Category: কাজী নজরুল ইসলাম

  • যৌবন জল তরঙ্গ

    যৌবন জল তরঙ্গ

    যৌবন জল তরঙ্গ

    এই যৌবনজলতরঙ্গ রোধিবি কি দিয়া বালির বাঁধ?

    কে রোধিবি এই জোয়ারের টান গগনে যখন উঠেছে চাঁদ?

    যে সিন্ধু-জলে ডাকিয়াছে বান–তাহারি তরে এ চন্দ্রোদয়,

    বাঁধ বেঁধে থির আছে নালা ডোবা, চাঁদের উদয় তাদের নয়!

    যে বান ডেকেছে প্রাণ-দরিয়ায়, মাঠে-ঘাটে-বাটে নেচেছে ঢল,

    জীর্ণ শাখায় বসিয়া শকুনি শাপ দিক তারে অনর্গল।

    সারস মরাল ছুটে আয় তোরা! ভাসিল কুলায় যে-বন্যায়

    সেই তরঙ্গ ঝাঁপায়ে দোল রে সর্বনাশের নীল দোলায়!

    খর স্রোতজলে কাদা-গোলা বলে গ্রীবা নাড়ে তীরে জরদ্‍গব,

    গলিত শবের ভাগাড়ের ওরা, ওরা মৃত্যুর করে স্তব।

    ওরাই বাহন জরা-মৃত্যুর, দেখিয়া ওদের হিংস্র চোখ–

    রে ভোরের পাখি! জীবন-প্রভাতে গাহিবি না নব পুণ্য-শ্লোক?

    ওরা নিষেধের প্রহরী পুলিশ, বিধাতার নয়–ওরা বিধির!

    ওরাই কাফের, মানুষের ওরা তিলে তিলে শুষে প্রাণ-রুধির!

    বল তোরা নবজীবনের ঢল! হোক ঘোলা–তবু এই সলিল

    চির-যৌবন দিয়াছে ধরারে, গেরুয়া মাটিরে করেছে নীল!

    নিজেদের চারধারে বাঁধ বেঁধে মৃত্যু-বীজাণু যারা জিয়ায়,

    তারা কি চিনিবে–মহাসিন্ধুর উদ্দেশে ছোটে স্রোত কোথায়!

    স্থাণু গতিহীন পড়ে আছে তারা আপনারে লয়ে বাঁধিয়া চোখ

    কোটরের জীব, উহাদের তরে নহে উদীচীর উষা-আলোক।

    আলোক হেরিয়া কোটরে থাকিয়া চ্যাঁচায় প্যাঁচারা, ওরা চ্যাঁচাক।

    মোরা গাব গান, ওদেরে মারিতে আজও বেঁচে আছে দেদার কাক!

    জীবনে যাদের ঘনাল সন্ধ্যা, আজ প্রভাতের শুনে আজান

    বিছানায় শুয়ে যদি পাড়ে গালি, দিক গালি–তোরা দিসনে কান।

    উহাদের তরে হতেছে কালের গোরস্থানে রে গোর খোদাই,

    মোদের প্রাণের রাঙা জলসাতে জরা-জীর্ণের দাওত নাই।

    জিঞ্জির-পায়ে দাঁড়ে বসে টিয়া চানা খায়, গায় শিখানো বোল,

    আকাশের পাখি! ঊর্ধ্বে উঠিয়া কণ্ঠে নতুন লহরি তোল!

    তোরা ঊর্ধ্বের – অমৃত-লোকের, ছুড়ুক নীচেরা ধুলাবালি,

    চাঁদেরে মলিন করিতে পারে না কেরোসিনি ডিবেকালি ঢালি!

    বন্য-বরাহ পঙ্ক ছিটাক, পাঁকের ঊর্ধ্বে তোরা কমল,

    ওরা দিক কাদা, তোরা দে সুবাস, তোরা ফুল–ওরা পশুর দল!

    তোদের শুভ্র গায়ে হানে ওরা আপন গায়ের গলিজ পাঁক,

    যার যা দেবার সে দেয় তাহাই, স্বর্গের শিশু সহিয়া থাক!

    শাখা ভরে আনে ফুল-ফল, সেথা নীড় রচি গাহে পাখিরা গান,

    নীচের মানুষ তাই ছোঁড়ে ঢিল, তরুর নহে সে অসম্মান।

    কুসুমের শাখা ভাঙে বাঁদরের উৎপাতে, হায়, দেখিয়া তাই –

    বাঁদর খুশিতে করে লাফালাফি, মানুষ আমরা লজ্জা পাই!

    মাথার ঘায়েতে পাগল উহারা, নিসনে তরুণ ওদের দোষ!

    কাল হবে বার জানাজা যাহার, সে-বুড়োর পরে বৃথা এ রোষ!

    যে-তরবারির পুণ্যে আবার সত্যেরে তোরা দানিবি তখ্‌ত্,

    ছুঁচো মেরে তার খোয়াসনে মান, পুরায়ে এসেছে ওদের ওক্‌ত্ !

    যে বন কাটিয়া বসাবি নগর তাহার শাখার দুটো আঁচড়

    লাগে যদি গায়, সয়ে যা না ভাই, আছে তো কুঠার হাতের পর!

