Author: তাহের আলমাহদী

  • সাত

    সাত

    বিকেল পড়তেই নবমীর সঙ্গে পিলুর চোটপাট শুরু হয়ে গেল। নবমী আজকাল বাবাঠাকুরের বাড়িতে উঠে এসে চোপা করতে শিখে গেছে। অবশ্য পিলু জানে, নবমীর চোপা আগেও কম ছিল না। কেবল তাকে দেখলেই বুড়ির মাথা ঠাণ্ডা হত। তার সমবয়সীদের উৎপাতের কথা জঙ্গলটায় ঢুকলে বুড়ির কাছে শুনতে পেত। নবমীর নালিশ ছিল, দেখেন দা-ঠাকুর আমারে ঢিল মেইরেছে। দ্যাখেন—বলে পায়ের গোড়ালির উপর হাত দিয়ে দেখাতেই চটে গেছিল—নাম জান, কে, কে করেছে!

    নবমী মাথা নেড়েছিল।

    —মুখ চেন?

    নবমী তাও যেন ঠিক জানে না। তবু যারা পরিত্যক্ত ইটের ভাটার বনজঙ্গলে ঢুকে উৎপাত করতে পারে তাদের সে চেনে। সবাইকে নবমীর কাছে নিয়ে গেছিল।

    নবমী ঠিক চিনতে পেরেছিল।

    —তুই ঢিল ছুঁড়লি।

    —আমারে আকথা কু-কথা কয় পিলুদা।

    নবমীর সাফ কথা, না দা-ঠাকুর, মিছা কথা

    —তুমি আমারে ছাগলের বাচ্চা কও নাই।

    —হ কইছি।

    —তুমি আমারে কও নাই ওলাওঠা হইয়ে মরবি।

    —হ কইছি।

    —তুমি আমারে কও নাই বংশে বাতি দিতে থাকব না।

    —হ কইছি।

    পিলু নবমীকেই তেড়ে গেছিল।

    —কেন বললে। বল। ছাগলের বাচ্চা কেন বললে। এটা কু-কথা না!

    —আমার ছাগলের বাচ্চা নিয়া নিব কয়। কু-কথা হইব ক্যান।

    —তুমি বোঝ না ভয় দেখায়।

    —ঘর থেইকে তাড়িয়ে দেবে কয়।

    —এটা ঘর। এটাতে মানুষ থাকতে পারে। বনজঙ্গলে থাক, আর এটা তোমার ঘর হয়ে গেল।

    —আমার স্বামীর ভিটে পিলুদা। বনজঙ্গল বলেন ক্যানে!

    —স্বামীর ভিটা! ভয়ে তো মর, রাতে সাপ ঢোকে। সারারাত ঘুমাও না। লাঠি নিয়ে দরজায় বসে থাক। শেয়ালে খটাশে টেনে নিয়ে যখন যাবে, কে রক্ষা করবে! হ্যাঁ কে তোমাকে রক্ষা করবে বল। শাপশাপান্ত করলে ঢিল ছুঁড়বে না।

    তারপর পিলু কেমন ফুঁসে উঠত— তোরাই বা কী! বুড়ির কিছু আছে। নবমীর কাছে তোদের নিয়ে আসাই ঠিক হয়নি। আগে তো ভয়ে জঙ্গলটায় ঢুকতিস না।

    —না পিলুদা, বনটায় ডাইনি থাকে। লোকে স্বচক্ষে দেখেছে। নবমী ডাইনি। হ্যাঁ–কি রে, কথা বলছিস না কেন। বনজঙ্গলে ঘুরে বেড়ায়। ফলপাকুড় যা পায় খায়। ছাগলটা নিয়ে জঙ্গলের মাঠে ঘাস খাওয়ায়। গাছের সঙ্গে কথা বলে, সে কী মানুষ আছে! একটা গাছ হয়ে গেছে না! গাছের সঙ্গে তোদের যত বাঁদরামি! আর কোনোদিন নবমী যদি নালিশ করে ঠ্যাং ভেঙ্গে খোঁড়া করে দেব বলে দিলাম।

    –পিলুদা, একখানা কথা!

    —কী কথা আবার।

    —নবমী য্যান আমাদের ছাগলের বাচ্চা না কয়।

    —নবমী, আর কখনও যদি শুনি, এদের মুখ করেছ, তবে তোমার ভাত জল বন্ধ। তোমার খোঁজখবর নিতে আমার বয়ে গেছে।

    —না দা-ঠাকুর, মুখ কইরব না। আপনি না এইলে আমার যে দিন যায় না দা-ঠাকুর।

    সেই দা-ঠাকুরের সঙ্গে নবমী চোপা শুরু করেছে। পরী আর মায়া বিলুর তক্তপোষে শুয়েছিল। ভাদ্র মাসের গরম। জানালার খলপাটা তুলে দেওয়ায় ঠাণ্ডা বাতাস বইছে। কোথাও বৃষ্টি হয়েছে। আকাশে দুপুরের দিকে মেঘ করেছিল, আবার মেঘ কেটে গেছে। সামনের মাঠটায় আউস ধানের চাষ—ধান পেকে গেছে, জানালায় বসে সব দেখা যায়। ঘরটা তার এত চেনা, মনেই হয় না এটা তার পরবাস।

    পিলুর এক কথা, পারব না। রোজ রোজ বায়না। কে নিয়ে যায়! মানুষের আর কাজ কাম নেই। এই সেদিন গেলে স্বামীর ভিটে দেখতে। আজ আবার মাথায় ক্যাড়া উঠেছে। আমি পারব না। স্কুলের মাঠে ভলিবলের কোট কাটতে যাব।

    মিমি ঠিক বুঝতে পারছে না কেন বুড়ির এত চোপা! নবমী বুড়ির বনটা সেও চেনে। একবার কারবালার জঙ্গলের ভিতর দিয়ে আসার সময় পিলু বলেছিল, জান পরীদি, এই জঙ্গলটায় একটা বুড়ি থাকে।

    মিমি অবাক হয়ে গেছিল শুনে।

    সেই প্রথম তার বিলুদের বাড়ি দেখতে আসা পালিয়ে। লক্ষ্মীকে নাকি বিলুই সঙ্গে নিয়ে এসেছিল। রাস্তাটা লক্ষ্মী সে-জন্য চেনে। কালীবাড়িতে বিলুর সঙ্গে জোর করে পরিচয় করতে গিয়েই ফ্যাসাদ। মজা করার জন্যই বলেছিল, তোমাদের বাড়ি আমি যাব। লক্ষ্মী আমাকে নিয়ে যাবে বলেছে। মুখচোরা স্বভাবের বিলু সহসা ক্ষেপে গিয়ে বলেছিল, গিয়ে দেখ না।

    —কেন ঠ্যাং ভেঙ্গে দেবে।

    —কী করব গেলে বুঝবে।

    সেই থেকে তার জেদ। এবং এই জেদ শেষ পর্যন্ত তাকে বিলুর আত্মপ্রকাশের জন্য মরিয়া করে তুলবে যদি আগে টের পেত— তবে বোধ হয় এ-ভাবে গলায় তার কাঁটা ফুটে যেত না। বিলুর আত্মপ্রকাশের জন্যই যেন অপরূপা কাগজ, কবিতা পাঠের আসর-এবং এক জলছবির মতো একজন বাদ্যকার মাঠ দিয়ে ঢাক বাজিয়ে যায়। গভীর নিশীথে আশ্চর্য স্বপ্নের মতো একজন পুরুষ তার পাশে থাকুক—যার মধ্যে সে কোনো নীরব এবং নিশ্চিত মাধুর্য টের পাবে। তারই প্রতীক্ষায় সে আছে। এবং মায়া আজ তার পাশে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়ার পর বিলুর সেই আক্ষেপ, বার বার কিছু শব্দমালার মধ্যে খুঁজে বার করার চেষ্টা করেছে। পড়তে পড়তে মনে হয়েছে, বিলু যেন ঠিকই লিখেছে—পরী আমার সর্বনাশ। পরী আমার আকাশ বাতাস। গভীর রাতে নির্জনে হাঁটি। দেখি নক্ষত্র হয়ে সে আছে। মাথার উপরে। তার ডানার ঝাপটায় ধুলো ওড়ে। ওড়ে কাঙ্গালের বসন। উলঙ্গ করে দেয় অজ্ঞাতে— পরী আমার সর্বনাশ/জীবনে/বীজবপনে/বিসর্জনে।

    পরী বার বার উচ্চারণ করছিল, জীবনে, বীজবপনে, বিসর্জনে। এই কথাগুলি ভাবতে ভাবতে সে ঘুমিয়ে পড়েছিল। সকাল থেকে যা গেছে। আর ঘুম ভাঙতেই সে শুনছে কী…..

    পিলু বলছে, ডাকাতের বৌ, তার আবার স্বামীর ভিটে।

    ছি পিলু। তুই ওভাবে বলিস না। ডাকাতের বৌ নবমী!

    পরী পায়ে শাড়ি টেনে দরজা খুলে বের হয়ে এল। কিন্তু আশ্চর্য পাশের ঘরে মাসিমা, মেসোমশাই নির্বিকার। তারা অন্য কোনো বিষয় নিয়ে মনে হয় কথা বলছে।

    পিলু আর নবমীর এই কথা কাটাকাটি তারা যেন গ্রাহ্যই করছে না।

    পরীর এটা ভাল লাগল না।

    সে দেখল বুড়ি কোরা থান পরে হাতে লাঠি নিয়ে বসে আছে। কিছুটা অচল। লাঠি ভর দিয়ে উঠতে পারে। কিছুটা যে হেঁটে বেড়ায় তাও লাঠির সম্বলে। সেই নবমীর কী গলা। ডাকাতের বৌ বলাতেও কোনো আক্ষেপ নেই। কোথাও যাবে বলে সে প্রস্তুত। বাধ সেধেছে পিলু।

    পরী বলল, কী বাজে বকছিস পিলু।

    —আর বল না পরীদি, এই সেদিন ধরে ধরে নিয়ে গেছি। হাঁটতে পারে না। দু-পা গিয়ে পড়ে যায়। না ধরলে মুখ থুবড়ে পড়ে মরে থাকবে। তা তোকে কে বাবাঠাকুরের বাড়ি উঠে আসতে বলেছিল। ডর লাগে! ডর। ধনে তার যখ লেগেছে। ঘুম হয় না। লাঠি নিয়ে দরজায় ধপাস ধপাস। না আমি পারব না। একা পার তো যাও।

    পরী বলল, কিরে যা না। এত করে বলছে। তার স্বামী ডাকাত তোকে কে বলেছে!

    —কে আবার বলবে! জিজ্ঞেস কর না। না বললে আমরা জানব কী করে। তিনি নাকি ডাকাতের বৌ ছিলেন। এক বারে গরিমায় পা পড়ে না। ফোকলা দাঁতে কী হাসি, কী না, সে যদি দেখতে। ডাকাতের বৌ বলেই নাচ শুরু। লাঠিতে ভর করে ঘুরে ঘুরে কোমর বাঁকিয়ে নাচ যদি দেখতে!

    ডাকাতের বৌ, নবমী ডাকাতের বৌ—পরী বড় বড় চোখে দেখছিল। কেমন ডাকাত, কোথাকার ডাকাত, খুনটুন কত করেছে কে জানে! তবে কী জঙ্গলের মধ্যে থাকত ডাকাতের বৌ বলেই। কিন্তু পরী এটাই বা কী দেখছে! ডাকাতের বৌ বলায় নবমী কী খুশি।

    নবমী লাঠি ভর দিয়ে ওঠার সময় কঁকিয়ে বলল, ডাকাতের বৌ বলে কী আমার স্বামীর ভিটে থাকতে নাই। লিয়ে না যান, একাই চইললাম।

    পিলু সেই মতো এক দুর্বাসা যেন।—পা বাড়িয়ে দ্যাখ কী করি! যাও ঘরে। বারান্দায় বসে থাক।

    ইস্ পিলুটার মায়া দয়া নেই! জঙ্গলের মধ্যে স্বামীর ভিটে, বেশি দূরেও না, পরী বলল, চল নবমী, আমার সঙ্গে চল।

    মায়া বের হয়ে বলল, তুমি যাবে! আমিও যাব।

    পিলু বলল, তবে আমিও যাব।

    বাবা ঘর থেকে বের হয়ে বললেন, দিলে তো মাটি করে। নিত্যকার যাত্রাপালাটা দেখতে পেলে না। রোজ বিকাল হলে নবমীর নাকি মন কেমন করে। আর সাধাসাধি। পিলু যাবে না। নবমীর গোঁ যাবে। ডাকাতের বৌ বলে তারও জেদ কম না। দু’জনের তর্ক দেখলে তোমার হাসি পেত।

    পিলু বলল, জান পরীদি, কী আস্পর্ধা। বলে, কি না যোয়ান মানুষটা সামনে নাই। থাকলে দেইখতেন। তাঁর বন্ধুরে নির্যাতন! এক আছাড়ে ছাতু কইরে ফেলত। গোট গোট মল বানিয়ে দিয়েছিল। ঘাঘড়া। রেইতের বেলা ফিরে এইলে কোমরে হাত দিইয়ে নেইচেছি কত— কী যেন সব বলে না। তারপরই নবমীর দিকে আঙ্গুল তুলে বলল, মনে রেখ তুমি ডাকাতের বৌ, আমি বামুনের পোলা। এক ফুয়ে উড়ে যেত তোমার মরদ।

    পিলু ব্রাহ্মণ সন্তান কথাটা স্মরণ করিয়ে দিলেই নবমী জব্দ। বামুনের অভিশাপেই মানুষটা নাকি তার গেছে। কোন এক ব্রাহ্মণীর গা থেকে অলঙ্কার খুলে আনার সময় নাকি অভিশাপ দিয়েছিল, ভেদ বমিতে যাবি। নবমী মনে করতে পারে সব। নবমী মনে করতে পারে সেও ছিল লুটের মাল। বখরায় বনছিল না বলে, তাকে নিয়ে পালাল। কত গ্রাম গঞ্জ রেল ইস্টিশানে তারা পড়ে থেকেছে। তার জন্য মানুষটা পুলিশের তাড়ায় দেশ ছাড়া রাজ্য ছাড়া হয়ে গেল। শেষ বেলায় ইটের ভাটায়। কুলি কামিনের সর্দার।

    পরী আগে আগে হাঁটছে। পিলু, বুড়ির পেছনে। সত্যি বেশ দূর মনে হল তার বাড়ি ফিরতে হবে। রাত করে ফিরলেও কেউ বলার নেই। সে পার্টির কাজে কত জায়গায় যায় মিটিং মিছিল করতে। কত রাতে ফিরতে পারে না। খুব বেশি হলে সুহাসদাকে ফোন—এবং সুহাসদা জানে সে যেখানেই যাক, তার নিরাপত্তার ব্যবস্থা পার্টির ক্যাডাররাই করে থাকে। আজ দাদু ক্ষোভে অভিমানে ফোনও না করতে পারে।

    বাঁশঝাড়ের নিচ দিয়ে উঁচু নিচু পথ। সামনে ঢিবি। ঢিবির পাশে মাটি তোলায় মজা পুকুর। শাপলা শালুক, জলজ ঘাস, এবং কত সব বিচিত্র পাখি উড়ে যাচ্ছে বনটায়। পিলু কিংবা মায়ার যেন মনেই নেই তাদের দাদা নিখোঁজ। পরীদিকে নিয়ে বেড়াতে বের হয়ে সব দেখাচ্ছিল। ওটা—উ যে চালা ঘরটা দেখছ, ওখানে আমার পিসি বাড়ি করেছে। বাড়ি না বলে জঙ্গলের মধ্যে ঝুপড়ি বললেই হয়। গোপাল করের সীমানা শেষ হতেই বনজঙ্গলের শুরু। কাঁটা গাছ, খেজুরের বন, তাল গাছ, শিশুগাছ চারপাশে। বর্ষাকাল বলে ঝোপজঙ্গল নিবিড়

    পরী বলল, ঠিক রাস্তায় যাচ্ছিস তো!

    পরী আসলে সেই রাস্তাটা চিনতে পারছে না। এমনও হতে পারে বর্ষাকাল বলে, বনজঙ্গল নিবিড় বলে সে যে ঠিক এই রাস্তায় এসেছিল মনে করতে পারছে না—কিংবা দিন দিন বাড়িঘরের সংখ্যা বাড়ায় জঙ্গলে যাবার রাস্তাটা জায়গা বদল করতে পারে। আসলে রাস্তা বলেও কিছু নেই। একটা গভীর সুমার বনে ঢুকে যাচ্ছে তারা। পরী বলল, নবমী, জঙ্গলে একা থাকতে কষ্ট হত না।

    নবমী হাতজোড় করে তখন কার উদ্দেশে যে প্রণাম করত বোঝা ভার।

    পিলু এগিয়ে গিয়ে বলল, জান পরীদি, নবমীর ছাগলের দুটো বাচ্চা। বেশি হলে জঙ্গলে রেখে আসত।

    —জঙ্গলে কেন?

    —কী জানি কেন! ওতো বলে ভূতেরা চাইত

    —ভূতেরা ছাগলের বাচ্চা চাইত। ভারি মজার ভূত তো!

    নবমী লাঠি ঠুকে ঠুকে হাঁটছে। কাঁটা গাছে তার কাপড় জড়িয়ে গেলে পরী উবু হয়ে ছাড়িয়ে নিচ্ছে। কাঁটা গাছ বাঁচিয়ে যাবারও রাস্তা নেই।

    পরী নবমীর কাপড় থেকে কাঁটা গাছ ছাড়িয়ে দেবার সময় শুনতে পেল, ভূত কেন হবে। ঠাকুর দেবতা!

    পিলু বলল, আচ্ছা পরীদি, বনে ভূত ছাড়া কিছু থাকে! ঠাকুর দেবতা থাকে বাড়িতে। নয় মন্দিরে।

    নবমীর এক কথা, দা-ঠাকুর বনের দেবতা আছেন। জানেন না গো। একলা এতটা কাল থেইকে বুঝেছি।

    নবমীর সব কথা স্পষ্ট নয়। শুধু জিভ নাড়ে। আর কী বলে বোধহয় পিলু ছাড়া আর কেউ বোঝে না। তবু বনটার কাছে এসে মনে হল পরীর, এক নারী তার যুবতী বয়সে এই জঙ্গলে উঠে এসেছিল। সঙ্গে তার মরদ। বাবুদের ইটের ভাটায় কাজ। শীত বর্ষায় গাছপালার মধ্যে থাকতে থাকতে নবমীর এই বন ছাড়া অন্য কোনো অস্তিত্ব নেই। তবু শেষ বয়সে মেসোমশাই তাকে আশ্রয় দিয়েছেন। শেয়ালে খাটাসে খেলে মানুষের অসম্মান। এখন সেই নবমী স্বামীর ভিটে দেখার জন্য পাগল। কে করবে এত!

    বিলুদের বাড়িটায় হাঁস কবুতর খোঁড়া বাঁদর গোটা ছয়েক বিড়াল, দুটো কুকুর — কী না ছিল! এখন প্রাণীর সংখ্যা কমে এসেছে। পরী মনে করে একজন উদ্বাস্তু মানুষের নানা সংস্কার গড়ে উঠতে পারে— কোন পাপে দেশ ছাড়া, এমন কোনো উচাটনে পড়েই হয়তো যাবতীয় প্রাণীজগত থেকে গাছপালার প্রতি এক অপত্য স্নেহ গড়ে উঠেছে মানুষটার। তা না হলে এই নবমীকে, যার তিনকাল গেছে, শেষ কালে যাবার সময়, তার জন্য ঘর তুলে দিয়েছে! গীতা কিনে দিয়েছে! পিলু নাকি মাঝে মাঝে রামায়ণ মহাভারতও পড়ে শোনায়। সব বিলুর কাছেই শোনা। বাড়িটা যে চিড়িয়াখানা করে তুলছে তার বাবাটি— সেটাও ক্ষোভের বিষয়। পরী তার বাড়ি যে যায়, তাও বাবা মানুষটিকে দেখতে, তার চিড়িয়াখানা দেখতে। কিন্তু বিলু বোঝে না, এই বুড়ির তিনকুলে কেউ নেই—একজন মানুষের প্রাণ কত বড় হলে তাকে বসবাসের জায়গা করে দিতে পারে। নিজে উদ্বাস্তু না হলে, হয়তো নবমীর কথা মেসোমশাইয়ের মাথাতেই আসত না।

    জঙ্গল থেকে নবমীকে তুলেও আনা হত না। রোগে ভোগে চারপাশে শুধু বনজঙ্গলের জীবজন্তুর সাড়া পাওয়া যেত। পিলুর খোটা দিয়ে কথা বলাটাও পরীর পছন্দ হচ্ছিল না। ডাকাতের বৌ! তোর দাদা কত বড় ডাকাত জানিস। তার মান অপমানের জ্বালা কত জানিস! সে কী ভাবে আমাকে হেনস্থা করত জানিস!

    কিছুই জানিস না।

    ওদের দুই বন্ধুকে সাইকেলে আসতে দেখলেই বুক ধড়াস করে উঠত। সাইকেল থামিয়ে অপেক্ষা করতাম। কতদিন কতভাবে আমাকে পুড়িয়ে মারার চেষ্টা করেছে। আমাকে দেখেই মুকুল সাইকেল থেকে নেমে দাঁড়াত। তোর দাদা নামত না। অবজ্ঞারও শেষ থাকে। সে সাইকেল নিয়ে ভাঁকুড়ির রাস্তায় উধাও হয়ে যেত।

    কী যে খারাপ লাগত। বুঝবি না!

    আমি কী মুকুলের সঙ্গে কথা বলার জন্য সাইকেল থেকে নেমেছিলাম। যার জন্য নামা তিনি হাওয়া।

    কী ব্যাপার মুকুল!

    খুব চটে আছে।

    কেন?

    আর কেন। কলেজ ডিবেটে যেই তুমি উঠে দাঁড়ালে, ব্যস বাবু বললেন চল। আরে যাবে কী! শোনো মিমি কী বলছে। জোরজার করে বসিয়ে রাখলাম। কিন্তু যত তুমি যুক্তি দিয়ে বিজ্ঞান, প্রযুক্তির পক্ষে কথা বলছ, তত খেপে যাচ্ছে। যত তুমি হাততালি পাচ্ছ তত তার মুখ গোমড়া হয়ে যাচ্ছে। আর হঠাৎ জান দেখি পাশে নেই। কখন ভিড়ের মধ্যে হারিয়ে গেছে। বাইরে বের হয়ে দেখছি গঙ্গার ধারে সাইকেল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। বললাম, কী বিলু, এখানে! পরী ডিবেটে কী তুখোড় যুক্তি দিয়ে বলল, যদি শুনতে!

    আরে রাখ! বড়লোকের মাইয়া আমি চিনি। মুখে বড় বড় আদর্শের বুলি। আচ্ছা মুকুল, তুমি বিশ্বাস করতে পার এরা কখনও গরীবের দুঃখ বুঝতে পারে। ভণ্ডামী না। গ্রামে গ্রামে বিদ্যুৎ। সব মানুষের জন্য আহার আশ্রয় উত্তাপ একমাত্র বিজ্ঞান ছাড়া সম্ভব নয়। মানুষের জন্য সমান সুযোগ- কখনও সম্ভব! এরা যতদিন আছে শুধু ভণ্ডামির আশ্রয় নিয়ে গরীব মানুষকে প্রতারিত করবে। আগেকার জমিদাররা পুকুর কেটে, মন্দির বানিয়ে গরীব মানুষদের ধোঁকা দিয়ে গেছে, এরা এখন সমাজবাদের নামে ভাঁওতা দিচ্ছে। পরীর এটা প্রতারণা। তোর কী দরকার, হ্যাঁ কে তোকে বলেছে, মিটিং মিছিলে স্লোগান দিতে, এ-আজাদি ঝুটা হ্যায়।

    মিমি জানে, একজন মেয়ের এই আত্মপ্রকাশ বিলুর একদম পছন্দ নয়। সে মিটিং মিছিলে গেলে বিলু ক্ষেপে যেত। পথ নাটিকায় অংশ নিয়েছে মিমি, শুনলেই ও রাস্তায় যেত না। সে মহেশ নাটকে আমিনার পার্ট করেছে, কলেজিয়েট স্কুলের দোতলার হলঘরে নাটক—সে কার্ড দিতে গিয়ে শুনল, বিলু বাড়ি নেই। মাসিমা মেসোমশাইকে বলেছে, পিলুকে বলেছে, তোরা যাস। সে নাটকে অংশ নেবার আগে বারান্দায় বার বার ছুটে আসত, পিলু যদি আসে। আর কেউ না আসুক পিলু ঠিক আসবে। সেই পিলুর পর্যন্ত পাত্তা নেই। তার যে কী খারাপ লাগত! পরে পিলু এলে মিমিও কথা বলত না।

    পিলুর তখন এক কথা, কী করব দাদা বারণ করেছে।

    মিমি কটাক্ষ করে বলত, একেবারে লক্ষ্মণ ভাই। দাদা বারণ করল বলেই আসবি না। আমি কেউ না। দাদার কথাই বড় হল!

    পিলু বলত, জাননা দাদা কী অশান্তি করতে পারে!

    তোর দাদা স্বার্থপর। মজা দেখাচ্ছি।

    সেও তখন ক্ষেপে যেত। আরও বেশি পার্টিঅফিস, আরও বেশি কলেজ ইউনিয়ান, সারাদিন টো টো করে ঘুরছে—আর মিমি জানে, বিলুটা চোরের মতো দূর থেকে সব দেখবে আর দিনরাত ফুঁসবে।

    এটাও ডাকাতি। আমার ভাললাগা মন্দলাগার বিন্দুমাত্র দাম নেই। জবরদস্তি করে তুমি আমার প্রাণ ছিঁড়েখুঁড়ে খেতে চাও।

    .

    পিলু বলল, মিমিদি, আমরা এসে গেছি।

    সে কেমন হুঁস ফিরে বলল, নবমী কোথায়!

    –ঐ যে আসছে।

    পরী দেখল, এক অশীতিপর বৃদ্ধা কেমন বেহুঁস হয়ে স্বামীর ভিটে দেখার জন্য উঠে আসছে।

    গভীর বনজঙ্গলে মিমি কোনো ডেরা পর্যন্ত দেখতে পেল না। নবমী থাকত কোথায়! কুল গাছের জঙ্গল পার হয়ে বড় বড় সব শিরীষ গাছ, আকন্দ গাছের ঝোপ, পিটুলি লতার সমারোহ। লাল বনজ ফল। এক ঝাঁক টিয়াপাখি ঠুকরে খাচ্ছে। মানুষজনের সাড়া পেয়েই তারা উড়াউড়ি শুরু করেছিল। কিন্তু মিমি বুঝল না, শুধু বনজঙ্গলেই স্বামীর ভিটে কী করে হতে পারে। থাকার মতো একটা ঝুপড়ি হলেও বসবাসের জন্য দরকার। সেটা কোথায়?

    পিলু সারা জঙ্গলটায় ঢুকে গিয়ে কেমন এক নেশার মধ্যে পড়ে গেছে। ঝোপে জঙ্গলে কোথাও যদি পাকা পেয়ারা পাওয়া যায়—এই জঙ্গলের মধ্যে কোথাও কোনো গোপন জায়গায় সেই পেয়ারা গাছটা—পিলু বোধহয় সেটাই খুঁজছে। সে গুড়ি মেরে ঢুকছে, মায়া ডাকছে, ছোড়দা তুই কোথায়? মিমি দাঁড়িয়ে আছে একা। ছোট্ট এক তৃণখণ্ডের চারপাশে এত বড় বড় গাছের বনরাজি লীলা দেখতে দেখতে সে কিছুটা অভিভূত। এর কোনো গোপন অভিলাষ আছে সে টের পায়। এখানে একজন পুরুষ তার প্রিয়তমা নারীকে নিয়ে থাকার মধ্যে কোনো গভীর আনন্দ খুঁজে পেতেই পারে। নবমীর স্বামী মানুষটাকে কেন জানি এই মুহূর্তে একজন স্বপ্নের মানুষ মনে হল। সেও হয়তো পালিয়ে কোথাও এখন গোপন করতে চায় নিজেকে। সে আর তার প্রিয় পুরুষ। আহার আশ্রয় উত্তাপের ব্যবস্থা থাকলে এর চেয়ে ভালবাসার জায়গা আর কোথায় থাকতে পারে সে জানে না।

    এবং উলঙ্গ করে দেবার স্পৃহা নিরন্তর যে জন্মলাভ করে মনের মধ্যে, ডাকাত মানুষটি বনজঙ্গলে ঢুকে গিয়ে এটা বোধহয় আরও বেশি টের পেয়েছিল। সে জায়গাটা ছেড়ে যেতে পারেনি। সারাদিন পরিশ্রমের পর কী ঝড় বৃষ্টি, কী শীতের হাওয়ায় অথবা কোনো জ্যোৎস্না রাতে তার পরিভ্রমণ ছিল নবমীকে নিয়ে। প্রতিটি গাছের প্রতি তার মায়া জন্মে যেতেই পারে। এমনকী এই মুহূর্তে তার নিজেরও কেন যে মনে হচ্ছিল জায়গাটা ছেড়ে চলে গেলে সেও আর এক নবমী। নবমী হাঁপাতে হাঁপাতে উঠে এসে মিমির পায়ের কাছে বসে পড়ল। কথা বলতে পারছে না।

    মিমি বলল, কোথায় তোমার ঘর!

    —ঐ যে হোথায়!

    মিমি কিছুই দেখতে পাচ্ছে না। শুধু একটা ভাঙ্গা ইট কাঠের আস্তানা। ভিতরে কিছু নেই। যে কোনো মুহূর্তে ওটা ধসে পড়তে পারে। পরিত্যক্ত কোনো আবাস হতে পারে এটা মিমি ভাবতেই পারে না। বাইরে থেকে মনে হয় শেওলা ধরা ইটের পাঁজা। তার ভিতর থেকে, ফাঁকফোঁকর থেকে বনজ উদ্ভিদের জন্ম হচ্ছে। এবং হেমন্তে শীতে কিংবা বর্ষায় এই ইটের পাঁজার মধ্যে শেকড় চালিয়ে বেঁচে থাকার প্রাণান্তকর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

    —ওর ভিতর তুমি থাকতে!

    নবমীর ফোকলা মুখে পরিতৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল। কিছু বলল না। সে তার আবাসের দিকে অপলক তাকিয়ে আছে। সামনে কবে কোন প্রাচীনকালে মাটি তুলে ইট তৈরি হয়েছিল, তার খানাখন্দ এখনও বিদ্যমান। এই খানাখন্দের জনই ছিল নবমীর জীবনলাভের উপায়। তার রোগ শোক ব্যাধি এবং সুখ সব যাবার সময় জলে বিসর্জন দিয়ে গেছে।

    কেন যে মিমির মনে হল, এমন সুন্দর জায়গা ছেড়ে কেউ যায়। মানুষটার স্মৃতি নবমীকে আটকে রাখতে পারল না। কারণ এই গভীর বনজঙ্গলের মধ্যে সব গাছপালার সঙ্গে একজন মানুষের নিরন্তর অবস্থান যে মরে যায়নি, নবমীর মুখ দেখে সে তা টের পাচ্ছিল।

    মিমি না বলে পারল না, তোমার খারাপ লাগল না, চলে গেলে!

    —সাধে কী গেছি মা ঠাকরুণ!

    —কী হয়েছিল!

    —যথ।

    —যথ!

    —হ্যাঁ মা ঠাকরুণ যখ এসে ঘোরাঘুরি করতে শুরু করল। কত ডাকতাম, তার সাড়া পেতাম না। ডর ধরে গেইছিল।

    নবমী এ-সব কী বলছে। সারা জীবন এই বনজঙ্গলে বসবাসের পর যখ এসে তাড়া করল তাকে!

    মিমি কিছুটা বিহ্বল হয়ে পড়ছে। একজন অনাথ নারীর মধ্যে যখের ভয় কেন উদয় হল, সে তা বুঝতে পারছে না। ক্রমেই সে বিস্ময়ের মধ্যে ডুবে যাচ্ছিল।

    সে বলল, তোমার মা বাবার কথা মনে পড়ে না!

    —পড়ে।

    —কষ্ট হয় না?

    –না।

    —কার কথা ভাবলে কষ্ট হয়।

    —মরদের কথা।

    —আর কারো কথা না!

    —না আরও একজন আছেন। পিলু দাদা। আমার দা-ঠাকুর।

    —তোমার দা-ঠাকুর। পিলু তো সেদিনের ছেলে।

    —উ তো এসে আমাকে দেখে পালাল না।

    —পালাবে কেন!

    —আমি যে মানুষ না মিমিদি। আমার শনের মতো চুল, কংকালসার শরীর, উলঙ্গ হয়ে ঘুরে বেড়াই, ডাইনি ছাড়া কেউ কিছু ভাবতে পারত না। জঙ্গলটায় ভয়ে লোক ঢুকত না। আমি তুকতাক করে ছাগল ভেড়া বানিয়ে রাখি। বিলুদাও রেগে যেত। দা-ঠাকুর খোঁজ খবর নিতে এলেই বিলু দাদা তাড়া করত দা-ঠাকুরকে।

    নবমী কত কথা বলে যাচ্ছে।

    কবেকার সব স্মৃতি—ভাল করে বোধহয় মনেও রাখতে পারেনি। তার অসংলগ্ন কথা এটা ওটা বাদ দিয়ে জুড়ে দিলে মনে হয়, আশ্চর্য এক গভীর প্রেম ছিল তার ডাকাত মানুষটির সঙ্গে।

    সে বলল, তোমার বাবা কী করতেন!

    —তিনি তো বড় সওদাগর ছিলেন। বয়েল গাড়ি ছেইল তিন গণ্ডা। বাজারে আড়ত — চাল, ডাল, তেলের। মোকাম। ঘর দরজার সীমাসংখ্যা নাই। বাড়িতে ডাকাত পড়ল। ছিনতাই হয়ে গেলাম।

    পরী শুনছে। তার মধ্যে কোনো জলছবি ফুটে উঠছে। প্রশস্ত হলঘর — ঝাড় লণ্ঠন, চাকরবাকর, দাঁড়ে কাকাতুয়া এমন এক জলছবি ভেসে বেড়াতে থাকলে সে দেখতে পেল, সেখানে কে একজন লুণ্ঠন করার জন্য গোপনে ঢুকে গেছে। তার ভিতর হাহাকার বাজছে। কোথায় গেল বিলু! কোথায় গিয়ে উঠল। যেন সেই মৃত ডাকাত আবার অন্য ভূমিকায় এসে হাজির হয়েছে বনটায়। সেখানে সে কাউকে তুলে আনতে চায়—আবার অবাঞ্ছিত ভেবে নিজেকে কষ্ট দিতেও ভালবাসে।

    নবমীর জীবন তাকে আজ অন্য কথা বলছে। তার মা-বাবার কথা মনে পড়ে, তবে কষ্ট হয় না। তার মোকামের কথা মনে পড়ে কিন্তু কোনো অসুবিধা বোধ করে না।—দু-তিন গণ্ডা বয়েল গাড়ির কথা মনে পড়ে—কিন্তু তাতে উঠে বসার কোনো আগ্রহ নেই তার। শুধু স্বামীর ভিটায় ঘুরে ফিরে চলে আসতে চায়। পিলু মুখ করে। সে নিয়ে না এলে আজ এই তীর্থক্ষেত্রেরও খবর পেত না। তীর্থ তো মানুষ শান্তির জন্য করে। মানসিক শান্তি।

    তখনই পিলু কোত্থেকে জঙ্গলের মধ্যে উঠে দাঁড়াল। ডাকল, পরীদি, শিগগির এস।

    —কেন।

    —এস না।

    মায়াও জঙ্গলের ডালপালা সরিয়ে দূরে উঁকি দিল।—মিমিদি, এসে দেখ!

    মিমির ইচ্ছে হচ্ছিল না নড়তে। এই বৃদ্ধার সঙ্গে তার কথা বলার আগ্রহ অসীম। সে বলল, যাচ্ছি। যাচ্ছি বলে আবার কথা শুরু করে দিল।

    —তোমার মরদ কী মরে যখ হয়ে গেছিল।

    —না না। মরদ আমার সে-রকম আদমি ছেল না।

    পরী ঘাসের উপর বসে পড়েছে। দাঁড়িয়ে কথা বলতে অসুবিধা হচ্ছিল। সব কথা নবমীর বুঝতেও পারছে না। সে নবমীর সামনে হাঁটু মুড়ে বসে পড়ল।

    দু’জন মুখোমুখি বসে।

    একজনের ঊষাকাল, অন্যজনের সাঁজ লেগে গেছে।

    পরীর কেন জানি নবমীর মুখ দেখতে দেখতে এমনই মনে হল। তার চেয়ে যে বেশি শ্রী ছিল না নবমীর শরীরে কে বলবে! সে নবমীকে বলল, ডাকাতের সঙ্গে ঘর করতে ভয় করত না।

    নবমীর আবার সেই অপরূপ স্নিগ্ধ হাসি।

    —যম। চোখের পাকে ভিরমি খেত। যমের মতো আমারে ডরাত। বলে কী নবমী!

    —তোমার চোখের পাকে ভিরমি খেত।

    —হা সাচ বুলছি। মিছা বুলছি না। ডাকাতি ছেইড়ে দিল ডরে।

    —বলে কী!

    —হ্যাঁ মিমিদি, আমি মিছা কখনও বুলি না।

    মিমির কেন যে এত আগ্রহ নবমীর সব খোঁজ খবর নেবার। সে বলল, তোমার বাবা মাকে দেখতে ইচ্ছে হত না।

    —হত। তবে মরদের ইজ্জত বড় না আমার ইচ্ছা বড় বুলেন! আমি তারে ছেইড়ে গেলে আতান্তরে পইড়ে যাবে না!

    —সেই ভেবেই যাওনি।

    লজ্জায় নবমী মাথায় আঁচল টেনে দিল।

    এ কী পরীর সহসা আবার অশ্রুপাত কেন!

    সে কথা বলতে পারছিল না। দু-হাটুর মধ্যে মুখ গুঁজে দিল। কোথায় খুঁজবে। সে জানে মেসোমশাই তার সান্ত্বনা পেয়ে আশ্বস্ত হয়েছেন। বাড়ির সবাই। কিন্তু তাকে আশ্বস্ত করবে কে! বিলু যদি কোনো প্ল্যাটফরমে শুয়ে থাকে। সে তো নিজেকে কষ্ট দেবার জন্যই সংসারের স্বচ্ছলতা থেকে সরে গেল। এক দিকে তার নিজের আত্মপ্রকাশের তাড়না, অন্য দিকে পরীর মর্যাদা নষ্ট না হয় ভেবেই সে নিখোঁজ হয়ে গেল। তার হাত পা কাঁপছে। কেন যে দেখতে পাচ্ছে, প্রখর রোদে কেউ হেঁটে যাচ্ছে। মুখচোরা মানুষ। কাউকে নিজের কষ্টের কথা কখনও মুখ ফুটে বলে না। তা ছাড়া সে কলকাতার রাস্তাঘাটও ভাল চেনে না। ভিতরে এমন উতলা হয়ে পড়ল যে কিছুক্ষণ সে আর কোনো কথা বলতে পারল না।

    নবমীর কথাতেই তার হুঁস ফিরে এল। নবমী তো জানে না, সেই শুধু ডাকাত নিয়ে ঘর করেনি। সব নারীকেই কোনো না কোনো ডাকাতের পাল্লায় শেষ পর্যন্ত পড়ে যেতে হয়।

    —আমার নিবাসে চলেন।

    নবমী লাঠি ভর করে উঠে দাঁড়াল।

    পরী আর কী করে! নবমীর জীবন যে আগ্রহের মধ্যে ফেলে দিয়েছে, তাতে সে তাকে যেন আর বিন্দুমাত্র অবহেলা করতে পারে না। নবমী এতটা হেঁটে এসেও কোনো ক্লান্তি বোধ করছে না। সে এখন যেন পরীদিকে নিয়ে এই বনের মধ্যে ঢুকে গিয়ে কী মজা ছিল তার বেঁচে থাকার – দ্যাখ দ্যাখ, ঐ শিরীষের তলায় মরদ শুয়ে আছে, আমি জল নিয়ে গেছি, দ্যাখ দ্যাখ, হোথায় আড়াল হয়ে গেলে মরদ খোঁজাখুঁজি করত। জ্যোৎস্না রাতে ঘুরে বেড়াত গাছের ছায়ায়—আকাশ চাঁদমালা হয়ে বিরাজ করত—এমন ভুবনমোহিনী রূপ তার যেন বনজঙ্গলে না থাকলে ডাকাত মানুষটি টের পেত না।

    ভিতরে ঢুকতে ভয় করছিল পরীর। যেন ইটের পাঁজা সব খুলে মাথার উপরে পড়বে। কিন্তু সে অবাক হয়ে দেখল, মেঝে পাকা। দেয়ালে সিমেন্ট বালির পলেস্তারা, একটা বনজ গন্ধ ঘরে।

    শেষ দিকে নবমী ছাগলের দুধ আর বনের ফলমূল খেয়ে বেঁচে থাকত।

    পিলু বলেছে, বাসাটাই যেন বুড়িকে আগলে রাখত। হয়তো নবমী যখের ভয়ে পড়ে না গেলে স্বামীর ভিটে ছেড়ে যেতই না। জঙ্গলেরও থাকে প্রাণ কিংবা ভালবাসা, আর সব প্রাণীসকলের মতো নবমীও ছিল এই জঙ্গলের একজন। শেয়াল, বেজি, গো-সাপ, এমন কি সাপ খোপও ছিল তার প্রিয় সঙ্গী। আর যখন যে গাছে ফল হত, যেন নবমীর হয়ে তারা ঝরে পড়ত নিচে। পিলু গেলেই বাবাঠাকুরের জন্য ফল প্রণামী দিত। বেল, কয়েতবেল, তাল, নারকেল, আম, জাম, গোলাপজাম —কত না বিচিত্র ফলের সমারোহ। কেউ জানতই না, এই কবরভূমি সংলগ্ন জমি সরকারের খাস, আর ভূত প্রেতের উপদ্রবে কত রাতে মানুষ তালকানা হয়ে গেছে, পথ হারিয়েছে—পথ হারালেই জঙ্গলের মধ্যে এলোপাথাড়ি ছুটতে গিয়ে দেখেছে, কোনো জরাগ্রস্ত উলঙ্গ রমণী গাছের নিচে বসে ঝিমুচ্ছে। এই বনজঙ্গলে ঘরবাড়ি ওঠার আগে অঞ্চলের মানুষেরা বনটায় ঢুকতেই সাহস পেত না। নবমী বলে এক যুবতী এই জঙ্গলে প্রেত হয়ে ঘুরে বেড়ায়, নবমীর বন বলে খ্যাত, তাকে কখনও দেখা যায়, কখনও দেখা যায় না, যে দেখে সেই দৌড়ায়। পিলুই আবিষ্কার করেছিল, বনের গভীরে এক বুড়ি থাকে। চাঁদের বুড়ির মতোই ছিল প্রথম দিকে রহস্যময় — কিন্তু পিলুর বেজায় সাহস-নবমীর বনের ভিতর দিয়ে শহর থেকে সর্টকাট একটা রাস্তা সে খুঁজে বের করেছিল। রেল-লাইন পার হয়ে, নীলকুঠির পরিত্যক্ত জঙ্গল পার হয়ে কবরখানা। কবরখানার ভিতর দিয়ে গেলেই নবমীর জঙ্গল। সেই কবে থেকে মানুষেরা নবমীর নিশীথে পরিভ্রমণকে কোনো ভৌতিক ক্রিয়াকাণ্ড ভেবে তার এলাকা পরিহার করে চলেছে। পিলু যেদিন তাকে দেখেছিল, তারও কম ভয় ছিল না। এক হাতে কী একটা ফল কুড়িয়ে লাঠি ভর করে এগিয়ে আসছে। দৌড় দৌড়। এক দৌড়ে গাছপালা জঙ্গল ফেলে সে বাড়ি ফিরে নাকি বলেছিল, বাবা, বনটায় না—তারপর আর কিছু বলতে পারেনি।

    বাবা পাটকাঠির বেড়া বাঁধছিলেন। শুনে বলেছিলেন, বনটায় কী!

    পিলু চোখ বড় বড় করে বলেছিল, বনের অপদেবী।

    —বনের অপদেবী!

    — হ্যাঁ বাবা। লাঠি ঠুকে ঠুকে জঙ্গলে ঘুরে বেড়াচ্ছে।

    —অপদেবী হবে কেন। চোখের বিভ্রম। অমন জঙ্গলে মানুষ আসবে কী করে। ভিতরে তো শুনেছি ঢোকাই যায় না। কেউ কেউ বলে নবমী বলে এক নারী এক কালে তার স্বামীকে নিয়ে থাকত। তারা তো সেই কবে হেজে মজে গেছে।

    —না বাবা আছে। আমি দেখেছি।

    বাবা হেসে বলেছিলেন, তুমি যে কত কিছু দেখতে পাও!

    বাবার এই কথাটাই পিলুকে নাকি জেদ ধরিয়ে দিয়েছিল। শহর থেকে ফেরার পথে সে বাদশাহী সড়ক দিয়ে আসত না। তার কাছে বাদশাহী সড়কটাও ছিল রহস্যময় এই রাস্তায় সিরাজদৌল্লা ঘোড়া ছুটিয়ে গেছেন পলাশীর মাঠে যুদ্ধ করতে। মোহনলাল মীরমদনের বাহিনী ছুটে চলেছে ঘোড়ায় চড়ে। মীরজাফর হাতীর পিঠে। দামামা বাজছে। সেই রাস্তার পাশে অলৌকিক বনটা তাকে তখন নাকি আরও বেশি টানত। নিঝুম গাছপালা থেকে কেবল পাতা ঝরছে। খস খস শব্দ শুনতে পায়। সর সর করে কারা যেন লুকিয়ে পড়ে তার পায়ের শব্দ পেলে। আর ডাহুক পাখির কলরব কিংবা বনটিয়ার ঝাঁক কোথাও। কোথাও মৌমাছির গুঞ্জন। পিলু ভিতরে ঢুকলে নাকি বিচিত্র কীটপতঙ্গের আওয়াজ পেত। তার মনে হত বনের ভিতর এক অদৃশ্য বাজনা বাজে।

    তার পরীদিকে দেখলেই পিলুর রাজ্যের সব খবর দেবার স্বভাব। বনটায় ঢুকলে তার গা নাকি ফুলে যেত। লোম খাড়া হয়ে উঠত। ঝুপ করে সামনে কে লাফিয়ে পড়ল, আরে বিশাল একটা হনুমান দলে দলে হনুরা তাকে দেখলেই কেমন বিস্ময়ে নাকি তাকিয়ে থাকত। তাকে কিছু বলত না। দু-একটা যে তাকে দেখার জন্য একবারে গায়ের কাছে চলে আসত তাও সে বলেছে। পিলু হনু দেখলে সাহস পেত। এরা তো মানুষের সমগোত্র। তা ছাড়া রামের সেতুবন্ধনে এরা ছিল বলেই রাক্ষসের দেশ থেকে সীতাকে রামচন্দ্র উদ্ধার করতে পেরেছিল। সেও নাকি দেখেছে, জঙ্গলের ভিতর মানুষ চলাচলের একটা গোপন পথ তৈরি হয়ে গেছে। খুব খেয়াল করলে ওটা বোঝা যেত। পথটা অনুসরণ করতে গিয়েই সে নবমীর এলাকায় ঢুকে তাকে দেখে ফেলেছিল।

    তারপর পিলু এই রহস্য আবিষ্কারের জন্য কতবার যে বনটায় ঢুকে গেছে। না কোথাও জনমানবের চিহ্ন নেই। সে দেখতে পেত না নবমীকে। নবমী কী তখন মানুষের সাড়া পেলে ঝোপ জঙ্গলে লুকিয়ে পড়ত!

    সে তার খুশিমতো যে-সময়কার যে ফল, পেড়ে এনেছে। তালের দিনে তাল, এমন কী একবার জঙ্গলের মধ্যে একটা পাকা আনারসও সে খুঁজে পেয়েছিল!

    কে গাছ রোপণ করে!

    সে নারকেল নিয়ে আসত। ঝুনো নারকেল। এত গভীর জঙ্গলের মধ্যে একটা নারকেল গাছ, একটা লিচু গাছ পর্যন্ত সে আবিষ্কার করেছিল!

    কে রোপণ করে!

    সেই অনন্ত আগ্রহই পিলুকে কখন যে বনের রাজা বানিয়ে ফেলেছিল। কিংবা নবমী যখন বলে, মাঝে মাঝে সে দেখতে পেত কেষ্টঠাকুরের লীলা—সে নাকি তখন জোড় হাত করে ঝোপ জঙ্গলের মধ্যে লুকিয়ে পড়ত। তাকে দেখলে ঠাকুরের লীলা যদি আর দেখতে না পায়। এমন কী সে তার ছাগলটাকেও আড়াল করে রাখত। … পিলুর যে কত কথা মনে হয়।

    পিলু গাছে উঠে ডালে বসে থাকত। কখনও গাছের ছায়ায় হেঁটে বেড়াত। বেত ঝোপ থেকে বেতের ডগা নিয়ে যেত। নারকেল পেলে নিয়ে যেত। ঠাকুর পুণ্যবান — ফলমূল তার প্রিয় হবে বেশি কী। একবার দেখেছিল, ঠাকুর ঝুড়ি এনে সারা দিনমান, বন আলু তোলার জন্য মাটি সরাচ্ছে। বিশাল বন-আলুটা ঝুড়িতে ধরছে না। ওটা মাথায় তুলতে বেজায় কষ্ট। সহ্য হয়নি। লাঠি ভর দিয়ে কাছে যেতেই পিলু চমকে উঠেছিল—আরে সেই বুড়িটা।

    পিলুর আত্মারাম খাঁচা।

    নবমী কী বুঝে বলেছিল, জঙ্গলটায় এলেন যখন কৃপা করে, একবার কপালে মাথা ঠেকাতে দিন গো দা-ঠাকুর।

    পিলু দৌড় মারবে কিনা ভাবছিল।

    নবমী তারপর সত্যি গড় হয়ে পায়ের কাছে একটা ঝুনো নারকেল রেখে বলল, দা-ঠাকুর, মানুষ তো এ-বনে ঢোকে না।

    পিলু বলেছিল, তুমি কে? তুমি নবমী। লোকে বলে হেজে মজে গেছে! মরে গেছে! —আমি মরব কেন! বেঁইচে আছি।

    —লোকে যে বলে জঙ্গলে ডাইনি থাকে।

    —না গো দা-ঠাকুর। আমর ঘরে আমি থাকি! ডাইনি থাকবে কেন!

    —তোমার ঘর আছে!

    —আছে না। হুই উদিকটায়। আসেন দা-ঠাকুর। পায়ের ধুলা দিয়ে যান। আপনার পা-খান ছুঁতে দিন। বলেই সে গড় হয়েছিল ফের।

    এর পর আর ভয় থাকে।

    সে বলেছিল, তোমার ভয় করে না! কোথায় তোমার ঘর।

    —বনজঙ্গলে থাকলে দা-ঠাকুর ঘর লাগে না গো। সব কথা শুনি। জঙ্গলে ঘুরে বেড়াই। উৎপাত

    করলে ভয় দেখাই।

    —ভয় দেখাও মানে।

    —এই আছি, এই নাই। বলেই জঙ্গলে সহসা অদৃশ্য নবমী।

    —এই নবমী, তুমি কোথায়।

    নবমী ঝুপ করে ভেসে উঠেছিল জঙ্গল থেকে। …. পিলুর যে কথা কতা মনে হয়!

    নবমীর পেটে পেটে তবে এত দুষ্টুবুদ্ধি। বনটায় লোকজন ঢুকলে তার অধিকার খর্ব হয়ে যাবে। সে নিজেই নানা রঙ্গ তামাসায় মেতে গেছিল। গাছপালা এবং অরণ্যের মোহ তাকে এত দিন জড়িয়ে রেখেছিল। সেই নারী শেষে যখের ভয়ে উঠে গেল পিলুদের বাড়ি।

    মৃন্ময়ীকে যত গভীর অরণ্যে নিয়ে যাচ্ছে তত তার সব মনে পড়ছিল। পিলুই তাকে নবমীর গল্প করত। পিলুর তো গাঁজাখুরি গল্পের শেষ নেই—এও হয়তো তেমনি। কিন্তু সত্যি তবে নবমী বুড়ি আছে। আছে তার গভীর অরণ্য আর অরণ্যের প্রতি টান। আজ নবমীর সঙ্গে না এলে সে টের পেত না, কোনো নারী একা স্বামীর স্মৃতি আগলে যে কোনো দুর্গম এলাকায় বসবাস করতে পারে।

    বার বার বিলুর মুখ ভেসে উঠছে।

    সে যে কী করবে!

    কোথায় খোঁজ করবে তার।

    বছর তিন আগেও একবার বিলু নিখোঁজ হয়ে গেছিল। তখনও মেসোমশাই ছিলেন নির্বিকার। গেছে—আবার ফিরে আসবে। মেসোমশাইয়ের এত আত্মবিশ্বাস কী করে হয় সে জানে দৈব বিশ্বাসই এর মূলে। তার কাছে মানুষের জন্য এমন কী প্রাণীজগত থেকে সব গাছপালা কী নয়, এক অদৃশ্য শক্তির খেলা। সেখানে কোনো লড়ালড়ি চলে না।

    পিলু গেল কোথায়!

    মিমি ডাকল, এই পিলু, কোথায় গেলি।

    অনেক দূর থেকে পিলু সাড়া দিচ্ছে।

    ওরা ওখানটায় কী করছে ভাই বোনে!

    বেলা পড়ে আসছে। গাছপালার ছায়া ক্রমে দীর্ঘ হয়ে যাচ্ছে। এবং সে দেখল দূরবর্তী আকাশে বিশাল চাঁদের আবছা উপস্থিতি। পূর্ণিমা পার হয়ে গেছে, প্রতিপদ কিংবা দ্বিতীয়া—সাঁজ লেগে গেলেও ভয় পাবার কিছু নেই পিলু বোধহয় জানে। পিলু কী এই অরণ্যের মধ্যে জ্যোৎস্নায় কখনও হাঁটাহাঁটি করেছে। তার ভয় না থাকারই কথা। কারণ নবমী বনটায় থাকলে রাতের বেলায় সে অনায়াসেই ঘোরাঘুরি করতে পারে।

    পরী বলল, তা হলে শেষে যখের তাড়া খেয়ে স্বামীর ভিটে ছাড়লে!

    —হা মিমিদি।

    ওরা হাঁটছিল। নবমী তার স্বামীর স্মৃতি ঘুরে ঘুরে দেখাচ্ছে। নবমীর এই স্মৃতি ছাড়া আর কিছু যেন সম্বল নেই—যা সে মানুষের কাছে গর্ব করে বলতে পারে।

    মিমি সব শুনছিল না। তাকে এখন আসলে যখ তাড়া করছে। সে বলল, নবমী, যখ তো গুপ্তধন পাহারা দেয়। তোমার ঘরে যখ কী করতে আসবে!

    নবমীর কী মনে হতেই চুপ করে গেল। বাবাঠাকুর তো তাকে চোটপাট করেছে—কী তোমার ইট ক’খানা নিতে হবে! পারব না। কে নেবে! তোমার ছাগল নিতে হবে, আবার কাঠের পেটি নিতে হবে। এত বাহানা চলবে না। যেতে হয় একা চল। ছাগলটা নিচ্ছি।

    কিন্তু নবমীর সেই কড়জোড়ে প্রার্থনা, পেটিখান ফেইলে যাই কী করে।

    দা-ঠাকুরও কম চোটপাট করেনি। এখন যদি খবরটা জানাজানি হয়ে যায় তবে বাবাঠাকুর গোসা করতে পারেন।

    —নবমী, আমরা কী তোমার গুপ্তধনের লোভে বাড়ি এনে তুলেছি। বল! আমরা কী জানতাম, তুমি ইট ক’খানা পেটিতে পাহারা দিচ্ছ, গুপ্তধন আগলাচ্ছ আমরা জানতাম! পিলু তো সব ক’টা ইট জলে ফেলে দিতে গেছিল। দশ কান হলে ভাববে না, তোমার গুপ্তধনের খবর পেয়েই বাড়ি তুলে এনেছি, ঘর বানিয়ে দিয়েছি। পিলু মায়া প্রতিদানে তোমাকে বিকালে রামায়ণ মহাভারত পড়ে শোনায়। তোমার সেবা যত্ন সব গুপ্তধন পেয়েছি বলে! বল, বল চুপ করে থাকলে কেন। বাবাঠাকুরের মুখ মনে পড়তেই নবমী কেমন চুপ করে গেল।

    মিমি ফের বলল, যখ দেখেছ চোখে।

    নবমী রা করছে না।

    —যখ ঘোরাঘুরি করে টের পেতে কী করে!

    নবমী রা করছে না।

    —কী হল তোমার! কথা বলছ না!

    নবমীর হাত থেকে লাঠিটা পড়ে গেছে। মিমি ওটা তুলে দিল নবমীর হাতে। যখের কথা তুললেই রা করছে না। নবমীর মুখে সেই প্রসন্নতাও নেই।

    নবমী যেন তার অজ্ঞাতেই সব ফাঁস করে দিচ্ছিল। কী যে হবে!

    তখনই পিলু মায়া লতাপাতা ঝোপজঙ্গল সরিয়ে এদিকে ছুটে আসছে। শিগগির মিমিদি এস, শিগগির।

    —কেন!

    —এসই না।

    —কেন বলবি তো।

    মায়ার মুখ শুকিয়ে গেছে।

    পিলু হাত ধরে টেনে নিয়ে যাচ্ছে মিমিদিকে। নবমীকে বলল, বোস। আমরা আসছি।

    —কোথায় হাত টেনে নিয়ে যাচ্ছিস?

    সামনে বিশাল এলাকা নিয়ে কবরভূমি। মিনার, পরিত্যক্ত মসজিদ, কবরের উপর শ্বেতপাথরের ফলক, কোথাও গম্বুজ আর যতদূর চোখ যায় গাছপালা, পরে লাল সড়ক, একটা গরুর গাড়ি যাচ্ছে, ঝোপ জঙ্গলের ফাঁক থেকে তাও দেখা যায়।

    জায়গায় জায়গায় শুধু ঘাস। তার উপর দিয়ে ওকে টেনে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

    আর কিছু দূর গিয়েই সে যা দেখল, তার আত্মারাম খাঁচা। তাড়াতাড়ি পালাতে চাইল মিমি। পিলুর এই দুর্জয় সাহস তাকে কেমন বিচলিত করছে। সে কেবল বলছিল, সর্বনাশ!

    —কিচ্ছু করবে না। তুমি ভয় পাচ্ছ কেন!

    বিশ পঁচিশ গজ দূরে সেই ভয়ঙ্কর দৃশ্য দেখার জন্য পিলু তাকে এখানটায় এনে দাঁড় করিয়েছে। পিলুর ভয় ডর কম। তাই বলে কাল নিয়ে খেলা!

    মিমি দু-জনের হাত ধরেই ছুটতে চাইল। কিন্তু পারল না।

    পিলু কেবল বলছে, সাপের সং। কিচ্ছু করবে না। দেখ না। আমরা তো কখন থেকে দাঁড়িয়ে দেখছি। তুমি আসছ না!

    যেন পিলু এই গভীর বনের জন্মরহস্য আবিষ্কারের নেশায় এতক্ষণ তার ছোট বোনকে সঙ্গে নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। তার পরীদি আসছে না দেখে সে ছুটে এসেছিল—না দেখে গেলে, পিলু ভাববে, পরীদি কী ভীতু— আলিসান দুই ভুজঙ্গ একে অপরকে জড়িয়ে লতার মতো বেয়ে উঠছে।

    ভাদ্রের শেষ বেলা—মিষ্টি ঠাণ্ডা হাওয়া। গাছের ছায়ায় তারা দাঁড়িয়ে দেখছে। দেখতে দেখতে পরীর শরীর কেমন অবশ হয়ে যাচ্ছিল। সাপের এই সহবাস তাকে কোনো গভীর অতলে ডুবিয়ে দিচ্ছে। ভয়ঙ্কর সৌন্দর্যের লীলায় সে অধীর। এখন ইচ্ছে করলেও সে নড়তে পারবে না। সে তাকিয়েই আছে। অবিরাম ঘাসের উপর বেয়ে বেয়ে দু’জনের এই সংলগ্ন হওয়া কোনো নারী পুরুষের উপগত হওয়ার মতো। ক্ষণিকের আশ্রয় উত্তাপ অথবা বিষবাষ্প থেকে আত্মরক্ষার সামিল— সাপ দুটো যাচ্ছে আবার ফিরে আসছে, দু’জনে মুখোমুখি ফণা তুলে দুলছে, ছোবল দিচ্ছে ভূমণ্ডলের হৃৎপিণ্ডে, তারপর আরও ঘন, আরও আরও যেন দুটো দড়ি পাক খেয়ে কিংবা ঘূর্ণিঝড়ের মতো বাতাসে ভর করে দাঁড়াচ্ছে—তারপর এক অপরূপ নৃত্য, ঘুরে ঘুরে দুলে দুলে নৃত্য। ফুলে ফুলে উঠছে শরীর। রোদে ঝকমক করছে তলপেট এবং বরফের মতো সাদা পেটের সংলগ্ন স্থানে সহ-অবস্থান। শরীরে, রোমকূপে ঝড় তুলে দিচ্ছে।

    বনভূমির কী যে থাকে সবুজ ঘ্রাণ, এই বেলায় বাতাসে তার ঘ্রাণ ছড়াচ্ছে। পরীর চোখ বিস্ফারিত। রোমকূপে ঝড়। আকাশ বাতাস থেকে দেবদূতের মতো উঠে আসছে মাত্র একটি মুখ—সে এতই নিষ্পাপ, সে এতই ভীরু, তার যেন জোরজার করারও ক্ষমতা নেই। এখন আর চোখের সামনে কোনো কালভুজঙ্গ দেখতে পাচ্ছে না। এবার পরী নিজেই কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠল—ঠিক সাপের ভঙ্গিতে এই মোচড় তাকে পীড়নের মধ্যে ফেলে দিচ্ছে। চোখ লাল, কান গরম—এমন কী বালক- বালিকার সামনে দাঁড়িয়ে সঙ্গম দৃশ্য উপভোগ করা অশোভনতা পর্যন্ত খেয়াল নেই। শরীরের গভীর অন্তস্তল থেকে দ্রুত কী সব সংকেত পাঠাচ্ছে হৃৎপিণ্ডে। ধক ধক করছে—বুক। সে দাঁড়িয়ে থাকতে পারছে না। পিলুর কাঁধে ভর দিয়ে কোনো রকমে বলল, আমার কী হচ্ছে। জোর পাচ্ছি না। শিগগির আমাকে ধর। আমাকে নিয়ে পালা। আমি না হলে মরে যাব।

    পিলু বলল, ভয় পাচ্ছ কেন। ওরা এখন কারো ক্ষতি করবে না। আমি তো ঢিল ছুঁড়েছিলাম। ভ্রুক্ষেপ নেই। দেখ না কত ঢিল ছুঁড়েছি। আমাকে তাড়া করেছে? তবে ভয় পাবে কেন!

    পিলু জানে না, পিলু বোঝে না, সরল বালক। সাপের সং দেখার সৌভাগ্য কম মানুষের হয়। সে বলল, জান পরীদি, ইস্ কী যে খারাপ লাগছে না। যাব দৌড়ে!

    —কোথায় যাবি! কেমন ত্রাসের গলায় কথাটা বলল পরী।

    —এক দৌড়ে যাব, এক দৌড়ে আসব। জান সাপের সং-এর উপর নতুন গামছা ফেলে দিলে পুণ্য হয়। গামছাটা ঘরে রাখলে যার যা মনোবাসনা পূর্ণ হয়।

    —কে বলেছে!

    —বাবা বলেছেন।

    —যাবি! অতি কষ্টে কথাটা বলল। সারা শরীরে ঘুমের মতো কী এক জড়তা নেমে আসছে। আর তখনই দেখল সেই কালান্তক যম প্রায় পাশাপাশি ঘাসের বুক বেয়ে পরিত্যক্ত মসজিদে ঢুকে গেল।

    পরী আর পারল না। বসে পড়ল। তার পায়ে জোর নেই। দু-জংঘার মাঝে অবিরাম নদী প্রবাহ প্রবল প্রতাপে ভেসে যাচ্ছিল। পরী বসে থাকতে পারল না। পরী ঘাসের উপর শুয়ে পড়ল কাত মানুষের দ্বারা ব্রিজে ফেলল। যেন সে এক গভীর অবশ অলস মুখর রাতে উপগত হবার পর তৃপ্তি নিয়ে শুয়ে আছে। সবাই চলে গেলেও তার কিছু আসে যায় না। রোমন্থনে সেই অমৃতের স্বাদ। সমুদ্র কত গভীর এবং তার সুখে অবগাহন পরীকে বড়ই কাতর করে রেখেছে। হুঁস নেই।

    —পরীদি! কী হল তোমার! ও পরীদি, ওঠো শরীর খারাপ লাগছে! ভয় কী। দেখ কিচ্ছু নেই। ও পরীদি, ওঠো।

    পিলু দেখছে পরীদি চোখ মেলতে পারছে না। সে কেমন হায় হায় করে উঠল।

    —নবমী, নবমী।

    সে চিৎকার করে ডাকছে। নবমী বনজঙ্গলের ভেতর থেকে পিলুর ভয়ার্ত গলা পেয়ে ছুটে আসার চেষ্টা করছে। এসেই সে দেখছে পরীকে। শুয়ে, দিদিমণি অবশ।

    পিলু সব বললে, নবমী ফোকলা দাঁতে হেসে ফেলল। পরীদিকে ডাকাতে ধরেছে গো। বসেন। ঠিক হয়ে যাবে।

    জীবনের এই মাধুর্য পিলুর টের পাবার কথা নয়, নবমী জানে। নবমী তাকাল। এই অরণ্যের কোথায় সেই নিভৃত স্থান, যেখানে সে কত রাতে গাছের ছায়ায়, ঘাসের উপর ডাকাতের হাতে পড়ে উলঙ্গ হয়ে গেছে। সেই মাধুর্য জীবনে আর নেই—কিন্তু তার স্বাদ আজ যেন এক নারীর মধ্যে আবার খুঁজে পেয়েছে।

    নবমী মাথার কাছে বসে হাত বুলিয়ে দিতে থাকল শরীরে। বেশবাস কিছুটা আলগা হয়ে গেছে। দুই বালক বালিকা কেমন তাজ্জব। পরীদির হিস্টিরিয়া আছে কিনা জানে না। পরীদিকে যদি ভূতে ধরে। এত সুন্দর পরীদিকে নিয়ে কবরখানায় ঢুকে সে ভাল কাজ করেনি! কী যে করবে।

    পিলু প্রায় ছুটে যেতে যেতে বলল, নবমী, তুমি বোস। মায়া, তুই থাক। বাবাকে ডেকে আনছি।

    পরীর হুঁস ফিরে আসছে।

    ছিঃ ছিঃ সে এটা কী করে ফেলল!

    নবমী ডাকছে, যাবেন না গো দাদাবাবু। সে বলল, সাপের সং দেখে ভিরমি খেয়েছে। হুঁস ফিরে এসেছে। যাবেন না!

    পিলু চঞ্চল স্বভাবের। সে দৌড়ে এসে দেখল, পরীদি উঠে বসেছে। মাথার চুল ঠিক করছে হাত দিয়ে। আঁচল দিয়ে শরীর ঢেকে দিচ্ছে।

    পিলু হাঁটু গেড়ে বসে বলল, হেঁটে যেতে পারবে তো।

    কোটাল আসার মতো পরীর পরিতৃপ্ত মুখ। নিজেই উঠে দাঁড়াল। তারপর কী ভেবে আঁচল দিয়ে দ্রুত পেছনটা আড়াল দিল। একবার নিজেও পেছন দেখার চেষ্টা করল। আর তারপর পিলু না, আর ভাবতে পারে না! পরীদি ছুটছে। এক হাতে আঁচল কোমরের নিচে টেনে ধরে রেখেছে। আর ছুটছে। বাতাসে আঁচল উড়ে না যায়? পরীদি কোমরের পেছনে হাত রেখে শুধু বলছে, শিগগির আয়।

    কেন এই চাঞ্চল্য পিলু বুঝল না।

    নবমী গাছপালার মধ্যে দ্রুত হাঁটতে পারে না। তাকে ফেলে চলে যাওয়াও যায় না। পরী এটা বোঝে। সে শুধু বলল, আমি যাচ্ছি। তোরা আয়।

    পিলু বলল, মায়া, তুই যা পরীদির সঙ্গে। জঙ্গলে হারিয়ে গেলে রাস্তা খুঁজে পাবে না।

    মায়া তাড়াতাড়ি ছুটছে। তার ফ্রক উড়ছিল, বাতাসে পরীদি টানা ছুটছে না। ঝোপ জঙ্গল ভেঙ্গে দ্রুত ছোটাও যায় না। কোথাও বসে একটু বিশ্রাম নিচ্ছে, হাঁপাচ্ছে। আবার ছুটছে। আবার দাঁড়াচ্ছে। হাঁপাচ্ছে, আবার ছুটছে। মায়াও পরীদির সঙ্গে ছুটছে, দাঁড়াচ্ছে, হাঁপাচ্ছে।

    মায়া পরীদির এই মতিগতির কিছু অর্থ ধরতে পারছে না। আর বাড়ি এসে অবাক, পরীদি কাউকে না বলেই মা’র শাড়ি সায়া ব্লাউজ নিয়ে পুকুরঘাটে চলে গেল।

    বাবা পরীদির ছুটে আসা দেখে কিঞ্চিৎ তাজ্জব হয়ে গেছিলেন। বললেন, ওরা কোথায়!

    পরীদি জল ঢালতে ঢালতে বলল, ওরা আসছে।

    নবমীও বাঁশতলা দিয়ে হেঁটে আসছে। বোধহয় জোর ছিল না—হাঁটতে আর পারছিল না। পিলু ধরে নিয়ে আসছে। এক হাতে নবমীর লাঠি। ফিরে এসেই নবমী ধপাস করে বসে পড়ল। এক গ্লাস জল খেল আলগা করে। বাঁ-হাতে মুখ মুছে দেখল, পরীদি চান করে ভিজা কাপড়ে বিলুদার ঘরে ঢুকে যাচ্ছে। নবমী কেমন প্রসন্ন গলায় বলল, তীর্থ করে এলাম বাবাঠাকুর।

    —ভাল করেছ। মনে জোর পাবে। মানুষের দাঁড়াবার জায়গা একটা বড় দরকার। যখন মনে হয় চলে যাবে। পিলু না যায় মায়াকে নিয়ে যাবে। নিয়ে যাবার লোকের তো অভাব নেই।

    পরী ঘর থেকে সব শুনতে পাচ্ছিল। সে ভাল নেই। জঙ্গলে যা হল। সে কেমন আশ্চর্য এক সুখ, ঠিক সুখও বলা যায় না, জীবনে বেঁচে থাকার জন্য তারও যে দরকার ছিল নিজেকে আবিষ্কার করার। কোনো পুরুষই একজন নারীর জন্য অপেক্ষা করে না। নারীও না। তবু কেউ অদৃশ্য ছায়ার মতো তাকে অনুসরণ করে। সে তার পিছু হাঁটে। কোনো দুর্গম অঞ্চলই তার পথে বাধা সৃষ্টি করতে পারে না। বিশ্ব, তুমি কী চাও! আমাকে আর কত কষ্ট দিতে চাও। নিজে আগুনের ভিতর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছ। আমি কী ভাল আছি! এ কী শাস্তির মধ্যে ফেললে। এখন আমি তোমাকে কোথায় খুঁজব!

    সাড়া শব্দ না পেয়ে বাবা বললেন, দেখ তো পিলু, মিমি কী করছে!

    দরজা বন্ধ! অনেকক্ষণ হয়ে গেল। সহসা তিনি ত্রাসের মুখে পড়ে গিয়েই বলেছেন, হয়তো নিজেই দৌড়ে যেতেন। কেন এই ত্রাস তাঁর!

    পিলু দরজা ঠেলে অবাক।

    পরীদি দাদার বিছানায় উপুড় হয়ে পড়ে আছে। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। সন্তর্পণে দরজা ভেজিয়ে সে বাবার কাছে ছুটে গেল। কানে কানে ফিস ফিস করে বলল, বাবা, পরীদি না কান্নাকাটি করছে। বাবা বিস্ময়ের গলায় বললেন, কাঁদছে! কেন! শরীর খারাপ! তারপরই কী ভেবে বাবা মাথা নিচু করে বসে থাকলেন। নিখোঁজ পুত্রের কথা ভেবে তাঁরও মন খারাপ হয়ে গেল। তবু তিনি উঠে দাঁড়ালেন। পরীকে সান্ত্বনা দেওয়া দরকার। আজ তিনি কেন জানি পরীকে শুধু রায়বাহাদুরের নাতনি ভাবতে পারলেন না। সে এ-পরিবারের একজন। দরজার কাছে গিয়ে বাবা তাঁর ইদানীংকার আপ্তবাক্যটি বললেন, বুঝলে মিমি, কেহ আত্মাকে আশ্চর্য মনে করে— কেহ বা আশ্চর্যবৎ বলিয়া আত্মাকে বর্ণনা করে। আবার কেহ আশ্চর্য বলিয়া শোনে। কিন্তু ইহার বিষয় শুনেও কেহ ইহাকে বোঝে না। কান্নাকাটি কর না। সে ঠিক ফিরে আসবে।

    পিলু শুনছিল। সে জানে বাবা গুরুত্বপূর্ণ কথা বলার সময় সাধু বাক্য বলেন।

  • আট

    আট

    সকালে পিলু আবার সাইকেল নিয়ে বের হয়ে গেল। দাদা না থাকায় সাইকেলটা নিয়ে সে যখন তখন বের হয়ে যেতে পারে। যখন খুশি ফিরতে পারে। মা বাবা কোনো ফরমাস করলে তার মেজাজ তখন আর অপ্রসন্ন হয় না। বরং সে অপেক্ষায় থাকে বাবা কী ফরমাস করবেন, মা’র কী দরকার। কাল সকালে দাদাকে বিছানায় না দেখে সাইকেলে প্রায় সারাটা দুপুর কাটিয়েছে। এটা যে কী মজা, যেন সে ঘোড়ায় চড়ে বসে—তারপর বাদশাহী সড়কে উঠে এদিক ওদিক— যেদিকে দু চোখ যায় ইচ্ছে করলে চলে যেতে পারে। দাদা বাড়ি না থাকায় ধমক খাবার ভয় নেই। বাবার ধারণা শরীরের মতো যন্ত্রও বসিয়ে রাখলে ঘুণে ধরে। ঘুণে ধরা ঠিক না। চলুক, যতক্ষণ চলছে চলতে দাও। থামলেই বিগড়াবার ভয় থাকে।

    কাল সারাটা দিন পরীদিকে নিয়েই কেটে গেল।

    আজ বাকি কাজগুলো তার করা দরকার। যেমন মুকুলদাকে খবর দিতে হবে। যদি কোনো নতুন খবর টবর পেয়ে যায়।

    সে সড়কে উঠে গেলেই হাওয়ার সঙ্গে পাল্লা দেয়। ট্রাক সামনে। যমদূত আসছে। সে রাস্তা ছাড়ছে না। ট্রাক, বাস দেখলে মেজাজ খারাপ হয়ে যায়। বাপের জায়গা। নিশ্চিন্তে সাইকেল চালাতে না পারলে মেজাজ আসে না। সে সড়ক ছাড়ছে না। ট্রাকটাকে পাকা রাস্তার বাইরে নামিয়ে ছাড়বে। সে পারেও। দুরন্ত গতিতে ট্রাকের সামনে হ্যাণ্ডেল ঘুরিয়ে নেয়। বোঝো মজা! নামিয়ে ছাড়লাম শালা শুয়োরের বাচ্চা আমি! বোঝো এবার। সেও তখন মরিয়া হয়ে যায়। সেও ছেড়ে কথা বলে না। কোনো কারণে গরু ছাগল আনতে গেলে কিংবা সড়কের ধারে একা থাকলে ট্রাক দেখলেই একটা ইট কুড়িয়ে নেয়। ধাঁই করে মারে—তারপর মাঠ ধরে দৌড় আর দৌড়। ট্রাক থামতে থামতে বনজঙ্গ লের আড়ালে পড়ে যায় সে।

    বাবা একদিন শুনে তেড়ে এসেছিলেন—খুবই বিপজ্জনক খেলা। বার বার নিষেধ করছি! কখন কী হয় বলা যায়। সাইকেল নিয়ে তো বের হও না, বাড়ির আত্মাটি হাতে নিয়ে বের হও। সময় মতো না ফিরলে কত দুশ্চিন্তা তুমি বোঝো।

    এটা ঠিক। এটা তারও হয়। দাদা সাইকেলে শহরে যেত। ফিরত বেশ রাত করে। অপরূপার কত কাজ! তা ছাড়া পুলিশ মাঠে দাদাদের আড্ডা। কী নিয়ে যে দাদারা এত কথা বলে বোঝে না। ফিরতে একটু বেশি রাত হলেই সে সড়কের কাছে হাঁটতে হাঁটতে চলে যায়। দুশ্চিন্তা। দাদার বেলায় এটা হত, নিজের বেলায় কেন তা হয় না বোঝে না।

    আসলে ফাঁক পেলেই তার যে সাইকেল চড়ার নেশায় পেয়ে বসে। নেশা বিষম বস্তু। বাবা বলেছেন, একবার ধরলে আগাপাশতলা ছাল চামড়া ছাড়িয়ে নেয়। তারও নেবে হয়তো। কে জানে—ট্রাকের সঙ্গে পাল্লা দেওয়া, যেই টের পাচ্ছে, পেছনে ট্রাকের হর্ন, তার যে কী হয়—পাল্লা। চালাও পানসি রানাঘাট—কে পারে দেখ! কে আগে যায় দ্যাখ! হলে কী হবে শেষ পর্যন্ত তাকে রাস্তা ছেড়ে দিতেই হয়। ক্ষোভে জ্বালায় তখন তার একমাত্র ঢিল সম্বল। ট্রাক দেখলেই—মারো শালাকে। কে তার শত্রু ঠিক অবশ্য জানে না। ট্রাক না ট্রাকের ড্রাইভার। বড় হয়ে সে ভেবেছে, ট্রাকের ড্রাইভার হবে। এই একটা বাসনা আছে। কত কত সব দূর গঞ্জ, পাহাড়তলি কিংবা শস্যক্ষেত্র পার হয়ে চলে যাবে। নদী, মাঠ, সেতু পার হয়ে সে চলে যাবে। সটান বসে থাকবে—হু হু করা বাতাসে তার চল উড়বে— স্বপ্ন স্বপ্ন। সাইকেলেরই এত নেশা, আর ট্রাকের নেশা কী না জানি।

    —আরে পিলু যে! আয় আয়।

    মুকুল বারান্দায় দাঁড়িয়ে দাঁত মাজছিল। মুখে পেস্টের ফেনা। কথা বলতে অসুবিধা হচ্ছে বলে, মুখের ফেনা ফেলে এগিয়ে গেল, গেট খুলে দিল। ভোর রাতে বেশ বৃষ্টি হয়েছে। বাগানের এখানে সেখানে জল জমে আছে। শরতের আকাশ, সকালের রোদ, রাস্তার কদমগাছ-এবং চারপাশে সবুজের সমারোহে সে বেশ প্রসন্ন। শারদীয়া অপরূপার প্রস্তুতি চলছে। বিশ্ব হয়তো কোনো জরুরী খবর দিয়ে পাঠিয়েছে পিলুকে। ওর তো মতিস্থির নেই। হয়তো কোনো লেখা পছন্দ, প্রেসে দিয়ে দাও, আবার বিকেলে ডাকে আসা কোনো লেখা পছন্দ হয়ে গেল তো ওটা ফেরত নিয়ে এস। পরে দেখা যাবে। তা ছাড়া সে যেমন ভাল নেই—চৈতালি কলকাতায় চলে যাবার পর থেকেই মনমরা, আসলে তো কাগজটা বের করার এত উৎসাহ একমাত্র চৈতালি—সেই নেই। বিশ্বও ভাল নেই। মিমির সঙ্গে বোধহয় বড় রকমের খিটিমিটি বাধিয়ে বসে আছে। কিছুতো বলে না! চাপা স্বভাবের।

    পিলু বলল, জানো মুকুলদা, দাদা না কোথায় চলে গেছে। তোমাকে কোনো খবর দিয়ে গেছে। কোথায় উঠবে! কোথায় থাকবে।

    —বলিস কী! কোথায় গেল বলে যায়নি। কখন গেল। ওর যে কী হয় মাঝে মাঝে বুঝি না।

    —না। একটা … বলেই থেমে গেল। বাবা কেন যে চিঠির কথা ফাঁস হতে দিতে চান না, সে বুঝছে না। চিঠিতে দাদা পরীদিকে জড়িয়ে গেছে। খুবই নাকি কেলেঙ্কারি ব্যাপার। দাদা তো খারাপ কিছু লেখেনি। তার জন্য পরীদিকে বাইরে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে—খারাপ তো লাগবেই!

    মুকুল বলল, ভিতরে আয়। কবে গেল! কখন গেল। তুই চুপ করে আছিস কেন। মেসোমশাই থানায় গেছে? এতো ভারি ঝামেলা। কত কাজ অপরূপার। না বলে না কয়ে ফের উধাও। পাগলা আছে সত্যি। কোথায় যাবে কিছুই বলে যায়নি।

    — না।

    তার এই প্রিয় বন্ধুটি হঠাৎ নিখোঁজ হয়ে যেতেই মুকুল কেমন কষ্টের মধ্যে পড়ে গেল। দু’জনের দুটো প্রিয় সাইকেল, দই প্রিয় নারী, কবিতা চর্চা, অর্থাৎ স্বপ্ন, বিশ্ব এ-শহর ছেড়ে চলে যেতে পারল। দু’দিন দেখা নেই, ভাবাইল, আজই যাবে, কেন যে এটা হয়! যেন কোনো এক আশ্চর্য অমোঘ বন্ধন তৈরি হয়ে গেছে দু’জনের মধ্যে। দু’জনে কতদিন চুপচাপ বসে থেকেছে বড় মাঠে কিংবা রেশম কুটির জঙ্গলে ঢুকে গাছপালার ছায়ায় হেঁটে গেছে—দু’হাত উপরে তুলে গলা ছেড়ে কবিতা আবৃত্তি, নিজেদের কবিতা পাঠ আর কখনও সাঁ সাঁ করে সাইকেল চালিয়ে নির্জন রাস্তায় কোনো বৃক্ষের ছায়া পেতে কী যে ভাল লাগত! সে নেই, নিখোঁজ। বুকটা কেমন তোলপাড় করে উঠল।

    —বাড়িতে ঝগড়াঝাঁটি হয়েছিল।

    —না।

    তারপরই মনে হল সে মিছে কথা বলছে। বাবার হম্বিতম্বি—গায়ে হাত, দেবীর গায়ে হাত, এ-যে মহাপাপ।

    কিন্তু পাপের কথা তো বলা যায় না। তবে যে সে তার বাবাকেই ছোট করে ফেলবে। দাদাকেও। সে বলল, না মানে, মন কষাকষি চলছে। তুমি তো জান, আমার বাবা কি রকমের।

    —মিমি জানে।

    —হ্যাঁ কাল তো মিমিদি আমাদের বাড়িতেই ছিল।

    —তোদের বাড়িতে!

    পিলু বুঝল না, এতে দোষের কী আছে। তারা গরীব। কিন্তু পরীদি তো গরীব লোকদের খুব ভালবাসে। বাড়িতে কত দাপট তাও সে অনেকবার দেখেছে। বাবা কত করে বললেন, তা হয় না, তুমি বাড়ি যাও। পিলু সঙ্গে যাবে। অবশ্য পিলু জানে, পরীদি একাই যেতে পারে। তার দুর্জয় সাহস।

    —সকালে বাড়ি চলে গেল। পিলু বলল।

    —চল তো পরীর কাছে। বলেই মুকুল সাইকেল বের করতে গেলে বলল, পরীদিকে পাবে না। কোথায় যেন যাবে। নাটক আছে।

    মুকুল জানে পরী মহেশ নাটকে আমিনার পার্ট করে। কিছুদিন তাকে বাড়ি থেকে বের হতে দেওয়া হচ্ছিল না তাও জানে। পরেশচন্দ্রের সঙ্গে কথা চলছে। বিবাহযোগ্যা কন্যা হলে যা হয়। পরী থম মেরে বাড়িতে এতদিন বসেছিল, ভাবলেই অবাক লাগে। তবে পরী আবার বিদ্রোহ করেছে!

    মুকুল কী করবে ভেবে পাচ্ছে না। সে গেট থেকেই দৌড়ে গেল। বারান্দায় উঠে বলল, বৌদি, শুনছ বিলুর কাণ্ড। সে নাকি আবার ভেগেছে।

    বৌদি দাদা সবাই বের হয়ে দেখল, পিলু তখনও বাগানের বাইরে দাঁড়িয়ে।

    —ভিতরে এস। ওখানে কেন!

    —না আমি যাই। সুধীনদা, নিখিলদাকে যদি কিছু বলে যায়।

    মুকুল সাইকেল বের করছে। সে কেমন জলে পড়ে গেছে। পিলুর কথাও মনে নেই। কিন্তু পিলু বলছে, যদি কিছু বলে যায়। তাকে কিছু বলল না, পরীকেও না, নিখিল, সুধীনদাদের কিছু বলে যাবে বিশ্ব সেই ছেলেই না। সে বলল, দাঁড়া আমি যাচ্ছি।

    বৌদি বলল, কিছু মুখে না দিয়েই বের হচ্ছ। পিলুকে ডাক। কিছু খেয়ে বের না হলে অশান্তি হবে। সে পিলুকে ডেকে বলল, আয়। ভেবে আর কী হবে। সেবারেও তো কোন এক ছোড়দির খবর পেয়ে মেসোমশাই বিশ্বকে আনতে চলে গেলেন। ওর যা স্বভাব, আর যা চেহারা, ছোড়দির অভাব হবে না। অযথা মাথা গরম করে লাভ নেই।

    পিলু তবু ঢুকল না। কারণ সে তো ভাল নেই—যতই এই শহর, এবং বোস্টাল জেলের পাঁচিল পার হয়ে কোনো দিগন্ত প্রসারিত মাঠে পড়ে যেতে ভাল লাগুক, সাইকেলের নেশা থাকুক—তবু দাদার জন্য আজ কেন জানি তার কিছু ভাল লাগছে না।

    —না আমি যাই।

    পিলু কিছুতেই ভিতরে ঢুকল না। দাদা যা মানুষ, যদি কোনো প্ল্যাটফরমে শুয়ে থাকে! যদি স্টেশনে এসে মনে হয়—কাজ ঠিক করেনি। বাড়ির কথা, পিলুর কথা ভাবলে, দাদা শেষে কোথাও নাও যেতে পারে। লজ্জায় হয়ত বাড়ি যেতে পারছে না। চিঠি লিখে গিয়ে কে আর ফিরে আসে। মান মর্যাদা যে খোয়া যায়।

    তার হাতে এত কাজ মুকুলদার সঙ্গে আটকে গেলে আজকের দিনটাও নষ্ট হবে। কোথায় কোথায় চলে যাবে—তারপর তার আসল কাজটাই হবে না।

    সে সাইকেলে যাচ্ছে। কে পেছন থেকে ডাকল, এই পিলু, তোর দাদা নাকি নিখোঁজ।

    পিলুর মাথা গরম হয়ে যায়। কলোনির সুবোধদা। কাপড়ের দোকান আছে মীরা সিনেমার সামনে। দোকান খুলতে যাচ্ছে। খবরটা তবে বাতাসের আগে উড়ছে। নিখিলদা বাড়ি নেই। সুধীনদা বাজারে গেছে। তবে মুকুলদা ঠিক খবর দেবে। তার এখন সবচেয়ে জরুরী কাজ, দুটো স্টেশনে খোঁজ নেওয়া। পিলু বাবার নির্বিকার স্বভাব পায়নি। সে তার আয়ত্তের মধ্যে যতদিন দাদা না ফিরছে, ঘোরাঘুরি চালিয়ে যাবে। আর তার কেন যে মনে হয় স্টেশনে গেলেই দেখতে পাবে দাদা দাঁড়িয়ে চা খাচ্ছে। কেউ ডেকে না নিয়ে গেলে দাদা যেতে পারছে না। সে গেলেই দাদা সুটকেস হাতে নিয়ে তার সঙ্গে রওনা হবে।

    এই সব আশার কুহকেই সেবারে সে রোজ গাড়ি এলেই স্টেশনের রাস্তায় গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকত। এটা এত বেশি প্রচার হয়ে গেছিল, যে দাদা সেই ভয়ে চিঠিতে লিখে গেছে, আমার জন্য স্টেশনে গিয়ে বসে থাকিস না। মন মানে! দাদা তুই এত অবুঝ। তুই বুঝিস না, বাড়ি না থাকলে আমাদের কত কষ্ট!

    সে স্টেশনে সাইকেল তুলে প্ল্যাটফরম ধরে হেঁটে গেল। যাত্রীর ভিড়। সাড়ে আটটার ট্রেন ছাড়বে। আর সঙ্গে সঙ্গে কেন যে মনে হয় দূরে ঐ তো দাদা দাঁড়িয়ে আছে। বড় বড় চুল, পাজামা পাঞ্জাবি পরা। সে কাছে গিয়ে নিরাশ হয়ে গেল। দাদা না। সে উঁকি দিয়ে মুখ দেখতে দাদার বয়সী মানুষটা বলল, খোকা, কিছু বলবে।

    সে লজ্জায় পড়ে যায়। ওয়েটিং রুমের ভিতরে উঁকি দিল, তারপর মনে হল বাথরুমে থাকে যদি। সে বাথরুমের দরজা ঠেলেও দেখল। এটা তার কেন হয়। দাদা না ফিরে আসা পর্যন্ত সে বাড়িতে এখন এক দণ্ড স্থির হয়ে বসে থাকতে পারবে না। দাদা যদি না ফেরে কলকাতায় চলে যাবে। কলকাতায় গিয়ে খুঁজতে শুরু করবে। কিন্তু সে তো খুব বেশিদূর যায়নি। বাবা মাঝে মাঝে এ-দেশে এসে উধাও হয়ে যেতেন। তাঁর শিষ্য যজমান আত্মীয়রা কে কোথায় এসে উঠল খোঁজ- খবর নিতেন। বাবার তখন ট্রেনে টিকিট লাগত না। উস্বাস্তু মানুষের কাছ থেকে নাকি রেলের ভাড়া নিতে নেই—এই বিশ্বাসে বাবা সহজেই এখানে সেখানে চলে যেতে পারতেন। দু-দিনের বলে বের হতেন—ফিরতেন পক্ষকাল পরে। মা’র চোপার ভয়ে বলতেন, আর বল না নেত্যকালীর সঙ্গে ট্রেনে দেখা। সেই ধরে নিয়ে গেল। কিছুতেই ছাড়ল না।

    মাধবদির সরকাররা পূর্বস্থলীতে এসে উঠেছে। নিয়ে গেল। সেখান থেকে রানাঘাটে। হাইজাদির রাঘব ঘোষ কিছুতেই ছাড়ল না, এত বড় পাবদা মাছ, প্রায় হাতখানা মেলে ধরে পাবদা মাছের সাইজ দেখিয়েছিলেন। এ-দেশে এসে এত বড় পাবদা বাবা খাননি, পাবদা মাছ খাবার লোভেই বাবা বিনা নোটিসে থেকে গেলেন। পিলুর তখন মনে হয় বাবাও কম পেটুক না। তারপর বাবার এক কথা, রাঘব খুব আদর যত্ন করল। ছেড়ে আসি কী করে! এমন সব গল্প শুনে পিলুর মনে হয়েছিল বড় হলে রানাঘাটে যাবে। অনেক স্টেশনে কিংবা প্ল্যাটফরমে রাত্রিবাস তাদের তখন নিত্যকার ব্যাপার। সে বিছানায় উঠে বসেছিল তড়াক করে। বাবার পাবদা মাছ খাওয়ার গল্প শুনতে শুনতে মুগ্ধ হয়ে গেছিল। নানা জায়গায় তারা ঘুরেছে এ-দেশে এসে। রানাঘাট জায়গাটায় গেছে কিনা বলতেই বাবার জবাব, যাব না কেন। দেশভাগের পর রানাঘাটের উপর দিয়েই তো এলাম।

    তারপরের প্রশ্ন ছিল, রানাঘাট কতদূর। সেখানে আবার যাওয়া যাবে কি না। কারণ গেলে বড় পাবদা মাছের ঝোল খাওয়া যাবে—পিলুর এমন মনে হত। রানাঘাটে তার যাওয়া হয়নি। তিন চার বছরের উপর বনজঙ্গলে বাড়ি ঘর করার পর কোথাও আর যাওয়া যায় তাও সে এখন বিশ্বাস করে না। কিন্তু বড় হয়ে রানাঘাট যাবে—এই উচ্চাশা সে এখনও পোষণ করে থাকে। বেগে সাইকেল চালাবার সময় তার লক্ষ্য, চালাও পানসি রানাঘাট।

    যার রানাঘাটই যাওয়া হয়নি, তার পক্ষে যে কলকাতা জায়গাটা খুব নিরাপদ নয় পিলু তা বোঝে। সে কাশিমবাজার স্টেশনে ঢুকে খুঁজল। কোনো বেঞ্চিতে কেউ শুয়ে নেই। সব ফাঁকা। কেবল কিছু কাক দুরের গো-ডাউনের মাথায় কা কা করছে। সে কেমন ক্রমশই নিরাশ হয়ে যেতে থাকল। বাকি থাকল, সেই রেশম কুটির জঙ্গল। যেখানে দাদা সারাদিন একটা গাছের নিচে শুয়েছিল। পরীদিকে মেরে আসার পর জঙ্গলটায় ঢুকে গাছের ছায়ায় চুপচাপ শুয়েছিল।

    রেশম কুটির জঙ্গলটা রেললাইনের ধারে। সে সেখানে ঢুকে গেল। বড় বড় তুঁত গাছ, নীল সবুজ ঘন পাতা—রেশম গুটির চাষ। কেমন গভীর নির্জন। গাছপালার মধ্যে কোনো মানুষের সাড়া পাওয়া যায় না। তবু তার সেই আশা কুহকিনী—সে খুঁজতে খুঁজতে এক সময় চিৎকার করে উঠল, দাদারে!

    না কেউ সাড়া দিচ্ছে না।

    সে গলা ফাটিয়ে ডাকছে, দাদারে!

    না কেউ সাড়া দিচ্ছে না।

    গাছের পাতা হাওয়ায় দুলছে। ঘাসের মধ্যে কীটপতঙ্গ ঘুরে বেড়াচ্ছে। একটা ট্রেন চলে গেল হুইসিল দিতে দিতে। মালগাড়ির ঝাকর ঝকর শব্দ। দূরে বাসের হর্ন বাজছে। সব এত স্বাভাবিক, সব এত ঠিকঠাক, কেবল তাদের সংসারেই দাদা আগুন ধরিয়ে কোথায় যে চলে গেল! তার চোখ ফেটে জল আসছিল। সে ছাড়বে না, দাদা কী ভেবেছে! তারা মানুষ না, যা খুশি করবে। সে কেমন পাগলের মতো কেবল ডাকছে, দাদারে তুই ফিরে আয়। পরীদি তোর বিছানায় শুয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদেছে। তোর কোনো মায়া দয়া নেহ!

    পিলু আসলে দাদার এই নিখোঁজ হয়ে যাওয়ার বিষয়টিতে এর চেয়ে বেশি প্রতিক্রিয়া জানাতে পারে না। তার আর কোনো বড় সম্বল নেই। জ্বালা ক্ষোভের যন্ত্রণায় সে ছটফট করছিল। গাছের ডাল ভাঙছে। যা কিছু সামনে পড়ছে লাথি মেরে সরিয়ে দিচ্ছে। কাক পক্ষী দেখলে তেড়ে যাচ্ছে। তোমরা সুখে থাকবে, উড়বে-ওড়া বের করছি। আর ডাকছে, দাদারে। যেন সে দাদাকে পেলে চুলের মুঠি ধরে টেনে নিয়ে যেত। গাছের ডাল ভেঙে ভাল ছিল না, পাখি তাড়িয়ে ভাল ছিল না—কী ভাবে যে সে খুঁজে বের করবে!

    একদিন বাবা বললেন, বুঝলে পিলু, এটাই তোমার কুঅভ্যাস! ভাল না। দাদা ফিরে আসছে না কেন, আমরা কী করব! তোমার খোঁজার পালা শুরু হয়ে গেল। সে কী এখানে আছে! জান পৃথিবীটা কত বড়। এর সাতটা সমুদ্র আছে জান। হিমালয় পাহাড় আছে জান। পাঁচটা মহাদেশ আছে জান? কুমেরু সুমেরু আছে জান! এত বড় পৃথিবীতে লুকিয়ে থাকলে কার বাপের সাধ্যি আছে খুঁজে বের করে। সে নিজে ফিরে না এলে আমরা কিছু করতে পারি না। খোঁজাখুজি সার। তুমি বের হবে না বলে দিলাম।

    কিন্তু কে কার কথা শোনে! সে সাইকেল বের করছে। সে রেলে চড়ে বেলডাঙ্গা পর্যন্ত গেছে। ভাবদা সারগাছি গেছে। সে এই করতে করতে কতদূর যেতে পারে একবার দেখবে। কলকাতায় দরকার হলে চলে যাবে।

    মায়া বলল, ছোড়দা, যাস না। সারাদিন টো টো করে কোথায় ঘুরিস, খাওয়া নেই, তোর ঘুরতে ভাল লাগে। কষ্ট হয় না। মা কাঁদে। আমার কপাল এই। যাও একটু সুখের মুখ দেখলাম, এখন দু’জনের এই মতিগতি। কেউ কারো কথা শোনে না।

    পিলু যাবেই—অগত্যা বাবা আর কী করেন। তাঁর আজ দুর্গা নবমীর ব্রত আছে। সকাল সকাল বের হতে হবে। স্নানে যাবার উদ্যোগ করছিলেন। তখনই পিলুর মাথায় ক্যাড়া উঠে গেল। সাইকেল বের করতে দেখেই বললেন, আরে তোমার দাদা তো লিখে গেছে, তোমার এই কুঅভ্যাসটি তো তার জানা। তোমাকে কী লিখে গেছে বল!

    যেন বাবা পড়া ধরছেন।

    পিলু ছাত্রের মতো বলল, স্টেশনে গিয়ে বসে থাকতে নিষেধ করে গেছে।

    —তবে!

    খড়মের একটা বাউলি খুলে গেছে। বাবা খড়মে বাউলি ঠুকে দিতে দিতে বললেন, তবে, বুঝছ সে তোমার মতো অবিবেচক নয়। সে জানে। তাকে নিয়ে তোমার মাথার ক্যাড়া উঠে যাবে। এ- জন্যই নিজের হস্তাক্ষরে লিখে গেছে। গুরুত্বটা তার বুঝছ।

    পিলু জানে তাদের বাবা এ-রকমেরই। ঈশ্বর ছাড়া তাঁর কোনো আর অবলম্বন নেই। না হলে সেই কবে এমন একটা বনজঙ্গলে ঘরবাড়ি বানাতে সাহস পায়। ছেলেপুলে নিয়ে সংসার। সামনে পুলিশ ক্যাম্প ছাড়া আর কোনো মানুষের বসতি নেই। রাতের বেলা বেড়ার পাশে শেয়াল খাটাস ঘুরে যায়। পুলিশ ক্যাম্পও খুব কাছে না। পানীয় জল আছে, প্রথমেই সেদিন বাবার ছিল এই আপ্ত বাক্যটি সার। কপর্দকশূন্য মানুষের যা হয়ে থাকে।

    —এখানে ঠাকুরকর্তা ঘরবাড়ি বানালেন। কে আছে?

    —কেন, ঈশ্বর আছেন। গাছপালা বনজঙ্গল আছে। মাটি আছে। আকাশ আছে। হাওয়া আছে! কী নেই বল?

    সুতরাং এমন বাবার সঙ্গে তার তর্ক করা বৃথা। সে সকালে এক পেট পাত্তা খেয়ে আর কোনো কথা না বলে সাইকেলে বের হয়ে গেল!

    বাবা বিরক্তিতে বললেন, যত্তসব! খুঁজবেন। বের কর খুঁজে। দেখি কী করতে পার। আরে তাঁর মর্জি না হলে, তোমার দাদা নিখোঁজ হন। তাঁর মর্জি না হলে, তিনি কখনও ফিরে আসেন।

    একদিন মিমি হুড়মুড় করে রিকশা থেকে নেমে ছুটে এল। পিলু দেখছে, পরীদি কেমন রোগা হয়ে গেছে। এর আগেও প্রায়ই খবর নিয়ে গেছে, আর খবর শুনে মুখ কালো হয়ে গেছে। ফেরেনি। কোনো চিঠিও দেয়নি। পরীদি তারপরও বলেছে, মেসোমশাই ভাববেন না—আমি বসে নেই। লোক লাগিয়েছি। কলকাতায় আমাদের কাগজের জানাশোনা ছেলেরা আছে। ওদের সব খুলে লিখেছি। সম্ভবত বিলু কলকাতায় গা ঢাকা দিয়ে বসে আছে। কফি-হাউসে খোঁজখবর নিতে বলেছি। খবর পেলেই চলে যাব।

    —তুমি চলে যাবে কেন? তোমার দাদামশাই দুঃখ পাবেন। আমিই যাব। কলকাতায় আমি গেছি! ভাববে না, আমি কলকাতা চিনি না। মা রান্নাঘরের দরজায় দাঁড়িয়েছিল। মা বাবার কথা সহ্য করতে পারে না। বলল, তুমি গেলেই হয়েছে। বাপ বেটা দু’জনকে খুঁজতেই তখন আবার পরীকে হন্যে হয়ে ছুটতে হবে।

    বাবা পরীদির দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, বোঝো! অর্থাৎ যেন বলা, বোঝো আমি কী শান্তিতে আছি।

    সেই পরীদি রিকশা থেকে লাফ দিয়ে নামল। শাড়ি সামলে এক হাতে ছুটে আসছে জাম গাছতলার নিচ দিয়ে। পিলু বারান্দায় মাদুর পেতে পড়ছিল। আর তখনই রিকশার ঘণ্টি বাজছে—সে দেখছে রাস্তা থেকে পরীদি ছুটতে ছুটতে আসছে। মুখে চোখে উত্তেজনা! পরীদি কী দাদার খোঁজ পেয়েছে! সে চিৎকার করে বলল, বাবা, পরীদি আসছে। সেও পরীদির কাছে ছুটে গেল। দাদার নিশ্চয়ই কোনো খবর আছে। না হলে এ-ভাবে কেউ ছুটে আসে না। আর তখনই মাথায় পোকা ঢুকে যায়, কোনো খারাপ খবর নয় তো! পরীদি তো সাইকেলে আসে। কলোনিতে পরীদি পার্টির কাজ করে বেড়ায়। কার লোন বের হয়নি, কার ক্যাসডোল মেলেনি, কারা নতুন এল—বসতি কোথায় দেওয়া হবে, নানা কাজে এখন পরীদি আসে। মাঝে মাঝে রাত বেশি হয়ে গেলে শহরে ফেরে না। দাদার ঘরে মায়াকে নিয়ে শোয়। সে তখন বাবার পাশে শুয়ে থাকে। সেই পরীদি রিকশাতে। খুবই জরুরী খবর— না হলে রিকশায় যেন আসতে পারে না। কাছে আসতেই দেখল পরীদির চোখে মুখে উচ্ছ্বাস। ঠিক এই পরীদিকে পিলু চেনে না।

    সে বলল, পরীদি তুমি! দাদার কোনো খবর পেলে!

    পরীদি বলল, পেয়েছি।

    পিলু লাটুর মতো পাক খেয়ে বলল, মা মা, বাবা বাবা–মায়া, দাদার খোঁজ পাওয়া গেছে। বাবা ঘরে কিছু করছিলেন। করছিলেনটা আর কী! তাঁর গামছায় বাঁধা পুঁটুলিটা ঘাঁটছিলেন। যখন তিনি অথৈ জলে পড়ে যান, ওটা করে থাকেন। এরই ভিতর তাঁর টাকা পয়সা গোঁজা থাকে। কেউ ধরলেই ক্ষিপ্ত হয়ে যান। পুঁটুলিটা তাকের উপর তুলে রাখেন। বাড়িতে ঠাকুর দেবতার পর এই পুঁটুলিটাই বাবার সব। সিঁদুর মাখা একটি রুপোর টাকাও থাকে পুঁটুলিতে। টাকাটা বাবা দেশ থেকে সঙ্গে এনেছিলেন। মাথা নেড়া একজন মানুষের মুণ্ডুর ছাপ টাকাতে। সে একবার গোপনে খুলে টাকাটা হাতে নিয়ে দেখেছিল। তাঁর পোঁটলা কেউ ধরলেই টের পান। সেদিন বাবা অগ্নিশর্মা। আমার গৃহলক্ষ্মীর উপর কার দয়া হল! কে ধরেছে। কেউ স্বীকার করে না। সেও না। বাবা গজগজ করছিলেন, আমার জিনিসে কার যে এত দরকার বুঝি না। কিছুই খোয়া যায়নি—কিন্তু কিছুতেই বাবার মেজাজ প্রসন্ন করা গেল না সেদিন।

    দাদার খবর পাওয়া গেছে শুনে সবাই ছুটে বের হয়ে এলেও বাবাকে দেখা গেল না। নবমী পর্যন্ত তার ঘর থেকে বড় দাদাঠাকুরের খবর পাওয়া গেছে শুনে গুড়ি মেরে বের হয়ে এসেছিল। কেবল বাবার সাড়া পাওয়া যাচ্ছিল না।

    পরীদি ছুটে এসে বারান্দায় বসে গেল। মাটি উঁচু করে ঘরের বারান্দা। গোবরজলে নিকানো। পরীদির এই স্বভাব। মাটির দাওয়ায় বসলে আকাশের নক্ষত্র নাকি খুব কাছে দেখা যায়। অদ্ভুত সব কথা। পরীদি উচ্ছ্বাসে প্রায় যেন ভেঙে পড়েছে। মায়ার দিকে তাকিয়ে বলল, এক গ্লাস জল খাওয়া।

    কী খবর কিছুই বলছে না। কোথায় আছে দাদা তাও বলছে না। পিলু অপেক্ষা করছে উঠোনে— দাদা কোথায় আছে? কবে আসবে? কিন্তু পরীদি কিছুই বলছে না দাদার সম্পর্কে। এদিক ওদিক তাকিয়ে বলল, মেসোমশাই বাড়ি নেই!

    ভিতর থেকে গলা পাওয়া গেল, যাই। দেখ না, কোথায় যে রাখলাম।

    খুবই জরুরী কিছু বাবা হারিয়ে বসে আছেন। দাদার খবরের চেয়েও জরুরী বিষয় বাবার এখন আর কী থাকতে পারে পিলু বুঝতে পারছে না। এমন কী অমূল্য নিধি তাঁর হারিয়েছে যা দাদার খবরের চেয়ে বড়। পরীদি যতবারই এ-বাড়িতে এসেছে— দেখেছে বাবা ঝোপজঙ্গলে গাছের পরিচর্যায় ব্যস্ত। আগাছা সাফ করছেন। গাছের গোড়ায় মাটি দিচ্ছেন। সেই বাবা ঘরের ভেতর কী করছেন এখন কে জানে! পরীদিও হয়েছে, বাবা বারান্দায় এসে না বসলে যেন কোনো খবরই কাউকে দিয়ে লাভ নেই।

    পিলু আর পারল না, দাদা তোমাকে চিঠি দিয়েছে।

    —তোর দাদাকে এই চিনলি এত দিনে। সে চিঠি দেবে! তা হলেই হয়েছে। সে চিঠি দেবার পাত্র।

    —তবে কে জানাল? তুমি কলকাতায় গেছিলে!

    পার্টির মিছিল গেলে পরীদি কলকাতায় যায়। পরীদি এমনিতেও যেতে পারে। কলকাতায় তার কাকা থাকেন, এক পিসি থাকেন। তাদের বাড়ি ঘর আছে। বেড়াতে যেতে পারে। কত কারণেই পরীদি যখন তখন কলকাতায় চলে যেতে পারে। এক-দু’দিন থেকে ফিরে আসতে পারে—যদি সেখানে দাদার কোনো খবর পায়।

    পরীদির হাতে সুন্দর মলাটের একটা বই। এত যত্ন করে রেখেছে, এবং কোলের উপর রেখে যাতে ভাঁজটাজ না পড়ে—যেন এই বইটা পরীদির কাছে বাবার চণ্ডীস্রোত্রের চেয়ে মূল্যবান। কারণ পরীদি আঁচল দিয়ে এরই মধ্যে মলাটে ধুলোবালি না লাগে, মুছে আবার নিজের মুখ মুছল। কার্তিকের বেলা—রোদের তাপ কম—তবু পরীদি ঘামছে। এত যত্নে আলতো করে আঁচলে বই-এর মলাট কেউ মুছে দেয় পিলু এই প্রথম টের পেল। নিজের মুখের চেয়েও দামি বই-এর সুন্দর মলাট—এমনই মনে হল তার।

    বাবা বিরক্ত হয়ে যেন এবার বাইরে বেরিয়ে এলেন। বারান্দায় জলচৌকিতে বসে বললেন, তা হলে শ্রীমানের খবর পাওয়া গেল। আসার কোনো খবর দেয়নি!

    পরী বলল, না তা দেয়নি। খবর পাওয়া যায়নি!

    —কী বলছ। এই যে পিলু গলা ফাটিয়ে বলল, দাদার খবর পাওয়া গেছে।

    —তা পাওয়া গেছে।

    —সেটা কী! বাবার কেমন তিক্ত গলা।

    পরী যত্ন করে পত্রিকাটা এগিয়ে দিল।

    —এটা কী! এটা দিয়ে আমি কী করব!

    —কলকাতার খুব বড় কাগজ।

    –কী আছে এতে?

    —বিলুর কবিতা!

    —কবিতা!

    পিলু দেখল বাবার চোখ মুখ কুঁচকে গেছে। পরীদি কী যে করবে ভেবে পাচ্ছে না। এটা তাহলে বই নয়। পত্রিকা। দাদার কোনো খবর নেই। দাদার কবিতা ছাপা হয়েছে। বাবা যে এতে কুপিত হবেন বোঝাই যায়। দাদার কবিতা নিয়ে বাবার যত ক্ষোভ। গোল্লায় গেল। মাথায় পোকা ঢুকে গেছে। আখের সর্বনাশ!

    পরীদি বলল, বিলুর কবিতা ছাপা হয়েছে।

    —ছাপা হয়েছে তো আমি কী করব।

    —কত নামি কাগজ মেসোমশাই—।

    যেন পরীদির এত দিনে জীবন সার্থক। পিলু জানে, দাদা বন্ধুদের গর্ব—দাদা পরীদির আবিষ্কার। পরীদিই ব্লেকমেল করে দাদাকে দিয়ে কবিতা লিখিয়েছে। ব্লেকমেল কী পিলু জানে না। তবু দাদার সঙ্গে ঝগড়া বেঁধে গেলে, পরীদি চেঁচিয়ে বলত, আমি তোমাকে কবিতা লেখার জন্য ব্লেকমেল করেছি বিলু!

    —হ্যাঁ করেছ। কে যায় ও-পথে। তুমিই তো অযথা ভয় দেখালে। প্রতারণা করেছ।

    —প্রতারণা! তোমার সঙ্গে!

    —কার সঙ্গে তবে! তোমার তো একজনই আছে প্রতারণা করার লোক। তুমি বলনি, বলে দেব।

    —কী বলে দেব বলেছি।

    —আমি যে গ্যারেজ থেকে গোবিন্দের কৌটা ভেঙে কুড়ি টাকা নিয়ে সেবারে পালিয়েছিলাম বলনি! বলনি, আমি চোর। চোরকে কালীমন্দিরের পুরোহিত করা যায় না!

    —হায় সর্বনাশ, বিলু তোমার মিছে কথা বলতে জিভে আটকাল না! চোর না বললে তো মন্দিরে পুরুতগিরি করতে। সব তো ঠিক হয়ে গেছিল। দাদামশাই, তোমার মানুকাকা, মেসোমশাই মিলে ঠিকই করে ফেলেছিল। মনে নেই ছুটে এসেছিলে, পরী আমাকে বাঁচাও। বাবার যা কাছাখোলা অবস্থা রাজি হয়ে যাবেন। বর্তে যাবেন। রক্ষা কর। কার্তিক ঠাকুরকে তখন কে রক্ষা করেছিল!

    —না বলিনি।

    —মিছে কথা বলবে না। একদম বলবে না। বলনি, এখন আমি কী করব পরী!

    পিলু দেখেছে, দাদা আর কথা বলতে পারত না। একেবারে চুপ করে যেত।

    পরীদি তখনও গজ গজ করছে—আমি যত নষ্টের গোড়া না! নষ্ট করেছি। ঠিক করেছি। আরও করব। পারলে একশবার করব। হাজারবার করব। কবিতা লিখতে বললে মানুষকে নষ্ট করা হয়!

    দাদা আবার গর্জে উঠত, চুপ। তুমি বলনি, বিলু, সব করব। কবিতা লেখ। তুমি পারবে। তোমার চোখ মুখ বলছে পারবে। তোমার ভিতর জ্বালা আছে। অনুভূতি আছে স্বপ্ন আছে। তুমি পারবে। কলেজ ম্যাগাজিনের কবিতাটি দাও। তবেই দাদামশাইকে বলব, বিলুটা একটা চোর। গ্যারেজ থেকে টাকা চুরি করে একবার পালিয়েছিল। একটা চোরকে বাবাঠাকুরের জায়গায় বসাবে। ভাল দেখাবে! তোমার মা কালী রাগ করবেন না! কী বলনি! বল চুপ করে থাকলে কেন। কে আমাকে রাস্তায় টেনে নামিয়েছিল।

    পরীদি বলত, বেশ করেছি। তোমার সর্বনাশ আমি চাই। আঃ কী কবিতা! পরী আমার সর্বনাশ। আর কোনো লাইন খুঁজে পেলেন না তিনি!

    দাদার ঘরে কথা কাটাকাটি হচ্ছে। বাইরে থেকে কেউ শুনছে। সেই পরীদি কত উচ্ছ্বাস নিয়ে এসেছে, আর বাবা কেবল বসে বসে তামাক টানছেন। পত্রিকাটা মাটিতে পড়ে আছে। পরীদির কাছে যা গৌরবের, বাবার কাছে বোধ হয় তা খুবই অগৌরবের।

    হঠাৎ বাবা প্রশ্ন করলেন, এতে কী পেট ভরে মা! এই যে চাকরিটা ছেড়ে দিয়ে বাবু দুম করে অন্তর্ধান করলেন, ফল ভাল হবে! কবিতা লিখলে পেট ভরবে!

    পরীদি মাথা নিচু করে বসে আছে।

    মা বললেন, মিমি, বিলুর কোনো খবর নেই কাগজে!

    —আছে মাসিমা। কাগজটাইতো খবর। বিলু কী সুন্দর কবিতা লিখেছে। বলে সে মা’র কাছে কাগজটা নিয়ে গেল।

    বাবা বললেন, ওনি তো কবিতা বোঝেন!

    আসলে ঠেস দিয়ে কথা।

    পরীদি বলল, কবিতা বোঝার জন্য কেউ লেখে না মেসোমশাই। পড়ে ভাল লেগে যায়। দূরের কথা বলে। স্বপ্নের কথা বলে। বেঁচে থাকার কথা বলে। কত পাঠক পড়বে। নাম জানবে। আমি তো আর কিছু চাইনি।

    বাবা বললেন, বেশ ছিল, এখানে কাগজ নিয়ে পড়েছিল। কুকর্ম সুকর্ম তার এখানকার বন্ধুরাই সামলাত। এত বড় শহরে গিয়ে কবিতা লিখে শেষে দেশসুদ্ধ যজালি!

    পরী মেশোমশাইকে জানে। তার প্রতি মেসোমশাইয়ের এ-কারণে চাপা ক্ষোভও আছে। যদি তিনি পাতা উল্টে দেখেন, পড়েন। কত বড় বড় কবির পাশে তার কবিতা ছাপা হয়েছে। না দেখলে বুঝবেন কী করে! তারপরই মনে হল, মানুষের দারিদ্র্য অনেক কিছু বোধহয় হরণ করে নেয়। ঝড়, জল, অন্ন চিন্তা, মুষ্টি নির্ভর জীবন কোন কবিকেই সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছতে দেয় না। তিনি দেখলেও এর গাম্ভীর্য কিংবা গুরুত্ব টের পাবেন না। পরীর নিজেরই ইচ্ছে হল একবার সবটা পড়ে শোনায়।

    তখনই পিলু বলল, তুমি যে বললে, দাদার খবর আছে, এই খবর!

    —হ্যাঁ। তোর দাদা কলকাতায় গা ঢাকা দিয়ে আছে। কতদিন থাকতে পারে দেখব। পত্রিকা অফিসে গেলেই ওর খবর পাওয়া যাবে। কফি হাউসে গেলে পাওয়া যাবে। কবিরা মুখচোরা স্বভাবের হয়। আড়ালে আবডালে থাকতে ভালবাসে জানি। তবু সে ভালই আছে। এর চেয়ে বড় খবর আর কী পেতে চাস বুঝি না। আমার কাছে এর চেয়ে বিলুর আর অন্য কোনো বড় খবর যে থাকতে পারে না। কথা বলতে বলতে মিমির গলা ধরে এল।

    এতে বাবার বোধ হয় সামান্য লেগেছে। বললেন, দেখি। তারপর তিনি পাতা উল্টাতে থাকলেন কাগজটার।

  • নয়

    নয়

    সকাল থেকেই পিলুর মেজাজ খারাপ। আমাকে কিছু বলবে না। যাব বাড়ি থেকে বের হয়ে বুঝবে মজা।

    —যা না যা, একটাতো গেছে। তুইও যা। কে থাকতে বলেছে। আমি তোদের কে?

    আসলে পিলু বুঝতে পারে, দাদা বাড়ি নেই বলে মা’র চণ্ডীপাঠ শুরু হয়ে গেছে। শীতের সময়। বাড়িতে পিঠে পুলি হবে। চাল বাটা থেকে, মাষকলাই কিছুই বাদ যায়নি। ঠাকুরের ভোগ হবে। অথচ দাদাটা বাড়ি নেই। ইট কাটার আগে ঠাকুরকে সামান্য অন্নভোগ।

    সব ঝক্কি তার উপর

    —এই পিলু!

    বাবা হয়তো ডাকলেন।

    —যাতো সনাতনকে বলবি সের খানেক আরও খেজুরের গুড় দিতে। তোর মা-তো রণচণ্ডী হয়ে আছেন। ঠাকুরের ভোগ কার জন্য। আরে বোঝো না, কার জন্য। মানত করেছি যখন, দিতেই হয়। দেখি ঠাকুর কী করেন। কতটা খেলাতে পারেন। ইটের ভাটা হবে বোঝো না!

    সকাল থেকেই শুরু হয়েছিল। এক দণ্ড সে বসে থাকতে পারছে না। পরীক্ষা হয়ে গেছে। স্কুল নেই। বাড়িতে আর কে আছে ছোটাছুটি করবে। দাদাটি তো মজা করছেন। কার সঙ্গে পিলু তাও বোঝে না। পরীদি দাদার কবিতা নিয়েই হৈচৈ করছে। আরে মানুষটা কোথায় আছে কী খাচ্ছে, কারো মাথায় নেই। এক ফোঁটা জল গড়িয়ে খেতে জানে না, তার কি না এত মেজাজ!

    সকালে উঠেই একবার যেতে হয়েছে নিবারণ দাসের আড়তে। ইট কাটা হবে। মাটি তোলার কাজের জনমজুর নিবারণ দাসেরই ঠিক করে দেবার কথা। বাবার বড় যজমান। বিষয়ী মানুষ। সব কাজে কর্মে নিবারণ দাসকে খবর দাও। কোথায় ইটের ভাটা হবে, জনমজুর কত লাগবে, সাঁওতাল মেঝেন হলে ভাল হয়—সবই নিবারণ দাসের পরামর্শে। দাদা বাড়ি নেই—অথচ বাবা কোনো কাজই করতে বাকি রাখছেন না। বাবা যে ভাল নেই সে বোঝে! যখন ভাল নেই, তখন আর ইটের ভাটা পুড়িয়ে কী হবে! কার জন্য মন্দির! নবমীর গুপ্তধন বাবা পেয়ে সব ঠাকুরের নামে করে রাখছেন। জমি জমা বাড়ি ঘর সব। নবমীর ইচ্ছে, জঙ্গলে তার স্বামীর ভিটায় যেন শিবলিঙ্গ প্রতিষ্ঠা হয়। পিলু আজ নবমী বুড়ির উপরও ক্ষেপে আছে। কৈ যখন তুলে আনি তখন তো এত বায়না ছিল না! যখের ভয়! যখ ঢুকে গেছে! যখন ঢুকে গেছে তো আমরা কী করব!

    সেই নবমীর এখন সাধ, তার ভিটায় যেন একখানা শিবলিঙ্গ স্থাপন করা হয়।

    সে শুনেই হম্বিতম্বি শুরু করেছে। নবমী তোমার এত সাধ থাকলে জঙ্গলে পড়ে থাকলেই পারতে। কে করে!

    বাবা শুনে ক্ষিপ্ত হয়ে গেলেন।—কে করে মানে!

    পিলুও আজকাল বাবার মুখে মুখে উত্তর করে। বাবা তখন গুম মেরে যান। কখনও তার ভুল ধরিয়ে দেন। কে করে মানে ঈশ্বর করেন। নবমীর ভিটায় শিবলিঙ্গ স্থাপন হবে কী হবে না তাঁর মর্জি। তুমি বললেও হবে না, না বললেও আবার হতে পারে।

    হয়ে গেল।

    সকাল থেকে এই করে তার চোটপাট শুরু। বাবা রাজি হয়েছেন। ইটের ভাটায় আর ক’খানা বেশি ইট পুড়িয়ে নিলেই হবে। বাড়িতে এই রাজসূয় যজ্ঞ চলছে, আর তার দাদাটা কলকাতায় গা ঢাকা দিয়ে আছে। কেউ কোনো খোঁজখবর নিচ্ছে না। আজ বাড়িতে ঠাকুরের ভোগ হবে। দু-দশজনকে বলাও হয়েছে—প্রসাদ নেবার জন্য—মা সকাল থেকে লেগে পড়েছে। বৃন্দাবন করের বৌ এসে গেছে। বাড়িতে গোবিন্দভোগ আতপ চালের ভাত হবে। পায়েস হবে। পিঠে পুলি কালই করে রাখা হয়েছে। ঠাকুরকে দেওয়া হবে না, তবে যারা আমন্ত্রিত তাদের পাতে দেওয়া হবে। কাল থেকে বালতি বালতি জল তোলা, ড্রামে ভরা, নিরাপদদা সকাল থেকেই কাজে লেগে গেছে—সে চেলাকাঠ এনে ফেলছে। গর্ত করছে। উনুনে বড় কড়াই, বড় তামার ডেগ বসানোর মতো গর্ত করা হচ্ছে। আর তার দাদার কথা একবারও কেউ মনে করছে না! মাথা কী গরম সহজে হয়। একবার দাদা ফিরে আসুক, মজা বুঝবে।

    বাবা বললেন, পিলু, কাজের বাড়িতে মেজাজ খারাপ করতে নেই। মা’র কথা শুনতে হয়। দেখছিস তো কেউ বসে নেই!

    বাবা পিলুকে আজ বেশ তোষামোদ করে কথা বলছেন। সকালবেলায় স্কুলের মাঠে তার কত কাজ। সবাই এসে বসে থাকবে। একটা দড়ি যোগাড় হয়ে গেছে। দুটো বাঁশও। চাঁদা তুলে বল কেনা হয়েছে। সে না গেলে কেউ কাজে হাত দেবে না। কিছুতেই মা আজ সাইকেল তাকে হাতছাড়া করবে না। চাবিটা কোথায় লুকিয়ে রেখেছে। সে দৌড়ে গেছে। সনতের দোকান থেকে খেজুরের গুড় এনে দিয়েছে। সাইকেলটা দিলে কত তাড়াতাড়ি হয়। সেই সাইকেলটাই হাত ছাড়া! কার মাথা ঠিক থাকে।

    আর এ-সময়ই বাবার কী মনে হল কে জানে! ডাকলেন, পিলু, শোন। পিলু রাগে ক্ষোভে থম মেরে আছে। কিছু বলছে না। বাবা বললেন, যখন ভোগ হচ্ছেই, এক কাজ করলে হয় না! তুই কী মনে করিস—একবার শহরে খবর দিলে হয় না, বিলুর বন্ধুদের। অন্ন প্রসাদ নিত তারা।

    বাবার এ-হেন বিবেচনায় পিলু আরও ক্ষিপ্ত হয়ে গেল। দাদা বাড়ি নেই, ভোজ হচ্ছে। দাদার বন্ধুরাও ভোগ খাবে। তাদের বলে আসতে হবে। সাইকেলটা সে এই অজুহাতে পেয়ে যেতে পারে। আসলে সাইকেলে তালা পড়ার পেছনে বাবার কোনো উসকানি থাকতে পারে। দিন-রাত টো টো করে বেড়ানোর স্বভাব হয়ে গেছিল। বাবা বার বার সাবধান করেও পারেননি। সাইকেলই তোমাকে খাবে। কিন্তু সে তো কথা শোনার পাত্র নয়। তাকে জব্দ করতে হলে সাইকেলে তালা না দিয়ে রাখলে চলবে না। প্রতিবেশীরা তার সাইকেল, আর ট্রাকের বাজি রেখে খেলা দেখে ফেললেই বাবার কাছে এসে নালিশ, ঠাকুরকর্তা, পিলু তো যমের সঙ্গে লড়ালড়ি শুরু করে দিয়েছে। তারপর বিশদ বর্ণনা। অভিযোগ এক দু-দিন নয়—মাঝে মাঝেই ওঠে। আজ কাজের দিন, কোনো অনর্থ ঘটলে—শুভ কাজ পণ্ড। তার চেয়ে সংসারে বাবার শুভ কাজের দাম বেশি!

