Category: কাজী নজরুল ইসলাম

  • ঈদ-মোবারক

    ঈদ-মোবারক

    ঈদ-মোবারক

    শত যোজনের কত মরুভূমি পারায়ে গা,

    কত বালুচরে কত আঁখি-ধারা ঝরায়ে গো,

    বরষের পরে আসিলে ঈদ!

    ভুখারীর দ্বারে সওগাত বয়ে রিজওয়ানের,

    কণ্টক-বনে আশ্বাস এনে গুল-বাগের,

    সাকিরে ‘জামের’ দিলে তাগিদ!

    খুশির পাপিয়া পিউ পিউ গাহে দিগ‍্‍বিদিক,

    বধূ জাগে আজ নিশীথ-বাসরে নির্ণিমিখ!

    কোথা ফুলদানি, কাঁদিছে ফুল!

    সুদূর প্রবাসে ঘুম নাহি আসে কার সখার,

    মনে পড়ে শুধু সোঁদা-সোঁদা বাস এলো খোঁপার,

    আকুল কবরী উলঝলুল!!

    ওগো কাল সাঁঝে দ্বিতীয় চাঁদের ইশারা কোন

    মুজদা এনেছে, সুখে ডগমগ মুকুলি মন!

    আশাবরি-সুরে ঝুরে সানাই।

    আতর সুবাসে কাতর হল গো পাথর-দিল,

    দিলে দিলে আজ বন্ধকি দেনা–নাই দলিল,

    কবুলিয়তের নাই বালাই॥

    আজিকে এজিদে হাসেন হোসেন গলাগলি,

    দোজখে ভেশতে ফুলে ও আগুনে ঢলাঢলি,

    শিরী ফরহাদে জড়াজড়ি।

    সাপিনির মতো বেঁধেছে লায়লি কায়েসে গো,

    বাহুর বন্ধে চোখ বুঁজে বঁধু আয়েসে গো!

    গালে গালে চুমু গড়াগড়ি॥

    দাউ দাউ জ্বলে আজি স্ফূর্তির জাহান্নাম,

    শয়তান আজ ভেশতে বিলায় শারাব-জাম,

    দুশমন দোস্ত এক-জামাত!

    আজি আরফাত-ময়দান পাতা গাঁয়ে গাঁয়ে,

    কোলাকুলি করে বাদশা-ফকিরে ভায়ে ভায়ে,

    কাবা ধরে নাচে ‘লাত-মানাত’ ॥

    আজি ইসলামি-ডঙ্কা গরজে ভরি জাহান,

    নাই বড় ছোট–সকল মানুষ এক সমান,

    রাজা প্রজা নয় কারও কেহ।

    কে আমির তুমি নওয়ার বাদশা বালাখানায়?

    সকল কালের কলঙ্ক তুমি; জাগালে হায়

    ইসলামে তুমি সন্দেহ॥

    ইসলাম বলে, সকলের তরে মোরা সবাই,

    সুখ-দুখ সম-ভাগ করে নেব সকলে ভাই,

    নাই অধিকার সঞ্চয়ের!

    কারও আঁখি-জলে কারও ঝাড়ে কি রে জ্বলিবে দীপ?

    দুজনার হবে বুলন্দ-নসিব, লাখে লাখে হবে বদনসিব?

    এ নহে বিধান ইসলামের॥

    ঈদ-অল-ফিতর আনিয়াছে তাই নববিধান,

    ওগো সঞ্চয়ী, উদ‍্‍বৃত্ত যা করিবে দান,

    ক্ষুধার অন্ন হোক তোমার!

    ভোগের পেয়ালা উপচায়ে পড়ে তব হাতে,

    তৃষ্ণাতুরের হিস‍্‍সা আছে ও পিয়ালাতে,

    দিয়া ভোগ করো, বীর, দেদার॥

    বুক খালি করে আপনারে আজ দাও জাকাত,

    কোরো না হিসাবি, আজি হিসাবের অঙ্কপাত!

    একদিন করো ভুল হিসাব।

    দিলে দিলে আজ খুনসুড়ি করে দিল‍্‍লগি,

    আজিকে ছায়েলা-লায়েলা-চুমায় লাল যোগী!

    জামশেদ বেঁচে চায় শারাব॥

    পথে পথে আজ হাঁকিব বন্ধু, ঈদ-মোবারক! আসসালাম!

    ঠোঁটে ঠোঁটে আজ বিলাব শিরনি ফুল-কালাম!

    বিলিয়ে দেওয়ার আজিকে ঈদ!

    আমার দানের অনুরাগে-রাঙা ঈদগা রে!

    সকলের হাতে দিয়ে দিয়ে আজ আপনারে –

    দেহ নয়, দিল হবে শহিদ॥

    কলিকাতা

    চৈত্র, ১৩৩৩

  • আয় বেহেশ‍্‍তে কে যাবি আয়

    আয় বেহেশ‍্‍তে কে যাবি আয়

    আয় বেহেশ‍্‍তে কে যাবি আয়

    আয় বেহেশ‍্‍তে কে যাবি, আয়

    প্রাণের বুলন্দ দরওয়াজায়,

    ‘তাজা-ব-তাজা’-র গাহিয়া গান

    চির-তরুণের চির-মেলায়!

    আয় বেহেশ‍্‍তে কে যাবি আয়॥

    যুবা-যুবতির সে দেশে ভিড়,

    সেথা যেতে নারে বুঢ‍্‍ঢা পীর,

    শাস্ত্র-শকুন জ্ঞান-মজুর

    যেতে নারে সেই হুরি-পরির

    শারাব সাকির গুলিস্তাঁয়।

    আয় বেহেশ‍্‍তে কে যাবি আয়॥

    সেথা হরদম খুশির মৌজ,

    তির হানে কালো-আঁখির ফৌজ,

    পায়ে পায়ে সেথা আর্জি পেশ,

    দিল চাহে সদা দিল-আফরোজ,

    পিরানে পরান বাঁধা সেথায়।

    আয় বেহেশ‍্‍তে কে যাবি আয়॥

    করিল না যারা জীবনে ভুল,

    দলিল না কাঁটা, ছেঁড়েনি ফুল,

    দারোয়ান হয়ে সারা জীবন

    আগুলিল বেড়া, ছুঁল না গুল,–

    যেতে নারে তারা এ-জলসায়।

    আয় বেহেশ‍্‍তে কে যাবি আয়॥

    বুড়ো নীতিবিদ–নুড়ির প্রায়

    পেল নাকো এক বিন্দু রস

    চিরকাল জলে রহিয়া, হায়!–

    কাঁটা বিঁধে যার ক্ষত আঙুল

    দোলে ফুলমালা তারই গলায়।

    আয় বেহেশ‍্‍তে কে যাবি আয়॥

    তিলে তিলে যারা পিষে মারে

    অপরের সাথে আপনারে,

    ধরণির ঈদ-উৎসবে

    রোজা রেখে পড়ে থাকে দ্বারে,

    কাফের তাহারা এ-ঈদগায়!–

    আয় বেহেশ‍্‍তে কে যাবি আয়॥

    বুলবুল গেয়ে ফেরে বলি

    যাহারা শাসায়ে ফুলবনে

    ফুটিতে দিল না ফুলকলি;

    ফুটিলে কুসুম পায়ে দলি

    মারিয়াছে, পাছে বাস বিলায়!

    হারাম তারা এ-মুশায়েরায়!

    আয় বেহেশ‍্‍তে কে যাবি আয়॥

    হেথা কোলে নিয়ে দিলরুবা

    শারাবি গজল গাহে যুবা।

    প্রিয়ার বে-দাগ কপোলে গো

    এঁকে দেয় তিল মনোলোভা,

    প্রেমের-পাপীর এ-মোজরায়।

    আয় বেহেশতে কে যাবি আয়॥

    আসিতে পারে না হেথা বে-দীন

    মৃত প্রাণ-হীন জরা-মলিন

    নৌ-জোয়ানীর এ-মহ‍্‍ফিল

    খুন ও শারাব হেথা অ-ভিন,

    হেথা ধনু বাঁধা ফুলমালায়!

    আয় বেহেশ‍্‍তে কে যাবি আয়॥

    পেয়ালার হেথা শহিদি খুন

    তলোয়ার-চোঁয়া তাজা তরুণ

    আঙ্গুর-হৃদি চুয়ানো গো

    গেলাসে শারাব রাঙা অরুণ।

    শহিদে প্রেমিকে ভিড় হেথায়।

    আয় বেহেশ‍্‍তে কে যাবি আয়॥

    প্রিয়া-মুখে হেথা দেখি গো চাঁদ,

    চাঁদে হেরি প্রিয়-মুখের ছাঁদ।

    সাধ করে হেথা করি গো পাপ,

    সাধ করে বাঁধি বলির বাঁধ

    এ রস-সাগরে বালু-বেলায়!

    আয় বেহেশ‍্‍তে কে যাবি আয়॥

    কলিকাতা

    ১ পৌষ, ১৩৩৩

  • চিরঞ্জীব জগলুল

    চিরঞ্জীব জগলুল

    চিরঞ্জীব জগলুল

    প্রাচী’র দুয়ারে শুনি কলরোল সহসা তিমির-রাতে,

    মেসেরের শের, শির, শমশের–সব গেল এক সাথে!

    সিন্ধুর গলা জড়ায়ে কাঁদিতে–দু’ তীরে ললাট হানি

    ছুটিয়া চলেছে মরু-বকৌলি ‘নীল’ দরিয়ার পানি!

    আঁচলের তার ঝিনুক মাণিক কাদায় ছিটায়ে পড়ে,

    সোঁতের শ্যাওলা এলো কুন্তল লুটাইছে বালুচরে!…

    মরু-‘সাইমুম’-তাঞ্জামে চড়ি কোন পরীবানু আসে?

    ‘লু’ হাওয়া ধরেছে বালুর পর্দা সম্ভ্রমে দুই পাশে!

    সূর্য নিজেরে লুকায় টানিয়া বালুর আস্তরণ,

    ব্যজনী দুলায় ছিন্ন পাইন-শাখার প্রভঞ্জন।

    ঘূর্ণি-বাঁদিরা ‘নীল’ দরিয়ায় আঁচল ভিজায়ে আনি

    ছিটাইছে বারি, মেঘ হতে মাগি আনিছে বরফ-পানি।

    ও বুঝি মিশর-বিজয়লক্ষ্মী মূরছিতা তাঞ্জামে,

    ওঠে হাহাকার ভগ্ন-মিনার আঁধার দীওয়ান-ই-আমে!

    কৃষাণের গরু মাঠে মাঠে ফেরে, ধরে নাকো আজ হাল,

    গম ক্ষেত ভেঙে পানি বয়ে যায় তবু নাহি বাঁধে আল।

    মনের বাঁধেরে ভেঙেছে যাহারা চোখের সাঁতার পানি

    মাঠের পানি ও আলেরে কেমনে বাঁধিবে সে, নাহি জানি!

    হৃদয়ে যখন ঘনায় শাঙন, চোখে নামে বরষাত,

    তখন সহসা হয় গো মাথায় এমনই বজ্রপাত!…

    মাটিরে জড়ায়ে উপুড় হইয়া কাঁদিছে শ্রমিক কুলি,

    বলে,– ‘মা গো, তোর উদরে মাটির মানুষই হয়েছে ধূলি,

    রতন মাণিক হয় না তো মাটি, হীরা সে হীরাই থাকে,

    মোদের মাথায় কোহিনূর মণি–কী করিব বল তাকে?

    দুর্দিনে মা গো যদি ও-মাটির দুয়ার খুলিয়া খুঁজি,

    চুরি করিবি না তুই এ মাণিক? ফিরে পাব হারা পুঁজি?

    লৌহ পরশি করিনু শপথ, ফিরে নাহি পাই যদি

    নতুন করিয়া তোর বুকে মোরা বহাব রক্ত-নদী!’

    আভীর-বালারা দুধাল গাভীরে দোহায় না, কাঁদে শুয়ে,

    দুম্বা-শিশুরা দূরে চেয়ে আছে দুধ ঘাস নাহি ছুঁয়ে।

    মিষ্টি ধারাল মিছরির ছুরি মিশরি মেয়ের হাসি,

    হাঁসা পাথরের কুচি-সম দাঁত,—সব যেন আজ বাসি!

    আঙুর-লতার অলকগুচ্ছ– ডাঁশা আঙুরের থোপা,

    যেন তরুণীর আঙুলের ডগা–হুরী বালিকার খোঁপা,

    ঝুরে ঝুরে পড়ে হতাদরে আজ অশ্রুর বুঁদ সম!

    কাঁদিতেছে পরী, চারিদিকে অরি, কোথায় অরিন্দম!

    মরু-নটী তার সোনার ঘুঙুর ছুঁড়িয়া ফেলেছে কাঁদি,

    হলুদ খেজুর-কাঁদিতে বুঝি বা রয়েছে তাহারা বাঁধি।

    নতুন করিয়া মরিল গো বুঝি আজি মিশরের মমি,

    শ্রদ্ধায় আজি পিরামিড যায় মাটির কবরে নমি!

    মিশরে খেদিব ছিল বা ছিল না, ভুলেছিল সব লোক,

    জগলুলে পেয়ে ভুলেছিল ওরা সুদান-হারার শোক।

    জানি না কখন ঘনাবে ধরার ললাটে মহাপ্রলয়,

    মিশরের তরে ‘রোজ-কিয়ামত’ ইহার অধিক নয়।

    রহিল মিশর, চলে গেল তার দুর্মদ যৌবন,

    রুস্তম গেল, নিষ্প্রভ কায়খসরু-সিংহাসন।

    কী শাপে মিশর লভিল অকালে জরা যযাতির প্রায়,

    জানি না তাহার কোন সূত দেবে যৌবন ফিরে তায়।

    মিশরের চোখে বাহিল নতুন সুয়েজ খালের বান,

    সুদান গিয়াছে–গেল আজ তার বিধাতার মহাদান!

    ‘ফেরাউন’ ডুবে না মরিতে হায় বিদায় লইল মুসা,

    প্রাচী’র রাত্রি কাটিবে না কি গো, উদিবে না রাঙা উষা?

    * * *

    শুনিয়াছি, ছিল মমির মিশরে সম্রাট ফেরাউন,

    জননীর কোলে সদ্যপ্রসূত বাচ্চার নিত খুন!

    শুনেছিল বাণী, তাহারই রাজ্যে তারই রাজপথ দিয়া

    অনাগত শিশু, আসিছে তাহার মৃত্যু-বারতা নিয়া।

    জীবন ভরিয়া করিল যে শিশু-জীবনের অপমান

    পরের মৃত্যু-আড়ালে দাঁড়ায়ে সে-ই ভাবে, পেল প্রাণ!

    জনমিল মুসা, রাজভয়ে মাতা শিশুরে ভাসায় জলে,

    ভাসিয়া ভাসিয়া সোনার শিশু গো রাজারই ঘাটেতে চলে।

    ভেসে এলো শিশু রাণীরই কোলে গো, বাড়ে শিশু দিনে দিনে,

    শত্রু তাহারই বুকে চড়ে নাচে, ফেরাউন নাহি চিনে।

    এল অনাগত তারই প্রাসাদের সদর দরজা দিয়া,

    তখনও প্রহরী জাগে বিনিদ্র দশ দিক আগুলিয়া!

    – রসিদ খোদার খেলা,

    তারই বেদনায় প্রকাশে রুদ্র যারে করে অবহেলা।…

    মুসারে আমরা দেখিনি, তোমায় দেখেছি মিশর-মুনি,

    ফেরাউন মোরা দেখিনি, দেখেছি নিপীড়ন ফেরাউনি।

    ছোটে অনন্ত সেনা-সামন্ত অনাগত কার ভয়ে,

    দিকে দিকে খাড়া কারা-শৃঙ্খল, জল্লাদ ফাঁসি লয়ে।

    আইন-খাতায় পাতায় পাতায় মৃত্যুদণ্ড লেখা,

    নিজের মৃত্যু এড়াতে কেবলই নিজেরে করিছে একা!

    সদ্যপ্রসূত প্রতি শিশুটিরে পিয়ায় অহর্নিশ

    শিক্ষা দীক্ষা সভ্যতা বলি তিলে-তিলে-মারা বিষ।

    ইহারা কলির নব ফেরাউন ভেলকি খেলায় হাড়ে,

    মানুষ ইহারা না মেরে প্রথমে মনুষ্যত্ব মারে!

    মনুষ্যত্বহীন এই সব মানুষেরই মাঝে কবে

    হে অতি-মানুষ, তুমি এসেছিলে জীবনের উৎসবে।

    চারিদিকে জাগে মৃত্যুদণ্ড রাজকারা প্রতিহারী,

    এরই মাঝে এলে দিনের আলোক নির্ভীক পথচারী।

    রাজার প্রাচীর ছিল দাঁড়াইয়া তোদের আড়াল করি,

    আপনি আসিয়া দাঁড়াইলে তার সকল শূন্য ভরি!

    পয়গম্বর মুসার তবু তো ছিল ‘আষা’ অদ্ভুত,

    খোদ সে খোদার প্রেরিত–ডাকিলে আসিত স্বর্গ-দূত।

    পয়গম্বর ছিলে নাকো তুমি–পাওনি ঐশী বাণী,

    স্বর্গের দূত ছিল না দোসর, ছিলে না শস্ত্র-পাণি,

    আদেশে তোমার নীল দরিয়ার বক্ষে জাগেনি পথ,

    তোমারে দেখিয়া করেনি সালাম কোনো গিরি-পর্বত।

    তবুও এশিয়া আফ্রিকা গাহে তোমার মহিমা-গান,

    মনুষ্যত্ব থাকিলে মানুষ সর্বশক্তিমান!

    দেখাইলে তুমি, পরাধীন জাতি হয় যদি ভয়হারা,

    হোক নিরস্ত্র, অস্ত্রের রণে বিজয়ী হইবে তারা।

    অসি দিয়া নয়, নির্ভীক করে মন দিয়া রণ জয়,

    অস্ত্রে যুদ্ধ জয় করা সাজে–দেশজয় নাহি হয়।

    ভয়ের সাগর পাড়ি দিল যেই শির করিল না নিচু,

    পশুর নখর দন্ত দেখিয়া হটিল না কভু পিছু,

    মিথ্যাচারীর ভ্রুকুটি-শাসন নিষেধ রক্ত-আঁখি

    না মানি–জাতির দক্ষিণ করের বাঁধিল অভয় রাখি,

    বন্ধন যারে বন্দিল হয়ে নন্দন-ফুলহার,

    না-ই হল সে গো পয়গম্বর নবী দেব অবতার,

    সর্ব কালের সর্ব দেশের সকল নর ও নারী

    করে প্রতীক্ষা, গাহে বন্দনা, মাগিছে আশিষ তারই!

