Category: কাজী নজরুল ইসলাম

  • হিংসাতুর

    হিংসাতুর

    হিংসাতুর

    হিংসাই শুধু দেখেছ এ চোখে? দেখ নাই আর কিছু?

    সম্মুখে শুধু রহিলে তাকায়ে, চেয়ে দেখিলে না পিছু!

    সম্মুখ হতে আঘাত হানিয়া চলে গেল যে-পথিক

    তার আঘাতেরই ব্যথা বুকে ধরে জাগ আজও অনিমিখ?

    তুমি বুঝিলে না, হায়,

    কত অভিমানে বুকের বন্ধু ব্যথা হেনে চলে যায়!

      

    আঘাত তাহার মনে আছে শুধু, মনে নাই অভিমান?

    তোমারে চাহিয়া কত নিশি জাগি গাহিয়াছে কত গান,

    সে জেগেছে একা – তুমি ঘুমায়েছ বেভুল আপন সুখে,

    কাঁটার কুঞ্জে কাঁদিয়াছে বসি সে আপন মনোদুখে,

    কুসুম-শয়নে শুইয়া আজিকে পড়ে না সেসব মনে,

    তুমি তো জান না, কত বিষজ্বালা কণ্ঠক-দংশনে!

    তুমি কি বুঝিবে বালা,

    যে আঘাত করে বুকের প্রিয়ারে, তার বুকে কত জ্বালা!

      

    ব্যথা যে দিয়াছে – সম্মুখে ভাসে নিষ্ঠুর তার কায়া,

    দেখিলে না তব পশ্চাতে তারই অশ্রু-কাতর ছায়া!..

    অপরাধ শুধু মনে আছে তার, মনে নাই কিছু আর?

    মনে নাই, তুমি দলেছ দুপায়ে কবে কার ফুলহার?

    কাঁদয়ে কাঁদিয়া সে রচেছে তার অশ্রুর গড়খাই,

    পার হতে তুমি পারিলে না তাহা, সে-ই অপরাধী তাই?

    সে-ই ভালো, তুমি চিরসুখী হও, একা সে-ই অপরাধী!

    কী হবে জানিয়া, কেন পথে পথে মরুচারী ফেরে কাঁদি!

      

    হয়তো তোমারে করেছে আঘাত, তবুও শুধাই আজি,

    আঘাতের পিছে আরও কিছু কি গো ও বুকে ওঠেনি বাজি?

    মনে তুমি আজ করিতে পার কি –তব অবহেলা দিয়া

    কত যে কঠিন করিয়া তুলেছ তাহার কুসুম-হিয়া?

    মানুষ তাহারে করেছ পাষাণ–সেই পাষাণের ঘায়

    মুরছায়ে তুমি পড়িতেছ বলে সেই অপরাধী হায়?

    তাহারই সে অপরাধ –

    যাহার আঘাতে ভাঙিয়া গিয়াছে তোমার মনের বাঁধ!

      

    কিন্তু কেন এ অভিযোগ আজি? সে তো গেছে সব ভুলে!

    কেন তবে আর রুদ্ধ দুয়ার ঘা দিয়া দিতেছে খুলে?

    শুষ্ক যে-মালা আজিও নিরালা যত্নে রেখেছে তুলি

    ঝরায়ো না আর নাড়া দিয়ে তার পবিত্র ফুলগুলি!

    সেই অপরাধী, সেই অমানুষ, যত পার দাও গালি!

    নিভেছে যে-ব্যথা দয়া করে সেথা আগুন দিয়ো না জ্বালি!

    ‘মানুষ’, ‘মানুষ’শুনে শুনে নিতি কান হল ঝালাপালা!

    তোমরা তারেই অমানুষ বল – পায়ে দল যার মালা!

    তারই অপরাধ – যে তার প্রেম ও অশ্রুর অপমানে

    আঘাত করিয়া টুটায়ে পাষাণ অশ্রু-নিঝর আনে!

    কবি অমানুষ – মানিলাম সব! তোমার দুয়ার ধরি

    কবি না মানুষ কেঁদেছিল প্রিয় সেদিন নিশীথ ভরি?

    দেখেছ ঈর্ষা – পড়ে নাই চোখে সাগরের এত জল?

    শুকালে সাগর –দেখিতেছ তার সাহারার মরুতল!

    হয়তো কবিই গেয়েছিল গান, সে কি শুধু কথা – সুর

    কাঁদিয়াছিল যে – তোমারই মতো সে মানুষ বেদনাতুর!

    কবির কবিতা সে শুধু খেয়াল? তুমি বুঝিবে না, রানি,

    কত জ্বাল দিলে উনুনের জলে ফোটে বুদ‍্‍বুদ‍্-বাণী!

    তুমি কী বুঝিবে, কত ক্ষত হয়ে বেণুর বুকের হাড়ে

    সুর ওঠে হায়, কত ব্যথা কাঁদে সুর-বাঁধা বীণা-তারে!

      

    সেদিন কবিই কেঁদেছিল শুধু? মানুষ কাঁদেনি সাথে?

    হিংসাই শুধু দেখেছ, দেখনি অশ্রু নয়ন-পাতে?

    আজও সে ফিরিছে হাসিয়া গাহিয়া? –হায়, তুমি বুঝিবে না,

    হাসির ফুর্তি উড়ায় যে – তার অশ্রুর কত দেনা!

  • বর্ষা-বিদায়

    বর্ষা-বিদায়

    বর্ষা-বিদায়

      ওগো বাদলের পরি!

    যাবে কোন দূরে, ঘাটে বাঁধা তব কেতকী পাতার তরি!

    ওগো ও ক্ষণিকা, পুব-অভিসার ফুরাল কি আজি তব?

    পহিল ভাদরে পড়িয়াছে মনে কোন দেশ অভিনব?

      

    তোমার কপোল-পরশ না পেয়ে পাণ্ডুর কেয়া-রেণু,

    তোমারে স্মরিয়া ভাদরের ভরা নদীতটে কাঁদে বেণু।

    কুমারীর ভীরু বেদনা-বিধুর প্রণয়-অশ্রুসম

    ঝরিছে শিশির-সিক্ত শেফালি নিশি-ভোরে অনুপম।

      ওগো ও কাজলের মেয়ে,

    উদাস আকাশ ছলছল চোখে তব মুখে আছে চেয়ে।

    কাশফুল সম শুভ্র ধবল রাশ রাশ শ্বেত মেঘে

    তোমার তরির উড়িতেছে পাল উদাস বাতাস লেগে।

    ওগো ও জলের দেশের কন্যা! তব ও বিদায়-পথে

    কাননে কাননে কদম-কেশর ঝরিছে প্রভাত হতে।

    তোমার আদরে মুকুলিতা হয়ে উঠিল যে বল্লরি

    তরুর কণ্ঠ জড়াইয়া তারা কাঁদে দিবানিশি ভরি।

      ‘বউ-কথা-কও’পাখি

    উড়ে গেছে কোথা, বাতায়নে বৃথা বউ করে ডাকাডাকি।

    চাঁপার গেলাস গিয়াছে ভাঙিয়া, পিয়াসি মধুপ এসে

    কাঁদিয়া কখন গিয়াছে উড়িয়া কমল-কুমুদী-দেশে।

      তুমি চলে যাবে দূরে,

    ভাদরের নদী দুকূল ছাপায়ে কাঁদে ছলছল সুরে!

      

    যাবে যবে দূর হিমগিরিশিরে, ওগো বাদলের পরি,

    ব্যথা করে বুক উঠিবে না কভু সেথা কাহারেও স্মরি?

    সেথা নাই জল, কঠিন তুষার, নির্মম শুভ্রতা, –

    কে জানে কী ভালো বিধুর ব্যথা – না মধুর পবিত্রতা!

