তন

    থেমে গেল, তাহা মাতাইবে পুন কোন নন্দন-বন!

    চোখে জল আসে, হে কবি-পাবক, হেন অসময়ে গেলে

    যখন এ-দেশে তোমারই মতন দরকার শত ছেলে।

    আষাঢ়-রবির তেজোপ্রদীপ্ত তুমি ধূমকেতু-জ্বালা,

    শিরে মণি-হার, কন্ঠে ত্রিশিরা ফণি-মনসার মালা,

    তড়িৎ-চাবুক করে ধরি তুমি আসিলে হে নির্ভীক,

    মরণ-শয়নে চমকি চাহিল বাঙালি নির্নিমিখ।

    বাঁশিতে তোমার বিষাণ-মন্দ্র রনরনি ওঠে, জয়

    মানুষের জয়, বিশ্বে দেবতা দৈত্য সে বড় নয়!

    করনি বরণ দাসত্ব তুমি আত্মা-অসম্মান,

    নোয়ায়নি মাথা চির-জাগ্রত ধ্রুব তব ভগবান,

    সত্য তোমার পর-পদানত হয়নিকো কভু, তাই

    বলদর্পীর দণ্ড তোমায় স্পর্শিতে পারে নাই!

    যশ-লোভী এই অন্ধ ভন্ড সঞ্জান ভীরু-দলে

    তুমিই একাকী রণ-দুন্দুভি বাজালে গভীর রোলে!

    মেকির বাজারে আমরণ তুমি রয়ে গেলে কবি খাঁটি,

    মাটির এ দেহ মাটি হল তব সত্য হল না মাটি।

    আঘাত না খেলে জাগে না যে-দেশ, ছিলে সে-দেশের চালক,

    বাণীর আসরে তুমি একা ছিলে তূর্যবাদক বালক।

    কে দিবে আঘাত?কে জাগাবে দেশ? কই সে সত্যপ্রাণ?

    আপনারে হেলা করি, করি মোরা ভগবানে আপমান।

    বাঁশি ও বিষাণ নিয়ে গেছ, আছে ছেঁড়া ঢোল ভাঙা কাঁসি,

    লোক-দেখানো এ আঁখির সলিলে লুকানো রয়েছে হাসি।

    যশের মানের ছিলে না কাঙাল, শেখনি খাতিরদারি!

    উচ্চকে তুমি তুচ্ছ করনি, হওনি রাজার দ্বারী।

    অত্যাচারকে বলনিকো দয়া, বলেছ অত্যাচার,

    গড় করনিকো নিগড়ের পায়, ভয়েতে মাননি হার।

    অটল অচল অগ্নিগর্ভ আাগ্নেয়-গিরি তুমি

    উরিয়া ধন্য করেছিলে এই ভীরুর জন্মভূমি।

    হে মহা-মৌনী, মরণেও তুমি মৌন-মাধুরী পিয়া

    নিয়েছ বিদায়, যাওনি মোদের ছল-করা গীতি নিয়া!

    তোমার প্রয়াণে উঠিল না কবি দেশে কল-কল্লোল,

    সুন্দর! শুধু জুড়িয়া বসিলে মাতা সারদার কোল।

    স্বর্গে বাদল মাদল বাজিল, বিজলি উঠিল মাতি,

    দেব-কুমারীরা হানিল বৃষ্টি-প্রসূন সারাটি রাতি।

    কে নাই জাগি, অর্গল-দেওয়া সকল কুটির- দ্বারে

    পুত্রহারার ক্রন্দন শুধু খুঁজিয়া ফিরিছে কারে!

    নিশীথ-শ্মশানে অভাগিনি এক শ্বেতবাস-পরি্যিতা,

    ভাবিছে তাহারই সিঁদুর মুছিয়া কে জ্বালাল ঐ চিতা!

    ভগবান! তুমি চাহিতে পার কি ঐ দুটি নারী পানে?

    জানি না, তোমায় বাঁচাবে কে যদি ওরা অভিশাপ হানে!

    কলিকাতা

    শ্রাবণ, ১৩২৯

  • সত্যেন্দ্র-প্রয়াণ

    সত্যেন্দ্র-প্রয়াণ

    সত্যেন্দ্র-প্রয়াণ

    আজ
    আষাঢ়-মেঘের কালো কাফনের আড়ালে মু-খানি ঢাকি
    আহা
    কে তুমি জননি কার নাম ধরে বারে বারে যাও ডাকি?
    মাগো কর হানি দ্বারে দ্বারে
    তুমি
    কোন হারামণি খুঁজিতে আসিলে ঘুম-সাগরের পারে?
    ‘কই রে সত্য, সত্যেন কই’ কাতর কান্না শুধু
    গগন-মরুর প্রাঙ্গণে হানে সাহারার হাহা ধুধু!
    সত্য অমর, কেঁদো না জননি, আসিবে আবার রবি,
    গিয়াছে বাণীর কমল-বনে মা, কমল তুলিতে কবি!
    ও কে
    ক্রন্দসী হায় মুরছিয়া পড়ে অশ্রু-সিন্ধুতীরে
    গেল
    সহসা নিশীথে বাণীর হাতের বেয়ালার তার ছিঁড়ে।
    আহা, কোন ভিখারিনি এরে
    কাহারে হারায়ে নিখিলের দ্বারে ফরিয়াদ করে ফেরে?
    সতীর কাঁদনে চোখ খুলে চায় ঊর্ধ্বে অরুন্ধতী,
    নিবিড় বেদনা ম্লান করে আনে রবির কনক-জ্যোতি।
    সত্য অমর, কাঁদিয়ো না সতী, আসিবে আবার রবি,
    গিয়াছে বাণীর কমল-কাননে কমল তুলিতে কবি!
    আজ
    সারথি হারায়ে বিষাদে অন্ধ ছন্দ-সরস্বতী,
    ওগো
    পুরোহিত-হারা ভারতী-দেউলে বন্ধ পূজা-আরতি।
    ওরে মৃত্যু-নিষাদ ক্রূর
    বিষাদ-শায়ক বিঁধিয়া করেছে বাংলার বুক চুর!
    নিভে গেল মঙ্গল-দীপশিখা, বঙ্গবাণীর আলো,
    দুলে দশদিকে শুধু দিশেহারা অশ্রু অতল কালো!
    ‘সত্য’ অমর! কাঁদিয়া না কবি, আসিবে আবার রবি,
    গিয়াছে বাণীর কমল-কাননে কমল তুলিতে কবি।
    শ্বেত
    বৈজয়ন্তী উড়ে চলে যায় মৃত্যুরও আগে আগে,
    ওরে
    সে চির-অমর, মৃত্যু আপনি তারই পায়ে প্রাণ মাগে।
    তাই ওই বাজে জয়-ভেরি
    স্বর্গ-দুয়ারে, ওঠে জয়ধ্বনি, ‘জয় সুত অমৃতেরই!’
    কাঁদিসনে মাগো, ওই তোর ছেলে মাতা সারদার কোলে
    শিশু হয়ে পুনঃ দুধ-হাসি হেসে তোরে ডেকে ডেকে দোলে!
    ‘সত্য’ অমর, কাঁদিয়ো না কেহ, আসিবে আবার রবি,
    মা বীণাপাণির সোহাগ আনিতে স্বর্গে গিয়াছে কবি।

