Category: কাজী নজরুল ইসলাম

  • দুরন্ত পথিক

    দুরন্ত পথিক

    দুরন্ত পথিক

    [কথিকা]

    সে চলিতেছিল দুর্গম কাঁটা-ভরা পথ দিয়ে। পথ চলিতে চলিতে সে একবার পিছন ফিরিয়া দেখিল, লক্ষ আঁখি অনিমিষে তাহার দিকে চাহিয়া আছে। সে-দৃষ্টিতে আশা-উন্মাদনার ভাস্বর জ্যোতি ঠিকরাইয়া পড়িতেছিল। তাহাই দুরন্ত পথিকের বক্ষ এক মাদকতা-ভরা গৌরবে ভরপুর করিয়া দিল। সে প্রাণ-ভরা তৃপ্তির হাসি হাসিয়া বলিল, ‘হাঁ ভাই! তোমাদের এমন শক্তি-ভরা দৃষ্টি পেলে কোথায়?’ অযুত আঁখির অযুত দীপ্ত চাউনি বলিয়া উঠিল,–‘ওগো সাহসী পথিক, এ দৃষ্টি পেয়েছি তোমারই চলার পথ চেয়ে!’ উহারই মধ্যে কাহারও স্নেহ-করুণ চাউনি বাণীতে ফুটিয়ে উঠিল,–‘হায়! এ দুর্গম পথে তরুণ পথিকের মৃত্যু যে অনিবার্য’ অমনি লক্ষ কণ্ঠের আর্ত ঝংকার গর্জন করিয়া উঠিল, ‘চোপরাও ভীরু! এই তো মানবাত্মার সত্য শাশ্বত পথ!’ পথিক দু-চোখ পুরিয়া এই কল্যাণ-দৃষ্টির শক্তি হরণ করিয়া লইল। তাহার সুপ্ত যত কিছু অন্তরের সত্য, এক অঙ্গুলি-পরশে সাধা বীণার ঝঞ্ঝনার মতো সাগ্রহে সাড়া দিয়ে উঠিল,–‘আগে চল।’ বনের সবুজ তাহার অবুঝ তারুণ্য দিয়া পথিকের প্রাণ ভরিয়া দিয়া বলিল–‘এই তোমায় যৌবনের রাজটিকা পরিয়ে দিলাম; তুমি চির-যৌবন, চির অমর হলে।’ দূরের আকাশ আনত হইয়া তাহার শিরশ্চুম্বন করিয়া গেল। দূরের দিগ্‌বলয় তাহাকে মুক্তির সীমারেখার আবছায়া দেখাইতে লাগিল। দুই পাশে তাহার বনের শাখী শাখার পতাকা দুলাইয়া তাহাকে অভিনন্দন করিতে লাগিল। স্বাধীন দেশের তোরণ-দ্বার পারাইয়া বোধন-বাঁশির অগ্নি-সুর হরিণের মত তাহাকে মুগ্ধ মাতাল করিয়া ডাক দিতেছিল। বাঁশির টানে মুক্তির পথ লক্ষ্য করিয়া সে ছুটিতে লাগিল।–‘ওগো কোথায় তোমার সিংহদ্বার? দ্বার খোলো, দ্বার খোলো,–আলো দেখাও, পথ দেখাও! … বিশ্বের কল্যাণের মন্ত্র তাহাকে ঘিরিয়া বলিল,–‘এখনও অনেক দেরি, পথ চলো!’ পথিক চমকিয়া উঠিয়া বলিল,—‘ওগো আমি যে তোমাকেই চাই!’ সে অচিন সাথি বলিয়া উঠিল,–‘আমাকে পেতে হলে ঐ সামনের বুলন্দ-দরওয়াজা পার হতে হয়!’ দুরন্ত পথিক তাহার চলায় দুর্বার বেগের গতি আনিয়া বলিল–‘হ্যাঁ ভাই, তাহাই আমার লক্ষ্য!’ দূরে বনের ফাঁকে মুক্ত গগন একবার চমকাইয়া গেল, পেছন হইতে নিযুত তরুণ কণ্ঠের বাণী শোর করিয়া বলিয়া উঠিল,–‘আমাদেরও লক্ষ্য ঐ, চলো ভাই, আগে চলো,–তোমারই পায়ে-চলা পথ ধরে আমরা চলেছি!’ পথিক আগে চলার গৌরবের তৃপ্তি তাহার কণ্ঠে ফুটাইয়া হাঁকিয়া উঠিল, ‘এ পথে যে মরণের ভয় আছে!’ বিক্ষুব্ধ তরুণ কন্ঠে প্রদীপ্ত আগুন যেন গর্জিয়া উঠিল,–‘কুছ পরওয়া নেই! ও তো মরণ নয়, ও যে জীবনের আরম্ভ!’ … অনেক পিছন পাঁজর-ভাঙা বৃদ্ধেরা মরণের ভয়ে কাঁপিয়া মরিতেছিল! তাহাদের স্কন্ধদেশে চড়িয়া একজন মুখ-চোখ ভ্যাঙচাইয়া বলিতেছিল,–‘এই দেখো মরণ! একটু দূরে চন্দন-কুণ্ডলী ধোঁয়া-ভরা আগুন জ্বালাইয়া বৃদ্ধের দৃষ্টি-চাহনি প্রতারিত করার চেষ্টা করা হইতেছিল! হাসি চাপিতে চাপিতে একজন ইহাদিগকে সম্মুখের ধুলায় আগুনের দিকে খেদাইয়া লইয়া যাইতে যাইতে বলিতেছিল,–‘ঐ তো সামনে তোমাদের নির্বাণ কুণ্ড; এ বৃদ্ধ বয়সে কেন বন্ধুর পথে ছুটতে গিয়ে প্রাণ হারাবে? ও দুরন্ত পথিকদল মোলো বলে।’ বৃদ্ধের দল দুই হাত উপরে উঠাইয়া বলিল,–‘হাঁ হুজুর, আলবত। তাহার আশে পাশে কাহার দুষ্ট কণ্ঠে বারে বারে সতর্ক করিতেছিল,–‘ওহে বেকুবদল, ভিক্ষায়াং নৈব নৈব চ। তোদের এরা নির্বাণ-কুণ্ডে পুড়িয়ে তিল তিল করে মারবে।’ তাদের রাখাল হাসি চাপিয়া বলিয়া উঠিল,–‘না না, ওদের কথা শুনো না। ওদের পথ ভীতি-সংকুল আর অনেক দূর, তাও আবার দুঃখ-কষ্ট-কাঁটা-পাথর-ভরা, তোমাদের মুক্তি ওই সামনে।’

