Author: তাহের আলমাহদী

  • আওরঙ্গজেবের পরিচিতি

    আওরঙ্গজেবের পরিচিতি

    আওরঙ্গজেবের পরিচিতি

    অবিস্মরণীয় আওরঙ্গজেব

    আমি এসেছি অচেনা মানুষ হিসেবে, চলেও যাব অচেনা মানুষের মতো।

    —মৃত্যুর প্রাক্কালে আওরঙ্গজেবের লেখা চিঠি

    মোগল সম্রাট আওরঙ্গজেব ১৭০৭ সালে ৮৮ বছরের পরিণত বয়সে যখন জীবনের পেছন দিকে তাকিয়েছিলেন, তখন তিনি ব্যর্থতাই দেখতে পেয়েছিলেন।

    মৃত্যুশয্যা থেকে আওরঙ্গজেব ছেলেদের কাছে বেশ কিছু মর্মভেদী চিঠি লিখেছিলেন। এসব লেখায় তার অধার্মিকতার জন্য আল্লাহ তাকে শাস্তি দিতে পারেন, এমনসহ নানা ভয়ানক শঙ্কা প্রতিফলিত হয়েছে। তবে সর্বোপরি, বাদশাহ হিসেবে তার ভুলগুলো নিয়ে আর্তনাদই করেছেন বেশি। সবচেয়ে ছোট ছেলে কাম বকশের কাছে লেখা চিঠিতে তার মৃত্যুর পর অফিসার ও সেনাবাহিনীর প্রতি খারাপ আচরণ করা হবে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তৃতীয় ছেলে আযম শাহের কাছে অনেক গভীর সংশয়ের কথা স্বীকার করেছিলেন : ‘শাসন করা ও জনগণকে রক্ষার গুণ আমার মধ্যে একেবারেই ছিল না। আমার মূল্যবান জীবনটা বৃথাই গেল। খোদা এখানেই আছেন, কিন্তু আমার নিষ্প্রভ চোখ তার উজ্জ্বল দীপ্ত দেখতে পারছে না।’

    আওরঙ্গজেব ১৫ কোটির বেশি লোকের ওপর ৪৯ বছর শাসনকাজ পরিচালনা করেছেন। তিনি মোগল সাম্রাজ্যকে সর্বোচ্চ সীমায় সম্প্রসারিত করেছিলেন, মানব ইতিহাসে তিনিই প্রথমবারের মতো ভারতীয় উপমহাদেশের বেশির ভাগ এলাকাকে একটি একক রাজকীয় শাসনের অধীনে এনেছিলেন। আইনগত বিধিবিধানের ব্যাখ্যা ও প্রয়োগে তিনি স্থায়ী অবদান রেখে গেছেন, সব ধরনের লোক ও ধর্মীয় গ্রুপের সদস্য তার কাছে ন্যায়বিচার পেয়েছে বলে তার সুখ্যাতি রয়েছে। খুবই সম্ভব যে তিনি ছিলেন তার আমলের সবচেয়ে ধনী লোক, তার কোষাগার ছিল পরিপূর্ণ। তাতে ছিল উপচে পড়া হীরা, মানিক, মুক্তা, স্বর্ণ। এমনকি জৌলুষপূর্ণ কোহিনূর হীরাও ছিল তার কাছে। তবে এসব অর্জনও শেষ দিনগুলোতে নিজের রাজনৈতিক অসম্পূর্ণতা সম্পর্কে তার উৎকণ্ঠা প্রশমিত করতে পারেনি।

    আযম শাহ ও কাম বকশ— উভয়ের কাছে আওরঙ্গজেব তার ধর্মীয় ত্রুটিগুলোর কথাও স্বীকার করে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে তাকে শিগগিরই কঠিন ঐশী বিচারের মুখে পড়তে হতে পারে। নিবেদিতপ্রাণ মুসলিম হিসেবে চিন্তা করেছেন যে এই জীবন ও পরকালে তিনি ‘আল্লাহর কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পথই বেছে নিয়েছিলেন।’ তিনি বোঝাহীনভাবে এই দুনিয়ায় এলেও পাপের বোঝা নিয়ে পরকালে যাচ্ছেন বলে ধারণা তার মধ্যে প্রবেশ করেছিল। আযমকে তিনি শেষ যে চিঠিটি লিখেছিলেন তাতে স্মৃতিকাতরতা, দীর্ঘ অলঙ্কৃত বাক্যে তিনবার বিদায়সম্ভাষণ করেছিলেন : ‘বিদায়, বিদায়, বিদায়’।

    আওরঙ্গজেব তিন শতাধিক বছর আগে, ১৭০৭ সালের শীতকালে, এই পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন। তাকে সমাহিত করা হয় মহারাষ্ট্রের খুলদাবাদের সাধারণ, ছাদ ও প্রাচীরহীন একটি খোলা কবরে। দিল্লিতে হুমায়ূনের লাল বেলেপাথরের বিশাল সমাধিসৌধ বা আগ্রায় শাহ জাহানের জাঁকজমকপূর্ণ তাজ মহলে অপরিমিত ব্যয়ে নির্মিত বিশ্রামাগারের বিপরীতে আওরঙ্গজেবের কবরটি তাকে স্মরণ করার মতো কোনো তাগিদ সৃষ্টি করেনি। আওরঙ্গজেবের ইচ্ছানুযায়ী একটি সুফি দরগার মধ্যে সমতল ও চিহ্নহীন স্থানে তাকে সমাহিত করা হয়। কয়েক শ’ বছরের ব্যাপ্তিতে এতে মার্বেলের মেঝ হয়েছে, মার্বেলের রেলিং লাগানো হয়েছে, শনাক্তকারী ফলকও সংযোজন করা হয়েছে। অবশ্য, এসব অলঙ্করণ সত্ত্বেও আওরঙ্গজেবের সমাধির সাদামাটা অবস্থা তার পূর্বসূরীদের সমাধিস্থল ও জাগতিক কীর্তিগাঁথা জোরালোভাবে প্রকাশকারী পাথরের ব্লকগুলোর প্রবল বিপরীত কথাই জানায়।

    আওরঙ্গজেব হয়তো বিস্মৃতির আড়ালে হারিয়ে যেতে চেয়েছিলেন, কিন্তু দুনিয়া তাকে ছেড়ে দিতে রাজি নয়। একুশ শতকের ভারত ও পাকিস্তানের জনসাধারণের স্মৃতিতে তিনি স্পন্দমান একটি চরিত্র। ভারতে লোকজন তার আমল নিয়ে উত্তপ্তভাবে বিতর্কে নিয়োজিত হয়, প্রায়ই হিন্দুদের প্রতি জঘন্য নির্যাতন করার জন্য তার নিন্দা করে। আওরঙ্গজেব নিজের কৃতকর্ম নিয়ে প্রশ্ন তুললেও বর্তমান ভারতের অনেকেই সংশয়হীনভাবে মনে করে যে তিনি ছিলেন উগ্র গোঁড়া, তরবারির জোরে শাসন করতেন, পেছনে রেখে গেছেন হিন্দু অশ্রুধারা। আধুনিক ভারতের অবয়ব থেকে আওরঙ্গজেবকে মুছে ফেলার সাম্প্রতিক রাজনৈতিক প্রয়াসগুলো (দিল্লিতে আওরঙ্গজেব সড়কের নাম পরিবর্তন করা এমনই একটি কাজ) এই সম্রাট ও ভারতের ইসলামি অতীতবিষয়ক বিতর্কে নতুন প্রাণের সঞ্চার করেছে। কাছের পাকিস্তানে আওরঙ্গজেব স্রেফ কিছুটা ভালো অবস্থায় আছেন। সেখানে অনেকে ভারতীয় ধারার আলোকে মনে করে যে আওরঙ্গজেব সুস্পষ্টভাবে গোঁড়া ছিলেন। তবে অন্যরা তাকে অতীত কালের মুসলিম সত্যনিষ্ঠ শাসকদের একজন মনে করে। এসব আধুনিক ধারণায় ইতিহাসের বক্তব্য থাকে খুবই সামান্য।

    আরো ভালোভাবে বলা যায়, আওরঙ্গজেব-সম্পর্কিত মিথ্যা তথ্য ও নিন্দাবাদ একুশ শতকের দক্ষিণ এশিয়াকে ছেয়ে ফেলায় লোকটি নিজে একটি হেঁয়ালি হিসেবেই রয়ে গেছেন।

    আওরঙ্গজেব ছিলেন বিশাল এলাকাজুড়ে বিস্তৃত মোগল সাম্রাজ্যের ষষ্ট শাসক। উপমহাদেশের বাইরের দুনিয়ায় বর্তমানে খুব কমই মোগলদের কথা স্মরণ করা হয়, কিন্তু তাদের আমলে তারা ছিলেন তীব্র মোহিনী শক্তিসম্পন্ন, সম্ভ্রম জাগানিয়া। ১৬০০ সাল নাগাদ মোগল সাম্রাজ্যের জনসংখ্যা ছিল পুরো ইউরোপের চেয়ে বেশি, সারা পৃথিবীতে মোগলদের সম্পদের কোনো তুলনা ছিল না। এক রক্তাক্ত উত্তরাধিকারের লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে আওরঙ্গজেব ক্ষমতায় আসেন ১৬৫৮ সালে৷ এই লড়াইয়ে তার দুই ভাই মারা যান, একজন বার্মায় পালিয়ে যান এবং তার পিতা কারারুদ্ধ হন। আওরঙ্গজেব নিজের নাম রাখেন ‘বিশ্বজয়ী’ (আলমগীর), তার ৪৯ বছরের রাজত্বকালে একটার পর একটা রাজ্য দখল করে নামকরণকে যথার্থ প্রতিপন্ন করেছেন।

    জীবদ্দশাতেও আওরঙ্গজেব জগতব্যাপী কল্পনামানসে ধরা পড়ে ছিলেন। ১৬৭৫ সালে ওই সময়ের ইংল্যান্ডের রাজকবি জন ড্রাইডেন বিদ্যমান মোগল সার্বভৌমত্ব নিয়ে বীরোচিত ট্রাজেডি আওরেঙ্গ-জেব লিখেছিলেন। আর ইউরোপিয়ান পর্যটকেরা ভারত সফর করেছেন ক্রমবর্ধমান হারে, তাদের অনেকেই খ্যাতিমান আওরঙ্গজেব আলমগীরের সাথে সাক্ষাত প্রার্থনা করেছেন। ব্রিটিশ, ডাচ, পর্তুগিজ ও ফরাসি বণিকেরা উপমহাদেশের পকেটগুলোতে কার্যক্রম পরিচালনা করত, মোগলদের সাথে বাণিজ্য চুক্তি করার প্রয়াস চালাত। অবশ্য মোগলদের দৃষ্টিতে ইউরোপিয়ানরা ছিল চুনো পুঁটি। পূর্বসূরিদের মতো আওরঙ্গজেবের মনেও দৃঢ় বিশ্বাস গেঁথে ছিল যে তিনি বিশ্ব ইতিহাসের বৃহত্তম সাম্রাজ্যগুলোর একটি পরিচালনা করছেন। এই সাম্রাজ্যের বিস্তৃতি ছিল ৩.২ মিলিয়ন বর্গ কিলোমিটার (আধুনিক ভারতের প্রায় সমান) এবং এর সম্পদ, সমৃদ্ধি ও ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের জন্য ছিল সম্মানের পাত্র।

    গত কয়েক দশক ধরে অন্যান্য মোগল শাসক ইতিহাসবিদদের ব্যাপক মনোযোগ আকর্ষণ করলেও আওরঙ্গজেব শিকার হয়েছেন অবহেলার। এ সম্রাটের জীবনকে তুলে ধরার কাজটি, তার সম্পর্কে আমরা বিস্ময়করভাবেই কম জানি, কোনোভাবেই সহজ নয়। আওরঙ্গজেব ছিলেন জটিল শাসক। ক্ষমতা, ন্যায়বিচার, ধর্মপ্রীতি ও মোগল সাম্রাজ্যের দায়ভারসহ নানা সাঙ্ঘর্ষিক আকাঙ্ক্ষা ও উদ্দীপনার সমাবেশে গড়ে ওঠেছিল তার জীবন। যেকোনো পরিস্থিতিতেই এ ধরনের লোক হবেন দুরূহ ঐতিহাসিক বিষয়। তার সময় ও আমাদের নিজেদের সময়ের মধ্যকার সাংস্কৃতিক জ্ঞানের বিপুল পার্থক্যের বিষয়টি বিবেচনা করা হলে তা যে কত কঠিন হতে পারে, তা বোঝাই যাচ্ছে।

    বর্তমান সময়ে স্ফুলিঙ্গ সৃষ্টি করে এমন উত্তপ্ত ও ফুটন্ত ইতিহাসও আওরঙ্গজেব। অবশ্য, আওরঙ্গজেবকে নিয়ে প্রচলিত লোকরঞ্জক ভাষ্যগুলোতে বাস্তব অস্তিত্বের চেয়ে বানোয়াট কাহিনীই রয়েছে বেশি। আওরঙ্গজেবকে ঘিরে থাকা কল্পকথার ধূম্রজাল ভেদ করতে পারলে আমরা সম্ভবত সপ্তদশ শতকের ভারতের এককভাবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বটিকে আবিষ্কার করতে পারব। বর্তমান ছাড়া অতীতে যাওয়ার অন্য কোনো পথ না থাকায় আমি প্রথমে আমাদের সময়ে কল্পিত আওরঙ্গজেবের দিকেই নজর ফেরাব। আমি তারপর দুইভাবে তথা তার সময়ের ফসল হিসেবে এবং যে যুগে তিনি বাস করেছিলেন ওই কালকে অবয়ব দানকারী সম্রাট হিসেবে তাকে বিশ্লেষণ করব।

    খলনায়ক আওরঙ্গজেবের কল্পকথা

    তথাকথিত ‘গ্র্যান্ড মোগলদের’ শেষ ব্যক্তি আওরঙ্গজেব চেষ্টা করেছিলেন ঘড়ির কাঁটা উল্টা দিকে ঘোরাতে। তা করতে গিয়ে তিনি ঘড়িটি বন্ধ করে ফেলেন, এটি ভেঙ্গে যায়।

    —জওহেরলাল নেহরু

    আওরঙ্গজেবের জন্য ২০১৫ সালটি ছিল খারাপ। প্রায় পুরো বছর ধরেই এই মোগল সম্রাটের নামে থাকা দিল্লির একটি প্রধান রাস্তার নাম বদল করা নিয়ে বিতর্ক চলে। স্থানীয় একটি শিখ গ্রুপ প্রথম বিষয়টি উত্থাপন করে। নাম বদলের যুক্তি হিসেবে বলা হয় যে আওরঙ্গজেব ছিলেন ‘ভারতের অসহিষ্ণু অমানবিক নৃশংস অপরাধের অন্যতম স্বৈরাচারী উৎপীড়নকারী শাসক।’ হিন্দু জাতীয়তাবাদী ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) সাথে সংশ্লিষ্ট কয়েকজন পার্লামেন্ট সদস্য সাথে সাথে এই স্রোতে যোগ দিয়ে তাদের ভাষায় দিল্লির ইতিহাসের অন্যতম বেদনাদায়ক অধ্যায়টিকে নিশ্চিহ্ন করার কিংবা অন্তত নগরীর রাস্তা থেকে এই উৎপীড়ক শাসকের নাম মুছে ফেলার আহ্বান জানান। নয়া দিল্লির কর্মকর্তারা এই দাবির কাছে নতি স্বীকার করে ২০১৫ সালের আগস্টের শেষ দিকে ভারতের একাদশ রাষ্ট্রপতি এ পি জে আবদুল কালাম সড়ক নামে নতুন নামকরণ করেন। এক সপ্তাহ পর রাতের অন্ধকারে নগরকর্মীরা চুপি চুপি রাস্তার সাইনগুলো থেকে আওরঙ্গজেবের নাম মুছে ফেলে।

    অবশ্য এ ধরনের প্রয়াসের ফলে আওরঙ্গজেব সম্পর্কে সমাজ-বিস্তৃত স্মৃতিবিলোপ না ঘটে বরং জনসাধারণের মনে আবার তাকে জাগিয়ে তোলে। এর মাত্র এক মাস পর ২০১৫ সালের অক্টোবরে শিব সেনার এক এমপির একটি টেপ প্রকাশিত হয়। এতে তাকে এক সরকারি কর্মকর্তার প্রতি আওরঙ্গজেব কি আওলাদ (আওরঙ্গজেবের বংশধর) এবং আরো কিছু গালিগালাজ প্রয়োগ করতে দেখা যায়। ভারতীয় মুসলিমদের লক্ষ্য করে প্রয়োগ করা এ ধরনের বাক্য বাবর কি আওলাদ (বাবরের বংশধর) পরিভাষার প্রতিফলন ঘটায়। বিশেষ করে ১৯৮০-এর দশকের শেষ দিকে ও ১৯৯০-এর দশকের প্রথম দিকে হিন্দুত্ববাদী দাঙ্গাবাজদের অযোধ্যার বাবরি মসজিদ ভাঙ্গার আগ দিয়ে এর ব্যবহার বেড়ে গিয়েছিল। কিন্তু বাবরের স্থানে আওরঙ্গজেব হলো কেন?

    বিভেদকারী হিন্দু জাতীয়তাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী অত্যাচারী মুসলিম বিজয়ী হিসেবে বাবর ও আওরঙ্গজেব অনেক দিক থেকে বিনিময়যোগ্য। এই দিক থেকে আওরঙ্গজেব ভারতের অতীতের ধিক্কারজনক ঘটনাবলীর সাথে জড়িত ‘গোঁড়া মুসলিমদের’ পুরো শ্রেণির প্রতিনিধি এবং এ কারণে ভারতের বর্তমান সময়ে অনাকাঙ্ক্ষিত। আওরঙ্গজেবকে সবচেয়ে ধার্মিক মোগল বাদশাহ হিসেবে ব্যাপকভাবে বিশ্বাস করাটাও কাকতালীয় বিষয় নয়। এ কারণে আওরঙ্গজেব অতীত ও বর্তমান উভয় সময়ের উদ্দীপ্ত মুসলিম সমগ্রের (যারা তাদের ধার্মিকতা দিয়ে ভারতীয় সমাজে হুমকি সৃষ্টি করেছিল) আদর্শ প্রতিনিধিত্বকারী। এই তত্ত্ব অনুযায়ী ভারতীয় ও হিন্দু সংস্কৃতি একটি একক, সমতল অবস্থানে মিশে যায়, যেখানে অন্য ধর্মীয় গ্রুপগুলোর জন্য শ্বাস ফেলার অবকাশ থাকে সামান্যই।

    ভারতের তীব্র সমালোচিত শাসকদের মধ্যেও আওরঙ্গজেবের বিশেষ, অনাকাঙ্ক্ষিত স্থান রয়েছে। এমনকি যারা বিজেপি ও সমমনা হিন্দু জাতীয়তাবাদী গ্রুপগুলোর ভাবাবেগের সাথে একমত নয়, এমন সাধারণ অভিমতেও নির্মম ইসলামি উৎপীড়ক (যাদের কাছে ভারতের সবকিছু, বিশেষ করে হিন্দু মাত্রই ঘৃণিত) হিসেবে আওরঙ্গজেবকে বিদ্রূপ করা হয়ে থাকে। সীমান্তের ওপাড়ে পাকিস্তানেও অনেকে বদ আওরঙ্গজেবের ভাষ্যটি অনুমোদন করে, এমনকি তাকে দক্ষিণ এশিয়ার বর্তমান দুর্দশার জন্য দায়ী মনে করা হয়। পাকিস্তানি নাট্যকার শহিদ নাদিমের বক্তব্য এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যেতে পারে। তিনি বলেছেন : ‘আওরঙ্গজেব যখন [তার ভাই] দারাশিকোর ওপর বিজয়ী হলেন, তখনই [ভারতবর্ষ) বিভক্তির বীজ রোপিত হয়েছিল।’ অনেক লোক অনুমোদন না করলে এ ধরনের কষ্টকল্পিত অভিমত ফালতু হিসেবে পরিগণিত হতো।

    এই পাকিস্তানি নাট্যকারের দৃষ্টিভঙ্গির নজির পাওয়া যায় আধুনিক ভারতের প্রতিষ্ঠাতা জওহের লাল নেহরুর রচনাবলীতে। জওহের লাল নেহরু কোনোভাবেই আওরঙ্গজেবের অনুরাগী ছিলেন না। ১৯৪৬ সালে প্রথম প্রকাশিত ডিসকোভারি অব ইন্ডিয়ায় নেহরু বিস্তারিতভাবে আওরঙ্গজেবের অন্তর্নিহিত খুঁতগুলো তুলে ধরেন, ‘গোঁড়া ও কঠোর বিশুদ্ধবাদী’ হিসেবে তার নিন্দা করেন। তিনি ঘড়ির কাঁটা উল্টা দিকে চালানো ও মোগল সাম্রাজ্যের ধ্বংসকারী বিপজ্জনক পূর্বানুবৃত্তিকারী হিসেবে ষষ্ট মোগল সম্রাটের সমালোচনা করেছেন। সম্ভবত নেহরুর সবচেয়ে কঠিন আঘাত ছিল আওরঙ্গজেবের মুসলিম পরিচিতির ওপর। তিনি অভিমত ব্যক্ত করেন যে আওরঙ্গজেব বাড়াবাড়ি রকমের মুসলিম হওয়ায় সফল ভারতীয় রাজা হতে পারেননিঃ ‘আওরঙ্গজেব যখন [আগেকার মোগল শাসকদের সমন্বয়বাদের] বিরোধিতা ও একে দমন করা শুরু করেন এবং ভারতীয় শাসক হিসেবে নয়, বরং মুসলিম হিসেবেই কার্যক্রম পরিচালনা করতে থাকেন, তখন মোগল সাম্রাজ্য ভেঙে পড়তে শুরু করে। নেহরুর মতে, ইসলামের প্রতি আওরঙ্গজেবের দৃঢ়ভাবে অনুরক্ত থাকাটাই তার ভারতবর্ষ শাসন করার সক্ষমতা নষ্ট করে দিয়েছিল।

    আওরঙ্গজেব বিপজ্জনকভাবে ধার্মিক ছিলেন এবং এ কারণেই তিনি খারাপ সম্রাট ছিলেন- এমন ধারণা কেবল নেহরুই পোষণ করতেন, তা নয়। নেহরুর সমসাময়িক আরো অনেকেই এ ধরনের মতবাদ সমর্থন করেছেন। এদের অন্যতম ছিলেন বিশ শতকে আওরঙ্গজেবের ইতিহাস রচনাকারী যদুনাথ সরকার। ব্রিটিশ উপনিবেশিক চিন্তাবিদেরা আরো অনেক আগে থেকেই মোগলদেরকে নানা অভিযোগে অভিযুক্ত করে আসছিলেন। তাদের অভিযোগের মধ্যে ছিল মোগলরা কামুক, উৎপীড়ক ও মুসলিম। আলেকজান্ডার ডো ১৭৭২ সালেই মোগল শাসন সম্পর্কে এক আলোচনায় মন্তব্য করেছিলেন যে ‘মোহাম্মদের ধর্ম অদ্ভূতভাবে স্বৈরতন্ত্রের সাথে খাপ খেয়ে যায়, এবং প্রাচ্যের এ ধরনের সরকারের টিকে থাকার কারণগুলোর সাথেই তা সম্পর্কিত।’ ভারতে ব্রিটিশ শাসনের জন্য ব্রিটিশদের কাছে সমস্যাটির এই সমাধান যে প্রয়োজনীয় ছিল, তা স্পষ্ট। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতারা উপনিবেশিক যুক্তির শেষ ধাপটি প্রত্যাখ্যান করলেও অনেকেই কোনো বাছবিচার না করেই প্রথম অংশটি গ্রহণ করে নেন। পাঠ্যবই ও গণমাধ্যমের মাধ্যমে এসব ধারণা সমাজে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে, কয়েকটি প্রজন্ম ধরে আওরঙ্গজেব ধর্মীয় উগ্রবাদে তাড়িত উৎপীড়ক শাসক ছিলেন, এমন উপনিবেশিক ধারণা গলধঃকরণ করে তা বমনও করছে।

    কয়েক শ’ বছর ধরে একেবারে হালকা প্রমাণের ওপর ভিত্তি করে অনেক ভাষ্যকার দুষ্ট, গোঁড়া আওরঙ্গজেবের কল্পকথা প্রচার করেছেন। আওরঙ্গজেব সম্পর্কে অনেক ভ্রান্ত ধারণা এখনো লোকরঞ্জক স্মৃতিতে বিরাজ করছে। এসব ভ্রান্ত ধারণার মধ্যে রয়েছে তিনি লাখ লাখ হিন্দুকে হত্যা করেছেন, হাজার হাজার মন্দির ধ্বংস করেছেন। সাধারণভাবে বিশ্বাস করা এসব ‘তথ্য’ ঐতিহাসিক প্রমাণে না টিকলেও কোনো কোনো পণ্ডিত, সাধারণত খারাপ উদ্দেশ্যে, এ ধরনের আষাঢ়ে গল্পের একটি কথিত ভিত্তি প্রদান করার চেষ্টা করেছেন। অবশ্য, আরো বেশি দেখা যায় আওরঙ্গজেবকে নিয়ে আগে উল্লেখ করা সমালোচনাগুলো টিকিয়ে রাখার নির্লজ্জ লক্ষ্য হাসিলের জন্য সুবিধাজনক কিছু নির্বাচিত ঘটনার পক্ষপাতপূর্ণ ব্যবহার। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, সমালোচকেরা সুর তোলেন যে আওরঙ্গজেব অমুক অমুক মন্দির ভেঙ্গেছেন। কিন্তু তারা এ কথা স্বীকার করেন না যে তিনি অনেক হিন্দু মন্দির রক্ষা করার জন্য অসংখ্য আদেশ জারি করেছেন, ব্রাহ্মণদের বৃত্তি ও ভূমি মঞ্জুর করেছেন। তারা হলি উদযাপনে তার কড়াকড়ি আরোপের নিন্দা করেন একথা উল্লেখ ছাড়াই যে তিনি মোহাররম ও ঈদের অনুষ্ঠানও কাট-ছাঁট করেছেন। তারা বেমালুম চেপে যান যে স্বাস্থ্য-সংক্রান্ত বিষয়াদি নিয়ে তিনি হিন্দু সন্ন্যাসীদের সাথে পরামর্শ করতেন, আগের যেকোনো মোগল শাসকের চেয়ে তিনি অনেক বেশি সংখ্যক হিন্দুকে তার প্রশাসনে নিয়োগ করেছিলেন। আওরঙ্গজেবের শাসন-সংশ্লিষ্ট অনেক কম উল্লেখ করা তবে ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর সাথে এই শাসককে নিয়ে ধর্মভিত্তিক ঘৃণায় চালিত কাল্পনিক চরিত্রকে সমন্বিত করার কাজটি আমরা করতে পারি না।

    তবে কোনোভাবেই কেউ বলবে না যে আওরঙ্গজেব ত্রুটিহীন ছিলেন। আধুনিক গণতান্ত্রিক, সার্বজনীন মূল্যবোধ ও মানবাধিকার মানদণ্ড পূরণ করতে না-পারা আওরঙ্গজেবের অনেক পদক্ষেপ খুঁজে বের করা কঠিন নয়। রাষ্ট্র ও সাম্রাজ্যের প্রাক-আধুনিক বিশ্বে শাসনকাজ পরিচালনা করেছিলেন আওরঙ্গজেব। সহিংসতা, রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব ও অন্য সবকিছুই ওই সময় ও তিনি যে স্থানে বাস করেছিলেন তার সাথে শর্তসাপেক্ষ। আওরঙ্গজেবের সমসাময়িকদের মধ্যে ছিলেন ইংল্যান্ডের দ্বিতীয় চার্লস, ফ্রান্সের চতুর্দশ লুই, উসমানিয়া সাম্রাজ্যের সুলতান দ্বিতীয় সোলায়মান। কেউ জোর দিয়ে বলতে পারবে না যে এসব ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব বর্তমান সময়ের রীতিনীতি অনুযায়ী ‘সুশাসক’ ছিলেন। কারণ অতীতকে বর্তমানের মানদণ্ডের সাথে তুলনা করার কোনো মানে হয় না। ঐতিহাসিক সমীক্ষার উদ্দেশ্য সম্পূর্ণ ভিন্ন কিছু।

    ইতিহাসবিদেরা বিশেষ সময় ও স্থানের ফসল হিসেবে তাদের নিজস্ব অবস্থার আলোকে ওই ব্যক্তিদের উপলব্ধি করতে চান, তাদের কর্মপন্থা ও প্রভাবের ব্যাখ্যা করেন। যাদের নিয়ে আমরা সমীক্ষা চালাচ্ছি, তাদেরকে অপরাধ মুক্ত করার কোনো প্রয়োজন আমাদের নেই এবং তাদেরকে পছন্দ করার কোনো দরকারও নেই আমাদের। তবে আমরা অভিমত প্রকাশ করা থেকে যথেষ্ট সময় বিরত থাকার চেষ্টা করেছি এ কারণে যে যাতে আওরঙ্গজেবকে নিয়ে থাকা কল্পকথা আড়ালে ম্লান হয়ে যায় এবং আরো বোধগম্য ও বিশ্বাসযোগ্য কথা বলার অবকাশ সৃষ্টি হয়।

    মানুষ আওরঙ্গজেবকে ফিরে পাওয়া

    সার্বভৌম ক্ষমতার ভিত্তির স্থিতিশীলতা নির্ভর করে ন্যায়বিচারের (আদালত) ওপর।
    –শাসকদের সম্পর্কে প্রচলিত সাধারণ বাণী, আওরঙ্গজেবের সমর্থিত।

    হিন্দুস্তানের শাসক হিসেবে আওরঙ্গজেব তার জীবনকে বিন্যস্ত করেছিলেন কিছু প্রধান আদর্শ ও বদ্ধমূল ধারণার আলোকে। তিনি হতে চেয়েছিলেন ন্যায়পরায়ণ রাজা, ভালো মুসলিম, মোগল সংস্কৃতি ও প্রথা রক্ষাকারী। আওরঙ্গজেব একইসাথে একটি সম্প্রসারণবাদী রাষ্ট্রেরও প্রধান ছিলেন, প্রায়ই সহিংসতা প্রয়োগ করে উপমহাদেশ ও এর অধিবাসীদের ওপর রাজকীয় কর্তৃত্ব সম্প্রসারণ করার প্রয়াস চালাতেন। আওরঙ্গজেব সম্পর্কে আমার ভাষ্যটি সর্বোপরি ন্যায়বিচারসহ এসব সার মূল্যবোধ অনুসরণে তার চেষ্টা, এবং রূঢ় ক্ষমতা কব্জা করার জন্য যেসব আদর্শ তিনি বিসর্জন দিয়েছেন, সেইসব উদাহরণ কেন্দ্র করে প্রণীত।

    ন্যায়বিচার সম্পর্কে আওরঙ্গজেবের ভাষ্য বৃহত্তর ইসলামি ঐতিহ্যের রঙে গভীরভাবে রঞ্জিত, এর বেশির ভাগের সাথে ধর্মতত্ত্বের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই । ন্যায়বিচার-সম্পর্কিত প্রাক-আধুনিক ‘ইসলামি’ আদর্শ ব্যাপকভাবেই ইসলাম পূর্ববর্তী পারস্য ও গ্রিক দর্শন থেকে গৃহীত। এই ভাষ্যে জিহাদ ও জিজিয়ার (যথাক্রমে ধর্মযুদ্ধ ও ব্যক্তির ওপর আরোপিত কর) মতো বিভেদকারী ধারণাগুলো আখলাক ও আদবের (যথাক্রমে রাজনৈতিক আচরণ ও নৈতিক মূল্যবোধ) মতো আদর্শগত ধারণার চেয়ে অনেক কম গুরুত্বপূর্ণ। আওরঙ্গজেব তার রাজকীয় পূর্বসূরীদের মাধ্যমেও প্রভাবিত হয়েছিলেন, নিজেকে পূর্ববর্তী মোগল রাজাদের অনুকরণে গড়ে তুলেছিলেন। নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, ন্যায়বিচার-সম্পর্কে আওরঙ্গজেবের আদর্শ বর্তমান সময়ে সাধারণভাবে গৃহীত আদর্শের সাথে মেলে না। কিন্তু তা খুব বড় বিষয় নয়। সমসাময়িক মানদণ্ডে আওরঙ্গজেবকে বিচার করার বদলে আমি চেয়েছি তার জীবন ও শাসন সম্পর্কে ঐতিহাসিক ভাষ্য নির্মাণ করতে এবং কয়েক শ’ বছর ধরে আমাদের মেনে নেওয়া ভুল তথ্যের নিচে চাপা পড়ে থাকা এই ব্যক্তি ও রাজাকে উদ্ধার করতে।

    ন্যায়বিচার, ধর্মানুরাগ ও মোগল রাষ্ট্রের প্রতি আওরঙ্গজেবের ভক্তি ফারসি ইতিহাস গ্রন্থরাজি, বাদশাহর চিঠিপত্র ও সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতকজুড়ে থাকা অন্য প্রাথমিক দলিল-দস্তাবেজগুলোতে বারবার উল্লেখ করা বিষয়। আওরঙ্গজেব সম্পর্কে আমার ভাষ্যের মূল কাঠামো এসেছে এসব ফারসি রচনাবলীর সমালোচনামূলক পাঠ থেকে। এছাড়াও হিন্দি, সংস্কৃত, ও অন্যান্য ভাষায় (আরো জানার জন্য এই বইয়ের শেষ দিকে থাকা জীবনীমূলক প্রবন্ধ ও পুনশ্চ : মধ্য যুগের ফারসি সাহিত্য পাঠ নিয়ে নোট অধ্যায় দেখুন) গবেষণাও রয়েছে। আওরঙ্গজেবের আদর্শগুলো- বিশেষ করে তার ন্যায়বিচার, মূল্যবোধ ও যথার্থ ইসলামি আচরণবিষয়ক ধারণাগুলো- বর্তমানে এগুলো সাধারণভাবে যেভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়, তা থেকে অনেক ভিন্ন। তবে তিনি ন্যায়পরায়ণ শাসক ছিলেন কিনা তা আমাদের বিবেচ্য বিষয় নয়। বরং আমি জানতে চাই, আওরঙ্গজেব ন্যায়পরায়ণ শাসক বলতে কী বুঝতেন এবং তা কিভাবে হিন্দুস্তানের সম্রাট হিসেবে তার বিশ্ব-সম্পর্কিত দৃষ্টিভঙ্গি ও কর্মপন্থা গড়ে দিয়েছিল।

    বোধগম্যভাবেই আওরঙ্গজেব তার নিজস্ব পরিভাষাতেই একটি প্রতিশ্রুতিশীল উদ্যোগ, তবে বর্তমান সময় পর্যন্ত তা করার চেষ্টা হয়েছে সামান্যই। এই বই মধ্য যুগের ভারতবর্ষে আওরঙ্গজেবের প্রভাব এবং ইন্দো মুসলিম ইতিহাসের মধ্যে তার গুরুত্বপূর্ণ স্থানটি আরো ভালোভাবে বুঝতে আমাদের সহায়তা করবে। আরো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, জোরালো বাস্তব ঐতিহাসিক বক্তব্য বর্তমানের (যা আওরঙ্গজেবকে এমনভাবে উপস্থাপন করে যা তিনি কখনোই ছিলেন না) আবেগকে প্রশমিত করতে পারে। এটিও বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক যে আওরঙ্গজেবকে নিয়ে বর্তমান বিকৃতির মধ্যে আমার সুপারিশ করা মধ্যবর্তী ভূমিকার ভিত্তি চিন্তাশীল ইতিহাসের সাথে সম্পৃক্ত। এর বিপরীতে, আগেকার চিন্তাবিদেরা আওরঙ্গবের উত্তপ্ত লোকরঞ্জক ভাবমূর্তি প্রশমিত করতে দুটি ভিন্ন কৌশল প্রয়োগ করেছিলেন। কিন্তু রক্ষণাত্মক হওয়ায় উভয়টিই ব্যর্থ হয়েছে।

    প্রথম ব্যর্থ কৌশলে স্বীকার করে নিতে হয়েছিল যে আওরঙ্গজেব ছিলেন ধর্মীয় স্বৈরশাসক, আবার সেইসাথে প্রধানত আকবর ও দারাশিকোর মতো ‘প্রচলিত মতবাদবিরুদ্ধ মুসলিম’ মোগল ব্যক্তিত্বদের চেয়ে ভিন্ন। এই যুক্তিতে বলা হয়, গোঁড়া আওরঙ্গজেবের তুলনায় আকবর ও দারা অনেক বেশি হিন্দু ধ্যান-ধারণা আত্মস্থ করেছিলেন। আর এভাবেই তারা উপমহাদেশের গ্রহণযোগ্য শাসক হওয়ার জন্য উপযুক্ত পরিমাণে ‘ভারতীয়তে’ পরিণত হয়েছিলেন। এই চিন্তাধারায় আওরঙ্গজেবকে পুনঃবিবেচনা বা পুনঃমূল্যায়ন করা হয় না। এর বদলে তৃতীয় মোগল সম্রাট ও আওরঙ্গজেবের দাদার বাবা আকবরের নির্মিত কথিত সহিষ্ণুতার সংস্কৃতি ধ্বংস করা ও আওরঙ্গজেবের বড় ভাই দারা শুকোহর কাছ থেকে মোগল রাজমুকুট ছিনিয়ে নেওয়ার জন্য তাকে কলঙ্কিত করা হয়। অবশ্য, মনে করা হয় যে ইতিহাসের মহা পথ-পরিক্রমায় আদর্শমূলক ভারতীয় মুসলিমদের সমন্বয়বাদী উত্তরাধিকারে ভারসাম্য রক্ষাকারী হিসেবে কাজ করেছে আওরঙ্গজেবের সাম্প্রদায়িকতাবাদ । এই চিন্তাধারা এমনকি হিন্দু জাতীয়তাবাদের প্রাথমিক প্রচারক ভি ডি সাভারকারের মতো লোকজনও লালন করেন। দিল্লির আওরঙ্গজেব রোডের নাম বদল নিয়ে বিতর্কের সময় এই যুক্তি অনুসরণ করেই সেটির নতুন নাম দারা শুকোহ রোড রাখার প্রস্তাবও এসেছিল।

    কিন্তু বাস্তবতা হলো, আওরঙ্গজেবের মতো আকবর ও দারা শুকোহ উভয়েই তাদের নিয়ে লোকরঞ্জক খ্যাতিতে যা বলা হয়, তার চেয়ে অনেক বেশি জটিল ছিলেন। আওরঙ্গজেবের সাথে ভারসাম্য করার জন্য আকবর ও দারাকে সামনে আনতে গিয়ে এসব লোক সম্পর্কে নতুন কিছু শিখতে আমরা ব্যর্থ হই, তাদের মুসলমানিত্ব অনুযায়ী মোগল বাদশাহদের মান নির্ণয় করার কাজে নিজেদের শৃঙ্খলিত করে ফেলি। এই তুলনা করতে গিয়ে আমরা এই ধারণা পোষণ করে বিরাট ভুল করে বসি যে ভারতবর্ষের ইতিহাস, তথা ইন্দো-মুসলিম অতীতের সবকিছুই ধর্মবিষয়ক। আওরঙ্গজেব মুসলিম ছিলেন। তবে তার আধুনিক অনুসারীরা বা সমর্থকেরা তাকে যে ধরনের মুসলমান হিসেবে বিবেচনা করে, তেমন ছিলেন না তিনি। অধিকন্তু, আওরঙ্গজেবকে তার বিশ্বাসের মধ্যে খর্ব করা যায় না। অতীতের কাছে সৎ থাকার জন্য আমাদের যুবরাজ ও সম্রাট হিসেবে তার পূর্ণতর ছবিটি পুনরুদ্ধার করতে হবে।

    আক্রমণে ভিন্ন কৌশল গ্রহণ করে কেউ কেউ যুক্তি দেন যে আমরা খুবই কঠোরভাবে আওরঙ্গজেবকে বিচার করছি। সম্ভবত ভারতের সবচেয়ে ঘৃণ্য মুসলিম বদমাসটি আসলে ততটা জঘন্য ছিলেন না?

    এই যুক্তির ভিত্তি নিহিত রয়েছে আওরঙ্গজেবের আমল সম্পর্কে ভ্রান্ত ব্যাখ্যা সংশোধন এবং মোটামুটিভাবে সঠিক হলেও যেসব বিষয় এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে, সেগুলো উপস্থাপনের ওপর। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, লোকরঞ্জক বিশ্বাসের বিপরীতে আওরঙ্গজেব কখনো বড় মাত্রার এমন কোনো ধর্মান্তর কর্মসূচিতে নেতৃত্ব দেননি যাতে অমুসলিমদেরকে ইসলাম বা তরবারির কোনো একটিকে গ্রহণ করে নিতে হয়েছিল। আওরঙ্গজেব কখনোই হাজার হাজার হিন্দু মন্দির ধ্বংস করেননি (খুব সম্ভবত সংখ্যাটি কয়েক ডজনে সীমিত থাকতে পারে)। তিনি হিন্দুদের পাইকারিভাবে হত্যার মতো জঘন্য কোনো কাজ করেননি। বস্তুত, তিনি তার সরকারের সর্বোচ্চ অবস্থানে হিন্দুদের বসিয়েছিলেন। তিনি হিন্দু ধর্মীয় গ্রুপগুলোর স্বার্থ সুরক্ষিত রেখেছিলেন, এমনকি ব্রাহ্মণদের হয়রানি বন্ধ করার জন্য স্বধর্মী মুসলিমদের নির্দেশ পর্যন্ত দিয়েছিলেন। তিনি তার সব প্রজার জন্য নিরাপদ রাস্তা ও মৌলিক আইন-শৃঙ্খলার ব্যবস্থা করার চেষ্টা করেছিলেন।

    সব ঘটনার সঠিক বিবরণ দেওয়া ইতিহাসবিদের দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত বিষয়, এবং এটুকু সত্য : আমাদের বিশ্বাস করতে হবে যে আওরঙ্গজেব ছিলেন তার সমসাময়িক খ্যাতির তুলনায় অন্যের প্রতি অনেক কম অকল্যাণকামী। তবে আওরঙ্গজেব পুরোপুরি জঘন্য ব্যক্তি ছিলেন না, কেবল এমন কথার ফুলঝুড়ি দিয়েই আমরা আওরঙ্গজেব সম্পর্কে লোকরঞ্জক নিন্দাগুলোর ঊর্ধ্বে উঠতে পারব না। আরো সমস্যার বিষয় হলো, আমরা ভারতবর্ষের জটিল অতীত সম্পর্কে ন্যায়বিচার করতে ব্যর্থ হই। আওরঙ্গজেব কি একুশ শতকের স্পর্শকাতরতার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিলেন? এমন প্রশ্নের চেয়ে উপনিবেশ-পূর্ব ভারতবর্ষে অর্ধশত বর্ষ শাসনকারী ও রাজনৈতিক দৃশ্যপট বদলে দেওয়া লোকটি সম্পর্কে অনেক বেশি কথা বলার আছে। আমাদেরকে অবশ্যই তাড়াহুড়া করে আওরঙ্গজেবের বিচার করার প্রবল, আধুনিক প্রবৃত্তি দমন করে বরং এই প্রভাবশালী বাদশাহর কর্ম ও আদর্শগুলোকে প্রথমে পুনরুদ্ধার করতে হবে।

    আমাদের প্রয়োজন আওরঙ্গজেব সম্পর্কে নতুন ভাষ্য। আমি এখানে এ ধরনের একটি বক্তব্যই উপস্থাপন করছি।

    আমার ভাষ্যে আওরঙ্গজেবের জীবন ও শাসনকাল সম্পর্কে বর্তমানে স্বল্প পরিচিত অনেক বক্তব্য অন্তর্ভুক্ত করে এর মাধ্যমে বিভ্রান্তির শিকার এক বাদশাহ-সম্পর্কে অতি-প্রয়োজনীয় ঐতিহাসিক গভীরতা যোগ করেছে। এতে আওরঙ্গজেবের কথিত ‘সবচেয়ে খারাপ’ বিষয়গুলো তথা তার মন্দির অবমাননা, কূটিল রাজনৈতিক বুদ্ধি, সহিংস পন্থা, কিছু ধর্মীয় সম্প্রদায়কে নির্যাতন করার মতো অভিযোগের জবাব দেওয়া হলেও এগুলোতেই বইটি সীমাবদ্ধ নয়। যদি কেবল আওরঙ্গজেব সম্পর্কে কুৎসা রটনাকারীদের বিভ্রান্তিকর তথ্য ও সন্দেহজনক দাবিগুলো মোকাবিলা করা হয়, তবে তা হবে একটি ফাঁকা কাজ। কারণ এটি ইতিহাসের মূল নির্দেশিকা তথা ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বদের তাদের নিজস্ব পরিভাষার ভিত্তিতে উপলব্ধি করার কাজটি বাস্তবায়ন করা হবে না।

    এই পার্থক্যের— রক্ষণাত্মকভাবে চিন্তা করা বনাম ঐতিহাসিকভাবে চিন্তা করা— একটি ভালো উদাহরণ হলো হিন্দুদের প্রতি আওরঙ্গজেবের আচরণ। লোকরঞ্জক ধারণায় আওরঙ্গজেবকে সব হিন্দুর প্রতি বিদ্বেষপরায়ণ ও সবভাবে তাদেরকে ধ্বংস করতে চেয়েছিলেন বলে কল্পনা করা হয়। কিন্তু দায়িত্বশীল ইতিহাসবিদ বিজ্ঞচিতভাবে বলতে পারেন যে পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে আওরঙ্গজেব সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে হিন্দুদের সাথে আচরণ করেছিলেন। মোগল রাষ্ট্র ও বিশেষ হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে প্রায়ই সঙ্ঘাতের সৃষ্টি হতো এবং এতে অনেক সময় স্পর্শকাতর ধর্মীয় বিষয়ও থাকত। কিন্তু অনেক হিন্দুই আওরঙ্গজেবের ভারতবর্ষে সহিষ্ণুতা ও সুরক্ষা লাভ করেছিল। আওরঙ্গজেবের শাসন নিয়ে চিন্তা করার সময় নির্ভুল হলেও এ ঐতিহাসিক সংশোধনটি হিন্দুদের ব্যাপারে সাধারণ কোনো ধারা গ্রহণ ফলপ্রসূ পথ কিনা সেই মৌলিক প্রশ্নটি বিবেচনা করতে পারেনি।

    বাস্তবে আওরঙ্গজেব তার সাম্রাজ্যে হিন্দুদের ব্যাপারে সার্বজনীন কোনো এজেন্ডা অনুসরণ করেননি। ওই আমলে ‘হিন্দুরা’ সাধারণত নিজেদের ওই পরিভাষায় পরিচিত করত না, তারা বরং আঞ্চলিক, সাম্প্রদায়িক ও বর্ণবাদী পরিচয়ে (যেমন রাজপুত, মারাঠা, ব্রাহ্মণ, বৈষ্ণব ইত্যাদি) পরিচিত করত। অনেক বিশেষজ্ঞ উল্লেখ করেছেন, ‘হিন্দু’ শব্দটি সংস্কৃত নয়, বরং ফারসি। আর এ শব্দটি ব্রিটিশ উপনিবেশ আমলে সাধারণভাবে স্ব-উল্লেখে ব্যবহৃত হয়েছিল । মোগলরাও ‘হিন্দুদের’ বিভিন্ন গ্রুপের মধ্যকার পার্থক্যকে গুরুত্ব দিত। উদাহরণ হিসেবে মোহাব্বত খানের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। তিনি ১৬৭০-এর দশকে অল্প সময়ের জন্য দাক্ষিণাত্যে মোগল অভিযানে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। তিনি এমনকি মারাঠাদের (তারা দৃশ্যত এই ঘটনায় ‘হিন্দু’ হিসেবে বিবেচিত হয়নি) বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার সময় মোগল আভিজাত্যের মধ্যে ‘রাজপুত ও হিন্দুদের’ অগ্রাধিকার দিয়েছেন। আওরঙ্গজেবের আমলে একটি ব্লক হিসেবে মোগল-হিন্দু সম্পর্ককে মূল্যায়ন করার বদলে আমরা ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে তথা বিশেষ গ্রুপ ও পদক্ষেপকে আলাদা আলাদাভাবে বিবেচনা করব। এর ফলে পাঠকেরা এখানে হিন্দুদের প্রতি আওরঙ্গজেবের আচরণ নিয়ে আলাদা কোনো অংশের দেখা পাবে না, বরং মোগল রাষ্ট্রের পক্ষে নিয়োজিত হিন্দু অভিজাত, ব্রাহ্মণ নেতা এবং সশস্ত্র মারাঠা বিরোধিতারীদের নিয়ে পূর্ণাঙ্গ আলোচনা দেখতে পাবে!

    আমাদের সময়ের সীমাবদ্ধকরণ, সাম্প্রদায়িক পরিভাষার ঊর্ধ্বে আমরা যদি ওঠতে পারি, এবং এর বদলে সপ্তদশ শতকের মোগল বিশ্বকে পুনরুদ্ধারের প্রবল প্রয়াস চালাই, তবে আওরঙ্গজেবের এক চমকপ্রদ ছবির আবির্ভাব ঘটবে। এই আওরঙ্গজেব ছিলেন ভারতবর্ষের সম্রাট। তিনি সারা জীবন সাধনা করেছেন মোগল সাম্রাজ্য রক্ষা ও সম্প্রসারিত করার, রাজনৈতিক শক্তি লাভ করার এবং ন্যায়বিচারবিষয়ক তার নিজস্ব ধারণার আলোকে শাসন করার।

    আওরঙ্গজেবের জীবন সম্পর্কে কিছু মৌলিক তথ্যের ব্যাপারে ইতিহাসবিদেরা একমত। তিনি জন্মগ্রহণ করেছিলেন ১৬১৮ সালের শরতে। ১৬৫৮ সালে ৩৯ বছর বয়সে তার প্রথম রাজ্যাভিষেক হয়েছিল। তিনি ১৬৮১ সালে পুরো রাজদরবার নিয়ে দাক্ষিণাত্য অভিযানে বের হয়েছিলেন। ওই সময় তার বয়স ছিল ৬০-এর কোঠার মাঝামাঝিতে। এরপর তিনি বিজাপুর, গোলকোন্ডা ও এমনকি তামিল নাড়ুর অংশবিশেষও জয় করেছিলেন। তিনি ৮৮ বছর বয়সে ১৭০৭ সালে পরলোকগমন করেন। তবে আমরা তথ্যগুলোকে কিভাবে একসাথে করে সাজাব, তার আলোকে আওরঙ্গজেব সম্পর্কে আকর্ষণীয় সবকিছু বের হয়ে আসে। অন্য কথায় বলা যায়, আর এই ভাষ্যই আসল জিনিস।

    আওরঙ্গজেব সম্পর্কে আমার ভাষ্য একইসাথে সম্রাট হিসেবে তার জীবনে গভীরতা ও ব্যাপকতা অনুসন্ধান করেছে। এগুলো কিছুটা কালক্রমানুনিকভাবে ও কিছুটা বিষয়ভিত্তিক সাজানো হয়েছে। শৈশব থেকে মৃত্যু পর্যন্ত আওরঙ্গজেবের জীবনকে অনুসরণ করতে গিয়ে আমরা মোগল রাজত্ব, নৈতিক আচরণ, রাজনীতি সম্পর্কে তার ধারণা গঠনকারী প্রধান শক্তিগুলো উপলব্ধি করতে পারি, সময়ের পরিক্রমায় এসব শক্তি কিভাবে বিবর্তিত হয়েছে, তাও দেখতে পাই। সিংহাসনে থাকাকালীন কিছু ঘটনা ও পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে আমরা আওরঙ্গজেব সম্পর্কে আরো গভীর মূল্যায়ন ও তার ঐতিহাসিক নীতির ফলাফল সম্পর্কে জানতে পারি।

    আমি আওরঙ্গজেবের জীবনের প্রথম চার দশক তথা তার তারুণ্য আমল দিয়ে শুরু করব। এ সময়ই তিনি বিশেষ করে ভাইদের বিরুদ্ধে আসন্ন উত্তরাধিকার লড়াইয়ে বিপুলভাবে জয়ী হওয়ার অবস্থান সৃষ্টি করেছিলেন। দুই বছরের রক্তাক্ত সংগ্রামের পর আওরঙ্গজেব সিংহাসন নিশ্চিত করেন, অল্প সময়ের মধ্যেই তার নিজের প্রয়োজনের (তার প্রায় ৫০ বছরের শাসনকালে প্রকাশিত প্রকল্প) সাথে সামঞ্জস্যতা রেখে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া ক্ষমতাসীন সংস্কৃতির সাথে খাপ খাইয়ে নিতে শুরু করেন। আওরঙ্গজেবের শাসনের তিনটি বিষয় তার শাসন কৌশল ও ন্যায়বিচার-সম্পর্কিত ধারণা পেতে আমাদের সহায়তা করে। এগুলো হচ্ছে : সাম্রাজ্যিক আমলাতন্ত্র, একজন নৈতিক নেতা হিসেবে আওরঙ্গজেবের নিজেকে মূল্যায়ন এবং হিন্দু ও জৈন মন্দির সম্পর্কে তার নীতি। এগুলো আওরঙ্গজেবের শাসনকালের সবচেয়ে বিতর্কিত বিষয়গুলোর সাথে সম্পৃক্ত এবং স্বল্প জানা ঘটনাগুলো সামনে নিয়ে আসে। সর্বোপরি, এসব অধ্যায় প্রায়ই একটিমাত্র চশমা দিয়ে দিয়ে বিকৃতভাবে উপস্থাপিত একজন বাদশাহ-সম্পর্কে ঐতিহাসিক গভীরতা যোগ করে। আমি এর পর আওরঙ্গজেবের জীবনের শেষ দিকের বর্ণনা দেব। এসবের মধ্যে রয়েছে দাক্ষিণাত্যে তার শেষ দশকগুলোর সংগ্রাম ও মৃত্যু। অষ্টাদশ শতকে মোগল সাম্রাজ্যের পতনের জন্য তাকে যেসব কারণে অভিযুক্ত করা হয়, সেগুলোর ওপরও আমি আলোকপাত করব।

    ব্যাপক গবেষণার ওপর ভিত্তি করে আমি প্রস্তাব করছি যে আমরা রাজপুরুষ হিসেবে আওরঙ্গজেবকে (তিনি রাজপরিবারের গতিশীলতার জালে নিজেকে জড়িয়ে ফেলেছিলেন। এটি তার প্রথম দিকের জীবন গড়ে দিয়েছিল এবং পরে তাকে এমন এক ভারতবর্ষীয় সম্রাটে পরিণত করেছিল, যিনি ভূখণ্ড, রাজনৈতিক শক্তি ও বিশেষভাবে ন্যায়বিচারের প্রতি ক্ষুধিত ছিলেন) সফলভাবে দেখতে পাব!

  • যুবরাজ আমল

    যুবরাজ আমল

    যুবরাজ আমল

    ভারতবর্ষীয় যুবরাজের শৈশব

    আশা করা যায়, তার শুভাগমন এই শ্বাশত রাজবংশের জন্য সৌভাগ্যময় আর শুভ প্রমাণিত হবে।

    —নাতি আওরঙ্গজেবের জন্মের পর জাহাঙ্গীরের শুভেচ্ছা

    দাদা জাহাঙ্গীরের রাজত্বকালে গুজরাতের দোহাদে ১৬১৮ সালের ৩ নভেম্বর জন্মগ্রহণ করেন আওরঙ্গজেব। এর কয়েক সপ্তাহ পর আওরঙ্গজেবের বাবা যুবরাজ খুররম (পরে শাহ জাহান নামে পরিচিত) জন্ম-উৎসবের আয়োজন করেন। এ সময় তিনি সদ্য জন্ম নেওয়া তার ছেলেকে গর্বের সাথে প্রদর্শন করেন, রাজকোষাগারে বিপুল পরিমাণে মণি-মানিক্য ও কয়েক ডজন হাতি পাঠিয়ে দেন। তবে এ ধরনের সুপ্রশন্ন সূচনা সত্ত্বেও বাবার আনুকূল্য নিশ্চিত করাটা আওরঙ্গজেবের জন্য সহজ হয়নি।

    আওরঙ্গজেব ছিলেন শাহ জাহানের তৃতীয় ছেলে। তার বড় দুই ভাই হলেন দারা শুকোহ ও শাহ সুজা। এক বছর পর শাহ জাহানের চতুর্থ ছেলে মুরাদের জন্ম হয়। চারজনই ছিলেন আপন ভাই, শাহ জাহানের প্রিয় স্ত্রী মোমতাজের ছেলে। অন্য ভাইদের মতো আওরঙ্গজেবও নানা বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাহিত্যিক ঐতিহ্যে পরিব্যপ্ত রাজকীয় শিক্ষালাভ করেন।

    পাঠ্যক্রম অনুযায়ী আওরঙ্গজেব কোরআন ও হাদিস, ধর্মীয় জীবনীসহ ইসলামি ধর্মীয় পুস্তকাদি অধ্যায়ন করেন। তিনি তুর্কি সাহিত্যও পাঠ করেন, ক্যালিগ্রাফির শিল্প-সম্পর্কে শিক্ষা গ্রহণ করেন। মোগলদের রাজকীয় শিক্ষাব্যবস্থায় ফারসি ক্লাসিক, বিশেষ করে সাদি, নাসিরউদ্দিন তুসি ও হাফিজের মতো বর্তমানেও অত্যন্ত প্রিয় মহান কবি ও পণ্ডিতদের রচনাবলী বেশ গুরুত্ব পেত। গুঞ্জন রয়েছে যে আওরঙ্গজেবের বিশেষ প্রিয় গ্রন্থ ছিল রুমির মসনবি। এসব ফারসি সাহিত্য মোগল রাজপুরুষদের নৈতিক মূল্যবোধ গড়ে দিত, বিশেষ করে ন্যায়বিচার, আদব, আখলাক ও রাজত্ব সম্পর্কে তাদের ধারণা বিকশিত করত।

    আওরঙ্গজেবকে সম্ভবত মহাভারত ও রামায়ণের মতো সংস্কৃতি গ্রন্থরাজির ফারসি অনুবাদের সাথেও ভালোভাবে পরিচিত করানো হয়েছিল। এসব অনুবাদের পৃষ্ঠপোষকতা করেছিলেন আওরঙ্গজেবের দাদার বাবা আকবর। আমরা জানি যে আকবর তার এক ছেলের কাছে রাজকীয় শিক্ষার জন্য মহাভারত উপকারী বলে সুপারিশ করেছিলেন। শৈশব থেকেই আওরঙ্গজেব অনর্গল হিন্দি বলতে পারতেন। মোগল পরিবারের চতুর্থ প্রজন্ম হিসেবে তিনি এই দক্ষতা অর্জন করেছিলেন। তিনি হিন্দি সাহিত্যবিষয়ক নিবন্ধগ্রন্থে দক্ষ ছিলেন, তা ছিল সম্ভবত তার আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণেরই অংশবিশেষ। এমনকি প্রাক-আধুনিক হিন্দির সাহিত্যিক বাহন ব্রজ ভাষায় তিনি মৌলিক রচনাও করেছেন বলে বলা হয়ে থাকে। মোগল রাজকীয় পাঠ্যক্রমে তরবারি, ছোরা, গাদা বন্দুক, সামরিক কৌশল ও প্রশাসনিক দক্ষতার মতো বাস্তব অনুশীলনও অন্তর্ভুক্ত ছিল।

    শিক্ষার বাইরে মোগল রাজপুরুষের শৈশবের অনুষঙ্গ ছিল ভাইদের মধ্যকার প্রতিদ্বন্দ্বিতা, আওরঙ্গজেবের বেড়ে ওঠাও ব্যতিক্রম ছিল না।

    অল্প বয়স থেকেই শাহ জাহানের চার ছেলে মোগল সিংহাসনের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতায় লিপ্ত ছিলেন। মোগলরা মধ্য এশিয়ার উত্তরাধিকার প্রথা অনুসরণ করত। এই প্রথায় পরিবারের সব পুরুষ সদস্যই রাজনৈতিক ক্ষমতা দাবি করতে পারত, বয়স এখানে অপ্রাসঙ্গিক বিবেচিত হতো। আকবর প্রতিদ্বন্দ্বিতা কমিয়ে আনেন বৈধ উত্তরাধিকারের তালিকা কেবল ছেলেদের মধ্যে আবদ্ধ রেখে (এর ফলে ভাতিজা ও ছেলে কাজিনরা বাদ পড়ে যায়)। প্রথম সন্তানই উত্তরাধিকারী হবে, এমন আইন না থাকায় শাহ জাহানের দীপ্তিময় ময়ুর সিংহাসন একদিন আওরঙ্গজেবের অধিকারে আসতেই পারে, যদি তিনি তার দাবিদার ভাইদের পেছনে ফেলে দিতে পারেন। অবশ্য শৈশবেই ভাইদের থেকে আওরঙ্গজেব যে আলাদা তা প্রমাণ করার সুযোগ তিনি পেয়েছিলেন খুবই সামান্য।

    শাহ জাহান প্রকাশ্যে তার বড় ছেলের প্রতি আনুকূল্য প্রদর্শন করতেন। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, দারা শুকোহর প্রথম বিয়ের অনুষ্ঠানটি মোগল ইতিহাসের অন্য সব আয়োজন ছাপিয়ে যায়। এতে খরচ হয়েছিল ৩২ লাখ রুপি। আর কোনো বিয়েতে এত অর্থ ব্যয় হয়নি। ১৬৩৩ সালে রাজপরিবার এত জৌলুসময় আয়োজন করেছিল, যা আজও বিস্ময় সৃষ্টি করে। ইউরোপিয়ান পর্যবেক্ষক পিটার মান্ডের মতে, সম্ভ্রম-জাগানিয়া আতশবাজির প্রদর্শন আগ্রার আকাশে আধা মাইল পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছিল। শাহ জাহানের শাসনকাল সম্পর্কে সরকারি কার্যবিবরণী পাদশাহনামায় ওই বিবাহ অনুষ্ঠানের চিত্র শোভিত হয়ে আছে। গ্রন্থটি বর্তমানে সংরক্ষিত রয়েছে ইংল্যান্ডের উইন্ডসর ক্যাসলে। স্পন্দমান দৃশ্যাবলীতে রাজকীয় সঙ্গীতজ্ঞ, উপহারবাহক, শুভাকাঙ্ক্ষী ও কর্মকর্তাদের নিয়ে গড়া বিশাল জনস্রোতকে বর্ণাঢ্য সাজে শাহ জাহানের প্রিয় ছেলের সম্মানে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। ওই সময় আওরঙ্গজেবের বয়স ছিল ১৪ বছর। অনুষ্ঠানে তিনি উপস্থিত ছিলেন বলেই জানা যায়। কিন্তু বিবাহ অনুষ্ঠান নিয়ে পাদশাহনামায় যেসব ছবি রয়েছে, তাতে স্থান পাওয়ার মতো উপযুক্ত বিবেচিত হননি তিনি।

    দারা শুকোহর বিয়ের কয়েক মাস পর আওরঙ্গজেব তার বাবার নজরে পড়ার একটি বিরল সুযোগ লাভ করেন। রাজকীয় প্রিয় বিনোদন হাতির লড়াইয়ের আয়োজন করতে বলেছিলেন শাহ জাহান। সুধাকর ও সুরত সুন্দর (মোগল হাতিদের নাম প্রায়ই হিন্দিতে রাখা হতো) মুখোমুখি হলো। খুব কাছ থেকে লড়াই দেখার জন্য বাদশাহ ও তার তিন বড় ছেলে লড়াই ঘোড়ার পিঠে কাছাকাছিই অবস্থান করছিলেন। হঠাৎ করেই সুধাকর পাশবিক রোষে আওরঙ্গজেবকে আক্রমণ করে বসে। আওরঙ্গজেব হাতির মাথায় বর্শা বিদ্ধ করেন। এতে হাতিটি আরো ক্ষেপে যায়। সুধাকর তখন আওরঙ্গজেবের ঘোড়াটিতে কাবু করে, ফলে তিনি মাটিতে পড়ে যান। অন্যরা সাহায্য করার চেষ্টা করেন। সুজা ও রাজা জয় সিং (যথাক্রমে আওরঙ্গজেবের ভাই ও প্রখ্যাত রাজপুত) অস্ত্র হাতে এগিয়ে আসেন, আতশবাজি নিক্ষেপ করে হাতিকে লক্ষ্যচ্যুত করার চেষ্টা করে প্রহরীরা। কিন্তু তাতে কাজ হয়নি। কেবল সুরত সুন্দরই আওরঙ্গজেবের কাছ থেকে সুধাকরকে ফিরিয়ে আবার লড়াইয়ে মত্ত করতে সক্ষম হয়।

    উল্লেখ্য, এই জীবন-মরণ লড়াইয়ে দারা শুকোহকে কোথাও দেখা যায়নি। এই ঘটনার লিখিত বিবরণে তার ভূমিকার কোনো কথা নেই, আর টিকে থাকা ছবিতে দারাকে পেছনে ওঁত পেতে থাকতে দেখা যায়, তিনি তখন ক্ষতি ও গৌরব উভয় থেকেই নিরাপদ দূরত্বে ছিলেন।

    ফারসি কবিতার মাধ্যমে আওরঙ্গজেবের সাহসিকতা স্মরণীয় করে রেখেছেন শাহ জাহানের রাজকবি আবু তালেব কালিম। তিনি চমৎকারভাবে বর্ণনা করেছেন কিভাবে আওরঙ্গজেবের বর্শা বিদ্যুৎ গতিতে সুধাকরের মাথায় আঘাত করেছিলেন। তারপর যুবরাজের বর্শার আঘাতে হাতির মনকে বিষিয়ে পাগল করে দিলো।’ আওরঙ্গজেবের সাহসিকতার প্রশংসা করেন শাহ জাহান, অন্তত এক মুহূর্তের জন্য হলেও তিনি তার নিজের ছবি দেখেছিলেন তার ছেলের মধ্যে। শাহ জাহানের দরবারি ইতিহাস লেখকেরা একমত হয়ে আওরঙ্গজেবের ভয়হীন এই কৃতিত্বের সাথে ১৬১০ সালে শাহ জাহানের সাথে ক্রুদ্ধ এক সিংহের মোকাবিলার তুলনা করেন। ওই ঘটনা দেখেছিলেন শাহ জাহানের বাবা জাহাঙ্গীর।

    কয়েক বছর পর সাম্রাজ্য পরিচালনায় সহায়তা করার জন্য আওরঙ্গজেবকে দরবার থেকে দূরে পাঠিয়ে দেন শাহ জাহান। তখন আওরঙ্গজেবের বয়স মাত্র ১৬ বছর। ১৬৩৫ থেকে ১৬৫৭ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ২২ বছর ধরে আওরঙ্গজেব মোগল সাম্রাজ্য চষে বেড়ান; বলখ, বুন্দেলখন্ড ও কান্দাহারে লড়াই করেন; গুজরাত, মুলতান ও দাক্ষিণাত্য পরিচালনা করেন।

    যুবরাজ এসবের মধ্যেও উপভোগের জন্য সময় বের করে নিতেন, হিরাবাই জৈনাবাদির সাথে ঝড়ো রোমান্সে মেতে ওঠার সময়ও বের করে নিয়েছিলেন। ১৬৫৩ সালে আওরঙ্গজেব বুরহানপুরে তার মামার বাড়ি বেড়াতে গিয়ে গাছ থেকে আম পাড়ার খেলায় মত্ত হিরাবাইকে দেখে তার প্রেমে বিভোর হয়ে পড়েন। মেয়েটি ছিলেন গায়িকা ও নর্তকী। দুজনে প্রেমের বন্ধনে আবদ্ধ হন। গুঞ্জন রয়েছে যে আওরঙ্গজেব এই তরুণীর এতটাই অনুগত হয়ে পড়েছিলেন যে তিনি এমনকি সারা জীবনের জন্য মদ্যপান না করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন (প্রথম ফোঁটা মদ আওরঙ্গজেবের ঠোঁট দিয়ে যাওয়ার আগেই তিনি থামিয়ে দিয়েছিলেন)। কিন্তু হায়, হিরাবাই এক বছরের কম সময়ের মধ্যে মারা যান, তাকে আওরঙ্গাবাদে সমাহিত করা হয়। এ ধরনের চমকপ্রদ মুহূর্ত সত্ত্বেও আওরঙ্গজেব তার প্রাপ্তবয়স্ক রাজপুরুষালী আমলে রাষ্ট্রীয় কাজেই বেশির ভাগ সময় ব্যয় করেছেন।

    রাজপরিবার থেকে আওরঙ্গজেবের দূরে থাকাও তাকে তার বাবার হৃদয়কে স্নেহসিক্ত করতে পারেনি। তিনি তার ২২ বছরের এই সময়কালে খুব কমই রাজদরবারে এসেছেন। বিশেষ বিশেষ ঘটনায়, যেমন ১৬৩৭ সালে তার প্রথম বিয়ের সময় এসেছিলেন। প্রশাসনিক ও সামরিক অভিযান- উভয় দিক থেকেই নিজেকে দক্ষ প্রমাণ করেছিলেন আওরঙ্গজেব। তবে প্রায়ই দিল্লির সিদ্ধান্তে হতাশ হতেন। দৃশ্যত তার সাফল্য ক্ষুণ্ণ করার জন্যই এমনটা করা হতো। উদহারণ হিসেবে ১৬৫০-এর দশকের ঘটনা বলা যায়। দাক্ষিণাত্যে তার কয়েকটি প্রায় জয়ের মুহূর্তে তাকে বাধ্য করা হয় প্রত্যাহারের জন্য। দারা শুকোহর তাগিদে এই আদেশ জারি করেছিলেন শাহ জাহান।

    আওরঙ্গজেব তার ২০ ও ৩০-এর কোঠার বয়সকালে যখন যুদ্ধক্ষেত্রে নিজেকে প্রমাণ করছিলেন, প্রশাসনিক সক্ষমতা বাড়াচ্ছিলেন, দুর্ধর্ষ খ্যাতি অর্জন করছিলেন, তখন দারা শুকোহ রাজদরবারে আয়েসী জীবনযাপন করছিলেন। শাহ জাহানের বড় ছেলে পরিচিত ছিলেন দার্শনিক আগ্রহের জন্য, হিন্দু ও মুসলিম সাধু-সন্ন্যাসীদের সাথে বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনায় দিন কাটাত তার। কাগজে-কলমে দারা সবসময়ই আওরঙ্গজেবের চেয়ে এগিয়ে ছিলেন। বড় ভাই মোগল মনসব ব্যবস্থায় (এতে রাষ্ট্রের সব কর্মকর্তা সম্পৃক্ত ছিলেন) ছিলেন উচ্চতর পদবির অধিকারী। শাহ জাহান তাকেই সিংহাসনে আসীন দেখতে চান বলে ব্যাপকভাবে ধারণা করা হতো। কিন্তু দারা কেন্দ্রীয় রাজদরবারের অত্যন্ত কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশের বাইরে থাকা প্রকৃত দুনিয়ার অভিজ্ঞতার অভাবে ছিলেন। আর এটিই পরে মারাত্মক অসুবিধা হিসেবে পরিগণিত হয়েছিল।

    লোকরঞ্জক স্মৃতিতে প্রায়ই দারা শুকোহর উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করা হয়, ভারতীয় ইতিহাসের বড় ‘কী হতো যদি’ বিবেচনা করা হয় তাকে। ‘ধর্মান্ধ’ আওরঙ্গজেবের বদলে ষষ্ট মোগল বাদশাহ যদি হতেন ‘উদার’ দারা, তবে কী হতো? ইতিহাস কি ভিন্ন দিকে মোড় নিত? সাম্প্রতিক সময়েও অনেকে শহিদ নাদিমের দারা নাটকে উদ্দীপ্ত হয়ে প্রশ্ন করেন, বাদশাহ হলে কি দারা ১৯৪৭ সালের ভারতবর্ষের নৃশংস বিভক্তি অনেক আগেই নাকচ করতে পারতেন? অযাচিত নস্টালজিয়া সরিয়ে রাখা রেখে বলা যায়, বাস্তবতা হলো এই যে জয়ী হতে বা মোগল সাম্রাজ্য শাসন করার জন্য পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ছিল না দারার। হিন্দুস্তানের মুকুটের জন্য চার ভাইয়ের মধ্যকার অনিবার্য মোকাবিলায় দারার অসুস্থ বাদশাহকে সাথে রাখাটা আওরঙ্গজেবের জোট, কৌশলগত দক্ষতা, 3 মোগল সাম্রাজ্য কয়েক দশক ধরে ঘুরে ঘুরে যে রাজনৈতিক বিচক্ষণতা অর্জন করেছিলেন, তার সাথে পাল্লা দেওয়ার মতো ছিল না।

    বিশ্ব জয় করলেন আওরঙ্গজেব

    ইয়া তখত ইয়া তাঁবুত
    হয় সিংহাসন নয়তো কবর

    —মোগল রাজত্বের একটি মন্ত্র

    শাহ জাহান ১৬৫৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসের এক সকালে জেগে মারাত্মক অসুস্থতা বোধ করলেন, প্রাসাদের বারান্দায় প্রজাদের সামনে হাজির হওয়ার দৈনন্দিন কাজটিও করতে পারলেন না। তিনি ওই দিনের দরবারও বাতিল করে দিলেন। শাহ জাহান এক সপ্তাহেরও বেশি সময় জনসাধারণের সামনে উপস্থিত হতে পারলেন না। ফলে যা ক্ষতি হওয়ার হয়ে গেল। বাদশাহর অসুস্থ হওয়ার খবর তীব্র বেগে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ল। দোকানদারেরা আতঙ্কিত হলো, লুটপাট বেড়ে গেল। শাহ জাহানের চার ছেলে মনে করলেন, তাদের বাবা মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে। ফলে তারা ক্ষমতার এই শূন্যতার সুযোগ গ্রহণ করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হলেন। প্রচলিত মোগল প্রথা অনুযায়ী, ছলে-বলে-কলে-কৌশলে যিনি জয়ী হবেন, তিনিই হবেন হিন্দুস্তানের পরবর্তী সম্রাট।

    সঙ্ঘাত বন্ধ হতে লাগল প্রায় দুই বছর এবং আওরঙ্গজেব অবিসংবাদিত বিজয়ী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলেন। সিংহাসনে উত্তরণের পরিক্রমায় আওরঙ্গজেব তার তিন ভাই— দারা শুকোহ, শাহ সুজা ও মুরাদ- ও বাবা শাহ জাহানকে পরাভূত করেছিলেন। ১৬৬০-এর দশকের শেষ দিকে পরিবারের ঘনিষ্ঠজনদের বিরোধ নিষ্পত্তি করার প্রক্রিয়ায় আওরঙ্গজেব তার দুই ভাইকে মৃত্যুদণ্ড দেন, আরেকজনকে ভারতবর্ষ থেকে বিতাড়িত করেন, বাবাকে (তিনি অল্প সময়ের মধ্যেই সুস্থ হয়ে ওঠেছিলেন) আটকিয়ে রাখেন আগ্রার লাল কেল্লায়। অবিভক্ত মোগল সাম্রাজ্য শাসন করার জন্য একমাত্র আওরঙ্গজেবই এই সহিংসতা থেকে অক্ষতভাবে বের হয়ে আসতে পেরেছিলেন!

    ইউরোপিয়ান পর্যটকেরা মোগল রাজপরিবারকে নিমজ্জিত করা নৃশংস, রক্তাক্ত উত্তরাধিকার লড়াইয়ে আতঙ্কিত হয়েছিলেন। কয়েক দশক পর মোগল ভারত সফরকারী ইতালির জেমেলি ক্যারেরি পারিবারিক দ্বন্দ্বকে ‘অপ্রাকৃতিক যুদ্ধ’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। আওরঙ্গজেবের শাসনকালের শেষ দিকে সুরাতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির চ্যাপলিন জন অভিংটন ‘এ ধরনের বর্বর আত্মদানের’ নিন্দা করেছেন, বিষয়টিকে ‘অমানবিক’ হিসেবে অভিহিত করে সমাপ্তি টেনেছেন। ফ্রান্সিস বার্নিয়ার ও নিকোলাও মানুচির মতো অন্যান্য ইউরোপিয়ান পর্যটন লেখক এসব ঘটনা নিয়ে জালিয়াতপূর্ণ ও বিভীষিকাময় দমবন্ধ করা বক্তব্য দিয়েছেন, চার ভাইয়ের, বিশেষ করে আওরঙ্গজেবের ‘আধিপত্য বিস্তারের লোলুপতা’ নিয়ে কথা বলেছেন। ভারতীয় পর্যবেক্ষকেরাও এই ঘটনা উল্লেখ করেছেন, তবে তারা ঘটনায় অনেক কম আশ্চর্য হয়েছেন, অন্তত শুরুতে এর নির্মমতা সম্পর্কে কম সরব ছিলেন।

    মোগল রাজকীয় ব্যবস্থা দীর্ঘ দিন ধরেই সুস্পষ্টভাবে ফরাসি বাক্য ইয়া তকত ইয়া তাঁবুত (হয় সিংহাসন নয়তো কবর) নীতিতে পরিচালিত হতো। শাহ জাহান তার দুই ভাইকে (১৬২২ সালে খসরু ও ১৬২৮ সালে শাহরিয়ার) খুন করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। তিনি দুই ভাতিজা ও দুই কাজিনকে মৃত্যুদণ্ড দেন ১৬২৮ সালে সিংহাসন দখল করার পর। পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি সাক্ষী দিচ্ছে যে শাহ জাহানের বাবা জাহাঙ্গীর দায়ী ছিলেন জাহাঙ্গীরের ছোট ভাই দানিয়েলের মৃত্যুর জন্য। আপাত দৃষ্টিতে মনে হতে পারে যে দানিয়েল মারা গিয়েছিলেন বিষাক্ত মদ পানে। এমনকি বাবর ও হুমায়ূনের মতো মোগল শাসনের প্রাথমিক যুগেও ভাইয়ের বিরুদ্ধে ভাই, বাবার বিরুদ্ধে ছেলের সহিংস সঙ্ঘাত দেখা গেছে।

    অবশ্য আওরঙ্গজেব ও তার ভাইদের মধ্যে সিংহাসন নিয়ে লড়াই প্রত্যাশিত থাকলেও সময় বা সঙ্ঘাতের ফলাফল পূর্বনির্ধারিত ছিল না।

    শাহ জাহান ১৬৫৭ সালে ছিলেন ৬৫ বছর বয়স্ক। তখনই তার আগের অন্য চার মোগল সম্রাটের চেয়ে তিনি অনেক বেশি দিন জীবিত ছিলেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও তার অসুস্থতা ছিল আকস্মিক ও অপ্রত্যাশিত। কী কারণে শাহ জাহান মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গিয়েছিলেন, সে ব্যাপারে পর্যবেক্ষকেরা একমত নন। ইতালির ভ্রমণকারী নিকোলি মানুচি তার বিশেষ রংচং মাখানো কায়দায় দাবি করেছেন যে অসংবৃত এই শাসক অতিরিক্ত মাত্রায় যৌন শক্তি বর্ধক ওষুধ গ্রহণ করেছিলেন। মানুচির স্বদেশী ক্যারেরিও উপসংহার টেনেছেন এই বলে যে অসম্ভব আবেগের বশবতী শাহ জাহান একজন বুড়ো মানুষের স্বাভাবিক অবস্থার চেয়ে অনেক বেশি যৌনতায় মজে গিয়েছিলেন। তবে বাস্তবে তার অসুস্থতার মূল কারণ হতে পারে মুত্রথলি বা আন্ত্রিক কোনো রোগ। যে কারণেই তিনি অসুস্থ হয়ে থাকুন না কেন, এর ফলেই উত্তরাধিকার লড়াই শুরু হয়েছিল, তবে চার যুবরাজের মধ্যকার সঙ্ঘাতের ভিত্তি আরো অনেক আগেই প্রস্তুত হয়েছিল।

    আওরঙ্গজেব ১৬৫০-এর দশকের প্রথম দিকে দারা শুকোহর বিরোধিতার লক্ষ্যে শাহ সুজা ও মুরাদের সাথে গোপন মিত্রতার বন্ধনে আবদ্ধ হন। তিন ছোট ভাই জানতেন যে তাদের বাবা তার বড় ছেলেকেই পছন্দ করছেন এবং দারাও হয়তো একই সময় তার ভাইদের খুন করার নিজস্ব পরিকল্পনা প্রণয়ন করছিলেন। সেই ১৬৫২ সালের দিকেও সমসাময়িক একটি ফরাসি ভাষ্যে দারাকে ‘তার ভাইদের রক্ত পান করতে তৃষ্ণার্ত নেকড়ে’ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। উত্তরাধিকার যুদ্ধ চলাকালে বলা হয়ে থাকে, শাহ জাহানের কাছে একটি চিঠি পাঠিয়ে আওরঙ্গজেব আবারো দারার খুনে প্রবৃত্তির কথা বিশেষ করে আওরঙ্গজেবের নির্দোষ রক্ত নিতে তার ব্যগ্রতার কথা জানিয়েছিলেন। তবে সময়ের পরিক্রমায় দেখা যায়, ভ্রাতৃহত্যার কাজটি করেছিলেন আওরঙ্গজেবই।

    শাহ জাহানের অসুস্থতার সময় দিল্লির দরবারে উপস্থিতি ছিলেন একমাত্র দারা শুকোহ। তার ভাইয়েরা তখন সাম্রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলো নিয়ন্ত্ৰণ করছিলেন। পূর্বে শাহ সুজা নিয়ন্ত্রণ করতেন বাংলা, পশ্চিমে মুরাদ পরিচালনা করতেন গুজরাত, আর দক্ষিণে আওরঙ্গজেব নিয়োজিত ছিলেন দাক্ষিণাত্যে। ভাইদের কাছে সংবাদপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টায় দারা চরদের আটকিয়ে ও রাস্তা বন্ধ করে দিয়েছিলেন। কিন্তু তাতে কাজ হয়নি। শাহ জাহানের অসুস্থতার খবর শুনেই তিন ছোট ভাই দারার ক্ষমতা গ্রহণ, তাদের খুন করার ষড়যন্ত্র ও তাদের বাবাকে বন্দী করা নিয়ে গুজব দিয়ে তাদের কান ভারী করে ফেললেন। চার মাত্রিক প্রতিযোগিতা দানা বেঁধে ওঠার প্রেক্ষাপটে সাম্রাজ্যের অভিজাতেরাও পক্ষাবলম্বন করেন। শাহ সুজা ও মুরাদ ছিলেন প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী, উভয়ের হাতে ছিল বিপুল সমর্থন। তবে মূল প্রতিযোগিতা হয়েছিল দারা ও আওরঙ্গজেবের মধ্যে। বেশির ভাগ মোগল অভিজাত এই দুজনের কোনো একজনকে সমর্থন করতেন। রাজপরিবারের নারীরাও মোগল উত্তরাধিকার লড়াইয়ে জড়িত হয়ে পড়েছিলেন। শাহ জাহানের তিন মেয়ে তাদের প্রিয়জনকে সিংহাসনের বসানোর জন্য বাছাই করে নেন। বড় মেয়ে জাহানারা সমর্থন করতেন দারা শুকোহকে, মেজ মেয়ে রোশানারা সমর্থন করতেন আওরঙ্গজেবকে। আর সবার ছোট মেয়ে গৌহারারা ছিলেন মুরাদের পক্ষে। দারার বিরুদ্ধে প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে মুরাদের সাথে শিথিল মিত্রতায় আবদ্ধ হন আওরঙ্গজেব।

    বাবার মৃত্যু নিয়ে ভুল খবর বিশ্বাস করে ১৬৫৭ সালের ডিসেম্বরে মুরাদ নিজেকে বাদশাহ ঘোষণা করেন, গুজরাতে অভিষেক অনুষ্ঠানও আয়োজন করলেন। আওরঙ্গজেবের কাছে আগেভাগে মুরাদের নিজেকে সম্রাট ঘোষণার চেয়েও বেশি হুমকিপূর্ণ ছিল মোগল সাম্রাজ্যের অন্যতম সম্পদশালী রাজ্য গুজরাতে মুরাদের শক্তিশালী অবস্থান ও তার হাতে থাকা বিপুলসংখ্যক সৈন্য। ছোট ভাইকে মিষ্টি কথায় তুষ্ট করে গুজরাত থেকে বের করার জন্য আওরঙ্গজেব তাকে প্রতিশ্রুতি দেন (তিনি সম্ভবত এই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করার কোনো ইচ্ছা তিনি পোষণ করেননি) : আওরঙ্গজেব ওয়াদা করেন যে দারা শুকোহ ও শাহ সুজাকে পরাজিত করার পর তিনি মোগল সাম্রাজ্যের উত্তর ও উত্তর পশ্চিমাংশ মুরাদের নিয়ন্ত্রণে ছেড়ে দেবেন। ইতিহাসবিদ ঈশ্বরদাস জানান যে আওরঙ্গজেব এমনকি তার ভাইকে একটি ফরাসি প্রবাদবাক্যের উদ্ধৃতিও দেন : দুই হৃদয় একসাথে হলে চিড়ে যায় পর্বত।’ এই কপটতায় কাজ হয়। গুজরাত থেকে বের হয়ে আসেন মুরাদ। আওরঙ্গজেবের বাহিনীর সাথে তার বাহিনী মিলে ১৬৫৮ সালের এপ্রিলে উজ্জায়িনির কাছে ধারমতে রাজকীয় বাহিনীকে পরাজিত করে। দুই ভাইয়ের পরবর্তী গন্তব্য ছিল দিল্লি। তখন তাদের লক্ষ্য মোগল সাম্রাজ্যের কেন্দ্র জয় করা।

    আওরঙ্গজেব ও মুরাদের যৌথ বাহিনী ১৬৫৮ সালের মে মাসের এক প্রচণ্ড উত্তপ্ত দিনে আগ্রার ঠিক পূর্ব প্রান্তে দারা শুকোহর ৫০ হাজার সদস্যের শক্তিশালী বাহিনীর মুখোমুখি হয়। সামুগড়ের লড়াই (ছবি ১) হিসেবে বর্তমানে পরিচিত এই প্রচণ্ড সঙ্ঘাতই মোগল উত্তরাধিকার সঙ্কটের ফয়সালাসূচক মুহূর্ত বিবেচিত হয়। সংঘর্ষের আগের দিন আওরঙ্গজেব তার ও মুরাদের বাহিনীকে বিশ্রামে রাখেন। আর দারার সৈন্যরা ভারী যুদ্ধসাজে প্রচণ্ড রোদে তাদের শত্রুর বাহিনীর প্রতীক্ষায় থাকে। তাদের শক্তি ক্ষয় হয়, দারার সেনাবাহিনীর অনেকে গরমেই কাবু হয়ে পড়ে, তাদের শেষ করার জন্য শত্রুর আঘাতের প্রয়োজন পড়েনি।

    পরের দিন ভোরে শুরু হলো যুদ্ধ, উভয় পক্ষই গোলন্দাজ বাহিনী, অশ্বারোহী বাহিনী, তীরন্দাজ, যুদ্ধ হাতি বাহিনী ও পদাতিক বাহিনীতে সুসজ্জিত ছিল। আওরঙ্গজেব ও দারা উভয়ে নিজ নিজ হাতিতে সওয়ার হয়ে তাদের বাহিনীর শীর্ষে অবস্থান করছিলেন। তাদের বাহিনী প্রবল যুদ্ধ করছিল, আঠার শতকের এক ইতিহাসবিদের ভাষায় ‘যুদ্ধের তীব্র শব্দ ওই সন্ত্রাস-জর্জরিত ময়দানের ওপরে ওঠে গিয়েছিল।’ দিনের শেষভাগে আওরঙ্গজেবের সৈন্যরা দারা শুকোহকে বহনকারী যুদ্ধহাতিকে লক্ষ্য করে কামানের গোলা ও রকেট নিক্ষেপ করার মতো অবস্থানে অগ্রসর হয়ে পড়ে। জীবন বিপন্ন হওয়ার আশঙ্কায় দারা হাতি থেকে নেমে ঘোড়ায় চড়ে যুদ্ধ ক্ষেত্র থেকে পালিয়ে যান। তিনি পেছনে রেখে যান একটি বিশৃঙ্খল ও মনোবল হারা বাহিনী। এই বাহিনী অল্প সময়ের মধ্যেই পর্যুদস্ত হয়।

    দারা শুকোহ আগ্রায় পালিয়ে যান, সেখানে লাল কিল্লায় শাহ জাহান আয়েসে অবস্থান করছিলেন। দারা এরপর দিল্লি হয়ে লাহোরে আত্মগোপন করেন। বড় ভাই যখন বন্দী হওয়া থেকে রক্ষা পেতে ছুটছেন, তখন আওরঙ্গজেব ও মুরাদ আগ্রার লাল কিল্লার দিকে অগ্রসর হন। শাহ জাহান তখন সুস্থ হয়ে ওঠলেও ছিলেন নামমাত্র সম্রাট।

    শাহ জাহান চেষ্টা করেছিলেন আওরঙ্গজেবের সাথে সাক্ষাত করার। তিনি এমনকি ইউসুফ নবী ও ইয়াকুব নবীর কয়েক বছরের বিচ্ছেদের পর মিলন হওয়া নিয়ে পবিত্র কোরআনে থাকা ঘটনার উদ্ধৃতিও দেন। তিনি চাচ্ছিলেন ছেলেকে মিষ্টি কথায় ভুলিয়ে তার সাথে সাক্ষাত করতে। প্রতারিত হওয়ার শঙ্কায় আওরঙ্গজেব তা প্রত্যাখ্যান করেন। এর বদলে ১৬৫৮ সালের জুনের শুরুতে তিনি ও মুরাদ আগ্রা দুর্গ অবরোধ করে এর পানি সরবরাহ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন করে দেন। শাহ জাহান ছিলেন দুর্গের ভেতরে। কয়েক দিন পর তিনি দুর্গের ফটক খুলে দিয়ে তার কোষাগার, অস্ত্রভাণ্ডার ও নিজেকে তার ছোট দুই ছেলের কাছে উন্মুক্ত করে দেন। বড় মেয়ে জাহানারাকে মধ্যস্ততাকারী হিসেবে ব্যবহার করে শেষ চাল হিসেবে শাহ জাহান সাম্রাজ্যকে পাঁচ ভাগে ভাগ করার একটি প্রস্তাবে রাজি করানোর চেষ্টা করেছিলেন আওরঙ্গজেবকে। তিনি তিন ভাইকে সাম্রাজ্যের তিন অংশ এবং আওরঙ্গজেবের বড় ছেলে মোহাম্মদ সুলতানকে (মৃত্যু ১৬৭৬) একটি অংশ প্রদান করার প্রস্তাব করেন। শাহ জাহানের অবশিষ্ট সমর্থকদের অনেকে দ্রুততার সাথে আওরঙ্গজেবের বিজয়কে মেনে নেন। এমনকি তাদের অবরোধ সম্পন্ন করার আগেই তারা তার প্রতি আনুগত্যের শপথ গ্রহণ করেছিলেন।

    কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই আওরঙ্গজেব ও মুরাদের মধ্যে টানাপোড়েনের সৃষ্টি হয়। মুরাদ তার সৈন্যদের বেতন বাড়িয়ে দেন, দ্রুত পদোন্নতির প্রতিশ্রুতি দেন, আনুগত্য বদল করার জন্য আওরঙ্গজেবের সৈন্যদের অনেককে উদ্বুদ্ধ করার চেষ্টা করেন। বড় ভাইয়ের তাগিদ সত্ত্বেও দারা শুকোহর পিছু ধাওয়ার ব্যাপারে গড়িমশি করতে থাকেন মুরাদ। তিনি এমনকি আওরঙ্গজেবের সাথে বৈঠকও এড়িয়ে যান। আওরঙ্গজেব তখন সিদ্ধান্ত নেন যে মুরাদ তার কার্যকারিতা হারিয়ে ফেলেছেন।

    আওরঙ্গজেব ১৬৫৮ সালের গ্রীস্মে ছোট ভাইকে তার সাথে ব্যক্তিগত সাক্ষাতে প্রলুব্ধ করতে অসুস্থতার ভান করেন। খাওয়া দাওয়ার পর মুরাদ বিশ্রাম নিতে রাজি হয়ে নিরস্ত্র হন। এই কাহিনীর পরবর্তীকালের সংস্করণগুলোতে বলা হয় যে মুরাদ মদ্য পান করেন (আর আওরঙ্গজেব সংযত ছিলেন) বা মর্দনকারীদের দক্ষ হাতের কারসাজিতে আয়েসের জগতে চলে যান, তরুণ যুবরাজের চিন্তাভাবনা বিনাশ করে দেওয়া ভোগে লিপ্ত হন, তাকে গভীরভাবে অবচেতন করে ফেলা হয়। প্রতিরক্ষাহীন হওয়া মাত্র আওরঙ্গজেবের সৈন্যরা মুরাদকে গ্রেফতার করে শৃঙ্খলাবদ্ধ করে ফেলে। ছোট ভাইয়ের ২০ হাজার সদস্যের বাহিনীকে আত্মস্ত করে নিতে বিলম্ব করেননি আওরঙ্গজেব।

    হিন্দুস্তানের সম্রাট

    উৎসব যখন খোদ বেহেশতের মতো সজ্জিত হয়, তখন আকাশও তাদের আসন ছেড়ে নৃত্য করে।

    —কাফি খানের উদ্ধৃতি। আওরঙ্গজেবের প্রথম অভিষেকের বর্ণনা এভাবেই দিয়েছেন আঠার শতকের এই ইতিহাসবিদ

    মুরাদ কারারুদ্ধ, শাহ জাহান বন্দী, দারা পলাতক- এমন অবস্থায় প্রথম অভিষেক অনুষ্ঠান আয়োজন করতে যথেষ্ট বেশি সময়ই নিয়েছিলেন আওরঙ্গজেব। ১৬৫৮ সালের ৩১ জুলাই জ্যোতিষীদের কাছে শুভ বলে বিবেচিত দিনটিতে দিল্লির শালিমার গার্ডেন্সে নিজেকে সম্রাট ঘোষণা করে আলমগীর (বিশ্বজয়ী) রাজকীয় পদবি গ্রহণ করেন তিনি।

    আওরঙ্গজেব মোগল প্রথা অনুসরণ করে সঙ্গীতের আয়োজন করার নির্দেশ দেন, উপহার বণ্টন করেন। তবে নিজের নামে মুদ্রা প্রচলন ও জুমার নামাজে খুতবা প্রদানের রীতি অনুসরণ করা থেকে বিরত থাকেন। স্বল্প পরিসরের অনুষ্ঠান হলেও এর মাধ্যমেই আওরঙ্গজেব যুগের সূচনা ঘটে। কয়েক বছর পর আঁকা প্রথম অভিষেক অনুষ্ঠানের ছবিতে একইসাথে সরলতা ও উদ্দীপনার সমাবেশ দৃষ্টিগোচর হয়। ছবিতে কালো দাড়িতে তরুণ আওরঙ্গজেব হাঁটু ভাজ করে রয়েছেন। রাজদরবার সফরকারী পরবর্তীকালের লোকজন তার উঁচু নাসিকা ও জলপাই রঙের যে ত্বকের বর্ণনা দিয়েছে, এই ছবিতে তাকে তেমনই দেখা যায়। ছবিতে তিনি সোজা হয়ে বসে ছিলেন, শেষ বয়সে তার কাঁধ ঝুঁকে পড়ার যেসব চিত্র দেখা যায়, তা এতে অনুপস্থিত। ছবিতে আর মাত্র দুটি মানুষ দৃশ্যমান। এতে অনুষ্ঠানটি যে সংক্ষিপ্ত ছিল, তার ইঙ্গিত মেলে। অখণ্ড মোগল সাম্রাজ্যের সমৃদ্ধ, মানসম্পন্ন শাসনের উচ্চাশায় আঁকা ছবিতে বেহেশতি অনুমোদনের চিহ্ন হিসেবে উপরে কালো মেঘ ভেদ করে সদ্য মুকুট পরা সম্রাটের ওপর আলোর ঝরনাধারা নেমে আসতে দেখা যায় (ছবি-২)।

    প্রাথমিক অভিষেকের পর আওরঙ্গজেব তার তখনো মুক্ত থাকা দুই ভাই দারা শুকোহ ও শাহ সুজাকে বাগে আনার কাজ শুরু করলেন।

    আওরঙ্গজেব কয়েক মাস ধরে দারাকে অনুসরণ করে গেলেন। তাকে তিনি প্রথমে লাহোরে শনাক্ত করেন, তারপর তাকে মুলতানে তাড়িয়ে নেন, পরে আরো দক্ষিণে সিন্ধু নদ পথে এগিয়ে চলেন। ধরা পড়া এড়ানোর জন্য দারা শুকোহ তার ক্রমশ ছোট হতে থাকা বাহিনীকে দুর্গম এলাকা দিয়ে পরিচালিত করেন, কখনো বিশুদ্ধ পানির ধারা এড়িয়ে জঙ্গল কেটে সফর করতে থাকেন। শেষ পর্যন্ত তিনি গুজরাতে তার পথচলার সমাপ্তি টানেন, তত দিনে অনেক সমর্থকই তার সাথে ছিল না। ১৬৫৮ সালের সেপ্টেম্বরে দারাকে ধরার কাজটি তার অনুগত কর্মকর্তাদের হাতে ন্যস্ত করে আওরঙ্গজেব দিল্লির দিকে যাত্রা শুরু করেন শাহ সুজাকে সামাল দেওয়ার জন্য।

    শাহ সুজা আগের বছরটি অত্যন্ত ব্যস্ত কাটিয়েছিলেন। ১৬৫৭ সালে শাহ জাহানের অসুস্থতার খবর পেয়ে তিনি নিজেকে বাদশাহ ঘোষণা করে জাঁকজমকপূর্ণ আবুল ফৌজ (বিজয়ের পিতা) নাসরুদ্দিন (বিশ্বাসের রক্ষক) মোহাম্মদ তৃতীয় তৈমুর দ্বিতীয় আলেকজান্ডার শাহ সুজা বাহাদুর গাজি পদবি ধারণ করেন। তবে শাহ সুজার মোগল সাম্রাজ্য শাসন করার স্বপ্ন স্বল্পস্থায়ী হয়েছিল। ১৬৫৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে (ওই বছরের মে মাসে সামুগড়ের যুদ্ধের আগে, যেখানে আওরঙ্গজেব ও মুরাদের যৌথ বাহিনী দারা শুকোহর বাহিনীকে হারিয়েছিল) শাহ সুজা যুদ্ধে নামেন দারা শুকোহর বাহিনীর বিরুদ্ধে। বেনারাসের কাছে হওয়া ওই যুদ্ধে দারার বাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন তার ছেলে সোলায়মান শুকোহ। যুদ্ধে শাহ সুজা শোচনীয়ভাবে পর্যুদস্ত হন। এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুদ্ধক্ষেত্রে এত রক্ত ঝড়েছিল যে ঘাসগুলো টিউলিপ ফুলের রঙ ধারণ করেছিল। ১৬৫৮ সালের মে মাসে সুজাকে এক চিঠি লিখে আওরঙ্গজেব জানালেন, তিনি যদি সম্রাট ঘোষণা থেকে সরে আসেন, তবে তার ওপর আওরঙ্গজেব সাম্রাজ্যের পূর্ব অংশের শাসনভার ন্যস্ত করবেন। সুজা প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যান করে যুদ্ধের প্রস্তুতি নেওয়া শুরু করেন।

    আওরঙ্গজেব ও শাহ সুজা ১৬৫৯ সালের জানুয়ারিতে এলাহাবাদের উত্তর পশ্চিম দিকে খাজওয়ায় যুদ্ধে নামলেন। শেষ মুহূর্তে শাহ জাহানের সাবেক অনুগত রাজপুত যশোবন্ত সিং দল ত্যাগ করা সত্ত্বেও সুজার চেয়ে আওরঙ্গজেবের বাহিনী ছিল অনেক বড়, ২:১। কিন্তু তবুও তীব্র লড়াই হয়। জানা যায়, একপর্যায়ে আওরঙ্গজেব তার হাতির পাগুলো বেঁধে ফেলার হুকুম দেন প্রাণিটির পলায়ন রোধ করার জন্য। আওরঙ্গজেবের দৃঢ়তা তার লোকদের মনোবল চাঙ্গা করে, তারা সুজার বাহিনীকে পরাজিত করে। সুজা পালিয়ে যান। পরের দেড় বছর ধরে আওরঙ্গজেবের বাহিনী ক্রমাগত সুজাকে তাড়িয়ে বেড়াতে থাকে, শেষ পর্যন্ত তাকে ভারতবর্ষই ত্যাগ করতে বাধ্য করে। ১৬৬০ সালের মে মাসে শাহ সুজা তার পরিবার নিয়ে নৌপথে ঢাকা ছাড়েন। তারা বার্মায় যান। সেখানে তারা আরাকানের শাসকের হাতে মারা পড়েন। আরাকানের শাসক সম্ভবত আশঙ্কা করেছিলেন যে মোগল যুবরাজ অভ্যুত্থান করতে পারেন। তবে এসব ঘটনার সত্যতা ও সুজার মৃত্যু নিয়ে অস্পষ্টতা রয়েছে।

    এদিকে ভারতবর্ষে উত্তরাধিকার লড়াইয়ের শেষ বড় যুদ্ধটি হয় ১৬৫৯ সালের মার্চের তিন দিন। দারা ২০ হাজার লোকের একটি বাহিনী (এদের বেশির ভাগ গুজরাত থেকে সংগ্রহ করা) গঠন করে আজমিরের বাইরে পাহাড়ে পাহাড়ে অবস্থান গ্রহণ করেন। তিনি আশা করেছিলেন, এই বন্ধুর এলাকা, পরিখা ও প্রতিরক্ষা প্রাচীর তার সৈন্য স্বল্পতা কাটাতে সহায়ক হবে। আওরঙ্গজেব গোলন্দাজ বাহিনী দিয়ে লড়াই শুরু করেন। দুদিন ধরে এই আক্রমণ শানানো হয়। ফলে পুরো এলাকা ঘন ধোয়ায় ঢেকে যায়৷ আওরঙ্গজেবের দরবারি ইতিহাসবিদের ভাষায়, ‘বারুদের ধোয়া বজ্রসহ প্রবল মেঘের মতো যুদ্ধক্ষেত্র অন্ধকার করে ফেলে। এমনভাবে স্ফুলিঙ্গ সৃষ্টি হলো, ভূমি জ্বলে ওঠল যে মনে হলো পরশ পাথরের শক্তি দেখছি আমরা।’ আওরঙ্গজেব তৃতীয় দিনে দারার একটি অংশের দিকে আক্রমণ কেন্দ্ৰীভূত করলেন। রাজকীয় বাহিনীর বেশির ভাগ অংশ সামনাসামনি যুদ্ধ করলেও একটি অংশ গোপনে পেছনে চলে গিয়েছিল। তারাই যুদ্ধকে আওরঙ্গজেবের অনুকূলে নিয়ে আসে। সেনাবাহিনীর পেছনে অবস্থান নিয়ে নিজের বাহিনীর কচুকাটা অবস্থা দেখে আবারো জীবন বাঁচাতে পালিয়ে যান দারা।

    তিন মাস ধরে পালিয়ে বেড়ালেন দারা। তারপর ভুল করে মালিক জিওয়ান নামের এক আফগান গোত্রপতির আশ্রয় কামনা করলেন। কয়েক বছর আগে তিনি শাহ জাহানের কাছে করুণা ভিক্ষা করে এই লোকের জীবন রক্ষা করেছিলেন। কিন্তু ভাবাবেগে আক্রান্ত না হয়ে মালিক জিওয়ান দ্রুত দারাকে গ্রেফতার করে আওরঙ্গজেবের বন্দী হিসেবে তাকে দিল্লি পাঠিয়ে দেন।

    জীবন ও মৃত্যু

    একজন সম্রাটকে কোমলতা ও কঠোরতার মাঝামাঝি অবস্থান গ্রহণ করতে হয়৷

    —আওরঙ্গজেব

    আওরঙ্গজেব প্রথমবারের মতো নিজেকে মোগল সাম্রাজ্যের বাদশাহ হিসেবে ঘোষণা করার প্রায় এক বছর পর ১৬৫৯ সালের ১৫ জুন তার দ্বিতীয় অভিষেক অনুষ্ঠান উদযাপন করেন। এবার মোগল সম্পদের বিপুল জৌলুস প্রদর্শিত হয়। গায়কদের দল আওরঙ্গজেবের বিশালত্ব ঘোষণা করে, সঙ্গীতজ্ঞরা মনি-মানিক্য উপহার লাভ করেন, আর এত পরিমাণ কাপড় ব্যবহৃত হয় যে ‘সাত মহাদেশের বণিকেরা বিপুল পরিমাণে লাভবান হয়।’ এবার মুদ্রা প্রচলন করা হয়, আওরঙ্গজেব আলমগীরের (বিশ্বজয়ী সিংহাসন উজ্জ্বলকারী) নামে খুতবা পাঠ করা হয়।

    এখন ৪০ বছর বয়স্ক আওরঙ্গজেব তার ক্ষমতা লাভের দুই বছরের দ্বন্দ্বের ফলে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল, তা নিরসন করতে নতুন ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। প্রথমে দারা শুকোহর বিষয়টি ফয়সালা করার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি ছিলেন সাবেক সম্ভাব্য উত্তরসূরী ও উত্তরসূরীর লড়াইয়ে আওরঙ্গজেবের সবচেয়ে প্রবল শত্রু।

    দারা শুকোহ ১৬৫৯ সালের গ্রীষ্মকালের শেষ দিকে বন্দী হিসেবে দিল্লি পৌঁছেন। আওরঙ্গজেব তাকে ও তার ১৪ বছর বয়স্ক ছেলে সিপহর শুকোহকে ছেঁড়া কাপড় পরিয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘোরানোর নির্দেশ দেন। পরাজিত দু’জনকে খোলা, রোগাক্রান্ত হাতির পিঠে চড়ানো হয়। সেপ্টেম্বরের ঝলসানো রোদে এমন করুণ দৃশ্য দেখা কঠিন ছিল। তাদের পেছনে উপস্থিত ছিল এক সৈনিক। তারা যাতে পালানোর বেপরোয়া কোনো চেষ্টা না করেন, সেটা জানাতেই সে ছিল তৈরী। অবশ্য, মোগল প্রজারা আগেও এ ধরনের মর্যাদাহানিকর প্রদর্শনী দেখেছে। দারা বছর দেড়েক আগে শাহ সুজার পক্ষের কয়েকজনকে আগ্রায় অবমাননাকরভাবে ঘুরিয়ে ছিলেন। কিন্তু মোগল যুবরাজদের সাথে এমন অমর্যাদাপূর্ণ আচরণ ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। ফ্রাসোয়াঁ বার্নিয়ার বলেছেন যে সমবেত লোকজন দারা শুকোহ ও তার কিশোর ছেলের প্রকাশ্য অবমাননার এই দৃশ্য দেখে গুটিয়ে গিয়ে ছিল।

    পরের দিন আওরঙ্গজেবের সরাসরি নির্দেশ দারা শুকোহর শিরোশ্ছেদ করা হয়। কোনো কোনো সূত্র উল্লেখ করেছে যে মৃত্যুদণ্ডাদেশের যৌক্তিকতা প্ৰতিপন্ন করতে দারার ইসলাম থেকে কথিত মুরতাদ হওয়ার কথা উল্লেখ করেছিলেন আওরঙ্গজেব। তবে অন্যরা কেবল মৃত্যুদণ্ডাদেশের কথাই উল্লেখ করেন। এর কয়েক বছর পর পূর্ববর্তী একটি খুনের বদলার অজুহাতে মুরাদকে মৃত্যুদণ্ড দেন। এতে মনে হয়, যত ঠুনকো অজুহাতই হোক না কেন, ভাইদের হত্যা করার বিষয়টি যৌক্তিক করতে চেয়েছিলেন আওরঙ্গজেব। সম্ভবত ন্যায়বিচারভিত্তিক শাসন পরিচালনাকারী রাজার জন্য এ ধরনের ব্যাখ্যা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তবে দারার দুই ছেলের বড় জন তথা সোলায়মান শুকোহর জন্য কোনো যুক্তি দেওয়ার দরকার মনে করেননি আওরঙ্গজেব। ১৬৬১ সালে তার জন্য অতিরিক্ত মাত্রায় আফিম পানি দেওয়ার নির্দেশ দেন তিনি।

    আওরঙ্গজেবের খুনে পদক্ষেপগুলো আধুনিক পাঠকের কাছে সন্দেহাতীতভাবে কঠোর মনে হতে পারে। তবে তার ভাইয়েরাও ভিন্ন কোনো পদ্ধতি গ্রহণ করতেন না। মানুচি বিষয়টি ধরে রাখতে পেরেছিলেন। তিনি লিখেছেন, মৃত্যুর দিন দারা শুকোহকে আওরঙ্গজেব জিজ্ঞাসা করেছিলেন, তাদের ভূমিকা বিপরীত হলে তিনি কী করতেন? দেয়ালের লিখন দেখতে পেয়ে দারা বিদ্রূপ করে বলেছিলেন যে তিনি আওরঙ্গজেবের লাশ চার টুকরা করে দিল্লির চার প্রধান ফটকে ঝুলিয়ে রাখতেন। তুলনামূলকভাবে আওরঙ্গজেব সংযমের পরিচয়ই দিয়েছিলেন। তিনি দারা শুকোহর লাশ দিল্লির হুমায়ূনের সমাধিতে কবর দেওয়ার নির্দেশ দেন। দারা সেখানেই বিশ্রামে রয়েছেন।

    কঠিন মোগল নজির অনুসরণ করার পর আওরঙ্গজেব করুণা প্রদর্শন করেন, এমনকি দারা শুকোহ ও অন্য ভাইদের বেশির ভাগ সাবেক সমর্থকের প্রতি ক্ষমা প্রদর্শন করেন, এমনকি তাদের যোগ্যতার মূল্যায়নও করেন। তিনি প্রতিহিংসার পথ অবলম্বন না করে তার ভাইদের সৈন্য ও প্রধান উপদেষ্টাদের তার নিজের সেনাবাহিনী ও প্রশাসনে নিয়ে আসেন। ধনী গুজরাতি জৈন বণিক শান্তিদাসের কাছ থেকে মুরাদ যে ঋণ গ্রহণ করেছিলেন, তিনি তা পরিশোধ করেন। ১৬৭০ এর দশকে আওরঙ্গজেব এমনকি তার মেয়ে জুবেদাতুন্নিসাকে দারা শুকোহর ছোট ছেলে সিপিহর শুকোহর সাথে বিয়ে দেন এবং তার ছেলে যুবরাজ আকবরের সাথে সোলায়মান শুকোহর মেয়ের বিয়ে দেন। দারার মাত্র কয়েকজন ঘনিষ্ঠ সহকর্মীর প্রতি কোনো দয়া প্রদর্শন করা হয়নি। এদের একজন হলেন সারমাদ। আর্মেনিয়ান ইহুদি সন্ন্যাসী সারমাদ উদ্ভট আচরণের জন্য পরিচিত ছিলেন। তিনি ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন যে দারা শুকোহই সিংহাসনে আসীন হবেন। আওরঙ্গজেব ১৬৬১ সালে তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেন।

    দারা শুকোহর সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের ওপর আওরঙ্গজেব অনেক বেশি শানিত আক্রমণ চালিয়েছিলেন। ১৬৪৯-এর দশক ও ১৬৫০-এর দশকে শাহ জাহানের দরবারে অবস্থানকালে দারা শুকোহ ধর্ম, সাহিত্য ও আধ্যাত্মিক সাধনায় প্রচুর সময় ব্যয় করেছিলেন। তিনি ব্রাহ্মণদের একটি দলকে ৫০টি উপনিষদ ফারসি ভাষায় অনুবাদ করার নির্দেশ দেন। এই অনুবাদ পরে ফ্রান্সে পাওয়া গিয়েছিল। এর মাধ্যমেই সংস্কৃত সাহিত্য সম্পর্কে অবগত হয়েছিল ইউরোপ। পাঞ্জাবি আধ্যাত্মিক নেতা বাবা লালের সাথে তার দার্শনিক কথোপকথন হয়েছিল। দারা ফারসিতে গবেষণামূলক গ্রন্থ ‘দুই সাগরের মোহনা’ রচনা করেন। এতে তিনি দেখিয়েছেন যে হিন্দুধর্ম ও ইসলামধর্ম একই লক্ষ্যের দিকে ধাবিত হয়েছে। গবেষণা গ্রন্থটি সমুদ্রসঙ্গম নামে সংস্কৃতে অনুবাদ হয়েছে।

    সাবেক সম্ভাব্য উত্তরসূরী হিসেবে স্বীকৃত ব্যক্তিটির হিন্দু দর্শনের, বিশেষ করে সংস্কৃত সাহিত্যের প্রতি প্রবল আগ্রহের কারণেই আওরঙ্গজেব এর সুস্পষ্ট বিরোধিতায় অবতীর্ণ হন। তিনি দারা শুকোহর আন্তঃসাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড বন্ধ করে দেন, বেনারসের ব্রাহ্মণ কবিন্দ্রচার্য সরস্বতীর রাজকীয় বৃত্তি বাতিল করে দিয়ে শাহ জাহান ও সংস্কৃত সাংস্কৃতিক বিশ্বের মধ্যকার দীর্ঘ দিনের সম্পর্কের ইতি ঘটান। বৃত্তি আবার চালুর জন্য চেষ্টা করেছিলেন কবিন্দ্রচার্য। কিন্তু সফল হতে পারেননি। এসবের মাধ্যমে বড় ভাইয়ের সাংস্কৃতিক অনুরাগ থেকে নিজেকে আলাদা করতে চেয়েছেন আওরঙ্গজেব।

    শাহ জাহানের অস্পষ্ট উপস্থিতি যে প্রশ্ন সৃষ্টি করেছিল, সে তুলনায় দারা শুকোহ ও তার কীর্তি সামাল দেওয়া ছিল নিতান্তই তুচ্ছ বিষয়। আওরঙ্গজেব যখন সিংহাসনে বসেন, তত দিনে শাহ জাহান সুস্থ হয়ে গেছেন। মূলত, আওরঙ্গজেব তার বাবাকে আগ্রার লাল কেল্লায় বন্দী করে রেখেছিলেন। অনেকে মর্জিমতো ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন যে তাজমহল দেখানোর লোভ দেখিয়ে তাকে সেখানে নিয়ে গিয়ে চাবি ফেলে দেওয়া হয়েছিল। পঞ্চম মোগল বাদশাহ তার জীবনের শেষ সাড়ে সাত বছর গৃহবন্দী অবস্থায় কাটিয়েছিলেন। মাঝে মাঝে তাকে সঙ্গ দিতেন তার বড় মেয়ে জাহানারা। অনেকে শাহ জাহানকে সিংহাসনচ্যুত করা ও বন্দী করার তীব্র নিন্দা করে। তবে তার কারাবন্দী বাবার ট্রাজেডি তার শাসনের প্রথম দিকে তার জন্য জ্বালাতন সৃষ্টিকারী সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছিলেন।

    সিংহাসনের জন্য ভাইদের মধ্যে লড়াই মোগলদের মধ্যে গ্রহণযোগ্য রীতি হিসেবে বিদ্যমান থাকলেও ক্ষমতাসীন বাবাকে ক্ষমতাচ্যুত করা খারাপ কাজ বিবেচিত হতো। প্রধান কাজি (মুসলিম বিচারপতি) বিষয়টিকে এত কঠোরভাবে নিয়েছিলেন যে তিনি রাজকীয় ক্রোধের ঝুঁকি নিয়েই শাহ জাহানের জীবিতকালে আওরঙ্গজেবের সিংহাসন আরোহণকে অনুমোদন করতে অস্বীকৃতি জানান। আওরঙ্গজেব তাকে বরখাস্ত করে ওই পদে আরো নমনীয় আবদুল ওয়াহাবকে নিযুক্ত করেন।

    ভারতবর্ষের বাইরেও শাহ জাহানের প্রতি আওরঙ্গজেবের নৃশংসতা নানা জটিলতার সৃষ্টি করে। মক্কার শরিফ আওরঙ্গজেবকে হিন্দুস্তানের যথার্থ শাসক হিসেবে স্বীকৃতি দিতে অস্বীকৃতি জানান, এমনকি তিনি শাহ জাহানের প্রতি অসদাচরণ করার কারণে কয়েক বছর পর্যন্ত আওরঙ্গজেবের আর্থিক উপহার গ্রহণ করেননি। আওরঙ্গজেবের রাজকীয় পদবি ‘আলমগীর’ (বিশ্বজয়ী) নিয়ে বিদ্রূপ করে সাফাভি রাজা শাহ সোলায়মান (শাসনকাল ১৬৬৬-৯৪) এক তিক্ত পত্র লিখেন। নিজেকে ভুলভাবে বিশ্বজয়ী (আলম-গিরি) হিসেবে অভিহিত করার জন্য আওরঙ্গজেবের সমালোচনা করে শাহ সোলায়মান বলেন, তিনি তো কেবল তার বাবাকে জয় (পিদর-গিরি) করেছেন। আওরঙ্গজেব তার ন্যায়বিচারের অবস্থান প্রতিপন্ন করার জন্য সিংহাসনে আরোহণের সময় অনেক ধরনের কর (কয়েকটি সূত্র মোট ৮০টির কথা জানিয়েছে) মওকুফ করে দিয়েছিলেন। তবে আওরঙ্গজেব তার বাবাকে ক্ষমতাচ্যুত করেছিলেন বলে যে অভিযোগ উত্থাপিত হয়, তার জবাবে তিনি যা বলেছিলেন তা ছিল ডাহা অসত্য ঘোষণা। তিনি সাফাভি রাজা শাহ সোলায়মানকে (ভুলভাবে) জানিয়েছিলেন যে শাহ জাহান স্বেচ্ছায় অবসরগ্রহণ করে আওরঙ্গজেবকে মুকুট প্রদান করেছেন।

    পিতার সাথে অন্যায় আচরণের বিষয়টি কোনোভাবেই সামাল দিতে পারেননি আওরঙ্গজেব। এই ঝঞ্ঝাটময় সূচনা তার পুরো শাসনকালে সমস্যা সৃষ্টি করে গেছে, এমনকি তার ধর্মানুরাগেও প্রভাব ফেলেছে বলে আমরা দেখতে পাব। প্রথম দিকের এই ঘটনাও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় আওরঙ্গজেবের প্রতিশ্রুতিকে বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত করেছে, অবশ্য তা উচ্চাকাঙ্ক্ষায় সীমিত হয়ে পড়েছে। দীর্ঘ শাসনকালে আওরঙ্গজেব তার নীতি ও তার রাজনীতির মধ্যে নানা সঙ্ঘাতময় অবস্থার মুখে পড়েছেন, খুব কমই নীতি জয়ী হয়েছে।

    সূচনায় আওরঙ্গজেবের ঝামেলায় ও সমস্যায় থাকলেও ১৭০৭ সালে মৃত্যু পর্যন্ত ৪৯ বছর মোগল সাম্রাজ্য শাসন করেছেন। তিনি প্রায়ই বিদ্রোহের মুখে পড়েছেন। তবে এমন অবস্থায় সব মোগল শাসকই পড়েছিলেন। তিনি ছিলেন ঘুরে দাঁড়াতে সক্ষম বাদশাহ।

  • আওরঙ্গজেব শাসনকালের মহা পথ-পরিক্রমা

    আওরঙ্গজেব শাসনকালের মহা পথ-পরিক্রমা

    সম্প্রসারণ ও ন্যায়বিচার

    আমি আপনাকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি যে শ্রেষ্ঠ বিজয়ীরা সবসময় শ্রেষ্ঠ রাজা হন না। দুনিয়ার জাতিগুলো প্রায়ই স্রেফ অসভ্য বর্বরদের অধীনস্ত হয়, সবচেয়ে বিপুল বিজয়ও মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে ভেঙে খান খান হয়ে যায়। সে-ই সত্যিকারের রাজা, যার জীবনের প্রধান কাজ হয় সাম্যের সাথে তার প্রজাদের শাসন করা ।
    -–আওরঙ্গজেব, সদ্য সিংহাসনচ্যুত শাহ জাহানকে লেখা পত্ৰ

    আওরঙ্গজেব একটি সম্পদশালী, সমৃদ্ধশীল ও সম্প্রসারণমুখী সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকারী হয়েছিলেন। তার বাবা শাহ জাহানের আমলে মোগল রাষ্ট্রের রাজস্ব বেড়েছিল। শাহ জাহান খ্যাতিমান ছিলেন নির্মাণ প্রকল্পের জন্যও। তিনি আগ্রার তাজ মহল ও দিল্লিতে শাহজাহানাবাদ নির্মাণে অর্থের ব্যবস্থা করেছিলেন । আর আওরঙ্গজেবের কৃতিত্ব ছিল রাজকীয় সীমান্ত সম্প্রসারণে ।

    শাসনকালজুড়ে আওরঙ্গজেব একের পর এক বিদ্রোহ দমন করেছেন, ঠাণ্ডা মাথায় সম্প্রসারণ যুদ্ধ করেছেন, নির্দয় অবরোধ তদারকি করেছেন। তিনি বিশেষ করে তার রাজত্বের প্রথম ভাগে (১৬৫৮-৮১) মোগল সাম্রাজ্য সম্প্রসারণ ও সুসংহতকরণে কূটনীতির প্রয়োগ করে প্রায়ই খুশি থাকতেন। তবে মোগল এলাকা আরো বড় করতে শক্তিপ্রয়োগ করতে দ্বিধা করেননি। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ১৬৬০-এর দশকে মোগল রাজ্যের প্রতি মারাঠা হুমকি দমন করার জন্য মারাঠা নেতা শিবাজিকে রাজকীয় চাকরিতে যোগদান করতে প্রলুব্ধ করেছিলেন। ওই প্রয়াস ব্যর্থ হওয়ার পর আওরঙ্গজেব সহিংস হয়ে ওঠেন, বাকি জীবন মারাঠাদের বিরুদ্ধে লড়াই করেন। এতে তিনি সীমিত সফলতা পেয়েছিলেন। মোগল কব্জা থেকে যারা শিবাজিকে পালিয়ে যেতে সাহায্য করেছিল বলে তার মনে হয়েছিল, তাদেরকেও তিনি শাস্তি দিয়েছেন, বেনারাস ও মথুরার মন্দির ধ্বংস করেছেন ।

    আওরঙ্গজেব তার শাসনকালের প্রথমার্ধে মোগল সাম্রাজ্যের অখণ্ডতার প্রতি আরো অনেক সশস্ত্র হুমকির মুখোমুখি হয়েছিলেন। তিনি এসবের প্রতি সামান্যই কোমলতা প্রদর্শন করেছিলেন। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, মোগল রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অস্ত্র হাতে নেওয়ার জন্য ১৬৭৫ সালে তিনি শিখ গুরু তেগ বাহাদুরের মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিলেন। রাঠোর ও সিসোদিয়া রাজপুতেরা ১৬৭০-এর দশকের শেষ দিকে বিদ্রোহ করেছিল। আওরঙ্গজেব উভয় গ্রুপকে দমন করে রাজকীয় পতাকাতলে আনার জন্য সামরিক শক্তি প্রয়োগ করেছিলেন। রাষ্ট্রীয় স্বার্থের সাথে আপসকারী পরিবার সদস্যদের বিরুদ্ধেও আওরঙ্গজেব কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিলেন। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, আওরঙ্গজেবের ছেলে যুবরাজ আকবর ১৬৮১ সালে বিদ্রোহ করলে তাকে ধাওয়া করা হয়। বাবার ক্রোধ থেকে রক্ষা পেতে তিনি অল্প সময়ের মধ্যেই ইরানে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন। সেখানেই তিনি ১৭০৪ সালে মারা যান ।

    আওরঙ্গজেব ১৬৮১ সালে তার পুরো রাজদরবার নিয়ে দক্ষিণ দিকে রওনা হন। এটি ছিল নজিরবিহীন পদক্ষেপ। তার লক্ষ্য ছিল দাক্ষিণাত্যকে রাজকীয় কর্তৃত্বের আওতায় নিয়ে আসা। আকবরের আমল থেকেই দাক্ষিণাত্যের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে যাচ্ছিল মোগলেরা। কোনো কোনো সম্রাট দক্ষিণ দিকে আক্রমণ চালিয়েছিলেন, কিন্তু আওরঙ্গজেব প্রথম সম্রাট হিসেবে দাক্ষিণাত্যের বেশির ভাগ অংশে মোগল শক্তি সম্প্রসারণ করেন।

