Category: মুহম্মদ জালালউদ্দীন বিশ্বাস

  • বাবরনামা

    বাবরনামা

    বাবরনামা

    মোগল সম্রাট জহির উদ্-দিন মুহম্মদ জালাল উদ্-দিন বাবর বিরচিত

    অনুবাদ • সম্পাদনা • ভূমিকা মুহম্মদ জালালউদ্দীন বিশ্বাস

    প্রকাশকাল—মাঘ ১৪২২ ফেব্রুয়ারি ২০১৬

    প্রচ্ছদ—ধ্রুব এষ

    .

    অনুবাদকের উৎসর্গ

    আমার অকাল প্রয়াত বন্ধু প্রিন্সিপাল মতিউর রহমান

    তাঁর সহধর্মিণী সাহারা বানুকে

    চিরস্থায়ী বন্ধুত্বের নিদর্শনস্বরূপ—

    জীবন-চলার পথ কত না বন্ধুর আর দুর্গম জানি

    সে জীবনে বাধা আছে, ব্যথা আছে, দুঃখ আছে, বঞ্চনা আছে,

    তবু সে জীবনখানি বিজয়ের আশা নিয়ে সদা জেগে আছে

    আশাহত ব্যথাহত, জীবন-যন্ত্রণা কত সব নেয় মানি।

    পতন-অভ্যুদয় বন্ধুর পথে-পথে যে জীবন চলে

    সে জীবন বাধা জয় করবেই একদিন সফল সে হবে।

    সফল জীবন-রূপে যে জীবন একদিন প্রতিষ্ঠিত হবে

    চরৈবেতি চরৈবেতি, সত্য-পথে যে জীবন সদা বয়ে চলে—

    সে জীবন মরে নাকো, অমৃতস্য পুত্র রূপে চিরামর থাকে

    মহাকালচক্ররথে সে জীবন বয়ে চলে সেটাই জীবন

    অমৃতের পুত্র যারা, পৃথক সে কিছু নয় জীবনমরণ—

    ক্ষণিকের মুসাফির অমৃতের যাত্রাপথ অব্যাহত রাখে—

    ক্ষুদ্র সে জীবন তাই তার কাছে ক্ষুদ্র নয়, অসীম অনন্ত

    মহাকাল স্রোতে তাই যতই সে ভেসে যাক—নাই তার অন্ত।

    ১৫.৯.২০১৫ ঈসায়ী
    মুহম্মদ জালালউদ্দীন বিশ্বাস
  • ভূমিকা

    ভূমিকা

    ভূমিকা

    পাক ভারত—বাংলা উপমহাদেশে বিভিন্ন সময়ে সংঘটিত মুসলিমদের রাজনৈতিক অভিযানগুলোকে আমি রাজনৈতিক মিশন বলে অভিহিত করে থাকি। অষ্টম শতাব্দীর শুরুর প্রথম দশকের দ্বিতীয় পাদে অর্থাৎ ৭১২ ঈসায়ী মনে মুহম্মদ বিন কাসিমের নেতৃত্বে পরিচালিত অভিযানটি ছিল ভারতে মুসলিমদের প্রথম রাজনৈতিক মিশন। বিপক্ষে ছিলেন সিন্ধুর হিন্দু রাজা দাহির। তাঁর পরাজয় ও মুহম্মদের বিজয় ছিল ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসের প্রথম আধুনিক ঘটনা। কেননা, সদ্য পৌত্তলিকতামুক্ত আরববাসী পৌত্তলিক ভারতবাসীর জীবনে ইসলামের আলোকবার্তা বয়ে এনেছিলেন। সেই আলোর সংস্পর্শে পৌত্তলিক সিন্ধুবাসী হিন্দুরা আলোকিত হয়ে ওঠে। পর্যায়ক্রমে উত্তর—পশ্চিম সীমান্ত প্ৰদেশ, পঞ্জাব, বেলুচিস্তান কেউই বাদ যায়নি। তারা সবাই আলোক্কাত ও মুসলিম হয়ে ওঠেন

    মুসলিমদের দ্বিতীয় বিজয়াভিযান পরিচালিত হয় সুলতান মাহমুদের নেতৃত্বে। তৃতীয় বিজয়াভিযান পরিচালিত হয় মুহম্মদ ঘুরির নেতৃত্বে এবং তাঁর নেতৃত্বেই ভারতের দিল্লিতে প্রথম মুসলিম সালতানাত কায়েম হয়। বিপক্ষে ছিলেন অহঙ্কারী দাম্ভিক পৃথ্বিরাজ চৌহান। তাঁর দম্ভ চূর্ণ করে দিয়ে দিল্লিতে মুসলিম সালতানাত কায়েম করে এদেশে মুসলিমদের রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করেন মুহম্মদ ঘুরি। অবশিষ্ট পৌত্তলিক ভারত ইসলামের আলোয় আলোকিত হয়ে উঠতে থাকে। চতুর্থ অভিযান পরিচালিত হয় জহির—উদ—দিন মুহম্মদ বাবুরের নেতৃত্বে। প্রতিপক্ষ ছিলেন ইব্রাহীম লোদি। তারপরের প্রতিপক্ষ ছিলেন রাজা সাঙ্গা। বাবুরকে পরাজিত করে তিনি দিল্লি সালতানাত দখলের দুঃস্বপ্ন দেখেছিলেন। বাবুর তা চূর্ণ—বিচূর্ণ করে দিয়ে দিল্লিতে মোগল সালতানাত কায়েম করেন পরবর্তী প্রায় সাড়ে তিনশো বছরের জন্য। এই বিজয়ের ধারাবাহিক বর্ণনা এই ভূমিকায় প্রদত্ত হয়েছে। ‘বাবরনামা’ গ্রন্থের পাঠকদের জন্য তা খুবই প্রাসঙ্গিক।

    এক

    বিশ্বনবি হজরত মুহম্মদ মুস্তাফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আবির্ভাব মানব জাতি ও মানব—সভ্যতার ইতিহাসের এক যুগান্তকারী ঘটনা। তাঁর আবির্ভাবের সাথে সাথে নবুয়ত ও রিসালাতের ধারা একদিকে যেমন শেষ হয়ে গিয়েছিল, অন্যদিকে তেমনি মানুষের যুগযুগান্তরের জ্ঞান ও প্রজ্ঞার সাধনা পূর্ণতালাভ করেছিল। পবিত্র মহানবির (স) উপর মহাগ্রন্থ পবিত্র কুরআন অবতরণের সাথে—সাথে যেমন আসমানি কিতাবের ধারা পূর্ণতা লাভ করেছিল, অন্যদিকে তেমনি পবিত্র কুরআনে ‘তোমাদের দ্বীনকে পুরা করলাম’ এবং ‘ইসলামই আল্লাহর একমাত্র মনোনীত ধর্ম’—ঘোষণার সাথে সাথেই মহানবি (স) ত্রিকালশ্রেষ্ঠ ও ত্রিকালদর্শী মহাপুরুষরূপে জগতে চিরপ্রতিষ্ঠিত হয়ে গেলেন। এ কোনো অতিশয়োক্তি নয় যে, তিনিই জগতের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ, ত্রিকালশ্রেষ্ঠ এবং ইহপরকালের অবিসংবাদিত নেতা। তাই তাঁর উপর অবতীর্ণ পবিত্র মহাগ্রন্থ আল—কুরআন যেমন সকল কালের সর্বশ্রেষ্ঠ গ্রন্থ, মানবজাতির চিরকালের মহাসনদ; তেমনই সেই পবিত্র কুরআনের প্রতিবিম্ব মহানবির জীবন ও বাণী বিশ্বমানবের চিরকালীন ও চিরন্তন আদর্শ। মহানবি (স) বিদায় হজ্বের ভাষণে তাই স্পষ্টতই বলেছিলেন, ‘আল্লাহর কিতাব ও রসুলের সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরে থাকবে—তাহলে কেউ তোমাদের বিভ্রান্ত করতে পারবে না।’ মহানবি (স)—এর পবিত্র মুখনিঃসৃত এ বাণী বিশ্বমুসলিমের চিরকালীন—চিরকালের পথপ্রদর্শকের বাণী—স্পষ্টতই, একথা যুগে যুগে কালে কালে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ হয়েছে যে, মহানবির এ বাণী অজর—অমর—অব্যয়—অক্ষয়; তার লয় নেই, তার ক্ষয় নেই; মহাপ্রলয়কালাবধি মহাকাল—সাগরে তা আলোকবর্তিকার ন্যায় পথহারা পথিককে আলোর সন্ধান দিয়ে যাবে—ন্যায়হারা, সত্যহারা, পথহারা জাতিকে সঠিক সত্যের দিশা দিয়ে যাবে।

    বড়ই সৌভাগ্যবান ঐ আরবজাহান, যে জাহানে, যে মরুর বুকে আবির্ভূত হয়েছিলেন পবিত্র মহানবি—যিনি আল্লাহর খলিল হজরত ইব্রাহিমের দ্বীনকে আরবদেশের বুকে পুনরুজ্জীবিত করে—কাবাকেন্দ্রিক অধ্যাত্মিক মহাজগৎ সৃষ্টি করে বিশ্বমানবের জন্য অমিয়সুধার মহাভাণ্ডার সুরক্ষিত করে গেলেন। এ এক অত্যাশ্চর্য ব্যাপার; এবং আরো অদ্ভুত এবং আরো সুন্দর একটি ব্যাপার হলো যে, ইসলামের মহানবি আবির্ভূত হয়েছিলেন পৃথিবীর একেবারেই মধ্যভাগে—মধ্যস্থলে—একেবারেই মক্কা—মহানগরে; যা জেদ্দা বন্দরের অনতিদূরেই অবস্থিত। আদিমানব আদম ও হাওয়ার পদস্পর্শধন্য জেদ্দা—অনতিদূরেই যুগযুগান্তরের নবি—রসুলদের পদস্পর্শধন্য মক্কানগরী—সে মক্কানগর—যেখানে সুরক্ষিত রয়েছে পবিত্র স্বর্গীয় পাথর ‘হাজরে আসওয়াদ’, সে পবিত্র কাবাগৃহ—যাকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়েছিল ইব্রাহিমি দ্বীনের আধ্যাত্মিক জগৎ—সে কাবানগরী মক্কায় মহানবির আবির্ভাব বিশ্বমানবের জন্য আরেক তাৎপর্যময় মহাঘটনারূপে চিরস্মরণীয় হয়ে রইল। একেবারে আদিমানব ও আদিনবি আদম থেকে শুরু করে আখেরী নবি মুহম্মদের (স) আবির্ভাব—সেমিটিক ধর্মজগতের এক যুগান্তকারী ঘটনারূপে ত্রি—জগতে অজর অমর—অব্যয়—অক্ষয় হয়ে রইল।

    মহানবি মুহম্মদ (স) নিজের জীবন ও সাধনা দিয়ে অশিক্ষিত, অজ্ঞ আরব জনগণকে যে মহামন্ত্র ও মহাসত্যের সন্ধান দিয়েছিলেন, সে মন্ত্র, সে আলোকিত সত্য তাদের যুগযুগান্তরের অন্ধকার ও অজ্ঞতাকে দূরীভূত করে দিয়ে এক আলোকিত ও সম্ভাবনাময় জান্নাতি জাতিরূপে জগতে তাদের চিরমহিয়ান হওয়ার মহামর্যাদায় বিভূষিত করল। সদ্য আলোকিত জাতি, সেদিন সুসভ্য ও মহিমান্বিত জাতিসত্তায় রূপান্তরিত হয়েছিল। তাদের চোখের সামনেকার সকল অন্ধকার বিদূরিত হয়ে গিয়েছিল। সেদিন তাঁরা অনুভব করেছিলেন, যে মহিমান্বিত মহাসত্যের সন্ধান তারা পেয়েছেন যে মহাসত্য তা শুধু তাদের জন্য নয়; তা এসেছে বিশ্বমানবের জন্য। আলোকিত আরবজাহানের বাইরের অনালোকিত জগতকে সে সত্যের আলোয় আলোকিত করার প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ হয়ে বিশ্বের দিগদিগন্তে তা ছড়িয়ে দেওয়ার এক স্বর্গীয় প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ হয়ে তাঁরা কখনো বা দিগ্বজয়ীর বেশে, কখনো বা চিরত্যাগী চির সন্ন্যাসীর বেশে দিগদিগন্তে ছড়িয়ে পড়লেন। বিশ্বমানবের দরবারে সে মহাসত্যের বাণী পৌঁছে দেওয়ার যে আধ্যাত্মিক মাদকতা তাঁরা সেদিন অনুভব করে জীবন—মরণ—পণ করে বিশ্বের দিগদিগন্তে ছড়িয়ে পড়েছিলেন, তা কি ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব? এটা কোন মহাশক্তি আর কোন মহামন্ত্রবলে সম্ভব হলো? নিশ্চয়ই তার সামনে জগতের আর সব ধর্মীয়, আধ্যাত্মিক, সাংস্কৃতিক, সামাজিক, বৈশ্বিক সমস্ত ধ্যানধারণাই ম্লান হয়ে গিয়েছিল। পবিত্র ইসলামের আলোকিত জীবন—দর্শনের সামনে ইরানের মানিকীবাদ (Manikism) নিশ্চয়ই বড় অসহায় ও দুর্বল হয়ে পড়েছিল। খোদ আরবের পৌত্তলিকতাবাদ, তার প্রতিবেশী আরো দুই ধর্মীয় মতবাদ খ্রিস্টীয় ও ইহুদিবাদ—নিঃসন্দেহে তার সামনে নিষ্প্রভ হয়ে পড়েছিল। নতুবা ইসলামের আলোকিত সৌন্দর্য ও আলোকিত জীবনবাদের সংস্পর্শে আসার ফলে তারা এ নবীন জীবনবাদ প্রতিষ্ঠার জন্য ময়দান ছেড়ে দিতে বাধ্য হলো কেন? যে ইজম বা যে বাদটাই ছিল পুরোমাত্রায় ভাববাদ, এবং সে বাদ বা ইজমকে কেন্দ্র করে যে মানবতাবাদ বা মানবজীবনবাদ গড়ে উঠল—আর তার সংস্পর্শে অন্যান্য ইজম বা বাদ ময়দান ছেড়ে দিতে বাধ্য হলো কোন মহাশক্তি আর কোন মহামন্ত্রবলে? সে কি তরবারির জোরে? প্রাচ্যের ও পাশ্চত্যের ইসলাম—বিরোধী নিন্দুকদের ইসলামের বিরুদ্ধে ও জঘন্য অপবাদ সুস্থ ও সুকুমারবুদ্ধিবৃত্তিসম্পন্ন মানুষদের কাছে মোটেও গ্রহণযোগ্য হয়নি—হবেও না কোনোদিন। এভাবেই ইসলাম তার অন্তর্নিহিত প্রাণশক্তির বলে একদা যেদিন পৃথিবীর মধ্যস্থলে সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, মহানবির তিরোধানের মাত্র একশো বছরের মধ্যে তা পশ্চিমে স্পেন ও পূর্বে ভারত উপমহাদেশের সিন্ধু নদ পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছিল।

    দুই

    ইসলামের পবিত্র মহানবির (স) তিরোধানের পর পর্যায়ক্রমে খোলাফায়ে রাশেদীনের যুগ অতিবাহিত হয়ে হজরত আবু বকর, হজরত উমর, হজরত উসমান ও হজরত আলীর (রা) পর সদ্য প্রতিষ্ঠিত ইসলাম জগতে দুর্যোগের যে ঘনঘটা নেমে আসে, তা ছিল মূলত রাজনৈতিক। ইসলামের বিশ্বভ্রাতৃত্বের আদর্শ, ইসলামের আর্থসামাজিক ও আধ্যাত্মিক জগৎ তখনও পর্যন্ত একই ঐক্যসূত্রে গ্রোথিত ছিল। এবং তখনও পর্যন্ত আবিষ্কৃত মহাদেশীয় ভূখণ্ডগুলোতে ইসলামের বিজয়াভিযান অব্যাহত ছিল। অব্যাহত গতিতে এগিয়ে চলেছিল—ইসলামের অগ্রাভিযান। সে অভিযান একদিকে ছিল যেমন রাজনৈতিক, অন্যদিকে তেমনই ছিল আর্থসামাজিক ও আধ্যাত্মিক। এর পুরো বিষয়টিকে এক কথায় মিশন (Mission) বলে অভিহিত করাটাই অধিকতর যুক্তিসঙ্গত। যেমন—রাজনৈতিক মিশন, সামাজিক মিশন, আধ্যাত্মিক মিশন, অর্থনৈতিক মিশন ইত্যাদি। আমরা এর সমস্তটিকে একত্রিত করে—বোঝার সুবিধার্থে ‘মুহম্মদী মিশন’ বলে অভিহিত করব। তাতে বিষয়টি বুঝতে আরও সুবিধা হবে।

    ইসলামের এ মিশন বা মুহম্মদী মিশন অতীত পৃথিবীর সমস্ত মিশনকে নস্যাৎ করতে—করতে পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছড়িয়ে পড়তে লাগল। এ ব্যাপারে আমিরুল মুমিনিন হজরত উমর ফারুক রাজিআল্লাহুতায়ালা আনহুর অবদান যেন সবচেয়ে বেশি বলে প্রতীত হয়। মহানবি মুহম্মদের (স) সেই জগদ্বিখ্যাত উক্তি—‘আমার পরে নবি হলে উমর হতেন নবি’—এ যে কোনো অতিশয়োক্তি নয় ইসলামের ধারাবাহিক ইতিহাস পর্যালোচনা করলে সে কথার সততা আমাদের চোখের সামনে সূর্যসত্য হয়ে ফুটে ওঠে।

    তাঁর উপর সর্বশক্তিমান আল্লাহর অপার করুণা বর্ষিত হোক। সেই মহান খলিফার হাত দিয়ে তৎকালীন বিশ্বের যে সকল দেশে মুহম্মদী মিশন পরিচালিত হয়েছিল তা আশ্চর্যরকমভাবে সার্থক হয়ে উঠেছিল। ইসলাম জগতের সেই মহান সন্তানের মধ্যে আল্লাহ যেন ‘নবুয়তি বরকত দান করেছিলেন। তাঁর অধিকাংশ মিশনই হয়েছিল সফল ও সার্থক। এবং আরও সুখ ও আনন্দের বিষয় যে, তাঁর আমলে বিজিত প্রায় সমস্ত ভূখণ্ডেই আজও ইসলামের পতাকা সমুন্নত রয়েছে।

    তাঁর হাতেই বিজিত হয়েছিল মিশর ও ইরানের মতো দুটি প্রাচীন সভ্য দেশ ও সেই সাথে মধ্যপ্রাচ্য ও মধ্য এশিয়ার অধিকাংশ দেশই এসেছিল ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে। আজকের উজবেকিস্তান, তুর্কমেনিস্তান, কিরগিজস্তান প্রভৃতি ভূখণ্ড ছিল তারই খিলাফতকালের বিজয়ের স্মারক। একথা ভেবে আজ আমাদের শোকের অন্ত নেই যে, সে মহান খলিফা অত্যল্পকালের মধ্যেই ইসলামের ইতিহাসে যে অক্ষয় কীর্তি স্থাপন করে গিয়েছেন, তার দৃষ্টান্ত শুধু ইসলামের ইতিহাসে নয়; সমগ্র পৃথিবীর ইতিহাসে সুদুর্লভ। তবে এর চেয়েও শোকাবহ ঘটনা যে, মহান খলিফার অপঘাতে শাহাদতের ঘটনায় সেদিনকার মুসলিম বিশ্ব যেমন বিমূঢ় ও মুহ্যমান হয়েছিল, আজকের মুসলিম বিশ্ব সমভাবে তার অংশীদার। তাঁর মতো অতি দ্রুত গতিতে ও অতি দ্রুত পদচারণায় বিশ্বের অন্যান্য ভূখণ্ডে তাঁর মতো করে আর ইসলাম প্রচারিত হতে পারল না এবং মর্তপৃথিবী ঐভাবে সুগঠিত হতে পারল না। সত্যি, এ দুঃখ রাখার জায়গা নেই।

    তিন

    ঐতিহাসিকভবে একথা সত্য যে, হজরত উমরের খিলাফতকালে তৎকালীন ভারত উপমহাদেশে বিচ্ছিন্নভাবে দু—একটি মিশন পরিচালিত হয়েছিল। তবে তা ততটা ফলপ্রসূ হয়নি। এ না হওয়ার মূলে ছিল হজরত উমরের সীমাহীন দূরদর্শিতা। তাঁর সুযোগ্য নেতৃত্বে যতগুলো অভিযান প্রেরিত হয়েছিল তার সবকটিতেই তাঁর এ দূরদর্শিতা সক্রিয় ছিল। তাঁর দেশবিজয়ের একটা বৈশিষ্ট্য ছিল এই যে, বিজিত ভূখণ্ডগুলোতে তিনি নিরঙ্কুশ শাসন কায়েম করতেন। তাঁর প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ছিল অসাধারণ। সে বিশাল ব্যক্তিত্বের খিলাফতাধীনে কোনো প্রাদেশিক শাসনকর্তার পক্ষে তাঁর নির্দেশ অমান্য করা সম্ভব ছিল না। খলিফা উমরের শুধু দূরদর্শিতা নয়; দূরদৃষ্টিও ছিল অসাধারণ। মদিনা মুনাওয়ারা থেকে বহুদূরস্থিত প্রদেশগুলোর প্রশাসন ব্যবস্থাকে তিনি যেন সেই দূরদৃষ্টি দিয়ে প্রত্যক্ষ করতেন। কোনো প্রশাসকের পক্ষে সম্ভব ছিল না তাঁর আদেশ অমান্য করা, আর কোনো প্রজার পক্ষে সম্ভব ছিল না প্রশাসনিক নিয়ম ও আইনকানুনকে ভঙ্গ করা। তাঁর খিলাফতাধীনে এভাবেই গড়ে উঠেছিল এক শৃঙ্খলাবদ্ধ শাসনব্যবস্থা। বলাবাহুল্য, বিজিত এলাকাগুলোতে এভাবে প্রশাসনিক শৃঙ্খলা আনয়ন না করা পর্যন্ত তিনি নতুন নতুন এলাকায় মিশন পাঠানোর পক্ষপাতী ছিলেন না। সেজন্য তৎকালীন ভারত উপমহাদেশে মিশন পাঠানোর ব্যাপারে তাঁর কিছুটা দ্বিধা ছিল। তবুও একথা ঠিক যে, পূর্ণ জীবন লাভ করলে তাঁর নবুয়তি—বরকতময় হাতের কল্যাণে মুহম্মদী মিশন তৎকালীন বিশ্বের আরও কত এলাকা যে বিজিত হয়ে সেখানে চিরস্থায়ী ইসলামি ব্যবস্থা কায়েম হতো তা একমাত্র আল্লাহই জানেন। আল্লাহ সেই পবিত্রাত্মা মহাপুরুষের কল্যাণময় আত্মাকে জান্নাতে চিরশান্তিতে রাখুন।

    পবিত্র খোলাফায়ে রাশেদীনের যুগ অতিবাহিত হওয়ার পর ইসলাম জগতে জয়ের ধারা বদলে যায় এবং মুহাম্মদী মিশন প্রেরণের ধারা নতুন নতুন গতি লাভ করে। প্রাথমিক যুগে ইসলাম যেখানে নিজেদের মধ্যেকার মতপার্থক্যের ঊর্ধ্বে এক মহিমান্বিত জীবনব্যবস্থারূপে তাঁর পরিচয় অব্যাহত রেখে অবলীলাক্রমে অমুসলিম বিশ্বের পানে প্রধাবিত ছিল, পরবর্তী যুগে সেখানে তা সঙ্কুচিত হয়ে নিজেদের মধ্যেকার মতপার্থক্যকে প্রবলতর করে তুলে আত্মঘাতী ও ভ্রাতৃঘাতী যুদ্ধ প্রণোদনাকে অনিবার্য করে তুলল। এভাবে মুসলিম বিশ্ব নিজেরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়ল, পূর্বের বিজয়ের ধারা শ্লথ হয়ে পড়ল, এবং এক—একটি এলাকায় বংশগত খিলাফতের ধারা প্রযুক্ত হলো। রাজনৈতিক মতপার্থক্য পর্যায়ক্রমে আধ্যাত্মিক মতপার্থক্যের রূপ পরিগ্রহ করল। ইসলামের শত্রুরা নব—নব ছদ্মবেশে মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টিতে আত্মনিয়োগ করল এবং ভ্রাতৃঘাতী দাঙ্গা—হাঙ্গামায় ইন্ধন যোগাতে লাগল। এভাবে তৎকালীন কেন্দ্রীয় মুসলিম নেতৃত্ব দুর্বল হয়ে পড়ল, বংশগত খিলাফত কায়েম হয়ে পড়ল এবং ব্যক্তিগত পর্যায়ে মিশন প্রেরিত হতে লাগল। ভিন্ন ভিন্ন পথে হলেও তা ছিল মুহাম্মদী মিশন। তা ছিল মুহম্মদেরই শিক্ষা প্রসারের প্রচেষ্টা। এ মিশন শুধু রাজনৈতিকভাবে নয়; সামাজিক, অর্থনৈতিক ও আধ্যাত্মিকভাবেও প্রেরিত হতে লাগল এবং পর্যায়ক্রমে বিজিত অঞ্চলগুলোতে বসবাসরত মানুষদের হৃদয়—মন—প্রাণ জয় করে নিতে লাগল। এ বিজয়ের ধারায় হিঁদুস্তান বিজয়ের পরিকল্পনা ছিল ইসলামি ইতিহাসের একটি যুগান্তকারী অধ্যায়ের সূচনা।

    চার

    মহানবি মুহম্মদ মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রচারিত জীবনবাদ পৃথিবীর দিগ—দিগন্তে ছড়িয়ে দেওয়ার দায়িত্বে নিয়োজিত মানবজাতির মহান সন্তানেরা সামান্যতম অলসতাকেও প্রশ্রয় দেননি। মরলে শহীদ বাঁচলে গাজী—এ সৌভাগ্য ও সম্মান তাঁরা ত্যাগ করতে মোটেও রাজি ছিলেন না। তাই জীবনমরণ পণ করে তাঁরা পৃথিবীর এক প্রান্ত হতে অন্য প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছেন। বিশ্বমানবের দরবারে তাঁরা পৌঁছে দিয়েছেন সেই স্বর্গীয় বাণী—স্বর্গীয় জীবনবাদ। এ ছিল স্পষ্টতই মিশনারি কর্মসাধনা। তা ছিল নিজেদের জীবনের বিনিময়ে মহানবির মিশনকে বিশ্বমানবের দ্বারে দ্বারে পৌঁছে দেওয়ার সাধনা। এ মিশন প্রেরণ মূলত তিনটি পদ্ধতিতে সম্পন্ন হয়েছিল। দিগ্বিজয়ীদের মারফত, ধর্মপ্রচারক—সুফি—সন্তদের মারফত এবং বণিকদের মারফত। সন্দেহ নেই, এ সুসংস্কৃত ও পরিশীলিত ধর্ম ও সংস্কৃতি পথভ্রান্ত, পথহারা ও অন্ধকারের যাত্রীদের প্রকৃতই পথ দেখাতে সমর্থ হয়েছিল। আলোকিত ধর্ম, আলোকিত সংস্কৃতি অনালোকিত ধর্ম ও সংস্কৃতির জগতে অতি দ্রুত স্থান করে নিতে সমর্থ হয়েছিল। দিগ্বিজয়ী, সুফি—সন্ত ও বণিকরা—প্রকৃতপক্ষেই মিশনারির ভূমিকা পালন করে যেতে সমর্থ হয়েছিলেন। তৎকালীন আবিষ্কৃত মহাদেশ ও ভূখণ্ডগুলোতে আরব বণিকদের ছিল অবাধ যাতায়াত। কোনো কোনো ক্ষেত্রে দিগ্বিজয়ী মিশনারিদের দিগ্বিজয়ী মিশন পরিচালনার বহুকাল পূর্বেই পৃথিবীর বহু ভূখণ্ডে ইসলাম পৌঁছে গিয়েছিল। যেমন—দক্ষিণ ভারতীয় সমুদ্রোপকূলবর্তী এলাকাসহ শ্রীলঙ্কা, জাভা, সুমাত্রা ইত্যাদি ভূখণ্ড—যেগুলো আজ মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়াসহ মালদ্বীপ প্রভৃতি নামে পরিচিত—যে স্থানগুলো সহ কোরিয়া, থাইল্যান্ড, চীন প্রভৃতি ভূখণ্ডে তো প্রথমেই বণিকদের মারফত ইসলাম পৌঁছে গিয়েছিল। এ দেশগুলোর অধিকাংশতেই তো মুসলমানদের রাজনৈতিক মিশন পরিচালিতই হয়নি; তা সত্ত্বেও ঐ ভূখণ্ডগুলোতে বণিক ও ইসলাম ধর্ম প্রচারকদের মারফত অতি দ্রুত ইসলাম পৌঁছে গিয়েছে। তৎকালীন বিশ্বের অনেক ভূখণ্ডই ছিল অন্ধকার কুসংস্কারাচ্ছন্ন। সে সব এলাকায় অতি দ্রুত ইসলাম তার জায়গা করে নিতে সমর্থ হয়।

    ঐ সময়ে রাজনৈতিক অভিযান প্রেরণের বহু পূর্বেই তৎকালীন ভারতবর্ষের দক্ষিণ—পশ্চিম সমুদ্রোপকূল সহ শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ ইত্যাদি ভূখণ্ডগুলোতে আরব বণিকদের অবাধ পদচারণা ছিল। এবং ব্যবসা—বাণিজ্য সংক্রান্ত বিবাদের সূত্র ধরেই অবশেষে ভারত ভূখণ্ডে বড় রকমের দিগ্বিজয়ী মিশন পরিচালিত হয়।

    আগেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, খলিফা উমরের শাসনামলে হিঁদুস্তানে রাজনৈতিক মিশন প্রেরণের পরিকল্পনা গৃহীত হয়েছিল। কিন্তু যে কারণেই হোক, সে মিশন তেমন সফলতা অর্জনে সমর্থ হয়নি। ইতোমধ্যেই মহাত্মা খলিফা উমর শাহাদত বরণ করেন। তারপর, বহুকাল যাবত আর তেমন কোনো ফলপ্রসূ রাজনৈতিক মিশন প্রেরণের সংবাদ পাওয়া যায় না।

    ইতোমধ্যে মুসলিম জগতে অনেক রাজনৈতিক পট পরিবর্তন দেখা দেয়। সময় প্রবাহের সাথে সাথে খোলাফায়ে রাশেদীনদের যুগ অতিক্রান্ত হয়ে যায়। তারপরের ইতিহাস তো ইতিহাসের মনোযোগী পাঠকমাত্রের অজানা নয়। এরপরে, ভিন্ন ভিন্ন পথ ও পদ্ধতিতে পৃথিবীর একপ্রান্ত হতে অন্য প্রান্তে পৌঁছে যায় ইসলামের মিশন।

    পাঁচ

    খলিফা হজরত উমর (রা)—এর স্বপ্ন অনেক কাল পরে সফল হয় এক সপ্তদশবর্ষীয় আরব তরুণের দ্বারা। আর সেই সাথে একথাও অতীব শ্রদ্ধার সাথে স্মরণীয় যে, আরবদের সিন্ধু বিজয় শুধু ভারতবর্ষের ইতিহাসে নয়; সমগ্র বিশ্ব—ইসলামের ইতিহাসের এক স্মরণীয় ঘটনা। খলিফা হজ্জাজ বিন ইউসুফের ভাইপো ও জামাতা সপ্তদশবর্ষীয় তরুণ মুহম্মদ ইবনে কাসিমের নেতৃত্বে সিন্ধু বিজয় ভারত ইতিহাসের একটি স্মরণীয় ঘটনা। প্রকৃতপক্ষে, এ বিজয়ের দ্বারাই ভারত উপমহাদেশে মুসলমানদের রাজনৈতিক অধিকার সুপ্রতিষ্ঠিত হয়। আর সেই যে সিন্ধু বিজয় সম্পন্ন হয়েছিল—বিচ্ছিন্নভাবে হলেও সে বিজয় ছিল এক চিরস্থায়ী বিজয়। বাস্তবিকই এ ছিল ইসলামের এক সার্থক রাজনৈতিক মিশনের সাফল্য। সাফল্যের এ পথ বেয়েই একদিন সমস্ত হিঁদুস্তান ইসলামের অধীনতা স্বীকার করে নিয়েছিল। উপায় ছিল না; কারণ সমগ্র হিঁদুস্তান তখন পৌত্তলিকতার অন্ধকার গহ্বরে হাবুডুবু খাচ্ছিল। পটভূমিটি তুলনামূলক আলোচনার অবকাশ রাখে। একই অবস্থা ছিল আরবেও। পবিত্র মক্কা নগরীতে হজরত ইব্রাহিম ও তাঁর পুত্র ইসমাইল কাবা—শরীফ প্রতিষ্ঠার মধ্যে দিয়ে যে একেশ্বরবাদী পবিত্র জীবনব্যবস্থা কায়েম করেছিলেন, তাঁদের তিরোধানের পরে পৌত্তলিকতাবাদীরা পুতুল—প্রতিমা প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে সেই পবিত্র মক্কাভূমিকে অপবিত্র করে ফেলেছিল। পবিত্র কাবাগৃহে ছবি ও মূর্তি প্রতিষ্ঠা করে সে গৃহের পবিত্রতা নষ্ট করেছিল। প্রকৃতপক্ষে, একেশ্বরবাদী আরবভূমি অপবিত্র পৌত্তলিকতার অন্ধকার গহ্বরে হাবুডুবু খাচ্ছিল। তারপর পবিত্র দ্বীনের নবি মুহম্মদ মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লালামের আজীবন প্রচেষ্টা ও সাধনার মাধ্যমে পাপপঙ্কিল আরবভূমি একেশ্বরবাদী পুণ্যভূমিতে পরিণত হয়েছিল। একই অবস্থা ছিল ভারতবর্ষেও। সেখানেও পৌত্তলিকতার অভিশাপদগ্ধ জনজীবন সমাজের একদল সুবিধাবাদী পৌত্তলিক—পুরোহিত—নৃপতিদের জালে আবদ্ধ হয়ে ছটফট করছিল—মানবতার নাভিশ্বাস উঠছিল। সপ্তদশ বর্ষীয় তরুণ মুজাহিদ, প্রথমে গাজী ও পরে শহীদ, মুহম্মদ বিন কাশিমের নেতৃত্বে সিন্ধুভূমিতে ইসলাম কায়েম হওয়ার পর পৌত্তলিকতার অভিশাপ থেকে সেখানকার জনগণ মুক্তির নিশ্বাস নিতে থাকে। এক উন্নত সংস্কৃতি ও পবিত্রতম জীবনব্যবস্থার সংস্পর্শে আসার পর সেখানকার মানবচিত্তের পৌত্তলিকতাদগ্ধ ঘোর অন্ধকার বিদূরিত হতে থাকে এবং একটি অত্যুন্নত ও পরিশীলিত জীবনবাদ ও সংস্কৃতির সংস্পর্শে আসার ফলে তাদের মনোজগতে বিপুল পরিবর্তন সূচিত হতে থাকে। এদের মধ্যে বহুসংখ্যক পৌত্তলিক মানসিক পরিবর্তনের সাথে সাথে ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে এসে ধন্য হয়। সদ্যাগত আরবদের সাথে ভ্রাত্বত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে পড়ে। এভাবে সুপ্রতিষ্ঠিত হয় একটি সুসংস্কৃত ও সুপরিশীলিত সুন্দর সমাজব্যবস্থা। ইসলাম আরব—হিঁদুস্তানের ভৌগোলিক ব্যবধানকে ঘুচিয়ে দিয়ে তাদের মধ্যে এক সুসংহত সমাজব্যবস্থা গড়ে তোলে।

    এভাবে কেটে যায় প্রায় তিনশো বছর। এই সুদীর্ঘ তিনশো বছরে ইসলাম বৃহত্তর সিন্ধু এলাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ রয়ে গেল। এর মূল কারণ ছিল বাগদাদকেন্দ্রিক তৎকালীন খিলাফত ব্যবস্থার মধ্যে ঐক্যের নিদারুণ অভাব। অগণিত রাজনৈতিক মতবাদদীর্ণ ভ্রান্ত ও ব্যক্তিগত উচ্চাভিলাষজাত ধ্যান—ধারণার কারণে পরবর্তীকালে অবশিষ্ট হিঁদুস্তান অভিমুখে বড় কোনো রাজনৈতিক মিশন পরিচালিত হতে পারল না। ফলে, আরব মুসলমানরা বৃহত্তর সিন্ধু উপকূলেই দিন অতিবাহিত করতে লাগল।

    হিঁদুস্তানের মাটি ও আহাওয়ার নিজস্ব একটি বৈশিষ্ট্য আছে। সে বৈশিষ্ট্য ও সে প্রভাব থেকে আরব মুসলমানরা নিজদের মুক্ত রাখতে পারল না। সর্বোপরি, স্বল্প পরিশ্রমে পর্যাপ্ত জীবনোপকরণের পরম্পরাগত ধারা তাদের অলস, কুঁড়ে ও অপদার্থ জাতিসত্তায় পরিণত করল। ভোগবিলাসের স্পৃহা ও ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যগত শিথিলতা তাদের আরব—ভূমিজাত বীরত্ব ও দিগ্বিজয়গত স্পৃহাকে ধূলিমলিন করে দিল। ফলে, ইসলামের রাজনৈতিক ও আধ্যাত্মিক মিশন সিন্ধু উপত্যকা অতিক্রম করে বৃহত্তর ভারতে ছড়িয়ে পড়তে পারল না। এর জন্য আরো তিনশো বছর অপেক্ষা করতে হলো।

    ছয়

    ভারতে ইসলামের বিজয়াভিযানের ধারায় অবশেষে যুক্ত হলো ইরানের গজনীর শাসকদের উত্থান। ইরানের সামানী বংশীয় পঞ্চম রাজা আবদুল মালিকের প্রভুভক্ত ক্রীতদাস আলপ্তগীন নিজ কর্মগুণের দ্বারা যে রাজবংশ প্রতিষ্ঠা করেন, ইতিহাসে তা গজনবীবংশ রূপে অক্ষয়—অব্যয় হয়ে আছে। ইরানের রাজবংশজাত সবুক্তগীন ভাগ্যদোষে ক্রীতদাসরূপে আলপ্তগীনের নিকটে বিক্রীত হন বটে, কিন্তু ধমনিতে প্রবাহিত রাজরক্ত ও উন্নত ললাটের অধিকারী সৌভাগ্যবান সবুক্তগীন অচিরেই গজনীর সালতানাত লাভ করেন। উচ্চাকাঙ্ক্ষী সবুক্তগীন ইরান ও আফগানিস্তানের পাহাড়ি উপত্যকা অতিক্রম করে ভারতের উদ্দেশে রাজনৈতিক অভিযান প্রেরণ করেন। আরবদের প্রায় পৌনে তিনশো বছর পর সবুক্তগীনের নেতৃত্বে দুর্ধর্ষ তুর্কি মুসলিমদের সফল রাজনৈতিক মিশন পরিচালিত হয়। জয়পালের নেতৃত্বাধীন সম্মিলিত পৌত্তলিক বাহিনী শোচনীয়ভাবে পরাজয় বরণ করে।

    এরপরে, গজনী বংশের মহান সন্তান গাজী বীর সলতান মাহমুদের উত্থান। এ মহান সন্তানের নেতৃত্বে হিঁদুস্তানের উদ্দেশ্যে পর পর আঠারোটি শান্তি মিশন পরিচালিত হয়। এ মিশনগুলোর প্রধান লক্ষ্য ছিল ভারতবর্ষের মাটিতে মুসলমানদের রাজনৈতিক উত্তরাধিকারকে সুপ্রতিষ্ঠিত করা। মহাবীর গাজী সুলতান মাহমুদের জীবনের একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা হলো যে, তিনি কখনো কোনো যুদ্ধে পরাজয় বরণ করেননি। বিশ্বের সমরেতিহাসে এ এক আশ্চর্যজনক দৃষ্টান্ত।

    ১০০০ খ্রিষ্টাব্দে ভারতের উদ্দেশ্যে সুলতান মাহমুদের প্রথম সামরিক মিশন পরিচালিত হয় এবং ১০২৬ খ্রিষ্টাব্দে গুজরাট ও সোমনাথে সর্বশেষ অষ্টাদশতম মিশন সার্থকভাবে পরিচালনার মাধ্যমে তাঁর হিঁদুস্তান অভিযান সমাপ্ত হয়। এভাবে গাজী বীর সুলতান মাহমুদ পুনঃপুনঃ সমর মিশন পরিচালনার মধ্য দিয়ে ভারতবর্ষে মুসলমানদের আর্থসামাজিক, রাজনৈতিক ও আধ্যাত্মিক উত্তরাধিকার কায়েমের পথ সুপ্রশস্ত করেন।

    ১০৩০ খ্রিষ্টাব্দে সুলতান মাহমুদের ইন্তিকালের পর তাঁর দুর্বল উত্তরাধিকারীরা তাঁর মিশনের ধারা অব্যাহত রাখতে ব্যর্থ হন।