    সেথা মহিমার ঊর্ধ্ব শিখরে নাই তরলতা হাসি,

    সেথা রজনির রজনিগন্ধা প্রভাতে হয় না বাসি।

    সেথা যাও তব মুখর পায়ের বরষা-নূপুর খুলি,

    চলিতে চকিতে চমকি উঠ না, কবরী উঠে না দুলি।

      

    সেথা রবে তুমি ধেয়ান-মগ্না তাপসিনী অচপল,

    তোমার আশায় কাঁদিবে ধরায় তেমনি ‘ফটিক-জল’।

  • সাজিয়াছি বর মৃত্যুর উৎসবে

    সাজিয়াছি বর মৃত্যুর উৎসবে

    সাজিয়াছি বর মৃত্যুর উৎসবে

    দেখা দিলে রাঙা মৃত্যুর রূপে এতদিনের কি গো রাণী?

    মিলন-গোধূলি-লগনে শুনালে চির-বিদায়ের বাণী।

    যে ধূলিতে ফুল ঝরায় পবন

    রচিলে সেথায় বাসর-শয়ন,

    বারেক কপোলে রাখিয়া কপোল, ললাটে কাঁকন হানি,

    দিলে মোর পরে সকরুণ করে কৃষ্ণ কাফন টানি।

    নিশি না পোহাতে জাগায়ে বলিলে, ‘হল যে বিদায় বেলা।’

    তব ইঙ্গিতে ও-পার হইতে এপারে আসিল ভেলা।

    আপনি সাজালে বিদায়ের বেশে

    আঁখি-জল মম মুছাইলে হেসে,

    বলিলে, ‘অনেক হইয়াছে দেরি, আর জমিবে না খেলা!

    সকলের বুকে পেয়েছ আদর, আমি দিনু অবহেলা।’

    ‘চোখ গেল উহু চোখ গেল’ বলে কাঁদিয়া উঠিল পাখি,

    হাসিয়া বলিলে, ‘বন্ধু, সত্যি চোখ গেল ওর নাকি?’

    অকূল অশ্রু-সাগর-বেলায়

    শুধু বালু নিয়ে যে-জন খেলায়,

    কী বলিব তারে, বিদায়-ক্ষণেও ভিজিল না যার আঁখি!

    শ্বসিয়া উঠিল নিশীথ-সমীর, ‘চোখ গেল’কাঁদে পাখি!

    দেখিনু চাহিয়া ও-মুখের পানে–নিরশ্রু নিষ্ঠুর!

    বুকে চেপে কাঁদি, প্রিয় ওগো প্রিয়, কোথা তুমি কত দূর?

    এত কাছে তুমি গলা জড়াইয়া

    কেন হুহু করে ওঠে তবু হিয়া,

    কী যেন কী কীসের অভাব এ বুকে ব্যথা-বিধুর!

    চোখ-ভরা জল, বুক-ভরা কথা, কণ্ঠে আসে না সুর।

    হেনার মতন বক্ষে পিষিয়া করিনু তোমারে লাল,

    ঢলিয়া পড়িলে দলিত কমল জড়ায়ে বাহু-মৃণাল!

    কেঁদে বলি, ‘প্রিয়া, চোখে কই জল?

    হল না তো ম্লান চোখের কাজল!’

    চোখের জল নাই–উঠিল রক্ত–সুন্দর কঙ্কাল!

    বলিলে, ‘বন্ধু, চোখেরই তো জল, সে কি রহে চিরকাল?’

    ছল ছল ছল কেঁদে চলে জল, ভাঁটি-টানে ছুটে তরী,

    সাপিনীর মত জড়াইয়া ধরে শশীহীন শর্বরী।

    কূলে কূলে ডাকে কে যেন, ‘পথিক,

    আজও রাঙা হয়ে ওঠেনি তো দিক!

    অভিমানী মোর! এখনই ছিঁড়িবে বাঁধন কেমন করি?

    চোখে নাই জল–বক্ষের মোর ব্যথা তো যায়নি মরি!’

    কেমনে বুঝাই কী যে আমি চাই, চির-জনমের প্রিয়া!

    কেমনে বুঝাই–এত হাসি গাই তবু কাঁদে কেন হিয়া!

    আছে তব বুকে করুণার ঠাঁই,

    স্বর্গের দেবী–চোখে জল নাই!

    কত জীবনের অভিশাপ এ যে, কতবার জনমিয়া–

    পারিজাত-মালা ছুঁইতে শুকালে–হারাইলে দেখা দিয়া।

    ব্যর্থ মোদের গোধূলি-লগন এই সে জনমে নহে,

    বাসর-শয়নে হারায়ে তোমায় পেয়েছি চির-বিরহে!

    কত সে লোকের কত নদনদী

    পারায়ে চলেছি মোরা নিরবধি,

    মোদের মাঝারে শত জনমের শত সে জলধি বহে।

    বারেবারে ডুবি বারেবারে উঠি জন্ম-মৃত্যু-দহে!

    বারে বারে মোরা পাষাণ হইয়া আপনারে থাকি ভুলি,

    ক্ষণেকের তরে আসে কবে ঝড়, বন্ধন যায় খুলি।

    সহসা সে কোন সন্ধ্যায়, রাণী,

    চকিতে হয় গো চির-জানাজানি!

    মনে পড়ে যায় অভিশাপ-বাণী, উড়ে যায় বুলবুলি।

    কেঁদে কও, ‘প্রিয়, হেথা নয়, হেথা লাগিয়াছে বহু ধূলি।’

    মুছি পথধূলি বুকে লবে তুলি মরণের পারে কবে,

    সেই আশে, প্রিয়, সাজিয়াছি বর মৃত্যুর উৎসবে!

    কে জানিত হায় মরমের মাঝে

    এমন বিয়ের নহবত বাজে!

    নবজীবনের বাসর-দুয়ারে কবে ‘প্রিয়া’‘বধূ’হবে–

    সেই সুখে, প্রিয়া, সাজিয়াছি বর মৃত্যুর উৎসবে!

  • অপরাধ শুধু মনে থাক

    অপরাধ শুধু মনে থাক

    অপরাধ শুধু মনে থাক

    মোর অপরাধ শুধু মনে থাক!

    আমি হাসি, তার আগুনে আমারি

    অন্তর হোক পুড়ে খাক!

    অপরাধ শুধু মনে থাক!

    নিশীথের মোর অশ্রুর রেখা

    প্রভাতে কপোলে যদি যায় দেখা,

    তুমি পড়িও না সে গোপন লেখা

    গোপনে সে লেখা মুছে যাক

    অপরাধ শুধু মনে থাক!

    এ উপগ্রহ কলঙ্ক-ভরা

    তবু ঘুরে ঘিরি তোমারি এ ধরা,

    লইয়া আপন দুখের পসরা

    আপনি সে খাক ঘুরপাক।

    অপরাধ শুধু মনে থাক!

    জ্যোৎস্না তাহার তোমার ধরায়

    যদি গো এতই বেদনা জাগায়,

    তোমার বনের লতায় পাতায়

    কালো মেঘে তার আলো ছা’ক।

    অপরাধ শুধু মনে থাক!

    তোমার পাখির ভুলাইতে গান

    আমি তো আসিনি, হানিনি তো বাণ,

    আমি তো চাহিনি কোনো প্রতিদান,

    এসে চলে গেছি নির্‌বাক।

    অপরাধ শুধু মনে থাক।

    কত তারা কাঁদে কত গ্রহে চেয়ে

    ছুটে দিশাহারা ব্যোমপথ বেয়ে,

    তেমনি একাকী চলি গান গেয়ে

    তোমারে দিইনি পিছু-ডাক।

    অপরাধ শুধু মনে থাক!