    * * *

    ‘এই ভারতের মহামানবের সাগর-তীরে’ হে ঋষি,

    তেত্রিশ কোটি বলির ছাগল চরিতেছে দিবানিশি!

    গোষ্ঠে গোষ্ঠে আত্মকলহ অজাযুদ্ধের মেলা,

    এদের রুধিরে নিত্য রাঙিছে ভারত-সাগর-বেলা।

    পশুরাজ যবে ঘাড় ভেঙে খায় একটারে ধরে আসি

    আরটা তখনও দিব্যি মোটায়ে হতেছে খোদার খাসি!

    শুনে হাসি পায়, ইহাদেরও নাকি আছে গো ধর্ম জাতি,

    রাম-ছাগল আর ব্রহ্ম-ছাগল আরেক ছাগল পাতি!

    মৃত্যু যখন ঘনায় এদের কসায়ের কল্যাণে,

    তখনও ইহারা লাঙুল উঁচায়ে এ উহারে গালি হানে।

    ইহারে শিশু শৃগালে মারিলে এরা সভা করে কাঁদে,

    অমৃতের বাণী শুনাতে এদের লজ্জায় নাহি বাধে!

    নিজেদের নাই মনুষ্যত্ব, জানি না কেমনে তারা

    নারীদের কাছে চাহে সতীত্ব, হায় রে শরম-হারা!

    কবে আমাদের কোন সে পুরুষে ঘৃত খেয়েছিল কেহ,

    আমাদের হাতে তারই বাস পাই,আজও করি অবলেহ!

    আশা ছিল, তবু তোমাদেরই মত অতি-মানুষেরে দেখি

    আমরা ভুলিব মোদের এ গ্লানি, খাঁটি হবে যত মেকি।

    তাই মিশরের নহে এই শোক এই দুর্দিন আজি,

    এশিয়া আফ্রিকা দুই মহাভূমি বেদনা উঠেছে বাজি!

    অধীন ভারত তোমার স্মরণ করিয়াছে শতবার,

    তব হাতে ছিল জলদস্যুর ভারত-প্রবেশ-দ্বার!

    হে ‘বনি ইসরাইলে’র দেশের অগ্রনায়ক বীর,

    অঞ্জলি দিনু ‘নীলে’র সলিলে অশ্রু ভাগীরথীর!

    সালাম করারও স্বাধীনতা নাই সোজা দুই হাত তুলি

    তব ‘ফাতেহা’য় কী দিবে এ জাতি বিনা দুটো বাঁধা বুলি?

    মলয়-শীতলা সুজলা এ দেশে–আশিস করিও খালি–

    উড়ে আসে যেন তোমার দেশের মরুর দু-মুঠো বালি।

    * * *

    তোমার বিদায়ে দূর অতীতের কথা সেই মনে পড়ে,

    মিশর হইতে বিদায় লইল মুসা যবে চিরতরে,

    সম্ভ্রমে সরে পথ করে দিল ‘নীল’ দরিয়ার বারি,

    পিছু পিছু চলে কাঁদিয়া কাঁদিয়া মিশরের নরনারী,

    শ্যেন-সম ছোটে ফেরাউন-সেনা ঝাঁপ দিয়া পড়ে স্রোতে,

    মুসা হল পার, ফেরাউন ফিরিল না ‘নীল’ নদী হতে।

    তোমার বিদায়ে করিব না শোক, হয়ত দেখিবে কাল

    তোমার পিছনে মরিছে ডুবিয়া, ফেরাউন দজ্জাল!

    কৃষ্ণনগর

    ১৬ ভাদ্র ১৩৩৪

  • আমানুল্লাহ্

    আমানুল্লাহ্

    আমানুল্লাহ্

    খোশ্-আম্‌দেদ আফগান-শের! – অশ্রুরুদ্ধ কণ্ঠে আজ–

    সালাম জানায় মুসলিম-হিন্দ শরমে নোয়ায়ে শির বে-তাজ!

    বান্দা যাহারা বন্দেগী ছাড়া কী দিবে তাহারা, শাহানশাহ্!

    নাই সে ভারত মানুষের দেশ! এ শুধু পশুর কতল‌্গাহ্!

    দস্তে তোমার দস্ত রাখিয়া নাই অধিকার মিলাতে হাত,

    রূপার বদলে দু-পায়ে প্রভুর হাত বাঁধা রেখে খায় এ জাত!

    পরের পায়ের পয়জার বয়ে হেঁট হল যার উচ্চ শির,

    কী হবে তাদের দুটো টুটো বাণী দু-ফোঁটা অশ্রু নিয়ে, আমির!

    ভুলিয়া য়ুরোপ-‘জোহরা’র রূপে আজিকে ‘হারুত-মারুত’ প্রায়

    কাঁদিছে হিন্দু-মুসলিম হেথা বন্দী হইয়া চির-কারায়;

    মোদের পুণ্যে ‘জোহরা’র মত সুরূপা য়ুরূপা দীপ্যমান

    ঊর্ধ্ব গগনে। আমরা মর্ত্যে আপনার পাপে আপনি ম্লান!

    পশু-পাখি আর তরুলতা যত প্রাণহীন সব হেথা সবাই,

    মানুষে পশুতে কসাইখানাতে এক সাথে হেথা হয় জবাই।

    দেখে খুশি হবে– এখানে ঋক্ষ শার্দূলও ভুলি হিংসা-দ্বেষ

    বনে গিয়া সব হইয়াছে ঋষি! সিংহ-শাবক হয়েছে মেষ!

    কাবুল-লক্ষ্মী দেহে মনে এই পরাধীনদেরে দেখিয়া কি

    রহিল লজ্জা-বেদনায় হায়, বোরকায় তাঁর মুখ ঢাকি?

    তুমি এলে আজ অভিনব বেশে সেই পথ দিয়া, পার্শ্বে যার

    স্তূপ হয়ে আছে অখ্যাতি-সহ লাশ আমাদের লাখ হাজার।

    মামুদ, নাদির শাহ, আবদালি, তৈমুর এই পথ বাহি

    আসিয়াছে। কেহ চাহিয়াছে খুন, কেহ চাহিয়াছে বাদশাহি।

    কেহ চাহিয়াছে তখ‍্‍ত-ই-তাউস, কোহিনুর কেহ—এসেছে কেউ

    খেলিতে সেরেফ খুশরোজ হেথা, বন্যার সম এনেছে ঢেউ।

    ‘খঞ্জর’ এরা এনেছে সবাই, তুমি আনিয়াছ ‘হেলাল’ আজ,

    তোমারে আড়াল করেনি তোমার তরবারি আর তখ‍্‍ত্ তাজ।

    তুমি আসনি ক’ দেখাতে তোমায়, দেখিতে এসেছ সকলেরে!

    চলেছ, পুণ্য সঞ্চয় লাগি বিপুল বিশ্ব কাবা হেরে।

    হে মহাতীর্থ-যাত্রা-পথিক! চির-রহস্য-ধেয়ানি গো!

    ওগো কবি! তুমি দেখছ সে কোন অজানা লোকের মায়া-মৃগ?

    কখন কাহার সোনার নূপুর দেখিল স্বপনে, জাগিয়া তায়

    ধরিতে চলেছ সপ্ত সাগর তেরো নদী আজ পারায়ে, হায়!

    তখ‍্‍ত্ তোমার রহিল পড়িয়া, বাসি লাগে নও-বাদ্‌শাহি,

    মুসাফির সেজে চলেছ শা’জাদা না-জানা অকূলে তরী বাহি।

    সুলেমান-গিরি হিন্দুকুশের প্রাচীর লঙ্ঘি ভাঙি কারা,

    আদি সন্ধানী যুবা আফগান, চলেছে ছুটিয়া দিশাহারা!

    সুলেমান সম উড়ন-তখ‍্‍‍‍‍তে চলিলে করিতে দিগ্বিজয়,

    কাবুলের রাজা, ছড়ায়ে পড়িলে সারা বিশ্বের হৃদয়-ময়!

    শম্‌শের হতে কমজোর নয় শিরীন-জবান, জানো তুমি,

    হাসি দিয়ে তাই করিতেছ জয় অসির অজেয় রণ-ভূমি!

    শুধু বাদশাহি দম্ভ লইয়া আসিতে যদি, এ বন্দী দেশ

    ফুলমালা দিয়া না করি বরণ করিত মামুলি আর্জি পেশ।

    খোশামোদ শুধু করিতে হয়ত, বলিত না তারা ‘খোশ-আমদেদ’,

    ভাবিত ভারত ‘কাবুলি’তে আর কাবুলি-রাজায় নাহিকো ভেদ।

    ‘আমানুল্লা’রে করি বন্দনা, কাবুল রাজার গাহি না গান,

    মোরা জানি ঐ রাজার আসন মানব জাতির অসম্মান!

    ঐ বাদশাহি তখ্‌তের নীচে দীন-ই-ইসলাম শরমে, হায়,

    এজিদ হইতে শুরু করে আজও কাঁদে আর শুধু মুখ লুকায়!

    বুকের খুশির বাদশাহ তুমি,–শ্রদ্ধা তোমার সিংহাসন,

    রাজাসন ছাড়ি মাটিতে নামিতে দ্বিধা নাই–তাই করি বরণ।

    তোমার রাজ্যে হিন্দুরা আজও বেরাদর-ই-হিন্দ, নয় কাফের,

    প্রতিমা তাদের ভাঙোনি, ভাঙোনি একখানি ইঁট মন্দিরের।

    ‘কাবুলি’রে মোরা দেখিয়াছি শুধু, দেখিনি কাবুল পামির-চূড়,

    দেখেছি কঠিন গিরি মরুভূমি–পিই নাই পানি সেই মরুভূর!

    আজ দেখি সেথা শত গুলিস্তাঁ-বোস্তাঁ-চমক কান্দাহার—

    গজনী-হিরাট-পঘ্‌মান কত জালালাবাদের ফুল-বাহার!

    ঐ খায়বার-পাশ দিয়া শুধু আসেনি নাদির আবদালি,

    আসে ঐ পথে নারঙ্গি সেব্ আপেল আনার ডালি ডালি।

    আসে আঙ্গুর পেস্তা বাদাম খোর্মা খেজুর মিঠি মেওয়া,

    অঢেল শিরনি দিয়াছে কাবুল, জানে না ক’ শুধু সুদ নেওয়া!

    কাবুল নদীর তীরে তীরে ফেরে জাফরান-খেতে পিয়ে মধু

    আমাদেরই মত মৌ-বিলাসী গো কত প্রজাপতি কত বঁধু।

    সেথায় উছসে তরুণীর শ্বাসে মেশ‍্‍ক-সুবাস, অধরে মদ,

    গাহে বুলবুলি নার্গিস লালা আনার-কলির পিয়ে শহদ।…

    দেখিয়াছি শুধু কাবুলির দেনা, কাবুলি দাওয়াই, কাবুলি হিং,–

    তুমি দিয়ে গেছ কাবুল-বাগের দিল-মহলের চাবির রিং!

  • উমর ফারুক

    উমর ফারুক

    উমর ফারুক

    তিমির রাত্রি –‘এশা’র আজান শুনি দূর মসজিদে,

    প্রিয়হারা কার কান্নার মত এ-বুকে আসিয়া বিঁধে!

    আমির-উল-মুমেনীন,

    তোমার স্মৃতি যে আজানের ধ্বনি–জানে না মুয়াজ্জিন!

    তকবির শুনি শয্যা ছাড়িয়া চকিতে উঠিয়া বসি,

    বাতায়নে চাই–উঠিয়াছে কি রে গগনে মরুর শশী?

    ও-আজান ও কি পাপিয়ার ডাক, ও কি চকোরীর গান?

    মুয়াজ্জিনের কণ্ঠে ও কি ও তোমারই সে আহ্বান?

    আবার লুটায়ে পড়ি!

    ‘সেদিন গিয়াছে’–শিয়রের কাছে কহিছে কালের ঘড়ি!

    উমর! ফারুক! আখেরী নবীর ওগো দক্ষিণ-বাহু!

    আহ্বান নয়–রূপ ধরে এসো!–গ্রাসে অন্ধতা-রাহু

    ইসলাম-রবি, জ্যোতি আজ তার দিনে দিনে বিমলিন!

    সত্যের আলো নিভিয়া–জ্বলিছে জোনাকির আলো ক্ষীণ!

    শুধু অঙ্গুলি-হেলনে শাসন করিতে এ জগতের

    দিয়াছিলে ফেলি মুহম্মদের চরণে যে-শমশের,

    ফিরদৌস ছাড়ি নেমে এস তুমি সেই শমশের ধরি,

    আর একবার লোহিত-সাগরে লালে লাল হয়ে মরি!

    নওশার বেশে সাজাও বন্ধু মোদের পুনর্বার

    খুনের সেহেরা পরাইয়া দাও হাতে বাঁধি হাতিয়ার!

    দেখাইয়া দাও–মৃত্যু যথায় রাঙা দুলহিন-সাজে

    করে প্রতীক্ষা আমাদের তরে রাঙা রণ-ভূমি মাঝে!

    মোদের ললাট-রক্তে রাঙিবে রিক্ত সিঁথি তাহার,

    দুলাব তাহার গলায় মোদের লোহু-রাঙা তরবার!

    সেনানী! চাই হুকুম!

    সাত সমুদ্র তের নদী পারে মৃত্যু-বধূর ঘুম

    টুটিয়াছে ঐ যক্ষ-কারায় সহে না ক’ আর দেরি,

    নকিব কণ্ঠে শুনিব কখন নব অভিযান ভেরি!…

    নাই তুমি নাই, তাই সয়ে যায় জমানার অভিশাপ,

    তোমার তখ‍্‍তে বসিয়া করিছে শয়তান ইনসাফ!

    মোরা ‘আসহাব-কাহাফে’র মত দিবানিশি দিই ঘুম,

    ‘এশা’র আজান কেঁদে যায় শুধু–নিঃঝুম নিঃঝুম!

    কত কথা মনে জাগে,

    চড়ি কল্পনা-বোর্‌রাকে যাই তের শ’ বছর আগে

    যেদিন তোমার প্রথম উদয় রাঙা মরু-ভাস্কর,

    আরব যেদিন হল আরাস্তা, মরীচিকা সুন্দর।

    গোষ্ঠে বসিয়া বালক রাখাল মুহম্মদ সেদিন

    বারে বারে কেন হয়েছে উতলা! কোথা বেহেশ‍্‍তি বীণ

    বাজিতেছে যেন! কে যেন আসিয়া দাঁড়িয়েছে তাঁর পিছে,

    বন্ধু বলিয়া গলা জড়াইয়া কে যেন সম্ভাষিছে!

    মানসে ভাসিছে ছবি–

    হয়ত সেদিন বাজাইয়া বেণু মোদের বালক নবী

    অকারণ সুখে নাচিয়া ফিরেছে মেষ-চারণের মাঠে!‌

    খেলায়েছে খেলা বাজাইয়া বাঁশি মক্কার মরু বাটে!

    খাইয়াছে চুমু দুম্বা-শিশুরে জড়াইয়া ধরি বুকে,

    উড়ায়ে দিয়েছে কবুতরগুলি আকাশে অজানা সুখে!

    সূর্য যেন গো দেখিয়াছে–তার পিছনে অমারাতি

    রৌশন-রাঙা করিছে কে যেন জ্বালায়ে চাঁদের বাতি।

    উঠেছিল রবি আমাদের নবী, সে মহা-সৌরলোকে,

    উমর, একাকী তুমি পেয়েছিলে সে আলো তোমার চোখে!

    কে বুঝিবে লীলা-রসিকের খেলা! বুঝি ইঙ্গিতে তার

    বেহেশ‍্‍ত-সাথী খেলিতে আসিলে ধারার পুনর্বার।

    তোমার রাখাল-দোস্তের মেষ চরিত সুদূর গোঠে,

    হেথা ‘আজ্‌নান’-ময়দানে তব পরাণ ব্যথিয়া ওঠে!

    কেন কার তরে এ প্রাণ-পোড়ানি নিজেই জান না বুঝি,

    তোমার মাঠের উটেরা হারায়, তুমি তা দেখ না খুঁজি!

    ইহারই মাঝে বা হয়ত কখন দুঁহুঁ দোঁহা দেখেছিলে,

    খেজুর-মেতির গল-হার যেন বদল করিয়া নিলে,

    হইলে বন্ধু মেষ-চারণের ময়দানে নিরালয়,

    চকিত দেখায় চিনিল হৃদয় চির-চেনা আপনায়!

    খেলার প্রভাত কাটিল কখন, ক্রমে বেলা বেড়ে চলে,

    প্রভাতের মালা শুকায়ে ঝরিল খর মরু বালুতলে।

    দীপ্ত জীবন-মধ্যাহ্নের রৌদ্র-তপ্ত পথে

    প্রভাতের সখা শত্রুর বেশে আসিল রক্ত-রথে।

    আরবে সেদিন ডাকিয়াছে বান, সেদিন ভূবন জুড়ি,

    ‘হেরা’-গুহা হতে ঠিকরিয়া ছুটি মহাজ্যোতি বিচ্ছুরি!

    প্রতীক্ষমাণ তাপসী ধরণী সেদিন শুদ্ধস্নাতা

    উদাত্ত স্বরে গাহিতেছিল গো কোরাণের সাম-গাথা!

    পাষাণের তলে ছিল এত জল, মরুভূমে এত ঢল?

    সপ্ত সাগর সাতশত হয়ে যেন করে টলমল!

    খোদার হাবিব এসেছে আজিকে হইয়া মানব-মিতা,

    পুণ্য-প্রভায় ঝলমল করে ধরা পাপ-শঙ্কিতা।

    সেদিন পাথারে উঠিল যে মৌজ তাহারে শাসন-হেতু

    নির্ভীক যুবা দাঁড়াইলে আসি ধরি বিদ্রোহ-কেতু!

    উদ্ধত রোষে তরবারি তব ঊর্দ্ধে আন্দোলিয়া

    বলিলে, ‘রাঙাবে এ তেগ মুসলমানের রক্ত দিয়া!’

    উন্মাদ বেগে চলিলে ছুটিয়া! –একী এ কী ওঠে গান?

    এ কোন লোকের অমৃত মন্ত্র? কার মহা আহ্বান?

    ফতেমা–তোমার সহোদরা–গাহে কোরান-অমিয়-গাথা,

    এ কোন মন্ত্রে চোখে আসে জল, হায় তুমি জান না তা!