    কলিকাতা,

    শ্রাবণ, ১৩২৯

  • দিল-দরদী

    দিল-দরদী

    দিল-দরদী

    [কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের ‘খাঁচার পাখি’ শীর্ষক করুণ কবিতাটি পড়িয়া]

    কে ভাই তুমি সজল গলায়

    গাইলে গজল আপসোসের?

    ফাগুন-বনের নিবল আগুন,

    লাগল সেথা ছাপ পোষের।

    দরদ-ভেজা কান্না-কাতর

    ছিন্ন তোমার স্বর শুনে

    ইরান মুলুক বিরান হল

    এমন বাহার-মরশুমে।

    সিস্তানের ঐ গুল-বাগিচা

    গুলিস্তান আর বোস্তানে

    সোস্ত হয়ে দখিন হাওয়া

    কাঁদল সে আপশোশ-তানে।

    এ কোন যিগর-পস্তানি সুর?

    মস্তানি সব ফুল-বালা

    ঝুরল, তাদের নাজুক বুকে

    বাজল ব্যথার শূল-জ্বালা।

    আব্‌ছা মনে পড়ছে, যে দিন

    শিরাজ-বাগের গুল ভুলি

    শ্যামল মেয়ের সোহাগ-শ্যামার

    শ্যাম হলে ভাই বুলবুলি, –

    কালো মেয়ের কাজল চোখের

    পাগল চাওয়ার ইঙ্গিতে

    মস্ত্ হয়ে কাঁকন চুড়ির

    কিঙ্কিণি রিন ঝিন গীতে।

    নাচলে দেদার দাদরা তালে,

    কারফাতে, সরফর্দাতে,–

    হাঠাৎ তোমার কাঁপল গলা

    ‘খাঁচার পাখি’ ‘গর্বাতে’।

    চৈতালিতে বৈকালি সুর

    গাইলে, “নিজের নই মালিক,

    আফ্‌সে মরি আপশোশে আহ্,

    আপ-সে বন্দী বৈতালিক।

    কাঁদায় সদাই ঘেরা-টোপের

    আঁধার ধাঁধায়, তায় একা,

    ব্যথার ডালি একলা সাজাই,

    সাথির আমার নাই দেখা।

    অসাড় জীবন, ঝাপসা দুচোখ

    খাঁচার জীবন একটানা।”

    অশ্রু আসে, আর কেন ভাই,

    ব্যথার ঘায়ে ঘা হানা?

    খুব জানি ভাই, ব্যর্থ জীবন

    ডুবায় যারা সংগীতেই,

    মরম-ব্যথা বুঝতে তাদের

    দিল-দরদী সঙ্গী নেই।

    জানতে কে চায় গানের পাখি

    বিপুল ব্যথার বুক ভরাট,

    সবার যখন নওরাতি, হায়,

    মোদের তখন দুঃখ-রাত!

    ওদের সাথি, মোদের রাতি

    শয়ন আনে নয়ন-জল;

    গান গেয়ে ভাই ঘামলে কপাল

    মুছতে সে ঘাম নাই অঞ্চল।

    তাই ভাবি আজ কোন দরদে

    পিষছে তোমার কলজে-তল?

    কার অভাব আজ বাজছে বুকে,

    কলজে চুঁয়ে গলছে জল!

    কাতর হয়ে পাথর-বুকে

    বয় যবে ক্ষীর-সুরধুনী,

    হোক তা সুধা, খুব জানি ভাই,

    সে সুধা ভরপুর-খুনই।

    আজ যে তোমার আঁকা-আঁশু

    কণ্ঠ ছিঁড়ে উছলে যায় –

    কতই ব্যথায়, ভাবতে যে তা

    জান ওঠে ভাই কচলে হায়!

    বসন্ত তো কতই এল,

    গেল খাঁচার পাশ দিয়ে,

    এল অনেক আশ নিয়ে, শেষ

    গেল দীঘল-শ্বাস নিয়ে।

    অনেক শারাব খারাব হল,

    অনেক সাকির ভাঙল বুক!

    আজ এল কোন দীপান্বিতা?

    কার শরমে রাঙল মুখ?

    কোন দরদি ফিরল? পেলে

    কোন হারা-বুক আলিঙ্গন?

    আজ যে তোমার হিয়ার রঙে

    উঠল রেঙে ডালিম-বন!

    যিগর-ছেঁড়া দিগর তোমার

    আজ কি এল ঘর ফিরে?