    ইতিহাসের ধারাবাহিকতার একটা সাধারণ বৈশিষ্ট্য হলো এই যে, যখন কোনো প্রবল ব্যক্তিত্বের উত্তরাধিকারীরা পূর্বের প্রবলত্ব বজায় রাখতে ব্যর্থ হয়, তখন তার অন্য প্রতিদ্বন্দ্বী তাদের পরাজিত করে সে স্থান দখল করে ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় নিজেদের নতুন করে সংযোজন করে তার ধারা রক্ষা করে। এ ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। আলোকিত ও প্রবল প্রতাপান্বিত গজনী বংশ দুর্বল হয়ে পড়লে প্রতিপক্ষ শক্তিশালী ঘুরি বংশ সে স্থান দখল করে ইতিহাসের ধারাবাহিকতা রক্ষায় অগ্রণী হলো।

    গজনী বংশের যেমন সুলতান মাহমুদ, ঘুরি বংশের তেমনই মুহম্মদ বিন সাম। ‘মুঈনউদ্দীন’ ও ‘শিহাবুদ্দীন’ তাঁর উপাধি। ইনিই ভারতবর্ষের ইতিহাসে শিহাবউদ্দীন মুহম্মদ ঘুরি নামে সুপরিচিত। সুলতান মাহমুদ গজনবীর ভারত—মিশনকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্যই বোধ করি শিহাবউদ্দীন মুহম্মদ ঘুরির আবির্ভাব হয়েছিল।

    সবকিছু দেখেশুনে মনে হয় সুলতান মাহমুদের অসমাপ্ত মিশনকে সমাপ্ত করার জন্য বিধাতা তাঁকে হিঁদুস্তানে প্রেরণ করেছিলেন।

    পৌত্তলিক নৃপতিদের বিরুদ্ধে সুলতান মাহমুদের যে ভূমিকা ছিল, মুহম্মদ ঘুরিও হিঁদুস্তানে সে ভূমিকাই পালন করে গিয়েছেন। পঞ্জাব, মুলতান, গুজরাট, কনৌজ, দিল্লি, আজমীর, বুন্দেলখণ্ড, বাংলা, বিহার সর্বত্রই তিনি শান্তি মিশন পরিচালনা করেছিলেন। এসব মিশন পরিচালনা ভারতের ইতিহাসে তাঁর অবিস্মরণীয় কীর্তি বলে স্বীকৃতিলাভ করেছে। বিশেষ করে, আজমীর বিজয় তাঁর জীবনের এক অক্ষয় কীর্তি বলে পরিগণিত হবে। আর তাঁর বিশ্বস্ত অনুচর কুতুবউদ্দীন আইবকের আরেক বিশ্বস্ত অনুচর ইখতিয়ারউদ্দীন মুহম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজির বিহার ও বঙ্গবিজয়—ভারত—ভূখণ্ডে ইসলামের অবিস্মরণীয় বিজয় বলে স্বীকৃতি লাভ করেছে। তবে একথাও সত্য যে, সুলতান মাহমুদ ও ঘুরির দেশ—বিজয়ের মধ্যে কিছুটা পার্থক্য আছে। সুলতান মাহমুদ ছিলেন অপরাজিত বীর——মুজাহিদ ও গাজী; কিন্তু ঘুরি কোনো কোনো ক্ষেত্রে পরাজয় বরণ করেছিলেন কিন্তু সে পরাজয় ছিল তাঁর জয়ের পূর্ব—লক্ষণ। পিছিয়ে এসে দীর্ঘ লাফ দেয়ার সাথেই তার তুলনা করা যায়। মুহম্মদ ঘুরি তাই—ই করেছিলেন।

    ঘুরির ভারত অভিযানের—বলাবাহুল্য, শান্তি মিশন পরিচালনার ক্ষেত্রে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনা হলো তরাইনের যুদ্ধে পৃথ্বিরাজ চৌহানের বিরুদ্ধে সমরাভিযান। তরাইনের প্রথম যুদ্ধে রাজপুত বাহিনীর বিরুদ্ধে পরাজয় ছিল প্রকৃতপক্ষে দ্বিতীয় যুদ্ধে তাঁর বিজয়েরই আলামত। বাস্তবিকই তাই হয়েছিল—তিনি যেমনটি আশা করেছিলেন। তারপর মীরাট, কোল, দিল্লি, কনৌজ, কালিঞ্জর ইত্যাদি বিজয়—প্রকৃতপক্ষে, ভারতে মুসলিমদের রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য অতি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এ পদক্ষেপ ব্যর্থ হবার কথা ছিল না—হবারও নয়। কারণ, এ যুগের কবির কথায়—‘আল্লাতে যার পূর্ণ ইমান কোথা সে মুসলমান।’ বলাবাহুল্য, তাঁরা ছিলেন পূর্ণ ইমানের অধিকারী সাচ্চা মুসলমান। বাতিলপন্থীদের যত সামরিক ক্ষমতাই থাকুক না কেন, ইসলামের শান্তি মিশনের সাথে সংঘর্ষে পর্যুদস্ত হওয়াটাই ছিল প্রাকৃতিক বিধিবিধানের অংশ।

    এ প্রসঙ্গে একটা বিষয় একটু সংক্ষেপে বিশ্লেষণ করা একান্ত আবশ্যক। এ পর্যন্ত ভারতে মুসলমানদের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার কায়েমের ক্ষেত্রেও তিন বীর মুজাহিদের অবদান কারও চেয়ে খাটো করতে চাই না। প্রকৃতপক্ষে, এ ছিল বিজয়ের ধারাবাহিকতায় তিনটি মনজিল। প্রথম মনজিলে ছিলেন মহাত্মা গাজী মুহম্মদ বিন কাসিম, দ্বিতীয় মনজিলে ছিলেন মহাত্মা গাজী সুলতান মাহমুদ আর তৃতীয় মনজিলে ছিলেন মহাত্মা গাজী শিহাবউদ্দীন মুহম্মদ ঘুরি। প্রথম জন ছিলেন আরব, পরবর্তী দু’জন তুর্কি—বলাবাহুল্য তরুণ তুর্কি। এ মহাত্মাদের বিপুল বিজয়াভিযান সিঁদুস্তান ভূখণ্ডে মুসলমানদের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার যেমন কায়েম করে, তেমনই পৌত্তলিক ভারতে ইসলামের বিজয় পতাকাতলে ইসলামের সুশীতল শান্তিবাতাস প্রবাহের পথ প্রশস্ত করে, মুসলমানদের বসবাসের উপযুক্ত করে গড়ে তোলে। এভাবে এ ভূখণ্ডে ইসলামের এক দীর্ঘস্থায়ী বিজয় সূচিত হয়। এ প্রসঙ্গে আরও উল্লেখ্য যে, মুহম্মদ বিন কাসিম ও সুলতান মাহমুদ ভারতে ধারাবাহিক ও স্থায়ী মুসলিম শাসনব্যবস্থা ঠিক পুরোপুরি কায়েম করে যেতে পারেননি; সে কাজটি সম্পন্ন করেন মুহম্মদ ঘুরি। বাস্তবিকই ভারতে স্থায়ী মুসলিম রাজ কায়েমের মধ্য দিয়ে ভারত—ইতিহাসে তিনি তিনি চিরস্থায়ী সম্মানের অধিকারী হয়ে গেলেন।

    সাত

    মুহম্মদ শিহাবউদ্দীন ঘুরির ভারত বিজয়ের সাথে, ভারতে ইসলামের আধ্যাত্মিক মিশন পরিচালনার ইতিহাস মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। মুহম্মদ ঘুরির ভারতাভিযানের পূর্ব পর্যন্ত মুসলমান আধ্যাত্মিক মিশনারিরা ইসলাম প্রচারে বাতিলপন্থীদের দ্বারা বারবার বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছিলেন। অতীতে যেমন হয়েছিলেন—ইসলামের নবি—রসুলেরা! পৌত্তলিকতার অন্যতম ও শক্তিশালী ঘাঁটি ভারতে নায়েবে রসুলেরা ইসলাম প্রচারে প্রাণঘাতী বাধার সম্মুখীন হয়েছিলেন। আর এ বাধ্য অপসারণ করে ইসলামের শান্তির ধারাকে নিষ্কণ্টক করার জন্য ভারতে বারবার সমর—মিশন পরিচালনার প্রয়োজন দেখা দিয়েছিল। তখনও পর্যন্ত এ সমর—মিশন পরিচালনার দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেছিলেন ইসলামের উপর্যুক্ত তিন বীর মুজাহিদ।

    শিহাবউদ্দীন মুহম্মদ ঘুরির সাথে ভারতে ইসলামের আধ্যাত্মিক মিশন পরিচালনার ইতিহাস অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। তরাইনের দ্বিতীয় যুদ্ধে ঘুরির বিজয় প্রকৃতপক্ষে এ ভূখণ্ডে ইসলামের আধ্যাত্মিক বিজয়ের পথকেও সুগম করেছিল। এ বিজয়ের মধ্য দিয়েই রাজস্থান প্রদেশের আজমীরে ইসলামি আধ্যাত্মিক মিশনের শান্তির বৃক্ষ রোপণ করেছিলেন সুলতানুল হিন্দু খাজা মঈনউদ্দীন চিশতি সঞ্জরী রহমাতুল্লাহ আলাইহে। বলাবাহুল্য, তৎকালীন আজমীর এলাকার শাসক পৃথ্বিরাজ চৌহান তাঁর আধ্যাত্মিক মিশনকে বারবার বাধাগ্রস্ত ও বিপর্যস্ত করে তুলেছিলেন। কিন্তু সর্বশক্তিমান আল্লাহ যাঁর ললাটে হিঁদুস্তানের আধ্যাত্মিক সম্রাট হওয়ার সৌভাগ্যচিহ্ন অঙ্কন করে দিয়েছিলেন, সেখানে হিঁদুস্তানের একজন প্রাদেশিক শাসকের ঔদ্ধত্য কীভাবে টিকে থাকতে পারে? পর্যুদস্ত ও ধ্বংস হয়ে গিয়েছিলেন পৃথ্বিরাজ চৌহান। সেই আজমীর আজ পৃথ্বিরাজ চৌহানের জন্য নয়, খাজা মঈনউদ্দীন চিশতির কারণেই পুণ্যতীর্থক্ষেত্রে পরিণত বিগত হাজার বছর ধরে। পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষ সে পুণ্যতীর্থক্ষেত্রে এসে সেই মহাসাধকের স্পর্শপদ—ধন্য—ধূলিকণা মাথায় করে নিয়ে যায়।

    এ প্রসঙ্গে হিঁদুস্তানে ইসলামের আধ্যাত্মিক মিশন পরিচালনার ধারায় চার মহাপুরুষের নাম অতীব শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করতে হবে। এঁরা হলেন খাজা মঈনউদ্দীন চিশতি, খাজা কুতুবউদ্দীন বখতিয়ার কাকি, খাজা ফরীদউদীন মাসউদ গঞ্জশকর ও হজরত নিজামউদ্দীন আউলিয়া রহমাতুল্লাহ আলাইহে।

    হিঁদুস্তানে মুসলমানদের রাজনৈতিক মিশনের সাথে—সাথেই আধ্যাত্মিক মিশনের ধারা এ মহাপুরুষেরা সুযোগ্য নেতৃত্বের দ্বারা এগিয়ে নিয়ে চলেছিলেন। এ প্রসঙ্গে ওই রাজনৈতিক পটভূমিকায় এ মহাপুরুষদের সংক্ষিপ্ত জীবনচরিত আলোচনা করা হবে। এর ফলে, তৎকালীন হিঁদুস্তানের রাজনৈতিক ও আধ্যাত্মিক পটভূমি, পরিবেশ ও পরিস্থিতি বুঝতে সহজ হবে।

    চিশতিয়া তরিকার পীর, মহান বুজুর্গ ও ইসলামের নৈতিক—আধ্যাত্মিক দর্শনের মহান প্রচারক খাজা মঈনউদ্দীন চিশতি ১১৪২ খ্রিষ্টাব্দে সাজিস্তানে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ছিলেন প্রসিদ্ধ সাধক খাজা গিয়াসউদ্দীন হাসান চিশতি। তিনি ছিলেন প্রত্যক্ষভাবে মহানবির (স) দৌহিত্র হজরত ইমাম হুসেনের (রা) বংশধর। মহাত্মা খাজা বিদ্যাশিক্ষা ও আধ্যাত্মিক জ্ঞান অর্জনের লক্ষ্যে নিজ মাতৃভূমি ত্যাগ করে অনেক দেশ ভ্রমণ করেন। তবে প্রথমে গিয়েছিলেন সমরখন্দে। সেখানে তিনি পবিত্র কুরআন মজীদের ত্রিশ পারা সম্পূর্ণ মুখস্ত করে নেন এবং ইসলামি জ্ঞানার্জনের সাধনায় নিয়োজিত হন। তারপর তিনি প্রসিদ্ধ সাধক হজরত খাজা উসমান হারুনীর (র) শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। সেখান থেকে নিজ পীরের সাথে তিনি দামিশক সফর করেন। সেখানে ইসলামের আধ্যাত্মিক সাধকদের বড় একটি জামাতের সাথে তাঁর দেখা হয়ে যায়। তাঁরা সকলেই আল্লাহর ধ্যানে এমনভাবে মশগুল ছিলেন যে, তা দেখে তাঁর হৃদয় বিগলিত হয়ে যায়। বলাবাহুল্য, তা থেকে তিনি আল্লাহ প্রেমের এক গভীর মাদকতা অনুভব করেন এবং উপযুক্ত সুফল লাভে সমর্থ হন। সেখান থেকে তিনি মক্কা মুআজ্জমা ও মদিনা মুনাওয়ারার উদ্দেশে রওনা হন। সে সময়েও তাঁর পীর খাজা উসমান (র) তাঁর সফরসঙ্গী ছিলেন। তাঁর পীর খাজা উসমান আধ্যাত্মিক শিক্ষালাভে পাকা—পোক্ত করে দিয়ে তাঁকে হিঁদুস্তানের উদ্দেশ্যে আধ্যাত্মিক মিশন পরিচালনার জন্য পাঠিয়ে দেন। মঈনউদ্দীন পীরের আদেশপ্রাপ্ত হওয়ার পর প্রথমে মাতৃভূমি সাজিস্তান এবং সেখান থেকে একটি আধ্যাত্মিক দল নিয়ে হিরাট, বলখ ও গজনী হয়ে হিঁদুস্তানের উদ্দেশ্যে রওনা হন এবং অচিরেই দিল্লি এসে পৌঁছান।

    দিল্লি থেকে ১১৯৩ খ্রিষ্টাব্দে ৪০ জন সাথি নিয়ে তিনি আজমীরের নিকটবর্তী স্থানে এসে পৌঁছান। রাজা পৃথ্বিরাজ চৌহানের রাজকর্মচারীদের দ্বারা বাধাপ্রাপ্ত হয়ে সেখানেই কিছুকাল অবস্থান করেন। কিন্তু এ আধ্যাত্মিক দলের সন্তোষজনক আচরণে খুশি ও নিঃসন্দেহ হয়ে তাঁদের ছেড়ে দিলে তাঁরা আজমীরে এসে পৌঁছান। কিন্তু সেখানে গিয়ে তাঁরা একটি আশ্রয়—শিবির গড়তে চাইলে বারবার বাধার সম্মুখীন হতে থাকেন।

    এসব বাধাই অবশেষে পৃথ্বিরাজ চৌহানের কাল হয়ে দাঁড়ায়। রাজস্থানের আজমীরের মাটিতে হিঁদুস্তানের যে সুলতান তাঁর আধ্যাত্মিক শান্তির ছত্র ধরতে চেয়েছিলেন, তাই বাস্তবায়িত হলো কিন্তু নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল পৃথ্বিরাজের ঔদ্ধত্য ও অহঙ্কার। একইভাবে, সেখানে মুসলমানদের আধ্যাত্মিক অধিকার যেমন কাযেম হলো, তেমনি কায়েম হলো মুসলমানদের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার।

    খাজা মঈনউদ্দীন চিশতির (র) আধ্যাত্মিক উত্তাধিকারের দায়িত্ব অর্পিত হয় তাঁর বিশিষ্ট শিষ্য ও অনুচর খাজা কুতুবউদ্দীন বখতিয়ার কাকীর (র) উপর। তাঁর সংক্ষিপ্ত জীবনচরিত আলোচনার পূর্বে আবারও আমরা হিঁদুস্তানের রাজনৈতিক অবস্থার দিকে দৃষ্টিপাত করব।

    মুঈজউদ্দীন বিন সাম বা মুহম্মদ ঘুরি ভারতে পাকাপোক্তভাবে মুসলমানদের রাজনৈতিক অধিকার কায়েম করার পর তার উত্তর—দায়িত্বের ভার তাঁর বিশ্বস্ত অনুচর ও দাস সেনাপতি কুতুবউদ্দীন আইবকের হস্তে অর্পণ করে আপন রাজ্যে ফিরে যান—সেই সাথে তাঁকে দাসত্বের শৃঙ্খল হতে মুক্তির সনদ দিয়ে যান। সুযোগ্য সেনাপতি ও বিশ্বস্ত অনুচর কুতুবউদ্দীন আইবক অত্যন্ত যোগ্যতার সাথে সে সাম্রাজ্যের হাল ধরেন এবং অনিতিবিলম্বেই দিল্লিতে মুসলিম রাজত্বের গোড়াপত্তন করে তাকে রাজধানীর মর্যাদায় উন্নীত করেন। এক মহিমান্বিত সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকারী রূপেও দিল্লিতে মুসলিম—রাজ্যের রাজধানী কায়েম তাঁর জীবনের একটি অতীব উজ্জ্বল ও মহৎ কীর্তি। মুহম্মদ ঘুরি যাঁকে দাসত্বমুক্তির সনদ দিয়ে গিয়েছিলেন, তাঁরই দ্বারা প্রতিষ্ঠিত রাজবংশ দুর্ভাগ্যক্রমে ইতিহাসে দাসবংশ রূপে প্রসিদ্ধি লাভ করেছে। কিন্তু নির্ভুল ও নির্মোহ ঐতিহাসিকের দৃষ্টিতে সে বংশকে দাসবংশ বলে মেনে নেওয়া যায় না। কুতুবউদ্দীন আইবক ১২০৬ খ্রিষ্টাব্দে দিল্লিতে যে রাজবংশ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, ইতিহাসে তা দাসবংশরূপে সুপরিচিত হলেও প্রকৃতপক্ষে তা ছিল একজন স্বাধীন নৃপতি কর্তৃক এক স্বাধীন রাজবংশের প্রতিষ্ঠা। সুলতান কুতুবউদ্দীন আইবকের অমর কীর্তি হলো নূর কুতুবুল আলম খাজা কুতুবউদ্দীন বখতিয়ার কাকীর নামে নামাঙ্কিত কুতুবমিনার প্রতিষ্ঠা। প্রকৃতপক্ষে, এ কুতুব মিনার হলো মুসলমানদের দিল্লি বিজয়ের স্মারক। মহাত্মা কুতুবউদ্দীনের নামে তা উৎসর্গিত ও নামাঙ্কিত করা হয়।

    এখন মহান সাধক খাজা কুতুবউদ্দীন বখতিয়ার কাকীর সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত আলোচনা আবশ্যক। কারণ খাজা মুঈনউদ্দীন চিশতির (র) খলিফা কুতুবউদ্দীন বখতিয়ার কাকীর বৃত্তান্ত এখানে খুবই প্রাসঙ্গিক। পূর্বেই উল্লিখিত হয়েছে যে, রাজনৈতিক মিশনের সাথে সাথেই হিঁদুস্তানের মাটিতে ইসলামের আধ্যাত্মিক মিশন সমভাবে কার্যকর ছিল।

    খাজা কুতুবউদ্দীন বখতিয়ার কাকী (র) মাওরাউন নহর শহরে জন্মগ্রহণ করেন। দেড় বছর বয়সে পিতৃহীন হলে তাঁর মা তাঁকে শিক্ষিত করে তোলেন। পাঁচ বছর বয়সে তিনি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। মওলানা আবু হাফস ওশীর অধীনে তিনি শিক্ষা সমাপন করে বাগদাদে গিয়ে উচ্চশিক্ষা লাভ করেন তারপর তাঁর পীর—মুর্শিদের নির্দেশে হিঁদুস্তানে গমন করে দিল্লিতে এসে আধ্যাত্মিক শিবির স্থাপন করেন। সুলতান শামসুদ্দীন আলতামাশ তাঁর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন; তা সত্ত্বেও রাজদরবার ও রাজনীতির সাথে তিনি কোনো রকমের সম্পর্ক রেখে চলেননি। দিল্লি মহানগরের কিলোঘরী নাম স্থানে মালিক ইজজুদ্দীনের নামে নামাঙ্কিত মসজিদের নিকটে তিনি ত্যাগী ফকিরের ন্যায় জীবন অতিবাহিত করেন কিন্তু কোনো দিন কোনো অবস্থাতেই সুলতানের দরবারের হাজিরির খেয়াল তার মনে কখনো আসেনি; কিন্তু সুলতান আলতামাশ তাঁর খানকাহ দরবারে নিয়মিত হাজিরা দিতেন।

    মহত্মা খাজা কুতুবউদ্দীন বখতিয়ার কাকীর দিল্লি আগমনের কয়েক দিন পরেই দিল্লির প্রসিদ্ধ সাধক শায়খ—উল—ইসলাম মওলানা জামালউদ্দীন বুস্তামির (র) ইন্তিকাল হয়ে যায়। মওলানা বুস্তামির ইন্তিকালের পর সুলতান আলতামাশ ‘শায়খ—উল—ইসলাম’ খেতাব খাজা বখতিয়ার কাকীকে (র) দিতে চাইলে তিনি তা সবিনয়ে প্রত্যাখ্যান করেন। পরে দিল্লির আরেক মহান সাধক শেখ নজমউদ্দীন সুগরাকে (র) ঐ খেতাব দিয়ে সম্মানিত করা হয়।

    খাজা বখতিয়ার কাকী দিল্লিতে অবস্থান করেই তাঁর আধ্যাত্মিক মিশন জারি রাখেন। একদা মহাত্মা খাজা মঈনউদ্দীন চিশতি যে আধ্যাত্মিক শিক্ষার শান্তিবৃক্ষ আজমীরে রোপণ করেন তাঁর উপযুক্ত শিষ্যসামন্তদের দ্বারা তা হিন্দুস্ত ানের এক প্রান্ত হতে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত ছায়াদার শান্তিবৃক্ষের ন্যায় ছায়া প্ৰদান করতে থাকল।

    মহাত্মা খাজা বখতিয়ার কাকীর নাম হিঁদুস্তানের ইসলামি আধ্যাত্মিক মিশন পরিচালনার ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। আর সেই মহান সাধকের নামে নামাঙ্কিত মুসলমানদের হিঁদুস্তান বিজয়ের স্মারক রূপে কুতুবমিনার নাম ধারণ করে জগতে অক্ষয় হয়ে অবস্থান করবে।

  • প্রথম অধ্যায় : এশিয়ার মোগল সম্রাট বাবর

    প্রথম অধ্যায় : এশিয়ার মোগল সম্রাট বাবর

    প্রথম অধ্যায় : এশিয়ার মোগল সম্রাট বাবর

    তুজুক-ই-বাবরী, যার ফার্সি অনুবাদ ‘বাবরনামা’ এবং যার বঙ্গানুবাদ ‘বাবুরের আত্মকথা’, তার মহান লেখক জহির—উদ্—দিন মুহম্মদ বাবুর, তাঁর উত্তরাধিকারীদের প্রায় ৩০০ বছর যাবৎ ভারত শাসনের অধিকার প্রদাতা, মোগল সালতানাতের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনকারী তথা প্রতিষ্ঠাতা, বাবুরের বিষয়ে, বাবরনামা শুরু করার পূর্বে, বিস্তারিত কিছু তথ্য জেনে নেওয়া পাঠকদের জন্য একান্ত জরুরি। এটা পাঠকদের জন্য যেমন প্রয়োজনীয়, তেমনই উপাদেয় এবং জ্ঞানবর্ধকও।

    তাঁর সম্পর্কে একান্ত প্রয়োজনীয় কিছু তথ্যের সংক্ষিপ্ত নির্যাস।

    নাম : আল-সুলতান-এ-আজম, ওয়ালি-এ-সকম; আল মুকাররম, বাদশাহ-এ-গাজী, জহির-উদ-দিন মুহম্মদ (প্রচলিত নাম বাবুর)।

    শাসনকাল : ৩০ এপ্রিল, ১৫২৬ ঈসায়ী থেকে ২৬ ডিসেম্বর ১৫৩০ ঈসায়ী পর্যন্ত।

    ভাষাজ্ঞান : চুগতাই তুর্কি, ফার্সি।

    উপাধি : মোগল বংশ (তথা সাম্রাজ্য)-এর প্রতিষ্ঠাতা।

    জন্ম : ১৪ ফেব্রুয়ারি, ১৪৮৩ ঈসায়ী।

    জন্মস্থান : আন্দিজান।

    মৃত্যু : ২৬ ডিসেম্বর ১৫৩০ ঈসায়ী (৪৭ বছর বয়সে)।

    মৃত্যুস্থান : আগ্রা।

    অন্তিম সংস্কার : বাগ-এ-বাহার।

    উত্তরাধিকারী : হুমায়ূঁ

    পত্নীগণ : ১. আয়েশা সুলতানা বেগম, ২. বিবি মুবারিকা ইউসুফজাঈ, ৩. দিলদার বেগম, ৪. গুলনার আগাচা, ৫. গুলরুখ বেগম, ৬. মাহম বেগম, ৭. মাসুমা বেগম, ৮. নারগুল আগাচা, ৯. সৈয়দা আফাক।

    পুত্রগণ : ১. হুমায়ূঁ, ২. কামরান মির্জা, ৩. আসকারি মির্জা, ৪. হিন্দাল মির্জা।

    কন্যাগণ : ১. গুলবদন বেগম, ২. ফখরুন্নিসা, ৩. আলতুন্নিসা (কন্যা রূপে গণ্য)।

    রাজমহল (প্রাসাদ) : তাইমুরের রাজমহল।

    বংশ : তাইমুরি (বা তিমরিদ)।

    পিতা : উমর শেখ মির্জা, আমির ফারগানা (ফারগানার শাসক)।

    মাতা : কুতলুগ নিগার খানম।

    ধর্মমত : সুন্নি ইসলাম।

  • দ্বিতীয় অধ্যায় : বাবুরের সম্পর্কে ঐতিহাসিকদের মত

    দ্বিতীয় অধ্যায় : বাবুরের সম্পর্কে ঐতিহাসিকদের মত

    দ্বিতীয় অধ্যায় : বাবুরের সম্পর্কে ঐতিহাসিকদের মত

    ইউরোপীয় ঐতিহাসিক স্টিফেন ফ্রেডরিক ডেলকের মতে, ‘বাবুর পারসিক নাম, যার অর্থ বাবুর। বাবুরের ইংরেজি প্রতিশব্দ Leopard, বাংলায় যাকে বাঘ বলা হয়। মহাকবি ফেরদৌসির অমর কাব্য ‘শাহনামা’য়ও এই শব্দের উল্লেখ পাওয়া যায়। এই শব্দটি মধ্য এশিয়ার তুর্কি ভাষায় এসেছে। সংস্কৃত ভাষায় এই শব্দের অর্থ হলো ব্যাঘ্র।’

    বাবুরের চাচাতো ভাই মির্জা মুহম্মদ হায়দার বাবুরের ব্যক্তিত্বের প্রশংসা করতে গিয়ে লিখেছেন—‘চেঙ্গিস খাঁ-র পর চুগতাই বংশের লোকেরা শুষ্ক স্বভাব ও অসভ্য ছিলেন। তাঁদের জন্য বাজারি শব্দের প্রয়োগ করা হতো। এই বংশের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত ব্যক্তি জহির-উদ্-দিন মুহম্মদের জন্য লোকে ‘বুজুর্গ’ বলে সম্বোধন করত।’

    ঐতিহাসিক ভি. এ. স্মিথ (V. A. Smith)-এর মতে, ‘নিজের যুগে এশিয়ার শাহজাদা বাবুর বিচক্ষণ ব্যক্তিদের অন্যতম বলে গণ্য হতেন। তিনি একজন সুযোগ্য ব্যক্তি ছিলেন। তিনি তাঁর যুগের শাসকদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ স্থান লাভে সমর্থ হয়েছিলেন।’

    ভারতীয় ঐতিহাসিক শ্রীনেত্র পাণ্ডে বাবুর প্রসঙ্গে লিখেছেন—‘বাবুর তুর্কি শব্দ, যার অর্থ হলো বাঘ।’ নিজের বীরত্ব ও নির্ভীকতার কারণেই তিনি এই নামে অভিহিত হতেন। তাঁর জন্মজাত নাম ছিল জহির-উদ-দিন মুহম্মদ। তাঁর পিতা উমর শেখ মির্জা, আমির তাইমুরের বংশধর ছিলেন, ফারগানার এক ক্ষুদ্র রাজ্যের শাসক ছিলেন, যেটি তিনি তাঁর পূর্ব পুরুষদের কাছ থেকে লাভ করেছিলেন। বাবুরের মাতা কুতলুক নিগার খানম মঙ্গোল দলপতি ইউনুস খাঁ-র কন্যা ছিলেন, যিনি চেঙ্গিস খাঁ-র বংশধর ছিলেন। এইভাবে বাবুরের ধমণীতে তুর্কি ও মঙ্গোল—উভয়েরই রক্তধারা প্রবাহিত ছিল এবং উভয় বীর জাতিরই গুণ তাঁর মধ্যে বিদ্যমান ছিল। তাঁর মধ্যে তুর্কিদের ধৈর্য, বীর্যবত্তা ও দৃঢ়তার সাথে সাথে মঙ্গোলদের উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও নিষ্ঠুরতাও বিদ্যমান ছিল। বাবুর বড়ই সভ্য ও সুসংস্কৃত ব্যক্তি ছিলেন।

    বাবুরের বয়স পুরো বারো বছর হতে-না-হতেই তাঁর পিতা মৃত্যুমুখে পতিত হন এবং ফারগানার ক্ষুদ্র একটা রাজ্যের শাসনভার তাঁর উপরে এসে পড়ে। যদিও বাবুরের বয়স খুব কম ছিল তা সত্যেও তাঁর পিতার রাজ্যভার বহন করার ক্ষমতা তাঁর মধ্যে পুরো মাত্রায় বিদ্যমান ছিল। বাবুর বাল্যকাল থেকেই বড় উচ্চাকাঙ্ক্ষী ছিলেন। অতএব, পৈতৃক সূত্রে প্রাপ্ত ক্ষুদ্র রাজ্য নিয়ে তিনি সন্তুষ্ট ছিলেন না। ফলে তিনি তাঁর পূর্বপুরুষদের দ্বারা বিজিত মধ্য এশিয়ায় বিশাল সাম্রাজ্যের প্রতিভূ হওয়ার স্বপ্ন দেখতে লাগলেন। সমরখন্দ, আমির তাইমুরের রাজধানী ছিল। অতএব, বাবুরের দৃষ্টি সমরখন্দের উপরে গিয়ে পড়ল এবং তিনি তাকে জেতার সংকল্প করলেন। যদিও বাবুর সমরখন্দের উপর দু’বার প্রভুত্ব স্থাপনে সফল হয়েছিলেন কিন্তু তা সত্ত্বেও, পরে তাঁকে সমরখন্দ ও ফারগানা দুই রাজ্য থেকেই তাকে বঞ্চিত হতে হয়।

    বাধ্য হয়ে তিনি আফগানিস্তানে চলে গেলেন এবং সেখানে আফগানদের পরাজিত করে তিনি কাবুল ও কান্দাহারে তাঁর প্রভুত্ব স্থাপন করলেন এবং সেখান থেকে ভারত আক্রমণের পরিকল্পনা করতে লাগলেন।

  • তৃতীয় অধ্যায় : বাবুরের জীবনবৃত্তান্ত

    তৃতীয় অধ্যায় : বাবুরের জীবনবৃত্তান্ত

    তৃতীয় অধ্যায় : বাবুরের জীবনবৃত্তান্ত

    জহির-উদ-দিন মুহম্মদ বাবুর ফারগানা উপত্যকার আন্দিজান নামক স্থানে ১৪৮৩ ঈসায়ী সনের ১৪ ফেব্রুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন। ফারগানা উপত্যকা বর্তমানে উজবেকিস্তানে অবস্থিত। তিনি ফারগানা উপত্যকার শাসক উমর শেখ মির্জার জ্যেষ্ঠ পুত্র ছিলেন। তাঁর মায়ের নাম ছিল কুতলক নিগার খানম, যিনি মোগলিস্তানের শাসক ইউনুস খাঁ-র কন্যা ছিলেন।

    বাবুর বরলাস জাতির সঙ্গে সম্পর্কিত ছিলেন, যারা মূলত মঙ্গোল ছিলেন। তাঁর পূর্ব পুরুষ ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে তুর্কি ও ইরানি সভ্যতাকে অবলম্বন করেছিলেন। তাঁরা তুর্কিস্তান ও খোরাসানে গিয়ে বসতি স্থাপন করেন।

    বাবুর নিজেকে মঙ্গোল বা মোগল বলে অভিহিত করেছেন। তুর্কি ও মঙ্গোল রক্তের মিশ্রণ হওয়ার কারণে চলমান সময়ে তিনি দুই জাতিরই সাহায্য লাভ করেন। তিনি সৌভাগ্যবশত ঐ সময়ে ইরানিদের সাহায্য লাভেও সমর্থ হয়েছিলেন। তাঁর সেনাবাহিনীতে এই তিন জাতিরই বীর সৈনিকেরা ছিলেন। মধ্য এশিয়ার বিজয় অভিযানে বেরুনোর সময়ে তাঁর বাহিনীতে পাখতুন, আরব, বরলাস, ও চুগতাই সৈনিকদের বিশাল একটি সংখ্যা সম্মিলিত হয়ে গিয়েছিল। তাঁর সামরিক বাহিনীতে ‘কিজিলবাস’ নামক বীর যোদ্ধাদের একটি দল ছিল যাদের আজারবাইজানের শিয়া-সুন্নি বলে অভিহিত করা হতো। পরবর্তীকালে মোগল দরবারে আজারবাইজানের এই শিয়া যোদ্ধাদের বংশধররা গুরুত্বপূর্ণ স্থান লাভ করেন এবং তাঁরা প্রভাবশালী জোট রূপে সময় সময় সামনে আসতে থাকেন।

    বাবুরের সম্পর্কে বলা হয় যে, তিনি শারীরিকভাবে অত্যন্ত বলশালী পুরুষ ছিলেন। তিনি দু’জন লোককে ডান ও বাম কাঁধে বসিয়ে খাড়া দেওয়ালে চড়ে দৌড় লাগাতেন। শরীরকে শক্ত-পোক্ত রাখার জন্য এই দিনচর্যাকে তিনি কসরত রূপে গ্রহণ করতেন।

    বাবুরের সম্পর্কে একথাও প্রচলিত আছে যে, তিনি একজন দক্ষ সাঁতারু ছিলেন। তিনি ক্ষুদ্র-বৃহৎ বিভিন্ন নদী সাঁতরে এপার-ওপার করতেন। এ কথাও প্রচলিত আছে যে, উত্তর ভারতের সুবিখ্যাত গঙ্গা নদীও তিনি দু’বার সাঁতরে পার হয়েছিলেন। তিনি অত্যন্ত দৃঢ়চেতা মানুষ ছিলেন। তাঁর প্রথম বিয়ে আয়েশা সুলতানা বেগমের সঙ্গে হয়েছিল। পরে তাঁর পত্নীদের সংখ্যার বিশেষ উন্নতি হয়।

    প্রথম দিকে বাবুর সংকীর্ণচেতা সুন্নি মুসলমান ছিলেন। তবে পরে শিয়া সম্প্রদায়ের সঙ্গে নৈকট্য বাড়ানোর পর শিয়া বীর যোদ্ধারা তাঁর কাছে নিবেদিতপ্রাণ বলে প্রমাণিত হন। তাঁর দৃষ্টি নিবদ্ধ ছিল একটি মহান এবং বিশাল সাম্রাজ্য লাভের প্রতি। অতএব ধর্মীয় সংকীর্ণতা থেকে তিনি দূরে সরে যান। তাঁর ধর্মীয় সংকীর্ণতা ত্যাগ করতে দেখে তাঁর এক চাচা তাঁকে ‘দুরাকাঙ্ক্ষী মানুষ’ বলে অভিহিত করেছিলেন। তাঁর বাহিনীতে দাড়িবিহীন যুবা সৈনিকদের বড় একটি দল ছিল।

    তিনি শরাব সেবনে অভ্যস্ত ছিলেন। তবে তিনি তাঁর মৃত্যুর দু’বছর আগে শরাব থেকে পুরো তওবা করে নিয়েছিলেন। তিনি তাঁর দরবারিদেরও এমনটি করতে বলেছিলেন। শরাব সেবন না করার কসম তিনি যুদ্ধে জয়লাভ ও সৈনিকদের উৎসাহ বাড়ানোর উদ্দেশ্যে করেছিলেন, যাতে তিনি সফল হয়েছিলেন।

    বাবুরের সামরিক জীবন

    ১৪৯৪ ঈসায়ী সনে বাবুর তাঁর পিতার রেখে যাওয়া ফারগানা রাজ্যের শাসন ক্ষমতা লাভ করেন। ঐ সময়ে তাঁর বয়স ছিল মাত্র বারো বছর। তবে তাঁর চাচা কিছুদিন পরেই অত্যন্ত নির্দয়ভাবে ফারগানার ক্ষমতা থেকে বঞ্চিত করে তাঁকে নির্বাসিত জীবন যাপনে বাধ্য করেন। ফারগানা ছাড়ার পর তিনি অনেক দিন যাবৎ খানাবদোশ-এর মতো পথে পথে জীবন কাটাতে থাকেন। তাঁকে নিঃসন্দেহে ফারগানা রাজ্য থেকে বঞ্চিত করে খানাবদোশের জীবন-যাপনে বাধ্য করা হয়েছিল, তবে তাঁর পিতার আমলের বিশ্বস্ত ব্যক্তি ও কৃষকদের থেকে তিনি গোপনে সাহায্য-সহযোগিতা লাভ করতে থাকেন।

    পিতার আমলের বিশ্বস্ত ব্যক্তিদের সহযোগিতার ১৪৯৭ ঈসায়ী সনে সৈনিক শক্তি জুটিয়ে তিনি সমরখন্দের উজবেক নগরে আক্রমণ চালান। আক্রমণের সাত মাস পর তিনি সমরখন্দ বিজয়ে সফল হলেন। সমরখন্দ জয়ের পর তিনি ফারগানা অভিমুখে সসৈন্যে রওনা হয়ে যান। তবে ঐ সময়ে এটা তাঁর দুর্ভাগ্যই বলতে হবে যে, যখন তিনি ফারগানা থেকে ৩৫০ কিলোমিটার দূরে ছিলেন তখনই তাঁর বিশ্বস্তরা তাঁর নজর এড়িয়ে রাতারাতি তাঁকে ছেড়ে চলে যান। ঐ সময়ে বাবুরের সেনাদল সমরখন্দের মরুভূমিতে আটকা পড়ে গিয়েছিল। বিশ্বস্তদের অকস্মাৎ সঙ্গ ত্যাগ করার ফলে ফারগানা পুনরাধিকার করার স্বপ্ন শুধু স্বপ্নমাত্রই রয়ে গেল না, বিজিত সমরখন্দও তাঁর হাতছাড়া হয়ে গেল।

    ১৫০১ ঈসায়ী সনে তিনি আবারও সমরখন্দে আক্রমণ চালালেন। তবে তাঁর চির পরিচিত প্রতিদ্বন্দ্বী উজবেক শাসক মুহম্মদ শায়বানির কাছে তাঁকে পরাজয়ের স্বাদ গ্রহণ করতে হলো। ঐ পরাজয়ের পর বাবুরের কাছে খুব কম সংখ্যক সৈনিক মাত্র বেঁচে ছিলেন। তবে যে অল্পসংখ্যক সৈনিক বেঁচে-বর্তে ছিলেন তাঁরা ছিলেন সন্দেহাতীতভাবে প্রভুভক্ত। তিনি তাঁদের সঙ্গে তিন বছর ধরে এদিক-ওদিক চলতে-চলতে তাজিক ও বাদাখশানের অধিবাসীদের নিজের বাহিনীতে ভর্তি করাতে সমর্থ হলেন। ১৫০৪ ঈসায়ী সনে বাবুর এক শক্তিশালী সেনাবাহিনী সঙ্গে নিয়ে হিন্দুকুশ পবর্তমালা অতিক্রম করেন। তিনি কাবুল আক্রমণ করে তা বিজয়ে সমর্থ হলেন। তারপর কান্দাহার বিজয়েও তিনি সাফল্য পেলেন। কাবুল ও কান্দাহার বিজেতা রূপে বাবুর এক নতুন ও শক্তিশালী হুকুমতের মালিক হলেন। তিনি ১৫০৬ ঈসায়ীতে হেরাতের শাসক হুসাইন বাইকারার সঙ্গে মৈত্রীপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপন করলেন। হুসাইন বাইকারা মুহম্মদ শায়বানির বিরোধী ছিলেন। তাঁর প্রতি মৈত্রীর হাত বাবুর মুহম্মদ শায়বানিকে হারানোর উদ্দেশ্যে বাড়িয়েছিলেন। তবে মৈত্রী সম্পর্ক স্থাপনের কিছু কাল পরেই ১৫০৬ ঈসায়ীতেই বাইকারা মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যুর পর হেরাত বাবুরের পূর্ণ অধিকারে এসে গেল। তবে, হেরাতের শাসক হওয়ার চেয়ে বাবুর মুহম্মদ শায়বানির উপর বিজয় লাভকে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করতেন।