    দুরন্ত পথিক চলিয়াছিল, সেই মুক্ত দেশের উদ্‌বোধন-বাঁশির সুর ধরিয়া। … এইসব তাহার পথের বিভীষিকা জুলুম আরম্ভ করিল। পথিক দেখিল, ঐ পথ বাহিয়া যাওয়ার এক-আধটুকু অস্ফুট পদচিহ্ন এখনও যেন জাগিয়া রহিয়াছে। পথের বিভীষিকা তাহাদেরই মাথার খুলি এই নতুন পথিকের সামনে ধরিয়া বলিল,–‘এই দেখো এদের পরিণাম।’ সেই খুলি মাথায় করিয়া নতুন পথিক আর্তনাদ করিয়া উঠিল,–‘আহা, এরাই তো আমায় ডাক দিয়েছে! আমি এমনই পরিণাম চাই–আমার মৃত্যুতেই তো আমার শেষ নয়, আমার পশ্চাতে ওই যে তরুণ যাত্রীর দল, ওদের মাঝখানেই আমি বেঁচে থাকব!’ বিভীষিকা বললে,–‘তুমি কে?’ পথিক হেসে বললে,–‘আমি চিরন্তন মুক্তিকামী। এই যাদের খুলি পড়ে রয়েছে তারা কেউ মরেনি, আমার মাঝেই তারা নূতন শক্তি, নূতন জীবন, নূতন আলোক নিয়ে এসেছে। এ মুক্তের দল অমর!’ বিভীষিকা কাঁপিয়া উঠিয়া বলিল,–‘আমার চেন না? আমি শূঙ্খল। তুমি যাই বল, তোমাকে হত্যা করাই আমার ব্রত, মুক্তিতে বন্ধন দেওয়াই আমার লক্ষ্য। তোমাকে মরতে হবে!’ দুরন্ত পথিক দাঁড়াইয়া বলিল,–‘মারো,–বাঁধো,–কিন্তু আমাকে বাঁধতে পারবে না; আমার তো মৃত্যু নাই! আমি আবার আসব!’ বিভীষিকা পথ আগুলিয়া বলিল,–‘আমার যতক্ষণ শক্তি আছে, ততক্ষণ তুমি যত বারই আস তোমাকে বধ করব। শক্তি থাকে আমায় মার, নতুবা আমার মার সহ্য করতে হবে।’

    অনেক দূরে মুক্ত দেশের অলিন্দে ঐ পথেরই বিগত শহীদেরা চিরতরুণ জ্যোর্তিময় দেহ লইয়া দাঁড়াইয়া তাহাকে আহ্বান করিতে লাগিল। পথিক বলিল,–‘কিন্তু এই জীবন দেওয়াটাই কী জীবনের সার্থকতা? মুক্ত বাতায়ন হইতে মুক্ত আত্মা স্নিগ্ধ-আর্দ্র কণ্ঠে কহিয়া উঠিল,–হাঁ ভাই! যুগ যুগ জীবন তো এই মৃত্যুরই বন্দনা গান গাইছে। সহস্র প্রাণের উদ্‌বোধনই তো তোমার মরণের সার্থকতা। নিজে মরিয়া জাগানোতেই তোমার মৃত্যু যে চিরজাগ্রত অমর!’ নবীন পথিক তাহার তরুণ বিশাল বক্ষ উন্মোচন করিয়া অগ্রে বাড়াইয়া দিয়া কহিল,–‘তবে চালাও খঞ্জর!’ পিছন হইতে তরুণ যাত্রীর দল দুরন্ত পথিকের প্রাণশূন্য দেহ মাথায় তুলিয়া কাঁদিয়া উঠিল–‘তুমি আবার এসো!’ অনেক দূরে দিগ্‌বলয়ের কোলে কাহাদের একতা-সংগীত ধ্বনিয়া উঠিতে লাগিল,–

    ‘দেশ দেশ নন্দিত করি মন্দ্রিত তব ভেরি,

    আসিল যত বীরবৃন্দ আসন তব ঘেরি।’

  • ছায়ানট

    ছায়ানট

    ছায়ানট

    ‘কাজী নজরুল ইসলাম’ রচিত কাব্যগ্রন্থ ‘ছায়ানট’ আশ্বিন ১৩৩২ বঙ্গাব্দ, মুতাবিক সেপ্টেম্বর ১৯২৫ খৃষ্টাব্দে প্রথম গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। এই কাব্যে কবিতা ও গান মিলিয়ে রয়েছে পঞ্চাশটি। গ্রন্থটি ‘ব্রজবিহারী বর্ম্মণ রায়’ কর্তৃক ‘বর্ম্মণ পাবলিশিং হাউস’, ১৯৩ কর্ণওয়ালিশ ষ্ট্রীট, কলকাতা হতে প্রকাশিত হয়। প্রথম সংস্করণে পৃষ্ঠা সংখ্যা ছিল ১০০, মূল্য পাঁচ সিকা।

    প্রথম সংস্করণে ‘ছায়ানট’ কাব্যটি কবির শ্রেয়তম রাজলাঞ্ছিত বন্ধু মুজফ্‌ফর আহ্‌মদ ও কুতুবউদ্দীন আহ্‌মদের করকমলে উৎসর্গ করা হয়েছিল, যদিও পরবর্তী সংস্করণগুলোতে ‘উৎসর্গ’ পত্রটি বর্জন করা হয়েছিল।

    ‘বিজয়িনী’ ১৩২৮ পৌষের ‘মোসলেম ভারত’ পত্রে প্রথম প্রকাশিত হয়।

    ‘চৈতী হাওয়া’ ১৩৩২ বৈশাখের ‘কল্লোল’ পত্রে প্রথম প্রকাশিত হয়।

    ‘নিশীথ-প্রীতম্’ ১৩২৮ মাঘে চতুর্থ বর্ষ, চতুর্থ সংখ্যক ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য-পত্রিকায় এবং অষ্টম বর্ষ, তৃতীয় সংখ্যক ‘নারায়ণ’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল।

    ‘লক্ষ্মীছাড়া’ ১৩২৮ ভাদ্রের ‘উপাসনা’য় প্রথম প্রকাশিত হয়।

    ‘শেষের গান’ ১৩২৯ শ্রাবণের ‘সহচর’ পত্রিকায় প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল, তাতে প্রথম পঙ্‌ক্তিটি ছিল এরূপ—

    আমারমরণ-রথের চাকার ধ্বনি ঐ রে এবার কানে আসে।

    তৃতীয় স্তবকের প্রথম পঙ্‌ক্তি ছিল এরূপ—

    মোর কাফনের কর্পূর-বাস ভরপুর আজ দিগ্বলয়ে,

    ‘নিরুদ্দেশের যাত্রী’ ১৩২৭ চৈত্রের ‘নারায়ণ’ পত্রে প্রকাশিত হয়েছিল; শিরোনামের নীচে বন্ধনীর মধ্যে লেখা ছিল : ‘বাউল—কাশ্মিরী খেম্‌টা’।

    ‘চিরন্তনী প্রিয়া’ ১৩২৮ কার্ত্তিকের এবং ‘বেদনা-মণি’ ১৩২৯ ভাদ্রের ‘মানসী ও মর্মবাণী’তে প্রকাশিত হয়েছিল।

    ‘অনাদৃতা’ ১৩২৮ ভাদ্রের ‘নারায়ণে’ প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল।

    ‘শায়ক-বেঁধা পাখি’ ১৩২৯ আষাঢ়ের ‘বঙ্গবাণী’তে প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল।

    ‘হারা-মণি’ ১৩২৮ সালে নারায়ণ পত্রিকার ১২১৬ পৃষ্ঠায় প্রকাশিত হয়েছিল।

    ‘স্নেহ-ভীতু’ ১৩২৭ ফাল্গুণের ‘মোসলেম ভারত’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল; বন্ধনীর মধ্যে লেখা ছিল : ‘বাউল সুর—তাল লোফা’। সে সংখ্যাতেই গানটির ‘শ্রীমতী মোহিনী সেনগুপ্তা’ কৃত স্বরলিপিও প্রকাশত হয়েছিল।