    যুগে যুগে ধরা করেছে শাসন গর্বদ্ধত যে যৌবন –

    মানেনি কখনও, আজও মানিবে না বৃদ্ধত্বের এই শাসন।

    আমরা সৃজিব নতুন জগৎ, আমরা গাহিব নতুন গান,

    সম্ভ্রমে-নত এই ধরা নেবে অঞ্জলি পাতি মোদের দান।

    যুগে যুগে জরা বৃদ্ধত্বেরে দিয়াছি কবর মোরা তরুণ–

    ওরা দিক গালি, মোরা হাসি খালি বলিব ‘ইন্না…. রাজেউন!1

  • তরুণের গান

    তরুণের গান

    তরুণের গান

    যে দুর্দিনের নেমেছে বাদল তাহারি বজ্র শিরে ধরি

    ঝড়ের বন্ধু, আঁধার নিশীথে ভাসায়েছি মোরা ভাঙা তরী॥

    মোদের পথের ইঙ্গিত ঝলে বাঁকা বিদ্যুতে কালো মেঘে,

    মরু-পথে জাগে নব অঙ্কুর মোদের চলার ছোঁয়া লেগে,

    মোদের মন্ত্রে গোরস্থানের আঁধার ওঠে গো প্রাণ জেগে,

    দীপ-শলাকার মত মোরা ফিরি ঘরে ঘরে আলো সঞ্চরি॥

    যে দুর্দিনের নেমেছে বাদল তাহারি বজ্র শিরে ধরি

    ঝড়ের বন্ধু, আঁধার নিশীথে ভাসায়েছি মোরা ভাঙা তরী॥

    নব জীবনের ফোরাত-কূলে গো কাঁদে কারবালা তৃষ্ণাতৃর,

    ঊর্ধ্বে শোষণ-সূর্য, নিম্নে তপ্ত বালুকা ব্যথা-মরুর।

    ঘিরিয়া য়ুরোপ-এজিদের সেনা এপার, ওপার, নিকট, দূর

    এরি মাঝে মোরা আব্বাস সম পানি আনি প্রাণ পণ করি॥

    যে দুর্দিনের নেমেছে বাদল তাহারি বজ্র শিরে ধরি

    ঝড়ের বন্ধু, আঁধার নিশীথে ভাসায়েছি মোরা ভাঙা তরী॥

    যখন জালিম ফেরাউন চাহে মুসা ও সত্যে মারিতে, ভাই,

    নীল দরিয়ায় মোরা তরঙ্গ, বন্যা আসিয়া তারে ডুবাই;

    আজও নমরুদ ইব্রাহিমেরে মারিতে চাহিছে সর্বদাই,

    আনন্দ-দূত মোরা সে আগুনে ফোটাই পুষ্প-মঞ্জরী॥

    যে দুর্দিনের নেমেছে বাদল তাহারি বজ্র শিরে ধরি

    ঝড়ের বন্ধু, আঁধার নিশীথে ভাসায়েছি মোরা ভাঙা তরী॥

    ভরসার গান শুনাই আমরা ভয়ের ভূতের এই দেশে,

    জরাজীর্ণেরে যৌবন দিয়া সাজাই নবীন বর-বেশে,

    মোদের আশার ঊষার রঙে গো রাতের অশ্রু যায় ভেসে,

    মশাল জ্বালিয়া আলোকিত করি ঝড়ের নিশীথ-শর্বরী॥

    যে দুর্দিনের নেমেছে বাদল তাহারি বজ্র শিরে ধরি

    ঝড়ের বন্ধু, আঁধার নিশীথে ভাসায়েছি মোরা ভাঙা তরী॥

    নূতন দিনের নব যাত্রীরা চলিবে বলিয়া এই পথে

    বিছাইয়া যাই আমাদের প্রাণ, সুখ, দুখ, সব আজি হতে।

    ভবিষ্যতের স্বাধীন পতাকা উড়িবে যে-দিন জয়-রথে

    আমরা হাসিব দূর তারা-লোকে, ওগো তোমাদের সুখ স্মরি॥

    যে দুর্দিনের নেমেছে বাদল তাহারি বজ্র শিরে ধরি

    ঝড়ের বন্ধু, আঁধার নিশীথে ভাসায়েছি মোরা ভাঙা তরী॥

  • চল চল চল

    চল চল চল

    চল চল চল

    মার্চের সুর

    কোরাস :

    চল্ চল্ চল্!

    ঊর্ধ্ব-গগনে বাজে মাদল,

    নিম্নে উতলা ধরণী-তল,

    অরুণ প্রাতের তরুণ দল,

    চল্ রে চল্ রে চল্।

    চল্ চল্ চল্॥

    উষার দুয়ারে হানি আঘাত,

    আমরা আনিব রাঙা প্রভাত,

    আমরা টুটাব তিমির রাত,

    বাধার বিন্ধ্যাচল।

    নব নবীনের গাহিয়া গান,

    সজীব করিব মহাশ্মশান,

    আমরা দানিব নতুন প্রাণ,

    বাহুতে নবীন বল।

    চল রে নৌ-জোয়ান,

    শোন রে পাতিয়া কান–

    মৃত্যু-তোরণ-দুয়ারে-দুয়ারে

    জীবনের আহ্বান।

    ভাঙরে ভাঙ আগল,

    চল্ রে চল্ রে চল্।

    চল্ চল্ চল্॥

    কোরাস:

    ঊর্ধ্বে আদেশ হানিছে বাজ–

    শহীদি-ঈদের সেনারা সাজ,

    দিকে দিকে চলে কুচকাওয়াজ

    খোল রে নিদ-মহল!

    কবে সে খোয়ালি বাদশাহি

    সেই সে অতীতে আজো চাহি

    যাস মুসাফির গান গাহি

    ফেলিস অশ্রুজল।

    যাক রে তখ্‌ত্-তাউস

    জাগরে জাগ বেহুঁশ!

    ডুবিল রে দেখ কত পারস্য

    কত রোম গ্রীক রুশ,

    জাগিল তারা সকল,

    জেগে ওঠ হীনবল!

    আমরা গড়িব নূতন করিয়া

    ধুলায় তাজমহল!

    চল্ চল্ চল্॥

  • বাজল কি রে ভোরের সানাই

    বাজল কি রে ভোরের সানাই

    বাজল কি রে ভোরের সানাই

    বাজ্‌ল কি রে ভোরের সানাই
    নিঁদ্‌-মহলার আঁধার-পুরে
    শুন্‌ছি আজান গগন-তলে
    আঁধার-রাতের মিনার-চূড়ে॥
    সরাই-খানার্‌ যাত্রীরা কি
    ‘বন্ধু জাগো’ উঠ্‌ল হাঁকি’?
    নীড় ছেড়ে ঐ প্রভাত-পাখি
    গুলিস্তানে চল্‌ল উড়ে’॥
    তীর্থ-পথিক্‌ দেশ-বিদেশের
    আর্‌ফাতে আজ জুট্‌ল কি ফের,
    ‘লা শরীক আল্লহু’ মন্ত্রের
    নাম্‌ল কি বান পাহাড় ‘তূরে’॥
    আজকে আবার কা’বার পথে
    ভিড় জমেছে প্রভাত হ’তে,
    নামল কি ফের্ হাজার স্রোতে
    ‘হেরার’ জ্যোতি জগৎ জুড়ে॥
    আবার ‘খালেদ’ ‘তারেক’ ‘মুসা’
    আনল কি খুন-রঙিন ভূষা,
    আস্‌ল ছুটে’ হাসীন ঊষা
    নও-বেলালের শিঁরিন সুরে॥
  • রীফ-সর্দার

    রীফ-সর্দার

    রীফ-সর্দার

    তোমারে আমরা ভুলেছি আজ,

    হে নবযুগের নেপোলিয়ন,

    কোন সাগরের কোন সে পার

    নিবু-নিবু আজ তব জীবন।

    তোমার পরশে হল মলিন

    কোন সে দ্বীপের দীপালি-রাত,

    বন্দিছে পদ সিন্ধুজল,

    ঊর্ধ্বে শ্বসিছে ঝঞ্ঝাবাত।

    তব অপমানে, বন্দি-রাজ,

    লজ্জিত সারা নর-সমাজ,

    কৃতঘ্নতা ও অবিশ্বাস

    আজি বীরত্বে হানিছে লাজ।

    মোরা জানি আর জানি জগৎ

    শত্রু তোমারে করেনি জয়,

    পাপ অন্যায় কপট ছল

    হইয়াছে জয়ী, শত্রু নয়!

