Tag: কাজী নজরুল ইসলামের কাব্য

  • ফণী-মনসা

    ফণী-মনসা

    ফণী-মনসা

    ‘ফণী-মনসা’ ১৩৩৪ বঙ্গাব্দের শ্রাবণ মুতাবিক ১৯২৭ খৃষ্টাব্দের জুলাই মাসে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। প্রকাশক ছিলেন কবি নিজেই, যদিও ঠিকানা ছাপা হয়েছিল ‘বর্মণ পাবলিশিং হাউসের’, ১৯৩ কর্ণওয়ালিশ ষ্ট্রীট, কলিকাতা। পৃষ্ঠা সংখ্যা ৫৪, মূল্য পাঁচ সিকা।

    ‘সব্যসাচী’ ২৩শে পৌষ ১৩৩২ মুতাবিক ৭ই জানুয়ারি ১৯২৬ তারিখে ‘লাঙলে’ প্রকাশিত হয়েছিল।

    ‘দ্বীপান্তরের বন্দিনী’ ১৭ই মাঘ ১৩৩২ তারিখে ৫ম বর্ষের ১০ম সংখ্যক ‘বিজলী’তে ‘বন্দিনী’ শিরোনামে বের হয়েছিল।

    ‘আশীর্বাদ’ শামসুন নাহারের ‘পুণ্যময়ী’ পুস্তকের ‘প্রশস্তি’।

    ‘সাবধানী ঘণ্টা’ ১৩৩১ কার্তিকের কল্লোলে ‘সর্বনাশের ঘণ্টা’ শিরোনামে প্রকাশিত হয়েছিল। এ সম্পর্কে অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত লিখিয়াছেন—

    “মনে আছে এই কবিতা নজরুল কল্লোল আপিসে বসে লিখেছিল একবৈঠকে।”

    [কল্লোল যুগ, ৮৯ পৃষ্ঠা]

    ‘শনিবারের চিঠি’তে ‘আমি ব্যাঙ’ কবিতাটি প্রকাশিত হলে নজরুল ইসলাম তা মোহিতলাল মজুমদারের রচনা বলে মনে করেন। তাই প্রতিক্রিয়ায় ‘কল্লোল’ পত্রিকায় (কার্তিক ১৩৩১) তিনি লেখেন ‘সর্বনাশের ঘণ্টা’।

    ‘সর্বনাশের ঘণ্টা’ অনেক স্থানে পরিবর্তিত হয়ে গ্রন্থভুক্ত হয়েছে। মূল কবিতাটি নিম্নে সম্পূর্ণ উদ্ধৃত হল।

    সর্বনাশের ঘণ্টা

    রক্তে আমার লেগেছে আবার সর্বনাশের নেশা।

    রুধির-নদীর পার হতে ঐ ডাকে বিপ্লব-হ্রেষা।

    হে দ্রোণাচার্য! আজি এই নব জয়যাত্রার আগে

    দ্বেষ-পঙ্কিল হিয়া হতে তব শ্বেত পঙ্কজ মাগে

    শিষ্য তোমার, দাও গুরু দাও তব রূপ-মসি ছানি’

    অঞ্জলি ভরি শুধু কুৎসিত কদর্যতার গ্লানি।

    তোমার নীচতা ভীরুতা তোমার, তোমার মনের কালি

    উদ্‌গারো গুরু শিষ্যের শিরে, তব বুক হোক খালি।

    বন্ধু গো! গুরু! দূষিত দৃষ্টি দূর করো, চাহ ফিরে,

    শয়তানে আজ পেয়েছে তোমায়, সে যে পাঁক ঢালে শিরে!

    চিরদিন তুমি যাহাদের মুখে মারিয়াছ ঘৃণা-ঢেলা,

    যে ভোগানন্দ দাসেদের গালি হানিয়াছ দুই বেলা,

    আজ তাহাদেরি বিনামার তলে আসিয়াছ তুমি নামি

    বাঁদরেরে তুমি ঘৃণা করে ভালবাসিয়াছ বাঁদরামি।

    হে অস্ত্রগুরু! আজি মম বুকে বাজে শুধু এই ব্যথা,

    পাণ্ডবে দিয়া জয়-কেতু, হলে কুক্কুর-কুরু-নেতা।

    ভোগ-নরকের নারকীর দ্বারে হইয়াছ তুমি দ্বারী

    ব্রহ্ম-অস্ত্র ব্রহ্ম-দৈত্যে দিয়া, হে ব্রহ্মচারী!

    তোমার কৃষ্ণ-রূপ-সরসীতে ফুটেছে কমল কত

    সে কমল ঘিরি নেমেছে মরাল কত সহস্র শত।

    কোথা সে দিঘীর উচ্ছল জল কোথা সে কমল রাঙা;

    হেরি শুধু কাদা শুকায়েছে জল, সরসীর বাঁধ ভাঙা!

    সেই কাদা মাখি চোখে-মুখে তুমি সাজিয়াছ ছি ছি সং,

    বাঁদর-নাচের ভালুক হয়েছ; হেসে মরি দেখে ঢং!

    অন্ধকারের বিবর ছাড়িয়া বাহিরিয়া এস গুরু,

    হেরো দিবালোকে—বাঁদরের বেদে কেটেছে গুম্ফ ভুরু।

    মিত্র সাজিয়া শত্রু তোমারে ফেলেছে নরকে টানি,

    ঘৃণার তিলক পরাল তোমারে স্তাবকের শয়তানি।

    যাহারা তোমারে বাসিয়াছে ভাল, করিয়াছে পূজা নিতি,

    তাহাদের হানে অতি লজ্জার ব্যথা আজ তব স্মৃতি।

    নপুংসক ঐ শিখণ্ডী আজ রথের সারথি তব—

    হানো বীর তব বিদ্রূপ-বাণ, সব বুক পেতে লব

    ভীষ্মের সম, যদি তাহে শর-শয়নের বর লভি;

    তুমি যত বল, আমিই সে রণে জিতিব অস্ত্র-কবি!

    তুমি জানো, তুমি সম্মুখ-রণে পারিবে না পরাজিতে,

    আমি তব কাল যশোরাহু সদা শঙ্কা তোমার চিতে।

    রক্ত অসির কৃষ্ণ মসির যে কোনো যুদ্ধে, গুরু,

    তুমি নিজে জানো তুমি অশক্ত, তাই করিয়াছ শুরু

    চোরা-বাণ ছোঁড়া বেল্লিকপনা বিনামা-আড়ালে থাকি,

    ন্যক্কার-আনা নপুংসকেরে রথ-সম্মুখে রাখি।

    হেরো গুরু আজ চারিদিকে হতে ধিক্কার অবিরত

    ছি ছি বিষ ঢালি জ্বালায় তোমার পুরানো প্রদাহ-ক্ষত।

    আমারে যে সবে বাসিয়াছে ভাল মোর অপরাধ নহে।

    কালীয়-দমন উদিয়াছে মোর বেদনার কালিদহে।

    তাহার সে দাহ তোমারে দহেনি, দহেছে যাদের মুখ

    তাহারা নাচুক জ্বলুনির চোটে। তুমি পাও কোন্ সুখ

    দগ্ধ-মুখ সে রাম-সেনাদলে নাচিয়া হে সেনাপতি!

    শিব-সুন্দর-সত্য তোমার লভিল এ কি এ গতি?

    যদিই অসতী হয় বাণী মোর, কালের পরশুরাম

    কঠোর কুঠারে নাশিবে তাহারে, তুমি কেন বদনাম

    কিনিতেছ গুরু! কেন এত তব হিয়া-দগ্‌দগি জ্বালা?

    হোলির রাজা কে সাজাল তোমারে পরায়ে বিনামা-মালা?

    তোমার গোপন দুর্বলতারে, ছি ছি করে মসীময়

    প্রকাশিলে গুরু, এই খানে তব অতি বড় পরাজয়।

    তুমি ভিড়িও না গো-ভাগাড়ে-পড়া চিল-শকুনের দলে,

    শতদল-দলে তুমি যে মরাল শ্বেত-সায়রের জলে।

    ওঠ গুরু, বীর, ঈর্ষা-পঙ্ক-শয়ন ছাড়িয়া পুন,

    নিন্দার নহ, নান্দীর তুমি, উঠিতেছে বাণী শুন!

    উঠ গুরু উঠ, লহ গো প্রণাম, বেঁধে দাও হাতে রাখি,

    ঐ হেরো শিরে চক্কর মারে বিপ্লব-বাজপাখি।

    অন্ধ হয়ো না, বেত্র ছাড়িয়া নেত্র মেলিয়া চাহ—

    ঘনায় আকাশে অসন্তোষের বিদ্রোহ-বারিবাহ।

    দোতালায় বসি উতলা হয়ো না শুনি বিদ্রোহ-বাণী,

    এ নহে কবির, এ কাঁদন ওঠে নিখিল-মর্ম ছানি।

    বিদ্রূপ করি উড়াইবে এই বিদ্রোহ-তেতো জ্বালা

    সুরের তোমরা, কি করিবে তবু হবে কান ঝালাপালা

    অসুরের ভীম অসি-ঝনঝনে, বড় অসোয়াস্তি-কর!

    বন্ধু গো এত ভয় কেন? আছে তোমার আকাশ-ঘর!

    অর্গল এঁটে সেথা হতে তুমি দাও অনর্গল গালি,

    গোপীনাথ মলো? সত্য কি? মাঝে মাঝে দেখো তুলি জালি।

    বারীন ঘোষের দ্বীপান্তর আর মির্জাপুরের বোমা,

    লাল বাংলার হুমকানি,—ছি ছি এত অসত্য ও মা,

    কেমন করে যে রটায় এ সব ঝুটা বিদ্রোহী দল!

    সখা গো আমায় ধরো ধরো! মা গো, কত জানে এরা ছল!

    সই লো আমার কাতুকুতু-ভাব হয়েছে যে, ঢলে পড়ি!

    আঁচলে জড়ায়ে পা চলে না আর, হাত হতে পড়ে ছড়ি!

    শ্রমিকের গাঁতি বিপ্লব-বোমা, আ ম’লো তোমরা মরো!

    যত সব বাজে বাজখাঁই সুর, মেছুনি-বৃত্তি ধরো!

    যারা করে বাজে দুখভোগ ত্যাগ, আর রাজরোষে মরে,

    ঐ বোকাদের ইতর ভাষায় গালি দাও খুব করে।

    এই ইতরামি বাঁদরামি-আর্ট আষ্ঠেপৃষ্ঠে বেঁধে

    হন্যে কুকুর পেট পালি আর হাউ হাউ মরি কেঁদে।

    এই শয়তানি করে দিনরাত বলো আর্টের জয়!

    আর্ট মানে শুধু বাঁদরামি আর মুখ-ভ্যাংচানো নয়!

    আপনার নাক কেটে দাদা এই পরের যাত্রা ভাঙা,

    ইহাই হইল আদর্শ আর্ট, নাকি-সুর, কান-রাঙা!

    আর্ট ও প্রেমের এই সব মেড়ো মাড়োয়ারি দলই জানে,

    কোনো বিদ্রোহ অসন্তোষের রেখা নাই কোনখানে!

    সব ভুয়ো দাদা, ও-সবে দেশের কিছুই হইবে নাকো,

    এমনই করিয়া জুতো খাও আর মলমল-মল মাখো!

    জ্ঞান-অঞ্জন-শলাকা তৈরি হতেছে এদের তরে,

    দেখিবে এদের আর্টের আঁটুনি একদিনে গেছে ছুঁড়ে!

    বন্ধু গো! গুরু! আঁখি খোলো, খোলো শ্রবণ হইতে তুলা,

    ঐ হেরো পথে গুর্খা-সেপাই উড়াইয়া যায় ধূলা!

    ঐ শোনো আজ ঘরে ঘরে কত উঠিতেছে হাহাকার,

    ভূধর প্রমাণ উদরে তোমার এবার পড়িবে মার!

    তোমার আর্টের বাঁশরির সুরে মুগ্ধ হবে না এরা,

    প্রয়োজন-বাঁশে তোমার আর্টের আর্টশালা হবে নেড়া!

    প্রেমও আছে গুরু, যুদ্ধও আছে, বিশ্ব এমনই ঠাঁই,

    ভাল নাহি লাগে, ভাল ছেলে হয়ে, ছেড়ে যাও, মানা নাই!

    আমি বলি— গুরু, বলো তাহাদেরে কোন বাতায়ন-ফাঁকে

    সজিনার ঠ্যাঙা সজনিরই মত হাতছানি দিয়ে ডাকে!

    যত বিদ্রুপই করো গুরু, তুমি জান এ সত্য-বাণী,

    কারুর পা চেটে মরিব না; কোনো প্রভু পেটে লাথি হানি

    ফাটাবে না পিলে; মরিব যেদিন মরিব বীরের মত,

    ধরা-মা’র বুকে আমার রক্ত রবে হয়ে শাশ্বত।

    আমার মৃত্যু লিখিবে আমার জীবনের ইতিহাস—

    ততদিন সখা সকলের সাথে করে নাও পরিহাস!