    আওরঙ্গজেব তার শাসনকালের দ্বিতীয়ার্ধ (১৬৮১-১৭০৭) দক্ষিণ ভারতে ব্যয় করে মোগল সাম্রাজ্যকে সর্বোচ্চ সীমায় সম্প্রসারিত করেন। তিনি ১৬৮০ এর দশকে বিজাপুর ও গোলকোন্ডা অবরোধ করেন, উভয় সালতানাতকে তার অধীনে আনার ব্যবস্থা করেন। ১৬৯০ ও ১৭০০-এর দশকে তিনি মারাঠাদের বজ্রমুষ্টি থেকে তামিল নাড়ু ও দক্ষিণে অনেক পাহাড়ি দুর্গ দখল করেন। অবশ্য এসব কাজে তিনি প্রবল প্রতিরোধের মুখোমুখি হতে থাকেন। ১৭০৭ সালে আওরঙ্গজেব যখন মারা যান, তত দিনে মোগল সাম্রাজ্যের জনসংখ্যা সমসাময়িক ইউরোপের দ্বিগুণ হয়ে গেছে, মোগল ভৌগোলিক এলাকা সর্বকালের সর্বোচ্চ সীমায় পৌঁছে গেছে ।

    যুদ্ধ ও শক্তির প্রতি সংকল্পবদ্ধ থাকার দিক থেকে আওরঙ্গজেব তার পূর্বপুরুষদের চেয়ে সামান্যই ভিন্ন ছিলেন। তবে তিনি ব্যাপক আকাঙ্ক্ষা পোষণ করতেন, উল্লেখযোগ্য সফলতা প্রদর্শন করেছিলেন। ঐক্যবদ্ধ মোগল সাম্রাজ্য সমুন্নত রাখার গুরুভার ও সম্ভব হলে এর সীমান্তগুলো সম্প্রসারণ করার দায়িত্ব আওরঙ্গজেবের কাঁধের ওপর ভারী বোঝা চাপিয়ে তার মধ্যে আগ্রাসী সামরিক উদ্যোগ গ্রহণের মানসিকতা গড়ে তুলেছিলেন। তবে মোগল সিংহাসনে বসার মধ্যে কেবল রক্তপাত ঘটানো ও মানচিত্র ক্রমাগত বড় করার চেয়েও বেশি কিছু সম্পৃক্ত ছিল। আওরঙ্গজেবের মধ্যে জাগতিক শক্তির জন্য তার আকাঙ্ক্ষার সাথে ছিল ন্যায়বিচার (আদল) নিশ্চিত করার ধারণা ।

    অনেক সময় আওরঙ্গজেব নিজেকে ভূখণ্ডগত নিয়ন্ত্রণকারীর মতো নয়, বরং তাদের চেয়ে ঊর্ধ্বে থাকা পক্ষপাতহীন, নৈতিক শাসক দাবি করতেন। সম্প্রসারণবাদী একটি রাষ্ট্রের প্রধান হিসেবে এ ধরনের দাবি বিস্ময়করই। একবার দাক্ষিণাত্য ও বাঙলায় অকার্যকরভাবে সৈন্য মোতায়েনের জন্য সদ্য সম্রাট হওয়া আওরঙ্গজেবের সমালোচনা করেছিলেন শাহ জাহান। এর জবাবে আওরঙ্গজেব বলেছিলেন যে দক্ষ বিজয়ীরা সবসময় দক্ষ শাসক হয় না। দক্ষ শাসকেরা প্রধানত ন্যায়পরায়ণ শাসনের দিকেই নজর দেন ।

    সমসাময়িক অনেক দলিল-দস্তাবেজে ন্যায়বিচারের প্রতি আওরঙ্গজেবের ঘোষিত ভক্তির জোরালো প্রমাণ পাওয়া যায়। উদাহরণ হিসেবে ইতালির পর্যটক নিকোলাও মানুচির কথা বলা যেতে পারে। তিনি কোনোভাবেই আওরঙ্গজেবের প্রতি ইতিবাচক ছিলেন না। সেই তিনিও বাদশাহ সম্পর্কে বলেছেন : ‘তিনি বিষণ্ন মেজাজের, সবসময় কোনো না কোনো কাজে নিয়োজিত থাকেন, ন্যায়বিচার করতে আগ্রহী থাকেন, সঠিক সিদ্ধান্তে আসতে চান।’ হিন্দু জ্যোতিষী ঈশ্বরদাস ১৬৬৩ সালে সংস্কৃত ভাষায় আওরঙ্গজেব সম্পর্কে লিখেছেন। তিনি বাদশাহকে ধর্মপরায়ণ (ধর্মায়া) হিসেবে অভিহিত করে এমনকি উল্লেখ করেছেন যে তার করনীতি ন্যায়সঙ্গত (বিধিত)।

    সার্বভৌমত্ব সম্পর্কে আওরঙ্গজেবের সামগ্রিক মূল্যবোধ ছিল ন্যায়বিচার নিয়ে তার বদ্ধমূল ধারণার ওপর নির্ভরশীল, যদিও চাতুর্যপূর্ণ রাজনীতি ও ক্ষমতার অতৃপ্ত তৃষ্ণা নিবারণের জন্য বেশ বড় মাত্রার কৌশল তাতে জড়িয়ে ছিল। এ কারণে আমরা যদি আওরঙ্গজেবের জীবন ও শাসন সম্পর্কে কোনো কিছু (হিন্দুস্থানের বাদশাহ হওয়ার জন্য তার ভাইদের পদদলিত করা, হিন্দু মন্দিরের প্রতি তার আচরণ ও সুফি মাজারে তার সমাধি হওয়া নিয়ে তার ধারণা) বুঝতে চাই তবে আমাদেরকে অবশ্যই একজন কার্যকর, সাম্যবাদী নেতার অর্থ তিনি কী চিন্তা করেছিলেন, তা পুনঃনির্মাণ করতে হবে। এ দিক থেকে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ওই ব্যাপারগুলোর ওপর আলোকপাত করা, যেখানে আওরঙ্গজেব মূল্যবোধ ও ন্যায়বিচারবিষয়ক তার নিজের আদর্শের বিরুদ্ধেই গেছেন। এক্ষেত্রে বিশেষভাবে বিবেচ্য বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে তার বাবাকে উৎখাত করা ও দাক্ষিণাত্যের মুসলিম রাজ্যগুলোর বিরুদ্ধে নৃশংস যুদ্ধে লিপ্ত হওয়া। বাস্তব রাজনীতিতে তাড়িত হয়ে গৃহীত পদক্ষেপগুলো নিয়ে আওরঙ্গজেব প্রায়ই ঝামেলায় পড়ে যেতেন। তার অস্বস্তি ন্যায়পরায়ণ শাসনের প্রতি তার প্রতিশ্রুতির ব্যাপারে গভীরতা ও সীমারেখা উভয়ের ইঙ্গিতই দেয়।

    মহান মোগল ঐতিহ্যের উত্তরাধিকারী
    হিন্দুস্তান অঞ্চলে রুটির এই সামান্য টুকরাটি [তথা মোগল সাম্রাজ্য] হলো মহামান্বিত তৈমুর ও আকবরের উদার উপহার ।
    -–আওরঙ্গজেব, নাতি বিদার বখতকে লেখা চিঠিতে

    একটি সাম্রাজ্যের পাশাপাশি আওরঙ্গজেব এমন একটি বর্ণাঢ্য মোগল অতীতের উত্তরাধিকারী হয়েছিলেন যাতে ছিল সমৃদ্ধ অনুকরণীয় আদর্শ ও ভয়ানক দায়িত্ববোধ। একজন মহান রাজা কিভাবে হওয়া যায়, তার উদাহরণ দিতে তিনি গুরুত্বপূর্ণ রাজকীয় পূর্বপুরুষদের নাম উল্লেখ করেছেন তার লেখালেখিতে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, জীবনের শেষ দিকে লেখা এক চিঠিতে আওরঙ্গজেব তার নাতিদেরকে উপদেশ দিয়েছিলেন যে মোগল সাম্রাজ্য হলো তৈমুর ও আকবরের উপহার, পরবর্তী প্রজন্মগুলোর দায়িত্ব হলো এর সামগ্রিক গৌরব সমুন্নত রাখা ।

    পূর্বসূরীদের মাধ্যমে আওরঙ্গজেব একটি বিশাল, নানা মাত্রিক সাংস্কৃতিক ও সামাজিক ব্যবস্থার উত্তরাধিকারী হয়েছিলেন। কয়েক দশক ধরে মোগল বাদশাহরা চমকপ্রদ ভবনরাজি নির্মাণ করেছিলেন, কবি-পণ্ডিতদেরকে পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন, পাণ্ডুলিপির জন্য বিশাল বিশাল পাঠাগার তৈরী করেছেন, চিত্রকর ও শিল্পীদের সহায়তা করেছেন। এসব শিল্প, বুদ্ধিবৃত্তিক ও স্থাপত্য ধারার অনেকগুলোকে স্থায়িত্ব দিয়েছেন আওরঙ্গজেব, আবার কোনো কোনোটিকে বাতিল করেছেন, পরিমার্জিত করেছেন। তিনি কখনো তার মোগল উত্তরাধিকারকে লঙ্ঘন করেননি, তবে তার নিজস্ব স্বতন্ত্র সৃষ্টিতে পরিশীলিত করেছেন ।

    শুরুতে শাহ জাহান ও অন্যান্য মোগল সম্রাটের অনুসরণ করা সাংস্কৃতিক ও দরবারি কার্যক্রম কঠোরভাবে অনুসরণ করেছিলেন আওরঙ্গজেব ।

    উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, বাদশাহ হিসেবে প্রথম কয়েক বছর সময়কালের মধ্যে আওরঙ্গজেব তার প্রথম স্ত্রী দিলরাস বানু বেগমের জন্য আওরঙ্গবাদে একটি স্মারক সমাধি নির্মাণ করেন। তার এই স্ত্রী ১৬৫৭ সালে পঞ্চম সন্তান জন্মদানকালে প্রসবজনিত জটিলতায় পরলোকগমন করেছিলেন। উজ্জ্বল শ্বেতশুভ্র এ সমাধি ক্ষেত্রটি বিবি কা মাকরাবা (রানির সমাধি) নামে পরিচিত। এটি ছিল শাহ জাহানের তাজ মহলের দৃশ্যমান অনুকরণ। অবশ্য আকারে ছিল অর্ধেক এবং বাইরের দিকে মার্বেল পাথর না দিয়ে প্রলেপ দিয়ে অলঙ্কৃত করা হয়েছিল। বর্তমানে এর নাম গরিবের তাজ। আওরঙ্গজেব এখানে স্বীকৃত মানসম্পন্ন মোগল সমাধি দিয়ে স্ত্রীকে সম্মানিত করার স্বপ্নাবিভাবের প্রতি সুবিচার করতে পারেননি।

    আওরঙ্গজেব তার প্রথম ১০ বছরের শাসনকালে হিন্দু রীতিনীতি থেকে উদ্ভূত অনেক মোগল রাজকীয় প্রথা বহাল রেখেছিলেন। তার রাজকীয় চেহারার দর্শন তথা শুভ দৃষ্টিপাত দিতে তিনি প্রতিদিন সকালে ঝরোকা প্রাসাদের জানালায় দৃশ্যমান হতেন। চান্দ্র ও সৌর জন্মদিনে তিনি প্রকাশ্যে সোনা ও রুপা দিয়ে ওজন করিয়ে তা গরিবদের মধ্যে বিতরণ করে দিতেন। আকবরের আমল থেকে এ হিন্দু প্রথাটি মোগলরা অনুসরণ করত ৷

    হিন্দু ধর্মীয় ব্যক্তিত্বদের সাথে ব্যক্তিগত যোগাযোগ রক্ষা করে চলতেন আওরঙ্গজেব। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, তিনি ১৬৬১ সালে মহান্ত আনন্দ নাথকে একটি চিঠি লিখে যোগ শাস্ত্রানুসারে তাকে একটি ওষুধ লিখে দিতে বলেছিলেন। ১৬৬০-এর দশকে তিনি পাঞ্জাবে একটি গ্রামে আনন্দ নাথের ভূসম্পত্তি বাড়িয়ে দেন। এ ধরনের যোগাযোগ জাহাঙ্গীরের হিন্দু যোগী যদরূপের সাথে বৈঠক ও আকবরের মথুরার বৈষ্ণব সম্প্রদায়কে ভূমিদানের মতোই ।

    কয়েক বছর পর্যন্ত আওরঙ্গজেবের বিনোদনমূলক কার্যক্রম তার পূর্বপুরুষদের মতোই ছিল। মোগল সম্রাটদের প্রিয় অবকাশকেন্দ্র কাশ্মিরে তিনি গ্রীস্মকালটি কাটাতেন, সঙ্গীত উপভোগ করতেন। ওই আমলের স্বল্প-উদ্ধৃত তবে গুরুত্বপূর্ণ ইতিহাসবিদ বখওয়ার খানের ভাষ্যানুযায়ী, বাদশাহ সঙ্গীত কলার ওপর বিশেষজ্ঞ জ্ঞান রাখতেন। ফকিরুল্লাহর ১৬৬৬ সালের সঙ্গীত গবেষণা গ্রন্থ রাগ দর্পণে আওরঙ্গজেবের প্রিয় শিল্পী ও বাদ্যকারদের তালিকা দেওয়া হয়েছে।

    শাসনকালের দ্বিতীয় দশকে আওরঙ্গজেব তার রাজকীয় আচরণ বদলাতে শুরু করেন। হিন্দু উৎস থেকে আসা অনেক রাজকীয় প্রথা তিনি বাতিল করেন, সঙ্গীতের মতো কিছু কিছু ব্যবস্থার ওপর থেকে পৃষ্ঠপোষকতা প্রত্যাহার করে নেন। তিনি সরকারি দরবারি ইতিহাসবিদের পদটিই বিলুপ্ত করে দেন। আওরঙ্গজেবের দরবারের কঠোরতর নীতিপরায়ণ পরিবেশের কারণেই এমনটা হয়েছিল। তবে মোগল সাম্রাজ্যের অন্যান্য স্থানে এসব পরিবর্তন সামান্যই অনুভূত হয়েছিল ।

    আওরঙ্গজেব ১৬৬৮ সাল পর্যন্ত দরবারি ইতিহাসলেখক মোহাম্মদ কাজিমকে পৃষ্ঠপোষকতা করে গেছেন। মোগল পাঠাগার ও সরকারি নথিপত্রে প্রবেশগম্যতা ভোগ করতেন কাজিম। মোগল সম্রাটেরা সবসময় দরবারি ইতিহাসবিদ নিয়োগ করেননি। বাবর ও জাহাঙ্গীর নিজেরাই তাদের স্মৃতিকথা লিখেছেন, হুমায়ূনের রাজত্ব সম্পর্কে বেশির ভাগ ইতিহাস লেখা হয়েছে তার মৃত্যুর পর। তবে আকবর ও শাহ জাহান সাধারণ নিয়ম হিসেবে বেতনভোগী ইতিহাসবিদ নিয়োগ করেছিলেন। পূর্ববর্তী মোগল সম্রাটদের মধ্যে এ দুজনই ছিলেন তর্কসাপেক্ষে আওরঙ্গজেবের কাছে প্রধান দুই দৃষ্টান্ত । মোহাম্মদ কাজিমের আলমগিরনামা (আওরঙ্গজেব আলমগিরের ইতিহাস) হাতে পাওয়ার পর এই রীতি থেকে বের হয়ে আসেন আওরঙ্গজেব। এ গ্রন্থটি আওরঙ্গজেবের প্রথম ১০ বছরের ইতিহাস। এরপর কাজিমকে অন্য দায়িত্বে নিয়োজিত করা হয়।

    দরবারি ইতিহাসলেখকের প্রতি কেন বিরূপ হয়েছিলেন আওরঙ্গজেব তা এখনো অস্পষ্ট রয়ে গেছে। তার হঠাৎ করে সরকারি ইতিহাসের প্রতি বিরূপ হওয়ার কারণ নির্ণয়ে অনেক গবেষক প্রয়াস চালিয়েছেন। তারা নানা কারণ অনুমান করেছেন। এসবের মধ্যে রয়েছে বাদশাহর অতিমাত্রায় ধার্মিক হয়ে পড়ার ফলে ধর্মতত্ত্ব ছাড়া অন্য সব বইয়ের প্রতি বিতৃষ্ণ হওয়া, রাজকোষাগার খালি হয়ে যাওয়া। রাজদরবারে এর পরবর্তী সময়ের ঘটনাপ্রবাহের দিকে নজর দেওয়া হলে এসব যুক্তি টেকে না। ঘটনা যা-ই হোক না কেন, আওরঙ্গজেব আর কোনো ইতিহাসবিদকে নিয়োগ করেননি, তবে তিনি ইতিহাস লেখার ওপর নিষেধাজ্ঞাও জারি করেননি। যদিও পরবর্তীকালের ইতিহাস লেখকদের ভ্রান্ত পাঠের কারণে ২০ শতকের অনেক ইতিহাসবিদ আওরঙ্গজেব নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিলেন বলে অভিমত প্রকাশ করেছেন। অনেক মোগল কর্মকর্তা আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর সময়ে বা এর সামান্য পরপরই ফারসি ভাষায় ইতিহাস লিখেছেন। এগুলো আজও আমাদের কাছে রয়েছে।

    আওরঙ্গজেব ১৬৬০-এর দশকে অনেক দরবারি সৌজন্যবিধিতে পরিবর্তন করেছেন। ১৬৬৯ সালে তিনি দৈনন্দিন দর্শনে হাজির হওয়ার প্রথা বাতিল করেন । প্রায় একই সময়ে তিনি সোনা ও রুপা দিয়ে জন্মদিনে ওজন করার প্রথা রদ করেন বলে জানা যায়। তিনি দরবারের অনেক অনুষ্ঠান থেকে সঙ্গীতজ্ঞদের সরিয়ে নেন, তাদেরকে অন্য দায়িত্বে নিয়োজিত করেন। মজার ব্যাপার হলো, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তাদের বেতন বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল।

    এসব পরিবর্তনের অনেকগুলো হয়তো সাধারণ রাষ্ট্রনায়কোচিত জ্ঞান থেকে করা হয়েছিল। উদাহরণ হিসেবে ঝারোকা জানালায় প্রতিদিন আবির্ভূত হওয়ার কথা বলা যায়। অনাকাঙ্ক্ষিত রাজকীয় উত্তেজনা এড়াতেই এই প্রথা থেকে সরে আসেন আওরঙ্গজেব। ১৬৫৭ সালে শাহ জাহান অসুস্থ হয়ে পড়লে তার অসুস্থতার খবর চাপা দিয়ে রাখা সম্ভব হয়নি, কারণ তিনি ঝারোকায় হঠাৎ করেই অনুপস্থিত হয়ে পড়েছিলেন । শাহ জাহান বিছানায় ছিলেন মাত্র ১০ দিন। কিন্তু এই সময়ের মধ্যেই মোগল রাজপুত্রদের মধ্যে সঙ্ঘাতের চাকা ঘুরতে শুরু করে দিয়েছিল ।

    অবশ্য আওরঙ্গজেব তার শাসনকালের ১০ বছর পূর্তির সময়কালের দিকে যেসব পরিবর্তন করেছিলেন, সবই বিচক্ষণ ছিল, তা বলা যায় না। উদাহরণ হিসেবে সঙ্গীতের কথা বলা যেতে পারে। এটা সম্ভবত করা হয়েছিল ব্যক্তিগত কারণে। তিনি এ থেকে হয়তো বাস্তব উপকার পাচ্ছিলেন না, এবং ব্যক্তিগত রুচির বিষয়টিও এতে ছিল। মূল্যবান ধাতু দিয়ে ওজন করানোর প্রথার ব্যাপারেও একই ধরনের মনোভাব পোষণ করে থাকতে পারেন। অবশ্য শেষ জীবনে তিনি এ ব্যাপারে তার মন পরিবর্তন করেছিলেন। আওরঙ্গজেব তার নাতি বিদার বখতের জন্য ওজন পরিমাপ প্রথা অনুসরণের সুপারিশ করেছিলেন, সম্ভবত নিজের জন্যও তা শুরু করেছিলেন। এ ব্যাপারে ১৬৯০ সালে ইউরোপিয়ান পর্যটক জন অভিঙ্গটনের একটি প্রতিবেদন পাওয়া গেছে। আওরঙ্গজেবের মধ্যে সঙ্গীতের প্রতি তার প্রথম বয়সের উদ্দীপনা আর ফিরে না এলেও শেষ জীবনে তিনি কিন্তু এটিকে যথার্থ রাজকীয় প্রথা বলে অভিহিত করে তার ছেলেকে উপভোগ করার পরামর্শ দিয়েছিলেন। তারপরও ১৬৬৯ সালের দিকে আওরঙ্গজেব হিন্দু মূল থেকে প্রাপ্ত অনেক প্রথাসহ মোগল সংস্কৃতির সুপরিচিত অনেক অনুষ্ঠান রাজদরবার থেকে উঠিয়ে দেওয়ায় এর সামগ্রিক পরিবর্তনের নিট প্রভাব অস্বীকার করা যায় না ।

    দ্বিতীয়ত, এবং সম্ভবত অভাবিত বিষয় হলো এই যে আওরঙ্গজেবের নতুন নীতির ফলে প্রতিভাধর ব্যক্তিরা তার ছেলে ও মোগল অভিজাতদের দরবারে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়েছিলেন। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, আওরঙ্গজেব নিজে সঙ্গীত থেকে বিরত থাকলেও তার কয়েকজন ছেলে উৎসাহভরে সঙ্গীতজ্ঞ ও সঙ্গীত শিল্পীদের পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। ক্যাথেরিন স্কফিল্ড উল্লেখ করেছেন যে আওরঙ্গজেবের আমলে সঙ্গীতের ওপর এত বেশি ইন্দো-ফারসি আকর গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছিল, যা পূর্ববর্তী ৫০০ বছরের ভারতবর্ষের ইতিহাসেও হয়নি। চিত্রকলার ব্যাপারেও একই কথা বলা যেতে পারে। সমসাময়িক প্রমাণে দেখা যায়, ১৬৬০-এর দশকের পর আওরঙ্গজেব চিত্রশিল্পীদের নিয়মিত তহবিল প্রদান করা বন্ধ করে দিয়েছিলেন। কিন্তু সম্রাটের বৃদ্ধ বয়সের অনেক ছবি এখনো টিকে আছে। বর্ষীয়ান আওরঙ্গজেবের ছবিগুলো খুব সম্ভবত যুবরাজদের দরবার থেকে এসেছে। এসব দরবারে চিত্রকলা শিল্প বিকশিত হচ্ছিল। এই আমলে ফারসি কবিতাও সমৃদ্ধ হয়েছিল। আর আওরঙ্গজেবের নিজের মেয়ে জেবুন্নিসা ছিলেন প্রখ্যাত কবি। তিনি মাখফি (আড়ালে থাকা ব্যক্তি) ছদ্মনামে লিখতেন ।

    সংস্কৃত পণ্ডিতদের দিক থেকে আওরঙ্গজেবের মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার ফলেও প্রতিভাগুলো উপ-রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকদের কাছে ছড়িয়ে পড়ে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ১৬৫০-এর দশকের শেষ দিকে আওরঙ্গজেবের নির্দেশে বৃত্তি থেকে বঞ্চিত হওয়ার পর কবিন্দ্রাচার্য মোগল অভিজাত দানিশমন্দ খানের দরবারে নিয়োগ লাভ করেন। পরে তিনি ফরাসি পর্যটক ফ্রাসোয়াঁ বার্নিয়ারকে সহায়তা করেছিলেন। আওরঙ্গজেবের মামা শায়েস্তা খান সংস্কৃত বুদ্ধিজীবী ও সংস্কৃত-সম্পর্কিত প্রকল্পগুলোর উল্লেখযোগ্য পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। বাঙলার গভর্নরের দায়িত্ব পালনকালে তিনি আকবরের আমলে অনূদিত মহাভারতের ফরাসি পাণ্ডুলিপির সূচিপত্র তৈরী করার নির্দেশ দেন বসন্ত রাইকে। শায়েস্তা খান নিজে সংস্কৃত কবিতা রচনা করেছিলেন। তার কবিতাগুলো রসকল্পক্রমে সংরক্ষিত রয়েছে। আর সংস্কৃত কবিরা কখনো আওরঙ্গজেবকে স্বীকৃতি দিতে বিরাম দেননি। উদাহরণ হিসেবে দেবদত্তের কথা বলা যেতে পারে। তিনি ছিলেন গুজরাতি নারীদের প্রেমবিলাস নিয়ে লেখা গুজারিশতাকামের লেখক। এই গ্রন্থের সূচনায় তিনি আওরঙ্গজেব ও তার ছেলে আযম শাহের কথা উল্লেখ করেছেন।

    আওরঙ্গজেবের দরবার ১৬৬৯ সাল থেকে ভিন্ন মনোভাব পোষণ করতে থাকে, কিছু কিছু ব্যাপারে কম কম উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে। তবে তারপরও শাহ জাহানের আমলে থাকা মোগল সংস্কৃতির অনেক কিছু অব্যাহত থাকার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। এসবের মধ্যে রয়েছে আদালতের শাস্ত্রাচার ও রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতা ।

    ইউরোপিয়ান পর্যটকেরা আওরঙ্গজেবের দরবারের আনুষ্ঠানিকতা সম্পর্কে বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন। দরবার পরিচালিত হতো কঠোর বিধিবিধান ও আদেশের মাধ্যমে। সম্রাট আসন গ্রহণ করতেন একটু উঁচু মঞ্চে, দিল্লিতে থাকলে বসতেন ময়ূর সিংহাসনে। এতে যত মনি-মানিক্য ছিল, তা দরবারের দর্শকেরা গুণেও শেষ করতে পারত না। সম্রাট নিজে সিল্কের পোশাক পরতেন, সোনায় মোড়ানো পাগড়ি মাথায় দিতেন, মুক্তা ও রত্নপাথরের ব্যাপকভাবে ব্যবহার করতেন। মোগল ক্রমপরম্পরা নিজেদের অবস্থান অনুযায়ী অভিজাতেরা দাঁড়াতেন, এই উজ্জ্বল ঝলমলে প্রদর্শনীতে বিস্ময়ের দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতেন । মেঝগুলোতে থাকত মহামূল্যবান কার্পেট, দেয়ালে দেয়ালে শোভা পেত পর্দা । রাজকীয় বাদকদল (নওবাত) আওরঙ্গজেবের সঙ্গীত-বিধিনিষেধের বাইরে ছিল। তারা সদা-প্রস্তুত থাকত। এই বিলাসবহুল পরিবেশে আওরঙ্গজেব উপহার প্রদান করতেন, গ্রহণ করতেন, পর্যটক ও অভিজাতদের স্বাগত জানাতেন, সরকারি কার্যক্রম পরিচালনা করতেন ।

    আওরঙ্গজেবের স্বকীয় আগ্রহে পূর্ববর্তী মোগল সংস্কৃতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে ১৬৭০-এর দশকে কয়েকটি বিশালাকার রাজকীয় প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, রাজদরবারে আলেমরা বিশাল বুদ্ধিবৃত্তিক প্রকল্প ফতোয়া-ই আলমগিরি সম্পন্ন করেন। আট বছর পরিশ্রমের পর হানাফি মাজহাবের শাস্ত্রাচার অনুযায়ী ১৬৭৫ সালে এর রচনার কাজ শেষ হয়। এই সঙ্কলন কাজটি করার সময় মাঝে মাঝে এমনকি জোরে করা পাঠ আওরঙ্গজেব শুনতেন, মাঝে মাঝে সংশোধনের কথা বলতেন। এর পর থেকে সাম্রাজ্যজুড়ে বিচারকেরা এই বই থেকে উদ্ধৃতি দিতেন। বইটি আরবিতে লিখিত হলেও এর পরপরই তা ফারসিতে অনূদিত হয়। এ বইতে আওরঙ্গজেবের ধর্মভক্তি প্রতিফলিত হয়েছে। ন্যায়বিচারের প্রতি আওরঙ্গজেবের আগ্রহ পরিষ্কার আইনি বিধান প্রণয়নে উদ্বুদ্ধ করে থাকতে পারে। অবশ্য আকবর থেকে পাণ্ডিত্যপূর্ণ গবেষণার প্রতি বৃহত্তর মোগল ধারাবাহিকতা আওরঙ্গজেবের মাধ্যমে অব্যাহত থাকে। পূর্বপুরুষদের মতো আওরঙ্গজেবও বিশাল একটি রাজকীয় পাঠাগারের পৃষ্ঠপোষকতা করতেন, এমনকি তার পাণ্ডুলিপি সংগ্রহের জন্য ১০ লাখ রুপি পর্যন্ত ব্যয় করেছিলেন ।

    আওরঙ্গজেব ১৬৭০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে লাহোরের বিশাল বাদশাহি মসজিদের (চিত্র ৩) নির্মাণকাজে পৃষ্ঠপোষকতা করেন। দিলরাসের গরিবের তাজের বিপরীতে এখানে শাহ জাহানের সৃজনী ক্ষমতার সমকক্ষ হন আওরঙ্গজেব। আওরঙ্গজেবের কৃতিত্বগাঁথা এই মসজিদে ফুলের মটিফ, মার্বেল পাথর ও বাঁকানো কার্নিশসহ চমকপ্রদ ছোঁয়া ছিল। নির্মাণের সময় বাদশাহি মসজিদ ছিল বিশ্বের সবচেয়ে বড় মসজিদ। এখানে ৬০ হাজার মুসুল্লি একসাথে নামাজ আদায় করতে পারেন। মসজিদটি এখনো দর্শনার্থীদের বিস্মিত করে। সময়ের পরিক্রমায় এবং ঊনিশ শতকের প্রথম দিকে শিখ সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা রণজিৎ সিংয়ের গোলন্দাজ ভাণ্ডার হিসেবে ব্যবহারের ফলে ভবনটি কিছু ক্ষতির শিকার হয়েছিল। বর্তমানে এটি আবারো মসজিদ হিসেবে বিরাজ করছে। এর প্রগাঢ় সৌন্দর্য দর্শকদের মধ্যে সম্ভ্রমের উদ্রেক করে, মোগল নান্দনিক রুচিবোধের কথা মনে করিয়ে দেয়।

    আওরঙ্গজেব ১৬৭৯ সালে দিল্লি ত্যাগ করেন, আর কখনো উত্তর ভারতে ফিরে আসেননি। ১৬৮১ সাল থেকে তিনি দাক্ষিণাত্যের দিকে অগ্রসর হতে থাকেন, বিরামহীনভাবে অভিযানে নিয়োজিত ছিলেন বিশাল অস্থায়ী লাল তাঁবুতে বাস করে। আওরঙ্গজেবের পূর্বপুরুষেরা প্রায়ই তাঁবুতে (মোগল রাজকীয় চিহ্ন লাল রঙের) বাস করতেন, এখানেও আওরঙ্গজেব উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া ঐতিহ্য অনুসরণ করেছেন। মোগল জীবনযাত্রা যাযাবর শেকড়ে ফিরে যাওয়ায় আওরঙ্গজেব অতুচ্চ মোগল সংস্কৃতির অনেক স্বকীয় বৈশিষ্ট্যসহ তার নিজের অগ্রাধিকার ও রুচির ওপর জোর দিয়েছেন।

    উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, অর্ধ শতকজুড়ে শাসনকালে আওরঙ্গজেব প্রতিদিন এবং কখনো কখনো দিনে দুবার করেও দরবার ডাকতেন। তিনি ন্যায়বিচার করা নিয়ে গর্ব করতেন, অনেক সময় আবেদনকারীর জবাব নিজে লিখতেন। তিনি জ্যোতিষীদের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখতেন। এটি ছিল মোগল রাজকীয় কার্যক্রমের অন্যতম অনুষঙ্গ। এমনকি আঠার শতকেও তা অব্যাহত ছিল। ১৬৯০-এর দশকে ভারতবর্ষ সফরকারী ইতালির পর্যটক গেমেলি ক্যারেরি লিখেছেন যে ‘সম্রাট [আওরঙ্গজেব] তার জ্যোতিষীদের পরামর্শ ছাড়া কোনো কাজই করেন না।’ ১৭০৭ সালে মৃত্যুর সামান্য আগে এক জ্যোতিষী সুপারিশ করেন যে জ্বর ভালো করার জন্য সম্রাটকে একটি হাতি ও একটি হীরা দান করতে হবে। হাতি দান করার হিন্দু ও ফারসি রীতি অনুসরণ করার পরামর্শটি অযৌক্তিক বিবেচনা করে প্রত্যাখ্যান করেন আওরঙ্গজেব । তবে তিনি গরিবদের মধ্যে ৪০০০ রুপি দান করেন। উল্লেখ্য, ৪৯ বছরের শাসনকালজুড়ে এ ধরনের জ্যোতিষী সম্রাটের কাছে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছে ।

    আরো সাধারণভাবে বলা যায়, আওরঙ্গজেব জীবনের শেষ দিকে তার শাসনের অনেক আগে থেকেই মোগল রাজকীয় জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হওয়া হিন্দু আদর্শ, ধর্মগ্রন্থ ও সংস্কৃতি থেকে কোনোভাবেই দূরে ছিলেন না। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ১৬৯০-এর দশকে চন্দ্রমান নামের এক কবি রামায়ণের ফরাসি ভাষ্য নারগিসিস্তান (নার্সিসাস উদ্যান) আওরঙ্গজেবকে উৎসর্গ করেন। ১৭০৫ সালে অমর সিং একই কাজ করে তার গদ্য ফারসি রামায়ণ (অমর প্রকাশ নামে) আওরঙ্গজেবকে উৎসর্গ করেন। আকবর প্রথম ফারসি রামায়ণের পৃষ্ঠপোষকতা করেছিলেন। এটি দুই মহান সংস্কৃত মহাকাব্যের অন্যতম ও ষোড়শ শতকের শেষ দিকের এই সময়কালে ছিল অনেক হিন্দুর কাছে প্রধান ধর্মতাত্ত্বিক গ্রন্থ। পরের শত বছরে কবিরা অসংখ্য স্বতন্ত্র ফারসি রামায়ণ রচনা করেন, এগুলোর কিছু কিছু ক্ষমতায় থাকা মোগল সম্রাটদের উৎসর্গ করেন। এমনকি রাজত্বের শেষ দিকেও আওরজঙ্গজেব মোগল রাজত্ব ও রামের মহাকাব্যিক কাহিনীর মধ্যকার কথিত সম্পৃক্ততার অবসান ঘটিয়ে মোগল সাংস্কৃতিক প্রথা থেকে খুব বেশি দূরে সরে যাননি ।

  • হিন্দুস্তানের শাসক

    হিন্দুস্তানের শাসক

    তার বিশাল সাম্রাজ্য সুরক্ষা করা

    শাহ জাহান সপ্তাহে এক দিন দরবার আয়োজনে অভ্যস্ত ছিলেন এবং সত্যনিষ্ঠতার প্রতি শ্রদ্ধাশীল ও ঈশ্বরের প্রতি ভক্তিময় ছিলেন, কারোরই তার কাছে অভিযোগ জানানোর প্রয়োজন হতো না। এখন আওরঙ্গজেব দিনে দুবার দরবারের আয়োজন করেন এবং অভিযোগের পরিমাণ ক্রমাগত বেড়েই যাচ্ছে।
    –ভীমসেন স্যাক্সেনা, আওরঙ্গজেব প্রশাসনের হিন্দু সদস্য, ফারসিতে লিখিত

    আওরঙ্গজেব একটি বিশাল সাম্রাজ্যের তত্ত্বাবধান করতেন। ফলে একটি বিরাট আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রয়োজন ছিল। তিনি সাম্রাজ্যের বেশির ভাগ অংশে নিয়মিত উপস্থিত থাকতেন না, বরং নিজের শাসনামলের প্রথমার্ধের বেশির ভাগ সময় দিল্লিতে ও শেষার্ধ প্রধানত দাক্ষিণাত্য অভিযানে ব্যয় করেছেন। মোগল সাম্রাজ্য পরিচালনার দৈনন্দিন কাজের দায়িত্ব ছিল রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তাদের কাঁধে। অবশ্য ন্যায়বিচারের প্রতি নাছোড়বান্দা মনোভাবের কারণে আওরঙ্গজেবের শারীরিক দূরত্ব তাকে অনেক প্রশাসনিক কার্যক্রমে ব্যক্তিগতভাবে সম্পৃক্ত হওয়া থেকে বিরত রাখতে পারত না ।

    আওরঙ্গজেব বিপুলসংখ্যক নিউজ বুলেটিনের (আখবারাত, যুবরাজদের দরবারগুলোর খবরাখবর নিয়ে এগুলো প্রতিদিন তার কাছে আসত। এতে রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তাদের কার্যক্রম ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর তথ্য থাকত) মাধ্যমে তার রাজ্যের সব প্রান্তের ঘটনাবলী সম্পর্কে অবগত থাকতেন। ওই সময়ের সব নেতাই এ ধরনের সংবাদ বুলেটিনের ওপর নির্ভর করতেন। এসব বুলেটিন আওরঙ্গজেবের দরবারে কী ঘটছে, সে সম্পর্কিত তথ্যও তার শত্রু ও মিত্র সবাইকে অবগত করত। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ডাচ দূত হার্বার্ট ডি জ্যাগার জানিয়েছেন, ১৬৭৭ সালে শিবাজি সংবাদ প্রতিবেদন দিয়ে এত ব্যস্ত থাকতেন যে তিনি বৈঠক করার সময় পর্যন্ত বের করতে সমস্যায় পড়তেন ।

    আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও মোগল রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধিদের আচরণ-সম্পর্কিত প্রতিবেদন শুনতেও অত্যন্ত আগ্রহী ছিলেন আওরঙ্গজেব। এসব ক্ষেত্র প্রায়ই অতি বিশাল সাম্রাজ্যটি শাসন করার আওরঙ্গজেবের প্রয়াসের ত্রুটিগুলো প্রকাশ করে দিত।

    আওরঙ্গজেব মোগল ভূখণ্ড জুড়ে মৌলিক নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করতেন। তিনি বারবার তার ছেলে ও গুরুত্বপূর্ণ অভিজাতদেরকে রাস্তাঘাটের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা নিয়ে লিখতেন, সাধারণ প্রজাদের বিরুদ্ধে চুরি ও অন্যান্য অপরাধ প্রতিরোধ করতে না পারার জন্য তাদের তিরস্কার করতেন। অবশ্য, আওরঙ্গজেবের প্রয়াস সত্ত্বেও আইন-শৃঙ্খলা সমস্যা জটিল হয়েছিল মোগল ভারতে, তার রাজত্বের শেষ দিকে সম্ভবত আরো অবনতি ঘটেছিল। এই পর্যায়ে মোগল বাহিনী শিথিলভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল, কয়েক দশকের সঙ্ঘাতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। অনেক নতুন সৈনিকের মধ্যে মোগল স্বার্থের প্রতি আনুগত্য ছিল দুর্বল। ১৬৯০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে ইতালির গেমেলি ক্যারেরি অভিযোগ করেছিলেন যে মোগল ভারত চোরদের থেকে পর্যটকদের নিরাপত্তা দিতে পারে না, যেমনটা পারে সমসাময়িক সাফাভি ও উসমানিয়া সাম্রাজ্য । আওরঙ্গজেব নিজে আর্তনাদ করে বলেছেন যে বুরহানপুর ও আহমদাবাদের মতো বড় বড় নগরীতে পর্যটকদের ওপর ডাকাতি হয়। এতে বোঝা যায়, পল্লী এলাকায় আরো সাংঘাতিক হামলা হতো ।

    আওরঙ্গজেবকে মিশ্র মানসম্পন্ন তার রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তাদের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতেও হিমশিম খেয়েছিলেন। মোগল প্রশাসকেরা নিয়মিত ঘুষ নিতেন, আওরঙ্গজেব যদিও এ ধরনের দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর নির্দেশ দিয়েছিলেন। এমনকি অষ্টাদশ শতকের একটি ইন্দো-ফারসি গ্রন্থের ভাষ্যানুযায়ী খাবলে ধরা ও টেনে আনার জন্য প্রধান কাজি (এই সুবাদে তিনি ছিলেন সাম্রাজ্যের নৈতিক নির্দেশনাদাতা) আবদুল ওয়াহাবের ‘হাতটি ছিল দীর্ঘ, তিনি বিপুল অর্থ সংগ্রহ করেছিলেন।’ দুর্নীতিগ্রস্ত প্রশাসকেরা আওরঙ্গজেবকে হতাশ করেছিলেন, বাদশাহ তাদের অন্যায় পন্থার সমালোচনা করতেন। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, নাতি বিদার বখতকে লেখা এক চিঠিতে কয়েকজন দুর্নীতিগ্রস্ত অভিজাত ব্যক্তির কথা উল্লেখ করে তাকে উপদেশ দেন : “শান্তি অনুপস্থিতি থাকলে সার্বভৌমত্ব থাকতে পারে না।’ তবে সম্রাট তার লোকদের প্রতি ক্ষমশীলতাও প্রদর্শন করতেন। তিনি রাজকীয় কর্মকর্তাদের কঠোরভাবে তিরস্কার করার জন্য তার ছেলেদের ধমক দিতেন, এবং অনেক সময় শাস্তি পরিবর্তন করে দিতেন ।

    আওরঙ্গজেবের ক্ষমতাশীলতা অনেক সময়ই তার পরিবার সদস্যের প্রতি সম্প্রসারিত হতো না। রাষ্ট্রীয় স্বার্থের বিরোধিতাকারীদের তিনি শাস্তি দিতেন, এমনকি স্রেফ ভুল করলেও নিস্তার মিলত না। উত্তরাধিকার লড়াইয়ের সময় এই বিষাদময় প্রবণতা ব্যাপকভাবে দেখা গেছে, তবে তার পুরো আমলে তা অব্যাহত থাকে ।

    উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, মামা শায়েস্তা খানকে আওরঙ্গজেব দক্ষিণে পাঠিয়েছিলেন ১৬৫৯ সালে শিবাজির সামরিক বিরোধিতা প্রতিরোধ করতে। শিবাজি তখন দাক্ষিণাত্যে মোগল স্বার্থের প্রতি হুমকি সৃষ্টি করছিলেন। শায়েস্তা খান পুনেতে সুন্দর সুন্দর ভবন ও উদ্যান নির্মাণ করেছিলেন, পুরো অঞ্চলের সমৃদ্ধি নিয়ে এসেছিলেন। খাদ্যের দাম কম থাকে, শায়েস্তা খানের বদান্যতায় লোকজন উপকৃত হয়। পুনেতে শায়েস্তা খানও আয়েসী ও বিলাসী জীবনযাপন করছিলেন, মেয়ের বাগদানের মতো অনুষ্ঠান আয়োজন করছিলেন। কিন্তু এসব করতে গিয়ে তিনি তার প্রধান লক্ষ্য তথা শিবাজিকে দমন করার গুরুত্বপূর্ণ কাজটির কথাই ভুলে গিয়েছিলেন।

    শিবাজি কিন্তু শায়েস্তা খানকে ভোলেননি। তিনি ১৬৬৩ সালের বসন্তে তার প্রাসাদে গুপ্তহামলা চালান। মাত্র কয়েক ডজন লোক নিয়ে রাতের অন্ধকারে শিবাজি চুপি চুপি প্রাসাদে ঢুকে পড়েন। মারাঠারা হঠাৎ করে শায়েস্তা খানের শয়নকক্ষে প্রবেশ করে। তিনি নিজেকে রক্ষা করতে পারলেও তার একটি আঙুল কাটা পড়ে। তিনি তার পরিবারকেও রক্ষা করতে পারেননি। তার কয়েকজন স্ত্রী শেষ হয়ে যায়। শিবাজি ও তার লোকজন চলে আসার আগে শায়েস্তা খানের ছেলেকে হত্যা করেন বলে অনেক সূত্র জানিয়েছে। তারা তাকেই শায়েস্তা খান মনে করে তার বিছানায় তাকে হত্যা করে। এই লজ্জাজনক পরাজয়ের কথা শুনে আওরঙ্গজেব তার মামাকে মোগল সাম্রাজ্যের শাস্তিমূলক বদলির স্থান হিসেবে পরিচিত বাঙলায় পাঠিয়ে দেন। এমনকি তাকে পূর্ব দিকে গমনপথে ভাগ্নের সাথে সৌজন্য সাক্ষাতকারের সুযোগ পর্যন্ত দেওয়া হয়নি।

    কয়েক দশক পর আরো কম নাটকীয় তবে বর্ণাঢ্য ঘটনায় আওরঙ্গজেব তার ছেলে আযম শাহকে তিরষ্কার করেন সুরাত মহাসড়কে ডাকাতি বন্ধ করতে ব্যর্থতার কারণে। আযম শাহ প্রতিবাদ করে বলেন যে এলাকাটি তার নয়, বরং অন্য এক কর্মকর্তার আওতাধীন। জবাবে আওরঙ্গজেব তার ছেলের মনসব মর্যাদা হ্রাস করে উল্লেখ করেন, ‘যদি কোনো যুবরাজের বদলে অন্য কোনো কর্মকর্তার সাথে সংশ্লিষ্ট থাকত বিষয়টি, তবে তদন্তের পর এই নির্দেশ জারি করা হতো। যুবরাজের জন্য তদন্ত ছাড়াই শাস্তি।’

    আওরঙ্গজেব তার চতুর্থ ছেলে যুবরাজ আকবরের বিদ্রোহের সময় আরো কঠোর হয়েছিলেন। ১৬৮১ সালে রাজস্থানে রাঠোর ও সিসোদিয়াদের বিদ্রোহ দমন করার জন্য পাঠানোর পর আকবর বিদ্রোহ করে নিজেকে বাদশাহ ঘোষণা করেন। তিনি অল্প সময়ের মধ্যেই তার রাজপুত মিত্রদের সমর্থন হারিয়ে শিবাজির ছেলে ও ওই পর্যায়ে আওরঙ্গজেবের চরম শত্রু শম্ভুজির দরবারে পালিয়ে যান। কয়েক বছর পর ১৬৮৭ সালে আওরঙ্গজেব তার ছেলেকে ভারতবর্ষ থেকে বিতাড়িত করেন। যুবরাজ আকবর পারস্যে আত্মগোপন করেন, সেখানেই ১৭০৪ সালে ইন্তিকাল করেন ।

    আওরঙ্গজেব তার সাম্রাজ্যে রাজপুত শাসকদের মতো আরো কিছু বিদ্রোহের মুখে পড়েছিলেন। রাজপুতেরা দীর্ঘ সময় মোগলদের অধীনে কাজ করেছিল, তবে আকবরের আমলে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় প্রথম একীভূত হওয়ার পর থেকে বিদ্রোহ করা যেন প্রথাই হয়ে পড়েছিল।

    আওরঙ্গজেবের আমলে একটি অবাক করা ঘটনা ছিল ১৬৭৯-৮১ সময়কালে মারওয়ার ও মেবারের রাজপুত পরিবারগুলোর বিদ্রোহ। এ ঘটনাটি দুই রাজ্যে ভিন্ন ভিন্ন ফলাফল দেখা দেয়। ১৬৭৮ সালের ডিসেম্বরে যশোবন্ত সিং রাঠোর মারা গেলে ঝামেলার সূত্রপাত ঘটে। ওই সময় আওরঙ্গজেব দক্ষিণ পশ্চিম রাজস্থানের রাঠোর রাজ্যের উত্তরাধিকারব্যবস্থায় হস্তক্ষেপ করার চেষ্টা করেন। আওরঙ্গজেবের হস্তক্ষেপকে রাঠোরের রাজপরিবার, বিশেষ করে মারওয়ারের দুই নাবালক রাজপুত্রকে সাম্রাজ্যের দরবারে লালন-পালন করা নিয়ে তার পরামর্শ ও যোধপুর দখল করার জন্য তার সৈন্য পাঠানোর সিদ্ধান্তকে ভালোভাবে নেয়নি। প্রতিবেশী মেবারের সিসোদিয়া রাজপুতদের মধ্যে ভয়ের সৃষ্টি হয় যে একই ধরনের ঘটনা ঘটতে পারে তাদের বেলাতেও। তারা তখন মারওয়ারের সাথে জোট গঠন করে।

    আগেই বলা হয়েছে, রাঠোর-সিসোদিয়া যৌথ বিদ্রোহ দমন করার জন্য ছেলে যুবরাজ আকবরকে দায়িত্ব দিয়েছিলেন আওরঙ্গজেব। আকবর এতে সফল হন। কিন্তু রাঠোর ও সিসোদিয়াদের কাছ থেকে প্রকাশ্য সমর্থন লাভ করে সুযোগ পেয়েছেন মনে করে তিনি ১৬৮১ সালের জানুয়ারির প্রথম দিকে রাজস্থানের নাদোলে নিজেকে সম্রাট ঘোষণা করেন। রাজকীয় চাপে যুবরাজ আকবর বিদ্রোহ আরো দক্ষিণে নিয়ে যান। এদিকে আওরঙ্গজেবের আরেক ছেলে আযম শাহ ১৬৮১ সালের জুনে রাজপুতদের সাথে কূটনৈতিক নিষ্পত্তির জন্য আলোচনা করেন। এর ফলে ১৬৮১ সালের জুন মাসে রাজসমুদ্র নামে একটি চুক্তি হয়। এটি চুক্তি মেবার ও মোগল সাম্রাজ্যের মধ্যে এটা স্থায়ী ও ফলপ্রসূ শান্তির পথ দেখায়। তবে মারওয়ারে কয়েক বছর ধরে বিদ্রোহ দেখা যায়। এর কারণ ছিল প্রত্যক্ষ রাজকীয় নিয়ন্ত্রণ নিয়ে হতাশা ।

    এই পুরো ঘটনাকে আধুনিক ইতিহাসবিদেরা ‘রাজপুত বিদ্রোহ’ এবং মুসলিম শাসনের বিরুদ্ধে হিন্দু বৈরিতা হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। এই সাম্প্রদায়িক পাঠ ভুল প্রমাণিত হয় রাঠোর ও সিসোদিয়া উভয়ের মুসলিম যুবরাজ আকবরকে সমর্থন করার সিদ্ধান্তে, রাজসমুদ্র চুক্তির ব্যাপারে তাদের ভিন্ন প্রতিক্রিয়ার কথা না-ই বা উল্লেখ করা হলো। মেবার আওরঙ্গজেবের সাথে চুক্তিটি গ্রহণ করেছিল, আর মারওয়ার অব্যাহতভাবে মোগল জোয়াল থেকে মুক্তি পাওয়ার সংগ্রাম করেছে। এই ঘটনা আসলে একটি ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, কয়েক শ’ বছর ধরে মোগল শাসনের বিরুদ্ধে হিন্দু ও মুসলিমেরা আরো যেসব বিদ্রোহ করেছিল সেগুলোর মতোই ।

    আওরঙ্গজেব রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার হুমকি নিরসনে সবসময় কূটনীতির আশ্রয় গ্রহণ করতেন না। আর যেসব ব্যক্তি সম্রাটকে চ্যালেঞ্জ করতেন, তারা প্রায়ই নিজেদেরকে তার সহিংসতার সামর্থ্য এবং এমনকি অনেক সময় নৃশংসতার শিকার হতে দেখতে পেতেন ।

    উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, কয়েক বছর যুদ্ধের পর ১৬৮৯ সালে মোগল বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণের পর বন্দী হিসেবে আনা শিবাজির ছেলে শম্ভূজি কোনো ধরনের করুণা লাভ করেননি। শম্ভুজি ও তার ব্রাহ্মণ উপদেষ্টা কবি কলাশকে প্রকাশ্যে অপদস্থ করার জন্য তাদেরকে ভাঁড়ের টুপি পরতে বাধ্য করতে এবং উটে করে দরবারে নিয়ে আসতে আদেশ দেন আওরঙ্গজেব । তারপর তিনি কাঁটা দিয়ে শম্ভুজির চোখ দুটি উপড়ে ফেলতে বলেন। এক ইতিহাসবিদ কাব্যে বিষয়টি বর্ণনা করেছেন, ‘তার কাঁধ আর তার মাথাটির ভার বহন করতে পারছিল না।’ কোনো কোনো ইতিহাসে বলা হয়েছে যে শম্ভুজি ও কবি কলাশের লাশ কুকুরদের সামনে নিক্ষেপ করা হয়, আর তাদের মাথা খড়ে ভর্তি করে দাক্ষিণাত্যের নগরীগুলোতে ঘুরিয়ে অবশেষে দিল্লির কোনো একটি ফটকে ঝুলিয়ে রাখা হয় ।

    তবে আদর্শ রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে কিছু ধরনের নৃশংসতাসহ সহিংস পন্থা অবলম্বনের দিক থেকে ওই সময় আওরঙ্গজেব প্রথাবিরুদ্ধ ছিলেন, এমন নয়। আওরঙ্গজেবের কাছে সহিংসতা কেবল অনুমোদনযোগ্যই ছিল না, তা প্রয়োজনীয় ছিল এবং তা যদি মোগল সাম্রাজ্যের স্থিতিশীলতা ও সহযোগিতা উৎসাহিত করে থাকে, তবে তা যৌক্তিকও ছিল। অবশ্য রাষ্ট্রীয় শক্তি প্রয়োগের দিক থেকে ওই সময়ের মানুষ হিসেবে আওরঙ্গজেব তার ভূমিকা পালন করেছেন, এই যুক্তি তাকে পরবর্তী প্রজন্মগুলোর তীব্র সমালোচনা থেকে রক্ষা করতে পারেনি। আওরঙ্গজেবের সহিংসতার একটি একটি মর্মভেদী উদাহরণ হলো নবম শিখ নেতা তেগ বাহাদুর। বর্তমান সময়ের অনেক অস্বস্তির সাথে এ ঘটনাটি সম্পর্কিত।

    পাঞ্জাবে উত্তেজনা সৃষ্টির কারণে মোগল সাম্রাজ্য ১৬৭৫ সালে তেগ বাহাদুরের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে। অনেক শিখ তাদের ধর্মের আদি সময়টিকে কিভাবে বিবেচনা করে, এই ঘটনা তার অন্যতম বিষয়। অথচ মোগল দৃষ্টিকোণ থেকে এটি ছিল স্রেফ একটি গতানুগতিক কাজ। আওরঙ্গজেবের আমলের কোনো ফারসি গ্রন্থে এই মৃত্যুদণ্ডের উল্লেখ নেই। এতে মনে হয়, মোগলদের কাছে এটিকে বিশেষ কোনো ঘটনা বিবেচিত হয়নি। পরবর্তীকালের ফারসি সূত্রগুলো নানা সাংঘর্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এমনকি কোথায় তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছিল, তা নিয়েও পরস্পরবিরোধী তথ্য উপস্থাপন করা হয় । মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার স্থান হিসেবে কেউ দাক্ষিণাত্য, কেউ লাহোরের কথা বলেছেন । আর শিখ দলিল-দস্তাবেজে দিল্লিতে হত্যাকাণ্ডটি ঘটেছিল বলে বলা হয়ে থাকে। শিখ নথিপত্রে অনেক পরের এবং সেগুলোতেও ব্যাপক পার্থক্য দেখা যায় । আধুনিক পাঠ্যপুস্তকগুলোতে বারবার উল্লেখ করা লোকরঞ্জক কাহিনীতে বলা হয় যে তেগ বাহাদুর কাশ্মিরি ব্রাহ্মণদের বাধ্যতামূলক ধর্মান্তরের প্রতিবাদ করছিলেন। অথচ মৃত্যুদণ্ডের ব্যাপারে আদিতম নথি-পত্রে এ ব্যাপারে বিস্তারিত কিছু বলে না ।

    বিষয়টি অনেকটাই পরিষ্কার হয় ফারসি ও শিখ উভয় সূত্রগুলোতে : আওঙ্গেজেবের দৃষ্টিতে তেগ বাহাদুর মোগল রাষ্ট্রীয় স্বার্থের বিরোধিতা করেছিলেন সামরিকভাবে এবং এর ফলে তার মৃত্যুদণ্ড ছিল যৌক্তিক পদক্ষেপ । তার ধর্মীয় মর্যাদা রাষ্ট্রের শত্রুদের মৃত্যুদণ্ডসহ শাস্তি প্রদান করার ব্যাপারে আওরঙ্গজেব প্রশাসনের সর্বব্যপ্ত প্রতিশ্রুতি লঘু করতে কিছুই করেনি। আর তেগ বাহাদুরের ভাইয়ের ছেলে ও সপ্তম শিখ গুরু হর রাইয়ের উত্তরাধিকার লড়াইয়ে দারা শুকোহর প্রতি সমর্থন দিয়েছিলেন বলে যে গুঞ্জন রয়েছে, তাও এতে সহায়ক হয়নি। একই সময় রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অস্ত্র হাতে নেওয়া অন্যান্য ধর্মীয় গ্রুপের (যেমন সাতনামি) প্রতিও একই ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছিল।

    মূল্যবান হিন্দু অভিজাত
    হে সম্রাট দুনিয়া আপনার হুকুমে চলুক;
    শুকরিয়া আর সালাম ঝরুক ঠোঁট থেকে;
    আপনার আত্মা যেহেতু সব মানুষকে রক্ষা করছে,
    তাই আপনি যেখানেই থাকুন না কেন, ঈশ্বর আপনাকে রক্ষা করুন!
    -–চন্দর ভান ব্রাহ্মণ, আওঙ্গজেবের অধীনে কর্মরত এই হিন্দু কবির রচনার মাধ্যম ছিল ফারসি

    আওরঙ্গজেবের বিশাল আমলাতন্ত্রে হিন্দুরা ভালো অবস্থায় ছিল, তারা চাকরি ও পদোন্নতির সুযোগ পেয়েছিল। আকবরের আমল থেকে রাজপুত ও অন্য হিন্দুরা মোগল প্রশাসনের পূর্ণ সদস্য হয়ে পড়েছিল। তারা তাদের মুসলিম প্রতিপক্ষদের মতো মনসব নামে পরিচিত আনুষ্ঠানিক পদবি (এটিই ছিল রাজকীয় পদপরম্পরায় তাদের মর্যাদা) পেত। তারা সাম্রাজ্য সম্প্রসারণের জন্য লড়াই করত। মোগল অভিজাতদের মধ্যে মুসলিমেরা সংখ্যায় বেশি হলেও হিন্দুরাও মর্যাদাসূচক অবস্থায় এগিয়ে আসছিল, তারাও অতি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করত। আওরঙ্গজেবও মোগল আমলাতন্ত্রে হিন্দুদের একীভূত করার জন্য বাস্তববাদী কৌশল গ্রহণ করেছিলেন, বিশেষ করে দাক্ষিণাত্যে অভিযান চালানোর সময় তিনি হৃদয়, মন ও ভূখণ্ড জয় করতে চেয়েছিলেন। তবে অনেক ক্ষেত্রে তিনি তার রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তাদের ধর্মের ব্যাপারে উদাসীন ছিলেন। তিনি তাদের প্রশাসনিক দক্ষতার দিকেই নজর দিতেন।

    শাহ জাহানের ছেলেদের উত্তরাধিকার যুদ্ধের (১৬৫৭-৫৯) সময় মোগল প্রশাসনের হিন্দু সদস্যদের সমর্থন আওরঙ্গজেব বনাম দারার প্রতি সমর্থনে বিভক্ত হয়ে পড়েছিল। রাজপুতদের বেশির ভাগ সমর্থন করেছিল দারাকে, আর মারাঠারা (মধ্য সপ্তদশ শতক থেকে তারা পরাক্রান্ত হয়ে ওঠেছিল) সমর্থন দিচ্ছিল আওরঙ্গজেবকে। তবে সার্বিকভাবে ২১ জন উচ্চ পদস্থ হিন্দু অভিজাত (অর্থাৎ যারা এক হাজার বা তার চেয়ে বেশি মনসবধারী ছিলেন) আওরঙ্গজেবের পক্ষে লড়াই করেছেন, আর ২৪ জন ছিলেন দারার সমর্থক। অন্য কথায় বলা যায়, আওরঙ্গজেব ও দারার শুকোহ প্রায় সমান হারে হিন্দু অভিজাতদের সমর্থন পেয়েছিলেন ।

    হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে মোগল অভিজাতদের অনেক সদস্যের দৃষ্টিকোণ থেকে সিংহাসনে আরোহণের ক্ষেত্রে আওরঙ্গজেব ছিলেন চৌকষ বাজি। কবি চন্দর ভান ব্রাহ্মণের মতো মোগল দরবারের অন্যান্য হিন্দু সদস্যের কাছে আওরঙ্গজেবের বিজয় ছিল গ্রহণযোগ্য ঘটনা, কারণ এতে মোগল রাষ্ট্রের মূলনীতি বদলায়নি ।

    প্রত্যাশা মতো, আওরঙ্গজেবের সিংহাসনে আরোহণের সূচনায় মোগল প্রশাসনে হিন্দুদের অংশে সামান্যই পরিবর্তন হয়েছিল। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, আকবরের আমলে সব মোগল অভিজাতের মধ্যে হিন্দুরা ছিল ২২.৫ ভাগ। শাহ জাহানের আমলে ও আওরঙ্গজেবের শাসনকালের প্রথম ২১ বছর শাসনকালে (১৬৫৮-৭৯) তা ২১.৬ ভাগেই থাকে। তবে ১৬৭৯ থেকে ১৭০৭ সময়কালে আওরঙ্গজেব মোগলদের অভিজাত পর্যায়ে হিন্দু অংশগ্রহণ বাড়িয়ে প্রায় ৫০ ভাগ করেন। মোগল অভিজাতের মধ্যে হিন্দু বাড়ে ৩১.৬ ভাগ । দাক্ষিণাত্যজুড়ে সম্প্রসারণশীল মোগল সার্বভৌমত্বের কৌশলগত বিষয় হিসেবে এই নাটকীয় বৃদ্ধি মারাঠাদের ব্যাপক অন্তঃপ্রবাহকে ফুটিয়ে তুলেছে।

    সংখ্যা ছাড়াও রাজা রঘুনাথের কাহিনীর মতো স্বতন্ত্র ঘটনাগুলোও আওরঙ্গজেবের ভারতবর্ষে মূল্যবান হিন্দু অভিজাতদের কথা ধরে রেখেছে।

    রাজা রঘুনাথ মাত্র পাঁচ বছর সম্রাটের সেবা করেছিলেন। তা সত্ত্বেও তিনি ছিলেন আওরঙ্গজেবের সবচেয়ে প্রিয়ভাজন রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তা। শাহ জাহানের আমলে অর্থমন্ত্রী হিসেবে রাজকীয় ক্যারিয়ার শুরু করেছিলেন রঘুনাথ। সমুগড়ে দারা শুকোহকে আওরঙ্গজেব পর্যুদস্থ করার পর একদল প্রশাসকের সাথে রঘুনাথও আওরঙ্গজেবের আনুগত্য স্বীকার করেন। রঘুনাথকে আওরঙ্গজেব তার দিওয়ান (সাম্রাজ্যের মুখ্য অর্থমন্ত্রী) হিসেবে নিয়োগ করেন। এই উচ্চ মর্যাদা এক শ’ বছর আগে সম্রাট আকবরের মুখ্য অর্থমন্ত্রী হিসেবে টোডর মলকে নিয়োগ করার কথাই মনে করিয়ে দেয়। আওরঙ্গজেব তার দ্বিতীয় অভিষেকের সময় তার হিন্দু দিওয়ানকে রাজা পদবি প্রদান করেন, মনসব আড়াই হাজার করার মাধ্যমে তাকে সম্মানিত করা হয়। তারপর থেকে রঘুনাথ দক্ষ হাতে সাম্রাজ্যের কোষাগার পরিচালনা করেন ।

    কয়েক বছরের মধ্যে দরবারে রঘুনাথের প্রভাব এমনকি তার দফতরের বাইরেও ছড়িয়ে পড়ে। ফরাসি পর্যটক বার্নিয়ার তাকে সাম্রাজ্যের ভারপ্রাপ্ত উজিড় হিসেবে অভিহিত করেছেন। চন্দর ভান এই মূল্যায়নের সাথে একমত পোষণ করেছেন, প্রশংসা করে রঘুনাথকে ‘হিন্দুস্তানের জ্ঞানী লোকবিষয়ক গ্রন্থের প্রচ্ছদপট’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। রঘুনাথের জীবনের অবসান ঘটে ১৬৬৩ সালে। তিনি তখন মোগলদের প্রিয় অবকাশ যাপন কেন্দ্র কাশ্মিরের মনোরম দৃশ্য উপভোগ করছিলেন আওরঙ্গজেবের সঙ্গী হয়ে । অবশ্য আওরঙ্গজেব তার প্রিয় হিন্দু দিওয়ানকে ভোলেননি ।

    এমনকি কয়েক দশক পর বৃদ্ধ বয়সে মৃত্যুর সময়ও আওরঙ্গজেব তার কথা মনে করেছেন, তার প্রথম অর্থ কর্মকর্তার প্রতি স্মৃতিকাতরতা প্রকাশ করেছেন । শেষ বয়সে অন্যান্য প্রশাসকের কাছে লিখা চিঠিতে দক্ষ সরকার পরিচালনায় রঘুনাথের উপদেশমালার উদ্ধৃতি দিয়েছেন। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, উজিড় আসাদ খানকে লেখা চিঠিতে রঘুনাথের প্রাজ্ঞ বাণী উল্লেখ করেছেন আওরঙ্গজেব : সরকারি কাজের দায়িত্ব কোনো লোভী লোকের কাছে নয়, বরং খুবই অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ও কর্মদক্ষ লোকের ওপর ন্যস্ত করা উচিত।’ মৃত্যুর ৪০ বছর পরও রঘুনাথ তার পৃষ্ঠপোষকের মনে বিশাল আকারে বিরাজ করছিলেন, এবং তা কেবল আর্থিক বিষয়েই নয়, বরং সাধারণভাবে মোগল রাষ্ট্রীয় বিষয়াদি ও ন্যায়বিচারের ক্ষেত্রেও। মোগল সাম্রাজ্যের মহান কর্মকর্তা হিসেবে সজীব স্মৃতির কাছে রঘুনাথের ধর্মীয় পরিচিতি আওরঙ্গজেবের কাছে ছিল অপ্রাসঙ্গিক ।

    আওরঙ্গজেব তার শাসনকালের দ্বিতীয় অংশে প্রতিরোধের মুখেও অনেক বেশি হারে রাজকীয় আমলাতন্ত্রে হিন্দুদের নিয়োগ করেছিলেন।

    আমি আগেই উল্লেখ করেছি, ১৬৭৯-১৭০৭ সময়কালের মধ্যে মোগল কর্মকর্তাদের মধ্যে হিন্দুদের প্রতিনিধিত্ব অর্ধেক বেড়ে গিয়েছিল। হিন্দু অভিজাতের এই বৃদ্ধি নিয়ে অনেক কর্মকর্তা আপত্তি উত্থাপন করেছিলেন। উদাহরণ হিসেবে ভীমসেন সাক্সেনার নাম উল্লেখ করা যেতে পারে। এই হিন্দু সৈনিক কয়েক দশক আওরঙ্গজেবের অধীনে কাজ করেছিলেন। পরে তিনি ফারসিতে ইতিহাস রচনা করেছিলেন। তিনি সাক্ষ্য দিয়েছিলেন, ‘ওই সময়ের রেওয়াজ ছিল যে [পদোন্নতির জন্য] হিন্দুদের নাম কখনো সুপারিশ করা হতো না।’ খুবই সম্ভব যে মারাঠাদের সংখ্যা বৃদ্ধিতে অভিজাতদের মধ্যকার নির্দিষ্ট কিছু গ্রুপ অস্বস্তিতে পড়ে গিয়েছিল। ওই পর্যায়ে মোগল অভিজাতদের মধ্যে মারাঠারা রাজপুতদের ছাড়িয়ে গিয়েছিল। এর ফলেই হিন্দু কর্মকর্তাদের হ্রাস করার (যদি ব্যর্থও হয়ে থাকে) চেষ্টা হয়েছিল ।

    পরের দিকেও আওরঙ্গজেব জোরালোভাবে বলে যাচ্ছিলেন যে মোগল চাকরির জন্য ধর্মীয় লিটমাস টেস্টের প্রয়োজন নেই। একবার বুখারা থেকে আগত এক মুসলিম (তিনি ১৬৮০-এর দশকের শেষ দিকে মোগল চাকরিতে প্রবেশ করেছিলেন) এই যুক্তিতে ইরানিদের রাজকীয় চাকরিতে পদোন্নতি দেওয়া বন্ধ করতে সম্রাটের কাছে আবেদন জানিয়েছিলেন যে তারা সুন্নি নয়, শিয়া। আওরঙ্গজেব এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে অভিমত প্রকাশ করেন যে “দুনিয়াদারির বিষয়ের সাথে ধর্মের সম্পর্ক কী? গোঁড়ামি দিয়ে প্রশাসনিক কাজে হস্তক্ষেপ করার যুক্তি কী আছে? ‘কারণ তোমার জন্য তোমার ধর্ম, আমার জন্য আমারটি।’ এই শাসন [তোমার প্রস্তাবিত] যদি প্রতিষ্ঠিত হয়, তবে আমার কর্তব্য হবে সব (হিন্দু) রাজা ও তাদের অনুসারীদের একেবারে নিশ্চিহ্ন করা। বিজ্ঞ লোকেরা সক্ষম কর্মকর্তাদেরকে দায়িত্ব থেকে অপসারণ নাকচ করে।”

    শিবাজি ও আওরঙ্গজেব
    দিল্লি থেকে সুবেদারগিরি করাটা পতিতাকে প্রলুব্ধ করার মতো । তার সৌন্দর্য দেখে, কে না তাকে কামনা না করে থাকতে পারে?
    তার ছলাকলা তো বিশ্ব জয় করার ।
    সে যার পানেই তাকাবে, তাকে সে সাথে সাথে কর্পদহীন করে ফেলবে।
    ভুষণ বলে, তার সাহচর্যে সময় ব্যয় করায় কোনোই লাভ নেই ।
    -–ভূষণ ত্রিপাঠী, হিন্দু কবি, তিনি কাজ করতেন শিবাজির সাথে, ১৬৭৩

    আওরঙ্গজেবের সাম্রাজ্যবাদী এজেন্ডার বিরোধিতা করে সবচেয়ে বেশি খ্যাতি অর্জন করেছিলেন শিবাজি ভোঁসলে। মারাঠা যোদ্ধা শিবাজি শেষ পর্যন্ত নিজের শক্তিতে রাজা হয়েছিলেন। মোগল সম্রাট কয়েক দশক ধরে সাম্রাজ্যের শক্ত ঘাঁটিগুলোতে শিবাজির ধ্বংস সৃষ্টিকারী হামলা দমন করার, অনেকটাই অসফলভাবে, চেষ্টা করেছিলেন ।

    আওরঙ্গজেব সিংহাসনে আরোহণের আগে থেকেই শিবাজি ছিলেন একটি কাঁটা। শিবাজি ১৬৫০-এর দশকটি ব্যয় করেছিলেন পশ্চিম দাক্ষিণাত্যের পাহাড়ি এলাকায় (আধুনিক কালের পুনের কাছে) একটি রাজ্য প্রতিষ্ঠায়। তিনি প্রথম সরাসরি আওরঙ্গজেবের বিরোধিতা করেন ১৬৫৭ সালে। এ সময় শাহ জাহানের নির্দেশে যুবরাজ আওরঙ্গজেব দাক্ষিণাত্য অভিযানে নিয়োজিত ছিলেন। কিন্তু মোগল সিংহাসন লাভের লড়াইয়ের জন্য আওরঙ্গজেব যখন মধ্য ভারতে চলে গেলেন, তখন শিবাজি তার এলাকা বাড়ানোর সুযোগটি গ্রহণ করেছিলেন।

    শিবাজি ১৬৬০-এর দশকে ছিলেন ১০ হাজার অশ্বারোহী ও ৫০ হাজার পদাতিক সৈন্যের অধিকারী। তিনি তার বাহিনীকে হয়ে মোগল লক্ষ্যবস্তুগুলোতে মোতায়েন করলেন। শিবাজি ছিলেন গেরিলা যুদ্ধ ও হামলায় পারদর্শী। ক্ষিপ্র অভিযানে বিপুলাকার মোগল সেনাবাহিনীর তুলনায় তার বাহিনী ছিল দক্ষ। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, আমি আগেই উল্লেখ করেছি যে ১৬৬৩ সালের এপ্রিলে তিনি মাত্র কয়েক ডজন লোক নিয়ে আওরঙ্গজেবের মামা শায়েস্তা খানের বাড়িতে প্রবেশ করে তার কয়েকজন স্ত্রী ও তার ছেলেকে হত্যা করেন। ১৬৬৪ সালের জানুয়ারিতে সুরাত হামলা করেন শিবাজি। এটি ছিল পশ্চিম উপকূলের অন্যতম ব্যস্ত বন্দর। এর জনসংখ্যা ছিল দুই লাখ। শিবাজি কয়েক দিন ধরে নগরীতে লুটপাট চালান। এ সময় মোগল গভর্নর ভয়ে কাছের এক দুর্গে লুকিয়ে ছিলেন ।

    এ ধরনের বিপর্যয় অসহ্যকর মনে হওয়ায় ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার লঙ্ঘনের কারণে ১৬৬৫ সালের প্রথম দিকে শিবজিকে পাকড়াও করার জন্য মির্জা রাজা জয় সিংকে নির্দেশ দেন আওরঙ্গজেব। জয় সিং ছিলেন কাজওয়াহা রাজপুত ও হিন্দু ধর্মাবলম্বী। যে কয়েকজন রাজপুত উত্তরাধিকার লড়াইয়ে আওরঙ্গজেবকে সমর্থন করেছিলেন, তাদের অন্যতম ছিলেন তিনি। জয় সিংয়ের দুই মাস ধরে পুরান্দার পাহাড়ের দুর্গ অবরোধের পর শিবাজি আত্মসমর্পণ করেন। তিনি মোগল রাষ্ট্রের জায়গিরদার হয়ে জমি, দুর্গ সমর্পণ করতে, খাজনা দিতে, মোগলদের জন্য যুদ্ধ করতে রাজি হন। শিবাজি যখন বশ্যতাস্বীকার ও সহযোগিতা করতে সম্মতি প্রদর্শন করছিলেন, আসলে তখনই মোগলদের প্রতি তার বিরোধিতা সবেমাত্র শুরু হয়।

    শিবাজি ১৬৬৬ সালের মে মাসে সাক্ষাত করতে আগ্রায় আওরঙ্গজেবের দরবারে যান। সম্প্রতি তিনি শত্রু থেকে অভিজাতে পরিণত হয়েছিলেন। প্রত্যাশা মতোই তিনি মোগল সম্রাটকে নজরানা দেন, আনুগত্যসূচক নতজানুও হন । কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই সম্পর্ক তিক্ততায় গড়ায়। দুজনের মধ্যে মুখোমুখি সাক্ষাতের এটিই একমাত্র লিখিত ঘটনা। তবে তখন কী ঘটেছিল, তা নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে ব্যাপক মতানৈক্য দেখা যায়। তবে বেশির ভাগের অভিমত হলো, কিছুটা কল্পিত উপেক্ষায় শিবাজি কষ্ট পেয়েছিলেন। সেটা হতে পারে সম্রাট তার গুরুত্ব স্বীকার না করায় কিংবা তাকে নিম্ন মর্যাদার অভিজাতদের মধ্যে দাঁড়াতে বলায়। এর ফলে প্রকাশ্য দরবারেই বিরোধ দেখা দেয়। কাফি খান নামের এক ইতিহাসবিদ উল্লেখ করেছেন, শিবাজি ‘আহত পশুর মতো’ চিৎকার করতে করতে ভূমিতে পতিত হলেন। আরেক ইতিহাসবিদ ভীমসেন স্যাক্সেনা বলেছেন, তিনি ‘অর্থহীন প্রলাপ বকছিলেন, ফালতু জিনিস নিয়ে কথা বলছিলেন, মনে হচ্ছিল যেন তিনি পাগলামিতে আক্রান্ত হয়েছেন।’ সৌজন্যবিধিতে এ ধরনের লঙ্ঘন বরদাস্ত করেননি আওরঙ্গজেব। ফলে শিবাজিকে পাহারায় দরবার থেকে বাইরে নিয়ে গৃহবন্দী করা হয়।

    শিবাজি তার ক্রোধপ্রকাশের অল্প কিছু সময়ের মধ্যেই আগ্রা থেকে তার ৯ বছরের ছেলে শম্ভুজিকে নিয়ে পালিয়ে যান। খুব সম্ভবত, বের হওয়ার জন্য প্রহরীদের ঘুষ দিয়েছিলেন শিবাজি। তবে কাল্পনিক অনেক কাহিনীতে বলা হয় যে ব্রাহ্মণদের দান করার জন্য আনা বিশাল বিশাল ঝুড়িতে করে পালিয়ে গিয়েছিলেন শিবাজি। মোগল ভূখণ্ড থেকে বের হওয়ার আগে পর্যন্ত ভ্রাম্যমাণ সন্ন্যাসীর বেশ গ্রহণ করেছিলেন তিনি। এক ইতিহাসবিদ বলেছেন, তার ছেলেও একই পোশাক গ্রহণ করেছিলেন। তবে একটি বর্ণনায় দেখা যায়, ভ্রমণের সময় যাতে তাকে চেনা না যায়, সেজন্য তিনি ব্রাহ্মণের স্ত্রীর ছদ্মবেশ গ্রহণ করেছিলেন। কয়েক বছর আগে সমর্পণ করা দুর্গগুলো পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে শিবাজি ১৬৬৯ সালে নতুন করে হামলা চালানোর মাধ্যমে মোগল কর্তৃত্ব অস্বীকার করার কথা ঘোষণা করেন ।

    শিবাজির সাথে সম্পর্ক যে কারণেই নষ্ট হয়ে থাকুক না কেন, মোদ্দা কথা হলো, আওরঙ্গজেব তাকে মোগল পতাকার নিচে সামিল করতে পারেননি। আপাত দৃষ্টিতে এই ব্যর্থতাকে ধাঁধা মনে হতে পারে। কারণ, রাজপুতেরা কয়েক প্রজন্ম ধরেই মোগল আভিজাত্যে একীভূত হওয়ার ক্ষেত্রে ইতিবাচকভাবে সাড়া দিচ্ছিল। অবশ্য, এই উদাহরণ সব হিন্দু সম্মিলিতভাবে গুরুত্বপূর্ণ মতপার্থক্যগুলো দেখতে তথা আওরঙ্গজেবের আনুষ্ঠানিক অভ্যর্থনায় শিবাজি কেন বেঁকে বসলেন, তার ব্যাখ্যা করতে বাধা দেয়। ওই সময়ের অনেক রাজপুত শিবাজিকে মনে করত অসভ্য ভুঁইফোড়, মোগল পরিভাষায় যার আদবে ঘাটিত ছিল। বস্তুত বেশির ভাগ রাজপুতের তুলনায় ফারসি দরবারি আদব কায়দায় পিছিয়ে ছিলেন শিবাজি। তার বাবা বিজাপুরের আদিল শাহি রাজবংশের অভিজাত হলেও তিনি শৈশব কাটিয়েছিলেন তার মা জিজাবাইয়ের কাছে। সেখানে দরবারি জীবন ছিল অনুপস্থিত। সম্ভবত এই অবস্থার কারণে (এ দিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে তার দক্ষতাকে অবমূল্যায়ন করা হচ্ছে না) শিবাজির পক্ষে মোগল অভিজাত হিসেবে তার ভূমিকায় মানিয়ে নিতে পারেননি, যেমনটা পেরেছিলেন অনেক রাজপুত। শিবাজি বরং আওরঙ্গজেবের বিরুদ্ধে যুদ্ধক্ষেত্রেই অবতীর্ণ হওয়াকেই গ্রহণ করে নিয়েছিলেন ।

    শিবাজির বিদ্রোহে প্রত্যাবর্তন মোগলদের জন্য বিপর্যয়কর হয়েছিল। ১৬৭০ থেকে শিবাজি সুরাত ও অন্যান্য স্থান বারবার লুটপাট করেন। পরের চার বছর তিনি মহারাষ্ট্রে খানদেশ, বেরার ও বেগলানের মতো মোগল ঘাঁটিগুলোতে অভিযান পরিচালনা করেন, মোগল ও বিজাপুরি উভয় বাহিনীর বিরুদ্ধে অবতীর্ণ হন। এই সময়ে আওরঙ্গজেব সাম্রাজ্যের উত্তর-পশ্চিম পাবর্ত্য এলাকায় পাঠান গোত্রগুলোর বিদ্রোহ দমনে নিয়োজিত ছিলেন।

    আওরঙ্গজেব ১৬৭৪ সালের জুনে ব্যক্তিগতভাবে যখন খাইবার পাসের কাছে পার্বত্য এলাকায় আফ্রিদি গোত্রের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন, তখন শিবাজি নিজেকে রাজা তথা ছত্রপতি ঘোষণা করেন। তার এই স্বাধীন মারাঠা রাজ্য ওয়েস্টার্ন ঘাট ও কোনকান উপকূলের অংশবিশেষজুড়ে বিস্তৃত ছিল। শিবাজি পরের ছয় বছর ব্যয় করেন মারাঠা এলাকা সম্প্রসারণে । তিনি সংস্কৃতভিত্তিক রাজনৈতিক রীতিনীতির মাধ্যমে ইন্দো-ফারসি আদব কায়দার পরিবর্তন করতে চেয়েছিলেন। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ১৬৭৭ সালে তিনি রাজাবিবাহারকোষ (রাজকীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর শব্দকোষ) নামে পরিচিত একটি সংস্কৃত গ্রন্থের পৃষ্ঠপোষকতা করেন। এতে ১৫০০ ইন্দো-ফারসি প্রশাসনিক পরিভাষার সংস্কৃত প্রতিশব্দ স্থান পেয়েছিল। এ ধরনের গ্রন্থ গবেষণাসুলভ মনে হলেও এটি মোগল শাসক সংস্কৃতি দমনে তার প্রয়াস সফল করতে সহায়ক হয়েছিল। শিবাজির শাসনকালের শেষ দিকে মারাঠা সরকারি নথিপত্রে সংস্কৃত পরিভাষা ব্যাপকভাবে বেড়ে ছিল ।

    শিবাজি ১৬৭৮ সাল থেকে একের পর এক রোগে আক্রান্ত হতে থাকেন । দুই বছর পর ১৬৮০ সালে তিনি বিছানায় পরলোকগমন করেন। শিবাজির মৃত্যু নিয়ে অনেক গুজব প্রচলিত রয়েছে। এর একটি হলো তার দ্বিতীয় স্ত্রী সূর্যবাই তাকে বিষ প্রয়োগ করেছিলেন শম্ভুজির বদলে তার ১০ বছর বয়স্ক ছেলে রাজারামকে সিংহাসনে বসানোর জন্য। শম্ভুজি ছিলেন তার বাবার প্রথম স্ত্রীর সন্তান। বিষ প্রয়োগের কাহিনী সম্ভবত সত্য নয়। তবে রাজারাম ও শম্ভুজির মধ্যে সংক্ষিপ্ত উত্তরাধিকার লড়াই হয়েছিল। এতে শম্ভুজি জয়ী হয়ে বাবার উত্তরসূরি হিসেবে দাক্ষিণাত্যে মোগল স্বার্থের বিরুদ্ধে উৎপাত অব্যাহত রেখেছিলেন ।

    শিবাজি ও আওরঙ্গজেব যদিও মাত্র একবার মুখোমুখি হয়েছিলেন (১৬৬৬ সালে দরবারে) তারা একে অপরকে তাচ্ছিল্য করতেন। শিবজির অন্যতম রাজকবি ভূষণ সম্রাট আওরঙ্গজেবকে কুম্ভকর্ণ হিসেবে অভিহিত করেছেন। রামায়ণে এই নামে একটি বিপুলাকায়, অতিভোজী দানব চরিত্র আছে। আওরঙ্গজেব ‘পার্বত্য মুষিক’ বলতেন শিবাজিকে। মোগল সূত্রগুলো গালিগালাজ করে তাকে বলত শিব, সম্মানসূচক জি কখনো যোগ করা হতো না। আওরঙ্গজেবের আমলের অষ্টাদশ শতকের প্রথম দিকের এক ইতিহাসবিদ শিবাজির মৃত্যুর তারিখটি লিপিবদ্ধ করেছেন বেশ রূঢ়ভাবে : ‘কাফিরটি দোজখে গেল।’ (কাফির বিজাহান্নাম রাফত)।

    মোগল-মারাঠা সঙ্ঘাত দানা বেঁধেছিল কৌশলগত, পরিবর্তনশীল মিত্ৰতা দাবিকারি পাশবিক শক্তি লাভের আকাঙ্ক্ষা থেকে । শিবাজি বিজাপুর, গোলকোন্ডা এবং প্রয়োজনীয় সময়ে মোগলসহ (অনেক ক্ষেত্রে দক্ষিণ ভারতে হিন্দু শক্তিগুলোর বিরুদ্ধে) অনেক ইসলামি রাষ্ট্রের সাথে মিত্রতা করেছেন। শিবাজি তার সেনাবাহিনীতে মুসলিমদের স্বাগত জানাতেন; তার বেতনভুক কাজি (মুসলিম বিচারক) ছিল, তার শীর্ষ কমান্ডারদের মধ্যে কয়েকজন ছিলেন মুসলিম। মোগল মিত্রতা ও রাজকীয় বাহিনীও ছিল বৈচিত্র্যময়। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, পুরান্দারে শিবাজিকে অবরোধ করার জন্য আওরঙ্গজেব পাঠিয়েছিলেন জয় সিং নামের এক হিন্দুকে। রাজপুত ও মোগল শাসনের বিরোধিতাকারী মারাঠারা নিজেদেরকে ‘মুসলিম’ স্বৈরতন্ত্র প্রতিরোধকারী ‘হিন্দু’ হিসেবে পরিচয় দানের আধুনিক ধারণাটি নিছকই আধুনিক কালের। মোগল বা মারাঠা কোনো পক্ষের লেখকেরাই (বিশেষ করে মারাঠারা) এই সঙ্ঘাতকে ধর্মীয় যুদ্ধের আবহে আখ্যায়িত করতে কোনোভাবেই কুণ্ঠিত ছিলেন না। তবে বাস্তবে রাজনৈতিক ক্ষমতার তৃষ্ণা থেকেই আওরঙ্গজেবের শাসনের বিরোধিতা ও মোগল প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছিল।

  • নীতিপরায়ণ মানব ও নেতা

    নীতিপরায়ণ মানব ও নেতা

    ধর্মভক্তি ও ক্ষমতা
    সম্রাট [আওরঙ্গজেব] একটি দোয়া লিখে সেটিকে [বন্যার] পানিতে নিক্ষেপ করলেন। সাথে সাথেই পানি কমতে শুরু করল। খোদাভক্ত সম্রাটের দোয়া খোদা কবুল করলেন, দুনিয়া আবারো শান্ত হলো ।
    –ভীমসেন স্যাক্সেনা, আওরঙ্গজেব বাহিনীর এক হিন্দু সৈনিক, লিখেছেন ফারসিতে

    অন্য সব মোগল শাসকের মতোই আওরঙ্গজেব মুসলিম হিসেবে জন্মগ্রহণ করেছিলেন, জীবনজুড়ে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া ধর্মের অনুশীলন করেছেন। অনেক আগে মারা যাওয়া সম্রাটদের মনের ভাবনা সম্পর্কে জানা অসম্ভব। তবে তাদের কর্মের ওপর ভিত্তি করে মনে হতে পারে যে আওরঙ্গজেব তার পূর্বসূরিদের চেয়ে বেশি ধার্মিক ছিলেন। তিনি তার পূর্বপুরুষদের চেয়ে অনেক বেশি নিয়মিত নামাজ পড়তেন। আর মদ্যপান ও আফিম থেকে বিরত ছিলেন। এই দুটি নেশায় মোগল পরিবারের অনেক পুরুষ সদস্য মারা গেছেন। ১৬৬০ এর দশকে আওরঙ্গজেব কোরআনে হাফেজ হন। শেষ বয়সে তিনি নামাজের টুপি সেলাই করতেন, নিজ হাতে পবিত্র কোরআনের অনুলিপি প্রস্তুত করতেন। এসব কাজ তিনি করতেন ধর্মীয় উদ্দেশ্যে ।

    তবে আওরঙ্গজেব ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে কোনোভাবেই বিশুদ্ধবাদী ছিল না । বরং তিনি সারা জীবন প্রখ্যাত হিন্দু ধর্মীয় ব্যক্তিত্বদের সাথে পরামর্শ করেছিলেন, যেমনটি করেছিলেন তার পূর্বসূরি মোগল সম্রাটেরা। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ১৬৮০-এর দশকে আওরঙ্গজেব বৈরাগী হিন্দু শিব মঙ্গলদাস মহারাজের সাথে ধর্মীয় আলোচনা করেন, ওই সন্ন্যাসীকে বিপুল উপহার প্রদান করেন। সম্রাটের সাথে ইসলামি সুফি সম্প্রদায়ের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। এটিও ছিল দীর্ঘ দিন ধরে অনুসরণ করা মোগল ঐতিহ্য। এর প্রমাণ পাওয়া যায় মহারাষ্ট্রের একটি চিশতি দরগায় তার কবর হওয়ার মধ্যে। একটি ছবিতে দুই ছেলেকে নিয়ে রাজস্থানের আজমিরে মইনুদ্দিন চিশতির (মৃত্যু ১২৩৬) দরগায় যেতে দেখা যায় আওরঙ্গজেবকে। ছবিটি সম্ভবত ১৬৮০ সালের দিকের (চিত্র ৫)। ইসলাম সম্পর্কে আওরঙ্গজেবের বিশ্বাসের মধ্যে অনেক তাবিজ-কবজের বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত ছিল। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, একবার যুদ্ধের সময় তিনি দোয়া-দরুদ লিখে সেগুলো রাষ্ট্রের শত্রুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য যুদ্ধক্ষেত্রে নিয়ে যাওয়া ঝান্ডা ও পতাকায় গেঁথে দিয়েছিলেন।

    আওরঙ্গজেব প্রায়ই তার নিজের ও অন্যদের কল্যাণের জন্য প্রকাশ্যে তার ধর্মভক্তি প্রকাশ করতেন। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, যুদ্ধ পতাকায় দোয়া দরুদ লিখে সেলাই করার কথা বলা যায়। তিনি কাজটি করতেন তার ও তার সৈন্যদের দৃষ্টিতে জয় নিশ্চিত করার জন্য। সম্রাট একবার দোয়া লিখে বন্যার পানিতে নিক্ষেপ করেছিলেন। ভীমসেন স্যাক্সেনার ভাষায় এতে পানি হ্রাস পেয়েছিল। আরেক ইতিহাসবিদ লিখেছেন, যুদ্ধের মধ্যেই তিনি তার ধর্মনুরাগ প্রকাশ করার লক্ষ্যে নামাজ পড়ার জন্য ঘোড়া থেকে নেমে গিয়েছিলেন। তিনি কাজটি করেছিলেন তার সৈন্যদের এই আত্মবিশ্বাস বাড়াতে যে আল্লাহ তাদের পক্ষে আছেন। আওরঙ্গজেব হতে চাইতেন ভালো মুসলিম এবং তা অন্যদের দেখাতেও চাইতেন ।

    মুসলিম শাসক হিসেবে আওরঙ্গজেবের ধর্মীয় আদর্শ দাবি করত যে তিনি ন্যায়বিচার নিশ্চিত করবেন, তার নাগরিকদের সুরক্ষা দেবেন। তিনি তার নাতি আজিমুশ্বানের কাছে লেখা এক পত্রে লিখেছেন : ‘তুমি ইহকাল ও পরকালের সুখের উৎস হিসেবে প্রজাদের সুরক্ষা প্রদানকে বিবেচনা করতে পারো।’ তবে ইসলামের সাথে তার প্রকাশ্য সম্পর্ক নিয়ে সম্রাট বারবার সমস্যায় পড়তেন । দুটির মধ্যে সঙ্ঘাতের সৃষ্টি হলে আওরঙ্গজেব সাধারণত রাষ্ট্রীয় স্বার্থের বেদীতে ধর্মীয় বাধ্যবাধকতা বলি দিতেন, যদিও এ ধরনের সিদ্ধান্ত তার বুকে ভারী বোঝা হয়ে থাকত ।

    পিতাকে ক্ষমতাচ্যুত করে ও তাকে অর্ধ দশকেরও বেশি সময় আটকে রেখে ইসলামি বিধান লঙ্ঘন করেছিলেন আওরঙ্গজেব। আমি আগেই বলেছি, মক্কার শরিফ এই রায় স্পষ্টভাবে দেন। তিনি আওরঙ্গজেবের অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করে জানিয়ে দেন যে শাহ জাহান জীবিত থাকা পর্যন্ত হিন্দুস্তানের বৈধ শাসক হিসেবে তাকে স্বীকৃতি দেবেন না। মক্কার শরিফের মন পরিবর্তনের চেষ্টায় কখনো বিরাম দেননি আওরঙ্গজেব। এতে মনে হয়, মুসলিম ধর্মীয় নেতাদের অনুমোদনের অভাব মোগল সম্রাটকে অস্বস্তিতে ফেলেছিল। ১৬৬৬ সালে শাহ জাহান ইন্তিকাল করলে সমস্যাটির আপনা-আপনি সমাধান হয়। তবে এর মধ্যবর্তী সাড়ে সাত বছরের ইসলামি নীতিমালার লঙ্ঘনের জন্য আওরঙ্গজেবকে অত্যন্ত চড়া মূল্য দিতে হয়েছিল।

    এর কয়েক দশক পর এক ইউরোপিয়ান পর্যটক অভিমত প্রকাশ করেছেন যে আওরঙ্গজেবের মদ্যপানসহ ‘কঠোর সংযম’ ছিল তার পিতার প্রতি করা তার আগেকার পাপের প্রায়শ্চিত্ত। এই সূক্ষ্ম যোগসূত্র নির্ভুল হোক বা না হোক, খুব সম্ভবত অবৈধ মুসলিম রাজা হিসেবে আওরঙ্গজেবকে চিহ্নিত করার কারণেই তিনি আরো নিবেদিতপ্রাণ মুসলিমে পরিণত হতে উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন। ঐকান্তিকতার সাথে পবিত্র কোরআন মুখস্ত করা, পবিত্র কোরআনের অনুলিপি তৈরী করাসহ তার আরো সুস্পষ্ট ধর্মীয় কর্মকাণ্ডে নিয়োজিত হওয়ার ঘটনা ঘটে তার সিংহাসনে আরোহণের পর। এখানে, আওরঙ্গজেবের ধার্মিকতা রাষ্ট্রীয় নীতিতে তেমন প্রভাব ফেলেনি যেভাবে তার রাজকীয় অভিজ্ঞতা তার ধার্মিক জীবনে পরিবর্তনকে উদ্দীপ্ত করেছিল।

    তার শাসন পরিক্রমার ধারায় ইসলামি ধর্মীয় আদর্শ ও মোগল রাষ্ট্রীয় স্বার্থের মধ্যে আরো নানা সঙ্ঘাতের সৃষ্টি হয়েছিল। প্রায় সব ক্ষেত্রেই আওরঙ্গজেব রাষ্ট্রীয় স্বার্থকেই অগ্রাধিকার দিতেন। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ১৬৮৬ সালের বিজাপুর অভিযানকালে বিজাপুরের ধর্মবিদদের একটি দল আওরঙ্গজেবের কাছে গিয়ে এই যুক্তিতে অবরোধ তুলে নিতে বলেন যে একই মুসলিম ধর্মাবলম্বীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা অন্যায়। আওরঙ্গজেব অনড় থাকেন, তিনি বিজাপুরের পতন না হওয়া পর্যন্ত তার নৃশংস কৌশল কঠোরভাবে প্রয়োগ করেন। সম্রাট তারপর বিজাপুরি প্রাসাদের কিছু দেয়ালচিত্র মুছে ফেলার নির্দেশ দিয়েছিলেন এটা বোঝাতে যে মোগল ধর্মীয় রাষ্ট্রের কঠোর দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী ছবিগুলো পৌত্তলিকতাবিষয়ক!

    তিনি যখন মনে করতেন, কোনো কাজ সাম্রাজ্যের স্বার্থ পূরণ করবে তখন আওরঙ্গজেব এমনকি আগে অনুমোদিত ইসলামি নীতিমালার সাথেও আপস করতেন। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ১৭০০ সালে মারাঠা শক্ত ঘাঁটি সাতারা দুর্গ অবরোধের সময় মোগল সৈন্যরা ৯ হিন্দু ও চার মুসলিমকে আটক করে। আওরঙ্গজেবের পৃষ্ঠপোষকতায় প্রণীত আইনি গ্রন্থ ফতোয়া-ই-আলমগিরি অনুযায়ী এক মোগল বিচারক চার মুসলিমকে তিন বছর করে কারাদণ্ড ও ইসলাম গ্রহণ করার শর্তে হিন্দুদেরকে মুক্তির রায় দেন। এই সাজা ছিল বেশ নমনীয়। এতে অসন্তোষ সৃষ্টি হওয়ায় আওরঙ্গজেব ওই বিচারককে ‘অন্যভাবে রায় দিতে বলেন, যাতে রাজ্যের নিয়ন্ত্রণ হাতছাড়া না হয়।’ সূর্যোদয়ের আগেই বিদ্রোহী সবার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।

    ইসলামের প্রাজ্ঞ ব্যক্তিবর্গ তথা আলেম সমাজ আওরঙ্গজেবের প্রয়োজন অনুযায়ী ধর্মীয় বিবেকজনিত দ্বিধা ত্যাগ করার আগ্রহের ব্যাপার নিয়ে অন্ধ হয়ে থাকেনি পূর্ববর্তী মোগল শাসকদের মতো আওরঙ্গজেবও তার পুরো রাজত্বকালে আলেমদের, বিশেষ করে কাজি হিসেবে তাদের ভূমিকার সাথে সঙ্ঘাতে জড়িয়েছেন। সিংহাসন দখল করেই তিনি প্রধান কাজি হিসেবে আবদুল ওয়াহাবের নাম ঘোষণা করেন। এর কারণ হলো, তার পূর্ববর্তী প্রধান কাজি পিতাকে ক্ষমতাচ্যুত করার আওরঙ্গজেবের পাপ এড়িয়ে যাননি। কয়েক দশক পর আবদুল ওয়াহাবের ছেলে (তিনিও ছিলেন কাজি) শায়খুল ইসলামের সাথে দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়। এই কাজি ইসলামি দেশ বিজাপুর ও গোলকুন্ডা দখল ও অনেক মুসলিমকে হত্যার বিষয়টি অনুমোদন করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। শায়খুল ইসলাম অল্প সময়ের মধ্যেই পদত্যাগ করে হজে চলে যান। রাজকীয় নিয়মের সাথে সামঞ্জস্য নিয়ে চলতে অস্বীকৃতিকারী ব্যক্তিকে অপসারণ করার জন্য এটি ছিল মোগলদের দীর্ঘ দিন ধরে অনুসরণ করা ব্যবস্থা।

    আকবরের আমল থেকেই মোগল শক্তির মধ্যে ভারসাম্য বিধানে অন্যতম উপাদান ছিল আলেম সমাজ। আকবর এই সম্প্রদায়ের অধিকতর কঠোর সদস্যদের বিদ্রূপ করতেন, কয়েকজন সোচ্চার ব্যক্তিকে নির্বাসনে পাঠিয়েছিলেন। আকবরের অনুকরণে আওরঙ্গজেবও তার সিংহাসন আরোহণের বিরোধিতাকারী শাহ জাহানের প্রধান কাজির মতো আলেম সমাজের সমস্যা সৃষ্টিকারী সদস্যদের অসন্তুষ্ট করার ঊর্ধ্বে ছিলেন না। তবে সম্ভব হলে আলেমদের প্রশান্ত রাখার জন্য আওরঙ্গজেব তাদের সাথে নমনীয় আচরণ করতেন, বিশেষ করে তাদের জন্য আয়ের ব্যবস্থা করে দিতেন ।

    আওরঙ্গজেব ফতোয়া-ই-আলমগিরি লেখার জন্য অনেক জ্ঞানী মুসলিমকে অর্থ প্রদান করেছিলেন। ১৬৬৭ থেকে ১৬৭৯ সালের সময়কালে এটি রচনা করা হয়েছিল। আওরঙ্গজেবের আমলে আলেমরা জনসাধারণের নৈতিক চরিত্র সংশোধনের দায়িত্বেও ছিলেন, জিজিয়ার কর তারাই আদায় করতেন । ১৬৭৯ সালের শুরুতে আওরঙ্গজেব তার সাম্রাজ্যে সামরিক সেবা না দেওয়ার বিপরীতে জিজিয়া কর আরোপ করেন। রাজপুত ও মারাঠা রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তা, ব্রাহ্মণ ধর্মীয় নেতাদের এই কর থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছিল। তবে সাধারণ জৈন, শিখ ও অন্যান্য অমুসলিমের জন্য তা প্রদান বাধ্যতামূলক করা হয়। জিজিয়া কর মোগল সাম্রাজ্যে প্রায় ১০০ বছর বাতিল ছিল। আওরঙ্গজেবের এটি পুনঃজীবিত করার একটি কারণ ছিল এর সংগ্রহের দায়িত্বে আলেমদের নিয়োজিত করার জন্য। তাত্ত্বিকভাবে জিজিয়ার ফলে আলেমদের মধ্যে বিশেষ করে যারা যথার্থ ইসলামি রাষ্ট্র হিসেবে মোগল সাম্রাজ্যকে চিহ্নিত করে সম্রাটদের ধর্মীয় আন্তরিকতা নিয়ে সন্দেহে ভুগতেন তাদের মধ্যে আওরঙ্গজেবের খ্যাতি বাড়াতেও সহায়ক হয়েছিল।

    আওরঙ্গজেবের অনেক অভিজাত (এদের মধ্যে ছিলেন অনেক প্রখ্যাত মুসলিম ও রাজপরিবারের সদস্য, যেমন আওরঙ্গজেবের বড় বোন জাহানারা ) দুর্বল প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত হিসেবে জিজিয়া নিয়ে তীব্র বিদ্রূপ করেছিলেন। এই কর অনেক হিন্দুকেও কষ্ট দেয়। আওরঙ্গজেবকে লেখা এক কঠোর সমালোচনামূলক পত্রে (এটি হয় শিবাজি কিংবা ১৬৫২-১৬৮২ সাল পর্যন্ত মেবার শাসনকারী রাজপুত শাসক রানা রাজ সিং লিখেছিলেন) জিজিয়াকে ফালতু হিসেবে অভিহিত করেছিলেন এই যুক্তিতে যে এটি আকবরের আমল থেকে মোগল নীতির ভিত্তি হিসেবে বিরাজমান সুলেহ কুল (সবার জন্য শান্তি) ধারণার পরিপন্থী।

    বাস্তবে, জিজিয়া পুনঃবহাল শক্তিশালী আলেমদের ওপর আওরঙ্গজেবের নিয়ন্ত্রণ বাড়ায়নি। সমসাময়িক অনেক ঘটনায় জিজিয়া সংগ্রহে অনিয়মের চিত্র পাওয়া যায়। সংগৃহীত অর্থের একটি বড় অংশই লোভী সংগ্রহকারীদের পকেট থেকে বের হয়নি। এ ধরনের চুরি বন্ধ করতে অক্ষম ছিলেন আওরঙ্গজেব।

    নৈতিক তদারকি
    রাজা হলেন গরিবের রাখাল, এমনকি যদি তিনি তার মহিমা দিয়ে তাদের ভীতও করেন।
    রাখালের জন্য ভেড়া থাকে না। ভেড়ার সেবা করার জন্যই রাখালের অস্তিত্ব থাকে ।
    –সাদি, গুলিস্তাঁ

    আওরঙ্গজেবের তার আদর্শের সাথে আপস করতে ইচ্ছুক থাকলেও বাদশাহ তার প্রজাদের প্রতি পিতৃমনস্ক দৃষ্টিভঙ্গির বাধ্যবাধকতাকে সমর্থন করতেন । তিনি মনে করতেন যে তার সাম্রাজ্যে বসবাসকারী সবার কেবল দৈহিকই নয়, তাদের নৈতিক কল্যাণের দায়িত্বও তার। সে অনুযায়ী তিনি তার সাম্রাজ্যে বসবাসকারীদের নৈতিক জীবনযাপন করতে তাদেরকে উৎসাহিত, এবং এমনকি জবরদস্তিও করতেন ।

    আওরঙ্গজেব নিজেকে নীতিপরায়ণ নেতা হিসেবে উপস্থাপনের লক্ষ্যে ন্যায়বিচার ও নৈতিকতাবিষয়ক ইসলামি আদর্শ সামনে আনতেন। তার পিতৃসুলভ প্রবণতা গড়ে ওঠেছিল সাদির গুলিস্তাঁর (গোলাপ উদ্যান) মতো ফারসি নীতিবাদী গ্রন্থাবলীতে পাওয়া রাজাদের দুঃখদায়ক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে। এসব সতর্ক রাজা শাসন করতেন ভালোই, তবে ধারণা করা হতো, তাদের বেশির ভাগই ছিলেন সবচেয়ে পাপাচারপূর্ণ স্বৈরাচার। উল্লেখ্য, আওরঙ্গজেব হিন্দু ও মুসলিম সবারই কার্যক্রমে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। অনেক ক্ষেত্রে তিনি ধর্ম নির্বিশেষে সব প্রজার জন্য একই ধরনের আচরণবিধি প্রণয়ন করেছিলেন। কিছু ঘটনায় দেখা যায়, তিনি একটি ধর্মীয় গ্রুপের নির্দিষ্ট ইস্যুগুলোর সমাধান করছেন, যদিও তিনি কার্যত সবার জন্য প্রযোজ্য নীতিই তাতে প্রয়োগ করছেন।

    মোগল ভারতে বসবাসকারীদের মধ্যে নীতিপরায়ণতা প্রচারের জন্য আওরঙ্গজেব যেসব সবচেয়ে সাধারণ ধরনের রাষ্ট্রীয় নীতি প্রয়োগ করেছিলেন, সেগুলোর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিল নানা নিষেধাজ্ঞা ও বিধিনিষেধ! আওরঙ্গজেব তার রাজত্বের বিভিন্ন পর্যায়ে অ্যালকোহল, আফিম, পতিতাবৃত্তি, জুয়া, উস্কানি সৃষ্টিকারী ধর্মীয় লেখালেখি, ধর্মীয় উৎসব সার্বজনীনভাবে উদযাপনসহ বিভিন্ন পাপাচার সীমিত বা নিষিদ্ধ করার চেষ্টা করেছিলেন। মুহতাসিবদের (সেন্সর) দায়িত্ব ছিল নৈতিক বিধিমালা প্রয়োগ করা, প্রতিটি নগরীতে আলেমদের অনেকে এই কাজে নিয়োজিত ছিলেন। এ ধরনের বিধিনিষেধের যৌক্তিকতা ও লক্ষ্য ছিল অভিন্ন : জনসাধারণ ও ব্যক্তির জীবনবিধান। রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার সাথে সংশ্লিষ্ট মৌলিক উদ্বেগগুলোও অনেক সময় নিয়ন্ত্রণ আরোপের উদ্দীপনা সৃষ্টি করত। এগুলোই তাত্ত্বিকভাবে নীতিপরায়ণ ও নিরাপদ রাজ্য হিসেবে মোগল ভারতকে তৈরীতে হাতিয়ারে পরিণত হয়েছিল। আওরঙ্গজেব দৃঢ়ভাবে এই মনোভাব পোষণ করতেন যে নৈতিকতা হলো রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব ও শাসিতদের কল্যাণ সুরক্ষিত রাখার শাসকের বৃহত্তর কর্তব্যের আওতাভুক্ত বিষয়।

    আওরঙ্গজেব তার পুরো সাম্রাজ্যে অ্যালকোহল পান হ্রাস করার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু তার আমলে যেসব উল্লেখযোগ্য নীতি ভয়াবহভাবে ব্যর্থ হয়েছে, তার মধ্যে এটি একটি। অ্যালকোহলকে ব্যাপকভাবে অনৈস্লামিক হিসেবে নিন্দা করা হতো, মোগল সম্রাটেরা অ্যালকোহল পানে নিরুৎসাহিত করার জন্য ধর্মীয় নীতির আলোকে সোচ্চার ছিলেন। উদাহরণ হিসেবে জৈন সন্ন্যাসী শান্তিচন্দ্রের কথা বলা যায়। তিনি ১৫৯০ সালের দিকে আকবরের ‘অ্যালকোহল নিষিদ্ধ করা’ নিয়ে আলোচনা করে বলেছিলেন যে ‘এটি সার্বজনীনভাবে নিষিদ্ধ হওয়া উচিত।’ জাহাঙ্গীরও অ্যালকোহল নিষিদ্ধ করেছিলেন (যদিও তিনি ছিলেন পুরো মাত্রায় মদ্যপ)। এই নিষেধাজ্ঞা বারবার আরোপ করায় মনে হচ্ছে নিষেধাজ্ঞা ছিল অকার্যকর।

    বিফল হওয়ার আশঙ্কা সত্ত্বেও আওরঙ্গজেব তার পূর্বপুরুষদের অনুকরণ করে মদ ও তাড়ি বিক্রি সীমিত করার চেষ্টা করেন। ফরাসি পর্যটক ফ্রাসোয়া বার্নিয়ারের সাক্ষ্য অনুযায়ী মদ ছিল ‘জেন্টিল ও মোহামেতান [হিন্দু ও মুসলিম] উভয় আইনেই নিষিদ্ধ,’ এবং দিল্লিতে তা সহজলভ্য ছিল না। তবে সাধারণভাবে, আওরঙ্গজেবের ভারতবর্ষে অ্যালকোহল গলধঃকরণ ছিল ব্যাপক অষ্টাদশ শতকের প্রথম দিকে আওরঙ্গজেবের দরবারে ইংরেজ রাষ্ট্রদূত উইলিয়াম নরিস সাক্ষ্য দিয়েছেন, আসাদ খান (১৬৭৬ থেকে ১৭০৭ সময়কালে প্রধান উজিড়) ও অন্যান্য সরকারি কর্মকর্তার কাছে ‘কড়া মদের চেয়ে প্রিয় আর কিছু নেই এবং হাতের কাছে পেলে তারা প্রতিদিন তা পান করেন। সে অনুযায়ী, আসাদ খানের কাছে কিছু মদ ও পছন্দের পানপাত্র (যা দিয়ে কড়া পানি’ গলধঃকরণ করা যাবে) পাঠিয়ে তাকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করেন ।

    আওরঙ্গজেব ব্যক্তিগতভাবে অ্যালকোহল পান করতে অস্বীকৃতি জানালেও তিনি জানতেন, তার কর্মকর্তাদের মধ্যে খুব কম লোকই তার উদাহরণ অনুসরণ করেন। গালগল্প ও অতিরঞ্জনের প্রকট দুর্বলতাসম্পন্ন নিকোলি মানুচি লিখেছেন যে আওরঙ্গজেব একবার উত্তেজিতভাবে অভিমত প্রকাশ করেন যে হিন্দুস্তানে মাত্র দুজন মদ পান করেন না। এদের একজন হলেন তিনি ও অন্যজন হলেন প্রধান কাজি আবদুল ওয়াহাব। তবে মানুচি গোপনীয়তা ফাঁস করে তার পাঠকদের জানিয়েছেন : ‘কিন্তু আবদুল ওয়াহাবের ব্যাপারে [আওরঙ্গজেব] ভুল ছিলেন। কারণ আমি তাকে প্রতিদিন এক বোতল করে স্পিরিট (ভিনো) পাঠাতাম। তিনি তা পান করতেন গোপনে, যাতে সম্রাট তা বুঝতে না পারেন। ‘

    আওরঙ্গজেবের জারি করা অন্যান্য নিষেধাজ্ঞার মধ্যে ছিল আফিম উৎপাদন ও ব্যবহারের হ্রাস করা । এগুলোও একই ধরনের ব্যর্থ পরিণতি বরণ করে।

    আওরঙ্গজেব অনেক ধর্মীয় ছুটির সার্বজনীন উদযাপন সীমিত করেন। এসব বিধিনিষেধ সব ধর্মের লোকজনকেই প্রভাবিত করেছিল। কারণ আওঙ্গজেব তার সাম্রাজ্যের সব প্রধান ধর্মের উৎসব নিয়ন্ত্রিত করেছিলেন এবং আজকের দিনের অনেক ভারতীয়ের মতো তখনও ভারতীয়রা একের পবিত্র দিনগুলো অন্যরাও পালন করত।

    আওরঙ্গজেব তার শাসনকালের অষ্টম বছরে ফারসি নববর্ষ নওরোজ, মুসলিমদের ঈদ-উল-ফিতর ও ঈদ-উল-আজহা ‘বড় ধরনের জাঁকজমকভাবে পালনের’ ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেন। একই সময় তিনি হিন্দুদের হলি ও দিওয়ালি এবং মুসলিমদের মোহররম উদযাপনের সাথে সম্পৃক্ত হইচই হ্রাস করার চেষ্টা করেন। আওরঙ্গজেবের এসব হুকুম জারি করার আংশিক কারণ ছিল এই যে তার কাছে হইচয়ের বাড়াবাড়ি বিতৃষ্ণাকর মনে হয়েছিল । জননিরাপত্তার বিষয়গুলোও সম্ভবত তার এই উদ্যোগ গ্রহণের পেছনে কাজ করেছিল।

    মধ্য যুগের ভারতবর্ষে ধর্মীয় উৎসবগুলো প্রায়ই পরিণত হতো বিপজ্জনক বিষয়ে। উদাহরণ হিসেবে ভীমসেন স্যাক্সেনার কথা বলা যায়। তিনি মহারাষ্ট্রের ত্রিমবাকে প্রতি ১২ বছর পরপর হওয়া একটি বিশাল উৎসবের কথা বলেছেন (তিনি সম্ভবত কুম্ভ মেলার কথা উল্লেখ করেছেন)। সন্ন্যাসীদের সশস্ত্র দলগুলো এই অনুষ্ঠান উপলক্ষে জড়ো হয়ে একে অন্যের বিরুদ্ধে লড়াই করত। এতে অনেকে হতাহত হতো। ভারতবর্ষ সফরকারী ফরাসি পর্যটক জ্যাঁ ডি থেভেনট বলেছেন, ১৬৬৬-৬৭ সময়কালে গোলকোন্ডায় মোহররম উদযাপন (তাতে হিন্দু ও মুসলিম উভয়ে অংশ নিত) এতই উন্মাদনাপূর্ণ হয়ে পড়েছিল যে সহিংসতা হওয়াটাই সাধারণ ব্যাপারে পরিণত হয়ে গিয়েছিল। ১৬৬৯ সালে বুরহানপুরে মোহররম উৎসবের সময় ৫০ জন নিহত ও ১০০ জন আহত হয় । মোগল ভারতবর্ষে চুরি ও অন্যান্য অপরাধও ব্যাপকভাবে হতো ধর্মীয় উৎসবের সময়। যেমন গুজরাতের হলি উৎসবকারীদের বিশাল আগুন জ্বালানোর জন্য কাঠ চুরি করার প্রবণতা ছিল। আওরঙ্গজেব ১৬৬০-এর দশকের মাঝামাঝিতে এই প্রথা দমন করার জন্য তার কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়েছিলেন। একইসময় তিনি হলি ও দিওয়ালি উভয় উৎসবে অশ্লীল ভাষা ব্যবহারের বিরুদ্ধে নির্দেশও দিয়েছিলেন ।

    আওরঙ্গজেব ধর্মীয় উৎসবগুলোতে প্রচুর মদ্য পান করে উন্মাদ হওয়া ও অবৈধ আচরণ করা হ্রাস করেছিলেন, তবে এ ধরনের উৎসব পুরোপুরি নিষিদ্ধ করার পদক্ষেপ গ্রহণ করেননি। বস্তুত, শাসনকালের প্রথম দিকে ইতোপূর্বে হিন্দু উৎসবগুলোর ওপর আরোপ করা কর হ্রাস করে এসব উৎসবকে উৎসাহিত করেছিলেন। বিপুলসংখ্যক উদাহরণে দেখা যায়, আওরঙ্গজেবের পুরো শাসনকালে লোকজন সার্বজনীন অবকাশ যাপনের সময়গুলোতে অংশগ্রহণ অব্যাহত রেখেছিল। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ১৬৯০-এর দশকের শেষ দিকেও অনেক ইউরোপিয়ান পর্যটক ও হিন্দু লেখক হলি উদযাপনের কথা লিখেছেন। এমনকি আওরঙ্গজেবের নিজের সন্তানেরা পর্যন্ত অমুসলিম ধর্মীয় উৎসবগুলোতে অংশ নিত। আওরঙ্গজেব তার জীবনের শেষ দিকে লেখা এক চিঠিতে তার ছেলে মোয়াজ্জেমকে নওরোজ উৎসবে অংশগ্রহণ করার জন্য কঠোর শাস্তি দিয়েছিলেন। আওরঙ্গজেব এই প্রাচীন প্রথাকে কিংবদন্তীপ্রতীম হিন্দু শাসক বিক্রমাদিত্যের অভিষেক উদযাপন স্মারকও মনে করতেন ।

    নৈতিক আচরণ উন্নয়নের এজেন্ডার অংশ হিসেবে আওরঙ্গজেব চেষ্টা করেছিলেন তার প্রজাদের, বিশেষ করে মুসলিমদের মধ্যে ধর্মতাত্ত্বিক ঝোঁক গড়ে তুলতে । সাম্প্রতিক সময়ে ইসলামে ধর্মান্তরিত করাবিষয়ক তার কথিত এজেন্ডা নিয়ে সবচেয়ে বেশি সমালোচিত হয়ে থাকেন আওরঙ্গজেব। কিন্তু বাস্তবে আওরঙ্গজেবের সরকার কখনো হিন্দুদের বা অন্য কোনো ধর্মের লোকদের মধ্যে ব্যাপক ধর্মান্তরের কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করেনি। তবে কেউ কেউ ইসলাম গ্রহণ করার তাগিদ অনুভব করেছিল।

    ইসলামে ধর্মান্তরের ফলে অনেকে মোগল ক্রমপরম্পরার উচ্চতর ধাপে উঠতে পারত, জিজিয়া কর আদায়কারীসহ মুসলিমদের জন্য নির্ধারিত অনেক চাকরিতে নিয়োগ পাওয়ার যোগ্য বিবেচিত হতো। অবশ্য, ধর্মান্তরের ফলে লোকজনকে আওরঙ্গজেবের অনুসন্ধানের আওতায়ও নিয়ে আসত। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ১৬৯৯ সালে এক চিঠিতে দুই ব্যক্তির নিন্দা করেন এ কারণে যে তারা ‘তাদের ইসলামে ধর্মান্তর নিয়ে দম্ভ করছে এবং সম্রাটের বিরুদ্ধে কথা বলছে। আওরঙ্গজেব তাদেরকে ‘অধার্মিক লোক’ (বেদিন) হিসেবে আখ্যায়িত করেন। আন্তরিকতা না থাকায় উভয়কেই কারারুদ্ধ করার আদেশ দেন তিনি |

    সার্বিকভাবে আওরঙ্গজেবের ভারতবর্ষে খুব কম হিন্দুই ইসলামে ধর্মান্তরিত হয়েছিলেন। রাজদরবারে আসা নিয়মিত বুলেটিনগুলোতে অতি সামান্য সংখ্যক ধর্মান্তরের খবর আসত, অনেক সময় সম্পর্কিত ব্যক্তিদের নামও থাকত, এদেরও বেশির ভাগ ছিল নিম্ন পর্যায়ের রাষ্ট্রীয় কর্মী।

    আওরঙ্গজেব অবশ্য মুসলিম প্রজাদের ব্যাপারে অনেক বেশি সক্রিয় ছিলেন। তিনি তাদের ধর্মের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে চেয়েছেন বেশি, বিশেষ করে আহমদ সরহিন্দির (মৃত্যু ১৬২৪) নির্বাচিত কিছু লেখার ওপর সেন্সরশিপ আরোপ করেছিলেন। সরসিন্দি ছিলেন সুফি নকশবন্দি তরিকার সদস্য। তিনি তার তীব্র বিতর্কমূলক দৃষ্টিভঙ্গির জন্য ব্যাপকভাবে সমালোচিত ছিলেন। তার ওই দৃষ্টিভঙ্গি মুসলিমদের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে বিরোধ বাড়িয়ে দিয়েছিল। সরহিন্দি জাহাঙ্গীরের রাজত্বের শেষ দিকে ইন্তিকাল করলেও তার জনপ্রিয়তা ছড়িয়ে পড়ে শাহ জাহানের শাসনকালে। তার গ্রন্থ কোনো কোনো মাদরাসা পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল, অনেকে ক্রমবর্ধমান হারে তাকে মুজাহিদ (সংস্কারক), এমনকি নবি হিসেবেও বিবেচনা করতে থাকে। সমসাময়িক ইউরোপিয়ান শক্তিগুলো যেভাবে গ্রন্থরাজি সেন্সর করত, সে তুলনায় আনুষ্ঠানিক হাতিয়ারের অভাব ছিল মোগল সাম্রাজ্যে। কিন্তু আওরঙ্গজেব ১৬৮০-এর দশকে সরহিন্দিকে আলাদা করে রাখেন, তার কিছু ধর্মতাত্ত্বিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ রচনা নিষিদ্ধ করেন।

    অনেক সময় আওরঙ্গজেব নির্দিষ্ট কিছু মুসলিম গ্রুপের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করতেন। এসব গ্রুপের মতবাদ ইসলাম সম্পর্কে তার ভাষ্যের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ১৬৪০-এর দশকে আওরঙ্গজেব তখনো ছিলেন গুজরাত পরিচালনার দায়িত্বে থাকা যুবরাজ, আহমদাবাদের মোগল সৈন্যরা মাহদাবি সম্প্রদায়ের (সহস্রাব্দবাদী এই সম্প্রদায় পনের শতকের শেষ দিকে ভারতবর্ষে প্রতিষ্ঠিত হয়) কয়েক ডজন সদস্যকে হত্যা করে। মাহদাবিদের রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ ছিল। সম্ভবত এ কারণেও তাদের প্রতি এ ধরনের কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছিল। এর ৪০ বছর পর, তখন তারা তাদের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় অবস্থান পরিবর্তন করে ফেলেছে, মাহদাবিদের একটি প্রতিনিধিদল রাজদরবারে আওরঙ্গজেব ও প্রধান কাজিকে বোঝাতে সক্ষম হন যে তারা নিরীহ, মূলধারার মুসলিম!