    কত ঝরে ফুল, কত খসে তারা,

    কত সে পাষাণে শুকায় ফোয়ারা,

    কত নদী হয় আধ-পথে হারা,

    তেমনই এ স্মৃতি লোপ পাক।

    অপরাধ শুধু মনে থাক!

    আঙিনায় তুমি ফুটেছিলে ফুল

    এ দূর পবন করেছিল ভুল,

    শ্বাস ফেলে চলে যাবে সে আকুল –

    তব শাখে পাখি গান গাক।

    অপরাধ শুধু মনে থাক!

    প্রিয় মোর প্রিয়, মোরই অপরাধ,

    কেন জেগেছিল এত আশা সাধ!

    যত ভালোবাসা, তত পরমাদ,

    কেন ছুঁইলাম ফুল-শাখ।

    অপরাধ শুধু মনে থাক!

    আলোয়ার মতো নিভি,পুনঃ জ্বলি,

    তুমি এসেছিলে শুধু কুতূহলী,

    আলেয়াও কাঁদে কারও পিছে চলি –

    এ কাহিনি নব মুছে যাক।

    অপরাধ শুধু মনে থাক!

  • আড়াল

    আড়াল

    আড়াল

    আমি কি আড়াল করিয়া রেখেছি তব বন্ধুর মুখ?

    না জানিয়া আমি না জানি কতই দিয়াছি তোমায় দুখ।

    তোমার কাননে দখিনা পবন

    এনেছিল ফুল পূজা-আয়োজন,

    আমি এনু ঝড় বিধাতার ভুল–ভণ্ডুল করি সব,

    আমার অশ্রু-মেঘে ভেসে গেল তব ফুল-উৎসব।

    মম উৎপাতে ছিঁড়েছে কি প্রিয়, বক্ষের মণিহার?

    আমি কি এসেছি তব মন্দিরে দস্যু ভাঙিয়া দ্বার?

    আমি কি তোমার দেবতা-পূজার

    ছড়ায়ে ফেলেছি ফুল-সম্ভার?

    আমি কি তোমার স্বর্গে এসেছি মর্ত্যের অভিশাপ

    আমি কি তোমার চন্দ্রের বুকে কালো কলঙ্ক-ছাপ?

    ভুল করে যদি এসে থাকি ঝড়, ছিঁড়িয়া থাকি মুকুল,

    আমার বরষা ফুটায়েছে অনেক অধিক ফুল!

    পরায়ে কাজল ঘন বেদনার

    ডাগর করেছি নয়ন তোমার,

    কূলের আশায়, ভাঙিয়া করেছি সাত সাগরের রাণী,

    সে দিয়াছে মালা, আমি সাজায়েছি নিখিল সুষমা-ছানি।

    দস্যুর মতো হয়ত খুলেছি লাজ-অবগুণ্ঠন,

    তব তরে আমি দস্যু, করেছি ত্রিভুবন লুণ্ঠন!

    তুমি তো জান না, নিখিল বিশ্ব

    কার প্রিয়া লাগি আজিকে নিঃস্ব?

    কার বনে ফুল ফোটাবার লাগি ঢালিয়াছি এত নীর,

    কার রাঙা পায়ে সাগর বাঁধিয়া করিয়াছি মঞ্জীর।

    তুমি না চাহিতে আসিয়াছি আমি–সত্য কি এইটুক?

    ফুল ফোটা-শেষে ঝরিবার লাগি ছিলে না কি উৎসুক?

    নির্মম-প্রিয়-নিষ্ঠুর হাতে

    মরিতে চাহনি আঘাতে আঘাতে?

    মরিতে চাহনি আঘাতে আঘাতে?

    তুমি কি চাহনি কেহ এসে তব ছিঁড়ে দেয় গাঁথা-মালা?

    পাষাণের মতো চাপিয়া থাকিনি তোমার উৎস-মুখে,

    আমি শুধু এসে মুক্তি দিয়াছি আঘাত হানিয়া বুকে!

    তোমার স্রোতেরে মুক্তি দানিয়া

    স্রোতমুখে আমি গেলাম ভাসিয়া।

    রহিবার যে–সে রয়ে গেল কূলে, সে রচুক সেথা নীড়!

    মম অপরাধে তব স্রোত হল পুণ্য তীর্থ-নীর!

    রূপের দেশের স্বপন-কুমার স্বপনে আসিয়াছিনু,

    বন্দিনী! মম সোনার ছোঁয়ায় তব ঘুম ভাঙাইনু।

    দেখ মোরে পাছে ঘুম ভাঙিয়াই,

    ঘুম না টুটিতে তাই চলে যাই,

    যে আসিল তব জাগরণ-শেষে মালা দাও তারই গলে,

    সে থাকুক তব বক্ষে–রহিব আমি অন্তর-তলে।

    সন্ধ্যা-প্রদীপ জ্বালায়ে যখন দাঁড়াবে আঙিনা-মাঝে,

    শুনিও কোথায় কোন তারা-লোকে কার ক্রন্দন বাজে!

    আমার তারার মলিন আলোকে

    ম্লান হয়ে যাবে দীপশিখা চোখে,

    হয়ত অদূর গাহিবে পথিক আমারি রচিত গীত –

    যে গান গাইয়া অভিমান তব ভাঙাতাম সাঁঝে নিতি।

    গোধূলি-বেলায় ফুটিবে উঠানে সন্ধ্যামণির ফুল,

    তুলসী-তলায় করিতে প্রণাম খুলে যাবে বাঁধা চুল।

    কুন্তল-মেঘ-ফাঁকে অবিরল

    অকারণে চোখে ঝরিবে গো জল,

    সারা শর্বরী বাতায়নে বসি নয়ন-প্রদীপ জ্বালি

    খুঁজিবে আকাশে কোন তারা কাঁপে তোমারে চাহিয়া খালি।

    নিষ্ঠুর আমি–আমি অভিশাপ, ভুলিতে দিব না, তাই

    নিশ্বাস মম তোমারে ঘিরিয়া শ্বসিবে সর্বদাই।

    তোমারে চাহিয়া রচিনু যে গান

    কণ্ঠে কণ্ঠে লভিবে তা প্রাণ,

    আমার কণ্ঠে হইবে নীরব, নিখিল-কণ্ঠ-মাঝে

    শুনিবে আমারি সেই ক্রন্দন সে গান প্রভাতে সাঁঝে!

  • নদীপারের মেয়ে

    নদীপারের মেয়ে

    নদীপারের মেয়ে

    নদীপারের মেয়ে!

    ভাসাই আমার গানের কমল তোমার পানে চেয়ে।

    আলতা-রাঙা পা দুখানি ছুপিয়ে নদী-জলে

    ঘাটে বসে চেয়ে আছ আঁধার অস্তাচলে।

    নিরুদ্দেশে ভাসিয়ে-দেওয়া আমার কমলখানি

    ছোঁয় কি গিয়ে নিত্য সাঁঝে তোমার চরণ, রাণী?

    নদীপারের মেয়ে!

    গানের গাঙে খুঁজি তোমায় সুরের তরি বেয়ে।

    খোঁপায় গুঁজে কনক-চাঁপা, গলায় টগর-মালা,

    হেনার গুছি হাতে বেড়াও নদীকূলে বালা।

    শুনতে কি পাও আমার তরির তোমায়-চাওয়া গীতি?

    ম্লান হয়ে কি যায় ও-চোখে চতুর্দশীর তিথি?

    নদীপারের মেয়ে!

    আমার ব্যথার মালঞ্চে ফুল ফোটে তোমায়-চেয়ে।

    শীতল নীরে নেয়ে ভোরে ফুলের সাজি হাতে,

    রাঙা উষার রাঙা সতিন দাঁড়ায় আঙিনাতে।

    তোমার মদির শ্বাসে কি মোর গুলের সুবাস মেশে?