    তাই কি এমন কাশ ফুটেছে

    তোমার ব্যথার চর ফিরে?

    নীড়ের পাখি ম্লান চোখে চায়,

    শুনছে তোমার ছিন্ন সুর;

    বেলা-শেষের তান ধরেছে

    যখন তোমার দিন দুপুর!

    মুক্ত আমি পথিক-পাখি

    আনন্দ-গান গাই পথের,

    কান্না-হাসির বহ্নি-ঘাতের

    বক্ষে আমার চিহ্ন ঢের;

    বীণ ছাড়া মোর একলা পথের

    প্রাণের দোসর অধিক নাই,

    কান্না শুনে হাসি আমি,

    আঘাত আমার পথিক-ভাই।

    বেদনা-ব্যথা নিত্য সাথি,–

    তবু ভাই ওই সিক্ত সুর,

    দুচোখ পুরে অশ্রু আনে

    উদাস করে চিত্ত-পুর!

    ঝাপসা তোমার দুচোখ শুনে

    সুরাখ হল কলজেতে,

    নীল পাথারের সাঁতার পানি

    লাখ চোখে ভাই গলছে যে!

    বাদশা-কবি! সালাম জানায়

    ভক্ত তোমার অ-কবি,

    কইতে গিয়ে অশ্রুতে মোর

    কথা ডুবে যায় সবই!

    কলিকাতা,

    আশ্বিন, ১৩২৮

  • ইন্দু-প্রয়াণ

    ইন্দু-প্রয়াণ

    ইন্দু-প্রয়াণ

    [কবি শরদিন্দু রায়ের অকালমৃত্যু উপলক্ষ্যে]

    বাঁশির দেবতা! লভিয়াছ তুমি হাসির অমর-লোক,

    হেথা মর-লোকে দুঃখী মানব করিতেছি মোরা শোক!

    অমৃত-পাথারে ডুব দিলে তুমি ক্ষীরোদ-শয়ন লভি,

    অনৃতের শিশু মোরা কেঁদে বলি, মরিয়াছ তুমি কবি!

    হাসির ঝঞ্ঝা লুটায়ে পড়েছে নিদাঘের হাহাকারে,

    মোরা কেঁদে বলি, কবি খোয়া গেছে অস্ত-খেয়ার পারে!

    আগুন-শিখায় মিশেছে তোমার ফাগুন-জাগানো হাসি,

    চিতার আগুনে পুড়ে গেছ ভেবে মোরা আঁখি-জলে ভাসি।

    অনৃত তোমার যাহা কিছু কবি তাই হয়ে গেছে ছাই,

    অমৃত তোমার অবিনাশী যাহা আগুনে তা পুড়ে নাই।

    চির-অতৃপ্ত তবু কাঁদি মোরা, ভরে না তাহাতে বুক,

    আজ তব বাণী আন্-মুখে শুনি, তুমি নাই, তুমি মূক।

    অতি-লোভী মোরা পাই না তৃপ্তি সুরভিতে শুধু ভাই,

    সুরভির সাথে রূপ-ক্ষুধাতুর ফুলেরও পরশ চাই।

    আমরা অনৃত তাই তো অমৃতে ভরে ওঠে নাকো প্রাণ,

    চোখে জল আসে দেখিয়া ত্যাগীর আপনা-বিলানো দান।

    তরুণের বুকে হে চির-অরুণ ছড়ায়েছ যত লালি,

    সেই লালি আজ লালে লাল হয়ে কাঁদে, খালি সব খালি!

    কাঁদায়ে গিয়াছ, নবরূপ ধরে হয়তো আসিবে ফিরে,

    আসিয়া আবার আধ-গাওয়া গান গাবে গঙ্গারই তীরে,

    হয়তো তোমায় চিনিব না, কবি, চিনিব তোমার বাঁশি,

    চিনিব তোমার ওই সুর আর চল-চঞ্চল হাসি।

    প্রাণের আলাপ আধ-চেনাচেনি দূরে থেকে শুধু সুরে,

    এবার হে কবি, করিব পূর্ণ ওই চির-কবি-পুরে।…

    ভালই করেছ ডিঙিয়া গিয়াছ নিত্য এ কারাগার,

    সত্য যেখানে যায় নাকো বলা, গৃহ নয় সে তোমার।

    গিয়াছ যেখানে শাসনে সেখানে নহে নিরুদ্ধ বাণী,

    ভক্তের তরে রাখিয়ো সেখানে আধেক আসনখানি।

    বন্দী যেখানে শুনিবে তোমার মুক্তবদ্ধ সুর,–

    গঙ্গার কূলে চাই আর ভাবি কোথা সেই থসুর-পুর!

    গণ্ডির বেড়ি কাটিয়া নিয়াছ অনন্তরূপ টানি,

    কারও বুকে আছ মূর্তি ধরিয়া, কারও বুকে আছ বাণী।

    সে কি মরিবার? ভাঙি অনিত্যে নিত্য নিয়াছ বরি,

    ক্ষমা করো কবি, তবু লোভী মোরা শোক করি, কেঁদে মরি।

    না-দেখা ভেলায় চড়িয়া হয়তো আজিও সন্ধ্যাবেলা

    গঙ্গার কুলে আসিয়া হাসিছ দেখে আমাদের খেলা!

    হউক মিথ্যা মায়ার খেলা এ তবুও করিব শোক,

    ‘শান্তি হউক’ বলি যুগে যুগে ব্যথায় মুছিব চোখ!