    আওরঙ্গজেব বিচ্যুত বিবেচিত অরাজনৈতিক মুসলিম সম্প্রদায়গুলোর ওপরও চড়াও হয়েছিলেন। যুবরাজ থাকার সময় তিনি শিয়া সম্প্রদায়ের শাখা ইসমাইলি বোহরাদের লক্ষ্যবস্তু করেছিলেন। তিনি তাদের এক নেতাকে মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত দিয়েছিলেন। আওরঙ্গজেব তার পুরো রাজত্বকালে ইসমাইলি বোহরাদের হয়রানি করেছেন। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, তিনি তার শাসনকালের অষ্টম বছরে বোহরা মসজিদগুলোতে সুন্নিদের মতোই দিনে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ার নির্দেশ দেন। তিনি কয়েক দশক পরও রাজকীয় বাহিনীর সৈন্যরা এই সম্প্রদায়ের সদস্যদের মাঝে মাঝেই গ্রেফতার করত।

    পূর্ববর্তী মোগল শাসকদের মতো আওরঙ্গজেবও জনকল্যাণের নামে কোন কোন জিনিসের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে হবে এবং ব্যক্তিগত অভিরুচির ব্যাপার হিসেবে কোনগুলোকে ছাড় দেওয়া হবে সে ব্যাপারে সতর্ক সীমারেখা টেনেছিলেন। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, সঙ্গীতও ব্যক্তিগত অভিরুচির বিষয়ে পরিণত হয়েছিল। সাধারণভাবে মনে করা হয়ে থাকে, আওরঙ্গজেব তার পুরো সাম্রাজ্যে সঙ্গীত নিষিদ্ধ করেছিলেন। এ ভুল ধারণাটির অপনোদন করেছেন ক্যাথেরিন স্কোফিল্ডের মতো বিশেষজ্ঞরা। কিন্তু তা সত্ত্বেও লোকরঞ্জক ধারণার মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি হয়নি। আওরঙ্গজেব তার নিজের দরবারে সামান্য কিছু ধরনের সঙ্গীত সীমিত করেছিলেন।

    সম্ভবত আরো মজার ব্যাপার হলো, আওরঙ্গজেব কখনো তার আমলে অত্যন্ত জনপ্রিয় ব্যঙ্গমূলক কবিতা নিষিদ্ধ করেননি। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, শেষ বয়সে সরকারি কর্মকর্তা কামগর খানের দ্বিতীয় বিয়ে নিয়ে জনৈক কবি আদি রসাত্মক একটি কবিতা রচনা করেছিলেন। অপমানিত কামগর খান এতে বাদশাহের হস্তক্ষেপ কামনা করেন। আওরঙ্গজেব জবাবে বলেন, ‘এই কবি আমাকে নিয়েও [ব্যঙ্গ কবিতা রচনা করতে ছাড়েনি। আর এর বিপরীতে আমি তার পারিশ্রমিক বাড়িয়ে দিয়েছি, যাতে [এজন্য হলেও] আর সে এ কাজ না করে, কিন্তু এর পরও সে [ব্যঙ্গ] রচনা কমায়নি।’ আওরঙ্গজেব তখন আবেদনটি খারিজ করে কামগর খানকে উপদেশ দেন, ‘আমাদের উচিত হবে আমাদের সংবেদনশীলতা অবদমিত করে সম্প্রীতিতে বসবাস করা।’

  • হিন্দু সম্প্রদায়ের তত্ত্বাবধায়ক

    হিন্দু সম্প্রদায়ের তত্ত্বাবধায়ক

    মন্দিরের রক্ষক

    [ইলোরা] হলো সত্যিকারের, অতিলৌকিক শিল্পীর [অর্থাৎ খোদা] নিপুণ হাতে গড়া বিস্ময় –ইলোরার হিন্দু, জৈন ও বৌদ্ধ মন্দিরগুলো সম্পর্কে আওরঙ্গজেবের ভাষ্য

    আওরঙ্গজেবের সাম্রাজ্যজুড়ে ছড়িয়ে ছিল অসংখ্য হিন্দু ও জৈন মন্দির। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলো সরকারি সুরক্ষা পাওয়ার দাবিদার ছিল, এবং আওরঙ্গজেব সাধারণভাবে সেগুলোর সমৃদ্ধির দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন। আবার মোগল দৃষ্টিকোণ থেকে ওই কল্যাণকামী ধারণা বাতিল হতে পারত যদি নির্দিষ্ট মন্দির বা সেগুলোর সাথে সম্পৃক্তরা রাজকীয় স্বার্থের পরিপন্থী কাজ করত। এই নীতির আলোকে সম্রাট আওরঙ্গজেব তার পুরো শাসনকালে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হওয়া মন্দির ধ্বংস ও অবমাননা করেছেন ।

    আধুনিক অনেক লোক কিছু মন্দিরের ক্ষতি করার আওরঙ্গজেবের নির্দেশগুলোকে হিন্দুদের বিরুদ্ধে বৃহত্তর প্রতিহিংসার প্রতিফলন হিসেবে দেখে থাকে। এ ধরনের দৃষ্টিভঙ্গির মূলে রয়েছে উপনিবেশ আমলের গবেষণা ৷ এই গবেষণায় সময়োত্তীর্ণ হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতিকে ব্রিটিশ ভাগ করে জয় করার কৌশলের আলোকে উপস্থাপন করা হয়। বর্তমানে অনেক ওয়েবসাইটে হিন্দুদের বিরুদ্ধে আওরঙ্গজেবের ‘নৃশংসতার’ তালিকা তুলে ধরে (ভাসা ভাসা তথ্য উপস্থাপন এসব সাইটের অন্যতম বৈশিষ্ট্য) সাম্প্রদায়িক উত্তেজনায় ইন্ধন দিয়ে থাকে। আওরঙ্গজেব হিন্দুদের প্রতি ঘৃণা থেকে কতটি মন্দির ধ্বংস করেছিলেন, তার প্রকৃত সংখ্যা নিয়ে বিস্তর মতভেদ রয়েছে। সবচেয়ে চোখ ধাঁধানো ব্যাপার হলো, আওরঙ্গজেব তার সাম্রাজ্যে হাজার হাজার মন্দির গণনা করলেও বাস্তবে তিনি সর্বোচ্চ মাত্র গুটি কতেক মন্দির ধ্বংস করেছিলেন। এই অসমঞ্জস্যতা অর্থপূর্ণ মনে হবে না যদি এই বদ্ধমূল ধারণা পোষণ করা হয় যে আওরঙ্গজেব ছিলেন ভারতকে হিন্দু উপাসনা স্থান শূন্য করার একনিষ্ঠ এজেন্ডায় পরিচালিত ব্যঙ্গচিত্র ধর্মান্ধ। তবে আওরঙ্গজেবের ঐতিহাসিকভাবে যুক্তিসম্মত দৃষ্টিভঙ্গি অবশ্যই ব্যাখ্যা করতে হবে, কেন তিনি যত হিন্দু মন্দির ধ্বংস করেছিলেন, তার চেয়ে বেশি মন্দির তিনি সুরক্ষিত রেখেছিলেন।

    আওরঙ্গজেব আসলে অমুসলিম ধর্মীয় নেতা ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে রক্ষার ব্যবস্থা করার ইসলামি আইন অনুসরণ করেছিলেন। অষ্টম শতক থেকে ইন্দো মুসলিম শাসকেরা হিন্দুদেরকে জিম্মি তথা ইসলামি আইনে সংরক্ষিত শ্রেণি গণ্য করতেন। এর ফলে হিন্দুরা বিশেষ কিছু অধিকার ও রাষ্ট্রীয় রক্ষাকবচের অধিকারী হতো। অবশ্য, হিন্দু ও জৈন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের প্রতি আচরণের ক্ষেত্রে আওরঙ্গজেব ইসলামি আইনের সীমারেখা ছাড়িয়ে গিয়েছিলেন। বরং আওরঙ্গজেবের কাছে মন্দির সুরক্ষিত রাখা ও মাঝে মাঝে ধ্বংস করার কাজটি মোগল সাম্রাজ্যজুড়ে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার কারণ হিসেবে ব্যবহৃত হতো ।

    আওরঙ্গজেবের ন্যায়বিচারের ধারণার মধ্যে ধর্মীয় স্বাধীনতার নির্দিষ্ট কিছু ব্যবস্থাও ছিল। এ কারণেই তিনি হিন্দু উপাসনার বেশির ভাগ স্থানকে সুরক্ষিত রেখেছিলেন। সাধারণভাবে মোগল শাসকেরা প্রজাদেরকে তাদের নিজস্ব ধর্মীয় ধারণা ও প্রবণতা অনুসরণ করার জন্য বিপুল আনুকূল্য প্রদর্শন করতেন। এটি ছিল ওই আমলে অনেক ইউরোপিয়ান দেশের কঠোর বিধানের সম্পূর্ণ বিপরীত 1 ওইসব দেশে শাসকদের ধর্মই অনুসরণ করতে হতো প্রজাদের। অবশ্য, রাষ্ট্রীয় স্বার্থ মোগল ভারতে ধর্মীয় স্বাধীনতায় চাপ সৃষ্টি করত। আর আওরঙ্গজেবও তার মনে হওয়া বিদ্রোহ বা অনৈতিক আচরণের ক্ষেত্রে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও নেতাদের বিরুদ্ধে কঠোর আঘাত হানতে দ্বিধা করতেন না। তবে এ ধরনের উদ্বেগ না থাকলে সব ভারতীয়ের প্রতি সমান আচরণ করার ব্যাপারে নিজের বিশ্বাসই আওরঙ্গজেবকে মন্দিরের প্রতি রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার ব্যবস্থা করে দিতে উদ্বুদ্ধ করত।

    মেবারের হিন্দু রাজপুত শাসক রানা জয় সিংয়ের কাছে ১৬৫৪ সালে পাঠানো এক রাজাদেশে (ফারসিতে নিশান) আওরঙ্গজেব মন্দির ও অন্যান্য অমুসলিম ধর্মীয় স্থাপনার প্রতি একজন ভালো রাজার আচরণ সম্পর্কে একটি রূপরেখা দিয়েছেন। এতে তিনি লিখেছেন : ‘মহান রাজারা খোদার ছায়া হওয়ায় খোদার দরবারের স্তম্ভ এসব উচ্চ মর্যাদার লোকের নজর নিবেদিত থাকে এই কাজে যাতে : বিভিন্ন ধরনের ও বিভিন্ন ধর্মের (মাজাহিব) লোকজন শান্তির ছায়াতলে বাস করতে পারে, সমৃদ্ধিতে তাদের দিন গুজরান করতে পারে, কেউ যেন অন্যদের ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করতে না পারে।’ আদব দুরস্ত ফরাসির মনোরম রীতি থেকে সরে এসে আমরা আওরঙ্গজেবের বক্তব্য হিসেবে যা পাই তা হলো : রাজারা হলো দুনিয়াতে আল্লাহর প্রতিনিধি এবং এ কারণে ধর্মীয় সম্প্রদায়গুলোর মধ্যে শাস্তি নিশ্চিত করার দায়িত্ব রয়েছে তাদের।

    ওই একই রাজাদেশে ‘গোঁড়ামির (তাসুর) আশ্রয় নেওয়া’ সব রাজার নিন্দা করেছেন এ কারণে যে ওই শাসক ‘খোদার সমৃদ্ধ সৃষ্টিকে গুঁড়িয়ে দিচ্ছেন এবং ঐশী ভিত্তিকে ধ্বংস করছেন।’ সিংহাসনে আসীন হলে আওরঙ্গজেব এ ধরনের অনৈপ্লামিক ব্যবস্থার দিকে থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে এর বদলে নিজের ‘পূর্বসূরিদের শ্রদ্ধামূলক রীতি ও প্রতিষ্ঠিত বিধান’ অনুসরণ করে ‘চার কোণযুক্ত বসতিময় বিশ্বকে দীপ্তিময়’ করবেন বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। আওরঙ্গজেবের দৃষ্টিতে ইসলামি শিক্ষা ও মোগল ঐতিহ্য তাকে হিন্দু মন্দির, তীর্থযাত্রীদের তীর্থস্থান ও সাধু পুরুষদের রক্ষা করতে বাধ্য করেছে।

    আওরঙ্গজেব মোগল সাম্রাজ্যে ধর্মীয় সহিষ্ণুতা পরিচর্যা করার ব্যাপারে তার রাজকীয় প্রতিশ্রুতির প্রতি বিশ্বস্ততা থাকার জন্য ৪৯টি বছর পেয়েছিলেন এবং তিনি শুরু করেছিলেন দৃঢ়ভাবে। সম্রাট হিসেবে আওরঙ্গজেবের প্রথম দিকের একটি কাজ ছিল বেনারসের স্থানীয় মোগল কর্মকর্তাদের এই রাজকীয় নির্দেশ (ফরমান) প্রদান যে স্থানীয় মন্দিরগুলোর কার্যক্রমে যেন কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ না হয়। ১৬৫৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে আওরঙ্গজেব লিখেন যে তিনি জানতে পেরেছেন যে ‘কিছু লোক বিদ্বেষপরায়ণতা ও তিক্ততার কারণে বেনারস ও কাছের কয়েকটি এলাকায় সেখানকার প্রাচীন মন্দিরগুলোর দায়িত্বে থাকা একদল ব্রাহ্মণসহ হিন্দু অধিবাসীদের হয়রানি করছে।’ সম্রাট এরপর কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেন : ‘ব্রাহ্মণ বা অন্য হিন্দুরা যাতে তাদের ঐতিহ্যবাহী এলাকায় অবস্থান করে সাম্রাজ্যের ধারাবাহিকতার জন্য দোয়া করতে পারে, সেজন্য তোমাকে অবশ্যই নজর রাখতে হবে সেখানে তাদেরকে কেউ যেন অন্যায়ভাবে হয়রানি করতে না পারে।’

    মন্দির ও সেগুলোর তত্ত্বাবধায়কদের রক্ষার জন্য আওরঙ্গজেবের ১৬৫৯ সালের বেনারস ফরমানের শেষ অংশটি তার লেখা অনেক রাজকীয় আদেশের সাধারণ ধ্রুববাক্যে পরিণত হয়। তিনি তাতে বলেছিলেন, তাদেরকে তাদের মতো করে রাখতে হবে, যাতে মোগল সাম্রাজ্যের দীর্ঘস্থায়িত্বের জন্য ব্রাহ্মণরা দোয়া করতে পারে।

    রাজ্য শাসনকালের পুরো সময়জুড়ে আওরঙ্গজেবের অবিচ্ছেদ্য নীতি ছিল হিন্দু ধর্মের প্রতিষ্ঠান ও তাদের নেতাদের কল্যাণ নিশ্চিত করা। তিনি অনাকাঙ্ক্ষিত হস্তক্ষেপ থেকে মন্দিরগুলোকে রক্ষা করার জন্য, হিন্দু সম্প্রদায়কে ভূমি মঞ্জুর করার জন্য এবং হিন্দু আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্বদের বৃত্তি প্রদান করার জন্য অনেক নির্দেশ জারি করেছিলেন।

    উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, শাসনকালের নবম বছরে গৌহাটির উমানন্দ মন্দিরকে পূর্ববর্তী ভূমিদান ও রাজস্ব সংগ্রহের অধিকার বহাল রাখার বিষয়টি নিশ্চিত করে একটি ফরমান জারি করেন। ১৬৮০ সালে তিনি নির্দেশ দেন যে বেনারসে গঙ্গার তীরে বসবাসকারী হিন্দু সন্ন্যাসী ভগবন্ত গোসাহঁকে যেন হয়রানিমুক্তভাবে থাকতে দেওয়া হয়। ১৬৮৭ সালে তিনি বেনারসের একটি ঘাটে থাকা কিছু ফাঁকা স্থান (ঘটনাক্রমে ওই জমি ছিল একটি মসজিদের কাছে) রামজীবন গোসাইঁকে দেওয়ার নির্দেশ দেন, যাতে তিনি ‘ধার্মিক ব্রাহ্মণ ও পবিত্র দরবেশদের’ জন্য ঘর তুলতে পারেন। ১৬৯১ সালে বালাজি মন্দিরকে সহায়তার লক্ষ্যে চিত্রকূটের মহন্ত বালক দাস নিবানিকে আটটি গ্রাম ও বেশ ভালো পরিমাণ করমুক্ত ভূমি মঞ্জুর করেন আওরঙ্গজেব। ১৬৮৮ সালে মধ্য ভারতের পূর্ব খানদেশে নেক ভট্টের ছেলে রং ভট্ট নামের এক ব্রাহ্মণকে তিনি করমুক্ত ভূমি মঞ্জুর করেন। তালিকাটি বেশ বড় এবং এতে এলাহাবাদ, বৃন্দাবন, বিহার ও অন্যান্য স্থানে মন্দির ও ব্যক্তিদের নাম রয়েছে।

    হিন্দু ধর্মীয় সম্প্রদায়ের অনুকূলে মঞ্জুরি প্রদান করার পূর্বপুরুষদের ঐতিহ্য বহাল রাখেন আওরঙ্গজেব। এই ধারাবাহিকতা ফুটে ওঠে জঙ্গম নামের এক শৈব গ্রুপের সাথে তার আচরণে। গ্রুপটি আকবরের আমল থেকে মোগল আদেশ থেকে উপকৃত হয়ে আসছিল। আকবরই ১৫৬৪ সাল থেকে ভূমিতে তাদের আইনত অধিকার নিশ্চিত করেন। এ গ্রুপটি আওরঙ্গজেবের কাছ থেকে বেশ কিছু ফরমান লাভ করেন। এসবের ভিত্তিতে তারা অন্যায়ভাবে বাজেয়াপ্ত হওয়া ভূমি ফিরে পায় (১৬৬৭), স্থানীয় মুসলিমদের বাধা থেকে সুরক্ষা প্রাপ্তি ঘটে (১৬৭২) ও অবৈধভাবে ধার্য কর ফেরত পেয়ে যায় (১৬৭৪)। এসব পদক্ষেপে নিশ্চিত হওয়া যায় যে ধার্মিক ব্যক্তিরা তাদের ধর্মীয় কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে পারতেন। আর তা ছিল আওরঙ্গেেজবর ন্যায়বিচার অন্তঃদৃষ্টির একটি অনুষঙ্গ ।

    আওরঙ্গজেব জৈন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিও একই ধরনের অনুকূল নীতি বাস্তবায়ন করেছেন। এখানেও আকবরের উদাহরণ অনুসরণ করে ১৬৫০ এর দশকের শেষ দিকে শত্রুঞ্জয়, গিরনার ও মাউন্ট আবুতে (তিনটি স্থানই ছিল জৈন তীর্থযাত্রীদের গন্তব্য) ভূমি মঞ্জুর করেন। তিনি সম্ভবত ১৬৮১ সালের আগে কোনো একসময় জৈন সন্ন্যাসী লাল বিজয়কে একটি আখড়া (পশাল) এবং ১৬৭৯ সালে একটি বিশ্রামাগার (উপাশ্রয়) মঞ্জুর করেন। ১৭০৩ সালের দিকে আওরঙ্গজেব জনৈক জৈন ধর্মীয় নেতা জিনা চন্দ্র সুরিকে হয়রানি থেকে রক্ষা করার নির্দেশ জারি করেন। এ ধরনের নির্দেশনার ফলে এই সময়কালের জৈন সাহিত্যে সম্রাটের উচ্ছ্বসিত প্রশংসার কারণ বুঝতে পারি। একটি স্থানে বলা হয়েছে, ‘আওরঙ্গজেব শাহ সাহসী ও শক্তিশালী রাজা’ (মারদানো আওর মহাবলী আওরঙ্গশাহি নারান্দা)।

    আওরঙ্গজেব ১৬৭২ সালে হিন্দুদের দেওয়া সব ভূমি ফিরিয়ে নেওয়া ও এ ধরনের সব বন্দোবস্তু কেবল মুসলিমদের জন্য নির্ধারিত করার একটি আদেশ জারি করেন। সম্ভবত আলেমদের দাবির প্রতি এটি ছিল একটি ছাড়। এই নির্দেশ কঠোরভাবে পালন করা হলে তা হতে পারত হিন্দু ও জৈন সম্প্রদায়ের জন্য বড় ধরনের আঘাত। কিন্তু ঐতিহাসিক প্রমাণ বলে ভিন্ন কথা।

    ভূমি দানের নতুন নীতি বিশেষ করে সাম্রাজ্যের দূর প্রত্যন্ত এলাকায় বাস্তবায়ন করা হয়নি। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, বাংলার মোগল কর্মকর্তারা ১৬৭২ সালের নির্দেশ জারির আগে হিন্দুদেরকে যত ভূমি বন্দোবস্তু দিয়েছিলেন, পরে দিয়েছিলেন তার চেয়ে বেশি। স্বতন্ত্র ঘটনাগুলোর প্রাচুর্যও ইঙ্গিত দেয় যে ভূমি ফিরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ ছিল কাগজে-কলমে, বাস্তবে নয়। উদাহরণ হিসেবে গুজরাতের কথা বলা যেতে পারে। আওরঙ্গজেবের শাসনকালের শেষ দিকে চিকিৎসকদের একটি পারসি পারিবার ১৭০২ সালের আগে পাওয়া ভূমি মঞ্জুরের নিশ্চয়তাপত্র পেয়েছিল। একইভাবে আগেই অন্যান্য অঞ্চলের যে বিপুলসংখ্যক উদাহরণ আমি উল্লেখ করেছি, তাতে ওই নীতির সীমিত বাস্তবায়নের ইঙ্গিত দিচ্ছে। প্রমাণের ভিত্তিতে আধুনিক অনেক ইতিহাসবিদ মনে করছেন যে ১৬৭২ সালের নির্দেশটি কার্যত সাম্রাজ্যের কোথাও বাস্তবায়িত হয়নি, পাঞ্জাবের মতো কিছু নির্দিষ্ট এলাকা ছাড়া তা ‘কাগজপত্রেই থেকে যায় ৷

    আরো অনেক সময় হিন্দু মন্দিরগুলোর প্রতি উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন আওরঙ্গজেব। উদাহরণ হিসেবে আগেই উল্লেখ করা ১৬৫৯ সালের বেনারস নির্দেশের কথা বলা যায়। এতে আওরঙ্গজেব জানিয়েছেন, ইসলামি আইনের বিধান অনুযায়ী, ‘প্রাচীন কোনো মন্দির ভাঙ্গা যাবে না।’ তবে এতে আরো যোগ করা হয়েছে, ‘নতুন কোনো মন্দির নির্মাণ করা যাবে না।’ রিচার্ড ইটন উল্লেখ করেছেন, এটি বেনারসের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য ছিল, আওরঙ্গজেবের শাসনকালে সাম্রাজ্যের অন্যত্র অসংখ্য মন্দির নির্মিত হয়েছে। কিন্তু তবুও এ নির্দেশটি ছিল আগেকার মোগল নীতির থেকে সরে যাওয়া। উল্লেখ্য, এ নীতিটি আওরঙ্গজেবের হিন্দু মন্দির রক্ষার জটিলতা (এবং সেইসাথে সীমা) প্রকাশ করে।

    মন্দির ধ্বংসকারী
    কোনো প্রাচীন মূর্তির মন্দির ভেঙ্গে ফেলা বৈধ নয় এবং প্রাচীন কাল থেকে প্রথা হিসেবে চালু থাকা সরোবরে প্রক্ষালন নিষিদ্ধ করাও দায়িত্ব আপনার নয় ৷
    –ভবিষ্যত দিল্লির সুলতান সিকান্দার লোদির (শাসনকাল ১৪৮৯-১৫১৭) প্রতি মুফতিদের উপদেশ

    মোগল সাম্রাজ্যজুড়ে থাকা লাখ লাখ মন্দিরের সবগুলো না হলেও বেশির ভাগই আওরঙ্গজেবের আমলের শেষ সময় পর্যন্ত টিকে ছিল।

    আওরঙ্গজেবের নির্দেশে ঠিক কতটি মন্দির ধ্বংস বা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে তা কেউ জানে না, আমরা কখনো জানতেও পারব না। আওরঙ্গজেবের শাসনকালে মন্দির ধ্বংসের নিশ্চিত সংখ্যা মাত্র এক ডজনের সামান্য কিছু বেশি বলে উল্লেখ করেছেন এ বিষয়ক শীর্ষস্থানীয় বিশেষজ্ঞ রিচার্ড ইটন। আর এগুলোর মধ্যে সরাসরি সম্রাটের নির্দেশে ধ্বংস করা হয়েছে আরো কম । অন্যান্য বিশেষজ্ঞ ইটনের উল্লেখ না করা আরো কয়েকটি মন্দির ধ্বংসের কথা উল্লেখ করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে ১৬৫৯ ও ১৭০৬ সালে সোমনাথ মন্দির ধ্বংস-সংক্রান্ত দুটি নির্দেশ (দ্বিতীয় নির্দেশটির অস্তিত্ব থাকার অর্থ হচ্ছে, প্রথম নির্দেশটি বাস্তবায়িত হয়নি)। আওরঙ্গজেব নিজেও মন্দির অপবিত্রকরণ তদারকি করেছেন। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ১৬৪৫ সালে তিনি জৈন বণিক শান্তিদাসের নির্মিত আহমদাবাদের চিন্তামনি পার্শ্বনাথ মন্দিরে মিরহাব (মুসলিমদের মসজিদে নামাজের নির্দেশসূচক) তোলার নির্দেশ দেন। কিন্তু এমনকি এ ধরনের ক্ষেত্রেও ইটন উদ্ধৃতি হলো, ‘প্রায় সবসময়ই প্ৰমাণ অতিরঞ্জিত, অসম্পূর্ণ ও এমনকি সাংঘর্ষিক।’ এমন প্রেক্ষাপটে বলা যায়, আমরা যতগুলো সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারি, আওরঙ্গজেবের আমলে সম্ভবত তার চেয়ে বেশি মন্দির ধ্বংস করা হয়েছিল (হয়তো মোটে কয়েক ডজন?), কিন্তু এখানে আমরা অজ্ঞাত অতীতের ওপর টেনে দেওয়া কালো পর্দার মুখোমুখি হই ।

    অবশ্য, ক্ষীণ যে কয়েকটি রশ্মি আছে, তার আলো থেকে আমরা ধরে নিতে পারি যে আওরঙ্গজেবের ভারতবর্ষে মন্দির ধ্বংস ছিল তুলনামূলকভাবে অনেক কম। উদাহরণ হিসেবে সাকি মস্তাইদ খানের মাসির-ই আলমগিরে (আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর সামান্য পরে লিখিত ফারসি ভাষায় ইতিহাসপুঞ্জি) ১৬৭০ সালে মথুরার কেশব দেব মন্দির গুঁড়িয়ে দেওয়ার নির্দেশের কথা বলা যেতে পারে। এটিকে দৃশ্যত একেবারে ভিত্তিহীন বিরল ও অসম্ভব ঘটনা’ হিসেবে অভিহিত করা যেতে পারে। সার্বিকভাবে মাসির-ই আলমগিরি হলো ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা আওরঙ্গজেবের শাসনকাল। এখানে অনেক সময় লেখকের অভিরুচি অনুযায়ী তথ্য পরিবর্তন করা হয়েছে। এই প্রবণতার মানে হলো এই যে এ গ্রন্থটি (এটি ইতিহাস নয়, বরং বাগাড়ম্বড়তার শিল্পকর্ম) থেকে উদ্ধৃতি দেওয়ার সময় চরম সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। মাসির-ই আলমগিরিতে আওরঙ্গজেবের হাতে ভাঙ্গা মন্দিরের সংখ্যা বাড়িয়ে দেখানোর বিষয়টি প্রমাণিত। এতে এমন সব গাল-গল্প উল্লেখ করা হয়েছে যেসব ঘটা অস্বাভাবিক ও অপ্রত্যাশিত ।

    উপনিবেশ-পূর্ব আমলের ভারতবর্ষে মন্দির ভাঙ্গার ব্যাপারটি ইটনের মতে, “সংখ্যার খেলায় কাটাকাটিতে মেতে ওঠা’ একটি পণ্ডশ্রম। আওরঙ্গজেব কেন সুনির্দিষ্ট কিছু হিন্দু মন্দিরকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছিলেন, আর বিশালসংখ্যক মন্দিরকে স্পর্শ করার বাইরে রেখেছিলেন. তা নিয়ে যুক্তি পুনঃগঠনের জন্য আমরা আরো দৃঢ় ভিত্তির ওপর অবস্থান করছি।

    রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহের কারণেই নির্দিষ্ট হিন্দু মন্দিরগুলোর ওপর হামলা চালাতে প্ররোচিত হয়েছিলেন আওরঙ্গজেব। আওরঙ্গজেব ১৬৬৯ সালে বেনারসের বিশ্বনাথ মন্দির ধ্বংস করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। তারপর ১৬৭০ সালে কেশব দেব মন্দির গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। উভয় ক্ষেত্রেই আওরঙ্গজেব মন্দিরের সাথে সম্পৃক্তদেরকে তাদের রাজনৈতিক ভুল পদক্ষেপের শাস্তি দিতে চেয়েছিলেন এবং মোগল রাষ্ট্রের প্রতি তাদের ভবিষ্যতের আনুগত্য নিশ্চিত করতে চেয়েছেন ।

    ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলো রাজনৈতিক কারণে ধ্বংস করার ধারণাটি আধুনিক অনেক লোকের কাছে অগ্রহণযোগ্য বিবেচিত হলেও প্রাক-আধুনিক ভারতবর্ষে ধর্ম ও রাজনীতির মধ্যে এ ধরনের জোরালো রেখা টানা ছিল না। বরং এর বিপরীতে হিন্দু ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ই মন্দিরকে ব্যাপকভাবে রাজনৈতিক পদক্ষেপের সাথে সম্পর্কিত মনে করত। সম্ভবত ষোড়শ শতকে লিখিত সংস্কৃত গ্রন্থ বৃহতসংহিতায় সতর্ক করা হয়েছে যে ‘দৃশ্যমান কারণ ছাড়া যদি কোনো শিবলিঙ্গ, ছবি বা মন্দির ভেঙ্গে যায়, সরে যায়, ঘাম নির্গত হয়, কাঁদে, কথা বলে বা অন্য কিছু করে, তবে ওই রাজা ও তার রাজ্য ভেঙে পড়ার হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করা হচ্ছে।’ ধর্মীয় প্রতিমার রাজনৈতিক শক্তি থাকার এই বক্তব্যের আলোকে হিন্দু রাজারা সপ্তম শতক থেকে একে অন্যের মন্দিরগুলো লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করতেন, নিয়মিতভাবে দুর্গা, গনেশ, বিষ্ণু ইত্যাদি দেব-দেবীর মূর্তি লুটপাট করতেন, ভেঙে ফেলতেন। তারা নিয়মিতভাবে একে অপরের মন্দিরগুলো ধ্বংস করতেন। কোনো কোনো হিন্দু রাজা এ ধরনের কাজকে উদযাপন ও স্মরণে রাখার জন্য সংস্কৃত কবিতা রচনা করতেন। আওরঙ্গজেবের মতো ইন্দো-মুসলিম শাসকেরা এর আলোকে শাস্তিমূলক রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপ হিসেবে হিন্দু মন্দিরগুলোকে বৈধ লক্ষ্যবস্তু বিবেচনা করতেন।

    আওরঙ্গজেব ১৬৬৯ সালে বেনারসের বিশ্বনাথের মন্দিরের বড় অংশ ভেঙ্গে ফেলেন। আকবরের আমলে রাজা মানসিং মন্দিরটি নির্মাণ করেছিলেন । অনেকে মনে করেন, মানসিংহের নাতির ছেলে জয় সিং ১৬৬৬ সালে মোগল দরবার থেকে শিবাজি ও তার ছেলে শম্ভুজিকে পালিয়ে যেতে সাহায্য করেছিলেন। এই জয় সিংই এর আগে পুরান্দারে শিবাজির বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালিয়েছিলেন । এছাড়া ১৬৬৯ সালে বিশ্বনাথ মন্দিরের সাথে সম্পর্কিত বেনারসের অনেক জমিদারদের মধ্যে একটি বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়ে। তাদের অনেকেও শিবাজির পলায়নের সাথে জড়িত ছিলেন।

    আওরঙ্গজেব ১৬৭০ সালে মাথুরার কেশব দেব মন্দিরটি নিশ্চিহ্ন করার নির্দেশ দেন। ১৬১৮ সালে বীর সিং বুন্দেলার নির্মিত এ মন্দিরটি ভাঙ্গার পেছনেও ছিল রাজনৈতিক কারণ। মাথুরার ব্রাহ্মণরা সম্ভবত ১৬৬৬ সালে শিবাজির আগ্রা থেকে চলে যেতে সহায়তা করেছিলেন। অধিকন্তু কেশব দেব মন্দিরটির পৃষ্ঠপোষকতা করতেন সিংহাসনে আওরঙ্গজেবের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী দারা শুকোহ। আরো কাছাকাছি সময়ে, তথা ১৬৬৯ ও ১৬৭০ সালে ওই অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়া জাট বিদ্রোহে মোগলদের ব্যাপক হতাহতের ঘটনা ঘটে। পরে বছরগুলোতে যোধপুর, খান্দেলা ও অন্যান্য অঞ্চলে একই কারণে মন্দির ধ্বংস করার নির্দেশ দেন আওরঙ্গজেব ।

    বিশ্বনাথ ও কেশব দেব মন্দিরের উভয়স্থানেই মসজিদ নির্মিত হয়, তবে তা ভিন্ন ভিন্ন পরিস্থিতিতে। বিধ্বস্ত মন্দিরটির প্রাচীরের কিছু অংশ ভবনটির সাথে একীভূত করে নির্মিত জ্ঞানবাপি মসজিদটি এখনো দাঁড়িয়ে আছে। এই পুনঃব্যবহারের কারণ সম্ভবত এটি মোগল কর্তৃত্ব বিরোধিতার ভয়ঙ্কর পরিণাম সম্পর্কে ধর্মীয় আবরণে দেওয়া একটি বিবৃতি। ব্যবহার করায় সুবিধা থাকাও সম্ভবত পুনঃব্যবহারের একটি কারণ। জ্ঞানবাপি মসজিদটি আওরঙ্গজেবের আমলে নির্মিত হলেও এর পৃষ্ঠপোষকের নাম জানা যায় না, কাঠামোটির কথাও মোগল নথিপত্রে নেই ।

    মাথুরার কেশব দেবের মন্দিরের স্থানে নির্মিত মসজিদটির পৃষ্ঠপোষকতা করেছিলেন আওরঙ্গজেব। জাট বিদ্রোহের সময়কার মোগল কমান্ডার ও মাথুরার প্রধান মসজিদের পৃষ্ঠপোষক আবদুল নবি খানের মৃত্যুর ঘটনার মাধ্যমে এর ব্যাখ্যা করা যেতে পারে। আবদুল নবির মৃত্যুর (এতে মাথুরার মসজিদগুলোর পৃষ্ঠপোষতা হ্রাস পেয়েছিল) মাত্র আট মাস পর কেশব দেব মন্দিরটি ধ্বংস করা হয়।

    আমরা মোগল মন্দির ধ্বংস নিয়ে রাজনীতি পুনঃনির্মাণ করতে পারলেও মধ্য যুগের পর্যবেক্ষকেরা, যদি করেও থাকেন, খুব কমই কখনো কিছু স্থানে হামলার বাস্তব রাজনৈতিক যুক্তির ওপর জোর দিয়েছিলেন। অনেক হিন্দু ও জৈন চিন্তাবিদ মন্দির ধ্বংসকে কলি যুগ বা বর্তমান সময়ের আবির্ভাব হিসেবে দেখেছেন। মন্দির ধ্বংসের বর্ণনা করার সময় মুসলিম লেখকেরা সাধারণভাবে জিহাদ বা অন্য কোনো ধর্মভিত্তিক ধারণা তুলে ধরেছেন। ইসলামি প্রবণতাটির মূল সম্ভবত নিহিত রয়েছে এই ধারণায় যে ইসলামি আইনে সরকারের স্বার্থে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ক্ষতিসাধন অনুমোদন করে না। ফলে ইসলাম বিস্তারের যুক্তি উপস্থাপন ছিল ওই কাজের যৌক্তিকতা প্রতিপন্ন করা। এই যুক্তি সাংস্কৃতিকভাবে যথাযথ হলেও আওরঙ্গজেবের ভারতবর্ষে মন্দির ধ্বংসের ঐতিহাসিকভাবে ব্যাপকভিত্তিক ব্যাখ্যা দিতে পারে না।

    আওরঙ্গজেব কেন কিছু মন্দির ধ্বংস করলেন এবং অন্যগুলো একেবারে অক্ষত রেখে দিলেন তার ব্যাখ্যা ইতিহাসের আলোকে কলি যুগ ও জিহাদ তত্ত্ব দিতে না পারলেও বিকল্প ধর্মীয় কারণও বিরাজ করতে দেখা যায়। আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর ইতিহাস রচনাকারী মুস্তাইদ খান বলেছেন যে ১৬৬৯ সালে আওরঙ্গজেব জানতে পারেন যে ‘থাট্টা, মুলতান ও বেনারসের কিছু বিচ্যুৎ ব্রাহ্মণ তাদের প্রতিষ্ঠিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ভ্রান্ত বই পড়াচ্ছেন। তাদের কাছ থেকে ভ্রষ্ট শিক্ষা গ্রহণ করার জন্য দূর দূরান্ত থেকে হিন্দু ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের লোকজন সেখানে যাচ্ছে।’ মাথুরার কেশব দেব মন্দিরের ক্ষেত্রেও একই বিষয় প্রযোজ্য হতে পারে। সেই জাহাঙ্গীরের আমলেও এ মন্দিরটির দিকে মুসলিমরা আকৃষ্ট হয়েছিল।

    মোগল বাদশাহদের কয়েকটি প্রজন্ম নির্দিষ্ট কিছু ধর্মীয় আচরণ, বিশেষ করে মোগলদের দৃষ্টিতে অপেক্ষাকৃত কম মার্জিত হওয়ার সুযোগ গ্রহণকারী ভ্রান্ত ব্রাহ্মণদের দমন করার চেষ্টা করেছেন। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, আকবর নিম্নবর্ণের লোকদের কাছে হিন্দু গ্রন্থগুলোর ভুলভাবে উপস্থাপনের জন্য ব্রাহ্মণদের দায়ী করেছিলেন। তিনি আশা করেছিলেন যে সংস্কৃত পুস্তকগুলো ফারসিতে অনুবাদ করা হলে (তার দৃষ্টিতে) এসব ঔদ্ধত্যপূর্ণ নেতা তাদের পথ সংশোধন করতে উদ্দীপ্ত হবেন ।

    আওরঙ্গজেবও সাধারণ হিন্দুদের প্রতারিত করার লক্ষ্যে ব্রাহ্মণদের নিজেদের ধর্ম সম্পর্কে বিভ্রান্তি সৃষ্টির জন্য উদ্বেগ প্রকাশ করতেন, এবং সম্ভবত বিশেষভাবে আতঙ্কিত ছিলেন এই ভেবে যে, মুসলিমরা ভণ্ড লোকদের খপ্পরে পড়ে যাচ্ছে। এ ধরনের প্রতারণার মাধ্যমে ব্রাহ্মণরা আর্থিকভাবেও লাভবান হতেন। ফরাসি পর্যটক জ্যাঁ ডি থেভেনট অভিমত ব্যক্ত করেছেন যে বেনারসে ব্রাহ্মণদের সংখ্যা অনেক এবং তারা বিপুলসংখ্যক লোককে টেনে আনা বড় বড় অনুষ্ঠান থেকে ‘লাভবান হওয়ার পথ খোঁজে। এ ধরনের ক্ষেত্রে মোগল রাজকীয় বাধ্যবাধকতা ছিল তাদের প্রজাদেরকে প্রতারিত হওয়া প্রতিরোধ করার জন্য দায়িত্বশীল ভূমিকা গ্রহণ। বেনারস ও অন্যান্য স্থানের বেশির ভাগ মন্দিরে ভ্রান্ত কার্যকলাপ হয় কিনা তার অনুসন্ধান করার জন্য নির্দেশ দিয়েছিলেন আওরঙ্গজেব। তবে বিশ্বনাথ ও কেশব দেব মন্দিরের ক্ষেত্রে তার মনে হয়েছিল, ধ্বংস করাই হবে যথাযথ ।

    আওরঙ্গজেবের লক্ষ্যবস্তু হওয়া বেশির ভাগ মন্দির ছিল উত্তর ভারতে। গুটিকতেক ব্যতিক্রম ছাড়া আওরঙ্গজেব দাক্ষিণাত্যের কোনো মন্দির ধ্বংস করেননি। অথচ এখানেই তার জীবনের শেষ তিন দশক মোগল সাম্রাজ্য সম্প্রসারণের কাজে তার সেনাবাহিনী নিয়োজিত ছিল। মধ্য ও দক্ষিণ ভারতে অসংখ্য মন্দির ভেঙ্গে ফেলা সম্ভব ছিল। কারণ মোগলরা এসব এলাকায় তাদের সামরিক শক্তি দুর্গ ও অন্যান্য সামরিক লক্ষ্যবস্তুগুলোর বিরুদ্ধে প্রয়োগ করেছিল। কিন্তু আওরঙ্গজেব মোগল সাম্রাজ্যে নতুন নতুন এলাকা সফলভাবে একীভূত করার সাথে মন্দির ভাঙ্গাকে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে বিবেচনা করেননি।

    এমনকি আওরঙ্গজেব যখন দক্ষিণ দিকে মোগল শাসন সম্প্রসারণের পথে ব্যাপক প্রতিরোধের মুখে পড়েছিলেন, তখনো তিনি প্রয়োজনের আলোকে অন্যান্য কৌশল অবলম্বন করেছিলেন। এই দৃষ্টিভঙ্গিতে বোঝা যাচ্ছে, আওরঙ্গজেব ও তার কর্মকর্তারা মনে করতেন যে মন্দির ভাঙ্গা হলো চরম পদক্ষেপ, তাই এর ব্যবহার করতে হবে খুবই কম!

  • শেষ সময়

    শেষ সময়

    দাক্ষিণাত্য বিজয়

    আমি এই দুনিয়ার মানুষদেরকে খুবই লোভী দেখেছি, আওরঙ্গজেব আলমগিরের মতো সম্রাট একেবারে বিনা কারণে এত ব্যাকুলতা ও আবেগ নিয়ে দুর্গ দখল করেন যে মনে হয় তিনি ব্যক্তিগতভাবে কিছু পাথরের স্তূপের জন্য হাঁপাতে হাঁপাতে ছুটছেন ।
    –হিন্দু সৈনিক ভীমসেন স্যাক্সেনার ফারসি স্মৃতিকথা, ১৭০৭

    যদি কোনো দরবেশ অর্ধেক রুটি খান, তবে তিনি বাকিটা দেবেন কোনো গরিবকে।
    রাজা কোনো পুরো ভূখণ্ড জয় করলেও তিনি আরেকটির জন্য ব্যাগ্র হয়ে ওঠেন।
    –সাদি, গুলিস্তাঁ

    আওরঙ্গজেব ১৬৮০-এর দশকের প্রথম দিকে দিল্লির ময়ূর সিংহাসন পেছনে ফেলে দাক্ষিণাত্যের দিকে এগিয়ে গেলেন। তিনি দাক্ষিণাত্যে মোগল সম্প্রসারণ অভিযানে একের পর এক কমান্ডারকে পরিচালনা করছিলেন, কিন্তু কোনো কিছুতেই কাঙ্ক্ষিত সাফল্য পাননি। দাক্ষিণাত্যের প্রতি মোগলদের আকর্ষণ ছিল সেই আকবরের আমল থেকে, আগের শতকে তারা ওই এলাকায় অনেকগুলো সামরিক অভিযান পরিচালনা করেছিল। কিন্তু আওরঙ্গজেব দক্ষিণ ভারত জয় করার জন্য নজিরবিহীন সম্পদ নিয়োজিত করেছিলেন, নিজেও জীবনের শেষ দশকগুলো যুদ্ধক্ষেত্রে কাটিয়েছেন ।

    আওরঙ্গজেব তার সব জীবিত ছেলে (যুবরাজ আকবর ছাড়া, তিনি ছিলেন বিদ্রোহী) ও হেরেমসহ বিপুলসংখ্যক সহকর্মী নিয়ে দক্ষিণ দিকে এগিয়ে গেলেন। চলমান তাঁবু শিবিরের সাথে নিশ্চিতভাবেই ভ্রাম্যমান বাজার, সেনাবাহিনী, আমলাতান্ত্রিক কর্মকর্তা ও চাকর-বাকরের দল ছিল। কয়েক মাস পথ চলার পর কাফেলা দাক্ষিণাত্যে পৌঁছে, বিজয়ের দিকে দৃষ্টি ফেললেন আওরঙ্গজেব ।

    মোগল সম্রাটেরা অনেক সময়ই চলমান অবস্থায় থাকতেন, আওরঙ্গজেব সম্রাটের সাথে রাজধানী নিয়ে চলাচল করার মহান মোগল ঐতিহ্য অনুসরণ করেছিলেন। তবে আওরঙ্গজেবের পদক্ষেপে অভিনবত্ব যা ছিল তা এই যে তিনি রাজধানী স্থায়ীভাবে দক্ষিণ দিকে সরিয়ে নেন। তার অনুপস্থিতিতে ও জনসংখ্যা বেশ কমে যাওয়ায় অনেকের কাছে দিল্লি পরিণত হয় ভুতুরে নগরীতে। লাল কেল্লার কক্ষগুলো ধূলিমলিন হয়ে সফরকারী দূতদের যাওয়ার অনুপযুক্ত বিবেচিত হয় ।

    ভূখণ্ডগত সম্প্রসারণের পরিভাষায় আওরঙ্গজেব তার দাক্ষিণাত্য অভিযানে নজিরবিহীন সাফল্য লাভ করেন। উপমহাদেশের দক্ষিণাংশজুড়ে মোগল নিয়ন্ত্ৰণ সম্প্রসারণের জন্য তিনি সামরিক ও কূটনীতি উভয় সম্পদই ব্যবহার করেন । কিন্তু আওরঙ্গজেব জীবিত কালেই দাক্ষিণাত্যের যুদ্ধগুলো অপ্রত্যাশিতভাবে ইঙ্গিত দিতে থাকে যে মোগল সাম্রাজ্যের ভবিষ্যত ভালো নয়। আওরঙ্গজেবের শেষ দশকগুলোর নির্মম আক্রমণ ও সীমাহীন অবরোধ ছিল কৃত্রিমভাবে সাফল্যপূর্ণ, তবে চূড়ান্তভাবে ফাঁপা ।

    দাক্ষিণাত্যে আওরঙ্গজেবের অনেক বিজয়ের মধ্যে বিজাপুর ও গোলকোন্ডা জয় ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, অবশ্য তা ছিল বেশ ব্যয়বহুলও ।

    আওরঙ্গজেব ১৬৮৫ সলে বিজাপুর অবরোধ করেন। এটি ১৪৮৯ সাল থেকে আদিল শাহি রাজবংশের মাধ্যমে শাসিত হতো, তাদের সেনাবাহিনীতে সদস্য ছিল ৮০ হাজার। বিজাপুরের শাসক সিকান্দারকে তার ৩০ হাজার লোকসহ নগরীর সুরক্ষিত প্রাচীরগুলোর অভ্যন্তরে ১৫ মাস ধরে আটকে ফেলা হয়। ক্ষুধায় উভয় পক্ষের অনেক লোক মারা যায়, কিন্তু সিকান্দার আদিল শাহ আত্মসমর্পণ করার আগে পর্যন্ত মোগলরা অবরোধ প্রত্যাহার করেনি। পরাজিত শাসক ১৬৮৬ সালে আওরঙ্গজেবের কাছে এসে মোগল সার্বভৌমত্ব গ্রহণ করার ব্যাপারে তার ইঙ্গিত নিশ্চিত করতে ভূমিতে নত হন ।

    কুতুব শাহি রাজবংশ নিয়ন্ত্রণ করত গোলকোন্ডা। ১৫১৮ সালের দিক এই রাজবংশ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। বিশ্বাসঘাতকতামূলক কাজের মাধ্যমে পরের বছরই মোগল বাহিনীর কাছে এর পতন ঘটে। মোগলরা প্রথমে কুতুব শাহি সেনাবাহিনীর বেশির ভাগ অংশকে গোলকোন্ডা দুর্গে তাড়িয়ে তারপর অবরোধ আরোপ করে (চিত্র ৬)। মোগল সেনাবাহিনী আট মাস ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করে। এ সময় তারা কুতুব শাহি বাহিনীকে খাদ্য, পানি ও শক্তিবৃদ্ধি থেকে বঞ্চিত করে। এ ধরনের বঞ্চনা আর সহ্য করতে না পেরে এক কর্মকর্তা এক রাতে ফটক সামান্য খুলে চলে যাওয়ার জন্য আওরঙ্গজেবের কাছ থেকে ঘুষ নেন। মোগল বাহিনী দ্রুততার সাথে তাতে প্রবেশ করে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে কুতুব শাহি রাজ্য গ্রহণ করে, এর বিখ্যাত হিরার খনিগুলো মোগল পতাকার অধীনে নিয়ে আসে ।

    গোলকোন্ডার পর আওরঙ্গজেবের কাছে প্রধান বিরোধী হিসেবে টিকে থাকে কেবল মারাঠারা। মারাঠা নেতারা ১৬৯৮ সালে মোগলদের কাছে তামিল নাড়ুর দুর্গ জিনজি (গিনগি) খোয়ায়। ১৬৯৯ থেকে ১৭০৬ সাল পর্যন্ত আওরঙ্গজেবের বাহিনী মারাঠাদের এক ডজন দুর্গে আক্রমণ চালায়, মোগল সীমান্ত বৃদ্ধি পায়, প্রায় পুরো উপমহাদেশ তাদের হাতে চলে আসে। সামগ্রিকভাবে আওরঙ্গজেব চারটি নতুন মোগল প্রদেশ যুক্ত করেন, যা সম্মিলিতভাবে ছিল পুরো মোগল সাম্রাজ্যের এক চতুর্থাংশের চেয়ে বেশি। তবে এই মোগল দখলদারিত্ব হয়েছিল স্বল্পস্থায়ী। আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর কয়েক দশকের মধ্যেই মোগলরা দাক্ষিণাত্যে তাদের সব অর্জন খুইয়ে ফেলে; সাম্রাজ্য সঙ্কুচিত হয়ে আসতে থাকে ।

    এমনকি আওরঙ্গজেবের জীবনকালেও দাক্ষিণাত্যে সামরিক অভিযানে মোগল রাষ্ট্রের জন্য বড় বড় সমস্যার সৃষ্টি করেছিল। অব্যাহত সঙ্ঘাতে কোষাগার খালি হয়ে পড়ছিল, অনেক অভিজাত সদস্যের ইচ্ছা নষ্ট হয়ে পড়েছিল। বিশেষ করে রাজপুত ও উত্তর ভারতের অন্যান্য এলাকার মানুষ দক্ষিণ ভারতে দশকের পর দশক ধরে কাটাতে বিরক্ত হয়ে পড়েছিল। এলাকাটি ছিল তাদের বাড়ি থেকে অনেক দূরে, সেখানকার জলবায়ু, সংস্কৃতি ও জনসাধারণকে নিজের মনে করত না তারা। উদাহরণ হিসেবে উত্তর প্রদেশের কায়স্থ বর্ণের ভীমসেন স্যাক্সেনার কথা বলা যেতে পারে। তার পরিবার কয়েক প্রজন্ম ধরে মোগলদের অধীনে কাজ করেছে। তিনিও খোলামেলাভাবে সফর ও পরিবার থেকে দীর্ঘ সময় আলাদা থাকার কষ্টের কথা বলেছেন । তিনি দক্ষিণ ভারতীয়দের প্রতি তার প্রতি বিতৃষ্ণা প্রকাশ করে তাদেরকে পুরোপুরি বিদেশী লোক হিসেবে বর্ণনা করেছেন। ১৬৯০-এর দশকের মধ্যভাগে দাক্ষিণাত্যের যুদ্ধগুলো সম্পর্কে ভীমসেন যা লিখেছেন তাতে আধুনিককালের দৃষ্টিতে বেশ আপত্তিকর মনে হবে। তিনি দক্ষিণের হিন্দুদের সম্পর্কে লিখেছেন : ‘তারা কালো বর্ণের, বাজে গড়নের ও কুৎসিত চেহারার। আগে দেখা হয়নি, এমন কারো সাথে যদি রাতের অন্ধকারে সাক্ষাত হয়, তবে সে হয়তো ভয়েই মরে যাবে।’ এ ধরনের লোকদের মুখোমুখি হওয়াকে তারা বিরক্তিকর মনে করত, অনেকে ভাবত যে মোগল চাকরি আকর্ষণ হারিয়ে ফেলেছে।

    অন্য মোগল কর্মকর্তাদের কাছে অবশ্য দক্ষিণের জীবন সহ্যকর বলেই মনে হয়েছিল। তবে মোগল মনসব ব্যবস্থা নিজের ভারেই ভেঙে পড়ে ছিল। অভিজাতদেরকে আয়ের উৎস ভূমি পাওয়ার (জায়গির) জন্য প্রায়ই তাদেরকে বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হতো। ইতোমধ্যেই মোগল রাষ্ট্র তার কাছ থেকে যে নির্দিষ্ট সংখ্যক সৈন্য পাওয়ার প্রত্যাশা করত, ওই সব সৈন্যের বেতনের জন্য যে সম্পদ ব্যয় করতে হতো, তা এমন অবস্থায় তাদের কাছে থাকত না। বিশ্বাসঘাতকতা করা ও দলত্যাগ ছিল সাধারণ ঘটনা ।

    জিনজি অবরোধের সময়কার অস্থিরতা এমন কিছু ইঙ্গিত দিয়েছিল যা দাক্ষিণাত্যের বছরগুলোতে অনেক মোগল সৈন্য ও অভিজাতকে হঠাৎ করে অভিভূত করে ফেলেছিল। আওরঙ্গজেব ১৬৯৮ সালে জিনজি দখল করেন, তবে তা হয়েছিল আট বছর অবরোধের পর। এত দীর্ঘ অবরোধ চালিয়ে যাওয়ার বিষয়টি যুক্তিগ্রাহ্য করা কঠিন। পর্যবেক্ষকেরা এজন্য কমান্ডার জুলফিকার খানকে দায়ী করেন। তাদের মতে, এই কমান্ডার দায়িত্ব পালনে প্রতিশ্রুতিশীল ছিলেন না। এ নিয়ে অনেক গুজব ছড়িয়ে পড়েছিল। এর একটি ছিল এই যে তিনি জিনজি নিয়ন্ত্রণকারী মারাঠাদের সাথে গোপন আঁতাত করেছিলেন । তাছাড়া তিনি হতশ্রী কান্দহার অভিযানেও যেতে না চাওয়ায় বিজয় সম্পন্ন করার কাজে সময়ক্ষেপণ করছিলেন। কারণ, এর পরই তাকে সেখানে পাঠানো হবে বলে ধারণা করা হচ্ছিল। যাই হোক না কেন, একটি অবরোধ অপ্রয়োজনীয়ভাবে দীর্ঘায়িত হওয়ায় মনে হচ্ছে যে সেনাবাহিনীর নৈতিক শক্তি ও রাজকীয় কর্তৃত্ব শিথিল হয়ে যাওয়া ।

    আওরঙ্গজেবের লোকজন দোদুল্যমান হয়ে পড়লেও বয়সের সাথে পাল্লা দিয়ে অভিযানও বাড়াচ্ছিলেন আওরঙ্গজেব। সম্রাট তার জীবনের ৬০, ৭০ ও ৮০-এর দশকগুলো দাক্ষিণাত্যে কাটানোর পাশাপাশি প্রায়ই ব্যক্তিগতভাবে যুদ্ধ ও অবরোধ তদারকি করতেন। ভীমসেনের ভাষায়, খুব একটা ইতিবাচকভাবে নয়, ‘[আওরঙ্গজেব] ব্যক্তিগতভাবে কিছু পাথরের স্তূপের জন্য হাঁপাতে হাঁপাতে ছুটছেন।’ আওরঙ্গজেব তার ক্রমবর্ধমান তৎপরতার মাধ্যমে সাফল্য লাভ করছিলেন, সুস্থ বা অসুস্থ থাকুন, সৈন্যদল পরিচালনার নির্দেশ দিয়েই যাচ্ছিলেন। তিনি এক প্রশাসককে লিখেছেন, ‘যতক্ষণ এই নশ্বর জীবনের একটি শ্বাসও বাকি থাকবে, ততক্ষণ শ্রম আর কাজ থেকে মুক্তি নেই।’ অফিসারেরা পছন্দ না করলেও দাক্ষিণাত্যে বাস করাটা সম্রাট নিজে উপভোগ করতেন। আগের যুবরাজ আমলে তিনি তার বাবাকে দাক্ষিণাত্যের টাটকা বাতাস, মিষ্টি পানি আর ব্যাপক চাষাবাদের প্রশংসা করে লিখেছিলেন ।

    দাক্ষিণাত্যে আওরঙ্গজেবের অনেক কার্যক্রমের জন্য মানুষের জীবন ও জীবিকার দিক থেকে উচ্চ মূল্য দিতে হয়েছে। মোগল ও মারাঠা উভয়েই গ্রাম এলাকা জ্বালিয়ে দিয়েছিল, কোনো কোনো এলাকায় দুর্ভিক্ষ নেমে এসেছিল । মোগল অবরোধের ফলে অনেক এলাকায় বিপুলসংখ্যক প্রাণহানি ঘটত, আবার এর পর নেমে আসত রোগ-বালাই। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ১৬৯০ সালে পাঁচ বছর আগের তুলনায় বিজাপুরের জনসংখ্যা অর্ধেকে নেমে আসে। এখানেও মোগল আক্রমণের পরপরই কলেরার বিস্তার ঘটে। করুণা লাভের জন্য আকুল আবেদনে সম্প্রসারণ অভিযান পরিত্যক্ত করা বা তার কৌশলে পরিবর্তন ঘটত না। অবশ্য কোনো কোনো সময় সামান্য স্বস্তির ব্যবস্থা করা হতো। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ভয়াবহভাবে আক্রান্ত এলাকায় তিনি কর মওকুফ করে দিতেন, খরার কারণে ১৬৮৮-৮৯ সময়কালে হায়দরাবাদের জিজিয়া বাতিল করেছিলেন, দুর্ভিক্ষ ও যুদ্ধের ক্ষতির কারণে ১৭০৪ সালে পুরো দাক্ষিণাত্যের জিজিয়া কর থেকে রেহাই দিয়েছিলেন। মোগল ও মারাঠা সঙ্ঘাতের ফলে যে কঠিন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল, এসব পদক্ষেপ তাতে সামান্যই স্বস্তি সৃষ্টি করতে পারত ৷

    আওরঙ্গজেব ছিলেন সম্রাট। ফলে তার সাম্রাজ্য সম্প্রসারণের জন্য বিশেষ কোনো কারণ দেখানোর প্রয়োজন ছিল না। কিন্তু তারপরও বৃদ্ধ বয়সে ও অনেক মোগল কর্মকর্তার আরো যৌক্তিক বিবেচনাকে অগ্রাহ্য করে আওরঙ্গজেব কেন এ ধরনের আগ্রাসী উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন, সে প্রশ্ন জাগতেই পারে। সামনাসামনি যুদ্ধে মোগলদের সমকক্ষ না হওয়া সত্ত্বেও রাজকীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে ক্ষিপ্র, আকস্মিক ও গেরিলা কৌশল অবলম্বন করে অনেক বেশি কার্যকারিতার পরিচয় দেওয়া মারাঠা যোদ্ধাদের অব্যাহত প্রতিরোধে কি আওরঙ্গজেব হতাশ হয়েছিলেন? আওরঙ্গজেব কি বিশ্বাস করতেন যে আরো ভূখণ্ড মোগল রাষ্ট্রকে টিকিয়ে রাখতে সহায়ক হবে? কিভাবে সরে আসতে হবে, তা না জানার কারণেই কি তিনি দক্ষিণ ভারত জয়ের জন্য তার জীবনের এতটা অংশ নিবেদন করেছিলেন? কারণ যাই হোক না কেন, মনে হচ্ছে, আরো বেশি বেশি ভূখণ্ড জয়ের নেশায় নিজেকে হারিয়ে ফেলেছিলেন আওরঙ্গজেব ।

    মৃত্যুন্মুখ রাজা
    এই দুনিয়ার যন্ত্রণা তো খুবই ভয়াবহ, আর আমি স্রেফ একটা কোমল কলি–
    আমি কিভাবে সূর্যঘড়িতে মরুভূমির সব বালি ঢেলে দেব?
    –আওরঙ্গজেব

    আওরঙ্গজেব তার শেষ বয়সের বড় একটি অংশ যুদ্ধক্ষেত্রে কাটালেও নিজের জীবন ও মোগল রাষ্ট্রের ভবিষ্যত নিয়ে চিন্তাভাবনা করার মতো সময় বের করতে পেরেছিলেন। সম্রাট দাক্ষিণাত্য দিয়ে পথ চলার সময় (ক্রমবর্ধমান হারে তাকে বহন করে নেওয়া হচ্ছিল, চিত্র ৭) জেনারেল, রাজকীয় কর্মকর্তা ও পরিবার সদস্যদের কাছে পত্র লিখতেন। এসব নথিপত্র তার অন্তঃদৃষ্টি ও নিজের জীবনের ব্যাপারে অনুশোচনা, ভারতবর্ষের ইতিহাসে তার স্থান, মোগল সাম্রাজ্যের বিশাল অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেছে।

    আওরঙ্গজেবের শেষ বয়সের কিছু উদ্বেগ ছিল দুনিয়াবি ও চরমভাবে মানবীয়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, তিনি বারবার তার অন্যতম প্রিয় ফল আম নিয়ে লিখেছেন। মোগল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা বাবরের আমল থেকেই মোগলরা আম ভালোবাসত। তিনি তার স্মৃতিকথায় লিখেছেন, ‘আম যখন ভালো, তখন সত্যিই ভালো।’ আওরঙ্গজেব তার ছেলে ও কর্মকর্তাদের ঝুড়ি ঝুড়ি আম পাঠাতে বলতেন, তারা তা করলে তিনি তাদের প্রশংসা করতেন। আওরঙ্গজেব অপরিচিত প্রজাতির আমের নাম রাখতেন সংস্কৃত শব্দভাণ্ডার থেকে উৎপত্তি হওয়া হিন্দি শব্দে, যেমন সুধারস, রসনাবিলাস ইত্যাদি। হাতে আসা আমের চালান নষ্ট হয়ে গেলে তিনি অসন্তুষ্ট হতেন।

    আওরঙ্গজেব তার যৌবনকালের কথাও স্মরণ করতেন, পরিবারের সাথে তার দিনগুলো ছিল অনেক সুখের ছিল বলে মনে করতেন। যুবরাজ আযমকে লেখা ১৭০০ সালের এক চিঠিতে তার ছেলের শৈশবের স্মৃতি মনে করিয়ে দিয়েছেন। রাজকীয় ঢোলের শব্দ নকল করে আযম হিন্দি শব্দে বাবা সম্বোধন করে চিৎকার করে বলেছিলেন, ‘বাবাজি, ধুন, ধুন।’ শেষ বয়সে আওরঙ্গজেব বিশেষভাবে উদয়পুরির (তার সবচেয়ে ছোট ছেলে কাম বকশের মা । আশ্চর্যজনক ঘটনা হলো, তিনি ছিলেন সঙ্গীতজ্ঞ) সঙ্গ উপভোগ করতেন। মৃত্যুশয্যায় কাম বকশকে লেখা এক চিঠিতে আওঙ্গজেব বলেন যে অসুস্থতা সময় উদয়পুরি তার সাথে আছেন এবং মৃত্যুর পর তিনিও অল্প সময়ের মধ্যে তার সঙ্গী হবেন। উদয়পুরি মারা যান ১৭০৭ সালে, আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর কয়েক মাস পর ৷

    শেষ বছরগুলোতে আওরঙ্গজেব প্রায়ই পেছনের সময়ে ফিরলেও সামনের দিকে তাকাতেন এবং যা দেখতেন তা অপছন্দ করতেন ।

    আওরঙ্গজেব তার সাম্রাজ্যের ভবিষ্যত নিয়ে আশঙ্কায় ছিলেন। এর পেছনে যুক্তিগ্রাহ্য কারণও ছিল। মোগল সাম্রাজ্যকে চেপে ধরা আর্থিক ও প্রশাসনিক ভয়াবহ সমস্যা ছাড়াও এ ধরনের জটিলতা কাটানোর মতো সক্ষমতাসম্পন্ন কাউকে আশপাশে দেখতে পাননি তিনি ।

    মৃত্যুর সময় আওঙ্গেজেবের তিন ছেলে জীবিত ছিলেন (অপর দুজন বাবার আগেই মারা গিয়েছিলেন)। এদের কাউকেই তিনি রাজা হওয়ার উপযুক্ত মনে করতেন না। উদাহরণ হিসেবে অষ্টাদশ শতকের প্রথম দিকে মোয়াজ্জেমকে লেখা একটি চিঠির কথা বলা যায়। এতে কান্দাহার জয় করতে ব্যর্থ হওয়ার জন্য তার তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি তাকে তিক্ত ভাষায় গালাগাল করে বলেন, ‘অপদার্থ ছেলের চেয়ে মেয়েও অনেক ভালো।’ তিনি এরপর মোয়াজ্জেমকে লক্ষ্য করে বলেন, ‘এরপর তুমি কিভাবে এই দুনিয়ায় তোমার প্রতিদ্বন্দ্বীকে এবং সর্বোচ্চ পবিত্র মহামান্বিত খোদাকে মুখ দেখাবে?”

    আওরঙ্গজেব বুঝতে পারেননি যে মোগল সিংহাসনে আরোহণের জন্য তার ছেলেদের দুর্বল প্রস্তুতির জন্য অনেকাংশে দায়ী তিনিই। ইতিহাসবিদ মনিস ফারুকি বিস্তারিতভাবে লিখেছেন কিভাবে আওরঙ্গজেব রাজকীয় অন্দরমহলে হস্তক্ষেপ করে মোগল রাজপুত্রদের শৃঙ্খলিত করে রেখে ছিলেন, যুবরাজদের স্বায়ত্তশাসন খর্ব করেছিলেন। ১৭০০-এর দিক থেকে আওরঙ্গজেব ছেলেদের বিপরীতে নাতিদের বেশি আনুকূল্য প্রদান করতে থাকেন, এটিও ছেলেদের অবস্থান আরো নাজুক করেছিল। অনেক সময় আওরঙ্গজেব যুবরাজদের চেয়ে অভিজাতদের অগ্রাধিকার দিতেন। যেমন ১৬৯৩ সালে জিনজিতে মারাঠা শাসক রাজারামের সাথে অবৈধ আলোচনা শুরু করার পর আওরঙ্গজেব তার সর্বকনিষ্ঠ ছেলে কাম বকশকে গ্রেফতার করার দায়মুক্তি সুযোগ দিয়েছিলেন তার প্রধান উজিড় আসাদ খান ও সামরিক কমান্ডার জুলফিকার খানকে। আওরঙ্গজেবের তাৎপর্যপূর্ণ শেষ ইচ্ছায় তিনি মোগল সাম্রাজ্যকে তিন ছেলের মধ্যে ভাগ করে দেন, আসাদ খানসহ কয়েকজনকে স্থায়িত্ব দিয়ে বিশেষ কর্মকর্তা নিয়োগ করেন ৷

    মোগল যুবরাজদের প্রজন্মগুলো বিশাল নেটওয়ার্ক নির্মাণ করতেন, এটিই নতুন নতুন গ্রুপকে মোগল পতাকাতলে নিয়ে আসত, অবিভক্ত সাম্রাজ্যের মুকুটের জন্য যুবরাজদের লড়াই করতে সক্ষম করে তুলত। সংক্ষেপে বলা যায়, উত্তরাধিকার লড়াইই মোগল রাষ্ট্রকে নতুন জীবন দিত, প্রাণবন্ত করে তুলত। আওরঙ্গজেব মোগল যুবরাজদের দন্তনখরহীন করে ফেলেছিলেন। ফলে যখন সময় এলো, তখন তারা আর যুদ্ধ করতে বা শাসন করতে সক্ষম হননি ।

    আওরঙ্গজেব তার ছেলেদের নিয়ন্ত্রণ করার মাধ্যমে কিভাবে মোগল রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতি করেছেন, সে ব্যাপারে অন্ধ থাকলেও মোগল রাষ্ট্রের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াদি বুঝতে পেরেছিলেন। শেষ বয়সে ছেলে ও নাতিদের কাছে লেখা চিঠিপত্রে আওরঙ্গজেব মোগল সার্বভৌমত্ব সম্পর্কে তার ব্যাপক অন্তঃদৃষ্টি প্রকাশ করেছেন।

    আওরঙ্গজেব ১৬৯১-পরবর্তী সময়ে আযম শাহের বড় ছেলে, তার নাতি বিদার বখতকে লেখা এক চিঠিতে কিভাবে সর্বোত্তমভাবে জীবনযাপন ও শাসন করা যায়, সে ব্যাপারে নিজের কর্মপন্থা তুলে ধরে উপদেশ দেন। তিনি শুরু করেন এই সুপারিশ দিয়ে যে পানি সামনে রেখে ফজরের নামাজ পড়তে ও কোরআন তেলায়াত করতে হবে, তারপর ওই পানি পান করতে হবে। এতে করে রোগ ও বিপদ থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে। বিদার বকশকে তার পরবর্তী পরামর্শ ছিল আকবরের আমল থেকে প্রচলিত একটি মোগল প্রথা অনুসরণ করার। এতে নিজেকে বিভিন্ন সামগ্রী দিয়ে ওজন করা হতো। আওরঙ্গজেব এটিকে হিন্দু প্রথা বিবেচনা করা সত্ত্বেও লিখেছেন, ‘যদিও সোনা, রুপা, তামা, শস্য, তেল ও অন্যান্য সামগ্রী দিয়ে কারো পুরো দেহের ওজন করা আমাদের পূর্বপুরুষদের দেশের বা এখানকার [ভারতবর্ষ] মুসলিমদের প্রথা নয়, কিন্তু এই ব্যবস্থার ফলে অনেক অভাবগ্রস্ত ও গরিব মানুষ বিপুলভাবে উপকৃত হয়।’ চিঠিতে সম্রাট তার নাতিকে বলেন যে শাহ জাহান বছরে দুবার নিজেকে ওজন করাতেন। তবে তিনি বিদার বকশকে পরামর্শ দেন, তিনি যেন বছরে ১৪ বার এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন। আমরা দেখেছি, আওরঙ্গজেব তার শাসনকালের প্রথম দশকে নিজের ওজন করার প্রথা অনুসরণ করলেও পরে তা বাদ দেন (তবে শেষ বয়সে তিনি সম্ভবত আবার তা চালু করেছিলেন। এমন মত দিয়েছেন চ্যাপলিন জন ওভিঙ্গটন)। আওরঙ্গজেব হিন্দুভিত্তিক ওজন করা প্রথাটিকে ভারতীয় মোগল ঐতিহ্যের অংশ বিবেচনা করেছিলেন, এমনকি যদিও ব্যক্তিগতভাবে নিজে তা থেকে দূরে ছিলেন ।

    একইভাবে আওরঙ্গজেব শেষ দিকে তার ছেলে আযম শাহকে লেখা এক চিঠিতে শাহ জাহানের সঙ্গীত উপভোগকে অনুমোদন করে বলেছিলেন, এটি যথার্থ রাজকাজ। উল্লেখ্য, তিনি এর কয়েক দশক আগেই এটি পরিত্যাগ করেছিলেন। মোগল বাদশাহ হওয়ার জন্য আরো অনেক পথ ছিল। শেষ বয়সের চিঠিতে আওরঙ্গজেব সমন্বয়বাদকে অনুমোদন করেছিলেন যা ছিল তার রক্তধারার অংশ, এটিই ছিল প্রবল বিরোধিতার মুখে সাম্রাজ্যের টিকে থাকা নিশ্চিতকারী বিপুল শক্তি ।

    আওরঙ্গজেব ১৭০৭ সালের প্রথম দিকে মধ্য ভারতের আহমদনগরে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় মৃত্যুবরণ করেন। তার ইচ্ছানুযায়ী তাকে খুলদাবাদে সুফি দরবেশ জয়নুদ্দিন শিরাজির (মৃত্যু ১৩৬৯) মাজারে অচিহ্নিত এক কবরে সমাহিত করা হয়। আপনিও এখন ওই কবর দেখতে যেতে পারেন, যদিও সেখানে ছোট, উন্মুক্ত স্থানে দেখার তেমন কিছুই নেই। হুমায়ূন, আকবর ও শাহ জাহানের জাঁকালো সমাধিসৌধের তুলনায় এই মাজারে বছরে খুব কম পর্যটকই যায় ।

    আওরঙ্গজেবের সাদামাটা কবরটি তার জটিল জীবনের একেবারে বিপরীত বিষয়। আওরঙ্গজেব তার ধার্মিকতার ওপর গুরুত্বারোপ করার জন্যই কবরের স্থান হিসেবে এই গাম্ভীর্যতা ও পারিপার্শ্বিকতা বাছাই করেছিলেন । বস্তুত আওরঙ্গজেব তার জীবনের শেষ প্রান্তে এসে ক্রমবর্ধমান হারে ধর্মীয় বিষয়াদি নিয়ে চিন্তিত ছিলেন। অবশ্য সম্রাটের আধুনিক সমালোচকেরা বিষয়টি যেভাবে কল্পনা করে, তিনি তা করেছিলেন তার চেয়ে ভিন্নভাবে। অন্যদের প্রতি ধর্মীয় উগ্রতাপূর্ণ আচরণ করার বদলে আওরঙ্গজেবের ধর্মভক্তি প্রকাশিত হয়েছিল তার অন্তঃমুখী উদ্বেগে যা তিনি করেছিলেন খোদার ইচ্ছার বিরুদ্ধে। তিনি তার শেষ বয়সের চিঠিপত্রে প্রায়ই হাশরের ময়দানের কথা উল্লেখ করতেন, পরবর্তী দুনিয়ায় প্রবেশ করতে উদ্যত এক অচেনা লোক হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করেছেন।

    ইসলামের সাথে এই বহুরূপী সম্রাটের সম্পর্ক ছিল জটিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও ধর্মের গণ্ডিতে আটকে রাখার মতো ছিলেন না তিনি। বস্তুত, আওরঙ্গজেব সম্পর্কে সাদামাটা বিষয়াদি রয়েছে সামান্যই। আওরঙ্গজেব ছিলেন ক্ষমতা, নিজস্ব ধরনের ন্যায়বিচার ও সম্প্রসারণে নিবেদিতপ্রাণ এক সম্রাট। তিনি ছিলেন দারুণ মেধাসম্পন্ন শাসক, সেইসাথে অনেক ভুলও করেছেন। তিনি মোগল সাম্রাজ্যকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে সম্প্রসারিত করেছিলেন, এবং সম্ভবত এটি ভাঙার অবস্থায়ও নিয়ে গিয়েছিলেন। কোনো একক বৈশিষ্ট্য বা পদক্ষেপে আওরঙ্গজেব আলমগিরকে আবদ্ধ করা যায় না। তিনি প্রায় ৫০ বছর মোগল সিংহাসনকে অলংকৃত করেছিলেন, জনসাধারণের কল্পনাশক্তিকে অনেক দূর পর্যন্ত বিমোহিত করেছেন।

  • আওরঙ্গজেবের উত্তরাধিকার

    আওরঙ্গজেবের উত্তরাধিকার

    আওরঙ্গজেবের পর

    স্রষ্টা ছাড়া আর কারো নেই ভবিষ্যতের জ্ঞান;
    যদি কেউ বলে সে তা জানে, তবে তাকে বিশ্বাস করো না!
    –বাবা মুসাফির (মৃত্যু ১৭১৪) নকশবন্দিয়া সুফি দরবেশ, আওরঙ্গজেবের ছেলেদের মধ্যকার উত্তরাধিকার লড়াই নিয়ে মন্তব্য

    আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর কয়েক দশকের মধ্যে মোগল সাম্রাজ্য ভেঙে পড়ে । আওরঙ্গজেব-পরবর্তী সময়ে মোগলদের পতন যত দ্রুত বা সামগ্রিক হয়েছিল বলে যে ধারণা দেওয়া হয়ে থাকে, সাম্প্রতিক সময়ের গবেষণাগুলোতে দেখা যাচ্ছে, বিষয়টি মোটেই তেমন ছিল না। তবে এমনকি অতি সূক্ষ্ম তারতম্যকে অনুমোদন করা হলেও বলতে হবে, আওরঙ্গজেবের পর মোগল সাম্রাজ্যের ক্রমাগত পতন বেশ অবাক করা ।

    সম্রাটের তিন জীবিত ছেলে একে অপরের বিরুদ্ধে উত্তারাধিকার লড়াইয়ে অবতীর্ণ হন। দুই বছরেরও কম সময়ের মধ্যে তার দ্বিতীয় ছেলে মোয়াজ্জেম যুদ্ধে অপর দু’জনকে- আযম ও কাম বখশ- হত্যা করেন। তিনি বাহাদুর শাহ নাম ধারণ করে মোগল সিংহাসনে আরোহণ করেন। আপাত দৃষ্টিতে সবকিছুই স্বাভাবিক বলে মনে হতে থাকে। উত্তরাধিকার লড়াই ছিল প্রত্যাশিত এবং তা সাধারণত মোগল শক্তিকে নতুন করে উজ্জীবিত করত। কিন্তু এবার এই পরবর্তী ধাপে তা না হয়ে বরং মোগল সাম্রাজ্যে গভীরভাবে শিকড় গেড়ে থাকা সমস্যাগুলো বিপর্যয় সৃষ্টি করে ।

    আওরঙ্গজেবের কাছ থেকে মোগল রাষ্ট্রের অখণ্ডতার প্রতি চলমান অনেক হুমকি উত্তরাধিকার সূত্রে লাভ করেছিলেন বাহাদুর শাহ। উত্তরে জাট ও শিখেরা সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল, দক্ষিণে মারাঠারা ফুঁসছিল, অকার্যকর করের ফলে কোষাগার ফাঁকা হয়ে পড়ছিল, রাজপুতেরা বিদ্রোহ করছিল। বাহাদুর শাহের সিংহাসনে আরোহণের পর এসব সমস্যার আরো অবনতি ঘটে। কারণ মোগল কর্তৃত্বের প্রতি নতুন করে চ্যালেঞ্জ জানাতে অনেকেই রাজনৈতিক পটপরিবর্তনকে সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করেছিল। কিন্তু বাহাদুর শাহ তার বাবার মতো ছিলেন না। তিনি মোগল সার্বভৌমত্বের বিরোধিতায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন ।

    উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, মারওয়ারের রাঠোর রাজপুত পরিবার (তারা ৩০ বছর আগে আওরঙ্গজেবের সময় ব্যর্থ বিদ্রোহ করেছিল) আবারো চেষ্টা করে মোগল নিয়ন্ত্রণ ছুঁড়ে ফেলে দিতে। রাঠোরের শাসক অজিত সিং যোধপুর থেকে মোগল বাহিনীতে বিতাড়িত করেন, এমনকি নগরীতে রাজকীয় দখলদারিত্বের সময় নির্মাণ করা মসজিদগুলো পর্যন্ত ধ্বংস করেন। বাহাদুর শাহ যোধপুর পুনর্দখল করেন। কিন্তু অজিত সিং অল্প সময়ের মধ্যেই মারওয়ারের জন্য বর্ধিত স্বাধীনতা লাভ করেন। এর অন্যতম কারণ ছিল বাহাদুর শাহ তখন পাঞ্জাবে শিখ-নেতৃত্বাধীন একটি বিদ্রোহের দিকে মনোযোগ সরিয়ে নিয়েছিলেন। এটিও ছিল আওরঙ্গজেবের আমল থেকে রয়ে যাওয়া আরেকটি অস্থিরতা।

    বাহাদুর শাহ মারা যান ১৭১২ সালে, তার বাবার মৃত্যুর মাত্র পাঁচ বছর পর। এরপর মোগল সাম্রাজ্য দ্রুত গতিতে ভেঙে পড়ে। ১৭১২ থেকে ১৭১৯ সাল পর্যন্ত সাত বছরে অল্প ব্যবধানে উত্তরসূরি হিসেবে শাসন করেছিলেন চারজন। আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর ১৩ বছরের মধ্যে পাঁচজন বাদশাহ মোগল সিংহাসনে বসেছিলেন, অথচ আগের ১৫০ বছরে রাজত্ব করেছিলেন মাত্র চারজন। বস্তুত, এ ধরনের অস্থিতিশীলতার কারণে মোগল রাজপরিবার অভিজাতদের ওপর থেকে কর্তৃত্ব হারিয়ে ধারাবাহিক কর আদায়সহ রাষ্ট্র পরিচালনার স্বাভাবিক কার্যক্রম পর্যন্ত চালাতে পারছিল না। রাজকীয় প্রশাসনে দুর্নীতি ব্যাপকভাবে বিস্তৃত হয়, অনেক এলাকা মোগল রাষ্ট্র থেকে আলাদা হয়ে পড়ে ।

    ইরানি যুদ্ধবাজ নেতা নাদির শাহ ১৭৩৯ সালে দিল্লি লুণ্ঠন করেন, মোগল গর্ব হিসেবে টিকে থাকা সবকিছু পদদলিত করেন। নাদির শাহ মোগল সম্রাট মোহাম্মদ শাহকে পণবন্দী করে রাখেন, আর তার সৈন্যরা দিল্লিবাসীর ওপর গণহত্যা চালায়, এর বিপুল সম্পদরাশির কোষাগার লুণ্ঠন করে। দুই মাস পর নাদির শাহ ইরান ফিরে যাওয়ার সময় সাথে করে ময়ূর সিংহাসন ও কোহিনূর হীরাসহ মোগল সার্বভৌমত্বের মহামূল্যবান প্রতাঁকের অনেক কিছু নিয়ে যান। হামলার অল্প সময় পর চিত্রিত নাদির শাহের একটি ছবিতে তাকে ভারী অলংকার, আক্ষরিকভাবেই লুণ্ঠিত মোগল সম্পদে সজ্জিত অবস্থায় দেখা যায় । নাদির শাহের হামলার পর মোগল সাম্রাজ্য সত্যিকার অর্থে আর আগের অবস্থায় ফিরতে পারেনি। ওই সময়ের এক মুসলিম বুদ্ধিজীবী বিষয়টিকে বলেছেন এভাবে : ‘দিল্লির সালতানাত হয়ে পড়েছেন শিশুর খেলনা ।’

    ঊনিশ শতকের মধ্যভাগ নাগাদ মোগল সাম্রাজ্য নিস্তেজ হয়ে পড়েছিল। তারপর ১৮৫৮ সালে সিপাহি বিদ্রোহের পর ব্রিটিশরা একটি আদালত কক্ষে আনুষ্ঠানিকভাবে মোগল সাম্রাজ্যের পতন ঘোষণা করে। তবে ওই পর্যায় পর্যন্ত ‘সাম্রাজ্য’ ছিল কেবল নামে। ১৭৫০-এর দশকের শেষ দিক থেকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ভূমির মালিকানা, সেনাবাহিনী ও রাজস্ব আদায়ের ক্ষমতাসহ সত্যিকারের সার্বভৌমত্বের প্রায় সব বিষয় করায়ত্ত করে ইতোমধ্যেই ক্ষয়ে পড়া মোগল সাম্রাজ্য আরো নিঃশেষ করে ফেলেছিল। সর্বশেষ বাদশাহর আগের জন্য তথা দ্বিতীয় আকবর শাহ (শাসনকাল ১৮০৬-৩৭) জীবন্ত জাদুঘর প্রদর্শন সামগ্রীতে পরিণত হয়েছিলেন, ব্যয়ভার মেটানোর জন্য দরবারে বিদেশী পর্যটকদের দর্শনদানের বিনিময়ে ফি গ্রহণ করতেন ।

    কোন কারণে মোগল শক্তির পতন হলো বা ঠিক কখন মোগল সাম্রাজ্য মেরামতের অযোগ্য হয়ে ভেঙে পড়তে শুরু করল তা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। তবে বেশির ভাগ ইতিহাসবিদ মনে করেন, আওরঙ্গজেব আংশিকভাবে হলেও দায়ী। এটি একটি অদ্ভূত যুক্তি। কারণ আওরঙ্গজেবই মোগল সাম্রাজ্যকে ভৌগোলিকভাবে সর্বোচ্চ অবস্থায় নিয়ে গিয়েছিলেন। তবে আওরঙ্গজেবের সাফল্য হয়তো তার বিনাশও ছিল। তিনি সম্ভবত মোগল সাম্রাজ্যকে খুব বেশি দূর পর্যন্ত বিস্তৃত করে ফেলেছিলেন। ফলে সম্প্রসারণশীল রাজকীয় সম্পদ শিথিল হয়ে আসছিল, পুরো ব্যবস্থাই ভেঙে পড়ার মুখে পড়ে গিয়েছিল ।

    আরো সংশয়পূর্ণ বিষয় হচ্ছে, কেউ কেউ উপস্থাপন করেছেন যে আওরঙ্গজেবের কঠোর নীতিপরায়ণতাই ছিল মরণ আঘাত। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, আওরঙ্গজেবের ওপর বিশ শতকের সবচেয়ে বেশি গবেষণামূলক কাজ করেছেন যে যদুনাথ সরকার, তিনি তার নিজস্ব নাটকীয় কায়দায় এভাবে বলেছেন, ‘[আওরঙ্গজেবের আমলে] মোগল আল হেলাল পূর্ণিমার চাঁদের পূর্ণতা পায় এবং তারপর দৃশ্যমানভাবেই ক্রমশ ক্ষীণজ্যোতি হতে শুরু করে।’ যদুনাথ সরকার তার পাঁচ খণ্ডের হিস্টরি অব আওরঙ্গজেবসহ এই সম্রাটকে নিয়ে লেখা অনেক গ্রন্থে আওরঙ্গজেবের দর্শন ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি তার শেষ বৃহৎ গ্রন্থটি শুরু করেছেন এই বলে যে ‘আওরঙ্গজেবের জীবন হলো একটি দীর্ঘ ট্রাজেডি, অদৃশ্যমান অপ্রতিরোধ্য ভাগ্যের বিরুদ্ধে এক ব্যক্তির ব্যর্থ সংগ্রামের কাহিনী, যুগের শক্তিতে কিভাবে সবচেয়ে শক্তিশালী মানবীয় উদ্যোগ ব্যর্থ হতে পারে তার উপাখ্যান।’ যদুনাথ সরকারের কাছে আওরঙ্গজেব ছিলেন ট্রাজিক ব্যক্তিত্ব। অধিকন্তু, অন্যান্য উপনিবেশিক-আমলের চিন্তাবিদের মতো যদুনাথ সরকারও আওরঙ্গজেবকে মনে করতেন ধর্মান্ধ (এবং সে কারণেই ‘মোগল আল হেলাল’)। তিনি মনে করেছিলেন, ইসলামের একটি বিশেষ ধারার প্রতি তার নিবেদিতপ্রাণ থাকার কারণে সাম্রাজ্যে চরম বিপর্যয়ের সৃষ্টি হয়েছিল।

    বর্তমান সময়ের খুব কম ইতিহাসবিদই যদুনাথ সরকারের মোগল সাম্রাজ্যের পতনের ধর্মভিত্তিক ব্যাখ্যাকে গুরুত্ব দিয়ে গ্রহণ করছেন। কিন্তু তবুও সাধারণ মানুষের মধ্যে এটি লোকরঞ্জক বিষয়ই হয়ে রয়েছে। এর আংশিক কারণ, এটি আখ্যানগত সমস্যা, ঐতিহাসিক নয়। নীতিবাদী গল্পকথনে কোনো শক্তিশালী, সমৃদ্ধ রাষ্ট্রের পতনের জন্য কোনো ব্যক্তিকে দায়ী করার মধ্যে মানবীয় আকাঙ্ক্ষা পূরণের আবেদন রয়েছে। মুসলিম দুরাত্মারা বর্তমান সময়ে বিশেষভাবে চটকদার জিনিস, এটিই ধার্মিক আওরঙ্গজেবকে আকর্ষণীয় বলির পাঠায় পরিণত করেছে। এর বিপরীতে, আধুনিক ইতিহাসবিদেরা একগুচ্ছ সামাজিক, রাজস্ব, প্রশাসনিক কারণ উল্লেখ করেছেন, যা মোগল শক্তিকে দুর্বল করে ফেলেছিল। এ ধরনের পরিব্যাপ্ত, পদ্ধতিভিত্তিক ব্যাখ্যা ইতিহাসের জন্য উপাদেয় হলেও বাজারের গল্পকথকদের জন্য মুখরোচক নয় ।

    খোলামেলাভাবে বলা যায়, আওরঙ্গজেব-পরবর্তী মোগল ভারতবর্ষ সম্পর্কে আমরা খুবই কম জানি। আমরা তার শাসনকালের সাথে সম্পর্কিত অনেক বিষয়ের ব্যাপারে এখনো অন্ধকারে রয়ে গেছি। মোগল রাষ্ট্র ফাঁপায় পরিণত করতে তার ভূমিকার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হলে এসব প্রাসঙ্গিক বিষয় জানা দরকার। তবে আওরঙ্গজেব দূর দৃষ্টিতে দেখতে পেয়েছিলেন যে তিনি একটি তিক্ত উত্তরাধিকার রেখে যাচ্ছেন। তিনি শেষ বয়সে লেখা তার চিঠিপত্রে প্রায়ই মোগল সাম্রাজ্যের সামনে অন্ধকার দিন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন, যদিও সাম্রাজ্যের পতনমুখ গতি বদলে দিতে নিজেকে ক্ষমতাহীন দেখতে পেয়েছিলেন।

    মোগল সাম্রাজ্যের পতনের সূচনার জন্য আওরঙ্গজেবকে সম্ভাব্য দায়ী করার বিষয়টি সরিয়ে রেখে আমরা কিভাবে এই জটিল, অনেক সময় সাংঘর্ষিক চরিত্রের সম্রাটের দীর্ঘ, অসম শাসনকালকে মূল্যায়ন করতে পারি? আধুনিক মানদণ্ডের আলোকে রাষ্ট্রীয় সহিংসতা, ব্যক্তি স্বাধীনতা ও সহিষ্ণুতা নিয়ে আওরঙ্গজেবের সমালোচনা করার মধ্যে অন্তঃদৃষ্টির অবকাশ থাকে সামান্যই । কিন্তু তার সময়ের অন্যান্য শাসকের সাথে, বিশেষ করে পূর্ববর্তী মোগল সম্রাটদের সাথে তিনি কিভাবে তুলনীয় তা আরো ফলপ্রসূভাবে জানতে চাইতে পারি ।

    আওরঙ্গজেব তার পূর্ববর্তী যেকোনো মোগল সম্রাটের চেয়ে, অন্তত অনেক মোগল প্রথার প্রতিষ্ঠাতা আকবরের পর থেকে, অনেক বেশি মোগল রীতিনীতি ভেঙেছেন। কিন্তু কিছু শিল্পকলার ওপর থেকে রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতা হ্রাস করা, দাক্ষিণাত্যে সরে যাওয়া, জিজিয়া কর পুনঃপ্রবর্তনের মতো অনেক পরিবর্তন সাধন সত্ত্বেও আওরঙ্গজেব মোগল প্রশাসনিক, সামরিক ও সাংস্কৃতিক কর্মসূচির দিক থেকে বিপুলভাবে ধারাবাহিকতাই রক্ষা করে গেছেন। তিনি আকবরের মতো আন্তঃসংস্কৃতির পথিকৃত ছিলেন না (হয়তো ভারত সম্রাজ্যের ষষ্ট শাসক হিসেবে তিনি এর প্রয়োজন আছে বলেই মনে করতেন না)। কিন্তু আওরঙ্গজেব ফতোয়া-ই-আলমগিরির মতো বিশাল মাত্রার বুদ্ধিবৃত্তিক প্রকল্পের পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন, কয়েকটি ফারসি রামায়ণ তাকে উৎসর্গ করা হয়েছে। শাহ জাহানের সমমানের মহান নির্মাতা ছিলেন না আওরঙ্গজেব, কিন্তু তবুও যদি লাহোরের বাদশাহি মসজিদ বিবেচনা করা হয়, তবে তিনি খুব পিছিয়েও থাকবেন না। বর্তমানে বেশির ভাগ লোক যেমনটা মনে করে, তার চেয়েও মোগল পূর্বসূরীদের সাথে অনেক বেশি সমরূপ ছিলেন তিনি।

    আওরঙ্গজেব তারপরও স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের অধিকারী ছিলেন, বিশেষ করে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার প্রতি তার গতানুগতিক উদ্বেগ ও তার সামরিক নৈপূণ্যের দিক থেকে। নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, পূর্ববর্তী মোগল শাসকেরাও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে আগ্রহী ছিলেন। এক্ষেত্রে জাহাঙ্গীরের কথা বলা যেতে পারে । যে কেউ যাতে সম্রাটের মনোযোগ আকর্ষণ করতে পারে, সেজন্য জাহাঙ্গীর আগ্রা দুর্গ থেকে নদীর কিনারা পর্যন্ত ৬০টি ঘণ্টা-সংবলিত একটি বিশাল ‘ন্যায়বিচারের শিকল’ ঝোলানোর ঘোষণা দিয়েছিলেন। আওরঙ্গজেবের কাছে ন্যায়বিচার ছিল অনেক কম প্রদর্শনীর বিষয়। তিনি অসৎ প্রশাসকদের দমন করা ও নিরাপদে ধর্মীয় উৎসবের নিশ্চয়তা দানকেই বুঝতেন ন্যায়বিচার। অবশ্য সম্রাটের ইচ্ছা সত্ত্বেও আওরঙ্গজেবের প্রশাসন দুর্নীতির মতো জঘন্য কাজ করত। অধিকন্তু, আওরঙ্গজেব তার সারা জীবনে নৈতিকতা ও মূল্যবোধের নির্দিষ্ট ব্র্যান্ডের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকলেও মধ্য যুগের অন্য অনেক রাজার মতো তিনিও বারবার চির অতৃপ্ত রাজনৈতিক শক্তির জন্য তার ঘোষিত মূল্যবোধের বিরুদ্ধে কাজ করেছেন।

    আওরঙ্গজেব ছিলেন গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে দারুণ দক্ষ সামরিক কৌশলবিদ । তিনিই সম্ভবত ছিলেন মোগল ধারায় সবচেয়ে সুদক্ষ জেনারেল। তিনি দীর্ঘস্থায়ী উত্তরাধিকার লড়াইয়ের মাধ্যমে ময়ূর সিংহাসন জয় করেছিলেন। কয়েক প্ৰজন্ম ধরে মোগলদের কাম্য দাক্ষিণাত্য তিনি জয় করেছিলেন। কিন্তু তারপরও প্রবীণ আওরঙ্গজেব যেকোনোভাবেই হোক না কেন, দক্ষিণ ভারতে তার পথ হারিয়েছিলেন, লক্ষ্যহীনভাবে দুর্গগুলো দখল করছিলেন, বৃদ্ধ বাদশাহ ও দুর্বল যুবরাজদের কাছ থেকে সুযোগ গ্রহণে ইচ্ছুক প্রশাসকদের বিরুদ্ধে ক্রমবর্ধমান হারে নির্বিষ হয়ে ওঠেছিলেন।

    আওরঙ্গজেবের শাসনকাল যদি ২০ বছর সংক্ষিপ্ত হতো, জাহাঙ্গীর (তিনি শাসন করেছিলেন ২২ বছর) বা শাহ জাহানের (তিনি শাসন করেছিলেন ৩০ বছর) কাছাকাছি সময় পর্যন্ত শাসন করতেন, তবে আধুনিক ইতিহাসবিদেরা হয়তো তাকে ভিন্নভাবে বিচার করতেন। কিন্তু আওরঙ্গজেবের শেষ দশকগুলোতে ছেলেদের শৃঙ্খলিত করা, ক্রমবর্ধমান হারে স্ফীত হয়ে ওঠা প্রশাসনের ওপর নির্ভরশীল থাকা, বাজে পরামর্শপুষ্ট যুদ্ধে নিয়োজিত হওয়া ছিল তার জট পাকানো উত্তরাধিকারের বিশাল অংশ। ফলে আমাদের জন্য রেখে যাওয়া হয়েছে বিপুল উচ্চাভিলাষ ও মোগল ভারতের বাস্তবতার মধ্যে অপূরণীয় ব্যবধানে জর্জরিত একজন জটিল মানুষ ও রাজার মিশ্রণ মূল্যায়ন ।

    আওরঙ্গজেবকে শৃঙ্খলমুক্ত করা
    সময়, পরিস্থিতি, ইতিহাস আমাকে যা বানিয়েছে, আমি অবশ্যই তাই, তবে তারপর আমি তার চেয়েও বেশি কিছু। আমরা সবাইই তাই ।
    –জেমস ব্যান্ডউইন, আমেরিকান লেখক, ১৯৫৫

    আওরঙ্গজেবের লোকরঞ্জক স্মৃতির সাথে ঐতিহাসিক সম্রাটের রয়েছে স্রেফ ঝাপসা সাদৃশ্য। এই অমিল থাকার বিষয়টি স্বীকার করে নেওয়া দুটি কারণে গুরুত্বপূর্ণ। একটি কারণ হলো উত্তপ্ত সাম্প্রদায়িক ধারণার প্রশমন করা এবং অপরটি হলো ঐতিহাসিক গবেষণাকে শৃঙ্খলমুক্ত করা ।

    আওরঙ্গজেবের লোকরঞ্জক খ্যাতির ফলে ভারত ও পাকিস্তান উভয় দেশই মোগল অতীত নিয়ে রাজনৈতিক ইন্ধনযুক্ত ভাষ্যে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আগেই বলা হয়েছে, আওরঙ্গজেবের দুই ভাষ্যই (ধর্মান্ধ আওরঙ্গজেব ও ধার্মিক আওরঙ্গজেব) প্রকাশ্য ধারায় পরিণত হয়েছে। ধর্মান্ধ আওরঙ্গজেবের চিত্রটি বিশেষভাবে বিভ্রান্তিকর ও ধ্বংসকারী। এতে হিন্দু ও হিন্দুবাদকে ধ্বংস করতে আগ্রহী উগ্র আওরঙ্গজেবের চিত্র আঁকা হয়। মুসলিমবিরোধী ভাবাবেগ বাড়াতে ও ভারতীয় মুসলিমদেরকে বিপজ্জনক বিশ্বাসঘাতক হিসেবে চিত্রিত করতে ভারতের রাজনীতিবিদ ও অন্যরা এই ধারণা প্রচার করে। আওরঙ্গজেবকে বিশুদ্ধ মুসলিম (উর্দু কবি মোহাম্মদ ইকবাল, মৃত্যু ১৯৩৮, তাকে ‘ভারতের মূর্তি গৃহে ইব্রাহিম’ হিসেবে অবহিত করেছিলেন) হিসেবে চিত্রিত করাও সমস্যাসঙ্কুল। এভাবে উপস্থাপনের ফলে এই ধারণা সৃষ্টি করে যে মুসলিমরা প্রধানত তাদের বিশ্বাসের মাধ্যমে সংজ্ঞায়িত হয়, আর ইসলাম হলো মৌলিকভাবে হিন্দু ধর্মের চেয়ে আলাদা। ভারতবর্ষের জন্য এই ধারণার অর্থ হলো এই যে মুসলিমেরা পুরোপুরি ভারতীয় হতে পারে না, আর পাকিস্তানে তারা ধারণা দেয় যে সব মূল্যবান নাগরিককে অবশ্যই ইসলামের সংকীর্ণ ধরনের সংজ্ঞায় থাকতে হবে।

    আওরঙ্গজেবকে নিয়ে প্রচলিত লোকরঞ্জক ধারণা কেন বাতিল করার জরুরি, তার দ্বিতীয় কারণ হলো, যাতে আমরা তাকে ইতিহাসের পরিভাষায় বুঝতে পারি। আওরঙ্গজেব ছিলেন তার সময়ের মানুষ, আমাদের সময়ের নয়। আমি যুক্তি দিয়েছি যে আওরঙ্গজেব ন্যায়বিচার নিয়ে তার আদর্শের আলোকে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, নিজের রাজনৈতিক ও নৈতিক আচরণের (আদব ও আখলাক) প্ৰতি দায়বদ্ধ ছিলেন, রাজনৈতিক প্রয়োজন অনুযায়ী কাজ করেছেন। আওরঙ্গজেবের বিশ্ববীক্ষা তার নিজের ধর্মভক্তি ও উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া মোগল সংস্কৃতির মাধ্যমে সৃষ্টি হয়েছিল। হিন্দু-মুসলিম সঙ্ঘাত (আধুনিক সময় এ ধারণাটিতে আচ্ছন্ন) তার স্বার্থের অনুকূলে ছিল না, বরং তিনি তার ধারণার আলোকে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, মোগল ঐতিহ্য সমুন্নত রাখা এবং উপমহাদেশজুড়ে তার মুষ্ঠি সম্প্রসারণ করার দিকে নজর দিয়েছিলেন।

    কিন্তু তারপরও আওরঙ্গজেব সহজে সংক্ষিপ্ত করাকে প্রতিহত করেন। তিনি ছিলেন প্রবল বৈপরীত্যপূর্ণ ও ধাঁধাময় এক ব্যক্তিত্ব। আওরঙ্গজেব নিয়ম অনুসরণে পুরোপুরি আচ্ছন্ন ছিলেন। এমনকি রাস্তাঘাটের নিরাপত্তা নিয়েও সর্বক্ষণ অস্থির থাকতেন। কিন্তু বাবাকে বন্দী করা ছাড়া তার কাছে আর কোনো উপায় দেখতে পাননি, অবশ্য এই কারণে এশিয়ার একটি বড় অংশে তিনি সমালোচিত হয়েছেন। তিনি দারা শুকোহসহ তার পরিবার সদস্যদের হত্যা করতে কিংবা শত্রুদের টুকরা টুকরা করে কাটতেও (এই যেমন শম্ভুজির ক্ষেত্রে আক্ষরিক অর্থেই) দ্বিধা করেননি। আবার তিনি নিজ হাতে টুপি সেলাই করতেন, ধার্মিক জীবনযাপন করার আকাঙ্ক্ষা লালন করতেন। খারাপ প্রশাসক, পচা আম, অপদার্থ ছেলেদের প্রতি ক্রুদ্ধ হতেন তিনি। তিনি ছিলেন সঙ্গীতের সমঝদার, এমনকি গায়িকা হিরাবাইয়ের প্রেমেও পড়েছিলেন। কিন্তু মধ্যবয়সের শুরুতে তিনি নিজেকে সঙ্গীত শিল্পের আনন্দ থেকে বঞ্চিত করেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও শেষ বয়সে আরেক সঙ্গীতশিল্পী উদয়পুরির সঙ্গ উপভোগ করতেন। তিনি বিশ্বের বৃহত্তম মসজিদটি নির্মাণ করেছিলেন, অথচ নিজের কবরের জন্য অচিহ্নিত একটি স্থান বেছে নিয়েছিলেন। তিনি মোগল সাম্রাজ্যকে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় মাত্রায় সম্প্রসারিত করলেও নিজেকে চরম ব্যর্থ মনে করতেন ।

    আওরঙ্গজেব ছিলেন রহস্যময় সম্রাট। অধিকন্তু, আওরঙ্গজেবের শাসনকাল সম্পর্কে উচ্ছ্বসিত ইতিহাসবিদ কাফি খান তাকে পারস্য ঐতিহ্যের কিংবদন্তিপ্রতীম শাসক জামশিদের সাথে তুলনা করে বলেছেন, ‘জামশিদের সমমানের একজন শাসকের ৫০ বছরের শাসনকালের প্রধান ঘটনাগুলোর সারাংশ টানার চেষ্টা সাগর থেকে এক কলস পানি নেওয়ার মতো।’ এই উৎসুক্য সৃষ্টিকারী সম্রাট এবং যে সাম্রাজ্য তিনি শাসন করেছেন, সে সম্পর্কে অনেক কথা বলা এখনো বাকি রয়ে গেছে। কল্পকথার আওরঙ্গজেবের আবরণটি পরিষ্কার করার পরই আমরা কেবল মধ্য যুগের ভারতবর্ষের গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র সম্রাট আওরঙ্গজেবের মুগ্ধতা সৃষ্টিকারী ধাঁধার মুখোমুখি হতে পারি ।

  • পুনশ্চ

    পুনশ্চ

    মধ্য যুগের ফারসি সাহিত্য পাঠ নিয়ে নোট

    আওরঙ্গজেবের জীবন ও রাজত্ব বিশাল বিস্তৃত নথিপত্রে বিন্যস্ত হয়ে রয়েছে। ইতিহাস, রাজকীয় আদেশ, খবর প্রতিবেদন, চিঠিপত্র, ভ্রমণকাহিনী ও অন্যান্য দলিল-দস্তাবেজে (এগুলো মূলত লেখা হয়েছে ফারসি ভাষায়) মধ্য যুগের ভারতবর্ষীয় এ সম্রাটকে নিয়ে লিখিত ভাষ্যের বিশাল ভাণ্ডার সৃষ্টি করেছে। তবে ইতিহাসবিদেরা এই প্রাচুর্যপূর্ণ আর্কাইভের সুষ্ঠু ব্যবহার করতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন।

    আওঙ্গজেব সম্পর্কিত অনেক গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র ও ইতিহাসে ইতিহাসবিদদের প্রবেশগম্যতার অভাব রয়েছে। অসংখ্য নথিপত্র কখনো ছাপা সংস্করণের মুখ না দেখে পাণ্ডুলিপির লাইব্রেরিগুলোতে অবহেলিতভাবে পড়ে আছে। দক্ষিণ এশিয়া ও ইউরোপজুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা এসব লাইব্রেরিতে যাওয়ার জন্য বিশেষজ্ঞদের বিপুল সময় ও অর্থের প্রয়োজন হয়। আবার অনেক স্থান ফটোগ্রাফির ওপর এমন বিধিনিষেধ রয়েছে যে সেগুলোর আর্কাইভ সামগ্রীর সত্যিকারের ব্যবহার প্রায় অসম্ভব। এছাড়া ভাষাও একটি বড় চ্যালেঞ্জ । আওরঙ্গজেব সাম্রাজ্যের সরকারি প্রশাসনিক ভাষা ফারসি হওয়ায় এ ভাষাতেই মোগলদের বেশির ভাগ ইতিহাস লেখা হয়েছে। কিন্তু বর্তমান ভারতে এটি বিদেশী ভাষা । অনেক ইতিহাসবিদের মূল ফারসি পাণ্ডুলিপিগুলো বাদ দিয়ে এর বদলে ইংরেজি অনুবাদের ওপর নির্ভর করার কারণ প্রয়োজনের তাগিদ ও এগুলোর প্রাপ্তি সহজলভ্য হওয়া। এই দৃষ্টিভঙ্গি লাইব্রেরি সামগ্রীর ব্যবহার ব্যাপকভাবে হ্রাস করে। আবার মোগল পাণ্ডুলিপিগুলোর অনেক অনুবাদের মান প্রশ্নবোধক। ভুল অনুবাদ ও সংক্ষিপ্তকরণ রয়েছে ভয়াবহ মাত্রায়। ভুল বা বিভ্রান্তিকর অনুবাদের কিছু কিছু বেশ সুবিধাজনকভাবেই অনুবাদকদের এজেন্ডা বাস্তবায়নে ব্যবহৃত হয়েছে। বিশেষ করে উপনিবেশ যুগের অনুবাদগুলোর কথা বিশেষভাবে বলা যায়। এসব অনুবাদে ইন্দো-মুসলিম সম্রাটদের সবচেয়ে খারাপভাবে উপস্থাপন করতে চাওয়া হয়েছিল যাতে তাদের তুলনায় ব্রিটিশদেরকে শ্রেষ্ঠ মনে হয়। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় উদাহরণ হলো ইলিয়ট ও ডসনের হিস্টরি অব ইন্ডিয়া, অ্যাস টোল্ড বাই ইটস ওন হিস্টোরিয়ান্স। এসব বই ব্রিটিশ উপনিবেশবাদ সম্পর্কে জানার বিশাল উৎস হলেও মোগল ভারতবর্ষ সম্পর্কে ভ্রান্ত চিত্র উপস্থাপন করে ।

    এমনকি বিশেষজ্ঞরা আওরঙ্গজেব আমলের নথিপত্র দেখার ও পাঠের যদি সুযোগ পানও তখন বড় ধরনের বাধা হিসেবে সামনে আসে এসবের ব্যাখ্যা। কাফি খান (মুন্তাখাব আল-লুবাব) ও মুসতাইদ খানের (মাসির-ই আলমগির মতো আওরঙ্গজেব শাসনকালবিষয়ক তথাকথিত প্রধান প্রধান ইতিহাসবিদের অনেকে লিখেছেন আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর অনেক পরে এবং তারা কয়েক দশক আগে সংঘটিত ঘটনাগুলো পুনঃগঠনের জন্য স্মৃতিকথা ও জনশ্রুতির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভর করেছেন। এ ধরনের ব্যবস্থার ফলে অগোচরে অনিচ্ছাকৃত ভুল তাদের রচনায় প্রবেশ করেছে। প্রত্যক্ষদর্শীর ভাষ্যের সন্ধান পাওয়া গেলে এসব গ্রন্থকে তুলনা করে ভুলগুলো শনাক্ত করা যায়। এমনকি রাজাদেশ ও চিঠিপত্রসহ যেসব নথিপত্র অনেক বেশি নির্ভরযোগ্য মনে হয়, সেগুলোও প্রায়ই ঘটনাটি সম্পর্কে বিভ্রান্তিকর চিত্র সৃষ্টি করে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, অনেক নির্দেশ কখনো কার্যকর করা হয়নি ।

    অধিকন্তু, মধ্য যুগের অনেক লেখক যথার্থ তথ্য প্রাপ্তি নিয়ে আচ্ছন্নতায় থাকতেন না। বরং এর বিপরীতে আওরঙ্গজেবের আমলে ইতিহাসবিদদের মধ্যে আদর্শ কৌশল ছিল অতীতকে ভ্রমাত্মকভাবে উপস্থাপন করা। এসব ইতিহাসবিদ তারিখ (ফারসি ঘরানার ইতিহাস রচনা) লেখার সময় অতীতকে নিখুঁতভাবে তুলে ধরার মতোই বাধিত থাকতেন সাহিত্যিক লক্ষ্য হাসিলের জন্য। সাহিত্যিক প্রয়োজনের আলোকে ইতিহাস পরিবর্তন করা ছাড়াও কাফি খানের মতো লেখকেরা ব্যাপক বাগাড়ম্বড়তার আশ্রয় নিয়েছেন। তাদের এ কৌশল আমাদেরকে তাদের পক্ষপাতিত্বের কথা প্রকাশ করলেও বিশেষ রাজকীয় সিদ্ধান্তটি গ্রহণের নেপথ্য কারণটি অন্ধকারে রেখে দিয়েছেন। অবশ্য এ ধরনের স্তরে স্তরে থাকা অংশগুলো প্রাক-আধুনিক ঐতিহাসিক ভাষ্যগুলোকে বাতিল করে দেয় না। তবে মোগল ইতিহাস দায়িত্বশীলতার সাথে পুনঃনির্মাণের জন্য আমাদেরকে এসব তথ্যের সাহিত্যিক ও ঐতিহাসিক উভয় মান বিচার করে সতর্কতার সাথে ব্যবহার করতে হবে ।

    বেশির ভাগ আধুনিক ইতিহাসবিদ ফারসি-মাধ্যমের মোগল ইতিহাসের সাথে ইউরোপিয়ান ভ্রমণকাহিনী, হিন্দি ও অন্যান্য স্থানীয় ভাষার রচনাবলী ও (সাধারণভাবে সবচেয়ে কম) সংস্কৃত গ্রন্থরাজিসহ অন্যান্য ভাষার প্রাক-আধুনিক গ্রন্থরাজিকে পরিপূরক হিসেবে গ্রহণ করেন। এসব গ্রন্থে প্রায়ই কল্পনা ও বাস্তবতার মিশ্রণ দেখা যাওয়ায় এগুলোও একই ধরনের চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করে। ইউরোপিয়ান ভ্রমণকাহিনীগুলোর প্রতি বিশেষ মনোযোগ লাভ করে, কারণ মোগল সাম্রাজ্যবিষয়ক অনেক বিশেষজ্ঞ এখনো বুঝতে পারছেন না এসব রচনা আসলে বাস্তব তথ্যের সাদাসিধে বর্ণনা নয়, বরং এগুলো বিশেষ শ্রেণির পাঠকদের (এবং প্রায়ই পুঁজিবাদী বাজার) সামনে রেখে প্রণীত কৌশলী ভাষ্য ।

    আধুনিক ইতিহাসবিদেরা ইতিহাসের বই-পত্রগুলো পাঠ করেন কঠোরতার সাথে। এর মানে হলো, আমরা এসব বই-পত্রকে সেগুলোর বৃহত্তর সামাজিক ও সাহিত্যিক প্রেক্ষাপটে স্থাপন করি, গুরুত্ব বিচার করি, প্রমাণ মূল্যায়ন করি, একটি পাণ্ডুলিপিকে অন্যটির সাথে তুলনা করি। ইতিহাসবিদেরা পেইন্টিংস, ভবনরাজি, মুদ্রার মতো প্রমাণগুলোও বিবেচনা করেন। চূড়ান্তভাবে, ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব, প্রতিষ্ঠান বা ঘটনার ব্যাখ্যা করার জন্য ইতিহাসবিদেরা একটি নিয়মসম্মতভাবে ধারাবাহিক ভাষ্য নির্মাণের জন্য প্রাথমিক নথিপত্রগুলো তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে বিবেচনা করেন। ইতিহাস নিয়ে ভিন্নমত পোষণ করার ব্যাপক অবকাশ আছে, তবে ভিন্ন ভিন্ন মত প্রায়ই হয় গঠনমূলক। কিন্তু আওরঙ্গজেবের ঐতিহাসিক নথিপত্রগুলো সংগ্রহ, আত্মস্ত করা ও বোধগম্য করার প্রক্রিয়া খুব সহজ নয়।

    জীবনীমূলক প্রবন্ধ
    আওরঙ্গজেবের এই জীবনীগ্রন্থের ভিত্তি হলো প্রাক-আধুনিক ও আধুনিক উভয় সময়ের পূর্ববর্তী বিশেষজ্ঞদের রচনাবলী। এরপর আমার বিবেচনায় আনা গ্রন্থগুলো সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য দিয়ে কৃতজ্ঞতা স্বীকার করছি। আমি একই সাথে আওরঙ্গজেব অধ্যয়নের সময়কার গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্রগুলোর কয়েকটি সম্পর্কে সারসংক্ষেপও দিয়েছি। আমি পাণ্ডুলিপির আর্কাইভগুলো খুব কমই ব্যবহার করেছি, আমার প্রাথমিক নথিপত্র নিয়ে গবেষণা প্রধানত ছাপানো সংস্করণের ওপর নির্ভরশীল ছিল। উদ্ধৃতি ও অন্যান্য বিশেষ তথ্যের জন্য আগ্রহী পাঠকেরা এই অংশের পর থাকা নোটের ওপর নজর বুলাতে পারেন।

    আমি আগেই উল্লেখ করেছি, ফারসি ইতিহাসগুলো– আওরঙ্গজেব আলমগিরবিষয়ক আমাদের বিপুল ঐতিহাসিক সম্পদরাশির মূল কাঠামো গঠন করেছে। আওরঙ্গজেবের প্রাথমিক জীবনের প্রধান প্রধান ঘটনা শাহ জাহান আমলের ইতিহাসগুলোতে নথিবদ্ধ হয়ে আছে। এসবের মধ্যে আমি এই গ্রন্থে আব্দুল হামিদ লাহোরির পাদশাহনামা, ইনায়েত খানের শাহজাহাননামা, মোহাম্মদ সালিহ খামবুর আমল-ই-সালিহ, তাবাতাবাইয়ের শাহজাহাননামা থেকেও তথ্য সংগ্রহ করেছি।

    আওরঙ্গজেবের আমলে অনেক লোক ইতিহাস রচনা করেছেন। মোহাম্মদ কাজিমের আলমগিরনামা, সম্পাদনা খাদিম হোসাইন ও আবদুল হাই (কলকাতা, ১৮৬৮), আওরঙ্গজেবের শাসনকালের প্রথম ১০ বছরের তথ্য দেয়। এটিই ওই সময়ের একমাত্র সরকারি রাজকীয় ইতিহাস। বখতওয়ার খানের (মৃত্যু ১৬৮৫) মিরাত আল-আলম একটি সার্বজনীন ইতিহাস, যা আওরঙ্গজেব আমলের প্রথম দশকের ঘটনাবলীতে সমৃদ্ধ। সাজিদা আলভি তার পার্সপেকটিভস অন মোগল ইন্ডিয়া গ্রন্থে (করাচি, ২০১২) উল্লেখ করেছেন, বখতওয়ার খানের বইটি এখন খুবই কম পাঠ করা হয়, কিন্তু এ বইয়ে আলমগিরনামায় না পাওয়া অনেক তথ্যের সন্ধান মেলে। আকিল রাজি খানের (মৃত্যু ১৬৯৬/৭) ওয়াকিয়াত-ই আলমগিরি হলো উত্তরাধিকার যুদ্ধের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ভাষ্য। আমি মৌলভি জাফর হাসানের সংস্করণটি (দিল্লি, ১৯৪৬ ) ব্যবহার করেছি। এছাড়া হাতিম খানের আলমগিরনামা, মোহাম্মদ মাসুমের তারিখ-ই শাহ শুজাই, আবুল ফজল মামুরির তারিখ-ই আওরঙ্গজেবের মতো অপ্রকাশিত ফারসি ইতিহাস গ্রন্থ রয়েছে। আমি এ বইটি লেখার কাজে এসব গ্রন্থের সহায়তা নিতে পারিনি ।

    আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর কয়েক দশকের মধ্যে লেখকেরা অনেক ইতিহাস রচনা করেছেন। কাফি খানের মুন্তাখাব আল-লুবাব (আনুমানিক ১৭৩০) ও সাকি মুস্তাইদ খানের মাইসির-ই আলমগির (১৭১০) অনেক ইতিহাসবিদের কাছে খুবই প্রিয়। এর আংশিক কারণ বই দুটির মইনুল হক (করাচি ১৯৭৫) ও যদুনাথ সরকারের (কলকাতা, ১৯৪৭) ইংরেজি সংস্করণ পাওয়া যায়। এছাড়া বই দুটিতে আওরঙ্গজেবের পুরো আমলের তথ্য থাকার কারণেও জনপ্রিয় পরবর্তীকালে লেখা হওয়ায় এবং আওরঙ্গজেবের নীতিপরায়ণ প্রকাশ্য ভাবমূর্তির ওপর জোর দেওয়া বাগাড়ম্বড়াতার কারণে বই দুটির ব্যাপারে আমি একদিকে যেমন সতর্ককতা অবলম্বন করেছি, অন্য দিকে অন্যান্য সূত্রের সাথে তুলনা করেছি। আমি কাফি খানের ইলিয়ট ও ডাওসনের অনুবাদের সাথে ভিন্ন মত প্রকাশ করছি। জনপ্রিয়তার কারণে আমি যদুনাথ সরকারের মাইসির-ই আলমগিরির অনুবাদের কথা উল্লেখ করেছি। তবে পাঠকদের সতর্ক থাকতে হবে যে যদুনাথের অনুবাদটি অসম্পূর্ণ, এতে ভুল রয়েছে (এই অনুবাদ নিয়ে আরো কিছু তথ্যের জন্য টিলম্যান কুলকের ‘অ্যা মোগল মুনসি অ্যাট ওয়ার্ক’ ইউরোপিয়ান ইউনিভার্সিটি ইনস্টিটিউট, পিএইচডি থিসিস, ২০১৬], ১০-১৫, ২০-২২ দেখা যেতে পারে)।

    ভীমসেন স্যাক্সেনার তারিখ-ই দিলখুশা দাক্ষিণাত্যের ঘটনাবলীর একটি অমূল্য ভাষ্য। আমি একটি ব্রিটিশ লাইব্রেরি পাণ্ডুলিপির (অর, ২৩) সাথে যদুনাথ সরকারের অনুবাদ তুলনা করেছি এবং কয়েকটি পৃষ্ঠার পুনঃঅনুবাদ করেছি। নগর ব্রাহ্মণ ও যোধপুরের মোগল বেসামরিক কর্মকর্তা ঈশ্বরদাস লিখেছেন ফুতুহাত-ই আলমগিরি, আনুমানিক ১৭০০ সালে (যদুনাথ সরকার ভুল করে সালটি উল্লেখ করেছেন ১৭৩০)। ফুতুহাতে (ভাদোদারা, ১৯৯৫) নিশ্চিতভাবেই কিছু ঐতিহাসিক ভুল আছে, তবে তা সত্ত্বেও এমন কিছু বিবরণ আছে, যা অন্য কোথাও পাওয়া যায় না। স্বল্প ব্যবহৃত মিরাত-ই-আহমদি (১৭৫৪) গ্রন্থে আওরঙ্গজেবের গুজরাত আমলের কথা বলা হয়েছে। শাহ নওয়াজ খানের মাইসির আল-উমারা, সম্পাদনা আবদুর রাহিম ও মির্জা আশরাফ আলী (কলকাতা, ১৮৮৮-৯১), ১৭৮০ সাল পর্যন্ত মোগল অভিজাতদের সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত জীবনবৃত্তান্ত দেয়। এছাড়া রয়েছে এইচ বেভারিজ ও বেনী প্রাসাদ (পাটনা, ১৯৭৯) অনূদিত মাইসির আল-উমারাও।

    ফারসি ভাষার ইতিহাস ছাড়াও আমি ভূষণের শিবরাজভূষণের (অনুবাদের জন্য অ্যালিসন বাচকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি) মতো বইগুলোসহ সীমিত পরিসরে হিন্দি সাহিত্য ব্যবহার করেছি। আমি জ্ঞান চন্দ্রের সহযোগিতায় জৈন ভাষায় লিখিত বই দেখিছি (এই বিষয়ে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ হলো মোহাম্মদ আকরাম লারি আজাদের রিলিজিয়ন অ্যান্ড পলিটিক্স ইন ইন্ডিয়া (দিল্লি, ১৯৯০], ২৩৪-৩৭)। আমি সহায়তার মাধ্যমে শিখ সামগ্রীও কিছুটা ব্যবহার করেছি। আওরঙ্গজেবের জীবনের আরো ব্যাপকভিত্তিক জীবনী রচনার জন্য অন্যান্য হিন্দি গ্রন্থ বিশেষ করে রাজপুত দরবারের গ্রন্থগুলো ব্যবহার করা যেতে পারে। এছাড়া লক্ষ্মীপতির অবদুল্লাকরিত ও নৃপতিনিতিগরবিতাভৃত্তের মতো সংস্কৃত সামগ্রীর সহায়তাও গ্রহণ করা যায়। এগুলোতে আওরঙ্গজেবের মৃত্যু পরবর্তী রাজনৈতিক ঘটনাগুলো রয়েছে ।

    ইতিহাসবিদদের জন্য ইউরোপিয়ান ভ্রমণকাহিনীগুলো আওরঙ্গজেবের ভারতবর্ষ সম্পর্কে অনেক আগে থেকেই নির্ভরযোগ্য উৎস। বিশেষ করে নিকোলাও মানুচির স্টোরিয়া ডি মোগর, (অনুবাদ উইলিয়াম আরভিন, লন্ডন, ১৯০৭-০৮), ফ্রাসোয়া বার্নিয়ারের ট্রাভেলস ইন দি মোগল আম্পায়ার (অনুবাদ আর্চিবল্ড কনস্টাবল ও ভিনসেন্ট স্মিথ, অক্সফোর্ড, ১৯১৪) ও জ্যা-বাস্তাইজ টাভারনিয়ারের ভয়েজ (অনুবাদ ভি. বল, লন্ডন, ১৮৮৯)-এর কথা বিশেষভাবে বলা যেতে পারে। এখানে আমি জেমেলি ক্যারেরি, পিটার মুন্ডি, উইলিয়াম নরিস, জন অভিঙ্গটন ও জ্যা ডি থেভেনটের মতো কিছুটা কম জনপ্রিয় ভাষ্যের উদ্ধৃতি দিয়েছি। বিদেশী পর্যটকেরা মোগলদের নিয়ে বড় ধরনের অন্তঃদৃষ্টি তুলে ধরেছেন। তবে বিশেষজ্ঞরা প্রায়ই কোনো কারণ ছাড়াই ভারতীয় নথিপত্রের চেয়ে ইউরোপিয়ান গ্রন্থগুলোর ওপর বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন, ইউরোপিয়ান পর্যটকেরা কিভাবে কল্পকাহিনী ও বাস্তবতার মধ্যে গোলকধাঁধার সৃষ্টি করেছেন তা না বুঝেই

    আমি আওরঙ্গজেবের চিঠিপত্রের মাধ্যমে তাকেই তার সম্পর্কে কিছুটা বলার সুযোগ দিয়েছি। এসব চিঠিপত্র ওই সময়ের অনেক মোগল ইতিহাসে তাকে যেভাবে চিত্রিত করা হয়েছে সেই ছবির চেয়ে ভিন্ন ব্যক্তি হিসেবে তাকে উপস্থাপন করে। আওরঙ্গজেব অনেক চিঠি লিখেছিলেন ফারসি ভাষাতে, সম্ভবত দুই হাজার এখনো টিকে আছে। এগুলো নিয়ে বেশ কয়েকটি সঙ্কলন প্রকাশিত হয়েছে। এসবের মধ্যে রয়েছে আদব-ই আলমগিরি, কালিমাত-ই তাইবিয়াত, রাকাইম-ই কারিম ও রুকাত-ই আলমগিরি (আমি ব্যাপকভাবে বিলিমোরিয়ার ইংরেজি অনুবাদ ব্যবহার করেছি, তবে মূল ফারসি ভাষার কাছাকাছি ভাষ্যই প্রয়োগ করেছি। আমি দস্তার আল-আমল আগাহি ও আহকামই-আলমগিরির (এটি আর যদুনাথ সরকারের অ্যানিকডোটেস অব আওরঙ্গজেব নামে প্রকাশিত গ্রন্থটি এক নয়) মতো অপ্রকাশিত সঙ্কলন ব্যবহার করিনি। যদুনাথ সরকারের অ্যানিকডোটেস (কলকাতা, ১৯১৭) প্রলুব্ধ সৃষ্টিকারী গ্রন্থ, এতে আওরঙ্গজেব সম্পর্কে টুকরা টুকরা অনেক রসাল কাহিনী আছে। এতে অবশ্য অনেক ভুল তথ্যও রয়েছে। যদুনাথ সরকারও তা স্বীকার করেছেন, কিছু কিছু পাদটীকায় কয়েকটি ঘটনার সত্য ভাষ্যও উল্লেখ করেছেন। আমি যদুনাথ সরকারের অ্যানিকডোটেস সতর্কতার সাথে ব্যবহার করেছি, আওরঙ্গজেবের কথিত দ্বিতীয় উইল (দেখুন, অ্যানিডোটেস, ৫১-৫৫) এবং এ জাতীয় অনেক সম্ভাব্য বানোয়াট ভাষ্য পুরোপুরি বাদ দিয়েছি।

    আওরঙ্গজেবের বক্তব্য ফরমান (রাজকীয় আদেশ) আকারে এবং সেগুলোর রাজোচিত সমান্তরাল নিশান আকারেও আমাদের কাছে এসেছে। আমি হিন্দু মন্দির ও ধর্মীয় সম্প্রদায়ের ব্যাপারে বিশেষভাবে নির্ভর করেছি জ্ঞান চন্দ্রের আওরঙ্গজেবের ফরমানবিষয়ক প্রবন্ধগুলোর ওপর। এ ব্যাপারে এস এ আই তিরমিজির মোগল ডকুমেন্টস (দিল্লি, ১৯৯৫)-এর ওপর নজর বুলিয়েছি।

    আওরঙ্গজেবের আমলের সংবাদ প্রতিবেদনগুলো (আখবারাত) এখনো অনেক আর্কাইভে টিকে আছে। অবশ্য এই গ্রন্থে সেগুলোর সীমিত ব্যবহার হয়েছে। আমি অন্যান্য বিশেষজ্ঞের প্রতিবেদনের মাধ্যমেই সেগুলোর সাথে পরিচিত হয়েছি। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, মনিষ ফারুকি তার প্রিন্সেস অব দি মোগল এম্পায়ারে (ক্যাম্ব্রিজ, ২০১২) আখবারাত-ই দারবার-ই মাওলা ব্যাপকভাবে ব্যবহার করেছেন। এটি আছে কলকাতার ন্যাশনাল লাইব্রেরি অব ইন্ডিয়ায় ৷

    আওরঙ্গজেবের ওপর মাধ্যমিক সাহিত্য বিপুল, তবে যতটা ধারণা করা যেতে পারে, তার চেয়েও ভাসা ভাসা। ঊনিশ শতকে মন্টস্টুয়ার্ট ইলফিনস্টোন (১৮৪১) ও স্ট্যানলি লেন-পুলের (১৮৯৩) রচিত আওরঙ্গজেবের জীবনী ছাপা থাকলেও তা সেকেলে হয়ে পড়েছে। আমি এখানে এ জাতীয় গ্রন্থের ওপর নির্ভর করিনি। আত্ম-প্রতিষ্ঠিত ইতিহাসবিদ যদুনাথ সরকার (১৮৭০-১৯৫৮) বিশ শতকে আওরঙ্গজেবের ওপর সবচেয়ে বেশি গবেষণামূলক কাজ করেছেন । তিনি আওরঙ্গজেবের আমলের অনেক ইতিহাস ও চিঠিপত্র সঙ্কলন ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন, আওরঙ্গজেবের ওপর অনেক বই প্রকাশ করেছেন। এসবের মধ্যে রয়েছে অমূল্য পাঁচ খণ্ডের হিস্টরি অব আওরঙ্গজেব (১৯১২-২৪)। দীর্ঘ সময় ধরে তিনিই ছিলেন আওরঙ্গজেবের ওপর শেষ কথা। যদুনাথ সরকারের সর্বাত্মক প্রয়াসের পরের কয়েক দশকে তুলনামূলকভাবে অনেক কম সংখ্যক বিশেষজ্ঞ এই বাদশাহকে নিয়ে লিখেছেন। বিশেষজ্ঞরা ধীরে ধীরে আওরঙ্গজেবকে অধ্যায়নে ফিরে গেছেন, যদুনাথ সরকার যেভাবে উপস্থাপন করেছেন, তারা বাদশাহকে দেখতে পেয়েছেন ভিন্নভাবে। আমরা সবাই যদুনাথ সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞ হলেও তার বিশ্লেষণ ব্যাপকভাবে সাম্প্রদায়িকতাপূর্ণ এবং অনেক সময় তাতে ঐতিহাসিক বস্তুনিষ্ঠতার অভাব দেখা যায়। যারা যদুনাথ সরকারের পদ্ধতি ও কৃতিত্ব নিয়ে চিন্তা করতে চান, তাদের উচিত হবে দিপেশ চক্রবর্তীর দি কলিং অব হিস্টরি : স্যার যদুনাথ সরকার অ্যান্ড হিস এম্পায়ার অব ট্রুথ (শিকাগো, ২০১৫) বিবেচনা করা।

    আরো সাম্প্রতিক সময়ে আওরঙ্গজেবের ওপর গবেষণা বেড়েছে, আমি এই রচনায় তা গ্রহণ করেছি। আমি ওপরে যেসব বিশেষজ্ঞের নাম উল্লেখ করেছি, তার বাইরে নিম্নোক্তদের লেখা ছিল বিশেষভাবে ফলপ্রসূ : এম আতাহার আলী, সতীশ চন্দ্র, এস এম আজিজুদ্দিন হোসাইন, ইরফান হাবিব, হারবান্স মুখিয়া ও জন রিচার্ডস। আরো অনেক বিশেষজ্ঞ আওরঙ্গজেবের শাসকালের বিশেষ বিষয় সম্পর্কে লিখেছেন। আমার লেখায় তাদের তথ্য ব্যবহার করেছি। এসবের মধ্যে রয়েছেন : ক্যাথেরিন অ্যাশর (স্থাপত্য), রিচার্ড ইটন (মন্দির অবমাননা),

    লুই ফেঞ্চ (শিখদের সাথে সম্পর্ক), ইউহানান ফ্রিডম্যান (সরহিন্দি নিষিদ্ধকরণ), যশ গোম্যান্স (যুদ্ধ ও দাক্ষিণাত্যের বছরগুলো), স্টুয়ার্ট গর্ডন (মোগল-মারাঠা সঙ্ঘাত), বি এন গোস্বামী (হিন্দু সন্ন্যাসী), জে এস গ্রেওয়াল (ফতোয়া-ই আলমগিরি), রবার্ট হ্যাঁলিসে (রাজপুতদের সাথে সম্পর্ক), শালিন জৈন (জৈনদের সাথে সম্পর্ক), হেইদি পাওয়েলস (কেশব দেব মন্দির), ক্যাথেরিন বাটলার স্কোফিল্ড (নি ব্রাউন, সঙ্গীত) ও তাইমিয়া জামান (ভীমসেন স্যাক্সেনা)। বিনয় লালের ওয়েবসাইটটি (Manas; http://www.sscnet.wcla.edu/southasia/) আওরঙ্গজেবের শাসনকালের বেশির ভাগ বিতর্কিত বিষয়গুলো নিয়ে সংক্ষিপ্ত, সহজবোধ্য প্রবন্ধ রয়েছে। মোগল ইতিহাসের বেশ কিছু পর্যালোচনায় বৃহত্তর মোগল প্রকল্পে আওরঙ্গজেবের খাপ খাওয়ানোর বিষয়টি দেখানো হয়েছে। এসবের মধ্যে রয়েছে মাইকেল এইচ ফিশার, অ্যা শর্ট হিস্টরি অব দি মোগল এম্পায়ার (লন্ডন, ২০১৬), জন এফ রিচার্ডস, দি মোগল এম্পায়ার (ক্যাম্ব্রিজ, ১৯৯৩), ফ্রান্সিস রবিনসন, দি মোগল এম্পেস অ্যান্ড দি ইসলামিক ডাইনাস্টিকস অব ইন্ডিয়া, ইরান অ্যান্ড সেন্ট্রাল এশিয়া, ১২০৬-১৯২৫ (নিউ ইয়র্ক, ২০০৭)।

    এ বইটি লেখার সময় সুপ্রিয়া গান্ধী (দারা শুকোহ), ইয়াল রাইস (পেইন্টিং) ও বেশ কয়েকজন সহকর্মীর অপ্রকাশিত ও প্রকাশিতব্য গ্রন্থ থেকে সহায়তা গ্রহণ করার সুবিধা পেয়েছি। এছাড়া সুইজারল্যান্ডের জুরিখে ২০১৪ ইউরোপিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফর সাউথ-এশিয়ান স্টাডিজ কনফারেন্সে হেইদি পাওয়েলসের আয়োজিত আওরঙ্গজেববিষয়ক প্যানেলের অনেক লেখকের রচনাও দেখেছি। বর্তমান সময়ে আওরঙ্গজেব একটি নতুন করে সৃষ্টি হওয়া ব্যাপক আগ্রহের বিষয়। অনেক বিশেষজ্ঞ শিগগিরই তার ওপর অনেক মাধ্যমিক পর্যায়ের সামগ্রী উপহার দিতে চলেছেন ।

    আওরঙ্গজেববিষয়ক নথিপত্রের ব্যাপারে নিশ্চয়তা দিয়ে বলা শেষ দুটি কথা হলো যথাক্রমে প্রাচুর্যতা ও স্বল্পতা। আওরঙ্গজেব ইতোমধ্যেই সম্ভবত সবচেয়ে প্রামাণিক মোগল সম্রাটে পরিণত হয়েছেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও আখবারাতের মতো গুরুত্বপূর্ণ অনেক নথিপত্রে প্রবেশগম্যতা গবেষকদের জন্য কঠিন। তাছাড়া আওরঙ্গজেববিষয়ক নতুন নতুন সামগ্রী নিয়মিত আত্মপ্রকাশ করছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, সম্রাটের একটি তরবারি ২০১১ সালে আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের কাবার্ড থেকে চাঞ্চল্যকরভাবে বের হয়েছে। বেসরকারি বাজারে প্ৰামাণিক সামগ্রী আত্মপ্রকাশ করছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ২০১৪ সালে ক্রিস্টিসে আওরঙ্গজেবের ইস্যু করা একটি ফরমান ২৭,৫০০ পাউন্ডে বিক্রি হয়েছে। আওরঙ্গজেবের ওপর যারা গুরুত্ব দিয়ে কাজ করতে চান, তাদের নথিপত্রের অভাবে ভুগতে হবে না ।

    অবশ্য সৌখিন পাঠক ও গবেষক উভয়কেই ঐতিহাসিক প্রমাণ ও নিয়মসম্মত ঐতিহাসিক দাবির প্রকৃতি সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে। যেসব ব্যক্তি হিন্দু-মুসলিম সঙ্ঘাতের সন্দেহমূলক আধুনিক পরিভাষায় আওরঙ্গজেবের কথিত বর্বরতার ‘প্রমাণ’ উত্থাপন করার দাবি করে থাকেন, তারা প্রায়ই জাল নথিপত্র ও নির্লজ্জ ভুল অনুবাদসহ বিদ্বেষপ্রসূত মিথ্যাচার করছেন। যারা আওরঙ্গজেবের নিন্দা করেন, তাদের অনেকেরই ইতিহাসের নিয়মানুবর্তিতা সম্পর্কে কোনো প্রশিক্ষণ নেই, এমনকি প্রাক-আধুনিক ফারসি ইতিহাস কিভাবে পড়তে হয়, সে সম্পর্কে মৌলিক দক্ষতা পর্যন্ত নেই। লোকরঞ্জক পরিমণ্ডলে বন্যার মতো ছেয়ে যাওয়া আওরঙ্গজেব-সম্পর্কিত সাম্প্রদায়িক ভাষ্য নিয়ে সংশয়প্রবণ হতে হবে। এই জীবনী রচনা করা হয়েছে ঐতিহাসিক ব্যক্তি ও সম্রাট আওরঙ্গজেব আলমগির সম্পর্কে আমাদের মধ্যে বিরাজমান খুবই হালকা জ্ঞানের গভীরতা বাড়ানোর জন্য ।

    কৃতজ্ঞতাস্বীকার
    আমি এই সংক্ষিপ্ত বইয়ে অনেক ঋণের কৃতিজ্ঞতাস্বীকার করছি। অনেকেই তাদের অপ্রকাশিত গ্রন্থের তথ্য আমাকে জানিয়েছেন, ছবি দিয়ে সাহায্য করেছেন, এই বইয়ের প্রাথমিক পাণ্ডুলিপি পাঠ করেছেন। তাদেরকে উচ্ছ্বসিতভাবে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। আর সব মতামত, যুক্তি ও ভ্রান্তি কেবল আমার একার।

    ভারতীয় ইতিহাসের অন্যতম ঘৃণিত ব্যক্তি আওরঙ্গজেবকে নিয়ে লেখালেখি করা কোনো তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নয়। এ ব্যাপারে আমি বিশেষ ঋণ স্বীকার করছি। আমি বইটি লিখব কিনা তা নিয়ে যখন দ্বিধায় ছিলাম, তখন যারা আমাকে উপদেশ দিয়েছিলেন, তাদের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি আপনি জানেন, কে আপনি আর আমি খুবই কৃতজ্ঞ ।

    আওরঙ্গজেবের জীবন ও শাসনকালের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাপ্রবাহ
    ১৬১৮ : জন্ম

    ১৬৩৩ : পাগলা হাতির মোকাবিলা

    ১৬৩৪ : প্রাপ্ত বয়স পূর্তি উদযাপন

    ১৬৩৭ : প্রথম বিয়ে

    ১৬৫৩-৫৪ : শিল্পী হিরাবাইয়ের সাথে রোমান্স

    ১৬৫৭ : প্রথম স্ত্রী দিলরাস বানু বেগমের ইন্তিকাল

    ১৬৫৭ : শাহজাহানের অসুস্থ হয়ে পড়া, উত্তরাধিকার লড়াই শুরু

    ১৬৫৭ : সম্রাট হিসেবে প্রথম অভিষেক অনুষ্ঠান

    ১৬৫৮ : সম্রাট হিসেবে দ্বিতীয় অভিষেক অনুষ্ঠান

    ১৬৫৯ : দারা শিকোহর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর

    ১৬৬১ : মুরাদ বকসের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর

    ১৬৬৩ : রাজা রঘুনাথের মৃত্যু

    ১৬৬৬ : শাহজাহানের ইন্তিকাল

    ১৬৬৬ : মোগল দরবার থেকে শিবাজির পলায়ন

    ১৬৬৭ : ফতোয়া-ই-আলমগিরির রচনা শুরু

    ১৬৬৯ : সম্রাটের ঝরোকা দর্শন প্রথা বাতিল

    ১৬৬৯ : বেনারসের বিশ্বনাথ মন্দির ধ্বংস

    ১৬৭৩-৭৪ : লাহোরে বাদশাহি মসজিদের নির্মাণকাজ সমাপ্ত

    ১৬৭৫ : তেজ বাহাদুরের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর

    ১৬৭৯-৮০ : রাঠোর-সিসোদিয়া বিদ্ৰোহ

    ১৬৭৯ : জিজিয়া কর পুনঃপ্রবর্তন

    ১৬৭৯ : মোগল অভিজাতদের মধ্যে হিন্দু প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধি শুরু

    ১৬৮০ : শিবাজির মৃত্যু

    ১৬৮১ : যুবরাজ আকবরের বিদ্রোহ

    ১৬৮১ : আওরঙ্গজেবের দাক্ষিণাত্য যাত্রা

    ১৬৮৫-৮৬ : বিজাপুর অবরোধ

    ১৬৮৭ : গোলকোন্ডার পতন

    ১৬৮৯ : শম্ভুজির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর

    ১৯৯৮ : জিনজির (গিনগি) পতন

    ১৭০৪ : নির্বাসনে যুবরাজ আকবরের মৃত্যু

    ১৭০৪ : দাক্ষিণাত্যে জিজিয়া করে ছাড়

    ১৭০৫ : অমর সিংয়ের ফারসি রামায়ণ আওরঙ্গজেবকে উৎসর্গ

    ১৭০৭ : আওরঙ্গজেবের ইন্তিকাল

  • ষোল

    ষোল

    সারেঙসাব জ্যাককে দেখে অন্য দিকে চোখ ফেরালেন। বড়লোকের ছেলে যা হয়, যা খুশি মনে আসে করে বেড়ায়। এখন জ্যাককে দেখলে কে বলবে, সেই ছোটবাবুকে এ-ভাবে জব্দ করেছে। আসলে, দুর্ঘটনার জন্য জ্যাক দায়ী ছিল না। সেই অতিকায় ব্রেকার, যার কার্যকারণ কেউ ব্যাখ্যা করতে পারে না কারণ কখন সমুদ্রে কি হয়, জলোচ্ছ্বাস, ঘূর্ণি এবং এমন সব ভূকম্পন, অগ্নুৎপাত হতে থাকে যে তার কার্যকারণের ব্যাখ্যা একমাত্র সেই মহামহিমের কাছেই থেকে যায়। কাপ্তান তখন বুকে ক্রস টেনে শুধু বলতে পারেন, হে মহামহিম আপনি মঙ্গলময়। কারণ কোনও বেতার সংকেত ছিল না। অটোএলার্ম ঠিক ছিল। ব্রীজে ডিউটি-অফিসার অটো-এলার্ম বাজলে ঠিক শুনতে পেতেন। যাই হোক, সারেঙ যেন ছোটর এই দুর্ঘটনায় জ্যাককে বাদে আর কাউকে দায়ি ভাবতে পারেন না। সেই জ্যাক যখন আনন্দে শিস্ দিতে দিতে হাঁটছে তখন কেন জানি তাঁর ভাল লাগল না। জ্যাক কাল যাবে, গেলেই যেন তার ছেলের আবার মন্দ কিছু হয়ে যাবে। সে ডেবিডকে ডেকে বলল, আপনি যান। আমি পরে যাচ্ছি। জ্যাক সঙ্গে গেলে যেন মাথা ঠিক রাখতে পারবেন না।

    তখন চুপি চুপি জ্যাক বলল, ছোট কি বলে?

