Category: কাজী নজরুল ইসলাম

  • পলাতকা

    পলাতকা

    পলাতকা

    কোন্‌ সুদূরের চেনা বাঁশীর ডাক শুনেছিস্‌ ওরে চখা?
    ওরে আমার পলাতকা!
    তোর
    পড়লো মনে কোন্‌ হারা-ঘর,
    স্বপন-পারের কোন অলকা?
    ওরে আমার পলাতকা!
    তোর   জল ভরেচে চপল চোখে,
    বল   কোন হারা-মা ডাকলো তোকে রে?
      গগন-সীমায় সাঁঝের ছায়ায়
    হাতছানি দেয় নিবিড় মায়ায়—
    উতল পাগল! চিনিস কি তুই চিনিস ওকে রে?
    যেন
    বুক-ভরা ও গভীর স্নেহে ডাক দিয়ে যায়, ‘আয়,
    ওরে আয় আয় আয়,
    কোলে   আয় যে আমার দুষ্টু খোকা!
    আমার পলাতকা!’
    দখিন হাওয়ায় বনের কাঁপনে—
    দুলাল আমার! হাত-ইশারায় মা কি রে তোর
    ডাক দিয়েছে আজ?
    এত দিনে চিনলি কি রে পর ও আপনে!
    নিশিভোরেই তাই কি আমার নামলো ঘরে সাঁঝ!
    ধানের শীষে, শ্যামার শিসে—
    জাদুমণি! বল সে কিসে রে,
    তুই
    শিউরে চেয়ে ছিঁড়লি বাঁধন!
    চোখ-ভরা তোর উছলে কাঁদন রে!
    তোরে
    কে পিয়ালো সবুজ স্নেহের কাঁচা বিষে রে!
    যেন
    আচম্‌কা কোন শশক-শিশু চমকে ডাকে হায়,
    ‘ওরে আয় আয় আয়—
    আয় রে খোকন আয়,
    বনে
    আয় ফিরে আয় বনের সখা!
    ওরে চপল পলাতকা।’

    কলিকাতা

    শ্রাবণ ১৩২৮

  • চিরশিশু

    চিরশিশু

    চিরশিশু

    নাম-হারা তুই পথিক-শিশু এলি অচিন দেশ পারায়ে।

    কোন্‌ নামের আজ পরলি কাঁকনম বাঁধনহারায় কোন কারা এ॥

    আবার মনের মতন করে

    কোন নামে বল ডাকব তোরে!

    পথ-ভোলা তুই এই সে ঘরে

    ছিলি ওরে এলি ওরে

    বারে বারে নাম হারায়ে॥

    ওরে যাদু ওরে মাণিক, আঁধার ঘরের রতণমণি!

    ক্ষুধিত ঘর ভরলি এনে ছোট্ট হাতের একটু ননি।

    আজ যে শুধু নিবিড় সুখে

    কান্না-সায়র উথলে বুকে,

    নতুন নামে ডাকতে তোকে

    ওরে ও কে কন্ঠ রুখে

    উঠছে কেন মন ভারায়ে!