    আসিবে আবারও নিদাঘ-শেষের বিদায়ের হাহাকার,

    শাঙনের ধারা আনিবে স্মরণে ব্যাথা-অভিষেক তার।

    হাসি নিষ্ঠুর যুগে যুগে মোরা স্নিগ্ধ অশ্রু দিয়া,

    হাসির কবিরে ডাকিব গভীরে শোক-ক্রন্দন নিয়া।

    বহরমপুর জেল,

    শ্রাবণ, ১৩৩০

  • অশ্বিনীকুমার

    অশ্বিনীকুমার

    অশ্বিনীকুমার

    আজ যবে প্রভাতের নব যাত্রীদল

    ডেকে গেল রাত্রিশেষে, ‘চল আগে চল’, –

    ‘চল আগে চল’ গাহে ঘুম-জাগা পাখি,

    কুয়াশা-মশারি ঠেলে জাগে রক্ত-আঁখি

    নবারুণ নব আশা। আজি এই সাথে,

    এই নব জাগরণ-আনা নব প্রাতে

    তোমারে স্মরিনু বীর প্রাতঃস্মরণীয়!

    স্বর্গ হতে এ স্মরণ-প্রীতি অর্ঘ্য নিও!

    নিও নিও সপ্তকোটি বাঙালির তব

    অশ্রু-জলে স্মৃতি-পূজা অর্ঘ্য অভিনব!

    আজও তারা ক্রীতদাস, আজও বদ্ধ-কর

    শৃঙ্খল-বন্ধনে দেব! আজও পরস্পর

    করে তারা হানাহানি, ঈর্ষা-অস্ত্রে যুঝি

    ছিটায় মনের কালি-নিরস্ত্রের পুঁজি!

    মন্দভাষ গাঢ় মসি দিব্য অস্ত্র তার!

    ‘দুই-সপ্ত কোটি ধৃত খর তরবার’

    সে শুধু কেতাবি কথা, আজও সে স্বপন!

    সপ্তকোটি তিক্ত জিহ্বা বিষ-রসায়ন

    উদ্গারিছে বঙ্গে নিতি, দগ্ধ হল ভূমি!

    বঙ্গে আজ পুষ্প নাই, বিষ লহো তুমি!

    কে করিবে নমস্কার! হায় যুক্তকর

    মুক্ত নাহি হল আজও! বন্ধন-জর্জর

    এ কর পারে না দেব ছুঁইতে ললাট!

    কে করিবে নমস্কার?

    কে করিবে পাঠ

    তোমার বন্দনা-গান? রসনা অসাড়!

    কথা আছে বাণী নাই ছন্দে নাচে হাড়!

    ভাষা আছে আশা নাই, নাই তাহে প্রাণ,

    কে করিবে এই জাতিরে নবমন্ত্র দান!

    অমৃতের পুত্র কবি অন্নের কাঙাল,

    কবি আর ঋষি নয়, প্রাণের আকাল

    করিয়াছে হেয় তারে! লেখনী ও কালি

    যত না সৃজিছে কাব্য ততোধিক গালি!

    কণ্ঠে যার ভাষা আছে অন্তরে সাহস,

    সিংহের বিবরে আজ পড়ে সে অবশ!

    গর্দান করিয়া উঁচু যে পারে গাহিতে

    নব জীবনের গান, বন্ধন-রশিতে

    চেপে আছে টুঁটি তার! জুলুম-জিঞ্জির

    মাংস কেটে বসে আছে, হাড়ে খায় চিড়

    আর্ত প্রতিধ্বনি তার! কোথা প্রতিকার!

    যারা আছে—তারা কিছু না করে নাচার!

    নেহারিব তোমারে যে শির উঁচু করি,

    তাও নাহি পারি, দেব! আইনের ছড়ি

    মারে এসে গুপ্ত চেড়ী। যাইবে কোথায়!

    আমার চরণ নহে মম বশে, হায়!

    এক ঘর ছাড়ি আর ঘরে যেতে নারি,

    মর্দজাতি হয়ে আছে পর্দা-ঘেরা নারী!

    এ লাঞ্ছনা, এ পীড়ন, এ আত্মকলহ,

    আত্মসুখপরায়ণ পরাবৃত্তি মোহ–

    তব বরে দূর হোক! এ জাতির ’পরে

    হে যোগী, তোমার যেন আশীর্বাদ ঝরে!

    যে-আত্মচেতনা-বলে যে আত্মবিশ্বাসে

    যে-আত্মশ্রদ্ধার জোরে জীবন উচ্ছ্বাসে

    উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠে মরা জাতি বাঁচে,

    যোগী, তব কাছে জাতি সেই শক্তি যাচে!

    স্বর্গে নহে, আমাদের অতি কাছাকাছি

    আছ তুমি হে তাপস, তাই মোরা যাচি

    তব বর, শক্তি তব! জেনেছিলে তুমি

    স্বর্গাদপি গরীয়সী এই বঙ্গভূমি!

    দিলে ধর্ম, দিলে কর্ম, দিলে ধ্যান জ্ঞান,

    তবু সাধ মিটিল না, দিলে বলিদান

    আত্মারে জননি-পদে, হাঁকিলে, ‘মাভৈঃ!

    ভয় নাই, নব দিনমণি ওঠে ওই!

    ওরে জড়, ওঠ্ তোরা!’ জাগিল না কেউ,

    তোমারে লইয়া গেল পারাপারী ঢেউ।

    অগ্রে তুমি জেগেছিলে অগ্রজ শহীদ,

    তুমি ঋষি, শুভ প্রাতে টুটেছিল নিদ,

    তব পথে যাত্রী যারা রাত্রি-দিবা ধরি

    ঘুমাল গভীর ঘুম, আজ তারা মরি

    বেলাশেষে জাগিয়াছে! সম্মুখে সবার

    অনন্ত তমিস্রাঘোর দুর্গম কান্তার!

    পশ্চাতে ‘অতীত’ টানে জড় হিমালয়,

    সংশয়ের ‘বর্তমান’ অগ্রে নাহি হয়,

    তোমা-হারা দেখে তারা অন্ধ ‘ভবিষ্যৎ’,

    যাত্রী ভীরু, রাত্রি গুরু, কে দেখাবে পথ!