    ‘সর্বনাশের ঘণ্টা’ কবিতার উত্তরে পরলোকগত কবি মোহিতলাল মজুমদার ৮ই কার্তিক ১৩৩১ তারিখের সাপ্তাহিক ‘শনিবারে চিঠি’র বিশেষ বিদ্রোহ সংখ্যায় তার জবাব দেন ‘দ্রোণ-গুরু’ কবিতায়। নিম্নে কবিতাটি সম্পূর্ণ উদ্ধৃত হল—

    দ্রোণ-গুরু

    [কুরুক্ষেত্র-যুদ্ধকালে দ্রোণাচার্য কুরু সেনাপতি পদে অভিষিক্ত হইলে, তিনি প্রাচীন ও অকর্মণ্য বলিয়া দ্রোহ-বিদ্বেষী কর্ণের বিদ্বেষ আরও বাড়িয়া যায়। এদিকে দ্রোণ-শিষ্য অর্জুনের কৃতিত্বও ক্রণের দুঃসহ হইয়া ওঠে। এই বিদ্বেষের কথা মহাভারতে উল্লিখিত আছে। কিন্তু নিম্নলিখিত ঘটনাটির কথা মূল মহাভারতে নাই। কর্ণাটদেশে প্রচলিত মহাভারতের তামিল-সংস্করণের একটি গাধা অবলম্বনে এই কবিতা রচিত হইয়াছে। দ্রোণাচার্যের মনে অর্জুনের প্রতি আন্তরিক স্নেহ নষ্ট করিবার জন্য, এবং তাঁহার উপর যাহাতে গুরুর নিদারুণ অভিশাপ বর্ষিত হয় এই উদ্দেশ্যে, অর্জুন কর্তৃক লিখিত বলিয়া একখানি গুরুদ্রোহসূচক কুৎসাপূর্ণ পত্র দ্রোণাচার্যের নিকট প্রেরিত হয়। বলা বাহুল্য, এই কৌশল সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হইয়াছিল।]

    কি বলিস তুই অশ্বত্থামা! আমি মরে যাই লাজে!

    আমি ব্রাহ্মণ, তবু বলিব না—ক্ষত্রিয়কুল-মাঝে

    হেন কাপুরুষ আছে কোনো ঠাঁই—ভীরু, আত্মম্ভরি—

    মিথ্যা দম্ভ গর্বের ভরে আপনারে বড় করি

    আপনার পূজা ষোড়শোপচারে মাগে যে গুরুর কাছে!

    অনুষ্ঠানের ত্রুটি পাছে হয়, সদা সেই ভয় আছে!—

    তাহারি লাগিয়া আক্রোশ করি শিষ্য হইয়া বীর

    বন্যবরাহ হনন করা সে ঘৃণ্য ব্যাধের তীর

    চিৎকার সহ নিক্ষেপ করে বাতাসের সনে রণ—

    বলে পাণ্ডব—কৌরব-গুরু আমি সে প্রিয়জন।

    পাণ্ডব সেকি? কোন পাণ্ডব? কে বা সে ছন্নমতি?

    আমার নিকটে অস্ত্রশিক্ষা!—হায় একি দুর্গতি!

    বলে, সে পার্থ!—কৃষ্ণ-সারথী! নব-অবতার নর!

    মহাবিপ্লব যুগান্তরের নবীন য]পদের সভাতলে,

    মুগ্ধ হইল লক্ষ্যভেদের অপূর্ব কৌশলে;

    যার বীরত্বে বিস্মিত নিজে শঙ্কর ত্রিপুরারি—

    দানিল দিব্য পাশুপত যারে দানবদহনকারী,

    যার প্রতিভায় ব্রাহ্মণ-দ্রোণ ব্রহ্মণ্যের চেয়ে

    মানিয়াছে বড় ক্ষাত্র-মহিমা শিষ্য যাহারে পেয়ে,

    —এই লিপি তার!—অশ্বত্থামা! হয়েছিস উন্মাদ?

    কি কথা বলিস? কে শুনালে তোরে এ হেন মিথ্যাবাদ?

    —অর্জুন?—আরে ছিছি, ছিছি ছিছি! তার হেন দুর্মতি!

    তার মুখে হেন অনার্য-বীণা!—আপন গুরুর প্রতি,

    মিথ্যা রটনা—এই অপবাদ মিথ্যার অভিনয়ে

    পটু হবে সেই! অসি ছেড়ে শেষে মসির পাত্র লয়ে

    —ছিটাইছে কালি, রণ-অঙ্গনে অঙ্গনা-রীতি ধরে!—

    রমণীর মত বাতাসে ভেজায়ে কোন্দল শুরু করে!

    বিরাটপুরীর অজ্ঞাতবাসে বৃহন্নলার কথা

    মনে আছে বটে—অকীর্তিকর!—সেথাকার বাচালতা

    পুরন্ধ্রীদের কুৎসা-কলহ, সেই নট-নটী লীলা

    স্বভাব নষ্ট করেছিল বুঝি? আজো অন্তঃশীলা

    নপুংসকের বিকৃত শোণিত কিণাঙ্ক-করমূলে

    বহিছে নাড়িতে? হায়, হতভাগ্য এখনো যায়নি ভুলে।

    গুরুনিন্দার পাতকের ভয় এতটুকু মনে নাই।

    আজ তুমি বড়! গুরুমারা চোর! তুমি মহাবীর, তাই

    এটা ক্ষুদ্র মশকের হুল সহিতে পারো না তুমি!

    —অত্যাচারীর খড়্‌গ ভাঙিবে, রাখিবে ভারত-ভূমি!

    হুলের আঘাতে, কুরুক্ষেত্রে ফেলে দিয়া গাণ্ডীব,

    রথ হতে নামি মৃত্তিকা ’পরে মাথা ঠোকে ঢিব্ ঢিব্!

    নারায়ণী-সেনা হাসিছে অদূরে, রঙ্গ দেখিছে তারা,

    আমার মাথা যে হেঁট হয়ে যায়, পশ্চিমে ঐ কারা—

    ফেরুপাল বুঝি—হর্ষিত চিতে চিৎকার করি ওঠে,

    সূর্যের মুখে অস্তমলিন হাসি বুঝি ঐ ফোটে।

    ***

    কেন তোর এই অধঃপতন বল্ দেখি, ফাল্গুনি!

    এই বিদ্বেষ ঈর্ষার জ্বালা কার তরে বল্ শুনি?

    আমি গুরু তোর, একা তোরি গুরু?—আর কেহ নাহি রবে?

    আজিকার এই সমরাঙ্গনে যদি কেউ যশ লভে—

    রণ-কৌশলে আর কেহ যদি আমারে প্রণাম করি

    দূর হতে পায় আমারি শিক্ষা-সাধনার কারিগরি—

    ধর্মক্ষেত্রে সে কি অধর্ম? তোমারি হইবে জয়?

    তোমার দর্পে আর কেহ যদি হেসে কুটি-কুটি হয়,

    সে কি তা মহা ধর্ম-দ্রোহ?—হয় যদি তাই হোক,

    তার লাগি মোর অপরাধ কিবা—কেন তায় এত শোক!

    আজ দেখিতেছি, একদিন সেই নিষাদের নন্দনে

    করেছুনু ঘোর অবিচার আমি মমতা অন্ধ মনে।—

    তোমারি লাগিয়া অঙ্গুলি তার চেয়েছিনু দক্ষিণা,

    সে পাপের সাজা কেবা দিবে আর ক্রুর অর্জুন বিনা

    আজ পুনারায় নবধানুকীর অঙ্গুলি কাটি লয়ে

    পাঠাতাম যদি তোমার সকালে—হর্ষে ও বিস্ময়ে

    গুরুদেব বলি কত বাখানিতে বৃদ্ধের বীরপনা!

    সে আর হবে না আর করিব না ধর্মের বঞ্চনা।

    এতকাল ধরি দিয়াছ যে গুরু-ভক্তির পরিচয়,

    সেই ভাল ছিল, তার বেশি এ যে হয়ে গেল অতিশয়!

    মনে ভেবে দেখো, কিবা মানে তার, কি বুঝিবে রাজগণ,—

    ধিক্কারে আজ মুখরিত হল কুরুদের প্রাঙ্গণ।

    ***

    না—না, না—না, না—না, একি এ প্রলাপ বকিতেছি বারবার!

    অশ্বত্থামা! ফের পড়, লিপি,—হয়নি পরিষ্কার!

    মোর প্রাণাধিক প্রিয়তম সেই কিরীটীর নহে লিপি,

    এ লিখেছে কোন কুলশীলহীন পরের প্রসাদজীবী!

    লেখার মাঝারে ওঠে না ফুটিয়া সেই মনোহর মুখ,

    আজানু-দীর্ঘ সেই বাহু তার, বিরাট বিশাল বুক!

    হ্রস্ব খর্ব এ কোন বামন উপানৎ পরি উঁচা

    হইবারে চায়, চুরি করা চূড়া মাথায় বেঁধেছে ছুঁচা!

    অর্জুন নিজে শ্যাম-কলেবর—কৃষ্ণের সখা সে যে!

    সে কি ঘৃণা করে কৃষ্ণবরণ? বধূ কৃষ্ণার তেজে

    বাহুতে বীর্য, বক্ষে জাগিল যৌবন-ব্যাকুলতা—

    সে করেছে গ্লানি মসীরূপ বলি? সম্ভব নহে কথা!

    এ কোন শবর কিরাতের গালি, অনার্য জাতি-চোর!

    নকল কুলীন! বর্ণ-গর্বে কুৎসা রটায় মোর!

    হয়েছে! হয়েছে! অশ্বত্থামা! জেনেছি এতক্ষণে—

    বীরকুলগ্লানি সেই নিন্দুকে এবার পড়েছে মনে!

    আমি ব্রাহ্মণ, চির-উজ্জ্বল ব্রাহ্মণ্যের শিখা

    ললাটে আমার মিথ্যা-দহন জ্বলে যে সত্যটীকা।

    রাজসভাতলে জনগণমাঝে করি না যে বিচরণ;

    পথ-কুক্কুর নীচ-সহবাস ত্যাজিয়াছি প্রাণপণ।

    তবু যে আমার ধনু নির্ঘোষে টঙ্কার-ঝঙ্গারে

    নিজে গায়ত্রী-ছন্দ-জননী আসিয়া দাঁড়ান দ্বারে।

    আমরা পর্ণ-কুটিরের তলে রাজার দুলাল বীর—

    গড্ডলিকার দল নহে—আসি মাটিতে নোয়ায় শির!

    আমি সাধিয়াছি আর্য-সাধনা-সনাতন সুন্দর!—

    যে-মন্ত্র-বলে শাশ্বতীসমা সদ্‌গতি লভে নর!

    ত্যাজি অনার্য-সৃষ্টপন্থা, অন্ত্যজ-অনাচার,

    ক্ষত্রিয় সাজি ক্ষত্রিয়ে দিছি ব্রাহ্মণ-সংস্কার।

    কর্ণপটহ বিদারণ করি, বিদারিয়া নভোতল।

    পথে পথে ফিরি ইতরের সাথে করি নাই কোলাহল

    যুগ-ধর্মের সুযোগ বুঝিয়া চির-সত্যের গ্লানি

    করি নাই কভু,—যশোলিপ্সার—স্বার্থের আপসানি!

    নিজ হৃদয়ের পুরীষ-পঙ্ক দুই হাতে ছড়াইয়া

    যুগবাণী বলি, ধ্রুব-শাশ্বত পদতলে গুঁড়াইয়া,

    যত মূর্খ ও ষণ্ডমার্কে ভক্তশিষ্য করি,

    এই দেবতার দিবারে করিনি পিশাচের শর্বরী!

    জানিস্ বৎস, কোন মহারথী—এ কোন নূতন গ্রহ,

    মোর সাথে চির-শত্রুতা মানি, বিদ্বেষ দুঃসহ

    পুষিয়াছে মনে?—বৈরী সে, যথা কৃষ্ণের শিশুপাল!—

    সত্যের এই মিথ্যা-বৈরী যুগে যুগে চিরকাল?

    আজ আসিয়াছে নূতন ছদ্মে শিষ্যের সাজ পরি—

    গুরু-শিষ্যের ভক্তি ও স্নেহ কুৎসার লবে হরি!

    চিনেছি তোমারে হে কপটচারী দাম্ভিক দুর্জন!

    বক্ষের মণি অর্জুন নও—পাদুকার অর্জুন!

    বীর সে পার্থ আর্ত হয় না স্বার্থের সঙ্কোচ,

    —গুরুহত্যার পাতকের ভয়ে ললাটের স্বেদ মোছে!

    ব্রজ-আঘাতে হয় না কাতর বীর সে সব্যসাচী—

    তারে কাবু করে গোটা দুই তিন বাতাসের মশা-মাছি!

    তাহারি কারণে উন্মাদ হয়ে করিবে সে গুরুদ্রোহ!

