Category: কাজী নজরুল ইসলাম

  • অভয়-মন্ত্র

    অভয়-মন্ত্র

    অভয়-মন্ত্র

    [গান]
      
       বল,      নাহি ভয়, নাহি ভয়!
      
       বল,      মাভৈঃ মাভৈঃ, জয় সত্যের জয়!
    কোরাস :
       বল,      হউক গান্ধি বন্দি, মোদের সত্য বন্দি নয়।
      
       বল,      মাভৈঃ মাভৈঃ পুরুষোত্তম জয়।
      
       তুই      নির্ভর কর আপনার পর,
      
                আপন পতাকা কাঁধে তুলে ধর!
    ওরে
    যে যায় যাক সে, তুই শুধু বল, ‘আমার হয়নি লয়’!
      
       বল,      ‘আমি আছি’, আমি পুরুষোত্তম, আমি চির-দুর্জয়।
      
       বল,      নাহি ভয়, নাহি ভয়,
      
       বল,      মাভৈঃ মাভৈঃ, জয় সত্যের জয়। …

      

      
       তুই      চেয়ে দেখ ভাই আপনার মাঝে,
      
                সেথা জাগ্রত ভগবান রাজে,
    নিজ
    বিধাতারে মান, আকাশ গলিয়া ক্ষরিবে রে বরাভয়!
    তোর
    বিধাতার ধাতা বিধাতা, বিধাতা কারারুদ্ধ কি হয়?
      
       বল,      নাহি ভয়, নাহি ভয়,
      
       বল,      মাভৈঃ মাভৈঃ, জয় সত্যের জয়। …

      

      
       আজ      বক্ষের তোর ক্ষীরোদ-সাগরে
      
                অচেতন নারায়ণ ঘুম-ঘোরে
    শুধু
    লক্ষ্মীর ভোগ লক্ষ্য তাঁহার, নয় কিছুতেই নয়!
    তোর
    অচেতন চিতে জাগারে চেতনা নারায়ণ চিন্ময়।
      
       বল,      নাহি ভয়, নাহি ভয়,
      
       বল,      মাভৈঃ মাভৈঃ, জয় সত্যের জয়। …

      

      
       ওই      নির্যাতকের বন্দি-কারায়
      
                সত্য কি কভু শক্তি হারায়?
    ক্ষীণ
    দুর্বল বলে খণ্ড ‘আমি’র হয় যদি পরাজয়,
    ওরে
    অখণ্ড আমি চির-মুক্ত সে, অবিনাশী অক্ষয়!
      
       বল,      নাহি ভয়, নাহি ভয়,
      
       বল,      মাভৈঃ মাভৈঃ, জয় সত্যের জয়। …

      

      
       ওরে      সত্য যে চির-স্বয়ম্ প্রকাশ,
      
                রোধিবে কি তারে কারাগার-ফাঁস?
    ওই
    অত্যাচারীর সত্য পীড়ন? আছে তার আছে ক্ষয়!
    সেই
    সত্য মোদের ভাগ্য-বিধাতা, যাঁর হাতে শুধু রয়।
      
       বল,      নাহি ভয়, নাহি ভয়,
    বল,  মাভৈঃ মাভৈঃ, জয় সত্যের জয়। …
      
       যে      গেল সে নিজেরে নিঃশেষ করি
      
                তাদের পাত্র দিয়া গেল ভরি!
    ওই
    বন্ধু মৃত্যু পারেনিকো তাঁরে পারেনি করিতে লয়!
    তাই
    আমাদের মাঝে নিজেরে বিলায়ে সে আজ শান্তিময়!
      
       বল,      নাহি ভয়, নাহি ভয়,
      
       বল,      মাভৈঃ মাভৈঃ, জয় সত্যের জয়। …

      

      
       ওরে      রুদ্র তখনই ক্ষুদ্রেরে গ্রাসে
      
                আগেই যবে সে মরে থাকে ত্রাসে,
    ওরে
    আপনার মাঝে বিধাতা জাগিলে বিশ্বে সে নির্ভয়!
    ওই
    শূদ্র-কারায় কভু কি ভয়াল ভৈরব বাঁধা রয়?
      
       বল,      নাহি ভয়, নাহি ভয়,
      
       বল,      মাভৈঃ মাভৈঃ, জয় সত্যের জয়। …

      

      
       ওই      টুটে-ফেটে-পড়া লোহার শিকল,
      
                ভগবানে বেঁধে করিবে বিকল?
    ওই
    কারা ওই বেড়ি কভু কি বিপুল বিধাতার ভার সয়?
    ওরে
    যে হয় বন্দি হতে দে, শক্তি আত্মার আছে জয়।
      
       বল,      নাহি ভয়, নাহি ভয়,
      
       বল,      মাভৈঃ মাভৈঃ, জয় সত্যের জয়। …

      

      
       ওরে      আত্ম-অবিশ্বাসী, ভয়-ভীত!
      
                কেন হেন ঘন অবসাদচিত?
    বল
    পর-বিশ্বাসে পর-মুখপানে চেয়ে কি স্বাধীন হয়?
    তুই
    আত্মাকে চিন, বল ‘আমি আছি’, ‘সত্য আমার জয়’!
      
       বল,      নাহি ভয়, নাহি ভয়,
      
       বল,      মাভৈঃ মাভৈঃ, জয় সত্যের জয়।
      
       বল,      হউক গান্ধি বন্দি, মোদের সত্য বন্দি নয়!
  • আত্মশক্তি

    আত্মশক্তি

    আত্মশক্তি

    [গান]

    এসো বিদ্রোহী মিথ্যা-সূদন আত্মশক্তি বুদ্ধ বীর!

    আনো উলঙ্গ সত্যকৃপাণ, বিজলি-ঝলক ন্যায়-অসির।

    তূরীয়ানন্দে ঘোষো সে আজ

    ‘আমি আছি’– বাণী বিশ্ব-মাঝ,

    পুরুষ-রাজ!

    সেই স্বরাজ!

    জাগ্রত করো নারায়ণ-নর নিদ্রিত বুকে মর-বাসীর;

    আত্ম-ভীতু এ অচেতন-চিতে জাগো ‘আমি-স্বামী নাঙ্গা-শির।’

    এসো প্রবুদ্ধ, এসো মহান

    শিশু-ভগবান জ্যোতিষ্মান।

    আত্মজ্ঞান-

    দৃপ্ত-প্রাণ!

    জানাও জানাও, ক্ষুদ্রেরও মাঝে রাজিছে রুদ্র তেজ রবির!!

    উদয়-তোরণে উড়ুক আত্ম-চেতন-কেতন ‘আমি-আছি’-র॥

    করহ শক্তি-সুপ্ত-মন

    রুদ্র বেদনে উদ্‌বোধন,

    হীন রোদন –

    খিন্ন-জন

    দেখুক আত্মা-সবিতার তেজ বক্ষে বিপুলা ক্রন্দসীর!

    বলো, নাস্তিক হউক আপন মহিমা নেহারি শুদ্ধ ধীর!

    কে করে কাহারে নির্যাতন

    আত্ম-চেতন স্থির যখন?

    ঈর্ষা-রণ

    ভীম-মাতন

    পদাঘাত হানে পঞ্জরে শুধু আত্ম-বল-অবিশ্বাসীর,

    মহাপাপী সেই, সত্য যাহার পর-পদানত আনত শির॥

    জাগাও আদিম স্বাধীন প্রাণ,

    আত্মা জাগিলে বিধাতা চান।

    কে ভগবান? –

    আত্ম-জ্ঞান!

    গাহে উদ্‌গাতা ঋত্বিক গান অগ্নি-মন্ত্র শক্তি-শ্রীর।

    না জাগিলে প্রাণে সত্য চেতনা, মানি না আদেশ কারও বাণীর!

    এসো বিদ্রোহী তরুণ তাপস আত্মশক্তিবুদ্ধ বীর,

    আনো উলঙ্গ সত্য-কৃপাণ বিজলি-ঝলক ন্যায়-অসির॥

  • মরণ-বরণ

    মরণ-বরণ

    মরণ-বরণ

    [গান]
    এসো এসো এসো ওগো মরণ!
    এই
    মরণ-ভীতু মানুষ-মেষের ভয় করো তো হরণ॥
    না বেরিয়েই পথে যারা পথের ভয়ে ঘরে
    বন্ধ-করা অন্ধকারে মরার আগেই মরে,
    তাতা থইথই তাতা থইথই তাদের বুকের পরে
    ভীম
    রুদ্রতালে নাচুক তোমার ভাঙন-ভরা চরণ॥
    দীপক রাগে বাজাও জীবন-বাঁশি,
    মড়ার মুখেও আগুন উঠুক হাসি।
    কাঁধে পিঠে কাঁদে যেথা শিকল জুতোর-ছাপ,
    নাই সেখানে মানুষ সেথা বাঁচা-ও মহাপাপ।
    সে
    দেশের বুকে শ্মশান-মশান জ্বালুক তোমার শাপ,
    সেথা
    জাগুক নবীন সৃষ্টি আবার হোক নব নামকরণ॥
    হাতের তোমার দণ্ড উঠুক কেঁপে
    এবার দাসের ভুবন ভবন ব্যেপে,
    মেষগুলোকে শেষ করে দেশ-চিতার বুকে নাচো!
    শব করে আজ শয়ন, হে শিব জানাও তুমি আছ।
    মরায়-ভরা ধরায়, মরণ! তুমিই শুধু বাঁচো –
    এই
    শেষের মাঝেই অশেষ তুমি, করছি তোমায় বরণ॥
    জ্ঞান-বুড়ো ওই বলছে জীবন মায়া,
    নাশ করো ওই ভীরুর কায়া ছায়া!
    মুক্তিদাতা মরণ! এসো কালবোশেখির বেশে;
    মরার আগেই মরল যারা, নাও তাদেরে এসে।
    জীবন তুমি সৃষ্টি তুমি জরা-মরার দেশে,
    তাই
    শিকল-বিকল মাগছে তোমার মরণ-হরণ শরণ॥
  • বন্দি-বন্দনা