    হে প্রেমিক, তব প্রেম বরিষায় দেশে

    এল ঢল বীরভূমি বরিশাল ভেসে।

    সেই ঢল সেই জল বিষম তৃষায়

    যাচিছে ঊষর বঙ্গ তব কাছে হায়!

    পীড়িত এ বঙ্গ পথ চাহিছে তোমার,

    অসুর নিধনে কবে আসিবে আবার!

    হুগলি,

    মাঘ, ১৩৩২

  • হেমপ্রভা

    হেমপ্রভা

    হেমপ্রভা

    কোন অতীতের আঁধার ভেদিয়া

    আসিলে আলোক-জননী।

    প্রভায় তোমার উদিল প্রভাত

    হেম-প্রভ হল ধরণী॥

    ভগ্ন দুর্গে ঘুমায়ে রক্ষী

    এলে কি মা তাই বিজয়-লক্ষ্মী,

    ‘মেয়্ ভুখা হুঁ’-র ক্রন্দন-রবে

    নাচায়ে তুলিলে ধমনী॥

    এসো বাংলার চাঁদ-সুলতানা

    বীর-মাতা বীর-জায়া গো॥

    তোমাতে পড়েছে সকল কালের

    বীর-নারীদের ছায়া গো॥

    শিব-সাথে সতী শিবানী সাজিয়া

    ফিরিছ শ্মশানে জীবন মাগিয়া,

    তব আগমনে নব-বাংলার

    কাটুক আঁধার রজনী॥

    মাদারীপুর,

    ২৯ ফাল্গুন, ১৩৩২

  • বাংলার মহাত্মা

    বাংলার মহাত্মা

    বাংলার মহাত্মামা

    (গান)

    আজ
    না-চাওয়া পথ দিয়ে কে এলে
    কংস-কারার দ্বার ঠেলে।
    আজ
    শব-শ্মশানে শিব নাচে ঐ ফুল-ফুটানো পা ফেলে॥
    আজ
    প্রেম-দ্বারকায় ডেকেছে বান
    মরুভূমে জাগল তুফান,
    দিগ‍্‍বিদিকে উপচে পড়ে প্রাণ রে!
    তুমি
    জীবন-দুলাল সব লালে-লাল করলে প্রাণের রং ঢেলে॥
    শ্রাবস্তি-ঢল আসল নেমে
    আজ ভারতের জেরুজালেমে
    মুক্তি-পাগল এই প্রেমিকের প্রেমে রে‌!
    ওরে
    আজ নদীয়ার শ্যাম নিকুঞ্জে রক্ষ-অরি রাম খেলে॥
    চরকা-চাকায় ঘর্ঘরঘর
    শুনি কাহার আসার খবর,
    ঢেউ-দোলাতে দোলে সপ্ত সাগর রে!
    পথের ধুলা ডেকেছে আজ সপ্ত কোটি প্রাণ মেলে।
    আজ
    জাত-বিজাতের বিভেদ ঘুচি,
    এক হল ভাই বামুন-মুচি,
    প্রেম-গঙ্গায় সবাই হল শুচি রে!
    আয়
    এই যমুনায় ঝাঁপ দিবি কে বন্দেমাতরম বলে–
    ওরে
      সব মায়ায় আগুন জ্বেলে॥

    হুগলি,

    জ্যৈষ্ঠ, ১৩৩১

  • বিদায়-মাভৈঃ

    বিদায়-মাভৈঃ

    বিদায়-মাভৈঃ

    বিদায়-রবির করুণিমায় অবিশ্বাসীর ভয়,

    বিশ্বাসী! বলো আসবে আবার প্রভাত-রবির জয়!

    খণ্ড করে দেখছে যারা অসীম জীবনটাই,

    দুঃখ তারাই করুক বসে, দুঃখ মোদের নাই।

    আমরা জানি, অস্ত-খেয়ায় আসছে রে উদয়।

    বিদায়-রবির করুণিমায় অবিশ্বাসীর ভয়॥

    হারাই-হারাই ভয় করেই না হারিয়ে দিলি সব!

    মরার দলই আগলে মড়া করছে কলরব।

    ঘরবাড়িটাই সত্য শুধু নয় কিছুতেই নয়।

    বিদায়-রবির করুণিমায় অবিশ্বাসীর ভয়॥

    দৃষ্টি-অচিন দেশের পরেও আছে চিনা দেশ,

    এক নিমেষের নিমেষ-শেষটা নয়কো অশেষ শেষ।

    ঘরের প্রদীপ নিবলে বিধির আলোক-প্রদীপ রয়।

    বিদায়-রবির করুণিমায় অবিশ্বাসীর ভয়॥

    জয়ধ্বনি উঠবে প্রাচীন চিনের প্রাচীরে,

    অস্ত-ঘাটে বসে আমি তাই তো নাচি রে।

    বিদায়-পাতা আনবে ডেকে নবীন কিশলয়,

    বিশ্বাসী! বল আসবে আবার প্রভাত-রবির জয়॥

    কলিকাতা

    চৈত্র, ১৩৩০

  • সাবধানী ঘণ্টা

    সাবধানী ঘণ্টা

    সাবধানী ঘণ্টা

    রক্তে আমার লেগেছে আবার সর্বনাশের নেশা।

    রুধির-নদীর পার হতে ঐ ডাকে বিপ্লব-হ্রেষা!

    বন্ধু গো, সখা, আজি এই নব জয়-যাত্রার আগে

    দ্বেষ-পঙ্কিল হিয়া হতে তব শ্বেত পঙ্কজ মাগে

    বন্ধু তোমার; দাও দাদা দাও তব রূপ-মসি ছানি

    অঞ্জলি ভরি শুধু কুৎসিত কদর্যতার গ্লানি!

    তোমার নীচতা, ভীরুতা তোমার, তোমার মনের কালি

    উদ্গারো সখা বন্ধুর শিরে; তব বুক হোক খালি!