    অস্ত হতে এলে পথিক উদয় পানে পা বাড়ায়ে॥

    কলিকাতা

    ফাল্গুন ১৩২৭

  • মানস-বধূ

    মানস-বধূ

    মানস-বধূ

    যেমন
    ছাঁচি পানের কচি পাতা প্রজাপতির ডানার ছোঁয়ায়,
    ঠোঁট দুটি তার কাঁপন-আকুল একটি চুমায় অমনি নোয়ায়॥
    জল-ছলছল উড়ু-উড়ু চঞ্চল তার আঁখির তারা,
    কখন বুঝি দেবে ফাঁকি সুদূর পথিক-পাখির পারা,
    নিবিড় নয়ন-পাতার কোলে,
    গভীর ব্যথার ছায়া দোলে,
    মলিন চাওয়া (ছাওয়া) যেন দূরের সে কোন্ সবুজ ধোঁয়ায়॥
    সিঁথির বীথির খসে-পড়া কপোল-ছাওয়া চপল অলক
    পলক-হারা, সে মুখ চেয়ে নাচ ভুলেছে নাকের নোলক।
    পাংশু তাহার চূর্ণ কেশে,
    মুখ মুছে যায় সন্ধে এসে,
    বিধুর অধর-সীধু যেন নিঙড়ে কাঁচা আঙুর চোয়ায়॥
    দীঘল শ্বাসের বাউল বাজে নাসার সে তার জোড়-বাঁশিতে,
    পান্না-ক্ষরা কান্না যেন ঠোঁট-চাপা তার চোর হাসি সে।
    ম্লান তার লাল গালের লালিম,
    রোদ-পাকা আধ-ডাঁশা ডালিম,
    গাগরি ব্যথার ডুবায় কে তার টোল খাওয়া গাল-চিবুক-কুয়ায়॥
    চায় যেন সে শরম-শাড়ির ঘোমটা চিরি পাতা ফুঁড়ি,
    আধফোঁটা বউ মউল-বউল, বোলতা-ব্যাকুল বকুল কুঁড়ি
    বোল-ভোলা তার কাঁকন চুড়ি
    ক্ষীরের ভিতর হিরের ছুরি,
    দু-চোখ-ভরা অশ্রু যেন পাকা পিয়াল শালের ঠোঙায়॥
    বুকের কাঁপন হুতাশ-ভরা, বাহুর বাঁধন কাঁদন-মাখা,
    নিচোল বুকের কাঁচল আঁচল স্বপন-পারের পরির পাখা।
    খেয়াপারের ভেসে-আসা
    গীতির মতো পায়ের ভাষা,
    চরণ-চুমায় শিউরে পুলক হিমভেজা দুধ-ঘাসের রোঁয়ায়॥
    সে যেন কোন্ দূরের মেয়ে আমার কবিমানস-বধূ;
    বুকপোরা আর মুখভার তার পিছলে পড়ে ব্যথার মধু।
    নিশীথ-রাতের স্বপন হেন,
    পেয়েও তারে পাইনে যেন,
    মিলন মোদের স্বপন-কূলে কাঁদনভরা চুমায় চুমায়।
    নামহারা সেই আমার প্রিয়া, তারেই চেয়ে জনম গোঁয়ায়॥

    দৌলতপুর, কুমিল্লা

    জ্যৈষ্ঠ ১৩২৮

  • দহনমালা

    দহনমালা

    দহনমালা

    হায় অভাগি! আমায় দেবে তোমার মোহন মালা?
    বদল দিয়ে মালা, নেবে আমার দহন-জ্বালা?
    কোন ঘরে আজ প্রদীপ জ্বেলে
    ঘরছাড়াকে সাধতে এলে
    গগনঘন শান্তি মেলে, হায়!
    দু-হাত পুরে আনলে ও কি সোহাগ-ক্ষীরের থালা
    আহা দুখের বরণ ডালা?
    পথহারা এই লক্ষ্মীছাড়ার
    পথের ব্যথা পারবে নিতে? করবে বহন, বালা?
    লক্ষ্মীমণি! তোমার দিকে চাইতে আমি নারি,
    দু-চোখ আমার নয়ন জলে পুরে,
    বুক ফেটে যায় তবু এ-হার ছিঁড়তে নাহি পারি,
    ব্যথাও দিতে নারি,–নারী! তাই যেতে চাই দূরে।
    ডাকতে তোমায় প্রিয়তমা
    দু-হাত জুড়ে চাইছি ক্ষমা,
    চাইছি ক্ষমা চাইছি ক্ষমা গো!
    নয়ন-বাঁশির চাওয়ার সুরে
    বনের হরিণ বাঁধবে বৃথা লক্ষ্মী গহনবালা।
    কল্যাণী! হায় কেমনে তোমায় দেব
    যে-বিষ পান করেছি নীলের নয়ন-গালা॥