    আমার বনের কুসুম তুলি পর কি আর কেশে?

    নদীপারের মেয়ে!

    আমার কমল অভিমানের কাঁটায় আছে ছেয়ে!

    তোমার সখায় পূজ কি মোর গানের কমল তুলি?

    তুলতে সে-ফুল মৃণাল-কাঁটায় বেঁধে কি অঙ্গুলি?

    ফুলের বুকে দোলে কাঁটার অভিমানের মালা,

    আমার কাঁটার ঘায়ে বোঝ আমার বুকের জ্বালা?

  • ১৪০০ সাল

    ১৪০০ সাল

    ১৪০০ সাল

    (কবি-সম্রাট রবীন্দ্রনাথের ‘আজি হতে শতবর্ষ পরে’ পড়িয়া)

    আজি হতে শত বর্ষ আগে

    কে কবি, স্মরণ তুমি করেছিলে আমাদেরে

    শত অনুরাগে,

    আজি হতে শত বর্ষ আগে!

    ধেয়ানী গো, রহস্য-দুলাল!

    উতারি ঘোমটাখানি তোমার আঁখির আগে

    কবে এল সুদূর আড়াল?

    অনাগত আমাদের দখিন-দুয়ারি

    বাতায়ন খুলি তুমি, হে গোপন হে স্বপনচারী,

    এসেছিলে বসন্তের গন্ধবহ-সাথে,

    শত বর্ষ পরে যথা তোমার কবিতাখানি

    পড়িতেছি রাতে!

    নেহারিলে বেদনা-উজ্জ্বল আঁখি নীরে,

    আনমনা প্রজাপতি নীরব পাখায়

    উদাসীন, গেলে ধীরে ফিরে!

    আজি মোরা শত বর্ষ পরে

    যৌবন-বেদনা-রাঙা তোমার কবিতাখানি

    পড়িতেছি অনুরাগ-ভরে।

    জড়িত জাগর ঘুমে শিথিল শয়নে

    শুনিতেছে প্রিয়া মোর তোমার ইঙ্গিতে-গান

    সজল নয়নে!

    আজও হায়

    বারে বারে খুলে যায়

    দক্ষিণের রুদ্ধ বাতায়ন,

    গুমরি গুমরি কাঁদে উচাটন বসন্ত-পবন

    মনে মনে বনে বনে পল্লব-মর্মরে,

    কবরীর অশ্রুজল বেণী-খসা ফুল-দল

    পড়ে ঝরে ঝরে!

    ঝিরিঝিরি কাঁপে কালো নয়ন-পল্লব,

    মধুপের মুখ হতে কাড়িয়া মধুপী পিয়ে পরাগ-আসব!

    কপোতের চঞ্চুপুটে কপোতীর হারায় কূজন,

    পরিয়াছে বনবধূ যৌবন-আরক্তিম কিংশুক-বসন!

    রহিয়া রহিয়া আজও ধরণির হিয়া

    সমীর-উচ্ছ্বাসে যেন ওঠে নিশ্বসিয়া!

    তোমা হতে শত বর্ষ পরে–

    তোমার কবিতাখানি পড়িতেছি, হে কবীন্দ্র,

    অনুরাগ-ভরে!

    আজি এই মদালসা ফাগুন-নিশীথে

    তোমার ইঙ্গিতে জাগে তোমার সংগীতে!

    চতুরালি, ধরিয়াছি তোমার চাতুরি!

    করি চুরি

    আসিয়াছ আমাদের দুরন্ত যৌবনে,

    কাব্য হয়ে, গান হয়ে, সিক্তকণ্ঠে রঙিলা স্বপনে।

    আজিকার যত ফুল–বিহঙ্গের যত গান

    যত রক্ত-রাগ

    তব অনুরাগ হতে, হে চির-কিশোর কবি,

    আনিয়াছে ভাগ!

    আজি নব-বসন্তের প্রভাত বেলায়

    গান হয়ে মাতিয়াছ আমাদের যৌবন-মেলায়!

    আনন্দ-দুলাল ওগো হে চির অমর!

    তরুণ তরুণী মোরা জাগিতেছি আজি তব

    মাধবী বাসর!

    যত গান গাহিয়াছ ফুল-ফোটা রাতে–

    সব গুলি তার

    একবার–তা-পর আবার

    প্রিয়া গাহে, আমি গাহি, আমি গাহি প্রিয়া গাহে সাথে!

    গান-শেষে অর্ধরাতে স্বপনেতে শুনি

    কাঁদে প্রিয়া, “ওগো কবি ওগো বন্ধু ওগো মোর গুণী–”

    স্বপ্ন যায় থামি,

    দেখি, বন্ধু আসিয়াছ প্রিয়ার নয়ন-পাতে

    অশ্রু হয়ে নামি!

    মনে লাগে, শত বর্ষ আগে

    তুমি জাগো–তব সাথে আরো কেহ জাগে

    দূরে কোন ঝিলিমিলি-তলে

    লুলিত অঞ্চলে।

    তোমার ইঙ্গিতখানি সংগীতের করুণ পাখায়

    উড়ে যেতে যেতে সেই বাতায়নে ক্ষণিক তাকায়,

    ছুঁয়ে যায় আঁখি-জল-রেখা,

    নুয়ে যায় অলক-কুসুম,

    তারপর যায় হারাইয়া,–তুমি একা বসিয়া নিঝ‍্‍ঝুম!

    সে কাহার আঁখি-নীর-শিশির লাগিয়া

    মুকুলিকা বাণী তব কোনোটি বা ওঠে মুঞ্জরিয়া,

    কোনোটি বা তখনও গুঞ্জরি ফেরে মনে

    গোপনে স্বপনে!

    সহসা খুলিয়া গেল দ্বার,

    আজিকার বসন্ত-প্রভাতখানি দাঁড়াল করিয়া নমস্কার!

    শতবর্ষ আগেকার তোমারই সে বাসন্তিকা দূতি

    আজি নব নবীনেরে জানায় আকুতি!…

    হে কবি-শাহান-শাহ্! তোমারে দেখিনি মোরা,

    সৃজিয়াছ যে তাজমহল–

    শ্বেতচন্দনের ফোঁটা কালের কপালে ঝলমল–

    বিস্ময়ে-বিমুগ্ধ মোরা তাই শুধু হেরি,

    যৌবনেরে অভিশাপি–“কেন তুই শতবর্ষ করিলি রে দেরি?

    হায়, মোরা আজ

    মোমতাজে দেখিনি, শুধু দেখিতেছি তাজ!”

    শত বর্ষ পরে আজি, হে-কবি-সম্রাট!

    এসেছে নূতন কবি–করিতেছে তব নান্দীপাঠ!

    উদয়াস্ত জুড়ি আজও তব

    কত না বন্দনা-ঋক ধ্বনিয়া উঠিছে নব নব।

    তোমারই সে হারা-সুরখানি

    নববেণু-কুঞ্জ-ছায়ে বিকশিয়া তোলে নব বাণী।

    আজি তব বরে

    শত বেণু-বীনা বাজে আমাদের ঘরে।

    তবুও পুরে না হিয়া ভরে নাকো প্রাণ,

    শতবর্ষ সাঁতরিয়া ভেসে আসে স্বপ্নে তব গান।

    মনে হয়, কবি,

    আজও আছ অস্তপাট আলো করি

    আমাদেরই রবি!

    আজি হতে শত বর্ষ আগে

    যে-অভিবাদন তুমি করেছিলে নবীনেরে

    রাঙা অনুরাগে,

    সে-অভিবাদনখানি আজি ফিরে চলে

    প্রণামি-কমল হয়ে তব পদতলে!

    মনে হয়, আসিয়াছ অপূর্বের রূপে

    ওগো পূর্ণ, আমাদেরই মাঝে চুপে চুপে!