    উন্মাদ-সম কেঁদে কও, ‘ওরে, শোনা পুনঃ সেই বাণী!

    কে শিখাল তোরে এ গান সে কোন বেহেশ‍্ত হতে আনি

    এ কী হল মোর? অভিনব এই গীতি শুনি হায় কেন

    সকল অঙ্গ শিথিল হইয়া আসিছে আবেশে যেন!

    কী যেন পুলক কী যেন আবেগ কেঁপে উঠি বারে বারে,

    মানুষের দুঃখে এমন করিয়া কে কাঁদিছে কোন পারে?’

    ‘আশ্‌হাদু আন-লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু’ বলি

    কহিল ফাতেমা–‘এই যে কোরান, খোদার কালাম গলি

    নেমেছে ভুবনে মুহম্মদের অমর কণ্ঠে, ভাই!

    এই ইসলাম, আমরা ইহারই বন্যায় ভেসে যাই!’…

    উমর আনিল ইমান।–গরজি গরজি উঠিল স্বর

    গগন পবন মন্থর করি–‘আল্লাহু আকবর!’

    সম্ভ্রমে-নত বিশ্ব সেদিন গাহিল তোমার স্তব–

    ‘এসেছেন নবী, এত দিনে এল ধরায় মহামানব!’

    পয়গম্বর নবী ও রসুল–এঁরা তো খোদার দান!

    তুমি রাখিয়াছ, হে অতি-মানুষ, মানুষের সম্মান!

    কোরান এনেছে সত্যের বাণী, সত্যে দিয়াছে প্রাণ,

    তুমি রূপ–তব মাঝে সে সত্য হয়েছে অধিষ্ঠান।

    ইসলাম দিল কি দান বেদনা-পীড়িত এ ধরণীরে,

    কোন নব বাণী শুনাইতে খোদা পাঠাল শেষ নবীরে,—

    তোমারে হেরিয়া পেয়েছি জওয়াব সেসব জিজ্ঞাসার!

    কী যে ইসলাম, হয়ত বুঝিনি, এইটুকু বুঝি তার

    উমর সৃজিতে পারে যে ধর্ম, আছে তার প্রয়োজন!

    ওগো, মানুষের কল্যাণ লাগি তারই শুভ আগমন

    প্রতীক্ষায় এ দুঃখিনী ধরা জাগিয়াছে নিশিদিন

    জরা-জর্জর সন্তানে ধরি বক্ষে শান্তিহীন!

    তপস্বিনীর মত

    তাহারই আশায় সেধেছে ধরণী অশেষ দুখের ব্রত।

    ইসলাম–সে তো পরশ-মাণিক তারে কে পেয়েছে খুঁজি!

    পরশে তাহার সোনা হল যারা তাদেরেই মোরা বুঝি।

    আজ বুঝি–কেন কেন বলিয়াছিলেন শেষ পয়গম্বর—

    ‘মোর পরে যদি নবী হত কেউ, হত সে এক উমর!’

    পাওনি কো ‘ওহী’, হওনি কো নবী, তাই তো পরান ভরি

    বন্ধু ডাকিয়া আপনার বলি বক্ষে জড়ায়ে ধরি!

    খোদারে আমরা করি গো সেজদা, রসুলে করি সালাম,

    ওঁরা ঊর্ধ্বের, পবিত্র হয়ে নিই তাঁহাদের নাম,

    তোমারে স্মরিতে ঠেকাই না কর ললাটে ও চোখে-মুখে

    প্রিয় হয়ে আছ তুমি হতমান মানুষ জাতির বুকে।

    করেছ শাসন অপরাধীদের তুমি করনি কো ক্ষমা,

    করেছ বিনাশ অসুন্দরের। বলনি কো মনোরমা

    মিথ্যাময়ীরে। বাঁধনি কো বাসা মাটির ঊর্ধ্বে উঠি।

    তুমি খাইয়াছ দুঃখীর সাথে ভিক্ষার খুদ খুঁটি!

    অর্ধ পৃথিবী করেছ শাসন ধুলার তখ‍্‍তে বসি

    খেঁজুর পাতার প্রাসাদ তোমার বারে বারে গেছে খসি

    সাইমুম-ঝড়ে। পড়েছে কুঠির, তুমি পড়নি কো নুয়ে,

    ঊর্ধ্বের যারা–পড়েছে তাহারা, তুমি ছিলে খাড়া ভুঁয়ে!

    শত প্রলোভন বিলাস বাসন ঐশ্বর্যের মদ

    করেছে সালাম দূর হতে সব, ছুঁইতে পারেনি পদ।

    সবারে ঊর্ধ্বে তুলিয়া ধরিয়া তুমি ছিলে সব নিচে,

    বুকে করে সবে বেড়া করি পার, আপনি রহিলে পিছে!

    হেরি পশ্চাতে চাহি–

    তুমি চলিয়াছ রৌদ্রদগ্ধ দূর মরুপথ বাহি

    জেরুজালেমের কিল্লা যথায় আছে অবরোধ করি

    বীর মুসলিম সেনা দল তব বহু দিন মাস ধরি।

    দুর্গের দ্বার খুলিবে তাহারা, বলেছে শত্রু শেষে–

    উমর যদি গো সন্ধিপত্রে স্বাক্ষর করে এসে।

    হায় রে আধেক ধরার মালিক আমিরুল-মুমেনিন

    শুনে সে খবর একাকী উষ্ট্রে চলেছে বিরামহীন

    সাহারা পারায়ে! ঝুলিতে দু’খানা শুকনো ‘খুব্‌জ’ রুটি,

    একটি মশকে একটুকু পানি খোর্মা দু-তিন মুঠি!

    প্রহরীবিহীন সম্রাট চলে একা পথে উটে চড়ি

    চলিছে একটি মাত্র ভৃত্য উষ্টের রশি ধরি!

    মরুর সূর্য ঊর্ধ্ব আকাশে আগুন বৃষ্টি করে,

    সে আগুন-তাতে খই সম ফোটে বালুকা মরুর পরে।

    কিছুদূর যেতে উট হতে নামি কহিলে ভৃত্যে, ‘ভাই

    পেরেশান বড় হয়েছে চলিয়া! এইবার আমি যাই

    উষ্ট্রের রশি ধরিয়া অগ্রে, তুমি উঠে বস উটে;

    তপ্ত বালুতে চলি যে চরণে রক্ত উঠেছে ফুটে!’

    …ভৃত্য দস্ত চুমি

    কাঁদিয়া কহিল ‘উমর! কেমনে এ আদেশ করো তুমি?

    উষ্ট্রের পিঠে আরাম করিয়া গোলাম রহিবে বসি

    আর হেঁটে যাবে খলিফা উমর ধরি সে উটের রশি?’

    খলিফা হাসিয়া বলে,

    ‘তুমি জিতে গিয়ে বড় হতে চাও, ভাই রে এমনই ছলে!

    রোজ-কিয়ামতে আল্লা যেদিন কহিবে ‘উমর! ওরে,

    করেনি খলিফা মুসলিম-জাঁহা তোর সুখ তরে তোরে!’

    কী দিব জওয়াব, কি করিয়া মুখ দেখাব রসুলে ভাই?

    আমি তোমাদের প্রতিনিধি শুধু! মোর অধিকার নাই

    আরাম সুখের,–মানুষ হইয়া নিতে মানুষের সেবা!

    ইসলাম বলে সকলে সমান, কে বড়ো ক্ষুদ্র কে-বা!’

    ভৃত্য চড়িল উটের পৃষ্ঠে উমর ধরিল রশি,

    মানুষে স্বর্গে তুলিয়া ধরিয়া ধুলায় নামিল শশী!

    জানি না, সেদিন আকাশে পুষ্পবৃষ্টি হইল কি-না,

    কী গান গাহিল মানুষে সেদিন বন্দি, বিশ্ববাণী!

    জানি না, সেদিন ফেরেশতা তব করেছে কি না স্তব,–

    অনাগত কাল গিয়েছিল শুধু, ‘জয় জয় হে মানব!’…

    আসিলে প্যালেস্টাইন, পারায়ে দুস্তর মরুভূমি,

    ভৃত্য তখন উটের উপরে, রশি ধরে চল তুমি!

    জর্ডন নদী হও যবে পার, শত্রুরা কহে হাঁকি–

    ’যার নামে কাঁপে অর্ধ পৃথিবী, এই সেই উমর নাকি?’

    খুলিল রুদ্ধ দূর্গা-দুয়ার! শত্রুরা সম্ভ্রমে

    কহিল–‘খলিফা আসেনি, এসেছে মানুষ জেরুজালমে!’

    সন্ধিপত্র স্বাক্ষর করি শত্রু-গির্জা-ঘরে

    বলিলে, ‘বাহিরে যাইতে হইবে এইবার নামাজ তরে!’

    কহে পুরোহিত, ‘আমাদের এই আঙিনায় গির্জায়,

    পড়িলে নামাজ হবে না কবুল আল্লার দরগায়?’

    হাসিয়া বলিলেন, ‘তার তরে নয়, আমি যদি হেথা আজ

    নামাজ আদায় করি, তবে কাল অন্ধ লোক-সমাজ

    ভাবিবে–খলিফা করেছে ইশারা হেথায় নামাজ পড়ি

    আজ হতে যেন এই গির্জারে মোরা মসজিদ করি!

    ইসলামের এ নহে কো ধর্ম, নহে খোদার বিধান,

    কারও মন্দির গির্জারে করে ম’জিদ মুসলমান!’

    কেঁদে কহে যত ঈসাই ইহুদি অশ্রু সিক্ত আঁখি–

    ‘এই যদি হয় ইসলাম–তবে কেহ রহিবে না বাকি,

    সকলে আসিবে ফিরে

    গণতন্ত্রের ন্যায় সাম্যের শুভ্র এ মন্দিরে!’

    তুমি নির্ভীক এ খোদা ছাড়া করনি কো কারে ভয়

    সত্যব্রত তোমায় তাইতে সবে উদ্ধত কয়।

    মানুষ হইয়া মানুষের পূজা মানুষরই অপমান

    তাই মহাবীর খালেদেরে তুমি পাঠাইলে ফরমান

    সিপাহ-সালারে ইঙ্গিতে তব করিলে মামুলি সেনা,

    বিশ্ব-বিজয়ী বীরেরে শাসিতে এতটুকু টলিলে না।

    ধরাধাম ছাড়ি শেষ নবী যবে করিল মহাপ্রয়াণ,

    কে হবে খালিফা–হয়নি তখনও কলহের অবসান,

    নবী-নন্দনী বিবি ফাতেমার মহলে আসিয়া সবে

    করিতে লাগিল জটলা–ইহার পরে কে খালিফা হবে!

    বজ্রকণ্ঠে তুমিই সেদিন বলিতে বলিতে পারিয়াছিলে–

    ‘নবীসূতা! তবে মহল জ্বালাব, এ সভা ভেঙে না দিলে!’

    মানব-প্রেমিক! আজিকে তোমারে স্মরি,

    মনে পড়ে যত মহত্ত্ব-কথা–সেদিন সে বিভাবরী

    নগর-ভ্রমণে বাহিরিয়া তুমি দেখিতে পাইলে দূরে

    মায়েরে ঘিরিয়া ক্ষুধাতুর দুটি শিশু সকরুণ সুরে

    কাঁদিতেছে আর দুঃখিনী মাতা ছেলেরে ভুলাতে, হায়,

    উনানে শূণ্য হাঁড়ি চড়াইয়া কাঁদিয়া অকূলে চায়!

    শুনিয়া সকল–কাঁদিতে কাঁদিতে ছুটে গেলে মদিনাতে

    বয়তুল-মাল হইতে লইয়া ঘৃত আটা নিজ হাতে,

    বলিলে, ‘এসব চাপাইয়া দাও আমার পিঠের পরে,

    আমি লয়ে যাব বহিয়া এ-সব দুখিনী মায়ের ঘরে!’

    কত লোক আসি আপনি চাহিল বহিতে তোমার বোঝা,

    বলিলে, ‘বন্ধু, আমার এ ভার আমিই বহিব সোজা!

    রোজ-কিয়ামতে কে বহিবে বল আমার পাপের ভার?

    মম অপরাধে ক্ষুধায় শিশুরা কাঁদিয়াছে, আজই তার

    প্রায়শ্চিত্ত করিব আপনি!’ – চলিলে নিশীথ রাতে

    পৃষ্ঠে বহিয়া খাদ্যের বোঝা দুখিনীর আঙিনাতে।

    এত যে কোমল প্রাণ,

    করুণার বশে তবু গো ন্যায়ের করনি কো অপমান!

    মদ্যপানের অপরাধে প্রিয় পুত্রেরে নিজ করে

    মেরেছ দোররা, মরেছে পুত্র তোমার চোখের পরে।

    ক্ষমা চাহিয়াছে পুত্র, বলেছ পাষাণে বক্ষ বাঁধি–

    ‘অপরাধ করে তোরই মত স্বরে কাঁদিয়াছে অপরাধী!’

    আবু শাহমার গোরে

    কাঁদিতে যাইয়া ফিরিয়া আসি গো তোমারে সালাম করে।

    খাস দরবার ভরিয়া গিয়াছে হাজার দেশের লোকে,

    ‘কোথায় খলিফা’ কেবলই প্রশ্ন ভাসে উৎসুক চোখে,

    একটি মাত্র পিরান কাচিয়া শুকায়নি তাহা বলে

    রৌদ্রে ধরিয়া বসিয়া আছে গো খলিফা আঙিনা-তলে!

    … হে খলিফাতুল-মুসলেমিন! হে চীরধারী সম্রাট!

    অপমান তব করিব না আজ করিয়া নান্দী পাঠ,

    মানুষেরে তুমি বলেছ বন্ধু, বলিয়াছ ভাই, তাই

    তোমারে এমন চোখের পানিতে স্মরি গো সর্বদাই!

    বন্ধু গো, প্রিয়, এ হাত তোমারে সালাম করিতে গিয়া

    ওঠে না ঊর্ধ্বে, বক্ষে তোমারে ধরে শুধু জড়াইয়া!…

    মাহিনা মোহররম–

    হাসান হোসেন হয়েছে শহীদ, জানে শুধু হায় কৌম্,

    শহীদি বাদশা! মোহর্‌রমে যে তুমিও গিয়াছ চলি

    খুনের দরিয়া সাঁতারি– এজাতি গিয়াছে গো তাহা ভুলি!

    মোরা ভুলিয়াছি, তুমি তো ভোলনি! আজও আজানের মাঝে

    মুয়াজ্জিনের কণ্ঠে বন্ধু, তোমারই কাঁদন বাজে!

    বন্ধু গো জানি, আমাদের প্রেমের আজও ও গোরের বুকে

    তেমনি করিয়া কাঁদিছ হয়ত কত না গভীর দুখে‌!

    ফিরদৌস হতে ডাকিছে বৃথাই নবী পয়গম্বর,

    মাটির দুলাল মানুষের সাথে ঘুমাও মাটির ’পর!

    হে শহীদ! বীর! এই দোয়া কর আরশের পায়া ধরি–

    তোমারই মতন মরি যান হেসে খুনের সেহেরা পরী।

    মৃত্যুর হতে মরিতে চাহি না, মানুষের প্রিয় করে

    আঘাত খাইয়া যেন গো আমার শেষ নিঃশ্বাস পড়ে!

    কলকাতা

    ১৬ই পৌষ, ১৩৩৪

  • চক্রবাক

    চক্রবাক

    চক্রবাক

    কাজী নজরুল ইসলামের ‘চক্রবাক’ কাব্যগ্রন্থ প্রথম প্রকাশিত হয় ১৩৩৬ বঙ্গাব্দে মুতাবিক ১৯২৯ খৃষ্টাব্দের আগস্টে; প্রকাশক শ্রীগোপালদাস মজুমদার; ডি. এম. লাইব্রেরি, ৬১ কর্ণওয়ালিস্ ষ্ট্রীট, কলিকাতা। প্রবাসী প্রেস, ৯১ আপার সার্কুলার রোড, কলিকাতা হতে শ্রীসজনীকান্ত দাস কর্তৃক মুদ্রিত; পৃষ্ঠা সংখ্যা ৪+৭৮; মূল্য ১৷৷৹ (দেড় টাকা)।

    ১৯২৯ সালের জানুয়ারিতে কাজী নজরুল ইসলাম আবার চট্টগ্রামে আসেন এবং তামাককুণ্ডীতে অবস্থান করেন। উল্লেখ্য, এর আগে ১৯২৬ সালে জুলাই মাসে তিনি চট্টগ্রাম এসেছিলেন, সে সময়ে ‘সিন্ধু হিন্দোল’ কাব্যের কবিতাগুলো রচিত হয়েছিল। এবারের সফরে তিনি ‘চক্রবাকে’র সূচনা কবিতা ‘ওগো চক্রবাকী’, ‘বাদল-রাতের পাখি’, ‘স্তব্ধ-রাতে’, ‘বাতায়ন-পাশে গুবাক তরুর সারি’, ‘কর্ণফুলী’, ‘শীতের সিন্ধু’ এবং অন্যান্য গ্রন্থভুক্ত আরও কিছু কবিতা ও গান রচনা করেন। অধ্যাপিকা সেলিনা বাহার জামানের নিকট রক্ষিত পাণ্ডুলিপিতে দেখা যায়— ‘শীতের সিন্ধু’ কবিতাটি ‘সিন্ধু-চতুর্থ তরঙ্গ’ রূপে রচিত হয়। মনে হয়, ছন্দের পার্থক্যের কারণে পরে কবি এর ভিন্ন নাম দেন।

    ‘চক্রবাক’ কাব্যে ‘উৎসর্গ’ ও গোড়ার শিরোনামহীন কবিতাটি ছাড়া এই একুশটি কবিতা অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল— ১. তোমারে পড়িছে মনে, ২. বাদল-রাতের পাখি, ৩. স্তব্ধরাতে, ৪. বাতায়ন-পাশে গুবাক তরুর সারি, ৫. কর্ণফুলী, ৬. শীতের সিন্ধু, ৭. পথচারী, ৮. মিলন-মোহানায়, ৯. গানের আড়াল, ১০. ভীরু, ১১. এ মোর অহঙ্কার, ১২. তুমি মোরে ভুলিয়াছ, ১৩. হিংসাতুর, ১৪. বর্ষা-বিদায়, ১৫. সাজিয়াছ বর মৃত্যুর উৎসবে, ১৬. অপরাধ শুধু মনে থাক্, ১৭. আড়াল, ১৮. নদীপারের মেয়ে, ১৯. ১৪০০ সাল, ২০. চক্রবাক ও ২১. কুহেলিকা।