    ‘পলাতকা’ ১৩২৮ বৈশাখের ভারতী’তে প্রকাশিত হয়েছিল; বন্ধনীর মধ্যে লেখা ছিল: ‘মা-মরা খোকার মৃত্যু-শয্যায় পিতা গাচ্ছেন’ এবং ‘সুর—বৈকালী মেঠো বাউল’। গানটি ভারতী হতে ১৩২৮ আশ্বিনের ‘মোসলেম ভারতে’ উদ্ধৃত হয়েছিল।

    ‘মানস-বধূ’ ১৩২৯ শ্রাবণে প্রথম বর্ষ, চতুর্থ সংখ্যক মাসিক ‘বসুমতী’তে বের হয়েছিল।

    ‘দহন-মালা’ ১৩২৮ বৈশাখের এবং ‘অকরুণ প্রিয়া’ ১৩২৮ আশ্বিনের ‘নারায়ণে’ প্রকাশিত হয়েছিল।

    ‘দূরের-বন্ধু’ ১৩২৭ কার্ত্তিকের ‘মোসলেম ভারতে’ ‘গান’ শিরোনামে প্রকাশিত হয়েছিল; বন্ধনীর মধ্যে লেখা ছিল : ‘লাউনি—বারোঁয়া—তেওরা’।

    ‘আশা’ ১৩২৭ পৌষের ‘মোসলেম ভারতে’ ‘গান’ শিরোনামে প্রকাশিত হয়েছিল এবং বন্ধনীর মধ্যে লেখা ছিল: ‘খাম্বাজ—(টিমা) একতালা’। সেই সংখ্যাতে শ্রীমতী মোহিনী সেনগুপ্তা কৃত গানটির স্বরলিপিও প্রকাশিত হয়েছিল।

    ‘মরমী’ প্রকাশিত হয়েছিল ১৩২৭ ফাল্গুনের ‘মোসলেম ভারতে’। ১৩৩০ অগ্রহায়ণের ‘কল্লোলে’ গানটি পুনর্মুদ্রিত হয় এবং সেই সংখ্যাতেই শ্রীমতী মোহিনী সেনগুপ্তা গানটির সুর ও স্বরলিপি প্রকাশ করেন।

    ‘প্রতিবেশিনী’ ১৩২৭ মাঘের ‘সওগাতে’ ‘বেদনা-হারা’ শিরোনামে এবং ১৩২৭ চৈত্রের ‘মোসলেম ভারতে’ ‘গান’ শিরোনামে প্রকাশিত হয়েছিল।

    ‘দুপুর-অভিসার’ ১৩২৮ শ্রাবণের ‘ভারতী’তে প্রকাশিত হয়েছিল, বন্ধনীর মধ্যে লেখা ছিল : ‘গৌড়—সারঙ্—দাদরা’।

    ‘ছল-কুমারী’ ১৩২৮ অগ্রহায়ণের ‘উপাসনা’য় প্রকাশিত হয়েছিল।

    ‘বাদল-দিন’ ১৩২৮ আশ্বিনের এবং ‘কার বাঁশী বাজিল?’ ১৩২৮ ভাদ্রের ‘মোসলেম ভারতে’ প্রকাশিত হয়েছিল।

    ‘অকেজোর গান’ ১৩২৮ অগ্রহায়ণের এবং ‘স্তব্ধ বাদল’ ১৩২৯ শ্রাবণের ‘প্রবাসী’তে প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল।

    ‘চির-চেনা’ ১৩২৯ শ্রাবণের ‘বঙ্গবাণী’তে প্রকাশিত হয়।

    ‘অমর কানন’ ১৩৩২ শ্রাবণে পঞ্চম বর্ষ, তেত্রিশ সংখ্যক ‘বিজলী’তে প্রকাশিত হয়।

    ‘পূবের হাওয়া’ [ঝড় : পূর্ব তরঙ্গ] ১৩৩১ শ্রাবণের, ‘আলতা-স্মৃতি’ ১৩৩০ পৌষের এবং ‘রৌদ্র-দগ্ধের গান’ ১৩৩০ চৈত্রের ‘কল্লোলে’ প্রকাশিত হয়েছিল।

    পরবর্তীতে ছায়ানটের ২৬টি কবিতা সামান্য পরিবর্তন সহ ‘পূবের হাওয়া’ কাব্যগ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত হয়। এসব কবিতায় যে-পাঠভেদ আছে, তার বিবরণ ‘পূবের হাওয়া’র গ্রন্থপরিচয়ে পাওয়া যাবে। আমরা ছায়ানটের প্রথম সংস্কণের পাঠ অনুসরণ করেছি।

    উৎসর্গ

    আমার শ্রেয়তম রাজলাঞ্ছিত বন্ধু

     মুজফ্‌ফর আহমদ

     

     কুতুবউদ্দীন আহমদ

     করকমলে –

  • বিজয়িনী

    বিজয়িনী

    বিজয়িনী

    হে মোর রাণী! তোমার কাছে হার মানি আজ শেষে।
    আমার
    বিজয়-কেতন লুটায় তোমার চরণ-তলে এসে।
    আমার
    সমর-জয়ী অমর তরবারী
    দিনে দিনে ক্লান্তি আনে, হয়ে ওঠে ভারী,
    এখন
    এ ভার আমার তোমায় দিয়ে হারি,
    এই
    হার-মানা-হার পরাই তোমার কেশে॥
    ওগো জীবন-দেবী!
    আমায় দেখে কখন তুমি ফেললে চোখের জল,
    আজ
    বিশ্বজয়ীর বিপুল দেউল তাইতে টলমল!
    আজ
    বিদ্রোহীর এই রক্ত-রথের চূড়ে,
    বিজয়িনী! নীলাম্বরীর আঁচল তোমার উড়ে,
    যত
    তৃণ আমার আজ তোমার মালায় পূরে,
    আমি
    বিজয়ী আজ নয়ন-জলে ভেসে॥

    কুমিল্লা

    অগ্রহায়ণ ১৩২৮

  • কমল-কাঁটা

    কমল-কাঁটা

    কমল-কাঁটা

    আজকে দেখি হিংসামদের মত্ত-বারণ-রণে

    জাগ্‌ছে শুধু মৃণালকাঁটা আমার কমলবনে।

    উঠল কখন ভীম কোলাহল,

    আমার বুকের রক্তকমল

    কে ছিঁড়িল-বাঁধ-ভরা জল

    শুধায় ক্ষণে ক্ষণে।

    ঢেউয়ের দোলায় মরাল-তরী নাচ্‌বে না আনমনে॥

    কাঁটাও আমার যায় না কেন, কমল গেল যদি!

    সিনান-বধূর শাপ শুধু আজ কুড়াই নিরবধি!

    আস্‌বে কি আর পথিক-বালা?

    পরবে আমার মৃণাল-মালা?

    আমার জলজ-কাঁটার জ্বালা

    জ্বলবে মোরই মনে?

    ফুল না পেয়েও কমল-কাঁটা বাঁধবে কে কঙ্কণে?