    সে বলল, আমি পারব না।

    বাবা বললেন, সাইকলটা নিয়ে মুকুল নিখিল সুধীনকে অন্তত বলে আয়। ওরা তো আমার বাড়িতে অন্ন প্রসাদ কখনও গ্রহণ করেনি। গেরস্থের এতে মঙ্গল হয় জানিস।

    সাইকেলটা হাতে পাবে জেনেই সে শেষে রাজি হয়ে গেল। বলল, দাও তবে বলে আসি।

    বাবা বললেন, মিমিকেও খবরটা দিস।

    বাবা একপ্রস্থ ফর্দ দিয়ে নিরাপদকে আবার বাজারে পাঠিয়েছেন। পিলু সাইকেল নিয়ে বের হয়ে গেল। সে সাঁ সাঁ করে ছুটে যেতে থাকল। এবং যাবার আগে স্কুলের মাঠে বলে গেল, আজ আর তাকে পাওয়া যাবে না। বাবা অশ্বমেধ যজ্ঞ শুরু করেছেন। অশ্বমেধ যজ্ঞ কী সে জানে। নবমীকে বিকেলে রামায়ণ মহাভারত পাঠ করে শোনানোর দায়িত্ব মাঝে মাঝে তার উপর বর্তায়। দুলে দুলে সুর ধরে পড়তে মন্দ লাগে না। অভিমন্যু বধ পড়তে পড়তে সেও সবার সঙ্গে সঙ্গে কেঁদে ফেলে। সুভদ্রা জননী যেন আর কেউ না। তার নিজের মা’র কথা মনে হয়। উত্তরার কথা মনে হলে তার পরীদির মুখ ভেসে ওঠে। যেন পরীদিরই কাজ, দাদা যে আজ নিখোঁজ পরীদি তার জন্য দায়ী। সাজগোজ করিয়ে রণক্ষেত্রে পাঠিয়ে এখন নিজে হা হুতাশ করছে।

    কারণ সে পরীদিকে আবার দেখেছে, দাদার খোঁজ খবর না পেয়ে কেমন মনমরা হয়ে গেছে।

    পরীদি নিজেও গেছিল কলকাতায়। ফিরে এসে বাবাকে সব খবর দেওয়া চাই।

    পত্রিকা অফিসে গেছে। কবিতার নিচে নাকি নাম ঠিকানা লিখে দিতে হয়। ওদের খাতা থেকে যে ঠিকানাটি দেওয়া হয়েছে, তা অপরূপার ঠিকানা। মুকুলদার বাড়ির ঠিকানায় পত্রিকা এসেছে পরীদি খবর দিয়ে গেছিল।

    তারপর পরীদি আবার খোঁজাখুঁজি করেছে কলকাতায় গিয়ে। সেখানে বেলাঘাটা বলে একটা জায়গা আছে। চাউলপট্টি রোড বলে রাস্তা আছে। পোড়ো ভাঙ্গা বাড়ি, সরকার বাড়ির মাঠ পার হয়ে বড় বড় সব পুকুর ডোবা। কুঁড়েঘর সারি সারি। তারপরই একটা খাল। হাড়ের কারখানা—কী দুর্গন্ধ। সেই বস্তিতে পরীদি খোঁজ নিতে গিয়ে মহা বিপর্যয়ে পড়ে গেছিল। খুঁজতে খুঁজতে রাত হয়ে গেছে। ঝড় বৃষ্টি, আর সেই পুকুর ডোবা নালা ভর্তি ছোট ছোট ঝুপড়ি। প্রেসের কোন কিরণ বাবু বলেছে, হ্যাঁ এই নামে তো একজন আমাদের প্রুফ দেখে। ঠিকানাটা দেখুন তো। পরীদি দেখেছে,দাদার সই। নিচে কী সব নম্বর দিয়ে লেখা চাউলপট্টি রোড। জায়গাটা যে এত দুর্গম হতে পারে, এমন আস্তাকুঁড় হতে পারে পরীদি নাকি চিন্তাই করতে পারেনি। বিলু কী নিজেকে নিঃশেষ করে দিচ্ছে। হাড় পোড়া দুর্গন্ধ, খাটা পায়খানা, মানুষ শুয়োর গাদাগাদি করে আছে। সেখানেও পরীদি খুঁজে এসেছে। সন্ধ্যা বলে একটি মেয়ে খবর দিয়েছে, বিশ্ববাবু কখন আসে, কখন থাকে, কখন যায় আমরা কেউ টের পাই না। তার ঘরটাও দেখিয়েছে। ঘরে কিছুই নেই। টিনের বাক্স। একটা খাটিয়া। একটা মাটির জার। জল নেই।

    পরীদি তারপর আর একা যেতে সাহস পায়নি। পার্টির দু-জন ক্যাডারকে নিয়ে খুঁজতে গেছে। গিয়ে দেখে নেই। পরদিন সকালেই নাকি ভাড়া মিটিয়ে সুটকেস হাতে নিয়ে চলে গেছে কোথায়। এমন দাদা যার, তার ভাই আর কত ভাল হবে! তুই পরীদিকে নাকের জলে চোখের জলে এক করছিস। তোর মায়া দয়া নেই! বাবার জন্য কষ্ট হয় না। মা’র জন্য! তুই অত কী রাজকার্য করতে গেলি, আমাদের কথা ভুলে গেলি! পরীদির গন্ধ পেলেই পালাস। তুই বল, পরীদির কী অপরাধ! পরীদির পার্টি করা তুই পছন্দ করিস না, নাটক করা পছন্দ করিস না। পরীদির এটা বিলাসিতা। বিলাসিতা হলে, তোর ঘরে রাতে শুয়ে ঘুমাতে পারে! আলো নেই, পাখা নেই। জানালা বাঁশের কঞ্চির। ছোট্ট জানালা। হাওয়া বাতাস কিছু ঢোকে না, থাকতে পারে! পরীদি তো আমাদের বাড়ি এলে যেতেই চায় না।

    এ-সব ভাবলেই পরীদিকে মনে হয় সেই উত্তরা—যে নারী তার যুবরাজকে যুদ্ধের পোষাক পরিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে ছেড়ে দিয়েছে। মাথায় উষ্ণীষ, শরীরে বর্ম, ঢাল, তরবারি, তৃণ পিঠে। সব দিয়েছে, কেবল সপ্তরথী ঘিরে ধরলে, সে জানত না কী করে বাঁচতে হয়। ব্যূহ থেকে বের হতে হয়। দাদাও কী কোনো অদৃশ্য সপ্তরথীর বাণে জর্জরিত। না-হলে পালাচ্ছে কেন বার বার। সে পরীদিকে কী আর মুখ দেখাতে চায় না। জীবনের সেই জয়, যা সহজ লভ্য নয়, করতলগত নয়—যার জন্য সে অস্ত্রবিদ্যায় বিশারদ হয়ে ওঠার চেষ্টা করছে, হয়তো ঠিকঠাক পারছে না, সে পাখি দেখলে মুগ্ধ দেখতে পায়, চোখ এখনও দেখতে পায় না, যতদিন না তার সেই দেখা পূর্ণ হচ্ছে, ততদিন কী অজ্ঞাতবাস চলবে!

    সে সবাইকে বলে ফিরে এল। কেন যে আজ মনে হল, সত্যি এই কাজের দিনে তার বাড়িতেই থাকা দরকার। সে না থাকলে বাবা একা। সে ফিরে এসে দেখল, পরীদি রান্নাঘরে বসে মুগের ডাল বাছছে। পরীদিকে গিয়ে বাড়িতে পায়নি।

    পরীদিকে বাড়িতে আর কেউ কিছু বলে না। তবে বোঝে পরীদিকে নিয়ে প্রচণ্ড তিক্ততা চলছে। পরীদি কোথায় বললে, এক কথা, তা তো তোমরা ভাল জানবে। সে তো আমাদের কিছু বলে যার না। সুহাসদাও নাকি একদিন ফোন করায় তার দাদামশাই বলেছিল, জানি না। বরং আমি জিজ্ঞেস করছি সে কোথায়! আমার মানমর্যাদা নিয়ে তোমরা আর কত হোলির রঙ খেলবে। সে কোথায় আছে, থাকবে, সে তো তোমরা জানবে। তোমরা তার সুহৃদ। আমরা তার শত্রু। সে কোথায় ঘোরে থাকে খায় তোমরাই আমার চেয়ে বেশি জানবে।

    পিলুর এ-জন্য আরও বেশি কষ্ট। কোথাও যেন ঠাঁই নেই। পরীদি বাড়িতে থাকে খায়, খুশি মতো ফেরে, বাড়ির কাজের লোকদের সঙ্গেই যা সম্পর্ক। পরীদির কখন কী দরকার জানে। পরীদি ইচ্ছে করলে প্রাসাদের মতো বাড়িতে নিরিবিলি, নিজের ঘরে, বারান্দায় বসে চুপচাপ যেমন দিন যাপন করতে পারে আবার তেমনি, সহসা সিঁড়ি ধরে নেমে নিজের লাল রঙের সাইকেল নিয়ে উধাও হয়ে যেতে পারে। শুধু বাড়িতে খবর রেখে যায়, যেন খবরটা দাদামশাইকে দেওয়া হয়।

    এখন যে পরীদি মুগের ডাল বাছছে সেও আর এক পরীদি। পার্টি করা, নাটক করা, কিংবা ক্যাডারদের নিয়ে মিছিল মিটিং করা পরীদি যেন এ নয়। ঠিক মা’র মতো, বাবার মতো একেবারে ঠাকুর ঘরের পবিত্রতা নিয়ে বসে আছে। চাল বেছে টাগারিতে রাখছে। মাকে ডেকে বলছে, এতেই হয়ে যাবে। পিলুকে দেখে বলেছে, পিলু বসে থাকিস না। নিরাপদকে নিয়ে কলার পাতা কেটে আন। আর শোন, কলার পাতাগুলো ধুয়ে রাখ। তারপরই পরীদি রান্নাঘরে ঢুকে বলল, মাসিমা, এ কী! কাঁদছেন কেন!

    পিলু দেখল বাবা বেশ তটস্থ হয়ে উঠেছেন। কেন কাঁদছে বাবা টের পেয়ে গেছেন। কারণ বাবার সঙ্গে যা কিছু মান অভিমান ঝগড়া রাতের বেলা। দাদা বাড়ি নেই, অথচ বাড়িতে অন্নভোগের আয়োজন হচ্ছে, লোকজন খাওয়ানো হচ্ছে, কেউ পারে—বড় পুত্রটি কোথায় আছে, তার কোনো সঠিক হদিস পাওয়া যাচ্ছে না—তিনি এখন অন্নভোগ নিয়ে পড়লেন।

    পিলুর মেজাজ খারাপ হয়ে গেল। মুখ কালো হয়ে গেল। সে শুনতে পাচ্ছে, মা বলছে, কাঁদি আর সাধে মা। যার মানুষের কোনো হুঁস নেই, তার কান্না ছাড়া আর কী সম্বল আছে বল! একবার গেল, কলকাতায় কোথায় আছে খুঁজতে গেল! তোমার বাবা দাদামশাই পারতেন। নির্বিকার পুরুষ।

    বাবা বললেন, আরে পরী পাত্তা করতে পারল না, ধরেও ধরতে পারল না, আমি গেলে তো বিষম কাণ্ড হবে।

    হঠাৎ মা কেমন দজ্জাল গলায় বলে উঠল, লজ্জা করে না, যখন বলেছিলে, এমন কু-পুত্রের মুখ দর্শন করব না। তারপর পরীদির দিকে তাকিয়ে বলল, আমার সোজা সরল ছেলেটার উপর এত অত্যাচার! ভগবান সহ্য করবে! পরী, তোমার গা ছুঁয়ে বলছি, বিলু আমাকে বলেছে, এক বর্ণ মিথ্যা বলছি না। বলেছে, মা আমি মারিনি। মারতে পারি না। বিশ্বাস কর আর যাই করি আমি পরীকে কখনও মারতে পারি না।

    এ-কথা শোনার পর পরীদিও মুখ আড়াল করে ফেলল। দু-হাতে মাকে সামলাচ্ছে, আর মুখ নিচু করে ফেলছে। উদগত অশ্রু সামলে কেন যে পরীদিও বলছে, মাসিমা থামুন। মাসিমা, আমিও জানি ও মারেনি, মারতে পারে না। মাসিমা থামুন।

    —আমি থামব বল! নিষ্কর্মা মানুষের এত বড় কথা! তোমার দাদামশাই কী বললেন, আর তিনি বিশ্বাস করে ফেললেন। আমার ছেলে কারো গায়ে হাত তোলার ছেলে! তুমি তাকে কী না বলেছ! তুমি না গেলে ও কখনও ফেরে! সে তোমার কু-পুত্র!

    পিলু, নিরাপদদা, বৃন্দাবন করের বৌ, মায়া সবাই মা’র এই দজ্জাল স্বভাবে কেমন সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ছে।

    —আর তুমি বাড়ি বসে ধর্ম দেখছ। বলছ, পাপ খণ্ডন হোক, পাপ খণ্ডন হোক। সহ্য হয় বল! একবার একটা চিঠি পর্যন্ত দিলে না। গেলে না। বললে না গিয়ে, চল, যা হবার হয়ে গেছে। বাড়ি চল। বসে থাকলে। উৎসব, ইটের ভাটা, মন্দির শিবলিঙ্গ কত আয়োজন, আর আমার ছেলেটা একটা আঁস্তাকুড়ে পড়ে আছে! বলে আবার হু হু করে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ল।

    পরীদিও মা’র সামনে বসে পড়েছে। মা’র মাথায় পিঠে হাত বুলিয়ে বলছে, মেসোমশাইকে নিয়ে আমি যাব। ঠিক খুঁজে বের করব। আপনি এ-ভাবে কাঁদবেন না। কী খারাপ লাগছে বলুন তো? ঐ দেখুন পিলু মায়া সবাই কাঁদছে। আমি কাকে সামলাই। তারপরই ধমক, এই পিলু, হচ্ছেটা কী। মায়া, যা এখান থেকে—যা!

    পরীর মুখে এসে গেছিল, আপনার পুত্রটি মানুষ না অপদেবতা। কিন্তু মাসিমা কষ্ট পাবেন!

    কার জন্য কাঁদছিস! সে কারও দুঃখ বোঝে পিলুকে বলার ইচ্ছে।

    পরী শেষে বললে, মাসিমা, অবুঝ হলে চলবে কেন। চিঠি কাকে দেবে! মেসোমশাই যাবে কোথায়! মেসোমশাইয়ের দোষ কী। দাদামশাইয়েরও দোষ নেই। তারা যে যার মতো বুঝেছে। কাউকে দোষ দিয়ে লাভ নেই। ঐ দেখতো পিলু, কারা আসছে। এগিয়ে যা।

    কারা আসছে বলায় মা’র সম্বিত ফিরে এল। রান্নাঘরের কোণায় ঢুকে ঘটিতে জল নিয়ে বাইরে গিয়ে মুখ ধুয়ে এল। এখন পিলু কিংবা মায়া, পরী সবাই জানে, মা’র মুখে যতক্ষণ হাসি না ফুটে উঠবে ততক্ষণ, এই বাড়ির গাছপালায়ও অদৃশ্য কুয়াশা লেগে থাকবে। ভেজা আবহাওয়া – ভারি স্বভাবের হয়ে যাবে ঘর বাড়ি— অন্ধকার হয়ে থাকবে সবার ভেতরটা। একমাত্র মাসিমার মুখে হাসি ফোটাতে পারলেই আজকের অন্নভোগ সার্থক।

    বাবা হঠাৎ উঠোনে দাঁড়িয়ে বললেন, মন খারাপ করবে না। অন্নভোগ সবারই কমবেশি থাকে। তার হাত থেকে কে কবে রেহাই পেয়েছে।

    রাতের দিকে বাড়িটা কেমন নিঝুম মনে হল পরীর। সে পিলু মাসিমা বারান্দায় বসে গল্প করছিল। মাসিমা রাতে কিছু খাবেন না। পরীরও খাবার ইচ্ছে নেই। শীতের বেলা শেষ হতে সময় লাগে না। তাদের খেতে খেতে বেলা পড়ে গেছিল। অবেলায় খেয়ে রাতে আর খাবার ইচ্ছে নেই।

    মেসোমশাই বলেছিলেন, তোমার মাসিমার বুদ্ধিতেই জমিটা কেনা হয়েছিল। ভাগ্যিস কিনেছিলাম। চার পাঁচ বছরে কী দাম হয়ে গেল।

    বাবার কাছে এটা খুবই কৃতিত্বের খবর। পিলু এটা বোঝে। বাবা যে এখানে এই গভীর বনজঙ্গলের মধ্যে প্রথম ঘর বাড়ি বানান, পরীদিকে কতবার যে সে খবর দিয়েছে। পরীদিও যতবার শুনেছে, যেন এর আগে শোনেনি। তাই নাকি! এত দাম হয়ে গেল জমি!

    পরীদি যে খুবই বুদ্ধিমতী সে বোঝে। এক দাদা ছাড়া বাড়িতে পরীদির আর কোনো শত্রু নেই। রাত হয়ে যাওয়ায় আজ থেকে গেল। পিলুর এটা যে কী আনন্দের। বিকাল থেকেই পেছনে লেগেছে, পরীদি আজ যাবে না। আমি বলে আসব। তুমি থাক পরীদি। একটা তো রাত। থেকে যাও।

    আসলে এটা কেন হয় সে বোঝে না। তাদের বাড়িতে অতিথি অভ্যাগত কেউ আসে না। মানুকাকা শহর থেকে এলে, গাছের পেঁপে, আমের সময় আম, বেলের সময় বেল—যেদিনকার যা ফল ব্যাগে করে নিয়ে যায়। বাবার তখন কী আনন্দ! এটা নে, ওটা নে। আর মা’র তখন নানা অভিযোগ। গজ গজ করবে, দিয়ে দাও, সব দিয়ে দাও। এসে তো উঠেছিলে, তাড়াবার কত ফন্দি করছিল। এখন তো বলছে, ধনদা, আমার জন্য জমি দেখুন। রিটায়ার করে ভাবছি এখানেই বাড়িঘর বানাব।

    আসলে পিলুর কাছে বাবার এই জায়গা নির্বাচন নিয়ে, এক ধরনের অহঙ্কার আছে। বাবাই পারেন, বোঝেন, কেন না, এখানে না এলে সে এই গভীর বনজঙ্গলের স্বাদই পেত না। নবমীকেও আবিষ্কার করা হত না। এক সময় তো তাদের কী ভয় লাগত! বাবা বাড়ি নেই, জঙ্গলের মধ্যে বাড়িটা- চারপাশ নিঝুম, আকাশে কিছু নক্ষত্র বাদে তাদের দেখবার কেউ নেই—তখন কুকুরের বাচ্চা তুলে এনেছিল একটা—কী না দিন গেছে!

    মা কথা বলছে না। সকালে দাদার জন্য কান্নাকাটি করার পর আর কোনো অশান্তি করেনি ঠিক, তবু নিখোঁজ পুত্রটির জন্য সারা দিন এক চাপা দুঃখ বয়ে বেড়িয়েছে।

    পরীদি চলে যেত, কেবল তার মনে হয়েছে, এই পরিবারে সে যতক্ষণ থাকবে, ততক্ষণ কিছুটা যেন অবলম্বন থাকবে। নবমী পাশে বসে ঝিমোচ্ছিল। নবমীর খুব ইচ্ছে ছিল, আজ সে তার মরদের গল্প করে। কিন্তু কেন যে বার বার মরদের কথা তুলতে গেলেই পিলু ধমকে উঠেছে।—থাম তো ডাকাতের গল্প কে শুনবে!

    পরী বলল, আজ ডাকাতের গল্পই হোক। তুই ওকে ধমকাচ্ছিস কেন।

    —ও পরীদি, শোন না! ডাকাতের গল্প কী শুনবে—বাবা, তুমি একবার একটা ল্যাংড়া গরু নিয়ে এসেছিলে না!

    ল্যাংড়া গরুটার কথা উঠতেই মাসিমা কেন হেসে ফেলল সে বুঝল না।

    মাসিমা বললেন, আর বল না, সে যা গেছে। চণ্ডীপাঠের নামে বের হতেন, ফেরার নাম থাকত না।

    পরীর মনে হল, তা হলে মাসিমাও ডাকাতের গল্পই শুরু করেছেন।

    পরী বলল, কোথায় যেতেন?

    মা হেসে বলল, জিজ্ঞেস কর না, কোথায় যেত।

    বাবা বললেন, আমার তখন সসেমিরা অবস্থা বুঝলে। যে যেখানে পূজা-আর্চার খবর দিত, চলে যেতাম—সেখান থেকে আবার এক জায়গায়—বাড়িতে থেকে তো লাভ নেই। উপাৰ্জন চাই। ছ’ছটা মুখ। বোঝো। তা একবার ছেলেদের দুধ খাওয়াবার সখ হয়েছিল বলে বাবার সেই গরু আনা এবং পিলুর সড়কে দাঁড়িয়ে থেকে বাবার আবিষ্কারের কাহিনী বললে, পরী কেমন হতবাক হয়ে গেল।

    —বুঝলে পরী। কী না বলেছে তোমার মাসিমা! আমি অবলা মানুষ, বলেই পিজরাপোলে না দিয়ে গরুটা বামুনকে দান করে দিয়েছে। দুধ দিল না ঠিক, তবে কী জান, বামুনের বাড়িতে গোবরটাও তো কম নয়। ওটা ওরা বোঝে না! তখন ওটুকুই বা আমাকে কে দেয়। কত জায়গা থেকে আম জামের কলম, কাঁঠালের কলম এনে লাগিয়েছি। সারা বাড়িটায় এত যে গাছপালা তারও প্রাণ আছে জান! তোমার মাসিমা কত আমাকে বকাবকি করেছে জান! নির্বুদ্ধিতার শেষ নেই।

    নবমী বলল, আমার মরদ না, একবার জেল খেটে এল। দু সাল। আসার সময় আমার জন্য একটা টিয়া পাখি নিয়ে এসেছিল। পিলু বলল, আবার মরদের গল্প! থাম বলছি।

    একটা হ্যারিকেন জ্বলছে। বারান্দার এক কোণায় জলচৌকিতে বাবা বসে আছেন। মা পরীদি মায়া মাদুরে বসে আছে চাদর গায়ে। চারপাশে বাড়িটার গাছপালার ছায়া, এই হ্যারিকেনের আলো এবং পরিবারের সবাই আজ অনুষ্ঠানের পর কেন যে এত অতীতের গল্প নিয়ে পড়েছে পিলু তা বোঝে কোথা থেকে কোথায় তারা উঠে এসেছে। নবমীকে দেখলে মনেই হবে না, তারই গুপ্তধন আজ এই গরীব বামুনের পরিবারটিকে স্বচ্ছলতার মুখ দেখিয়েছে। আসলে পিলুর ভেতর মায়া দয়া বেশি। পিলু এ জন্য কম ধমক খায়নি। এই মায়া দয়াই নবমীর কাছে নিয়ে গেছে তাকে। এই মায়া দয়াই শেষে গুপ্তধন এনে দিয়েছে সংসারে।

    নবমী বলে একটা বুড়ি আছে জঙ্গলে সবাই জানত। কী খায়, কোথায় থাকে, কী পরে, কেউ খোঁজ নিত না। ওর কঙ্কালসার শরীর শনের মতো চুল আর প্রায় উলঙ্গ অবস্থায় ঘেরাফেরা—কাউকেই কাছে টানেনি। বরং দেখলে পালিয়েছে। নবমী ঠিক বুঝতে পেরেছিল পিলুকে। ঠিক মানুষকেই সে চিনেছে। পিলু না নিয়ে এলে জঙ্গলেই মরে থাকত। ওর ইট ক’খানা ইটের পাঁজার মধ্যে পড়ে থাকত। মানুষের কাজে লাগত না। পরীদি জানে না। একবার ইচ্ছে হল বলে। তারপরই বাবার দিকে তাকিয়ে বলল, বলি বাবা?

    বাবা বললেন, তোমার আবার কী বলার আছে! তুমি তো কোথাও পালাওনি। কাল ফিরবে বলে পক্ষকাল পরে ফেরনি। কোথাও ডাকাতি করেছ বলেও জানি না।

    বাবার এই কথায় সবাই হেসে উঠল।

    পরী ভাবল, যাক, যে চাপা কুয়াশায় ঢেকেছিল বাড়িটা তা যেন কেটে গেল।

    —বলি বাবা!

    —বল না। আমি বারণ করব কেন!

    —না ঐ যে ইট, নবমীর ঘরে ইট।

    —অ সেই কথা। পরীকে বলনি! পরী জানে না!

    পরী বুঝল না, পরী কী জানে না।

    পিলু গল্প বলার মতো যেন সব বলে গেল। পরী শুনে হাঁ। নবমী তবে তার ডাকাতের ধন ইটের মধ্যে রেখে দিয়েছিল। নবমীকে এমন প্রশ্ন করতে বলল, না না, ডাকাতের ধন হবে কেন? ও আমার গয়নাগাটি। কত যে ছেল। সব গলিয়ে রেখে দিয়েছিল। বনজঙ্গলে থাকি, কার কখন নজর যাবে—

    পরী অনেক দিন থেকে এই বাড়ির মানুষগুলির সঙ্গে মিশে আছে। নবমীকে তুলে আনার মধ্যেও মহত্ত্ব আছে—কিন্তু গুপ্তধন মেসোমশাই কিছুই নিজে ভোগ করছেন না—ঈশ্বরের প্রতি তাঁর এত নির্ভর কেমন যেন বিচলিত করে তুলল। সে এত দিন যা জেনেছে, যা পড়েছে, তার সঙ্গে মানুষের আত্মবিশ্বাস এবং ধর্মবিশ্বাসে কোনো ফারাক আছে বলে ভাবতে পারল না। সত্যি তো এ-দেশে গরীব মানুষের তো কিছুই নেই। কবে হবে তাও জানে না। কিন্তু একটা পরিবারকে এই বিশ্বাসই কী প্রবলভাবে বাঁচিয়ে রেখেছে— মেসোমশাইকে না দেখলে সে টের পেত না।

    সে বলল, মেসোমশাই, আমরা একটু ঘুরে আসি।

    —কোথায়?

    —আপনার বাড়ির সবটা আমি দেখিনি। আপনার গাছপালাও না।

    বাবা তাতে খুবই খুশি। পরী বাড়ি ঢুকেছে, নবমীকে নিয়ে বনের মধ্যে গেছে। কিন্তু এই বাড়ির সব গাছপালা সে দেখেনি। কিংবা বাবা কোনো দিন বলতে পারেননি, কোথা থেকে কোন গাছের কলম এনে লাগিয়েছেন। শুধু লাগিয়েই ক্ষান্ত হননি, তার ফল খাইয়েছেন, সেখানেও শেষ ছিল না, খেয়ে যদি কেউ বলেছে, ভারি সুমিষ্টি আম, একটা কলম করে দেবেন। বাবা খুশি হয়ে কলম করে দিয়েছেন। কখনও বাড়ি বয়ে গিয়ে দেখে এসেছেন, তাঁর দেওয়া কলমের আদর যত্ন ঠিক হচ্ছে কি না!

    জ্যোৎস্না রাতে পরী গাছগুলির পাশ দিয়ে হাঁটছে, পিলু কেবল বাবার গল্প করছে। গাছপালার ছায়ায় হাঁটতে হাঁটতে মনে হল পরীর—মানুষ তার উত্তরপুরুষের জন্য এ-ভাবেই কিছু রেখে যায়। পরী কাঁঠাল গাছগুলির নিচে এসে দাঁড়িয়ে গেল। চারপাশে জ্যোৎস্না নেমে এসেছে। গাছপালাগুলি দাঁড়িয়ে আছে প্রহরীর মতো। একজন মানুষের এর চেয়ে বড় কী আর অবলম্বন থাকতে পারে সে ভেবে পেল না। যেন বিলু কিংবা পিলু তাদের বাবার কথা এক দিন ভুলে যেতে পারে—কিন্তু গাছগুলি কোনো দিন ভুলবে না—কত যত্নে তিনি তাদের বড় করে তুলেছেন। মানুষের সৃষ্টির তো শেষ নেই। যে যার মতো কবিতা সৃষ্টি করে।

    বিলুর কবিতা মেসোমশাইয়ের ভাল লাগবে কেন?

    মেসোমশাই বলতেই পারেন, কবিতা লিখে কী হয়।

    পিলু বলল, পরীদি, ওদিকটায় চল!

    —কেন রে!

    —বাবার বাতাবি লেবু গাছটা দেখবে না।

    জ্যোৎস্নায় এই ভ্রমণ খুবই মধুর। আসলে তাকে নেশায় পেয়ে গেছে। যেন ইচ্ছে করলে সারা রাতই গাছপালার ভেতর এখন ঘুরে বেড়াতে পারে। বিলু পাশে থাকলে কী যে ভাল লাগত। আর সহসা কেন যে মনে হল, গাছপালার মতো চাই তার একজন সরল অকপট মানুষ। -যে বৃক্ষের মতো ছায়া দেবে।

    সে এবার বলল, চল পিলু। রাত হয়েছে। এই মায়া আয়।

    .

    ঘরে মায়া আর মিমি। আলো জ্বলছে। হ্যারিকেনের অল্প আলো জ্বালা। মশারির নিচে লেপ গায়ে দিয়ে মিমি পাশ ফিরে শোয়। মায়া শুয়ে পড়েছে। মিমি মশারি গুঁজে দিল এক দিককার। তক্তপোষটা খুব বড় না। তার অসুবিধা হবার কথা। তবু মানুষের কী যে থাকে! সে পা ছড়িয়ে দিলে একটা দিকের মশারি আলগা হয়ে যাচ্ছে। বিলু আর পিলুর জন্য এই ছোট্ট তক্তপোষ। এতেই সে বছরের পর বছর শুয়ে রাত কাটিয়ে দিয়েছে। কোনো অভিযোগ ছিল না।

    কখন মনে হল, মায়া ঘুমিয়ে পড়েছে।

    তার ঘুম আসছে না।

    ঘুম আসার কথাও না।

    গাছাপালা লাগাবার মধ্যেও কবিতা আছে—ঘর বাড়ি বানাবার মধ্যেও কবিতা আছে। পূজা-আর্চার মধ্যেও আছে—নবমীর জীবনের মধ্যেও। কোথায় নেই! স্বার্থপরতার চেয়ে এই কবিতা কম কৃতিত্বের নয় এমনই মনে হল তার। বিলুকে আজ কেন জানি সত্যি স্বার্থপর মনে হল তার। তবু তার নিজের জীবনের মধ্যেও কেন এই কষ্ট, দুঃখ বিলুর জন্য সে জানে না। কিছু শেয়াল ডাকল অদুরে। কীটপতঙ্গের আওয়াজ এত গভীর হয় আগে সে জানত না। যেন এক আশ্চর্য মিউজিক সৃষ্টি হচ্ছে। এই মিউজিক মানুষের বেঁচে থাকার জন্য কত দরকার, বাড়ির গাছপালার ছায়ায় হেঁটে না বেড়ালে টের পেত না। বাড়ির অন্নভোগ কত সুস্বাদু আজ মাসিমার চোখে জল না দেখলে টের পেত না। তার চোখে জল এসে গেল।

    কখন ঘুমিয়ে পড়েছে মিমি জানে না। সহসা ঘুম ভেঙ্গে গেল। কেউ যেন দরজায় দাঁড়িয়ে ডাকছে, পিলু। দরজা খোল। পিলু।

    কে ডাকছে। কে! মিমি কেমন ধড়ফড় করে উঠে বসল। তার বুক কাঁপছে। গলা শুকিয়ে উঠছে। কে ডাকছে, কে!

    অবিকল বিলুর গলা। বিশ্ব কী তবে ফিরে এসেছেন!

    সে ডাকল, এই মায়া ওঠ, শিগগির ওঠ।

    মায়া উঠে বসলে বলল, কেউ দরজায় দাঁড়িয়ে আছে।

    মায়া ঠিক বুঝতে না পেরে বলল, কে?

    —মনে হয় তোর দাদা।

    —দাদা।

    মিমি বলল, আস্তে। সে সন্তর্পণে নামল। হ্যারিকেনের আলোটা উসকে দিয়ে এগিয়ে যাবার সময় মনে হল, হাত পা কাঁপছে। সে পড়ে যাবে। কোনো রকমে দরজা খুলতেই দেখল, কেউ দাঁড়িয়ে নেই। কেউ না। সে বাইরে বের হয়ে এল। না কেউ না। হতাশায় তার বুক ভেঙ্গে গেল।

    চিৎকার করে বলতে পারলে, সে সান্ত্বনা পেত—বিশ্ব, আমি কী করব!

    উঠোনে হ্যারিকেনের সামনে অনাথ রমণীর মতো কে বসে! বিশ্ব কাছে এসে বলল, তুমি!

    মিমি কিছুই বুঝতে পারছে না। ভৌতিক মনে হচ্ছে সব কিছু।

    তুমি এখানে! রিকশাটা ছেড়ে দিতে গেছিলাম।

    মায়া বুঝতে পারছিল না, পরীদি একা লণ্ঠন হাতে নিয়ে কোথায় গেল। বাইরে বের হয়ে অবাক। দাদা। হাতে সুটকেস। সে চিৎকার করে উঠল, বাবা, দাদা ফিরে এসেছে।

    সহসা এই ঘরবাড়িতে সব আলো জ্বলে উঠল ঘরে ঘরে। পিলু চিৎকার করে বের হয়ে এসেছে— দাদারে। মা কেবল পাগলের মতো উঠোনে এসে লণ্ঠন তুলে পুত্রের মুখ দেখতে দেখাতে বলল, এলি তবে। রাগ পড়েছে।

    বাবা বললেন, তোমাকে অসুস্থ মনে হচ্ছে। মুখে গোটা। দেখি দেখি। বলে বাবা লণ্ঠন তুলে কী দেখে বললেন, মায়ের দয়া হয়েছে! ও ধনবৌ, শিগগির বিছানার চাদর ওয়াড় পাল্টে দাও। গায়ে হাত দিয়ে বললেন, ইস জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে!

    মিমির মুখে কথা সরছিল না। অন্ধকারে কোথায় দূরে নিজেকে আড়াল করে রেখেছে।

    বাবা, দাদাকে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে, ঠাকুরের চরণামৃত দিলেন খেতে। বললেন, ভালই হয়েছে। মহাপাপ খণ্ডন। কপালে দুর্ভোগ থাকলে কে খণ্ডাবে বল! যাক পাপ খণ্ডন হয়ে গেল। বোঝা নামল আমার।

    মিমি বলল, পিলু, রিকশাটাকে বল থাকতে। আমি যাব।

    বিশ্ব ঘরে শুয়ে টের পাচ্ছিল। মিমি আর তার ঘরে আসেনি। রাতের ট্রেনে সে প্রায় তস্করের মতো পালিয়ে এসেছে। সন্ধ্যা জোর করে ট্রেনে তাকে তুলে দিয়ে গেছে। কেউ জানে না, সে সারা রাস্তায় প্রায় একজন তস্করের মতোই বসেছিল। ধরা পড়ে গেলে অনাসৃষ্টি হবে না কে বলতে পারে। তার সারা শরীরে কী ব্যথা। গলা বুজে আসছে। কথা বলতে কষ্ট। পিলু মায়া মা বাবা সবাই দাঁড়িয়ে আছে পাশে। এখন এই রোগের প্রতিবিধান নিয়েই বাবা ফাঁপরে পড়ে গেছেন। মিমি যে এ বাড়িতেই আছে কারো যেন খেয়াল নেই।

    বিশ্ব কোন রকমে পাশ ফেরার চেষ্টা করল। কোনো রকমে বলল, পরীকে ডাক। পরী এলে বাবা বললেন, যাও তোমরা। সবাইকে নিয়ে বাবা বের হয়ে গেলেন। বিশ্ব বললে, এত রাতে যাবে!

    —অসুবিধা হবে না। পিলুকে সঙ্গে নিয়ে যাব।

    —জানি। পিলু না গেলেও তুমি একা চলে যেতে পার। তোমার অসুবিধা হবে না জানি। একটাতো রাত। নাই গেলে। বলে পাশ ফিরে বিশ্ব চোখ বুজল। এ-মুহূর্তে বিশ্বর যেন এর চেয়ে বেশি কিছু বলার অধিকার নেই। এত কষ্ট শরীরে তবু সে বাড়িতে ফিরে পরীকে দেখতে পাবে আশাই করেনি। সব চেয়ে দুশ্চিন্তা ছিল পরীকে মুখ দেখাবে কী করে। সেই পরী বাড়িতে নিজেই হাজির।

    বাবা তখন উঠোনে দাঁড়িয়ে আবার তার ইদানীংকার আপ্তবাক্যটি উচ্চারণ করলেন, বুঝলে কেহ আত্মাকে আশ্চর্যবৎ মনে করে—কেহ বা আশ্চর্যবৎ বলিয়া আত্মাকে বর্ণনা করে—আবার কেহ আশ্চর্য বলিয়া শোনে। কিন্তু ইহার বিষয় শুনেও কেহ ইহাকে বোঝে না।

    ***

    দ্বিতীয় পর্ব সমাপ্ত

    ‘দেশভাগ বা নীলকণ্ঠ পাখীর খোঁজে’ সিরিজের পর্বসমূহ —

  • অলৌকিক জলযান

    অলৌকিক জলযান

    ‘অলৌকিক জলযান’ দেশভাগ (নীলকন্ঠ পাখির খোঁজে) সিরিজের তৃতীয় পর্ব। তবে সময়ের হিসেবে এটি ‘মানুষের ঘরবাড়ি’র আগেই প্রকাশ পেয়েছিল। সেকারণেই হয়তো নীলকন্ঠ পাখির খোঁজের সোনাকে এই বইয়ে কিছুটা হলেও খুঁজে পাওয়া গিয়েছে।

    বইতে আগের পর্বের প্রভাব খুব সামান্যই, মাঝে মাঝে শুধু প্রচ্ছন্ন আভাস রয়েছে এছাড়া এটি স্বতন্ত্র একটি উপাখ্যান। কয়লা চালিত মালবাহী জাহাজ, এস এস সিউল ব্যাংক ও এর জাহাজীদের জীবন নিয়েই গল্প এগিয়েছে। বাংলা ভাষায় জাহাজ ও সমুদ্রে নাবিকদের জীবন নিয়ে এত বিশাল কলেবরের আর কোন উপন্যাস নেই সম্ভবত। দিনের পর দিন যে মানুষেরা মাটির সংস্পর্শ পায় না, অসীম দিগন্তবিস্তৃত সাগরের নীলই যাদের বাড়িঘর, স্বভাবতই তাদের জীবন-যাপনের ধরণ আপামরজনগণের থেকে অনেক আলাদা। লেখক নিজে একসময় নাবিক ছিলেন, জাহাজের জীবন তাই তার রন্ধ্রে রন্ধ্রে চেনা।

    বার বার স্ক্র্যাপ হয়ে যাওয়ার হাত থেকে বেঁচে যাওয়া প্রায় ধ্বংসপ্রাপ্ত জাহাজ সিউল ব্যাংক নিজেই এই বইয়ের অন্যতম প্রধান চরিত্র, সেই জাহাজের নামেই বইয়ের নামকরণ ‘অলৌকিক জলযান’। অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখায় কখনো কখনো মনে হয়েছে সিউল ব্যাংক জীবন্ত এক সত্ত্বা, সে এবং তার কাপ্তান হিগিনস যেন অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই বইয়ের ক্যাপ্টেন স্যালি হিগিনসের সাথে হারমান মেলভিলের, মবি ডিক উপন্যাসের ক্যাপ্টেনের অনেক মিল লক্ষ্য করেছি। সম্ভবত, দীর্ঘদিন ধরে সমুদ্রে জাহাজ ও তার কাপ্তান একে অপরকে অবলম্বন করে বেঁচে থাকে বলেই এক জাদুবাস্তব সম্পর্ক গড়ে ওঠে তাদের মধ্যে।

    মানুষের ঘরবাড়ি এবং পরবর্তীতে অলৌকিক জলযানেও লক্ষ্য করেছি অতীনবাবুর নারী চরিত্রগুলো অত্যন্ত দূর্বল। না এমন না যে গল্পে তাদের বিশেষ অবদান নেই, সেটা ভালভাবেই আছে। কিন্তু কখনই তারা শক্তিশালী চরিত্র হয়ে উঠতে পারে না। মানুষের ঘরবাড়ির লক্ষ্মী বা মৃন্ময়ী; অলৌকিক জলযানের বনি এদের ইম্প্যাক্ট মূল গল্পে বেশ ভালভাবেই আছে। কিন্তু চরিত্র হিসেবে এদের গঠন সুবিধার না। খুবই দূর্বল, মেলোড্রামাটিক এবং ‘ক্লিঙ্গি’।

    সমুদ্র ও জীবনের ছেদবিন্দুতে লেখা এক মহাকাব্য

    ‘নীলকন্ঠ পাখির খোঁজে’ উপন্যাসের সোনা দেশভাগের পর চলে আসে ভারতে। কৈশোর থেকে যুবা বয়সের মাঝামাঝি সময়। নিজের যোগ্যতা দিয়ে ছিন্নমূল পরিবারের হাল ধরার ভীষণ তাগিদ। দু’বেলা পেট ভরে ভাত আর সেইলরের সাদা পোশাকে বাবা-মাকে গর্বিত করার আশা নিয়ে জাহাজে উঠে আসে সোনা। আমাদের সোনাবাবু— সোনালী বালির নদীর চর, যেখানে সে বালির মধ্যে গর্ত করে একটা মালিনী মাছ বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করেছিল, সেই নদী, সেই তরমুজ ক্ষেত পেরিয়ে সে এখন অন্তহীন সমুদ্রে এস. এস. সিউল-ব্যাংক জাহাজের নাবিক। জাহাজে সবাই তাকে ডাকে ছোটবাবু বলে। সমুদ্রের বিশালত্বে কিংবা নতুন জীবনের অভ্যস্ততায় এক সময় তার মনেই থাকে না, তার একটা দেশ আছে পৃথিবীর অপর প্রান্তে, সেখানে তার বাবা-মা, ভাইবোন কতো আলাদাভাবে জীবন কাটাচ্ছে।

    সাদা জাহাজটাকে সে কিছুতেই ভাবতে পারে না জাহাজ, আসলে সেই সৌরলোকের অন্তহীন যাত্রার মত মনে হয়, যেন চারপাশে সব গ্রহ নক্ষত্র, উপগ্রহ আর এক সৌরলোক থেকে অন্য সৌরলোকে একটা যান অনবরত ছুটছে।

    দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রায় বন্দরে বন্দরে বিরতি। জাহাজীরা চিঠি পায় বন্দরে পৌঁছুলে। বাদশা মিয়ার চার নম্বর বউ চিঠি লিখে পাঠায়। মৈত্রদা বাংকে শুয়ে লুকিয়ে লুকিয়ে বউয়ের চিঠি পড়ে। সবার চিঠি আসে। শুধু চিঠি আসে না ছোটবাবুর। রিফিউজি পরিবারটির ঠিকানা আজ এখানে, কাল সেখানে। ছোটবাবু দেখছে সমুদ্রের বিচিত্র জীবন, সমুদ্রের গর্ভে তিমি মাছের ছোটাছুটি, দেখছে জাহাজ মিসিসিপি নদীতে পড়ছে, কিন্তু জানাতে পারছে না কাউকে। বলতে পারছে না, মা, আমরা এখন মিসিসিপি নদীতে।

    এত সুন্দর কাব্যের আঙ্গিকে বাংলা সাহিত্যে কোনো পুরুষ চরিত্রের উপস্থাপন দেখিনি আগে। সোনাবাবু কিংবা জাহাজের ছোটবাবু, তাকে নিম্নস্তরের জাহাজীদের কাতারে ফেলে দেওয়া যায় না। মনে হয়, একটা সময় খুব বনেদি পরিবারের ছেলে ছিল। সেই চন্দন কাঠের সুবাস গায়ে। ছোটবাবুর শরীরের সুষমা অধীর করে দেয় বনিকে—

    যেন জীবনের এক আশ্চর্য মোহ অথবা ঘ্রাণ বলা যেতে পারে, অথবা রাজার রাজা ছোটবাবু, এবং শরীরের সর্বত্র মহিমময় ঈশ্বর কোন কৃপণতা রাখেন নি। এক আশ্চর্য মোমের শরীর, অথবা পাথরের মূর্তি। … ছোটবাবুর মুখে নীল দাড়ি। শরীরের লাবণ্য কোনো দূরবর্তী এক বনভূমির কথা অথবা কোন মরুভূমিতে একজন মুসাফিরের নিত্য হেঁটে যাওয়ার কথা মনে করিয়ে দেয়।

    কত রকম ব্যক্তিত্বের মানুষ এই জাহাজে। জাহাজের কাপ্তান স্যালি হিগিনস। তার একটাই দায়িত্ব—ঝড়ঝঞ্ঝা সবকিছু থেকে জাহাজকে বন্দরে পৌঁছে দেওয়া। সাদা চুল, নকল দাঁত, কাপ্তান এর সাদা ইউনিফর্ম, কাঁধে চারটে সোনালী স্ট্র্যাপ। পোশাক-পরিচ্ছদ থেকে ব্যবহারের মাঝে বিরাজ করে প্রাজ্ঞতা। কাপ্তান স্যালি হিগিনস, এস.এস.সিউল-ব্যাংক‌ আন্ডার হিজ কম্যান্ড।

    দেখি ইঞ্জিন সারঙের মত বিশ্বস্ত মানুষ। কাজকর্ম শেষে সে তার কোরান খুলে বসে। আবিষ্ট মনে সূরার আয়াত পড়ে যাচ্ছে। তার পৃথিবীতে এর বেশি কিছু লাগে না।

    জাহাজে চড়ে বসে একজোড়া চড়ুই পাখি। তারাও যোগ হয় জাহাজের যাত্রী কিংবা এই উপন্যাসের চরিত্র হিসেবে। যোগ হয় এক অ্যালবাট্রস যুগল। আর পুরোটা উপন্যাস জুড়ে প্রতাপশালী হয়ে রয়েছে সমুদ্র। কি মনোরম বর্ণনা—

    কেননা, সমুদ্র সেই কবে থেকে, কেউ বলতে পারে না, পৃথিবীতে অথবা সৌরজগতে বড় সে একা! একাকী সে, আছে তার মত, সে কখনও উত্তাল তরঙ্গমেলার ভেতর আকাশের নক্ষত্রদের ছুঁয়ে দিতে চায়, তার কি যে প্রলোভন তখন।

    নোনা জলে ভাসতে ভাসতে ডাঙা তখন দুর্লভ বস্তু জাহাজীদের কাছে। কোথাও একটা দ্বীপ চোখে পড়লে বা বন্দরের আবছা অবয়ব দৃষ্টিসীমার মধ্যে আসলে, জাহাজীরা সব কাজ ফেলে, ডেকে এসে দাঁড়ায়। কাজ ফেলে দূরবীন লাগিয়ে বসে থাকে ডেবিড।‌ অথবা কখনো কাজের তাড়া থাকলে ছোটবাবুকে বসিয়ে রাখে দূরবীন নিয়ে। এনি ওম্যান ছোট? সমুদ্রে নাকি জীবনধারণের জন্য ঈশ্বর সবই দিয়ে রেখেছেন। তবে আসল জিনিসটাই কিনা নেই। ওম্যান।

    একনাগাড়ে মাসাধিক শুধু জলে ভেসে থাকতে থাকতে বন্দর এলে জাহাজীরা ‘প্রকৃত জাহাজী’ হয়ে যায়। দাদার মতো শাসন করে, ছায়া দিয়ে রাখে মৈত্রদা। ‌বন্দর এলে মৈত্রদা ‘জাহাজী মৈত্র’ হয়ে যায়। এই জায়গাটায় চৌরঙ্গী বইয়ের সাথে মিল পেয়েছি। হোটেল শাজাহানে বিত্তশালীরা যেমন আদিম রিপুর তাড়নায় বেসামাল হয়ে যেতো, বন্দরে তেমনি জাহাজীরা আদিম রিপুকে ব্রেক কষাতে পারে না কোনো কিছু দিয়েই।‌

    চারিদিকে শুধু সমুদ্রের ঢেউ আর আকাশ। তার মধ্যে দিয়ে ছুটে চলেছে সাদা জাহাজ। জাহাজের কলকব্জা, কতো রকমের মাস্তুল, ডেক—সব যার্গন এতো সাবলীলভাবে কথায় কথায় টেনে এনেছেন অতীন বাবু। চোখের সামনে চলে আসে অতিকায় পিস্টন, জাহাজের পিচিং। কিছুতেই মনে হয় না, জাহাজটা শুধু একটা জাহাজ। মনে হয় এরও প্রাণ আছে। মানুষ যেভাবে বাঁচে অক্সিজেন দিয়ে, জাহাজটা তেমনি কয়লা টেনে নিচ্ছে প্রশ্বাসে। কোথাও এর একটা আত্মা না থেকে পারে না। অন্তত এমন একটা বিশ্বাস জন্মে যায় নাবিকের মনে।

    সাড়ে চারশো পৃষ্ঠাব্যাপী এই উপন্যাস। তবুও এর ব্যাপ্তি আরো গভীর। ষাটের দশকের এস. এস. সিউল-ব্যাংক পাঠককে গোটা পৃথিবীটাই ঘুরিয়ে আনবে। ভারত মহাসাগর, আটলান্টিক, মিসিসিপি নদী হয়ে ছবির মত দ্বীপ তাহিতি। সমুদ্রের জলের নিচে ফসফরাস জ্বলে উঠলে মনে হয় নক্ষত্রপুঞ্জ ঝলমল করছে জলের নিচে। সমুদ্র ও আকাশের অসীমতায় ডুবে পরিক্রমণ করে আসা হয় ব্যক্তি-জীবনের গণ্ডিও। প্রকৃতি ও মানুষের কী অক্ষুন্ন আদিমতা। অনন্ত পারাবারকে প্রদক্ষিণ করে বয়ে চলে এই মহাকাব্য।

    অলৌকিক জলযান;  অখণ্ড সংস্করণ। প্রথম প্রকাশ – মাঘ ১৩৬৮; প্রচ্ছদ : পূর্ণেন্দু পত্রী।

    উৎসর্গ

    মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়
    যিনি আমার সুখে
    আছেন, দুঃখেও আছেন।

  • এক

    এক

    ।। এক।।

    ১৭ই মে—১৯৫৩।

    এ-ভাবে সোনা ক্রমে হেঁটে যাচ্ছে। ক্রমে সেই দিনগুলো থেকে, জন্ম থেকে সে এভাবে ক্রমে হেঁটে যাচ্ছে যেন। বড় হতে হতে চার পাশের মুগ্ধতার ভিতর কখন যেন কঠিন কিছু আবিষ্কার করেও সে হেঁটে যাচ্ছে। নস্কর বাড়ির লাল পাঁচিলের পাশ দিয়ে সূর্যের আলো আসছে। সে তার ভিতর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। ক্রমে সূর্য ওপরে উঠছে, সে তখনও হেঁটে যাচ্ছে। ক্যাম্বেল হাসপাতাল পার হয়ে সে হেঁটে যাচ্ছিল সারপেনটাইন লেন ধরে, তারপর সে আরও কিছু দূর গেলে দেখতে পেল ট্রাম যায়। তবু সে হেঁটে যাচ্ছে। তাকে ধর্মতলা, চৌরঙ্গী পার হয়ে যেতে হবে। সবুজ রেমপার্ট সামনে। ফোর্ট উইলিয়ামের দুর্গ বাম দিকে। এবং এভাবে আর কিছুদূর হেঁটে গেলে শিপিঙ অফিস। সে সেখানে হেঁটে হেঁটে আর পারছে না। চোখ মুখ দেখলে বোঝা যায় তার অশেষ যন্ত্রণা। সরল সহজ চোখ দুটো দুঃখে টস টস করছে।

    এভাবে সোনা শিপিঙ অফিসে আসছে-যাচ্ছে। মাসতার দিচ্ছে। জাহাজের খবর হলেই বড় বড় মাসতার পড়ে যায়। সে দাঁড়িয়ে থাকে সবার সঙ্গে। হাতে জাহাজী ছাড়পত্র ‘নলি’। ঠিক যেন অনেকটা ধর্ম-পুস্তকের মতো সে দু হাতের ভিতর নলিটাকে ধরে রাখে। দেখলে মনে হবে সে প্রার্থনা করছে।

    সবাইকে এমনভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। বড় আম গাছের ছায়া ক্রমে ছোট হয়ে যায়। মানুষের ছায়া ক্রমে ছোট হয়ে আসে। জাহাজ থেকে কাপ্তান বড় মিস্ত্রি নেমে আসেন। ওরা যত কাছে এগিয়ে আসে তত বুকটা কাঁপে। সোনা তখন সোজাসুজি তাকাতে পারে না পর্যন্ত। সে প্রথম সফরে যাবে। প্রথম সফর বলে, অভিজ্ঞতা নেই বলে কেউ তাকে নিতে চায় না।

    তার যন্ত্রণা বাড়ে। বোর্ডের লেখাগুলো সব এক এক করে মুছে দেওয়া হয়। আর কোনো জাহাজের খবর নেই। আজ আর কোনো জাহাজ থেকে জাহাজী রিক্রুট করতে কেউ আসছে না। সে তবু বড় আম গাছটার ছায়ায় দাঁড়িয়ে থাকে। যেন মনে হয় সে আজ হোক কাল হোক, কোনও জাহাজ পাবেই। বয়স যতই ওর কম হোক, অভিজ্ঞতা কিছু না থাকুক, একদিন না একদিন সে ঠিক সবার মতো জাহাজ পেয়ে যাবে। তার আকাঙ্ক্ষা তখন বাড়ে।

    মাঝে মাঝে সোনা দেখতে পায় একজন বুড়ো মতো মানুষ তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকেন। সাদা লম্বা দাড়ি। চুল ছোট করে ছাঁটা। সাদা পাজামা। ঢোলা পাঞ্জাবি গায়ে। হাতে একটা লেদার ব্যাগ। মাসতার শেষ হয়ে গেলে তিনি এসে কিছুক্ষণ বড় আম গাছটার নিচে দাঁড়ান। কি যেন দেখেন। বোর্ডে পরদিন কোন কোন জাহাজ নোঙর ফেলছে খুটিয়ে খুটিয়ে দেখার স্বভাব। জাহাজ না থাকলে লোকটাও ঠিক ওর মতো চুপচাপ ফিরে যায়।

    চারপাশে সব মানুষেরা জাহাজ পেয়ে যখন হাসি ঠাট্টায় মসগুল অথবা কেউ না পেয়ে যখন চুপচাপ চলে যাচ্ছে তখনও দুজন মানুষ দাঁড়িয়ে থাকে—একটা খবর না পেলে চলছে না। জাহাজ না পেলে ওরা আর বেশীদিন এই বড় শহরে থাকতে পারছে না।

    সোনা দেখল তখন পাশে নদী। নদীতে কত জাহাজ। জাহাজের মাস্তুলে নানা বর্ণের নিশান। কোথাও জাহাজ রঙ হচ্ছে। কোথাও কোনও জাহাজ থেকে নাবিকরা নেমে ট্যাকসি ধরে শহরের ভিতর ঢুকে যাচ্ছে—। আর তারা দুজন জাহাজের অপেক্ষায় মাসতারের অপেক্ষায় চুপচাপ গাছের ছায়ায় যেন কত যুগ ধরে দাঁড়িয়ে আছে।

    বুড়ো মানুষটা একদিন বললেন, তুমি বাবা জাহাজ পাচ্ছ না?

    সে বলল, না চাচা।

    —এত কম বয়সে তো জাহাজে নেয় না।

    —আমার ‘নলি’ আছে। ভদ্রা জাহাজ থেকে ট্রেনিং নিয়েছি।

    —নলি দিয়ে কিছু হয় না। সফর না দিলে কিছু হয় না।

    —আমার তবে হবে না?

    বুড়ো মানুষটা সামান্য হাসলেন। হবে না কেন, হবে। তবে খুব ঝামেলা। বুড়ো মানুষটার মুখে চোখে আবার সেই কঠিন চেহারা। যেন এই মানুষ নিত্যদিন সফর করে জাহাজের সমস্ত খবর অথবা বলা যায় প্রাচীন নাবিকের মতো চোখ-মুখ এবং তিনি জানেন, সফরে কি যে কঠিন অভিজ্ঞতা। তুমি ছেলে নাবালক বলা চলে, ভাল করে দাড়ি গোঁফ ওঠেনি, তুমি ছেলে জাহাজে যাচ্ছ, তুমি তো জান না, সমুদ্র কি ভয়ঙ্কর, ঝড় কি ভয়ঙ্কর, সি-সিকনেস কি কঠিনভাবে নাড়া দেয়, রক্ত উগলে দিলেও তুমি নিস্তার পাবে না। আর সেই দীর্ঘ সমুদ্র যাত্রায় হোম-সিকনেস এক কঠিন অসুখ। তুমি যাবে জাহাজে এটা চাট্টিখানা কথা!

    আসলে বুড়ো মানুষটা বুঝি আর কথাই বলতেন না ওর সঙ্গে। কারণ চোখ-মুখ দেখলেই টের পাওয়া যায়—বুড়ো মানুষটা তাকে ভীষণভাবে উপেক্ষা করছেন। সব খবর না নিয়ে তোমার আসা ঠিক হয়নি ছেলে। তোমার জাহাজী ট্রেনিং এক, সমুদ্র সফর অন্য রকম। কিন্তু ওর বলার ইচ্ছা ছিল, চাচা, আপনি যা ভেবেছেন আমি তা জানি। আমি জানি সব। আমার বয়সের কথা আমি টের পাই। আমার চেহারার ভিতর একজন মায়াবী মানুষের ছবি আছে টের পাই। জাহাজে এমন মানুষের ছবি থাকা ঠিক না আমি জানি। তবু চাচা আমাকে অনেকটা পথ হেঁটে আসতে হয় এখানে। যতটা আমাকে ওপরে নরম মনে হয়, ভেতরে ভেতরে আমি তত শক্ত। জাহাজ ধরতে না পারলে পৃথিবীতে আমার দাঁড়াবার আর কোনও জায়গা থাকবে না চাচা।

    সোনা বলল, আপনি জাহাজ পেয়েছেন?

    বুড়ো মানুষটা বললেন, না। আমার জাহাজ আসছে। দু-চার দিনের ভিতর এসে যাবে।

    —কোন কোম্পানির?

    —ব্যাঙ্ক লাইন।

    —জাহাজের নাম?

    —এস এস সিউল ব্যাঙ্ক।

    —জাহাজে ওরা আপনাকে নেবেই?

    —নেবে না! কি যে বলছ! বলে একটা হাই তুলল বুড়ো মানুষটা। বাসটাস ধরতে হয় এমন একটা ভাব। কেমন নিশ্চিন্ত ভঙ্গী। আর তার তখন মনে হল যারা আসে সবাই একে একে জাহাজ পেয়ে যায়। সে পায় না। সে বলল, আমি যে কি করে জাহাজ পাব?

    বুড়ো মানুষটা বললেন, আমার সঙ্গে তুমি যেতে পার। বলেই কি ভাবলেন—না না ঠিক হবে না। তেলের জাহাজে তুমি বরং যাও। পার তো মোটর ভেসেলে। কয়লার জাহাজে তুমি পারবে না ছেলে।

    সেই এক কথা। বার বার সে এমন কথা শুনেছে। শুনেছে ভীষণ হাড়ভাঙ্গা খাটুনি—ঠিক খাটুনি বলা যায় না, প্রায় ক্রীতদাসের সামিল কাজ। সে বলল, আমি পারব না কেন চাচা?

    —পারবে না ছেলে। চোখ-মুখ দেখলেই ওরা বুঝতে পারে কে কেমন মানুষ। মাঝ দরিয়ায় একটা কিছু হয়ে যাক ওরা চায় না। তাও যদি দুটো-একটা সফর থাকত তবে নিতে সাহস করত।

    সোনা বুঝেছিল বুড়ো মানুষটা জাহাজে সারেঙ অথবা টিণ্ডালের কাজ করেন। দেখলেই বোঝা যায় অনেক সমুদ্র-সফর ওঁর মুখের রেখাতে। তিনি সহজেই সমুদ্র সম্পর্কে সব বলে যেতে পারেন। বলে যেতে পারেন সমুদ্রের নোনাজলের হাওয়া একবার গায়ে লাগলে কি হয়। তিনি বলে যেতে পারেন—পৃথিবীর কোথায় কি মানুষ আছে, তারা কিভাবে বাঁচে। সব মানুষেরাই এভাবে নানা কারণে সব কাজ পারে না। তখন সোনা আর সাহস পায় না বলতে, আমি ঠিক পারব।

    বুড়ো মানুষটা বললেন, সিউল ব্যাঙ্ক জাহাজটা আসলে জাহাজ না। জাহাজ হলে তোমাকে আমি নিতাম। সে যত কঠিন কাজই হোক না। আসলে ওটা একটা ইবলিশ। ইবলিশ বুঝতে পার?

    —না চাচা।

    —ইবলিশ জান না? ইবলিশ মানে শয়তান।

    তারপর মানুষটা একেবারে চুপ। কিছু বলছেন না। সাদা পাতা মুখে দেবার স্বভাব মাঝে মাঝে। কৌটা খুলে সাদা পাতা জিবে ফেলে দিয়ে বললেন, আর দাঁড়িয়ে কি হবে। জাহাজ তো আর আজকে নেই। কাল তিনটে জাহাজ আসছে। বোর্ডটা একবার ভাল করে দেখে যাও। ক্ল্যান কোম্পানীর জাহাজ পাও কি না দ্যাখো। ভাল জাহাজ। কাজ কম। খাবার-দাবার ভাল। দু-তিন মাসের পচাগোস্ত অন্তত খাওয়ায় না। লম্বা সফরেও বের হতে হয় না।

    সোনা কিছু বলছিল না। সে জানে, কালও এমনি আসবে। কালও সে এমনি ফিরে যাবে। পুরানো জাহাজিরা সফর শেষে ছ-সাত মাস বসে থেকে জাহাজ পাচ্ছে না। সব কপাল। কপাল ভাল থাকলে কেউ কেউ দু-তিন মাসেও জাহাজ পেয়ে যায়। সে তো এই পনের-ষোল দিন হল মাত্ৰ ক্ৰমান্বয় মাসতার দিয়ে যাচ্ছে। সুতরাং মনে হল—এই বুড়ো মানুষটাই তাকে কেবল রক্ষা করতে পারেন। সে, যে করে হোক তাকে সহজে ছাড়ছে না।

    —জাহাজটা শয়তান কেন চাচা?

    —ওটা কোন আমলের জাহাজ কেউ বলতে পারে না। কেউ বলে ডেনিসদের ওটা যুদ্ধ জাহাজ ছিল, কেউ বলে পালের জাহাজ, আবার কেউ বলে, প্রথম মহাযুদ্ধে জাহাজটা খুব ঘায়েল হয়েছিল। মাঝ দরিয়া থেকে মাঝিমাল্লারা টেনে কার্ডিফে নিয়ে যায়। চক্ পাল্টে, বয়লার পাল্টে ওটাকে ওরা কার্গোসিপ বানিয়ে ফেলে। কিন্তু ঘাড়ে শয়তান চেপে আছে। পুরানো জাহাজ কখন দরিয়ায় যে খসে খসে পড়বে কে জানে!

    সোনা বলল, মানুষ এমন জাহাজে যায় সফর করতে!

    বুড়ো মানুষটা পেট দেখাল। এটা ছেলে, এটা।

    —আপনি যাবেন!

    —যাব না! বলেই চোখ বুজে ফেললেন। যেন কতদিন পর তার অতি প্রিয়জন আসছে।

    —বারে বা এ তো বেশ। সোনা খুব চিন্তায় পড়ে গেল। চোখ খুলছেনই না। যেন ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখছেন। জাহাজটা বুঝি সাদা রংয়ের—কি আশ্চর্য নীল জলের ওপর দিয়ে জাহাজটা আসছে। সে এবার জোরে ডাকল, চাচা!

    —হুঁ। বলেই চোখ মেলে হাসলেন। দুনিয়ায় দুজন কাপ্তান আছে জাহাজটাকে চালাতে পারে। একজন উইলিয়াম, বুড়ো মানুষ, হিগিন্স আরও বুড়ো। শেষ বয়সের বিয়ে। বৌ পালিয়ে গেছে। ছোট একটা ছেলে আছে। জাহাজে কাজ করলে অবশ্য এমন হামেশাই হয়। ছেলেটাও একটা ইবলিশ। বাপের সঙ্গে সঙ্গে জাহাজে ঘুরে বেড়ায়, পড়াশোনা করে না, বেহদ্দ পাজি।

    ওর মনে হল বুড়ো মানুষটা কথা বলতে ভীষণ ভালবাসেন। আর কি যে কারণ থাকে কখনও কখনও মানুষ সহসা সবকিছু মন খুলে বলে দেয়।—আমারও কেউ নেই ছেলে। আমি আছি, দরিয়া আছে আর আছে তিনটে জ্যান্ত কসবি। জাহাজের তিনটে বয়লার। এই কসবি তিনটেকে বাগে আনতে পারে মাত্র দুজন সারেঙ। হ্যাঁ দুজন সারেঙ। বুড়ো মানুষটা কানের কাছে ঝুঁকে কেমন ফিস ফিস গলায় বললেন, মোহব্বত না থাকলে ছেলে জাহাজ চলে না। বয়লার স্টিম দেয় না।

    সে বলল, আর কেউ পারে না চাচা?

    —না। দুজনই পারে। একজন ইমানুল্লা, আর একজন এই বুড়ো মানুষ। ইমানুল্লা আসছে। খুব লম্বা, ঢ্যাঙা মানুষ। তুমি দেখলেই বুঝবে—কি শক্ত হাত-পা, মাংস, শরীর শুকিয়ে গেছে। কেবল হাড় কটা। লোহা পুড়িয়ে পুড়িয়ে যা হয়।

    সোনা বুঝেছিল, বুড়ো মানুষটা এনজিন সারেঙ। তাকেও এনজিনে কাজ করতে হবে। কোলবয় হয়ে জাহাজে উঠতে হবে। একজন এনজিন সারেঙের সঙ্গে পরিচয় থাকা ভাল। সে বুড়ো মানুষটাকে ছাড়তে চাইত না। যখন যেখানে দেখা হত দাঁড়িয়ে গল্প করত।

    পরদিনও দেখা। বুড়ো মানুষটা দোতালা থেকে নামছেন। সিঁড়ির মুখে সে দাঁড়িয়ে। কি ছেলে জাহাজ পেলে?

    —না।

    —একবার ওদিকের ব্যারাকে চলে যাও। সিটি-লাইনের জাহাজ আসছে। বোর্ডে কিছু লেখা হচ্ছে না। ওরা শুধু ক্রু নিতে আসছে। মাল খালাস-টালাস হবে না। তেলের জাহাজ। কাজ করে সুখ আছে। জাহাজটা খুব বড়। মাঝখানে ফোকসাল। দেওয়ানী তেমন লাগবে না। সারেঙ মজিদ মিঞা। স্টারবাক সাহেব কাপ্তান। ইয়র্কে বাড়ি……

    ওর মনে হল বুড়ো মানুষটা জাহাজের এন্তার ফিরিস্তি দিয়ে যাবেন। যেন পৃথিবীর কোথায় কোন সমুদ্রে কোন কোম্পানির কটা জাহাজ আছে, জাহাজের কি কি সুখ-সুবিধা, কোন কাপ্তান কেমন, কে নতুন কাপ্তান হয়ে কোথায় আসছে, কাপ্তান কি কি পছন্দ করে, এবং দরিয়ায় মানুষের জন্য আর কি সুখ-সুবিধা রাখা দরকার—অন্যান্য দেশের দরিয়ায় জাহাজিরা কি কি পেয়ে থাকে, ওরা কি কি পায় না, আসলে সব সময় ওর মাথার ভিতর বুঝি জাহাজী খবর ঠাসা থাকে। পৃথিবীতে আর কোন জীবন আছে, সুখ-দুঃখ আছে বুড়ো মানুষটা বুঝি জানেন না। অথচ তার দেরি হয়ে যাচ্ছে, বুড়ো মানুষটা কথা থামাচ্ছে না। মাসতারে সে সবার শেষে পড়ে যাবে। অবশ্য শেষে আগে বলে কিছু নেই। লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা। ছায়া ছবির মতো বড় মালোম, মেজ মালোম অথবা মেজ মিস্ত্রি এসে সার সার দেখে যাবেন। ‘নলির’ ওপর উঁকি দেবেন। ক’ সফর, কনডাকট এসব দেখে ঝুড়িতে মাছ তুলে নেবার মতো তুলে নেবেন। ওর ‘নলি’ দেখে যদিও কেউ নেবে ভাবে—ওর মুখ দেখে কেউ নেয় না। জাহাজে কঠিন কদর্য শক্ত মুখ চোখ না হলে সমুদ্রের সঙ্গে যোঝা কঠিন। বড় মালোম মেজ মিস্ত্রি এটা জানেন।

    সে তাড়াতাড়ি টিনের সেড পার হয়ে ক্যান্টিনের পাশ দিয়ে বের হয়ে গেল। রাস্তা পার হলে অন্য পাশে লম্বা দোচালা টিনের ঘর সব। সামনে মাঠ। কিছু ফল-ফুলের গাছ। এবং তার ছায়ায় মানুষের জটলা। সিটি লাইনের জাহাজের নাম গন্ধ নেই। সে আরও দ্রুত হেঁটে গেল। ভাল জাহাজ, কাজ কম, কম সময়ের সফর, বেশীদিন এক নাগাড়ে সমুদ্রে থাকতে হয় না। সে যত যাচ্ছে তত এসব মনে হচ্ছে। বেশ হয় জাহাজটা পেলে।

    কে যেন তখন খবর নিয়ে এল—আসছে আসছে। লাইনে দাঁড়াও। সবাই যে যেখানে ছিল লাইনে জুটে গেল। খুব লম্বা লাইন। এনজিন রুমের জন্য ওদিকটায় মাসতার পড়েছে। সে ছুটে গেল ওদিকটায় একটু জায়গা নিয়ে দাঁড়িয়ে গেল। চেনা জানা দু-একজনকে সে দেখতে পেল। ওর সঙ্গে ওরা ট্রেণিং নিয়েছে। এখনও জাহাজ না পেয়ে ঘুরছে। সে ওদের দেখে কেমন সাহস পেল সামান্য।

    না, সেই এক রকমের ব্যাপার। নলিটা উঁকি দিয়ে দেখলেন মেজমিস্ত্রি। তারপর কাগজে টোকা মারলেন। এবং একবার চোখ তুলে ওর মুখটা দেখেই কি ভেবে আর আগ্রহ প্রকাশ করলেন না। সে বুঝতে পারছে না কেন এমন হয়। এই যে মেজমিস্ত্রি, ভীষণ সুপুরুষ, লম্বা, মাথায় এংকোরের ছবি আঁটা টুপি। কাঁধে দুটো করে সোনালি স্ট্রাইপ, এবং সিগার টানছিলেন। তিনিও তো এ জাহাজেই কাজ করছেন। সে আর দাঁড়াল না। ওর ধারণা, বেশী দেরী করলে সেই বুড়ো মানুষটাকে সে হারিয়ে ফেলবে। তাড়াতাড়ি দু’লাফে আবার রাস্তা পার হয়ে গেল। লাফ দিয়ে পার হতে গিয়ে চটি ছিঁড়ে গেল। চটিটা হাতে নিয়ে সে এখন ছুটছে এবং সিঁড়ির মুখে গিয়ে দেখছে, বুড়ো মানুষেটা নেই। সে চোখ গোল গোল করে বসে পড়ল। মনে হল হতাশায় নাকটা সামান্য লম্বা হয়ে গেছে।

    তবু খুঁজতে হয়। সে খুঁজতে খুঁজতে ম্যাডিকেল রিপোর্টের ঘরটা পার হয়ে গেল। বাঁদিকে বড় রাস্তার ওপর যে ফুল বাগানটা রয়েছে সেখানে উঁকি মারল। একটু ডানদিকে ঘুরে পেশাপখানায় ঘুরে ঘুরে দেখল। অনেক মানুষের ভেতর বুড়ো মানুষটা নেই সে ভাবতে পারল না। এক হতে পারে চলে গেছে, অথবা ক্যান্টিনে, না কি নদীর পাড়ে চুপচাপ বসে রয়েছে। সে, সে-সব জায়গায় খুঁজে তারপর ক্যান্টিনে ঢুকতেই দেখল, বুড়ো মানুষটা হা হা করে হাসছেন।

    সে ঢুকেই ডাকল, চাচা।

    —হেই।

    —জাহাজ হল না! সে বলতে বলতে কাছে চলে গেল।

    —বোস। বুড়ো মানুষটা নিজের মানুষের মতো ওকে কাছে বসাল। বলল, আমার বিবিজান তো চলে আসছে। ভয় কি!

    সে বুঝতে না পেরে তাকিয়ে থাকল। সারেঙ সাব এবার পাশাপাশি মানুষগুলোর দিকে তাকিয়ে বললেন, জাহাজ পাচ্ছে না। কেউ নিচ্ছে না জাহাজে! মুখ দেখেই টের পাচ্ছে বাবু মানুষ। সখ করতে জাহাজে ঘুরতে যাচ্ছে।

    —না না সখ করতে না চাচা। সখ করবার সময় কোথায়! একথা ঠিক না।

    চা এসেছিল, বুড়ো মানুষটা চা, দুটো নিমকি বিস্কুট দিয়েছেন খেতে। সে খুব আগ্রহের সঙ্গে খাচ্ছে। এবং খাওয়া দেখেই কেন জানি টের পেলেন বুড়ো মানুষটা, ছেলেটার ভিতরে খুব খিদে। পেট ভরে খেতে পায় না।

    বুড়ো মানুষটা এবার বললেন, জাহাজ আসছে। কাল। লম্বা জাহাজ। লম্বা ডেরিক। কাপ্তানের অসুখ। জাহাজ হোমে ফিরে যাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে পারছেন না। এখানে নেমে যাবেন। এবারের বাড়িয়ালা হিগিনস। সেই বুড়ো মানুষটা। কেবল চার্ট রুমে বসে বসে ঝিমোয়।

    সোনা বলল, বাড়িয়ালা!

    —আরে ঐ হল কাপ্তান। আমরা তো সারাজীবন বাড়িয়ালা বলেই চালিয়ে দিলাম। এখনকার ছোকরা জাহাজিরা এসব শুনে হাসে! তা যাক—শোন, তুই যাবি। এখনও ভেবে দেখ। সব বলে রাখা ভাল। তারপর বলবি, সব খুলে বলিনি। কাজেই ছেলে আমায় দোষ দিবি না। দিলে ভাল হবে না। আমার আবার বদনাম নিতে ভীষণ খারাপ লাগে।

    আর যারা পাশে ছিল, ওরা একে একে উঠে যাচ্ছে। বুড়ো মানুষটা এবার খিস্তি করছেন। শালারা! শালারা ভেবেছে ব্যাঙ্ক লাইনের এডেন ব্যাঙ্কে যাচ্ছি। চাচা আমারে নিবা না, আমার কথা মনে রাইখ। বেইমান—যেই শুনেছে সিউল ব্যাঙ্কে যাচ্ছি, শালারা দেখলি কেমন সুর সুর করে উঠে গেল।

    সোনা চা খেয়ে বেশ কথা বলতে জুত পাচ্ছে।

    —ওরা চাচা তোমার সঙ্গে যাবে ঠিক ছিল!

    —কিছু ঠিক ছিল না। ঘুরঘুর করার স্বভাব। বলে, বুড়োমানুষ উঠে দাঁড়ালেন। সব ফাঁস করে দিতে যেন এ-সময় বুড়োমানুষটাও আর সাহস পাচ্ছেন না।

    সে বলল, আমি কিন্তু আপনার সঙ্গে যাব।

    —যাবি যাবি। বুড়ো মানুষটা হাঁটছে আর গজগজ করছে। মুখগুলো চিনে রাখা দরকার। বেশ নানাভাবে গুছিয়ে আনছিলেন। সিউল ব্যাঙ্ক আর তেমন জাহাজ নেই। খোলনলচে পাল্টে একেবারে আলাদা। কি এর মেসরুম, কি এর ফোকসাল, চক্ পাল্টে বয়লার রিপেয়ার করে সব এখন এমন ঠিকঠাক যে কয়লা না দিলেও চলে। বেশ শুনছিল কথা কিন্তু যেই না শুনেছে বুড়ো মানুষটা আসলে সেই জাহাজেই যাচ্ছে, কাল আসছে জাহাজটা, তখনি সুর সুর করে ওরা উঠে গেল।—আচ্ছা দেখা যাবে, ভালো জাহাজ আমার নসিবে এলে দেখা যাবে—আর বলি জাহাজটা খারাপ কি! এখন তো কত জাহাজ, কত আরাম। আগে তো এসব ছিল নারে বাপু। আমরা কাজ করিনি! জাহাজ চালিয়ে সমুদ্র পার করে দিইনি—গজগজ করতে করতেই মনে হল—হ্যাঁ পাশে সেই ছেলেটা –কিছু জানে না, যেতে চায়—কালতো সিউল ব্যাঙ্কের মাসতার দিতে বললে, লাইন থেকে লোক পালাবে। অথবা কেউ দাঁড়াবে না। যারা ছ-সাত মাস থেকে জাহাজ পাচ্ছে না তারা নসিবের ওপর ভর করে বিশমিল্লা রহমানে রহিম বলে ঝুলে পড়বে। এসব যখন হবে বা হচ্ছে তখন ছেলেটাকে সব খুলে না বললে বুঝি ঠিক হবে না।

    বুড়ো মানুষটা তখন গজগজ করছেন আর হাঁটছেন। রোদের ভিতর দিয়ে হাঁটছেন। খুব তাড়াতাড়ি হাঁটার স্বভাব। যেন এই বয়সেও দেখানোর স্বভাব বয়স তেমন হয়নি। কথা খুব তাড়াতাড়ি বলেন—আচ্ছা আচ্ছা বাপু তুমি এস। যাবে যখন বলছ যাবে। এখন আমাকে আর কথা বাড়িও না। তবে ভেবে দ্যাখো একবার, ভাববে, কেন মাসতারে কেউ দাঁড়াতে চায় না। সিউল ব্যাঙ্কের নাম শুনলে সবাই পালায়। এনজিনরুমের ক্রু কিছুতেই যোগাড় করা যায় না। সব অচল মাল শেষপর্যন্ত তুলে নিতে হয়।

    বুড়োমানুষটা যত জোরে হাঁটছেন, হাতের ফোলিও ব্যাগটা যত জোরে দুলছে তত সে দ্রুত হাঁটছে পাশাপাশি। যেন ছুটে যাওয়ার সামিল। মাঝে মাঝে কথা বলতে বলতে পিছিয়ে পড়ছেন। খিদিরপুরের ব্রিজের কাছে বাস। কিছুটা পথ না হেঁটে গেলেই নয়—সুতরাং তারও বুড়ো মানুষটাকে কিছুটা পথ এগিয়ে দেবার মতো যেন কথা বলতে বলতে যাওয়া। কিন্তু অচল মালের কথায় আসতেই সে কেমন থমকে দাঁড়াল। অনেকটা পিছিয়ে পড়ল সে। হনহন করে মানুষটা দু’পাশের বাড়িঘর গাছপালার ছায়া ফেলে এগিয়ে যাচ্ছে। সে কেন এমন থমকে দাঁড়াল বুঝতে পারছেন না, তারপর ফের অচল মালের কথা মনে হতেই ডাকল—হেই!

    —হেই। এস। এভাবে কেউ দাঁড়ায় না!

    —হেই অচল মাল! সোনা জোরে জোরে হাসল। দুহাত ওপরে তুলে হা-হা করে হাসল।

    —হেই অচল মাল! বুড়ো মানুষটাও জোরে হা-হা করে হেসে উঠলেন।

    সে এবার ছুটে গিয়ে ধরে ফেলল বুড়োমানুষটাকে। তিনি বললেন, আসলে ওটা অচল জাহাজ, অচল মালে চলে। আসলে ওটাই হচ্ছে সবচেয়ে তেজী জাহাজ, জাহাজিরা তেজী। দুনিয়ায় তোমার এমন জাহাজ একটাই আছে।

    —হিগিন্‌স্‌ আসছে জানো? হিগিন্‌স্‌ দুনিয়ার সেরা বাড়িয়ালা। ছেলেকে ছেড়ে কোথাও যায় না। অচল জাহাজ চালিয়ে নিয়ে যায় বলে কোম্পানি কিছু বেশি সুযোগসুবিধা দেয় হিগিন্‌স্‌ সাহেবকে। তুমি না দেখলে বুঝতে পারবে না, হিগিন্‌স্‌ সাহেব কী ভীষণ রগচটা মানুষ। কেবল ছেলেটার কাছে একেবারে জুজু। ওকে হাত করতে পারলে তুমি রাজার হালে থাকতে পার।

    —কেমন বয়স?

    —তোমার গিয়ে তেরো চোদ্দ হবে। একটু বেশি হতে পারে। ঠিক জানি না।

    ওরা ক্রমে ব্রিজের ওধারে চলে গেল। এখান থেকে বুড়োমানুষটা বাসে উঠে যাবেন। সে যাবে কিসে জানে না। আসলে তাকে হেঁটে যেতে হবে। সুতরাং সে কিছু বলছে না। এখন দুটো চটিই হাতে। এবং সহসা বুড়ো মানুষটার মনে হল, এমন গরমের দিনে পিচের রাস্তার ওপর দিয়ে ছেলেটা হেঁটে এসেছে। মুখ লাল হয়ে গেছে। ভীষণ ঘামছে। জবজব করছে ঘামে। পায়ে ফোসকা পর্যন্ত পড়ে যেতে পারে। বুড়ো মানুষটা কি ভেবে বলল, চটিটা ঠিক করে নে।

    সোনা জেব উল্টে দেখাল—নেই।

    —যাবি কি করে?

    —হেঁটে।

    —কোথায় আছিস?

    —দূর সম্পর্কের আত্মীয়ের বাড়ি।

    —খেতে দেয়?

    —দেয়।

    —আমার কাছে থাকবি? কোন অসুবিধা হবে না। একটা তো দিন। সোনা কেমন বিব্রত বোধ করতে লাগল।

    বুড়োমানুষটা প্রথম বাসটা ছেড়ে দিলেন। পাশের একটা দোকানের শেডে দাঁড়িয়ে ফোলিও ব্যাগটা খুলে দেখলেন—কি আছে ব্যাগে। এবং কিছু পয়সা, এই রেজকি নোট মিলে টাকা তিনেকের মতো আছে দেখে বললেন, কিছু মনে করিস না। পয়সা কটা রাখ। কাল তোর জাহাজ হবে। পরশু,সাইন হবে। সাইন হলে টাকা পাবি। আমি তখন তোর টাকাটা কেটে নেব। কিছু মনে করিস না।

    কখনও সখনও মানুষের চোখ-মুখ সজল হয়ে যায়। সে চারপাশে তাকিয়ে সেই সজল চোখ লুকিয়ে ফেলল মানুষটার কাছে। কত দিন পর, হ্যাঁ কতদিন পর একজন মানুষ তার দুঃখটা কি, সে কেন যাচ্ছে তার দেশ মাটি মানুষ ফেলে, টের পাচ্ছে। ওর মনে হল কতদিন পর আবার একজন মানুষ পৃথিবীতে তার যন্ত্রণা ঠিক ঠিক ধরতে পারছে। সে হাত পেতে পয়সা নেবার সময় সোজাসুজি তাকাতে পারল না। মনে হল মানুষটা অনেক উঁচু হয়ে গেছে। সে যতই মুখ তুলে তাকাক মানুষটার আসল মুখ দেখতে পাবে না।

    পরদিন সে অবাক, সত্যি এতবড় একটা জাহাজে ক্রু নেয়া হবে অথচ ভিড় নেই। ডেক জাহাজিদের লাইনে ভিড়টা তবু আছে, কিন্তু এনজিন ক্রুদের লাইনে খুব কম। যত লোক লাগবে তার সিকিভাগও নেই। কারণ এনজিনে তিনটে বয়লার, তিন বয়লারের জন্য তিনজন করে প্রত্যেক ওয়াচে ফায়ারম্যান। তিনটে ওয়াচের জন্য সুতরাং ন’জন ফায়ারম্যান। প্রত্যেক ওয়াচের জন্য দুজন করে কোলবয়। মোট ছ’জন। দুজন ডংকিম্যান। তিনজন গ্রিজার, একজন কসপ, বড় টিণ্ডাল, ছোট টিণ্ডাল, সারেঙ। তাছাড়াও দুজন বাড়তি। খুন জখম, জাহাজ থেকে জলে ঝাঁপ দেওয়া এসব তো আছেই। কারণ সফরে এক দুজন মানুষ মরবে, বা জলে ভেসে যাবে এ-আর বেশি কি।

    জাহাজের বড়-মালোম ডেক-জাহাজিদের বেছে নিচ্ছেন। এনজিনে কিছু বাছার নেই। গড়পড়তা সব। এমনকি দু-একজন ব্ল্যাকলিসটেড জাহাজী এ-ফাঁকে জাহাজ পেয়ে গেল। তবু হয় না। বুড়োমানুষটা ডেকে সেধে আনছেন। এনজিন জাহাজিরা কোথায় ঘাপটি মেরে লুকিয়ে আছে তিনি জানেন। মেজমিস্ত্রি বড়মিস্ত্রি হিমসিম খাচ্ছে। ওরা জানে এমনটা হয়। জাহাজিরা যেতে চায় না এ জাহাজে। ঘুরেফিরে দুটো দল। হোমে যারা যায় তারাই আবার বছর ঘুরে এলে ফিরে আসে।

    কিন্তু বুড়োমানুষটার হয়েছে ঝামেলা। তিনি শেষপর্যন্ত একজনকে টেনে টেনে নিয়ে আসছেন। ওর লুঙ্গি খুলে যাচ্ছে। মানুষটা একহাতে লুঙ্গি আগলাচ্ছে। বুড়োমানুষটা এখনও বেশ শক্তি রাখেন। তিনি টেনে আনছেন, প্রায় যেন টেনে হেঁচড়ে নিয়ে আসছেন—যাবে না, যাবে না বললেই হল। এবং বোঝা যায় যাকে টেনে আনা হচ্ছে সে এই বুড়ো মানুষটাকে সমীহ করে—তবু যেতে চায় না—কি যে ভয়!

    সোনা এসব দেখেও ঘাবড়াল না। আর জাহাজ সে যখন পাচ্ছে না, এখানেও সে বেশিদিন থাকতে পারছে না, তখন যে কোনও জাহাজ, সে যত ভয়াবহ হোক, ভাবে না। সে যখন সাইন করে টাকা নিচ্ছিল তখনও বুড়োমানুষটা বললেন, ভেবে দ্যাখ। এখনও ইচ্ছা করলে থেকে যেতে পারিস। কিছুদিন অপেক্ষা করলে একটা ভাল জাহাজ মিলে যেতে পারে।

    সোনা হেসেছিল। কিছু বলেনি। তার গুনে গুনে টাকা নেবার স্বভাব না, কারণ সে এই প্ৰথম পরিশ্রমের বিনিময়ে টাকাটা এডভান্স পাচ্ছে। এই টাকায় কেনাকাটা করে থাকে জাহাজিরা। অনেকদিনের সফর। সফর শেষে কবে ফিরবে, কি আদৌ ফিরবে না ঠিক থাকে না। তাছাড়া বসে খেলে যা হয়, জাহাজ থেকে দেশে ফিরে এলে চুপচাপ বসে থাকা, পয়সা নেই আবার জাহাজ না পেলে টাকা- পয়সা হয় না। সুতরাং এ-টাকাটার ভীষণ দাম জাহাজিদের কাছে। সে অবশ্য তত কিছু বোঝে না। কেবল সে জানে যতটা বেশি সম্ভব এর থেকে টাকা মাকে পাঠাতে হবে। টাকা তিনেকের মতো দিতে হবে চাচাকে। বাকি টাকাটা দিয়ে একজোড়া জুতো, একটা প্যান্ট, একটা জামা, টিনের একটা সুটকেস, মাজন, এখন রেজার-টেজার দরকার হবে না, গালের দাড়ি বেশ সামান্য কোঁকড়ানো এবং অল্পস্বল্প।

    —বেশ একটা মুখে তার ঈশ্বর ঈশ্বর ভাব। সে এভাবে আরও অনেকদিন চালিয়ে দিতে পারবে। আরও কিছু কেনা দরকার। চাচাকে সে বলে জেনে নিতে পারে আর কি দরকার। সে ছুটে গিয়ে বলল, আর কি নিতে হবে।

    চাচার ফদমতো সে নিল, একজোড়া নীল রঙের প্যান্ট, নীল রংয়ের জামা। এই পরে কাজ করতে হবে। পুরানো সু কারো যদি থাকে মেরামত করে নাও। বেশ শক্ত হতে হবে তলা। সে তাও নিল। সে বেশ ঘুরেফিরে কেনাকাটা করেছে। রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাবার সময় কেমন তার সবকিছুর ওপর দিয়ে উড়ে উড়ে যেতে ইচ্ছা হচ্ছিল। সে যেন বেশ একটা বিজয়ে বের হয়ে যাচ্ছে। সে মাকে একটা চিঠি লিখতে পারে। লিখতে পারে—মা আমি জাহাজে যাচ্ছি, কবে ফিরব জানি না। আদৌ ফিরব কিনা তাও জানি না। একটা ভাঙ্গা জাহাজে সমুদ্রযাত্রা। কিন্তু সে লিখতে পারে না। মা তার তবে ভীষণ ভাববে। কেবল টাকাটা পাঠিয়ে দেবে জাহাজ ছাড়ার ঠিক একদিন আগে—এবং মা বুঝতে পারবে তার নিখোঁজ ছেলে জাহাজে চলে যাচ্ছে। অথচ তখন করার কিছু থাকবে না।

    এই কলকাতা শহরে সে আজ প্রায় তিন মাস এগারো দিনের মতো আছে। এদিক ওদিক করে আড়াই মাসের ওপর ভদ্রা জাহাজে ছিল রোববার ছুটির থাকত ছিল। সাদা কোর্তা পরে নীল রঙের জাহাজি পোশাক আর সাদা টুপি মাথায় সে কখনও হেঁটে হেঁটে অথবা অল্প পয়সার ট্রাম ভাড়ায় ঘুরে বেড়িয়েছে—এই শহর কি বড়, ‘আর কত মানুষ, মানুষেরা এখানে কেউ কেউ রাস্তায় শুয়ে থাকে, রাস্তায় মরে যায়। এসব দেখলে মনে হত সেও রাস্তায় একদিন এভাবে না খেতে পেয়ে মরে পড়ে থাকবে।

    এখন আর এসব মনে হয় না। বড় বড় শো-কেসগুলোর আশেপাশে ঘুরে বেড়ায়। একটা বড় জাহাজ, তার ওপর সে যেন দাঁড়িয়ে আছে, আর সমুদ্রে কি যে স্বপ্ন থাকে মানুষের, সে যাচ্ছে কোলবয় হয়ে, সবচেয়ে কঠিন এবং পরিশ্রমের কাজ। তার প্রথম সফর, কোলবয় প্রথম সফরে, দ্বিতীয় সফরে সে ঠিক ফায়ারম্যান হয়ে যাবে, আর একটা সফর দিতে পারলে সে গ্রিজার, তারপর টিণ্ডাল। একটা পরীক্ষা, ওর তো ততদিনে জাহাজি অভিজ্ঞতা হয়ে যাবে, সে তো কলেজের পড়াশুনা কিছুটা এগিয়ে রেখেছে, সে তো ইংরেজি খুব ভাল জানে, অঙ্কে সে ভালো। পরীক্ষায় বসলে অনায়াসে বি-এ-ও- টির কাছাকাছি কিছু একটা সার্টিফিকেট পেয়ে যাবে। তারপরই সে জাহাজের ফিফ্থ এনজিনিয়ার, তার পরেই ফোর্থ, থার্ড, সেকেণ্ড চিফ। এমন সব স্বপ্নের ভেতর দিন তার কেটে যায়। এমনভাবে সে এই বড় শহরের ওপর দিয়ে কখনও হেঁটে যায়নি। কেমন ভয় ভয় ছিল। মানুষজনের ভিড়ে ওকে খুব অসহায় মনে হত। এখন সে বেশ প্রায় লাথি মেরে সব উলটে পালটে যেন হেঁটে যাচ্ছে। হাঁটার ভেতর কিছুটা হাওয়ায় ভেসে যাবার মতো ভাব তার।

    হাঁটতে হাঁটতেই কেন জানি মৈত্রের কথা মনে পড়ল। মৈত্র এসেই ওকে বলেছিল, কি নাম? সে নাম বললে বলেছিল, ছোটবাবু তুমি জাহাজের?

    —ছোটবাবু!

    —কোলবয়দের আমি ছোটবাবু ডাকি।

    মৈত্র সঙ্গে যাচ্ছে। অমিয় বলে ওর চেয়ে একটু বেশি বয়সী আরও একজন জাহাজী যাচ্ছে। সেও কোলবয়। মৈত্র টিণ্ডাল। সে কাজ করত রয়েল নেভিতে। নৌ বিদ্রোহের দুটো একটা গল্প গাছের ছায়ায় সকলকে দাঁড় করিয়ে বেশ হাত নেড়ে নেড়ে শুনিয়ে দিয়েছে।

    মৈত্র বেশ তাজা মানুষ। খুব হাসিমশকরা করতে ভালবাসে। ডেকে আরও দুজন আছে। ওদের সঙ্গেও আলাপ করে নিতে হয়েছে। আসলে, দীর্ঘ সমুদ্র-যাত্রায় ওরাই সব। চাচা বলছে, এরা তোমার জাতভাই ছেলে। আর তো সব আমার জাতভাই। আগে তো কেউ তোমাদের ছিল না। এখন দুচারজন, ট্রেনিং নিয়ে জাহাজে আসছে।

    আসলে সোনা বোধহয় এতটা সাহস পেত না এই শহরকে উপেক্ষা করার। চাচা এবং মৈত্র সঙ্গে আছে বলেই তার এত সাহস। এবং সমুদ্র সফর যেন খুব বড় কাজ, এই শহরের অলিগলিতে পচে মরার চেয়ে, অসীম সমুদ্র-যাত্রায় এক কঠিন সুখ আছে। তুমি ছোটবাবু অনায়াসে সব মানুষকে অবহেলা করতে পার। এই শহরকে লাথি মারতে পার।

    মৈত্রকে দেখলে এটা বিশ্বাস করা যায়। জাহাজে মারামারি করতে গিয়ে দু-দুবার ব্ল্যাকলিস্টেড হয়েছে, গর্বের সঙ্গে বলে। সে পরোয়া করে না, বেশ একটা অহমিকা নিয়ে আছে, যেন কোনও ভয় নেই বাছারা আমরা সবাই ঈশ্বরের সন্তান। কোন শালা কার চেয়ে কম। মৈত্রর এমন সব কথাবার্তা শুনে সে মাঝে মাঝে হেসে ফেলেছে।

    —তাহলে ছোটবাবু জাহাজে মুখ গোমড়া করে থাকবে না।

    সোনা বলেছিল, না না।

    —কষ্ট হয় হবে। পারবে না যখন বলবে, আমরা আছি। কিছু লজ্জা করবে না বলতে। জাহাজে ওঠার সময় মৈত্র আগে। সে পিছনে। লম্বা সিঁড়ি। এক এক করে সবাই উঠে যাচ্ছে। মৈত্র বেশ লম্বা। খুব শক্ত মানুষ। বড় একটা সেলার হাতে। মাথায় তালপাতার নীল টুপি। মোটা বেল্ট কোমরে আঁটা। এবং জুতো কুমীরের চামড়ার। বেশ শক্ত মজবুত এবং হাঁটু পর্যন্ত জুতোর চামড়া উঠে গেছে। কিছুটা গামবোটের মতো দেখতে। সে পরেছে লাল রঙের পাতলা গেঞ্জি। সে তারপর পিছনের দিকে তাকালেই দেখল অমিয় কিং জর্জ ডকের তিন নম্বর জেটিতে দাঁড়িয়ে কার সঙ্গে কথা বলছে।

    আর সে যা দেখল, কেমন নিঝুম একটা জাহাজ। মাস্তুলে একটা পাখি বসে আছে। সিঁড়ির ওপাশে একটা বড় জাহাজ থেকে মাল নামানো হচ্ছে। তার অতিকায় শব্দ, আর সব সারি সারি ক্রেনের নিচে জাহাজিরা এক এক করে উঠে আসছে দল বেঁধে।

    জাহাজে ইউনিয়ান জ্যাক উড়ছে। এই জাহাজে সে এখন ছোটবাবু।

    সোনার এসব খেয়াল থাকার কথা না। সিঁড়ি ধরে ওঠার সময়ই সে ঘাবড়ে গেছে। কি লম্বা সিঁড়ি, কি খাড়া! খুব সন্তর্পণে উঠে গেছে। এবং গ্যাঙওয়েতে মাত্র একজন রয়েছে। এবং বোধহয় কোয়ার্টার মাস্টার সে। বুড়ো মানুষটা বসে বসে একটা মাছ ধরার জাল বুনছে। মাঝে মাঝে কেবল জিজ্ঞাসা করলে জবাব দিচ্ছে—ওদিকে। জাহাজিদের সে আস্তানা দেখিয়ে দিচ্ছে।

    সোনা দেখল বেশ বড় জাহাজ। সে হেঁটে গেল—সে জমুনা বাজু ধরে হাঁটছে। আগে যারা উঠে এসেছিল তারা পিছিলে দাঁড়িয়ে আছে। সে তাদের ভিতর চাচাকে দেখতে পেল। খুব সকালে চাচা সবার আগে চলে এসেছেন। মৈত্র কাছে থাকায় যত না সাহস ছিল, জাহাজে চাচাকে দেখে সে আরও সাহসী হয়ে গেল। সে বেশ লাফ দিয়ে দিয়ে যেন উঠে যাচ্ছে। বাঁদিকে বড় বড় ফলকা পার হয়ে প্রায় কাছাকাছি গিয়ে বলল, কোনদিকে?

    —নিচে নেমে যা। সিঁড়ি আছে সামনে। তোদের পছন্দ মতো ফোকসাল দেখে নে।

    এসব ব্যাপারে যা হয়, ছোটবাবু, মৈত্র, অমিয় একসঙ্গে একটা ফোকসাল বেছে নিল। ওপরে নীচে দুটো দুটো চারটে বাঙ্ক। এটা পোর্ট-সাইড, এবং পোর্ট-সাইডে সব এনজিন ক্রুদের বুঝি থাকবার নিয়ম। সে বেশ তাড়াতাড়ির মাথায় তার বাঙ্কটা দখল করে নিলে মৈত্র বলল, এটা নিলে ছোটবাবু সামলাতে পারবে তো?

    ছোটবাবু বলল, জানি না।

    —এটা নাও। তোমার ভাল হবে। দেওয়ানি কম পাবে।

    সে ভালমন্দ বোঝে না। চারপাশে কেমন একটা গন্ধ। রঙ বার্নিশ মিলে একটা পোড়া পোড়া গন্ধ। সে মোটা ম্যাট্রেসের ওপর একটা চাদর পেতে দিল। তখন মৈত্র বলল, একটু চা হলে ভাল হত ছোটবাবু। চা করে আনছি। তুমি বরং দেখে এসো অমিয় উঠে আসছে কিনা।

    তখন অমিয় উঠে আসছিল। ওর লটবরহ যেন অনেক। এত লটবহর নিয়ে সে উঠে আসতে পারছে না। ওর কাঁধে বড় দুটো কিডস ব্যাগ। সঙ্গে একটা নীল রঙের লম্বা টিন, ডান হাতে একটা সুটকেস্, সঙ্গে ফ্ল্যাকস। বাঁ হাতে কোন রকমে সমস্ত শরীরের ব্যালেন্স রেখে সে উঠে আসছে।

    ছোটবাবু তাড়াতাড়ি নিচে নেমে ওর কাছ থেকে টিনটা নিয়ে নিল। আরও সে দেখল বড় একটা ট্রাঙ্ক। এসব নিয়ে অমিয় জাহাজে উঠে আসছে। ওর ভারি অবাক লাগল, টিনের ভেতর মুড়ি, মোয়া নাড়। ওর মা ওর জন্য সমস্ত সফরে কি কি কষ্ট হতে পারে ভেবে বাঁধাছাঁদা করে যাবতীয় সুখ- সুবিধা ওর সঙ্গে গুছিয়ে দিয়েছে। ছোটবাবু অমিয়র দিকে তাকিয়ে ফিক করে হেসে ফেলল।

    সারাটা সকাল এভাবে একজন দুজন করে উঠে আসছে। কিং জর্জ ডকের চারপাশে যখন সব বড় বড় ক্রেনগুলো বড় বড় জাহাজ থেকে মাল নামাচ্ছে, সূর্য বেশ মাথার ওপর কিরণ দিচ্ছে, এবং ভীষণ গরম, ফোকসালে টেঁকা যাচ্ছে না, ডেক-সারেঙ এনজিন-সারেঙ ছুটোছুটি করছে, কাজকাম বুঝে নিচ্ছে তখন ছোটবাবু দেখল, একজন বুড়ো মতো মানুষ জেটিতে খুব দামী গাড়ী থেকে নামছেন। সঙ্গে এক টেডি বয়। ঠিক টেডি বয় বললে ভুল হবে, চুল কেমন নীলাভ রঙের, কালো প্যান্ট সাদা হাফসার্ট, হাতে একটা ক্যামেরা, চোখ ভীষণ নীল, সমুদ্রে গেলে এ চোখের রঙ কেমন হবে সে এখন বলতে পারে না।

    জাহাজের সব অফিসারেরা এখন খবর পেয়ে গেছে, ক্যাপ্টেন হিগিনস জেটিতে নেমেছেন। ওরা ছুটে ছুটে সিঁড়ি ধরে নেমে গেল। বড় মালোম জাহাজ থেকেই হাত তুলে ওয়েলকাম করছে কাপ্তানকে সব জাহাজিরা এসে ভিড় করছে রেলিঙে। এনজিন-সারেঙ নেমে গেছে নিচে। জাহাজের সর্বত্র ঘটাঙ ঘটাঙ শব্দ। আর সেই বুড়ো মতো মানুষ, সঙ্গে তার একমাত্র সন্তান, আগে আগে বেশ নিরিবিলি, যেন তার সব দেখা, জানা। পুরানো জাহাজের গন্ধে টের পান জাহাজের হাল তবিয়ত কেমন আছে, রেলিঙে হাত রেখেই টের পান, এ-সফরে কতটা নসিবে দুর্ভোগ আছে। তিনি সিঁড়ি ধরে উঠতে উঠতে গল্প করে যাচ্ছেন। কারণ সবাই তো তাঁর চেনা জানা। অনেক সফর এদের সঙ্গে তার কেটেছে। বড় মালোম তো বনিকে গত সফরে দেখেছে। বনিকে এ-সফরে দেখেও বড় একটু ঘাবড়ে যেতে পারে।

    তবু কি করা ঠিক, কাপ্তান স্থির নিশ্চয় কিছু জানেন না। কোনটা ভাল ছিল। এই নিয়ে আসাটা ভাল, না রেখে আসা ভাল ছিল। তিনি সেজন্য এ-ব্যাপারে বড়কে মোটামুটি কিছু বলবেন। বড় যে একটা প্রশ্ন তুলবে তিনি ওঠার মুখে বড়র মুখ দেখে টের পেয়েছেন। যেন বড় এতে খুশি হয়নি। অন্য কেউ এটা জানে না বলে তারা বনিকে বেশ হেইল করছে। বনি আবার কতদিন পর—আঃ সেই জাহাজ! বনি এখন হয়তো ডেকে উঠেই সারা ডেকময় ছুটে বেড়াবে। ওর দৌরাত্ম্য মাঝে মাঝে বড় বেশি কষ্টদায়ক।

    কাপ্তান বুড়ো, ভীষণ বুড়ো, লম্বা, একটু নুয়ে গেছেন। কালো প্যান্ট, সেই সাদা হাফসার্ট, গলায় টাই। গরমে ঘামছেন। চোখ সাদাটে! নীল রঙটা চোখে কেমন ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। প্রথমেই ওঁর যা অভ্যাস, জাহাজে উঠেই ব্রীজে দু’বার পায়চারি করা। দু’বার পায়চারি করলে সমস্ত জাহাজটা চোখের ওপর কেমন আশ্চর্য জ্যান্ত হয়ে যায়। যেন জাহাজটা আর জাহাজ থাকে না, কাপ্তান হাত তুলে হেই বলে চিৎকার করে ওঠেন—হেই, হেই ডার্লিঙ এসে গেছি।

    বনির আলাদা ঘর। কাপ্তানের আলাদা ঘর। ঠিক ব্রীজের পিছনে চার্ট রুম। চার্ট রুমের পাশে কাপ্তানের কেবিন। এবং তার ঠিক নিচে বনির কেবিন।

    তিনি বনিকে নানাভাবে বুঝিয়েছেন, জাহাজে তুমি বড় হয়ে যাবে। তুমি আর আগের মতো চলাফেরা করলে চলবে না। তুমি মনে রাখবে সমুদ্রযাত্রা ভয়ঙ্কর সাহসী কাজ। সেখানে নানা কারণে বিদ্রোহ দেখা দিতে পারে। তুমি জাননা বনি—এই ইণ্ডিয়ান জাহাজিরা কত ভদ্র। তাদের তুমি উৎপাত কর না। অবশ্য বনি বলেছে, আমি দুষ্টুমী করব না বাবা, আমি ভাল হয়ে থাকব। তোমাকে আমি দুঃখ দেব না।

    সিঁড়িতে তিনি তখন শব্দ পেলেন, ক্যাপ্টেন বয় সালাম জানাতে এসেছে। তিনি তাকে বললেন, দু’কাপ কফি পাঠাবে। জ্যাকের কেবিনে এক কাপ

    আসলে বনি এখন এ-জাহাজে জ্যাক হয়ে গেছে। গত সফরেও বনি জ্যাক ছিল। চিফ-মেটের সঙ্গে একটু পরামর্শ দরকার। সেও তো তার মত বয়সী মানুষ। এবং বনিকে ভীষণ স্নেহ করে থাকে। তিনি দেখলেন পাইপটা নিভে গেছে। বাইরে তখন চিফ-মেটের গলা, স্যার আসতে পারি?

    —ইয়েস্ কাম্ ইন্।

    চিফ-মেট এসে চুপচাপ টেবিলের পাশে বসল। মাস্টার পিছন ফিরে আছেন। উনি একটা খৃষ্টের ছবি দেয়ালে টানাচ্ছেন। ওটা সব সময় ওঁর সঙ্গে থাকে। এবার যে আরও বেশি বুড়ো হয়েছেন ওঁর হাত কাঁপা দেখে চিফ এটা টের পাচ্ছে। সে এগিয়ে বলল, দিন। আমি ঠিক করে দিচ্ছি। কারণ যতবার এটা কাপ্তান করতে গেছেন ততবার কেমন ছবিটা তেড়চা হয়ে গেছে। ঠিক সোজা থাকছে না। কাপ্তানের চোখেমুখে দুশ্চিন্তার ছাপ। এ-সফর তার শেষ সফর। তিনি যত ঝড় সাইক্লোন থাকুক, খারাপ ওয়েদার থাকুক, চোরা হিমবাহ থাকুক, সমুদ্রের নিচে গোপন পাহাড় থাকুক, তার ডার্লিংকে বন্দরে ঠিক ভিড়িয়ে দিতে পারবেন। অথচ এবার কেমন একটা অমঙ্গলের আশঙ্কা। ছবিটা সোজা থাকছে না। চিফ এসে ছবিটা সোজা টানিয়ে দিলে কিছুটা শান্ত মুখে যেন বসতে পারছেন। কফি খেতে খেতে চিফই প্রথম বলে ফেলল, এবারও বনিকে নিয়ে এসেছেন দেখছি।

    —কিছুতেই থাকতে চায় না।

    —কিন্তু ওতো বড় হয়ে যাচ্ছে। আমরা কবে ফিরব ঠিক কি। ততদিন পর্যন্ত ওকে ছেলে সাজিয়ে রাখা যাবে?

    কাপ্তান বললেন, জানি না কি হবে। কিন্তু না নিয়ে এসেই বা উপায় কি! কার কাছে রেখে আসব, কেউ রাখতে চায় না। হোসটেল থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে। কোনও আইনকানুন মানতে চায় না।

    তারপর আর কোনও কথা না। বড়-মালোম আর কাপ্তান চুপচাপ কেবল গরম কফি খেয়ে যাচ্ছেন। ওঁরা শুনতে পাচ্ছেন, বনি ওর রেকর্ড-প্লেয়ারে একটা পপ গান বাজাচ্ছে। বনি বোধহয় এমন শান্ত আকাশ, নিরিবিলি নদীর ছবি দেখে চুপচাপ থাকতে পারছে না। সে কেবিনের ভেতর নাচছে আর গাইছে।

  • দুই

    দুই

    ।। দুই।।

    সকাল থেকেই বেশ একটা এলোমেলো হাওয়া দিচ্ছে। নদী থেকে এই হাওয়া উঠে এলে মৃদু ঠাণ্ডা একটা ভাব থাকে জাহাজের ভেতর। ছোটবাবুর উঠতে দেরি হয়ে গেছে। দুবার মৈত্র অমিয় ডেকে গেছে। কিন্তু ছোটবাবু রাতে একটা দুঃস্বপ্ন দেখায় সারারাত প্রায় ঘুমোতে পারেনি। সকালের দিকে ঘুমটা এসেছিল। পোর্টহোল দিয়ে সামান্য রোদ পর্যন্ত পায়ের কাছে এসে পড়েছে। কেমন শান্ত একভাব জেটিতে। মনেই হয়নি সে একটা জাহাজের ভেতর আছে। তার মনে হয়েছিল, সে আগের মতোই আছে—কাজ কর্ম নেই, একটু দেরি করে উঠলে কোন ক্ষতি হবে না।

    সে সিঁড়ি ধরে ওপরে উঠে এল। চারপাশে রোদ। ডেক জাহাজিরা ও-পাশে চা চাপাটি খাচ্ছে। এ-পাশে এনজিন-জাহাজিরা গ্যালিতে ভিড় করেছে। আর একটু পর কাজের সময় হয়ে যাবে। সবাই বেশ জলদি যে যার চায়ের জল গরম করে নিচ্ছে। গতকালই ওরা রেশন পেয়েছে। চা, চিনি, সিগারেট। মৈত্র, অমিয় এবং ছোটবাবু মিলে ‘বিশু’ করে নিয়েছে। তদারকির ভার মৈত্রের ওপর। চা করবে অমিয়, কাপ প্লেট ধুয়ে রাখার ভার ছোটবাবুর।

    কাল জাহাজটাকে খুব নিরিবিলি শান্ত মনে হচ্ছিল। আজ সকালে একেবারে আলাদা চেহারা। জেটি থেকে মানুষ-জন উঠে আসছে। চারপাশে সব লম্বা লম্বা জেটি। এক দুই তিন করে, সে গুনে গুনে দেখল এ-ডকে এগোরোখানা জাহাজ রয়েছে। বয়াতে বাধা জাহাজগুলোতে নৌকায় মানুষজন উঠে আসছে।

    হাওয়াটা বেশ লাগছে তো। সে এখনও জানে না কি কাজ করতে হবে তাকে। জাহাজটাকে কিছুতেই ইবলিশ মনে হচ্ছে না। বরং মনে হচ্ছে বেশ বড় জাহাজ। কত লম্বা হবে, সে মেপে বলতে পারে। তবে জাহাজের পেছনে আছে এনজিন আর ডেক-ক্রুদের বাথরুম, তারপরে আছে দু’পাশে দুটো মেসরুম। মেসরুম দুটোর মাঝখানে সিঁড়ি। সিঁড়ি টুইন-ডেকে নেমে গেছে। সিঁড়ির দু’পাশে দুটো ফোকসাল। পোর্ট-সাইডের ফোকসালে এনজিন-সারেঙ, পরেরটায় দুজন এনজিন টিণ্ডাল। ‘স্টাবোর্ড-সাইডের ফোকসালে ডেক-সারেঙ, পরেরটায় ডেক-টিণ্ডাল এবং কশপ। তারপর সিঁড়ি ক্রমে লোয়ার ডেকে নেমে গেলে মাঝ বরাবর বড় একটা লম্বা ঘর। ঘরে ক্রুদের জন্য রসদ। দু’পাশে লম্বা ভাগ করা সব ইনজিনক্রুদের থাকার জায়গা। ওপর নীচ বাঙ্ক মিলে অনেকগুলো পর পর ফোকসাল। লোয়ার – ডেকে ঠিক সিঁড়ির মুখের ফোকসালটায় ছোটবাবু, মৈত্র এবং অমিয় থাকে।

    ওরা তিনজন তিনটা লকার পেয়েছে। তিনজনের জিনিসপত্র আলাদা রাখা আছে। কেবল চা চিনি একসঙ্গে। ছোটবাবু সিগারেট খায় না বলে প্রথম নিতে চায়নি, পরে মৈত্রকে দিয়ে দিতে চাইলে, মৈত্র বলল, রাখো ছোটবাবু রেখে দাও। আমাদের জাহাজ আপাতত যাচ্ছে বুনো সাইরিস। সেখানে তোমার সিগারেট সোনার দামে বিক্রি হয়ে যাবে। সে টাকায় সেখান থেকে ইচ্ছা করলে দামী কম্বল কিনে নিতে পার। পৃথিবীর কোথাও এত ভাল শস্তা দামী কম্বল তৈরি হয় না। সুতরাং ছোটবাবু সিগারেট নিয়ে লকারে রেখে দিয়েছে। তার খুব ইচ্ছে মার জন্য ভাল একটা কম্বল নিয়ে দেশে ফিরবে। শীতের রাতে মার ভীষণ কষ্ট। ঠান্ডা ঘরে কাঁথায় মার শীত কমে না। ছোট ছোট ভাই-বোনেদের ঢেকেঢুকে মার জন্য বাকি কিছু থাকে না। একটা ভালো কম্বল হলে বেশ হবে।

    ডেকে দাঁড়িয়ে ছোটবাবুর মনে হল আসলে জাহাজটা ইবলিশ না। পুরানো জাহাজ হলে যা হয় কাজ সব সময় লেগেই থাকে। এখান থেকে রঙ খসে পড়ে যায়। ওখান থেকে রেলিং খসে পড়ে যায়। কাঠ উঠে যায়, এবং জাহাজ পুরানো হলে যা হয়, কেবল মেরামতের কাজ লেগেই থাকে। রঙ-বার্নিশের কাঁচা গন্ধ। জাহাজের আপ-ডেকে, মেসরুমের দু’পাশে দুটো গ্যালি। তারপর দুটো হ্যাঁচ। দু’হ্যাচের মাঝখানে মাস্তুল। মাস্তুলের দু’পাশে দুটো দুটো করে চারটা ডেরিক। মাস্তুলের গোড়ায় দুটো; করে উইনচ্। মাস্তুলের রঙ হলুদ। খোলের রঙ সাদা, কেবিনের রঙ সাদা। তারপর চীফ-কুকের গ্যালি। গ্যালির দু’পাশে দুটো এলি-ওয়ে। দুটো এলি-ওয়ে দিয়েই এনজিন-রুমে নামা যায়। দুটো এলি-ওয়ের পোর্টসাইডে থাকে এনজিনের অফিসাররা। প্রথমটায় থাকে ফিফথ-এনজিনিয়ার, পরেরটায় ফোরথ, এভাবে শেষেরটায় থাকে চীফ এনজিনিয়ার। এরা কেউ এসেছে ওয়েলস থেকে। কারু বাড়ি স্কটল্যান্ডে, কেবল ফিফথ মানে ফাইবারের বাড়ি কলকাতায়। জাতিতে বাঙালী খৃষ্টান। স্টাবোর্ড সাইডের প্রথম কেবিনটা ফাঁকা। পরের কেবিনটাতে থাকে স্টুয়ার্ড। স্টুয়ার্ড কলকাতার পার্ক সার্কাসের মানুষ। বুড়ো এবং দেখলে খুবই অথর্ব মনে হয়। একটা কি যেন অসুখ আছে তার। জাহাজঘাটায় ছোটবাবুর এমন মনে হয়েছিল। পরের কেবিনগুলোতে ছোট-মালোম, মেজ-মালোম, বড়-মালোম এবং মাঝখানে রয়ে গেছে চৌকোন একটা বিরাট ফাঁকা জায়গা। ওপরে উঠে গেলেই বোট-ডেক এবং কাঁচের স্কাইলাইট। একটা লম্বা সিঁড়ি ‘দ’-এর মতো বেঁকে বেঁকে পাতালে নেমে যাবার মতো। সিঁড়ির প্রথম ধাপে আছে প্রকান্ড সিলেন্ডার। বড় বড় লম্বা থামের মতো মোটা, স্টিম পাইপ এসে জুড়ে গেছে। সিঁড়ির পরের ধাপে রয়েছে গোল গোল লম্বা তিনটে পিস্টন রড। স্টিলের মোটা এত মোটা স্টিলের রড ছোটবাবু জীবনেও দেখেনি। আকার এবং পরিমাণ দেখে ছোটবাবু ঘাবড়ে গেছিল। নিচে নেমে গেলে ক্র্যাঙ্ক স্যাফট। লম্বা, কত লম্বা হবে, যেন ওটা যেতে যেতে টানেল পথে কোথায় হারিয়ে গেছে। ওটা গেছে ঠিক ওদের ফোকসালের অনেক নিচ দিয়ে এবং বাইরে বের হয়ে প্রপেলারকে ধরে রেখেছে। আশ্চর্য বিস্ময়ে ছোটবাবু দেখতে দেখতে বুঝল বড় বেশি তাপ্পি মারা জাহাজ। সে এনজিন-রুমে দৈত্যের মতো তিনটে অতিকায় বয়লার দেখতে পেল। বয়লারের গায়ে নানারকম পাইপ, কক এবং গেজ লাগানো আছে। এ-পাশে জেনারেটর, এভাপরেটার, ও-পাশে কনডেনসার, ব্যালেস্ট পাম্প, জেনারেল সার্ভিস পাম্প। জাহাজের ডানদিক দিয়ে ঠিক বয়লারের গা ঘেঁষে ওপাশে ঢুকে গেলে বয়লারের বিরাট তিনটে করে হাঁ-করা মুখ, যেন গিলতে আসছে। লম্বা স্টোক-হোলডে দাঁড়িয়ে সে ওপরের দিকে তাকাল। ভীষণ নিচে সে নেমে এসেছে। বয়লারের সামনে একা দাঁড়িয়ে থাকতে ওর ভীষণ ভয় লাগছিল। বয়লারের তিনটি করে ফারনেস। দুদিকে দুটো, একটা নিচে। লম্বা সব স্লাইস র‍্যাগ শোয়ানো পাশে। একটা তুলতে গিয়ে মনে হল খুব ভারি আর তখন ঝুপ করে মনে হল কিছু মাথায় পড়ছে। কালো অন্ধকার গহ্বরে ঢুকে গেলে যেমন ভয় লাগে, তেমনি একটা ভয়। এখনও ঝুর-ঝুর করে মাথার ওপর কি সব পড়ছে। গুঁড়ো গুঁড়ো, এবং ক্রমে অন্ধকার করে দিচ্ছে, প্রায় নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে যাবার মতো।

    সে তাড়াতাড়ি স্টোক-হোলডের সিঁড়ি ধরে ওপরে ওঠার মুখেই দেখল কাপ্তানের বেহদ্দ ছেলেটা কি করে দেখতে পেয়েছে, নিচে সে দাঁড়িয়ে আছে। ছেলেটার হাতে চিপিঙ করার পাতলা হাতুড়ি। ফানেলের গুড়ি থেকে সব ময়লা টেনে ফেলছে। ছোটবাবু বুঝতে পারল না, ওকে দেখে এমন করছে, না, না দেখে। যেভাবেই হোক ছোটবাবু রাগ করতে পারে না। বাড়িওয়ালার ছেলে, কোন কারণেই সে মুখ গোমড়া করে উঠে যেতে পারে না। ছোটবাবু ওঠে ওর পাশ কাটিয়ে যাবার সময় সামান্য হেসে বলল, গুড-মর্নিং স্যার।

    —গুড-মৰ্ণিঙ।

    ছোটবাবুর মুখ বেশ কালো হয়ে গেছে। আসলে ও-সব কয়লার গুঁড়ো। জ্যাকেরও জাহাজে কাজ থাকে। একজন নাবিক হিসাবে ওকে উঠে আসতে হয়েছে। সে দেখতে পায়নি নিচে কেউ আছে। সে ওর খুশিমতো কাজ করে। যখন যেখানে খুশি। সে দেখছিল হলুদ রঙের চিমনি, তার চারপাশে সব কয়লার গুঁড়ো, রঙ খেয়ে নিচ্ছে। সে ভেবেছিল, জায়গাটা সাফ করে রঙ করবে। ওর তো খুশিমতো কাজ। কশপকে বলে হলুদ রঙ নিয়েছে। সে সেজন্য বেশ টেনে টেনে ময়লা নামাচ্ছে, এবং খুব নিচে একজন যে মানুষ দাঁড়িয়েছিল, এবং বয়লার দেখে ভয় পেয়ে গেছিল, তার মাথায় গিয়ে পড়েছে সব, সে জানত না। সে নিজের মতো কাজ করে গেছে। কে গুড-মর্নিং বলল, চোখ তুলে তার দেখার স্বভাব না। কারণ সে জানে, এ জাহাজে এখন কেবল সালাম সার, গুড মর্নিঙ, গুড নুন সাব। মাঝে মাঝে সে খুব বিগড়ে যায়, কেন যে এমন হয় সে জানে না। সুতরাং বনি জানে না একজন কম বয়সের জাহাজি এ জাহাজে উঠে এসেছে। বরং সে জানে এ জাহাজে সে খুব ছোট, সবাই তাকে খাতির করে থাকে। তার ওপর কথা বলার কারু যেন অধিকার নেই।

    আর ছোটবাবু দেখল, বেশ নিরিবিলি শান্তভাবে কাপ্তেনের ছেলেটা কাজ করে যাচ্ছে। আসলে ওর কাছে এটা কাজ না, খেলা। ছোটবাবু এটা দেখেই টের পেয়েছে। এবং তখনই মনে হল লম্বা চিমনি যেন আকাশ ছুঁতে চায়। তার নিচে, সাদা বয়লার স্যুট পরে নীল চোখের অতি মায়াবি মুখ সে ভেবে পায় না, কেন এই ছেলেকে সবাই খারাপ ভেবে থাকে। ওর মা নেই। মা না থাকলে মানুষের কি থাকে। ছোটবাবুর বেশ কষ্ট হচ্ছে। ছেলেটি লম্বা, অথচ বয়স কম, চোখ দেখলেই টের পাওয়া যায়, খুব নির্দোষ স্বভাবের মুখ। সে কারো দিকে বুঝি তাকায় না, না তাকিয়েই গুডমর্নিঙ বলে থাকে। এভাবেই জাহাজে যেন ছোটবাবু ওর মতো আর একজন দুঃখী মানুষকে সহসা আবিষ্কার করে ফেলল। সামনে একমডেসান ল্যাডার। কাপ্তানের ঘরে উঠে যাবার সিঁড়ি। নিচে বোধ হয় ছেলেটার থাকার ব্যবস্থা হয়েছে। টোপাস সকাল থেকেই চারপাশটা ভীষণ ভালভাবে সাফসোফ করছে। কাপ্তানের কেবিনের পাশে চার্ট-রুম। তারপর ব্রীজ। ব্রীজে দুটো কম্পাস। পাশে স্টিয়ারিং হুইল। সাদা রঙ ব্রীজের। দু’পাশে তার দুটো উইংস। কাপ্তান সেখানে পায়চারি করছেন অন্যমনস্কভাবে। সে ল্যাডারের আড়ালে দাঁড়িয়ে বুঝতে পারল ক্রমে সে এক ভীষণ উঁচু জায়গায় উঠে এসেছে। এখান থেকে নিচে জাহাজের সামনের হ্যাঁচ দুটো চোখে পড়ছে। বড় মাস্তুল চোখে পড়ছে। দড়ি-দড়া সব চারপাশে ওপরে নিচে ছড়িয়ে আছে। দুটো হ্যাচের মাঝখানে দুটো দুটো চারটে ডেরিক। তারপর বড় একটা আলাদা উইনচ। জাহাজের নোঙর ফেলার জন্যে রাখা হয়েছে। সামনে পতাকা উড়ছে। এ-ভাবে একটা জাহাজ আর তার মানুষজন চোখের ওপর ভেসে উঠলে, সে দেখল, পেছনে কে দাঁড়িয়ে তাঁকে ডাকছে—ছেলে আমার সঙ্গে আয়।

    মুখ ফেরালে সারেঙ দেখলেন, মাথায় মুখে কয়লার ধূলোতে ছেলেকে একবোরে চেনা যাচ্ছে না। এ সবে সারেঙের ঘাবড়াবার কথা না। বললেন, কোথায় ছিলি ছেলে? মাথাটা বাঁ-হাতে ঝেড়ে দিতে দিতে বললেন, মুখে মাথায়, এসব কয়লা লাগিয়েছিস?

    —জাহাজটা ঘুরে ঘুরে দেখছিলাম চাচা! স্টোক হোলডে ঢুকতে এমনটা হল।

    —আয় আমার সঙ্গে।

    ছোটবাবু সারেঙের সঙ্গে হাঁটতে থাকল।

    এনজিন সারেঙ যখন ছোটবাবুকে নিয়ে বয়দের কেবিন পার হয়ে বোট ডেক থেকে আপ ডেকে নেমে যাচ্ছেন তখনই জ্যাকের মনে হল, সাব না বলে কে যেন স্পষ্ট বলল স্যার। গুড মর্নিঙ কথাটা বেশ টেনে টেনে তার উচ্চারণ। জাহাজে একমাত্র অফিসাররা ওকে জ্যাক বলে ডাকে। যারা ক্রু তারা সবাই সাব, কিন্তু কে একজন বলে গেল স্যার, মনে হল স্যার বলে রসিকতা করে গেল।

    জ্যাক উঠে দাঁড়াল। ওর কোকড়ানো চুল গভীর নীল রঙের। চোখ কিছুটা উদাসীন মাঠে বরফ পড়ার মতো। নাক সুন্দর নরম, মসৃণ ঘাড় গলা, থুতনি আশ্চর্য ঢেউ খেলানো, আর গোটা মুখে গোলাপি আভা। বোধ হয় সদ্য দেশ থেকে আসার দরুন এমন দেখাচ্ছে। এবং দেখলেই বোঝা যায়, খুব ঘন নীল রঙের চুলের ভিতর ভারি মনোরম হয়ে আছে মুখখানি। জ্যাক দৌড়ে বোট-ডেক থেকে নেমে গেল।

    সূর্য তেমনি উঠে আসছে তিন নম্বর জেটির ও-পাশ থেকে। ক্রেনের ছায়াগুলো ক্রমে ছোট হয়ে আসছে। কে এমন বলে গেল, স্যার, তার কি স্যার বলার বয়স হয়েছে। সাব, বাংলা কথা জাহাজিরা বললে এটা সম্মানের বাবা এমন বলেছেন। সে সেই লোকটাকে খুঁজতে গিয়ে মনে হল, না অনর্থক খোঁজা। কাকে সে জিজ্ঞাসা করবে। এমনিতেই সে অনেক সময় খুব গুটিয়ে যায়, বাবাকে সব খুলে বলতে পারে না, তবু মাঝে মাঝে ভীষণ রেগে গেলে ওর কান্ড-জ্ঞান থাকে না। জাহাজে উঠেই সে ঝামেলা পাকালে বাবা খুব বিব্রত বোধ করবেন। ফিরে আসার সময়ে মনে হল, উইনচের তলায় কেউ ঢুকে গেছে! পা দুটো বের হয়ে আছে। উইনচের ভিতর থেকে পুরানো নাটবোল্টু টেনে টেনে খুলে আনছে। ফিফথ ঝুঁকে আছে ভিতরে। সে খুব উৎসাহ দিচ্ছে, আবার আবার। আরো জোরে আঃ লাগছে না!

    —এই তো ভাল করে লাগালাম স্যার।

    —না লাগে নি।

    —ফসকে যাচ্ছে স্যার। এবং মুখে তেলকালি লাগায় এখন আর ছোটবাবুকে আদৌ চেনা যাচ্ছে না। তবু ফানেলের নিচে সেই কোঁকড়ানো চুলের মুখ, ভারি সুন্দর এবং মুগ্ধতায় ভরা। কেন জানি ওর ভারি ইচ্ছে হচ্ছে ছেলেটির সঙ্গে বন্ধুত্ব হোক। সে তার ছেলেবেলাকার কবিতার কথা মনে করে, ফিফথকে বলল, আমি একটা কবিতা বলতে পারি স্যার।

    —মানে?

    —মানে স্যার এবার আটকে গেছে। দেখুন। বলে সে টান দিলে নাটটা আদৌ ঘুরল না। স্যার আপনি হ্যাঁচ্য দিন।

    —হ্যাঁচ্য মানে?

    —এই যে বলে না, বলুন স্যার, জ্যাক এন্ড জিল হেঁইয়; ওয়েন্ট আপ দি হিল—হেঁইয়। এই দেখুন ঘুরছে। আবার সে রেঞ্চ এঁটে বলল, জ্যাক এন্ড জিল ডাউন, হেঁইয়। ব্রেক হিজ ক্রাউন, হেঁইয়। এবার নাটটা একেবারে ঢিলে করে গা ঝাড়া দিয়ে বের হয়ে পেছনে তাকাতেই একেবারে কাঠ। জ্যাক দাঁড়িয়ে আছে। সব শুনেছে। ওর মুখটা এমনিতেই চেনা যাচ্ছিল না, জ্যাককে দেখে মুখটা আরও গোলমেলে হয়ে গেল।

    জ্যাক ওর এমন কাতর মুখ দেখে হা-হা করে হেসে উঠল। হেসেই সে দু লাফে বোট-ডেকে উঠে গেল। ছোপ ছোপ কালির ভেতর ছোটবাবুর মুখ নরম দাঁড়ি কিছুটা বুড়ো ক্লাউনের মতো। এমন জোরে হাসায় ছোটবাবুও হি-হি করে হেসে দিল। পরে একেবারে শক্ত হয়ে গেল। ফের ভিতরে ঢুকে বলল, স্যার আমাদের জাহাজ কোথায় যাবে?

    —কোথায় যাবে এখনও ঠিক হয় নি।

    —শুনেছি বুনোসাইরিস যাবে।

    —বুয়েনস-এয়ার্স যাবার কথা আমরাও শুনেছি। তবে বোর্ডে তো কিছু দেয় নি এখনও।

    —স্যার, আমি জ্যাক এন্ড জিল বললাম বলে ছোট স্যার রাগ করে নি তো?