    ‘ভীরু’ ও ‘এ মোর অহঙ্কার’ কবিতা দুটি পূর্ববর্তী ‘জিঞ্জির’ কাব্যের অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল, তাই ‘বাংলা একাডেমি’ প্রকাশিত ‘নজরুল রচনাবলী’তে কবিতা দু’টি ‘চক্রবাক’ কাব্য হতে বর্জিত হয়েছে। কিন্তু কবিতা দুটির ভাব ও বিষয় ‘চক্রবাক’ কাব্যের সাথেই বেশি সাজুস্যপূর্ণ বিবেচনা করে, বর্তমান সংস্করণে কবিতা দুটিকে ‘চক্রবাক’ কাব্যভুক্ত করা হয়েছে।

    ‘জিঞ্জির’ কাব্যভুক্ত ‘এ মোর অহঙ্কার’ কবিতাটিতে ১৩টি স্তবক; কিন্তু ‘চক্রবাক’ কাব্যে এর ষষ্ঠ স্তবক বর্জিত হয়েছিল। বর্তমান সংস্করণে ‘জিঞ্জির’ কাব্যের পাঠানুসারে ১৩ স্তবকের পূর্ণাঙ্গ কবিতাটি গ্রহণ করা হয়েছে।

    ‘তোমারে পড়িছে মনে’ ১৩৩৫ ভাদ্রের ‘ধূপছায়া’য় প্রকাশিত হয়েছিল।

    ‘স্তব্ধরাতে’ ১৩৩৫ মাঘের ‘ধূপছায়া’য় প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল।

    ‘বাতায়ন-পাশে গুবাক তরুর সারি’ ১৩৩৫ চৈত্রের কালিকলমে প্রকাশিত হয়েছিল, রচনার স্থান ও তারিখ লেখা ছিল— ‘চট্টগ্রাম, ২৪-১-২৯।’

    ‘কর্ণফুলী’ সাপ্তাহিক ‘আত্মশক্তি’তে প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল।

    ‘পথচারী’ ১৩৩৬ জ্যৈষ্ঠের ‘উপাসনা’য় প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল।

    ‘গানের আড়াল’ ১৩৩৫ অগ্রহায়ণ-পৌষের ধূপছায়ায় প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল।

    ‘তুমি মোরে ভুলিয়াছ’ ১৩৩৫ বৈশাখের ‘সওগাতে’ ‘রহস্যময়ী’ শিরোনামে প্রকাশিত হয়েছিল। এ-সম্পর্কে কবি কলিকাতা হতে ৩১-৩-১৯২৮ তারিখের এক পত্রে ঢাকায় অধ্যাপক কাজী মোতাহার হোসেন সাহেবকে লিখেন—

    “আমি আবার বিষ্যুৎবার কলকাতা ফিরে আসব। সেদিন সন্ধ্যায় Broadcusting-এ আমার গান গাইতে হবে। … আমি বিষ্যুবারে দুটো গান ও আমার নতুন কবিতা ‘রহস্যময়ী’ আবৃত্তি করব। ‘রহস্যময়ী’ চৈত্রের সওগাতে বেরুবে। এর ‘তুমি মোরে ভুলিয়াছ’ নামটা বদলে ‘রহস্যময়ী’ করেছি।

    —[নজরুল-জীবনে প্রেমের এক অধ্যায়, ৬৩ পৃ.]

    ‘হিংসাতুর’ ১৩৩৫ জ্যৈষ্ঠের ‘সওগাতে’ প্রথম প্রকাশিত হয়। এর রচনা স্থান ও তারিখ — ‘কলিকাতা, ২৯-৩-২৮।’ এই কবিতাটির প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করেই কবি তাঁর প্রথমা (পরিত্যক্তা) পত্নীকে কলিকাতা হতে ১-৭-৩৭ তারিখে এক পত্রের শেষে P.S. (পুনশ্চ) দিয়ে লিখেছেন—

    “আমার ‘চক্রবাক’ নামক কবিতা-পুস্তকের কবিতাগুলো পড়েছ? তোমার বহু অভিযোগের উত্তর পাবে তাতে। তোমার কোনো পুস্তকে আমার সম্বন্ধে কুটক্তি ছিল।”

    —[নজরুল-রচনা-সম্ভার, প্রথম সংস্করণ, ২৩৮ পৃ.]

    ‘বর্ষা-বিদায়’ প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ১৩৩৫ ভাদ্রের ‘সওগাতে’।

    ‘সাজিয়াছ বর মৃত্যুর উৎসবে’ ‘প্রগতি’র বৈশাখ ১৩৩৫ সংখ্যায় প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল।

    ‘আড়াল’ ১৩৩৬ আষাঢ়ের ‘কল্লোলে’ প্রথম প্রকাশিত হয়।

    ‘নদীপারের মেয়ে’ ১৩৩৫ বৈশাখের ‘কালিকলমে’ প্রথম প্রকাশিত হয়।

    ‘১৪০০ সাল’ ১৩৩৪ আষাঢ়ের ‘কল্লোলে’ ‘আজি হতে শতবর্ষ আগে’ শিরোনামে প্রকাশিত হয়েছিল। কল্লোল হতে এটি ১৩৩৪ আষাঢ়ের ‘নওরোজে’ উদ্ধৃত হয়েছিল। কবিতাটি ‘কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরে’র ‘১৪০০’ সাল কবিতার জবাবে লিখিত হয়েছিল।

    ‘কুহেলিকা’ ১৩৩৫ মাঘের মোয়াজ্জিনে প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল।

  • উৎসর্গ

    উৎসর্গ

    উৎসর্গ

    বিরাট-প্রাণ, কবি দরদী–

    প্রিন্সিপাল শ্রীযুক্ত সুরেন্দ্রনাথ মৈত্র

    শ্রীচরণারবিন্দেষু

    দেখিয়াছি হিমালয়, করিনি প্রণাম,

    দেবতা দেখিনি, দেখিয়াছি স্বর্গধাম।…

    সেদিন প্রথম যবে দেখিনু তোমারে,

    হে বিরাট মহাপ্রাণ, কেন বারেবারে

    মনে হল এত দিনে দেখিনু দেবতা!

    চোখ পুরে এল জল, বুক পুরে কথা।

    ঠেকিল ললাটে কর আপনি বিস্ময়ে,

    নব লোকে দেখা যেন নব পরিচয়ে।

    কোথা যেন দেখিছিনু কবে কোন লোকে,

    সে-স্মৃতি দেখিনু তব অশ্রুসিক্ত চোখে।

    চলিতে চলিতে পথে দূর পথচারী

    আসিলাম তব দ্বারে, বাহু আগুসারি

    তুমি নিলে বক্ষে টানি, কহ নাই কথা,

    না কহিতে বুঝেছিলে ভিখারির ব্যথা।

    মুছায়ে পথের ধূলি অফুরান স্নেহে–

    নিন্দা-গ্লানি-কলঙ্কের কাঁটা-ক্ষত দেহে

    বুলাইয়ে ব্যথা-হরা স্নিগ্ধ শান্ত কর,

    দেখিনু দেবতা আজও আছে ধরা ’পর!

    নূতন করিয়া ভালবাসিনু মানবে,

    যাহারা দিয়াছে ব্যথা তাহাদেরই স্তবে

    ভুরিয়া উঠিল বুক, গাহি নব গান।

    ভুলি নাই, হে উদার, তব সেই দান!

    উড়ে এসেছিনু ভগ্নপক্ষ, চক্রবাক

    তব শুভ্র বালুচরে, আবার নির্বাক

    উড়িয়া গিয়াছে কবে, আজও তার স্মৃতি

    হয়ত জাগিবে মনে শুনি মোর গীতি!

    শায়ক বিঁধিয়া বুকে উড়িয়া বেড়াই

    চর হতে আন-চরে, সেই গান গাই!…

    ভালবেসেছিলে মোরে, মোর কণ্ঠে গান,

    সে-গান তোমারই পায়ে তাই দিনু দান!

  • ঝরা পালক

    ঝরা পালক

    ঝরা পালক1

    –ওগো ও চক্রবাকী

    তোমারে খুঁজিয়া অন্ধ হল যে চক্রবাকের আঁখি!

    কোথা কোন লোকে কোন নদী পারে রহিলে গো তারে ভুলে?

    হেথা সাথী তব ডেকে ডেকে ফেরে ধরণীর কূলে কূলে।

    দিবসে ঘুমালে সব ভুলে যার পাখায় বাঁধিয়া পাখা,

    চঞ্চুতে যার আজিও তোমার চঞ্চুর চুমা আঁকা,

    ‘রোদ লাগে’ বলে যার ডানাতলে লুকাইতে নানা ছলে,

    থাকিয়া থাকিয়া উঠিতে কাঁপিয়া তবু কেন পলে পলে;

    ভাদরের পারা আদরের ধারা যাচিয়া যাহার কাছে

    কায়ার পিছনে ছায়াটির মত ফিরিয়াছ পাছে পাছে,–

    আজ সে যে হায় কাঁদিয়া তোমায় দিকে দিকে খুঁজে মরে,

    ভীরু মোর পাখি! আঁধারে একাকী কোন বালুচরে?

    সাড়া দেয় বন, শন্ শন্ শন্–ঐ শোন মোর ডাকে,

    তটিনীর জল আঁখি ছলছল ফিরে চায় বাঁকে বাঁকে,

    ফিরায়ে আমার প্রতিধ্বনিরে সান্ত্বনা দেয় গিরি,

    ও-পারের তীরে জিরিজিরি পাতা ঝুরিতেছে ঝিরি ঝিরি।

    বিহগীর হায় ঘুম ভেঙে যায় বিহগ-পক্ষপুটে,

    বলে, ‘বিরহীরে, মোর সুখ-নীড়ে আয় আয় আয় ছুটে!

    জুড়াইব ব্যথা কাঁটা বিঁধে যথা সেথা দিব বুক পেতে,

    ঐ কাঁটা লয়ে বিবাগিনী হয়ে উড়ে যাব আকাশেতে!’

    ঠোঁট-ভরা মধু আসে কুলবধূ, বলে, ‘আঁধারের পাখি,

    নিশীথ নিঝুম চোখে নাই ঘুম, কারে এত ডাকাডাকি?

    চল তরুতলে, এই অঞ্চলে দিব সুখ-শেজ পাতি,

    ভুলে কাননে ফুল তুলে মোরা কাটাইব সারা রাতি!’

    অসীম আকাশ আছে মোর পাশ তারার দিপালী জ্বালি,

    বলে, ‘পরবাসী! কোথা কাঁদ আসি? হেথ শুরু চোরাবালি!

    তোমার কাঁদনে আমার আঙনে নিভে যায় তারা-বাতি,

    তুমিও শূন্য আমিও শূন্য, এস মোরা হব সাথী!”…

    মানে না পরান, গেয়ে গেয়ে গান কূলে কূলে ফিরি ডাকি,

    কোথা কোন কূলে রহিলে গো ভুলে আমার চক্রবাকী?

    চাহি ও-পারের তীরে

    কভু না পোহায় বিরহের রাতি এতই দীরঘ কি রে?

    না মিটিতে সাধ বিধি সাধে বাদ, বিরহের যবনিকা

    পড়ে যায় মাঝে, নিভে যায় সাঁঝে মিলনের মরু-শিখা।

    মিলনের কূল ভেঙে ভেঙে যায় বিরহের স্রোত-বেগে,

    অধরের হাসি বাসি হয়ে ওঠে নিশিথ-প্রভাতের জেগে!

    একা নদীতীরে গহন তিমিরে আমি কাঁদি মনোদুখে,

    হয়ত কোথায় বাঁধিয়া কুলায় তুমি ঘুম যাও সুখে।

    আমাদের মাঝে বহিছে যে নদী এজীবনে শুকাবে না,

    কাটিবে যে নিশি, আসিবে প্রভাত–যতেক অচেনা চেনা

    আসিবে সবাই; আসিবে না তুমি তব চির-চেনা নীড়ে,

    এ-পাড়ের ডাক ও-পার ঘুরিয়া এ-পারে আসিবে ফিরে!

    হয়ত জাগিয়া দেখিব প্রভাতে, আমারি আঁখির আগে

    তুমি যাচিতেছ নবীন সাথীর প্রেম নব অনুরাগে।

    জানি গো আমার কাটিবে না আর এই বিরহের নিশি,

    খুঁজিবে বৃথাই আঁধারে তোমায় দশদিকে দশ দিশি।

    যখন প্রভাতে থাকিব না আমি এই সে নদীর ধারে,

    ক্লান্ত পাখায় উড়ে যাব দূর বিস্মরণীর পারে,

    খুঁজিতে আমায় এই কিনারায় আসিবে তখন তুমি–

    খুঁজিবে সাগর-মরু-প্রান্তর গিরি দরি বনভূমি।

    তাহারি আশায় রেখে যাই প্রিয়, ঝরা পালকের স্মৃতি–

    এই বালুচরে ব্যথিতের স্বরে আমার বিরহ-গীতি!

    যদি পথ ভুলে আস এই কূলে কোনদিন রাতে রাণী,

    প্রিয় ওগো প্রিয়, নিও তুলে নিও ঝরা এ পালকখানি।

  • তোমারে পড়িছে মনে

    তোমারে পড়িছে মনে

    তোমারে পড়িছে মনে

    তোমারে পড়িছে মনে

    আজি   নীপ-বালিকার ভীরু-শিহরণে,

    যূথিকার অশ্রু-সিক্ত ছলছল মুখে

    কেতকী-বধূর অবগুন্ঠিত ও বুকে–

    তোমারে পড়িছে মনে।

    হয়ত তেমনই আজি দূর বাতায়নে

    ঝিলিমিলি-তলে

    ম্লান     লুলিত অঞ্চলে

    চাহিয়া বসিয়া আছ একা,

    বারেবারে মুছে যায় আঁখি-জল লেখা।

    বারেবারে নিভে যায় শিয়রের বাতি,

    তুমি জাগো, জাগে সাথে বরষার রাতি।

    সিক্ত-পক্ষ পাখি

    তোমার চাঁপার ডালে বসিয়া একাকী

    হয়ত তেমনই করি ডাকিছে সাথীরে,

    তুমি চাহি আছ শুধু দূর শৈল-শিরে।

    তোমার আঁখির ঘন নীলাঞ্জন-ছায়া

    গগনে গগনে আজ ধরিয়াছে কায়া।…

    আমি হেথা রচি গান নব নীপ-মালা–

    স্মরণ-পারের প্রিয়া, একান্তে নিরালা

    অকারণে! –জানি আমি জানি

    তোমারে পাব না আমি এই গান এই মালাখানি

    রহিবে তাদেরই কণ্ঠে–যাহাদেরে কভু

    চাহি নাই, কুসুমে কাঁটার মত জড়ায়ে রহিল যারা তবু।

    বহে আজি দিশিহারা শ্রাবণের অশান্ত পবন

    তারই মতো ছুটে ফেরে দিকে দিকে উচাটন মন,

    খুঁজে যায় মোর গীত-সুর

    কোথা কোন্ বাতায়নে বসি তুমি বিরহ-বিধুর।

    তোমার গগনে নেভে বারেবারে বিজলির দীপ,

    আমার অঙ্গনে হেথা বিকশিয়া ঝরে যায় নীপ।

    তোমার গগনে ঝরে ধারা অবিরল,

    আমার নয়নে হেথা জল নাই, বুকে ব্যথা করে টলমল।

    আমার বেদনা আজি রূপ ধরি শত গীত-সুরে

    নিখিল বিরহী-কণ্ঠে–বিরহিনী–তব তরে ঝুরে।

    এ-পারে ও-পারে মোরা, নাই নাই কূল!

    তুমি দাও আঁখি-জল, আমি দিই ফুল।

  • বাদল-রাতের পাখি

    বাদল-রাতের পাখি

    বাদল-রাতের পাখি

    বাদল-রাতের পাখি!

    কবে পোহায়েছে বাদলের রাতি, তবে কেন থাকি থাকি

    কাঁদিছ আজিও ‘বউ কথা কও’ শেফালির বনে একা,

    শাওনে যাহারে পেলে না, তারে কি ভাদরে পাইবে দেখা?…

    তুমি কাঁদিয়াছ ‘বউ কথা কও’ সে-কাঁদনে তব সাথে

    ভাঙিয়া পড়েছে আকাশের মেঘ গহীন শাওন-রাতে।

    বন্ধু, বরষা-রাতি

    কেঁদেছে যে সাথে সে ছিল কেবল বর্ষা-রাতেরই সাথী!

    আকাশের জল-ভারাতুর আঁখি আজি হাসি-উজ্জ্বল;

    তেরছ-চাহনি জাদু হানে আজ, ভাবে তনু ঢলঢল!

    কমল-দীঘিতে কমল-মুখীরা অধরে হিঙ্গুল মাখে,

    আলুথালু বেশ–ভ্রমরে সোহাগে পর্ণ-আঁচলে ঢাকে।

    শিউলি-তলায় কুড়াইতে ফুল আজিকে কিশোরী মেয়ে

    অকারণ লাজে চমকিয়া ওঠে আপনার পানে চেয়ে।

    শালুকের কুঁড়ি গুঁজিছে খোঁপায় আবেশে বিধুরা বধূ,

    মুকুলি পুষ্প-কুমারীর ঠোঁটে ভরে পুষ্পল মধু।

    আজি আনন্দ-দিনে

    পাবে কি বন্ধু বধূরে তোমার, হাসি দেখে লবে চিনে?

    সরসীর তীরে আম্রের বনে আজও যবে ওঠ ডাকি

    বাতায়নে কেহ বলে কি, ‘কে তুমি বাদল-রাতের পাখি!

    আজও বিনিদ্র জাগে কি সে রাতি তার বন্ধুর লাগি?

    যদি সে ঘুমায়–তব গান শুনি চকিতে ওঠে কি জাগি?

    ভিন-দেশি পাখি! আজিও স্বপন ভাঙিল না হায় তব,

    তাহার আকাশে আজ মেঘ নাই–উঠিয়াছে চাঁদ নব!

    ভরেছে শূন্য উপবন তার আজি নব নব ফুলে,

    সে কি ফিরে চায় বাজিতেছে হায় বাঁশি যার নদীকূলে?

    বাদলা-রাতের পাখি!

    উড়ে চল–যথা আজও ঝরে জল, নাহিকো ফুলের ফাঁকি!