    একি পাপ! একি অহংকারের নিদারুণ সম্মোহ!

    সে কি পাণ্ডব! দ্রোণের শিষ্য ক্ষত্রিয়-চূড়ামণি!—

    খুলে ফেল্ তোর ক্ষত্রিয়-বেশ, ওরে পাণ্ডব-শনি!

    রাধেয় কর্ণ পরিচয় তোর। আর যাহা পরিচয়—

    গুরু ভার্গবে প্রতারণা করি সেজেছিলি শ্রোত্রিয়!

    সেই কীট তোরে ছাড়িল না আজও। সেদিন পড়িলি ধরা

    দংশন সহি।—আজ বিপরীত—হলি যে অর্ধমরা!

    জমদগ্নির অভিশাপ বহি পলায়ে আসিলি চোর!

    জাতি আপনার লুকাতে নারিলি, লজ্জা নাহি যে তোর!

    দ্রোণ-গুরু নয়, সার্থক তোর গুরু সে পরশুরাম—

    বিস্ময় মানি দম্ভে তোমার—রেখেছ গুরুর নাম!

    ***

    ওরে নির্ঘ্‌ণ! আপনি আপন বিষ্ঠার পর্বতে

    চড়ি বসিয়াছ—মনে করিয়াছ আঁধারিবে হেন মতে

    সবিতার মুখ! ঘোর যশো-রবি-রাহু হতে সাধ যায়!

    আরে, আরে, তোর সম্পর্ধায় দেখি জোনাকিও লাজ পায়!

    কেমনে আনিলি হেন কথা মুখে? যজ্ঞের হবিটুকু

    সন্তর্পণে রাখিয়াছি ঢেকে, তাও হেরি চাকু-চুকু

    করিয়া লেহন, সাধ যায়—সেথা উগারিতে একরাশি

    অমেধ্য যে সব উদরে রাজিছে—কতকালকার বাসি,

    চুরি করা যত গরহজমের!—পথে প্রান্তরে যার

    সৌরভ পেয়ে এতদিন পরে ভরিয়াছে সংসার

    লালা ও পঙ্কবিলাসীর দল—শবভুক নিশাচর,

    শকুনি, গৃধিনী, শৃগালের পাল—রসনা-তৃপ্তিকর

    পাইয়াছ ভোজ! ভাবিয়াছ বুঝি সেই রস উপাদেয়?

    দেব-যজ্ঞের আহুতি সে ঘৃত সোমরস হবে হেয়?

    উন্মাদ—তুই উন্মাদ! তাই পতনের কালে আজ

    বিষ-বিদ্বেষ উথলি উঠেছে, নাই তোর ভয় লাজ!

    আমারে করেছে কুরু-সেনাপতি কৌরব-নৃপমণি,

    তাই হিংসায় পুরীষ-ভাণ্ডে মাছি ওঠে ভনভনি!

    তাই তাড়াতাড়ি পার্থের নামে কুৎসার ছল ধরে

    তারি নামে লিপি পাঠালি আমারে কুৎসিত গালি ভরে

    আমি ব্রাহ্মণ, দিব্যচক্ষে দুর্গতি হেরি তোর—

    অধঃপাতের দেরি নাই আর, ওরে হীন জাতি-চোর!

    আমার গায়ে যে কুৎসার কালি ছড়াইলি দুই হাতে—

    সব মিথ্যার শাস্তি হবে সে এক অভিসম্পাতে,

    গুরু ভার্গব দিল যা তুহারে! ওরে মিথ্যার রাজা।

    আত্মপূজার ভণ্ড পূজারী! যাত্রার বীর সাজা

    ঘুচিবে তোমার, মহাবীর হওয়া মর্কট-সভাতলে!

    দুর্দিনের এই মুখোশ-মহিমা তিতিবে অশ্রুজলে!

    অভিশাপরূপী নিয়তি করিবে নিদারুণ পরিহাস

    চরমক্ষণে মেদিনী করিবে রথের চক্র গ্রাস!

    মিথ্যায় ভুলি যে মহামন্ত্র গুরু দিয়েছিল কানে,

    বড় প্রয়োজনে পড়িবে না মনে, সে বিফল সন্ধানে

    নিজেরি অস্ত্র নিজেরে হানিবে—শেষ হবে অভিনয়,

    এতদিন যাহা নেহারি সকলে মেনেছিল বিস্ময়!

    ‘বিদায়-মাভৈ’ ১৩৩০ চৈত্রের ‘প্রবাসী’তে এবং ‘বাংলার মহাত্মা’ ১৩৩২ জ্যৈষ্ঠে ৫ম বর্ষের ২৬শ সংখ্যক ‘বিজলী’তে প্রকাশিত হয়েছিল।

    ‘অশ্বিনীকুমার’ ২১শে মাঘ ১৩৩২ মুতাবিক ৪ঠা জানুয়ারি ১৯২৬ তারিখে ‘লাঙল’ পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল। রবিশালের কর্মযোগী অশ্বিনীকুমার দত্তের মৃত্যুতে এই শোক-কবিতা রচিত।

    ‘ইন্দু-প্রয়াণ’ কবিতাটির ২৪শ চরণ কবিপত্নী প্রমীলা নজরুল ইসলাম কর্তৃক প্রকাশিত সংস্করণে মুদ্রিত আছে এইরূপ—

    এবারে হে কবি করিব পূর্ণ এ চির-কবি পুরে! …

    এই পঙ্‌ক্তিটি প্রথম সংস্করণে ছিল এইরূপ—

    এবার হে কবি করিব পূর্ণ ঐ চির-কবি পুরে! …

    ‘দিল-দরদী’ ১৩২৮ আশ্বিনের ‘মোসলেম-ভারতে’ প্রকাশিত হয়েছিল। তাতে কবিতার শেষ দুই চরণ ছিল এরূপ—

    বাদশা কবি! সালাম জানায় বুনো তোমার ছোট্ট ভাই!

    কইতে গিয়ে অশ্রুতে মোর যায় ডুবে যায় সব কথাই।

    কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত ১৩২৯ বঙ্গাব্দের ১০ই আষাঢ় মুতাবিক ১৯২২ খৃষ্টাব্দের ২৫শে জুন রাত্রি ২৷৷৹ (আড়াইটায়) দুরন্ত ব্রঙ্কাইটিস্ রোগে দেহত্যাগ করেন। তাঁর স্মরণে নজরুল ইসলাম ১৩২৯ শ্রাবণে দ্বিতীয় বর্ষ ৩৩শ সংখ্যক ‘বিজলী’তে লেখেন ‘সত্যেন্দ্র-প্রয়াণ’ কবিতা।

    ‘সত্য-কবি’ ভারতী পত্রিকায় ‘কবি সত্যেন্দ্র’ শিরোনামে এবং ‘সত্যন্দ্র-প্রয়াণ-গীতি’ মাসিক বসুমতীতে ‘প্রত্য-প্রয়াণ-গীতি’ শিরোনামে প্রকাশিত হয়। ‘ভারতী’ হতে ‘কবি সত্যেন্দ্র’ ১৩২৯ আষাঢ়ের ‘উপাসনা’য় উদ্ধৃত হয়েছিল।

    ‘অন্তর-ন্যাশনাল-সঙ্গীত’, ‘রক্ত-পতাকার গান’ ও ‘জাগর-তূর্য’ যথাক্রমে ১৩৩৪ সালের ৮ই বৈশাখ, ১৫ই বৈশাখ ও ২২শে বৈশাখ তারিখের ‘গণবাণী’তে প্রকাশিত হয়েছিল।

    ‘যুগের আলো’ ১৩৩৩ ফাল্গুনের ‘যুগের আলো’তে এবং ‘পথের দিশা’ ‘অগ্রদূত’-এ প্রকাশিত হয়েছিল।

    ‘যা শত্রু পরে পরে’ ১৩৩৩ আশ্বিনে বর্ধমানের ‘শক্তি’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল; ‘শক্তি’ হতে ২৫শে আশ্বিন ১৩৩৩ তারিখে ‘গণবাণী’তে উদ্ধৃত হয়েছিল।

  • সব্যসাচী

    সব্যসাচী

    সব্যসাচী

    ওরে ভয় নাই আর, দুলিয়া উঠেছে হিমালয়-চাপা প্রাচী,

    গৌরীশেখরে তুহিন ভেদিয়া জাগিছে সব্যসাচী!

    দ্বাপর যুগের মৃত্যু ঠেলিয়া

    জাগে মহাযোগী নয়ন মেলিয়া,

    মহাভারতের মহাবীর জাগে, বলে ‘আমি আসিয়াছি।’

    নব-যৌবন-জলতরঙ্গে নাচে রে প্রাচীন প্রাচী!

    বিরাট কালের অজ্ঞাতবাস ভেদিয়া পার্থ জাগে,

    গান্ডিব ধনু রাঙিয়া উঠিল লক্ষ লাক্ষারাগে!

    বাজিছে বিষাণ পাঞ্চজন্য,

    সাজে রথাশ্ব, হাঁকিছে সৈন্য,

    ঝড়ের ফুঁ দিয়া নাচে অরণ্য, রসাতলে দোলা লাগে,

    দোলায় বসিয়া হাসিছে জীবন মৃত্যুর অনুরাগে!

    যুগে যুগে মরে বাঁচে পুন পাপ দুর্মতি কুরুসেনা,

    দুর্যোধনের পদলেহী ওরা, দুঃশাসনের কেনা!

    লঙ্কাকান্ডে কুরুক্ষেত্রে,

    লোভ-দানবের ক্ষুধিত নেত্রে,

    ফাঁসির মঞ্চে কারার বেত্রে ইহারা যে চির-চেনা!

    ভাবিয়াছ, কেহ শুধিবে না এই উৎপীড়নের দেনা?

    কালের চক্র বক্রগতিতে ঘুরিতেছে অবিরত,

    আজ দেখি যারা কালের শীর্ষে, কাল তারা পদানত।

    আজি সম্রাট কালি সে বন্দী,

    কুটীরে রাজার প্রতিদ্বন্দ্বী!

    কংস-কারায় কংস-হন্তা জন্মিছে অনাগত,

    তারই বুক ফেটে আসে নৃসিংহ, যারে করে পদাহত!

    আজ যার শিরে হানিছে পাদুকা কাল তারে বলে পিতা,

    চির-বন্দিনী হতেছে সহসা দেশ-দেশ-নন্দিতা।

    দিকে দিকে ওই বাজিছে ডঙ্কা,

    জাগে শংকর বিগত-শঙ্কা!

    লঙ্কা-সায়রে কাঁদে বন্দিনী ভারত-লক্ষ্মী সীতা,

    জ্বলিবে তাঁহারই আঁখির সুমুখে কাল রাবণের চিতা!

    যুগে যুগে সে যে নব নব রূপে আসে মহাসেনাপতি,

    যুগে যুগে হন শ্রীভগবান যে তাঁহারই রথ-সারথি!

    যুগে যুগে আসে গীতা-উদ্‌গাতা

    ন্যায়-পান্ডব-সৈন্যের ত্রাতা।

    অশিব-দক্ষযজ্ঞে যখনই মরে স্বাধীনতা-সতী,

    শিবের খড়্গে তখনই মুণ্ড হারায়েছে প্রজাপতি!

    নবীন মন্ত্রে দানিতে দীক্ষা আসিতেছে ফাল্গুনি,

    জাগো রে জোয়ান! ঘুমায়ো না ভূয়ো শান্তির বাণী শুনি-

    অনেক দধীচি হাড় দিল ভাই,

    দানব দৈত্য তবু মরে নাই,

    সুতা দিয়ে মোরা স্বাধীনতা চাই, বসে বসে কাল গুনি!

    জাগো রে জোয়ান! বাত ধরে গেল মিথ্যার তাঁত বুনি!

    দক্ষিণ করে ছিঁড়িয়া শিকল, বাম করে বাণ হানি’

    এসো নিরস্ত্র বন্দীর দেশে হে যুগ-শস্ত্রপাণি!

    পূজা করে শুধু পেয়েছি কদলী,

    এইবার তুমি এসো মহাবলী।

    রথের সুমুখে বসায়ো চক্রী চত্রুধারীরে টানি,

    আরসত্য সেবিয়া দেখিতে পারি না সত্যের প্রাণহানি।

    মশা মেরে ওই গরজে কামান—‘বিপ্লব মারিয়াছি’।

    আমাদের ডান হাতে হাতকড়া, বাম হাতে মারি মাছি!

    মেনে শত বাধা টিকটিকি হাঁচি,

    টিকি দাড়ি নিয়ে আজও বেঁচে আছি!

    বাঁচিতে বাঁচিতে প্রায় মরিয়াছি, এবার সব্যসাচী,

    যা হোক একটা দাও কিছু হাতে, একবার মরে বাঁচি!

    হুগলি,

    কার্তিক, ১৩৩২

  • দ্বীপান্তরের বন্দিনী

    দ্বীপান্তরের বন্দিনী

    দ্বীপান্তরের বন্দিনী

    আসে নাই ফিরে ভারত-ভারতী?