    —সে তো আমি জানি না।

    —আচ্ছা স্যার আমি না জেনে দোষ করেছি। কাপ্তান ডেকে পাঠালে এমন বললে নিশ্চয়ই ক্ষমা করে দেবেন।

    —তা দিতে পারেন। আসলে ছোটবাবুর ভিতরটা খচ খচ করছে। এদিকের উইনচ চলছে না কারণ, পুরানো জং-ধরা মেসিন। বাইরে ক্রেন থেকে বড় বড় পাটের গাঁট নামানো হচ্ছে ফল্কার ভেতর। হারিয়া হাফিজ—কেবল ক্রমাগত এমন সব শব্দ গোটা ডেকময়। সব পাটের গাঁট বোঝাই হচ্ছে। এগুলো কোথায় যাবে—ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। এজেন্ট অফিস থেকে কোনও খবর দিতে পারে, কাপ্তান অথবা বড় মালোম খুলে কিছু বলছেন না। তবু আন্দাজে ধরে নেওয়া যায়। জাহাজ কোথায় যাবে ধরে নেওয়া যায়—যাবে বুনোসাইরিস।

    সে জাহাজে উঠে উঠেই এটা যে কি করে ফেলল। উইনচের তলায় সে এখন চিত হয়ে শুয়ে আছে। ওর পা দুটো ডেকের ওপর সাঁড়াশির মতো এবং সাদা পা দুটোর মোজা কালো রঙের। পুরানো হাফ-সোল মেরামত করা জুতোর ফাঁক দিয়ে বুড়ো আঙুল বের হয়ে আছে। এবং এখন যেন এই ফাইবার অর্থাৎ ফিফথ এনজিনিয়ারকে খুশি রাখা একান্ত দরকার। ফাইবার কিছুতেই উইনচের নিচে ঢুকতে চাইছে না। কারণ, এত বড় শরীরটা তার ঢুকবে না। অবাঙ্গালীর মতো লম্বা এবং ঘাড়ে- গর্দানে খুব শক্ত। বেশ যখন ছেলেটা কাজ চালিয়ে যেতে পারছে, তখন নীচে না ঢুকে বরং সাফসোফ থেকে সকালের টিফিনটা সেরে নেওয়া যাবে। পরে পরে হয়ে গেলে মন্দ কি! আসলে সারেঙের কাছে ফাইবার একজন হেলপার চেয়েছে। এ সব কাজ ফাইবারেরই করার কথা। ছোটবাবু শুধু এটা- ওটা এগিয়ে দেবে। নাট বোল্ট তেলে ধুয়ে দেবে, বাটালি হাঁতুড়ি এগিয়ে দেবার কথা। অথচ ফাইবার ওকে দিয়েই সব করিয়ে নিচ্ছে। সে এটা-ওটা ছোটবাবুকে এগিয়ে দিচ্ছিল।

    ছোটবাবুর এসব কাজ জানা। ট্রেনিং শিপে সে এমন সব কাজ করে এসেছে। সে এখন অন্য কিছু ভাবতে পারছে না। ফাইবার বাঙ্গালী সাহেব। বাঙ্গালী সাহেবকে হাত না করতে পারলে তার চলবে না। সে তো আর ছোট-স্যারকে রাগাবার জন্য এমন বলে নি। সে তো কেমন সুন্দর সব ছবির দৃশ্য ভাবতে ভাবতে ছেলেবেলাকার একটা কবিতা মনে করতে পেরেছে। জ্যাক এন্ড জিল বলে হেঁইয় দিতে গিয়ে যত গন্ডগোল। ফাইবার হাতে থাকলে একজন অন্তত তার সাক্ষী থাকবে।

    খাবার টেবিলে ছোটবাবুকে খুব বিমর্ষ দেখাচ্ছিল। ওরা তিনজন মিলে এক বীশু। মৈত্র, ছোটবাবু আর অমিয়। মৈত্র বলে দিয়েছে, বিফ যেন দেওয়া না হয় ওদের। সারেঙ বলেছে, আজ তো মটন দিয়েছে, কাল কি দেবে বলতে পারি না।

    ছোটবাবু খেতে বসে বিফ কি মটন দেখছে না। অথবা ওদের কথাবার্তা বেমালুম শুনছে না। সে অন্যমনস্কভাবে খাচ্ছে। সে খুব ভীতু স্বভাবের মানুষ। সে হেসে দিয়েছিল, ছোট-স্যার হেসেছেন বলে। মুখ গোমড়া রাখলে যদি আরও রেগে যায়। কিন্তু হেসে কি লাভ হল। ছোট স্যার তো তখন লাইফ বোটের ও পাশে চলে গেছে। সে হাসল কি কাঁদল কে দেখেছে।

    স্নান করে ছোটবাবু একটা সাদা প্যান্ট সাদা হাফ-সার্ট গায়ে দিয়েছে। সারা দিন সে কাজ করেছে ফাইবারের সঙ্গে। বারোটায় তাড়াহুড়ো করে ভাত ডাল খেয়েছে, বাঁধাকপি ভাজা খেয়েছে। মাংস খায়নি। এখনও জাহাজের বাসি মাংস শেষ হয়নি। যখন সকালের দিকে ভান্ডারী মাংস কাটছিল সে ভীষণ দৃশ্য, সাদা হয়ে গেছে, বরফ ঘরে মাংস দীর্ঘদিন থাকলে যা হয়।

    কাল পরশু রসদ উঠবে। মৈত্র এ-নিয়ে একটা ঝগড়া বাধিয়ে পর্যন্ত দিয়েছিল, সারেঙকে শাসিয়েছে—মটন যেন রসদে বেশী করে নেওয়া হয়। আমরা যারা হিন্দু আছি তাদের কথা ভাববেন। অথচ মৈত্র সব খায়। সে বিফ মটন মানে না। তার কাছে দুই সমান। তবে সে এমন করছে কেন! ওরা দুজন বাঙালি হিন্দু জাহাজি নতুন উঠেছে বলে। ডেকে যে দুজন উঠেছে, একজনের নাম বঙ্ক, অর্থাৎ বন্ধুবিহারী দেবনাথ। অন্যজনের নাম মজুমদার, অনিমেষ মজুমদার। মৈত্র বোধ হয় এদের নিয়ে জাহাজে একটা দল করতে চায়। আর্টিকেলে কি আছে না আছে, সে সেটা শুনতে চাইছে না।

    মৈত্র মাংসের হাড়িটা ছোটবাবুর দিকে এগিয়ে দিল। —যা লাগে নে।

    ছোটবাবু বলল, মৈত্রদা আমার মাংস খেতে ইচ্ছে হচ্ছে না।

    অমিয় বলল, আমারও।

    —ওটা হলে তো চলবে না। মাংস না খেলে জাহাজ চালাবে কি করে। আবার এটা কয়লার জাহাজ। তারপর আবার জাহাজে স্টিম ঠিক থাকে না। সমুদ্রে পড়লে ঝড় উঠলে বুঝবে, বুঝবে। খাও খাও। পুরুষ মানুষ মাংস খাবে না, সে কি রকম কথা।

    ছোটবাবু বলল, মাংসের আসলে যা চেহারা দেখেছি।

    —পোকা দ্যাখো নি তো।

    —পোকা?

    —হ্যাঁ-হ্যাঁ পোকা।

    ছোটবাবুর সঙ্গে সঙ্গে ওক উঠে এল। সে সোজা দৌড়ে গেল বাথরুমে। মৈত্র শুনতে পেল, ছোটবাবু বমি করছে।

    —এ হলেই হয়েছে! সে তাড়াতাড়ি ভাত ফেলে ছুটে গেল। তুই ছোটবাবু এ-কথায় বমি করে দিলি! জাহাজে কি ট্রেনিং নিয়েছিস তবে। কচু ট্রেনিং! ওঠ। চল খাবি। তোকে জোর করে মাংস গেলাতে হবে, বমি তোর বের করে দিচ্ছি।

    এনজিন-সারেঙ মেসরুমের বাইরে ছিলেন। জোরজার করে ছোটবাবুকে মাংস খাওয়ানো হবে বলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। ছোটবাবুর মুখে রা নেই। এনজিন-সারেঙ মেসরুমে ঢুকে বললেন; মৈত্রমশায় কেন জোরজার করছেন। আস্তে আস্তে সব সয়ে যাবে। জোরজার করলে এই ভীতু ছেলেটা আরও ভয় পেয়ে যাবে।

    মৈত্র, জাহাজের বড় টিন্ডাল। মৈত্রকে সারেঙ যথেষ্ট সমীহ করে কথা বলছেন এবং মৈত্র এ জাহাজের একজন দায়িত্বশীল মানুষ বুঝতে পেরে ছোটবাবু বলল, তাই মৈত্রদা। সময় ঠিক করে দেবে।

    তবু মৈত্র কেমন গুম হয়ে বসে থাকল।—চল নিচে। ওরা নিচে নেমে গেলে দেখল ডেকজাহাজি বন্ধু অনিমেষ ওদের বাংকে বসে রয়েছে। অমিয়, ছোটবাবুর থালা গ্লাস ধুয়ে আনছে। ও এখনও নামে নি।

    মৈত্র ভিতরে ঢুকেই গজগজ করছিল—হয়েছে বেশ, জাহাজে যে কেন আসা। মৈত্র টান মেরে লকার খুলে ফেলল, জামা কাপড় টেনে বের করছে। এ সব দেখে ওরা ঠিক বুঝল না মৈত্র এখন কি করতে চায়। মৈত্র তারপর একটি টিন বের করে বাংকের নিচে কি খুঁজছে। অমিয় এসে গেলে, ওর হাত থেকে একটা প্লেট টেনে তোয়ালে দিয়ে বেশ করে মুছল। অমিয়র সেই টিনটা। ওতে মুড়ি মোয়া নাড় আছে। গতকাল ওরা দুটো একটা করে খেয়েছে। অমিয় বাউন্ডুলে স্বভাবের ছেলে। সে দুটো একটার বেশি নিজে খায়নি। কিন্তু এখন যেন মৈত্র নিজের টিন থেকে মুড়ি বের করে দিচ্ছে। একবার অমিয়র দিকে তাকাচ্ছে না পর্যন্ত।

    ছোটবাবুর মনে হল এটা ঠিক হচ্ছে না। অমিয়কে ওর মা সফরে যাচ্ছে ছেলে, কবে ফিরবে ঠিক কি, পূজাপার্বণে ছেলের কথা মনে হবে, ছেলের জন্য বেশ যত্ন করে মোয়া, নারকেলের নাড়, তিলের তক্তি সব কত যত্ন করে সঙ্গে দিয়েছে। এ-ভাবে শেষ করে দেওয়া ঠিক না। সে বলল, মৈত্রদা আমার কিছু খেতে ইচ্ছা হচ্ছে না।

    —খেতে ইচ্ছে হচ্ছে না কেন? সারাদিন খেটে তো চোখ কোথায় গেছে! মুখ চোখ তো একেবারে ঈশ্বরের পুত্রের মতো করে রেখেছ। কে যে তোমাকে জাহাজে আসার ছাড়পত্র দিলো।

    —সেই তো মৈত্রদা।

    অমিয় বলল, খা না। কিছু তো একটা খেতে হবে।

    মৈত্র ফের বলল, আরে জাহাজে বাবা মা কেউ কারো আসে না। আমরা নিজেরাই নিজেদের বাবা মা। সংকোচের কিছু নেই।

    ছোটবাবু বলল, রাখো। খাচ্ছি।

    তখন পোর্ট-হোল দিয়ে জেটির ও-পাশের ক্রেন দেখা যাচ্ছে। বন্দরের সব মানুষেরা ঘরে ফিরে যাচ্ছে। একটা জাহাজ ঢুকছে লকগেট দিয়ে। চোঙ মুখে পাইলট দু’পাশের মানুষদের দড়িদড়া ঢিলে দেবার অথবা টেনে ধরার নির্দেশ দিচ্ছে। বেশ সুন্দর উজ্জ্বল রোদ। সূর্য গঙ্গার ও-পাশে পাটকলের চিমনি পার হয়ে নারকেল গাছের ছায়ায় নেমে যাচ্ছে। সে কেমন অনিচ্ছার সঙ্গে খাচ্ছিল। ওকে ঘিরে ওরা চারজন নানারকম গল্প চালিয়ে যাচ্ছে। আর ক’দিন জাহাজ আছে, আর ক’দিন এ-ভাবে থেকে একদিন জাহাজ গিয়ে সমুদ্রে পড়বে। ছোটবাবু তখন শুধু ভাবছিল জ্যাক যদি বাবাকে বলে দেয়, যদি বলে দেয়, আমাকে বাবা ঠাট্টা করেছে এবং সে এ-ভাবে একসময় সেজেগুজে গিয়ে ওপরে দাঁড়াল। দেখল, ডেকের পাশে মাস্তুলের নিচে জাহাজিরা বসে তাস খেলছে। সে কেবল ভাবছিল, কখন সারেঙ ডাকবে, ছেলে তোকে ডাইনিংরুমে বাড়িয়ালা ডেকেছে। এবং এ-ভাবেই ক্রমে রাত্রি বাড়ে।

    আর অজস্র নক্ষত্র আকাশে। চারপাশে জাহাজ, জেটির লাল নীল আলো। সেই পরিচিত আবহাওয়া। ঠিক সে যেমন রেলিঙে দাঁড়িয়ে ভদ্রা জাহাজে কত কিছু ভাবত, আজও তেমনি এক সময় ভাবতে গিয়ে দেখল বোট-ডেকের ও-পাশে জ্যাক দাঁড়িয়ে আছে। ওর মুখে নীল রঙের আলো। উইংসের আলো মুখে বেশ একটা মহিমময় স্নিগ্ধ সুষমা সৃষ্টি করেছে। তার কেন জানি নিমেষে সব ভয় কেটে গেল।

    এবং এ-সবই কেবল বিকেলে সবুজ ঘাস মাড়িয়ে যাবার মতো। সে যে কতদিন কোনো মাঠের ঘাসের ওপর ধীরে ধীরে হেঁটে যায়নি। তার ভারি ইচ্ছে কাল বিকেলে যে চলে যাবে বড় মাঠে। একা একা হেঁটে সেই ফোর্ট উইলিয়ামের রেমপার্টে বসে থাকবে। যে ক’দিন জাহাজ এ বন্দরে আছে মাঠের ঘাসে বসে থাকবে। একা থাকলে সে নিজের সঙ্গে অজস্র কথা বলতে পারে। তার তখন কোনও কষ্ট থাকে না।

    জাহাজে মাল বোঝাই প্রায় শেষ। সবই চটের গাঁট। সামনে পেছনে চারটা ফল্কাতেই পাটের গাঁট আছে। উপরে রয়েছে কিছু চায়ের পেটি। এবং জাহাজ ছাড়ার আগের দিন এল বড় বড় খাঁচায় সব সারস পাখি। পাখিদের ডেকের ওপরই রাখা হল। মোটামুটি বোঝাই শেষ। ক্রেনগুলো সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। চব্বিশ ঘন্টায় ফ্ল্যাগ উড়ছে। সকালে জ্যাক পাখিদের খাবার দিচ্ছে। জ্যাক বেশ একটা ভাল কাজ পেয়ে চুপচাপ। সে আর কারো দিকে তাকাচ্ছে না। ছোটবাবু বেশ একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে পেরেছে। সে আর কখনও কাছে যায় না। জ্যাক পোর্ট-সাইড ধরে হাঁটলে, ছোটবাবু যায় স্টাবোর্ড সাইড ধরে। মুখোমুখি হতে ছোটবাবু ভীষণ ভয় পাচ্ছে।

    সারেঙকে ছোটবাবু সব খুলে বলেছিল। সারেঙ জবাবে বলেছে, খুব বেঁচে গেছ। ওর নালিশ দেবার স্বভাব না। সে কখনও বাপকে লাগায় না। এমন অতিষ্ঠ করে তুলবে, তুমিই শেষ পর্যন্ত বাড়িয়ালার কাছে ছুটবে। যতটা পার এড়িয়ে যাবে।

    সে খুবই এড়িয়ে যাচ্ছে। যদিও জ্যাকের মুখ ভারি সুন্দর, জ্যাককে কখনই খারাপ লাগার কথা না, তবু ছোটবাবু আর তাকায় না। বরং ছোটবাবু দেখল, জাহাজ লকগেট দিয়ে নামছে। বড় মিস্ত্রি, মেজ মিস্ত্রি সবাই বোট-ডেকে দাঁড়িয়ে আছে। জ্যাক বাইনোকুলারে কিছু দেখছে।

    ছোটবাবু জানে, বাইনোকুলারটা মেজ-মালোমের। তিনি এখন কাজে ব্যস্ত। জাহাজ নদীতে না নামা পর্যন্ত তিনি অবসর পাবেন না। সে জাহাজে উঠেই মেজ-মালোমকে দেখেছে মাঝে মাঝে তিনি বসে থাকেন বোট-ডেকে। চোখে থাকে বাইনোকুলার। অনেক দূরের কিছু দেখার আশা। খুব কাছে বড় বড় হয়ে দেখা দিলে বুঝি সব কিছুর মানে অন্যরকম তাঁর কাছে।

    জাহাজের ওয়াচ আরম্ভ হয়ে গেছে। ছোটবাবুকে কোনও ওয়াচে রাখা হয়নি। এটা সারেঙ নিজেই ঠিক করেছেন। ওয়াচ ভাগের দায়িত্ব তাঁর। জাহাজে দুজন কোলবয় ফালতু। পাঁচ নম্বর অথবা চার নম্বর মিস্ত্রির সঙ্গে হেলপার হিসাবে কাজ করার কথা ওদের। ছোটবাবুকে সেজন্য ফালতু রাখা হয়েছে।

    জাহাজ যাচ্ছে কলম্বোতে। বোর্ডে লেখা রয়েছে এমন। তারপর জাহাজ যাবে লরেঞ্জোমরকুইস এবং পরে ডারবান কেপ-টাউন হয়ে সোজা দক্ষিণ আমেরিকার সেন্টিসে। তারপর বুয়েনস-এয়ার্স। এই পর্যন্ত বোর্ডে লেখা রয়েছে। তারপর জাহাজ কোথায় যাবে, কেউ জানে না। এমন কি কাপ্তান পর্যন্ত বলতে পারবেন না। আর ব্যাঙ্ক লাইনের সফর বড় বেশি লম্বা সফর। কবে জাহাজ ফিরবে হোমে কেউ জানে না। আদৌ ফিরবে কি না, কারণ সমুদ্রের মায়ায় ভীষণভাবে মানুষেরা পড়ে যায়। তখন বুঝি পৃথিবীতে মাটি গাছপালা পাখি বলে কিছু আছে মনে থাকে না।

    এবং এভাবেই সংসারে এক অতীব ইচ্ছা কখনও কখনও মানুষকে ভীষণ পাগল করে দেয়। কাপ্তানের পায়চারি দেখলে সেটা টের পাওয়া যায়। তিনি অন্যমনস্কভাবে হেঁটে যাচ্ছেন কেবল। তিনি কেবল জানেন, জাহাজের দূর্বলতম স্থান কোনটা। একটার পর একটা মেরামত করা হচ্ছে আবার অন্য জায়গায় ফুটোফাটা হয়ে যায়। বালকেডে নানারকম হিজিবিজি লোহার পাত লাগানো। কোনোটা সরে গেলে অথবা কোন কারণে ফুটোফাটা হয়ে গেলে কি হবে তিনি জানেন। এসব জানেন বলেই ব্যালেস্টের ওপর খুব নজর। একটা নয়, দুটো ব্যালেস্ট রেখেছেন। এবং এ জাহাজেই আছে একমাত্র উত্তরাধিকার তাঁর। তিনি তাকে নিয়ে উঠেছেন। তাঁর যে ভারি সখ ছিল—অন্তত একটা ছেলে। ছেলে না হলে এমন যে একটা পৃথিবী আছে, যার তিনভাগ জল, একভাগ স্থল, সমুদ্রে বের না হলে যা টের পাওয়া যায় না এবং সমুদ্রের এক ভারি আশ্চর্য টান আছে। সমুদ্রে তিনি জাহাজ নিয়ে প্রায় যাবতীয় দেশ এবং সমুদ্রের দ্বীপ, গাছপালা, ঝড় টাইফুন, তিমি মাছ, ডলফিনের ঝাঁক অথবা সিন্ধুঘোটক দেখে বেড়িয়েছেন। তাঁর মতো সেই উত্তরাধিকারও পুরুষানুক্রমে সেই ধারা টেনে নিয়ে যাবে এবং এভাবেই তিনি ভেবে থাকেন। মেয়েটাকে ছেলে বানিয়ে রাখেন। ছেলেটাকে সঙ্গে নেন। আসলে ওসব বলতে হয় চিফকে। –দ্যাখো নদী দ্যাখো। এর নাম কলকাতা বন্দর, হুগলী নদীর তীরে অবস্থিত বন্দর। তোমাদের পূর্বপুরুষরা এ বন্দরে প্রথম কলের জাহাজ নিয়ে এসেছিল। তুমি এসব দেখে রাখো।

    বনি বাপের পাশে দাঁড়িয়ে চোখে দূরবীন লাগিয়ে সব দেখছে। সে স্থির। গরমকাল। সে গলস্‌ পরেছে চোখে। যখন দূরবীন পরছে না, তখন গগল্স্ পরে থাকছে। এটা গ্রীষ্মের বিকেল, এবং সারা দিনের প্রচণ্ড উত্তাপে জাহাজ-ডেকে দাঁড়ানো যাচ্ছে না। বোট-ডেক কাঠের। ডেক-জাহাজিরা জল মারছে এখন। জাহাজ বেশ দুপাশে বয়া রেখে এগিয়ে যাচ্ছে। এনজিনে খুব একটা স্টিমের দরকার হচ্ছে না। দুটো বাঙ্কারে দুজন কোলবয় একটু ফাঁক পেয়ে বিড়ি খাচ্ছে। এবং গুহার মতো কিছু সাইড বাঙ্কার থেকে সোজা স্টোক-হোলডে নেমে গেছে। অথবা সুট বলা যেতে পারে। কয়লা হড়হড় করে নেমে গেলে আবার সুট ভরে ফেলতে হবে। ক্রস-বাঙ্কার খোলা আছে। বাংকারে কয়লা ছাদ পর্যন্ত বোঝাই। দরজা খুলে বেলচা মেরে দিলেই হড়হড় করে নেমে আসে। তিনজন ফায়ারম্যান উইণ্ডসেলের নিচে দাঁড়িয়ে স্টিম দেখছে। খুব একটা স্টিম লাগছে না। একশো আশি হলেই হয়ে যাচ্ছে। অল্প কয়লা খাচ্ছে। এখনও স্টোক-হোলড তেমন তেতে যাচ্ছে না। বালকেডগুলো হাত দিয়ে ছোঁয়া যাচ্ছে। আসলে কাজ আরম্ভ এখনও ঠিকমতো হয়নি। মৈত্রের ওয়াচ। সে মাঝে মাঝে হেঁটে যাচ্ছে। ওর নীল রঙের টুপি, হাতে দস্তানা, পায়ে পুরানো বুট জুতো। সে মাঝে মাঝে ফার্নেস-ডোর খুলে দেখছে, কোনটায় কয়লা মেরে দিতে হবে, কোনটায় র‍্যাগ মেরে ছাই ফেলে দিতে হবে, অথবা কোনটাতে স্লাইস মেরে কয়লার চাঙ টুকরো টুকরো করে দিতে হবে। সে নিজেই দেখে যায়। কখনও এয়ার বালব ছেড়ে দেয়। মাঝে মাঝে এনজিনরুম থেকে গ্রীজার ছুটে আসে। মেজ-মিস্ত্রি ছুটে আসেন। কম, কম স্টিম মাংতা। আসলে জাহাজটা যাচ্ছে ভীষণ ধীরে ধীরে। কলকাতা বন্দরকে ভারি অবিশ্বাস সকলের।

    তখন ছোটবাবু দেখল বেশ নিরিবিলি একজন মানুষ বোট-ডেকে ডেক-চেয়ারে চুপচাপ বসে আছে। পাশে মেস-রুম-বয় কফি রেখে গেছে। একটা ছোট টিপয়ে দুটো বই। বইয়ের ওপর আপেল একটা। ছোটবাবু তখন স্নান সেরে ডেক ধরে উঠে যাচ্ছে। অমিয় এবং মৈত্রের ওয়াচ আছে। ওরা চারটার ওয়াচ শেষ করে উঠে এসেছে। ওদের স্নান সারতে সময় লাগবে। এসময় বাথরুমে ভীষণ ভিড়। সে একটু পায়চারি করবে বলে ডেক ধরে যাচ্ছে। আসলে ওর ফোকসালে বসে থাকতে ভাল লাগছে না। কত কথা মনে হচ্ছে। এখনও সে এ-দেশের গাছপালা, বাড়িঘর, কলের চিমনি এবং জেলেডিঙ্গি অথবা জাহাজ ঢুকছে খাড়িতে এসব দেখতে পাচ্ছে। এখনও সে দেখতে পাচ্ছে দূ’পাশে কি সুন্দর নারকেল গাছ, মানুষের ছায়া। ঘুরে ফিরে মা, ছোট ভাইবোন, বাবার মুখ নদীর জলে ভেসে উঠছে।

    মেজ-মালোমের পাশ কাটিয়ে সে নেমে যাচ্ছিল। আসলে সে চুরি করে মেজ-মালোমের দূরবীনটা দেখতে চাইছে। ওর ভারি সখ দূরবীন দিয়ে দু’পাশের গাছপালা পাখি দেখে। কিন্তু সে তো সবচেয়ে ছোট কাজ করে। সে যদিও জাহাজিদের ভিতর সবচেয়ে পড়াশোনায়ালা আদমি, এটা জাহাজে সারেঙই প্রচার করে দিয়েছে। সবাই খতটত লেখাবার জন্য আসবে সেটাও ঠিক। এবং সুন্দর ইংরেজি বলতে পারে বলে ফাইবারও বেশ পছন্দ করে ওকে কাজের সময়। চার নম্বর মিস্ত্রি দেখেছে; ছেলেটিকে কোনো কাজ একবার বললেই বুঝে নেয়। বার বার প্রশ্ন করে বিরক্ত করে না।

    মেজ-মালোমের মনে হচ্ছিল, এই যে ছেলেটি যাচ্ছে জাহাজে, যার চোখ ভারি আশ্চর্য মিষ্টি, মুখে গোঁফের রেখা, গালে দাড়ি মাত্র কালো হয়ে উঠেছে এবং প্রায় যেন লম্বা গাছের মতো শান্ত নিরীহ, কিছু বলতে চায় না, জাহাজে উঠেই চুপ মেরে গেছে তাকে একবার ডেকে বললে হয়, তুমি বাবু জাহাজে উঠেই গুম মেরে গেলে কেন? তারপরই মেজ-মালোম ডাকল, হেই।

    সে কাছে গিয়ে খুব সুন্দর এবং স্পষ্ট ইংরেজিতে বলল, আমাকে ডাকছেন স্যার?

    —হেঁ।

    সে ছুটে গিয়ে আরও সামনে দাঁড়াল।

    —এসব জায়গার কি নাম?

    —ফলতা হবে। তবে আমি স্যার ঠিক বলতে পারব না।

    —তোমার দেশ, তুমি জান না?

    —এখানে তো কখনও আসিনি স্যার।

    —কিচ্ছু নেই।

    —ছোটবাবু বলল, না স্যার, গাছ-পালা, বাড়ি-ঘর, গ্রাম, মাঠ সব আছে।

    —না, কিচ্ছু নেই।

    —না স্যার, সব আছে।

    —কিছু নেই। তুমি দ্যাখো, কিছু দেখা যায় কিনা, বলেই তিনি কফি খেতে থাকলেন।

    ছোটবাবু তাড়াতাড়ি দূরবীনটা চোখে লাগালে দেখতে পেল, বেশ সব বড় বড় কলের চিমনি। কি যে বড়! আকাশে উঠে গেছে যেন একটা নারকেল গাছ। তারপর একটা বাঁধানো ঘাট, মানুষজন নেই, চিতায় আগুন-টাগুন আছে। সে দেখছে আর বলে যাচ্ছে। সব আছে স্যার। মানুষের যা যা দরকার সব আছে স্যার।

    —আসল জিনিষটা নেই। তিনি আপেল খাচ্ছেন কামড়ে। তার গালে সামান্য দাঁড়ি মুখে প্রবীণতার ছাপ। চোখ দুটো খুব তাজা। বেশ খচমচ করে খেয়ে যাচ্ছেন। ভালো করে দ্যাখো। আমার দেখতে দেখতে চোখ টাটাচ্ছে।

    ছোটবাবু দেখছিল সব। সে বলতে বলতে মাঝে মাঝে অন্যমনস্ক হয়ে যাচ্ছে। কেমন ছায়াছবির মতো সব সরে যাচ্ছে।

    মেজ-মালোম বললেন, সব বললে হে, কিন্তু একটা কথা বললে না।

    —কি স্যার?

    —ওম্যান! ওম্যানের কথা বললে না।

    —তা স্যার দেখলাম নাতো।

    —তাহলে তুমি বলছ মানুষের জন্য যা দরকার সব আছে?

    —না স্যার ঠিক বলিনি। ছোটবাবু কি যে ফ্যাসাদে পড়ে গেল। সে মুখ খুব কাঁচুমাচু করে রেখেছে।

    —মানুষের জন্য যা যা দরকার সব আছে শুধু আসল জিনিসটাই নেই জাহাজে। বুঝবে ঠ্যালা। সমুদ্রযাত্রা কাকে বলে বুঝবে। বলেই সে থু করে আপেলের বোঁটাটা মুখ থেকে ফেলে দিল।—এজন্য বসে থাকি। বসে থাকি আর ভাবি, বেশ দিনকাল কেটে গেল। জীবনের সবটাই জাহাজে কেটে গেল। আসল জিনিসটাই মাঝে মাঝে কেমন জীবন থেকে হারিয়ে যায়। খুঁজি। খুঁজে যখন পাই তখন বন্দর থেকে জাহাজ ছেড়ে দেয়।

    ছোটবাবুর ভারি মজা লাগছিল। বেশ মানুষটা। সে পরে আছে সাদা প্যান্ট গা-খালি। গায়ের রং শঙ্খের মতো সাদা অথবা মানুষের চামড়া তুলে নিলে যে রং হয়—তেমনি সাদা লালে মিলে এক আশ্চর্য কঠিন রং এবং গরমে পুড়ে কেমন ফোস্কা পড়ার মতো। পিঠের ওপরে ঠিক কাঁধের নিচে ঘা। কিছু মলম-টলম মাখানো।

    এটা হয়। যারা শীতের দেশের মানুষ, তাদের এই গরমে রোদে ঘোরাঘুরি করলে ফোসকা পড়ে যায়। মানুষটার কোন কষ্ট হচ্ছে বোঝাই যায় না। বেশ শুনে যাচ্ছে। তারপর? —জাহাজ যাচ্ছে। জল কেটে জাহাজ যাচ্ছে। আর বাতাস কেটে ছায়াছবির মতো সব পার হয়ে যখন ছোটবাবু দেখল সূর্য অস্ত যাবার মুখে তখন মেজ ওঠে বললে, নসিব খারাপ। সে দুটো একটা যে বাংলা জানে ছোটবাবুকে এমন বলে যেন সমঝে দিতে চাইল।—নো ওম্যান। ঠোঁট উল্টে সিঁড়ি ভেঙ্গে নিচে তড়তড় করে নেমে গেল। যেন চোখের ওপর থেকে ভোজবাজির মতো অদৃশ্য হয়ে গেল মানুষটা।

    সে একা দাঁড়িয়ে থাকল। উইংসে মাস্তুলে ডেরিকে, কেবিনে কেবিনে সব আলো জ্বলছে, লাল নীল রঙের আলো। ছোটখাটো একটা যেন শহর নিয়ে ছোটবাবু নদী ধরে সমুদ্রে নেমে যাচ্ছে। এনজিনের একটানা শব্দ উঠে আসছিল। সমস্ত আকাশ জুড়ে নক্ষত্রের যে নামটাম মুখস্থ করে রেখেছিল সে সব মনে করার চেষ্টা করল। কবে একবার একটা বিদেশী ছবিতে কোনও ধর্মীয় সঙ্গীতের সময় সে শুনেছিল এক আশ্চর্য সিমফনি। নির্জনতা, একাকীত্ব সে সিমফনির সুরে সুরে ভরা। তারপর মনে হল, এইসব নক্ষত্র দেখতে দেখতে মনে হল, সে ভীষণ একা। ভীষণ সে অসহায়। সে কোথায় যাচ্ছে জানে না, কোথায় এর শেষ জানে না, কবে ঘরে ফিরবে জানে না। এমন নিরুদ্দেশে যাত্রা মানুষের হয় তার জানা নেই। কে যেন বলেছিল এ-বংশের একজন না একজন নিরুদ্দেশে যাত্রা করে থাকে। তারা কেউ আর ফিরে আসে না। তুমি আমার জেনারেশনে সেই মানুষ ছোটবাবু। তুমি বোধহয় ফিরে আসছ না।

    মনে হল তখন কেউ পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে। সে দেখল, মৈত্রদা।—কিরে মন খারাপ! দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছিস বলে মন খারাপ। মৈত্রদা না এলে সে সত্যি ভীষণ যেন এখন ভয় পেয়ে যেত।

    ছোটবাবু ঘুরে দাঁড়াল।

    —তোর এরকম হবার কথা না তো। মন খারাপ হবে আমাদের। বিয়ে করেছি। বৌ থাকল ঘরে। আমি ভেসে গেলাম সমুদ্রে। কিছু একটা হলেও কিছু করার থাকবে না। ছুটে আসতে পারব না। কত সব চিন্তা। ভাবলে ঘুম আসে না।—আয়, একা একা থাকবি না। জাহাজে একা একা থাকা খুব খারাপ। গল্পটল্প করে সব ভুলে থাকবি।

    —এখানে আমি আছি কে বলল তোমাকে?

    —আমরা জানি কে কোথায় থাকতে পারে। বলে হাসল। তুমি যে বোট-ডেকে থাকবে আমরা জানতাম। তোমার খুব যে ইচ্ছা কাপ্তানের ছেলেটার সঙ্গে বন্ধুত্ব হোক সেটা আমরা বুঝি!

    —না মৈত্রদা। সত্যি তা না। এখান থেকে চারপাশটা স্পষ্ট দেখা যায়। এখানে মানুষজন কম থাকে, এখানে মেজ-মালোম দূরবীন নিয়ে বসেছিলেন। আমার ভারি সখ ছিল দূরবীনে পাড়ের গাছপালা দেখি।

    —বেশ করেছ। এখন এস। লক্ষ্মী ছেলেটির মতো খেয়ে নাও। কাল সকালে সমুদ্রে পড়ব। তখন আর ঠিকমতো খেতে পারবে না। জাহাজে পিচিঙ আরম্ভ হয়ে যাবে।

    মৈত্র এভাবে কখনও ছোটকে তুই তুকারি করে কখনও তোমার বলে। এভাবে সে-রাতে ছোটবাবু বেশ পেট ভরে খেল। মনে হল জাহাজে খুব একটা পরিশ্রমের কাজ থাকে না। যা শুনেছে তা, এমন কি ভীতিকর সে বুঝছে না। যদিও সমুদ্রে জাহাজ পড়বে কাল সকালে। তিন জোয়ারে জাহাজ সমুদ্রে গিয়ে পড়বে। ফলতার কাছে ওদের একবার নোঙর ফেলতে হয়েছে, রাতে এক জায়গায়, সকালে সমুদ্র দেখতে কেমন না জানি হবে।

    ভোরের দিকে ঘুম ভাঙলে মনে হল জাহাজটা একেবারে থেমে গেছে। বোধহয় নোঙর ফেলেছে। ছোটবাবু ওপরে উঠে এল। বা বেশ। সে চিনতেই পারছে না। পাইলট নেমে যাচ্ছে জাহাজ থেকে। ওপরে অজস্র পাখি। বড় বড় পাখি। যেন কি করে টের পেয়েছে একটা পুরানো জাহাজ যাচ্ছে সমুদ্রে। টের পেয়েছে, প্রচুর খাবার এই জাহাজে। ওরা মাস্তুলের ওপর ঝাঁকে ঝাঁকে বসে রয়েছে। আর সেই দিগন্ত বিস্তৃত নীল জলরাশি। ছোটবাবু ভাবল জলরাশি না বললে এর ঠিক ওজন থাকে না। অসীম জলরাশি। পারাপারহীন জলরাশি। আকাশ এবং সমুদ্র মিলে এক নীল ভূখণ্ড যেন। এভাবে একটা সাদা জাহাজ নীল জলরাশির ভিতর নীল আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে থাকলে আশ্চর্য, ছবি হয়ে যায়। আর পাখিগুলো সাদা বিন্দু বিন্দু প্রজাপতির মতো অনবরত সেই ছবির ভেতর উড়ে বেড়াচ্ছে। ছোটবাবু এমন একটা নিথর জগৎ আছে, এমন একটা ধীর স্থির সমুদ্র আছে, জানত না। পাইলট সিপটাই ছিল ডাঙ্গার শেষ সূত্র। সেও ক্রমে দূরে দূরে সরে একসময় সমুদ্রের ঢেউয়ের ভেতর অদৃশ্য হয়ে গেল।

    ছোটবাবু ডেকের ওপরে সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারছে না আর। জাহাজ এগিয়ে যাচ্ছে। দ্রুতগতিতে জাহাজ এগিয়ে যাচ্ছে। জাহাজ হেলছে দুলছে। মাস্তুল, ডেরিক, দড়িদড়া হেলছে দুলছে। এভাবে দাঁড়ালে বেশিক্ষণ সে ডেকে দাঁড়াতে পারবে না। সে দু’পা ফাঁক করে দাঁড়িয়ে ছিল, তারপর সামনে পেছনে বেশ ঝুঁকে ঝুঁকে তাল রেখে হেঁটে গেল। টুইন-ডেক পার হয়ে দ্রুত ছুটে গেল সামনে। জাহাজের আগিলে সে উঠে দাঁড়াল। শেষবারের মতো বোধহয় পাইলট সিপটাকে সে দেখতে চায়। কিন্তু দেখা যাচ্ছে না। সে ফিরে আসছে। জাহাজের পিচিঙ আরম্ভ হয়ে গেল বলে মাথা পেট গোলাচ্ছে। অথচ তার কাজ ফাইবারের সঙ্গে। তাকে এ-জাহাজে এভাবে এ-সফরে কাজ করে যেতে হবে। সে আর থামতে পারে না। ফিরে যেতে পারে না।

    সে ফিরে আসার মুখেই দেখল জ্যাক মাংস কেটে পাখিদের খাওয়াচ্ছে। জ্যাক লম্বা বয়লার স্যুট পরেছে। পায়ে কেডস জুতো। ছোটবাবু সন্তর্পণে পালাচ্ছে। পালাবার সময়ই মনে হল কেউ সহসা ডাকছে—হেই। সে পড়ে যেতে যেতে কোনরকমে উঠে দাঁড়াল। দেখল, আড়চোখে তাকে দেখছে জ্যাক। সে এবার প্রায় ছুটে পালাল। জাহাজে পিচিঙ, এভাবে ছুটলে সে পড়ে যেতে পারে তার তাও মনে থাকল না।

  • তিন

    তিন

    ।। তিন।।

    বারোটা-চারটার ওয়াচ শেষে সিঁড়ি ভেঙ্গে ওপরে উঠে এল মৈত্র। জাহাজের পিচিঙ ক্রমে বাড়ছে। সমুদ্রে বেশ বাতাস আছে। তবু আকাশ পরিষ্কার থাকলে তেমন ভয় থাকে না। ভয় অমিয় এবং ছোটবাবুকে নিয়ে। এরা দুজনই নতুন। এদের দুজনেরই প্রথম সফর। ছোটবাবু হয়ত পিচিঙ কোন রকমে সামলাবে। কারণ তাকে বাঙ্কারে কাজ করতে হচ্ছে না। কিন্তু অমিয় এ-ওয়াচেই যা দেখাল। সুট খালি পড়ে আছে। বাংকারে সে দাঁড়াতে পারছে না। র‍্যাগ দিয়ে আগুন ফার্নেস থেকে টেনে নামানোর সময় অমিয় জল জল করছিল। একসঙ্গে তিনজন ফায়ারম্যানের আগুন টানার ভিতর বেচারা নিঃশ্বাস পর্যন্ত নিতে পারছিল না। ছাই উড়ছে। আগুনের গনগনে উত্তাপ, আর আগুনের ওপর জল ঢেলে দিলে প্রচণ্ড গ্যাস। সে গ্যাসের ভিতর নতুন জাহাজির সাধ্য কি দাঁড়ায়। তার ওপর ইণ্ডিয়ান কোল। একেবারে অসার।

    ওপরে এসেই মৈত্র টের পেল অমিয়র কাজ শেষ হয়নি। অমিয়র স্বভাব আগে উঠে ফানেলের গোড়ায় বসে থাকা। কিন্তু সে নেই। আকাশ বেশ মেঘলা। গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি হচ্ছে। এ-সব লক্ষণ ভাল না। ঝড় অথবা সাইক্লোনের লক্ষণ। এমনিতেই রক্ষা নেই, ঝড়ের ভিতর যে অমিয়টা কি করবে! পাশের বাংকারের কোলবয়, বয়সী মানুষ। তার এই নিয়ে এগারো-সফর। সে সব কায়দা-কানুন জানে। সে জানে ওয়াচের পরও কাজ করতে হবে। অন্ততঃ এক ঘণ্টা এক নাগাড়ে ওয়াচের পর কাজ না করলে সুট ভরতে পারবে না। অথবা সে এমন ভাবে এক নাগাড়ে কাজ করে যায়, কোন তাড়াহুড়ো নেই আবার আস্তেও নয়, সে বেশ সোজা সরলভাবে কাজটাকে নিয়ে ফেলেছে। বয়স হলেও মানুষটা কয়লা টানার কষ্ট গ্রাহ্যের ভেতর আনে না। সফরের অভিজ্ঞতায় সে সি-সিকনেস হজম করে ফেলেছে।

    মৈত্র, বড়-টিণ্ডাল বলে ওয়াচের দায়-দায়িত্ব তার। স্টিম ঠিক রাখার দায়-দায়িত্ব থেকে সব কিছু। সুট ভর্তি না পেলে পরের ওয়াচের ছোট-টিণ্ডাল অমিয়কে বেগার খাটিয়ে মারবে। ছোট-টিণ্ডালের দলটা নিচে নেমে গেছে। নেমে এখন আগুন টানছে ফার্নেস থেকে। ফার্ণেসের ছাই ঝেড়ে ভেতরে কয়লা হাকড়াবে। এর ভেতর অমিয় সুট ভরে না দিতে পারলে রক্ষে নেই। মৈত্র তাড়াতাড়ি ফের নেমে গেল। ভেতরে একটা লম্ফ জ্বলছে। লম্ফটা আবছা মতো দেখা যাচ্ছে। কয়লার গুঁড়ো উড়ে চার পাশটা ভীষণ অন্ধকার। প্রথমে ঢুকে সে কিছু দেখতে পেল না। তারপর চোখ সয়ে এলে দেখল, কয়লা সুট থেকে বেশি দূরেও না। সুটে কয়লা এনে ফেলছে অমিয় আর মনে হচ্ছে সব কয়লা গড়গড় করে নিচে নেমে যাচ্ছে। সে আপন মনে দুটো একটা খিস্তি করছে। দুটো-একটা অশালিন চিৎকার এবং চোখ লাল, ঘামে ওর জামা-প্যান্ট জবজবে। টুপি ভিজে গেছে। চোখ আগুনের মতো লাল। সে টলছে। ঠিকমতো দাঁড়াতে পারছে না। বোধ হয় দু-একবার হড়-হড় করে জল খেয়ে বমিও করেছে।

    মৈত্র তাড়াতাড়ি নিজেই গাড়িটা টেনে পর পর ক’গাড়ি খুব দ্রুত কয়লা ভরে ফেলে দিল। অমিয়কে বলল, তুই বোস। এভাবে সুট ভরে না। এতক্ষণ কি করছিলি!

    ইচ্ছা হল অমিয়র, বেলচে দিয়ে ঠাস করে মৈত্রের মাথায় একটা বাড়ি মারে। সে এতক্ষণ বসেছিল বুঝি মৈত্র মনে করছে। সে বলল, টিণ্ডাল, তোমাকে কে আসতে বলেছে! যাও শালা। ভাগো। আর্মার কাজ আমি যেভাবে পারি করব। কাউকে ডাকি নি তো। শালা নবাবী দেখাতে এয়েছে।

    এসব কাজে মাথা গরম হয়। মৈত্র অনেক সফরে এমন সব দেখেছে। সেজন্য সে কিছু বলল না। কেবল যত তাড়াতাড়ি সম্ভব কয়লা ভরে যেতে থাকল। বলল, হাত লাগা আমার সঙ্গে। দাঁড়িয়ে থাকিস না।

    এবং এক সময় সুট ভরে গেলে ওরা ওপরে উঠে দেখল, বৃষ্টিতে ডেক ভিজে গেছে। ছোটবাবু কি করছে কে জানে! সে দুদিন থেকে দেওয়ানিতে ভুগছে। কিছু খেতে পারছে না। সব ওক দিয়ে ফেলে দিচ্ছে। এখন তো আরও বেশি হবার কথা। ছোটবাবু পিচিঙের জন্য ভাল করে রাতে ঘুমোতে পারছে না। হয়ত গিয়ে দেখবে, সে চিৎপাত হয়ে পড়ে আছে বাংকে। চোখে ঘুম নেই। তবু চোখ বুজে আছে। এভাবে নতুন জাহাজিদের হ্যাপা সামলাতে সামলাতে ওর সফর শেষ হয়ে যায়। কোম্পানিগুলো এসব অজুহাত দেখিয়ে, নানাভাবে এই সব নতুন জাহাজিদের নিতে চায় না। মৈত্র বোঝে এতে তার দেশের সুনাম নষ্ট। কোম্পানিগুলি এভাবে দুর্নাম ছড়িয়ে ক্রমে এ-বন্দর থেকে ক্রু নেওয়া কমিয়ে দিচ্ছে। ওরা বেশী করে এখন চালনা অথবা চাটগাঁ থেকে ক্রু তুলে নিচ্ছে। এ- সব কারণে সে অমিয়র হ্যাপা সামলাচ্ছে এখন। এবং এভাবে কিছুদিন চালিয়ে যেতে পারলেই অমিয় ঠিকঠাক একদিন সব নিজেই চালিয়ে নিতে পারবে।

    চারপাশটা অন্ধকার। সমুদ্রে কোনো রঙ ফুটে উঠছে না। সকাল হতে এখনও অনেক দেরি। অবশ্য সে এ-সময়টা জামা কাপড় ছেড়ে হাত পা ধুয়ে শুয়ে পড়ে না। সে নিজেই চা করে নেয়। অমি ও ছোটবাবুকে দেয়। তারপর সকাল হলে যখন ডেক জাহাজিরা কাজে বের হয়ে যায় তখন সে গড়িয়ে নেয়! ছোটবাবু চা খেয়েই যা সামান্য কিছু আরাম পায়।

    নুন জল মাঝে মাঝে মৈত্র খেতে দিচ্ছে ছোটবাবুকে। এতে দেওয়ানি কমে শরীরের। মাথা তেমন ঘোরে না। সব স্বাভাবিক হয়ে আসে। সে ডেক ধরে হাঁটতে হাঁটতে বুঝতে পারল, দেওয়ানি তাকেও বেশ কাহিল করেছে। প্রথম প্রথম সবাই কিছু-না-কিছু কাহিল হয়ে যায়। কিন্তু ছোটবাবুর দিকে তাকানো যাচ্ছে না। দু-তিন দিনেই চোখ কোথায় ঢুকে গেছে। সুন্দর সুশ্রী মুখ চুপসে গেছে। আর মনে হয় কি যেন একটা ভয় সবসময় ছোটবাবুর। ছোটবাবু কিছু বলছেও না। ঝড়ের সময়ই সব চেয়ে বেশি আশঙ্কা। মৈত্র কি করবে ভেবে পাচ্ছে না।

    মাঝে মাঝে মৈত্র ভীষণ রেগে যায়। কেন আসা জাহাজে! কে দিব্যি দিয়েছে। তারপরই মনে হয় কেউ দিব্যি দেয় না। কিনারায় কাজের কোন সুরাহা না হলে এই সব বাচ্চা বাচ্চা ছেলেরা জাহাজে চলে আসে। সবারই ভেতর একটা ইতিহাস থাকে। দুঃখের ইতিহাস। কেউ সখ করে জাহাজে মরতে আসে না। তখন তার ভীষণ মায়া হয় সবার জন্য।

    সে গ্যালি পার হয়ে সিঁড়ি ধরে নিচে নেমে গেল। খুব আস্তে আস্তে নামতে হয়। কেউ যেন পায়ের শব্দে জেগে না যায়। সারা সময় স্টিয়ারিং এনজিনের একটানা ক্যাচ ক্যাচ শব্দ। প্রথম প্রথম এ-জন্যও ছোটবাবুর ঘুম আসত না। সম্পূর্ণ একটা আলাদা জীবনে এই ছোটবাবু কেমন হয়ে গেছে।

    অমিয় কোন রকমে জামা-কাপড় ছেড়ে বাংকে গা এলিয়ে দিচ্ছিল। কিন্তু মৈত্র কিছুতেই ওকে বাংকে বসতে দিল না। একজন স্বাভাবিক জাহাজির মতো অমিয় থাকুক সে চায়। সে বলল, এই ওঠো। স্নান না করে এলে তোমাকে শুতে দেওয়া হবে না। এমন কিছু হয় নি, স্নান না সেরে তুমি বাংকে শুয়ে পড়বে। যাও। ওঠো। সে এই সব কথাগুলো খুবই আস্তে আস্তে বলছিল। যদি ছোটবাবুর চোখে সামান্য ঘুম লেগে থাকে। সে এমনকি আলো জ্বালল না। পোর্ট-হোলের কাঁচটা কে বন্ধ করে রেখেছিল। গুমোট ভাব। পাইপ থেকে ঠিকমতো হাওয়া বের হচ্ছে না। মৈত্র ছোটবাবুর পাইপের মুখ ধীরে ধীরে ঘুরিয়ে দিল। বেশী হাওয়া লাগলে ছোটবাবুর ঘুম ভাল হবে। কিন্তু কি আশ্চর্য ছোটবাবু চোখ বুজেই বলছে, মৈত্রদা, আমি যে দাঁড়াতে পর্যন্ত পারছি না। মাথা ঘুরে পড়ে যাচ্ছি।

    মৈত্র কেমন ক্ষেপে গেল, না দাঁড়াতে পারলে আমি কি করব!

    —আমাকে বাথরুমে যেতে হবে। কতবার চেষ্টা করেছি। তুমি একটু ধরবে?

    মৈত্র হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠল, ওঠ, ওঠ। কে বলছে দাঁড়াতে পারছিস না। যত সব বাজে কথা।

    —না, সত্যি মৈত্রদা দাঁড়াতে পারছি না। সকাল হয়ে যাচ্ছে ভয়ে আর ঘুম আসছে না। সারেঙের টান্‌টু শব্দ কেবল শুনতে পাচ্ছি।

    —ওঠ ওঠ বলছি। সে ঠেলে তুলে দিল। সে প্রায় যেন লাথি মারার মতো ঘাড় ঠেলে বের করে দিল ছোটবাবুকে।

    —যা যা বলছি। পেচ্ছাপ করে আয়।

    শরীর টলছে বলে সে একটু গিয়েই বালকেড ধরে দাঁড়িয়ে থাকল

    এবার মৈত্র খিস্তি করে বলল, কেন যে মরতে আসা। কেউ নেই তোমার জাহাজে। যাও ছোটবাবু। না গেলে সমুদ্রে হারিয়া করে দেব। তবু সুনাম নষ্ট হতে দেব না আমাদের।

    অমিয় ভয়ে ভয়ে আগেই উঠে গেছে। সে স্নান করেছে। স্নান করায় শরীরটা ভীষণ হাল্কা লাগছে। সে এখন আর ক্লান্তি বোধ করছে না। ছোটবাবুর জন্য মৈত্র এখনও চেঁচাচ্ছে। এবং সবাই জেগে গেছে। সবাই ফোকসাল ছেড়ে চলে এসেছে। সারেঙ বলছে, মৈত্রমশায়, আপনি ওর পেছনে কেন লেগেছেন?

    —কি বলছে শুনুন। এই যা বলছি। পেট খালি করে আয়। চা করে দিচ্ছি। তারপর ঘুমোবার চেষ্টা কর।

    সবাই যে যার ফোকসালে চলে গেল। নতুন জাহাজিদের নিয়ে এমন সব কত ঘটনা এই জাহাজের ইতিহাসে ছড়িয়ে আছে। রেড-সিতে একবার একজন নতুন জাহাজি স্টোকহোলডের গরম সহ্য করতে না পেরে সমুদ্রে ঝাঁপিয়ে আত্মহত্যা করেছিল। অথবা একবার এক জাহাজির সি-সিকনেস এমন হল, সে স্কাই-হোলের ভেতর দিয়ে এনজিনে ঝাঁপিয়ে আত্মহত্যা করেছিল। কেউ কেউ তো পাগল হয়ে যায়। এ-সব ব্যাপারে কারো কিছু বলার থাকে না।

    সারেঙ শুধু বললেন, ছেলে সাহস করে এয়েছিস যখন, সাহস করে একবার উঠে যা। দ্যাখ না কি হয়।

    এ-সবে ছোটবাবু ভীষণ লজ্জিত এবং অপমানিত। সে মুখ তুলে তাকাতে পারছে না পর্যন্ত। জাহাজে যখন সবাই নির্বিঘ্নে ঘুমোচ্ছে, খাচ্ছে দাচ্ছে, সে মনে মনে বলল, ‘মাগো আমি ঠিক পারব। দ্যাখো পারব। ওরা আমাকে সময় দিচ্ছে না। সে আর দাঁড়াল না। সে উঠতে গিয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেল। মৈত্র ধরতে গেলে বলল, ধরবে না মৈত্রদা। আমি দেখছি পারি কিনা। ভদ্রা জাহাজের সেকেণ্ড অফিসার, চ্যাটার্জির শেষদিনের বক্তৃতার সময়ের মুখ ভেসে উঠল চোখে। তিনি যেন বলছেন, আমার জাহাজি বন্ধুরা, আজ তোমাদের যাবার দিন। জাতীয় সঙ্গীত গাইবার পরই বিউগিল বেজে উঠেছিল। ডাইনিং হলে সব মাসতার দিলে তিনি বক্তৃতার মতো করে বলে যাচ্ছিলেন। বলতে বলতে ওঁর গলা ধরে এসেছিল। তিনি বলেছিলেন, জাহাজি বন্ধুরা, আমি তোমাদের নানাভাবে টরচার করেছি। তোমাদের সহ্যসীমা কতদূর দেখেছি। আমার বিশ্বাস তোমরা পারবে। এর চেয়েও অনেক অনেক কষ্ট তোমাদের জন্য জাহাজে অপেক্ষা করছে। হলিস্টোনে তোমাদের হাতের রক্তপাত আমাকেও ভীষণ ভাবে টরচার করত। সিনিয়ার রেটিঙসদের র‍্যাগিংয়ের কথাও তোমাদের মনে থাকবে। সবই জাহাজে একজন ভালো জাহাজি হবার জন্য! আমার বিশ্বাস যাবার দিনে নিশ্চয়ই আমাকে ক্ষমা করতে পারবে। এখন না পারলেও জাহাজে গেলে ঠিক পারবে। আমার তখন দুঃখ থাকবে না।

    আরও অনেক কথা। সব মনে পড়ছে না। এখন সব মনে পড়ার কথাও নয়। তবু সব কথার ভেতর এমনই বুঝি যন্ত্রণা ছিল তাঁর। ছোটবাবু সিঁড়ির রেলিং ধরে কোনরকমে এবার উঠে দাঁড়াল। সহজভাবে দাঁড়াতে চাইল। মাথা ঘুরছে। কিছু দেখতে পাচ্ছে না। তবু অন্ধের মতো ওপরে উঠে প্যান্ট খুলে সামনেই পেচ্ছাপ করে দিল। নেমে যাবার ক্ষমতা ক্রমে এভাবে হারিয়ে ফেললে কি যে হবে! অহঙ্কার শরীরে ফুলে ফুলে উঠছে। সে বলল, স্যার আপনি এত বড় জানতাম না। আমাকে ক্ষমা করবেন স্যার। আমি যে কিছুতেই পারছি না। আমাকে তো সবাই নানাভাবে সাহায্য করে যাচ্ছে। আমাকে এখনও বাংকারে পাঠায় নি। জানি না পাঠালে আমার কি হবে!

    সে প্রায় চোখ বুজেই হাত ধরে ধরে নেমে এল। সমুদ্র থেকে প্রচণ্ড বাতাস উঠে আসছে। সমুদ্রে ঢেউ প্রবল। ঢেউ-এর জলকণা শরীরে এসে লাগছে। সে বুঝতে পারল, এখন মে-জুনের সময়। এখন এ-সমুদ্রে ঝড়-ঝন্‌ঝা লেগে থাকারই কথা। এ ক’দিন ঝড়-বৃষ্টি হয় নি সে কপাল ভাল বলে। নিচে নেমে গেলে মৈত্র সোজা দাঁড় করিয়ে রাখল ওকে কিছুক্ষণ। এখন শোবি না। আর যখন ঘুম আসবে না বসে থাক। চা করে আনছি।

    ছোটবাবু বলল, এত সকালে কিছু খাব না। খেলে আবার ফোকসাল পরিষ্কার করতে হবে।

    —সে দেখা যাবে। আমি না পারি টোপাস করে যাবে। টোপাস আছে কি করতে!

    —বেশ ভাল বলছ। বমি করে ভাসাই, আর ওরা ঐ কেবল করুক!

    —বাছা তোমার গলা থেকে তো এখনও রক্ত উগলে ওঠেনি। এতেই টোপাসের জন্য তোমার এত ভাবনা।

    ছোটবাবুর কাছে এর চেয়ে কষ্টের কি আছে জানা নেই। তবু সে চায় না এ-সব কথা আবার দু কান হোক। সে বলল, মৈত্রদা তুমি চেঁচামেচি না করলেই পারতে। বাড়িয়ালা শুনলে কি বলবে! কি ভাববে!

    —কিছু ভাববে না। জাহাজে সবারই প্রথম প্রথম এমন হয়। আমারও হয়েছে। সারেঙেরও হয়েছে। তবে ভেঙ্গে পড়বি না। মনে জোর রাখ। কাজ করতে এয়েছিস। বসে থাকতে তো আসিস নি। এখন না হয় মোটর ভেসেল, অয়েল এনজিন এসব হয়েছে, আগে তো এ-সব ছিল না। তোর মতো মানুষেরাই কোম্পানীর আমলে জাহাজ চালিয়ে নিয়ে গেছে। জাহাজ সমুদ্রে থেমে থাকে নি। সে লকার থেকে চা, চিনি কনডেন্সড মিল্কের টিন বের করে তরতর করে ওপরে উঠে গেল। জলটা গ্যালিতে বসিয়ে স্নান করে নেবে বাথরুমে। জল গরম হতে হতে ওর স্নান হয়ে যাবে। নানাভাবে অমিয় এবং মৈত্রদা ওকে সাহস দিয়ে যাচ্ছে। শেষের কথাগুলো মৈত্রদার ভারী মজার। যেন এতক্ষণ যে চেঁচামেচি করেছে তার জন্য লজ্জিত। এখন কি করে যে এদের একটু তোয়াজ করবে ভেবে পাচ্ছে না। ছোটবাবু মনে মনে হাসছিল।

    আসলে জাহাজে এভাবেই আত্মীয়তা গড়ে ওঠে। এভাবেই আবার বিদ্রোহ গড়ে ওঠে। এভাবেই জাহাজিরা কখনও কখনও আবার প্রতিপক্ষ হয়ে যায় যেমন কাপ্তানের ছেলেটা জাহাজে উঠেই ওর সঙ্গে কেমন শত্রুতা আরম্ভ করে দিয়েছে। সে তো কখনও তাকায় না। কিন্তু কি যে ভয়, সে না তাকিয়ে পারে না। তাকালেই দেখতে পায় বড় বড় চোখে ওকে দেখছে। সে তখন ভেবে পায় না এমন করে তাকাচ্ছে কেন। ভয়ে বুক গলা শুকিয়ে যায়। দুটো চোখ এভাবে ওকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। তাকে বুঝি লক্ষ্য রেখে যাচ্ছে। সে ঠিকমতো কাজ করতে পারে কিনা, না সে কাজে ফাঁকি দেয়। সে এ জাহাজে একজন অক্ষম মানুষ এসব খবর পৌঁছে দেওয়া ওর স্বভাব হতে পারে।

    এভাবে সকাল হয়ে যায়। সে চা খেয়ে আজ বমি করে নি। শরীরটা হাল্কা লাগছে। সে আরও কিছুক্ষণ শুয়ে থাকল। পোর্ট-হোলের কাঁচটা বন্ধ ছিল, সেটা আবার খুলে দিয়েছে। পিচিঙ বাড়ছে বলে, জল পোর্ট-হোল দিয়ে মেঝেতে এসে পড়ছে। সে এবার নিজেই উঠে বসল, এবং বালকেডে একটা পা রেখে কাঁচটা বন্ধ করে দিল। ঢেউয়ের ঝাপটায় সব ভিজে যাচ্ছিল।

    সবাই ক্রমে সকাল হলে উঠে পড়ছে। সকালের দিকে সূর্যের লাল আলো এসে ফোকসালে পড়ছে। ওর ইচ্ছা হচ্ছিল, ওপরে উঠে বসে থাকে। কিন্তু, ওপরে বসতে পারবে না। কারণ জাহাজ সামনে পেছনে দুলছে। এখন সোজা হাঁটা যাচ্ছে না। পেছনে সামনে-ঝুঁকে হাঁটতে হচ্ছে। সারেঙ টাটু না বললে সে উঠছে না। যতক্ষণ পারে সে এভাবে শুয়ে থাকবে।

    এবং কাজের সময়ে সে ফাইবারের সঙ্গে কথায় কথায় হাসতে পারল না। অতিকায় সব ঢেউ চারপাশে। আকাশ আবার মেঘলা। বৃষ্টি হচ্ছে না। অথচ কি ভীষণ জোরে হাওয়া দিচ্ছে। মাঝে মাঝে ডেকের ওপর সমুদ্রের জল। উইনচের নীচে ছোটবাবু কাজ করছিল—ওর প্যান্ট-জামা জলের ঝাপটায় ভিজে যাচ্ছে। সারসপাখিগুলো জলের ঝাপটায় কোঁ কোঁ করে উঠছে। এখন আসছে আবার সেই ছেলেটা। ফাইবার বুঝতে পারছিল, ছোটবাবুকে সি-সিকনেসে খুব কাবু করেছে। ওকে আজ সে খাটাচ্ছে না। সে নিজেই কাজ করছে। ছোটবাবু পাশে বসে কেবল নাটবোল্ট, তেল এসব এগিয়ে দিচ্ছে। কখনও কখনও বা দু’পা ছড়িয়ে বসে থাকছে ডেকে। দূরের দিগন্তরেখায় সমুদ্রের অজস্র ঢেউ, ওপরে সমুদ্রপাখিদের বিচরণ, কখনও বা একঘেয়ে নিরিবিলি অশান্ত সমুদ্রের ভেতর থেকে জাহাজে এনজিনের শব্দ—আমি যাচ্ছি, যাচ্ছি, আমি যাচ্ছি, যাচ্ছি। এভাবে একটানা শব্দ করে চলেছে এনজিনটা। আর মাস্তুলে ডেক-জাহাজি ইমরান উঠে গেছে। ফলঞ্চা বাঁধতে সে ওপরে উঠে গেছে। এ ঝড়ের দরিয়ায় মাস্তুলে রঙ হবে ভাবতে ছোটবাবুর কেমন গা গুলিয়ে উঠল।

    এবং তখনই জ্যাক লাফিয়ে লাফিয়ে বোট-ডেক থেকে নেমে আসছে। সে অবলীলায় এ-ঝড়ের সমুদ্রে কেমন লাফিয়ে লাফিয়ে হাঁটছে। সে বেশ ঝুঁকে ঝুঁকে হেঁটে যাচ্ছে। শরীরে ব্যালেন্স রেখে হেঁটে যাচ্ছে। কখনও লাফিয়ে ডেক পার হচ্ছে। সে পড়ে যাচ্ছে না। উইনচের ফাঁক দিয়ে ছোটবাবু এমন দেখে অবাক। কাপ্তানের ছেলেটা তো তার চেয়েও কমবয়সী। অথচ কি শক্ত সমর্থ। যখন ঢেউ এসে ডেক ভিজিয়ে দিচ্ছে, তখন এ কি খেলা তার! জল থৈ থৈ করছে ডেকে। সে জল নিয়ে খেলা করছে। সে পরেছে গামবুট। সে সারস পাখিগুলোকে ফল্কার কাঠে তুলে দিচ্ছে। সমুদ্রের জল ততটা এখনও উঠতে পারছে না। সে লম্বা একটা দড়ি দিয়ে কাঠের বাক্সগুলোকে মাস্তুলের সঙ্গে বেঁধে ফেলছে। এবং কাজ করে যাচ্ছে ঠিক একজন পাকা নাবিকের মতো। উইনচের ফাঁক দিয়ে এ-সব দেখতে দেখতে ছোটবাবুর মনে হল, জ্যাক কাউকে এরই ভিতর খুঁজছে। সে সঙ্গে সঙ্গে ও-পাশের ওয়ারপিনড্রামের আড়ালে নিজেকে লুকিয়ে ফেলল। না, আর এখান থেকে ওকে জ্যাক দেখতে পাবে না। তখন পঁচিশ টাকার খালাসী উঠে গেছে মাস্তুলের ডগায়। সে দুলে দুলে সার্কাসে ট্র্যাপিজের খেলা দেখানোর মতো রঙ লাগিয়ে যাচ্ছে।

    এখন ভাণ্ডারিরা ক্রুদের রসদ নিয়ে ফিরছে। চীফ কুক এপ্রন জড়িয়ে দরজার মুখে এসে দাঁড়াল। কার্পেন্টার লম্বা একটা সুতোয় বাঁধা গেজে জাহাজের সাউণ্ডিং নিচ্ছে। মার্কনি সাব রেলিঙে ভর করে সমুদ্র দেখছেন। মেজ-মালোম ব্রীজে দাঁড়িয়ে আছেন। ওর চোখ লাব্বাস লাইনের দিকে। কোয়ার্টার মাস্টার কম্পাসের কাঁটা মিলিয়ে স্টিয়ারিঙ সোজা করে রেখেছে। জাহাজ যতই কাত হোক, হেলতে- দুলতে থাকুক, সে কখনও কাঁটা থেকে নড়বে না। কাপ্তান তখনও ঘুমোচ্ছেন। কারণ দিনের বেলায় জাহাজের তেমন ভয় থাকে না। রাতটাই সব সময় সমুদ্রে নানাভাবে কষ্টদায়ক। কি যে গভীর অন্ধকার। তবু তিনি শৈশব থেকে এভাবে সমুদ্রে বিচরণ করে কি অন্ধকার, কি আলোতে, সমুদ্রের ক্ষমতা কতটুকু ধরে ফেলেছেন। যেন সমুদ্রেরও একটা খেলা আছে—এইসব অতি ছোট ছোট কাগজের নৌকার মতো জাহাজ এই সেদিন ওর বুকে ভেসে এল। এই সেদিন সমুদ্র দেখেছে, ক্রমে এক-দুই, তারপর শয়ে, হাজারে। কি যে তাদের রূপ! কোনটা সাদা, কোনটা কালো, কোনটা নীল রঙের। নানা রংয়ের বাহার। আর যখন সমুদ্রে সূর্য ওঠে, সূর্য অস্ত যায়, অথবা জ্যোৎস্নার কি যে মায়াবিনী এক খেলা। মাঝে মাঝে ঝড়ের ভিতর এই এক খেলায় অথবা নিচে কত সব প্রবালের দ্বীপ, বরফের পাহাড়, চোরা স্রোতে জাহাজ আটকে যেতে পারে—তবু এক খেলা, অসীমে এলে এই খেলার রহস্য ধরা যায়। কেবল লুকোচুরি খেলা। খেলায় কাপ্তান দেখেছেন, প্রায়ই জিতে গেছেন তিনি। কারণ সমুদ্রেরও বুঝি আছে অসীম ভালবাসা। মানুষের এই সব অতিকায় জাহাজ অতি ছোট কাগজের নৌকার মতো ভেসে বেড়ালে সমুদ্রের ছেলেমানুষী হাতগুলো আকাশের দিকে লাফিয়ে ওঠে। পোষা বেড়ালছানার মতো ধরতে চায়। আর জাহাজগুলোও বেশ জল কেটে ঢেউ কেটে ক্রমে সুদূরে চলে যায়। তখন আকাশের নিচে নীল রঙের ছায়ায় আশ্চর্য ছবি। কাপ্তানের ভারি মজা লাগে দেখতে। সমুদ্রের জন্য তখন মমতা তার বাড়ে। তিনি হোমে ফিরে বেশিদিন একা থাকতে পারেন না। সমুদ্র তাঁকে টানে।

    ছোট-টিণ্ডালের আজ ভারি খারাপ অবস্থা। টিণ্ডাল দেখছিল, ঝড়ে পড়ে বয়লারগুলো ভীষণ মারমুখো হয়ে উঠছে। স্টিম কিছুতেই রাখা যাচ্ছে না। মাঝে মাঝে তিন নম্বর মিস্ত্রি ছুটে স্টোক হোলডে চলে আসছে। এনজিনের শব্দে কিছু শোনা যায় না বলে, দু’হাত ওপরে তুলে চিৎকার করছে স্টিম স্টিম; আর তখন স্টোক-হোলডে, তিনজন ফায়ারম্যান, দুজন কোলবয়ের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে যাচ্ছে। ফার্নেস ডোর খুলে অনবরত কয়লা হাকড়াতে হচ্ছে। মুখে আগুনের আভা, দাঁড়ানো যাচ্ছে না। গতকালের চেয়ে পিচিঙ আরও বেড়েছে। সমুদ্রের অবস্থা ক্রমে ভয়ঙ্কর হয়ে উঠছে। ডেকে হিবিঙলাইন বেঁধে দেওয়া হয়েছে। কেউ যেন এখন আর বোট-ডেক ধরে উঠে না যায়। দিনের বেলাতে গেলেও রাতের বেলাতে কেউ যেন না যায়। নিচে টানেল-পথ খুলে দেওয়া হয়েছে—সেখান থেকে একটা সোজা সিঁড়ি প্রপেলার স্যাফটের গোড়া দিয়ে ওপরে উঠে গেছে। এনজিন-জাহাজিরা যেন সেখান দিয়ে যাওয়া- আসা করে—সারেঙ এই বলে সবাইকে সাবধান করে দিয়েছেন।

    এখন টিণ্ডালের মুখেও ভীষণ দুশ্চিন্তার ছাপ। প্রত্যেকটা ফার্নেস ডোরে উঁকি দিয়ে দেখছে। এয়ার- বালব সব খুলে দিয়েছে। স্লাইস মেরে ফার্ণেসের ভিতর সব আগুন ঘেঁটে দিচ্ছে। ছাই ঝেড়ে দিচ্ছে। কয়লা ফায়ারম্যানদের অনবরত হাঁকড়াতে বলছে। সে হাত তুলে যাচ্ছে আর বলছে, জলদি জলদি, কয়লা হাঁকড়া। ফার্নেস জ্বালিয়ে দে। সব পুড়িয়ে দে। কসবীর কলজে উপড়ে আন। বলেই সে কখনও মনে ঐশীশক্তি পাবার লোভে, দু’হাত ওপরে তুলে চিৎকার করে ওঠে, আল্লা হু আকবর। অর্থাৎ যারা স্টোক-হোলডে আছে তাদের প্রত্যেকে তখন এই এক ধ্বনি মিলে একসঙ্গে যুস পেয়ে যায়। কেউ তখন ফার্নেস ডোর খুলে কয়লা হাঁকড়াচ্ছে, কেউ তখন ভীষণভাবে আগুনের জ্বলন্ত কঠিন চাঙগুলি ভেঙ্গে টুকরো টুকরো করে দিচ্ছে। কেউ তখন শ্বাস ফেলতে না পেরে উইণ্ডসেলের নিচে এসে দাঁড়িয়েছে। শাঁ-শাঁ করে জল নেমে আসছে ফানেলের গোড়া দিয়ে।

    এভাবে টিণ্ডাল বুঝতে পারে দরিয়া ক্ষেপে গেছে। দরিয়া ক্ষেপে গেলে মজা পায় বয়লারগুলো। ওদের তখন ভেতরে ভেতরে ফেলা। স্টিম গেজের কাঁটা তখন আর উঠতে চায় না। সব স্টিম হজম করে বসে থাকে। তখন লড়াই মানুষে আর এই বয়লারে। তখন এনজিনিয়ার ছুটে আসে বার বার। এবং যা কিছু গালাগাল আছে সব সে অনায়াসে বলে যেতে পারে। টিণ্ডাল তখন এ-সব গালাগাল শুনতে হবে ভেবে ফের হল্লা এবং ঐশীশক্তির ওপর নির্ভরশীল না হলে উপায় নেই। বিশাল সমুদ্রের বুকে খুবই অসহায় এই মানুষের তৈরী কল—এবং বোধ হয় সেজ-মিস্ত্রির ইতর কথাবার্তা না শোনার জন্যও ফের চিৎকার সকলে মিলে, আল্লা-হু-আকবর। আর সঙ্গে সঙ্গে যেন বেড়াল পালায় জানালা টপকে, সেজ-মিস্ত্রি, সুড়সুড় করে সরে পড়ে। কারণ জানা আছে অনেক ঘটনা এমন। ঝড়ের দরিয়ায় বয়লারের পেটে কত এনজিনিয়ার এভাবে হাপিজ হয়ে গেছে। ধর ধর শালোকে। আন ধরে, ক্ষিপ্ত লাল চোখ, এবং অমানুষের মতো মুখ-চোখ এই সব ফায়ারম্যানদের। তখন না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না, যেন ওরা মানুষ না, আসলে দানব, দানব হয়ে যায়। এবং ফার্নেস ডোর খুলে ঠেলে দেয়, যাও জাহান্নামে। মিস্ত্রি মানুষেরা সেজন্য ঝড়ের দরিয়ায় খুব একটা স্টোক-হোলাডের ভেতর ঢোকে না। গলা বাড়িয়েই যা যা বলার বলে চলে যায়—স্টিম মাংতা।

    তখন সমুদ্রের জল স্টোক-হোলডের ভেতর। জাহাজ ভীষণ কাত হয়ে যাচ্ছে। আবার উঠে যাচ্ছে, আবার ডানদিকে হেলে পড়ছে। সমুদ্রের ঢেউ বোট-ডেকে উঠে আসছে। মনে হচ্ছে ঝড় মাস্তুলের দড়িদড়া উড়িয়ে নিচ্ছে। আকাশে নক্ষত্র দেখা যাচ্ছে না। চারপাশে শুধু সমুদ্র, গভীর জল, নীল অন্ধকার আর ট্রেনের চাকায় যেমন শব্দ তেমনি এনজিনে শব্দ হচ্ছে, আর যাচ্ছি না আমি, যেতে পারছি না আমি। এনজিন এবং বয়লার ক্রমাগত যেন এমন বলে চলে যাচ্ছে।

    এবং এরই ভিতর সেই অমানুষের মতো দানবের চোখ-মুখ, হিংস্র ভয়াল। দেখলে বোঝাই যায় না, গনি, জব্বার, মান্নান এদের নাম। লম্বা উঁচু চেহারা। মাথায় ফেজ টুপি, কালো রঙ। বয়লারের ছাই টানায় মুখ সাদা ফ্যাকাশে। ওপরে বাংকারের অন্ধকারে কেউ নেই, শুধু লম্ফ জ্বলছে। নিচে কোলবয় দুজন জল খাচ্ছে। আর যে আগুন নিচে স্টোক-হোলডে টেনে নামানো হয়েছে, তা জ্বল দিয়ে তারা নেভাচ্ছে! ওরা মাত্র দুজন। তিনজন ফায়ারম্যান আয়াসে যা করছে, ওরা জীবন দিয়েও যেন সেটা নেভাতে পারছে না। কি প্রচণ্ড আগুনের তাপ। সারা স্টোক-হোলড লাল এবং মনে হয় আগুনের উত্তাপে সব গলে যাবে। ওরা দুজন, অর্থাৎ দুজন কোলবয় ক্রমান্বয়ে জল মেরে ছাই এস- রিজেকটারে হাপিজ করে যখন উঠে যাচ্ছে তখন ওদের মানুষ বলে চেনা যাচ্ছে না। যেন দুটো পোকা লোহার রেলিং ধরে উঠছে, উঠতে উঠতে একটু দাঁড়িয়ে পড়ছে, জাহাজ কাত হলে ওরা শক্ত হয়ে যাচ্ছে। জাহাজের ওপর দিয়ে জল গড়ালে ওরা রেলিঙের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে। তারপর ক্রমে উঠতে উঠতে ওপরের অন্ধকারে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে। আর দেখা যাচ্ছে না।

    আর ঠিক সাতটার সময় পিছিলে হঠাৎ খবর এসে গেল, একজন পড়েছে।

    কে পড়েছে! সবার মুখ অধীর।

    পড়েছে। নাম, লতিফ। লতিফ মানে সেই বুড়ো রোগা লোকটা। সারেঙ যাকে ধরে এনেছিল। যে কান্নাকটি করেছে—যাবে না, এমন বলেছে, যে সিপিং অফিসে এ-জাহাজে আসতে হবে ভেবে নদীর পাড়ে একটা গাছের আড়ালে লুকিয়েছিল, যাকে এনজিন সারেঙ প্রায় টানতে টানতে এনে দাঁড় করিয়েছিল।

    বড় নিরীহ মুখ। বয়সের ছাপ মুখে ভীষণ। বয়স নলিতে কি আছে ঈশ্বর জানে। কিন্তু মুখ চোখ দেখলেই মনে হয়, ভেতরে ভেতরে সে ভারি অসহায়। কয়লার জাহাজের নাম শুনলেই মুখ ফ্যাকাসে! সে যেতে চায় না। এস. এস. সিউল ব্যাঙ্ক আসছে শুনলে, সে লাথি থেকে বের হয় না। না খেয়ে থাকে, টাকা পয়সা শেষ হয়ে যায় তবু মানুষটা কয়লার জাহাজে যাবে না। সেই মানুষটাই পড়েছে।

    কেউ ডেক ধরে যেতে পারছেনা। ঝড় বৃষ্টিতে সমুদ্র আবছা মতো। জাহাজ কাত হয়ে জলের কাছাকাছি যাচ্ছে আবার ভেসে উঠছে। সব পাখিগুলোর খাঁচা বোট-ডেকে তুলে দেওয়া হয়েছে। মোটা দড়ি দড়ায় বাঁধা। একটা খাঁচা এর মধ্যে কখন যে ঝড়ে উড়িয়ে নিয়ে গেছে কেউ জানে না। উপরে ওঠা যাচ্ছে না। দুজন অতি প্রাচীন নাবিক খুব দরকারি কাজে ডেকের ওপর দিয়ে হিবিং লাইনে ঝুঁকে ঝুঁকে বোট-ডেকে উঠে যাচ্ছে। বেশ একটা খেলার মতো যেন ওরা ব্যালেন্সের খেলা দেখাচ্ছে। সমুদ্রের ঢেউ ওপর দিয়ে ভেসে গেলে ওরা হিবিং লাইন ধরে ডুবে যায় জলে। আবার ভেসে ওঠে।

    অর্থাৎ ওরা লম্বা হয়ে যায়। প্যারালাল বারে খেলা দেখাবার মতো। খুব অনায়াসে ওরা ঢেউ মাথার ওপর দিয়ে বের করে দিতে পারে। তারপর জলে ডুব দিয়ে ওঠার মতো অবস্থা। নোনাজলে শরীর তখন জবজবে ভেজা। এমন যখন জাহাজের অবস্থা তখন ছোটবাবু দেখল, কেউ নড়ছে না। গল্প গুজব করছে সবাই।

    ছোটবাবুর এখন ডেকে কাজ। সে আজ চপাটি কিছুটা খেতে পেরেছে। সে খুব দুর্বল ভেতর থেকে। তবু সে শক্তভাবে চলাফেরা করার চেষ্টা করছে। যখন মানুষটা বাংকারে পড়েছে তখন নিশ্চয় সবাই সেখানে এখন ছুটে যাবে।

    সে তাড়াতাড়ি সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামার সময় বুঝল, আসলে সে এখন কিছুই তাড়াতাড়ি করতে পারে না। কিন্তু আশ্চর্য কেউ পিছিলে কোন তাড়াহুড়ো করছে না, কেমন যেন এটা জাহাজে সব সময়ই হয় ভাব। কেউ বলছে, কে পড়ল রে! ট্যারা লতিফ না বুড়া লতিফ।

    জাহাজে দুজন জাহাজি, লতিফ নামে। একজন ফায়ারম্যান। অন্যজন কোলবয়।

    —বুড়া লতিফ।

    —বুড়া মানুষের হাড় শক্ত। এটা কি কামের কথা। বুড়া জানে জাহাজ চলে ভাল!

    আরও সব রসিকতা, কেউ বড় একটা লতিফকে নিয়ে ভাবছে না। মৈত্র এখন ঘুমোচ্ছে অমিয় ঘুমোচ্ছে। ওদের শরীর একবার ডাইনে আবার বাঁয়ে হেলে যাচ্ছে। তবু ওরা নির্বিঘ্নে ঘুমোচ্ছে। ওপরে ছাদের গ্যালিতে থালাবাসন পড়ার শব্দ। এবং ঝড় ঝঞ্ঝা হলে যা হয়, একটা চাপা গোঁ গোঁ আওয়াজ আর স্টিয়ারিং এনজিনের কক্ কক্ শব্দ। অতিকায় সব প্যানিয়ানের ভেতর কক্ কক্ আওয়াজ উঠলে ছোটবাবু ঘাবড়ে যায়। এটা যে কি হচ্ছে! বুড়ো লতিফের জন্য কেউ ভাবছে না। এবং যেতে যেতেই সে শুনল কে যেন বলছে, বেটা কুঁড়ের বাদশা। কতদিন থেকে সফর করে। সেই কয়লায়ালা। আর এক ধাপ এগোল না।

    যেন এটা ধারণা মানুষের বিশেষ করে এই সব জাহাজিদের, পড়ে যাওয়া মানে দুবলা লোক, দুবলা লোকের জায়গা জাহাজে নয়। সরমের কথা। এবং এদের জন্য মায়া মমতা দেখানো পাপ। যেন এটা ঠিকঠাক থাকে, সমুদ্রে সাইক্লোন টাইফুন অথবা কঠিন হিমবাহের পাশাপাশি জাহাজ চালিয়ে নেওয়া, কখনও কখনও কলকব্জার ভেতরও মারামারি লেগে যায় অথবা যদি ইণ্ডিয়ান কোল থাকে জাহাজে তবে তো একটা কঠিন মারামারি। এসব জয়ের ভেতর জাহাজি জীবনের হামেসা সুখী হওয়ার ব্যাপারটা থেকে যায়। এবং যারা এ-সব পারে না, তারা জাহাজিদের মুখে কালি দেয়। তাদের জন্য মায়া দ্যাখানো ঠিক না।

    একবার ইচ্ছা হল মৈত্রদাকে ডেকে তোলে। এখন মৈত্রদাই তার কাছে সব। সুখে-দুঃখে সব পরামর্শ সে দেয়। কিন্তু ওয়াচের পর ঘুম, ঘুম ভাঙ্গানো ঠিক না। এমন একটা যখন কঠিন মারামারি, মার মার কাট কাট বয়লারে, তখন ওদের ঘুমোতে দেওয়াই উচিত। ওপরে উঠতে পারলে ঝড়ের দরিয়াটা একবার দেখা যেত। সে একবার গ্যালির ওপরে উঠেও গিয়েছিল, কিন্তু সেই সমুদ্রের অতিকায় সব ঢেউ পাহাড় প্রমাণ ছুটে আসছে দেখলে কেমন মাথা ঘুরে যায়। এবং সেই চাপা আওয়াজ, লক্ষ লক্ষ দানবের হাহাকারের শব্দ। সে ভয়ে সিঁড়ি ধরে ওপরে না উঠে, নিচে সোজা টানেলপথে নেমে গেল! এবং ক্রমে সিঁড়ি ধরে নেমে যেতে যেতে, অনেক নিচে নেমে যেতে যেতে কিছুটা প্রায় পাতালে নেমে যাবার মতো, সে প্রপেলার স্যাটের পাশ কাটিয়ে নুয়ে নুয়ে এনজিনরুমে ঢুকে গেল। তারপর যেন দেখতে না পায় কেউ, কিছুটা চুপিচুপি সে যাচ্ছে। তার কাজ ফাইবারের সঙ্গে। কিন্তু ডেকের ওপর সমুদ্রের ঢেউ এসে ঝাপটা মারছে বলে হয়তো ফাইবার অন্য কোন কাজটাজ করছে। ফাইবারকে খুঁজতে স্টোক-হোলডে ঢুকে গেল। এখানে কাজকর্ম ঠিক চলছে। সে ছোট-টিণ্ডালকে দেখতে পেল না। আর সবাই কাজ করে যাচ্ছে। কে বলবে, এই জাহাজে একজন মানুষ বাংকারে পড়ে আছে। সে আবার সিঁড়ি ধরে ওপরে উঠতে গিয়ে দেখল, সারেঙ বাংকার থেকে বেরিয়ে আসছেন। সারেঙকে দেখে ছোটবাবু না বলে পারল না, চাচা লতিফ পড়ে গেছে শোনলাম।

    —হুঁ!

    —পড়ে গেছে কেন?

    —তুই নিচে যা। এখন ওদিকে যাস না।

    —কেন!

    —না। বলছি, যাস না।

    —কে আছে ওর পাশে?

    —কেউ না।

    —আমি একটু দেখে আসছি চাচা।

    সহসা সারেঙ ওর হাত ধরে ফেললেন।—যাবে না। যাবে না বলছি। চোখ গরম করে বললেন, নিজের কাজ করগে।

    —কিন্তু …..।

    —কিন্তু টিন্তু জাহাজে না……।

    তবু মানুষের কি হয়ে যায়। সে বলল, না আমি যাব।

    সারেঙ বললেন, যাও। গেলে মরবে।

    মানুষের এমন হয়, এমন হয়ে থাকে, এটা মানুষের স্বভাব। ছোটবাবু ঠিক বোঝে না জাহাজে এলে মানুষেরা এমন নিষ্ঠুর হয়ে যায় কেন। সে বোঝে না মানুষের তো এটা স্বভাব না, মানুষ তো বিপদে আপদে ছুটে যাবেই। এমনভাবে সবকিছু এড়িয়ে যাওয়া ঠিক না। ভেতর ভেতর তার যে অসহায় ভাবটা ছিল কেন জানি সেটা ক্রমে ক্রমে কমে আসছে। কিন্তু ভেতরে ঢুকেই সে অবাক হয়ে গেল। বড়-মিস্ত্রি, মেজ মালোম অন্ধকারে দাঁড়িয়ে আছে। বাংকারে ভীষণ অন্ধকার। একটা মাত্র লম্ফ জ্বলছে বলে সে প্রথমে দেখল সাদা পোশাকে কারা ঘোরাফেরা করছে। ভূতের মতো যেন এবং কাছে গেলে সে আর ফিরে আসতে পারল না। দেখল, লতিফ লম্বা হয়ে পড়ে আছে। হাত- পা ছড়ানো। মুখ দিয়ে লালা গড়াচ্ছে। চোখ কেমন ওপরে উঠে গেছে। এবং মুখের রঙ কয়লার ধুলোতে কালো। পিছনে পাহাড়প্রমাণ কয়লার ঢিবি। ছাদ পর্যন্ত ঠেকে আছে। কয়লার গাড়িটা উল্টে গেছে। সুট থেকে কয়লা হড় হড় করে নেমে যাচ্ছে। এবং কয়লা টেনে ফায়ারম্যানরা সুর্ট একেবারে খালি করে ফেলেছে।

    তখনই যেন পেছন থেকে হাঁক। কারণ ছোটবাবু বুঝেছিল ওখানে ওর থাকা ঠিক না। সে পালাবে। কিন্তু তখনই শব্দ—হেই।

    সে ফিরে তাকাল। দেখল মেজ-মিস্ত্রি খুব শক্ত চোখে ওর দিকে তাকিয়ে আছে।

    মেজ মিস্ত্রি ফের চিৎকার করে বলছে, গো অন!

    সে ঠিক বুঝতে না পেরে দাঁড়িয়ে আছে।

    এবং বোধ হয় মেজ-মিস্ত্রি জানে এও জাহাজি মানুষ, অক্ষরজ্ঞান নেই মূর্খ এবং কথা বোঝে না। মেজ-মিস্ত্রি নুয়ে বেলচাটা তুলে কয়লার ঢিবির কাছে গিয়ে দাঁড়াল। তারপর এক দুই করে বেলচায় কিছু কয়লা তুলে দেখাল। এ-কাজটা ছোটবাবুর এখন করা দরকার। না হলে জাহাজ চলবে না। সুট খালি হয়ে গেছে। নিচে যমুনাবাজুর ফায়ারম্যানের কাছে কয়লা নেই।

    ছোটবাবুর অন্য কাজের কথা, তবু মেজ-মিস্ত্রি জাহাজে সব। ওদের অন্তত সব। ওর ওপরে ফায়ারম্যান, তার ওপরে গ্রীজার, তারপর টিণ্ডাল, সারেঙ, সারেঙের মা-বাপ জাহাজে মেজ-মিস্ত্রি। ছোটবাবুর কোন কিছু করার নেই। সে হাতে বেলচে নিয়ে প্রায় যেন ভূত দেখার মতো গাড়িটা কয়লার পাহাড়ের কাছে নিয়ে গেল। এবং সে জানে এই জাহাজে সে ঠিক এখন লতিফের মতো। অন্ধকার বাংকারে দিনের পর দিন তার কাজ। সে ঠিক বুঝতে পারল না, সে কি কাজ করছে। সে জানে পিছনে দাঁড়িয়ে আছে মহামহিম মেজ-মিস্ত্রি। প্রায় তার কাছে তিনি সেই প্রাচীনকালের ফারাওদের মতো। অসীম ক্ষমতা। ছোটবাবু গড় গড় করে গাড়িটা ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে, আর ষাঁড়ের খেলার মতো অসীম উৎসাহ মানুষটার, যেন লাল রুমাল উড়িয়ে দেওয়া, সাবাস। জলদি। আরও জলদি। জোরে। দু’হাত ওপরে তুলে হারি আপ। ম্যান, হারি আপ। থামো মাত। চলো জলদি। কাম ঠিক মাংতা। এবং ছোটবাবুর হঁস ছিল না। সে একটা তাঁতের মাকুর মতো সুটের কাছে গাড়ি ভরে, আসছে যাচ্ছে। অন্ধকারে সে এখন কয়লার গুঁড়োর ভিতর অস্পষ্ট দেখছে সব। কয়লা হড়হড় করে নেমে আসছে নিচে। পায়ের কাছে। গাড়ি ভরে সে হাতল ধরে নিয়ে যাচ্ছে। ওরা গোল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে এবং ভেতরে রয়েছে জ্যাক। জ্যাক মাঝে মাঝে চোখ তুলে দেখছে ওকে। কখনও কখনও অপলক। তখন ছোটবাবুর ভেতর কি করে যে ভয়টা কেটে গেছে। সে মানুষের মতো ভাবছে নিজেকে। সে সত্যি ভয় পাচ্ছে না। আর তখনই মনে হল, মেজ-মিস্ত্রি লতিফের মুখের কাছে জুতোর টো নিয়ে আসছে। জুতোর টো দিয়ে দেখছে, মানুষটা কেমন আছে। অর্থাৎ মুখ নেড়ে দিতে যাচ্ছে। এবং তখনই ছোটবাবুর সেই সবদিনের কথা, কেউ যেন হাতি চড়ে যায়, রাজার মতো নিরুদ্দেশে যায় সব মনে পড়ে যায়। এবং বড় এক নদীর কথা মনে পড়ে। নদীর পাড়ে পাড়ে সেই সব প্রাচুর্যের দিনগুলো মনে পড়লেই ভেতরে সাহস বেড়ে যায়। সম্মানবোধ বেড়ে যায়। মানুষ হিসাবে সে কালো বলে কালো মানুষের ওপর তার প্রীতি বেড়ে যায়। এই যে মেজ-মিস্ত্রি মাঝে মাঝে টো দিয়ে মুখ নেড়ে দিচ্ছে, জ্ঞান ফিরে এসেছে কি না দেখছে এটা সারেঙ. সাব দেখেও কিছু বলতে পারছেন না। তিনি চুপচাপ। এবং দেখছেন, অর্থাৎ যা ভেবেছিলেন, ছোঁড়াটা নিজের দোষে মরল। এবং রাগে তিনি আর ছোটবাবুর দিকে তাকাচ্ছেন না।

    সারেঙের মাথায় এখন নানা ভাবনা। কি করে ওটাকে বোট-ডেকে তোলা যাবে। এখানে পড়ে থাকলে চলবে না। ওপরে তুলে নুন জল খাওয়াতে হবে। ভাল করে স্নান করিয়ে দিতে হবে। এবং মাঝে মাঝে সেই জুতোর টো এগিয়ে আসছে। সাহেব-মানুষেরা লতিফকে নিয়ে হাসি-তামাসা করছে। ছোটবাবু দেখছে সব। ভিতরে যে এমন একটা রক্তপ্রবাহ মানুষের মাঝে মাঝে থেকে যায় সে জানে না। মাথাটা কেন যে গরম হয়ে যাচ্ছে। সে কাজে কোন অবহেলা দেখাচ্ছে না। তবু আবার জুতোর টো মেজ-মিস্ত্রি লতিফের মুখের দিকে এগিয়ে আনলে সে গাড়ি উল্টে দিল, বেলচেটা দূরে ফেলে দিল, এবং কাছে এসে খুব আলতোভাবে যেন কত বিনয়ের সঙ্গে সে মেজ-মিস্ত্রির পায়ের কাছ থেকে করুণ ভিক্ষার মতো লতিফের মুখটা সরিয়ে নিল। তারপর চোখ তুলে তাকাল মেজ-মিস্ত্রির দিকে। ছোটবাবু লম্বা মানুষ। সে এই বেঁটে ছোটখাট মানুষটাকে কাঁধে ফেলে নিল এবার।

    সারেঙ কেমন ঘাবড়ে গেলেন। লতিফকে এভাবে তোলা যাবে না। তিনি তোলার জন্য দড়িদড়ার ব্যবস্থা করতে গিয়েছিলেন। আর ছোটবাবু ভোররাতের দিকে বমি করেছে। ওপরে উঠতে পারত না। কেমন নির্জীব মানুষ। সে কিনা এখন ঝড়ের সমুদ্রে এমন একটা ভয়াবহ কাজে জড়িয়ে পড়েছে। মেজ-মিস্ত্রি প্রথম ব্যাপারটা বুঝতে পারে নি। সে একটা নেটিভ ইণ্ডিয়ানের কাছে কি আশা করতে পারে, অথচ নেটিভ-ইণ্ডিয়ানটা অনায়াসে বের হয়ে যাচ্ছে টলতে টলতে। পড়ে গেলেই নিচে, স্টোক হোলডে দুটোই গুঁড়ো হয়ে যাবে। কিন্তু এমনভাবে কাঁধের ওপর ফেলে নিয়েছে যে এখন আর কিছু বলাও যায় না। সন্তর্পণে হেঁটে যাচ্ছে। ফানেলের গুঁড়ি ধরে সমুদ্রের ঢেউ, তখন থেকে উঠে আসছে। আর সে উঠে যাচ্ছে। সে উঠে যাচ্ছে লোহার সিঁড়ি ধরে। সে টলছে। সে কাঁপছে। কিন্তু ওর হাত পা ভীষণ শক্ত মজবুত। সে বোট-ডেকে উঠেই আর পারল না। বমির মতো উঠে আসছিল, সে চায় না বমিটা এখানে হোক। সে তাড়াতাড়ি লতিফকে বোট-ডেকে রেখে সিঁড়ি ধরে নিচে নেমে যেতে থাকল এবং বাংকারে ঢুকে দেখল, কয়লা অনেক নিচে নেমে গেছে। যেন সে সারা মাস বৎসর কাজ করেও এই পাতালে নেমে যাওয়া সুটের ভেতরটা ভরতে পারবে না। বমিটা এবার সজোরে নাকমুখ দিয়ে বের হয়ে এল। এবং তাজা নোনতা স্বাদ। চ্যাট-চ্যাট করছে। কেমন কালো রঙ। অন্ধকার বাংকারে সে বুঝতে পারছে না, আসলে এটা কি। সে বেলচেটা আবার তুলে নিল। মুখটা মুছে ফেলল ভারি তোয়ালে দিয়ে। আসলে ওর মুখ এখন হিজিবিজি নিগ্রো দুঃখী মানুষদের মতো দেখতে হয়ে গেছে। তার যতসব স্বপ্ন, এখন হিজিবিজি খাঁজকাটা একটা মাকড়সার জালের মতো ছিঁড়ে যাচ্ছে। হাত দিলেই ছিঁড়ে যাচ্ছে।

    সে জানে সে থেমে গেলেই হেরে যাবে। সে জানে পাশে এক অজগর পাতালের দিকে নেমে গেছে, তার সঙ্গে এক লড়াই তার। না-হলে সেই হাসি ঠাট্টা! মসকরা করবে, সে করুণার পাত্র হয়ে যাবে। সে দাঁড়াতে পারছে না—এমন আর কখনও ভাববে না। সে বেশ আছে, ভালো আছে, মাগো আমি ভাল আছি। টাকা পেলে কিনা জানাবে। কম টাকা, তবু তোমাদের কিছু অন্তত হয়ে যাবে। আমি এখন যাচ্ছি কলম্বো, তারপর আমেরিকা, আমি যে কত বড় হব বলে নিরুদ্দেশে চলে এসেছি। আমার আকাঙ্ক্ষা অনেক, আমি সুন্দর এক পৃথিবীর বাসিন্দা হয়ে বাঁচতে চাই। আমি হেঁটে যাব মা, চারপাশে মানুষেরা বলবে, ঐ যে মানুষটা হেঁটে যাচ্ছে। আমি স্বপ্ন দেখব মা, হ্যাঁ স্বপ্ন, পাশে স্টাবোর্ড-সাইডের বাংকারে এখনও গাড়ির শব্দ পাওয়া যাচ্ছে। মনু কাজ করছে ওখানে। খুব পরিশ্রমী মনু, মৈনুল হক, তা তুমিও তো বেশ কাজ করে যাচ্ছ। আমার এমন ভাবে ওক উঠে আসছে কেন। বার বার। এই নিয়ে সাত বার। তুমি কি এখন একবার এ-বাংকারে আসবে! এসে খোঁজ নেবে আমি পারছি কিনা! সারেঙসাব বলে গেছেন দেখতে, মাঝে মাঝে দেখতে। তুমি আমাকে দেখবার আগে বলছি, ঠিক সুট ভরে দেব। তোমার আগে ভরে ফেলব।

    এ-ভাবে সে ক্রমান্বয়ে একটা মাকুর মতো বাংকারের অন্ধকারে কাজ করতে করতে এক সময় দেখল, কয়লার লুট ভরে গেছে। সে তাড়াতাড়ি গাড়িটা প্রায় ঠেলে ফেলে দিয়ে হাত তুলে হৈ হৈ করে উঠলেই ছুটে এসেছিল মনু। সে দেখতে পেয়েছিল, ছোটবাবু হাত দিয়ে সুটের কয়লা সাজিয়ে দিচ্ছে। সে কেমন একটা গন্ধ পেল বাংকারে। তাজা রক্তের গন্ধ যেন। এমন হয় সে জানে এবং মনু তাড়াতাড়ি ওর কাছে লম্ফ নিয়ে গেল। লম্ফ তুলে দেখল। মুখটা ভীষণ বীভৎস। চোখ লাল। কালো মুখে সাদা দাঁত বের করে হাসছে। হাসিটা ভারি কষ্টের। মনু বলল, তোর বাংকারে বাঁস কেন রে!

    —কোথায় বাঁস!

    —তাজা খুনের বাঁস।

    —যাঃ।

    —হ্যাঁ। পাচ্ছি! দ্যাখতো বলে সে লম্ফটা নিয়ে অস্পষ্ট আলোতে খুঁজতে থাকল। তারপর এক জায়গায় এসে থমকে দাঁড়াল। বলল, এখানে তুই বমি করেছিস?

    ছোটবাবু বলল, হ্যাঁ।

    —এসে দেখ কি করেছিস।

    ছোটবাবু বলল, আমি আর উঠতে পারছি না! আমার ওয়াচ শেষ, আমিও শেষ।

    তবু মনু ওকে ধরে নিয়ে গেল। ছোটবাবু দেখল, লাল তাজা রক্তে ভেসে গেছে ডেক। সঙ্গে সঙ্গে আবার ওক ওঠে এল ভিতর থেকে। তারপর টলতে টলতে পড়ে গেল নিচে। ছোটবাবু যথার্থই সংজ্ঞা হারিয়ে ফেলল। সমুদ্রে ঝড়ের ঝাপটা তখন আরওবেগে নামছে। জাহাজ উঠছে নামছে। ফুলছে। ক্ষেপা সমুদ্র। মেঘলা আকাশ। প্রচণ্ড ঝড়ে দানবের মতো নীল রঙের ঢেউ। মাথায় সাদা ফেনা। এ্যালবাট্রস পাখিদের আর্তনাদ কখনও ঢেউয়ের মাথায়—ওরা উড়ে উড়ে ভেসে যাচ্ছে। অস্পষ্ট এক কুয়াশার ছবি যেন চারপাশে।

    এবং খবর চারপাশে আবার ছড়িয়ে পড়ল। ছোটবাবু পড়েছে। মৈত্রের এখন ওয়াচ। সে নেমে যাবার মুখে এমন শুনল। মেজ-মিস্ত্রি আবার এসে নেমেছে! তার যা স্বভাব! জ্যাক এসে নেমেছে। সে পাশে দাঁড়িয়ে দেখল ছোটবাবু কাত হয়ে পড়ে আছে। সে পাশে বসবে ভাবল, কিন্তু মনে হচ্ছে সেকেণ্ড পা তুলে আছে। যারা ছোট কাজ করে তাদের মুখ হাত দিলে বড় অপমান। সম্মান থাকে না বুঝি। পা বাড়িয়ে মুখটা একটু নেড়ে চেড়ে দেখা। সত্যি পড়েছে না ভয় পেয়ে এমন করছে। মুখে রক্তের দাগ দেখেও মায়া হয় না। জ্যাক এবার উঠে দাঁড়াল। ঠিক পাশে। এবার পা তুলতে যাচ্ছে আর্চি। আর্চি স্নান সেরে নেমে এসেছে। পায়ে তার বাথরুম স্লিপার। বুড়ো আঙ্গুল বের হয়ে আছে। জ্যাক এখনও শক্ত বুটজুতো পরে আছে। পা-টা উঠে আসছে। ডান পা তুলে আর্চি ছোটবাবুর মুখের দিকে এগিয়ে নিচ্ছে। আর তখন ঠিক পাশে অর্চির বাঁ পা। পায়ের বুড়ো আঙ্গুলের মাথায় জ্যাক তার গোড়ালির সর্বশক্তি দিয়ে চাপ দিতেই চিৎকার করে উঠল আর্চি।—এহো গেলাম! গেলাম!

    আর্চির বাঁ পায়ের বুড়ো আঙুলটা ভীষণভাবে থেঁতলে গেছে। না দেখে এমন একটা কাজ করে ফেলেছে জ্যাক। সে চোখ টেনে বলল, সরি মিঃ আর্চি। কোথায় লাগল। উপুড় হয়ে পায়ের কাছে বসতেই দেখল, আর্চি পাটা নিয়ে ঘুরে ঘুরে এক পায়ের ওপরে নাচছে। জ্যাকের ভীষণ হাসি পাচ্ছিল। কিন্তু মৈত্র যখন ছোটবাবুকে কাঁধে ফেলে নিয়ে যাচ্ছিল, তখন ফোঁটা ফোঁটা রক্ত দেখে জ্যাক ঘাবড়ে গেছে। মুখ থেকে ছোটবাবুর ফোঁটা ফোঁটা রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। জ্যাক কেবল নিশি পাওয়া মানুষের মতো ছোটবাবুর পেছনে হেঁটে যেতে লাগল। সে হাসতে পারল না, কাঁদতেও পারল না।

  • চার

    চার

    ।। চার।।

    সমুদ্র ক্রমে শান্ত হয়ে এল একসময়। বন্দর পেতে বেশি দেরি নেই। জাহাজিদের এ-সফরে প্রথম বন্দর। কাজেই অনেকে, সেই সকাল থেকেই কিনার দেখার চেষ্টা করছে। কিছুই তো দেখা যায় না। কেবল নীল আকাশ, নীল সমুদ্র, আর মাঝে মাঝে সমুদ্রপাখিদের ওড়াউড়ি। রাতের জ্যোৎস্নায়, নীল আকাশ, সবুজ নক্ষত্র এবং সমুদ্র থেকে ঠাণ্ডা বাতাস। একনাগাড়ে বসে থাকলে ডেকে মনে হয় কেমন এক গোলাকৃতি নীল বিরাট একটা টানেলের ভিতর দিয়ে জাহাজটা নিশিদিন ছুটে যাচ্ছে। যেন কোন অতিকায় এক স্পেস রকেট, অথবা আরও কিছু—তখন আর উঠতে ইচ্ছে হয় না। বসে থাকতে ভাল লাগে।

    ছোটবাবু এখন ভালোর দিকে। বমি করতে করতে গলা চিরে যায়। এবং গলা চিরে গলগল করে রক্ত উঠে আসে। তারপর নুনজল, এবং নুনজনই জাহাজে একমাত্র ওষুধ, জাহাজে বমি করলে, খেতে না পারলে, মাথা ঘুরলে একমাত্র এই জল। সমুদ্র থেকে বালতি করে জল তুলে খেয়ে ফেলা। তারপর অভ্যাস, অভ্যাসে সব কিছু সহা হয়ে যায়, মাথাও ঘোরে না, বমিও হয় না। কেবল তখন মনে হয় এই জাহাজের পিচিং ভারি আরামের। চোখ বুজে আসে। ঘুম চলে আসে। কিনারায় বেশিদিন থাকলে অসুবিধা!

    মেজ-মালোম আবার সেই ডেক-চেয়ারে বসে আছেন। চোখে বাইনোকুলার। কিনার কাছে নেই। তবু দেখার স্বভাব। জাহাজ বন্দরের কাছাকাছি এলে তিনি সময় পাবেন না। জাহাজের বাঁধাহাদা আছে। আগিলে, বড়-মালোম, পিছিলে, মেজ মালোম। দু’জন দু’দিকে! আর ডেক-জাহাজিরা আছে। ওরা হারিয়া বললে, দড়িদড়া হারিয়া করে দিচ্ছে, হাপিজ বললে, দড়ি টেনে ধরছে। ওয়ারপিন ড্রামে দড়িদড়া টানাটানি করে বাঁধাছাঁদা হয়ে গেলে ছুটি। মেজ-মালোম তখন আবার ডেক চেয়ারে বসে জুতসই বন্দরের বড় বড় গাছপালার ভেতর কিছু খুঁজে বেড়াবে। কারণ যা খবর, জাহাজ এখানে থামছে না। শুধু রসদ নেবে। রসদ নিতে কত আর সময়। সুতরাং ডেকে বসে থাকলে বাইনোকুলারটা একমাত্র তার সম্বল। জাহাজে সময় কাটানোর পক্ষে সে একটা বেশ কাজ পেয়ে যায় তখন।

    তখন নিচে মৈত্র ছোটবাবুর কাছে খবর নিয়ে এল, রাতে জাহাজ বন্দর ধরছে। মৈত্রের বারোটা- চারটা ওয়াচ শেষ। রাতে ওয়াচ নেই। জাহাজ বাঁধাছাঁদা হলে একটা বয়লার শুধু চলে। জাহাজের যে সামান্য কাজ, উইন্‌চ চালানো, জেনারেটর চালানো, এ-সব কাজে একটা বয়লার চালালেই হয়ে যায়। তখন ছুটি ছুটি ভাব। বেশ একটা উত্তেজনা, মৈত্রকে দেখলেই বোঝা যায়। সে শিষ দিয়ে নামছে। অমিয় একটা গান গাইছে। ওর গলা ভাল। বেশ গায়। সে যেন কি একটা আকাশ টাকাশ নিয়ে গান গাইছে! ডেক-সারেঙ, ডেক-জাহাজিরা ছুটি পাচ্ছে না। ওদের কাজ জাহাজের বাঁদাছাঁদা না হলে শেষ হচ্ছে না। তবু জাহাজ বাঁধাছাঁদা হবে ভেবে, বন্ধু, অনিমেষ, মনু সবাই একবার করে খবর দিয়ে গেছে, সারেঙও এসেছিলেন, ছেলে, জাহাজ বন্দরে ঢুকছে। উপরে উঠে না গেলে দেখবে কি!

    মৈত্র স্নান সেরে এসেছে। অমিয় লকার খুলে কি যেন খুঁজছে। বোধহয় খাম পোস্টকার্ড। কিন্তু অমিয় জানে না, দেশের খাম পোস্টকার্ডে চলবে না। মৈত্র একটা চিঠি লিখবে শেফালিকে, যা সময়, একটু সাবধানে না থাকলে চলবে না। মৈত্র বেশ আশায় আশায় আছে। সে জাহাজ বন্দরে ঢুকে গেলেই ঠিক খাম পোস্টকার্ড সংগ্রহ করে ফেলবে। এবং নানাভাবে সে ভেবে রেখেছে—শেফালির জন্য সে কি করতে পারে। বুনোসাইরিসে না যাওয়া পর্যন্ত সে কিছু করতে পারছে না। ওখানে জাহাজ বেশ কিছুদিন নোঙর ফেলে থাকবে। জাহাজ খালি হবে, জাহাজ বোঝাই হবে। বেশ কিছুদিন লেগে যাবে বোঝাই হতে। কোম্পানির ঘরে টাকা জমবে মন্দ না। সে এ বন্দর থেকে ভেবেছে কিছু কাঠের হাতি, ময়ূরের পালখ কিনে নেবে। ওগুলো বেশ দামে বিক্রি করা যাবে। এ ভাবে তার দু’পয়সা হবে। এবং এ-ভাবে সে শেফালিকে বেশ ভালো টাকা পাঠাতে পারবে।

    ছোটবাবুর দিকে মৈত্র তাকিয়েছিল। কিছু ভাবছিল। শেফালির কথা। ছোটবাবু বেশ শুয়ে আছে! মুখে একটু সাদাটে ভাব। রক্তপাতে এমনটা হয়েছে। শুয়ে আছে সাদা চাদর গায়ে। সে লম্বা পাতলুন পরেছে আর ডোরাকাটা পাঞ্জাবি। ওর চুল আরও বড় হয়েছে। জাহাজে উঠলে শরীরের রঙ আরও মনোরম হয়। ছোটবাবু এমনিতেই ভীষণ সুন্দর, সুপুরুষ, তার ওপর নোনা জল লেগে এক আশ্চর্য সুষমা মুখে। খুব ভালবাসতে ইচ্ছে হয়। আদর করতে ইচ্ছে হয়। ছোটবাবুর দিকে তাকিয়ে থাকলে চোখ ফেরানো যায় না।

    মৈত্র বলল, ছোটবাবু তোমার কথা জ্যাক বলছিল।

    —কি বলছিল! ছোটবাবু কোন রকমে উঠে বসার চেষ্টা করল। মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে গেল।

    —তুমি কেমন আছ!

    ছোটবাবু বলল, যাঃ।

    —সত্যি! বললাম, ভালোর দিকে।

    —কেন বললে না, ভালো আছি। আমি আবার দু-একদিনের ভেতর বাংকারে নেমে যেতে পারব।

    –এটা তোমার ছোটবাবু বাড়াবাড়ি। তুমি পারবে না। তুমি বড্ড একগুঁয়ে।

    —সবাই পারলে আমি পারব না কেন! তাছাড়া সবাই কি ভাববে!

    —তুমিও পারবে। পারতে তোমার সময় লাগবে।

    —এখন তো আর মাথা ঘোরে না। বেশ সয়ে গেছে সব। খুব খিদেও পায়।

    —শরীর ভাল হলে পারবে। তোমাকে আমার ওয়াচে নেব ভাবছি। ফালতু থাকলে, আবার কখন কোন দরিয়ায় কিসে কে পড়বে, তখন হঠাৎ পারবে না। একবার অভ্যাস হয়ে গেলে, দেখবে সব কাজই মানুষ পারে, মানুষ পারে না, পৃথিবীতে এমন কাজ নেই

    ছোটবাবু কিছু বলল না। চুপ করে থাকল।

    মৈত্র বলল, আচ্ছা ছোটবাবু তুমি এমন চুপচাপ থাক কেন। কথা বল না!

    ছোটবাবু বাল্‌কেডে হেলান দিয়ে বসে আছে। সে মৈত্রের দিকে তাকিয়ে না হেসে পারল না। বলল—কথা বলি না কোথায়! বেশ কথা বলি।

    —আচ্ছা ছোটবাবু জাহাজে তুমি এমন ভাবে থাকো কেন?

    —কি ভাবে।

    —এই যে মনে হয় কেউ তোমার যেন নেই।

    —না না। তেমন ভাবে থাকি না তো।

    —তুমি ভাল ছেলের মতো জাহাজে থাকলে ভীষণ কষ্ট পাবে।

    —ভাল ছেলের মতো কোথায় থাকি!

    —তুমি ছোটবাবু যাই বল খুব চাপা স্বভাবের। আমরা ফোকসালে কত কথা বলি, তুমি তো তোমার বৌদির সব খবর প্রায় মুখস্থ করে ফেলেছ।

    —তা বলতে পার। এত বেশি শেফালি বৌদির কথা বল, যে মনে হয়, পৃথিবীতে আর কেউ বাস করে না। একমাত্র শেফালি বৌদিই বাস করে।

    —তবে! আর তুমি তোমার দেশে কে আছে, কেন এমন একটা কাজে এলে, অমিয় বলল, কলেজের পড়াশোনা পর্যন্ত তোমার আছে, জাহাজের ট্রেনিং-এ সব লুকিয়ে গেছ—এত সব কেন? কিনারায় একটা চাকরি দেখে নিতে পারলে না!

    —তুমি তো জানো মৈত্রদা তোমার মতো, তোমার মতো কেন, আমাদের জাহাজে যারা আছে, একমাত্র ডেক-সারেঙ বাদে সবাই আমরা পাকিস্তানের, আমরা দেশ ছেড়ে চলে এসেছি। আমাদের তো কিছু একটা করে খেতে হবে। নাবিক বলতে আমরা জানি, সবাই সন্দীপ, নোয়াখালি, চিটাগাঙের লোক। এখন দেশ ভাগ হয়ে গেছে। ওরা কতদিন আর আমাদের জাহাজ চালাবে। আমাদের তো সমুদ্র-যাত্রায় বের হতেই হবে।

    —এসব বড় বড় কথা। এ-সব কথা তোমাদের ট্রেনিং-এ শেখায়। আসলে এমন একটা অমানুষিক কাজ, একঘেয়েমির কাজ করতে কেউ সখ করে আসে না। নানা কারণে অবশ্য আসে। কিন্তু তোমার মতো মানুষ কেন আসে বুঝি না!

    ছোটবাবু ফের হাসল। বলল, মৈত্রদা অভাবে সবাই আসে। আমিও এসেছি। তুমি আমার সম্পর্কে এর চেয়ে বেশি না ভাবলেও চলবে।

    বন্ধু এবং অনিমেষ পাশে বসেছিল। অমিয় ‘বিশুর’ ভাত ডাল সবজি গরম করে নিচ্ছে। একটু পরেই ওরা মেসরুমে খেতে বসবে। ছোটবাবু সকালে ওপরে উঠে গেছিল। মেসরুমে খেয়েছে। এখনও উঠতে চায়। নিচে বসে থাকতে ভাল লাগছে না। পোর্টহোল দিয়ে আকাশ দেখা যাচ্ছে। এখন ওপরে ওঠে সমুদ্র দেখতে ইচ্ছা হচ্ছে। সমুদ্র ভীষণ শান্ত ঠিক শিশু সরল মানুষের মতো। লতিফ ভাল আছে। সে আবার বাংকারে নেমে যেতে পারছে। ডেকে উঠে যাবার সময় সেও একবার খবর নিয়ে গেল, কেমন আছেন ছোটবাবু।

    ছোটবাবু হেসে বলল, ভাল। তুই কোথায় যাচ্ছিস!

    —ওপরে। নামাজের সময় পার হইয়া যায়।

    এনজিন-সারেঙ এসে বললেন, মৈত্র মশায়, ছোটবাবুকে ওপরে নিয়ে যান। কিনার দেখা যাচ্ছে।

    এই কিনার দেখার ব্যাপারটা জাহাজিদের কাছে আশ্চর্য অভিজ্ঞতার মতো। যেন জল শুধু জল, দেখে দেখে চিত্ত তার হয়েছে বিকল, পৃথিবীর কোথাও ডাঙ্গা আছে ভাবাই যায় না। সমুদ্রে জাহাজ চললে, নিশিদিন জাহাজ চলতে থাকলে ভাবাই যায় না, মানুষেরা ডাঙ্গায় থাকে। কোথাও মানুষ, গাছপালা, পাখি এবং মাটি আছে বিশ্বাসই করা যায় না। কিনারার নামে নতুন ডাঙ্গা দেখার জন্য সবাই পাগলের মতো ওপরে ছুটছে। যে-যার কাজ ফেলে এখন ওপরে উঠে যাচ্ছে। কেউ ফোকসালে নেই। বুড়ো ভাণ্ডারি পর্যন্ত গ্যালিতে হাতা-খুন্তি ফেলে রেলিঙে এসে দাঁড়িয়েছে।

    যারা নিচে কাজ করছিল, এনজিনরুমে, তারাও কেউ কেউ যেমন ছোট টিণ্ডাল উঠে এসেছে। কাপ্তান ব্রীজে, রেলিং-এ ভর করে দেখছেন! মেজ-মালোম ডেক-চেয়ারে বসে আছে। ওর চোখে বাইনোকুলার। জ্যাক বোট-ডেক থেকে লোয়ার-ডেকে নেমে এসেছে। জ্যাকের চলাফেরা অদ্ভুত। সে কখনও জাহাজে হাঁটে না। সে লাফিয়ে অথবা দৌড়ে দৌড়ে যায়। এক ফল্কা থেকে আর এক ফল্কায় যেতে সে নিচে নেমে ওপরে উঠে যায় না। সে লাফ মেরে ফল্কাটা ডিঙ্গিয়ে যায়। ছোটবাবু ওপরে উঠেই দেখল, জ্যাক মেজ-মালোমের পাশে বসে রয়েছে। চুপচাপ। চোখে তার বাইনোকুলার। জ্যাকের বড় চুল কেটে ফেলা হয়েছে। জ্যাককে ভীষণ নেড়া নেড়া লাগছে। এত খাটো চুলে জ্যাককে দেখতে ভালো লাগছে না।

    তখন যা হয়, চারপাশে সবাই তখন ডাঙ্গা খুঁজে বেড়ায়। ওরাও খুঁজতে গিয়ে দেখল, দিগন্ত রেখায় সমুদ্রের নীল জল পার হয়ে ছায়া ছায়া ভাব, মেঘের মতো এক টুকরো জমির ছবি। কি যে আছে, কিছুই দেখা যাচ্ছে না, তবু সবাই দাঁড়িয়ে আছে। কেউ নিচে নেমে যাচ্ছে না। যেন দেখা, কিভাবে কাছে যাওয়া যায়। জাহাজ চালিয়ে কাছে যাওয়া যায়। প্রপেলার তেমনি জলের নিচে অন্তহীন ঘুরে চলছে, সাদা ব্লেড নীল জলে ঘুরছে, কেবল ঘুরছে, সাদা ফেনা তুলে দিচ্ছে পেছনে, আর অনেক দূর থেকে ভেসে আসছে একটা সরলরেখার মতো ভাসমান তিমি মাছের ছবি, ছবিটা ক্রমে যেন জাহাজের সঙ্গে এগিয়ে আসছে, মনে হয় একটা না, অনেক কটা, সারি সারি, একটা আর একটার পেছনে, ছুটে আসছে। সমুদ্রের জল উঁচু হয়ে যাচ্ছে সরলরেখার মতো। প্রপেলার জল ভেঙে ভেঙে এমন একটা দূরের ছবি তৈরি করে রাখলে মনে হয় জাহাজটার পেছনে তিমি মাছেরা স্রোতের মতো জলের নিচে উঠে আসছে। ছোটবাবুর বেশ ভালো লাগছিল—সে যত দূরে সম্ভব চোখ মেলে দিচ্ছে।

    আসলে এমন একটা সুন্দর দৃশ্য সে কবে দেখেছে জানে না। সে কেমন বিস্ময়ে নড়তে পারছে না। সূর্য অস্ত যাচ্ছে। সমুদ্র এখন ভীষণ লাল। আকাশ লাল হয়ে গেছে। আর সাদা জাহাজ। সাদা জাহাজটাকে সে কিছুতেই ভাবতে পারে না জাহাজ, আসলে সেই সৌরলোকের অন্তহীন যাত্রার মতো মনে হয়, যেন চারপাশে সব গ্রহ নক্ষত্র, উপগ্রহ আর এক সৌরলোক থেকে অন্য সৌরলোকে একটা যান অনবরত ছুটছে। তারা ক’জন জাহাজি তার ভেতর বসে রয়েছে। বিরাট এক স্পেসঅডিসির মতো এই যানে তাদের যাত্রা আরম্ভ হয়েছে।

    জাহাজে ক্রমে আলো জ্বলে উঠল। দূরের বন্দরে আলো জ্বলছে। জ্যোৎস্না রাতে সমুদ্রে আলো জ্বললে এক আশ্চর্য মায়ার খেলা। ডেকের মাস্তুলের মাথায় আলো, ব্রীজের উইংসে আলো, কেবিনে কেবিনে আলো, সামনে পেছনে সব জায়গায় আলো। ডগ-ওয়াচে যার ‘আগিলে’ পাহারা দেবার কথা তার ছুটি, জাহাজ বন্দর ধরলে, ফরোয়ার্ড পিকে পাহারা লাগে না। তাকে কোনও দূরের জাহাজ অথবা পাহাড় দেখে তখন ঘণ্টা বাজাতে হয় না। সেও শিস দিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে ডেকে

    এভাবে জাহাজ ক্রমে বন্দরের কাছাকাছি চলে আসছে। কেউ নেমে যায়নি। সূর্যাস্তে জাহাজিরা রাতের খাবার মেসরুমে খেয়ে নেয়। সবাই ভুলে গেছে খেতে হবে। ভাণ্ডারি ভীষণ গালাগাল করছে। জাহাজিদের খাইয়ে দিতে পারলেই ছুটি। সেও তখন তার বুড়ো চোখে বন্দরে, আলো, অস্পষ্ট ছায়া অথবা দুরের কোন জাহাজে ব্যাণ্ড বাজতে থাকলে সুদূরে সেইসব বিদেশিনীদের কথা মনে করে জীবন অন্তহীন এক সৌরযানের মত—কেবল নিয়ত চলা, এমনি ভাববে। নামাজের সময় মনের ভিতরে কত কথা বুড়ো বয়সে যে উঁকি দেয়।

    আসলে ছোটবাবুকে ওপরে ধরে তুলেছিল অমিয়। এখন এ-সব দেখে মনে হচ্ছে, সেও জাহাজের চারপাশে ধীরে ধীরে ঘুরে বেড়াতে পারে। তার শরীর দুর্বল, সে ভাল করে এখনও খেতে পারে না, গলায় খেতে লাগে, এসব মনে থাকে না। কাপ্তানের ছেলেটা তো মেজ-মালোমের পাশে একটু বসে আবার কোথায় দু-লাফে নেমে গেল। পিছিলে সে আসে না। এখানে নিচে ফোরক্যাসেলে খালাসিরা থাকে, তার হয়তো মানা আছে এদিকটাতে আসা। তবু আজ ছোটবাবু দেখল সব বাঁধা নিষেধ ভেঙে জ্যাক ছুটে ছুটে পিছিলের যমুনাবাজু দিয়ে ঢুকে গঙ্গাবাজুতে বের হয়ে গেল। সবাই তখন তটস্থ। সারেঙ দু’হাত দিয়ে পিছিলের সব জাহাজিদের সরিয়ে দিচ্ছে। কোন কারণে যেন গায়ে না লেগে যায়।

    আর ছোটবাবু তখন হাঁটছে। মৈত্র দেখছে না, ওর পাশে ছোটবাবু নেই। ছোটবাবু ধীরে ধীরে হেঁটে যাচ্ছে। বোট-ডেকে মেজ-মালোমের কাছে কী যে ওর আকর্ষণ। সে পাশে গিয়ে দাঁড়ালেই মেজ- মালোম বলল, ও-কে?

    সে বলল, ইয়েস ও-কে। তারপর সে বলল, এনি ওম্যান সেকেন্ড।

    —নো।

    ছোটবাবু চুপচাপ ওর চেয়ারের নিচে পা ছড়িয়ে বসে পড়ল। সেই প্রথম দিন থেকেই মানুষটিকে কেমন পাগলাটে পাগলাটে লাগে। থুতনিতে ওর লাল দাড়ি। সেই একমাত্র অফিসার মানুষ, ফোকসালে গিয়ে যে রোজ দেখে আসছে তাকে। কেমন আছে ছোটবাবু, এখন কি খাওয়া দরকার, সামান্য অষুধ অন্য সব আরও যা কিছু দরকার, সে দিয়ে আসছে। মানুষটিকে ছোটবাবুর ভীষণ ভালো লাগে। সে ওর সঙ্গে খুব সহজে কথা বলতে পারে। কোন সংকোচ বোধ করে না। এই যে সে বলে ফেলল, এনি ওম্যান সেকেন্ড যেন এটা না বললে আর কিছু বলার থাকে না। এখনতো জ্যোৎস্না রাত, এখনতো দূরের বন্দরে নানাবর্ণের আলো, শুধু হাজার জোনাকির মতো জ্বলছে, আর কিছু দেখা যাচ্ছে না। আর জাহাজ ইতস্ততঃ চারদিকে নোঙর ফেলে আছে, অথবা বয়াতে বাঁধা। তার ভেতর দিয়ে কিছু দেখা যেতে পারে না। এমন কি বাড়ি ঘর মন্দির সব অস্পষ্ট। তার ভেতর মেয়েমানুষের ছবি দেখা স্বপ্নের মতো।

    আসলে ছোটবাবুর মনে হল, মেজ-মালোম দূরবীনটা চোখে দিয়ে অন্য একটা জগতের সন্ধানে থাকে। সেখানে একটা বড় রাস্তা থাকে। দুধারে পাইনের গাছ থাকে, পাশে নীল জলের হ্রদ থাকে, সে একটা স্কুটারে বসে থাকে, পেছনে থাকে এক সুন্দরী যুবতী, যেন নিশিদিন সে স্কুটার চালাচ্ছে, আর পেছনে পিঠের কাছে যুবতী তাকে সাপ্টে বসে আছে। সে একা জাহাজে উঠে এলেও যুবতী তাকে বুঝি ছাড়ে না। তাছাড়া মানুষের কি যে আছে, কি যে আশা কুহকিনী, আশা কুহকিনী না হলে এমন ভাবে সমুদ্রের ভেতর একটি মানুষ দূরবীন চোখে বসে থাকতে পারে না।

    মেজ–মালোম বলল, তুমি ছোটবাবু এটা ধর।

    —আপনি স্যার!

    —আমার এখন জাহাজ বাঁধাছাঁদা আছে।

    —কিন্তু স্যার।

    —কিন্তু কি আবার!

    —এখানে একা বসে থাকব…

    মেজ-মালোম জানে ছোটবাবু জ্যাককে ভীষণ ভয় পায়। জ্যাক সম্পর্কে একটা কৃত্রিম ভয় ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে জাহাজে। সবাই জ্যাককে ভীষণভাবে এজন্য এড়িয়ে চলে। কিন্তু মেজ-মালোম জানে জ্যাক, শান্ত, নিরীহ, সেও প্রথম প্রথম তার সম্পর্কে ভীষণ গুজব শুনেছে, এখন দেখছে উল্টো। জ্যাক আপন মনে থাকে, সে নিজের খুশিমতো কাজ করে। তার যেখানে খুশি চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে। সে কাউকে বিরক্ত করে না। অথচ চিফ-অফিসার কেন যে সবাইকে জ্যাক সম্পর্কে ভীষণ সাবধান করে দিয়েছে।

    মেজ-মালোম বলল, চলো তবে পিছিলে। আমার তো সেখানেই কাজ। তুমি দেখতে টেখতে পেলে সহজেই ডাকতে পারবে।

    ছোটবাবু বলল, সেই ভাল স্যার। এবং এ-ভাবে সে মেজ-মালোমের পেছনে হেঁটে গেল। খুব ধীরে ধীরে সিঁড়ি ধরে লোয়ার ডেকে নেমে গেল। নামার সময় মেজ-মালোম বলল, কি ধরতে হবে?

    ছোটবাবু বলল, না। আপনি এগোন আমি আস্তে আস্তে হাঁটছি। ছোটবাবু ডেকের ওপর ধীরে ধীরে হেঁটে যাচ্ছে। মাথার ওপর মাস্তুলের লাল আলো দুলছে। ছোটবাবুর ছায়াটা আলোর জন্য একবার বড় হচ্ছে আবার ছোট হচ্ছে।

    আর কি যে জাহাজটা নিরিবিলি মনে হয় এখন! জাহাজ থেমে আছে। খুব কাছেই বন্দর। তবু সে বুঝল, প্রায় মাইলের ওপর হবে। সমুদ্রের ভেতরে জাহাজ বয়াতে বাঁধাছাদা হচ্ছে। দূরবীন চোখে লাগিয়ে সে বসে রয়েছে। দূরবীন চোখে লাগালেই ডাঙ্গার সব ফাঁকফোকরগুলো কেমন চোখের ওপর ভীষণভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ে। সে বসে বসে চারপাশে খুঁজতে থাকল। সে কি খুঁজছে! তার তো এভাবে খোঁজার কথা নয়। সে তো এমনভাবে জাহাজে বাঁচবে বলে আসেনি। এভাবে সে খোঁজাকে কেমন অসভ্যতা মনে করে থাকে, তবু বুঝি জাহাজের আছে এক অতীব কঠিন অসুখ, ছোটবাবু জানে না, এই ন-দশদিনেই তার ভেতরে ভেতরে একটা অসুখের জন্ম হয়েছে। তারও লুকিয়ে ডাঙ্গায় মেয়ে দেখতে ইচ্ছে হয়।

    মাঝে মাঝে হাঁক আসছে, হ্যালো ছোট, এনি ওম্যান।

    —নো স্যার।

    —একা দেখে ফেলবে না। ডাকবে।

    —ইয়েস স্যার, ডাকব।

    —এ ব্যাপারে মানুষেরা ভীষণ স্বার্থপর

    —ছোটবাবু বলল, একটা স্যার কুকুর! —কুকুর!

    —হ্যাঁ স্যার, কুকুরটা রাস্তা পার হয়ে যাচ্ছে।

    মেজ-মালোম বলল, অস্পষ্ট আলোতে কুকুর, মানুষ, মেয়ে দূরবীনে একরকমের দেখায়। ভালো করে দ্যাখো।

    —ঠিক বুঝতে পারছি না স্যার।

    মেজ-মালোম হাসিল ফেলে চলেও আসতে পারছে না। ডেক-জাহাজিরা এখন দড়িদড়া ঢিলা দিচ্ছে। উইন্‌চ চালাচ্ছে বংকু। ডেক-টিন্ডাল হাসান কেবল হারিয়া হারিয়া করছে। হাসিল ক্রমে নেমে যাচ্ছে জলে। দুটো ছোট নৌকা জাহাজের আগে এবং পিছনে। ওরা হাতের ইসারায় ঠিক বয়াতে হাসিল বেঁধে ফেলছে। অথচ মেজ-মালোম কি যে করে! সে আবার হাই করে ডাকল।

    —আছে এখনও?