  • স্তব্ধ-রাতে

    স্তব্ধ-রাতে

    স্তব্ধ-রাতে

    থেমে আসে রজনীর গীত-কোলাহল,

    ওরে মোর সাথী আঁখি-জল,

    এইবার তুই নেমে আয়–

    অতন্দ্র এ নয়ন-পাতায়।

    আকাশে শিশির ঝরে, বনে ঝরে ফুল,

    রূপের পালঙ্ক বেয়ে ঝরে এলোচুল;

    কোন্ গ্রহে কে জড়ায়ে ধরিছে প্রিয়ায়,

    উল্কার মাণিক ছিঁড়ে ঝরে পড়ে যায়।

    আঁখি-জল, তুই নেমে আয়—

    বুক ছেড়ে নয়ন-পাতায়!…

    ওরে সুখবাদী

    অশ্রুতে পেলিনে যারে, হাসিতে পাবি কি তার আদি?

    আপনারে কতকাল দিবি আর ফাঁকি?

    অন্তহীন শূন্যতারে কত আর রাখবি রে কুয়াশায় ঢাকি?

    ভিখারী সাজিলি যদি, কেন তবে দ্বারে

    এসে এসে ফিরে যাস নিতি অন্ধকারে?

    পথ হতে আন্-পথে কেঁদে যাস লয়ে ভিক্ষা-ঝুলি,

    প্রসাদ যাচিস যার তারেই রহিলি শুধু ভুলি?

    সকলে জানিবে তোর ব্যথা,

    শুধু সে-ই জানিবে না কাঁটা-ভরা ক্ষত তোর কোথা?

    ওরে ভীরু, ওরে অভিমানী!

    যাহারে সকল দিবি, তারে তুই দিলি শুধু বাণী?

    সুরের সুরায় মেতে কতটুকু কমিল রে মর্মদাহ তোর?

    গানের গহিনে ডুবে কতদিন লুকাইবি এই আঁখি-লোর?

    কেবলই গাঁথিলি মালা, কার তরে কেহ নাহি জানে!

    অকূলে ভাসায়ে দিস, ভেসে যায় মালা শূন্য-পানে।

    সে-ই শুধু জানিল না, যার তরে এত মালা-গাঁথা,

    জলে-ভরা আঁখি তোর, ঘুমে-ভরা আঁখি-পাতা।

    কে জানে কাটিবে কিনা আজিকার অন্ধ এ নিশীথ,

    হয়ত হবে না গাওয়া কাল তোর আধ-গাওয়া গীত,

    হয়ত হবে না বলা, বাণীর বুদ‍্‍বুদে যাহা ফোটে নিশিদিন!

    সময় ফুরায়ে যায়–ঘনায়ে আসিল সন্ধ্যা কুহেলি-মলিন!

    সময় ফুরায়ে যায়, চল্ এবে, বলি আঁখি তুলি–

    ওগো প্রিয়, আমি যাই, এই লহ মোর ভিক্ষা-ঝুলি!

    ফিরেছি সকল দ্বারে, শুধু তব ঠাঁই

    ভিক্ষা-পাত্র লয়ে করে কভু আসি নাই।

    ভরেছে ভিক্ষার ঝুলি মাণিকে মণিতে,

    ভরে নাই চিত্ত মোর! তাই শূন্য-চিতে

    এসেছি বিবাগী আজি, ওগো রাজা-রাণী,

    চাহিতে আসিনি কিছু! সঙ্কোচে অঞ্চল মুখে দিও নাকো টানি।

    জানাতে এসেছি শধু–অন্তর-আসনে

    সব ঠাঁই ছেড়ে দিয়ে–যাহারে গোপনে

    চলে গেছি বন-পথে একদা একাকী,

    বুক-ভরা কথা লয়ে–জল-ভরা আঁখি।

    চাহিনিকো হাত পেতে তারে কোনদিন,

    বিলায়ে দিয়েছি তারে সব, ফিরে পেতে দিইনিকো ঋণ!

    ওগো উদাসিনী,

    তব সাথে নাহি চলে হাটে বিকিকিনি।

    কারও প্রেম ঘরে টানে, কেহ অবহেলে

    ভিখারী করিয়া দেয় বহুদূরে ঠেলে!

    জানিতে আসিনি আমি, নিমেষের ভুলে

    কখনও বসেছ কি না সেই নদী-কূলে,

    যার ভাটি-টানে–

    ভেসে যায় তরী মোর দূর শূন্যপানে।

    চাহি না তো কোন কিছু, তবু কেন রয়ে রয়ে ব্যথা করে বুক,

    সুখ ফিরি করে ফিরি, তবু নাহি সহা যায়

    আজি আর এ-দুঃখের সুখ।…

    আপনারে দলিয়া, তোমারে দলিনি কোনদিন,

    আমি যাই, তোমারে আমার ব্যথা দিয়ে গেনু ঋণ।

  • বাতায়ন-পাশে গুবাক-তরুর সারি

    বাতায়ন-পাশে গুবাক-তরুর সারি

    বাতায়ন-পাশে গুবাক-তরুর সারি

    বিদায়, হে মোর বাতায়ন-পাশে নিশীথ জাগার সাথী!

    ওগো বন্ধুরা, পাণ্ডুর হয়ে এল বিদায়ের রাতি!

    আজ হতে হল বন্ধ আমার জানালার ঝিলিমিলি,

    আজ হতে হল বন্ধ মোদের আলাপন নিরিবিলি।…

    অস্ত-আকাশ-অলিন্দে তার শীর্ণ কপোল রাখি

    কাঁদিতেছে চাঁদ, ‘মুসাফির জাগো, নিশি আর নাই বাকি!’

    নিশীথিনী যায় দূর বন-ছায়, তন্দ্রায় ঢুলুঢুল্,

    ফিরে ফিরে চায়, দু’ হাতে জড়ায় আঁধারের এলোচুল।–

    চমকিয়া জাগি, ললাটে আমার কাহার নিশাস লাগে?

    কে করে বীজন তপ্ত ললাটে, কে মোর শিয়রে জাগে?

    জেগে দেখি, মোর বাতায়ন পাশে জাগিছ স্বপনচারী

    নিশীথ রাতের বন্ধু আমার গুবাক-তরুর সারি!

    তোমাদের আর আমার আঁখির পল্লব-কম্পনে

    সারা রাত মোরা কয়েছি যে কথা, বন্ধু, পড়িছে মনে!–

    জাগিয়া একাকী জ্বালা করে আঁখি আসিত যখন জল,

    তোমাদের পাতা মনে হত যেন সুশীতল করতল

    আমার প্রিয়ার! –তোমার শাখার পল্লবমর্মর

    মনে হত যেন তারই কণ্ঠের আবেদন সকাতর।

    তোমার পাতায় দেখেছি তাহারই আঁখির কাজল-লেখা,

    তোমার দেহেরই মতন দীঘল তাহার দেহের রেখা।

    তব ঝির ঝির মির মির যেন তারই কুণ্ঠিত বাণী,

    তোমায় শাখায় ঝুলানো তারির শাড়ি আঁচলখানি।

    – তোমার পাখার হাওয়া

    তারি অঙ্গুলি-পরশের মত নিবিড় আদর-ছাওয়া!

    ভাবিতে ভাবিতে ঢুলিয়া পড়েছি ঘুমের শ্রান্ত কোলে,

    ঘুমায়ে স্বপন দেখেছি,–তোমারি সুনীল ঝালর দোলে

    তেমনি আমার শিথানের পাশে। দেখেছি স্বপনে, তুমি

    গোপনে আসিয়া গিয়াছ আমার তপ্ত ললাট চুমি।

    হয়ত স্বপনে বাড়ায়েছি হাত লইতে পরশখানি,

    বাতায়নে ঠেকি ফিরিয়া এসেছে, লইয়াছি লাজে টানি।

    বন্ধু, এখন রুদ্ধ করিতে হইবে সে বাতায়ন!

    ডাকে পথ, হাঁকে যাত্রীরা, ‘করো বিদায়ের আয়োজন!’

    –আজি বিদায়ের আগে

    আমারে জানাতে তোমারে জানিতে কত কী যে সাধ জাগে!

    মর্মের বাণী শুনি তব, শুধু মুখের ভাষায় কেন

    জানিতে চায় ও বুকের ভাষারে লোভাতুর মন হেন?

    জানি–মুখে মুখে হবে না মোদের কোনদিন জানাজানি,

    বুকে বুকে শুধু বাজাইবে বীণা বেদনার বীণাপানি!

    হয়ত তোমারে দেখিয়াছি, তুমি যাহা নাও তাই করে,

    ক্ষতি কী তোমার, যদি গো আমার তাতেই হৃদয় ভরে?

    সুন্দর যদি করে গো তোমারে আমার আঁখির জল,

    হারা-মোমতাজে লয়ে কারও প্রেমে রচে যদি তাজ-ম’ল,

    –বল তাহে কার ক্ষতি?

    তোমারে লইয়া সাজাব না ঘর, সৃজিব অমরাবতী!…

    হয়ত তোমার শাখায় কখনও বসেনি আসিয়া পাখী,

    তোমার কুঞ্জে পত্রপুঞ্জে কোকিল ওঠেনি ডাকি।

    শূন্যের পানে তুলিয়া ধরিয়া পল্লব-আবেদন

    জেগেছে নিশীথে জাগেনিকো সাথে খুলি কেহ বাতায়ন।

    –সব আগে আমি আসি

    তোমারে চাহিয়া জেগেছি নিশীথ, গিয়াছি গো ভালবাসি!

    তোমার পাতায় লিখিলাম আমি প্রথম প্রণয়-লেখা

    এইটুকু হোক সান্ত্বনা মোর, হোক বা না হোক দেখা।…

    তোমাদের পানে চাহিয়া বন্ধু, আর আমি জাগিব না।

    কোলাহল করি সারা দিনমান কারও ধ্যান ভাঙিব না।

    –নিশ্চল নিশ্চুপ

    আপনার মনে পুড়িব একাকী গন্ধবিধুর ধূপ।–

    শুধাইতে নাই, তবুও শুধাই আজিকে যাবার আগে–

    ঐ পল্লব-জাফ্‌রি খুলিয়া তুমিও কি অনুরাগে

    দেখেছ আমারে–দেখিয়াছি যবে আমি বাতায়ন খুলি?

    হাওয়ায় না মোর অনুরাগে তবপাতা উঠিয়াছে দুলি?

    তোমার পাতার হরিত আঁচলে চাঁদনী ঘুমাবে যবে,

    মূর্ছিতা হবে সুখের আবেশে, –সে আলোর উৎসবে

    মনে কি পড়িবে এই ক্ষণিকের অতিথির কথা আর?

    তোমার নিশাস শূন্য এ ঘরে করিবে কি হাহাকার?

    চাঁদের আলোক বিস্বাদ কি গো লাগিবে সেদিন চোখে?

    খড়খড়ি খুলি চেয়ে রবে দূর অস্ত অলখ-লোকে?–

    – অথবা এমনি করি

    দাঁড়ায়ে রহিবে আপন ধেয়ানে সারা দিনমান ভরি?

    মলিন মাটির বন্ধনে বাঁধা হায় অসহায় তরু,

    পদতলে ধূলি, ঊর্ধ্বে তোমার শূন্য গগন-মরু।

    দিবসে পুড়িছ রৌদ্রের দাহে, নিশীথে ভিজিছ হিমে,

    কাঁদিবারও নাই শকতি, মৃত্যু-আফিমে পড়িছ ঝিমে!

    তোমার দুঃখ তোমারেই যদি, বন্ধু, ব্যথা না হানে,

    কী হবে রিক্ত চিত্ত ভরিয়া আমার ব্যথার দানে!…

    * * *

    ভুল করে কভু আসিলে স্মরণে অমনি তা যেও ভুলি।

    যদি ভুল করে কখনও এ মোর বাতায়ন যায় খুলি,

    বন্ধ করিয়া দিও পুন তায়! … তোমার জাফ্‌রি-ফাঁকে

    খুঁজো না তাহারে গগন-আঁধারে–মাটিতে পেলে না যাকে!

  • কর্ণফুলী

    কর্ণফুলী

    কর্ণফুলী

    ওগো ও কর্ণফুলী,

    উজাড় করিয়া দিনু তব জলে আমার অশ্রুগুলি।

    যে লোনা জলের সিন্ধু-সিকতে নিতি তব আনাগোনা,

    আমার অশ্রু লাগিবে না সখী তার চেয়ে বেশি লোনা!

    তুমি শুধু জল করো টলমল; নাই তব প্রয়োজন

    আমার দু-ফোঁটা অশ্রুজলের এ গোপন আবেদন।

    যুগ যুগ ধরি বাড়াইয়া বাহু তব দু’ ধারের তীর

    ধরিতে চাহিয়া পারেনি ধরিতে, তব জল-মঞ্জীর

    বাজাইয়া তুমি ওগো গর্বিতা চলিয়াছ নিজ পথে!

    কূলের মানুষ ভেসে গেল কত তব এ অকূল স্রোতে!

    তব কূলে যারা নিতি রচে নীড় তারাই পেল না কূল,

    দিশা কি তাহার পাবে এ অতিথি দুদিনের বুলবুল?

    – বুঝি প্রিয় সব বুঝি,

    তবু তব চরে চখা কেঁদে মরে চখিরে তাহার খুঁজি!

    * * *

    তুমি কি পদ্মা, হারানো গোমতী, ভোলে যাওয়া ভাগিরথী–

    তুমি কি আমার বুকের তলার প্রেয়সী অশ্রুমতী?

    দেশে দেশে ঘুরে পেয়েছি কি দেখা মিলনের মোহানায়,

    স্থলের অশ্রু নিশেষ হইয়া যথায় ফুরায়ে যায়?

    ওরে পার্বতী উদাসিনী, বল্ এ গৃহ-হারারে বল্,

    এই স্রোত তোর কোন পাহাড়ের হাড়-গলা আঁখি-জল?

    বজ্র যাহারে বিঁধিতে পারেনি, উড়াতে পারেনি ঝড়,

    ভূমিকম্পে যে টলেনি, করেনি মহাকালেরে যে ডর,

    সেই পাহাড়ের পাষাণের তলে ছিল এত অভিমান?

    এত কাঁদে তবু শুকায় না তার চোখের জলের বান?

    তুই নারী, তুই বুঝিবি না নদী পাষাণ নরের ক্লেশ,

    নারী কাঁদে–তার সে-আঁখিজলের একদিন শেষ।

    পাষাণ ফাটিয়া যদি কোনদিন জলের উৎস বহে,

    সে জলের ধারা শাশ্বত হয়ে রহে রে চির-বিরহে!

    নারীর অশ্রু নয়নের শুধু; পুরুষের আঁখি-জল

    বাহিরায় গলে অন্তর হতে অন্তরতম তল!

    আকাশের মত তোমাদের চোখে সহসা বাদল নেমে

    রৌদ্রের তাত ফুটে ওঠে সখী নিমেষে সে মেঘ থেমে!

    * * *

    –ওগো ও কর্ণফুলী!

    তোমার সলিলে পড়েছিল কবে কার কান-ফুল খুলি?

    তোমার স্রোতের উজান ঠেলিয়া কোন তরুণী কে জানে,

    ‘সাম্পান’-নায়ে ফিরেছিল তার দয়িতের সন্ধানে?

    আনমনা তার খুলে গেল খোঁপা, কান-ফুল গেল খুলি,

    সে ফুল যতনে পরিয়া কর্ণে হলে কি কর্ণফুলী ?

    যে গিরি গলিয়া তুমি বও নদী, সেথা কি আজিও রহি

    কাঁদিছে বন্দী চিত্রকূটের যক্ষ চির-বিরহী?

    তব এত জল একি তারই সেই মেঘদূত-গলা বাণী?

    তুমি কি গো তার প্রিয়-বিরহের বিধুর স্মরণখানি?

    ঐ পাহাড়ে কি শরীরে স্মরিয়া ফারেসের ফরহাদ,

    আজিও পাথর কাটিয়া করিছে জিন্দেগি বরবাদ?

    সারা গিরি হল শিরী-মুখ হায়, পাহাড় গলিল প্রেমে,

    গলিল না শিরী! সেই বেদনা কি নদী হয়ে এলে নেমে?

    ঐ গিরি-শিরে মজনুন কি গো আজিও দিওয়ানা হয়ে

    লায়লীর লাগি নিশিদিন জাগি ফিরিতেছে রোয়ে রোয়ে?

    পাহাড়ের বুক বেয়ে সেই জল বহিতেছ তুমি কি গো? –

    দুষ্মন্তের খোঁজে-আসা তুমি শকুন্তলার মৃগ?

    মহাশ্বেতা কি বসিয়াছে সেথা পুণ্ডরীকের ধ্যানে?–

    তুমি কি চলেছ তাহারই সে প্রেম নিরুদ্দেশের পানে?–

    যুগে যুগে আমি হারায়ে প্রিয়ারে ধরণীর কূলে কূলে

    কাঁদিয়াছি যত, সে অশ্রু কি গো তোমাতে উঠেছে দুলে?

    * * *

    – ওগো চির উদাসিনী!

    তুমি শোনো শুধু তোমারই নিজের বক্ষের রিনিরিনি।

    তব টানে ভেসে আসিল যে লয়ে ভাঙা ‘সাম্পান’ তরী,

    চাহনি তাহার মুখ-পানে তুমি কখনও করুণা করি।

    জোয়ারে সিন্ধু ঠেলে দেয় ফেলে তবু নিতি ভাটি-টানে

    ফিরে ফিরে যাও মলিন বয়ানে সেই সিন্ধুরই পানে!

    বন্ধু, হৃদয় এমনই অবুঝ কারও সে অধীন নয়!

    যারে চায় শুধু তাহারেই চায়– নাহি মনে লাজ ভয়।

    বারে বারে যায় তারই দরজায়, বারে বারে ফিরে আসে!

    যে আগুনে পুড়ে মরে পতঙ্গ–ঘোরে সে তাহারই পাশে!

    তব জলে আমি ডুবে মরি যদি, নহে তব অপরাধ,

    তোমার সলিলে মরিব ডুবিয়া, আমারই সে চির-সাধ!‌

    আপনার জ্বালা মিটাতে এসেছি তোমার শীতল তলে,

    তোমারে বেদনা হানিতে আসিনি আমার চোখের জলে!

    অপরাধ শুধু হৃদয়ের সখী, অপরাধ কারও নয়!

    ডুবিতে যে আসে ডুবে সে একাই, তটিনী তেমনই বয়!

    * * *

    সারিয়া এসেছি আমার জীবনে কূলে ছিল যত কাজ,

    এসেছি তোমার শীতল নিতলে জুড়াইতে তাই আজ!

    ডাকনিকো তুমি, আপনার ডাকে আপনি এসেছি আমি

    যে বুকের ডাক শুনেছি শয়নে স্বপনে দিবস-যামি।

    হয়ত আমারে লয়ে অন্যের আজও প্রয়োজন আছে,

    মোর প্রয়োজন ফুরাইয়া গেছে চিরতরে মোর কাছে!