    মা-র কতদিন দ্বীপান্তর?

    পুণ্য বেদির শূন্যে ধ্বনিল

    ক্রন্দন—‘দেড় শত বছর।’…

    সপ্ত সিন্ধু তেরো নদী পার

    দ্বীপান্তরের আন্দামান,

    রূপের কমল রূপার কাঠির

    কঠিন স্পর্শে যেখানে ম্লান,

    শতদল যেথা শতধা ভিন্ন

    শস্ত্র-পাণির অস্ত্র-ঘায়,

    মন্ত্রী যেখানে সান্ত্রি বসায়ে

    বীনার তন্ত্রী কাটিছে হায়,

    সেখান হতে কি বেতার-সেতারে

    এসেছে মুক্ত-বন্ধ সুর?

    মুক্ত কি আজ বন্দিনী বাণী?

    ধ্বংস হল কি রক্ষ-পুর?

    যক্ষপুরীর রৌপ্য-পঙ্কে

    ফুটিল কি তবে রূপ-কমল?

    কামান গোলার সীসা-স্তূপে কি

    উঠেছে বাণীর শিশমহল?

    শান্তি-শুচিতে শুভ্র হল কি

    রক্ত সোঁদাল খুন-খারাব?

    তবে এ কীসের আর্ত আরতি,

    কিসের তরে এ শঙ্খারাব?…

    সাত সমুদ্র তেরো নদী পার

    দ্বীপান্তরের আন্দামান,

    বাণী যেথা ঘানি টানে নিশিদিন,

    বন্দী সত্য ভানিছে ধান,

    জীবন-চুয়ানো সেই ঘানি হতে

    আরতির তেল এনেছ কি?

    হোমানলে দিতে বাণীর রক্ষী

    বীর ছেলেদের চর্বি ঘি?

    হায় শৌখিন পূজারি, বৃথাই

    বেদির শঙ্খে দিতেছ ফুঁ,

    পুণ্য বেদির শূন্য ভেদিয়া

    ক্রন্দন উঠিতেছে শুধু!

    পূজারি, কাহারে দাও অঞ্জলি?

    মুক্ত ভারতী ভারতে কই?

    আইন যেখানে ন্যায়ের শাসক,

    সত্য বলিলে বন্দী হই,

    অত্যাচারিত হইয়া যেখানে

    বলিতে পারি না অত্যাচার,

    যথা বন্দিনী সীতা সম বাণী

    সহিছে বিচার-চেড়ীর মার,

    বাণীর মুক্ত শতদল যথা

    আখ্যা লভিল বিদ্রোহী,

    পূজারি, সেখানে এসেছ কি তুমি

    বাণী পূজা-উপচার বহি?

    সিংহেরে ভয়ে রাখে পিঞ্জরে,

    ব্যাঘ্রেরে হানে অগ্নি-শেল,

    ব্যাঘ্রেরে হানে অগ্নি-শেল,

    বাণীর কমল খাটিবে জেল!

    তবে কি বিধির বেতার-মন্ত্র

    বেজেছে বাণীর সেতারে আজ,

    পদ্মে রেখেছে চরণ-পদ্ম

    যুগান্তরের ধর্মরাজ?

    তবে তাই হোক। ঢালো অঞ্জলি,

    বাজাও পাঞ্চজন্য শাঁখ!

    দ্বীপান্তরের ঘানিতে লেগেছে

    যুগান্তরের ঘুর্ণিপাক!

    হুগলি,

    মাঘ, ১৩৩১

  • প্রবর্তকের ঘুর-চাকায়

    প্রবর্তকের ঘুর-চাকায়

    প্রবর্তকের ঘুর-চাকায়

    যায় মহাকাল মূর্ছা যায়

    প্রবর্তকের ঘুর-চাকায়

    যায় অতীত

    কৃষ্ণ-কায়

    যায় অতীত

    রক্ত-পায়—

    যায় মহাকাল মূর্ছা যায়

    প্রবর্তকের ঘুর-চাকায়!

    প্রবর্তকের ঘুর-চাকায়!

    যায় প্রবীণ

    চৈতি-বায়

    আয় নবীন-

    শক্তি আয়!

    যায় অতীত

    যায় পতিত,

    ‘আয় অতিথ,

    আয় রে আয় –’

    বৈশাখী-ঝড় সুর হাঁকায় –

    প্রবর্তকের ঘুর-চাকায়

    প্রবর্তকের ঘুর-চাকায়!

    ওই রে দিক্-

    চক্রে কার

    বক্রপথ

    ঘুর-চাকার!

    ছুটছে রথ,

    চক্র-ঘায়

    দিগ্‌বিদিক

    মূর্ছা যায়!

    কোটি রবি শশী ঘুর-পাকায়

    প্রবর্তকের ঘুর-চাকায়

    প্রবর্তকের ঘুর-চাকায়!

    ঘোরে গ্রহ তারা পথ-বিভোল, –

    ‘কাল’-কোলে ‘আজ’খায় রে দোল!

    আজ প্রভাত

    আনছে কায়,

    দূর পাহাড়-

    চূড় তাকায়।

    জয়-কেতন

    উড়ছে কার

    কিংশুকের

    ফুল-শাখায়।

    ঘুরছে রথ,

    রথ-চাকায়

    রক্ত-লাল

    পথ আঁকায়।

    জয়-তোরণ

    রচছে কার

    ঐ উষার

    লাল আভায়,

    প্রবর্তকের ঘুর-চাকায়

    প্রবর্তকের ঘুর-চাকায়।

    গর্জে ঘোর

    ঝড় তুফান

    আয় কঠোর

    বর্তমান।

    আয় তরুণ

    আয় অরুণ

    আয় দারুণ,

    দৈন্যতায়!

    ভয় কী আয়!

    ঐ মা অভয়-হাত দেখায়

    রামধনুর

    লাল শাঁখায়!

    প্রবর্তকের ঘুর-চাকায়

    প্রবর্তকের ঘুর-চাকায়!

    বর্ষ-সতী-স্কন্ধে ঐ

    নাচছে কাল

    থই তা থই

    কই সে কই

    চক্রধর,

    ঐ মায়ায়

    খণ্ড কর।

    শব-মায়ায়

    শিব যে যায়

    ছিন্ন কর

    ঐ মায়ায় —

    প্রবর্তকের ঘুর-চাকায়

    প্রবর্তকের ঘুর-চাকায়!

    কৃষ্ণনগর,

    ৩০ চৈত্র, ১৩৩২

  • আশীর্বাদ

    আশীর্বাদ

    আশীর্বাদ

    কল্যাণীয়া শামসুন নাহার খাতুন

    জয়যুক্তাসু

    শত নিষেধের সিন্ধুর মাঝে অন্তরালের অন্তরীপ

    তারই বুকে নারী বসে আছে জ্বালি বিপদ-বাতির সিন্ধু-দীপ।

    শাশ্বত সেই দীপান্বিতার দীপ হতে আঁখি-দীপ ভরি

    আসিয়াছ তুমি অরুণিমা-আলো প্রভাতি তারার টিপ পরি।

    আপনার তুমি জান পরিচয় – তুমি কল্যাণী তুমি নারী –

    আনিয়াছ তাই ভরি হেম-ঝারি মরু-বুকে জমজম-বারি।

    অন্তরিকার আঁধার চিরিয়া প্রকাশিলে তব সত্য-রূপ –

    তুমি আছ, আছে তোমারও দেবার, তব গেহ নহে অন্ধ-কূপ।

    তুমি আলোকের – তুমি সত্যের – ধরার ধুলায় তাজমহল, –

    রৌদ্র-তপ্ত আকাশের চোখে পরালে স্নিগ্ধ নীল কাজল!

    আপনারে তুমি চিনিয়াছ যবে, শুধিয়াছ ঋণ, টুটেছে ঘুম,

    অন্ধকারের কুঁড়িতে ফুটেছ আলোকের শতদল-কুসুম।

    বদ্ধ কারার প্রকারে তুলেছ বন্দিনীদের জয়-নিশান –

    অবরোধ রোধ করিয়াছে দেহ, পারেনি রুধিতে কণ্ঠে গান।

    লহো স্নেহাশিস – তোমার ‘পুণ্যময়ী’র ‘শাম‍্‍স্1’ পুণ্যালোক

    শাশ্বত হোক! সুন্দর হোক! প্রতি ঘরে চির-দীপ্ত রোক।

    হুগলি,

    ১৯ মাঘ, ১৩৩১

  • মুক্তিকাম

    মুক্তিকাম

    মুক্তিকাম

    স্বাগত বঙ্গে মুক্তিকাম!

    সুপ্ত বঙ্গে জাগুক আবার লুপ্ত স্বাধীন সপ্তগ্রাম!

    শোনাও সাগর-জাগর সিন্ধু-ভৈরবী গান ভয়-হরণ,–

    এ যে রে তন্দ্রা, জেগে ওঠ তোরা, জেগে ঘুম দেওয়া নয় মরণ!

    সপ্ত-কোটি কু-সন্তান তোরা রাখিতে নারিলি সপ্তগ্রাম?

    খাসনি মায়ের বুকের রুধির? হালাল খাইয়া হলি হারাম!

    মৃত্যু-ভূতকে দেখিলি রে শুধু, দেখিলি না তোরা ভবিষ্যৎ,

    অস্ত-আঁধার পার হয়ে আসে নিত্য প্রভাতে রবির রথ!

    অহোরাত্রিকে দেখেছে যাহারা সন্ধ্যাকে তারা করে না ভয়,

    তারা সোজা জানে রাত্রির পরে আবার প্রভাত হবে উদয়।

    দিন-কানা তোরা আঁধারের প্যাঁচা, দেখেছিস শুধু মৃত্যু-রাত,

    ওরে আঁখি খোল, দেখ তোরও দ্বারে এসেছে জীবন নব-প্রভাত!

    মৃত্যুর ‘ভয়’ মেরেছে তোদেরে, মৃত্যু তোদেরে মারেনি, ভাই!

    তোরা মরে তাই হয়েছিস ভূত, আলোকের দূত হলিনে তাই!

    জীবন থাকিতে ‘মরে আছি’ বলে পড়িয়া আছিস মড়া-ঘাটে,

    সিন্ধু-শকুন নেমেছে রে তাই তোদের প্রাণের রাজ-পাটে!

    রক্ত মাংস খেয়েছে তোদের, কঙ্কাল শুধু আছে বাকি,

    ওই হাড় নিয়ে উঠে দাঁড়া তোরা ‘আজও বেঁচে আছি’ বল ডাকি!

    জীবনের সাড়া যেই পাবে, ভয়ে সিন্ধু-শকুন পালাবে দূর,

    ওই হাড়ে হবে ইন্দ্র-বজ্র, দগ্ধ হবে রে বৃত্রাসুর!

    এ মৃতের দেশে, অমৃত-পুত্র, আনিবে কি সেই অমৃত-ঢল –

    যাতে প্রাণ পেয়ে মৃত সগরের দেশ এ বঙ্গ হবে সচল?

    জ্যান্তে-মরা এ ভীরুর ভারতে চাই নাকো মৃত-সঞ্জীবন,

    ক্লীবের জীবন-সুধা আনো, করো ভূতের ভবিষ্যৎ সৃজন!

    হুগলি

    ২০ পৌষ, ১৩৩১

  • সাবধানী ঘণ্টা

    সাবধানী ঘণ্টা

    সাবধানী ঘণ্টা

    রক্তে আমার লেগেছে আবার সর্বনাশের নেশা।

    রুধির-নদীর পার হতে ঐ ডাকে বিপ্লব-হ্রেষা!

    বন্ধু গো, সখা, আজি এই নব জয়-যাত্রার আগে

    দ্বেষ-পঙ্কিল হিয়া হতে তব শ্বেত পঙ্কজ মাগে

    বন্ধু তোমার; দাও দাদা দাও তব রূপ-মসি ছানি

    অঞ্জলি ভরি শুধু কুৎসিত কদর্যতার গ্লানি!

    তোমার নীচতা, ভীরুতা তোমার, তোমার মনের কালি

    উদ্গারো সখা বন্ধুর শিরে; তব বুক হোক খালি!

    সুদূর বন্ধু, দূষিত দৃষ্টি দূর করো, চাহো ফিরে,

    শয়তানে আজ পেয়েছে তোমায়, সে যে পাঁক ঢালে শিরে!

    চিরদিন তুমি যাহাদের মুখে মারিয়াছ ঘৃণা-ঢেলা,

    যে ভোগানন্দ দাসেদেরে গালি হানিয়াছ দুই বেলা,

    আজি তাহাদেরই বিনামার তলে আসিয়াছ তুমি নামি!

    বাঁদরেরে তুমি ঘৃণা করে ভালবাসিয়াছ বাঁদরামি!

    হে অস্ত্রগুরু! আজি মম বুকে বাজে শুধু এই ব্যথা,

    পাণ্ডবে দিয়া জয়কেতু, হলে কুক্কুর-কুরু-নেতা!