    কলিকাতা

    আশ্বিন ১৩৩১

  • চৈতি হাওয়া

    চৈতি হাওয়া

    চৈতি হাওয়া

    হারিয়ে গেছ অন্ধকারে-পাইনি খুঁজে আর

    আজকে তোমার আমার মাঝে সপ্ত পারাবার!

    আজকে তোমার জন্মদিন –

    স্মরণবেলায় নিদ্রাহীন

    হাত্‌ড়ে ফিরি হারিয়ে-যাওয়ার অকূল অন্ধকার!

    এই-সে হেথাই হারিয়ে গেছে কুড়িয়ে-পাওয়া হার!

    শূন্য ছিল নিতল দীঘির শীতল কালো জল,

    কেন তুমি ফুটলে সেথা ব্যথার নীলোৎপল?

    আঁধার দীঘির রাঙলে মুখ,

    নিটোল ঢেউ-এর ভাঙলে বুক,-

    কোন্‌ পূজারী নিল ছিঁড়ে? ছিন্ন তোমার দল

    ঢেকেছে আজ কোন দেবতার কোন্‌ সে পাষাণ-তল?

    অস্ত-খেয়ার হারামাণিক-বোঝাই-করা না’

    আস্‌ছে নিতুই ফিরিয়ে দেওয়ার উদয়-পারের গাঁ।

    ঘাটে আমি রই বসে

    আমার মাণিক কই গো সে?

    পারাবারের ঢেউ-দোলানী হান্‌ছে বুকে ঘা!

    আমি খুঁজি ভিড়ের মাঝে চেনা কমল-পা!

    বইছে আবার চৈতী হাওয়া গুমরে ওঠে মন,

    পেয়েছিলাম এমনি হাওয়ায় তোমার পরশন।

    তেমনি আবার মহুয়া-মউ

    মৌমাছিদের কৃষ্ণা-বউ

    পান করে ওই ঢুল্‌ছে নেশায়, দুল্‌ছে মহুল-বন,

    ফুল-শৌখিন্‌ দখিন হাওয়ায় কানন উচাটন!

    পড়ছে মনে টগর চাঁপা বেল চামেলি জুঁই,

    মধুপ দেখে যাদের শাখা আপনি যেত নুই।

    হাসতে তুমি দুলিয়ে ডাল,

    গোলাব হয়ে ফুটত গাল!

    থলকমলী আঁউরে যেত তপ্ত ও-গাল ছুঁই!

    বকুলশাখা ব্যকুল হত, টলমলাত ভুঁই!

    চৈতী রাতের গাইত গজল বুলবুলিয়ার রব,

    দুপুর বেলায় চবুতরায় কাঁদত কবুতর!

    ভুঁই- তারকা সুন্দরী

    সজনে ফুলের দল ঝরি

    থোপা থোপা লাজ ছড়াত দোলন-খোঁপার পর,

    ঝাঁঝাল হাওয়ায় বাজত উদাস মাছরাঙার স্বর!

    পিয়াল-বনায় পলাশ ফুলের গেলাস-ভরা মউ!

    খেত বঁধুর জড়িয়ে গলা সাঁওতালিয়া বউ।

    লুকিয়ে তুমি দেখতে তাই,

    বলতে, ‘আমি অমনি চাই!’

    খোঁপায় দিতাম চাঁপা গুঁজে, ঠোঁটে দিতাম মউ।

    হিজল শাখায় ডাকত পাখি ‘বউ গো কথা কউ।’

    ডাকত ডাহুক জল- পায়রা নাচত ভরা বিল,

    জোড়া ভুরু ওড়া যেন আসমানে গাঙ-চিল।

    হঠাৎ জলে রাখতে পা,

    কাজলা দীঘির শিউরে গা-

    কাঁটা দিয়ে উঠত মৃণাল ফুটত কমল-ঝিল!

    ডাগর চোখে লাগত তোমার সাগর দীঘির নীল।

    উদাস দুপুর কখন গেছে এখন বিকেল যায়,

    ঘুম জড়ানো ঘুমতী নদীর ঘুমুর পরা পায়।

    শঙ্খ বাজে মন্দিরে,

    সন্ধ্যা আসে বন ঘিরে,

    ঝাউ-এর শাখায় ভেজা আঁধার কে পিঁজেছে হায়!

    মাঠের বাঁশী বন-উদাসী ভীমপলাশী গায়।

    ১০

    বাউল আজি বাউল হল আমরা তফাতে!

    আম-মুকুলের গুঁজি-কাঠি দাও কি খোঁপাতে?

    ডাবের শীতল জল দিয়ে

    মুখ মাজো কি আর প্রিয়ে?

    প্রজাপতির ডাক-ঝরা সোনার টোপাতে

    ভাঙা ভুরু দাও কি জোড়া রাতুল শোভাতে?

    ১১

    বউল ঝরে ফলেছে আজ থোলো থোলো আম,

    রসের পীড়ায় টসটসে বুক ঝুরছে গোলাপবজাম!

    কামরাঙারা রাঙল ফের

    পীড়ন পেতে ঐ মুখের,

    স্মরণ করে চিবুক তোমার, বুকের তোমার ঠাম-

    জামরুলে রস ফেটে পড়ে, হায় কে দেবে দাম।

    ১২

    করেছিলাম চাউনি চয়ন নয়ন হতে তোর,

    ভেবেছিলুম গাঁথ্‌ব মালা পাইনে খুঁজে ডোর!

    সেই চাহনি নীল-কমল

    ভরল আমার মানস-জল,

    কমল-কাঁটার ঘা লেগেছে মর্মমূলে মোর।

    বক্ষে আমার দুলে আঁখির সাতনরী-হার লোর।

    ১৩

    তরী আমার কোন্‌ কিনারায় পাইনে খুঁজে কূল,

    স্মরণ-পারের গন্ধ পাঠায় কমলা নেবুর ফুল।

    পাহাড়তলীর শালবনায়

    বিষের মত নীল ঘনায়!

    সাঁঝ পরেছে ওই দ্বিতীয়ার-চাঁদ-ইহুদী-দুল।

    হায় গো, আমার ভিন্‌ গাঁয়ে আজ পথ হয়েছে ভুল।

    ১৪

    কোথায় তুমি কোথায় আমি চৈতে দেখা সেই,

    কেঁদে ফিরে যায় যে চৈত-তোমার দেখা নেই।

    কন্ঠে কাঁদে একটি স্বর-

    কোথায় তুমি বাঁধলে ঘর?

    তেমনি করে জাগছে কি রাত আমার আশাতেই?

    কুড়িয়ে পাওয়া বেলায় খুঁজি হারিয়ে-যাওয়া খেই!

    ১৫

    পারাপারের ঘাটে প্রিয় রইনু বেঁধে না’

    এই তরীতে হয়ত তোমার পড়বে রাঙা পা।

    আবার তোমার সুখ-ছোঁওয়ায়

    আকুল দোলা লাগবে নায়,

    এক তরীতে যাব মোরা আর-না-হারা গাঁ

    পারাপারের ঘাটে প্রিয় রইনু বেঁধে না’॥

    হুগলি

    চৈত্র ১৩৩১

  • বেদনা-অভিমান

    বেদনা-অভিমান

    বেদনা-অভিমান

    ওরে আমার বুকের বেদনা!