    – সে কবে বাঁচিতে চায়,

    জীবনের সব প্রয়োজন যার জীবনে ফুরায়ে যায়!

    জীবন ভরিয়া মিটায়েছি শুধু অপরের প্রয়োজন,

    সবার খোরাক জোগায়ে নেহারি উপবাসী মোরই মন!

    আপনার পানে ফিরে দেখি আজ–চলিয়া গেছে সময়,

    যা হারাবার তা হারাইয়া গেছে, তাহা ফিরিবার নয়!

    হারায়েছি সব, বাকি আছি আমি, শুধু সেইটুকু লয়ে

    বাঁচিতে পারি না, যত চলি পথে তত উঠি বোঝা হয়ে!

    বহিতে পারি না আর এই বোঝা, নামানু সে ভার হেথা;

    তোমার জলের লিখনে লিখিনু আমার গোপন ব্যথা!

    ভয় নাই প্রিয়, নিমেষে মুছিয়া যাইবে এ জল-লেখা,

    তুমি জল–হেথা দাগ কেটে কভু থাকে না কিছুরই রেখা!

    আমার ব্যথায় শুকায়ে যাবে না তব জল কাল হতে,

    ঘূর্ণাবর্ত জাগিবে না তব অগাধ গভীর স্রোতে।

    হয়ত ঈষৎ উঠিবে দুলিয়া, তারপর উদাসিনী,

    বহিয়া চলিবে তব পথে তুমি বাজাইয়া কিঙ্কিণি!

    শুধু লীলাভরে তেমনই হয়ত ভাঙিয়া চলিবে কূল,

    তুমি রবে, শুধু রবে নাকো আর এ গানের বুলবুল!

    তুষার-হৃদয় অকরুণা ওগো, বুঝিয়াছি আমি আজি–

    দেওলিয়া হয়ে কেন তব তীরে কাঁদে ‘সাম্পান’-মাঝি!

  • শীতের সিন্ধু

    শীতের সিন্ধু

    শীতের সিন্ধু

    ভুলি নাই পুনঃ তাই আসিয়াছি ফিরে

    ওগো বন্ধু, ওগো প্রিয়, তব সেই তীরে!

    কূল-হারা কূলে তব নিমেষের লাগি

    খেলিতে আসিয়া হায় যে কবি বিবাগী

    সকলই হারায়ে গেল তব বালুচরে,–

    ঝিনুক কুড়াতে এসে–গেল আঁখি ভরে

    তব লোনা জল লয়ে, –তব স্রোত-টানে

    ভাসিয়া যে গেল দূর নিরুদ্দেশে পানে!

    ফিরে সে এসেছে আজ বহু বর্ষ পরে,

    চিনিতে পার কি বন্ধু, মনে তারে পড়ে?

    বর্ষার জোয়ারে যারে তব হিন্দোলায়

    দোলাইয়া ফেলে দিলে দুরাশা-সীমায়,

    ফিরিয়া সে আসিয়াছে তব ভাটি-মুখে,

    টানিয়া লবে কি আজ তারে তব বুকে?

    খেলিতে আসিনি বন্ধু, এসেছি এবার

    দেখিতে তোমার রূপ বিরহ-বিথার।

    সেবার আসিয়াছিনু হয়ে কুতূহলী,

    বলিতে আসিয়া–দিনু আপনারে বলি

    কৃপণের সম আজ আসিয়াছি ফিরে

    হারায়েছি মণি যথা সেই সিন্ধু-তীরে!

    ফেরে না তা যা হারায়–মণি-হারা ফণী

    তবু ফিরে ফিরে আসে! বন্ধু গো, তেমনি

    হয়ত এসেছি বৃথা চোর বালুচরে!–

    যে চিতা জ্বলিয়া, –যায় নিভে চিরতরে,

    পোড়া মানুষের মন সে মহাশ্মাশানে

    তবু ঘুরে মরে কেন, –কেন সে কে জানে!

    প্রভাতে ঢাকিয়া আসি কবরের তলে

    তারি লাগি আধ-রাতে অভিসারে চলে

    অবুঝ মানুষ, হায়! –ওগো উদাসীন,

    সে বেদনা বুঝবে না তুমি কোনদিন!

    হয়ত হারানো মণি ফিরে তারা পায়,

    কিন্তু হায়, যে অভাগা হৃদয় হারায়

    হারায়ে সে চিরতরে! এ জনমে তার

    দিশা নাহি মিলে, বন্ধু! –তুমি পারাবার,

    পারাপার নাহি তব, তোমার অতলে

    যা ডোবে তা চিরতরে ডোবে আঁখিজলে!‌

    জানিলে সাঁতার, বন্ধু, হইলে ডুবুরি,

    করিতাম কবে তব বক্ষ হতে চুরি

    রত্নহার! কিন্তু হায় জিনে শুধু মালা

    কী হইবে বাড়াইয়া হৃদয়ের জ্বালা!

    বন্ধু, তব রত্নহার মোর তরে নয়–

    মালার সহিত যদি না মেলে হৃদয়!

    হে উদাসী বন্ধু মোর, চির আত্মভোলা,

    আজি নাই বুকে তব বর্ষার হিন্দোলা!

    শীতের কুহেলি-ঢাকা বিষণ্ণ বয়ানে

    কিসের করুণা মাখা! কূলের সিথানে

    এলায়ে শিথিল দেহ আছ একা শুয়ে,

    বিশীর্ণ কপোল বালু-উপাধানে থুয়ে!

    তোমার কলঙ্কী বঁধু চাঁদ ডুবে যায়

    তেমনই উঠিয়া দূর গগন-সীমায়,

    ছায়া এসে পড়ে তার তোমার মুকুরে,

    কায়াহীন মায়াবীর মায়া বুকে পূরে

    ফুলে ফুলে কূলে কূলে কাঁদ অভিমানে,

    আছাড়ি তরঙ্গ-বাহু ব্যর্থ শূন্য পানে!

    যে কলঙ্কী নিশিদিন ধায় শূন্য পথে–

    সে দেখে না, কোথা, কোন বাতায়ন হতে,

    কে তারে চাহিয়াছে নিতি! সে খুঁজে বেড়ায়

    বুকের প্রিয়ারে ত্যজি পথের প্রিয়ায়!

    ভয় নাই বন্ধু ওগো, আসিনি জানিতে

    অন্ত তব, পেতে ঠাঁই অন্তহীন চিতে!

    চাঁদ না সে চিতা জ্বলে তব উপকূলে–

    কে কবে ডুবিয়া হায়, পাইয়াছে তল?

    এক ভাগ থল সেথা, তিন ভাগ জল!

    এসেছি দেখিতে তারে সেদিন বর্ষায়

    খেলিতে দেখেছি যারে উদ্দাম লীলায়

    বিচিত্র তরঙ্গ-ভঙ্গে! সেদিন শ্রাবণে

    ছলছল জল-চুড়ি-বলয়-কঙ্কণে

    শুনিয়াছি যে-সঙ্গীত, যার তালে তালে

    নেচেছে বিজলি মেঘে, শিখী নীপ-ডালে।

    যার লোভে অতি দূর অস্তদেশ হতে

    ছুটে এসেছিনু এই উদয়ের পথে!–

    ওগো মোর লীলা-সাথী অতীত বর্ষার,

    আজিকে শীতের রাতে নব অভিসার!

    চলে গেছে আজি সেই বরষার মেঘ,

    আকাশের চোখে নাই অশ্রুর উদ‍্‍বেগ,

    গরজে না গুর গুর গগনে সে বাজ,

    উড়ে গেছে দূর বনে ময়ূরীরা আজ,

    রোয়ে রোয়ে বহে নাকো পুবালি বাতাস,

    শ্বসে না ঝাউয়ের শাখে সেই দীর্ঘশ্বাস,

    নাই সেই চেয়ে-থাকা বাতায়ন খুলি

    সেই পথে–মেঘ যথা যায় পথ ভুলি।

    না মানিয়া কাজলের ছলনা নিষেধ

    চোখ ছেপে জল ঝরা, –কপোলের স্বেদ

    মুছিবার ছলে আঁখি-জল মোছা সেই,

    নেই বন্ধু, আজি তার স্মৃতিও সে নেই!

    থর থর কাঁপে আজ শীতের বাতাস,

    সেদিন আশার ছিল যে দীরঘ-শ্বাস–

    আজ তাহা নিরাশায় কেঁদে বলে, হায়–

    ‘ওরে মূঢ়, যে চায় সে চিরতরে যায়!

    যাহারে রাখিবি তুই অন্তরের তলে

    সে যদি হারায় কভু সাগরের জলে

    কে তাহারে ফিরে পায়? নাই, ওরে নাই,

    অকূলের কূলে তারে খুঁজিস বৃথাই!

    যে-ফুল ফোটেনি ওরে তোর উপবনে

    পুবালি হাওয়ার শ্বাসে বরষা-কাঁদনে,

    সে ফুল ফুটিবে না রে আজ শীত-রাতে

    দু’ ফোঁটা শিশির আর অশ্রুজল-পাতে!’

    আমার সান্ত্বনা নাই জানি বন্ধু জানি,

    শুনিতে এসেছি তবু–যদি কানাকানি

    হয় তব কূলে কূলে আমার সে ডাক!

    এ কূলে বিরহ-রাতে কাঁদে চক্রবাক,

    ও কূলে শোনে কি তাহা চক্রবাকী তার?

    এ বিরহ একি শুধু বিরহ একার?

    কুহেলি-গুণ্ঠন টানি শীতের নিশীথে

    ঘুমাও একাকী যবে, নিশব্দ সঙ্গীতে

    ভরে ওঠে দশ দিক, সে নিশীথে জাগি

    ব্যথিয়া ওঠে না বুক কভু কারো লাগি?

    গুণ্ঠন খুলিয়া কভু সেই আধরাতে

    ফিরিয়া চাহ না তব কূলে কল্পনাতে?

    চাঁদ সে তো আকাশের, এই ধরা-কূলে

    যে চাহে তোমায় তারে চাহ না কি ভুলে?

    তব তীরে অগস্ত্যের সম লয়ে তৃষা

    বসে আছি, চলে যায় কত দিবা-নিশা!

    যাহারে করিতে পারি চুমুকেতে পান

    তার পদতলে বসি গাহি শুধু গান!

    জানি বন্ধু, এ ধরার মৃৎপাত্রখানি

    ভরিতে নারিল যাহা–তারে আমি আনি

    ধরিব না এ অধরে! এ মম হিয়ার

    বিপুল শূন্যতা তাহে নহে ভরিবার!

    আসিয়াছি কূলে আজ, কাল প্রাতে ঝুরে

    কূল ছাড়ি চলে যাব দূরে বহুদূরে।

    বল বন্ধু, বল, জয় বেদনার জয়!

    যে-বিরহে কূলে কূলে নাহি পরিচয়,

    কেবলই অনন্ত জল অনন্ত বিচ্ছেদ,

    হৃদয় কেবলই হানে হৃদয়ে নিষেধ;

    যে-বিরহে গ্রহ-তারা শূন্যে নিশিদিন

    ঘুরে মরে; গৃহবাসী হয়ে উদাসীন–

    উল্কা-সম ছুটে যায় অসীমের পথে,

    ছোটে নদী দিশাহারা গিরিচূড়া হতে;

    বারেবারে ফোটে ফুল কণ্টক-শাখায়,

    বারেবারে ছিঁড়ে যায় তবু না ফুরায়

    মালা-গাঁথা যে-বিরহে, যে-বিরহে জাগে

    চকোরী আকাশে আর কুমুদী তড়াগে;

    তব বুকে লাগে নিতি জোয়ারের টান,

    যে-বিষ পিইয়া কণ্ঠে ফুটে ওঠে গান–

    বন্ধু, তার জয় হোক! এই দুঃখ চাহি

    হয়ত আসিব পুনঃ তব কূল বাহি।

    হেরিব নতুন রূপে তোমারে আবার,

    গাহিব নতুন গান। নব অশ্রুহার

    গাঁথিব গোপনে বসি। নয়নের ঝারি

    বোঝাই করিয়া দিব তব তীরে ডারি।

    হয়তো বসন্তে পুনঃ তব তীরে তীরে

    ফুটিবে মঞ্জরী নব শুষ্ক তরু-শিরে।

    আসিবে নতুন পাখি শুনাইতে গীতি,

    আসিবে না শুধু একা তব এ অতিথি!

    যেদিন ও বুকে তব শুকাইবে জল,

    নিদারুণ রৌদ্র-দাহে ধুধু মরুতল

    পুড়িবে একাকী তুমি মরূদ্যান হয়ে

    আসবি সেদিন বন্ধু, মম প্রেম লয়ে!

    আঁখির দিগন্তে মোর কুহেলি ঘনায়,

    বিদায়ের বংশী বাজে, বন্ধু গো বিদায়!

  • পথচারী

    পথচারী

    পথচারী

    কে জানে কোথায় চলিয়াছি ভাই মুসাফির পথচারী,

    দুধারে দুকূল দুঃখ-সুখের–মাঝে আমি স্রোত-বারি!

    আপনার বেগে আপনি ছুটেছি জন্ম-শিখর হতে

    বিরাম-বিহীন রাত্রি ও দিন পথ হতে আন্‌পথে।

    নিজ বাস হল চির-পরবাস, জন্মের ক্ষণপরে

    বাহিরিনু পথে গিরি-পর্বতে–ফিরি নাই আর ঘরে!

    পলাতকা শিশু জন্মিয়াছিনু গিরি-কন্যার কোলে,

    বুকে না ধরিতে চকিতে ত্বরিতে আসিলাম ছুটে চলে।

    জননীরে ভুলি যে পথে পলায় মৃগ-শিশু বাঁশি শুনি,

    যে পথে পালায় শশকেরা শুনি ঝর্ণার ঝুনঝুনি,

    পাখি উড়ে যায় ফেলিয়া কুলায় সীমাহীন নভোপানে,

    সাগর ছাড়িয়া মেঘের শিশুরা পলায় আকাশ-যানে,–

    সেই পথ ধরে পলাইনু আমি! সেই হতে ছুটে চলি

    গিরি দরী মাঠ পল্লীর বাট সোজা বাঁকা শত গলি।

    – কোন গ্রহ হতে ছিঁড়ি

    উল্কার মত ছুটেছি বাহিয়া সৌর-লোকের সিঁড়ি!

    আমি ছুটে যাই জানি না কোথায়, ওরা মোর দুই তীরে

    রচে নীড়, ভাবে উহাদেরই তরে এসেছি পাহাড় চিরে।

    উহাদের বধূ কলস ভরিয়া নিয়ে যায় মোর বারি,

    আমার গহনে গাহন করিয়া বলে সন্তাপ-হারী!

    উহারা দেখিল কেবলই আমার সলিলের শীতলতা,

    দেখে নাই–জ্বলে কত চিতাগ্নি মোর কূলে কূলে কোথা!

    –হায়, কত হতভাগী –

    আমিই কি জানি–মরিল ডুবিয়া আমার পরশ মাগি!

    বাজিয়াছে মোরা তটে-তটে জানি ঘটে-ঘটে কিঙ্কিণী,

    জল-তরঙ্গে বেজেছে বধূর মধুর রিনিকি ঝিনি।

    বাজায়াছে বেণু রাখাল-বালক তীর-তরুতলে বসি,

    আমার সলিলে হেরিয়াছে মুখ দূর আকাশের শশী।

    জানি সব জানি, ওরা ডাকে মোরে দু’ তীরে বিছায়ে স্নেহ,

    দীঘি হতে ডাকে পদ্মমুখীরা, ‘থির হও বাঁধি গেহ!’

    আমি বয়ে যাই—বয়ে যাই আমি কুলুকুলু কুলুকুলু,

    শুনি না–কোথায় মোরই তীরে হায় পুরনারী দেয় উলু।

    সদাগর-জাদি মণি-মাণিক্যে বোঝাই করিয়া তরী

    ভাসে মোর জলে,–‘ছলছল’ বলে আমি দূরে যাই সরি!

    আঁকড়িয়া ধরে দু’ তীর বৃথাই জড়ায়ে তন্তুলতা,

    ওরা দেখে নাই আবর্ত মোর, মোর অন্তর-ব্যথা।

    লুকাইয়া আসে গোপনে নিশীথে কূলে মোর অভাগিনী,

    আমি বলি চল্ ছল্ ছল্ ছল্ ওরে বধূ তোরে চিনি!

    কূল ছেড়ে আয় রে অভিসারিকা, মরণ-অকূলে ভাসি!

    মোর তীরে-তীরে আজও খুঁজে ফিরে তোরে ঘরছাড়া বাঁশি।

    সে পড়ে ঝাঁপায়ে জলে,

    আমি পথে ধাই–সে কবে হারায় স্মৃতির বালুকা-তলে!

    জানি নাকো হায় চলেছি কোথায় অজানা আকর্ষণে,

    চলেছি যতই তত সে অথই বাড়ে জল ক্ষণে ক্ষণে।

    সম্মুখ-টানা ধাই অবিরাম, নাই নাই অবসর,

    ছুঁইতে হারাই–এই আছে নাই–এই ঘর এই পর!

    ওরে চল্ চল্ ছল্ ছল্ ছল্ কী হবে ফিরায়ে আঁখি?

    তোরই তীরে ডাকে চক্রবাকেরে তোরই সে চক্রবাকী!

    ওরা সন্ধ্যায় ঘরে ফিরে যায় কূলের কুলায়-বাসী,

    আঁচল ভরিয়া কুড়ায়ে আমার কাদায়-ছিটানো হাসি।

    ওরা চলে যায়, আমি জাগি হায় লয়ে চিতাগ্নি শব,

    ব্যথা-আবর্ত মোচড় খাইয়া বুকে করে কলরব!

    ওরে বেনোজল, ছল্ ছল্ ছল্ ছুটে চল্ ছুটে চল্!

    হেথা কাদাজল পঙ্কিল তোরে করিতেছে অবিরল।

    কোথা পাবি হেথা লোনা আঁখিজল, চল্ চল্ পথচারী!

    করে প্রতীক্ষা তোর তরে লোনা সাত-সমুদ্র-বারি!

  • মিলন-মোহনায়

    মিলন-মোহনায়

    মিলন-মোহনায়

    হায় হাবা মেয়ে, সব ভুলে গেলি দয়িতের কাছে এসে!

    এত অভিমান এত ক্রন্দন সব গেল জলে ভেসে!

    কূলে কূলে এত ভুলে ফুলে কাঁদা আছড়ি-পিছাড়ি তোর,

    সব ভুলে গেলি যেই বুকে তোরে টেনে নিল মনোচোর!