    হেরাতের ক্ষমতা পূর্ণরূপে হস্তগত হয়ে যাবার পর তিনি শায়বানির বিরুদ্ধে আক্রমণের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, তখনই খবর এল যে, কাবুলে বিদ্রোহ শুরু হয়েছে। তিনি তৎক্ষণাৎ হেরাত থেকে কাবুল গিয়ে পৌঁছালেন। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, বিদ্রোহ দমন হয়ে গেল।

    দু’বছরের মধ্যেই তাঁর কিছু উচ্চপদস্থ সেনাবর্গ আরো একবার বিদ্রোহ করলেন, তা দমনেও তিনি সফল হলেন।

    তবে ঐ সবের মধ্যে ব্যতিব্যস্ত থাকার কারণে উজবেক শাসক শায়বানিকে সম্মিলিত আক্রমণের মাধ্যমে পরাজিত করার স্বপ্ন বাবুরের থেকে চার বছর দূরে চলে গেল।

    ১৫১০ ঈসায়ী সনে পারস্যের শাসক শাহ ইসমাঈল শায়বানির উপর আক্রমণ চালিয়ে তাঁকে শুধু পরাজিতই করলেন না; বরং তাঁকে হত্যা করলেন। বাবুর পারস্যের শাসকের প্রতি বন্ধুত্বের হাত বাড়ালেন। এই বন্ধুত্বের বলে তিনি তাঁর পূর্ব পুরুষদের ভূমি তাইমুরি সাম্রাজ্য পুনরাধিকার করতে চাচ্ছিলেন। শাহ ইসমাঈল শুধুমাত্র বাবুরের বন্ধুত্বই স্বীকার করলেন না; বরং নিজের বোনকে তিনি বাবুরের সঙ্গে বিয়ে দিয়ে মৈত্রীর বন্ধনকে আত্মীয়তার বন্ধনে আবদ্ধ করিয়ে নিলেন। এই বিবাহের সাথে সাথে বাবুর উপহারস্বরূপ একটি বড় দৌলত, আয়েশ-আরামের জন্য সাজ-সজ্জা ও সামরিক সাহায্য লাভ করলেন।

    শাহ ইসমাঈলের প্রতি কৃতজ্ঞতা বশত বাবুর শিয়া মুসলিমদের রীতি রেওয়াজকে গ্রহণ করে নিলেন। এরপর বিপুল সামরিক শক্তি সহকারে তিনি বুখারা অভিমুখে রওনা হয়ে গেলেন। উল্লেখ্য যে, পথিমধ্যে শহর, নগর, গ্রাম-গঞ্জগুলোতে তাঁকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানানো হলো। এবার বাবুরের বিজয় অভিযান এগিয়ে চলল।

    সমরখন্দে তাঁকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানানো হলো। ওই অভ্যর্থনাকে বাবুর ‘আল্লাহর উপহার’ নামে আখ্যায়িত করলেন। ওই সময়ে বাবুরের উচ্চাকাঙ্ক্ষা এতই উচ্চে উঠে গিয়েছিল যে, ফারগানা বিজয়কে তাঁর কাছে বড় তুচ্ছ মনে হতে লাগল। তিনি তাঁর দৃষ্টি ভারতের প্রতি নিবদ্ধ করলেন।

    ওই সময়ে ভারতে সৈয়দ বংশের শাসন কায়েম ছিল। বাবুর মনে করতেন যে, তিনি স্বয়ং ভারতের উপর শাসনকার্য চালানোর প্রকৃত উত্তরাধিকারী। তিনি তাইমুরের বংশধর ছিলেন। তাইমুর পঞ্জাব জয় করেছিলেন। তাইমুর তাঁর দাস খিজির খাঁ-র হাতে সেখানকার শাসনভার ন্যস্ত করে গিয়েছিলেন। খিজির খাঁ দিল্লির সুলতান হয়ে সৈয়দ বংশের ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ইব্রাহীম লোদি সৈয়দ বংশের কাছ থেকে ক্ষমতা দখল করে নিয়েছিলেন। ইব্রাহীম লোদি ছিলেন গিজলাই আফগান। বাবুরের উচ্চাকাঙ্ক্ষা বেড়েই চলেছিল এ জন্য যে, তিনি নিজে ছিলেন তাইমুর লঙ্গের বংশধর, তিনি তাঁর বিজিত ভূখণ্ডের শাসক হবেন।

    বাবুরের ভাগ্য তাঁর সহায় হলো। কথিত আছে, ইব্রাহীম লোদির কুলীন আফগান, যারা তাঁর অভিভাবক ছিলেন, তাঁর আচরণে ক্ষুব্ধ হয়ে তাঁকে খুব ঘৃণার চোখে দেখতেন, তাঁরা ইব্রাহীম লোদির উপর আক্রমণ চালানোর জন্য বাবুরকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন।

    ১৫২৬ ঈসায়ী সনের ফেব্রুয়ারি মাসে ১২,০০০ সুদক্ষ সৈন্য নিয়ে বাবুর ভারত আক্রমণের জন্য পানিপথের প্রান্তরে এসে অবস্থান নিলেন। ওই সময়ে তাঁর পুত্র হুমায়ূনও যুদ্ধক্ষেত্রে বাবুরের সঙ্গে ছিলেন। ঐ সময়ে হুমায়ূনের বয়স ছিল ১৭ বছর।

    পানিপথের যুদ্ধে বাবুর জয়লাভ করলেন। এই বিজয়ের সঙ্গে-সঙ্গেই তিনি ভারতের প্রথম মোগল সম্রাট বলে অভিহিত হওয়ার অধিকার লাভ করলেন এবং ভারতে মোগল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা রূপে ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে গেলেন।

    বাবুরের জীবন-পরিচয় ও সামরিক জীবনের এই সংক্ষিপ্ত জানকারির পর এবার তাঁর দ্বারা তাঁর মাতৃভাষা চুগতাই তুর্কি ভাষায় লিখিত ‘তুজুক-ই-বাবুরী’ যা তাঁর পৌত্র জালালউদ্দীন মুহম্মদ আকবরের নির্দেশে খান-ই-খানান আবদুর রহিম কর্তৃক ফার্সি ভাষায় অনূদিত ‘বাবরনামা’র প্রতি অগ্রসর হচ্ছি। যেমনটি আগেই বলা হয়েছে ‘বাবরনামা’ বাবুরের নিজের লেখা ঐতিহাসিক রচনা। একে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ কয়েকখানি গুরুত্বপূর্ণ রচনার অন্যতম বলে গণ্য করা হয়।

  • চতুর্থ অধ্যায় : কিশোর বয়সে শাসক

    চতুর্থ অধ্যায় : কিশোর বয়সে শাসক

    চতুর্থ অধ্যায় : কিশোর বয়সে শাসক

    বাবুর তাঁর আত্মকথা শুরু করতে গিয়ে লিখেছেন—বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম।

    অর্থাৎ, সর্বশক্তিমান আল্লাহর নামে আরম্ভ, যিনি অসীম দয়ালু, অতীব কৃপাবান।

    হিজরি ৮৯৯, রমজান মাসে (জুন, ১৪৯৪) যখন আমার বয়স বারো বছর ছিল, তখন আমি ফারগানা দেশের শাসক পদ লাভ করি।

    ফারগানা একটি ছোট দেশ। এখানে প্রচুর পরিমাণে আনাজ ও ফলমূল উৎপন্ন হয়। পশ্চিম সীমান্ত বাদে অবশিষ্ট ফারগানা বালুকাময় পার্বত্যভূমি দিয়ে ঘেরা। কোনো শত্রু কেবল শীত ঋতুতেই খুজন্দ ও সমরখন্দের দিক থেকে এখানে প্রবেশ করতে পারে।

    এর উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে শাইহুল নদী খুজন্দ হয়ে প্রবাহিত হয়ে আসে। এটি ‘শাহ রুখিয়া’ নামেও সুপরিচিত। এটি উত্তর দিকে তুর্কিস্তানে চলে গেছে। এই নদী কোনো সাগরে গিয়ে পতিত হয়নি; বরং ঢালু ভূমি বেয়ে প্রবাহিত হতে হতে বালুকাময় ভূমিতে গিয়ে বিলুপ্ত হয়ে গেছে।

    ফারগানার মধ্যে সাতটি নগর আছে। পাঁচটি দক্ষিণ দিকে এবং দুটি উত্তরে শাইহুল নদীর তটে অবস্থিত। দক্ষিণের পাঁচটি নগরের অন্যতম হলো আন্দিজান নগর। এটি ফারগানার রাজধানী। এখানে প্রচুর পরিমাণে আনাজপাতি ও ফলমূল জন্মায়। এ নগর আঙুর এবং তরমুজের জন্যও সুপ্রসিদ্ধ। আন্দিজানের নাশপাতির কোনো তুলনা হয় না। সমরখন্দ ও কেশের কেল্লাগুলির পরেই আন্দিজানের কেল্লার নাম আসে। এর তিনটি ফাটক আছে। এই কেল্লা দক্ষিণ দিকে অবস্থিত। কেল্লা থেকে পানির সাতটি স্রোতোধারা বাইরের দিকে প্রবাহিত হয়। এটি অত্যন্ত খরস্রোতা। কেল্লার অধিকাংশই কাঁটাদার ঝোপঝাড় দিয়ে ঢাকা। আন্দিজান পশুপাখিদের একটি উত্তম শিকার-ক্ষেত্রে। এখানকার একজন কৃষক অন্য স্থানের চারজন কৃষকের সমান আহার করে। এরা খুবই স্বাস্থ্যবান হয়ে থাকে।

    ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিক বর্ণনা

    আন্দিজানের বাজার ও লোকালয়গুলোতে তুর্কি জাতির লোকেদের আধিক্য দেখা যায়। লোকেদের বলার এবং লেখার শৈলী সম্পূর্ণরূপে শুদ্ধ। সবাই আল্লাহভক্ত। মশহুর সংগীতজ্ঞ খাজা ইউসুফ আন্দিজানে জন্মগ্রহণের জন্য নিজেকে গর্বিত মনে করেন। এখানকার আবহাওয়া এমনই যে, এখানকার অধিকাংশ লোক শারদ ঋতুতে ম্যালেরিয়া জ্বরে আক্রান্ত হয়ে পড়েন। তা সত্ত্বেও এখানকার আবহাওয়া অত্যন্ত মধুর। এখানে পানির উত্তম ব্যবস্থা রয়েছে। বসন্ত ঋতুর বাহার তো দেখার মতো। এখানে অনেক রীতি-রেওয়াজ বিকশিত হওয়ার সুযোগ পেয়েছে। এর দক্ষিণ-পূর্বে, চারদিকে উঁচু প্রাচীর ও পর্বত বেষ্টিত বারাকোহ নগর রয়েছে। এখানে বাগ-বাগিচার বিপুল সমারোহ দেখা যায়, তবে এটি উপেক্ষার শিকার হয়েছে। এখানকার স্বচ্ছ দিঘি ও পুকুরগুলোতে নীল ফুল ফুটে আছে। ঘণ্টা আকারের রঙ-বেরঙের ফুল (টিউলিপ) এবং গোলাপেরও এখানে বিপুল সমারোহ দেখা যায়। বারাকোহের এক প্রান্তে জাউরা নামক একটি যমজ মসজিদ রয়েছে যা খুবই সুন্দর। মসজিদের মধ্য দিয়ে শহর অভিমুখে প্রবাহিত নহর পাহাড়ি উপত্যকার দিকে চলে গেছে। মসজিদের অঙ্গন খুবই সুসজ্জিত। সামনে রয়েছে পান্থশালা, যেখানে দেশ-বিদেশের মুসাফিররা বিশ্রাম নিতে পারেন।

    আন্দিজানের পশ্চিমে সড়কের কিনারে-কিনারে আনার ও খুবানি গাছের বাগিচা বড়ই মনোরম দৃশ্যের অবতারণা করে। এখানকার আনার তার বৈশিষ্ট্যের জন্য ‘দানা-এ-কলা’ নামে সুবিখ্যাত। রসালো ও সুস্বাদু আনার ছাড়াও এখানকার খুবানিও ‘জৰ্দ-জব’ নামে সুপ্রসিদ্ধ। এক বিশেষ ধরনের খুবানিও এখানে জন্মায়, যা শুকিয়ে যাওয়ার পরেও তার গুরুত্ব অক্ষুণ্ণ রাখে। এর বীজকে মানুষ পাথর দিয়ে ভাঙে, যাতে তা থেকে শাঁস বেরোয়। এই শাঁস অত্যন্ত সুস্বাদু হয়ে থাকে।

    প্রাকৃতিক-ঐতিহাসিক বৰ্ণনা

    এখানকার লোকেদের প্রিয় সখ হলো পশু-পাখি শিকার করা। কিছু লোক কুস্তি করতেও খুব ভালোবাসেন। সমরখন্দ ও বুখারার অধিকাংশ বহিরাগত লোক মার্খিলং নগরের বাসিন্দা। এদের ‘জাগলার’ বলা হয়। এটিও পর্বত-বেষ্টিত, বাগ-বাগিচায় পূর্ণ শস্য-শ্যামল নগর। এখানকার পাহাড়ি গ্রামেও জনবসতি রয়েছে। প্রাকৃতিক পানি ব্যবস্থার উত্তম স্রোত রয়েছে এখানে। এখানে বিভিন্ন রকমের ফলমূলও প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায়, তবে অধিকাংশ বাগিচা বাদামের। এখানকার সমস্ত মানুষ ফার্সি ভাষা ব্যবহার করেন। নগরের দক্ষিণ দিকে দু’ মাইল দূরে পাহাড়ি উপত্যকায় এমন একটি চটান আছে যাকে ‘মিরর স্টোন’ নামে অভিহিত করা হয়। এটি প্রায় দশ হাত লম্বা এবং একটি মানুষ সমান উঁচু। এর উপর সমস্ত বস্তু দর্পণের সমান প্রতিবিম্বিত হয়।

    অসফারা-বখ্ নগরের চতুর্থ গুরুত্বপূর্ণ জেলা। এ ছাড়া অন্যান্য জেলা হলো—বরুখ, সুখ ও হুশিয়ার।

    মুহম্মদ শায়বানি খান যখন মাহমুদ খান ও আলাচা খানকে পরাজিত করে তাশখন্দ ও শাহরুখিয়া অধিকার করে নেন তখন আমি সুখ ও হুঁশিয়ারের পাহাড়ি উপত্যকায় চলে যাই। এখানে এক বছর ধরে অত্যন্ত কষ্টদায়ক জীবন যাপনের পর আমি কাবুলের আজিমাত নামক স্থানে চলে যাই। আন্দিজানের পশ্চিমের সড়ক পথ ধরে খুজন্দনগর পঞ্চাশ আলগাচ1 দূরে। সমরখন্দ পূর্ব দিক থেকে খুজন্দ ঠিক এতটা দূরে অবস্থিত। এটি প্রাচীন নগরগুলোর একটি। এখানে শেখ মসলাহাত ও খাজা কামাল ফলের চাষ করেন।

    এখানকার আনার তার স্বাদের জন্য দূর-দূরান্ত অবধি সুপ্রসিদ্ধ। লোক যে রকম সমরখন্দের আপেলের সুনাম করেন ঠিক তেমনই তারা খুজন্দের আনার সম্পর্কে আলোচনা করেন। খুজন্দের কুরঘান শহর বেশ উঁচুতে অবস্থিত এবং এর চার দিকে দেওয়াল টানা হয়েছে। এর উত্তরে শাইহুন নদী কিছু দূর থেকে নিক্ষিপ্ত তীরের ন্যায় উড়ে যাওয়ার মতো করে প্রবাহিত হচ্ছে বলে মনে হয়। এই নদী এই নগরীর উত্তর দিকে অবস্থিত মনুঘুল পাহাড়ি উপত্যকা থেকে নেমে আসে। লোকে বলে এখানে পোখরাজ ও অত্যন্ত মূল্যবান পাথরের খনি রয়েছে। এখানে প্রচুর পরিমাণে সাপও রয়েছে। খুজন্দের লোকেরা প্রচুর পরিমাণে পশুপাখি শিকার করেন। কিষান ও খরগোশ সর্বত্রই নজরে পড়ে। এখানকার জলবায়ু দূষিত। পাতাঝরার মৌসুমে সাধারণভাবে এখানকার মানুষ জ্বরাক্রান্ত হয়ে পড়ে। লোকেদের মধ্যে প্রচলিত আছে গৈরিয়া পাখিরা পাহাড়ের উত্তর দিক থেকে এই জ্বর বয়ে নিয়ে আসে।

    খুজন্দ ও কন্দে-বাদামের মধ্যকার বিস্তৃত ক্ষেত্রটি ‘হা-দরবেশ’ নামে পরিচিত। এখানে প্রায়শই খুব জোরে বায়ু প্রবাহিত হয়। এই খরবায়ু মরঘিনামের পূর্ব দিক থেকে আসে এবং পশ্চিমের দিকে চলে যায়। লোকে বলে, এই বায়ু কোনো দরবেশের অনুগ্রহের পাত্র হওয়ার জন্য মরুভূমির ঝড়ের মতোই নিষ্ঠুরভাবে বয়ে যায়। এই প্রবল গতিসম্পন্ন ঘূর্ণিবাত্যার আওয়াজ শুনলে মনে হয় যেন সে ‘হা-দরবেশ, হা-দরবেশ’ করে ডাকতে ডাকতে প্রবল বেগে ছুটে চলেছে।

    শাইহুন নদীর উত্তরের নগর-শৃঙ্খলার অন্যতম নগর হলো ‘অকশা’। বইপত্রে একে অকশিকা লেখা হয়েছে। এখানকার প্রসিদ্ধ কবি অসিরুদ্দীন ‘অকশিশ’র নামানুসারে এই শহরের এই নামকরণ হয়েছে।

    আন্দিজান, ফারগানার অকশার চেয়ে বড় নগর। অকশা নগর সড়ক পথে নয় ইয়ালগচ দূরে অবস্থিত। উমর শেখ মির্জা একে রাজধানী বানিয়েছিলেন। এই নগরের নিচে দিয়ে শাইহুন নদী বয়ে গেছে। এই নগর তার উচ্চ মর্যাদার জন্য গর্ব করে। এর নিচে রয়েছে ভয়ংকর উপত্যকা। উমর শেখ মির্জা যখন একে রাজধানী বানিয়েছিলেন তখন তাঁর সুবিধার জন্য দু-একটি উপত্যকাকে কেটে দিয়েছিলেন। এখানে গ্রাম নেই। এখানে সম্পূর্ণ রূপে শহুরে জনগোষ্ঠীর বসবাস। এখানকার তরমুজ অতি উত্তম স্বাদের হয়ে থাকে। এর একটি প্রকারের নাম মীর তিমুর। আমি বলতে পারি না যে, এই প্রকারের তরমুজ দুনিয়ার আর কোথাও জন্মায় কি-না। পুলাবার তরমুজও খুব প্রসিদ্ধ, তবে, যখন আমি সমরখন্দে পৌঁছাই তখন এখানকার তরমুজের প্রশংসা শুনে আমি তা আনিয়ে নিই। দুটিই কেটে যখন তার স্বাদ গ্রহণ করি তখন আমি জানতে পারি যে, অকশার তরমুজের মোকাবিলায় বুখারার তরমুজ কিছুই নয়। অকশার লোকেরাও পশুপাখি শিকার করতে খুব পছন্দ করে। শাইহুন নদীর ওই পারে বড় জঙ্গল রয়েছে, জঙ্গলের পর আন্দিজানের খরখোশ ও কৃষকদের খুব নজরে পড়ে।

    এরা আর্থিক দিক দিয়ে সচ্ছল। কাসন, অকশার একটি ছোট্ট লোকালয়। কাসনেও খুব সুন্দর সুন্দর বাগিচা আছে। কাসন ও অকশার মধ্যে মৌসুমের সৌন্দর্য ও আবহাওয়ার মধ্যে যেন হুড় লেগে যায়। এ কথার উপসংহার টানা বেশ সুকঠিন যে, কোন এলাকাটি বেশি সুন্দর আর কোন এলাকাটি কম সুন্দর।

    ফারগানার পরিবেষ্টিত পাহাড়ি উপত্যকার কোনো তুলনা নেই। এখানাকার লাল ছাল বিশিষ্ট গাছ থেকে পটকা তৈরি হয়। এর ডাল খোদাই করে তৃণীর ও ডাল চেঁছে তীর তৈরি করা হয়। এমন সুন্দর কাঠ সর্বত্র সুলভ নয়, অতএব, তাকে দুর্লভ বলাই শ্রেয়। এই ইয়ালগচ পাহাড়ের উপর জন্মায়। এই গাছের দৈর্ঘ্যকে মাপের একক হিসেবে মেনে নেওয়া হয়েছে। এখানকার পাহাড়ি উপক্যতায় পোখরাজ ও লোহার খনি রয়েছে।

    বংশাবলি ও যুদ্ধের বর্ণনা

    উমর শেখ মির্জা অতি উচ্চাকাঙ্ক্ষী ও মিথ্যাভিমানী শাসক ছিলেন। তিনি সর্বদাই অন্যের রাজ্য জয় করে নেওয়ার আকাঙ্ক্ষা পোষণ করতেন। সমরখন্দের বিরুদ্ধে তিনি কয়েকবার সামরিক শক্তি প্রয়োগ করেন। কয়েকবার তিনি পরাজিত হন এবং কয়েকবার তাঁকে পিছু হটে আসতে হয়। তাঁর শ্বশুরকে তিনি কয়েকবার তাঁর রাজ্যে আমন্ত্রণ জানান। আমার নানার নাম ছিল ইউনুস খান। মোগল ‘খান’দের মধ্যে তাঁর স্থান ছিল সর্বশীর্ষে। এ সম্মান তিনি চেঙ্গিস খানের দ্বিতীয় পুত্র চুগতাই খানের কারণে লাভ করেছিলেন। তিনি আমাদের পূর্বপুরুষ ছিলেন। খান (ইউনুস খান), মির্জা (উমর শেখ মির্জা)-র কয়েকবার আমন্ত্রণের পর ফারগানা আসেন। তাঁকে তিনি জমি দেন। তবে আংশিক রূপে নিজের অসদাচরণের কারণে মোগলদের উচ্চ ঐতিহ্যকে রক্ষা করতে তিনি সমর্থ হননি। মির্জার কাছে খান যখন শেষ বারের মতো আসেন তখন তিনি (মির্জা) ছয়টি মাত্র নগরীর অধিপতি রয়ে গিয়েছিলেন। তারপর তিনি (খান) মোগলিস্তানে চলে যান।

    ১৪৯৪ ঈসায়ী সন অবধি মোগল খানের পদবি মাহমুদ খান, ইউনুস খানের কাছে রয়ে যায় যাঁরা উমর শেখ মির্জার ভাই ছিলেন। তারপর সমরখন্দের শাসককে তাঁর আচরণ দ্বারা এমন রুষ্ট করা হয় যে, তিনি উমর শেখ মির্জার বিরুদ্ধে মাহমুদ খানকে সামরিক সাহায্য প্রদান করেন।

    ইতোমধ্যে একটি অদ্ভুত ঘটনা ঘটে, যার উল্লেখ এখানে একান্ত প্রয়োজন। অকশা কেল্লা একটি বিপজ্জনক উপত্যকার উপর অবস্থিত ছিল। এই বিপজ্জনক উপত্যকার সঙ্গে সংলগ্ন ছিল মহলের ইমারত। রমজান মাসের এক সোমবারে, মানে জুন মাসের ৮ তারিখে উমর শেখ মির্জা তাঁর সমস্ত কবুতর উড়িয়ে দিলেন এবং নিজে বাজ হয়ে গেলেন (বলাবাহুল্য, তিনি মৃত্যুবরণ করলেন)। ঐ সময়ে তাঁর বয়স ছিল ৩৯ বছর। তিনি ১৪৬০ ঈসায়ী সনে সমরখন্দে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তিনি আবু সঈদ মির্জার চতুর্থ পুত্র ছিলেন। তাঁর বড় অন্য তিন ভাই ছিলেন—আহমদ মির্জা, মাহমুদ মির্জা ও মহামিদ মির্জা। আবু সঈদ মির্জার পিতা ছিলেন মুহম্মদ মির্জা, যিনি তাইমুর বেগের তৃতীয় পুত্র ছিলেন। অন্য দুই পুত্র ছিলেন মিশান শাহ মুহম্মদ ও জাহাঁগীর মুহম্মদ। তাঁদের চেয়ে ছোট ছিলেন শাহরুখ মির্জা।2 উমর শেখ মির্জা ফারগানা (আন্দিজান) শাসনের উত্তরাধিকার লাভ করেছিলেন।

    উমর শেখ মির্জা সাধারণ মাঝারি মানুষ ছিলেন। তাঁর চেহারা থাকত ভাবলেশহীন। তিনি গোলাকার করে দাড়ি রাখতেন। পোশাক ও পানাহারের মামলায় তাঁর বিশেষ কোনো রুচি ছিল না। তিনি চার পরত-বিশিষ্ট সাফা পরতেন। সাফার শেষ অংশটি পিছনে ঝুলতে থাকত। তিনি গরমের দিনে এবং দরবারে সাফা পরে থাকতেন, অবশিষ্ট সময়ে মোগল টুপি ধারণ করতেন।

    তিনি আল্লাহর উপর সাচ্চা ইমান রাখতেন। তিনি হানাফি মজহব মেনে চলতেন। পাঁচ ওয়াক্তের নামাজ পড়তেন। তিনি কুরআন তিলাওয়াত করতেন। তিনি খাজা উবাইদুল্লাহর প্রতি আস্থাবান ছিলেন। তিনি তাঁর কাছে এসেও ছিলেন এবং তাঁকে ‘প্রিয় বৎস’ সম্বোধন করেছিলেন। তিনি কাব্যময় স্বভাবের মানুষ ছিলেন কিন্তু কাব্যভাবময় লেখার চেষ্টা তিনি কখনোই করেননি।

    একবার যখন তিনি শোনেন যে, কাইথাল থেকে ফেরার পথে একটি কাফেলা আন্দিজানের পূর্ব পাহাড়ি উপত্যকায় ফেঁসে গিয়ে ধ্বংস হয়ে গেছে এবং তাঁদের মধ্যে মাত্র দু’জন লোক বেঁচে ফিরতে পেরেছে। তখন তিনি এতটাই অভিভূত হয়ে যান যে, তিনি তৎক্ষণাৎ তাঁর নিরীক্ষকদের সেখানে পাঠিয়ে দেন। আদেশ দেন যে, তাদের সমস্ত মালপত্র যেন নিজেদের হেফাজতে নিয়ে আসা হয়। তিনি খোরাসান ও সমরখন্দে মৃতদের উত্তরাধিকারীদের কাছে খবর পাঠিয়ে দেন। এক-দুই বছর ধরে তিনি সেই কাজে লেগে রইলেন, ফলে মৃতদের মালপত্র তাদের সঠিক উত্তরাধিকারীদের কাছে পৌঁছে গেল।

    তিনি সাহসী, বীর, উত্তম বক্তা, মিশুক এবং চরিত্রবান ব্যক্তি ছিলেন। তিনি নিজের তরবারির উপর ভরসা রাখতেন। তিনি একজন সাধারণ তীরন্দাজ ছিলেন, কিন্তু কুস্তিতে অসাধারণ ছিলেন। তিনি উচ্চাকাঙ্ক্ষী ছিলেন ঠিকই কিন্তু যুদ্ধ করে তাঁর ধৈর্য হারিয়ে ফেলতেন।

    প্রারম্ভিক দিনগুলোতে তিনি খুব পান-পিয়াসী ছিলেন তবে পরে তিনি জলসা ইত্যাদিতে সপ্তাহে দু-একবার মাত্র পানাসক্তির সখ মিটিয়ে নিতেন। এরকম জলসাগুলোয় তিনি শায়রী শুনে প্রশংসা করতে ভুলতেন না। মাদক বস্তু তিনি নিজে প্রস্তুত করতে জানতেন। শিকারে তিনি আগে-আগে থাকতেন। তিনি প্রাকৃতিক কলা-প্রেমী ছিলেন। সাজসজ্জা পছন্দ করতেন। প্রেম-প্রীতির কথাবার্তায় তিনি খুবই আকর্ষণ অনুভব করতেন। শিকারের সাথে সাথে পাশা খেলাও তিনি খুব পছন্দ করতেন। তিনি পর পর তিনটি যুদ্ধ করেন। প্রথম যুদ্ধ আন্দিজানের উত্তরে, শিহান নদীর তটে, বকরকুদ নামক স্থানে ইউনুস খানের সঙ্গে সংঘটিত হয়। এই যুদ্ধে তাঁকে পরাজয়ের স্বাদ চাখতে হয়। তাঁকে বন্দী করা হয়। ইউনুস খান উদারতার পরিচয় দিয়ে তাঁকে মুক্ত করে দেন এবং আন্দিজানে চলে যাওয়ার অধিকার দিয়ে দেন।

    তিনি দ্বিতীয় যুদ্ধ করেন তুর্কিস্তানের উজবেকদের সঙ্গে। উজবেকরা সমরখন্দের কাছে হানা দেয়। তিনি বরফ জমা নদী পেরিয়ে হানাদারদের বিরুদ্ধে জোরালো আক্রমণ চালিয়ে দেন। তাদের কবল থেকে লোকেদের তিনি রক্ষা করেন। লুটের মাল ফিরিয়ে আনেন। কোনো প্রকারের লোভ-লালসার নিকটবর্তী না হয়ে তিনি সেই লুটের মাল তাদের মালিকদের হাতে তুলে দেন।

    তিনি তৃতীয় যুদ্ধটি করেন আহমদ মির্জার সঙ্গে শাহরুখিয়া ও খিবার নিকট। এখানে তিনি পরাজিত হন।

    তিনি তাঁর পিতার কাছ থেকে ফারগানা দেশটি লাভ করেন। তাশখন্দ ও সেরম তাঁর বড় ভাই আহমদ মির্জা পেয়েছিলেন। দীর্ঘকাল ধরে সীমা-বিবাদের দ্বন্দ্ব চলতে থাকে। তিনি এক সময় শাহরুখিয়া অধিকার করে নিয়েছিলেন। পরে সেটি তাঁর হাতছাড়া হয়ে যায়। পরে তাঁর অধিকারে শুধুমাত্র খুজন্দ ও ফারগানা মাত্র রয়ে যায়। কিছু লোক খুজন্দকে ফারগানা থেকে পৃথক বলে মানেন না। আফিরুশনাও তাঁর অধিকার রয়ে যায়। কিছু লোক আফেরুশনাকে ঔরিসও বলে থাকেন।

    তাশখন্দের মোগলদের সঙ্গেও আহমদ মির্জার যুদ্ধ হয়। ১৪৮৮ ঈসায়ী সনে তিনি হাফিজ বেগ দিলদারের কাছে পরাজয় বরণ করেন। পরে এটি আহমদ মির্জার হাত থেকে, পরে, পরাজয়ের ফলে হাতছাড়া হয়ে যাওয়া রাজ্যের ভূভাগ উমর শেখ মির্জার হাতে চলে আসে।

    উমর শেখ মির্জা তাঁর রাজ্য ও অধিকার ক্ষেত্রকে তাঁর পুত্র কন্যাদের মধ্যে, যখন তাঁরা বড় হন, বণ্টন করে দেন। তাঁর তিন পুত্র ও পাঁচ কন্যা ছিলেন। জহির-উদ-দিন মুহম্মদ বাবুর তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র ছিলেন। তিনি লেখেন—আমার মায়ের নাম ছিল কুতলুক নিগার খানম। জাহাঙ্গীর মির্জা তাঁর দ্বিতীয় পুত্র ছিলেন। তিনি আমার চেয়ে দু’বছরের ছোট ছিলেন। তাঁর মায়ের নাম ছিল ফাতিমা সুলতান। নাসির মির্জা তাঁর তৃতীয় পুত্র ছিলেন। তাঁর মা ছিলেন আন্দিজান নিবাসিনী। তিনি বড় সুশীলা ছিলেন। নামটিও খুব সুন্দর ছিল।

    ১৫০০ ঈসায়ী সনে সর-এ-পুলে পরাজয়ের পর আমাকে সমরখন্দ ছাড়তে হয়। ওই দিনটি আমার জন্য ছিল বড়ই কষ্ট ও যন্ত্রণার। আমার হাত থেকে রাজ্য চলে গিয়েছিল। আমার সহোদর বোন খানজাদা বেগম মুহম্মদ শায়বানি খানের হেরেমে চলে যান। তিনি একটি খুব সুন্দর পুত্র-সন্তানের জননী হন। পুত্রের নাম রাখা হয় খুররম শাহ। তাকে বল্‌থ্ দেশের উত্তরাধিকারী ঘোষণা করা হয়।

    ১৫০৭ ঈসায়ী সনে শাহ ইসমাঈল আমার জন্য মুহম্মদ শায়বানিকে পরাজিত ও হত্যা করেন। সে সময়টি খানজাদা বেগমের জন্য অতি কঠিন সময় ছিল। তিনি আল্লাহর দয়ার মুখাপেক্ষী হয়ে রয়ে গেলেন। পরে আমার জন্য শাহ ইসমাঈল তাঁর সঙ্গে অতি উত্তম আচরণ করেন। তাঁর সুরক্ষার জন্য সেখান থেকে তাঁকে কুন্দুজ পাঠিয়ে দিলেন। সেখানে তিনি আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।

    তারপর দশ বছর যাবৎ তাঁর সঙ্গে আমার আর সাক্ষাৎ হয়নি। যখন আমি মুহম্মদ কুকুলদশের সাহায্যে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে যাই তখন তিনি না আমাকে চিনতে পারেন আর না আমি তাঁকে। যখন আমি তাঁর সঙ্গে আমার কথা বলি তখন তিনি কয়েক মুহূর্ত পরেই আমাকে চিনতে পারেন।

    মেহেরবান বেগম আমার সৎ ও নাসির মির্জার সহোদর বোন ছিলেন। তিনি আমার চেয়ে দু’বছরের ছোট ছিলেন। নাসির মির্জার আরেক বোনের নাম ছিল সহর বেগম, যিনি আমার চেয়ে সাত বছরের ছোট ছিলেন। ইয়াদগার সুলতান আমার আরেক সৎবোন ছিলেন। তাঁর মা ছিলেন বড়ই সুশীলা। তাঁর নাম ছিল আগা সুলতান।

    রুকাইয়া সুলতান পঞ্চম বোন তথা চতুর্থ সৎবোন ছিলেন। তাঁর মায়ের নাম ছিল মকদুম সুলতান বেগম।

    ইয়াদগার বেগম ও রুকাইয়া সুলতান, উমর শেখ মির্জার চতুর্থ ও পঞ্চম কন্যা ছিলেন, এঁদের জন্মের আগে পিতা মারা যান।

    ইয়াদগার সুলতান বেগম আমার দাদি, আলসান দৌ বেগমের ছত্রছায়ায় লালন-পালনের জন্য নিয়ে যান। এ সময়ে তিনি আবদুল লতিফের পুত্র হামজার কাছে থাকতেন।

    শায়বানি ১৫০৩ ঈসায়ী সনে আন্দিজান ও অকশা অধিকার করে নিয়েছিলেন। তারপর, আমার পুরো পরিবার আশ্রয়হীন হয়ে পড়েন এবং পথে পথে ঘুরতে থাকেন।

    ১৫১১ ঈসায়ী সনে আমার দাদি খুতলানে এসে আমার সঙ্গে মিলিত হন। এ সময় পর্যন্ত আমি হামজা ও অন্যান্য সুলতানদের হটিয়ে দিয়ে হিসার অধিকার করে নিই। রুকাইয়া সুলতান বেগম ততদিনে উজবেক নিবাসী জানী বেগের পত্নী রূপে এক সন্তানের জননী হয়েছিলেন, যিনি এ সময়ে জীবিত ছিলেন না (বাবুর কর্তৃক এই বিবরণ লেখা হওয়ার সময় অবধি)।

    মাতুলকুলের পরিচয়

    আমার মা কুতলুক নিগার খানম ইউনুস খানের দ্বিতীয় কন্যা ছিলেন। তিনি মাহমুদ খাঁ ও আহমদ খাঁ-র সৎ-বোন ছিলেন।

    ইউনুস খান চুগতল খানের বংশধর ছিলেন। তিনি চেঙ্গিস খানের দ্বিতীয় পুত্র ছিলেন।

    ইউনুস খানের বংশলতিকা এইভাবে অগ্রসর হতে হতে চেঙ্গিস খানের রক্তে গিয়ে মিলে যায়—১. ইউনুস খান পুত্র, ২. ওয়াইস খান পুত্র, ৩. শেরআলী পুত্র, ৪. মুহম্মদ খান পুত্র, ৫. খিজির খাজা খান পুত্র, ৬. তুগলক তাইমুর খান পুত্র, ৭. আসলাম পুগা খান পুত্র, ৮. বাবা খান পুত্র, ৯. বরক খান পুত্র, ১০. সুতওয়া খান পুত্র, ১১. মুতু খান পুত্র, ১২. চুগতল খান পুত্র ১৩. চেঙ্গিস খান। এখানে খানেদের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস পেশ করার মতো সুঅবসর আমার রয়েছে—

    ইউনুস খান (১৪৮৭ ঈ.) ও আলসান বুগা খান (১৪৬২ ঈ.) ওয়েইস খান (১৪২৮ ঈ.)-এর পুত্র ছিলেন। ইউনুস খানের মা শেখ নূরুদ্দীনের দুহিতা অথবা দৌহিত্রী ছিলেন। শেখ নূরুদ্দীন তুর্কি গোত্রের নেতা ছিলেন যাঁর রক্তের সম্পর্ক ছিল তাইমুর বেগের সঙ্গে। ওয়েইস খানের মৃত্যুর পর মোগল সম্প্রদায় দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। একটি অংশ ইউনুস খানের অংশে গেল তো দ্বিতীয় বড় অংশটি আলসান বুগা খানের অংশে চলে গেল।

    ঔলংগ বেগের পুত্র আবদুল আজিজ মির্জার সঙ্গে ইউনুস খানের বড় মেয়ের বিয়ে দেওয়া হয়েছিল।

    ইউনুস খান নিজের রাজ্যপাট ভালোমতোই সামলান। তিনি রাজ্য বিস্তারের জন্য ইরাক পর্যন্ত যান। সেখানে তিনি এক বছর যাবৎ তবরেজে অবস্থান করেন। ওই সময়ে জাহান শাহ বাইরাম ক্ষমতাসীন ছিলেন। ওখান থেকে তিনি শর্জা চলে যান যেখানে ইব্রাহীম সুলতান মির্জার দ্বিতীয় পুত্র শাহরুখ মির্জা রাজত্ব করছিলেন। ক্ষমতাসীন হওয়ার পাঁচ-ছ মাস পর ৩ মে, ১৪৩৩ ঈসায়ীতে তিনি ইন্তেকাল করেন। তার পর সিংহাসনে বসেন তাঁর পুত্র আবদুল্লাহ। আবদুল্লাহ মির্জার সঙ্গে ইউনুস খানের মৈত্রীপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ইউনুস খানকে তিনি খুবই সম্মান করতেন। সতেরো-আঠারো বছর যাবৎ তাঁদের মধ্যে প্রগাঢ় সম্পর্ক থাকে।

    ঔলংগ বেগ ইউনুস খানের বড় মেয়েকে নিজের ছেলের সঙ্গে বিয়ে দেন। তিনি তাঁর রাজ্যকে ঠিকমতো সামলাতে পারছিলেন না। তাঁর রাজ্য ছিন্নভিন্ন হয়ে যাচ্ছিল। ঔলংগ বেগ মির্জা ও তাঁর পুত্রের অযোগ্যতার সুযোগ নেওয়ার জন্য বুগচা খান ফারগানায় আক্রমণ চালিয়ে দেন। তিনি খান্দ-এ-বাদাম অবধি লুটপাট চালান এবং আন্দিজান পর্যন্ত এগিয়ে চলেন। তিনি সমস্ত মানুষকে যেন সম্মোহনের ডোরে বেঁধে রেখেছিলেন। আবিসালদ মির্জা সমরখন্দের সিংহাসনে বসার পর তাঁর সেনাবাহিনীকে তরাজ অভিমুখে পাঠিয়ে দেন। তারপর মোগলিস্তানের অসপরা নামক স্থানে আলসান বুগাকে পরাজিত করেন। তিনি ইউনুস খানকে খোরাসানে ডেকে দাওয়াত দিলেন। বন্ধুত্বের মর্যাদা দিয়ে তিনি তাঁকে মোগলিস্তানের খান উপাধি দেন।