    কলিকাতা

    চৈত্র ১৩২৭

  • বিদায়-বেলায়

    বিদায়-বেলায়

    বিদায়-বেলায়

    তুমি
    অমন করে গো বারে বারে জল-ছল-ছল চোখে চেয়ো না,
    জল ছলছল চোখে চেয়ো না।
    কাতর-কন্ঠে থেকে থেকে শুধু বিদায়ের গান গেয়ো না,
    শুধু বিদায়ের গান গেয়ো না॥
    হাসি দিয়ে যদি লুকালে তোমার সারা জীবনের বেদনা,
    আজো তবে শুধু হেসে যাও, আজ বিদায়ের দিনে কেঁদো না।
     ব্যথাতুর আঁখি কাঁদো-কাঁদো মুখ
    দেখি আর শুধু হুহু করে বুক!
    চলার তোমার বাকি পথটুকু—
    পথিক! ওগো সুদূর পথের পথিক—
    হায়,
    অমন করে ও অকরুণ গীতে আঁখির সলিলে ছেয়ো না,
    ওগো আঁখির সলিলে ছেয়ো না॥
    দূরের পথিক! তুমি ভাব বুঝি
    তব ব্যথা কেউ বোঝে না,
    তোমার ব্যথার তুমিই দরদী একাকি,
    পথে ফেরে যারা পথ-হারা,
    কোন
      গৃহবাসী তারে খোঁজে না,
    বুকে
      ক্ষত হয়ে জাগে আজো সেই ব্যথা-লেখা কি?
    দূর
    বাউলের গানে ব্যথা হানে বুঝি শুধু ধূধূ মাঠে পথিকে?
    এ যে
    মিছে অভিমান পরবাসী! দেখে ঘর-বাসীদের ক্ষতি কে!
    তবে   জান কি তোমার বিদায়-কথায়
      কত বুকভাঙা গোপন ব্যথায়
    আজ   কতগুলি প্রাণ কাঁদিছে কোথায়—
      পথিক! ওগো অভিমানী দূর পথিক!
    কেহ
        ভালবাসিল না ভেবে যেন আজও
    মিছে ব্যথা পেয়ে যেয়ো না,
    ওগো
    যাবে যাও, তুমি বুকে ব্যথা নিয়ে যেয়ো না॥

    দৌলতপুর, কুমিল্লা

    বৈশাখ ১৩২৮

  • অকরুণ পিয়া

    অকরুণ পিয়া

    অকরুণ পিয়া

    আমার
    পিয়াল বনের শ্যামল পিয়ার ওই বাজে গো বিদায়বাঁশি,
    পথ-ঘুরানো সুর হেনে সে আবার হাসে নিদয় হাসি॥
    পথিক বলে পথের গেহ
    বিলিয়েছিল একটু স্নেহ,
    তাই দেখে তার ঈর্ষাভরা কান্নাতে চোখ গেল ভাসি॥
    তখন মোদের কিশোর বয়স যেদিন হঠাৎ টুটল বাঁধন,
    সেই হতে কার বিদায়-বেণুর জগৎ জুড়ে শুনছি কাঁদন।
    সেই কিশোরীর হারা মায়া
    ভুবন ভরে নিল কায়া,
    দুলে আজও তারই ছায়া আমার সকল পথে আসি॥

    কলিকাতা

    শ্রাবণ ১৩২৮

  • ব্যথা-নিশীথ

    ব্যথা-নিশীথ

    ব্যথা-নিশীথ

    এই
    নীরব নিশীথ রাতে
    শুধু
    জল আসে আঁখি-পাতে।
    কেন
    কি কথা স্মরণে রাজে?
    বুকে
    কার হতাদর বাজে?
    কোন
    ক্রন্দন হিয়া-মাঝে
    ওঠে
    গুমরি ব্যর্থতাতে
    আর
    জল ভরে আঁখি-পাতে।
    মম
    ব্যর্থ জীবন-বেদনা
    এই
    নিশীথে লুকাতে নারি,
    তাই
    গোপনে একাকী শয়নে
    শুধু
    নয়নে উথলে বারি।
    ছিল
    সেদিনও এমনই নিশা,
    বুকে
    জেগেছিল শত তৃষা
    তারি
    ব্যর্থ নিশাস মিশা
    ওই
    শিথিল শেফালিকাতে
    আর
    পূরবীর বেদনাতে।

    কলিকাতা

    ফাল্গুন ১৩২৭

  • সন্ধ্যাতারা

    সন্ধ্যাতারা

    সন্ধ্যাতারা

    ঘোমটা-পরা কাদের ঘরের বৌ তুমি ভাই সন্ধ্যাতারা?