    —আছে।

    —আর একটু। এই হয়ে গেল। এই বাস্টার্ড টিন্ডাল—শালা লোগ, জাহাজ জখম করে দেবে। তারপরই যেন ক্রিশ্চিয়ানিটির সারমর্ম বুঝে ফেলার মতো দু’হাত ওপরে তুলে ফাদারের কায়দায় বলে যাওয়া—আ…স… তে আ…স..তে। তারপরই ছুটে ছোটবাবুর কাছে ফল্কার ওপরে চলে এলে শুনল, স্যার রাস্তা পার হয়ে চলে গেল। আর দেখা যাচ্ছে না।

    মেজ-মালোম ছোটকে কিছুতেই বিশ্বাস করল না। সে প্রায় যেন জোরজার করে কেড়ে দূরবীনটা যতটা সম্ভব তাড়াতাড়ি চোখের ওপর রাখলে দেখল, শুধু অস্পষ্ট ঘর-বাড়ি, এলেবেলে রাস্তা। রাস্তা, সমুদ্রের বালিয়াড়ি, না জাহাজ, না কোন ব্রীজ-টিজ হবে কিছু বোঝা যাচ্ছে না। আসলে এতদূর থেকে রাতে কিছু দেখা সম্ভব না। তবু নিরিবিলি দেখলে কখনও কখনও মনে হয় একটা বড় রাস্তা অনেক দূর, এই মিচিগান টান হবে তার দিকে চলে গেছে, সে একটা মোটর সাইকেলে বসে রয়েছে, তার শরীরে শীতের পোশাক পিছনে কেউ যেন সাপটে ধরে আছে। চুলের মেয়েলি গন্ধ নাকে লাগছে।

    এ-ভাবে সে যখনই দূরবীনে চোখ রাখে, এমন একটা গন্ধ পায়। এখন জাহাজে তার, সারা অবসর সময়ে এই একটা আশ্চর্য আলাদিনের আকাঙ্ক্ষা হাতে। এটা নিয়েই সে আছে, সে এখন এই ফল্কাতেই বসে থাকবে, কতক্ষণ বসে থাকবে সে নিজেও জানে না। তার আকাঙ্ক্ষা, কারণ কিছুদিন সমুদ্রে থাকলেই বুঝি তার মনে হয় ডাঙা কবে সে ফেলে এসেছে। বন্দরে নেমে যেতে না পারলে ফুল, ফল, পাখী, মেয়েদের হেঁটে যাওয়া সব অর্থহীন।

    ফল্কাতেই মেসরুম বয় এসে খবর দিয়ে গেল, রাতের খাবার দেওয়া হয়েছে। ডাইনিঙ হলে, কাপ্তান বসে রয়েছে। রাতের খাবারটা সবাই একসঙ্গে বসে খায়। ডাইনিঙ হলের লম্বা টেবিলের মাঝখানে কাপ্তান, পাশে জ্যাক, এ-পাশে চিফ-অফিসার, জ্যাকের পাশে সেকেন্ড। এভাবে থার্ড, মার্কনি সাব, ওপাশে চিফ এনজিনিয়ার, দু’পাশে সেকেন্ড থার্ড এবং এভাবে ফোর্থ ফিফথ্। স্টুয়ার্ড মেনু রেখে যায় প্রত্যেকের সমানে। টাইপ করা মেনুর কাগজটা হলদে রঙের থাকে। এবং ওপরে নানাবর্ণের আলো। ব্যান্ড বেজে উঠলেই কোন বড় হোটেলের একটা নাচের ঘর হয়ে যেতে পারে। জ্যাককে দেখা যায় তখন চুপচাপ খেয়ে যাচ্ছে।

    আর এটা কেন যে হয়, জ্যাক ভারি সুন্দর; ‘মেজ-মালোম এ জাহাজে উঠেই কেমন সেই মেয়েলি চুলের গন্ধটা জ্যাকের কাছে গেলে তখন পায়। তার তো সাহস হয় না,সে বলতে পারে না, জ্যাক তুমি কি কেবিনে কোন মেয়ে নিয়ে রাত্রিবাস কর। তোমার শরীরে এমন গন্ধ কেন। তুমি তো বালক, সাবালকের কোন চিহ্নই দেখা যাচ্ছে না। বরং তোমার কোমর ভীষণ সরু, তুমি বেশ মেয়েদের মতো মাঝে মাঝে হেঁটে যাও। এটা কি তোমার এ জাহাজে একটা ভীষণ নেশা ধরিয়ে দেওয়ার জন্য করা। তোমার এটাকে কি বলব, এই পেছন টেছন বলতে পারি, বেশ ভারি হয়ে উঠছে। জাহাজিরা যে কি এখন করে! আসলে সেও জ্যাককে ভয় পায়। ভীষণ আদুরে ছেলে। কাপ্তান তো সেদিন দেখেও কিছু বলল না, মেজ-মিস্ত্রি আর্চি বলেছে ইচ্ছা করে জ্যাক পা তার মাড়িয়ে দিয়েছে। এখন মেজ-মিস্ত্রি খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটে। একেবারে থেতলে দিয়েছে নখটা।

    ওর উঠতে ইচ্ছা হচ্ছিল না, সে তবু উঠে পড়ল। পাশে তার কেউ নেই। ছোটকে, এনজিন- বড়-টিন্ডাল ধরে ধরে নিয়ে গেছে। ছোট বেশ ছেলে। ভীষণ লম্বা। একটু রোগা মতো। চোখ ভারি, নাক উঁচু, কপাল বেশ বড়। চিবুক বেশ ডিমের মতো। এবং মুখে সব সময় এক আশ্চর্য সুষমা বয়ে বেড়ায়। মানুষের মুখে, বিশেষ করে ওর মুখে নরম নীল রঙের গোঁফ দাড়ি মিলে সে যেন সুদূর এক পর্বতের গুহাবাসী মানুষের মতো জীবের কেবল মঙ্গল কামনা করছে। আগে মেজ ভাল করে দেখেনি, বাংকারে পড়ে গেলেই তার কিছু কাজ পড়ে যায়। ওদের ওষুধপত্র দেওয়ার একটা কাজ তাকে করতে হয়। ওতেই আসা যাওয়া। ছোটর চোখ দুটো ফোর-ক্যাসেলে গেলেই কেমন ব্যাকুলভাবে তাকাতো। সে যেতে যেতে ভাবল, সুন্দর মুখে ছোটবাবু এ-জাহাজে ক্রমে সবার প্রিয় পাত্র হয়ে উঠছে। কেবল একটা রাগ, মেজ-মিস্ত্রি পুষে রেখেছে। সে যখন ডেকের ওপর দিয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটে তখন এটা বোঝা যায়।

    তবু সে নানাভাবে ভাবতে ভাবতে এলি-ওয়েতে ঢুকে গেল। এনজিনে কোন শব্দ নেই। সে যে হেঁটে যাচ্ছে, সে নিজের জুতোর শব্দ পাচ্ছে। কেবিনের ভেতর কেউ এখনও আছে। তার চলাফেরার শব্দ সে যেতে যেতে পাচ্ছে। ঠিকঠাক পোশাক না পরে গেলে, কাপ্তান ভীষণ ক্ষেপে যায়। এখন ওকে কেবিনে গিয়ে হাত মুখ ধুয়ে রাতের পোশাক পরে নিতে হবে। এবং সে যখন টিপটপ হয়ে বের হয়ে এল, বয় বাবুর্চিদের খুব দৌড়াদৌড়ি। আসলে কাপ্তান এসে অনেক আগেই বসে থাকেন। একটু গল্পগুজব করা, এই যে পৃথিবীর চারপাশটা সারাজীবন ধরে দেখে ফেলার পর নানারকমের গল্প মাথায় গিজ গিজ করছে, এ সব ঠিক বলতে না পারলে জাহাজি জীবনে মজা পাওয়া যায় না। জ্যাক কাছে থাকলে একরকমের গল্প, এই মাছ টাছের গল্প, তিমি মাছ, শুষোক মাছ, অথবা সিল মাছের গল্প, অথবা নানাবর্ণের সব যে দ্বীপ, তার গাছপালা পাখি এবং যেতে যেতে যে মনে হয় অনেক দ্বীপে একটা কাক পর্যন্ত নেই, কেবল, নিশিদিন সমুদ্রে একা থেকে থেকে কেমন শুকিয়ে যাচ্ছে, এবং সেখানে যদি কেউ ভেড়ার পাল নিয়ে যায়, আর হাতে সুবর্ণ লাঠি থাকে, তবে কোন বাইবেলে বর্ণিত মেষপালকের মতো দেখাবে। আর জ্যাক না থাকলে অন্য রকমের গল্প। জ্যাক অনেক সময় তাড়াতাড়ি নিজের কেবিনেই খেয়ে নেয়। এতে কাপ্তান অমত করেন না। কেউ কিছু বললে, বলেন, ছেলেমানুষ সন্ধ্যা হলেই ঘুম পায়।

    অথচ মেজ-মালোম দেখেছে, জ্যাক বেশ রাত করে ঘুমোয়। ওর পাশের কেবিনে বড় বড় সব লকার। বিচিত্র সব বই। সে বই পড়তে ভালোবাসে। আর বিস্ময়ের ব্যাপার জ্যাক এমন সব বই পড়ে যাতে শুধু সমুদ্রের কথাই আছে। সে কিনারার কথা জানতে চায় না। তার মনে হয় না, বড় একঘেয়েমি এ ভাবে চলা। গত সফরের আগের সফরে সে জ্যাকের সঙ্গে এই জাহাজেই ছিল। সে দু-সফর দিয়েছে এই জাহাজে। জ্যাককে সে দুবার দেখেছে। এবার জ্যাকের শরীরে আরও বেশি ভালবাসার কথা লেখা আছে যেন। সে জ্যাক কাছে এলেই কেমন টের পায় মানুষেরা পৃথিবীর চারপাশে, বনে জঙ্গলে, কোন দ্বীপে, কোন নির্জন পরিত্যক্ত জাহাজে শুধু মেয়েদের কথাই কেবল ভাবে। জ্যাককে দেখতে বেশ মেয়েলি মেয়েলি। কিন্তু জ্যাকের কথাবর্তা পুরুষের চেয়েও কঠিন। জ্যাক খুব আস্তে আস্তে কথা বলে। খুব ওজন রেখে কথা বলে। সে বোঝে, সে জাহাজের সর্বময় কর্তার ছেলে। সে খুব একা একা থাকতে ভালোবাসে। বোধহয় জ্যাকের ভীষণ অহঙ্কার—সে, অহঙ্কারে ডেকের ওপর পা না ফেলে লাফিয়ে লাফিয়ে যায়। মনে হয় না, জ্যাকের ভিতর এই একাকীত্বের কোন দুঃখ আছে। তখন জ্যাক শান্ত, গম্ভীর, নিরীহ আবার চঞ্চল কখনও। জ্যাককে বোঝা মুস্কিল।অনলাইনে বেস্টসেলিং বই কিনুন

    মেজ-মালোম তাড়াতাড়ি খেয়ে নিল। সে তার ড্রিংকস বোট-ডেকে পাঠিয়ে দিতে বলল। মেসরুম- বয়, একটা ইজিচেয়ার, একটা টিপয়, একটা গ্লাস, আর রেশনের মদ রেখে এলে বেশ যেমন একজন মানুষ, চার ফেলে বড়শিতে মাছ ধরার জন্য একটা সিগারেট খেতে খেতে বের হয়ে যায়, তেমনি মেজ-মালোম দূরবীন হাতে ওপরে উঠে গেল। কিন্তু কিছু দেখতে পেল না।

    তখন কেউ যেন বলে, এনি ওম্যান সেকেন্ড।

    —নো।

    —ইফ এনি ওম্যান?

    —ডাকব। তাবৎ মনুষ্যকুলকে ডেকে বলব, এস, দ্যাখো।

    জ্যাকও একবার বলে গেছে। এনি ওম্যান।

    —নো।

    —এনি ম্যান।

    —ম্যান।

    —ইয়েস ম্যান।

    মেজ-মালোম বলল, ম্যান দিয়ে কি হয়।

    জ্যাক বলল, ছোটকে কেমন দেখলে?

    —ভাল।

    মেজ-মালোম বুঝল এখানেই জ্যাকের অহঙ্কার। কোন প্রশ্ন শুনতে সে চায় না। কাপ্তানের সে ছেলে, এটা মনে হতেই সে বুঝিয়ে দিয়েছে, সব প্রশ্নের জবাব তাকে দিতে হবে এমন কথা নেই।

    —ছোট কি দেখছিল দূরবীনে?

    —ওকে পাহারায় রেখেছিলাম। যদি মেয়েটেয়ে চোখে পড়ে।

    —ন্যাস্টি।

    মেজ-মালোম বলল, ভীষণ ভালো, ভীষণ ভালো। বলে জিভে মেজ চুক চুক করতে থাকল। সে ড্রিংক করছে, চোখ বুজে ড্রিংক করছে। তার এখন দূরবীনে চোখ রাখতে ভাল লাগছে না।

    জ্যাক প্রায় দৌড়ে তার কেবিনে ঢুকে গেল। সে দরজা বন্ধ করে দিল। পোর্টহোল খোলা। ভীষণ গরম বলে পোর্টহোল খোলা রাখতে হয়। পাখা ঘর ঠান্ডা রাখতে পারে না। তবু জ্যাক পোর্টহোল বন্ধ করে দিল। কাচের ওপর পর্দা টেনে দিল। বড় আয়না সামনে। সঙ্গে এটাচড বাথরুম। সে এখন ভাবল ঠান্ডা জ্বলে ভাল করে হাত মুখ ধোবে। এইসব ইন্ডিয়ান নেটিভদের সেকেন্ড বাজে সব ব্যপার শেখাচ্ছে। সেকেন্ড অফিসারের দুরবীনে মেয়েমানুষ খোঁজা কেমন তার অহঙ্কারে লাগে।

    সে রাগেই হোক, দুঃখে হোক শরীর থেকে সার্ট খুলে ফেলল। একেবারে খালি গা। এও হতে পারে ভীষণ গরম বলে গায়ে জামা রাখা যাচ্ছে না। সারাদিন ডেকে পুরুষ সেজে থাকতে তার খারাপ লাগছে না। ডেকে যখন জাহাজিরা দুলে দুলে মাস্তুলে অথবা ফানেলে রঙ লাগায়, তখন তার মনে হয় সেও উঠে যাবে। কখনও কখনও উঠে যায়। নিচে তখন ডেক-সারেঙ ভীষণ ব্যস্ত হয়ে পড়ে। চেঁচামেচি শুরু করে দেয়। সে ভ্রূক্ষেপ করে না। তার ভাল লাগে এ-ভাবে দড়িদড়ায় লাফিয়ে লাফিয়ে যেতে। কিন্তু আজ এসেই কেন জানি ইচ্ছা হচ্ছে শরীরের যেখানে যে-ভাবে ভালবাসার আধারগুলো ক্রমে পুষ্ট হচ্ছে, সেগুলো দাঁড়িয়ে একটু দেখবে।

    সে আয়নায় দাঁড়ালে বুঝতে পারে বয়স অনুপাতে সে ভীষণ লম্বা। শরীর তার হালকা। খুব পরিমিত শরীর। মোটাও নয়, খুব রোগাও নয়। সে হাত লম্বা করে দিলে তাকে ব্যালাড সিংগারের মতো দেখায়। আশ্চর্যভাবে সে দাঁড়ালে দেখতে পায় আয়নায়, কি সুন্দর মসৃণ বুকের ভিতর ভালবাসার আধার সামান্য উঁচু হয়ে উঠছে, সে তখন হাত রাখে। এ-ভাবে হাত রাখলে ভাল লাগে সে যেন জানত না। আজ প্রথম তার এ-সব ভারি ভাল লাগছে।

    জ্যাক অন্যদিন পুরুষের মতো রাত্রির পোশাক পরে শুয়ে পরে। কিন্তু আজ সে তার নাইটি বের করে নিল। সিল্কের নাইটির রঙ একেবারে শরীরের রংয়ের সঙ্গে মিলে গেছে। সে যখন নাইটি পরে হেঁটে যায় তখন তার ইচ্ছা করে আলোগুলো কেবিনের জ্বালা থাক। সে যেদিকে তখন ঘুরছে তার চারপাশে একটা ছায়া ঘুরছে। মোমের পুতুলের মতো ছায়াটা চারপাশে ঘুরছে। এবং সে দেখতে পেল, তার পাতলা সিল্কের ভিতর দিয়ে আজানু স্ত্রীজাতির অহঙ্কার শরীরে ক্রমে দেখা দিচ্ছে। এখন যদিও অস্পষ্ট, এবং মাসকাল পার হলে সব স্পষ্ট হয়ে যাবে। সে এখনও ঢোলা জামাপ্যান্ট পরে না। এখনও তার তেমন সব পুষ্ট নয় বলে, প্রায় অঙ্কুরোদগমের মতো সারা শরীরে ব্যাপারটা নিয়ত ঘটছে বলে, সে বেশ হাল্কাভাবে চলাফেরা করতে পারে। তার কোন অসুবিধা হয় না।

    কিন্তু সে এভাবে কতক্ষণ যে বড় আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল। বাবা যত দিন যাবে তত ক্রমে চুল খাটো করে কেটে দেবে। চুল কাটবার সময় বাবার সঙ্গে ভীষণ ধ্বস্তাধ্বস্তি করেছে। কিন্তু সে যাই করে, কেউ কাছে না থাকলে করে। বাবার অপমান হোক সে সেটা চায় না।

    তবু কাপ্তান বলেছিল, বনি, চুল খাটো না করে দিলে তোমাকে ঠিক কেমন যেন দেখায়।

    —ভাল দেখায় না বাবা!

    —না।

    —ভাল না দেখাক, তুমি আমার চুল বেশি ছেঁটে দেবে না।

    —না বেশি ছাঁটছি না। দ্যাখ। বলে তিনি বনির চুল নেড়া করে দিতে দিতে বলতেন, আমি তখন জাহাজে তোর ডেক-এপ্রেন্টিস আছি! তখন ভাল চুল ছাঁটতে জানতাম না। ব্যাঙ্ক লাইনের লম্বা সফর। পোর্টে নেমে চুল কাটার সময় থাকে না। আমাদের চিফ-অফিসার বুঝলি, একটা ঘুঘু ছিল। সে আমাকে বলল, ওহে ছোকরা, জাহাজে উঠেছ, এ্যাপ্রেন্টিসগিরি করছ, চুল টুল কাটতে শিখেছ তো!

    —ওঃ ঘাড় ধরে গেছে!

    —এই হয়ে গেল, বলেই কাঁচি কচকচ করে চালাতে থাকলেন। —তারপর বুঝলি বনি, একখানা যা চুল ছেঁটে দিলাম না।

    —মানে!

    —মানে কাগে চুল ঠুকরে নিলে কেমন হয়। বড়র ঘাড় হেঁটে আমি প্রথম চুল কাটা শিখি। এখন তো সবারই ইচ্ছে চুল ছেঁটে দিই। আমার মতো জাহাজে কে এত ভাল চুল কাটে।

    এবং বন্দরে নেমে চুল ছাঁটা দায়। কারণ বেশ লম্বা পাড়ি। বুয়েনস-এয়ার্স না যাওয়া পর্যন্ত চুল ছাঁটার কথা ওঠে না। মাঝে যা সব বন্দর পাওয়া যাবে, সেখানে একদিন কি দুদিন হল্ট, কাপ্তান পর্যন্ত জানে না। এজেণ্ট অফিস বলতে পারবে ব্যাপারটা। এবং বেশ যখন চুল ছেঁটে কাপ্তান আয়নার কাছে গিয়ে বললেন, দ্যাখ কেমন সুন্দর চুল ছেঁটেছি, তখন বনির দু-পা ছড়িয়ে চিৎকার, চেঁচামেচি। সবাই ছুটেএসেছিল। পাশাপাশি যারা থাকে সবাই। স্টুয়ার্ড পর্যন্ত। কাপ্তান কেবল সবার সমর্থন চাইছেন, কি স্টুয়ার্ড, চুলটা সুন্দর দেখাচ্ছে না? এদিক থেকে দ্যাখো, হ্যাঁ ঠিক হেঁটেছি না? এই যে মেজ এসে গেছ, তুমি বল তো কেমন হয়েছে?

    —বা বেশ! সুন্দর! একেবারে বাটি ছাঁট।

    —বাটি ছাঁট মানে? কাপ্তান প্রশ্ন করলেন।

    —ইন্ডিয়ার রাজা মহারাজারা যেসব ছাঁট ফাটে চুল কাটে।

    —তবে! তুমি জ্যাক কেবল লাফাচ্ছ।

    অগত্যা জ্যাক কি করবে। সে সবার সামনে কাঁদতে পারে না। অহঙ্কারে লাগে। সে চুপচাপ উঠে যায়। এবং পরে ঘরে এসে আয়নার সামনে দাঁড়ালে তার হু-হু করে গলা বেয়ে কান্না উঠে আসে। তার এমন সুন্দর চুল বাবা জাহাজে উঠেই ক্যাচ ক্যাচ করে ছেঁটে দিয়েছে। বাবার একবার হাত পর্যন্ত কাঁপল না।

    বনি এখন নিজের কেবিনে এ সব নিয়ে ভাবে না। বোধহয় বাবা খেয়ে-দেয়ে কেবিনে যাচ্ছেন। পাশের ল্যাডার দিয়ে ব্রীজে উঠে যাবার পথ। বোধহয় কোন কাজে কোয়ার্টার মাস্টার সিঁড়ি ধরে উঠছে। কেবিনে বসে সে সব টের পায়। জুতোর শব্দ প্রায় তার সব মুখস্থ, বাবা না সেকেন্ড অফিসার, না চিফ, না থার্ড অফিসার অথবা যদি কোয়ার্টার মাস্টার হয় তবু সে টের পায়। দরজা না খুলেও টের পায় কে যাচ্ছে। তার দরজা বন্ধ। দরজার সামনে দাঁড়াবার সাহস কারো নেই। সে এখন এ- কেবিনে সোজা লম্বা হয়ে শুয়ে পড়বে। তার টিপয়ে জল। সে শুলে পায়ের কাছে বড় আয়না, বেশ পালিশ করা দামী মেহগিনি কাঠের বাঙ্ক। একেবারে সাদা বিছানা। প্রতিদিন সকালে চাদর, বালিশের ওয়ার পাল্টে দিয়ে যায় কাপ্তানবয়। সে অন্যদিন আলো নিভিয়ে শুয়ে পড়ে। কিন্তু আজ তার কেন জানি ঘুমোতে ইচ্ছা করছে না।

    সে কেবিনের সবকটা আলো জ্বেলে দিল। দুটো আলো পাশাপাশি লাল নীল রঙের। একটা সাদা ডুম, কারুকার্য করা কাচের ঝালরে ঢাকা। আর ঠিক আয়নার সামনে কালো রঙের বাতিদানের ওপর হলুদ রঙের ডুম। ফুল স্পিডে সে পাখা ছেড়ে দিল। হাওয়া পাইপের মুখ ভাল করে ঘুরিয়ে দিল। তারপর সুন্দর প্রসাধন করে সে এসে লম্বা হয়ে শুয়ে পড়ল।

    তার শরীরে সোনালি গাউন। সিল্কের পাতলা গাউনের ভেতর ওর আশ্চর্য শরীর দেখা যাচ্ছে। খুব হাওয়া, প্রায় ঝড়ের মতো হাওয়ায় চুল, চাদর, পাতলা গাউন সব উড়ছে। সে আয়নার দিকে তাকিয়ে আছে। আয়নায় তার প্রতিবিম্ব ভাসছে। আয়নায় সে নিজেকে এমনভাবে দেখে কেমন মুগ্ধ হয়ে যাচ্ছে। যদিও সুন্দর চুলের জন্য ওর ভারি মায়া হচ্ছিল, তবু এমন একটা পোশাকে সে ভীষণ বিহ্বল হয়ে গেছে। ওর মনে হচ্ছিল, হাওয়ায় উড়ে যাচ্ছে। অথবা গভীর সমুদ্রে সে ডুবে যাচ্ছে। চারপাশে নীল জল, কারণ ঘরের আলোটা এক নীল জলের আভার মতো ভেসে বেড়াচ্ছে কেবিনে, সে তার ভিতর শুয়ে আছে, চারপাশে এখন সমুদ্রের মাছেরা ঘোরাফেরা করছে যেন। কোনও মাছ ওর খুব কাছে। তেমন সুন্দর মনে হচ্ছে না। কেবল একটা রুপোলি মাছ অনেক দূরে। ওর দিকে তাকিয়ে আছে। কাছে আসতে সাহস পাচ্ছে না।

    সহসা বনির মনে হল, সে এলিস ইন ওয়ান্ডার ল্যান্ড হয়ে গেছে। আবার সে যেন দেখতে পাচ্ছে আয়নায়, সেই ছোট্ট রাজকুমার যার একটা ছোট্ট গ্রহে বাস, যে সহসা পৃথিবীতে এসে আটকে পড়েছিল—যেতে পারছিল না, আর নানাভাবে প্রশ্ন পৃথিবীর সেই বিমানচালককে, অর্থাৎ বাওয়াব গাছের আগাছা ভীষণভাবে অনিষ্ট করে যাচ্ছে তার গ্রহে। একটাই গাছ সারা গ্রহে, এত ছোট্ট গ্রহ যে সেখানে এত বড় গাছ থাকা ঠিক না, ওর আগ্নেয়গিরি আছে একটা, যা অনায়াসে বাওয়াবের পাতায় ঢেকে রাখা যায়,

    নদী আছে, যা সে ইচ্ছা করলেই ইউকনের পাতায় ঢেকে দিতে পারে—এমন একজন ছোট্ট রাজপুত্র তার পায়ের কাছে কেন যে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে। সে ভেবে পায় না, চোখে তার এমন সব স্বপ্ন জড়িয়ে আসছে কেন! কেমন তার ভিতরটা ভীষণ আবেগে কাঁপছে। সে বুঝতে পারছে শরীরে এক অতীব উত্তেজনা। সে পৃথিবীতে এমন একটা সুন্দর মানুষ আছে জানত না। ভারি আরামে তার ঘুম আসছে। ছোট্ট রাজপুত্র, তার পৃথিবীতে এসে আটকে গেছে। তার নিজের গ্রহে আর ফিরে যেতে পারছে না। বনি স্বপ্নের ভেতর কেবল হাসছে, হেসে চলেছে। সে আলোর ভেতর দু’হাত বুকের ওপর রেখে কেবল এক অসমতল অমসৃণ পাহাড়ের চারপাশে সমুদ্রে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আর তার কি যে মনে হচ্ছিল না! ছোট্ট রাজপুত্রের জন্য ভেতরে ভেতরে একটা মায়া গড়ে উঠছে। সে নিজেও সেটা কিভাবে কখন হয়েছে জানে না।

  • পাঁচ

    পাঁচ

    ।। পাঁচ।।

    ঠিক এ-সময়ে জাহাজে নানা জায়গায় নানা কাজ। যেমন, মৈত্র বৌকে চিঠি লিখছে, শেফালি আমরা কলম্বো বন্দরে আজ পৌঁছেছি। কাল আবার নোঙর তুলব। জাহাজে রসদ উঠলেই আমাদের কাজ শেষ। এখানে আশা করেছিলাম তোমার চিঠি পাব, কিন্তু কেন যে পেলাম না। চিঠি না পেলে ভীষণ খারাপ লাগে। ভাল লাগে না। আমরা লরেঞ্জু-মরকুইসে যাচ্ছি। ঠিকানা দেওয়া থাকল। গিয়ে যেন তোমার অন্ততঃ তিনটে চারটে…..তুমি তো বলতে, রোজ একটা করে আমাকে চিঠি লিখবে। কেন যে তুমি চিঠি লেখ না। কি করে যে চিঠি না লিখে থাকতে পার। তারপরই মৈত্র সেই এক কথায় চিঠি শেষ করবে—আমার ভাল লাগে না শেফালি। তোমাকে ছেড়ে আমার কোথাও থাকতে ভাল লাগে না।

    রাত বাড়ছে। সকালে এজেন্ট অফিসের লোক আসবে। যে যার চিঠি ফোকসালে লিখতে বসে গেছে। ছোটবাবুর কাছে লাইন দিয়েছে কেউ কেউ। ছোট-টিণ্ডাল দুবার ঘুরে গেছে। এখনও বেশ ভিড়। ভিড় না কমলে সে ঠিক ঠিক লেখাতে পারবে না। চিঠি লেখার সময় কেউ পাশে থাকুক সে চায় না। ছোট-টিণ্ডাল বাদশা মিঞার কপালে সেজন্য ঘাম। তাকে খুব উদ্বিগ্ন দেখাচ্ছে। সে চিঠি এখন লিখিয়ে না রাখাতে পারলে সকালে আর সময় পাবে না। দরজার গোড়ায় খুব ভালো মানুষের মতো সে দাঁড়িয়ে আছে এখন।

    সবার হলে ছোটবাবু ডাকল, আসুন চাচা।

    বাদশা মিঞা ওকে হাতের ইসারায় ডাকল। ছোট বলল, কি ব্যাপার!

    —আস না!

    সে, ছোট-টিণ্ডালের পিছু পিছু উঠে গেল। টিণ্ডাল, ফোকসালে ঢুকে বলল, দরজাটা বন্ধ কইরা দেই।

    ছোটবাবু বলল, কেন? দরজা বন্ধ করার কি আছে।

    —তোমারে কই নাই, একটা কথা কমু, কেউ জানে না। তুমি জানবা কেবল। আমার বিবির কাছে একটা খত লিখা দেও।

    —সেটা তো সবাই জানে।

    –কেডা জানে?

    —সবাই জানে চাচা। আমি তো জানি, জাহাজে উঠেই জানি, তুমি তোমার চার নম্বর বিবির কাছে খতটত লেখাতে চাও।

    —এডা মনু মিঞার কাজ।

    —মনু কেন হবে!

    —না, ওডা আমার দ্যাশের লোক।

    —মনু বলে নি।

    —তবে কেডা কইছে কও। তারে একবার মোকাবেলা করি।

    —সে যেই বলুক। এতে লজ্জার কি আছে।

    —নারে বাজান, জাহাজে তুমি মানুষ চিন না। শালারা সব ইবলিশের বাচ্চা। কথা নাই বার্তা নাই, পিছনে লাগে।

    —কেউ লাগবে না।

    —তা তোমার শরীরডা ভাল না। দু’লাইনে লিখা দ্যাও। ভাল আছি। ডারবানের ঘাটে, বড় কইরা একটা খত লিখা দিয়। বিবির বড় খত না পাইলে মন ভরে না। আর শোন তুমি লিখা দিয়, তোমার শরীরটা ভাল না বইলা বেশি কিছু লিখতে পারলাম না।

    ছোটবাবু হেসে বলল, ঠিক আছে লিখে দেব। এবং খুব সংগোপনে প্রায় ফিস ফিস গলায় অজস্র কথা বলে গেল ছোট-টিণ্ডাল। মৈত্রকে ছোট-টিণ্ডাল ভীষণ ভয় পায়। এখনই হয়ত মৈত্র এসে ছোটবাবুকে ডেকে নিয়ে যাবে। এবং ধমক দেবে, তোমার আক্কেল নেই মিঞা। একটা অসুস্থ মানুষকে নিয়ে তুমি টানাটানি করছ।

    ছোটবাবু তাড়াতাড়ি খতটা লিখে দিতেই ছোট-টিণ্ডাল দাঁত বের করে হাসল। ছোটবাবু দেখল, দু’পাশের চার-চারটা দাঁত ওর সোনায় বাঁধানো। হাঁ করলে জিভটা বের হয়ে আসে। ওর মুখে নানা রকমের দাগ। এবং দেখলে বোঝাই যায়, সমুদ্রে সে ঘুরে ঘুরে নোনা জলের স্বাদ ঠিক ধরতে পেরেছে। সে একটার পর একটা নিকা করেছে। সে কাউকে তাড়ায় নি। সে চিঠিতে সবার খবর নিয়েছে।

    বাদশা মিঞাকে ছোটবাবুর খারাপ লাগল না। ছোটখাট মানুষ। চল খুব ছোট করে ছাঁটা। দাড়ি নেই, গোঁফ নেই। বোধ হয় এটা ওর এ-বয়েসেও ওঠে নি। বয়স ষাটের ওপর হবে। নলিতেও কারচুপি—বয়স কমিয়ে রেখেছে। সমুদ্রের ঝড়ে-জলে মানুষটা ভীষণ দক্ষ। ওর চার নম্বর বিবির বয়স খুব যে কম এবং প্রায় বালিকা, এটা চিঠির সব কথাবার্তা থেকে ছোটবাবু ধরে ফেলেছে। সে বলল, চার নম্বর চাচি আপনাকে খুব ভালোবাসে?

    বাদশা মিঞা কেমন ছেলেমানুষের মতো মুখ নীচু করে রাখল। যেন এটা বলে ছোটবাবু ওকে ভীষণ লজ্জা দিচ্ছে। ভালবাসার কথা মুখে বলে ছোট করতে চায় না বিবিকে।

    ছোটবাবু বলল, আমি ঠিক লিখে দেব। আপনার কোন ভাবনা নেই। এবং এই বলে সে বের হয়ে এসেই দেখল, ফোকসালে অমিয় নেই। কোথাও সে পালিয়ে সেই ছবিগুলো বোধ হয় দেখছে। এ সব ছবি কোথায় যে পাওয়া যায় ছোটবাবু জানে না। বীভৎস সব ছবি যোগাড় করেছে বন্ধু। সে একবার অমিয়কে দেখাবে বলে এসেও ছিল। ছোটবাবু কাছে ছিল বলে অমিয় আমতা আমতা করেছে। এবং যখন গিয়ে দেখল, অমিয় নেই তখন সে ঠিক ভেবে নিল, বন্ধু ওকে নিয়ে গেছে। ওরা একসঙ্গে লুকিয়ে সেই সব ছবি দেখছে। উলঙ্গ এবং নগ্ন সেই সব ছবির ভেতর অমিয় বেশ আছে। ছোটবাবু ফোকসালে ঢুকে এবার শুয়ে পড়ল। মৈত্র বলল, এলি।

    ছোটবাবু বলল, হ্যাঁ।

    —কি লিখাল রে বাদশা মিঞা।

    —জাহাজের খবর-টবর দিল।

    —ওর চার নম্বর বিবির কথা তোকে কিছু বলে নি!

    —বলেছে। ওকেই তো চিঠি।

    –তোকে বলে নি, কাউকে বলবে না।

    —তা বলেছে।

    —ওর এই কারবার। সবাইকে বলবে। এখন ওর দুটো কাজ এমন বলবে। একটা কাজ বড় বেটার সাদি, দু নম্বর কাজ, চার নম্বর বিবির পেটে একটা বাচ্চা—এই হলে তার হয়ে গেল।

    —সে আর কিছু চায় না!

    —না। বলেই বলবে, কাউকে বলবে না, অথচ ও নিজেই বলে বেড়ায়।

    —এমন স্বভাব কেন!

    —ওর ধারণা, এই বয়সে চার নম্বর বিবি ঘরে এনে একজন সাচ্চা মরদের মতো কাজ করে ফেলেছে। সেটা ও জাহির করতে চায়।

    —কিন্তু আমাকে যে বলল, জাহাজের সব শালা ইবলিশের বাচ্চা।

    —ও ওমনি বলে। আসলে একটা আস্ত শয়তান। না হলে কেউ এমন বয়সে তার নাতনির বয়সী একটা মেয়েকে সাদি করতে পারে!

    ছোটবাবুর হাই উঠছিল। ওর ঘুম পাচ্ছে। জলের ছলাত ছলাত শব্দ আসছে। জলের ঢেউ মাঝে মাঝে ধাক্কা মারছে বলে হালটা নড়ছে। এবং সেজন্য স্টিয়ারিং এনজিনের শব্দ আসছে। পাশাপাশি ফোকশালগুলোতে জাহাজিরা গল্প করছে। সবই দেশ-বাড়ির গল্প। মাছের গল্প। কেউ কেউ সময় পেয়ে গল্প করতে করতে জাল বুনছে। কেউ হয়তো এখন ওপরে কোরান শরিফের ব্যাখ্যা শুনছে, অথবা ইমানদার মানুষ হবার জন্য এ-সফরে কোরান শরিফ পড়াটা রপ্ত করে ফেলা ভাল। সময় পেলেই মাদুর বিছিয়ে ডেক-সারেঙের সামনে তারা বসে থাকছে।

    তখনই ছোটবাবুর মনে হল, মাকে সে একটা চিঠি লিখতে পারে। সে সবার মতো লিখল না, আমার ভাল লাগছে না, কবে যে দেশে ফিরব জানি না। সে লিখল, মা আমি ভালো আছি। আমার টাকা হয়তো পেয়েছ। ভাইদের পড়া বন্ধ করে দিও না। জ্যাঠিমাকে বলবে যেন আমার জন্য চিন্তা না করে। বড়দা মেজদার খবর দিও। আমি মা যাচ্ছি দক্ষিণ আমেরিকা। কলম্বো থেকে জাহাজ কাল ছাড়ছে। কত বড় সমুদ্র মা, কত বড়, সমুদ্রে না এলে বোঝা যায় না। বাবা করে বাড়ি এসেছিল জানিও। জ্যাঠামশাইর জন্য খুব খারাপ লাগে মা। জ্যাঠামশাইর শরীর কেমন আছে জানিও। জাহাজে আমার মৈত্রদা আছে। অমিয়, বন্ধু, সারেঙসাব, মেজ-মালোম সবাই আমাকে খুব ভালবাসে। আমার জন্য তুমি একেবারে চিন্তা করবে না। সফর শেষে যখন ফিরব ওঃ কি যে ভাল লাগবে না। শেষ করল এই বলে, মা আমি এখন জাহাজি।

    এ-ভাবেই জাহাজে জাহাজিরা চিঠি লিখে থাকে। সকালের দিকে নৌকায় সব কাঠের হাতি, ময়ূরের পালখ কিনার থেকে এল। মৈত্র ভেবেছিল নেবে, কিন্তু সে যে একটা সঙ্গে ভীষণ দরকারী জিনিস নিয়ে যাচ্ছে। এটা সে জাহাজে উঠলেই লুকিয়ে নিয়ে যায়। এবারও গোপনে নিয়েছে। কাঠের হাতি, ময়ূরের পালখ নিয়ে কি আর হবে! সে কিছু নিল না। অন্য জাহাজিরা সব নিতে গিয়ে দেখল, রসদ আসছে। রসদ উঠছে জাহাজ-ডেকে। মেজ-মালোম ছুটোছুটি করছে। ঠিক রোজকার ঘটনা, অর্থাৎ ডেক- টিণ্ডাল যাচ্ছে আগিলে। কশপ যাচ্ছে, হাতে রঙের টব নিয়ে। বন্ধুর কি কাজ জানে না। সে মেসরুমে বসে রঙের টব ঢোলের মতো বাজাচ্ছে।

    আর গান গাইছে অমিয়। যেন এখন ওদের এই জাহাজে এ-সব ঘটনা রোজ ঘটবে। নামাজ পড়ছে দু’নম্বর ‘পরী’র মানুষেরা। ওরা সকালে চাপাটি খেয়েই নামাজ পড়তে বসে গেছে।

    তখন দেখা যাবে নেমে আসছে জ্যাক। সে এদিকে পাখিগুলোর খাঁচায় মাংস দিয়ে যাচ্ছে। রসদ তোলা হলে, মেজ-মালোম বোট-ডেকে সেই দুরবীন চোখে বসে গেল। তারপর জাহাজ ছাড়লে এক নিত্য দিনের ঘটনা! কবেতক যে আবার জাহাজ বন্দর পাবে কেউ জানে না। জাহাজ সমুদ্রে চলছে তো চলছেই।

    তখন জাহাজ গভীর সমুদ্রে। দিন শেষ হয়ে যাচ্ছে। মৈত্র ওয়াচ শেষ করে ফিরেছে। অমিয় এসে চুপি চুপি ওর লকারে কি যেন রাখছে। আজকাল অমিয়র এটা হয়েছে। সে সবার সামনে লকার খোলে না। কিন্তু রবিবার ইন্সপেকসনের দিন থাকে। কাপ্তান, মেজ-মালোম, বড়-মালোম সবাই সার বেঁধে নেমে আসে। সব সাফসোফ আছে কিনা ঠিক আছে কি না দেখে। তাছাড়া কোথায় কি আবার ভাঙছে, ঘুরে ঘুরে এটাও কাপ্তান দেখতে চান। ইন্সপেকসনের সময় লকার খুলে রাখার নিয়ম। অমিয় লকার খুলতে চায় না। সে সারেঙকে বলেছে, চাবি পাচ্ছে না। আসলে চাবিটা ওর কাছেই ছিল। অমিয় যে কেন এমন একটা মিথ্যা কথা বলল সে ভেবে পায় না।

    ছোটবাবু দেখল, অমিয় কি সব ভিতরে রেখে দিচ্ছে। কি রাখছে সে টের পেল না। ছোটবাবু বলল, কি রাখলি অমিয়?

    —কৈ কিছু নাতো।

    ছোটবাবু আর কিছু বলল না। অমিয় পাশের ঘরে ওয়াচের নোংরা জামা প্যান্ট ছেড়ে স্নান করতে গেলে মৈত্রকে বলল, অমিয় কি নিয়ে আসে সঙ্গে?

    —কি আবার নিয়ে আসে! বাংকারে কি এমন আছে, শুধু তো কয়লা।

    —কিছু নিয়ে আসে।

    মৈত্র বলল, মরুক গে। জাহাজে উঠলেই নানারকম অসুখে ভোগে মানুষ। এ-নিয়ে তোমার মাথা ঘামাতে হবে না ছোটবাবু। ওপরে যাও। কাল থেকে তো তোমার আবার ওয়াচ।

    ছোটবাবু এবার ওপরে উঠে গেল। থালা-বাসন ধুয়ে ভাণ্ডারীর কাছ থেকে ‘বিশু’র মাংস নিয়ে নিল। কফি ভাজা, ডাল আর ভাত। মাংস নেবার সময় সে বলল, চাচা বিফ না মটন?

    ভাণ্ডারী গলা বাড়িয়ে দেখল ছোটবাবুকে। মেসরুমের সঙ্গে গ্যালির একটা জানলা থাকে। তার ফাঁকে গলা বাড়িয়ে বলল, বিফ। তারপর ফের কচ্ছপের মতো সে গলা ভেতরে নিলে ছোটবাবুর কেমন রাগ হল। রোজ রোজ বিফ। সে বলল, চাচা আমাদের জন্য মটন নিতে পার না। কি দিয়ে খাই বলতো!

    —দেয় না। ভাণ্ডারী সারেঙের চায়ের জল গরম করছে। পাশের উনুনে সে আর এক ডেকচি ভাত সেদ্ধ করছে। তামার বড় ডেকচি। ছোটবাবু কি বলছে, ঠিক মতো শুনতে পাচ্ছে না। সে ফের গলা বের করে বলল, কি বললে?

    —আমাদের জন্য মটন নিতে পার না?

    এবার ভাণ্ডারী কেমন রেগে গেল। বলল, আমারে কিছু কইবা না। সারেঙ-সাব কিছু করতে পারে না! তোমরা যাও, মাস্তার দ্যাও। কও, মটন না দিলে চলব না।

    —চলব না তো বলিনি। তুমি তো জানো বিফ আমি খেতে পারি না, অমিয় খায় না। কেবল মৈত্রদা খায়।

    —থাকতে থাকতে তুমিও খাবে। তারপর ভাণ্ডারী আর কোন কথা বলল না। সে এত রোগা মানুষ আর সে এত বেশি রগচটা যে কথা বলা দায়। এখনই হয়ত কিছু বললে ক্ষেপে যাবো, ছোটবাবু ভয়ে ভয়ে মাংসের ডেকচিটা নীচে রাখল। তিনটে থালায় সে ভাত নিল, ডাল নিল, কফি ভাজা নিল। সে কফি ভাজা ডাল এই দিয়ে ঠিক খেয়ে নেবে।

    মৈত্র এসে আজ আবার ক্ষেপে গেল ছোটবাবুর ওপর। আমাকে তোরা কি পেয়েছিস? ছোটবাবু বুঝতে না পারে তাকিয়ে থাকল।

    —আমি কি মানুষ না! এতটা গোস্ত আমার জন্য রেখেছিস।

    ছোটবাবু বলল, কে খাবে। তুমি না খেলে কে খাবে। আমি খাই না,অমিয় খায় না!

    —কেন অমিয় খায় না, কেন তুই খাবি না!

    —আমার ভাল লাগে না। এবং এখনই হয়তো ফের মৈত্র মেসরুমে হৈ-চৈ বাধিয়ে দিতে পারে। সারেঙের সাত পুরুষ উদ্ধার করতে পারে। এবং মৈত্র ক্ষেপে গেলে সারেঙসাব একবারে কোন রা করেন না। সারেঙসাব ইচ্ছে করলেই এদের জন্য আলাদা মটনের ব্যবস্থা করতে পারে। হিন্দু পোলাদের জাত মারতে চান তিনি। বিফ খাওয়াবার এমন একটা সুযোগ তিনি ছাড়তে চান না। অর্থাৎ এমন সব কথা মৈত্র তখন চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বলবে। সারেঙসাব রেলিংয়ে ভর করে তখন সমুদ্র দেখেন। তিনি মনে করেন, মৈত্র ভীষণ গোঁয়ার,ওর সঙ্গে কথায় পারা যাবে না। তিনি যে ভীষণভাবে চেষ্টা করেছেন, কলম্বোতে রসদ নেবার সময় বার বার বলেছেন, জাহাজে যখন হিন্দু নাবিক আছে, তখন কিছু অন্তত মটন নেওয়া হোক। একেবারে যে না নেওয়া হয়েছে তা না, তবু ডারবান পর্যন্ত এই রসদেই চালিয়ে নিতে হবে। বিফ সস্তা বলে, কোম্পানি রেশনে বেশি বিফ দেওয়া পছন্দ করে। সারেঙের কথায় কি হবে! আর্টিকেল বদলাতে না পারলে কিছু হবে না।

    সারেঙসাব এই নিয়ে মৈত্রের সঙ্গে ঝগড়া করতে পারেন। বয়স মানুষকে নানাভাবে ধার্মিক করে রাখে। অযথা চিল্লাচিল্লি তাঁর পছন্দ না। ছোটবাবু এ-সব বোঝে। বোঝে বলেই বলল, তুমি মৈত্রদা এ নিয়ে ঝামেলা কর না। তোমার অযথা ঝামেলা করার স্বভাব।

    —আমার অযথা ঝামেলা করার স্বভাব!

    —তাই তো।

    —আমার কচু। জাহাজে এয়েছিস, মরবি। বলে দিলাম, মরবি। কেউ রক্ষা করতে পারবে না।

    ছোটবাবু বুঝতে পারে না, এই কথায় এত উত্তেজনা হয় কি করে! মৈত্রদা এখন ভীষণ গোগ্রাসে খাচ্ছে। বড় বড় মাংসের টুকরো দিয়ে চটকে ভাত খাচ্ছে। সবটা মাংস সে খুব সহজেই খেয়ে বলল, এই ছোটবাবু, আমি হিন্দুর পোলা না। আমি বামুন না, আমার জাত নেই। সঙ্গে সঙ্গে এমন বিষম খেল যে মুখের সমস্ত ভাত চারপাশে ছড়াতে থাকল। অমিয় বলল, তোমার মৈত্রদা ব্লাড প্রেসার আছে। মাংসটা কম খাও।

    এত কাসছে, তবু কথা থামছে না মৈত্রের।—বিফ না খেলে জাহাজ চালানো যায় না। আমি, আমি হিন্দুর পোলা বলচি, বিফ না খেয়ে কয়লার জাহাজে কাজ করা যায় না। মটন, মটন চাই! কেন দেবে মটন! কেন দেবে। যখনকার যা, তোমাকে তাই খেতে হবে।

    এবার ছোটবাবু যেন না বলে পারল না, আচ্ছা খাব, কাল থেকে খাব। তুমি চোচমেচি করবে না তো। জলটা খাও। ছোটবাবু জল এগিয়ে দিল। তারপর মৈত্র একেবারে চুপ। সে আর কোন কথা বলতে পারল না। সে নিচেও গেল না। ছোটবাবু রেলিঙে ঝুঁকে আছে। আর সেই সমুদ্র, নীল আকাশ এবং যেমন মনে হয়ে থাকে অনেকদূর থেকে সারি সারি তিমি মাছের ঝাঁক জাহাজের পেছনে ছুটে আসছে, তেমনি সব ঠিকঠাক থাকলে ছোটবাবুর পাশে খোলা ডেকে দাঁড়িয়ে থাকতে ইচ্ছা করে তার। মৈত্র ছোটবাবুর পাশে দাঁড়াতেই দেখতে পেল, অতিকায় সব সমুদ্রপাখি জাহাজটার পেছনে ছুটে আসছে। এ অঞ্চলে এদিক-ওদিক সব দ্বীপ,পাহাড় ছড়ানো। কি করে জাহাজের খবর পেয়েছে পাখিগুলো, খাবারের জন্য ওরা জাহাজটার পেছন নিয়েছে।

    সমুদ্র থেকে ঠাণ্ডা বাতাস উঠে আসছিল। চারপাশে সমুদ্র নীল জলের ভিতর যেন খেলা করে বেড়াচ্ছে। দূরে ওরা দেখতে পেল, ভেড়ার পালের মতো ডলফিন ভেসে বেড়াচ্ছে। ছোটবাবুর ইচ্ছা একটা তিমি মাছ যদি এ-সময় সমুদ্রে ভেসে ভেসে দিগন্তের দিকে চলে যেত, বেশ মজা হত তবে। এখন মনে হচ্ছে কোথাও কেউ রেকর্ড-প্লেয়ার বাজাচ্ছে। জ্যাক মাঝে মাঝে যখন একঘেয়েমি ঠেকে, বোট-ডেকে বসে বেহালা বাজায়। আসলে বেহালাটা কাপ্তানের। তিনি মাঝে মাঝে তাঁর ঘরে বসে বাজান। সবারই এই দূর সমুদ্র যাত্রায় কিছু না কিছু নেশা আছে। যেমন জ্যাক ভাল নাচতে পারে। একদিন জ্যাক বোট-ডেকে পায়ে খড়খড়ি লাগিয়ে নেচেছে। আজ জ্যাক, বোট ডেকে বসে আছে। জাহাজ জিরো ডিগ্রী পার হয়ে এসেছে। গরমটা এখন তেমন নেই। জ্যাক, একটা কালো রঙের প্যান্ট পরেছে। লতাপাতা আঁকা জামা গায়ে দিয়েছে। টাইটা বেশ লম্বা। জ্যাক এখন খুব সেজেগুজে থাকতে ভালবাসে। আর কেউ জানে না, জ্যাক বোট-ডেকে দাঁড়িয়ে থাকতে ভীষণ ভালবাসে। সে সেখানে দাঁড়ালেই ছোটকে দেখতে পায়। সে ছোটকে আজকাল নানারকম ফরমাস করতে ভালবাসে।

    জ্যাক ডাকল, হাই।

    ছোট বুঝতে পারল, জ্যাক তাকে ডাকছে। সে দৌড়ে বোট-ডেকে উঠে গেল। বলল, জ্যাক আমাকে ডাকছ!

    —তুমি কি দেখছিলে?

    —কিচ্ছু না।

    —এটা ধরো বলে একটা রেকর্ড তার হাতে ধরিয়ে দিল। তারপর জ্যাক নুয়ে কি একটা সুন্দর আই লাভ-টাব গোছের গান তুলে অন্য একটা রেকর্ড খুঁজে বেড়াল। তিন চারদিন আগেও এমনি হঠাৎ তাকে হাই করে ডেকেছিল। বলেছিল, তুমি দূরবীনে কি দেখেছিলে?

    —কিচ্ছু না।

    —কিচ্ছু দেখতে পাওনি?

    –না। একটা কুকুর দেখেছিলাম।

    —আর দেখবে না।

    —আমি ঠিক দেখতে চাই না। কিন্তু মেজ বললে…

    —মেজ বললেও দেখবে না।

    ছোট খুব ভাল ছেলের মতো ঘাড় কাৎ করে বলেছিল, আচ্ছা।

    আজ আবার কি জন্য ডেকেছে ছোট বুঝতে পারে না। বেশ শীত শীত করছে। সে হাতে একটা রেকর্ড নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কাপ্তান ব্রীজে পায়চারি করছেন। দুটো একটা নক্ষত্র আকাশে উঠছে। আকাশে বিন্দুমাত্র মেঘ নেই। এমন নির্মল আকাশ অনেকদিন দেখা যায়নি সমুদ্রে। এমন কি সমুদ্র এত শান্ত যে এখন ইচ্ছা করলে কাপ্তান, এক রবিবারে, ছোটখাটো একটা নাটক অভিনয় করিয়ে নিতে পারেন। ছোটখাটো স্ক্রীন টানিয়ে, ম্যাকবেথের কোন সিন, জ্যাক তো মুখস্থ বলতে পারে সবটা অথবা ও-নিলের কোন সমুদ্রবিষয়ক নাটক, তখন কাপ্তান বেহালা বাজাতে পারবেন, এটাই তাঁর লাভ। তিনি, উইংসের আড়ালে দাঁড়িয়ে বেহালা বাজাবেন এবং সমুদ্রের চারপাশের এক নীলাভ জ্যোতি তাঁকে কেমন গ্রাস করতে থাকবে তখন।

    জ্যাক আর একটা রেকর্ড পাল্টাল। খুব দ্রুত তালে বাজছে। গমগম করে উঠছে সারা জাহাজটা। নিচে এঞ্জিনের শব্দটা পর্যন্ত এমন একটা গানের সুরে ছন্দ মিলিয়ে চলছে। জ্যাক, পায়ে তাল দিচ্ছে। জ্যাক বলছে, গাও, গাও। জোরে। ছোটবাবু একেবারে হাঁ। সে বলল, আমি পারি না।

    —গাও,গাও না।

    ছোটবাবু বলল, আমি পারি না জ্যাক।

    —গাও, গাও না……..উই আর ইন দি সেম বোট, গাও, গাও না।

    ছোটবাবু বেশ গলা মিলিয়ে গাইবার চেষ্টা করল, উই আর ইন…

    জ্যাক বলল, বেশ সুন্দর হচ্ছে। আরও জোরে। গাও, আরও জোরে….।

    কাপ্তান আর থার্ড অফিসার তাড়াতাড়ি উঁকি দিল ব্রীজ থেকে। কাপ্তান বয় যেতে যেতে দেখল, জাহাজের সবচেয়ে কমবয়সী নাবিকটির সঙ্গে জ্যাকের ভারি বন্ধুত্ব। সে কফি আর আইসক্রীম রেখে গেছে।

    ছোটবাবু বলল, তুমি খেয়ে নাও জ্যাক।

    জ্যাক বলল, ছোটবাবু মনে থাকে যেন, আর কখনও স্যার-টার বলবে না।

    —না বলছি না।

    —আমার খারাপ লাগে স্যার শুনতে।

    ‘ছোটবাবু বলল, জ্যাক, তুমি মেয়েদের মতো দেখতে। বলেই জিভ কেটে ফেলল। সে ভুলে যায় সব। এটা ঠিক না। জ্যাকের অহংকারে লাগতে পারে। বেটাছেলেকে মেয়েছেলে বললে কার না রাগ হয়। সে তাড়াতাড়ি জ্যাককে অন্যমনস্ক করার জন্য বলল, জ্যাক ঐ দেখ কত বড় পাখি! কি বড় ডানায় যেন সমস্ত আকাশ ঢেকে দিয়েছে।

    জ্যাক দেখল ওদের মাথার ওপর, হাত দশেক ওপর হবে, পাখিটা প্রকাণ্ড ডানা মেলে স্থির হয়ে ভেসে যাচ্ছে। জাহাজের সঙ্গে চলছে।

    জ্যাক বলল, সর্বনাশ।

    —কি হল!

    —ওটা এখন ছোঁ মারবে!

    —তার মানে!

    —আমার সব খাবার ছোঁ মেরে নেবে।

    ছোটবাবু তাড়াতাড়ি খাবারটার ওপর ঝুঁকে দাঁড়াল।

    —তোমার চোখ তুলে নেবে ছোটবাবু। শিগগির বোটের নিচে চলে এস।

    ছোট আর দেরি করল না। সে কফির কাপ এবং আইসক্রিমের প্লেট নিয়ে ছুটে বোটের নিচে চলে গেল। তারপর সে দেখল, জ্যাক সুন্দর দু’পা বিছিয়ে দিয়েছে। বোট-ডেকের ভিতর দিয়ে, উপুড় হয়ে পড়ে আছে। ছোটবাবু উবু হয়ে বসে আছে। খুব তাড়াতাড়ি খেতে কষ্ট। রেকর্ডটা শেষ হয়ে আসছে। যেন ওর’খাওয়াটা একটু দ্রুত সমাধান করার জন্য, সে কিছুটা ছোটকে দিয়েছে। ভাগ করে দিয়ে সে একটা কথাও ছোটকে বলতে দিল না। সে আবার রেকর্ড-প্লেয়ারের পাশে উবু হয়ে বসে পড়ল।

    ছোটবাবুর সাহস হল না বলে, আমি খাব না জ্যাক। ছোটবাবু খেয়ে জামায় মুখ মুছে ফেলল। যেন সে খায়নি। সে খেল কিনা তাও বলল না জ্যাককে। বেশ পরিপাটি করে দু’পা ছড়িয়ে সহজ হয়ে বসে পড়ল। জ্যাককে সে যে খুব ভয় পেত, এখন এমন বলতে ইচ্ছা হচ্ছে। কিন্তু জ্যাক একবারও তাকাচ্ছে না। সে রেকর্ডের গাদা থেকে একটা ভাল রেকর্ড খুঁজছে। যা শুনলে ছোটবাবু বুঝবে, জ্যাকের সংগ্রহে কত সুন্দর গান আছে।

    কাপ্তান ব্রীজে পায়চারি করতে করতে ভাবছিলেন যাক, জ্যাক সমুদ্রে একজন সমবয়সী সঙ্গী পেয়ে গেছে। ঠিক সমবয়সী নয়, তবু বয়সে ওরা কাছাকাছি। স্বাভাবিকভাবেই ওরা দুজন জাহাজে একটা টান বোধ করবে। আর নেটিভরা খুব বিনীত, ভদ্র, এবং ভীতু হয়। ছেলেটার ভিতর সব গুণগুলোই আছে। তিনি মনে মনে জ্যাকের জন্য যতটা উদ্বিগ্ন ছিলেন, এখন আর ততটা নেই। যেমন শিকারী তার দুষ্টু মেয়ের হাতে কখনও কখনও বাঘের ছানা দিয়ে দেয়, এবং তাকে ভুলিয়ে রাখে, অথবা পোষা বেড়াল, ছোটবাবু যেন জ্যাকের তাই। কাপ্তান বলল, বুঝলে থার্ড, জ্যাক আমার স্বভাব পেয়েছে। সমুদ্রে ঘুরে বেড়াতে ওর কখনও খারাপ লাগে না। স্কুলেটুলে কিছু হয় না। তার চেয়ে একজন মানুষ সমুদ্রে ঘুরে বেড়ালে বেশি শিখতে পারে। জ্যাক আমার কত কম বয়সে কত বেশি জানে। কেমন আত্ম-তৃপ্তিতে কাপ্তান চোখ বুজে ফেললেন।

    এভাবে জাহাজ আবার ক্রমে এগিয়ে চলে। কখনও কখনও ছোটবাবু জ্যাকের সঙ্গে পাখিদের মাংস খাওয়ায়। ডারবান পর্যন্ত ছোটবাবুর শেষ পর্যন্ত ওয়াচ থাকল না। সে ফালতু হয়ে থাকল। ফালতু মানে কাজ কম। ডেকের ওপর উইনচে শুধু কাজ করা। ডেকের ওপর মাঝে মাঝে পাখিদের মাংস দেবার সময় বড় বড় সব এ্যালবাট্রস পাখি ডানা মেলে মাথার ওপর ভেসে থাকে। জ্যাক আর সে মাঝে মাঝে মাংস ছুড়ে দেয়। বেশ একটা খেলা। ডেকে ওদের ভারি আশ্চর্য খেলা জমে ওঠে। একে একে অনেক পাখি, প্রায় সারাটা ডেক তখন ছেয়ে যায়, দলে দলে ওরা মাংস খাবার লোভে জাহাজের চারপাশ ঘিরে ফেলে—তারপর উড়তে উড়তে ভাসতে ভাসতে সমুদ্রযাত্রার সঙ্গী হয়। মাংস ছুড়ে দিলেই হাওয়ায় ক্লপ করে ধরে ফেলে। ডেকে পর্যন্ত পড়তে দেয় না। পাখিগুলো মাংস খাবার লোভে কোথায় যে ভেসে চলেছে নিজেরাও জানে না। কারণ ওরা এভাবে জাহাজের পিছু পিছু শুধু উড়তেই থাকবে। সামনে যতক্ষণ কোনও ডাঙ্গা না পাচ্ছে ওরা আর থামবে না।

    জাহাজিরা অবসর পেলেই পাখিদের স্নান, খাওয়া এসব দেখত। কখনও সবাই দেখত বেশ সামান্য ঢেউয়ের ওপর ওরা ভেসে রয়েছে। ডুবে ডুবে সাঁতার কাটছে। অথবা প্রপেলার যেখানে জল ভেঙ্গে চলে আসছে সেখানটায় ওরা ডুবে গভীর নীল জলে, সাদা ডানা মেলে মাছ খুঁজছে। প্রপেলারের ঝাপটায় কত সব ছোট মাছ, মরে যায়। ওগুলো জলে ভাসলে অথবা জলে ডুবে গেলে ওরা তুলে খায়। কখনও ভাণ্ডারিরা উচ্ছিষ্ট খাবার ফেলে দেয় জলে। ওরা সে-সবও খায়। জাহাজিদের কাছে, সমুদ্রের মতো, আকাশের নক্ষত্রের মতো এই সব পাখিদেরও একটা দাম আছে। মাস্তুলে কোনও পাখি এসে বসলে ওরা তাড়িয়ে দেয় না। ওদের সময় ভাল যাচ্ছে, এমন ভেবে থাকে।

    বন্দরে ঢোকার মুখে মৈত্র ভাবল এ-বন্দরে শেফালির ঠিক চিঠি আসবে। এখানে শুধু বাংকার নেওয়া হবে। রাতে রাতে জাহাজ, দুটো পাহাড়ের ভিতর দিয়ে বন্দরে ঢুকে যাচ্ছে।

    শেফালী বন্দরে বন্দরে এক চিঠি লেখে। সেই এক অপেক্ষার কথা চিঠিতে। তুমি কবে ফিরবে। মৈত্রকে ছেড়ে শেফালীর এক দণ্ড ভাল লাগে না। লিখবে জাহাজ তারপর কোথায় যাচ্ছে। ঠিকানা স্পষ্ট করে লিখ। গতবার এজেন্ট অফিসের কি যে ঠিকানা দিলে কিছু বুঝতে পারিনি।

    বন্দরে ঢোকার মুখেই ঠিক চিঠি হাজির। পাইলট জাহাজে উঠে এসেছে। পাইলটের সঙ্গে সব চিঠি এসেছে। সারেঙ ডেকে ডেকে চিঠি দিচ্ছে সকলকে। মৈত্র চিঠি পেয়ে একটু গোপনে পড়বে বলে, বোট ডেকে উঠে গেছে। তা না হলে অমিয়টা গিদরের মতো করবে। কি লিখল দাদা। চুমুটুমু খাবার কথা লেখেনি! অমিয়র জিভ খুব আল্পা।

    এবারের চিঠিতে শেফালী নতুন একটা উপসর্গের কথা লিখেছে। মৈত্র নুয়ে দেখল, অস্পষ্ট অক্ষরে লেখা, তবু হাতের লেখা বুঝতে কষ্ট হয় না, এতবার এই লেখা পড়েছে যে সে শেফালীর সামান্য আঁচড়ে ধরে ফেলে সব। শেফালী লিখেছে, আমার বড় বমি পায়। তোমার জন্য রাতে আমার ঘুম আসে না। তারপর লিখেছে, শেফালীর ভাল থাকছে না শরীর। ক্রমশ বমি বাড়ছে। শরীর দুর্বল। কেবল দুঃস্বপ্ন দেখি। তারপর নিচের প্যারায় শেফালী- সে তার স্বপ্নের কথা লিখেছে।

    আচ্ছা তোমার জাহাজে লম্বা বড় একটা বাঁশ আছে? বাঁশের মাথায় কি কোন কঙ্কাল বাঁধা আছে? প্রায় একটা বড় তিমি মাছের ছবি সমুদ্রে ভেসে যেতে দেখি। প্রায়ই মনে হয় মাছটা তোমাকে গিলে ফেলার জন্য অপেক্ষায় আছে। তুমি সেটা বুঝতে পারছ না। তুমি ক্রমশ মাছটার দিকে এগিয়ে যাচ্ছ। মাঝে মাঝে তোমাকে আমি সেই ঝোলানো কঙ্কালের নিচে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখি। ভয়ে তখন আমার মুখ শুকিয়ে যায়। মনে হয় আর সমুদ্রে গিয়ে কাজ নেই। বরং এবার এসে এই কলকাতা শহরে কিছু দেখে নাও। তুমি লক্ষ্মীটি আমার, দস্যুর মতো কোনও গোঁয়ার্তুমি কর না। ঝড়ের সময় ডেকের ওপর দিয়ে হাঁটবে না। মনে থাকে যেন লক্ষ্মীটি। জাহাজে উঠলেই এভাবে শেফালী ভীষণ সংশয়ে ভোগে।

    দস্যু কথাটা বলে শেফালী যেন অদ্ভুত এক সুখ পায়। দস্যু কথাটা ওর সম্পর্কে একটা ভীষণ উপমার মতো। দু’হাত তুলে মৈত্র এখন সেই সব দৃশ্যের ভিতর ডুবে যেতে চাইছে। দস্যুর মতো ঝাঁপিয়ে পড়া, দস্যুর মতো সহবাস এসব হামেশা শেফালী তাকে বলে থাকে। মৈত্রের চিঠি পড়তে পড়তে ভীষণ জল তেষ্টা পাচ্ছে। সে আর ডেকে দাঁড়াতে পারছে না। নিচে নেমে সে ঢকঢক করে জল খেল।

    আজকাল অমিয়র সঙ্গে মৈত্রের তুই তুকারিতে এসে দাঁড়িয়েছে। অমিয় এখন জাহাজে বেশ সাবালক জাহাজি। সে দেখল মৈত্র জল খাচ্ছে। বেশ ঠাণ্ডা। শীত লাগছে ভীষণ। এই শীতে কি করে যে ওর তেষ্টা পায়! সে বলল, কার চিঠি?

    মৈত্র বলল, আর কার?

    —শেফালী বৌদির?

    মৈত্র বলল, তাইতো মনে হয়।

    মাঝে মাঝে ওরা যখন ওয়াচ শেষ করে বাথরুমে ঢুকে যায়, তখন স্নানের ভেতর ওরা কেমন নিজেদের উলঙ্গ ছবি দেখে ফেলে। ভারি মজা এই স্নানে। সাবানের ফেনা সারা শরীরে। মৈত্রের চেহারা তখন বড় ভয়ঙ্কর। ওর চুল কোঁকড়ানো। হাত-পায়ের পেশী ভীষণ শক্ত। সে হাতে একটা তামার বালা পরে থাকে। এমন একটা শক্ত মানুষের চেহারা দেখলেই অমিয়র কেন জানি মৈত্রের বৌর কথা মনে হয়। সে তখন বলতে থাকে, তোর বৌটাকে এবার দেশে গেলে দেখাস মৈত্র।

    —কেন কেন! এত লোভ কেন আমার বৌকে দেখার।

    —আমার লোভ না। লোভ তোমার। তোর এমন শরীর, বৌয়ের কষ্ট হয় না!

    –কষ্ট! কিসের কষ্ট! মৈত্রের মুখ একেবারে নাবালকের মতো। যেন সে কিছু বোঝেনি।

    -–কষ্ট, কষ্ট, এত ব্যাখ্যা করতে পারব না। আশেপাশে ছোটবাবু থাকতে পারে—ছোটবাবুর সামনে মৈত্র চায় না খিস্তিখেউড় করে। অমিয় একটা ধারি, সে যা কিছু বলতে পারে। ওরা এদিক ওদিক খুঁজে দেখলে ছোট নেই। হয়ত সে মেজ-মালোমের পাশে বসে আছে। ওকে খুঁজে দেখা দরকার। ওর চিঠি আসেনি। চিঠি না এলে জাহাজিরা খুব বেজার মুখে ঘুরে বেড়ায়। একা একা থাকে। এবং নিজেকে খুব তুচ্ছ মনে হয়।

    মৈত্র ছোটবাবুকে বন্ধুর ফোকসালে শেষ পর্যন্ত পেল। বন্ধুর বাংকে চুপচাপ শুয়ে আছে। চারপাশে যখন বন্দরের আলো, পাহাড়ের মাথায় বাতিঘর তখন ছোট এভাবে নিচে বসে আছে ভাবতেই মৈত্রের কেমন খারাপ লাগল। সে কোন চিঠি পায়নি। সে নিজে সবার চিঠি লিখে দিয়েছে, সবার চিঠির জবাব এসেছে,তার চিঠি নেই।

    মৈত্র পাশের বাংকে বসে বলল, ঠিকানা ভুল লিখেছিস?

    —না, ঠিকানা ঠিকই লিখেছি। তবে আমার যা মনে হয় বাবা-মা, আগের জায়গায় নেই।

    —কোথায় গেছে?

    —কোথায় যাবে, তাও জানি না। বাবা বারবারই জায়গা বদল করতে চাইছেন। নবদ্বীপের দিকে থাকার খুব ইচ্ছে। ওখানে কিছু যজমানি পাবেন কথা আছে। তবে ওখানে যদি যান, চিঠি একদিন না একদিন পাবেন। আমি ঠিক বুয়েন্স এয়ার্সে মার চিঠি পাব আশা করছি।

    —তা হলে পেয়ে যাবি

    —নাও পেতে পারি। আমাদের পরিবার এখনও ঠিক করতে পারছে না কোথায় থাকবে।

    —কেন, কলকাতার দিকে চলে এলেই হয়।

    —কলকাতাকে বাবার ভীষণ ভয়। জ্যাঠামশাই তো কিছুতেই আসবেন না। গাঁয়ের দিকে বাড়িটাড়ি করে কিছু জমিজমা কিনে বাঁচার একটা চেষ্টা চলছিল। কিন্তু বাবা, জ্যাঠামশাই এত আনাড়ি শেষ পর্যন্ত কিছু ঠিক করে উঠতে পারেন না। একটা রেশনের দোকান জ্যাঠামশাই করলেন। টাকা কম ছিল বলে পার্টনার নিলেন। পরে কি করে যে সেই মালিক হয়ে গেল বুঝলাম না। জ্যাঠামশাই একদিন ক্ষোভে দুঃখে সব ছেড়ে চলে এলেন। তারপর কেমন খুব দুঃখ থেকে বলার মতো সে বলল আসলে আমাদের পরিবার জানে না, একবার ছিন্নমূল হলে ফের কিভাবে বাঁচতে হয়। সে যেন বেশ দামী কথা বলে ফেলেছে। এমনভাবে বললে, বড় কথা শোনাবে তবু এটাই ঠিক। বাবা কেমন হাল ছেড়ে দিয়েছেন।

    মৈত্র বলল, সব ঠিক হয়ে যাবে। একটু থেমে বলল, আসার সময় তুই জেনে আসিসনি সব।

    —সে তো আটমাস আগে, আটমাস আগে বাড়ি ছেড়েছি।

    —বাড়িতে আর যাসনি?

    –না।

    —জাহাজে ওঠার আগে একবার দেখা করে এলি না!

    —তাহলে আমার জাহাজে আসাই হত না। সে বলতে চাইল আপাতত আমি নামগোত্রহীন। বাবা মার সঙ্গে সম্পর্কহীন! কিন্তু বলতে পারল না। বুয়েন-এয়ার্সে যদি না আসে তবে ভাগ্যের সন্ধানে ওরাও বের হয়েছে ভেবে নিতে হবে। ভাগ্যের সন্ধানে মৈত্রদা আমিও বের হয়েছি। টাকা মা পাবে না। অফিসে আবার ফেরত চলে আসবে।

    মৈত্র এবার কেমন ঠাট্টা করে বলল, বাড়ি থেকে রাগ টাগ করে পালিয়েছিস বুঝি!

    —রাগ, না রাগ ঠিক না। তবে সবাইকে না জানিয়ে ভাগ্যের সন্ধানে বের হয়ে পড়েছি। কেউ জানত না, আমি কোথায়। আমার চিঠি পেলে মা যে কি খুশী হতেন।

    —তোর এটা ঠিক হয়নি ছোট। মাকে এভাবে চিন্তায় ফেলে দেওয়া তোর ঠিক হয়নি।

    ছোট এবার দেয়ালের দিকে মুখ ঘোরালো। ছোট কি মায়ের জন্য কাঁদছে। ছোট কিছুতেই এদিকে মুখ ঘোরাচ্ছে না। মৈত্র ভীষণ বিব্রত বোধ করছে। এ-ভাবে ছোটকে মুখ ঘুরিয়ে থাকতে দেখলে সে ভীষণ ক্ষেপে যায়। সে বলল, বুঝলি ছোট তোর বৌদি চিঠি লিখেছে।

    ছোট কোন আগ্রহ দেখাল না! তবু মৈত্র বলে চলেছে, বুঝলি তোর বৌদির কি ভয় রে! ও নাকি ডেকের মাস্তুলে একটা তিমি মাছ স্বপ্নে ঝুলতে দেখে। কখনও তিমি মাছের কঙ্কাল। এ আবার কি রকম স্বপ্ন রে বাবা!

    ছোট উঠে বসল এবার। সে মুখ ঘুরিয়ে রেখেছে এখনও। সে তেমনিভাবে বলল, সত্যি আজগুবি স্বপ্ন মৈত্রদা। না হলে শেফালী বৌদি হবে কেন। তোমরা দুজনেই দুজনকে ছেড়ে থাকতে পারছ না। বলে ছোট্ট রসিকতা করে নিজেই নিজেকে হাল্কা করে দিল। এবং বড্ড ছেলেমানুষী করে ফেলেছে ভেবে সে তাড়াতাড়ি সিঁড়ি ধরে মৈত্রের নাগালের বাইরে চলে গেল।

    মৈত্র বলল, বেচারা!

  • ছয়

    ছয়

    ।। ছয়।।

    এ-বন্দরটা বেশ নিরিবিলি নির্জন। শহর খুব কাছে না হয়তো। বাতিঘর থেকে আলো এসে মাঝে মাঝে তাদের জাহাজে পড়ছে। ছোটবাবু একবার আলোর মুখোমুখি পড়ে চোখে অনেকক্ষণ ঝাপসা দেখেছে। সে ভেবেছিল চুপচাপ ফল্কাতে বসে থাকবে। কিছু পাখী জাহাজে আসতে আসতেই মরে গেছে। লোনা জলের ঝাপ্‌টা কিছু পাখির সহ্য হয়নি। ওরা সে-সব সমুদ্রেই ফেলে দিয়েছে। কোথাকার পাখি, রাজস্থানের কোন অঞ্চল থেকে পাখিগুলো ডারবান যাবে, কি কোথায় যাবে কেউ জানে না। চিড়িয়াখানা-টানায় হবে হয়তো। এটা ওরা আন্দাজে অনুমান করেছিল। পাখিগুলো জলে ভাসিয়ে দিলে ছোটবাবুর এমন মনে হত। কারণ, মরা পাখিরা জলে কিছুটা ভেসেছিল, জাহাজ একটু দূরে গেলেই বড় বড় হাঙর ছুটে আসবে। কত সুন্দর নরম মাংস, ভারতবর্ষের কোথায় এদের বাস ওরা জানে না, তবু সে টের পায় জলের নিচে সেইসব অতিকায় হাঙরের ঘোরাফেরা আর জাহাজ যায়, সেই একভাবে, নীল রঙের সাম্রাজ্যে জাহাজ, সাদা জাহাজ যায় আর যায়। পাখিগুলোর মরা শরীর অনেক দূর থেকেও ভাসতে দেখা গেছিল।

    কিছু পাখী মরে যাওয়ায় ফল্কার এদিকটা ফাঁকা। জাহাজ বেশ দ্রুত যাচ্ছে। কারণ জাহাজটাকে সমুদ্র-স্রোত কিছুটা দ্রুত যেতে হয়তো সাহায্য করছে। এখানে সে জানে একটা মৌসুমী স্রোত আছে, মৌসুমী স্রোতের জন্য হতে পারে, বা জাহাজ খুব নিরিবিলি সমুদ্র পেয়েছে বলে প্রায় একদিন আগে লরেঞ্জোমরকুইসে ঢুকে গেছে। আর হাওয়াটা জাহাজের সামনে। পেছনে সে জন্য ধোঁয়া যাচ্ছে। ফানেলের ধোঁয়ায় সারাটা আফটারপিক, ফলকা একেবারে কালো হয়ে গেছে। ছোটবাবু ফলকায় একটু বসবে ভেবেছিল, সকালে ডেক-টিণ্ডাল খুব ভালোভাবে জল মেরেছে, অথচ এখন হাত দিলে ফের কালো ছাপ। সে এখানে বসতে পারল না।

    বেশ অন্ধকার এদিকটাতে। যে-কোন কারণেই হোক, মাস্তুলের আলোটা জ্বলছে না। ঠিক বোট- ডেকে এখন মেজ-মালোম আছে। কিন্তু সে গিয়ে দেখল মেজ-মালোম নেই। কেবল বড়-মিস্ত্রি সেজেগুজে কোথাও নেমে যাবে বলে গ্যাঙওয়েতে দাঁড়িয়ে আছে।

    প্রায় একমাস হতে চলল, ওর মনেই ছিল না, এ-জাহাজে বড়-মিস্ত্রি বলে একজন আছে। অথচ সে প্রথম দিন দেখেছে, মানুষটি ক্রাচে ভর করে ডেকে উঠে আসছে। কিনারায় ওর মেয়ে ঠিক করা থাকে। বন্দরে বন্দরে ঘুরে এটা হয়েছে। হয় জেনি, নয় লরা, নয় এলমা এমন কেউ না কেউ আছে। কলকাতা বন্দরে কে থাকে, তার নাম কি? মানুষটা এতদিন কোথায় ছিল! কেবিনে, নিজের ঘরে! সারাক্ষণ মানুষটা সে শুনেছে দাবা নিয়ে বসে থাকে। আর টিপয়ে মদ এবং সে একা দুজনের হয়ে সকাল সন্ধ্যা কখনও গভীর রাত পর্যন্ত দাবা খেলে যায়। মনে হয় সে ঘুমোতে জানে না। সারাক্ষণ জেগে জেগে জাহাজ পাহারা দেবার স্বভাব বুঝি। যখন ভালো লাগে না পোর্ট-হোলে দাঁড়ায়। সমুদ্র যেন পেছনে চলে যাচ্ছে এমন তার মনে হয়। সে সমুদ্রে একটু সময় তাকিয়ে থাকলেই সমস্ত গ্লানি খুব সহজে শরীর থেকে মুছে ফেলতে পারে।

    ছোটবাবুর মনে হল এ-মানুষটাই জাহাজে সবচেয়ে বেশী সুখী। বেশি লম্বা নয়, বেঁটেও নয়, গোলগাল মানুষ, গোলগাল বলে যতটা লম্বা দেখানো দরকার তা দেখায় না। মাথায় একটাও চুল নেই। টাকটা এত বেশি মসৃণ আর চকচকে যে কখনও কখনও একটা বরফের বলটল মনে হয়। বোধহয় জাহাজটা এখানে রাত কাটাবে! নয়তো বড়-মিস্ত্রি বের হত না। ওর তো কোন কাজ নেই, কেবল একটা কেবিন, দাবার ছক। ছকটা আবার সাধারণ ছকের মতো নয়, খাঁজকাটা। এতে দাবার বড়েরা পিচিং-এর সময় ছিটকে পড়ে যায় না।

    ওর একদিন বড়-মিস্ত্রির ঘরে পাইপ মেরামতের কাজ ছিল। সেদিন বড়-মিস্ত্রি সারাক্ষণ মুখ গুম করে বসেছিল। কি বিরক্ত! ছোটবাবু আর পাঁচ নম্বর মিস্ত্রি কোনরকমে, যতটা তাড়াতাড়ি সম্ভব কাজটা সেরে বের হলে ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়বার মতো। সেই থেকে সে আর মানুষটাকে দেখেনি। তার কোন ওয়াচ নেই। দিনের বেলা সবসময় বয়লার স্যুট পরে থাকে। পেছনের পকেটে একটা লম্বা টর্চ। এটা সে কখনও পকেট থেকে খুলে রাখে না। বড়-মিস্ত্রিকে একটা টর্চ বাদে কিছুতেই ভাবা যায় না।

    গ্যাঙওয়েতে সিঁড়ি পড়ে গেলেই খোঁড়াতে খোঁড়াতে মানুষটা নেমে যাবে। সামনে কি আছে, রাস্তার নাম কি, ট্যাকসি কোথায় পাবে, সব সে জানে। হয়তো এ বন্দরে এই নিয়ে বিশবার এসেছে। তার কাছে বন্দরের ছবি এত স্পষ্ট যে, জাহাজিরা মেয়ে ধরতে গেলে পর্যন্ত ওর কাছে শোনা যায় টিপস্ নিতে। কোন জায়গায় ভালো জিনিস আছে বড়-মিস্ত্রির মতো কেউ বলতে পারে না।

    সব শোনা ছোটবাবুর। মানুষটাকে দেখে আবার মনে পড়ে গেল। সে কোনরকমে অন্ধকারে গ্যঙওয়ে পার হবার সময় টের পেল না, আরও একজন দাঁড়িয়ে আছে। একটু দূরে। সে অমিয়। অমিয়, জাহাজ বন্দর ধরছে, আর নেমে যাবার তাল করছে। ছোটবাবুরও ইচ্ছে করছে একবার নিচে নেমে যেতে। যেন কতকাল মাটির স্পর্শ সে পায়নি। পায়ের নিচে মাটি পেলে, আফ্রিকা, আমেরিকা, ইণ্ডিয়া, মনে থাকে না। মাটি, মাটি। মাটি, জননী, এমন শুধু মনে হয়। মানুষের কাছে এর চেয়ে প্রিয় কিছু নেই।

    ছোটবাবু অস্পষ্ট অন্ধকারে দেখল, বড়-মিস্ত্রির পিছু পিছু আর একজন নেমে গেল। ক্রেনগুলোর পাশ দিয়ে ডকের বড় বড় লম্বা গুদাম, রেল-লাইন, লাইন পার হয়ে গেটের দিকে অদৃশ্য হয়ে গেল। জাহাজ যখন বাঁধাছাঁদা হয়ে গেছে তখন যে যার মতো বন্দরে নেমে যাবেই। ফোকসালে এসে দেখল, মৈত্র উবু হয়ে চিঠি লিখছে। পাতার পর পাতা লিখছে, এবং একটা বাণ্ডিল বোধহয় করে ফেলবে। কেউ কেউ তাঁকে খুঁজে গেছে। চিঠি লেখাতে দল বেঁধে এসেছিল। সে ভয়ে আর জেগে থাকতে পারল না। যা সব চিঠি, মাঝে মাঝে সে না হেসে পারে না। হাসলে আবার ওরা রাগ করে। সে চিঠি লেখার ভয়ে তাড়াতাড়ি কম্বল গায়ে শুয়ে পড়লে মনে হল, ওপরে কেউ ওকে খুঁজছে। এবং সিঁড়িতে পায়ের শব্দ। কেউ দ্রুত নেমে আসছে। মৈত্র দেখল, মেজ-মালোম উঁকি দিচ্ছে। তাড়াতাড়ি, মৈত্র লাফিয়ে দরজার কাছে গেলে ছোটবাবুর দিকে আঙ্গুল তুলে মেজ যেন কি বলছে।

    মৈত্র বলল, স্যার ও ঘুমোচ্ছে।

    ছোটবাবু ঘুমোয়নি। সে সব শুনছে। যদি মজার কোন ব্যাপার হয়, তবে বলবে, না স্যার ঘুমোইনি, আর না হলে এখন ঘুমের ভান করে পড়ে থাকতেই হবে। সে চুপচাপ কথাবার্তা শুনছে কেবল।

    সেকেণ্ড বলছে, এত তাড়াতাড়ি ছোট ঘুমিয়ে পড়েছে।

    —ওর মনটা ভাল নেই স্যার।

    —কেন কেন!

    —দেশ থেকে চিঠি আসেনি।

    —স্যাড!

    —খুব স্যাড। সবার চিঠি এসেছে, চিঠি না এলে কেমন লাগে বলুন!

    —খুব খারাপ! খুব খারাপ! তবে তার জন্য মন খারাপ করার কি আছে।

    —খুব মন খারাপ করে সন্ধ্যার দিকে চুপচাপ শুয়েছিল। কারো সঙ্গে কোন কথাবার্তা না। যখন খুঁজে বের করলাম তখন দেখি মুখ অন্যদিকে ঘুরিয়ে কাঁদছে।

    ছোটবাবু এবার আর সাড়া না দিয়ে পারল না। মৈত্রদা ওকে সেকেণ্ডের কাছে একেবারে বালকের সামিল করে ফেলেছে। ওর খুব এতে অহঙ্কারে লাগে। সে উঠে বসল, কম্বল গা থেকে ফেলে বলল, না স্যার, আমি কাঁদিনি। ও বেশি বেশি আপনাকে বলছে।

    —তা ঠিক আছে, তুমি যখন কাঁদোনি, ভালো করেছ। জাহাজিরা চোখের জল ফেলে না। ওরা এত বেশি লোনা জল ঘাটে, চোখের জলে সেটা পোষায় না। তোমাকে যা বলছিলাম, তুমি যাবে ওপরে?

    —কোথায় স্যার?

    —এই জেটিতে একটু ঘুরে আসব।

    প্রস্তাবটা মন্দ না। সে বলল, চলুন।

    আসলে ছোটর গরম জামাকাপড় কিছু নেই। মৈত্র বলল, আমার সোয়েটারটা গায়ে দে। না হলে ঠাণ্ডা লেগে যাবে। মৈত্র ওর লকার খুলে বেশ ভাল সোয়েটার ঘি ঘি রঙের বের করে দিল। ভীষণ ঢোলা। এবং মৈত্রের প্যান্ট, আরও ঢোলা, তবু শীত মানবে ভেবে ছোটবাবু এসব পরে সেকেণ্ডের সঙ্গে জেটিতে নেমে গেল এবং সত্যি আরাম, আশ্চর্য আরাম। ওরা রেল-ইয়ার্ড পার হয়ে সামনের ইকাগে। রেস্তোরাঁতে বসে গেল—তুমি কি খাবে?

    —কিছু না স্যার।

    —আরে খাও। নতুন এয়েছ, দ্যাখো না খেয়ে! যাবে একদিন?

    —কোথায় স্যার?

    —কার্ণিভেলে।

    —সেটা কোথায়?

    —বুয়েনস এয়ার্সে। ও কি সব ব্যাপার। তোমার মনে হবে, সে একটা ব্যাপার। যাকগে, ড্রিঙ্কসের অর্ডার দিচ্ছি।

    ছোটবাবুর আশ্চর্য মনে হল মেজকে। সে এতটা কখনও প্রত্যাশা করে না। ওরা সাহেবসুবো মানুষ। সে সবচেয়ে নিম্নতম মজুরিতে কাজ করে—ওর সঙ্গে মেজ-মালোমের সহৃদয় ব্যবহার কেবল কষ্টদায়ক ঘটনা। মেজ-মালোমকে মনে হয় দার্শনিক, কখনও মনে হয় হিসেবী, আবার কখনও লুচ্চা। এখন কি মনে হচ্ছে সে ভেবে পাচ্ছে না। সে বয়সে ছোট বলে, মসৃণ গাল মসৃণ দাড়ির ভেতর আশ্চর্য একটা লোভ এই সব জাহাজিদের থেকে যেতে পারে। এবং সেটা কতদূর পর্যন্ত গড়াবে সে বুঝতে পারে না, সে অনেক ভেবে বলল, না স্যার। আমি ড্রিঙ্ক করি না।

    —তবে কফি খাও। খাবার কি খাবে?

    —কিছু না স্যার। এক কাপ কফিই যথেষ্ট!

    মেজ পর পর পেগ-পাঁচেক খেয়ে ফেলার সময় দূরে রেল-ইয়ার্ডের পাশে বড়-মিস্ত্রির গলা পাওয়া গেল। খুব বচসা করছে কারো সঙ্গে।

    —তুমি শালা ইণ্ডিয়ান, দালাল, কিচ্ছু জান না, এখানে আমাকে বাজারের মাগি চেনাতে এসেছ!

    কেউ তখন হেঁকে বলছে, আপনি স্যার ভুল করছেন, আমি দালাল নই। বাজারের সেরা মাগি খুঁজে বের করা আমার পেশা না।

    রেল ইয়ার্ডে আলো কম। বেশ দূরে দূরে বাতির থাম। গাড়ি সান্টিঙের শব্দ আসছে। কখনও জেটির পাশ দিয়ে টংলিং টংলিং শব্দ করতে করতে একটা মালগাড়ি যেন সমুদ্রে নেমে যাচ্ছে। অন্ধকারে ঠিক বোঝা যায় না। কেবল বোঝা যায়, আর একটু এগিয়ে গেলেই সমুদ্র। বড়-মিস্ত্রি খুব আজ বেকায়দায় পড়ে গেছে।

    আসলে ব্যাপারটা ছিল অন্য রকমের। অমিয় চুপি চুপি বের হয়ে যাচ্ছিল! ওর ইচ্ছা ছিল বড় মিস্ত্রি নেমে গেলেই সে নেমে যাবে। সে গ্যাঙওয়ে থেকে যখন দেখল বড়-মিস্ত্রি, রেল-ইয়ার্ডের ভিতর ঢুকে গেছে, তখন সে নিজেও নেমে গেল। সে এখানে একটু হেঁটে বেড়িয়ে দেখবে, এমন তার আশা। বড়-মিস্ত্রি খুঁড়িয়ে হাঁটে বলে সময় লাগে। অমিয় যেতে যেতে তখন দেখছে, কেউ অন্ধকারে তার জন্য দাঁড়িয়ে আছে। যদিও এটাকে ঠিক অন্ধকার বলা যায় না, কম আলো, অস্পষ্ট আলোতে সে বুঝতে পারছে না, কে দাঁড়িয়ে আছে। সে পাশ কাটিয়ে চলে যাবে ভাবছিল, কিন্তু কেউ তাকে ডাকছে। হাত তুলে ডাকছে।

    বড়-মিস্ত্রির মনে হয়েছিল, জাহাজ থেকে নামার পরই কেউ যেন তাকে অনুসরণ করছে। সে এসব দেশের দালালদের চেনে। ভীষণ টাকার খাঁকতি বেটাদের। জাহাজ এসে নোঙর ফেলেছে, এখন মৌকা, ওঁত পেতে আছে। কে নামছে, কেউ নামলেই সঠিক জায়গায় পৌঁছে দেওয়া। আরে বাপু আমাকে শহরের পথঘাট চেনাবে, বাজারের কে কেমন আছে জানাবে। আমি তো সব জানি! মিলড্রেড কি চিঠি পায়নি তাহলে! চিঠি পেলে সে তো না এসে থাকার মেয়ে নয়! সে তো অন্য সময়ে ঠিক জাহাজ বাঁধার আগেই জাহাজঘাটায় এসে দাঁড়িয়ে থাকে। যেন কত সে নিজের মানুষ! যেন বহুদিন সফর শেষে তার মানুষ ঘরে ফিরছে। বড়-মিস্ত্রি এ সব ভেবে সুখ পায়। মিলড্রেড যতই টাকা নিক, তাতে ওর কোন দুঃখ থাকে না।

    সে ভেবেছিল, ইণ্ডিয়ান মার্কেটের দিকে যাবে, না পর্তুগীজদের যে বড় গীর্জা আছে, সেখানে, এবং প্রতি রোববারে যে মেলার মতো বসে জায়গাটা, সেখানে যাবে। সেখানে গেলে সে অনেক দিন আগের এসিকে পেয়ে যেতে পারে। কিন্তু সেই গীর্জায় যাবার পথটা এতদিন পর ভুলে গেছে। ওর হাঁটতে হাঁটতে মনে হয়েছিল, মিলড্রেড জাহাজঘাটায় না এসে অপমান করেছে। সে মিলড্রেডের সঙ্গে আর সম্পর্কে রাখবে না। সে আবার পুরোনো ঘরেই যাবে। পূরোনো জিনিস দামে সস্তা আর শরীরের পক্ষে উপকারী। প্রায় পুরোনো টনিকের মতো, অথবা পুরোনো মদের মতো।

    সে অনুসরণকারী লোকটার জন্য অপেক্ষা করল। দালাল মানুষেরা সব খবর রাখে। সে ওদের কাছে ঠিক খবরাখবর পেয়ে যাবে। সে ডাকল। কিন্তু লোকটা আসছে না দেখে, সে হাত তুলে ডাকতে ডাকতে ছুটে গেল।

    অমিয় কাছে এলে বুঝতে পেরেছিল বড়-মিস্ত্রি। সে খুব থতমত খেয়ে গেছে। সে বলল, আমি স্যার!

    বড়-মিস্ত্রি বলল, ঠিক, ঠিক আছে। তুমি যে দালাল নও বুঝি। দালাল হলেও তেমন লজ্জার কি আছে, তোমার সেজন্য ভয় নেই। বলছিলাম, একটু চার্চের দিকে যাব। তুমি আমার সঙ্গে আসতে

    পার।

    অমিয় বুঝতে পারল না এমন কেন বলছে! চার্চ কোথায়, কি ব্যাপার সে কিচ্ছু জানে না। সে বলল স্যার চার্চ!

    —হ্যাঁ বুঝেছি নেকা সাজতে চাও। তোমরা যারা ইণ্ডিয়ান এখানে থাক কেন যে পর্তুগীজ সরকার রেখেছে বুঝি না। ঠেঙ্গিয়ে সমুদ্রের ওপারে দিয়ে আসতে পারে না। এত মিথ্যা কথা তোমরা বলতে পার!

    অমিয় বুঝতে পারল, সে যে একই জাহাজের জাহাজি বড়-মিস্ত্রি স্বপ্নেও ভাবেনি। বড়-মিস্ত্রি কেবিন থেকে বের হয় না। তার সঙ্গে জাহাজের ক্রুদের কোন সম্পর্ক নেই। সম্পর্ক মেজ-মিস্ত্রির সঙ্গে সারেঙের। সারেঙের আদেশ মতো সব কাজগুলো হয়। সুতরাং অমিয়র মাথায় দুষ্টবুদ্ধি খেলে গেল। সে বলল, স্যার আপনি মহামান্য।

    —তুমি মহামান্য আর প্রিন্স অফ ওয়েলস যাই বলে আমাকে সম্বোধন কর না কেন, তাতে একটা পয়সা বেশি পাবে না।

    অমিয় বলল, চলুন স্যার গীর্জার দিকে।

    —সেই ভাল।

    —স্যার আমি কিন্তু মেয়েদের পাড়ায় আপনাকে নিয়ে যেতে পারব না।

    —গুলি মার। এসির ঘর আমার জানা আছে। সেখানে আমি যাব। তুমি আমার সঙ্গে থাকবে।

    বড়-মিস্ত্রি মনে মনে খুব হাসল। বিদেশে কি করে চলতে হয় সে জানে। এদের কাছে কখনও অজ্ঞতা প্রকাশ করতে নেই। তাহলে এমন সব জায়গায় নিয়ে যাবে, যে আর জাহাজে সময় মতো ফেরা যাবে না। জলের মতো টাকা খরচ করিয়ে দেবে! সুতরাং যেন সেই নিয়ে যাচ্ছে দালাল মানুষটাকে কেবল যেন সঙ্গে একজন লোক থাকলে ভাল, লোক থাকলে সে ভয় পাবে না, মুখ দেখলে সে চিনতে পারে মাল কেমন, অমিয়কে বড়-মিস্ত্রি সেভাবে সঙ্গে নিয়েছে।

    বড়-মিস্ত্রি যেতে যেতে বলল, মিলড্রেড কেন যে এল না!

    কাল সকালে জাহাজ ছেড়ে দেবে। জাহাজ ছেড়ে দিলে, এ-জীবনে আর মিলড্রেডের সঙ্গে দেখা নাও হতে পারে। তাছাড়া ওকে দেখে বড়-মিস্ত্রি মনে রেখে দেবে না, হয়তো আট-দশ মাস সফরে কি বছরের ওপর হয়ে গেলেও একদিনও না দেখা হতে পারে—আবার দেখা হলেও, অন্ধকারে কাকে দেখেছিল মনে রাখতে পারবে না। সে খুব বিজ্ঞের মতো বলল, না স্যার মিলড্রেডের দোষ নেই। ওরা এখানকার বাস তুলে দিয়েছে।

    —তুলে দিয়েছে!

    —হ্যাঁ স্যার। আর টাকা-পয়সা হচ্ছিল না। ওরা আরও পশ্চিমে চলে গেছে।

    —আমাকে একবার খবর দিতে পারল না! ছিঃ ছিঃ, কি যে করে, তারপর সে দাঁড়াল। টুপিটা মাথা থেকে খুলে আবার ঠিক করে পরল। যেন সে মিলড্রেডকে আর দেখতে পাবে না ভেবে কাতর হয়ে পড়েছে।

    —না এটা মিলড্রেডের ভীষণ অন্যায়। ভীষণ। সে আমাকে চিঠিতে অন্তত টাকার কথা লিখতে পারত।

    —আমি স্যার দেখা হলে বলে দেব।

    —তোমার সঙ্গে দেখা হবে?

    —তা হবে না!

    —এখানে কত ইণ্ডিয়ান আছে?

    —তা বেশ, প্রায় চারভাগের একভাগ আমরা।

    —ওকে দেখা হলে বলবে তো, আমি ভীষণ দুঃখিত, কেন ও আমাকে চিঠি না দিয়ে পশ্চিমে চলে গেল। ওকে বলবে, কেন—কেন চলে গেল!

    অমিয় আড়ালে মুচকি হেসে বলল, বলব স্যার।

    ওরা হাঁটতে হাঁটতে বেশ শহরের ভিতরে ঢুকে গেছে। এদিকটায় কিছু ঘিঞ্জি বস্তির মতো। নিগ্রো বালক-বালিকার মুখ, যুবতীরা হেঁটে বেড়াচ্ছে, কোথাও সিংহের ছবি, কোথাও আদিবাসী রমণীর পোশাকে স্বল্পতা। আর বন্য লতায়-পাতায় ওরা শরীর ঢেকে কেউ কেউ হেঁটে চলে গেল। যেন একটা আদিমতা এ-অঞ্চলে এখনও আছে। বলতে কি নিগ্রো যুবতীদের দেখে অমিয়র ভীষণ ভয় করছিল। সে প্রায় বড়-মিস্ত্রির গা ঘেঁষে হাঁটছে। সে কিছুই চেনে না, আসলে বড়-মিস্ত্রি যেখানে যেখানে যাবে, সেও তার সঙ্গে সেখানে সেখানে যাবে বড়-মিস্ত্রি এমনই চাইছে। এবং বড় মিস্ত্রি হাঁটতে হাঁটতে কেমন একসময় বলল, এস একটু বসি কোথাও।

    —আপনি যে এসির ঘরে যাবেন বলেছিলেন?

    —ধুস্ এসি! মিলড্রেডের জন্য মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে গেল।

    অমিয় দেখল, বড় মিস্ত্রি হেলায়-ফেলায় টাকা খরচ করতে পারে। জাহাজ বেঁধে ফেলার আগেই কোথা থেকে সে যে এত পয়সা পেল বুঝতে পারছে না। বেশ খেয়ে কেমন ঝিম মেরে থাকল কিছুক্ষণ, তারপর অমিয়র দিকে তাকিয়ে বলল, এই যে ইণ্ডিয়ান, তুমি ভালো, খুব ভালো। তুমি আমার জন্য যা করলে কোনদিন ভুলতে পারব না।

    অমিয় বলল, তবে চলুন স্যার জাহাজঘাটায় পৌঁছে দিয়ে আসি।

    —একটা ট্যাকসি দ্যাখো পাও কিনা!

    অমিয় ট্যাকসি ডেকে বড়কে বসিয়ে দিল। এবং রেল-ইয়ার্ডে ঢুকেই বলল এবারে আপনি যান স্যার। কাল আছেন তো। কাল আবার দেখা হবে।

    এখানেই গণ্ডগোলটা বেঁধে গেল। দুজনেই মাতাল। তবে অমিয় খায়নি বেশি। সে এ-ব্যাপারটা দেশে বেশ রপ্ত করেছিল, এবং এজন্য ওর দাদাদের সঙ্গে বনিবনা হত না। লেখাপড়া হল না। ওকে ওর বাবা মিশনারি স্কুলে পড়িয়েছিল, এখন একেবারে বেহেড মাতালের ভূমিকায় অভিনয় করা ঠিক না। সে তার মায়ের কাছে সব সময় নির্দোষ থাকতে চেয়েছে, কারণ তার মা তাকে শেষ পর্যন্ত ঘৃণা করত না। এমন কি আসার সময় শুকনো খাবার মুড়িমোয়া সব করে দিয়েছিল, সে এভাবে জানে কি করে মানুষের অন্তরে ঢুকে যেতে হয়। কেবল লীলাবৌদি, রমাবৌদির ভেতর সে ঢুকে যেতে পারেনি। ওদের তাড়নাতে সে শেষপর্যন্ত বাড়ি ছেড়েছে। বাড়িতে সে একদণ্ড থাকতে পারত না। সে এখন দাঁত-মুখ কেমন শক্ত করে ফেলল এবং বাজারে-মাগি মিলড্রেডকে মনে হয় না, নিজের বৌদিদের সম্পর্কে সে এই কটূক্তি করতে ভালবাসে! বাজারে-মাগিদের মুখ যেন এর চেয়ে বেশি ভাল হয়।

    বড়-মিস্ত্রি বলল, আমাকে তুমি কোথায় নিয়ে এসেছ?

    —এই তো স্যার, রেল-ইয়ার্ড, ডানদিকে কয়লার সুট। দেখুন না, কয়লা কেমন জাহাজের বাংকারে ঢুকে যাচ্ছে। সামনেই তো আপনার জাহাজ—এস-এস সিউল ব্যাঙ্ক লেখা।

    —এটা চেসটনের রাস্তা, না?

    —না স্যার। এটা বন্দরের রাস্তা। আপনার জাহাজে উঠে যাবার রাস্তা।

    বড় মিস্ত্রি ট্যাকসি থেকে নামছে না।—কিন্তু আমার যে মিলড্রেডের কাছে যাবার কথা।

    –সে তো নেই স্যার।

    –নেই? কেন নেই? এবার সাঁ করে দরজা খুলে বের হয়ে এল। আলবৎ সে থাকবে। তুমি অন্য মেয়েদের কাছে নিয়ে যাবার জান্য দালালি করছ।

    —তা না স্যার। সত্যি বলছি।

    —দালালেরা আবার সত্যি কথা বলে! বলে তিনি সামান্য হাসলেন। তারপর ক্রাচের ওপর ভর করে মাথাটা কেমন নুইয়ে দিলেন।—কি সুন্দর রাত! মিলড্রেড পশ্চিমে গেছে। আমি শালা কাল জাহাজ ছেড়ে পশ্চিমে চলে যাব।—তুমি শয়তান, আস্ত শয়তান। তোমার জন্য আমার মিলড্রেডের সঙ্গে দেখা হল না। বলে বড়-মিস্ত্রি ক্রাচে শরীরটা এলিয়ে দিয়ে দুঃখী মানুষের মতো মুখ করে রাখল।

    অমিয় দেখল, খুব বাড়াবাড়ি হয়ে গেছে। এখন পালানো দরকার। অন্য কেউ নেমে এলেই ওকে চিনে ফেলবে। জাহাজ সামনে। ফার্লঙের মতো পথ। সে এখন অন্য পথে জাহাজে উঠে যাবে। আগে ওঠাই নিরাপদ। সে রেল-ইয়ার্ড ধরে হাঁটতে থাকল। এবং শোনা যাচ্ছে বড়-মিস্ত্রি এবার জোরে জোরে চিৎকার করছে—তুমি বাস্টার্ড ইণ্ডিয়ান, দালাল, কিচ্ছু জন না, এখানে আমাকে বাজারের মাগি চেনাতে এয়েছ!

    অমিয় তখন দূর থেকে হেঁকে বলছে, আপনি স্যার ভুল করছেন, আমি দালাল নই। বাজারে মাগি খুঁজে বের করা আমার পেশা না।

    —তুমি সৎ, তুমি ভালো, শুয়ারকা বাচ্চা। বেজন্মা, ইতর।

    মেজ-মালোম এবং ছোটবাবু তখন ফিরছিল জাহাজঘাটার দিকে। দেখল একা একটা ফাঁকা জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে বড়-মিস্ত্রি। আর টলছে। মুখ টুপিতে ঢাকা। মেজ-মালোম জানে বন্দর এলে বড়-মিস্ত্রি জাহাজে থাকে না। তার বাঁধা ঘর আছে। ওরা এসে ওকে নিয়ে যায়। সেই যৌবনের প্রথম থেকে কাজ করতে করতে এটা হয়েছে। অথচ বড় আজ এখানে একা। সে বলল, স্যার আপনি?

    —তুমি কে হে?

    —আমি সেকেণ্ড অফিসার ডেবিড় ম্যাকমবার

    —ডেবিড্‌!

    —হ্যাঁ স্যার।

    —তুমি জাহাজে ফিরছ?

    —হ্যাঁ স্যার।

    —সঙ্গে কে আছে?

    —আমাদের ছোটবাবু।

    —ছোটবাবু! সে ভ্রু কোঁচকালো।

    —জাহাজেই কাজ করে।

    বড়-মিস্ত্রি ভেবেছিল, মেজকে সব ভেঙে বলবে। এক শয়তান ইণ্ডিয়ানের পাল্লায় পড়ে সে আজ যথাসর্বস্ব খুইয়েছে। তার যা ছিল সঙ্গে ট্যাকসিতে টিপসে গেছে। বড়-মিস্ত্রি যে এক সময় খুশি হয়ে অমিয়কে জেব খালি করে দিয়েছিল সে-সব আর মনে নেই। তার কিছু নেই। একেবারে খালি। চোট্টা ইণ্ডিয়ানটারই কাজ। অথচ আর একজন ইণ্ডিয়ান সেকেণ্ডের পাশে রয়েছে। তাছাড়া রুচি টুচির বালাই বলতে সেকেণ্ডের কিছু নেই। বড়-মিস্ত্রি নানাদিক ভেবে সব চেপে গেল। তারপর ওদের সঙ্গে টলতে টলতে হাঁটতে থাকল। যেন সে জেটিতে নেমে এসেছিল একটু হাওয়া খেতে। ওকে দেখলে এখন তার চেয়ে বেশি কিছু মনে হয় না।

    বড়-মিস্ত্রি এবার গ্যাঙওয়ের নিচে এসে দাঁড়াল। সেকেণ্ডের মনে হল বড় উঠতে পারবে না। নিজেও তেমন শক্ত নয়। ছোট এখন সাহায্য করতে পারে। কিন্তু ছোট ওকে ধরতে গেলে অপমান বোধ করতে পারে। সেজন্যে সে নিজে উঠে গেল একা। কোয়ার্টার মাস্টারকে ইশারা করল হাতে এবং কাছে এলে বড়-মিস্ত্রিকে ধরে তুলে আনতে বলে কেবিনের দিকে হেঁটে গেল!

    বড়-মিস্ত্রি নিজের কেবিনের কাছে এসে দেখল দরজা বন্ধ। সে ভেবে পেল না ওর কেবিনে কে এখন থাকতে পারে। দরজায় সে টোকা মারল। কেউ দরজা খুলছে না। বেশ জোরে ধাক্কা মারতেই সে হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেল। আর ভেতরে একেবারে তাজা এক মেয়ে।

    সে প্রথমটায় ভূত দেখার মতো উঠে দাঁড়াল। ওর সামনে মিলড্রেড।

    —তুমি!

    —তোমার তো কোন কাণ্ডজ্ঞান নেই রিচার্ড?

    রিচার্ড একটু ঘাবড়ে গেল। সে খোঁড়াচ্ছিল। সে তার স্বভাবে সেটা স্বীকার করবে না। মিলড্রেড ধরতে গেলে হাত সরিয়ে ঠিকঠাক হয়ে বসে বলল, বুঝতে পারছি না।

    —বুঝতে পারছো না মানে।

    —মানে, তুমি, কি করে তুমি!

    —আমি ঠিকই আমি। জাহাজ একদিন আগে আসবে কে জানত।

    —কি করে খবর পেলে।

    —সকালে কাগজে দেখলাম। তোমার জাহাজ ভিড়ছে। সাত তাড়াতাড়ি আসা যায় না। সিটি কোম্পানির থার্ড অফিসার এসেছে। ওর সঙ্গে এপয়েন্টমেন্ট। ওটা শেষ করে আসতে দেরি হল।

    —দাঁড়াও দাঁড়াও। হড়বড় করবে না। ভেবে দেখছি। সে ভাবতে থাকলে মিলড্রেড বলল, রাখো তোমার ভাবনা। এখন কি বের হবে?

    —শরীর ঠিক নেই মিলড্রেড। দরজা বন্ধ করে দাও। এবং এভাবে রিচার্ড কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে বসে থাকল। মিলড্রেড তাড়াতাড়ি তেমন সেজে আসতে পারেনি অথবা শরীরে ধকলের চিহ্ন, মিলড্রেডের পায়ে সাদা মোজা লতাপাতা আঁকা সিল্কের গাউন। সে বাঙ্কে শুয়ে পড়ল। যেন সেও আর পারছে না। পোর্টহোল দিয়ে নীল একটা আলো এসে পড়ছিল, পোর্টহোলের কাচ বন্ধ করে পর্দা টেনে দিল রিচার্ড। তারপর সংক্রামক ব্যাধির মতো একটার পর একটা ঘটনা। সেই ইন্ডিয়ানটাকে গালাগাল। সে আর কিছু বলছিল না মুখে। ওর জাহাজি খিস্তি যা জমা আছে একটার পর একটা এবং এভাবে একটা সে মজা পেয়ে যায়। ঘরের নীল আলো নিভে গেলে ওর মনে হয় একা হাঁটছে এবং এক বাগার ইন্ডিয়ান ওর পেছনে ছুটছে তাকে ধরার জন্য।

    সে মিলড্রেডকে বলল, আবার হাতের কাছে পেলে হয়। তারপর শুনতে পায় বাংকারে হড়হড় করে কয়লা নামছে। কি সাংঘাতিক শব্দ। জাহাজ কাল ছাড়ছে। রাতে রাতে বাংকার ভরে যাবে। সকালে জাহাজ ছেড়ে দিলে আবার কবে এই তাজা মেয়ের সঙ্গে শুতে পারবে জানে না। সে অসংখ্য ধন্যবাদ জানাল প্রথমে ঈশ্বরকে, তারপর সেকেন্ডকে। সেকেন্ড ওকে না ডাকলে সে হয়ত আর একবার চেষ্টা করত এসির ঘরে যাওয়া যায় কিনা। তারপর ওর ধন্যবাদের পালা, সেই ইন্ডিয়ানটিকে। সে তার জেব সাফ না করে দিলে, ঠিক চলে যেত। যে-ভাবেই হোক এসির কাছে চলে যেত। এখন আর ইন্ডিয়ান দালালকে খচ্চর মনে হচ্ছে না, সে ভীষণ তার পক্ষে উপকারী। আবার দেখা হলে ধন্যবাদ না জানিয়ে তাকে পারবে না। খুব আপশোস এখন তার হাতের কাছে সে নেই।

  • সাত

    সাত

    ।। সাত।।

    রাত থাকতেই জাহাজ নোঙর তুলেছে। ডেবিডের ওয়াচ আটটা বারোটা। কিন্তু জাহাজ নোঙর তুলেছে বলে, শেষ রাতের দিকে পিছিলে হাড়িয়া হাফিজ করতে হয়েছে তাকে। জাহাজ নোঙর তুলে সমুদ্রে না পড়া পর্যন্ত সে ডেকে বসেছিল। কেবিনে ফিরে গিয়ে সে ঘুমোবার আর চেষ্টা করেনি।

    এটা ওর স্বভাব। কিনারায় জাহাজ ভিড়লেই তার আর ঘুম আসে না। যতক্ষণ সমুদ্রে জাহাজ ভেসে না যায়, সে বসে থাকে চুপচাপ। মাথার ওপর আকাশ থাকে। আকাশের অজস্র তারা ক্রমে কেমন অনুজ্জ্বল হয়ে যায়। চারপাশে এক আশ্চর্য নিস্তব্ধতা থাকে। এনজিনের শব্দ বাদে আর কিছু তখন কানে আসে না। স্টোক-হোলডে স্লাইস অথবা র‍্যাগের শব্দ। বেলচায় কয়লা মারার শব্দ। আর কিছু কানে আসে না। সমুদ্রের কিনারায় গাছপালাও ক্রমে চোখের ওপর থেকে সরে যায়। পৃথিবীর সব বন্দরে সে এ-ভাবে বসে থাকে। স্ত্রী এবির কথা মনে হয়। ছেলে-মেয়ের মুখ ভেসে ওঠে। ওরা ওকে প্রত্যেকে একটা করে চিঠি দেয়। চিঠিতে ওদের নানা বায়নাক্কা থাকে। বউ নানাভাবে লেখে তুমি চিন্তা কর না, আমরা ভাল আছি। তখন মনে হয় এবির চোখ দুটো তেমন সুন্দর নয়। চুল সোনালি, এবি ভারী সংসারী মেয়ে। এত ভাল যে মাঝে মাঝে এবিকে খুব একঘেয়ে লাগে। সে তার ছেলেপিলে সংসার বাদে আর কিছু জানে না।

    এবি নিজেও একটা কাজ করে। স্কুলে সে শিক্ষকতা করছে সেই কবে থেকে। দুজনের রোজগারে ওরা ডলফিনে বেশ সুন্দর ছিমছাম একটা বাড়ি করেছে। খুব শখ হে-ঘাসের ভেতর দিয়ে এবির হেঁটে যাবার। সূর্য উঠলে এবিকে সে কখনও দৌড়াতে দেখেনি। ওর ইচ্ছা হত, সূর্য উঠলে সে এবিকে নিয়ে হে-ঘাসের ভেতর দৌড়াবে।

    এবি সবসময় কাজকর্মে ব্যস্ত থাকতে চায়। সে বেশি হৈ-চৈ পছন্দ করে না। চার্চে প্রতি রবিবার তার যাওয়া চাই। খুব ধর্মভীরু এবি! এতটা ধর্মভীরু যে মাঝে মাঝে ডেবিডের এবির ঈশ্বর সম্পর্কে খুব ঠাট্টা করতে ইচ্ছে হয়। খুব রক্ষণশীল পরিবারের মেয়ে। ক্যাথলিক এবং আচার-আচরণে আন্তরিক। এমন আন্তরিকতাও ডেবিডের খুব পছন্দ না। বৌ একটু ছলনা করবে না, একটু চাতুরি খেলবে না, একেবারে সতীসাধ্বী হয়ে থাকবে ভাবতে তার ভারি খারাপ লাগে। সমুদ্র থেকে ঘুরে গেলে ওর মনে হয় সে এবির প্রতি নানাভাবে অবিশ্বাসের কাজ করেছে। এবি যদি সামান্য অবিশ্বাসের কাজ করত তবে বোধ হয় তার এতটা অনুতাপ থাকত না।

    কিনার সরে গেলেই সে ভাবে ধার্মিক হবে। স্ত্রীর প্রতি আন্তরিক হবে, কিন্তু কিনারায় গেলে কিচ্ছু তখন মনে থাকে না। কেবল একটা মুখ ভাসে, দূরবীনে সে এবির মুখ আর দেখতে পায় না। যেন এক পাখি নিরন্তর উড়ছে, সেটা যে কি, কেন ওড়ে, কেন সমুদ্রে ছায়া ফেলে যায়, দিগন্তরেখায় অদৃশ্য হয়ে গেলে কিছু ভাল লাগে না। সব গাছপালা দ্বীপ তখন কেন যে এত মনোরম লাগে সে বুঝতে পারে না। সে আজও বসেছিল, যতক্ষণ কিনার দেখা গেছে, চোখে দূরবীন। কাল তার ভারি ইচ্ছে ছিল কোথাও ঠিকানা খুঁজে যাবার, কিন্তু ছোটবাবুকে সঙ্গে নিয়ে সে যেন ভুল করে ফেলেছিল। আসলে সে চায় আন্তরিক থাকতে। একজন পাহারাদারের কাজ করবে ছোটবাবু। ছোকরা সে। ভেতরে এখনও রক্ত ততটা দামাল নয়। কিছুটা সত্ত মানুষের মতো লাগে। সে এখন ভাবছে ছোটকে সঙ্গে না নিয়ে বের হলেই ভাল হত। বড়-মিস্ত্রির মতো তবে একটা ঘরের খোঁজে যাওয়া যেত।

    আসলে, রাতে জাহাজে কেউ ছিল না। কাপ্তান, চিফ-অফিসার, জ্যাক বাদে সবাই নেমে গেছিল। ক্রুদের ভেতর থেকেও কেউ কেউ নেমে গেছে। শেষ পর্যন্ত বড়-মিস্ত্রি মিলড্রেডকে নিয়ে কেবিনেই রাত কাটিয়েছে। এতটা অবশ্য ওর ভাল লাগে না। নির্লজ্জের মতো সে এটা এখনও করতে পারে না। কিনার চলে গেলেই ওর মায়া হয় গাছপালার জন্য। এবার সে ভেবেছে সামনের বন্দরে ঠিক নামবে। যে-ভাবে হোক, কারণ এই প্রায় মাস দুই হল সে জাহাজে উঠে এসেছে, জাহাজটা পুরানো বলে বেশিদিন একনাগাড়ে কাজ করা যায় না। অনেকে অসুখে পড়ে যায়। সে সিঙ্গাপুরে উঠেছে। সে, বড়-মিস্ত্রি, মেজ মিস্ত্রি। জাহাজ হোমে গেলে সে নেমে যেতে পারবে না। ব্যাঙ্ক লাইনের সফরে বেশিদিন থাকার নিয়ম। পাঁচ-সাত মাসে নেমে গেলে, কোম্পানি সুনজরে দেখে না। যদিও সে যতটা জানে জাহাজ বুয়েন-এয়ার্স থেকে ব্রাজিলের ভিকটোরিয়া বন্দরে, তারপর সোজা কার্ডিফে। যদি জাহাজ ড্রাইডক হয় তবে বেশ কিছুদিন এবির সঙ্গে কাটাতে পারবে। ওর ভারি ইচ্ছে তখন এবিকে নিয়ে হে-ঘাসের ভেতর কেবল লুকোচুরি খেলবে। কিন্তু এবি যেন কেমন, সে এটাকে ভারি অসভ্যতা ভাবে। কখনও কোনও মাঠের ভেতর ঘাসেব ছায়ায় এবি দূরবীনে চোখ রাখতে চায় না। ওর ভারি লজ্জা। এই বয়সে এ-সব ওর এতটুকু ভাল লাগে না।

    অথচ এবি জানে না, দূরবীনে মেয়েদের ছবি আশ্চর্যভাবে বদলে যায়। সে দেখতে পায় একটা জীবন, হ্যাঁ জীবনই তো যেন সচল আন্তরিক আকাশ ওর কাছে মাথা পেতে রেখেছে। ছুঁয়ে দিলেই ঝর ঝর করে বৃষ্টিপাত হবে। এমনটা না হলে ডেবিডের মন ভরে না। মাঝে মাঝে ডেবিড তখন কেমন অন্যমনস্ক হয়ে যায়। কোন দ্বীপে বন্যমেয়ের স্নান সে চুরি করে দেখতে ভালবাসে। মানুষের অদিমতা তাকে অত্যন্ত জীবন্ত করে রাখে।

    একা একা ডেকে বসে থাকলে কত কিছু এমন মনে হয়। রাতে জাহাজ বাংকার নিয়েছে বলে সারাটা ডেক কয়লার গুঁড়োতে ভরে গেছে। সারাটা ডেক হ্যাচ ডেরিক, বয় কেবিন, লাইফ বোট সব কয়লার ধুলোয় ঢেকে গেছে। হেঁটে গেলে জুতোর ছাপ পড়ছে ডেকে। তার হাঁটতেও ভাল লাগছে না।

    ক্যাপ্টেন হিগিনস্ তখন ব্রীজ থেকে বারবারই সমুদ্রে কি যেন উঁকি দিয়ে দেখছেন। কিছু খুলে টুলে গেল নাকি। যা একখানা লক্কড় মার্কা জাহাজ, কখন যে কি হয়! বে-অফ বেঙ্গলে বড় রকমের একটা ঝড়ে পড়েছিল—তারপর তো জাহাজ পাট-রাণীর মতো চলছে। হেলে-দুলে কেবল দক্ষিণ পশ্চিমে এবং ক্রমে দক্ষিণে, কখনও দক্ষিণ-পূর্বও করতে হচ্ছে। স্টিয়ারিং হুইলের সঙ্গে কম্পাসের কাঁটার হিসাব ঠিক রাখা এবং জাহাজ চালানো তেমন কঠিন না। কিন্তু মুশকিল নদীর মতো সমুদ্র কখনও কখনও দামাল হয়ে যায়। কোথাকার স্রোত, কি ভেঙে এনে কোথায় জমা করে এবং কিভাবে চড়া পড়ে যেতে পারে আর তার চড়ায় উঠে গেলে হয়ে গেল। যেতে যেতে এমন যে দুটো একটা ছবি এই যেমন জাহাজ চড়ায় আটকে আছে, অথবা একটা বয়াতে লাল, নীল আলো, অর্থাৎ নিচে অতলে একটা জাহাজ ডুবে আছে, সেখানে এখন সমুদ্র প্রাণীরা নানাবর্ণের লতার ভেতর জলজ ঘাসের ভেতর আস্তানা বানিয়েছে—এমন সব দৃশ্য দেখতে পাওয়া যে না যাবে তা নয়। এ সব দেখলেই পুরোনো জাহাজের ভয়। অবশ্য পুরোনো জাহাজ অনেক সময় পুরোনো টনিকের মতো কাজ করে। ঝড় জলে সে বেশি সময় যুঝতে পারে।

    হিগিন্‌স্‌ এখন চার্টরুমে ঢুকে যাবেন। ডেবিড এবার সিঁড়ি ধরে নিচে নেমে গেল। ডেক-জাহাজিরা হোসপাইপে জল মেরে যাচ্ছে ডেকে। টিন্ডাল বোট-ডেকে উঠে সি-ওয়াটার ভালব ঘুরিয়ে দিচ্ছে। নানা জায়গায় নানাভাবে এইসব ভালব্ ছড়িয়ে আছে। যেখানে যেভাবে জলের দরকার ভালব ঘুরিয়ে দিলেই হল। হোসপাইপ লাগিয়ে দিলেই হল। জেনারেল সার্ভিস পাম্প থেকে নানাভাবে সব পাইপ জাহাজের চারপাশে ছড়িয়ে গেছে। এবং এ-জাহাজ পুরোনো বলে, স্টিমএঞ্জিন বলে, সবসময় জাহাজে জলের দরকার বেশি। লম্বা সফরে জল কখনও কখনও ফুরিয়ে যায়। তখন এভাপরেটিঙ করতে হয়। নোনা জল থেকে মিষ্টি জল করে নিতে হয়।

    ডেবিড বুঝতে পারে এভাবে এক বিচিত্র জীবন এ জাহাজে থাকলে গড়ে ওঠে। কিনারার প্রতি টান, পরিবারের জন্য মায়া, তারপর দীর্ঘদিন বাদে মনে হয়, সে একজন নিরালম্ব মানুষ, সে আছে এই জাহাজেই, জাহাজেই তার জন্ম, জাহাজেই তার শৈশব, যৌবন এবং বার্ধক্য এবং এভাবে সে মরে যাবে। তখন মনে হয় না, তার স্ত্রী আছে, ছেলেপুলে আছে, কেবল মনে হয় সে একটা যানে চড়ে ক্রমান্বয়ে সমুদ্র, দ্বীপ এবং পাহাড় অতিক্রম করে পৃথিবীর সব মানুষের ঘরে ঘরে পণ্য পৌঁছে দিচ্ছে। সাংসারিক জীবন, স্ত্রী-পুত্র সব অনেক দূরের মনে হয় তখন। বন্দরে নেমে তখন একটু বেলাল্লাপনা করতে না পারলে ভাল লাগে না। পুরোনো ছবির মতো মেয়েমানুষের শরীর একটা যাদুঘর হয়ে যায়। সে বুঝতে পারে ঠান্ডা, অতি ঠান্ডা কোমরের নিচু অংশটা। কেন যে সেখানে ফুল ফোটার মতো উত্তাপ থাকে না।

    ডেবিড ভেবেছিল, এক বিকেলে ছোটবাবুকে নিয়ে বোট-ডেকে বসবে। একটা দ্বীপের পাশ দিয়ে তখন তারা যাবে। দ্বীপটা সোনালি। নানারকমের ক্যাকটাস। ক্যাকটাসগুলো এত বড় যে কখনও ওদের বড় গাছটাছ মনে হয়। এমন সব ক্যাকটাস পৃথিবীর অন্য কোথায় আছে তার জানা নেই। সে তো অন্তত দেখেনি। দূরবীনে এ-সব এত ভাল দেখা যায় যে, মনে হয় সমুদ্রের নীল জল যখন এ-ভাবে এমন একটা দ্বীপকে পৃথিবীর জন্ম থেকে ঘিরে রেখেছে, আর সেই ক্যাকটাস সব ধীরে ধীরে বড় হচ্ছে তখন সেখানে কোন মানুষের পায়ের ছাপ থাকবে না হয় না। কিন্তু সে জানে, এ দ্বীপে মানুষেরা আসেনি। কি হবে, এইসব দ্বীপে শুধু ক্যাকটাস, এবং এত ছোট যে ফার্লঙের মতো বৃত্তাকারে ভেসে আছে। মাটির রঙ সে যতবার যে-ভাবেই দেখেছে, সোনালি এবং ক্যাকটাসগুলো অতি প্রাচীন বলে নীল রঙের। আর সূর্য উঠলে ওর মনে হত পৃথিবীতে প্রথম মানুষ আদম ইভ এখানে বোধ হয় শৈশবে বড় হয়েছে। আদম ইভের পক্ষে এর চেয়ে নির্জন জায়গা খুঁজে পাওয়া মুশকিল। সে দূরবীনে কোনও গিরগিটি দেখেনি, কোনও টিকটিকি দেখেনি। পিঁপড়ে টিপড়ে আছে কিনা, বুঝতে পারে না। কেবল দ্বীপটার চারপাশে নানারকমের শঙ্খের মরা খোল পড়ে আছে। হঠাৎ দেখলে মানুষের মাথার কঙ্কালের মতো মনে হয়। তখন গা’টা শিউরে ওঠে।

    কিন্তু সে দেখল, ছোটকে তখন ভীষণ ধমকাচ্ছে মেজ-মিস্ত্রি। ছোট কাজ করছিল ফাইভারের সঙ্গে। ফাইভারকেও খিস্তি করছে। এবং গালাগাল, মুখে যা আসে তাই বলছে। বড় বেশি হামবড়া ভাব এই মেজ-মিস্ত্রি আর্চির। সে জাহাজের এনজিনঘরের সব। দায়িত্ব সব তার। সে জোরে জোরে হাঁকছে—সারেঙ, সারেঙ! ডেকের ওপর দাঁড়িয়ে হাঁকছে। এবং ওর চিৎকারে জ্যাক পর্যন্ত ছুটে এসেছিল। কাপ্তান চার্টরুমের পোর্টহোল দিয়ে দেখছে, আর্চি ভীষণ মেজাজে কথা বলছে সারেঙের সঙ্গে। সারেঙ আমতা আমতা করছে।

    ছোট চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে।

    আর্চি চেঁচিয়ে বলছে, এ ছোকরা এখানে কেন? এখানে কেন জবাব দাও।

    হঠাৎ মেজ-মিস্ত্রি ক্ষেপে যাবার কারণ সে বুঝতে পারছে না। সে বলল, সারেঙসাব বলেছেন ফাইভারকে একটু হেল্প করতে।

    —হেল্‌প, মানে তুমি ফাইভারকে হেল্প করবে! তোমার এত সাহস কোথা থেকে আসে হে ছোকরা! তুমি কি ভেবেছ!

    ছোট যথাযথ ইংরেজীতে বিনয়ের সঙ্গে জবাব দিল, আমি কিছু ভাবিনি স্যার।

    —মুখের ওপর কথা! কি সাহস! এইসব ছোকরাদের বেজায় সাহস। তুমি কাল কার পারমিশনে জাহাজ থেকে নেমে গেছ?

    —কারো না। যাবার সময় সারেঙসাবকে বলে গেছি।

    আর্চি বুঝল এখানে তার কিছু করার নেই। নিচে নেবে যাবার অনুমতি সারেঙ অনায়াসে দিতে পারে। সে আবার হেঁকে উঠল, ওহে ছোকরা, শুনে রাখো জাহাজের কাজে নবাবি চলে না।

    ছোট বলল, জানি স্যার।

    —তুমি জানো! কি জানো! কি জানো, যাও হতভাগা পাজি, নচ্ছার, নিচে যাও। ফাইভার, এই রাসকেল ফাইভার, তোমার মুখের চামড়া খুলে এবার দেখছি একজোড়া জুতো না বানালে চলছে না। আহম্মক, তুমি হেল্পার নিয়েছ কেন!