    ইউনুস খান, আলসান দৌলত বেগমের সঙ্গে পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ হন। তাঁর তিনটি কন্যা সন্তান জন্মগ্রহণ করেন। কুতলুক নিগার খানম, আমার মা; ইউনুস খানের অন্য মেয়ে ছিলেন। আমার গেরিলা অভিযানের দিনগুলোতে তিনি অধিকাংশ সময় আমাকে সাহায্য করতে থাকেন। ১৫০৫ ঈসায়ী সনের জুন মাসে, আমার কাবুল বিজয়ের পাঁচ-ছ’ মাস পরে তিনি ইন্তেকাল করেন।

    খুব নিগর খানম ইউনুস খানের তৃতীয় কন্যা ছিলেন। খোরাসানের মুহম্মদ হুসাইনের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। খুব নিগার একটি কন্যা একটি পুত্র সন্তানের জন্ম দেন। উজবেকের হাবিব খানের সঙ্গে তাঁর কন্যা হাবিবার বিয়ে হয়। ঐ সময়ে আমি সমরখন্দ ও বুখারা (১৫১১ ঈ.) জয় করি।

    খুব নিগার খানমের ছেলের নাম ছিল হায়দার মির্জা। তিনি আমার সেবায় তিন-চার মাস থাকেন। ১৫১২ ঈ. সনে তিনি আমার কাছ থেকে কাশগড় যাওয়ার অনুমতি নেন। লোকে বলত যে, তিনি সেখানে পরম সুখে শান্তিতে জীবন কাটাচ্ছেন। তিনি খুব ভালো হাতের কাজ জানতেন। তিনি খুব ভালো রঙের কাজও করতেন। তিনি ভালো তীর এবং তৃণীরও বানাতেন। তাশখন্দের খান মির্জাদের পক্ষ থেকে আমি অনেক সহযোগিতা ও সংরক্ষণ লাভ করেছিলাম।

  • পঞ্চম অধ্যায় : বাবুরের যুদ্ধ ও বিশ্বস্তদের ভূমিকা

    পঞ্চম অধ্যায় : বাবুরের যুদ্ধ ও বিশ্বস্তদের ভূমিকা

    পঞ্চম অধ্যায় : বাবুরের যুদ্ধ ও বিশ্বস্তদের ভূমিকা

    খাজা হুসাইন বেগ একজন উত্তম স্বভাব ও সরল প্রকৃতির মানুষ ছিলেন। ওই যুগের রীতি অনুযায়ী খানা-পিনার মাহফিলে শায়রী শুনিয়ে বাহবা লুটতেন।

    আল-মজাল্‌দ্ বেগ আমার প্রথম অভিভাবক ছিলেন। শাসন কার্যের উত্তম নিয়ম-কানুন সম্পর্কে জ্ঞান রাখতেন।

    আল-মজাল্‌দ্, উমর শেখ মির্জা (পিতা)-র ওহদেদার ছিলেন। তিনি দু’বার বিদ্রোহ করেন, একবার অকশায়, আরেকবার তাশখন্দে। তিনি অকৃতজ্ঞ, নেমকহারাম ও অকর্মণ্য ব্যক্তি বলে প্রমাণিত হন।

    ইয়াকুবের পুত্র হাসান আমার অন্যতম অভিভাবক ছিলেন। তিনি সংকীর্ণচেতা, কিন্তু তিনি উত্তম স্বভাবের ফুর্তিবাজ এবং চালাক-চতুর মানুষ ছিলেন। তাঁর কবিতার পঙ্‌ক্তি আজও আমার মনে আছে—

    ‘ও হুমাঁ, ফিরে এসো তুমি তোতার আসার আগে

    এবং আমার অস্থি-মজ্জা কাকে চুষে খাওয়ায় আগে।’

    ‘ফিরে এসো হুমাঁ, তোতা পক্ষীর নিচেয় নামার আগে

    এবং কাকের আমার হাড্ডি চুষে খেয়ে যাবার আগে॥’

    তিনি সাহসী ও শিল্পকলাবিশারদ ছিলেন। পোলো খেলতে ভালোবাসতেন। তিনি ব্যাঙের মতো লাফ দিতে পারতেন। উমর শেখ মির্জার মৃত্যুর পর তিনি আমার অভিভাবকত্বের দায়ভার গ্রহণ করেন। তিনি এতই প্রভুভক্ত ছিলেন যে, বিপদের মুখোমুখি হতেও ভয় পেতেন না।

    কাসিম বেগ, আন্দিজানের বেগ সেনাদের প্রধান ছিলেন, তিনিও আমার প্রতি বিশ্বস্ত ছিলেন। হাসান পুত্র ইয়াকুবের পর তিনি আমার শুভাকাঙ্ক্ষী ছিলেন। বীরপুরুষ ছিলেন। একবার তিনি উজবেকদের আচ্ছা রকমের বেগ লাগিয়ে দেন। তিনি কাসন অভিমুখে অগ্রসর হওয়া অশ্বারোহী সেনার উপর আক্রমণ চালিয়ে দেন। তখন তাঁর উদ্যত তরবারি তাদের দ্রুত গতিতে অগ্রসরমান বাহিনীকে চিরে দিয়েছিল। তিনি এই কাণ্ড উমর শেখ মির্জার উপস্থিতিতে ঘটিয়েছিলেন, যাতে তিনি খুবই প্রভাবিত হন।

    আমার গেরিলা যুদ্ধের কারণে তিনি খুসরো শাহের অধীনে চলে যান। তবে, ১৫০৪ ঈসায়ীতে তিনি আমার কাছে আবার ফিরে আসেন। তাঁর ফিরে আসার পর আমি আমার নিজের প্রতি তাঁর পুরনো প্রভুভক্তি ও স্নেহের পরশ পাই। আমি যখন তুর্কমান হাজারার উপর দররা-এ-খাশ থেকে আক্রমণ করি, তখন তিনি একজন যুবা সৈনিকের মতো পুরো উৎসাহের সঙ্গে আমার আগে-আগে থাকেন। আমি কাবুল ফেরার পর পুরস্কার স্বরূপ তাঁকে বংগশ এলাকাটি প্রদান করি। তাঁকে আমি হুমায়ূনের অভিভাবক নিযুক্ত করি। ১৫২২ ঈসায়ীতে তিনি আল্লাহর সন্নিধানে চলে যান। তিনি একজন সৎ ও আল্লাহ-ভীরু মুসলমান ছিলেন। তাঁর ছিল পূর্ণরূপে একজন ত্যাগীমানুষের জীবন। তাঁর পরামর্শ ও সিদ্ধান্ত হতো অত্যন্ত সুন্দর। যদিও তিনি লেখাপড়া জানতেন না তা সত্ত্বেও চুটকি বলে মনোরঞ্জন করার কলা জানতেন।

    বাবা বেগ কুল আরেকজন বিশ্বস্ত ব্যক্তি ছিলেন, শেখ মজদ্ বেগের মৃত্যুর পর যাঁর উপর আমার দেখাশোনার দায়ভার এসে পড়ে। মির্জা যখন আন্দিজান অভিমুখে সেনা অভিযান চালান তখন তিনি আহমদ মীরের পক্ষে চলে যান। মাহমুদ মির্জার মৃত্যুর পর সমরখন্দ ত্যাগ করেন এবং আমার কাছে চলে আসেন। তিনি আমার শত্রুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন। তাদের পরাজিত করেন ও পালাতে বাধ্য করেন। তাঁর প্রশাসনিক ব্যবস্থা ও যুদ্ধকলা ছিল নিপুণ। সৈন্যদের তিনি সম্পূর্ণরূপে এবং শক্তভাবে নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখতেন। তিনি নামাজও পড়তেন না, রোজাও করতেন না। তাঁর স্বভাব ছিল অত্যাচারী এবং হাবভাব ছিল বন্ধ্যা ভূমির মতো।

    আমার নানি, আলসান দৌলত বেগমের আত্মীয় আল-দোস্ত-তগলও আমার এতটাই বিশ্বস্ত ছিলেন যতটা তিনি উমর শেখের আমলে ছিলেন। লোকেদের আশা ছিল যে, তিনি আমার অনেক কাজে আসবেন। তবে তিনি কোনো বাজ পাখি ধরা ব্যক্তির মতোই ব্যর্থ মানুষ বলে প্রতীত হন। তিনি ছিলেন শুষ্ক স্বভাব বিশিষ্ট, কৃপণ, সহজে মুসিবতে পড়ে যাওয়া, রুক্ষ ভাষা প্রয়োগকারী এমন এক ব্যক্তি, যার চেহারায় সর্বদাই মৃতবৎ ছায়া ফুটে উঠত।

    সমরখন্দের তুগলক পরিবারের আরেক ব্যক্তি, কঠিন দিনগুলোতে আমার সাথি হয়েছিলেন, তাঁর নাম ছিল বাইসালঘা। গেরিলা যুদ্ধের সময়ে তিনি আমার সঙ্গে থাকেন। তিনি সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী এবং সঠিক পরামর্শদানকারী মানুষ ছিলেন।

    আলী দোস্ত তগাইয়ের ছোট ভাই মীর গিয়াস তগাইও আমার বিশ্বাসভাজনদের অন্যতম ছিলেন। তিনি আগে আবু সঈদ মির্জার অধীনে ছিলেন। ১৪৯৪ ঈসায়ীতে যখন কাসন, মাহমুদ খানের অধিকারে চলে এসেছিল, তখন ঐ দিনগুলোতেও তিনি খানেদের অধীনে ছিলেন। তিনি কিছুটা জোকার স্বভাবের হাস্যরসিক মানুষ ছিলেন। কারো ক্ষতি করতে গিয়ে তিনি খুবই নির্ভীক থাকতেন।

    খোরাসান সেনা চৌকিতে থাকা আলী দরবেশ খোরাসানীও আমার একজন উত্তম সহযোগী ছিলেন। তিনি একজন নির্ভীক যোদ্ধা ছিলেন। বাইশকরাম দ্বারের রক্ষায় যখন আমি তাকে মোতায়েন করেছিলাম তখন আমি তাঁর বিশ্বস্ততার সঙ্গে পরিচিত হয়েছিলাম। তিনি ‘নকশে তালিক’ রচনা করেছিলেন। তাঁর লেখা খুবই স্বচ্ছ ছিল। তিনি কিছুটা তোষামোদি ও কিছুটা লোভী স্বভাবের মানুষ ছিলেন।

    ইকিউরি নিবাসী কম্বর আলী মোগলও আমার সহযোগীদের অন্যতম ছিলেন। তিনি লোকেদের কাছে সিকনার নামে পরিচিত ছিলেন। এটা এ জন্যই ছিল যে, তাঁর পিতা যখন ফারগানায় এসেছিলেন তখন তিনি সেনা বাহিনীর সঙ্গে চলমান পানির পাত্র বহনের কাজে নিযুক্ত ছিলেন। পরে তাঁকে বেগ বলা হতে থাকে। তিনি এমন একজন মানুষ ছিলেন যিনি তাঁর ভাগ্যের খোদ নির্মাতা হন। তিনি সুন্দর চরিত্রের মানুষ ছিলেন। তাঁর মধ্যে দোষ বলতে একটাই ছিল যে, তিনি ছিলেন কিছুটা অলস প্রকৃতির এবং অতিশয় বাক্যবাগীশ। আমি মনে করি যে, অতি বাক্যবাগীশরা মূর্খ হয়ে থাকে। তাদের কর্মক্ষমতা কমে যায়। তার মাথায় গোবর পোরা থাকে।

    উমর শেখ মির্জার মৃত্যুর সময়ে আমি আন্দিজানের চারবাগী বাগিচায় ছিলাম। আন্দিজানে এ খবর আসে রমজান মাসের ৯ তারিখে মঙ্গলবার, ৯ জুনে। আমি আমার বিশ্বস্ত ও নিরাপত্তা কর্মীদের সঙ্গে তৎক্ষণাৎ মহল অভিমুখে যাত্রা করি। আমি সোজা মহলে প্রবেশ করতে চাচ্ছিলাম কিন্তু মহলের দ্বার রক্ষক সিরাম তঘাল অগ্রসর হয়ে আমার ঘোড়ার লাগাম ধরলেন এবং আমাকে ইবাদতগাহের দিকে নিয়ে গেলেন। অবশ্যই, ঐ সময় তিনি হয়তো ভেবে থাকবেন যে, আহমদ মির্জা যদি সসৈন্যে সেখানে চলে আসেন (আমার পিতার মৃত্যুর সংবাদ পেয়ে) তখন আন্দিজানের সকল বেগ (বেগ দলপতিগণ)-কে তাঁর সামনে অবশ্যই হাজির হতে হবে। এমতাবস্থায়, না জানি আমার পিতার মৃত্যুশোক ও অন্তিম সৎকারে আমি সামিল হতে পারব কি-না?

    ইবাদতগাহে, আমার পিতার মৃত্যুর পরের জন্য পঠিতব্য দোয়ার পর আমি ঔজক-এ সৎ-ভাই আহমদ খান ও মাহমুদের কাছে গেলাম। খাজা মওলানা-এ-কাজীরও মৃত্যু-সংবাদ শুনে চলে আসার কথা আশা করা হচ্ছিল। কিন্তু তিনিও ফারগানায় এলেন না, তখন বেগ সরদাররা আমার জন্য আনত মস্তক হলেন। তাঁরা খাজা মাহমুদ, যিনি আমার পিতার আমলের দর্জি ছিলেন, তাঁকে ডেকে আনার জন্য আমাকে পাঠালেন। তিনি লোকেদের সকল প্রকারের আশঙ্কা নিবারণের কাজ করলেন। (আশঙ্কা এ জন্য যে, আহমদ মির্জার দ্বারা ক্ষমতা দখলের লড়াই যেন ছড়িয়ে দেওয়া না হয়)।

    আমি কেল্লায় এলাম। ওখান থেকে ইবাদতগাহে শোকের রসম পালন করতে গেলাম। পিতার আমলের বেগ দলপতিরা আমাকে পূর্ণ সমর্থন জানালেন, সে জন্য পিতার উত্তরাধিকার স্বরূপ আমি ক্ষমতা লাভ করলাম। ইয়াকুবের পুত্র হাসান ও কাসিম আমার পক্ষ মজবুত হয়ে যাওয়ার পর আমার কাছে এলেন। তাঁরাও সোৎসাহে অন্য লোকেদের সঙ্গে আমাকে কেল্লায় নিয়ে গেলেন।

    ইতোমধ্যে এ খবরও ছড়িয়ে পড়ল যে, আহমদ মির্জা, আউসা-টিপা, খুজন্দ ও মার্খম অতিক্রম করেছেন। তবে তিনি আন্দিজান পর্যন্ত আসতে পারেননি।

    খাজা কাজী ও ঔজিগ হাসান, যিনি খাজা হুসাইনের ভাই ছিলেন, তাঁদের আন্তরিকতাপূর্ণ সহযোগিতাও আমি পেয়ে গেলাম।

    প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের দ্বারা বাবুরকে সাহায্য

    সর্বশক্তিমান আল্লাহর সিদ্ধান্ত আমার পক্ষে ছিল। তাঁর কৃপা ছিল আমার উপর। ওই সময়ে এমন কিছু ঘটনা ঘটে যার উল্লেখ এখানে একান্ত আবশ্যক। যার পক্ষ থেকে আমার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার আশংকা ছিল তিনি খিবা নামক স্থানে অগ্রসর হয়ে আন্দিজান পর্যন্ত পৌঁছাতে পারতেন না। ঐ সময়ে ওই এলাকার ভূমি, অধিক বর্ষার কারণে কর্দমাক্ত হয়ে পড়েছিল। অবশিষ্ট ছিল শুধু একটি পুল, তাও এতটা পিছল যে, তার উপর দিয়ে ঘোড়া বা উটেদের পার হয়ে আসা সম্ভব ছিল না।

    এ ধরনের আরো একটি ঘটনা ঘটে, তা হলো পশুদের মধ্যে ভয়ংকর মহামারী ছড়িয়ে পড়ে। তারা দলে দলে মারা পড়তে থাকে।

    আমার সিপাই ও কৃষকরা আমার জয়ের জন্য এরকমই তৈরি ছিল যে, জীবন-মৃত্যুকে পায়ের ভৃত্য বলে মানতেও পিছপা ছিল না। তারা নিজেদের শেষ নিশ্বাসটি পর্যন্ত লড়ার জন্য প্রস্তুত ছিল।

    এমতাবস্থায়, আহমদ মির্জার বাহিনী অগ্রসর হওয়ার আর কোনো সুযোগই পেল না।

    মির্জার মা শাহ সুলতান বেগম, জাহাঙ্গীর মির্জা ও হেরেমের অন্য মহিলারা অকশা থেকে আন্দিজানে এলেন। বাহাদুর সৈনিকেরা ও বেগ দলপতিরা তাদের অভ্যর্থনা জানালেন। শোক পালনের রীতি পুরো করার পর খাদ্য ও রসদ সামগ্রী দীন-দরিদ্র ও আশ্রয়হীনদের মধ্যে বণ্টন করা হলো।

    এ সবের মধ্যে দেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রতিও পুরো মাত্রায় মনোযোগ রাখা হচ্ছিল। আহমদ মির্জা, যিনি আন্দিজানের বাইরে থেকেই লোক-লস্কর নিয়ে ফিরে গিয়েছিলেন, ফেরার পথেই তাঁর শরীর স্বাস্থ্য অকস্মাৎ ভেঙে পড়ে। প্রচণ্ড জ্বর হয় এবং টিপার নিকট অকশায় পৌঁছাতেই তিনি এই নশ্বর জগৎ-সংসার ছেড়ে অনন্তের উদ্দেশে যাত্রা করেন। ১৪৯৪ ঈসায়ী সনের মধ্য জুলাইয়ে তাঁর জীবনাবসান হয়। ঐ সময়ে তাঁর বয়স ছিল ৪৪ বছর।

    তিনি আল্লাহর সার্বভৌমত্বকে মন-প্রাণ দিয়ে স্বীকার করতেন। তিনি শরাব পানের দিনগুলোতেও আল্লাহর ইবাদত করতে কখনোই ভুলতেন না। পাঁচ ওয়াক্তের নামাজ তিনি নিয়মিত পড়তেন। তিনি খাজা উবাইদুল্লাহর অনুসারী ছিলেন। তিনি তাঁর দ্বারা কথিত দীনের বিধানাবলি নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করতেন।

    ওই দিনগুলোতে তিনি খুব বেশি পরিমাণে ধর্মীয় রীতিনীতি পালন করতেন, যে সময়ে খাজা তাঁর মেহমান হতেন। লোকে বলে, ওই সময়ে খাজার সঙ্গে হাঁটুতে হাঁটু ঠেকিয়ে বসে থাকা অবস্থায় তাঁকে কখনো দেখা যায়নি। তিনি তাঁর পদতলে বসতেই বেশি পছন্দ করতেন।

    তিনি লেখাপড়া জানতেন না। অবশ্য যে তালিম নিতেন তা সর্বদাই মনে রাখতেন। খাজা যখন তাঁর অতিথি হতেন তখন তিনি তাঁর সঙ্গে ছায়ার মতো অবস্থান করতেন। ওয়াদা রক্ষায় তিনি পাক্কা ঈমানদার ছিলেন। সাহসী ছিলেন। তিনি স্বহস্তে কিছুই করা পছন্দ করতেন না। তিনি আদেশ দিয়ে তা যথারীতি পালন হচ্ছে কি-না তা দেখার মানুষ ছিলেন। তীর-ধনুক দিয়ে হাঁস পাখি শিকার করতে তিনি খুব আনন্দ লাভ করতেন। তিনি বাজ ছেড়ে তোতা শিকার করতেও পছন্দ করতেন। তাঁর সম্পর্কে লোকে বলে, তিনি গোসলখানাতেও এবং ঘনিষ্ঠ লোকেদের মধ্যেও নিজের পা দুটিকে নির্বস্ত্র হতে দিতেন না। তার একমাত্র কারণ এটাই হতে পারে যে, তাঁর স্বভাব-প্রকৃতি এই রকমই ছিল। তাঁর স্বভাব-প্রকৃতির এটাও একটা ভিন্ন দিক ছিল যে, তিনি যখন শরাব পান করতে শুরু করতেন তখন বিশ-ত্রিশ দিন পর্যন্ত একটানা পান করে পুরো নেশাখোর হয়ে যেতেন আর যখন শরাব পান ত্যাগ করতেন তখন বিশ-ত্রিশ দিন পর্যন্ত শরাবের পেয়ালা পর্যন্তও স্পর্শ করতেন না।

    তিনি চারটি যুদ্ধ করেন। প্রথম যুদ্ধ করেন বলখ জামাল আরগুনের ছোট ভাই নিয়ামত আরগুনের সঙ্গে অবুরতুজিতে, যাতে তিনি জয়লাভ করেন। দ্বিতীয় যুদ্ধ উমর শেখ মির্জার সঙ্গে খাওয়ামে, এতেও তিনি জয়লাভ করেন। তৃতীয় যুদ্ধ তিনি মাহমুদ খানের সঙ্গে তাশখন্দের চীর নামক স্থানে করেন ১৪৯৬ ঈসায়ীতে। আসলে যুদ্ধ না হয়ে এটি ছিল একটি সংঘর্ষ। এতে সামনা-সামনি সরাসরি যুদ্ধ না হয়ে, এক-এক, দুই-দুই করে উভয় পক্ষের সৈনিকেরা একে অন্যের উপর হামলা করতে থাকত, শক্তি পরীক্ষা হতো। এই শক্তি পরীক্ষায় তাঁর সামরিক শক্তি ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। চতুর্থ যুদ্ধ হায়দার কুকুল দাস মোগলের সঙ্গে মটমিলক নামক স্থানে হয়, যাতে তিনি জয়লাভ করেন।

    তিনি তাঁর পিতার কাছ থেকে সমরখন্দ ও বুখারা লাভ করেছিলেন। তাশখন্দ ও সেরাম তিনি তাঁর শক্তির বলে জয়লাভ করেছিলেন। যাকে তিনি তার ছোট ভাই উমর শেখ মির্জাকে দিয়ে দিয়েছিলেন। খোজেন্দ ও আওসারিয়া তাঁর অধিকারে অনেক দিন পর্যন্ত থাকে।

    তাঁর দুই পুত্র অতি অল্প বয়সে আল্লাহর সন্নিধানে চলে যান। তাঁর পাঁচটি কন্যা ছিল, যাঁদের মধ্যে চতুর্থ মেয়েটি কুতক বেগমের গর্ভে জন্মেছিলেন। রাজিয়া সুলতান বেগম সর্ব জ্যেষ্ঠ কন্যা ছিলেন। তিনি তাঁর সৌন্দর্যের জন্য মশহুর ছিলেন। তাঁর এক পুত্র সন্তান জন্মেছিল, যিনি বাবা খান নামে সুপরিচিত ছিলেন।

    মেহের নিগার খানম তাঁর প্রথম পত্নী ছিলেন। তিনি ইউনুস খানের বড় মেয়ে তথা আমার মায়ের সহোদরা বোন ছিলেন।

  • ষষ্ঠ অধ্যায় : মাহমুদ মির্জার জীবনাবসান

    ষষ্ঠ অধ্যায় : মাহমুদ মির্জার জীবনাবসান

    ষষ্ঠ অধ্যায় : মাহমুদ মির্জার জীবনাবসান

    ১৪৯৪ ঈসায়ী সনের জানুয়ারি মাসে মাহমুদ মির্জা অসুস্থ হয়ে পড়েন। ছয়দিন অসুস্থতার পর তিনি ইন্তেকাল হয়ে যান। এ সময়ে তাঁর বয়স ছিল ৪১ বছর।

    মাহমুদ মির্জার জন্ম ও পরিচয়

    ১৪৫৩ ঈসায়ী সনে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তিনি আবু সঈফ মির্জার তৃতীয় পুত্র ও আহমদ মির্জার সহোদর ভাই ছিলেন।

    তিনি বেঁটে ও মজবুত কাঠামোর মানুষ ছিলেন। তিনি চাপদাড়ি রাখতেন। এটি তাঁর ব্যক্তিত্বের পক্ষে আকর্ষণীয় ছিল না। সেই সঙ্গে তাঁর আচরণ অনেক কঠিন ছিল। তিনি নিয়মানুবর্তী মানুষ ছিলেন। হিসাব-কিতাবে খুব দক্ষ ছিলেন। রাজস্বের পুরো হিসেবের উপর তিনি দৃষ্টি রাখতেন। কর্মচারীদের বেতনও তিনি প্রদান করতেন। তাঁর জন্য যা উপহার আসত তা তিনি সবার সামনে সাজিয়ে রাখতেন। তিনি সম্পূর্ণরূপে নিয়মানুবর্তী ছিলেন। কৃষক ও সৈনিকদের মধ্যে তিনি কখনো পার্থক্য করতেন না। নিজের কর্তব্যের প্রতি যেখানে তিনি পূর্ণ নিষ্ঠাবান ছিলেন সেখানে তাঁর চরিত্রেও অনেক দোষ ছিল, তিনি বাজ পাখি পালন করে তা দ্বারা শিকার করাতেন। তিনি জবরদস্ত শরাবি ছিলেন, ছেলেদের নিজের কাছে রাখতে খুব পছন্দ করতেন। তিনি শায়রী খুব পছন্দ করতেন, তবে তাঁর শায়রী হতো উত্থান-পতন বিহীন এবং নীরস। তাঁর শায়রী এমনটাই মনে হতো যেন কেউ লিখিত কাব্য পাঠ করছেন। খাজা উবাইদুল্লাহর প্রতি তাঁর খুব শ্রদ্ধা ছিল। তাঁর ব্যক্তিত্ব যতটা এবড়ো-খেবড়ো ছিল, দরাবরেও ঠিক তেমন মন্দ ভাষাই ব্যবহার করতেন। তাঁর ব্যবহার দ্বারা তিনি কাউকে খুশি করতে পারতেন না।

    যুদ্ধবিগ্রহ

    মাহমুদ মির্জা, হুসাইন মির্জার সঙ্গে দুটি যুদ্ধ করেন। প্রথম যুদ্ধ করেন অস্তারাবাদে, দ্বিতীয়টি চিকমন-এ। দুটি যুদ্ধেই তিনি পরাজিত হন। তারপরে তিনি বদাখশানের দক্ষিণে গিয়ে জিহাদে অংশগ্রহণ করেন এবং মুহম্মদ গাজী নাম ধারণ করেন।

    মুহম্মদ মির্জার প্রাপ্ত রাজ্য

    তাঁর রাজত্বের জন্য আবু সঈদ মির্জা কর্তৃক তাঁকে অস্তারাবাদ রাজ্যটি দেওয়া হয়েছিল। পিতার মৃত্যুর পর তাঁর অংশে খোরাসানও আসে।

    পিতার মৃত্যুর পর আমার সংরক্ষক ও বিশ্বস্তদের যে সাহায্য-সহযোগিতা আমি লাভ করি তাকে আমার উপর আল্লাহর রহমত বলেই আমি বিশ্বাস করি।

    আমার দ্বারা আমার পিতার শাহী-তখ্‌তকে সামলে নেওয়ার পর, কেল্লার আশপাশকে মজবুত করে পরিবেষ্টিত করে নেওয়া হয়। প্রাচীর উঁচু করে তোলা হয়। আমার চাচা আহমদ মির্জার পক্ষ থেকে আমার কাছ থেকে ফারগানা রাজ্য কেড়ে নেওয়ার এবং আমাকে বিতাড়িত করার ভয় আমার উপর সর্বদাই বিরাজ করতে থাকে। এরকম ভয় আমার সংরক্ষক ও বিশ্বস্তদেরও ছিল। ঐ সময়কালকে একটি সন্ধিক্ষণের কাল বলে অভিহিত করা যেতে পারে।

    ফারগানার বাইরের এলাকার মৌসম (বর্ষা) ও জানোয়ারদের মড়ক আমার নিরাপত্তা প্রস্তুতির পূর্ণ অবসর দিয়ে দিয়েছিল।

    আধিকারিক রূপে বাবুরের রাজ্য প্রাপ্তি

    কিছুকাল পরে মাহমুদ খানের শাহরুখিয়া আসার ফলে আমি সান্ত্বনা লাভ করি। (মাহমুদ খান খানেদের মধ্যে সবচেয়ে ‘বড় খান’ বা তাদের নেতা ছিলেন। তাঁর ইশারায় ছোট ছোট রাজ্যের মালিকদের তাজ ও তখত্ উল্টে যেত।) আমার শুভাকাঙ্ক্ষীরা আমাকে পরামর্শ দিলেন, তাঁর সামনে আমাকে হাজিরা দেওয়া উচিত।3

    আমি ওই স্থানে পৌঁছে গেলাম যেখানে তিনি অবস্থান করছিলেন। তিনি শাহরুখিয়ার বাইরের অংশে অবস্থিত হায়দর বাগে অবস্থান করছিলেন। বাগে একটি বিশাল তাঁবু খাটানো হয়েছিল। তিনি যে তাঁবুতে ছিলেন, সেটি চারটি দ্বার বিশিষ্ট তাঁবু ছিল। তাঁবুর মধ্যে তিনি সিংহাসনে আসীন ছিলেন।

    আমি তাঁর সামনে হাজির হলাম, হাঁটু গেড়ে তাঁর সামনে ঝুঁকে পড়ে আমি তাঁকে তিনবার সালাম করলাম। তাঁর প্রতি সম্মান ব্যক্ত করার এটাই রীতি ছিল। তিনি আমার প্রতি এক নজর দেখলেন। আমাকে তাঁর কাছে ডাকলেন, স্নেহভরে তিনি আমার কুশলাদি জিজ্ঞাসা করলেন। পিতার অকাল মৃত্যুতে আফসোস প্রকাশ করলেন।

    এই সাক্ষাতের দু-তিন দিন বাদেই আমার সুফল মিলল। অকশা ও আন্দিজানের সেই ক্ষেত্র, যা আগে আমার পিতার অধীনে ছিল, খান (মাহমুদ খান)-র দ্বারা আমাকে প্রদান করা হলো।

    এই সুসংবাদটি শোনার পর আমি আমার পিতার মকবরায় গেলাম। সেদিন ছিল শুক্রবার। আমি আল্লাহর ইবাদতে এক ঘণ্টা সময় কাটালাম, তারপর বন্দেসালারের পথ ধরে আন্দিজানের উদ্দেশে রওয়ানা হয়ে গেলাম। আমি সেখানে সন্ধ্যার মুখোমুখি সময়ে পৌঁছে গেলাম।

    বাবুরের বিচক্ষণতা প্রদর্শনের প্রারম্ভিক দিনগুলো

    আন্দিজানের জিকরাকে জংলি উপজাতিদের বসবাস। কাশগড় ও ফারগানার পার্বত্য এলাকায় ছ’হাজার বস্তিতে এরা বসবাস করে। এরা ঘোড়া, ভেড়া ও ইয়াক পালন করে। এই পার্বত্য উপজাতির লোকেরা ইয়াককেও অন্যান্য গৃহপালিত পশুর মতো পালন করে। এরা এতই উদ্ধত যে, বাইরের দুনিয়ার কোনো মানুষকেই এরা সম্মান প্রদর্শনের প্রয়োজন আছে বলে মনে করে না। ওই এলাকাটি খানের দ্বারা আমাকে উপহার স্বরূপ দেওয়া হয়েছে, ঐ ক্ষেত্রটি যখন আমার অধিকারে, তখন এই কথাটা বলার জন্য সৈয়দ কাসিম বেগের নেতৃত্বে আমি সেনা পাঠালাম। তাদের বলা হলো যে, এবার থেকে তাদের রাজস্ব আদায় করতে হবে। তাদের কাছ থেকে রাজস্ব বাবদ আমার সৈনিকেরা দু’হাজার ভেড়া ও পনেরোশো ঘোড়া নিয়ে এল। ভেড়া ও ঘোড়াগুলোকে আমি আমার সৈনিক, সংরক্ষক ও বিশ্বস্তদের মধ্যে বণ্টন করে দিলাম।

    এরপর জিকরাল থেকে ফিরে এসে সৈনিকেরা ঔরাটিয়ার দিকে অগ্রসর হলো। ওই এলাকাটি আমার পিতার আমলে কিছুদিন তাদের অধিকারে ছিল। পরে তাঁর জীবনাবসানের পর কিছুদিনের জন্য ঔরাটিয়া সৈয়দ আলী মির্জার অধিকারে চলে গিয়েছিল। তার উপর তখনও পর্যন্ত সৈয়দ আলী মির্জার বড় ভাই বাইসংঘার মির্জার অধিকার ছিল। আলী মির্জা সসৈন্যে আমার ওই দিকে অগ্রসর হওয়ার কথা শুনে তিনি মচাহিলের দিকে চলে গেলেন। তিনি তাঁর অবর্তমানে শেখ জয়নুলকে সেখানকার হাকিম নিযুক্ত করে দেন। আমি খুজন্দ ও ঔরাটিয়া সড়কের মধ্যবর্তী স্থানে ছিলাম, তখন শেখ জয়নুল তাঁর দূতকে আমার কাছে পাঠিয়ে দিলেন।

    দূত রূপে আমার কাছে আগত ব্যক্তি, আমার সঙ্গে মূর্খতাপূর্ণ কথাবার্তা বলার ফলে কোনো সমাধান বের করতে পারলেন না। পরিণামে, তাঁকে খালি হাতে ফিরে যেতে হলো। শেখ জয়নুল অসন্তুষ্ট হয়ে ঐ দূতকে কত্‌ল করার হুকুম দিলেন। কিন্তু তাঁর হুকুম পালন হতে পারল না। এর কারণ ছিল, হুকুম পালনকারী ব্যক্তি শেখ জয়নুলকে হুকুম দেওয়ার যোগ্য ব্যক্তি বলে মনে করতেন না। ঐ দূত ওখান থেকে পালিয়ে দু-তিন দিন পরে আমার কাছে এসে উপস্থিত হয়।

    ঔরাটিয়া পর্যন্ত পৌঁছানো সড়কটি ছিল অত্যন্ত কষ্টদায়ক। তা সত্ত্বেও আমি সেখানে পৌঁছে, ওই এলাকাকে নিজ অধিকারভুক্ত করতে সমর্থ হলাম। শরৎ ঋতুর আগমন শুরু হয়ে গিয়েছিল। ওখানকার কৃষকরা ক্ষেতে মক্কা ও চারা বোনার কাজে নেমে পড়েছিল। কয়েক দিনের সফরের পর আমরা সেখান থেকে ফিরে এসে আন্দিজানে পৌঁছে গেলাম। সৈয়দ মির্জা দ্বারা ঔরাটিয়ার অধিকার ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল। ওই এলাকা, আমার ফারগানা থেকে পলায়নের পর, যেমনটি আমি শুনেছিলাম ‘খান’4 ঔরাটিয়া মুহম্মদ হুসাইন নামক ব্যক্তিকে প্ৰদান করেছিলেন। ১৫০৫ ঈসায়ী পর্যন্ত তা তাঁর অধিকারে থাকে।

  • সপ্তম অধ্যায় : খুশরু শাহের উপর হুসাইন মির্জার আক্রমণ

    সপ্তম অধ্যায় : খুশরু শাহের উপর হুসাইন মির্জার আক্রমণ

    সপ্তম অধ্যায় : খুশরু শাহের উপর হুসাইন মির্জার আক্রমণ

    ১৪৯৫ ঈসায়ী সনের শরৎ ঋতুর প্রারম্ভেই সৈয়দ সুলতান হুসাইন মির্জার সেনা খুরাসান থেকে বেরিয়ে হিসারের রাস্তা ধরে তিমরিজ পৌঁছে গেল। খুশরু শাহেরও অত্যন্ত শক্তিশালী বাহিনী ছিল, তা সত্ত্বেও তিনি তাঁর ছোট ভাই মাসুদ মির্জার কাছ থেকে সাহায্য নিলেন। দুই বাহিনী এ পার ওপার-দুই পারে অবস্থান নিল। প্রচণ্ড শীতের কারণে কোনো বাহিনী নদী পার হতে সাহস পেল না। কিছু দিন যাবৎ যুদ্ধ ছাড়াই দু’পক্ষের সেনা নিজ-নিজ স্থানেই পড়ে রইল। হুসাইন মির্জা খুবই বিচক্ষণ এবং যুদ্ধাভিজ্ঞ ব্যক্তি ছিলেন। তিনি নদীর এমন অংশ খুঁজে নিলেন যেখানে পানি কম ছিল। তিনি তাঁর বাহিনীকে নদী পার হওয়ার আদেশ দিলেন। ঐ স্থান থেকে কুন্দুজ এলাকাটি নিকটবর্তী ছিল। কুন্দুজ মাসুদ মির্জার এলাকা ছিল। হুসাইন মির্জা জানতেন নিজের এলাকা রক্ষার জন্য মাসুদ মির্জা সসৈন্যে কুন্দুজ অভিমুখে চলে আসবেন।

    মাসুদ মির্জা যখন কুন্দুজ অভিযানের খবর পেলেন তখন তিনি আবদুল লতিফ বখশির নেতৃত্বে পাঁচ ছ’শ সৈন্যকে হুসাইন মির্জার বাহিনীকে আটকানোর জন্য পাঠিয়ে দিলেন।

    কিন্তু হুসাইন মির্জার অগ্রবর্তী সেনাকে আবদুল লতিফ বখশির সৈন্যরা রুখতে পারল না। মারামারি-হানাহানি করতে করতে তিনি হিসার পর্যন্ত অধিকার করে চললেন। নিজের এলাকার পতনের খবর শুনতেই মাসুদ মির্জা তাঁর ভাইয়ের সঙ্গ ত্যাগ করে কমরিদ উপত্যকায় নেমে গেলেন। তিনি উপত্যকার রাস্তা ধরে ছোট ভাই বাইসুঘর মির্জার কাছে নিরাপদে পৌঁছানোর পথ বেছে নিলেন।

    তরপর শোনা গেল মাসুদ মির্জাকে শায়বানির কাছে পৌঁছে চাকরি নিতে হয়েছে।

    হুসাইন মির্জার সেনার সামনে খুশরু শাহ ছাড়া অন্য ছোট-ছোট রাজ্যের সামনে মির্জা আর টিকতে পারেননি। এক-এক করে তাঁকে পরাজয় স্বীকার করতে হয়।

    আন্দিজানে যাওয়ার পথে আমার কাছে হুসাইন মির্জার অগ্রবর্তী হওয়ার খবর আসতে থাকে। আমি আমার বাহিনীকে সমরখন্দে রওনা করিয়ে দিই। খুশুরু শাহ আমার কাছে এসে সাহায্য প্রার্থনা করলেন। আমি আরো মির্জাকে একত্রিত করলাম। সবার শক্তি একত্রিত করে আমি যুদ্ধের জন্য সেনা প্রস্তুত করলাম। সকলেই নিজেদের মধ্যেকার পারস্পরিক বিবাদ ভুলে গিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে মোকাবিলা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। আবুল করিম নামক স্থানে হুসাইন মির্জার সঙ্গে আমাদের বাহিনীর সংঘর্ষ হলো। এই সংঘর্ষে হুসাইন মির্জা বড়ই ক্ষতিগ্রস্ত হলেন। ভয়াবহ সংঘর্ষে নাস্তানাবুদ হুসাইন মির্জাকে অবশেষে খুরাসানে গিয়ে আশ্রয় নিতে হলো।

    এখানে আমার সমরখন্দ অভিমুখে অগ্রসর হওয়ার উত্তম সুযোগ ছিল। আমি মির্জাদের পূর্ণ সামরিক সহযোগিতা লাভ করেছিলাম। গরম পড়া শুরু হতেই আমি সমরখন্দ জয়ের জন্য অভিযান শুরু করি। আমি তুলুন খাজার নেতৃত্বে তিনশো সাহসী সৈনিককে অগ্রবর্তী হওয়ার আদেশ দিই। তারা ইয়ারইলাক অবধি পৌঁছাল।

    সমরখন্দ অভিযানের শুরুয়াত

    বাইসুঘর মির্জা আমার আক্রমণের খবর পাওয়ামাত্রই নিজের গদি ছেড়ে দিলেন। বড় কোনো বাধা ছাড়াই আমার সেনা ইয়ারইলাক গিয়ে পৌঁছায়। ওই দিন রাতে আমার সৈন্যদের হাতে প্রচুর পরিমাণে লুটের সামগ্রী এসে গিয়েছিল।

    দু’দিন পর আমার সেনা সিরাজে প্রবেশ করল। সেখানে কাশিম বেগ দুলদাইয়ের শাসন ছিল। সিরাজে নিযুক্ত কাশিম বেগ দুলদাইয়ের দারোগা মোকাবিলার সাহস পেলেন না। তিনি তৎক্ষণাৎ আত্মসমর্পণ করলেন।