    সুদূর বন্ধু, দূষিত দৃষ্টি দূর করো, চাহো ফিরে,

    শয়তানে আজ পেয়েছে তোমায়, সে যে পাঁক ঢালে শিরে!

    চিরদিন তুমি যাহাদের মুখে মারিয়াছ ঘৃণা-ঢেলা,

    যে ভোগানন্দ দাসেদেরে গালি হানিয়াছ দুই বেলা,

    আজি তাহাদেরই বিনামার তলে আসিয়াছ তুমি নামি!

    বাঁদরেরে তুমি ঘৃণা করে ভালবাসিয়াছ বাঁদরামি!

    হে অস্ত্রগুরু! আজি মম বুকে বাজে শুধু এই ব্যথা,

    পাণ্ডবে দিয়া জয়কেতু, হলে কুক্কুর-কুরু-নেতা!

    ভোগ-নরকের নারকীয় দ্বারে হইয়াছ তুমি দ্বারী,

    হারামানন্দে হেরেমে ঢুকেছ হায় হে ব্রহ্মচারী!

    তোমার কৃষ্ণ রূপ-সরসীতে ফুটেছে কমল কত,

    সে কমল ঘিরি নেচেছে মরাল কত সহস্র শত,–

    কোথা সে দিঘীর উচ্ছল জল, কোথা সে কমল রাঙা,

    হেরি শুধু কাদা, শুকায়েছে জল, সরসীর বাঁধ ভাঙা!

    সেই কাদা মাখি চোখে মুখে তুমি সাজিয়াছ ছি ছি সং,

    বাঁদর-নাচের ভালুক হয়েছ, হেসে মরি দেখে ঢং।

    অন্ধকারের বিবর ছাড়িয়া বাহিরিয়া এস দাদা,

    হেরো আরশিতে–বাঁদরের বেদে করেছে তোমায় খ্যাঁদা!

    মিত্র সাজিয়া শত্রু তোমারে ফেলেছে নরকে টানি,

    ঘৃণার তিলক পরাল তোমারে স্তাবকের শয়তানি!

    যাহারা তোমারে বাসিয়াছে ভাল, করিয়াছে পূজা নিতি,

    তাহাদের হানে অতি লজ্জার ব্যথা আজ তব স্মৃতি।

    নপুংসক ঐ শিখণ্ডী আজ রথের সারথি তব,–

    হানো বীর তব বিদ্রুপ-বাণ, সব বুক পেতে লব

    ভীষ্মের সম; যদি তাহে শর-শয়নের বর লভি,

    তুমি যত বল আমিই সে-রণে জিতিব অস্ত্র-কবি!

    তুমি জান, তুমি সম্মুখ রণে পারিবে না পরাজিতে,

    আমি তব কাল যশোরাহু সদা শঙ্কা তোমার চিতে,

    রক্ত-অসির কৃষ্ণ মসির যে কোনো যুদ্ধে, ভাই,

    তুমি নিজে জান তুমি অশক্ত, করিয়াছ শুরু তাই

    চোরা-বাণ ছোঁড়া বেল্লিকপনা বিনামা আড়ালে থাকি

    ন্যক্কার-আনা নপুংসকেরে রথ-সম্মুখে রাখি।

    হেরো সখা আজ চারিদিক হতে ধিক্কার অবিরত

    ছি ছি বিষ ঢালি জ্বালায় তোমার পুরানো প্রদাহ-ক্ষত!

    আমারে যে সবে বাসিয়াছে ভাল, মোর অপরাধ নহে!

    কালীয়-দমন উদিয়াছে মোর বেদনার কালীদহে–

    তাহার দাহ তো তোমারে দহেনি, দহেছে যাদের মুখ

    তাহারা নাচুক জ্বলুনির চোটে। তুমি পাও কোন সুখ?

    দগ্ধ-মুখ সে রাম-সেনাদলে নাচিয়া হে সেনাপতি!

    শিব সুন্দর সত্য তোমার লভিল একী এ গতি?

    যদিই অসতী হয় বাণী মোর, কালের পরশুরাম

    কঠোর কুঠারে নাশিবে তাহারে, তুমি কেন বদনাম

    কিনিছ বন্ধু, কেন এত তব হিয়া দগদগি জ্বালা?–

    হোলির রাজা কে সাজাল তোমারে পরায়ে বিনামা-মালা?

    তোমার গোপন দুর্বলতারে, ছি ছি করে মসিময়

    প্রকাশিলে, সখা, এইখানে তব অতি বড় পরাজয়।

    শতদল-দলে তুমি যে মরাল শ্বেত-সায়রের জলে।

    ওঠো সখা, বীর, ঈর্ষা-পঙ্ক-শয়ন ছাড়িয়া পুনঃ,

    নিন্দার নহ, নান্দীর তুমি, উঠিতেছে বাণী শুন।

    ওঠো সখা, ওঠো, লহো গো সালাম, বেঁধে দাও হাতে রাখি,

    ঐ হেরো শিরে চক্কর মারে বিপ্লব-বাজপাখি!

    অন্ধ হয়ো না, বেত্র ছাড়িয়া নেত্র মেলিয়া চাহো–

    ঘনায় আকাশে অসন্তোষের নিদারুণ বারিবাহ।

    দোতালায় বসি উতাল হয়ো না শুনি বিদ্রোহ-বাণী,

    এ নহে কৌরব, এ কাঁদন উঠে নিখিল-মর্ম ছানি।

    বিদ্রুপ করি উড়াইবে এই বিদ্রোহ-তেঁতো জ্বালা?

    সুরের তোমরা কী করিবে তবু হবে কান ঝালাপালা

    অসুরের ভীম অসি-ঝনঝনে, বড় অসোয়াস্তি-কর!

    বন্ধু গো, এত ভয় কেন? আছে তোমার আকাশ-ঘর!

    অর্গল এঁটে সেথা হতে তুমি দাও অনর্গল গালি,

    গোপীনাথ মলো? সত্য কি? মাঝে মাঝে দেখো তুলি জালি!