    —একা পারা যাচ্ছে না সেকেন্ড। দেখুন, কি পুরোনো জং ধরা, মনে হচ্ছে, জাহাজে যারা গত সফরে ছিল, তারা হাতই দেয়নি।

    —রাখো তোমার নোংরামো। পরের ঘাড়ে দোষ চাপাবে না। পুরোনো জাহাজে এমন হয়।

    —দেখুন স্ট্রেপারগুলো কেমন জ্যাম। দেখুন, বলে সে তেলকালিতে মাখামাখি হয়েও স্ট্রেপারের নাট আলগা করতে পারল না।

    আর্চি দেখল, বেশ লম্বা হয়ে ফাইভার ডেক বরাবর উইনচের নিচে ঢুকে গেছে। ওর পা থেকে কোমর পর্যন্ত বাইরে। আর বাকিটা ভেতরে। নাট টেনে জ্যাম ছাড়াতে পারছে না। এ-শীতেও সে ঘামছে। এবার আর্চি খুব জোরে ফাইভারের পায়ের ওপর চাপ দিল। –আঃ একটা চিৎকার। টানো। এবং সঙ্গে সঙ্গে নাট-বোল্ট আলগা হয়ে গেল। এমন একটা নির্যাতনের ভেতর আর্চির নিষ্ঠুরতার যেন শেষ থাকে না। জাহাজ ডারবান যাচ্ছে! সেখানে কিছু পাটের গাট নামানো হবে। কিছু চায়ের পেটি। ডেরিকগুলো ঠিকঠাক, এবং উইনচগুলো সব চালু করে নিতে না পারলে মেজ-মিস্ত্রি আর্চির বদনাম হয়ে যাবে।

    অথচ ছোটবাবু জানে মেজ মিস্ত্রি আগেও দেখেছে, সে ফাইভারের সঙ্গে কাজ করছে। কাল বড়- মিস্ত্রি ওকে মেজ-মালোমের সঙ্গে দেখেছে। সে জাহাজে কি কাজ করে হয়ত এমন খবর নিয়েছে। আর একটা রাগ তো পুষেই রেখেছে মেজ-মিস্ত্রি! এখন বড়-মিস্ত্রি পাশে থাকলে ঝাল মেটাতে সময় লাগবে না। সে মেজ-মিস্ত্রির এমন ব্যবহারে অবাক হল না। কেবল বলল, স্যার, আমি কোথায় কাজ করব।

    সামান্য কোলবয়ের সোজাসুজি মেজ-মিস্ত্রির সঙ্গে কথা বলার এক্তিয়ার নেই। এসব বেয়াদপী সে সহ্য করতে পারে না। সে গম্ভীর হয়ে যায়। সারেঙকে শুধু কি বলে দিল। মেজ-মিস্ত্রির দায় নেই ছোটকে সোজাসুজি কিছু বলার। এবং এই যে সোজাসুজি ছোট জিজ্ঞাসা করল, এতে অপমান, ভীষণ অহংকারে লাগে। আগে এসব জাহাজে ছিল না। আগে যারা আসত, ওরা সবাই প্রায় যেন ক্রীতদাসের সামিল। একটা কথাও বুঝত না। সারেঙ সব কাজ বুঝে নিত, তারপর সে সবাইকে দিয়ে কাজগুলো করাত। এখন এরা নতুন উঠে আসছে। কেউ কেউ বেশ সুন্দর ইংরাজিতে কথাবার্তাও বলতে পারে। আর কি যে এরা ভাবে, একটু ইংরেজিতে কথাবার্তা বলতে পারলেই, যথাযথ বলেছে ভেবে ফেলার চেষ্টা করে। আর্চি তখন মনে মনে না হেসে পারে না।

    আর্চির গালাগাল ছোটকে ভীষণ কাবু করে দিয়েছে। আবার জ্যাক মাথার ওপর বোট-ডেকে দাঁড়িয়ে সব শুনছে। জ্যাক কাছে না থাকলে সে যেন এতটা অপমানিত বোধ করত না। সে জ্যাকের দিকে চোখ তুলে তাকাতে পারল না পর্যন্ত। চুপচাপ সারেঙের পিছু পিছু এনজিনরুমের দরজায় ঢুকে গেল। লোহার জালিতে হেঁটে গেলেই সামনে সোজা সিঁড়ি নেমে গেছে। সে সিঁড়ির দু’রডে হাত রেখে শরীর সোজা ছেড়ে দিয়ে নেমে গেল না আজ। ধীরে ধীরে কোন কারাগারে বন্দী মানুষের মতো হেঁটে গেল। আর্চি যেভাবে পেছনে লেগেছে, আজ হোক কাল হোক সে একটা হয়তো কিছু করে ফেলতে পারে। ছোটবাবু ভেতর ভেতর কেমন সহসা অসহিষ্ণু হয়ে উঠল। তখন সারেঙ বললেন, ওদিকে না। এদিকে।

    ছোট, জেনারেটারের ডানদিকে হেঁটে গেল। তারপর বয়লার এবং ক্র্যাঙ্ক স্যাটের মাঝখানে ঢুকে সে ও-পাশের কনডেনসার বাঁয়ে ফেলে আরও ভেতরে ঢুকে গেল। এখানে সারেঙ একটা প্লেট তুলে বললেন, নিচে নাম। নিচটা ভীষণ অন্ধকার। কিছু দেখা যাচ্ছে না। ছোটর ভীষণ ভয়ে মুখ শুকিয়ে গেল। সে নিচে নেমে গেলে যদি সারেঙ প্লেট চাপা দিয়ে সরে যান। অন্ধকারে পর পর জলের খালি ট্যাঙ্ক নিচে। ভেতরে ঢুকে গেলে, একটা দিয়ে আর একটায় বের হয়ে যেতে পারবে, কিন্তু ওপরে উঠে আসার রাস্তাটা তার জানা থাকবে না। কেমন একটা গুম গুম শব্দ ভেতরে। সারেঙ একটা বাতির ব্যবস্থা করছে। নিচে কিছু দেখা যাচ্ছে না। একটা বালব জ্বলছে লম্বা রবারে মোড়া তারে। সে সেটা নিয়ে ভেতরে নেমে গেলে দেখল, ট্যাঙ্কগুলো থেকে জল পাম্প করে ফেলে দেওয়া হয়েছে। ওর এখন কাজ বালতিতে সব ময়লা তোলা। লাল সবুজ নানারকমের শ্যাওলা জমেছে। ট্যাঙ্কের ছাদে, চারপাশে শ্যাওলার জট। এ-কাজ একা এক নাগাড়ে এক বছরেও শেষ করতে পারবে না। সে বুঝল, এটা শাস্তি দেবার কৌশল।

    ছোট চুপচাপ কাজ করে গেল। সে ক্রমে ভেতরে ঢুকে যাচ্ছে। বালতির সঙ্গে দড়ি বাঁধা। এনজিনরুমের নিচে এই ট্যাঙ্ক ছড়ানো। এক একটা এপারটমেন্টের মতো। ভেতরে গোলগোল হোল। একটার ভেতর দিয়ে আর একটা ট্যাঙ্কে চলে যাওয়া যায়। সারেঙ বালতিটা ভরে গেলেই তুলে ফেলছেন। মেজ-মিস্ত্রি জেনারেটারের পাশে দাঁড়িয়ে স্টিম দেখছে জাহাজের। আর বেশ একটা যেন মজা পাচ্ছে। সে হাভানা চুরুটের ধোঁয়ায় চারপাশ অন্ধকার করে ফেলেছে।

    ছোট এভাবে কাজ করে যাচ্ছিল। সে বেশ ভেতরে ঢুকে গেছে। সে সব সময় সঙ্গে আলোটা রেখেছে, একটা এপারটমেন্ট থেকে অন্য এপারটমেন্টে ঢুকে যাবার সময় সে বাতিটা ছাড়ছে না। ভয়, সে একটা না গোলকধাঁধায় পড়ে যায়। এমন একটা জায়গা এই জাহাজে আছে যে স্বপ্নেও ভাবতে পারেনি। ওপরে বিশাল প্লেটের ওপর বড় বড় কলামে সিলিন্ডার। বড় বড় তিনটে পিস্টন থামের মতো মোটা ঘুরে যাচ্ছে। অতিকায় প্রপেলার স্যাফট মাথার ওপর অনবরত ঘুরছে। আর তার তলায় সেই আলাদিনের দৈত্যের মতো সারেঙ গুহার মুখে। সে কোথায় যে ক্রমে চলে যাচ্ছে! সে বুঝতে পারছে তার পায়ের নিচে জাহাজের তলা, খোলের শেষ বিন্দ!

    ছোটবাবুর ঘাড় ধরে গেছে। কারণ, ভেতরে সোজা বসা যায় না। নুয়ে নুয়ে কাজ করছে সে। সে ট্যাঙ্কের জল সাদা কাপড়ে মুছে দিচ্ছে। ওর জামা প্যান্ট ভিজে গেছে। ভেতরটা এত ঠান্ডা যে শীতের গুহা যেন। ওর মনে হচ্ছিল হাত-পা অসাড় হয়ে আসছে। সে বুঝতে পারছে আর কিছু সময় থাকলে সে এখানে ঠান্ডায় বরফ হয়ে যাবে।

    কিন্তু সে তো কাজকে ভয় পায় না। সে তো মরে গেলেও বলতে পারবে না, শীত করছে। যতক্ষণ না সারেঙ নিচে নেমে বলছেন, উঠে আয়, ততক্ষণ এখানেই তাকে থাকতে হবে।

    ছোট সেজন্য খুব দ্রুত কাজ করে যাচ্ছে! বসে বসে করলে শরীরের রক্ত গরম থাকে না, ঠান্ডা হয়ে যায়। সে কিছুটা হাঁটু গেঁড়ে কাজ করে যেতে থাকল। দাঁত, ঠকঠক করছে। তবু সে কাজ করে যাচ্ছে। যতটা সম্ভব সে হাত পা নেড়ে করে যাচ্ছে। ওর মুখ চোখে এখন নানাবর্ণের দাগ। কোথাও সবুজ, কোথাও খয়েরি। সে জানে না, ওর চোখ মুখ এখন একজন সারকাসের জোকারের মতো।

    ছোটকে সারেঙ কোথায় নিয়ে গেল! জ্যাক কাজের অছিলায় ঘুরে বেড়াচ্ছে। ছোটকে খুঁজে মরছে। আর্চি বেশ মজা করছে ছোটকে নিয়ে। জ্যাকের তাই মনে হল। আর্চি ভেবেছে, জ্যাক কিছু বোঝে না। জ্যাক লাফিয়ে লাফিয়ে নামছে। সে কাউকে কিছু বলছে না। সে চিমনির পাশে, বয়লার ঘরে নেমে যাবার সিঁড়িতে বেশ শিস দিতে দিতে নামছে। অথবা সেই গানটা যেন শিসের ভেতর—উই আর ইন দি সেম বোট….. অথবা মনে হয় জ্যাক ভীষণভাবে ভেতরে ভেতরে অস্থির হয়ে উঠছে। জ্যাককে এখন খুব চতুর মনে হচ্ছে। ছোটকে দিয়ে আর্চি কি করাচ্ছে, অথবা কি করাতে চায় সেটা না দেখতে পারলে ভেতরের অস্বস্তিটা যাচ্ছে না। সে লম্বা বয়লার স্যুটের ওপর একটা কালো সোয়েটার চাপিয়েছে। কারণ শীত ক্রমে বাড়ছে। যত ডারবানের দিকে যাচ্ছে তত ঠান্ডা বাড়ছে। এবং এভাবে ওরা এখন শীতের দেশে চলে যাবে। ছোট যে এখন কোথায়! সে বাংকারে উঁকি দিয়ে দেখল অন্ধকারে একজন কোলবয় বসে বসে বিড়ি খাচ্ছে। সে জ্যাককে দেখেই তাড়াতাড়ি বিড়িটা ফেলে বেলচে হাতে গাড়িটা টানতে টানতে কয়লার কাছে নিয়ে গেল। পাশের বাংকারের লোকটা মাঝ-বয়সী মানুষ অনবরত গাড়ি টেনে নিয়ে যাচ্ছে আর কয়লা ফেলছে।

    না, এখানেও নেই। সে সিঁড়ি ভেঙ্গে আরও নিচে ঠিক বয়লার ঘরে নেমে গেল। টিন্ডাল, ফায়ারম্যান, ওকে দেখেই ব্যস্ত হয়ে পড়ছে। সারেঙের ওয়াচ। সবাই এখন দমাদম কয়লা হাকড়াচ্ছে চুল্লীতে। জ্যাক- এ-সব বুঝতে পারে, এটা ওরা ওর সম্মানে কাজ দেখাচ্ছে। এখন কয়লা ফার্ণেসে না দিলেও চলত। সে এখানেও ছোটকে দেখতে না পেয়ে হতাশ হল। মিঃ আর্চি ছোটকে কোথায় নিয়ে সেঁদিয়েছে।

    জ্যাক এবার গঙ্গাবাজুর বয়লার আর বালকেড বরাবর যে রাস্তাটা এনজিনরুমে চলে গেছে তার ভেতর ঢুকে গেল। এখানে এলে চারপাশের ছাই ঝুরঝুর করে মাথার ওপর পড়তে থাকে। সে যেতে যেতে বুঝতে পারল ওর মুখেও ছাই লেগেছে। রুমাল দিয়ে ভালভাবে ছাই মুছে ভেতরে ঢুকে দেখল মিঃ আর্টি সিঁড়িতে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সে দেখছে না, জ্যাক সামনে। জ্যাক বলল, গুড মৰ্ণিং মিঃ আৰ্চি।

    —গুড মৰ্ণিং জ্যাক। হঠাৎ এখানে। তুমি তো কখনও আস না।

    —আপনার এনজিনঘর দেখতে এলাম।

    —তুমি আগে দ্যাখোনি।

    —কবে দেখলাম! খুব বিস্ময়ের সঙ্গে তাকাল।

    —বেশ, এস, দেখাচ্ছি।

    মিঃ আর্চির কথাবার্তা কি সুন্দর এখন। বড় ভাল মানুষ। যেন সে জ্যাকের জন্য যা কিছু দরকার সব করতে পারে। জ্যাককে নিয়ে সে প্রপেলার স্যাটের পাশে চলে গেল। কখনও কনডেনসারের পাশে। ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে সব দেখালো। জ্যাক আসলে কিছুই দেখছে না। সে তো সব জানে, সে তো কতবার এসব দেখেছে। কিন্তু সারেঙ যে ছোটকে এদিকে নিয়ে এল তারপর কোথায়! সে বলল, মিঃ আর্চি আপনার এনজিনঘর খুব পরিষ্কার। এমন পরিষ্কার রাখেন কি করে! তারপর খস খস শব্দ। কেউ মনে হয় প্লেট তেল আর শিরিস কাগজে ঘসছে। মনে হল জ্যাকের, হয়তো ছোট হবে। ওরা নীল রঙের পোশাক পরে সবাই। কিন্তু কাছে গেলে দেখল, একজন বুড়ো মতো মানুষ কোলবয় টয় হবে, প্লেট ঘসছে। জ্যাক আর ভেতরে উত্তেজনা চেপে রাখতে পারছে না। সে তো, সারেঙ, ছোটবাবুকে নিয়ে এনজিনরুমে নেমে এলে অনেকক্ষণ বোট-ডেকের রেলিঙে দাঁড়িয়েছিল। এনজিনরুম থেকে উঠে যাবার দুটো পথ। একটা এনজিনরুম থেকে সোজা সিঁড়ি ধরে, অন্যটা বয়লারঘর দিয়ে চিমনির পাশে। সে বোট-ডেকে, বয়-কেবিনের পাশে ছিল বলে দুটো পথই চোখের ওপর। ছোট এবং সারেঙ এনজিনরুম থেকে উঠে গেলে ঠিক চোখে পড়ত।

    অথচ সে বলতে পারছে না, মেজ, তুমি ওকে কোথায় রাখলে। মিঃ আর্চি, ছোট তো সামান্য একজন নাবিক, তুমি কত বড় কাজ কর জাহাজে, একজন সামান্য নাবিককে এভাবে অকারণ কষ্ট দিয়ে কি লাভ! তুমি নিজেকে ছোট করছ আর্চি। এ সবই মনের কথা। সে আর না পেরে, শেষবারের মতো যমুনাবাজুর বয়লারের ফাঁকে উঁকি মারলেই দেখল, সারেঙ দাঁড়িয়ে আছেন। হাতে দড়ি! তিনি টেনে টেনে বালতি তোলার সময় দেখলেন, একেবারে সামনে জ্যাক। তিনি খুব থতমত খেয়ে গেলেন। বললেন, গুড মৰ্ণিং সাব।

    জ্যাক বলল, গুড মর্ণিং! এখানে কি করছ সারেঙ?

    —টাংকি সাফ করছি সাব।

    —আমি টাংকিতে নামব!

    —না না সাব। নামলে সব ভিজে যাবে। জুতা ভিজে যাবে। ঠান্ডা লাগবে। ভীষণ ঠান্ডা।

    জ্যাক কিছু শুনল না। সে লাফিয়ে নিচে নেমে গেল। দেখল অনেক দূরে আলোর তারটা ভেতরের দিকে চলে গেছে! সে বলল, কি চমৎকার সারেঙ। সে ছোটকে দেখতে পাচ্ছে না।

    মাথার ওপর ট্যাঙ্ক-টপ প্রায় ছাদের মতো। নির্জন কারাগারের মতো জায়গা। কেবল এনজিনটা গর্জাচ্ছে বলে কঠিন একটা ধাতব শব্দ। ভেতরে জলের আধার। এবং শ্যাওলার গন্ধ। ঠান্ডা এক অতীব হিমশৈল ভেসে বেড়ালে সমুদ্রে যেমন লাগে ঠিক তেমনি। জ্যাক শীতের দেশের মানুষ, ওরও কেমন ভেতরটা শীত শীত করছে। কিছুক্ষণ থাকলে ওরও দাঁত ঠক ঠক করবে।

    এবং এ-সময়ে মনে হল, ঠিক ভূতের মতো অথবা ছায়া ছায়া অন্ধকারে কেউ হামাগুড়ি দিয়ে এদিকে আসছে! ক্রমে কাছে এলে বুঝতে পারল, ছোট। জলে ভিজে একেবারে সাদা হয়ে গেছে। মুখে নানাবর্ণের বর্ণমালা, সঠিক জোকার। চোখ তবু উজ্জ্বল। সে জ্যাককে দেখেই হাসল। জামাকাপড় জবজবে ভেজা। ভীষণ ক্লান্ত এবং দাঁত ঠক ঠক করে কাঁপছে।

    জ্যাক হাসতে পারল না। কিছু বলতেও পারল না। ছোট, প্লেটের মুখে এসে বালতিটা সারেঙের হাতে দেবার সময় বলল, একটু আগুন না হলে চাচা মারা যাব।

    জ্যাককে বলল, তুমি এখানে! দাঁত ঠক ঠক করে কাঁপছে বলে কথা স্পষ্ট হচ্ছে না। কেমন লম্বা হয়ে যাচ্ছে প্রতিটি শব্দ। যেন জলে ঠক ঠক শব্দ করে মাছ ধরার মতো এক পাখি। জ্যাক এবার ওপরে উঠে সোজা চলে গেল। একটা কথাও ছোটর সঙ্গে বলল না। সারেঙ কিছুটা এতে ঘাবড়ে গেছে। সে বলল, চল ওপরে। খাবার সময় হয়ে গেছে। পরে দেখা যাবে।

    সে ছুটি পেয়ে এক দৌড়ে ওপরে উঠে গেল। সে যে সাদা হয়ে গেছে এবং তাকে অকারণ মেজ-মিস্ত্রি টরচার করছে এটা মৈত্র পিছিলে সব জাহাজিদের বলে বেড়াচ্ছে। এটা কেন হবে! সারেঙের কি ইচ্ছা। ওর কি ইচ্ছা ছোটকে মেরে ফেলবে! মেজ-মিস্ত্রি কি ভাবেন! তাকে কি আমাদের মাথা নেবার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। এবং ছোট, পিছিলে ঢুকে গেলেই বুঝতে পারল ভীষণ উত্তেজনা সৃষ্টি করছে মৈত্র, অমিয়, লতিফ, মনু, জব্বার। সারেঙকে ওরা এলেই ঝাঁপিয়ে পড়ল। —আপনি কি ভেবেছেন!

    —কি ভেবেছি!

    –মেজ-মিস্ত্রি যাই বলবে আপনাকে তাই করতে হবে! —তা ছাড়া কি!

    —আপনি নিজের বুদ্ধি বিবেচনা খাটাবেন না? এখনও আপনি ভেবেছেন, আমরা ওদের গোলাম আছি!

    —কিন্তু উনি অর্ডার দিলে আমি কি করব।

    —বলতে পারলেন না, ডারবানের ঘাটে হবে। সবাই নেমে যা পারা যায় করা যেত। ছোটর একার কি দায় কাজ করার।

    —কিছুটা কাজ এগিয়ে রাখা যাচ্ছে।

    —শুনুন, মৈত্র বলল, তোষামোদ আর করবেন না। আর না। জব্বার বলল, আর না। ওরা যা খুশী একসময় করতো, এখন আর না।

    সারেঙসাব পুরোনো মানুষ। তার কাজ করার স্বভাব। আদেশ তামিল করা তার কাজ! সে ভেবে পেল না কি অন্যায়টা মেজ-মিস্ত্রি করেছে। ওর বরং ছোটর ওপরই রাগ হল। একটুতেই কাহিল হয়ে যায়! এবং ছোটও ভীষণ লজ্জায় পড়ে গেছে। সে গ্যালিতে আগুন পোহাবার সময় বলল, আরে মৈত্রদা কিছু তো করতে হবে।

    —যা জানিস না তা নিয়ে কথা বলিস না। ডারবানের ঘাটে আমরা সবাই মিলে করলে কি আর কাজ! এতো আর তকতকে ঝকঝকে করা হয় না। একটু মুছে পরিষ্কার করে দেওয়া। ঠিক পরিষ্কার করতে গেলে এক বছরে কেন, জাহাজের জীবনেও হবে না। এটা আবার জাহাজ নাকি! তাপ্পি মারা জাহাজ তায় মেজ-মিস্ত্রি তার আবার কত রোয়াব! শেষ পর্যন্ত মেজ সম্পর্কে মৈত্রদা কিছু উঁচুদরের খিস্তিও ঝেড়ে দিল।

    মাঝে মাঝে এটা দেখেছে ছোট, মৈত্রদা ঝগড়ার সময় কেমন ছেলেমানুষ হয়ে যায়। সে সারা সফরেই এভাবে জাহাজিদের পক্ষ নিয়ে কথা বলে। সে সেদিনও ঝগড়া করেছে। সারেঙসাব, মেজ- মিস্ত্রির কি রাইট আছে জুতো দিয়ে মুখ নেড়ে দেখার! কি রাইট আছে বলুন। আপনারা কিছু বলেন না বলে পেয়ে বসে। আপনারা বলবেন না, আমাদেরও যেতে দেবেন না।

    সারেঙসাব বললেন, আরে সাহেবদের সঙ্গে ঝগড়া করে পারা যায় না। ওরা আমাদের তো ওপরওয়ালা। ওরা আমাদের অনেক ক্ষতি করতে পারে।

    মৈত্রদা যেমন বলে থাকে বলে ফেলল, কচু করতে পারে। কই দু-দুবার তো ব্ল্যাক লিসটেড হয়েছি, জাহাজ পাই না এমন তো হয় না।

    ছোট কি করবে তখন ভেবে পায় না। সারেঙসাব এভাবেই সারাজীবন কাজ করে এসেছেন। সব কাজই জাহাজের কাজ, সবই করতে হবে, ভয় পেলে চলবে না। ছোট আগুনের পাশে দাঁড়িয়ে চাঙ্গা হয়ে উঠেছে। ঠান্ডা লেগে যেতে পারে এই একটা ভয় থেকে গেল। জ্বরটর আসতে পারে। বুকে কফ বেঁধে একটা কেলেঙ্কারি হতে পারে। কারণ ভেতরে ভেতরে সে খুব আড়ষ্ট বোধ করছিল। খাবার খেয়ে আবার কি কাজ করতে হবে সে জানে না। যদি আবার ট্যাঙ্কের ভিতর নেমে যেতে হয়—ও কেমন অসহায় বোধ করতে থাকল।

    তবু বিকেলের দিকে কেউ জানে না, কেন মেজ-মিস্ত্রি সারেঙকে বলে পাঠাল, এখন ট্যাঙ্কটপের কাজ বন্ধ থাকবে। ছোট যেমন কাজ করছে, তেমনি করবে।

    ছোট কেবল বুঝতে পারল, এটা জ্যাকের কাজ। জ্যাক কিভাবে এটা করেছে সে জানে না। প্ৰথমে সে জ্যাকের ওপর ভীষণ খুশী। তারপরই জ্যাকের ওপর ওর কেমন একটা রাগ, অথবা জ্যাক কি ভেবে থাকে, আমি কোন কাজের উপযুক্ত নই, আমি কি কিছু পারি না! জ্যাক কি আমাকে খুব সাহসী মনে করে না? সে ভাবল, জ্যাককে একা পেলে দু-কথা শুনিয়ে দেবে। এবং তারপরই মনে হল, সত্যি সে সাহসী নয়। ভাবতেই ভেতরে কেমন হীনমন্যতা জন্মে গেল। এমন কি জ্যাকের সঙ্গে দেখা হয়ে গেলেও ভারি লজ্জার ব্যাপার। সে সারাটা বিকেল ফাইভারের সঙ্গে প্রায় ঠিক আগের মতো লুকিয়ে লুকিয়ে কাজ করল। জ্যাক যাতে দেখতে না পায়—সে জাহাজে সেঁধিয়ে গেল।

    এভাবে সেকেন্ড অফিসারও বিকেলে বসে থাকল, ছোটকে দেখতে পেল না। এভাবে জ্যাক চুপচাপ বয়কেবিন পর্যন্ত বার বার ঘুরে গেছে তবু ছোটকে দেখতে পেল না’। বেশ জাহাজ যাচ্ছে। এবং কিছু উডুক্কু মাছ বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে, আর নীল জলে ডুবে যাচ্ছে। সামনে জল কেটে যাচ্ছে জাহাজ, দু’পাশে অজস্র বিন্দু বিন্দু সাদা ফেনা। আর আকাশটাকে কখনও মনে হয় নীল চাঁদোয়ার মতো। এবং কতভাবে যে এ-আকাশ সুন্দরভাবে সেজে থাকতে ভালবাসে। কখনও কিছু মেঘ ভেসে গেলে, সমুদ্রে তাদের ছায়া, কখনও সাদা, কখনও লাল, অথবা হলুদ রঙের ছায়া। নীল জলে এইসব ছায়া খেলা করে বেড়ালে জ্যাকের মনে হয় পৃথিবীতে সে খুব ভালবাবে বেঁচে আছে। ঠিক সেই নদীর পারে কোন দুর্গের পাশে তার বাবার প্রাসাদের মতো বাড়িতে সে যখন হেঁটে যায়, চারপাশে ডেইজি ফুলেরা তখন ফুটে থাকে। এখানে ফুল নেই, কিন্তু ছোট আছে। ছোট আছে বলেই বোট- ডেকে তার বার বার হেঁটে বেড়াতে ভাল লাগে।

    এভাবে একদিন সেই ক্যাকটাসের দ্বীপটাও দূরে দেখা গেল। তখন বিকেল, সূর্য অস্ত যাবে আর কিছু সময় বাদে। ছোটকে সেকেন্ড অফিসার ডেবিড খুঁজে বেড়াচ্ছে। এ তিন-চারদিন কেউ ওকে দেখতে পায়নি। ডেবিড বুঝতে পারছে ছোটকে এভাবে মেজ-মিস্ত্রি গালাগাল করছে বলে তার খুব আত্মসম্মানে লেগেছে। এবং এভাবে ডেবিড মানুষের স্বভাব বুঝতে পারে—ছোট ঠিক দশটা জাহাজির মতো নয়। কোথায় যেন সে একটা প্রাচীন সম্ভ্রান্ত পরিবারের ছবি তার ব্যবহারে সব সময় ঝুলিয়ে রাখে। তখন ছেলেটার জন্য ডেবিডের কেন জানি কষ্ট হয়।

    ছোটকে ডেবিড ফোকসাল থেকে ডেকে নিল। বলল, এস।

    ছোট এবং ডেবিড পাশাপাশি হাঁটছে। ছোট পরেছে একটা সাদা পাজামা, একটা ডুরে সার্ট। সে একটা ফুলহাতা সোয়েটার গায়ে দিয়েছে। সোয়েটারটা সেই আগের—মৈত্রদা দিয়েছে। কথা আছে ডারবানে গিয়ে মৈত্রদা সেকেন্ডহ্যান্ড মার্কেট থেকে ওকে সব গরম জামা-কাপড় কিনে দেবে। কারণ জাহাজ যত যাবে তত ক্রমশ শীত বাড়বে। অবশ্য একটা কালো রঙের ফুলহাতা সোয়েটার আর কম্বলের গরম প্যান্ট কোম্পানী তাকে দিয়েছে। সেটা এত ঢোলা যে পরা যায় না। আর শীত আরও না পড়লে পরা যাবে না। তা ছাড়া জাহাজি মানুষেরা ফিটফাট থাকবে, পরিচ্ছন্ন থাকবে, শহরে বের হবার সময় টিপটপ বের হতে হবে, কারণ বিদেশে ছোট একজন ভারতীয়, সে যেভাবে বাঁচবে, সেখানে তার দেশ সেভাবে বাঁচবে।

    ওরা এসে দুটো ক্যাপস্টানের পাশাপাশি প্রথমে বসল। এক নম্বর ফল্কার ঠিক পাশে। ওরা জাহাজের সামনে আছে এবং গঙ্গাবাজুতে আছে। ক্রমে দ্বীপটা দূরবীনে স্পষ্ট হয়ে উঠছে। মেজ বলল, তুমি কি দেখতে পাও বলবে!

    ছোট দেখছে, সেই সোনালী রঙের দ্বীপ। বড় বড় ক্যাকটাস। কি যে বড়! শৈশবে সে একবার বনের ভেতর হারিয়ে গিয়েছিল। এবং মনে হয় সংসারে সবার জন্য এমন একটা প্রিয় বন অথবা তপোবন থাকা দরকার যেখানে মানুষ হেঁটে গেলে নিজেকে খুঁজে পায়। মেজ-মালোম এই দ্বীপের কাছে এলে কি যেন পেয়ে যায়, যা ওর মুখ না দেখলে ঠিক বিশ্বাস করা যাবে না।

    মেজ বলল, জানো ছোট, আমার মাঝে মাঝে এই সব দ্বীপে নেমে যেতে ইচ্ছে হয়।

    ছোট বলল, দু-একদিন ভাল লাগবে। তারপর আর ভাল লাগবে না।

    —না তুমি জান না। তারপর মেজ-মালোম কেমন সঙ্কোচ বোধ করল, যেন ছোটকে এ সব ঠিক বলা যায় না। আসলে এমন একটা দ্বীপ দেখবে বলে সে সব সময় বসে থাকে। যদি গভীর রাতে কথা থাকে দ্বীপটা পার হয়ে যাবে—যদি এমন হয় ওয়াচ শেষে আরও দু-তিন ঘন্টা, দরকার হলে চার-পাঁচ ঘন্টা জেগে থাকতে হবে, সে তাও করে। দ্বীপে সে এবং এক সুন্দরী দ্বীপবাসিনী, সে আর কিছু চায় না। কিছু পাতি লেবুর গাছ থাকবে, আর থাকবে—নীল জলের গভীরে, পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে আশ্চর্য সব ঝিনুক। শালতিতে দ্বীপের চারপাশে সোনালী রোদে ঝিনুক খোঁজা সে যে কি বিষ্ময়! সে ডুবে ডুবে ঝিনুক তুলে আনবে, ঝিনুকের খোল ভেঙ্গে শাঁস সে লেবুর রসে আর নুনে ভিজিয়ে খাবে। সে আর সেই যুবতী। যার শরীরে কোন পোশাক থাকবে না। সে মাথায় পাতার মুকুট পরতে ভালবাসবে আর সে রোদে অথবা বৃষ্টিপাতে মাঠের ছায়ায় ঘাসের ভেতর নিরন্তর ছুটে বেড়াবে। সে তার চিবুকে, তারপর স্তনে এবং নিচে নেমে যেতে যেতে ক্রমে গভীর সমুদ্রে ডুবে গেলে, মনে থাকবে না এবি তার স্ত্রী। মনে থাকবে না এবি আগামী বসন্তে ওর জন্য জন্মদিনের কেক বানাবে, এবং চার্চে সে সব কিছুর ভেতর তার স্বামী যে সমুদ্রে ঘুরে বেড়াচ্ছে তার জন্য প্রার্থনা করবে।

  • আট

    আট

    ।। আট।।

    আবার ব্যস্ততা জাহাজে। বন্দর আসছে, বন্দর ধরছে জাহাজ। জাহাজিরা সবাই কাজ ফেলে ওপরে ছুটে যাচ্ছে। মেজ-মালোম ডেবিড দূরবীনে বন্দর দেখছে। এনজিন-সারেঙ মাঝে মাঝে উঠে আসছেন ডেকে। মৈত্র বার বার অমিয়কে সাবধান করছে, ঠিক ফাদার যেমন গীর্জায় ঈশ্বর সম্পর্কে বক্তৃতা করেন, তেমনি মৈত্র, ডাঙ্গার মেয়েরা কি ভয়াবহ তার বর্ণনা, জ্যান্ত ছবি এঁকে এঁকে সাবালক অমিয়কে বুঝিয়ে যাচ্ছে। বাংকে গল্পগুজব করার সবয় মৈত্র প্রাচীন নাবিকের মতো সব বন্দরের রহস্য ব্যাখ্যা করে যায়। অমিয়র যা স্বভাব দাঁড়াচ্ছে দিনকে দিন!

    ছোটবাবু বসে বসে সব শুনছিল। সে এমন সব আজগুবি কথা কখনও শোনে নি। ওর মাঝে মাঝে মৈত্রের কথা অবিশ্বাস করতে ইচ্ছা হত। এমন সব নক্কারজনক কথা, যা সে বিশ্বাসই করতে পারে না, সে কি করে বিশ্বাস করবে কেউ তার মার জন্য মানুষ সংগ্রহ করে নিতে পারে। সে কেমন শুনতে লজ্জা পায়। সে তখন না বলে পারে না, মৈত্রদা চুপ কর। এসব আগলি কথা না শোনাই ভাল।

    মৈত্র ভীষণ ক্ষেপে গেল এ-কথায়। দেখ ছোট, তোকেও বলে রাখি, বেশি বাড়াবাড়িও ভাল নয়। অত সোজা না দুনিয়াটা। বয়স এখনও হয় নি, বয়স ভাল করে হোক। আমার মতো ঝানু না হলে এ-সব বিশ্বাস করতে তোমার কষ্ট হবে। তুমি কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারবে না।

    —তা হোক তুমি অন্য কথা বল।

    —বন্দরে আবার অন্য কথা কি।

    মনু বসেছিল পাশের বাংকে। সে বলল, ঠিক, বন্দরে আবার অন্য কথা কি!

    —কেন কত কথা থাকতে পারে। আমরা ইচ্ছা করলে নেমে সব ঘুরে দেখতে পারি। বাসে চড়ে বেশ দূরে—এই সব আফ্রিকার জঙ্গলে ঘুরে আসতে পারি। এখানে যে ইন্ডিয়ানরা থাকে তাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে পারি। তারা কিভাবে আছে তা জেনে নিতে পারি। কি কি অসুবিধা, কালার-বার কি রকম ভয়াবহ এ-সব জেনে নিতে পারি।

    অমিয় বলল, জেনে লাভ! ঘোরাঘুরির পয়সা কোন বাবা দেবে?

    —লাভ আমরা জানলাম।

    —মৈত্র শোন, ছোটর কথা শোন। সে ফস করে সিগারেট জ্বেলে টানতে থাকল। তারপর চুপ। অমিয় এখন এমন ভাবে তাকাচ্ছে যে ছোট ভেবে পাচ্ছে না কি করবে। অমিয় এবার ঠিক খিস্তি করবে। তাড়াতাড়ি ছোট বলল, এই আমি আসিরে!

    —থাম, যাবি কোথায়! আমরা বুঝি অভিযানে এসেছি!

    —না, তা না।

    —তোর কথা শুনে তো এমনই মনে হয়।

    ছোট বলল, ধুস, আমি এমনি বললাম। না বললে মৈত্রদা যেভাবে আরম্ভ করেছিল………

    -–কি বললি, তুই ভাবলি আমি মিথ্যা বলছি?

    —মিথ্যা বলবে কেন। হয়তো হয়েছে।

    —হয়তো না, হয়েছে। হাসানকে ডাকব?

    মনু বলল, হাসানটা আবার কে! মনু ডেক-জাহাজিদের পাত্তা দিতে চায় না। করে কয়লায়ালার কাজ। এবং মুখের ওপর কথা বলতে পারে। ওকে ডেক-টিন্ডাল হাসান একদিন বলেছিল, বোঝলাৱে মিঞা, দ্যাশের চকিদার আর জাহাজের কয়লায়ালা কামে তফাৎ নাইরে মিঞা।

    —হ হ যান, মিঞা কইবেন না, খালাসির কাম করেন বড় বড় কথা কন!

    —তুমি মিঞা এনজিনিয়ার!

    —আরে আমার কাজ এনজিনের লগে। পানি মারা কাম না। ওড়া তো টোপাসের কাম!

    এভাবে জাহাজে ডেক-জাহাজিদের সঙ্গে এনজিন-জাহাজিদের বেশ একটা রেষারেষি থাকে। এবং মাঝে মাঝে বেশ মজার ব্যাপার স্যাপার ঘটে যায়। যেভাবে যাকে যে চটাতে পারে। হাসান খুব ইয়ার্কিবাজ মানুষ। জাহাজিদের পেছনে লাগা তার স্বভাব। তাকে ডাকার যে কি দরকার এখন, এলেই বলবে, আহা কি যে করেন! কয়লায়ালা বইসা আছে, আমার জাত মান আর থাকল না। এবং কখনও এক কথায় দু’কথায় কথা কাটাকাটি, ঝগড়া। মনু এটা পছন্দ করে না। সে বলল, আর ডাইকা কাম কি!

    —ছোট বিশ্বাস করছে না।

    —সেই পোলাডার কথা?

    —হ্যাঁরে, লেমো নাম ছিল। ভাল নাম ডেবিড এ্যালবার্টসন না কি যেন, শালা এসব ইংরেজি নামফাম আমার মনে থাকে না। নাম ওলটেপালটে যায়। আগেরটা পরে, পরেরটা আগে বলে ফেলি।

    —তা ঠিক ছোটবাবু। হাসানকে এ-বন্দরে এলেই ভালোমানুষের মতো দেখবে। সে ইয়ার্কি ফাজলামো করবে না। কেমন দুঃখী মানুষ। সে যেন তখন কি ভাবে! মাঝে মাঝে পয়েন্টস-রোড ধরে সামনের যে পাহাড়টা দেখছ সেখানে চলে যায়। আমার সঙ্গে চার-পাঁচ সাল আগে এক জাহাজে সফর ছিল। তখন দেখেছি।

    ছোট বলল, কেন যেত?

    —কেন আবার? জাহাজিরা যেখানে যায়, সেও যেত। ছেলেটা নিয়ে যেত। ওর মার কাছে নিয়ে যেত। আর ছেলেটার মার সঙ্গে ডেক-টিণ্ডাল কেমন তোমার মোহব্বতে পড়ে গেছিল। তারপর যা হয়—এখন আর ছেলেটা আসে না। পুরোনো ঠিকানায় বোধহয় আর ওরা নেই। তবু ডেক-টিণ্ডাল জাহাজ এখানে এলেই দাঁড়িয়ে থাকে। একদিন আবার হয়তো ছেলেটার সঙ্গে দেখা হয়ে যাবে। তাকে নিয়ে যাবে।

    মৈত্র বলল, আশা কুহকিনী। ছেলেটা আসলে ওর নিজের ছেলে।

    ছোটবাবু বলল, মৈত্রদা তোমার মায়া-দয়া ভারি কম।

    —হবে। বলে সে বাংকে এলিয়ে পড়ল। শালা হাসান গত যুদ্ধে এখানে আটকা পড়েছিল। বুঝলে।

    ছোট, জাহাজ বাঁধা হলে সত্যি দেখল, ডেক-টিণ্ডাল হাসান খুব সেজেগুজে রেলিঙে দাঁড়িয়ে আছে। চুপচাপ। কেউ কিছু বললে জবাব দিচ্ছে না। সে নিচে নামার জন্য দাঁড়িয়ে আছে।

    গল্পটা শোনার পর হাসানের জন্য ছোটর মনটা কেমন খারাপ হয়ে গেল। অথবা এক বালকের মুখ, যেন সে নিচে দাঁড়িয়ে আছে, হাতে ম্যাণ্ডোলিন, সে এই জেটিতে দাঁড়িয়ে বাংলা গান গাইছে। এমন একটা বন্দরে, সেই বালক, এখন তো সেই লেমো ওর বয়সিই হবে, কি তার বড়ও হতে পারে—আর আসে না। ডেক-টিণ্ডাল হাসান এখানে এলেই বার বার সারা শহরে হেঁটে যায়, যদি ছেলেটার সঙ্গে দেখা হয়। ওর মার সঙ্গে দেখা হয়।

    হাসান এ-ভাবে আজও বিকেলটা এখানেই বুঝি কাটিয়ে দেবে। সে যদি ফিরে আসে। এবং এ- ভাবে ঠিক আশা কুহকিনী, হাসানের আশা আছে একদিন না একদিন লেমোর সঙ্গে ওর ফের দেখা হবে। তখন আর হাসানকে শুধু ডেক-টিণ্ডাল মনে হয় না, যেন জাম-জামরুলের ছায়ায় হেঁটে যাওয়া বাংলার মানুষ। তাকে মনে হয় প্রাচীন নাবিক। সে অনেক সাগরে ঘুরেছে মনে হয়। তার বেদনা যেন সবার চেয়ে গভীর।

    এ-সব ভাবতে ভাবতে ছোটবাবু দেখল, মেজ-মালোম ঠিক আগের জায়গায়। ওর চোখে দূরবীন। সে ওদিকে আর যাবে না। গেলেই ডেবিড ওকে দূরবীনটা দিয়ে নিজে চুপচাপ বসে থাকবে।

    এবং এক কথা।

    এনি ওম্যান।

    —নো স্যার।

    —বন্দরে মেয়েরা কেন যে আসে না!

    —এখানে মালটাল নামানো হয়! এখানে কেন ওরা আসবে?

    –কেন বেড়াতে!

    তখন ছোট শুনল, কেউ ওকে ডাকছে। সে দেখল, বোট-ডেকে জ্যাক। সে তাকে ডাকছে। জ্যাক ডাকলে সে প্রায় দৌড়ে যায়। জ্যাককে সে সারাদিন দেখেনি। কোথায় যে থাকে। জ্যাক না ডাকলে সে যেতে পারে না। সে বলল—তুমি আমাকে ডাকছ?

    —তুমি এস না! —কি ব্যাপার?

    —আরে এস না।

    ও গেলেই জ্যাক বলল, বেশ শীত পড়েছে।

    —খুব।

    —তোমার শীতে ডেকে দাঁড়াতে ভাল লাগছে!

    —খুব।

    —কেন তোমার ভাল লাগছে!

    —কেন ভাল লাগে কি করে বলব।

    —তুমি কিন্তু রাতে মেজ-মালোমের সঙ্গে কিনারায় যাবে না।

    —গেলে কি হবে?

    —গেলে ভাল হবে না।

    —মেজ আমাকে যেতে বললে না গিয়ে থাকব কি করে! মেজ এ-জাহাজে সবচেয়ে ভাল লোক। -বাজে কথা।

    —বাজে কথা কি ভাল কথা আমি জানি না জ্যাক। তবু বলি মেজকে আমার খুব ভাল লাগে।

    –তোমাকে আজ বলেনি কিছু?

    —কি কলবে?

    —কিনারে যেতে।

    —না-তো।

    —ও ঠিক নেমে যাবে। যাবার সময় তোমাকে সঙ্গে নেবে।

    —ও তো এখন বাইনোকুলারে কিসব দেখছে।

    —কিছু দেখতে পাবে না, তবু দেখবে। তারপর একটু থেমে জ্যাক বলল, তুমি আমার কেবিনে একটু আসবে?

    —কেউ দেখলে খারাপ ভাববে।

    জ্যাকের মুখটা সহসা লাল হয়ে গেল। তারপর সামলে নিল।—কেউ খারাপ ভাববে না।

    —মিঃ আর্চি টের পেলে আবার জাহাজের তলায় পাঠাবে।

    —গুলি মারো। এসতো। বলে হাত ধরে টানতে থাকল।

    ছোট খুব বিব্রত বোধ করতে থাকল। জাহাজের সর্বময় তিনি—তাকে জাহাজের ‘লর্ড বলা যেতে পারে, মাস্টার তিনি জাহাজের, তাঁর একমাত্র ছেলে জ্যাক। ছোটকে যতই আসকারা দিক, এ-ব্যাপারে কাপ্তানও কিছু মনে করতে পারেন। সে খুব মুখ কাঁচুমাচু করে বলল, জ্যাক আমাকে বিপাকে ফেলে তোমার কি লাভ?

    জ্যাক কেমন ঘাবড়ে গেল।—বিপাকে মানে!

    —আমার মতো মানুষ তোমার কেবিনে গেলে খুব খারাপ দেখাবে।

    —কিছু খারাপ দেখাবে না।

    —তোমাদের অন্য অফিসাররা কিছু মনে করতে পারেন।

    —তারা তো আমার গার্জিয়ান নয় ছোট। বলেই সে ছোটর হাত চেপে ধরল। খুব উষ্ণ হাত মনোরম। অদ্ভুত নেশার মতো এই হাত দুটো ছোটবাবুর। ছোট এখন এত কাছাকাছি যে সেই সুন্দর ঘ্রাণ, ছোট কি শরীরে কিছু মাখে! ছোটর কাছে দাঁড়িয়ে থাকলে জ্যাকের মনে হয় শরীরের ভার তার কেমন লাঘব হয়ে যায়। সে বলল, তুমি না এলে আমি ভীষণ দুঃখ পাব ছোটবাবু।

    —তোমার বাবা কোথায় জ্যাক?

    —তিনি কিনারায় গেছেন।

    —চিফ-অফিসার?

    —তিনিও নেই। এজেণ্ট অফিসে গেছেন চিঠিপত্র আনতে। ফিরতে দেরি হবে।

    —মেজ-মালোম!

    —সে তো ওর জায়গা থেকে উঠবে না।

    —কেউ দেখতে পাবে না তো?

    —আরে না। এস না।

    জ্যাক প্রায় ছোটকে টানতে টানতে ওর কেবিনে নিয়ে গেল। কি সুন্দর সাজানো কেবিন। পর- পর দুটো ঘর। একটা ঘরে নানারকম বই। সাদা দেয়ালে নীল রঙের ক্যালেণ্ডার। একটা সুন্দর ছেলে সমুদ্র-বেলায় দাঁড়িয়ে আছে। মাথায় একরাশ চুল। জ্যাক কেবিনে নীল আলো জ্বেলে দিল।

    জ্যাক বলল, ঠিক তোমার মতো দেখতে।

    —আমার মতো! সে সন্তর্পণে দরজার দিকে তাকাতেই জ্যাক বলল, তুমি খুব ভীতু ছোটবাবু। বলে সে দরজা বন্ধ করে দিল। তারপর বলল, এখন ভয় করছে?

    —না। কিন্তু ক্যালেণ্ডারের পাতায় আমার মতো ছেলের মুখ কৈ দেখি। বলে সে উঁকি দিয়ে দেখল জ্যাক ওর পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। জ্যাকের লম্বা হাতা সার্ট গায়, জামাটা আগের চেয়ে বেশ ঢোলা। ওর প্যান্টের কাট-ছাট অদ্ভুত রকমের। জ্যাকের চুল আবার সামান্য বড় হয়েছে। ওর নীল রঙের চোখে কি যে আকাঙ্ক্ষা সে বোঝে না। জ্যাক ওর এত ঘনিষ্ঠ যে সে জ্যাকের শরীরের আশ্চর্য ঘ্রাণ পাচ্ছে। কিছুটা ফুঁইফুলের মতো গন্ধ। অথবা বনের ভিতর হেঁটে গেলে বৃষ্টিপাতের সময় যে সবুজ গন্ধ পাওয়া যায় জ্যাক যেন তার চারপাশে তেমনি গন্ধ ছড়িয়ে রেখেছে। জ্যাক বলল, ছোট তুমি কাল আমার সঙ্গে বেড়াতে যাবে।

    —কাল!

    —হ্যাঁ কাল! এখানে আমরা একটা পাহাড়ের টিলায় উঠে যাব।

    —আমার তো কাল সেকেণ্ড-হ্যাণ্ড মার্কেটে যাবার কথা। গরম জামাকাপড় কিনতে হবে।

    জ্যাক কেন যে আর কিছু বলতে পারে না। সে চুপচাপ থাকল। তারপর কেমন ভুল হয়ে গেছে মতো বলল, তুমি বসো ছোটবাবু।

    ছোট খুব আস্তে আস্তে কথা বলছিল। এখন মৈত্র অথবা অন্য কেউ খুঁজে বেড়ালেই সে বিপদে পড়ে যাবে। সে বলল, এবারে যাই জ্যাক?

    —বারে এই তো এলে। আমি কতদিন থেকে ভাবছি, তোমাকে আমার কেবিনে নিয়ে আসবো।

    —মাস্টার জানতে পারলে ভীষণ খারাপ হবে। আমাকে এমন কি জাহাজ থেকে নামিয়েও দিতে পারে। তিনি এতটা বাড়াবাড়ি সহ্য করবেন কেন! শর্ত হলেও কয়লায়ালা। বলে, ছোট মুখ ভীষণ গম্ভীর করে ফেলল।

    জ্যাক এবার বলল, ছোট, বাবা আমাকে খুব বিশ্বাস করেন। তিনি জানেন আমি এমন কিছু করব না, যাতে তাঁর অপমান হয়। তিনি আমাকে ছেড়ে থাকতে পারেন না। আমিও না। আসলে বাবা বাদে আমার আর কেউ নেই।

    ছোট জানে জ্যাকের মা ওর বাবার সঙ্গে থাকে না। জ্যাকের জন্য এ-ভাবেও ভেতরে ভেতরে কেমন একটা টান গড়ে উঠেছে। ওর এখন মনে হয় জাহাজে যারা কাজ করে তাদের ভীষণ একটা দুঃখ থাকে।

    জ্যাক বলল, তুমি হয়তো এবার চিঠি পাবে।

    —চিঠি! মায়ের!

    —হ্যাঁ।

    —না, পাব না। আমি জানি পাব না। মা আমার চিঠি পেলে তক্ষুনি উত্তর দিতেন। চিঠি কোনদিন ওদের কাছে পৌঁছবে না।

    জ্যাক ফের বলল, তুমি বসো। আমার কেবিন তোমার কেমন লাগছে?

    —খুব সুন্দর। মনেই হয় না জাহাজে আছি। সব রকমের ব্যবস্থা আছে। আমার খুব ইচ্ছে এমন একটা কেবিনে ঘুমোই।

    জ্যাক কিছু বলতে পারল না। শুধু বলল, তুমি জাহাজে কাজ করলে একদিন এমন একটা কেবিনে ঠিক থাকতে পাবে। বাবা মাঝে মাঝে তোমার কথা বলেন।

    —কি বলছ জ্যাক? আমার কথা বলেন!

    জ্যাক বলল, হ্যাঁ। তারপর বলল, তুমি আমার ফ্রেণ্ড; আমি তোমার কাছে তেমন ব্যবহার পেতে চাই।

    —জ্যাক!

    জ্যাকের মুখ বড় সরল দেখাচ্ছে। সে বলল, তুমি আমাকে কখনও ভয় পাবে না বল?

    ছোট চুপ করে থাকল।

    —বল, আমাকে তোমার সুবিধা অসুবিধার কথা সব বলবে।

    ছোট কিছু বলল না। সে কেমন অভিভূত। এত ভাল জ্যাক! অথচ এতদিন সে জ্যাককে এড়িয়ে গেছে।

    ছোট ধীরে ধীরে বলল, তুমি বসো। তুমি আমার অনেক ছোট জ্যাক। আমি তোমার বন্ধু হতে পারি না।

    জ্যাক কেমন অধীর গলায় বলল, কেন! কেন?

    তারপর ছোট আর কিছু বলতে পারল না। জ্যাক ওর কাঁধে পড়ে। জ্যাক শরীরে অতীব এক সুষমা বয়ে বেড়ায়। সে কেন যে নিজেকে এত অসম ভেবে থাকে। আসলে জ্যাক কখনও কখনও হয়তো আবেগে ভোগে। এটা একটা খেয়ালও হতে পারে। এবং নানাভাবে জ্যাক সম্পর্কে ছোট ভেবে বুঝল, সে কথা দিতে পারে না। সে পালিয়ে এসেছে। জ্যাক খুব ছেলেমানুষ। জ্যাক খুব আদূরে। জ্যাক ভীষণ খেয়ালি। নিজের ভাগ্য এত বেশি সুপ্রসন্ন ভাবতে সে পারে না। আসলে সে হয়তো আর একটা বিপদে জড়িয়ে পড়ছে। যেমন কাল সে মেজ-মালোমের সঙ্গে গিয়ে ঠিক করেনি। সে এবার বলল, জাহাজে তোমার সঙ্গে কথায় বলার কেউ নেই। তোমার সঙ্গে ঘুরে বেড়াবার কেউ নেই। তুমি খুব একা বুঝি? তোমার একজন কাছের মানুষ দরকার। যদি তিনি মনে করেন আমাকে দিয়ে হবে, তুমি যেখানে বলবে তখন যাব। তুমি যেমন আমার মনিবের মতো আছো তেমনি থাকো। যখন যা সার্ভিস চাইবে, পাবে।

    জ্যাক কেমন সহসা ক্ষিপ্ত হয়ে গেল। সে চিৎকার করতে থাকল,—ইউ গেট-আউট। আই সে ইউ গেট-আউট।

    ছোট বলল, যাচ্ছি স্যার।

    ছোট চলে গেলে জ্যাক দরজা বন্ধ করে দিল। তারপর যেখানে যা আছে সব ছুঁড়ে ফেলতে লাগল। ওর দু-চোখ বেয়ে ভীষণ প্রবল বেগে কি যেন নেমে আসছে। সে নিজেই এই অসম্মানে যা কিছু আছে সব তছনছ করে দিচ্ছে। চিৎকার চেঁচামেচিতে বাটলার, কাপ্তান-বয়, ডেবিড ছুটে এসেছিল।

    —কি হয়েছে জ্যাক। কাপ্তান বয় বলল, কি হয়েছে সাব।

    জ্যাক কিছু বলছে না। কেবল ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে।

    তখন ছোট দৌড়ে পালাচ্ছিল। পাশে মেজ-মালোমকে সে ফেলে চলে যাচ্ছে। মেজ-মালোম ডাকল, এই ছোট শোন, শোন।

    ছোট তখন ওর পাশে ঘাপটি মেরে বসল। তারপর হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, এনি ওম্যান সেকেণ্ড!

    —নো।

    —তবে আমি যাই।

    —কোথাও গেছিলে?

    —কোথাও না সেকেণ্ড।

    —এত জোরে ছুটছ?

    ছোট বলল, বড়-মিস্ত্রি কিনারায় নামছে

    —এত ভয় বড়কে?

    ছোট মিথ্যা কথা বলে পার পেল। তারপর কেমন নিশ্চিন্ত গলায় বলল, দূরবীনে মেয়ে ধরা পড়লে আমাকে ডাকবে।

    —ঠিক ডাকব।

    —একা একা দেখে ফেলবে না।

    —আরে না না। একা আমি কিছু দেখি না। জাহাজিদের মতো এত স্বার্থপর নই।

    তখন বড়-মিস্ত্রি হেঁটে হেঁটে ঠিক রেলব্রীজের কাছে গিয়ে থমকে দাঁড়াল। ছায়া-ছায়া অন্ধকারে আবার একজন ইণ্ডিয়ান। সে একটু থেমে গেলেই বুঝল বেশ নেশা করে বাবু ব্রীজের থামে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বোধহয় হেঁটে বাড়ি ফেরার সাহসটুকু নেই। কিন্তু এ যে সেই ইণ্ডিয়ান। আরে ওকে তো ধন্যবাদ দেওয়া হয়নি। ওকে তো মনে মনে খুঁজে বেড়াচ্ছে।

    সে ওর কাছে গিয়ে বলল, গুড ইভিনিং।

    অমিয় হাঁটতে পারছিল না। সে টলছিল। সে কোনো রকমে বলল, গুড ইভিনিং!

    —অনেক ধন্যবাদ। তোমাকে বন্ধু ধন্যবাদ দেওয়া হয়নি। দুজনেই বোঝা যাচ্ছে নেশা করেছে খুব। বড়-মিস্ত্রি নেশা করলেও ঠিক জায়গায় পৌঁছে যাবে। ওকে কেউ ফোন করেছিল। রেলব্রীজের ও-পাশে গাড়ি থাকবে। আর অমিয় বড়মিস্ত্রির কাছ থেকে যা খসিয়েছিল, এখানে ঠিক তা একজন দালালকে ধরে পাউণ্ডে বদলে নিয়েছে। এবং এ-পয়সায় এ-দেশের সস্তা মদ, চোলাই বলাই ভাল ঠিক ইণ্ডিয়ান মার্কেটের পাশে সবার সঙ্গে কাঠের মোড়াতে বসে হুস হাস পান করে, নেচে গেয়ে—সেই এক নাচ, বসে বসে, কখনও পিঠ উঁচু করে কখনও নুয়ে নুয়ে যখন একেবারে চোখ বুজে এসেছিল, একটি রিক্সা করে চলে এসেছে। আর কি চেহারা রিক্সায়ালার, একেবারে মা কালীর মতো। মাথায় পালকের টুপি, কোমরে পালক পাখির, মুখে নানারকম উল্কি আঁকা। প্রথম তো ভয়ে একেবারে ঠাণ্ডা। তারপর মনে হল তা অনেকেই, মেয়েরা পর্যন্ত উঠে বেশ এখানে সেখানে যাচ্ছে। সেও উঠে বসল। আর এখানে এসেই রিক্সা সে ছেড়ে দিয়েছে। পোর্টের ভিতরে ঢুকতে দেবে না। সে এখানে হাঁফ ছেড়ে তারপর যাবে—ভেবেছিল, তখনই কিনা ভূতের মতো বড়-মিস্ত্রি টলতে টলতে বলছে, বেশ আছো বাবা, তা তোমার কথামতো চলে গেলে দেখা হতো না। তুমি আমার বন্ধু। তুমি আমার সঙ্গে সঙ্গেই আছ দেখছি। ধন্যবাদ। আবার দেখা হবে।

    অমিয়র মুখ শুকিয়ে গেছে। ধরা পড়তে পড়তে বেঁচে গেল। নেশা টেশা একেবারে গোল্লায়। সে বলল, না স্যার আমি…

    দাঁড়িয়ে কথা শোনার মতো সময় নেই বড় মিস্ত্রির। কি বলছে বিড় বিড় করে বোঝাও যাচ্ছে না! আসলে আমিয় নিজেও বুঝতে পারছে না কি বলছে। সে বাংলায় বলে যাচ্ছে। বাংলাকে সে ইংরেজি ভাষা মনে করছে। সে কলকাতার কোন খালাসী টোলা ভেবেছে এটা। সে যে এখানে, এই আফ্রিকার বন্দরে দাঁড়িয়ে আছে ক্ষণেকের জন্য ভুলে গেছে। তারপর সব খেয়াল হতেই কেমন সেও ছুটতে থাকল। সে এবার ক্রমে নিজের জালে নিজে জড়িয়ে পড়ছে। তাকে এখন এ-জাহাজে শেষ পর্যন্ত ভূতের অভিনয় না করতে হয়। বড়-মিস্ত্রি ওকে ছেড়ে দেবে না। কিভাবে যে কি করবে কিছুই, এখন মাথায় আসছে না। মৈত্রকে বলতে পারছে না। ছোট তো আরও সরল সে এমন শুনলে আরও ঘাবড়ে যাবে জাহাজে।

    অমিয় সব ভুলে যাবার জন্য আবার গান ধরেছে। আসলে সে গ্যাংওয়ে ধরে উঠে আসতে পারছে না। পড়ে যাবে, পড়ে গেলে একেবারে অতলে। ওর জড়ানো গলায় গান শুনলে যদি কোয়ার্টার- মাস্টার ফোকসালে খবর দেয়।

    শেষ পর্যন্ত মৈত্র নিচে নেমে দুমদাম পাছায় লাথি মারতে থাকল। জাহাজে কেন আসা। বেশ তো মা ভাইদের জ্বালাতন করছিলে, তাই করতে। আমাদের কেন। সে লতিফকে বলল, নে তোল। চ্যাঙদোলা করে তুলে নে। তারপর বাথরুমে ফেলে জল ঢাল।

    অমিয় সব বুঝছিল। জাহাজের ওপরে এসেই সে ঠেলেঠুলে সবাইকে সরিয়ে দিয়ে বলল, আমাকে

    ছোঁবে না। আমি ঠিক হেঁটে যাব। ঠিক এক দুই সে তারপর পা মুড়ে বসে পড়ল। সে বলল, উঠব না।

    –কেন উঠবি না?

    —আমাকে তুমি অপমান করেছ।

    —অপমান মানে!

    —আলবৎ অপমান। তুমি আমার পাছায় লাথি মারলে কেন?

    —সবাই দেখছে। ওঠ প্লিজ, আর পাছায় লাথি মারব না!

    —দেখুক। সবাই তো বেশ মৌজ করছে। বন্দর এলেই সব শূয়োরের বাচ্চা নাগর সেজে বের হচ্ছে। যত দোষ নন্দ ঘোষ।

    মৈত্র বলল, অমিয় জাহাজ থেকে শালা তোমায় হারিয়া করে দেব।

    —দাও না, বারণ করেছি। শালা এ মনুষ্যজন্ম থাকা না থাকা সমান। তুমি আমার পাছায় লাথি মেরেছ। ছোটকে না বলেছি তো আমি কুত্তার বাচ্চা।

    এবং ছোট দেখল, পিছিলে কি যেন একটা গণ্ডগোল। সে বোট-ডেক থেকেই বুঝল, সবাই সেখানে জড় হয়েছে। সেও ছুটে গেলে দেখল অমিয় বেহুঁশ হয়ে আছে। কেউ এদিকে আসতে পারে, কিংবা কোনও অফিসার। এনজিন সারেঙ তাড়াতাড়ি ওকে নিচে নিয়ে যেতে বলছে। এবং ওকে ঠেলে ঠুলে নিচে নিয়ে গেলে মনে হল, অনেক দূরে একটা অতিকায় ট্রেন, কোন গভীর বনাঞ্চলের ভেতর দিয়ে ছুটছে। গাছ পালা পাখি সব ভয়ে উড়ে যাচ্ছে। এবং এক আশ্চর্য শব্দ জাহাজে উঠলে সবাই শুনতে পায়, শব্দটা, সেই ট্যানি টরেন্টো, ট্যানি টরেন্টো। গর্ভিণী তিমি শিকার করে ফিরে আসার সময় শিকারিরা এমন একটা শব্দে ডেকে দাঁড়িয়ে গান গাইতে ভালবাসে।

    .

    পরদিন সকাল সাতটা বাজতে না বাজতেই কিনারার সব মানুষেরা উঠে আসছে। ওরা অধিকাংশ নিগ্রো কুলি। ক্রেনগুলো সব এগিয়ে আসছে।

    ডেরিকগুলো তুলে দেওয়া হচ্ছে। উইনচের বল বিয়ারিঙে তেল দিচ্ছে গ্রিজার। মেজ-মালোম ছুটে ছুটে বেড়াচ্ছে। ছোটকে দুবার দেখেও যেন চেনে না এমন ভাবে তাকিয়েছে। পাখিগুলো প্রথমে নেমে গেলো। ফল্কা একেবারে খালি। নিগ্রো কুলিরা এসে গ্যালিতে ভাত ভাত করছে। ওরা ভাত মুড়িমুড়কির মতো জ্যাবের ভিতর নিয়ে কাজ করছে আর খাচ্ছে। জাহাজিরা কাজের ফাঁকে ফাঁকে নিগ্রো কুলিদের সঙ্গে ভাঙা ইংরেজিতে হাসি ঠাট্টা করছে। বাদশা মিঞা একজন নিগ্রো কুলির হাত পা দড়ি দিয়ে কত মোটা মাপছে। সে একটা বড় টুল টেনে এনেছে। তার ওপরে উঠে দৈত্যের মতো মানুষটার হাতের পেশী কি যে সবল, এমন মাপবার সময় খুব দুঃখ, সে এতটা দুর্বল কেন! আর নিগ্রো কুলিটা ফিক্‌ফিক করে হাসছে। মাপবার সময় যখন যা বলছে মানুষটা তাই করছে। বাদশা মিঞাকে ছোট একটা পুতুলের মতো লাগছে। কি কালো আর সবল শরীর। মাথায় রোঁয়া রোঁয়া কোঁকড়ানো চুল। বাদশা মিঞা হাসতে হাসতে ঠাট্টা করছে—তোমার কটা বিবি মিঞা?

    —তিন। সে আঙ্গুল দেখিয়ে এমন বলছে।

    বাদশা খুব যেন কাছের মানুষ পেয়ে গেছে, সে একেবারে দাঁত বের করে বলল, মি…সে বুকে আঙ্গুল ঠেকাল, যেন ‘মি’ দিয়ে ঠিক নিজেকে প্রকাশ করতে পারছে না, বুকে আঙ্গুল ঠেকিয়ে সেটা সে প্রমাণ করছে—মি বুঝলে সাব্ ফোর। ফোর বিবি।

    —ফোর! মাই গড। লিটল ম্যান। ভেরি লিট্ল।

    বাদশা মিঞা লিট্ল কথার অর্থ বোঝে। সে খুব চুপসে গেল। ওকে সোজা কথায় হালার হালা বলেছে। এ-হালার গতরে চার বিবিরে সামলানো দায়।

    —সাব, ফোর নো গুড?

    —ইয়েস, গুড। ওয়ান নো গুড, টু গুড, থ্রি ভেরি গুড। নাইস। সে জিভ দিয়ে ঠোঁট চাটছে। ফোর! ও ভাবা যায় না।

    —তুমি নাস্তায় কি খাও সাহেব?

    —আণ্ডা।

    —কটা করে?

    —আটটা করে। কাঁচা। সরবৎ করে খাই।

    —আমার খেলে হবে!

    —জরুর হবে।

    বাদশা মিঞা বলল, ভাত নেবে? সে ওর দু জ্যাব ভরে ভাত দিয়ে দিল। নিগ্রো কুলিটা তারপর দুলাফে নেমে গেল। ফল্কায় সব ভারি ভারি কাঠ হাওয়ায় উড়িয়ে দেবার মতো টেনে ফেলে দিচ্ছে। এবং এ-ভাবে জাহাজে কাজ সুরু হলে মনে হয়, কেউ এখন আর নিজের দুঃখের কথা ভেবে বসে নেই। সবাই কাজ করছে। চার নম্বর মিস্ত্রি সামনের উইনচে আছে, পাঁচ নম্বর আছে এদিকের উইনচে। কাপ্তান পায়চারি করে সব দেখছেন। মেজ-মালোমের কাছে হিসাবপত্র আছে। কি নামবে সে জানে। জাহাজে কোন আলাদা ক্লার্ক নেই। চিফ-অফিসার সেকেণ্ড-অফিসার এ সব কাজ ভাগ করে নেয়। আর্চি নিচে রয়েছে। কিছু মেরামতের কাজ আছে। কিনার থেকে কন্‌ট্রাক্টর এসেছে মেরামত করতে। বড় বড় অক্সিজেন সিলেণ্ডার নামিয়ে দেওয়া হচ্ছে। প্লেট খুলে ফের মেরামত হচ্ছে। স্মোক-বকসে কাজ পড়েছে ছোটর। সকাল থেকে ওর দেখা নেই। দুজন দুজন করে তিনটে-স্মোক বকস ভাগ করে নিয়েছে। মৈত্র নিজে গেছে সঙ্গে। ছ’জন কোলবয় স্মোক-বক্স সাফ করার জন্য রয়েছে বলে, ছোটকে সকাল থেকে দেখা যাচ্ছে না।

    অনিমেষ, বন্ধু এবং অন্য ডেক-জাহাজিরা ফলঞ্চা বেঁধে রঙ লাগাচ্ছে। চিমনিতে রঙ লাগাচ্ছে পঁচিশ টাকার জাহাজিরা। তেইশ টাকার জাহাজিরা ফলঞ্চা বেঁধে জাহাজের খোল রঙ করছে। বন্দরে এলেই এ-সব কাজ ওদের বেড়ে যায়। সমুদ্রের ঢেউ এসে ক্রমান্বয়ে সব রঙ ধুয়ে নিতে চায়। আর ওরা যেখানে যেভাবে রঙ ধুয়ে যায় আবার বন্দরে এসেই রঙ করে ফেলে। যেন নিয়ত এক সংগ্রাম এই সমুদ্রের সঙ্গে।

    স্মোক-বকসের ভেতরে বসে তখন ছোট চেঁচামেচি করছিল, মৈত্রদা কিছু দেখতে পাচ্ছি না।

    —মার জোরে, জোরে মার। জোরে বুরুশ চালা। মাগীর কলিজাতে পাড় দে।

    এগুলো এমন সব কথা যা মৈত্রকে বলতে হয়। না বললে যারা কাজ করছে, মেজাজ পাবে না। এই যে এক মাসের ওপর ওরা জাহাজ চালিয়ে এসেছে, এই যে এক মাস ধরে স্মোক-বকসের পাইপগুলো ধোঁয়া গিলে গিলে জ্যাম হয়ে গেছে কালিতে, এগুলো ঠিক মতো বুরুশ না চালালে বয়লারে ঠিক স্টিম উঠবে না। ধোঁয়া বের হবার পাইপ জ্যাম থাকলে আগুন ভালো জ্বলবে না। আগুনের ভেতর আগুন, সে যে কি আগুন এই বয়লারে নিয়ত জ্বলে কেউ না দেখলে টের পাবে না। এ- ভাবে হাজার হাজার টন কয়লা পুড়বে বয়লারের পেটে। স্মোক-বকস সাফসোফ না থাকলে বয়লারের বদহজম হবে। এবং এটা মৈত্র ভাল বোঝে, সে সেই সকাল থেকে লেগেছে। চারপাশটা এখন ধোঁয়ার মতো, আসলে সব শুকনো ভুসো কালি, ফর্ ফর্ করে চারপাশে উড়ছে। এবং ওরা যে নীল জামা প্যান্ট পরে এসেছিল, তার ওপর পলেস্তারা পড়েছে ভুসো কালির। ভুসো কালিতে মুখ একেবারে মা-কালী। চোখ দুটো জবা ফুলের মতো লাল। নাকে সবাই রুমাল বেঁধেও পার পাচ্ছে না। গলা থেকে থুতু উঠে আসলে কেবল মনে হয় দলা দলা কালো কফ। কেউ বেশিক্ষণ ভেতরে বসে থাকতে পারে না। পাইপের ভেতর বুরুশ ঠেলে বের করে ঘসে দুবার, তারপর বাইরে বের হয়ে আসে। আবার যখন যাচ্ছে ভেতরে সেই ঘূর্ণিঝড়ের মতো ভুসো কালির ঝড়টা কিছুটা থেমে গেছে তখন। বার বার গিয়ে তা প্রায় বিশ বাইশটা পাইপ, ঠিক গোনার মতো তখন অবস্থা থাকে না, এক এক করে সবাই সাফ করে যখন ঠিক বারোটায় উঠে গেল দল বেঁধে তখন মনে হচ্ছে একদল অভিযাত্রী সত্যি কোন দুর্গম কয়লা খনির ভেতর থেকে জীবন-মরণ লড়াই শেষে ক্লান্ত অবসন্ন পায়ে উঠে যাচ্ছে।

    মৈত্রের ভীষণ তখন গর্ব হয়। গতকালের অমিয়র এমন বেলাল্লাপনা ভুলে যায়। এমন একটা কাজের পর যদি এটুকু না করল তবে আর বাঁচা কেন। কিন্তু এইসব জাহাজিদের এত কম পারিশ্রমিক, আর্টিকেলে ওদের জন্য এত কম বরাদ্দ যে তখন তার মন খারাপ হয়ে যায়। মৈত্রের তখন এই সব হতভাগা জাহাজিদের জন্য আফশোস হয়।

    জ্যাক তখন খুট খুট করে জাহাজে চিপিঙ করছে। ঠিক দু নম্বর লাইফ-বোটের নিচে সে বসে আছে। এবং সে দেখতে পাচ্ছে কতজন অভিযাত্রী ক্রমে পিছিলের দিকে চলে যাচ্ছে। ওদের চেহারা এক রকমের। মাথায় কালো টুপি। জামা প্যান্ট ভুসো কালিতে ঢাকা। ওরা কে এবং ছোটবাবু কোনটা সে বুঝতে পারল না। কিন্তু সে জানে ছোটবাবু ওদের ভেতর সব চেয়ে লম্বা। ছোটকে যে যে- ভাবেই সাজিয়ে রাখুক সে ঠিক চিনে ফেলতে পারবে। দূর থেকে না পারলেও, কাছে গেলে চিনতে পারবে। ছোটর শরীরে আশ্চর্য একটা সৌরভ আছে যা কখনও উবে যায় না।

    সে কালকে রেগে গিয়ে যে কি করে ফেলল! ছোটকে এ-অবস্থায় দেখে সব রাগ-অভিমান সে ভুলে গেল। হঠাৎ এমন সরগোল এবং কাজকর্মের ভেতর সব ভুলে সে উঠে দাঁড়াল। তারপর চিৎকার করে ডাকল, ছো…ট। ছোট আমি এখানে! কেমন সরলভাবে বলে যাওয়া। ছোট যেতে যেতে হাত তুলে দিল। কিছু বলল না।

  • নয়

    নয়

    ॥ নয় ॥

    জাহাজ ছাড়ার আগে মৈত্র ছোটবাবুকে ওয়াচে নিয়ে নিল। সারেঙের ইচ্ছে ছিল না। কি দরকার, যখন চলে যাচ্ছে। এখন তো সমুদ্রে তেমন ঝড় উঠছে না। আর সামনে যে সমুদ্র পাড়ি দিতে হবে, খুব ভয়াবহ হবে না। শীতের সমুদ্র। শান্ত নিরিবিলি। নানা বর্ণের সমুদ্র-পাখীরা ঘোরাফেরা করবে কেবল। এখন ছোট যেভাবে আছে সে-ভাবেই থাক না। ওকে আর কে ঘাটাচ্ছে।

    তবু মৈত্র বলল, না। ওর শক্ত হওয়ার দরকার আছে। সব জাহাজে আপনি আমি থাকব না।

    —ছোট কি বলে?

    —ওর আবার বলার কি আছে! ওর ইচ্ছায় তো আর কাজ হবে না।

    সারেঙ বললেন, ঠিক আছে, যা ভাল মনে করেন, করবেন

    সারেঙের এ নিয়ে কোনও দ্বিধা থাকল না। ছোটবাবুর জন্য মৈত্রমশায় ভেবে থাকেন। এটা সারেঙসাব নিজেও চান, ছোট শক্ত হোক। অনেকটা হয়েছে। জাহাজের স্মোক-বকসে খুব ভালভাবে কাজ করেছে। কয়লা লেভেলিং-এর দিন, সে তো সবচেয়ে বেশি খেটেছে। এভাবে একজন জাহাজি জাহাজে ঠিকঠাক কাজ করতে না পারলে পদে পদে অপদস্থ হতে হয়। সুতরাং ছোটবাবুর ফালতু থাকা আর হল না। এখন সেও অন্য জাহাজির মতো ‘পরিদার’। তার ‘পরি’ মৈত্রদার সঙ্গে। বারোটা- চারটা ওয়াচ। এক বাংকারে সে কাজ করবে, অন্য বাংকারে অমিয়। অমিয় ইতিমধ্যেই বেশ ‘পরি’ শেষে শিস দিতে দিতে উঠে আসে। একদিন ছোট দেখেছিল, অমিয় ‘পরি’ শেষ করে বোট-ডেকে দাঁড়িয়ে জোরে জোরে কবিতা আবৃত্তি করছে। বোধ হয় কোন ইংরেজ কবির সমুদ্রবিষয়ক কবিতা। সে শুনতে পায় নি। ওর হাত পা নাড়া দেখে ভেবেছিল, অমিয় বোট-ডেকে পাগলামি করছে। সে ওপরে যেতে পারে নি। কারণ সে উইন্‌চে কাজ করছিল। ফাইবার ওকে দিয়ে কাজ করাচ্ছিল। ওকে সে জিজ্ঞাসা করলে বলেছিল, কবিতা আবৃত্তি করলাম। কি শান্ত আকাশ, কি অসীম সমুদ্র, ইচ্ছে হয় না হাত পা ছুঁড়ে কবিতা আবৃত্তি করতে! ইচ্ছে হয় না ধনধন্যে পুষ্পে ভরা আমাদের এই বসুন্ধরা গানটা গেয়ে ফেলি!

    এ-ভাবে প্রথম যে জাহাজ মনে হয় নিদারুণ, সমুদ্র-যাত্রা মনে হয় কঠিন সফর, জীবনযাপনে বিশ্বস্ততা থাকে না, মনে হয় সবাই ভিন্ন ভিন্ন গ্রহ থেকে নেমে এসেছে, ক্রমে তা আর মনে হয় না। মনে হয় এরা সবাই মিলে একই গুষ্ঠিভুক্ত জীব। এখানে ঠিক সবাই একইভাবে, যেমন সারেঙ বলতে পারেন কবে বাড়িয়ালা মাসতার ডেকে বলবেন, নাটক, যাত্রা, কবিগান, যার যা খুশি কর। শান্ত সমুদ্রে ডেকের ওপর নাটক, আবৃত্তি গান-বাজনা লাগাও। বেশ তো বের হয়েছি সেই ডাঙ্গা ছেড়ে এভাবে হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকলে চলবে কেন। তখন মনেই হয় না কাপ্তান খুব বুড়ো, মনে হয় না অথর্ব, মনে হয় না খিটখিটে তাঁর মেজাজ, বরং মনে হয় মানুষটা জীবনের চারপাশটা যেন শেষদিন পর্যন্ত দ্যাখোরে বাহার। চুপি চুপি বলবেন, আমার জন্য কিন্তু একটা প্রোগ্রাম রাখবে। এখনও একেবারে খারাপ হাত না।

    সবাই তখন হেসে ফেলবে। এই যখন জাহাজের নিয়তি, অর্থাৎ যেখানেই জাহাজ যাক, জাহাজের একঘেয়েমি থাকবে, নিশিদিন তো শুধু নীল জল, নীল আকাশ, মাঝে মাঝে সমুদ্র পাখিদের ওড়া অথবা ডলফিনের ঝাঁক ভেড়ার পালের মতো সমুদ্রে দেখা আর তো বৈচিত্র্য বলতে কিছু নেই। যখন ঝড় সাইক্লোন দেখা দেয়, তখন বোধ হয় একটা বৈচিত্র্য আসে। একেবারে সব মানুষগুলোকে পাগলা করে দেয়। অথবা কুয়াশার ভেতর ঢুকে গেলে কিংবা কোন হিমশৈল, এটা সহজে ঘটে না। কাপ্তান সারাজীবনে দুবার সংকেত পেয়েছিলেন, নেমে আসছে, নেমে আসছে। পালাও পালাও। জাহাজের মুখ ঘুরিয়ে দাও। ভয়ঙ্কর সমুদ্রের অতলে মৃত্যুর বিভীষিকা। যেন এক অতিকায় সমুদ্র জুড়ে হিমশৈল এক প্রাগৈতিহাসিক জীব হয়ে যায়। আর তো কিছু নেই। কেবল কাজ, চার্ট দেখা, চার্ট মতো জাহাজ চলছে কিনা দেখা, সকাল-সন্ধ্যায় গ্রহ-নক্ষত্র দেখে জাহাজের অবস্থান বোঝা। কখনও কখনও দেখা, দিক ঠিক আছে কিনা, অথবা দিক নির্ণয়। অথবা মার্কনি সাব অর্থাৎ রেডিও অফিসার সকাল হলে জাহাজের খবর জানিয়ে দিচ্ছেন এরিয়া স্টেশনকে। প্রতি সকালে তার এটা কাজ!—হ্যাঁ হ্যাঁ, সিউল ব্যাঙ্ক। তারপর প্রায় মুখস্থ বলার মতো বলে যাওয়া, কত এন. আর. টি., কত জি. আর. টি., কোন কোর্সে জাহাজ যাচ্ছে এবং নেক্স্ট পোর্ট অফ কল কি! অথবা পজিশান জাহাজের ভুল হলে চেয়ে নেন রেডিও বিয়ারিঙ। তা হলেই সব ঠিকঠাক। আর ভয় থাকে না। এভাবে সব কাজের ভাগবাটোয়ারা করে বাকি সময়টা কাপ্তান হুইল ঘরে বসে থাকেন। অথবা খোলা ডেকে বসে এই যে, পৃথিবী, সমুদ্র এবং গ্রহ-নক্ষত্র এবং সৌরলোক সব মিলে ঈশ্বরের কি অপার মহিমা এমন ভাবেন। তখন কাপ্তানের চোখ বুজে আসে, তারপরই কেমন একটা দুঃস্বপ্ন ভেতরে নাড়া দেয়, যেন কেউ পাশে দাঁড়িয়ে রয়েছে। তার গাউন এবং চুলের গন্ধ পর্যন্ত পাচ্ছেন তিনি! যত বুড়ো হয়ে যাচ্ছেন তত সে পাশে দাঁড়িয়ে কেমন হা-হা করে পাগলের মতো হাসে। তারপরই এক পতনের শব্দ হয়। নিশীথে কেউ শুনতে পায় না, খোলা-ডেক থেকে কে কাকে যেন ঠেলে ফেলে দিচ্ছে। আর কোন শব্দ নেই। প্রপেলারটা ঝিক্ ঝিক্ শব্দ তুলে কেবল যাচ্ছে। তখন কেমন ভয়ে কাপ্তানের বুক গলা শুকিয়ে যায়। তিনি হাঁকতে থাকেন, জ্যাক, জ্যাক, দ্যাখ তো কেউ আমার ঘরে ঢুকেছে কিনা!

    —না তো। কে ঢুকবে।

    —মনে হল কেউ আমার ঘরে ঢুকেছে!

    জ্যাক এতে কিছু মনে করে না। সে এটা বাড়িতেও দেখেছে। বাবার হাতে কাজকর্ম না থাকলে এমন হয়। একা চুপচাপ বসে থাকলে, কেন জানি বাবা ভীষণ ঘাবড়ে যান। সে বাবাকে এ জন্যও ছেড়ে থাকতে পারে না।

    বাড়িটা ওদের পোর্টের কাছাকাছি। একদিকে বড় মাঠ, শহরের ভেতরে রাস্তা চলে গেছে। রাস্তা পার হলে, কিছু লোহা-লক্কড়ের কারখানা। তারপরই নির্জন গাছপালা, ঘেরা একটা ফোর্টের মতো বাড়ি। সামনে লাইটহাউস। অর্থাৎ রাস্তা সামনে, তারপর ড্রাই-ডকের জেটি। কিছু লম্বা ক্রেন। ড্রাই- ডক করা সব জাহাজের খোল ওদের বারান্দায় দাঁড়ালে চোখে পড়ে। আর আছে আরও দূরে সব যুদ্ধজাহাজের ঘাঁটি। সারি সারি ডেস্ট্রয়ার সমুদ্রের জলে ঘোরাফেরা করতে দেখা যায়। বাবা বোধহয় বাড়িটা ইচ্ছে করেই এমন একটি জায়গায় করেছিলেন। সারাদিন ব্যালকনিতে বসে থাকলে সমুদ্রে সব ছোট ছোট জাহাজ, বড় জাহাজ, টাগ-বোট এবং যুদ্ধ জাহাজের নীল জলে ঘোরাফেরা ভাল লাগে দেখতে। আর বাড়িটা গাছপালায় ঘেরা। বেশ-জায়গা নিয়ে। নানাবর্ণের সব গাছ বাবা পৃথিবীর সব বন্দর থেকে সংগ্রহ করেছেন। কেউ বেঁচেছে, কেউ বাঁচেনি। তবু বাড়িটাকে দেখলে মনেই হয় না, ওয়েলসে এমন আর একটা বাড়ি আছে।

    মাঝে মাঝে বাবা ঠিক এমনি চিৎকার করে ওঠেন, দেখ তো ভেতরে কে গেল?

    —কে বাবা!

    —মনে হয় কেউ।

    —না তো।

    —ভালো করে দ্যাখ।

    জ্যাক ভিতরে ঢুকে ভাল করে দেখে আসে। পরিচারিকা মেয়েটিও ছুটে আসে। সফরে বের হলে একজন পাহারাদার থাকে বাড়িতে। মাঝে মাঝে পরিচারিকার সঙ্গে বাজারের হিসাবপত্র নিয়ে বসে। এমন শুনতে পেলে সেও ছুটে আসে। কি হয়েছে স্যার।

    —চোখ বুজে ছিলাম, মনে হল কেউ এসে দাঁড়াল, কি বলল, তারপর কোন তোয়াক্কা না করে ভেতরে ঢুকে গেল।

    এ নিয়ে প্রথম প্রথম সবাই খুব চিন্তিত হয়ে পড়ত। ওদের ভাবনা হত। সমুদ্রে ঘুরে বেড়ালে, এমন হওয়া স্বাভাবিক। সারাক্ষণ জল আর জল, কখনও ডাঙ্গা, মানুষের কাছে ডাঙ্গা যে কত মধুর, একজন নাবিকের চোখ দেখলে তা টের পাওয়া যায়। এবং বোধ হয় কাপ্তান আর সফরে যেতে চান না। কিন্তু পরে এত স্বাভাবিক হয়ে যান যে তখন আর কেউ কিছু বলতে সাহস পায় না।—ও এটা আমার হয়। ওটা কিছু না, শোন তো বনি। কাছে গেলে বলবে, বেহালাটা আন তো একটু বাজাই।

    তখন হয়তো সমুদ্রে সূর্যাস্ত হচ্ছে অথবা জ্যোৎস্না রাত থাকলে এ ভাবে কতক্ষণ যে বাজান! যত বয়স হয়ে যাচ্ছে, তত বাবা বেহালা বাজাতে বেশি ভালবাসেন। বনি এটা দেখে বুঝেছে, বাবার ভেতরে অসীম দুঃখ। তাকে তিনি কিছুই বলতে চান না। তখন তার ভীষণ অভিমান। সে পাশেই দাঁড়িয়ে থাকে। কোন কথা বলে না। বাবা তাকে যেন দেখছে না। সেও বাবাকে দেখছে না। সামনের রাস্তায় কিছু গাড়ি-ঘোড়ার শব্দ। রাত হলে তাও থাকে না। বাড়িটা পোর্টের পিছন দিকে বলে খুব নির্জনতা আছে। ছাদে উঠলে, শহরের ভেতরে যে ক্যাসেল আছে তার চূড়ো দেখা যায়। আর এই যে লাইট-হাউস, এবং সব রঙ-বেরঙের বাড়ি, জাহাজের ভোঁ এ-সবের ভেতর বাবা এবং সে মাঝে মাঝে এমন নীরব হয়ে যায় যে কেউ বুঝতেই পারে না, বাড়িতে কেউ আছে।

    বনি সমুদ্রে এলে শরীর ওর ভাল হয়ে যায়। প্রায় নাবিকের জীবনেই এটা ঘটে। কিন্তু বনি যতটুকু বড় হয়েছে, যা কিছু শিখেছে, অথবা জীবনযাপনে সে যে মাঝে মাঝে স্বপ্ন দেখতে শিখে গেছে, সেটাও এই জাহাজে। এই রাতের বেলাতে বাবা হুইল ঘরে একটা ডেক-চেয়ারে বসে আছেন। এনজিন – ঘর থেকে ঝিক ঝিক শব্দটা উঠে আসছে। সমুদ্রের বাতাসে আর তেমন জলকণা নেই। বাতাস ক্ৰমশঃ শুকনো হয়ে উঠছে। বেশ ঠান্ডা বাতাস। বাবার মাথার চুল গত সফরেও দুটো একটা সে কালো দেখেছে। কিন্তু সে এ-সফরে দেখল, বাবা তার ভীষণ বুড়ো, চুলগুলো ভীষণ সাদা। বিশেষ করে বাবা যখন একা একা চুপচাপ উইংসে দাঁড়িয়ে থাকেন, তখন বাবাকে ভীষণ দুঃখী মনে হয়। উইংসের সবুজ আলো দুলতে থাকে। জাহাজ ক্রমাগত সমুদ্রে ভেসে যায়। জ্যোৎস্নায় কেমন চারপাশের সমুদ্র অলৌকিক এক জগৎ নিয়ে বেঁচে থাকে। সে শুনতে পায় বাবা সমুদ্রকে উদ্দেশ্য করে কি যেন বলছেন, অথবা মনে হয় কিছুটা গানের মতো, অর্থাৎ সারাটা জীবন বাবা সমুদ্রে কাটিয়েছেন, ওর বয়স যদিও কম, তবু সে সমুদ্রে এসেই বুঝতে পেরেছে, বাবা এই সমুদ্রেই থেকে যেতে চান। বাড়িটা যে তিনি সমুদ্রের ধারে করেছেন সেও তো মৃত্যুর আগে তিনি জানালা দিয়ে সমুদ্র দেখতে পাবেন বলে।

    আসলে মানুষের এই হয়। যত বয়স বাড়ে, তত ঈশ্বর সম্পর্কে বিচিত্র অনুভূতি অথবা মৃত্যুচেতনা, এবং কখনও গভীরে কি যেন বাজে। বনি বাবাকে অবসর সময়ে এখন দুটো কাজ করতে দেখে। সে দেখে বাবা, ঈশ্বর সম্পর্কে সব রকমের বই, বিশেষ করে জেরুজালেমের প্রাচীন ইতিহাস পড়তে খুব ভালবাসেন। কখনও কখনও তিনি বালকের মতো পড়ে যান ট্রেজার আইল্যান্ড অথবা ফরাসী দেশের সেই ছোট্ট রাজপুত্রের গল্প। যে থাকত ছোট্ট একটা গ্রহাণুতে। বাবা আর এখন ডিকেন্সের বই পড়েন না। অথচ লাইব্রেরিতে তার সব বই আছে। তিনি এখন বেছে বেছে সব ছোটদের বই সঙ্গে নেন। অথবা কোনও বন্দরে গেলেই তিনি ছোটদের বই কি ভাল আছে খোঁজ করবেন। এ- সব দেখে মনে হত সব তিনি বনির জন্য কিনছেন। তার কোন এতে উৎসাহ নেই। কিন্তু বই কিনে কিছুতেই না পড়ে বনিকে দেবেন না। বনি তখন না হেসে পারে না। অথবা কখনও কখনও তাঁর যখন ঘুম আসে না, যখন সারা রাত্রি সাহসা খুব দীর্ঘ হয়ে যায়, তিনি-বোট-ডেকে একাকী বেহালা বাজান। রাতের জাহাজ এমনিতেই ভীষণ মায়াবী। নীল রঙের ভেতর সাদা জাহাজের চলা, কেবল ঢেউ ভেঙে অন্তহীন গভীর সমুদ্রে চলা, আর অন্তহীন নক্ষত্রের ছায়া সমুদ্রে, তখন বাবার ভীষণ আবিষ্ট হয়ে বেহালা বাজানো বনির কি যে খারাপ লাগে! সেও নেমে যায় বোট ডেকে। বাবাকে সে ডাকে, বাবা!

    —কে!

    —আমি বাবা।

    —অঃ। তোমার আবার এখানে আসার কি হল?

    —এমন ঠান্ডায় দাঁড়িয়ে থাকলে তোমার অসুখ হবে।

    —কোথায় ঠান্ডা!

    —ঠান্ডা নয়! আমার ভীষণ যে শীত করছে বাবা!

    —যা! তুমি ছেলেমানুষ, তোমার তো আরও গরম লাগার কথা! বলেই তিনি জামার নিচে বুকের কাছে বনির হাতটা নিয়ে যেতেন। দ্যাখো তো ঠান্ডা লাগছে?

    বনি দেখেছে, ঘামছেন বাবা। কেমন ভিজে ভিজে।

    বাবা না বলে যেন পারেন না, আমি যে বেহালা বাজাচ্ছি। কি যে ভাল লাগে না। মনেই হয় না, পৃথিবীতে শীত আছে।

    বনি টের পেত বাবার বুকটা কেমন ধীরে ধীরে ছোট হয়ে যাচ্ছে। ঠিক সে এমন আর একটা বুকের কাছে হাত রাখলে টের পাবে, তাজা, গভীর। সে যেন বলতে পারত, বাবা, ছোটবাবুর বুকটা তোমার মত না। ওর বোধ হয় খুব চওড়া। তোমার মত বয়সে ওর বুকে হাত দিলেও বুঝি এমন ছোট মনে হবে।

    বনির এ-ভাবে কত যে ভাবনা! তার বয়স বাড়ে! বুঝতে পারে, সে নানাভাবে বুঝতে পারে, সে বয়স অনুযায়ী বেশী বুঝতে পারে। সে যখন এ-ভাবে ভাবে, তখনই কখনও দেখতে পায়, ছোটবাবু স্মোক-বকস পরিষ্কার করে পুপ-ডেকে ফিরে যাচ্ছে, কখনও দেখতে পায়, নীল রঙের পোশাক পরে বোট-ডেক পার হয়ে সোজা তরতর পরে ফানেলের গুঁড়িতে। তারপর সিঁড়ি ধরে স্টোক হোলডে নেমে যাচ্ছে। আবার কখনও সে দেখতে পায় পুপ-ডেকের রেলিঙে দাঁড়িয়ে চর্বি ভাজা রুটি খাচ্ছে, চা খাচ্ছে, আর অনবরত সমুদ্র দেখতে দেখতে কেমন তন্ময় হয়ে যাচ্ছে।

    তখন কেন যে বনি জোরে না ডেকে পারে না–ছো….ট….বা….বু।

    .

    সেদিনও পোর্ট এলিজাবেথ বন্দর ছেড়ে যাবার মুখে বনি ডেকেছিল, ছোটবাবু এভাবে কোথায় ছুটে যাচ্ছ।

    —সেকেন্ডের কাছে।

    —কি ব্যাপার!

    —মেয়ে। জাহাজে ওম্যান এসে গেছে।

    —যাঃ

    —হ্যাঁ। ওকে খবরটা দিতে হবে। বেচারা কাজের চাপে বন্দরে একবারও নামতে পারেনি। ফাঁক পেলেই বোট-ডেকে দাঁড়িয়ে দেখেছে। অথচ ৭ত কাছে বন্দর, বার বার দেখেও তার-আশ মেটেনি। খবরটা দিয়ে আসছি।

    বনি লাল রঙের জাহাজী টুপি মাথায় পরেছে। পায়ে পরেছে কেড্স সাদা রঙের। চুল কাটা হয়নি অনেকদিন। চুল বড় হয়ে গেছে। চুল বড় হলেই ছোটবাবুর ইচ্ছে হয় আর একটু দাঁড়িয়ে থাকে জ্যাকের পাশে। জ্যাক সুন্দর একটা ডোরাকাটা পুল-ওভার পরেছে। পিছনে পকেট, সামনে পকেট, সবুজ রঙের প্যান্ট পরেছে। জ্যাকের কাছে এ শীতটা মনোরম। ছোটবাবুর কাছে শীতটা প্রচন্ড। সে সেকেন্ড-হ্যান্ড মার্কেট থেকে দুটো সস্তায় সোয়েটার কিনেছে, একটা ফুলহাতা, একটা হাতকাটা। সে লেদার জ্যাকেট কিনেছে একটা। মাথায় পরার জন্য উলের টুপি। একটা পুরোনো ওভারকোট কিনবে ভেবেছিল। কিন্তু মৈত্র বলেছে, বুনোসাইরিসে পুরোনো জিনিস খুব সস্তা। আর আমেরিকা অথবা ইউরোপের বন্দরে গেলে তো কথাই নেই। যা না হলে নয় এমন কিছু কিনে নিতে বলেছে।

    জ্যাক ছোটবাবুর পোশাক দেখে হেসে ফেলল। ছোটবাবুর পুরোনো পোশাক তার ওপর যা যা কিনেছে, শীতের জন্য সব পরে ফেলেছে। ছোটবাবু পোশাকের ভেতর আটকে গেছে। হাতে দস্তানা। একটু শীতকাতুরে ছোটবাবু। পেছনে পড়ে থাকছে বন্দর। একেবারে সমুদ্রের গায়ে সিঁড়ির মতো ধাপে ধাপে পাহাড়। তার কোলে ঘর বাড়ি, লাল, নীল কাঠের বাড়ি। পাহাড়ের ওপরে ট্রেন লাইন, জাহাজ থেকে পাহাড়ের মাথায় রাতে বনি আর ছোটবাবু গাড়ির এনজিন ছুটে যেতে দেখেছে। কেমন ঘুরে ঘুরে অদৃশ্য হয়ে যায়, এনজিনের আলো। পাহাড়ের গাছপালার ভেতর একটা এমন আলোর বন্যা দেখতে ওদের অনেকক্ষণ ভাল লাগছিল। ওটা গাড়ির এনজিনের মতো মনে হয়েছে। আসলে ছোটবাবু জানে না ওটা কি!

    এখন সকাল বলে, এবং শীতের মরসুমে সবাই জামাকাপড় সেঁটে বেশ হাহা হিহি করতে করতে এনজিন রুমে নেমে যাচ্ছে অথবা ডেকে জল মারছে অথবা ফলঞ্চা বেঁধে মাস্তুল রঙ করছে। ইন্ডিয়ানদের পোশাক একেবারে বেঢপ। ছোটবাবুকে কিছুতেই আর আলাদা করে চেনা যাচ্ছে না। বনি বলল, ছোটবাবু যেভাবে তুমি ভাল্লুকের মতো ছুটছ—ঠিক উলটে পড়বে। একটু আস্তে যাও। ডেবিড অনেক মেয়ে দেখেছে, আলাদা করে তোমার না দেখালেও চলবে।

    আসলে বনি ছোটবাবুর সব পছন্দ করে। কিন্তু যখন দূরবীনে মেয়ে খুঁজে বেড়ায় বন্দরে তখন কেমন ক্ষেপে যায় বনি। সে কখনও কখনও ছোটবাবুকে এ নিয়ে ছোট বড় কথা বলে ফেলে। ছোটবাবু জানে ক্যাপ্টেনের আদুরে ছেলে—তার সঙ্গে ভাব করে থাকাই ভাল। তাকে রাগালে জাহাজে থাকা চলে না। তাছাড়া বড়মানুষের ছেলেরা একটু বাঁদর গোছের হয়, সে দিক থেকে তো জ্যাক ভীষণ ভালো। কোনও অহংকার নেই মনে হয়। আবার যখন মনে হয় জ্যাক ভীষণ অহংকারী তখন সে আর বোট-ডেক দিয়ে নিচে নামে না। ওর নামতে ভয় হয়।

    যেমন জ্যাক আর দাঁড়াল না। রাশভারি তার কথাবার্তা। গলার স্বর কিছুটা মেয়েলি। রাশভারি গলায় কথা বলতে চাইলে সেটা আরও বেশি মেয়েলি হয়। ছোটবাবু সেজন্য মাঝে মাঝে হেসে ফেলে। হেসে ফেললে জ্যাক আরও রেগে যায়। দুদিন তিনদিন তখন আর কথা বলে না। এ কদিনেই সে বুঝেছে, জ্যাক তাকে এ-জাহাজে নানাভাবে জ্বালাবে। এই যে সামনে পড়ে গেল, কেন যে বলতে যাওয়া, ওম্যান। না বললেই যেন ভাল ছিল, মেয়েদের কথা বলতে গেলে জ্যাকের চোখ মুখ কেমন হয়ে যায়। জ্যাক কি ওকে সাধুসন্ত বানিয়ে রাখার চেষ্টা করছে। সে তো তা নয়। এভাবে সে শৈশবের কথা মনে করতে পারে—কবে কোথায় কে যেন প্রাচীন শ্যাওলাধরা একটা ইঁটের ঘরে তাকে নিয়ে কি করেছিল। সে সেই থেকে ভয় পায়। অবশ্য এখন সে আর তেমন ভয় পায় না। সে তো ডেবিডের সঙ্গে বের হয়ে ডারবানে শিস পর্যন্ত দিয়েছে। ডেবিড খুব খুশী সে জন্য।

    এবং কেন যে এমন হয়, জ্যাক তাকে ভাল্লুক বলেছে। এখন শীতের রোদ ডেকে। জাহাজ সোজা এবার আটলান্টিকে পড়বে। তেত্রিশ ডিগ্রি বরাবর জাহাজ যাচ্ছে। শহর বন্দর ক্রমে দূরে সরে যাচ্ছে। ফানেলের ধোঁয়া সমুদ্রের জলে যেন এক মহামায়ার মতো, অথবা মনে হয় কেউ মোহিনী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে এই বিশ্বে এবং তার চুলের বাহার, উড়ছে অনবরত, সমুদ্রে, বাতাসে উড়ে যাচ্ছে।

    ভাল্লুক কথাটা মোটামুটি খারাপ। এমন খারাপ কথা এই প্রথম বলেছে জ্যাক। ছোটবাবুর মনে হল, জ্যাকের সঙ্গে সে কোন সম্পর্কই রাখবে না। জ্যাক তো ওদের ফোকসালে আসে না। এলেও খুব কম। যেন না আসারই নিয়ম। রবিবারে সবাই যখন সাফাই দেখতে বের হয়, ঠিক তখনও জ্যাক বোট-ডেকে দাঁড়িয়ে থাকে।

    তারপর মনে হল, ভাল্লুক কথাটা গালাগাল। ইংরেজিতে গালাগাল তেমন গায়ে লাগে না। একটা কথা অবশ্য ছেলেবেলা থেকেই সে শুনলে ক্ষেপে যায়। ব্লাডি কথাটা ওর কেন জানি সহ্য হয় না। সোয়াইন, বাস্টার, রাসকেল এসব কথা শালা শূয়োরের বাচ্চার মতো তত পাজি শব্দ নয়। সে ভাল্লুক কথাটাকে শালা শুয়োরের বাচ্চার মতো ভাবতে গিয়ে মুখ গোমড়া করে ফেলল। মুখ গোমড়া হলেই ভেতরে ভেতরে সে বেপরোয়া হয়ে যায়। সে তখন আর কিছু ভাবতে পারে না।

    সে ফের ছুটতে থাকল। তা না হলে ডেবিড হুইল-ঘরে চলে যেতে পারে। সে অফিসারস গ্যালি পার হয়ে ভেতরে ঢুকে গেল। তারপর দরজায় কড়া নাড়ল, সেকেন্ড সেকন্ড প্লিজ।

    ডেবিড দরজা খুলে বলল, কি ব্যাপার?

    —ওম্যান।

    —কোথায়?

    —এনজিন-রুমে।

    –বলছ কি!

    আর তখনই ছোটবাবু দেখল ওর প্রতিবিম্ব দর্পণে। একেবারে চেনা যাচ্ছে না তাকে। সে পোশাকের ভেতর হারিয়ে গেছে। শুধু মুখটা দেখা যাচ্ছে। মাংকি ক্যাপের জন্য সে কেমন ভুতুড়ে হয়ে গেছে। এমন মুখ এবং চেহারা হয় পোশাকের ভেতর আটকা পড়লে সে জানত না। বেশ মজা লাগছে দেখতে নিজেকে। সে নিজেই হেসে ফেলল, বলল, ছোটবাবু তুমি ভাল্লুক নও, একেবারে জাম্বুবান বলেই সে হাঁকল।—ওম্যান স্যার।

    —ইয়েস স্যার ও–ম্যা…….ন।

    ডেবিড ছুটছে, ছোটবাবু ছুটছে। ছোট চিৎকার করে বলছে, জাহাজে ওম্যান। ওরা ছুটে এসে এনজিন ঘরে ঢুকে গেল। আর চিৎকার করে বলতে থাকল ওম্যান। ওম্যান।

    —কোথায়।

    —আসুন না। দেখাচ্ছি। ওরা সিঁড়ি ধরে নিচে নেমে গেল।

    জাহাজে তখন খবর রটে গেল, যেমন খবর রটে যায় মৈত্রমশাই যাবেন সাগরসঙ্গমে, এণ্ড জাহাজিদের কাছে সাগরসঙ্গম, না হলে সামান্য দুটো চড়াই পাখির পাশে দাঁড়িয়ে ছোটবাবু বলবে কেন, স্যার মিসেস স্পেরো।

    —ইয়েস। ইয়েস।

    —স্যার, মিঃ স্পেরো।

    —ফাইন।

    ছোটবাবু বলল, স্যার নেমে যাচ্ছি, দেখছি, কিচ-কিচ করছে। কে কিচ কিচ করে! ওমা দুটো পাখি। ওদের আমি জানি, এই যে ছাই রঙের দেখছেন এটা মিসেস স্পেরো, আর এই যে দেখছেন, গলার কাছে সাদা রঙ ওটা মিঃ স্পেরো।

    তখন ডেবিড বলে উঠল, হ্যালো মিঃ এন্ড মিসেস হাউ ডু ইউ ডু।

    —খুব ভালো আছে সেকেন্ড। ছোটবাবু কখন যে কি বলে! সেকেন্ড, স্যার, যখন যা খুশি। আসলে সে খুব অন্তরঙ্গ হয়ে গেলে—সেকেন্ড বলে ফেলে। যখন অফিসার ভেবে ফেলে, তখন স্যার। সে বলল, শীতে ভীষণ কষ্ট পাচ্ছিল, এনজিনের গরমে বেশ আছে এখন। দেখছেন না কেমন পাখা ঝাড়ছে। আবার আমাকে আপনাকে দেখছে ঘাড় বাঁকিয়ে।

    —আমরা ওদের ডিস্টার্ব করছি না তো? সেকেন্ড বলল।

    —না, না। দেখছেন না আমাদের ভয় পাচ্ছে না।

    তারপর একে একে অনেকেই ছুটে এসেছিল। এসেই অবাক। দেখল মেজ-মালোম আর ছোটবাবু অতিকায় সার্কুলেটিঙ ফ্যানটার নিচে দাঁড়িয়ে আছে। তার নিচে মেন স্টিম-পাইপ, পাশে লম্বা রেলিঙ। রেলিঙে দুটো চড়ুই পাখি বসে পাখা ঝাড়ছে। উড়ছে। নাচছে গাইছে। মাঝে মাঝে কিচ কিচ করছে।

    পাগল যেমন ছোট তেমনি মেজ-মালোম। পাগল না হলে দুটো পাখি নিয়ে এরকম একটা হৈ- চৈ বাধিয়ে দিতে পারে! আর তখন মৈত্র ‘পরি’তে ছোটকে খুঁজছে। ওরা সারেঙকে বলে আটটা বারোটা ওয়াচ চেয়ে নিয়েছে। এটা সাধারণত সারেঙের ওয়াচ, কিন্তু সারেঙ মৈত্রের কথা ভেবেই হোক অথবা ছোটবাবুর কথা ভেবেই হোক ওয়াচ বদলে নিয়েছেন। আটটা বেজে গেছে। মৈত্র দেখল, ছোট নামেনি। সকালের চারটা-আটটার পরীদারেরা উঠে যাচ্ছে। মৈত্র এসেই স্টিম দেখে নিয়েছে। এখন স্টিম তর-তর করে নেমে যাবে। ফার্ণেসের ছাই ঝেড়ে দিতে হবে। র‍্যাগ মারতে হবে। অমিয় চুপচাপ উইন্ড-সেলের নিচে বালতি হাতে দাঁড়িয়ে আছে, ওদিকে ছোটবাবুর দাঁড়িয়ে থাকার কথা। কিন্তু সে নেই। এ বেশ ঝামেলা। বেশ বাবুটি বের হয়ে কোথায় যে চলে গেল। কেউ তো দাঁড়িয়ে থাকবে না। আগয়ালারা তিনটে বয়লার থেকে একেবারে সোজা সব আগুন টেনে ফেলে দিচ্ছে, এবং পর পর সাত আট বেলচা কয়লা হাকড়ে বালব্ খুলে দিচ্ছে। পায়ের কাছে আগুন ধক্ ধক্ করে জুলছে। স্টোক-হোলড লাল হয়ে গেছে তাপে। কেউ নিঃশ্বাস নিতে পারছে না। একা অমিয় জল মেরে আগুন আয়ত্তে আনতে পারছে না। মৈত্রকে ছোটাছুটি করতে হচ্ছে। সে এখন ছোটবাবুর হয়ে ক্রমান্বয়ে বালতি বালতি জল মেরে যাচ্ছে। ছাই টেনে জড় করছে। আর মাথায় রক্ত উঠে যাচ্ছে রাগে। কোথায় যে গেল! সে যেতেও পারছিল না। মোটামুটি সব ঠিকঠাক না করে স্টোক-হোলড ছেড়ে যেতে পারছে না। তাহলে স্টিম তর তর করে নেমে যাবে। স্টিম নেমে গেলে কেলেঙ্কারী। সে কোনরকমে মাথা ঠান্ডা রেখে যখন দেখল বেশ হাওয়ায় ফার্নেসের আগুন একবারে লাল, স্টিম- গেজের কাঁটা লাল দাগটা বরাবর থর থর করে কাঁপছে, তখনই সে দু-লাফে এঞ্জিনরুমে ঢুকে গেল। ছোটবাবুকে যেখান থেকে হোক ঘাড় ধরে নামাতে হবে। না হলে লজ্জা হবে না।

    সে ওপরে উঠে অবাক। মেজ-মালোম আর ছোট দুই বন্ধুর মতো কথা বলছে। তিন নম্বর মিস্ত্রি নিচে দাঁড়িয়ে গজ গজ করছেন। হেল, এমন বলছেন। তিন নম্বর মিস্ত্রির কাছে টিন্ডালের বদনাম হবে। সে এটা দেখে আরও রেগে গিয়েছিল, কিন্তু কাছে গিয়ে মেজ-মালোমের সঙ্গে ওর এমন অন্তরঙ্গ কথাবার্তা শুনে আর ঘাড় ধরতে ইচ্ছে হল না। দুজন অসমবয়সী মানুষ জাহাজে এসে কেমন ছেলেমানুষ হয়ে গেছে।

    মৈত্র ডাকল, ছোট।

    ছোট পেছন ফিরে তাকিয়ে জিভ লম্বা করে দিল, একেবারে ভুলে গেছি। বলেই আর দাঁড়াল না। এক দৌড়ে সে ওপরে উঠে গেল, টুইন ডেক পার হয়ে গেল। কিনার অস্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে। শহর বন্দর দেখা যাচ্ছে না। সমুদ্র সামান্য ফের অশান্ত হয়ে উঠছে।

    মৈত্র ওকে একটাও চড়া কথা শোনাতে পারল না। সে নেমে এসে বলল, এই অমিয় হাত লাগা।

    —ছোটকে পেলি না?

    —পেয়েছি।

    —কি করছে?

    —বাবু ওম্যান, আবিষ্কার করে মেজ-মালোমের সঙ্গে ওম্যান সম্পর্কে একটা বড় লেকচার দিচ্ছে। স্টোক-হোলড, খোলের সব চেয়ে নিচুতে বলে, ওপরে কি ঘটে, খবর রাখা ঠিক হয়ে ওঠে না। এখন এই যে এত বড় একটা খবর জাহাজে রটে গেল, অমিয় তার বিন্দুবিসর্গ জানে না। সে কেমন অবাক হয়ে বলল, মৈত্র, বলিস্ কি!

    —ঠিকই বলছি, ওম্যান!

    —তার মানে মেয়েছেলে!

    —হ্যাঁরে বাবা, ওম্যানের বাংলা মানে মেয়েছেলে, শালা তোর বাবাতো তোকে ইংরেজি স্কুলে পড়িয়েছিল রে। সাহেব করার ইচ্ছা ছিল, তা এখন ওম্যানের বাংলা মানেটা গুলিয়ে ফেলছ! কয়লায়ালা আর কাকে বলে!

    —সত্যি বলছিস?

    —মিথ্যা বলতে যাব কেন।

    –কে ধরে এনেছে?

    —কেউ না। নিজেই জাহাজে উঠে এসেছে।

    —কোথায় নেমে যাবে?

    —সে জানি না।

    —মাইরি। আমি মরে যাব মৈত্র। বল, সব খুলে।

    আগয়ালারা এসে জড় হয়েছে। মৈত্র ওদের সঙ্গে একটু রাশভারি কথাবার্তা বলে থাকে। এই যে মিঞারা কাম কর, খাড়ইয়া থাইক না। স্টিমের অবস্থা ভাল না। ওরা স্টিম দেখতে সরে গেলে মৈত্র বলল, চালা, হাত চালা। সে অমিয়র কথারও জবাব দিল না। এ্যাস রিজেক্টারে সে বেলচে মেরে ছাই তুলতে থাকল।

    এবং তখনই দেখা গেল ছোটবাবু নেমে আসছে। নীল পোশাক সে পরেছে। যা পরে সে পরি দেয়, সেই পোশাক। মাথায় নীল রঙের টুপি। নিচে নেমে একটু যেন লজ্জায় পড়ে গেল। বেলচেটা নিতে গেলে মৈত্র বলল, যা, ওপরে যা। অমিয়, তুইও উঠে যা। কয়লা যা খাচ্ছে।

    বাকি কাজটা মৈত্র করবে। আগয়ালাদের নিয়ে সে ফাঁকে ফাঁকে হাতে হাতে কাজটা সেরে ফেলবে। আগয়ালারা এটা করে থাকে। কারণ মৈত্রর মুখের ওপর তারা কথা বলতে পারে না। আগে কয়লায়ালাদের কাজ ছিল, সব কাজ কামের পর তাদের চানের জল তোলা। এবারে সারেঙসাব তাও বন্ধ করে দিয়েছেন। এ ভাবে কয়লায়ালারা বেশ মজা পেয়ে যাচ্ছে। ওরা মৈত্রের সামনে কিছু না বললেও নিজেরা ভেতরে ভেতরে সমালোচনা করতে ছাড়ছে না। কখনও কখনও এটা যে সারেঙসাবের কানে না গেছে এমন না। তিনি তখন বলেছেন, কেন করবে? তোমাদের চানের জল কয়লায়ালারা কেন গরম করবে। আগে করত, তোমরা ওদের বয়লারে কয়লা মারা শেখাতে, অসুখে বিসুখে অথবা কেউ কোন বন্দরে, নেমে গেলে, কাজের লোক হয়ে যেত কয়লায়ালা। বাড়িয়ালা খুশি হয়ে লিখে দিতেন সফরে কে কি কাজ করেছে। এখন তো বাপজানেরা তা আর হচ্ছে না। একটা সফর সেরে যেতে পারলেই আগয়ালা। তারপর কাজ দেখানোর পালা। সেটা তোমাদের হাতে না, সেটা সাহেবদের হাতে।

    সুতরাং আর এ-নিয়ে বাড়াবাড়ি হয়নি। অমিয় বেলচে কাঁধে ওর, বাংকারে চলে যাচ্ছে। উঠে যাবার সময় সে লারে, লা লা বলে গান গাইছিল। অমিয়র চুল খাটো করে ছেঁটে দিয়েছে মৈত্র। চুল কাঁটার লোক না থাকলে যা হয়, মৈত্র ওদের চুল ছেঁটে দেয়। থ্যাবড়া ছাঁট। অমিয় মাথায় হাত দিয়ে মাঝে মাঝে বলতে ছাড়ে না, শালা চুল কাটতে কাটতে বউএর কথা ঠিক ভাবছিল।—দ্যাখ চুলটা পেছনে কি করে দিয়েছে!

    ছোটবাবু দেখল, সত্যি চুলটার ভীষণ বাজে ছাঁট হয়েছে। এ-নিয়ে অমিয় তিন চারবার বলেছে। এখন বলছে, এজন্য যে, সে ছোটর কাছে কিছু জানতে চায়। সে বলল, ছোটবাবু কে এসেছে রে জাহাজে।

    —কে আসবে!

    —খুব র‍্যালা মারছিস!

    —র‍্যালা মানে।

    —ঐ খুব মেয়েছেলে নিয়ে ড ডট্। আমার যে কি হবে না! মাথার চুলটা এমন বাজে হেঁটে দিল। কে জানত বল, জাহাজে মেয়েছেলে উঠে আসবে। তারপর একটু থেমে বলল, কোথায় যাবে, সেন্টিস, মন্টিভিডিও না বুনোসাইরিস!

    ছোটবাবু হেসে দিল। ধুস্, তুই যে কি না! তোকে কে বলেছে জাহাজে মেয়েছেলে প্যাসেঞ্জার যাচ্ছে! কেপটাউনে গেলে তবু হয়তো দেখা যেত মেয়েটেয়ে, পোর্ট এলিজাবেথ থেকে কে আর উঠবে! আমাদের নসিব খারাপ, জাহাজ সোজা আটলান্টিকে পড়ছে।

    এদিকে তখন সুট থেকে গড় গড় করে কয়লা আগয়ালারা টেনে নিচ্ছে তো নিচ্ছেই। মৈত্র খেয়াল করছে না। মাথার ওপরে বাবুরা দাঁড়িয়ে গল্প করছে। সে এ্যাস-রিজেকটারে ছাই ফেলে দিচ্ছে। হঠাৎ মনে হল, ঠিক মাথার ওপর প্রায় ফুট বিশেক উঁচুতে অন্ধকারে দাঁড়িয়ে গল্প করছে তারা। এবার সে চিৎকার না করে পারল না, এই হারামজাদা, রাসকেল, তোরা ভেবেছিস কি! আর সঙ্গে সঙ্গে দেখা গেল সব ফাঁকা। সঙ্গে সঙ্গে দুটো ছায়া দু’দিকে অদৃশ্য হয়ে গেল।

    মৈত্র ওপরে মুখ তুলে তখনও চিৎকার করে যাচ্ছে, আমি কিছু করতে পারব না। ভেবেছিসটা কি! সুট ভরতে না পারলে, ওয়াচের পর খেটে যেতে হবে। রোজ রোজ আমি পারব না। পরির বদনাম তোমাদের জন্য কেন নেব!

    ছোটবাবু ঢুকে দেখল, কয়লা একেবারে অতলে। সে লম্ফটা হাতে নিয়ে সুটের পাশে দাঁড়াল। চারপাশটা ঘুটঘুটে অন্ধকার। ঠিক খাদের নিচে, মানুষ একা অন্ধকারে লম্ফ হাতে দাঁড়ালে যেমন দেখায়, তেমনি ভুতুড়ে। সে আর দাঁড়াল না। ডারবান থেকেও কিছু কয়লা নেওয়া হয়েছে। টুইন-ডেকের দু’দিকে কয়লার ডাই। এখন এক নাগাড়ে চব্বিশ-পঁচিশ দিন সমুদ্রে ভেসে যেতে হবে। যত ওরা দক্ষিণে নেমে যাবে তত শীত বাড়বে। ডেকের কয়লা মাঝ দরিয়ায় না গেলে ফেলা হবে না হয়তো নিচে। সে এবার বুঝতে পারল ঠিক এক নাগাড়ে ঘন্টা চারেকের মতো কয়লা ফেলতে না পারলে সুট সে ভরতে পারবে না।

    এবং এ-ভাবে এক সংগ্রামের মতো, কখনও কখনও ভয়ে রাতে ঘুম আসে না, সকাল হলেই ওয়াচ, অথবা রাত আটটা বাজলেই ওয়াচ। বাংকে শুয়ে থাকলেও মনে হয়, কেউ যেন অনেক দূরে হেঁকে যাচ্ছে, যোয়ানলোগ টান্টু। এই এক শব্দ, অনেকটা টেনি টরেন্টো শব্দের মতো। গর্ভিনী তিমি শিকার করে ফেরার সময়, সমুদ্রে এমন একটা শব্দ শিকারীরা শুনতে পায়। গর্ভিনী তিমিরা কত যে অবলীলায় ভেসে ভেসে বেড়ায় সমুদ্রে। ছোটবাবুও বাংকে শুয়ে থাকলে এমন সব শব্দ শুনতে পায়। বুক তার ধুকপুক করতে থাকে সে নিজের এই আতঙ্কের কথা কাউকে বলে না। যেন গ্রাহ্য করছে না, সে অন্য সবার মতো কাজ করতে পারছে এটা প্রমাণের জন্য আর এক মুহূর্ত নষ্ট করল না। দরজার কাছে সে লম্ফটা রেখে এল। মেডিসিন কারটা সে ঠেলে নিয়ে গেল সামনে। সুট থেকে কয়লা দূরে সরে যাচ্ছে ক্রমশ। সে নুয়ে দ্রুত বেলচা দিয়ে গাড়ি ভরে ফেলল। তারপর দু হাতে সামনে ঠেলে দিল গাড়িটা। এখন আর ভারি গাড়িটা মাঝে মাঝে কাত হয়ে পড়ে যায় না। সে ঠিক ঠিক সুটের মুখের কাছে নিয়ে দাঁড় করিয়ে দিতে পারে, ঢেলে দিতে পারে, সে গাড়ি টানছে, কয়লা তুলছে, সুটে এনে ফেলছে। লম্ফটা দপ দপ করে জ্বলছে, আবার কখনও ঘন অন্ধকার, ওকে ছায়ার মতো মনে হয় তখন। সে ঘেমে নেয়ে যাচ্ছে। ওর জামা প্যান্ট ভিজে গেছে।

    বাংকারে বুটের শব্দ, ঝম ঝম কয়লা ভরার শব্দ, থপ থপ করে হেঁটে যাবার শব্দ, গড় গড় করে কয়লা সুটে ফেলে দেবার শব্দ। এ-ভাবে সব নানা রকমের অতিকায় শব্দ ক্রমে গড়াগড়ি খেতে থাকলে, একসময় মৈত্র এসে দেখল, ছোট এক মুহূর্ত বিশ্রাম নিচ্ছে না। মৈত্র বলল, আমি ভরছি, তুই ফেল।

    —না, তুমি যাও। আমি ঠিক পারব।

    —ওয়াচের লোকেরা নেমে গেছে।

    —আর ক’গাড়ি ফেললেই হয়ে যাবে। তুমি চলে যাও। পেটে আগুন জ্বলছে। খেতে বসে দেরী করতে পারব না।

    অমিয় এবং মৈত্র উঠে গেল। ছোটবাবু এখানেই ছোটবাবু। সে কারও সাহায্য না নিয়ে কখনও কখনও খুবই যে সে দায়িত্বশীল বুঝিয়ে দিতে চায়।

    মৈত্র এবং অমিয় সিঁড়িতে পা রাখার সময় শুনল, অনেকটা হিসাব রাখার মত, ছোটবাবু গাড়ি টেনে নিচ্ছে, আর হরে রাম বলছে, এক, দুই হরে রাম, হরে হরে এক দুই, গাড়ি ফেলে দিলে তিন, চার পাঁচ এবং শেষে একসময় যখন দেখল কয়লায় ভরে উঠছে সুটের মুখ সে একেবারে ছাদের দিকে বেলচে ছুঁড়ে দিয়ে, গাড়িটা কয়লার কাছে লাথি মেরে উল্টে সোজা দৌড়ে বোট-ডেক পার হয়ে গেল।

    আসলে রোজ রোজ সে এভাবেই কাজের শেষে যেন কিছু আবিষ্কারের মতো চিৎকার করে ওঠে, সাবাস ছোটবাবু, সুট ভরে মাথা কিনে নিলে!

    কারণ কাজটা তার কাছে প্রায় দুর্গম গিরি প্রান্তর পার হয়ে যাওয়ার মতো। সে রোজ রোজ এভাবে ভরে ফেলে সাংঘাতিক কিছু করে যাচ্ছে। সে জীবনের কাছে হেরে যাচ্ছে না। যত এমন ভাবে, তত বেঁচে থাকার আকাঙ্খা বাড়ে। সে ভাল করে স্নান করে। সে ওয়াচের জামা প্যান্ট পাল্টে বাথরুমে একেবারে উলঙ্গ হয়ে যায় এবং গরম জল ঢেলে সে যখন স্নান করে তখন মুখে শরীরে সাবানের ফেনা। সারা শরীরে অজস্র সাবানের ফেনা এবং বুদবুদ, সে মাঝে মাঝে হাত পা ঘসতে ঘসতে টের পায়, পেশী শক্ত হয়ে যাচ্ছে, সমুদ্রের বাতাসে শরীরের রঙ ক্রমশ উজ্জ্বল হয়ে যাচ্ছে। জল ঢেলে দিলে শরীরে বিন্দু বিন্দু ফোঁটা সারা শরীরে আর শরীরময় আকাঙ্খা। সে চুপচাপ তখন কেমন শুধু দাঁড়িয়ে থাকে। তার কিছু ভাল লাগে না তখন। মার চিঠি এল না, কেউ তাকে চিঠি দেয় না। সে নিরুদ্দেশে, সবাই হয়তো ভেবেছে, ছেলেটা বেঁচে নেই।

    তখন অমিয় ডাকল, কিরে কতক্ষণ ধরে চান করছিস। তোর ক্ষিদে পায় না?

    সে সত্যি খুব ক্ষুধার্ত। সে এক মুহূর্ত আর দেরি করতে পারল না। এতক্ষণ যে শরীর অবশ অবশ মনে হচ্ছিল, সে যেন জোর করে তা অস্বীকার করতে চেয়েছে। সে আর দেরি করতে পারছে না। পাজামা পরে নিল। জামা, গরম পুল-ওভার পরে সে সোজা মেসরুমে ঢুকে বলল, দে।

    টেবিলে যে যার মতো খাচ্ছে। কেউ নিচে বসে খাচ্ছে, কেউ টেবিলে বসে খাচ্ছে। বড় টিনের ভেতর ডাল। কাঠের হাতা, ডেকচিতে ভাত। ডাল যে যার মতো তুলে নিচ্ছে। ‘বিশু’র সবাই গোল হয়ে বসে গেছে খেতে। যাদের খাওয়া হয়ে গেছে তারা এখন ডেকে মাদুর পেতে নামাজ পড়ার আগে দাঁত খুঁটছে। রুপোর খড়কে। গলায় ঝুলানো। ছোটবাবু এসব কিছুই দেখছিল না। সে আসলে মুখ বুজে খাচ্ছে। আলুভাজা, ডাল, মাংস হয়নি। মটন হলে সে খায়, না হলে খায় না। বাঁধাকপির সঙ্গে মাংসের ছোট ছোট টুকরো দিয়ে বেশ একটা সুস্বাদু খাবার ভান্ডারি তৈরি করেছে। খেতে ভাল হয়েছে বলে সে গলা পর্যন্ত খেয়ে যাচ্ছে। আর মাঝে মাঝে অমিয়, মৈত্র দেখছে, ছোটবাবুকে। কিছু বলছে না। বেশ খেয়ে গেল ছোটবাবু। খাওয়া হলে মৈত্র বললে, বাঁধাকপি দিয়ে গোস্ত হয়েছে। কেমন লাগল রে?

    —খুব ভাল হয়েছে। ভান্ডারি জ্যাঠা বেশ রেঁধেছে। জ্যাঠার হাত যা খোলে মাঝে মাঝে! ভান্ডারি তখন গ্যালি থেকে গলা বের করে হঠাৎ জিভে কামড় দিয়ে ফেলেছে।—তুমি খাইলা জ্যাঠা!

    —হ খাইলাম। ভান্ডারি বুড়ো মানুষ, রোগা রোঁয়া রোঁয়া চুল মাথায়। তাকে খেতে শুনে এমন জিভ বের করে দিয়েছে কেন সে তার কিছুই বুঝতে পারল না।

    সে বলল, না খাইলে পারতা।

    —ক্যান এমন কথা কন!