    সম্মুখে রাখি মায়া-মৃগ

    পশ্চাৎ হতে হানে শায়ক–

    বীর নহে তারা ঘৃণ্য ব্যাধ

    বর্বর তারা নর-ঘাতক।

    হে মরু-কেশরী আফ্রিকার!

    কেশরীর সাথে হয়নি রণ,

    তোমারে বন্দি করেছে আজ

    সভ্য ব্যাধের ফাঁদ গোপন।

    কামানের চাকা যথা অচল

    রৌপ্যের চাকি ঢালে সেথায়,

    এরাই য়ুরোপি বীরের জাত

    শুনে লজ্জাও লজ্জা পায়!

    তুমি দেখাইলে, আজও ধরায়

    শুধু খ্রিস্টের রাসভ নাই,

    আজও আসে হেথা বীর মানব,

    ইবনে-করিম কামাল-ভাই।

    আজও আসে হেথা ইবনে-সৌদ,

    আমানুল্লাহ্, পহ্‌লবী,

    আজও আসে হেথা আলতরাশ,

    আসে সনৌসী–লাখ রবি।

    তুমি দেখাইলে, পাহাড়ি গাঁয়

    থাকে নাকো শুধু পাহাড়ি মেষ,

    পাহাড়েও হাসে তরুলতা

    পাহাড়ের মতো অটল দেশ।

    থাকে নাকো সেথা শুধু পাথর,

    সেথা থাকে বীর-শ্রেষ্ঠ নর,

    সেথা বন্দরে বানিয়া নাই

    সেথা বন্দরে নাই বাঁদর!

    শির-দার তুমি ছিলে রীফের,

    পরনিকো শিরে শরিফি তাজ,

    মামুলি সেনার সাথে সমান

    করেছ সেনানী, কুচকাওয়াজ!

  • বাংলার ‘আজীজ’

    বাংলার ‘আজীজ’

    বাংলার ‘আজীজ’1

    পোহয়নি রাত, আজান তখনও দেয়নি মুয়াজ্জিন,

    মুসলমানের রাত্রি তখন আর-সকলের দিন।

    অঘোর ঘুমে ঘুমায় যখন বঙ্গ-মুসলমান,

    সবার আগে জাগলে তুমি গাইলে জাগার গান!

    ফজর বেলার নজর ওগো উঠলে মিনার পর,

    ঘুম-টুটানো আজান দিলে – ‘আল্লাহো আকবর!’

    কোরান শুধু পড়ল সবাই বুঝলে তুমি একা,

    লেখার যত ইসলামি জোশ তোমায় দিল দেখা।

    খাপে রেখে অসি যখন খাচ্ছিল সব মার,

    আলোয় তোমার উঠল নেচে দু-ধারী তল্‌য়ার!

    চমকে সবাই উঠল জেগে, ঝলসে গেল চোখ,

    নৌজোয়ানীর খুন-জোশিতে মস্ত্ হল সব লোক!

    আঁধার রাতের যাত্রী যত উঠল গেয়ে গান,

    তোমার চোখে দেখল তারা আলোর অভিযান।

    বেরিয়ে এল বিবর হতে সিংহশাবক দল,

    যাদের প্রাতাপ-দাপে আজি বাংলা টলমল!

    এলে নিশান-বরদার বীর, দুশমন পর্দার,

    লায়লা চিরে আনলে নাহার, রাতের তারা-হার!

    সাম্যবাদী! নর-নারীরে করতে অভেদ-জ্ঞান,

    বন্দিনিদের গোরস্থানে রচলে গুলিস্তান!

    শীতের জরা দূর হয়েছে ফুটছে বাহার-গুল,

    গুলশনে গুল ফুটল যখন – নাই তুমি বুলবুল!

    মশালবাহী বিশাল পুরুষ! কোথায় তুমি আজ?

    অন্ধকারে হাতড়ে মরে অন্ধ এ-সমাজ।

    নাইকো সতুন , পড়ছে খসে ইসলামের আজ ছাদ;

    অত্যাচারের বিরুদ্ধে আর ঘোষবে কে জেহাদ?

    যেমনি তুমি হালকা হলে আপনা করি দান,

    শুনলে হঠাৎ—আলোর পাখি—কাজ-হারানো গান!

    ফুরিয়েছে কাজ, জাকছে তবু হিন্দু-মুসলমান,

    সবার ‘আজীজ’, সবার প্রিয়, আবার গাহো গান!

    আবার এসো সবার মাঝে শক্তিরূপে বীর,

    হিন্দু-সবার গুরু ওগো, মুসলমানের পীর!

  • সুরের দুলাল

    সুরের দুলাল

    সুরের দুলাল

    পাকা ধানের গন্ধ-বিধুর হেমন্তের এই দিন-শেষে,

    সুরের দুলাল, আসলে ফিরে দিগ্‌বিজয়ীর বর-বেশে!