    —বলে না কিছু।

    —কেন!

    —কথা বলতে দিচ্ছে না।

    —কাল গেলে আমরা কথা বলতে পারব না?

    —না।

    তারপর ডেবিড পাইপে ধোঁয়া উঠছে না দেখে বুড়ো আঙ্গুলে টিপে কি দেখল। তখন লম্বা ব্ৰীজ পার হয়ে সারেঙ অন্যদিকে চলে যাচ্ছেন। জ্যাকের ভারি ইচ্ছে হল, ব্রীজ পার হয়ে বড় পাহাড়ের মাথায় উঠে যায়। এবং ডেবিডকে বলার ইচ্ছে, আচ্ছা এখান থেকে কতদূর!

    —বেশি দূর না।

    —পাহাড়টার মাথায় উঠে গেলে ছোটবাবুর হাসপাতাল চোখে পড়বে?

    —পড়তে পারে।

    —উঠবে ওপরে?

    —পড়ে যাবে।

    —তুমি এস না। বলে সেই যেন ডেবিডকে নিয়ে সেই নিকটবর্তী পাহাড়ের গাছপালার ভেতর দিয়ে ওপরে উঠে গেল। তখন সূর্য অস্ত যাবার মুখে। লেগুনের জলে নানাবর্ণের শালতি। লম্বা কোনোটা সাদা রঙের, কোনোটা নীল রঙের। আর কোনোটার মাথায় পাল, ছোট ছোট এই সব শালতির পাটাতনে বসে রয়েছে যুবক যুবতীরা। ওরা নৌকা-বাইচ দিচ্ছে। এবং পাশাপাশি সব জাহাজ। পাহাড়ের ছায়া লেগুনের জলে। আলো জ্বলছে বড় গম্বুজের মাথায়। অনেক দূরে সেই হাসপাতালের মাঠে লাল গীর্জা। ডেভিড গীর্জার মাথায় ক্রস দেখিয়ে বলল, ওখানে ছোটবাবু থাকে।

    পরদিন জ্যাক, কাপ্তান, মেজ মালোম, সারেঙ, মৈত্র সবাই—এক দঙ্গল যেন। এ-সব জাহাজে একজন কোলবয়ের জন্য এটা বাড়াবাড়ি। কথা থাকে অসুস্থ হলে জাহাজ বন্দরে লাগলে নামিয়ে দেওয়া, কিন্তু বোধ হয় ছোটবাবুর জন্য বনির যেমন মায়া, তেমনি কাপ্তান থেকে সবাই। ছোট, বিনীত ভদ্র। অসহায় চোখ। কম বয়সে সবারই চোখ এমন থাকে, তাঁর নিজেরও এমন ছিল। আর তা ছাড়া কি যেন আছে ছোটর ভেতর। যখন সাদা এম্বুলেন্সে নিয়ে যাওয়া হয় কাপ্তান নিজের ভেতর কেমন অস্থির হয়ে পড়েছিলেন। ছোটবাবুর মুখে নীল দাড়ি। শরীরের লাবণ্য কোনো দূরবর্তী এক বনভূমির কথা অথবা কোন মরুভূমিতে একজন মুসাফিরের নিত্য হেঁটে যাওয়ার কথা মনে করিয়ে দেয়। ছোটবাবুর মুখের ছবির সঙ্গে দূরবর্তী কোন মরুভূমির মহামহিমের কথা কেবল মনে পড়ে যায়। তখন কিছুতেই তাকে ফেলে তিনি জাহাজ সমুদ্রে ভাসিয়ে দিতে সাহস পান না।

    এবং এ জন্য কাপ্তান এখানে নানারকম মেরামতের কাজ বের করে যেমন, চক্ মেরামত, এনজিন রুমের বালকেড পাল্টে ফেলা, এবং ব্রীজে কিছু কাজকর্ম তাছাড়া স্মোক-পাইপ বসানের কাজ আছে এবং এসব কাজের ভিতর বন্দরে পড়ে থাকার প্রয়োজনীয়তা—যেন তিনি ছোটবাবুর জন্য অপেক্ষা করছেন না, অপেক্ষা করছেন, জাহাজের এইসব মেরামতের জন্য। মেরামত শেষ হলেই জাহাজ ছাড়া হবে।

    ওরা যখন নেমে যাচ্ছিল, মেজ-মিস্ত্রি অর্থাৎ সেকেন্ড-এনজিনিয়ার তখন দু-পা ফাঁক করে দাঁড়িয়ে আছে ডেকে। সাদা বয়লার স্যুট পরেছে সে। ওর পাতলা চুল মাথায় এবং চোখে-মুখে কঠিন এক তাচ্ছিল্য, কোথাকার কে এক নেটিভ ইন্ডিয়ান তার জন্য এত সব। মুখে খুবই দাম্ভিকতার ছাপ। জ্যাকের জন্য সে মাঝে মাঝে আকুলতা বোধ করে থাকে। এমন নাবালকের মুখ এবং জাহাজে যা সব হয়ে থাকে, কখনও অধিক পানীয় পেটে পড়লে সে ঠিক থাকতে পারে না। জ্যাকের কেবিনের চারপাশে ঘুরে বেড়ায়। মাঝে মাঝে ইচ্ছে হয় নরম পাখির মতো রোস্ট—জ্যাকের শরীর যেন সুস্বাদু খাদ্য—সেই জ্যাক পর্যন্ত এমন বিশ্রী একটা লোককে দেখতে যাচ্ছে। জ্যাক এ-জাহাজে ওকে মাঝে মাঝে পাগল করে দেয়। জ্যাকের যতদিন দাড়িগোঁফ না উঠবে ততদিন একটা মেয়ের শরীর বাদে তার কাছে আর কিছু না। সে কেবল ফাঁক খুঁজেছে। জ্যাককে দেখলেই গলে পড়ছে। কথা বলছে গদগদ গলায়। ওর কেবিনে কতদিন আসতে বলেছে চুপি চুপি। সে বন্দর থেকে যা কিছু দুর্লভ জ্যাকের জন্য নিয়ে আসতে চায়। বন্ধুত্ব অসীম বন্ধুত্ব, তারপর কখনও সবাই যখন কেবিনে ঘুম যাবে জ্যাকের শরীরে জোরজার করে একটা কিছু করে ফেলবে। জ্যাক সাহসই পাবে না। বাপকে এমন নোংরা ঘটনার কথা বলতে সাহস পাবে না। ও তারপর যে কি মজা হবে! জ্যাক যদি অভ্যস্ত হয়ে যায়, এ-জাহাজ নিরবধিকাল চললেও ভাববে না, দেশে ফেরা দরকার। সে জিভ্ দিয়ে ঠোঁট চাটছিল আর ভেতরে ভেতরে ফুঁসছিল।

    জ্যাক সবার পেছনে। হাসপাতালের ভেতর বড় রাস্তা এবং সুন্দর ফুলের বাগান, গোলাপ ফুলই বেশি। ওর ইচ্ছে হল একটা ফুল তুলে নেয় ছোটবাবুর জন্য। এবং সে সবার অলক্ষ্যে একটা গোলাপ ফুল তুলে ফেলল। তারপর রুমালে ঢেকে সে যখন ঢুকে গেল ভেতরে, দেখল সারি সারি বেড। এবং শেষ দিকে বাবা এবং সেই ওল্ড-ম্যান অর্থাৎ সারেঙ। সে দেখতে পেল ছোটবাবু শুয়ে আছে পাশ ফিরে। ওর মাথায় ব্যান্ডেজ এবং ও-পাশে মুখ ফিরিয়ে শুয়ে আছে। জ্যাক কিছুতেই সাহস পেল না সামনে গিয়ে একবার দেখে। সে তার বাবার পেছনে প্রায় যেন লুকিয়ে দাঁড়িয়েছিল। যেন ছোটবাবু দেখতে না পায়। সে দেখছিল ছোটবাবু বাবার দিকে তাকিয়ে আছে। বাবাকে ছোটবাবু ভীষণ ভয় পায়। বাবা থাকলে ছোটবাবু ভীষণ অস্বস্তিতে পড়ে যায়। সারেঙ শিয়রের দিকে। এনজিন টিন্ডাল সামনে—ও পাশের বেডে ঠোঁট পুরু চুল কোঁকড়ানো বাদামী মানুষ। পা টানা দেওয়া। চেহারা দেখলে ড্রাইভার মনে হয়। এবং এ-ভাবে এখানে কত বিচিত্র ব্যান্ডেজে পড়ে থাকা মানুষ! ওষুধের গন্ধ ছোটবাবু এখানে এভাবে একা পড়ে রয়েছে। সে কিছু বলতে পারছে না। রিপোর্ট ঝুলছে। বাবা ডাক্তারের সঙ্গে একটু কথা বলতে চাইছেন, কবেতক তুলে নেয়া যাবে এবং এ-ভাবে জ্যাক দেখল বাবা করিডোর দিয়ে যখন হেঁটে যাচ্ছেন ছোটবাবুর মুখে সুন্দর হাসি। সে ডেভিডকে হাতের ইশারায় কাছে ডাকছে। ছোটবাবু ওকে চোখ তুলে একবার দেখেছে, কিন্তু যেন একেবারেই চিনতে পারেনি। জ্যাকের ভীষণ অভিমান। সে তেমনি পায়ের দিকে দাঁড়িয়ে আছে। ছোটবাবু জানে না, সে ছোটবাবুর জন্য চুরি করে একটা গোলাপ ফুল নিয়ে এসেছে।

    ছোটবাবুর কথা শুনে সেকেন্ড হেসে ফেলল। বলল, ওরা ভাল আছে।

    জ্যাক আর থাকতে পারল না। বলল, কারা ভাল আছে সেকেন্ড?

    —মিস্টার য়্যান্ড মিসেস স্প্যারো।

    —ওর ঘুম হচ্ছিল না বুঝি!

    জ্যাকের কথা ছোটবাবু শুনতে পায়নি। মেজ-মালোম স্পষ্ট করে বললেন, ওদের জন্য তোমার ঘুম নেই চোখে?

    ছোটবাবু আস্তে আস্তে বলল, না। সে সারেঙের দিকে হাত তুলে বলল, ভাল আছি। ভাববেন না। মৈত্রকে বলল, মৈত্রদা বসো। দাঁড়িয়ে থাকলে কেন? আমাকে তোমরা কবে নিয়ে যাবে। আমার ভাল লাগছে না।

    মৈত্র বলল, ঠিক নিয়ে যাব।

    —আমাকে ফেলে কিন্তু চলে যেও না তোমরা। তবে একেবারে একা পড়ে যাব। জাহাজ ছাড়ছে কবে?

    জ্যাক কাছে এসে দাঁড়ালো। জ্যাক কাছে এলে মৈত্র এবং সারেঙ বেশ দূরে সরে দাঁড়াল। জ্যাক পাশে বসল। বলল, তোমাকে না নিয়ে আমরা যাব না ছোটবাবু।

    ছোটবাবুর সব রাগ দুঃখ কেমন নিমেষে উবে গেল। —সত্যি যাবে না।

    —না।

    ছোটবাবু বলল, তুমি ভাল হয়ে যাও জ্যাক। সবাই তোমাকে খারাপ বলে। আমার ভাল লাগে না।

    —আমি ভাল হয়ে যাব ছোটবাবু।

    —ঠিক!

    –ঠিক।

    জ্যাক এবার ওকে ফুলটা দিল। বলল, তোমার জন্য এনেছি। জ্যাককে তখন কি যে ভাল লাগে। ছোটবাবু বলল, কত বড় ফুল! এবং জ্যাক ইচ্ছে করলে আরও কত ফুল এনে দিতে পারে। কিন্তু সে যে একটা দুঃসাহসিক কাজের ভেতর ফুলটা ওর হাতে দিতে পেরেছে তার জন্য খুশী। সে বাজার থেকে অনেক ফুল এনে দিতে পারে। ইচ্ছে করলে ওর চারপাশে ফুলের সমারোহ গড়ে তুলতে পারে। কিন্তু সে তো সে-সব কিছু আসার সময় একেবারেই ভাবেনি। সে এই হাসপাতালে ঢুকে আবিষ্কার করেছে হাসপাতালে সময়ে অসময়ে দুর্লভ সব ফুলেরা ফুটে থাকে। একটা ফুল ছোটবাবুকে দিতে পারলে কি যে ভাল লাগবে। এবং এমন মনে হতেই সে কাপ্তান স্যালি হিগিনসের মেয়ে একেবারে মনে থাকল না। মান-সম্ভ্রমের কথা মনে থাকল না। একটা ফুল চুরি করে ফেলল ছোটবাবুর জন্য ফুলটা ছোটবাবুকে দিতে পেরে শেষ পর্যন্ত একটা মহৎ কিছু করে ফেলেছে ভাবল।

    এবং এ-ভাবেই জীবন কখনও মধুময়, কখনও এক কঠিন বাস্তবতা অথবা জ্যাক হয়তো জানে না, জাহাজে একজন হিংস্র মানুষ ওর শরীরে মেয়েমানুষের ঘ্রাণ পাচ্ছে। ওর অভিসন্ধির শেষ নেই। অন্ধকার গুহার মতো কেবিনে একজন মানুষ স্থির দাঁড়িয়ে আছে। তার চোখেও ভাল ঘুম নেই।

    স্যালি হিগিনস ফিরে এসে সেকেন্ড অফিসারকে ডাকলেন। এবং পরামর্শ—অবশ্য জ্যাক, মৈত্র অথবা সারেঙ কিছুই শুনতে পেল না। তারপর দু-দিন যেতে না যেতেই আবার বন্দরে সেই সাদা এম্বুলেন্স। ছোটবাবু বসে রয়েছে। জ্যাক সাহায্য করছে তুলে আনতে। গ্যাঙ-ওয়ে ধরে ছোটবাবু উঠে আসছে। ব্রীজে দাঁড়িয়ে আছে সেই লোকটা। একজন নেটিভের সঙ্গে জ্যাকের মেলামেশা তার আদৌ পছন্দ না। সে দু-পা নিজের অজান্তেই ঠক ঠক করে নাচাচ্ছিল। বুড়ো বয়সে কাপ্তানের ভীমরতি ধরেছে।

    তবু উঠে এলে, জ্যাককে মেজ-মিস্ত্রি আর্চি বলল, কেমন আছে?

    জ্যাক বলল, ভাল।

    এবং জ্যাকের যেন এখন কাজের শেষ নেই। বোধ হয় জ্যাক নিজের একগুঁয়েমির কথা ভেবে বিনয়ী হয়ে গেছে। এভাবে ছোটকে পাখি দুটোর পেছনে লেলিয়ে সে ঠিক কাজ করেনি। এখন সে ছোটবাবুকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে। ওর ফোকসালে নিয়ে যাচ্ছে। জাহাজিরা ছোটবাবুকে ভীষণ ভাগ্যবান ভাবল। ছোটবাবুর সঙ্গে এমন যখন আচরণ তখন তারাও আর ছোটবাবুকে অবহেলা করতে পারে না। কেউ কেউ উদ্বিগ্ন চোখে মুখে কথাবর্তা বলল। শেষে এল অনিমেষ, বন্ধু। ওরা ফলঞ্চা ঝুলিয়ে জাহাজের বাইরে রঙ করছিল। শরীরে নীল পোশাক। মজুমদার এসেই হাত ঘুরিয়ে মেয়েদের মতো নাচতে থাকল আর গাইতে থাকল, ছোটবাবু ফিরে এসেছে, ছোটবাবু ভূত দেখেছে, আহা আমার কি যে মজা হয়েছে, রেতের বেলা বউ আমারে বাবা বলেছে। এবং এভাবে সবাই হো হো করে হেসে উঠল। জ্যাক এ সবের কিছু বোঝে না। তবু সে বুঝতে পারে ছোটবাবুকে ফিরে পেয়ে সবাই আনন্দ করছে। তারও ওদের সঙ্গে দাঁড়িয়ে আনন্দ করতে ইচ্ছে হল।

    আর এভাবে জাহাজ ভিকটোরিয়া পোর্টে মাসাধিকাল থেকে গেল। মাসাধিকাল এ-জাহাজের বর্ণনা দিতে গেলে দেখা যাবে প্রতিদিন একই ছবি—বড় বড় গ্যাস সিলেন্ডার অথবা অক্সিজেন-সিলেন্ডার ডেরিকে উঠেছে নেমেছে। বড় বড় লোহার পাত জড় হয়েছিল এবং জোড়া তালি দেবার জন্য ওয়েলডিঙের কঠিন ধাতব শব্দ, কানে তালা লেগে যাবার মতো। আর ঝুলে ঝুলে রং করা ডেক- জাহাজিদের। চারপাশে বোল্ট লোহায় মুড়ে নেওয়া হচ্ছে। যতটা পারা যায় পুরানো জং-ধরা ঝরঝরে বালকেড মেরামত করে নেওয়া। আর পাশে সরু লেগুনের নীল জল। দু’পাশে শহরের ইট কাঠ সেতু। বিকেলে নৌকা বাইচ। এবং লম্বা লম্বা সালতিগুলো যেন শয়ে শয়ে লেগুনের জলে ভেসে যাচ্ছে—তখন ছোটবাবুর জন্য আর কিছুদিন অপেক্ষা করলে কি ক্ষতি ছিল। বনি, বাবার কথা শুনে সত্যি ভয় পেয়ে গেছে। বেশি কথা বললে, ছোট হয়তো কখনও আর নিরাময় হবে না। সে যে এখন কি করে!

    তারপর আবার যা হয়ে থাকে, জাহাজ নোঙর তুলে ফেলছে। পাশের জেটিতে তেমনি জাহাজে আকরিক লোহা বোঝাই হচ্ছে। বোধ হয় কার্ডিফ অথবা হামবুর্গ যাবে জাহাজ। ওদের জাহাজ বাউন্ড ফর পোর্ট অফ সালফার। এখন আরও উত্তরে উঠে যাওয়া। জাহাজ সমুদ্রে পড়লে কার্সি ফ্ল্যাগ নামিয়ে ফেলা হল। জাহাজের সামনে শুধু কোম্পানীর ফ্ল্যাগ। পেছনে ইউনিয়ান জ্যাক। আবার সেই অসীম যাত্রা, নীল আলোময় অন্তহীন যাত্রা যেন। ঝ্যাক ঝ্যাক অবিরাম শব্দ এনজিনের। কেউ হয়তো অবসর সময়ে লম্বা তারের বঁড়শি ফেলে রেখেছে সমুদ্রে। তাজা মাছ উঠলে বেশ হয়। সুরমাই মাছ। বাসি খাবার খেয়ে মুখে রুচি নেই। একটু তাজা মাছের স্বাদ এবং যেদিন সত্যি বড় একটা মাছ, প্রায় ত্ৰিশ বত্রিশ সের ওজনের একটা মাছ উঠে আসে, তখন সবার কি যে হৈ-চৈ। তাজা মাছ। ডেক আর এনজিন ক্রু মিলে উৎসবের মতো দিনটা কাটিয়ে দেয়।

    এবং জাহাজ বলতে গেলে বেশ যাচ্ছে। দু-এক দিনের ভেতর ওরা ক্যারেবিয়ান-সি পাবে। তারপর মিসিসিপি নদী। নদীর মোহনা এবং নদীর ভেতর দিয়ে বোধ হয় যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে ঢুকে যাওয়া। সেখানে সালফার বোঝাই হবে। যখন এমন সব ঘটনা, তখন জ্যাকের মনে হল বাবার দিন রাত কি যেন দুশ্চিন্তা মাথায়। ঠিক সেই দুঃস্বপ্ন দেখার পরে যেমন বাবা বলতেন, চিৎকার করে পরিচারকদের ডেকে বলতেন, দ্যাখো দ্যাখো ঘরের ভেতরে কে ঢুকে গেল। আমার সব কিছু তছনছ করে দিচ্ছে। আমার কিছু ঠিক রাখছে না। ছুঁড়ে ফেলে দিচ্ছে অথবা যখন তিনি শান্ত হয়ে আসেন তখন তাঁর কন্ঠস্বরে দুঃখী মানুষের আভাস। তিনি ধীরে ধীরে বলেন, বনি দ্যাখতো কে গেল! ঘরের ভেতর কে ঢুকে গেল। চোখে মুখে বাবার কি যে ভীতির ছাপ থাকত।

    —কৈ কাউকে তো দেখছি না! কে ঢুকল! ভেতরে কেউ নেই বাবা

    —মনে হল যেন কেউ ঢুকে গেল।

    আসলে বনি জানে বাবা মাঝে মাঝেই এমন করেন। বয়স যত বাড়ছে বাবার এটা বেশি হচ্ছে। যতক্ষণ সমুদ্রে ভেসে পড়তে না পারছেন, ততক্ষণ এটা থাকছে। কিন্তু এ সফরে বনি দেখছে, বাবা জাহাজেও মাঝে মাঝে সহসা বলে ওঠেন, দ্যাখতো চার্টরুমে কে ঢুকে গেল! বাকিটুকু বলতে যেন তিনি সাহস পান না। বনি মুখ দেখে বুঝতে পারে বাবা কথা সম্পূর্ণ শেষ না করেই ওর দিকে তাকিয়ে আছেন। বনি আবার সব বুঝে ফেলছে নাতো এমন চোখ মুখ তখন তাঁর। বনি জবাব দিত, কেউ না। এই এস না, দ্যাখো কেউ না। কেবল বড় বড় চার্ট, ম্যাপ এবং সেকসটান, নানা রকমের বই। সব বইগুলো যেন বনি লকার থেকে নামিয়ে দেখাতে চায়, দ্যাখো কেউ কোথাও নেই। এমনকি জ্যোতির্বিজ্ঞানের সব বই, যার ভিতর বনি পর্যন্ত এই সৌরজগতের এক অসীমতার রহস্য খুঁজে পায়।

    বাড়ির পুরানো পরিচারকের কাছে বনি শুনেছে, বাবার প্রথম পক্ষের মায়ের মৃত্যুর পর এটা হয়েছে। বাবা এবং প্রথম পক্ষের মার সুন্দর একটা ছবি সে বাড়ির একটা অব্যবহৃত সিন্দুকে খুঁজে পেয়েছিল। আশ্চর্য, ছবিটা এত অযত্ন সত্ত্বেও এতটুকু মলিন হয়নি। বাবার প্রথম বয়সের ছবি। কি যে রূপবান ছিলেন এবং মা আরও। সে ওটা সুন্দর করে ঝেড়ে মুছে দেয়ালে ঝুলিয়ে রেখেছিল। বাবা ছবিটা দেখে বেশি উৎসাহ পেতেন না। যেন, আর ও বয়সের মুখ দেয়ালে টানিয়ে কি হবে! তিনি স্মিত হাসতেন। মানুষ তার অহঙ্কার নিয়ে বেশি দিন বাঁচতে পারে না। এবং এ-ভাবে যখন পুরানো স্মৃতির ভেতর ডুবে যান তখনই এমন হয় অথবা কখনও অন্যমনস্ক হয়ে গেলে মনে হয় পাশ কাটিয়ে কেউ চলে গেল। কে? কে?

    পরে বুঝতে পারেন, কেউ না। বুঝতে পারলেই লজ্জা পান। বিষণ্ণ হয়ে যান তারপর ভীষণ সতর্ক নজর চারপাশে। আবার কি ভাবেন। এটা কি কোন ভৌতিক ব্যাপার, ভাবেন আর পায়চারি করেন। না না এটা তা হবে কেন। তিনি যে তখন এলিসের চুলের গন্ধ পান। চুলের গন্ধটা পাশ থেকে তখনও যেন ভেসে আসছে। তাড়াতাড়ি চুপি চুপি বড় সেই হলঘরে ঢুকে চারপাশে, যেমন লকার, সিন্দুক ওয়াড্রোব খাট বাতিদান সব টেনে টেনে হাঁটু মুড়ে কখনও হামাগুড়ি দিয়ে একেবারে ছেলেমানুষের মতো হারানো খেলনা খুঁজে বেড়াবার মতো অথবা দুষ্টু বালকের ঘুড়ি কেটে গেলে যে দুঃখ, ঘুড়িটা উড়ে চলে যাচ্ছে, ধরতে না পারলে যে দুঃখ, বাবার মুখে তেমনি দুঃখ ভেসে থাকত! মুখে হাতে ধুলো ময়লা লেগে বাবাকে শিশুর মতো লাগত। বনি তখন সহ্য করতে পারত না। কি এত খুঁজছ। আমাকে বলতে পার না।

    তিনি বলতে পারেন না আমি খুঁজছি, আমার হারানো স্মৃতিকে। চুপচাপ হাত পা ঝেড়ে উঠে দাঁড়ান। মার কাছে শিশুর দুষ্টুমীর কথা লুকিয়ে যাবার মতো যেন বলা, লাঠিটা যে কোথায় রাখলাম বনি!

    —এই তো লাঠি।

    —দ্যাখো কি আশ্চর্য, সারা ঘর খুঁজছি। অথচ একেবারে সামনে লাঠিটা। ঠিক এই লুকোচুরি যেন ছোটবাবুকে নিয়ে। যেমন বাবা সময় পেলেই বলবে, বনি, ছোট কেমন আছে?

    —ভাল।

    —লাগে না আর?

    —না।

    —কথা ঠিক ঠিক বলে?

    —হ্যাঁ।

    —ঠিক ঠিক যে বলে বুঝতে পার?

    —বুঝতে পারি।

    সিঁড়ি ধরে ওপরে উঠতে উঠতে কথা বলেন। পেছনে তাকান না তখন। নিচে দাঁড়িয়ে থাকে বনি। তিনি বলতে বলতে অদৃশ্য হয়ে যান।—ওকে বেশি কথা বলতে দেবে না। ওর মাথার আঘাত গুরুতর। ভাল হতে সময় লাগবে।

    বনি আরও প্রশ্ন করতে পারে ভেবে তিনি চার্টরুমে ঢুকে গেলেন। বনি চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। বাবার ওপর রাগে দুঃখে ভীষণ কান্না পাচ্ছিল। কি দরকার ছিল তবে ওকে নিয়ে আসার। সে তো এখন পাখিদের খাবার দিতে ভালবাসে, সে তো এখন আবার কাজে নেমে যেতে চায়। সবাই কাজ করছে। ওর বসে থাকতে ভাল লাগবে কেন। অথচ বাবা এমন জেনেও ওকে পুরোপুরি নিরাময় করে তুললেন না কেন। কোম্পানীর টাকা বাঁচিয়েছেন। তাড়াতাড়ি জাহাজে তুলে এনে কোম্পানীর বিষয় বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ তিনি এমন হয়তো প্রমাণ করেছেন।

    বন্ধু এখন রং করছে। জাহাজের খোলে রঙ লাগাচ্ছে। খালি বলে খুব ওপরে ভেসে উঠেছে জাহাজ। বন্দরে খোলের রং করা শেষ করে উঠতে পারে নি। বাকি যেটুকু আছে ফলঞ্চা বেঁধে বন্ধু রং করছে। সে ঝুলে আছে সমুদ্রের ওপর। ওর প্রতিবিম্ব জলে ভেসে চলে যাচ্ছে। দিন বড় বলে বেশ রোদ। ঘামে সে ভিজে গেছে। ক্রমে ইকুয়েডরে চলে আসছে জাহাজ। এবং রঙ্গিন ছবির মতো চারপাশের দৃশ্য। এসময়ে ছোটবাবু বন্ধুর একটা ছবি তুলে রাখছে। জ্যাকের ক্যামেরা দিয়ে সে পরপর ছবি তুলে যেতে ভালবাসে। এবং এভাবে একটা জাহাজ অসীম সমুদ্রে জল কেটে যাচ্ছে, শুধু যখন চারপাশে থাকে নির্জনতা আর এনজিনের একটানা যাই যাই শব্দ এবং দূরে দিগন্ত রেখায় মেঘের ছায়া। তখন হয়তো একটা শুশুকের অবিরাম জলে ভেসে থাকা ভীষণ বিস্ময়ের। ছোটবাবু খুব সন্তর্পণে তাও ক্যামেরায় ধরে রাখে।

    জ্যাকও এভাবে ছবি তুলতে ভালবাসে। যখন ছোটবাবু বসে থাকে চুপচাপ, যখন পাখি দুটো ওর পায়ের কাছে বসে থাকে অথবা মাথার ওপর উড়ে বেড়ায় তখন সে বোট-ডেক থেকে হাঁটু মুড়ে, জাহাজ, সমুদ্র ছোটবাবু পাখি দুটো মিলে একটা ছবি; আবার ছোটবাবু যখন বিকেলে ডেকে হেঁটে বেড়ায় তখনও ছবি এবং এভাবে অজস্র ছবি। জ্যাক যখন ফানেলের গুঁড়িতে চিপিং করতে বসে তখন ছোটবাবু ছবি তুলে রাখে জ্যাকের। জ্যাক যখন দূরবীণে সমুদ্র দেখে তখনও। ডেবিডের এভাবে অনেক ছবি উঠেছে। এভাবে ওরা কখনও বোট-ডেক থেকে, কখনও মাংকি আয়ল্যাণ্ড থেকে সমুদ্রের কখনও সমুদ্রে জেগে-ওঠা কোরাল আয়ল্যাণ্ডের যখন যেখানে ধরে রাখার মতো দৃশ্য থাকছে ক্যামেরায় ধরে রাখছে।

    এখন ওদের জাহাজ উইণ্ডওয়ার্ড দ্বীপের কাছাকাছি। কিছু কিছু বর্ণময় দ্বীপের পাশ দিয়ে জাহাজ যাচ্ছে। বোধহয় এভাবে ক্যারেবিয়ান সমুদ্রে ছড়িয়ে রয়েছে অজস্র দ্বীপপুঞ্জ। কোনটার রং সোনালী, কোনটা রুপোলী, কোনটা আবার সবুজ। নানা বর্ণের ফার্ণ গাছ চারপাশে। এমন কি ওরা কোথাও সমুদ্রের বালিয়াড়িতে বড় বড় শঙ্খ, কচ্ছপের খোল দেখতে পেল। নির্জন দ্বীপে সমুদ্রের বালিয়াড়িতে কতকাল অথবা আবহমানকাল ধরে এভাবে মরা কচ্ছপের খোল শামুকের হাড় শঙ্খ মাছের কঙ্কাল পড়ে আছে। রোদে শুকুচ্ছে, বৃষ্টিতে ভিজছে। কেবল ডেবিড সময় পেলেই বসে থাকছে দূরবীণ নিয়ে। কোনো মেয়েমানুষের প্রতিবিম্ব যদি সমুদ্রের জলে ভেসে বেড়ায়।

    জাহাজ পোর্ট অফ জামাইকাতে একদিনের জন্য থামবে। জল ও রসদ নিতে হবে। জ্যাক যখন এমন একটা খবর দিল তখন আবার সবার মাটিতে নেমে যাবার আকাঙ্ক্ষা।

    ডেবিড তেমনি বসেছিল বোট-ডেকে। ছোটবাবু পাশে বসে আছে। ডেবিড খুব নিবিষ্ট মনে দ্বীপের ভেতর চোখ চালিয়ে দিয়েছে। এবং ওর দূরবীণে গাছপালা ক্রমে সরে যাচ্ছে। ছোট বলল, এনি ওম্যান।

    —নো। সেকেণ্ড হতাশ গলায় বলল।

    —আমাকে দিন, আমি দেখছি।

    সেকেণ্ড বলল, তুমি খুঁজে পাবে না।

    ছোট বলল, কেন?

    —এত গাছপালা দেখতে দেখতে একসময় তন্ময় হয়ে যাবে। মেয়েমানুষের কথা তোমার মগজে থাকবে না।

    —কাল তো সকালে বন্দর ধরছে।

    —কেউ নামতে পারছে না।

    কেউ নামতে পারছে না যখন, তখন আর কি করা। ভোর রাতে জাহাজ বাঁদাছাঁদা হয়েছে। আসলে এটা যেন ঠিক বন্দর নয়। কারণ ওরা আর কোন জাহাজ দেখতে পেল না। সমুদ্র পাশে ছড়িয়ে আছে। খুব দূরে শহর। একটা ফিতের মতো কাঠের সাঁকো সমুদ্রের ওপর দিয়ে জাহাজের কাছাকাছি চলে এসেছে। একটা সাদা রঙের মোটরকার সকালের দিকে কেউ কেউ দেখতে পেল সেই কাঠের সাঁকোর ওপর দিয়ে আসছে। আর কিছু নেই চারাশে। কেবল কিছু সি-গাল এবং তাদের কলরব। দূরে বালিয়াড়ি দিগন্ত-বিস্তৃত। মাঝে মাঝে লাল নীল কাঠের ঘর ইতস্তত দেখা যাচ্ছে। সামান্য হাওয়া উঠলে সেই সব লাল নীল কাঠের ঘরের চারপাশে জলের ঢেউ চলে যাচ্ছে। ছড়িয়ে পড়ছে। টাগ-বোটে রসদ আসছে। রসদ ওঠানো হচ্ছে। বাটলার হিসাব মিলিয়ে সব নিচ্ছে

    তখনই এনজিন সারেঙ এসে ছোটর ফোকসালে উঁকি দিলেন। দেখলেন, ছোট নেই। কোথায় ছোট! ওপরে উঠে দেখলেন, ছোট মনু জব্বার বন্ধু সমুদ্রের জলে ছিপ ফেলে মাছ ধরছে।

    —তুই এখানে! শিগগির নিচে যা।

    ছোট বলল, আমি যাব না চাচা, মাছ ধরছি। নিচে যেতে ভাল লাগছে না।

    সারেঙ বললেন, তোকে বাড়িয়ালা ডেকেছে। জামাকাপড় পরে বের হতে হবে।

    ছোটর মুখটা সহসা সাদা হয়ে গেল। সে কিছু বলতে পারল না! ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। তাকে এ অসময়ে বাড়িয়ালা কেন ডাকবে! সে জাহাজের কাজে উপযুক্ত নয় তাকে নামিয়ে দিতে পারে এখানে। সে বলল, আমাকে কেন ডাকছে চাচা?

    —জানি না।

    —আমি আপনাকে বলেছি না পরিতে ঠিক কাজ করতে পারব। আপনি কিছুতেই দিলেন না, যেন সারেঙসাবই এজন্য দায়ী। সে বলল কাল থেকে কাজ করতে পারব। কাল থেকে কাজ করতে পারব বললে, নিশ্চয়ই বাড়িয়ালা এবারের মতো ক্ষমা করে দেবেন।

    সারেঙ বললেন, আমি কিছু জানি না, তোকে যেতে বলেছে, যা। ভাল জামা প্যান্ট পরে যাবি। বাড়িয়ালার সঙ্গে কিনারায় যেতে হবে তোকে।

    ছোট বোকার মতো তাকিয়ে থাকলে ফের সারেঙসাব বললেন, দেরি করিস না, বুড়ো মানুষ ক্ষেপে যাবে আবার। ওর কত কাজ।

    ছোট কেমন এবার বেয়াড়া হয়ে গেল। সে বলল, আমি যাব না। মৈত্রদা কোথায়। আঃ আমাকে কাজ দেবে না! বললাম, সব ঠিক, আমি ভাল আছি, ঠিক পরি করতে পারব, কিন্তু বাবুদের মাথাব্যথা। না, এখন না পরে। আমাকে ঠিক নামিয়ে দেবে এবার। আপনারা, সবাই এজন্য দায়ী হবেন।

    সারেঙসাব বললেন, মাথা গরম করিস না। তাড়াতাড়ি যা। কেন ডেকেছে, কেন তোকে কিনারায় নিয়ে যাচ্ছে আমি জানি না।

    —সঙ্গে কিছু নিতে বলেনি!

    —নারে না।

    কিছুটা ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ার মতো, কারণ তাকে নেমে যেতে হলে সব নিয়ে এই যেমন, তার টিনের সুটকেস, বেডিং, পুরানো বুট জুতো এসব নিয়ে নেমে যাবার অর্ডার হত। সে বলল, আপনি যাবেন না?

    —না।

    —আমি ওর সঙ্গে একা যাব! ছোটর মুখ দেখে মনে হয় সে একা গেলে ভয়েই মরে যাবে। এত বড় মানুষের সঙ্গে যাবে কি করে!

    সারেঙসাব বললেন, ঠিক জানি না। তুই একা যাবি, না আর কেউ সঙ্গে যাবে বুঝতে পারছি না। আমাকে কিছু কিন্তু বলেনি। সারেঙসাব আর দাঁড়ালেন না। ওঁর নামাজের সময় হয়ে গেছে। তিনি এখন সামান্য জলখাবার খেয়ে নামাজ পড়তে বসবেন। তারপর নানা রকমের কাজ। লোক এমনিতেই কম। একজন মাত্র ফালতু ছিল, সেও দুর্ঘটনার পর থেকে কিছু করতে পারছে না। ওকে কাজের সব দিক নানাভাবে সামলাতে হচ্ছে।

    ছোটবাবু বের হবার মুখে দেখল, সবাই ভিড় করেছে ওর ফোকসালে। কাপ্তান ডেকে পাঠালে একটা সাংঘাতিক কিছু ঘটনা। ওরা যেন ছোটকে দেখে খুব বিষণ্ন হয়ে গেছে। কেন ডাকছে, কি ব্যাপার, নানারকম প্রশ্ন। ছোট কেবল বলছে, জানি না। সারেঙসাবও বলতে পারলেন না। সে একটা সাদা হাফ সার্ট, কালো রঙের প্যান্ট পরেছে। পায়ে সাদা কেডস্ জুতো! সে খুব সাফসোফ, এবং নীল রঙের সামান্য নরম অল্প অল্প দাঁড়ি এখন যেন আরও বেশি লাবণ্যময়। সবাই ছোটকে দেখতে দেখতে ভাবল ভারি বিড়ম্বনা ছেলেটার। ছোট রাগে এবং ক্ষোভে ভেতরে ভেতরে ফেটে পড়ছে। চোখ মুখ ভারি থমথম করছে। সে কিনারায় কেন যাচ্ছে জ্যাক বিন্দু বিসর্গ জানায় নি। সে কারো সঙ্গে একটা কথা বলল না। মৈত্রদা, অমিয়, বাদসা মিঞা, ছোটকে চিফ-কুকের গ্যালি পর্যন্ত এগিয়ে দিল। আর ভিতরে যাওয়ার সাহস তাদের নেই।

    ছোট একা একা হেঁটে গেল। এলিওয়ে দিয়ে হেঁটে গেল। পাশের কেবিন বাঙালী সাহেবের। জাহাজে উঠে সে সবার চেয়ে বেশি সাহেব। যখন ছোটবাবু সবার সঙ্গে বেশ জমিয়ে নিয়েছে, তখন বাঙালী সাহেব ফিফথ-এনজিনিয়ার ওদের সবাইকে বেশি নেটিভ ভেবে নিয়েছে। তারপর ফোর্থ এবং শেষেরটায় থাকে বড়-মিস্ত্রি। সেই রাস্তাটা, যেখানে সে এক রাতে লম্বাছায়া নড়ে উঠতে দেখেছিল। এখন সবই কেমন ফাঁকা। দু’পাশে কাঠের কারুকার্য করা দেয়াল। সে ডাইনিং হলের সামনে এসেই দেখল, সিঁড়ি ধরে দু’পাটি শাদা জুতো, তারপর ক্রমে হাঁটু পর্যন্ত এবং শেষে সে বুঝতে পারল, বাড়িয়ালা নেমে আসছেন। পুরো জাহাজী পোশাকে তিনি নেমে এলেন। চারটা লম্বা সোনালী স্ট্রাইপ এবং উজ্জ্বল এত বেশি সব যে, সে কেমন বিস্ময়ে মানুষটির দিকে তাকিয়ে শুধু বলল, গুড মর্নিং স্যার।

    স্যালি হিগিনস বললেন, গুড মর্নিং। তারপর তিনি আরও কাছে এগিয়ে এলে ছোটবাবু যেন কি এক আশ্চর্য আকর্ষণে হাত বাড়িয়ে দিল। ভীষণ ভয় মনে মনে, এত বড় মানুষটা তার সঙ্গে হ্যাণ্ডসেক করবেন কিনা, সে নিজের মনুষ্যত্বের কাছে কেমন যেন তা না হলে অপমানিত হবে, যেই না ভেবে সে হাত বাড়িয়ে দিয়েছে, কি এক সাধারণ মানুষ তিনি, স্যালি হিগিনস সত্যি হাত বাড়িয়ে ওর সঙ্গে হ্যাণ্ডসেক করলেন। আর সঙ্গে সঙ্গে ছোটর যত ভয়, যা কিছু আতঙ্ক নিমেষে উবে গেল। মানুষটা তাকে নামিয়ে দিতে চাইলে সব খুলে বলতে পারবে। বলবে, আমি ঠিক পারব। আমার কোন অসুখ নেই। আমাকে জাহাজ থেকে দয়া করে নামিয়ে দেবেন না।

    স্যালি হিগিনস বললেন, এস।

    সে বাড়িয়ালার পেছনে পেছনে হাঁটতে থাকল। মেজ-মালোমের কেবিনের দরজায় হিগিনস স্টিকে দুবার ধীরে ধীরে টোকা মারলেন। বললেন সেকেণ্ড জলদি।

    ডেবিড ভাবতেই পারেনি এত তাড়াতাড়ি তিনি নেমে আসবেন। সে তাড়াতাড়ি মাথায় টুপি গলিয়ে বের হয়ে এল। সাদা জুতো ডেবিডের সাদা হাফ-প্যান্ট, সোনালী ব্রেড কাঁধে কলারে। ওরা দু’জন আগে আগে, সে পেছনে। গ্যাঙ-ওয়েতে ছোটবাবু আরও অবাক হয়ে গেল। জ্যাক দাঁড়িয়ে আছে। জ্যাক হাতে সোনার ব্যাণ্ড দেওয়া খুব বড় মাপের ঘড়ি পরেছে। গায়ে লতাপাতা ফুল-ফল আঁকা ঢোলা জামা, ঢোলা তসরের প্যান্ট সে পরেছে।

    তিনি নামতে নামতে কেমন নিজের মানুষের মতো বললেন, দেশে কে কে আছে তোমার ছোটবাবু?

    –সে সবার কথা বলল।

    —তুমি কি কিছু জানিয়েছ তাদের?

    ছোট ঠিক বুঝতে পারল না। সে দেখল সেই কাঠের সেতুর ওপর সাদা রঙের মোটরকার। বাড়িয়ালা তাকে প্রশ্ন করে গাড়ির ভেতরে গিয়ে বসলেন।

    ডেবিড বলল, বাড়িতে জানিয়েছ, ক্রোজনেস্ট থেকে লাফাতে গিয়ে যে পড়ে গিয়েছিলে?

    ছোটবাবু বলল, না।

    —এতদিন হাসপাতালে ছিলে, জানাও নি?

    সে বলল, না।

    আশ্চর্য! তিনি আর কোন প্রশ্ন করলেন না। তিনি কি ভাবলেন, তারপর বললেন, একজন বড় ডাক্তারের সঙ্গে পরামর্শ করতে যাচ্ছি। দরকার হলে এখানে একরে নেওয়া হবে। এবার তিনি আরও ধীরে ধীরে যেন বলে যেতে থাকলেন, প্রায় গীর্জার ফাদারের মতো, ছোটবাবু তোমার মাথার খুলি সামান্য ড্যামেজ হয়েছিল। বয়স কম বলে বোধহয় তেমন ভয়ের নেই। সেরে যাবে। মাঝে মাঝে এক্সরে নিলে ঘাবড়ে যাবে না।

    ছোট খুব মনোযোগ দিয়ে শুনছে। মাস্টার তার মতো সামান্য মানুষের সঙ্গে সোজাসুজি কথা বলছেন! ওর মাথায় কোন জটিলতা থাকতে পারে সে বিশ্বাস করতে পারল না। এমন একজন বড় মানুষের এমন কথার পর সে মরে পর্যন্ত যেতে পারে। একটা সাদারঙের গাড়িতে তারা বসে রয়েছে। সবাই চুপচাপ, চারপাশে সমুদ্র, বালিয়াড়ি, লাল নীল কাঠের ঘর। এবং বহু দূরে শহরের সবকিছু কুয়াশার মতো অস্পষ্ট। সে কিছুই যেন দেখছিল না। বাড়িয়ালার সাদা চুল ঘাড়ের পেছনে এবং কোঁচকানো চামড়া সে শুধু দেখতে পাচ্ছে। এক পাশে জ্যাক একপাশে ডেবিড, এর চেয়ে জীবনে কি আর বেশি সৌভাগ্য থাকতে পারে সে বুঝতে পারছে না। ডেকের ওপর সবাই দাঁড়িয়ে দেখছে ওদের। সামান্য একজন কোলবয়ের এই গৌরবময় যাত্রা বোধহয় নানা কারণেই জাহাজি জীবনে বড় আনন্দের। সে হাত নাড়ল ওদের।

    কাঠের সেতু পার হয়ে গেলে, সামনে পিচের রাস্তা। সমুদ্রে ঢেউ এসে মাঝে মাঝে টায়ার ভিজিয়ে দিয়ে যাচ্ছে। যেন জলের সঙ্গে গাড়িটার ছলাৎ ছলাৎ খেলা চলছে। জলকণা উড়ে এসে গাড়ির ভেতর ওদের মুখ ভিজিয়ে দিচ্ছে। জ্যাক ছোটবাবুকে আড়চোখে দেখছে। ছোটবাবু পাখি দেখছে আকাশের। জলকণার জন্য মাঝে মাঝে কাচ ভীষণ ঝাপসা হয়ে উঠছে। ছোটবাবু আকাশ দেখতে পাচ্ছে না, অস্পষ্ট সমুদ্রে ছোট ছোট ঢেউ দেখতে পাচ্ছে শুধু। জ্যাক কেবল তখন দেখতে পায় তার পাশে, ছোট, ছোটবাবু। কি যে তার সুষমামণ্ডিত মুখ! সমুদ্রের মতো গভীর চোখ। দু’পাশে ঝাপসা কাচে চোখ রেখে কেবল কি যেন খুঁজে বেড়ায়। তাকে দেখে না। ছোটবাবু কি তার মতো বয়সের কাউকে ফেলে এসেছে দেশে! জ্যাক তখন ভিতরে ঝড়ের খড়কুটোর মতো ছটফট করতে থাকে। তার কিছুই ভাল লাগে না।

    .

    আবার পাল তুলে দেবার মতো সমুদ্রে সন্ধ্যায় জাহাজ ভেসে গেল। গভীর সমুদ্রে জাহাজ। কিনার আর দেখা যাচ্ছে না। কেবল সেই ছলাৎ ছলাৎ শব্দ জলের। এবং যেসব পাখিরা উড়ে এসেছিল পেছনে, তারা আবার ডাঙ্গায় ফিরে গেছে। ছোটবাবু আর জ্যাক দাঁড়িয়েছিল রেলিঙে। সূর্য ক্যারেবিয়ান সিতে অস্ত যাচ্ছে। চারপাশে এক নীলাভ সোনালী আভা এবং একটা পাখি পর্যন্ত আকাশে নেই। শুধু সমুদ্রে দুজনের প্রতিবিম্ব ভাসছে। কেউ কোনও কথা বলছে না।

    জ্যাক একসময় আর থাকতে না পেরে বলল, ছোট তুমি কাউকে ভালোবাসো না?

    ছোট বলল, হ্যাঁ।

    —কে সে?

    —সে আমার লিটল গার্ল। মাই লিটল্‌ ডার্লিং। মাই প্রিন্সেস।

    জ্যাক কেমন গম্ভীর হয়ে গেল! সে যেন এক্ষুনি আবার পায়ে হান্টার সু পরে বের হয়ে আসবে। এবং বলবে, কিল দ্যাট বার্ড। কিন্তু জ্যাক ভীষণ দুঃখী গলায় বলল, ওর জন্য তুমি কিছু নিয়ে যাবে না। এমন কিছু আশ্চর্য জিনিস……

    ছোট বলল, হ্যাঁ, নিয়েছি তো।

    —কি নিলে?

    —একটা কম্বল নিয়েছি। শীতে বড় কষ্ট পেত। আর পাবে না। আমি বড় হয়ে গেছি। বলেই কেমন চোখ বুজে তার সেই ছোট রাজপুত্রীর কথা ভাবতে ভাবতে চোখ ঝাপসা হয়ে আসে। শীতের রাতে কুপি জ্বেলে সে হয়তো গোপনে এখনও জেগে থাকে। কখন দরজায় ডাকবে, মা আমি এসেছি। দরজা খোল।

    জ্যাক আর দাঁড়াল না। অভিমানে ওর চোখ ফেটে জল আসছে। সে তার কেবিনে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল।

    এবং রাতে, যখন জ্যোৎস্না উঠেছে সমুদ্রে তখন সবাই শুনল, খুব জোরে জোরে জ্যাক রেকর্ড বাজাচ্ছে। যেন কোন দূরবর্তী গীর্জায় কেউ ধর্মীয় সঙ্গীত পিয়ানোতে বাজিয়ে যাচ্ছে। কখনও উঁচু লয়ে, কখনও খুব নিচু লয়ে, একেবারে বৃষ্টিপাতের মতো। যেন কখনও সেই বৃষ্টিপাত, সমুদ্রে ধীরে ধীরে আবার ঝম্ ঝম্ শব্দ, আবার মিলিয়ে যাচ্ছে অনেক দূরে। বৃষ্টিপাতের অস্পষ্ট নীরবতার মতো চুপচাপ সব কিছু আবার। ছোটবাবু জানে না, জ্যাক এখন গানের সঙ্গে সুন্দর এক মিউজিক বাজিয়ে যাচ্ছে। যেন বলছে, আমি ফুটে উঠছি দ্যাখো। সে তার দু’হাত গোপনে, পৃথিবীর কেউ দেখতে পাচ্ছে না, তবু গোপনে কি যে ইচ্ছে থেকে যায়, সে দু-হাত ছড়িয়ে নিজের ছোট্ট ঘরটিতে আপনমনে নেচে যেতে থাকল। যেন নাচের মুদ্রায় শুধু এক আকাঙ্ক্ষা। লেট মি ন্যুম। আমাকে ফুটতে দাও। লেট মি ব্ল্যুম, ব্ল্যুম…… ব্ল্যুম………

  • সতের

    সতের

    ।। সতেরো।।

    এখন জাহাজ ইউকাটান প্রণালীতে ঢুকে গেছে। পোর্ট-অফ জ্যামাইকা ছেড়ে আসার তিন চার দিনের ভেতরই জাহাজ ম্যাকসিকো উপসাগর পেয়ে গেল। পেছনে পড়ে থাকল নানারকম দ্বীপমালা। যেমন কিউবা এবং তার পাশাপাশি অসংখ্য সব দ্বীপ। দ্বীপের ছড়াছড়ি এ-অঞ্চলটাতে। কত বিচিত্র সব নাম। ভূগোল বইয়ে এদের হয়তো কোনও উল্লেখ নেই। কোনো জরিপমালাতে হয়তো একটা বিন্দুর মতো রয়েছে এদের অবস্থান। তবু কি যে সুন্দর লাগে এদের পাশ দিয়ে যখন জাহাজ যায়। কিছুতেই বিশ্বাস হয় না পৃথিবীর মানচিত্রে এদের কোনও উল্লেখ নেই।

    এভাবে সমুদ্রের দু’পাশে জাহাজ ফেলে এসেছে নানারকম দেশ। পোর্টসাইডে রয়েছে বৃটিশ হণ্ডুরাস। অথবা গুয়াতেমালা, নিকারগুয়া এবং অন্যপাশে যেমন স্টারবোর্ডের কথাই ধরা যাক, আছে পশ্চিম ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জের অসংখ্য নারকেল গাছ অথবা আনারস কিংবা আখের খেতের ছবিয়ালা দ্বীপ, কিংবা বড় বড় পিচের হ্রদ। কিউবার পাশ কাটিয়ে কিছুটা নাক উঁচিয়ে ঢুকে যাবার মতো জাহাজটা এল-কুইয়োর পাশাপাশি এসে গেছে। এখন সোজা নব্বই ডিগ্রি বরাবর ওপরে উঠে গেলেই নিউ- অর্লিয়নস্ বন্দর। মিসিসিপির মুখে এই বড় বন্দরে জাহাজ আপাতত যাচ্ছে।

    ব্রীজে পায়চারি করছে তিন নম্বর মালোম। রাত তখন এগারোটা বাজতে দশ মিনিট। আর পুরো এক ঘণ্টা দশ মিনিট ওর ওয়াচের সময়। সময়টা যথেষ্ট, সে এ-সময়টুকুর ভেতর তার হাতের যা কাজ সেরে ফেলতে পারবে। লুক-আউট ডিউটিতে আছে পাঁচ নম্বর জাহাজি মান্নান। অস্পষ্ট অন্ধকারে আফটার-পিকের মাথায় ওর ছায়াটা নড়ছে। অন্ধকার রাত। চারপাশে কিছুই চোখে পড়ছে না। তবু মাঝে মাঝে কাচের ভেতর দিয়ে দূরবর্তী নিহারীকাপুঞ্জ দেখতে ভীষণ ভাল লাগে। আকাশ পরিষ্কার থাকলে এটা তার হয়। মন মেজাজ ভাল না থাকলে এটা হয়। সে সারাক্ষণ আকাশে নক্ষত্রমালা দেখে রাত কাবার করে দিতে পারে কারণ, তার মন ভাল না থাকলে চোখে ঘুম আসে না। সে যতদূর জানত, জাহাজ ভিকটোরিয়া পোর্ট থেকে নেবে লৌহ আকরিক। তারপরই জাহাজ হোমের দিকে মুখ ঘুরিয়ে দেবে কারণ কথা এমনই ছিল, কিন্তু জাহাজ বুয়েনএয়ার্স থেকে ছাড়বার সময়ই সে সব টের পেয়ে যায়। এবং সেই থেকে মন খারাপ।

    সে বাণ্টির চিঠি পেয়েছে। বাণ্টির সঙ্গে দু’বছরের পরিচয়। এবং কথা আছে সেকেণ্ড মেটের পরীক্ষায় বসে তারপর ভেবে ঠিক করা যাবে বিয়ের দিন। বাণ্টির চিঠি চারদিন আগে এসেছে। ওর বাবা তেলবাড়িতে চলে যাচ্ছে। ও এখন আপাতত একা আছে ব্রিমিংহামে। সে ভেবেছিল, থার্ড ফিরে গেলে কিছুদিনের জন্য ইউরোপের দেশগুলোতে ঘুরে বেড়াবে। যদিও পছন্দ করে না থার্ড, বরং সে যে-কদিন হোমে থাকে, অন্তত সে-কদিন কোথাও নড়তে চায় না। কোন বড় রাস্তা ধরে ওর হেঁটে যেতে ভাল লাগে। অথবা ওর বাবার খামারে আলু কিংবা বাঁধাকপির চাষ কেমন হল, সে বাবার সঙ্গে তখন খামারে খাটতে ভালবাসে। এবং এভাবে সে হোমে ফিরে গেলে কি কি করত মনে মনে ভাবছে। বাণ্টিকে সে যেখানে খুশি চুমো খেত অথবা কোন রেস্তোঁরাতে বসে হৈ-চৈ অথবা যদি কোন গীর্জা থাকে তার পাশে চুপচাপ নীরবে বসে থাকা, কিন্তু জাহাজ হোমে যাচ্ছে না বলে, সে কিছুটা কর্তব্যে শীথিল, কাজ করতে ভাল লাগছিল না। তবু তাকে কিছু কাজ সেরে ফেলতেই হবে। সময় পিছিয়ে দেওয়া একটা বড় কাজ। তাকে ওয়াচে ত্রিশ মিনিট ঘড়ির কাঁটা পিছিয়ে দিতে হবে। এ-ভাবে ঘড়ির কাঁটা পিছিয়ে দেওয়া এবং লগ-বুকে সব নোট করে রাখা তার কাজ। লুক-আউট- ডিউটির পাঁচ নম্বর জাহাজি তখন হঠাৎ দুম করে একটা বেল বাজিয়ে দিল।

    থার্ড অফিসার তাড়াতাড়ি স্টাবোর্ড-সাইডে ছুটে গেল। এবং ঝুঁকে দেখল—অন্ধকারে একটা জাহাজ উঠে আসছে। কিছু সিগনালিঙের কাজ থাকে তখন। হোয়াট সিপ, বাউণ্ড ফর দি পোর্ট, এ-সব জেনে নিতে হয়। কোথায় যাবে জাহাজ, কোন দেশের, কি লাইন। কোথা থেকে এল। এমন সব খবর নেওয়া দরকার। অথবা ওরা যে সমুদ্র পার হয়ে এসেছে, তার ওয়েদার রিপোর্ট—এবং এসব জেনে নেওয়া ভাল। অথচ মন খারাপ বলে সে কিছুই করল না। দুটো একটা সিগনালিঙ পাঠিয়ে যখন বুজতে পারল, না কোনোই জবাব পাওয়া যাচ্ছে না, জাহাজটা চলে যাচ্ছে, থার্ড মেট আর কোনও সিগনাল পাঠাল না। কাপ্তান বুড়ো মানুষ। এখন হয়ত তিনি জেগে থাকার নামে বেশ ঘুমোচ্ছেন। ওঁর কেবিনে সোজা তো ঢুকে যাওয়া যায় না। সে দু-একদিন দেখেছে, বেল বেজে উঠলে তিনি কেমন ফোলা ফোলা চোখে ওর দিকে তাকিয়ে দরজা টেনে বলেন, কাম ইন। বারোটা-চারটায় ডিউটি দিতে আসছে সেকেণ্ড-মেট ডেবিড। যদি লগ-বুকে কিছু নাও লিখে রাখে ডেবিড হয়তো কিছু বলবে না। কেমন ছেলেমানুষ ডেবিড। ডেবিড বয়সে বড় এবং সোজাসুজি কথা বলতে ভালবাসে বলে, থার্ড ডেবিডকে সবার চেয়ে বেশি মান্য করে থাকে। যত ঝামেলা বুড়ো কাপ্তানকে নিয়ে। ডেবিডকে তার ওয়াচ বুঝিয়ে যেতে হবে এবং যেহেতু এটা কাপ্তানের ওয়াচ, সে কাপ্তানের হয়ে কাজটা করে থাকে, তাকে বেশি ঝামেলা পোহাতে হয়। ওয়াচের পর প্রায় অনেকক্ষণ তাকে কাপ্তানের ঘরে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। যতক্ষণ তিনি সই না করে দিচ্ছেন, যতক্ষণ তিনি সবকিছু দেখে নিচে সই করে না দিচ্ছেন, ততক্ষণ সে যেতে পারে না।

    এবং এজন্য তাকে সব খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে হয়। এত বার সে নির্ভুল করতে চেয়েছে রিপোর্ট, কিন্তু কেন যে সে দেখেছে, কোথাও না কোথাও তিনি ঠিক ভুল ধরে ফেলেন। আজ সে যেন একটু স্বাধীনভাবে দেখতে চাইল, কাপ্তান সত্যি ঘুমোন কিনা। বুড়ো হলে যা হয়ে থাকে, খুব খুঁতখুঁতে স্বভাবের, যেন সবদিকে ঠিক নজর আছে এমন দেখাতে চান। এবং সে জানে মাস্টার যতই বড় কথা বলুক এত রাত পর্যন্ত জেগে থাকেন না; বরং তার পাশে ঘড়ি থাকে, ঠিক সময় হলে হয়তো তাঁকে জাগিয়ে দেয়। এবং এসব ভেবে যখন বেশ একটা মজা করা যাবে ভেবেছিল তখন কেন যে মনটা খচখচ করছে। কি জানি, যদি তিনি সত্যি জেগে থাকেন। সে তো বাণ্টির কথা ভাবতে ভাবতে কেমন অতলে ডুবে গেছিল। যেন লুক-আউট ডিউটির পাঁচ নম্বর জাহাজির সব দোষ। আরে বাবা সামনে পাহাড় কিংবা দ্বীপ-টিপ না পড়লেই হল। অন্ধকার। কিছু দেখা যায় না, চড়ায় জাহাজ আটকে গেলে ভয়াবহ ব্যাপার। দ্বীপ, পাহাড়, অথবা একেবারে নাক বরাবর জাহাজ এলে ভয়। কলিসান এড়াতে বেল বাজাও। কোথাও দূরে কি একটা জাহাজ নেমে যাচ্ছে—কি যে দরকার বুঝি না। আসলে ঘুম, এই মধ্যরাতে ভীষণ ঝিমুনি আসে এবং জেগে থাকার জন্যই কেবল যেন মাঝে মাঝে বেল বাজানো।

    মধ্যরাতে এভাবে মনটা খিচে গেলে সে দেখল ঘুম ঘুম চোখে ডেবিড এসে দাঁড়িয়েছে। কোয়ার্টার- মাস্টার মহসীন চলে যাচ্ছে। তিন নম্বর কোয়ার্টার মাস্টার এসেছে ওয়াচ বদল করতে।

    ডেবিড ঘুম ঘুম চোখেই বলল, কোনো খবর নেই?

    —কিসের খবর?

    —জাহাজ কোথায় যাচ্ছে।

    —নিউ অরলিনস্ যাচ্ছে।

    —সেটা আপাতত। তারপর কোথায়। পোর্ট অফ সালফার কথা ছিল, সেখানে যাচ্ছে না? সালফার বোঝাই হবে নিউ অরলিনসে। আবার শুনছি, জাহাজ আর চালাবে না কোম্পানী। জাহাজ এবার স্ক্র্যাপ করার অর্ডার হয়েছে।

    —স্ক্র্যাপ! বলছেন কি! এত রাতে এমন খবরে থার্ড কেমন হতবাক।

    —ভাঙ্গা জাহাজ! আর কতদিন চালাবে।

    —সেতো শুনেছি আরও ক’বার স্ক্র্যাপ করার কথা হয়েছিল।

    —হয়েছিল। এবারও হয়েছে। কিন্তু আমাদের কপাল যাবে কোথায়! শেষ পর্যন্ত হবে না। স্ক্র্যাপ করা যাবে না। অর্ডারে সই করবে কে!

    -কেন, কোম্পানীর যারা মালিক!

    —তুমি কিচ্ছু জান না। এ জাহাজে প্রথম সফর। জানবেই বা কি করে! পাইপে আগুন ধরাতে গিয়ে হাওয়ায় আগুন নিভে গেল ডেবিডের।

    —জানি কিছুটা, বলে ডেবিডের পাইপে আগুন ধরিয়ে দিল। বলল, একটা দুর্ঘটনা ঘটে যায়, আর কর্তৃপক্ষ স্ক্র্যাপ করতে সাহস পায় না।

    —তবে আবার কথা বলছ কেন! দেখে যাও। তবে যা অনুমান, সে যে অর্ডারই আসুক, আমরা বেঁচে থাকতে এর রহস্য উদ্ধার করতে পারব না। বেঁচে থাকতে এটা স্ক্র্যাপ করা হচ্ছে না।

    আসলে ওরা রহস্যের কথা বলতে গিয়ে এই জাহাজের এতদিন টিকে থাকার রহস্যের কথা বলছে। জাহাজের বয়সকাল নির্ণয় করা যাচ্ছে না। তবে এটা যে প্রথম মহাযুদ্ধের আমলের জাহাজ তার রেকর্ড কোম্পানীর ঘরে রয়েছে। কোম্পানীর ঘরে এর আগের নাম সিনারা, জার্মান সিপ এবং কোন এক সি-ডেভিল ছিল জাহাজের কাপ্তান। তার সব নানারকম কাহিনী আছে, এবং সেই সি-ডেভিল বার বার বিপদ থেকে উদ্ধার পেয়েছে এমন সব ঘটনাও নাকি কোম্পানীর ঘরে লিপিবদ্ধ আছে। আর আছে ওর কনভয়ে ছিল, কিছু যুদ্ধে আহত মানুষ এবং জাহাজটাকে যখন ধরে আনা হয়েছিল, তখন দেখা যায় ক্যাপ্টেন লুকেনার নিহত। তিনি তাঁর কেবিনে মৃত অবস্থায় পড়েছিলেন। ধরা পড়ার আগে আত্মহত্যা করেছিলেন। এটা একরকমের ইতিহাস জাহাজ সম্পর্কে। লুকেনার ধরা পড়ার মুহূর্তে সব নেম প্লেট, এবং কবে কোথায় জাহাজের নির্মাণ হয়েছিল তার সব হদিশ মুছে দিতে আদেশ দিয়েছিলেন। সেই থেকে জাহাজটা নামগোত্রহীনের মতো, তবু যা হোক ব্যাঙ্ক লাইন খুব সস্তায় কিনে জাহাজটাকে ফের সমুদ্রগামী করে তুলেছিল।

    সুতরাং জাহাজিদের মুখে নানা গুজবে শোনা যায় মাঝে মাঝে। যে জন্মায় না, সে মরে না। সিউল ব্যাংকের কোন জন্মসালই নেই, সে আদতে মরবে কিনা, অর্থাৎ তার কোন শেষ আছে কিনা কেউ বলতে পারে না। যদি জাহাজ নিউ-অরলিসে গিয়ে আর না চলে, অর্থাৎ স্ক্র্যাপ করার পাকা অর্ডার পেয়ে যায়—তবে কি যে মজা! ডেবিড তবে ঠিক একমাসের ভেতরই এবির কাছে চলে যেতে পারছে। বোধ হয় ডেবিড এমন একটা স্বপ্ন এতক্ষণ ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে দেখছিল। সে বলল, অল রাইট! অল-ও-কে? সে একটা স্বপ্ন দেখছিল তার চোখ মুখ দেখে তা বোঝা যাচ্ছে। স্বপ্নটা স্বপ্নই। তবে জাহাজ স্ক্র্যাপ করার কথা এখন উঠছে না। তবে উঠতে কতক্ষণ! সে স্বপ্নে দেখেছিল জাহাজের সব প্লেট খুলে দেওয়া হয়েছে। একটা কঙ্কালের মতো জাহাজের সব রিবগুলো বন্দরে ঝুলছে। ক্যাপ্টেন হিগিনস মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছেন জেটিতে; পাশে সে দেখতে পেয়েছিল ছোটবাবুকে। ছোটবাবু পুরো পোশাকে এবং বোধহয় কালো রঙের সুট এবং গোলাপী নেকটাই আর কি সুমহান চেহারা ছোটবাবুর। আর কি যেন স্বপ্নে, হ্যাঁ একজন ব্যালাড সিংগারের মতো মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে, সাটিনের ফ্রক গায়, ছোটবাবুর পাশে সেও দাঁড়িয়ে আছে। আর একজন, সে কে? কিছুতেই মনে আসছে না। সাদা দাড়ি, সাদা চুল, লম্বা মানুষ, বেশ লম্বা, মাথায় সাদা টুপি এবং কিছুটা তীর্থযাত্রীর মতো দেখতে। ক্যাপ্টেন হিগিনসের পাশে সেও মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। এতক্ষণে সে ধরতে পারল তিনি এনজিন-সারেঙ। প্রায় গোটা স্বপ্নটাই চোখের ওপর সত্য হয়ে দেখা দিলে ডেবিড উইংসের একপাশে গিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে গেল। থার্ড অফিসার নেমে যাচ্ছে। অন্ধকার রাতে, জাহাজের এমন একটা নীরবতার ভেতরও বোঝা যাচ্ছে, পাঁচ ছ’মাসেই সবার ভেতর ভীষণ একঘেয়েমি এসে গেছে। থার্ড- মেট নেমে যাচ্ছে, যেন ঘুমে টলতে টলতে নামছে। বড় শ্লথগতিতে সে নামছে। সে কি হাঁটতে হাঁটতে অথবা সিঁড়ি ভাঙতে ভাঙতে ঘুমুচ্ছে! সে কি কাপ্তানের ঘরে ঘুমের ঘোরে ঢুকে যাবে। ডেবিডের ইচ্ছে ছুটে গিয়ে থার্ড-মেটকে জাগিয়ে দেয়। কিন্তু তখনই মনে হল, দরজা খোলার শব্দ। থার্ড-মেট কাপ্তানের ঘরে পৌঁছে গেছে। তার আর নিচে নামার দরকার নেই।

    আসলে এটা হয় জাহাজিদের। সফরের সময় যত বাড়তে থাকে তত তিক্ততা বাড়ে। মেজমালোম ডেবিড যা জানত এখন তার উল্টো। সে ভেবেছিল জাহাজ যখন হোমে ফিরবে তখন, কিছুদিন হোমে থাকা, অন্তত ফের এই ভাঙা জাহাজে সফর করতে এক্ষুনি উঠতে হবে না। কিন্তু বুয়েনস্- এয়ার্সে চার্ট করতে গিয়ে বুঝতে পারল, জাহাজের গতি কাপ্তান পাল্টে দিচ্ছে। জাহাজ আপাতত আর হোমে ফিরছে না। কবে ফিরবে কেউ ঠিক বলতে পারবে না। স্বয়ং কাপ্তান নিজেও না। এমন এক কাজ নিয়ে জাহাজ ভেসে পড়বে যে, কেউ আর তখন হোমে ফেরার কথা ভাবতে পারবে না। এসব মনে হলেই মুখে ভয়ঙ্কর বিস্বাদ। আর তখন সারাটাক্ষণ সেই দূরবীণ, পোর্ট অথবা দ্বীপ দেখলেই যা হয়ে থাকে,একটু দেখে ফেলা এবং এসব দেখার ফলেই আজগুবি সব স্বপ্ন, না হলে জাহাজের নিচে কাপ্তান, এবং ছোটবাবু, অথবা ব্যালাড সিংগারের মতো মেয়ে এসব দেখার কি মানে! আর তারপরই যা হয়ে যায়, সে স্বপ্নে পাতলা কুয়াশার ভেতরে কি দেখতে পায়, এবং এভাবে তার রাতের পোষাক নষ্ট হয়ে গেলে মনে হয়, এক্ষুনি সে নিজে বড় একটা হাতুড়ি নিয়ে দমাদম ঘা মারবে জাহাজের বালকেডে। ভাঙ্গা জাহাজ সে একেবারে ভেঙ্গে দেবে।

    আর তখন কাপ্তান লগবুকে নুয়ে কী দেখছেন! কি যে এত দেখেন, থার্ড-মেট বুঝতে পারে না। প্রায় তো ঘুরেফিরে একইরকম রিপোর্ট। যতক্ষণ মাথা তুলে লগ-বুক ওকে ফিরিয়ে না দেবেন ততক্ষণ সে সোজা সরল বৃক্ষের মতো দাঁড়িয়ে থাকবে। এবং প্রায় এক নাগাড়ে বিড় বিড় করে পড়ে যাবার মতো, তিনি প্রতিটি কলামের ওপর অর্থাৎ যা যা আছে যেমন—সঠিক কি কোর্স জাহাজের, জাইরো কমপাসের কি কোর্স, জাহাজের যদি কিছু ভুলভ্রান্তি থাকে তারপর স্ট্যাণ্ডার্ড কমপাসের কি কোর্স এবং কি ডিভিয়েশন, বাতাসের গতিপ্রকৃতি, ওয়েদার এবং তার ভিজিবিলিটি, যদি সমুদ্রে ঝড় থাকে তার সি-হাইট, অবশ্য এখন ঝড় নেই বলে, কলামটা তার কাছে তেমন জরুরী নয়, বরং বাদ দিয়ে যাবার মতো পরের কলামে কি আছে দেখার সময় একবার কি ভেবে চোখ তুলে থার্ড-মেটকে দেখলেন, কিছু বললেন না। তারপর আবার টিক, এই শালা ভাঙ্গা জাহাজে কাপ্তানের নক্কিপক্কি বিরক্তিকর। থার্ড-মেটের ভীষণ ঘুম পাচ্ছে। অথচ মুখে হাসি হাসি ভাব। কি খুশী দাঁড়িয়ে থাকতে পেরে! কাপ্তানের জন্য সে এভাবে যে কতকাল দাঁড়িয়ে থাকতে পারে!

    তখনই ট্যাংক এবং বিল সাউন্ডিং-এর ঘরে এসে পেনসিলটা কানে গুঁজে ডান পাটা বাঁ পায়ের ওপর রেখে, ঠিক অনেকদিন আগের মতো যেন যৌবনেই আছেন হিগিনস্ এমনভাবে থার্ড-মেটকে দেখলেন। জাহাজের ড্রাফট ভীষণ কমে গেছে। খালি জাহাজ। ডিপ ট্যাংক নাম্বার ওয়ান, টু, থ্রিতে জল নেই বললেই চলে। এবং এভাবে জাহাজ নিয়ে চলা ভীষণ রিস্ক। এক নম্বর হোল্ডে দু নম্বর হোল্ডে জল যতটা থাকা দরকার তার চেয়ে কম। তিন নম্বর চার নম্বরে যতটা থাকা দরকার তার চেয়ে বেশি। এখুনি বড় মিস্ত্রি রিচার্ডের ঘরে রিপোর্ট পাঠিয়ে দিতে হবে জল কোথায় কি আছে! ওরা ওদের লগবুকে একবার দেখে নিক। কোথাও ভুলভ্রান্তি হতে পারে। এতসব খুটিনাটি দেখার পরে তার মনে হল কোর্স মেড গুড। তারপর তিনি নাবালকের মতো পাখি সব করে রব পড়ে যাবার ঢঙে পড়ে গেলেন—টোটেল আওয়ার্স ইউজড রাডার পাঁচ, ডি. এফ. —দুই তারপর দেখলেন ক্লক কতটা পিছিয়ে দেওয়া হল এবং ইফ এনি এংকোর বিয়ারিঙ। এতসব দেখেও শেষ হয় না, জাহাজের পজিসান ল্যাটিচুড লংগিচুড দেখলেন এবং পাশে দেখলেন অবজার্ভিং অফিসারদের সাইন।

    এত কি যে দেখার আছে। থার্ড-মেটের চোখে কি যে ঘুম! সে তবু একেবারে সোজা। কোন কষ্ট হচ্ছে, বুঝতে দিচ্ছে না। জাহাজ ভাঙ্গা বলে কাপ্তান ভীষণ খুঁতখুঁতে স্বভাবের! না কি এই জাহাজই মানুষটার সব। জাহাজের হাল তবিয়ত সব ঠিক না থাকলে মানুষটারও বুঝি কিছু ঠিক থাকে না। তার তখনই বুকে কম্প দিয়ে জ্বর আসার মতো হৃৎপিণ্ডে ওর জ্বর এসে গেল। যা খুব সাহসী মানুষের মতো মনে হয়েছে, এখন তাকে তাই হৃৎপিণ্ডে ঝড় তুলে দিচ্ছে। সিগনালিঙ না করে যেন ভালো করেনি। কাপ্তান আটটা বারোটায় সত্যি ঘুমোন না। আদৌ তিনি ঘুমোন কিনা এ মুহূর্তে বিশ্বাস করতে কষ্ট হল। মানুষটা কবে থেকে যেন এ-জাহাজে জেগেই বসে রয়েছেন। সে এখন কিভাবে যে পালাবে।

    আর তখন তিনি চোখ না তুলেই বললেন, খারাপ লাগছে?

    থার্ড-মেট মাথা চুলকাল।

    তিনি বললেন, এ-কাজে আসা কেন!

    থার্ড-মেট ভীষণ ঘেমে যাচ্ছে।

    –শরীর ভাল নেই?

    থার্ড-মেটের হাঁটুতে কাঁপুনি ধরে যাওয়ার মতো। এবং যেন এক্ষুনি মাস্টার চিৎকার করে উঠবেন, গেট এলংগ দেয়ার ইউ লোফার! কিন্তু তিনি তা না বলে শুধু বললেন, খুব শান্তভাবে, এ সেলর উইল এনডিউর মেনি এ হার্ডসিপ! সিগনেলিঙ সম্পর্কে তিনি একটা কথাও বললেন না, বললেন, ইউ মে গো, তিনি সই করে ছেড়ে দিলেন।

    তারপর তিনি শুতে যাবার আগে একবার নিচে নামেন। ঠিক নিচেই বনি ঘুমোচ্ছে। বনিকে নিয়ে মাঝে মাঝে খুব অসহায় বোধ করেন। এখন হয়তো মেয়েটা পা মুড়ে শুয়ে আছে। হয়তো এমন গরমেও পাখা চালাতে ভুলে গেছে। এবং দরদর করে ঘামছে। নিচে নেমে তাঁর কিছু করার থাকে না। কারণ ভেতরের দিকে দরজা বন্ধ। দরজা না খুললে তিনি কিছু দেখতে পান না। তবু এটা অভ্যাসের মতো, শুতে যাবার আগে একবার নিচে নেমে দেখা। বনি যত বড় হচ্ছে এবং তিনি যত বুঝতে পারছেন বনি এই জাহাজে এখন মেয়ের মতো থাকতে চায়, তত যেন তিনি সতর্ক হয়ে যাচ্ছেন।

    এবং এ ভাবেই হিগিনস আবার সিঁড়ি ধরে ওঠার সময় দেখতে পান, চারপাশে শুধু অন্ধকার, কালো সমুদ্র, কালো আকাশ, গভীর উজ্জ্বল নক্ষত্র, এবং সমুদ্রের ঠাণ্ডা বাতাস এখন মাংকি-আয়ল্যাণ্ডের ওপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে। তিনি তখন বুঝতে পারেন শেষ রাতের দিকে সমুদ্রের বাতাস ঠাণ্ডা হতে আরম্ভ করেছে। এবং এখন গিয়ে শুধু শুয়ে পড়া। শোবার আগে একবার নাইট অর্ডার বুকটা চেয়ে নেবেন। সেকেণ্ড-মেটকে বলে দিতে হবে, রাত তিনটেয় একটা বাতিঘর দেখা যেতে পারে, তখন যেন তাকে ডেকে দেওয়া হয়। এসব ভেবে কেবিনের ভেতর যা যা তিনি এই মধ্য যামিনী অন্তে করে থাকেন হাঁটু মুড়ে বসা খৃষ্টের মূর্ত্তির সামনে এবং দেখলেই মনে হবে, মহামহিম ঈশ্বরের কাছে একজন রণক্লান্ত সৈনিকের আত্মনিবেদন—মাথাটা নুয়ে আছে, সাদা চুল মাথায় কদম ফুলের মতো ধবধবে, পাশেই জ্বলছে একটা স্তিমিত আলো, এবং নানারকম সব মোটা বই, কিছু মানচিত্র, যদিও একধারে ওগুলো সরানো, তথাপি মনে হয়’যে যী সাস নিরন্তর এই জাহাজের সীমাহীন নির্ভরতা, কারণ তাঁর মাথার ওপরে তিনি আছেন। এবং নিচে লেখা, ও দাই লর্ড, ইয়োর সি ইজ সো ভাস্ট, এণ্ড মাই বোট ইজ সো স্মল….এবং তখনই মনে হল, একটা চাপা গোংগানি কোথাও থেকে উঠে আসছে। মনে হচ্ছে একদল লোক ছুটে আসছে নিচে, কেউ দৌড়ে পালিয়ে যাচ্ছে এবং অন্ধকারে এত রাতে এমন কোলাহল ভাবতেই দরজার সামনে চিৎকার, ঘোস্ট!!

    মিঃ হিগিনস কিছু বুঝতে পারছেন না! একেবারে হতভম্ব।

    বড়-মিস্ত্রি রিচার্ড এখন এলিওয়ের কার্পেটের ওপর সংজ্ঞাহীন। রিচার্ড কথা বলতে বলতে শেষ পর্যন্ত আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারেনি। চোখ গোল গোল, এবং লাল টকটকে। শরীরে কোন পোশাক নেই। আতঙ্কে বোধহয় ওর মাথা ঠিক ছিল না। সে বোধহয় কেবিন থেকে লাফিয়ে একদণ্ড দেরি করেনি। ছুটে আসার সময় বোধহয় চিৎকার করছিল ফলে কারো কারো ঘুম ভেঙ্গে গেছে। ওরা দরজা খুলে দেখছে এলি-ওয়ে ধরে বড়-মিস্ত্রি একপায়ে ছুটছে। উলঙ্গ হয়ে ছুটছে। গরমকাল, গায়ে পোশাক রাখা যায় না। যে-যার কেবিন থেকে দেখছিল। এবং ওদেরও খুব একটা শরীরে পোশাক ছিল না। তাড়াতাড়ি কিছু জড়িয়ে সবাই যখন কাপ্তানের দরজায় হাজির তখন সবাই দেখতে পাচ্ছে, কাপ্তান নিচে নেমে একটা পাতলা চাদরে বড়-মিস্ত্রির শরীর ঢেকে দিচ্ছেন। এবং সবাইকে বলছেন, ওকে ওর কেবিনে রেখে আসতে। ব্যাপার কিছু স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে না।

    আর তখনই বড়-মিস্ত্রি ফের ধড়ফড় করে উঠে বসল। সে শুনেছে মিঃ হিগিনস তাকে তার কেবিনে রেখে আসতে বলেছেন। সে ব্যাপারটা বুঝতে পেরে বলল, নো, নো…..। সবাই ভাবল যাক জ্ঞান ফিরেছে। সবাই কিছুটা যেন আশ্বস্ত। এখন তবে সত্যি কেবিনে পাঠানো যায় না। কে যেন ছুটে বড়-মিস্ত্রির জন্য একটা হাফপ্যান্ট নিয়ে আসতে গেল। কেউ ওর মুখে মাথায় জলের ঝাপটা দিল। বনি পর্যন্ত চিৎকার চেঁচামেচিতে জেগে গেছে। সেও ভুল করে ফেলেছিল। তাড়াতাড়ি গাউন খুলে লম্বা ঢোলা জামা, আর পাজামা পরে ওপরে উঠে এলে, সে না হেসে পারল না। এমন ধাড়ি মানুষটা একেবারে খোকা! ভূতের ভয়ে কেবিন থেকে পালিয়ে এসেছে, আর এই নিয়ে ঠাট্টা সোরগোল যত এমন সব হচ্ছিল তত রেগে যাচ্ছে বড়-মিস্ত্রি। মেসরুম বয়কে দিয়ে এক কাপ গরম কফি এনে খাইয়ে দেওয়া হয়েছে। এবং কাপ্তান এখন একটু ঘুমোবেন। জাহাজে বড়-মিস্ত্রির দায়িত্ব তাঁর চেয়ে কম নয়। অথচ এখন ছেলেমানুষের মতো ভয়ে ঘামছে। তিনি কিছুটা বিরক্ত না হয়ে পারছেন না। ঘোস্ট জাহাজে থাকে, এবং বয়স বাড়ার সঙ্গে এ-বিশ্বাসটা তার যে না হয়েছে তা না। তার জন্য এভাবে উলঙ্গ হয়ে ছোটা এবং চিৎকার চেঁচামেচি করে সবার ঘুম ভাঙ্গিয়ে দেওয়া ঠিক না। সব কিছু জীবনে সহজভাবে মেনে নিতে না জানলে জাহাজে আসা এবং কাজ করা শক্ত। অবশ্য এতটা তিনি রিচার্ডকে বলতে পারেন না, বলতে পারেন শুধু, কি দেখেছো?

    রিচার্ডের মুখ চোখ এখনও কেমন আতঙ্কে ডুবে আছে। সে শুধু বলল, ঘোস্ট! সে আর কিছু বলতে পারছে না। সাদা চোখে চারপাশে কি খুঁজছে!

    —কোথায়? কাপ্তান প্রশ্ন করলেন।

    রিচার্ড কিছু বলছে না আর। ওর টাকমাথা, গোলগাল ফুটবলের মতো চেহারা সত্যি ভারি হাস্যকর! কিছুটা এখন মানুষ না ভেবে, মানুষের ডামি ভাবা ভাল। দরজায় দাঁড়িয়ে আছে থার্ড-মেট। ভেতরের দিকে চিফ-মেট। সেকেণ্ড-এনজিনিয়ার ওর ঘাম মুছিয়ে দিচ্ছে।

    কাপ্তান জোরে পাখা চালিয়ে দিলেন, দরজা ফাঁকা করে দিতে বললেন, এবং বয়বাবুর্চি যারা ভিড় করেছিল, তাদের চলে যেতে বললেন। স্টুয়ার্ডের এখন অনেক কাজ, কখন কি লাগবে, কাপ্তান তাকে যেতে না বললে যেতে পারে না সে। সেও বাইরে বোট-ডেকে পায়চারি করছে। সেকেণ্ড-মেট এসে, ফিস ফিস করে কি বলে গেল বনিকে। বনি এবার হা-হা করে হেসে উঠল। এটা কাপ্তানের নিজেরও ভাল লাগল না, সবাই হয়তো একটু বেয়াড়া ভাবল বনিকে। কাপ্তান বনির দিকে চেয়ে বললেন, তুমি জেগে থাকবে না বনি। নিচে যাও।

    সুতরাং বনি আর থাকতে পারে না, বনি এমনিতে রিচার্ডকে পছন্দ করে না, বন্দরে বনি দেখেছে, খোঁড়া লোকটা ভীষণ ধূর্ত। ধূর্ত না হলে সব বন্দরেই সে মেয়ে পাবে কি করে! কি সব সুন্দর সুন্দর মেয়েরা এই ধূর্ত লোকটার কাছে ধরা দেয়। সে টাকা দিয়ে ওদের পুষে রেখেছে। যেন লোকজন ঠিক করাই আছে, অথবা সে এই গোটা পৃথিবীর অধীশ্বর, যখন যে বন্দরে থাকবে, সেখানেই ভোগের নিমিত্ত উপাচার। উপাচার না হলে এই ধূর্ত মানুষটা আরও শয়তান হয়ে যায়। যত শয়তান হয়ে যায় তত বেশি দাবার ছকে ঝুঁকে থাকে। ভেতরের অদম্য আকাঙ্ক্ষাকে সে কেমন নিজের প্রতিপক্ষ ভেবে খেলায় মেতে গিয়ে ভুলে থাকে! বনির এমনই মনে হয় খোঁড়া লোকটাকে দেখলে। ওর ইচ্ছে ছিল ক্রাচ দুটো বন্দরে ঢোকার আগে সমুদ্রে সবার অলক্ষ্যে ফেলে দেবে। এবং এভাবে যদি লোকটাকে অন্তত একটা বন্দরে অকর্মণ্য করে রাখা যায়। কিন্তু কি আশ্চর্য সে তার বাবার টেবিলের পাশে, এলি-ওয়েতে এমনকি বোট-ডেকে কোথাও ক্রাচ দেখতে পেল না। সে তাহলে একপায়ের ওপর ভর করে এতটা ওপরে উঠে এসেছে! সে নিজেই কেমন ভেবে ফেলল, রিচার্ড নিজেই একটা ভূত। ভূত না হলে সারাদিন সারামাস সমুদ্রে কারো সঙ্গে একটা কথা না বলে থাকা একেবারে অসম্ভব।

    তারপরই মনে হল, সেয়ানে সেয়ানে কোলাকুলি। জাহাজে তবে এই রিচার্ডের চেয়েও বড় ভূত আছে। সে রিচার্ডকে খুব কাবু করে ফেলেছে। বনির খুব ইচ্ছে হল ফের জোরে হাসে। সেকেণ্ড- এনজিনিয়ার কর্তার মুখে আতঙ্ক দেখে কি ভালমানুষ! যেন কিছু জানে না কিছু বোঝে না! বনি দরজা বন্ধ করার সময় বলল, আর্চি তুমি আরও বড় ভূত। সব আমি বুঝি। আমাকে পুরুষ ভেবেই এত, মেয়ে জানতে পারলে না কি করতে!

    সকালবেলা খবরটা জাহাজে ফের রটে গেল। বড়-মিস্ত্রি জাহাজে ভূত দেখেছে। এবং ভূত দেখে বড়-মিস্ত্রি সোজা এক পায়ে লাফিয়ে কাপ্তানের কেবিনের সামনে মূর্ছা গেছে। কাপ্তান এটা ক্রুদের ভিতর রটে যাক চাননি। তিনি বয় বাবুর্চিদের বলতে নিষেধ করে দিয়েছিলেন। স্টুয়ার্ডকে ডেকে বলেছিলেন, এসব ভূত টুত সংক্ৰামধ ব্যাধি। একজন দেখলে সবাই একে একে দেখতে থাকে। শেষ পর্যন্ত ভূতের ভয়েই জাহাজে বিদ্রোহ দেখা দেবে বিচিত্র কি! তিনি এই সব ভেবে শেষ পর্যন্ত স্টুয়ার্ডকে এমন বলেছিলেন। তাছাড়া রিচার্ড জাহাজে তার পরেই, এমন একজন মানুষের পক্ষে ভূত দেখা ঠিক না, দেখলেও আতঙ্কে হৈ-চৈ বাঁধিয়ে দেওয়া আরও বেঠিক। এবং তিনি নিজেও এ-বয়সে মাঝে মাঝে দেখতে পান এলিস তার পাশ কাটিয়ে কেবিনে ঢুকে যাচ্ছে, এমনকি মনে হয় গাউনের বাতাস শরীরে পর্যন্ত লাগছে! মাঝে মাঝে এলিসের শরীরে সঠিক আতরের গন্ধটা পর্যন্ত পান! কেবল মাঝে মাঝে খুব বেশি ভয় হলে বনিকে ডাকেন, তারপরই বুঝতে পারেন মনের ভুল। তিনি আগের মতো হয়ে যান। বনিকে বলেন, না কিছু না। আর কিনা রিচার্ড একটা আহাম্মকের মতো ভূতের ভয়ে মুর্ছা গেল!

    রিচার্ডের কেবিন পাল্টে দেওয়া হয়েছে। আর বিস্ময়কর ঘটনা, জাহাজে রিচার্ডের পেছনে পেছনে লরেনজো-মরকুইসের ঘাট থেকে উঠে এসেছে তাজা একজন ভূত। অথবা বলা যায় ঘাটে ঘাটে সেই এক মুখ, সে ভেবে পায় না এটা কি করে সম্ভব!

    রিচার্ড বলেছিল কাপ্তানকে, ডারবানে ওকে আমি ফের দেখি। শহরের একপাশে একটা অন্ধকার মতো জায়গায় সেই রেল ব্রীজ পার হয়ে, সেই এক মুখ, ওকে ধন্যবাদ জানিয়ে বললাম, ওর জন্য আমি জাহাজে ফিরে আসতে পেরেছিলাম, ও আমার জেব খালি না করে দিলে ঠিক কারো ঘরে চলে যেতাম। এসে দেখি মিলড্রেড আমার কেবিনে। ওকে ধন্যবাদ জানানো দরকার ভেবেছিলাম।

    হিগিনস আর্চি অথবা ডেবিড এমন শুনে প্রথমে ভেবেছিল পকেটমার-টার হবে। বড় বেশি নেশা করে পোর্টে নামলে এমনতো হবেই। কিন্তু পরে যা বলল রিচার্ড, তাতে ওরা বোকা বনে গেল।

    রিচার্ড বলেছিল, ধন্যবাদ জানাতেই দেখলাম অন্ধকারে মিশে গেল ছায়াটা। সঙ্গে সঙ্গে, বিশ্বাস করুন মিঃ হিগিনস ঈশ্বরের দোহাই, আমার কম্প দিয়ে জ্বর এসে গেল। কোথায় লরেনজোমরকুইস, কোথায় ডারবান, সেই লোকটা হুবহু এক রকমের দেখতে, আমি এতটুকু ভুল দেখিনি। মেয়েমানুষের দালালটা আমার পেছনে এভাবে কেন যে লাগল! কাকে আমি বোকার মতো ধন্যবাদ জানাতে গেলাম!

    সবাই চুপচাপ শুনে যাচ্ছিল। রিচার্ড শুয়ে আছে তখন। ওর পাশে সবাই জেগে। ওর কথা বলতে কষ্ট হচ্ছে বোঝা যাচ্ছিল। কাপ্তান সবটা না শুনে যেন নড়তে পারছিলেন না।

    —আমি কিন্তু কাউকে কিছু বলিনি। আমার সাহস তো কারো চেয়ে কম নয়, বলেই ফ্যাক ফ্যাক করে কেঁদে দিয়েছিল বড়-মিস্ত্রি। দোহাই আপনার মিঃ হিগিনস জাহাজ থেকে আমি নেমে যাব। আপনি অন্য কাউকে দেখুন।

    কাপ্তানের চোখ কপালে ওঠার দাখিল তখন। তিনি বলেছিলেন, তারপর?

    —তারপর ফের বুয়েনএয়ার্সে। বেশ কিছদিন ভাল ছিলাম। শহরে বেশ ক’দিন যাওয়া-আসা হচ্ছে। আর কিছু দেখছি না। বেশ ভাবলাম, ঘাড় থেকে ভূত নেমে গেছে। কিন্তু হায়, ঐ সেদিন, মানে যেদিন আপনার শহরে বেশ গণ্ডগোল, আইখম্যান পালিয়ে আছে, তাকে ধরার জন্য কারা ফাঁদ পেতেছে এবং গণ্ডগোল, সেদিন তো আপনি জানেন মিঃ হিগিনস্, কি কুয়াশা সারা শহরময়। বন্দরে আমাদের নামতে উঠতে পর্যন্ত অসুবিধা হচ্ছিল, সেদিন সন্ধ্যায় দেখি কুয়াশার ওপর দিয়ে ভেসে ভেসে এল, এসে ঠিক আমার মুখের ওপর ঝুঁকে, আমি কি করি বলুন, একেবারে মুখের ওপর দিয়ে অদৃশ্য হয়ে গেল। সেই মুখ, নীল পোশাক, কামানো দাড়ি গোঁফ দেখতে ইণ্ডিয়ানদের মতো। হুবহু এক, এক চেহারা। জাহাজে কখনও কোন বড়-মিস্ত্রি দালালদের পয়সা মেরেছে বলে জানি না। আপনি জানেন স্যার? পয়সা মারলে মরার পর শোধ নিতে পারে। আমি তো এক পেনি কাউকে ঠকাইনি! তবে আমার কেন এমন হল। আবার কান্না।

    কাপ্তান বিরক্ত হয়ে বললেন, মনের ভুল রিচার্ড। তুমি মনের ভুলে এ-সব দেখে যাচ্ছ। তারপর কাঁটার মতো ইণ্ডিয়ান কথাটায় খোঁচা খেলেন। তিনি তাকালেন চীফ-মেটের দিকে।—তুমি কিছু বুঝতে পারছ।

    চীফ-মেট বলল, নো স্যার।

    —তুমি? তিনি আর্চির দিকে তাকালেন।

    —নো স্যার।

    —আমাদের জাহাজের কেউ পিছু লাগেনি তো!

    আর্চি হাসল। এত সাহস তারা পাবে কোথায়?

    স্টুয়ার্ড ডাকল, স্যার।

    হিগিনস স্টুয়ার্ডের দিকে তাকালে সে কেমন আমতা আমতা করে বলল, কিছু একটা জাহাজে আছে স্যার। বলেই সে তার অভিজ্ঞতার কথা বলল। কারণ সে, রাতে কখনও কখনও সহসা জেগে যায়। তার মনে হয়, ঠাণ্ডা ঘরের দরজায় কেউ দাঁড়িয়ে আছে। সে উঠে দরজা খুলে দেখেছে স্টোর- রুমের দরজা তেমনি লক করা। সে তবু ভেবেছে ভেতরে যদি কিছু হয়ে থাকে! দরজা খুলে আলো জ্বেলে দিতেই ওপরে তেমনি কাপ প্লেট ডিস, নানাবর্ণের ক্রোকারিজ, এবং পাশে সিঁড়ি, নিচে নেমে গেছে। ডানদিকে সব্জির পাহাড়। ফল এবং ডিমের ঝুড়ি থাকে থাকে সাজানো। প্রচণ্ড ঠাণ্ডা, আর সামনে কোল্ড স্টোরেজ, বড় বড় গরু ভেড়া মুরগীর মাংস আস্ত হুকে ঝুলছে। কেউ ভেতরে টেবিল টেনে বসে নেই। বাটলার তখন ভীষণ ঠাণ্ডা মেরে যেত। শাক-সব্জি এবং মরা মাংস মিলে একটা উৎকট গন্ধ থাকত, ভয়ে সে তাও টের পেত না।

    ডেবিডও একবার ঘুরে গেছে, কেমন আছে রিচার্ড দেখার জন্য। সে এসে বলেছিল, কিছু হয়তো আছে জাহাজে। সে বলল, ছোটবাবুও ভূত দেখেছে। এবং তার সমর্থন চারপাশ থেকে। কাপ্তান জানেন, যে কেবিনে, রিচার্ড থাকে, ঠিক সেই কেবিনে, লুকেনার আত্মঘাতী হয়েছিল। যদিও এ-সব তিনি বাজে কথা ভেবে থাকেন, যদিও মাঝে মাঝে আবার মনে হয় হয়তো কোথাও এর সত্যাসত্য আছে, কারণ, তিনি এই সমুদ্র অথবা সৌরজগতের কতটুকু জানেন। তখনই রিচার্ড ফের উঠে বসেছিল, আপনি বিশ্বাস করুন মিঃ হিগিনস, বন্দরে না হয় হল, কিন্তু জলে, বিশ্বাস করুন আমার জন্য একটা ডিম একটা আপেল, অবশ্য ডিম একটা নয়, সে স্টুয়ার্ডের সঙ্গে বন্দোবস্ত করে একটার বদলে দুটো নেয়, দুটো নিতে পারে না, নেওয়ার নিয়ম নেই, সে সেজন্য একটা ডিমের কথা বলল।

    সে বলেছিল মিঃ হিগিনস আমার সঙ্গে রোজ মেসরুম-বয়ের ঝগড়া হত। সকালে আমি ডিমের অমলেট খাই। নিজেই করে নিই। একটা আপেল খাই, খুব সকালে। তখন কেউ ঘুম থেকে ওঠে না। কিন্তু ক’দিন থেকে দেখি টেবিল থেকে সব উধাও।

    হিগিনস মেসরুম-বয়কে ডেকে সব জেনে নিতে পারতেন। কিন্তু কি হবে! তিনি চুপচাপ শুনে যেতে থাকলেন।

    রিচার্ড বলেছিল ফের, প্রথম মনে হতো অধিক নেশার জন্য আমি ভুল দেখছি। একটা লম্বা কালো হাত, গলে পড়ছে পোর্ট-হোলে। কি কালো! তারপর কেমন শূন্যে ঝুলে থাকত আপেলটা কিছুক্ষণ। চোখের ওপর এমন ঘটলে কতদিন আমি মাথা ঠিক রাখি বলুন!

    রিচার্ড ফের বলেছিল, আজকে আমি কিছু খাইনি। মুখ শুঁকে দেখুন। সে প্রায় উঠে কাপ্তানের মুখের কাছে হা-হা করতে থাকল। কোনো গন্ধ আছে! নেই। তবে। আমি দেখলাম, পোর্টহোলে সেই মুখ, বীভৎস ভয়ঙ্কর। আমি নেমে যাব। আমি আর জাহাজে থাকব না। আপনি আমাকে কিছুতেই রাখতে পারবেন না মিঃ হিগিনস।

    হিগিনসের মনে হয়েছিল অকেদিন থেকে রিচার্ড একটা ভয়ের ভেতর পড়ে গেছে। ভয়ের ভেতর পড়ে গেলেই নানাভাবে মন দুর্বল থাকে। সে তখন কখনও লম্বা হাত, এবং বীভৎস মুখ দেখতে পায়। আপেল অথবা ডিম চুরি যাবার ব্যাপারটা বিশ্বাসযোগ্য মনে হচ্ছে না। বয়-বাবুর্চিদের স্বভাব খুব ভাল না। বড়-মিস্ত্রি যখন সব সময় মৌজে আছেন, তখন তারাও একটু মৌজে থাকার জন্য ছল চাতুরী খেলতে পারে। তিনি মেসরুম বয়কে ডেকে ধমকে দিয়েছিলেন। তারপর তিনি ঘড়ি দেখে বুঝতে পেরেছিলেন, সকাল হতে দেরি নেই। অন্ধকারে তিনি বোট-ডেকে উঠে গিয়েছিলেন। চারপাশের নিস্তব্ধ অন্ধকারে, আকাশের নক্ষত্রমালার ভেতর কি দেখতে দেখতে ভেবেছিলেন এভাবে এত সব মৃত আত্মা এই জাহাজে কবে থেকে রয়েছে! যেমন এলিস, তাঁর প্রথম পক্ষের স্ত্রী তিনি যেখানেই যান, এলিস তাঁকে ছেড়ে থাকে না। এলিস বোধহয় তাঁকে ছেড়ে থাকতে পারে না।

    সকালবেলাতে এটাও একটা খবর ছিল, কাপ্তান বোট-ডেকে ডেক-চেয়ারে ঘুমিয়ে আছেন। কেউ ডাকতে সাহস পায়নি। বনি এসে তাঁকে ডেকে তুলেছে এবং তখন বেশ বেলা হয়ে গেছে। এমন- ভাবে তিনি কখনও ঘুমোন না। বোধহয় স্বপ্নটপ্ন দেখেছেন, কী স্বপ্নে দেখেছেন মনে করতে পারছেন না। কেবল খুব দূরে যেন এক কুয়াশাজালে কেউ দাঁড়িয়ে থাকে সব সময়। আর বলছে আমাকে চিনতে পারছ?

    সে আর কেউ না। তার প্রথম পক্ষের স্ত্রী এলিস। কি করুণ আর বিষণ্ণ মুখ। হিগিনস কেমন ধীরে ধীরে তখন হাঁটতে থাকেন। বনি পাশে না থাকলে তিনি যেন চিৎকার করে বলতেন, না, আমি তোমাকে কখনও কোথাও দেখিনি। তুমি আমাকে প্লিজ কষ্ট দেবে না। প্লিজ প্লিজ….!

  • আঠার

    আঠার

    ।। আঠার।।
    অমিয় চুপচাপ বাংকে শুয়ে আছে। খুব হৈ-চৈ চলছে ডেকে এবং সবাই বড়-মিস্ত্রির ভূত দেখার ব্যাপারে নানারকম মন্তব্য করছে। তখনও নির্বিকার অমিয়। সে শুয়ে শুয়ে কোত্থেকে একটা প্যান- আমেরিকান গাইড-বুক পেয়েছে তাই পড়ছে। পৃথিবীর কোন বন্দরে, অথবা কোন শহরে ভাল খাবার, ভাল দৃশ্যাবলী আছে, এখন এটা জানা যেন তার বেশি জরুরী। ছোটবাবু নিচে বসে রয়েছে, সেও বের হয়নি। মৈত্র মুখ গোমড়া করে রেখেছে। যেন এখুনি অমিয়র ওপর ফেটে পড়বে।

    মৈত্র নিচে বসে রয়েছে বলে অমিয়র মুখ দেখতে পাচ্ছে না। সকাল সাতটায় সবার চা চপাটি খেয়ে পরীর জন্য ঠিকঠাক থাকার কথা, তখন অমিয় বই পড়ছে মনোযোগ দিয়ে। এবং ছুটির দিনের মতো অমিয় কখন উঠবে, কখন চা চপাটি খাবে ওরা যেন ঠিক বলতে পারে না। এই যে এমন একটা ঘটনা ঘটে গেল, যে কোন সময় অমিয় ধরা পড়তে পারে, তার জন্য তার যেন কিছু আসে যায় না। মৈত্র এতে আরো ক্ষেপে যাচ্ছে। এখন তো ওর উচিত বসে কিছু একটা পরামর্শ করা। দুটো ডিম, একটা আপেল যদি অমিয় একা খেত, ওরা যদি সমান ভাগে ভাগ করে না খেত, তবে মৈত্রের কিছু আসত না। অমিয় একা হ্যাপা সামলাতো। এখন যে চুরির দায়ে ওরাও ধরা পড়েছে। আর কি সাহস পোর্ট-হোল দিয়ে হাত বাড়িয়ে বড়-মিস্ত্রির টেবিল থেকে ডিম আপেল চুরি করে আনা- না ভাবা যায় না। রাগও হচ্ছে আবার কোথায় যেন একটা মায়াও গড়ে উঠছে। অমিয়র সাহস আছে।

    কিন্তু তারপরই যখন মৈত্রের মনে হয়, সেও আছে সঙ্গে, ধরা পড়লে ছোটবাবুও রেহাই পাবে না তখনই চিৎকার করে চুল ধরে টেনে নামাতে ইচ্ছে হয়। নামিয়ে দু লাথি, এবং চড়-থাপ্পড়। অথচ সে জানে, কোন গণ্ডগোলই করা যাবে না। চুপচাপ এখন হজম করে যাওয়া বাদে তাদের উপায় নেই। ব্যাপারটা কত দূরে গড়াবে কেউ বলতে পারে না। শুধু লক্ষ্য করে যাওয়া। অমিয়কে কতবার বলেছে, কিভাবে ম্যানেজ করছিস অমিয়, সে কিছু বলত না। কেবল বলত, খা শালা। হারামে পেয়েছিস খেয়ে নে।

    জাহাজে বাসী গোস্ত আর ডাল, বাসী বাঁধাকপি ভাজা এবং খেতে খেতে মুখে এমন অরুচি যে এই দুটো ডিম এবং আপেল মধ্যরাত্রিতে ওদের কাছে ভীষণ লোভের। ছোটবাবু মাঝে মাঝে পরিজ অথবা কেক নিয়ে আসে, মৈত্র জানে, জ্যাক ছোটবাবুকে খুব পছন্দ করে। ওদের ভাল কিছু হলে জ্যাক ছোটবাবুর জন্য রেখে দেয়। কখনও কমলা, কলা আবার ফ্রাইড এগ যখন সে আনতে পারে, সবাই বসে ভাগ করে খায়। ডেকে যে দুজন আছে অর্থাৎ বন্ধু আর অনিমেষ মজুমদার ওরাও তখন বাদ যায় না। মনু অথবা মান্নানকে একদিন ডেকেছিল খেতে, ওরা খায়নি। সাহেবদের গ্যালিতে শুয়োর রান্না হয় বলে, কিছুই ওরা খেতে চায় না। যত ভাল খাবার হোক ওরা খাবে না। সুতরাং জ্যাক আলাদা করে ভাল কিছু দিলে এক সঙ্গে পাঁচজন, এবং তখন অনিমেষ গ্যালিতে নেচে টব বাজাবে, দু-এক দানা খাবে, আর জাহাজ এবং জাহাজিদের জীবন সম্পর্কে ইতর রসিকতা। এভাবেই যখন দিন যাচ্ছিল, তখন অমিয়টা ওদের কি যে ফ্যাসাদে ফেলে দিল।

    অমিয় এখনো উঠছে না। মৈত্র নিচে বসে রয়েছে। অমিয় ওপরের বাঙ্কে, রেলিঙে কম্বল বিছানো, কেবল অমিয়র দুটো হাত, এবং বইটা দেখা যাচ্ছে। ডান পাটা সে বাঁ পায়ের ওপর রেখে নাচাচ্ছে সেটা সে দেখতে পাচ্ছে। যত অমিয় পা নাচাচ্ছিল, তত মৈত্রের রক্ত টগবগ করে ফুটছিল। হারামজাদা কি বুঝতে পারছে না, তারা কতটা বিপাকে পড়ে গেছে। অমিয় কি ওদের বিপদের মুখে ফেলে দিয়ে মজা দেখছে। সে আর তখন কি করে। সে ডাকল, অমিয়।

    ছোটবাবুর মুখ দেখলেই বোঝা যায় সে খুব উদ্বিগ্ন। এবং যা খবর তাতে বোঝাই যায় সব এই অমিয় করেছে। বড়-মিস্ত্রিকে উলঙ্গ করে ছেড়েছে।

    কোন সাড়াশব্দ না পেয়ে যেন একান্ত সোহাগে ডাকা—অমিয় তোকে ডাকছি আমি।

    —আমাকে দাদা তুমি ডাকছ! বলে একেবারে সুবোধ বালকের মতো নেমে পড়ল।—বল।

    —এখন কি হবে!