    পরদিন ফজরের নামাজের পর আমি আমার বাহিনীকে অগ্রবর্তী হওয়ার আদেশ দিলাম। এবার সমরখন্দে প্রবিষ্ট হওয়ার জন্য জার আফসাঁ নামক নদী পার হওয়ার প্রয়োজন পড়ল। কুরা পুলাকের পথ ধরে আমরা নদী পার হলাম। এবার আমাদের ফৌজের কড়া মোকাবিলা করতে হলো। এই যুদ্ধে আমার কয়েকজন বিশ্বস্ত সাথিকে হারাতে হলো। তবে বিজয় আমার পক্ষে এল।

    যেইমাত্র আমার বাহিনী ইয়ামে প্রবেশ করল-অমনি সেখানকার সমস্ত সওদাগর এক জোট হয়ে আমার বাহিনীকে স্বাগত জানাল। ইয়াম ছিল একটি বিশাল বাণিজ্যিক ক্ষেত্র। সেখানকার সওদাগররা এই আশ্বাস পেতে চাচ্ছিলেন যে, আমাদের সৈন্যদের দ্বারা সেখানকার বাজারগুলো যেন লুট হয়ে না যায়। আমি তাদের আশ্বাস দিলাম। কিন্তু এ খবর আমার সৈনকদের নিকট সময়মতো পৌঁছাতে পারল না। বিজয়-মদ-মত্তে আমার সৈনিকেরা সারা রাত ধরে ইয়ামের বাজার লুট করল। খবর পাওয়া মাত্রই আমি আমার সৈনিকদের মধ্যে প্রবেশ করে জানিয়ে দিলাম যে, সওদাগরদের আমি বাজার লুট না করার ওয়াদা দিয়েছিলাম। আমি আমার সাথিদের বললাম যে, তাদের দ্বারা এমনটা হওয়ার কারণে আমি ইয়ামবাসীদের কাছে মিথ্যাবাদী প্রতিপন্ন হয়ে যাব। আমার কথা শোনামাত্রই আমার সৈনিকেরা যে অনুশাসনের পরিচয় দিল তা অতুলনীয়। ওই দিন প্রথম প্রহরে আমার সৈনিকেরা যে মাল যেখান থেকে লুটেছিল সেই-সেই মাল তারা সেখানে গিয়েই রেখে এল। তারা সবকিছু ফিরিয়ে দিয়েছিল। একটা সুঁই-সুতোও পর্যন্ত তারা নিজেদের কাছে রাখেনি। সবকিছুই ওই সওদাগরদের কাছে পৌঁছে গেল যে যার মালিক ছিলেন।

    এই সময়ে আরেকটি ঘটনা আমার কানে আসে যে, আবুল করিমের কিছু ঘোড়া বাইসুঘর মির্জার দলের কিছু লোক চুরি করেছিল। তারা ধরা পড়েছে। আবুল করিমের সেনাপ্রধানরা তাদের কয়েকজনকে হত্যা করেছিল এবং অবশিষ্ট কয়েকজনকে ধরে আবুল করিমের সামনে পেশ করেছিল। চুরির অভিযোগে তাদের বেদম মার দেওয়া হলো এবং শহর থেকে বের করে দেওয়া হলো।

    এই ঘটনাকে মির্জা ঘরানার লোকেরা নিজেদের জন্য খুব অপমানজনক বলে মনে করলেন। এই অপমানের জ্বালা তখনও নিবারণ হয়নি, এমন সময় আবুল করিম সমরখন্দে মির্জা রাজ্যগুলোর বিরুদ্ধে সেনা পাঠিয়ে তাদের রাজ্য খালি করে দেওয়ার অভিযান চালিয়ে দিলেন। মির্জা রাজ্যগুলোর সরদাররা একজোট হয়েও কিছু করতে পারলেন না। তাঁরা একের পর এক পরাজিত হতে থাকলেন।

    সমরখন্দ বিজয়ের রাস্তা সাফ

    তাঁরা সবাই আমার পক্ষে এসে গেলেন। আমাকে নিয়ে তাঁরা আশায় বুক বাঁধছিলেন। তাঁরা আমার পক্ষে এসে যাওয়াতে আমার শক্তি বেড়ে গেল। আমি আমার সমরখন্দ বিজয়ের সংকল্প আরো মজবুত করে নিলাম। কয়েক দিন বাদেই আমি আরো অগ্রসর হয়ে সমরখন্দ অবরোধ করলাম।

    পিছন থেকে আরো মির্জা আমার দলে এসে ভিড়তে লাগল। তাদের মধ্যে বদিউজ্জামান মির্জা নামে একজন ছিলেন, যাঁর কাছ থেকে অস্তারাবাদ কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। মির্জাদের আরামপ্রিয়তা তাদের দুর্বলতার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তারা সোনা-রুপার পাত্রে শরাব পান করত। নিজেদের আরাম-আয়েশের প্রতি তারা সবচেয়ে বেশি মনোযোগী থাকত। সামরিক শক্তির ব্যাপারে তারা পুরোপুরি গাফিল থাকত। এ সকল দুর্বলতার কারণে তাদের উপর মুসিবতের পাহাড় ভেঙে পড়ছিল। তারা পরাজিত হয়ে আমার কাছে আসছিল। আমার সামরিক-শক্তি বেড়ে চলেছিল। সবাই আমার উপর এই আশায় বুক বেঁধেছিল যে, আমি একটা অলৌকিক কিছু করে দেখাব। তাদের হৃত রাজ্যগুলোকে পুনরুদ্ধার করিয়ে দেব।

    আমার দলে শামিল হওয়া মির্জাদের পক্ষের সামরিক শক্তির বলে দিনের পর দিন আমার উচ্চাকাঙ্ক্ষা বেড়ে চলেছিল। সমরখন্দ বিজয়াভিযান যেকোনো দিন, আজ, কাল, পরশুতে পুরো হতে পারত। আমার লক্ষ্য ছিল খাজা দিদারের কেল্লা। আমার সেনা ওই দিকে এগিয়ে চলেছিল। মাঝের পথ বিশাল চারণক্ষেত্র রূপে বিরাজ করছিল। আমি অগ্রবর্তী হয়ে সৈনিকদের শিবির গেড়ে দিয়েছিলাম।

    সমরখন্দের শাসক বাইসুঘর মির্জা, যিনি আমার ক্রমবর্ধমান সামরিক শক্তি দেখে চিন্তিত ছিলেন, তিনি শায়বানি খাঁ-র কাছে সাহায্য চাইলেন।

    শায়বানি খাঁ-র কাছ থেকে সাহায্য আসুক বা না আসুক, তার পরোয়া না করেই আমি খাজা দিদারে দাখিল হওয়ার হুকুম দিয়ে দিলাম।

    আমার সেনাদলে কিছু খবুদের, কিছু শাহরজের এবং কিছু আলাদা-আলাদা রাজ্যের সৈনিক ছিল, যার কারণে তাদের লড়াই, চিন্তাভাবনা এবং হামলা করার নিয়ম-কানুন আলাদা-আলাদা ছিল। তা সত্ত্বেও আমি তাদের সাহসিকতার সাথে কাজ করাতে সফল ছিলাম।

    সমরখন্দের লোকেরা ছিল রূঢ়িবাদী। কেল্লার দেওয়াল যথেষ্ট মজবুত এবং মোটা ছিল। কেল্লায় বিশাল লোহার গেট ছিল। কেল্লার কাছেই একজন বিখ্যাত সাধকের কবর ছিল, যাকে ‘শাহে-জিন্দা’ বলা হতো। কেল্লার দেওয়াল ৪০ ফুটের চেয়েও বেশি উঁচু এবং দৈর্ঘ্য প্রায় ১০০ ফুট ছিল।

    পূর্বে তুর্কি এবং মোগলদের দ্বারা সমরখন্দ বিজিত হয়েছিল। তাইমুর বেগ তাকে তাঁর রাজধানী বানিয়েছিলেন। সমরখন্দের সৈনিকেরা নিজেদের কেল্লার মধ্যে সুরক্ষিত করে নিয়েছিল। ‘রূঢ়িবাদী’ [ধর্মবিশ্বাসী] হওয়ার ফলে তাদের বিশ্বাস ছিল যে, ‘শাহে-জিন্দা’ ও আল্লাহতায়ালা তাদের রক্ষা করবেন। তারা রণক্ষেত্রে অবতীর্ণ হয়ে সামনা-সামনি যুদ্ধ করতে ভয় পাচ্ছিল। আমার সৈনিকেরা কেল্লার চারিধার ঘিরে রেখেছিল। কেল্লার মধ্যে নিজেদের নিরাপদ বলে মনে করা সৈনিকেরা বেশি সময় যাবৎ টিকে থাকতে পারল না। কেল্লার উপরে কমন্দ ফেলে দিয়ে আমার সাথে আমার অনেক সৈনিকের উপরে চড়ে ভিতরে লাফ দিয়ে পড়ল। কিছুক্ষণ লড়াইয়ের পরেই তারা অস্ত্র সমর্পণ করল। কেল্লা দখলের পর আমাদের সৈনিকেরা দৌড়ে গিয়ে কেল্লার ফাটক খুলে দিল। বাইরের সমস্ত সৈন্য ভিতরে ঢুকে পড়ল। এখন কেল্লা পুরোপুরি আমাদের দখলে।

    আল্লাহর কৃপায় কেল্লা এখন আমাদের অধিকারে।

    সমরখন্দের প্রাকৃতিক এবং ঐতিহাসিক বর্ণনা

    সমরখন্দ খুব সুন্দর নগর। এর পূর্ব দিকে কোহিক নদী বয়ে চলেছে। কোহিক পাহাড় থেকে এই নদী বেরিয়ে এসেছে, অতএব ওই পাহাড়ের নামে এই নদীর নামকরণ হয়েছে। এই নদী থেকে অসংখ্য নহর বেরিয়ে এসেছে, যা থেকে সেচের কাজের সাধন হচ্ছে। এই নহরের পানি বাগিচাগুলো পর্যন্ত পৌঁছে যায়। যার কারণে সমরখন্দের মাটি উর্বর ও ফসল-সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে। এই নদী বুখারা অবধি বয়ে গিয়ে তাকে সুজলা-সুফলা করে তুলেছে।

    কুসকুল নামক আর একটি নদীও সমরখন্দ দিয়ে বয়ে গিয়েছে। এ নদী খুব বড় নয়, তবে বছরে তিন-চার বার বড়ই উথাল-পাথাল হয়ে ওঠে। তার পানি বুখারা অবধি পৌঁছায় না। সমরখন্দের আঙুর, তরমুজ, আপেল ইত্যাদি চাষের জন্য সেচের সাধনও এই নদীর উপর নির্ভরশীল। সমরখন্দের এই সকল ফলের মধ্যে আপেল ও আনার তো জগৎ-প্রসিদ্ধ। শীতকালে এখানে খুব ঠান্ডা পড়ে। গরমের দিনগুলোতে এখানকার আবহাওয়া কাবুলের মতোই মধুর থাকে।

    সমরখন্দের উপনগরগুলোতে অনেক সুন্দর ইমারত রয়েছে। এ সকল ইমারত ও সুন্দর বাগিচাগুলো তাইমুর বেগ ও ঔলংগবেগ মির্জা নির্মাণ করিয়েছিলেন।

    এর আর এক উপনগর গিলক সরাইয়ে তাইমুর বেগ তাঁর কেল্লা বানিয়েছিলেন। এটি চারটি বিশাল তোরণ সমৃদ্ধ দুর্গ। নগরটি চারদিক দিয়ে প্রাচীর বেষ্টিত। প্রধান দ্বারটি লোহার গেট রূপে রয়ে গেছে। জুমআর নামাজের জন্য বিশাল মসজিদ নির্মাণ করা হয়েছে। এ মসজিদ সম্পূর্ণ রূপে পাথরের তৈরি। এর পাথরগুলো অতি উত্তম রূপে খোদাই করা হয়েছে। এর পাথর খোদাইকারী শিল্পীদের হিঁদুস্তান থেকে নিয়ে আসা হয়েছিল। এর গম্বুজ মেহরাববিশিষ্ট। এতে অত্যন্ত উজ্জ্বল হরফে পবিত্র কুরআনের লিপি খোদাই করা রয়েছে। এর লিপিগুলো এতটাই স্পষ্ট যে, দু’মাইল দূর থেকেও তা পড়া যায়। নগরীর পূর্ব দিকে দুটি বাগিচা রয়েছে। দূরবর্তী বাগিচাটি বাগে-বুলন্দী ও নিকটবর্তী বাগিচাকে বাগে-দিলকুশা বলা হয়। বাগিচায় তাইমুর বেগের ভারত-যুদ্ধের সঙ্গে সম্পর্কিত চিত্রকলা রয়েছে।

    তাইমুর বেগের আমলের চিহ্নসমূহ

    তাইমুর বেগের আমলে নকশে জাঁহা নামে আরো একটি বাগিচা নির্মাণ করা হয়েছিল। এটি কোহিক পর্বতের পাদদেশে অবস্থিত ছিল। তবে, যখন আমি সেটি দেখি তখন সেটি ধ্বংসোন্মুখ হয়ে পড়েছিল। অবশ্যই, রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে তার এই পরিণতি ঘটেছিল। এখন তা নামে মাত্রই রয়ে গিয়েছিল।

    শহরের দক্ষিণ দিকে রয়েছে বাগে-চিনার এবং উত্তর দিকে বাগে-ইসমাঈল ও বাগে বেহিশত (স্বর্গোদ্যান)।

    ওখানে সেই সকল ব্যক্তির মকবরা রয়েছে যাঁরা একদা সমরখন্দের শাসক ছিলেন। সমরখন্দে উঁচু প্রাচীর ঘেরা একটি মাদ্রাসাও রয়েছে যেটি নির্মাণ করিয়েছিলেন মুহম্মদ সুলতান মির্জার পুত্র তাইমুর বেগ, তাঁর পুত্র জাহাঙ্গীর মির্জা। সেখানে একটি মকবরার কাছে গম্বুজ সমৃদ্ধ এক সুন্দর ইমারতের মধ্যে একটি হাম্মাম (স্নানঘর) রয়েছে যা ‘মির্জা হাম্মামখানা’ নামে অভিহিত। এটি ছোট ছোট রঙ-বেরঙের পাথর দ্বারা সজ্জিত।

    ঔলংগ মির্জা বিনির্মিত আরেকটি বিখ্যাত বাগে-ময়দান রয়েছে যার অর্থ হলো সমতল বাগান। এর মধ্যে চল্লিশ স্তম্ভ বিশিষ্ট একটি ইমারত রয়েছে। এতে নকশাদার পাথরে নির্মিত চারটি মিনার চার কোণে অবস্থিত। এই ইমারতে ব্যবহৃত পাথর সম্পর্কে কথিত আছে যে, এগুলো দূর-দূরান্ত থেকে বয়ে আনা হয়েছিল। এখানে একটি মসজিদও রয়েছে, যেটি মসজিদে-লকলকা নামে পরিচিত। এর বাস্তুশিল্পের বৈশিষ্ট্য হলো এই যে, এতে আওয়াজ গুঞ্জরিত হয়। এর গম্বুজের নিচে দাঁড়িয়ে কেউ পায়ের থাপ দিলে সেই হাল্কা থাপের ধ্বনিও গম্বুজের প্রতিটি অংশে ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হতে শোনা যায়। এটি কেমন করে হয় এ রহস্যের উন্মোচন আজও অবধি হয়নি।

    সমরখন্দ তার নিজের কিছু শ্রেষ্ঠত্বের জন্য অন্য নগরগুলোর থেকে সম্পূর্ণ পৃথক। এখানকার ময়দানগুলোতে বসা হাটবাজারগুলোতে খুব ভিড় হয়। বাজারগুলো সুসজ্জিত। এখানে তন্দুরগুলিতে রুটি সেঁকা হয়। রসুইগুলোতে সুস্বাদু খাদ্য প্রস্তুত হয়। এখানে দুনিয়ার সবচেয়ে ভালো কাগজ উৎপাদিত হয়। কাগজ উৎপাদনে ব্যবহৃত সামগ্রী খান-এ-গিল ও আব-এ-রহমত থেকে নিয়ে আসা হয়। এখানকার বাজারগুলোতে বিক্রীত মখমলগুলো দেখলে যেন মনে হয় তারা নিজেরাই কথা বলছে।

    সমরখন্দের ভৌগোলিক বর্ণনা

    সমরখন্দের সুলতান এখানে বছরে একবার এসে দু-এক মাসের জন্য তাঁবু ফেলে কাটিয়ে যাওয়াটা বেশ পছন্দ করতেন। যেখানে তাঁবু ফেলা হতো সেটি চার মাইল বিস্তৃত বর্গাকার এলাকা।

    সমরখন্দের সবচেয়ে বড় নগর বুখারা। এ নগর যেখানে সুন্দর নগরগুলোর অন্যতম, সেখানে এখানকার তরমুজ এতই সুস্বাদু যে, তার কোনো তুলনা হয় না। বুখারার কুলও অতুলনীয়। এই কুল পেকে গেলে শুকিয়ে নেওয়া হয়। দূর-দূরান্ত অবধি এই শুকনো কুলের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। ওষুধ তৈরিতে এর খুবই উপযোগিতা রয়েছে। বুখারার শরাব তীব্র নেশা উৎপন্নকারী বস্তু।

    সমরখন্দের উত্তর দিকে ‘কে কেশ’ নামে অন্য একটি নগরী রয়েছে। এখান পর্যন্ত পৌঁছানোর জন্য রয়েছে সড়ক পথ। কেশ নগরকে ‘শহর-এ-সব্‌জ্’ অর্থাৎ সবুজনগরী বলে অভিহিত করা হয়। এটি ছিল তাইমুর বেগের জন্মস্থান। এটিকে নিজের রাজধানী বানানোর জন্য তাইমুর বেগ কঠিন পরিশ্রম করেন। তিনি তাঁর নিজের আরামের জন্য আদর্শ ইমারত নির্মাণ করান। এখানে তিনি তাঁর দরবার বসাতেন। এতে মেহরাবযুক্ত পরকোট রয়েছে।

    এখানে, নগর থেকে চার মাইল দূরে একটি তরণ তাল (সেতু) রয়েছে। এই সেতু খুব বড় এলাকা জুড়ে বিস্তৃত এবং গভীর। এটি ‘কিল-ইমাগহ” নামে পরিচিত। কুলবা গ্রামে এরকমই আরো একটি নগর রয়েছে।

    সমরখন্দে করশুল নামে আরো একটি নগর রয়েছে। করশুল একটি মোগল শব্দ। সম্ভবত, চেঙ্গিস খানের শাসনামলের পরে শহরটি এই নামে পরিচিত হয়। করশুলে পানি প্রাপ্তির সাধন সীমিত কিন্তু বসন্ত ঋতুতে এর শোভা বড়ই মনোহর। এখানে প্রচুর খাদ্যশস্য উৎপন্ন হয়। এখানে অসংখ্য রকমের ছোট-ছোট পাখি দেখা যায়।

    এখানে খোবর ও খুরামান নামে আরো দুটি নগর রয়েছে যা সমরখন্দ ও বুখারার মধ্যে পড়ে। এই ক্ষেত্রের সকল গ্রামের ভৌগোলিক অবস্থান খুবই উর্বর। অবশ্যই এখানকার উর্বর ভূমিই ছিল প্রধান কারণ, যা তাইমুর বেগকে সমরখন্দকে নিজের রাজধানী বানানোর জন্য আকৃষ্ট করেছিল।

  • অষ্টম অধ্যায় : বাবুরের আন্দিজান বিজয়াভিযান

    অষ্টম অধ্যায় : বাবুরের আন্দিজান বিজয়াভিযান

    অষ্টম অধ্যায় : বাবুরের আন্দিজান বিজয়াভিযান

    আন্দিজানের দক্ষিণ এলাকা অশপরী, তুরিকশর, চিচকরক এবং তার আশপাশের এলাকাগুলো বিজয়ের উদ্দেশ্যে আমি ইব্রাহীম সারু, ওয়াইশ লেঘারি এবং সাইয়িদি করাকোর নেতৃত্বে আমার সৈনিকদের রওয়ানা করিয়ে দিলাম। আমার জানা ছিল যে, সেখানকার বিজয়ের জন্য নদী এবং কিছু দুর্গম পথ অতিক্রম করার প্রয়োজন পড়বে। সকল সম্ভাবনার কথা বিবেচনা করে সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করে আমি সেনাদলের উপযুক্ত সরদারদের পাঠিয়েছিলাম। ওই এলাকার প্রতি ইঞ্চি ভূমি আমার পরিচিত ছিল এবং সেখানকার লোকেরা শুধু আমাকেই চিনত না বরং আমিও তাদের ভালোমতোই চিনতাম।

    ওই এলাকার সরদার ওউজিন হাসান ও তাম্বোল আমার সৈনিকদের ওদিকে পৌঁছানোর খবর পেতেই, নিজেদের গোত্রের লোকেদের স্বাগত জানানোর জন্য এসে পৌঁছালেন। আমার সৈনিকদের স্বাগত জানাতে আসা লোকেদের মধ্যে আমার কিছু বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া মোগল সৈনিকও ছিল। তাঁরা সকলেই আন্দিজানে আমার সৈনিকদের উষ্ণ অভ্যর্থনা জানালেন। আমার প্রতি তাদের আনুগত্য প্রমাণের জন্য সাইপন থেকে দু’মাইল দূরে তাঁবু ফেলে এবং আমাকে স্বয়ং আমন্ত্রণ জানানোর জন্য তাদের বার্তাবাহককে পাঠাল।

    আমার জন্য এই অবসরট ছিল খুবই আনন্দদায়ক। আমার পিতার জমানার এবং আমার কিশোর কালের লোকেরা আমার প্রতি কত-ই না বিশ্বস্ত ছিলেন! সেখানকার অভ্যর্থনা-সম্বর্ধনার সুখভোগের দু-একদিন বাদেই আমি মর্খিননের দিকে অভিযান চালানোর পরিকল্পনা গ্রহণ করি।

    মর্খিননের দিকে অগ্রবর্তী হওয়ার সময় সেখানকার ঝোপঝাড়-ঘেরা এলাকায় কিছু ছোটখাটো সংঘর্ষ হলো। যাদের উপর আমি অতি সহজে জয়লাভ করি। এই ছোটখাটো এলাকা জয়ের পর আমি ফের আমার সৈনিকদের এগিয়ে নেওয়ার জন্য পরিকল্পনা প্রস্তুত করি।

    কাসিম বেগ, ইব্রাহীম সারু এবং ওয়াইশ লেঘারির নেতৃত্বে তিন দিক দিয়ে সৈন্যদের অগ্রসর হওয়ার আদেশ দিলাম। অবশিষ্ট সৈন্যদের সঙ্গে নিয়ে চতুর্থ বাহিনীর নেতৃত্ব হাতে নিয়ে আমি এগিয়ে চললাম।

    মর্খিননের শাসক ও সরদারদের কাছে এ খবর পৌঁছে গিয়েছিল যে, আমার সেনাদল এগিয়ে আসছে।

    বাগ-এ-খলিল পর্যন্ত পৌঁছাতে কোনো বেগ পেতে হলো না। সেখানে তিন সরদারের বাহিনী আমার কাছে এসে মিলিত হলো। এবার আমাদের দক্ষিণ আন্দিজানের পাহাড়ের উপর অবস্থিত কেল্লা পর্যন্ত পৌঁছাতে হবে। মাঝপথে প্রবল বেগে নদী বয়ে চলেছিল। ঔজিন হাসান ও তাম্বোল দিলেরির থেকে শত্রুবাহিনীর মোকাবিলা করতে করতে কেল্লার নিচে পর্যন্ত সাফল্যের সঙ্গে পৌঁছে গেলেন।

    ওই সময়ে দক্ষিণ আন্দিজানের পার্বত্য এলাকার শেষ প্রান্তে বসবাসকারী কিষানদের কাছে এ খবর দাবানলের মতো পৌঁছে গেল যে, আমার বাহিনী সেখানে এসে পৌঁছেছে, তারা দলে-দলে আমাদের দিকে আসতে লাগল।

    ইতোমধ্যে ইব্রাহীম সারু এবং ওয়াইশ লেঘারিও শত্রুবাহিনীর মোকাবিলা করতে করতে নদী পার হতে সমর্থ হলেন।

    অকশা প্রদেশের অধিবাসীরা আমার পক্ষের জোশ দেখার যোগ্য ছিল। তারা নিজেরা আক্রমণকারী লুটেরা বনে গিয়ে মহলে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল।

    আমার তিন সরদার অকশাবাসীদের উৎসাহকে পূর্ণ সম্মান দিয়ে যাচ্ছিলেন।

    আমার সৈনিকেরা খরস্রোতা নদীর স্রোতের বুক চিরে একে একে তীরে পৌঁছে যাচ্ছিল।

    আন্দিজানের দক্ষিণে অবস্থিত ঐ কেল্লা, ‘কেল্লা কাশগড়ী’র উপর জয়লাভ করা আমাদের জন্য খুবই প্রয়োজন ছিল। যদিও সেখানে আন্দিজানের বড় কোনো ফৌজ ছিল না, শুধুমাত্র কেল্লা রক্ষার জন্য রক্ষক নিযুক্ত ছিল, তবে তারা কেল্লা প্রাচীরের উপর উঠে আমাদের সৈনিকদের উপর আক্রমণ চালাচ্ছিল, তাদের কেল্লা থেকে দূরে রাখতে তখনও আমাদের বাহিনী সফল হতে পারেনি। কেল্লায় তখনও পর্যন্ত আমার পক্ষের একজন সৈনিকও সফল হতে পারেনি। যুদ্ধ চলছিল।

    ইতোমধ্যে এক আজব ঘটনা ঘটল-কেল্লা কাশগড়ীর কিলেদার করবুচ্ বখশী কেল্লা প্রাচীরে উঠে মোগল বেগ ঘরানার এক যুবককে কাছে ডেকে নিল। দুই হাত দিয়ে সে তার গলা টিপে মেরে ফেলল এবং তারপর তাকে কেল্লায় দেওয়াল থেকে নিচে ফেলে দিল।

    সে কেন এমন করল, প্রথমে তো একথা একেবারেই বোধগম্য হয়নি। কিছুক্ষণ পর বোঝা গেল যে, সে এটাই দেখাতে চাচ্ছিল যে, সে সমস্ত মোগল ও বেগ ঘরানার সৈনিকদের এইভাবে মেরে ফেলবে।

    কিলেদার করবুচ্ বখশী এবং কেল্লার অন্য রক্ষকদের সকল রকমের প্রচেষ্টা সত্ত্বেও তারা কাশগড়ী কেল্লা রক্ষা করতে পারল না। আমাদের সৈনিকেরা এক দিক থেকে কেল্লা প্রাচীরে উঠে পড়ার সুযোগ পেয়ে গিয়েছিল।

    কিছু তো করবুকচ বখশীর দিকে তরবারি ঘোরাতে ঘোরাতে দৌড়ে গেল, কিছু খলিল দলবান এবং অন্যেরা আরেক দিকে, কেল্লা রক্ষকের সহায়ক কাজী গোলামের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। তারা তাদের অন্য দুনিয়ায় পাঠিয়ে দিল।

    তারপর, কেল্লা রক্ষকদের সকল প্রতিরোধ গুঁড়িয়ে দিয়ে তাদের শমন ভবনে পাঠিয়ে দেওয়া হলো।

    কেল্লা হাত থেকে বেরিয়ে গেল, এটা দেখার পর পরই অন্য রক্ষকেরা অস্ত্র সমর্পণ করল। ৭০-৮০ জনকে দাস বানিয়ে নেওয়া হলো। পাঁচ-ছজন পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ পেয়ে গেল। অবশিষ্টদের পরলোকবাসী বানিয়ে দেওয়া হলো।

    তারপর, সেনা-অভিমুখ ছিল  আন্দিজান নগরের প্রতি। সেখানে মোকাবিলার জন্য নাসির বেগ প্রস্তুত ছিলেন।

    আন্দিজানে ক্ষমতার পুনঃপ্রাপ্তি

    যেইমাত্র আমি আন্দিজান নগরে ভোর বেলায় আমার সৈনিকদের পৌঁছে যাবার খবর পাই, কালবিলম্ব না করে দুপুর বেলায় আমি স্বয়ং আন্দিজানে গিয়ে পৌঁছাই।

    ঐ সময়ের মধ্যে আমার সেনা আন্দিজান পুরোপুরি কবজা করে ফেলে। আন্দিজানে পৌঁছানোর পর আমি নাসির বেগ ও তার দুই পুত্র দোস্ত বেগ ও মরিম বেগকে আমার সেনাদের কাছে বন্দী রূপে পাই। তারা তাদের হাত তুলে রেখেছিল, যা আত্মসমর্পণ ও অধীনতা স্বীকারের প্রতীক ছিল। তারা এই ভেবে ভীতত্রস্ত ছিল যে, আমি সেখানে পৌঁছানো মাত্রই সাথে তাদের ধড় থেকে মাথা নামিয়ে দেবার আদেশ শুনিয়ে দেব, এই ভয়ের সাথে সাথে তাদের চোখে ভয় ও চেহারায় যন্ত্রণার ছাপ স্পষ্ট হয়ে উঠছিল। তারা আমার কাছ থেকে দয়া পাওয়ার আশা করছিল।

    ঐ সময়টি আমি কীভাবে ভুলতে পারতাম যে সময়ে, আন্দিজানের ক্ষমতা আমার কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া হয়েছিল, তখন আমি দু’বছর ধরে কীভাবে দুঃখ-কষ্ট ও যন্ত্রণাময় জীবন কাটিয়েছিলাম!

    আমি, দুশমনদের সঙ্গে কেমন ব্যবহার করা উচিত, তেমনটাই করলাম। তারপর আমি উজকিন্ত কেল্লায় গেলাম। কিছুক্ষণ পর ঔজিন হাসান আমাকে জানিয়ে দিলেন, আন্দিজান হাতছাড়া হওয়ার খবর পাওয়ার পর অকশিতে কিছু সরদার একজোট হয়ে মাথা তুলছে এবং তারা বিদ্রোহ করার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

    বিদ্রোহীদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার খবর পাওয়ার পর আমি দ্রুত পদক্ষেপ নিলাম না। চার-পাঁচ দিন অপেক্ষা করলাম। এই অপেক্ষার পেছনে আমার উদ্দেশ্য ছিল আর যে সকল বিদ্রোহীদের জোটার সম্ভাবনা আছে তারা সবাই একজোট হোক, যাতে তাদের সম্পূর্ণভাবে নির্মূল করা যেতে পারে।

    আমার রণনীতি সফল হলো। আমি অকশি কেল্লায় হামলা চালিয়ে তাদের সবাইকে একসঙ্গে সাফ করে দিলাম।

    বাহাদুর সাথিদের উপহার

    আন্দিজান থেকে ফেরার পর আমি তার দক্ষিণ দিকে এবং উত্তর এলাকার অধিকাংশ ভূ-ভাগ ওই সমস্ত মোগলদের উপহারস্বরূপ দিয়ে দিলাম, যারা আন্দিজান বিজয়াভিযানের মধ্যে রাস্তায় এসে আমার প্রতি বিশ্বস্ততা দেখিয়েছিল এবং আমার পক্ষে লড়াই চালিয়েছিল।

    ঔজিন হাসানকে আমি অকশা এলাকা প্রদান করে তাকে তার সন্তান-সন্ততি ও পরিবারবর্গকে সেখানে ডেকে এনে বসবাসের পরামর্শ দিলাম। ঔজিন হাসান, বেগ জাতিভুক্ত ছিলেন।

    অকশার এলাকা ঔজিনকে প্রদান করে আমি মোগলদের সাথে সাথে বেগদের আনুগত্যও লাভ করে নিয়েছিলাম।

    তারপর আমি তাশখন্দের দিকে রওনা হয়ে গেলাম।

    আহমদ কম্বোল মোগলের বিরুদ্ধে সেনা অভিযান

    সময়খন্দে দু’বার ক্ষমতাসীন হওয়ার পরবর্তী দু’বছর যাবৎ আন্দিজান যাওয়ার সময় আমি আর পেলাম না।

    ইতোমধ্যে সেখানে পর-পর পাঁচ বার বিদ্রোহীরা মাথা তোলে, যাদের বিদ্রোহ দমনের জন্য সমরখন্দ থেকে বারবার সেনা পাঠাতে হয়।

    বিদ্রোহীদের প্রধান নেতা ছিল আহমদ কম্বোল মোগল; যে শেষবারের মতো মাথা তুলে পুরো জোশের সঙ্গে আন্দিজানের উপর পূর্ণ অধিকার কায়েমের চেষ্টা করছিল। তখন আমার অশ্বারোহীসহ পদাতিক বাহিনী পাঠানোর প্রয়োজন পড়ল।

    মোগল সৈন্যদের আয়ুশ নামক স্থানে আসার খবর পেয়ে আহমদ কম্বোল মোগল পালিয়ে গেল। মোগল ফৌজ আন্দিজানে পুরো এলাকায় যেখানে যেখানে সে পালিয়ে থাকার চেষ্টা করল তাড়াতে থাকল। তার সমস্ত বিদ্রোহী সাথিদের খুঁজে বের করে করে ক করা হলো। আহমদ কম্বোল মোগল অবশেষে নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ল। সে পার্বত্য এলাকায় গিয়ে পাহাড়ে চড়ে-চড়ে জান বাঁচানোর চেষ্টা করার সময় পা পিছলে পড়ে গেল, এবং মারা গেল।

    আহমদ কম্বোল মোগলের শেষ পরিণতির পর আন্দিজানে বিদ্রোহীদের সকল আশা ধুলোয় মিশে গেল।

    কম্বরদের দ্বারা বাবুবের বিরুদ্ধে শায়বানির সাহায্য

    ১৫০০ ঈসায়ী সনের ১৭ জুলাই থেকে ১৫০১ সাল পর্যন্তকার সময়টি আমার জন্য বড়ই বিপত্তিকর বছর হয়ে রয়েই গেল।

    এ বিপত্তি মোগলকে সাজা দেওয়ার চক্করে পড়ে এই বিপত্তি আমার উপর এসে পড়ে।

    আহমদ কম্বোল মোগল ছিল ‘কম্বর’ উপজাতির লোক। বুখারা ও সমরখন্দের পার্বত্য এলাকায় বসবাসকারী উপজাতিদের মধ্যে কম্বর উপজাতির লোকেদের সংখ্যা ও প্রভাব ছিল সবচেয়ে বেশি। জনবল, লড়াকু ও লুটেরা বৃত্তির কারণে তারা বুখারা ও সমরখন্দের চারদিকে নিজেদের দবদবা রাখত।

    নিজেদের গোত্রের সরদার আহমদ কম্বোল মোগলের পরাজয় ও মৃত্যুকে তারা ভুলতেও পারেনি, সইতেও পারেনি, তাদের মধ্যে ঐক্যবদ্ধতা বেড়ে গেল।

    ‘কম্বোর’রা একজোট হয়ে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হলো যে, ‘লোহা দিয়ে লোহা কাটা’ প্রবাদবাক্যটিকে সার্থক করে তোলা উচিত

    তারা শায়বানির কাছে গিয়ে কাহিনি পাড়ল যে, আমার বাহিনী তার উপর আক্রমণ চালানোর জন্য বুখারার দিকে ঝড়ের বেগে ছুটে আসছে।

    শায়বানির জোরদার প্রস্তুতি

    বুখারায় শায়বানির শক্তিশালী বাদশাহী ছিল। তিনি নিজেও বাহাদুর যোদ্ধা ছিলেন। আমার মতো বিরোধীদের তার দিকে ধেয়ে আসার সংবাদ তাকে জোরদার প্রস্তুতি গ্রহণে বাধ্য করে তুলল।

    তার সৌভাগ্য যে, ওই সময়ের সকল উজবেক সরদার তার পালে এসে জড়ো হলো। উজবেক সরদারদের মধ্যে জোহরা বেগী আগা নামক এক মহিলার যুব সম্মান ছিল। উজবেক জাতির সমস্ত সরদার তাঁকে ‘মা’য়ের মর্যাদা দিতেন। জোহরা বেগী আগার এক ইশারায় তারা নিজেদের জীবন দিয়ে দেওয়াকে গর্বের কাজ বলে মনে করতেন।

    জোহরা বেগী আগা স্বয়ং শায়বানির কাছে চলে এলেন। তিনি তাঁর সমর্থনের ঘোষণা দিলেন।

    এই ঘটনার পর শায়বানির পক্ষ অত্যন্ত মজবুত হয়ে উঠল।

    উজবেক সরদারদের মজবুত সহযোগিতা পাওয়ার পর আমার বাহিনীর বুখারা পর্যন্ত পৌঁছানোর অপেক্ষা না করেই স্বয়ং সমরখন্দ অভিযানের প্রস্তুতি সম্পন্ন করলেন।

  • নবম অধ্যায় : সমরখন্দে বাবুরের পরাজয়

    নবম অধ্যায় : সমরখন্দে বাবুরের পরাজয়

    নবম অধ্যায় : সমরখন্দে বাবুরের পরাজয়

    উজবেকদের ‘মা’ (জোহরা বেগী আগা)-য়ের সমর্থন পাওয়ার জন্য শায়বানির সমরখন্দে পৌঁছাতে বিলম্ব হলো না। তিনি এক বিশাল বাগিচায় তাঁর শিবির ফেললেন।

    আমার অনুপস্থিতির কারণে সমরখন্দের মির্জা (মির্জা সরদার)-দের মধ্যে শায়বানি ভীতি ছেয়ে গেল। সময়টা ছিল দুপুর। মির্জারা দলে দলে, চারদিক থেকে এসে শায়বানির সামনে তাদের উপস্থিতির জানান দিল।

    শায়বানি তাঁর আসন থেকে ওঠারও প্রয়োজন বোধ করলেন না। তাঁর সামনে এসে মির্জাদের চরম অপমান সইতে হলো। আমার পিছনে সমরখন্দের প্রশাসক খাজা ইয়াহিয়া যখন মির্জাদের অপমানজনক সিদ্ধান্ত নিয়ে নেওয়ার খবর পেলেন তখন তিনি খুব দুঃখ পেলেন। তবে তাঁর আর কোনো উপায় ছিল না।

    তাঁকেও বাধ্য হয়ে শায়বানির সামনে যেতে হলো। খাজা ইয়াহিয়ারও অপমানের জ্বালা সইতে হলো।

    এর পরেও শায়বানি তাঁর ঘৃণ্য রূপটি প্রদর্শন করলেন। যদিও সমরখন্দে তাঁর বিরোধিতা করার কেউ ছিল না তা সত্ত্বেও শহরে তিনি লুট-তরাজ চালালেন। গণহত্যা চালিয়ে নিজের প্রতাপ দেখালেন। তিনি এমন এক মির্জাকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করলেন যিনি নগরবাসীর আত্মসমর্পণের জন্য ভূমিকা পালন করেছিলেন।

    আমি কেশ পার্বত্য এলাকার পথ ধরে সমরখন্দে পৌঁছাতে চাইলাম; কিন্তু ওই সময়কার অবস্থা পুরোপুরি আমার বিরুদ্ধে চলে গিয়েছিল।  সমরখন্দ থেকে মির্জারা পালিয়ে যাচ্ছিল। তারা জান বাঁচানোর জন্য উপত্যকা, সেতু ও বিপজ্জনক রাস্তা ধরে সমরখন্দ ছেড়ে পালিয়ে যাচ্ছিল।

    ঐ সময়ে আমার বাহিনীর বহুসংখ্যক সাথি রাতের আঁধারে গোপনে আমাকে ছেড়ে চলে গেল।

    শায়বানির সেনার সাথে সরায়-পুল-এ আমি যুদ্ধ করলাম। যেখানে আমাকে পরাজয় বরণ করতে হলো।

    সমরখন্দ পুনরাধিকার করা আমার জন্য স্বপ্ন হয়ে রয়ে গেল।

    বাবুরের হাত থেকে সমরখন্দও বেরিয়ে গেল এবং ফারগানাও

    শায়বানি বাহিনীর কাছে পরাজয়ের স্বাদ গ্রহণের পর ওই সময় আমাকে হার স্বীকার করতেই হলো।

    আমি পিছু হটে এলাম। এবার আমার সামনের মঞ্জিল ছিল অজানা।

    আমার হাত থেকে সমরখন্দও বেরিয়ে গেল এবং ফারগানাও। এবার আমার জানা ছিল না যে, আমি কোথায় যাচ্ছি আর কোথায় আমার গন্তব্য।

    এবার আমার এ পরিকল্পনাও এল যে, আমি কুরাতিগিনের পথ ধরে খান দাদা আলাচা খানের কাছে পৌঁছে যাই। তবে ওই সময়ে এ ব্যবস্থাও হলো না। আমরা অন্য পথ কামতোরেতে উপত্যকা ধরলাম, যেখান থেকে ‘সরা-তকপাস’ অতিক্রম করে নিন্দক পর্যন্ত পৌঁছতে আমি সমর্থ হলাম।

    এখান পর্যন্ত পৌঁছানোর পরিকল্পনা আমার জন্য সার্থক বলে প্রমাণ হলো। কেননা, সেখানে খুসরো শাহের এক নৌকর ৯ সুসজ্জিত ঘোড়া এবং ৯ পোশাকসহ আমাদের কাছে এল।

    ওই সময়ে প্রাপ্য এ সাহায্য আমার জন্য খুব বড় সাহায্য বলে গণ্য হলো।

    পরদিন শাহের ভাই আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করলেন। কিছু বেগের সহযোগিতার আশ্বাসও আমি পেলাম। তারপর আমি হিসারের উদ্দেশে রওনা হয়ে গেলাম।

    অবিস্মরণীয় কষ্টদায়ক যাত্ৰা

    হিসার পৌঁছানোর জন্য নির্জন উপত্যকার পথ ধরলাম। তিন-চার দিন ধরে আমরা ঐ রাস্তা দিয়ে চলতে লাগলাম। উপত্যকার রাস্তা এতটাই নির্জন, এতটাই বিপজ্জনক ছিল যে, আমি আগে তা কল্পনাও করিনি, দেখিওনি। ওই নির্জন উপত্যকার রাস্তা এতটাই বিপজ্জনক ছিল যে, সামান্য পদস্খলন ঘটলেই মানুষ এমন গভীর খাদের মধ্যে গিয়ে পড়বে যে, তার বাঁচার আর কোনো আশাই থাকবে না। পড়ার সময় হুলবিশিষ্ট ধারালো পাথরের সাথে টক্কর খেলে তার দেহ এতটাই ক্ষত-বিক্ষত হবে যে, তা গণনা করাও অসাধ্য হয়ে পড়বে।

    এইভাবে এই কষ্টদায়ক ও বিপজ্জনক পথের সফর এক সময় শেষ হলো। আমরা ‘ফৈন’ নামক পাহাড়ি উপত্যকায় গিয়ে পৌঁছাতে সমর্থ হলাম। সেখানে দু’মাইল বিস্তৃত সুন্দর একটি ঝিল ছিল। ঝিল পাড়ে পৌছেই ক্লান্তি নিবারণের জন্য বসে পড়লাম।

    আমরা ‘ফৈন’ উপত্যকা অতিক্রম করে এসেছি, এ কথা ইব্রাহীম তরখান পর্যন্ত পৌঁছাতে বিলম্ব হলো না। সে সিরাজ কেল্লা অধিকার করে এলাকায় তার শাসন কায়েম করেছিল।

    সেখানকার সরদারদের পক্ষ থেকে আমাকে যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করা হলো। আমাকে নজরানা বাবদ ৭০-৮০টি ঘোড়া প্রদান করা হলো।

    বাবুরের নতুন করে সমরখন্দ আক্রমণের প্রস্তুতি

    এবার পরিস্থিতি আমার পক্ষে আসতে লাগল। সংগজার তখনও কম্বর আলী (সিকনর)-র অধিকারে ছিল। আবুল কাশিমের অধিকার ছিল কোহবরে। ইব্রাহীম তরখানের পূর্ণ আনুগত্য ছিল আমার পক্ষে। এদের সবার সৈনিক আমার শক্তিকে মজবুত করার জন্য এসে জুটেছিল।

    আমরা আসফাদিক অভিমুখে অগ্রসর হলাম।

    ওই সময়ে শায়বানি খান তিন-চার হাজার সৈনিক নিয়ে খাজা দিদার অধিকার করে রেখেছিলেন। তিনি সমরখন্দ রক্ষার ভার ‘জানে-ওয়াফা’ নামক ব্যক্তির দায়িত্বে দিয়ে রেখেছিলেন। জানে ওয়াফা কেল্লা রক্ষার জন্য ৫০০ থেকে ৬০০ সৈনিক মোতায়েন করে রেখেছিলেন। ‘হামজা’ ও ‘মেহেদী’ নামক কিলেদারদের জিম্মায় রেখেছিলেন কেল্লার বাইরের দিক রক্ষার ভার।

    আমার বাহাদুর সঙ্গী-সাথি ও বেগ সরদারদের সঙ্গে আমি এ বিষয়ে খোলাখুলি আলোচনা করি যে, শায়বানির কাছ থেকে সমরখন্দকে কীভাবে পুনরাধিকার করা যায়?