    আজও মালা হয়নি গাঁথা হয়নি আজও গান-রচন,

    কুহেলিকার পর্দা-ঢাকা আজও ফুলের সিংহাসন।

    অলস বেলায় হেলাফেলায় ঝিমায় রূপের রংমহল,

    হয়নিকো সাজ রূপকুমারীর, নিদ টুটেছে এই কেবল।

    আয়োজনের অনেক বাকি–শুননু হঠাৎ খোশখবর,

    ওরে অলস, রাখ আয়োজন, সুর-শাজাদা আসল ঘর।

    ওঠ রে সাকি, থাক না বাকি ভরতে রে তোর লাল গেলাস,

    শূন্য গেলাস ভরব–দিয়ে চোখের পানি মুখের হাস।

    দম্ভ ভরে আসল না যে ধ্বজায় বেঁধে ঝড়-তুফান,

    যাহার আসার খবর শুনে গর্জাল না তোপ-কামান,

    কুসুম দলি উড়িয়ে ধূলি আসল না যে রাজপথে–

    আয়োজনের আড়াল তারে করব গো আজ কোনোমতে।

    সে এল গো যে-পথ দিয়ে স্বর্গে বহে সুরধুনী,

    যে-পথ দিয়ে ফেরে ধেনু মাঠের বেণুর রব শুনি।

    যেমন সহজ পথ দিয়ে গো ফসল আসে আঙিনায়,

    যেমন বিনা সমারোহে সাঁঝের পাখি যায় কুলায়।

    সে এল যে আমন-ধানের নবান্ন উৎসব-দিনে,

    হিমেল হাওয়ায় অঘ্রানের এই সুঘ্রাণেরই পথ চিনে।

    আনেনি সে হরণ করে রত্ন-মানিক সাত-রাজার

    সে এনেছে রূপকুমারীর আঁখির প্রসাদ, কণ্ঠহার।

    সুরের সেতু বাঁধল সে গো, ঊর্ধ্বে তাহার শুনি স্তব,

    আসছে ভারত-তীর্থ লাগি শ্বেত-দ্বীপের ময়দানব।

    পশ্চিমে আজ ডঙ্কা বাজে পুবের দেশের বন্দীদের,

    বীণার গানে আমরা জয়ী, লাজ মুছেছি অদৃষ্টের।

    কণ্ঠ তোমার জাদু জানে, বন্ধু ওগো দোসর মোর!

    আসলে ভেসে গানের ভেলায় বৃন্দাবনের বংশী-চোর।

    তোমার গলার বিজয়-মালা বন্ধু একা নয় তোমার,

    ওই মালাতে রইল গাঁথা মোদের সবার পুরস্কার।

    কখন আঁখির অগোচরে বসলে জুড়ে হৃদয়-মন,

    সেই হৃদয়ের লহো প্রীতি, সজল আঁখির জল-লিখন।

  • নিশীথ অন্ধকারে

    নিশীথ অন্ধকারে

    নিশীথ অন্ধকারে

    (গান)

    এ কী বেদনার উঠিয়াছে ঢেউ দূর সিন্ধুর পারে,

    নিশীথ-অন্ধকারে।

    পুরবের রবি ডুবিল গভীর বাদল-অশ্রু-ধারে,

    নিশীথ-অন্ধকারে॥

    ঘিরিয়াছে দিক ঘন ঘোর মেঘে,

    পুবালি বাতাস বহিতেছে বেগে,

    বন্দিনি মাতা একাকিনী জেগে কাঁদিতেছে কারাগারে,

    শিয়রের দীপ যত সে জ্বালায় নিভে যায় বারে বারে।

    নিশীথ-অন্ধকারে॥

    মুয়াজ্জিনের কণ্ঠ নীরব আজিকে মিনার-চূড়ে,

    বহে না শিরাজ-বাগের নহর, বুলবুল গেছে উড়ে।

    ছিল শুধু চাঁদ, গেছে তরবার,

    সে চাঁদও আঁধারে ডুবিল এবার,

    শিরতাজ-হারা কাঁদে মুসলিম অস্ত-তোরণ-দ্বারে।

    উঠিতেছে সুর বিদায়-বিধুর পারাবার-পরপারে।

    নিশীথ-অন্ধকারে॥

    ছিল না সে রাজা–কেঁপেছে বিশ্ব তবু গো প্রতাপে তার,

    শত্রু-দুর্গে বন্দি থাকিয়া খোলেনি সে তরবার।

    ছিল এ ভারত তারই পথ চাহি,

    বুকে বুকে ছিল তারই বাদশাহি,

    ছিল তার তরে ধুলার তখ্‌ত্ মানুষের দরবারে।

    আজি বরষায় তারই তরবার ঝলসিছে বারে বারে।

    নিশীথ-অন্ধকারে॥

  • শরৎচন্দ্র

    শরৎচন্দ্র

    শরৎচন্দ্র

    (চণ্ডবৃষ্টি-প্রপাত ছন্দ)

    নব ঋত্বিক নবযুগের!

    নমস্কার! নমস্কার!

    আলোকে তোমার পেনু আভাস

    নওরোজের নব উষার!

    তুমি গো বেদনা-সুন্দরের

    দর্‌দ্-ই-দিল্, নীল মানিক,

    তোমার তিক্ত কণ্ঠে গো

    ধ্বনিল সাম বেদনা-ঋক।

    হে উদীচী উষা চির-রাতের,

    নরলোকের হে নারায়ণ!

    মানুষ পারায়ে দেখিলে দিল্ –

    মন্দিরের দেব-আসন।

    শিল্পী ও কবি আজ দেদার

    ফুলবনের গাইছে গান,

    আশমানি-মউ স্বপনে গো

    সাথে তাদের করনি পান।

    নিঙারিয়া ধুলা মাটির রস

    পিইলে শিব নীল আসব,

    দুঃখ কাঁটায় ক্ষত হিয়ার

    তুমি তাপস শোনাও স্তব।

    স্বর্গভ্রষ্ট প্রাণধারায়

    তব জটায় দিলে গো ঠাঁই,

    মৃত সাগরের এই সে দেশ

    পেয়েছে প্রাণ আজিকে তাই।

    পায়ে দলি পাপ সংস্কার

    খুলিলে বীর স্বর্গদ্বার,

    শুনাইলে বাণী, ‘নহে মানব –

    গাহি গো গান মানবতার।

    মনুষ্যত্ব পাপী তাপীর

    হয় না লয়, রয় গোপন,

    প্রেমের জাদু-স্পর্শে সে

    লভে অমর নব জীবন!’

    নির্মমতায় নর-পশুর

    হায় গো যার চোখের জল

    বুকে জমে হল হিম-পাষাণ,

    হল হৃদয় নীল গরল;

    প্রখর তোমার তপ-প্রভায়

    বুকের হিম গিরি-তুষার –

    গলিয়া নামিল প্রাণের ঢল,

    হল নিখিল মুক্ত-দ্বার।

    শুভ্র হল গো পাপ-মলিন

    শুচি তোমার সমব্যথায়,

    পাঁকের ঊর্ধ্বে ফুটিল ফুল

    শঙ্কাহীন নগ্নতায়!