    —কিছু হবে না।

    —ওরা কি বুঝতে পারবে না বলছিস?

    —বুঝতে পারলে কি হল!

    —মাসতার দিতে বলবে। দ্যাখো এদের কেউ তোমার ডিম, আপেল চুরি করেছে কিনা!

    —তা দিলে কি করা! বলেই সে আবার কিসব দৃশ্যাবলী দেখা যেন তার বাকি। সে এসব না দেখে ফালতু কথাবার্তা শুনতে রাজী না, সে ফের মনোযোগের সঙ্গে পাতা ওল্টাতে থাকলে মৈত্র আর ধৈর্য ধরতে পারল না। চিৎকার করে উঠল, রাসকেল তোমার জন্য আমরা ঝামেলায় জড়িয়ে পড়ি! সে উঠে গিয়ে হয়ত একটা ঘুঁসিই মেরে দিত। ছোটবাবু একটা কথাও এতক্ষণ বলেনি, এবার সে বলল, কি হচ্ছে মৈত্রদা! পাগলের মতো কি করতে যাচ্ছ!

    মৈত্রের সত্যি খেয়াল হল, এটা করা ঠিক না। যা অমিয়র গোঁয়ার্তুমি, সে হয়তো মারামারি লাগিয়ে দেবে। এবং চিৎকার চেঁচামেচিতে সবাই ছুটে এলে, কিছু একটা বলতে হবে। সব কথা বলে দিতে পারে অমিয়। ও কেমন মরিয়া। জাহাজে ওঠার পরই মৈত্র এটা লক্ষ্য করেছে। কেবল কি ভাবে, আর বড় বড় কথা। এবং স্বপ্ন দেখতে ভালবাসে অমিয়। সে যে জাহাজে খালাসির কাজ নিয়ে এসেছে এটা একটা অজুহাত মাত্র। অমিয় জীবনে বড় কিছু করতে চায়। এমন একটা কিছু করে দেশে ফিরবে, যা দেখে ওর বাবা এবং ভাইয়েরা ভেবে ফেলবে, বাড়ির জাহান্নামে যাওয়া ছেলেটা রাজপুত্র হয়ে ফিরেছে।

    সুতরাং মৈত্র বাড়াবাড়ি কিছু করল না। চুপচাপ আবার নিজের জায়গায় গিয়ে বসে পড়ল।

    অমিয় বলল, কি দাদা চা ফা খাবে না। খিদে পায় না?

    মৈত্র কোন কথা বলল না। ছোটবাবু বলল, চাবি দাও।

    মৈত্র চাবি ছুঁড়ে ফেলে দিল।

    অমিয় সুড়সুড় করে উঠে গেল। লকার খুলে চা চিনি কনডেনস্ড মিল্ক বের করে সোজা ওপরে উঠে যেতে থাকলে, মৈত্র বলল, চা আমি খাব না।

    অমিয় সিঁড়ির মুখে থামল। সামান্য হাসল। তারপর ঠোঁট বাঁকিয়ে বিড়বিড় করে বলল, কি আমার জাহাজিরে! ভয়ে টেসে গেছে! বড় বড় কথা যত!

    আসলে মৈত্র নৌ-বিদ্রোহের সময় কি কি করেছিল, এবং কি কি কারণে সে দুবার জাহাজে ব্ল্যাক- লিস্টেড হয়েছিল তার ফিরিস্তি দেবার সময় দেখাতে চায় সে কতবড় জাহাজি, আর এখন!

    চা, অমিয় তিনটে মগে আলাদা আলাদা করে এনেছে। মৈত্রের জন্য একটা বেশি চপাটি। মৈত্র চপাটি বেশি খেতে ভালবাসে। এখন তাকে যে করেই হোক মৈত্রের সঙ্গে সমঝোতা করতে হবে। সে এসেই পায়ের কাছে বসল, এবং কিছুটা নিবেদনের ভঙ্গীতে চা-এর মগ আর চপাটি তুলে দিল হাতের কাছে।

    —খাব না বললাম!

    —খাও গুরু। তুমি শালা গুরু রাগ করলে আমাদের কি হবে! আর এমন করব না। এই দ্যাখো কানমলা নাকমলা খাচ্ছি। আচ্ছা তবু রাগ যাচ্ছে না, সে মৈত্রের পা টেনে একটা কল্পিত রেখা টেনে বলল, এই দ্যাখো নাকে খত দিচ্ছি, আর কি চাই বল!

    মৈত্র আর কি করে! তবু বুকটা ধুক্‌ধুক্ করতে থাকে, সিঁড়িতে কোনও পায়ের শব্দ দ্রুত নেমে এলে মনে হয়, এই বুঝি ফোকসালে ঢুকে সারেঙ বলবে, তোমরা বাপুরা বোট-ডেকে যাও। মাসতার দিতে হবে। অথবা ওপরে কেউ চিৎকার করে কথা বললেই বুকটা ধড়াস করে উঠছে। কেউ বুঝি এতক্ষণে টের পেয়ে গেছে, ডিম এবং আপেল, বড়-টিণ্ডালের ফোকসালে মাঝে মাঝে দেখা গেছে—সব কিছুর দায় বড়-টিণ্ডালের। আমাদের সারেঙ ঝুটঝামেলায় টানবেন না। এসব ভেবে মৈত্র খুব মুষড়ে পড়েছিল আর কিনা অমিয় এখন ঠাট্টা তামাসা করছে। তবু কেন যে মৈত্র অমিয়র ওপর রাগ করে থাকতে পারে না। ছোটবাবুও চা হাতে নিয়ে বসে রয়েছে, সে না খেলে কেউ খাচ্ছে না, তখন মৈত্র মাথা নিচু করে চা চপাটি খেতে থাকলে, অমিয় বলল, কেবল তুমি আমার দোষই দেখছ!

    ছোটবাবু বলল, এখন আর কথা না। যা বলার বাংকারে গিয়ে বলবি। জামাপ্যান্ট পাল্টে ওরা ওদের ওয়াচের পোশাকে তাড়াতাড়ি ওপরে উঠে গেল। সোজা বোট-ডেকে উঠে, আবার ফানেলের গুঁড়ি ধরে নিচে নেমে গেল। পেছনে ছোট। ছোটকে দেখেই জ্যাক দৌড়ে এসেছিল। রাতের এমন মজার ঘটনা, ছোটবাবুকে গোপনে বলতে না পারলে যেন ওর খাবার হজম হচ্ছে না। এতক্ষণ বোধহয় চিপিং হাতে কখন ছোটবাবু ওয়াচে নামবে তার জন্য অপেক্ষা করছিল জ্যাক। আর জ্যাকের যে কি করে ধারণা জন্মেছে, যত গোপন খবর, সব একমাত্র ছোটবাবুকে সে দিতে পারে। ছোটবাবু তার কোন ক্ষতি করতে পারে না।

    যদিও জাহাজে এ-খবর গোপন থাক কাপ্তান চেয়েছিলেন, কিন্তু পৃথিবীতে কেন যে কোন খবরই নানা কারণে শেষপর্যন্ত গোপন থাকে না। স্টুয়ার্ড প্রথমে বলেছিল চিফ-কুককে, আর কাউকে কিন্তু বলবে না, বড় সাব উলঙ্গ হয়ে ভূতের ভয়ে ছুটেছে এটা ক্রুদের ভিতর জানাজানি হোক তিনি চান না। সাহেব মানুষ ভূতের ভয়ে উলঙ্গ হয়ে ছুটবে, ছিঃ কি যে প্রেস্টিজের ব্যাপার—এই প্রেস্টিজ কথাটা শেষ পর্যন্ত সবার কানে উঠে গেছে। সেকেণ্ড-কুক ধর্মভীরু মানুষ গোয়ানিজ, অল্প অল্প বাংলা জানে, সে সত্যিকথা গোপন রাখতে পারে না, এবং খবরটা যেহেতু ভারি মজার, সকাল হতে না হতেই সমস্ত ফোকসালে গুজবের মতো ছড়িয়ে পড়ল। ওরা ঘুম থেকে উঠেই তারপর শুনছিল, জাহাজে ভীষণ কাণ্ড, আবার ভূত। ছোটবাবু, আর বড় সাব দুজনেই তবে ভূত দেখেছে। ছোটকে কেউ কেউ প্রশ্ন করেছিল, তোর ভূত দেখতে কেমন।

    সে বলেছিল, কি জানি মনে নেই। একটা লম্বা ছায়ার মতো দেখেছিলাম। কেমন ভয় পেয়ে গেলাম। আসলে মহসীন চাচা এজন্য দায়ী। এমন সব ভূতের গল্প জাহাজের করেছেন যে গভীর রাতে অন্ধকারে জাহাজের কোন গলিঘুঁজিতে দাঁড়ালেই মনে হয়, এই বুঝি একটা লম্বা হাত এগিয়ে আসছে। গা কেমন ছমছম করতে থাকে। আসলে বুঝতে পারি, কিছু না। মনের ভুল সব। কিন্তু অন্ধকার রাতে কিছুতেই সেটা বিশ্বাস করতে পারি না।

    এবং দিনের বেলায় ছোটবাবু সব বুঝতে পারে। রাতের বেলা কত সব আলো চারপাশে। মাস্তুলে, ডেরিকে, সর্বত্র এ-ভাবে আলোর মালা দুলে দুলে জাহাজের সব ছায়া কখনও ছোট কখনও বড় করে দেয়। এবং নিজের ছায়াই সে কতবার দেখেছে, কখনও লম্বা হয়ে যায়, খাটো হয়ে যায়। কে কোথা দিয়ে হেঁটে বেড়ালে তার ছায়া নিচে সহজেই এসে পড়তে পারে, এবং অস্বাভাবিক কিছু ভেবে, ভূত ভূত বলে চিৎকার করে ওঠা অসম্ভবের কিছু না। জ্যাক তখন নামতে নামতে অজস্র কথা বলছে। ছোট আগে, জ্যাক পেছনে, সিঁড়ি ভেঙ্গে নামছে। জ্যাক সব ঘটনা কানে কানে বলছে, আর বলেই হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ছে। কি যে উচ্ছ্বল! আর সহসা সে কেন যে বলে ফেলল, আর্চি আমার দিকে হাঁ করে তাকিয়ে থাকে, আমার ভয় করে ছোট।

    ছোটবাবুর এ সব শোনার সময় নেই। সে জ্যাককে নিয়ে বাংকারে ঢুকে যেতে পারলে বাঁচে। জ্যাক আসল খবর দিতে পারবে। কাপ্তান এ ব্যাপারে কিছু ভাবছেন কিনা, অর্থাৎ কোনও ইনভেস্টিগেশনে যাবেন কিনা, যদি যান তবে সেটা কখন, অথবা সে কি গোটা ব্যাপারটা জ্যাককে বলবে, জ্যাক এ- ব্যাপারে যদি ওদের সহায় হয়, এভাবে নানা ভাবনা তাকে পেয়ে বসলে দেখল, অমিয়কে নিয়ে মৈত্র নিচে নেমে গেছে। ওরও নামার দরকার। অন্য সব আগওয়ালারা এসে গেছে। সে ইচ্ছে করলে এখন নাও নামতে পারে। বাংকারে ঢুকে কথাবার্তা বলতে পারে জ্যাকের সঙ্গে। সে গাড়ি গাড়ি কয়লা ফেলবে, জ্যাক পাশে দাঁড়িয়ে কত অজস্র কথা বলবে তখন, আসলে সে আজ চায় শুধু একটা কথা জানতে, তারপর কাপ্তান কি করছেন?

    সে বলল, জ্যাক, বড়সাব আসলে সত্যি ভূত দেখেছেন তো!

    —কি যে বল না! সারাক্ষণ…বলেই মুখের কাছে দুহাতে এমন অঙ্গভঙ্গী করল যে, বেহুঁস, মাতাল, কি দেখতে কি দেখে থাকে, বাবার খেয়েদেয়ে কাজ নেই, ঐ নিয়ে পড়ে থাকবে। পাজি নচ্ছার মেস- রুম-বয়ের কাজ সব। বাবা নাকি খুব ধমকে দিয়েছেন, এসব ডিম-আপেল যেন আর কেউ চুরি না করে। আবার হলে কেলেঙ্কারি হবে।

    কিছুটা ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ার মতো যেন সে এখন অজস্র কথা বলে যেতে পারে, জ্যাক দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কথা বলতে ভালোবাসে। কখনও একটা বড় কয়লার চাঙের ওপর বসে কথা বলতে ভালোবাসে। আজ কথায় কথায় বার বার আর্চির কথা বলছে। আর্চিকে কি করে একটা বড় রকমের শিক্ষা দেওয়া যায়, সে তো এসব তার বাবাকে বলতে পারে না, বলতে গেলেই কাপ্তান ওর দিকে সংশয়ের দৃষ্টিতে তাকাবেন। তাহলে মেজ-মিস্ত্রি আর্চি কি টের পেয়েছে, বেঁটে-খাটো চৌকো মুখের লোকটা, কি টের পেয়েছে, জ্যাক আসলে মেয়ে। বনি, জ্যাক সেজে এ-জাহাজে ডঠে এসেছে। সুতরাং যা কিছু গোপন শলাপরামর্শ সে ছোটবাবুর সঙ্গে করতে পারে।

    ছোটবাবু বলল, হাঁ করে দেখছে তো কি হয়েছে!

    —না, এটা ভাল না ছোটবাব্!

    —কেন ভাল না।

    —সে তুমি বুঝবে না।

    সত্যি ছোটবাবু এসব বুঝবে কি করে! সাহেবদের ব্যাপার-স্যাপার আলাদা। সে এই প্রথম এদের ‘ দেখছে। মফস্বল শহরে সে একজন সাহেবকে দেখেছিল, তিনি পাদ্রী, গীর্জায় থাকেন। কলকাতা শহরে এসে সে দূর থেকে এদের চৌরঙ্গীপাড়ায় দেখেছে। কিন্তু এভাবে দৈনন্দিন জীবনে, কাজের সঙ্গে যুক্ত থেকে দেখা এই প্রথম। ওদের সব কিছুই সে সেজন্য ভীষণ সমীহ চোখে দেখে থাকে। সে বলল, তুমি খুব সুন্দর জ্যাক। তোমাকে সবাই দেখতে ভালবাসে।

    —তুমি ভালোবাসো না!

    সে বলল, হ্যাঁ। তোমাকে দেখতে আমার ভীষণ ভাল লাগে।

    —সত্যি!

    –সত্যি।

    জ্যাকের চোখ যে চকচক করছে ছোট টের পেল না। বাংকারে অন্ধকার। কয়লার ধূলো উড়ছে। এভাবে জ্যাকের এখানে বেশি সময় দাঁড়িয়ে থাকা ঠিক না। তাছাড়া এখন মৈত্রদা এবং অমিয় আসবে। জ্যাক থাকলে, খোলাখুলি কথা বলতে পারবে না। সে বলল, জ্যাক খুব ধুলো উড়ছে। তুমি যাও। আমি এখন কয়লা ফেলব। অনেক কাজ।

    যদিও ছোটবাবু জানে, জ্যাকের মর্জি হলে যাবে, মর্জি না হলে যাবে না। আবার এও দেখেছে, সেই দুর্ঘটনার পর থেকে জ্যাক আর ওর সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করে না। বরং জ্যাক আজকাল অতীব সুবোধ বালক যেন। ছোটবাবু যা পছন্দ করে না, জ্যাক তেমন কিছু করে না। জ্যাক এখন এ-বাংকারে থাকুক ছোটবাবু যখন চাইছে না, তখন জ্যাক কেমন মুখ ভার করে ওপরে উঠে যাবে ভাবল। দরজার মুখে এসে আবার ফিরে গেল। বলল, এই

    –কী! ছোটবাবু বেলচার ওপর ভর করে দাঁড়াল।

    —তোমার লিটল ডার্লিং তোমাকে চিঠি দেয় না?

    —না।

    —কেন?

    —সে অনেক কথা।

    —আমাকে বলবে না?

    —বলব না কেন?

    –কবে বলবে?

    —যে কোনো দিন।

    —তোমার লিট্ল ডার্লিংকে আমার ভীষণ দেখতে ইচ্ছে করে।

    —দেখাব। আমার কাছে ওর ছবি আছে।

    —তোমার কাছে ওর ছবি আছে।

    —আছে।

    জ্যাকের ভেতরটা গুড় গুড় করছে। ছোটবাবুর লিট্ল ডার্লিং দেখতে কেমন, নিশ্চয়ই বিশ্রী হবে। ওর মতো সুন্দরী হবে না, হে ঈশ্বর, সে যেন আমার চেয়ে দেখতে খারাপ হয়। ওর আরও কাতর প্রার্থনা, পৃথিবীতে ছোটবাবুর লিট্ল ডার্লিং না থাকলে কি হত! জ্যাক ইচ্ছে করলে ছোটবাবুকে ফোকসালে পাঠিয়ে এখনই সেই ছবি দেখতে পারত, কিন্তু সে কথাবার্তা বলে বুঝেছে, ছোটবাবু ভীষণ ব্যস্ত। তবু কেন যে ওর যেতে ইচ্ছে করছে না। সে বলল, এই।

    –কী! আবার দাঁড়াল ছোটবাবু। সে কয়লার গাড়ি ঠেলে নিয়ে যাচ্ছিল। জ্যাক যাচ্ছে না। আবার কি বলবে। গাড়ি রেখে সে পাশে এসে দাঁড়াল। জ্যাক দেখছে, ছোটবাবুর চোখ লাল, কয়লার ধূলো পড়লে চোখ লাল হয়ে যায়, এবং চোখের ভিতর কালো মণি দুটোতে তার কোন প্রতিবিম্ব পড়ছে না। একেবারে নিস্পৃহ চোখ। এবং তখন ইচ্ছে করে জ্যাকের, ছোটবাবুর বুকের জামা রাগে দুঃখে ফালা ফালা করে দেয়। এমন নিস্পৃহ চোখ দেখলে, জ্যাকের মনে হয়, ছোটবাবু ভাল না। ছোটবাবু আর দশজনের মতো তার কাছে।

    এবং এভাবে জ্যাক বাংকারে এলে আর সহজে যেতে চায় না। কেবল কথা বলতে ভালবাসে। কত রকমের কথা, মাঝে মাঝে ছোটবাবু না বলে পারে না, জ্যাক তুমি ওপরে যাও। কাপ্তান দেখতে পেলে রাগ করবেন। জ্যাক তার কথায় কর্ণপাত করে না। সে তার মতো অনর্গল কথা বলে যায়, এবং বাড়িটা ওদের কোথায়, আর কি গাছ আছে, কতসব গাছ, এই যেমন ইউকন গাছের কথা প্রায়ই জ্যাক বলে থাকে। কত লম্বা, আর কত বড় এবং কি গভীর নীলবর্ণের পাতা, তুষারপাতের সময় কখনও কখনও পাইনের জঙ্গল মনে হয় বাড়িতে গজিয়ে গেছে। নীলবর্ণের পাতার ওপর সাদা তুষারদানা, এবং তুলোর মতো পেঁজা পেঁজা ভাব গাছপালার চারপাশে, অথবা রিনরিন করে যখন তুষারপাতের শব্দ হয় জানালার কাঁচে, এবং যখন, নির্মল আকাশ থাকে ওদের বাড়ির মাথায়, দূরে লাইট-হাউসের আলো, সমুদ্রে নানা বর্ণের জাহাজ এবং সি-গালদের কোলাহল সমস্ত বন্দর জুড়ে তখন যদি কোন জ্যোৎস্না রাতে ছোটবাবু তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকত, তবে পৃথিবীর কোথাও বুঝি কোনও কষ্ট থাকত না। কেবলমাত্র ছোটবাবুর লিটল ডার্লিং তার সবকিছু কেমন বিষণ্ণ এবং দুঃখময় করে দিচ্ছে।

    তাছাড়া সে তো আর পারে না—সেইদিন থেকে সে ছোটবাবুর কাছে কেমন ছোট হয়ে গেছে। ছোটবাবুর কাছে সে খুব নিষ্ঠুর, অন্ততঃ সে আর একবার প্রমাণ করে দিতে চায় ছোট, আমি মেয়ে, তুমি বিশ্বাস কর আমি মেয়ে। আমাকে বাবা বনি বলে ডাকে। রাতে আমি সুন্দর পোশাকে শুয়ে থাকি। আমার মাথার ওপরে থাকে অল্প সবুজ আলোর ডুম। সিল্কের চাদরে আমার শরীর ঢাকা থাকে। তখন যদি তুমি আমাকে দেখতে ছোট, আমার ওপর তোমার কিছুতেই রাগ থাকত না।

    ছোট কখনও কখনও দেখত, জ্যাক নিরিবিলি চুপচাপ অন্ধকারে দাঁড়িয়ে আছে। কথা বলছে না। কেবল দেখে যাচ্ছে ছোটবাবুর কাজ। এবং ছোটবাবুর তখনই খারাপ লাগে, ওর সঙ্গে ওর মতো কথা বলার জাহাজে কেউ নেই। সে তখন আবার কাছে এসে বলে, জ্যাক, আমার লিট্ল ডার্লিংকে দেখলে তুমিও ভালবেসে ফেলবে। আমি যেখানে যাই, ওর ছবি আমার সঙ্গে থাকে।

    জ্যাক তখন বলত, আমি যাই ছোট।

    ছোটবাবু এভাবে বুঝতে পারত না, জ্যাক তখন আর দাঁড়াত না কেন, সোজা চলে যেত। দুদিন তিনদিন কোন কথা বলত না। ছোট তখন আবার ভয় পেতে শুরু করত জ্যাককে। জ্যাক কথা না বললে, জ্যাক ইচ্ছে করে বাংকারে নেমে না এলে, কখনও জ্যাকের সঙ্গে তার কথাবার্তা হত না। এবং এমনকি সে দেখেছে তখন কথাবার্তা হলেও, জ্যাক তার সেই ছোট্ট ছবির কথা একবারও বলত না। জ্যাক এমন ভাবে কথা বলত, যেন কখনও সে লিট্ল ডার্লিং-এর নামই শোনে নি। ছোটবাবু ও তখন একেবারে সব ভুলে অন্য কথা, জাহাজ নিউ-অরলিনসে যাচ্ছে, মিসিসিপি নদীর ভেতরে জাহাজ ঢুকে যাবে কি মজা! এবং আলাদা রোমাঞ্চ, সে ভূগোল বইয়ে পড়েছে, মিসিসিপি পৃথিবীর দ্বিতীয় বড় নদী। মিসোরি ধরলে, এটাই পৃথিবীর সবচেয়ে বড় নদী। আর মিসিসিপি সম্পর্কে ওরা সবাই এখন থেকেই দুটো একটা কিংবদন্তী শুনতে শুরু করেছে, জাহাজ যত এগুবে, মিসিসিপি সম্পর্কে সবাই তত কৌতূহলী হয়ে উঠবে। নদীর মোহনাতে জাহাজ ঢুকলেই বোঝা যাবে এসে গেছে, মিসিসিপি এসে গেছে! তখন সমুদ্রের জল আর নীল থাকবে না। একেবারে হলুদ রঙ, অথবা গৈরিক রঙ বলা চলে। ঘোলা জল, যেদিকে তখন তাকানো যায়, কেবল অজস্র পাখি, দলে দলে ওরা আকাশের ওপর হাজার হাজার, তারও বেশি, কত যে পাখি—সি-গাল, মিউল হগস্‌, সি-পিজিয়নস এবং এ্যালবাট্রসও আছে মাঝে মাঝে কেবল অনবরত ঘুরে ঘুরে মোহনার ওপর যেন চক্রকারে সেই কবে থেকে ওরা উড়ছে। এবং নতুন জাহাজ দেখলেই ঘুরে ঘুরে ওড়া, অথবা নদী তার মোহনায় কত সব খাবার ভাসিয়ে নিয়ে আসছে তাদের জন্য। আর নিচে বোধহয় অজস্র মাছ, যেন এক বিস্তীর্ণ জলাশয়ে পাখি মাছ মানুষ মিলে এক আশ্চর্য মিউজিক তৈরী করে ফেলে! মাছেরা নিচে সব ছোট ছোট দ্বীপের চারপাশে সাদা পাখনা মেলে ঘুরে বেড়াচ্ছে, ওপরে পাখিরা নীল নির্জনতার ভেতর, আর তার ভিতর এক সাদা জাহাজ যাচ্ছে, সাদা পোশাকে দাঁড়িয়ে আছে জ্যাক, পাশে নীল রঙের পোশাকে দাঁড়িয়ে আছে ছোটবাবু। এভাবে একদিন সত্যি ওরা নদীর মোহনায় দূরের ছায়া ছায়া মেঘের মতো ভেসে থাকা কিনারার ছবি দেখতে দেখতে মুগ্ধ হয়ে গেল।

    ছোটবাবু বলল, জ্যাক আমরা কাল বন্দর পাচ্ছি?

    জ্যাক বলল, হ্যাঁ।

    —আমরা ক’দিন থাকব?

    জ্যাক বলল, জানি না।

    —মাস্টার তোমাকে কিছু বলেন নি?

    —না।

    —তুমি বেড়াতে যাবে না?

    —কোথায়?

    —কিনারায়।

    —জ্যাক বলল, বাবার সঙ্গে আমার কিনারায় যেতে ভাল লাগে না ছোট।

    ছোট বুঝতে পারে, জ্যাকের দুঃখটা কোথায়। কাপ্তান বুড়ো মানুষ, বন্ধু-বান্ধব অথবা এজেন্ট অফিসের যারাই আসেন সবাই যেন প্রায় তার বাবার সমবয়সী, ওরা ওর বাবার সঙ্গেই বেশি কথা বলতে ভালবাসে! সে চুপচাপ তার বাবার পাশে বসে থাকে মাত্র। হয়তো তখন রাস্তায় শীতের বিকেলে ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা হৈ-চৈ করছে, কোনও বড় মাঠে, দেবদারু গাছের মতো দাঁড়িয়ে আছে অজস্র পাইন, অজস্র পাইনের জঙ্গল ভেদ করে একটা সরু রাস্তা অনেক দূরে সীমাহীন গভীরতায় ঢুকে গেছে, তখন সেই গাড়ি তার ড্রাইভার অথবা রিনরিন বাজনার মতো সেইসব পাহাড়ি রাস্তায় বোধহয় জ্যাকের ঘুরে বেড়াতে ভাল লাগে। অথবা কোনও বড় কার্নিভালে হৈ-চৈ করা, মুখোশ মুখে লাগিয়ে ঘুরে বেড়ানো ভারি মজার—জ্যাক এসবই পছন্দ করে কিন্তু বুড়ো কাপ্তানের সঙ্গে গেলে জ্যাক বোধহয় সেসব পায় না। কেবল সব ভারি ভারি কথা। মজার কথা কেউ তার সঙ্গে বলে না। জ্যাকের তো ভীষণ একঘেয়ে লাগারই কথা তখন।

    সে বলল, জ্যাক, তুমি তবে আমাদের সঙ্গে যাবে?

    —কোথায়?

    —তুমি আমি আর ডেবিড একসঙ্গে বের হবো। বেশ মজা হবে।

    —কোথায় যাব আমরা?

    —ডেবিড আমাদের যেখানে নিয়ে যাবে।

    —সে কোথায় যাবে ছোট?

    —তা তো জানি না। বলেছে, নিউ-অরলিনসে আমরা বেশ ক’দিন থাকব। ইচ্ছে করলে নাকি আমরা গাড়িতে বেটন-রুজ পর্যন্ত ঘুরে আসতে পারি।

    —বাবাকে বলব।

    তখনই মিঃ স্প্যারো বয়-কেবিনের মাথায় বসে ওদের দেখছে। আর মিসেস স্প্যারো বেশ হাওয়ায় দুলে দুলে উড়ছে। কোথা থেকে তখন উড়ে আসছে বড় একটা সি-গাল। সঙ্গে সঙ্গে পাখিদুটো ভয় পেয়ে একেবারে জালির ভেতর দিয়ে উড়ে গেল। এবং সাঁ-সাঁ করে বের হয়ে যাচ্ছে বড় সি-গালটা। জ্যাক পাখিটাকে তাড়িয়ে দেবার জন্য হাতে একটা ভাঙা লোহার টুকরো নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকল। বোধহয় জ্যাক অথবা ছোটবাবুর মারমুখো চেহারায় ভয় পেয়েছে পাখিটা। ওটা আর উড়ে এল না। এবং ছোটবাবু বুঝতে পারল, এই মোহনায় পাখি দুটো নিরাপদ নয়। ওরা এখন জালির ভেতর ঢুকে গেছে। নিরাপদে রয়েছে, ওরা বোধহয় মোহনা পার না হলে আর বের হবে না। এবং তখনই ছোটবাবু ফের বলল, আমরা ক্যারলটনে যেতে পারি, একটু দূরে গেলে বনেটকারে আরও দূরে গেলে কলেজ- পয়েন্ট। শেষ পর্যন্ত ডেবিড বলেছে, আর খুব দূরে গেলে বেটনরুজে। একদিন না হোক দুদিনে ফিরে আসা যেতে পারে। নদীর পারে আশ্চর্য সব জায়গা। মিসিসিপিকে যতটা পারি ভেতরে ঢুকে দেখে আসব।

    আর তখনই হৈ-চৈ-প্রিয় ডেবিড ছুটে আসছে। সেই দূরবীন গলায় ঝুলছে। যত জাহাজ এগুবে, এই দূরবীনে ডেবিডের চোখ তত বড় হয়ে যাবে। আর যত রাগ জ্যাকের এই দূরবীনটাকে নিয়ে। ছোটবাবুকে ডেবিড নষ্ট করে দিচ্ছে এবং সঙ্গে সঙ্গে সে বলল, আমি তোমাদের সঙ্গে কোথাও যাব না ছোটবাবু। তারপর এক মুহূর্ত দাঁড়াল না। সে সিঁড়ি ধরে ওপরে উঠে গেল।

    এবং এখন বিকেল। চারটা বেজে গেছে বলেই ডেবিডের ছুটি। তার এখন শুধু আবার আগের মতো বসে থাকা। পশ্চিমে পাহাড়ের ওপাশে অথবা সানফ্রান্সিসকো কিংবা লস এঞ্জেলসের সমুদ্রে সূর্য অস্ত যাচ্ছে, কারণ যখনই সূর্য অস্ত যায় সে ভেবে থাকে, সমুদ্রে সূর্য ডুবে যায়। পৃথিবীর আহ্নিক গতি বার্ষিক গতির কথা তার ভাবতে ভাল লাগে না। সমুদ্রে সূর্য ডুবে গেছে না ভাবতে পারলে এমন একটা জাহাজের বোট-ডেকে দূরবীন চোখে বসে থাকার মানে হয় না। কারণ ওর কাছে পৃথিবীর সব যুবতীরাই তখন ভীষণ দামী। একবার দূরবীনে দেখে ফেলতে পারলে, তাদের সব কিছু যেন দেখে ফেলে, এবং তখন জিভ লালায় ওর মোটা হয়ে যায়। ঠোঁট সে জিভের লালায় ভিজিয়ে রাখতে ভালবাসে। স্ত্রী এবির কথা মনে থাকে না। ছোট্ট মেয়েটি ফোলা ফোলা মুখে জানালায় দাঁড়িয়ে হাত যে নেড়েছিল, এবং রাস্তাটা যেখানে বাঁক নিল, গাড়িটা যেখানে অদৃশ্য হয়ে গেল, দূরবর্তী বাড়ির জানালায় কেউ তখনও দাঁড়িয়ে আছে, চোখে জল, এসব মনে থাকে না। সে কেমন গাউন আর তার ভেতরে এক অহমিকাময় যুবতীর শরীরের সুন্দর সুদৃশ্য জায়গাগুলো ভেবে ভেবে স্ত্রীর মুখ একেবারে ভুলে থাকে। এবিকে পেলে সে বোধ হয় তখন বুকে মুখ লুকিয়ে বলত, জাহাজে গেলে আমি ভাল থাকি না। তুমি কেমন থাকো আমার খুব জানতে ইচ্ছে করে। কিন্তু এবি চিঠিতে তাকে কখনও এ-সম্পর্কে কিছু লেখে না। ওর ভীষণ রাগ হয়, অভিমান হয়। কেবল চিঠিতে, ওর শরীর, ওর নাওয়া-খাওয়ার কথা থাকে। ছেলে-মেয়েদের কথা থাকে। কে কি দুষ্টুমি করেছে, অথবা স্কুল ক্রিকেটে বড় ছেলে ক্যাপ্টেন হয়েছে বলে বাড়িতে কে কে নিমন্ত্রিত হয়েছিল এসব লেখা থাকে। জমিতে এবার ক্যাবেজ কেমন হয়েছে লেখা থাকে। মটরশুঁটির চাষ মনে হয় ভালই হবে। টমেটো খুব হয়েছে। গরুগুলোর খবর থাকে। গম চাষ বোধহয় ভাল হবে না খুব, এসব লিখে জানায়। ওর যে একটা শরীর আছে, এবিও যে একটা শরীর বয়ে বেড়ায় চিঠিতে তা কিছুতেই বোঝা যায় না। ছোট দাঁড়িয়েছিল। ওর রাতে ওয়াচ। সে এখানে এখন অনায়াসে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে পারে। ডেবিড একটু দূরে বসেছে। জ্যাককে দেখেই ডেবিড বোধহয় খুব আনন্দ প্রকাশ করেছিল, পোর্ট, আবার পোর্ট, কিন্তু জ্যাক চলে যাওয়ায় ডেবিড বোধহয় একটু আহত হয়েছে। সে চুপচাপ বসেছিল, পাশে ছোটবাবু রয়েছে এটা যেন সে দেখতেই পাচ্ছে না। সে নিজের মতো দূরবীনে নদীর মোহনায় পাখিদের ওড়া দেখছে। এবং পাখিগুলো যে খুব বড় আকারের হয়ে যায়, উড়তে উড়তে একেবারে মুখের ওপর মনে হয় হাওয়া কাটিয়ে ওপাশে চলে যায়, ছোটবাবু দূরবীন চোখে না দিয়েও এটা বুঝতে পারে।

    ছোট ডাকল, এনি ওম্যান?

    উত্তর এল, নো।

    ছোট ভাবল, এ সময় হয়তো কিছু বলা ঠিক হচ্ছে না। এই মোহনায় মেয়ে পাবে কোথায়। কেবল দূরে দু-তিনটে জাহাজ দাঁড়িয়ে আছে। ওদেরও এবার দাঁড়িয়ে পড়তে হবে। পাইলট-বোট আসবে। পাইলট এবার ভার নেমে জাহাজের এবং জাহাজ নদীতে ঢুকে গেলে, দু’পাড়ে হয়তো গাছপালার ফাঁকে ওম্যান দেখে ফেললেও ফেলতে পারে। এখানে শুধু পাখি, ঘোলা জল, এটা হয়তো সেকেণ্ড রসিকতা ভেবে থাকতে পারে। ছোটবাবুর ভয়ে বুকটা গুড়-গুড় করে ওঠে। ওর মুখটা ভীষণ ফ্যাকাশে হয়ে গেল ফের।

    আর তখনই ওরা দেখল দূর থেকে পাইলট-সিপ বেগে চলে আসছে। কিনারার বার্তা বয়ে আনবে। চিঠি আনবে। সেকেণ্ড লাফিয়ে উঠে পড়ল। চিৎকার করে বলল, আসছে আসছে। ছোটবাবুকে দেখিয়ে বলল, ঐ দ্যাখো আসছে। ওটা আমাদের নিয়ে যাবে মিসিসিপির ভেতর। এখানে এলেই আমার মনে হয় ছোট, আমরা যেন মার্ক টোয়েনের জগতে এসে গেছি। তুমি পড়েছ লাইফ অন দি মিসিসিপি, পড়েছ?

    ছোট খুব সহজ গলায় বলল, নো স্যার।

    সেকেণ্ড পিটপিট করে তাকাল। বুঝতে চেষ্টা করল ছোটবাবু এত সম্মান দিয়ে কথা বলছে কেন। তারপরই কি বুঝতে পেরে হা হা করে হেসে ওর কাঁধে জোরে চাপড় দিল, কি জান ছোট, মনটা ভাল নেই। ভেবেছিলাম দেশে ফিরব। কিন্তু সব বাতিল। বাড়ির জন্য মনটা মাঝে মাঝে খারাপ হয়ে যায়। তারপর একটু থেমে সেই পাইলট-বোটের দিকে তাকিয়ে বলল, আমাদের মিসিসিপিতে নিয়ে যাবার জন্য সে আসছে। তুমি পড়বে। সেলরদের কাছে এটা ভীষণ পবিত্র গ্রন্থ। আমি যে কতবার পড়েছি বইটা। আমি কোথাও কোথাও মুখস্থ পর্যন্ত বলে যেতে পারি।

    তারপরই একটু থেমে দেখে নিল, পাইলট-সিপ আর কতদূর। যতক্ষণ জাহাজের কিনারায় এসে না ভিড়ছে ততক্ষণ বোধহয় কথা বলা যাবে—আর সব কথাই একমাত্র এখন এই মহামহিম নদী, তার প্রাচীনতা এবং তার নাব্যতা কতটুকু, প্রাচীন কালে, কে প্রথম এই নদী আবিষ্কার করেছিল, তার নাম, হ্যাঁ মনে পড়ছে ডি-সোটা।

    —ওহে ছোটবাবু, তুমি ভাবলে সেই লোকটি কিনা একটা মহৎ কাজ করে ফেলেছে। কিছুই না। প্রথম ডি-সোটা মিসিসিপি দেখতে পান। এবং সেখানেই তাঁর মৃত্যু হয়। নদীর পাড়ে পুরোহিত ও সৈনিকেরা তাঁকে সমাধি দেয়। এবং বুঝতেই পারছ তারপরই আশা করা যায় সৈনিক এবং পুরোহিতরা ফিরে এসে বিশাল মহাকায় নদীর কথা সাধারণ মানুষকে বলবে। তারা বলেওছিল। কেউ আর এ- নিয়ে মাথা ঘামায়নি। শোনা যায় ঐ লোকটির মৃত্যুর পঁচিশ বছর পর শেকসপিয়ারের জন্ম। এবং প্রায় পঞ্চাশ বছর বেঁচে রইলেন, তারপর তাঁর ও মৃত্যু হল। আরও পঞ্চাশ বছর যখন তিনি কবরে থাকলেন আরামে তখন দ্বিতীয় শ্বেতাঙ্গ ব্যক্তির মিসিসিপির পাড়ে আবির্ভাব ঘটল। অর্থাৎ তুমি বুঝতেই পারছ ডি-সোটার মৃত্যুর প্রায় একশ ত্রিশ বছর পর আর একজন, তার নাম বোধহয় লা-সালে এবং এমনই একটা নাম মনে হচ্ছে, তিনি আবার জাতিতে ফরাসী, প্রথম মিসিসিপি সম্পর্কে তাঁর অনুসন্ধান করবার একটা স্পৃহা জাগল।

    পাইলট-সিপটা বেশ ছুটে আসছে—সে আবার সেদিকে তাকাল। আরও কিছুক্ষণ ছোটবাবুর সঙ্গে এই নদী এবং তার প্রাচীনতা সম্পর্কে কথাবার্তা বলা চলে। এখন কোনও কাজ নেই, যে ভাবেই হোক এই সব চারপাশের নদী-নালার গুণকীর্তন করে সময়টা কেটে যাবে। সে বলল, যা বলছিলাম, আমাদের যুগে এমন একটা আশ্চর্য নদী দেখার পর দেড়শো বছর চুপচাপ কাটিয়ে দিতে পারি—ভাবা যায় না। কোথাও কোনও সমুদ্র উপকূলে এক খণ্ড ভাঙ্গা প্রাচীন শিলাস্তর খুঁজে পেলে অন্তত পনেরটি অভিযাত্রী দল ছুটে আসবে। একদল যাবে শিলাস্তরের রহস্যসন্ধানে। বাকি চোদ্দটি দল যাবে পরস্পরের সন্ধানে।

    ছোটবাবুর মনে হল, সেকেণ্ড এই নদী সম্পর্কে অনেক খবর রাখে। এবং প্রথম প্রথম কথা বুঝতে ছোটবাবুর অসুবিধা হত। এখন একেবারেই তা হয় না। এবং ছোটবাবুও প্রায় ওদের মতোই একসেন্টে কথাবার্তা বলতে পারে। আর এটাই বোধহয় ওর আশ্চর্য ক্ষমতা, কত সহজে, সেও সাবলীল। ইংরেজিতে কথাবার্তা চালিয়ে যেতে পারে। সে বলল, সব নদীর মোহনাই কিন্তু এক রকমের।

    —মানে!

    —সেই পাইলট-সিপ, কিছু জাহাজের প্রতীক্ষা, আর অজস্র পাখি এবং দূরে এই ছায়া ছায়া পাহাড় অথবা বনাঞ্চলের ছায়া। ওর ইংরেজিতে এমন শব্দেরই বেশি সমাবেশ ছিল বলে, সেকেণ্ড মনোযোগ দিয়ে শুনছিল, এবং পরে মনে হল, ঠিকই বলেছে ছোট—টেমস, গঙ্গা অথবা এই মিসিসপি, যদি আমাজনে যাওয়া যায়, সেখানেও হয়তো কিংবা ইউফ্রেটিস নদীর তীরে নীল নদের অববাহিকায়।

    সেকেণ্ড বলল, যা বলছিলাম বুঝলে ছোট দেড়শো বছরের ওপর তখন এখানে সব সাদা মানুষেরা পাল তুলে তীরে বসতি গড়েছে। এদের সঙ্গে স্থানীয় আদিবাসীদের যোগাযোগ হয়েছে, দক্ষিণ দেশগুলোতে স্পানিয়ার্ডরা নির্বিচারে লুঠতরাজ চালাচ্ছে। নরহত্যা নারীধর্ষণ রোজকার ঘটনা। ওদের যেনতেন প্রকারেণ ধর্মান্তরিত করা হচ্ছে। একটু ওপরের দিকে ইংরেজরা তাদের কাছে মালা কম্বল বিক্রি আরম্ভ করে দিয়েছে, হুইস্কি ধরিয়ে ওদের মগজে ফূর্তির বান ডাকিয়েছে, কানাডায় ফরাসীরা আর এক ধাপ এগিয়ে, ইস্কুল খুলে হাতেখড়ি দিচ্ছে, বিদ্যাদানের নামে সব আত্মসাত করার নয়া ফরমূলা। মনট্রিল এবং কুইবেকে পশম কেনাবেচার ভেতর দিয়েও বেশ যখন জানাজানি ভালভাবেই হয়ে গেছে তখনও কেউ জানে না, এই দেশের ভেতরে রয়েছে এত বড় একটা নদী। একেবারে জানে না বললে ভুল হবে, তারা ভাসাভাসা খবর শুনেছিল। নদীর আয়তন এবং অবস্থান সম্পর্কে কোন সঠিক ধারণা ছিল না। অথচ দ্যাখো, ওদের মগজে কোন দুঃসাহসিক ইচ্ছে ছিল না, কোথায় সেই নদী, তার উৎপত্তি কোথায়, কোনদিক থেকে নেমে কোথায় যাচ্ছে, একেবারে সোজাসুজি না ডাইনে বাঁয়ে ঘুরে ঘুরে অশ্বখুর তৈরি করে চলেছে—কিছুই জানার ইচ্ছে ছিল না তাদের। আসলে কি জানো ছোট, নদীটা যে ওদের কোন কাজে লাগবে ভাবতেই পারেনি। নদী তারা চায়নি। তাদের জীবনে নদীর কোন প্রয়োজন ছিল না। অথচ প্রায় দেড়শ বছর পর যখন লা-সালে এই নদী আবিষ্কার করলেন, তখন পড়িমরি করে কে আগে যাবে, কার আগে প্রাণ কে করিবে দান, আসলে কি জানো, তখন সবার মনে জেগেছিল, নদীটাকে কিভাবে যে কাজে লাগানো যায়! তখনকার দিনে কেউ কেউ বিশ্বাস করত, ওটা গিয়ে পড়েছে ক্যালিফোর্ণিয়া উপসাগরে, এবং এখান থেকেই চীনে যাবার একটা সংক্ষিপ্ত পথ খুঁজে পাওয়া যাবে। অথবা কেউ কেউ ভাবত, ওটা গিয়ে পড়েছে ভার্জিনিয়ার সমুদ্রে। যাই হোক সে অনেক ইতিহাস বুঝলে ছোট, ঐ দ্যাখো পাইলট উঠে আসছে। তোমার চিঠি এলে দিয়ে দেব। তুমি এস। তখন ছোটবাবু হাসল। ওর চিঠি কখনও আসে না হেসে যেন বলতে চাইল। মেজ-মালোম ডেবিড ওর দিকে তাকিয়ে থাকল। ভারি কোমল স্বভাবের ছেলেটা। একটা চিঠি না এলে কী যে খারাপ লাগে! এখানে ছোটবাবুকে একা রেখে যেন যাওয়া ঠিক না। সে ফের বলল, এস আমার সঙ্গে।

    সে বলল, সেকেণ্ড, আমার চিঠি আসে না, আমাকে কেউ চিঠি দেয় না। আমারও আর কাউকে চিঠি লিখতে ইচ্ছে হয় না। কাকে লিখব! যাঁকে লিখলে খুশি হতেন, তাঁকে জানাতেই পারছি না, জাহাজ মিসিসিপিতে ঢুকে যাচ্ছে। অবশ্য আমার মা জানেনও না পৃথিবীতে মিসিসিপি বলে একটা নদী আছে। তারপর বলার ইচ্ছে হল—তাঁর পৃথিবী ভীষণ ছোট। সেই ছোট পৃথিবীতে শুধু তাঁর আমরাই আছি। আর কি আছে না আছে তার জন্য তাঁর কিছু আসে যায় না।

  • উনিশ

    উনিশ

    ।। উনিশ।।

    হেই হেই আর গুম গুম একটা শব্দ। ওরা নদীর ভেতরে ঢুকে গেলে এমন সব শব্দের ভিতর পড়ে গেল। দু’পাড় দেখা যাচ্ছে। প্রায় মাইলের ওপর চওড়া নদী, প্রায় সাত-আট ফেদম জল আছে। এবং গভীর নদীর ওপরে রয়েছে বড় বড় স্টিম-বোট। ওরা কেউ উজানে যাচ্ছে, কেউ নেমে আসছে। মাছ ধরার ছোট ছোট জাহাজ—ওরা কেউ মাছ ধরতে যাচ্ছে, কেউ মাছ ধরে ফিরছে। আর কখনও নদীর পাড় ভীষণ খাড়া। পঞ্চাশ ষাট ফুট খাড়া পাড়। নদী যেন অবলীলায় গর্জন করতে করতে লাফিয়ে নামছে। জাহাজটা তার ভেতর দিয়ে একটা ছবির মতো উঠে যাচ্ছে। দূর থেকে কখনও মনে হচ্ছে নিশ্চল জাহাজ, কাছে এলেই বোঝা যায়, না, বেশ যাচ্ছে জাহাজ। পাইলট চোঙ মুখে মাঝে মাঝে নদীর টেক সম্পর্কে বোধ হয় ব্যাখ্যা করে যাচ্ছে। এবং এভাবে জাহাজ চললেই মনে হয় সেই যেন কোনো অভিযাত্রী দল নদীর ভেতর দিয়ে ঢুকে যাচ্ছে। তখন দেখা যায় কেবল জাহাজিদের অহংকারী মুখ। ওরা ডেক ধরে হেঁটে গেলেই টের পায় নদী ভীষণ গর্জাচ্ছে, ফুঁসছে। তার সব কিছু অহংকার অবলীলায় ভেঙেচুরে জাহাজ ক্রমে দামাল হয়ে উঠছে। আর কি যেন তখন ভাল লাগে, নদীর পাড়ে কখনও বন, কখনও ছোট শহর, কখনও শুধু বার্চ আর দিওদর জাতীয় গাছ, অথবা বিরাট বাওবাব বৃক্ষের অন্তরালে দেখা যায় এক ফালি আকাশ, সেখানে চাঁদ উঠছে।

    এমন সব দৃশ্য দেখলে মনে হয়, পৃথিবীতে এভাবে জাহাজে জাহাজে ঘোরা ভারী রোমাঞ্চকর। তখন হয়তো যাদের ওয়াচ নেই তারা ফল্কার ওপর বসে তাস খেলছে। কেউ হয়তো রেলিঙে চুপচাপ দাঁড়িয়ে অনেক দূরে দেখতে পায় একটা দেশ, তার ছোট্ট একটা নদী, নদীর পাড়ে তার গ্রাম এবং মসজিদে যে লোকটা আজান দিতে যায় তার মুখ। গভীর রাতে বিবির অপেক্ষা, মানুষটার জাহাজ থেকে চিঠি আসার কথা, ঘুম নেই তার চোখে। আর সেই মানুষ এখন একাকী রেলিংয়ে দাঁড়িয়ে পৃথিবীর অপর প্রান্তে নদীর মোহনায় এক ফালি চাঁদ দেখতে দেখতে অবাক হয়ে ভাবছে মসজিদের মাথায় চাঁপা ফুল গাছের ডালের ফাঁকে যখন চাঁদ ওঠে, ঠিক একরকম দেখতে। সব তেমনি ঠিক আছে, গাছপালা, বন, মাঠ, নদীর জল এবং জ্যোৎস্না। কেবল নেই সরল নোলক-পরা মেয়েটি যে পাশে থাকলে তার মনে হত, এটাও তার দেশ। আলাদা করে কিছু আর ভাবা যায় না।

    তখন ভাণ্ডারি খাবার এগিয়ে দিচ্ছে! তাজা মাছ। মাছের ঝোল। ম্যাকরল মাছ তুলে নিয়েছে কিনার থেকে। তাজা মাছ, মাছের ঝাল, ঝাল গন্ধ সারা ডেকময়। আর ভাত এবং কেউ কেউ আগে থেকেই বলেছে ভাত বেশি খাবে। মাছের বেশ বড় টুকরো, প্রায় ইলিশ মাছের মতো খেতে স্বাদ, দেখতেও কিছুটা কাছাকাছি, ওগুলো হেরিংও হতে পারে। তবে জাহাজিদের কাছে নামে কিছু আসে যায় না। এবং গুম গুম শব্দের ভেতর জাহাজের ক্রমে এগিয়ে যাওয়া বেশ আরামদায়ক। ছোটবাবু, মৈত্র আর অমিয় অথবা অন্য যারা এখন ওয়াচে রয়েছে—ওপরে উঠতে পারছে না। তবু ছোটবাবু এক ফাঁকে উঠে তীরের গাছপালা, এবং কখনও আলোর বিন্দু দেখে দূরে, কেমন মুগ্ধ হয়ে গেছিল। সে ভুলেই গেছিল নিচে তার কাজ, সুট খালি হয়ে যাচ্ছে। কাপ্তান নিজেও ঠিক নেই, কারণ তিনি লাফিয়ে লাফিয়ে বোট-ডেক পার হয়ে যাচ্ছেন। কোথাও ঠিকমত দাঁড়িয়ে থাকতে পারছেন না। চীফ- অফিসারের সারাদিন বেশ খাটুনি গেছে। সারেঙ সারা দিনমান ডেক-জাহাজিদের দিয়ে সব কটা ফল্কা সাফসোফ করছে। এখন কাপ্তান নিজে নিচে যাচ্ছেন। আলো ফেলে দেখছেন, কোথাও কোনও ফুটাফাটা রয়েছে কিনা।

    সকাল থেকেই জাহাজে মাল উঠতে শুরু করবে। ওয়াচ ভেঙ্গে দেওয়া হবে। এবং সবাই যে যার মতো বিকেলে নেমে যাবে বন্দরে। বন্দর এলেই এই এক উত্তেজনা। ঠিক তখনই খবরটা সবাই শুনেছিল। সারেঙ বলে যাচ্ছে, প্রায় ফুঁকে ফুঁকে বলে যাবার মতো, আমরা ভারতীয় নাবিকরা বন্দরে নামতে পারছি না। দাঙ্গা, কালো-সাদাতে দাঙ্গা। কোথাও লঙ-মার্চে কার বের হবার কথা, সারেঙ সে-সবও বলে গেল। এমন একটা সুন্দর রাতে, এ-ধরনের দাঙ্গার খবর! কেউ আর তখন মন দিতে পারছে না কাজে! যারা তাস খেলছিল, ওরা তাসফাস ছুঁড়ে দিল হাওয়ায়। যারা খেতে বসেছিল, তারা বিষম খেল খেতে খেতে। যাঁরা নামাজ পড়ছিল ডেকে, তারা কিছুক্ষণ আরও বেশি আল্লার কাছে প্রার্থনা করবে বলে চুপচাপ বসে থাকল যেন। জাহাজের সব কিছু তখন কেমন একেবারে চুপ মেরে গেল। যেন একটা মরা জাহাজ নিয়ে কিছু অদৃশ্য আত্মা নদীর জলে ভেসে যাচ্ছে। কেউ কোনও কথা বলতে পারছে না।

    বন্দরে নামতে না পারলে জাহাজিদের কি যে ব্যাজার মুখ—এখন এ-জাহাজটাকে না দেখলে বোঝা যাবে না।

    তখন ডেবিড দেখল মুখ ভার করে দাঁড়িয়ে আছে কয়েকজন জাহাজি। অস্পষ্ট অন্ধকারে সে তাদের ঠিক চিনতে পারল না। জায়গাটা আফটার-পিকের চার নম্বর ফল্কার কাছে। ওরা যেন কি গুজ-গুজ- ফুস-ফুস করছিল। এদের ভিতর ছোটবাবু নেই। অবশ্য এখন আর ওয়াচ নেই তার। জাহাজ বন্দরে পৌঁছে দেওয়ার দায়দায়িত্ব পাইলটের। কেবল তার একটা বড় কাজ রয়েছে, জাহাজ বাঁদা-ছাঁদার। সে তো ভোর রাতের দিকে। তবু যেন কিছু একটা অছিলায় চলে আসা। ছোটবাবুকে সে খুঁজছে এটা কাউকে বুঝতেই দিচ্ছে না। উইচের নিচে ঝুঁকে কি দেখছে! আসলে কিছুই দেখছে না। সে অহেতুক আফটার-পিকে আসতে পারে না, একটা কাজ চাই হাতে। জাহাজ বাঁধার আগে সব কিছু পরীক্ষা করে দেখা যেন। হাসিল ঠিক আছে কিনা, উইনচ কাজ করছে কিনা, হারিয়া হাপিজ ঠিক মতো বললে দড়িদড়া ঠিকমতো নেমে যাবে, উঠে আসবে কিনা, এ-সব দেখেই যেন চলে যেত। তবু একবার নিচে নেমে বাঁ পাশে ঢুকে গেল। দরজায় ঝুঁকে বল, হেই!

    কিন্তু কেউ নেই। ফোকসাল ফাঁকা। থাকা উচিত ছিল। ডেকে, মেসরুমে, গ্যালিতে কোথাও ছোটবাবু নেই। এবং মনে হল, সেই গুজগুজ যারা করছিল তাদের ভিতর যদি থাকে। সেখানেও নেই। ওরা বন্ধু, অনিমেষ, মান্নান, মনু এবং ডেক-টিণ্ডাল হাসান। যদিও ওদের একটা করে প্রত্যেকের নম্বর আছে, কিন্তু ডেবিডের স্বভাব অন্যরকম। সে নম্বরে চেনে না, সে নামে চেনে। অন্য সবাই জাহাজিদের নম্বরে চেনে,

    কি নাম, যদিও নাম মনে রাখা ভারী কষ্ট, তবু ওর মনে হয় মানুষের সম্মানের জন্য নামে চেনা ভাল। ওরা তো জেল-কয়েদী নয়, জেল-কয়েদী হলেই বা মানুষ মানুষকে নামে চিনবে না কেন সে বুঝতে পারে না। অবশ্য এ নিয়ে তার এখন দায় নেই। ছোটকে না পেলে চলছে না। একটা মজার ট্রিপ, আহা দিনের বেলা হলে কি যে ভারি মজা হত, তবু রাত জেগে দূরবীন নিয়ে বসে থাকা। একা ভাল লাগবে না বলে একমাত্র সে ছোটবাবুকে সঙ্গে নিতে পারে।

    লাফিয়ে লাফিয়ে সিঁড়ি ভেঙ্গে ওপরে ওঠার মুখে দেখা মৈত্রের সঙ্গে। সে বলল, টিণ্ডাল, ছোটবাবু কোথায়?

    –সে তো ঘুমোচ্ছে।

    —ঘুমোচ্ছে?

    —হ্যাঁ। বলেই সে নেমে যেমন দেখে থাকে, ঠিক ছোটবাবু অমিয়র বাংকে শুয়ে আছে। ওপরের বাংকে বলে মেজ-মালোম ছোটকে দেখতে পায় নি। সে ডেকে বলল, এই ছোট তোকে মেজ-মালোম ডাকছে।

    ছোটবাবুর ঘুম ভীষণ। জাহাজের দুলকি চালে বেশ শরীরে আমেজ এসে যায়। খুব এখন নাক ডাকিয়ে ঘুমোতে পারে। মৈত্র দু-তিন বার ডেকেও সাড়া পেল না। সেকেণ্ড এসে দেখল খুব জোরে জোরে নাড়ছে মৈত্র। কিন্তু ওঠবার নাম নেই।

    সেকেণ্ড বলল, থাক।

    —থাক মানে। আপনি দাঁড়ান। বলে সে ওপরে উঠে দু-হাতে টেনে তুলল, এই ছোট! ছোট শুনতে পাচ্ছিস! ছোট তখন চোখ মেলে তাকাবার চেষ্টা করল।—মেজ মালোম তোকে ডাকছে!

    –মেজ-মালোম কে?

    —কি হারামজাদা! মেজ-মালোমকে চেন না! সে বলল, মেজ-মালোম ডেবিড।

    –ডেবিড এখানে কেন?

    —আরে তুমি মেজাজ দেখাচ্ছ!

    সেকেণ্ড তখন বলল, ছোট কি বলছে!

    মৈত্র বলল, বলছে একটু বসতে। মেজ-মালোমকে একটু বসতে বল। তারপর আর কি করে—সেকেণ্ড কাছে এসে বলল, ওম্যান।

    ছোট বলল, ওম্যান! কোথায় সেকেণ্ড?

    —তাড়াতাড়ি এস।

    দু-লাফে নেমে গেল ছোট। ওর ঘুম একেবারে ভেঙ্গে গেল। মৈত্র এবং অন্য সবাই, পারলে যেন এই জাহাজের যত জাহাজি রয়েছে সবাই এখন এই ডেবিডের পেছনে পেছনে বোট-ডেকে উঠে যাবে।

    ডেবিড ঠিক সিঁড়ির মুখেই বলল, নো ওম্যান।

    ছোট বলল, তবে!

    —এস কথা আছে।

    —এত রাতে কি কথা!

    —অনেক কথা।

    —মানে!

    —মানে, দু’পাড়ের শহর ঘরবাড়ি তেলের পিপে, স্টিম-বোট, মোটর-বোট, লাল নীল রঙের আলো, কোথাও ব্যাণ্ড বাজবে, এস দেখবে। আমরা এক ফাঁকে ঠিক ওম্যান দেখে ফেলব কোথাও।

    সুতরাং আর কি করা। সকালে ওয়াচ থাকছে না। হাল্কা কাজ থাকবে। সুতরাং এমন একটা জাহাজে যখন ক্রমে উজানে উঠে যাচ্ছে, দু-পাড়ের গাছপালা ছায়া অন্তহীন ক্রমশ সরে সরে যাচ্ছে, অথবা এক ফালি চাঁদ জাহাজটার সঙ্গে সঙ্গে উজানে ভেসে চলেছে, তখন রাত জেগে অন্তহীন দৃশ্যমালায় ডুবে যেতে ভালই লাগবে।

    পাশেই জ্যাকের কেবিন। পোর্ট-হোলে এখনও আলো আছে। জ্যাক তবে ঘুমোয় নি? সেকেণ্ড আগেই ঠোটে আঙ্গুল ছুঁয়ে বলেছে, কিছু দেখে ফেললে খুব যেন হৈ-চৈ না করে ছোট। ওতে জ্যাকের জেগে যাবার সম্ভাবনা। চুপচাপ বসে থাকা ডেক চেয়ারে, আর ডেক খুব সাফ বলে ছোটবাবু ডেকে কাত হয়ে হাতে মাথা রেখে শুয়ে থাকতে পারে পর্যন্ত। এবং ছোট দেখল, মেজ চকোলেট কালারের বড় একটা বোতল এনেছে, দুটো গ্লাস। কেবিন-বয় ইলতুতমিস টিপয়ে কাঁচের প্লেটে রঙিন মাংস রেখেছে। ছোট ছোট টুকরো প্রায় স্যালাডের মতো করে রাখা।

    সেকেণ্ড বলল, চলুক।

    ছোটর ভীষণ ইচ্ছে হল। বেশ ঝাঁঝ। সে ঠিক সহ্য করতে পারে না। তবু বলল, কেউ দেখে ফেলবে নাতো!

    —দেখে ফেললে কি হবে!

    —খারাপ ভাববে।

    —যা, খারাপের কি! ওম্যান-ওয়াইন-ওরসিপ ভারি পবিত্র ব্যাপার মানুষের। খাও খাও। পবিত্র যা কিছু তার থেকে দূরে থাকার কোনো মানে হয় না। বলেই ছোটকে দূরবীনটা দিয়ে সে উঠে গেল। দূরবীনে সে কিছুই দেখতে পেল না। পাগল। রাতে, এই সামান্য চাঁদের আলোতে পাড়ের কিছুই স্পষ্ট নয়। বরং ভোঁ ভোঁ শব্দ করতে করতে যে সব স্টিম-বোট নেমে যাচ্ছে উঠে আসছে, অথবা যদি কোন জাহাজ উঠে যায়, পাশাপাশি এলে তাদের রঙীন ছবির মতো দেখায়। জাহাজে সে কোনো মেয়ে দেখতে পাচ্ছে না। তবু জেগে থাকা, এভাবে একটা রাত মিসিসিপি নদীর বুকে জেগে থাকা ভারি আনন্দের। সে তো আর কখনও আসছে না, আবার যদি আসেও, সে কবে আসবে বলতে পারবে না। তখন আজকের মতো সব কিছু তার ঠিকঠাক নাও থাকতে পারে।

    সে দু’টুকরো মাংস মুখে ফেলে দিল। ভাজা ভাজা মাংস। সেকেণ্ড এসে সামান্য মদ ওর গ্লাসে ঢেলে দিল, তারপর সোডা দিয়ে হাল্কা করে দিল, নিজে রাখল একেবারে নির্জলা, সে একেবারে সবটা গলায় ঢেলে দেবার মতো ঢেলে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে বলল, হাই—বলে সে দু’হাত ওপরে তুলে, কি মজা, এমন একটা ভঙ্গী করলে ছোট বলল, এই জ্যাক জেগে যাবে।

    সেকেণ্ড বলল, জ্যাককে ‘ডাকো না! সেও এসে বসুক।

    —তুমি পাগল। জ্যাক আমাদের সন্ন্যাসী বালক। তোমার দূরবীণ দেখলেই চটে যাবে।

    —তা অবশ্য ঠিক। আচ্ছা কেমন ভাল লাগছে না! এত বড় নদীতে ভেসে যেতে ভাল লাগছে না!

    —খুব।

    —এখন তোমার নাচতে ইচ্ছে করছে না! ছোট বলল, নাতো।

    —বারে ভেতরে তোমার ডিং ডিং করে বাজনা বাজছে না!

    —নাতো।

    —বলছ কি, এ-সময়ে ডিং ডিং করে বাজনা বাজছে না!

    —নাতো।

    —বলছ কি, এ-সময়ে ডিং ডিং করে ভেতরে বাজনা না বাজলে আবার কবে বাজবে, নদীতে এলেই আমার বাজনা বাজতে থাকে। নদীতে ডিং ডিং বাজনা না বাজলে লা-সালে প্রাণ হাতে করে মিসিসিপিতে আসত না।

    —ডিং ডিং করে বাজনা বাজলেই প্রাণ হাতে করে আসা যায় না।

    —আরে সে খুব সেয়ানা মানুষ ছিল। তখন ফ্রান্সের সম্রাট চতুর্দশ লুই। তার ইলিয়ানের কেল্লা থেকে মনট্রিলে যেতে ভীষণ কষ্ট। ডাঙ্গায় প্রায়ই লুঠতরাজ হত। রাস্তা বলতে কিছু ছিল না। কেবল জঙ্গল, মাঠ, অকারণ বনানী পাহাড় আর সব রেড় ইণ্ডিয়ানদের ভয়াবহ আক্রমণ, কিন্তু নদী দেখেই বুকের ভিতর বাজনা বাজতে থাকল। চতুর্দশ লুইকে লিখে পাঠাল কিছু সুযোগ-সুবিধার জন্যে। এবং সেটা আদায় হলে বেশ নদীপথে সে মনট্রিলে পৌঁছে গেল। পয়সা কম, লাভ বেশী।

    —তুমি যে বললে ডিং ডিং করে বাজনা না বাজলে…..

    সেকেণ্ড কিছুক্ষণ চুপচাপ থাকল। ভুলে গেছে মতো, তারপর বলল, আমার কখনও কখনও এটা মনে হয়। মানুষ যতই স্বার্থপর হোক ছোট, কিন্তু কিছু ভাল কাজ করে থাকে কি না বল! মোষের চামড়ার ব্যবসাটা লা-সালে আদায় করে নিলেন বটে, বিনিময়ে তিনি কেল্লা নির্মাণ, কেল্লা দখল, জায়গা জমি যা কিছু দখল করলেন, সব চতুর্দশ লুইয়ের নামে। কেবল তাঁর ব্যবসা নদীর পাড়ে অথবা বনভূমির ভেতর হাজার হাজার মোষের। মোষের চামড়ার। ইজারা নেওয়া দেওয়ার কারবার।—তুমি ঠিক দেখছ তো!

    ছোট বলল, দেখছি, ডান দিকে একটা স্টিম-বোট উঠে আসছে।

    —তোমাকে আর একটু দেব! ছোট তখন ওর দিকে তাকালে, সে ছোটর গ্লাস তুলে দেখল। ছোট এক সিপও খায় নি। এই খাচ্ছ না কেন!

    ছোট বলল, দেখি, সে প্রায় হাত বাড়িয়ে নিল, এবং ঠোঁটের কাছে নিয়ে খুব কষ্টে এক সিপ খেল, তারপর আর এক সিপ। এবং কিছুক্ষণ পর আরও এক সিপ। বেশ ঝিম-ঝিম্ করছে। সেকেণ্ড বলে চলেছে তখন। আর একটা দলে এসেছিলেন, জোলিয়েত এবং পুরোহিত মার্কুয়েট। তারা সারা দেশ পার হয়ে ঠিক এক সময় মিসিসিপির তীরে এসে পৌঁছাল। তারা ঠিক লা-সালের মতো যায় নি। ওরা বড় বড় হ্রদ পার হয়ে গিয়েছিল। ওরা হরিৎ উপসাগর থেকে ডিঙ্গি নৌকায় রওনা হয়েছিল। সঙ্গে ছিল মাত্র পাঁচজন লোক। ওরা উইসকনসিন এবং মিসিসিপি যেখানে মিশেছে ঠিক সেখানে পৌঁছে দেখল, সামনে শুধু অরণ্য—গভীর, যেন হাজার হাজার তিমি মাছ আকাশ থেকে অদৃশ্য সুতোয় কেউ ঝুলিয়ে রেখেছে। নদী পাশ দিয়ে বয়ে গেছে বোঝাই যাচ্ছে না, আরও কত সব কিংবদন্তী রয়েছে, ওরা শুনতে পেয়েছিল, নদীতে একটা বিরাট দানব রয়েছে। মাঝে মাঝে তার গর্জন আরম্ভ, হয়। চারপাশের গাছ-পালা থেকে সব পাখিরা পালিয়ে যেত। বুনো মোষেরা লেজ তুলে দিক-বিদিক ছুটতে থাকত। সমস্ত চরাচর একেবারে কাঁপিয়ে দিত।

    সেকেণ্ড-এর মনে হল, ছোট ঝিমুচ্ছে। সেকেণ্ড কেমন ক্ষেপে গেল। সে ধাক্কা মরল ছোটকে। বলল, তুমি সেলর!

    —ইয়েস স্যার।

    —নো।

    —কেন নো স্যার?

    —তুমি ঝিমুচ্ছ আমি কি বলছি, শুনেছ?

    —ধুস! আমার ভীষণ ঘুম পাচ্ছে সেকেণ্ড। আমি উঠব। তোমার বক্ বক্ আমার ভাল লাগছে না।

    —আরে শোন শোন, এই ছোট ঐ দ্যাখো। সত্যি ছোটর চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। একটা স্টীম- বোট যাত্রী বোঝাই—নিচে নেমে যাচ্ছে। আলোতে সাজানো। মার্দিগ্রাস উৎসব কি এখানে আরম্ভ হয়ে গেছে! সে বলল, দ্যাখো দ্যাখো কেমন নাচছে জোড়ায় জোড়ায়।

    দূরবীন না হলেও দেখা যায়। খুব কাছে এবং দ্রুত নেমে যাচ্ছে স্টিম-বোটটা। –আচ্ছা ছোট, ডেবিড ছোটকে ঠেলা দিয়ে বলল, ওরা আমাদের সঙ্গে ওপরে উঠে যায় না কেন! নিচে নেমে যাচ্ছে কেন!

    ছোট বলল, আমি আর খাব?

    সেকেণ্ড বলল, খাবে। একশবার খাবে। রাত এখনও অনেক জাগতে হবে।

    —কটা বাজে?

    —এগারোটা।

    —জ্যাক জেগে যাবে না তো!

    —জাগলে আমাদের কি! ডেবিড খুব উত্তেজনার মাথায় কথা বলছে। আহারে! এমন একটা সময়ে সুন্দর স্টিম-বোটে আমরা কেন থাকলাম না।

    ডেবিড কি এখন বসে বসে মরাকান্না জুড়ে দেবে! সে বলল, ডেবিড, তুমি মরাকান্না জুড়ে দিলে আমি এখানে থাকব না। আমি চলে যাব। বলেই ছোট হুড়মুড় করে উঠে বসল। জাহাজ যে যাচ্ছে বোঝা যাচ্ছে, কারণ তীরের গাছাপালা যদিও এখন আর কিছুই তেমন স্পষ্ট নয়, ছায়া-ছায়া এবং নদী ক্রমে প্রশস্ত হয়ে যাচ্ছে, কেবল কলকল জলের শব্দ। ওর তখন দূরের কোথাও আর একটা নদী পাড়ের কথা মনে পড়ে যায়, ঠিক যেন সেখানে ড্যাং ড্যাং করে দুর্গাপুজোর বাজনা বাজছে, কবুতর উড়ছে আকাশে এবং অজস্র কাশফুল নদীর পাড়ে তুষারপাতের মতো বাতাসে উড়ছে। সে উঠেই যেতে পারল না। মাথাটা কেমন ঝিম্‌ঝিম্ করছে। সেকেণ্ড পুরোহিতের মতো নদী সম্পর্কে যা মাথায় আসছে বলে যাচ্ছে।

    সেকেণ্ড বলল, মার্কুয়েট ভীষণ চালাক লোক ছিল হে। রাতদিন নদীর জলে ডিঙ্গা ভাসিয়ে যাচ্ছে তো যাচ্ছেই, নদী কখনও বাঁক নিয়েছে। দ্বীপের মতো মাঝখানে ডাঙ্গা। এতদিন চালিয়েও ওরা একটা মানুষের পায়ের দাগ দেখতে পেল না, কেবল যেখানে মাঠ, মাঠে বড় বড় ঘাস সেখানে হাজার হাজার বুনো মোষ কি যে আনন্দে ঘোরাফেরা করছে!

    তারপর সেকেণ্ড কেমন মোহভঙ্গের মতো বলে ফেলল, প্রায় দু’হপ্তা চলার পর ওরা মানুষের পায়ের দাগ দেখতে পেয়েছিল, যেন সেই এক রবিনসন ক্রুশোর ব্যাপার। ওরা নদীর দু’পাড়ে কোথাও বড় বড় পাহাড় পর্যন্ত দেখেছিল। রবিনসন ক্রুশোর ব্যাপারটা ভয়াবহ, কেউ তখন আক্রমণ করে বসবে, ভয়ে বুক গলা শুকিয়ে তাদের কাঠ। কারণ তাদের নানাভাবে হুঁশিয়ারি ছিল, নদীর দু-পাড়ের আদিবাসীরা নদীর মতোই হিংস্র, নির্মম। তারা সব আগন্তুকদের মেরেই ফেলে। এক মুহূর্ত তারা অপেক্ষা করে না। মার্কুয়েট তাদের সহজেই খুঁজে পেয়েছিল। তাদের সৌজন্যপূর্ণ ব্যবহারে মার্কুয়েট অবাক। সর্দার রেড ইণ্ডিয়ান ওর শেষ কম্বলখানি খুলে দিয়েছিলে মার্কুয়েটকে। পরম সমাদরে আদর অভ্যর্থনা, এবং কুকুর নিয়ে ঘাসের ওপর বড় বড় গাছের ছায়ায় খেলা পর্যন্ত দেখিয়েছিল। উপহার দিয়েছিল পর্যাপ্ত মাছ, জই-এর পায়েস। সকাল বেলায় নদীর পাড়ে সর্দার তার ছশো অনুচরসহ ওদের বিদায় জানিয়েছিল।

    সেকেণ্ড বলল, তুমি ঘুমোচ্ছ!

    —না।

    —তবে এভাবে চিৎপাত হয়ে শুয়ে পড়েছ কেন?

    —মাথাটা ঝিমঝিম করছে।

    সেকেণ্ড প্রায় কানের কাছে মুখ এনে চিৎকার করে বলল, এখন যেখানে আলটন শহর আছে না, সেখানে মেয়েদের কিছু নগ্ন মূর্তি তারা খুঁজে পেয়েছিল। তার নিচেই ওরা দেখেছিল নদীর জল ঘোলাটে কেমন হলুদ রঙ জলের। মিসিসিপির শান্ত নীল জলস্রোতকে কোথা থেকে প্রচণ্ড গতিতে জলের ঘূর্ণি এসে একেবারে হলদেটে করে দিচ্ছে। ওরা জানত না, ওটা মিসৌরি। মিসৌরি এসে এখানটায় মিলে নদীকে করেছে দুর্বার অশান্ত। পাগলা হাওয়ায় যেন নদীর জল অনেক ওপরে উঠে লাফিয়ে লাফিয়ে নেমে যাচ্ছে। পাগলাচণ্ডীর মতো অশান্ত গর্জনে নদী ক্ষিপ্ত হয়ে গেছে।

    হঠাৎ তখন মনে হল পেছনে কেউ দাঁড়িয়ে আছে। সেকেণ্ড দেখল, জ্যাক। জ্যাক এসে গেছে ছোটবাবু।

    ছোটবাবু উঠে বসল না, এমন কি তাকিয়েও দেখল না। বলল, আঃ

    জ্যাক বলল, কি করছ তোমরা?

    সেকেণ্ড ওর দূরবীন বগল থেকে একেবারে নামিয়ে নিচে লুকিয়ে ফেলল। বলল, নদী দেখছি। ছোটবাবুকে নদীর কথা বলছি।

    –ছোট তো ঘুমোচ্ছে।

    –না ঘুমোচ্ছে না।

    জ্যাক উপুড় হয়ে বসল মাথার কাছে। দেখল চোখ বুজে আসছে। খেয়েছে! আজ আবার খেয়েছে! চোখ দুটো টেনে ফাঁক করলে আবার খুঁজে যাচ্ছে। জ্যাক বলল, কাকে বলছ।

    —কেন ছোটকে।

    —কিছু শুনতে পাচ্ছে না।

    —মানে!

    —দ্যাখো না।

    —এই ছোট তুমি কিছু শুনতে পাচ্ছ না?

    —আমি বাড়ি যাব ডেবিড।

    —এই তো কথা বলছে।

    —ঠিক বলছে? ওতো এখন স্বপ্ন দেখছে।

    —স্বপ্ন!

    —তা ছাড়া কি!

    সেকেণ্ড এবার উপুড় হয়ে পড়ল, এই ছোট তুমি স্বপ্ন দেখছ?

    জ্যাক বুঝল দুজনেই বেশ টেনেছে। ছোটর খাবার অভ্যাস নেই এটা সে জানে। এ-ব্যাপারে ছোটর ভয়ও আছে। ছোট খায় না! অথচ ডেবিড ওকে খাওয়া শেখাচ্ছে। সে এবার দু-হাতে জামা ধরে তুলে বলল, ছোটবাবু তুমি কোথায় যাবে?

    —বাড়ি যাব।

    সেকেণ্ড তখন চোখ বুজে বলছে, ছোট কি বলছে জ্যাক?

    —বাড়ি যাবে বলছে।

    —কাল সকালেই তো বাড়ি পৌঁছে যাব।

    জ্যাক আর সহ্য করতে পারল না। বলল, তুমি ওকে আর দেবে না।

    —পাগল! ক্ষেপেছ ওকে আর দি। আমার একটা ইজ্জত নেই।

    ছোট এবার কাউকে যেন গ্রাহ্য করছে না—আমারও ইজ্জত আছে সেকেণ্ড। আমাকে তোমরা যখন-তখন অপমান করতে চাও। আমি কিছু সহ্য করব না। আমি বাড়ি যাব। তুমি আমাকে বাড়ি পৌঁছে দেবে। ভীষণ জড়ানো কথা এবং অস্পষ্ট।

    —দেব। ওঠো।

    —কিন্তু —

    —না আর কিন্তু না।

    —আমি উঠতে পারছি না।

    জ্যাক বলল, নাও ধরো। ডেবিড বলল, ধর। দুজনেই টলছে। জ্যাক দেখল, সিঁড়ি ধরে নামার সময় দুজনেই হুড়মুড় করে পড়বে। সে এবার বলল, তুমি বস ডেবিড। ওকে আমি রেখে আসি।

    জ্যাক জানে এখন বাবা ঘুমোচ্ছে। রাত অনেক। ওর ঘুম আসছিল না। সেই কখন থেকে সে পোর্ট-হোল খুলে চুপচাপ গোপনে দেখে যাচ্ছিল। ওরা কিছু খাচ্ছে সে সেটা টের পাচ্ছিল। গোপনে ওরা চুরি করে মদ খাচ্ছে বুঝতে পারে নি। ওদের কথাবার্তা সেই কখন থেকে শুনছে। অস্পষ্ট বলে বুঝতে পারছিল না। সে কিছুতেই কেবিনে শুয়ে থাকতে পারে নি।

    সে ক্রমে বুঝতে পারল, ছোটর ভীষণ নেশা হয়েছে। আর কেউ নেই এখন জেগে। জেগে থাকলেও ঐ যেমন এরা আছে তেমনি, পোর্টের কাছাকাছি দায়-দায়িত্ব সব পাইলটের। একটু বেচাল হলে তেমন ক্ষতির কিছু নেই। তবু সকালে জাহাজ বাঁধাছাঁদা আছে। ডেবিডের অনেক কাজ। কেবিনে একটু চোখ বুজতে পারলেই ডেবিড একেবারে ঠিকঠাক। আর এখন এই ছোটবাবু—সে ছোটবাবুকে নিভৃতে দাঁড় করিয়ে বলল, আমার কাঁধে হাত রাখো, ছোট। আস্তে আস্তে পা ফেল। ভয় নেই। পড়বে না।

    ছোটবাবু বলল, তুমি খুব ভালো ডেবিড

    জ্যাক বলল, আমি ভাল না। আমি ভীষণ খারাপ। আস্তে। লম্বা পা ফেলবে না।

    —আমাকে বাড়ি নিয়ে যাচ্ছ ডেবিড?

    —হ্যাঁ বাড়ি। একবার বলার ইচ্ছে হল, আমি জ্যাক, ডেবিট বোট-ডেকে শুয়ে আছে। কিন্তু কিছু বলল না।

    —জানো, আমার দুটো ভাই আছে। একটা বোন আছে।

    —জানি।

    —তুমি জানো আমরা এত গরীব ছিলাম না।

    —জানি।

    —আমরা দুর্গাপুজোতে মোষ বলি দেখতাম।

    মোষ বলি ব্যাপারটা জ্যাকের জানা নেই। সে বুঝতে পারল না। ছোটবাবু যাই বলুক সে হুঁ- হাঁ করে যাচ্ছে। খুব সন্তর্পণে সিঁড়ি ধরে নামানোর সময় কেমন হড়কে গিয়ে জ্যাককে ছোটবাবু পুরোপুরি জড়িয়ে ধরল। আহা ছোটবাবুর শরীর কী নরম! জ্যাক চোখ বুজে রয়েছে। মাতাল ছোটবাবু তার শরীরের ওপর ভর করে সোজা দাঁড়াবার চেষ্টা করছে। জ্যাকও ছোটবাবুর কাঁধে মুখ লুকিয়ে একেবারে একটা লতার মতো জড়িয়ে থাকতে চাইল। যেন বলতে চাইল, ছোট তুমি কি টের পাচ্ছ না! তুমি কিছু বুঝতে পারছ না?

    আর তখনই ছোটবাবু বলল, আমাকে এভাবে দাঁড় করিয়ে রাখলে কেন? আমি বাড়ি যাব না? জ্যাক বোধহয় ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদত। ছোটবাবু তুমি কি! তুমি কি ছোটবাবু? তুমি আমাকে একটু লতার মতো জড়িয়ে থাকতে দাও। কেউ নেই। ছোট, আমি বড় হয়ে গেছি। সত্যি বড় হয়ে গেছি।

    ছোটবাবু বলল, আমার দাঁড়াতে ভাল লাগে না।

    জ্যাক বলল, তুমি তো হাঁটতে পারছ না।

    —খুব পারছি।

    জ্যাকের ইচ্ছে, সে যতটা পারে দেরি করে নিয়ে যাবে। এই নীল দাড়ি এবং চুল বড় মহিমময়। আশ্চর্য ঘ্রাণের মতো এক সৌরভময় জগতে সে আছে। সে যেন এক সুন্দর পৃথিবীর বাসিন্দা হয়ে যায় তখন। কেউ জানে না, এই যে যুবক অথবা কাজ করে করে ছোটবাবুর ঋজু চেহারা, আর শরীরে কি উজ্জ্বল রঙ আর ঘাসের মতো নরম বাহুর ভেতরে হারিয়ে যাবার কি যে অশ্চর্য প্রলোভন কেউ তা বুঝতে পারবে না। জ্যাক যেন নিরবধিকাল এভাবে জড়িয়ে থাকবে ছোটবাবুর শরীরে। সে বারবার মিশে যেতে চাইছে অথবা ছোটবাবুর শরীরে সে হাত দিয়ে দেখার এমন সুযোগ আর পাবে কিনা জানে না। যেন জ্যাক এক পাথরের মূর্তির পাশে দাঁড়িয়ে আছে। অকারণ চারপাশে ওর নরম আঙুলগুলো ছুঁয়ে ছুঁয়ে যাচ্ছে শরীর এবং কি ভেবে হাঁটু গেড়ে বসে ওর দু পায়ের ফাঁকে মুখ রেখে ফিস ফিস করে বলছে, ছোটবাবু আমি মেয়ে। তুমি বিশ্বাস কর আমি মেয়ে। আমি জ্যাক নই ছোটবাবু। আমি বনি।

    ছোটবাবু বুঝতে পারল না, ডেবিড তাকে এভাবে কেন দাঁড় করিয়ে রেখেছে। সে তো কিছুই স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে না। সব কিছু সামনের ঝাপসা। ডেবিডের মুখ ঝাপসা। কখনও কুয়াশার ভেতরে মানুষের মুখ দেখলে যেমন লাগে তেমনি। সে বুঝতে পারছে না হাঁটুর ভেতর মাথা রেখে ডেবিড কি করছে? ওকে কী জুতো পরিয়ে দিচ্ছে? ঠোটে কি একটা পোকা উড়ে এসে বসেছে? সে কোনরকমে পোকাটা মুখ থেকে তাড়িয়ে দেবার জন্য হাত-পা ছুঁড়ে বলল, আমি বাড়ি যাব না? আর যা হবার, হাত-পা ছুঁড়তে গিয়ে প্রায় পড়তে পড়তে বেঁচে গেল। কারণ জ্যাক বুঝল এভাবে দাঁড় করিয়ে রাখা খুব রিস্কি। সে আবার হাঁটতে থাকল। একটা কথাও বলল না। একেবারে হুঁস নেই ছোটবাবুর। চুরি করে সে ছোটবাবুর ঠোটে চুমো খেয়েছে। ছোটবাবুর গালে গাল লাগিয়ে রাখছে। কেউ চলে আসতে পারে! এবং সে চারপাশে যখন দেখছে কেউ নেই সামনের ডেকে দু-একজন জাহাজি মাদুর পেতে ঘুমুচ্ছে, এবং পাশে সেই ছোটবাবুর দুটো পাখি, ওরাও বাকসের ভেতর ছোটবাবুর তৈরি ঘরে বেশ আছে, তখন সে বলতে চাইল, আহা ছোটবাবু তুমি কি মিষ্টি আহা তুমি কি সুইট। তোমার ঠোঁট দুটো ভীষণ ভারী। ভীষণ আদুরে। আমাকে তুমি কেন বুঝতে পার না।

    ছোটবাবু বিড় বিড় করে বকছে, আমার মুখে তুমি থুথু মাখিয়ে দিচ্ছ কেন? একটা পোকা!

    —কৈ, পোকা কোথায় দেখছি না তো?

    —ভিজে ভিজে কেন? জোঁকের মতো কেন?

    জ্যাক বলল, আস্তে ছোট। তুমি নেশা করে জাহান্নামে গেছ। কি যে হচ্ছে না! যেমন ডেভিড! আমার কেবিনের পাশে এমন হলে কি করে ঘুমোই? বোধ হয় ছোট টিণ্ডাল বাদশা মিঞা, ওয়াচের ফাঁকে উঠে এসেছে। ওকে দেখেই একেবারে বিরক্তিকর মুখ জ্যাকের। এই দ্যাখো তোমাদের ছোটবাবুর কাণ্ড। নিয়ে যাও তো।

    টিণ্ডাল বলল, ছোটবাবু তুমি সোরাব খেয়েছ? তোবা তোবা!

    জ্যাক বলল, আচ্ছা তুমি যাও টিণ্ডাল। আমিই দিয়ে আসছি।

    —না সাব। আপনি যান। আমি নিয়ে যাচ্ছি। সে দু-হাত জোড় করে বলল, কাউকে বলবেন না। ছোটবাবুর কি যে হয় মাঝে মাঝে।

    —আরে না না, আমি বলব না।

    জ্যাক বলল, মদ খেতে বারণ করবে। আমি যে এখানে দিয়ে গেছি, কাউকে বলবে না।

    —জী সাব। কেউ জানবে না। জানলে ছোটবাবুর ক্ষতি হবে।

    জ্যাক তারপর লাফিয়ে লাফিয়ে ডেক পার হয়ে গেল। সে ঘুরে ঘুরে বোট-ডেকের ওপর দিয়ে হাঁটতে থাকল। সে চুলে হাত রেখে নক্ষত্রের ভেতর, অথবা এই নদীর জলে যে আবহমান কাল ধরে কলকল শব্দ সারা মাস কাল ধরে ক্রমান্বয়ে নেমে যাচ্ছে সমুদ্রে, তাদের কাছে সে যেন ছুঁড়ে দিচ্ছে তার আশ্চর্য অনুভূতির খবর। তার কিছুতেই ঘুমোতে ইচ্ছে হল না। সারা রাত সে জেগে থাকবে। যেন ঘুমিয়ে পড়লেই সকালের বাসি ফুল হয়ে যাবে সব। আহা! তাজা কি টাটকা আর কি মনোরম এই বেঁচে থাকা। সে কেবিনে ঢুকে তার প্রিয় গান, ইয়েস সেলর গো অন, মুভ অন, পা ফেলে পা তুলে, গো অন, মুভ অন। ইউ সি দি.সি, দি মুন, এ্যাণ্ড দি লিটল স্টার। তাজা টাটকা রক্তের ভেতরে সে নাচতে থাকল। গমগম করে বাজছে। তার রেকর্ডের বাজনা সমস্ত মিসিসিপির জলে তরঙ্গ তুলে ক্রমে কুয়াশার ভেতর হারিয়ে যাচ্ছে।

    আর তখনই মনে হল দুটো চোখ পোর্ট-হোলে। সঙ্গে সঙ্গে ওর শরীরের রক্ত হিম হয়ে গেল। গোপনে ওকে কেউ এতক্ষণ দেখছিল। পোর্ট-হোলের কাঁচ বন্ধ করতে কখন ভুলে গেছে। উত্তেজনায় সে যখন অধীর, তখন গোপনে কেউ পোর্ট-হোলে দাঁড়িয়ে দেখতে পারে তার মনেই ছিল না। চোখ দুটো ভীষণ জ্বলছিল লোকটার। অস্পষ্ট আলোতে সে বুঝতে পারেনি, কে, তবু যখন মনে করতে পারল, তখন তার শরীরে আর বিন্দুমাত্র সাহস থাকল না। আর এই নাচ দেখে কেউ ভেবে ফেলতে পারে সে মেয়ে, বুঝে ফেলবে, সে বনি। লোকটা আর্চি বাদে কেউ নয়। শয়তানের মতো জাহাজে উঠেই তাকে অনুসরণ করে চলেছে।

    সে পোর্ট-হোলের কাঁচ বন্ধ করে দিল। পর্দা ফেলে দিল। তারপর দাঁড়িয়ে থাকল—কি করবে বুঝতে পারল না।

    জাহাজটা তখনও যাচ্ছে। নদীতে নানারকম বয়ার লাল নীল বাতি জ্বলছে নিভছে।

  • বিশ

    বিশ

    ।। বিশ।।

    আর আশ্চর্য, সকালে সবাই দেখল বড়-মিস্ত্রি বাক্স-পেটারা নিয়ে জাহাজ থেকে নেমে যাচ্ছে। বড়- মিস্ত্রির চোখের নিচে কালি পড়ে গেছে। আর্চি এবং ফোর্থ এনজিনিয়ার ধরে ধরে নিয়ে যাচ্ছে। যেন একটা এম্বুলেন্স ডাকলেই ভাল হত। জাহাজ বাঁধাছাঁদার পর পরই বড়-মিস্ত্রি রিচার্ড নেমে গেল।

    সবাই অবাক। জাহাজে বিন্দুমাত্র খবর রটেনি। সত্যি সত্যি বন্দর এলে বড়-মিস্ত্রি নেমে যাবে। যেন গোপন রাখা হয়েছিল ব্যাপারটা। কাপ্তান নেমে যাবার আগে হ্যাণ্ডসেক করেছেন। ডেক-অফিসার, এনজিন-অফিসাররা মিলে ওকে গাড়িতে তুলে দিয়ে এল।

    এনজিন-সারেঙ ওর চোখ মুখ দেখে ঘাবড়ে গেছেন। এমন শক্ত সমর্থ মানুষটা কি পাতলা হয়ে গেছে! ভেতরে কি এমন কঠিন অসুখ তিনি বুঝে উঠতে পারলেন না। মাঝে একবার এই কদিন আগে ভূত দেখেছিলেন বড়-মিস্ত্রি। জাহাজে এ জন্য কেউ ভাবে না। পুরানো ভাঙা জাহাজে এ-সব সংস্কার থেকে থাকে। সাহসী মানুষও মধ্যরাতে ঠাণ্ডা ঘরের ভেতর ঢুকতে ভয় পায়। অথবা সেই এলি-ওয়ে ধরে গেলে গা ছমছম করতে থাকে! ভূতের ভয়ে বড়-মিস্ত্রি জাহাজ ছেড়ে চলেছেন বিশ্বাস হয় না! আরও বড় কিছু কারণ। লক্কড়মার্কা জাহাজ, জাহাজে থাকতে ভাল লাগার কথা না। অথবা বাড়িতে কোনও দুর্ঘটনা। তিনি যতটা জানেন বড়-মিস্ত্রির নিজের বলতে ছোট এক ভাই আছে। রাউদ- এনজিনিয়ারিং ডকে কি একটা বড় কাজ করে। এবং স্ত্রী বলতে তিনি জেনেছেন, বন্দরে বন্দরে যারা তাঁর সঙ্গে রাত কাটিয়েছে তারাই।

    সুতরাং কোনও খবর না দিয়েই বড়-মিস্ত্রি যেন নেমে গেল। দুটো একটা প্রশ্ন সবাই করেছে, কিন্তু কেউ কোনও উত্তর পায়নি। বোধ হয় গোপন রাখার কথা বলা হয়েছে, আসলে যে বড়-মিস্ত্রি সেই রাত থেকে আর ঘুমোতে পারেনি, বুকের ভেতর রাত বাড়লেই মনে হত, একটা কালো হাত ‘পোর্ট-হোল দিয়ে গলে পড়বে। এবং সেই ভয়ে মানুষটা সারারাত জেগে বসে থাকত। একটা আশ্চর্য ম্যানিয়া হয়ে গেল। কাপ্তান নিজে ওর কেবিনে এক রাতে দেখেছেন, পোর্ট-হোলের দিকে সবসময় চোখ বড়-মিস্ত্রির। হাত ঝুলে পড়ছে ভেবে মানুষটার ভেতরে এক ধরনের ক্রমে অসুস্থতা গড়ে উঠছে। সে জাহাজের সবাইকে অবিশ্বাস করছে। তাকে সবাই চক্রান্ত করে জাহাজে তুলে এনেছে এমন একটা ভাব যেন, এবং কি করে যে ওর কি হয়ে গেল! এ-জাহাজে থাকলে সে ভয়ে মরে যাবে। এমন মনে হলে, কাপ্তান বেতার সংকেতে জানিয়ে দিলেন বড়-মিস্ত্রি ভীষণ অসুস্থ। নিউ-অরলিনসের ঘাটে সে নেমে যাচ্ছে। যদিও ব্যাপারটা একবার ভেবে দেখবার দরকার ছিল, কেন এমন হল, কিন্তু পরে মনে হয়েছে, জাহাজ থেকে নেমে গেলে যদি সে ভাল হয়ে যায়, তবে আর এতগুলো লোককে ঘাঁটিয়ে লাভ নেই।

    জাহাজে এরপর দুটো বিশেষ ব্যাপার দেখা গেল। যেমন মৈত্র কেন জানি অমিয়র সঙ্গে কথা বন্ধ করে দিল। তাছাড়া জ্যাককে আর বেশি ডেকে দেখা যেত না। জ্যাক সারাটা দিন প্রায় কেবিনেই থাকত। কাপ্তানের সঙ্গে কখনও বের হয়ে যেত। নিজের কেবিনে দরজা বন্ধ করে বসে থাকত। আবার তিন চারদিন দেখা গেল, জ্যাক সব সময়ই কেবিনে। বেরই হচ্ছে না। কাপ্তান-বয়, গরম জল দিয়ে আসছে মাঝে মাঝে। একটা হট-ওয়াটার ব্যাগ নিয়েও দু-তিন দিন দেখেছে কাপ্তান ওপরে উঠে গেছেন। বোধহয় জ্যাক অসুস্থ। কিন্তু কি অসুখ কেউ বলতে পারল না। এবং জাহাজ সালফার বোঝাই হয়ে যখন ফের মিসিসিপি ধরে নেমে যাচ্ছিল, তখন আরও তাজ্জব খবরে জাহাজের সবাই অবাক হয়ে গেল।

    সারেঙ এসে বললেন, তোকে ছোটবাবু, কাপ্তান ডেকেছেন

    ছোটবাবুর হাঁটুতে কাঁপুনি লেগে যায়। কাপ্তান এ-ভাবে কেন যে বার বার অযথা ডেকে পাঠান। কি কারণ, সে জানতে চাইলে সারেঙসাব বললেন, তুই যা না। তোকে তিনি খারাপ কিছু বলবেন না। খারাপ বললে মনে রাখবি, আমাকে বলতেন। ভাল জামা কাপড় পরে যাবি। যা অগোছালো তুই।

    ছোটবাবু তখন কেমন মানুষটাকে জাহাজে বাপ-পিতামহের মতো না ভেবে পারে না। এবং যা হয়ে থাকে জাহাজে কাপ্তান ডেকে পাঠালেই খুব বড় খবর। আবার ছোটবাবু লকারের আয়নায় নিজের মুখ দেখে নেয়। গরম বলে সে সাদা ট্রাউজার পরেছে, আর নীল রঙের ঢোলা গেঞ্জি। চুল বড় বড় বলে মাথাটা বেশ বড় এবং নীল দাড়ি। সে টের পেল জাহাজে সে সত্যি ভীষণ সুপুরুষ। সে খুব সহজভাবে কাপ্তানের সঙ্গে কথা বলবে। যেমন সারেঙসাবকে নিজের ভালমন্দের অভিভাবক ভাবলেই তার আর ভয় থাকে না। শুধু শ্রদ্ধা, সমীহ থাকে। সে কাপ্তানের সঙ্গে ব্যবহারে শ্রদ্ধা এবং সমীহের ভাবটুকু বজায় রাখবে।

    বের হবার মুখে দেখল সবাই ভিড় করে দাঁড়িয়েছে। বন্ধু, অনিমেষ ছুটে এসেছে। মনু, মান্নান সিঁড়ির মুখে দাঁড়িয়ে আছে। কাপ্তানের ডেকে পাঠানো একটা ভয়ঙ্কর ব্যাপার তাদের কাছে। ওদের মুখ খুব শুকনো দেখাচ্ছে। প্রায় যেন ফাঁসির আসামীর মতো মুখ। ছোটবাবু বের হয়ে ওদের মুখ দেখেই হেসে ফেলল। বলল, কিরে কে মারা গেছে! সে ব্যবহারে বেশ সহজ স্বাভাবিক দেখাতে চাইল।

    —বাড়িয়ালা তোকে ডাকল কেন?

    —কি করে বলব।

    —তুই কিছু করেছিস?

    —কি করব! কেবল ডেবিডের সঙ্গে পালিয়ে মদ খেয়েছিলাম। আর তো কোন দোষ করেছি বলে মনে হচ্ছে না।

    —যখন তখন কেন যে ডেকে পাঠায়। এবং কথা বলতে বলতে সবাই গ্যালি পর্যন্ত এগিয়ে গেল। আর কেউ নামল না নিচে। সারেঙসাব আগে আগে যাচ্ছেন। পেছনে ছোটবাবু। পর পর দুটো ফল্কা তারপর চিফ-কুকের গ্যালি, পাশে এলি-ওয়ে, ভেতরে ঢুকলেই কার্পেট পাতা। কার্পেটের ওপর দিয়ে ছোটবাবু হেঁটে গেল। এবং দেখতে পেল, পাঁচ নম্বর মিস্ত্রির ঘর খালি। এ-ভাবে অন্য সব কেবিন বাইরে থেকে লক করা। সে হেঁটে গেল। সে দেখল, ডাইনিং-রুমে সবাই বসে রয়েছে। প্রায় সব অফিসারেরা।

    এনজিন-অফিসাররা একদিকে, ডেক-অফিসারেরা একদিকে। মাঝখানে কাপ্তান। এনজিনসারেঙ ছোটবাবুকে ডাইনিং-হল পর্যন্ত এগিয়ে দিয়েই চলে গেলেন। সারেঙ চলে যেতেই সে ভীষণ ঘাবড়ে গেল। তবু কোনরকমে ডাইনিং হলে ঢুকেই বলল, গুড মর্নিং।

    সেকেন্ড অফিসার ডেবিড মুচকি হাসছে। সে তাকাল ডেবিডের দিকে। তারপর কাপ্তান, এবং শেষে একে একে সবাইকে দেখল। জ্যাককে আশা করেছিল। জ্যাক নেই। সবাই যে যার পুরু ইউনিফরম পরে বসে আছে। এবং সবাইকে মনে হচ্ছিল, ভীষণ জাঁকজমকের ভেতর রয়েছে তারা। সে এ- সব দেখে আরও ঘাবড়ে গেল। মুখে আবার সেই রক্ত চাপ, মাথাটা ঝিম-ঝিম করছে। সে বুঝতেই পারছে না এ-ভাবে সবার সামনে কাপ্তান তাকে ডেকে কি বলতে চান। অথবা এমন কি সে কিছু করেছে, যা সবার কাছে এখন বলা দরকার।

    কাপ্তান ওকে তখন বললেন, প্লিজ সিট দেয়ার মাই বয়। তিনি পাশের একটি চেয়ারে ওকে বসতে বললেন।

    ছোটবাবু সত্যি এত ভাবতে পারে না। তার পক্ষে এসব কথা খুব সম্মানের। সে জানে, চারপাশে ক্রুদের ভেতর এখন ভীষণ উত্তেজনা। এ-ভাবে ডেকে নেবার কি কারণ! ছোটবাবুর জন্য কি কোন দুঃসংবাদ আছে! ওর দেশ থেকে কি কোন মারাত্মক খবর এসেছে! কেন এ-ভাবে ডেকে আনা, এবং এমন একটা পরিবেশের ভেতর তাকে এ-ভাবে বসিয়ে রাখা! সে একেবারেই বুঝতে না পেরে হতবাক হয়ে গেল। নানাভাবে চেষ্টা করেও সে তার মুখ সহজ স্বাভাবিক রাখতে পারল না। মুখে চোখে ওর কেমন দুশ্চিন্তা ফুটে উঠেছে।

    কাপ্তান বললেন, মাই বয়, ভয়েজ কেমন লাগছে?

    —খুব ভালো স্যার।

    –একঘেয়ে লাগে না?

    —তা লাগে। মাঝে মাঝে লাগে।

    মাস্টার তার পাইপের ছাই টিপে টিপে আবার আগুন ধরাবার সময় বললেন, সব ঠিক হয়ে যাবে। বলেই তিনি তাকালেন মেজ-মিস্ত্রি আর্চির দিকে। যেন আর্চিকেই এ-কথাগুলো বলা। তিনি বললেন, তোমাকে সব বলেছি মিঃ আর্চি। এখন থেকে তবে ছোটবাবু তোমাদের ছ’নম্বর

    আর্চি কোনোরকমে অষুধ গেলার মতো বলল, হ্যাঁ ছ’নম্বর।

    —ছোটবাবু ভাল কাজ জানে না। তাকে শিখিয়ে পড়িয়ে নাও।

    মেজ মিস্ত্রি বলল, তাই হবে।

    ছোট এ-সব কি শুনছে! সে কেন পারবে এমন সব গুরুত্বপূর্ণ কাজ। অথচ সে কাপ্তান হিগিনসের দিকে মুখ তুলে তাকাতে পারছে না। মানুষটা সত্যি যেন অনেক বড়। তিনি যা বলবেন, সবাই মাথা পেতে নেবে, তাকে নিতে হবে। তবু যেন সে বুঝতে পারল, এনজিনে কাজ করার মতো বিদ্যা- বুদ্ধি তার নেই।

    তখনই আবার হিগিনস বললেন, উইনচ-রিপেয়ারের কাজগুলোতো তোমার মোটামুটি জানা?

    ছোটবাবু বলল, সামান্য স্যার।

    —আপাতত এভাবে চালিয়ে যেতে পারলেই হবে।

    ছোট্ট বলল, কিন্তু স্যার……। কিন্তু কাপ্তান ওকে কথা বলার সুযোগ দিলেন না। ডেবিড আগের মতোই ওর দিকে চেয়ে আছে। খুব খুশি ডেবিড। সবাই চেয়ে আছে। কেবল আর্চির গোমড়া মুখ চোখ তাকে ভয় পাইয়ে দিচ্ছে। আর্চি কিছুতেই নিজের এই অবমাননা যেন সহ্য করতে পারছে না। কোথাকার একটা অনভিজ্ঞ নেটিভ জাহাজে উঠেই সবার মন জয় করে ফেলল। এখন যেন ইচ্ছে করলে এই ছোটবাবু জাহাজে অনেক কিছু করতে পারে। আর্চি কিছুতেই কাপ্তানের বিরুদ্ধে যেতে পারছে না। চিফ জাহাজ থেকে নেমে যাওয়ায় ওরও একটা প্রমোশন কোম্পানীর ঘরে হয়তো হয়ে যাবে। কাপ্তান হিগিনিস বাদ সাধলে তার কিছুই হবে না। এবং তেতো ওষুধ গেলার মতো সে বলল, একবার পরীক্ষা করে নিলে হত না। ওর চেয় বেশি অভিজ্ঞ অনেকে আছে। কশপ ভাল কাজ জানে, ওকে দেখা যেতে পারত।

    কাপ্তান বললেন, জাহাজের অবস্থা ভাল না। বয়সী মানুষ দিয়ে হবে না। আমাদের এখন ইয়াং এনারজেটিক লোকের দরকার।

    মেজ-মিস্ত্রি আর্চি বুঝল, কাপ্তান নিজের সিদ্ধান্তে স্থির। সুতরাং সে চুপ করে থাকল।

    কাপ্তান বললেন, নাউ বয়, এখন থেকে তুমি ডাইরেকট মেজ-মিস্ত্রির আন্ডারে। তাঁকে তুমি ভক্তি শ্রদ্ধা করবে। তিনি এখন তোমার বস। তাঁর মর্জি মতো তোমাকে এখন থেকে চলতে হবে। তারপর থেমে বললেন, তুমি এমন কিছু করবে না যাতে তিনি এতটুকু দুঃখ পান।

    ছোটবাবুর এখন আবেগে গলা বুজে আসার মতো। সে ভাবতেই পারেনি এনজিন-রুমের ছ’নম্বর সে কখনও হতে পারবে। আজ থেকে সে জাহাজের একজন দায়িত্বশীল লোক।

    তার খাবারের মেনু আলাদা। সে ভাল পোশাক পরতে পাবে। স্যাবি পোশাক পরে থাকতে হবে না। মাইনে সে পাবে অনেক বেশি। কত পাবে এখনও ঠিক জানতে পারেনি, তবু এখন যা আছে তার চেয়ে কুড়ি গুণ বেশি। সে এখন থেকে ডাইনিং হলে খেতে আসবে। তার জন্য একটা কেবিন থাকবে। মেস-রুম-বয় তাকে দেখলেই সেলাম ঠুকবে। জাহাজিরা তাকে দেখলেই ছ’নম্বর বলবে। জাহাজে সে এ-খবরটা কতক্ষণে সবাইকে যে দিতে পারবে!

    আর তখনই কাপ্তান সবাইকে বললেন চলে যেতে। এবং সারেঙকে ডেকে পাঠাবার জন্য বললেন। বোধহয় এখন ওঠার দরকার এমন ভেবে ছোটবাবু উঠতে যাবে, কাপ্তান হিগিনস এসে ওর সামনে দাঁড়ালেন। বাঁধানো দাঁত জিভের ওপরে তুলে আবার মাড়িতে ফিট করে চারপাশে দেখলেন। কেউ নেই। তখন ধীরে ধীরে বললেন, মাই বয়, ফেস এনি হিউমিলেশান এ্যান্ড পানিশমেন্ট লাইক এ সেলর। ছোটবাবু বুঝতে পারল না এতে হিউমিলেশানের কি আছে! তারপরই যেন আর্চির চোখ তাকে অনুসরণ করতে থাকল। সে বলল, আই উইল ডু স্যার।

    তিনি ফের বললেন, মাই বয়, অলওয়েজ রিমেম্বার, ওয়ান হ্যান্ড ফর ইউরসেলফ, এ্যান্ড ওয়ান ফর দা শিপ।

    সে বলল, ইয়েস আই উইল।

    তারপর তিনি বললেন, সো দিস ইজ দা লাইফ এট সি। তুমি যেতে পার।

    কেমন কিছুটা টলতে টলতে ছোটবাবু বের হয়ে যেতে থাকল। পৃথিবীতে এ-কাজটা তাকে এমন অহংকারের চূড়োয় তুলে দিতে পারে সে কখনও ভাবে নি। সে যেন হেঁটে যাচ্ছে না, দৌড়ে যাচ্ছে, সে যেন দু-হাত ওপরে তুলে বলতে চায়, আমার কি হয়েছে দ্যাখো, আমি কত বড় দ্যাখো। কিন্তু কিছুটা এসেই সে থমকে দাঁড়াল। সব ক্রুদের জটলা একেবারে ভান্ডারি-গ্যালির সামনে। ওরা অপেক্ষা করছে। কি খবর! কোন দুঃসংবাদ। সে বলল ভীষণ ভীষণ দুঃসংবাদ, সে উঠেই প্রথম দেখল মনু সামনে, সে মনুর গলা জড়িয়ে ধরল, ভীষণ ভীষণ দুঃসংবাদ, সে বলল, মৈত্রদা কোথায়, চাচা কোথায় অমিয়, এই অমিয়—চাচা কোথায় গেল!

    সকলে অবাক। ভেবে পাচ্ছে না ছোটবাবু এমনভাবে সবাইকে খুঁজছে কেন!ওরা বলল, কি হয়েছে! মৈত্র ছুটে এসেছে নিচ থেকে। যেন বড় রকমের একটা দুঃসংবাদ বয়ে আনবে ছোটবাবু। ওরা নিচে নিঃশ্বাস বন্ধ করে বসেছিল। ছোটবাবুর হাঁকডাকে ওরা লাফিয়ে ওপরে ওঠে এল। আর সঙ্গে সঙ্গে মৈত্রের গলা জড়িয়ে ধরে বলতে বলতে কেঁদে ফেলল ছোটবাবু, আমাকে কাপ্তান এনজিনরুমের ছ’নম্বর করে দিয়েছে। আমি অফিসার হয়ে গেলাম দাদা। কাল থেকে তোমাদের সঙ্গে আর থাকতে পারব না।

    ততক্ষণে সারেঙও ফিরে এসেছেন। এসেই বললেন, বাড়িওয়ালা কালই ওর কেবিনে সব সামান রেখে আসতে বলেছে। ওর কেবিন দেখে এলাম। রঙ করতে হবে। আজই করতে হবে।

    মৈত্র বলল, এই অমিয়! এমন একটা খবরে মৈত্র গলে জল হয়ে গেছে। অমিয়র উপর রাগ নেই।

    অমিয় বলল, কি! মৈত্র ফের কথা বলায় সে খুব খুশি।

    —রঙ করতে হবে।

    মান্নান বলল, আমরা রঙ করব।

    মনু বলল, কি কন!

    মান্নান বলল, আমি আর ইয়াসিন রঙ করব।

    —ক্যান। আমরা কি করতে আছি। ছোটবাবু এনজিন রুমের। ছোটবাবু আমাদের লোক।

    এনজিন-সারেঙ বলল, মৈত্রমশাই ছোটবাবু আর আপনার হেপাজতে থাকল না। বলতে বলতে কেমন গলা ধরে এল তার।

    আসলে এনজিন-সারেঙ নিজের দুঃখটা এই বলে ঢাকা দিতে চাইছেন। ছোটবাবুর ওপর আজ থেকে তাঁর আর কোন দাবী থাকল না। ছোটবাবুর ভাল-মন্দের জন্য তার যা কিছু দায়িত্ব—বাড়িয়ালা এক কলমের খোঁচায় তা কেড়ে নিলেন। ছোটবাবুর জন্য ভেতরে কি যে মায়া! কারণ ছোটবাবুকে আর এদিকে বেশি আসতে দেখা যাবে না। আজ থেকে ছোটবাবুর জাত-মান বেড়ে গেল। অথচ সারেঙ-সাব খুব খুশি, ছোটবাবুকে এমন একটা কাজই মানায়। খুব-খাটুনির কাজ, আর মেজ-মিস্ত্রি আর্চির কথা মনে হলেই সারেঙ-সাব কেমন শক্ত হয়ে যান। ডেকের ওপর মেজ মিস্ত্রি যেভাবে পাঁচ নম্বরকে হেনস্থা করে থাকে, কিল চড় ঘুষি মেরে থাকে, পাঁচ নম্বর কাজে ভুল করলে, লাথি মেরে ফেলে দেয়, যদি ছোটবাবুকে এ-ভাবে এবং এভাবে যেন একটা কিছু হয়েও যাবে—ভয়ে সারেঙের বুকটা কেঁপে উঠল। যেন একটা হাঙ্গরের মুখে বাড়িওয়ালা ইচ্ছে করেই ছোটবাবুকে ছুঁড়ে ফেলে দিলেন। এখন থেকে মেজ-মিস্ত্রি ছোটবাবুর সব। তিনি তার কেউ না, তিনি ফালতু।

    সারেঙ-সাব বললেন, আমার সঙ্গে মনু অমিয় আয়। অর্থাৎ সারেঙসাব আর দেরি করতে পারছেন না। বোধহয় বেশি কথা বললে, আবেগে চোখ ঝাপসা হয়ে যেতে পারে ভেবে অমিয় এবং মনুকে নিয়ে চলে গেলেন। নিজে দাঁড়িয়ে ছোটবাবুর কেবিনে রং করবেন। সাদা, নীল যেখানে যে-রং লাগালে মানায় এবং এমন চাকচিক্যময় করে তুলতে হবে, যেন ছোটবাবুর কেবিনের পাশে আর সব কেবিন ভীষণ ম্যাড়ম্যাড়ে, ছোটবাবুর কেবিনে অন্য অফিসাররা এলেই যেন বুঝতে পারে—এ কেবিন ছাড়া ছোটবাবুকে মানায় না।

    ছোটবাবু তারপর ফোকসালে নেমে গেল। সবাই এখন ছোটবাবুর চারপাশে। ওরাও নেমে গেল। কত বড় সম্মান! যেন এখন এই সাধারণ জাহাজিরা বলতে চায়, আমরাও কম কিসে, আমাদের আর এত ছোট ভেব না। আমাদের লোক ছোটবাবু। তোমাদের ধার দিচ্ছি। এবং এর ভেতরই সেজে এল মজুমদার। সে যা করে থাকে, ঘুরে ঘুরে নাচে, এবং পায়ে ঘুঙুর। কারণ, এছাড়া ছোটবাবুকে ওরা কি দিয়ে বিদায়বেলার উৎসবে বলতে পারে তুমি আমাদেরই লোক। ছোটবাবু আমাদের ভুলে যেও না।

    কেবল মৈত্র পাশে বসে ভাবছে। সে এই নাচ গান হল্লা শুনছে না। চা আসছে, চপাটি আসছে, এরই ভেতর চপাটি সবাই খাচ্ছে যেন ওরা ভেবে ফেলেছে রঙ-বেরঙের কাগজের মালা, ফুল এবং সব নানা রঙের ফেস্টুন ছোটবাবুর বিদায় উৎসবে উড়ছে, ঝুলছে। তার ভেতরই তারা চা খাচ্ছে। আসলে এটা চা নয়, যেন পানীয় এবং মাথার ওপরে ছাদ, সাদা রঙের। একটা মরা আলো ফোকসালে। এতে ওদের আসে যায় না। ওরা ভেবে ফেলেছে এখানে এখন জ্বলছে হাজার রকমের নীল বাতি, উজ্জ্বল বর্ণমালার ভেতর ওরা নেচে গেয়ে ছোটবাবুকে হেইল করছে।

    কেবল ছোটবাবু চুপচাপ। এবং মৈত্রদা ছোটবাবুকে দেখছিল। ওদের এখন থামা উচিত। মৈত্র ওদের বলল, এবার তোরা যা। ছোটকে একটু একা থাকতে দে।

    ছোটবাবু বলল, না, না। ওরা থাক না। জান মৈত্রদা, আমার ভাল লাগছে না। কেমন ভয় ভয় করছে। তোমাদের ছেড়ে যেতে আমার ভাল লাগছে না।

    —ভয়ের কি আছে!

    —আমি তো কিছু ঠিক জানি না। ট্রেনিঙে যা শিখেছি, আর এই পাঁচ ছ মাসে পাঁচ নম্বরের সঙ্গে কাজ করে করে যা বুঝেছি।

    মৈত্র বলল, কি বা কাজ, উইনচ ঠিকঠাক রাখা, ফিলটার পরিষ্কার করা, টিউবে বয়লারের জল রোজ একবার টেস্ট করা—আর কি, তবে তুই কিছু বইটিই কিনে ফেলবি। তোর কাজে অনেক সুবিধা হবে।

    মৈত্র অবশ্য জানে কিসের জন্য ছোটবাবুর মুখ ব্যাজার। এতদিন একসঙ্গে থাকলে একটা মায়া গড়ে ওঠে ওদের ছেড়ে থাকতে ছোটবাবুর ভাল লাগবে না। এবং ছোটবাবু বোধহয় মনে মনে টের পেয়েছে—মেজ-মিস্ত্রি আর্চির নিষ্ঠুরতার শেষ নেই। মৈত্র বলল, ভয় কি আমরা তো আছি।

    ফোকসাল এখন ফাঁকা। কেবল ছোটবাবু আর মৈত্র বসে রয়েছে। অন্য ফোকসালে সবাই এখন ছোটবাবুর গুণগান করছে। আসলে যখন জাহাজে ছোটবাবু উঠে এসেছিল, তখনই সবাই টের পেয়েছে, ওদের মতো এমন ছোট কাজ করার লোক ছোটবাবু নয়। বাদশা মিঞা বলেছে, জানো ছোটবাবু কত লেখাপড়া জানা ছেলে। আমাদের মতো সে কেন ডেকে এনজিনে পড়ে পড়ে মার খাবে। ঠিক লোক এবার থেকে ঠিক জায়গায় চলে গেল। এতদিন ছোটবাবু তাদের সঙ্গে কাজ করেছে এই যথেষ্ট। এমন যে হবে সেটা এখন কে বেশি টের পেয়েছিল তা নিয়ে কোথাও কোথাও ঝগড়া বচসা পর্যন্ত আরম্ভ হয়ে গেল। এবং তখন বারোটা বাজলে, ওয়াচে মৈত্র একবার নেমে দেখে এল, সব ঠিকঠাক আছে কিনা। জাহাজ ভীষণ আস্তে চলছে বলে, কয়লা কম হচ্ছে। আর আমেরিকান কোল, খুবই কম কয়লায় বয়লারে স্টীম উঠে যায়। ছাই একেবারেই হয় না। যেন তেলের মতো জ্বলতে থাকে। তখন কোলবয়ের তেমন কাজ থাকে না। দু-চার বেলচা কয়লা মারলেই হয়ে যায়। সুতরাং তিনজন ফায়ারম্যান নিচে ঠিকঠাক কাজ চালিয়ে নিচ্ছে। তবু একবার দেখা দরকার ভেবে বোটডেকে উঠে যাবার সময় দেখল, সারেঙ-সাব এলি-ওয়ে ধরে বের হয়ে আসছেন। আর অবাক, বিচিত্র রং- এ সারেঙ-সাবের সাদা বয়লার স্যুট অদ্ভুত দেখাচ্ছে। চুলে দাড়িতে রঙ লেগেছে। নাকে কিছুটা সাদা রঙ। সারেঙ-সাবকে একজন বুড়ো জোকারের মতো দেখাচ্ছে। ওর হাসি পাচ্ছিল। অনেক কষ্টে হাসি চেপে বলল, সারেঙ-সাব মুখটা মুছে ফেলুন।

    সারেঙ-সাব বললেন, বুড়ো হলে কি হবে, কাজ কাম হাতে অনেকদিন করি না বলৈ কি হবে, এখনও পারি, রং লাগাতে পারি। অমিয় মনু পারে না। যত বলি ঠিক হচ্ছে না, তত বলে আর কি হবে সারেঙ-সাব। তখন কি করি বলুন, বুরুশ হাতে নিলাম। বললাম, দ্যাখ, দেখছিস—বুরুশের দাগ কোথায় ভেসে উঠছে!

    মৈত্র বুঝতে পারল, ছেলের জন্য নিজে রঙ করে দিতে না পারলে সারেঙ সাবের মন ভরছে না। সারেঙ-সাবের কি এখন গর্ব। ছেলে তার মান-সম্মান যখেনি শুধু, সবার ইজ্জত বাড়িয়ে দিয়েছে। তিনি আবার ছেলেমানুষের মতো বললেন, আসুন না, দেখবেন কি রকম রঙ করলাম। কেমন দেখাচ্ছে। বলে প্রায় জোরজার করে মৈত্রকে ধরে নিয়ে গেল। মৈত্র এদিকে কখনও আসেনি। কার্পেটের ওপর দিয়ে সে কেন যেন দ্রুত হাঁটতে পারে না। সে তবু সারেঙ-সাবের সঙ্গে প্রায় দৌড়ে গেল। সারেঙ- সাব দরজা খুলে দিয়ে বললেন, দেখুন। ছাদে নীল রং, কশপকে বলেছি রং এক নম্বর দিতে হবে, দেয়ালে একটু ব্লু আর মেজেন্টা মিলিয়ে কি রং এনেছি দেখুন। কোথাও বুরুশের দাগ ভেসে উঠেছে? তবে!

    অমিয় মনু রং-এর টব আর বুরুশ হাতে দাঁড়িয়ে আছে। মৈত্র অমিয়কে বলল, তোরা কি! মনুকে বলল, সারেঙ-সাবকে তোরা রং করতে দিলি?

    —আমরা দিয়েছি!

    অমিয় বলল, সাবান জল দিয়ে যত ধুই তত বলেন, না সাফ হচ্ছে না। ঠিক হচ্ছে না। রং লাগালে চিৎকার করছেন, হচ্ছে না। বুরুশের দাগ ভেসে উঠছে। আমরা কি করব বল? একা একা সবটা করলেন।

    সারেঙ-সাব বললেন, কেমন হয়েছে বললেন না তো?

    —খুব ভাল!

    মৈত্র আর দাঁড়াল না। নিচে এক্ষুনি নেমে যেতে হবে। এবং যেতে যেতেই বুঝতে পারল, ছোটবাবু ফোকসাল ছেড়ে আসায় সবচেয়ে অসহায় যেন এই মানুষটা। এমনিতে তিনি কম কথা বলেন, কাজকামে ডুবে থাকেন। জাহাজের কোথায় কি করার দরকার, সবার আগে তিনি বোধহয় টের পান। ভীষণ সতর্ক নজর। এতদিন একবারও মনে হয়নি, জাহাজে মৈত্রের চেয়ে ছোটবাবুর জন্য কেউ বেশি ভেবে থাকে। ছোটবাবুর জন্য আরও একজন মানুষ এই জাহাজেই নিরন্তর মহামহিমের কাছে প্রার্থনা করে থাকেন সে জানত না। সে বলল, ছোটবাবু, তোমার কপাল দেখে আমার হিংসে হচ্ছে।

    আর এভাবেই পরদিন ছোটবাবু তার নিজের বলতে সবকিছু ছেড়ে অর্থাৎ ছোটবাবুর শরীরে এতদিন যে খোলস ছিল, এখন একেবারে ভিন্ন রকমের, এবং এভাবে স্বভাব পালটাতে সবারই কষ্ট হয়। ছোটবাবুরও হয়েছিল। ফোকসালটা এ-ক’মাসে এত প্রিয় হয়ে গেছল সে বুঝতে পারেনি। যেন কথা ছিল চিরদিন সে এখানেই থাকবে। মৈত্র এবং অমিয় অথবা অন্য জাহাজিরাই তার সব, আর কেউ আছে পৃথিবীতে ক্রমে যখন ভুলে যাচ্ছিল, ঠিক তখন জীবনে এই পরিবর্তন খুব হকচকিয়ে দিল।

    .