    বারীন ঘোষের দ্বীপান্তর আর মির্জাপুরের বোমা,

    লাল বাংলার হুমকানি,–ছি ছি, এত অসত্য ওমা,

    কেমন করে যে রটায় এ সব ঝুটা বিদ্রোহী দল!

    সখী গো, আমায় ধরো ধরো! মাগো, কত জানে এরা ছল!

    সই লো, আমার কাতুকুতু ভাব হয়েছে যে, ঢলে পড়ি!

    আঁচলে জড়ায়ে পা চলে না গো, হাত হতে পড়ে ছড়ি!

    শ্রমিকের গাঁতি, বিপ্লব-বোমা, আ ম’লো তোমরা মরো!

    যত সব বাজে বাজখাঁই সুর, মেছুনি-বৃত্তি ধরো!

    যারা করে বাজে সুখভোগ ত্যাগ, আর রাজরোষে মরে,

    ঐ বোকাদের ইতর ভাষায় গালি দাও খুব করে।

    এই ইতরামি, বাঁদরামি-আর্ট আষ্টেপৃষ্টে বেঁধে

    হন্যে কুকুর পেট পালো আর হাউ হাউ মরো কেঁদে?

    এই নোংরামি করে দিনরাত বল আর্টের জয়!

    আর্ট মানে শুধু বাঁদরামি আর মুখ ভ্যাংচানো নয়!

    আপনার নাক কেটে দাদা এই পরের যাত্রা ভাঙা

    ইহাই হইল আদর্শ আর্ট, নাকি-সুর, কান রাঙা!

    আর্ট ও প্রেমের এই সব মেড়ো মাড়োয়ারি দলই জানে,

    কোন বিদ্রোহ অসন্তোষের রেখা নাই কোনখানে!

    সব ভুয়ো দাদা, ও-সবে দেশের কিছুই হইবে নাকো,

    এমনই করিয়া জুতো খাও আর মলমল-মল মাখো!–

    জ্ঞান-অঞ্জন-শলাকা তৈরি হতেছে এদের তরে,

    দেখিবে এদের আর্টের আঁটুনি একদিনে গেছে ছড়ে!

    বন্ধু গো! সখা! আঁখি খোলো, খোলো শ্রবণ হইতে তুলা,

    ঐ হেরো পথে গুর্খা-সেপাই উড়াইয়া যায় ধুলা!

    ঐ শোনো আজ ঘরে ঘরে কত উঠিতেছে হাহাকার,

    ভূধর প্রমাণ উদরে তোমার এবার পড়িবে মার!

    তোমার আর্টের বাঁশরির সুরে মুগ্ধ হবে না এরা,

    প্রয়োজন-বাঁশে তোমার আর্টের আটশালা হবে ন্যাড়া!

    প্রেমও আছে সখা, যুদ্ধও আছে, বিশ্ব এমনই ঠাঁই,

    ভাল নাহি লাগে, ভাল ছেলে হয়ে ছেড়ে যাও, মানা নাই!

    আমি বলি সখা, জেনে রেখো মনে কোন বাতায়ন-ফাঁকে

    সজিনার ঠ্যাঙা সজনিরই মত হাতছানি দিয়ে ডাকে।

    যত বিদ্রুপই করো সখা, তুমি জান এ সত্য-বাণী,

    কারুর পা চেটে মরিব না; কোন প্রভু পেটে লাথি হানি

    ফাটাবে না পিলে, মরিব যেদিন মরিব বীরের মত,

    ধরা-মা’র বুকে আমার রক্ত রবে হয়ে শাশ্বত!

    আমার মৃত্যু লিখিবে আমার জীবনের ইতিহাস!

    ততদিন সখা সকলের সাথে করে নাও পরিহাস!

    কলিকাতা

    কার্তিক, ১৩৩২

  • মুক্তিকাম

    মুক্তিকাম

    মুক্তিকাম

    স্বাগত বঙ্গে মুক্তিকাম!

    সুপ্ত বঙ্গে জাগুক আবার লুপ্ত স্বাধীন সপ্তগ্রাম!

    শোনাও সাগর-জাগর সিন্ধু-ভৈরবী গান ভয়-হরণ,–

    এ যে রে তন্দ্রা, জেগে ওঠ তোরা, জেগে ঘুম দেওয়া নয় মরণ!

    সপ্ত-কোটি কু-সন্তান তোরা রাখিতে নারিলি সপ্তগ্রাম?

    খাসনি মায়ের বুকের রুধির? হালাল খাইয়া হলি হারাম!

    মৃত্যু-ভূতকে দেখিলি রে শুধু, দেখিলি না তোরা ভবিষ্যৎ,

    অস্ত-আঁধার পার হয়ে আসে নিত্য প্রভাতে রবির রথ!

    অহোরাত্রিকে দেখেছে যাহারা সন্ধ্যাকে তারা করে না ভয়,

    তারা সোজা জানে রাত্রির পরে আবার প্রভাত হবে উদয়।

    দিন-কানা তোরা আঁধারের প্যাঁচা, দেখেছিস শুধু মৃত্যু-রাত,

    ওরে আঁখি খোল, দেখ তোরও দ্বারে এসেছে জীবন নব-প্রভাত!

    মৃত্যুর ‘ভয়’ মেরেছে তোদেরে, মৃত্যু তোদেরে মারেনি, ভাই!

    তোরা মরে তাই হয়েছিস ভূত, আলোকের দূত হলিনে তাই!

    জীবন থাকিতে ‘মরে আছি’ বলে পড়িয়া আছিস মড়া-ঘাটে,

    সিন্ধু-শকুন নেমেছে রে তাই তোদের প্রাণের রাজ-পাটে!

    রক্ত মাংস খেয়েছে তোদের, কঙ্কাল শুধু আছে বাকি,

    ওই হাড় নিয়ে উঠে দাঁড়া তোরা ‘আজও বেঁচে আছি’ বল ডাকি!