  • অন্ধ স্বদেশ-দেবতা

    অন্ধ স্বদেশ-দেবতা

    অন্ধ স্বদেশ-দেবতা

    ফাঁসির রশ্মি ধরি

    আসিছে অন্ধ স্বদেশ-দেবতা, পলে পলে অনুসরি

    মৃত্যু-গহন-যাত্রীদলের লাল পদাঙ্ক-রেখা।

    যুগযুগান্ত-নির্জিত-ভালে নীল কলঙ্ক-লেখা!

    নীরন্ধ্র মেঘে অন্ধ আকাশ, অন্ধ তিমির রাতি,

    কুহেলি-অন্ধ দিগন্তিকার হস্তে নিভেছে বাতি,−

    চলে পথহারা অন্ধ দেবতা ধীরে ধীরে এরি মাঝে,

    সেই পথে ফেলে চরণ–যে পথে কঙ্কাল পায়ে বাজে!

    নির্যাতনের যে যষ্টি দিয়া শত্রু আঘাত হানে

    সেই যষ্টিরে দোসর করিয়া অলক্ষ্য পথ-পানে

    চলেছে দেবতা–অন্ধ দেবতা–পায়ে পায়ে পলে পলে,

    যত ঘিরে আসে পথ-সংকট চলে তত নববলে।

    ঢলে পড়ে পথ পরে,

    নবীন মৃত্যু-যাত্রী আসিয়া তুলে ধরে বুকে করে!

    অন্ধ কারার বন্ধ দুয়ারে যথায় বন্দী জাগে,

    যথায় বধ্য-মঞ্চ নিত্য রাঙিছে রক্ত-রাগে,

    যথায় পিষ্ট হতেছে আত্মা নিষ্ঠুর মুঠি-তলে,

    যথায় অন্ধ গুহায় ফণীর মাথায় মানিক জ্বলে,

    যথায় বন্য শ্বাপদের সাথে নখর দন্ত লয়ে

    জাগে বিনিদ্র বন্য-তরুণ ক্ষুধার তাড়না সয়ে,

    যথা প্রাণ দেয় বলির নারীরা যূপকাষ্ঠের ফাঁদে,−

    সেই পথে চলে অন্ধ দেবতা, পথ চলে আর কাঁদে,−

    ‘ওরে ওঠ ত্বরা করি

    তোদের রক্তে-রাঙা উষা আসে, পোহাইছে বিভাবরী!’

    তিমির রাত্রি, ছুটেছে যাত্রী নিরুদ্দেশের ডাকে,

    জানে না কাথায় কোন পথে কোন ঊর্ধ্বে দেবতা হাঁকে।

    শুনিয়াছে ডাক এই শুধু জানে! অপনার অনুরাগে

    মাতিয়া উঠেছে অলস চরণ, সম্মুখে পথ জাগে!

    জাগে পথ, জাগে ঊর্ধ্বে দেবতা, এই দেখিয়াছে শুধু,

    কে দেখে সে পথে চোরা বালুচর, পর্বত, মরু ধুধু!

    ছুটেছে পথিক, সাথে চলে পথ, অমানিশি চলে সাথে,

    পথে পড়ে ঢলে, মৃত্যুর ছলে ধরে দেবতার হাতে।

    চলিতেছে পাশাপাশি–

    মৃত্যু, তরুণ, অন্ধ দেবতা, নবীন উষার হাসি!

  • পাথেয়

    পাথেয়

    পাথেয়

    দরদ দিয়ে দেখল না কেউ যাদের জীবন যাদের হিয়া,

    তাদের তরে ঝড়ের রথে আয় রে পাগল দরদিয়া।

    শূণ্য তোদের ঝোলা-ঝুলি, তারই তোরা দর্প নিয়ে

    দর্পীদের ওই প্রাসাদ-চূড়ে রক্ত-নিশান যা টাঙিয়ে।

    মৃত্যু তোদের হাতের মুঠায়, সেই তো তোদের পরশ-মণি,

    রবির আলোক ঢের সয়েছি, এবার তোরা আয় রে শনি!

  • দাড়ি-বিলাপ

    দাড়ি-বিলাপ

    দাড়ি-বিলাপ2

    হে আমার দাড়ি!

    একাদশ বর্ষ পরে গেলে আজি ছাড়ি

    আমারে কাঙাল করি, শূন্য করি বুক!

    শূন্য এ চোয়াল আজি শূন্য এ চিবুক!

    তোমার বিরহে বন্ধু, তোমার প্রেয়সী

    ঝুরিছে শ্যামলী গুম্ফ ওষ্ঠকূলে বসি!

    কপোল কপাল ঠুকি করে হাহাকার –

    ‘রে কপটি, রে সেফটি (safety) গিলেট রেজার!’….

    একে একে মনে পড়ে অতীতের কথা–

    তখনও ফোটেনি মুখে দাড়ির মমতা!

    তখনও এ গাল ছিল সাহারার মরু,

    বে-পাল মাস্তুল কিংবা বিপল্লব তরু!

    স্বজাতির ভীরুতার ইতিহাস স্মরি

    বাহিয়া বি-শ্মশ্রু গণ্ড অশ্রু যেত ঝরি।

    নারীসম কেশ বেশ, নারীকেলি মুখ,

    নারিকেলি হুঁকা খায়!–পুরুষ উৎসুক

    নারীর ‘নেচার’ নিতে, হা ভারত মাতা!

    নারী-মুণ্ড হল আজি নর বিশ্বত্রাতা!

    চলিত কাবুলিওয়ালা গুঁতো-হস্তে পথে

    উড়ায়ে দাড়ির ধ্বজা, আফগানিয়া রথে

    সুকৃষ্ণ নিশান যেন! অবাক বিস্ময়ে

    মহিলা-মহলে নিজ নারী-মুখ লয়ে

    রহিতাম চাহি আমি ঘুলঘুলি-ফাঁকে,

    বেচারি বাঙালি দাড়ি, কে শুধায় তাকে?

    চলিত মটরু মিঞা চামারুর নানা,

    মনে হত, এ দাড়িও ধার করে আনা

    কাবুলির দেনা-সাথে! বাঙালির দাড়ি

    বাঙালির শৌর্য-সাথে গিয়াছে গো ছাড়ি!

    দাড়ির দাড়িম্ব বনে ফেরে নাকো আর

    নির্মুক্ত হিড়িম্বা সতী, সে যুগ ফেরার!

    জামাতারে হেরি শ্বশ্রু লুকান যেমনি!

    ‘রেজারে’ হেরিয়া শ্মশ্রু লুকাল তেমনি!…

    ভোজপুরী দারোয়ান তারও দাড়ি আছে,

    চলিতে সে দাড়ি যেন শিখীপুচ্ছ নাচে!