    প্রথম দিন সে কেবিনে ঘুমোতে পারেনি। পাঁচ নম্বর, ওয়াচে নেমে গেছে। চিফের কাজকর্ম মেজ- মিস্ত্রি চালাচ্ছে। মাঝে মাঝে মেজ-মিস্ত্রি ওয়াচেও নেমে যাচ্ছে। এবং উইনচের স্ট্রেপার বিয়ারিং, ওঠানামায় ক্ষয়ে গেছে। ভেতরে লাইনিং দিয়ে মেরামত করতে হবে। ফাইলের কাজ বেশি। পাঁচ নম্বর কুঁড়ে প্রকৃতির বলে, ফাইল সে ছোটবাবুকে দিয়ে অনেকবার করিয়েছে। এখন সে নিজে দু-দিকে সমান চাপ দিয়ে ঘসে ঘসে লোহার পাত, তামার পাত অথবা ব্রাশ ঘসে ঘসে ঠিক যত মিলিমিটার পাতলা দরকার করে ফেলতে পারে। এবং যখন ওপরে উঠে আসে, তখন দেখতে পায় নদী ক্রমশ আবার বিস্তৃর্ণ হয়ে যাচ্ছে। বিকেলের দিকে মোহনা পাবার কথা।

    তখন কাপ্তান বনির কেবিনে। জাহাজ মোহনা ছাড়িয়ে আবার সমুদ্রে ভেসে চলেছে। বনির শরীরে একটা রঙবেরঙের সিল্কের চাদর। বনি শুয়ে আছে। চোখ কনুই দিয়ে ঢেকে রেখেছে। তার কেবিনে যে হিগিনস এসেছেন সে যেন টের পায়নি। অথবা এমন এক অতলে ডুবে আছে যে মনে হচ্ছে বনি ঘুমোচ্ছে।

    হিগিনস মেয়ের মাথার কাছে একটা চেয়ার টেনে বসলেন। যেন তিনি তাঁর এই একমাত্র জাতকের কাছে ক্ষমা চাইতে এসেছেন—এমন চোখ মুখ! অর্থাৎ বনির শরীরে সুহাস সুবর্ণ সব বাতিঘরেরা যে খেলে বেড়াচ্ছে তা তিনি বুঝতে পারছেন। এ-ভাবে পুরুষের মতো সেজে থাকতে বনির ভাল লাগছে না। অথচ উপায় নেই বলে থাকতে হচ্ছে। তবু ইচ্ছে করলেই হিগিনস সবাইকে বলে দিতে পারেন, আসলে বনি মেয়ে, সে জাহাজে মেয়ের মতোই থাকতে ভালবাসে—কিন্তু জাহাজের একঘেয়েমি এবং নিষ্ঠুরতা বনিকে ছিন্ন-ভিন্ন করে দিতে পারে। বনিকে তিনি মেয়ে বলে কিছুতেই জাহির করতে পারছেন না। এটা তাঁর ভয়। ভয় বলেই জোরজার করে তিনি সহজ সরল সত্যকে বিকৃত করছেন। মনে মনে বনির কাছে এখন খুব ছোট হয়ে যাচ্ছেন। যেন বলার ইচ্ছে, বনি আর কিছুদিন, এই যতদিন জাহাজ ফের হোমে না ফেরে ততদিন তারপর আর কখনও তোমাকে এভাবে থাকতে হবে না। তোমার জন্য আমি সুন্দর সুন্দর পোশাক কিনে দেব।

    তিনি ডাকলেন, বনি।

    বনি চোখ থেকে হাত সরাল না। বলল, এখন আমরা কোথায় বাবা?

    মোহনা ছাড়িয়ে গেছি। কিছু আর কোথাও দেখা যাচ্ছে না।

    —বনি আর কিছু বলল না। সে যেমন চুপ করে জেগেছিল তেমনি আবার অতলে ডুবে গেল।

    —কাপ্তান বললেন, ব্যথাটা কেমন?

    —নেই।

    —ভাল লাগছে?

    —ঘুম পাচ্ছে বাবা।

    —তুমি ভয় পাওনি তো?

    —না বাবা।

    —এখন এ-সব তোমার হবে। তুমি হয়ে বড় যাচ্ছ বনি।

    বনি বলল, বাবা, আমার কেবল ঘুমোতে ইচ্ছে করছে।

    হিগিনস মেয়ের কপালে হাত রাখলেন, সুন্দর ছোট্ট কপাল বনির। চুল ঘন এবং নরম বলে ভারি মনোরম লাগছে হাত বুলাতে। তিনি কপাল থেকে বনির চুল সরিয়ে দিলেন। এবং ইচ্ছে হল আস্তে চুমু খেতে। বনির ঘুম আসছে, ঘুমোক। এই বিকেলে, সূর্য যখন সমুদ্রে নানা বর্ণমালার ভেতর অস্ত যাবে, তখন বনি, এই সাদা জাহাজের ভেতর ঘুমিয়ে পড়বে। তিনি বললেন, কিছু খাবে?

    —না বাবা।

    হিগিনস বললেন, আমরা নিউ-প্লাইমাউথ যাচ্ছি।

    —কোথায় বাবা?

    —আমরা পানামা খাল পার হয়ে যাব। তারপর পঁচিশ-ছাব্বিশ দিন জাহাজ একনাগাড়ে চলবে, একদিনের জন্য তাহিতিতে থামবে। রসদ এবং জল নেওয়া হবে। নিউ-প্লাইমাউথ, নিউজিল্যান্ডের ছোট্ট বন্দর।

    তাহিতি দ্বীপের কথা শুনেই—কবে যেন কার কাছে বনি দ্বীপের সব সুন্দর সুন্দর গল্প শুনেছিল। পৃথিবীর সব সুখী মানুষেরা তাহিতি দ্বীপে একবার যেন না গিয়ে পারে না। সে বলল, আমরা নামতে পারব বাবা?

    —তোমার খুব নামতে ইচ্ছে করে?

    বনি কি বলবে, সে এবার মুখ থেকে হাত সরিয়ে তাকাল। বড় বড় চোখে বাবাকে দেখছে। কী সুন্দর তার বাবা!

    কাপ্তান বনির চোখের দিকে তাকালে আর স্থির থাকতে পারেন না। বয়স হওয়ার জন্য এটা বোধহয় হয়েছে। তিনি না থাকলে বনির কেউ থাকবে না। বনি বড় হচ্ছে, আর কিছু বড় হলে ভাবনার থাকবে না। আর কিছুদিন তিনি পৃথিবীতে থাকতে চান। এই মেয়ে ঠিক ঠিক বড় হয়ে গেলে তিনি মরতে ভয় পাবেন না। কাজেই বনি এভাবে তাকিয়ে থাকলে, কারণ দেখতে পাচ্ছেন, বনির চোখ বড় অসহায়। কিসের একটা ভয় ওকে তাড়া করছে। চোখ দেখলেই টের পান সব। তিনি উঠে যাবেন ভাবছিলেন। কিন্তু চোখে যেন একটা আতঙ্ক বনির। তিনি বললেন, তুমি কি বনি কোন দুঃস্বপ্ন দেখেছ?

    —না বাবা।

    —মুখ চোখ দেখে মনে হয় কতদিন না ঘুমিয়ে আছ।

    বনি বলল, না তো।

    —তবে চোখ মুখ এত শুকনো কেন? একা থাকতে ভয় পাও?

    বনি হেসে দিল। বলল, ভয় পাব কেন?

    —তবু কেন যে তোমাকে দেখে ভাল লাগছে না!

    —শরীর ভাল না থাকলে এমন হবে না!

    যেন হিগিনস এবার স্বস্তি পেলেন। রিচার্ড জাহাজ থেকে নেমে গেছে। ওর কিছু ম্যানিয়া আছে। এসব ভারতীয়দের সঙ্গে কাজ করার অভ্যাস তার আগে ছিল না। প্রথম থেকেই সে খুব একটা খুশি ছিল না। কোম্পানী জোরজার করে ওঁকে পাঠিয়েছে। মনে হয় একটা অজুহাত দেখিয়ে শেষ পর্যন্ত নেমে গেল।

    বনি উঠে বসল। বলল, তুমি খুব ভীতু বাবা।

    হিগিনস মেয়ের এমন কথায় সামান্য হাসলেন। তাঁকে কেউ কখনও এভাবে কথা বলতে পারে না। এই মেয়েটা তাঁর ভাল-মন্দ সব কিছু। এমন কি তিনি দেখেছেন, আজকাল বনি তাঁকে মাঝে মাঝে ঠিক শাসনের সুরে কথা বলে থাকে। বেশি খাটাখাটনি করলে রাগ করে খেতে যায় না। আচ্ছা আর হবে না, এই বলে অনেক বুঝিয়ে তবে বনিকে তখন খাওয়ানো যায়। আর বুঝতে পারছেন, ডাঙ্গার জন্য যা কিছু টান—এই ‘ছোট্ট সুন্দর ফুলের মতো মেয়েটার জন্য।

    হিগিনস বললেন, তুমি ঘুমোবে। ভুত-টুত জাহাজে, বাজে কথা

    বনি হেসে ফেলল। হেসে দিলে বনির ঝকঝকে দাঁত এত বেশি উজ্জ্বল হয়ে ওঠে চোখ দুটো এমন মায়াময় হয়ে যায়—যে মনেই থাকে না এই মেয়ে কিছুক্ষণ আগে মুখে অতিশয় আতঙ্কের ছবি এঁকে রেখেছিল। বনি বলল, আমি ভাল আছি বাবা। আমার জন্য ভাববে না। যেন বলতে চাইল ভয় আছে, আমি টের পাচ্ছি চারপাশে একটা ভয় ঘোরাফেরা করছে, কিন্তু যখন ছোটবাবুর কথা ভাবি তখন একেবারে ভয় থাকে না।

    সে বলল, বাবা, ছোটবাবু ঠিকমতো কাজ করছে তো।

    —পারছে না। আর্চি তো কাল বলল কি একটা পার্টস ভেঙে ফেলেছে ছোটবাবু।

    আর তক্ষুনি বিষন্ন হয়ে গেল বনির মুখ। আবার সেই আতঙ্ক ক্রমে সারা মুখে ছড়িয়ে পড়ল।

    হিগিনস মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে কি যেন বুঝতে পারলেন। বললেন, প্রথম প্রথম একটু এমন হবেই।

    বনি বলতে পারল না, আর্চি তোমাকে ঠিক ঠিক রিপোর্ট করছে না বাবা। আমি আবার ডেকে বের হতে পারলে বুঝতে পারব। আর্চি তোমাকে বানিয়ে যত রাজ্যের রিপোর্ট করে যাবে।

    এবং বোধহয় এ-ভাবেই জাহাজে দুই প্রতিদ্বন্ধী এখন হেঁটে বেড়াচ্ছে। বনির কপালে হিগিনস যাবার সময় ধীরে চুমু খেলেন। বাবা চলে গেলে দরজা বন্ধ করে বনি আবার বসে থাকল ভেতরে। কিছু ভাল লাগছে না। ছোটবাবুর সঙ্গে যেন তার কতদিন দেখা হয়নি। এই তিন চারদিনেই মনে হয়েছে—কবে কোন দ্বীপে একবার যেন সেই মানুষটিকে সে দেখেছিল। তার শরীরে লম্বা আলখাল্লা। সমুদ্রের পাড়ে পাড়ে সে হেঁটে যাচ্ছে। শরীরে তার সুবর্ণ নদীর জলের ঘ্রাণ। সমুদ্রের নীল জল পায়ে তার আছড়ে পড়ছে। মানুষটাকে সে অনেকদিন ভেবেছে, সামনে দাঁড়িয়ে দেখবে। দেখতে পারেনি। যতবার সে হেঁটে আগে যাবার চেষ্টা করেছে ততবার মনে হয়েছে পারছে না। সে হেঁটে হেঁটে চলে যাচ্ছে। আলখাল্লায় পায়ের পাতা ঢাকা তার। সমুদ্রের নীল জলে তা ভিজে যাচ্ছে। এবং কোনো সম্রাটের মতো সে যখন হেঁটে যায় বনি যেন ছোট্ট মেয়ের মতো তাকে দেখতে ভালবাসে। এবং কতকাল থেকে, যেন সেই শিশুবয়েস থেকে, অথবা বলা যায় শৈশবের প্রারম্ভে কিংবা তারও পরে সে এমন একজন মানুষকেই ভেবে আসছে। নরম সবুজ নীল দাড়ি, মাথায় একরাশ নরম নীলাভ চুল আর বড় বড় চোখ, লম্বা, ঠিক সম্রাট সিজারের মতো অথবা মনে হয়, সে যাচ্ছে তো যাচ্ছেই, বনি পেছনে পেছনে ছুটেও তার নাগাল পাচ্ছে না। যেন সে তখন ডাকছে, হেই অহংকারী যুবক, তুমি আমাকে দেখতে পাচ্ছ না! আমি বনি!

  • একুশ

    একুশ

    ।। একুশ।।

    এ-সময়ে এ-সমুদ্রে কিছু ঝড়ঝঞ্ঝা থাকে। এবং চার পাঁচ দিন ধরে আকাশ গরম সিসের মতো, বিদ্যুতের ফালা ফালা আকাশফাটানো গুম গুম শব্দ। জাহাজ আবার কিছুদিন লাফিয়ে লাফিয়ে প্রায় দ্রুতবেগে কোন অশ্বারোহী পুরুষের দুর্গম বনভূমি পার হয়ে যাবার মতো ছুটে যাচ্ছে। হিগিনস তখনই ভেতরে ভীষণ পুলক বোধ করেন। তিনি ঝড়ের দরিয়ায় দাঁড়িয়ে থাকেন। সিসের মতো আকাশের মেঘ এবং ঘন বৃষ্টিপাতের ভেতর নীল জলরাশির অজস্র সাদা ফেনা, এবং চারপাশে যেদিকে তখন চোখ যায় যেন, হাজার হাজার অতিকায় প্রাগৈতিহাসিক জীব জলের নিচে ফুঁসে বেড়াচ্ছে। জলের রঙ নীল থাকছে না। একেবারে সাদা। পঁচিশ ত্রিশ ফুট উঁচু ঢেউ সব ফুঁসে ফুঁসে ফুলে ফুলে যত জাহাজটার দিকে এগিয়ে আসে তত এক মজার খেলা, ওরা পারে না। তাঁর এমন বিশ্বস্ত জলযানের সঙ্গে পারে না। ঢেউ কাটিয়ে ছোট শশকের মতো ঘাসের ভেতর দিয়ে এঁকেবেঁকে যেন ছুটে যাচ্ছে জাহাজটা। তিনি বুঝতে পারেন, এ-ভাবেই এক আকর্ষণ, যেন এই জাহাজ তখন জাহাজ থাকে না। কোনো ইতিহাসের বিশ্বস্ত অশ্বের মতো। আর তিনি অশ্বারোহী পুরুষ। সেই অশ্বারোহী পুরুষটি লাগাম ধরে আছেন। সমুদ্রের এইসব ঝড়ঝঞ্ঝা, বিক্ষুব্ধ তরঙ্গমালার ভেতর দিয়ে বেগে চালিয়ে জাহাজ মুক্ত আকাশের নিচে চলে এলে তখন সমুদ্র বিজয়ের কি যে আনন্দ! আহা, আনন্দ, আনন্দ ধরে না প্রাণে। হিগিনস সারা দিনমান নিজের সেই প্রিয় ডেকচেয়ারে বসে জাহাজ আর সমুদ্রের খেলা দেখতে দেখতে চোখ বুজে ফেলেন।

    তখন কেউ পাশে এসে দাঁড়ালেও টের পান না, কেউ দাঁড়িয়ে আছে। যেন এই যে চলে আসা, এবং জাহাজ, ঝড়ঝঞ্ঝা সবই মহামহিমের ইচ্ছায় চলে, তবু কেন যেন সব কিছুর ভেতর নিজেকেই খুব বড় এবং সর্বময় ভাবতে ভাল লাগে। যত বয়স বাড়ছে, তত ভাবছেন, নিজেকে সর্বময় ভাবার ভেতর কি আর আছে! তত তিনি বুঝতে পারেন, যতই বয়স বাড়ক, নিজেকে সর্বময় ভাবতে না পারলে, বেঁচে থাকার আনন্দ কোথায় যেন হারিয়ে যায়। এবং এ ভাবে যখনই চিন্তা-ভাবনা ক্রমে মগজ কুরে খায়, তখন রাতের অজস্র নক্ষত্রমালার ভিতর দাঁড়িয়ে সমুদ্র এবং আকাশের মাঝামাঝি হাত তুলে বলতে ইচ্ছে করে তাঁর—ঈশ্বর, আপনার এই অসীম সমুদ্রে, আমার ছোট্ট জাহাজ সিউলব্যাংকে রক্ষা করুন। তিনি তাঁর অহংকারের জন্য ঈশ্বরের কাছে এ-ভাবে আবার কখনও ক্ষমা প্রার্থনার সময় নতজানু হয়ে নীরবে চোখের জল ফেলেন।

    ন’দিনের দিন সিউল-ব্যাঙ্ক লিমন উপসাগরে এ-ভাবে নেমে এল। সামনে দেখা যাচ্ছে পানামা ক্যানেল অঞ্চলের সব পাহাড় শ্রেণী। ক্রমে তা মেঘের মতো সমুদ্রে ভেসে উঠছে। বোঝাই যায় না পাহাড়ের মাথায় খাল কাটা আছে। পাহাড়ের এত কাছে এসেও জাহাজিরা কিছু বুঝতে পারছিল না। জাহাজের স্পীড কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। জাহাজ এগুচ্ছে কি সেই ছায়া ছায়া পাহাড়টা এগিয়ে আসছে বোঝা যাচ্ছে না। বিকেলের দিকে সিউল-ব্যাংক একেবারে পাহাড়ের নিচে এসে থেমে গেল। সমুদ্রের ঢেউ পাথর অথবা পাহাড়ে ধাক্কা খেয়ে ফিরে আসছে। এবং সব সময় মনে হচ্ছে জলের গভীরে এ-ভাবে চারপাশে পাহাড় এবং পাথর ডুবে যাচ্ছে আবার ভেসে উঠছে।

    আর সামনে, জাহাজিরা দেখল, লাইন দিয়ে সব জাহাজ দাঁড়িয়ে আছে ও-পারে যাবে বলে। ছোটবাবু, জ্যাক কিছুতেই বুঝতে পারছে না, খালটা কোথায়। ডেবিড এলে বোঝা যেত। কিন্তু ডেবিডের এখন চব্বিশ ঘন্টা সতর্ক থাকতে হবে। কিনার থেকে সব মেকসিকান কুলি উঠে এসেছে। হাসিল এবং লোহার তার লম্বা করে ফেলে দিয়ে যাচ্ছে। সামনে পাঁচ-সাতশো গজ দূরে দুটো জাহাজ। তিনটে ছিল, এইমাত্র একটা কি করে যে হারিয়ে গেল। ঠিক যেন লাইন দিয়ে টিকিট কেনার মতো এবং হলঘরে ঢুকে যাওয়া। কিছু সময় গেলে অমিয় দেখতে পেল সেই হারিয়ে যাওয়া জাহাজটা ক্রমে এক আশ্চর্য যাদুবলে ওপরে উঠে যাচ্ছে। পাহাড়ের মাথায় উঠে যাচ্ছে। এবং ওরা দেখতে পেল পাশে তেমনি আর একটা জাহাজ এভাবে পাহাড় থেকে নেমে আসছে। আর ওরা টের পাচ্ছে না, সেই সঙ্গে ওরাও যে এবার ধীরে ধীরে সেই বড় দুটো লোহার দরজা, প্রায় চিচিং ফাঁকের মতো, কোন এক যাদুবলে দরজা খুলে যাচ্ছে এবং সেই অতিকায় জাহাজ ঢুকে যাচ্ছে। দু’পাশে ট্রামলাইন বসানো। দু’পাশের ট্রাম জাহাজটাকে টেনে এক লক-গেট থেকে আর এক লগ-গেটে পৌঁছে দিচ্ছে। এবং এক সময় সূর্য অস্ত যাবার মুখে সিউল-ব্যাঙ্ক পাহাড়ের ওপর আশ্চর্যভাবে ঝুলতে থাকল। জলে ভেসে রয়েছে—সমুদ্র থেকে কিছুতেই বোঝা যায় না। যেন সহসা জাহাজটা পাখা গজিয়ে গেছে। এবং পাখায় ভর করে ভেসে রয়েছে ওপরে।

    জাহাজিরা দেখল, অনেক নিচে আবার তিন-চারটে জাহাজ, লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ওরা যে জাহাজটাকে পাহাড়ের ওপর থেকে নেমে আসতে দেখেছিল, সেই জাহাজ যেন খানিক সময় একটা বিপদের মুখে পড়ে চুপচাপ ছিল, পাহাড় থেকে নেমেই আবার তরতর করে সমুদ্রে ভেসে চলেছে। আর কি ছোট দেখাচ্ছে জাহাজগুলোকে। কাগজের নৌকার মতো ভাসতে ভাসতে সমুদ্রে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে।

    এখন দু’পাশে শহর। কোলেন শহর। খুব বেশি সময় ওরা শহর দেখতে পেল না। ওরা একটা হ্রদের মতো অঞ্চলে ঢুকে গেল। ছোটবাবুর মনে হল তখন পূর্ববঙ্গের বর্ষাকালের মতো পানামা উপত্যকার এ অঞ্চলটা। চারপাশে ছোট ছোট ঢিবি, ঘাস বনজঙ্গলে সবুজ হয়ে আছে, এবং নীল জল, অর্থাৎ পাহাড়ের উপত্যকায় মনে হয়, এক বর্ষাকাল, যেন জাহাজিরা উঁকি দিলে জলে পুঁটিমাছ ডারকিনা মাছ পর্যন্ত দেখে ফেলবে। আর সব গাছপালা দেখলে মনে হবে, সেই লক্ষ্মীপুজোর দিনে ছোটবাবু যেমন টুনি ফুল খুঁজতে যেত তার মায়ের জন্য, এও যেন এক পৃথিবী যেখানে সে এই বড় জাহাজ নিয়ে টুনি ফুল খুঁজতে বের হয়েছে। হাত দিলেই প্রায় যেন সেই সব নানা বর্ণের ফুল সে তুলে আনতে পারে। মনেই হয় না জীবনে এমন দৃশ্য সে কোথাও আর দেখতে পাবে।

    এভাবে কত কিছু মনে হয়। জাহাজিরা এখন সব রেলিঙে দাঁড়িয়ে আছে। এমন দৃশ্যাবলী কোথায় আর দেখা যাবে। সমুদ্র থেকে ওরা এখন অনেক উঁচুতে রয়েছে। ওরা যেন প্রায় বলতে গেলে ডাঙ্গার ওপর দিয়ে জাহাজ চালিয়ে নিচ্ছে। দু’পাশের কৃত্রিম হ্রদে সব জলাধার দেখলে বিশ্বাসই হবে না মানুষের তৈরী এমন একটা সমুদ্র পারাপারের ভেতর অজস্র গাছপালা আর তার ছায়ায় সিউল-ব্যাঙ্ক হেলে দুলে যেতে পারে। খুব ধীর গতি। বেশি স্পীডে চলতে পারছে না। এমন কি মনে হয় প্রপেলার খুব জোরে ঘুরলে নিচের ঘোলা জল উপরে উঠে আসবে। খুব ধীর গতিতে সুমহান জাহাজ সিউল-ব্যাঙ্ক যাচ্ছে। তার ভেতর রয়েছে কলকব্জার মতো জাহাজিরা। সে আছে বলেই যারা আছে, এবং রক্ত সঞ্চালনের কাজ যারা করে থাকে—সেই সব ছোট ছোট মানুষদের সুখ-দুঃখ এমন একটা গ্রাম গ্রাম জায়গায় না এলে টের পাওয়া যায় না। বোঝা যায় এখন, এরা সবাই প্রায় গ্রামের মানুষ, শাকান্ন এদের ভীষণ প্রিয়। এবং এই প্রথম জাহাজিরা দেখল সিউল-ব্যঙ্ক সার্চ লাইট জ্বালিয়েছে। রাতের বেলায়, ঠিক নদীতে স্টিমারের মতো দু-পাড়ের ঢিবি, বনজঙ্গল, আলো ফেলে দেখছে।

    রাত আটটা পর্যন্ত ছোটবাবু দাঁড়াতে পেরেছিল। ডাইনিং হলে খাবার সাজানো হচ্ছে। এখন রাতের পোশাক পরে খেতে যেতে হবে। ছোটবাবুর রাতের পোশাক বলতে কিছু নেই। কোলন বন্দরে জাহাজ থামেনি। বলবোয়া বন্দরেও জাহাজ থামবে না। নিউ-প্লাইমাউথ না যাওয়া পর্যন্ত কিছু হবে না। ডেবিড ছোটবাবুকে কিছু পোশাক দিতে চেয়েছিল, কিন্তু ছোটবাবু যেই পরে বের হল, সঙ্গে সঙ্গে জ্যাক হেঁসে বাঁচল না। একেবারে জোকারের মতো। ঢোলা খাট বেঢপ পোশাকে নিজেই কিঞ্চিৎ বিমূঢ় হয়ে গেছিল।

    খাবার টেবিলে ছোটবাবুর অসুবিধা হত। সে মাথা গুঁজে খেত। কেমন সঙ্কোচ হত। কাঁটা চামচের ব্যবহার সে জানত না। ডেবিড তাকে ভীষণ সাহায্য করে আসছে। এবং টেবিল ম্যানার্স বলতে যা কিছু জেনেছে সবই ডেবিডের সাহায্যে! এখন পোশাকের জন্য অথবা টেবিল ম্যানার্সের জন্য ততটা সঙ্কোচ বোধ করে না। কাপ্তান এখন প্রায় তার সঙ্গে কথা বলেনই না। জ্যাকও চুপচাপ খেয়ে উঠে যায়। খেতে বসলে মনে হয় না জ্যাক ছোটবাবুকে চেনে। আর এই যে ছোটবাবু জাহাজে ছ’নম্বর হয়ে গেল, তাতে জ্যাকের কিছু আসে যায় না। কেবল প্রথম দিন যখন ডেকে বের হয়ে জ্যাক হেঁটে যাচ্ছিল, কাকে যেন খুঁজছে চারপাশে এবং দেখে ফেলেই না দেখার মতো, কিছুটা সহজ স্বাভাবিক কথা বলার মতো, তুমি এখানে ছোটবাব!

    তাড়াতাড়ি ছোটবাবু উইনচের নিচে থেকে বের হয়ে বলেছিল, জ্যাক আমি এখন এনজিন রুমের ছ’নম্বর। দেখা হয়নি বলে খবরটা দিতে পারিনি। জ্যাক কোন কথা বলল না। সামান্য হাসল।

    —তোমার ঠিক নিচের কেবিনে আছি।

    —সত্যি!

    —সত্যি, তুমি জান না আমি যে নিচে রয়েছি?

    —না, তুমি কী ছোটবাবু! তারপর বলার ইচ্ছে হয়েছিল, আমি জানব না তুমি কোথায় আছ! তোমার কেবিনে কোথায় কি আছে, লকারে তোমার কি আছে তুমি দেয়ালে কি টানিয়েছ, আমি সব জানি। দেয়ালে তোমার মায়ের ছবি টানিয়ে রেখেছ ছোটবাবু। তোমার কেবিনের কোথায় কি আছে, আমি তোমার চেয়ে ভাল জানি।

    ছোটবাবু ডেকেছিল, জ্যাক

    জ্যাক বলেছিল, কেমন লাগছে?

    —বেশ ভাল লাগছে। আমি স্বপ্নেও ভাবিনি।

    জ্যাক বলেছিল, কি বিশ্রী ওয়েদার।

    ছোটবাবু কেমন থতমত খেয়ে বলেছিল, তাই।

    জ্যাক বলেছিল, মনে হয় আকাশে আর কখনও সূর্য উঠবে?

    তখন বিশ্রী আকাশ, ঝড়-ঝঞ্ঝা, জলকণা সব বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছিল। ছোটবাবুর পোশাক প্রায় ভিজে গেছিল।

    জ্যাক বলেছিল শুধু, এভাবে ভিজে জামা-প্যান্ট পরে থাকলে অসুখ করবে তো।

    —শুকোয় না। নিউ-প্লাইমাউথ থেকে কিনে নেব।

    —কেন তাহিতিতে কিনতে পারবে।

    —নামা যাবে?

    —খুব যাবে।

    ছোটবাবুর দুটো কাজের পোশাক। বয়লার সুট সে তাহিতি থেকে কিনে নেবে ভেবেছিল। কিন্তু নামতে পারবে কি পারবে না সে জানত না। মাঝরাতে জাহাজ আবার খাল ধরে লক-গেট ধরে প্রশান্ত মহাসাগরে নেমে যাবে কথা আছে। তখন ডেবিড একা বোট-ডেকে, সে সারাক্ষণ দূরবীন নিয়ে জেগে থাকবে। ছোটবাবু খুব ছেলেমানুষ বলে সকাল সকাল ঘুম পায়। বেশী রাত পর্যন্ত জেগে থাকতে পারবে না। ডেবিড কত বলেছে, আবার কবে পানামা খালে আসবে, কখনও আসতে পারবে কিনা তাও ঠিক কি, দেখে নাও। আমি তো যেখানে যতবার যাই বসে থাকি। রাত জেগে বসে থাকতে আমার ভাল লাগে ছোটবাবু। খালের পাড়ে পাড়ে প্রশান্ত মহাসাগরে নেমে যাবার আগে আবার আমরা শহর পাব। তুমি একটা দারুণ চান্স মিস করবে জেগে না থাকলে।

    ছোটবাবু তবু ঘুমিয়ে পড়েছিল। যদিও ইচ্ছে হয়েছিল, ঘুমিয়ে পড়ার আগে একবার চুপি চুপি আফটার-পিকে যাবে। সেখানে গেলেই সে দুটো ভাত খেতে পায়। বাঁধাকপি ভাজা দিয়ে ভাত। কারণ অফিসার্স গ্যালিতে ইংলিশ মেনু। রাইস কারি সপ্তাহে মাত্র একদিন। সেদিন ছোটবাবুর উৎসবের মতো ভোজ। তাছাড়া ওর মনে হয় বাকি ছ’দিন প্রায় না খেয়ে আছে। ভাত না খেলে তার কিছুতেই পেট ভরে না। কখনও কখনও গোপনে মৈত্র একটা প্লেটে ভাত মাংস দিয়ে যায়। সে নিজের কেবিনে চুরি করে দরজা বন্ধ করে কোনরকমে খেয়ে হাত মুখ সাবানে ধুয়ে ফেলে। আর প্লেটটা কাজে যাবার আগে জামার নিচে ভরে নেয়। অমিয়, সারেঙসাব, মনু, মান্নান যেই আসুক, কথা বলার অছিলায় দিয়ে দেয়। প্লেট বের করে চার পাশে সতর্ক নজর রাখে—এই তাড়াতাড়ি নিয়ে যা। মৈত্ৰদাকে দিবি। দিয়েই আবার উইনচের তলায়। স্ট্রেপারগুলো খুলে মেরামত করার দরকার। এবং তখন মনে হয় জ্যাক কিংবা ডেবিড এবং এমন কি পাঁচ নম্বর পর্যন্ত ভাত না খেয়ে থাকে কি করে! সে তো পেট ভরে দুটো ভাত খাবে বলে জাহাজের এমন একটা কাজে চলে এসেছিল। অথচ নসিব এমন, শেষ পর্যন্ত, সেই ভাত রোজ কপালে জুটছে না। সে নিজের নসিবের কথা উইনচের তলায় শুয়ে শুয়ে এভাবে কখনও ভাবত। চিল্ড গ্রুেপ-ফ্রুট, ওটমিল-পরিজ, পরিজটা মন্দ লাগে না। এরা ঝাল-ঝোল একেবারে খায় না। খেতে কি যে বিস্বাদ। ব্রেক ফাস্টে ফ্রাইড-এগ খেতে তার ভাল লাগে। বেকন খাবার সময় তো প্রায় বমি আসার মতো। কি রকম সব গন্ধ—এত সুন্দর রং-বেরংয়ের খাবার খেতে এমন বিস্বাদ সে জানত না। পালিয়ে পালিয়ে ভাত, ভাত না খেলে রাতে ঘুম আসে না ছোটবাবুর। একটু রাত করে আজ অমিয় এক প্লেট ভাত, সারডিন মাঝের ঝোল, সরষে বাটা দিয়ে কি যে রেঁধেছে ভান্ডারী জ্যাঠা। সে এত খেয়েছে যে খাবার পরই চোখ জড়িয়ে আসছিল। ডেবিডের সঙ্গে কিছুতেই ডেকে জেগে থাকতে পারেনি। বড় বড় ঢেঁকুর তুলে জোরে পাখা চালিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। ভীষণ গরমে এমন ঘুমটা মাটি হবার আশঙ্কাতে সে ফুল স্পীডে পাখা চালিয়ে শুয়েছে।

    বেশ গভীর রাতে মনে হল, কেউ তাকে ডাকছে। খুব ফিসফিস গলায়।

    —এই ছোটবাবু সে চোখ মেলে বুঝতে পারল না কে ডাকছে। দরজা লক করা। তার সুন্দর মেহগিনি কাঠের বাংক। রোজ সাদা দামী চাদর পাল্টে দিয়ে যায় মেস-রুম-বয়। মায়ের ছবিটা এ-ঘরে টানাতে পেরে সে ভীষণ খুশী। লকার কাঠের। বড় আয়না। শুয়ে থাকলে সবটা আয়নায় দেখা যায়। সে জেগে গেলে বুঝল, আলো জ্বালিয়ে সে ঘুমোচ্ছিল। আয়নায় সে দেখল তার পোশাক বলতে প্রায় খালি গা। ঘামে জবজবে ভেজা শরীর। সে উঠে বসল। কেউ ডেকেছে। দরজা বন্ধ। ভেতরেই কেউ আছে তার মনে হল, একেবারে যেন কানের কাছে কেউ এসে ডেকেছে, এই ছোটবাবু, তুমি ঘুমোচ্ছ!

    তারপরই সে দেখে অবাক, পোর্ট-হোলের কাঁচ খোলা, পর্দা সরিয়ে জ্যাক ওকে দেখছে। ও প্রথমে ভীষণ ভয় পেয়ে গেছিল এত রাতে জ্যাকের হঠাৎ এ-ভাবে ঝুঁকে থাকা পোর্ট-হোলে সত্যি ভয়ের। সে বলল, ওঃ তুমি!

    সে ওর তোয়ালে দিয়ে সারা শরীরের ঘাম মুছল। সে খুব কাছে গিয়ে বলল, কী ব্যাপার!

    —তুমি ঘুমোচ্ছ!

    —কেন কি হয়েছে!

    —আমি, ডেবিড বসে আছি। তুমি আসবে না?

    —খুব ঘুম পাচ্ছে জ্যাক।

    —সকালে তো আবার সমুদ্র। তোমার ডাঙা দেখতে ভাল লাগে না!

    সে কি করে বলবে, কিছুদিন পর পর ভাত খেলে নেশার মতো হয়। সে যে ওর কেবিনে আজ পেট ভরে ভাত খেয়েছে। দুবার ভাত চেয়ে পাঠিয়েছে। এত লোভ ভাল না ছোটবাবু একবার বন্ধু হেসে এমন বলেছে, তুমি আমাদের ভাতে কম ফেলে দেবে। আসলে সে আজ তিন চারদিন পর প্রায় ভাত খেয়েছে। আকন্ঠ খেয়ে কেবল ঘুমোতে ইচ্ছে করছে। ডাঙা সমুদ্র তার কাছে এখন সমান। সে বলল, কি আছে?

    —আবার আমরা খালের ভেতর ঢুকে গেছি। শহর দেখা যাচ্ছে।

    —আর কিছু না?

    —না।

    —তবে আর যাচ্ছিনে। বলেই সে লাফ দিয়ে ফের বাংকে শুয়ে পড়ল। বাংকে সে কাত হয়ে শুয়ে পড়ল।

    জ্যাক বলল, দূরবীনে সেকেন্ড কি সব চুরি করে দেখছে!

    —তুমি দেখছ না!

    —চাইলে দিচ্ছে না।

    —ডেবিড তো ভারি স্বার্থপর।

    —ভীষণ। তুমি গেলে তোমাকে দিতে পারে।

    আর তখনই মনে হল জ্যাক তবে আর আগের মতো নেই। বড় হয়ে যাচ্ছে জ্যাক। তারও বুঝি মেয়ে দেখতে ইচ্ছে হচ্ছে। এতদিনে যেন জ্যাক আরও লম্বা হয়ে গেছে। যত লম্বা হচ্ছে, তত সে তার পোশাক কিম্ভূত কিমাকার করে ফেলছে। জ্যাকের পোশাক দেখে তারও মাঝে মাঝে কম হাসি পায় না। সে বলল, দাঁড়াও ডেবিডকে একা একা দেখা বের করছি। বলেই সে বের হয়ে গেল। যেহেতু ওর কেবিনটা নিচে, ওকে সিঁড়ি ধরে বোট-ডেকে উঠে যেতে হল। জ্যাক আসছে ওপাশ দিয়ে। সে গ্যাঙ-ওয়ে ধরে সোজা ব্রীজের সামনে চলে যাবে। এবং জ্যাক ও-ভাবে সিঁড়ি ধরে উঠে আসার আগে সে ডেবিডের কাছে পৌঁছে যাবে। আর এটা ছোটবাবু দেখেছে, জ্যাক এলি-ওয়ে ধরে কখনও আসে না। জ্যাক তো ইচ্ছে করলেই ওর দরজায় নক্ করতে পারত। সে তা না করে, ও- পাশে, জাহাজের বাইরের দিকটায় সে দাঁড়িয়ে থাকে। এলি-ওয়েতে জ্যাক কেন যে আসে না! আসলে কি জ্যাক এলি-ওয়েতে ভয়ের কিছু দেখে ফেলেছে! সে যেমন দেখে ফেলে দৌড়েছিল!

    ছোটবাবু ডেবিডের ঠিক সামনে গিয়ে বসল। জ্যাক সিঁড়ি ভেঙে ছুটে আসছে। ছোটবাবু বলল, তুমি ভারি স্বার্থপর ডেবিড। জ্যাককে দেখতে দাওনি।

    —জ্যাক না দেখলে আমি কি করব।

    —কিছু দেখলে?

    —না।

    —আমাকে দাও। যদি পেয়ে যাই।

    সেকেন্ড বলল, দ্যাখো। এবং ওরা তিনজন পাশাপাশি বসে বলবোয়া বন্দরের শহর, ইট, কাঠ, গীর্জা, এবং গাছপালা, দূরের বিন্দু বিন্দু আলোর মালা, কখনও সামনে একেবারে সামনে ওরা দেখতে পাচ্ছে শহর ধরে একটা গাড়ি, ছায়া ছায়া অন্ধকারে ওরা কি করছে। ছোটবাবু বলল, আমি কিছু বুঝতে পারছি না। তুমি দ্যাখো।

    সেকেন্ড দূরবীনটা চোখে লাগিয়েই চিৎকার করে উঠল, ওম্যান।

    —যা!

    —হ্যাঁ দ্যাখো।

    ছোটবাবুর ইচ্ছে হল জ্যাক দেখুক। কারণ জ্যাক বড় হচ্ছে। সে বললে, তুমি দ্যাখো জ্যাক। জ্যাক বলল, না তুমি দ্যাখো।

    ছোটবাবু তখন দেখল—একটা গাড়ি। দু’জন মানুষের ছায়া, পুরুষ না মেয়ে, কি দুজনেই মেয়ে, কি দুজনেই পুরুষ, বোঝা যাচ্ছে না। এবং নিভৃতে পার্কের পাশে রাস্তায় ওরা দুজন। ওরা এই এমন গ্রহে বেঁচে আছে, তারা যাই হোক, পুরুষ রমণী হওয়াই ভাল, কারণ, সে বুঝতে পারছে, নারীজাতি মানুষের বড় প্রিয়। প্রিয় বলেই পুরুষ রমণী ভাবতে ভাল লাগছে। সে বলল, আর দেখা যাচ্ছে না। আসলে জাহাজ ক্রমাগত দু-তীর পেছনে ফেলে চলে যাচ্ছে।

    এবং এ-ভাবে জ্যাক যা চাইছিল, একটু ছোটবাবুর সান্নিধ্য। এটুকুর জন্য সে ওকে ডেকে এনেছে। ওর পাশে বসে থাকতে জ্যাকের ভাল লাগছে। কিছুক্ষণের ভেতর জাহাজ সমুদ্রে পড়বে। ডেক-জাহাজিরা জেগে রয়েছে। সেকেন্ড-অফিসার, ডেবিড এবং চিফ-অফিসার জাহাজিদের নিয়ে ছোটাছুটি করছে। এমন মধ্যরাতে জ্যাক দূরে সমুদ্রের গর্জন শুনতে পেল। সেই সব দ্বীপ, যেমন হনলুলু অথবা পলিনেশীয় দ্বীপপুঞ্জমালা থেকে বাতাস দ্রুত ছুটে আসছে। বাতাসের সঙ্গে আসছে অজস্র সমুদ্রের ঢেউ, ওরা প্রশান্ত মহাসাগরের বুকে কি যে সুহাস গতিতে ধীর গতিতে এগিয়ে আসছে। জ্যাকের মনে হল, প্রায় কাব্যগাঁথার মতো, নীল জলে ছোট একটা সাদা রঙের বোট, লাল রঙের পাল, একপাশে ওরা দুজন, এবং ক্রমে কি করে যে সে দেখতে পেল, বিন্দু বিন্দু হয়ে যাচ্ছে সব ঢেউ-এর জলকণা, তার ভেতর দিয়ে ছোটবাবু বোট এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। এবং জ্যাক সহসা প্রায় আর্তনাদের মতো চিৎকার করে উঠতে যাচ্ছিল—ছোটবাবু তুমি মরে যাবে। কিন্তু তখনই মনে হল ছোটবাবু তার বনবাস সহজেই স্বীকার করে নিয়েছে। কি নিশ্চন্ত মুখ চোখ। ঢেউয়ের ভেতর বোট ক্রমে হারিয়ে যাচ্ছে। সমুদ্রে আর সেই ভাঙা জাহাজটাও দেখা যাচ্ছে না। কেবল জ্যাক কেন যে দেখতে পেল, দূরে একটা পাখি আকাশের নিচে চক্রাকারে উড়তে উড়তে নেমে আসছে। সেই বড় পাখি, অতিকায় যার ডানা, যেন আকাশ জুড়ে সে নেমে আসছে। সাদা রঙের অতিকায় এ্যালবাট্রস বোটের একপাশে বসতেই বোটটা কেমন নড়ে উঠেছিল।

    যখন দূরবীনে ছোটবাবু শহর দেখছিল, তখন দু হাঁটুর ফাঁকে মাথা গুঁজে দিয়েছিল জ্যাক। এবং মাথা গুঁজে সে কি আজগুবী দৃশ্য দেখে ফেলল। আর যা হয়, এমন কেন যে সব দৃশ্য সে চোখের ওপর ভাসতে দেখল! ছোটবাবুকে বললে, ছোটবাবু পর্যন্ত ভয় পেয়ে যাবে। সে জানে ছোটবাবু সহজ সরল মানুষ, সহজেই ভয় পায়। ছোটবাবুর মুখ দেখলেই এটা সে বুঝতে পারে। এবং ছোটবাবু ভয় পাবে বলেই যেন এমন একটা দৃশ্য সে দেখেছে বলা ঠিক হবে না। কেবল ডেবিডকে সে বলতে পারে।

    কিন্তু সকালে যখন সিউল-ব্যাংক সমুদ্রে ভেসে গেছে আবার, তীর দেখা যাচ্ছে না, ঝিকঝিক শব্দে সিউল-ব্যাংক আপন গতিবেগে নির্ভাবনায় বেশ চলেছে, জাহাজিরা শেষ ডাঙা দেখবে বলে দাঁড়িয়ে আছে, আর দেখা যাচ্ছে না কিছু, কেবল নীল জল, নীল আকাশ এবং সমুদ্রের প্রশান্ত চেহারা তখনই জ্যাক দেখল, অনেক দূরে, প্রায় দিগন্তের কাছাকাছি দুটো বিন্দুর মতো সাদা রঙের কিছু ভাসছে। এমন নীল আকাশে দুটো বিন্দুর মতো সাদা রঙ নড়ছে দেখে, দৌড়ে সে চার্টরুমে উঠে গেল। এবং এই প্রথম সে বাবার দূরবীনটা গলায় ঝুলিয়ে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখতে থাকল—হ্যাঁ নড়ছে। ঠিক বোঝা যাচ্ছে না ও দুটো কি। তবু মনে হয় দুটো পাখির মতো। দুটো পাখি আকাশের গায়ে যেন ঢেউয়ের মতো কাঁপছে। আর উড়ে উড়ে ওরা এদিকে আসছে।

    ছোটবাবু তখন চড়ুই পাখি দুটোকে খাওয়াচ্ছিল। সকালের চা এসেছে। চা, একটা আপেল, দু’টুকরো স্যান্ড উইচ এবং কলা। উইনচের ভেতর থেকে বের হয়ে সে ময়লা হাত ঝেড়ে নিল, এবং কোনরকমে কিছুটা খেয়ে পাখি দুটোকে শিস দিয়ে ডাকল। শিস দিলেই ওরা চলে আসে। জ্যাক এখন খাওয়ায় তাদের। সেও। কিন্তু জ্যাক ব্রীজে দূরবীনে কি দেখছে। সেই কখন থেকে জাহাজের পেছনের দিকে সে তাকিয়ে আছে। এত কি দেখছে জ্যাক। জ্যাক পরেছে সুন্দর হলুদ রঙের বয়লার স্যুট। চোখে দূরবীন। সকালের সূর্য এই সমুদ্রে এবং জাহাজের চারপাশে ক্রমে ওপরে উঠে যাচ্ছে। বোট-ডেক থেকে জ্যাকের দূরবীনে এ-ভাবে দেখা সত্যি বিস্ময়ের। আগে হলে সে চিৎকার করে বলত, জ্যাক আমি এখানে। ইচ্ছে করলে ছুটে চলেও যেতে পারত বোট-ডেকে, কিন্তু এখন পারবে না। কারণ আর্চি ক্রমে ওর ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে উঠছে। তার সব কিছু গোপনে যেন লক্ষ্য রাখছে আর্টি। এবং ক্রমে সে একটা ব্যাপার বুঝতে পেরেছে, সেকেন্ড এনজিনিয়ার আর্চিকে খুশি করতে না পারলে তার এই সমুদ্র সফর বৃথা। সে চেষ্টা করে যাচ্ছে। আপ্রাণ সে খেটে যাচ্ছে। তবু ঠিকমতো সে, দক্ষ কারিগরের মতো সব কাজ পারছে না বলে, আর্চি ভীষণ বিরক্ত। আর্চি কাছে এসে দাঁড়ালেই বুকের রক্ত হিম হয়ে যায়।

    সে নড়তে পারল না। কেবল পাখি দুটোকে সকালের খাবার খাইয়ে সে ফের উইনচের ভেতর ঢুকে গেল। এখন ওর সারা হাতে মুখে কালি। একটা বলতিতে নানা সাইজের স্প্যানার। নাট বোল্ট। কেরোসিন তেল। সে নাট খুলে—কারণ দু’চারদিন যেতে না যেতে এই যেমন কোন উইনচের গিয়ার খারাপ, বিয়ারিং লুজ, একজস্ট স্টীম ঠিকমতো ক্লিয়ার হচ্ছে না অথবা হুইল জ্যাম হয়ে যাচ্ছে, এ- সব কাজ তাকে করতে হয় বলে বেশ সময় লেগে যায় একটা কাজ শেষ করে উঠতে। যখন সে নাট বোল্ট ভেতর থেকে খুলে আনে তখন একটা সে বড়রকমের কাজ করতে পারল বলে ভেবে থাকে। এবং সে কাজটা খুব খেটে মনোযোগের সঙ্গে শেষ করে যখন অপেক্ষা করে মেজ-মিস্ত্রি এসে দেখবে, তখন কেবল প্রার্থনা, হে ঈশ্বর হাতের কাজ দেখে তিনি যেন খুশী হন। কিন্তু হলে কি হবে, আর্চি এলেই, ওর মুখ শুকিয়ে যায়! এবং নির্ঘাত এসেই গিয়ার টেনে বালব ছেড়ে উইনচ চালিয়ে হঠাৎ ক্ষেপে যান। একেবারে জ্যাম। ঘুরছে না। ছোটবাবু কিছুতেই বোঝে না, কেন এমন হয়। সে নিজে বালব্ ঘুরিয়ে দেখেছে—সব ঠিকঠাক, লুজ নেই। টাইট ফিটিঙ, আর মেজ-মিস্ত্রি এসে ধরতেই সব কেমন গুবলেট হয়ে যায়। তার তখন ভয়ে নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে। আর অকথ্য গালিগালাজ দু’একদিন থেকে সবে শুরু করেছে। ছোটবাবু এ-সব একেবারে গ্রাহ্য করে না। কেবল মৈত্রদা অথবা অমিয় না শুনে ফেলে। শুনে ফেললেই মেজ-মিস্ত্রিকে অপমান করে বসতে পারে। তা হলে কি যে একটা কেলেঙ্কারী হবে! ভয়ে মুখ এ-জন্য আরও বেশি শুকিয়ে যায়।

    তখন জ্যাক দাঁড়িয়েই আছে। নড়ছে না। সিউল-ব্যাংক যাচ্ছে, ক্রমে জলে ভেসে যাচ্ছে। একটা প্রাচীন যান্ত্রিক দানবের মতো নীল জলরাশি ফালা ফালা করে ভেসে যাচ্ছে। এবং জ্যাকের পলক পড়ছে না। কাপ্তানবয় জ্যাকের আপেল কলা স্যান্ড-উইচ একটু বাদেই রেখে যাবে। এখন ওর চা খাবার সময়। আর একঘন্টা পরে ব্রেকফাস্ট। সে কেমন দূরবীনে চোখ লাগিয়ে মন্ত্রমুগ্ধের মতো কেবল পাখি দুটোর এগিয়ে আসা দেখছে। তার চা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে, কাপ্তান বয় দাঁড়িয়ে রয়েছে পাশে, কিছুই লক্ষ্য করছে না।

    জাহাজিরা যে যার কাজ করে যাচ্ছে, এই যেমন সারা ডেকে জল মারা। একদল জাহাজি কাঠের পাটাতনে হলিস্টোন মারছে। ডেক-টিন্ডাল হাঁকছে, মারো টান হাইয়, জোরে মারো হাইয়। ডেরিক মাস্তুলের কাছাকাছি ছিল, সব খুলে নিচে ফল্কার ওপর ফেলে রাখা হচ্ছে। এমনি সব টুকিটাকি কাজ সব চলছে। ডেক-ভান্ডারি এনজিন-ভান্ডারী খুব তাড়াহুড়ো করছে। ওয়াচের লোক উঠে আসবে। সকালের চপাটি এবং গোস্ত সেদ্ধ এ-সময়ের ভেতর করে না ফেলতে পারলে চিল্লাবে জাহাজিরা। চিফ-কুক লোহার গনগনে চুল্লিতে দুটো আস্ত মুরগী মাখন মাখিয়ে রোস্টের জন্য ভরে দিচ্ছে ভেতরে। লাঞ্চের মেনু দেখে দেখে সব ঠিক করতে হচ্ছে। স্টুয়ার্ড খাবারের স্টক—রেজিষ্ট্রার খুলে—কি আছে কি কমে আসছে, এখন জাহাজ হাজার মাইলের ওপরে এক নাগাড়ে চলবে, মোটামুটি তাহিতিতে পৌঁছবার আগে সব ঠিক ঠাক আছে কিনা দেখে নিচ্ছে। রেশন খুব সকালে বের করে দিয়েছে। জমাখরচ বসে বসে লিখছে। সমুদ্রের বুকে এখন এদের এ-সব কাজকর্ম দেখলে মনেই হয় না, দেশবাড়ি বলে কিছু আছে তাদের—এরা সবাই যেন সিউল-ব্যাংকের শিরা উপশিরা। এবং এ-ভাবে ওদের কাজকর্ম সিউল-ব্যাংকের রক্ত সঞ্চালনের মতো। নিচে আগয়ালাদের মুখ দেখলেই বুঝা যাবে কি কঠিন শ্রমে আপ্রাণ জাহাজের স্টীম ঠিক রাখার জন্য লড়ে যাচ্ছে।

    ছোট-টিণ্ডালের ওয়াচ এখন। এনজিন-রুমে আলি তেল যোগাচ্ছে। বড় বড় সব পিস্টন রড একেবারে রুপোর পাতে মনে হয় মোড়া, কি উজ্জ্বল এবং আর কি দানবের মতো ওঠানামা, এরই ফাঁকে প্রতিটি জয়েণ্টে ভীষণ মনোযোগের সঙ্গে তেল ঢেলে দিচ্ছে আলি। একটু অন্যমনস্ক হলেই হাত টেনে নিচে ফেলে দেবে—এবং হাড় মাংস অস্থি পিণ্ডাকারে পড়ে থাকবে ক্র্যাংক-ওয়েভের নিচে। গ্রিজার আলির চোখ ভীষণ সজাগ। তার অয়েল ক্যান ঠিক তালে তালে নিচে ওপরে নামছে উঠছে। একটু অন্যমনস্ক হলেই সব গেল।

    আর তখনই আসছে। সেই দুটো সাদা মতো পাখি ক্রমে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ওরা জাহাজের দিকে এগিয়ে আসছে। পাখি দুটো ক্রমে এত বড় হয়ে যাচ্ছে কেন! প্রায় আকাশ জুড়ে ডানা মেলে রেখেছে! যেন দুটো সি-প্লেন। তাড়াতাড়ি চোখ থেকে দূরবীন খুলে ফেলতেই দেখল, না এত বড় দেখাচ্ছে না। এখনও বেশ দূরে রয়েছে। এবং ওরা যে জাহাজের পেছনে উড়বে এটা বোঝাই যাচ্ছে। তবু মনে হয় পাখি দুটো ঠিক আর দশটা পাখির মতো নয়। এমন অতিকায় যে, জ্যাক সমুদ্রে কখনও এত বড় এ্যালবাট্রস দেখেনি। দূর থেকেই যা মনে হচ্ছে, কাছে এলে কি বড় না জানি মনে হবে! সে আবার চোখে দূরবীন লাগালেই কাপ্তান-বয় বলল, সাব টি।

    জ্যাক বুঝতে পারল, কাপ্তান-বয় আবার চা এনেছে। সে তাড়াতাড়ি যেন কোনরকমে চা খেয়ে আবার দেখতে থাকল। ওরা আসছে। এবং প্রায় সে ওদের ঠোট, চোখ দেখতে পাচ্ছে। চোখ নীল রংয়ের। থাবা বেশ বড়। অতিকায় ঈগল পাখির মতো। ওরা জাহাজের চার-পাশে চক্রাকারে ঘুরতে থাকল। ওদের পিঠের রং সোনালী। তারপর ওরা জাহাজের পেছনে জলের ওপর একবার বসল, কি তুলে নিল মুখে। দুটো ছোট মাছ। প্রপেলার জল ভেঙ্গে গেলে দুটো একটা মাছ মরে যায়, জলে ভেসে ওঠে। ওরা দুটো-একটা মাছের লোভে চলে এসেছে। এবং জ্যাক আশ্চর্য, এমন সুন্দর দুটো পাখি আবার কেন উড়তে থাকল, এবারে উড়ে আসছে ঠিক মাস্তুলের ডগায়, আর তখনই সে দেখল চিৎকার করতে করতে যাচ্ছে ডেবিড, ওহো—নো নো।। ছোটবাবু পাগলের মতো ছুটে আসছে—সেকেণ্ড দ্যাখো। সে হাত তুলে দেখাল সমুদ্রে।

    সেকেণ্ড দেখে কি করবে ভেবে পেল না।

    ছোটবাবু বলল, প্লিজ কিল দেম।

    এখন একমাত্র ওদের গুলি করে নামান যায়। সে ডাকল নিচ থেকে, জ্যাক—শিগগির।

    জ্যাক বুঝতে পারল না। আর সে ছুটে যাবার সময় আবার একটা ধূর্ত মুখ, সেই ধূর্ত চোখ, যেন আড়ালে ছুটে এসেছে ওপরে, টাংকির ওপাশ থেকে মুখ বাড়িয়ে বলছে, ইউ নটি গার্ল!

    সঙ্গে সঙ্গে জ্যাক চিৎকার করে উঠবে ভাবল, নো, মি বয়। কিন্তু যত জোরে বলবে ভেবেছিল, ঠিক ততটা গলা আস্তে হয়ে গেল। বলল, নো, মি বয় আর্চি।

    আর্চি দাঁড়িয়ে গেছে, একেবারে স্থবির। সে যেন আর কিছু শুনতে পাচ্ছে না। ইউ নটি গার্ল। গার্ল। নো, মি বয়। মি বয়।

    জ্যাকের হাত-পা শক্ত হয়ে গেল। চোখ ঝাপসা। আতঙ্কে হাত-পা কাঁপছে। সে দেখতে পেল না, বড় এ্যালবাট্রসটা মরিয়া। মিসেস স্প্যারোকে থাবায় তুলে নেবে বলে নেমে আসছে। কি দ্রুত গতি! গ্লাইড করতে থাকলে, ছোটবাবু একটা বড় ঢিল নিয়ে ছুটছে পিছু পিছু। যেন মিসেস স্প্যারোকে ডানার ভেতর আটকে ফেলেছে। আর ডেবিড লাফ দিয়ে সেই পাখার নিচ থেকে ভাবল, চড়ুই পাখিটাকে ছিনিয়ে নেবে, সে নিলও, কিন্তু সে দেখতে পাচ্ছে, ওর পিঠের জামা ফালা ফালা করে কিছুটা মাংস তুলে নিয়ে গেছে। মুহূর্তের ভেতর এমন ঘটল। জাহাজিরা ছুটে এসেও কিছু করতে পারল না। সমস্ত শরীর রক্তাক্ত করে পাখিটা আবার কেমন নির্ভাবনায় উড়ে যাচ্ছে। চড়ুই পাখিটাকে কব্জা করতে পারল না বলে যেন আক্রোশে ডেবিডকে ছিন্ন-ভিন্ন করে দিয়ে গেল।

    ডেবিড হাঁপাতে হাঁপাতে বসে পড়ল। চারপাশে জাহাজিরা ঘিরে ধরেছে। মিসেস স্প্যারো রক্ষা পেয়েই একেবারে জালির ভেতর। মিঃ স্প্যারো বের হচ্ছে না ভয়ে। ডেবিডের জামা ছোটবাবু খুলে দিচ্ছে। চীফ-অফিসার ছুটে এসেছে, এবং ডেবিডের এমন ছেলেমানুষী দেখে হাসবে কি ধমক দেবে বুঝতে পারল না। পিঠের ওপর নখের ক্ষত। বেনজিন দিয়ে সব পুড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে এবং যন্ত্রণায় ডেবিডের মুখ বেঁকে যাচ্ছে।

    চীফ-অফিসার তবু রুষ্ট মুখে বলল, কি দরকার ছিল ওর মুখের খাবার কেড়ে নেবার!

    সেকেণ্ড মুখ বাঁকিয়ে রয়েছে তেমনি। ভীষণ জ্বলছে। সে উঠে দাঁড়াবার চেষ্টা করল। সামান্য ব্যাণ্ডেজের দরকার। এবং কেবিনের ভেতর ডেবিডকে নিয়ে যেতে বললেন কাপ্তান।

    —ম্যান এ্যালব্রাটস!

    চীফ বলল, তাই মনে হচ্ছে।

    –লক্ষ্য করেছেন ওর পিঠ সোনালী রংয়ের!

    —না তো।

    জ্যাক সব দেখে-শুনে অবাক। সেই পাখি দুটো বেশ দূরে এখন। উড়ছে। কখনও সমুদ্রের জলে ভেসে বেড়াচ্ছে, কখনও ডুবে ডুবে প্রায় সাঁতার কাটার মতো। খাবার তুলে নিতে পারে নি বলে আক্রোশে যেন সমুদ্রের জলে পাখা ঝাপ্টাচ্ছে।

    জ্যাক বলল, আবার আসবে।

    ডেবিড বলল, আমারও মনে হয়, আবার আসবে।

    ছোটবাবু বলল, তা হলে কি হবে।

    —কিছু একটা করতে হবে। মৈত্র পাশ দিয়ে যাচ্ছিল। সে আর অযথা কথা বলতে পারে না। তবু যেন বলে গেল।—কিছু একটা করতে হবে। এভাবে তো আর এমন একটা অসহায় পাখিকে ম্যান-এ্যালব্রাটসটার থাবার ভেতর ফেলে দেওয়া যায় না।

    কি এক দুয়ে সত্যাসত্য আবিষ্কার-এর মুখে কেউ তখন আর কথা বলতে পারল না। মৈত্র কেমন একটা দৈত্যের মতো হেলে দুলে নেমে গেল।

    আর আর্চি তখন নিজের কেবিনে হা-হা করে হাসছে। নো মি বয়! সে দরজা খুলেই হাসছে। এনজিনের বিরাট আওয়াজে ওর হাসির শব্দ কেউ শুনতে পাচ্ছে না—নো মি বয়! চার্মিং! কি সুন্দর মিষ্টি কথা। ওটা কে! আয়নায় সে যেন কি দেখতে পেয়ে অবাক হয়ে গেল।

    সে কাছে গেল, আয়নার কাছে দাঁড়িয়ে বলল, তুমি কে হে। ও হো বাছা তুমি! থু!

    নো মি বয়! নো, ইউ নটি গার্ল! গার্ল! সেকেণ্ড জিভ দিয়ে ঠোঁট চেটে বলল, ইউ নটি গার্ল। কোন ভয় নেই! আমি কিছু করব না। কাপ্তানের মেয়ে তুমি। তোমাকে আমি কিছু করতে পারি! সে আনন্দের চোটে শিস দিতে দিতে চান করল। পৃথিবীতে এমন একটা গোপন খবর সে আবিষ্কার করতে কখনও পারবে বুঝতে পারে নি। ওর সন্দেহ, সংশয় সব ঘুচে গেছে। ডেকে ছোটবাবু আর জ্যাক দু’জন জড়াজড়ি করছিল। নেশার ঘোরে সে এতটুকু ভুল দেখে নি তবে!

    আবার আয়নায় একটা সুন্দর মানুষ হেঁটে হেঁটে চলে আসছে। লকারের আয়নাটা মাথাসমান উঁচু। সে কাছে গিয়ে বলল, কে! না’ কিছুই নেই। সে ভাল জামা প্যান্ট পরে দেখল, না, পছন্দ হচ্ছে না। জ্যাকের পাশে সে বড় বেমানান। সবচেয়ে দামী নাইটি পরে দাঁড়াল, না কেমন সেকেলে সেকেলে। কিছুতেই সে রূপবান হতে পারছে না। বয়সের দাগ সমস্ত মুখে, হাতে পায়ে, আর ঠিক তেমনি কেউ অনেক দূর থেকে সে দেখতে পাচ্ছে হেঁটে হেঁটে আয়নার ভেতরে দাঁড়িয়ে যাচ্ছে। সে চিৎকার করে বলতে গেল, হেল! তুমি কেন? ঘুসি মেরে কাঁচ ভেঙ্গে দিতে পারলে যেন ভাল করত।

    নো, মি বয়,—ইয়েস ইউ বয় সে দেখল তখন সুন্দর পোশাকে কেউ হেঁটে আসছে। অ মাই গড। আবার তুমি!

    এখনও লাঞ্চের দেরি আছে। এমন একটা গোপন আনন্দের জন্য সে এখন মদ্যপান করতে পারে। থ্রি চিয়ার্স। থ্রি চিয়ার্স কাকে উদ্দেশ্য করে। –না, কেউ জানবে না। জ্যাক, কাউকে বলব না। বলে জাহাজে দাঙ্গা বাধিয়ে দিই আর কি। সব পবিত্রতা, ঈশ্বর চিন্তা একেবারে মুহূর্তে ভেসে যাবে। না কেউ জানবে না তুমি মেয়ে।

    আবার সেই কে যেন দূর থেকে হেঁটে আসছে। ওর আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। তুমি তো খুব জ্বালাচ্ছ হে! সে বেশ বড় করে এক সিপ খেয়ে বলল, আঃ ভারি মজা। তারপর কি করা যায়। দুটো উলঙ্গ মেয়ের ছবি, না দুটোতে হবে না, সে খেতে থাকল। পর পর সব উলঙ্গ মেয়েদের ছবি তাস খেলার মতো সামনে সাজিয়ে রাখল। দেখতে দেখতে আবার বলল, নো মি বয়। ইয়েস ইউ বয়, কেউ জানবে না, কেবল একজন জানবে, এ-জাহাজে অসামান্য এক সুন্দরী বালিকা ক্রমে যুবতী হয়ে উঠছে। বালিকা এখন নিজের সৌরভে বিভোর।

    তারপরই মনে হল, না, আর একজন আছে, ছ’নম্বর। তার আগেই সে টের পেয়েছে। নারীজাতি সুধা পারাবার। সে সুধা পারাবারে আগেই মুখ রেখেছে। সঙ্গে সঙ্গে মুখটা ভীষণ শক্ত হয়ে গেল। এবারে সে স্পষ্ট দেখল, আয়নায় ছোটবাবু দাঁড়িয়ে আছে। হাসি হাসি মুখ। আর্চি এবার গ্লাস ছুঁড়ে মারল আয়নায়। কাঁচটা ভেঙ্গে গেল। কেউ নেই। ফাঁকা। সে ভয় পেয়ে প্রাণপণ চিৎকার করে উঠল, বয়!

    মেস-রুম বয় এসে অবাক, অসময়ে মেজ-মিস্ত্রি মদ খেয়ে মাতলামি করছে। গ্লাস ছুঁড়ে আয়নার কাঁচ ভেঙ্গে ফেলেছে।

  • বাইশ

    বাইশ

    ।। বাইশ।।
    দিন যায় তবু পাখি দুটো উড়ে আসে। জাহাজের পেছনে পেছনে কেবল উড়ছে। দিগন্তে কখনও উড়ে যাচ্ছে। ঝড়ের সমুদ্র পেলে আনন্দের শেষ থাকে না। যখন জাহাজে কেউ বের হতে পারে না, বৃষ্টিপাত প্রবল, ঝড়ো হাওয়ায় অস্পষ্ট এক কালো ঝাপসা অন্ধকারে সিওল-ব্যাংক এগিয়ে যাচ্ছে তখনও সেই পাখি উড়ে উড়ে আসছে। অথবা কক কক করে ডাকছে। অনেক দূর থেকে সেই শব্দ কখনও ঝড়ের রাতে অথবা কুয়াশার রাতে শোনা যায়।

    অথবা যখন আকাশ নির্মল থাকে সমুদ্র শান্ত থাকে এবং আবহাওয়া সুন্দর থাকে তখনও পাখি দুটো উড়ে আসছে। সকালের রোদ ডানা থেকে পিছলে যাচ্ছে। আর কি যাদু জানে, মাস্তুলের ডগায় পাখি দুটো ঠিক বসে না, একেবারে উঁচুতে দুটো বাজ-পাখির মতো গ্লাইড করতে থাকলে সবার আগে জ্যাক ছুটে আসে ডেকে। সে দু’পা ফাঁক করে দাঁড়ায়। দেখে, চড়ুই দুটো ঠিক জালির ভেতর আছে কিনা। যদি না থাকে তাড়িয়ে নিয়ে যায়। হাতে বড় একটা লোহার রড। ছোঁ মারলেই আঘাত হানবে। এবং আর যারা থাকে সে ডেবিড। ছোটবাবু সতর্ক নজর রাখে চারপাশে—না নেই। আর্চিকে কোথাও দেখা যাচ্ছে না। সঙ্গে সঙ্গে দু’লাফে উইনচের তলা থেকে তেল কালি মুখে হাজির। সামনে যা পায় তুলে ঢিল ছুঁড়তে থাকে।

    পাখি দুটো ভয় পায় না। হাওয়ায় ভেসে থাকে। আসলে পাখি দুটো বুঝতে পারে ছোটবাবুর ঢিল অত উঁচুতে উঠবে না। ওরা, পাখায় ঢেকে রেখেছে যেন জাহাজকে। নিশ্চিন্তে ওরা উড়ে বেড়াচ্ছে। জ্যাকও ঢিল ছুঁড়ছে। ডেবিড, মৈত্র এবং ইয়াসিন পর্যন্ত দাঁড়িয়ে গেছে। যদি নেমে আসে, অথবা কাউকে আক্রমণ করে।

    কত বড় পাখি! ডেবিড ভেবে পায় না আসলে এ-দুটো এ্যালবাট্রস কিনা, না অন্য পাখি! প্ৰশান্ত মহাসাগরের দ্বীপগুলোতে যে-সব এ্যালবাট্রসদের আস্তানা রয়েছে তাদের ভেতর এ-জাতীয় পাখিগুলো বিরল। প্রশান্ত মহাসাগরে অতিকায় এ্যালবাট্রসদের আস্তানা আছে সে শুনেছে। কখন দেখা দেবে কেউ বলতে পারে না। দেখা দিলে জাহাজের পক্ষে ভাল। কিন্তু বড় হিংস্র এদের স্বভাব। পুরুষগুলো বেশী মারমুখো হয়। এ-সব তথ্য ডেবিড পাখি সংক্রান্ত কোন বইয়ে পায় নি। প্রাচীন নাবিকের মুখে শুনেছে, এবং শুনেছে আশ্চর্য সব তথ্য।

    কাজেই ইচ্ছে করলেই সে কাপ্তানের কেবিন থেকে বন্দুকটা নিয়ে এসে এদের গুলি করে নামাতে পারে না। এদের হাত থেকে কোনরকমে তাহিতি পর্যন্ত চড়ুই দুটোকে রক্ষা করতে পারলেই হয়ে গেল। তাহিতি থেকে এরা প্রথম কিনবে একটা পাখির খাঁচা। চড়ুই দুটোকে খাঁচায় এবার ভরে ফেলবে। তারপর আর ভয় থাকবে না।

    তখন ছোটবাবু দেখেছে, এ্যালবাট্রসের তাড়া খেয়ে চড়ুই দুটো আর কাছে আসতে চায় না। এমন কি দেখেছে ওর বাকসোটাতে ঘুমোয় না। এনজিন-ঘরে থাকে। কিন্তু ভাল লাগবে কেন। একটু মুক্ত আকাশের নিচে উড়তে না পারলে ভাল লাগবে কেন। আর ভয় এই দুই বড় পাখির। কখন কি হবে কেউ বলতে পারছে না।

    জ্যাকের সেজন্য সব কিছুর ভেতর এই এক কাজ পাখি দুটোর দিকে লক্ষ্য রাখা। সে যখন দেখে এ্যালবাট্রস দুটো জাহাজের খুব কাছাকাছি, তখনই তার মাথা ঠিক থাকে না, লাফিয়ে লাফিয়ে নেমে আসে, আর আর্চি তেমনি সেয়ানা, সেও কোথা থেকে বের হয়ে আসে, যেন আর্চি ঘুমোয় না, আর্চি সারারাত জেগে থাকে জ্যাক কোথায় কখন থাকে দেখার জন্য। দেখা হলেই জ্যাকের সব যেন গন্ডগোল হয়ে যায়। মাথায় কিছু থাকে না। সে সোজা হাঁটে না, ঠিক উল্টো মুখে নেমে গেলে মজা পায় আর্চি। আর আর্চি তার ছোটখাট চেহারা নিয়ে কিম্ভুতকিমাকার। জ্যাক তখন ছুটেও পার পায় না। পেছনে তাকিয়ে দেখে, না আসছে না। সে দম ফেলে দাঁড়ায়। আবার ডাকে, ডেবিড, আসছে, আসছে। ম্যান-এ্যালবাট্রসটা এগিয়ে আসছে।

    চড়ুই দুটো না থাকলে তার নিচে না নামলেও হত। চড়ুই দুটো না থাকলে, সে চুপচাপ’ কেবিনে কাটিয়ে দিতে পারে। সন্ধ্যার পর ছোটবাবু আর ডেবিড ওর কেবিনের পাশে চুপচাপ বসে থাকে। বারোটা-চারটা ডেবিডের ওয়াচ। সুতরাং চারটা থেকে আটটা পর্যন্ত ডেবিড আর ছোটবাবু বসে থাকে চুপচাপ। পোর্ট-হোল খুলে জ্যাক তখন সারাক্ষণ গল্প করতে পারে।

    কিন্তু ছোটবাবুর ভারী প্রিয় পাখি দুটো। এ-পাখি দুটো আসার পর ছোটবাবুর বিষণ্ণতা কেটে গেছে। ছোটবাবু পাখি দুটোর জন্য বিশেষ করে মিসেস স্প্যারোর জন্য কেমন এক মায়া অনুভব করে থাকে। জ্যাকের এ-সব আগে ভাল লাগত না। এগুলো অসভ্যতা। কিন্তু যত দিন যাচ্ছে তত মনে হচ্ছে ছোটবাবু যা ভালবাসে, সে তা ভালবাসে। এটা কেন হয় সে বুঝতে পারে না। পাখি দুটোকে রক্ষা করার কেমন একটা নৈতিক দায়িত্ব পেয়ে সে বেশ একটা ভাল কাজ করে যাচ্ছে জাহাজে—আর তখন সেই লোকটা, ও কি ভয়ঙ্কর, বাবাকে সে অনায়াসে বলে দিতে পারে, কিন্তু মনে হয় আবার নির্বাসনের দিনগুলি চলে আসবে! জাহাজিরা যদি টের পেয়ে যায় সে মেয়ে, তবে বাবা ঠিক পিসির কাছে পাঠিয়ে দেবেন। পিসির মুখ ভাবলেই ভয়ে তার রক্ত হিম হয়ে আসে—এবং সে বুঝতে পারে ভয় থেকে এক একটা আকস্মিক ঘটনা ঘটে যায়। সে রেগে গিয়ে পিসির সুন্দর চুল কেটে দিয়েছিল। পিসির পোশাকে আগুন ধরিয়ে দিয়েছিল। জাহাজে এমন সব খবর খুব একটা মিথ্যা না—এতে আসে যায় না জ্যাকের। কেবল এখন নির্বাসনে যাবার আতঙ্কে আর্চির সব সহ্য করে যাচ্ছে। বাবাকে কিছু বলতে পারছে না। আর বাবা পাঠিয়ে দিলেই সে যাবে কি করে! ছোটবাবুকে ফেলে কোথাও গিয়ে সে থাকতে পারবে না। তার ভীষণ কান্না পাবে।

    সিউল-ব্যাঙ্ক যাচ্ছে তার সুহাস গতিতে। পাখি দুটো আকাশের ওপর সমান তালে ভেসে চলেছে। এবং এখন বেশ এই জাহাজ আর দুই বড় এ্যালবাট্রস ভেসে চলেছে। নীল জলধি বলা যায়, সাদা জাহাজ, সাদা পাখি আর বুদবুদ জলে, নীল জলে অসংখ্য প্রাচীন জীবেরা ঘোরাফেরা করছে। তাদের শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ কোথাও ভেসে উঠলে অসংখ্য বুদবুদ হয়ে যায়। সমুদ্রের বুকে জলরাশির ভেতর এই সব লক্ষ কোটি বুদবুদ দেখলে ছোটবাবুর এমনই মনে হয়। মনে হয় সমুদ্রেই তার নিবাস। এই সব অতিকায় হাঙ্গর অথবা তিমি কিংবা ধরা যাক যে সব সোর্ড ফিস ছুটে যাচ্ছে জলের নিচে এবং কখনও কখনও অতিকায় তিমিমাছকে গেঁথে ফেলছে—সেখানে যেমন এক যুদ্ধ রয়েছে ওপরেও তেমনি যুদ্ধ। পাখি দুটো উড়ছে, ওরা আহার খুঁজছে। চারপাশে সবাই আহারের জন্য নানাভাবে হত্যা চালিয়ে যাচ্ছে। কেবল মানুষ আহার বাদেও হিংসা চরিতার্থ করতে চায়। এ-সব মনে হলেই ফিসফিস গলায় কেউ যেন ডাকে—জ্যাক, আমি এখানে।

    জ্যাক দেখতে পায়, এলি-ওয়ের মুখে, বড় একটা উইন্ডসেলের আড়ালে ছোটবাবু দাঁড়িয়ে আছে। জ্যাক অবাক। কি করে টের পেয়েছে ছোটবাবু, সে আসছে।

    —কোথায়?

    —এখানে।

    —এখানে কি!

    —দেখো না এসে।

    জ্যাক দেখল, চড়ুই পাখি দুটো পরস্পর ঠোঁট থেকে কি কেড়ে খাচ্ছে।

    —এখানে তোমরা! আর কত জায়গায় খুঁজে মরছি।

    ছোটবাবু বলল, জ্যাক তাহিতিতে নেমেই একটা খাঁচা কিনে ফেলব।

    —এ্যালবাট্রস জাহাজের পেছনে ততদিন উড়তে নাও পারে।

    ছোটবাবু বুঝল, তার আগেই ফিরে যেতে পারে পাখি দুটো।

    —তবে যাচ্ছে না কেন? জ্যাক বলল, কত বড় পাখি দুটো না!

    —ভীষণ! দেখলে চোখ ফেরানো যায় না।

    —কি নীল চোখ!

    ছোটবাবু বলল, এই, আমি যাচ্ছি, মেজ-মিস্ত্রির ওয়াচ থেকে উঠে আসার সময় হয়েছে।

    —মেজ মিস্ত্রি লোক ভাল না।

    —খুব বাজে। আমাকে অযথা গালাগাল করে!

    –ধরে থাপ্পড় লাগাতে পার না! ঘুষি, ঘুষি মারতে পার না।

    —ঠিক মারবো—কি বাজে দ্যাখো, সব ঠিকঠাক করে রাখি আর মেজ-মিস্ত্রি এসেই কি যে করে না! তারপরই কি যেন অন্যায় করে ফেলেছে ছোটবাবু, মুখে ভীতির ছাপ। সে ফের বলল, এই জ্যাক।

    —কী? সে চেয়ে থাকল। আর এমন সুন্দর চোখে সে যখন তাকিয়ে থাকে ছোটবাবু কেন যে বুঝতে পারে না।

    ছোটবাবু বলল, তুমি কিন্তু আবার কাপ্তানকে বলে দিও না।

    —কি বলব?

    —এই যে বললাম—ঠিক একদিন মেরে বসব।

    —বললে কি হবে?

    —আমাকে ডেকে পাঠাবেন। বকবেন।

    —জ্যাক বলল, তুমি কিছু করতে যেও না ছোটবাবু

    —আমাকে অযথা খাটায়। রাত সাতটার আগে আজকাল ছাড়ছে না।

    জ্যাক কি বলবে! জ্যাক জানে মেজ-মিস্ত্রি এখন থেকে অনেক অন্যায় কাজ করে যাবে। তবু সহ্য করা ছাড়া উপায় কি

    জ্যাক বলল, ছোটবাবু, একটা কথা বলব?

    —আমাকে?

    —হ্যাঁ তোমাকে। তুমি মেজ-মিস্ত্রিকে কিছু বলতে যেও না। প্লিজ!

    —আরে না না। আমার সাহসই হবে না। খুব রাগ হয়, জানো কাল আমাকে বয়লারের নিচে পাঠিয়েছে। স্কাম-বক্স ক্লিয়ার হচ্ছে না, কে করবে, ডাকো ছোটবাবুকে। কি যে দরকার বুঝি না, ওটা জ্যাম থাকলে এমন কি ক্ষতি বল!

    জ্যাক এনজিনের কলকব্জা সম্পর্কে কিছু বোঝে না। কিন্তু বয়লারের নিচে, জাহাজ চালু অবস্থায় কেউ ঢুকতে সাহস পায় না। তা ছাড়া শীতের সমুদ্রে জাহাজ নেই। গরম, ভীষণ গরম। দু-চার দিন না গেলে জাহাজ আরও নিচে নেমে না গেলে গরম কমবে না। ওপরে টন টন কয়লা পুড়ছে, নিচে ছোটবাবু! ভাবতে বুক শুকিয়ে যায়। সে বলল, নিচে ঢুকলে কি করে?

    ছোটবাবু হাসল। বলল, কি করব বল! বললাম, বড় একটা বস্তা দিতে। না হলে তো ঝলসে যাব। পিঠে মাথায় বস্তা চাপিয়ে ঢুকে গেলাম।

    —পারলে করতে!

    —হ্যাঁ। মেজ-মিস্ত্রি অবাক। ও ভেবেছিল, আমি রাজী হব না। খুব বোকা ভেবেছে আমাকে। দুঃখে চোখ ভার হয়ে এল জ্যাকের। কত সহজে বলে যাচ্ছে ছোটবাবু—যেন কিছুই না কাজটা। একটা মরণপণ কাজের ভেতর জীবন নিয়ে ছোটবাবু ছুটছে। সে মুখ ফিরিয়ে সমুদ্র দেখতে থাকল। ওর চোখে জল দেখলে ছোটবাবু ভাববে, জ্যাক খুব ছেলেমানুষ। সে সমুদ্র দেখতে দেখতেই বলল, কি দরকার ছিল ছোটবাবু তোমার ছ’নম্বর হওয়ার! কি দরকার ছিল তোমার জাহাজে আসার?

    জ্যাক বয়সী মানুষের মতো কথা বলছে। এখন জ্যাককে কিছুতেই মনে হয় না নাবালক। বরং জ্যাক তরুণ। বিচার-বুদ্ধিতে জ্যাক তার চেয়েও প্রাজ্ঞ। সে বলল, বা কত ভাগ্য আমার! আমি দেশে যখন ফিরব ও তুমি বুঝতে পারবে না, আমার মা আমাকে দেখে আকাশের চাঁদ হাতে পাবেন। আমি তো এমনি চেয়েছিলাম। জ্যাক আমি খুব বড় হতে চাই। সবাই বলবে, ছোটবাবু খুব বড় মানুষ। বাবা, আমার ছোট ভাই-বোনেরা, জ্যাঠামশাই আমার জ্যাঠিমা আমাকে যখন দেখবে, আমার গায়ে জাহাজি পোশাক, সাদা হাফ সার্ট প্যান্ট, মাথায় এংকোরের নীল টুপি, আমি তাদের কাছে কি যে হয়ে যাব না!

    জ্যাক মুখ ফেরাল না। সেই এক গ্রাম্য বালকের বড় হবার আশা। এই সামান্য কাজের ভেতরই ছোটবাবুর বড় হবার স্বপ্ন সার্থক হতে চলেছে। সে বলল, ছোটবাবু, আর কেউ খুশী হবে না?

    —আবার কে হবে?

    —বারে তুমি যে বলতে…….?

    –কি বলতাম!

    —তোমার লিটল প্রিন্সেস!

    ছোটবাবু ভুলেই গিয়েছিল, সে তার মাকে লিটল প্রিন্সেস বলেছে। বলল, অঃ আমার মার কথা বলছ!

    জ্যাক অবাক! সে ফিরে দাঁড়াল। দেখল, ছোটবাবুকে। ছোটবাবুর মুখে চোখে কি যে আশ্চর্য যাদু থাকে! সে ভাবল কিছু বলবে, কিন্তু কি বলবে, কিছু বলতে পারছে না। ঠোঁট কাঁপছে। এতদিন একটা ভীষণ চাপা অভিমান ছিল ছোটবাবুর ওপর। ছোটবাবু কি জানত না, জাহাজে বনি নামে একজন মেয়ের সঙ্গে দেখা হয়ে যাবে। সে কেন তার লিটল প্রিন্সেসের কথা ভাববে।

    ছোটবাবু বলল, এই জ্যাক কি হয়েছে?

    ছোটবাবু তুমিও ভাল না।

    —আমি ভাল না কেন? আমি তো কিছু করি নি।

    —তুমি ভীষণ ভীষণ…..

    ছোটবাবু তারপরই দেখল জ্যাক দৌড়ে যাচ্ছে। ডেকের ওপর দিয়ে দৌড়ে যাচ্ছে। ছোটবাবু বুঝতে পারল না, জ্যাক এভাবে কেন দৌড়াচ্ছে।

    কারণ ছোটবাবু তো জানে না আনন্দে জ্যাকের চোখ দিয়ে অজস্র বারিধারা নেমে আসছে। জ্যাক এখন সোজা নিজের কেবিনে ঢুকে গেছে। এবং বালিসে মুখ গুঁজে দিয়েছে। ছোটবাবু তুমি আমাকে কি যে ভয় পাইয়ে দিয়েছিলে! আমি আর কাউকে ভয় পাই না।

    এবং পরদিনই সবাই ছুটে গেল মেজ-মিস্ত্রির কেবিনে। মেজ-মিস্ত্রি পড়ে গিয়ে আঘাত পেয়েছে। সে হেঁটে আসছিল বোট-ডেক ধরে, মনে হল পায়ে কেউ কি দিয়ে হ্যাঁচকা মেরেছে! সঙ্গে সঙ্গে একেবারে উপুড় হয়ে পড়েছে ডেকে। নাক দিয়ে অনেকটা রক্ত পড়েছে। কিন্তু কিভাবে কি যে হল কেউ বুঝতে পারে নি।

    ব্যাপারটা কেউ বুঝতে পারল না। কেউ বলল, জাহাজের সেই অশুভ শক্তি। কেবল ছোটবাবু বুঝতে পেরে গুম হয়ে গেল। সে জ্যাকের সঙ্গে দু’দিন কথা বলল না।

    জ্যাক থাকতে না পেরে বলল এই, তুমি কথা বলছ না কেন?

    —কি বলব।

    —যা খুশী।

    ছোটবাবু বলল, জ্যাক তুমিও ভাল না

    —আমি তো খারাপ সবাই জানে। নতুন কি দেখলে?

    —তুমি কেন মেজ-মিস্ত্রিকে এভাবে ফেলে দিলে? যদি দেখতে পেত।

    —ও দেখবে! তা হলেই হয়েছে। ও এখন কি দেখে তুমি তো জান না। কি খুঁজে বেড়ায় তুমি তা বোঝ না। কেবল এদিক-ওদিক চেয়ে দেখে। নিচে কি আছে, কোথা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে ওর মাথায় যদি থাকত…….

    ছোটবাবু বলল, কাউকে অহেতুক কষ্ট দিতে নেই।

    —তোমাকে দিচ্ছে কেন?

    ছোটবাবু আর কিছু বলতে পারল না। সে বুঝতে পারছে গভীর বন্ধুত্ব গড়ে উঠছে ওর সঙ্গে। জ্যাক তুমি আমার জন্য এটা করেছ?

    জ্যাক খুব সাদাসিধেভাবে বলল, হ্যাঁ।

    —জ্যাক তুমি কি? ওতে ওর রাগ তো বেড়ে যাবে।

    —টের পেলে তো। বলেই জ্যাক বলল, ঐ দ্যাখো আসছে। নেমে আসছে।

    ছোটবাবু দেখল, অতিকায় এ্যালবাট্রস দুটো জাহাজের দিকে উড়ে আসছে।—কোথায় আছে ওরা? —দাঁড়াও দেখছি। জ্যাক দৌড়ে চলে গেল। ছোট কাজ ফেলে যেতে পারে না! সে জ্যাককে দেখে যেমন টুপ করে ভেসে উঠেছিল উইনচের তলা থেকে, ফের সে উইনচের নিচে ডুবে গেল।

    এখন কে বলবে একটা মেয়ে জাহাজের সর্বত্র খুঁজে বেড়াচ্ছে পাখি দুটোকে। সে চিৎকার করছে, মিঃ স্প্যারো, মিসেস স্প্যারো তোরা কোথায়? ওরা উড়ে আসছে। ভেতরে ঢুকে যাও। কিন্তু কোথাও দেখতে পেল না। গেল কোথায়? কাপ্তান হুইলঘরে বসে দেখতে পাচ্ছেন, জ্যাক এংকোর ফেলার জিপসিতে উঠে পাখি দুটোকে খুঁজছে। বেশ আছে। জ্যাক, ছোটবাবু, ডেবিড বেশ আছে পাখি দুটোকে নিয়ে। এবং কাপ্তান নিজেও কতদিন দেখেছেন, চা-এর সঙ্গে সামান্য রুটি আপেল এলে উড়তে উড়তে চলে এসেছে তারা। তখন এই মহাসমুদ্রের শান্ত স্বভাবের ভেতর পাখি দুটো বড় বেশি ডাঙার খবর বয়ে আনে। পাখি দুটোকে খাবার ছুঁড়ে দিতে তারও কম ভাল লাগে না।

    তা ছাড়া মেয়েটা এভাবে বেশ দিন মাস কাল জাহাজে কাটিয়ে দিচ্ছে। কিছু তো নেই। সব সময় বই পড়তে ভাল লাগবে কেন, এখন বয়স বাড়ছে। চারপাশের গাছাপালার ভেতর বড় হয়ে ওঠার কথা। কিন্তু কপাল মন্দ, সমুদ্রে সমুদ্রে ঘুরে মরছে। মেয়ের এই একাকীত্বের জন্য বেদনাবোধ যখন খুবই তীব্র হয়ে ওঠে, তখন আর বসে থাকতে পারেন না। একা একা পায়চারি করেন। মনে হয়, সেই ভয়ঙ্কর দিনে তিনি যেন শুনেছিলেন তুমি আমাকে এটা কি করলে! তোমার পাপ হবে না, তোমার শাস্তি হবে না, তোমার শাস্তি হবে না! আর বুড়োবয়সে মেয়েটার নির্জন একাকীত্বের ভেতর সেই শাস্তিকে তিনি অনুভব করতে পারেন। তাঁর তখন ঈশ্বর চিন্তা পর্যন্ত খারাপ লাগে।

    তখন ছোটবাবু দেখল, জ্যাক হাসি হাসি মুখে ওর পায়ের কাছে দাঁড়িয়ে আছে। দু-হাত একসঙ্গে করে কি দেখাল ইশারায়। ছোটবাবু উইনচের তলায় নাট-বোল্ট খুলছে। চিত হয়ে আছে। কিছুটা দেখা যাচ্ছে। এবং জ্যাক ইশারা করলে সে আর শুয়ে থাকতে পারল না। বের হয়ে বলল, কি ব্যাপার!

    —তাড়াতাড়ি এস।

    জ্যাক কিছু বলছে না।—কী? বলবে তো?

    —এস। না দেখলে বিশ্বাস হবে না।

    জ্যাক লাফিয়ে লাফিয়ে সিঁড়ি ধরে উঠে যাচ্ছে। এখন বিকেল। সূর্য এবার পলিনেশীয় দ্বীপপুঞ্জমালার ওপাশে নেমে যাবে, এবং সূর্যাস্তের রঙ যেমন মনোহারিণী থাকে তেমনি, চারপাশে উজ্জ্বল লাল নীল হলদে আভা, কখন সমুদ্রে মিলিয়ে যাচ্ছে আর কখন ভেসে উঠছে কেউ বুঝে উঠতে পারছে না। আর এভাবে ওদের শরীরের রঙ পাল্টে যাচ্ছে। কখনও বেগুণী কখনও মেরুন, কখনও ক্রিসেন্থিমাম। ছোপ ছোপ রঙের ভেতর ওরা যখন বাক্সোটার পাশে হাঁটু গেড়ে বসল তখন কে বলবে ওদের দুজনের কাছে পৃথিবীতে এর চেয়ে আর কিছু বিস্ময়ের আছে। পাখি দুটো হলদে নীল ছোট মারবেল গুলির মতো ডিম পেড়েছে। আর অহংকারে ওদের পা পড়ছে না। কেবল মাথার ওপর পাখি দুটো উড়ছে। আর কিচকিচ করছে।

    ছোটবাবু বলল, কী?

    জ্যাক বলল, কী?

    ওরা দুজনেই পাখি দুটোকে প্রশ্ন করল।

    তখন মৈত্র যাচ্ছে। সে বলল, কি করছিস রে ছোটবাবু?

    —এসে দ্যাখো না।

    মৈত্র এসে বলল, সাবাস!

    সারেঙসাবকে ছোট ডেকে আনল, চাচা দেখে যান কি হয়েছে!

    জ্যাক দু-লাফে একেবারে কোথায় চলে গেল। একটু পরে সবাই দেখছে, জ্যাক, তার বাবাকে টানতে টানতে নিয়ে আসছে।

    কাপ্তান এসেও উঁকি দিলেন। তিনি দেখলেন। দেখলেন ছোট্ট একটা কাঠের বাক্সের এক পাশে খড়কুটো দিয়ে বানানো ঘরে পাখি দুটো সুন্দর সুন্দর সব ডিম পেড়েছে। জ্যাকের দিকে তাকিয়ে বললেন, কে আবিষ্কার করেছে?

    জ্যাক বলল, আমি। বাবা আমি খুঁজতে এসে দেখি দুজনে চোরের মতো এখানে পালিয়ে আছে। ও মা কাছে যেতেই দেখি ওরা উড়ে গেল তারপরে না বাবা….। আহা জ্যাকের চোখ কি উজ্জ্বল! এভাবে প্রায় সকলেই এসে দেখে গেল। কাপ্তান নিজে এসে দেখে গেলেন যখন, তখন জাহাজিরা না দেখে থাকে কি করে। চড়ুই দুটো এ-জাহাজের যাত্রীর মতো। প্রায় সবাই পাখি দুটোর ভালমন্দ নিয়ে ভাবতে থাকল। কাপ্তান পাখি সম্পর্কে নানারকম কথা বলতে বলতে উঠে গেলেন। পাশে চীফ- অফিসার, রেডিও-অপারেটর। এই সব পাখি দীর্ঘদিন সমুদ্রযাত্রায় নানারকম বৈচিত্র্য নিয়ে আসে। এরা যে সত্যি ডিম পাড়ে, জাহাজিদের কথাবার্তা শুনে একেবারে মনে হবে না। যেন সিউল-ব্যাংক জাহাজে চড়ুই দুটো প্রসব করল।

    এই ডিম দেখার পর মৈত্রমশাই মুখ গোমড়া করে থাকল। সে টাকা পাঠাতে পারে নি বুয়েনএয়ার্স বন্দর থেকে। ভেবেছিল ভিকটোরিয়া থেকে মোটা টাকা পাঠাবে। কম্বল এবং কিছু উলেন জামা বিক্রি করে যা পেয়েছে পাঠিয়েছে। ওতে কি হবে। সন্তান হবার সময় কত কিছুর দরকার। সে লিখেছিল আমি ঠিক পাঠাচ্ছি। কাজ কারবার যা করেছে ওতো সব রেখে এসেছে বুয়েন-এয়ার্সে। এখনও মেয়েটির কথা ভাবলে চোখে ঘুম আসে না। বিজবিজে ঘা। ওর ক’দিন থেকে এই একটা ভাব, কুঁচকির নিচে বিজবিজে কি যে দেখা যাচ্ছে, জ্বলছে। বন্দর না এলে কিছু করতে পারছে না। পালিয়ে ডাক্তার দেখিয়ে আসবে। সে তো আর এ-সব কাউকে বলতে পারে না। কেবল টাকা টাকা। অমিয় কি সব এনে জড় করছে লকারে। অমিয় বলল, দাদা, আমি দ্যাখো ঠিক রাজা হয়ে বাড়ি ফিরব।

    মৈত্র বলল, কচু।

    —দেখ না। বলে লকার খুলে দেখাল।

    —কি করেছিস? সারেঙসাবকে বলেছিস চাবি পাচ্ছিস না! আর এ-সব হচ্ছে!

    —তুমি দেখ না। এই যে, বলে অমিয় একটা বড় তাল, প্রায় সোনার পিন্ডের মতো দেখতে, মৈত্রকে দেখাল। কয়লার ছাই থেকে এ-সব উজ্জ্বল ধাতুপিন্ড সংগ্রহ করেছে। এখন তেমন বেশি হচ্ছে না। ইন্ডিয়ান কোল পুড়লে চকচকে এমন সব ধাতুপিন্ড—আর সবই মনে হয় অমিয়র, কিছু রয়েছে এর ভেতর—সে কুড়িয়ে আনে। আর যা ভেবে থাকে, এই সব সঞ্চিত ধাতুপিন্ড নিয়ে সে কোন বড় দ্বীপে নেমে যাবে। কেউ টের পাবে না। আসলে কয়লার ছাই বলে কেউ বুঝতেই পারে না, এর ভেতর এমন অমূল্য কিছু পড়ে থাকতে পারে। সেই যেন প্রথম এটা আবিষ্কার করেছে। একবার শুধু যাওয়া। লকারের নিচের তাকটা ভরে গেছে। যদি সত্যি সোনা হয়ে যায়, অথবা এমন ধাতুপিন্ড, যা আরও অমূল্য, সে তো এভাবে গলে গলে কয়লা থেকে হীরক হয়ে যাওয়ার গল্প শুনেছে। শুনেছে, কোন এক কয়লাবালা এক পিন্ড হীরক পেয়েছিল। কয়লা টানতে টানতে বড় বড় চাঁই ভেঙ্গে ফেলতেই উজ্জ্বল রত্নরাজি। এবং সে সারেংকে দেখিয়েছিল। সারেং কাপ্তানকে। কাপ্তান বলেছিল, কিছু না, কাচ। তারপর বলেছিল, ফেলে দাও। কোলবয় ফেলছে না, নিয়ে যাচ্ছে। তিনি ফের ধমক দিলে, সে ফেলে দিয়েছিল। তারপর চলে গেলে কাপ্তান কুড়িয়ে নিয়েছিল সাত রাজার ধন এক মাণিক, এবং জাহজে কেউ জানল না কাপ্তান বোকা বানিয়ে সব কেড়ে নিল। সে এমন বোকামি করছে না। মৈত্রেরও এমন একটা চালাকি মনে মনে থাকতে পারে। অমিয় বেশ ভাল করে তালা মেরে টেনে দেখল। না, এত সহজ নয় খোলা। কেবল একটা ভয় রয়েছে, যে কোনো সময় কাপ্তান সাফাইয়ে এসে এটা খুলে দেখতে পারেন। যা শোলার উপদ্রব হয়েছে! ওর লকারটার ভিতরে এখন যত আরশোলার রাজত্ব। রাজ্যের সব আরশোলা ওর লকারে জড় হয়েছে। চাবি পাচ্ছে না বলে খোলা যাচ্ছে না। গ্যাস দেওয়া যাচ্ছে না। সব আরশোলা তাড়া খেয়ে ওর লকারে পালিয়ে আছে।

    এবং লকারটা খুললেই সারা ঘরময় সেই আরশোলা উড়তে থাকে। যেন একটা দুটো না, অজস্ৰ এবং বেলুনের মতো হয়ে যায়, রং-বেরংয়ের বেলুন। বেশি উড়তে থাকলে বিপদ, সবার ঘরে উড়ে যাবে। কেউ তো জানে না, সব এসে এখন এই একটা লকারে আশ্রয় নিয়েছে। এত গ্যাসেও কোন ফল হচ্ছে না। এবং যেমন লকার খুলে দেখার একটা কাজ আছে অমিয়র, মালপত্র ঠিক আছে কিনা, না কেউ গেঁড়া মেরেছে, সবচেয়ে ভয় মৈত্রকে। যেভাবে টাকা টাকা করছে যে কোনো সময় ঠিক ফাঁক করে দিতে পারে—সুতরাং মাঝে মাঝে খুলে ফেলতে হয়, খুলে দেখার সময় আরশোলা উড়ে বেড়ালে আবার তাদের ধরতে হয়। ধরে ধরে একটা একটা করে ভরে রাখতে হয়! এখন তো কারো কেবিনে আর ছেড়ে দেওয়া যাচ্ছে না। আগে সে বড়-মিস্ত্রির কেবিনে এইসব আরশোলা মধ্যরাতে ছেড়ে দিত। আপেল ডিম তোলার সময় ওর হাত থেকে পাখির মতো একটা একটা করে আরশোলা উড়ে যেত, যেন অজস্র পাখি এবং বোধ হয় অজস্র চড়াই, ছোট ছোট পাখি, উড়ে উড়ে অল্প আলোতে নানাবিধ ছায়া ঘোরাফেরা করলে একটা হাত এবং ঝুলন্ত হাত, পাশে কি রয়েছে, নেশার ভেতর চোখের পলক পড়ত না—সে এভাবে একটা মহৎ কাজ করেছে জাহাজে উঠে। শালাকে ভাগিয়েছে। এমন ভাবে সুন্দরী মেয়েদের কাঁচা মাংস খেতে সে কাউকে দেখে নি। টাকার জোর থাকলে সব হয় না।

    সব হয় না বললে কি হবে, লাফিয়ে লাফিয়ে একটা একটা করে খপ করে ধরছে, আর লকারে ঢুকিয়ে দিচ্ছে। খোঁয়াড়ে ছাগল ঢুকিয়ে দেবার মতো। সে ধরছে আর বলছে, টাকা! না টাকাই সব না। টাকা! টাকা আছে, সব আছে। প্রেমিকা আমার, মুক্তো আমার, আমি টাকা নিয়ে যাব। কত টাকার খাঁকতি দেখাব।

    মৈত্র এ-সব দু-একদিন লক্ষ করছে, ছোটবাবুও লক্ষ্য করত। অমিয় বিড়বিড় করেছ বকছে। এখন মৈত্র ওপরে থাকলে, গোপনে লকার খুলে দেখলে এটা বেশি হয়। এক অদৃশ্য শত্রুর বিরুদ্ধে তার লড়াই। যতদিন লড়াইয়ে না জিতছে ততদিন অমিয়র যেন শান্তি নেই। এ-সব কারণে জীবনপণ করে সে সামনাসামনি সেই অদৃশ্য শত্রুর ডামি পেয়ে গেলে লোভ সামলাতে পারে না। কব্জা করে তবে ছাড়ল। ছোটবাবুরও উপকার হয়ে গেল। ছ-নম্বর হয়ে গেল। তাহিতিতে ছোটবাবুকে একটা ভোজ দিতে হবে। না হলে অমিয় ছোটবাবুর পিছনেও লাগবে।

    এ-সব মনে হলেই ওর মনে হয় অদৃশ্য সেই শত্রু মহান নায়কের মতো গোঁফ মুচড়ে মুচকি হাসছে। সে তখন স্থির থাকতে পারে না। জাহাজে উঠে এত দিন সে কাউকে বুঝতে দেয়নি, তার ভালবাসার মেয়েকে কেউ কেড়ে নিয়েছে। ঠিক কেড়ে নিয়েছে বললে ভুল হবে, যেন ইচ্ছে করেই সেই মেয়ে তাকে ছেড়ে চলে গেল। কারণ, অমিয়র কি আছে! শরীর বাদে ওর কিছু নেই। বাউন্ডুলে, চুল বড়, দাড়ি ঠিক মতো কামায় না, স্নান করে না, কেমন এলোমেলো, তারপর মদ্যপান, কোথায় যে টাকা পেত বাংলা মদের। এ-সব নানা অজুহাত দেখিয়ে ফুস করে উড়ে গেল।

    সে খপ করে আরশোলা ধরত আর বলত, টাকা! টাকা কামিয়ে একটা দ্বীপ কিনে ফেলব। তারপর চাষাবাদ। চারপাশে সমুদ্র দ্বীপের। দ্বীপের একপাশে উঁচু পাহাড়, পাহাড়ে একটা আমলকি গাছ থাকবে। তার নিচে ছোট্ট কুটির। নিচে বেলাভূমি, মৎস্য শিকারের অবাধ সুযোগ, পাশে ফুলের রাজত্ব, এক পাশে আঙুর ক্ষেত, পাশেই আঙুর পচিয়ে মদ, পাশেই আপেলের বাগান, পৃথিবীর যাবতীয় সুদৃশ্য গাছপালা এনে সে লাগাবে, তারপর সুন্দরী রূপবতী মেঘবরণ চুলের কন্যার হাতে ফুল দিয়ে বলবে, আমি পৃথিবী জয় করলাম।

    আসলে সে চায় প্রতিশোধ। সে যে কত বড় তা দেখাতে চায়। সে এভাবে চারপাশে নানারকম কারুকার্যময় জীবন দেখতে দেখতে মাঝে মাঝে ভীষণ উৎফুল্ল হয়ে ওঠে। তাহিতিতেই সে প্ৰমাণ করবে, এগুলো কি। সে বলল, এই যাবি মৈত্ৰ!

    —কোথায়?

    —কি ভেবে বলল, না থাক। পরে বলব। মৈত্রকে অমিয় কিছু আর বলল না।

    —কিছু বলছিস না যে?

    —এই বলছিলাম ছোট নাই তো। খুব খালি খালি লাগছে।

    —তা আর ভেবে কি হবে।

    —ছোটর খারাপ লাগে না আমাদের ছেড়ে থাকতে?

    —জিজ্ঞেস করে দেখ না।

    —এখন তো কথাই বলতে পারি না। কোথায় যে থাকে!

    —উইনচের নিচে পড়ে থাকছে।

    এভাবেই জাহাজ যায়। আর ছোটবাবু উইনচের তলায় চিৎ হয়ে পড়ে থাকে। দুলে দুলে জাহাজ যায়। আসলে চিৎ হয়ে শুয়ে থাকলে মনে হয় আকাশটাই দুলছে। রাত হয়ে গেলে মনে হয় নক্ষত্র দুলছে। উইনচের নিচে শুয়ে তার মা-বাবার মুখ এবং সেই দূরদেশে রয়েছে জন্মভূমি, সব তরমুজের লতা, এবং বড় অশ্বত্থ গাছ এ-সবের ভেতর মনে পড়ে ছোট্ট এক মেয়ে—সে তো এখন ওর মতো বড় হয়ে গেছে। নাকে ওর নথ ছিল। ঠিক দুর্গাপ্রতিমার সঙ্গে ওর মুখ এখন আকাশের গায়ে ভেসে উঠছে। কি বড় নথ, আর কি বড় চোখে ওকে দেখছে। সারা আকাশময় শুধু নক্ষত্র! এখন কি মাস, এ-মাসে কি তার আগে পুজো হয়ে গেছে! আকাশের গায়ে প্রতিবিম্ব ভেসে উঠলে সুদূরের সেই দুর্গাপুজোর কথা মনে হয়। চারপাশে ড্যাং ড্যাং বাজনা বাজছে। কি যে হয়, কিসের বাজনা, কেন এতদূর থেকেও সে স্পষ্ট শুনতে পায় বাজছে, দুর্গাপুজোর বাজনায় সারা শরীর ওর ফুলে ফুলে উঠছে।

    আসলে মায়ের কথা ভেবে ছোটবাবুর কান্না পাচ্ছিল। সে উইনচের নিচে শুয়ে গোপনে মায়ের জন্য কাঁদছে।

    রাত আটটায় ডাইনিং হলে খাবার সাজানো হচ্ছে। একে একে সবাই নেমে আসছে। ওভাল সাইজের টেবিল, ধবধবে সাদা চাদর বিছানো। টুপির মতো ন্যাপকিন সাজানো প্রত্যেক চেয়ারের সামনে। সুন্দর কারুকার্য করা দেয়াল। দেয়ালে বিখ্যাত সব কাপ্তানদের ছবি। নিচে নাম। ব্যাংকলাইনের সব দুর্দান্ত কাপ্তানদের বড় বড় ছবি। মাঝখানে হিগিনসের ছবি। আর চারপাশে আলোর ফুলঝুড়ি। বিচিত্র সব আলোর বাহার। খেতে বসলে রেকর্ড চালিয়ে দেওয়া হয় কোনো দিন। মিউজিক বাজতে থাকে। ওরা নিভৃতে খায়। অথবা দুটো-একটা পুরানো কিংবদন্তী। সমুদ্রগামী জাহাজে দূর অতীতে কত কি সব সংস্কার ছিল, সে সব কথাবার্তা কাপ্তান সারাজীবন ধরে যেন মুখস্থ করে রেখেছেন সব। জাহাজি ঐতিহ্য এভাবে খেতে বসে কথাবার্তায় ধরা পড়ে। ছোটবাবু খাবার সময় কথা বলে না। কেবল শুনে যায়।

    অথচ সবাই এসে দেখল, ছোটবাবু আসেনি। জ্যাকের খাবার এখন ওর কেবিনে যাচ্ছে। সে নিচে খেতে আসছে না। ডাইনিং হলে সে খেতে একেবারেই পছন্দ করছে না। জ্যাক যেভাবে পারছে মেজ- মিস্ত্রি আর্চিকে এড়িয়ে থাকতে চাইছে।

    তখন ডেবিড খুঁজে খুঁজে আবিষ্কার করল ছোট উইনচের তলায় ঘুমিয়ে পড়েছে। ছোটকে অহেতুক কাজ দিয়ে রাখে মেজ মিস্ত্রি। সে কিছু বলতে পারে না। ধীরে ধীরে ডাকল, এই ছোট। শিগগির ওঠ। তুমি ঘুমোচ্ছ!

    ছোট উঠেই কেমন ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেছে। সে তাড়াতাড়ি আবার স্প্যানার বসিয়ে দিতে গেল নাটের ডগায়! খুব অন্যায় করে ফেলেছে। তাড়াতাড়ি নিজেকে সংশোধন করার সময় বুঝতে পারল না, ডেবিড এসেছে ওকে ডাকতে। সবাই ডাইনিং হলে ওর জন্য অপেক্ষা করছে। রাত আটটা বাজে।

    এবং যতটা তাড়াতাড়ি সম্ভব সে ছুটে গেল। তাড়াতাড়ি তো সব হয়ে ওঠে না। যতটা পারল হাত-পা পরিষ্কার করে হলঘরে ঢুকে দেখল, আর্চি বিরক্ত মুখে ওর দিকে তাকিয়ে আছে। সে ভীষণ কুণ্ঠার সঙ্গে বলল, আমার দেরি হয়ে গেছে। দুঃখিত।

    ডেবিড বলল, এত কাজ করছ, খেয়াল নেই!

    ছোটবাবু বুঝতে পারল, ডেবিড ওর দোষ ঢাকছে। সে কিছু আর বলতে পারল না।

    ছোটবাবু মেনু দেখল। ক্রিম ম্যাভি লোসে, ফিলেটস্ অফ হেক, ম্যাকসিকান রোস্ট, রিবস্ অফ বিফ্, রোফোর্ট, বয়েল প্যোটাটোজ, ফ্রেনচ্ বিনস, চকোলেট, পুডিং চিজ, কফি।

    ছোটবাবু সব খাবার খেতে পারে না। সে বেছে বেছে খায়। বয়েলড্ প্যোটাটোজ চাক চাক কেটে নিল। ফ্রেন্‌চ বিন্‌স খেল সবটা। রোস্ট খেতে ও পছন্দ করে। সবশেষে সে খেল পুডিং কফি। খাবার পরও মনে হল, সে খায়নি। একটু ঝালঝোল ভাত ডাল কি যে প্রিয় তার। সে খেয়ে উঠে গেল। সে যে ভালভাবে খেতে পারে না ডেবিড বুঝতে পারে। যে ছেলেটা শৈশব থেকে অথবা জন্মাবধি একভাবে মানুষ, তাকে হঠাৎ অন্য জীবনযাপনে ফেলে দিলে যা হয়, এবং প্রায়ই দেখা যায়, খাবার টেবিলে ছোটবাবুর কোনও উৎসাহ থাকে না। যখন সবাই স্যুপ অথবা অন্য খাবার হুস-হাস খায়, তখন নীরবে ছোটবাবু এটা-ওটা বেছে খায়। কিছুটা খেয়েই প্লেট সরিয়ে রাখে।

    এখন ছোটবাবুর কাজ একটু ভাতের ব্যবস্থা করা। ভাত-ডাল হলেই হবে। একটা শুকনো লংকা পুড়িয়ে নিলেও তার অমৃতের মতো মনে হবে। এবং যেটা স্বভাবে দাঁড়িয়ে গেছে ছোটবাবুর ভাত না খেতে পেলে ঘুম আসতে চায় না। ভাল ঘুমোতে না পারলে, বেশি খাটতে পারে না। ভাঙা জাহাজে সারা দিনমান এটা-ওটা মেরামত লেগেই আছে। সাধারণ মেরামতের কাজগুলো সে-ই করে থাকে। কিছু কাজ আছে যেমন, বাল্ব ঘুরছে না, গ্যাস-পাইপ কাজ করছে না, উইনচের প্যানিয়ান জ্যাম, সেগুলো সহজ সাধারণ কাজ বলে সেই করে ফেলে। যত সহজ ভাবা যায়, পরিশ্রমের দিক থেকে তত সহজ নয়। সে সেই সকাল থেকে সারা দিনমান প্রায় ডেকে, বোটডেকে ছুটে ছুটে কাজ করে থাকে বলে, সব সময় মনে হয় পেট ক্ষুধায় জ্বলছে। আর ফাঁকে যদি আফ্‌ট-পিকে চলে আসতে পারে, তবে তো কথাই নেই, একেবারে চোরের মতো ভান্ডারিজ্যাঠার গ্যালিতে ঢুকে, জ্যাঠা তাড়াতাড়ি, একটু আলু ভাজা, ব্যাস, সে গোগ্রাসে খেয়ে প্যান্টেই হাত মুছে লাফিয়ে আবার কখন কাজে যায়, অফিসাররা বুঝতেই পারে না, ছোটবাবু আড়ালে খালাসিদের খাবার খেয়ে এসেছে।

    আর এভাবে খেতে পেলেই সে ভীষণ ছুটে ছুটে কাজ করতে পারে। খাটতে পারে বেশি। রাতে তাকে জেগে থাকতে হবে, যদি মৈত্রদা, অমিয়, মনু কেউ এদিকে আসে! সে এলি-ওয়ে ধরে হাঁটতে থাকল। কেউ আসছে না। ওরা হয়তো ভুলে গেছে, সে জেগে অছে দুটো ভাত খাবে বলে।

    তখনই অনিমেষ এল। একটা ছোট কলাই-করা বাটিতে ভাত। একটু মাংসের ঝোল। ছোটবাবু ঢাকনা খুলে শুঁকে দেখল—আহা কি সুন্দর ঘ্রাণ। ওর জিভে জল চলে এসেছে। এবং কেবিনে ঢুকেই দরজা বন্ধ করে দিল। সে যতক্ষণ ভাল করে স্নান না করবে, যতক্ষণ পরিপাটি করে না খাবে, এবং চোখ বুজে বুজে হাড় চিবোবে, ততক্ষণ সে জাহাজ ডুবে গেলেও কেবিন থেকে নড়বে না। উদ্বাস্তু জীবনের মতো ভাত-ডাল, ভেড়ার মাংস তার কাছে আবার ভীষণ মহার্ঘ হয়ে গেছে।

    সে কেবিনে ঢুকেই বেল টিপল। মেস-রুম বয় এসে ওকে সেলাম জানালে বলল, পানি। মেসরুম-বয় বড় কাচের জারে জল, গ্লাস, সব সাদা লতাপাতা আঁকা দামী তোয়ালে দিয়ে ঢাকা, টিপয়ে রাখল। বয় আসার আগে লকারে সে ভেড়ার মাংস আর ভাত লুকিয়ে রেখেছে। জলটাও চেয়ে নিল। নুন সে বেশি করে ছোট্ট একটা কাচের বোতলে রেখে দিয়েছে। ও, কি যে ভাল লাগছে! সে চারপাশে ভেড়ার মাংসের ঝাল-ঝাল গন্ধ পাচ্ছে। যেন এই কেবিনে অন্য ঘ্রাণ, কারণ সকালে স্প্রে করে দিয়ে যায় দামী সুগন্ধ, সব উবে গিয়ে শুধু মাংসের ঘ্রাণ, সে শিস দিতে থাকল। স্নান করল সাবান মেখে। জলের যখন যে-রকম দরকার, হট্, কোল্ড, সে শীত না পড়া পর্যন্ত ঠান্ডা জলের ট্যাপ খুলে স্নান করে। আয়নায় ওর শরীর, ওর স্বাস্থ্য ক্রমে ভীষণ মজবুত হয়ে যাচ্ছে। আয়নার সামনে দাঁড়ানোর অদ্ভুত স্বভাব হয়ে গেছে। কারণ, সে সব খুলে হাতের মাস, পায়ের মাল বিচিত্র অঙ্গভঙ্গীতে দেখতে দেখতে ভাবে, তুমি কি ছিলে ছোটবাবু কি হয়ে গেলে! ক্রমে দৈত্যের মতো হয়ে যাচ্ছ।

    কখনও কখনও এভাবে স্নান করার সময় ছোটবাবুর শরীর দেখার নেশায় পেয়ে যায়। সে খুব কম সময় খালি গায়ে থাকে আজকাল। গরমেও সে পাঞ্জাবী-পাজামা পরে থাকে। বোধহয় আর্টি জানে না, ছোটবাবু শুধু লম্বাই নয়, মজবুতও। আর্চিকে তুলে সে জোরে আছাড় মারলে গুঁড়ো হয়ে যাবে।

    সে এ-সব অবশ্য বুঝতে দেয় না। তোয়ালে দিয়ে চুল, ঘাড়, পিঠ, পেট এবং জংঘার জল ধীরে ধীরে শুষে নিল। পিঠে বুকে প্রায় নীলবর্ণের বনরাজিনীলা। ধীরে ধীরে প্রায় অঙ্কুর উদগমের মতো, নরম, বিন্দু বিন্দু জলকণা শরীরে লেগে থাকলে, সুন্দরী তরুণীদের কথা মনে হয়, পৃথিবীর কোথাও, সেই রূপবতী বালিকা বড় হয়ে উঠছে। চুল শ্যাম্পু-করা তার। লতাপাতা আঁকা ফ্রক গায়ে—এবং কোথাও হয়তো পাহাড়ের চড়াইয়ে সে সবুজ উপত্যকা দেখে থমকে দাঁড়িয়েছে। কেন জানি মেয়েটার তখন একা একা এমন সবুজ শস্যক্ষেত্র দেখতে ভাল লাগছে না। মা-বাবা-ভাই-বোন সব থাকতেও মনে হচ্ছে তার কি নেই। ছোটবাবু চোখ বুজে প্রায় খেয়ে যাচ্ছিল—আর এমন সব রঙীন এক পৃথিবী, যেন ইজেলে কেউ এসে ছবি এঁকে যাচ্ছে আর ছুঁড়ে ফেলে দিচ্ছে। জ্যাককে সে বলতে পারে এখন, জ্যাক, মাঝে মাঝে একজন ফ্রক-পরা মেয়েকে আমার ভালবাসতে ইচ্ছে করে। তোমার করে না!

    ভাত খেলেই ছোটবাবু জাহাজে সুখী মানুষ হয়ে যায়। সে আর দুঃখী রাজপুত্র থাকে না। সে ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে সুন্দর স্বপ্ন দেখতে ভালবাসে।

    সে শুয়ে শুয়ে কখনও এভাবে সুখী রাজপুত্রের মতো স্বপ্ন দেখতে ভালবাসে। জাহাজে ওঠার পর স্বপ্ন দেখলে—যা দেখত, কখনও সে হাতীতে চড়ে যাচ্ছে। একটা মরা নদী পার হয়ে যাচ্ছে। পেছনে একটা কুকুর আসছে, হাতীর সামনে কেউ বসে রয়েছে, যেমন দীর্ঘকায় তিনি, তেমনি চওড়া, তাকে নিয়ে তিনি কোথায় যেন চলে যাচ্ছেন। আবার সে দেখতে পেত, নদীর চরে অনেক উঁচুতে একজন মানুষ দাঁড়িয়ে আছে, কিংবদন্তীর মতো মানুষ তিনি, কখনও মনে হতো, আসলে তিনিই সেই মোজেস, বাইবেলে বর্ণিত মানুষ। তিনি, যতদূরে নৌকা নদীতে ভেসে যাচ্ছে, ততদূরে যেন হাত তুলে দিতে পারছেন। যত দূরে চলে যাচ্ছে নৌকা, তত হাত ওপরে উঠতে উঠতে আকাশ ছুঁয়ে দিতে চাইছে। তত গাছ-পালা, বন-উপবন, এবং নদীর বাঁক পেরিয়ে ছোটবাবু স্বপ্নে দেখত, হাতটা অনেক দূরে অনেক উঁচুতে ঝুলে আছে। জ্যাঠামশাই চিৎকার করে বলছেন, এবারে ফিরে যাও। আর আসতে হবে না। অনেকটা সারেঙ-চাচার মতো তাঁর মুখ, সেই মানুষ ছিল ওদের পরিবারের একান্ত মানুষ। স্বপ্নে সে তাঁকেও কতবার যে দেখেছে!