    বন্দি-বন্দনা

    বন্দি-বন্দনা

    [গান]
    আজি
    রক্ত-নিশি-ভোরে
    একী এ শুনি ওরে,
    মুক্তি-কোলাহল বন্দি-শৃঙ্খলে,
    ওই
    কাহারা কারাবাসে
    মুক্তি-হাসি হাসে,
    টুটেছে ভয়-বাধা স্বাধীন হিয়া-তলে॥
    ললাটে লাঞ্ছনা-রক্ত-চন্দন,
    বক্ষে গুরু শিলা, হস্তে বন্ধন,
    নয়নে ভাস্বর সত্য-জ্যোতি-শিখা,
    স্বাধীন দেশ-বাণী কণ্ঠে ঘন বোলে,
    সে ধ্বনি ওঠে রণি ত্রিংশ কোটি ওই
    মানব-কল্লোলে॥
    ওরা
    দু-পায়ে দলে গেল মরণ-শঙ্কারে,
    সবারে ডেকে গেল শিকল-ঝংকারে,
    বাজিল নভ-তলে স্বাধীন ডঙ্কারে,
    বিজয়-সংগীত বন্দি গেয়ে চলে,
    বন্দিশালা মাঝে ঝঞ্ঝা পশেছে রে
    উতল কলরোলে॥
    আজি
    কারার সারা দেহে মুক্তি-ক্রন্দন,
    ধ্বনিছে হাহা স্বরে ছিঁড়িতে বন্ধন,
    নিখিল গেহ যথা বন্দি-কারা, সেথা
    কেন রে কারা-ত্রাসে মরিবে বীর-দলে।
    ‘জয় হে বন্ধন’ গাহিল তাই তারা
    মুক্ত নভ-তলে॥
    আজি
    ধ্বনিছে দিগ্‌বধূ শঙ্খ দিকে দিকে,
    আজি
    গগনে কারা যেন চাহিয়া অনিমিখে,
    ধু ধু ধু হোম-শিখা জ্বলিল ভারতে রে,
    ললাটে জয়টিকা, প্রসূন-হার-গলে
    চলে রে বীর চলে;
    সে নহে নহে কারা, যেখানে ভৈরব-
    রুদ্র-শিখা জ্বলে॥
    কোরাস :
    জয় হে বন্ধন-মৃত্যু-ভয়-হর! মুক্তিকামী জয়।
    স্বাধীন-চিত জয়। জয় হে
    জয় হে! জয় হে! জয় হে!
  • বন্দনা-গান

    বন্দনা-গান

    বন্দনা-গান

    [গান]
    কোরাস :
    শিকলে যাদের উঠেছে বাজিয়া বীরের মুক্তি-তরবারি,
    আমরা তাদেরই ত্রিশ কোটি ভাই, গাহি বন্দনা-গীতি তারি॥
    তাদেরই উষ্ণ শোণিত বহিছে আমাদেরও এই শিরা-মাঝে,
    তাদেরই সত্য-জয়-ঢাক আজি মোদেরই কণ্ঠে ঘন বাজে।
    সম্মান নহে তাহাদের তরে ক্রন্দন-রোল দীর্ঘশ্বাস,
    তাহাদেরই পথে চলিয়া মোরাও বরিব ভাই ওই বন্দি-বাস॥
    শিকলে যাদের উঠেছে বাজিয়া বীরের মুক্তি-তরবারি,
    আমরা তাদেরই ত্রিশ কোটি ভাই, গাহি বন্দনা-গীতি তারি॥
    মুক্ত বিশ্বে কে কার অধীন? স্বাধীন সবাই আমরা ভাই।
    ভাঙিতে নিখিল অধীনতা-পাশ মেলে যদি কারা, বরিব তাই।
    জাগেন সত্য ভগবান যে রে আমাদেরই এই বক্ষ-মাঝ,
    আল্লার গলে কে দেবে শিকল, দেখে নেব মোরা তাহাই আজ॥
    শিকলে যাদের উঠেছে বাজিয়া বীরের মুক্তি-তরবারি,
    আমরা তাদেরই ত্রিশ কোটি ভাই, গাহি বন্দনা-গীতি তারি॥
    কাঁদিব না মোরা, যাও কারা-মাঝে যাও তবে বীর-সংঘ হে,
    ওই শৃঙ্খলই করিবে মোদের ত্রিশ কোটি ভ্রাতৃ-অঙ্গ হে।
    মুক্তির লাগি মিলনের লাগি আহুতি যাহারা দিয়াছে প্রাণ
    হিন্দু-মুসলিম চলেছি আমরা গাহিয়া তাদেরই বিজয়-গান॥
    শিকলে যাদের উঠেছে বাজিয়া বীরের মুক্তি-তরবারি,
    আমরা তাদেরই ত্রিশ কোটি ভাই, গাহি বন্দনা-গীতি তারি॥
  • মুক্তি-সেবকের গান

    মুক্তি-সেবকের গান

    মুক্তি-সেবকের গান

    [গান]

    ও ভাই
    মুক্তিসেবক দল!
    তোদের
    কোন্ ভায়ের আজ বিদায়-ব্যথায় নয়ান ছল-ছল?
    ওই
    কারা-ঘর তো নয় হারা-ঘর,
    হোথাই মেলে মা-র-দেওয়া বর রে!
    ওরে
    হোথাই মেলে বন্দিনী মা-র বুক-জড়ানো কোল!
    তবে
    কীসের রোদনরোল?
    তোরা
    মোছ রে আঁখির জল।
    ও ভাই
    মুক্তিসেবক দল!।

    আজ
    কারায় যারা, তাদের তরে।
    গৌরবে বুক উঠুক ভরে রে!
    মোরা
    ওদের মতোই বেদনা ব্যথা মৃত্যু আঘাত হেসে
    বরণ যেন করতে পারি মাকে ভালোবেসে।
    ওরে
    স্বাধীনকে কে বাঁধতে পারে বল?
    ও ভাই
    মুক্তিসেবক দল!

    ও ভাই
    প্রাণে যদি সত্য থাকে তোর
    মরবে নিজেই মিথ্যা, ভীরু চোর।
    মোরা
    কাঁদব না আজ যতই ব্যথায় পিষুক কলজে-তল।
    মুক্তকে কি রুখতে পারে অসুর পশুর দল?
    মোরা
    কাঁদব যেদিন আসবে তারা আবার ফিরে রে,
    কাঙালিনি মায়ের আমার এই আঙিনা-তল।
    ও ভাই
    মুক্তিসেবক দল॥
  • শিকল-পরার গান

    শিকল-পরার গান

    শিকল-পরার গান

    এই
    শিকল-পরা ছল মোদের এ শিকল-পরা ছল।
    এই
    শিকল পরেই শিকল তোদের করব রে বিকল॥
    তোদের
    বন্ধ কারায় আসা মোদের বন্দি হতে নয়,
    ওরে
    ক্ষয় করতে আসা মোদের সবার বাঁধন-ভয়।
    এই
    বাঁধন পরেই বাঁধন-ভয়কে করব মোরা জয়,
    এই
    শিকলবাঁধা পা নয় এ শিকলভাঙা কল॥
    তোমার
    বন্ধ ঘরের বন্ধনীতে করছ বিশ্ব গ্রাস,
    আর
    ত্রাস দেখিয়েই করবে ভাবছ বিধির শক্তি হ্রাস।
    সেই
    ভয়-দেখানো ভূতের মোরা করব সর্বনাশ,
    এবার
    আনব মাভৈঃ-বিজয়মন্ত্র বলহীনের বল॥
    তোমরা
    ভয় দেখিয়ে করছ শাসন, জয় দেখিয়ে নয়;
    সেই
    ভয়ের টুঁটিই ধরব টিপে, করব তারে লয়।
    মোরা
    আপনি মরে মরার দেশে আনব বরাভয়,
    মোরা
     ফাঁসি পরে আনব হাসি মৃত্যু-জয়ের ফল॥
    ওরে
    ক্রন্দন নয়, বন্ধন এই শিকল-ঝঞ্ঝনা,
    এ যে
    মুক্তি-পথের অগ্রদূতের চরণ-বন্দনা।
    এই
    লাঞ্ছিতেরাই অত্যাচারকে হানছে লাঞ্ছনা,
    মোদের
    অস্থি দিয়েই জ্বলবে দেশে আবার বজ্রানল॥
  • মুক্ত-বন্দি

    মুক্ত-বন্দি

    মুক্ত-বন্দি1

    [গান]

    বন্দি তোমায় ফন্দি-কারার গণ্ডিমুক্ত বন্দিবীর,

    লঙ্ঘিলে আজি ভয়দানবের ছয় বছরের জয়প্রাচীর।

    বন্দি তোমায় বন্দিবীর

    জয় জয়স্তু বন্দিবীর!!

    অগ্রে তোমার নিনাদে শঙ্খ, পশ্চাতে কাঁদে ছয়-বছর,

    অম্বরে শোনো ডম্বরু বাজে–‘অগ্রসর হও, অগ্রসর!’

    কারাগার ভেদি নিশ্বাস ওঠে বন্দিনী কোন্ ক্রন্দসীর,

    ডান-আঁখে আজ ঝলকে অগ্নি, বাম-আঁখে ঝরে অশ্রু-নীর।

    বন্দি তোমায় ফন্দি-কারার গণ্ডি-মুক্ত বন্দি-বীর,

    লঙ্ঘিলে আজি ভয়-দানবের ছয় বছরের জয়প্রাচীর।

    বন্দি তোমায় বন্দিবীর

    জয় জয়স্তু বন্দিবীর!!

    পথতরুছায় ডাকে ‘আয় আয়’ তব জননীর আর্ত স্বর,

    এ আগুন-ঘরে কাঁপিল সহসা ‘সপ্তদশ সে বৈশ্বানর’।

    আগমনি তব রণদুন্দুভি বাজিছে বিজয়-ভৈরবীর,

    জয় অবিনাশী উল্কা-পথিক চিরসৈনিক উচ্চশির।

    বন্দি তোমায় ফন্দি-কারার গণ্ডিমুক্ত বন্দিবীর,

    লঙ্ঘিলে আজি ভয়-দানবের ছয় বছরের জয়প্রাচীর।

    বন্দি তোমায় বন্দিবীর

    জয় জয়স্তু বন্দিবীর!!