    ভান্ডারি কিছু না বললেও সে বুঝতে পারল, সে আজ বিফ খেয়েছে। সে তো কিছু বোঝেনি, সে তো বুঝতে পারেনি, বিফ কি মটন! তা ছাড়া ইদানিং ওদের জন্য ভান্ডারী আলাদা মটন বাটলারের কাছ থেকে বলে কয়ে নিত। কিন্তু আজকে নানা কারণে এটা হয়তো সম্ভব হয়নি। ভান্ডারিকে চারপাশ সামলাতে হয়। সব কিছু এক হাতে করতে হয় মানুষটাকে। খেয়াল না থাকার কথাই! তা ছাড়া ওর তো কিছু হচ্ছে না, বমি হচ্ছে না, না বমি একেবারেই পাচ্ছে না। তবে কি এটা জুজুর ভয়! সে যেন কেমন সাংঘাতিকভাবে বলে ফেলল, খেতে তো জ্যাঠা খারাপ লাগল না। বেশ লাগে খেতে।

    মৈত্র বলল, সহসা চিৎকার করে বলল, থ্রি চিয়ার্স ফর ছোটবাবু।

    ছোট উঠে পড়ল। তবু মনের ভেতর এক আশ্চর্য অহমিকা আছে, কিংবা দীর্ঘ দিনের সংস্কার, সে একেবারে তার সবকিছু উড়িয়ে দিতে পারে না। যত এমন ভাবছে, মনে হচ্ছে, না এটা ঠিক না, কাল আবার হয়তো আগে জানতে পারলে গা ঘিন ঘিন করবে। সে ভাবল, আর কখনও মাংসের ব্যাপারে কোন কথাবার্তা বলবে না। যেমন সবাই খায় মুখ বুজে খেয়ে উঠবে।

    তখন ভদ্রা জাহাজের স্মৃতি তাকে কেন যে তাড়া করে—কে যেন ডেকের ওপর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে, আর কে যেন বলছে, বিফ খানে সাক্‌তা! তোমকো বিফ্ জরুর খানে হোগা।

    গোটা ব্যাপারটা তার কাছে এখন হাস্যকর। এমন সুন্দর দিন যেন হয় না। জাহাজ এখন কোথায়? বোধহয় ভারতবর্ষের শেষ সংযোগটুকু আজ মুছে যাবে। কথা আছে জাহাজ দুটোর ভেতর আটলান্টিকে পড়বে। ঠিক সময়টা কেউ জানে না। আবার আটটায় ওয়াচ। এখন আর গিয়ে ফোসকালে চিৎপাত হয়ে শুয়ে লাভ নেই। সেই যে দূরবর্তী এক উপকূলে তার বাসভূমি ফেলে এসেছে, সেই যে ক্ৰমান্বয়ে জাহাজের প্রপেলার কেবল ঘুরতে থাকল, সেই যে সে দিনরাত জাহাজ ডেকে পায়চারি করতে করতে দেখল, সমুদ্র উত্তাল, ভয়াবহ, ওর শেষ বাসভূমির গাছপালা ছায়া ছায়া হয়ে যাচ্ছে, ক্রমে সেটা মেঘের মতো দিগন্ত রেখায়, তারপর মিশে গেছে আকাশের সঙ্গে, তারপর সেই অসীম যাত্রা, সমুদ্রে সমুদ্রে ওরা ভারত মহাসাগর পাড়ি দিয়ে চলেছে, আজ ওরা শেষবারের মতো তাও পার হয়ে যাবে। সে এখানে দাঁড়িয়ে থাকবে। নিচে এখন নামবে না। ডেকের ওপর দাঁড়িয়ে থাকবে শুধু। দাঁড়িয়ে থাকতে তার ভাল লাগবে। রেলিঙে দাঁড়িয়ে মেজ-মালোমকে ডেকে বলবে, স্যার বলবেন, কখন জাহাজ আটলান্টিকে পড়ছে।

    সে এ-ভাবে যখন দাঁড়িয়েছিল, কেমন যেন একাকী, নিঃসঙ্গ। সে শীতের জন্য বেশ গরম পোশাক, পোশাক বলতে পুরোনো বাজার থেকে কেনা পোশাক। সে তাই সাদা প্যান্টের ওপর পরেছে। ঘন চুল সমুদ্রের হাওয়ায় নীল দেখাচ্ছে। আকাশ পরিচ্ছন্ন। তবু সমুদ্রে বেশ ঢেউ আছে। সে সোজা দাঁড়িয়ে থাকতে পারছে না। জাহাজে সামান্য পিচিং, সে এখন আর এ-সব আমল দেয় না। এই পিচিং তার ভাল লাগে। ওর কেমন তখন চোখে ঘুম জড়িয়ে আসে। দূরে, দিগন্তরেখায় সব পাখিরা যায়, কোথায় যে যায়, উড়ে উড়ে কোন মহাসমুদ্রে যায় সে জানে না। সে তখন কেবল ওদের অবাক হয়ে দেখে।

    মৈত্র ফোসকালে ছোটবাবুকে দেখতে না পেয়ে ওপরে উঠে এল। ওপরে উঠে দেখল, টুইনডেকে রেলিঙে দাঁড়িয়ে ছোটবাবু সমুদ্র দেখছে। ওর মনে হল বিফ খেয়ে বোধ হয় ছোটবাবুর মন ভাল নেই। কাছে গিয়ে সে দাঁড়াল। কিছু বলতে প্রথমে সে সংকোচ করল। তারপর যেন আর না বলে পারল না। কিরে বিফ খেয়েছিস বলে মন খারাপ!

    তখন মেজ-মালোম, ডেবিড চিৎকার করে ছোটকে বলচে, সামনে আটলান্টিক ছোট। ভালো করে দ্যাখো। আটলান্টিক কি বিশাল, মহান সমুদ্র। দ্যাখো। দেখলে তোমার আর দুঃখ থাকবে না।

  • দশ

    দশ

    ।। দশ।।

    সাগরের জল নীল, সব সাগরের জল নীল। যেখানে যখন সমুদ্র আলাদা নামে ভাগ হয়ে গেছে, ঠিক সেখানে তারা এমন কিছু দেখতে পায় না, যা দেখে সমুদ্রকে আলাদা নামে চেনা যায়। সেই নীল রঙ, সেই শান্ত নিরিবিলি আকাশ, সেই উড়ুক্কু মাছেদের উড়ে উড়ে জলের ওপর খেলা। তীরের মতো ওরা হাওয়ায় ভাসতে ভাসতে আবার জলে ডুবে যায়। এবং সমুদ্র-পাখীরা কখনও কখনও দেখা যায় পেছনে উড়ে আসছে। ঝড়ের সময়ও ঠিক তেমনি। যেন এক ভয়ঙ্কর সমুদ্রের ভেতরে, ভয়ঙ্কর সব ঢেউ আর মেঘলা আকাশের নিচে জাহাজ ছোট কাগজের নৌকার মতো। জাহাজের ওপর দিয়ে ঝড়ের দাপট, অথবা ঢেউগুলো কি আশ্চর্যভাবে যে ডেকের ওপর দিয়ে কখনও বোট ডেকের ওপর দিয়ে ভেসে চলে যায়। যেন সমুদ্র আর জাহাজের এক খেলা, মায়ার খেলা, অথবা লুকোচুরি খেলা। জাহাজ কখনও কখনও ঢেউয়ের ভেতর হারিয়ে গিয়ে বিশাল সমুদ্রের সঙ্গে তামাসা করে। আবার ভেসে উঠলে, প্রচন্ড রোষ সমুদ্রের, সে প্রবল বেগে আছড়ে পড়তে চায়। আর সামান্য জাহাজিরা তখন স্টোক-হোলডে বয়লারের সঙ্গে, আগুনের সঙ্গে লড়াই করতে করতে কত সহজে এইসব রোষ থেকে জাহাজকে যে রক্ষা করে থাকে। মানুষ এ-ভাবে সমুদ্রের সমস্ত অহঙ্কার ভেঙে দেয়। সে তার ঢেউ ফালা ফালা করে একদিন ঠিক শান্ত আকাশের নিচে চলে যায়। মনেই হয় না সমুদ্র সেদিনও জাহাজটাকে কি যে দুর্গতির ভেতর ফেলে দিয়েছিল। সমুদ্র ভালমানুষের মতো একেবারে সরল সহজ হয়ে গেলে, জাহাজিরা কাজের শেষে রেলিঙে ঝুঁকে দাঁড়িয়ে থাকে। অবসর সময়ে ছোটবাবুর সমুদ্র দেখা বাদে যেন আর কাজ থাকে না তখন। অথবা বর্ণময় দ্বীপের অসংখ্য গাছপালা।

    এবং এভাবে ছোটবাবু কখনও ডেকে, কখনও ফল্কায় অথবা মধ্যরাতে ঘুম না হলে সে একাকী উঠে আসে। সবাই ঘুমোচ্ছে। কেবল ডগ-ওয়াচে ওয়াসিন কিংবা অন্য কোনও ডেক-জাহাজি পাহারায় আছে। আর ব্রীজে ছোট-মালোম। স্টোক-হোলডে ফায়ারম্যান, টিন্ডাল। ফানেলের গুঁড়িতে উঠে গেলেই দেখা যাবে যেন পাতালে ক’জন ক্ষুদ্রাকৃতি মানুষ, ফার্নেসের দরজা ঠেলে র‍্যাগ মেরে ওল্টে পাল্টে দিচ্ছে আগুন। ওদের মুখগুলো আগুনে ঝলসে উঠলে বোঝা যায় মধ্যরাত্রিতে কেউ জেগে থাকে না, শুধু ওরা জেগে আছে। এনজিনে জেগে আছেন তিন নম্বর মিস্ত্রি। সে চুরুট খাচ্ছে আর মাঝে মাঝে স্টিম ঠিক আছে কিনা দেখছে। জেনারেটর ঠিকমত কাজ করছে কিনা লক্ষ্য রাখছে। ব্লিজ পাম্প চালিয়ে দিচ্ছে মাঝে মাঝে। চারপাশটায় লক্ষ্য রেখে, যেমন সে মাঝে মাঝে সার্কুলেটিঙ পাম্পে হাত দিয়ে দেখছে খুব বেশী গরম হয়ে গেল কিনা জলটা—এভাবে শুধু জেগে থাকা। অনেক উপরে ঠিক স্কাই-লাইটের ফাঁকে দেখা যায় আকাশটা ক্রমে সরে যাচ্ছে। কখনও মনে হয় আকাশটা ভীষণ দুলছে। এ-ভাবে জাহাজ ক্রমাগত চলছে।

    ক্রমাগত দিনের পর দিন এ-ভাবে শুধু চলা। জাহাজের চেহারা ওয়াচে ওয়াচে পাল্টে যায়! সমুদ্রে মধ্য রাতের চেহারা যেন সবচেয়ে নিঝুম। এবং এ-সময় কাপ্তানের ঘরে কোন আলো জ্বালা থাকে না। পোর্টহোল দিয়ে উঁকি দিলে দেখা যায় বড়-মিস্ত্রি একজন অসহায় বালকের মতো কম্বলের নিচে পা মুড়ে শুয়ে আছে। এনজিনের শব্দ কেবল উঠে আসে ভেতর থেকে, আর সব আলো জ্বালা ডেকে, উইংসের আলোগুলো মায়াবী এক জগত তৈরী করে দেয়। গভীর নীল সমুদ্রে সাদা জ্যোৎস্নায়, সাদা জাহাজ গভীর রাতে যখন যায়, তখন এক ছোট্ট সচল নগরী অথবা যেন জাহাজের সুন্দর সুচারু গতি দেখলে ঈশ্বরের পৃথিবীকে ভীষণ ভালবাসতে ইচ্ছে করে।

    মধ্যরাতে ছোটবাবুর কখনও কখনও ডেকের ওপর দিয়ে হেঁটে বেড়াতে ভাল লাগে। সহসা কেউ দেখলে ভূত টুত বলে চিৎকার পর্যন্ত করতে পারে। কারণ কোয়ার্টার মাস্টার মহসীনের বিশ্বাস জাহাজে যেমন সবাই আছে, তেমনি ভূতও আছে। জাহাজে মানুষ থাকবে, ভূত থাকবে না, সে বিশ্বাস করতে পারে না। সে তার সফরের কত এমন সব ভূতের যে গল্প করেছে। এবং এ-সব গল্প শুনলে, ডেকে একা ঘুরে বেড়াতে সত্যি ভয় লাগে। যেমন একটা ভূত ছিল, সিটি অফ পানামাতে। সে ডেকে মধ্য রাতে কোন জাহাজি পেলেই একেবারে ঠেলে সমুদ্রে হারিয়া করে দিত। যেমন একবার একটা ভূত একজন জাহাজির গলায় দড়ি লাগিয়ে একেবারে মাস্তুলের ডগায় ঝুলিয়ে দিয়েছিল। কাপ্তান নানাভাবে ভূতটাকে খুঁজে বেড়ালেন। তারপর দেখা গেল কাপ্তান নিজেই একেবারে চিৎপাত হয়ে পড়ে আছেন ইনজিন ঘরে। জ্ঞান ফিরে এলে তিনি বলেছিলেন, কেউ তাকে যেন, একটা বাতাস টাতাস হবে, ঠেলে নিচে ফেলে দিয়েছে।

    এবং ছোটবাবু ঠিক দুপুর রাতে একা একা ঘুরে বেড়ালে—সেই সব ভূতের নানারকম কীর্তিকাহিনীর কথা মনে করতে পারে। ওর ভয় যে না হয়, তা নয়, তবু এই নিঃসঙ্গতায়, এবং সমুদ্রের গভীরে, অর্থাৎ হাজার হাজার মাইল এ ভাবে সমুদ্রের ভিতর দিয়ে যাওয়া এবং মধ্যযামিনীতে কখনও কখনও একা দাঁড়িয়ে থাকা এক ভীষণ রোমাঞ্চ সে বুঝতে পারে। এইসব মধ্যযামিনীতে সে কি যে প্রলোভনে পড়ে যায়! তার মনে হয় সে এ ভাবে একদিন ঠিক এই পৃথিবী প্রদক্ষিণ করে ঘরে ফিরে যাবে। মানুষের কাছে এর চেয়ে বড় কি আছে! কারণ সে জানে ঘরে ফিরে গেলে, কত সব গল্প, মা চুপচাপ কুপি জ্বেলে বলবে, তারপর! ভাইবোনগুলো বলবে, তারপর

    তারপর কি, সে নিজেও জানে না। কারণ, কোনও চিঠি কোথাও থেকে না এলে সে বুঝতে পারবে না ওরা কোথায় আছে। তখন ডেকে দাঁড়িয়ে তার কেমন গলা ধরে আসে। তার এত অহংকারের উপার্জন কোনও কাজে এল না। মানি অর্ডারের টাকা কোম্পানীর ঘরে ফিরে গেছে।

    .

    ঠান্ডায় জাহাজিরা কাঁপছে, সমুদ্র থেকে ঠান্ডা বাতাস উঠে আসছে। গ্যালি থেকে কেউ যেতে চাইছে না। বুড়ো মানুষ ভান্ডারী, সবাই এসে গ্যালিতে ভিড় করলে ভীষণ বিরক্ত হয়। একে ছোট্ট জায়গা, সবাই হাত সেঁকলে, সে দাঁড়ায় কোথায়। তার যে কত কাজ! সে উনুনে বড় তামার ডেকচিতে ডাল, আর ভাত বসিয়েছে। একটা বড় কড়াইয়ে সে চর্বি দিয়ে রুটি ভাজছে। যে যার মতো তুলে নিচ্ছে, এবং রোদে দাঁড়িয়ে খাচ্ছে।

    এবং চড়ুই পাখি দুটো বসে আছে রেলিঙে। ওরাও শীতে কাঁপছে। এদের জন্য ছোটবাবু ভেবেছে একটা বাসা বানাবে। বাসাটাতে খড়কুটো দিয়ে এমন গরম জায়গা বানাবে, যাতে ওদের থাকতে কোন অসুবিধা না হয়। ছোটবাবু বুঝতে পারল না বোট-ডেকের রেলিঙে ওদের কি দরকার বসে থাকা। এখন এনজিন-ঘরে বেশ গরম। বয়লারের ওপর কোনও রেলিঙে-টেলিঙে বসে থাকলেই হয়ে যায়। না, তা না। সে ভেবেছিল, ওয়াচে নামার আগে ওদের তাড়িয়ে এনজিন ঘরে নিয়ে যাবে। অবসর সময়ে সে ওদের সঙ্গে কথাবার্তা বলে থাকে। ওর সঙ্গে যখন কথাবার্তা হয়, তখন জ্যাক আসে, মেজ-মালোমও আসে। কখনও কখনও জ্যাক পাখি দুটোকে, বিশেষ করে মেয়ে-পাখিটাকে জাহাজ ছাড়া করতে চায়। কি দরকার, মেয়ে পাখি থাকার। যেন হেগে-মুতে জাহাজ নোংরা করছে। জ্যাকের ভীষণ রাগ এই মেয়ে পাখিটাকে নিয়ে। আর মেজ-মালোম এবং সে শুধু, সে কেন, এখন তো জাহাজে এত একঘেয়েমী, যে এ-দুটো পাখি জাহাজে ভীষণ বৈচিত্র্য বয়ে এনেছে।

    সবাই ভেবে ফেলেছে তাদের মতো, পাখি দুটোও জাহাজের যাত্রি। এদের জন্য কখনও কখনও জাহাজিরা খাবার রেখে দিতে ভালবাসে। খেতে খেতে মনে পড়ে গেল, আরে মিঃ স্পেরো, মিসেস স্পেরো! কোন দরকার নেই। কারণ ওরা খুঁটে খুঁটে খায়, ওতেই চলে যায়। গ্যালিতে আসতে ভয় পায়, এত লোক দেখলে ভয়, তবু বেঁচে থাকার মতো খাবারের ভাবনা ওদের নেই। তবু জাহাজিদের যে কি হয়, খেতে খেতে মনে পড়ে গেলে, কখনও আপেলের টুকরো, কখনও কুচি মাংস, কখনও রুটির ভগ্নাংশ রেখে দিয়ে যেন মনে করে থাকে, এটা ঠিক জাহাজ চালিয়ে নেওয়ার মতো আর একটা কাজ। ওরা যেতে যেতে পাখি দুটোকে খুঁজে বেড়ায়। চারপাশে খুঁজে বেড়াতে বেড়াতে না দেখতে পেলে, ভাবে, কি হল, কোথায় গেল! যেন তখন তোলপাড় পড়ে যায়, কোথায় কোথায়! পাখি দুটোকে তো আর দেখা যাচ্ছে না।

    তখন হয়তো কাপ্তানের ছেলে পাখি দুটোকে নিয়ে ঠিক ব্রীজের নিচে বসে আছে। সে বসে রয়েছে একটা টিনের চেয়ারে। সে বোধ হয় পরে আছে লম্বা সাদা ট্রাউজার। সে পরে আছে লম্বা সার্টের ওপর ঢোলা পুল-ওভার, সে পরে আছে একটা ষোড়শ শতাব্দীর জলদস্যুসের টুপি, ওর পায়ে নীল রঙের জুতো, এবং কালো মোজা। ওর হাতে দস্তানা সাদা রঙের। চুল আরও বড় হয়ে গেছে। সে পা দুটো সামনের দিকে ছড়িয়ে দিয়েছে। তার পায়ের চারপাশে পাখি দুটো উড়ে বেড়াচ্ছে। পাখি দুটোকে ওর আপেলের কিছু অংশ কখনও রুটির অংশ সে ছুড়ে দিচ্ছে। পাখিগুলো খেয়ে যাচ্ছে। এটা একটা এখন জ্যাকের খেলা হয়ে গেছে। সে যেন জাহাজে বেশ একটা কাজ পেয়ে গেছে। পুরুষ পাখিটাকে সে বেশি খাওয়াতে ভালবাসে।

    পাখিদের খাওয়ানোর সময় হাতের দস্তানা খুলে ফেলে। দস্তানা সে কোমরে বেল্টে গুঁজে রাখে। সে কেমন এক অতীব সুন্দর ছবি তৈরি করে ফেলে ডেকে। জাহাজে থাকলে চুল চোখ কি মানুষের ক্রমে’ নীল হয়ে যায়! ছোটবাবু পাশে গিয়ে দাঁড়ালে বুঝতে পারে না, চুলে এমন সুন্দর গন্ধ কি করে হয়। সে তো কিছু মাখে না। জ্যাকের শরীরে এই যে ঘ্রাণ, যেন সব জাহাজিদের চেয়ে আলাদা। কাছে গেলে নড়তে ইচ্ছে হয় না। জ্যাকের পাশে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকতে তার ভীষণ ভাল লাগে। পাখি দুটো চারপাশে তখন উড়ে বেড়ায়, আর কিচ কিচ করে ডাকে।

    জ্যাক একদিন দেখল, ছোটবাবু চুপচাপ গ্যালির পাশে কি করছে। ছোটবাবু ঠুক ঠুক করে কাঠে পেরেক মেরে যাচ্ছে। কি হবে, এই বাকসো দিয়ে সে বুঝতে পারছে না। ছোটবাবুও কিছু বলছে না। তারপর ডাকল, জ্যাক!

    এ-ডাক জ্যাক কেন যে অবহেলায় মাড়িয়ে যেতে পারে না। কেমন সরল অনাড়ম্বর ডাক। সে এলেই ছোটবাবু বলল, তুমি একটা কাজ করবে জ্যাক?

    জ্যাক বুঝতে পারে না কি কাজ!

    সে বলল, হাতুড়িটা বড়। একটা ছোট হাতুড়ি কশপের আছে। আমি চাইলাম, দিল না। তুমি যাবে? আমাকে এনে দেবে?

    জ্যাক লাফিয়ে চলে যাচ্ছিল, তখন আবার ছোটবাবু ডাকল, আর শোন তুমি কটা কাঠ, কিছু পেরেক আরও আনতে পার কিনা দেখবে। আমাকে দিল না। বলল, মেজ-মিস্ত্রি বকবে। তুমি যদি পারো।

    জ্যাক যখন ফিরে এল, ছোটবাবু অবাক। কশপের কাঁধে কোমরে, প্রায় কশপকে চেনা যায় না, কাঠ বোঝাই হয়ে কশপ চলে এসেছে। এক গাদা কাঠ জ্যাকের হাতে, এত দিয়ে কি হবে, সে বুঝতে পারছে না।

    ছোটবাবু বলল, আরে এটা করেছ কি!

    জ্যাক পাশে কাঠ রেখে বসল। বলল, বেশ বড় করে বানাবে।

    কশপ দাঁড়িয়ে আছে। সে জ্যাক না বললে নামাতে পারছে না। দাঁড়িয়েই আছে।

    ছোটবাবু বলল, চাচা ওগুলো নিয়ে যাও। লাগবে না। জ্যাক যা এনেছে ওতেই হয়ে যাবে।

    —তোমার পেরেক লাগবে না?

    —জ্যাক আনে নি!

    এনেছে। আমার কাছে ভাল পেরেক আছে। তিনটে হাতুড়ি এনেছি, কোনটা লাগবে বল।

    —লাগবে না। জ্যাকের হাতুড়ি হলেই হবে। তুমি বরং এটা নিয়ে যাও। বলে সে হাতের হাতুড়িটা দিতে গেলে দেখল, নেবার মতো ক্ষমতা ওর নেই। এই কাঠগুলো ফের বয়ে নিতেই কষ্ট হবে। সে উঠে দাঁড়াল। কাঠগুলো সব নামাল। বলল, তুমি হাতুড়িটা নিয়ে চলে যাও। কাঠগুলো যা লাগে নেব, বাকিটা আমি রেখে আসব।

    এখানেই কেন জানি ছোটবাবুর জন্য সবার মায়া। এটা সে জানে, মানুষের কোথায় সব নরম জায়গা থাকে, সে নিজেও একটা দুঃখের ভিতর পড়ে গেছে, সে জন্য কারু সঙ্গে ছোটবাবু খারাপ ব্যবহার করতে পারে না। শৈশব থেকেই সে এমন একটা স্বভাবের ভেতর মানুষ হয়েছে।

    এবং এ-ভাবে ছোটবাবু এক জাহাজি। আর কেউ জানে না, জ্যাক একটা মেয়ে, ছেলে সেজে বেশ চালিয়ে যাচ্ছে। কাপ্তান একদিন আবার জোর করে বনির চুল ছেঁটে দেবে বলে বনিকে খুঁজে বেড়াচ্ছেন। চুল ছেঁটে দেবার সময় জাহাজে এক দৃশ্য তৈরি হয়। বনিকে খুঁজে পাওয়া যায় না। কাপ্তান, সারেঙ, বড়মালোম সবাই মিলে তখন কেবল খোঁজে। বনি কোথায় যে লুকিয়ে থাকে তখন!

    ছোটবাবু তখন বাংকারে কাজ করছিল। একটা লম্বা রাবারে মোড়া তারের মাথায় বাল্ব জ্বলছে। মাঝে মাঝেই টানাটানিতে নষ্ট হয়ে যায়। তখন থাকে একটা লম্ফ। লম্ফের আলোতে বাংকারটাকে কয়লার খাদ বাদে আর কিছু ভাবা যায় না। সে অন্ধকারে একা গাড়িতে কয়লা ভরে যাচ্ছে। শীতকাল, প্রচন্ড ঠান্ডায় সে ঘামছে। ওর মুখ কয়লায় কালো হয়ে গেছে। সে মাঝে মাঝে বেলচায় কয়লা ওপর থেকে টেনে নামাচ্ছে। বড় বড় পাথরের মতো কয়লার চাঙ এখন নেই। কয়লা কিছুটা ইংলিশ কোলের কাছাকাছি। খুব পরিশ্রম হবার কথা না। তবু সে তাড়াতাড়ি সুট ভরে ফেলতে পারলেই ছুটি পেয়ে যাবে। সে তাই এক নাগাড়ে কাজ করে যাচ্ছে। আর তখনই ফিস ফিস গলায় কে ডাকলে, ছোটবাবু আমি।

    মইসীন মিঞার ভূতের গল্প সারা জাহাজে একটা ভয় ছড়িয়ে রাখে। ছোটবাবু মাঝে মাঝে একা বাংকারে ঢুকতে ভয় পায়। জাহাজের ভেতর এটাই সবচেয়ে বোধহয় অন্ধকার জায়গা। মাল গুদাম ছাড়া এত অন্ধকার আর কোথাও নেই। সে ভয়ে সহসা সোজা হয়ে গেলে দেখল, জ্যাক ওর পাশে দাঁড়িয়ে বলছে, প্লিজ ছোট।

    ছোটবাবু কিছুই বুঝতে পারে না। সে বলল, কি!

    —আমি এখানে লুকিয়ে থাকব।

    —কেন?

    —বাবা চুল কেটে দেবার জন্য খুঁজছে।

    —আমাকে তবে জাহাজ থেকে নামিয়ে দেবে না!

    —না। আমি বলছি তোমাকে কিছু বলবে না।

    এ-ছাড়া সেই অস্পষ্ট অন্ধকারে বনির মুখে ভীষণ কষ্টের ছাপ, ছোটবাবুকে কেমন কাতর করে ফেলে। সে বলল, ঠিক আছে। ওদিকে চলে যাও। আমি এলে বলব, এখানে কেউ নেই।

    —ওরা তবে খুঁজে বের করে ফেলবে!

    —তবে কি করতে চাও?

    —তুমি আমাকে বেলচাটা দাও। আমি কয়লা ফেলতে থাকি।

    —আমি কি করব?

    —তুমি স্টোক-হোলডে নেমে যাও।

    —কিন্তু……..।

    —কিন্তু না। তুমি শোন, একটা কাজ করবে, এই মানে…….। মনে হয় বনি কিছু বলতে লজ্জা পাচ্ছে। সে নিজের পোশাকের দিকে তাকাচ্ছে। খুব সাদা পোশাক। এমন সুন্দর পোশাকে কেউ বাংকারে ঢোকে না। ওরা দরজায় কেউ উঁকি দিলেই, বুঝতে পারবে এমন সাদা ধবধবে পোশাকে কেউ বাংকারে কয়লা ফেলতে আসে না। সে ঠিক ধরা পড়ে যাবে। তবু কি যে সংকোচ, কি যে সে বলতে চায় ছোটবাবু ঠিক বুঝতে পারে না। সে বলল, ছোট, তোমার পোশাকটা দেবে। আমি পরে নেব।

    —আমার……মানে আমার নোংরা পোশাক। কী বলছ! তোমার ভীষণ ঢোলা হবে।

    —তা হোক! তুমি দাও।

    —আরে না না, সে কি করে হয়। খুব নোংরা।

    —কিছু হবে না। এখানেই বোঝা যায় জ্যাক জেদি। সে বলল, তুমি দাও। আমারটা তুমি পরে নাও।

    —তুমি কি বলছ জ্যাক! তোমারটা আমার গায়ে কখনও লাগে! খাটো হবে না!

    —হোক খাটো। তুমি নাও। দেরী কর না। দেরী করলে ধরা পড়ে যাব।

    ছোটবাবু আর কিছু ভাবতে পারে না। ঘামে গেঞ্জি ভিজে গেছে। প্যান্টালুন তেমন ভেজে নি। সে বনির সামনেই জামা খুলে ফেলল প্যান্ট খুলে ফেলল। আর কী শীত! সে তো এখন কাজ করছে না, শীতটা আবার জাঁকিয়ে বসেছে। সে বলল, এই তাড়াতাড়ি খুলে দাও। আমার ভীষণ শীত করছে জ্যাক। ও-তুমি আবার ওদিকে কোথায় চললে! জ্যাক!

    —এদিকে এস না ছোট। প্লিজ।

    —আরে তাড়াতাড়ি করে ফেল। আমার ভীষণ শীত করছে।

    —প্লিজ, এদিকে এস না। আমার হয়ে গেছে। অস্পষ্ট অন্ধকার থেকে জ্যাকের গলা পাওয়া গেল।

    —জ্যাক তোমাকে দেখা যাচ্ছে না। খালি গায়ে আমি কতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকব। জ্যাক, আমি শীতে মরে যাব। জ্যাক, তোমার এত লজ্জা কেন?

    মনে হয় অন্ধকারে জ্যাকও শীতে ভীষণ কাঁপছে। সে ছোটবাবুর কাছে যেতে ভয় পাচ্ছে। সে কেমন অধীর হয়ে পড়ছে। যেন সে ছোটর কাছে গেলেই নিজেকে ঠিক রাখতে পারবে না। কি সুন্দর, পবিত্র যীশুর মতো। সে যে কি করে ফেলতে পারে তখন! আশ্চর্য সুন্দর শরীর ছোটবাবুর। বাহুল্য নেই। সোজা সরল বৃক্ষের মতো ছোট দাঁড়িয়ে শীতে কাঁপছে। বনি কেমন আবিষ্ট হয়ে যাচ্ছে দেখতে দেখতে।

    ছোটবাবু চিৎকার করে বলছে, কি হচ্ছে জ্যাক? বলে সে লম্বা বাংকারের মাথায় ছুটে গেলে বনি বলল,—এই যে আসছি। আমার হয়ে গেছে ছোট।

    গলা এত কাঁপছে কেন? ছোটবাবু বুঝতে পারছে না, জ্যাকের গলা কেমন ধরে আসছে।

    —আমি শীতে মরে যাচ্ছি ছোট। বলে, মাথার টুপি টেনে এগিয়ে আসছে জ্যাক। তারপর জ্যাক কাছে এসে বলল,—আর দাঁড়াবে না। একেবারে নিচে নেমে যাও। কোথাও গিয়ে লুকিয়ে বসে থাক।

    ছোটাবাবু বলল, জ্যাক, তুমি আশ্চর্যভাবে ছোটবাবু হয়ে গেলে। আর একটু লম্বা হলে কেউ এমনিতেও ধরতে পারত না!

    বনি কোন কথা না বলে গাড়ি টেনে নিয়ে যাচ্ছে। ছোটবাবু সিঁড়ি ধরে নিচে নেমে গেল। আসলে এখন বনি ছোটবাবু বাদে আর কিছু জানে না। সে যে কি সুন্দর! যেন জীবনের এক আশ্চর্য মোহ অথবা ঘ্রাণ বলা যেতে পারে, অথবা রাজার রাজা ছোটবাবু, এবং শরীরের সর্বত্র মহিমময় ঈশ্বর কোন কৃপণতা রাখেন নি। নাভির নিচে সে এক আশ্চর্য বনরাজিলীলা। এক আশ্চর্য মোমের শরীর, অথবা পাথরের মূর্তি। ছোটবাবুর হাতের পেশী কোমরের ভাঁজ, উরুর দৃঢ়তা তাকে পাগল করে দিচ্ছে। সে যে কতক্ষণ এভাবে ছোটর সুন্দর শরীরের ভিতর ডুবে ছিল, জানে না। ঠিক বারোটা, বারোটা কেন, ঠিক এগারোটা পার করে দিতে পারলেই বাবা আর তাকে চুল ফেলতে জোরজার করবে না। বারোটা ত্রিশে ডাইনিং হলে লাঞ্চ। লাঞ্চ টাইম হয়ে গেলে বাবা চুল কাটার কথা ভুলে যাবেন।

    কাপ্তান-বয় সারা ডেক খুঁজে বেড়াচ্ছে। ছোট সাবকে কেউ দেখেছে কিনা বলতে পারছে না। ক্যাপ্টেন ব্রীজে কাঁচি নিয়ে অপেক্ষা করছেন। কাপ্তান-বয় একবার খবর দিয়ে গেছে, ডেকের ওপরে নেই ছোট সাব।

    ফোকসালে খুঁজলে হয়। তখন কাপ্তান-বয় ছুটেছে, ফোসকালে। না, সেখানেও কেউ দেখেনি। এই মেয়েটার মাঝে মাঝে কি যে হয়—কাপ্তান হিগিনস ভেবে পান না। নিচে নামতে হবে, সে কাপ্তান বয়কে এক কড়া ধমক লাগাল, কোথায় যাবে, ভাল করে খুঁজে দ্যাখো। এনজিন রুমে পালিয়ে থাকতে পারে। সে এবার থার্ডকে ডাকল। দ্যাখ তো জ্যাক কোথায় পালাল।

    —আবার!

    —চুল ফেলতে গেলেই পালিয়ে যায় কোথায়।

    সুতরাং থার্ড অফিসার আর কাপ্তান-বয় তন্ন তন্ন করে খুজে বেড়াল। এসে বলল—না নেই। কাপ্তানের রক্ত মাথায় উঠে গেল। সে বলল ওর কেবিনে দেখেছ? তারপরই মনে হল বনির কেবিনে ওদের ঢোকা ঠিক না। সে এবার বলল, দাঁড়াও দেখছি। কিন্তু আশ্চর্য বনি কেবিনেও নেই। কেবিনে থাকার কথা না। বনি এ-সময় ডেকে পাখি দুটোকে খাওয়ায়। সেখানে যদি থেকে যায়। কাপ্তান এবার বললেন, এনজিন রুমে দ্যাখো।

    —স্যার, সব জায়গা খুঁজেছি। কোথাও নেই।

    —বয়লারের ওপরে, স্মোক-বকসের পাশে?

    —সব দেখে এসেছি।

    —স্টুয়ার্ডের ঘরে, ওর বরফ-ঘরে?

    —দেখে এসেছি, নেই।

    তিনি এবার ডাকতে থাকলেন জ্যাক, ভালো হবে না। আমি তোমার চুল ফেলব না! কোথায় পালিয়ে আছ বল।

    দলবল নিয়ে এবার নিচে নেমে গেলেন কাপ্তান। বাংকারে উঁকি দিলে, কোলবয়েরা কয়লা ফেলে যাচ্ছে। কি যে হবে! কোথাও দেখা যাচ্ছে না। এবং জাহাজে ভীষণ উত্তেজনা। খবর রটে যেতে থাকল, জ্যাককে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। ছোটর বুক ভীষণ ঢিপ ঢিপ করছে। সে তার সাদা পোশাক পরে অমিয়র বাংকারে ঢুকে গল্প করছে। অমিয় এটা খেয়ালই করে নি ছোটবাবু বেশ ছিমছাম পোশাকে আছে। মুখে কালি। এও হতে পারে এ-ঘরে লম্ফ জ্বলছে। লম্ফের আলোতে সব স্পষ্ট নয় বলে সে খেয়াল করে নি। অমিয় বলল, শুনেছিস?

    —কি

    —জ্যাককে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না, ক্যাপ্টেন, বড়-মালোম সবাই ওকে খুঁজছে।

    —অঃ। এবং তারপর ছোটবাবু এক লাফে নিজের বাংকারে ঢুকে বলল, জ্যাক ভীষণ কান্ড। শিগগির উঠে যাও। ডেকের ওপর এবার কিন্তু কাপ্তান মাস্তার দিতে বলবে সবাইকে। সাইরেন বেজে উঠল বলে।

    এবং সে দেখল ঘড়িতে এগারোটা বেজে গেছে। সে বলল, তাড়াতাড়ি প্যান্ট জামা খুলে দাও ছোটবাবু। তারপর কি ভেবে বলল, ঠিক আছে। সে তাড়াতাড়ি কি যে করতে যাচ্ছে। তোমার প্যান্ট জামা পাঠিয়ে দেব।

    —আমার কি হবে?

    —কেন তুমি ওপরে চলে যাবে!

    —আরে বাংকারের অন্ধকারে কেউ টের পাবে না। ওপরে উঠলে সবাই টের পাবে।

    —অঃ।

    এবার যে যার পোশাক পাল্টে নিল। আগের মতোই জ্যাক চলে গেল অন্ধকারে। ছোটবাবুর এ-ব্যাপারে কোন লজ্জা নেই। সে আর অমিয় একসঙ্গে বাথরুমে স্নান করে থাকে। তাড়াতাড়ির সময় একটা বাথরুম বলে একই সঙ্গে স্নান করে নেয়। জাহাজে উঠে ছোটর লাজলজ্জা কিছুটা কমে গেছে। অথবা জাহাজে উঠলে বুঝি মানুষের ভিতর অনেক কৃত্রিমতা মুছে যায়। সব কেমন খোলামেলা। জামা প্যান্ট পাল্টে সে জ্যাককে দিয়ে দিল। যখন উঠে যাচ্ছে জ্যাক, তখন জ্যাক আবার যেন শীতে কাঁপছে! জ্যাকের মুখটা কেমন নীল হয়ে গেছে।

    আর ঠিক তখনই জাহাজে সেই ভয়ঙ্কর কঠিন শব্দ। দুবার লম্বা সাইরেনের মতো শব্দ।

    এবং যখন জাহাজে সবাই মাস্তার দিচ্ছে, কাপ্তানের চোখ মুখ সেই দুষ্টু মেয়েটির জন্য অধীর হয়ে আছে, কিছু বলতে পারছেন না, যেন তিনি ভেতরের সব দুঃখটা জোর করে চেপে রেখেছেন এবং হেঁটে যাচ্ছেন, বলতে সাহস পাচ্ছেন না, কোন রকমে যেন বড়-মালোম কাপ্তানের হয়ে বলছে তখন, জ্যাককে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। কেউ তোমরা দেখেছ?

    ছোটবাবু মাস্তার থেকে বের হয়ে বলল, হ্যাঁ স্যার, এইতো দেখলাম। এনজিন রুম থেমে যখন উঠে আসছিলাম, দেখলাম।

    —কোথায়? কাপ্তান ছুটে কাছে চলে গেলেন।

    —একোমডেসান ল্যাডারের নিচ দিয়ে চলে গেল।

    —ঠিক তুমি দেখেছ? জ্যাককে!

    —হ্যাঁ স্যার।

    সঙ্গে সঙ্গে কাপ্তান ছুটে গেলেন। একোমডেসান ল্যাডারের নিচেই বনির কেবিন। কাপ্তান হিগিন্‌স্‌ ছুটে যেতে থাকলেন। তিনি নীল রঙের সুট পরেছেন। হাতে চারটা সোনালি স্ট্রাইপ, কাঁধেও চারটা। স্ট্রাইপগুলো ভীষণ চক্‌চক্‌ করছে। মাথায় এংকোরের ছবি আঁকা জাহাজি টুপি। তিনি ভেতরে ঢুকেই অবাক। একটা সাদা কম্বলের ভেতর বনি শুয়ে আছে।

    তিনি ধীরে ধীরে ডাকলেন, বনি!

    —বাবা!

    —তুমি কোথায় ছিলে!

    —এখানে বাবা।

    —আমি তোমাকে খুঁজে গেলাম যে!

    —আমি তখন বোধহয় চড়ুইদের বাসাটা তৈরী করছিলাম।

    —শুয়ে আছ কেন?

    তখন পেছন থেকে কে ডাকল স্যার, পেলেন!

    তিনি ভুলে গেছিলেন, সবাই বোট-ডেকে দাঁড়িয়ে আছে। তিনি এবার দরজায় মুখ বার করে বললেন, যেতে বল। জ্যাককে পাওয়া গেছে।

    ওরা আর কিছু জানতে পারে না। এর চেয়ে বেশি জানার অধিকার তাদের নেই। ওরা বোট- ডেক থেকে নেমে গেল। জাহাজের ব্রাস্ট আবার বাজছে। এটা বোধহয় ক্লিয়ারিং সিগনাল। হিগিনস বনির কেবিনে বসেই শুনতে পেলেন সব। বড় উদ্বিগ্ন চোখে মুখে বললেন, তুমি অসময়ে শুয়ে আছ!

    —আমার খুব শীত করছে বাবা।

    —জ্বর আসবে মনে হয়? বলে তিনি বনির কপালে হাত রাখলেন।

    —আমার ভীষণ শীত করছে।

    —ডেবিডকে ডাকি। তোমাকে দেখুক। ওষুধপত্র যদি দিতে হয়!

    বনি বাবাকে কিছু বলল না। কেবল তাকিয়ে থাকল। হিগিনসের মনে হল, বনির বয়স বাড়ছে। বয়স বাড়লে কখনও কখনও ভীষণ শীত পায়। তিনি ডেবিডকে ডাকতে পাঠালেন না। শীতটা কিছুক্ষণ পর হয়তো কেটে যাবে। তবু মেয়েটার জন্য কি যে কষ্ট থাকে ভেতরে। তিনি পাশে কিছুক্ষণ বসে থাকলেন চুপচাপ। কেউ কোনও কথা বললেন না। ডেবিডকে ডেকে পাঠালে হয়তো বনির বয়স ধরা পড়ে যাবে। ওর ভেতরে কষ্টটাও ধরা পড়বে। কার জন্য বনি ভেতরে এমন কষ্ট পায়। তিনি বুঝতে পারলেন না।

    হিগিনস মেয়েটাকে কিছুতেই আর কিছু বলতে পারেন না। উঠে দাঁড়ান! ব্রীজে উঠে গেলে সমুদ্র চারপাশে। ব্রীজের উইংসে তিনি দাঁড়ান। অনবরত জাহাজটা জল কেটে যাচ্ছে। দু’পাশে সাদা ফেনা, অনেকদূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ছে। নীল পোশাক পরে কোয়ার্টার মাস্টার হুইলের হাতল ধরে রেখেছে।

    সন্ধ্যার সময় বনি ওপরে উঠে গেল। বনি বেশ কালো রঙের সুট পরেছে, নীল রঙের টাই, সে টুপি পরেনি। কাজের সময় সে কখনও কখনও সাদা দস্তানা হাতে পরে নেয়, এখন আর তাও নেই। শীতটা বেশ ক্রমে বাড়ছে। ঠান্ডা বাতাস সকালের দিকে ছিল, এখন নেই। জাহাজ ক্রমে আরও নিচে নেমে যাচ্ছে। জাহাজ ক্রমে গড়িয়ে গড়িয়ে একটা অতিকায় সাদা তিমি মাছের মতো জল কেটে ভেসে যাচ্ছে। এ-সময়ে তাকে বাবা ডাকেন না। সে এ-সময় আজকাল পাখি দুটোর পেছনে ঘুরে বেড়ায়। সে একা ঠিক না। মেজ-মালোম, ছোটবাবু আর সে। আরও কেউ কেউ আসে। তবে ওরা কেউ ঠিক এদের মতো পাখি দুটোকে নিয়ে মজা পায় না। যেন ওরা তিনজন তখন সমবয়সী বন্ধু। শীতের জন্য পাখি দুটিকে ওরা খড়কুটো বিছিয়ে দিয়েছে বাকসোটাতে। বাবা এ-সময়টাতে অন্যদিন একা একা চুপচাপ বসে আকাশের গ্রহ নক্ষত্র দেখেন, তাকে ডাকেন না, আজ কেন যে ডাকছেন!

    সে পাশে গিয়ে দাঁড়ালে হিগিনস বললেন, বোস।

    বাবার গলা খুব নরম। বাবার এমন গলা শুনলে ওর ভেতরটা গুড়গুড় করে ওঠে। কেমন বাবা ক্রমে ভীতু স্বভাবের হয়ে যাচ্ছেন। সে ভেবেছিল, বাবা তাকে আজ ভীষণ বকবে। বাবা ওকে একা পেতে চান। কিন্তু ব্রীজে, বাবা একা থাকতে পারেন না, সেখানে এখন কোয়ার্টার মাস্টার এবং থার্ড অফিসার আছে। ওদের ওয়াচ। বাবা সেখানে তাকে কোনা মন্দ কথা বলতে ডাকতে পারেন না। সে বসে পড়ল। চুলগুলো সে হাত দিয়ে দেখল, বেশ বড়, চুল বড় না থাকলে সে একেবারে ষোলআনা পুরুষের মতো হয়ে যায়। ছোটবাবু তখন ওর পাশে একেবারে ঘেসতে চায় না।

    বাবা অনেকক্ষণ চুপচাপ থাকলেন। এনজিনের শব্দটা এখানে তেমন প্রবল নয়। আস্তে কথাবার্তা বললেও স্পষ্ট শোনা যায়। ওর ভাল লাগছে না। কেমন সে বসে উসখুস করছে। বাবা হয়তো টের পেয়েছেন। তিনি বললেন, বনি শান্ত হয়ে বোস।

    বনি চুপচাপ বসে থাকল।

    হিগিনস বললেন, তুমি নোয়ার নাম নিশ্চয়ই জানো?

    —হ্যাঁ বাবা।

    —নোয়ার আর্কই হচ্ছে পৃথিবীর প্রথম জাহাজ। এর আগে পৃথিবীর ইতিহাসে জাহাজ টাহাজের খবর আর পাওয়া যায় না। তখন সবে সভ্যতার উন্মেষ। এ-সব খবরও হয়তো রাখো।

    —হ্যাঁ বাবা।

    —কিন্তু তুমি কি জানো তোমার পূর্বপুরুষেরা কি ভাবে আগে সমুদ্র সফরে বের হত?

    —কারা বাবা?

    —এই আমাদের আগে যারা সমুদ্রে এসেছিলেন।

    —তোমাদের আগে, মানে ডাবলিউ ফোর্ডের কথা বলছ?

    —আরে না না। এই যেমন হোমারের বীর নায়কেরা সমুদ্র ঘুরে এসে কি সব বলত? —না বাবা।

    —তারা সব নানারকমের গল্প বলত। তখন যারাই সমুদ্রে গেছে, ফিরে এসে নানারকম গল্প বলতো। সে-সব গল্প বলে ঠাকুমারা পর্যন্ত ভয় দেখিয়ে আমাদের ঘুম পাড়াতো। তখন সমুদ্র আমাদের কাছে একেবারে অজানা। আমাদের কথাই ধর না, যারা ভূমধ্যসাগর এবং বে অফ বিসকের কাছাকাছি ছিল, অর্থাৎ যারা এ-সব অঞ্চলে বসবাস করত ওরা আটলান্টিক বলে যে একটা সাগর আছে জানতই না। ওদের কতরকমের বিশ্বাস ছিল। যেমন হোমারের বীর নায়কেরা ইথাকাতে ফিরে কত বিচিত্র গল্প যে বলেছিল! ওরা নাকি সমুদ্রে এক আশ্চর্য ধ্বনি শুনতে পেত—প্ৰায় সেটা অবিকল সাইরেন বাজানোর মতো। শুনতে পেতো সমুদ্রে কারা ক্রমান্বয়ে সুন্দর মিউজিক বাজিয়ে যাচ্ছে। আবার তারা নানারকম দৈত্য দানবের গল্প বলত, মায়াবিনীদের গল্প বলত। কুহকিনীরা, সমুদ্রের ওপর নৃত্য করে বেড়াচ্ছে। বড় বড় পাথর সমুদ্রের জলে ভেসে বেড়াচ্ছে। কুহকিনীরা তার ওপর নেচে বেড়াচ্ছে। নাবিকেরা জাহাজ নিয়ে কিছুতেই আর তখন এগুতে পারত না।

    —অথবা কিংবদন্তি ছিল, দক্ষিণ অঞ্চলে, অর্থাৎ সূর্যের দেশে, বিষুবরেখার দক্ষিণে জাহাজ যাবার নিয়মই নেই। সেখানে সমুদ্র বলে কিছু নেই। একরকম মানুষ সেখানে বাস করে-যারা কেবল পোকা মাকড়ের মতো লাফায়। ওদের আহার নিদ্রা বলে কিছু নেই। অথবা কেউ কেউ বলত, সেখানে বড় বড় ষাঁড় ঘুরে বেড়ায়। ওদের নিঃশ্বাসে আগুন লক লক করত।

    বনি বুঝতে পারছে না, বাবা হঠাৎ এমন সব প্রাচীনকালের গল্প বলে যাচ্ছেন কেন। বাবা অবশ্য যখন যেখানে গেছেন বনিকে নিয়ে, সমুদ্রের অভিজ্ঞতার কথা দ্বীপের কথা কখনও বলতেন। কখনও সমুদ্রের প্রাচীন ইতিহাস নিয়ে বাবার মাথাব্যথা ছিল না।

    তখনও হিগনিস বলে যাচ্ছেন, সমুদ্রে কিছুদূর গেলেই এক শয়তানের কালো হাত দেখা যেত। সেই হাত ওপরে ভেসে সাপের মতো দুলত। বলত, আর না। ফিরে যাও। অথবা একরকমের শামুকের খোল ভেসে বেড়াতো হাওয়ায়, তাদের ভিতর সব বিষাক্ত ধোঁয়া। জাহাজ আর এগুতে পারত না। সেখানে ঢুকলে নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসত জাহাজিদের। অবশ্য আমাদের প্রাচীন অভিজ্ঞতা সমুদ্র সম্পর্কে ক্রমে ভেঙে যায়। আমরা জানতে পারি সমুদ্র বিশাল, জানতে পারি আটলান্টিক বলে এক মহাসাগর আছে, আমাদের সব নাবিকেরা ক্রমে বের হয়ে যায়, পৃথিবীর কোন কোন জায়গায় সমুদ্র কি-ভাবে আত্মগোপন করে আছে দেখতে।

    কাপ্তান-বয় কফি রেখে গেল। দু কাপ। সামান্য ফল। কাপ্তান সামনের সমুদ্র দেখছেন। মাস্তুল পার হয়ে জাহাজের মাথা কেমন সোজা একটা টর্পেডো বোটের মতো, আর পেছনে আফটার-পিক পার হয়ে প্রপেলারের ক্রমাগত সাদা ফেনা এ-জ্যোৎস্নায়ও দেখা যায়। তখনই মনে হয়, সমুদ্র মনোহারিণী। তিনি বোধ হয় সমুদ্র-মনোহারিণী বলার জন্য, এতসব পুরানো কথা বনিকে বলে যাচ্ছেন। অথবা তিনি কি বলতে চান, বনি, জীবন হচ্ছে মনোহারিণী। তাকে অবহেলায় নষ্ট করে দিও না। তোমার ইচ্ছেটা যখন ভেতরে পাগলা ঘোড়ার মতো দামাল হয়ে যায়, তখন সমুদ্র দ্যাখো। সমুদ্র দেখলে ভেতরের কষ্ট একেবারে মুছে যাবে। কেননা, সমুদ্র সেই কবে থেকে, কেউ বলতে পারে না, পৃথিবীতে .অথবা সৌরজগতে বড় সে একা! একাকী সে, আছে তার মতো, সে কখনও উত্তাল তরঙ্গমালার ভেতর আকাশের নক্ষত্রদের ছুঁয়ে দিতে চায়, তার কি যে প্রলোভন তখন। সে কখনও চুপচাপ। নিরীহ শান্ত। আকাশের নক্ষত্রেরা তার বুকে প্রতিবিম্ব ফেলে সারারাত জেগে থাকে। অথবা দর্পণে নিজের মুখ দেখতে পায় বোধহয়! অথবা ভেবে দ্যাখো, কত গাছপালা পাখি, সমুদ্রের উপকূলে কত দীর্ঘকাল ধরে নির্জনে তাদের ছায়া ফেলে যাচ্ছে। একটা ফড়িঙ অথবা প্রজাপতির ছায়া পর্যন্ত বাদ পড়ে না। কত রঙীন দ্বীপমালা নিশীথে উত্তাল তরঙ্গের ভেতর ডুবে থাকে। পৃথিবীর সব সুন্দরীদের গলায় যে মহামূল্য মণিমাণিক্য ঝলমল করছে, সমুদ্রের কোন গহন অন্ধকারে তাদের জন্ম হচ্ছে, লক্ষ লক্ষ বছর ধরে এরা জন্মাচ্ছে, নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, সমুদ্রের কিছু আসে যায় না। অথবা সেইসব মনস্টার, যারা এখনও সমুদ্রের ওপরে ভেসে ওঠেনি, যারা সূর্যের আলো সহ্য করতে পারে না—কে জানে, কত অতিকায় তারা। সীমিত অভিজ্ঞতায় তার কতটুকু খবর আমরা রাখি। সমুদ্রের শান্ত গভীর অন্ধকারে কি মহিমায় যে ওরা ঘুরে বেড়াচ্ছে কে জানে। অথবা বনি চারপাশে দ্যাখো, সমুদ্র তার বিশাল অস্তিত্ব নিয়ে জেগে আছে। সে পৃথিবীর এতটুকু ক্ষতি করে না। সে তো ইচ্ছে করলেই যা ডাঙা আছে নিমেষে গ্রাস করে ফেলতে পারে। কিন্তু কি মায়া দ্যাখো বনি, সে ডাঙার চারপাশে নিয়ত ফুঁসে বেড়াচ্ছে, কখনও অতীব শান্ত প্রায় করজোড়ে যেন বলছে, আমাকে নাও, চঞ্চলা হয়ে বলছে, আমার কি আছে, কেবল তুমি আছো।

    —অথবা বনি, আরো আশ্চর্য দ্যাখো, সমুদ্র তার নিজের অসীমতা নিয়ে জেগে আছে। তার অস্তিত্ব কখনও কমে না, বাড়ে না। জল বাষ্প হয়ে উড়ে যায়, মেঘেরা ভেসে বেড়ায়, যেন বাদাম তুলে চঞ্চলা তরণীর মতো সে তখন নিজের বুকে নিজেই ভাসতে ভাসতে চলে যায়। চারপাশে যা কিছু ডাঙা আছে, সেখানে তার বৃষ্টিপাত ফসল ফলায়, যত আবর্জনা রয়েছে, সে-নদী উপনদী ধরে তাকে বুকে. বহন করে আনে। এর জন্য তার কোন দুঃখ নেই বনি। পৃথিবীর জন্য তার কি যে মায়া। সব কিছু সে দিয়ে পৃথিবীর হয়ে বেঁচে আছে। বলেই তিনি সহসা মুখ ফেরালেন। তোমার কোন কষ্ট আছে?

    —না বাবা।

    —কষ্ট থাকলে, এই সমুদ্র দেখবে। পৃথিবীতে এর চেয়ে উদার, মহৎ এবং নিরিবিলি স্বভাবের আর কিছু নেই। আর সমুদ্র যে-ভাবে পৃথিবীকে ভালবাসতে জানে, আর কে আছে তেমন। তোমার যদি কিছু ভাল লেগে থাকে, তুমি যদি মনে করে থাক, ঠিক করছ, আমার কোন অমত থাকবে না। তবে যাই করবে, ভেবে করবে, বুঝতে না পারলে, অনেকক্ষণ, যত বেশি সময় হয় ততই ভাল, দাঁড়িয়ে থাকবে রেলিঙে। দেখবে, কেমন সূর্যাস্তের সঙ্গে তোমার ছায়া লম্বা হয়ে সমুদ্রের অনেক দূরে চলে যাচ্ছে। তখন একবার সমুদ্রকে জিজ্ঞাসা করতে পার, ঠিক করছ কিনা, সে কাউকে বনি, মিথ্যা বলে না।

    বনি বুঝতে পারল, সে বাবাকে মিথ্যা কথা বলেছে। বাবা টের পেয়েছেন। বাবা মনে মনে ওর ব্যবহারে হয়ত রুষ্ট হয়েছেন। সমুদ্রের কথা বলে, বাবা তাকে শাসন করছেন। বাবাকে সে কখনও ওর প্রতি কঠোর হতে দেখেনি। এ-জন্য বাবা তাকে ডেকে এনেছিলেন। সে কফি খেয়ে উঠে পড়ল। বেশ রাত হয়েছে। ডাইনিং হলে ডিনার সাজানো হচ্ছে। সাদা জ্যোৎস্না বাবার পায়ের কাছে পড়েছে। বাবাকে তখন খুব একা এবং নিঃসঙ্গ মনে হচ্ছে। বাবাকে ফেলে কেন জানি তার যেতে ইচ্ছা হল না। সে বাবার পাশে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকল। সমুদ্র দেখতে দেখতে বলল, আমি কখনও কষ্ট দেব না বাবা। কাল আমার চুল কেটে দিও। আমি আর পালিয়ে বেড়াব না।

  • এগার

    এগার

    ॥ এগার ॥

    রাতে রাতে বন্দরে ঢুকেছিল জাহাজ। সেণ্টিসে রসদ, মন্টিভিডিওতে কয়লা, জল আর কিছু না—জাহাজিরা অন্ধকার রাতে বন্দর স্পষ্ট দেখতে পায়নি। কেমন পাহাড়ী ছায়ায় লাল-নীল আলোর মালা, কেউ জাহাজ থেকে নামতে পারেনি। সবাই অন্ধকারে বন্দরের দৃশ্য দেখছিল। অন্ধকারে বন্দর ঠিক চেনা যায় না। কেমন একরকমের মনে হয়। কোনটা সেণ্টিসে কোনটা মন্টিভিডিও বোঝা যায় না। জাহাজ অন্ধকারেই আবার সমুদ্রে নেমে এসেছিল। ভোর রাতে জাহাজ গভীর সমুদ্রে নেমে গেছে। খুব একটা গভীরে যায়নি, উপকূলের আশেপাশে জাহাজ সারাদিন চলেছিল। দু’দিনের বেশি জাহাজের মানুষেরা দেখেছে ছায়া ছায়া উপকূল ভাগ। কেমন মেঘের মতো সমুদ্রের দিগন্তে ঝুলে আছে। দক্ষিণ আমেরিকার এই সব পাহাড়ী উপকূল কেমন রুক্ষ। গাছপালা চোখে পড়ে না। পাথর আর পাহাড় দক্ষিণে, যত এগিয়ে যাচ্ছে, শীত তত আরও বাড়ছে। প্রায় হাড়-কাঁপুনি শীত। পোর্ট এলিজাবেথ থেকে সাতাশ দিনের মতো জাহাজ ছেড়েছে। ক্রমে দক্ষিণ আমেরিকার কেপহর্ণের দিকে যাচ্ছে। প্রায় একশো আশি ডিগ্রী বরাবর দক্ষিণে এখন জাহাজ নেমে যাচ্ছে। যেন এভাবে আর কিছুদূর গেলেই জাহাজ দক্ষিণ মেরুতে পৌঁছে যাবে। মৈত্র শীতে ভীষণ কাঁপছে। সে মোটা কম্বল গায়ে পোর্ট-হোল দিয়ে কিছু দেখছে। গ্যাস-পাইপ ফোকসাল উষ্ণ রাখতে পারছে না।

    সামনের বন্দরে ওরা কিছুদিন থাকতে পারবে। এদের পক্ষে এটা আশার কথা। শুধু জল আর মাঝে মাঝে দ্বীপ, অথবা সমুদ্রে কেবল চলা নিশিদিন। এনজিনের ঝ্যাক ঝ্যাক শব্দ, স্টিয়ারিং এনজিনের কক্ কক্ শব্দ বিরক্তিকর। মাঝে মাঝে একেবারে অসহ্য। সুতরাং বন্দরে জাহাজ ঢুকে গেলে জাহাজিদের মনে হয়, পৃথিবীতে মানুষেরা ডাঙ্গায় বেঁচে থাকে। ডাঙ্গায় নেমে গেলেই মনে হয়, মাটির মতো প্রিয় আর কিছু নেই।

    জাহাজিরা বেশ চাঙ্গা হয়ে উঠছে। বন্দর আসছে বন্দর দেখা যাচ্ছে। রাত এগারোটা পর্যন্ত অনেক জাহাজি জেগে ছিল, বন্দর দেখতে পাবে বলে। ডেক-সারেঙ বলে গেছে, বারোটার আগে দেখা যাবে না। তবু প্রত্যাশা, কখন যে কে দেখে ফেলবে, অনেক দূরে ছায়া ছায়া মেঘের মতো ডাঙ্গা, অথবা সেই সন্ধ্যা থেকে হল্লা করছে জাহাজিরা, ঐ দ্যাখো। সারেঙ হেসে বলেছে, আরে না, ওটা দ্বীপ টিপ কিছু হবে। সময় না হলে জাহাজ বন্দর পায় না। সময় না হলে যেমন ওঁর দেখা মেলে না, এও বাবুরা তেমনি।

    অমিয় বলল, তা চাচা যা বলেছেন।

    ডেক-সারেঙ তার দলবল নিয়ে জেগে আছে। একটা দেড়টায় জাহাজ বন্দরে ঢুকে যাবে, ওদের বাঁধা-ছাঁদার কাজ। ডেক-জাহাজিরা এখন ঘুমোচ্ছে। সারেঙ ঠিক ঘুমোতে পারছে না। যদি বেচাল কিছু হয়ে যায়। সে একেবারে জাহাজের বাঁধা-ছাঁদা শেষ করে ঘুমোতে যাবে।

    এবং এ-সময়ে ছোটবাবু খবর নিয়ে এল, দেখা যাচ্ছে।

    এখন বাথরুমে স্নান করা। মৈত্র একটু আগে উঠে এসেছে। সে স্নান করে নিচে পোর্ট-হোলে কেবল কিছু দেখছে। অমিয় ঢুকে বলল, মৈত্র তুই জেগে আছিস! বললি যে শরীরটা ভাল না।

    অমিয় এবং ছোটবাবু স্নান সেরে এসেও দেখল, মৈত্র পোর্ট-হোলে দাঁড়িয়ে কি দেখছে! চোখ কেমন ঘোলা ঘোলা। ছোটবাবু কখনও মৈত্রকে এভাবে দ্যাখেনি। জাহাজে এ মানুষটাকে সে প্রায় সারেঙসাবের মতো ভেবে এসেছে। সেই মানুষ এভাবে দাঁড়িয়ে থাকলে কেমন ভয় পাবার কথা।

    অমিয় বলল, ছোটবাবু, শুয়ে পড়। সে মৈত্রকে বলল, হ্যারে তুই কি দেখছিস।

    —কিছু না।

    এবার অমিয় বলল, ছোটবাবু কি মজা! কাল থেকে ওয়াচ থাকবে না। ও—ভাবতে কি ভাল লাগছে! কদিন থাকবে জাহাজ!

    মৈত্র পোর্ট-হোল থেকে নড়ছে না। নিচের বাংকে ছোটবাবু ওপরের বাংকে অমিয়, কখনও কখনও ওরা পাল্টে নেয় বাংক। এ-ফোকসাল ওদের তিনজনের। এ-ফোকসালে একটা বাংক বেশি। মৈত্রের ওপরের বাংক খালি। মৈত্র এখনও পোর্ট-হোলে দাঁড়িয়ে আছে। মৈত্র কখনও কখনও ওপরের বাংকে শুয়ে থাকে।

    অমিয় স্নান করায় হি-হি করে কাঁপছে। সে লেপ, কম্বল, যা আছে সব নিয়ে একেবারে জাম্বুবানের মতো শুয়ে পড়েছে। মাথায় মাংকি ক্যাপ পরে শুয়েছে। সব একেবারে বরফ হয়ে থাকে। সে দেখল মৈত্র তখনও নড়ছে না। অমিয় বিরক্ত হয়ে বলল, ধুস শালা, কি যে দ্যাখে! এই মৈত্র, ঘুমালে ঘুমো না হয় ওপরে গিয়ে বন্দর দ্যাখ। আলো নিভিয়ে দেব।

    মৈত্র এবার তাকাল।

    অমিয় বালিস থেকে মাথা তুলে বলল, হ্যাঁরে তুই কি দেখছিস?

    —কিছু না।

    —কিছু দেখছিস ঠিক!

    —একটা তিমি মাছ!

    —হ্যাঁ, তিমি মাছ। বলে কি রে! আরে ছোটবাবু, অঃ ছোটবাবু তুমি ঘুমালে নাকি! শুনছ ছোটবাবু, সে লাফ দিয়ে সব লেপ কম্বল ফেলে দিয়ে একেবারে নিচে নেমে গেল। সে মৈত্রকে সরিয়ে এনে পোর্টহোলে মুখ এগিয়ে দিলে, দেখল সামনে শুধু অন্ধকার সমুদ্র। অনেক দূরে বন্দরের আলো দেখা যাচ্ছে। নীল অন্ধকারের ভেতর যেন আলোর অজস্র মালা। এবং দূরে লাইট-হাউসের আলো। ঘুরে ঘুরে লাইট-হাউস জাহাজগুলোকে পথ দেখিয়ে যাচ্ছে। এবং অন্ধকারের ভেতর কিছু জাহাজ সমুদ্রে ইতস্তত নোঙর ফেলে রেখেছে দেখতে পেল।

    অমিয় এবার পোর্ট-হোলে চিৎকার করতে থাকল, কোথায়, কোনদিকে! অন্ধকারে তুই তিমি মাছ দেখবি কি করে। বলে অমিয় সরে এল!

    মৈত্র আবার যথারীতি পোর্ট-হোলে মুখ রেখে দেখতে থাকল।

    অমিয় পাশে দাঁড়িয়ে বলল, দেখতে পাচ্ছিস?

    —হ্যাঁ।

    ছোটবাবু এখন কি করবে ভেবে পেল না। ঠাণ্ডায় পা গরম হচ্ছে না ছোটবাবুর। পা গরম না হলে ওর ঘুম আসে না। কিন্তু কি যে শীত! পায়ের হাঁটু পর্যন্ত একেবারে ঠাণ্ডা বরফ। সে স্নানের সময় গরম জল হাঁটু পর্যন্ত ঢালে। সে পায়ে গরম উলের মোজা পরে শোয়। জ্যাক ওকে দুটো দামী দস্তানা দিয়েছে উলের। শীতে হাত বরফের মতো। মাঝে মাঝে অসাড় লাগে। সে দস্তানা পরে থাকে। কাজ করার জন্য জ্যাক ওকে দুটো ভারি চামড়ার দস্তানা দিয়েছে। এবং পারলে যেন জ্যাক তাকে সব দিয়ে দেয়। সে এখন যা কিছু পরে আছে প্রায় সবই জ্যাকের দেওয়া। বেশ গরম! অমিয় অথবা মৈত্রের মতো সে শীতে তেমন কষ্ট পায় না। পা গরম হলেই ঘুম চলে আসবে। কিন্তু মৈত্র আর অমিয় পোর্ট-হোলে কি যে দেখছে বার বার!

    অমিয় ফের পোর্টহোল থেকে মুখ তুলে আনল।—সব বাজে কথা। গুল!

    মৈত্র বলল, তুমি হতভাগা কিছু দেখতে পাবে না। তুমি একটা আস্ত ষাঁড়।

    —আমি আর কি দেখতে পাব! কেবল অন্ধকার সামনে, কিছু জাহাজ নোঙর করা। জলে ফসফরাসের লাল ফুলকি। তুমি একটা মরুভূমির উট।

    —তা হলে তিমি মাছ দেখতে পেলি না!

    —না।

    —তা হলে বড় একটা বাঁশ দ্যাখ। ওতে একটা তিমি মাছের কঙ্কাল ঝোলানো আছে।

    —পাগল আর কি! বলে সে এক লাফে আবার ওপরের বাংকে উঠে গেল। আসলে মৈত্র ওর স্ত্রী শেফালীর চিঠির কথা বলছে। বন্দরে এলেই বোধ হয় ওর বৌর কথা বেশি মনে হয়। ওর ঘুম আসে না। অমিয় মুখে মাথায় লেপ কম্বল যা আছে সব দিয়ে ঢেকে দিল। শেফালি চিঠিতে সব সময় একটা তিমি মাছের কথা লেখে। বোধহয় মৈত্র জাহাজ নোঙর ফেললেই তিমি মাছটা দেখতে পায়।

    পরদিন সুবোধ বালকের মতো ঘুম থেকে উঠেই মৈত্র চা করে আনল। কাজ কাম সেরে বারোটায় স্নান করার জন্য বাথরুমে ঢুকে গেল। পোশাক খুলে ফেললেই আয়নায় নিজের শক্ত শরীর দেখার ইচ্ছে। কিন্তু শীতে সে দাঁড়াতে পারে না। সে তার পেশী দেখতে দেখতে কেমন শরীরে অনবরত গরম জল ঢালতে থাকে। হাতের পেশী দেখতে দেখতে সে শেফালির কথা মনে করতে পারে। শেফালি উঁচু লম্বা মেয়ে। সহবাসে শরীর বড় মনোরম। দস্যুর মতো তুমি, দস্যুর মতো আমাকে মেরে ফেলতে পার না–শেফালির এমন কথা কিনারায় এলেই তাকে পাগল করে দেয়। আমাকে তুমি মেরে ফেল আর পারছি না অথবা কেন যে এখন মৈত্রের মনে হয় শরীরের কষ্ট শেফালির বড় বেশি উগ্র। বাথরুমে অথবা কম্বল গায়ে চুপচাপ শুয়ে থাকলে শেফালির সব খালি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ চোখে দেখতে পায়। তখন মৈত্রের শরীরে শীতটা বাড়ে।

    বস্তুত মৈত্র বন্দরে এলেই শেফালির কথা বেশি মনে করতে পারে। বন্দরের গাছপালা, পারসিমন লতার গুচ্ছ অথবা স্কাইলার্ক ফুলের হলুদ রঙ ওকে মাতাল করে ফেলে। মৈত্র, সুখী এবং সৎ মৈত্র যাতে থাকতে পারে, তার জন্য কি যে ওর চেষ্টা!

    স্নান সেরে বের হলে মৈত্র দেখল, অমিয়, ছোটবাবু, টেবিলে থালা সাজিয়ে বসে আছে।

    খাবার সময় মৈত্র অমিয়কে বলল, দেখ অমিয় তুই নতুন এয়েছিস। শহর বন্দর সম্পর্কে তোর কোনও ধারণা নেই। লরেঞ্জো মরকুইসে, ডারবানে যা সব করেছিস, এখানে যেন এ সব না হয়। সব কিছুর একটা সীমা আছে।

    —আমি কি করেছি!

    —যাকগে, বলে দিলাম, যদি সাবধানে চলাফেরা না কর তবে কে কাকে রক্ষে করে। তারপর কেমন যে সে সহসা উত্তেজিত হয়ে গেল, শালা তুই এটা কলকাতার মদ পেয়েছিস। ঢক ঢক করে এতটা খেয়ে ফেললি! বিদেশী মদে কত ঝাঁজ তুই জানিস!

    —না।

    মৈত্র মাংসের হাড় চিবুচ্ছিল। সে ছোটবাবুর দিকে তাকিয়ে বলল, কেমন লাগছে ছোটবাবু?

    —ভাল।

    —দেখেছ, কি সব পরীদের মতো মেয়েরা গাছের নিচে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তারপরই বলল, তোমাকে নিয়ে আমার ভয় নেই ছোটবাবু। যত ভয় অমিয়কে নিয়ে। একটু থেমে বলল, এখানে মেয়েদের কি বলে জানো?

    অমিয় ক্ষেপে যাচ্ছিল। মৈত্র তাকে আর একটা কথা বলছে না।

    ছোটবাবু মুখ তুলে তাকালে বলল, চেঙ্গেরিতা। শালা চেঙ্গেরিতাই বটে। যেমন রঙ, তেমনি বাহার। আর শালার কেবল খাই খাই! গাউনের নিচে কেবল…।

    অমিয় থালা নিয়ে উঠে যাবার সময় শুধু বলল, কেবল খাবলা খাবলা। ও হাত দিলে কি যে মজা! আমি যাব। তুমি যা করতে পার কর শালা। বলে সে মেসরুম থেকে বের হয়ে গেল।

    মৈত্র চিৎকার করে উঠল, মরবে! শালা মরবে।

    ছোট বাবু সকালে ঘুম থেকে উঠে, সত্যি অবাক হয়ে গেছিল। জেটির পাশেই নানা রকম ফল ফলের গাছ, বড় বড় গাছ সমুদ্রের ধারে। সমুদ্র এখানে লেগুনের মতো নয়, অথবা নদী ধরে ভেতরে ঢুকেও বন্দর নয়, একেবারে সমুদ্রের ধারে শহর। জেটি থেকে একটু এই ফার্লং-এর মতো হাঁটলে শহরের ভেতরে ঢুকে যাওয়া যায়; এবং পেছনে তাকালে বিশাল সমুদ্র, শান্ত, নীল রঙের ভেতর এই সব সারি সারি জাহাজ, এবং জাহাজের পাশে যে সব গাছেরা ফুলেরা ছড়িয়ে আছে তাদের ভেতর এমন সব সুন্দর সুন্দর যুবক-যুবতীদের ঘুরে বেড়াতে দেখে ছোটবাবু ভীষণ অবাক হয়ে গেছিল। সামনে দাঁড়িয়ে আছে বড় বড় স্কাইস্ক্র্যাপার। সে জাহাজের বোট-ডেকে উঠে গেলে সব দেখতে পায়। এবং কালো এসফাল্টের পথ ধরে গোলাপী আভা মুখে মেয়েরা, ঠিক গোলাপী বললে ভুল হবে কিছুটা যেন নীল রং ফুটে বের হচ্ছে চোখের নিচ থেকে। সে ভেবেছিল দেবদেবীদের মুখ চোখ এমন হবার কথা, মানুষের মুখ চোখ এত সুন্দর হয় সে জানত না।

    সুতরাং মৈত্র বলল, খুব খারাপ জায়গা বাপু। খুব সাবধানে চলাফেরা করবে। একা একা বের হবে না। বের হলে আর খুঁজে পাওয়া যাবে না।

    অমিয় এবং ছোটবাবু এই প্রথম সমুদ্রে বের হয়েছে, প্রথম প্রথম যতটা অবাক হবার কথা তার চেয়েও বেশি অবাক সব কিছু দেখে। মৈত্র স্পেনীশ মেয়েদের এমন সব গল্প বলেছে যে নেমে গেলে আর ফিরে আসা যায় না। কি যে মোহ থাকে। টাকা পয়সা সব রেখে একেবারে নাঙ্গা হয়ে ফিরতে হয়।

    ওরা দুজন আবার শিশুর মতো চুপচাপ শুনে যাচ্ছিল।

    অমিয় তবু যেমন বলে থাকে, একটু বলে ফেলা যেন, যত বাজে কথা।

    মৈত্র বলল, একবার খপ্পরে পড়লে বুঝতে পারবে।

    অমিয় কি ভাবল, তারপর বলল, তুই বের হবি না?

    —পাগল! বের হয়ে সব টাকা গচ্ছা দিই আর কি! এখন আমার খুব টাকার দরকার। আমাকে বে-হিসেবী হলে চলে!

    ওরা তাড়াতাড়ি খেতে থাকল তারপর। কিছু জাহাজি রেলিঙে ভর করে গাছের ছায়ায় যুবক- যুবতীদের দেখছে। কিছু জাহাজি কলম্বো থেকে যে সব কাঠের হাতি, ময়ূরের পাখা কিনে নিয়েছিল বিক্রির জন্য—তারা ফোকসালে বসে সেই সব হাতী, পাখা সাফসোফ করছে। কারণ বিকেলে বন্দরে কত যে পাখী উড়বে। বন্দরে সব টিউলিপ গাছে কত ফুল ফুটে থাকবে। আর কত যুবক-যুবতী হেঁটে হেঁটে বন্দরে চলে আসবে হাওয়া খেতে। আশ্চর্য এই বন্দর। আসলে সব বড় বড় বার্চ জাতীয় গাছ চারপাশে। এবং গাছে সব হলুদ রঙের পাতা। নিচে লাল নীল স্কার্ট পরা যুবতী। হাতে কালো দস্তানা। মাথায় কালো টুপি। রঙ ওদের পাকা আপেলের মতো। মুখে ওদের সরল হাসি। আর কি অসামান্য রূপ। স্পেনীশ যুবতীদের চোখ কালো চুল কালো—সোনার হরিণের মতো পরম লোভের বস্তু। খেতে খেতে মৈত্র বন্দরের সব খবর দিয়ে যাচ্ছে।

    ছোটবাবুর দিকে তাকিয়ে বলল, খুব সাবধান! মারা পড়বে। রাম রাবণের যুদ্ধের কথা মনে আছে? সোনার হরিণের জন্য রাম যে রাম যে শালা পিতৃ আজ্ঞা পালনের নিমিত্ত বনে গিয়েছিল, যে শালা রাম মনুষ্য নয়, দেবতা, সে পর্যন্ত সোনার হরিণের লোভ সামলাতে পারে নি-রে অমিয়। আর ছোটবাবু তুমি তো মনুষ্য জাতির অপোগণ্ডো।

    অমিয় বলল, কোথাও একা যাচ্ছি না। তোর সঙ্গে যাব।

    ছোটবাবু বলল, আমিও।

    তখন গ্যালিতে ভাণ্ডারি, গলা বাড়িয়ে ওদের কথা শুনছে। বুড়ো মানুষ। রোগা। হাত পা কাঠির মতো। সে গলাটা কচ্ছপের মতো বের করে রেখেছে যেন। এটা শীতকাল, গ্যালীতে পর্যন্ত ঠাণ্ডা। ওর চোখ মুখ ঠাণ্ডায় সাদা ফ্যাকাসে হয়ে গেছে। মৈত্র বলল, কি শুনছ চাচা?

    —আপনেগ রসের কথা শুনছি।

    —আমি ঠিক বলিনি?

    —ঠিক বেঠিক জাহাজ না ছাড়লে বোঝা যাবে না। বলেই ভাণ্ডারি গলাটা টেনে নিল ভেতরে। ওরা তিনজনই শেষ পর্যন্ত ভয়ে জাহাজ থেকে নামে নি। ঠিক নামে নি বললে ভুল হবে ছোটবাবু মাটি দেখলে না নেমে থাকতে পারে না। সে একটু সমুদ্রের ধারে ধারে ঘুরে এসেছে। একটু ভেতরে ঢুকলে লেন্দ্রো-এলেন। সে ঠিক জানে না কতদুর গেলে লেন্দ্রো-এলেন, তবু সে কিছুদূর গিয়ে বুঝতে পেরেছিল এমন শীতে সে বেশিদূর হাঁটতে পারবে না। সমুদ্র থেকে কনকনে ঠাণ্ডা বাতাস একেবারে সব হিম করে দিচ্ছে। অথচ এ-দেশের মেয়েরা ছেলেরা ঘুরে বেড়াচ্ছে টেনিস খেলছে। ওদের শরীরে যেন শীত লাগছে না। সে ওদের দেখে অবাক না হয়ে পারছিল না।

    রাতের বেলা মনে হল ঠাণ্ডা আরও বেড়েছে। কেমন জ্যোৎস্নার মতো সারাদিন ঠাণ্ডা। শীতের রোদে দাঁড়ালে মনে হয় না রোদ। তবু যতক্ষণ রোদ ছিল জাহাজিরা ওপরে উঠে দাঁড়াতে পারছে, সন্ধ্যা হলে কেউ আর ওপরে থাকছে না। যারা বের হবার এ-শীতেও বের হয়ে যাচ্ছে। বড়-মিস্ত্রি সেই এক পোশাকে ক্রাচে ভর করে নেমে যাচ্ছে। মাঝ বয়সী মেমসাব ওকে ধরে ধরে গাড়িতে তুলে নিচ্ছে। জ্যাক বিকেলের দিকে ওর বাবার সঙ্গে এজেন্ট অফিসে গেছে। হয়তো কোথাও ওর বাবার পার্টি আছে। সেখান থেকে ফিরতে রাত হবে। চিঠি পত্র এসেছিল। ওর কোন চিঠি নেই। সে আর চিঠির আশাও করে না। আত্মীয়-স্বজন কিছু কলকাতায় আছে। ওদের ঠিক ঠিকানা ওর জানা নেই। সে মানুষ হিসেবে অগোছালো—তার কিছু ঠিকঠাক থাকে না। এমন কি জাহাজে ওঠার আগে যে দূর সম্পর্কের আত্মীয়টি ভীষণ সদাশয় ছিলেন, সে তাদের ঠিকানায় চিঠি দিতে পারত। কিন্তু সেটাও সে এখন খুঁজে পাচ্ছে না। কাজেই সে আর কিছু করতে পারে না। শেষ পর্যন্ত সে ঠিকানা লিখে বাসে রেখেছিল তো। এখন কিছুই মনে করতে পারছে না। আসলে এ-কাজটার সঙ্গে ওর মনের কোন সংযোগ নেই। যেন কোনরকমে সিঁড়ির ধাপ ভেঙ্গে ওপরে ওঠা। ঠিকমতো উঠতে পারবে কিনা জানে না। জাহাজে জ্যাক আছে, মৈত্র এবং অমিয়, সারেঙসাব, ইয়াসিন অনিমেষও আছে। ওরা আছে বলেই সে নিঃসঙ্গ নয়। সে এখন জ্যাকের কাছ থেকে নানারকম সমুদ্র বিষয়ক বই নিয়ে আসে। সমুদ্রের ওপর পড়াশোনা করতে ওর ভাল লাগে। এখন সে মার্কোর্পলোর ভ্রমণ কাহিনী পড়ছে। আসলে মানুষ এ-সব বই পড়লে মনে মনে সমুদ্রে না গিয়েও সমুদ্রে ভেসে চলতে পারে। অনেক সময় ওর ইচ্ছে হয় সেও লিখবে এমন একটা কাহিনী। কারণ মার্কোপলোর চেয়ে কম রোমাঞ্চকর নয় তার এই সমুদ্রযাত্রা।

    রাত এভাবে জাহাজে বেড়ে যায়। স্টিয়ারিং এনজিনে কোন শব্দ নেই। ওপরে সমুদ্রের হাওয়া বয়ে যাচ্ছে। তার শব্দ এবং সমুদ্র থেকে ঢেউ এসে আছড়ে পড়ছে। এ-বাদে কিছু শব্দ নেই। ক্রেনগুলো কাল থেকে এদিকে ঠিক ফল্কা বরাবর দাঁড়িয়ে যাবে। কাল থেকে মাল খালাস আরম্ভ হবে। ফল্কার কাঠ তোলা হবে কাল। কিনার থেকে মানুষ জন দলে দলে উঠে আসবে। এমন নিঃশব্দ, নির্জন তখন থাকবে না জাহাজ। দীর্ঘদিন পর জাহাজ বন্দরে এসে ভিড়লে কেমন সব চুপচাপ হয়ে যায়। সমুদ্রে পিচিঙের বিরাম থাকে না, কম বেশি, এনজিনের শব্দ সব সময়। সেটা সহসা বন্ধ হয়ে গেলে কেমন ভুতুড়ে মনে হয় জাহাজটাকে। কেমন একেবারে সব কিছু থেমে যায় যেন। কেউ সিঁড়ি ধরে নেমে এলে জুতোর শব্দ এত স্পষ্ট যে তখন ভীষণ অস্বস্তি লাগে।

    যারা হাতী এবং ময়ূরের পালক নিয়ে দোকানের মতো ওপরে সাজিয়েছিল, তারা পর্যন্ত নেমে এসেছে। কিনার থেকে তেমন কেউ আর ওপরে ওঠে আসে নি। কাল খবর রটে যাবে শহরে। ভারতবর্ষ থেকে জাহাজ এসেছে। ওরা প্রতিবারের মতো এবারে ময়ূরের পালক, কাঠের হাতী নিয়ে এসেছে। সুন্দর সুন্দর সব চাকচিক্যময় হাতী, কালো রঙের, আর ময়ূরের পালক ড্রইংরুম সাজাবার পক্ষে কি যে দরকারী। আর কি সস্তা! কেবল যমুনাবাজুর গ্যালিতে ডেক-ভাণ্ডারির গলা পাওয়া যাচ্ছে। সে বোধহয় উনুনের ছাই ঝাড়ছিল। সে বোধহয় উনুন পরিষ্কার করে রাখছে। অথবা এও হতে পারে—সে রাতে বন্দরে যাবে বলে সব ঠিকঠাক করে রাখছে। বেশি রাতে ফিরলে সকাল সকাল উঠতে কষ্ট হবে। হাতের কিছু কাজ সে সেরে রাখছে আগে থেকে।

    মৈত্র শুয়ে শুয়ে চিঠি পড়ছিল। ওর বৌ যথানিয়মে চিঠি লিখে থাকে। বন্দরে এলে সবাই চিঠি না পেলেও যেন কথা থাকে সে চিঠি পাবে। কি যে লেখা থাকে চিঠিতে! ছোটবাবু দেখেছে অনেক সময় মৈত্র পালিয়ে পালিয়ে বৌর চিঠি পড়ে। কেউ এলেই সে লুকিয়ে ফেলে। অথবা ধরা পড়ে গেছে মতো মুখ করে রাখে। ছোটবাবু জানে, সে ঘুমিয়ে পড়লেও মৈত্র চিঠি পড়ে। তখন অমিয় কিছু বলে না। সে একটা ক্রাইম নভেল পড়তে থাকে শুয়ে শুয়ে। কারণ সে হয়তো জানে চিঠি পড়া মৈত্রের সারা রাতেও শেষ হবে না। সে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে চিঠিটা পড়ে। তারপর চিঠি লিখতে বসে। শীতের জন্য সে মাঝে মাঝে চা করে আনে। চা খেতে খেতে কত কি যে ভেবে সে চিঠি লেখে।

    অমিয় মাঝে মাঝে ধুস্ শালা বলছে। কাকে ধুস্ শালা বলছে বোঝা যাচ্ছে না। মৈত্রকে না শীতের জন্য ধুস্ শালা বলছে ছোটবাবু বুঝতে পারছে না। মৈত্র আলো জ্বালিয়ে রেখেছে বলে অমিয়র ঘুম নাও আসতে পারে, অথবা শীতের জন্য, না কি সে ক্রাইম ফিকশানে কোনও এমন চরিত্র পেয়ে গেছে যাকে মাঝে মাঝেই ধুস্ শালা বলা যায়। ধুস্ শালা বললে, শীত কমে যায়, মৈত্রকেও বুঝিয়ে দেওয়া যায়, আলো জ্বালিয়ে রাখার জন্য ঘুম আসছে না।

    মৈত্র দেখল, তখন ছোটবাবু পাশ ফিরছে। ছোটবাবু ঘুমোবে এখন হয়ত। এক কাপের মতো চা করে এনেছিল, সে তবু বলল, কি রে খাবি, যা ঠাণ্ডা। চা খেলে ভাল লাগবে। আর সঙ্গে সঙ্গে দুজনেই লাফ দিয়ে উঠল। গলায় মাথায় মাফলার ঢেকে, কম্বল, লেপ মুড়ে একেবারে দুজন এসকিমোর মতো উঠে বসেছে। হাত বের করছে না পর্যন্ত। পারলে যেন মৈত্রকে এখন চা খাইয়ে দিতে হবে। আর উঁ হুঁ হুঁ এমন শব্দ, মুখ থেকে বাষ্প বের হচ্ছে গাদা গাদা।

    মৈত্র চা খেয়ে বাংকে উঠে গেল। এত তাড়াতাড়ি ওর ঘুম আসে না। তবু বাজি ধরার মতো সে বন্দরে না নেমে থেকেছে। ওর জন্য ছোটবাবু অমিয় নামে নি। ছোটবাবু একটু ঘুরেই উঠে এসেছে জাহাজে। কিন্তু বন্দরে এলে জাহাজ থেকে না নেমে থাকা ভীষণ কষ্টের। ওর চিঠি পড়তে পড়তেই মনে হল, কতকাল থেকে সেও মাটি না ছুঁয়ে আছে। সে তো মানুষ। সে কি করে ডাঙায় না নেমে থাকে। জাহাজে থাকলেই সে শেফালীর কথা ছাড়া আর কিছু ভাবতে পারে না। সে শেফালীর মুখ ভাবতে ভাবতে অথবা ওর চিঠি পড়তে পড়তে সত্যি একটা অসুখে পড়ে যায়। সে কম্বলের নিচে তখন হি হি করে শীতে কাঁপতে থাকে। আর তখন মনে হয় শেফালীর ভীষণ অবিশ্বাস মৈত্রকে। সে ফিরে গেলেই ভূতে পাওয়া রুগীর মতো ছিঁড়ে খেতে চায়, সে সমুদ্রে ভাল মানুষ থাকে কি করে।

    সময়-অসময় পর্যন্ত বোঝে না মানুষটা। পাগলের মতো ভালবাসার জায়গাগুলো নিয়ে পড়ে থাকে। তখন একেবারে সরল মানুষ। শেফালীকে ছেড়ে সে কোথাও যাবে না। দু’দণ্ড কোথাও দেরি করে না। যেন শেফালীর শরীর পেলে মৈত্রের আর কিছু লাগে না। আর কি আছে শেফালীর। লম্বা যুবতী শেফালী। শরীরের সর্বত্র মহিমময় ঈশ্বর সবকিছু ভরে দিয়েছেন। মনে হলেই মৈত্রের শেফালীর সবকিছু মনে পড়ে যায়। এবং এভাবেই মৈত্র জাহাজে তার সফর শেষ করে দেয় ভেবে ভেবে।

    অথচ সে আবার একনাগাড়ে বেশি দিন ঘরে থাকতে পারে না। এক সময় মনে হয় শেফালীকে আর তেমন ভাল লাগছে না। বরং শেফালীকেই মনে হয় ভীষণ বেপরোয়া। সে শেফালীর কাছে এতটা আশা করে না। তখন শেফালীকে ভীষণ ওর বাজে লাগে। আবার নোনা জল, সমুদ্রে সফর। জাহাজের জন্য উঠে পড়ে লাগা। টাকা কমে আসে, কতদিন বসে খাওয়া যায়, সে শেফালীকে নানাভাবে বোঝাতে থাকে, এবার সমুদ্রে বের হওয়া দরকার। বের হয়ে গেলেই যত মায়া ফের গড়ে ওঠে শেফালীর জন্য। সে শেফালীকে ছেড়ে সত্যি বেশিদিন সমুদ্রে থাকতে পারে না।

    কখনও শেফালী বলবে, তুমি থাকো কি করে? কষ্ট হয় না?

    মৈত্র হেসে বলত, তোমার কথা ভেবে ভেবে সফর শেষ করে দিই।

    শেফালীর তখন বলার ইচ্ছে হত, তুমি মিথ্যা কথা বলছ। আমাকে সত্যি কথা বলছ না। অথচ শেফালীর বলার সাহস হত না। মানুষটি যা একগুয়ে, কখন কি করে বসবে কে জানে। তাই চিঠিতে সেই যেন মায়ের মতো লেখা, অথবা সেই জাহাজডুবির গল্প মনে করতে পারে মৈত্র, যেন শেফালী প্রত্যেক চিঠিতে লিখতে চায়, সাগরে জাহাজডুবি হয়েছে। সমুদ্রে সাঁতার কাটছে বাবা এবং ছেলে। ছেলে কিছুতেই আর পারছে না। মাঝে মাঝে ডুবে যাচ্ছে। তখন যেন বাবা বলছেন, তুমি নক্ষত্র দেখতে পাচ্ছ, ঐ যে দূরে আকাশে নক্ষত্র, ঠিক তার নিচে তোমার মা একটা ঘরে বসে রয়েছেন। আমাদের জন্য গরম খাবার টেবিলে সাজিয়ে বসে আছেন। অপেক্ষা করছেন কতক্ষণে আমরা যাব। তুমি তবু তলিয়ে যাচ্ছ কেন জলে! জলের নিচে সব বড় বড় হাঙর, জোরে হাত-পা নাড়তে পারছ না। আমরা এসে গেছি, ঐ তো সেই পাহাড়টা, তুমি কতদিন তার ওপর দাঁড়িয়ে দূরের জাহাজ দেখেছ। দেখতে পাচ্ছ পাহাড়ের মাথায় আলো জ্বলছে। আর একটু কষ্ট করলেই আমরা সেখানে আহার এবং উত্তাপ পাব জান। সামান্য ধৈর্য, অধৈর্য হলে আমরা উভয়ে তলিয়ে যাব।

    শেফালীর যেন এভাবে বলার ইচ্ছে আমরা উভয়ে তলিয়ে যাব শুভেন্দু। আমি তোমার জন্য আহার এবং উত্তাপ সবই সঞ্চয় করে রাখছি। ঘরে ফিরলে আহার এবং উত্তাপ যা খুশি তোমার, যতটুকু ইচ্ছা সব চেঁটেপুটে নিও। এই উত্তাপের জন্য অন্যত্র হেঁটে যাবে না কথা দাও। আমার কাছে এক বাতিঘর সম্বল। সমুদ্রে ডুব দেবার প্রলোভন জাগলে নিজের বাতিঘরটির কথা ভেবো। শেফালীর চিঠিতে এমন অজস্র কথা থাকে। যার উত্তর দেবার সময় মৈত্র ভীষণ ভাবনায় পড়ে যায়।

    মৈত্র ডাকল, অমিয়, রাত কত হয়েছে খেয়াল আছে?

    —তোর বৌকে চিঠি লেখা শেষ?

    —শেষ।

    —ছোটবাবু কি করছে?

    —ঘুমোচ্ছে।

    —তুই শুয়ে পড়। আর একটু বাকি আছে, ওটুকু হলেই শুয়ে পড়ব। তুই ঘুমিয়ে পড় না।

    —ঘুম আসবে না।

    —কেন, আলো জ্বালা বলে?

    —না। বৌটার বাচ্চা হবে। টাকা পাঠানো দরকার।

    —টাকা পাঠাতে লিখেছে?

    —হ্যাঁ।

    —তাহলে সারেঙসাবকে বলে টাকা তুলে নিবি। কাল তো শুনলাম, কে কত তুলতে চায় একটা লিস্ট চেয়েছে।

    মৈত্র আর কিছু বলল না। সে কম্বলের নিচে হাত রেখে, হাত-পা গরম করার চেষ্টা করল। কখনও হয়ত ঘসে ঘসে কানে হাত চেপে ধরেছে। কিছুটা এভাবে ওর শরীর গরম হয়। তারপর সে মুখে মাথায় কম্বল টেনে দেবার সময় দেখল, ছোটবাবুর লেপ কম্বল পা থেকে সরে গেছে। এই হয়েছে জ্বালা। ঘুমালে ছোটবাবুর কোন হুঁস থাকে না। সে উঠে লেপ-কম্বল টেনে দিল। ছোটবাবুকে দেখলেই বোঝা যায়, খুব ছেলেমানুষ। ঘুমিয়ে থাকলে ওকে আরও বেশি ছেলেমানুষ লাগে। ছোটবাবুকে নিয়ে ভয় আছে। এ-বয়সটা খুব ভয়ের। অতি সহজে কোন যুবতী ওকে সম্বল করে বনবাসে চলে যেতে পারে। পোর্টহোল বন্ধ। দরজা বন্ধ। ঘরে, বাইরের ঠাণ্ডা ঢুকতে পারছে না। আলো জ্বালা থাকলেই যেন ভাল। যতটুকু উত্তাপ পাওয়া যায়। ছোটবাবু পায়ে মোজা পরেই শুয়ে পড়েছে। হাতে দস্তানা। ছোটবাবু যে ভীষণ শীতকাতুরে এই থেকে বোঝা যায়।

    এমন সময় অমিয় দেখল, বড় টিণ্ডাল মৈত্রও নাক ডাকিয়ে ঘুমোচ্ছে। সে বইয়ের পাতা ভাঁজ করে শুয়ে পড়বে ভাবল। ঘুমিয়ে থাকলে মৈত্রের মুখ সে তার বাংক থেকে স্পষ্ট দেখতে পায়। সে ওপরের বাংকে থাকে। মাঝে মাঝে মৈত্র ঘুমের ভিতর হাসলে টের পায় অমিয়, মৈত্র স্বপ্ন দেখছে। স্বপ্ন দেখলে সাধারণতঃ বৌকেই দেখতে পায়। ওরা একসঙ্গে সেই কলকাতা বন্দর থেকে আছে। নানাভাবে দেশের কথা উঠলে মৈত্র, ওর বৌ সম্পর্কে বলেছে। ওদের ভালবেসে বিয়ে। মৈত্রের স্ত্রী সুন্দরী, এ-কথাও মৈত্রের কাছ থেকে শোনা। এবং দেখতে ভালো। আর শেফালীর ভালবাসার জুড়ি নেই। সে প্রায় মাঝে মাঝে কেঁদে ফেলার মতো মুখ করে বসে থাকত, স্ত্রীর কথা মনে হলেই মৈত্র একেবারে চুপচাপ। কথা প্রসঙ্গে মৈত্র কত যেন কথা বলে—আর জাহাজে আসছে না, এমনও বলে মাঝে মাঝে। বয়স বেড়ে যাচ্ছে, এ-বয়সে একটা কাজ ডাঙায় খুঁজে না নিলে সারাটা জীবন সমুদ্রে কাটবে! সফরে সফরে সে টাকা জমাচ্ছে।

    মৈত্র এভাবে কত রকমের পরিকল্পনা করে থাকে। সে কতবার যে বলেছে টাকা সঞ্চয় করছি অমিয়। চিরটাদিন জাহাজে কাজ করতে ভাল লাগবে না। তুইও জমা। টাকা অযথা নষ্ট করবি না। জাহাজের একটা পয়সাও আমি নষ্ট করছি না। মদ খাচ্ছি না। কার্নিভেলে যাচ্ছি না। জুয়া খেলছি না। কিনারার এক খদ্দের ধরতে হবে শুধু। কথা আছে মানুষটা জাহাজেই আসবে। যদি জাহাজ থেকে নির্বিঘ্নে নামাতে পারি, তবে দু’পয়সা হয়ে যাবে। যা সামান্য আয় এতে বাড়ে। আমি এজন্য কাঠের হাতী আনিনি, ময়ূরের পালক আনিনি।

    অমিয় বলেছিল, একটা কেলেঙ্কারী না হয়।

    —কি আর হবে। ধরা পড়লে চুপ মেরে যেতে হবে। কার জিনিস কে খোঁজ রাখে।

    —আমার এসব ভাল লাগে না মৈত্র।

    মৈত্র বলল, আমারও কি ভাল লাগে! বউ সুন্দরী হলে অনেক খরচ।

    মৈত্রের ঐ অভ্যাস। দোষ ত্রুটির জন্য সে সবরকমের যুক্তি-তর্ক খাড়া রাখে। না পারলে চুপ। কোন কথা বলবে না। চুপচাপ কাজ করবে। তখন মনে হবে, ছোটবাবু এবং অমিয় জাহাজে সত্যি কয়লায়ালা, সে বড় টিণ্ডাল। আস্কারা দিয়ে মাথায় তুললে যা হয়। কথা না বলে সে মনে করিয়ে দেয় সে জাহাজের বড় টিণ্ডাল। অমিয় এবং ছোটবাবু তখন একেবারে ঠিক ঠিক কয়লায়ালার মতো ব্যবহার করতে থাকে। টিণ্ডাল সাব, খানা রেডি।

    মৈত্র আরও গম্ভীর হয়ে যায়।—খুব মজা, হারামজাদা, পঙ্গপালের দল। সে তেড়ে যায় ছোটবাবুকে। ছোটবাবু আর অমিয় তখন ডেকের ওপর ছুটে গিয়ে হা-হা করে হাসতে থাকে।

    রাত থাকতে অমিয়র ঘুম ভেঙ্গে গেল। বন্দর এলে ওয়াচ থাকে না। কাজের চাপ কম। সাতটা থেকে কাজ আরম্ভ। অমিয়র ইচ্ছে ছিল ছ’টা পর্যন্ত ঘুমাবে। একঘণ্টার ভেতর বাকি কাজ অর্থাৎ হাত-মুখ ধোয়া, বাথরুমের কাজ, এবং অন্যান্য, যেমন চর্বি ভাজা রুটি-চা এসব খাওয়ার কাজ সেরে ফেলতে পারবে। তারপর টান্টু বললেই লাফিয়ে কাজে বের হয়ে যাওয়া। অথচ ঘুম যে কেন রাত থাকতে ভেঙ্গে গেল। বেশ রাত। সকাল হতে হতে সাতটা বেজে যাবে। তবু তখন কিছুটা অন্ধকার থাকে। অন্ধকারে এনজিনরুমে নেমে যেতে হবে। সে ঘড়িতে দেখল পাঁচটা বাজেনি। সে ফের লেপ- কম্বল মুড়ি দিয়ে ঘুমোবার চেষ্টা করল। কিন্তু ঘুম এল না। সে কম্বল গায়ে উঠে বসল। বাথরুমে যেতে হবে। শীতের সময় যতক্ষণ পারা যায় চেপেচুপে পড়ে থাকার স্বভাব। সে বুঝতে পারল এর জন্য ঘুম ওর ভেঙ্গে গেছে। সে নেমে ওপরে ওঠার সময় ভাবল, দরজাটা বন্ধ করে আসেনি। সিঁড়ির মুখে, আলোটা সবসময় জ্বালা থাকে। দরজা খোলা রাখলে ঘরে অন্ধকার থাকে না। সে নেমে গিয়ে দরজা ফের বন্ধ করে দিল।

    তারপর ধাপে ধাপে ওপরে উঠতেই মনে হল, পূবের দিকটা বেশ ফর্সা মতো। সে রাতে এটা লক্ষ্য করেনি। একটা দ্বীপ-টিপ থাকবে। সেখানে আলো থাকতে পারে। নানাভাবে চারপাশের আলো মিলে এমন দেখাতে পারে। নতুন বন্দর। সামনে জেটি পার হলে বড় বড় গাছ। আলো-অন্ধকারে গাছগুলোকে বড় রহস্যময় লাগছিল। মৈত্র বলেছে জেটি পার হলে শহরের পার্ক। সমুদ্রের বুক থেকে এই পার্ক উঠে এসেছে যেন। এই পার্কে টিউলিপের ফুল প্রচুর ফোটে। ফুলের লোভে শহরের সব উঠতি বয়সের মেয়েরা এখানে বিকেল হলেই চলে আসে।

    এইসব মেয়েরা স্বাভাবিকভাবেই জাহাজিদের ভীষণভাবে মাতাল করে দেয়। এবং এখানে এক কার্নিভেল আছে, কার্নিভেলে গুহাপথ আছে অথবা রিঙের খেলা, মোটর রেস আছে যা মৈত্র এবং নাবিকদের পক্ষে ভীষণ লোভের। মৈত্র বলেছে মাথা ঘোরাবার পক্ষে জুয়োখেলায় যে-কোন রমণীই যথেষ্ট।

    প্রচণ্ড ঠাণ্ডায় ওর ঘুম ভেঙ্গে যেতে পারে। খুব বেশি ঠাণ্ডা পড়লে ওর শীতে ঘুম ভেঙ্গে যায়। এখন সে কেবল চা খেয়ে কিছুটা শরীর গরম করতে পারে। সে গ্যালিতে ঢুকে দেখল, উনুনে আঁচ দেওয়া আছে কিনা। সে দেখল আছে। ছাই ঝেড়ে সামান্য কয়লা দিয়ে দিল। ভাণ্ডারির এখন ওঠার সময়। ভাণ্ডারি উঠে খুশিই হবে দেখে।

    সে চা নিয়ে এসে দেখল, মৈত্র আলো জ্বেলে ঘরে বসে আছে। মুখে-চোখে ভয়ঙ্কর বিরক্তিকর রেখা ফুটে উঠেছে। ওর হাতে চা দেখেও একটা কথা বলল না। ভয়ঙ্কর কিছু হলে এমন হয়। অমিয় বলল, কি রে, কি হয়েছে! শরীর খারাপ!

    সে কেমন আরও ক্ষেপে গেল। কথা বলল না। তোয়ালে মগ নিয়ে ওপরে উঠে গেলে অমিয় হেসে ফেলল, শালা আমার নীতিবাগীশ। মৈত্র নেমে এলে বলল, বন্দরে ভিড়তে না ভিড়তেই।

    —হ্যাঁ ভিড়তে না ভিড়তেই। সে একবার অমিয়র দিকে তাকাল না পর্যন্ত। শরীর সাফসোফ করে এসে শীতে আরও কাবু হয়ে গেছে। সে কোনরকমে কম্বলের নিচে ঢুকে যেতে পারলে যেন বাঁচে। সে আণ্ডার-ওয়ারটা লকারের মাথায় শুকোবার জন্য ছড়িয়ে দিল।

    —নীতিবাগীশদের এই হয়। অমিয় চা খেতে খেতে ব্যঙ্গ করল।

    মৈত্র জবাব দিল না।

    —সারাদিন বৌ বৌ। আর শালা মানুষ বিয়ে করে না বুঝি!

    —বিয়ে না করলে এসব কথা মানায় না। তুমি তো বাউণ্ডলে। বাপের খেয়েছ, বোনের মোষ তাড়িয়েছ। ইচ্ছে করেই মৈত্র বন না বলে বোন বলল।

    অমিয় ও-কথায় কান দিল না। বলল, আমার হলে বেশ ভাল লাগে। বলে সে বেশ জোরে জোরে কথা বলতে চাইলে মৈত্র বলল, আস্তে, ছোটবাবু ঘুমোচ্ছে। ওরও ঠিক হয়ে যাবে। যেভাবে ঘুমোচ্ছে!

    লেপের নিচে ঢুকে বলল, তুই কার মুখ দেখিস অমিয়?

    —কত মুখ। কেবল দেখতে পাই একটা ফ্রক-পরা মেয়ে দৌড়াচ্ছে। আমি তার পেছনে ছুটছি। তারপর কোনরকমে ছুঁয়ে দিলেই আমার হয়ে যায়। খুব বেশি দূর যেতে পারি না। তারপর আর মুখটা মনে পড়ে না। সে হেঁটে হেঁটে অনেক দূরে চলে যায়। আমার আর তখন কোনও মুখের কথা মনে থাকে না। সকালে উঠে কাকে দেখে রাতে কলিসানটা হল কিছুতেই মনে করতে পারি না।

    মৈত্র বলল, আমার সব মনে থাকে।

    —কি দেখলি আজকে।

    —দেখলাম…….এই দেখলাম।

    —বলতে চাস না?

    —না, তোর এই আর কি, শেফালীকে দেখলাম। না বললে কি আর হবে। তোমাদের তো সবই বলি। তবে তোরা পঙ্গপালের দল, বিয়ে করিসনি, তোদের বলা ঠিক না। তোরা তবে খারাপ হয়ে যাবি।

    —ধুস্ শালা। তুই খারাপ করার কে রে? বাদ দে! চা খাবি?

    —খাওয়াবি!

    —মুখ সাদা ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। অনেকটা গেছে? চা খেলে আরাম পাবি।

    —অনেকটা। মৈত্র বলতে গিয়ে মুখ গোমড়া করে ফেলল।

    ওরা বসে বসে দুজন বেশ অনেকক্ষণ কথা বলল। এখন আর মনে হচ্ছে না, ওরা চার মাস আগেও ছিল অপরিচিত। কত সহজে সব কথা বলে ফেলতে পারে সবাই। মৈত্রের যা-কিছু কথাবার্তা সব এদের সঙ্গে। এরা মৈত্রের বন্ধু আবার সহকর্মী। আবার একেবারে অধস্তন মানুষের মতো ব্যবহার করতেও ছাড়ে না। তথাপি এই বাংকে অথবা ফোসকালে এলে ওরা বুঝতে পারে, যত দেশ ছেড়ে ক্রমে দূরে সরে যাবে, তত ওরা পরস্পরের ঘনিষ্ঠ হবে। জাহাজ তো সবেমাত্র চলতে আরম্ভ করেছে। বলতেই বলে ব্যাঙ্ক লাইনের সফর। সহজে শেষ হয় না।

    সকাল হলে অমিয় পোর্ট-হোলের কাচ খুলে দিল। সাতটা কখন বেজে গেছে। অথচ সারেঙ টান্টু বলছে না! কাকে কোথায় কাজ করতে হবে বলছে না। অমিয় অবশ্য জানে তাকে কোথায় কাজ করতে হবে। কারণ, ছোট টিন্ডালের সঙ্গে স্মোক-বসে তার কাজ আছে। বন্দরে এলেই বয়লারের সব স্মোক-বক্স পরিষ্কার করে ফেলতে হয়। এবং এ-কাজটা একমাত্র কোলবয়দের দিয়ে করিয়ে নেওয়া হয়। ছোটবাবু হয়তো ডেকে কাজ করবে। ডেকে কাজ দিলে ছোটবাবু বেশ সব দেখে বেড়াতে পারবে।

    সিঁড়িতে এখন জাহাজিদের ওঠানামার শব্দ। জেটিতে লোকজনের ভিড়। বড় বড় ক্রেন সব এগিয়ে আসছে। ওরা ফোকসালে বসে দেখতে পাচ্ছে। সামনের পোর্ট-হোল খোলা। কিনারায় মানুষ জড় হচ্ছে। ওরা গ্যাঙওয়ে দিয়ে উঠে আসছে। কেউ কেউ দল বেঁধে, কাজের পোশাকে গাছের নিচে জটলা করছে। বেশ একটা উৎসবের মতো মনে হয়, যেন সাড়া পড়ে যাবার মতো। ডেক-জাহাজিরা ফল্কায় কাঠ খুলে দিচ্ছে। ছুঁড়ে ছুঁড়ে ফেলছে কাঠ। আর হাজার হাজার পাখি উড়ছে মাথার ওপর, সমুদ্র পাখি। এদের ডানা তেমন বড় নয়। পাখিগুলো প্রায় কবুতরের সামিল। ওদের ডানার শব্দ বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে। অমিয় বসে বসে পোর্ট-হোলের ঘুলঘুলিতে বন্দরের দৃশ্য দেখতে থাকল। বড়-মিস্ত্রিকে খুব ভয়। সে খুব সাবধানে চলাফেরা করছে। এবং রক্ষে বড়মিস্ত্রি কোনদিন ডেকে বের হয় না। এতদিন পর দেখলে নাও চিনতে পারে। তবু আরও কিছুদিন সাবধানে থাকা ভালো।

    এভাবে কেন যে বন্দরের দৃশ্য দেখতে দেখতে কখনও বড়-মিস্ত্রির গোলগাল মুখ এবং অবয়ব চোখের ওপর ভেসে ওঠে। সে দৃশ্যটা ভুলে যেতে চায়। বরং ভাল লাগে, সেইসব বড় বড় গাছ, টিউলিপ ফুলের গাছ, গাছে সাদা অথবা মেরুণ রঙের ফুল—বন্দরে ফুলের ছবি, মেয়েরা সোনালী গাউনে ঢেকে চুপচাপ হেঁটে চলে আসবে, ওদের কালো চোখ, নীল চুল, সুষমায় ভরা মুখ, সে একটু ছুঁয়ে দেখবে তাদের—আর কিছু না। বন্দরে এর চেয়ে বেশি কিছু চায় না।

  • বার

    বার

    ।। বারো।।

    সেই জেটি সেই প্রশস্ত পথ সামনে। অদূরে ওরা শহরের ভিতর স্কাইস্ক্রেপার তেমনি দেখতে পাচ্ছে। ডেকে দাঁড়ালে চার পাশে অজস্র জাহাজ। জাহাজের চিমনি। সব চিমনি থেকে ধোঁয়া ওঠে না আজকাল। মোটর ভেসেলে কোন ধোঁয়া থাকে না। কিন্তু ওদের জাহাজে অথবা অন্য অনেক জাহাজ যেখানে ইনজিন কয়লায় অথবা তেলে চলে, সেখানে চিমনিগুলোর অল্প ধোঁয়া। বাকি চিমনিগুলো ঝক্‌ঝকে। মাস্তুলে সব নানা বর্ণের পাখি। ডেকে মানুষের ভিড়। সারি সারি ট্রাক, অথবা মালগাড়িতে ক্রেনে মাল নামানো হচ্ছে। এবং গাদাবোটগুলোকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে ছোট ছোট মোটর বোট। নানা রকমের পতাকা উড়ছে চারপাশে। এবং জাহাজের সিটি……বাজছে……. কোথাও। সব জাহাজেই জাহাজিরা এখন সুখী’ পায়রার মতো উড়ছে। কখন সন্ধ্যা হবে, কখন ওরা ছুটি পাবে, ছুটি পেলেই সেজে-গুজে লারে লারে গান গলায়, অথবা শিস দিতে দিতে ওরা নেমে যাবে বন্দরে।

    অমিয় বলল, মৈত্র, এমন বন্দরে না নেমে থাকা যায়!

    —নামব না বলিনি তো, আমাকে একদিন নামতেই হবে।

    —সে তো তোর মালের জন্য। অমিয় ফিফিস্ গলায় বলল, আমার একা নামতে ভয় লাগে। ওর যেন বলার ইচ্ছে এবার ঠিক বড়-মিস্ত্রির সঙ্গে দেখা হয়ে যাবে। দেখা হয়ে গেলে ধরা পড়ে যাবে। সে যদি কোন রকমে মৈত্রের সঙ্গে যেতে পারে, তবে তার আড়ালে আবডালে ঠিক নেমে যাওয়া যাবে।

    মৈত্র বলল, নামব, কিন্তু খবরদার কোথাও যাবি না আমাকে ফেলে। আমি যা বলব তা করবি। কোথাও ঢুকতে পাবে না, কোনও কার্নিভালে ঢুকতে পাবে না!

    —তুই তো আচ্ছা লোক মৈত্র। তোর জন্য শেষ পর্যন্ত রাস্তায় হাঁটতে পারব না, কোনও রেস্তোরাঁতে ঢুকতে পারব না।

    —তা আমি বলছি না।

    —বলতে বাদ রেখেছিস কি! কার্নিভেলে ঢুকবি না। তবে খাব কি, দেখব কি! জাহাজে আসার মজাটা কোথায়।

    —ঘুরে দ্যাখো। পথ ধরে হেঁটে যাও। সুন্দরী মেয়েদের গন্ধ পাবে। পার্কে কত সব ফুল, বাড়িগুলোর সামনে কত যে ফুল! মেয়ে দ্যাখো ফুল দ্যাখো তবে ছুঁতে যাবে না। লোন্দ্রা এল্যান ধরে গেলে বিচ পাবি সমুদ্রের। বিচে ওরা নাঙ্গা হয়ে শুয়ে থাকে।

    —আর কি দেখব?

    —যদি তুই না বের হস, জাহাজেই যদি থাকিস, তবে দেখবি, সামনের পার্কটায় শহর থেকে কচিকাচা মেয়েরা এসে বিকেলে ভিড় করবে। রং-বেরঙের ফ্রক গায়ে, আর কি সুন্দর পা। পা দেখলেই মনে হবে সারা জীবন এই পা জড়িয়ে পড়ে থাকি। কোথাও আর যেতে ইচ্ছে হবে না।

    অমিয় ডেকের ওপর দু’ হাত ছুঁড়ে বলল, ফাইন। কবে যাবি?

    —তোর খুব লোভ অমিয়। তোকে নিয়ে যাওয়া যাবে না।

    —আমি ভালছেলে হয়ে থাকব মাইরি। তুই বিশ্বাস কর আমি হারামিপনা করব না।

    —তোর স্বভাব ভাল না।

    —গঙ্গার জলে মুখ ধুয়ে নেব। স্বভাব ভাল হয়ে যাবে।

    —নোনা জলে ভাসলে গঙ্গার জলে স্বভাব ভাল হয় না।

    —ধুস্ শালা। তোর সঙ্গে আমি বের হচ্ছি না। একাই বের হব।

    —আরে না না। আমি যাব তোর সঙ্গে।

    —ঠিক?

    —ঠিক।

    —কথা দিচ্ছিস তবে?

    —হ্যাঁ, যাব বলছি। সব চিনিয়ে দিতে হবে না! সব সফরে তো আমি আর তোর সঙ্গে যাচ্ছি না। কোথায় কে বেকুব বানিয়ে দেবে কে জানে।

    আর তখন জাহাজের ওপর ডেক-সারেঙ, এনজিন-সারেঙ যে যার দল নিয়ে নিচে ওপরে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। মৈত্র এনজিনে নামার আগে এসব গল্প করছিল। দুটো বয়লার নেভানো। একটা বয়লার সামান্য চালু রাখা হয়েছে। জেনারেটর চালু রাখার জন্য স্টিমের দরকার।

    ডেক-জাহাজিরা জল মারছে ডেকে। বড় বড় পাটের গাঁট নেমে যাচ্ছে এখন। ডেরিকে পাটের গাঁট নামানো হচ্ছে। ফল্কায় একটা ক্রেনও কাজে লেগে গেছে। যত তাড়াতাড়ি করা যায়। বিশ বাইশ দিনের আগে তবু জাহাজ খালাস হচ্ছে না। অন্ততঃ এরা বিশ বাইশ দিন এ-বন্দরে থাকতে পারবে, ঘুরে বেড়াতে পারবে। তারপর জাহাজে কি বোঝাই হবে জাহাজিরা বলতে পারে না। মাল বোঝাই হলে আরও ক’দিন। তারপর ফের সমুদ্রে ভেসে পড়া।

    বন্দরে প্রথম দিন বলে জাহাজিদের তাড়াতাড়ি ছুটি হয়ে গেল। বারোটায় খানা খেতে এসে সবাই শুনল ছুটি। সবাই এখন হল্লা করছে বাথরুমে। একসঙ্গে স্নান করা যায় না। গরম জলের অভাব। যে যার গরম জলের টব টেনে নিয়ে যাচ্ছে। সবাই মাজাঘষা করছে। এবং স্নান করার সময় কিছু অশ্লীল গান যা কানে শোনা যায় না। কে গাইছে। গাইছে অনিমেষ। ডেক-জাহাজি। সে ইয়াসিনের গলা জড়িয়ে নেচে নেচে গাইছে, ওলো সখি ললিতে যাচ্ছি আমি গলিতে। সে এটা ধুয়া দিচ্ছে নেচে নেচে। নেচে নেচে সে মেয়েদের মতো গাইছে। এবং কেউ হয়তো ওরই ভিতর অনিমেষের পাছা টিপে দিয়ে মজা লুটছে। অনিমেষের মুখ চোখ কিছুটা মেয়েলি ধরনের। শ্যামলা রং। জাহাজে থেকে আরও উজ্জ্বল হয়েছে। এবং ডেক-জাহাজিরা ওকে জড়িয়ে ধরে রঙ্গরস করে থাকে। মাঝে মাঝে অনিমেষ ক্ষেপে যায়। তখন সবাই হা-হা করে হাসে।

    মৈত্র, অমিয়, ছোটবাবু তাড়াতাড়ি খেয়ে নিয়েছে। ছোটবাবুর জন্য মৈত্র পোশাক বের করছে। ওর ভালো পোশাক সে দিচ্ছে ছোটবাবুকে পরতে। এবং ছোটবাবু পরেছে, সাদা কটনের ফুলসার্ট, চকলেট কালারের প্যান্ট, নীল রঙের কোট, সবুজ টাই। এবং সমুদ্রে ঘুরে ঘুরে শস্য-শ্যামলা বাংলাদেশের যে ছবি ফুটে ওঠে, এই পোশাকের ভেতর ছোটবাবুকে তেমন মনোরম লাগছে দেখতে। এত ভাল লাগছে ছোটকে যে মৈত্র একেবারে হাঁ করে তাকিয়ে থাকল। বলল, তোকে ছুঁলে মনে কোন পাপ থাকে না। তোর সঙ্গে ঘুরে বেড়ালে, আমরা ভাল হয়ে যাব।

    অমিয় উদাস গলায় বলল, ছোটকে যে কেন নিয়ে যাওয়া। তুমি বাপু ক্যাপ্টেনের পোলাডার লগে যাও না ক্যান!

    ছোট বলল ওপরে যাচ্ছি। তোরা আয়। সেও ওকে বিদ্রূপ করতে পারত কিন্তু করল না।

    সে ওপরে উঠে গেল। মৈত্র, অমিয়, দ্রুত ওপরে উঠে গেল। আহা কতদিন পর এই মাটি! সে শহরের ভিতরে ঢুকে যাবে ওদের সঙ্গে। ওর সব কিছু মনে হচ্ছে মনোহারিণী। সে দেখল, তখন জ্যাক ডেকে দাঁড়িয়ে আছে। জ্যাক বোধ হয় পাখি দুটোর জন্য বাকসে খাবার দিচ্ছে। পাখি দুটার জন্য এখন জ্যাক সবচেয়ে বেশি সময় দিচ্ছে। সে আরও কিছু লক্ষ্য রাখতে পারে। মাঝে মাঝে জ্যাক পিছিলের দিকে তাকাচ্ছে।

    ছোট জানে, ওখানে গেলে ওর দেরি হয়ে যাবে। সেদিকে একেবারে সে গেল না। শিস দিতে দিতে ওরা নেমে গেল। তিনটে বাজে। সূর্য হেলে গেছে। চারটা বাজলেই সন্ধ্যা হয়ে যাবে। রোদে কোন উত্তাপ নেই। সোনালী রোদ, এবং চারপাশে যেন অতীব মায়াবি মানুষেরা ঘুরে বেড়াচ্ছে। দিনের বেলা এইসব ফুল-ফল পাখি আর আশ্চর্য রূপবান মানুষের রাজত্বে জ্যাক যে তাকে লক্ষ্য করছে ছোট দেখছে না।

    আকাশ স্বভাবতই পরিচ্ছন্ন। পার্ক থেকে ফুলের গন্ধ আসছে। সবুজ চারপাশে, মাঝখানে কালো এ্যাসফাল্টের রাস্তা শহরের দিকে গেছে। নানা বর্ণের গাড়ি চারপাশে। জেটিতে কিছু সৌখিন মেয়ে পুরুষ দাঁড়িয়ে জাহাজের মাল নামানো দেখছে। আশ্চর্য ওরা কোন কাস্টমসের ঝামেলা অথবা বেড়াজাল এখানে দেখতে পেল না। সামনের পার্কটা মেলার মতো হয়ে গেছে। মানুষের ভীষণ ভিড়। ছোট বড় ছেলে যুবা এবং বৃদ্ধারাও আছেন। মৈত্র এ সময় ওদের নিয়ে শহরের দিকে উঠে যেতে থাকল। মৈত্র খুব সাদাসিদে পোশাক পরেছে। ট্রাউজার, মোটা উলেন জামা, গলায় মাফলার, ওপরে লম্বা কোট। সে টাই লাল রঙের পরতে ভালবাসে। বড় রাস্তা, প্রশস্ত ফুটপাথ, মাঝে মাঝে এভিনিউ, ভিন্ন ভিন্ন গাছের সমারোহ। গাছের নিচে সুন্দরী যুবতীরা ঘোরাফেরা করছে।

    তখন আপেলয়ালা হাঁকল, আ…..পে…..ল!

    কেউ হাঁক দিল, এমিগা! কোমো ইস্তা ওস্তে।

    ওরা এদেশের মানুষদের কথাবার্তা বুঝতে পারছে না। ইংরেজি বললে কেমন এ-দেশের মানুষেরা হাবাকালা হয়ে থাকছে। সাধারণ মানুষ একেবারেই ইংরেজি জানে না। ওরা দুটো একটা স্পেনীশ কথাবার্তা শিখে নিয়েছে। ফলে ওরা প্রায় সময়ই এদেশের মানুষদের কাছে বাংলা বলছে। বাংলা- উর্দু এবং পৃথিবীর যে কোনও ভাষা ওরা বলে গেলেও কিছু বুঝবে না। ওরা সেজন্য নিজের খুশিমতো যা ইচ্ছা বলে যাচ্ছে। এবং অমিয়র যা স্বভাব। সে খুব খারাপ কথা মেয়েদের বলছে। ওরা অমিয়র কথা শুনে হাসছে। যেন মৈত্র, অমিয় বিদেশী মানুষ, ওদের কথা বুঝতে না পারলে ছোটবাবু বেশ মজা পায়।

    ছোটবাবু দেখল সামনে একটা টাওয়ার। মৈত্র ঘুরে ফিরে আগে দেখেছে বলে, সে জানে কোথায় কিভাবে যাওয়া যায়। ঠিক টাওয়ারের নিচে স্টেশন। ওরা আন্ডার গ্রাউন্ড ট্রেন ধরে ফ্লোরিদাতে যখন পৌঁছল, তখন রাত হয়ে গেছে। তখন শহরে সব আলো তারাবাতির মত জ্বলছে। আর সব কাচের শো-কেসে দামী শহরটা মনে হয় ঢুকে গেছে। বড় বেশি কৌতূহলী করে রাখে মানুষগুলোকে। সব স্বপ্নের দেশের মতো মানুষ মনে হয়। এমন সাজানো গোছানো শহর পৃথিবীতে আর কোথায় আছে ওরা জানে না। কোন চার্চ থেকে ধর্মীয় সঙ্গীত ভেসে আসছে। আর পথ জুড়ে তখন কোলাহল। ওরা হাঁটছে শিস দিচ্ছে, বাংলা গান গাইছে। কোথাও ঢুকে কফি খাচ্ছে। ঠাট্টা মসকরা করছে মেয়েদের সঙ্গে। মৈত্র মাঝে মাঝে অমিয়কে সাবধান করে দিচ্ছে। বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে অমিয়—এতটা ঠিক না। সে ভাবছে এখন সেই মানুষটার বাড়ি খুঁজে বের করতেই হবে। সেখানে গেলে সে দেশে টাকাটা পাঠিতে দিতে পারবে। এখানে সে সেই মানুষের নামে একটা একাউন্ট করে নেবে। সেই সব করে দেবে ওর হয়ে। কিন্তু মৈত্র সেই বাড়িটা ঠিক খুঁজে পেল না।

    মৈত্রকে খুব বিষণ্ণ দেখাচ্ছে। টাকাটা খুব তাড়াতাড়ি পাঠানো দরকার। অথচ এখানেই সেই সাহেব লোকটা থাকত। সাহেব বিনিময়ে কিছু টাকা নেয়। আর একবার সে বাড়তি টাকা এভাবে পাঠিয়েছে। এবারেও বাড়তি টাকা তার হবে।

    অমিয় হাঁটতে হাঁটতে বলল, কত পাঠাচ্ছিস?

    —তা হাজার প্যাসু পাঠানো দরকার। আজ কিছু দিয়ে যেতাম। বলতাম, সে যেন আমার নামে পাঠিয়ে দেয়। বাকিটা কাল দেব।

    ছোটবাবু সব বালকের মত দেখে যাচ্ছে। মাঝে মাঝে সে চিৎকার করে বলছে কি গ্রান্ড! কিন্তু মৈত্র লোকটার বাড়ি ঠিক হদিস না করতে পারায় কোনো কথা বলছে না। কেবল অমিয়কে পারে না বলে মৈত্র জবাব দিচ্ছে।

    —মোটামুটি বৌর কাছে খুব বড় মানুষ হয়ে বেঁচে থাকিস।

    —তাছাড়া কি। যা টাকা পাই ওতে শেফালীর মতো মেয়ে বিয়ে করা যায় না। কম পাঠালে আমার সম্মান থাকবে না।

    —তার মানে!

    —মানে, বৌ বলবে, আমি ছোট কাজ করি। ঠিকমতো টাকা পাঠাতে পারি না।

    —তার মানে তুই বৌকে বড় কাজটাজ করিস বলেছিস?

    —হ্যাঁ, তাই। শেফালী জানে জাহাজে আমি এনজিন রুমে ভাল কাজ করি। অনেক টাকা পাই।

    —এভাবে মিথ্যা বলে লাভ!

    —লাভ, শেফালীর মতো মেয়েকে কাছে পাওয়া। বলে, মৈত্র অমিয়কে একটু অন্যমনস্ক করার জন্য বলল সামনে শো-কেসটার পাশে দ্যাখ।

    —কিছু দেখছি না! একটা ওভারকোট ঝুলছে না!

    —হ্যাঁ।

    —নিচে কিছু দেখা যাচ্ছে?

    —ও মা। চারটা পা। বলেই অমিয় ছুটতে চাইল। মৈত্র হাত ধরে ফেলল, ধীরে অমিয়। ওদিকে চল। সে টেনে অমিয়কে অন্য রাস্তায় নিয়ে গেল।

    এবার মৈত্র বলল, সেবারে, এভাপেরুনকে নিয়ে কি একটা উৎসব চলছিল! ওঃ কি জাঁকজমক।

    ওরা তিনজনেই দেখল, এভাপেরুনের একটা বড় মূর্তি। এবং কিছুটা মা মেরীর মতো মুখ চোখ।

    ছোটবাবু বলল, এখানে একটু বসলে হয় না। হাঁটতে হাঁটতে পা ধরে গেছে। বেশ সুন্দর জায়গা। শীতটাও কম মনে হচ্ছে।

    মৈত্র তখন একটা গাছের পাতা ছিঁড়ে বলল, এ গাছটার নাম জানিস? সে পাতাটা দু আঙ্গুলে পিষে ওদের নাকের কাছে নিয়ে গেল, কেমন সুন্দর গন্ধ দ্যাখ। এটা বুনো মূস্কোদাইন।

    অমিয় বলল, সামান্য খাব।

    ছোটবাবু বলল, আমিও।

    মৈত্র বলল, পয়সা কে দেবে?

    —কেন তুমি! এত টাকা কামাবে, আর খাওয়াবে না!

    —ঢুকলে যে বের হতে চাইবে না। ভেতরে হাড়ের খেলা দেখাবে। সব বাঁদরের হাড়। আমার পকেটের সব ফাঁকা করে দেবে। তোমরা বাবা সুবোধ বালকের মতো হেঁটে এস তো। কোরিত্রম্বুজ হয়ে সোজা জাহাজে ফিরে যাব।

    অমিয় বলল, আসলে শালা তুমি চিপ্পুস। তারপরই সে চিৎকার করে উঠল, মৈত্র, দ্যাখ, দ্যাখ! মৈত্র তাকাল ডান দিকে। ঠিক মোড়ের মাথায় একটা স্টেশনারি দোকান। দোকানের সামনে একটা সেলস-গার্ল। খুব সরলভাবে অমিয়কে দেখে হাসছিল। অমিয় বলল, কি চমৎকার হাসে রে! মেয়েটার সঙ্গে একটু কথা বলে আসি!

    —যা দ্যাখ, কি বলে।

    অমিয় ফিরে এলে মৈত্র বলল, কিরে কিছু বলেছে?

    —না। আমার কথা কিছু বুঝতে পারছে না!