    পাঞ্জাবি, বেলুচি, শিখ, বীর রাজপুত,

    দরবেশ, মুনি, ঋষি, বাবাজি অদ্ভুত,

    বোকেন্দ্র-গন্ধিত ছাগ সেও দাড়ি রাখে,

    শিম্পাঞ্জি, গরিলা–হায়, বাদ দিই কাকে!

    এমন যে বটবৃক্ষ তারও নামে ঝুরি,

    ঝুরি নয় ও যে দাড়ি করিয়াছে চুরি

    বনের মানুষ হতে! তাই সে বনস্পতি আজ!

    দাড়ি রাখে গুল্মলতা রসুন পেঁয়াজ!

    হাটে দাড়ি, মাঠে দাড়ি, দাড়ি চারিধার,

    লক্ষ খারে ঝরে যেন দাড়ি-বারিধার!

    ঝরে যবে বৃষ্টিধারা নীল নভ বেয়ে

    মনে হয় গাড়ি গাড়ি দাড়ি গেছে ছেয়ে

    ধরণীর চোখে-মুখে, সে সুখ-আবেশে

    নব নব পুষ্পে তৃণে ধরা ওঠে হেসে!

    মুকুরে হেরিয়া নিত বি-শ্মশ্রু বদন

    লজ্জায় মুদিয়া যেত আপনি নয়ন।

    হায় রে কাঙালি,

    রহিলি তুই-ই হয়ে মাকুন্দা বাঙালি!

    এতেক চিন্তিয়া এক ক্ষুর করি ক্রয়

    চাঁছিতে লাগিনু গাল সকল সময়।

    বহু সাধ্য-সাধনায় বহু বর্ষ পরে

    উদিল নবীন দাড়ি! যেন দিগন্তরে

    কৃষ্ণ মেঘ দিল দেখা অজন্মার দেশে,

    লালিমলি-পার্সেল যেন অঘ্রানের শেষে!

    সে দাড়ি-গৌরব বহি সু-উচ্চ মিনারে

    দাঁড়াইয়া ঘোষিতাম, ‘এই দাড়িকারে

    নিন্দে যারা, তারা ভীরু তারা কাপুরুষ!

    হায় রে বেহুঁশ,

    নারী তো নরের রূপ পেতে নাহি চায়,

    তাদের হয় না দাড়ি, গুম্ফ না গজায়!

    দাড়ি রাখি হইয়াছি শ্রীহীন মিঞা!

    কিন্তু বন্ধু, তোমরা যে শ্রীমতী অমিয়া

    হইতেছ দিনে দিনে!

    কেবা নর কেবা নারী কেহ নাহি চিনে!’

    কে কাহার কথা শোনে, ওরা করে ‘শেভ’,

    আমারে দেখিলে বলে – ‘ঐ অজদেব!’

    হই অজ-মুণ্ড আমি তবু দক্ষ-রাজা,

    দক্ষেরই জামাতা শিব–(খায় খাক গাঁজা!)

    দিনে দিনে বাড়ে দাড়ি রেজার-কর্ষণে,

    শস্য-শ্যামা ধরা যেন হলের ঘর্ষণে!

    * * *

    একাদশ বর্ষ পরে–হায় রে নিয়তি

    কে জানে আমার ভাগ্যে ছিল এ দুর্গতি!

    সেদিন কার্জন-হলে দিলীপকুমার

    আসিল গাহিতে গান, কে করে শুমার

    কত যে আসিল নর কত সে যে নারী!

    ঠেসাঠেসি ঘেঁসাঘেঁসি, কত ধুতি শাড়ি

    ছিঁড়িল পশিতে সেথা! চেনা নাহি যায়

    কেবা নর কেবা নারী–এক কেশ এক বেশ, হায়!

    সে নিখিল নারী-সভা মাঝে

    হেরিলাম, আমারি সে জয়ডঙ্কা বাজে

    মুখে মুখে দিকে দিকে! আমি কৃষ্ণ-সম

    একাকী পুরুষ বিরাজিনু অনুপম।

    সম্মুখে বালিকা এক গাহিতে বসিয়া

    ভুলি গেল সুর লয় মোরে নিরখিয়া।

    বলে, ‘মাগো, ও কী দাড়ি, দেখে ভয় লাগে!

    সুর মম ভয়ে সারদার কোল মাগে,

    বাহিরিতে চাহে নাকো।

    উহারে সম্মুখ হতে সরাইয়া রাখো!’

    গর্বে নাড়ি দাড়ি

    কহিলাম–‘গান! তব সাথে মম আড়ি!’

    সরোষে যেমনি যাব বাহিরিতে আমি,

    বিস্ময়ে হেরিনু, মম দাড়ি গেছে থামি

    বাঁধিয়া যায় গো দাড়ি নিমেষের ভ্রমে?

    চিৎকারিল নারীদল নব নব সুরে,

    বানর নরের দল হাসিল অদূরে

    ঝিঁঝিট-খাম্বাজে কেহ, কেহ মালকোশে,

    হিন্দোলে হুঙ্কারে কেহ ওস্তাদি আক্রোশে!

    আসিল নারীর স্বামী, স্বামীর শ্যালক,

    পলাইতে যত চাহি পিছে লাগে শক!

    দেখেছি অনেক ব্রোচ, বহু সেফটিপিন,

    হিরিনি নাছোড়বান্দা হেন কোনদিন।

    আমারও স্ত্রীর ব্রোচ কাঁটা বহুবার

    বাঁধিয়াই ছাড়িয়াছে তখনই আবার!

    যত পালাইতে চাই তত বাঁধে দাড়ি,

    দাড়ি লয়ে পড়ে গেল শেষে কাড়াকাড়ি

    পুরুষ নারীর মাঝে! ক্ষুরে ও কাঁচিতে

    হাসিতে হল্লাতে গোলে কাশিতে হাঁচিতে

    লাগিল ভীষণ দ্বন্দ্ব!…. যখন চেতনা

    ফিরিয়া পাইনু গৃহে, হেরি আনমনা

    হাসিছে গৃহিণী মম বাতায়নে বসি।

    জাগিতে দেখিয়া কহে, ‘এতদিনে শশী

    হল মেঘ-মুক্ত প্রিয়!’ মুকুরে হেরিয়া মুখ কহিলাম আমি,

    ‘আমি কই?’ সে কহিল, ‘মুকুরেতে স্বামী!’