    রুদ্ধ-প্রতাপ হে যুদ্ধবীর, আজি প্রবুদ্ধ নব বলে।

    ভুলো না বন্ধু, দলেছ দানব যুগে যুগে তব পদতলে!

    এ নহে বিদায়, পুন হবে দেখা অমর-সমর-সিন্ধুতীর,

    এসো বীর এসো, ললাটে এঁকে দি অশ্রুতপ্ত লাল রুধির।

    বন্দি তোমায় ফন্দি-কারার গণ্ডিমুক্ত বন্দি-বীর,

    লঙ্ঘিলে আজি ভয়-দানবের ছয় বছরের জয়প্রাচীর।

    বন্দি তোমায় বন্দিবীর

    জয় জয়স্তু বন্দিবীর!!

  • যুগান্তরের গান

    যুগান্তরের গান

    যুগান্তরের গান

    [গান]

    বলো ভাই মাভৈঃ মাভৈঃ

    নবযুগ ওই এল ওই

    এল ওই রক্ত-যুগান্তর রে।

    বলো জয় সত্যের জয়

    আসে ভৈরব-বরাভয়

    শোন অভয় ওই রথ-ঘর্ঘর রে॥

    রে বধির! শোন পেতে কান

    ওঠে ওই কোন্ মহা-গান

    হাঁকছে বিষাণ ডাকছে ভগবান রে।

    জগতে জাগল সাড়া

    জেগে ওঠ উঠে দাঁড়া

    ভাঙ পাহারা মায়ার কারা-ঘর রে।

    যা আছে যাক না চুলায়

    নেমে পড় পথের ধুলায়

    নিশান দুলায় ওই প্রলয়ের ঝড় রে।

    সে ঝড়ের ঝাপটা লেগে

    ভীম আবেগে উঠনু জেগে

    পাষাণ ভেঙে প্রাণ-ঝরা নির্ঝর রে।

    ভুলেছি পর ও আপন

    ছিঁড়েছি ঘরের বাঁধন

    স্বদেশ স্বজন স্বদেশ মোদের ঘর রে।

    যারা ভাই বদ্ধ কুয়ায়

    খেয়ে মার জীবন গোঁয়ায়

    তাদের শোনাই প্রাণ-জাগা মন্তর রে।

    ঝড়ের ঝাঁটার ঝাণ্ডার নেড়ে

    মাভৈঃ-বাণীর ডঙ্কা মেরে

    শঙ্কা ছেড়ে হাঁক প্রলয়ংকর রে।

    তোদের ওই চরণ-চাপে

    যেন ভাই মরণ কাঁপে,

    মিথ্যা পাপের কণ্ঠ চেপে ধর রে।

    শোনা তোর বুক-ভরা গান,

    জাগা ফের দেশ-জোড়া প্রাণ,

    যে বলিদান প্রাণ ও আত্মপর রে॥

    মোরা ভাই বাউল চারণ,

    মানি না শাসন বারণ

    জীবন মরণ মোদের অনুচর রে।

    দেখে ওই ভয়ের ফাঁসি

    হাসি জোর জয়ের হাসি,

    অ-বিনাশী নাইকো মোদের ডর রে!

    গেয়ে যাই গান গেয়ে যাই,

    মরা-প্রাণ উটকে দেখাই

    ছাই-চাপা ভাই অগ্নি ভয়ংকর রে॥

    খুঁড়ব কবর তুড়ব শ্মশান

    মড়ার হাড়ে নাচাব প্রাণ

    আনব বিধান নিদান কালের বর রে।

    শুধু এই ভরসা রাখিস

    মরিসনি ভিরমি গেছিস

    ওই শুনেছিস ভারত-বিধির স্বর রে।

    ধর হাত ওঠ রে আবার

    দুর্যোগের রাত্রি কাবার,

    ওই হাসে মা-র মূর্তি মনোহর রে॥

  • চরকার গান

    চরকার গান

    চরকার গান

    ঘোর–
    ঘোর রে ঘোর ঘোর রে আমার সাধের চরকা ঘোর
    ওই
    স্বরাজ-রথের আগমনি শুনি চাকার শব্দে তোর॥
    তোর ঘোরার শব্দে ভাই
    সদাই শুনতে যেন পাই
    ওই
    খুলল স্বরাজ-সিংহদুয়ার, আর বিলম্ব নাই।
    ঘুরে
    আসল ভারত-ভাগ্য-রবি, কাটল দুখের রাত্রি ঘোর॥
    ঘর ঘর তুই ঘোর রে জোরে
    ঘর্ঘরঘর ঘূর্ণিতে তোর
    ঘুচুক ঘুমের ঘোর
    তুই   ঘোর ঘোর ঘোর।
    তোর
    ঘুর-চাকাতে বল-দর্পীর তোপ কামানের টুটুক জোর॥
    তুই  ভারত-বিধির দান,
    এই  কাঙাল দেশের প্রাণ,
    আবার
    ঘরের লক্ষ্মী আসবে ঘরে শুনে তোর ওই গান।
    আর
    লুটতে নারবে সিন্ধু-ডাকাত বৎসরে পঁয়ষট্টি ক্রোড়॥
    হিন্দু-মুসলিম দুই সোদর,
    তাদের মিলন-সূত্র-ডোর রে
    রচলি চক্রে তোর,
    তুই  ঘোর ঘোর ঘোর।
    আবার
    তোর মহিমায় বুঝল দু-ভাই মধুর কেমন মায়ের ক্রোড়॥
    ভারত  বস্ত্রহীন যখন
    কেঁদে  ডাকল – নারায়ণ!
    তুমি
    লজ্জা-হারী করলে এসে লজ্জা নিবারণ,
    তাই
    দেশ-দ্রৌপদীর বস্ত্র হরতে পারল না দুঃশাসন-চোর॥
    এই   সুদর্শন-চক্রে তোর
    অত্যাচারীর টুটল জোর রে ছুটল সব গুমোর
    তুই   ঘোর ঘোর ঘোর।
    তুই
    জোর জুলুমের দশম গ্রহ, বিষ্ণু-চক্র ভীম কঠোর॥
    হয়ে   অন্ন বস্ত্র হীন
    আর   ধর্মে কর্মে ক্ষীণ
    দেশ
    ডুবছিল ঘোর পাপের ভারে যখন দিনকে দিন,
    তখন
    আনলে অন্ন পুণ্য-সুধা, খুললে স্বর্গ মুক্তি-দোর॥
    শাসতে জুলুম নাশতে জোর
    খদ্দর-বাস বর্ম তোর রে অস্ত্র সত্যডোর,
    তুই   ঘোর ঘোর ঘোর।
    মোরা
    ঘুমিয়ে ছিলাম, জেগে দেখি চলছে চরকা, রাত্রি ভোর॥
    তুই   সাত রাজারই ধন,
    দেশ-   মা-র পরশ-রতন,
    তোর
    স্পর্শে মেলে স্বর্গ অর্থ কাম মোক্ষ ধন।
    তুই
    মায়ের আশিস, মাথার মানিক, চোখ ছেপে বয় অশ্রু-লোর॥
  • জাতের বজ্জাতি

    জাতের বজ্জাতি

    জাতের বজ্জাতি

    [গান]

    জাতের নামে বজ্জাতি সব জাত-জালিয়াত খেলছে জুয়া
    ছুঁলেই তোর জাত যাবে? জাত ছেলের হাতের নয় তো মোয়া॥
    হুঁকোর জল আর ভাতের হাঁড়ি, ভাবলি এতেই জাতির জান,
    তাই তো বেকুব, করলি তোরা এক জাতিকে একশো-খান!
     এখন দেখিস ভারত-জোড়া
     পচে আছিস বাসি মড়া,
    মানুষ নাই আজ, আছে শুধু জাত-শেয়ালের হুক্কাহুয়া॥
    জানিস না কি ধর্ম সে যে বর্মসম সহনশীল,
    তাকে কি ভাই ভাঙতে পারে ছোঁয়া-ছুঁয়ির ছোট্ট ঢিল।
     যে জাত-ধর্ম ঠুনকো এত,
     আজ নয় কাল ভাঙবে সে তো,
    যাক না সে জাত জাহান্নামে, রইবে মানুষ, নাই পরোয়া॥
    দিন-কানা সব দেখতে পাসনে দণ্ডে দণ্ডে পলে পলে
    কেমন করে পিষছে তোদের পিশাচ জাতের জাঁতাকলে।
     (তোরা) জাতের চাপে মারলি জাতি,
     সূর্য ত্যজি নিলি বাতি,
    তোদের
    জাত-ভগীরথ এনেছে জল জাত-বিজাতের জুতো-ধোয়া॥
    মনু ঋষি অণুসমান বিপুল বিশ্বে যে বিধির,
    বুঝলি না সেই বিধির বিধি, মনুর পায়েই নোয়াস শির।
     ওরে মূর্খ ওরে জড়,
     শাস্ত্র চেয়ে সত্য বড়ো,
    (তোরা)
    চিনলিনে তা চিনির বলদ, সার হল তাই শাস্ত্র বওয়া॥
    সকল জাতই সৃষ্টি যে তাঁর, এই বিশ্ব মায়ের বিশ্ব-ঘর,
    মায়ের ছেলে সবাই সমান, তাঁর কাছে নাই আত্ম-পর।
    (তোরা) সৃষ্টিকে তাঁর ঘৃণা করে
    স্রষ্টায় পূজিস জীবন ভরে
    ভস্মে ঘৃত ঢালা সে যে বাছুর মেরে গাভি দোওয়া॥
    বলতে পারিস বিশ্বপিতা ভগবানের কোন সে জাত?
    কোন ছেলের তাঁর লাগলে ছোঁয়া অশুচি হন জগন্নাথ?
     নারায়ণের জাত যদি নাই,
     তোদের কেন জাতের বালাই?
    (তোরা)
    ছেলের মুখে থুথু দিয়ে মার মুখে দিস ধূপের ধোঁয়া॥
    ভগবানের ফৌজদারি-কোর্ট নাই সেখানে জাতবিচার,
    (তোর)
    পইতে টিকি টুপি টোপর সব সেথা ভাই একাক্কার।
     জাত সে শিকেয় তোলা রবে,
     কর্ম নিয়ে বিচার হবে,
    (তা-পর)
    বামুন চাঁড়াল এক গোয়ালে, নরক কিংবা স্বর্গে থোয়া॥
    (এই)
    আচার-বিচার বড়ো করে প্রাণ দেবতায় ক্ষুদ্র ভাবা,
    (বাবা)
    এই পাপেই আজ উঠতে বসতে সিঙ্গি-মামার খাচ্ছ থাবা।
     তাই নাইকো অন্ন নাইকো বস্ত্র,
     নাইকো সম্মান, নাইকো অস্ত্র,
    (এই)
    জাত-জুয়াড়ির ভাগ্যে আছে আরও অশেষ দুঃখ-সওয়া॥
  • সত্য-মন্ত্র