    ভোর রাতের দিকে অদ্ভুত একটা স্বপ্ন দেখে আজও ছোটবাবুর ঘুম ভেঙে গেল। জেগে গিয়ে স্বপ্নটার মাথামুণ্ডু বুঝতে পারছে না। আর কি যেন হয়ে গেল! শরীরে এক আশ্চর্য ঘ্রাণ আছে সে এই প্রথম টের পেল। সুন্দর শরীরে এসব নির্গত ধারা, শরীরের ভেতরে জেগে থাকে সে জানত না। আশ্চর্য উষ্ণতা সারা শরীরে রিন-রিন করে বাজছিল। তারপর মনে হয়, রঙের কোমল কণিকারা প্রায় ভূমিকম্পের মতো আলোড়ন তুলে বের হয়ে এসেছে। সে পাশ ফিরে শুতে গিয়ে জংঘার পাশে এবং উরুর কাছাকাছি জাঙ্গিয়ার ভেতরে কি সব এলোমেলো ব্যাপার, প্রায় নষ্ট হয়ে যাওয়ার সামিল- সে উঠে বসে—কেমন অবোধ বালকের মতো কি করবে ভেবে পায় না। মৈত্রদাকে দেখেছে, দেখে সাহস জন্মেছে। অমিয়কে দেখেছে, দেখে বুঝতে পেরেছে সত্যিকারের পুরুষ মানুষ হয়ে গেলে এটা হয়। কিছুতেই তাকে বাধা দেওয়া যায় না। নষ্ট হয়ে যাওয়ার কিছু নেই।

    কিন্তু ছোটবাবু ঠিক ঠিক মনে করতে পারছে না, কি দেখে স্বপ্নে সে প্রথম নষ্ট হয়ে গেল। যতদূর মনে করতে পারে, অস্পষ্ট কুয়াশার ভেতরে কোনো বালিকার মুখ সে দেখেছিল। সে দু’হাঁটুর ফাঁকে মাথা গুঁজে আছে। স্বপ্নটা মনে করার চেষ্টা করছে। বালিকার কথা ভাবতে তার ভাল লাগছে। এবং খুব নিবিষ্ট হলে বুঝতে পারে প্রথমে এই জাহাজ কেমন ভাঙা পালবিহীন, এবং জাহাজটা ওর পূর্ববঙ্গের বাড়ির পাশ দিয়ে যাচ্ছে। বর্ষাকাল, ধান গাছে কীট-পতঙ্গেরা উড়ছে। সে আর কাপ্তান লগি মারছেন। ঠিক গাদা-বোটের মতো অতিকায় জাহাজটাকে বর্ষার ধান-খেতের ওপর দিয়ে ঠেলতে ঠেলতে নিয়ে যাচ্ছে। ওর মা বাঁশঝাড়ের নিচে দাঁড়িয়ে আছে। জ্যাঠিমা জ্যাঠামশাই সবাই দাঁড়িয়ে আছেন। সে সেই পালবিহীন অতিকায় জাহাজ স্বপ্নে ঠেলতে ঠেলতে একটা খালের ভেতরে নিয়ে ফেললে, দুটো একটা ধান-পোকা, সোনা-পোকা এবং বর্ষায় কীটপতঙ্গ জাহাজের গলুইয়ে উঠে আসছে। আর কি হয়েছিল তখন, একটা সোনা-পোকা ধরতে গিয়েই কি যেন হয়ে গেল, আমারে দ্যান, আমারে দ্যান সেই বালিকার মুখ। ট্যাবার পুকুরপাড়ে জঙ্গলটা পর্যন্ত স্বপ্নে সে দেখে ফেলেছে। আর কি আশ্চর্য, দু-লাফে সোনা-পোকা নিয়ে সে দৌড়াচ্ছে। সেই আমারে দ্যান, আমারে দ্যান মেয়েটাও দৌড়াচ্ছে। দৌড়াতে দৌড়াতে কি যে হয়ে যায়, দৃশ্যাবলী পাল্টে যায়, সমুদ্রের ঢালু উপত্যকায় নেমে যাচ্ছে কেবল, কেবল গড়িয়ে সেই বালিকা আর সে পড়ে যাচ্ছে, আর তখনই স্বপ্নের ভেতর থেকে ফ্রক- পরা অন্য একটা মেয়ে উঠে আসছে। সাদা সার্টিনের ফ্রক, পায়ে স্কেটিং পরে একেবারে দ্রুতগতিতে ওকে লুফে নিয়ে চলে গেল। তারপর সেই সমুদ্রে তুষার-বৃষ্টি—সমুদ্রে তুষারপাত—রিন রিন করে বাজছে। নীল বরফের উপত্যকায়, তুষারপাতের ভেতরে সাদা পোশাকে মেয়েটা অনবরত ছোটবাবুকে নিয়ে নাচছে। ছুটছে। খেলছে। প্রায় মাতালের মতো পড়তে পড়তে ঠিক সোজা দাঁড়িয়ে যাচ্ছে। আবার ঘুরে ঘুরে রিন রিন বাজনার মতো ধীরে, খুব ধীরে স্কেটিং করে যাচ্ছে। কখনও লাফিয়ে বরফের পাহাড় পার হয়ে, কখনও নীল জলের হ্রদ পার হয়ে সুন্দর একটা পাইন গাছের নিচে দাঁড়িয়ে গোপনে চুমো খাচ্ছে। ব্যাস সঙ্গে সঙ্গে মনে করতে পারছে ছোটবাবু, ভূমিকম্পে সেই কোমল সাদা কণিকারা লাভার মতো ছুটতে ছুটতে বের হয়ে এসেছে।

    কিন্তু ছোটবাবু বুঝতে পারছে না, সাদা সার্টিনের ফ্রক-পরা মেয়েটিকে কোথায় সে দেখেছে। চেনা, চেনা, খুবই চেনা মুখটা অথচ মেলাতে পারছে না। তারপরই সে ভয়ে গুটিয়ে গেল—সেই মেয়ে, সে মনে করতে পারছে, স্বপ্নে সেই মেয়ে সার্টিনের ফ্রক গায়ে পাইনের নিচে তাকে নষ্ট করে দিল। আর মনে হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সুন্দর স্বপ্নটা তার কাছে ভীষণ দুঃস্বপ্ন হয়ে গেল। সে মুখ ব্যাজার করে উঠে গেল বাথরুমে। বাথরুম থেকে পোশাক পাল্টে, পোর্ট-হোল খুলে দিল।

    তখনই সেই ভয়ঙ্কর ঘটনা জাহাজে ঘটে গেছে। ছোটবাবু টেরও পায়নি। জ্যাক এসে ছোটবাবুর দরজায় মাথা কুটছে প্রায়।—শিগগির ছোটবাবু। শিগগির উপরে এস। সব আমাদের শেষ হয়ে গেল।

    ছোটবাবু পাগলের মতো ছুটে গেল দরজায়। তারপর দরজা খুলে দিলে শুনল, জ্যাক বলছে, মিসেস স্প্যারো ডেড। আর কিছু বলতে পারছে না। চোখ প্রায় স্থির। ছোটবাবুকে অবাক হয়ে দেখছে। ছোটবাবুর শরীরে নতুন ঘ্রাণ। আর সঙ্গে সঙ্গে চোখের ওপর থেকে সমস্ত কুয়াশা সরে যাবার মতো চেঁচিয়ে বলে উঠল, মিসেস স্প্যারো ডেড। তারপর কেমন ধীরে ধীরে বলে গেল জ্যাক, লেডি এ্যালবাট্রস ছোঁ মেরে তুলে নিল, আমরা কিছু করতে পারলাম না ছোটবাবু। সে বালকেডে হেলান দিয়ে মৃতপ্রায় দাঁড়িয়ে থাকল। আর কিছু বলতে পারছে না।

  • তেইশ

    তেইশ

    ।। তেইশ।।

    সেই এক দৃশ্য—চারদিকে যতদূর চোখ যায় শুধু জল, নীল জলরাশি। ঠাণ্ডা বাতাস ক্রমে সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গে উত্তপ্ত হয়ে উঠবে। সমুদ্রে ছোট ছোট ঢেউ। বৃত্তের মতো ঘুরে ঘুরে ডুবে যাচ্ছে তারা। বেশি উঁচুতে উঠতে না পারলে, নিজের সামান্য বৃত্তে নিজেরা হারিয়ে যায়। আর কিছু থাকে না, আদিগন্ত শুধু সমুদ্রের এই জল নিয়ে খেলা।

    সিউল-ব্যাঙ্ক আপন গতিতে তেমনি চলছে। মনেই হবে না, জাহাজে কোন দুর্ঘটনা ঘটেছে। মনে হবে না সেকেণ্ড মেট ডেবিড এখন বোট ডেকে হামাগুড়ি দিচ্ছে—হাতে বন্দুক, হামাগুড়ি দিয়ে ঠিক বোটের আড়ালে মরা সাপের মতো পড়ে রয়েছে। এ্যালবাট্রস পাখি দুটো এদিকে এলেই গুলি করে নামাবে।

    তার পাশে আরও দুজন—জ্যাক আর ছোটবাবু। ছোটবাবুর সাতটায় কাজে নেমে যেতে হবে। কিন্তু সেই পাখি দুটোর জন্য ভেতরে ভীষণ একটা দুঃখ। মুখ ভার। পুরুষ চড় ইটা ভয়ে ফুলে ঢোল হয়ে গেছে। ওদের পায়ে পায়ে ঘুরছে। এবং জ্যাকের প্রায় কান্না পাচ্ছিল। ওরা এখনও কিছু করতে পারছে না। সেই থেকে ওরা নানাভাবে চেষ্টা করে যাচ্ছে, গুলিতে ফেলে দিতে। ডেকের ওপর মাংস ফেলে রেখেছে, যদি লোভে উড়ে আসে। কিন্তু সেই যে চড়ুইটাকে তুলে নিয়ে গেল আর এল না। অনেক দূরে পাখি দুটো উড়ে উড়ে যাচ্ছে। মাঝে মাঝে জলে আর্শিতে রোদ পড়ার মতো চোখ ভীষণ ঝলসে দিচ্ছে। পাখি দুটোকে তখন আর দেখাই যাচ্ছে না। চোখ ঝাপসা হয়ে উঠছে।

    এভাবে ডেবিডের রাগ বেড়ে যাচ্ছে—যেন ক্রমে প্রতিদ্বন্দ্বিতা এভাবে বেড়ে যায়। পাখি দুটোর চাতুর্যের কাছে সে হেরে যাচ্ছে। ওর ভেতরে ক্রমে প্রতিশোধস্পৃহা এভাবে বেড়ে গেলে সে স্থির থাকতে পারছে না। পাখি দুটো সামান্য কাছে এলেই পর পর গুলি ছুঁড়ে যাচ্ছে। এসব ছেলেমানুষী—কাপ্তান ভেবে পান না, ডেবিড অথবা জ্যাক, জ্যাকের তবু মানে আছে, জ্যাক ছোটবাবু পাখি দুটোর জন্য অনেক করেছিল, আর বয়স কম বলে সবকিছুর জন্য তাদের মায়া, মিসেস স্প্যারোর জন্য জ্যাক ফুঁপিয়ে কেঁদেছে পর্যন্ত। ছোটবাবু আবার বুঝি বিষণ্ণ হয়ে গেল—ছোটবাবুকে দেখলেই বোঝা যায় মুখ থমথম করছে ছোটবাবুর।

    তারপরই কাপ্তান মনে করতে পারলেন আসলে ডেবিডকে ক্ষত-বিক্ষত করে দিয়েছিল ম্যান অ্যালবাট্রসটা। ডেবিড সুযোগ বুঝে বন্দুক নিয়ে বোট-ডেকে ঠিক বোটের নিচে, কিছুটা আত্মরক্ষার মতো, কারণ ছোঁ মারলেই যেন মাংস খুবলে না নিতে পারে—বলা তো যায় না, ডেবিডের হাতের বন্দুক ওদের ভয় পাইয়ে দিয়েছে, যে কোন মুহূর্তে সাঁ-সাঁ করে নেমে এসে পিঠের মাংস তুলে নিতে পারে। বোটের নিচে আছে তারা। বোটের নিচে শুয়ে নির্ভয়ে বন্দুক চালাতে পারবে ডেবিড।

    ডেবিড সামান্য সুযোগটুকুও দিচ্ছে না। দেখলে মনে হবে, বোটের নিচে ওরা তিনজন পাশাপাশি শুয়ে। মুখ সমুদ্রের দিকে, পা পেছনের দিকে। কোথায় পাখি! পাখি দুটো দূর-সমুদ্রে ডুবে ডুবে স্নান করছে। ব্রিজে দাঁড়িয়ে পাখি এবং মানুষের প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেখছে চিফ-অফিসার, কাপ্তান, রেডিও-অফিসার। জ্যাক মাঝে মাঝে বের হয়ে দেখছে কোথায় গেল। যেন মরণপণ লড়াই—এবং কাপ্তান, চিফ-অফিসার বেশ মজা পাচ্ছিলেন। জ্যাক মাঝে মাঝে মাংকি আয়ল্যাণ্ডে উঠে গেছে—কতদূরে আছে ওরা—আবার জ্যাক চিৎকার করে উঠল, আসছে ডেবিড, রেডি। আসছে। বাবা, ঐ দ্যাখো কেমন বেগে ধেয়ে আসছে। কি লম্বা ডানা, কি বিরাট আকারের পাখি দুটো ঠিক জাহাজের ওপরে এসে গেল। কোথায় ডেবিড আর তার বন্দুক, যেন ডেবিডকে নিয়ে মজা করছে, কিছুতেই বন্দুকের পাল্লায় পাখি দুটোকে পাওয়া গেল না। অথচ এমনভাবে নেমে আসছিল, যেন একেবারে কাছে এসে সাঁ করে ওপরে নাচতে নাচতে উঠে গেল। পাখা কাঁপল তির-তির করে। উড়তে উড়তে ঘাড় কাত করে দেখল নিচের সিউল-ব্যাংক জাহাজটাকে আর তার মানুষগুলোকে। এবং ঠিক ছোঁ মেরে ডেকের ওপর থেকে মাংসের টুকরো নিয়ে গেল। চোখের নিমেষে ঘটে গেল। বন্দুকের নল ঘোরাবার সময় থাকল না, এত দ্রুত আর এমন ত্বরিতে ওরা উড়ে গেল। বোকার মতো বসে থাকল ডেবিড।

    ছোটবাবু চুপচাপ নেমে গেল এনজিন-রুমে। সে একবার ভেবেছিল বাকসোটার কাছে গিয়ে বসবে। ডিমগুলো নষ্ট হয়ে যাবে, এবং পুরুষ-চড়াইটাকে সে নিচে এনজিন-রুমে তাড়িয়ে নিয়ে এল। তারপর ওর মনে হল, কশপের কাছ থেকে স্প্যানার তেলজুট হাতুড়ি সব নিয়ে ওপরে উঠে গেলেও সারাদিন সে কাজ করতে পারবে না। সব সময় চোখ লেডি-এ্যালবাট্রস, তার উড়ে যাওয়া, তার গতিবিধি লক্ষ্য রাখাই কাজ হয়ে পড়বে। অথচ দিন যত যাচ্ছে, কাজ বাড়ছে। রেলিং ভেঙে পড়ছে, সিঁড়ি খসে পড়ছে। কার্পেন্টার এবং সে মিলে সে-সবও মেরামত করছে। কেবল জাহাজে ভেঙে পড়ার খবর। এবং মেন-জেনারেটার ক’দিন থেকে গণ্ডগোল করছে। সকালে তেমনি খবর গেছে, যেমন প্রতিদিন রেডিও-অফিসার খবর পাঠায় এরিয়া-স্টেশনকে—সিপ এস এস সিউল-ব্যাংক, বাউণ্ড ফর নিউ প্লাইমাউথ। হল্ট একদিনের জন্য তাহিতিতে। পনের হাজার টনের জাহাজ সিউল-ব্যাংক। ভাঙ্গা পুরোনো, স্পেয়ার পার্টসের একটা লিস্ট বেতার সংকেতে পাঠানো হচ্ছে। খাবার, জল, সব এভাবে যখন বেতার-সংকেতে দিকে দিকে ইথারে ভেসে চলেছে তখন এ্যালবাট্রস পাখি দুটোও ভেসে আসছে কেবল জাহাজের পেছনে। উড়ে উড়ে আসছে।

    যে যখন সময় পেয়েছে বোট-ডেকে পাহারায় থেকেছে—কখন কাছাকাছি দেখা যায়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সন্ধ্যা হলে সবাই দেখল, সমুদ্রে অন্ধকার নেমে আসছে। কিছু দেখা যাচ্ছে না।

    গভীর অন্ধকারে সমুদ্রটা একেবারে টুপ করে ডুবে গেল। চারপাশে কিছু দেখা যাচ্ছে না। কেবল আকাশের নক্ষত্রমালা বাদে তাদের দেখবার কিছু থাকে না। সারাটা দিন একটা ভয়ঙ্কর উত্তেজনার ভেতর গেছে! পাখিদের স্বভাব সম্পর্কে কথাবার্তা, কে কোথায় কবে কত বড় এ্যালবাট্রস দেখেছে তার গল্প। এত বড় এ্যালবাট্রস তারা এই প্রথম দেখেছে এটা প্রায় একবাক্যে স্বীকার করছে সবাই। যারা প্রাচীন নাবিক, যাদের সফর বিশ-বাইশ-চব্বিশ, তারাও এত বড় এ্যালবাট্রস কোনো সমুদ্রে কখনও দেখেছে বলতে পারল না।

    কাঠের বাকসোটা হাঁ করে পড়ে আছে। কাল হয়তো সমুদ্রে ফেলে দেওয়া হবে। ডেক-জাহাজিরা জল মারার সময়, বাকসোটা রাখা অকারণ ভেবে ফেলে দিতে পারে। সন্ধ্যার সময় ডেবিড, ছোটবাবু পুরুষ পাখিটাকে খুঁজছে, পায়নি। ওটা যে কোথায় গেল! কখন ওটাকেও হয়তো ধরে নিয়ে গেছে। কেউ টের পায়নি। এসব ভাবলেই ছোটবাবুর কিছু ভাল লাগে না। দেশে ফিরে যেতে ইচ্ছে করে। কবে জাহাজ দেশে ফিরবে কেউ বলতে পারে না।

    এবং এখন জাহাজের ফোকসালে অথবা কেবিনে সেই এক খবর। জাহাজটা স্ক্র্যাপ করার অর্ডার না আসা পর্যন্ত এভাবে উত্তেজনা প্রবল জাহাজে। যদিও সবাই জানে, এত পুরানো জাহাজ সমুদ্রে চলে না। এবং দু-দুবার স্ক্র্যাপ করার অর্ডার হয়েছিল। স্ক্র্যাপ করা হলে সিউল-ব্যাঙ্ক বলে একটা জাহাজ আছে, সমুদ্রে বিচরণ করছে, কখনও ছোটবাবু অথবা নতুন জাহাজিরা জানতেই পারত না।

    অথচ কি আশ্চর্য সেই পঁয়তাল্লিশে একবার, আটচল্লিশে একবার, সব ঠিকঠাক, জাহাজ আর চলছে না, জাহাজ পুরোনো লোহা লক্কড়ের দামে বিক্রি করে দেওয়া হচ্ছে। অথচ কি এক অজ্ঞাত কারণে সব ভেস্তে গেল। কি এক অজ্ঞাত অদৃশ্য শক্তি জাহাজটাকে আবার সমুদ্রে ভাসিয়ে আনে। বন্দরে বন্দরে যায়, খরচ বাড়ে, কোম্পানীর কর্তাব্যক্তিরা মুখ বুজে খরচের বহর সয়ে যাচ্ছে। তবু সিউল- ব্যাঙ্কের নাম ভাগাড়ে তুলে দিতে পারছে না।

    এটা আবার সংস্কারবশেও হতে পারে, যদিও কোম্পানীর প্রথম জাহাজ এটা না, তবু এর আসার সঙ্গে সঙ্গে কোম্পানীর দিন দিন শ্রীবৃদ্ধি প্রায় লক্ষ্মীর মতো, বড় পয়মন্ত এই সিউল-ব্যাঙ্ক। এবং যখন সারা পৃথিবী চষে কার্ডিফের রাউদ এনজিনিয়ারিং ডকে ফিরে যেত, কোম্পানীর কর্তাব্যক্তিরা ছুটে আসত, সিউল-ব্যাঙ্কের হাল তবিয়ত দেখতে। জাহাজটা ড্রাই-ডক করা হচ্ছে, অতিকায় জাহাজ নয়, মাঝারি জহাজ, তবু যখন হেঁটে যেত কর্তাব্যক্তিরা মনে হত সিউল-ব্যাঙ্ক অতিকায় জাহাজ হয়ে যাচ্ছে। রণক্লান্ত অশ্বের মতো দাঁড়িয়ে আছে। যেন ওরা মাঝে মাঝে দেখে ফেলত, অতিকায় সেই অশ্বের চোখে মুখে ক্লান্তি, চোখ দিয়ে জল গড়াচ্ছে, মুখ দিয়ে লালা গড়াচ্ছে। এমন সব আধিভৌতিক দৃশ্য দেখে ফেললে তারা আর জাহাজটা স্ক্র্যাপ করার কথা ভাবতে পারত না। জাহাজটা সম্পর্কে সবার কেমন মায়া গড়ে উড়েছিল। তারপরে ড্রাই-ডকে, ফের যুদ্ধের দামামা বেজে ওঠার মতো, সব বড় বড় অক্সিজেন সিলেণ্ডার নামিয়ে দেওয়া হচ্ছে। যুদ্ধের সাজে তৈরি করা হচ্ছে যেন যত খরচ লাগুক, অর্থাৎ এ যা খরচ হচ্ছে, তাতে আর একটা নতুন জাহাজ কেনা যেতে পারে, তবু খরচের বহরে কোম্পানী ভয় পায় না। কিন্তু হলে কি হবে কোম্পানী তো সব না, মেরিন বোর্ডের সার্ভেয়ার এসে শেষপর্যন্ত রায় দিলে, অচল জাহাজ সুতরাং আর এ চলবে না। তারপরই সেই এক দুর্ঘটনা, কোথায় বজ্রাঘাতে মৃত্যু, কেউ রাস্তায় যেতে যেতে দু-বার কি দেখে আঁৎকে উঠলে, কথা বলতে পারল না, ঘরে ফিরে যেতে পারল না, মৃত্যু। এবং এভাবে যখন সিউল-ব্যাঙ্ক জাহাজকে কেন্দ্ৰ করে নানাভাবে সংস্কার গড়ে উঠেছিল, তখন উনিশশো পঁয়তাল্লিশ সাল শেষ হচ্ছে। কোম্পানীর নতুন চেয়ারম্যান নিযুক্ত হলেন স্যার ম্যাথিউ দি সেকেণ্ড। পূর্বতন চেয়ারম্যান স্যার ম্যাথিউ ফেলের রহস্যজনক মৃত্যুর পরই তিনি যোগদান করলেন। তাঁর পুরো নাম রিচার্ড ফেল। বয়সে নবীন! লম্বা, ওয়েলসের লোক। স্বাভাবিকভাবে উজ্জ্বল স্বভাবের মানুষ। বাবার মৃত্যুর সঙ্গে সিউল-ব্যাঙ্ক জাহাজের স্ক্র্যাপ করার আদেশ পত্রের সঙ্গে কোনও সংযোগ রয়েছে বিশ্বাস করতে পারলেন না। তিনি এসেই এস এস সিউল-ব্যাঙ্কের নিজস্ব লাভ-লোকসানের একটা হিসাব চেয়ে বসলেন।

    আশ্চর্য হিসেবটা ঘুরেফিরে হাতে আসতে তার দু’বছরের ওপর লেগে গেছিল। সংক্রামক ব্যাধির মতো ভয়। কোন অমঙ্গলের প্রতীক ভেবে সবাই সিউল-ব্যাঙ্কের কাজকর্মে এলেই কেমন ঢিলেঢালা ভাব দেখাত। মুখে কিছু বলতে সাহস পেত না। নতুন চেয়ারম্যান কেন এসব চাইছেন—বোর্ডের মেম্বারদের বছরে কত কড়ি গুনতে হচ্ছে জাহাজটার জন্য এবং জেটিতে ফেলে রাখার দরুন বন্দর কর্তৃপক্ষকে কত দিতে হয়েছে, অথবা জাহাজ চলতে চলতে ক’জন কাপ্তান কতবার অসুস্থ হয়ে ফিরে এসেছেন, কতবার কম্পাস রিডিং-এ ভুল হওয়ার দরুন কত হাজার হাজার মাইল জাহাজটা কাপ্তানকে নিশি-পাওয়া মানুষের মতো সমুদ্রে ঘুরিয়ে মেরেছে তার হিসাব এবং হিগনস্ই ছিলেন একমাত্র কাপ্তান যাঁর কাছে সিউল-ব্যাঙ্ক একেবারে শান্তশিষ্ট মেয়েটির মতো—হিগিনিস্ জাহাজ থেকে নেমে দু’মাস ও অবসর নিতে পারতেন না, আবার ডাক পড়ত। আর একজন ছিলেন ফোর্ড। বছর তিন আগে তিনি সমুদ্রেই মারা গেলেন।

    স্যার ম্যাথিউ দি সেকেণ্ড যেহেতু কোম্পানীর অধিকাংশ শেয়ারের অংশীদার, স্ক্র্যাপ করার আগে একবার জাহাজটাকে দেখে যাবেন ভেবেছিলেন। দুদিন বাদে এ্যানুয়েল জেনারেল মিটিং। সব প্রস্তাব টাইপ হয়ে পড়ে আছে। তার ভেতর সিউল-ব্যাঙ্কের স্ক্র্যাপ করার প্রস্তাব। তিনি চেম্বারে বসে সইসাবুদ করতে করতে হঠাৎ কি ভাবলেন, জাহাজটা কতদিনের জাহাজ, তাঁর বাবার আমলের জাহাজ, বাবা জাহাজটার কিছু কিছু ইতিহাস বলে গেছিলেন, বিশেষ করে সেই লুকেনার ব্যক্তিটি, তাঁর মৃত্যু, আত্মহত্যা, এক জার্মান কাউণ্ট পরিবারের মানুষ ছিলেন লুকেনার, এসব কথা বলতে বলতে হঠাৎ বলে ফেলেছিলেন, আমার মনে হয় রিচার্ড, লুকেনারের মৃত্যুর এতদিন পরেও তাঁর প্রভাব রয়ে গেছে। রিচার্ড হয়তো হেসেই ফেলত। কিন্তু তাঁর বাবাকে তিনি জানেন। খুব গম্ভীর গলায় বলেছিলেন, হবে হয়তো।

    সুতরাং এসব ঘটনা যতটা ডেবিড জানে অথবা চিফ-অফিসার, আর কেউ তেমন জানে না। কাপ্তান বিশ্বস্ত মানুষ হিসেবে চিফ-মেটকে কথাপ্রসঙ্গে বলতেন। চিফ-মেটও কথাপ্রসঙ্গে বলত ডেবিডকে। ডেবিড কাউকে বলত না। কিন্তু জাহাজটাতে এ-দুটো এ্যালবাট্রস আসার পরই কেবিনে জটলা হচ্ছিল। একটু যে পানীয় না খাওয়া হচ্ছে তাও নয়। ডেবিডের কেবিনে ছোটবাবু বসে রয়েছে। ডেবিডের কেবিনে ওর ফ্যামিলির একটা গ্রুপ ফটো আছে। এবং সবার নাম ছোটবাবু জানে। বড় ছেলেটি ডেবিডের প্রায় ছোটবাবুর বয়সীই হবে। কতক্ষণ আর চুপচাপ থাকা যায়। মিঃ স্প্যারো, মিসেস স্প্যারো না থাকায় জাহাজটা আবার একঘেয়ে লাগছে। ওদের দিন, আর কাটছে না যেন। জাহাজ কবে যাবে, কবে কখন হোমে সবাই ফিরবে এই নিয়ে কথাবার্তার সময় ডেবিড উঠে দাঁড়াল। এটা ডেবিডের স্বভাব, একটু উত্তেজিত হয়ে পড়লেই—সে দাঁড়িয়ে যায়। এবং পায়চারি করতে থাকে। তারপর যা হয়ে থাকে—গল্প বলার মতো বলা, আমরা আর ফিরব কিনা জানি না ছোটবাবু। আসলে জাহাজটা স্ক্র্যাপ না হলে বোধহয় ফিরতে পারছি না।

    —তার মানে?

    –সে অনেক কথা। কাপ্তান খুব সেয়ানা।

    —কবে হবে স্ক্র্যাপ?

    —কেউ বলতে পারে না।

    —আমাদের কি হবে?

    —এভাবে চলবে জাহাজ। আমরা সমুদ্রে ভেসে বেড়াব।

    —ইয়ার্কি। জাহাজিরা সবাই বিদ্রোহ করবে না?

    —তুমি জাহাজি নও। তোমার তো আর ওদের সঙ্গে সম্পর্ক নেই। ওরা বিদ্রোহ করলে, ওদের নামিয়ে দেবে। কিন্তু তোমার কি হবে?

    —ওদের নামিয়ে দিলে জাহাজ চলবে না। আমরাও ফিরে যাব।

    —কলকাতা থেকে কোম্পানী উড়োজাহাজে ক্রু পাঠিয়ে দেবে।

    —এত খরচা করবে!

    —তাছাড়া কি। জাহাজটাকে এখন ওরা চাইছে যতদিন ইচ্ছে দক্ষিণ সমুদ্রে ঘুরে বেড়াক —বন্দর ধরবে না?

    –এই ধরবে। বড় বড় বন্দরে আর পাঠাবে না।

    —তার মানে?

    —মনে হচ্ছে বড় বন্দরের নিয়মকানুন অনেক! হয়তো দেখা যাবে, ভাঙা জাহাজ দেখে ওরা আঁৎকে উঠছে। কার পারমিশানে জাহাজটা চলছে। বলেই একটু থামল। পাইপের ধোঁয়া দেখল, মাথা চুলকাল। লকার খুলে দুটো ছবি বের করে দেখল। দুটোই বড় হাঙ্গরের ছবি। ছবি দেখলেই বোঝা যায় ডেবিডের ফটোগ্রাফিতে হাত ভাল। ডেবিড ছবি দুটো একটু কাত করে দেখল, বলল, এই হচ্ছে আমাদের কর্তৃপক্ষ বুঝলে। হাঙ্গরের মুখ থেকে পালানো খুব কঠিন।

    এমন একটা পরিবেশ কথাবার্তায় গড়ে তুলছে ডেবিড, যে ছোটবাবু কেমন হতাশ হয়ে গেছে। ভাঙা জাহাজ, জাহাজ চালানোর খরচ এত বেশি যে বছর বছর লাখ লাখ টাকা ক্ষতি স্বীকার করেও কেন যে জাহাজটাকে এভাবে দক্ষিণ সমুদ্রে ঠেলে দেওয়া, ভাঙ্গো তো, ভেঙ্গে ফেল, নতুন জাহাজ কেন, আমরা দ্বিগুণ উৎসাহে কাজ করে যাব। এত মেরামত জাহাজে থাকলে অবসর কখন, এখন তো কোনও কোনও দিন সন্ধ্যে সাতটা পর্যন্ত একনাগাড়ে কাজ।

    অথবা এই যে দক্ষিণ সমুদ্রে জাহাজটা ভাসিয়ে দেওয়া হল, এবং কবে ফিরবে, কাপ্তান হিগিন্‌স নিশ্চয় জানেন, কবে ফিরে যেতে পারছেন, একবার জ্যাককে বলতে হবে, আমরা দেশে কবে পৰ্যন্ত ফিরতে পারব জ্যাক, অথবা এও হতে পারে, কেউ জানে না কবে ফিরবে। সবটাই এখন এই সিউল- ব্যাঙ্কের মর্জির ওপর।

    তখনই বালকেডে হেলান দিয়ে ডেবিড অনেকক্ষণ ছোটবাবুকে দেখল। ছোটবাবু পাশের ব্যাঙ্কে সামান্য কাৎ হয়ে শুয়ে আছে। যত শুনছে তত সে বিমর্ষ হয়ে যাচ্ছে।

    ডেবিড এবার কাছে এসে প্রায় হাঁটু গেড়ে বসল ছোটবাবুর পাশে। বলল, খুব ফিসফিস গলায়- আসলে বুঝলে কতৃপক্ষ জাহাজটাকে ভয় পায়। ভীষণ ভয় পায়। কিছুতেই বে-অফ-বিসকে পার হতে দেবে না। জাহাজটাকে ইংলিশ চ্যানেলে ঢুকতে দেবে না। যেন জাহাজ ইংলিশ চ্যানেলে ঢুকছে শুনলেই ওদের জ্বর আসতে থাকে।

    ছোটবাবুর ভয়ে বোধহয় জ্বর আসছিল। আবার মনে হচ্ছিল, আসলে, জাহাজের সফর যত দীর্ঘ হবে, তত এভাবে জাহাজ সম্পর্কে নিন্দাবাদ চলবে। এটা বোধহয় তারই সূত্রপাত। সে, এসব জানে মৈত্রদার কাছ থেকে। জাহাজ তখন প্রতিদিন অসহ্য ঠেকবে। ডেবিডের প্রায় ন’মাস হতে চলেছে। সে এবং আরও দু-একজন অফিসার এ-জহাজে বেশি সফর দিয়েছে। সুতরাং এভাবে এখন থেকেই হয়তো ডেবিড ঘোঁট পাকাতে শুরু করেছে। সবার মনে একটা বদ্ধমূল ধারণা সৃষ্টি করে দেওয়া, জাহাজ নিরুদ্দেশে ভেসে চলেছে। কাপ্তানও ঠিক জানেন না, কোথায় যাবে। সালফার বোঝাই হয়ে আপাতত নিউ-প্লাইমাউথ যাচ্ছে, কিন্তু তারপর। তারপর বললে, তিনি বলবেন, তারপর জাহাজ ফিজিতে। অস্ট্রেলিয়ায় নয় কেন? মেলবোর্ণ, সিডনিতে নয় কেন, নয় এজন্য, এসব বড় বন্দর এমন লক্কড়-মার্কা জাহাজ ঢুকতে দেখলেই ধেয়ে মারতে আসবে বন্দর-কর্তৃপক্ষ

    —যদি ফিজি না যায়, তবে নিউগিনি, অথবা কিংস আয়ল্যাণ্ড, টোংগা। দরকার হয় ফের উঠে যাবে হাওয়াই। হনলুলুতে কিছুদিন। সামোয়াতে ফেলে রাখা চলে কিছুদিন। কিছু একটা কার্গো পেলেই হল। মাটি, মাটিই সই। এই যে সমুদ্র দেখছ, এ-সমুদ্রেই আমাদের এখন ঘুরে মরতে হবে। একটু থেমে ডেবিড বলল, এর পর কাজ কি হবে জান?

    —কি?

    —মাটি টানবে জাহাজ। আমি তোমাকে বলে দিলাম, মাটি টানা বাদে এ-জাহাজে আর কেউ কোন কার্গো দিতে সাহস পাবে না।

    ছোটবাবুর বেশ মজা লাগছিল এমন সব কথা শুনতে। সে এ-জন্যেই এত সহজে এমন একটা দামী কাজ পেয়ে গেছে। জাহাজে এজন্য কেউ আসতে চায় না। একটু ভয় পেলেই বাড়িয়ে ভয়কে সাত কাহন করে ফেলে। তারপর খোঁড়াতে খোঁড়াতে নেমে যায়। দরকার হলে ছোটবাবুও খোঁড়াতে থাকবে। যখন মনোটনিতে আত্মহত্যার প্রবণতা জাগবে, তখনই বুঝতে হবে, যত সত্বর সম্ভব, কিছু একটা অজুহাত দেখিয়ে নেমে যাওয়া ভাল।

    ডেবিড ফিসফিস গলায় বলল, কাপ্তান হিগিনস্ আখের গোছাচ্ছে, বুঝলে!

    ছোটবাবু অতসব বুঝতে পারে না। সে চুপচাপ শুনে যায়। চুপচাপ বসে থাকে! সে তো সবই কেমন নতুন শুনছে। এখন মনে হয় জাহাজে এটাই শেষ সফর তাঁর।—বুঝলে ছোটবাবু যত বেশি এখন তিনি থাকতে পারেন, তাই চেষ্টা করছেন। কোম্পানীর এমন একটা ভাঙ্গা জাহাজকে নিয়ে দক্ষিণ সমুদ্রে ঘুরে বেড়াচ্ছেন, আসলে ওর বলার ইচ্ছে ছিল, মতিচ্ছন্ন জাহাজ। পাগলা জাহাজ, না ঠিক পাগলা নয়, দুরন্ত দামাল, কিংবা সেই বেশি বয়সে শিশু সরল হয়ে যাবার মতো, লজেনচুস দিয়ে ভুলিয়ে রাখার মতো। হিগিনস এখন মাটি-ফাটি যা পাবেন ভরে নিয়ে সিউল-ব্যাঙ্ককে কার্গো দেবেন। লজেনচুস খাওয়াবেন। কর্তৃপক্ষ ভীষণ খুশি, গেলেই ঠিক বোর্ডের সদস্য করে নেবে। এডভাইস দাও, সুখে থাকো, গাড়ি চড়ো। হিগিনস এমনি এমনি করছে ভেবো না।

    ছোটবাবু বলল, ডেবিড, আমার কিন্তু অন্যরকম মনে হয়।

    ডেবিড কিছুই শুনতে চায় না। সেই সকাল থেকেই সে উত্তেজিত হয়ে আছে। সারাদিন কতভাবে চেষ্টা করেছে একটা পাখিকে অন্তত নামিয়ে আনা যায় কিনা, পারেনি। সে তারপর কি করেছে কে জানে। একটু রাত হলেই ছোটবাবুকে ডেকে এনেছে। সামান্য মদ দিয়েছে খেতে। সে নিজেও খাচ্ছে। চুক-চুক শব্দ হচ্ছে। এখন বেশ ছোটবাবু মজা পায়। ডাকলে সে না করতে পারে না। কিন্তু সে দু-চারদিন খেয়ে নিজের হিম্মত কতটুকু ধরে ফেলেছে। ডেবিড আর তাঁকে মাতাল বানিয়ে জব্দ করতে পারে না।

    ছোটবাবু বলল, তুমি কিচ্ছু না শুনতে চাইলে আমি কি করব?

    —কি শুনব? কি বলবে তুমি?

    —এই বলছিলাম, কাপ্তান জাহাজটাকে ভালবাসে।

    —হেল। কি যে বল না। জাহাজকে আবার ভালবাসাবাসি কি। আগলি। ননসেন্স। সব পরার্থ ভেবে করা নয় হে। সব স্বার্থে করা। আখের। আখের। বলেই আবার নুয়ে বলল, প্লিজ তুমি কিন্তু জ্যাককে কিছু বলবে না। বলে মদের গ্লাসটা ছুঁয়ে বলল, না। বলবে না, প্রমিস্ কেমন?

    ডেবিড খুব গোপনে যেন বলছে, সে দরজার কাছে গিয়ে উঁকি দিল, কি জানি কেউ যদি দেয়ালে কান পেতে রাখে। কে কিভাবে কাপ্তানের কাছে শেষপর্যন্ত লাগাবে আর কাপ্তান চোখ লাল করে ওকে দেখবেন তখন, ভয়ে তো বুক শুকিয়ে যাবে—সেই সব কারণে দরজাটা ভাল করে লক্ করে বলল, তোমাকে বলে দিলাম, জাহাজ মাটি টানার কাজ নেবে। জাহাজ ফিজি, নেরু, ওসেনিক, কাকাতিয়া আয়ল্যাণ্ডে যাচ্ছে। মাটি এনে অস্ট্রেলিয়ার উপকূলে ঢেলে দেবে। এই কাজ হবে আমাদের। সব দ্বীপ, সব আদিবাসী দ্বীপের…বলেই সে গ্লাস নিয়ে কেমন ফ্রিজ হয়ে গেল।—ছোটবাবু, তোমার মুখ এত উজ্জ্বল দেখাচ্ছে কেন!

    —দ্বীপ। দ্বীপে নেমে যাব।

    —ছোটবাবু বুঝবে না, কষ্ট বুঝবে না। ভাল না। দ্বীপ ভাল না।

    ডেবিড বুঝতে পারল, কথা সামান্য জড়াচ্ছে। ওটা ঠিক না। জাহাজ চালু অবস্থায় এটা ঠিক না। ওর বারোটা-চারটা ওয়াচ। এখন ওর খেয়েদেয়ে ঘুমানো দরকার। আসলে মনের কোণে এই যে গ্রুপ- ফটো দেয়ালে রয়েছে, তাদের জন্য সে পাগল হয়ে যাচ্ছে। সমুদ্রে ঘুরে ঘুরে দেশে ফেরার জন্য মন ভীষণ আকুল হয়ে উঠেছে। সে এখন সেই ছোট্ট শিশুর মুখ, হাত নাড়া, সুন্দর হাসি, মনে করতে পারলেই পাগল হয়ে যায়। তখন সে আর দেশে ফিরতে পারবে না ভেবে ভীত হয়ে পড়ে। এবং সে বোধহয় টের পাচ্ছে, জাহাজ কোথায় যাচ্ছে। যেমন অন্যান্যবার করে থাকে, এবারেও তেমনি। ব্রিটিশ ফসফেট কোম্পানী সেই সব দূরবর্তী ভাসমান দ্বীপমালা সব, ইজারা নিয়ে বসে রয়েছে। মাটি তুলে নাও। খোলে ভর্তি করে মাটি চালান করার এমন অল্প পয়সায় আর ক’টা জাহাজ ভাড়া পাওয়া যায়। খবর রটে যায়, আসছে, আসছে—সেই প্রাচীন কালের আদিম রহস্যময় জাহাজটি মাস্তুলে লম্ফ জ্বালিয়ে অন্ধকার রাত্রির বুকে, সমুদ্রের ঢেউ ফালা ফালা করে চলে আসছে। মাটি কাটার কাজ তখন দ্বীপে বেড়ে যায়। উদ্দাম উন্মত্ত নৃত্যমালা। দ্বীপের অধিবাসীদের তখন মশাল জ্বেলে সারা রাত নৃত্যমালা—মেজ-মালোম ডেবিড এখন থেকেই বুঝি দেখতে পাচ্ছে সব। ডেবিড ভয়ে কেমন গুটিয়ে আসছে। সেই দ্বীপগুলোতে ডেবিড অনেকবার গেছে। পাঁচবার সাতবার। সেখানে জাহাজ যাবে ভাবতেই ডেবিড ভীষণ চঞ্চল হয়ে উঠছে।

    ছোটবাবু বলল, দ্বীপগুলো খুব বড়!

    —আরে না। কোনোটা এক মাইল, দু’মাইল, পাঁচমাইল তার বেশি না।

    ডেবিড ফের বলল, কিভাবে যে ওরা থাকে! ভয় পায় না। দ্বীপটা যদি ডুবে যায়। কি যে মজা হয় না! তারপরই কেমন প্রাণ পেয়ে গেল ডেবিড, যখনই রাতের জ্যোৎস্নায় হেঁটে বেড়াবে, মনে হবে সমুদ্র থেকে কারা স্নান করে ফিরছে। সুন্দরী মেয়েরা জ্যোৎস্নায় যখন সমুদ্র থেকে স্নান করে ফিরে যায়, চুলের ডগা বেয়ে টপ্‌প্ জল ঝরতে থাকে, এবং মনে হবে যেন ওরা সমুদ্রে নোনাজলের তলায় এতক্ষণ কি খুঁজে এসেছে, আসলে জানো ওরা পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে মুক্তো খুঁজতে যায়। এবং শরীরে কোন পোশাক থাকে না ছোটবাবু। গাছপালার ভেতর লুকিয়ে দেখতে কি যে ভাল লাগে না!

    —দেখে ফেললে?

    —দেখব কেন। দালাল থাকে। দেখানোর বদলে পয়সা নেয়। রাজার জন্য ওরা মুক্তো খুঁজে আনে। কেবল অন্যমনস্কভাবে বলে গেল—আরে বুঝলে না, আমাদেরই ইজারা নেওয়া জায়গা। এখানে ছোটবাবু বুঝল, আমাদের বলতে ডেবিড বৃটিশ দ্বীপপুঞ্জের কথা বলতে চেয়েছে।—স্বজাতি আমার ভীষণ বুদ্ধিমান তো। দেশীয় নিয়মকানুন ঘাটায় না। যা আছে থাক, রাজার নিয়ম-কানুন মেনে চলার অভ্যাস ওদের হয়ে গেছে। আমাদের কেন হবে বল? জাহাজ থেকে নেমেই তুমি কোথাও কোনও রেস্তোরাঁতে চলে যাবে। দেখবে কার্ড নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। দালাল লোক। কিভাবে নিয়ে গেলে, গোপনে দেখা যাবে ওরা ঠিক জানে। খুব পয়সা নেয়। রাজার জন্য মেয়েরা মুক্তা খুঁজতে যায়। কার না লোভ হবে দেখার। তুমি বলো, আমরা তো আর মহাপুরুষ নই।

    ছোটবাবু বলল, মহাপুরুষদের একবার ধরে নিয়ে গেলে হয়, দেখালে হয়। কি করে, তখন দেখা যেত। বলে দুজনেই হেসে ফেলল,—রাত অনেক হয়েছে ডেবিড। ভীষর ঘুম পাচ্ছে। আমি যাই। বলে ছোটবাবু দরজা খুলে সোজা বের হয়ে গেল।

    আর তখনই মনে হল ডেবিডের, মিসেস স্প্যারোর জন্য ছোটবাবুর মন খারাপ থাকতে পারে। তাকে একটু সান্ত্বনা দেবার জন্য ডেকে এনেছিল। কিন্তু এতক্ষণ কেউ মিসেস স্প্যারোর আকস্মিক মৃত্যু সম্পর্কে কোনও কথা বলে নি। ছোটবাবুর মন খারাপ বলে হয়তো কোনও কথা বলে নি। ছোটবাবুর এমনই স্বভাব। সব দুঃখ নিজের ভেতর লুকিয়ে রাখে। কাউকে বুঝতে দেয় না। সে তাড়াতাড়ি দরজা ঠেলে মুখ বাড়াল। ডাকল, ছোট।

    ছোট যেতে যেতে মুখ ফেরাল। এলি-ওয়েতে কার্পেট পাতা বলে কোন শব্দ হয় না হাঁটা চলায়। এনজিনের হাহাকার শব্দটা ভীষণভাবে শুধু সব এলোমেলো করে দেয়। সুতরাং সে প্রথম বুঝতে পারেনি কে ডাকছে। পেছন ফিরে তাকালে দেখল গলা বাড়িয়ে হাতে ইশারা করছে ডেবিড।

    সে ফের ফিরে গেলে বলল, এস। ভিতরে বোস। কথা আছে। স্বাভাবিক মানুষের মত কথা বলছে। মদ খেয়ে সামান্য কথা জড়িয়ে যাচ্ছে কিছুতেই বুঝতে দিচ্ছে না।

    ছোটাবাবু বসলে, বলল—তুমি দুঃখ করো না।

    কিসের দুঃখ সে প্রথমে বুঝতে পারল না।

    —ঠিক উচিত শিক্ষা দেব মনে রেখ। আই মাস্ট কিল দেম।

    ছোটবাবু হাসল সামান্য

    —ওরা ভেবেছে কি! নিজেদের সম্রাটের মতো ভাবছে? যেন সমুদ্রে ওদেরই থাকার কথা। সামান্য দুটো পাখি, কিছুতেই ওদের জন্য বাঁচানো গেল না। ওরা রাজ্য জয় করে ফিরে গেল। মর্মান্তিক।

    ছোটবাবু বলল, ওরা আর আমাদের জাহাজে উড়বে না, ভাবতে খারাপ লাগে।

    —কি করা বল। যা ঘটে গেল তাতে আমাদের কোনও হাত নেই। আমরা তো কম চেষ্টা করি নি।

    ডেবিডের পিঠের ঘা ভাল করে শুকোয় নি। বেশী বললে, জামা খুলে হয়তো ডেবিড ঘা বের করে দেখাবে। ছোটবাবু বলল, সকালে উঠেই দেখতাম পোর্ট-হোলে মিসেস স্প্যারো বসে রয়েছে। শিস দিলেই উড়ে এসে পায়ের কাছে বসত।

    ডেবিড বলল, মিসেস স্প্যারো ঠিক বুঝতে পেরেছিল, তুমি ওকে খুব ভালবাস।

    —এখন তাই মনে হচ্ছে। খিদে পেলে কি কিচকিচ করত। খাবার খুঁটে খেত না। ছড়িয়ে না দিলে বিবি মুখ গোমড়া করে রাখত।

    —হবেই তো। এটা আমরা ঠিক বুঝতে পারি না আসলে পৃথিবীটার সব কিছু তারা। তুমি যেখানে যাবে মনে হবে, ওদের জন্য তুমি যাচ্ছ। মনে হবে—এরা তোমার কতকালের চেনা। জেটিতে পার্কে মেয়েদের দেখলে কখনও মনে হয় না, তুমি ওদের দ্যাখো নি। মনে হয় কতকালের এরা পরিচিত। একটু হেসে কথা বললে জাহাজে আর উঠে যেতে ইচ্ছে হয় না। ঘরবাড়ি বানিয়ে বন্দরেই থেকে যেতে ইচ্ছে হয়। কি হবে এত বড় পৃথিবী দেখে। এমন সুন্দর একটা পৃথিবী কাছে থাকলে সমুদ্র, দ্বীপ, কত সামান্য মনে হয়।

    —সত্যি।

    —যাই হোক তুমি ভাল করে ঘুমোবে। সন্তানকে যেভাবে উৎসাহ দেয় তেমনি চোখ-মুখ ডেবিডের। সে যেন ছোটবাবুকে উৎসাহ দিয়ে যাচ্ছে। সে বলল, জাহাজে ঘুরতে ঘুরতে কত রকমের অভিজ্ঞতা হবে, পৃথিবীর কত বন্দরে মনে হবে তোমার ভালবাসার মেয়েরা সব হেঁটে বেড়াচ্ছে, জাহাজ ছাড়ার সময় দেখবে আশ্চর্য একটা কষ্ট বুক থেকে বেয়ে উঠছে—তুমি টেরই পাও নি দু-দিন কি চার-দিন কি দু-সপ্তাহ যে সেলস গার্লটি তোমাকে হেসে কথা বলেছে, আপেল আঙ্গুর বিক্রি করেছে, মনে মনে তুমি তাকে ভালবেসে ফেলেছ। মেয়েরা যে কি! একটু হেসে কথা বললেই কেমন আপনার হয়ে যায়।

    ছোটবাবু বুঝতে পারল, আসলে ডেবিড ঘুরে-ফিরে নিজের দুঃখের কথাই বলে যাচ্ছে। ঘুম আসবে না ডেবিডের। এখন সে হয়তো পোর্ট-হোলে অন্ধকার সমুদ্র দেখবে—আসলে সমুদ্রে অন্ধকার থাকলে সারাক্ষণ তার সেই বাড়ি, গীর্জার চূড়ো, ছোট্ট নদী যদি থাকে অথবা গ্রীষ্মের সময় মনোরম রোদের ভেতর গাড়ি চালিয়ে কোন বড় শহরে চলে যাওয়া, হৈ-চৈ, ছেলে-মেয়েদের দুটো-একটা আবদারের কথা, স্ত্রীর বড় বড় চোখে তাকিয়ে থাকা—সবই মনে পড়বে। মনে পড়লেই তার সারারাত আর ঘুম আসবে না।

    ছোটবাবু বলল, যাচ্ছি।

    ডেবিড তাকিয়েই আছে পোর্ট-হোলে। কিছু বলছে না।

    —দরজাটা বন্ধ করে দাও।

    ডেবিড নড়ছে না দেখে সে দরজা টেনে দিল।

    তারপর ছোটবাবু ধীরে ধীরে হাঁটতে থাকল। রাত দশটা বেজে গেছে, সে ওয়াচের ঘণ্টা শুনে বুঝতে পারল। যখন এভাবে সমুদ্রের বুকে কেউ ঘণ্টা বাজায় তখন তার ইন্চকেপ-রকের কথা মনে হয়, মঠের সেই সন্ন্যাসীর কথা মনে হয়। কোনো না কোনো ঘটনার সঙ্গে মানুষের স্মৃতি জড়িয়ে যায়। ছোটবাবুর স্মৃতি ভীষণ সতেজ বলে ঘণ্টা বাজলেই দেখতে পায় এক অতিকায় পাহাড় সমুদ্রের বুকে দাঁড়িয়ে আছে। ঝড়ের রাতে জাহাজ পথ ভুল করে ঠিক পাহাড়ের গায়ে ধাক্কা খেয়ে ভেঙ্গে যায়। জাহাজ ডুবির এমন অজস্র ঘটনা মনে হলেই কেবল সে দেখতে পায়, সেই…মঠাধ্যক্ষ একটা বড় ঘণ্টা ঝুলিয়ে দিচ্ছেন, ঝড় উঠলেই ঘণ্টা বাজতে থাকে। দূরবর্তী জাহাজের নাবিকেরা তখন সতর্ক হয়ে যায়।

    ছোটবাবুর এই এক খারাপ স্বভাব। কিছু মাথায় এলেই সহজে যেতে চায় না। সে ভীষণ অন্যমনস্ক হয়ে যায়। হাঁটতে হাঁটুতে সে টেরই পাচ্ছে না ওপাশের এলি-ওয়ের দরজায় ধ্বস্তাধ্বস্তি হচ্ছে। ওটা মেজ-মিস্ত্রি আর্চির দরজা। কেবিনের পাশে বড়-মিস্ত্রি ছিল, এখন নেই। নির্জন এলি-ওয়েতে মেজ- মিস্ত্রি একাই থাকেন। এবং ছোটবাবুর মনে হল, কেউ ডাকছে, জ্যাকের সেই মেয়েলী গলা। কাতর। কিন্তু কোথায়? সে কেবল শুনতে পাচ্ছে, নো। মি বয়। আর মনে হচ্ছিল, যদিও এনজিনের হাহাকার শব্দে শোনার উপায় নেই, খুব কাছেই কিছু ঘটছে। সে একটু পিছিয়ে ডান দিকের এলি-ওয়েতে তাকাতেই, মনে হল জ্যাক দৌড়ে পালাচ্ছে। আর শিকারী বেড়ালের মতো থাবা উঁচিয়ে আছে মেজ-মিস্ত্রি। যেন তার হাত থেকে পাখি পালিয়েছে। ছোটবাবুকে দেখে হাত ছেড়ে তাড়াতাড়ি যেন দরজা বন্ধ করে দিচ্ছে।

    ছোটবাবু বুঝতে পারল না, জ্যাক এখানে এত রাতে কেন? আর্চিই বা দরজা খুলে খপ করে, ` ধরতে যাবার মতো হাত বাড়িয়েছিল কেন? ধ্বস্তাধ্বস্তি করে জ্যাকই বা ওদিকে ছুটে পালাচ্ছে কেন? সে তার কেবিনে ঢুকে যাবে ভাবল। নিচে এ সময় জ্যাকের নামার কথা না। জ্যাকের কেবিনে সিঁড়ি ধরে সে উপরে উঠে যেতে পারে। কিন্তু এত রাতে সে যেতে পারে না। তাছাড়া সেও ভাল নেই। ছোটবাবুকে দেখে মেজ-মিস্ত্রি আর্চি এমন হিংস্র হয়ে উঠল, যেন খেয়ে ফেলার মতো। এবং শীতল করে দিচ্ছিল তাকে। সে আর তাকাতে পারে নি। মাথা নীচু করে চলে এসেছে।

    যত দিন যাচ্ছে, ছোটবাবু রহস্যের ভেতর পড়ে যাচ্ছে। প্রথম মনে হয়েছিল জাহাজে শুধু পেটভরে খাওয়া আর দিনমান কাজ করা। আর কোনো দুঃখ নেই। বন্দর পাবে মাঝে মাঝে, পেলে নেমে যাবে বন্দরে। উৎফুল্ল হবে, বেড়াবে, এবং ফুলের গন্ধ নিতে নিতে কখনও ফুল ছিঁড়ে ছিঁড়ে খাবে। কিন্তু এখন সে বুঝতে পারছে—জাহাজ অন্যরকম। কেমন অজ্ঞাত এক মঠাধ্যক্ষ মাঝে মাঝে তার মাথার ভেতর ঘণ্টা বাজিয়ে যাচ্ছে। ঝড়ের রাতে জাহাজ সতর্ক করে দেবার মতো তাকে সতর্ক করে দিচ্ছে কেউ।

  • চব্বিশ

    চব্বিশ

    ।। চব্বিশ।।

    জ্যাক যেন নেকড়ের মুখ থেকে পালিয়ে ছুটছে। সে এলোপাথাড়ি ছুটছে। সব কেমন গণ্ডগোল হয়ে গেছিল—ছোটবাবুকে এলি-ওয়েতে ঢুকতে দেখেই শয়তানটা হাত ছেড়ে দিয়েছে। কেন যে মরতে সে নিচে নেমে এসেছিল। এবং সে যখন ওপরে উঠে প্রায় দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুকে গেল তখন এত ঘামছে, যে মনে হয় বৃষ্টিপাতে সে ডেকের ওপর দাঁড়িয়ে ভিজেছে। সে কিছু এখন আর ভাবতে পারছে না। দরজা লক করে সে চুপচাপ বসে থাকল কিছুক্ষণ। একবার পোর্ট-হোল খুলে দেখল, ও-পাশে ছোটবাবু দাঁড়িয়ে আছে কিনা। সতর্ক থাকল, যদি ছোটবাবু ভেবে অবাক হয়ে যায় এবং সংশয় দেখা দেয় মনে, তবে ওপরে ছুটে আসতে পারে। –কি ব্যাপার! তুমি এমনভাবে কেন ছুটে এলে। ভয়ংকর কিছু ঘটেছে ভেবে ছোটবাবু স্বাভাবিক কারণেই আসতে পারে। এলেও সে দরজা খুলবে না। কারণ সে এখন জানে তার মাথা ঠিক নেই। সে হয়তো ছোটবাবুর মুখের ওপর থুথু ছিটিয়ে দিতে পারে। আর্চির মুখের ওপর থুথু ছিটিয়ে দেবার মতো মনে হবে তবে।

    এসব কারণে জ্যাক এতটুকু স্থির হয়ে বসতে পারছে না। মাথা সমান উঁচু আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে দেখছে নিজেকে। সে যে মেয়ে এবং মেয়ের মতো। সে বলল, ছোটবাবু তুমি কেন বোঝ না জান না আমি বনি। শয়তানটা আমার সব টের পেয়ে গেছে। –আচ্ছা, ছোটবাবু আজ তোমরা এলে না কেন! কেমন কাতর গলায় সে নিজের প্রতিবিম্ব দেখতে দেখতে বলল। আমি সেই আটটা থেকে পোর্ট-হোলে দাঁড়িয়ে আছি, আসছ না তোমরা। নটা বেজে গেল। কতক্ষণ একা-একা থাকা যায়। রোজ আটটার পর বোট-ডেকে এসে বসো তোমরা অথচ আজ…!

    বনি এবার এক এক করে পুরুষের পোশাক শরীর থেকে খুলতে থাকল। আর্চি আমাকে ঘাটাবে না। বাবাকে বলে জাহাজ থেকে নামিয়ে দেব! তুমি ভাল করছ না। তুমি খারাপ। তুমি বদমাস। পোশাক খুলতে খুলতে, এমন অজস্র কথা। সে প্যান্ট খুলে ছুড়ে দিল, যেন পারলে আগুন ধরিয়ে দেয়। সে যে কি করছে এখন! সে মেয়ে, এবং এই পুরুষের পোশাক তাকে কিছুতেই আর পুরুষ করে রাখতে পারছে না।—শয়তান অধার্মিক—আর ছোটবাবু তুমি তুমি…ভাঙ্গা রেকর্ডের মতো পুনরাবৃত্তি…তুমি….তুমি এবং তখনই কি যে হয়ে যায়, সে তার প্যান্ট তুলে একটা ব্লেডে ফালা ফালা করে কেটে ফেলে। জাঙ্গিয়া খুলে দাঁতে ছিন্ন-ভিন্ন করে দেয়। লম্বা ঢোলা জামা খুলে দু-হাতে ছিঁড়ে উড়িয়ে দেয় সমুদ্রে। মোটা গেঞ্জি খুলে পোর্ট-হোলে ঝুলিয়ে দিল। তারপর দেশলাই কাঠি জ্বেলে আগুন ধরিয়ে ছুড়ে মারল আকাশের গায়ে। তারপর ব্রেসিয়ার। একটা একটা করে ভাঁজকরা তিনটে ছোট রুমাল খুলে ফেলতেই সে দেখল, দুটো স্তন রাবারের বলের মতো ফুলে উঠেছে। যেন পিন ফুটিয়ে দিলে স্তন থেকে রক্ত পিচকিরির মতো ছুটবে। সে দুহাতে দু-স্তন ধরে ব্যথায় গুমরে উঠল। টনটন করছে স্তনের চারপাশ। ক্রমে স্তনের চারপাশ থেকে শিরা-উপশিরা জেগে উঠলে সে দেখল, বেশ সুপুষ্টু স্তন, এবং চারপাশে মাখনের রং জেগে উঠছে আর শিরা-উপশিরাতে আশ্চর্য চঞ্চলতা সে টের পাচ্ছে। বিকেল থেকে সে এভাবে একই পোশাকে। আর ব্রেসিয়ারে আঁটা শক্ত স্তন এতক্ষণ খুবই মিইয়ে ছিল। সব খুলে ফেলতেই আবার সব সহজ স্বাভাবিক হয়ে গেল। ব্রেসিয়ারের দাগ শরীরের চারপাশে বসে গেছে। সে এখন ভীষণ হাল্কা বোধ করছে।

    এবং তখনই মনে হল, পোর্ট-হোলের কাচ সে বন্ধ করেনি। তাড়াতাড়ি রাতের পোশাকে স্তন এবং নাভিমুখ ঢেকে পোর্ট-হোলের কাচ বন্ধ করে দিল। ছোটবাবু এলেও সে দরজা খুলবে না। দরজা খুলতে হলে আবার সব তাকে পরে নিতে হবে। এবং সে কেমন অধীর হয়ে উঠল আয়নায়। সে বুঝতে পারছে তার শরীরে ভারী সুন্দর গঠন, যা সে মাঝে মাঝে হাত তুলে এবং নুয়ে নিচু অংশ দেখার সময় কাউকে ভেবে থাকে। ভাবতে ভাল লাগে।

    এই প্রতিবিম্ব তাকে কিছুক্ষণ মুহ্যমান করে রাখল। ছোটবাবু আসতে পারে, ডাকতে পারে মনে থাকল না। কাল সকালে সে ভেবেছে আর্চিকে সাবধান করে দেবে। আর্চি ওর দিকে এখন হিংস্র লোভী জন্তুর মতো তাকিয়ে থাকে। তখন আর্চির মুখে কিছু ছুড়ে মারার প্রতিক্রিয়া দেখা দিলে স্থির থাকতে পারে না।

    বনি এমন সাত-পাঁচ ভেবে যাচ্ছিল। আলতো করে বেগুনি রঙের একটা নাইটি পরে নিল। সাদা চাদরে ঢাকা মখমলের মতো বিছানা। দুটো বালিশের একটাকে সে সব সময় পাশবালিশ করে নেয়। সবুজ রঙের আলো জ্বেলে শুয়ে পড়বে ভাবল। কিন্তু তেষ্টা গলায়। সে জল খেল এক গ্লাস। শুয়ে পড়বে ভেবে বাংকের কাছে গেল—কিন্তু কেন জানি ভেতরে এক অসহ্য জ্বালা। ছোটবাবুর ওপর আবার মন বিরূপ হয়ে উঠছে। আটটার পর ছোটবাবু এখানে এসে বসলে তাকে নিচে নেমে যেতে হত না। আটটার পর ছোটবাবু কি আজ শুয়ে পড়েছে! ওর শরীর ভাল নাও থাকতে পারে। পাখি দুটো না থাকায় ছোটবাবুর মন ভাল নাও থাকতে পারে। কখন কি যে হয়, মনের এই বিরূপতা কাটতে ওর সময় লাগেনি। সে আবার ছোটবাবুর জন্য কেমন এক কষ্টে ডুবে যাবার সময়, দরজা খুলে ফেলল। অন্ধকার রাত বলে উইংসের আলো দুলে দুলে জাহাজটাকে এক অলৌকিক জাহাজ বানিয়ে ফেলছে। এবং ভাবতে ভাল লাগল জাহাজে কেউ নেই। কেবল সে আর ছোটবাবু। নিরবধি কাল যেন জাহাজটা এভাবেই চলবে। থামবে না। সে বেগুনি রঙের নাইটি পরে ডেকচেয়ারে বসে থাকবে। পাশে ছোটবাবু, পৃথিবীর সব প্রাচীন ইতিহাস ছোটবাবুর মুখ থেকে শুনতে শুনতে সে ঘুমিয়ে পড়বে।

    বনি আশা করেছিল ছোটবাবু ওপরে উঠে আসবে। এমন একটা ঘটনার পর চুপচাপ থাকতে পারে না ছোটবাবু। এবং সে এত অধীর যে ছোটবাবু এলে সে তার বুকে ঝাঁপিয়ে পড়বে। তাকে ছিন্নভিন্ন করে দিতে দিতে বলবে, দ্যাখো আমি কে? আমার ঊরুমূল দ্যাখো, বাহু দ্যাখো, আমার সুন্দর স্তনের রূপলাবণ্যে তুমি ভালো হয়ে যাও।

    বনি দরজা ফাঁক করে রেখেছে। চুপিচুপি দেখছে কেউ নিচ থেকে উঠে আসছে কিনা। জুতোর শব্দ উঠছে কিনা। কান সজাগ। যদি ছোটবাবু আসে তবে সিঁড়ি ভাঙ্গার শব্দে সে ঠিক টের পাবে—সে উঠে আসছে। ছোটবাবু ওঠার সময় যেন কি ভাবতে ভাবতে উঠে আসে। ওর পায়ের শব্দে সব টের পাওয়া যায়। অথচ ছোটবাবু আসছে না। সিঁড়িতে কোনও শব্দ নেই। নিঝুম সমুদ্রে অনেক নিচ থেকে সেই এনজিনের এক শব্দ, ক্রমান্বয়ে চারপাশে পরিব্যাপ্ত হয়ে যাচ্ছে। অন্ধকার সমুদ্র তখন আরও ভয়াবহ এবং গভীর মনে হয়। সমুদ্রের অতলে হাজার সেই প্রাগৈতিহাসিক জীবেরা সত্যি ঘোরাফেরা করছে মনে হয়। তারা এখনও তেমনি রয়েছে। তাদের স্বভাব পাল্টায় নি।

    বনি দরজা বন্ধ করে দিল। ওর জন্য ছোটবাবুর এতটুকু কষ্ট নেই। ছোটবাবুর ওপর চাপা অভিমান এবং মাঝে মাঝে মনে হয় সে ছোটবাবুর সঙ্গে আর কিছুতেই কথা বলবে না। সে এভাবে কতবার ভেবেছে, এই শেষ, এবং ছোটবাবু যেমন আছে তেমনি থাক, কিন্তু মনের ভেতরে কি যে থাকে, যেন সে শিশুবয়স থেকে ছোটবাবুকে দেখে এসেছে, একসঙ্গে বড় হয়ে উঠেছে, বড় মাঠে বিকেলে তুষারপাতের সময় একসঙ্গে স্কি খেলেছে, একসঙ্গে কোথাও দুজন কেবল নাচ ঘরে নেচে যাচ্ছে অথবা হৈ-হৈ করে কতকাল একজন সমুদ্রগামী মানুষের হাত ধরে সে হেঁটে যাচ্ছে। ছোটবাবু তার কেউ নয়, সে কিছুতেই আর এটা ভাবতে পারে না।

    বনি সত্যি শুয়ে পড়ল। সবুজ আলো জ্বেলে দু-পা ছড়িয়ে দিল। দু-হাতে মুখ ঢেকে রাখল। শরীরের সব পবিত্রতা আর্চি হরণ করে নিতে চাইছে। ছোটবাবু তুমি জান না, এ পবিত্রতা আমার সব। সহজে সে ঘুমোতে পারল না। পাশ ফিরে শুল। ঘুম আসছে না, কেবল হিজবিজি ভাবনা তার, যেন সেই আশৈশব ক্যাসেলের পাশে ভ্রমণ—বাবার হাত ধরে ভ্রমণ। এখন বাবার হাত ধরে কোথাও আর যেতে ভাল লাগে না তার। মনে মনে কার্ডিফ-ক্যাসেলের পাশ দিয়ে হেঁটে গেলে কেবল ছোটবাবুর মুখ সে দেখতে পায়। বাবার মুখ আর কিছুতেই মনে করতে পারে না।

    বনি আরও ভেবে অবাক হয়ে যায়, সে কত সহজে যে এই জাহাজে বড় হয়ে যাচ্ছে। তার চিন্তা ভাবনা কেমন পরিণত মানুষের মতো। সে আর ছেলেমানুষের মতো অকারণ ছোটবাবুর কেবিনে ছুটে যেতে পারছে না। পারলে যেন ভাল হত। অভিমানে সে এমন ভেঙ্গে পড়ত না। শুয়ে শুয়ে ফুলে ফুলে কাঁদতে হত না।

    ছোটবাবু তখনও জেগে আছে নিচে। সে চুপচাপ একাকী বসে রয়েছে। আর্চির মুখ অতিকায় হয়ে যাচ্ছে। কখনও মনে হচ্ছে সে নিজে সমুদ্রের নিচে ছোট রুপোলী মাছ, বেশ নেচে নেচে বেড়াচ্ছে। জলের ভেতরে কি আছে জানত না। কিন্তু সেই জলে এক ভয়ঙ্কর ক্রুদ্ধ মুখ, হাঙ্গরের মতো লেজ নেড়ে নেড়ে ক্রমাগত তাকে অন্ধকারে লক্ষ্য করে যাচ্ছে যেন। আর্চিকে খুশী করার জন্য সে যা নয় প্রমাণ করতে চাইছে। সে নিজে বার বার মনে মনে ভয়ঙ্কর হয়ে উঠছে, কিন্তু ব্যবহারে ভালমানুষ, মুখ বুজে কাজ করে যাওয়া স্বভাব। যখন আর পারে না, তখন কাপ্তানের কথা মনে হয়। মনে হয়, তাকে এভাবেই জীবনে বড় হতে হবে। সে তার ক্ষোভ অথবা উত্তেজনা ভুলে থাকার চেষ্টা করছে।

    জ্যাকের কথা ভেবে আরও অবাক। এত রাতে জ্যাক নিচে নামে না। জ্যাক রাত হলে নিজের কেবিনে বসে থাকে। কখনও জ্যাক এবং সে আর ডেবিড বোট-ডেকে বসে থাকে। একটু রাত হলেই জ্যাক কেবিনে চলে যায়। দুটো-একটা কথা পোর্ট-হোলে দাঁড়িয়ে জ্যাক বলতে ভালবাসে। সে ভেবেছিল, জ্যাক ওর দিকেই ছুটে আসবে। কিন্তু জ্যাক গঙ্গাবাজুর দিকে ছুটে গেল কেন বুঝতে পারল না। কেবিনেই বা জ্যাক ঢুকে গেল কেন—তাও বুঝছে না। কাল দেখা হলে আর্চির কাছে ক্ষমা চেয়ে নেবে। এবারে সে ঘুম যাবে ভাবল।

    কাপ্তান তখন নিজের কেবিনে বসে আছেন। সাদা জিন কাপড়ের ফুল প্যান্ট, সাদা হাফ-সার্ট এবং পায়ে সাদা জুতো। যতক্ষণ ডিউটি থাকবে, ততক্ষণ একেবারে পুরো ইউনিফরমে বসে থাকবেন। পোর্ট-হোল দিয়ে সামনের সমুদ্র দেখার স্বভাব। সালফার বোঝাই বলে জাহাজের ড্রাফট আটাশ। এর চেয়ে বেশি জাহাজে মাল তোলা যায় না। সামান্য ঢেউ উঠলেই জল উঠে আসে। খুব সতর্ক তিনি। এমন কি এখন যে মাঝে মাঝে অন্যমনস্ক হয়ে যাচ্ছিলেন তাও যেন ঠিক না। জাহাজ আবার সেই একই রাস্তা ধরে যাচ্ছে। সেই মাস্তুলে লম্ফ জ্বালিয়ে জাহাজ আবার যাচ্ছে সেই দ্বীপগুলিতে—কোম্পানী থেকে যে-যে ভাবে জাহাজের কার্গো দেওয়া হচ্ছে তাতে করে কতমাস এই সব দ্বীপপুঞ্জে ঘুরে বেড়াতে হবে তিনি বুঝতে পারছেন না।

    অথচ তিনি এই প্রশান্ত মহাসাগরে পড়ার পরই হঠাৎ অনুভব করলেন, বনি আর আগের মতো নেই। সে লাফিয়ে লাফিয়ে সিঁড়ি ভাঙ্গে না। সে রেলিঙ থেকে রেলিঙ-এ ঝুলে চলে যায় না। অথবা সে যে একটা দোল খাবার মতো ব্যবস্থা করে নিয়েছিল চিমনির পাশে সেখানে সে বসে না। বসলেও চুপচাপ, নিজের ভেতরে সে নেই, চোখে-মুখে কেমন এক আশ্চর্য উদাসীনতা। লাজুক, নম্র স্বভাবের হয়ে যাচ্ছে। বনির কথা ভেবেই তিনি অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিলেন। এবং তখনই মনে হল, তাকে দরজার বাইরে কেউ ডাকছে। বনির মতো গলা। দরজা খুলে বের হয়ে দেখলেন কেউ নেই। অবাক। তিনি স্পষ্ট শুনতে পেয়েছেন বনির মতো কেউ ডেকে বলছে, দরজা খোল। ভিতরে ঢুকতে পারছি না।

    হিগিনস সামান্য সময় দরজায় দাঁড়ালেন। বনি, না অন্য কেউ। অন্ধকার রাত বলে চারপাশে স্পষ্ট কিছু দেখা যায় না। চিমনির নিচে মনে হল গাউন পরে কেউ দাঁড়িয়ে আছে। কুয়াশার মতো, ছায়া ছায়া! কি আশ্চর্য বনি এ-পোশাকে বের হয়েছে! কি সাহস মেয়ের! রাত গভীর। কেউ বোট- ডেকে এ সময়ে থাকবে না বলে, বনির এমন সাহস তিনি একেবারেই পছন্দ করছেন না। তিনি প্রায় দ্রুত নেমে যাচ্ছিলেন সিঁড়ি ভেঙ্গে। জোরে ডাকতেও পারছেন না বনি বলে। জ্যাক বলে ডাকলে, ব্রীজে যাদের ডিউটি তারা সতর্ক হয়ে যেতে পারে। অসময়ে কাপ্তান নিচে নেমে যাচ্ছেন কেন! আর যদি চিমনির ও-পাশে ছায়া ছায়া অন্ধকারে বনিকে আবিষ্কার করে ফেলেন, তবে কেলেঙ্কারি। তিনি যেন মরিয়া হয়ে ছুটছেন, এবং নেমে যাবার সময় পাইপে হোঁচট খেয়ে পড়তে পড়তে উঠে দাঁড়ালেন। আর দাঁড়াতেই অবাক, রেলিঙ ফাঁকা। অস্পষ্ট ছায়া ছায়া অন্ধকারে বনি কিংবা গাউনপরা কেউ নেই। যত দ্রুত নেমে যাচ্ছিলেন, ঠিক তত দ্রুত তিনি বনির কেবিনে গিয়ে জোরে ডাকলেন, জ্যাক জ্যাক।

    বনি বাবার গলা শুনে ধড়ফড় করে উঠে বসল। সে ঘুমোয়নি। তার কিছুতেই ঘুম আসছিল না। সে লাফিয়ে নিজের পোশাক পরে দরজা খুলে বলল, বাবা তুমি!

    —বনি তুমি আমাকে ডেকেছিলে?

    —নাতো বাবা।

    —এই এক্ষুনি—মানে মিনিট চার-পাঁচ আগে।

    —নাতো বাবা। কেন কি হয়েছে!

    —কিছু না। তুমি ঘুমোও। সাবধানে ঘুমোবে। বনি তুমি ভয় পাও না তো?

    —না বাবা। ভয় পাব কেন!

    —ছেলেমানুষ তুমি।

    বনি বলল, ভিতরে এস! তুমি এত ঘামছ কেন বাবা? বোস।

    —ঘামছি! তিনি বসতে বসতে বললেন।

    —হ্যাঁ। বলে বনি তোয়ালে দিয়ে বাবার কপাল মুখ মুছিয়ে দিতে থাকল। তারপর হেসে ফেলল, তুমি না বাবা যত বয়স বাড়ছে তত ছেলেমানুষ হয়ে যাচ্ছ। আমার কথা ভেবে তোমার ঘুম আসে না।

    কাপ্তান কিছু বললেন না। বসে থাকলেন। দেখলেন, মেয়ের কিছু পোশাক ছেঁড়া। প্যান্ট, ঢোলা জামা, ব্রেসিয়ার একপাশে পড়ে আছে।

    কাপ্তান দেখলেন সব। কিছু বলতে পারলেন না। এই বোট-ডেকে এলিস এইমাত্র তবে এসেছিল, তার গলা। এলিসই বনির গলা নকল করে ডেকেছে। তারপর ভাবলেন, হয়তো তিনি বনির কথা ভাবতে ভাবতে খুব বেশি অন্যমনস্ক হয়ে গেছিলেন। এবং মনে হয়েছিল, বনি তাঁকে ডাকছে। কিন্তু পরক্ষণেই আর একটা চিন্তায় তিনি ভীত হয়ে পড়লেন। দীর্ঘ বিশ বছর আগে এলিসকে নিয়ে এ জাহাজে উঠেছিলেন। ঠিক সেই এলিসের গাউন অন্ধকার রাতেও রেলিঙে ঝলমল করছিল! তিনি এবার ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালেন। মেয়ের দিকে তাকাতে পর্যন্ত সাহস পেলেন না। কেবল বললেন, দরজাটা বন্ধ করে দাও। ধীরে ধীরে হাঁটতে থাকলেন।

    তারপর তিনি ঠিক সেই রেলিঙের কাছে গিয়ে বললেন, এলিস, আমি ক্যাপ্টেন স্যালি হিগিনস. বলছি।

    শুধু ওপরে অজস্র নক্ষত্রমালা, অন্ধকার সমুদ্রে একটা গুমগুম আওয়াজ, প্রপেলারের একটানা জল- ভাঙ্গার শব্দ, আর কিছু না। না, মনে হল, সেই এ্যালবাট্রস পাখি দুটো এখনও উড়ছে। দূরে কোথাও তিনি তাদের কক্ কক্ শব্দ শুনতে পেলেন।

    এ-সব কিছুই তিনি এখন শুনতে চান না! তিনি ফের বললেন, আমি স্যালি হিগিনিস ক্যাপ্টেন এস-এস সিউল-ব্যাঙ্ক, বলছি। তুমি শুনতে পাচ্ছ।

    না কোন জবাব নেই। পাখি দুটো জাহাজের মাথায়, বোধ হয় মাস্তুলের ডগায় বসার জন্য আবার এসেছে। তাদের অতিকায় ছায়া, তাঁকে মুহূর্তের জন্য ঢেকে দিয়ে চলে গেল।

    তিনি বললেন, এলিস, আমি সব সহ্য করব। যে কোন শাস্তি। দোহাই তুমি বনির ছদ্মবেশে এসো না। বনির গলায় আমাকে ডেকো না। বনির কোন দোষ নেই। তারপর তিনি নিজেই অবাক হয়ে ভাবলেন, অদৃশ্য আত্মার সঙ্গে তিনি কথা বলে চলেছেন। ভয়ে তাঁর শরীর ফুলে উঠছে। একাকী নিশীথ অন্ধকারে দেখলেন, দূরে একটা নক্ষত্র এইমাত্র খসে পড়ল। তিনি ফিরে এসে কেবিনে ঢুকতে সাহস পেলেন না। ব্রীজে একটা ডেক-চেয়ারে চুপচাপ অন্ধকারে বসে থাকলেন। সামনে থার্ড-মেট, হুইলের সামনে কোয়ার্টার-মাস্টার। ওদের দুজনেরই চোখ সামনের দিকে। পেছনে কেউ বসে আছে তারা টের পেল না।

    আবার কোন নক্ষত্র যদি সমুদ্রের অতল থেকে ভেসে ওঠে এবং ভাসতে ভাসতে আকাশের গায়ে টুপ করে লেগে যায় বুঝতে পারবেন, এই নক্ষত্র বেয়ে কেউ কখনও এ-জাহাজে নেমে আসে। বোধহয় এলিসও তাই করছে। জাহাজ থেকে আকাশে, আকাশ থেকে সমুদ্রের গভীরে ডুবে যায়। এভাবে জাহাজের পিছু পিছু অথবা যেখানে তিনি থাকছেন, এলিস সঙ্গে সঙ্গে রয়েছে। এমন মনে হতেই ফের স্বাভাবিক হয়ে গেলেন। উঠে থার্ড-মেটের কাঁধে হাত রাখলেন। সেদিন থার্ড-মেটকে গালাগালি করেছেন। আজ কেন জানি মনে হল থার্ড-মেট সত্যি খুব কর্তব্যপরায়ণ অফিসার। তিনি বললেন, থার্ড-মেট, তোমার কি মনে হয়?

    —কী স্যার?

    —ওই ভূতটুতের ব্যাপার সম্পর্কে!

    —আমার এতে বিশ্বাস নেই স্যার!

    —অথচ দ্যাখো রিচার্ড নেমে গেল। চোখ-মুখের কি অবস্থা হয়েছিল!

    —আমি তো জাহাজে কিছু কখনও দেখি না।

    —আমিও না। বলেই তিনি লগ-বুকের পাতা উল্টাতে থাকলেন। তারপর বললেন, কম্পাস রিডিং ঠিক দিচ্ছে তো।

    —সামান্য গণ্ডগোল করছে।

    সামান্য বলতে কতটুকু তিনি তাড়াতাড়ি অঙ্ক কষে সেই হিসেবটা বের করলেন। জাইরো কম্পাসের সঙ্গে হিসেব মিলিয়ে দেখলেন, ঠিকই আছে। একটু এদিক-ওদিক সব জাহাজেই হয়। তিনি এবার যেন তার পুরানো সাহস ফিরে পেয়েছেন। বললেন, তবু কখনও কখনও এমন হয়। কি হয়, কিছু বললেন না। থার্ড-মেট প্রশ্ন করে, কি হয় জানতে পারল না। কাপ্তান তাঁর কেবিনের দিকে চলে যাচ্ছেন। কাপ্তান যে ঘুমোন না, জেগে থাকেন এটা বোধহয় দেখিয়ে গেলেন। কাপ্তানের দরজা বন্ধ হলেও থার্ড-মেট তেমনি সামনে চোখ রেখে দাঁড়িয়ে থাকল। দুরের দুটো একটা আলো দেখে মনে হল অন্ধকারে একটা দ্বীপটিপ এগিয়ে আসছে সামনে। র‍্যাডারে সে দেখতে পেল—ওটা দ্বীপই। সঙ্গে সঙ্গে টেলিগ্রাম পাঠাল নিচে, স্লো। জাহাজের গতি কমিয়ে দিন। সামনে একটা দ্বীপ দেখা যাচ্ছে। এবং দ্বীপের পাশ কাটিয়ে জাহাজ ফের নেমে গেলে সে টেলিগ্রাম পাঠাল ফের—ফুল। পুরোদমে চালান। নিচে ডিউটি এনজিনিয়ার চার নম্বর, টেলিগ্রামে ঘণ্টা বাজতেই জাহাজের গতি বাড়িয়ে দিল। তারপর টুলের ওপর একটা পা রেখে সামান্য ঝুঁকে থাকল নিচে। কখনও পায়চারি করল। কখনও ব্যালেস্ট পাম্প চালিয়ে ময়লা জল বের করে দিতে থাকল। বয়লারের ওপাশে তিনজন ফায়ারম্যান, টিণ্ডাল। ওরা উইণ্ডসেলের নিচে দাঁড়িয়ে গেজে স্টিম দেখছে। এবং নানারকমের সব বালব, কক, গেজ। কক থেকে ফ্যাচ ফ্যাচ শব্দে স্টিম এবং জল একসঙ্গে বের হয়ে আসছে। আবার কোথাও হিসহিস শব্দ এবং নিচে ওরা প্রায় সমুদ্রের সারফেস থেকে আটাশ ফুট নিচে। ওরা কয়লা মেরে যাচ্ছে, ফার্নেস-ডোর খুলে আগুন ঘেঁটে দিচ্ছে। বড় বড় স্লাইশ, র‍্যাগ টানছে তুলছে এবং ভেতরে প্রায় সমস্ত শক্তি দিয়ে ঠেলে দিচ্ছে—এবং এভাবে শরীরে ওদের আগুনের হলকা এসে প্রায় সারা শরীর ঝলসে দেবার মতো। তখনই এয়ার বালব না টেনে পারা যায় না। না হলে আগুন লেগে পুড়ে মরার কথা।

    আর এই হচ্ছে নিশীথের জাহাজ। সমুদ্রে নিশীথে জাহাজ এভাবেই চলে। আফট্-পিকে যে জাহাজি ডিউটিতে থাকে এখন সে কেন বেল বাজাল না! থার্ড-মেট ভেবে পেল না এটা। সবাই যখন সতর্ক, সজাগ প্রায় শরীরের শিরা-উপশিরার মতো সিউল-ব্যাংককে সচল রাখছে, তখন আফট্-পিকে দ্বীপ দেখে ঘণ্টা বাজল না, ভারি বিস্ময়ের। জাহাজে একটা বড় রকমের দুর্ঘটনা ঘটতে পারত, চড়ায় উঠে পড়তে পারত জাহাজ—তাছাড়া এত কাছাকাছি কোনও দ্বীপ তো থাকার কথা না। সহসা এমন মনে হতেই চার্টের ওপর ঝুঁকে বুঝতে পারল, অন্তত দুশো মাইলের ভেতর কোনও দ্বীপ নেই। তবে এটা সে কি দেখল! সে যে টেলিগ্রাম পাঠাল, এবং মনে হল সামনেই একটা দ্বীপ, এমন কি র‍্যাডারে মনে হল দ্বীপ। এত সব হবার পর সে কেমন ঘাবড়ে গেল। ঘণ্টাখানেকও হয়নি কাপ্তান এসে নিজে কম্পাস রিডিং-এর ডিভিয়েসান দেখে গেছেন—জাহাজ দ্রাঘিমা অক্ষাংশ ঠিক রেখে এগিয়ে যাচ্ছে, অথচ সে একটা দ্বীপের পাশ কাটিয়ে জাহাজ নামিয়ে আনল।

    সে বলল, কোয়ার্টার-মাস্টার, তুমি কি স্টার-বোর্ডে একটা দ্বীপ দেখতে পাও নি?

    –না তো স্যার।

    —না তো স্যার! তবে আমি টেলিগ্রাম পাঠালাম কেন নিচে!

    —সে তো জানি না স্যার!

    —তুমি ঘুমোচ্ছিলে?

    —না স্যার।

    থার্ড-মেট ভাবল, এ দুনম্বর ঠিক নেশাভাঙ করে। সে হয়তো কিছুই খেয়াল করেনি। কেবল হুইল ঘুরিয়ে যাচ্ছে কম্পাস দেখে। আর কাকে সে সাক্ষী রাখতে পারে। লগ-বুকে লিখতে হবে সব। এনজিন- রুমের লগ-বুকে এতক্ষণে লেখা হয়ে গেছে। কতটা সময় জাহাজ স্লো চলেছে—কার ডিউটি, ফোর্থ এনজিনিয়ারের! না ওকে ফের নতুন করে কিছু লেখানো যাবে না। সে তাড়াতাড়ি কাপ্তানের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে বলল, থার্ড-মেট স্যার।

    —কাম-ইন।

    থার্ড-মেট দেখল কাপ্তান টেবিলে বড় একটা চার্ট ফেলে কি মাপ-জোক করছেন। এবং ভীষণ নিবিষ্ট। বললেন, বোস।

    —স্যার!

    —তুমি ভুল করেছ ভাবছ!

    —হ্যাঁ স্যার।

    —না। ঠিকই দেখেছ।

    —কিন্তু স্যার কোর্সে কোন দ্বীপের উল্লেখ নেই। দুশো মাইলের ভেতর নেই।

    তিনি বললেন, চার্ট সেকেণ্ড-মেট ভুল করেছে। চার্ট অনুযায়ী জাহাজ চললে আমাদের ভীষণ ভুগতে হত।

    থার্ড-মেট মাথা চুলকে বলল, তবে চার্ট অনুযায়ী জাহাজ চলছে না!

    —না।

    —কিন্তু স্যার, আমরা তো সাধ্যমতো করে যাচ্ছি। চার্ট অনুযায়ী জাহাজ চালাচ্ছি।

    কাপ্তান বুঝতে পারলেন, থার্ড-মেট কিছু ভুল করেছে ভেবে ভীত। তিনি বললেন, ভয় পাবার কিছু নেই। ঠিকই যাচ্ছে জাহাজ। যেন বলতে চাইলেন, আমরা ভুল করলেও সিউল-ব্যাঙ্ক ভুল করে না। আর হবেই বা না কেন, কতবার সিউল-ব্যাঙ্ক পানামা ক্রশ করে ঠিক এই পথে তাহিতি হয়ে নিউ-জিল্যাণ্ড এবং শেষে সে এই সব দক্ষিণ সমুদ্রের দ্বীপে ঘুরতে ঘুরতে প্রত্যেকটা দ্বীপকে চিনে ফেলেছে। ভুল কোর্সে চালিয়ে তাকে নিয়ে যাওয়া কঠিন। অবশ্য কেউ এ-সব বিশ্বাস করবে না, থার্ড-মেটও না, তিনি শুধু থার্ড-মেটকে বলে দিলেন, জাহাজ ঠিক যাচ্ছে। ভয় পাবার কিছু নেই। সেকেণ্ড-মেট এলে দেখা করতে বলবে।

    সেকেণ্ড-মেট বারোটায় এলে কাপ্তান দেয়ালে একটা স্টিক তুলে ধরলেন। বললেন, কত দ্রাঘিমা অক্ষাংশ?

    ডেবিড বলল, হানড্রেড এ্যাণ্ড ফাইভ ওয়েস্ট, ফিফটিন সাউথ।

    কাপ্তান বললেন, ঠিক আছে?

    ডেবিড দেখল, সে যে চার্ট করেছে, ওটা সোজা নিউ-প্লাইমাউথে যাবার কোর্স-লে। তাহিতিতে যেতে হলে আরও কয়েক ডিগ্রি সাউথ-সাউথ-ওয়েস্টে বেড়ে যাবার কথা। এবং আশ্চর্য জাহাজের এত বড় ভুলটা কারো নজরে আসেনি। আর ডেবিড অবাক, জাহাজ ঠিক পথেই চলেছে। চার্ট অনুযায়ী না চলে—কোথায় কম্পাস রিডিং-এ ভুল থেকে গেছে কেউ ধরতে পারেনি। তাহিতিতে যাবার পথে ওরা যে পরিচিত একটা ছোট্ট দ্বীপ দেখে থাকে সিউল-ব্যাঙ্ক তাও ভুল করেনি। এবং এমন সব হলেই ওরা কেমন বিমূঢ় হয়ে যায়। তখন কাপ্তান হিগিনস সহ গোটা জাহাজটা একটা শয়তানের আস্ত নিবাস তারা ভেবে থাকে। কাজেই ডেবিড আর কিছু বলতে পারল না। সে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকল। এত বড় একটা ভুলের জন্য সে দায়ী, যদিও জাহাজ ছাড়ার আগে সব অফিসাররাই চার্ট দেখে থাকে, অথচ দেখেও এমন একটা সহজ ভুল কেউ ধরতে পারল না—সুতরাং কাপ্তান ওকে অদায়িত্বশীল ভেবে তিরস্কার করবেন। এসব মনে হওয়ার দরুন সে যেতে পারছিল না।

    হিগিনস খুব খুশি। যেন এটা তিনি আরও দেখেছেন। ভীষণ একটা প্লেজার, আনন্দে আর তিনি স্থির থাকতে পারছেন না। বলছেন, বুঝলে ডেবিড, জাহাজ আমাদের খুব বিশ্বস্ত। আমরা ভুল করলেও সে করে না। কেমন দেখলে তো! নিজের চোখে দেখলে।

    ডেবিড কি বলবে? সে বলল, হ্যাঁ স্যার। এবার আমি তাহলে যেতে পারি?

    —যাবে? যাও।

    ডেবিড তাড়াতাড়ি বের হয়ে পড়ল। জাহাজটা সামান্য দুলছে। সমুদ্রে ঠাণ্ডা হাওয়া বয়ে যাচ্ছে। শেষ রাতের দিকে সামান্য শীতও বেড়েছে। ডেবিড সেজন্য একটা মোটা গেঞ্জি গায়ে দিয়ে এসেছে। জাহাজি পোশাক। মাথায় এংকোরের টুপি। সে প্রায় গটগট করে ব্রীজে ঢুকে গেলে থার্ড-মেট বলল, কি আশ্চর্য কাণ্ড!

    ডেবিড বলল, বাজে। বাজে কথা।

    —তার মানে!

    —মানে কাপ্তান ভুলটা ঠিকই ধরতে পেরেছিলেন। প্রথমেই ধরতে পেরেছিলেন। তিনি তলে তলে কোথায় কিভাবে কি করেছেন কে জানে!

    থার্ড-মেট বুঝল, ডেবিড এসবে পাত্তা দিতে চায় না। না দেওয়া স্বাভাবিক। একটা জাহাজ নিজের খুশিমতো চলে ভাবতে গেলেই শরীর শিউরে ওঠে। আর সত্যি সে যখন চোখের ওপর দেখতে পায়, একটা জাহাজ নিজের খুশিমতো পথ ঠিকঠাক করে নির্দিষ্ট বন্দরে ঢুকে যাচ্ছে তখন মাথা ঠিক রাখা যায় না। জাহাজটা তাদের নিয়ে তবে যা খুশি তাই করতে পারে। জাহাজটাকে তারা নিয়ে যাচ্ছে না, জাহাজটা তাদের নিয়ে যাচ্ছে। এ-সব মনে হলেই মাথায় প্রায় বাজ পড়ার মতো। মুখে ডেবিড বাজে বলে উড়িয়ে দিলেও মনে মনে ভীষণ ভয় পেয়ে গেছে। এবং এ-জাহাজটা যে খুশিমতো আর স্ক্র্যাপ করা যাবে না জাহাজের মর্জি না হলে স্ক্র্যাপ করার হুকুম যে দেবে সেই ভোগে যাবে এ-সব যখন ভাবছিল, তখ, চোখ ওর গোল গোল হয়ে যাচ্ছে। কখন থার্ড-মেট চলে গেছে, কখন আর একজন কোয়ার্টার-মাস্টার এসে হুইলের দায়িত্ব নিয়েছে সে যেন টের পায় নি। ওর কেন জানি মনে হল, জাহাজ থেকে নেমে যেতে না পারলে কারো রক্ষা থাকবে না। খুশিমতো চড়ায় উঠে বসে থাকবে, খুশিমতো সমুদ্রের অতলে ডুবে নিরুদ্দিষ্ট করে দেবে তাদের। কোন বেতার সংকেত কোথাও ওরা পৌঁছে দিতে পারবে না। সমস্ত এস-ও-এস ইথারে ভেসে ভেসে মহাকাশে বিলীন হয়ে যাবে। পৃথিবীর কোনো ট্রেনসমিটারে সিউল-ব্যাংকের এস-ও-এস ধরা পড়বে না। সে চিৎকার করে বলতে চাইল, নো নো। নেভার। কিন্তু পারল না। কোয়ার্টার-মাস্টার একটা মোমের পুতুলের মতো হয়ে গেছে। স্থির। চোখ এবং হাত-পা কোনো এক অদৃশ্য আত্মার প্রভাবে যেন চলছে।

    সে কাছে গিয়ে নাড়া দিল—এই

    কোয়ার্টার-মাস্টার ডেবিডের দিকে তাকাল।

    —চোখ এমন করে রেখেছ কেন?

    -–কি করে রেখেছি সাব?

    –একেবারে স্থির। চোখের পলক পড়ছে না।

    —না সাব।

    এমন নিশীথে, অর্থাৎ এত রাতে, কারণ এখন রাতদুপুর, সমুদ্রে কেউ জেগে নেই, পাখি দুটোও না, দ্বীপে হয়তো থেকে গেছে—তখন মোমের পুতুলের মতো কোয়ার্টার-মাস্টারের মুখ তাকে সীমাহীন অসহায়তার ভেতর টেনে নিয়ে যাচ্ছে। বার বার নাড়তে থাকে, না, না—তুমি ঠিক নেই তিন নম্বর। তুমি কারো প্রভাবে চোখ এমন করে রেখেছ। তুমি নিজের ভেতরে নিজে নেই।

    কোয়ার্টার-মাস্টার বলল, সাব ঠিক থাকা যায় না।

    –কেন কেন?

    —শরীরে কেমন রোমাঞ্চ হয়। কি যে হয় বুঝি না। কম্পাসের কাঁটা, হুইল যেন সব নিজের ইচ্ছায় চলে। আমার কিছু করার থাকে না।

    ডেবিড হয়তো এবার সত্যি চিৎকার করে উঠতে পারলে বাঁচত—সব গাঁজাখোরি। সব মিথ্যা। সিউল-ব্যাংক সম্পর্কে সব শুনে শুনে এমন হয়েছে। তোমরা ভীরু, কাপুরুষ। বলে সে নিজে হুইল ধরলে থরথর করে কাঁপতে থাকল। হুইলের সঙ্গে সে কেমন বিদ্যুৎপৃষ্ঠের মতো সেঁটে গেল। হাত দুটো শক্ত হয়ে যাচ্ছে। আর হুইলটা যখন যেমন দরকার নড়ছে। কম্পাসের কাঁটার সঙ্গে ঠিক মিল রেখে একবার ডাইনে বাঁয়ে ঘুরছে।

    সে প্রায় ছিটকে বের হয়ে এসে বলল, কি ব্যাপার। কখনও তোমরা বলনি তো!

    —কোন ক্ষতি করে না সাব।

    তারপরই কেমন তাকে এক অহংকারে পেয়ে বসে। সে, সব মিথ্যা অহমিকা জাহাজ-এর ভেবে জাহাজের মুখ উল্টোমুখে ঘুরিয়ে দিতে যায়। ঠিক ঘুরে যায়, কিন্তু পরে আবার নিজের মতো জাহাজ পথ করে নেয়। ডেবিড যা করতে চায় করে। সে যেভাবে চালাতে চায় চলে, কিন্তু পরক্ষণে কেমন সেই এক গতি, জাহাজ যাচ্ছে তাহিতিতে।

    কোয়ার্টার-মাস্টার বলল, আপনি সাব ভয় পেয়েছেন।

    ডেবিড বলল, না। তবু এটা কি যে হল!

    —কী সাব?

    —এই যে হুইল ধরলে হাত শক্ত হয়ে গেল।

    —ভয় পেয়েছেন বলে।

    —তুমি?

    —আমরা জাহাজকে মান্য করি। লেখা-পড়া জানি না, সারেং-সাব যা বলেন তাই করে থাকি। এত বড় জাহাজটা যাবে, তার খুশি মোতাবেক যাবে। ভয়ের কি আছে। সে তো আমাদের ঠিক ঠিক নিয়ে যায়। হিগিনস থাকলে আমাদের কোন ভয় থাকে না সাব।

    ডেবিড আর এ-নিয়ে ভাবল না। ভাবলে মাথা খারাপ হয়ে যাবে। জাহাজে উঠে সে অজস্রবার হুইল ঠিক ঠিক বেঁধে দিয়েছে, আজকের মতো অবস্থা তার হয়নি। মনে মনে সে ভীত হয়ে পড়ছে। সকাল হলে সব কেটে যাবে। এ-সব অনুভূতি থাকবে না। সে যতটা পারল হুইল থেকে দূরে দাঁড়িয়ে থাকল। ব্রিজের ভেতর থেকে আকাশ এবং সমুদ্রকে আশ্চর্য রহস্যময় মনে হয়। সে নক্ষত্র এবং অন্ধকার সমুদ্র দেখতে দেখতে বুঝল চারটে বাজতে দেরি নেই। একটু বাদেই সূর্য উঠবে। ঠিক পেরুর পর্বতমালার এপাশে সূর্য সে দেখতে পাবে। সমুদ্র থেকে সহসা ভেসে ওঠার মতো, এবং সূর্য ওঠার আগে সেই সব রং-বেরংয়ের আভা পরিবর্তনশীল আকাশ এবং সমুদ্রের রং, আর যদি কোনও ছোট ফ্লাইং ফিস সে-সময় উড়ে উড়ে আসে, তখন তার এই জাহাজের অস্থিরতার কথা মনে থাকবে না। মনে হবে, জাহাজ তারা ঠিকই চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। কোথাও কোন ভুল নেই। কাপ্তান জাহাজের নাম করে একটু বেশি বাহবা নিতে চাইছে। আর কিছু না।

    সকালে সমুদ্রে সূর্য উঠছিল। সূর্য ওঠার সময় মনে হয় এই সামনে একেবারে সামনে সূর্য সমুদ্রের অতল থেকে ভেসে উঠল। ডেবিড বোট-ডেকে দাঁড়িয়ে দাঁত ব্রাস করছিল। কোর্স এতটা কি করে ভুল হল সে কিছুতেই বুঝতে পারল না। জাহাজের আজগুবি বিশ্বাস অবিশ্বাসে সে কেমন মনমরা হয়ে আছে। এবং এভাবেই সে এখন ভেবে থাকে সমুদ্রে সূর্য উঠলেই এখন পেরুর পর্বতমালার নিচে উঠবে। যদিও তারা হাজার মাইলের ওপর দূরে রয়েছে। এবং কাছাকাছি কোথাও স্থলভাগ নেই বলে সূর্য পেরুর পর্বতমালার নিচে উঠছে ভাবতে ভাল লাগে তার। এও তেমনি মনে হয়, কাপ্তান হয়তো জানেন হিসেবে কোথাও ভুল করে জাহাজ ঠিক কোর্স-লে পেয়ে গেছে। ঠিক কোর্স-লে পেয়ে গেছে কথাটা কাপ্তান বেমালুম অস্বীকার করতে চাইছেন।

    এ-নিয়ে সকালে কথাবার্তা হতে পারে, সবাই জানবে, ডেবিড মারাত্মক ভুল করেছে। কোর্স লে ঠিক করতে পারেনি। সে এজন্যও কিছুটা মনমরা ছিল। তখনই সে দেখলো এ্যালবাট্রস দুটো মাস্তুলে বসে রয়েছে। মাস্তুলের ডগায় এত বড় পাখি দুটো কেউ খেয়ালই করেনি। এবং সঙ্গে সঙ্গে সে আর স্থির থাকতে পারল না। মনমরা ভাবটা একেবারে কেটে গেল। দু-লাফে কেবিনে ঢুকে বন্দুক হাতে নিয়ে হামাগুড়ি দিতে থাকল। তারপর সেই বড় পাখিটাকে, বড়-পাখিটাই ওর মাংস খুবলে নিয়েছে। এমন সুযোগ আর সে পাবে না। পাখি দুটোর বোধ হয় চোখে এখনও ঘুম জড়িয়ে আছে। ওদের ঠোট ডানার ভেতরে। সে সন্তর্পণে এগিয়ে যাচ্ছে। বুঝতেই দিচ্ছে না বোটের নিচে হামাগুড়ি দিয়ে কেউ এগিয়ে যাচ্ছে।

    সকালে তখন ছোটবাবু মাত্র বাথরুম থেকে বের হয়েছে। এক কাপ চা রেখে গেছে মেস-রুম- বয়। একটু ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা লাগছিল। শীত শীত করছে। একটা চাদর গায়ে চড়িয়ে চা খেল। পোর্ট-হোলের কাচ খুলে দিল। আর্চির কাছে প্রথমেই ক্ষমা চেয়ে নিতে হবে। তার এখন কিছু আর করণীয় নেই। নতুবা কাপ্তানের কাছে কি আবার মিথ্যা রিপোর্ট করবে, ভাবতেই সে বিষণ্ণ হয়ে গেল।

    আর জ্যাক সারারাত অসহ্য জ্বালায় একেবারে ঘুমোতে পারেনি! আর্চি ওকে ভয় দেখিয়েছে। আর্চি সব জেনে এখন ওকে নানাভাবে খেলাবে। সে যে ছোটবাবুকে চুমু খেয়েছিল, আর্টি তাও দেখেছে। আর্চি ভয় দেখাচ্ছে, কাপ্তানের কানে কথাটা তুলবে। জ্যাক সহজভাবে সব মেনে না নিলে আর্চি তাকে সহজে রেহাই দিচ্ছে না। সারারাত ভেবেছে কি করবে! ছোটবাবুকে সব খুলে বলবে কিনা, না চুপচাপ সব হজম করে যাবে। বাবাকে বললে, সে যে বনি, বাবার একমাত্র আশ্রয় এবং বাবার আশা-ভরসা —এমন শুনলে বাবা আরও ভেঙ্গে পড়বেন। ওর বয়েস কম হলে কি হয়, গত রাতে বাবার মুখ দেখে টের পেয়েছিল, তিনি মাঝে মাঝে ভীষণ ভয় পেয়ে যান। এবং ছেলেমানুষের মতো মুখ করে বনির দিকে তাকিয়ে থাকেন। বাবাকে তখন ওর ছোট্ট শিশুসন্তানের মতো লাগে। সে, সব এখন থেকে সহ্য করতে পারবে, কিন্তু বাবাকে কষ্টের ভেতর কিছুতেই ফেলে দিতে পারবে না। এ-সব ভাবতে ভাবতে ওর চোখ ভোররাতের দিকে জড়িয়ে এসেছিল, তখনই এক ভয়ঙ্কর শব্দে সে চমকে উঠল। জাহাজে ফায়ারিং হচ্ছে। সে ছুটে বের হবার আগে পোশাক তাড়াতাড়ি পাল্টে নিল। বোট-ডেকে নেমে যা দেখল, তাতে সে হিম হয়ে গেছে। বড় পাখিটা অতিকায় ডানা মেলে মুখ থুবড়ে পড়ে আছে। পাখা ঝাপটাচ্ছে। গল গল করে রক্তে ডেক ভেসে যাচ্ছে। আর লেডি এ্যালবট্রস জাহাজটার চারপাশে উড়ে উড়ে বেড়াচ্ছে। জাহাজটাকে ছেড়ে সে কিছুতেই দূরে চলে যাচ্ছে না। কেমন কান্নার মতো এক আর্ত বেদনা পাখিটার গলায়।

    পাখিটা রক্ত ওগলাতে ওগলাতে মরে যাচ্ছে এবং এক ভীষণ অমঙ্গলের আশঙ্কায় বনি স্তব্ধ হয়ে গেল। পাখিটা মরে গেলে সে এতটা ভেঙ্গে পড়বে কখনও বুঝতে পারে নি। মনে হল মৃত্যুর আগে পাখিটার অসহায় চোখ তার ভারি চেনা। যখন মনে হল তখন আর স্থির থাকতে পারল না। ছোটবাবুর কেবিনে দৌড়ে গেল। –ছোটবাবু, ম্যান এ্যালবাট্রস ডেড।

    ছোটবাবু ভারি খুশি। বলল, সত্যি! সে দরজা খুলে বলল, সত্যি। আর সঙ্গে সঙ্গে সেই বাচ্চা ছেলের মতো মরা-পাখি জাহাজ ডেকে দেখার জন্য ছুটতে থাকল। এলি-ওয়েতে জ্যাক দাঁড়িয়ে আছে। অমঙ্গল ভেবে মুখ ক্লিষ্ট। এবং ছোটবাবুকে অপলক দেখতে দেখতে চোখ ভারি হয়ে আসছে জ্যাকের। তখন কেমন নিজের আনন্দে আছে ছোটবাবু। রাতের ঘটনা বেমালুম ভুলে গেছে। ভুলে না গেলে সে এভাবে দৌড়াতে পারে না।

    আর তখনই একটা ভয়ঙ্কর অহংকারী স্বর এদিকে ভেসে আসছিল।-–ম্যান, ম্যান এদিকে এস।

    ছোটবাবু একেবারে ফ্রিজ হয়ে গেছে। মুখোমুখি সেকেণ্ড-এনজিনিয়ার আর্চি। সে ছুটে যেতে পারল না। আর্চি তাকে এনজিনরুমে নেমে যেতে বলছে।

    তখনও দূরে ঠিক ছোটবাবুর কেবিনের পাশে দাঁড়িয়ে আছে জ্যাক। সে দেখছে, আর্চি ছোটবাবুকে নিয়ে নেমে যাচ্ছে। কোথায় নিয়ে যাবে সে জানে। কত নিচে নামিয়ে তাকে টর্চার করবে তাও জানে। সে এখন কি করবে বুঝতে পারছে না। নিচে নামবে, না পাখিটার কাছে যাবে বুঝতে পারছে না।

  • পঁচিশ

    পঁচিশ

    ।। পঁচিশ।।

    —ম্যান, দৌড়ে কোথায় যাচ্ছিলে?

    —টুইন ডেকে স্যার।

    –ডেবিড পাখিটাকে একেবারে মেরে ফেলেছে?

    —হ্যাঁ স্যার।

    —ভাল করে নি।

    —না স্যার, ডেবিড ভাল করে নি।

    —ম্যান, জ্যাক তোমাকে কিছু বলেছে?

    —না স্যার।

    —ম্যান, তুমি জ্যাকের সঙ্গে মিশবে না।

    ছোটবাবু কিছু বলল না। সে নামছে। সিঁড়ি ধরে নিচে নামছে। ক্রমে নিচে নেমে যাচ্ছে। সিলেণ্ডারের কাছে এসে নিচে নেমে আর্চি হিপ-পকেট থেকে দু-ব্যাটারীর একটা টর্চ বের করছে। ওয়াচের সময় আর্চির হিপ-পকেটে টর্চটা থাকে। ওয়াচের এনজিনিয়াররা টর্চটা না থাকলে কাজ করতে পারে না। আর্চিও পারে না।

    টর্চ বের করতেই বুঝল, আর্চি তাকে ট্যাঙ্ক টপের নিচে ফের নামাবে। ওর কথাবার্তা শুনে মনে হয়েছিল, আর্চি ওর সঙ্গে বেশ ভাল ব্যবহার করছে। আর্চি আজ পর্যন্ত তার সঙ্গে এতগুলো কথা একসঙ্গে কখনও বলে নি। যদিও আর্চি ওকে নাম ধরে ডাকে না, অথবা ছ’ নম্বর বলতেও তার বাধে—এক ধরনের অবজ্ঞা ওর কথাবার্তায়, এবং এই যে ম্যান বলে ওকে সম্বোধন করছে, এটা ভীষণ অপমানের। এ-সব অবজ্ঞা ছোটবাবু গায়ে মাখে না। সে জানে, সেকেণ্ড এনজিনিয়ার এ-জাহাজে না থাকলে কাপ্তান অসহায় বোধ করবেন। কেউ এ-জাহাজে আসতে চায় না। ইচ্ছে থাকলেও কাপ্তান, একজন চিফ-এনজিনিয়ার জাহাজে এখন আর তুলে আনতে পারবেন না। টুয়েন্টি-ওয়ান বারি স্ট্রীট লণ্ডনে খবর গেলেও কিছু করা যাবে না। জাহাজের নাম শুনলেই সবাই সিক-লিভ নিয়ে বসে থাকবে। নামতে নামতে ছোটবাবুর এ-সব মনে হচ্ছিল। যত নিচে নেমে যাচ্ছিল তত দেখতে পাচ্ছে আর্চি টর্চটা হাতে দোলাচ্ছে। জ্যাকের সঙ্গে মিশতে বারণ করছে আর্চি। সে উত্তর দেয় নি। ওর হাতের টর্চ দুলছে তেমনি। সেই ঘণ্টা বাজানোর মতো। যেন ঘণ্টা দুলছে। আর্চিকে সেই জলদস্যুর মতো দেখাচ্ছে। ঘণ্টার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। হাতে তরবারী। ঠিক ঠিক জবাব না দিলেই ঘণ্টা তরবারির আঘাতে নামিয়ে দেবে। পাহাড় থেকে ঘণ্টাটা ছিটকে সমুদ্রের জলে পড়ে যাবে।

    ছোটবাবু শুধু অনুসরণ করছে। আর্চির পেছনে পেছনে যাচ্ছে। ওর নাকের কাছে আর্চির মাথা। গায়ে আর্চির সাদা বয়লার স্যুট, গলা থেকে পা পর্যন্ত একটাই পোশাক। ঢোলা। গত রাত্রে জ্যাকের সঙ্গে কিছু একটা মনোমালিন্য হতে পারে। আর্চি হয়তো ওকে পক্ষে টানতে চায়। আর্চিকে বলতে পারত, জ্যাক বুঝি এবার আপনার পেছনে লেগেছে! সে বলতে পারল না কারণ এত বড় কথা সে আর্চির মুখের ওপর বলতে সাহস পায় না। আর এত লম্বা কথা সে বলতে গেলে তোতলাতে থাকবে। সেজন্য সে কিছু না বলে চুপচাপ নেমে যেতে থাকল।

    আর্চি নিচে নেমে লগ-বুক খুলে কি দেখল। বোধ হয় ওকে সময় দিচ্ছে। ম্যান তুমি ভেবে দ্যাখো কার পক্ষ নেবে। ছোটবাবুর এমন মনে হতেই বলল, আমাকে ক্ষমা করবেন স্যার। কাল রাতে আমি ঠিক না বুঝে ছুটে গেছিলাম।

    আর্চি বুঝতে পারল না, এই নেটিভ-ইণ্ডিয়ানটি তাকে যথার্থ কি বলতে চায়। ছুটে গিয়ে তুমি ঠিক কর নি, সে বলতে পারত। কিন্তু এখন আর্চি বুঝতে পারছে, এ-সবের কোন দাম নেই। ম্যানের প্রতি জ্যাকের অনুরাগ—তাকে পাগলা করে দিচ্ছে। আর্চি আয়নায় দেখেছিল—তার যৌবন অটুট। সে এ-বয়সের মেয়েদের খেতে বেশী পছন্দ করে। এবং জ্যাকের বয়সের কিছু মেয়ে, যেমন জেনি, যেমন ওয়ালা মাত্র ফুটে ওঠা ফুলের কিছু মুখ পরপর চোখের ওপর ভেসে উঠতেই বুঝতে পারল, জ্যাককে তার ভীষণ দরকার। সমুদ্রে এখন জাহাজ ডুবি হলেও কিছু আসে যায় না। কাল হাতাহাতি করতে গিয়ে জ্যাকের আধ ফোটা স্তনে হাত লেগে গেছে। যতই শক্ত করে বেঁধে রাখুক, সে একেবারে নিশ্চিত হয়ে গেছে—জ্যাক মেয়ে। কাপ্তান এতগুলো ক্ষুধার্ত বাঘের মুখ থেকে তাঁর মেয়েকে রক্ষা করার একমাত্র এটাই উপায় ভেবেছেন।

    ছোটবাবু দেখল, ঠিক স্টাবোর্ড-সাইডের বয়লারের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে আর্চি। সে তার পেছনে দাঁড়িয়ে। যা বলবে, এখন তাকে তাই করতে হবে। কি করবে, সে বুঝতে পারছে না। ওপর থেকে ঝুরঝুর করে ছাই মাথায় মুখে পড়ছে। আর্চির মাথায় একটা গোলমতো টুপি। সে সাধারণত এ- ধরনের টুপি পরে না। কোথাও কোনো গোলমেলে কাজ থাকলে এটা পরে নেয় সে। সুতরাং ছোটবাবু বুঝতে পারছে, তাকে একেবারে খোলের নিচে নামিয়ে কিছু করাবে। নিচে নামতে সবার ভয়। জাহাজের জং-ধরা পাইপ, জং-ধরা স্কাম বকস জলের নিচে হয়তো বুক-সমান জলের নিচে রয়েছে। খুঁজে বের করতে হবে স্কাম-বকস। জলের নিচে ডুবে নাট-বোল্ট খুলে আনতে হবে। নতুবা এখানে আর্চির দাঁড়িয়ে থাকার কোন মানে হয় না।

    আর্চি টর্চ মেরে চারপাশটা দেখছে। ছোটবাবু এতদিন জাহাজে কাজ করেছে জানেই না, জাহাজের এমন একটা জায়গা স্টাবোর্ড-সাইডের বয়লারটা তার পেটের নিচে লুকিয়ে রেখেছে। সে দেখল, অনেক উঁচুতে বয়লারের পেট, গড়িয়ে ওপরে উঠে গেছে। ছাই জমে জমে বয়লারের প্লেটে একটা পলেস্তারা পড়ে গেছে। একটু নড়লেই কুয়াশার মতো ছাই—চারপাশে শুধু ছাই, কিছু ভাঙ্গা র‍্যাগ স্লাইস, ব্যালচে ডাঁই মারা এবং মনে হয় এখন এটা একটা বিরাট উই-এর ঢিবি।

    আর্চি তখন টর্চের আলো ঘুরিয়ে এনে ঢিবিটার ওপরে ফেলল। গলার স্বর ভীষণ ঠাণ্ডা। সে বলল, এগুলো স্টোক-হোলডে নিয়ে যাবে।

    ছোটবাবু হাত ঢুকিয়ে দিতেই ফুল-ঝুরির মত ছাই চারপাশে ফুর ফুর করে উড়তে থাকল। অর্থাৎ ছোটবাবু আর্চিকে যাবার পর্যন্ত সময় দেয় নি। সে হামলে প্রায় ফুটখানেক নিচ থেকে একটা ভাঙা ব্যালচে তুলে আনল। সঙ্গে সঙ্গে চারপাশের ছাই উড়ে উড়ে একেবারে জায়গাটা অন্ধকার হয়ে গেল। পেছনের দিকে দরজা ঠেলে দিতেই সে দেখল সারেঙ স্টোক-হোলডে দাঁড়িয়ে আছেন।

    সারেঙ সাব বুঝতে পারলেন ছেলেকে তার আর্চি অনর্থক অত্যাচার করছে। স্টিমের খুব একটা মারামারি নেই। দুজন ফায়ারম্যান নিয়ে সারেঙ নিজে এগিয়ে গেলেন—বললেন, তুই বেরিয়ে আয়। আমরা করে দিচ্ছি।

    ছোটবাবু বলল, না চাচা। এটা ঠিক হবে না। সে এসে যদি দেখে তোমরা আমার সঙ্গে হাত লাগিয়েছ তবে আরও ক্ষেপে যাবে। বলে সে নাকে মুখে রুমাল বেঁধে নিল। কেউ কিছু দেখতে পাচ্ছে না। সেই কুয়াশার মতো অন্ধকার কারো কথা কানেও যাচ্ছে না। কারণ এনজিনের অতিকায় ঝমঝম শব্দের সঙ্গে সে চিৎকার করে কথা বলছিল, আর ফুরফুর করে ছাই অনবরত শ্বাস প্রশ্বাসের সঙ্গে ফুসফুসে ঢুকছে বের হয়ে আসছে—সারেঙ বুঝতে পারলেন—এভাবে আর কিছুক্ষণ ভেতরে থাকলে শ্বাস বন্ধ হয়ে মরে যাবে ছেলেটা। তিনি তাড়াতাড়ি বালতি বালতি জল সেখানে ঢেলে দিলেন। দেখলেন, গুঁড়ো গুঁড়ো বৃষ্টির মতো ছাই ক্রমে হাওয়ায় থিতিয়ে আসছে। তখন এনজিনের দিক থেকে মাইজলা মিস্ত্রি এগিয়ে আসছে। রাগী চোখ। সারেঙ নিজেও এ-চোখকে সমীহ করেন। কারণ নলিতে মাইজলা মিস্ত্রি ভাল-মন্দ লিখবে—তারপর কেন জানি মনে হয় বয়েস হয়ে গেছে। সিউল-ব্যাঙ্ক জাহাজ থাকলে তিনি থাকবেন, না থাকলে তাঁকেও আর দশজন সারেঙের মতো মাথা নিচু করে রাখতে হবে—তিনি একেবারে পরোয়া না করে ছোটবাবুর সঙ্গে হাত লাগিয়ে কাজটা করে ফেললেন। এ-কাজগুলো সাধারণ কোলবয়দের কাজ। জল মেরে সারেঙ ঠিকঠাক করে দিলে তবে এ-সব টেনে বের করা যায়।

    আর্চির চোখ দুটো শয়তানের মতো ঘুরছে। ছোটবাবুকে জব্দ করার জন্য যেন পাষাণ ভার চাপিয়ে দেখা, কতটা সহ্য করার ক্ষমতা। ছোটবাবু কাজ সেরে যখন বের হতে যাবে, তখন ওকে আর চেনা যায় না। মুখে শরীরে শুধু ছাই আর ছাই, এরই ভেতরে চোখ দুটো লাল রক্তবর্ণ, তখনই ফের সেই ঠাণ্ডা গলা, ম্যান তুমি ভীষণ সাহসী। তুমি পারবে।

    তারপর ছোটবাবু দেখল সেই টর্চ ফের দুলছে। ঝড় উঠলে যেমন ঘণ্টাটা পাহাড়ের ওপর দুলে দুলে সতর্ক করে দিত, সামনে মৃত্যুর বিভীষিকা, এখনও সময় আছে কোর্স পাল্টে দাও, তেমনি টর্চ দোলাচ্ছে আর্চি।

    ছোটবাবু দাঁড়িয়ে থাকল। এই অকারণ টর্চার কেন যে করছে আৰ্চি!

    আর্চি কাছে এসে মুখ উঁচু করে দেখল ছোটবাবুকে। তারপর দু’ পাটির দাঁত শক্ত করে বলল, জ্যাক কিছু বলে নি!

    —না, বলে নি।

    আর্চি বিশ্বাস করতে পারল না। ম্যানের মুখে চুমো খেয়েছে জ্যাক। সে পোর্ট-হোলে দাঁড়িয়ে দেখেছে। না, ঠিক পোর্ট-হোল থেকে বললে ঠিক হবে না, আসলে সেও নেশার ঘোরে চুপি চুপি ডেকে বের হয়ে গেছিল এবং উইণ্ড-সেলের আড়াল থেকে দেখেছে, জ্যাক পাগলের মতো চুমো খাচ্ছে।

    সুতরাং ছোটবাবুর মুখ দেখেও আর্চি বিশ্বাস করতে পারল না, জ্যাক গত রাতের ঘটনা না বলে থাকবে। জ্যাক তার বাবাকে বলতে সাহস পাবে না, কারণ সে তাকে ভয় দেখিয়ে রেখেছে—কিন্তু ছোটবাবু। এবং যখন সে জ্যাককে টেনে নেবার চেষ্টা করেছিল কেবিনের ভেতরে তখন একমাত্র জ্যাক আর্ত গলায় ছোটবাবু, ছোটবাবু বলে চেঁচাচ্ছিল। এ-সব কারণে আর্চির ভেতরে রক্ত টগবগ করে ফুটছে। ক্রমশ এক বিদ্বেষ, ঈর্ষা ছোটবাবুর প্রতি। ছোটবাবুর চোখ রক্তবর্ণ, এবং এটা আর্চির কাছে শয়তানের চোখের মতো। সে না পেরে আবার টর্চ দোলাতে দোলাতে এক জায়গায় থামিয়ে দিল।—ওখানে। ওখানে নেমে যাও। হেল!

    ছোটবাবু ঠিক টর্চের আলোতে পায়ে পায়ে যেখানে গিয়ে দাঁড়াল সেটা সেই ঢিবির নিচে ভাঙ্গা লোহার একটা পাটাতন। একটা রোগা মানুষ ঢোকার মত ফাঁক রয়েছে। আর্চি আলো দুলিয়ে নিচে নামতে বলছে ছোটবাবুকে।

    ছোটবাবু প্রথম দুটো পা নামিয়ে দিল। সে ধীরে ধীরে দু’পা, তারপর ভাঙ্গা প্লেট বলে, ধারালো অংশে পা লেগে সামান্য কেটে যাচ্ছে—খুব সাবধানে সে জানে গোটা শরীরটা এই হোলের ভেতর দিয়ে নামিয়ে দিতে হবে। নিচে কি অন্ধকার! ঠিক হাতের কাছে একটা রবারের তারে মোড়া ল্যাম্প। সেটা নিয়ে ঠিক খাদের অতলে নেমে যাবার মতো। এবং কাপ্তানের কথা মনে হচ্ছে তার। উত্তেজিত হলে চলবে না। মাথা ঠাণ্ডা রেখে কাজ করে যেতে হবে—কারণ এ-দিকটায় আর বাতিল ব্যালেস্ট পাম্প জল তুলে ফেলতে পারছে না—ব্যালেস্ট-পাম্পের সমস্ত শক্তি নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে। তবু স্কাম- বকস যেন কত পুরাকালে এখানে কেউ এটা ফিট করে রেখে গেছে, তারপর আর মেরামত হয় নি। জাহাজের সব তেলকালি জল, পচা দুর্গন্ধ সব একাকার হয়ে জায়গাটা কৃমির বাসস্থানের মতো হয়ে আছে। ছোটবাবু কিছুটা নেমেই গলার কাছে আটকে গেল। প্রায় বঁড়শিতে ঝোলার মতো—ওর পা হাটু কোমর জলে ডুবে আছে। মুখটা কিছুতেই টেনে নামাতে পারছে না। গলার কাছে প্লেটে আটকে গেছে। আর্চির পায়ের ডগা ওর নাকের কাছে। মনে হচ্ছে ছোটবাবুর মাথা ভেতরে না ঢুকলে, মাথায় দু পা জড়ো করে উঠে দাঁড়াবে আর্চি। এবং তা হলেই হড়হড় করে নিচে ঢুকে যাবে মাথাটা।

    আবার নাকের ডগায় টর্চ দোলাতে থাকল। সেই এ্যাবট অফ এ্যাবটব্রথকের ঘণ্টা এবারে একেবারেই কেটে দেবে। তরবারীর মতো টর্চটা চোখের সামনে দুলছে। দুলতে দুলতে থেমে যাচ্ছে। তারপর চিৎকার, স্কাউন্ডেল।

    ছোটবাবু বুঝতে পারছে না, অকারণ ওকে স্কাউড্রেল বলছে কেন! সে তো অনেক চেষ্টা করেও মাথাটা গলাতে পারছে না। সে তো ইচ্ছে করে মাথা বের করে রাখেনি। মাথাটা ঢুকিয়ে নিতে পারলেই সে ডুবে ডুবে সেই স্কাম বকসটা খুঁজে বের করতে পারবে। তারপর ডুবে ডুবে নাট-বোল্ট খুলে স্কাম বকস খুলে ফেলবে। ভেতরটা পরিষ্কার করে ফেললেই ব্যালেস্ট পাম্প এদিকে এই বুকসমান উঁচু জলটা সমুদ্রে ফেলে দিতে পারবে। বন্দরের জন্য অপেক্ষা করতে হবে না। কিন্তু আর্চি যেভাবে গোয়ার্তুমি করছে সে যে এখন কি করে!

    তখনই আর্চি প্রায় নাকের ডগায় পা রেখে বলল, কি বলছি শুনতে পাচ্ছ?

    —না স্যার! আসলে তো ওকে কিছুই বলেনি এখনও।

    —জ্যাকের সঙ্গে মিশবে না।

    —মিশব না স্যার।

    —কথা বলবে না।

    —বলব না স্যার।

    —যা বলব ঠিক ঠিক তাই করবে।

    —করব স্যার।

    আর তখনই মাথাটা ঠিক কি করে যে হড়কে গেল। কানের নিচে সামান্য কেটে গেছে। জ্বলছে। পায়ের খানিকটা অংশ ছুলে গেছে। নোনা জল থাকায় ভীষণ জ্বলছে। সে এবার হাত বাড়িয়ে বলল, স্প্যানার হাতুড়ি দিন।

    আর্চি বলল, উঠে এস।

    কিন্তু স্যার? ছোটবাবু বাকিটা বলতে পারছে না। ঠিক আলাদিনের দৈত্যের মতো ওপরে বসে রয়েছে আর্চি। সে নিচে। তারের বাতিটা আর্চির হাতে। ওটা ধরে রাখলে, আর স্প্যানার দিলে সে ঠিক স্কামবকসটা খুঁজে বের করতে পারবে। যখন তখন নামা যাবে না। যখন নামা গেছে তখন কাজটা করে ফেলা দরকার। সে হাত দিয়ে জলে ঢেউ দিল। অন্ধকারে খোলের গায়ে জলের ঢেউ আছড়ে পড়ছে। সে উঠে দাঁড়ালে ঝুপ ঝুপ জলের শব্দ এবং জলে সাঁতার কাটলে যেমন জলের তরঙ্গ চারপাশে ঘুরে ঘুরে ছড়িয়ে যায়, এও ঠিক তেমনি। ছোটবাবু বুঝতেই পারছে না,, স্প্যানার হাতুড়ি আর্চি দিচ্ছে না। কেন। ওকে উঠে আসতে বলছে। ছোটবাবু ভাবল আর্চি আসলে মাথা খারাপ লোক। সিউলি-ব্যাংক জাহাজে যখন সে ছ’ নম্বর তখন সেকেণ্ড এনজিনিয়ারের নাট-বোল্ট একটু লুজ থাকবে সে আর বেশী কি। কথামতো সে না উঠলে আবার হয়তো মা-মাসী তুলে খিস্তি জুড়ে দেবে। সুতরাং সে প্রায় হামাগুড়ি দিয়ে মাথাটা কোন রকমে ওপরে গড়িয়ে দিল। তারপর একটা হাত, তারপর কাত হয়ে আর একটা হাত, এবং বুকসমান ওপরে উঠে এল প্রায়। সে তার শরীর এবার নিচে থেকে ওপরে তুলে অনতে পারল। জামা-প্যান্ট জবজবে ভিজে, নোংরা তেলকালি এবং জলে দুর্গন্ধময় শরীর। এখন সে ইচ্ছে করলেই ওপরে উঠে যেতে পারে না। আর্চি তারপর ফের কি বলবে, কে জানে!