    —মাগীকে আচ্ছা খিস্তি লাগা।

    —খিস্তি করলে হাসছে। আর কিছু বলছে না। হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ছে রে। তবু কিছু বলছে না।

    মৈত্র বলল, ছোটবাবু যাবে নাকি! মেয়ে মানুষের হাসি দেখে আসতে পার।

    ছোট বলল, তুমি বরং যাও। রেলিঙে একটু বসছি আমি। হাঁটতে হাঁটতে কোমর ধরে গেছে। একটা ট্যাকসি নিতে পারতে। বাসে উঠে যেতে পারতাম।

    —হাঁটাপথ সব চিনি। কিন্তু বাসগুলো কোথায় যায় জানি না। লেখা দেখে কিছু বোঝার উপায় নেই। হেঁটে হেঁটে আমি শহরটাকে ঘুরতে পারি, কিন্তু গাড়িতে উঠলে, কিছুতেই বোঝাতে পারি না কি করে জাহাজঘাটায় যাব। ওরা যে জাহাজটাকে কি বলে!

    অমিয়র মনে হল এটাও মৈত্রের ভুজং ভাজুং। ছোটবাবু আর অপেক্ষা না করে রেলিঙে বসে পড়ল। মৈত্র তখন বলছে, আমি যাচ্ছি। দেখি কি বলে। সে গিয়েই বলল, চেঙ্গেরিতা। আরও কি বলল, তারপর একটা ইটালিয়ান কম্বল দরদাম করে কিনে ফেলল। মৈত্র হ্যান্ডশেক পর্যন্ত করল। অমিয় ভীষণ রেগে যাচ্ছে। সেও হাত বাড়িয়ে দিল। ওর সঙ্গেও হ্যান্ডশেক করছে। বেশ মজা লাগছে। সে বলল মৈত্রকে, শালা তুমি ভোজবাজি জানো। তুমি আমাদের রাজা।

    মৈত্র এবার ঘড়ি দেখল। রাত খুব বেশি হয়নি। ওরা যদি ট্রেনে যায় তবে সামান্য পথ। এই ফালং-এর ‘মতো হবে। ইচ্ছা করলে হেঁটেও যাওয়া যায়। কিন্তু বেশি রাত করে জাহাজে ফেরা মৈত্রের পছন্দ নয়। একবার পাবে ঢুকে গেলে অমিয়কে তোলা যাবে না। বরং যাবার সময় ছোটবাবুকে একবার কার্নিভেলটা দেখিয়ে নিয়ে যাবে। সে ট্রেনে উঠে গেল। এক সময় ঠিক জায়গায় নেমে গেল। পাতাল রেলে চড়তে পেরে ছোটবাবু খুব খুশি। পাশেই বোধহয় কার্নিভেলের সদর দরজা। কোনটা কি সে বুঝতে পারে না। তার কাছে সব এক রকমের মনে হয়।

    ওরা কার্নিভেলের গেটে দেখল, উর্দিপরা দারোয়ান। মাথায় উটপাখির পালখ গোঁজা। গেটের ওপরে নিয়নের বড় হরফে লেখা নাম। বড় বড় সিংহ, বাঘের মুখোস ঝুলানো। পাশে ক্লাউনের কায়দায় নাচতে নাচতে একটা সাহেব ক্ল্যারিওনেট বাজাচ্ছে। পাশে সারি সারি চারটা টিকিট ঘর। খুব বড় লাইন নেই অথবা এখন রাতের বেলা বলে যে যার মতো আগেই ঢুকে গেছে। যারা গেছে তাদের অনেকে বের হয়ে আসছে। ওরা তাড়াতাড়ি টিকিট পেয়ে গেল। ওরা ভিতরে ঢুকে দেখল, বেশ হল্লা, মদ খেয়ে কেউ কেউ বেলল্লাপানা করছে। এখানে ইচ্ছা করলে দু পেগ মেরে নিলে মন্দ হয় না। খালি চোখে দেখার চয়ে, যেন সামান্য গোলাবী নেশা করে দেখলে জমে ভাল। এবং চারপাশে নীল আলো। ছোটবাবুকে এক পেগের বেশি দেবে না। কারণ ও বোধহয় খেলে জীবনে প্রথম খাবে। খেয়ে স্ট্যান্ড করতে পারবে কিনা কে জানে।

    ঢোকার মুখে দেখল একটা আলোর মুরগী ঘুরে ঘুরে ডিম পাড়ছে। নীচে এক বৃদ্ধা, হাতে ছোট বাসকেট। একটা করে মুরগিটা ডিম পাড়ছে, একটা করে বৃদ্ধা বাসকেটে রেখে দিচ্ছে। এটা হয়তো কোনও বিজ্ঞাপন। কিসের বিজ্ঞাপন ওরা বুঝতে পারল না। ওরা কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে মুরগির ডিমপাড়া দেখল। দেখতে দেখতে মৈত্র বলল, হাফ পয়সা উসুল।

    অমিয় বলল, উসুল।

    মৈত্র ছোটবাবুকে বলল, এদিকটাতে একটা টানেল আছে। ভিতরে খুব অন্ধকার। গুহা, ঝর্ণা, বরফের পাহাড় আর মাঝে মাঝে নকল সাপ, বাঘ, হরিণ, মানুষের কঙ্কাল ঘোরাফেরা করছে! খেলনার রেলগাড়িতে উঠে গেলে বেশ আধঘন্টার মতো নিচে ঘুরিয়ে আনবে।

    ওরা টানেলের ভেতর ঢুকল না। দুটো মাঝারি তাঁবু পার হয়ে গেল। মৈত্র অথবা ছোটবাবু না বললে, সে কোনও পাবে ঢুকবে বলে আশা করে না। যে কোন সময় মৈত্র বলতে পারে।

    একটা তাঁবুতে তখন কে যেন সুর করে মেঠো গান গাইছে। এবং ওরা দেখতে পেল, ঠিক গানের সমের সঙ্গে একটা করে পুতুল ওপরে উঠে যাচ্ছে। তার ঠিক ফাঁকে মানুষেরা গোল চাকতি বসিয়ে দু এক বোতল মদ জিতে নেবার চেষ্টা করছে। অনেকে পারছে না, কেউ কেউ পারছে। এটা একটা জুয়া খেলার তাঁবু। কেউ কেউ তখুনি বোতল জিতে দাঁতে কামড়ে ছিপি খুলে ঢক ঢক করে খাচ্ছে। এরা কোনো জাহাজের জাহাজি হবে। মৈত্র খেলার মতো করে দশটা চাকতি সোজা তুলে নিল। মাত্র চার প্যাঁসুর বাজি। সে দশটা চাকতি ছুঁড়ে সহজেই তিনটে চাকতি পুতুল নামা-ওঠার ফাঁকে জায়গামতো বসিয়ে দিল। অমিয় দেখল, হাতের টিপ মৈত্রের অসামান্য। সে সহজেই তিনবার জিতে দু বোতল, এই আট আউন্সের মতো করে হবে, বেশ পেয়ে গেলে বললে, নে। খাব খাব করছিলি, বসে বসে খা। মাগনায় যখন পেয়ে গেলাম—বলে মৈত্র ওদের দুজনকে নিয়ে একটা বসার মতো জায়গা খুঁজে নিল। সামনেই গোল গম্বুজের মতো তাঁবু। এক প্যাসু দিলেই লাল নীল চেয়ার পাওয়া যায়। এক প্যাসু দিলে গ্লাস। ওরা সেখানে বসে গ্লাস নিল। ছোট বড় হলুদ রঙের টেবিল আর ছোট বড় মাঝারি মানুষের কোলাহল। মেয়েরা যেন বেশি মাতাল। কখনও খেতে খেতে গাইছে, কিসব এটটিন পেটটিন………..তারপর তোতালামিতে পেয়ে যায়। আর গাইতে পারে না। মৈত্র বলল, খাও বাপু। কিন্তু বেশ্যা মেয়েরা বেশ তক্কেতক্কে আছে। একেবারে বেহুঁশ হবে না। ছোট, তুমি কি খাবে দ্যাখো। এটুকু খাও। তোমার শীত থাকবে না। রাতে ভাল ঘুম হবে। সকালে বাউয়েলস্ একেবারে ক্লিয়ার। ও শালীর শালীরা যে কি গাইছে!

    এভাবে মৈত্র খেতে থাকল। সে একাই খেয়ে ফেলল পুরো একটা। অন্যটা ওরা দুজনে ভাগ করে খেয়েছে। বেশিটা অমিয়, কমটুকু ছোটবাবু। ছোটবাবু গলায় ঝাঁঝ পাচ্ছে। বড় বিদঘুটে ব্যাপার, কেন যে লোকে খায় সে বোঝে না। এটা যে মৈত্র কি করছে। সে টাকা দিয়ে আরও দু বোতল নিজে কিনে এনেছে। সেই খুব বেশি সাবধানী ছিল, একটুতেই কেমন যেন এখন একগুঁয়ে হয়ে গেছে। মৈত্রদা এত মদ খেতে পারে, জাহাজে ছোট একেবারে বুঝতে পারেনি।

    এভাবেই মৈত্র জাহাজি মৈত্র হয়ে যায়। এভাবেই সে তার সংসারের কথা ভুলে গেল। শেফালীর কথা ভুলে গেল। মৈত্র, জাহাজি মৈত্র, এখন ঘাসের ওপর দু-পা ছড়িয়ে মদ খাচ্ছে। সামনে সব নীল লাল স্কার্ট পরা মেয়েরা হেঁটে যাচ্ছে। ওদের উরু দেখা যাচ্ছিল। পুরুষ্ট উরু। কোথাও নাচ হচ্ছে। কোথাও থেকে ব্যান্ডের বাজনা ভেসে আসছে এবং ব্যান্ড বাজলেই মেয়েরা ওর চোখের ওপর ফুলের মত হয়ে যায়। যেন ঈশ্বরের বাগানে এরা সব সদ্য ফোটা ফুল। ওর কেন যে সব ফুল তুলে নিতে ইচ্ছে করে। এবং একটা একটা করে ফুলের পাপড়ি ছিড়ে ফেলতে ইচ্ছে হচ্ছে। পাপড়ি ছিঁড়ে ছিঁড়ে খেতে ইচ্ছে করে কেবল।

    জায়গাটা এখন প্রায় উৎসবের মতো। কচি কচি মেয়েরা গ্যাসের বেলুন বাতাসে ভাসিয়ে দিচ্ছে। বালিকারা কোল্ড ড্রিঙ্কস খেয়ে মৈত্র এবং অমিয়কে দেখছে। ওরা দেখে তাজ্জব, এমন দু তিনটে দৈত্যের মতো মানুষ এখানে বসে হামেসা মদ খেয়ে যাচ্ছে কেন। ওদের মায়েরা তখন এত বেশি উরু খালি রেখেছে যে মৈত্র বেশিক্ষণ স্থির থাকতে পারছে না। অমিয় এবং ছোটকে ধাক্কা মেরে প্রায় যেন উঠে গেল। এবং বালিকাদের মায়ের সঙ্গে অশ্লীল কথা বলার চেষ্টা করল। শীতের ঠান্ডায় ছোটবাবুর কান লাল হয়ে উঠল মৈত্রের কথা শুনে।

    অমিয় রেগে গিয়ে নিজের পয়সায় আরও চার আউন্সের বোতল কিনে ফেলল। সে স্টুয়ার্ডের কাছে যে পয়সা পেয়েছে সবটাই পকেটে। মৈত্র কি ভেবেছে!

    যাতে মৈত্র না দেখে, একটু দূরে বসে অমিয় খাচ্ছিল। আর আকাশ দেখছিল। মনে হয় ওর কাছে আকাশটা খুব নিচে নেমে এসেছে। রাত বাড়ছিল। মৈত্র দেখল, অমিয় পাশে নেই। ছোট সামান্য খেয়েই শরীর ছেড়ে দিয়ে চেয়ারে মাথা এলিয়ে দিয়েছে। সে দেখল, ভারি ঝামেলা। ওর নেশা কেটে যাবার মতো। সে তাড়াতাড়ি উঠে গেল ছোটর কাছে, কি বাবু ভাল লাগছে না। ছোট মাথা ঝাঁকাল। মৈত্র ভাবল, এখন জাহাজে ফেরা দরকার। কি যে মোহের ভিতরে পড়ে যায় সে।

    মৈত্র অমিয়কে বলল, এই কি হচ্ছে!

    —কি আবার হচ্ছে।

    মৈত্র দেখল, আধ বোতলের মতো এখনও বাকি। সে সেটা উপুড় করে দিল। তারপর অমিয়কে ভীষণ মাতলামি করতে দেখে বলল, এক থাপ্পড় মারব মাতলামি করলে। পা ঠিক রাখবি।

    কে কার পা ঠিক রাখে! অমিয়র ঠিক রাখতে গিয়ে নিজের পা ঠিক রাখতে পারছে না। অমিয় বলল, তুই আমার সঙ্গে এমন করিস কেনরে! আমি কি করেছি তোর সঙ্গে।

    —তুমি শালা মুখ উঁচু করে রেখেছ কেন! কি দেখছিস ওপরে।

    —কিছুই দেখছি না। কবে আমরা দেশে ফিরব মৈত্র?

    —আমি তার কি জানি!

    —তুই আমাকে একা ফেলে যাবি না?

    মৈত্র ওর হাত ধরে টেনে তুলে দিল। মৈত্র এবং ওরা দুজন প্রায় টলতে টলতে হাঁটছে, কেবল ছোটবাবু টলছে না। কিন্তু কেমন যেন বমি বমি পাচ্ছে। ভেতরে অস্বস্তি হচ্ছিল। এখন সে আর কোথাও যেতে চাইছে না, শুধু জাহাজে ফিরে যেতে চাইছে। তবু সে, মৈত্র অথবা অমিয়কে ফেলে যেতে পারে না। সে ওদের সঙ্গে হাঁটতে থাকল। ওরা সোজা ডেনছিগোর দিকে যাচ্ছে। ওরা নকল এরোপ্লেনে চড়ল না। নকল মোটরে উঠে দাপাদাপি করল না। সামনের একটা মঞ্চের দিকে ওরা হেঁটে গেল। সামনের মঞ্চটায় উঠে গেলে কেবল ঘুরতে থাকে, উড়তে থাকে, উপরে উঠলে বেশ একটা মেজাজ আসে। তখন মনে হয় এই সংসার, যুবক যুবতী সহবাস সব এই কার্নিভেলের মতো। নিছক খেলনা। গত সফরে ওখানে উঠে মৈত্র বমি করে দিয়েছিল।

    ফেরার পথে মৈত্র বলল, কিরে ফের যাবি? তুই ছোটবাবু?

    অমিয় বলল, আমি যাব না। গেলেই শুয়োরের বাচ্চার সঙ্গে ঠিক দেখা হয়ে যাবে।

    মৈত্র বুঝতে পারল না অমিয় কাকে গালাগাল করছে।

    —শুয়োরের বাচ্চা খুব জ্বালাচ্ছে।

    —কে শুয়োরের বাচ্চা?

    —আছে। ওকে শালা এমন শিক্ষা দেব না।

    মদ খেলে নানাভাবে ভেতরের দুঃখ উথলে ওঠে। এটাও এমন একটা কিছু হবে। মৈত্র কথাটার তেমন গুরুত্ব দিল না। সে ছোটবাবুকে বলল, চল, ওদিকটায় ঘুরে যাই। সর্টকাট হয়ে যাবে। জুয়ার আড্ডাগুলোর পাশ দিয়ে সামনের রাস্তায় পড়তে পারব।

    অমিয় ধরা গলায় বলল, কোনদিকে?

    মৈত্র বলল, ওদিকে। খেলতে পারবি না কিন্তু।

    অমিয় বলল, তুই না খেললে, আমি খেলছি না।

    —ছোটবাবু সাবধান।

    —আমার টাকাই নেই।

    অমিয় বলল, তুমি ছোটবাবু কিন্তু ভীষণ চালাক লোক। একটা প্যাসু তুললে না।

    মৈত্র বলল, কিছু তোমাকে তুলতে হবে ছোটবাবু। তোমার দুটো স্যুট কেনা দরকার। সেকেণ্ডহ্যাণ্ড মার্কেটে খুব সস্তায় পেয়ে যাবে।

    ছোট বলল, অনেকদিন এখানে আছি তো। কাল তুলব ভাবছি।

    —তোমার শরীর কেমন লাগছে?

    —খারাপ না। বেশ ভাল লাগছে। আগের মতো খারাপ লাগছে না।

    মৈত্র বলল, কেমন সস্তায় মদ খাইয়ে দিলাম।

    অমিয় বলল, অনেক ধন্যবাদ। বলে, অমিয় হাত তুলে দাঁড়িয়ে থাকল। যেন সে মৈত্রকে আশীর্বাদ করছে। ওর হাত শিথিল। হাওয়ায় যেন হাত টলছে। ছোটবাবু বলল, এভাবে হেঁটে যাওয়া যাবে না। বরং একটু বসে গেলে হয়। অমিয়র নেশাটা যদি কমে।

    —এখানে কোথায় বসবি! শালা সব সোনার ঈগলেরা উড়ছে। চল একটু ফাঁকা জায়গা দেখে বসি।

    সুন্দরী যুবতীদের ছেড়ে যেতে ইচ্ছা হচ্ছিল না অমিয়র। সে এদিক ওদিক তাকিয়ে শিস মারছে। মৈত্র এবং ছোটবাবু এখন জাহাজে ফেরার জন্য আকুল। হয়তো গিয়ে দেখবে, শেফালীর চিঠি এসেছে আবার। বন্দরে সে তিনটে চারটে চিঠি পেতে পারে। শুধু এক খবর। টাকা, খরচ শেফালী দুহাতে করতে ভালবাসে। এখন তো শেফালীর দরকারেই লাগবে টাকাটা। শেফালীর সব চিঠিই নতুন মনে হয়, তাজা মনে হয়। যত পুরানো থাকুক, এত দূর দেশে এসে সে সব সময় চিঠিতে শেফালীর শরীরের ঘ্রাণ পায়। শেফালীর শরীরের গন্ধ চিঠিতে যেন লেগে থাকে।

    সে শেফালীর চিঠি পেলে সব ভুলে থাকতে পারে। বন্দরে নেমে এদিক-ওদিক ঘোরার আকর্ষণ বোধ করে না। কোন বারে, রেস্তোরাঁয়া বেশ্যালয়ে ঘোরার নিদারুণ অভ্যাস ওর মনের ভেতর থেকে মুছে যায়।

    মৈত্র এবার বলল, অমিয় তুই থাক, আমরা চলে যাই।

    —আমাকে ফেলে চলে যাবি! আমি একা যেতে পারব!

    —তবে চল। বেশ রাত হয়ে গেছে। সামনে অনেকগুলো জুয়ার আড্ডা পড়বে।

    —তুমি আমার জী-গুরু-দোস্ত। তোমার কথা না শুনলে চলে।

    তারপর ওরা সেই নকল মঞ্চ পার হয়ে গেল। ডানদিকে আর একটা বড় হলঘর। ভিতরে নাচ হচ্ছে। ক্যারিওনেট বাজছে। এবং একটা লোক ম্যাণ্ডোলিন বাজিয়ে ষাঁড়ের মতো চিৎকার করে গাইছে। এইসব চেঁচামেচি অথবা গান ভীষণ উত্তেজিত করে রেখেছে চারপাশটা। ডেনছিগোর বাইরে যেসব ফুলের গাছপালা অথবা সারি সারি পাম গাছের নকল জঙ্গল, বনের ভিতর মাঝে মাঝে লাল আলোর সংকেত, অর্থাৎ ওখানে কেউ কেউ যুবক যুবতীরা শুয়ে নীল আকাশ দেখছে, অথবা নতুন নক্ষত্রের জন্ম দিচ্ছে। লাল আলোর সংকেত, এদিকে না, এদিকের জায়গা দখল, অন্যদিকে, অন্যদিকে খুঁজে নাও। জায়গা পেয়ে যাবে। এখানে এসে মৈত্র বলল, ভালছেলের মতো চোখ বুজে থাক। তাকাবি না।

    —খুব মজা। হোঁচট খাই আর কি! তুই চোখ বুজে হাঁট না। অমিয় বরং লাল আলোর পাশ দিয়ে হেঁটে গেল। যেন সে এর ভিতর একটা জায়গা খুঁজতে এসেছে। আসলে ওর দেখা চাই, কে, কিভাবে কিসব চালাচ্ছে। এটা যে কি শহর! সে বুঝতে পারে না, খোলা আকাশের নিচে এসব হয়! ও কেমন ক্রমে অধৈর্য হয়ে পড়ছে।

    ছোটবাবু বলল, আমার ভয় করছে মৈত্রদা, এর ভিতর দিয়ে আসা ঠিক হয়নি। কেউ কিছু বলতে পারে।

    —আরে আয়তো। এরা কেউ কিছু বলবে না।

    মায়াবিনী আলো চারপাশে, ছোটবাবুর মনে হচ্ছিল, সে একেবারে কেমন হাবাকালা হয়ে যাচ্ছে। সব এত স্পষ্ট! সে লজ্জায় তাকাতে পারছে না, কেমন এক অপরাধবোধ এবং ভেতর থেকে আবার শীত উঠে আসছে। খোলামেলা জায়গায় এসব এ-ভাবে হয় সে জানত না। চারপাশে সারি সারি নানা ভঙ্গীতে উলঙ্গ হয়ে শুয়ে আছে তারা। কেউ ওভারকোট পেতে নিয়েছে, কেউ কিছুই পেতে নেয়নি। দেখে মনে হয়, শীতটিত ওদের শরীরে লাগে না। সে প্রায় দু’লাফে জায়গাটা পার হয়ে গেল যেন। অমিয়কে টানতে টানতে নিয়ে আসছে মৈত্র। কলার ধরে টেনে আনছে।

    জুয়া খেলার মেলায় ঢুকে মৈত্র অমিয়র কলার ছেড়ে দিল। এবং মৈত্র এসব জায়গায় গত সফরে বেশ গচ্ছা দিয়ে গেছে। তখন মৈত্র একা ছিল, দায়-দায়িত্ব কম ছিল। জুয়া খেলার আসরটাই মৈত্রের কাছে কার্নিভেলের মজার জায়গা। দোকানগুলো ওর সব চেনা। সে মুখগুলো পর্যন্ত মনে করতে পারে। কিন্তু এখন সে দেখছে সব কেমন বদলে গেছে। নানাবর্ণের বেলুন, কাগজের ফুল উড়ছে হাওয়ায়। সে আগের কাউকে দেখছে না। দুজন বেশ বলবান মানুষ, ওদের কোমরে মোটা বেল্ট, পায়ে হাঁটু পর্যন্ত সু, এবং হাতে লম্বা চামড়ার দস্তানা, ওরা খেলছে। দুজন মেয়ে দুপাশে দাঁড়িয়ে ওদের রিভলবারে গুলি ভরে দিচ্ছে। ওদের দেখেই বুঝল, এরা ঠিক জাহাজি। ওরা আসলে পাশের মেয়েদুটোকে ধরার জন্য জুয়া খেলে পয়সা নষ্ট করছে। রাত বাড়লে, এরা ঠিক মেয়েদুটোকে কোথাও নিয়ে যাবে। মৈত্র এবার দেখে অবাক হল, আগের বয়সী যুবতীরা একজনও নেই। খুব অল্পবয়সের ফুলের মতো নরম মেয়েরা এখন দোকান আগলাচ্ছে। আর এভাবে কি যে হয়ে যায় মানুষের, মৈত্র যেতে যেতে নীল লাল রঙের, কাঠের বল, গড়িয়ে দিতে পারলেই বাজি মাত, এক প্যাসুতে একটা নতুন কোট মিলে যাবে… যেন এখন ইচ্ছে মৈত্রর একটা কোট এক প্যাসুতে মিলে গেলে মন্দ হয় না। মাত্র এক প্যাসু ওর হাত ভীষণ পাকা। সে পাকা জুয়াড়ীর মতো অল্পবয়সের মেয়েটির সামনে দাঁড়িয়ে গেল। এই শহর, এত বড় শহর, আর এখানে মেয়েরা এখন জুয়ার রিঙে বসে থাকে ভাবতেই শরীরের ভেতর কেমন শিহরণ খেলে গেল। সে এবার হামলে পড়ে দুটো কাঠের বল বাজীকরের মতো তুলে নিল। বল দুটো ওপরে ছুঁড়ে দিয়ে আরও তিনটে লাল নীল বল বাতাসে এক এক করে পাঁচটা বল খেলাতে থাকল। পাঁচটা ক্রমে আরও তিনটা তারপর চারটা টপাটপ তুলে হাওয়ায় ভাসিয়ে রাখল। দুটো হাতে বারোটা বলের খেলা। অমিয়, ছোটবাবু এমনকি রিঙের মেয়েটা পর্যন্ত তাজ্জব বনে গেল।

    অমিয় চিৎকার করে বলল, শুয়োরের বাচ্চা তুমি সার্কাসে তবে সিংহের খেলা দেখাতে!

    মৈত্রের ইচ্ছে হল, গালে ঠাস করে চড় বসিয়ে দেয়। কিন্তু মদ খেলে হুঁশ থাকে না। শিশুর মতো সরল কথাবার্তা। তাছাড়া এমন এক তাজা মেয়ে সামনে। এমন একটা আশ্চর্য খেলার সব তামাসা মাটি। সে খুব সহজভাবে বলল, সিংহের খেলা নয় রে। এটা রিঙের খেলা দেখাচ্ছি। এবং এভাবে সে কখনও বারোটা বল পেছনে হাতের ভিতর অদৃশ্য করে ফেলেছে, আবার কেমন সব এক এক করে হাত নামিয়ে ট্রেতে রেখে দিচ্ছে। সঙ্গে সঙ্গে মেয়েটি হাততালি দিয়ে উঠল এবং রূপোর স্টিকে একটা বল এগিয়ে দিল মৈত্রের কাছে।

    মৈত্র বলল, না। আজ না মেমসাব। অনেক রাত হয়ে গেছে। কাল খেলব। তারপর আঙ্গুল তুলে অমিয়কে দেখাল। যেন বলা, মাতাল। এক্কেবারে মাতাল।

    মেয়েটি কিছুই বুঝল না। শুধু রুপোর স্টিক দিয়ে আরও দুটো বল মৈত্রের দিকে এগিয়ে দিল। সেই সরল হাসি। এবং এখন আর এ-মেয়েটিকে কম বয়েসী মনে হচ্ছে না। খাটো স্কার্টের ভেতর উরু দেখে সে বুঝল, খুব সেয়ানা মেয়ে। ফুলের পাপড়ি ছিঁড়ে ছিঁড়ে খায়।

    —না মেমসাব। ঘরে আমার বিবি আছে। ও জানতে পারলে রাগ করবে।

    মেয়েটি কিছু বুঝতে পারছে না। বোকার মতো হাসছে। মেয়েটি বোধ হয় বুঝেছে মানুষটা জাহাজি। রাত হলে সব জাহাজিদের ভিড় এখানে। মৈত্রকে ভীষণ লোভী দেখাচ্ছে! মেয়েটি ওর দিকে অপলক তাকিয়ে আছে। মৈত্রের যেন সাহস নেই এখন রিং ছেড়ে যায়। মাত্র এক প্যাসুর খেলা। সে না খেললে, মেয়েটার কাছে ছোট হয়ে যাবে। সে এবার প্যাসু ছুঁড়ে দিল। দুটো বল, রুপোর স্টিক হাতের কাছে। ট্রেতে এমন অনেক লাল নীল বল। সে বল গড়িয়ে দিল। বল গড়িয়ে অন্য দিকে চলে গেল! সে ঠিক জায়গার বল গড়িয়ে দিতে পারল না।

    মেয়েটি মৈত্রকে হেরে যেতে দেখেও হাততালি দিল। খুব খেলা দেখানো হচ্ছিল! এখন সব ভোজবাজি শেষ। মেয়েটি যেন এবার ওকে শেখাতে পারে। সে বাইরে বের হয়ে মৈত্রের পাশে দাঁড়াল। বোধ হয় বলল, এই দ্যাখ্যো সাঁইয়া। সে দুটো বল ঠিক ঠিক জায়গায় গড়িয়ে দিল। যেন খুব সহজ।

    মৈত্র এবার দু প্যাসু দিয়ে তিনটি বল নিল। কোন দিকে তাকাল না। ছোটবাবু একটা থামে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মৈত্রের টিপ দেখছে। মৈত্র এবার খুব সহজে একটা বল জায়গামতো পৌঁছে দিল। ছেলেবেলায় টিপ্পি খেলত। খেলাটা হুবহু একটা আধুনিক টিপ্পি খেলা। সে অনেকগুলো টিপ্পি বাঁচিয়ে সহজেই রাজা টিপ্পিটাকে গর্তে ফেলে দিতে পারত। সুতরাং মৈত্র একবার জিতেই ভেবেছে, মেয়েটার ঠিক জামা-কাপড় খুলে নিতে পারবে। কিন্তু পরে চার বার মেরে একবার। সে ফের প্যাসু দিয়ে দশটা। একটাও গেল না। মেয়েটা তেমনি ঠোঁট টিপে হাসছে। বড় সুস্বাদু খাদ্যের মতো হাসিটা ওকে প্রলোভনে ফেলে দিচ্ছে। সে ইতিমধ্যে দশ প্যাসুর মতো হেরে গেছে। অমিয় নাইটের মতো এগিয়ে এসে এক ধাক্কায় সরিয়ে দিল মৈত্রকে, খেল মেমসাব। তোমারে উলঙ্গ কইরা দিমু। অমিয় দেশের ভাষায় এবারে কথা বলতে লাগল।যা খেইল দেখামু, বোজবা কারে কয় বাঙ্গাল! বলে অমিয় আট প্যাসুতে ষোলটা কাঠের বল তুলে খেলতে গিয়ে দেখল সব কটা কাঠের ট্রেতে উঠে গেছে। সুতরাং এক ধাক্কায় ওকে সরিয়ে সামনে দাঁড়াল মৈত্র। হা-হা করে হাসল। সে এবার ষোল প্যাসুতে বত্রিশটা বল কিনে ফেলল।

    ষোল প্যাসু হেরে যেতেই শেফালীর মুখ মনে পড়ে গেল। হয়ত এতক্ষণে জাহাজে শেফালীর আর একটা চিঠি এসে গেছে। রোজ রোজ সে শেফালীর চিঠি পাবে আশা করে। সে তাড়াতাড়ি খেলা শেষ করে বুঝল জেতা যাবে না। কিন্তু মেয়েটা এমন অবজ্ঞার হাসি হাসছে যে পায়ের রক্ত মাথায় উঠে যাচ্ছে। হাতে রুপোর স্টিক। যেন রিঙের ভেতর এখন মেয়েটা ইচ্ছে করলে সিংহের খেলা দেখিয়ে দিতে পারে। দু-একবার জিতে গেলে প্যাসু ডাবল ফিরিয়ে দিচ্ছে। সবই অবহেলাভরে। কেমন ঝর্ণার উৎস থেকে কল কল করে নেমে দু’পাড়ের সব ভাসিয়ে দেবার ইচ্ছে। যত এমন হচ্ছে তত মৈত্রের জেদ। সে এবার সব বলগুলো কোলের কাছে টেনে নিলে, মেয়েটি চোখের ইসারায় বলছে, আর কেন, এবার যাও। কাল, মাথা ঠাণ্ডা করে এস। খেলতে পারবে।

    মৈত্র খিস্তি করল এবার, ছেনালী হচ্ছে! খেলবে না! সে এলোমেলোভাবে এক গাদা প্যাঁসু পকেট থেকে তুলতেই, মেয়েটি দ্রুত স্টিক হাতের ওপর ঘোরাতে থাকল। যেন মেয়েটির ইচ্ছে না, মৈত্র আর খেলুক। রেগে গেলে খেলা ঠিক হয় না। লোকটা ব্যালেন্স হারিয়ে ফেলছে। অথবা বলার ইচ্ছে যেন, লক্ষ্মী ছেলের মতো জাহাজে যেতে বললাম, তুমি বাপু ফের একগাদা নোট বের করেছ। কি করা। খেলা যাক। সে ট্রে এগিয়ে দিল।

    ছোটবাবু বলল, কি তুমি জাহাজে যাবে না!

    —দাঁড়া!

    মেয়েটি ততক্ষণে ওদের জন্য তিন কাপ কফি আনিয়ে দিয়েছে। ওরা দাঁড়িয়ে খাচ্ছে। অমিয় পাশে একটা টুলে বসে রয়েছে। সে দাঁড়াতে পারছে না। কফিটা খেলে নেশা মরে যাবে। মেয়েটির এমন সৌজন্যবোধ দেখে ছোটবাবু কেমন অবাক হয়ে গেল!

    মৈত্র কফি খেতে খেতে টেবিলের ওপর ঝুঁকে পড়েছে। কফি খেতে খেতে দাবার ছকের মতো কি যেন পরীক্ষা করছে। টেবিলের ওপর গোটা ছকটাতে কি যেন যাদু আছে। মেয়েটি যতবার বল গড়িয়েছে, প্রত্যেকবার ঠিক জায়গায় পৌঁছে গেছে। সে পারছে না কেন বুঝছে না। মৈত্র, শেফালীর মতো দুর্ধর্ষ মেয়েকে সামলায়, সে চাল-চলনে লড়নেওয়ালার মতো, তার কাছে এই মেমসাব সামান্য মেয়ে, তার কাছে সে বার বার হেরে যাচ্ছে।

    চারপাশে অনেকে দাঁড়িয়ে ওর খেলা দেখছে। ছোটবাবুর কফি শেষ। কেউ কেউ বল নিয়ে খেলবে ভাবছে, কিন্তু মৈত্রকে ও-ভাবে হেরে যেতে দেখে সাহস পাচ্ছে না। মনে হয় ওরা সবাই মেয়েটিকে চেনে। সে সবাইকে খেলার জন্য স্টিক দিয়ে বল ঠেলে দিচ্ছে। মৈত্র ওদের কথা বুঝতে পারছে না। সবাই স্প্যানীশ বলছে। তার জন্য মৈত্রের কোন অসুবিধা হচ্ছে না। সব দেশে সাধারণ বাজার করবার মতো বিদ্যা তার আছে। কিছুটা দর কষার মতো, কিছুটা চিটাগাঙ এবং সন্দিপী নিরক্ষর জহাজিদের ইংরেজির মতো। দর-দামের কথা বললে, হাউ মুচ মেমসাব, অর্থাৎ হাউ মাচ মেমসাব! সুতরাং মৈত্র প্রায় বোবার সামিল। সে, সব রেখাগুলো টেবিলের পরীক্ষা করছে। সে যেন এই ছকের ভেতর মেয়েটির মুখ দেখতে পাচ্ছে। বড় কোমল মুখ। নাক লম্বা। চুল কালো নীল চোখ। আর গায়ের মাংস আপেলের পিঠের মতো। পরনে লাল স্কার্ট, আঁটা ফ্রক, কোট শাদা রঙের। গলায় নীল পাথরের মালা, মাথায় লাল টুপি। তাতে পাখির পালক গোঁজা। কপালের কিছুটা কালো মখমলের জাল দিয়ে ঢাকা। চোখের নিচে কেমন নীলাভ রঙের আবছা অন্ধকার। মৈত্র মেয়েটিকে বেশিক্ষণ ছকের ভিতর দেখতে পেল না, অমিয় এসে কলার চেপে ধরেছে, এই যাবি কিনা বল!

    —যাব, চল। মৈত্র এবার মেয়েটির দিকে তাকাল। মেয়েটি ওকে দু হাঁটু ভাঁজ করে বাউ করল। মৈত্র, মাথার টুপি খুলে ওর বাউকে সম্মান জানাল। তারপর কোনও দিকে তাকাল না। সে সোজা অন্যমনস্কভাবে হাঁটতে থাকল। সে ছোটবাবু এবং অমিয়র সঙ্গে একটা কথাও বলল না। রাত গভীর। রাস্তায় লোক চলাচল কমে গেছে। কোথাও বোধ হয় এখন স্কাইলার্ক ফুল ফুটছে। ওরা ফুলের গন্ধ পাচ্ছে। টাওয়ারের বড় ঘড়িটাতে ঘণ্টা বাজছে এক দুই তিন…এভাবে অনেক। মৈত্র এমন সময়ে করুণ গলায় বলল, আমার জাহাজে যেতে ইচ্ছে করছে না রে। মেয়েটার পায়ের নিচে আমার পড়ে থাকতে ইচ্ছে হচ্ছে।

  • তের

    তের

    ।। তেরো।।

    ভোরবেলা মৈত্রের উঠতে একটু বেলা হয়ে গেল। বোধহয় মৈত্র রাতে সেই স্বপ্নটা দেখছিল। বোধহয় স্বপ্নটা এত দ্রুত মাথার ভেতর পাক খাচ্ছিল যে কখন ভোর হয়ে গেছে মৈত্র টের পায়নি। একটা মাছের কঙ্কাল, তিমি মাছের কঙ্কাল বড় পাইন গাছে কেউ ঝুলিয়ে রেখে গেছে। সে স্বপ্নে সব সময় গাছটার নিচে দাঁড়িয়েছিল। কাজে যাবার সময় বার বার স্বপ্নটার কথা তার মনে হচ্ছে।

    কাল মদ বেশী মাত্রায় হয়েছে। ঘুমও ভাল হয়নি। আর একটু ঘুমোলে বেশ ভাল হত। কিন্তু রাত থাকতেই সাতটার ঘণ্টা পড়ে গেছে। এখনও ডেকে আলো জ্বালা। সারেঙ ওপরে দাঁড়িয়ে টান্টু বলছেন। এনজিনরুমে অনেক কাজ। জাহাজের এসব কাজ বন্দরে না এলে করা যায় না। কিনার থেকে লোকজন উঠে এসেছে। এনজিনে ওয়েলডিং-এর কাজ। পুরানো জাহাজ় বলে, এটা থাকে তে ওটা খসে যায়। যতক্ষণ বন্দরে জাহাজ ততক্ষণ ওয়েলডিং।

    সকাল থেকেই মৈত্রের মেজাজ খারাপ। অমিয়র জন্য এটা হয়েছে। কাল মৈত্র অনেক প্যাসু হেরেছে। হেরে যাওয়ার মূলে অমিয়। সেই লোকটার একাউন্টে টাকা না পাঠাতে পারলে শেফালী তাড়াতাড়ি টাকা পাবে না। একটা ড্রাফট যাবে। তাছাড়া রিজার্ভ ব্যাঙ্কের কিছু নিয়ম কানুন আছে, সব ঠিকঠাক করে পেতে পেতে এমনিতেই দেরি হয়ে যাবে। যদি মানুষটা আজ আসে, এলে দুপুরে আসবে, তখন জাহাজে কে না কে উঠে আসে ঠিক থাকে না। জাহাজ-ডেকে হাজার রকমের মানুষ। কেউ কাউকে চেনে বলে মনে হয় না। কনট্রাকটারদের লোকই বেশি। নানা জায়গায় মেরামত করছে ওরা। এ- সময়ে মালটা নামিয়ে দেওয়া খুব সহজ! সেই মানুষটি আসবে কনট্রাকটারের লোক হয়ে। কারো কোন সন্দেহ করার কারণ থাকবে না!

    সেই একঘেয়ে কাজ। বন্দরে একরকম, সমুদ্রে অন্যরকম। জেটিতে ভীষণ ব্যস্ততা। মাল কেবল নেমে যাচ্ছে। মেজ-মালোম ফল্কায় ছুটে যাচ্ছেন। বড়-মালোম হিসাব মেলাচ্ছেন। পাঁচটায় ছুটি হলে আবার স্নান। মেসরুমে বসে আহার। তারপর ফুরফুরে পাখির মতো বন্দরে নাইটিঙ্গল দেখতে নেমে যাওয়া।

    সিঁড়ির মুখে অমিয়র সঙ্গে দেখা। অমিয় মগে চা নিয়ে নিচে নামছে। সিঁড়িতে নামার সময় মৈত্র বলল, কাল তোর জন্য এসব হল।

    —বা বেশতো। খেললি তুই, আর দোষ আমার!

    —তোর জন্যই তো বের হওয়া।

    —ন্যাকামি করবি না।

    —আজ আর কোথাও যাচ্ছি না। সোজা ঠিক জায়গায় চলে যাব।

    —যাবি না তো যাবি না। আমাকে কি বলছিস!

    এবং অমিরর আর ইচ্ছা হল না কথা বলতে। ছোটবাবু ওদের কথা কাটাকাটিতে খুব মজা পায়। এবং সে জানে এটা খুব সাময়িক। আবার সব ঠিক হয়ে যাবে।

    জাহাজ থেকে নেমে যাবার মুখে মৈত্রের মনে হল, কেউ ওকে ডাকছে। সে দাঁড়াল। ডেকবোসান এদিকে আসছে। ওর হাতে একটা চিঠি। শেফালীর চিঠি সে বুঝতে পারে। এখন সে নামতে পারে না, চিঠিটা পড়া দরকার। সে ফের ফোকসালে ফিরে গেল। আলো জ্বেলে বসল। ছোটবাবু অথবা অমিয়কে সে সঙ্গে নিচ্ছে না। একাই যাবে ভেবেছে। তারপর চিঠির ভাঁজ খোলার সময় অন্যবারের মতো তেমন সুগন্ধ পাচ্ছে না যেন। আর লেখাটা মনে হল বড় হিজিবিজি, এবং এখন সে বুঝতে পারল, আগের চিঠিটা অনেকদিন আগে শেফালী লিখেছিল। বুনো-এয়ার্সের ডাকঘরে অনেকদিন পড়েছিল হয়ত অথবা এজেণ্ট অফিসে। আর এ-চিঠি সদ্য লেখা। চিঠিটা পড়তে পড়তেই বুঝল, শেফালী ভয়ঙ্কর অসুস্থ। দুর্বলতার জন্য ভালভাবে চিঠিটা লিখতে পারেনি। চিঠিটা পড়তে পড়তেই সে কেমন বিচলিত বোধ করছে। হিজিবিজি লেখা স্পষ্ট বুঝতে পারছে না। সময় লাগছে পড়তে। লিখেছে ওর বমি ভয়ানক হচ্ছে। কিছু খেতে পারছে না। বিছানার সঙ্গে শরীর মিশে গেছে। শেষে লিখেছে, টাকার খুব দরকার। তুমি যে টাকা দিয়ে গিয়েছিলে সব শেষ। মাসে মাসে যে টাকা কোম্পানীর ঘর থেকে আসে ওতে কি হয় বল! ডাক্তার আর ওষুধে সব ফুরিয়ে গেছে। তুমি কবে ফিরছ, জাহাজ কবে ফিরবে। আবার কোথায় যাচ্ছ ঠিকানা দেবে।

    মাঝে মাঝে অনেক অস্পষ্ট কথা লেখা আছে। সে ঠিক তা এখনও উদ্ধার করতে পারেনি। যেন একটা নাম হ্যাঁ বিমল, ফের এসেছিল। শেফালী লাইনটা আবার নিজেই কেটে দিয়েছে। দুর্বল হাতে ভালভাবে কাটতে পারেনি। বিমলের স্ত্রী শেফালী, কথাটা মনে হলেই ভেতরে সে ভীষণ কষ্ট পায়। বিমল ওর বন্ধু, বিমল খুব জাহাজের গল্প শুনতে ভালবাসত। বিমল, সরকারী অফিসে কি একটা বড় চাকুরে। বিমলের কথা মনে হলেই মনে হয়, লোকটা আস্ত শয়তান!

    তখন মৈত্র সবে মাত্র কার্গো লাইনের জাহাজে কাজ নিয়েছে। সফর ঘুরে এসে কেমন শেয়ানা হয়ে গেল সে। পৃথিবীর অনেক দেশ সে দেখেছে। রয়েল নেভিতে সে সুযোগ তেমন ছিল না। সফর শেষে এভাবে বাড়ি ফিরলে সে রাজার মতো চলাফেরা করত। পৃথিবীর সব বন্দরের যাবতীয় সুখ যেন ওর দু’পকেটে। সে যেন সেইসব সুখের গল্প দু’পকেটে ভরে ফেরি করতে ভালোবাসে। সে, গল্প বলার সময় শেফালীকে একজোড়া ম্যানিলা হ্যাম্পের চটির গল্প শুনিয়েছিল। সে যে কি আগ্রহ! একজোড়া ম্যানিলা হ্যাম্পের চটি না পরতে পারলে শেফালী বুঝি ভাবল, বেঁচে থেকে সুখ নেই। বেঁচে সুখ নেই, বেড়িয়ে সুখ নেই। কি সুন্দর সুন্দর গল্প বলত শেফালীকে, মিয়ামি বিচের সুন্দরীদের প্রতিযোগিতার গল্প শুনলে শেফালী হাঁ করে থাকত। শেফালীকে সে কুহকে ফেলে দিয়েছিল। এবং যা হয়ে থাকে, সেই থেকে এমন সুন্দরী বৌটা বিমলের, ওর কাছে চলে আসতে চাইল। লাজ- লজ্জা সব সে হারিয়ে ফেলল।

    মৈত্র বলল, তাহলে তুমি শুভেন্দু মৈত্র, মনে মনে বিমলের নাম শুনলে কষ্ট পাও। বিমলের এখন কি ইচ্ছে সে এত দূর থেকে জানতে পারে না। সে চলে এলে বিমল সব লুটেপুটে খেতে পারে। বিমলের সুবিধা ওর চেয়ে অনেক বেশি। বিমল তো অন্য একটা মেয়েকে ঠিক মিয়ামি বিচে নিয়ে গেছে, তবে আর কেন! শেফালীর কি দরকার, বিমলের কথা লেখার! শেফালী কি বিমলকে এখনও ভুলতে পারেনি। শেফালী কি বিমলকে…কারণ মৈত্র নেই, মৈত্র জাহাজে চলে গেছে, তুমি এ-সময় আমার কাছে কাছে থাকো।

    সে চিঠিটা ভাঁজ করে পকেটে ভরে রাখল। অমিয় দুবার এসেছে, একটা কথাও বলেনি। মৈত্র কোথায় যাচ্ছে, জানতে চায়নি। যেন অমিয় অথবা মৈত্র কেউ কাউকে চেনে না। ছোটবাবু আজ বেশ সকাল সকাল মেজ-মালোমের সঙ্গে কিনারায় নেমে গেছে। বোধহয় এসব ছোটবাবুর ঠিক ভাল লাগেনি। ছোটবাবু চাপা স্বভাবের মানুষ। নানাভাবে চেষ্টা করেও ছোটবাবুর কিছু জানা যায় না। ওর চিঠি আসে না। চিঠি না এলে এখন সে আর দুঃখ করে না। মন ভার করে থাকে না। ছোটবাবু নিজের দুঃখ বোধহয় নিজের ভেতর সবসময় লুকিয়ে রাখে। ছোটবাবুকে ঠিক মৈত্র বুঝতে পারেনা।

    চারপাশটা দেখতে দেখতে নেমে গেল মৈত্র। চারপাশে তেমনি আলো জ্বলছে এবং আলোর বাহার। সে তার ভেতরে একাকী হেঁটে যাচ্ছে। দুপুরবেলা, সে ঠিক নামিয়ে দিয়েছিল মালটা। এখন সে রাজার মতো হাঁটতে পারে। কারণ টাকা পয়সার ভাবনা তার নেই। এখন শুধু পাঠানোর ভাবনা। সামনে সেইসব টিউলিপ ফুলের গাছ, সেইসব লাইটপোস্ট, সেইসব পাখিরা একরকমের, অথবা তেমনি নাইটিঙ্গেল পাখিরা উড়ছে।

    সেই টাওয়ারটা, সামনে। ঘড়িতে পাঁচটা বাজার শব্দ। লোকটার কাছে সে ঠিকানা ভালভাবে জেনে নিয়েছে। সে এখন শুধু সেদিকেই যাবে। অন্য কোথাও নয়। লাল নীল বলের কথা, মেয়ের বাও করা চোখের কথা দু-একবার মনে হয়েছে। সে একেবারে আমল দেয়নি। বাস, মানুষজন, নিচে ট্রেন ছুটে যাচ্ছে। বেশ ভিড়। এবং মানুষের শরীরে বিদেশী গন্ধ। সে ওদের পাশ কাটিয়ে গেলেই কেমন একটা আশ্চর্য গন্ধ পায়। ওর মনে হল তখন, না খেয়ে জাহাজ থেকে নেমে আসা ঠিক হয়নি। আসলে অমিয়কে সে এড়িয়ে থাকতে চেয়েছিল। একটু খেয়ে নিতে হয়। খুব খিদে পেয়ে গেছে। ফিরতে ফিরতে রাত হবে বেশ। কারণ যা বলেছে, তাতে ওকে কেরিয়েম্বুজ পার হয়ে যেতে হবে। সে রেস্তোঁরাতে ঢুকে খাবার চাইল। বড় রেস্তোঁরা। পাশে রেকর্ড-প্লেয়ারে নানারকম গান। কাউন্টারে দামী কাচের ভিতর মেমসাব, মুখে সেই সরল মিষ্টি হাসি। কি করে যে ওরা এমন সুন্দর হাসতে পারে। এতবার হাসতে ওদের কষ্ট হয় না! মেয়েরা এমনভাবে হাসলে সে শেফালীর কথা মনে না করে পারে না। আর মনে হলেই শির-শির করে শরীরে একটা শীতের মতো ঠাণ্ডা। চোখ মুখ জ্বালা করতে থাকে।

    সে ইচ্ছে করেই আর মেমসাবের দিকে তাকাল না। সে স্যাণ্ড-উইচ এবং কিছু গ্রীণ পিজ সেদ্ধ চেয়ে নিল।

    তখন অন্য এক যুবতী মেমসাব, সে এসে আর কি লাগবে জানতে চাইছে।

    সে বলল, আর কিছু চাই না।

    —একটু চা?

    —চা লাগবে না।

    —খুব ভাল আইসক্রিম কফি আছে।

    মৈত্র বলল, না।

    —অক্‌সটেল পরিজ আছে!

    মৈত্র বলল, না।

    —ড্রিংকস!

    —ইয়েস।

    এবং এ-ভাবে দামী মদ, সাদা টাওয়েল, অর্থাৎ টাওয়েল পাল্টে দিয়ে গেল মেয়েটা। অর্ডার নিচ্ছে যেসব মেয়েরা ওরা খদ্দেরদের খুব পাশাপাশি থাকছে। ঘুরছে ফিরছে। অনেক সময় কেউ কেউ পাশে বসে সঙ্গ দিচ্ছে। বোধহয় মৈত্রকে মেয়েটি পাশে বসে চিয়ার-আপ করছিল।

    মৈত্র বলল, দু পেগ।

    দু পেগ এলে, একটা নিজের কাছে টেনে নিল, অন্যটা মেয়েটিকে এগিয়ে দিল।

    —আমাকে! সব ইসারাতে কথাবার্তা।

    —ইয়েস।

    —নো।

    —খুব রাগ করব। হাত ঘুরিয়ে মুখ ভার করে বোঝাল, না খেলে সে দুঃখ পাবে।

    মেয়েটি এবার টেনে নিল গ্লাসটা। আর ঠিক তখনই অমিয় হাজির। ঠিক ওৎ পেতে আছে। মৈত্রের আবার পায়ের রক্ত মাথায়।

    —কিরে মেয়েছেলে নিয়ে মদ খাচ্ছিস! তুইতো আচ্ছা লোক। এই বৌকে টাকা পাঠানো! মৈত্র আরও দু পেগের অর্ডার দিল। তারপর সে খেল না। উঠে পড়ার সময় অমিয়র হাত ধরে

    বসিয়ে দিল। শালা খা, যত পারিস মদ মেয়েছেলে খা।

    —বা বেশ মৈত্র, তুই নিজে খেয়ে আমার নামে বিল রেখে যাচ্ছিস!

    মৈত্র অযথা কথা বাড়াল না। কাউন্টারের সামনে সে বিল মেটাবার জন্য দাঁড়াল।

    অমিয় প্রায় সরবত খাবার মতো চুমুক মেরে সবটা গলায়, মিনিটখানেক মুখ কুঁচকে রাখল। তারপর বলল দাঁড়া মৈত্র, আমি যাচ্ছি।

    —না। তুমি বরং আর একটু খাও শালা। বলে সে কাউন্টারে ইশারা করতেই আরও দু পেগ। অমিয় লোভ সামলাতে পারল না। পরের পয়সায় ইচ্ছে মতো মদ খেতে কি যে ভালো লাগে। মনে মনে সে মৈত্রকে জাহান্নামে পাঠালেও এখন খুব ভালবাসছে। মরুক গে, যেখানে খুশি যাক। সে এখানে বেশ আছে। বাকি দু পেগ, একটু সময় নিয়ে খাবে।

    মৈত্র ভাবল, যাক বাঁচা গেল! মেয়ে এবং মদ দিয়ে বসিয়ে দিতে পেরেছে। নতুবা সারাটা রাস্তা ভ্যানর ভ্যানর, এটা কি, ওটা কি—মেয়েটার প্রলোভনে অমিয় পড়ে গেছে। অমিয় মদ খেয়েই চলে যাবে সেখানে! তারপর খেলা আরম্ভ করবে। এবং সঙ্গে সঙ্গে মৈত্রের ফের কেন যে মদের নেশা পেয়ে গেল। ঠিক যেন জমেনি। তুমি অমিয় আমার ওপর টেক্কা দিতে চাইছ! সে ভাবল, খুব তাড়াতাড়ি যাওয়া দরকার! টাকাটা কাল পাঠালেও ক্ষতি হবে না শেফালীর। এবং মনে মনে ভাবল এক দুই করে কাঠের বল তুলে নেওয়া যাবে। চোখে যে ওর কি সব রঙীন ছবি ধরা পড়ছে এখন। এক দুই করে সব কাঠের রঙ্গীন বল ওর চোখের ওপর বেলুনের মতো উড়ে বেড়াচ্ছে। সব বল সে যেন বাজীকরের মতো আকাশে এক দুই করে অদৃশ্য করে দিচ্ছে। এমন কি মেয়েটাকে পর্যন্ত। এমন

    সে দেখতে পাচ্ছে, চারপাশে বলগুলো নক্ষত্র হয়ে গেছে, এবং সে আর মেয়েটি আকাশের নিচে নক্ষত্রের পাশে দুটো মাছের মতো সাঁতার কেটে বেড়াচ্ছে। আহা, হরি ওঁম। বলে মৈত্র রাস্তাতেই একেবারে বেমালুম মাতালের মতো হাঁটতে হাঁটতে ঠিক জায়গায় পৌঁছে গেল। কখনও লাইনে দাঁড়িয়ে, কখনও রেলিঙে ভর দিয়ে, চুক চুক করে মদ খেল। সব নদ-নদীর জল মাথায় ছুঁইয়ে গেল যেন।

    মৈত্র বার বার পেছনের দিকে তাকাচ্ছে। না, অমিয় ওকে পেছনে ফলো করছে না। জিভ বেশ ভারি ভারি ঠেকছে। কিছু রোস্ট মাংস নিয়েছিল প্যাকেটে। সে প্যাকেট খুলে রোস্ট মাংস চিবুতে থাকল। নরম জিভে এক ধরনের স্বাদ, নরম মাংস কতদিন খাচ্ছে না। কত দীর্ঘদিন…সে ভয়ঙ্কর ভাবে নরম মাংসের জন্য দীর্ঘদিন পর এক…দুই…তিন, চার…পাঁচ…ছয়, সে দীর্ঘদিন পর ছয় থেকে বারোটা লাল নীল বল চোখের সামনে ভাসতে দেখল। কার্নিভেলের মেয়েটা যেন এখন ওর সামনে ফের বাউ করছে।

    তারপর ওর আর কিছুই মনে আসছিল না। শুধু লাল নীল বল, হলুদ রঙের কাঠের ট্রে, রুপোর স্টিক এবং মেয়েটির আশ্চর্য সরল হাসি অথবা দু হাঁটু ভাঁজ করে সামান্য নুয়ে বাউ, সে যেতে যেতে এসবই মনে করতে পারছে। সে রিঙের সামনে দাঁড়িয়ে গলায় টাই টেনে দিল। সে ভীষণ স্মার্ট হবার চেষ্টা করছে। সে মাথার টুপিটা আরও টেনে দিল মুখের কাছে। সব কাউন্টার থেকে সেই এক সরল হাসি, এখানে আসুন স্যার। আপনার জন্য আমরা নানারকম মনোরঞ্জনের ব্যবস্থা রেখেছি। সে সব কিছু না শোনার চেষ্টা করছে। মাথার টুপিতে যতটা পারছে কপাল মুখ ঢেকে দিচ্ছে।

    তারপর সেই সরল অনাড়ম্বর হাসি। হাতে রুপোর স্টিক, এরেনার ভিতর হাতে চাবুকের মতো খেলা বেশ জমে উঠবে। মেয়েটি রুপোর স্টিক দিয়ে বল ঠেলে দিচ্ছে। মৈত্র সোজা বল তুলে নিল না। সে শুঁকে শুঁকে কি যেন টেবিলের চারপাশটা দেখছে। আসলে সে নুয়ে দেখছে। কোথায় কি রেখা অথবা ভাঁজ রয়েছে টেবিলের দাগগুলোর ভেতর সে যেন খুব ভালভাবে দেখছে। দেখলে মনে হবে, সে শুঁকে যাচ্ছে টেবিলের চারপাশটা।

    আর রূপোর স্টিকে মেয়েটি পায়চারি করতে করতে মাঝে মাঝে লাঠি ঘোরাচ্ছে। কেউ কেউ দোকানের সামনে পায়চারি করছে। ওরা তিন-চার দান হেরে যেতেই মুখ গোমড়া করে ফেলেছে। মেয়েটা পরেছে নীল রঙের ট্রাউজার। মনে হয় কোন নরম পাখির বুকের পালক দিয়ে সে তৈরি করেছে তার পোশাক। ওর পোশাকের ভেতর কি যে সব সুন্দর সব লতা-পাতা আঁকা ছবি। ওর পোশাকে আছে ভীষণ চাকচিক্য। মৈত্র এমন পোশাক জীবনেও যেন দেখেনি। হাতের কাছে ফুলের মতো গাউনের হাতা। ফুলে আছে। আর বুকের কাছে শরীরের সঙ্গে জামা সেঁটে আছে। স্তন এমন উঁচু করে রাখার কি যে দরকার! সে ভালভাবে তাকাতে পারছে না পর্যন্ত। মাথায় মেয়েটি আর টুপি পরেনি। চুলে বব্ ছাঁট। কোঁকড়ানো কালো চুলে নীল চোখে এক দুর্ধর্ষ প্রতিদ্বন্দ্বী। মৈত্র দান তুলে নিল।

    মেয়েটি ভেবেছিল সে খেলবে। কিন্তু আশ্চর্য, না খেলা না, প্যাসু গুনে গুনে দেওয়া। মৈত্র বরং বলগুলি নিয়ে তারের ওপর খেলা দেখানোর মতো বল হাওয়ায় ছুঁড়ে দিতে থাকল। আসলে মৈত্র জানে বেশি রাতে ওর খেলা জমবে। সে এখন যেন মেয়েটার বল ছুঁড়ে ছুঁড়ে বিজ্ঞাপন দিচ্ছে। এখানে আসুন, খেলুন, খুব সহজ খেলা, আপনার যা দরকার লাগে নিয়ে যান। কেবল রিঙের মেয়েটি বাদে। এর জন্য আমি শেষ খেলা খেলব ভাবছি মশাইরা। সে ঘুরে ঘুরে বলের নানা ট্রিক্স—জ্যাবের ভিতর কানের ভাঁজে এবং মাথায় বল রেখে ব্যালেন্সের খেলা—এবং লোক জমে গেলেই, কিছু কিছু লোক খেলতে আরম্ভ করে দেয়। দিলে যা হয় নেশা লাগে। হারতে থাকে। টেবিলে প্যাসু গুনে শেষ করতে পারে না মেয়েটি।

    কে বলবে এখন মৈত্র এই রিঙের খদ্দের! সে কখনও মেয়েটাকে টাকা গুনে দিতে পর্যন্ত সাহায্য করছে! একা পেরে উঠছে না। সে মেয়েটার হয়ে রুপোর স্টিকে বল ঠেলে দিচ্ছে। ভিড় কমে গেলেই সে আবার রুপোর স্টিকের মাথায় বল রেখে ব্যালেন্সের খেলা আরম্ভ করে দেয় এবং এভাবে সে এই রিঙে একজন মজাদার মানুষ।

    মৈত্র থামের আড়াল থেকে কখনও কখনও মেয়েটিকে দেখছে। সে আর খেলা দেখাচ্ছে না। এই ভিড়টা কেটে গেলেই আরম্ভ করবে। কিন্তু মনে হল, কেউ যেতে চাইছে না। কেউ খেলছে, কেউ মজা দেখছে। এমন একটা রিং ছেড়ে কারো যেতে ইচ্ছে করছে না। অথচ অন্য রিঙগুলো ফাঁকা হয়ে গেছে। কেবল এখানেই ভিড়। আচ্ছা মুশকিল হল। সে চারপাশে তাকিয়ে এবার এগিয়ে গেল। বল গড়িয়ে আসছে, আর সে ধরে ফেলছে। অর্থাৎ সে এবার খেলবে এবং ক্রমে ক্রমে বলগুলো ট্রে থেকে তুলে নিল। অর্থাৎ সে কাউকে আর খেলতে দিচ্ছে না। যাদের খেলে অভ্যাস যারা জানে মেয়েটির নানা রকমের বাহাদুরী, তারা মুচকি হাসছিল, বোকা জাহাজিটা মরবে। বেটা এক আজগুবী মানুষ।

    এবার মৈত্র এবং মেয়েটি। মৈত্র চুপচাপ খেলে যেতে থাকল। প্যাসগুলো ড্রয়ারে রেখে তালা মেরে দিল মেয়েটা। কারণ একা যখন এবং সামনে জাহাজি মানুষ, সে ঠিক ভরসা পাচ্ছে না। সে এখন রুপোর স্টিকে চিবুক রেখে মৈত্রের দিকে চুপচাপ তাকিয়ে আছে। মানুষটা বিদেশী এবং জাহাজি মানুষ। জাঁহাজি মানুষকে পোশাকে ঠিক চেনা যায়। মানুষটা ভীষণ বেপরোয়া। একসঙ্গে অনেকগুলো প্যাসু বাজী রেখেছে। মরদের মতো খেলে যাচ্ছে। অথচ মুখে ভীষণ তুচ্ছ তাচ্ছিল্য ভাব মেয়েটির। যেন এমন সে কত খেলোয়াড়দের দেখে থাকে রোজ।

    রাত বাড়ছিল। ভেতরে ভেতরে মৈত্র মরিয়া হয়ে উঠেছে। আর হেরে যাচ্ছে। এত হেরে গেলে রিঙেরও বদনাম। মেয়েটি জাহাজি মানুষটার ওপরে করুণা বশেও হয়তো রিঙের সব বল তুলে বড় একটা কাচের পাত্রে রেখে দিচ্ছে। কাচের পাত্রে তুলে দেওয়ার অর্থ আর না। একটু পর সব বন্ধ হয়ে যাবে। আর খেলা হবে না। এবার জাহাজে ফের।

    মৈত্র এবার ঝুঁকে দাঁড়াল। ইশারা করল। এবং হাতের পাঁচ আঙ্গুলে কিছু বোঝাতে চাইল।

    মেয়েটি বুঝল, পাঁচ প্যাসু! মেয়েটি ঠোঁট উল্টে দিল।

    মৈত্র আসলে আজও একগাদা প্যাসু হেরে গেছে। সে এই হেরে হেরে মেয়েটিকে জিতে নিতে চাইছে। সে পাঁচ আঙ্গুলে পঞ্চাশ প্যাসু বলতে চেয়েছে, মেয়েটি কি বুঝেছে কে জানে।

    মৈত্রের হাতে এখন আর কোনও বল নেই। সদরে যারা ব্যাণ্ড বাজাচ্ছে যারা ব্যাগ-পাইপ বাজাচ্ছিল এখন তারা পর্যন্ত বাজনা থামিয়ে দিয়েছে। অর্থাৎ এবার ছুটি। মেয়েটিও একসময় ওকে পাহারা রেখে বাক্সের সব প্যাসু ভেতরে কোথায় জমা দিয়ে এল। ঝাঁপ ফেলে দিচ্ছে। ডেনছিগোতে একজনও বসে এখন মদ খাচ্ছে না। কার্পেট তুলে ফেলা হচ্ছে। গোটা কার্নিভেল এখন ফাটা বেলুনের মতো চুপসে গেছে। কেমন নিঝুম। দু-একজন মাতাল পুরুষ অথবা রিঙের মেয়েরা বের হয়ে যাচ্ছে। ওদের দেখে মৈত্র আরও অস্থির হয়ে উঠছে।

    মৈত্র’ আর থাকতে পারল না। সে দশ আঙুলে, দেখাল, একশ। একশ প্যাসু দেব মেয়ে।

    মেয়েটি কোন কথা বলল না। সে মৈত্রের মুখের ওপর ঝাঁপ ফেলে দিল। এবং মৈত্রের দিকে সে আর ফিরে তাকাল না। হন হন করে সদর দরজার দিকে হাঁটতে থাকল। মৈত্র কেন জানি ডাকতে সাহস করল না। ওর চোখের ওপরে রাতের এমন সুন্দর নাইটিঙ্গেল পাখি অদৃশ্য হয়ে গেল। সে হায় হায় করে উঠল।

    .

    রবিবার সুতরাং সকলের ছুটি। ডেক এবং এনজিন জাহাজিদের কোন কাজ নেই। ডেক-ভাণ্ডারি এবং এনজিন-ভাণ্ডারির কেবল কাজ গ্যালিতে। মেসরুমবয় এবং মেটদেরও কাজ থাকে। স্টুয়ার্ড ইকবাল সাহেব ভোরে উঠেই চিফ কুক এবং ভাণ্ডারিদের রসদ দিয়ে দিয়েছেন। সুতরাং তিনিও প্রায় ছুটি উপভোগ করছিলেন। অফিসার এনজিনিয়াররা ছুটির দিন বলে বেশ রাত করে জাহাজে ফিরেছে। ওরা এখনও ঘুম থেকে ওঠেনি।

    ভোরের দিকে ছোটবাবু একবার উঠেছিল। কি ঘন কুয়াশা চারপাশে! কুয়াশার জন্য কিছু দেখা যাচ্ছে না। সে কুয়াশা এবং শীতের জন্য ফের এসে শুয়ে পড়েছে। মৈত্র জেগেছিল। সে খুটখাট শব্দ হতেই কম্বল সরাল মুখের। অমিয় এখনও ঘুমোচ্ছে। ওকে ডাকতে সাহস হচ্ছিল না। কাল কিনারায় সে শেষ পর্যন্ত কি কাণ্ড করে ফিরেছে কে জানে। ছোটবাবু হয়তো ফের নাক ডাকিয়ে ঘুমোবার জন্য কম্বলের ভিতর ঢুকে যাচ্ছে।

    অথচ একটু চা না খেলে হচ্ছে না। কাজের কোন তাড়া নেই। যতক্ষণ পারা যায় শুয়ে থাকা। আলস্য সারা শরীরে। এবং এ জন্যই যত হিজিবিজি চিন্তা থেকে রক্ষা পাবার জন্য ডাকল, এই ছোটবাবু।

    কম্বলের ভেতর থেকে জবাব এল—হুঁ

    —একটু চা খাওয়াবি?

    —খুব ঠাণ্ডা ওপরে। কুয়াশা। কিছু দেখা যাচ্ছে না।

    মৈত্র বুঝতে পারল ছোটবাবু কিছুতেই এখন উঠতে চাইছে না। এত শীতে সহজে কেউ উঠতে চায় না। কিন্তু ওকে উঠতে হবে। সে আর শুয়ে থাকতে পারবে না। তাকে একবার বাথরুমে যেতে হবে। শেফালী নানাভাবে সারারাত বিব্রত করেছে। রাতে ওর ভাল ঘুম হয়নি। সকালে শেফালীর কথা ভেবে ভীষণ মায়া হচ্ছিল। শেফালীকে কাল বিকেলে একেবারে ভুলে গিয়েছিল। কাল রাতে এবং মধ্য রাতে, অন্তত স্বপ্নটার আগে পর্যন্ত শেফালীর কথা মনে করতে পারেনি। ভোর রাতে ঘুমের ভেতর প্রথম একটা অপরিচিত মুখ, ঠিক কুয়াশার ভেতর দাঁড়িয়ে থাকলে যেমন লাগে, তেমনি শেফালী দাঁড়িয়েছিল। সে প্রথম বুঝতে পারেনি শেফালী। পরে যেন মনে হয়েছে চেনা চেনা। তারপরই যখন চোখ তুলে তাকাল, একেবারে শেফালী। বিমলবাবুর ভালবাসার স্ত্রী শেফালী। শুভেন্দু মৈত্রের কিডন্যাপ করা বৌ। বিমলবাবু যে বৌর ওপর অধিকার ছেড়ে দিয়ে ভেবেছিল, বাঁচা গেল। যা উত্তাপ মেয়ের বিমলবাবুর পক্ষে বোধ হয় সামলানো কঠিন ছিল বৌকে।

    ভেতর বাইরে কোথাও তেমন সোরগোল নেই। কাজের জন্য কোনো কিনারার লোক ডেকে উঠে আসেনি। ফল্কায় কাজ হচ্ছে না। কাঠের পাটাতনে ঢাকা। সকালে বড়-মালোম আর কাপ্তান নিচে নেমে গেছে। ওরা যাবে গীর্জায়। বাথরুম থেকে ফিরে এলে, শরীর খুব ঝরঝরে এবং হাল্কা মনে হচ্ছে। ওর ইচ্ছা হচ্ছিল, এখন চুপচাপ এক কাপ চা খায়। এ সময় সামান্য ধূপের গন্ধ থাকলে যেন ভাল হত। ফুলের গন্ধ অথবা চন্দনের সৌরভ হলে যেন মন্দ হয় না। রাতে সব পাপ কাজের কথা সে ভুলে যেতে পারত। রাতের শেষে জলের নিচে, নীল স্ফটিক জলে সে তবে হয়তো আর শেফালীকে বিশ্রীভাবে শুয়ে থাকতে দেখত না।

    সে নিজেই চা করে আনল। ছোটবাবু এবং অমিয়কে ডেকে চা দিল। ওদের জড়ানো চোখ। কোনরকমে চা খেয়েই আবার কম্বলের নিচে। যেন ওরা এমন সুখ সহজে হাতছাড়া করবে না। চা খেতে খেতে কেন যে গত সফরের সেই মেয়ে, এলসা দ্য কেলি, ওর মা স্যালেস দ্য কেলি, সেই মামাবাবু ক্যাপ্টেন ফ্রগের কথা মনে পড়ছে। দুপুরের দিকে কোথাও বের হয়ে পড়তে হবে। বের হতে না পারলেই সেই গোলকধাঁধা। সে বুঝতে পারছে, কিছুতেই আর জাহাজে সে থাকতে পারছে না।

    এবং এভাবে সে ভাবল, যদি বিকেলের দিকে ছোটবাবুকে নিয়ে বের হওয়া যায়। ছোটবাবুর ভেতর কেমন একটা সরল অনাড়ম্বর জীবনযাপন আছে, যা মুগ্ধ করে বিস্মিত করে। সে পাশে থাকলে বোধহয় সাহস পাবে। সুতরাং অমিয়কে সঙ্গে না নিয়ে বরং সে ছোটবাবুকে সঙ্গে নিয়ে বের হবে। ছোটবাবু মেজ-মালোমের সঙ্গে বের হতে পারে। সে চা খেতে খেতে বলল, আমার সঙ্গে এক জায়গায় যাবি ছোট!

    —কোথায়!

    —সে আছে, তোকে নিয়ে যাব। খারাপ জায়গা না। তোকে এলসা দ্যর কথা বলিনি! ওদের ওখানে যাব।

    কম্বলের নিচে অমিয় মিউ মিউ গলায় বলছে, আমিও যাব।

    —না, তোমাকে নেব না!

    —না নিলেও যাব। আমি যাব কিন্তু বলছি।

    —আচ্ছা ঝামেলা হল দেখছি!

    ছোটবাবু বলল, চলুক না মৈত্রদা। ও আবার একা ঘুরে বেড়াবে কোথায়!

    যেন মৈত্রকে রাগিয়ে দেবার জন্য কম্বলের ভেতর থেকেই জিজ্ঞাসা করল অমিয়—কিরে টাকা পাঠালি?

    —তোমাকে বলব কেন? আমার পার্সোনাল ব্যাপারে ঝুট ঝামেলা করবে না।

    এত শীতে ওরা আর ঘুমোতে পারছে না। দুজনই উঠে বসেছে। ছোটবাবু মুখটা শুধু বের করে রেখেছে। অমিয় তাও না। সে বসে আছে সব ঢেকে। এমন কি মুখে ঠান্ডা লাগার ভয়ে সে ঘোমটার মতো কম্বল মুখের ওপর ফেলে দিয়েছে। মৈত্রও বাংকে বসে পড়ল। টাকা পাঠাতে পারেনি, আজ ঠিক পাঠাবে। এলসা দ্য কেলির বাড়ি হয়ে বিকেলে চলে যাবে ঠিক জায়গায়। অমিয় থাকলে প্রলোভনে পড়ে যেতে পারে।

    ছোট বলল, তুমি তো সবই বল।

    —তা বলি।

    —তবে আর না বলে থাকছ কেন?

    —না, পাঠাই নি।

    অমিয় বলল, তাড়াতাড়ি পাঠা।

    —সে আমি বুঝব।

    এবং এভাবে ওরা ঠিক দুপুরে বের হয়ে গেল। ওরা জেটি ধরে হেঁটে গেল। এরা ভারতবর্ষের মানুষ, এদের দেখলেই কেউ কেউ ভারতবর্ষের মানুষ বলে চিনতে পারে। ওরা যে, শীত-কাতুরে ভীষণ, তাও বুঝতে পারে। কারণ সকালটা এত কুয়াশা আর ঠান্ডা ছিল হাত-পা কেউ গরম রাখতে পারে নি। দুপুরের দিকে কুয়াশা কেটে গেলে যা হয়, রোদ, মনোরম রোদ, রোদের ভেতর হেঁটে যাচ্ছে, হাল্কা মসলিনের মতো রোদ। ওরা তার ভেতরে হেঁটে যাচ্ছে অথচ শরীরে ওভারকোট, হাতে দস্তানা, মাথায় মাংকি ক্যাপ, যেন ওরা বরফের দেশে এসে গেছে। এখন তো এখানে শীত চলে যাবার সময়। বরং এদেশে এখন বসন্তকাল পড়বে। ওরা এমন ঢেকে-ঢুকে হেঁটে গেলে, কেউ কেউ হেসে ফেলে। আর তখনই বুঝতে পারে, ওরা ভারতবর্ষের মানুষ, একটু ওরা শীতকাতুরে। ওদের ক্ষমা করে দেওয়া চলে।

    কেউ হেসে ফেললে, মৈত্র হাতজোড় করে ক্ষমা চায়। তখন রাস্তার লোকজন ওদের দেখার জন্য ভিড় করতে থাকে। সে তাদেরও হাত জোড় করে ক্ষমা প্রার্থনা করছে। কেউ বুঝি ঠিক ঠিক বুঝতে পারে না। অমিয় তখন সুযোগ বুঝে আবোল-তাবোল অশ্লীল বাংলা কথাবার্তা যা মুখে আসে বলে যায়। ছোটবাবুর এসব শুনলে কান গরম হবার কথা। কিন্তু এখন কেমন সহ্য হয়ে গেছে। অমিয় অনেকের নামকরণ পর্যন্ত করে ফেলেছে। যেমন বড় মিস্ত্রির কথা উঠলেই অমিয় বলবে, শালা মগরবাজ আজও দেখলাম ঠিক নাগর সেজে চলে গেল রে মাইরি। মেয়েটার কি যে অল্প বয়স!

    সুতরাং এভাবে ছোটবাবু আনন্দই পায়। বিশেষ করে এই যে অচেনা শহর, মানুষজন, তাদের কথাবার্তায় সে নানাভাবে মজা পায়। সে জানে না তখন তার ভেতরে আছে এক প্রচন্ড দুঃখ। নিশিদিন সে দুঃখ সুপ্ত থাকে ভেতরে। ছোটবাবু সেজন্য কখনও খুব উচ্ছল হতে পারে না। ভেতরে উচ্ছাস থাকলে সেও বোধহয় গলা মিলিয়ে বাংলা অশ্লীল সব কথাবার্তা বলে মজা করতে পারত। কিন্তু সে পারে না।

    মৈত্র যেতে যেতে এক সময় বলল, এদেশের মেয়েরা দেখতে আশ্চর্য সুন্দর। অমিয় বলল, সে তো জাহাজেই টের পাচ্ছি।

    —বোধহয় পৃথিবীর আর কোথাও এমন সুন্দর যুবতী দেখতে পাবে না।

    —তা জানি না। ছোট বলল।

    —না পাবে না। এমন রঙ, এমন চোখ, এমন চুল পৃথিবীতে আর আছে বলে আমি জানি না।

    —হবে হয় ত।

    —এলসা ছিল, এদের ভেতর রাজকন্যা।

    —তাই বুঝি।

    —শালা ব্যানার্জী, এই ঠিক তোর স্বভাবের মতো ছিল রে, শালা কোথাকার এক অপোগন্ড, তাকে কিনা এদেশের এমন সুন্দর ‘মেয়েটা ভালবেসে ফেলল।

    —ভালবাসার কথা কেউ বলতে পারে না। কখন কিভাবে যে সব হয়ে যায়।

    —হেলেন অফ ট্রয়! মেয়েটাকে আমি পৃথিবীর ট্রয় নগরীর হেলেন ভেবে থাকি। সে প্রায় দু হাত তুলে বলে উঠল, হার মিরাকল ফেস চার্মস্ মি। .

    —তা হলে চল দেখা যাক তোমার হেলেনকে। অমিয় বলল, দ্যাখো আমার সঙ্গে ভিড়িয়ে দিতে পার কিনা। তবে আমি ঠিক এখানে থেকে যাব। পৃথিবীর আর কোথাও গিয়ে আমার কাজ নেই, ট্রয় নগরীর হেলেনকে নিয়ে শুধু ঘুরব। কাজ করতে আমার বয়ে গেছে!

    —কি আজেবাজে বকিস না।

    এই হচ্ছে মৈত্রের স্বভাব। কখন যে সে খুব ভালো মানুষ হয়ে যায় বোঝা যায় না। এলসাকে নিয়ে মৈত্র কোন ঠাট্টা পছন্দ করছে না। এলসা ওর আত্মীয়র কাছাকাছি যেন। সে শেষে বলল, আয়। লেন্দ্রো এলেন থাউজেন্ড টু। এই নম্বর। সে তার ডাইরি থেকে নম্বর টুকে এনেছিল। যেতে যেতে বাড়ির গায়ে নম্বর মিলিয়ে দেখছে। সে এই শহরের সব কেমন গোলমাল করে ফেলছে। এতবার এসেও ঠিক মনে রাখতে পারছে না। সব বাড়িঘর দেখতে এক রকমের, রাস্তা এক রকমের, সোজা একেবারে ছককাটা। একটা বাড়ির সঙ্গে অন্য বাড়ির কোন অমিল নেই এদিকটায়।

    মৈত্র জাহাজেই এলসার নানারকমের গল্প ছোটবাবুকে বলেছে। ছোটবাবুর তখন মনে হয় সব বন্দরের ছোটখাট ঘটনা মৈত্র জানে। এবং সে প্রায় ঐতিহাসিকের মতো। যা জানে বলে যায়, বন্দরের বিধি-নিষেধ সে সব জানে। ঘুরে বেড়াও ক্ষতি নেই, ফুল কেন ক্ষতি নেই কিন্তু আর বেশিদুর যাওয়া ঠিক না। আর যারা জাহাজি ওরা বলবে যদি বন্দরে মেয়েমানুষই না পেলে তবে কেন যে জাহাজি হওয়া। এমন সব নিয়মকানুন চলতি আছে জাহাজে। আর যেহেতু মৈত্র ওদের প্রায় গার্জিয়ানের মতো বন্ধুর মতো, তার কথা নানাকারণে রাখতে হয়। ওরা হাঁটতে হাঁটতে মৈত্রের কথামতো রাস্তাঘাট পার হয়ে যাচ্ছে।

    মৈত্র যেতে যেতে বলল, এই শোন তোরা আবার ওকে বলিস না, ব্যানার্জী বিয়ে করেছে। ব্যানার্জী শিক্ষকতা করছে। তোদের তো বলতে কিছু আটকায় না। আর দেখবি, এলসা কি সুন্দর ইংরেজি বলে। ও হল ইতালির মেয়ে। বাবা ওয়েলসের। ভদ্রলোক এখানে তেলের ব্যবসা করতে এসে কার- এ্যাকসিডেন্টে মারা যান। আর শোন, যাচ্ছি যখন, একটু কেনাকাটা দরকার।

    অমিয় সেই যে চুপ করেছে, আর একটি কথাও বলছে না। সামনের সেই টাওয়ারের ঘড়িতে দুটো বাজার শব্দ। মৈত্রের বুকটা ধ্বক করে উঠল। পাশেই যেন কেউ বিউগিল বাজাচ্ছে আর যেন ক্যারাভেন যায়, নানা রকমের উটের মুখ বোধ হয় সদর দরজায় টাঙিয়ে দেওয়া হয়েছে। মৈত্র এসব ভুলে থাকার জন্য একটা ফুলের দোকানে ঢুকে কিছু ফুল কিনে ফেলল। সেলেস দ্যর জন্য কিছু ফল। আর সে জাহাজ থেকে নেমে আসার সময় দু-প্যাকেট ক্যাপস্টেন সিগারেট নিয়েছে। মামাবাবু এ- সিগারেট খুব পছন্দ করেন। এখানে ভালো টোবাকো পাওয়া যায় না। দু-প্যাকেট ক্যাপস্টেন পেলে কি যে খুশী হবে!

    মৈত্রের সব জানা বলে, সে যেতে যেতে বলল, এটাই ফ্লোরিদার সব চেয়ে বড় বাড়ি। তুই এখানে ঢুকলে আমাদের এমব্যাসি-হাউজ দেখতে পাবি। পাশে একটা বড় রেস্তোঁরা আছে। মাঝ ভাজা পাওয়া যায়। অলিভ-অয়েলে রান্না। খেতে খারাপ লাগবে না। কতদিন মাছ খাই না। ওরা তিনজন সময় কাটাবার জন্য বসে চা খেল। এখানে এসেই কেন জানি মৈত্রের মনে হয়েছে, ওরা খুব তাড়াতাড়ি চলে এসেছে। একটু পরে না গেলে ঠিক হবে না। ওরা চা খেল, মাছ-ভাজা খেল। মেয়েদের সঙ্গে আড্ডা জমাতে চাইল। একটা কথাও বুঝছে না বলে, অমিয় ধুস্ শালা বলে ওঠে পড়ল।

    বের হতেই মনে হল শহরময় বড় গন্ডগোল আরম্ভ হয়ে গেছে। মানুষজন ছুটোছুটি করছে। যে যেদিকে পারছে পালাচ্ছে। কিছু স্টেনগানের শব্দ। পুলিশ এবং কিছু মিলিটারি ঘুরে গেল। ওরা এ- দেশের মানুষদের মতো ঠিক কোনও গলি-ঘুঁজি খুঁজে পেল না। দোকানের ভেতর ঢুকতে গিয়ে দেখল, সব ঝুপঝাপ সাটার বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। জানালা-দরজা সব বন্ধ। ওরা এবার এলোপাথারি ছুটতে গিয়ে বুঝতে পারল, ঠিক হবে না। ওরা একটা বড় ক্যামাও গাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে পড়ল। গাছটার চারপাশে নাবালকের মতো ঘুরে মরার সময় মনে হল, সব আবার ঠান্ডা। গাড়ি ঘোড়া চলছে, কেন এটা হল বুঝতে পারছে না। একটা মানুষের খোঁজে কারা এসে ফিরে গেছে। ধরতে পারেনি। পাশের এক বৃদ্ধা ওদের ক্যামাও গাছের চারপাশে ঘুরতে দেখে হেসে ফেলল। বলল, স্পষ্ট ইংরেজিতে বলল, তোমাদের কিছু হবে না বাছা। তোমরা ঘোরাফেরা কর, ময়ফেল কর। তারপর নিজে কেমন বিড় বিড় করে বকতে থাকল, পেরণ সরকারের পতনের পরই এমন আকছার ঘটনা ঘটছে।

    ওরা এখনও হাঁটছে। হাঁটতে হাঁটতে কেরিয়েম্বুজ পার হয়ে যাচ্ছে। মাঝে মাঝে আপেলের গাছ, চেরিফলের গাছ। কিছু আঙুরলতা দেয়ালের ওপর। আর সদর দরজায় তেমনি সেই বড় টিউলি প গাছটি আছে। ওরা সহসা গাছটার নিচে দাঁড়িয়ে পড়ল।

    টিউলিপ গাছটায় তেমনি ফুল ফুটে আছে। পাশে পাথরে নানাবর্ণের অর্কিডের ছড়াছড়ি। কিছু ফুলের চাষ লনে, পাশে গোলাপের বাগান। বড় বড় বেগুনি রঙের লাল রঙের গোলাপ ফুটে আছে। আর লনে সব ডেইজি ফুল, ফুটে আছে। হলুদ রঙের ছোট ছোট ফুল, এবং কেউ যেন জানালায় এখন চাঁদমালার মতো গুচ্ছ গুচ্ছ সান-ফ্লাওয়ার টাঙিয়ে দিয়ে গেছে। এমন সুন্দর টিপটপ সাজানো বাড়ি, অথচ জানালা বন্ধ, দরজা বন্ধ, কেউ নেই। ওরা কি কোথাও শীতের ছুটিতে চলে গেছে? জানালায় পারসিমন লতা ঝুলছে। এতটুকু ধুলো ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন নয়। যেন কেউ এখুনি দরজা বন্ধ করে বাইরে গেছে।

    মৈত্র বলল, রোজই এসে দেখতাম, ব্যানার্জী এবং এলসা এখানে বসে রয়েছে। ব্যানার্জী নানা রকমের গল্প বলছে। সবই আমাদের দেশের গল্প। ও যে কত জানত। ভাল ইংরেজি বলতে পারত ব্যানার্জী। কলেজে পড়েছে। তোর চেয়ে বয়সে বড় ছেলেটা। বেশ কিন্তু ছিল তবে খুব ভীতু। না হলে এলসাকে ফেলে এ-ভাবে কেউ চলে যায়! তারপর সে একটু হেসে বলল, আসলে ও হারামজাদা একটা অমানুষ। আমরা অমানুষ লেখাপড়া না শিখে, ও-শালা অমানুষ লেখাপড়া শিখে।

    একসময় মৈত্র বলল, চারপাশে নানারকমের ঘটনা ঘটছে, হয়তো সেজন্য দরজা-জানালা সব বন্ধ। সে এবার দরজায় দাঁড়িয়ে বেল টিপল। বেশ শব্দ হচ্ছে। বাজছে বেলটা। কিন্তু কেউ এসে দরজা খুলে দিচ্ছে না।

    কোন সাড়া পেল না মৈত্র। সন্ধ্যা হয়ে আসছে। ভেতরে ওরা কোন আলো জ্বলতে দেখল না। ওরা কি তবে শহর ছেড়ে চলে গেছে। সেলেস দ্য ক্যালি, বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজির অধ্যাপিকা। সেবারে ব্যানার্জি দরজাতেই পথ হারিয়ে অনেক রাত অবধি অপেক্ষা করেছিল। ভোর হলে পুলিশের শরণাপন্ন হবে, এমন একটা ভাবনা মনে মনে। সে সদর দরজার পাশে চুপচাপ দাঁড়িয়েছিল, যেমন একজন মাতাল মানুষ অথবা বাজ-পড়া মানুষ মরে যাবার পরও দাঁড়িয়ে থাকে, ঠিক তেমনি সে একজন প্রায় চেতনাহীন মানুষ, সকাল না হলে সে এখান থেকে নড়বে না ভেবেছিল। ঠায় দাঁড়িয়ে একটা লাঠিতে ভর করে রাত কাটাবে ভেবেছিল। শহর ঘুরতে বের হয়ে ওর এমন বিপাক। সে জানত না স্পেনীশ না জানলে, শহরে এমন বিপাকে পড়তে হয়।

    তারপর মৈত্র শার্শির ভেতর দিয়ে উঁকি দেবার চেষ্টা করল। না কিছু দেখা যাচ্ছে না। সে বলল, ভাগ্যিস এই দরজা দিয়ে সেলেস দ্য ক্যালী বাড়িতে ফিরছিলেন। দরজায় একজন মানুষ! কপালে টুপি নামানো। প্রথম তিনি ভেবেছিলেন মাতাল মানুষ। এ-ভাবে মানুষেরা শহরের রাস্তায় চুপ চাপ দাঁড়িয়ে থাকে কখনও! তিনি প্রথম ওকে স্পেনীশ ভাষায় কিছু জিজ্ঞাসা করেছিলেন। কিন্তু কোন উত্তর না পেলে ইংরেজিতে। ব্যানার্জী ইয়াংকি কিনা তাও।

    না এখনও কেউ আসছে না। এ-ভাবে এখানে দাঁড়িয়ে থাকাও খারাপ দেখাচ্ছে। সে যেন কথা প্রসঙ্গে আবার সব বলে যেতে থাকল, সে-রাতে ব্যানার্জীকে সরষে ফুল দেখতে হত। সেলেস দ্য ক্যালীর এমন কথা তার কাছে প্রায় তখন ঈশ্বরের সামিল। সে বলেছিল, মাদাম আমি ইয়াংকি নই। মাদাম আমি মাতাল নই। আমাকে ভয় পাবার কিছু নেই। আমি জাহাজি, ভারতীয়। শহর দেখতে বের হয়ে পথ হারিয়েছি।

    অমিয় বলল, একেবারে নবকুমার দেখছি।

    —প্ৰায় তাই।

    এখন মনে হয় ঘরের ভিতরে কেউ পায়চারি করছে।

    দরজা খুললে মৈত্র বলল, গুড ইভিনিং মাদাম

    তিনি কিছু বললেন না। তারপর যেন কি ভেবে বললেন, গুড-ইভিনিং। আপনারা…….।

    —চিনতে পারলেন না মাদাম! আমি মৈত্র।

    —মৈত্র! অনেকক্ষণ পর যেন বুঝতে পারলেন। আবার এসেছ!

    —হ্যাঁ, মাদাম। আবার এসেছি।

    তারপর মৈত্র তাঁর সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিল, এ অমিয় আর এ ছোটবাবু। গত সফরের ব্যানার্জীর মতো এক ফোকসালে আমরা থাকি।

    এলসাকে দেখা যাচ্ছে না। এ-সময় সে বাড়ি নাও থাকতে পারে। তবু উঁকি ঝুঁকি মারল সে। সেলেস দ্য বুঝতে পেরে বললেন, সে নেই। তারপর বললেন, এস ভেতরে। আকাশ ক’দিন থেকে বেশ পরিষ্কার কি বল?

    –তা ঠিক।

    –তোমরা আসবে বলেই হয়ত, বলে তিনি সামান্য হাসলেন।

    মৈত্র লক্ষ্য করছে, সেলেস দ্য কেমন বুড়ি হয়ে গেছেন। মামাবাবু নেই। তার কুকুর নেই। এলসা মামাবাবুর সঙ্গে কোথাও যেতে পারে। যেন এখানে এলসা না থাকলে আসার কোন মানে হয় না। কিন্তু এলসা সম্পর্কে সেলেস দ্য আর কিছু বলছে না।

    মৈত্র এবার বসতে বসতে অন্য কথা পাড়ল। বলল, ক্যাপ্টেন সাবকে দেখছি না। ওর কুকুরটা। তিনি থাকলে দেখতে ছোটবাবু যুদ্ধের গল্প খুব জমে উঠত। মামাবাবু যুদ্ধ ছাড়া কিছু বোঝেন না।

    সে এখন এভিতাতে আছে। সমুদ্রের ধারে তাঁবু বানিয়ে নিয়েছে। বেশ আছে।

    —কি করছেন এখন?

    —কিছুই না। সারাদিন কুকুর মেজিকে নিয়ে সমুদ্রের ধারে ছুটে বেড়ায়। সারা দুপুর সমুদ্রের নিচে ডুবুরিদের সঙ্গে সাঁতার কাটে। হাতে ওর একটা বর্শা থাকে। ম্যাকরল মাছ মেরে খেতে খুব ভালবাসে। সে এখন কুকুর বাদে কিছু জানে না। মেজির জন্য সে এ-শহর ছেড়ে চলে গেছে।

    ছোটবাবু বলল, মেজির বুঝি শহর ভাল লাগছিল না?

    —না। শহরে সে ভালভাবে ছুটতে পারে না। ফাঁকা জায়গা না হলে আয়াস পায় না মেজি। তাছাড়া একটি লোককে মেজি কামড়ে দিয়েছিল। ফ্রক ফাইন দিয়েছে। তা ছাড়া সরকার পক্ষের উকিল গুলি করে মারার জন্য সওয়াল পর্যন্ত করেছিল।

    —তাই বুঝি। অমিয় খুব সহজভাবে বলল। আর অমিয় এবং মৈত্র কি ভদ্র এখন। অশ্লীল কথাবার্তা বলতে পারে মুখ দেখে এখন তা বিশ্বাসই হয় না।

    —ওর ভীষণ ভয়, মেজিকে কেউ একদিন না একদিন ঠিক গুলি করবে। সে শেষ পর্যন্ত সব ছেড়েছুড়ে চলে গেল।

    মৈত্র যাকে খুঁজছে, তাকে দেখতে পাচ্ছে না। সেলেস দ্যকে খুব বিষণ্ণ দেখাচ্ছে। ফ্রক এখানে নেই। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে মানুষটা জার্মানির হয়ে লড়েছেন। কত রকমের নিষ্ঠুর মৃত্যুর গল্প যে করেছেন, করতে করতে হেসেছেন। মৃত্যুর জন্য, ধ্বংসের জন্য ওঁর কোন দুঃখ ছিল না। তিনি এখন একটা কুকুরের প্রাণ বাঁচাতে সমুদ্রতীরে বনবাসে চলে গেছেন। মানুষের মাঝে মাঝে কি যে হয়?

    ঘরে নীল রঙের কার্পেট পাতা। সবুজ, হলুদ, লাল সব কৃত্রিম ফুলের যেন ছড়াছড়ি কার্পেটে। দেয়ালে সাদা রঙ, কিছু ছবি। এলসার ছবি নেই। এ-ঘরে আগে মৈত্র এলে এলসার একটা বড় ছবি দেখতে পেত। এলসার হাতে টেনিস র‍্যাকেট। সে ছুটে গিয়ে বল মারছে এমন একটা ভঙ্গিতে তোলা ছিল ছবিটা। এত সুন্দর ছবিটাও এ ঘরে নেই। কেবল যীশুর একটা কাঠের মূর্তি। আর কোণে সবুজ বাতিদান। ফুলদানিতে কেউ ফুল তুলে রাখেনি। বোঝাই যায় এ-পরিবারে কোথাও একটা বড় রকমের ঝড় গেছে। সেলেস দ্য সেই ঝড় নিয়ে বেঁচে আছেন।

    সেলেস দ্য এক সময় এভিতাতে কি করে যাওয়া যায় তার সবরকমের পথঘাট বলে দিলেন মৈত্রকে।

    ছোটবাবু এলসার কথা ভাবছিল। ঘরের ভেতর কেমন একটা বিদেশী গন্ধ। অমিয় উসখুশ করছে। এমন একটা ছুটির দিনে, এ-ভাবে বসে থাকতে তার ভাল লাগে না। কেমন একটুতেই একঘেয়ে। কেন যে এ-ভাবে আসা! সেলেস দ্য ছোটবাবুকে বললেন, কেমন লাগছে আমাদের শহরটা।

    —খুব সুন্দর। ছিমছাম। আমার তো খুব ভাল লাগে হেঁটে বেড়াতে। কিন্তু কেউ এখানে ইংরেজি বোঝে না। পথ হারাব ভেবেই খুব বেশি দূর যেতে পারি না।

    এ-সব কথাও তেমন জমছে না। একটু কফি করতে সেলেস দ্য ভেতরে গেছেন। তখন অমিয় বলল, এই ওঠ। আমার ভাল লাগছে না।

    ছোটবাবু বলল, এলসা থাকলে আমাদের খুব ভাল লাগত।

    মৈত্র বলল, মনে হয় কোথাও গেছে। ঠিক এসে যাবে। এলসা মাকে বাদে থাকতে পারে না।

    অমিয় যেন কেমন ক্ষেপে গেল—দেখছিস বুড়ি খুব সেয়ানা। মেয়ের কথা কিছু বলছে না।

    —বেশি বললে ভাবতে পারে, এলসাকে আমাদের খুব দরকার। তিনি খারাপ ভাবতে পারেন।

    অমিয় বলল, এ-দেশের মেয়েরা ভাল কবে। ব্যানার্জী যাবার সময়, তুমি বিহনে প্রাণ বাঁচে না আমার, আর চলে গেলেই নটে গাছটি মুড়ল, আমার গল্প ফুরোল

    মৈত্র বলল, এই আসছে!

    অমিয় হেসে দিল, বলল, সেলেস দ্য বাংলা জানেন বুঝি।

    —এটা অসভ্যতা। তুই যখন ইংরেজি জানিস, যখন আমরাও মোটামুটি জানি, তখন ওঁর সামনে বাংলা বলা অভদ্রতা।

    এই প্রৌঢ়ার সঙ্গে গল্প করতে মৈত্রেরও খুব একটা ভাল লাগছে না। মৈত্র এ-সব দেশগুলোতে ঘুরে বেশ একটা নিজের মতো স্বভাব গড়ে তুলেছে। সে এখন সেলেস দ্যকে সাহায্য করছে কাজে। মৈত্রকে দেখে মনে হয় সে যেন এ-পরিপারের কেউ। তাকে কিছুতেই আর ভাবা যায় না, সে কখনও কোন জুয়ার রিঙে দাঁড়িয়ে আঙ্গুল ফাঁক করে বলতে পারে, পঞ্চাশ অথবা একশ।

    সেলেস দ্য বললেন, রাস্তায় গন্ডগোল দেখে দরজা জানালা বন্ধ করে রেখেছিলাম। একটা লোককে কারা খুঁজে বেড়াচ্ছে। কে যে সে! তার কি নাম আমরা জানি না। তার একটা নাম আইখম্যান। শোনা যায় ওটা নাকি মানুষটার ছদ্মনাম। আসল নাম কেউ জানে না।

    –সে কে!

    সে অনেক কিছু ছিল। তার নিষ্ঠুরতার শেষ ছিল না। সে এ-দেশে পালিয়ে আছে, কি করে যে এ-সব খবর রটে যায়! সে এখানে আসবেই বা কেন!

    —তা ঠিক।

    —কি করত?

    —যুদ্ধের সময় কনসেনট্রেশন ক্যামপে ইহুদীদের নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করত।

    —ভয়ঙ্কর!

    —হুঁ। ভয়ঙ্কর। বলেই সেলেস দ্য খ্রীষ্টের ছবিটা দেখলেন।

    ওরা প্রত্যেকেই এখন বেশ আগ্রহ নিয়ে শুনছিল। এবং মাঝে মাঝে জুতোর শব্দ অথবা কোন শব্দ শুনলে দরজার দিকে তাকাচ্ছে, না কেউ না। একটা পাতা পড়ার শব্দ, না কেউ না, বোধহয় ও-পাশের সিঁড়িতে কোন ভাড়াটে মানুষ উঠে যাচ্ছে। ছোটবাবু ঠিক বুঝতে পারে না, এলসাকে দেখার এমন আগ্রহ কেন। যেন ওরা ওকে দেখে না গেলে প্রায় ট্রয়ের হেলেনকে দেখার সুযোগ হারাবে। মৈত্র সুন্দরীদের সম্পর্কে বড় বেশি খুঁতখুঁতে স্বভাবের। তার মুখে এসব কথা, সুতরাং ওরা ভাবছিল, সেই মহিমময়ী এসে গেলে চারপাশের যত কিছু সহসা ফুলে ফলে ভরে যাবে। আর এমন একটা লোভে পড়ে গিয়ে কেউ উঠতে পারছে না।

    কফি অথবা খাবার, কিছুই ভাল লাগছে না। সেলেস দ্য ভীষণভাবে ওদের জাহাজ, ওরা তারপর কোথায় যাচ্ছে, ওরা বাড়িতে মাকে চিঠি লেখে কিনা, আর কে কে আছে, এ-সব জানতে চাইছেন। এবং এ-জন্য প্রশ্নের পর প্রশ্ন

    কিন্তু এ-সবের জন্য ওরা এখানে আসেনি। ওরা এসেছে এলসার জন্য। যে প্রতিদিন জাহাজঘাটায় ওর ছোট্ট বেবিমোটর নিয়ে অপেক্ষা করত। কি যে ছিল ব্যানার্জীর, কি যে ছিল ব্যানার্জীর চোখে! অনেক রাতে জাহাজে পৌঁছে দিয়েছিলেন সেলেস দ্য। পরদিন মেয়েকে পাঠিয়েছিলেন খোঁজ নিতে, সে কেমন আছে। ঠান্ডায় দাঁড়িয়ে শীতে অসুখে পড়ে যেতে পারে। বিকেলে ব্যানার্জী দেখেছিল একটি মেয়ে, চুল তার কবেকার……..কি যেন গাছের ছায়ায় দাঁড়ানো একটা মেয়ে, ভারি সুন্দর, ভারি লম্বা, ভারি হাসি-খুশি। তাকে সে খুঁজতে এসেছে। সে আছে, ভালই আছে, এবং সে নিচে নেমে গেলে বলেছিল, তুমি কোনদিকে যাবে? ব্যানার্জী বলেছিল, কোথাও না। আবার হারালে, কে আমাকে পৌঁছে দেবে।

    এলসা বলেছিল, আমি।

    এ-সব গল্প মৈত্র বলেছিল। অমিয় শুনে বলেছিল, কিছুটা গানের সুরে, এলসা আহা, আমরা হারিয়ে গেলে পৌঁছে দেবে না। আমি বার বার হারিয়ে যাব।

    সেলেস দ্য দুটো প্লেট আনতে গেলে অমিয় প্রায় গানের সুরে হাত তুলে গুনগুন করে গেয়েছিল—বার বার হারিয়ে যাব।

    —অমিয় তুই একটা জংলি

    —তা তুমি বলতে পার।

    —নমস্কার! একশবার নমস্কার। তোমাকে নিয়ে কোনও ভদ্র-পরিবারে যাওয়া ঠিক না।

    সে বলল, আচ্ছা নমস্কার। আমিও আর যাব না। কেবল দয়া করে এলসাকে এখন দেখিয়ে দাও। দেখাতে না পারলে জাহাজে ফিরে শালা তোমাকে পেঁদাব।

    মৈত্র ক্ষেপে গেল খুব। অথচ সে মুখ ভার করতে পারে না। এবং অমিয় এটা বুঝেই ফেলেছে। ঘন্টাখানেক সময় পার করে দিতে পারলেই মৈত্র সব ভুলে যাবে। সেলেস দ্য এলে সেও খুব গম্ভীর হয়ে গেল। একেবারে অসীম সমুদ্রে পাল তুলে দিয়েছে। মস্তো সিরিয়াস মুখ সবার।

    মৈত্র যেন নিজের মান সম্মান বাঁচানোর জন্য বলল, আজ উঠি মাদাম।

    —কেন! এতো সকাল সকাল। বোস না। গাড়িটা বেচে দিয়েছি। না হলে তোমার বন্ধুদের নিয়ে শহরটা ঘুরতে পারতাম। ওরা এখানকার সবকিছু দেখে গেলে আমার ভাল লাগত। এমন শহর, এমন সুন্দর জায়গা পৃথিবীতে আর নেই।

    মৈত্র যেন দুঃখ দিতে চায় না। সে বলল, আমরা আবার কাল আসব।

    অমিয় যেন নিঃশ্বাস ফেলে বাঁচল। আর একটা চান্‌স।

    সেলেস দ্য বললেন, কাল এস কিন্তু! অনেকদিন একা একা আছি। কেউ এখন আসে না। রিটায়ার করেছি বছরের ওপর। সেলেস দ্যর গলা কেমন ভারী ভারী। তারপর কেমন সহজ গলায় বললেন, তোমাদের এখানে ভাল লাগছে না বুঝতে পারি। তোমরা এখন শুধু খাবে দাবে, ঘুরে বেড়াবে। আনন্দ করবে। বড় সুখের সময় এটা।

    —না না আপনি তা মনে করবেন না। আপনাকে আমাদের খুব ভাল লেগেছে। আমরা কাল ঠিক আসব। ছোটবাবু খুব আন্তরিক গলায় বলে অপলক সেলেস দ্যকে দেখল।

    অমিয় বলল, এলসাকে বলবেন, আমরা এসেছিলাম।

    সেলেস দ্য কালীকে মনে হচ্ছিল তিনি এবার দূরে হেঁটে যাবেন। এবং ছায়ার মতো গাছপালার ভেতর অদৃশ্য হয়ে যাবেন। তিনি কিছুক্ষণ মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকলেন। কিছু বললেন না।

    অমিয় বলল, বলবেন কিন্তু মনে করে আমরা এসেছিলাম বলবেন।

    সেলেস দ্য ওদের সঙ্গে সদর পর্যন্ত হেঁটে গেলেন। তারপর তিনি দাঁড়ালেন। বললেন, কাল এস। তারপর হেসে বললেন, এলসা বেঁচে নেই।

    মৈত্র সহসা কিছু বলতে পারল না।—এমন একটা ফুলের মতো মেয়ে মরে গেল।

    —হ্যাঁ মরে গেল মৈত্র। তোমাদের যাবার মাস তিনের ভেতর সেও চলে গেল।

    ওরা কেউ আর এক পা বাড়াতে পারছে না। অমিয় যে অমিয়, যার মুখে কিছু আটকায় না, সেও বড় কোনও নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে আছে মনে হয়। মনে হয় নিঃসঙ্গ, বড় বেশি নিঃসঙ্গতা। নদীর বুকে ঢেউ উঠে শান্ত হয়ে গেল সব। সে চোখ তুলে সেলেস দ্যকে দেখার চেষ্টা করল না। ওর ভয় ধরে গেছে। মুখটা কেমন দেখাবে কে জানে! দুঃখী মুখ দেখতে তার ভাল লাগে না।

    মৈত্র বলল, কি হয়েছিল?

    –কি হয়েছিল জানি না। কেমন এক মেলাঙকোলিয়া। চুপচাপ থাকত, কথা বলত না। ক্ৰমে রোগা হয়ে গেল। চোখের ওপর আমার সুন্দর মেয়েটা পোড়া কাঠ হয়ে গেল। সে খেতে চাইতো না। কারো সঙ্গে কথা বলতে চাইত না।

    —কিন্তু ও যে একটা চিঠি লিখেছিল। পানামা ক্যানেলে আমাদের তখন জাহাজ। আমরা নিউজিল্যান্ড যাচ্ছি। ব্যানার্জী, চিঠির কথা আমাকে বলেছিল।

    —ওটা ওর শেষ চিঠি।

    —সামান্য একটা মাত্র লাইন। ডোন্ট ফরগেট মি। এমন কিছু বোধহয় লিখেছিল।

    —কি লিখেছিল আমি বলতে পারব না। তবে চিঠিটা যখন লেখে, তখন আমি ছিলাম। তখন ও বিছানা থেকে উঠতে পারে না, খুব দুর্বল। ওর কিছু লেখার আর তখন ক্ষমতাও ছিল না। ছোটবাবুর কেন যেন মনে হয় পৃথিবীতে মানুষের দুঃখটা এক রকমের। ভালবাসা এক রকমের মা-মাসীরা পৃথিবীর সব সময় এক রকমের হয়।

    এলসাকে সে দেখেনি, তবু কেন যে মনে হয়, এলসা পৃথিবীর এমন মেয়ে যার তুলনা নেই। সেও যেন এলসার জন্য এ-দেশে থেকে যেতে পারত। পৃথিবীর এমন সুন্দর মেয়েটা, ভালবাসতে গিয়ে মরে গেল।

    রাস্তায় নেমে হঠাৎ চেঁচিয়ে বলল, ব্যানার্জীটা কি অমানুষ!

    —অমানুষ কিনা জানি না। দুঃখটা ওর দিকেও ছিল। অথচ দ্যাখ ভেবে পাই না, ওর বাবা কেমন মানুষ। আমরা লিখেছিলাম, এমন একটি ঘটনাতে আপনার মত দেওয়া উচিত।

    —তিনি কি লিখেছিলেন?

    —জানি না। তবে উনি ব্যানার্জীকে ঠিক কিছু লিখেছিলেন। কি যে লিখেছিলন! সে অমানুষের মতো তারপরই কাজটা করে ফেলল। এলসাকে বলল, হয় না, আমি এখানে থেকে যেতে পারি না। থাকলে, খুব স্বার্থপরের মতো কাজটা হবে।

    ছোটবাবু বলল, এখানে থাকলে সেটা অবশ্য হত। আমাদের ভারতবর্ষের মানুষরা এমন ঠিকই ভাবতেন।

    অমিয় ধমক লাগাল, রাখ তোর কথা। আসলে ব্যানার্জী অমানুষ। না হলে এমন কাজ কেউ করে না। সে ভয় পেয়ে গেছিল শেষ পর্যন্ত।

    মৈত্র, আর একটু ব্যাখা করল, ওর বাবা সেকেলে মানুষ

    —সবার বাবারাই সেকেলে থাকে। ভালবাসার সে দাম দেবে না সেজন্য!

    ছোটবাবু বলল, কোথাকার একটা ছেলে, কোথাকার একটা মেয়ে, মেয়েটা কিনা, একটা ছেলেকে দেখেই প্রেমে পড়ে গেল। তারপর মরে গেল। ভাবা যায় না!

    মৈত্র বলল, মানুষের নিষ্ঠুরতা নানা রকমের থাকে। ব্যানার্জী পরে যা বলেছিল, জাহাজে মাঝে মাঝে কেমন অন্যমনস্ক হয়ে গেলে বলত, বাবার চিঠিটাতে মায়ের সতীত্ব প্রমাণের কথা ছিল।

    —তার মানে!

    —মানে, আমার জাতক হলে তুমি এ কাজ করবে না, ওর বাবা লিখেছিল।

    —হায় ভারতবাসী, হাসতে হাসতে গলায় ফাঁসি। সত্যি এমন হয়!

    —ব্যানার্জীর বেলায় এটা হতে দেখেছি। সে আছে, বেশ আছে। বউ আছে। বউ জানেনা এ সব। আমরা এখানে মেয়েটার জন্য কষ্ট পাচ্ছি।

    অথচ ওরা হাঁটতে হাঁটতে দেখল, রাত হয়ে গেছে। শো-কেসগুলোতে আলোর বর্ণমালা। কত সব বিচিত্র বর্ণের ছবি। কত সব সাজগোজ, কত সব লোভের পাখী ডানা মেলে উড়ছে। এ-সব দেখলে তারপর বুঝি মনে থাকে না, কোথাকার কে এলসা, কে ব্যানার্জী, কে সেলেস দ্য অথবা কোনও ক্যাপ্টেনের সমুদ্রতীরে বনবাস, তার প্রিয় কুকুর মেজিকে নিয়ে সে আছে। কেবল মনে হয় উটের মতো মুখটি তুলে এক অতীব নিষ্ঠুর খেলা মানুষের ভেতর বেঁচে থাকে, বেড়ে ওঠে, অবহেলায় দূরে ঠেলে দেয়া যায় না। মানুষ তার অতীব এক দাস। তাল-বেতাল সে তার স্বভাবে।

    মৈত্র এখন প্রায় দৌড়ে দৌড়ে হাঁটছিল। দেরি হলে কার্ণিভেল ভেঙ্গে যাবে যেন। অথচ মুখে কিছু বলছে না। সে কেবল হেঁটে যাচ্ছে। ওরা ওকে অনুসরণ করে হাঁটছে। বাসে অথবা ট্যাকসিতে ওরা যাচ্ছে না। অথবা মনে হয়, ছেলেমানুষের মতো মৈত্র মেলায় যাচ্ছে, ঘোড়দৌড় হয়ে গেলে সব গেল। সে ঘোড়দৌড় দেখার জন্য জোরে হাঁটছে যেন। কোন দিকবিদিক জ্ঞান থাকছে না।

    এবং মনে হয় তিনজনেই ভুলে কার্ণিভেলে ঢুকে গেছে। কেউ একটা কথা বলছে না। মেলাটা ঘুরে চলে যাবে।

    সেই এক চারপাশে নানাবর্ণের দোকান। মদের বোতল, রিঙ, সুবেশা রমনী। পিস্তলের খেলা অথবা ম্যাগপাই। কৃত্রিম হ্রদ, কৃত্রিম পাহাড়। আর হাজার হাজার জুয়ারি ছুটছে। ছুটির দিন বলে হয়ত এমন হয়েছে। নিয়ন আলো। আলোর রঙে রিঙের যুবতীদের মুখ ঝলমল করছে। আর কেউ কেউ খেলছে, হাঁটছে। কেউ কেউ নাচছে এবং গাইছে। যুবক-যুবতীরা হাসি মসকরা করছে। ওরা ছুটছে, খেলছে। ওরা সামনের পাহাড়ের টানেলে ঢুকে যাচ্ছে। সব নকল পাহাড়, নকল টানেল। যেন এই যে মানুষেরা তোমরা ভারি নকলনবিশ, আসলে চেহারা তোমাদের এমন নয়—কি যে সব ভাবছে মৈত্র। গত সফরে মৈত্র এক জাহাজি বন্ধু ব্যানার্জীর সঙ্গে এই টানেলের ভেতর ঢুকে গিয়েছিল।

    অন্ধকার গুহামধ্যে মৈত্র বাঘ হরিণ থেকে আরম্ভ করে কতকালের ভয়ঙ্কর মুখ পর্যন্ত দেখেছে। সবই নকল। ভয় দেখানোর জন্য এমনভাবে সাজিয়ে রাখা। এবং কত সব মুখোশের ভেতর ভূতের হাত-পা নাড়া। ওরা ভয় পায়নি। এলসা ওদের সঙ্গে ছিল। হঠাৎ ঢুকলে ভয় পাবার কথা। কিন্তু এলসা ছিল ভারি ভাল মেয়ে। ব্যানার্জি ভয় পাবে বলে প্রথম সে ঢুকতেই চায়নি।

    এ-ভাবে এলসা মরে গেলে মনে হল, ফুল ফোটার সময় হলে মৌমাছিরা উড়ে আসে। ফুলের মতো মেয়ে এলসা। এলসা এখন নাগালের বাইরে। হায়, এলসা ভালবেসে মরে গেল! হায়, এলসার হাতের দস্তানা পর্যন্ত সাদা রঙের ছিল। এলসা পোশাক পরতে ভালবাসত সাদা রঙের। ওর চুল ছিল নীল রঙের, মুখে ছিল গোলাপী আভা, আর চোখে ছিল সুন্দর নীল রঙের সমুদ্র। তাকালে চোখ ফেরানো যেত না। মাথায় সোনালী টুপি, ময়ূরের পালক গোঁজা। সবুজ ঘাস মাড়িয়ে গেলে ওর পা খুব সুন্দর দেখাত।

    আর এ-ভাবে ফুল ফোটার সময় হলে, মৌমাছিরা সব উড়ে আসে। দু-পেগ গিলে ফেলতেই মৈত্রের এমন মনে হল। স্মৃতির ঘর থেকে কি সব উড়ে আসছে! সে যেন কেবল এলসার মুখ দেখতে পাচ্ছে। এলসার মুখ-চোখ এমন কি শেষদিন সে কি পোশাক পরেছিল, গাউনের রঙ কি, সব মনে করতে পারছে। তারপরই যেন মনে হয়—কি ফুল ফুটতে পারে এ সময়। গাছে গাছে কি ফুল থাকবে। ফুলের সৌরভের জন্য মানুষেরা এত উড়ে বেড়ায় কেন! এমন কি, কি রঙের জুতো পরতে ভালবাসত এলসা, সে এইসব চারপাশে লোকদের ভিড় দেখেও ভুলে যাচ্ছে না। আসলে ফুলের জন্য বড় লোভ মানুষের। এই লোভ মানুষকে খারাপ করে দেয়, নৃশংস করে তোলে। ফুলের পাপড়ি ছিঁড়ে খেতে ভালবাসে মানুষ।

    এবং এই লোভের জন্য এই যে এক লোভ, আমি আমার জন্য, আমার ভালবাসার জন্য আমি, আমি কোন বস্তুতে নেই, আমি আছি আমিতে। সুখ, আমার সুখ লোভ আমার নিজের। সুতরাং আমি যখন আমিতে, শেফালীর জন্য কি করতে পারি। এখন শেফালীর কথা মনে এলেই, ওর পুরু ঠোঁটের কথা মনে হয়। জংঘার কথা মনে হয় এবং এক সুরভিত অঞ্চলের কথা মনে হয়। সে তখন কেমন মানুষ থাকে না, লোভের পাখি হয়ে অদৃশ্য জায়গাগুলোতে বসতে চায়। এবং যেন কার্ণিভেলের সেই মেয়েটা ওকে এভাবে বসতে ডাকছে। সে পারছে না।

    যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সে এখান থেকে চলে যাবে। এখানে থাকলেই একটা লোভের পাখি, পাখির কেবল উড়ে যাবার বাসনা, বসার বাসনা। কাল সব টাকা সে পাঠিয়ে দেবে। আজও নানা কারণে দেরি হয়ে গেল। এবং এ-ভাবে যখন সে প্রায় ড্রাইভ দিয়ে বের হয়ে যাচ্ছিল তখনই দেখল, কে যেন ওর সামনে একটা রুপোর স্টিক ঝুলিয়ে রেখেছে। সে চোখ তুলে তাকাতেই দেখল, ওকে দেখে মেয়েটি বাউ করছে। বাউ করতে গিয়ে হাঁটুর ওপর এতটা গাউন তুলে ফেলেছিল যে, একটু হলেই সে সব দেখে ফেলত।

    আর সঙ্গে সঙ্গে সে কেমন হয়ে গেল। ওর হাত-পা শিথিল। সে নড়তে পারল না। যেন কেউ সমুদ্র দেখাবে বলে, অথবা পাহাড় থেকে দূরবীনে অনেক দূরের নক্ষত্র দেখাবে বলে ওকে ডাকছে। সে প্রায় পাগলের মতো লাল নীল বলের পাশে দাঁড়িয়ে গেল। এবং সে সার্কাসের হাতি-ঘোড়া লুফে নেবার মতো বলগুলোকে হাওয়ায় ছুঁড়ে দিয়ে লুফে নিল।

    সদর দরজায় তখন লোকটা বেশ জোরে জোরে ব্যাগপাইপ বাজাচ্ছে। সে নাচছে কোমর দুলিয়ে, পা তুলে নাচছে। মানুষের এমনই স্বভাব, শুয়োরের বাচ্চারা আবার বড় বড় কথা বলে! সে সেজন্য পা তুলে পাছা দুলিয়ে ঘুরে ঘুরে নেচে যাচ্ছে। সে ঠিক জানে, মানুষের স্বভাব কি! তখন মৈত্র খেলতে থাকল। খেলতে খেলতে সে যে মৈত্র, সে-কথা একেবারে ভুলে গেল।

    অমিয় বলল, এটা কি হচ্ছে!

    মৈত্র কিছু বলছে না। অমিয় অথবা ছোটবাবুকে সে চেনে না মতো। ওরা চলে গেলে যেন ভাল হয়। আসলে সে ওদের নিয়ে এসেছিল সঙ্গে পাহারা দেবে বলে। এখন এরা থাকলেই অসুবিধা। ওরা চলে গেলে সে ভীষণ খুশী হবে! সে বলল তোরা জাহাজে যা। আমি পরে যাচ্ছি। ওরা হাঁটতে থাকলে সে বলল, চিনে যেতে পারবি তো?

    অমিয় বলল, খুব।

    ছোটও খুব বলে চলে গেল।

    আর যুবতী রুপোর স্টিক নিয়ে হাঁটছে। রিঙে বাঘের খেলা দেখাচ্ছে যেন। বল এগিয়ে দিচ্ছে। মৈত্র খুব একটা আজ হারছে না। সে খেলছিল আর চোখে চোখে কথা বলে যাচ্ছে। সে মাঝে মাঝে চোখ টিপে দিচ্ছিল। মেয়েটা এজন্য কিছু বলছে না। রিঙে বাঘের খেলায় বাঘটা একটু হাই তুলবে, হাউ করে উঠবে, কতটা কি করবে মেয়েটা যেন জানে।

    এবং এ-ভাবে সে আর মৈত্র এক ভয়ংকর খেলায় মেতে উঠেছে। এ-খেলা শেষ হতে সময় নেবে। অন্য যারা খেলছিল, তারা মৈত্রের সঙ্গে পেরে উঠছে না। কেউ কেউ মৈত্রের অসম্ভব রকমের মার দেখে হাততালি দিচ্ছিল পর্যন্ত। বড় রকমের মার দেখে কেউ কেউ আর খেলতে সাহস পাচ্ছে না! তখন সেই যুবতী আগুনের মতো জ্বলছে। মৈত্রের চোখ দেখলে টের পাওয়া যায়। মেয়েটি সাদা জ্যাকেট পরে আছে। ক্ষণে ক্ষণে যুবতী পোষাক পাল্টে আসছে, তাঁবুর পাশে নিজের ছোট্ট ঘরটায় গেলেই মৈত্র বুঝতে পারে কিছু একটা এবার হবে। কিন্তু কিছু হয় না। ব্যাগপাইপের সুর ক্রমে থেমে আসে। মৈত্র আরও রাত বাড়ার আশায় আছে।

    ওদিকে ক্রমে কার্ণিভেলের আলো নিভিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এবং ইতস্ততঃ অন্ধকার। ফিসফিস্ শব্দ কেউ জোরে জোরে গলা ছেড়ে গান গাইছে। মৈত্র গানের কোন কথা বুঝতে পারছে না। কোথাও ছায়ার মতো দাঁড়িয়ে আছে কেউ গাছের নিচে। সব অস্পষ্ট। জলের মতো শব্দ কোথাও। টুপটাপ শব্দের খেলা। যুবতী এবার সব বলগুলি তুলে নিচ্ছে। আর না। রাত অনেক হয়েছে।

    মৈত্র খেলতে না পেরে থামে হেলান দিল। সিগারেট খেল থামে হেলান দিয়ে তারপর ফের হাতের পাঁচ আঙ্গুলে মেয়েটার চোখে তিন-চারবার নাচাল। ইশারায় টাকার অঙ্ক বোঝবার জন্য পাঁচ আঙ্গুলে পাঁচ রকমের নোট গুঁজে দিল।

    যুবতী সামান্য হাসল। তারপর ভালমানুষের মতো দোকানের ঝাঁপ বন্ধ করে দিচ্ছে। বের হয়ে হাঁটতে থাকল। একবার তাকাল না। মৈত্রের এবার ওর ওপর লাফিয়ে পড়তে ইচ্ছে হল। তারপর সে দৌড়ে আগে চলে গেল। দু-হাত তুলে আগলে দিল ওর পথ। মরিয়া হয়ে গেছে মৈত্র। কিন্তু মেয়েটি ওর হাতের নিচ দিয়ে গলে গেল। তারপর একটু দূরে গিয়ে ফের বাউ। আমার পেছনে এস না, তোমাকে গুডবাই। ওর চোখের ওপর দিয়ে মেয়েটা চলে গেল। বাস-স্ট্যান্ডে মানুষের ভিড়ের ভেতর ঢুকে দাঁড়িয়ে আছে। মৈত্র কিছু আর করতে পারছে না। হাওয়ায় ঘুসি মেরে কেবল হাঁটছে। একটুকুর জন্য ফসকে গেল।

    .

    সে জেটিতে কখন ঢুকে গেছে খেয়ালই করেনি। দুধারে বড় বড় ক্রেনের নিচ দিয়ে সে উঠে গেল। সিঁড়ি ধরে জাহাজে ওঠার সময়ই সে সমুদ্রের গর্জন শুনতে পেল। কেমন শোঁ শোঁ বাতাসের শব্দ। শরীর টলছে। সে একা! খালি ডেক। কেউ জেগে নেই বোধহয় জাহাজে। একটা বেড়াল থাকলে এই রাতে মিউ মিউ করে ডাকতে পারত। ফোসকালে ঢুকে সে আলো জ্বেলে জল খেল ঢকঢক করে। ওর ভীষণ তেষ্টা পেয়েছিল।

    পরদিন যথারীতি মৈত্র কাজ করল এনজিন রুমে। আজ তাকে বাকি টাকাটা পাঠাতেই হবে। একটার পর ছুটি হয়ে গেছে। এনজিন রুমে মেরামতের কাজ বেশি। ওদের হাতে কাজ কম। ছুটি হলে সে বাংকে শুয়ে ক’বার শেফালীর চিঠি পড়ল। চিঠি পড়লেই মনে হয় শেফালী ওর ভীষণ কাছে, যেন পাশে বসে রয়েছে। দূরের চিঠি কত যে কাছের মনে হয়, তখন ওর ভাল লাগে না। কেমন সে, বাড়ি ফেরার জন্য অধীর হয়ে পড়ে। চিঠি পড়লেই ওর ইচ্ছে হয় সমুদ্রের মাছ হয়ে সে যদি চলে যেতে পারত। জল কেটে নদীর মোহনায় উঠে যেতে ইচ্ছে হয়। তারপরই মনে হয় সে জানালায় দাঁড়িয়ে আছে। শেফালী তখন দাঁতে ফিতে কামড়ে চুল বাঁধছে। কপাল ভাল রাতে সে কোনও স্বপ্ন দেখেনি। যে-ভাবে সে গত রাতে মেয়েটার পেছনে ছুটেছিল, রাতে তার ঠিক স্বপ্ন দেখার কথা। যেন মানুষটা তিমি শিকারে বের হয়েছে, আর ফিরে আসছে না। সমুদ্রের ধারে তেমনি বৃদ্ধ পাইন গাছে, মাছের, বড় হাঙ্গর হবে হয়ত অথবা হিংস্র তিমি মাছের কঙ্কাল ঝুলছে। তার নিচে কেন যে মৈত্র দাঁড়িয়ে থাকে কেবল।

    অমিয় ভেতরে ঢুকে বলল, মৈত্র জানিস, কাল লোকটাকে শেষ পর্যন্ত ধরতে পারেনি। পালিয়েছে।

    —কোন লোকটা?

    —আরে খুব খারাপ লোক। গত যুদ্ধে ওর নাকি নিষ্ঠুরতার তুলনা নেই। লোকটার নাম আইখম্যান। এখানে লোকটা পালিয়ে আছে। এখানে ওর ছদ্মনাম। নাৎসি জার্মানীর ইহুদি নিধনের পান্ডা।

    —ইহুদি নিধন মানে?

    —তুই একটা আস্ত জাহাজি। গত যুদ্ধের খবর রাখিস না! কনসেন্ট্রাসন ক্যাম্প, গ্যাস-চেম্বার, এ-সবের নাম জানিস না!

    —লোকটার সঙ্গে তার কি সম্পর্ক?

    —সেই তো সব করিয়েছে।

    –ধ্যাৎ, ও করাবে কেন। অমন একটা ভাল কাজ পেলে তুইও করতিস।

    —কি নিষ্ঠুর কাজ বল!

    —ও তো সাক্ষাৎ মহাদেব।

    —বাজে কথা।

    —বাজে কথা কি?