    সত্য-মন্ত্র

    সত্য-মন্ত্র

    [গান]

    পুথির বিধান যাক পুড়ে তোর,
    বিধির বিধান সত্য হোক!
    বিধির বিধান সত্য হোক!!
    (এই)
    খোদার উপর খোদকারি তোর
    মানবে না আর সর্বলোক!
    মানবে না আর সর্বলোক!!
    (তোর)
    ঘরের প্রদীপ নিবেই যদি,
    নিবুক না রে, কীসের ভয়?
    আঁধারকে তোর কীসের ভয়?
    (ওই)
    ভুবন জুড়ে জ্বলছে আলো,
    ভবনটাই সে সত্য নয়।
    ঘরটাই তোর সত্য নয়।
    (ওই)
    বাইরে জ্বলছে চন্দ্র সূর্য
    নিত্যকালের তাঁর আলোক।
    বিধির বিধান সত্য হোক!
    বিধির বিধান সত্য হোক!!
    লোক-সমাজের শাসক রাজা,
    (আর)
    রাজার শাসক মালিক যেই,
    বিরাট যাঁহার সৃষ্টি এই,
    তাঁর শাসনকে অগ্রে মান
    তার বড়ো আর শাস্ত্র নেই,
    তার বড়ো আর সত্য নেই!
    সেই খোদা খোদ সহায় তোর,
    ভয় কী? নিখিল মন্দ ক’ক!
    বিধির বিধান সত্য হোক!
    বিধির বিধান সত্য হোক!!
    বিধির বিধি মানতে গিয়ে
    নিষেধ যদি দেয় আগল
    বিশ্ব যদি কয় পাগল,
    আছেন সত্য মাথার পর,–
    বে-পরোয়া তুই সত্য বল।
    বুক ঠুকে তুই সত্য বল!
    (তখন)
    তোর পথেরই মশাল হয়ে
    জ্বলবে বিধির রুদ্র-চোখ!
    বিধির বিধান সত্য হোক!
    বিধির বিধান সত্য হোক!!
    মনুর শাস্ত্র রাজার অস্ত্র
    আজ আছে কাল নাইকো আশ,
    কাল তারে কাল করবে গ্রাস।
    হাতের খেলা সৃষ্টি যাঁর
    তাঁর শুধু ভাই নাই বিনাশ,
    স্রষ্টার সেই নাই বিনাশ!
    সেই বিধাতায় মাথায় করে
    বিপুল গর্বে বক্ষ ঠোক!
    বিধির বিধান সত্য হোক!
    বিধির বিধান সত্য হোক!
    সত্যতে নাই ধানাই পানাই
    সত্য যাহা সহজ তাই,
    সত্য যাহা সহজ তাই;
    আপনি তাতে বিশ্বাস আসে,
    আপনি তাতে শক্তি পায়
    সত্যের জোর-জুলুম নাই
    সেই সে মহান সত্যকে মান–
    রইবে না আর দুঃখ-শোক।
    বিধির বিধান সত্য হোক!
    বিধির বিধান সত্য হোক!!
    নানান মুনির নানান মত যে,
    মানবি বল সে কার শাসন?
    কয় জনার বা রাখবি মন?
    এক সমাজকে মানলে করবে
    আরেক সমাজ নির্বাসন,
    চারিদিকে শৃঙ্খল বাঁধন!
    সকল পথের লক্ষ্য যিনি
    চোখ পুরে নে তাঁর আলোক!
    বিধির বিধান সত্য হোক!
    বিধির বিধান সত্য হোক!!
  • বিজয়-গান

    বিজয়-গান

    বিজয়-গান

    [গান]

    ওই
    অভ্র-ভেদী তোমার ধ্বজা
    উড়ল আকাশ-পথে।
    মা গো, তোমার রথ-আনা ওই
    রক্ত-সেনার রথে॥
    ললাট-ভরা জয়ের টিকা,
    অঙ্গে নাচে অগ্নিশিখা,
    রক্তে জ্বলে বহ্নিলিখা–মা!
    ওই বাজে তোর বিজয়-ভেরি,
    নাই দেরি আর নাই মা দেরি,
    মুক্ত তোমার হতে॥
    আনো তোমার বরণডালা, আনো তোমার শঙ্খ, নারী!
    ওই দ্বারে মা-র মুক্তি সেনা, বিজয়-বাজা উঠছে তারই।
    ওরে ভীরু! ওরে মরা!
    মরার ভয়ে যাসনি তোরা;
    তোদেরও আজ ডাকছি মোরা ভাই!
    ওই খোলে রে মুক্তি-তোরণ,
    আজ একাকার জীবন-মরণ
    মুক্ত এ ভারতে॥
  • পাগল পথিক

    পাগল পথিক

    পাগল পথিক

    [গান]

    এ কোন্
    পাগল পথিক ছুটে এল বন্দিনী মা-র আঙিনায়।
    ত্রিশ কোটি ভাই মরণ-হরণ গান গেয়ে তাঁর সঙ্গে যায়॥
    অধীন দেশের বাঁধন-বেদন
    কে এল রে করতে ছেদন?
    শিকল-দেবীর বেদির বুকে মুক্তি-শঙ্খ কে বাজায়॥
    মরা মায়ের লাশ কাঁধে ওই অভিমানী ভায়ে ভায়ে
    বুক-ভরা আজ কাঁদন কেঁদে আনল মরণ-পারের মায়ে।
    পণ করেছে এবার সবাই,
    পর-দ্বারে আর যাব না ভাই!
    মুক্তি সে তো নিজের প্রাণে, নাই ভিখারির প্রার্থনায়॥
    শাশ্বত যে সত্য তারই ভুবন ভরে বাজল ভেরি,
    অসত্য আজ নিজের বিষেই মরল ও তার নাইকো দেরি।
    হিংসুকে নয়, মানুষ হয়ে
    আয় রে, সময় যায় যে বয়ে!
    মরার মতন মরতে, ওরে মরণভীতু! ক-জন পায়!
    ইসরাফিলের শিঙা বাজে আজকে ঈশান-বিষাণ সাথে,
    প্রলয়-রাগে নয় রে এবার ভৈরবীতে দেশ জাগাতে।
    পথের বাধা স্নেহের মায়ায়
    পায় দলে আয় পায় দলে আয়!
    রোদন কীসের? – আজ যে বোধন!
    বাজিয়ে বিষাণ উড়িয়ে নিশান আয় রে আয়॥
  • ভূত-ভাগানোর গান

    ভূত-ভাগানোর গান

    ভূত-ভাগানোর গান

    [বাউল গান]

    ওই
    তেত্রিশ কোটি দেবতাকে তোর তেত্রিশ কোটি ভূতে
    আজ
    নাচ বুড্‌ঢি নাচায় বাবা উঠতে বসতে শুতে!
    ও ভূত
      যেই দেখেছে মন্দির তোর
    নাই দেবতা নাচছে ইতর,
    আর
    মন্ত্র শুধু দন্ত-বিকাশ, অমনি ভূতের পুতে,
    তোর
    ভগবানকে ভূত বানালে ঘানি-চক্রে জুতে॥

    ও ভূত
      যেই জেনেছে তোদের ওঝা
    আজ নকলের বইছে বোঝা,
    ওরে
    অমনি সোজা তোদের কাঁধে খুঁটো তাদের পুঁতে,
    আজ
    ভূত-ভাগানোর মজা দেখায় বোম-ভোলা বম্বুতে!

    ও ভূত
      সর্ষে-পড়া অনেক ধুনো
    দেখে শুনে হল ঝুনো,
    তাই
    তুলো-ধুনো করছে ততই যতই মরিস কুঁথে,
    ও ভূত
    নাচছে রে তোর নাকের ডগায় পারিসনে তুই ছুঁতে!

    আগে বোঝেনিকো তোদের ওঝা
    তোরা গোঁজামিলের মন্ত্র-ভজা।
    (শিখলি শুধু চক্ষু-বোঁজা)
    শিখলি শুধু কানার বোঝা কুঁজোর ঘাড়ে থুতে,
    তাই
    আপনাকে তুই হেলা করে ডাকিস স্বর্গদূতে॥

    ওরে
      জীবন-হারা, ভূতে-খাওয়া!
      ভূতের হাতে মুক্তি পাওয়া
    সে কি সোজা? – ভূত কি ভাগে ফুসমন্তর ফুঁতে?
    তোরা
    ফাঁকির ‘কিন্তু’ এড়িয়ে – পড়বি কূলহারা ‘কিন্তু’তে!

    ওরে
      ভূত তো ভূত – ওই মারের চোটে
      ভূতের বাবাও উধাও ছোটে!
    ভূতের বাপ ওই ভয়টাকে মার, ভূত যাবে তোর ছুটে।
    তখন
    ভূতে-পাওয়া এই দেশই ফের ভরবে দেবতা দূতে॥
  • বিদ্রোহীর বাণী

    বিদ্রোহীর বাণী

    বিদ্রোহীর বাণী

    দোহাই তোদের! এবার তোরা সত্যি করে সত্য বল্!