    সর্বসম্মতিক্রমে একথাই সামনে এল যে, সমরখন্দবাসী শায়বানিকে মোটেও পছন্দ করে না। শায়বানি সেখানে যেভাবে লুটতরাজ ও গণহত্যা চালিয়েছিলেন, তাতে সমরখন্দবাসী তার উপর ক্ষোভে ঘৃণায় ফুঁসছে।

    এ কথা নিশ্চিত ভাবে সামনে এল যে, আমাদের আক্রমণের সময় তারা যদি আমাদের সহযোগিতা না-ও করে তবে বিরোধিতাও করবে না। এটা হওয়াটাও আমাদের জন্য লাভদায়ক ছিল। একবার কেল্লা অধিকার হওয়ার পর সমরখন্দবাসী সম্পূর্ণভাবে আমাদের পক্ষে আসার কথা ছিল।

    কী হবার ছিল তা আল্লাহ-ই জানেন। তবে হামলার হিম্মত করাটা আমাদের হাতে ছিল।

    জোহরের নামাজের পর আমি আমার বাহিনীকে ইয়ার-ইয়ালাক অভিমুখে রওনা হওয়ার আদেশ দিলাম।

    রাতের আঁধারে আমরা খান-ইয়ুর্তিতে পৌঁছে গেলাম। তবে সমরখন্দবাসী আমদের আসার খবর জেনে ফেলতে পারে, এই আশঙ্কায় আমরা জনবসতি থেকে দূরেই থাকলাম।

    আমারা ‘কোহিক’ নদীর তটে শিবির ফেললাম। পরস্পরে আমরা খোলাখুলি আলোচনা করলাম যে, আক্রমণ কি কীভাবে করা যাবে?

    চৌদ্দ দিন আগের পুরনো কথা আমার স্মরণে আসছিল। আমরা ওই দিন আস-সাদিক কেল্লায় এক পারিবারিক দাওয়াতে বসে সলা-পরমার্শ করছিলাম। কেউ একজন প্রশ্ন করেছিল—‘আমরা সমরখন্দকে কবে ফিরে পাব?’

    এক বাহাদুর সাথি বলেছিল—‘আমরা গ্রীষ্মকালে  সমরখন্দ ফিরে পাব…।’

    ‘পাতাঝরার কাল অতিক্রান্ত হওয়ার পর’—অন্যজন বলেছিল।

    ‘এক মাসের মধ্যে…।’ তৃতীয় জন আশ্বাস দিয়ে বলেছিল।

    ‘চল্লিশ দিন লাগতে পারে…।’ চতুর্থ ব্যক্তি বিশ্বাসের সাথে বলেছিল।

    ‘বেশি হয়ে যাচ্ছে… কুড়ি দিনে…।’ অন্য একজন হিম্মত দেখিয়ে বলেছিল।

    তখন নুয়ান কুকুলদাশ5 পূর্ণ বিশ্বাসের সাথে বলেছিল, ‘আমরা চৌদ্দ দিনে সমরখন্দ ফিরিয়ে নেব।’

    ওই সময় আমার নুয়ান কুকুলদাশের কথা মনে আসছিল। আল্লাহ তার মুখ-নিঃসৃত বাক্যকে সত্য করে দেখাতে যাচ্ছিলেন। আমরা ঠিক চৌদ্দ দিনে সমরখন্দ ফিরিয়ে নিতে যাচ্ছিলাম।

    ওই সময়ে আমার এক অদ্ভুত স্বপ্নও স্মরণে আসছিল। একদিন আমি স্বপ্ন দেখলাম যে, খাজা উবাইদুল্লাহ আমার এখানে এসেছেন। আমি দৌড়ে গিয়ে তাঁকে সালাম জানালাম। তিনি ভিতরে এলেন। আমার অধীনস্তদের মধ্যে একজন দৌড়ে গিয়ে মেজপোশ নিয়ে এল। তাঁর সামনে সেটি বিছিয়ে দেওয়া হলো। ওই সময়ে খাজা সাহেবের মুখের উপর আমি এক অলৌকিক নূরের ঝলক দেখি।

    ওই সময়ে বাবা আমাকে একটি পত্র দিলেন। আমি সেটি পাঠ করলাম। তাতে লেখা ছিল-’মেজপোশ বিছানোটা ত্রুটি পূর্ণ।’ (মোল্লা বাবা, বাবুরের স্বপ্নে দেখা ব্যক্তির নাম)।

    খাজা সাহেবের কাছে কোনো বিষয় গোপন থাকার কথা ছিল না। তিনি সঙ্গে সঙ্গে বললেন-’আমি তোমার ত্রুটি মার্জনা করে দিয়েছি।’

    তারপর তিনি উঠে দাঁড়ালেন। আমি সসম্মানে তাঁকে বাহির পর্যন্ত পৌঁছে দেওয়ার জন্য অগ্রসর হলাম।

    তখন তিনি সেই দরবারে আমাকে হাত দিয়ে ধরে এতটা উপরে উঠিয়ে দিলেন যে, ফরাশ থেকে আমার পা সম্পূর্ণ রূপে উঠে গেল। (আমার স্মরণ নেই যে, তিনি আমার ডান বাহু ধরেছিলেন না বাম বাহু)।

    আমার পদদ্বয়কে ফরাশ থেকে উঠিয়ে দেওয়ার পর তিনি তুর্কি ভাষায় বলেছিলেন-’শেখ মসলহত তোমাকে দিয়ে দেওয়া হলো (সমরখন্দ)।’

    বাস্তবিকই আমি কয়েক দিন বাদেই সমরখন্দ ফিরে পেয়েছিলাম।

    সমরখন্দে সহজ বিজয়

    আমরা পরিকল্পিতভাবে রাতের বেলায় নদী পার হলাম। আমার ৭০-৮০ জন জানবাজ সৈনিক নিজেরাই দায়িত্ব নিয়েছিল যে, তারা কেল্লার গুপ্ত সুড়ঙ্গ থেকে মইয়ের সাহায্যে কেল্লা প্রাচীরে উঠে গিয়ে ‘তুর্কিশ দরওয়াজা’ পর্যন্ত পৌঁছে যাবে। তারপর তারা কেল্লায় নিযুক্ত উজবেক রক্ষীদের উপর অতি দ্রুত হামলা চালিয়ে দেবে।

    আমার বাহাদুর সৈনিকেরা নিজেরাই সিঁড়ি বানিয়ে নিল। নিচে যত সংখ্যক সৈনিক শক্ত পদে দাঁড়িয়ে ছিল, তার থেকে এক-দুজন কম সংখ্যায়, দ্বিতীয় দলটি প্রথম দলটির কাঁধের উপর দাঁড়িয়ে গেল। এইভাবে তৃতীয়টি… সবশেষে অন্তিম দলটি কাজ করল।

    এইভাবে একে অন্যের কাঁধের সাহায্যে সিঁড়ি নির্মাণকারী সৈনিকদের দলে সবচেয়ে উপরে পৌঁছানোদের সংখ্যা দুই অথবা তিন রয়ে গিয়েছিল…। তাদের মধ্য থেকে একজন লাফ মেরে কেল্লার প্রাচীরে উঠে গেল, তারপর সে নিজে থেকে নিচে থাকাদের হাতের সাহায্যে উপরে টেনে নিল। তারপর নিচের লোকেরা দলের সংখ্যা এক-এক করে কমাতে কমাতে উপরে উঠে যাওয়ার ক্রম বানিয়ে নিল। প্রথম থেকে নিশ্চিত পরিকল্পনা অনুসারে অর্ধেক সংখ্যা নিচেই রয়ে যাওয়ার কথা ছিল। তাদের চারদিক থেকে দলবদ্ধ করে আমার সঙ্গে ঐ সময়ে কেল্লার দ্বারে আক্রমণ করার কথা ছিল, যখন উপরে পৌঁছানো সৈনিকেরা নিজেদের কাজ সেরে ফেলবে।

    উপর থেকে সংকেত পাওয়া মাত্রই, বাইরে মোতায়েন শত্রু-প্রহরীদের সজাগ হওয়ার আগেই আমার সৈনিকেরা কেল্লা-দ্বারে হামলা চালিয়ে দিল।

    তারা প্রথম হামলাটি চালাল কেল্লা-রক্ষক ফাজিল তুরখানের6 উপর। তাকে সহ তার সাথিদের হত্যা করা হলো। কুড়াল দিয়ে গেটের তালা ভেঙে সেটি ফেলে দেওয়া হলো। দরজা খুলতেই আমি লাফ দিয়ে ভিতরে পৌঁছে গেলাম।

    কেল্লার দ্বার খুলতেই প্রাচীরের রাস্তায় পৌঁছে আমার সৈনিকেরা, কেল্লার উজবেক সৈনিকদের উপর হামলা চালিয়ে মার-কাট শুরু করে দিয়েছিল।

    কয়েক মুহূর্ত পরেই সম্পূর্ণ রূপে কেল্লা আমার অধিকারে এসে গিয়েছিল। উত্তম রণনীতির কারণেই সমরখন্দের উপর আমার সহজ বিজয় বা পুনঃপ্রাপ্তি ঘটে গিয়েছিল।

    সহযোগীদের বিবরণ, নগরাধিকার অভিযানের বিবরণ এই প্রকারের

     সমরখন্দ পুনরাধিকার অভিযানে আবুল কাসিম কোহবর তাঁর ৩০-৪০ জন সৈনিককে তাঁর ছোট ভাই আহমদ কাসিমের নেতৃত্বে আমার সাথে পাঠিয়েছিলেন। এই রকমই ইব্রাহীম তুরখানও তাঁর ভাই আহমদ তুরখানের নেতৃত্বে কিছু সৈনিক পাঠিয়েছিলেন। এই সামরিক সাহায্য আমি কেল্লার অধিকার কায়েমের পর পেয়েছিলাম।

    কেল্লা অধিকারের পর আমি আমার সেনা সহকারে বাইরে এসে নগরাভিমুখে রওনা হই। নগরে পৌঁছে আমি ঘোষণা করি যে, সেখানে এখন আর শায়বানির নয়, আমার হুকুমত কায়েম হয়েছে।

    নগরবাসী স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। তারা সহজে বিশ্বাস করতে পারছিল না। তার কিছুক্ষণ পর সওদাগররা দৌড়ে দৌড়ে আমার কাছে এল এবং আমাকে অভিনন্দন জানাতে লাগল।

    আরো কিছুক্ষণ অতিবাহিত হতে-না-হতেই পুরো নগরে, আমার সমরখন্দ পুনরাধিকারের খবর দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ল। সকালের আলো ছড়িয়ে পড়েছিল। নগরবাসী আনন্দাতিশয্যে নৃত্য করতে শুরু করেছিল। আনন্দ করছিল। তখন নগরের বিভিন্ন অংশে মজুত উজবেক সৈন্যরাও প্রতিরোধের জন্য সামনে এসে গেল।

    তাদের নিপাত করার জন্য আমার বা আমার সৈনিকদের প্রয়োজন পড়ল না। সমরখন্দের নগরবাসী নিজেরাই লাঠি-সোটা ইট-পাটকেল নিয়ে তাদের উপর এমনভাবে আক্রমণ চালাল মনে হবে যেন তারা পাগলা কুত্তা খেদানোর কাজে নেমে পড়েছে। এই হামলায় চার-পাঁচশো উজবেক সৈনিক মারা পড়ল।

    সেখানকার প্রশাসক জানে-ওয়াফা যখন এ খবর পেলেন তখন তিনি খাজা ইয়াহিয়ার বাড়িতে অবস্থান করছিলেন। খবর পাওয়ামাত্রই তিনি পালিয়ে গেলেন। তিনি সোজা শায়বানির পদতলে গিয়ে শরণ নিলেন।

    ওই দিন সন্ধায় তুর্কিক দরওয়াজা থেকে সোজা মাদরাসা ইমারতে গিয়ে পৌঁছালাম। সেখানকার গম্বুজের উপর অবস্থিত স্তম্ভে আমার হুকুমতের বিজয় পতাকা উড়িয়ে দিলাম।

    সেখানকার লোকেরা খুবই ব্যস্ত-ত্রস্ত ছিল। এটা ছিল তাদের আনন্দাতিশয্যের দ্যোতক। তারা জয়ধ্বনি দিয়ে আমাকে স্বাগত জানাচ্ছিল। উজবেকদের জন্য মুর্দাবাদ ধ্বনি দিচ্ছিল। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত তা সমানে চলল।

    সূর্যাস্তের পর নগরের কুলীন, ধনাঢ্য ও সওদাগর শ্রেণির লোকেদের আমার কাছে আনাগোনা শুরু হয়ে গেল। তাঁরা সঙ্গে করে নজরানা নিয়ে আসছিলেন। কেউ বা রান্না করা সুস্বাদু ব্যঞ্জন নিয়ে এলেন তো কেউ বা নিয়ে এলেন রকমারি ফলের ভেট। আমার দীর্ঘায়ু কামনা করে আমার জন্য দোয়া করছিলেন। তাদের খুশির সীমা ছিল না।

    পরদিন সকালে খবর এল যে, লোহা দরওয়াজার কাছে প্রায় ১৫-২০ জন উজবেক সৈনিক টাকাকড়ি কেড়ে নিয়ে লুটপাট চালাচ্ছে।

    খবর পাওয়া মাত্রই আমি কিছু সৈনিক নিয়ে লোহা দরজার দিকে রওনা দিলাম।

    কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর আগেই তারা লুটের মাল নিয়ে পালিয়ে গিয়েছিল। অনেক দূর পর্যন্ত তাদের ধাওয়া করা হলো। কিন্তু তারা পাহাড় ও উপত্যকার দুর্গম রাস্তা দিয়ে পালিয়ে যেতে সমর্থ হলো।

    ৭ জুন, ১৫০২ থেকে ২৬ জুন, ১৫০৩ পর্যন্তকার বিবরণ

    এটি আমার জন্য খুব ব্যস্ত সময় ছিল। আমার মনে আমার পিতৃরাজ্য পুনরুদ্ধারের বাসনা খুব প্রবল হয়ে উঠেছিল। সমরখন্দের ক্ষমতা পুনরাধিকার করে সেখানকার প্রশাসনিক ব্যবস্থাকে সুগঠিত করে আমি খানেদের সমর্থন লাভের চেষ্টা শুরু করলাম।

    ফারগানার লালসায় সমরখন্দও হাতছাড়া হয়ে গেল

    আমি সসৈন্যে খেতাল অভিমুখে রওনা হয়ে গেলাম। এখন আমার প্রধান লক্ষ্য ফারগানা রাজ্য লাভ করা। এটা তখনই সম্ভব ছিল যখন বড় খান’-এর সমর্থন লাভ হতো।

    খানেদের ঐক্যবদ্ধ সমর্থন লাভ শুরু হয়ে গিয়েছিল। বড় খানের ছোট ভাই আহমদের সাথে কাশগড়ে আমার সাক্ষাৎ হলো। তাঁর কাছ থেকে আমি এই আশ্বাস পেলাম যে, আয়ুশ-এ পৌঁছানোমাত্রই আমি অস্ত্রশস্ত্র ও লোকজনের সাহায্য পেয়ে যাব। কিন্তু বড় খানকে, তার বোন শাহ বেগম খানেদের মধ্যে যাঁর অত্যধিক সম্মান ছিল, আমার বিরুদ্ধে চলে গেলেন।

    আন্দিজান অবধি আমার সৈন্যরা পৌঁছাতে পেরেছিল, তখন কোথাও থেকে খবর আমার আগে আমার সৈনিকদের কাছে পৌঁছে গেল যে, খানেদের সমর্থন আমার পক্ষে নেই। এর অন্তর্নিহিত অর্থ হলো এই যে, তাদের সমর্থন ফারগানার শাসকের পক্ষে রয়েছে।

    এই খবর চাউর হওয়ার মধ্যেই আমি আমার গন্তব্যের অর্ধেক পথে পৌঁছে যাই, তখন রাতের অন্ধকারে আমার অধিকাংশ সৈন্য আমাকে ছেড়ে চলে গেল।

    এমন খবরও ছড়াল যে, আন্দিজানের তাম্বোলরা আমার বিরুদ্ধে আমার চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী শায়বানির সাহায্যও চেয়ে রেখেছে।

    এমতাবস্থায় আমাকে আমার অবশিষ্ট ২০-৩০ জন বিশ্বস্ত সাথিকে নিয়ে আয়ুশ থেকেই পিছু হটতে হলো।

    এই সময়টি আমার জন্য খুব কঠিন বলে প্রতিপন্ন হলো। আমার পিছনে সমরখন্দেও বিদ্রোহ হয়ে গিয়েছিল। আরো একটি ঘটনা ঘটে গেল, তা হলো, আমার আত্মীয়-স্বজনদের নিজের পক্ষে টানার জন্য শায়বানি খান আমার বোনকে বিয়ে করেছিল।

    আমার আত্মীয়-স্বজনদের নিজের পক্ষে টেনে নেওয়ার পর সে  সমরখন্দ পুনর্দখল করে নিয়েছিল।

    এইভাবে, আমি না পারলাম ফারগানার শাসক হতে আর না পারলাম সমরখন্দকে নিজের অধিকারে রাখতে।

    ২০-৩০ জন বিশ্বস্ত সাথিকে সঙ্গে নিয়ে এই সময়ে আর বড় কোনো যুদ্ধের কথা ভাবতেই পারতাম না।7

  • দশম অধ্যায় : কাবুলের পথে বাবুর

    দশম অধ্যায় : কাবুলের পথে বাবুর

    দশম অধ্যায় : কাবুলের পথে বাবুর

    ফারগানা রাজ্য ত্যাগ ও খুরাসান যাওয়ার সিদ্ধান্ত আমি মুহররম মাসে গ্রহণ করি। আমি যাত্রা শুরু করলাম এবং হিসারের আলাক-ইয়ালাক নামক পাহাড়ি গ্রাম পর্যন্ত গিয়ে পৌঁছালাম। কালটা ছিল শীতকাল। আমি পাহাড় অঞ্চলে শিবির ফেললাম।

    এই সময়ে আমি ২৩ বছর বয়সে প্রবেশ করেছিলাম। আমি আমার চেহারায় ক্ষুরের ব্যবহার শুরু করেছিলাম।

    আমার সঙ্গে ওই সময় ২০০ থেকে ৩০০ পর্যন্ত বিশ্বস্ত সাথি ছিলেন। তাদের অধিকাংশই স্বাবলম্বী ছিলেন (সাধন সম্পন্ন ছিলেন, আর্থিকভাবে বাবুরের উপর নির্ভরশীল ছিলেন না)। এবং প্রশস্ত বক্ষ ও গ্রীবা বিশিষ্ট বলিষ্ঠ চেহারার মানুষ ছিলেন। শিবির ফেলার পর আমি আমার সাথিদের সঙ্গে এই বিষয়ে পরামর্শ করতে লাগলাম যে, এখন আমাদের খুরাসান অভিমুখে রওনা হওয়া উচিত হবে কি-না। তবে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো গেল না। এখনও আমার আশা ছিল যে, হিসার রাজ্য থেকে অথবা খুসরো শাহের পক্ষ থেকে আমার যে কোনো প্রকারের সাহায্য মিলে যাবে।

    এই আশা নিয়ে কিছুদিন যাবৎ আমি শিবির ফেলে রাখলাম। তবে কোথাও থেকে কোনো সহযোগিতা মিলল না। এই সময়ে পেশগড়ের ‘মুল্লা বাবা’ ওই পথ দিয়ে অতিক্রম করলেন। তিনি খুসরো শাহের মুরিদ (আস্থাভাজন)-দের অন্যতম ছিলেন। তাঁর সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হলো। তবে তাঁর দিক থেকেও আমি কিছু পেলাম না। যদিও তিনি যদি চাইতেন তাহলে তাঁর উপর আস্থা জ্ঞাপনকারী গোত্রের লোকেদের আমাকে সহযোগিতা করতে বলে দিতেন। তা ছিল তাঁর ইশারার অপেক্ষা মাত্র। সাথে সাথে তারা এসে যেত।

    সেখানে শিবির ফেলে তিন-চার দিন যাবৎ সামরিক সহযোগিতা পাওয়ার কোশেশ করতে থাকলাম। কোনো সাফল্য না পেয়ে অগত্যা সেখান থেকে ডেরা গুটিয়ে নিলাম। অধিক দিনযাবৎ পড়ে থেকে কোনো লাভ ছিল না। সেখান থেকে রওনা হয়ে আমরা হিসারের এমন একটা জায়গায় এসে পৌঁছালাম যেটি ইমাম মুহিব্ব’ নামে সুপরিচিত ছিল। সেখানে পৌঁছাতেই খুসরোর কিছু সশস্ত্র সৈনিক সেখানে এসে পৌঁছাল। খুসরো শাহ আমার প্রতি ভীত-ত্রস্ত লোকেদের অন্যতম ছিলেন। তিনি তাঁর সশস্ত্র সৈনিক আমার সেবায় পাঠিয়ে আমার কৃপা ও নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে নিয়েছিলেন। তিনি তাঁর সৈনিকদের পাঠানোর সাথে সাথে যে বার্তা পাঠিয়েছিলেন তাতে এই সংকেতই ছিল যে, তিনি আমার বর্তমান অবস্থায় তাঁর সৈনিক পাঠিয়ে নিজের মানবিক কর্তব্য পালন করেছেন। তবে, এ কথা তো আমি জানতামই যে, আসল কারণ কী ছিল। অবশ্যই তিনি এই ভেবে ত্রস্ত হচ্ছিলেন যে, না জানি কখন আমি তাঁর দিকেই ঘুরে দাঁড়াই। তবে, ওই সময়ে আমার মানুষেরই প্রয়োজন ছিল, খুসরো শাহ সে প্রয়োজন মিটিয়েছিলেন।

    সেখান থেকে অগ্রসর হয়ে আমি পথিমধ্যেকার নানা গোত্র ও উপজাতিদের মধ্য থেকে সৈনিক রূপে মানুষের ব্যবস্থা করতে চাইলাম কিন্তু সফলতা মিলল না। এখন তাদের মনে এই আশঙ্কা জাগতে লাগল যে, শীঘ্রই যদি ভালো কোনো সাফল্য পাওয়া না যায় তাহলে এমনটি যেন না হয় যে, আমার সঙ্গে চলমান সৈনিকরা আমার সঙ্গ ত্যাগ করে চলে যায়। তবে পরবর্তীতে এ আশঙ্কা ভিত্তিহীন প্রমাণ হয়। তারা সম্পূর্ণরূপে আমার অনুগত ও নিবেদিতপ্রাণ ছিল। তারা তাদের পরিবার-পরিজনদের ছেড়ে আমার সাথে এসেছিল। আমার উপর তাদের ভরসা ছিল। আসলে ‘সরায়-পুল’-এর পরাজয় এবং রাতারাতি আমার সৈনিকদের আমাকে ছেড়ে চলে যাওয়া এবং সমরখন্দ রক্ষা করতে না পারার কারণে আমার আত্মবিশ্বাস কিছুটা কমে গিয়েছিল; যার কারণে আমি আমার সঙ্গে চলমান লোকেদের নিয়ে শঙ্কার মধ্যে ছিলাম। পরের দিনগুলোতে এ আশঙ্কা ভিত্তিহীন বলে প্রমাণিত হয়।

    অতিরিক্ত সহায়তা পেলেন বাবুর

    আমরা কবাদিয়ান পৌঁছাতেই খুসরো শাহের ছোট ভাই বক্ল্ তাঁর বাহিনীর বেশ বড় একটা অংশ নিয়ে আমার কাছে এসে পৌঁছালেন। তিনি শহরে-সফা ও তিরমিজের শাসক ছিলেন। তিনি আমার জন্য তাঁর আনুগত্য পেশ করলেন। আমরা ঔবজাফেরির আমু এলাকা, তারপর তিরমিজের বিপরীত দিকে প্রবহমান নদী পার হলাম। নদী পারের বাসিন্দারা তাদের এলাকায় আমাদের প্রবেশ করার খবর পাওয়ামাত্রই তারা সপরিবারে পানাহার সামগ্রীর উপহার নিয়ে আমার সামনে উপস্থিত হলেন। তাঁরা আমার কাছ থেকে এই বিষয়ে নিশ্চিত হলেন যে, আমি তাদের এলাকা অধিকার কিংবা লুটতরাজ করতে আসিনি। তারা নির্ভয় হয়ে গেলেন। তাঁদের এলাকা অতিক্রম না করা পর্যন্ত তাঁরা আমাদের সাথে সাথে রয়ে গেলেন। তাঁরা আমাদের সকল প্রকারের আদর-সৎকার করলেন।

    কাহমর্দ ও বামিয়ান এলাকা অতিক্রম করার সময়ও সেখানকার বাসিন্দারা আমাদের এরকমই আদর-সৎকার করলেন।

    তার আগে, খুসরো শাহের বোনের ছেলে আহমদী কাসিম (আহমদ-ই-কাসিম) আমাদের সঙ্গ দেওয়ার জন্য এসে গেলেন। আগে আমার চিন্তা ছিল যে, আমরা আজর কেল্লা এবং কাহমর্দের উপত্যকা দিয়ে, কারো বাধা-বিপত্তি ছাড়াই পার হয়ে যাব, তখন পরবর্তী পরিকল্পনা যেখানে আমলে নেওয়া যাবে।

    যা ভেবেছিলাম তাইই হলো। কাহমর্দ উপত্যকা পার হয়ে আসার পর তখনও আমি অগ্রসর হওয়ার কথা ভাবছিলাম, এমন সময় আলবক-এ, ইয়ার-আল-বলালকে তার কিছু সাহসী সৈনিকদের নিয়ে ঘোড়া দাবড়িয়ে আমার দিকে আসতে দেখা গেল।

    আমি একটু সতর্ক হলাম। তবে, ক্ষণিকের জন্যই। কেননা, আগত সশস্ত্র অশ্বারোহীরা আমার শিবির থেকে বেশ কিছু দূরেই ঘোড়ার লাগাম টেনেছিল। তারা এক সাথে নেমে পড়ল। তারা ঘাড় ঝুঁকিয়ে আমাকে সালাম করল।

    আমি জবাব দিয়ে স্বাগতভাবে বললাম— ‘খোশ আমদেদ (তোমাদের আগমনকে স্বাগত)।’

    ইয়ার-আল-বলাল আমার খুব নিকটজন হয়ে রয়ে গিয়েছিলেন। আমার সুদিনের সময়কার লড়াইগুলোতে তিনি তাঁর তরবারির ঝলকানি দেখিয়ে আমাকে প্রভাবিত করেছিলেন। আমার ক্ষমতাহীন হয়ে যাওয়ার পর আমার সম্মতি নিয়ে তিনি খুসরো শাহের কাছে চলে গিয়েছিলেন।

    ‘কীভাবে আসা হলো বলাল…?’ আমার কাছে ডেকে আমি তাকে সহর্ষে জিজ্ঞাসা করলাম।

    ‘এদিকে আপনার আসার খবর পেতেই আমি খুসরো শাহের কাছ থেকে আপনার কাছে আসতে আমার আর তর সইল না। আমার অধীনস্ত সৈন্যরা বলল, ‘যেখানে আমি সেখানে তারাও। তারাও আপনার খিদমতে আমার সঙ্গে এসে গেল…’

    ‘আমার সৌভাগ্য…।’ আমি বললাম।

    ‘আমরা একটি ক্ষুদ্র জায়গার মধ্যে বদ্ধ থাকার জন্য পয়দা হইনি…।’ আল-বলাল আমার মনের কথাটা বললেন-আমাদের যুদ্ধে তরবারির ঝলকানি দেখানো আর সম্মুখবর্তীদের ঝলক দেখানোর শখ রয়েছে এবং ক্ষুধা-তৃষ্ণার মধ্যে আপনার সঙ্গে থাকলেই তা পুরো হতে পারে। খুসরো শাহের মনও এত দুর্বল নয়…।’ আমার খুশির আর সীমা রইল না।

    ইতোমধ্যে কম্বর আলী শেখও আমার কাছে ফিরে এলেন। তিনি জিন্দান উপত্যকায় এসে আমার সঙ্গে মিলিত হলেন। কম্বর আলী নিজে একাই একটা ফৌজ ছিলেন। রণক্ষেত্রে তাঁর তরবারির ঝলকানি বিপক্ষীয়দের মনে ভয় ধরিয়ে দিত।

    কাহমর্দে নয়া খুশির বার্তা

    নতুন খুশির বার্তা এটাই ছিল যে, আল বেগমের সঙ্গে জাহাঙ্গীর মির্জার বিয়ে হয়ে গিয়েছিল। আল বেগম, মাহমুদ মির্জা ও খানজাদা বেগমের কন্যা ছিলেন। এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ কথা এটাই ছিল যে, জাহাঙ্গীর মির্জা আমার বিশ্বস্তদের অন্যতম ছিলেন। তিনি তখন পর্যন্তকার জীবনে অন্য মির্জাদের বিপরীত আচরণ করে এসেছিলেন।

    মাহমদ মির্জা ও খানজাদা বেগমের কন্যার সঙ্গে জাহাঙ্গীর মির্জার বিবাহ হয়ে যাবার অর্থ এই ছিল যে, মির্জাদের সমস্ত শক্তি জাহাঙ্গীর মির্জার পক্ষে এসে যাওয়া। জাহাঙ্গীর মির্জার পক্ষে সমস্ত মির্জাদের এসে যাওয়ার অর্থ ছিল এখন আমার আর মির্জাদের জোটবদ্ধতার মোকাবিলা করতে হবে না।

    ইতোমধ্যে কাহমর্দে, সেখানকার প্রশাসক বাকী বেগ আমার সঙ্গে এসে মিলিত হলেন। তাঁর ভাষা ছিল—

    ‘দশ দরবেশ (ফকির) একই কম্বলের মধ্যে শুতে পারেন, কিন্তু দুই রাজা এক কামরায় বা একই রাজ্যের সীমার মধ্যে থাকতে পারেন না।

    তিনি পরে বললেন—

    ‘যদি কোনো মানুষের একটি রুটি মিলে যায় তাহলে তিনি তার অর্ধেকটা খেয়ে বাকিটা একটি ফকিরকে দিয়ে দিতে পারেন; কিন্তু কোনো রাজার যদি কোনো জায়গায় রাজত্ব মিলে যায় তাহলে তিনি অন্য রাজার রাজ্যেকেও গ্রাস করার স্বপ্ন দেখতে থাকেন।’

    বাকী মির্জার কথা তাৎপর্যপূর্ণ ছিল। প্রকৃতপক্ষে, তিনি সেখানকার প্রশাসক ছিলেন। এই এলাকাটি মাহমুদ মির্জার পুত্রের অংশে ছিল। মাহমুদ মির্জার পুত্র বাকী মির্জাকে ওই এলাকার প্রশাসক নিযুক্ত করে রেখেছিলেন, যার মধ্যে কাহমদও ছিল।

    বাকী মির্জার পক্ষে ওই এলাকায় আমার ঘাঁটি গেড়ে থাকতে নিষেধ করারও সাহসও ছিল না, শক্তিও ছিল না। অতএব, তিনি আমাকে ইশারা-ইঙ্গিতে বলে দিয়েছিলেন যে, একই রাজ্যে দুই রাজা থাকতে পারেন না। অন্য ভাষায় তিনি বলে দিয়েছিলেন যে, আমাকে এখান থেকে চলে যাওয়া উচিত।

    পরে তিনি আমাকে সবিনয়ে জানালেন— ‘তিনি এখন এসে এ কথা বলার প্রয়োজন এ জন্য অনুভব করেছেন যে, আমি খবর পেয়েছিলাম যে, খুসরো শাহ তাঁর সামরিক শক্তি এবং অন্য সাথিদের নিয়ে সেখানে, আমার কাছে এসে আমাকে (বাবুরকে) বাদশাহ ঘোষণা করতে চাইছেন।’

    বাকী বেগ কর্তৃক প্রদানকৃত উপরোক্ত জানকারি আমার জন্য খুব বড় সুসংবাদ ছিল, তবে তাঁর জন্য ছিল চিন্তার বিষয়।

    খুসরো শাহের দ্বারা কাহমর্দে এসে আমাকে বাদশাহ ঘোষণার সোজা অর্থ ছিল কাহমদ দুই বাদশাহর এলাকা হয়ে যায় যে-এক মাহমুদ-পুত্রের, দুই আমার।

    তার পরের কথা, বাকী বেগের কিছু বলার প্রয়োজন পড়ল না। আমি নিজেই সবকিছু বুঝে নিলাম। আমি এ কথা কেমন করে ভুলতে পারতাম যে, আমার বিরোধিতার মামলা হলে তো মাহমুদ মির্জার সাথে আমার অন্য দুই চাচা আহমদ মির্জা এবং ঔলঙ্গ বেগ, মাহমুদ মির্জার সঙ্গে নিজেরাই সহযোগিতায় নেমে পড়তেন।

    এই পরিস্থিতিতে জাহাঙ্গীর মির্জার অবস্থাও কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়ত। তাঁকে আমার বিরুদ্ধে তাঁর শ্বশুর ও চাচি শাশুড়িদের পক্ষ নিতে বাধ্য হয়ে যেতে হতো, কেননা, তাঁর বিবাহের পাগড়ি তখনও অটুট ছিল।

    মির্জা ভাইদের একতার বিষয়ে যেমনটি আমি আশা করতাম, ঠিক ওই রূপে সামনে এল। বাকী বেগের বিনয়ের পর হুসাইন মির্জার পক্ষ থেকে আমাকে একটি গুপ্তপত্র পাঠানো হলো। বদিউজ্জামান মির্জা, খুসরো শাহ এবং জুনিন বেগের দ্বারাও আমার কাছে এমন বার্তাই পাঠানো হলো।8

    সবার পক্ষ থেকে একই বার্তা ছিল— ‘তিন ভাই-ই, মাহমুদ মির্জা, আহমদ মির্জা ও ঔলঙ্গ মির্জারা একজোট হয়ে গেছেন। তারা আমার প্রতি অগ্রসর হচ্ছেন….।’

    বাবুরের রণনীতি : অগ্রবর্তী হওয়ার ক্রম জারি

    আমি আমার সঙ্গী-সাথিদের নিয়ে কাহমর্দ ত্যাগ করলাম। আমি আমার বিশ্বস্ত, বাকী বেগের উপর কোনো আঁচ আসতে দিতে চাচ্ছিলাম না।

    আমি অগ্রসর হয়ে মুর্গ-এ-আব-এর তটে গিয়ে ডেরা বাঁধলাম। সুরক্ষার দৃষ্টিতে এই তট আমার জন্য সম্পূর্ণরূপে সুবিধাজনক ছিল। সেখানে যদি উজবেকদের পক্ষ থেকে প্রতিরোধ হয়ও তা সত্ত্বেও তাদের দমন করার জন্য পূর্ণ শক্তি আমার কাছে ছিল।

    বদিউজ্জামান মির্জাদের প্রতি তাঁর সচেতনতা প্রদর্শনের জন্য বলখ কেল্লা, শিয়াবর্গা ও আন্দিরকুর্দ সুরক্ষার জন্য তাঁর সৈন্যদের লাগিয়ে দিলেন। নিজে গিরজবাঁ ও জেংগ উপত্যকায় পাহারাদারি করতে লাগলেন। এটি ছিল পার্বত্য-ক্ষেত্র।

    মির্জাদের প্রতি কর্তব্যপরায়ণতা দেখিয়ে তিনি আমার প্রতি আনুগত্য জারি রাখলেন। তিনি আমাকে গুপ্ত পত্র পাঠালেন—

    ‘খুসরো শাহের পক্ষ থেকে বার্তা এসেছে যে, তিনি তাঁর ছোট ভাইকে, বাদাখশান ও খুরাসানের পার্বত্য পথ ধরে বহুসংখ্যক সৈন্যসহ রওয়ানা করিয়ে দিয়েছেন। যদি উজবেকদের পক্ষ থেকে আপনার উপর কোনো হামলা হয় তাহলে খুসরো শাহের ভাই কঠোরভাবে তাদের দমন করবেন। উজবেকরা আপনার নিকট পর্যন্ত পৌঁছাতে পারবে না।

    আমি ঐ পত্রকে ব্যর্থ মনে করে একদিকে ফেলে দিলাম। সর্বপ্রথমে আমার সামরিক শক্তি এতটা মজবুত ছিল যে, উজবেকদের ধূলিসাৎ করে দিতে পারতাম। দ্বিতীয়ত, এই মুর্গ-এ-আব-এর এলাকাটি তাইমুরি সালতানাতের একটি অংশ ছিল। সেটিকে মির্জাদের পক্ষ থেকে কাউকেই দেওয়া হয়নি। ওই এলাকায়, ওই সময়কার তাইমুর বংশজ হুসাইন মির্জার শাসন ছিল। হুসাইন মির্জা ওই সময়কার সবচেয়ে বড় এবং প্রতাপশালী শাসক ছিলেন। তিনি মির্জা বংশের যে কোনো ব্যক্তিকে যে কোনো স্থানের শাসক বানাতে পারতেন আবার যে কোনো ব্যক্তির কাছ থেকে শাসনাধিকার ছিনিয়েও নিতে পারতেন।