    জীবনের সাড়া যেই পাবে, ভয়ে সিন্ধু-শকুন পালাবে দূর,

    ওই হাড়ে হবে ইন্দ্র-বজ্র, দগ্ধ হবে রে বৃত্রাসুর!

    এ মৃতের দেশে, অমৃত-পুত্র, আনিবে কি সেই অমৃত-ঢল –

    যাতে প্রাণ পেয়ে মৃত সগরের দেশ এ বঙ্গ হবে সচল?

    জ্যান্তে-মরা এ ভীরুর ভারতে চাই নাকো মৃত-সঞ্জীবন,

    ক্লীবের জীবন-সুধা আনো, করো ভূতের ভবিষ্যৎ সৃজন!

    হুগলি

    ২০ পৌষ, ১৩৩১

  • আশীর্বাদ

    আশীর্বাদ

    আশীর্বাদ

    কল্যাণীয়া শামসুন নাহার খাতুন

    জয়যুক্তাসু

    শত নিষেধের সিন্ধুর মাঝে অন্তরালের অন্তরীপ

    তারই বুকে নারী বসে আছে জ্বালি বিপদ-বাতির সিন্ধু-দীপ।

    শাশ্বত সেই দীপান্বিতার দীপ হতে আঁখি-দীপ ভরি

    আসিয়াছ তুমি অরুণিমা-আলো প্রভাতি তারার টিপ পরি।

    আপনার তুমি জান পরিচয় – তুমি কল্যাণী তুমি নারী –

    আনিয়াছ তাই ভরি হেম-ঝারি মরু-বুকে জমজম-বারি।

    অন্তরিকার আঁধার চিরিয়া প্রকাশিলে তব সত্য-রূপ –

    তুমি আছ, আছে তোমারও দেবার, তব গেহ নহে অন্ধ-কূপ।

    তুমি আলোকের – তুমি সত্যের – ধরার ধুলায় তাজমহল, –

    রৌদ্র-তপ্ত আকাশের চোখে পরালে স্নিগ্ধ নীল কাজল!

    আপনারে তুমি চিনিয়াছ যবে, শুধিয়াছ ঋণ, টুটেছে ঘুম,

    অন্ধকারের কুঁড়িতে ফুটেছ আলোকের শতদল-কুসুম।

    বদ্ধ কারার প্রকারে তুলেছ বন্দিনীদের জয়-নিশান –

    অবরোধ রোধ করিয়াছে দেহ, পারেনি রুধিতে কণ্ঠে গান।

    লহো স্নেহাশিস – তোমার ‘পুণ্যময়ী’র ‘শাম‍্‍স্1’ পুণ্যালোক

    শাশ্বত হোক! সুন্দর হোক! প্রতি ঘরে চির-দীপ্ত রোক।

    হুগলি,

    ১৯ মাঘ, ১৩৩১

  • প্রবর্তকের ঘুর-চাকায়

    প্রবর্তকের ঘুর-চাকায়

    প্রবর্তকের ঘুর-চাকায়

    যায় মহাকাল মূর্ছা যায়

    প্রবর্তকের ঘুর-চাকায়

    যায় অতীত

    কৃষ্ণ-কায়

    যায় অতীত

    রক্ত-পায়—

    যায় মহাকাল মূর্ছা যায়

    প্রবর্তকের ঘুর-চাকায়!

    প্রবর্তকের ঘুর-চাকায়!

    যায় প্রবীণ

    চৈতি-বায়

    আয় নবীন-

    শক্তি আয়!

    যায় অতীত

    যায় পতিত,

    ‘আয় অতিথ,

    আয় রে আয় –’

    বৈশাখী-ঝড় সুর হাঁকায় –

    প্রবর্তকের ঘুর-চাকায়

    প্রবর্তকের ঘুর-চাকায়!

    ওই রে দিক্-

    চক্রে কার

    বক্রপথ

    ঘুর-চাকার!

    ছুটছে রথ,

    চক্র-ঘায়

    দিগ্‌বিদিক

    মূর্ছা যায়!

    কোটি রবি শশী ঘুর-পাকায়

    প্রবর্তকের ঘুর-চাকায়

    প্রবর্তকের ঘুর-চাকায়!

    ঘোরে গ্রহ তারা পথ-বিভোল, –

    ‘কাল’-কোলে ‘আজ’খায় রে দোল!

    আজ প্রভাত

    আনছে কায়,

    দূর পাহাড়-

    চূড় তাকায়।

    জয়-কেতন

    উড়ছে কার

    কিংশুকের

    ফুল-শাখায়।

    ঘুরছে রথ,

    রথ-চাকায়

    রক্ত-লাল

    পথ আঁকায়।

    জয়-তোরণ

    রচছে কার

    ঐ উষার

    লাল আভায়,

    প্রবর্তকের ঘুর-চাকায়

    প্রবর্তকের ঘুর-চাকায়।

    গর্জে ঘোর

    ঝড় তুফান

    আয় কঠোর

    বর্তমান।

    আয় তরুণ

    আয় অরুণ

    আয় দারুণ,

    দৈন্যতায়!

    ভয় কী আয়!

    ঐ মা অভয়-হাত দেখায়

    রামধনুর

    লাল শাঁখায়!

    প্রবর্তকের ঘুর-চাকায়

    প্রবর্তকের ঘুর-চাকায়!

    বর্ষ-সতী-স্কন্ধে ঐ

    নাচছে কাল

    থই তা থই

    কই সে কই

    চক্রধর,

    ঐ মায়ায়

    খণ্ড কর।

    শব-মায়ায়

    শিব যে যায়

    ছিন্ন কর

    ঐ মায়ায় —

    প্রবর্তকের ঘুর-চাকায়

    প্রবর্তকের ঘুর-চাকায়!

    কৃষ্ণনগর,

    ৩০ চৈত্র, ১৩৩২