    ঢের দেখালি ঢাক ঢাক আর গুড় গুড়, ঢের মিথ্যা ছল।

    এবার তোরা সত্য বল॥

    পেটে এক আর মুখে আর এক – এই যে তোদের ভণ্ডামি,

    এতেই তোরা লোক হাসালি, বিশ্বে হলি কম-দামি।

    নিজের কাছেও ক্ষুদ্র হলি আপন ফাঁকির আপশোশে,

    বাইরে ফাঁকা পাঁইতারা তাই, নাই তলোয়ার খাপ-কোশে।

    তাই হলি সব সেরেফ আজ

    কাপুরুষ আর ফেরেব-বাজ,

    সত্য কথা বলতে ডরাস, তোরা আবার করবি কাজ!

    ফোঁপরা ঢেঁকির নেইকো লাজ!

    ইলশেগুঁড়ি বৃষ্টি দেখেই ঘর ছুটিস সব রামছাগল!

    যুক্তি তোদের খুব বুঝেছি, দুধকে দুধ আর জলকে জল!

    এবার তোরা সত্য বল॥

    বুকের ভিতর ছ-পাই ন-পাই, মুখে বলিস স্বরাজ চাই,

    স্বরাজ কথার মানে তোদের ক্রমেই হচ্চে দরাজ তাই!

    ‘ভারত হবে ভারতবাসীর’ – এই কথাটাও বলতে ভয়!

    সেই বুড়োদের বলিস নেতা – তাদের কথায় চলতে হয়!

    বল রে তোরা বল নবীন –

    চাইনে এসব জ্ঞান-প্রবীণ!

    স্ব-স্বরূপে দেশকে ক্লীব করছে এরা দিনকে দিন,

    চায় না এরা – হই স্বাধীন!

    কর্তা হবার শখ সবারই, স্বরাজ-ফরাজ ছল কেবল!

    ফাঁকা প্রেমের ফুসমন্তর, মুখ সরল আর মন গরল!

    এবার তোরা সত্য বল॥

    মহান-চেতা নেতার দলে তোল রে তরুণ তোদের নায়,

    ওঁরা মোদের দেবতা, সবাই করব প্রণাম ওঁদের পায়।

    জানিস তো ভাই শেষ বয়সে স্বতই সবার মরতে ভয়,

    ঝড়-তুফানে তাঁদের দিয়ে নয় তরি পার করতে নয়।

    জোয়ানরা হাল ধরবে তার

    করবে তরি তুফান পার!

    জয় মা বলে মাল্লা তরুণ ওই তুফানে লাখ হাজার

    প্রাণ দিয়ে ত্রাণ করবে মার!

    সেদিন করিস এই নেতাদের ধ্বংস-শেষের সৃষ্টি কল।

    ভয়-ভীরুতা থাকতে দেশের প্রেম ফলাবে ঘণ্টা ফল!

    এবার তোরা সত্য বল॥

    ধর্ম-কথা প্রেমের বাণী জানি মহান উচ্চ খুব,

    কিন্তু সাপের দাঁত না ভেঙে মন্ত্র ঝাড়ে যে বেকুব!

    ‘ব্যাঘ্র সাহেব, হিংসে ছাড়ো, পড়বে এসো বেদান্ত!’

    কয় যদি ছাগ, লাফ দিয়ে বাঘ অমনি হবে কৃতান্ত!

    থাকতে বাঘের দন্ত-নখ

    বিফল ভাই ওই প্রেম-সেবক!

    চোখের জলে ডুবলে গর্ব শার্দুলও হয় বেদ-পাঠক,

    প্রেম মানে না খুন-খাদক।

    ধর্মগুরু ধর্ম শোনান, পুরুষ ছেলে যুদ্ধে চল।

    সেও ভি আচ্ছা, মরব পিয়ে মৃত্যু-শোণিত-অ্যালকোহল!

    এবার তোরা সত্য বল॥

    প্রেমিক ঠাকুর মন্দিরে যান, গাড়ুন সেথায় আস্তানা!

    শবে শিবায় শিব কেশবের – তৌবা – তাঁদের রাস্তা না!

    মৃতের সামিল এখন ওঁরা, পূজা ওঁদের জোরসে হোক,

    ধর্মগুরু গোর-সমাধি পূজে যেমন নিত্য লোক!

    তরুণ চাহে যুদ্ধ-ভূম!

    মুক্তি-সেনা চায় হুকুম!

    চাই না ‘নেতা’, চাই ‘জেনারেল’, প্রাণ-মাতনের ছুটুক ধূম!

    মানব-মেধের যজ্ঞধূম।

    প্রাণ-আঙুরের নিঙরানো রস – সেই আমাদের শান্তি-জল।

    সোনা-মানিক ভাইরা আমার ! আয় যাবি কে তরতে চল।

    এবার তোরা সত্য বল॥

    যেথায় মিথ্যা ভণ্ডামি ভাই করব সেথায় বিদ্রোহ!

    ধামা-ধরা! জামা-ধরা! মরণ-ভীতু! চুপ রহো!

    আমরা জানি সোজা কথা, পূর্ণ স্বাধীন করব দেশ!

    এই দুলালুম বিজয়-নিশান, মরতে আছি – মরব শেষ!

    নরম গরম পচে গেছে, আমরা নবীন চরম দল!

    ডুবেছি না ডুবতে আছি, স্বর্গ কিংবা পাতাল-তল!

  • অভিশাপ

    অভিশাপ

    অভিশাপ

    আমি
    বিধির বিধান ভাঙিয়াছি, আমি এমনি শক্তিমান!
    মম
    চরণের তলে, মরণের মার খেয়ে মরে ভগবান।
    আদি ও অন্তহীন
    আজ মনে পড়ে সেই দিন –
    প্রথম যেদিন আপনার মাঝে আপনি জাগিনু আমি,
    আর
    চিৎকার করি কাঁদিয়া উঠিল তোদের জগৎ-স্বামী।
    ভয়ে
    কালো হয়ে গেল আলো-মুখ তার।
    ফরিয়াদ করি গুমরি উঠিল মহা-হাহাকার –
    ছিন্ন-কণ্ঠে আর্ত কণ্ঠে তোমাদের ওই ভীরু বিধাতার –
    আর্তনাদের মহা-হাহাকার –
    যে,
    ‘বাঁচাও আমারে বাঁচাও হে মোর মহান, বিপুল আমি!
    হে মোর সৃষ্টি! অভিশাপ মোর!
    আজি হতে প্রভু তুমি হও মম স্বামী!’–
    শুনি
    খলখলখল অট্ট হাসিনু, আজিও সে হাসি বাজে
    ওই
    অগ্ন্যুদ্‌গার-উল্লাসে আর নিদাঘ-দগ্ধ
    বিনা-মেঘের ওই শুষ্ক বজ্র-মাঝে!
    স্রষ্টার বুকে আমি সেই দিন প্রথম জাগানু ভীতি, –
    সেই দিন হতে বাজিছে নিখিলে ব্যথা-ক্রন্দন গীতি!
    জাপটি ধরিয়া বিধাতারে আজও পিষে মারি পলে পলে,
    এই
    কালসাপ আমি, লোকে ভুল করে মোরে অভিশাপ বলে।
  • মুক্ত-পিঞ্জর

    মুক্ত-পিঞ্জর

    মুক্ত-পিঞ্জর

    ভেদি দৈত্য-কারা

    উদিলাম পুন আমি কারা-ত্রাস চির-মুক্ত বাধাবন্ধ-হারা

    উদ্দামের জ্যোতি-মুখরিত মহা-গগন-অঙ্গনে –

    হেরিনু, অনন্তলোক দাঁড়াল প্রণতি করি মুক্ত-বন্ধ আমার চরণে।

    থেমে গেল ক্ষণেকের তরে বিশ্ব-প্রণব-ওংকার,

    শুনিল কোথায় বাজে ছিন্ন শৃঙ্খলে কার আহত ঝংকার!

    কালের করাতে কার ক্ষয় হল অক্ষয় শিকল,

    শুনি আজি তারই আর্ত জয়ধ্বনি ঘোষিল গগন পবন জল স্থল।

    কোথা কার আঁখি হতে সরিল পাষাণ-যবনিকা,

    তারই আঁখি-দীপ্তি-শিখা রক্ত-রবি-রূপে হেরি ভরিল উদয়-ললাটিকা।

    পড়িল গগন-ঢাকে কাঠি,

    জ্যোতির্লোক হতে ঝরা করুণা-ধারায়–ডুবে গেল ধরা-মা’র স্নেহ-শুষ্ক মাটি,

    পাষাণ-পিঞ্জর ভেদি, ছেদি নভ-নীল–

    বাহিরিল কোন্ বার্তা নিয়া পুন মুক্তপক্ষ অগ্নি-জিব্রাইল!

    দৈত্যাগার দ্বারে দ্বারে ব্যর্থ রোষে হাঁকিল প্রহরী!

    কাঁদিল পাষাণে পড়ি

    সদ্য-ছিন্ন চরণ-শৃঙ্খল!

    মুক্তি মার খেয়ে কাঁদে পাষাণ-প্রাসাদ-দ্বারে আহত অর্গল!

    শুনিলাম – মম পিছে পিছে যেন তরঙ্গিছে

    নিখিল বন্দির ব্যথা-শ্বাস –

    মুক্তি-মাগা ক্রন্দন-আভাস।

    ছুটে এসে লুটায়ে লুটায়ে যেন পড়ে মম পায়ে;

    বলে – ‘ওগো ঘরে-ফেরা মুক্তি-দূত!

    একটুকু ঠাঁই কিগো হবে না ও ঘরে-নেওয়া নায়ে?’