  • তর্পণ

    তর্পণ

    তর্পণ

    (স্বর্গীয় দেশবন্ধুর চতুর্থ বার্ষিক শ্রাদ্ধ উপলক্ষে)

    − আজিও তেমনি করি

    আষাঢ়ের মেঘ ঘনায়ে এসেছে

    ভারত-ভাগ্য ভরি।

    আকাশ ভাঙিয়া তেমনই বাদল

    ঝরে সারা দিনমান,

    দিন না ফুরাতে দিনের সূর্য

    মেঘে হল অবসান!

    আকাশে খুঁজিছে বিজলি প্রদীপ,

    খোঁজে চিতা নদী-কূলে,

    কার নয়নের মণি হরায়েছে

    হেথা অঞ্চল খুলে।

    বজ্রে বজ্রে হাহাকার ওঠে,

    খেয়ে বিদ্যুৎ-কশা

    স্বর্গে ছুটেছে সিন্ধু–

    ঐরাবত দীর্ঘশ্বসা।

    ধরায় যে ছিল দেবতা, তাহারে

    স্বর্গ করেছে চুরি;

    অভিযানে চলে ধরণীর সেনা,

    অশনিতে বাজে তূরী।

    ধরণীর শ্বাস ধূমায়িত হল

    পুঞ্জিত কালো মেঘে,

    চিতাচুল্লিতে শোকের পাবক

    নিভে না বাতাস লেগে।

    শ্মশানের চিতা যদি নেভে, তবু

    জ্বলে স্মরণের চিতা,

    এ-পারের প্রাণ-স্নেহরসে হল

    ও-পার দীপান্বিতা।

    − হতভাগ্যের জাতি,

    উৎসব নাই, শ্রাদ্ধ করিয়া

    কাটাই দিবস রাতি!

    কেবলি বাদল, চোখের বরষা,

    যদি বা বাদল থামে –

    ওঠে না সূর্য আকাশে ভুলিয়া

    রামধনুও না নামে!

    ত্রিশ জনে করে প্রায়শ্চিত্ত

    ত্রিশ কোটির সে পাপ,

    স্বর্গ হইতে বর আনি, আসে

    রসাতল হতে শাপ!

    হে দেশবন্ধু, হয়ত স্বর্গে

    দেবেন্দ্র হয়ে তুমি

    জানি না কী চোখে দেখিছ

    পাপের ভীরুর ভারতভূমি!

    মোদের ভাগ্যে ভাস্কর-সম

    উঠেছিলে তুমি তবু,

    বাহির আঁধার ঘুচালে,

    ঘুচিল মনের তম কি কভু?

    সূর্য-আলোকে মনের আঁধার

    ঘোচে না, অশনি-ঘাতে

    ঘুচাও ঘুচাও জাতের লজ্জা

    মরণ-চরণ-পাতে!

    অমৃতে বাঁচাতে পারনি এ দেশ,

    ওগো মৃত্যুঞ্জয়,

    স্বর্গ হইতে পাঠাও এবার

    মৃত্যুর বরাভয়!

    ক্ষীণ শ্রদ্ধার শ্রাদ্ধ-বাসরে

    কী মন্ত্র উচ্চারি

    তোমারে তুষিব, আমরা তো নহি

    শ্রাদ্ধের অধিকারী!

    শ্রদ্ধা দানিবে শ্রাদ্ধ করিবে

    বীর অনাগত তারা

    স্বাধীন দেশের প্রভাত-সূর্যে

    বন্দিবে তোমা যারা!

  • না–আসা দিনের কবির প্রতি

    না–আসা দিনের কবির প্রতি

    না–আসা দিনের কবির প্রতি

    জবা-কুসুম-সংকাশ রাঙা অরুণ রবি

    তোমরা উঠিছ; না-আসা দিনের তোমরা কবি।

    যে-রাঙা প্রভাত দেখিবার আশে আমরা জাগি

    তোমরা জাগিছ দলে দলে পাখি তারই-র লাগি।

    স্তব-গান গাই আমি তোমাদেরই আসার আশে,

    তোমরা উদিবে আমার রচিত নীল আকাশে।

    আমি রেখে যাই আমার নমস্কারের স্মৃতি–

    আমার বীণায় গাহিয়ো নতুন দিনের গীতি!

  • চোখের চাতক

    চোখের চাতক

    চোখের চাতক

    ‘চোখের চাতক’ প্রথম সংস্করণ প্রকাশিত হয় ১৩৩৬ বঙ্গাব্দের অগ্রহায়ণ মুতাবিক ১৯২৯ খ্রিস্টাব্দের ডিসেম্বরে। প্রকাশক শ্রীগোপালদাস মজুমদার; ডি. এম. লাইব্রেরি, ৬১ কর্ণওয়ালিশ ষ্ট্রীট, কলিকাতা। মুদ্রাকর শ্রীসতীশচন্দ্র রায়, সুধা প্রেস, ১৯৮/১ কর্ণওয়ালিশ ষ্ট্রীট, কলিকাতা। পৃষ্ঠা সংখ্যা ৪+৭৮; মূল্য এক টাকা, রাজ-সংস্করণ ১৷৹ (পাঁচ সিকা)। এতে ৫৩টি গান অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, কিন্তু ‘সূচী’তে আছে ৫১টি গান। গ্রন্থটির উৎসর্গ পত্রে লেখা ছিল—

    কল্যাণীয়া বাণী-কণ্ঠী

    শ্রীমতী প্রতিভা সোম

    জয়যুক্তাসু।

    ‘আমার কোন্ কূলে আজ ভিড়ল তরী’ ১৩৩৬ আশ্বিনের ‘সওগাতে’ প্রথম প্রকাশিত হয়।

    ‘কে তুমি দূরের সাথী’ ১৩৩৬ শ্রাবণের ‘কল্লোলে’ প্রথম প্রকাশিত হয়।

    ‘আমার সাম্পান যাত্রী না লয়’ এবং ‘তোমায় কূলে তুলে বন্ধু’ ১৩৪৩ ফাল্গুণের ‘বুলবুলে’ ‘চট্টল-গীতিকা’ শিরোনামে উদ্ধৃত হয়।

    ‘ওরে মাঝি ভাই’ ১৩৩৫ ফাল্গুনের ‘আঁধার রাতে কে গো একেলা’ ১৩৩৬ আষাঢ়ের এবং ‘জনম জনম গেল আশা-পথ চাহি’ ১৩৩৬ অগ্রহায়ণের ‘সওগাতে’ প্রথম প্রকাশিত হয়। ‘ওরে মাঝি ভাই’ রচনার স্থান ও তারিখ— ‘চট্টগ্রাম, জানুয়ারি ১৯২৯।’