    —লোকটাকে পুড়িয়ে মারা উচিত। আমাদের মেজাজ খারাপ হয়ে গেছে শুনে।

    —ও-ভাই সব এক ব্যাপার। বলে আর দাঁড়াল না মৈত্র। পোশাক পাল্টে ওপরে উঠে গেল। সে জাহাজ থেকে নেমে পড়ল, কিছুতেই লোভে পড়ে যাবে না। লোভে পড়ে গেলেই রক্ত গরম হয়ে যায়। কিন্তু সে যত শহরের ভেতর ঢুকে যাচ্ছে, তত শুনতে পাচ্ছে তার পাশে কারা নেচে নেচে ব্যাগ-পাইপ বাজাচ্ছে। সে কিছুতেই জায়গা মতো যেতে পারছে না। সবাই নেচে নেচে যাচ্ছে, সে তার ভেতর মিশে না গেলে কেমন একা পড়ে যাবে। ওর আসলে ইচ্ছা হচ্ছিল না কোথাও সে যায়। বরং সেই উটের মত মুখটি তুলে যারা ব্যাগ-পাইপ বাজায় সেখানে যেতে পারলে যেন ভালো হত। মেয়েটির সুন্দর চোখ সমুদ্রের মতো নিরীহ চোখ তাকে কিছুতেই আর কিছু আছে পৃথিবীতে, ভাবতে দিল না।

    এবং এ-ভাবে মৈত্র দেখল, সে ঘুরেফিরে কার্ণিভেলের দরজায়। আর ব্যাগ-পাইপ বাজিয়ে যাচ্ছে লোকটা। নতুন মনে হয়, একই লোক বাজায় না। সাজ পাল্টে পাল্টে যায়। লোকজন ভিড় করে দাঁড়িয়ে গেটে। সে ভেতরে ঢুকলে অন্যদিনের মতো মেয়েটা বাউ করল। মেয়ে তুমি এভাবে কেন যে গাউন টেনে হাঁটু ভাঁজ করে দাও। এমনভাবে গাউন টেনে ওপরে তুললে আমি ঠিক থাকতে পারি না।

    সে খুবই হুঁশিয়ার। টাকা নষ্ট করলে তার চলবে না। যত রাতই হোক আজ যে-কোনভাবে যুবতীর পায়ে গড় হতে হবে। না হলে সে পাগল হয়ে যাবে। মৈত্র এ-জন্য খুব রয়েসয়ে খেলছে। কখন কার্ণিভেলের সব মানুষরা চলে যাবে, কখন ঝাপ বন্ধ করে মেয়েটি হাঁটবে, এখন সে সেই আশায় আছে।

    মেয়েটির হাতে তেমনি রুপোর স্টিক। সবার সঙ্গে সে প্রাণখুলে হাসছে। মৈত্রের এসব ভাল লাগছে না। ধমক দিতে ইচ্ছে ইচ্ছে, না এমন কর না। এমন করলে ঠিক ভালবাসা হয় না।

    যেন এই মেয়ে এবং সে রিঙের মালিক! এক বোতল মদ নিয়ে এল। দুটো গ্লাসে দু-জন ভাগ করে খাচ্ছে। মৈত্র মেয়েটির হয়ে খেলা পরিচালনা করছে। সে নিজে না খেলে অন্যদের বল এগিয়ে দিচ্ছে। কিন্তু শেষের দিকে যারা এল, তাদের সে খেলতে দিল না। ওরা খেলতে আরম্ভ করলেই সহজে ঝাঁপ বন্ধ হবে না। ওরা রাত করে ফেলবে। মৈত্র তখন নিজে সব বল তুলে খেলতে থাকল। সে ওর সময় মতো তবে ঠিক ওকে কাছে পেয়ে যাবে।

    মৈত্রকে এখন দেখলে মনেই হয় না সে বিদেশে এসেছে। যেন এই মেয়ে এবং সে কতকাল একসঙ্গে আছে। কতকাল থেকে সে এবং এই মেয়ে সমুদ্রের ধারে বসে রয়েছে। ওদের মাথার ওপর অজস্র টিউলিপ ফুল ঝরছে। ওরা ফুলের নিচে কবরের মতো শুয়ে আছে। বোঝাই যায় কেউ কারো ভাষা জানে না। বরং শেফালীর কথা মনে হলে, কেন যে মনে হয় শেফালী এই মুহূর্তে তার কেউ না। সে বিমলবাবুর ভালবাসার স্ত্রী।

    এক সময় রাত গভীর হলে মৈত্র দেখল যুবতী দোকান বন্ধ করছে। সে টাকা গুনে কোথায় কাকে দিয়ে এল। মৈত্র ওর পাশে পাশে হাঁটছে এখন। সে বন্ধুর মতো হেঁটে যেতে থাকলে মেয়েটি গাউন টেনে বাউ করতে চাইল। গুড-নাইট বলতে চাইল। কিন্তু মৈত্র ছেড়ে দেবার পাত্র না। সে সোজা এবার ওর পকেট থেকে সব প্যাসগুলো তুলে ধরল নাকের কাছে। চকচক্ করছে। লোভে পড়ে যাক্ মেয়েটা, এত প্যাসুর লোভ মেয়েরা সামলাতে পারে না। কিন্তু কেমন নির্বিকার তবু মেয়েটি। মৈত্রের পায়ের রক্ত মাথায়। ঝাঁ-ঝাঁ করছে শরীর। এবার হাতের ঘড়ি, আংটি পারলে যেন পোশাক খুলে সব দিয়ে-থুয়ে সে পায়ে পড়ে থাকতে চায়। তখন মেয়েটি ওর হাতে হাত রাখল। এ-ভাবে রাস্তার ওপর এ-সব ঠিক না। সন্তানের মতো স্নেহের চোখে তাকাল। তারপর সবাই জেগে আছে, সে ইশারায় শহরের আলো ঘরবাড়ির দিকে আঙ্গুল তুলে এমন বলতে চাইল। এখনও পুলিশের টহল আছে মোড়ে মোড়ে। আর এই কার্ণিভেলে সব বাতি নিভে যায়নি। সব মানুষ চলে যায়নি। শিশুর মতো এত অধীর হলে চলে না।

    তারপর কি যেন জানে এই মেয়ে। সে শিস্ দিতেই একটা নতুন ঝকঝকে ট্যাক্সি সামনে হাজির। দরজা খুলতে না খুলতে মৈত্র ডাইভ মেরে একেবারে ভেতরে। মেয়েটিও ভেতরে। ওর কি যে মনে হচ্ছে এখন! মাথার ওপরে আকাশ আছে, নক্ষত্রেরা জ্বলছে সে বুঝতে পারছে না। চারপাশের বাড়ি ঘর আলো, গাছপালা ফেলে কোথায় যে যাচ্ছে গাড়িটা। সে কিছুই দেখছে না। সে পাশে বসে মেয়ের শরীরের মনোরম গন্ধ নিতে নিতে দু’হাতে জড়িয়ে ধরল। তারপর একটা হাত পেছনে ফেলে দিল। অন্য হাতটা সে সামনে জড়িয়ে যেন সে শীতের রাতে মেয়েটাকে নিয়ে চাদরের নিচে ওম পোহাচ্ছে। যতক্ষণ এভাবে থাকা যায়। কিন্তু মৈত্র দেখছে, সে খুব বেশিদূর এগোতে পারছে না। মেয়েটা বাধা দিচ্ছে। কি যে করে! কামড়ে খামচে এখন যেন ফালা ফালা করে দিতে ইচ্ছা হচ্ছে। অথচ সে পারছে না। এমন নির্বিকার মেয়েরা থাকতে পারে তার বিশ্বাস হয় না।

    এবং এ-ভাবে সে ভেতরে খুব বেশি অস্থির হয়ে উঠলে দেখল, মেয়েটা তাকে হাত তুলে কি দেখাচ্ছে।

    সে দেখল, একটা গীর্জা। গীর্জার মাথায় ক্রস।

    মৈত্র এ সব মানতে চাইছে না। সে উপুড় হয়ে ট্যাকসিতেই…

    মেয়েটা সবলে যেন দু-হাতে শক্ত করে ধরে রেখেছে মৈত্রকে। এ-দেশের টাকসিওয়ালাদের এমন দৃশ্য দেখা হামেশা অভ্যাস, রাত হলেই ওরা এমন সব ঘটনা দেখতে পায়। অথচ মৈত্রকে তখন অধীর হতে দেখে, আশ্চর্য সুন্দর ইংরেজিতে বলছে, ওয়েট ম্যান। ওয়েট। সি উড ক্যারি ইউ টু হার হোম। আসলে ট্যাকসিওয়ালাদের নানারকম প্যাসেঞ্জার বইতে হয় বলে, ইংরেজিটা কিছু শিখে নিয়েছে। এবং সে ইংরেজি বুঝতে পারছে দেখে, মেয়েটাও ভাঙ্গা ভাঙ্গা একটা দুটো ইংরেজি বলতে চাইল। কিন্তু মৈত্র কিছু বুঝতে পারছে না। আকাশে বেশ মেঘ। সে শহর পার হচ্ছে এটা বুঝতে পারছে। এবং এক সময় এমন শীতে বেশ জোরে বৃষ্টি।

    এইসব বৃষ্টিপাতের ভেতর রাস্তার আলো ঝাপসা। কাচে জল পড়ে পড়ে সামনের সব কিছু ধূসর করে রেখেছে এবং আশ্চর্য উষ্ণতা ভেতরে। যেন কতকাল থেকে, মনে হয় আজন্ম এমন এক ভূখণ্ডের জন্য মৈত্র অপেক্ষা করে আছে। মেয়ের স্কার্ট হাঁটুর ওপরে উঠে গেছে। ওর বার বার নরম জায়গাগুলো ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখার কি যে ইচ্ছে! যেন ছুঁতে না পেলে মরে যাবে। আর নরম চুল, ফাঁপা এবং ফুরফুর করে সামান্য কাচের ফাঁকে বৃষ্টির ছাঁট, চুল উড়ছে ফুরফুর করে, সে সেই নরম চুলে মুখ ডুবিয়ে দেবার জন্য আকুল হতে গিয়ে দেখল, একটা পুরানো বাড়ির সামনে গাড়ি থেমেছে। দরজায় কেউ দাঁড়িয়ে। মেয়েটির হাতে সে একটা প্যাকেট দিল। সর্বেশা অর্থাৎ মদ, উগ্র মদের গন্ধ চারপাশে। মৈত্র এ-পাশে ও-পাশে ফ্লাটবাড়ির মতো সাহেব মেমদের মুখ দেখে ক্রমে দোতলার সিঁড়ি ভেঙ্গে ওপরে উঠে গেল। একটা ক্রাচ ঠিক দেয়ালে হেলান দেওয়া, কেউ ভেতরে আছে মনে হয়। দরজা খুলে গেলে দেখল, আধপোড়া একজন মানুষের মুখ। সে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে দরজার কাছে এল। দরজা খুলে দিয়ে যেন সে কাউকে চেনে না মতো এবং সঙ্গের লোকটি কে, তার সম্পর্কে পর্যন্ত কোন উৎসাহ নেই, লোকটা এমন কি একবার মৈত্রের দিকে তাকাল না পর্যন্ত। সে কেমন যেন সব সময় আচ্ছন্ন হয়ে থাকে কিসে, হেঁটে হেঁটে ভেতরের দরজা দিয়ে পাশের ঘরে চলে গেল। লোকটার মুখে ভীষণ ক্রুরতার ছাপ। মৈত্রের এ হেন দৃশ্যে ছুটে পালাবার কথা, কিন্তু আশ্চর্য সেই মায়াবিনী তাকে কিছুতেই যেতে দিচ্ছে না। এবং দরকার হলে মৈত্র দ্বন্দ্বযুদ্ধে লোকটাকে ডাকবে। পৃথিবীতে সে আর পাশের যুবতী, আর কিছু আছে এ-মুহূর্তে সে জানে না। সে বিশ্বাসও করে না। সে বলল, মেয়ে আর কতক্ষণ!

    যুবতী ভাঙ্গা ভাঙ্গা ইংরেজিতে কিছু বলে গেল। যেন বলা এমন অধীর হলে চলে না! তুমি কেমন জাহাজি হে! আমার মানুষকে দেখার পরও আছ, ভাবা যায় না।

    হায় যুবতী জানে না, মৈত্র আর এক পা নড়তে পারছে না। সে যুবতীর ওপর এবার যেমন বাঘে শিকার নিয়ে পালায় প্রায় তেমনি ছোট কচি হরিণশিশুর মতো ঘাড়ে গলায় চুমু খেতে থাকল আর সঙ্গে সঙ্গে মনে হল, মেয়েটার ভেতরে একটা দুর্গন্ধ। সে এতক্ষণ কেন যে পায়নি! সে বলল, মেয়ে তোমার পিঠে এগুলো কিসের দাগ!

    মেয়েটির শরীরে কোন পোশাক নেই। জঙ্ঘার পাশে আশ্চর্য নীল সুবর্ণ বাতিঘর। অথচ পিঠে লাল ছোট ছোট বিজবিজে ঘা। লোকটার মুখ আধপোড়া। চামড়া ওঠানো মুখ। কি যে ভয়ঙ্কর আর কুৎসিত। পাশের ঘরে লোকটির গোঙানি শোনা যাচ্ছে। মৈত্র মেয়েটির স্তনে হাত রাখল। মৈত্র জীবনে যেন যুবতী দেখেনি, সুবর্ণ বাতিঘরে আলো জ্বালায় নি, সে শরীরের সব অংশের ভেতর নিমজ্জমান এক নেমকহারাম। যেন সে কিছুই ছুঁতে চাইছে না। যেন এই শরীরে পৃথিবীর সব কিছু মেয়েটি জড় করে রেখেছে। কোথায় সামান্য বিজবিজে ঘা, অথবা এটা যে এক অতীব কঠিন অসুখের চিহ্ন তা সে বুঝতে চাইছে না। যুবতী নানাভাবে চাইছে ওকে ফিরিয়ে দিতে। এমন অসুখ নিয়ে আমার কিছু ভাল লাগে না। তুমি পাগলামি কর না। তুমি শুনতে পাচ্ছ না, দূরে কোনো গীর্জায় ধর্মীয় সংগীত বাজছে। তুমি কি জান না, সমুদ্র কি নীল আর গভীর! তোমার শরীর নষ্ট হয়ে যাবে ম্যান।

    ভাল কথা কে শোনে! পাশের ফ্ল্যাটে মিউজিক বাজছে। সমুদ্রে—ধীরে ধীরে অথবা, গভীর সমুদ্রে হাওয়ায় যেন বৃষ্টিপাতের শব্দ ধীরে ধীরে ঝম্ ঝম্ শব্দের মতো। যেন সহসা অতিদূর থেকে কোন সমুদ্রপাখির ডানার শব্দ ক্রমে এগিয়ে আসতে আসতে সহসা বাতাসে বৃষ্টিপাতের ভেজা গন্ধ পেয়ে ওপরে উঠে যাওয়া। অনেক ওপরে। আবার কখনও পাখিটা যেন পাখা বিস্তার করে প্রবহমান ধারায় নেমে আসছে। মেয়েটি মিউজিক শুনতে শুনতে কেমন অধীর গলায় বলল, ম্যান, আমাকে ক্ষমা কর। আমি পারব না। ভেবেছিলাম আমার সব দেখে তুমি ভয় পাবে। ঘাবড়ে যাবে।

    মৈত্র পায়ের কাছে মাথা নিচু করে বসে রয়েছে। সে অনুমতি চাইছে। সেও যেন সেই মিউজিকের ভেতর এই মেয়েকে কেমন সুগন্ধী হয়ে যেতে দেখছে। ওর হাত-পা কাঁপছে, কান গরম হয়ে গেছে, সে পায়ের কাছে পড়ে থেকে বলছে যেন, আমি মরে যাব মেয়ে। সব দিয়েছি। আরও দেব। মেয়েটির কষ্ট হচ্ছিল। সে জানে, ব্যবহারে, এই যুবক, ক্রমে তার পুরুষের মতো হয়ে যাবে। ওর ভীষণ কষ্ট হচ্ছিল। ভীষণ। সে এ-সব থেকে পরিত্রাণের জন্য এখন জুয়ার রিঙে কাজ নিয়েছে। এমন একজন আধপোড়া কঠিন অসুখের মানুষকে নিয়ে যখন শরীরের বিজবিজে ঘা ক্রমাগত পাগল করে দেয়, অস্থির করে তোলে তখন এক অপার্থিব চিৎকার এবং দেয়ালে ক্রমাগত মাথা ঠুকে মরা

    মৈত্র বলতে চাইল কিছু। বলতে পারছে না। ছেলেমানুষের মতো শরীরের সর্বত্র ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখছে। দেবীপ্রতিমার গায়ে হাত দেবার মতো। অথবা সন্তান মায়ের স্তন নিয়ে যে-ভাবে খেলা করে, তেমনি পুষ্ট স্তন হাতে নিয়ে বসে থাকা। যেন মৈত্র এখন এ-শরীর দিয়ে হলেও, সে নিঃশেষ হয়ে গেলেও পায়ের নিচে পড়ে থাকবে।

    মেয়েটির সত্যি কষ্ট হচ্ছিল। সে বলল, এস। মৈত্র একেবারে শিশু হয়ে গেল। যে-যেভাবে মৈত্র চাইল, ঠিক সেভাবে তাকে শুইয়ে রাখল পাশে। আর সব কিছু নিয়ে মৈত্র এমন ছেলেমানুষী করতে থাকল যে শুড়শুড়ি, কি যে শুড়শুড়ি, মেয়েটি ভীষণ জোরে হাসতে থাকল। সে ওর শরীর সরিয়ে নিতে থাকল। না না, ওটা কি করছ ম্যান! আমার ভীষণ শুড়শুড়ি লাগছে। এখানে না। এখানে না।

    কে শোনে কার কথা, সারাক্ষণ জাহাজি মানুষের প্রেম কি যে নিদারুণ! এক অতিকায় হাঙ্গরের সমুদ্রে ডুব দিয়ে আহার অন্বেষণের মতো। মেয়েটি বলল, ম্যান, তোমার ভীষণ কষ্ট?

    মৈত্র বলল, ভীষণ।

    —এখন ভাল লাগছে? —ভীষণ ভাল লাগছে।

    —তুমি কতদিন আছ?

    —কিছুদিন।

    তারপর মৈত্র সুন্দর বিছানায় ঘুমিয়ে পড়ল। সারারাত ওপাশের ঘরে লোকটা চেঁচাচ্ছিল। মৈত্র কিছু শুনতে পায়নি। গভীর রাতে ঘুম ভাঙলে মনে হল মেয়েটি ওর পাশে নেই। সে দেখল ঘর অন্ধকার। পাশের ঘরে আলো জ্বলছে। যুবতী এখন ওর স্বামীর পাশে।

    মৈত্র আবার ঘুমিয়ে পড়ল। ওর কোন হিংসে হচ্ছিল না। বরং এক অতীব শান্তি শরীরে, কি যে মহিমময়ী মনে হচ্ছে যুবতীকে। ওর ভাল লাগছিল ঘুমিয়ে পড়তে।

    খুব সকালে সে শুনতে পেল। ভাঙ্গা ভাঙ্গা ইংরেজিতে বলছে, ম্যান, বেলা হয়েছে। এবারে ওঠো। জাহাজে ফিরতে হবে।

    ঠিক যেন শেফালির মতো গলা। কি যে আপন আর সুন্দর এই বেঁচে থাকা! সে পাশ ফিরলে দেখল, চা। যুবতীর শরীরে কপালে পবিত্রতা। মৈত্র উঠতে পারছে না। ভীষণ লজ্জা করছে। আলনা থেকে মৈত্রকে ওর পোশাক এনে দিল। মৈত্রকে অবোধ বালকের চেয়ে বেশি কিছু মনে হচ্ছে না। যুবতী সামান্য হেসে বলল, ম্যান চা ঠাণ্ডা হচ্ছে।

    মৈত্র কম্বল কোমর পর্যন্ত জড়িয়ে নিল। সেন্ট্রাল হিটের জন্য বেশ আরাম বোধ হচ্ছে। সে চা খেতে খেতে বলল, কোথাও আর যাব না। থাকব। এখানেই থেকে যাব।

    —থাকলে মারব। ওঘরে গিয়ে একটু বোস। এত বেশি ভাঙ্গা ভাঙ্গা কথা যে মৈত্র কিছুই বোঝে নি। তারপর ইশারা করলে, বুঝল, এ-বাড়িতে এসে গৃহকর্তার সঙ্গে একটু আলাপ হবে না, এটা ঠিক না। মৈত্র বাথরুমে ঢুকে গেল, স্নান করল, পোশাক পাল্টাল, এবং সেই কঠিন পোড়া অসুস্থ মানুষটার সঙ্গে কথা বলার জন্য মাথার কাছে একটা চেয়ারে বসল।

    লোকটির কথা বলতে ভীষণ কষ্ট হচ্ছিল, তবু বলল, সাহস আছে তোমার।

    মৈত্র কিছু বলল না।

    সে নিজের মনে মনে বিড়বিড় করে বলল, সাহস আমারও ছিল। এখন কিচ্ছু নেই। তারপর ওপরের দিকে তাকিয়ে থাকল। একেবারে ভীষণ শূন্যতা চোখে। মৈত্র আর বসে থাকতে সাহস পেল না। ওর সত্যি এবার লোকটাকে ভয় করছে। সে বলল, আসি। সে উঠে প্রায় দৌড়ে পালাবার মতো সিঁড়ি ধরে নামতে থাকলে দেখল, যুবতী পেছনে পেছনে নেমে আসছে। সে বলল, তুমি চিনে যেতে পারবে না। আমার সঙ্গে যাবে।

    যেন সে কতদিন পর এক সুদীর্ঘ প্রবাস থেকে ফিরে এসেছে। মেয়েটিকে তার কিছুতেই মনে হচ্ছে না, দূরের, যেন সে-আছে, তার চারপাশেই আছে, কতকালের চেনা প্রিয়জনের মতো, ওর চোখ ভারি হয়ে আসছিল। মৈত্র বলল, আবার আসব।

    যুবতী ওকে জাহাজঘাটায় নামিয়ে বলল, না। আর আসবে না। সে একটু থেমে বলল, ডাক্তার দেখাবে।

    মৈত্র বলল, আমার কিছু হবে না।

    যুবতী তবু বলল, না হলেও দেখাবে। বলবে সব। পিঠে বিজবিজে ঘা, সব খুলে বলবে। না বললে আমি কষ্ট পাব।

    মৈত্র মেয়েটির কথাবার্তা এখন যেন মন দিয়ে শুনছে না। সে আর কি দিতে পারে। সব দিয়েছে, তার আরও কিছু থাকলে মেয়েটিকে এমুহূর্তে দিয়ে দিতে পারত। বড় বেশি ছোট মনে হচ্ছে নিজেকে। সে এত খাটো মাপের মানুষ। সে বলল, এসে গেছি।

    গুড বাই। মেয়েটি গাড়িতে বসে হাত নাড়ল। শিফনের ফ্রক গায়ে। মাথায় উলের টুপি। মুখটা সব দেখা যাচ্ছে না। মৈত্র নুয়ে হ্যাণ্ডসেক করল। আসলে নুয়ে ওর সুন্দর মুখটা আর একবার দেখতে চাইল। কি কোমল, আর নরম, আর বড় বেশি স্নিগ্ধতা চোখে মুখে! সে কিছুই বলতে পারল না। ধীরে ধীরে ক্রেনের লম্বা ছায়া অতিক্রম করে জাহাজে উঠে গেল।

  • চৌদ্দ

    চৌদ্দ

    ।। চৌদ্দ।।

    সকালে উঠেই মৈত্র দেখল, চব্বিশ ঘণ্টার ফ্ল্যাগ মাস্তুলে টানিয়ে দেওয়া হয়েছে। জাহাজের মাল নামানো শেষ। ড্রিফটিঙ লাইন অনেক ওপরে উঠে গেছে জাহাজের। গ্যাঙওয়েতে সিঁড়ি খাড়া। খাড়া সিঁড়িতে উঠতে ভয়। ক্রমে জাহাজ জলের ওপর ভেসে উঠলে যা হয়। মেরামতের কাজ মোটামুটি শেষ। তবু মনে হয় বয়লার চক মেরামত করে নিলে হত। জাহাজ সরফাই-এর সময় এমন একটা রিপোর্ট যেন ছিল। তারপর কি করে যে কি হয়ে যায়। মৈত্র ঠিক বোঝে না, এ-ভাবে একটা ভাঙ্গা জাহাজ নিয়ে কাপ্তান দরিয়াতে ভেসে চলেছে কি করে! এবং চারপাশে এত নিয়মকানুন থাকা সত্ত্বেও এটা হয়। বুড়ো কাপ্তানের চোখ মুখ লাল। অথচ তিনি কিছু করতে পারেন না। কোম্পানী এজেণ্ট-অফিসের মারফত এ-সব করে থাকে। কিভাবে কোথায় কি পরিমাণ টাকা দিলে, বেশি পরিমাণ টাকা বেঁচে যায়, এবং রিপোর্টে লেখা থাকে তখন, দি সিপ মে সেইল, কাপ্তান যেন ঠিক জানেন না।

    সকালের দিকে ঘন কুয়াশা। কাজের ভেতর শুধু এখন এনজিন রুমে ঘুরে বেড়ানো। কোলবয়দের দিয়ে রেলিঙ, অথবা এনজিনরুমের পাটাতন ঝকঝকে করা। ঘন কুয়াশার ভেতর দিয়ে শীতের পোশাকে এখন সব জাহাজিরা যে যার কাজে চলে যাচ্ছে। মৈত্র, জানে তার টাকা পাঠানো হল না। সে সব শেষ করে ফেলেছে। সামনের বন্দরে কিছু একটা করা যায় কিনা, শেফালীকে যে সে মাসোহারা দিয়ে এসেছে, ওতে ওর চলার কথা। তবু সে যেমন মুদিখানা, ডাক্তার এবং অন্য সব মানুষদের বলে আসে, আমি যাচ্ছি, ওর যা লাগে দিয়ে যাবেন। সবাই ঠিক ঠিক দিয়ে যায়। সফর শেষে বাড়ি ফিরে এলে সে কারো এক পয়সা বাকি রাখে না। শেফালীর স্বভাব বেশি খরচ করে আরামে বেঁচে থাকা। টাকার প্রতি ওর ভীষণ মায়া কম। এবং তখন এমন একটা সময়, যে সারা সফর ঘুরে শরীরে জমে থাকে এক ভয়ঙ্কর ক্ষুধা, শেফালী যতই আরামে থাকুক, পয়সা খোলামকুচির মতো খরচ করে থাকুক, তার রাগ থাকে না। শেফালী একেবারে সবকিছু এমন ভাবে খরচ করেছে বলেই খুশি। এতটুকু অসুবিধে করে বেঁচে থাকলে মৈত্র ভীষণ কষ্ট পেত যেন। কিন্তু জাহাজে ওঠার সময় মনে মনে সে ভীষণ ক্ষেপে যায়। শেফালী এভাবে খরচ না করলে আরও কিছুদিন কিনারায় থেকে যেতে পারত।

    গত রাতে সে ফেরেনি। কেন ফেরেনি, কোথায় ছিল কিছু বলছে না। সে এখন পুরোপুরি টিণ্ডাল। ছোটবাবু অমিয়কে কয়লায়ালা বাদে আর কিছু ভাবছে না।

    অমিয়, ছোটবাবু জানে অথবা বুঝতে পারে বাবু কোথায় রাত কাটিয়েছে। ওরাও এ-নিয়ে কোনও কথাবার্তা বলছে না। বললেই যেন টিণ্ডাল গরম দেখাবে।

    বিকেলের দিকে মৈত্র কোথাও বের হয়নি। কেবল একটু নিচে নেমে সে পায়চারি করছিল। কেউ কেউ কিনারায় আগুন জ্বেলে গরম পোহাচ্ছে। ওরা সবাই জাহাজে মেরামতের কাজ শেষ করে ফিরে যাচ্ছিল। ওদের বোসান হয়তো এখনও ফিরে আসেনি। ওরা আগুন পোহাচ্ছে। ডালপালা, গাছপাতা জড় করে আগুন জ্বেলে নিচ্ছে। মৈত্রের ভেতর কি যেন অস্থিরতা। সে বুঝতে পারে না। সে আর যেতে পারে না দূরে, সে জেটিতেই ঘুরে বেড়ায়। তার মনে হয় চারপাশে কি যেন ঘণ্টাধ্বনি, সেই যে কবে থেকে শুনে শুনে একেবারে পাগল হয়ে যাচ্ছে। সে সামনে এগিয়ে যাচ্ছে, যেন সমুদ্রের নিচে কেউ ঘণ্টাধ্বনি বাজাচ্ছে। সে তাড়াতাড়ি এগিয়ে গেল। সামনে আগুন জ্বলছে। ভীষণ কুয়াশার ভেতর দিয়ে সে হাঁটছে। পৃথিবীর সব কিছু এখন অন্যরকমের মনে হয়। কাছের মানুষ ছায়া ছায়া, দূরের কিছু দেখা যায় না। পর্দায় ভেসে আসা একটা মানুষ যেন তার কাছাকাছি ভেসে এল। সে বলল,

    ছাঁইয়া। সে তার পাশে এসে বলল, এটা দ্যাখো। আমরা একজন মানুষকে খুঁজে বেড়াচ্ছি। সে নিষ্ঠুরতার প্রতীক। সেদিন ধরা পড়েও কি করে যে পালিয়ে গেল। এটা ওর ছবি। কেমন ছায়া ছায়া হয়ে ভেসে এল মানুষটা, কুয়াশার মতো ভেসে এল, তারপর আবার মিলিয়ে গেল। মৈত্র দেখতে পেল, হাতে একটা ছবি। কুয়াশায় একেবারে স্পষ্ট নয়। সে ওপরে ওঠে ফোকসালে আলো জ্বেলে দেখল, ছবিটা যেন চেনা, খুব চেনা। নিচে একটা বড় টাকার ঘোষণা। খুব লোভের। সে ইচ্ছা করলেই ধরিয়ে দিতে পারে। হাতের কাছে এমন সুযোগ!

    অথচ তার ভাল লাগছে না কিছু। ক্যাপ্টেন ফ্রক, আইখম্যান হতে পারে, আইখম্যান মৈত্র নিজে ও হতে পারে, অথবা সেই সিফিলিস আক্রান্ত মানুষটি। কেউ যেন কম যায় না। বরং ক্যাপ্টেন ফ্রক এখন একটা কুকুরের প্রাণরক্ষার্থে বনবাসে চলে গেছে। সে যেই হোক, তার আর এ নিয়ে ইচ্ছা নেই কিছু করার। সে জানে, একটু রাত হলে অথবা গভীর রাতে জাহাজে মানুষটা উঠে আসতে পারে। কিংবা কাল, কাল ওরা থাকছে না। চলে যাচ্ছে। ওর ঘুম পাচ্ছিল। সে ওপরে উঠে ফোকসালে ঢুকে গেল। বাংকে শুয়ে পড়ল। অমিয়, ছোটবাবুর সঙ্গে একটা কথাও বলল না।

    রাত না পোহাতেই জাহাজ আবার চালু হয়ে গেল। এনজিনরুমে তিনটি বয়লারেই লক্ লক্ করে জ্বলে উঠল আগুন। ফায়ারম্যানদের মুখ লাল হয়ে গেল। ওপরে প্রচণ্ড ঠাণ্ডা বলে এই স্টোক-হোলডে বেশ গরম এবং এক অনিবার্য সুখ। তখন ওপরে জাহাজের সামনে পেছনে বড় মালোম, মেজ মালোম। জাহাজের দড়ি দড়া সব খুলে দেওয়া হচ্ছে। নোঙর উঠে যাচ্ছে জাহাজের। মাস্তুল থেকে ফ্ল্যাগ নামানো হচ্ছে। কোয়ার্টার মাস্টার জাহাজের পেছনে ইউনিয়ান জ্যাক তুলে দিয়ে গেছে এবং এ-ভাবে ক্রমে জাহাজ জেটি থেকে দূরে সরে যাচ্ছে, ক্রমে প্রপেলার বেশ জোরে ঘুরছে। বন্দর পেছনে ফেলে জাহাজ আবার দূর সমুদ্রগামী হয়ে যাচ্ছে।

    তখন সব জাহাজিদের ভীড় উপরে। কেউ নিচে নেই। যারা ওয়াচে নামার তারা নিচে এবং এনজিনরুমে এখন ঘড়ির কাঁটায় মাঝে মাঝে এ্যাস্টার্ণ-এ-হেড অথবা স্লো কখনও ফুল। বন্দর এলাকায় জাহাজটা এ-ভাবে পথ করে ক্রমে সমুদ্রে, গভীর সমুদ্রে নেমে গেলে মনে হয় এক রহস্যময় বন্দর ফেলে ওরা চলে যাচ্ছে। যত বাড়িঘর এবং জাহাজের মাস্তুল দূরবর্তী হয়ে যায় তত এই জাহাজিদের আপ্রাণ চুপচাপ ডেকে দাঁড়িয়ে থাকা। আসলে এই হচ্ছে জাহাজ, জাহাজের মানুষ। তারা নিরন্তর বন্দর ফেলে চলে যায়। নিরন্তর এক বন্দর ফেলে গেলেই প্রত্যাশা আবার কবে বন্দর পাবে। এবং এই বুঝি নিয়ম জাহাজি মানুষের যা চলে যায়, তার জন্য মায়াও শেষ হয়ে যায়। আবার নতুন মায়া গড়ে ওঠে, এবং স্বপ্ন নানাভাবে, বন্দর এলে কিভাবে যে তাদের দিনগুলো কেটে যায়।

    ওরা আবার বন্দরের জন্য দিন গুনতে থাকে।

    যেমন ছোটবাবু কয়লায় একটা একটা করে দাগ কেটে রাখে কাঠের পাটাতনে। একটা দিন গেলেই সে দাগ কেটে রাখে—এভাবে তার হিসেব ঠিক থাকে। আবার কখনও ক্যালেণ্ডারের পাতায় কেউ দাগ কাটছে। জ্যাক এভাবে তার দিনের হিসেব রাখে। এবং সে বুঝতে পারে এই জাহাজে প্রায় চার মাসের ওপর তার সময় পার হয়ে গেল। সে যে বয়সে ছিল এখন যেন ঠিক সেই বয়সে নেই এবং স্নান করার সময় সে কি সব টের পায়, আশ্চর্য নরম এক রঙের বৃত্তের মতো বুকের দু’পাশে তার বয়স ক্রমে সজীব হয়ে উঠছে। সে নানাভাবে এইসব সজীবতা থেকে আত্মরক্ষা করতে চেষ্টা করছে। তখনই কেন যে শৈশবের স্বপ্নের মতো এক সুন্দর মুখ তার চারপাশে খেলা করে বেড়ায়। নিজের হাতে তৈরি সে ব্র্যাসিয়ারের ভেতর রুমাল গুঁজে দেয়। এক দুই তিন। এখন ঠিক সে তিনটে রুমাল পর পর ভাঁজ না করে দিলে বুক অসমান থেকে যায়। সে ধরা পড়ে যাবে। অথচ তার মুখে কষ্টের ছাপ। এই ভাঁজ করা রুমাল মাঝে মাঝে ইচ্ছে হয় ছুঁড়ে ফেলে দিতে। সে যেন পারলে ডেক ধরে ছুটে যেতে চায়। এবং বলার আকাঙ্ক্ষা, হে মানুষেরা, আমি মেয়ে। মি গার্ল এবং তখন সত্যি গভীর সমুদ্রে শুধু নক্ষত্রেরা জেগে থাকে এবং দূরে হয়তো কোথাও তিমি মাছের ঝাঁক, জ্যোৎস্না ওদের পিঠে পিছলে যাচ্ছে—কি যে মনোহারিণী এই সমুদ্র! জ্যাক একা ডেকে দাঁড়িয়ে থাকলে এটা টের পায়।

    সে এই বিষণ্নতায় বেশি সময় ডুবে থাকতে পারে না। ছোটবাবুর বোধ হয় পরি শেষ। সে ঘড়ি দেখলেই বুঝতে পারে এই ঠিক সময়, এখন ছোটবাবু সিঁড়ি ধরে ওপরে বোট-ডেকে উঠে আসবে। তখন তাঁর ইচ্ছে হয়, লুকোচুরি খেলা, মহামহিম এই ঈশ্বরের জগতে তার, নীরবে কোথাও আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকতে ইচ্ছে হয়। ছোটবাবুকে সে ভয় পাইয়ে দিতে পারলে মজা পায়। হয়তো ছোটবাবু ফানেলের গুঁড়ি ধরে ওঠে আসছে তখনও। বনির কি যে কৌতূহল! সে জালিতে মুখ রেখে দেখতে থাকে, উঠে আসছে, উঠে আসছে ছোটবাবু, ছোটবাবু মাথা নিচু করে রেখেছে। ওকে দেখতে পাচ্ছে না। ঠিক ফানেলের পাশ কাটিয়ে যেই না যাওয়া হঠাৎ চিৎকার, হেই। ছোটবাবু বুঝতে পারে জ্যাক। সে ভয় না পেলে জ্যাক আনন্দ পায় না। তখন ছোটবাবু আর কি করে। কেমন ভয়ের অভিনয় করে বলতে থাকে, জ্যাক তুমি! ওঃ কি না ভয় পেয়েছিলাম।

    আবার সমুদ্রে সূর্য অস্ত যায়। পিছিল আর আগিল থেকে ফ্ল্যাগ জড় করে ব্রীজে উঠে যায় কোয়ার্টার মাস্টার। রেডিও অফিসার মাংকি-আয়ল্যাণ্ডে দূরবর্তী স্টেশনের খবরের আশায় থাকে। সাদা ফুলশার্ট কালো প্যান্ট পরে জ্যাক একাকী রেলিঙে। চড়ুই পাখি দুটো ওর মাথার ওপর। সমুদ্রে এতটুকু ঢেউ নেই। জলে একটা ফুটকিরি উঠলে পর্যন্ত টের পাওয়া যাচ্ছে। ফ্লাইং ফিসেরা উড়ে উড়ে অদৃশ্য হচ্ছে যখন, অথবা জলে প্রপেলারের ভাঙ্গা শব্দ, অতিকায় জলে ভাঙ্গা ভাঙ্গা শব্দ শুনলে মাছেরা ভয় পেয়ে যেতে পারে। জ্যাক তখনও দাঁড়িয়ে থাকে, ছোটবাবু হয়তো পাখি দুটোর টানে চলে আসবে। কারণ সে তো ইচ্ছে করলেই ছোটবাবুরা যে-দিকটায় থাকে যেতে পারে না। এদের জন্য জাহাজের পেছনটা। তাও ছোটবাবুরা থাকে ডেকের নিচে সিঁড়ি ধরে নেমে গেলে, বেশ অনেক নিচে, অর্থাৎ জাহাজ যখন ত্রিশ-বত্রিশ ড্রাফটে চলে তখন ছোটবাবুদের কেবিন প্রায় জলের নিচে থাকে। ছোটবাবুর কি যে মজা! তার পোর্ট-হোলে কেবল নীল জল চলে যাচ্ছে, চলে যাচ্ছে নীল জল, সমুদ্রের নীল জল ক্রমাগত ওর পোর্ট-হোলের কাচের ওপরে ভেসে যাচ্ছে। জ্যাক শরীরে আশ্চর্য ঘ্রাণ মেখে এভাবে কখনও কখনও ছোটবাবুর জন্য বোট-ডেকে অপেক্ষা করতে ভালবাসে তখন বড়-মিস্ত্রি কেবিনের দরজা বন্ধ করে পৃথিবীর সব বই যেমন যাবতীয় ঘোস্টস্টোরির ভেতর ডুবে থাকে। সে দরজা খোলে না। ডিনারে খেতে যায় না। তার খাবার তার ঘরে দিয়ে যেতে হয়।

    কি যে একটা ভয় বড়-মিস্ত্রির। আগে তবু কখনও কখনও কেবিনের বাইরে বের হতেন। আফ্রিকার বন্দর পার হবার পর থেকে তাও নেই। একদিন কেবল ছোটবাবু দেখেছে, বড়-মিস্ত্রি প্রায় ছুটে এক পায়ে, রেলিঙে দু-হাতে ঝুলে অনেকটা গ্লাইড করে দ্রুত নেমে যাবার মতো, তখন মেজ-মিস্ত্রি ভীষণ হতবাক, চিফ নেমে আসছে। মেজ-মিস্ত্রি দ্রুত ছুটে তাঁর সামনে দাঁড়ালে একটা কথা না। চুপচাপ পকেট থেকে টর্চ বের করে হেঁটে গেছিলেন তারপর টর্চ মেরে ব্যালেস্ট পাম্পের গোড়ায় যে একটা নাট লুজ হয়ে গেছে, এবং এত শব্দের ভেতরও সেই লুজনাটের শব্দ কিভাবে যে তাঁর কানে পৌঁছেছিল তা ভেবে ছোটবাবু একেবারে মনমরা। এতদিনের একটা আপশোস, লোকটার কাজকর্ম নেই, কেবল কেবিনের দরজা বন্ধ করে সারাদিন আহার মদ্যপান বই পড়া, দাবা খেলা, পৃথিবীতে আর কিছু আছে তিনি যেন জানেন না এবং এনজিনের শব্দ ছন্দের মতো বোধ হয় তাঁর কানে বাজে। একটু বেসুরো হলেই টের পান, কোথায় কি গণ্ডগোল! এবং খবরটা মৈত্রকে দিলে বলেছিল, শালা সঙ্গীতজ্ঞ। সেই থেকে কেন জানি ছোটবাবু বড়-মিস্ত্রিকে বড় সঙ্গীতজ্ঞ বাদে কিছু ভাবতে পারে না।

    সঙ্গীতজ্ঞ সায়েবটিকে এক রাতে সে দেখেছে বুয়েন-এয়ার্স বন্দরে, চুপি চুপি বের হয়ে যাচ্ছেন। মাথার টাক এত বড় যে পূর্ণিমার চাঁদের মতো বিশাল মনে হয়েছিল, ক্রাচের চেয়ে দু-হাতের ওপর যেন বেশি উনি নির্ভরশীল। বেঁটেখাটো মানুষ, গোল মতো অথচ হাঁটা দেখলে মনে হবে ভীষণ ফিট- বড়ি। সারাদিন বসে বসে এমন ফিট বডি রাখে কি করে! কতবার ভেবেছে, এনজিনরুম থেকে উঠে যাবার সময় একবার পোর্ট-হোলে যা আছে কপালে, দেখবে—কি করছেন তিনি। এবং একবার সে যা দেখেছিল বিশ্বাসই হয় নি, সাহেব মানুষের এ-সব কি আবার। এবং সে দেখেছিল বড়-মিস্ত্রি চোখ বুজে যোগাসন করছেন।

    এ-সব কথা অবশ্য দু-কান করা চলে না। সে কেবল তার মৈত্রদাকে বলেছিল। তখন মৈত্ৰদা আবার মৈত্রদা হয়ে গেছে। আর গরম নেই। সে বলেছিল, ছোটবাবু, তুমি শেষ পর্যন্ত জাহাজে একটা কেলেঙ্কারি করবে।

    সে ভেবে পাচ্ছিল না, কি কেলেঙ্কারি সে করতে যাচ্ছে!

    মৈত্র বলেছিল, তোমার ওদিকে যাবার কথা না।

    ছোটবাবু বলেছিল, কেন

    —কোনদিন ধমক খাবে। সারেঙকে ডেকে বলবে, তোমারা আদমি ইধার কিউ ঘুমতা। অবশ্য ছোটবাবু পোর্ট-হালে উঁকি দিয়ে দেখেনি। আসলে দেখতে সাহস পায় নি। হলে কি হবে কৌতূহল মানুষকে ভীষণ বিপদে ফেলে দেয় কখনও কখনও। ছোটবাবুর বেলায়ও তাই। তখন সকালবেলা। রেডিও অফিসার এরিয়া স্টেশনকে বলে যাচ্ছে—জাহাজের নাম, যেমন প্রতিদিন সকালে করতে হয়, রেডিও-অফিসার সকালের ডিউটিতে যা যা করে থাকে, প্রতিদিন, ইয়েস এস এস সিউল ব্যাঙ্ক অথবা এক কথায় ডেনসিঙ গার্ল অর্থাৎ কি নাম জাহাজের, কোন কোম্পানীর জাহাজ, এসব বলতে হয় না। ডেনসিঙ গার্ল বললেই যেন বলে দেওয়া হয় এটা ব্যাঙ্ক লাইন কোম্পানী, ২১, বারি স্ট্রীট, লণ্ডনের একটি ভাঙ্গা জাহাজ—আর কিছু বলার দরকার হয় না। তারপর কোর্স-লে, নেকস্ট পোর্ট অফ কল, জাহাজের এন আর টি, জি আর টি, এরিয়া স্টেশনকে জানিয়ে দেওয়া এবং বোধ হয় জায়গাটা ছিল চোয়াল্লিশ পয়েণ্ট তিন ওয়েস্ট লঙ্গিচুড এবং বত্রিশ পয়েন্ট আট সাউথ ল্যাটিচুড।

    সমুদ্র শান্ত ছিল। জাহাজ খালি বলে তবু সামান্য পিচিঙ ছিল জাহাজে। শীত ছিল না। বরং কিছুটা গরমকালের মতো ব্যাপার! তবে সকালের সমুদ্র এমনিতেই ঠাণ্ডা থাকে। সামান্য ঠাণ্ডা হাওয়া সে-জন্য জাহাজের দড়িদড়া কাঁপিয়ে আমাজন নদীর মোহনায় অথবা গভীর বনাঞ্চলে চলে যাচ্ছে। জাহাজের গতি কিছুটা উত্তর পূর্বমুখী ছিল।

    ঘোস্ট-স্টোরি যাদের পড়ার বাতিক, তাদের একটা বিশ্বাস জন্মে যায়, ভূতেরা সর্বত্রই থাকে। এমন কি এই যে এখন জাহাজ গভীর সমুদ্রে, এখানেও ভূত অনায়াসে চলে আসতে পারে! অথবা এইসব জাহাজে, এত দীর্ঘদিনের জাহাজ যখন, যদি ধরা যায় এটা এক সময়ে যুদ্ধজাহাজই ছিল, তবে অসংখ্য মৃত্যু এই জাহাজে ঘটেছে। যাত্রীজাহাজ হলেও রেহাই নেই। ক্রুদের সমুদ্রে আত্মাহুতি তো লেগেই থাকে। সুতরাং যেমন মাছ বাদে জলাশয় হয় না, ভূত বাদে জাহাজ হয় না। আর এই যেন জাহাজ, জাহাজে কতদিন ধরে সব মরা গরু, ছাগল, শুয়োর বরফ ঘরে ঝুলে থাকে। এদেরও প্রাণ থাকে। একবার নর্দানসায়ারে তো একটা গাধা নিয়ে হৈ চৈ। গাধাটা থাকত চার্চের মাঠে। নানারকম পপলার গাছের ছায়ায় গাধাটা ঘুরে বেড়াতো। বে-ওয়ারিশ গাধা—কার গাধা কেউ জানে না। সবাই কখনও না কখনও ওটাকে দেখেছে গীর্জার মাঠে। জ্যোৎস্নায় বেশি দেখা গেছে। এটা যে কেবল ছেলেপুলেরাই দেখে থাকে তাই শুধু নয়, এটা আবাল-বৃদ্ধ-বনিতারা দেখেছে। এটা যে শুধু এ-সময়কার লোকেরাই দেখেছে তা নয়, গত শতাব্দীর লোকেরাও দেখেছে। গাধাটা সেণ্ট জনের গাধা। না দেখে উপায় নেই। কেলেঙ্কারি সেদিনই ঘটে গেল, কার আলু খেত খেয়ে শেষ করে দিচ্ছিল, মালিক তো তেড়ে মারতে যায়—ওমা গাধা হাওয়ায় বিলীন। এবং লোকজন সব চেঁচামেচিতে বের হয়ে এলে ক্ষেতের মালিক অবাক তার একবিন্দু শস্য নষ্ট হয় নি। এসব ঘটনা বড়-মিস্ত্রি হামেশাই শুনে আসছে। অথবা এ্যাশ-ট্রির সেই উইচ মাদারস্টোলের হত্যার হুকুম এবং এ-সব কারণে ভূতেরা অনেক সময় প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে থাকে।

    বড়-মিস্ত্রির কি হয়েছে কে জানে আর কেবিন থেকে বের হন না। দরজা বন্ধ করে বসে থাকেন সারাদিন। পোর্ট-হোল খোলা থাকে কেবল! এনজিনের গণ্ডগোল হলে কেবল এনজিনরুমে হপ্তাহে দু হপ্তাহে মুহূর্তের জন্য দেখা যায়। ছোটবাবু এ-হেন বড়-মিস্ত্রির কেবিনের পাশ দিয়ে যাবার সময় একটা কেলেঙ্কারি করে ফেলেছিল আর কি!

    ছোটবাবু ভেবেছিল কিছুতেই সে ওদিকে যাবে না। তবু কি যে আকর্ষণ থাকে। রাত্রে আজকাল অমিয় আপেল ডিম কোথা থেকে নিয়ে আসে। আপেল এবং ডিম ঠিক তিনজন মিলে সমানভাগে খায়। ধারণা ছিল ছোটবাবুর যে, এটা অমিয় স্টুয়ার্ডের কাছ থেকে চেয়ে নিচ্ছে। সুতরাং রহস্য তার জানার কথা না। দুপুররাতে সে যখন ওয়াচ শেষ করে উঠে আসছে তখন কি কপাল, কে বলবে, সোজা স্টোক-হোলডের সিঁড়ি ধরে না উঠে সে এনজিন-রুমের সিঁড়ি ভেঙ্গে ওপরে উঠে যাচ্ছে। এ-পথ ধরে সাধারণত ক্রুদের ওঠার নিয়ম নেই। সে, পথ সংক্ষেপ করার জন্য আগে মাঝে মাঝে উঠে যেত। সে-রাতে ওঠার মুখে দেখল, সামনের রাস্তা ব্লক করা। দরজা লক করে দেওয়া হয়েছে। আবার এনজিনরুমে নেমে বয়লাররুম পার হয়ে সিঁড়ি ধরতে হবে। অনেকটা পথ। ডাইনিঙ হলের পাশ দিয়ে একটা গুপ্তপথ আছে। সে ভাবল ওটা দিয়ে স্টাবোর্ডসাইডে নেমে যাবে। অন্ধকারে পথটা অস্পষ্ট। অমিয় সবসময়ই আজকাল একটু দেরি করে উঠে আসে বাঙ্কার থেকে। বোধহয় স্টুয়ার্ডের কাছ থেকে ডিম এবং আপেল চেয়ে নিতে দেরি হয়, অথবা কি অমিয়, গোপনে স্টোররুম থেকে চুরি করে থাকে। ও যা মানুষ সব পারে। জাহাজের একঘেয়েমী খাওয়া সহ্য হয় না। এ-জন্য অমিয়র এমন একটা দুর্ধর্ষ কাজ ওরা মনে মনে তারিফ করে থাকে। ওরা প্রশ্ন করলে, অমিয় ক্ষেপে যায়।

    তবে মুসকিল হচ্ছে ডাইনিং হলের ও-পাশের গুপ্তপথের লাগোয়া কেবিনে থাকে সেই বড় মিস্ত্রি। যাকে সে একদিন দেখেছিল শীর্ষাসনে আপেল খাচ্ছে। এখন হয়ত গেলে দেখতে পাবে বই পড়ছে। ওর ধারণা এসব লোকেরা কখনও ঘুমায় না। সারাক্ষণ জেগে থাকে। নাহলে সব এনজিনিয়াররা বড়-মিস্ত্রিকে দেখে ভয় পায় কেন। এনজিনের কোথায় কি গণ্ডগোল মানুষটা যা জানে, আর কেউ তেমন জানে না। অথবা ও বোধহয় জানে, কত তারিখে, কোন সময়ে এনজিনের কোন অংশে ব্রেক- ডাউন হবে। না হলে সঙ্গে সঙ্গে টের পায় কি করে! কি সকালে, কি বিকেলে, কি মধ্যযামিনীতে এ-পর্যন্ত যতবার ছোটবাবু দেখেছে, অবশ্য খুব কমই দেখেছে, কিন্তু সময়ের কোন ঠিক নেই। ওর কেবিনটা ঠিক এনজিনরুমের পাশে। এমন গোলযোগে থেকে থেকে, সারাক্ষণ থেকে থেকে—এই তো জাহাজ যতদিন চলবে, বিশ বাইশ মাস নাগাড়ে, চব্বিশ ঘণ্টা কেবল অতিকায় ঝ্যাকোর ঝ্যাকোর শব্দ। এভাবে একজন সারাক্ষণ শব্দ শুনতে শুনতে—কারণ সে তো দেখেছে এনজিনে এমন শব্দ যে, চিৎকার করে কথা না বললে শোনা যায় না। বেশির ভাগ সময় হাতের ইশারায় কথা বলতে হয়। চার ঘণ্টা ওয়াচ শেষ করে যখন উঠে যায় এনজিনিয়াররা তখন ওদের মানুষ বলে মনে হয় না। শব্দেই হয়তো মাথা ধরে যায়। অথবা মাথার ভেতরে শিরা-উপশিরা যা কিছু থাকে তার নাটবল্টু আম্মা হতে কতক্ষণ।

    ছোটবাবু এতসব ভাববার সময় পায় নি। সে এতরাতে এই জায়গায় এসে ফিরেও যেতে পারছে না! কারণ এতক্ষণে হয়তো মেজ-মিস্ত্রি নিচে নেমে গেছে। যে-করেই হোক তাকে এলিওয়ে ধরে আরও কিছুটা এগিয়ে যেতে হবে এবং গুপ্তপথটা আবিষ্কার করতে হবে। খুব একটা পরিচিত নয় পথটা। কেবল একদিন এদিকটায় সে জ্যাকের সঙ্গে এসেছিল। এখানে কেবিনের পাশে পাশে ঘুরে ঘুরে নিচে ওপরে পথ নেমে গেছে। কেবিনগুলো দেখতে সব একরকমের। বোট-ডেকে উঠে যেতে পারলে হত। পাশেই কোথাও একটা সিঁড়ি আছে। কিন্তু সে একটু এগিয়ে অন্ধকারের ভেতর পড়ে গেল। কেউ এখন এদিকটায় জেগে নেই। কেবল একটা ছায়ার মতো দেয়ালের পাশে কেউ অন্ধকারে দাঁড়িয়ে আছে যেন! বোধহয় এগুলো কাপ্তান-বয়, মেসরুম-বয়ের কেবিন। যাই হোক খুব তাড়াতাড়ি সে আবছা আলো অন্ধকারে দেখতে পেল অস্পষ্ট এক ছায়ার মতো, কেউ দাঁড়িয়ে আছে। এবং এমন একটা অন্ধকার এলিওয়ো তো কোন বাতি না থাকলে যা হয় কেবল এনজিনের ভৌতিক একটা শব্দে, ওর মাথা কেমন গোলমাল হয়ে যাচ্ছে অথচ সে সামনের সরুপথটা ধরে না গেলে জাহাজের স্টাবোর্ড-সাইডে পড়তে পারবে না। সেই ছায়াটা ক্রমে লম্বা হয়ে যেতে থাকল। আর ওর চোখ- মুখ শুকনো, ভৌতিক ব্যাপারটা একেবারে মিথ্যা নয়, সে দেখল সেই ছায়া ক্রমে লম্বা হতে হতে ওর পায়ের কাছে নেমে এসেছে এবং সে তখনই চিৎকার করে উঠবে ভাবল, আর মুখে কেউ তখন হাত চাপা দিয়ে প্রায় টানতে টানতে যখন স্টাবোর্ড-সাইডে নিয়ে গেল, তখন সে একেবারে অবাক, অমিয়। অমিয় সামনে দাঁড়িয়ে।

    অমিয় বলল, ওদিকে কেন গেছিলি!

    ছোটবাবু কিছু বলতে পারল না।

    —ও-রাস্তাাটা ভাল না। শালা সঙ্গীতজ্ঞ ভূতটুতের ব্যবসা করে।

    ছোটবাবু বলল, সত্যি!

    —সত্যি! কেউ যায় না।

    —কেন যায় না!

    —মাঝে মাঝে একটা লম্বা ছায়া দাঁড়িয়ে থাকে।

    ছোটবাবুর গা ছম ছম করতে থাকল। দুপুর রাতে এমনিতে জাহাজ ভীষণ ভয়াবহ। অনেকে একা তখন ওপরে উঠতে ভয় পায়। চারপাশে সমুদ্র। কিছু দেখা যাচ্ছে না। অন্ধকারে শুধু কিছু নক্ষত্র। এবং কোনো কেবিনে অথবা ফোকসালে আলো জ্বালা নেই। কেবল ডেকের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে বড় বড় দুটো মাস্তুল। মাস্তুলের দু’পাশে দুটো আলো আর উইংসে আলো। এমন একটা ভয়াবহ ঘটনার সম্মুখীন হয়ে ছোটবাবু জাহাজটা যে সত্যি ভূতুড়ে বিশ্বাস না করে পারল না। এবং সে দেখল অমিয়র হাতে একটা আপেল দুটো ডিম। ছোটবাবু বলল, কোথায় পাস তুই এ-সব। এত রাতে সবাই যখন ঘুমিয়ে থাকে তখন কোথা থেকে সব সংগ্রহ করিস!

    অমিয় বলল, এত সব জানবার তোমার কথা না! ভাগের ভাগ খাবে। কোন প্রশ্ন নয়।

    তারপর ছোটবাবু দেখল অমিয় জামার নিচ থেকে এক টুকরো চকচকে কি বের করছে। ওরা তখন ডেকের ওপর দিয়ে হাঁটছিল। অমিয়র কি যে বাতিক দিন দিন হচ্ছে, লকারটা সে কিছুতেই খুলছে না। যখন সাফাই দেখতে বের হন কাপ্তান তখন তিনি দু-একবার এই লকার বন্ধ করে রাখার রহস্য জানতে চেয়েছেন। অমিয় বলছে, সে চাবি হারিয়েছে। তা তিন-চার মাস হয়ে গেলে সন্দেহের কারণ দেখা দিতে পারে। এভাবে যে অমিয় কি গোপন করছে ছোটবাবু বুঝতে পারছে না। অবশ্য লকার খুলে মাঝে মাঝে অমিয় যে না দেখেছে তাও নয়। অমিয় বয়লার রুমে কয়লা পুড়ে গেলে তার ভেতর থেকে উজ্জ্বল সব ভারি ধাতুপিণ্ড সংগ্রহ করছে। ওর ধারণা যে কি! দেখতে মূল্যবান, কিন্তু এ-সব এত সহজে যদি মিলে যায় তবে, কোলবয় হয়ে পৃথিবীর সবাই গোল্ড-রাশে নেমে যেত। ছোটবাবু এবং মৈত্র এ-নিয়ে রসিকতা করেছে, কিন্তু মনে মনে কষ্ট পাবে ভেবে, চাবিটা পাওয়া যে ঠিকই যাচ্ছে না এমন সমর্থন জানিয়ে এসেছে। আসলে গোটা লকারটাতে সে রেখেছে সব পোড়া কয়লা থেকে কাল্পনিক অমূল্য সব ধাতু। সে এ-ভাবে একদিন ঠিক বড়লোক হয়ে যাবে। স্বপ্নে প্রায় রাজা হবার মতো। এবং ছোটবাবু দেখল আজও অমিয় কিছু সংগ্রহ করে এনেছে। দেখলে সত্যি অমিয়র জন্যে মায়া হয়। অমিয় যেন এ-জন্যই ছোটকে এত তোষামোদ করে থাকে। আপেল খাওয়ায়, ডিম এনে খাওয়ায়। এদের রেশনে যা নেই তা জীবন বাজী রেখে সংগ্রহ করে আনছে।

    ছোটবাবু আর কোন প্রশ্ন করল না। কেবল বলল, ঠিক আছে, আর ওদিকটাতে যাব না। সকালে ঘুম থেকে উঠলে ছোটবাবুর মনে হল ওপরে কেউ নাচছে। এবং ঢোল বাজাবার মতো টব বাজাচ্ছে কেউ। সুর ধরে কেউ গাইছে। সারেঙ দুবার খোঁজ নিয়ে গেছে ছোটবাবুর! ছোট তখনও ঘুমোচ্ছিল বলে ডাকে নি। ওপরে উঠে সে তাজ্জব। অনিমেষ মজুমদার একটা স্লিপিঙ-গাউন পরে মেয়ে সেজেছে। চুলে খোঁপা বেঁধেছে গামছা দিয়ে। আজ রবিবার। ছোটবাবুদের সমুদ্রে রবিবার শনিবার বলে কিছু নেই। ডেক-জাহাজিদের আছে।

    ডেক-ক্রুরা আয়াসে চলাফেরা করছে। তাড়াহুড়ো নেই। মেসরুমে ভীড়। বাথরুম থেকে ছোটবাবু বুঝতে পারল অমিয় টপ্পা গাইছে। এ-সব টপ্পা শোনা যায় না। অফিসারের নামে অশ্লীল পদ্য এবং সমে অমিয়, ছোটবাবু ভূত দেখেছে বলে শেষ করছে।

    অমিয় বেশ মিলিয়ে টপ্পা তৈরি করতে পারে। ছোটবাবু উঁকি দিলে দেখল, অমিয় বসে রয়েছে, পায়ের নিচে রঙের টব। জানালা দরজায় সব ক্রুদের মুখ। যারা বয়সে বুড়ো এদিকটায় আসছে না। গনি, ছোট টিণ্ডাল, বাদশা মিঞা নামাজ পড়তে এসে ফিরে গেছে। বেশ ময়ফেল জমেছে এবং রঙের টবে ঢোলের শব্দ আর পায়ের ঘুঙুর বেঁধে পুরানো এক স্লিপিং-গাউন মেমসাবের পরে ঘুরে ঘুরে মাথায় হাত তুলে পেছনে হাত রেখে অনিমেষ মজুমদার নাচছে। কেউ ওকে জড়িয়ে ধরে কামড়ে দিতে চাইছে। কেউ ওর হাত ধরে চুমু খাচ্ছে এবং পয়সা দিচ্ছে। সে তারপর ঘুরে ঘুরে ডেকে নেচে বেড়াল। এবং চারপাশে এই যে সমুদ্র, জাহাজ দিনরাত ভেসে চলেছে, তার ওপর অনিমেষ এ-ভাবে একটা মেয়ে সেজে তামাসা দেখাল, কে কত দেবে ঠিক হল। তার বিনিময়ে কেউ ঠেলে ঠেলে নিয়ে গেল ফোকসালে, নাও, এবারে লিখে নাও, বন্দরে এলে অনিমেষকে এ-টাকাটা দিতে হবে। একসঙ্গে যা টাকা জমবে, তা দিয়ে উৎসবের মতো জাহাজে, একেবারে কিনার থেকে তাজা মুরগি কিনে আনবে সারেঙ, তারপর পিকনিকের মতো ব্যাপার। অনিমেষ সং সেজে টাকা তুলে দিচ্ছে ডেক-সারেঙকে।

    আসলে এই সং সাজার ভেতর অনিমেষ কেমন আনন্দ পায়। সে আবিষ্কার করেছিল, ডেক- টিণ্ডাল বুনোসাইরিসের পুরানো বাজার থেকে বিবির জন্য একটা সেকেণ্ড-হ্যাণ্ড স্লিপিং-গাউন কিনে এনেছে। সবাই যা আনে বাজার থেকে, পাশাপাশি সবাইকে খুলে দেখায়। কিন্তু ডেক-টিণ্ডাল অন্য রকমের। সে গোপনে তুলে রাখার সময় ধরা পড়েছিল। অনিমেষ তারপর বেশ সং সেজে ফেলল রাতে। রাত নটায় সে ঘুরেছে মেয়ে সেজে। সকালেও মেসরুমে মেয়ে সেজে বেশ পয়সা কামিয়ে বেড়িয়েছে। কিন্তু ছোটবাবু ভূত দেখেছে এটাই ছিল বার বার এক কথা। ছোটবাবুকে সারেঙ ডেকে সাবধান করে দিয়েছেন, তোকে ছোট কত করে বলব, তুই যে কেন একা উঠে আসিস! এবং সারেঙ যেন ছোটকে কি বলতে গিয়েও বলতে পারেন না। কেবল একসময় না বললেও যেন নয়, এমন ভেবে মুখ কাছে এনে বললেন, জাহাজে কত সব অদ্ভূত ঘটনা ঘটে। তুই সবচেয়ে কম বয়সের জাহাজি। কখন কি ঘটবে বলা যায় না। রাত বারোটায় কে তোকে একা একা এনজিন রুম থেকে উঠে আসতে বলেছে। মৈত্র মশাই কোথায় থাকে! জব্বার, অমিয়? তুই একা একা আসবি না। দুপুররাতে কেউ জাহাজে একা ঘুরে বেড়ায় না।

    ছোটবাবুর খুবই বিশ্বাস সারেঙকে। তিনি তাকে হাতে ধরে জাহাজে নিয়ে এসেছেন। ওদের এখন ওয়াচের সময় হয়ে যাচ্ছে। জাহাজ কেমন নিরিবিলি যাচ্ছে। রোদ গ্যালিতে এসে পড়েছে। যত বেলা বাড়বে রোদ গ্যালি থেকে সরে যাবে। এবং কেউ কেউ রেলিঙের ধারে বেঞ্চিতে বসে সমুদ্র দেখছে, চর্বিভাজা রুটি খাচ্ছে। এবং ভূত নিয়ে ক্রুদের ভেতর কথাবার্তা। কোন কোন জাহাজে ভূতের উপদ্রব সত্যি ছিল ক্রমে তাও কথায় কথায় চলে আসছে। এবং একবার যে একটা জাহাজ-ভূত ছিল সাউথ-সিতে তার গল্প। এখন তো শোনা যাচ্ছে সে রাস্তায় আর কেউ জাহাজ চার্টার করে না। কোর্স- লে পাল্টে দিয়েছে। ছোটবাবু সারেঙের কথাবার্তা শুনে বুঝেছে, মধ্যরাতে একা ওর সত্যি ঘুরে বেড়ানো ঠিক না। গতকালের ঘটনার পেছনে সে কোনো কার্য-কারণ খুঁজে পাচ্ছে না। অথচ চোখের ওপর ঘটনাটা দেখেছে। এবং হতবাক হয়ে গেছে।

    তখন কাপ্তান ফল আর এক-কাপ কফি খাচ্ছিলেন। তখন জ্যাক নিজের কেবিনে ফল, দু স্লাইস স্যাণ্ড-উইচ এবং কফি খাচ্ছে। জ্যাকের পায়ের কাছে পাখি দুটো। জ্যাক আজ কাজে বের হয় নি। দেরি করে ঘুম থেকে উঠেছে। রাত হলে, যখন সত্যি গভীর রাত হয়, এবং ডগ-ওয়াচের ঘণ্টায় ওর ঘুম ভেঙ্গে যায়, তখন নিভৃতে খুব দামী দামী স্কার্ট এবং সুন্দর সব গাউন পরে নিভৃতে বসে থাকে। আয়নায় প্রতিবিম্ব ভাসে। চুল আরও বড় হলে ওর মুখ আরও সুন্দর দেখাত। যা আছে তাই দিয়ে চুলটাকে পেছনের দিকে সামান্য ফাঁপিয়ে রাখে। এবং হাত দিয়ে, দু-হাত দিয়ে চুলের চারপাশটা চেপে চেপে সে তার মায়ের মতো দু-পাশে দুটো ক্লিপ এঁটে দেয়। তারপর দু-হাত দু-দিকে ডানার মতো মেলে দেয়, উঠে দাঁড়ায়। রেকর্ডপ্লেয়ারে সুন্দর রিন-রিন্ করে বাজনা বাজে, কখনও স্লোভাক লোকসঙ্গীত অথবা এক অবিরাম সঙ্গীতের মতো যেন কোন গীর্জায় কেউ ঝম্ ঝম্ করে পিয়ানোর রিডে হাত চালাচ্ছে। সে নিজের মতো কোনও ব্যালেগার্লের ছবি শরীরে ফুটিয়ে ধীরে ধীরে একা একা নাচে। একা একা সে টো-এর ওপর ঘুরতে ঘুরতে কোনও দূরবর্তী সরোবরের নীলপদ্ম হয়ে যায়। ওর শরীরে থাকে তখন আশ্চর্য ঘ্রাণ। রাত বারোটায়, জাহাজে সবাই যখন ঘুমিয়ে থাকে তখন সারা জাহাজে এক মূল্যবান সুগন্ধি ছড়িয়ে যায়। কেবিনে কেবিনে, ফোকসালে ফোকসালে গন্ধটা ভেসে বেড়ালে শরীরে আকাঙ্ক্ষা জন্মে। সমুদ্র আর ভাল লাগে না। কবে যে জাহাজ আবার বন্দর ধরবে!

    সকালে ঘুম ভাঙলেই জ্যাকের কাজ, সব পোশাক শরীর থেকে খুলে ফেলা। সে তার পোশাক খুলে বড় একটা ট্রাঙ্কে রেখে দেয়। সুন্দরভাবে রেখে দেয়। ভাঁজ করে, যেন ভাঁজ নষ্ট না হয়, কারণ বাবা তার পোশাক কিনে আনার সময় খুব গোপনীয়তা রক্ষা করেন। বনি রাতে নিজের পোশাকে সাদা চাদরের নিচে শুয়ে থাকতে ভালবাসে। তিনি তা বোঝেন। তবু খুব সতর্ক থাকতে হয়। বনিকে তিনি সব বলে দেন। তখন বনির কান্না পায়। সে আর এ ভাবে পুরুষ সেজে থাকতে পারছে না। ছোটবাবু কি যে, বোকা! কিছুতেই বোঝেনা সে মেয়ে। সে তো ছোটবাবুর পিঠে পিঠ লাগিয়ে এক দুপুরে বাংকারে বসে গল্প করেছিল। কি যে সুন্দর আর তরুণ সন্ন্যাসীর মতো অথবা মনে হয় মহান বৃক্ষের ছায়ায় সে তখন দাঁড়িয়ে। ওর ইচ্ছে, যেমন বাবা জানে সে মেয়ে, ছোটবাবুও জানুক সে মেয়ে। পৃথিবীতে আর কারো কাছে ধরা না দিলেও ক্ষতি নেই। যত জাহাজের দিন যাচ্ছে বনি তত পাগল হয়ে যাচ্ছে এবং যখন কিছু ভাল লাগে না, সাহসে কুলায় না, কিছু একটা করে ফেলতে, তখন রাতে মধ্যরাতে সে রেকর্ড-প্লেয়ারে সব মহান সঙ্গীতজ্ঞদের মিউজিক বাজিয়ে চলে। পৃথিবীর সবচেয়ে দামী পোশাকে সে একা একা নাচে। তার সঙ্গে থাকে তখন ছোটবাবু। কল্পনায় সেই ছোটবাবুকে ← তার পাশে রাখে কোন যুবক ব্যালে-ড্যানসারের মতো। ছোটবাবুর চওড়া কাঁধ, সোনালী অথবা নীলরঙের দাড়ি গোঁফ এবং শক্ত হাতের ভাঁজে এক পা তুলে নিজের সব কিছু অর্পণ করে দেবার ভিতর কি যে আকুলতা! বনির এই অস্থিরতা ওর চোখ মুখে ভাসে। সে কখনও শুয়ে থাকে নরম বিছানায়। সাদা মোমের মতো পা, হাতে নীল শিরা উপশিরা, গোলাপী রঙের স্তনে হুল ফোটালে রোমকূপে বিন্দু বিন্দু ঘাম। সে এ-ভাবে আর পারে না।

    পারে না বলেই সকালে সে বার বার দরজা খুলে উঁকি দিয়েছে, কখন ছোটবাবু আসবে। সে তার বয়লার সুট পরে দাঁড়িয়ে আছে দরজায়। তাকে সে আজ একটা কথা বলবে। বলবে, আমি মেয়ে, ছোট, মি গার্ল। এবং সে প্রতিদিন এটা ভেবেছে বলবে, তুমি কাউকে বল না, বললে, বাবা আমাকে জাহাজ থেকে নামিয়ে দেবে, দেশে পাঠিয়ে দেবে। পরিচারকদের হাতে আমায় নির্বাসন দেবে। তুমি কিন্তু বল না। কেবল তুমি জানবে, আমি মেয়ে। আর কেউ না। হ্যাঁ আর জানে চিফ অফিসার। তিনি আমার আংকল। তিনি এবং বাবা আমার কাছে সমান।

    ছোট যখন বোট-ডেকে উঠে এল, তখন জ্যাক ফানেলের গুঁড়িতে কিছু একটা করছে। আসলে এটা অজুহাত, ফানেলের গুঁড়ি ধরে ছোট সবার পরে এনজিন রুমে নেমে যাবে। এখনই ঠিক সময় এবং কি ভেবে জ্যাক ডাকল, ছোট!

    তখন জাহাজের চিমনির ছায়া বেশ লম্বা হয়ে সমুদ্রে ভেসে গেছে। ধোঁয়া ব্রীজের ওপর দিয়ে সামনে কিছুটা এগিয়ে আবার উত্তর-পূব মুখি ভেসে যাচ্ছে। নীল সমুদ্রে এই ধোঁয়া কিছুটা ছায়া ফেলে এগিয়ে যাচ্ছে, এবং তাজা রোদ বলে সমুদ্রের নীল রঙ কেবল সোনালী বর্ণমালায় সেজে চারপাশের অসীমতায় ডুবে যাচ্ছে। এমন যখন জাহাজের চারপাশের বর্ণমালা তখন ছোট দেখল, চিমনির পাশে উইণ্ডসেলের নিচে জ্যাক দু-হাঁটুর ভেতর থেকে মুখ তুলে ওকে দেখছে! উইণ্ডসেলের ছায়ায় জ্যাকের মুখ ভীষণ দুঃখী অথবা ভীতু দেখাচ্ছে। সে ছোটকে কী বলতে গিয়ে বলতে পারল না। ছোট তখন ডাকল, জ্যাক।

    জ্যাক বলল, কাজে যাচ্ছ?

    ছোট মাথা হেলাল। এটা জ্যাক জানে, এখন ছোটবাবু বয়লার রুমে নেমে যাচ্ছে। জ্যাক যে কি করে বলবে, আমার কেবিনে তুমি এস! তার খুবই সংকোচ বলতে পারে না। সে বলল, বারোটার পর কি করছ?

    —স্নান করব। খাব। তারপর ঘুমোব

    —কখন উঠবে?

    —চারটে বাজতে পারে, পাঁচটাও বাজতে পারে।

    —পাঁচটায় আমার কেবিনে আসবে। তখন কেউ ওপরে থাকবে না।

    ছোট কেমন ঘাবড়ে গেল। জ্যাকের কেবিনে ও আর যেতে পারে না। ওদিকে ক্রুদের যাবার নিয়ম নেই। গেলে কথা উঠতে পারে। সে সহজেই বলে ফেলতে পারল না, যাব। একবার গিয়ে সে যা ফ্যাসাদে পড়ে গেছিল!

    জ্যাক বলল, কাউকে বলবে না তুমি আসছ। দরজার পাশে আমি দাঁড়িয়ে থাকব। তুমি এলেই দরজা বন্ধ করে দেব। কেউ টের পাবে না।

    ছোট বলল, কেউ দেখে ফেললে!

    —কে দেখবে! এদিকে তখন কেউ আসে না।

    এটা সত্যি, তখন এ-দিকটা খুবই ফাঁকা থাকে। ক্যাপ্টেন তখন ব্রীজে উঠে যান। কাপ্তান-বয়কে ডেকে না পাঠালে সে যেতে পারে না তখন। ডিউটিতে যে কোয়ার্টার মাস্টার থাকে সেও নামে না। কাপ্তান ব্রীজে থাকলে সবাই খুব মনোযোগী হয়ে যায় কাজে। ছোটবাবু টুপ করে নিচে ডুবে যাবার আগে কি ভেবে যে বলে ফেলল, যাব। তারপর আর দেখা গেল না। জ্যাক আবার উইণ্ডসেলে হেলান দিয়ে বসে থাকল। তার এখন আর উঠতে ইচ্ছে করছে না। বসে বসে কেবল সমুদ্র, দূরের কোথাও কোন সবুজ দ্বীপ ভেসে উঠবে এক্ষুনি, এ সব ভেবে বসে বসে অনেকটা সময় কাটিয়ে দিল। ওর চোখ আনন্দে এবং উত্তেজনায় চিকচিক করছে। ছোটবাবু তার কেবিনে আবার আসছে, আনন্দে ওর চোখে জল এসে গেছে।

  • পনের

    পনের

    ।। পনের।।

    জ্যাক অনেকক্ষণ এ-ভাবে বসে থাকল। সূর্য মাথার ওপরে উঠে আসছে। আকাশে কোন মেঘের আভাস নেই! জাহাজটা দুরন্তগতিতে জল কেটে যাচ্ছে। দু’পাশে জাহাজের জলকণা উড়ছে। জাহাজের দু’পাশে অজস্র বুদবুদ ওঠে ভেঙে যাচ্ছে। অনেক দূরে সে দেখতে পাচ্ছে জলের একটা সরল রেখা ক্রমে সমুদ্রের অতল থেকে উঠে আসছে এবং টগবগ করে যেন ফুটছে। প্রপেলারের ধাক্কায় জলরাশি ভেঙে খান খান হয়ে যাচ্ছে। দুটো একটা সামুদ্রিক মাছ মরে ভেসে উঠছে। কোথা থেকে কিছু ছোট ছোট পাখি আবার উড়ে এসে সে-সব খাচ্ছিল! জ্যাক কেমন আনমনা হয়ে গেছে সে-সব দেখতে দেখতে।

    এবং তখনই মনে হল পেছনে কেউ ডাকছে তাকে। দেখল, বাবা তার পাশে দাঁড়িয়ে আছেন। একা একা সমুদ্রে এভাবে ঘুরে বেড়াতে বোধ হয় মেয়েটার ভাল লাগছে না। এখন স্নানের সময় জ্যাককে তিনি মাঝে মাঝে সব মনে করিয়ে দেন। জ্যাক কোন কারণেই একটু অগোছালো হতে পারে না। এ-কমাসে জ্যাক আরও বড় হয়ে গেছে। জ্যাকের চুল আবার বড় হয়ে গেছে। জ্যাকের চুল কাটার সময় তাঁরও মনের ভেতর তোলপাড় করে ওঠে। কি সুন্দর নীলাভ চুল। সারা মাথা ঢেকে রয়েছে। ঘাড় পর্যন্ত চুল এসে নেমেছে। মসৃণ নরম উলের মতো চুলে হাত দিলেই অনেক স্মৃতি এসে তাঁকে তোলপাড় করে দেয়।

    এবং তিনি যেন বুঝতে পারেন তাঁর যৌবনে প্রথমা স্ত্রীর চুলে ছিল এমনি সুন্দর সব বর্ণমালা। স্ত্রীর মুখ মনে হলেই কেন জানি মনে হয়, তিনি ওকে অবিশ্বাস করে ভুল করেছেন। আসলে যৌবনে মেয়েরা তো একটু চঞ্চল থাকবেই। চিরদিনই তাঁর মনে হয়েছে ভাঙা জাহাজের তিনি কাপ্তান। সব সময় উদ্বেগ, জাহাজ বন্দরে না পৌঁছানো পর্যন্ত। ভীষণ তিনি সজাগ। স্ত্রীর প্রতি তাঁর কর্তব্য রয়েছে সেটা তিনি ভুলে যেতেন। এই জাহাজ, তাঁর সব কিছু তখন। একটা পাগলা জেদি ঘোড়ার মতো জাহাজটা সমুদ্রের ঝড় সাইক্লোন কাটিয়ে যখন নিরিবিলি শান্ত আকাশের নিচে এসে দাঁড়াত তখন তাঁর মনে থাকত না যে কে তাঁর বেশি আপন। তাঁর স্ত্রী না এই জাহাজ! বোধ হয় তাঁর স্ত্রী এলিস এটা বুঝতে পারত। হিগিনস ওর জন্য একেবারেই সময় দিতে পারছেন না। সারাক্ষণ চার্ট-রুমে বড় টেবিলে ঝুঁকে অথবা কখনও সব ওসেনোগ্রাফিরর ভেতর এই জাহাজের নিরাপদ আশ্রয়ের কথা ভেবে বুঁদ হয়ে থাকতেন। মনে মনে এলিস এটা পছন্দ করত না। ভাবত বুঝি, তবে এত কষ্ট করে মানুষটার সঙ্গে সমুদ্রে আসা কেন।

    কখনও জ্যোৎস্না রাতে এলিস খুব সেজে ওঁর চার্ট-রুমে ঢুকে যেত।—কি হল! এই যাচ্ছি। এলিস কেবিনে অথবা বাইরের ডেকে একা একা পায়চারি করে ক্লান্ত হত। মানুষটার কাজ কিছুতেই শেষ হচ্ছে না। এত কি যে কাজ! এমন অসীম নীল সমুদ্রে একটু পাশাপাশি বসে সামান্য মদ আর মাংসের রোস্ট। নক্ষত্রেরা মাথার ওপর দুলছে। এ-হেন সময়ে মানুষটার চার্ট-রুমে কেবল কাজ। কেবল বই ঘেঁটে ঘেঁটে দেখা। রিপোর্ট লেখা। জাহাজের হাল তবিয়ত কেমন যাচ্ছে তার একটা বিবরণ প্রতিদিন লগবুকে রাত জেগে লিখে রাখা। যেন জাহাজটাই মানুষটার কাছে সব, এলিস তাঁর কেউ নয়। তখন বোধহয় এলিসের ভীষণ অভিমান হত। চোখে জল আসত। সে যে এমন সুন্দর পোশাকে অপেক্ষা করছে মানুষটার জন্য তার দাম দিতেন না তিনি।

    স্যালি হিগিনস আরও সব মনে করতে পারেন এবং এ-সব মনে হলে তিনিও ভুলে যান বারোটায় লাঞ্চ সাজানো হচ্ছে ডাইনিং হলে। ভুলে যান, তাঁর পায়ের কাছে চুপচাপ বসে রয়েছে বনি। বনি এখন নানাভাবে স্বপ্ন দেখতে পারে সে-সবও ভুলে যান। যেমন ভুলে যেতেন, জাহাজে অন্য সুন্দর সব যুবকেরা যাদের কাজ এনজিনে অথবা ডেকে, যারা অফিসার জাহাজের, তাদের একঘেয়ে সমুদ্রযাত্রা ক্যাপ্টেনের সুন্দরী স্ত্রী অনেকটা লাঘব করে দিচ্ছে। ফাঁক পেলেই তারা এলিসের চারপাশে ঘুরঘুর করছে। দুটো একটা কথা বলার জন্য সারাদিন স্বপ্ন দেখছে। এখন যেন তিনি সব বুঝতে পারেন। বয়স হলে সবার সব দোষত্রুটি সহজেই ক্ষমা করে দেয়া যায়। এবং নিজেকেই সব কিছুর জন্য দায়ী ভাবতে বেশি ভাল লাগে।

    তিনি মেয়ের মাথায় আঙুল চালিয়ে বললেন, চুল আবার বেশ বড় হয়ে গেছে।

    বনি জবাব দিল না।

    —চুল কাটবে না?

    —না বাবা।

    কি করুণ সেই স্বর বনির!

    হিগিনস আবার বললেন, কেন?

    —চুল কাটতে আমার ভাল লাগে না বাবা।

    —কিন্তু জাহাজ যে খুব খারাপ জায়গা বনি!

    হিগিনস মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে কিছু আর বলতে পারলেন না।—ওঠো। বারোটা বাজবে এবার।

    —তুমি যাও আমি যাচ্ছি।

    আসলে বনি বসে আছে ছোটবাবুর জন্য। এখানে বসে থাকলে অনেক নিচে, সেই স্টোকহোলডে উঁকি দিলে ছোটবাবুকে দেখা যায়। ছোটবাবুকে দেখার একটা নেশা হয়ে গেছে বনির। বনি জানে ছোটবাবু এখন বাংকারে। খুব সন্তর্পণে কান সজাগ রাখলে শোনা যায় ছোটবাবুর গাড়ি টানার শব্দ। গাড়ি এনে সুটের মুখে উপুড় করে দিচ্ছে। ছোটবাবু উঠে এলে আর একবার মনে করিয়ে দিতে হবে।

    ছোটবাবু উঠে এলে সে ফের বলল, মনে আছে তো।

    —খুব।

    সে এবার আনন্দে শিস দিয়ে উঠল। ছেলেদের পোশাকে থেকে থেকে সে ছেলেদের মতো শিস দিতে শিখে গেছে। সে মাঝে মাঝে শিস দিয়ে গান গায়। পায়ে তাল ঠুকতে থাকে—অথবা কেবিনে পোশাক পাল্টানোর সময় সে পায়ে তাল দিয়ে গান গায়। তার মনের ভেতর থাকে অজস্র দুষ্টুমী বুদ্ধি। ছোটবাবু কেবিনে এলে সে কি কি করবে, এবং ছোটবাবুকে কি কি ভাবে হতবাক করে দেবে এ-সব ভাবতে ভাবতে সাওয়ারের নিচে দাঁড়িয়ে যায়। নরম শরীরে, এবং কি যে কোমল অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ, সে নরম হাতে সারা শরীরে দামী সাবান বুলিয়ে দেবার সময় অজস্র ফেনা এবং নাভির নিচু অংশে সোনালি রেশমের মতো বিজবিজে এক আরামদায়ক ঘটনা। কি যে হচ্ছে সব শরীরে, যত এমন সব হচ্ছে তত ছোটবাবুর জন্য মায়া তার বেড়ে যাচ্ছে।

    ডাইনিং হলে সবাই দেখল জ্যাক ভীষণ চঞ্চল। ওর চোখ দুটো ভীষণ উজ্জ্বল দেখাচ্ছে আজ। সে উত্তেজনায় ভালভাবে খেতে পর্যন্ত পারল না। দেখলেই মনে হয়, জ্যাকের জীবনে চরম কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে। অথচ কি সেটা জ্যাক নিজেও বুঝি ভালভাবে জানে না।

    ঠিক চারটে ত্রিশে ঘুম থেকে উঠে মনে হল ছোটবাবুর, কোথাও আজ তার যাবার কথা! জ্যাক তাকে ডেকেছে। গোপনে যেতে বলেছে। কেন যে জ্যাক ডাকল! যত সময় এগিয়ে আসছে তত বুক কাঁপছে! সারেঙসাব বার বার বলেছেন, ছেলে, জাহাজ খারাপ জায়গা। সাবধানে চলাফেরা করবে। জ্যাক তাকে আবার কোনো বিপদে ফেলবে না তো! জ্যাকের দুষ্টুবুদ্ধি তাকে কোনো বিপদে ফেলবে না তো! এখন অবশ্য কিছু সে করতে পারে না। জ্যাককে কথা দিয়েছে, শুধু কথা কেন, জ্যাক তাকে আদেশ করতে পারে। জ্যাক যা যা বলবে সে তা করতে বাধ্য। ইচ্ছে করলে জ্যাক ওকে একটা ক্লাউন বানিয়ে ফেলতে পার। সে তখনও কিছু বলতে পারবে না।

    সে তার সবচেয়ে ভাল পোশাক বের করল। কিন্তু জ্যাক গোপনে যেতে বলেছে। ভাল পোশাকে গেলে জাহাজিদের মনে সংশয় দেখা দিতে পারে, জাহাজ সমুদ্রে, বন্দর কবে পাবে ঠিক নেই, এখন থেকেই সাজগোজ করে বসে থাকা! সুতরাং সে পরেছে একটা হাফ-হাতা সিল্কের গেঞ্জি। নানারকমের ছবি গেঞ্জিতে। যেমন কোথাও উট অথবা বাঘের ছবি আবার কোথাও জলের মাছ ডাঙায় লাফিয়ে পড়েছে। আবার কোনো বনাঞ্চলের ছবি, ছোট্ট একটা মেয়ে—হাতে তার খেলনা, সে বসে আছে গেঞ্জির নিচু দিকটায়। এবং এ-ভাবে সে তার গেঞ্জিতে পৃথিবীর যাবতীয় জীবজন্তু নিয়ে যখন সত্যি হাজির তখন ঠিক ঘড়ির কাঁটায় পাঁচটা বাজে। সে দেখল কেবিনের দরজা বন্ধ। সে পরেছে কালো রঙের প্যান্ট। কালো রঙের প্যান্ট পরলে ছোটবাবুকে কেমন বেশি লম্বা দেখায় বেশি সাহসী দেখায়। সে চারপাশে সতর্কভাবে তাকাচ্ছে। কেউ দেখছে কিনা। না কেউ নেই। সে ধীরে ধীরে দরজায় কানপেতে ডাকল, জ্যাক, আমি ছোটবাবু। তুমি আমাকে আসতে বলেছিলে।

    আর আশ্চর্য, দরজা সামান্য ঠেলে দিতেই খুলে গেল। ভিতরে কোন আলো জ্বালা নেই। চারপাশটা কেমন অন্ধকার লাগছে। সে বুঝতে পারছে না, ভেতরে সত্যি কেউ আছে কিনা। পোর্ট-হোলের কাচে পর্দা টানানো। বাইরের এতটুকু আলো কেবিনে আসতে পারছে না। জ্যাক কোথায়! সে ভয় পেয়ে গেল। সে দরজায় দাঁড়িয়ে আছে। জ্যাক কি তাকে ছেলেমানুষের মতো আড়ালে দাঁড়িয়ে হেই করে উঠতে চায়, ভয় দেখাতে চায়। দেয়ালে তেমনি নীল রঙের লাইফ বেল্ট, বাংকের মাথায় সোনালী লাইফ-জ্যাকেট দুলছে।

    সে আবার ডাকল, জ্যাক তুমি কোথায়!

    কোন উত্তর নেই।

    সে এবার বলল, জ্যাক আমাকে ভয় পাইয়ে তোমার কি লাভ!

    এবার মনে হল কেউ খুব ধীরে ধীরে বলছে, আমি এখানে ছোট।

    ছোট তবু বুঝতে পারল না জ্যাক কোথা থেকে কথা বলছে। কেবিন আর ততটা অন্ধকার মনে হচ্ছে না। দামী মেহগিনি কাঠের বাংক। বাংক না বলে দামী খাট বলাই ভাল। দু’জন অনায়াসে পাশাপাশি শুতে পারে। পাশে আর একটা বাংক—মোটা তোয়ালে বিছানো। ডানদিকে কাঠের বড় আলমারি। আলমারির ওদিকটায় সে আর একটা দরজা দেখতে পাচ্ছে। ওটা বোধ হয় বাথরুমের দরজা। সুন্দর ক্যালেণ্ডার দেয়ালে। তারিখের ওপর লাল দাগ। সব এখন স্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে। জ্যাক তখন আবার ওকে বলছে, আমি এখানে।

    তারপর ছোট দেখল ক্রমে একটা আলো ফুটে উঠছে কেবিনের ভেতর। ক্রমে কেমন দিনের বেলার মতো, ঠিক ঠিক দিনের বেলা বললে ভুল হবে, পুজো মণ্ডপে যে রঙিন আলো থাকে তেমনি এবং এ-ভাবে এক মায়াবী জগৎ গড়ে তুলে কি যে লাভ জ্যাকের। সে এবার এক পা এগিয়ে গেলে দেখতে পেল, দেয়ালের নতুন ক্যালেণ্ডারে এক বালিকার ছবি। ঠিক বালিকা বলা যাচ্ছে না, কেমন ব্যালে-গার্লের মতো। বালিকা মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। চোখ দেখা যাচ্ছে না, নরম নীলাভ চুলে প্রজাপতি আঁটা ক্লিপ। সাদা রিবন। এবং গলায় মুক্তোর মালার মতো পবিত্রতা চারপাশে ঘিরে আছে। সে হতবাক। সে কি বলবে ভেবে পেল না। আসলে এই জ্যাক, না এটা কোন যাদুকরের ছবি, সে নিজেকে ঠিক বিশ্বাস করতে পারছে না। বার বার চোখ মুছে বলছে, আমি ঠিক বুঝতে পারছি না তুমি কোথায় জ্যাক। দোহাই তুমি আমাকে ভয় পাইয়ে দিও না। আমি কিন্তু দৌড়ে পালাব।

    বনি নিজের ভেতর তন্ময় হয়ে আছে। সে কিছুতেই এমন পোশাকে চোখ তুলে তাকাতে পারছে না। সাদা সার্টিনের ফ্রক, হাঁটু পর্যন্ত ফ্রক নেমে গেছে, ফ্রকে নানা বর্ণমালা অথবা চাঁদমালা বলা যায়, এবং পায়ে সে পরেছে সাদা দামী হাবসী লেদারের সু এবং দামী মোজা ওর পায়ের চারপাশটা কি যে আশ্চর্য স্নিগ্ধ করে রেখেছে! সে বলল ছোট আমি এখানে।

    ছবিটা তবে কথা বলছে! সুন্দর ঘ্রাণ শরীরে। সেই যে মহার্ঘ ঘ্রাণ ওরা মাঝে মাঝে জাহাজে পায়, তেমনি এক ঘ্রাণ! সে বলল, তোমার মুখ দেখতে পাচ্ছি না জ্যাক। তুমি কোথায়!

    জ্যাক এবার দুপা এগিয়ে এল এবং মুখ তুলে দাঁড়াল। যেন, এই যেন আমি, আমি বনি, আমার কিছু আর ভাল লাগে না। সমুদ্রে আমি ভীষণ একা। এবং এ-সব কথা সে একটাও উচ্চারণ করতে পারল না। আর তখন কেমন নেশার মতো ছোটবাবু কাছে এগিয়ে যেতে যেতে সহসা হা-হা করে হেসে উঠল, জ্যাক তুমিও! জ্যাকের ট্রাপে সে কিছুতেই পা দিচ্ছে না। জ্যাক তাকে সত্যি ক্লাউন বানিয়ে দিতে চায়। সাধারণ কার্গো জাহাজে মেয়ে দেখা ভূত দেখার সামিল। সে বলল, তুমিও! অমিমেষের মতো মেয়ে সেজে মজা করছ জ্যাক। ঠিক না। সঙ্গে সঙ্গে সারেঙসাবের কথা মনে হল। বলল, আমি যাচ্ছি জ্যাক। তুমিও অনিমেষের মতো দেখছি ঠিক ফলস্ পরে…..দ্যাটস ভেরি আগলি।

    সঙ্গে সঙ্গে আর্তনাদ। বনি প্রায় হাঁটু মুড়ে বসে পড়ল। যেন সে অনেক কষ্টে তার অসম্মান হজম করছে। এবং ধীরে ধীরে আঙুল তুলে দরজার দিকে দেখাল, প্লিজ ইউ গো

    এবং প্রায় দৌড়ে বের হয়ে যেতে দেখা গেল ছোটবাবুকে। ছোটবাবু হাঁপাতে হাঁপাতে পিছিলে এসে দাঁড়ালে সবাই ওকে ঘিরে দাঁড়াল। ভূত দেখলে যেমন মুখের চেহারা হয়, ঠিক তেমনি, শূন্য দৃষ্টি। সবাই নানাভাবে প্রশ্ন করলেও একটাও কথা বলতে পারছে না ছোটবাবু। সে এ-সব কাউকে বলতে পারে না। জ্যাক সত্যি এবার তবে ওর পেছনে লেগে গেল। সে এখন কি করবে ভেবে পাচ্ছে না।

    আর তখনই জ্যাক নিজের পোশাকে বাইরে বের হয়ে এল। সে পরেছে আজ নীল রঙের ঢোলা সার্ট। সে পরেছে শিকারীর বেশ, এবং সে পাখি দুটোর পেছনে প্রায় ছোটখাটো অরণ্যদেব হয়ে গেছে! জাহাজের এ-দড়ি ঝুলে, কখনও বোট ডেক থেকে ফল্কায় নেমে আসছে। আবার লাফিয়ে উইনচে উঠে যাচ্ছে। আবার কখনও আরও ওপরে। সে যেন এখন পাখি দুটোকে না ধরতে পারলে বাঁচবে না। সে সিঁড়ি বেয়ে মাস্তুলের ডগায় উঠে গেল। যত ছোটবাবু এমন দেখছে তত তাজ্জব বনে যাচ্ছে। সে ভাবল এখন পালিয়ে থাকা ছাড়া উপায় নেই। এবং তখনই হাঁক, হেই ছোট, কাম-অন।

    সে কাছে গেলে বলল, গেট দ্যাট বার্ড।

    ছোট দেখল, জ্যাক মিসেস প্যারোর দিকে হাত তুলে দেখাচ্ছে।

    ছোটবাবু দাঁড়িয়ে থাকল তেমনি। জ্যাক ভীষণ ক্ষেপে গেছে। পাখিটা হাতে পেলে হয়তো পাখা ছিঁড়ে দেবে, মুন্ডু ছিঁড়ে ফেলবে। জ্যাক সব পারে। জ্যাককে সে কেন যে এসব বলতে গেল!

    —আমি বলছি, আমি জ্যাক বলছি। এবং জ্যাকের সেই সুন্দর মুখ কি ভীষণ ক্ষিপ্ত! ওর এমন সুন্দর চোখে কি গভীর ক্ষত!

    ছোট বলল, প্লিজ!

    জ্যাক ফের বলল, ধরে দাও।

    তা ক্যাপ্টেনের জেদি ছেলে। মাথায় কি যে তার হয়, সে আর কি করে, সে কথা না শুনে জ্যাককে অবমাননা করতে পারে না। সে কাতর গলায় বলল, দিচ্ছি।

    কারণ সে জানে পাখি দুটো ওর পোষমানা, অবশ্য এখন এ মুহূর্তে ওরা কি করবে সে বুঝতে পারছে না। ধরা যত সহজ ভেবেছিল, আসলে তত সহজ নয়। কারণ ওরা বোধহয় টের পায় সব। তারপর ছোট লাফিয়ে ফল্কায় উঠে গেল। এবং তখন জ্যাক ছুঁড়ে দিল ওর হাতের দস্তানা। ছোট টেনেটুনে পড়ে নিল দস্তানা। এবং সে দেখতে পেল মিসেস স্প্যারো মাস্তুলের ডগায় বসে রয়েছে। সে খুব সন্তর্পণে মাস্তুলের ডগায় দড়ি ঝুলে উঠে গেল। পাখিদুটো আবার উড়ে গেল। ছোট তখন পাখিদুটোর নাম ধরে ডাকছিল। ফিরে আসতে বলছিল। যেমন মাথার ওপর ঘুরে বেড়ায় উড়ে বেড়ায়, ছোট যেন এখনও ওদের তেমনি কাছে চাইছে। কিন্তু পাখিরা বুঝি বুঝতে পারে ঠিক। ছোটর ডাকে কেউ আর কাছে আসছে না। ওরা গ্যালির ছাদে বসে নিশ্চিন্তে পাখা ঠোকরাচ্ছে।

    ছোট সেখান থেকে লোহার তার বেয়ে নেমে গেল। অনায়াসে সে যেখানে যখন খুশি উঠে যেতে পারছে। দেখলে মনে হবে পাকা জাহাজি। লম্বা সফরে ছোট, পাকা জাহাজি বনে গেছে এবং এই দুরন্তপনা এনজিন সারেঙের ভাল লাগছিল না। এত বেশি উড়ে বেড়ানো ভালো না। ছোটবাবুর কান্ড দেখে সারেঙ মাঝে মাঝে চোখ বুজে ফেলেছেন ভয়ে। যেন ছোট মজা করছে নিজের জীবন নিয়ে। রাগে শরীর কাঁপছে তাঁর। কি যে দরকার কাপ্তেনের ছেলেটার সঙ্গে ভাব করার। একেবারে কথা শোনে না ছোট। কান ধরে নামিয়ে আনলে এখন ঠিক হয়। কাপ্তানের ছেলেটার জন্য তাও করতে পারছেন না।

    তখন ছোট আবার ছাদ থেকে লাফ দিয়ে ডেকে নেমে পাখি দুটোর পেছনে দৌড়াল। সেও যেন এ-জাহাজে আর একটা পাখি হয়ে গেছে। পাখির মতো ফল্কায় ডেকে মাস্তুলে মাংকি অ্যায়ল্যান্ডের ছাদে কখনও উইংসে ঝুলে সে বার বার পাখি দুটোকে ওর কাঁধে অথবা মাথায় এসে বসতে অনুরোধ করছে। কিছু করবে না। যেমন জাহাজে ছিল তেমনি থাকবে ওরা। আর নিচে তখন জ্যাক। সে দু হাত তুলে বেশ মনোরম এক রিঙের খেলোয়াড়ের মতো খেলা দেখাচ্ছে। কেবল ছোটবাবুকে উত্তেজিত করে যাচ্ছে—ওহো! পারলে না। ইউজলেস।

    বুঝি রক্তের ভেতর থেকে তেজী ঘোড়ারা। এ-সব বললে আরও তেজী স্বভাবের হয়ে যায়। -ওই ওদিকে চলে গেল। দ্যাখো ফওর-মাস্টে গিয়ে বসেছে। ছোট লাফিয়ে উঠে গেলে জ্যাক চিৎকার করতে থাকল উড়ে যাচ্ছে, তোমার কানের পাশ দিয়ে পালিয়ে গেল। এনজিন-রুমে ঢুকে গেল। সঙ্গে সঙ্গে ছোট দড়ি ঝুলে একেবারে মাংকি আয়ল্যান্ডের মাথায়। তারপর স্টেনসান ধরে নিচে সোজা ঝুলে পড়ল।

    ছোট এ-ভাবে স্কাইলাইটের সিঁড়িতে নেমে গেল। এনজিন-রুমের ভেতর ঢুকে গেল। প্রায় গ্লাইড করার মতো দু’রেলিঙে হাত রেখে নেমে যাচ্ছে। হাওয়ায় পা ভাসিয়ে দুহাতে ভর করে ক্রমে নিচে, নিচে নেমে যাচ্ছে। আর পেছনে জ্যাক তার চেয়ে যেন এককাঠি ওপরে।

    মৈত্রের ইচ্ছে হল একবার, ঘাড় ধরে তুলে নিয়ে আসে। চা করে বসে রয়েছে, চা ঠান্ডা হচ্ছে। পাখি দুটোর পেছনে লেগেছে। কিন্তু কাপ্তানের দুরন্ত ছেলেটা আছে সঙ্গে। আর সাহসে কুলাল না। অমিয় চা হাতে নিয়ে ওপরে উঠে গেলে দেখল, ছোটবাবু মেইন-মাস্টের ক্লোজ-নেস্টে দাঁড়িয়ে আছে। সে আকাশ দেখছে, কি সমুদ্র দেখছে না পাখি দুটোকে খুঁজছে অমিয় বুঝতে পারছে না। ডেকে দাঁড়িয়ে আছে জ্যাক। অমিয়র হাতে ছোটবাবুর চা। অমিয়, যে অমিয় জাহাজে ভয়ঙ্কর খেলায় মেতে উঠেছে এবং ঘোস্ট খেলা, বেশ জমে উঠেছে, যদিও সে জানে না শেষ পর্যন্ত কিভাবে শেষ হবে খেলা সেও জ্যাককে দেখে ট্যাসে গেল। ডেকে বলতে পারল না ছোট, তোর চা। চা ঠান্ডা হচ্ছে।

    আর ছোটও তখন ঠান্ডা একেবারে ঠান্ডা। ঠিক বুঝতে পারছে না, এমন নিরিবিলি সমুদ্রে দিগন্তরেখায় এটা কি দেখা যাচ্ছে! যেন এক অতিকায় মনস্টার আকাশ কালো করে এগিয়ে আসছে ক্রমশঃ। ক্রমশঃ ওটা বড় হয়ে যাচ্ছে এবং বিদ্যুতের তরঙ্গমালা ওর মাথায় খেলে গেলে সহসা সাইরেন বেজে উঠল। সারেঙ, ডেক সারেঙ কাপ্তান যে-যার মতো চোঙ মুখে ফুঁকে যাচ্ছে—নিচে নেমে যাও। নিচে।

    জ্যাক পাগলের মতো হাত ওপরে তুলে চিৎকার করে উঠল, দি ব্রেকার! ছোট তাড়াতাড়ি জলদি। ছোট, দাঁড়িয়ে থেকো না।

    বোধহয় কখনও কখনও এ-সব অতিকায় মহামায়া মানুষের চোখ ধাঁধিয়ে দেয়। ছোট কেমন ক্ৰমে ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে। ওর শরীরে শক্তি নেই, হাত-পা শিথিল, নিচে কি করে নামতে হয় সে যেন জানে না। জ্যাক পাগলের মতো হাঁকছে, এবং একে একে এনজিন-সারেঙ, মৈত্র, মনু, জব্বার এবং সেকেন্ড অফিসার ছুটে এসেছে। জাহাজের মুখ ঘুরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। ছোট তেমনি দাঁড়িয়ে—তারপর কেমন হাত তুলে দিল ওপরে। আকাশ ছুঁতে চাইল যেন।

    মৈত্র আর পারল না। ওটা মরবে। ও জানে না, ওটা কি আসছে। ভাসিয়ে নিয়ে যাবে কোথায় অপোগন্ডটা জানে না। সে উপরে উঠে গেল। ক্রোজ-নেস্টে উঠে চুল ধরে নামাবে ভাবল। তখন কাপ্তান চিৎকার করছে, জ্যাক! সেকেন্ড অফিসার জ্যাককে টানতে টানতে ধরে নিয়ে যাচ্ছে। ক্রমে এসে গেল, এসে গেল, ভেসে গেল—ছোটবাবু রব উঠে যাবার মুখে দড়ি ধরে, ঝুলে একেবারে আফট-পিকে। কিন্তু পারল না। শেষ রক্ষা করতে পারল না। সে উইন্ডসেলে আটকে গেল। এবং পড়ে গেল। অমিয় সারেঙ জব্বার সবাই ধরাধরি করে নিয়ে আসার আগেই—দি ব্রেকার। ওরা সিঁড়ির মুখে ঠেলে দিল ছোটকে। এবং অনেকটা উঁচুতে জাহাজ উঠে গেছে। ওদের ভাসিয়ে নিয়ে যেত, কিন্তু ওরা ব্রেকারের মুখে পড়লে কি করতে হয় জানে, এবং সারেঙ-সাব এই বুড়ো বয়সেও স্টেনসান ধরে ভেসে থাকলেন। জল জাহাজের ওপর দিয়ে নেমে গেল। দেখলেন তিনি একা। ডেকে কেউ নেই। তাকাতে না তাকাতেই আবার একটা ব্রেকার। আবার জলে ডুবে ডুবে মরণ খেলা! খেলার মতো খেলা। জাহাজ অনেক ওপরে উঠে নিচে নেমে গেল। তিনিও জলের ভেতর থেকে উঠে এলেন! এবং মনে হল, আবার ব্রেকার আসছে। অনেক দূরে। মেসরুমে এসে বুঝতে পারলেন তিনি পাগলের মতো জীবন বিপন্ন করে ছোটকে বাঁচিয়ে এনেছেন। ছোটকে ঠেলে ঢুকিয়ে না দিলে সে অসীম তরঙ্গ মালায় সমুদ্রের গভীরে ছিন্নভিন্ন হয়ে যেত। তিনি মৃত্যুর মুখোমুখি এতক্ষণ দাঁড়িয়েছিলেন ভাবতেই কেমন শরীর থরথর করে কেঁপে উঠল। নিচে নামার শক্তিটুকু পর্যন্ত নেই। সমুদ্রের এইসব সহসা জলোচ্ছাস বেশীক্ষণ থাকে না। কেউ সঠিক জানে না, কেন এমন হয়! কোন বেতার সংকেত পর্যন্ত পাওয়া যায় না। হয়তো বা কোনও টাইডল ওয়েভ হবে, যাই হোক ব্যাপারটা গুরুতর বোঝা গেল যখন আকাশ পরিষ্কার, সমুদ্র শান্ত যেন জাহাজ সমুদ্রে কিছুক্ষণ ডুব-সাঁতার কেটে আবার অবিরাম ভেসে চলেছে। তখন মৈত্র সারেঙের ঘরে উঁকি দিয়ে বলল, জলদি! সারেঙের ঘর তখন লোকজনে ঠাসা।

    —কেন কি হল!

    —শিগগির আসুন। ছোটর মাথায় কি ঢুকে আছে।

    —মানে! এবং সঙ্গে সঙ্গে ভেজা জামা কাপড়ে নেমে গেলেন। দেখলেন ঘাড়ের ওপরে একটা পেরেকের মতো। এতক্ষণ ছোট ভয়ে কিছু বলে নি। জামা রক্তপাতে ভিজে গেলে, অমিয় চিৎকার করে উঠেছিল, ছোট, রক্ত!

    ছোট কিছু বলেনি। অনেকক্ষণ থেকেই এটা হচ্ছে। মাঝে মাঝে গোপনে সে হাত দিয়েছে মাথায়, বুঝতে পারছে ভীষণ কিছু একটা হয়েছে কিন্তু সবাই ওর ওপর এমন ক্ষেপে আছে যে, বলতে সাহস পায়নি। সে অসহ্য কষ্ট ভোগ করছে। চোখ বুজে দাঁত চেপে সহ্য করছে। বসে আছে। কেমন হিতাহিত জ্ঞানশুন্য মানুষের মতো ওর চোখ মুখ দেখাচ্ছে।

    সারেঙ-সাব বললেন, আমি যাচ্ছি।

    ছোট বলল, কিছু হয়নি। কেটে গেছে একটু। এর জন্য লাফালাফি।

    সবাই ছোটর ফোকসালে ভিড় করেছে।

    ছোট কেমন বিব্রত বোধ করতে থাকল। সমস্ত শরীরে অসহ্য জ্বালা। কেমন ঘুম ঘুম এবং নেশার মতো মনে হচ্ছে। সে নিজেকে শক্ত রাখছে। জাহাজে আবার দুর্ঘটনা। সে নিজেকে ভীষণ অপয়া ভাবতে থাকল। ওর জন্য সবাই এভাবে বিব্রত হচ্ছে দেখেও একটা সংকোচ ভেতরে। সে আর পারছিল না। মৈত্র গরমজল করে এনে, ক্ষতস্থান ধুয়ে দিচ্ছে। সারেঙ সেকেন্ড অফিসারকে ডেকে আনলে বোঝা গেল দুর্ঘটনা অতীব—কারণ তখন বেতার সংকেত পাঠানো হচ্ছে। ক্যাপ্টেন নিজে এসেছেন ছুটে। চীফ-অফিসার এসেছে। জ্যাক খবর শুনে যখন এল, তখন ছোট লম্বা হয়ে শুয়ে আছে। সাদা চাদরে শরীর ঢাকা। মাথায় ব্যান্ডেজ, মাথা কাত করা। চোখে কি ছোটবাবু দেখতে পাচ্ছে না। জ্যাকেেক দেখে ছোট এতটুকু চিনতে পারল না যেন। যেভাবে তাকিয়েছিল, তেমনি সাদা চোখে তাকিয়ে আছে। চোখের পলক পড়ছে না।

    তখন রেডিও-অফিসার কাপ্তানের ঘরে। সেকেন্ড-অফিসার রিপোর্ট করেছেন। কাপ্তান দেখে সই করলেন। ডাকলেন, রেডিও-অফিসারকে। রেডিও রোমাকে জানাও, সিপ সিউল ব্যাঙ্ক। কোল-বয় ছোট- বাবু। অ্যাকসিডেন্ট। অ্যাকসিডেন্ট রিপোর্ট দাও।

    রেডিও-অফিসার বললেন, নিয়ারেস্ট স্টেশন ক্যালিফোর্ণিয়া।

    —তাকে জানাও।

    রেডিও অফিসার তাড়াতাড়ি রেডিও-মেডিকাল ট্রিটমেন্টের ব্যবস্থা করে জানালেন, জাহাজ ঘুরিয়ে দিতে হবে। এক্ষুনি।

    —কোথায়?

    —জাহাজ ভিকটোরিয়া পোর্টে ভিড়িয়ে দিতে বলছে। রিস্ক নিতে রাজী হচ্ছে না।

    জাহাজের মুখ আবার ঘুরিয়ে দেওয়া হল। জাহাজের মুখ এখন পশ্চিম-উত্তর-পশ্চিম। জাহাজ এখন যত তাড়াতাড়ি ভিড়িয়ে দেওয়া যায়।

    এবং খবর এই ফোকসালে এসেও পৌঁছে গেল। খারাপ খবর। সবাই উদ্বিগ্ন হয়ে আছে। সেকেন্ড- অফিসার শেষ রাতের দিকে কোরামিন দিয়েছেন ছোটকে। কেমন ধীরে ধীরে ছোটর চোখ বুজে আসছে। তেমন রক্তপাত হয়নি! একটা লোহার শক্ত মতো কিছু মাথার ভিতর ঢুকে আছে। মাঝে মাঝে মৈত্র স্থির থাকতে না পেরে ডেকেছে, ছোট! সারেঙ ডেকেছেন, ছেলে, কোনও ভয় নেই, আমরা তো আছি! জ্যাক নির্বাক। জ্যাক ডাকে নি। সে সারাক্ষণ এই ফোকসালে ছোটর শিয়রে বসে রয়েছে। কাপ্তানবয় খেতে ডেকেছিল, সে খেতে গেছে।

    খাওয়ার পর ব্রীজে বাবার পাশে কিছু সময় চুপচাপ দাঁড়িয়েছিল। কাপ্তান বলতে পারতেন, বনি তুমি বড় হয়ে যাচ্ছ। তুমি এ ভাবে ছোটকে বিপদের মুখে ফেলে না দিলেও পারতে। কিন্তু মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে কিছু বলতে পারেন নি। ভারী দুঃখী মুখ। বনি যেন এ জাহাজে এখন সবচেয়ে দুঃখী। এবং বড় তার অপরাধ। সে মাথা নিচু করে রেখেছিল। বনির বোধহয় এটা স্বভাব, অপরাধ করে ফেললে সে মাথা নিচু করে রাখে। তখন হিগিনস বলেছিলেন, যাও শুয়ে পড়গে।

    বনি যায় নি। সে তেমনি দাঁড়িয়েছিল।

    হিগিনস জানেন, এভাবে দাঁড়িয়ে থাকলে বোঝা যায়, বনির কিছু বলার ইচ্ছে। তিনি বলেছিলেন, আমাকে কিছু বলবে?

    —ছোটবাবুর ফোকসালে যাব।

    হিগিনসের মনে হল, মেয়েটা বুঝতে পেরেছে তার অপরাধের কথা। তিনি মেয়ের বোধবুদ্ধিতে খুশী হলেন। বলেছিলেন, না গেলেও কিছু কেউ ভাববে না।

    বনি তখন কিছু না বলে নেমে যাচ্ছিল। বনি যখন ভাল হয়ে যায় সত্যি ভাল হয়ে যায়। আসলে বনির বয়সে এমন একজন ছোট্ট নাবিকের মায়ায় পড়ে যাওয়া স্বাভাবিক। কেমন এক অমলিন ঘ্রাণ বনির শরীরে। বুড়ো বয়সে কিছুতেই মেয়েটাকে দুঃখ দিতে মন চায় না। তিনি ফের ডেকেছিলেন, বলেছিলেন, যাও। দুষ্টুমি কর না। ঘুম পেলে চলে এস। এবং সারেঙকে ডাকিয়ে জানিয়েছিলেন, জ্যাক যাচ্ছে, ছোটবাবুর ফোকসালে। লক্ষ্য রেখ। আসলে হিগিনস মেয়ের কথা ভেবে না নিজের কথা ভেবে বললেন, বুঝতে পারলেন না। সকালের রোদ জাহাজে, এত বড় একটা দুর্ঘটনা এই জাহাজে ঘটেছে বোঝাই যায় না। কাপ্তানের উৎকণ্ঠা দেখলে শুধু বোঝা যায়। কারণ তিনি এখন লগ-বুগে গত রাতের রিপোর্ট পড়তে পড়তে কেমন থমকে গেছেন। তিনি বনির কথা লেখেন নি। বনি যে ছোটবাবুকে পাখি ধরার জন্য ডেকেছিল, এবং ছোটবাবু বনির কথা মতো কারণ ছোটবাবু তো সামান্য জাহাজি, সে বনি কিছু বললে না করে থাকে কি করে—অথচ রিপোর্টে এ-সব কিছু নেই। তিনি লগ- বুকে আসলে লিখেছেন, ভয়ঙ্কর ব্রেকারের মুখে পড়ে গিয়ে ছোটবাবুর এই দুর্ঘটনা। বনিকে তিনি একেবারেই জড়ান নি।

    রিপোর্ট পড়তে পড়তে বয়সের কথা মনে হল। ধর্মাধর্মের কথা মনে হল। এই শেষ সমুদ্রসফর তাও মনে হল তাঁর। সারাজীবন চেষ্টা করেছেন জাহাজের সব রকমের কাজে সৎ থাকতে। এবং ভাঙ্গা জাহাজেই প্রায় সব সফর বলে তিনি জীবনে সৎ থাকা বাঞ্ছনীয় ভেবেছিলেন। যেন কোম্পানী তাঁকে ভাঙ্গা জাহাজ দিয়ে পরীক্ষা করেছিল, তুমি কেমন নাবিক দেখা যাক হে। তখন জাহাজ সাউথ সিতে, কাপ্তান ম্যানিলি অসুস্থ। তাকে কিঙস আয়াল্যান্ডে নামিয়ে দিলেই তার এসেছিল, হিগিনস জাহাজ হোমে নিয়ে যাবে। ডেক-অ্যাপ্রেন্টিস থেকে আজ পর্যন্ত যা যা উন্নতি, সব এ জাহাজেই।

    লগ-বুকের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি নুয়ে নুয়ে কি দেখছেন। বয়সের জন্য চোখে কম দেখেন। কাছের জিনিস আরও কম। চশমায় যেন কুলোয় না এমন নুয়ে নুয়ে বার বার রিপোর্টটা পড়ছেন। ভীষণ সতর্ক হয়ে যাচ্ছেন। এই যে জাহাজ কোর্স পাল্টে অন্য পোর্টে ঢুকে যাচ্ছে সব ক্ষয়ক্ষতি দেবে বীমা কোম্পানী। এদিক-ওদিক হলে দেবে না। বনির কথা লেখা থাকলে তো আর কথাই নেই। এবং এ- সময়ে মেয়েটার ওপর তিনি কেমন বিরক্ত বিব্রত এবং তালা টেনে টেনে যখন দেখলেন খুব সুরক্ষিত, কেউ পড়তে পারবে না কি লেখা আছে, তখন চীফ অফিসার ছুটে এসেছিল, লগ-বুকে এটা লেখা দরকার। কাপ্তান বলেছিলেন, আমি লিখেছি। আমার খেয়াল আছে। তিনি বনিকে বাঁচিয়ে নিজেকে বাঁচিয়ে রিপোর্ট লিখেছেন। এবং এ-সময় এত বেশি ধূর্ত মনে হল নিজেকে যে জাহাজে ঠিক কিছু অঘটন ঘটবে—যে-জাহাজ ওঁর জন্য এত করেছে, শেষ সফরে তিনি আবার তার লগ বুকে ঠিক কাপ্তানের মতো সাহসী কাজ করছেন না। দুর্বল কাপুরুষের মতো তিনি এটা কি যে করে ফেলেছেন বনির কথা ভেবে!

    আর তখনই বোধ হয় মনে হয় তিনি ক্যাপ্টেন স্যালি হিগিনস। সোজা হয়ে দাঁড়াতে চান। দু হাত ওপরে তুলে বলতে চান, আমাকে রক্ষা করুন প্রভু। আপনি মঙ্গলময়। তিনি ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করতে করতে একেবারে তখন দাসানুদাস হয়ে যান। মনেই থাকে না একটা জাহাজের ওপর অপরিসীম ক্ষমতা তাঁর। তখন বনির কথা লিখলেও কিছু আসে যায় না। নিজের কথা লিখলেও আসে যায় না। তাঁর বয়স তাঁকে নিজের ওপর আরও বেশি যেন প্রভুত্ব দিয়েছে। তিনি অবহেলায় সব কেটেকুটে যা সত্য তাই লিখলেন। জবাবদিহি তিনি গ্রাহ্য করলেন না।

    আর তখনই দেখলেন জাহাজ বন্দরে ঢুকছে। জাহাজ বাঁধাছাদা হচ্ছে। এ্যাম্বুলেন্স রেডি। ছোটবাবুকে স্ট্রেচারে নামানো হচ্ছে। ভাবলেন সঙ্গে যাওয়া দরকার। বনি এবং সেকেন্ডকে সঙ্গে ডেকে নিলেন। সারেঙ, এনজিন-বড়-টিন্ডাল যাবে। এজেন্ট-অফিসের লোক এবং একজন ডাক্তার ওর সিঁড়িতে তখন উঠে আসছে।

    একটা লেগুনের মতো সরু খালবিল যেন এ-বন্দরে ঢুকে গেছে। সমুদ্র থেকে এই লেগুন ধরে এলে দু’পাশে সব পাহাড়, এবং গাছপালা। ওরা তখন এত বেশি সবাই চিন্তিত ছিল যে এমন সুন্দর দৃশ্য কারো চোখে পড়েনি। একটা লম্বা ব্রীজ চলে গেছে দু-পাড়ের শহরের ওপর দিয়ে। লেগুনের জলে জাহাজ এস এস সিউল ব্যাঙ্ক বাঁধা। লেগুনের নীল জল, এবং দুপাশের গাছ পালা পাহাড় মিলে এ-জাহাজ কটা দিন বন্দরে কাটিয়ে দিল। হিগিনস এখানে কিছু মেরামতের কাজ সেরে নিলেন। ছোটবাবুর মাথার খুলিতে জঙ-ধরা পেরেক সামান্য ঢুকে গেছিল এবং অপারেশনের পর তাড়াতাড়ি আরোগ্য লাভে সবাই খুশি। হাসপাতালে একমাত্র এনজিন-সারেঙ এবং সেকেন্ড অফিসার বাদে কেউ যেতে পারছে না। ওরা ছোটবাবু কেমন আছে দেখতে যায়। ওরা ফিরে এলে জ্যাকের কোনো আর অস্বস্তি থাকে না। সে কখনও এত বেশি অধীর থাকে যে হাঁটতে হাঁটতে চলে যায় ব্রীজের নিচে। এবং বাদামী রঙের মানুষ, চুল কোঁকড়ানো, ঠোঁট পুরু মানুষ দেখে দেখে যখন ক্লান্ত তখনই হয়তো দূরে ব্রীজের ওপর দিয়ে সে দেখতে পায় সেকেন্ড অফিসার ডেবিড আসছে।

    তখন জেটিগুলোতে কি সব অতিকায় শব্দ, আকরিক লোহা সব জাহাজে বোঝাই হচ্ছে। এবং এমন সব অতিকায় শব্দ যে জ্যাক যতই জোরে চিৎকার করুক, কাছে না এলে ডেবিড কিছু শুনতে পায় না, অথবা তখন হয়তো কোন মোটর-গাড়ি পেছনে দাঁড়িয়ে প্যাঁক প্যাঁক করছে, জ্যাকের কানেই যাচ্ছে না, পেছনে কোন মোটর-গাড়ি থাকতে পারে, পৃথিবীতে এখন একটা খবর বাদে অন্য কোন খবর আছে সে জানে না।

    জ্যাক বলল, আমরা কবে যেতে পারব?

    —কাল।

    —সত্যি!

    জ্যাক আনন্দে ডেবিডের পিঠে ঘুসি বসিয়ে দিল।

    —ও লাগছে।

  • আওরঙ্গজেব : ব্যক্তি ও কল্পকথা

    আওরঙ্গজেব : ব্যক্তি ও কল্পকথা

    আওরঙ্গজেব

    ব্যক্তি ও কল্পকথা

    অড্রি ট্রুসকে

    অনুবাদ

    মোহাম্মদ হাসান শরীফ

    প্রকাশকাল : ফেব্রুয়ারি ২০২০

    বাংলা সংস্করণ উৎসর্গ

    আব্বাকে, তিনিই আমাকে প্রথম বাদশাহ আওরঙ্গজেব সম্পর্কে ধারণা দিয়েছিলেন।

    অনুবাদকের কথা

    এ বইটি পড়ার সময় শৈশবে শোনা একটি গল্প (‘কিস্‌সা’) মনে পড়েছিল। গল্পকার প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাসে বলেছিলেন, “বাদশাহ আওরঙ্গজেব ছিলেন ‘জিন্দা পীর।’ ভণ্ড পীরদের বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন সোচ্চার। বাদশাহি পেয়েই তিনি বাহিনী নিয়ে ছুটে গেলেন কে আসল আর কে নকল পীর তা নির্ধারণ করতে। প্রতিটি মাজারের ফটকে গিয়ে তিনবার সালাম দিলেন। মাজারের প্রধান পীরের সমাধি থেকে সালামের জবাব না এলেই তিনি শ্রমিকদের হুকুম দিতেন সেটি ভেঙ্গে ফেলতে। এভাবে মাজার ভাঙ্গতে ভাঙ্গতে তিনি এগিয়ে চললেন। সামনে পড়ল খাজা মঈনুদ্দিন চিশতির (র.) মাজার। তিনি সেখানে গিয়েও সালাম দিলেন। প্রথমবার সালামের জবাব না পেয়ে দ্বিতীয়বার দিলেন। জবাব পেলেন না। এরপর তৃতীয়বার দিলেন। তখনো জবাব পেলেন না। তখন শ্রমিকদের বললেন, ভাঙ্গো।

    শ্রমিকরা শাবল হাতে যেই মাজারের প্রাচীরে আঘাত দিতে গেছে, সাথে সাথে সমাধি থেকে প্রচণ্ড শব্দ বের হলো : ‘থামো।’

    সবাই চমকে গেল।

    বাদশাহ তখন বললেন, ‘আমি তো আপনাকে সালাম দিয়েছিলাম। আপনি জবাব দেননি।’

    কবরের ভেতর থেকে খাজা মঈনুদ্দিন চিশতি (র.) বললেন, ‘প্রথমবার তুমি যখন সালাম দিয়েছিলে, তখন আমি ওজু করছিলাম। দ্বিতীয়বার যখন সালাম দিয়েছ, তখন নামাজে দাঁড়িয়েছিলাম। আর তৃতীয়বার সালামের সময় আমি মুনাজাত করছিলাম। এজন্যই তোমার সালামের জবাব দিতে পারিনি।’

    বাদশাহ আওরঙ্গজেব অনুতপ্ত হলেন, ক্ষমা চাইলেন।

    খাজা মঈনুদ্দিন চিশতিও তাকে ক্ষমা করলেন। তবে বললেন, তুমি মাজারগুলো ভেঙ্গে ঠিক করোনি। যাদের মাজার ভেঙ্গেছ, তারা আমার কাছে নালিশ নিয়ে এসেছিল। তুমি সব মাজার আবার মেরামত করে দেবে।

    বাদশাহ সাথে সাথে রাজি হলেন। এ জন্যই ভারতের সব মাজারে দুটি তারিখ খোদাই করা আছে। একটিতে নির্মাণের সময়, আরেকটি বাদশাহ আওরঙ্গজেবের সংস্কারের তারিখ।

    কাহিনীটি আমার মনে গেঁথে ছিল। এ ধরনের লোক সম্পর্কে আগ্রহ থাকাই স্বাভাবিক। ফলে বইটি যখন অনুবাদ করার প্রস্তাব এলো, সাথে সাথে গ্রহণ করেছি। পড়ে মুগ্ধ হয়েছি। ফলে অনুবাদটি পরিশ্রমের কাজ মনে হয়নি, শেখার একটি পর্ব বিবেচনা করেছি।

    আওরঙ্গজেব প্রবল বৈপরীত্যপূর্ণ ও ধাঁধাময় এক ব্যক্তিত্ব। অনেকে তাকেই মোগল সাম্রাজ্যের পতনের জন্য দায়ী করেন। অথচ তিনিই মোগল সাম্রাজ্যকে সর্বোচ্চ মাত্রায় সম্প্রসারিত করেছিলেন। আওঙ্গজেবকে হিন্দুবিদ্বেষী মনে করা হয়। অথচ তার আমলেই হিন্দুরা মোগল মসনবে সর্বোচ্চ সংখ্যায় নিয়োগ পেয়েছিল। তাকে খাঁটি মুসলিম মনে করা হয়। অথচ তার আমলেই ইসলামি অনেক অনুষ্ঠানের ওপরও বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছিল। তিনি বিশ্বের বৃহত্তম মসজিদটি নির্মাণ করেছিলেন, অথচ নিজের কবরের জন্য অচিহ্নিত একটি স্থান বেছে নিয়েছিলেন।

    লেখক জানিয়েছেন, এই জীবনী রচনা করা হয়েছে ঐতিহাসিক ব্যক্তি ও সম্রাট আওরঙ্গজেব আলমগির সম্পর্কে আমাদের মধ্যে বিরাজমান খুবই হালকা জ্ঞানের গভীরতা বাড়ানোর জন্য। বইটি পড়লে সত্যিই আমাদের জ্ঞান বাড়বে। সবচেয়ে বড় কথা হলো, আওরঙ্গজেব সম্পর্কে জানার আগ্রহ নতুন করে বাড়বে।

    এ গ্রন্থটি একটি রাজনৈতিক প্রপাগান্ডাকে গুঁড়িয়ে দেওয়া পরিমিত, অতিরঞ্জনহীন ভাষ্য। এ বই প্রমাণ করে যে আওরঙ্গজেব এমন মানুষ ছিলেন যিনি অবশ্যই অনেক ভুল করেছেন, তবে এমন কেউ তিনি নন যার নিন্দা করতে হবে অন্ধভাবে।

    উপমহাদেশের ইতিহাস, রাজনীতি, সমাজবিজ্ঞান, অর্থনীতি নিয়ে যারা ভাবেন, তাদের জন্য এটি একটি অমূল্য গ্রন্থ। বিশেষ করে বর্তমান ভারতে আওরঙ্গজেবকে নিয়ে তীব্র সমালোচনা চলতে থাকায় তাকে জানার গুরুত্ব বেড়ে গেছে। বইটি বড় নয়। ছোট্ট পরিসরের মধ্যেই কেবল আওরঙ্গজেববেই নয়, মোগল ইতিহাসকেই তুলে আনা হয়েছে। আওরঙ্গজেব হয়ে ওঠেছেন মোগল ইতিহাসের মধ্যমণি।

    মুখবন্ধ

    এ বইটির লেখা সূচনা হয়েছিল একটি টুইটার বার্তার মাধ্যমে। আমার কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল যে মোগল সম্রাটদের কোনো একজনের ওপর একটি সহজবোধ্য গ্রন্থ লিখব কিনা। আলোচনা শিগগিরই ইমেইলে স্থানান্তরিত হলো, আমি বিষয় হিসেবে বেছে নিলাম আওরঙ্গজেব আলমগিরকে। এই বই সামাজিক মাধ্যমের মাধ্যমে প্রথম সূত্রবদ্ধ হওয়াই ছিল যথার্থ। কারণ আধুনিক ভারতকে ছেয়ে ফেলা আওরঙ্গজেব জ্বর প্রায়ই টুইটার ও ফেসবুকের মতো ফ্লাটফর্মে সবচেয়ে বেশি বিস্তার লাভ করে। এই সংক্ষিপ্ত জীবনীতে আমি লোকরঞ্জক সংস্কৃতিতে আওরঙ্গজেব নিয়ে প্রকম্পমান ও অব্যাহত উপস্থিতির জবাব দিয়েছি। অবশ্য একজন ইতিহাসবিদের দৃষ্টিকোণ থেকে বলা যায়, আওরঙ্গজেব হলেন প্রথম ও প্রধানতম মোগল সম্রাট যার সম্পর্কে বেশির ভাগ লোক জানে দুঃখজনকভাবে কম। এই বই তার সব জটিলতা নিয়েই ঐতিহাসিক আওরঙ্গজেবকে পরিচিত করার চেষ্টা করা হয়েছে বৃহত্তর পাঠকগোষ্ঠীর কাছে।

    তথ্যপ্রবাহ ও সহজ পাঠের জন্য বইটি পাদটীকা ছাড়াই উপস্থাপন করা হয়েছে। আওরঙ্গজেবের জীবন ও শাসন কৌশল এমনিতেই জটিল বিষয়, এতে পাদটীকা যোগ করা হলে তা আরেকটি বাধা হিসেবে আবির্ভূত হবে। যেসব পাঠক আমার সূত্রগুলো জানতে আগ্রহী, তারা সেগুলো পাবেন জীবনমূলক প্রবন্ধ ও নোটের অংশে। পুনশ্চ তাদের কাছে ভালো লাগবে যারা ইতিহাসবিদেরা কিভাবে অতীত নিয়ে চিন্তা করেন এবং প্রাক-আধুনিক সূত্রগুলো বিশ্লেষণ করেন তা জানতে আগ্রহী।