    নয়ন নিঙাড়ি এল জল,

    মুখে বলিলাম তবু – ‘বন্ধু! আর দেরি নাই, যাবে রসাতল

    পাষাণ-প্রাচীর-ঘেরা ওই দৈত্যাগার,

    আসে কাল রক্ত-অশ্বে চড়ি, হেরো দুরন্ত দুর্বার!’ –

    বাহিরিনু মুক্ত-পিঞ্জর বুনো পাখি

    ক্লান্ত কণ্ঠে জয় চির-মুক্তি ধ্বনি হাঁকি –

    উড়িবারে চাই যত জ্যোতির্দীপ্ত মুক্ত নভ-পানে,

    অবসাদ-ভগ্ন ডানা ততই আমারে যেন মাটি পানে টানে।

    মা আমার! মা আমার! এ কী হল হায়!

    কে আমারে টানে মা গো উচ্চ হতে ধরার ধূলায়?

    মরেছে মা বন্ধহারা বহ্নিগর্ভ তোমার চঞ্চল,

    চরণ-শিকল কেটে পরেছে সে নয়ন-শিকল।

    মা! তোমার হরিণ-শিশুরে

    বিষাক্ত সাপিনি কোন টানিছে নয়ন-টানে কোথা কোন্ দূরে!

    আজ তব নীলকণ্ঠ পাখি গীতহারা

    হাসি তার ব্যথা-ম্লান, গতি তার ছন্দহীন, বদ্ধ তার ঝরনাপ্রাণধারা!

    বুঝি নাই রক্ষীঘেরা রাক্ষস-দেউলে

    এল কবে মরু-মায়াবিনী

    সিংহাসন পাতিল সে কবে মোর মর্ম-হর্ম্যমূলে!

    চরণ-শৃঙ্খল মম যখন কাটিতেছিল কাল –

    কোন্ চপলার কেশ-জাল

    কখন জড়াতেছিল গতিমত্ত আমার চরণে,

    লৌহবেড়ি যত যায় খুলে, তত বাঁধা পড়ি কার কঙ্কণবন্ধনে!

    আজ যবে পলে পলে দিন-গণা পথ-চাওয়া পথ

    বলে – ‘বন্ধু, এই মোর বুক পাতা, আনো তব রক্ত-পথ-রথ –’

    শুনে শুধু চোখে আসে জল,

    কেমনে বলিব, ‘বন্ধু! আজও মোর ছিঁড়েনি শিকল!

    হারায়ে এসেছি সখা শত্রুর শিবিরে

    প্রাণ-স্পর্শমণি মোর,

    রিক্ত-কর আসিয়াছি ফিরে!’…

    যখন আছিনু বদ্ধ রুদ্ধ দুয়ার কারাবাসে

    কত না আহ্বান-বাণী শুনিতাম লতা-পুষ্প-ঘাসে!

    জ্যোতির্লোক মহাসভা গগন-অঙ্গন

    জানাত কিরণ-সুরে নিত্য নব নব নিমন্ত্রণ!

    নাম-নাহি-জানা কত পাখি

    বাহিরের আনন্দ-সভায় – সুরে সুরে যেত মোরে ডাকি।

    শুনি তাহা চোখ ফেটে উছলাত জল –

    ভাবিতাম, কবে মোর টুটিবে শৃঙ্খল,

    কবে আমি ওই পাখি-সনে

    গাব গান, শুনিব ফুলের ভাষা

    অলি হয়ে চাঁপা-ফুলবনে।

    পথে যেত অচেনা পথিক,

    রুদ্ধ গবাক্ষ হতে রহিতাম মেলি আমি তৃষ্ণাতুর আঁখি নির্নিমিখ!

    তাহাদের ওই পথ-চলা

    আমার পরানে যেন ঢালিত কী অভিনব সুর-সুধাগলা!

    পথ-চলা পথিকের পায়ে পায়ে লুটাত এ মন,

    মনে হত, চিৎকারিয়া কেঁদে কই –

    ‘হে পথিক, মোরে দাও ওই তব বাধামুক্ত অলস চরণ!

    দাও তব পথচলা পা-র মুক্তি-ছোঁয়া,

    গলে যাক এ পাষাণ, টুটে যাক ও-পরশে এ কঠিন লোহা!’

    সন্ধ্যাবেলা দূরে বাতায়নে,

    জ্বলিত অচেনা দীপখানি,

    ছায়া তার পড়িত এ বন্ধন-কাতর দু-নয়নে!

    ডাকিতাম, ‘কে তুমি অচেনা বধূ কার গৃহ-আলো?

    কারে ডাক দীপ-ইশারায়?

    কার আশে নিতি নিতি এত দীপ জ্বাল?

    ওগো, তব ওই দীপ সনে

    ভেসে আসে দুটি আঁখি-দীপ কার এ রুদ্ধ প্রাঙ্গণে!’ –

    এমনই সে কত মধু-কথা

    ভরিত আমার বদ্ধ বিজন ঘরের নীরবতা।

    ওগো, বাহিরিয়া আমি হায় এ কী হেরি –

    ভাঙা-কারা বাহু মেলি আছে মোর সারা বিশ্ব ঘেরি!

    পরাধীনা অনাথিনি জননী আমার –

    খুলিল না দ্বার তাঁর,

    বুকে তাঁর তেমনই পাষাণ,

    পথতরুছায় কেহ ‘আয় আয় জাদু’ বলি জুড়াল না প্রাণ!

    ভেবেছিনু ভাঙিলাম রাক্ষস-দেউল

    আজ দেখি সে দেউল জুড়ে আছে সারা মর্মমূল!

    ওগো, আমি চির-বন্দি আজ,

    মুক্তি নাই, মুক্তি নাই,

    মম মুক্তি নতশির আজ নতলাজ!

    আজ আমি অশ্রুহারা পাষাণ-প্রাণের কূলে কাঁদি –

    কখন জাগাবে এসে সাথি মোর ঘূর্ণি-হাওয়া রক্ত-অশ্ব উচ্ছৃঙ্খল আঁধি!

    বন্ধু! আজ সকলের কাছে ক্ষমা চাই –

    শত্রুপুরীমুক্ত আমি আপন পাষাণপুরে আজি বন্দি ভাই!

  • ঝড়

    ঝড়

    ঝড়

    [পশ্চিম তরঙ্গ]

    ঝড়–ঝড়–ঝড় আমি–আমি ঝড়–

    শন–শন–শনশন শন–ক্কড়ক্কড় ক্কড়–

    কাঁদে মোর আগমনি আকাশ বাতাস বনানীতে।

    জন্ম মোর পশ্চিমের অস্তগিরি-শিরে,

    যাত্রা মোর জন্মি আচম্বিতে

    প্রাচী-র অলক্ষ্য পথ-পানে

    মায়াবী দৈত্যশিশু আমি

    ছুটে চলি অনির্দেশ অনর্থ-সন্ধানে!

    জন্মিয়াই হেরিনু, মোরে ঘিরি ক্ষতির অক্ষৌহিণী সেনা

    প্রণমি বন্দিল–‘প্রভু! তব সাথে আমাদের যুগে যুগে চেনা,

    মোরা তব আজ্ঞাবহ দাস–

    প্রলয় তুফান বন্যা, মড়ক দুর্ভিক্ষ মহামারি সর্বনাশ!’

    বাজিল আকাশ-ঘণ্টা, বসুধা-কাঁসর;

    মার্তণ্ডের ধূপদানি–মেঘ-বাষ্প-ধূমে-ধূমে ভরাল অম্বর!

    উল্কার হাউই ছোটে, গ্রহ উপগ্রহ হতে ঘোষিল মঙ্গল;

    মহাসিন্ধু-শঙ্খে বাজে অভিশাপ-আগমনি কলকল কল কলকল কল কলকল কল!

    ‘জয় হে ভয়ংকর, জয় প্রলংকর’ নির্ঘোষি ভয়াল

    বন্দিল ত্রিকাল-ঋষি।

    ধ্যান-ভগ্ন রক্ত-আঁখি আশিস দানিল মহাকাল।

    উল্লম্ফিয়া উঠিলাম আকাশের পানে তুলি বাহু,

    আমি নব রাহু!

    হেরিলাম সেবারতা মহীয়সী মহালক্ষ্মী প্রকৃতির রূপ,

    সহসা সে ভুলিয়াছে সেবা, আগমন-ভয়ে মোর

    প্রস্তর-শিখার সম নিশ্চল নিশ্চুপ!

    অনুমানি যেন কোনো সর্বনাশা অমঙ্গল ভয়

    জাগি আছে শিশুর শিয়র-পাশে ধ্যানমগ্না মাতা, শ্বাস নাহি বয়।

    মনে হল ওই বুঝি হারা-মাতা মোর! মৌনা ওই জননীর

    শুভ্র শান্ত কোলে

    –প্রহ্লাদকুলের আমি কাল-দৈত্য-শিশু–

    ঝাঁপাইয়া পড়িলাম ‘মা আমার’ বলে।

    নাহি জানি কোন্ ফণিমনসার হলাহল-লোকে–

    কোন্ বিষ-দীপ-জ্বালা সবুজ আলোকে–

    নাগমাতা কদ্রু-গর্ভে জন্মেছি সহস্রফণা নাগ

    ভীষণ তক্ষকশিশু! কোথা হয় নাগনাশী জন্মেজয়-যাগ–

    উচ্চারিছে আকর্ষণ-মন্ত্র কোন্ গুণী–

    জন্মান্তর-পার হতে ছুটে চলি আমি সেই মৃত্যু-ডাক শুনি!

    মন্ত্র-তেজে পাংশু হয়ে ওঠে মোর হিংসা-বিষ-ক্রোধ-কৃষ্ণ প্রাণ,

    আমার তুরীয় গতি–সে যে ওই অনাদি উদয় হতে

    হিংসাসর্প-যজ্ঞমন্ত্র-টান!

    ছুটে চলি অনন্ত তক্ষক ঝড়–

    শন–শন–শনশন শন

    সহসা কে তুমি এলে হে মর্ত্য-ইন্দ্রাণী মাতা,

    তব ওই ধূলি-আস্তরণ

    বিছায়ে আমার তরে জাতকের জন্মান্তর হতে?

    লুকানু ও-অঞ্চল-আড়ালে, দাঁড়ালে আড়াল হয়ে মোর মৃত্যু-পথে!