    ভোগ-নরকের নারকীয় দ্বারে হইয়াছ তুমি দ্বারী,

    হারামানন্দে হেরেমে ঢুকেছ হায় হে ব্রহ্মচারী!

    তোমার কৃষ্ণ রূপ-সরসীতে ফুটেছে কমল কত,

    সে কমল ঘিরি নেচেছে মরাল কত সহস্র শত,–

    কোথা সে দিঘীর উচ্ছল জল, কোথা সে কমল রাঙা,

    হেরি শুধু কাদা, শুকায়েছে জল, সরসীর বাঁধ ভাঙা!

    সেই কাদা মাখি চোখে মুখে তুমি সাজিয়াছ ছি ছি সং,

    বাঁদর-নাচের ভালুক হয়েছ, হেসে মরি দেখে ঢং।

    অন্ধকারের বিবর ছাড়িয়া বাহিরিয়া এস দাদা,

    হেরো আরশিতে–বাঁদরের বেদে করেছে তোমায় খ্যাঁদা!

    মিত্র সাজিয়া শত্রু তোমারে ফেলেছে নরকে টানি,

    ঘৃণার তিলক পরাল তোমারে স্তাবকের শয়তানি!

    যাহারা তোমারে বাসিয়াছে ভাল, করিয়াছে পূজা নিতি,

    তাহাদের হানে অতি লজ্জার ব্যথা আজ তব স্মৃতি।

    নপুংসক ঐ শিখণ্ডী আজ রথের সারথি তব,–

    হানো বীর তব বিদ্রুপ-বাণ, সব বুক পেতে লব

    ভীষ্মের সম; যদি তাহে শর-শয়নের বর লভি,

    তুমি যত বল আমিই সে-রণে জিতিব অস্ত্র-কবি!

    তুমি জান, তুমি সম্মুখ রণে পারিবে না পরাজিতে,

    আমি তব কাল যশোরাহু সদা শঙ্কা তোমার চিতে,

    রক্ত-অসির কৃষ্ণ মসির যে কোনো যুদ্ধে, ভাই,

    তুমি নিজে জান তুমি অশক্ত, করিয়াছ শুরু তাই

    চোরা-বাণ ছোঁড়া বেল্লিকপনা বিনামা আড়ালে থাকি

    ন্যক্কার-আনা নপুংসকেরে রথ-সম্মুখে রাখি।

    হেরো সখা আজ চারিদিক হতে ধিক্কার অবিরত

    ছি ছি বিষ ঢালি জ্বালায় তোমার পুরানো প্রদাহ-ক্ষত!

    আমারে যে সবে বাসিয়াছে ভাল, মোর অপরাধ নহে!

    কালীয়-দমন উদিয়াছে মোর বেদনার কালীদহে–

    তাহার দাহ তো তোমারে দহেনি, দহেছে যাদের মুখ

    তাহারা নাচুক জ্বলুনির চোটে। তুমি পাও কোন সুখ?

    দগ্ধ-মুখ সে রাম-সেনাদলে নাচিয়া হে সেনাপতি!

    শিব সুন্দর সত্য তোমার লভিল একী এ গতি?

    যদিই অসতী হয় বাণী মোর, কালের পরশুরাম

    কঠোর কুঠারে নাশিবে তাহারে, তুমি কেন বদনাম

    কিনিছ বন্ধু, কেন এত তব হিয়া দগদগি জ্বালা?–

    হোলির রাজা কে সাজাল তোমারে পরায়ে বিনামা-মালা?

    তোমার গোপন দুর্বলতারে, ছি ছি করে মসিময়

    প্রকাশিলে, সখা, এইখানে তব অতি বড় পরাজয়।

    শতদল-দলে তুমি যে মরাল শ্বেত-সায়রের জলে।

    ওঠো সখা, বীর, ঈর্ষা-পঙ্ক-শয়ন ছাড়িয়া পুনঃ,

    নিন্দার নহ, নান্দীর তুমি, উঠিতেছে বাণী শুন।

    ওঠো সখা, ওঠো, লহো গো সালাম, বেঁধে দাও হাতে রাখি,

    ঐ হেরো শিরে চক্কর মারে বিপ্লব-বাজপাখি!

    অন্ধ হয়ো না, বেত্র ছাড়িয়া নেত্র মেলিয়া চাহো–

    ঘনায় আকাশে অসন্তোষের নিদারুণ বারিবাহ।

    দোতালায় বসি উতাল হয়ো না শুনি বিদ্রোহ-বাণী,

    এ নহে কৌরব, এ কাঁদন উঠে নিখিল-মর্ম ছানি।

    বিদ্রুপ করি উড়াইবে এই বিদ্রোহ-তেঁতো জ্বালা?

    সুরের তোমরা কী করিবে তবু হবে কান ঝালাপালা

    অসুরের ভীম অসি-ঝনঝনে, বড় অসোয়াস্তি-কর!

    বন্ধু গো, এত ভয় কেন? আছে তোমার আকাশ-ঘর!

    অর্গল এঁটে সেথা হতে তুমি দাও অনর্গল গালি,

    গোপীনাথ মলো? সত্য কি? মাঝে মাঝে দেখো তুলি জালি!

    বারীন ঘোষের দ্বীপান্তর আর মির্জাপুরের বোমা,

    লাল বাংলার হুমকানি,–ছি ছি, এত অসত্য ওমা,

    কেমন করে যে রটায় এ সব ঝুটা বিদ্রোহী দল!

    সখী গো, আমায় ধরো ধরো! মাগো, কত জানে এরা ছল!

    সই লো, আমার কাতুকুতু ভাব হয়েছে যে, ঢলে পড়ি!

    আঁচলে জড়ায়ে পা চলে না গো, হাত হতে পড়ে ছড়ি!

    শ্রমিকের গাঁতি, বিপ্লব-বোমা, আ ম’লো তোমরা মরো!

    যত সব বাজে বাজখাঁই সুর, মেছুনি-বৃত্তি ধরো!

    যারা করে বাজে সুখভোগ ত্যাগ, আর রাজরোষে মরে,

    ঐ বোকাদের ইতর ভাষায় গালি দাও খুব করে।

    এই ইতরামি, বাঁদরামি-আর্ট আষ্টেপৃষ্টে বেঁধে

    হন্যে কুকুর পেট পালো আর হাউ হাউ মরো কেঁদে?

    এই নোংরামি করে দিনরাত বল আর্টের জয়!

    আর্ট মানে শুধু বাঁদরামি আর মুখ ভ্যাংচানো নয়!

    আপনার নাক কেটে দাদা এই পরের যাত্রা ভাঙা

    ইহাই হইল আদর্শ আর্ট, নাকি-সুর, কান রাঙা!

    আর্ট ও প্রেমের এই সব মেড়ো মাড়োয়ারি দলই জানে,

    কোন বিদ্রোহ অসন্তোষের রেখা নাই কোনখানে!

    সব ভুয়ো দাদা, ও-সবে দেশের কিছুই হইবে নাকো,

    এমনই করিয়া জুতো খাও আর মলমল-মল মাখো!–

    জ্ঞান-অঞ্জন-শলাকা তৈরি হতেছে এদের তরে,

    দেখিবে এদের আর্টের আঁটুনি একদিনে গেছে ছড়ে!

    বন্ধু গো! সখা! আঁখি খোলো, খোলো শ্রবণ হইতে তুলা,

    ঐ হেরো পথে গুর্খা-সেপাই উড়াইয়া যায় ধুলা!

    ঐ শোনো আজ ঘরে ঘরে কত উঠিতেছে হাহাকার,

    ভূধর প্রমাণ উদরে তোমার এবার পড়িবে মার!

    তোমার আর্টের বাঁশরির সুরে মুগ্ধ হবে না এরা,

    প্রয়োজন-বাঁশে তোমার আর্টের আটশালা হবে ন্যাড়া!

    প্রেমও আছে সখা, যুদ্ধও আছে, বিশ্ব এমনই ঠাঁই,

    ভাল নাহি লাগে, ভাল ছেলে হয়ে ছেড়ে যাও, মানা নাই!

    আমি বলি সখা, জেনে রেখো মনে কোন বাতায়ন-ফাঁকে

    সজিনার ঠ্যাঙা সজনিরই মত হাতছানি দিয়ে ডাকে।

    যত বিদ্রুপই করো সখা, তুমি জান এ সত্য-বাণী,

    কারুর পা চেটে মরিব না; কোন প্রভু পেটে লাথি হানি

    ফাটাবে না পিলে, মরিব যেদিন মরিব বীরের মত,

    ধরা-মা’র বুকে আমার রক্ত রবে হয়ে শাশ্বত!

    আমার মৃত্যু লিখিবে আমার জীবনের ইতিহাস!

    ততদিন সখা সকলের সাথে করে নাও পরিহাস!

    কলিকাতা

    কার্তিক, ১৩৩২

  • বিদায়-মাভৈঃ

    বিদায়-মাভৈঃ

    বিদায়-মাভৈঃ

    বিদায়-রবির করুণিমায় অবিশ্বাসীর ভয়,

    বিশ্বাসী! বলো আসবে আবার প্রভাত-রবির জয়!

    খণ্ড করে দেখছে যারা অসীম জীবনটাই,

    দুঃখ তারাই করুক বসে, দুঃখ মোদের নাই।

    আমরা জানি, অস্ত-খেয়ায় আসছে রে উদয়।

    বিদায়-রবির করুণিমায় অবিশ্বাসীর ভয়॥

    হারাই-হারাই ভয় করেই না হারিয়ে দিলি সব!

    মরার দলই আগলে মড়া করছে কলরব।

    ঘরবাড়িটাই সত্য শুধু নয় কিছুতেই নয়।

    বিদায়-রবির করুণিমায় অবিশ্বাসীর ভয়॥

    দৃষ্টি-অচিন দেশের পরেও আছে চিনা দেশ,

    এক নিমেষের নিমেষ-শেষটা নয়কো অশেষ শেষ।

    ঘরের প্রদীপ নিবলে বিধির আলোক-প্রদীপ রয়।

    বিদায়-রবির করুণিমায় অবিশ্বাসীর ভয়॥

    জয়ধ্বনি উঠবে প্রাচীন চিনের প্রাচীরে,

    অস্ত-ঘাটে বসে আমি তাই তো নাচি রে।

    বিদায়-পাতা আনবে ডেকে নবীন কিশলয়,

    বিশ্বাসী! বল আসবে আবার প্রভাত-রবির জয়॥

    কলিকাতা

    চৈত্র, ১৩৩০

  • বাংলার মহাত্মা

    বাংলার মহাত্মা

    বাংলার মহাত্মামা

    (গান)

    আজ
    না-চাওয়া পথ দিয়ে কে এলে
    কংস-কারার দ্বার ঠেলে।
    আজ
    শব-শ্মশানে শিব নাচে ঐ ফুল-ফুটানো পা ফেলে॥
    আজ
    প্রেম-দ্বারকায় ডেকেছে বান
    মরুভূমে জাগল তুফান,
    দিগ‍্‍বিদিকে উপচে পড়ে প্রাণ রে!
    তুমি
    জীবন-দুলাল সব লালে-লাল করলে প্রাণের রং ঢেলে॥
    শ্রাবস্তি-ঢল আসল নেমে
    আজ ভারতের জেরুজালেমে
    মুক্তি-পাগল এই প্রেমিকের প্রেমে রে‌!
    ওরে
    আজ নদীয়ার শ্যাম নিকুঞ্জে রক্ষ-অরি রাম খেলে॥
    চরকা-চাকায় ঘর্ঘরঘর
    শুনি কাহার আসার খবর,
    ঢেউ-দোলাতে দোলে সপ্ত সাগর রে!
    পথের ধুলা ডেকেছে আজ সপ্ত কোটি প্রাণ মেলে।
    আজ
    জাত-বিজাতের বিভেদ ঘুচি,
    এক হল ভাই বামুন-মুচি,
    প্রেম-গঙ্গায় সবাই হল শুচি রে!
    আয়
    এই যমুনায় ঝাঁপ দিবি কে বন্দেমাতরম বলে–
    ওরে
      সব মায়ায় আগুন জ্বেলে॥

    হুগলি,

    জ্যৈষ্ঠ, ১৩৩১

  • হেমপ্রভা

    হেমপ্রভা

    হেমপ্রভা

    কোন অতীতের আঁধার ভেদিয়া

    আসিলে আলোক-জননী।

    প্রভায় তোমার উদিল প্রভাত

    হেম-প্রভ হল ধরণী॥

    ভগ্ন দুর্গে ঘুমায়ে রক্ষী

    এলে কি মা তাই বিজয়-লক্ষ্মী,

    ‘মেয়্ ভুখা হুঁ’-র ক্রন্দন-রবে

    নাচায়ে তুলিলে ধমনী॥

    এসো বাংলার চাঁদ-সুলতানা

    বীর-মাতা বীর-জায়া গো॥

    তোমাতে পড়েছে সকল কালের

    বীর-নারীদের ছায়া গো॥

    শিব-সাথে সতী শিবানী সাজিয়া

    ফিরিছ শ্মশানে জীবন মাগিয়া,

    তব আগমনে নব-বাংলার

    কাটুক আঁধার রজনী॥

    মাদারীপুর,

    ২৯ ফাল্গুন, ১৩৩২

  • অশ্বিনীকুমার

    অশ্বিনীকুমার

    অশ্বিনীকুমার

    আজ যবে প্রভাতের নব যাত্রীদল

    ডেকে গেল রাত্রিশেষে, ‘চল আগে চল’, –

    ‘চল আগে চল’ গাহে ঘুম-জাগা পাখি,

    কুয়াশা-মশারি ঠেলে জাগে রক্ত-আঁখি

    নবারুণ নব আশা। আজি এই সাথে,

    এই নব জাগরণ-আনা নব প্রাতে

    তোমারে স্মরিনু বীর প্রাতঃস্মরণীয়!