    সিন্ধুর বুকে লুকাইলি মুখ এমনই নিবিড় করে,

    এমনই করিয়া হারাইলি তুই আপনারে চিরতরে–

    যে দিকে তাকাই নাই তুই নাই! তোর বন্ধুর বাহু

    গ্রাসিয়াছে তোরে বুকের পাঁজরে–ক্ষুধাতুর কাল রাহু!

    বিরহের কূলে অভিমান যার এমন ফেনায়ে উঠে,

    মিলনের মুখে সে ফিরে এমনই পদতলে পড়ে লুটে?

    এমনই করিয়া ভাঙিয়া পড়ে কি বুক-ভাঙা কান্নায়,

    বুকে বুক রেখে নিবিড় বাঁধনে পিষে গুঁড়ো হয়ে যায়?

    তোর বন্ধুর আঙুলের ছোঁয়া এমনই কি জাদু জানে,

    আবেশে গলিয়া অধর তুলিয়া ধরিলি অধর পানে!

    একটি চুমায় মিটে গেল তোর সব সাধ সব তৃষা,

    ছিন্ন লতার মতন মুরছি পড়িলি হারায়ে দিশা!

    – একটি চুমার লাগি

    এতদিন ধরে এত পথ বেয়ে এলি বেয়ে এলি কি রে হতভাগী?

    গাঙ-চিল আর সাগর-কপোত মাছ ধরিবার ছলে,

    নিলাজি লো, তোর রঙ্গ দেখিতে ঝাঁপ দিয়ে পড়ে জলে।

    দু’ধারের চর অবাক হইয়া চেয়ে আছে তোর মুখে,

    সবার সামনে লুকাইলি মুখ কেমনে বঁধুর বুকে?

    নীলিম আকাশে ঝুঁকিয়া পড়িয়া মেঘের গুণ্ঠন ফেলে

    বৌ-ঝির মত উঁকি দিয়ে দেখে কুতূহলী-আঁখি মেলে।

    ‘সাম্পান’-মাঝি খুঁজে ফেরে তোর ভাটিয়ালি গানে কাঁদি,

    খুঁজিয়া নাকাল দু’ধারের খাল–তোর হেরেমের বাঁদি!

    হায় ভিখারিণী মেয়ে,

    ভুলিলি সবারে, ভুলিলি আপনা দয়িতেরে বুকে পেয়ে!

    তোরই মত নদী আমি নিরবধি কাঁদি রে প্রীতম লাগি,

    জন্ম-শিখর বাহিয়া চলেছি তাহারই মিলন মাগি!

    যার তরে কাঁদি–ধার করে তারই জোয়ারের লোনা জল

    তোর মত মোর জাগে না রে কভু সাধের কাঁদন-ছল।

    আমার অশ্রু একাকী আমার, হয়ত গোপনে রাতে

    কাঁদিয়া ভাসাই, ভেসে ভেসে যাই মিলনের মোহানাতে,

    আসিয়া সেথায় পুনঃ ফিরে যাই।–তোর মত সব ভুলে

    লুটায়ে পড়ি না–চাহে না যে মোরে তারই রাঙ্গা পদমূলে!

    যারে চাই তারে কেবলই এড়াই কেবলই দি তারে ফাঁকি;

    সে যদি ভুলিয়া আঁখি পানে চায় ফিরাইয়া লই আঁখি!

    –তার তীরে যবে আসি

    অশ্রু-উৎসে পাষাণ চাপিয়া অকারণে শুধু হাসি!

    অভিমানে মোর আঁখিজল জমে করকা-বৃষ্টি2 সম,

    যারে চাই তারে আঘাত হানিয়া ফিরে যায় নির্মম!

    একা মোর প্রেম ছুটিবে কেবলই নিচু প্রান্তর বেয়ে,

    সে কভু ঊর্ধ্বে আসিবে না উঠে আমার পরশ চেয়ে–

    চাহি না তাহারে! বুকে চাপা থাকা আমার বুকের ব্যথা,

    যে বুক শূন্য নহে মোরে চাহি–হব নাকো ভার সেথা!

    সে যদি না ডাকে কী হবে ডুবিয়া ও-গভীর কালো নীরে,

    সে হউক সুখী, আমি রচে যাই স্মৃতি-তাজ তার তীরে!

    মোর বেদনার মুখে চাপিয়াছি নিতি যে পাষাণ-ভার!

    তা দিয়ে রচিব পাষাণ-দেউল সে পাষাণ-দেবতার!

    কত স্রোতধারা হারাইছে কূল তার জলে নিরবধি,

    আমি হারালাম বালুচরে তার, গোপন-ফাল্গুনদী!

  • গানের আড়াল

    গানের আড়াল

    গানের আড়াল

    তোমার কণ্ঠে রাখিয়া এসেছি মোর কণ্ঠের গান–

    এইটুকু শুধু রবে পরিচয়? আর সব অবসান?

    অন্তর-তলে অন্তরতর যে ব্যথা লুকায়ে রয়,

    গানের আড়ালে পাও নাই তার কোনদিন পরিচয়?

    হয়ত কেবলই গাহিয়াছি গান, হয়ত কহিনি কথা,

    গানের বাণী সে শুধু কি বিলাস, মিছে তার আকুলতা?

    হৃদয়ে কখন জাগিল জোয়ার, তাহারই প্রতিধ্বনি

    কণ্ঠের তটে উঠেছে আমার অহরহ রনরনি,–

    উপকূলে বসে শুনেছ সে সুর, বোঝ নাই তার মানে?

    বেঁধেনি হৃদয়ে সে সুর, দুলেছে দুল হয়ে শুধু কানে?

    হায়, ভেবে নাহি পাই–

    যে চাঁদ জাগালো সাগরে জোয়ার, সেই চাঁদই শোনে নাই

    সাগরের সেই ফুলে ফুলে কাঁদা কূলে কূলে নিশিদিন?

    সুরের আড়ালে মূর্ছনা কাঁদে, শোন নাই তাহা বীণ?

    আমার গানের মালার সুবাস ছুঁল না হৃদয়ে আসি?

    আমার বুকের বাণী হল শুধু তব কণ্ঠের ফাঁসি?

    বন্ধু গো যেও ভুলে–

    প্রভাতে যে হবে বাসি, সন্ধ্যায় রেখো না সে ফুল তুলে!

    উপবনে তব ফোটে যে গোলাপ–প্রভাতেই তুমি জাগি

    জানি, তার কাছে যাও শুধু তার গন্ধ-সুষমা লাগি।

    যে কাঁটা-লতায় ফুটেছে সে-ফুল রক্তে ফাটিয়া পড়ি,

    সারা জনমের ক্রন্দন যার ফুটিয়াছে শাখা ভরি–

    দেখ নাই তারে! –মিলন-মালার ফুল চাহিয়াছ তুমি,

    তুমি খেলিয়াছ বাজাইয়া মোর বেদনার ঝুম্‌ঝুমি!

    ভোলো মোর গান, কী হবে লইয়া এইটুকু পরিচয়,

    আমি শুধু তব কণ্ঠের হার, হৃদয়ের কেহ নয়!

    জানাও আমারে, যদি আসে দিন, এইটুকু শুধু যাচি–

    কণ্ঠ পারায়ে হয়েছি তোমার হৃদয়ের কাছাকাছি!

  • ভীরু

    ভীরু

    ভীরু3

    আমি জানি তুমি কেন চাহ না কো ফিরে।

    গৃহকোণ ছাড়ি আসিয়াছ আজ দেবতার মন্দিরে।

    পুতুল লইয়া কাটিয়াছে বেলা

    আপনারে লয়ে শুধু হেলা-ফেলা,

    জানিতে না, আছে হৃদয়ের খেলা আকুল নয়ন-নীরে,

    এত বড় দায় নয়নে নয়নে নিমেষের চাওয়া কি রে?

    আমি জানি তুমি কেন চাহ না কো ফিরে॥

    আমি জানি তুমি কেন চাহ না কো ফিরে।

    জানিতে না আঁখি আঁখিতে হারায় ডুবে যায় বাণী ধীরে।

    তুমি ছাড়া আর ছিল না কো কেহ

    ছিল না বাহির ছিল শুধু গেহ,

    কাজল ছিল গো জল ছিল না ও জল আঁখির তীরে।

    সে দিনো চলিতে ছলনা বাজেনি ও-চরণ-মঞ্জীরে।

    আমি জানি তুমি কেন চাহ না কো ফিরে॥

    আমি জানি তুমি কেন চাহ না কো ফিরে।

    সে দিনো তোমার বনপথে যেতে পায়ে জড়াত না লতা।

    সে দিনো বেভুল তুলিয়াছ ফুল

    ফুল বিধিঁতে গো বিঁধেনি আঙুল,

    মালার সাথে যে হৃদয়ও শুকায়, জানিতে না সে বারতা।

    জানিতে না, কাঁদে মুখর মুখের আড়ালে নিঃসঙ্গতা!

    আমি জানি তুমি কেন চাহ না কো ফিরে॥

    আমি জানি তব কপটতা, চতুরালি!

    তুমি জানিতে না, ও কপালে থাকে ডালিম-দানার লালী!

    জানিতে না ভীরু রমণীর মন

    মধুকর-ভারে লতার মতন

    কেঁপে মরে কথা কণ্ঠে জড়ায়ে নিষেধ করে গো খালি।

    আঁখি যত চায় তত লজ্জায় লজ্জা পাড়ে গো গালি!

    আমি জানি তব কপটতা, চতুরালি!

    আমি জানি, ভীরু! কিসের এ বিস্ময়।

    জানিতে না কভু নিজেরে হেরিয়া নিজেরি করে যে ভয়।

    পুরুষ পুরুষ—শুনেছিলে নাম,

    দেখেছ পাথর করোনি প্রণাম,

    প্রণাম করেছ লুব্ধ দু-করে চেয়েছে চরণ-ছোঁয়।

    জানিতে না, হিয়া পাথর পরশি পরশ-পাথরও হয়!

    আমি জানি, ভীরু, কিসের এ বিস্ময়॥

    কিসের তোমার শঙ্কা এ, আমি জানি।

    পুরানের ক্ষুধা দেহের দু’তীরে করিতেছ কানাকানি।

    বিকচ বুকের বকুল-গন্ধ

    পাপড়ি রাখিতে পারে না বন্ধ,

    যত আপনারে লুকাইতে চাও তত হয় জানাজানি।

    অপাঙ্গে আজ ভীড় করেছে গো লুকানো যতেক বাণী।

    কিসের তোমার শঙ্কা এ, আমি জানি॥

    আমি জানি, কেন বলিতে পারো না খুলি।

    গোপনে তোমায় আবেদন তার জানায়েছ বুলবুলি।

    যে-কথা শুনিতে মনে ছিল সাধ

    কেমনে সে পেল তারি সংবাদ?

    সেই কথা বঁধু তেমনি করিয়া বলিল নয়ন তুলি।

    কে জানিত এত জাদু-মাখা তার ও কঠিন অঙ্গুলি।

    আমি জানি কেন বলিতে পারো না খুলি॥

    আমি জানি তুমি কেন যে নিরাভরণা,

    ব্যথার পরশে হয়েছে তোমার সকল অঙ্গ সোনা।

    মাটির দেবীরে পরায় ভূষণ,

    সোনার সোনায় কি-বা প্রয়োজন?

    দেহ-কুল ছাড়ি নেমেছে মনের অকুল নিরঞ্জনা।

    বেদনা আজিকে রূপেরে তোমার করিতেছে বন্দনা।

    আমি জানি তুমি কেন যে নিরাভরণা॥

    আমি জানি, ওরা বুঝিতে পারে না তোরে।

    নিশীথে ঘুমালে কুমারী বালিকা, বধূ জাগিয়াছে ভোরে!

    ওরা সাঁতরিয়া ফিরিতেছে ফেনা,

    শুক্তি যে ডোবে—বুঝিতে পারে না!

    মুক্তা ফলেছে—আঁখির ঝিনুক চুবেছে আঁখির লোরে।

    বোঝা কত ভার হলে—হৃদয়ের ভরাডুবি হয়, ওরে,

    অভাগিনী নারী, বুঝাবি কেমন করে॥

    কৃষ্ণনগর

    ৩২ শ্রাবণ, ১৩৩৪

  • এ মোর অহঙ্কার

    এ মোর অহঙ্কার

    এ মোর অহঙ্কার1

    নাই বা পেলাম আমার গলায় তোমার গলার হার,

    তোমায় আমি করব সৃজন, এ মোর অহঙ্কার!

    এমনি চোখের দৃষ্টি দিয়া

    তোমায় যারা দেখল প্রিয়া,

    তাদের কাছে তুমি তুমিই। আমার স্বপনে

    তুমি নিখিল রূপের রাণী মানস-আসনে!–

    সবাই যখন তোমায় ঘিরে করবে কলরব,

    আমি দূরে ধেয়ান-লোকে রচব তোমার স্তব।

    রচব সুরধুনী-তীরে

    আমার সুরের উর্বশীরে,

    নিখিল কণ্ঠে দুলবে তুমি গানের কন্ঠ-হার–

    কবির প্রিয়া অশ্রুমতী গভীর বেদনার!

    যেদিন আমি থাকব না কো, থাকবে আমার গান,

    বলবে সবাই, ‘কে সে কবির কাঁদিয়েছিল প্রাণ?’

    আকাশ-ভরা হাজার তারা

    রইবে চেয়ে তন্দ্রাহারা,

    সখার সাথে জাগবে রাতে, চাইবে আকাশে,

    আমার গানে পড়বে মনে আমায় আভাসে!

    বুকের তলা করবে ব্যথা, বলবে কাঁদিয়া,

    ‘বন্ধু! সে কে তোমার গানের মানসী প্রিয়া?’

    হাসবে সবাই, গাইবে গীতি,–

    তুমি নয়ন-জলে তিতি

    নতুন করে আমার গানে আমার কবিতায়

    গহীন নিরালাতে বসে খুঁজবে আপনায়!

    রাখতে যেদিন নারবে ধরা তোমায় ধরিয়া,

    ওরা সবাই ভুলবে তোমায় দুদিন স্মরিয়া,

    আমার গানের অশ্রুজলে

    আমার বাণীর পদ্মদলে

    দুলবে তুমি চিরন্তনী চির-নবীনা!

    রইবে শুধু বাণী, সেদিন রইবে না কো বীণা!

    তৃষ্ণা-‘ফোরাত’-কূলে কবে ‘সাকিনা’-সমা

    এক লহমার হলে বধূ, হায় মনোরমা!

    মুহূর্ত সে কালের রেখা

    আমার গানে রইল লেখা

    চিরকালের তরে প্রিয়! মোর সে শুভক্ষণ

    মরণ-পারে দিল আমায় অনন্ত জীবন।

    নাই বা পেলাম কণ্ঠে আমার তোমার কণ্ঠহার,

    তোমায় আমি করব সৃজন এ মোর অহঙ্কার!

    এই তো আমার চোখের জলে,

    আমার গানে সুরের ছলে,

    কাব্যে আমার, আমার ভাষায়, আমার বেদনায়,

    নিত্যকালের প্রিয়া আমায় ডাকছ ইশারায়!…

    চাই না তোমায় স্বর্গে নিতে, চাই না এ ধূলাতে

    তোমার পায়ে স্বর্গ এনে ভুবন ভুলাতে!

    ঊর্ধ্বে তোমার–তুমি দেবী,

    কি হবে মোর সে-রূপ সেবি!

    চাই না দেবীর দয়া, যাচি প্রিয়ার আঁখিজল,

    একটু দুঃখে অভিমানে নয়ন টলমল!

    যেমন করে খেলতে তুমি কিশোর বয়সে–

    মাটির মেয়ের দিতে বিয়ে মনের হরষে,

    বালু দিয়ে গড়তে গেহ,

    জাগত বুকে মাটির স্নেহ,

    ছিল না তো স্বর্গ তখন সূর্য তারা চাঁদ,

    তেমনি করে খেলবে আবার পাতবে মায়া-ফাঁদ!

    মাটির প্রদীপ জ্বালবে তুমি মাটির কুটিরে,

    খুশির রঙে করবে সোনা ধূলি-মুঠিরে।

    আধখানা চাঁদ আকাশ ’পরে

    উঠবে যবে গরব-ভরে

    তুমি বাকি আধখানা হাসবে ধরাতে,

    তড়িৎ ছিঁড়ে পড়বে তোমার খোঁপায় জড়াতে!

    তুমি আমার বকুল যূঁথী–মাটির তারা-ফুল

    ঈদের প্রথম চাঁদ গো তোমার কানের পারসি দুল!

    কুস্‌মি-রাঙা শাড়িখানি

    চৈতি সাঁঝে পড়বে রাণী,

    আকাশ-গাঙে জাগবে জোয়ার রঙের রাঙা বান,

    তোরণ-দ্বারে বাজবে করুণ বারোয়াঁ মুলতান।

    আমার-রচা গানে তোমায় সেই বেলাশেষে

    এমনই সুরে চাইবে কেহ পরদেশি এসে!

    রঙিন সাঁঝে ঐ আঙিনায়

    চাইবে যারা, তাদের চাওয়ায়

    আমার চাওয়া রইবে গোপন!–এ মোর অভিমান,

    যাচবে যারা তোমায়, রচি তাদের তরে গান!

    নাই বা দিল ধরা আমায় ধরার আঙিনায়,

    তোমায় জিনে গেলাম সুরের স্বয়ংবর-সভায়!

    তোমার রূপে আমার ভুবন

    আলোয় আলোয় হল মগন,

    কাজ কি জেনে কাহার আশায় গাঁথছ ফুল-হার

    আমি তোমায় গাঁথছি মালা এ মোর অহঙ্কার!

    কৃষ্ণনগর

    ২৬ চৈত্র, ১৩৩৪

  • তুমি মোরে ভুলিয়াছ

    তুমি মোরে ভুলিয়াছ

    তুমি মোরে ভুলিয়াছ

    তুমি মোরে ভুলিয়াছ তাই সত্য হোক! –

    সেদিন যে জ্বলেছিল দীপালি-আলোক

    তোমার দেউল জুড়ি – ভুল তাহা ভুল!

    সেদিন ফুটিয়াছিল ভুল করে ফুল

    তোমার অঙ্গনে প্রিয়! সেদিন সন্ধ্যায়

    ভুলে পেরেছিলে ফুল নোটন-খোঁপায়!