    এখন এটা অন্য বিষয় ছিল যে, বছরের পর বছর ধরে হুসাইন মির্জার এ মনোযোগিতা আর ছিল না যে, কে, কোথায় শাসন করছেন, কে কোনটিকে বেদখল করছেন। তিনি সেনা বৃদ্ধি করেননি। কোনো রাজ্য জয়ের উৎসাহও তাঁর ছিল না। তিনি শুধু তাঁর নিজের সালতানাত না হারানোর প্রতিই মনোযোগ রাখতেন। তাঁর সালতানাতের খালি জায়গা দখল করে কেউ যদি বছরের পর বছর ধরে সেখানে পড়ে থাকেন তবুও হুসাইন মির্জা তাকে ফালতু ব্যাপার মনে করে শান্তির বাঁশি বাজিয়ে যাওয়াকে শ্রেয় মনে করতেন।

    আমি মির্জাদের নয়, হুসাইন মির্জার ক্ষেত্রে ছিলাম। অতএব, নিশ্চিন্ত ছিলাম। আমি আমার পূর্বপুরুষদের ভূমিতে ছিলাম। হুসাইন মির্জার সঙ্গে আমারও এতটাই আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিল, যতটা ছিল মাহমুদ মির্জার, আহমদ মির্জা ও ঔলংগ বেগ মির্জার বংশধরদের।

    মুর্গ-এ-আব-এর বিষয়ে আমি বলতে পারি যে, সেখানে আমি কিছুটা এরকম নিশ্চিন্ত ছিলাম যেমনটি ছিলাম আমার পিতৃরাজ্য ফারগানায়। এখন এটা ভিন্ন বিষয় ছিল যে, ফারগানা আমার কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া হয়েছিল, মুর্গ-এ-আব-এ আমি ডেরা বেঁধে অবস্থান করছিলাম।

    মুর্গ-এ-আবকে অধিকার করে রাখাটা আমার গন্তব্য ছিল না, আমার লক্ষ্য অনেক বড় ছিল। ওই লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য আমি একদিন আমার সৈনিকদের হুকুম দিলাম—

    ‘তিরমিজ পার্বত্য এলাকা এবং কিরকি উপত্যকা পর্যন্ত পৌঁছানোর জন্য বহু সংখ্যক নৌকার ব্যবস্থা করা হোক। সেই সাথে ভারী মাত্রায় সেতু নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী সংগ্রহ করা হোক।’

    আমার আদেশ পালন করা হতে লাগল। এই এলাকার উপজাতি এবং পাহাড়ি বস্তিগুলোর বাসিন্দারা আমাকে সর্বপ্রকারে সহযোগিতা করছিল।

    এইভাবে ছোট একটা রাজ্য তো বটে; বরং ওই ভূ-ভাগে একজন বাদশাহ রূপে পরবর্তী প্রস্তুতি গ্রহণ করার পূর্ণ অবসর আমি পেয়েছিলাম।

    বাবুরের ক্রমবর্ধমান সামরিক শক্তি

    একের-পর-এক, আমার ছেড়ে যাওয়া সাথিরা আমার সঙ্গে আবার মিলিত হয়ে আসছিল। খুসরো শাহের এক মোগল সৈনিক আমার কাছে চলে এল। সে বলল-’আমরা মোগল সরদাররা আপনার প্রতি আমাদের আনুগত্য পেশ করতে চাই।’ পরে সে বলল— ‘খুসরো শাহ তাঁর সমস্ত সৈন্যসহ আপনার খিদমতে চলে আসছেন…।’

    ওই বার্তা আমার জন্য উৎসাহব্যঞ্জক ছিল। কিছুক্ষণ পরেই আমি শুনতে পেলাম যে, সায়ক খান আন্দিজান অধিকার করে নিয়েছে। এখন সে হিসার ও কুন্দুজ অভিমুখে অগ্রসর হচ্ছে।

    এই খবরের পর আবার খবর এল যে, খুসরো শাহ কুন্দুজ ছেড়ে দিয়েছেন। তিনি এখন সদলবলে  কাবুলের পথ ধরেছেন।

    এবার যখনই হোক, আমার নিকট পর্যন্ত পৌঁছানোটা নিশ্চিত ছিল।

    আমাকে বেশি অপেক্ষা করতে হলো না। তিন-চার হাজার ঘোড়ার মাথা আমার নজরে এল। তাদের পিঠে মোগল অশ্বারোহীরা ছিল। তারা তাদের পরিবার-পরিজনদের সঙ্গে নিয়ে আমার সঙ্গে মিলিত হতে আসছিল। তারা এল। আমি তাদের উষ্ণ অভ্যর্থনার জন্য তাদের দিকে এগিয়ে গেলাম।

    কিন্তু এটা দেখে আমি সংশয়ে পড়ে গেলাম যে, তারা খুসরো শাহের নেতৃত্বে আসেনি। তাদের সামনে পিছনে কোথাও খুসরো শাহের খবর ছিল না। ওই তিন-চার হাজার মোগল ঘোড়সওয়ার নিজেরাই সিদ্ধান্ত নিয়ে, ঐক্যবদ্ধ হয়ে, নিজেদের পরিবার-পরিজনদের নিয়ে আমার সেবায় উপস্থিত হয়েছিল।

    এবার আমার খুসরোর জন্য অপেক্ষায় থাকতে হলো।

    ইতোমধ্যে আরো একটি খবর এল যে, বাকী বেগ, কম্বর আলীকে পদচ্যুত করে দিয়েছেন, সেই সাথেই এ খবরও এল যে, কম্বর আলীকে তার হঠকারী আচরণের জন্য রুষ্ট হয়ে ওই পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। তাঁর এ ধরনের হঠকারী আচরণের কথা আমার কাছে নতুন কিছু ছিল না। আসলে, সে যতবড় বীরপুরুষ ছিল, তার হঠকারী আচরণও ছিল ঠিক ওই রকমই। তাকে আমার নিজের কাছে রাখার যে অভিজ্ঞতা আমার ছিল সে অনুসারে কখনো-কখনো তার হঠকারিতা দেখে আমার মনে হতো যে, জেনে বুঝে সে অন্যের মনোযোগ আকর্ষণের জন্য বাজে আচরণ এবং কথাবার্তা বলছে।

    খুসরো শাহের অপেক্ষায় বাবুর

    খুসরো শাহের জন্য অপেক্ষায় ছিলাম। তার বিষয়ে আমার কাছে খবর এল যে, মোগল অশ্বারোহীরা আমার কাছে এসে পৌঁছাবার পর তিনি খুবই অসামঞ্জস্যপূর্ণ অবস্থায় রয়েছেন। তিনি ভবিষ্যতে তাঁর দুর্দিনের কথা ভাবতে শুরু করেছেন। তিনি তাঁর জামাইকে তাঁর ভবিষ্যতের কথা ভাবার জন্য আমার কাছে পাঠালেন।

    তিনি আমাকে অত্যন্ত সম্মান করতেন। তিনি তাঁর সমস্যার কথা বললেন এবং আমার কাছ থেকে আশ্বাস পেলেন। আসলে খুসরো শাহ হাওয়া বুঝে ছাতা ধরা লোক ছিলেন। তিনি যেদিকে ওজন বেশি দেখতেন সেই পাল্লায় বসে পড়তেন। তিনি বীর বাহাদুর নন, রাজনৈতিক চিন্তা-ভাবনার মানুষ ছিলেন এবং নিজের জীবনের নিরাপত্তার উপর বেশি নজর রাখতেন।

    তার জামাই আমার পাল্লা ভারী অনুভব করে আমার কাছ থেকে ফিরে চলে গেল।

    তাকে পাঠানোর পর আমি আমার বাহিনীকে কিজিলের পার্বত্য ভূমির দিকে রওনা করিয়ে দিলাম, যেখানে অনদর-আব নামক নদী তাকে স্পর্শ করত।

    পরদিন, ১৫০৪ ঈসায়ী সনের আগস্ট মাসের শেষ সপ্তাহ, তথা পয়লা রবিউল আউয়ালে আমি অনদর-আব নদী পার হয়ে, সামনে অবস্থিত বিশাল ময়দানে সেনা শিবির স্থাপনের আদেশ দিলাম।

    ওখানে আমি খুসরো শাহের আগমনের খবর পেয়ে গিয়েছিলাম। কিছু সময় পর তিনি পূর্ণ উৎসাহে তাঁর পূর্ণ সামরিক শক্তি নিয়ে আমায় সামনে এসে উপস্থিত হলেন। তিনি আমার সামনে পড়তেই প্রথা এবং নিয়ম অনুসারে মাথা ঝুঁকিয়ে আমাকে তিনবার সালাম করলেন। হাঁটু গেড়ে বসে আমার কুশলাদি জিজ্ঞাসা করলেন। উঠে পিছু হটে গিয়েও তিনি মাথা ঝুঁকিয়ে তিন বার সালাম করার নিয়ম পালন করলেন। তিনি তাঁর সমস্ত মাল ও আসবাব ঘোড়া ও খচ্চরের গিঠে তুলে নিয়ে এসেছিলেন।

    তাঁর সঙ্গে তাঁর ভাই জাহাঙ্গীর মির্জা ও মির্জা (ওয়াইস) খানও এসেছিলেন। তারাও সম্মান প্রদর্শনের ওই রীতিই পালন করলেন। তাঁরা আমার নামে খুত্বা (যশোগাথা) পড়লেন।

    তারপর, আমার সেবায় নিয়ে আসা উপহার সামগ্রী আমাকে পেশ করা হলো। আমি তাদের বসতে বললাম। তবে তাঁরা বসলেন না। দু-এক দণ্ড9 দাঁড়িয়ে থেকে তাঁরা কথাবার্তা বলতে লাগলেন।

    খুসরো শাহের বার্তালাপের বিষয় তাড়াতাড়িই শেষ হয়ে গেল। তিনি কোনো সাহসী ব্যক্তি ছিলেন না। যুদ্ধ ও বাহাদুরি দেখানোর মতো কোনো কাজ তিনি কখনো করেননি। অতএব, ওই বিষয়ে তিনি বেশি চর্চাই করতে পরতেন না। তিনি কাপুরুষ ও নেমকহারাম লোকেদের মধ্যে গণ্য হতেন। তবে, যখন তিনি স্বতঃস্ফূর্তভাবে আমার কাছে এসে জুটেছেন তখন এমনিতেই আমার পাল্লা ভারী হয়ে যাচ্ছিল, আমার প্রয়োজন না থাকলে আমি তাকে ভাগিয়ে দিতাম।

    খুসরো শাহ ব্যক্তিগতভাবে যা-ই হোন না কেন, তাঁর কাছে শক্তিশালী সৈন্যবল ছিল। তাঁকে চোখ বন্ধ করে বিশ্বাস করার মতো লোকের সংখ্যাও যথেষ্ট ছিল। তিনি একটি শক্তিশালী সামরিক বাহিনী নিয়ে এসেছিলেন এবং এ সুসংবাদও ছিল যে, এর চেয়ে বিশাল সংখ্যক মানুষ দু-একদিন বাদে আমার সেবায় এসে যাবে।

    হিন্দুকুশ পর্বতে বাবুর

    আমি শিবির তুলে নেওয়ার আদেশ দিলাম। হিন্দুকুশ পর্বত পার হতে সফর শুরু করলাম। আমরা যতই চড়াই অতিক্রম করছিলাম ততই পাহাড়ি লোকেরা আমার সেবায় চলে আসছিল। তাদের মধ্যে খুব ভালো লোকও ছিল আবার খারাপ লোকও ছিল, কিছু বাহাদুরও ছিল, কিছু বীরবিক্রমে যুদ্ধ করার আবেগে টগবগ করছিল তো কিছু লোক কেবল বোঝা বহনের কাজেই আসতে পারত। বহু লোক সপরিবারে এসে আমার কাছে জুটেছিল।

    আমার এক বিশাল কাফেলা সামনে এগিয়ে চলেছিল। আমার সাফল্য কামনা করে যাওয়া গীত লহরী দূর-দূরান্ত পর্যন্ত আকাশ-বাতাসে ছড়িয়ে পড়ছিল।

    আল্লাহ সর্বশক্তিমান।

    রাস্তায় আরো বিশ-ত্রিশ হাজার সৈন্য আমার সঙ্গে এসে মিলিত হলেন। এই সৈনিকেরা মাহমুদ মির্জার সালতানাত ত্যাগ করে চলে এসেছিলেন। তাঁরা লৌহ-দরওয়াজার রক্ষক ছিলেন। তাঁরা মাহমুদ মির্জার সেবা ত্যাগ করে আমার সেবায় চলে এসেছিলেন।

    আমার সেনাদল হিন্দুকুশ পেরিয়ে আরো এগিয়ে চলেছিল। সে সময় একজন বৃদ্ধ আমাদের দলের সামনে চলে এলেন। তিনি তাঁর নাম বললেন, হাসান বরদিন। নিজেকে চুঙ্গিস্কর আদায়কারী বলে পরিচয় দিলেন। তিনি নিজেকে আইকিক এবং ঔবাজ লোকেদের দ্বারা সেখানে নিযুক্ত বলে জানালেন। নিজের পরিচয় দেওয়ার পর তিনি যখন আমার পিছন ধরে অগ্রসরমান কাফেলার প্রতি যেইমাত্র দৃষ্টিপাত করলেন, অমনি তাঁর চোখ কপালে উঠে গেল।

    তিনি কিছু বললেন না, কোনো প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত না করে কাঠের পুতুলের মতো দাঁড়িয়ে রইলেন।

    আমি তাঁকে ওই লোকেদের শক্তির বিষয়ে জিজ্ঞাসা করলাম যারা তাকে সেখানে চুঙ্গি আদায়ের জন্য নিযুক্ত করেছিল। তিনি তাদের সংখা দুই থেকে তিনশো বলে জানালেন। তাঁর যা অবস্থা হচ্ছিল, তা দেখে হাসি ছাড়া আর কিছুই আসতে পারত না। তিনি আমার বিশাল কাফেলার কোন অংশে হারিয়ে নিয়েছিলেন, পরে তাঁর আর কোনো খোঁজ-খবর পাওয়া গেল না।

    ওই দিন সন্ধায় কাফেলার শিবির ফেলার পর, যখন খুসরো শাহ তাঁর ডেরায় চলে গিয়েছিলেন, তখন মির্জা খান আমার সঙ্গে সাক্ষাতের অনুমতি চাইলেন। অনুমতি পাওয়ার পর আমার সামনে উপস্থিত হয়ে হাঁটু গেড়ে বসে সবিনয়ে নিবেদন করলেন-

    ‘আমি, আমার ভাইয়ের (খুসরো শাহ) জন্য আমার প্রাণ দিতে চাই…।’

    তাঁর এই কথা শুনে আমি ও আমার দরবারিরা চমকে উঠলাম। আমি তাঁকে তাঁর কথা স্পষ্ট করতে বললাম, তখন আসল কথা প্রকাশ্যে এসে পড়ল। মামলা এটাই ছিল যে, খুসরো সামনেকার কষ্টদায়ক পথ অতিক্রমে অসমর্থ ছিলেন। তিনি খচ্চর বা উটের পিঠে চড়েও চলতে পারছিলেন না। তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন, তিনি তাঁর পরিবার-পরিজনদের কথা মনে করে খুব কষ্ট পাচ্ছিলেন। নিজের এই দুরবস্থার কথাটা আমার সামনে উপস্থিত হয়ে বলতে তার সাহসে কুলাচ্ছিল না। সে জন্য তিনি তাঁর ছোট ভাই মির্জা খানকে পাঠিয়েছিলেন।

    এই কারণেই মির্জা খান বলেছিলেন, তিনি তাঁর ভাইয়ের বদলে নিজের জীবন দিতে চান।

    অন্য কথায় খুসরো শাহ আমার কাছ থেকে মুক্ত হতে চাচ্ছিলেন। খুসরো শাহের এই চরিত্রের কথা আমার অজানা ছিল না। আমি আগে থেকেই জানতাম যে, তিনি কাপুরুষ এবং কষ্ট সহ্য করার মতো শক্তি তাঁর ছিল না।

    আমি খুসরো শাহকে সানন্দে মুক্তি দিলাম। সেই সাথেই বলে দিলাম যে, তিনি তাঁর মাল-আসবাবসহ সঙ্গে তিন-চারটি খচ্চর কিংবা উটও নিয়ে যেতে পারেন।

    এই অনুমতির পর খুসরো শাহের খুশির আর সীমা-পরিসীমা রইল না। তিনি তাঁর সব হীরে-জহরত, সোনা-রুপা এবং অন্য সকল বস্তু যে সব তিনি সঙ্গে করে এনেছিলেন তার সব গুছিয়ে নিলেন। দুটি খচ্চরের পিঠে তা চাপিয়ে দিলেন। সওয়ারির জন্য উট নিয়ে নিলেন।

    তিনি আমার কাছে বিদায় নিতে এলেন। তিনি আমার সঙ্গে ওয়াদা করলেন যে, তিনি খুরাসান, ঘুলে ও দজানার রাস্তা ধরে খুরাসানের উদ্দেশে রওনা হবেন। তারপর তিনি কাহমর্দ থেকে নিজের পরিবার-পরিজনদের সঙ্গে নিয়ে  কাবুলে আমার কাছে আবার ফিরে আসবেন।

    আমার কাছে তাঁর ওয়াদার কোনো গুরুত্ব ছিল না।

    খাজা জায়েদে পরবর্তী শিবির

     কাবুল অভিমুখে রওনা হয়ে খাজা জায়েদ নামক স্থানে পরবর্তী শিবির ফেলা হলো। পরদিন সকালে হামজা বেগ দুশল নামক স্থানে উজবেক ঘোড় সওয়ারদের দেখতে পেয়েছেন। এ খবর শোনামাত্রই আমি সৈয়দ কাসিম ও আহমদ কাসিম কোহবরের নেতৃত্বে সাহসী সৈনিকদের একটি দল দেখতে পাওয়া উজবেকদের বিরুদ্ধে রওনা করিয়ে দিলাম।

    পাঠিয়ে দেওয়া সৈনিকেরা তাদের চারদিক থেকে ঘিরে ফেলল। তাদের আচ্ছামতো দিয়ে দিল, তাদের কারো একজন ছিন্ন মস্তক নিয়ে আমার কাছে ফিরে এল।

    চার-পাঁচদিনের সফরের পর আমরা ঘুর-বুন্দ নামক স্থানে পৌঁছালাম। এই পার্বত্য এলাকাটি উত্তসুর শহর নামে পরিচিত। সেখানে পৌঁছে জানা গেল যে, সেখানকার প্রধান হাকিম হলেন শেরাক নামক একজন ব্যক্তি। সে সময়ে তিনি বারান নামক স্থানে অবসর যাপন করছিলেন। তিনি এলাকার সুরক্ষার জন্য কিছু সিপাই রেখে গিয়েছিলেন।

    তবে আমাদের অগ্রসর হওয়ার সময় কোনো সিপাই সামনে আসেনি। অবশ্যই তারা লুকিয়ে পড়াটাকেই নিজেদের জন্য মঙ্গল বলে মনে করেছিল। পরবর্তীকার ইলাকেদার (এলাকার প্রশাসক) ছিলেন আবদুর রজ্জাক মির্জা। তিনিও আমাদের বাহিনীর অগ্রবর্তী হওয়ার খবর পেয়ে পানজিরের রাস্তা ধরে কাবুলের উদ্দেশ পালিয়ে গিয়েছিলেন।

    সামনে লমঘান তুরখানি আফগানদের এলাকা ছিল। আমরা সফর জারি রাখলাম। দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সফর জারি রইল। পথ রোধ করার জন্য কেউ এল না।

    ওইদিন রাতে আসমানে আমি একটি উজ্জ্বল তারকা দেখি। ওই তারকাটিকে এর আগে আমি আর কখনো দেখিনি। ওই উজ্জ্বল তারকাটির নাম ছিল ‘শুকতারা’। তা সাধারণত, দক্ষিণ দিকে উদিত হয়, তাকেই কখনো-কখনো মাত্র দেখা যায়। সে যখন উদিত হয় তখন তার উজ্জ্বলতার কাছে আর সব তারকা নিষ্প্রভ হয়ে পড়ে।

    ওই তারকাটির সম্পর্কে আমার বহু কিছু শোনা ছিল। ওটা দেখামাত্রই আমি আকাশের দিকে দু’হাত বাড়িয়ে দিলাম। আমি খুশির চোটে ফেটে পড়তে চাইলাম-

    ‘তুমি কত দূর থেকে চমক দিচ্ছ… ও শুকতারা! আমি শুনেছি তুমি সৌভাগ্যের প্রতীক। ওই মানুষের তুমি ভাগ্য বদলে দাও, যার উপর তোমার আলোক বৰ্ষিত হয়।’

    সূর্য এক বাঁশ পরিমাণ উপরে উঠে গিয়েছিল। আমাদের কাফেলা সনজিদের পাহাড়ি উপত্যকা অতিক্রম করে গিয়েছিল। ঐ সময়ে আমাদের সাহসী অশ্বারোহী সৈন্যরা দ্রুত গতিতে এসে আমাদের কাছে খবর পৌঁছে দিল যে, আলকারিয়ারের কুরাবাগে শেরাক গোত্রের কিছু লোক ওঁৎ পেতে রয়েছে আমাদের উপর হামলা করবার জন্য।

    আমি একটি ক্ষুদ্র অশ্বারোহী দলকে এই বলে পাঠিয়ে দিলাম যে, যে কোনো ভাবেই হোক তাদের কাবু করে আমার সামনে নিয়ে আসা হোক।

    শেরাকদের সঙ্গে আমার দলের সৈন্যদের একটি হালকা যুদ্ধ হলো। তারা তাদের কাবু করতে সমর্থ হলো।

    আমার সৈনিকেরা তাদের বন্দী করে আমার সামনে নিয়ে এল। তাদের ঘোড়া থেকে নামানো হলো। সংখ্যায় তারা ৭০-৮০ জন ছিল। তারা শক্তপোক্ত বাহাদুর লোক ছিল। তারা ছিল জন্মাগতভাবে যুদ্ধবাজ প্রজাতির লোক। তারা চলমান কাফেলার উপর অকস্মাৎ হামলা চালানোয় খুব দক্ষ। বৃহৎ হতেও বৃহত্তর কাফেলার উপর হামলা চালিয়ে লুটতরাজ করা তাদের পেশা। বন্দী করে নিয়ে আসা এই শেরাকদের সবাইকে আমি জীবনভিক্ষা দিলাম। তাদের আমার সেনাবাহিনীর অন্তর্ভুক্ত করে নিলাম।

  • একাদশ অধ্যায় : বাবুর কর্তৃক কাবুল বিজয়

    একাদশ অধ্যায় : বাবুর কর্তৃক কাবুল বিজয়

    একাদশ অধ্যায় : বাবুর কর্তৃক কাবুল বিজয়

    আমি পরবর্তী শিবির স্থাপন করলাম আক-সরাই উপত্যকা অতিক্রম করার পর কারাবাগ নামক স্থানে।

    এই শিবিরে আমি আমার কিছু বিশ্বাস্ত সাথি ও সেনাপতির মৃত্যুর খবর পেলাম।

    প্রকৃতপক্ষে, চারদিক থেকে পাহাড়ি উপত্যকা অতিক্রম করার অভিযান চালিয়ে কারাবাগে শিবির স্থাপনের পরিকল্পনা আমিই করেছিলাম। সেখানকার ভৌগোলিক অবস্থা এবং পাহাড়ি উপজাতির যোদ্ধাদের ঐক্য নষ্ট করার জন্য এই পরিকল্পনাই সঠিক ছিল।

    যদি আমাদের পুরো সেনা শক্তি একজোট হয়ে একই রাস্তা দিয়ে এগুতে থাকত তাহলে উপজাতি যোদ্ধাদের একতাবদ্ধতা একই স্থানেই রয়ে যেত। তারা যদি ঐক্যবদ্ধভাবে আমাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ত তাহলে আমাদের বিপুল ক্ষয়-ক্ষতির সম্মুখীন হতে হতো।

    দুশমনদের আকস্মিক আক্রমণকালে হানাহানি ও ছোটাছুটি শুরু হলে বহু সৈনিকের গভীর পাহাড়ি খাদে পড়ে গিয়েও জীবন-হানির আশঙ্কা ছিল। এই অবস্থা থেকে বাঁচার জন্য এই পকিল্পনাই ছিল যে, পাহাড়ি উপত্যকার চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে, বিশাল ঘেরা বানিয়ে এগিয়ে যাওয়া হোক এবং অবশেষে এসে একত্রিত হওয়া হোক।

    বাবুর বাহিনীর ক্ষয়ক্ষতি

    ঘেরাও করে পাহাড়ি উপত্যকা অতিক্রম করতে গিয়ে আমার বাহিনীকে পাহাড়ি উপজাতিদের দ্বারা পরিচালিত গেরিলা যুদ্ধের কবলে পড়তে হলো। যাতে জান-মালের ব্যাপক ক্ষতি হলো।

    কারাবাগে এসে একত্রিত হওয়ার পর তাদের গণনা করা হলো। গণনার পর আমি ভীষণভাবে চিন্তিত হয়ে পড়লাম। একবার তো আমার এমনও মনে হলো যে, আমার অগ্রবর্তী বাহিনীর এত বীরযোদ্ধা মারা গেল যে, আমার শক্তি খুব ক্ষীণ হয়ে পড়েছে। আমার উপর ঘটে যাওয়া দু’দুবারের খারাপ দিনগুলোতে এতটা হতাশ আমি আর কখনো হইনি যেমনটি ওই সময়ে কিছুক্ষণের জন্য হয়েছিল। একবার তো আমার মনে হলো যে, কাবুল বিজয় অভিযান ত্যাগ করে আমি আবার পিছনের দিকে ফিরে যাই এবং আমি আমার ওই সৈনিকদের পূর্ব পুরুষদের বিজিত রাজ্যগুলোতে গিয়ে নিযুক্ত করে দিই…।

    এই চিন্তা মনে জাগার পর আমি আমার উচ্চ পদস্থ সেনানায়কদের সঙ্গে পরামর্শ করলাম। এ থেকে যে পরামর্শ তৎক্ষণাৎ বেরিয়ে এল, তা হলো আমার পদস্থ সেনানায়ক ও সৈনিকেরা মোটেও পর্যুদস্ত নন। তাঁরা এই মর্মে উৎসাহিত ছিলেন যে, তাঁরা যতদূর পর্যন্ত এসেছেন, ওই পর্যন্তকার সমস্ত এলাকা তাঁরা জয় করতে-করতেই এসেছেন। তাঁরা তাঁদের সৈনিক ও সাথিদের হারিয়েছেন বটে কিন্তু পাহাড়ি উপজাতিদের তাঁরা চিরকালের জন্য ঠান্ডা করে দিয়ে এসেছেন।

    সৈয়দ ইউসুফসহ অন্য কিছু সিপাহসালার তাঁদের উদ্যম ব্যক্ত করতে গিয়ে বললেন—

    ‘আমাদের এক মুহূর্তও থেমে থাকা উচিত নয়, শরৎ ঋতু শুরু হতে চলেছে, তার আগেই আমাদের লামঘান পৌঁছে যাওয়া উচিত। সেখানকার সমতল এলাকার যুদ্ধে বিজয় সম্পূর্ণ আমাদের পক্ষে আসবে। আমরা নিজেদের কাবুল বিজেতা বলে অভিহিত করতে চাই বাদশাহ…।’

    সৈনিক ও সিপাহসালারদের এ উদ্যম আমাকে নয়া উৎসাহে পরিপূর্ণ করে তুলল। আমি ফৌজকে শিবির গুটিয়ে নেওয়ার আদেশ দিলাম। আমরা আবা-কুরুকের পাহাড়ি উপত্যকা জয়ের উৎসাহে এগিয়ে চললাম।

    আবা কুরুকে নয়া উৎসাহ

    আমার মা-জননী, যাঁকে আমি ‘কাহমদ’-কে তাঁর জন্য সুরক্ষিত স্থান মনে করে রেখে এসেছিলাম, তিনি আবা-কুরুক-এ আমার কাছে এসে পুনরায় মিলিত হলেন। তিনি আমার কাছে আসার কারণ স্বরূপ বললেন—

    ‘কাহমর্দ-এ আমার জন্য বিপদ বড়ই বেড়ে গিয়েছিল। শোরিম তগাই যেইমাত্র জানতে পারল যে, খুসরো শাহ খুরাসানের পথে রয়েছে, তখন সে তাকে তার পক্ষে টেনে নেওয়ার জন্য রওনা হয়ে যায়। এই কাজের জন্য খুসরো শাহের ভাগ্নে আহমদী কাসিমকে সে তার সঙ্গে করেও নিয়ে যায়। খুসরো শাহ, তগাইয়ের মিত্রতার অধীনে এসে যেতে পারে, এটা বুঝে নেওয়ার পর আমার মনে হলো এখন আমার আর কাহমর্দে থাকাটা ঠিক হবে না। আমি লশকরদের সঙ্গে নিয়ে সেখান থেকে এখানকার উদ্দেশে চলে এসেছি।’

    আমি আমার মায়ের কথা ও সম্ভাবনার কথা চিন্তা করার পর বুঝতে পারলাম যে, মায়ের এই পদক্ষেপ সঠিক ছিল। যেমনটি আমি পূর্বে লিখেছি। খুসরো শাহ এমন ব্যক্তি ছিলেন যিনি স্বভাবগতভাবে কাপুরুষ ছিলেন; রঙ বদলাতে তাঁর বিন্দুমাত্রও বিলম্ব হতো না।

    আবা-করুক পাহাড়ি উপত্যকায় রাত্রি যাপনের পর, আমাদের সেনা আবা-কুরুক উপত্যকা বিজয় অভিযানে অগ্রসর হয়ে গেল।

    আমি সেনার একটি অংশকে হায়দার তকী বাগ এবং কুল্ বায়জিদ মকবরা অতিক্রম করার জন্য রওনা করিয়ে দিলাম। জাহাঙ্গীর মির্জার নেতৃত্বে দ্বিতীয় দলটি চারবাগ বিজয়াভিযানে পাঠালাম। তৃতীয় দলটি কতলক কদম মকবরা অতিক্রম করার জন্য রওনা করিয়ে দিলাম। চতুর্থ দলটির সঙ্গে আমি নিজে সুড়ঙ্গ বিশিষ্ট পাহাড়ি উপত্যকা অতিক্রম করার জন্য অগ্রসর হলাম।

    আমি আগ বাড়িয়ে পৌঁছে যাওয়ার পর জানতে পারলাম, কতলক কদম মকবরা এলাকায় অগ্রসরমান আমার বাহিনী কতলক কদম পুল পার হতে বাধা পাচ্ছে।

    আমি মির্জা জাহাঙ্গীরের দলকে সাহায্য করার জন্য দ্রুত রওনা হয়ে গেলাম। ঘটনা ছিল, জাহাঙ্গীর মির্জার এবং অন্য সেনাদল নিজেদের অভিযান সফল করে সমতল ভূমিতে এসে আমার সঙ্গে মিলিত হয়েছিল। আর তৃতীয় দলটি রয়ে গিয়েছিল। তাদের ফেঁসে যাওয়ার কারণ ছিল, কাবুলের দিক থেকে সেখানকার বাসিন্দাদের বড় একটা ভিড় সেখানে এসে জুটে গিয়েছিল। কাবুলবাসী জেনে গিয়েছিল যে, তাদের দেশ আক্রান্ত হয়েছে। তারা তাদের স্বাধীনতার জন্য সেখানে দৌড়ে এসেছিল। তারা কতলক কদমের পুলটি ভেঙে দিয়েছিল। ওই পুল পার হওয়া ছাড়া আমার আটকা পড়া তৃতীয় দলীটি অগ্রসর হতে পারছিল না।

    জাহাঙ্গীর মির্জার নেতৃত্বে পৌঁছানো সেনাদলটি একটি পাহাড়-বেষ্টিত রাস্তা পেরিয়ে, আটকে পাড়া সৈনিকদের সাহায্যের জন্য অগ্রসর হলো। কাবুলবাসীদের বিরোধকে তরবারির জোরে ঠান্ডা করে দেওয়া হলো। আমাদের সৈন্যরা কিছু সময় বাদে কাবুলের প্রধান নগরে প্রবেশ করল।

    কাবুল ও গজনী আমার অধিকারে এসে গিয়েছিল। কাবুলের প্রধান নগর দ্বারে আমাদের হালকা বিরোধের মোকাবিলা করতে হলো। তারা নগরদ্বারের রক্ষক ছিল। নগরদ্বার রক্ষা করাটা তাদের কর্তব্য ছিল। রাস্তা থেকে তাদের সরে যেতে না দেখে ঘোড়া থেকে আমাকে নেমে পড়তে হলো। আমি অগ্রসর হয়ে তাদের রাস্তা ছেড়ে দেওয়ার আদেশ দিলাম। তবে তারা ডেটে রয়ে যাওয়াতে আমাকে তরবারির সাহায্য নিতে হলো। তাদের শরীরগুলোকে টুকরো করার পরই আমার সৈন্যরা কাবুল দরওয়াজা পার হতে পারল।

    কাবুলের শাসক মুকিম, তাঁর পরিবারের সকল সদস্য, আত্মীয়-স্বজন ও তাঁর সঙ্গে সম্পর্কিত সমস্ত লোকেরই জীবন-দানের আদেশ আমি আমার সেনাকে দিয়ে দিলাম। তাদের সংরক্ষণের প্রতিশ্রুতিও আমি দিলাম।

    পরে আমি মুকিম, তাঁর পরিবারের সকল সদস্য ও আত্মীয়-স্বজনদের গজনীতে পাঠিয়ে দিলাম। এবার আমার কাবুল বিজয়ের অভিলাষ পূর্ণ হয়ে গেল। পরবর্তী দশ দিন, বিনা যুদ্ধে, বিশেষ কোনো প্রয়াস ছাড়াই কাবুল ও গজনীর জনপদগুলোতে ঘুরে-ঘুরে তাদের আস্থা অর্জনের কাজে লাগিয়ে দিলাম।

    পরম করুণাময় আল্লাহর অসীম অনুগ্রহে কাবুল ও গজনীর প্রতি ইঞ্চি ভূমি আমার অধিকার-ক্ষেত্রে এসে গিয়েছিল।10

  • দ্বাদশ অধ্যায় : কাবুলের বর্ণনা

    দ্বাদশ অধ্যায় : কাবুলের বর্ণনা

    দ্বাদশ অধ্যায় : কাবুলের বর্ণনা

    কাবুল চার ঋতুর দেশ (শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষা ও বসন্ত ঋতু)। এখানকার ভূমি উর্বর। এখানে পূর্বে লামঘানাত, পেশোয়ার, হনগর ও হিঁদুস্তানের কিছু অংশ আছে। পশ্চিমে পবর্তমালা রয়েছে যেখানে হাজারা ও নিকুদারি উপজাতির বসতি রয়েছে। উত্তরে হিন্দুকুশ পবর্তমালা একে অন্য দেশগুলোর সীমানা থেকে পৃথক করেছে। এখানে কুন্দুজ ও অন্দর-আব দেশ রয়েছে। দক্ষিণে ফার্মুল নগজ, বান ও আফগানিস্তান।

    কাবুলের নগরীয় বর্ণনা

    কাবুল নগরের আবাদি ছোট তবে এটি বিস্তৃত ক্ষেত্রে পূর্ব থেকে পশ্চিম অবধি বিস্তৃত। এটি চারদিক থেকে পাহাড় দিয়ে ঘেরা। এই পাহাড়গুলো নগরীয় আবাদিকে একে অন্যের সঙ্গে জুড়ে দিয়েছে। এখানকার অবতল ক্ষেত্রের একটি এলাকা শাহ-কাবুল নামে পরিচিত। সেখানকার সম্পর্কে বলা হয় যে, হিঁদুস্তানের কোনো শাহ এখানে তাঁর রিহাইশগাহ (আবাসগৃহ) নির্মাণ করিয়েছিলেন। এটি চার মাইল ব্যাসের একটি ঘেরা এলাকা। এখানে বাগিচা আছে, নহর আছে যা পাহাড় কেটে বের করে আনা হয়েছে। শাহ কাবুলের দক্ষিণে উঁচু প্রাচীর আছে, যা দু’মাইল বিস্তৃত একটি তরনতাল (পুল বা সেতু)।

    কাবুল নগর থেকে কিছুটা দূরে অবস্থিত খাজা শাকুর মকবরা (দরগাহ)। সেখান থেকে কিছুটা উঁচুতে খাজা খিজিরের কদমগাহ রয়েছে, একটি তৃতীয় প্রসিদ্ধ স্থান, যা আরো উপরে অবস্থিত, খাজা রৌশানাল নামে পরিচিত। এখানকার একটি পাহাড়কে সিয়াহি সংগ (কালা পাহাড়) বলে। পাহাড়ে উঠে দেখলে চারদিকে অত্যন্ত সুন্দর হরিৎ-ক্ষেত্রের দৃশ্য নজরে পড়ে। এখানে প্রবাহমান উত্তুরে হাওয়া তাদের জন্য বড় সুখদায়ক অনুভূতি বয়ে আনে, যাদের ঘরের জানালা উত্তর দিকে অবস্থিত।

    বাণিজ্যিক নগর রূপে কাবুল

    কাবুল ও কান্দাহার থেকে দুটি বাণিজ্যিক হাঁটা-পথ রয়েছে-একটি হিঁদুস্তান ও অপরটি খুরাসান মুখী। কাবুলে কাশগড়, ফারগানা, তুর্কিস্তান, সমরখন্দ, বুখারা, বলখ, হিসার ও বাদাখশান থেকে সওদাগরি কাফেলা আসে। কান্দাহারে খুরাসানের সওদাগরও আসে।

    কাবুলকে একটি উমদা (অতুলনীয়) বাণিজ্য কেন্দ্র বলে গণ্য করা হয়। এখানে আসা সওদাগররা খুব বেশি মুনাফা নেন না। কাবুলে প্রতি বছর ৭ থেকে ১০ হাজার ঘোড়া বিক্রির জন্য আনা হয়। এখানে হিঁদুস্তান থেকে আগত বাণিজ্যিক কাফেলার সংখ্যা ১০ থেকে ২০ হাজার পর্যন্ত হয়ে থাকে। হিঁদুস্তান থেকে আগত সওদাগররা সাদা কাপড়, আখ ও জড়ি-বুটি নিয়ে আসেন।

    কাবুলের জলবায়ু ও উৎপাদনের বর্ণনা

    কাবুলের আশপাশে গ্রীষ্ম ও শীতপ্রধান রাজ্য রয়েছে। একদিনের সফরে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাওয়া যায়। কাবুলে কোথাও কোথাও তুষারপাতও হয়।

    এখানে শীত ও গ্রীষ্মকালে ফল মূল নগর বসতির কাছাকাছিই পাওয়া যায়। শীতকালের প্রধান ফল হলো-আঙুর, আনার, আলুচা, আপেল, নাশপাতি ও গুদেদার ফল। আলু-বালুও (বাবুর সম্ভবত চেরি ফল কিংবা এরকমই কোনো গুদেদার ফলকে বুঝিয়ে থাকবেন, কিংবা আলু বুখারা?) সহজে উৎপাদন করা যায়। গ্রীষ্মকালে লোকেরা নগরে লেবু ও আখ বিক্রির জন্য নিয়ে আসে। পাহাড় এলাকায় প্রচুর পরিমাণে মধু পাওয়া যায়। মৌমাছিরা বড় বড় চাক তৈরি করে। এখানে তো আঙুরের বাহার লেগে যায়। কয়েক প্রকারের আঙুর তো এখানেই উৎপাদিত হয়। এখানে আব-এ-আঙুর11 নামেও এক প্রকারে আঙুর পাওয়া যায়।

    কাবুলে প্রচুর পরিমাণে শরাবও উৎপাদিত হয়। অবশ্যই এখানকার শরাব একটু কড়া হয়। নেশা দ্রুত চড়ে যায় এবং বহুক্ষণ পর্যন্ত তার প্রভাব থাকে।

    কাবুল খাদ্যশস্য উৎপাদনের জন্য বেশি উর্বর নয়। অবশ্য এখানে অত্যন্ত উন্নত মানের তরমুজ হয়। তবে, খুরাসানের তরমুজের বীজ এখানে বপন করলে তার স্বাদ বদলে যায়।

    এখানকার ঋতুগুলো অত্যন্ত মনোরম হয়। এখানকার মতো ঋতু দুনিয়ার আর কোথাও আছে কিনা আমি বলতে পারব না। এমনকি, গরমের সময়েও ফারকোট ছাড়া রাতের বেলা কেউ ঘুমাতে পারে না। শীতকাল কষ্টদায়ক হয় না। কাবুলের আবহাওয়া সমরখন্দ ও তবরেজের মতো।