    স্বর্গ হতে এ স্মরণ-প্রীতি অর্ঘ্য নিও!

    নিও নিও সপ্তকোটি বাঙালির তব

    অশ্রু-জলে স্মৃতি-পূজা অর্ঘ্য অভিনব!

    আজও তারা ক্রীতদাস, আজও বদ্ধ-কর

    শৃঙ্খল-বন্ধনে দেব! আজও পরস্পর

    করে তারা হানাহানি, ঈর্ষা-অস্ত্রে যুঝি

    ছিটায় মনের কালি-নিরস্ত্রের পুঁজি!

    মন্দভাষ গাঢ় মসি দিব্য অস্ত্র তার!

    ‘দুই-সপ্ত কোটি ধৃত খর তরবার’

    সে শুধু কেতাবি কথা, আজও সে স্বপন!

    সপ্তকোটি তিক্ত জিহ্বা বিষ-রসায়ন

    উদ্গারিছে বঙ্গে নিতি, দগ্ধ হল ভূমি!

    বঙ্গে আজ পুষ্প নাই, বিষ লহো তুমি!

    কে করিবে নমস্কার! হায় যুক্তকর

    মুক্ত নাহি হল আজও! বন্ধন-জর্জর

    এ কর পারে না দেব ছুঁইতে ললাট!

    কে করিবে নমস্কার?

    কে করিবে পাঠ

    তোমার বন্দনা-গান? রসনা অসাড়!

    কথা আছে বাণী নাই ছন্দে নাচে হাড়!

    ভাষা আছে আশা নাই, নাই তাহে প্রাণ,

    কে করিবে এই জাতিরে নবমন্ত্র দান!

    অমৃতের পুত্র কবি অন্নের কাঙাল,

    কবি আর ঋষি নয়, প্রাণের আকাল

    করিয়াছে হেয় তারে! লেখনী ও কালি

    যত না সৃজিছে কাব্য ততোধিক গালি!

    কণ্ঠে যার ভাষা আছে অন্তরে সাহস,

    সিংহের বিবরে আজ পড়ে সে অবশ!

    গর্দান করিয়া উঁচু যে পারে গাহিতে

    নব জীবনের গান, বন্ধন-রশিতে

    চেপে আছে টুঁটি তার! জুলুম-জিঞ্জির

    মাংস কেটে বসে আছে, হাড়ে খায় চিড়

    আর্ত প্রতিধ্বনি তার! কোথা প্রতিকার!

    যারা আছে—তারা কিছু না করে নাচার!

    নেহারিব তোমারে যে শির উঁচু করি,

    তাও নাহি পারি, দেব! আইনের ছড়ি

    মারে এসে গুপ্ত চেড়ী। যাইবে কোথায়!

    আমার চরণ নহে মম বশে, হায়!

    এক ঘর ছাড়ি আর ঘরে যেতে নারি,

    মর্দজাতি হয়ে আছে পর্দা-ঘেরা নারী!

    এ লাঞ্ছনা, এ পীড়ন, এ আত্মকলহ,

    আত্মসুখপরায়ণ পরাবৃত্তি মোহ–

    তব বরে দূর হোক! এ জাতির ’পরে

    হে যোগী, তোমার যেন আশীর্বাদ ঝরে!

    যে-আত্মচেতনা-বলে যে আত্মবিশ্বাসে

    যে-আত্মশ্রদ্ধার জোরে জীবন উচ্ছ্বাসে

    উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠে মরা জাতি বাঁচে,

    যোগী, তব কাছে জাতি সেই শক্তি যাচে!

    স্বর্গে নহে, আমাদের অতি কাছাকাছি

    আছ তুমি হে তাপস, তাই মোরা যাচি

    তব বর, শক্তি তব! জেনেছিলে তুমি

    স্বর্গাদপি গরীয়সী এই বঙ্গভূমি!

    দিলে ধর্ম, দিলে কর্ম, দিলে ধ্যান জ্ঞান,

    তবু সাধ মিটিল না, দিলে বলিদান

    আত্মারে জননি-পদে, হাঁকিলে, ‘মাভৈঃ!

    ভয় নাই, নব দিনমণি ওঠে ওই!

    ওরে জড়, ওঠ্ তোরা!’ জাগিল না কেউ,

    তোমারে লইয়া গেল পারাপারী ঢেউ।

    অগ্রে তুমি জেগেছিলে অগ্রজ শহীদ,

    তুমি ঋষি, শুভ প্রাতে টুটেছিল নিদ,

    তব পথে যাত্রী যারা রাত্রি-দিবা ধরি

    ঘুমাল গভীর ঘুম, আজ তারা মরি

    বেলাশেষে জাগিয়াছে! সম্মুখে সবার

    অনন্ত তমিস্রাঘোর দুর্গম কান্তার!

    পশ্চাতে ‘অতীত’ টানে জড় হিমালয়,

    সংশয়ের ‘বর্তমান’ অগ্রে নাহি হয়,

    তোমা-হারা দেখে তারা অন্ধ ‘ভবিষ্যৎ’,

    যাত্রী ভীরু, রাত্রি গুরু, কে দেখাবে পথ!

    হে প্রেমিক, তব প্রেম বরিষায় দেশে

    এল ঢল বীরভূমি বরিশাল ভেসে।

    সেই ঢল সেই জল বিষম তৃষায়

    যাচিছে ঊষর বঙ্গ তব কাছে হায়!

    পীড়িত এ বঙ্গ পথ চাহিছে তোমার,

    অসুর নিধনে কবে আসিবে আবার!

    হুগলি,

    মাঘ, ১৩৩২

  • ইন্দু-প্রয়াণ

    ইন্দু-প্রয়াণ

    ইন্দু-প্রয়াণ

    [কবি শরদিন্দু রায়ের অকালমৃত্যু উপলক্ষ্যে]

    বাঁশির দেবতা! লভিয়াছ তুমি হাসির অমর-লোক,

    হেথা মর-লোকে দুঃখী মানব করিতেছি মোরা শোক!

    অমৃত-পাথারে ডুব দিলে তুমি ক্ষীরোদ-শয়ন লভি,

    অনৃতের শিশু মোরা কেঁদে বলি, মরিয়াছ তুমি কবি!

    হাসির ঝঞ্ঝা লুটায়ে পড়েছে নিদাঘের হাহাকারে,

    মোরা কেঁদে বলি, কবি খোয়া গেছে অস্ত-খেয়ার পারে!

    আগুন-শিখায় মিশেছে তোমার ফাগুন-জাগানো হাসি,

    চিতার আগুনে পুড়ে গেছ ভেবে মোরা আঁখি-জলে ভাসি।

    অনৃত তোমার যাহা কিছু কবি তাই হয়ে গেছে ছাই,

    অমৃত তোমার অবিনাশী যাহা আগুনে তা পুড়ে নাই।

    চির-অতৃপ্ত তবু কাঁদি মোরা, ভরে না তাহাতে বুক,

    আজ তব বাণী আন্-মুখে শুনি, তুমি নাই, তুমি মূক।

    অতি-লোভী মোরা পাই না তৃপ্তি সুরভিতে শুধু ভাই,

    সুরভির সাথে রূপ-ক্ষুধাতুর ফুলেরও পরশ চাই।

    আমরা অনৃত তাই তো অমৃতে ভরে ওঠে নাকো প্রাণ,

    চোখে জল আসে দেখিয়া ত্যাগীর আপনা-বিলানো দান।

    তরুণের বুকে হে চির-অরুণ ছড়ায়েছ যত লালি,

    সেই লালি আজ লালে লাল হয়ে কাঁদে, খালি সব খালি!

    কাঁদায়ে গিয়াছ, নবরূপ ধরে হয়তো আসিবে ফিরে,

    আসিয়া আবার আধ-গাওয়া গান গাবে গঙ্গারই তীরে,

    হয়তো তোমায় চিনিব না, কবি, চিনিব তোমার বাঁশি,

    চিনিব তোমার ওই সুর আর চল-চঞ্চল হাসি।

    প্রাণের আলাপ আধ-চেনাচেনি দূরে থেকে শুধু সুরে,

    এবার হে কবি, করিব পূর্ণ ওই চির-কবি-পুরে।…

    ভালই করেছ ডিঙিয়া গিয়াছ নিত্য এ কারাগার,

    সত্য যেখানে যায় নাকো বলা, গৃহ নয় সে তোমার।

    গিয়াছ যেখানে শাসনে সেখানে নহে নিরুদ্ধ বাণী,

    ভক্তের তরে রাখিয়ো সেখানে আধেক আসনখানি।

    বন্দী যেখানে শুনিবে তোমার মুক্তবদ্ধ সুর,–

    গঙ্গার কূলে চাই আর ভাবি কোথা সেই থসুর-পুর!

    গণ্ডির বেড়ি কাটিয়া নিয়াছ অনন্তরূপ টানি,

    কারও বুকে আছ মূর্তি ধরিয়া, কারও বুকে আছ বাণী।

    সে কি মরিবার? ভাঙি অনিত্যে নিত্য নিয়াছ বরি,

    ক্ষমা করো কবি, তবু লোভী মোরা শোক করি, কেঁদে মরি।

    না-দেখা ভেলায় চড়িয়া হয়তো আজিও সন্ধ্যাবেলা

    গঙ্গার কুলে আসিয়া হাসিছ দেখে আমাদের খেলা!

    হউক মিথ্যা মায়ার খেলা এ তবুও করিব শোক,

    ‘শান্তি হউক’ বলি যুগে যুগে ব্যথায় মুছিব চোখ!

    আসিবে আবারও নিদাঘ-শেষের বিদায়ের হাহাকার,

    শাঙনের ধারা আনিবে স্মরণে ব্যাথা-অভিষেক তার।

    হাসি নিষ্ঠুর যুগে যুগে মোরা স্নিগ্ধ অশ্রু দিয়া,

    হাসির কবিরে ডাকিব গভীরে শোক-ক্রন্দন নিয়া।

    বহরমপুর জেল,

    শ্রাবণ, ১৩৩০

  • দিল-দরদী

    দিল-দরদী

    দিল-দরদী

    [কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের ‘খাঁচার পাখি’ শীর্ষক করুণ কবিতাটি পড়িয়া]

    কে ভাই তুমি সজল গলায়

    গাইলে গজল আপসোসের?

    ফাগুন-বনের নিবল আগুন,

    লাগল সেথা ছাপ পোষের।

    দরদ-ভেজা কান্না-কাতর

    ছিন্ন তোমার স্বর শুনে

    ইরান মুলুক বিরান হল

    এমন বাহার-মরশুমে।

    সিস্তানের ঐ গুল-বাগিচা

    গুলিস্তান আর বোস্তানে

    সোস্ত হয়ে দখিন হাওয়া

    কাঁদল সে আপশোশ-তানে।

    এ কোন যিগর-পস্তানি সুর?

    মস্তানি সব ফুল-বালা

    ঝুরল, তাদের নাজুক বুকে

    বাজল ব্যথার শূল-জ্বালা।

    আব্‌ছা মনে পড়ছে, যে দিন

    শিরাজ-বাগের গুল ভুলি

    শ্যামল মেয়ের সোহাগ-শ্যামার

    শ্যাম হলে ভাই বুলবুলি, –

    কালো মেয়ের কাজল চোখের

    পাগল চাওয়ার ইঙ্গিতে

    মস্ত্ হয়ে কাঁকন চুড়ির

    কিঙ্কিণি রিন ঝিন গীতে।

    নাচলে দেদার দাদরা তালে,

    কারফাতে, সরফর্দাতে,–

    হাঠাৎ তোমার কাঁপল গলা

    ‘খাঁচার পাখি’ ‘গর্বাতে’।

    চৈতালিতে বৈকালি সুর

    গাইলে, “নিজের নই মালিক,

    আফ্‌সে মরি আপশোশে আহ্,

    আপ-সে বন্দী বৈতালিক।

    কাঁদায় সদাই ঘেরা-টোপের

    আঁধার ধাঁধায়, তায় একা,

    ব্যথার ডালি একলা সাজাই,

    সাথির আমার নাই দেখা।

    অসাড় জীবন, ঝাপসা দুচোখ

    খাঁচার জীবন একটানা।”

    অশ্রু আসে, আর কেন ভাই,

    ব্যথার ঘায়ে ঘা হানা?