      

    ভুল করে তুলি ফুল গাঁথি বর-মালা

    বেলাশেষে বারে বারে হয়েছ উতলা

    হয়তো বা আর কারও লাগি!…আমি ভুলে

    নিরুদ্দেশ তরি মোর তব উপকূলে

    না চাহিতে বেঁধেছিনু, গেয়েছিনু গান,

    নীলাভ তোমার আঁখি হয়েছিল ম্লান

    হয়তো বা অকারণে! গোধূলি বেলায়

    তোমার ও-আঁখিতলে! হয়তো তোমার

    পড়ে মনে, কবে যেন কোন লোকে কার

    বধূ ছিলে ; তারই কথা শুধু মনে পড়ে!

    –ফিরে যাও অতীতের লোক-লোকান্তরে

    এমনই সন্ধ্যায় বসি একাকিনী গেহে!

    দুখানি আঁখির দীপ সুগভীর স্নেহে

    জ্বালাইয়া থাক জাগি তারই পথ চাহি!

    সে যেন আসিছে দূর তারা-লোক বাহি

    পারাইয়া অসীমের অনন্ত জিজ্ঞাসা,

    সে দেখেছে তব দীপ, ধরণির বাসা!

    শাশ্বত প্রতীক্ষমানা অনন্ত সুন্দরী!

    হায়, সেথা আমি কেন বাঁধিলাম তরি,

    কেন গাহিলাম গান আপনা পাসারি?

    হয়তো সে গান মম তোমার ব্যথায়

    বেজেছিল। হয় তো বা লেগেছিল তার পায়

    আমার তরির ঢেউ। দিয়াছিল ধুয়ে

    চরণ-অলক্ত তব। হয়তো বা ছুঁয়ে

    গিয়েছিল কপোলের আকুল কুন্তল

    আমার বুকের শ্বাস। ও-মুখ-কমল

    উঠেছিল রাঙা হয়ে। পদ্মের কেশর

    ছুঁইলে দখিনা বায়, কাঁপে থরথর

    যেমন কমল-দল ভঙ্গুর মৃণালে

    সলাজ সংকোচে সুখে পল্লব-আড়ালে,

    তেমনই ছোঁয়ায় মোর শিহরি শিহরি

    উঠেছিল বারে বারে সারা দেহ ভরি!

    চেয়েছিলে আঁখি তুলি, ডেকেছিল যেন

    প্রিয় নাম ধরে মোর – তুমি জান, কেন!

    তরি মম ভেসেছিল যে নয়ন-জলে

    কূল ছাড়ি নেমে এলে সেই সে অতলে।

    বলিলে,– “অজানা বন্ধু, তুমি কী গো সেই,

    জ্বালি দীপ গাঁথি মালা যার আশাতেই

    কূলে বসে একাকিনী যুগ যুগ ধরি

    নেমে এসো বন্ধু মোর ঘাটে বাঁধ তরি!”

    বিস্ময়ে রহিনু চাহি ও-মুখের পানে

    কী যেন রহস্য তুমি – কী যেন কে জানে –

    কিছুই বুঝিতে নারি! আহ্বানে তোমার

    কেন জাগে অভিমান, জোয়ার দুর্বার

    আমার আঁখির এই গঙ্গা যমুনায়!–

    নিরুদ্দেশ যাত্রী, হায়, আসিলি কোথায়?

    একি তোর ধেয়ানের সেই জাদুলোক,

    কল্পনার ইন্দ্রপুরী? একি সেই চোখ

    ধ্রুবতারাসম যাহা জ্বলে নিরন্তর

    ঊর্ধ্বে তোর? সপ্তর্ষির অনন্ত বাসর?

    কাব্যের অমরাবতী? একি সে ইন্দিরা,

      

    তোরই সে কবিতা-লক্ষ্মী? –বিরহ-অধীরা

    একি সেই মহাশ্বেতা, চন্দ্রপীড়-প্রিয়া?

    উন্মাদ ফরহাদ যারে পাহাড় কাটিয়া

    সৃজিতে চাহিয়াছিল – একি সেই শিঁরী?

    লায়লি এই কি সেই, আসিয়াছে ফিরি

    কায়েসের খোঁজে পুনঃ? কিছু নাহি জানি!

    অসীম জিজ্ঞাসা শুধু করে কানাকানি

    এপারে ওপারে, হায়!…তুমি তুলি আঁখি

    কেবলই চাহিতেছিলে! দিনান্তের পাখি

    বনান্তে কাঁদিতেছিল – ‘কথা কও বউ!’

    ফাগুন ঝুরিতেছিল ফেলি ফুল-মউ!

    কাহারে খুঁজিতেছিলে আমার এ চোখে

    অবসান-গোধূলির মলিন আলোকে?

    জিজ্ঞাসার, সন্দেহের শত আলো-ছায়া

    ও-মুখে সৃজিতেছিল কী যেন কি মায়া!

    কেবলই রহস্য হায়, রহস্য কেবল,

    পার নাই সীমা নাই অগাধ অতল!

    এ যেন স্বপনে-দেখা কবেকার মুখ,

    এ যেন কেবলই সুখ কেবলই এ দুখ!

    ইহারই স্ফুলিঙ্গ যেন হেরি রূপে রূপে,

    এ যেন মন্দার-পুষ্প দেব-অলকায়!

    যখন সবারে ভুলি। ধরার বন্ধন

    যখন ছিঁড়িতে চাহি, স্বর্গের স্বপন

    কেবলই ভুলাতে চায়, এই সে আসিয়া

    রূপে রসে গন্ধে গানে কাঁদিয়া হাসিয়া

    আঁকড়ি ধরিতে চাহে,–মাটির মমতা!

    পরান-পোড়েনি শুধু, জানে নাকো কথা !

    বুকে এর ভাষা নেই, চোখে নাই জল,

    নির্বাক ইঙ্গিত শুদু শান্ত অচপল!

    এ বুঝি গো ভাস্করের পাষাণ-মানসী

    সুন্দর, কঠিন, শুভ্র। ভোরের ঊষসী,

    দিনের আলোর তাপ সহিতে না জানে।

    মাঠের উদাসী সুরে বাঁশরির তানে,

    বাণী নাই, শুধু সুর, শুধু আকুলতা!

    ভাষাহীন আবেদন দেহ-ভরা কথা।

    এ যেন চেনার সাথে অচেনার মিশা, –

    যত দেখি তত হায় বাড়ে শুধু তৃষা।

    আসিয়া বসিলে কাছে দৃপ্ত মুক্তানন,

    মনে হল – আমি দিঘি, তুমি পদ্মবন!

    পূর্ণ হইলাম আজি, হয় হোক ভুল,

    যত কাঁটা তত ফুল, কোথা এর তুল?

    তোমারে ঘিরিয়া রব আমি কালো জল,

    তরঙ্গের ঊর্ধ্বে রবে তুমি শতদল,

    পুজারির পুষ্পাঞ্জলিসম। নিশিদিন

    কাঁদিব ললাট হানি তীরে তৃপ্তিহীন!

    তোমার মৃণাল-কাঁটা আমার পরানে

    লুকায়ে রাখিব, যেন কেহ নাহি জানে।

    …কত কী যে কহিলাম অর্থহীন কথা,

    শত যুগ-যুগান্তের অন্তহীন ব্যথা।

      

    শুনিলে সেসব জাগি বসিয়া শিয়রে,

    বলিলে, “বন্ধু গো হের দীপ পুড়ে মরে

    তিলে তিলে আমাদের সাথে! আর নিশি

    নাই বুঝি, দিবা এলে দূরে যাব মিশি!

    আমি শুধু নিশীথের।” যখন ধরণি

    নীলিমা-মঞ্জুষা খুলি হেরে মুক্তামণি

    বিচিত্র নক্ষত্রমালা – চন্দ্র-দীপ জ্বালি,

    একাকী পাপিয়া কাঁদে ‘চোখ গেল’খালি,

    আমি সেই নিশিথের। – আমি কই কথা,

    যবে শুধু ফোটে ফুল, বিশ্ব তন্দ্রাহতা।

    হয়তো দিবসে এলে নারিব চিনিতে,

    তোমারে করিব হেলা, তব ব্যথা-গীতে

    কেবলই পাইবে হাসি সবার সুমুখে,

    কাঁদিলে হাসিব আমি সরল কৌতুকে,

    মুছাব না আঁখি-জল। বলিব সবায়,

    “তুমি শাঙনের মেঘ –যথায় তথায়

    কেবলই কাঁদিয়া ফের, কাঁদাই স্বভাব!

    আমি তো কেতকী নহি, আমার কি লাভ

    ওই শাঙনের জলে? কদম্ব যূথীর

    সখারে চাহি না আমি। শ্বেত-করবীর

    সখী আমি। হেমন্তের সান্ধ্য-কুহেলিতে

    দাঁড়াই দিগন্তে আসি, নিরশ্রু-সংগীতে

    ভরে ওঠে দশ দিক! আমি উদাসিনী।

    মুসাফির! তোমারে তো আমি নাহি চিনি!”

      

    ডাকিয়া উঠিল পিক দূরে আম্রবনে

    মুহুমুহু কুহুকুহু আকুল নিঃস্বনে।

    কাঁদিয়া কহিনু আমি, “শুন, সখী শুন,

    কাতরে ডাকিছে পাখি কেন পুনঃ পুনঃ!

    চলে যাব কোন দূরে, স্বরগের পাখি

    তাই বুঝি কেঁদে ওঠে হেন থাকি থাকি।

    তোমারই কাজল আঁখি বেড়ায় উড়িয়া,

    পাখি নয় – তব আঁখি ওই কোয়েলিয়া!”

      

    হাসিয়া আমার বুকে পড়িলে লুটায়ে,

    বলিলে, –“পোড়ারমুখি আম্রবনচ্ছায়ে

    দিবানিশি ডাকে, শুনে কান ঝালাপালা!

    জানি না তো কুহু-স্বরে বুকে ধরে জ্বালা!

    উহার স্বভাব এই, তোমারই মতন

    অকারণে গাহে গান, করে জ্বালাতন!

    নিশি না পোহাতে বসি বাতায়ন-পাশে

    হলুদ-চাঁপার ডালে, কেবলই বাতাসে

    উহু উহু উহু করি বেদনা জানায়!

    বুঝিতে নারিনু আমি পাখি ও তোমায়!”

      

    নয়নের জল মোর গেল তলাইয়া

    বুকের পাষাণ-তলে। উৎসারিত হিয়া

    সহসা হারাল ধারা তপ্ত মরু-মাঝে।

    আপনারে অভিশাপি ক্ষমাহীন লাজে!

    কহিনু, “কে তুমি নারী, এ কি তব খেলা?

    অকারণে কেন মোর ডুবাইলে ভেলা,

    এ অশ্রু-পাথারে একা দিলে ভাসাইয়া?

    দুহাতে আন্দোলি জল কূলে দাঁড়াইয়া,

    অকরুণা, হাস আর দাও করতালি!

      

    অদূরে নৌবতে বাজে ইমন-ভূপালি

    তোমার তোরণ-দ্বারে কাঁদিয়া কাঁদিয়া,

    – তোমার বিবাহ বুঝি? ওই বাঁশুরিয়া

    ডাকিছে বন্ধুরে তব?” যুঝি ঢেউ সনে

    শুধানু পরান-পণে।…তুমি আনমনে

    বারেক পশ্চাতে চাহি পড়িলে লুটায়ে

    স্রোতজলে, সাঁতরিয়া আসি মম পাশে

    ‘আমিও ডুবিব সাথে’বলিয়া তরাসে

    জড়ায়ে ধরিলে মোরে বাহুর বন্ধনে!…

    হইলাম অচেতন!… কিছু নাই মনে

    কেমনে উঠিনু কূলে!… কবে সে কখন

    জড়াইয়া ধরেছিলে মালার মতন

    নিশীথে পাথার-জলে, – শুধু এইটুকু

    সুখ-স্মৃতি ব্যথা সম চির-জাগরূক

    রহিল বুকের তলে!… আর কিছু নাই!…

    তোমারে খুঁজিয়া ফিরি এ কূলে বৃথাই,

    হে চীর রহস্যময়ী!ও কূলে দাঁড়ায়ে

    তেমনই হাসিছ তুমি সান্ধ্য-বনচ্ছায়ে

    চাহিয়া আমার মুখে! তোমার নয়ন

    বলিছে সদাই যেন, ‘ডুবিয়া মরণ

    এবার হল না, সখা! আজও যায় সাধ

    বাঁচিতে ধরার পরে। স্বপনের চাঁদ

    হয়তো বা দিবে ধরা জাগ্রত এলোকে,

    হয়তো নামিবে তুমি অশ্রু হয়ে চোখে,

    আসিবে পথিক-বন্ধু হয়ে প্রিয়তম

    বুকের ব্যাথায় মোর – পুষ্পে গন্ধ সম!

    অঞ্জলি হইতে নামি তোমার পূজার

    জড়াইয়া রব বক্ষে হয়ে কণ্ঠহার!’

      

    নিশীথের বুক-চেরা তব সেই স্বর,

    সেই মুখ সেই চোখ করুণা-কাতর

    পদ্মা-তীরে-তীরে রাতে আজও খুঁজে ফিরি!

    কত নামে ডাকি তোমা, – “মহাশ্বেতা, শিঁরী,

    লায়লি, বকৌলি, তাজ, দেবী, নারী, প্রিয়া!”

    – সাড়া নাহি মিলে কারও! ফুলিয়া ফুলিয়া

    বয়ে যায় মেঘনার তরঙ্গ বিপুল,

    কখনও এ-কূল ভাঙে কখনও ও-কূল!

    পার হতে নারি এই তরঙ্গের বাধা,

    ও যেন ‘এসো না’ বলে পায়ে ধরে-কাঁদা

    তোমার নয়ন-স্রোত! ও যেন নিষেধ,

    বিধাতার অভিশাপ, অনন্ত বিচ্ছেদ,

    স্বর্গ ও মর্ত্যের মাঝে যেন যবনিকা!…

    আমাদের ভাগ্যে বুঝি চিররাত্রি লিখা!

    নিশীথের চখাচখি, দুইপারে থাকি

    দুইজনে দুইজন ফিরি সদা ডাকি!

    কোথা তুমি? তুমি কোথা? যেন মনে লাগে,

    কত যুগ দেখি নাই! কত জন্ম আগে

    তোমারে দেখেছি কোন নদীকূলে গেহে,

    জ্বালো দীপ বিষাদিনী ক্লান্ত শ্রান্ত দেহে!

    বারে বারে কাঁপে, আকাশ-দীপিকা

    কাঁপে তারারাজি – যেন আঁখি-পাতা তব,–

    এইটুকু পড়ে মনে! কবে অভিনব

    উঠিলে বিকশি তুমি আমার মাঝে,

    দেখি নাই! দেখিব না – কত বিনা কাজে

    নিজেরে আড়াল করি রাখিছ সতত

    অপ্রকাশ সুগোপন বেদনার মতো।

    আমি হেথা কূলে কূলে ফিরি আর কাঁদি,

    কুড়ায়ে পাব না কিছু? বুকে যাহা বাঁধি

    তোমার পরশ পাব – একটু সান্ত্বনা!

    চরণ-অলক্ত-রাঙা দুটি বালুকণা,

    একটি নূপুর, ম্লান বেণি-খসা ফুল,

    করবীর সোঁদা-ঘষা পরিমল-ধুল,

    আধখানি ভাঙা চুড়ি রেশমি কাচের,

    দলিত বিশুষ্ক মালা নিশি-প্রভাতের,

    তব হাতে লেখা মম প্রিয় ডাক-নাম

    লিখিয়া ছিঁড়িয়া-ফেলা আধখানি খাম,

    অঙ্গের সুরভি-মাখা ত্যক্ত তপ্ত বাস,

    মহুয়ার মদ সম মদির নিশ্বাস

    পুরবের পরিস্থান হতে ভেসে-আসা, –

    কিছুই পাব না খুঁজি? কেবলই দুরাশা।

    কাঁদিবে পরান ঘিরি? নিরুদ্দেশ পানে

    কেবলই ভাসিয়া যাব শ্রান্ত ভাটি-টানে?

    তুমি বসি রবে ঊর্ধ্বে মহিম-শিখরে

    নিষ্প্রাণ পাষাণ-দেবী? কভু মোর তরে

    নিষ্প্রাণ পাষাণ-দেবী? কভু মোর তরে

    নামিবে না প্রিয়া-রূপে ধরার ধুলায়?

    লো কৌতুকময়ী! শুধু কৌতুক-লীলায়

    খেলিবে আমারে লয়ে? –আর সবই ভুল?

    ভুল করে ফুটেছিল আঙিনায় ফুল?

    ভুল করে বলেছিলে সুন্দর? অমনি –

    ঢেকেছ দুহাতে মুখ ত্বরিতে তখনই!

    বুঝি কেহ শুনিয়াছে, দেখিয়াছে কেহ

    ভাবিয়া আঁধার কোণে লীলায়িত দেহ

    লুকাওনি সুখে লাজে? কোন শাড়িখানি

    পরেছিলে বাছি বাছি সে সন্ধ্যায় রানি?

    হয়তো ভুলেছ তুমি, আমি ভুলি নাই!

    যত ভাবি ভুল তাহা – তত সে জড়াই

    সে ভুলে সাপিনিসম বুকে ও গলায়!

    বাসি লাগে ফুলমেলা। – ভুলের খেলায়

    এবার খোয়াব সব, করিয়াছি পণ।

    হোক ভুল, হোক মিথ্যা, হোক এ স্বপন,

    –এইবার আপনারে শূন্য রিক্ত করি

    দিয়া যাব মরণের আগে! পাত্র ভরি

    করে যাব সুন্দরের করে বিষপান!

    তোমারে অমর করি করিব প্রয়াণ

    মরণের তীর্থযাত্রী!

        ওগো, বন্ধু প্রিয়,

    এমনই করিয়া ভুল দিয়া ভুলাইয়ো

    বারে বারে জন্মে জন্মে গ্রহে গ্রহান্তরে!

    ও-আঁখি-আলোক যেন ভুল করে পড়ে

    আমার আঁখির পরে। গোধূলি-লগনে

    ভুল করে হই বর, তুমি হও কনে

    ক্ষণিকের লীলা লাগি! ক্ষণিকের চমকি

    অশ্রুর শ্রাবণ-মেঘে হারাইয়া সখী!…

      

    তুমি মোরে ভুলিয়াছ, তাই সত্য হোক!

    নিশি-শেষে নিভে গেছে দীপালি-আলোক!

    সুন্দর কঠিন তুমি পরশ-পাথর

    তোমার পরশ লভি হইনু সুন্দর –

    – তুমি তাহা জানিলে না!

      …সত্য হোক প্রিয়া

    দীপালি জ্বলিয়াছিল – গিয়াছে নিভিয়া!