    ব্যর্থ হল অঞ্চল-আড়াল; বহ্নি-আকর্ষণ

    মন্ত্র-তেজে ব্যাকুল ভীষণ

    রক্তে রক্তে বাজে মোর–শনশন শন–

    শন–শন–ওই শুন দূর–

    দূরান্তর হতে মাগো, ডাকে মোরে অগ্নি-ঋষি বিষহরি সুর!

    জননী গো চলিলাম অনন্ত চঞ্চল,

    বিষে তব নীল হল দেহ, বৃথা মা গো দাব-দাহে পুড়ালে অঞ্চল!

    ছুটে চলি মহা-নাগ, রক্তে মোর শুনি আকর্ষণী,

    মমতা-জননী

    দাহে মোর পড়িল মুরছি;

    আমি চলি প্রলয়-পথিক–দিকে দিকে মারী-মরু রচি।

    ঝড়–ঝড়–ঝড় আমি–আমি ঝড়–

    শন–শন–শনশন শন–ক্কড়ক্কড় ক্কড়–

    কোলাহল-কল্লোলের হিল্লোল-হিন্দোল–

    দুরন্ত দোলায় চড়ি–‘দে দোল দে দোল’

    উল্লাসে হাঁকিয়া বলি, তালি দিয়া মেঘে

    উন্মদ উন্মাদ ঘোর তুফানিয়া বেগে!

    ছুটে চলি ঝড়–গৃহ-হারা শান্তি-হারা বন্ধ-হারা ঝড়–

    স্বেচ্ছাচার-ছন্দে নাচি !ক্কড়ক্কড় ক্কড়

    কণ্ঠে মোর লুণ্ঠে ঘোর বজ্র-গিটকিরি,

    মেঘ-বৃন্দাবনে মুহুছুটে মোর বিজুরির জ্বালা-পিচকিরি!

    উড়ে সুখ-নীড়, পড়ে ছায়া-তরু,নড়ে ভিত্তি রাজ-প্রাসাদের,

    তুফান-তুরগ মোর উরগেন্দ্র-বেগে ধায়।

    আমি ছুটি অশান্ত-লোকের

    প্রশান্ত-সাগর-শোষা উষ্ণশ্বাস টানি।

    লোকে লোকে পড়ে যায় প্রলয়ের ত্রস্ত কানাকানি!

    ঝড়–ঝড়–উড়ে চলি ঝড় মহাবায়-পঙ্খিরাজে চড়ি,

    পড়-পড় আকাশের ঝোলা শামিয়ানা

    মম ধূলিধ্বজা সনে করে জড়াজড়ি!

    প্রমত্ত সাগর-বারি–অশ্ব মম তুফানির খর ক্ষুর-বেগে

    আন্দোলি আন্দোলি ওঠে। ফেনা ওঠে জেগে

    ঝটিকার কশা খেয়ে অনন্ত তরঙ্গ-মুখে তার!

    আমি যেন সাপুড়িয়া     মারি মন্ত্র-মার–

    ঢেউ-এর মোচড়ে তাই     মহাসিন্ধু-মুখে

    জল-নাগ-নাগিনিরা আছাড়ি পিছাড়ি মরে ধুঁকে!

    প্রিয়া মোর ঘূর্ণিবায়ু     বেদুইন-বালা

    চূর্ণি চলে ঝঞ্ঝা-চুর মম আগে আগে।

    ঝরনা-ঝোরা তটিনীর নটিনি-নাচন-সুখ লাগে

    শুষ্ক খড়কুটো ধূলি শীত-শীর্ণ বিদায়-পাতায়

    ফাল্গুনী-পরশে তার।–আমার ধমকে নুয়ে যায়

    বনস্পতির মহা মহিরুহ, শাল্মলি, পুন্নাগ, দেওদার,

    ধরি যবে তার

    জাপটি পল্লব-ঝুঁটি, শাখা-শির ধরে দিই নাড়া;

    গুমরি কাঁদিয়া ওঠে প্রণতা বনানী,

    চচ্চড় করে ওঠে পাহাড়ের খাড়া শির-দাঁড়া!

    প্রিয়া মোর এলোমেলো গেয়ে গান আগে আগে চলে;

    পাগলিনি কেশে ধূলি চোখে তার মায়া-মণি ঝলে।

    ঘাগরির ঘূর্ণা তার ঘূর্ণি-ধাঁধা লাগায় নয়নালোকে মোর।

    ঘূর্ণিবালা হাসির হররা হানি বলে–‘মনোচোর।

    ধরো তো আমারে দেখি’–

    ত্রস্ত-বাস হাওয়া-পরি, বেণি তার দুলে ওঠে সুকঠিন মম ভালে ঠেকি।

    পাগলিনি মুঠি মুঠি ছুঁড়ে মারে রাঙা পথধূলি,

    হানে গায় ঝরনা-কুলুকুচু, পদ্ম-বনে আলুথালু খোঁপা পড়ে খুলি!

    আমি ধাই পিছে তার দুরন্ত উল্লাসে;

    লুকায় আলোর বিশ্ব চন্দ্র সূর্য তারা পদভর-ত্রাসে!

    দীর্ঘ রাজপথ-অজগর সংকুচিয়া ওঠে ক্ষণে ক্ষণে,

    ধরণি-কূর্মপৃষ্ঠ দীর্ণ জীর্ণ হয়ে ওঠে মত্ত মোর প্রমত্ত ঘর্ষণে।

    পশ্চাতে ছুটিয়া আসে মেঘ ঐরাবত-সেনাদল

    গজগতি-দোলা-ছন্দে; স্বরগে বাজে বাদল-মাদল!

    সপ্ত সাগর শোষি শুণ্ডে শুণ্ডে তারা–

    উপুড় ধরণি-পৃষ্ঠে উগারে নিযুত লক্ষ বারি-তীর-ধারা।

    বয়ে যায় ধরা-ক্ষত-রসে

    সহস্র পঙ্কিল স্রোত-ধার।

    চণ্ডবৃষ্টি-প্রপাত-ধারা-ফুলে

    বরষার বুকে ঝলে জল-মালা-হার।

    আমি ঝড়, হুল্লোড়ের সেনাপতি; খেলি মৃত্যু-খেলা

    ঘূর্ণনীয়া প্রিয়া-সাথে। দুর্যোগের হুলাহুলি মেলা

    ধায় মম অশ্রান্ত পশ্চাতে!

    মম প্রাণরঙ্গে মাতি নিখিলের শিখী-প্রাণ মুহু-মুহু মাতে!

    শ্যাম স্বর্ণ পত্রে পুষ্পে কাঁপে তার অনন্ত কলাপ।–

    দারুণ দাপটে মম জেগে ওঠে অগ্নিস্রাব-জ্বলন্ত-প্রলাপ

    ভূমিকম্প-জরজর থরথর ধরিত্রীর মুখে!

    বাসুকি-মন্দার সম মন্থনে মম সিন্ধুতট ভরে ফেনা-থুকে।

    জেগে ওঠে মম সেই সৃষ্টি-সিন্ধু-মন্থন-ব্যথায়

    রবি শশী তারকার অনন্ত বুদবুদ!–উঠে ভেঙে যায়

    কত সৃষ্টি কত বিশ্ব আমার আনন্দ-গতিপথে।

    শিবের সুন্দর ধ্রুব-আঁখি

    যমের আরক্ত ঘোর মশাল-নয়ন-দীপ মম রথে।

    জয়ধ্বনি বাজে মোর স্বর্গদূত ‘মিকাইলের’ আতশি-পাখায়।

    অনন্ত-বন্ধন-নাগ-শিরস্ত্রাণ শোভে শিরে! শিখী-চূড়ায় তায়

    শনির অশনি ওই ধূমকেতু-শিখা,

    পশ্চাতে দুলিছে মোর অনন্ত আঁধার চিররাত্রি-যবনিকা!

    জটা মোর নীহারিকাপুঞ্জ-ধূম পাটল পিঙ্গাস,

    বহে তাহে রক্ত-গঙ্গা নিপীড়িত নিখিলের লোহিত নিষ্কাশ।

    ঝড়–ঝড়–ঝড় আমি–আমি   ঝড়–

    ক্কড়ক্কড় ক্কড়–

    বজ্র-বায়ু দন্তে-দন্তে ঘর্ষি চলি ক্রোধে!

    ধূলি-রক্ত বাহু মম বিন্ধ্যাচল সম রবিরশ্মি-পথ রোধে।

    ঝঞ্ঝনা-ঝাপটে মম

    ভীত কূর্ম সম

    সহসা সৃষ্টির খোলে নিয়তি লুকায়।

    আমি ঝড়, জুলুমের জিঞ্জির-মঞ্জীর বাজে ত্রস্ত মম পায়!

    ধাক্কার ধমকে মম খান খান নিষিদ্ধের নিরুদ্ধ দুয়ার,

    সাগরে বাড়ব লাগে,     মড়ক দুয়ার্কি ধরে আমার ধুয়ার!

    কৈলাসে উল্লাস ঘোষে ডম্বরু ডিণ্ডিম

    দ্রিম দ্রিম দ্রিম!

    অম্বর-ডঙ্কার ডামাডোল

    সৃজনের বুকে আনে অশ্রু-বন্যা ব্যথা-উতরোল।

    ভাণ্ডারে সঞ্চিত মম দুর্বাসার হিংসা ক্রোধ শাপ।

    ভীমা উগ্রচণ্ডা ফেলে উল্কারূপী অগ্নি-অশ্রু, সহিতে না পারি মম তাপ!

    আমি ঝড়, পদতলে ‘আতঙ্ক’-কুঞ্জর, হস্তে মোর ‘মাভৈঃ’-অঙ্কুশ।

    আমি বলি, ছুটে চলো প্রলয়ের লাল ঝাণ্ডা হাতে,–

    হে নবীন পরুষ পুরুষ!

    স্কন্ধে তোলো উদ্ধত বিদ্রোহ-ধ্বজা; কণ্টক-অশঙ্ক রে নির্ভীক!