    ঝঞ্ঝা-কাতর নিশীথ রাতের কপোত সম রে

    আকুল এমন কাঁদন কেঁদো না।

    কখন সে কার ভুবনভরা ভালোবাসা হেলায় হারালি,

    তাইতো রে আজ এড়িয়ে চলে সকল স্নেহে পথে দাঁড়ালি!

    ভিজে ওঠে চোখের পাতা তোর,

    একটি কথায় – অভিমানী মোর!

    ডুকরে কাঁদিস বাঁধনহারা, ‘ওগো, আমায় বাঁধন বেঁধো না’।

    বাঁধন গৃহের সইল না তোর,

    তাই বলে কি মায়াও ঘরের ডাক দেবে না তোকে?

    অভিমানী গৃহহারা রে!

    চললে একা মরুর পথেও

    সাঁঝের আকাশ মায়ের মতন ডাকবে নত চোখে,

    ডাকবে বধূ সন্ধ্যাতারা যে!

    জানি ওরে, এড়িয়ে যারে চলিস তারেই পেতে চলিস পথে।

    জোর করে কেউ বাঁধে না তাই বুক ফুলিয়ে চলিস বিজয়-রথে।

    ওরে কঠিন! শিরীষকোমল তুই!

    মর্মর তোর মর্মে ছাপা বেল কামিনী জুঁই!

    বুকপোরা তোর ভালবাসা, মুখে মিছে বলিস ‘সেধো না’।

    আমার  বুকের বেদনা।

    দৌলতপুর, কুমিল্লা

    জ্যৈষ্ঠ ১৩২৮

  • নিশীথ-প্রীতম্

    নিশীথ-প্রীতম্

    নিশীথ-প্রীতম্

    হে মোর প্রিয়,
    হে মোর নিশীথ-রাতের গোপন সাথি!
    মোদের
    দুইজনারেই জনম ভরে কাঁদতে হবে গো –
    শুধু
    এমনি করে সুদূর থেকে, একলা জেগে রাতি॥
    যখন
    ভুবন-ছাওয়া আঁচল পেতে নিশীথ যাবে ঘুম,
    আকাশ বাতাস থমথমাবে সব হবে নিঝঝুম,
    তখন
    দেব দুঁহু দোঁহার চিঠির নাম-সহিতে চুম!
    আর
    কাঁপবে শুধু গো,
    মোদের
    তরুণ বুকের করুণ কথা আর শিয়রে বাতি।
    মোরা
    কে যে কত ভালোবাসি কোনোদিনই হবে না তা বলা,
    কভু
    সাহস করে চিঠির বুকেও আঁকব না সে কথা;
    শুধু
    কইতে-নারার প্রাণপোড়ানি রইবে দোঁহার ভরে বুকের তলা।
    শুধু
          চোখে চোখে চেয়ে থাকার –
    বুকের তলায় জড়িয়ে রাখার
    ব্যাকুল কাঁপন নীরব কেঁদে কইবে কি তার ব্যথা!
    কভু
    কী কথা সে কইতে গিয়ে হঠাৎ যাব থেমে,
    অভিমানে চারটি চোখেই আসবে বাদল নেমে।
    কত
    চুমুর তৃষায় কাঁপবে অধর, উঠবে কপোল ঘেমে।
    হেথা
    পুরবে নাকো ভালোবাসার আশা অভাগিনী,
    তাই
    দলবে বলে কলজেখানা রইনু পথে পাতি।

    কুমিল্লা

    অগ্রহায়ণ ১৩২৮

  • অ-বেলায়

    অ-বেলায়

    অ-বেলায়

    বৃথাই ওগো কেঁদে আমার কাটল যামিনী।
    অবেলাতেই পড়ল ঝরে কোলের কামিনী–
    ও সে শিথিল কামিনী॥
    খেলার জীবন কাটিয়ে হেলায়
    দিন না যেতেই সন্ধেবেলায়
    মলিন হেসে চড়ল ভেলায়
    মরণ-গামিনী।
    আহা
    একটু আগে তোমার দ্বারে কেন নামিনি।
    আমার অভিমানিনী॥
    ঝরার আগে যে কুসুমে দেখেও দেখি নাই
    ও যে
    বৃথাই হাওয়ায় ছড়িয়ে গেল, ছোট্ট বুকের একটু সুরভি
    আজ তারই সেই শুকনো কাঁটা বিঁধচে বুকে ভাই –
    আহা
    সেই সুরভি আকাশ কাঁদায় ব্যথায় যেন সাঁঝের পূরবী।
    জানলে না সে ব্যথাহতা
    পাষাণ-হিয়ার গোপন কথা,
    বাজের বুকেও কত ব্যথা
    কত দামিনী!
    আমার
    বুকের তলায় রইল জমা গো –
    না-কওয়া সে অনেক দিনের অনেক কাহিনি।
    আহা
    ডাক দিলি তুই যখন, তখন কেন থামিনি!
    আমার অভিমানিনী॥

    দৌলতপুর, কুমিল্লা

    বৈশাখ ১৩২৮

  • হার-মানা-হার

    হার-মানা-হার

    হার-মানা-হার

    তোরা
    কোথা হতে কেমনে এসে
    মণি-মালার মতো আমার কণ্ঠে জড়ালি।
    আমার
    পথিক-জীবন এমন করে
    ঘরের মায়ায় মুগ্ধ করে বাঁধন পরালি॥
    আমায়
    বাঁধতে যারা এসেছিল গরব করে হেসে
    তারা
    হার মেনে হায় বিদায় নিল কেঁদে,
    তোরা
    কেমন করে ছোট্ট বুকের একটু ভালোবেসে
    কচি বাহুর রেশমি ডোরে ফেললি আমায় বেঁধে!
    তোরা
    চলতে গেলে পায়ে জড়াস,
    ‘না’ ‘না’ বলে ঘাড়টি নড়াস,
    কেন
    ঘর-ছাড়াকে এমন করে
    ঘরের ক্ষুধা স্নেহের সুধা মনে পড়ালি॥
    ওরে
    চোখে তোদের জল আসে না–
    চমকে ওঠে আকাশ তোদের
    চোখের মুখের চপল হাসিতে।
    হাসিই তো মোর ফাঁসি হল,
    ওকে
    ছিঁড়তে গেলে বুকে লাগে,
    কাতর কাঁদন ছাপা যে ও হাসির রাশিতে!
    আমি
    চাইলে বিদায় বলিস, ‘উঁহু,
    ছাড়ব নাকো মোরা’
    একটু মুখের ছোট্ট মানাই এড়িয়ে যেতে নারি,
    কত
    দেশ-বিদেশের কান্নাহাসির
    বাঁধনছেঁড়ার দাগ যে বুকে পোরা,
    তোরা
    বসলি রে সেই বুক জুড়ে আজ,
    চিরজয়ীর রথটি নিলি কাড়ি।
    ওরে
       দরদিরা! তোদের দরদ
    শীতের বুকে আনলে শরৎ,
    তোরা
    ঈষৎ-ছোঁয়ায় পাথরকে আজ
    কাতর করে অশ্রুভরা ব্যথায় ভরালি।