    তোমার চোখে দৃষ্টি জাগে হারানো কোন মুখের পারা।

    সাঁঝের প্রদীপ আঁচল ঝেঁপে

    বঁধুর পথে চাইতে বেঁকে

    চাউনিটি কার উঠছে কেঁপে

    রোজ সাঁঝে ভাই এমনি ধারা।

    কারা হারানো বধূ তুমি অস্তপথে মৌন মুখে

    ঘনাও সাঁঝে ঘরের মায়া গৃহহীনের শূন্য বুকে।

    এই যে নিতুই আসা-যাওয়া,

    এমন করুণ মলিন চাওয়া,

    কার তরে হায় আকাশ-বধু

    তুমিও কি আজ প্রিয়-হারা।

    কলিকাতা

    কার্তিক ১৩২৭

  • দূরের বন্ধু

    দূরের বন্ধু

    দূরের বন্ধু

    বন্ধু আমার! থেকে থেকে কোন সুদূরের বিজন পুরে
    ডাক দিয়ে যাও ব্যথার সুরে?
    আমার
    অনেক দুখের পথের বাসা বারে বারে ঝড়ে উড়ে,
    ঘর-ছাড়া তাই বেড়াই ঘুরে॥
    তোমার বাঁশীর উদাস কাঁদন
    শিথিল করে সকল বাঁধন
    কাজ হল তাই পথিক-সাধন—
     খুঁজে ফেরা পথ-বঁধূরে,
     ঘুরে ঘুরে দূরে দূরে॥
    হে মোর প্রিয়! তোমার বুকে একটুকুতেই হিংসা জাগে,
    তাই তো পথে হয় না থামা — তোমার ব্যথা বক্ষে লাগে!
    বাঁধতে বাসা পথের পাশে
    তোমার চোখে কান্না আসে,
    উত্তরী বায় ভেজা ঘাসে
    শ্বাস ওঠে আর নয়ন ঝুরে,
    বন্ধু তোমার সুরে সুরে॥

    বরিশাল

    আশ্বিন ১৩২৭

  • আশা

    আশা

    আশা

    হয়ত তোমার পাব দেখা,

    যেখানে ঐ নত আকাশ চুমছে বনের সবুজ রেখা॥

    ঐ সুদূরের গাঁয়ের মাঠে,

    আলের পথে বিজন ঘাটে ;

    হয়ত এসে মুচকি হেসে

    ধরবে আমার হাতটি একা॥

    ঐ নীলের ঐ গহন-পারে ঘোমটা-হারা তোমার চাওয়া,

    আনলে খবর গোপন-দূতী দিক-পারের ঐ দখিনা হাওয়া।

    বনের ফাঁকে দুষ্টু তুমি

    আস্তে যাবে নয়্না চুমি,

    সেই সে কথা লিখচে হোথা

    দিগ্‌বলয়ের অরুণ-লেখা।

    বরিশাল

    আশ্বিন ১৩২৭

  • মরমী

    মরমী

    মরমী

    কোন মরমির মরম ব্যথা আমার বুকে বেদনা হানে,

    জানি গো, সেও জানেই জানে।

    আমি কাঁদি তাইতে যে তার ডাগর চোখে অশ্রু আনে,

    বুঝেছি তা প্রাণের টানে॥

    বাইরে বাঁধি মনকে যত

    ততই বাড়ে মর্ম-ক্ষত,

    মোর সে ক্ষত ব্যথার মতো

    বাজে গিয়ে তারও প্রাণে

    কে কয়ে যায় হিয়ার কানে॥

    উদাস বায়ু ধানের খেতে ঘনায় যখন সাঁঝের মায়া,

    দুই জনারই নয়ন-পাতায় অমনি নামে কাজল-ছায়া!