    পুরুষ ক্রন্দন-জয়ী,–দুঃখ দেখে দুঃখ পায়–ধিক তারে ধিক

    আমি বলি, বিশ্ব-গোলা নিয়ে খেলো লুফোলুফি খেলা!

    বীর নিক বিপ্লবের লাল-ঘোড়া,

    ভীরু নিক পারে-ধাওয়া পলায়ন-ভেলা!

    আমি বলি, প্রাণানন্দে পিয়ে নে রে বীর,

    জীবন-রসনা দিয়া প্রাণ ভরে মৃত্যু-ঘন ক্ষীর!

    আমি বলি, নরকের ‘নার’ মেখে নেয়ে আয় জ্বালা-কুণ্ড সূর্যের হাম্মামে।

    রৌদ্রের-চন্দন-শুচি, উঠে বসো গগনের বিপুল তাঞ্জামে!

    আমি ঝড় মহাশত্রু স্বস্তি-শান্তি-শ্রীর,

    আমি বলি, শ্মশান-সুষুপ্তি শান্তি–

    জয়নাদ আমি অশান্তির।

    পশ্চিম হইতে পূর্বে ঝঞ্ঝনা-ঝাঁঝর

    ঝঞ্ঝা-জগঝম্প ঘোর–বাজায়ে চলেছি ঝড়–

    ঝনাৎ ঝনাৎ ঝন

    ঝমরঝমরঝন ঝননঝননশন

    শনশনশন

    হুহু হুহু হুহু–

    সহসা কম্পিত-কণ্ঠ-ক্রন্দন শুনি কার–‘উহু! উহু উহু উহু!’

    সজল কাজল-পক্ষ্ম কে সিক্তবসনা একা ভিজে–

    বিরহিণী কপোতিনী, এলোকেশ কালোমেঘে পিঁজে।

    নয়ন-গগনে তার নেমেছে বাদল, ভিজিয়াছে চোখের কাজল,

    মলিন করেছে তার কালো আঁখি-তারা

    বায়ে-ওড়া কেতকীর পীত পরিমল!

    এ কোন্ শ্যামলী পরি পুবের পরিস্থানে কেঁদে কেঁদে যায়–

    নবোদ্ভিন্ন কুঁড়ি-কদম্বের ঘন যৌবন-ব্যথায়!

    জেগেছে বালার বুকে এক বুক ব্যথা আর কথা,

    কথা শুধু প্রাণে কাঁদে,

    ব্যথা শুধু বুকে বেঁধে, মুখে ফোটে শুধু আকুলতা!

    কদম্ব তমাল তাল পিয়াল-তলায়

    দূর্বাদল-মখমলে শ্যামলী-আলতা তার মুছে মুছে যায়!

    বাঁধে বেণি কেয়া-কাঁটা বনে।

    বিদেশিনি দেয়াশিনি একমনে দেয়া-ডাক শোনে!

    দাদুরির আদুরি কাজরি

    শোনে আর আঁখি-মেঘ-কাজল গড়ায়ে

    দুখ-বারি পড়ে ঝরঝরি।

    ঝিমঝিম রিমঝিম–রিমিরিমি রিম ঝিম

    বাজে পাঁইজোর–

    কে তুমি পুরবি বালা? আর যেন নাহি পাই জোর

    চলা-পায়ে মোর, ও-বাজা আমারও বুকে বাজে।

    ঝিল্লির ঝিমানি-ঝিনিঝিনি

    শুনি যেন মোর প্রতি রক্ত-বিন্দু-মাঝে!

    আমি ঝড়? ঝড় আমি?–না, না, আমি বাদলের বায়!

    বন্ধু! ঝড় নাই

    কোথায়?

    ঝড় কোথা? কই?–

    বিপ্লবের লাল-ঘোড়া ওই ডাকে ওই–

    ওই শোনো, শোনো তার হ্রেষার চিক্কুর,

    ওই তার ক্ষুর-হানা মেঘে!–

    না, না, আজ যাই আমি, আবার আসিব ফিরে,

    হে বিদ্রোহী বন্ধু মোর! তুমি থেকো জেগে!

    তুমি রক্ষী এ রক্ত-অশ্বের,

    হে বিদ্রোহী অন্তর্দেবতা!–শুনো শুনো মায়াবিনী ওই ডাকে ফের–

    পুবের হাওয়ায়–

    যায়–যায়–সব ভেসে যায়

    পুবের হাওয়ায়–

      হায়!–

  • ভাঙার গান

    ভাঙার গান

    ভাঙার গান

    ‘ভাঙার গান’ বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম রচিত বিদ্রোহাত্মক কাব্যগ্রন্থ— এতে কবিতা ও গান সঙ্কলিত হয়েছে। গ্রন্থটি ১৩৩১ বঙ্গাব্দের শ্রাবণ মুতাবেক ১৯২৪ খৃষ্টাব্দের আগষ্ট মাসে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। উৎসর্গ পাতায় লেখা ছিল— “মেদিনীপুরবাসীর উদ্দেশে”। ১১ নভেম্বর তারিখে তৎকালীন বঙ্গীয় সরকার গ্রন্থখানি নিষিদ্ধ ও বাজেয়াপ্ত করেন। বৃটিশ সরকার কখনও এ নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করেননি। ‘ভাঙার গানে’র দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশ পায় ১৯৪৯ খৃষ্টাব্দে। প্রকাশক সুরেন দত্ত, ন্যাশনাল বুক এজেন্সী লিমিটেড, ১২ বঙ্কিম চ্যাটার্জি ষ্ট্রিট, কলিকাতা—১২। পৃষ্ঠা ৪+৩৬; মূল্য এক টাকা। দ্বিতীয় পৃষ্ঠায় রাবার ষ্ট্যাম্পের লেখা — “সম্পূর্ণ লভ্যাংশ কবির সাহায্যে দেওয়া হইবে।” এখানে দ্বিতীয় সংস্করণের পাঠ ও ক্রম অনুসৃত হয়েছে।

    ‘ভাঙার গান’ শীর্ষক গানটি সম্পর্কে জনাব মুজফ্‌ফর আহমদ লিখেছেন—

    “আমার সামনেই দাশ-পরিবারের শ্রীসুকুমাররঞ্জন দাশ ‘বাঙ্গলার কথা’র জন্যে একটি কবিতা চাইতে এসেছিলেন। শ্রীযুক্তা বাসন্তী দেবী তাঁকে কবিতার জন্য পাঠিয়েছিলেন। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ তখন জেলে। … অন্য দিকে মুখ ফিরিয়ে নজরুল তখনই কবিতা লেখা শুরু ক’রে দিলেন। সুকুমাররঞ্জন আর আমি আস্তে আস্তে কথা বলতে লাগলাম। বেশ কিছুক্ষণ পরে নজরুল আমাদের দিকে মুখ ফিরিয়ে তার সেই মুহূর্তে রচিত কবিতাটি আমাদের পড়ে শোনাতে লাগল। … নজরুল ‘ভাঙার গান’ লিখেছিল ১৯২১ সালের ডিসেম্বর মাসের কোনো এক তারিখে। ‘ভাঙার গান’ ‘বাঙ্গলার কথা’য় ছাপা হয়েছিল।”

    — [ কাজী নজরুল ইসলাম : স্মৃতিকথা ]

    ‘জাগরণী’ শীর্ষক কোরাস গানটি সম্পর্কে জনাব আফতাব-উল-ইসলাম লিখেছেন—

    “১৯২১ সনে শ্রীযুত বীরেন সেন (কাজীর এবং আমাদের সকলের ‘রাঙা দা’) তখন কুমিল্লা বিদ্যালয়ে শিক্ষক। কাজী নজরুল কান্দিরপার তাঁরই বাড়ীতে থাকেন। প্রিন্স অব ওয়েল্‌সের ভারত-ভ্রমণ উপলক্ষে কংগ্রেস-ঘোষিত হরতাল-পালনের জন্য (২১শে নভেম্বর) একটি গান লিখে দেওয়ার অনুরোধ নিয়েই প্রথম তাঁর সাথে দেখা করি ‘রাঙা দা’র বাড়ীতে। তিনি তা তো দিলেনই, অধিকন্তু কাঁধে হারমোনিয়াম বেঁধে মিছিলের সঙ্গে তিনি নিজেও গাইলেন:

    ভিক্ষা দাও। ভিক্ষা দাও

    ফিরে চাও ওগো পুরবাসী,

    সন্তান দ্বারে উপবাসী,

    দাও মানবতা ভিক্ষা দাও।”

    — [ গুলিস্তাঁ, নজরুল-সংখ্যা]

    ‘মোহান্তের মোহ-অন্তের গান’ সম্বন্ধে ডক্টর সুশীলকুমার গুপ্ত বলেন—

    “অসহযোগ আন্দোলন আরম্ভ হবার পর তারকেশ্বরের দুর্নীতিপরায়ণ অসচ্চরিত্র ধর্মব্যবসায়ী মোহান্তকে তাড়াবার নিমিত্ত একটি আন্দোলন উপস্থিত হয়। নজরুল এই সময়ে ‘মোহান্তের মোহ-অন্তের গান’ লিখে এই আন্দোলনকে সমর্থন ও শক্তিশালী করেন।”

    — [নজরুল-চরিত-মানস, ১৫৭ পৃষ্ঠা]

    ‘আশু-প্রয়াণ-গীতি’ ১৩৩১ বঙ্গাব্দের আষাঢ়ে ৩য় বর্ষের ৫ম সংখ্যক ‘বঙ্গবাণী’তে প্রকাশিত হয়।

    ‘দুঃশাসনের রক্তপান’ ১৩২৯ বঙ্গাব্দের ১০ই কার্তিক শুক্রবার ১ম বর্ষের ১৭শ সংখ্যক ‘ধূমকেতু’তে ‘দুঃশাসনের রক্ত’ শিরোনামে প্রকাশিত হয়।

    ‘শহিদী ঈদ’ সাপ্তাহিক ‘মোহাম্মদী’তে ছাপা হয়েছিল।