    দৌলতপুর, কুমিল্লা

    বৈশাখ ১৩২৮

  • লক্ষ্মীছাড়া

    লক্ষ্মীছাড়া

    লক্ষ্মীছাড়া

    আমি
    নিজেই নিজের ব্যথা করি সৃজন।
    শেষে
    সে-ই আমারে কাঁদায়, যারে করি আপ্‌নারই জন॥
    দূর হতে মোর বাঁশির সুরে
    পথিক-বালার নয়ন ঝুরে
    তার
    ব্যথায়-ভরাট ভালোবাসায় হৃদয় পুরে গো!
    তারে
    যেমনি টানি পরান-পুটে
    অমনি সে হায় বিষিয়ে উঠে!
    তখন
    হারিয়ে তারে কেঁদে ফিরি সঙ্গীহারা পথটি আবার নিজন॥
    মুগ্ধা ওদের নেই কোনো দোষ, আমিও ওগো ধরা দিয়ে মরি,
    প্রেম-পিয়াসি প্রণয়ভুখা শাশ্বত যে আমিই তৃপ্তিহারা,
    ঘরবাসীদের প্রাণ যে কাঁদে পরবাসীদের পথের ব্যথা স্মরি
    তাইতো তারা এই উপোসির ওষ্ঠে ধরে ক্ষীরের থালা,
    শান্তিবারিধারা।
    ঘরকে পথের বহ্নিঘাতে
    দগ্ধ করি আমার সাথে,
    লক্ষ্মী ঘরের পলায় উড়ে এই সে শনির দৃষ্টিপাতে গো!
    জানি আমি লক্ষ্মীছাড়া
    বারণ আমার উঠান মাড়া,
    আমি
    তবু কেন সজল চোখে ঘরের পানে চাই?
    নিজেই কি তা জানি আমি ভাই?
    হায়
    পরকে কেন আপন করে বেদন পাওয়া,
    পথেই যাহার কাটবে জীবন বিজন?
    আর
    কেউ হবে না আপন যখন, সব হারিয়ে চলতে হবে
    পথটি আমার নিজন।
    আমি   নিজেই নিজের ব্যথা করি সৃজন।

    কলিকাতা

    ভাদ্র ১৩২৮

  • শেষের গান

    শেষের গান

    শেষের গান

    আমার
    বিদায়-রথের চাকার ধ্বনি ঐ গো এবার কানে আসে।
    পুবের হাওয়া তাই কেঁদে যায় ঝাউয়ের বনে দিঘল শ্বাসে॥
    ব্যথায় বিবশ গুলঞ্চ ফুল
    মালঞ্চে আজ তাই শোকাকুল,
    মাটির মায়ের কোলের মায়া ওগো আমার প্রাণ উদাসে॥
    অঙ্গ আসে অলস হয়ে নেতিয়ে-পড়া অলস ঘুমে,
    স্বপনপারের বিদেশিনীর হিম-ছোঁয়া যায় নয়ন চুমে।
    হাতছানি দেয় অনাগতা,
    আকাশ-ডোবা বিদায়-ব্যথা
    লুটায় আমার ভুবন ভরি বাঁধন ছেঁড়ার কাঁদন-ত্রাসে॥
    মোর বেদনার কপূর্রবাস ভরপুর আজ দিগ্‌বলয়ে,
    বনের আঁধার লুটিয়ে কাঁদে হরিণটি তার হারার ভয়ে।
    হারিয়ে পাওয়া মানসী হায়
    নয়নজলে শয়ন তিতায়,
    ওগো, এ কোন্ জাদুর মায়ায় দু-চোখ আমার জলে ভাসে॥
    আজ
    আকাশ-সীমায় শব্দ শুনি অচিন পায়ের আসা-যাওয়ার,
    তাই মনে হয় এই যেন শেষ আমার অনেক দাবি-দাওয়ার।
    আজ কেহ নাই পথের সাথি,
    সামনে শুধু নিবিড় রাতি,
    আমায়
    দূরের বাঁশি ডাক দিয়েছে, রাখবে কে আর বাঁধন-পাশে।

    কলিকাতা

    শ্রাবণ ১৩২৮

  • নিরুদ্দেশের যাত্রী

    নিরুদ্দেশের যাত্রী

    নিরুদ্দেশের যাত্রী

    নিরুদ্দেশের পথে যেদিন প্রথম আমার যাত্রা হল শুরু।

    নিবিড় সে-কোন্ বেদনাতে ভয়-আতুর এ বুক কাঁপল দুরু-দুরু॥

    মিটল না ভাই চেনার দেনা, অমনি মু্হুর্মুহু
    ঘরছাড়া ডাক করলে শুরু অথির বিদায়-কুহু
    উহু উহু উহু!
    হাতছানি দেয় রাতের শাঙন,
    অমনি বাঁধে ধরল ভাঙন–
    ফেলিয়ে বিয়ের হাতের কাঙন–
    খুঁজে বেড়াই কোন আঙনে কাঁকন বাজে গো!
    বেরিয়ে দেখি ছুটছে কেঁদে বাদলি হাওয়া হু হু!

    মাথার ওপর দৌড়ে টাঙন, ঝড়ের মাতন, দেয়ার গুরু গুরু॥

    পথ হারিয়ে কেঁদে ফিরি, ‘আর বাঁচিনে! কোথায় প্রিয়,

    কোথায় নিরুদ্দেশ?’

    কেউ আসে না, মুখে শুধু ঝাপটা মারে নিশীথ-মেঘের

    আকুল চাঁচর কেশ।
    ‘তাল-বনা’তে ঝঞ্ঝা তাথই হাততালি দেয় বজ্রে বাজে তূরী,
    মেখলা ছিঁড়ি পাগলি মেয়ে বিজলি-বালা নাচায় হিরের চুড়ি
      ঘুরি ঘুরি ঘুরি
    ও সে সকল আকাশ জুড়ি!
    থামল বাদল রাতের কাঁদা,
    হাসল, আমার টুটল ধাঁধা,
    হঠাৎ ও কার নূপুর শুনি গো?
    থামল নূপুর, ভোরের তারা বিদায় নিল ঝুরি।
    আমি
    এখন চলি সাঁঝের বধূ সন্ধ্যাতারার চলার পথে গো!
    আজ
    অস্তপারের শীতের বায়ু কানের কাছে বইছে ঝুরু-ঝুরু॥

    কলিকাতা

    চৈত্র ১৩২৭

  • চিরন্তনী প্রিয়া

    চিরন্তনী প্রিয়া

    চিরন্তনী প্রিয়া

    এসো এসো এসো আমার চির-পুরানো!

    বুক জুড়ে আজ বসবে এসো হৃদয়-জুড়ানো!

    আমার   চির-পুরানো!

    পথ বিপথে কতই আমার নিত্য নূতন বাঁধন এসে যাচে,

    কাছে এসেই অমনি তারা পুড়ে মরে আমার আগুন আঁচে।

     তারা এসে ভালোবাসার আশায়

    একটুকুতেই কেঁদে ভাসায়,

    ভীরু তাদের ভালোবাসা কেঁদেই ফুরানো।

    বিজয়িনী চিরন্তনী মোর!