    আজি এই অপূর্ণের কম্প্র কণ্ঠস্বরে

    তোমারি বসন্তগান গাহি তব বসন্ত-বাসরে–

    তোমা হতে শত বর্ষ পরে!

  • চক্রবাক

    চক্রবাক

    চক্রবাক

    এপার ওপার জুড়িয়া অন্ধকার

    মধ্যে অকূল রহস্য-পারাবার,

    তারি এই কূলে নিশি নিশি কাঁদে জাগি

    চক্রবাক সে চক্রবাকীর লাগি।

    ভুলে যাওয়া কোন জন্মান্তর পারে

    কোন সুখ-দিনে এই সে নদীর ধারে

    পেয়েছিল তারে সারা দিবসের সাথী,

    তারপর এল বিরহের চির-রাতি,–

    আজিও তাহার বুকের ব্যথার কাছে,

    সেই সে স্মৃতি পালক পড়িয়া আছে!

    কেটে গেল দিন, রাত্রি কাটে না আর,

    দেখা নাহি যায় অতি দূর ওই পার।

    এপারে ওপারে জনম জনম বাধা,

    অকূলে চাহিয়া কাঁদিছে কূলের রাধা।

    এই বিরহের বিপুল শূন্য ভরি

    কাঁদিছে বাঁশরি সুরের ছলনা করি!

    আমরা শুনাই সেই বাঁশরির সুর,

    কাঁদি–সাথে কাঁদে নিখিল ব্যথা-বিধুর।

    কত তের নদী সাত সমুদ্র পার

    কোন্ লোকে কোন দেশে গ্রহ-তারকার

    সৃজন-দিনের প্রিয়া কাঁদে বন্দিনী,

    দশদিশি ঘিরি নিষেধের নিশীথিনী।

    এ পারে বৃথাই বিস্মরণের কূলে

    খোঁজে সাথি তার, কেবলই সে পথ ভুলে।

    কত পায় বুকে কত সে হারায় তবু–

    পায়নি যাহারে ভোলেনি তাহারে কভু।

    তাহারি লাগিয়া শত সুরে শত গানে

    কাব্যে, কথায়, চিত্রে, জড় পাষাণে,

    লিখিছে তাহার অমর অশ্রু-লেখা।

    নীরন্ধ্র মেঘ বাদলে ডাকিছে কেকা!

    আমাদের পটে তাহারই প্রতিচ্ছবি,

    সে গান শুনাই–আমরা শিল্পী কবি।

    এই বেদনার নিশীথ-তমসা-তীরে

    বিরহী চক্রবাক খুঁজে খুঁজে ফিরে

    কোথা প্রভাতের সূর্যোদয়ের সাথে

    ডাকে সাথী তার মিলনের মোহানাতে।

    আমরা শিশির, আমাদের আঁখি-জলে

    সেই সে আশার রাঙা রামধনু ঝলে।

  • কুহেলিকা

    কুহেলিকা

    কুহেলিকা

    তোমরা আমায় দেখতে কি পাও আমার গানের নদী-পারে?

    নিত্য কথার কুহেলিকায় আড়াল করি আপনারে।

    সবাই যখন মত্ত হেথায় পান করে মোর সুরের সুরা,

    সব-চেয়ে মোর আপন যে জন সে-ই কাঁদে গো তৃষ্ণাতুরা।

    আমার বাদল-মেঘের জলে ভরল নদী সপ্ত পাথার,

    ফটিক-জলের কণ্ঠে কাঁদে তৃপ্তি-হারা সেই হাহাকার!

    হায় রে! চাঁদের জ্যোৎস্না-ধারায় তন্দ্রাহারা বিশ্ব-নিখিল,

    কলঙ্ক তার নেয় না গো কেউ, রইল জুড়ে চাঁদেরই দিল!

  • সন্ধ্যা (কাব্য)

    সন্ধ্যা (কাব্য)

    সন্ধ্যা (কাব্য)

    ‘সন্ধ্যা’ ১৩৩৬ বঙ্গাব্দের ভাদ্র মুতাবিক ১৯২৯ সালের আগস্টে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। প্রকাশক শ্রীগোপাল দাস মজুমদার; ডি. এম. লাইব্রেরি, ৬১ কর্ণওয়ালিস ষ্ট্রীট, কলিকাতা। প্রবাসী প্রেস, ৯১ আপার সার্কুলার রোড, কলিকাতা হতে সজনীকান্ত দাস কর্তৃক মুদ্রিত। পৃষ্ঠা সংখ্যা ২ + ৫৮; মূল্য ১৷৹ (পাঁচ সিকা)।

    ‘সন্ধ্যা’ কবিতাটি ১৩৩৫ আষাঢ়ের, ‘তরুণ তাপস’ ১৩৩৬ শ্রাবণের এবং ‘আমি গাই তারি গান’ ১৩৩৫ আশ্বিন-কার্তিকের ‘ছাত্র’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।

    ‘ভোরের পাখী’ ১৩৩৫ পৌষের ‘সওগাত’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়, রচনার স্থান ও তারিখ— ‘হরগাছা, রংপুর; ১২ অগ্রহায়ণ, ১৩৩৫।’

    ‘জাগরণ’ সাপ্তাহিক ‘জাগরণ’ পত্রিকায় এবং ‘তরুণের গান’ ১৩৩৫ শ্রাবণের মোয়াজ্জিনে প্রকাশিত হয়।

    ‘চল্ চল্ চল্’ ঢাকা মুসলিম সাহিত্য-সমাজের মুখপত্র দ্বিতীয় বার্ষিক (১৩৩৫) ‘শিখা’য় ‘নতুনের গান’ শিরোনামে প্রকাশিত হয়। পাদটীকায় মুদ্রিত আছে— ‘দ্বিতীয় বার্ষিক অধিবেশনের উদ্বোধন-সঙ্গীত।’ ১৯২৮ খ্রিস্টাব্দের ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহে উক্ত অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ১৩৩৫ ফাল্গুনের সওগাতে ‘নতুনের গান’ পুনর্মুদ্রিত হয়; এর পাদটীকায় মুদ্রিত আছে— ‘নিখিল-বঙ্গ মুসলিম যুবক সম্মিলনীতে এই গানটি গীত হইয়াছিল।’ শিখায় ও সওগাতে প্রকাশিত গানটিতে ১১শ ও ১২শ এবং ১৭শ ও ১৮শ চরণগুলি নিম্নরূপ—

    তাজা-ব-তাজার গাহিয়া গান

    সজীব করিব গোরস্থান

    * * *

    নয়া জমানার মিনারে মিনারে

    নব-উষার আজান।

    ‘ভোরের সানাই’ ১৩৩৫ অগ্রহায়ণের ‘সওগাতে’ প্রকাশিত হয়, এর পাদটীকায় মুদ্রিত আছে— ‘নিখিল-বঙ্গ মুসলিম যুবক-সম্মিলনের উদ্বোধন-সঙ্গীত।’

    ‘যৌবন-জল-তরঙ্গ’ ১৩৩৫ কার্তিকের ও ‘রীফ-সর্দার’ ১৩৩৫ আশ্বিনের ‘সওগাতে’ প্রকাশিত হয়।

    ‘বাংলার আজীজ’ (চট্টগ্রামের পরলোকগত স্কুল-ইন্‌স্পেক্টার খান বাহাদুর আবদুল আজীজ বি.এ. সাহেবের স্মরণে রচিত) ১৩৩৪ কার্তিকের মাসিক ‘মোহাম্মদী’তে ও ‘সুরের দুলাল’ (দিলীপকুমার রায়ের ইউরোপ হতে স্বদেশে প্রত্যাগমন-উপলক্ষে রচিত) ১৩৩৪ মাঘের ‘কল্লোলে’ প্রকাশিত হয়।