    দুইটি হিয়াই কেমন কেমন

    বদ্ধ ভ্রমর পদ্মে যেমন,

    হায়, অসহায় মূকের বেদন

    বাজল শুধু সাঁঝের গানে,

    পুবের বায়ুর হুতাশ তানে॥

    বরিশাল

    আশ্বিন ১৩২৭

  • মুক্তি-বার

    মুক্তি-বার

    মুক্তি-বার

    লক্ষ্মী আমার! তোমার পথে আজকে অভিসার।

    অনেক দিনের পর পেয়েছি মুক্তি-রবিবার॥

    দিনের পরে দিন গিয়েছে, হয়নি আমার ছুটি,

    বুকের ভিতর মৌন-কাঁদন পড়ত বৃথাই লুটি।

    আজ পেয়েছি মুক্ত হাওয়া,

    লাগল চোখে তোমার চাওয়া,

    তাই তো প্রাণে বাঁধ টুটেছে রুদ্ধ কবিতার॥

    তোমার তরে বুকের তলায়

    অনেক দিনের অনেক কথা জমা,

    কানের কাছে মুখটি থুয়ে

    গোপন সে সব কইব প্রিয়তমা।

    এবার শুধু কথায়-গানে রাত্রি হবে ভোর,

    শুকতারাতে কাঁপবে তোমার নয়ন-পাতার লোর।

    তোমায় সেধে ডাকবে বাঁশি,

    মলিন মুখে ফুটবে হাসি,

    হিম-মুকুরে উঠবে ভাসি করুণ ছবি তার।

    দেওঘর

    পৌষ ১৩২৭

  • আপন-পিয়াসী

    আপন-পিয়াসী

    আপন-পিয়াসী

    আমার
    আপনার চেয়ে আপন যে জন
    খুঁজি তারে আমি আপনায়,
    আমি
    শুনি যেন তার চরণের ধ্বনি
    আমারি তিয়াসী বাসনায়॥
    আমারই মনের তৃষিত আকাশে
    কাঁদে সে চাতক আকুল পিয়াসে,
    কভু সে চকোর সুধা-চোর আসে
    নিশীথে স্বপনে জোছনায়।

    আমার মনের পিয়াল তমালে হেরি তারে স্নেহ-মেঘশ্যাম,

    অশনি-আলোকে হেরি তারে থিরবিজুলি-উজল অভিরাম।

    আমারই রচিত কাননে বসিয়া
    পরানু পিয়ারে মালিকা রচিয়া,
    সে মালা সহসা দেখিনু জাগিয়া,
    আপনারি গলে দোলে হায়॥

    কলিকাতা

    আষাঢ় ১৩৩১

  • বিবাগিনী

    বিবাগিনী

    বিবাগিনী

    করেছ পথের ভিখারণী মোরে কে গো সুন্দর সন্ন্যাসী?

    কোন বিবাগীর মায়া-বনমাঝে বাজে ঘরছাড়া তব বাঁশি?

    ওগো সুন্দর সন্ন্যাসী॥
    তব
    প্রেমরাঙা ভাঙা জোছনা
    হেরো
    শিশির-অশ্রু-লোচনা,
    চলিয়াছে কাঁদি বরষার নদী গৈরিকরাঙা-বসনা।
    ওগো
    প্রেম-মহাযোগী, তব প্রেম লাগি নিখিল বিবাগি পরবাসী!
    ওগো সুন্দর সন্ন্যাসী॥
    মম
    একা ঘরে নাথ দেখেছিনু তোমা ক্ষীণ দীপালোকে হীন করি,
    হেরি
    বাহির আলোকে অনন্তলোকে এ কী রূপ তব মরি মরি!
    দিয়া
    বেদনার পরে বেদনা
    নাথ
    একী এ বিপুল চেতনা
    তুমি
    জাগালে আমার রোদনে, অন্ধে দেখালে বিশ্ব-দ্যোতনা।
    ওগো
    নিষ্ঠুর মোর! অশুভ ও-রূপ তাই এত বাজে বুকে আসি।
    ওগো সুন্দর সন্ন্যাসী॥

    হুগলী

    আষাঢ় ১৩৩১

  • প্রতিবেশিনী

    প্রতিবেশিনী

    প্রতিবেশিনী

    আমার ঘরের পাশ দিয়ে সে চলত নিতুই সকাল-সাঁঝে।

    আর এ পথে চলবে না সে সেই ব্যথা হায় বক্ষে বাজে॥

    আমার দ্বারের কাছটিতে তার ফুটত লালী গালের টোলে,

    টলত চরণ, চাউনি বিবশ কাঁপত নয়ন-পাতার কোলে –

    কুঁড়ি যেমন প্রথম খোলো গো!

    কেউ কখনও কইনি কথা,

    কেবল নিবিড় নীরবতা

    সুর বাজাত অনাহতা

    গোপন মরম-বীণার মাঝে॥

    মূক পথের আজ বুক ফেটে যায় স্মরি তারই পায়ের পরশ

    বুক-খসা তার আঁচর-চুমু,

    রঙিন ধুলো পাংশু হল, ঘাস শুকাল যেচে বাচাল

    জোড়-পায়েলার রুমঝুমু!