    আর্চি বলল, ম্যান তোমার ছুটি!

    ছুটি! তাকে কি বলছে আর্চি! আর্চি সামান্য হাসল পর্যন্ত। আর্চির চোয়াল চৌকো এবং হাসলে দাবার ছকের মতো মুখটা মনে হয়—কোন ঘরে কি চাল আছে পাকা দাবাড় না হলে বোঝা মুশকিল। ছোটবাবু তো কিছুই বুঝছে না। সে দাঁড়িয়ে আছে। কারণ ছুটি বললেই ছুটি হয়ে যায় না, আসলে সে আবার একটা র‍্যাগিং-এর ভেতরে পড়ে গেছে। সেই টি এস ভদ্রা জাহাজে যেমন সিনিয়ার ট্রেনিজরা জুনিয়রদের ওপর অকারণ টরচার করত—এখানেও এই মেজ-মিস্ত্রি আর্চি তাকে নিয়ে যা খুশী করছে। সে জানত, কোনো নালিশ চলবে না।

    এবং সে এজন্যই ছুটি কথাটা বুঝতে পারেনি। ছুটি কথাটার যথার্থ মানে কি সে যেন ভুলে গেছে! এবং ওর মনে হচ্ছিল ছুটি বললেই সে দৌড়ে উঠে যাবে, আর তখন ধাঁই করে পাছায় লাথি মারবে আর্চি। সে উপুড়ে হয়ে পড়তে পারে ভয়ে, ছুটি বলা সত্ত্বেও দাঁড়িয়ে থাকল। মেজ-মিস্ত্রি ওর সামনে থেকে সরে না যাওয়া পর্যন্ত সে যাচ্ছে না। অথবা সে যখন দেখল মেজ-মিস্ত্রি কিছুতেই নড়ছে না, তখন পাশ কাটিয়ে, একেবারে এক দৌড়। এবং ঠিক ওপরে সিলেণ্ডারের সিঁড়িতে এসে থামল। একটু তেলজুট চেয়ে নিতে হবে। মুখে হাতে পিঠে সব কাদার মতো তেল-কালি। সে এই শরীরে এখন কারপেটের ওপর হেঁটে গেলে সব নোংরা হয়ে যাবে। সে কশপের কাছ থেকে বেশি করে তেলজুট নিয়ে নিল।

    তারপর যা হয়, সিলেণ্ডারে পাশে লম্বা লোহার জালি, জালিতে বসে ঘসে পা হাত মুখ সাফ করে ফেলল। নিচে বোধহয় আর্চির ওয়াচ শেষ। ফোর্থ নেমে আসছে। ফোর্থ নেমে এলেই আৰ্চি উঠে যাবে। আর্চির সঙ্গে আবার দেখা হবে ভাবতেই সে আর সেখানেও বসল না। একেবারে দু- লাফে ওপরে উঠে গেল। ওপরে উঠেই অবাক! পোর্ট-সাইডে ঠিক তিন নম্বর ফল্কার পাশে বড় বড় কাঠ এনে ফেলছে ডেক জাহাজিরা। লম্বা কাঠ চিরে ফেলা হচ্ছে। কেন এসব হচ্ছে ছোটবাবু বুঝতে পারছে না। মৈত্রদা অমিয় নেই। ওদের হয়তো এখন ওয়াচ। সে একটু এগিয়ে গেল। সে তাড়াতাড়ি মরা পাখিটাকে দেখবে বলে দু-লাফে ফল্কায় উঠে গেল। এবং পাখিটার পাশে দেখল, জ্যাক দাঁড়িয়ে। সে আর জ্যাকের সঙ্গে কথা বলতে পারে না। জ্যাক তবু ছোটবাবুকে দেখছে। আর্চি ছোটবাবুকে খোলের ভেতর ফের ঢুকিয়ে দিয়েছিল। কষ্টে জ্যাক তাকাতে আর সাহস পাচ্ছিল না। সে মাথা নিচু করে রেখেছে। পাখিটার পাশে দাঁড়িয়ে। সব কাজের যেন তদারক করার ভার তার ওপর – ছোটবাবুর দিকে তাকালেই সে নড়তে পারবে না। আর্চির কথা মনে হলে চোখে আগুন জ্বলতে থাকে—এখন সে সেজন্য হাই করে ডাকল, কার্পেন্টার

    কার্পেন্টার ছুটে আসছে।

    সে আবার ডাকছে, কশপ।

    ডেক-কশপ ছুটে আসছে।

    সে ডাকছে, সারেঙ।

    ডেক সারেঙ ছুটে এসে সালাম জানাচ্ছে।

    সে এমন কি তার বাবাকে টানতে টানতে নিয়ে এল। ডেবিড এবং রেডিও-অফিসার আরও যারা আছে তাদেরও ডেকে নিলে হয়—কারণ এখন একটা কফিন তৈরি হচ্ছে জাহাজে। বড় বড় ফালা কাঠে হাতুড়ি ঠুকছে, পেরেক মারছে কার্পেন্টার। আর সেই লেডি এ্যালবাট্রস উড়ছে। উড়ে উড়ে আসছে। জ্যাক সবাইকে ডাকছে। সে এই পাখির মায়ায় এবং এটা তো ঠিক, সবাই যদিও এখন আর প্রাচীন নাবিকের মতো সংস্কারে ভোগে না তবু কেন যে এটা ওদের বিশ্বাস করতে ভাল লাগে পৃথিবীতে সব নাবিকেরা মরে গিয়ে এ্যালবাট্রস পাখি হয়ে যায়। মরার পরেও সমুদ্রকে ওরা ভুলতে পারে না। সমুদ্রের জন্য তাদের ভীষণ মায়া। তখন তারা পৃথিবীতে আবার এ্যালবাট্রস হয়ে ফিরে আসে। সমুদ্রে উড়ে উড়ে বেড়ায়। তাদের কোন অনিষ্ট করা জাহাজি মানুষের পক্ষে ঠিক না।

    কেউ কেউ সামনে না হলেও গোপনে মেজ-মালোম ডেবিডকে যে ধিক্কার না দিচ্ছে তা নয়। আর এটা হয়তো কাপ্তানের ছেলেটা বুঝতে পেরে ঠিক সুমদ্রে একজন মৃত নাবিকের প্রতি যেমন সম্মান দেখানো হয়,—তেমনি সম্মান—আর কত বড় পাখি—প্রায় দশ বারো ফুটের ডানা মেলে সে চিৎ হয়ে পড়ে আছে। জ্যাক ঠোঁট দিয়ে রক্ত ওগলাতে দেখেছে। তারপর চোখ দুটো অসহায়, কি যে অসহায়, পাখিটা জ্যাকের দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে ছিল মরে যাবার আগে। জ্যাকের মনে হয়েছিল তেষ্টা পেয়েছে। যেমন মানুষ মৃত্যুর আগে ভীষণ তৃষ্ণার্ত বোধ করে। পাখিটাও হয়তো ওর দিকে করুণ চোখে একটু জলপানের নিমিত্ত তাকিয়ে আছে—সে ছুটে গিয়ে জল এনেছিল। জল খেতে দিয়েছিল। আশ্চর্য পাখিটা প্রায় বুক ভরে জল তেষ্টা নিবারণ করতে করতে চোখ বুজে ফেলেছিল।

    জ্যাক শুধু ছোটবাবুকে বলেছিল, তুমি স্নান করে এস ছোটবাবু। ভাল প্যান্ট-জামা পরবে। ছোটবাবু কিছু বলল না। সে কথা না বললেই হ’ল। জ্যাক যা বলেছে এখন তাকে তাই করতে হবে। সে কেবিনে চলে গেল স্নান করবে বলে। তারপর সারাদিন ছুটি। অন্য সময় হলে সে জ্যাককে বলত, আমার সারাদিন ছুটি। আর্চি ভীষণ খুশি আমার কাজে। আমাকে সে ছুটি দিয়েছে জ্যাক। কিন্তু সে যখন কথা দিয়েছে আর্চিকে, তখন আর কিছু বলা যায় না। না হলে যেন বলা যেত, তোমার দুটো একটা বই জ্যাক আমাকে দেবে। সারাদিন বাংকে শুয়ে আজ শুধু বই পড়ব।

    পাখিটার মৃত্যুর পর ডেবিডেরও খারাপ লাগছিল। যত না এই পাখিটার জন্য তার চেয়ে বেশি লেডি এ্যালবাট্রসের জন্য। কারণ লেডি এ্যালবাট্রস এখন সমুদ্রে একা। এবির মতো নিঃসঙ্গ। এবির কাতর চোখমুখ এখন যেন তাড়া করছে। সে একেবারে পাটভাঙ্গা ইউনিফরম পরে এসেছে।

    এবং এভাবে প্রায় সব নাবিকেরা এখন গোল হয়ে দাঁড়িয়েছে পাখিটার চারপাশে। কাপ্তান কি ভেবে বাইবেল এনেছেন সঙ্গে। এনজিন-সারেঙ কোরাণশরিফ। বাইবেল থেকে কাপ্তান বেশ সুর করে দুটো একটা স্তবক—অর্থাৎ মৃত্যু জীব মাত্রেই শেষ কথা নয়, ঈশ্বরের দুটো একটা বাণী এমনভাবে পড়ে শুনিয়ে গেলেন। কোরাণশরিফ থেকে দুটো সুরা পড়ে গেলেন সারেঙ এবং সবই মৃত্যু সম্পর্কিত কথাবার্তা। দেখলে মনে হবে এই বিশাল সমুদ্রে তারা সত্যি সত্যি একজন মৃত নাবিককে সুমদ্রে সমাধিস্থ করছে। আর্চি দু-বার এদিকটায় এসেছিল, সে এসব দেখে ভীষণ ছেলেমানুষী ভেবেছে। জ্যাকের শরীরের প্রতি তার লোভ ভীষণ। সেও বেশ সেজে-গুজে মাথায় তার জাহাজি টুপি, পায়ে সাদা জুতো, সাদা মোজা একেবারে সব সাদা ইউনিফরমে জ্যাকের পাশে দাঁড়িয়ে গেল।

    জ্যাক এত নিবিষ্ট যে কে তার পাশে কিভাবে দাঁড়িয়েছে খেয়াল নেই। সবার সঙ্গে সে পাখির ডানা ধরে কাঠের বাকসোতে শুইয়ে দিল। পেরেক মেরে সে নিজেই ঢাকনা বন্ধ করে দিল। কাপ্তান ঘুরে-ফিরে তদারক করার মতো কাজটা দেখছেন। কাঠ একটু বেশি বের হয়ে থাকলে কার্পেন্টারকে ডেকে কাঠ কেটে দিতে বলছেন।

    এনজিন-সারেঙ কেমন মুহ্যমান পাখিটার মৃত্যুতে। তিনি পর পর সব বেছে বেছে সুরা আবৃত্তি করে যাচ্ছেন। যেমন বলছেন—যদি আল্লাহ তোমাদের সাহায্য করেন, তবে এমন কেউ নেই যে তোমাদের পরাভূত করতে পারে; আর তিনি যদি তোমাদের পরিত্যাগ করেন তবে কে আছে যে তোমাদের সাহায্য করতে পারে। আর আল্লার ওপরেই বিশ্বাসীদের নির্ভর করা উচিত।

    এনজিন-সারেঙ নিবিষ্ট মনে সুর ধরে পড়ে যাচ্ছেন। জাহাজ চলছে না এখন। জাহাজ সমুদ্রে থেমে আছে। সবকিছু কেমন স্থির অবিচল, কেবল পাখিটা বাদে। ঘুরে ঘুরে কখনও একেবারে মাথার ওপর উড়ে আসছে সে। সে দেখছে তার সঙ্গী পুরুষ পাখিটা আর ডেকে নেই। নাবিকেরা তাকে কোথায় লুকিয়ে রেখেছে। তবু সে মাথার ওপর এই ত্রিশ চল্লিশ ফুট ওপরে উড়ছে। উড়ে উড়ে অনেক নিচে নেমে আসছে। এবং পাখিটাই এখন শোকার্ত মানুষের মতো মৃত্যুর আবাহাওয়া তৈরি করছে। তখন সারেঙ বলে যাচ্ছেন। সবাই মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। তিনি বলছেন, প্রত্যেক প্রাণ মৃত্যু আস্বাদন করবে। আর তোমাদের প্রাপ্য যা তাই তোমাদের দেওয়া হবে পুনরুত্থানের দিনে। তখন বহুদূর যে অবস্থান করবে আগুন থেকে আর প্রবিষ্ট হবে উদ্যানে নিঃসন্দেহে সে সফলকাম।

    তারপর তিনি বললেন, হে আমাদের পালনকর্তা সন্দেহ নেই যাকে তুমি আগুনে প্রবিষ্ট করাও তাকে তুমি প্রকৃতই লাঞ্ছিত করেছ। আর যারা অন্যায়কারী তাদের সহায় কেউ থাকে না।

    আর্চি আড়চোখে দেখছে জ্যাকেেক। এখন বুঝতে অসুবিধা হয় না জ্যাকের স্তন উঁচু বলেই বুকের কাছটা বেমানান। শরীর জ্যাকের ঠিক রোগা বলা যায় না, যা আছে সবই ঠিক ঠিক মতো! সে এসবের ভেতরও জ্যাকের শরীর দেখতে দেখতে কেমন লোভী চতুর হয়ে যাচ্ছে। সারেঙ-এর শেষ কথা, সে যেন শুনতে পাচ্ছে না–আর যারা অন্যায়কারী তাদের সহায় কেউ থাকে না—সারেঙ এত সব কি বিড় বিড় করে কথা বলছেন বলে আর্চি কিছুটা বিরক্ত। সে এ-সময় একটা চুরুট ধরাতে পারলে বেঁচে যেত।

    চিফ-অফিসার, রেডিও-অফিসার পাঁচ নম্বর এনজিনিয়ার মাথার দিকটায়। নিচের দিকে কাপ্তান, জ্যাক। আর্চি এনজিন-সারেঙ দু’পাশে আর সব জাহাজিরা। ছোটবাবু একপাশে সবার ভেতরে। সে একটু সবার আড়ালে পড়ে গেছে।

    এবার কাপ্তান পড়ে শোনালেন—যীশুখৃষ্টের জন্ম এইভাবে হইয়াছিল। তাঁহার মতা মরিয়ম যোসেফের প্রতি বাগদত্তা হইলে তাঁহাদের সহবাসের পূর্বে জানা গেল তাঁহার গর্ভ হইয়াছে—পবিত্র আত্মা হইতে। আর তাঁহার স্বামী যোসেফ ধার্মিক হওয়াতে ও তাঁহাকে সাধারণের কাছে নিন্দার পাত্র করিতে ইচ্ছা না করাতে, গোপনে ত্যাগ করিবার মানস করিলেন। তিনি এই সকল ভাবিতেছেন, এমন সময় দেখ, প্রভুর এক দূত স্বপ্নে তাঁহাকে দর্শন দিয়া কহিলেন, তোমার স্ত্রী মরিয়মকে গ্রহণ করিতে ভয় করিও না। কেননা তাহার গর্ভে যাহা জন্মিয়াছে, তাহা পবিত্র আত্মা হইতে আসিয়াছে। আর তিনি পুত্র প্রসব করিবেন, কারণ তিনিই আপন প্রজাদিগকে তাহাদের পাপ হইতে ত্রাণ করিবেন। আর তাঁহার না রাখা যাইবে ইম্মানুয়েল। অনুবাদ করিলে ইহার অর্থ দাঁড়াল আমাদের সহিত ঈশ্বর।

    জ্যাক তখনই কেন জানি ছোটবাবুর জন্য মনে মনে অধীর হয়ে উঠল। ছোটবাবু এখনও আসছে না। আসলে ছোটবাবু জাহাজিদের পিছনে দাঁড়িয়ে আছে। জ্যাক বুঝতে পারেনি। সে বলল, সবাই এসেছে বাবা?

    কাপ্তান বের হয়ে এলেন ভিড়ের ভেতর থেকে। সঙ্গে এনজিন-সারেঙ। চিফ-অফিসার ঘুরে ঘুরে দেখলেন। সবাই এসেছে। জ্যাক নিজে বের হয়ে যখন দেখল ছোটবাবু আছে, তখন আর কে এল না এল যেন আসে যায় না। এবারে ওরা একজন নাবিকের সলিলসমাধির মতো কফিনটাকে সবাই ধরে জলে ফেলে দিল। সঙ্গে সঙ্গে জাহাজের প্রপেলার ঘুরে গেল। তিনবার সমুদ্রের বুকে চিমনি থেকে সাইরেনের আওয়াজ—ক্রমে সেই কফিন বড় বড় পাথর সহ সমুদ্রের অতলে ডুবে গেল।

    জ্যাক রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে থাকল।

    যতদূর দেখা যায় জ্যাক রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে দেখল।

    এখন বোঝাই যায় না কোথায় সেই পাখির মৃতদেহ ফেলে দেওয়া হয়েছে। সমুদ্র আবার আগের মতো নিরিবিলি। একটা অতীব পাপের কথা মনে হল জ্যাকের। চারপাশের কত কিছু ঘটনা জাহাজটাকে যে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে! সে চোখ তুলে ছোটবাবুকে খোঁজার সময় দেখল, বোট-ডেক খালি। আর্চি এখন বোট-ডেকে দাঁড়িয়ে। যেখানে ছোটবাবু দাঁড়াত, ডেবিড ছোটবাবুর সঙ্গে বসে গল্প করত, আর্চি সেখানে দাঁড়িয়ে দূরবীনে লেডি-এ্যালবাট্রসকে দেখছে। ডেকে কজন জাহাজি। ওরা কাজ করছে। দড়িদড়া গোছাচ্ছে। আর কেউ নেই। বোট-ডেকে আর্চিকে দেখে সে সিঁড়ি ধরে উঠে গেল না। নিচে এলি- ওয়ে ধরে ছোটবাবুর কেবিনের পাশে গিয়ে দাঁড়াল। ভেতর থেকে দরজা বন্ধ। সে ডাকল, ছোটবাবু।

    কোন জবাব নেই।

    সে সন্তর্পণে ডাকল, ছোটবাবু, আমি জ্যাক

    ছোটবাবু ভেতরে পোর্ট-হোলে দাঁড়িয়ে আছে।

    জ্যাক ডাকল, ছোটবাবু তুমি ঘুমোচ্ছ?

    ছোটবাবু দরজা খুলে দিচ্ছে না। ছোটবাবু বোধহয় অসময়ে ঘুমোচ্ছে। কিন্তু আর্চি ওকে ঘুমোতে দেখলে ভীষণ একটা কেলেঙ্কারী করবে। সে দৌড়ে বাইরে বের হয়ে পোর্টহোলে উঁকি মারল। ছোটবাবু ঘুমোয়নি। পোর্ট-হোলে দাঁড়িয়ে আছে চুপচাপ

    জ্যাক বলল, তুমি সাড়া দিচ্ছ না কেন?

    ছোটবাবু বলল, আর্চি বারণ করেছে।

    —বারণ করেছে মানে!

    —তোমার সঙ্গে কথা বলতে বারণ করেছে। কথা বললেই খোলের ভেতর টেনে নিয়ে যাবে বলেছে।

    জ্যাক মাথা নিচু করে চলে যাচ্ছিল।

    ছোটবাবু জ্যাককে এভাবে চলে যেতে দেখে কেমন ঘাবড়ে গেল। জ্যাক রেগে গেলেও সে মুশকিলে পড়ে যাবে। এমন একটা অসহায় অবস্থা কি করে বোঝাবে জ্যাককে! সে ডাকল, জ্যাক শোন!

    জ্যাক ফিরে এসে বলল, আমাকে কিছু বলবে?

    ছোটবাবু বলল, জ্যাক চুল বড় রাখলে তোমাকে দেখতে ভাল লাগে।

    জ্যাক বলল, তাই বুঝি

    —তোমাকে খুব সুন্দর দেখাচ্ছে।

    জ্যাক পরেছে খয়েরী রঙের ট্রাউজার। নানাবর্ণের কারুকার্যময় মীনাকরা সাদা জ্যাকেট। ওর চুল ঘাড়ের কাছে বেশ লম্বা হয়ে গেছে। বোধহয় আবার জাহাজে কাপ্তানকে দেখা যাবে খুঁজে বেড়াচ্ছেন জ্যাককে। হাতে কাঁচি। জ্যাকের চুল এভাবে ক্রমে গভীর নীল রঙের হয়ে গেলেই বুড়ো কাপ্তান কেন যে চিন্তায় পড়ে যান! এমন সুন্দর চুল কেটে ফেললে, জ্যাককে ভীষণ বাজে লাগে দেখতে। এবং এই যে জ্যাক দাঁড়িয়ে আছে ওর সামনে, কেমন মেয়েলি ধরনের চোখ-মুখ, দুবার চোখ তুলে ছোটবাবুকে দেখেই আবার বলছে, আমি যাই ছোটবাবু। চোখ নামিয়ে নিতে পারলে যেন বাঁচে।

    ছোটবাবু ভাবল, রাগ পড়েনি হয়তো। সে দেখেছে, জ্যাককে সুন্দর বললে ভীষণ খুশি হয়! এখন সে জ্যাককে খোসামোদ করছে। আর কিভাবে কি করা যায় সে বুঝতে পারছে না। সে বলল, আমরা পালিয়ে কথা বলব জ্যাক। আর্চিকে দেখলেই আমরা কেউ কাউকে চিনতে পারব না, কেমন

    জ্যাক হেসে দিল। বড় কাতর হাসি। দু’গালে সেই হাসি একটা হাল্কা করুণ বিষণ্ণতা ছড়িয়ে দিয়ে গেল! সে বলল, তাই হবে ছোটবাবু। হয়তো জ্যাক আরও কিছু বলতে পারত, কি বলতে পারত অবশ্য জানে না। তবু জ্যাক নিজেকে ছোটবাবুর চেয়ে বেশি চালাক ভেবে থাকে। সে বলল, ছোটবাবু জাহাজে কাউকে বল না আর্চি কথা বলতে বারণ করেছে।

    —কি দরকার বলার!

    —তুমি যদি ডেবিডকে বলে দাও আবার…।

    —আরে না! তারপর একটু থেমে বলল, আচ্ছা জ্যাক, আর্চি কি টের পেয়েছে তুমি ওকে ফেলে দিয়েছিলে!

    —নাতো।

    —গত রাতে আর্চির পেছনে লাগতে গেছিলে কেন?

    —আর্চির পেছনে! বলে জ্যাক দু-হাতে এমন ভঙ্গী করল যে ছোটবাবুর মনে হল, আর্চিকে দেখলে এক্ষুনি কপালে ঢিল ছুঁড়ে মারবে জ্যাক। সে শেষে বলল, আমার ইচ্ছে। পোর্ট-হোলে সে আর এক দণ্ড দেরি করল না।

    তখনই আবার জ্যাকের কি যেন হয়ে যায়!

    আসলে জ্যাক, পুরুষ পাখিটার মৃত্যুতে ভারি কষ্টের ভেতর পড়ে গিয়েছে। ছোটবাবুর অসহায় মুখ দেখলে কষ্টটা আরও বাড়ে।

    সে ঘড়িতে দেখল দশটা বাজে। কেবিনে ঢুকে চুপচাপ বসে থাকবে ভাবল। জাহাজে সে ভীষণ বিপদের মুখে পড়ে গেছে। আর্চি তাকে ক্ষিপ্ত নেকড়ের মতো চোখে চোখে রাখছে। এবং তাকে কখনও কাছে সুযোগ মতো পেলেই হল! শিকার নিয়ে খেলার মতো বাঘটা তাকে নিয়ে খেলতে চাইবে।

    এবং এভাবেই সে সব বুঝতে পারে। অভিজ্ঞতা ক্রমে তাকে অনেক বেশি পরিণত করে দিয়েছে। বাবার কাছে বসে থাকলে সে নিরাপদ ভাবে। বাবার কাছে না থাকলে মনে হয় ফিকির খুঁজছে আর্চি আর এভাবে দুই প্রতিদ্বন্দ্বী। সে কেবিনে না ঢুকে সিঁড়ি ধরে ওপরে উঠতে থাকল। চার্টরুমের পাশ দিয়ে যাবার সময় নিচে দেখল না, কে আছে। আর্চি যে আছে সে না দেখেও বুঝতে পারে। লেডি এ্যালবাট্রসের ডানা ভেঙ্গে দেবার জন্য ওঁৎ পেতে বসে আছে।

    তখন ডেবিড কিছু ভেবে পাচ্ছিল না। চোখে ঘুম ঘুম ভাব। সকাল থেকে সে দু-চোখ এক করতে পারেনি। কোর্স-লে ভুল হওয়ায় মনটা ভাল ছিল না। এ্যালবাট্রসের মৃত্যুর পর মনটা আরও খারাপ ছিল। এবং যখন বাইবেল থেকে তিনি পড়ে শোনাচ্ছিলেন, তখন ডেবিড ভেবে পেল না, কাপ্তান মৃত্যু সম্পর্কিত দুটো একটা কথা বলেই খৃষ্টের জন্ম সম্পর্কে এতটা বিস্তারিত বক্তৃতা ঝাড়লেন কেন! আর বার বার বলছিলেন, ইম্মানুয়েল, আমাদের সহিত ঈশ্বর। আমাদের সহিত ঈশ্বর আছেন। তিনি আছেন বেশ, তাকে ফলাও করে এত বলার কি দরকার! অহেতুক এমন একটা শোকার্ত সময়ে আমাদের সহিত ঈশ্বর, বার বার বলার কি যে দরকার। কাপ্তান হিগিনস কি ঈশ্বরের ভরসায় এবার সমুদ্র সফরে বের হয়েছেন! ওরা জাহাজ ঠিকঠাক চালাতে না পারলেও তার ঈশ্বর অর্থাৎ আমাদের সহিত ঈশ্বর চালিয়ে নেবেন!

    যত এমন হচ্ছে তত ডেবিড সংশয়ের ভেতর পড়ে যাচ্ছিল। কাপ্তানের নিজের সাহসও ক্রমে কমে আসছে। অথচ জাহাজে তিনিই সবার ঈশ্বরের মতো। এবং এই প্রথম জাহাজে বোট-ড্রিল শুরু হয়েছে। প্রতি পনেরো দিন অন্তর নিজেদের সেফটির জন্য একবার অন্ততঃ বোট-ড্রিল যেখানে করার দরকার, সেখানে কাপ্তান মাসে দু’মাসে একবার করাতেন। আবার ছ’মাসও বন্ধ থাকত একনাগাড়ে। জাহাজ প্রশান্ত মহাসাগরে নেমে আসার পর কাপ্তান থার্ড-মেটকে ডেকে পাঠিয়েছেন। বলে দিয়েছেন, নিয়মিত বোট-ড্রিল হবে জাহাজে। সেফটির জন্য সব বোট তিনি নিজে দেখা-শোনা করেছেন। মাত্ৰ চারটা লাইফ-বোট। লাইফ-বয়া প্রতি তিনজনের জন্য একটা। আর প্রত্যেকের আছে একটা করে লাইফ- জ্যাকেট। জাহাজ ডুবি হলে এ-চারটা বোটই তাদের একমাত্র সম্বল।

    কাপ্তান বিশ্বাসই করতেন না, জাহাজ সিউল-ব্যাংক সমুদ্রে কখনও ডুবে যেতে পারে! না হলে ডেবিড যতবার জাহাজে এসেছে এই জাহাজে ততবার সে দেখেছে স্যালি হিগিনস এসব বোট-ফোটের পরোয়া করতেন না। রাজার মতো জাহাজ বন্দরে চালিয়ে নিতেন। সিউল-ব্যাংকের কিছু হতে পারে তিনি স্বপ্নেও ভাবতে পারতেন না।

    তাই স্যালি হিগিনসের এসব নির্দেশ ডেবিডকে ভয় পাইয়ে দিয়েছিল। গত রাতে যা সব ঘটল। এবং কোর্স-লে রহস্য নিয়ে কেউ ভাববার সময় পায়নি। এ্যালবাট্রসের মৃত্যু এবং জাহাজের ওপর একটা বিষণ্ণতা ঝুলেছিল বলে কেউ কিছু বলাবলি করেনি। আর জ্যাককে তো মোটামুটি সবাই সমীহ করে থাকে। সে যখন চায় এ্যালবাট্রস পাখিটার সমাধি হোক, তখন তারা এ-নিয়ে আর কথা বলতে পারে না। এ্যালবাট্রস হত্যার সময় কিছুই মনে হয়নি। কিন্তু সেই গোল হয়ে দাঁড়ানো, কফিনের ভেতর পুরে দেওয়া, ঠুকঠুক করে পেরেক মেরে দেওয়া, এ-সবের ভেতর প্রত্যেকের বোধহয় কোন প্রিয় স্মৃতি জড়িয়ে থাকে। এ্যালবাট্রসের সমুদ্রে সমাধি প্রকৃত একজন জাহাজির সমুদ্রে সমাধি হচ্ছে এমন মনে হয়েছিল সবার। তারা একটা মৃত পাখির চারপাশে দাঁড়িয়ে আছে মনেই হয়নি। যেন কোন প্রিয়জনের কফিনের পাশে দাঁড়িয়ে তারা ঈশ্বরের কাছে মৃত আত্মার শান্তি কামনা করছিল।

    ডেবিড এসব ভেবে পাশ ফিরে শুল। বারোটায় লাঞ্চ। সে এখন একটু গড়িয়ে নিতে চায়। বিকেলে বারোটা-চারটায় তার ফের ওয়াচ। জাহাজ বন্দরে না যাওয়া পর্যন্ত এভাবে চলবে। সামান্য গড়িয়ে নিতে পারলেই সব ফের ঠিক হয়ে যাবে ভেবেছিল। কিন্তু ঘুম কিছুতেই আসছে না। কাপ্তানের কাজ- কর্ম সবই কেমন ক্রমে সংশয়ের ভেতর ফেলে দিচ্ছে তাকে।

    আর তখন চুপি চুপি অমিয় পা টিপে টিপে ছোটবাবুর কেবিনের পাশে এসে সন্তর্পণে ডাকল, ছোট দরজা খোল।

    ছোটবাবু তড়াক করে লাফিয়ে উঠে পড়ল ব্যাংক থেকে। দরজা খুলে তাড়াতাড়ি ওকে ঢুকিয়ে দরজা বন্ধ করে দিল। কে কোথায় দেখে ফেলবে! সে বলল, কি ব্যাপার!

    —বলছি। বলে অমিয় ছোটর কেবিনটা দেখল। ভারি মনোরম লাগছে। কি ঝকঝকে সব কিছু। নিচে কার্পেট পাতা। দুটো দু’পাশে বড় বড় কাঠের বাংক। সে রং করে যাবার পর আর আসেনি। ছোটবাবুর বিছানা ধবধবে সাদা। একটু গড়িয়ে নিতে ইচ্ছে করছে। দেয়ালে ওর মায়ের ছবি। একটা ক্যালেণ্ডার। তার পাতায় তারিখের ওপর ক্রস টানা। একটা করে দিন যাচ্ছে, ছোটবাবু দিনটার ওপর ক্রস টেনে দিচ্ছে। সে সব দেখতে দেখতে বলল, তোকে একবার ফোকসালে যেতে হবে ছোটবাবু।

    ছোটবাবু বলল, কেন কি হয়েছে?

    অমিয় বলল, মৈত্রকে নিয়ে আর পারা যাচ্ছে না।

    —ঝগড়া বাঁধিয়েছিস ফের?

    —ধুস, ঝগড়া করতে যাব কেন। ও বেটা মরবে।

    —কি বলছিস যা তা!

    অমিয় ফিসফিস করে বলল, সত্যি বলছি। এভাবে থাকলে ও ঠিক মরবে। বললাম মেজ-মালোমের কাছে যেতে। কিছুতেই যাচ্ছে না। দিনরাত যন্ত্রণায় কষ্ট পাচ্ছে। জ্বর ভীষণ। এই নিয়েই ওয়াচ করছে। চোখ মুখ লাল! কেবল পালিয়ে থাকছে। আলোতে বের হচ্ছে না। নিচে স্টক-হোলডে জবুথবু হয়ে বসে থাকে। কথা বলে না।

    —কি হয়েছে বলবি তো!

    —আর কি হবে? বললাম ছোটকে অন্তত বলি। তেড়ে এল। ছোটকে বলে কি হবে! ও হারামজাদা মানুষ নাকি। ওতো নিজেই অমানুষ। ওকে মেজ-মিস্ত্রি যা না তা করাচ্ছে। মুখ বুজে সহ্য করে যাচ্ছে। বোধ বাস্যি থাকলে কেউ এভাবে সহ্য করতে পারে না!

    ছোটবাবু হাসল। বলল, আমার জন্য মৈত্রদাকে মাথা গরম করতে বারণ করবি। কিন্তু কি হয়েছে বলবি তো!

    অমিয়, পৃথিবীর কেউ যেন আর শুনতে না পায়, এত আস্তে কি যে সব বলল। তারপর বলল, আমাকে শাসিয়েছে। বলেছে, যদি দু-কান হয় তবে সে আমাকে খুন করবে।

    ছোটবাবুর মুখ ভীষণ চিন্তিত দেখাল। সে বুঝতে পারল, এসব দু-কান হলে মৈত্রদাকে জাহাজ থেকে নামিয়ে দেবে। নামিয়ে দিলেই খুব অর্থাভাবে পড়ে যাবে। শেফালী বৌদির জন্য ওর অনেক টাকার দরকার। কফিনটাকে যখন সমুদ্রে ফেলে দেওয়া হয় তখন মৈত্রদা ছিল না। সে বোধহয় আসেনি। এলে ভাল করে দেখা যেত। ছোটবাবু কি ভেবে বলল, গিয়ে কিছু বললেই তো খেপে যাবে।

    —তুই ওর কপালে হাত দিয়ে দেখবি। তুই ওর চোখ মুখ দেখেই টের পেয়েছিস এমনভাবে বলবি—ওর গোঁয়ার্তুমি ভাল লাগছে না। এক ফোকসালে থাকি, আমার ভয় করছে।

    ছোটবাবু বলল, মেয়েটা ওকে কতভাবে বারণ করেছে। শুনল না।

    —নে, এখন মর। বলছে, তাহিতিতে নেমে ডাক্তার দেখাবে। পেনিসিলিন নেবে। নিলেই ঠিক হয়ে যাবে। আর কটা দিন তো।

    ছোটবাবু বলল, লাঞ্চের পর যাব। আর্চি তখন খেয়ে ঘুমোয়।

    অমিয় দরজা খুলে মুখ বার করল সামান্য! কোনো অফিসার এনজিনিয়ার এদিকে আসছে কিনা দেখল। না কেউ আসছে না। সে বের হয়েই পোর্ট-সাইডের গ্যাংওয়ের দিকে চলে গেল। দেখলে মনে হবে, সে এনজিন-রুম থেকে উঠে ডেকে হেঁটে যাচ্ছে। ছোটবাবুর কেবিন থেকে বের হয়ে আসছে সে কাউকে বুঝতেই দিল না।

    বিকেলে ছোটবাবুও এভাবে গোপনে মৈত্রদার ফোকসাল থেকে বের হয়ে এসেছিল। যেন সে স্টিয়ারিং এনজিনের পেনিয়ান মেরামত করে উঠে আসছে। সে ভাণ্ডারিজ্যাঠাকে বলল, জ্যাঠা তোমাদের ছেড়ে থাকতে ভাল লাগছে না। আর তখনই এনজিন-সারেঙ ডেক-সারেঙ ডেকের ওপর চিৎকার চেঁচামেচি লাগিয়েছে। সবাই যে যার ফোকসাল থেকে বের হয়ে আসছে। অনেক দূরে দিগন্তে কি দেখে সবাই আঁৎকে উঠছে। কি যে আসছে সব মেঘের মতো! কুণ্ডলি পাকিয়ে ক্রমে কখনও সারা আকাশ জুড়ে পঙ্গপালের মতো অজস্র কালো বিন্দু বিন্দু। আবার এক হয়ে যেন ঝড় অথবা বনের হরিৎবর্ণ পাতারা উড়ে উড়ে এদিকে চলে আসছে। ব্রীজে সব অফিসাররা দূরবীন চোখে দেখছে। লেডি এ্যালবাট্রসকে জাহাজের চারপাশে অথবা দিগন্তের কাছাকাছি কোথাও দেখা যাচ্ছে না! এখন যা দেখা যাচ্ছে নির্মল আকাশের নিচে সেই অদ্ভুত এক চিরহরিৎবর্ণের গাছের শাখা-প্রশাখা একত্র ডাই মেরে যেন উড়ে আসছে। অথবা কখনও ভয়ংকর ক্রুব্ধ। মেঘের মতো তাদের ধাবমান শব্দ এবং ডেকের, ব্রীজে যে যেখানে ছিল স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে গেল। সূর্য তখন আকাশের নিচে হেলে পড়েছে। সূর্যকে ঢেকে দিয়ে জাহাজের পেছনে পেছনে কালো ক্রুব্ধ অতিকায় কিছু এগিয়ে আসছে।

    এ-সবের ভেতর কেউ লক্ষ্য করছে না ফোর-মাস্টের নিচে জ্যাক দাঁড়িয়ে আছে। ওর পকেটে ছোট ছোট পাথর, লোহার টুকরো। সে দূর থেকে পাগলের মতো একের পর এক পাথর ছুঁড়ে যাচ্ছে! কোনোটা মাস্তুলের ডগায় লাগছে। কোনোটা লাগছে না। লাগলে ঠুং করে আওয়াজ হচ্ছে! এমন একটা ভয়ংকর বিপদের সামনে জাহাজ অথচ সে এতটুকু বিচলিত হচ্ছে না। সে ক্রমাগত পাথর ছুঁড়ে যাচ্ছে।

    আর ছোটবাবুর যেন এসবে আসে যায় না কিছু। সে কেবিনে ঢুকে দরজা বন্ধ করে শুয়ে পড়ল।

  • ছাব্বিশ

    ছাব্বিশ

    ।। ছাব্বিশ।।

    ওরা এভাবে সবাই ডেকের ওপর দাঁড়িয়েছিল!

    মাংকি-আয়ল্যাণ্ডে কাপ্তান, রেডিও-অফিসার, সেকেণ্ড-মেট। ব্রীজে চিফ-মেট, কোয়ার্টার-মাস্টার, থার্ড-মেট। কাপ্তান চোখ থেকে কিছুতেই দূরবীন নামাচ্ছেন না।

    সেকেণ্ড-মেট কিছু বুঝতে পারছে না। জাহাজের পেছনে অনেক দূরে, কত দূরে হবে বুঝতে পারছে না, প্রায় যেন দিগন্তের কাছাকাছি ভলকানিক ইরাপসান অথবা কালো ধোঁয়া ক্রমান্বয়ে কুণ্ডলি পাকিয়ে ওপরে উঠে আসছে।

    কাপ্তান বললেন, কি যে এগিয়ে আসছে?

    —দেখেছেন স্যার, কেমন ওটা এখন একেবেঁকে দিগন্তে সার সার সমান্তরাল রেখা হয়ে গেল! রেডিও-অফিসার বলল, ঠিক যেন কোন চিত্রকরের ছবি

    এবং এভাবে ওরা সেই দিগন্তে দেখতে পেল নানারকমের সব ছবি হয়ে যাচ্ছে। অতিকায় সব ছবি। কখনও একেবেঁকে ফুল লতা-পাতার মতো, কখনও ঘুরে ঘুরে জলস্তম্ভের মতো, কখনও উড়ে উড়ে বিন্দু বিন্দু আঙ্গুরগুচ্ছের মতো আকাশে ঝুলে পড়তে লাগল। তারপর ফের ছড়িয়ে পড়ল পেছনের আকাশে। এত দূরে যে দূরবীনে আসছে না। তবু ওরা যে এদিকে এগিয়ে আসছে এটা বোঝা যাচ্ছে। কারণ ক্রমশ ওদের এলোমেলোভাবে ছড়িয়ে আবার শৃঙ্খলাবদ্ধভাবে এগিয়ে আসার ভেতর মনে হচ্ছিল, মেঘেরা সজীব হয়ে গেছে। এবং যেমন খুশি আকাশের গায়ে চিত্রকরের মতো অতিকায় সব বর্ণাঢ্য ছবি এঁকে দিচ্ছে। আবার মনে হচ্ছিল, বড় মাঠে সেই সুন্দর বালিকারা যেমন দ্রুত প্যারেড করার সময় হাত-পা কখনও উঁচুতে কখনও নিচুতে আবার রাইট টার্ন, আবার লেফ্‌ট টার্ন, আবার ঝুঁকে বসে পড়া একসঙ্গে এবং একসঙ্গে উঠে দাঁড়ানো, অথবা দু’হাত ছড়িয়ে ডানা মেলে দেবার মতো ঘুরে ঘুরে ছবি হয়ে যাওয়ার মতো কোনো বড় মাঠে প্যারেড হচ্ছে। এত বড় আকাশটা ওদের যেন হাঁটা চলার জন্য। ঘুরে বেড়ানোর জন্য, কখনও পোশাক সবুজ বর্ণের মনে হয়, অথবা ঘন নীল রং-এর সমুদ্রে এসব দৃশ্য সবাইকে ক্রমে অস্থির করে তুলছে।

    তখনই সেকেন্ড-মেট বলল, স্যার বিন্দু বিন্দু কিছু একসঙ্গে জড় হয়ে এদিকে আসছে।

    —বিন্দু বিন্দু! কাপ্তান দূরবীন নামিয়ে চশমা রুমাল দিয়ে খুব করে মুছে নিলেন।

    —মনে হচ্ছে পাখির মতো।

    —পাখি! কাপ্তান অতীব আতঙ্কে প্রায় চিৎকার করে উঠলেন।

    তারপর কাপ্তানের মনে হল, তিনি জাহাজের রক্ষাকারী এবং সর্বময়, সুতরাং পাখির কথায় এভাবে ভেঙ্গে পড়া ঠিক না। এবং তিনি যে আতঙ্কে চিৎকার করে উঠেছিলেন ওটাও ভাল ভুল হয়ে গেছে। স্বাভাবিকভাবে কথাবার্তা বলা দরকার। তিনি বললেন, তবে ওরা আসছে?

    —হ্যাঁ, মনে হয় আসছে।

    —আসতে দাও।

    সেকেন্ড-মেট বলল, ওরা কেন আসছে?

    –বোধ হয় খাবারের সন্ধানে।

    সেকেন্ড-মেট এমন কথায় আশ্বস্ত হতে পারল না। এবং দেখল প্রায় দীর্ঘ এক অজগর সাপের মতো একটা গগনচুম্বী আঁকাবাঁকা কালো কিছু আকাশের গায়ে ঝুলে পড়ছে। মনে হচ্ছে বিশাল জলরাশির অতল থেকে ওরা দলে দলে একসঙ্গে ঝাঁকঝাঁক পাখি, একসঙ্গে জড় হয়ে ক্রমশ সমুদ্রে ছায়া বিস্তার করে উড়ে আসছে।

    ওরা দেখতে পেল ওটা ক্রমশ বিস্তার লাভ করছে সাপের ফণার মতো। অথবা ছাতার মতো অনেক ওপরে জাহাজটাকে ঢেকে দিচ্ছে।

    তখন সূর্য অস্ত যাচ্ছে। অন্ধকার সমুদ্র তারপর। রাতে ওরা কোথায় কি করবে কেউ বুঝতে পারছে না। পাখিগুলো যে ধূসর বর্ণ এটা টের পাচ্ছে তারা। দূরবীনে ওদের এখন পঙ্গপালের মতো লাগছে দেখতে। ওরা বুঝল, পাখিগুলো আকারে খুব ছোট। একসঙ্গে ঝাঁকে ঝাঁকে এই সব পাখিরা দল বেঁধে উড়তে ভালবাসে। সুতরাং এরা জাহাজের ওপর প্রায় একটা প্রকান্ড ছাতার সামিল। শুধু ধূসরবর্ণ, আর একসঙ্গে ওরা কলরব করছে বলে, ঝমঝম বৃষ্টিপাতের মতো শব্দ। ক্রমশ ছড়িয়ে পড়ছে, ছড়িয়ে পড়ছে। অনেক দূরে দিগন্তের কাছাকাছি সরু লম্বা লেজের মতো হয়ে গেছে ওদের শেষ প্রান্ত। একটা গোপন মৃত আগ্নেয়গিরির মুখ থেকে উঠে আসার মতো যখন গোটা ব্যাপারটা তখন কি করা যায়! জাহাজিরা কিছুই বুঝতে পারছে না। যে যার ফোকসাল থেকে উঠে এসে পিছিলে জড় হয়েছে। ওদের তীক্ষ্ণ শিস দেবার মতো শব্দে কানে তালা লেগে যাচ্ছে। জাহাজিরা পাগলের মতো ছোটাছুটি করছে। ডেক-সারেঙ বার বার ব্রীজের নিচে দাঁড়িয়ে এখন কি করণীয় নির্দেশ চাইছে। কিন্তু ব্রীজ থেকে কেউ নামছে না। কিছু তাকে বলছে না। এমন একটা দৃশ্যে সবাই কেমন হতবাক হয়ে গেছে।

    তখন একজন মাস্তুলের নিচে বলে উঠল, আমাদের পাপে এটা হয়েছে।

    —কে এভাবে চিৎকার করে! এনজিন-সারেঙ দৌড়ে গেল।

    –এটা কি এটা কি! বলেই সে তার হাত বাড়িয়ে দিল। সারেঙ দেখল, সামান্য মলমূত্র পাখির সে বলল, ভীষণ জ্বালা করছে সারেঙ-সাব।

    সঙ্গে সঙ্গে এই দু-এক ফোঁটা যারা ডেকে দাঁড়িয়েছিল তাদের শরীরে এসে পড়তে থাকল। প্ৰায় ফোসকা পড়ার মতো জ্বালা। এবং যারাই দাঁড়িয়েছিল তাদের শরীরে এক আধ ফোঁটা পড়ছে, পড়ছে তো পড়ছেই। আগুনে ছ্যাঁকা লাগলে যেমন শরীর জ্বালা করে তেমনি ছটফট করতে করতে সবাই সিঁড়ির নিচে দৌড়ে যেতে থাকল। চিফ-মেট ব্রীজ থেকে চোঙে জোর গলায় বলে যাচ্ছেন, জাহাজিরা ভেতরে ঢুকে পড়। কেউ বাইরে বের হবে না। আমাদের জাহাজে সেই সব বিষাক্ত পাখিরা উড়ে এসেছে। আমরা জানি না এদের হাত থেকে কি করে রেহাই পাব।

    দুটো একটা পাখি ততক্ষণে খুব নিচে নেমে এসেছে। এইসব হাজার হাজার পাখিদের এমন বীভৎস হাঁকডাক ভাবা যায় না। নিচে নেমে এলে জাহাজিরা দেখেছিল ওদরে চোখ রক্তবর্ণ। ঠোঁট সাদা, ডানা সবুজ রঙের, পেটের দিকটা একেবারে ধূসরবর্ণ। মলমূত্রে যাদের মুখ হাত-পা সামান্য বিবর্ণ হয়ে গেছে তারা বিছুটি শরীরে লাগালে যেমন দৌড়ে দৌড়ে জ্বালা নিবারণ করে, সেভাবে দৌড়ে দৌড়ে জ্বালা নিবারণ করছে।

    আর্চি বাহবা নেবার জন্যে বাইরে এসে যেই না দাঁড়িয়েছিল আর অমনি ওর মুখে সেই সব তরল পদার্থ এবং সে পাগল প্রায় এখন ছুটছে। জ্যাক ছিল চিফ-কুকের গ্যালির ছাদের নিচে। সে তখন ছুটছে ওপরে—চিফ-মেটের তখন সতর্ক কথাবার্তা, নিচে যে যেখানে আছে সবাইকে বলে দাও, ডেক ধরে কেউ যেন হেঁটে না যায়। এনজিন-জাহাজিদের জন্য টানেল পথ খুলে দেওয়া হোক।

    জাহাজে এখন অন্ধকার ক্রমে বসে যাচ্ছে, আর ব্রীজ থেকে চীফ-মেটের অসহায় গলা ভেসে আসছে। সেকেন্ড-মেট কোনরকমে হুমড়ি খেয়ে গড়িয়ে পড়ল নিচে, তারপর দু’হাত মুখের ওপর রেখে ভীতু কাপুরুষের মতো দৌড়ে পালাতে থাকল। কে কোথায় কিভাবে আছে দেখার সময় নেই।

    কেবল জ্যাক কিছুটা ছুটে এলি-ওয়েতে ঢুকেই ভাবল, ছোটবাবু-কোথায়!

    সে ফের ছোটবাবুর কেবিনের দিকে ছুটতে থাকল। ছোটবাবুর দরজা লক করা। আর্চি পাগলের মতো কেবিনে চিৎকার করছে। জ্বলে গেল বলছে, এবং যে যেখানে এভাবে মলমূত্রের ভেতর পড়ে গেছে তারা জ্বলে গেল বলছিল। অমিয়র হাতে, মজুমদারের কানের ওপর, ইয়াসিনের পায়ে, ডেক- কশপের বুকে, ডেক-সারেঙের গলায় এবং প্রায় সবাই এইসব ধূসরবর্ণ বিষাক্ত পাখিদের আক্রমণের ভেতর পড়ে গেছিল। কেবল বেঁচেছে যারা এনজিন রুমে তখন কয়লা মারছিল, যারা এনজিন রুমে ডিউটি দিচ্ছিল, আর যারা ব্রীজে কিংবা মাংকি-আয়ল্যান্ডে দাঁড়িয়ে দেখছিল, ওরা আসছে।

    আগেই সতর্ক করে দেওয়া দরকার ছিল। এইসব বিষাক্ত পাখিদের আক্রমণের ভেতর কোনো কোনো জাহাজ পড়ে থাকে, কাপ্তানের কাছে এমন খবর রয়েছে। ওরা কোথায় থাকে কোথায় কি ভাবে বসবাস করে কেউ হদিস করতে পারে না। প্রশান্ত মহাসাগরে এভাবে কোনো কোনো সময় দেখা গেছে, খুব ক্বচিৎ এটা ঘটে থাকে এবং অবিশ্বাস্য মনে হয়, তবু ঘটনা। যদিও এখন এটা ভেতরে ভেতরে সবার ধারণা ম্যান-এ্যালটাব্রসের মৃত্যু তাদের ভীষণ পাপের ভেতর ফেলে দিয়েছে। আর তাছাড়া তো প্রাচীন নাবিকদের মতো তাদের এখন তেমন সংস্কার নেই। তবু রাইম অফ দি এনসিয়েন্ট ম্যারিনারের কথা মনে হওয়া স্বাভাবিক। সে সময় এসব পাপবোধ ভীষণ কাজ করত। তখন জাহাজিরা সমুদ্র সম্পর্কে তেমন অভিজ্ঞ ছিল না। সমুদ্রের দ্রাঘিমা অক্ষাংশের খবর ছিল সামান্য। কোর্স-লে তৈরি করার ব্যাপারে ছিল অনভিজ্ঞ। ওরা সমুদ্রে সহজেই হারিয়ে যেতে পারে। কিন্তু ওসেনোগ্রাফি এখন একটা যদিও কঠিন বিষয় তবু প্রায় হাতের কব্জায় আছে সব কিছু। ওরা ম্যান এ্যালবাট্রসের মৃত্যুর জন্য এমন ঘটেছে জোর গলায় কেউ বলতে পারল না। কেবল কাপ্তান স্থির দাঁড়িয়ে আছেন। ব্রীজের কাছে তিনি দেখতে পাচ্ছেন, পাখিদের ডানা লেপ্টে যাচ্ছে। ওরা কাচের ওপর ধাক্কা খেয়ে নিচে পড়ে যাচ্ছে। একটা পাখি কি করে ভেতরে ঢুকে ডানা মেলে পড়ে গেল। আলো একদম সহ্য করতে পারছে না। প্রায় বাদুড়ের মতো দেখতে ওরা। ওদের ধরা ঠিক না। একটা স্টিক দিয়ে পাখিটাকে ঠেলে নিচে ফেলে দিতেই আর একটা এবং এভাবে ওরা ভীষণ আলোর ভেতর পড়ে কেমন দাপাতে থাকল। বেশি আলোতে ওরা দেখতে পায় না তবে! এবং সকালে সূর্য ওঠা পর্যন্ত জাহাজের এখন এভাবে অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় নেই।

    আর তখন জ্যাক প্রায় দরজা ভেঙ্গে ফেলার মতো অবস্থা করে ফেলেছে। ছোটবাবু ছুটি পেয়ে ঘুমোচ্ছিল। ওর ঘুম ভাঙলে মনে হল জাহাজে আগুন লাগলে যে যে শব্দ হাওয়ায় নাচতে থাকে সমস্ত জাহাজের চারপাশে তেমন সব বীভৎস শব্দ। আর দরজায় জ্যাকের গলা। এমন একটা দুঃসময়ে সে যে কেবিনে কি করে ঘুমিয়েছিল!

    সে দরজা খুলে ফেললে হুমড়ি খেয়ে ভেতরে এসে ছিটকে পড়ল জ্যাক। সে দেখল, জ্যাকের চোখ মুখ শুকনো।

    সে বলল, জ্যাক কি হয়েছে!

    শুকনো মুখে জ্যাক বলল, বিষাক্ত সব পাখিরা এসে জাহাজটাকে ঘিরে ফেলেছে। বাইরে একদম যাবে না।

    জ্যাক এখন ওপরে উঠতে পারছে না। এনজিন রুমে দ্রুত কয়লা হাঁকড়াচ্ছে জাহাজিরা। যত দ্রুত পারা যায়, এ সমুদ্র থেকে জাহাজ নিয়ে পালাতে চাইছে সবাই।

    জ্যাক ওপরে উঠলেই সেই বৃষ্টিপাতের মতো মলমূত্র এসে ওর মুখে শরীরে পড়তে পারে। সে একটা চাদর চেয়ে নিল ছোটবাবুর কাছ থেকে। সেটা মাথায় মুখে জড়িয়ে নিল। প্রায় যেন বোরখার মতো চাপিয়ে সিঁড়ি ধরে ওপরে উঠে যাচ্ছে। যাবার আগে ফের সাবধান করে দিল, সব জাহাজটাকে বিষাক্ত পাখিরা ঘিরে ফেলেছে। সমুদ্র দেখা যাচ্ছে না। আকাশ দেখা যাচ্ছে না। কুয়াশার ভেতর জাহাজ পড়ে গেলে যা হয়। সামনে পেছনে কেবল ওরা হাজার লক্ষ উড়ছে। আর জাহাজটা নোংরা করছে।

    এটা যে কি হয়ে গেল! সে একটু এগিয়ে গেল সামনে। ওদিকের এলি-ওয়েতে আলো জ্বলছে না। চারপাশে সব দরজা লক করে দেওয়া হয়েছে। এলি-ওয়েতে এখন কোনও পাখি আর ঢুকে পড়তে পারবে না। পাঁচ-নম্বর, তিন-নম্বর, ছোটবাবু, ডেবিড একসঙ্গে জটলা করছে। পাঁচ-নম্বর এতক্ষণ আর্চির ঘরে ছিল। সমস্ত মুখে আর্চির সে মলম লাগিয়ে দিয়েছে। ওপর থেকে কেউ আর নামতে পারছে না। ওর একবার আর্চিকে দেখে আসা দরকার। সে, ডেভিড, তিন নম্বর সবাই আর্চির কেবিনে ঢুকে গেল। ছোটবাবু বসল না। ওকে বসতে না বললে সে বসতে পারে না। জ্বালাটা বোধ হয় কমেছে। আর তখন ওপরে রেডিও-ট্রানসমিশান রুমে একের পর এক খবর ট্রানসমিট করে যাচ্ছে—জাহাজ সিউল-ব্যাঙ্ক কঠিন দুর্বিপাকে পড়ে গেছে। রেসকু আস, বলতে পারছে না। কাপ্তানের তেমন নির্দেশ নেই। তবু যা সব ঘটনা সে কাচের ভেতর দাঁড়িয়ে দেখেছে, ভাবতে পারে না, অজস্র পাখি জাহাজের মাস্তুলে দড়াদড়িতে জড়িয়ে একেবারে নিচে পড়ে যাচ্ছে এবং এভাবে যদি তিন-চার দিন চলে, দেখা যাবে সব মৃত পাখিদের ডাঁই এবং দুর্গন্ধ জাহাজে—ভীষণ অসুখে পড়ে যাবে সবাই অথবা মৃত পাখিরা এবং জীবিত পাখিরা মিলে কঠিন অসুখে ফেলে দেবে। ওরা কেউ নিস্তার পাবে না।

    তবুও যা ঘটনা তাই জানানো হল। বিষাক্ত পাখিদের মলমূত্রের ছিটেফোঁটা যাদের শরীরে পড়েছে, জ্বালা করছে ভীষণ। এবং জাহাজ ভিড়লে বোধ হয় চিকিৎসার ব্যবস্থা করা দরকার। কাল কি হবে আমরা বলতে পারছি না। পাখিগুলো এখনও জাহাজের চারপাশে রয়েছে। যেখানে যেভাবে পারছে ঠোকরাচ্ছে। আমরা কি করব বুঝে উঠতে পারছি না।

    কাপ্তান নিজেও চুপচাপ বসে নেই। তিনি চিফ-মেটকে নিয়ে সিঁড়ি ধরে নামছেন। শরীর মুখ ঢাকা। বনির কেবিন বন্ধ। তিনি ডাকলেন, বনি

    বনি বলল, ভেতরে বাবা।

    —বাইরে বের হবে না।

    –বের হচ্ছি না।

    তিনি তারপর আরও নিচে নেমে গেলেন। আর ভাবছিলেন, এরা কোত্থেকে এল! এমন পাখিদের আক্রমণে জাহাজ পড়বে ভাবতেও পারেন নি। গল্প গাঁথার মতো এসব খবর সমুদ্রে শুনেছেন। মনে হয়েছিল, যেমন সব জাহাজি গল্পে দিনকে রাত বানিয়ে ফেলতে পারে এও তেমনি। কিন্তু নিজে এমন ঘটনার সম্মুখীন হবেন, স্বপ্নেও ভাবতে পারেন নি। নিচে নেমে আর্চির কেবিনেই প্রথম ঢুকে দেখলেন, আর্চি শুয়ে আছে। কাঠপিঁপড়ের কামড়ের মতো মুখের দু-একটা জায়গা ফুলে গেছে। আসলে এটা এক ধরনের চুলকানি। ভীষণ, এবং জ্বালার মতো মনে হয়। অভয় দিয়ে বললেন, সকালে ঠিক হয়ে যাবে। আরও এভাবে সব ঘুরে ঘুরে দেখা। তারপর এনজিন রুমে নেমে টানেল-পথে ঢুকে গেলেন। প্রপেলার স্যাফটের গা ঘেঁষেঘেঁষে হেঁটে গেলেন। তারপর লম্বা খাড়া লোহার সিঁড়ি ওপরে উঠে গেছে। দু’পাশের দেয়াল থেকে কিছুটা হামাগুড়ি দিয়ে ওঠার মতো তিনি দ্রুত উঠে যেতে থাকলেন। মনেই হয় না বয়েস হয়েছে মানুষটার। লাফিয়ে লাফিয়ে এখন সিঁড়ি ভাঙছেন। স্টোররুমের পাশে এসে সিঁড়িটা থেমেছে। ঢাকনা খুলে খোলের ভেতর থেকে উঠে আসার মতো গলা বাড়ালেন ওপরে। চিফ-মেট একটা হাত ধরে প্রায় টেনে তুলে নিলে তিনি দেখলেন, সবাই ছুটে এসেছে। ডেক-সারেঙ সামনে দাঁড়িয়ে সালাম জানাচ্ছে। সবার ঘরে ঘরে উঁকি দিলেন। যেখানে যার ছিটেফোঁটা পড়েছে হাতে, পায়ে, তা দেখে বললেন, মাস্টার অয়েল লাগিয়ে দাও। ভয়ের কিছু নেই।

    তিনি অবশ্য জানেন না সত্যি কিসে কি নিরাময় হতে পারে। তবু একজন অভিজ্ঞ মানুষের মতো কথা বলে সবার সাহস ফিরিয়ে আনছেন। পাখিদের আর্ত চিৎকার চারপাশে। কান পাতা যাচ্ছিল না। সমুদ্রে শুধু অন্ধকার। জাহাজের আলো সব নিভিয়ে একবার দেখা যেতে পারে, ওরা কেবল আলোর দিকে ছুটে আসে কিনা। হাঁটতে হাঁটতে নানাভাবে উপায় খুঁজে বেড়াচ্ছেন। কিভাবে এদের সঙ্গে মোকাবিলা করে যাবেন। ফোকসাল থেকে নেমে যাবার আগে কি কি দরকার, সকাল না হলে যে কিছু ভাবা যাচ্ছে না—এসব মোটামুটি চিফ-মেটকে বুঝিয়ে ফের সেই ঢাকনার পাশে এসে দাঁড়ালেন। চিফ-মেট ডেক-সারেঙকে সব বুঝিয়ে দিল। এনজিন সারেঙ ঢাকনা খুলে দিয়েছে। কাপ্তান আবার নেমে যাচ্ছেন। টর্চ মেরে মেরে নামছেন

    সারা রাত জাহাজিদের মনে হল, আগুন লেগেছে জাহাজটাতে। এমন শব্দ চারপাশে। এইসব হাজার হাজার পাখির ডানায় কোনো বনাঞ্চলে অগ্নিকান্ডের মতো—সাঁই সাঁই আওয়াজ। ডানায় অজস্র ঝটপট শব্দ, এবং এক করুণ কলরব। এ-সবের ভেতর মনে হল, লেডি-এ্যালবাট্রস সমুদ্রে তোলপাড় করে বেড়াচ্ছে।

    ওরা পোর্ট-হোলে মুখ রেখে দেখল, এখানে-সেখানে সব পাখি। পাখিরা জাহাজের মাস্তুলে এবং দড়িদড়াতে আছড়ে পড়ছে, পাখির এমন নরম ডানা যখন, তখন এই জাহাজের চারপাশে উড়ে বেড়াবার কি যে অর্থ কেউ বুঝতে পারছে না। যত রাত বাড়ছে তত মনে হচ্ছে, অসহ্য। এভাবে চারপাশে পাখিরা মশার মতো বনবন করে ঝাঁকে ঝাঁকে উড়তে থাকলে ওরা নিশ্চিন্তে ঘুমায় কি করে! সবাই ডেবিডের ওপর ক্ষেপে যাচ্ছে। মৈত্র নিজের জ্বালায় বাঁচছে না। তার ওপর এই সব পাখিদের শিস দেওয়া ডাক, যেন হাজার লক্ষ শুশুক মাছ সমুদ্রে ডেকে বেড়াচ্ছে। ওরা ডাঙ্গার মানুষ, সমুদ্রে ওরা চিরদিন থাকে না, সবাই ভুলতে বসেছে।

    এবং এই নিয়েই মৈত্র, জব্বার এবং ইয়াসিন পিছিলে একটা দারুণ বিদ্রোহ গড়ে তুলতে পারে। আর ডেবিড বোধ হয় এটা আঁচও করেছিল মনে মনে ম্যান-এ্যালবাট্রসের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে—অর্থাৎ এক রাতও পার হয় নি, তখন কিনা এমন কঠিন সঙ্কট জাহাজের সামনে। বিষাক্ত পাখিরা এসে জাহাজে উপদ্রব আরম্ভ করে দিয়েছে। কাপ্তান ওকে যে-কোনো সময় ডেকে পাঠাতে পারেন—তাকে কৈফিয়ৎ দিতে হতে পারে। ম্যান-এ্যালবাট্রসের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে জাহাজে যখন একটা সত্যি অপরাধ ঘটে গেল—এবং তার প্রায়শ্চিত্ত পর্যন্ত আরম্ভ হয়ে গেছে তখন ডেবিডের কসুর কাপ্তান ক্ষমা করবেন না।

    ডেবিড ঐ সব ভাবছিল আর কেবিনে পায়চারি করছিল। সে এক জায়গায় স্থির হয়ে বসতে পারছে না। প্রথম প্রথম সে অপরাধের গুরুত্ব বুঝতে পারে নি। যত রাত বাড়ছে নিশীথে যত পাখিদের আক্রমণ বাড়ছে তত সে অস্থির হয়ে উঠছে। বিশেষ করে এদের ভেতর অসন্তোষ দেখা দিলে মারাত্মক কিছু একটা হয়ে যাবে। সে দরজা খুলে এলি-ওয়েতে প্রায় ছুটতে থাকল, ছোট, ছোট—ঘুমোলে!

    ছোট দরজা ফাঁক করে বলল, ঘুম আসে?

    —তা আসে না। কিন্তু! কেমন ভীত চোখ মুখ ডেবিডের।

    ছোট বলল, বোস।

    ডেবিড় ভীষণ ঘামছিল। সে বলল, ডেবিড কি হয়েছে?

    ডেবিড বলল, আমাকে কাপ্তান ঠিক এবারে ডাকবেন!

    —কেন ডাকবেন? কি করেছ?

    —ম্যান-এ্যালবাট্রস…সে বলতে পারল না আর।

    ছোটবাবু বুঝতে পারছে না। ম্যান-এ্যালবাট্রসের কথা বলছে কেন ডেবিড। সে বুঝতে না পারলে কোন প্রশ্ন করে না। তাকিয়ে থাকে শুধু।

    ডেবিড বলল, আমি মেরেছি!

    ছোটবাবু এবারে নিঃশ্বাস ফেলল স্বাভাবিকভাবে। বলল, তার জন্য কি হয়েছে।

    —যদি এ-জন্য হয়ে থাকে?

    —তুমি কি! কেউ আজকাল এ-সব বিশ্বাস করে?

    —কাপ্তান বুড়ো মানুষ তিনি…

    ছোটবাবু এখানেই ছোটবাবু! সে বলল, এ যুগে এ-সব অচল ডেবিড। তোমরা পুরোনো নাবিক, আমি নতুন। আমার তো কিছুই মনে হচ্ছে না।

    —নতুন বলেই হচ্ছে না। পুরোনো হলে তোমারও হত।

    —না, হত না। তুমি ডেবিড এত বুদ্ধিমান, তুমি ডেবিড কাপ্তানের সিউল-ব্যাংকে কাজ নিয়ে কতবার এসেছ, সিউল-ব্যাংকের ভবিষ্যত সম্পর্কে তুমি এতো জানো—আর তুমি এতে ঘাবড়ে গেলে!

    —যদি এরা বিদ্রোহ করে?

    —কারা তারা?

    –এই জব্বার, মৈত্র, এনজিন-সারেঙ…।

    —কেউ করবে না।

    —তুমি ঠিক বলছ?

    —ঠিক। বলে সে বলল, এস। ওরা বাইরে বের হয়ে গেল। ছোটবাবু নিজের কেবিনের দরজা লক করে দিল! সে এবং ডেবিড একসঙ্গে বের হয়ে দেখল, সবার দরজা লক করা ভেতর থেকে। কেউ বাইরে বের হচ্ছে না। ওরা দুজন ধীরে ধীরে হাঁটতে থাকল। আর বাইরে তেমনি পাখিদের ডানার শব্দ, যেন লকলক করে আগুন জ্বলছে—যেন বড় একটা গঞ্জ পুড়ে যাচ্ছে। বাতাসের সাঁই সাঁই শব্দ, এমন শব্দে মাথা সত্যি ঠিক রাখা যায় না। ছোটবাবুও পারত না। কিন্তু ছোটবাবু জানে সমুদ্র সফরে বের হলে এমন হামেশা হবে। এনজিন-সারেঙ তাকে এ-জন্য বার বার সিউল-ব্যাংকে কাজ নিতে বারণ করেছিলেন। যেন সিউল-ব্যাংকে কাজ নিয়ে উঠলেই সমুদ্রে জাহাজডুবির আশঙ্কা থাকে। সে এতটা ভেবে জাহাজে এসেছে। সুতরাং সে পাখিদের আক্রমণের ভেতর পড়ে ঘাবড়ে যাবার ছেলে নয়। অন্তত ডেবিডের সঙ্গে কথাবার্তায় এটাই এখন প্রমাণ করতে চাইছে।

    তা ছাড়া এমনই স্বভাব ছোটবাবুর। ডেবিড যখন ভয়ে কাহিল তখন সে একেবারে সোজা সরল, এবং যতটা সোজা সরল অথবা নির্ভয় মনে মনে, তার চেয়ে বেশি দেখানোর চেষ্টা। সে এমন কি লকার থেকে গ্লাস এবং বোতল বের করে নিজে সামান্য খেল, ডেবিডকে খেতে দিল। দেখে মনে হবে, ছোটবাবু এখন এ-জাহাজের সব চেয়ে সাহসী নাবিক

    ডেবিড গ্লাস নিয়ে প্রায় সবটা একসঙ্গে গলায় ঢেলে দিল। ওর এটা অনেক আগেই করা উচিত ছিল। তবে সে এতটা ভেঙ্গে পড়ত না। সে খুব ছেলেমানুষী করে ফেলেছে। সে আরও কিছুটা গলায় ঢেলে বলল, চল।

    —কোথায়?

    –ক্রুদের আস্তানায়।

    —এখন?

    —হ্যাঁ এক্ষুনি। তুমি একবার ওদের হাবভাব দেখে আঁচ করে আসবে।

    ছোটবাবু বুঝতে পারল ডেবিড এখনও নিশ্চিন্ত হতে পারছে না। সে বলল, চল।

    আর ছোটবাবুকে ফোকসালে এ-সময় ওরা পেয়ে কি যে করবে ভেবে পেল না। ওরা কেমন আছে জানতে এসেছে ছোটবাবু। মনু চা পর্যন্ত করে নিয়ে এল। সে বলতে পারল না ঢাকনার নিচে মেজ-মালোম বসে রয়েছে, বললে, ডেবিডকে অপমান করা হবে। কথা প্রসঙ্গে শেষ পর্যন্ত পাখিদের কথা উঠল। এবং অমিয় বলল, শালা শুঁয়োপোকার মত জ্বলছিল রে?

    ছোটবাবু বলল, মৈত্রদা চুপচাপ এত?

    —কিছু ভাল লাগছে না।

    —তাহিতিতে গেলেই সব ঠিক হয়ে যাবে।

    —আমাকে কিছু টাকা ধার দিবি ছোট?

    এত লোকের সামনে মৈত্রদার টাকা চাইতে এতটুকু সংকোচ হল না। ফের বলল, তুই তো অনেক টাকা পাবি। আমার কোম্পানীর ঘরে সামান্য পাওনা আছে।

    ছোটবাবু বুঝতে পারল মৈত্রদা আর সে মৈত্রদা নেই। কেমন ভীরু কাপুরুষ হয়ে গেছে। অসুখটার জন্য এমন হয়েছে হয়তো। ভালো হয়ে গেলে সব ঠিক হয়ে যাবে। আজকাল এ-অসুখের তেমন ভয় নেই সে শুনেছে। সে বলল, বাইরে এস।

    বাইরে এসে বলল, দেব। কাউকে বলবে না। যখন পারবে দেবে। তারপর ছোটবাবু বলল, যাচ্ছি। ওরা সঙ্গে আসতে চাইলে বলল, তোমরা যাও। নিচে ডেবিড বসে রয়েছে। তোমাদের দেখলে খুব অপ্রস্তুত হয়ে যাবে।

    এনজিন-সারেঙ বলল, মেজ-মালোমকে ডাকলি না কেন?

    ছোটবাবু বলল, ওই তো নিয়ে এল। তোমরা কেমন আছ আমাকে পাঠিয়ে খবর নিচ্ছে।

    ওরা সবাই মেজ-মালোমের তারিফ করল। দু-একজনের মনে যা-ও একটু আতঙ্ক ছিল, ম্যান- এ্যালবাট্রসের হত্যার জন্য তারা পাখিদের ক্ষোভে পড়ে গেছে, ডেবিড নিজে এসেছে শুনে তাও ভুলে গেল। বলল, ডাক না একবার।

    ছোটবাবু ঢাকনা খুলে ডাকল ডেবিডকে। বলল, ওপরে উঠে এস। কিছু ভাবনার নেই। সব ঠিক আছে।

    সে উঠে এসেই দেখল, সবাই খুব প্রীত এবং কথাবার্তায় একেবারে নিজের মানুষের মতো। ওদের কথাবার্তা সে বুঝতে পারে না। কিন্তু মুখ দেখে বুঝতে পারছে, পরিণামে জাহাজের যাই হোক তাকে দায়ী করে ওরা জাহাজে বিদ্রোহ করবে না। ওরা বন্দর-পেলে জাহাজ থেকে নেমে পড়বে না। ছোটবাবু ওদের কাছে যাদুকাঠির মতো। এবং সে-রাতেই, কারণ রাতে কেউ ঘুমোতে পারবে না জানত, ডেবিড আর একবার আর্চি কেমন আছে দেখতে গিয়ে সব বলে ফেলল। বলল, আর্চি, তুমি ছোটবাবুকে আর র‍্যাগিং করবে না। তোমাকে সাবধান করে দিচ্ছি। আজ যা দেখাল ছোটবাবু। এবং সে কথাপ্রসঙ্গে ছোটবাবু এদের কতো নিজের মানুষ, সে ইচ্ছে করলে আর্চিকে নাকের জলে চোখের জলে এক করে ফেলতে পারে তাও বলল।

    এবং ডেবিডের এভাবে যে কি হয়ে যায়। এখন সে খুব বেশি নিশ্চিন্ত। সারাটা দিন তার ভাল কাটেনি। মাথার ভেতর দুশ্চিন্তা। দুটো-একটা কথা, পাখিটা মেরে ফেলার পর যে কানে না এসেছে তাও নয়। এবং এভাবে সে সারাদিন ভীষণ দুশ্চিন্তায় ছিল। ভাল করে রাতে খেতে পারেনি। এবং সূর্যাস্তের সঙ্গে সঙ্গে যখন পাখিরা এসে জাহাজটাকে ঘিরে ফেলেছিল, চোখে তার সর্ষে ফুল—যদিও সে কথায়-বার্তায় সব সময় ড্যাম-ডেয়ারিং গোছের, কিন্তু মনে মনে মরমে মরে যাচ্ছিল—তখন ছোটবাবু তাকে সব দুশ্চিন্তা থেকে বাঁচিয়েছে।

    সে ফিস ফিস গলায় বলল, বুঝলে না সব অশিক্ষিত নাবিক। সংস্কার ভীষণ। ম্যান-অ্যালবাট্রসের জন্য এমন হয়েছে ওরা ভাবতে শুরু করেছিল।

    আর্চি শুয়ে আছে। বালিশ উঁচু করা। মাথাটা ওপরের দিকে। জ্বালা-যন্ত্রণা একেবারেই নেই। সে কেমন দু-পাটির দাঁত শক্ত করে বলল তাই বুঝি!

    —ছোটবাবুকে দিয়ে সব মিটমাট করা গেল। বাবাঃ এখন ঘুমোতে যাব।

    এবং সকালে সবাই দেখল গোটা জাহাজে ভীষণ দুর্গন্ধ। মল-মূত্রে জাহাজের ডেক, বোট-ডেক, মাংকি-আয়ল্যান্ডের ছাদ,গ্যালির ছাদ, সামনে-পেছনে ঢাকা। কেউ বের হচ্ছে না। আর আশ্চর্য একটা পাখিও নেই। যাদের মনে হয়েছিল, ডানা ভেঙে ডেকে পড়ে আছে, একটাও তেমন পাখির সন্ধান পাওয়া গেল না। কেবল দুর্গন্ধে টেকা যাচ্ছে না। কাদার মত প্যাঁচ প্যাঁচ করছে—নাবিকেরা গামবুট পরে, হাতে দস্তানা লাগিয়ে নিয়েছে। এবং খুব সতর্কতার সঙ্গে সবাই কাজ করছে। ওপরে কাপ্তান দূরবীন লাগিয়ে চারপাশে যতদূর চোখ যায় দেখছেন। ডেবিডও দেখছে। সে কিছু দেখতে পেল না। না, একেবারে কিছু দেখতে পায়নি ঠিক না, অনেক দূরে সমুদ্রের ঢেউয়ের মাথায় লেডি-এ্যালবাট্রস বসে রয়েছে। দূর থেকে জাহাজটাকে অপলক দেখছে।

    জ্যাক কেবিন থেকে বের হতে পারছে না। বোট-ডেকে জল মারা হচ্ছে। হোস পাইপে জল মারছে এবং এমন ভাবে মারা হচ্ছে যাতে ছিটে-ফোঁটাও কারো চোখে-মুখে গিয়ে না পড়ে। স্টিক ব্রুম ডেক জাহাজিদের হাতে। ওরা জল মেরে ব্রাশ চালাচ্ছে। এবং বোট-ডেকের কাজ সারতেই সকাল কেটে যাবে তাদের। ওরা প্রথমে একেবারে মাংকি-আয়ল্যাণ্ড থেকে কাজ আরম্ভ করেছে। ক্রমে নিচে নেমে আসবে। বোট-ডেকে পা মাড়িয়ে যাওয়া যাচ্ছে না। অথচ এমন একটা দুঃস্বপ্ন এত সহজে কেটে যাবে জ্যাক বুঝতেই পারেনি। প্রায় জাহাজ ডুবতে ডুবতে যেন বেঁচে গেল। মেজ-মালোমকে সে দরজায় দাঁড়িয়ে ডাকছে। আর চেঁচাচ্ছে—কি দেখছ? ওরা কি দুরে কোথাও আছে?

    ডেবিড ইশারায় বলছে—না। না নেই। কেবল লেডি-অ্যালবাট্রসকে দেখা যাচ্ছে। আর কিছু নেই।

    কাপ্তান চিফ-মেট ভাল করে দেখে প্রায় যখন নিশ্চিন্ত, রেডিও-অফিসার তখন বেতার সংকেত পাঠাচ্ছে। অল ক্লিয়ার—বেতার সংকেতে সে এরিয়া-স্টেশনকে জানিয়ে দিচ্ছে।

    যখন রেডিও-অফিসার অল-ক্লিয়ার জানাচ্ছে তখন একমাত্র একজন কেবিনে বসে অল-ক্লিয়ার ভাবতে পারছে না! সে তার মাথা সমান উঁচু আয়নায় দাঁড়িয়ে তোয়ালে দিয়ে মুখ ঘসছে। কালো দাগ। যেন কেউ সারা মুখে উল্কি পরিয়ে দিয়েছে। জ্বালা-যন্ত্রণা শেষ হয়ে গিয়ে ও-সব উল্কির মত কি ফুটে উঠছে! হাত দিলে জায়গাগুলো সামান্য অসাড় লাগছিল শুধু। সে বার বার বাথরুমে যাচ্ছে, সাবানে মুখ ঘষছে এবং কেবিনে এসে লকারের আয়নায় মুখ দেখতে দেখতে উন্মাদের মতো চিৎকার করে উঠতে চাইছে। এটা কি হল? ঠিক উইচদের মতো মুখ? সাদা রঙের পাশে কালো কালো উল্কি পরানো? কোনোটা ইয়ারিংয়ের মতো, কোনোটা সমান্তরাল, অথবা ডিম ভেঙে চড়াৎ করে এসে পড়লে যেমন হয়ে যায়, যেখানে-সেখানে মুখে তারাবাতির মতো বিন্দু বিন্দু কালো ফুটকরি। সারা মুখে বিচিত্র সব ছবিতে একেবারে একটা সে মন্ত্রপুত মানুষ হয়ে গেছে। যেন এখন কোমরে সিংহের চামড়া থাকলে উট-পাখির পালক গুঁজে দিলে এবং নানারকমের পাথরের মালা গলায় পরলে হাতে বর্শা থাকলে সে আফ্রিকার কোন অরণ্যসর্দারের ভূমিকা নিতে পারে।

    সে নিজেকে ভয় পাচ্ছিল। তার হাত-পা ঘামছে। সে ছুটে এলি-ওয়েতে বের হয়ে এল। মুখে এটা আমার কি হয়ে গেল! সে ছুটে ছুটে ডেবিডের কেবিনে ঢুকে বলল, ডেবিড সি, এই যে দেখছ! দ্যাখো দ্যাখো সারা মুখে কি আমার! কোন ব্যথা বেদনা নেই। একটু অসাড় লাগছে। সারা সকাল ধরে চেষ্টা করেছি এসব দাগ তুলে ফেলতে পারছি না। বলেই সে বাংকে দু-হাতে মুখ ঢেকে বসে পড়ল।

    আর্চিকে ডেবিড চিনতেই পারছিল না। সে প্রথম ভেবেছিল আর্চি ওকে ভয় দেখাবার জন্য মুখে রং কালি মেখে অথবা তামাসা করার জন্য ছুটে এসেছে। সে প্রথম খুব হকচকিয়ে গেছিল। তারপর মুখটা আর্চির এটা সে বুঝতে পেরেছিল। তারপর এই সাত সকালে এসব তামাশার কি মানে সে যখন বুঝতে পারছিল না, তখনই আর্চি বলতে বলতে ভীষণ ছটফট করছিল। অধৈর্য এবং প্রতিশোধের স্পৃহা সারা মুখে। সে বসতে পারছিল না, সে দাঁড়াতে পারছিল না—কেবল কি করা যায় ভাবছে। সে বিড় বিড় করে বলে যাচ্ছিল, তখন রাত দুটো, দুটোর পর মনে নেই কিছু, তার মানে আমি ঘুমিয়ে পড়েছিলামে। ঘুমোবার আগে মুখটা দেখেছি। ফোলা জায়গাগুলো তখন বসে যাচ্ছে। সব ঠিক হয়ে যাবে ভেবে ঘুমিয়ে পড়লাম। সকালে উঠে ডেবিড বিশ্বাস কর, বলে দু-হাত ঝাঁকাতে থাকল, আমি আয়নায় নিজেকে দেখে আঁতকে উঠলাম। আমার মুখটা…বলে সে থেমে থাকল। হাঁ-করা মুখ। মুখের দিকে তাকাতে ভয় করছে।

    ডেবিড, আর্চির মুখের চামড়া দু-আঙুলে টেনে টেনে দেখল। পোর্ট-হোলের কাচ খলে ভালো করে আলোতে দেখে বুঝল, ভেতরে চামড়ার ভাঁজের অনেক গভীরে দাগ ঢুকে গেছে। এখন ভালো ডাক্তার না দেখালে হবে না। সে এ-সবের কিছু বুঝতে পারছে না। তবু ভালো জাতের ক্রিম অথবা হয়তো কিছুই না, সময় পার হলে আপনি নিরাময় হয়ে যাবে—এজন্য এমন মুষড়ে পড়তে বারণ করল ডেবিড। বলল, আসলে পাখিগুলোর মলমূত্রে ভীষণ এসিডিটির ব্যাপার রয়েছে! তোমার কি মনে হয়

    আর্চির মুখে কঠিন বিরক্তি। সে এসব শুনতে চাইছে না। এ-মুখ নিয়ে বের হয়ে যাওয়া, এবং যদি দেখা যায়, জ্যাক দেখে ফেললে ভীষণ মজা পাবে। ছোটবাবু দেখলে, মুখ ব্যাজার করে ফেলবে। সে আরও বেশি এবার থেকে ছোটবাবুকে ভয় দেখাতে পারবে। ছোটবাবু ওর মুখের এই অমানুষসুলভ অবয়বে ঘাবড়ে যাবে!

    আর্চির চোখ এভাবে লাল হয়ে যাচ্ছে ভীষণ। সে কাপ্তানের কাছে যেতে পারত। নিচে পাঁচ- নম্বর ওর হয়ে ডিউটি করছে। পাঁচ-নম্বর ওর এখন বিশ্বাসী লোক। ছোটবাবুকে সে পছন্দ করে না। কে কে এখন এই ছোটবাবুটিকে জাহাজে পছন্দ করে না তার একটা হিসাব হাতের আঙুলে গুনে দেখল, মাত্র তিনজন। সে নিজে, পাঁচ-নম্বর আর এনজিন-রুম-কশপ। ডেবিড এবং অন্যান্য সবাই তার পক্ষে। সে ডেবিডকে কিছু বুঝতে না দিয়ে দরজা খুলে বাইরে বের হয়ে এল। স্লিপিং গাউন ওর হাঁটু পর্যন্ত ঝুলছে। দু-পাশের বেল্ট খুলে আছে। মাতালের মতো সে হেঁটে হেঁটে যাচ্ছে। সে এখন শুধু কেবিনে দরজা বন্ধ করে পড়ে থাকবে। মুখ দেখাতে—বিশেষ করে বন্দর এলে সে আর সুন্দরী মেয়েদের কাছে যেতে পারবে না, এমন একটা অমানুষের মতো মুখ জেব্রা অথবা ওরাং- ওটাং সে হয়ে গেল তাদের কাছে। অথবা হীন ব্যক্তি, মুখে উল্কি পরা থাকলে হীন শয়তান মনে করে ফেলবে সবাই। এবং কতদিন পর তার মনে হল—সে তার স্ত্রীর কাছে একমাত্র ফিরে গেলে সে তাকে ফিরিয়ে দেবে না। জাহাজে তার স্ত্রীর কথা আজ সে প্রথম মনে করতে পারল। স্ত্রী লরা একটা স্টেশনারী দোকানের মালিক। জাহাজ আসার খবরে লরা সেজেগুজে জেটিতে দাঁড়িয়ে থাকে। লরা দেখতে পায় জাহাজ থেকে আর্চি নামছে। আর্চি লরার সঙ্গে কথা বলে না। লরা কেবল দেখতে পায় তার সামনে আর একটি মেয়ে হাত নাড়ছে। লরা বুঝতে পারে এবার আর্চি এ মেয়েটির সঙ্গে যতদিন দেশে থাকবে রাত কাটাবে। সে যেসব ফুল নিয়ে এসেছিল সব নিয়ে ফিরে যেত। চার- পাঁচ বছর ধরে এমন চলছে। আর্চি জানে সফর শেষে হোমে ফিরে গেলে এবারেও সে জেটিতে ওর জন্য অপেক্ষা করবে। হয়তো সে তার ইয়ার বন্ধুদের, বান্ধবীদের কারো খোঁজ পাবে না এবার। লরাকে কেবল দেখতে পাবে একা দাঁড়িয়ে আছে।

    লরার কথা ভেবে এতটা দুর্বল হয়ে পড়া ঠিক না। সে মনে মনে লরাকে ভুলে যাবার চেষ্টা করছে। লরা নিজের মতো থাকুক সে চায়। লরা এত ঢ্যাঙা আর এত পাতলা যে তার একেবারে ভাল লাগে না। ওর কিছু নেই। শুধু হাত-পা এবং আর যা আছে তাতে ওর মন একেবারে ভরে না।

    তবু বার বার লরার কথা স্মৃতিতে এলে সে নিজে আর স্থির থাকতে পারছিল না। এতদিন পর আবার কেন। বিয়ে-টিয়ের ব্যাপারে তার বিশ্বাস-টিশ্বাস একেবারে নষ্ট হয়ে গেছে। বিশেষ করে তাদের মতো জাহাজি জীবন যাদের—বিয়ে করা একেবারে উচিত না। লরাকে সেজন্য আইন মোতাবেক পরিত্যাগ করেনি। আছে যখন থাক। ওর জীবন-যাপনে যখন লরা প্রতিবন্ধক নয় তখন লরা বৌ হিসেবে থেকে গেলে একদিকে মন্দ না। জাহাজি মানুষের বৌ অসুখে-বিসুখে টনিকের মতো। একজন অন্তত তখন পাশে রয়েছে ভাবতে ভাল লাগে।

    এ সব কথা মনে হওয়া ঠিক না—সে এবার জোরে ডাকল, বয়। বয় ভেতরে ঢুকে বিস্মিত হল। চা কফি কি দেবে ঠিক করতে পারল না। আর্চি শুধু বলল, ছোটবাবুকে আসতে বল। বয় বুঝতে পারল না, মুখটা জেব্রার মতো দেখতে হয়ে গেছে কেন?

    ছোটবাবু তখন এনজিন-রুমে কাজ করছে। অনেকগুলো লোহার রড তাকে কাটতে দিয়েছে। কিছু লোহার পাত। বাইশ টেবিলে সে রড বেঁধে কাটছে। হ্যাকসো বার বার টেনে টেনে দু-হাতের পেশী ফুলে গেছে। পেশী এত শক্ত যে প্রায় লোহার মতো। সে প্রায় দু-লাফে ওপরে উঠে এসেছে এবং বাইরে দাঁড়িয়ে বলেছে, মে আই কাম ইন স্যার। কাম-ইন। গম্ভীর গলা। ছোটবাবু ভিতরে ঢুকলে আর্চি দেয়ালের দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে। আর্চিকে সে সকালের দিকে এমন পোশাকে দেখেনি। বোধ হয় মুখের যন্ত্রণায় এখনও আর্চি কষ্ট পাচ্ছে।

    ছোটবাবু কিছু বলতে পারল না। সে পরেছে সাদা প্যান্ট, সাদা সার্ট, পায়ে কেডস, মোজা সবুজ রঙের। সে পিছনে হাত রেখে দাঁড়িয়ে আছে। প্রায় সৈনিকের মতো আজ্ঞাবহনকারী মানুষ মাত্র। আয়নায় ওর অবয়ব এত স্পষ্ট যে, সে এত সতর্কতার ভেতরও একবার নিজের মুখ, নীল রঙের দাড়ি, এবং কোথায় যেন এক পবিত্রতা মুখে, নিজেই যখন এসব টের পেয়ে যায় তখন নিজেকে নিজে দেখলে আজকাল ভীষণ সাহসী হয়ে যায়। কোন কিছুতেই ভয় পাবে না সে বিশ্বাস করতে ভালবাসে।

    আর তখনই বাঘের মতো হালুম করে যেন আর্চি ডেকে উঠল। ফিরে দাঁড়াতেই ছোটবাবু আর্চির মুখে কদর্য সব উল্কি দেখল। যেন এ-সব উল্কি পরে আর্চি তাকে ভয় দেখাবে বলে এতক্ষণ এভাবে দেয়ালের দিকে মুখ করে দাঁড়িয়েছিল।—ম্যান কোথায় কাজ করছ?

    ছোটবাবু মুখ দেখবে না কথার জবাব দেবে। সে কোনরকমে বলল, এনজিন-রুমে

    —নো। ইউ ম্যান, হোপলেস। তুমি ম্যান খুব ফাঁকিবাজ আছ। পুরো বাংলায় বলতে চেষ্টা করল আর্চি। তারপর যা বলল, তা আরও মারাত্মক। এক্ষুনি ছোটবাবুকে ডেকে কাজ করতে যেতে হবে। চার-নম্বর উইনচের পিস্টন রড খুলতে হবে। খুলে, এনজিন-রুমে নিয়ে যেতে হবে। ফাইলে মাজাঘসা আছে।

    ছোটবাবু বলল, স্যার ডেকে এখন যাওয়া ঠিক না। স্যার আপনার মুখে এসব কি? খুব সহজভাবে বলে ফেলেই বুঝতে পারল মহামান্য সেকেণ্ড এনজিনিয়ার আর্চিকে সে অবান্তর প্রশ্ন করতে পারে না। কিন্তু স্বভাব যাবে কোথায় ছোটবাবুর। আর্চি দেয়ালের দিকে মুখ ফিরিয়ে তেমনি দাঁড়িয়ে আছে। কথার জবাব দিচ্ছে না। যত এমন হচ্ছে, ভেতরটা ছোটবাবুর গুড়গুড় করছে। মরতে কেন যে এসব বলতে গেল। অথবা আর্চি এভাবে রাতে সেজে শুয়ে থাকতে হয়তো ভালবাসে। আর্চির ভেতর একটা শয়তান আছে এই প্রথম সে যেন টের পেল। সে আর থাকতে না পেরে বলল, যাচ্ছি স্যার।

    আর তখনই কঠিন এক অবজ্ঞার হাসি, ইয়েস ইউ গো।

    ছোটবাবু জানত, এই মলমূত্রের ভেতর পড়ে গেলে সে জ্বলেপুড়ে যাবে। তবু সে যাবে। সে হাঁটতে থাকল। স্বভাবেই তার এটা আছে। তার এখন থেকে ভীষণ সতর্ক থাকা দরকার। অশরীরী আত্মার মতো অতিকায় হিংস্র আর্চি যে কোনো সময় তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে। কিন্তু কেন যে এ সব হয়, সে তা বুঝতে পারে না, সে তো আর্চিকে মান্য করে থাকে। তবু শয়তানের মতো মুখ মানুষটার, ওর এ-সব ভেবে কষ্ট হতে লাগল। মানুষের মুখ শয়তানের মতো হয়ে গেলে ভারি দুঃখের।

    জাহাজ এভাবে চলছে। নিরন্তর চলছে এমনই মনে হয়। চলতে থাকলে মনে হয় না জাহাজটা আর কখনও বন্দর পাবে। জাহাজের ভেতর মানুষগুলো নিরন্তর কাজ করে চলেছে, বিরাম বিশ্রাম বলতে সামান্য, কেবল তাদের ভাবনা জাহাজটাকে ঠিক ঠিক বন্দরে পৌঁছে দেওয়া। দিতে পারলেই কাজ শেষ। তখন যা খুশি করো, যেখানে খুশি যাও, দিনে হাজির থাকলেই হয়ে যায়। কাজে কর্মে তেমন তাড়া থাকে না।

    সিউল-ব্যাংক জাহাজ একটু অন্যরকমের। এর কাজ লেগেই রয়েছে। কত সব উটকো কাজ। এবং সন্তর্পণে সবাই এখন জল মারছে। দুটো হোস পাইপে একসঙ্গে জল মারা হচ্ছে। জল মেরে দিলে সরে যাচ্ছে—চুনগোলা জলের মতো পাখিদের মলমূত্র। এবং জাহাজের সর্বত্র টক টক দুর্গন্ধ। আর জাহাজে যারা রয়েছে তারা পোর্ট-হোল খুলতে পারছে না। এলি-ওয়ের দরজাগুলো সব বন্ধ করে রেখেছে। কোনো কারণে দরজা খুললেই গন্ধে যখন টেকা যাচ্ছে না তখন ছোটবাবু ডেবিডের কাছ থেকে তার গামবুট দুটো চেয়ে নিল। গামবুটের ব্যবহার ডেক জাহাজিদের নিরন্তর —ঝড়-বৃষ্টিতে, তুষারপাতের সময় বরফ জমে গেলে ডেকে জাহাজিরা পায়ে গামবুট পরে চলাফেরা করে। আর ডেক, ফল্কা, মাস্তুলের নোংরা জল মেরে তুলে ফেলার সময় গামবুট পরে না নিলে, প্যান্ট জলে ভিজে যায়। এনজিন-রুম জাহাজিদের এসব দরকার হয় না। ছোটবাবুর গামবুট ছিল না সেজন্য। সে ডেবিডের কাছ থেকে চেয়ে নিয়েছে।

    সে বালতিতে হাতুড়ি, চিজেল নিয়েছে নানা সাইজের। একটা ছোট টবে কেরোসিন তেল। এবং এই বালতি টব তাকে দেখলেই দেখা যাবে। কাজে ছোটবাবু আছে বালতিটা নেই টবটা নেই ভাবা যায় না। ছোটবাবু এলিওয়ে ধরে দরজা খুলে ফেললে, দেখতে পেল ডেকটার সাদা রং। ডেবিডের কাছে মনে হয়েছে তুষারপাত হয়েছে। ছোটবাবুর তুষারপাত সম্পর্কে কোন অভিজ্ঞতা হয়নি। সে দরজা খুলতেই নাকে এসে ঝাঁঝ লেগেছে। এবং বমি আসছিল। সব যেন ভেতর থেকে উঠে আসছে। সে সন্তর্পণে হেঁটে যাচ্ছিল। হাতে চামড়ার মোটা দস্তানা। মাথায় ছেঁড়া টুপি, কেবল মুখে কিছু নেই। সে গন্ধ থেকে বাঁচার জন্য ইউকেলিপটাস তেল নাকে তুলোয় গুঁজে নিতে পারত। কিন্তু দেরি হয়ে যাবে। রুমাল চার-পাঁচ ভাঁজ করে মুখে বেঁধে নিয়েছে। এবং এখন ওর দুটো চোখ কেবল দেখা যাচ্ছে। নাকে কেরোসিন তেল সামান্য লাগিয়ে রেখেছে। গন্ধটা সে আর তেমন টের পাচ্ছিল না।

    তখন মান্নান বোট-ডেকে হোস পাইপে জল মারছে। ডেক-টিন্ডাল আর একটা হোস পাইপে জল মারছে। সূর্য বেশ ওপরে উঠে যাচ্ছে। মান্নানই প্রথম দেখতে পেয়েছিল ডেক ধরে কেউ হেঁটে যাচ্ছে। সে বুঝতে পারল না কে এমন মলমূত্র মাড়িয়ে যাচ্ছে। সাহস আছে মানুষটার। ডেকে যখন কেউ বের হচ্ছে না ভয়ে, জ্বালা যন্ত্রণার ভয়ে তাছাড়া সে তো শুনছে, কালো কালো দাগ হয়েছে হাতে পায়ে, তখন এমন কার দুঃসাহস! সে তখনই ভাবল হেই করে ডাকবে। কিন্তু অফিসারদের ভেতর যদি কেউ হয়। এই ভেবে সে যখন সামান্য অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিল, তখনই মনে হল আরে এ তো ছোটবাবু। ওর হাতে বালতি টব দেখেই সে চিনে ফেলেছে। আর তখুনি সে চেঁচিয়ে উঠল ওপর থেকে—হারে এডা যে ছোটবাবু।

    ছোটবাবু পিছন ফিরে তাকাল। চার্ট-রুমের পাশে জ্যাকের কেবিন। তার ছাদে দাঁড়িয়ে মান্নান হা হা করছে—কোনে যাচ্ছ!

    —পিস্টন খুলতে। চার নম্বর উইনচে যাচ্ছি।

    —মরণের ওষুধ কানে বানতে চাও চঁইয়া।

    ছোটবাবু হাসল। মান্নানের স্বভাব এভাবে কথা বলা। চঁইয়া কথার সঠিক মানে সে জানে না। তবু এটা কিছুটা কাঁচা খিস্তি জাতীয়। এবং মান্নানের এভাবে কথা বলার স্বভাব। সে বলল, দ্যাখেন টিন্ডাল, ছোটবাবুর কান্ড দ্যাখেন। মরণের ওষুধ কানে বানদনের লাইগা যাইতাছে।

    সবাই এটা দেখে ঘাবড়ে গেল। ছোটবাবু সন্তর্পণে হেঁটে যাচ্ছে। পিছলে পড়ে যেতে পারে। তার চেয়েও ভয়াবহ পড়ে গেলে হাতে পায়ে কিছু হবে না, মুখে লেগে গেলে ভীষণ কষ্ট পাবে ছোটবাবু। ওরা বুঝতে পারছে এটা সেই আর্চির কাজ। ছোটবাবুকে আর্চি একদম সহ্য করতে পারছে না। ওরা ওখানে আর দাঁড়াল না। হোস পাইপ খুলে ফেলল। এবং নেমে যেখানে ছোটবাবু কাজ করবে দুটো হোস-পাইপে জল মেরে একেবারে সাফসোফ করে ফেলছে। ছোটবাবু দেখল, নিশ্চিন্তে নির্ভয়ে সে এখন কাজ করে যেতে পারবে। তবু চারপাশের মলমূত্রের ভেতর কাজ করা অসহ্য রকমের কষ্ট। সকাল থেকে দুর্গন্ধে কেউ কিছু খেতে পারছে না। সকালে খবর এসেছে, জ্যাক কেবিনেই বমি করেছে।

    বিকেলের দিকে জাহাজ একদম পরিষ্কার। কেবল দুটো মাস্টের ওপরে ওরা উঠতে পারে নি। মাস্তুলের রঙ চেনা যায় না। সাদা হয়ে গেছে। ওগুলো চিপিং না করলে উঠবে না। এবং কড়া রোদ সারাদিন, সুতরাং বিকেলের দিকে গন্ধটা একদম থাকল না। কেবিনে কেবিনে ইউকলিপটাস তেল স্প্রে করা হয়েছে। জাহাজের সর্বত্র। কেবল আশংকা আবার বিকেলে তেমনি, অর্থাৎ সূর্য অস্ত যাবার আগে ওরা যদি উড়তে থাকে। কারণ ওরা সমুদ্রের কোথাও যদি পালিয়ে থাকে, অথবা দিগন্তের নিচে অথবা সামনে যে-সব দ্বীপ রয়েছে, দ্রুত উড়ে গিয়ে জাহাজটাকে আবার আক্রমণের জন্য যদি ওৎ পেতে থাকে।

    ব্রীজে একজন, চার্ট-রুমের রেলিঙে একজন। জ্যাকের কেবিনের ছাদে কাপ্তান নিজে দাঁড়িয়ে আছেন। আর ব্রীজের উইংসে চিফ-মেট। ওরা চারজন চারদিকে দূরবীন চোখে দাঁড়িয়ে আছে। যদি কিছু আবার দেখা যায়। ওরা যদি আবার কোথাও থেকে উড়তে আরম্ভ করে। সামান্য এক টুকরো মেঘ ভেসে উঠলে আতঙ্কে সবার চোখ কেমন সাদা হয়ে যাচ্ছে। যখন চারজন মিলে রায় দিতে পারছে, না ওটা একখন্ড মেঘ তখন সবাই নিশ্চিন্ত হতে পারছে।

    কেবল লেডী-এ্যালবাট্রস জাহাজের পেছন ছাড়ছে না। এটা কাপ্তানের ভাল লাগছিল না। এবং যেন যতদিন এই পাখিটা জাহাজকে অনুসরণ করবে ততদিন একটা না একটা দুর্ঘটনার আশঙ্কা থাকবে। কাপ্তানের এমন বয়েস যে, তিনি পাখিটা সম্পর্কে বেশি কিছু ভাবতে পারছেন না। এই যে এমন একটা ভয়াবহ দুঃস্বপ্নের মতো রাত কাটল সমুদ্রে এটা যে এই পাখিটার জন্য হয় নি কে বলতে পারে! এ্যালবাট্রস পাখি সমুদ্রে মেরে ফেলা ভারি অমঙ্গলের ব্যাপার। যদিও আজকাল এ-সব মানা হয় না। জাহাজ যত বেশি নিপুণ হয়ে যাচ্ছে চলা-ফেরায় তত সংস্কার জাহাজিদের মন থেকে মুছে যাচ্ছে। কিন্তু এরা ভাবে না কেন সিউল-ব্যাংক জাহাজ আজকালকার দশটা জাহাজের মতো নয়। সে তার পুরনো সংস্কার নিয়ে বেঁচে আছে। পাখিটাকে তাড়িয়ে দেবার ব্যাপারেও হাতে কিছু এমন উপায় নেই। মাস্তুলে বসতে না দিলেও ওর আসবে যাবে না, কারণ সমুদ্রে সে খুশিমত বিশ্রাম নিতে পারে। লেডি-এ্যালবাট্রস হিগিনসকে সত্যি খুব দুর্ভাবনায় ফেলে দিল।

    সূর্যাস্ত পর্যন্ত ওরা এভাবে দাঁড়িয়েছিল। চারজন পুরো জাহাজি ইউনিফরমে, প্রায় যেন একটা যুদ্ধ জাহাজ চালিয়ে নিচ্ছে। যে কোন সময় আক্রমণ হতে পারে, বিশেষ করে এই সূর্যাস্তের সময়। এ- সব দেখলে মনেই হবে না জাহাজ সিউল-ব্যাংক যাচ্ছে তাহিতিতে। ওখানে জল, বাংকার, রসদ নেবে জাহাজটা। জাহাজের ড্রাফট আটাশ ফুট, গ্রস-ড্রাফট বত্রিশ। জল, বাংকার নিলে জাহাজটা পুরো লোডেড। এবং মাল বলতে জাহাজে আছে সালফার। সেই মাটি। সালফার, ফসফেট, সবই মাটির সামিল। অথবা আয়রণ-ওর। এ-বাদে জাহাজে বেশি কিছু কার্গো দিতে এজেন্ট-অফিস ভরসা পায় না। একমাত্র ভারতবর্ষের বন্দরে গেলে কিছু ভাল মাল, যেমন জুট, চা এ-সবের পেটি তুলে নিতে পারে। ভারতবর্ষের বন্দরে সস্তা মালবাহী জাহাজের ভীষণ কদর। দু-দিকেই টাকা পয়সার লেনদেন চলে। কলকাতা বন্দরের মতো জাহাজটাও দুবলা বলে, বন্দরের সঙ্গে জাহাজটার বেশ ভালবাসাবাসি আছে। কলকাতা বন্দরে একবার ঢুকলে জাহাজ আর বের হতে চায় না। যত দিন যায় তত কর্তৃপক্ষ কাপ্তানের ওপর অধিক নির্ভরশীল হয়ে পড়ে

    হিগিনস লেডি-এ্যালবাট্রসকে দূরবীনে দেখতে দেখতে কেবল এমন সব ভেবে চলেছেন। জ্যাক সারাদিন কিছু খেতে পারে নি। রাতে হয়তো পারবে। জাহাজ-ডেক খুবই পরিচ্ছন্ন। রাতে জ্যোৎস্না ওঠার কথা আছে। জ্যোৎস্না উঠলে, তিনি জ্যাককে নিয়ে বোট-ডেকে কিছুক্ষণ আজ চুপচাপ বসে থাকবেন।

    কাপ্তান-বয় আটটায় নালিশ জানাল, ছোটসাব খাচ্ছে না।

    খাচ্ছে না অনেকে। গন্ধটা সবার নাকে লেগে রয়েছে। আর্চির খাবার কেবিনে গেছে। সে সারাদিন কেবিন থেকে বের হয় নি। ওর মুখে কালো কালো সব দাগ হয়েছে। এমন বিচিত্র ব্যাপার পৃথিবীতে সত্যি তবে ঘটে, ওর মুখটা দেখতে জেব্রার মতো হয়ে গেছে। জ্যাক তো শুনে হেসে গড়িয়ে পড়ছিল। কাপ্তান জ্যাককে এ-সব বলে কিছুটা যেন ভুলিয়ে-ভালিয়ে খাওয়াচ্ছিলেন। জ্যাক ভাবল, কি করে আর্চির মুখটা দেখা যায়।

    এবং আর্চি বিকেলে ছোটবাবুকে ডেকে পাঠিয়েছিল। ছোটবাবু সুবোধ বালকের মতো দাঁড়িয়ে কথা বলেছে। কোথাও কিছু ঘটেছে ছোটবাবুকে দেখে মনেই হয় না। পিস্টন খুলে মেরামত করে ঠিক ঠিক লাগিয়েছে পাঁচ-নম্বর এসে খবর দিয়ে গেছিল আর্চিকে। সুতরাং আর্চি আর কিছু করতে পারে না। ছোটবাবু চলে গেলে আয়নার সামনে বসে কেবল মুখ দেখা ওর কাজ। এবং বন্দর পেতে আরও চার-পাঁচ দিন। এর ভেতর সে বের হতে পারবে না। ডাক্তার দেখালে ঠিক একটা ব্যবস্থা হয়ে যাবে।

    এভাবে ঠিক খবর রটে গেল, একমাত্র আর্চির মুখ জেব্রার মতো। সে এখন কেবিন থেকে বের হচ্ছে না। অফিসারদের সবাই আর্চির ঘরে গিয়ে দেখে এসেছে। কাপ্তানের সঙ্গে জ্যাকও গিয়েছিল। জ্যাক তারপর বের হয়ে হা হা করে হাসতে হাসতে ছুটেছে। জ্যাক কেবিন থেকে বের হয়েই হাসতে পারে নি, সে দু-হাতে মুখ চেপে রেখেছিল, তারপর ছোটবাবুর কেবিনে ঢুকে কেবল হাসছে। কেবল হাসছে। ছোটবাবু ওকে এভাবে হাসতে দেখে ভয় পেয়ে গেল। কাপ্তানের ছেলেটার কি যে হয় মাঝে মাঝে। অকারণ কি হাসছে দ্যাখো! সে বলল, এই যে কি হয়েছে! এত হাসছ কেন?

    —সে। কেমন অবাক চোখে দেখল ছোটবাবুকে।

    —এত হাসছ কেন?

    আবার হাসি! হাসতে হাসতে পেটে খিল ধরে যাবার জো। অথচ জ্যাক হাসছেই।

    ছোট বলল, ইস তুমি না জ্যাক একেবারে ছেলেমানুষ।

    জ্যাক বলল, হুঁ! আবার অবাক চোখে ছোটবাবুর মুখ দেখতে থাকল। বড় বড় চোখ ছোটবাবুর। কপাল কি সুন্দর। ঠোঁট দুটো ভারী, চিবুক ছোট, আপেলের মতো। নাক লম্বা, মনোরম চোয়াল।

    ছোটবাবু বলল, এত হাসছিলে কেন?

    —জেব্রা, জেব্রা।

    ছোটবাবু বুঝতে পারল জ্যাক কি বলতে চায়। সে বলল, দেখলে?

    —দেখলাম।

    —ভাবতে কেমন লাগে সত্যি।

    —কি?

    —এই যে কোথা থেকে পাখিরা এল, কোথায় উড়ে চলে গেল। কেন এল, কেন এভাবে সারারাত উড়ে গেল, ডেক ফল্কা নোংরা করে গেল, তাজ্জব লাগে ভাবতে। আর আরও তাজ্জব, ওদের মলমূত্রে মানুষের কি হয়ে যায়। এমন পাখি পৃথিবীতে আছে আমি শুনি নি জ্যাক।

    —জ্যাক বলল, তুমি দেখেছ?

    –কী!

    —বারে, জেব্রা।

    ছোটবাবু চাইছে এ-ধরনের রসিকতা জ্যাক না করুক। আর্চি আর যাই হোক ওর বস। জ্যাক ওকে ছোট করলে সেও কিছুটা ছোট হয়ে যাবে। আর তাছাড়া বোধ হয় ছোটবাবুর এমনই স্বভাব, মানুষকে খাটো ভাবতে তার খারাপ লাগে। জ্যাক খুব ছেলেমানুষ। আর্চির কষ্টের কথা না ভেবে, তার মুখের কথা ভাবছে। এটা ঠিক না। তা ছাড়া জ্যাক ওর কেবিনে আছে আর্চি দেখলে ক্ষেপে যাবে। সে জ্যাককে বলতে পারছে না, আস্তে। বলতে পারছে না, জ্যাক তুমি এখন যাও।

    জ্যাক বলল, কি তুমি জেব্রা দেখেছ?

    —দেখেছি।

    –কেমন শয়তান শয়তান লাগছে মুখটা।

    ছোটবাবুর মনে হল, সেও আর্চিকে আজ সকালে দেখতে দেখতে শয়তান ভেবেছে। মানুষকে শয়তান ভাবা ঠিক না। আসলে ওর তখন মাথা গরম হয়ে গিয়েছিল। মাথা ঠান্ডা ছিল না। অথচ নাবিকের সবচেয়ে বড় পবিত্র কাজ মাথা ঠান্ডা রেখে জাহাজে কাজ করা। সে বলল, এমন বলতে নেই।

    জ্যাক বলল, কেন?

    –না বলতে নেই।

    জ্যাক দেখল, ছোটবাবু ভীষণ গম্ভীর হয়ে গেছে। ছোটবাবুর এমন মুখ সে কখনও দেখে নি। যেন এ-মুখটা দেখলে সমীহ করতে ইচ্ছে হয়। সহজেই আর বলা যায় না, না বলব। বললে তুমি কি করতে পার।

    জ্যাক বলল, ওপরে যাবে?

    ছোটবাবু বলল, না।

    —আর্চি দেখবে না। সে বের হচ্ছে না কেবিন থেকে।

    —ভাল লাগছে না। আমি ঘুমোব।

    এবার জ্যাক কেমন ভেতরে ভেতরে ক্ষেপে গেল। বলল, বাবা তোমাকে ডেকেছেন।

    —আবার আমাকে!

    জ্যাক উঠে দাঁড়িয়েছিল। বের হবার মুখে বলল, আমার কেবিনে।

    ছোটবাবু যখন সেজেগুজে উঠে গেল, তখন নটা বাজে। সে জ্যাকের কেবিনে ঢোকার মুখে দেখতে পেল, জ্যাক ওকে ডাকছে। বোট-ডেকে জ্যাক বসে রয়েছে। পাশে ডেক-চেয়ারে কেউ আছে। এবং অস্পষ্ট আলোতে সে ঠিক বুঝতে পারল না কে তিনি। কাছে গেলে বুঝতে পারল স্যালি হিগিনস জ্যাকের সঙ্গে গল্প করছেন।

    জ্যাক, ছোটবাবুকে দেখেই বলল, এই যে ছোটবাবু।

    স্যালি হিগিনস কাছে গেলে বললেন, বোস।

    ছোটবাবু জ্যাকের পাশে বসে পড়ল।

    স্যালি হিগিনস বললেন, কেমন লাগছে কাজকর্ম?

    —ভাল লাগছে স্যার।

    —কোন অসুবিধা হচ্ছে না তো?

    —অসুবিধা হচ্ছে না।

    —এভাবে সমুদ্রে ঘুরে বেড়ানোর একটা অনন্দ আছে।

    —তা আছে স্যার।

    —আমরা তাহিতি যাচ্ছি। বড় সুন্দর দ্বীপ। আচ্ছা জ্যাক বলতো তাহিতির রাজধানী কোথায়?

    এই হয়েছে মুশকিল। জ্যাকের মুখ ব্যাজার হয়ে গেল। কবে কখন কি বলেছেন, এখন ঠিক তা ঝালিয়ে নিচ্ছেন, জ্যাক বলল, তুমি বলবে না। বলছি। ইস কি যে হয় না বাবা, সব কেমন ভুলে যাই।

    —ছোটবাবু বলতে পার?

    ছোটবাবুর এ-ব্যাপারে কোনো সঙ্কোচ নেই। এত খবর তার রাখার কথা না। না রাখলেও কিছু আসে যায় না। সে সোজাসুজি না বলল।

    —মনে রাখবে। সব দেশের একটা ইতিহাস আছে। সব না জানলেও কিছুটা যে কোন নাবিকের পক্ষে জেনে রাখা ভাল। দেশে ফিরে গেলে, তোমাকে কত লোক কতভাবে জিজ্ঞাসা করবে, বলতে না পারলে ভারী অসম্মানের। তিনি বললেন, পিপিতি। পিপিতিতে জাহাজ যাচ্ছে। তারপর কেমন তিনি প্রাচীন গাঁথার মতো বলে যেতে ভালবাসেন—এই সব পলিনেশীয় দ্বীপপুঞ্জ আবিষ্কার করেন একজন এশিয়াবাসী। এবং যেমন ফোনেশিয়ান এবং গ্রীকরা খৃষ্টজন্মের ছ’শ বছর আগে পূর্ব আটলান্টিক আর ভূমধ্যসাগরের সব খবরাখবর সংগ্রহ করেছিল, ফোনেশিয়ানরা পূর্ব-আফ্রিকার উপকূল আবিষ্কার করেছিল, তেমনি একজন এশিয়াবাসী সামান্য কাঠের জাহাজে ভেসে চলে এসেছিলেন তাহিতিতে।

    তারপর তিনি বললেন, বলতো জ্যাক আফ্রিকার পশ্চিম উপকূল কত সালে কে আবিষ্কার করেন?

    জ্যাকের এটা মনে ছিল। সে বলল, খৃষ্টের জন্মের প্রায় চারশ বছর আগে হানো আফ্রিকার পশ্চিম উপকূল আবিষ্কার করেন।

    এভাবে কাপ্তেন আবার বলে যান ন’শ চুরাশী খৃষ্টাব্দে এরিক দি রেড আবিষ্কার করেছিলেন, গ্রীনল্যান্ড। চোদ্দশো ছিয়াশীতে ডিয়াজ, কেপ অফ গুড হোপ। চোদ্দশো সাতান্নব্বুইতে ভাস্কো-ডা-গামা ভারতবর্ষে যান। পনেরশো বিশে মেগালান সমস্ত পৃথিবী পরিভ্রমণে বের হন। টাসমান প্রথম অস্ট্রেলিয়া আবিষ্কার করেন। কাপ্তান কুকের প্রথম সমুদ্রযাত্রা সতেরোশ আটষট্টি থেকে একাত্তর। এভাবে তিনি আমুন্ডসেন পর্যন্ত বলে থামলেন।

    ছোটবাবুর শুনতে বেশ ভাল লাগছিল। জ্যাকের পড়াশোনা বোধ হয় জাহাজে এভাবে হয়ে থাকে।

    তারপর তিনি বললেন, পিপিতি ভারি সুন্দর ছোট্ট ছিমছাম শহর। আজকাল আর টিয়ারী হোটেলের চার পাশের ঘিঞ্জি বাড়ি-ঘর দেখতে পাবে না।

    মনেই হবে না, এখানে এখনও দেড়শ-দুশো বছর আগে আদিবাসীদের সঙ্গে ফরাসীদের রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম হয়েছিল। ভ্রমণকারীরা শহরে ঢুকেই প্রথম চলে যায় গোগাঁর আর্ট গ্যালারী দেখতে। সুন্দর বন্দর রয়েছে। এবং বালিয়াড়ি, ছোট ছোট নৌকা দেখতে পাবে। শহরটাতে প্রায় ত্রিশ হাজার লোক বসবাস করে থাকে। প্রতিদিন পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসছে ভ্রমণকারীরা। নেমেই ওরা তাহিতিদের প্রিয় খাবার পিসান ক্রু খেতে ভারি ভালোবাসে। এদের প্রিয় ফিস্টের নাম ট্যামারা। গরম পাথরের ওপর লোবস্টার, চিকেন, মেরিল্ড ফিস উল্টে-পাল্টে নানারকম মসলাপাতি দিয়ে ভাজা হয়। খেজুর গাছের ছায়ায় সমুদ্র দেখতে দেখতে যখন কেউ খায় তখন জীবন বড় সুন্দর মনে হয়।

    তিনি বললেন, পাহাড়ের ওপর তাহাড়া হোটেল। কতরকমের গাছপালার ফাঁকে ওপরে উঠে যেতে হয়। অধিকাংশ গাছ বলতে খেজুর তাল। ছোট ছোট এক রকমের ঝোপ রয়েছে, বন্য ফুলে ভরা। আর পাহাড়ের মাথা থেকে দেখতে পাবে অনেক দূরে একটা দ্বীপ, দ্বীপের নাম মুরিয়া। প্রায় বারো মাইল দূরে এই দ্বীপ। আসলে দ্বীপটাতে রয়েছে নানা বর্ণের পাহাড়। আর নীল রঙের লতাপাতা। পাহাড়ের চূড়ো একটা দুটো নয়, অনেক। প্রায় মনে হয় অসংখ্য ছোট ছোট পিরামিড—কোন প্রাচীন ফারাও নিজের জন্য এমন একটা নির্জন দ্বীপ যেন গড়ে রেখেছেন। পিপিতি থেকে মোটরবোটে গেলে নাইনটি মিনিটস লাগবে। ছোট ছোট বোট ভাড়া পাওয়া যায়। ইচ্ছে করলেই ঘুরে আসা যেতে পারে। তাহিতির উত্তর-পশ্চিমে প্রায় এক’শ চল্লিশ মাইল দূরে রয়েছে বোরা দ্বীপ। দু’হাজার লোকের বাস সেখানে। দ্বীপটা তার লেগুনের জন্য বিখ্যাত। সরু লম্বা লেগুন একেবারে দ্বীপের ভেতর ঢুকে গেছে। গ্লাস আঁটা মোটরবোটে অসংখ্য ভ্রমণকারী লেগুনে ঘুরে বেড়ায়। রাত কাটায়। জ্যোৎস্না রাতে জলের ধারে ছোট ছোট হোটেলে তারা থাকে। মাছ ধরে। সমুদ্র থেকে ঠান্ডা বাতাস চলে আসে। মাছ ধরার সময় ওদের খুব নিবিষ্ট লাগে দেখতে। গলদা চিংড়ি, হেরিং আর ম্যাকরোল মাছের জন্য জায়গাটা খুব বিখ্যাত

    তারপর তিনি ছোটবাবুর দিকে তাকালেন—কেমন মনে হয় ছোটবাবু, কেবল দু’পাশে উঁচু পাহাড়, নিচে নীল জল, ছোট ছোট উপত্যকা পাহাড়ের কিনারায়। সেখানে ছোট ছোট কাঁচের ঘর, বাতিদান, লাল-নীল চেয়ার, এবং পানীয় বলতে প্রিয় মদ হিনা, মানুই। বেশ গরম পাথরের বাটিতে চিংড়ি মাছ ভাজা আস্ত।

    ছোটবাবুর ভাজা চিংড়ি মাছ আস্ত শুনে প্রায় জিভে জল এসে গেল। বাবা হাট থেকে বড় গলদা চিংড়ি আনলে চিংড়ি মাছের মুড়ো ভাজা, নরম আতপ চালের গোলাতে ভিজিয়ে এবং মাথার ভেতরের অংশটা কি লাল, মুড়ো ভেঙ্গে ভাত মেখে নিলে ভাতটা একেবারে লাল হয়ে যেত। কতদিন সে ভাত এবং চিংড়ি মাছের মুড়ো ভাজা না খেয়ে আছে। যেন দেশে ফিরে গেলে সে প্রথমেই হাট থেকে বড় গলদা চিংড়ি কিনে আনবে।

    আর তখনই কাপ্তান হিগিনস পাইপ ঝেড়ে ফেলে দিচ্ছেন। দামী টোবাকো বোধ হয় খান। বেশ গন্ধ টোবাকোর। টাকা-পয়সা জমলে সেও একটা লম্বা পাইপ কিনবে, লম্বা গোঁফ রাখবে, এবং পাইপে টোবাকো টানবে। জ্যাক কিছুই বলছে না। সে এ-সব শুনছে কিনা তাও বোঝা যাচ্ছে না। জাহাজটা চলছে—আকাশের নক্ষত্র সব পেছনে পড়ে থাকছে, কখনও কখনও মনে হয়—না কেউ পেছনে পড়ে থাকছে না। জাহাজটার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে তারাও সবাই তাহিতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। নক্ষত্র, সমুদ্র, আকাশ, এ্যালবাট্রস পাখি, জাহাজ, জাহাজের নাবিকেরা সবাই যেন তাহিতির এমন সব সুন্দর দৃশ্যাবলীর কথা শুনে স্থির থাকতে পারছে না। একসঙ্গে সবাই তাহিতি দর্শনে যাচ্ছে।

    ছোটবাবু বলল, আমরা তো মাত্র একদিন থাকব স্যার?

    —একদিন থাকবে, আর এক রাত। সেদিন সবার ছুটি থাকবে। তোমরা যতটা পার দেখে নিও।

    ছোটবাবুর ভীষণ আশ্চর্য লাগছে—আগে হিগিনসকে মনে হত অন্য গ্রহের মানুষ। তিনি গঙ্গাবাজু ধরে আসছেন শুনলে সে হাঁটত যমুনাবাজু ধরে। যেন সামান্যতম বেয়াদপি দেখলেই তিনি সমুদ্রে তাঁকে ছুঁড়ে ফেলে দেবেন। জাহাজে কিসে কি বেয়াদপির সামিল সে জানত না। এখন এই জাহাজে চলতে চলতে তিনি কি যে আপন হয়ে যান কখনও কখনও। ঠিক পিতা, পিতামহের মতো মনে হয়। পৃথিবীতে সব পিতা-পিতামহেরা বোধ হয় এভাবে বেঁচে থাকে। সে বলল, আপনি কিনারায় নামবেন না? বলেই ভাবল, এটা কি বলা ঠিক হল। এটা অবান্তর কথা। একজন কাপ্তানের কিনারায় নামা না নামা সম্পর্কে সে কোনই প্রশ্ন করতে পারে না। সে প্রায় মরমে মরেই যেত।

    তখন হিগিনস খুবই অবাক হয়ে বললেন, নামব না! তাহিতি আমার খুব প্রিয় জায়গা। এইটুকু বলে তিনি অন্যমনস্ক হয়ে গেলেন। মনে হচ্ছে সবই সেদিনের কথা। এলিস তাহিতিতে নেমে ছেলেমানুষের মতো হৈ-চৈ বাঁধিয়ে দিয়েছিল। সমুদ্রের ধারে ধারে পিচের রাস্তা কত রকমের রং-বেরংয়ের গাড়ি, এবং আশ্চর্য বাজনা—গাড়ি চালাতে চালাতে সেই অদৃশ্য মিউজিক চারপাশে বেজে উঠেছিল।