    ‘শরৎচন্দ্র’ ১৩৩৪ আশ্বিনের ‘নওরোজে’ প্রকাশিত হয়। পাদটীকায় বলা হয়— ‘স্বনামধন্য ঔপন্যাসিক শ্রীযুক্ত শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় মহাশয়ের দ্বিপঞ্চাশৎ বর্ষ জন্মোৎসব উপলক্ষে রচিত।’ রচনার স্থান ও তারিখ — ‘কৃষ্ণনগর, ২৯ ভাদ্র ১৩৩৪।’ শরৎচন্দ্রের মৃত্যুর (১৬ই জানুয়ারি ১৯৩৮ মুতাবিক ২রা মাঘ ১৩৪৪, রবিবার) পর কবিতাটি ১৩৪৪ মাঘের ‘বুলবুলে’ পুনর্মুদ্রিত হয়।

    উৎসর্গ

    মাদারিপুর ‘শান্তি-সেনা’র

    কর-শতদলে

    বীর সেনানায়কের

    শ্রীচরণাম্বুজে

  • সন্ধ্যা

    সন্ধ্যা

    সন্ধ্যা

    −সাতশো বছর ধরি

    পূর্ব-তোরণ-দুয়ারে চাহিয়া জাগিতেছি শর্বরী।

    লজ্জায় রাঙা ডুবিল যে রবি আমাদের ভীরুতায়,

    সে মহাপাপের প্রায়শ্চিত্ত করি যুগে যুগে হায়!

    মোদের রুধিরে রাঙাইয়া তুলি মৃত্যুরে নিশিদিন,

    শুধিতেছি মোরা পলে পলে ভীরু পিতা-পিতামহ-ঋণ!

    লক্ষ্মী! ওগো মা ভারত-লক্ষ্মী! বল্, কতদিনে, বল্,−

    খুলিবে প্রাচী-র রুদ্ধ-দুয়ার-মন্দির-অর্গল?

    যে পরাজয়ের গ্লানি মুখে মাখি ডুবিল সন্ধ্যা-রবি,

    সে গ্লানি মুছিতে শত শতাব্দী দিতেছি মা প্রাণ-হবি!

    কোটি লাঞ্ছনা-রক্ত-ললাট পুব-মন্দিরদ্বারে

    মুছে যায় নিতি ললাট-রক্ত রাঙাতে পূর্বাশারে,

    ‘ঐ এল উষা’ ফুকারে ভারত হেরি সে রক্তরেখা,

    যে আশার বাণী লিখি মা রক্তে, বিধাতা মুছে সে লেখা!

    সন্ধ্যা কি কাটিবে না?

    কত সে জনম ধরিয়া শুধিব এক জনমের দেনা?

    কোটি কর ভরি কোটি রাঙা হৃদি-জবা লয়ে করি পূজা,

    না দিস আশিস, চণ্ডীর বেশে নেমে আয় দশভুজা!

    মোদের পাপের নাহি যদি ক্ষয়, যদি না প্রভাত হয়,

    প্রলয়ংকরী বেশে আসি কর ভীরুর ভারত লয়!

    অসুরের হাতে লাঞ্ছনা আর হানিসনে শংকরী,

    মরিতেই যদি হয় মা, দে বর, দেবতার হাতে মরি!

  • তরুণ তাপস

    তরুণ তাপস

    তরুণ তাপস

    রাঙা পথের ভাঙন-ব্রতী অগ্রপথিক দল!

    নাম রে ধুলায়−বর্তমানের মর্তপানে চল॥

    ভবিষ্যতের স্বর্গ লাগি

    শূন্যে চেয়ে আছিস জাগি

    অতীতকালের রত্ন মাগি

    নামলি রসাতল।

    অন্ধ মাতাল! শূন্য পাতাল, হাতালি নিষ্ফল॥

    ভোল রে চির-পুরাতনের সনাতনের বোল।

    তরুণ তাপস! নতুন জগৎ সৃষ্টি করে তোল।

    আদিম যুগের পুথির বাণী

    আজও কি তুই চলবি মানি?

    কালের বুড়ো টানছে ঘানি

    তুই সে বাঁধন খোল।

    অভিজাতের পানসে বিলাস–দুখের তাপস! ভোল॥

  • আমি গাই তারি গান

    আমি গাই তারি গান

    আমি গাই তারি গান

    আমি গাই তারি গান–

    দৃপ্ত-দম্ভে যে-যৌবন আজ ধরি অসি খরশান

    হইল বাহির অসম্ভবের অভিযানে দিকে দিকে।

    লক্ষ যুগের প্রাচীন মমির পিরামিডে গেল লিখে

    তাদের ভাঙার ইতিহাস-লেখা। যাহাদের নিশ্বাসে

    জীর্ণ পুথির শুষ্ক পত্র উড়ে গেল এক পাশে।

    যারা ভেঙে চলে অপদেবতার মন্দির আস্তানা,

    বকধার্মিক-নীতিবৃদ্ধের সনাতন তাড়িখানা।

    যাহাদের প্রাণ-স্রোতে ভেসে গেল পুরাতন জঞ্জাল,

    সংস্কারের জগদল-শিলা, শাস্ত্রের কঙ্কাল।

    মিথ্যা মোহের পূজা-মণ্ডপে যাহারা অকুতোভয়ে

    এল নির্মম–মোহ-মুদ্‌গর ভাঙনের গদা লয়ে।

    বিধি-নিষেধের চীনের প্রাচীরে অসীম দুঃসাহসে

    দু-হাতে চালাল হাতুড়ি শাবল। গোরস্থানেরে চষে

    ছুঁড়ে ফেলে যত শব-কঙ্কাল বসাল ফুলের মেলা,

    যাহাদের ভিড়ে মুখর আজিকে জীবনের বালু-বেলা।

    –গাহি তাহাদেরি গান

    বিশ্বের সাথে জীবনের পথে যারা আজি আগুয়ান!…

    –সেদিন নিশীথ-বেলা

    দুস্তর পারাবারে যে যাত্রী একাকী ভাসাল ভেলা,

    প্রভাতে সে আর ফিরিল না কুলে। সেই দুরন্ত লাগি

    আঁখি মুছি আর রচি গান আমি আজিও নিশীথে জাগি।

    আজও বিনিদ্র গাহি গান আমি চেয়ে তারই পথ-পানে।

    ফিরিল না প্রাতে যে-জন সে-রাতে উড়িল আকাশ-যানে

    নব জগতের দূরসন্ধানী অসীমের পথচারী,

    যার ভয়ে জাগে সদাসতর্ক মৃত্যু-দুয়ারে দ্বারী!

    সাগরগর্ভে, নিঃসীম নভে, দিগ্‌দিগন্ত জুড়ে

    জীবনোদ্‌বেগে তাড়া করে ফেরে নিতি যারা মৃত্যুরে,

    মানিক আহরি আনে যারা খুঁড়ি পাতাল-যক্ষপুরী,

    নাগিনীর বিষ-জ্বালা সয়ে করে ফণা হতে মণি চুরি।

    হানিয়া বজ্রপাণির বজ্র উদ্ধত শিরে ধরি

    যাহারা চপলা মেঘ-কন্যারে করিয়াছে কিঙ্করী।

    পবন যাদের ব্যজনী দুলায় হইয়া আজ্ঞাবাহী,–

    এসেছি তাদের জানাতে প্রণাম, তাহাদের গান গাহি।

    গুঞ্জরি ফেরে ক্রন্দন মোর তাদের নিখিল ব্যেপে–

    ফাঁসির রজ্জু ক্লান্ত আজিকে যাহাদের টুঁটি চেপে!

    যাহাদের কারাবাসে

    অতীত রাতের বন্দিনি উষা ঘুম টুটি ওই হাসে!