    একা তুমিই হাস বিজয়-হাসি দীপ দেখিয়ে পথে ঘুরানো।

    তুমি যেদিন মুক্তি দিলে হেসে বাঁধন কাটলে আপন হাতে,

    প্রেম-গরবি আপন প্রেমের জোরে,

    জানতে আমায় সইবে না কেউ বইবে না ভার

     হার মেনে সে আসতে হবে আবার তোমার দোরে।

    গরবিণী! গর্ব করে এই কপালে লিখলে জয়ের টিকা

    ‘চঞ্চল এই বাঁধন-হারায় বাঁধতে পারে এক এ সাহসিকা!’

     প্রিয়! তাই কি আমার ভালোবাসা

    সবাই বলে সর্বনাশা,

    এই ধূমকেতু মোর আগুন-ছোঁয়া বিশ্ব-পোড়ানো?

     সর্বনাশী চপল প্রিয়া মোর!

    তবে অভিশাপের বুকে তুমিই হাসবে এসো

    নয়ন ঝুরানো॥

    কলিকাতা

    ভাদ্র ১৩২৮

  • বেদনা-মণি

    বেদনা-মণি

    বেদনা-মণি

    একটি শুধু বেদনা মাণিক আমার মনের মণিকোঠায়
    সেই তো আমার বিজন ঘরে দুঃখ রাতের আঁধার টুটায়॥
    সেই মাণিকের রক্ত-আলো
    ভুলাল মোর মন ভুলাল গো।
    সেই মাণিকের করুণ কিরণ আমার বুকে মুখে লুটায়।
    আজ
    রিক্ত আমি কান্না হাসির দাবি দাওয়ার বাঁধন ছিঁড়ে
    বেদনা-মণির শিখার মায়াই রইল একা জীবন ঘিরে।
    এ কালফণী অনেক খুঁজি
    পেয়েছে ওই একটি পুঁজি গো!
    আমার
    চোখের জলে ওই মণিদীপ আগুন হাসির ফিনিক ফোটায়।

    কলিকাতা

    ভাদ্র ১৩২৮

  • পরশ পূজা

    পরশ পূজা

    পরশ পূজা

    আমি
    এদেশ হতে বিদায় যেদিন নেব প্রিয়তম,
    আর
    কাঁদবে এ বুক সঙ্গীহারা কপোতিনী সম,
    তখন   মুকুর পাশে একলা গেহে
       আমারই এই সকল দেহে
    চুমব আমি চুমব নিজেই অসীম স্নেহে গো,
    আহা
    পরশ তোমার জাগছে যে গো এই সে দেহে মম॥
    তখন তুমি নাইবা প্রিয় নাই বা রলে কাছে।
    জানব আমার এই সে দেহে এই সে দেহে গো
    তোমার
    বাহুর বুকের শরম-ছোঁয়ার কাঁপন লেগে আছে।
    তখন
    নাই বা আমার রইল মনে
    কোনখানে মোর দেহের বনে
    জড়িয়ে ছিলে লতার মতন আলিঙ্গনে গো,
    আমি
    চুমোয় চুমোয় ডুবাব এই সকল দেহ মম,
    এদেশ হতে বিদায় যেদিন নেব প্রিয়তম॥

    কুমিল্লা

    আষাঢ় ১৩২৮।

  • অনাদৃতা

    অনাদৃতা

    অনাদৃতা

    ওরে অভিমানিনী!
    এমন করে বিদায় নিবি ভুলেও জানিনি।
    পথ ভুলে তুই আমার ঘরে দু-দিন এসেছিলি,
    সকল সহা! সকল সয়ে কেবল হেসেছিলি।
    হেলায় বিদায় দিনু যারে
    ভেবেছিনু ভুলব তারে হায়!
    ভোলা কি তা যায়?
    ওরে
    হারা-মণি! এখন কাঁদি দিবস-যামিনী।
    অভাগীরে! হাসতে এসে কাঁদিয়ে গেলি,
    নিজেও শেষে বিদায় নিলি কেঁদে,
    ব্যথা দেওয়ার ছলে নিজেই সইলি ব্যথা রে,
    বুকে
     সেই কথাটাই কাঁটার মতন বেঁধে!
    যাবার দিনে গোপন ব্যথা বিদায়-বাঁশির সুরে
    কইতে গিয়ে উঠল দু-চোখ নয়নজলে পুরে!
    না কওয়া তোর সেই সে বাণী,
    সেই হাসিগান সেই মু-খানি, হায়!
    আজও খুঁজি সকল ঠাঁই।
    তোরে
    যাবার দিনে কেঁদে কেন ফিরিয়ে আনিনি?
    ওরে অভিমানিনী।

    দৌলতপুর, কুমিল্লা

    বৈশাখ ১৩২৮

  • শায়ক-বেঁধা পাখী

    শায়ক-বেঁধা পাখী

    শায়ক-বেঁধা পাখী

    রে নীড়-হারা, কচি বুকে শায়ক-বেঁধা পাখী!
    কেমন করে কোথায় তোরে আড়াল দিয়ে রাখি?
    কোথায় রে তোর কোথায় ব্যথা বাজে?
    চোখের জলে অন্ধ আঁখি কিছুই দেখি না যে?
    ওরে মাণিক! এ অভিমান আমায় নাহি সাজে—
    তোর
      জুড়াই ব্যথা আমার ভাঙা বক্ষপুটে ঢাকি’।
    ওরে আমার কোমল-বুকে-কাঁটা-বেঁধা পাখী,
    কেমন করে কোথায় তোরে আড়াল দিয়ে রাখি?
    বক্ষে বিঁধে বিষ মাখানো শর,
    পথ-ভোলা রে! লুটিয়ে পলি এ কার বুকের পর!
    কে চিনালে পথ তোরে হায় এই দুখিনীর ঘর?
    তোর
     ব্যথার শান্তি লুকিয়ে আছে আমার ঘরে নাকি?
    ওরে আমার কোমল-বুকে-কাঁটা-বেঁধা পাখি!
    কেমন করে কোথায় তোরে আড়াল দিয়ে রাখি?
    হায়, এ কোথায় শান্তি- খুঁজিস্‌ তোর?
    ডাক্‌ছে দেয়া, হাঁকছে হাওয়া, কাঁপছে কুটির মোর!
    ঝঞ্ঝাবাতে নিবেছে দীপ, ভেঙেছে সব দোর,
    দুলে
      দুঃখ রাতের অসীম রোদন বক্ষে থাকি থাকি।
    ওরে আমার কোমল বুকে কাঁটা-বেঁধা পাখি!
    এমন দিনে কোথায় তোরে আড়াল দিয়ে রাখি?
    মরণ যে বাপ বরণ করে তারে,
    ‘মা’ ‘মা’ ডেকে যে দাঁড়ায় এই শক্তিহীনার দ্বারে!
    মাণিক আমি পেয়ে শুধু হারাই বারে বারে,
    ওরে
    তাই তো ভয়ে বক্ষ কাঁপে কখন দিবি ফাঁকি!
    ওরে আমার হারামণি! ওরে আমার পাখি!
    কেমন করে কোথায় তোরে আড়াল দিয়ে রাখি?
    হারিয়ে পাওয়া ওরে আমার মাণিক!
    দেখেই তোরে চিনেছি, আয় বক্ষে ধরি খানিক!
    বাণ-বেঁধা বুক দেখে তোরে কোলে কেহ না নিক,
    ওরে
      হারার ভয়ে ফেলতে পারে চিরকালের মা কি?
    ওরে আমার কোমল বুকে কাঁটা-বেঁধা পাখী!
    কেমন করে কোথায় তোরে আড়াল দিয়ে রাখি।
    এ যে রে তোর চির-চেনা স্নেহ,
    তুই তো আমার নোস রে অতিথ অতীত কালের কেহ,
    বারে বারে নাম হারায়ে এসেছিস এই গেহ!
    এই
      মায়ের বুকে থাক যাদু তোর যদিন আছে বাকি!
    প্রাণের আড়াল করতে পারে সৃজন দিনের মা কি?
    হারিয়ে যাওয়া? ওরে পাগল, সে তো চোখের ফাঁকি!