    আজও আমার কাটবে গো দিন রোজই যেমন কাটত বেলা,

    একলা বসে শূন্য ঘরে – তেমনি ঘাটে ভাসবে ভেলা –

    অবহেলা হেলাফেলায় গো!

    শুধু সে আর তেমন করে

    মন রবে না নেশায় ভরে

    আসার আশায় সে কার তরে

    সজাগ হয়ে সকল কাজে।

    ডুকরে কাঁদে মন-কপোতী–

    ‘কোথায় সাথির কূজন বাজে?

    সে পা-র ভাষা কোথায় রাজে?’

    দেওঘর

    মাঘ ১৩২৭

  • দুপুর-অভিসার

    দুপুর-অভিসার

    দুপুর-অভিসার

    যাস কোথা সই একলা ও তুই অলস বৈশাখে?

    জল নিতে যে যাবি ওলো কলস কই কাঁখে?

    সাঁঝ ভেবে তুই ভর-দুপুরেই দু-কূল নাচায়ে
    পুকুরপানে ঝুমুর ঝুমুর নূপুর বাজায়ে
    যাসনে একা হাবা ছুঁড়ি,
    অফুট জবা চাঁপা-কুঁড়ি তুই!
    দ্যাখ্
    রং দেখে তোর লাল গালে যায়
    দিগ্‌বধূ ফাগ থাবা থাবা ছুঁড়ি,
    পিক-বধূ সব টিটকিরি দেয় বুলবুলি চুমকুড়ি–
    ওলো
    বউল-ব্যাকুল রসাল তরুর সরস ওই শাখে॥
    দুপুর বেলায় পুকুর গিয়ে একূল ওকূল গেল দুকূল তোর,
    ঐ চেয়ে দ্যাখ পিয়াল-বনের দিয়াল ডিঙে এল মুকুল-চোর।
    সারং রাগে বাজায় বাঁশি নাম ধরে তোর ওই,
    রোদের বুকে লাগল কাঁপন সুর শুনে ওর সই।
    পলাশ অশোক শিমূল-ডালে
    বুলাস কি লো হিঙুল গালে তোর?
    আ–
    আ মলো যা! তাইতে হা দ্যাখ,
    শ্যাম চুমু খায় সব সে কুসুম লালে
    পাগলি মেয়ে! রাগলি নাকি? ছি ছি দুপুর-কালে
    বল
    কেমনে দিবি সরস অধর-পরশ সই তাকে?

    কলিকাতা

    ফাল্গুন ১৩২৭

  • ছলকুমারী

    ছলকুমারী

    ছলকুমারী

    কত
    ছল করে সে বারে বারে দেখতে আসে আমায়।
    কত
    বিনা-কাজের কাজের ছলে চরণ দুটি
    আমার দোরেই থামায়॥
    জানলা-আড়ে চিকের পাশে
    দাঁড়ায় এসে কীসের আশে,
    আমায় দেখেই সলাজ ত্রাসে
    অনামিকায় জড়িয়ে আঁচল গাল দুটিকে ঘামায়॥
    সবাই যখন ঘুমে মগন দুরুদুরু বুকে তখন
    আমায় চুপে চুপে
    দেখতে এসেই মল বাজিয়ে দৌড়ে পলায়,
    রঙ খেলিয়ে চিবুক গালের কূপে!
    দোর দিয়ে মোর জলকে চলে
    কাঁকন হানে কলস-গলে!
    অমনি চোখাচোখি হলে
    চমকে ভুঁয়ে নখটি ফোটায়, চোখ দুটিকে নামায়॥
    সইরা হাসে দেখে তাহার দোর দিয়ে মোর
    নিতুই নিতুই কাজ-অকাজে হাঁটা,
    করবে কী ও? রোজ যে হারায় আমার দোরেই
    শিথিল বেণির দুষ্টু মাথার কাঁটা!
    একে ওকে ডাকার ভানে
    আনমনা মোর মনটি টানে,
    কী যে কথা সেই তা জানে
    ছল-কুমারী নানান ছলে আমারে সে জানায়॥
    পিঠ ফিরিয়ে আমার পানে দাঁড়ায় দূরে
    উদাস নয়ান যখন এলোকেশে,
    জানি, তখন মনে মনে আমার কথাই ভাবতেছে সে,
    মরেছে সে আমায় ভালবেসে!
    বই-হাতে সে ঘরের কোণে
    জানি আমার বাঁশিই শোনে,
    ডাকলে রোষে আমার পানে,
    নয়না হেনেই রক্তকমল-কুঁড়ির সম চিবুকটি তার নামায়।