  • জীবন-বন্দনা

    জীবন-বন্দনা

    জীবন-বন্দনা

    গাহি তাহাদের গান–

    ধরণীর হাতে দিল যারা আনি ফসলের ফরমান।

    শ্রম-কিণাঙ্ক-কঠিন যাদের নির্দয় মুঠি-তলে

    ত্রস্তা ধরণী নজরানা দেয় ডালি ভরে ফুলে ফলে।

    বন্য-শ্বাপদ-সংকুল জরা-মৃত্যু-ভীষণা ধরা

    যাদের শাসনে হল সুন্দর কুসুমিতা মনোহরা।

    যারা বর্বর হেথা বাঁধে ঘর পরম অকুতোভয়ে

    বনের ব্যাঘ্র মরুর সিংহ বিবরের ফণী লয়ে।

    এল দুর্জয় গতিবেগ সম যারা যাযাবর-শিশু

    –তারাই গাহিল নব প্রেমগান ধরণী-মেরীর যিশু–

    যাহাদের চলা লেগে

    উল্কার মতো ঘুরিছে ধরণী শূন্যে অমিত বেগে!

    খেয়াল খুশিতে কাটি অরণ্য রচিয়া অমরাবতী

    যাহারা করিল ধ্বংসসাধন পুন চঞ্চলমতি,

    জীবন-আবেগ রুধিতে না পারি যারা উদ্ধত-শির

    লঙ্ঘিতে গেল হিমালয়, গেল শুষিতে সিন্ধু-নীর।

    নবীন জগৎ সন্ধানে যারা ছুটে মেরু-অভিযানে,

    পক্ষ বাঁধিয়া উড়িয়া চলেছে যাহারা ঊর্ধ্বপানে।

    তবুও থামে না যৌবন-বেগ, জীবনের উল্লাসে

    চলেছে চন্দ্র-মঙ্গল-গ্রহে স্বর্গে অসীমাকাশে।

    যারা জীবনের পসরা বহিয়া মৃত্যুর দ্বারে দ্বারে

    করিতেছে ফিরি, ভীম রণভূমে প্রাণ বাজি রেখে হারে।

    আমি মরু-কবি– গাহি সেই বেদে-বেদুইনদের গান,

    যুগে যুগে যারা করে অকারণ বিপ্লব-অভিযান।

    জীবনের আতিশয্যে যাহারা দারুণ উগ্রসুখে

    সাধ করে নিল গরল-পিয়ালা, বর্শা হানিল বুকে!

    আষাঢ়ের গিরি-নিঃস্রাবসম কোনো বাধা মানিল না,

    বর্বর বলি যাহাদের গালি পাড়িল ক্ষুদ্রমনা,

    কূপমণ্ডূক ‘অসংযমী’র আখ্যা দিয়াছে যারে,

    তারি তরে ভাই গান রচে যাই, বন্দনা করি তারে!

  • ভোরের পাখি

    ভোরের পাখি

    ভোরের পাখি

    ওরে ও ভোরের পাখি!

    আমি চলিলাম তোদের কণ্ঠে আমার কণ্ঠ রাখি।

    তোদের কিশোর তরুণ গলার সতেজ দৃপ্ত সুরে

    বাঁধিলাম বীণা, নিলাম সে সুর আমার কণ্ঠে পুরে।

    উপলে নুড়িতে চুড়ে-কিঙ্কিণী বাজায়ে তোদের নদী

    যে গান গাহিয়া অকূলে চাহিয়া চলিয়াছে নিরবধি–

    তারি সে গতির নূপুর বাঁধিয়া লইলাম মম পায়ে,

    এরি তালে মম ছন্দ-হরিণী নাচিবে তমাল-ছায়ে।

    যে-গান গাহিলি তোরা,

    তারি সুর লয়ে ঝরিবে আমার গানের পাগল-ঝোরা।

    তোদের যে-গান শুনিয়া রাতের বনানী জাগিয়া ওঠে,

    শিশু অরুণেরে কোলে করে উষা দাঁড়ায় গগন-তটে,

    গোঠে আনে ধেনু বাজাইয়া বেণু রাখাল-বালক জাগি,

    জল নিতে যায় নব আনন্দে নিশীথের হতভাগী,

    শিখিয়া গেলাম তোদের সে গান! তোদের পাখার খুশি –

    যাহার আবেগে ছুটে আসে জেগে পুব-আঙিনায় উষী,

    যাহার রণনে কুঞ্জে কাননে বিকাশে কুসুম-কুঁড়ি,

    পলাইয়া যায় গহন-গুহায় আঁধার নিশীথ-বুড়ি,

    সে খুশির ভাগ আমি লইলাম। অমনি পক্ষ মেলি

    গাহিব ঊর্ধ্বে, ফুটিবে নিম্নে আবেশে চম্পা বেলি!

    তোদের প্রভাতি ভিড়ে

    ভিড়িলাম আমি, নিলাম আশ্রয় তোদের ক্ষণিক নীড়ে।

    ওরে ও নবীন যুবা!

    তোদের প্রভাত-স্তবের সুরে রে বাজে মম দিলরুবা।

    তোদের চোখের যে জ্যোতি-দীপ্তি রাঙায় রাতের সীমা,

    রবির ললাট হতে মুছে নেয় গোধূলির মলিনিমা,

    যে-আলোক লভি দেউলে দেউলে মঙ্গল-দীপ জ্বলে,

    অকম্প যার শিখা সন্ধ্যার ম্লান অঞ্চলতলে,

    তোদের সে-আলো আমার আশ্রু-কুহেলি-মলিন চোখে

    লইলাম পুরি! জাগে ‘সুন্দর’ আমার ধেয়ান-লোকে!

  • কালবৈশাখী

    কালবৈশাখী

    কালবৈশাখী

    বারেবারে যথা কালবৈশাখী ব্যর্থ হল রে পুব-হাওয়ায়,

    দধীচি-হাড়ের বজ্র-বহ্নি বারেবারে যথা নিভিয়া যায়,

    কে পাগল সেথা যাস হাঁকি–

    ‘বৈশাখী কালবৈশাখী!’

    হেথা বৈশাখী-জ্বালা আছে শুধু, নাই বৈশাখী-ঝড় হেথায়।

    সে জ্বালায় শুধু নিজে পুড়ে মরি, পোড়াতে কারেও পারি নে, হায়॥

    কালবৈশাখী আসিলে হেথায় ভাঙিয়া পড়িত কোন সকাল

    ঘুণ-ধরা বাঁশে ঠেকা দেওয়া ওই সনাতন দাওয়া, ভগ্ন চাল।

    এলে হেথা কালবৈশাখী

    মরা গাঙে যেত বান ডাকি,

    বদ্ধ জাঙাল যাইত ভাঙিয়া, দুলিত এ দেশ টালমাটাল।

    শ্মশানের বুকে নাচিত তাথই জীবন-রঙ্গে তাল-বেতাল॥

    কালবৈশাখী আসেনি হেথায়, আসিলে মোদের তরু-শিরে

    সিন্ধু-শকুন বসিত না আসি ভিড় করে আজ নদীতীরে।

    জানি না কবে সে আসিবে ঝড়

    ধুলায় লুটাবে শত্রুগড়,

    আজিও মোদের কাটেনিকো শীত, আসেনি ফাগুন বন ঘিরে।

    আজিও বলির কাঁসর-ঘন্টা বাজিয়া ওঠেনি মন্দিরে॥

    জাগেনি রুদ্র, জাগিয়াছে শুধু অন্ধকারের প্রমথ-দল,

    ললাট-অগ্নি নিবেছে শিবের ঝরিয়া জটার গঙ্গাজল।

    জাগেনি শিবানী – জাগিয়াছে শিবা,

    আঁধার সৃষ্টি – আসেনিকো দিবা,

    এরই মাঝে হায়, কালবৈশাখী স্বপ্ন দেখিলি কে তোরা বল!