    খুব জানি ভাই, ব্যর্থ জীবন

    ডুবায় যারা সংগীতেই,

    মরম-ব্যথা বুঝতে তাদের

    দিল-দরদী সঙ্গী নেই।

    জানতে কে চায় গানের পাখি

    বিপুল ব্যথার বুক ভরাট,

    সবার যখন নওরাতি, হায়,

    মোদের তখন দুঃখ-রাত!

    ওদের সাথি, মোদের রাতি

    শয়ন আনে নয়ন-জল;

    গান গেয়ে ভাই ঘামলে কপাল

    মুছতে সে ঘাম নাই অঞ্চল।

    তাই ভাবি আজ কোন দরদে

    পিষছে তোমার কলজে-তল?

    কার অভাব আজ বাজছে বুকে,

    কলজে চুঁয়ে গলছে জল!

    কাতর হয়ে পাথর-বুকে

    বয় যবে ক্ষীর-সুরধুনী,

    হোক তা সুধা, খুব জানি ভাই,

    সে সুধা ভরপুর-খুনই।

    আজ যে তোমার আঁকা-আঁশু

    কণ্ঠ ছিঁড়ে উছলে যায় –

    কতই ব্যথায়, ভাবতে যে তা

    জান ওঠে ভাই কচলে হায়!

    বসন্ত তো কতই এল,

    গেল খাঁচার পাশ দিয়ে,

    এল অনেক আশ নিয়ে, শেষ

    গেল দীঘল-শ্বাস নিয়ে।

    অনেক শারাব খারাব হল,

    অনেক সাকির ভাঙল বুক!

    আজ এল কোন দীপান্বিতা?

    কার শরমে রাঙল মুখ?

    কোন দরদি ফিরল? পেলে

    কোন হারা-বুক আলিঙ্গন?

    আজ যে তোমার হিয়ার রঙে

    উঠল রেঙে ডালিম-বন!

    যিগর-ছেঁড়া দিগর তোমার

    আজ কি এল ঘর ফিরে?

    তাই কি এমন কাশ ফুটেছে

    তোমার ব্যথার চর ফিরে?

    নীড়ের পাখি ম্লান চোখে চায়,

    শুনছে তোমার ছিন্ন সুর;

    বেলা-শেষের তান ধরেছে

    যখন তোমার দিন দুপুর!

    মুক্ত আমি পথিক-পাখি

    আনন্দ-গান গাই পথের,

    কান্না-হাসির বহ্নি-ঘাতের

    বক্ষে আমার চিহ্ন ঢের;

    বীণ ছাড়া মোর একলা পথের

    প্রাণের দোসর অধিক নাই,

    কান্না শুনে হাসি আমি,

    আঘাত আমার পথিক-ভাই।

    বেদনা-ব্যথা নিত্য সাথি,–

    তবু ভাই ওই সিক্ত সুর,

    দুচোখ পুরে অশ্রু আনে

    উদাস করে চিত্ত-পুর!

    ঝাপসা তোমার দুচোখ শুনে

    সুরাখ হল কলজেতে,

    নীল পাথারের সাঁতার পানি

    লাখ চোখে ভাই গলছে যে!

    বাদশা-কবি! সালাম জানায়

    ভক্ত তোমার অ-কবি,

    কইতে গিয়ে অশ্রুতে মোর

    কথা ডুবে যায় সবই!

    কলিকাতা,

    আশ্বিন, ১৩২৮

  • সত্যেন্দ্র-প্রয়াণ

    সত্যেন্দ্র-প্রয়াণ

    সত্যেন্দ্র-প্রয়াণ

    আজ
    আষাঢ়-মেঘের কালো কাফনের আড়ালে মু-খানি ঢাকি
    আহা
    কে তুমি জননি কার নাম ধরে বারে বারে যাও ডাকি?
    মাগো কর হানি দ্বারে দ্বারে
    তুমি
    কোন হারামণি খুঁজিতে আসিলে ঘুম-সাগরের পারে?
    ‘কই রে সত্য, সত্যেন কই’ কাতর কান্না শুধু
    গগন-মরুর প্রাঙ্গণে হানে সাহারার হাহা ধুধু!
    সত্য অমর, কেঁদো না জননি, আসিবে আবার রবি,
    গিয়াছে বাণীর কমল-বনে মা, কমল তুলিতে কবি!
    ও কে
    ক্রন্দসী হায় মুরছিয়া পড়ে অশ্রু-সিন্ধুতীরে
    গেল
    সহসা নিশীথে বাণীর হাতের বেয়ালার তার ছিঁড়ে।
    আহা, কোন ভিখারিনি এরে
    কাহারে হারায়ে নিখিলের দ্বারে ফরিয়াদ করে ফেরে?
    সতীর কাঁদনে চোখ খুলে চায় ঊর্ধ্বে অরুন্ধতী,
    নিবিড় বেদনা ম্লান করে আনে রবির কনক-জ্যোতি।
    সত্য অমর, কাঁদিয়ো না সতী, আসিবে আবার রবি,
    গিয়াছে বাণীর কমল-কাননে কমল তুলিতে কবি!
    আজ
    সারথি হারায়ে বিষাদে অন্ধ ছন্দ-সরস্বতী,
    ওগো
    পুরোহিত-হারা ভারতী-দেউলে বন্ধ পূজা-আরতি।
    ওরে মৃত্যু-নিষাদ ক্রূর
    বিষাদ-শায়ক বিঁধিয়া করেছে বাংলার বুক চুর!
    নিভে গেল মঙ্গল-দীপশিখা, বঙ্গবাণীর আলো,
    দুলে দশদিকে শুধু দিশেহারা অশ্রু অতল কালো!
    ‘সত্য’ অমর! কাঁদিয়া না কবি, আসিবে আবার রবি,
    গিয়াছে বাণীর কমল-কাননে কমল তুলিতে কবি।
    শ্বেত
    বৈজয়ন্তী উড়ে চলে যায় মৃত্যুরও আগে আগে,
    ওরে
    সে চির-অমর, মৃত্যু আপনি তারই পায়ে প্রাণ মাগে।
    তাই ওই বাজে জয়-ভেরি
    স্বর্গ-দুয়ারে, ওঠে জয়ধ্বনি, ‘জয় সুত অমৃতেরই!’
    কাঁদিসনে মাগো, ওই তোর ছেলে মাতা সারদার কোলে
    শিশু হয়ে পুনঃ দুধ-হাসি হেসে তোরে ডেকে ডেকে দোলে!
    ‘সত্য’ অমর, কাঁদিয়ো না কেহ, আসিবে আবার রবি,
    মা বীণাপাণির সোহাগ আনিতে স্বর্গে গিয়াছে কবি।

    কলিকাতা,

    শ্রাবণ, ১৩২৯

  • সত্য-কবি

    সত্য-কবি

    সত্য-কবি

    অসত্য যত রহিল পড়িয়া, সত্য সে গেল চলে

    বীরের মতন মরণ-কারারে চরণের তলে দলে।

    যে-ভোরের তারা অরুণ-রবির উদয়-তোরণ-দোরে

    ঘোষিল বিজয়-কিরণশঙ্ক-আবার প্রথম ভোরে,

    রবির ললাট চুম্বিল যার প্রথম রশ্মি-টিকা,

    বাদলের বায়ে নিভে গেল হায়, দীপ্ত তাহারই শিখা!

    মধ্য গগনে স্তব্ধ নিশীথ, বিশ্ব চেতন-হারা,

    নিবিড় তিমির, আকাশ ভাঙিয়া ঝরিছে আকূল ধারা,

    গ্রহ শশী তারা কেউ জেগে নাই, নিভে গেছে সব বাতি,

    হাঁক দিয়ে ফেরে ঝড়-তুফানের উতরোল মাতামাতি!

    হেন দুর্দিনে বেদনা-শিখার বিজলি-প্রদীপ জ্বেলে

    কা্হারে খুঁজিতে কে তুমি নিশীথ-গগন-আঙনে এলে?

    বারে বারে তব দীপ নিবে যায়, জ্বালো তুমি বারে বারে,

    কাঁদন তোমার সে যেন বিশ্বপাতারে চাবুক মারে!

    কী ধন খুঁজিছ? কে তুমি সুনীল মেঘ-অবগুন্ঠিতা?

    তুমি কি গো সেই সবুজশিখার কবির দীপান্ধিতা?

    কী নেবে গো আর? ঐ নিয়ে যাও চিতার দু মুঠো ছাই!

    ডাক দিও নাকো, শূন্য এ ঘর, নাই গো সে আর নাই!

    ডাক দিযো নাকো, মূর্ছিতা মাতা ধুলায় পড়িয়া আছে,

    কাঁদি ঘুমায়েছে কান্তা কবির, জাগিয়া উঠিবে পাছে!

    ডাক দিও নাকো, শূন্য এ ঘর, নাই গো সে আর নাই,

    গঙ্গা-সলিলে ভাসিয়া গিয়াছে তাহার চিতার ছাই!

    আসিলে তড়ি়ৎ-তাঞ্জামে কে গো নভোতলে তুমি সতী?

    সত্য কবির সত্য জননি ছন্দ-সরস্বতী?

    ঝলসিয়া গেছে দুচোখ মা তার তোরে নিশিদিন ডাকি,

    বিদায়ের দিনে কন্ঠের তার গানটি গিয়াছে রাখি

    সাত কোটি এই ভগ্ন কন্ঠে; অবশেষে অভিমানী

    ভর-দুপুরেই খেলা ফেলে গেল কাঁদায়ে নিখিল প্রাণী!

    ডাকিছ কাহারে আকাশ-পানে ও ব্যাকুল দুহাত তুলে?

    কোল মিলেছে মা, শ্মশান-চিতায় ঐ ভাগীরথী-কূলে!

    ভোরের তারা এ ভাবিয়া পথিক শুধায় সাঁঝের তারায়,

    কাল যে আছিল মধ্য-গগন, আজি সে কোথায় হারায়?

    সাঁঝের তারা সে দিগন্তরের কোলে ম্লান চোখে চায়,

    অস্ততোরণপার সে দেখায় কিরণের ইশারায়।

    মেঘ-তাঞ্জাম চলে কার আর যায় কেঁদে যায় দেয়া,

    পরপার-পারাপারে বাঁধা কার কেতকী-পাতার খেয়া?

    হুতাশদিয়া ফেরে পুরবির বায়ু হরিৎ-হুরির দেশে

    জর্দা-পরির কনক-কেশর কদম্ববন-শেষে!

    প্রলাপ প্রলাপ প্রলাপ কবি সে আসিবে না আর ফিরে

    ক্রন্দন শুধু কাঁদিয়া ফিরিবে গঙ্গার তীরে তীরে!

    ‘তুলির লিখন’ লেখা যে এখনও অরুণ-রক্ত-রাগে,

    ফুল্ল্ হাসিছে ‘ফুলের ফসল’ শ্যামার সবজি-বাগে,

    আজিও ‘তীর্থরেণু ও সলিলে’ ‘মণি-মঞ্জুষা’ ভরা,

    ‘বেণু-বীণা’ আর ‘কুহু-কেকা’-রবে আজও শিহরায় ধরা,

    জ্বলিয়া উঠিল ‘অভ্র-আবিরি’ ফাগুয়ায় ‘হোমশিখা’,-

    বহ্নি-বাসরে টিটকিরি দিয়ে হাসিল ‘হসন্তিকা’—

    এত সব যার প্রাণ-উৎসব সেই আজ শুধু নাই,

    সত্যপ্রাণ সে রহিল অমর, মায়া যাহা হল ছাই!

    ভুল যাহা ছিল ভেঙে গেল মহাশূন্যে মিলাল ফাঁকা,

    সৃজন-দিনের সত্য যে, সে-ই রয়ে গেল চির-আঁকা!

    উন্নতশির কালজয়ী মহাকাল হয়ে জোড়াপাণি

    স্কন্ধে বিজয়-পতাকা তাহারই ফিরিবে আদেশ মানি!

    আপনারে সে যে ব্যাপিয়া রেখেছে আপন সৃষ্টি-মাঝে,

    খেয়ালি বিধির ডাক এল তাই চলে গেল আন- কাজে।

    ওগো যুগে-যুগে কবি, ও-মরণে মরেনি তোমার প্রাণ,

    কবির কন্ঠে প্রকাশ সত্য-সুন্দর ভগবান।

    ধরায় যে-বাণী ধরা নাহি দিল, যে-গান রহিল বাকি

    আবার আসিবে পূর্ণ করিতে, সত্য সে নহে ফাঁকি!

    সব বুঝি ওগো, হারা-ভীতু মোরা তবু ভাবি শুধু ভাবি,

    হয়ত যা গেল চিরকাল-তরে হারানু তাহার দাবি।

    তাই ভাবি,আজ যে-শ্যামার শিস খঞ্জন-নর্তন

    থেমে গেল, তাহা মাতাইবে পুন কোন নন্দন-বন!