    ‘পেয়ে কেন নাহি পাই হৃদয়ে মম’ ১৩৩৫ সালে ঢাকার ‘জাগরণ’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয় এবং ‘জাগরণ’ হতে ১৩৩৬ অগ্রহায়ণের ‘সঞ্চয়ে’ উদ্ধৃত হয়।

    ‘না মিটিতে সাধ মোর নিশি পোহায়’ ১৩৩৬ কার্তিকের ‘সওগাতে’ প্রথম প্রকাশিত হয়।

    ‘পর-জনমে দেখা হবে প্রিয়’ ১৩৩৭ অগ্রহায়ণের ‘উত্তরা’য় প্রকাশিত হয়।

    ‘কে ডাকিলে আমারে আঁখি তুলে’ ১৩৩৬ পৌষের এবং ‘কার বাঁশী বাজে মুলতান-সুরে’ ১৩৩৬ মাঘের ‘সওগাতে’ প্রকাশিত হয়।

  • আমার কোন কূলে আজ ভিড়ল তরী

    আমার কোন কূলে আজ ভিড়ল তরী

    খাম্বাজ-পিলু–দাদরা
    আমার
    কোন কূলে আজ ভিড়ল তরী
    এ কোন্ সোনার গাঁয়।
    আমার
    ভাটির তরী আবার কেন
    উজান যেতে চায়॥
    আমার
    দুঃখেরে কাণ্ডারী করি
    আমি
    ভাসিয়েছিলাম ভাঙা তরী,
    তুমি
    ডাক দিলে কে স্বপনপরী
    নয়ন-ইশারায়॥
    আমার
    নিভিয়ে দিয়ে ঘরের বাতি
    ডেকেছিল ঝড়ের রাতি,
    তুমি
    কে এলে মোর সুরের সাথী
    গানের কিনারায়॥
    ওগো
    সোনার দেশের সোনার মেয়ে,
    তুমি
    হবে কি মোর তরীর নেয়ে,
    এবার
    ভাঙা তরী চল বেয়ে
    রাঙা অলকায়॥
  • কাঁদিতে এসেছি আপনারে লয়ে

    কাঁদিতে এসেছি আপনারে লয়ে

    জয়জয়ন্তী–একতালা

    কাঁদিতে এসেছি
    আপনারে লয়ে
    কাঁদাতে আসিনি
    হে প্রিয় তোমারে।
    এ মম আঁখি-জল
    আমারি নয়নের
    ঝরিবে না এ জল
    তোমার দুয়ারে॥
    ভাল যদি বাসি
    একাকী বাসিব,
    বিরহ-পাথারে
    একাকী ভাসিব।
    কভু যদি ভুলে
    আসি তব কূলে,
    চমকি চলিয়া
    যাব দূর-পারে॥
    কাঁটার বনে মোর
    ক্ষণিকের তরে
    ফুটেছ রাঙা ফুল
    শুধু লীলাভরে।
    মালা হয়ে কবে
    দুলিবে গলে কার
    জাগিব একাকী
    লয়ে স্মৃতি কাঁটার।
    কেহ জানিবে না
    শুকাল কে কোথা,
    কার ফুলে কারে
    সাজালে দেবতা।
    নিশীথ-অশ্রু মোর
    যাইবে শুকায়ে
    তব সুখ-দিনে
    হাসির মাঝারে॥
  • ছাড়িতে পরান নাহি চায়

    ছাড়িতে পরান নাহি চায়

    খাম্বাজ–দাদরা

    ছাড়িতে পরান নাহি চায়
    তবু   যেতে হবে, হায়!
    মলয়া মিনতি করে
    তবু   কুসুম শুকায়॥
    রবে না এ মধু-রাতি
    জানি তবু মালা-গাঁথি,
    মালা
    চলিতে দলিয়া যাবে
    তবু   চরণে জড়ায়॥
    যে কাঁটার জ্বালা সয়ে
    ফোটে ব্যথা ফুল হয়ে,
    আমি
    কাঁদিব সে কাঁটা লয়ে
    নিশীথ-বেলায়।
    তুমি
    রবে যবে পরবাসে,
    আমি দূর নীলাকাশে
    জাগিব তোমারই আশে
    নূতন তারায়॥
  • কে তুমি দূরের সাথী

    কে তুমি দূরের সাথী

    পুরবী–একতালা

    কে তুমি দূরের সাথী

    এলে ফুল ঝরার বেলায়।

    বিদায়ের বংশী বাজে

    ভাঙা মোর প্রাণের মেলায়॥

    গোধূলির মায়ায় ভুলে

    এলে হায় সন্ধ্যা-কূলে,

    দীপহীন মোর দেউলে

    এলে কোন্ আলোর খেলায়॥

    সেদিনও প্রভাতে মোর

    বেজেছে আশাবরি,

    পুরবীর কান্না শুনি

    আজি মোর শূন্য ভরি।

    অবেলায় কুঞ্জবীথি

    এলে মোর শেষ অতিথি,

    ঝরা ফুল শেষের গীতি

    দিনু দান তোমার গলায়॥

  • আজি এ শ্রাবণ-নিশি

    আজি এ শ্রাবণ-নিশি

    মিঁয়া কী মল্লার–কাওয়ালি

    আজি এ শ্রাবণ-নিশি
    কাটে কেমনে
    গুর দেয়া-গরজন
    কাঁপে হিয়া ঘনঘন
    শনশন কাঁদে বায়ু
    নীপ-কাননে॥
    অন্ধ নিশীথ, মন
    খোঁজে কারে আঁধারে,
    অন্ধ নয়ন ঝরে
    শাওন-বারিধারে।
    ভাঙিয়া দুয়ার মম
    এস এস প্রিয়তম,
    শ্বসিছে বাহির ঘর
    ভেজা পবনে॥
    কার চোখে এত জল
    ঝরে দিক প্লাবিয়া,
    সহিতে না পারি কাঁদে
    ‘চোখ গেল’ পাপিয়া।
    কাহার কাজল-আঁখি
    চাহি মোর নয়নে
    ঝুরেছিল একা রাতে
    কবে কোন্ শাওনে,
    আজি এ বাদল ঝড়ে
    সেই আঁখি মনে পড়ে,
    বিজলি খুঁজিছে তারে
    নভ-আঙনে॥