    আসে যদি ঝড়, আসুক, কুলোর বাতাস কে দিবি অগ্রে চল॥

  • নগদ কথা

    নগদ কথা

    নগদ কথা

    দুন্দুভি তোর বাজল অনেক

    অনেক শঙ্খ ঘণ্টা কাঁসর,

    মুখস্থ তোর মন্ত্ররোলে

    মুখর আজি পূজার আসর,−

    কুম্ভকর্ণ দেবতা ঠাকুর

    জাগবে কখন সেই ভরসায়

    যুদ্ধভূমি ত্যাগ করে সব

    ধন্না দিলি দেব-দরজায়।

    দেবতা-ঠাকুর স্বর্গবাসী

    নাক ডাকিয়া ঘুমান সুখে,

    সুখের মালিক শোনে কি–কে

    কাঁদছে নীচে গভীর দুখে।

    হত্যা দিয়ে রইলি পড়ে

    শত্রু-হাতে হত্যা-ভয়ে,

    করবি কী তুই ঠুঁটো ঠাকুর

    জগন্নাথের আশিস লয়ে।

    দোহাই তোদের! রেহাই দে ভাই

    উঁচুর ঠাকুর দেবতাদেরে,

    শিব চেয়েছিস–শিব দিয়েছেন

    তোদের ঘরে ষণ্ড ছেড়ে।

    শিবের জটার গঙ্গাদেবী

    বয়ে বেড়ান ওদের তরী,

    ব্রহ্মা তোদের রম্ভা দিলেন

    ওদের দিয়ে সোনার জরি!

    পূজার থালা বয়ে বয়ে

    যে-হাত তোদের হল ঠুঁটো,

    সে-হাত এবার নিচু করে

    টান না পায়ের শিকল দুটো!

    ফুটো তোর ঐ ঢক্কা-নিনাদ

    পলিটিক্সের বারোয়ারিতে –

    দোহাই থামা! পারিস যদি

    পড় নেমে ঐ লাল-নদীতে।

    শ্রীপাদপদ্ম লাভ করিতে

    গয়া সবাই পেলি ক্রমে,

    একটু দূরেই যমের দুয়ার

    সেথাই গিয়ে দেখ না ভ্রমে!

  • জাগরণ

    জাগরণ

    জাগরণ

    জেগে যারা ঘুমিয়ে আছে তাদের দ্বারে আসি

    ওরে পাগল, আর কতদিন বাজাবি তোর বাঁশি!

    ঘুমায় যারা মখমলের ঐ কোমল শয়ন পাতি

    অনেক আগেই ভোর হয়েছে তাদের দুখের রাতি।

    আরাম-সুখের নিদ্রা তাদের; তোর এ জাগার গান

    ছোঁবে নাকো প্রাণ রে তাদের, যদিই বা ছোঁয় কান!

    নির্ভয়ের ঐ সুখের কূলে বাঁধল যারা বাড়ি,

    আবার তারা দেবে না রে ভয়ের সাগর পাড়ি।

    ভিতর হতে যাদের আগল শক্ত করে আঁটা

    ‘দ্বার খোলো গো’ বলে তাদের দ্বারে মিথ্যা হাঁটা।

    ভোল রে এ পথ ভোল,

    শান্তিপুরে শুনবে কে তোর জাগর-ডঙ্কা-রোল!

    ব্যথাতুরের কান্না পাছে শান্তি ভাঙে এসে

    তাইতে যারা খাইয়ে ঘুমের আফিম সর্বনেশে

    ঘুম পাড়িয়ে রাখছে নিতুই, সে ঘুম-পুরে আসি

    নতুন করে বাজা রে তোর নতুন সুরের বাঁশি!

    নেশার ঘোরে জানে না হায়, এরা কোথায় পড়ে,

    গলায় তাদের চালায় ছুরি কেই বা বুকে চড়ে,

    এদের কানে মন্ত্র দে রে, এদের তোরা বোঝা,

    এরাই আবার করতে পারে বাঁকা কপাল সোজা।

    কর্ষণে যার পাতাল হতে অনুর্বর এই ধরা

    ফুল-ফসলের অর্ঘ্য নিয়ে আসে আঁচল-ভরা,

    কোন সে দানব হরণ করে সে দেব-পূজার ফুল –

    জানিয়ে দে তুই মন্ত্র-ঋষি, ভাঙ রে তাদের ভুল!

    বর্বরদের অনুর্বর ঐ হৃদয়-মরু চষে

    ফল ফলাতে পারে এরাই আবার ঘরে বসে।

    বাঘ-ভালুকের বাথান তেড়ে নগর বসায় যারা

    রসাতলে পশবে মানুষ-পশুর ভয়ে তারা?

    তাদেরি ঐ বিতাড়িত বন্যপশু আজি

    মানুষ-মুখো হয়েছে রে সভ্যসাজে সাজি।

    টান মেরে ফেল মুখোশ তাদের, নখর কন্ত লয়ে

    বেরিয়ে আসুক মনের পশু বনের পশু হয়ে!

    তারাই দানব অত্যাচারী–যারা মানুষ মারে,

    সভ্যবেশী ভণ্ড পশু মারতে ডরাস কারে?

    এতদিন যে হাজার পাপের বীজ হয়েছে বোনা

    আজ তা কাটার এল সময়, এই সে বাণী শোনা!

    নতুন যুগের নতুন নকিব, বাজা নতুন বাঁশি,

    স্বর্গ-রাণী হবে এবার মাটির মায়ের দাসী!

  • জীবন

    জীবন

    জীবন

    জাগরণের লাগল ছোঁয়াচ মাঠে মাঠে তেপান্তরে,

    এমন বাদল ব্যর্থ হবে তন্দ্রাকাতর কাহার ঘরে?

    তড়িৎ ত্বরা দেয় ইশারা, বজ্র হেঁকে যায় দরজায়,

    জাগে আকাশ, জাগে ধরা−ধরার মানুষ কে সে ঘুমায়?

    মাটির নীচে পায়ের তলায় সেদিন যারা ছিল মরি,

    শ্যামল তৃণাঙ্কুরে তারা উঠল বেঁচে নতুন করি;

    সবুজ ধরা দেখছে স্বপন আসবে কখন ফাগুন-হোলি,

    বজ্রাঘাতে ফুটল না যে, ফুটবে আনন্দে সে কলি!

  • যৌবন

    যৌবন

    যৌবন

    −ওরে ও শীর্ণা নদী,

    দু-তীরে নিরাশা-বালুচর লয়ে জাগিবি কি নিরবধি?

    নব-যৌবনজলতরঙ্গ-জোয়ারে কি দুলিবি না?

    নাচিবে জোয়ারে পদ্মা গঙ্গা, তুই রবি চির-ক্ষীণা?

    ভরা ভাদরের বরিষন এসে বারে বারে তোর কূলে

    জানাবে রে তোরে সজল মিনতি, তুই চাহিবি না ভুলে?

    দুই কূলে বাঁধি প্রস্তর-বাঁধ কূল ভাঙিবার ভয়ে

    আকাশের পানে চেয়ে রবি তুই শুধু আপনারে লয়ে?

    ভেঙে ফেল বাঁধ, আশেপাশে তোর বহে যে জীবন-ঢল

    তারে বুকে লয়ে দুলে ওঠ তুই যৌবন-টলমল।

    প্রস্তর-ভরা দুই কূল তোর ভেসে যাক বন্যায়,

    হোক উর্বর, হাসিয়া উঠুক ফুলে ফলে সুষমায়।

    −একবার পথ ভোল,

    দূর সিন্ধুর লাগি বুকে জাগুক মরণ-দোল!