    চোখে জল আসে, হে কবি-পাবক, হেন অসময়ে গেলে

    যখন এ-দেশে তোমারই মতন দরকার শত ছেলে।

    আষাঢ়-রবির তেজোপ্রদীপ্ত তুমি ধূমকেতু-জ্বালা,

    শিরে মণি-হার, কন্ঠে ত্রিশিরা ফণি-মনসার মালা,

    তড়িৎ-চাবুক করে ধরি তুমি আসিলে হে নির্ভীক,

    মরণ-শয়নে চমকি চাহিল বাঙালি নির্নিমিখ।

    বাঁশিতে তোমার বিষাণ-মন্দ্র রনরনি ওঠে, জয়

    মানুষের জয়, বিশ্বে দেবতা দৈত্য সে বড় নয়!

    করনি বরণ দাসত্ব তুমি আত্মা-অসম্মান,

    নোয়ায়নি মাথা চির-জাগ্রত ধ্রুব তব ভগবান,

    সত্য তোমার পর-পদানত হয়নিকো কভু, তাই

    বলদর্পীর দণ্ড তোমায় স্পর্শিতে পারে নাই!

    যশ-লোভী এই অন্ধ ভন্ড সঞ্জান ভীরু-দলে

    তুমিই একাকী রণ-দুন্দুভি বাজালে গভীর রোলে!

    মেকির বাজারে আমরণ তুমি রয়ে গেলে কবি খাঁটি,

    মাটির এ দেহ মাটি হল তব সত্য হল না মাটি।

    আঘাত না খেলে জাগে না যে-দেশ, ছিলে সে-দেশের চালক,

    বাণীর আসরে তুমি একা ছিলে তূর্যবাদক বালক।

    কে দিবে আঘাত?কে জাগাবে দেশ? কই সে সত্যপ্রাণ?

    আপনারে হেলা করি, করি মোরা ভগবানে আপমান।

    বাঁশি ও বিষাণ নিয়ে গেছ, আছে ছেঁড়া ঢোল ভাঙা কাঁসি,

    লোক-দেখানো এ আঁখির সলিলে লুকানো রয়েছে হাসি।

    যশের মানের ছিলে না কাঙাল, শেখনি খাতিরদারি!

    উচ্চকে তুমি তুচ্ছ করনি, হওনি রাজার দ্বারী।

    অত্যাচারকে বলনিকো দয়া, বলেছ অত্যাচার,

    গড় করনিকো নিগড়ের পায়, ভয়েতে মাননি হার।

    অটল অচল অগ্নিগর্ভ আাগ্নেয়-গিরি তুমি

    উরিয়া ধন্য করেছিলে এই ভীরুর জন্মভূমি।

    হে মহা-মৌনী, মরণেও তুমি মৌন-মাধুরী পিয়া

    নিয়েছ বিদায়, যাওনি মোদের ছল-করা গীতি নিয়া!

    তোমার প্রয়াণে উঠিল না কবি দেশে কল-কল্লোল,

    সুন্দর! শুধু জুড়িয়া বসিলে মাতা সারদার কোল।

    স্বর্গে বাদল মাদল বাজিল, বিজলি উঠিল মাতি,

    দেব-কুমারীরা হানিল বৃষ্টি-প্রসূন সারাটি রাতি।

    কে নাই জাগি, অর্গল-দেওয়া সকল কুটির- দ্বারে

    পুত্রহারার ক্রন্দন শুধু খুঁজিয়া ফিরিছে কারে!

    নিশীথ-শ্মশানে অভাগিনি এক শ্বেতবাস-পরি্যিতা,

    ভাবিছে তাহারই সিঁদুর মুছিয়া কে জ্বালাল ঐ চিতা!

    ভগবান! তুমি চাহিতে পার কি ঐ দুটি নারী পানে?

    জানি না, তোমায় বাঁচাবে কে যদি ওরা অভিশাপ হানে!

    কলিকাতা

    শ্রাবণ, ১৩২৯

  • সত্যেন্দ্র-প্রয়াণ-গীতি

    সত্যেন্দ্র-প্রয়াণ-গীতি

    সত্যেন্দ্র-প্রয়াণ-গীতি

    চল-চঞ্চল বাণীর দুলাল এসে ছিল পথ ভুলে,
    ওগো
     এই গঙ্গার কূলে।
    দিশাহারা মাতা দিশা পেয়ে তাই নিয়ে গেছে কোলে তুলে
    ওগো
     এই গঙ্গার কূলে॥
    চপল চারণ বেণু-বীণে তার
    সুর বেঁধে শুধু দিল ঝংকার,
    শেষ গান গাওয়া হল নাকো আর
    উঠিল চিত্ত দুলে,
    তারই
    ডাক-নাম ধরে ডাকিল কে যেন অস্ত-তোরণ-মূলে,
    ওগো
     এই গঙ্গার কূলে॥
    ওরে
    এ ঝোড়ো হাওয়ায় কারে ডেকে যায় এ কোন সর্বনাশী
    বিষাণ কবির গুমরি উঠিল, বেসুরো বাজিল বাঁশি।
    আঁখির সলিলে ঝলসানো আঁখি
    কূলে কূলে ভরে ওঠে থাকি থাকি,
    মনে পড়ে কবে আহত এ-পাখি
    মৃত্যু-আফিম-ফুলে
    কোন
    ঝড়-বাদলের এমনই নিশীথে পড়েছিল ঘুমে ঢুলে
    এই গঙ্গার কূলে॥
    তার
    ঘরের বাঁধন সহিল না সে যে চির-বন্ধনহারা,
    তাই
    ছন্দ-পাগলে কোলে নিয়ে দোলে জননি মুক্তধারা!
    ও সে
    আলো দিয়ে গেল আপনারে দহি,
    অমৃত বিলাল বিষ-জ্বালা সহি,
    শেষে
    শান্তি মাগিল ব্যাথা-বিদ্রোহী
    চিতার অগ্নি-শূলে!
    পুনঃ
    নব-বীণা-করে আসিবে বলিয়া এই শ্যাম তরুমূলে।
    ওগো
     এই গঙ্গার কূলে॥

    কলিকাতা

    শ্রাবণ, ১৩২৯

  • সুর-কুমার

    সুর-কুমার

    সুর-কুমার

    [দিলীপকুমারের ইউরোপ যাত্রা উপলক্ষ্যে]

    বন্ধু, তোমায় স্বপ্ন-মাঝে ডাক দিল কি বন্দিনী

    সপ্ত সাগর তেরো নদীর পার হতে সুর-নন্দিনী!

    বীণ-বাদিনী বাজায় হঠাৎ যাত্রা-পথের দুন্দুভি,

    অরুণ আঁখি কইল সাকি, ‘আজকে শরাব মুলতুবি!’

    সাগর তোমায় শঙ্খ বাজায়, হাতছানি দেয় সিন্ধু-পার,

    গানের ভেলায় চললে ভেসে রূপকথারই রাজকুমার!

    গানের ভেলায় চললে ভেসে রূপকথারই রাজকুমার!

    লয়ে সুরের সোনার কাঠি দিগ‌্‌বিজয়ে যাও সেথায়।

    বন্দী-দেশের আনন্দ-বীর! আনবে তুমি জয় করি

    ইন্দ্রলোকের উর্বশী নয় – কণ্ঠলোকের কিন্নরী।

    শ্বেতদ্বীপের সুর-সভায় আজকে তোমার আমন্ত্রণ,

    অস্ত্রে যারা রণ জেতেনি বীণায় তারা জিনল মন।

    কণ্ঠে আছে আনন্দ-গান, হস্ত-পদে থাক শিকল;

    ফুল-বাগিচায় ফুলের মেলা, নাই-বা সেথা ফলল ফল।

    বৃত্ত-ব্যাসে বন্দী তবু মোদের রবির অরুণ-রাগ

    জয় করেছে যন্ত্রাসুরের মানব-মেধের লক্ষ যাগ।

    ছুটছে যশের যজ্ঞ-ঘোড়া স্পর্ধা-অধীর বিশ্বময়,

    তোমার মাঝে দেখব বন্ধু নূতন করে দিগ‍্‍বিজয়।

    বীণার তারে বিমান-পারের বেতার-বার্তা শুনছি ওই

    কণ্ঠে যদি গান থাকে গো পিঞ্জরে কেউ বন্ধ নই।

    চলায় তোমার ক্লান্তি তো নাই নিত্য তুমি ভ্রাম্যমান,

    তোমার পায়ে নিত্য নূতন দেশান্তরের বাজবে গান।

    বধূর মতন বিধুর হয়ে সুদূর তোমায় দেয় গো ডাক,

    তোমার মনের এপার থেকে উঠল কেঁদে চক্রবাক!

    ধ্যান ভেঙে যায় নবীন যোগী, ওপার পানে চায় নয়ন,

    মনের মানিক খুঁজে ফের বনের মাঝে সর্বক্ষণ।

    দূর-বিরহী, পার হয়ে যাও সাত সাগরের অশ্রুজল,

    আমরা বলি – যাত্রা তোমার সুন্দর হোক, হোক সফল!

    কলিকাতা,

    ৪ ফাল্গুন, ১৩৩৩

  • রক্ত-পতাকার গান

    রক্ত-পতাকার গান

    রক্ত-পতাকার গান

    ওড়াও ওড়াও লাল নিশান!….

    দুলাও মোদের রক্ত-পতাকা

    ভরিয়া বাতাস জুড়ি বিমান!

    ওড়াও ওড়াও লাল নিশান॥

    শীতের শ্বাসেরে বিদ্রুপ করি ফোটে কুসুম,

    নব-বসন্ত-সূর্য উঠিছে টুটিয়া ঘুম,

    অতীতের ওই দশ-সহস্র বছরের হানো মৃত্যু-বাণ

    ওড়াও ওড়াও লাল নিশান॥

    চির বসন্ত যৌবন করে ধরা শাসন,

    নহে পুরাতন দাসত্বের ওই বদ্ধ মন,

    ওড়াও ওড়াও লাল নিশান!

    ভরিয়া বাতাস জুড়ি বিমান।

    বসন্তের এই জ্যোতির পতাকা ওড়াও ঊর্ধ্বে

    গাহোরে গান!

    লাল নিশান! লাল নিশান!

    কলিকাতা,

    ১ বৈশাখ, ১৩৩৪

  • অন্তর-ন্যাশন্যাল সঙ্গীত

    অন্তর-ন্যাশন্যাল সঙ্গীত

    অন্তর-ন্যাশন্যাল সঙ্গীত

    জাগো—
     
    জাগো
    অনশন-বন্দী, ওঠো রে যত
    জগতের লাঞ্ছিত ভাগ্যহত!
    যত
    অত্যাচারে আজি বজ্র হানি
    হাঁকে
    নিপীড়িত-জন-মন-মথিত বাণী,
    নব
    জনম লভি অভিনব ধরণি
    ওরে ওই আগত॥
    আদি
    শৃঙ্খল সনাতন শাস্ত্র-আচার
    মূল
    সর্বনাশের, এরে ভাঙিব এবার!
    ভেদি দৈত্য-কারা
    আয় সর্বহারা!
    কেহ
    রহিবে না আর পর-পদ-আনত॥
    কোরাস :
     
    নব ভিত্তি পরে
    নব
    নবীন জগৎ হবে উত্থিত রে!
    শোন
    অত্যাচারী! শোন রে সঞ্চয়ী!
    ছিনু সর্বহারা, হব সর্বজয়ী॥
    ওরে
    সর্বশেষের এই সংগ্রাম-মাঝ
    নিজ
    নিজ অধিকার জুড়ে দাঁড়া সবে আজ!
    এই
    “অন্তর-ন্যাশন্যাল-সংহতি” রে
    হবে
    নিখিল মানব জাতি সমুদ্ধত॥

    কলিকাতা,

    ১ বৈশাখ, ১৩৩৪

  • জাগর-তূর্য

    জাগর-তূর্য

    জাগর-তূর্য

    [ শেলির ভাব-অবলম্বনে ]

    ওরে ও শ্রমিক, সব মহিমার উত্তর-অধিকারী!

    অলিখিত যত গল্প-কাহিনি তোরা যে নায়ক তারই॥

    শক্তিময়ী সে এক জননির

    স্নেহ-সুত সব তোরা যে রে বীর,

    পরস্পরের আশা যে রে তোরা, মার সন্তাপ-হারী॥

    নিদ্রোত্থিত কেশরীর মতো

    ওঠ ঘুম ছাড়ি নব জাগ্রত!

    আয় রে অজেয় আয় অগণিত দলে দলে মরুচারী॥

    ঘুমঘোরে ওরে যত শৃঙ্খল

    দেহ মন বেঁধে করেছে বিকল,

    ঝেড়ে ফেল সব, সমীরে যেমন ঝরায় শিশির বারি।

    উহারা কজন? তোরা অগণন সকল শক্তি-ধারী॥

    কলিকাতা,

    ১ বৈশাখ, ১৩৩৪