    দেওঘর

    পৌষ ১৩২৭

  • পাপড়ি-খোলা

    পাপড়ি-খোলা

    পাপড়ি-খোলা

    রেশমি চুড়ির শিঞ্জিনীতে রিমঝিমিয়ে মরমকথা

    পথের মাঝে চমকে কে গো থমকে যায় ওই শরম-নতা॥

    কাঁখচুমা তার কলসি-ঠোঁটে

    উল্লাসে জল উলসি ওঠে,

    অঙ্গে নিলাজ পুলক ছোটে

    বায় যেন হায় নরম লতা॥

    অ-চকিতে পথের মাঝে পথ-ভুলানো পরদেশী কে

    হানলে দিঠি পিয়াস-জাগা পথবালা এই উর্বশীকে!

    শূন্য তাহার কন্যা-হিয়া

    ভরল বধূর বেদন নিয়া,

    জাগিয়ে গেল পরদেশিয়া

    বিধুর বধূর মধুর ব্যথা।

    দৌলতপুর, কুমিল্লা

    বৈশাখ ১৩২৮

  • বিধুরা পথিকপ্রিয়া

    বিধুরা পথিকপ্রিয়া

    বিধুরা পথিকপ্রিয়া

    আজ
    নলিন-নয়ান মলিন কেন বলো সখী বলো বলো।
    পড়ল মনে কোন্ পথিকের বিদায় চাওয়া ছলছল?
    বলো সখী বলো বলো
    মেঘের পানে চেয়ে চেয়ে বুক ভিজালে চোখের জলে,
    ওই সুদূরের পথ বেয়ে কি দূরের পথিক গেছে চলে–
    আবার ফিরে আসবে বলে গো?
    স্বর শুনে কার চমকে ওঠ? আ-হা!
    ও লো ও যে বিহগ-বেহাগ নির্ঝরিণীর কল-কল॥
    ও নয় লো তার পায়ের ভাষা, আ-হা,
    শীতের শেষের ঝরা-পাতার বিদায় ধ্বনি ও,
    কোন কালোরে কোন ভালোরে বাসলে ভালো, আ-হা!
    খুঁজছ মেঘে পরদেশি কোন পলাতকার নয়ন-অমিয়?
    চুমছ
    কারে? ও নয় তোমার চির-চেনার চপল হাসির আলো-ছায়া,
    ও যে
    গুবাক-তরুর চিকন পাতায় বাদল-চাঁদের মেঘলা মায়া।
    ওঠো পথিক-পূজারিনি উদাসিনী বালা!
    সে যে
    সবুজ-দেশের অবুঝ পাখি কখন এসে যাচবে বাঁধন,
    কে জানে ভাই, ঘরকে চলো।
    ও কী? চোখে নামল আবার বাদল-ছায়া ঢলঢল?
    চলো সখি ঘরকে চলো।

    দৌলতপুর, কুমিল্লা

    জ্যৈষ্ঠ ১৩২৮

  • মনের মানুষ

    মনের মানুষ

    মনের মানুষ

    ফিরনু যেদিন দ্বারে দ্বারে কেউ কি এসেছিল?
    মুখের পানে চেয়ে এমন কেউ কি হেসেছিল?
    অনেক তো সে ছিল বাঁশি,
    অনেক হাসি, অনেক ফাঁসি,
    কই
    কেউ কি ডেকেছিল আমায়, কেউ কি যেচেছিল?
    ওগো
    এমন করে নয়ন-জলে কেউ কি ভেসেছিল?
    তোমরা যখন সবাই গেলে হেলায় ঠেলে পায়ে,
    আমার সকল সুধাটুকুন পিয়ে,
    সেই তো এসে বুকে করে তুলল আপন নায়ে
    আচমকা কোন্ না-চাওয়া পথ দিয়ে।
    আমার যত কলঙ্কে সে
    হেসে বরণ করলে এসে
    আহা
    বুক-জুড়ানো এমন ভালো কেউ কি বেসেছিল?
    ওগো
    জানত কে যে মনের মানুষ সবার শেষে ছিল।

    কুমিল্লা

    আষাঢ় ১৩২৮