    কুমিল্লা

    জ্যৈষ্ঠ ১৩২৯

  • হারামণি

    হারামণি

    হারামণি

    এমন করে অঙ্গনে মোর ডাক দিলি কে স্নেহের কাঙালি!

    কে রে ও তুই কে রে? আহা ব্যথার সুরে রে, এমন চেনা স্বরে রে,

    আমার   ভাঙা ঘরের শূন্যতারই বুকের পরে রে।
    এ কোন
    পাগল স্নেহ-সুরধুনীর আগল ভাঙালি?
    কোন্ জননির দুলাল রে তুই, কোন্ অভাগির হারামণি,
    চোখ-ভরা তোর কাজল চোখে রে
    আহা
    ছলছল কাঁদন চাওয়ার সজল ছায়া কালো মায়া
    সারাখনই উছলে যেন পিছল ননি রে!
     মুখভরা তোর ঝরনাহাসি
     শিউলি সম রাশি রাশি
    আমার
    মলিন ঘরের বুকে মুখে লুটায় আসি রে!

    বুক-জোড়া তোর ক্ষুদ্ধ স্নেহ দ্বারে দ্বারে কর হেনে যে যায়

    কেউ কি তারে ডাক দিল না? ডাকল যারা তাদের কেন

    দলে এলি পায়?
    কেন
    আমার ঘরের দ্বারে এসেই আমার পানে চেয়ে এমন
    থমকে দাঁড়ালি?
    এমন চমকে আমায় চমক লাগালি?

    এই কি রে তোর চেনা গৃহ, এই কিরে তোর চাওয়া স্নেহ হায়!

    তাই কি আমার দুখের কুটির হাসির গানের রঙে রাঙালি?

     হে মোর স্নেহের কাঙালি।

    এ সুর যেন বড়োই চেনা, এ স্বর যেন আমার বাছার,

    কখন সে যে ঘুমের ঘোরে হারিয়েছিনু হয় না মনে রে!

    না চিনেই আজ তোকে চিনি, আমারই সেই বুকের মানিক,

    পথ ভুলে তুই পালিয়ে ছিলি সে কোন ক্ষণে সে কোন বনে রে!

    দুষ্টু ওরে, চপল ওরে, অভিমানী শিশু!
    মনে কি তোর পড়ে না তার কিছু?
    সেই অবধি জাদুমণি কত শত জনম ধরে
    দেশ বিদেশে ঘুরে ঘুরে রে,
    আমি
    মা-হারা সে কতই ছেলের কতই মেয়ের
    মা হয়ে বাপ খুঁজেছি তোরে!
    দেখা দিলি আজকে ভোরে রে!
    উঠছে বুকে হাহা ধ্বনি
    আয় বুকে মোর হারামণি,
    আমি
    কত জনম দেখিনি যে ঐ মু-খানি রে!

    পেটে-ধরা নাই বা হলি, চোখে ধরার মায়াও নহে এ,

    তোকে পেতেই জন্ম জন্ম এমন করে বিশ্ব-মায়ের

    ফাঁদ পেতেছি যে!

    আচমকা আজ ধরা দিয়ে মরা-মায়ের ভরা-স্নেহে হঠাৎ জাগালি।

    গৃহহারা বাছা আমার রে!
    চিনলি কি তুই হারা-মায়ে চিনলি কি তুই আজ?
    আজকে আমার অঙ্গনে তোর পরাজয়ের বিজয়-নিশান
    তাই কি টাঙালি?
    মোর স্নেহের কাঙালি।

    দৌলতপুর, কুমিল্লা

    জ্যৈষ্ঠ ১৩২৮

  • নীল পরী

    নীল পরী

    নীল পরী

    সর্ষে ফুলে লুটাল কার
    হলুদ-রাঙা উত্তরী।
    উত্তরী-বায় গো–
    আকাশ-গাঙে পাল তুলে যায়
    নীল সে পরীর দূর তরী॥
    তার
    অবুঝ বীণার সবুজ সুরে
    মাঠের নাটে পুলক পুরে,
    গহন বনের পথটি ঘুরে
    আসছে দূরে কচিপাতা দূত ওরই॥
    মাঠঘাট তার উদাস চাওয়ায়
    হুতাশ কাঁদে গগন মগন
    বেণুর বনে কাঁপচে গো তার
    দীঘল শ্বাসের রেশটি সঘন।
    তার
     বেতস-লতায় লুটায় তনু,
     দিগ্‌বলয়ে ভুরুর ধনু,
    সে
     পাকা ধানের হীরক-রেণু
     নীল নলিনীর নীলিম-অণু
    মেখেছে মুখ বুক ভরি॥

    ট্রেনে কুমিল্লার পথে

    চৈত্র ১৩২৭

  • স্নেহ-ভীতু

    স্নেহ-ভীতু

    স্নেহ-ভীতু

    ওরে
    এ কোন্ স্নেহ-সুরধুনী নামল আমার সাহারায়?
    বক্ষে কাঁদার বান ডেকেছে, আজ হিয়া কূল না হারায়!
    কণ্ঠে চেপে শুষ্ক তৃষা
    মরুর সে পথ তপ্ত সিসা,
    চলতে একা পাইনি দিশা ভাই;
    বন্ধ নিশাস–একটু বাতাস!
    এক ফোঁটা জল জহর-মিশা!–
    মিথ্যা আশা, নাই সে নিশানাই!
    হঠাৎ ও কার ছায়ার মায়া রে?–
    যেন
    ডাক-নামে আজ গাল-ভরা ডাক ডাকছে কে ওই মা-হারায়!
    লক্ষ যুগের বক্ষ-ছাপা তুহিন হয়ে যে ব্যথা আর কথা ছিল ঘুমা,
    কে সে ব্যথায় বুলায় পরশ রে? –
    ওরে
    গলায় তুহিন কাহার কিরণতপ্ত সোহাগ-চুমা?
    ওরে ও ভূত, লক্ষ্মীছাড়া,
    হতভাগা, বাঁধনহারা।
    কোথায় ছুটিস! একটু দাঁড়া, হায়!
    ঐ তো তোরে ডাকচে স্নেহ,
    হাতছানি দেয় ওই তো গেহ,
    কাঁদিস কেন পাগল-পারা তায়?
    এত
    ডুকরে কিসের তিক্ত কাঁদন তোর?
    অভিমানি! মুখ ফেরা দেখ যা পেয়েচিস তাও হারায়!
    হায়,
    বুঝবে কে যে স্নেহের ছোঁয়ায় আমার বাণী রা হারায়॥

    দেওঘর

    পৌষ ১৩২৭