    কাবুলের চারণক্ষেত্রের বর্ণনা

    কাবুলের চারদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে বিশাল বিশাল সবুজ চারণ ভূমি। এগুলোর মধ্যে সংগ-কুরঘান ভারি সুন্দর। এটি উত্তর-পূর্বে চার মাইল জুড়ে বিস্তৃত। এই চারণক্ষেত্রটি ঘোড়া চারণের ভূমি বলে খুবই প্রসিদ্ধ। তবে, এখানে খুব মশাও হয়। উত্তর-পশ্চিম দিকে চেলাক নামক চারণ ক্ষেত্রটি দুই মাইল জুড়ে বিস্তৃত। এখানে মশা ভর্তি। তারা আকারে কিছু বড় হয়। ঘাস খাওয়ার জন্য চরতে আসা ঘোড়াদের জন্য এই মশারা বড়ই কষ্টদায়ক হয়ে ওঠে। পশ্চিমে দুররিন নামে একটি চারণক্ষেত্র আছে। এর দুটি নাম দেওয়া হয়েছে-একটি টিপা ও অন্যটি কুশনাদির। এ দুটিই একে অন্যকে ছুঁয়ে রয়েছে। এরকম পাঁচটি চারণক্ষেত্র আছে যেগুলো দুই-দুই মাইল পর্যন্ত ছড়িয়ে রয়েছে। এই চারণক্ষেত্রেগুলো জনবসতি থেকে দুই মাইল দূরে অবস্থিত। কিছু চারণক্ষেত্র আছে সেখানে মশা গুনগুন করে না। এখানকার ঘাস ঘোড়াদের খুব পছন্দ।

    কাবুলের পাহাড়-পর্বতের বর্ণনা

    কাবুলের জীবন বিদেশি লোকেদের, এখানকার পাহাড়ি পথের চড়াই-উৎরাইয়ের কারণে পছন্দনীয় হতো না। পাহাড়ি চড়াই-উৎরাইয়ের মধ্যে অজানা ব্যক্তির পথ হারানোর সমস্যাও থাকত।

    বিশ্ববিখ্যাত হিন্দুকুশ পর্বতমালা বলখ, কুন্দল ও বাদাখশান থেকে কাবুলকে পৃথক করেছে। এগুলোর মধ্য থেকে তিনটি পথ পজ্-শির অভিমুখে চলে গেছে-একটি খাবক, দ্বিতীয়টি বজারক এবং তৃতীয়টি তুল-এর দিকে। তুলের পথটি সবচেয়ে ভালো। এটি সোজা সড়ক। স্থানীয় লোকেরা একে প্রধান হাঁটা পথ রূপে গুরুত্ব দেয়। অন্য একটি সড়ক অন্দর-আবের সঙ্গে মিলিত হয়েছে। এটি অত্যন্ত কষ্টদায়ক পথ। অন্দর-আব, সুখ-আব-য়ের সঙ্গে মিলিত হয়েছে। এটি একটি সুন্দর পথ। এর তৃতীয় পথটি শির্-তু-র সঙ্গে মিলিত হয়েছে। এই রাস্তায় বামলান এবং মারখান নগর পড়ে। এই দুই নগরে পৌঁছানোর রাস্তা শীতকালে বদলে যায়, লোকেরা আব-এ-দারা-র পথ ধরে।

    শীতকালে হিন্দুকুশ পর্বতমালা তিন-চার মাসের জন্য বন্ধ হয়ে যায়। এর কারণ হলো ওই উপত্যকার উপর বয়ে আসা বারিধারার কারণে ঐ পথ অতিক্রম করা যায় না। কেউ যদি হিন্দুকুশ পাহাড় ধরে শীতকালে পাহাড়ি উপত্যকায় পৌঁছানোর চেষ্টা করে তাহলে তাকে কঠিন অবস্থার মোকাবিলা করতে হবে। এটি পার হওয়ার উত্তম সময় হলো পাতা ঝরার কাল, তা সামনে-পিছনের তিন-চার মাসের হয়, এমন মৌসুমে পাহাড়ের উপর বরফ থাকে না এবং পানির স্তর নিচে নেমে যায়।

    কাবুল থেকে খুরাসান যাওয়ার জন্য কান্দাহারের পথই উত্তম। এখানকার রাস্তা সমতল। কোনো মোড়ও নেই।

    হিঁদুস্তান থেকে চারটি রাস্তা কাবুলের সঙ্গে মিশেছে। একটি নিচু পথ খাইবার পাস হয়ে যায়। দ্বিতীয়টি বংগস তৃতীয়টি নজ্ এবং চতুর্থটি ফারমুল হয়ে। উপরোক্ত তিনটি পথও নিচু রাস্তার। এই পথগুলো সিন্ধু হয়ে চলে গেছে।

    কাবুলের বাসিন্দাদের বর্ণনা

    কাবুল দেশে আলাদা-আলাদা জাতির লোকেরা বসবাস করে। উপত্যকা এবং সমতলে তুর্কি ও আরবরা বসবাস করে। নগরীয় আবাদির সঙ্গে সেখানে গ্রামীণ বসতিও আছে। কিছু বিখ্যাত গ্রামের নাম হলো-পশাই, পারাজি, বিরকুল, যেগুলোতে আফগান জাতির লোকেরা বসবাস করে। পশ্চিম পাহাড়ি এলাকায় হাজারা ও নিকদারি জাতিদের বাস, এদের মধ্যেকার কিছু লোক মোগলাই ভাষায় কথা বলে। উত্তর-পূর্ব পাহাড় অঞ্চলে কাফির12 ও কিটুর জাতির লোকেদের বসতি রয়েছে। দক্ষিণে আফগান জাতিদের।

    কাবুলের বিভাজন ক্ষেত্রের বর্ণনা

    কাবুল দেশটি চোদ্দটি ক্ষেত্রে বিভক্ত। বাজৌর, সাবাদ এবং হালনগরের কোনো কালে হয়তো স্বাধীন অস্তিত্ব ছিল, তবে তাদের পৃথক-পৃথক অস্তিত্বের চিহ্ন আজ আর নেই। এগুলো উর্বর এলাকা। আফগানরা এদের এখানে মেহনত-মজদুরির কাজ করে।

    পূর্বে লামঘানাত নগরের পাঁচটি উপনগর এবং দুটি কসবা আছে। এখানকার ভূমি উৎপাদক। এখানকার নগরাহার এলাকা কাবুল পৌঁছানোর জন্য কষ্টদায়ক এবং ক্লান্তিকর। সড়ক তিন-চারটি পাহাড় অতিক্রম করে গিয়েছে। রাস্তা নির্জন দীর্ঘ। ভূমি শুষ্ক ও অনুর্বর। খিরচিকি ও অন্য আফগানরা, চুরি-ডাকাতিকে যারা নিজেদের পেশা করে রেখেছে, তারা এই পথটি লুট-তরাজ চালানোর জন্য ব্যবহার করে। কিন্তু আমি এখানে আসার পর এই পথ নিরাপদ হয়ে গেছে। আমি একে কারাতুল ও কুরুকসালের সঙ্গে জুড়ে দিয়েছি। সেখানকার লোকেদের যাতায়াতের ফলে এখন এই সড়ক আগের মতো চোর-ডাকাতদের জন্য বিরান হয়ে রয়ে যায়নি।

    এই সড়কের মোড়ে-মোড়ে ঠান্ডা এবং গরমের অনুভূতি আলাদা আলাদাভাবে অনুভব করা যায়, হাওয়া যখন ঝরনার দিক থেকে বয়ে যায়।

    এই সড়ক অতিক্রম কালে বিভিন্ন রকমের গাছ, উদ্ভিদ, ঘাস, পশুপাখি, সভ্যতা ও রীতি-রেওয়াজের দেখা মেলে।

    নিংনহরের উত্তরে বরফ সাদা পাহাড়ি পথ, একে বংশ থেকে পৃথক করে। এই পথ কোনো সওয়ারিতে বসে অতিক্রম করা যায় না। সাদা বরফের কারণে এই এলাকাকে সফেদ কোহ (সফেদ-সাদা, কোহ-পর্বত, সাদা পাহাড়) বলা হয়। এখানে জমে থাকা বরফ কখনো গলে না এবং এর নিচু অংশও ভেঙে কখনো উপত্যকায় পড়ে না। এই বরফ ঢাকা এলাকা অতিক্রম করতে অর্ধেক দিন লেগে যায়।

    সফেদ কোহ এলাকা ছাড়াও জলবায়ুর দৃষ্টিতে অন্য কিছু এলাকা যথেষ্ট প্রসিদ্ধি লাভ করেছে। এখানকার পানি এত ঠান্ডা হয় যে, তাতে আর বরফ মেশানোর প্রয়োজন হয় না।

    উত্তরে আলী সংগ তুমান নামক একটি এলাকা আছে। এখানে খাঁড়া পাহাড় রয়েছে যা হিন্দুকুশ পর্বতমালার সঙ্গে মিশেছে। এখানে বসবাসকারী লোকেদের ইতিহাস অনেক প্রাচীন। এদের কাফির বলা হয়। এদের বসতি কাফিরিস্তান নামে পরিচিত। এখানে মহান নাম-এর কবর রয়েছে। যাঁর রক্তধারা পয়গম্বর নূহের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে কথিত আছে। আলনাগার নামক অন্য একটি এলাকা কাফিরিস্তানের একটি অংশ, এটি গওয়ার নগরের নিকটে অবস্থিত। গওয়ার থেকে বয়ে যাওয়া পানির স্রোত আলী শাংগ-এ গিয়ে মিশে যায়।

    লামঘানে অবস্থিত নূর উপত্যকা তাঁর নিজের নামেই অদ্বিতীয়। এখানে পাহাড়ের মাথায় কেল্লা রয়েছে। এই এলাকায় প্রচুর পরিমাণে খেজুর উৎপন্ন হয়। উপত্যকায় দুই প্রকারের আঙুর জন্মায়। এ সবের দ্বারা প্রস্তুত শরাব লামঘানের প্রসিদ্ধির কারণ বনে গিয়েছে। এখানে উৎপন্ন এক প্রকারের আঙুর থেকে হলুদ রঙের শরাব তৈরি হয় তো অন্য প্রকারের আঙুর থেকে লাল রঙের শরাব। প্রথম প্রকারেরটি বেশি সুস্বাদু হয়।

    আরেকটি কসবা এলাকা, চগন সরাই নামে পরিচিত। এটি এই এলাকার একমাত্র গ্রামীণ বসতি। এটি কাফিরিস্তানের পার্বত্য এলাকার একটি ছোট খণ্ডের উপর অবস্থিত। এখানকার লোকেরা ইসলাম ধর্মাবলম্বী, তবে তারা কাফিরদের সঙ্গে এমনই মিলে-মিশে থাকে যে, তারা তাদের রীতি-রেওয়াজ ও পরম্পরার মধ্যে নিজেদের শামিল করে রাখে। এলাকার লোকেরা শরাব পানে খুবই অভ্যস্ত। এই গ্রামীণ বসতিতে শরাব উৎপাদনের কোনো সাধন নেই। এরা কাফিরিস্তান থেকে হলুদ রঙের শরাব নিয়ে আসে এবং পান করে।

    আমি যখন ঐ গ্রাম (চগন সরাই)-এ পৌঁছাই তখন কাফিরিস্তানের মূল বাসিন্দারা, গ্রামীণ লোকেদের সাহায্য করতে আসে। তারা সঙ্গে করে হলুদ রঙের শরাব নিয়ে এল। আমি সেখানে পৌঁছানোর পর জানতে পারি যে, কাফিস্তানের লোকেরা শরাব পানে এতটাই অভ্যস্ত যে, প্রত্যেক ব্যক্তি গলায় শরারের পাত্র ঝুলিয়ে রাখে। এই পাত্রকে ওরা খিগ বলে। এরা এক খিগভর্তি শরাব পানির বিকল্প হিসেবে পান করে।

    তিমানের এক নগর বসতির নাম নিজরৌ। এটি কাবুলের উত্তরে কোহিস্তানে অবস্থিত। পাহাড়ি পথ ধরে এটি কাফিরদের এলাকার সঙ্গে মিশেছে। এখানকার লোক শান্ত স্বভাবের। এরা আঙুর ও অন্যান্য ফল উৎপাদন করে। আঙুর থেকে শরাব তৈরি করে। তবে, এদের শরাব তৈরির ঢঙ একটু অন্য রকমের। এরা আঙুর সিদ্ধ করে শরাব তৈরি করে। তারা কোনো ধর্মের উপর আস্থা রাখে না। কোনো প্রার্থনা করে না। তাদের সভ্যতা, সংস্কৃতি, জীবন-যাপনের ঢঙ সবটাই কাফিরদের মতো, যদিও তারা নিজেদের হজরত মুহম্মদ (সা)-এর অনুসারী বলে পরিচয় দেয়।

    নিজেরৌ, চারদিক দিয়ে পাহাড় বেষ্টিত জনবসতি, এখানে এমন একটি বৃক্ষ পাওয়া যায় ডাল আলো দেওয়ার জন্য বাতি হিসেবে জ্বালানো হয়।

    এখানকার পাহাড় এলাকায় উড়ন্ত গিরগিটি পাওয়া যায়।13 এখানে চামবাদুড়ের চেয়ে আকারে কিছুটা বড় এমন একটা জন্তু পাওয়া যায়, যা পরদা-বেষ্টিত পাখার সঙ্গে যুক্ত থাকে। এই পাখা বাহু ও পায়ের মধ্যে থাকে। আমি এমন জন্তু এর আগে আর কখনো দেখিনি। সেখানকার লোকেরা তাদের মধ্যে থেকে একটিকে আমার সামনে নিয়ে আসে। আমি কৌতূহলী হয়ে তা দেখলাম।

    লোকেরা বলল, এটি এক গাছ থেকে আরেক গাছে উড়ে যায়। লোকেরা তাঁর বৈশিষ্ট্য প্রসঙ্গে বলল যে, এটি গাছে রেখে দিলে গিজ14-এর মতো সোজা উড়ে গিয়ে অন্য গাছে গিয়ে বসে। লোকেরা গাছের গিয়ে পৌঁছালে সেটি তার পাখা ছড়িয়ে দিয়ে নিচে নেমে আসে। যেহেতু তার কারো দ্বারা ক্ষতির কোনো সম্ভাবনা থাকে না সেহেতু সে তাদের কাছে এসে যায়।

    নিজরৌ পাহাড়ি এলাকায় আমি অদ্ভুত রকমের একটি পাখিও দেখতে আসি। এটি লকা নামে পরিচিত। এর মাথা থেকে পাখনা পর্যন্ত চার-পাঁচটি রঙের পাখনা দেখা যায়। এর রঙ-বেরঙের পাখনার কারণে একে খুব আকর্ষণীয় বলে মনে করা হয়। এর আকৃতি কবুতরের মতো। কিছু বিশেষ জাতের কবুতরের গলায় চাঁর-পাঁচ রঙের পাখনা থাকে, এই রকম পাখনাই লকা পাখির মাথা থেকে লেজ পর্যন্ত দেখা যায়।

    নিজরৌ-এর অন্য একটি পাখির সম্পর্কে লোকেরা আমাকে বলে যে, তার পাখা বৃত্তাকারের হয়। এদের শুধু শরৎ ঋতুতেই দেখা যায়। ওরা দীর্ঘক্ষণ ধরে উড়তে পারে না, এ জন্য তারা মানুষের মধ্যে মিলে-মিশে থাকে।

    এক অদ্ভুত প্রজাতির ইঁদুরের কথাও তারা আমাকে বলে। তাকে কস্তুরি ইঁদুর বলা হয়। ওই ইঁদুর থেকে কস্তুরির মতো সুগন্ধ বেরুতে থাকে। তবে এই কস্তুরি ইঁদুরকে আমি দেখিনি।

    পন্‌জশর নামক অন্য একটি ছোট মনুষ্য বসতি আমি কাফিরিস্তানে দেখতে পাই। এটি রাস্তার ধারে অবস্থিত। এখানকার লোকেরা, পাহাড় থেকে নিচু এলাকায় থাকার কারণে, প্রায়শই, এরা মানুষের কাছ থেকে কর উসুলের কাজে লেগে থাকত। এটাই এখানকা লোকেদের আয়ের সাধন ছিল। এরা মানুষের উপর লুটতরাজও চালাত। যখন থেকে আমি এখানে আসি, তাদের এই অপকর্মকে আমি কঠোরভাবে দমন করি।

    এখানে ঘুরবন্দ নামে অন্য একটি বসতি আছে। এখানকার লোকেরা ‘বন্দ’ শব্দের অর্থ করে ‘কোহ’ বা পাহাড়, আর ‘ঘুর’ শব্দের অর্থ অতিক্রম করা রাস্তা। এখানকার একের পর এক আবাদি পাহাড়ের মধ্যে মধ্যে অবস্থিত। এখানকার ছোট-ছোট বস্তিগুলিতে পৌঁছানোর জন্যও পাহাড়ি পথ অতিক্রম করতে হয়, সে জন্য এই এলাকার নাম হয়েছে ঘুরবন্দ।

    এই বসতি এলাকার হাজারা নামক জনবসতিটি উপত্যকার সবচেয়ে উঁচু স্থানে অবস্থিত। এখানকার বাসিন্দাদের জিম্মায় রাজস্ব উসুলের কাজ ছিল, যা থেকে তাদের দিন গুজরান হতো। তবে, শাসন ব্যবস্থা পরিবর্তনের পর এখন তাদের ওই কাজ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। তারা আমার আদেশের প্রতীক্ষায় ছিল। এ জন্য আমি তাদের মধ্যে গেলাম। তাদের আর্থিক দুরবস্থা শোধরানোর জন্য অন্য উপায় বের করা হলো।

    কথিত আছে যে, সেখানকার লপিজ-লাজুলি পাহাড় এলাকায় রুপোর খনি রয়েছে। আমি ঘুরবন্দ শাসনের খরচের জন্য রুপোর খনির সন্ধানের কাজে লোক লাগিয়ে দিলাম।

    আমি, হিন্দুকুশ পর্বতমালার পরিবেষ্টিত গ্রামীণ বস্তিগুলোর মধেকার অন্যতম লোকালয় মিতা-কচ্চায়ও গেলাম। পর-য়ান নামক এলাকাটি এই লোকালয়ের শীর্ষে অবস্থিত। এই গ্রামে ১২-১৩ টি বস্তি পর্বতমালার নিচে অবস্থিত। এখানকার লোকেদের আয়ের মূল উৎস হলো শরাব উৎপাদন। এখানে প্রস্তুতকৃত শরাবের শ্রেষ্ঠত্ব সবাই স্বীকার করে। গ্রামে কিছু লোক কর আদায় করে শরাব উৎপাদনের কাজ করে, তবে সবাই এমনটি করে এ কথা বলা যায় না। লোকেরা এমন-এমন বীহড় পাহাড় এলাকার মধ্যে বাস করে যে, কর উসুলের কাজে নিয়োজিত লোকেরা তাদের নিকট পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে না।

    এখানকার পাহাড়ি উপত্যকা-ঘেরা পথকে হাঁটাপথ15 বলে। তা এ জন্যই বলে যে, সেখানে কোনো সওয়ারি ছাড়াই মানুষ সহজে চড়াই-উত্রাই পার হতে পারে। পাহাড় থেকে নেমে আসা বারিধারা নিচে সমতল ক্ষেত্রকে সিঞ্চিত করতে থাকে। যে সকল এলাকা বারিধারায় সিঞ্চিত হতে থাকে তাদের নাম কিরাত-জিয়ান ও দাস্তে-শেখ। সবুজ ঘাস ও মক্কা চাষ এই সমতল এলাকার প্রধান উৎপাদন। এখানকার এই উৎপাদনে তুর্কি ও মোগলদের একচ্ছত্র অধিকার রয়েছে।

    এই হাঁটা-পথে (টিউলিপ-নলিনী, চমকদার ফুলের গাছ) রঙ-বেরঙের নলিনী ফুলের বাহার দেখার মতো। এখানে এরকমই বহু-রঙের ফুল দেখা যায়। এই স্থান অতিক্রম করার সময় আমি ৩২-৩৩ পর্যন্ত রঙের ফুল গুনতে পেরেছিলাম। আমি এক রকমের নলিনী ফুলের নাম দিলাম ‘গোলাপি সুগন্ধিযুক্ত’। কারণ ছিল ওই ফুল দেখতে ছিল লাল গোলাপের মতো, তা থেকে লাল গোলাপের মতো সুঘ্রাণ ভেসে আসত। এখানে নলিনী ফুলের চাষ করা হয় না। দাস্তে-শেখের সমভূমিতে প্রাকৃতিকভাবে হয়, দূর-দূরান্ত পর্যন্ত রঙ-বেরঙের ছটা বিচ্ছুরিত হয়।

    পুরো ঘুরবন্দ এলাকায় শত শত জায়গায় নলিনী ফুটতে দেখা যায়। সকল জায়গায় প্রাকৃতিকভাবে ফোটে। এদের চাষ করা হয় না। নলিনী ফুলের বাহারের কারণেই ঘুরবন্দের পাহাড়ি এলাকাটি পর্যটকদের কাছে বড়ই আকর্ষণীয় হয়ে রয়ে গেছে।

    একটি ছোট পাহাড়ি ভূমির নিচে অবস্থিত বিশাল সমতল এলাকাটিকে খাজা-এ-রিগরাবান বলা হয়। এই সমতল ক্ষেত্রটি দুই ভাগে বিভক্ত-একটি সমতল উর্বর ভূমি তো অপরটি মালভূমি। এই মালভূমিটিতে সবুজ অপেক্ষাকৃত কম। এই এলাকায় প্রচণ্ড গরম পড়ে।

    কাবুলের দক্ষিণ-পশ্চিমে এমন নগর আছে যা বরফ-আবৃত পাহাড়ি ক্ষেত্র। কথিত আছে, এখানে কোনো কালে তুষায় পড়ত। তবে এটি ‘কোনো কালে’র কথামাত্র, ‘এখন’-কার কথা নয়। প্রাকৃতিক পরিবর্তন তো সর্বত্রই হয়ে থাকে। এখন সেখানে কঠিন বরফাবৃত পাহাড় দেখা যায়, কোনো করল এখানে তুষারপাত হয়ে থাকলেও তা অস্বীকার করা যায় না। কখনো প্রাকৃতিক পরিবর্তন হলে, এখানে আবারও বরফ পড়তে দেখা যাবে, এ সম্ভাবনাও উপেক্ষা করা যায় না।

    এখানে কঠিন বরফাবৃত পাহাড় বারো মাইল পর্যন্ত দেখা যায়। এই বরফাবৃত পাহাড়ের কারণে এখানকার লোকেরা পান করার জন্য খুব ঠান্ডা পানি সহজে পেয়ে যায়। সে কারণে এই এলাকার লোকেদের বরফ জমানোর সাধনের, বামিয়ান এলাকার লোকেদের মতোই, প্রয়োজন পড়ে না।

    এখানকার মানুষদের জীবনযাত্রা দ্রুতগতিসম্পন্ন। এখানকার প্রধান নদী হরমন্দ, সিন্ধু, কন্দালের দুঘাব এবং বলখ্-আব-এই চার নদী দূর-দূরান্ত অবধি বয়ে যায় না। এই চারটির মধ্যে দূরত্ব এতটুকুই যে, কোনো ব্যক্তি সাফরে বেরোলে একদিনের সফরেই এই চার নদীর পানির স্বাদ নিতে পারবে।

    পামঘান পর্বত পরিবেষ্টিত এলাকার নিচে কাবুলের যে গ্রামগুলো রয়েছে, ওখানকার লোকেরা প্রধানত আঙুরের চাষ করে। আঙুর ছাড়া অন্য ফলও তারা ফলায়, তবে আঙুর উৎপাদনের প্রতি তারা বেশি আকর্ষণ অনুভব করে, কেননা, এখানকার আঙুরে দ্রুত পাক ধরে।

    আসতারাগচের অধিবাসীরা এখানকার বাসিন্দাদের মতো একই প্রজাতির নয়। ঔলংগ বেগ মির্জা (বাবুরের পূর্বপুরুষ)-ও এদের পৃথক-পৃথক বর্ণনা দিয়েছেন। কমপক্ষে দুটি দেশের লোকেদের বাহুল্য তো আছেই একটি খুরাসানের অন্যটি সমরখন্দের। এরা নিজেদের, খুরাসানি ও সমরখন্দি রূপে আলাদা-আলাদা পরিচয় অক্ষুণ্ণ রেখেছেন।

    পামঘান কাবুলের অন্য এলাকার সঙ্গে এই অর্থেও পৃথক যে, এখানে বেশি রকমের আঙুরের চাষ হয় না। এখানে একই রকমের আঙুর ফলানো হয় এবং এটা খুব সুস্বাদু হয়। এখানকার আঙুর এত সুস্বাদু হওয়ার মূল কারণ হলো এখানকার উত্তম আবহাওয়া।

    ‘পামঘানের পর্বতমালা বরফাবৃত। এখানকার গ্রামীণেরা তাদের আঙুর বাগিচাগুলোকে সুন্দর করে সাজিয়ে রেখেছে। তারা বাগিচাগুলোকে কিছুটা এমন ধরনের লতাপাতা দিয়ে সাজিয়ে রাখে যে, তা অপূর্ব শোভা ধারণ করে। বাগিচার দু’দিক থেকে পর্বতের পানি-স্রোত বের করে নিয়ে এসে তারা তাকে সেচের কাজে ব্যবহার করে।

    পাহাড় থেকে বয়ে আসা পানি বড়ই শীতল, শুদ্ধ ও স্বচ্ছ হয়। এখানকার আঙুর বাগিচাকে পছন্দ করে ঔলংগ বেগ মির্জা তা অধিকার করে নিয়েছিলেন। আমি ওই বাগিচাগুলোতে চলে গেলাম। ঔলংগ বেগ মির্জার পছন্দের বাগিচাগুলো আমি স্বচক্ষে দেখলাম। প্রকৃতপক্ষে, ওই সকল বাগিচা ও সেখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের বর্ণনা করা সহজ নয়। স্মরণীয় করে রাখার জন্য ঔলংগ বেগ মির্জা সেগুলোকে পছন্দ করেছিলেন, আমি ওই বাগিচাগুলোর মালিকদের কাছ থেকে তাদের চাওয়া মূল্যের বিনিময়ে সেগুলোকে খরিদ করে নিলাম।

    এই বাগিচাগুলো এমনই ছাতার মতো যে, তার নিচের ভূমিতে রোদ পৌঁছায় না। নিচে বেশ লম্বা-চওড়া বিশ্রামস্থল বানানো রয়েছে। ভূমি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন, সবুজালিযুক্ত, ছায়াদার এবং মনোরঞ্জক।

    বাগিচার চারদিকে সেচকার্যের জন্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ব্যবহার করা হয়। এখানে সারিসারি আঙুর গাছ লাগানো হয়। গাছগুলো সারিতে এমনভাবে লাগানো হতো যে, তার মাঝখান দিয়ে রাস্তা তৈরি করা যেত না। সারির লতাগুলো একে অন্যের সঙ্গে ঘন-সন্নিবিষ্টভাবে এমনভাবে জড়িয়ে থাকত যে, তা এক-একটি দেওয়ালের মতো হয়ে যেত। বাগিচার মধ্যে সমতল স্থানে পৌঁছানোর জন্য তাদের তৈরি করা রাস্তা ব্যবস্থার করা যেত। ওই রাস্তাগুলো তাদের নিজেদের জন্য তৈরি। এগুলো ভিতরে যাওয়ার রাস্তার দ্বার-স্বরূপ ছিল। তাদের সজ্জাও ছিল দ্বারের মতো।

    এই বাগিচাগুলো গ্রামসমূহের মধ্যে নিয়ে অথবা উপত্যকার শীর্ষে গিয়ে দেখলেও ভারি সুন্দর দেখাত।

    এখানে খাজা-সহ্-ইয়ারান (বা তিনবন্ধু) নামে একটি এলাকা আছে। এটি একটি বৃত্তাকার ক্ষেত্র। এই এলাকায় আমি তিন রকমের ছোট-ছোট গাছ লাগাই। এদের গোলাকার রূপ দেওয়ার জন্য শুধুমাত্র তিন রকমেরই গাছ যাতে জন্মাতে পারে, সে জন্য এখানে বিশেষভাবে প্রয়াস করা হয়েছে। গাছের প্রকারেরও ক্রম দেওয়া হয়েছে। সবচেয়ে পিছনে বা প্রথমে গোলাকার পংক্তিতে বড় গাছের শৃঙ্খল রয়েছে, তারপর তার চেয়ে কিছু ছোট গাছ এবং তৃতীয় ক্রম তার চেয়েও ছোট গাছের।

    এখানকার বাসিন্দাদের মধ্যে এ কথা প্রচলিত আছে যে, এই তিনটি আলাদা-আলাদা রকমের ছোট গাছের এই শৃঙ্খলা তিন ফকিরের দোয়া-র পরিণাম। তিনজন ফকির এখানে এসে আশ্রয় নিয়েছিলেন। তারা যেমন বড়, মধ্য ও কনিষ্ঠ বয়সের ছিলেন। তেমনই গাছগুলোকেও সেখানকার বাসিন্দারা ‘খাজা-সহ-ইয়ারান’ বাগ বানিয়েছিলেন।

    ওখানকার অধিবাসীদের বিশ্বাস যে তিন ফকিরের দোয়া এখনও সেখানে কায়েম রয়েছে। যাঁরা সেখানে দোয়া চাইতে আসেন, তাঁদের দোয়া কবুল হয়।

    ‘খাজা-সহ-ইয়ারান’ অবলোকন করার পর আমি এতই প্রভাবিত হলাম যে, আমি কারিগরদের আদেশ দিলাম যে, দশ ফুট লম্বা ও দশফুট চওড়া পাথরের চবুতরা বানিয়ে দেওয়া হোক। এ সকল চবুতরা আমি বসন্তঋতু আসার আগে প্রস্তুত করে চারটি স্থানে তাদের নির্মাণ কাজ পূর্ণ করার আদেশ দিলাম।

    আমি এ আদেশও দিলাম যে, চবুতরায় এসে বিশ্রামকারী মানুষদের জন্য শীতল পানিরও ব্যবস্থা করা হোক। এ জন্য পাহাড়ের মধ্য দিয়ে নহর কেটে বাগিচার মধ্যে পানি নিয়ে আসারও আদেশ দিলাম। একথাও বললাম যে, চবুতরাগুলোর দুই দিকে হৌজ বানিয়ে দেওয়া হোক। হৌজে যেন সব সময় খাবার পানি ভর্তি থকে। এ সকল ব্যবস্থার আদেশ আমি এই ভেবে দিলাম যে, সেখানে এসে চবুতরায় উপবেশনকারীরা যেন পানির জন্য পেরেশান না থাকে। পাহাড় থেকে নহর কেটে আনায় কাজে লোক ওই দিনেই লেগে গেল।

    কাবুলের আরো একটি কসবা আছে-যার নাম লুহুগুর। এখানে চিখ নামে একটি বড় গ্রাম আছে। এই গ্রামেও অনেক বাগিচা আছে, লুহুগুরের অন্য গ্রামে বাগিচা দেখা হয়নি। এখানকার অধিবাসীদের ঔঘনশাল বলে। কাবুলের জাতিগুলোর মধ্যে এদের বেশ মান্যতা আছে। কাবুলের অন্য এলাকায় লোকেরা ঔঘনশালের উচ্চারণ করে উঘনসার।

    গজনীর একটি স্থানের নাম বিলায়াত। গজনীর এই স্থানটি সম্পর্কে বলা হয় যে, সবুক্তগীন, মাহমুদ ও তাঁর উত্তরাধিকারীদের আমলে এই জায়গাটি রাজধানী রূপে ব্যবহৃত হয়েছিল। এ-ও বলা হয় যে, শিহাবউদ্দীন মুহম্মদ ঘুরি ক্ষমতা লাভ করার পরই এই স্থানকে রাজধানী বানিয়েছিলেন। তবে বিলায়াত নামটি এখানকার মানুষদের মুখে জায়গা পায়নি। বিলায়াতের পরিবর্তে লোকেরা গজনীকেই মনে রেখেছে।

    গজনীকে ‘জবুলিস্তান’ও বলা হয়েছে। এখানে তিনটি ঋতু আছে। কিছু লোক মনে করেন কান্দাহারও গজনীর একটি অংশ। এটি কান্দাহারের দক্ষিণে কিছু দূরে এবং কাবুলের পশ্চিম দিকে অবস্থিত। কোনো ব্যক্তি যদি পায়ে হেঁটে কান্দাহার থেকে দ্রুতপদে হাঁটতে থাকে তাহলে দুপুর এক দু’ঘটিকার মধ্যে কাবুল পৌঁছাতে পারে।

    আদিনাপুর কাবুল থেকে যত দূরে অবস্থিত, তা সত্ত্বেও তার কাবুল থেকে আদিনাপুরগামী রাস্তাটি এত অসমতল যে, পুরো একদিনেও ওই পর্যন্ত যাত্রা পুরো করা যায় না।

    গজনীর ভূমি আশপাশের এলাকায় ভূমির চেয়ে অপেক্ষাকৃত অধিক উর্বর। এখান থেকে পাহাড়ি নদীগুলোর চার-পাঁচটি স্রোত বয়ে যায়। নহরের রূপে সেচের পানি পাঁচটি গ্রামে পৌঁছায়, সেখানে খুব ভালো ফসল ফলে।

    কাবুল অপেক্ষা গজনীর আঙুর অধিক সুস্বাদু হয়। এখানকার তরমুজও আকারে বড় এবং সুস্বাদু, আপেলও সুন্দর এবং রসালো হয়। হিঁদুস্তানে এখানকার ফলের খুব চাহিদা আছে। সওদাগর আসে এবং এগুলো কিনে নিয়ে যায়।

    গজনীতে চাষবাস করা কঠিন পরিশ্রমের কাজ। এর কারণ হলো এখানকার ভূমি খুবই রুক্ষ। প্রত্যেক বছর এখানকার চাষের জমি পাল্টাতে হয়। তবে এটা করে ভালো ফসলও লাভ করা যায়। কাবুলের চেয়ে বেশি খাদ্যশস্য এখানে উৎপন্ন হয়। কাবুল অপেক্ষা গজনীতে জিনিসপত্র সস্তা। মানুষ ইমানদার। সৎকর্মে বিশ্বাস রাখে। ইসলাম ধর্ম কঠোরতার সঙ্গে পালন করে। কিছু লোক তিন মাস রোজা রাখে।

    গজনীতে মোল্লা আবদুর রহমান নামক একজন ব্যক্তির খুব মান্যতা আছে। তিনি মস্ত বড় পণ্ডিত ছিলেন। তাঁর বিদ্যাত্তার কথা গজনীর মানুষ খুব গর্বের সঙ্গে প্রচার করে। এখানে মাহমুদের কবর রয়েছে, লোকে যাকে রওজা বলে। গজনীতে বহু মকবরা আছে। এগুলো খুব প্রসিদ্ধ ব্যক্তিদের। প্রত্যেকেরই মান্যতা রয়েছে।

    কাবুল ও গজনী জয় করার পর আমি কোহাত অভিমুখে রওনা হই। এটি সমতল এলাকা। এখানে আফগান জাতির লোকেরা বসবাস করে।

    গজনীর দল্ এবং আবিস্তাদা নামক স্থানেও আমি যাই। সেখানকার লোকেরা জানায় যে, এখানে একটি পাকা কবর আছে। ওই কবরে প্রতিদিন অলৌকিক দৃশ্য দেখা যায়। অলৌকিক এটাই যে, লোক সেখানে গিয়ে মানত করে ও নিজেদের কামনা-বাসনা জানায়, তখনই কবর নড়ে ওঠে এবং ঘুরে যায়। অলৌলিককত্বের ঔসুক্য আমাকে ওই কবরস্থানে নিয়ে গেল।

    আমি সেখানে গিয়ে দেখলাম, লোকেরা মানত করছে। মানত-প্রার্থনার একটা নির্দিষ্ট সময় ছিল। মানত-প্রার্থনাকারীদের সংখ্যা ছিল অনেক। আমি দেখলাম কবর নড়ে উঠল… এবং কিছুটা ঘুরে গেল। লোকেদের ভক্তি-ভাবের সীমা-পরিসীমা রইল না। যে যে লোকেরা ওখানে মানত-প্রার্থনা করছিল। যখন কবর ঘুরছিল তখন প্রসন্নতার তারা আবেগের টগবগ করছিল। বিশ্বাস মতে, ওই সময়ে সকল কামনা-বাসনা অবশ্যই পুরো হয়ে যাবার কথা ছিল।

    কবরে এসে মানত-কামনাকারীদের ভিড় কমে যাওয়ার পর আমি তৎক্ষণাৎ এই উপসংহারে পৌঁছে গেলাম যে, কবর ঘোরানোর জন্য তার সেবকদের ধন-কামানোর যুক্তি কাজ করে। তারা কবরের নিচে এমন একটি চবুতরা বসিয়ে রেখেছিল যে, তাতে চাপ পড়লে কবর কিছুটা ঘুরে যেত। চাপ সরে গেলে কবর আবার যথাস্থানে ফিরে আসত। এই যুক্তি ওই সেবকেরাই ব্যবহার করত। এটা হওয়ার সাথে-সাথে শ্রদ্ধানবত লোকেরা ধন, সম্পদ, ফলমূল, খাদ্য-বস্ত্রসহ নানা সামগ্রী সেখানে ঢেলে দিত যার প্রত্যক্ষ লাভ ও সুবিধা ওই কবর-সেবকরা ভোগ করত।

    এটা ছিল সহজ-সরল মানুষদের ভক্তি-শ্রদ্ধার সুযোগে তাদের সঙ্গে প্রতারণার মামলা। লোকেদের ভক্তিভাবের সঙ্গে ওই সেবকরা ধোঁকাবাজি করছিল। আমি তৎক্ষণাৎ কবরটিকে ভেঙে দেওয়ার এবং নিচের বিশেষ চবুতরাটিকে হটিয়ে দেয়ার কাজ করালাম। কবর পুনঃনির্মাণ করালাম। কবরের সেবকদের কঠোরভাবে সতর্ক করে দিলাম যে, ভবিষ্যতে তারা এরকম কিছু করলে কঠিন সাজা ভোগ করতে হবে।

    তারপর কবর ঘোরার কথা আর শোনা যায়নি।

    গজনী খুব প্রসিদ্ধ নগর। এখানকার বিষয়ে এ সংযোগও আছে যে, সেখানকার শাসনক্ষমতা যাদের হাতে থাকে তারা হয় হিঁদুস্তানি নতুবা খুরাসানি। এরা সবাই গজনীকে তাদের রাজধানী করেন।

    সুলতান মাহমুদের শাসনামলে সেখানে তিনটি বাঁধ নির্মাণ করানো হয়। উত্তর দিকের বাঁধটি ৪০-৫০ গজ উঁচু এবং ৩০০ গজ লম্বা করে নির্মাণ করানো হয়। ওই বাঁধে পানি ধরে রাখা হতো। প্রয়োজন মোতাবেক ছাড়া হতো। এই বাঁধ ১১৫২ ঈসায়ী সনে আলাউদ্দীন জহাঁসোস ঘুরি তাঁর আক্রমণ ও বিজয়ের সময় ভেঙে দেন। তিনি সুলতান মাহমুদ গজনবীর শাসনামলে বিনির্মিত অনেক মকবরা উপড়ে দেন, নগরে অগ্নিসংযোগ করেন। হত্যা ও বলাৎকারের বাজার গরম করে দেন।

    তিনি যতদিন যাবৎ গজনী শাসন করেন, ততদিন যাবৎ সুলতান মাহমুদের জামানায় নির্মিত বাঁধ খণ্ডহর হয়ে পড়ে থাকে। আল্লাহতায়ালার অনুকম্পায় তার ধ্বংসাবশেষ মাত্র ছিল। আমি আশা করতাম যে, সেগুলো পুনঃনির্মাণ করানো যেতে পারে। তবে, তার জন্য অনেক অর্থের প্রয়োজন ছিল।16

    সমরখন্দের পূর্ব দিকেও আরো দু-তিনটি ছোট বাঁধ রয়েছে। এগুলো খণ্ডহর। এগুলোরও পুনঃনির্মাণের প্রয়োজন রয়েছে। সার্-এ-দিহ্-তে একটি বাঁধ ওই সময়ে ভালো অবস্থায় পানি সরবরাহের কাজ করে যাচ্ছিল। এ বাঁধটি সার্-এ-দিহ্ গ্রামের উঁচুতে অবস্থিত।

    আমি কোনো একটি বইতে গজনী প্রসঙ্গে পড়েছিলাম যে, সেখানে বসন্ত ঋতুতে দুর্গন্ধযুক্ত ধুলো উড়ে আসে। এ বিবরণ সবুক্তগীনের শাসনামলে লেখা হয়েছিল। আমি বসন্ত ঋতু আসার পর গজনীর বিষয়ে লেখা উক্ত বিবরণের সত্য-মিথ্যার খবর নিলাম। সমস্ত প্রকারের খোঁজ-খবর ও লোকেদের কাছে জিজ্ঞাসাবাদের পর জানতে পারলাম যে, লিখিত বিবরণ ভুল ছিল। যদি ভুল না হয় তবে সংযোগবশত এই ধূলিঝড় গজনীতে এসে থেকে থাকবে, যে বছর ওই বিবরণ লেখা হয়েছিল। প্রাকৃতিক পরিবর্তনের নিয়ম দৃষ্টে এ ধরনের পরিবর্তন প্রায়শ সামনে এসে যায়। এ ধরনের পরিবর্তন বিচ্ছিন্নভাবে সংযোগবশত ঘটে থাকে। তাকে স্থায়ী বলা যায় না।

    গজনী ও খোয়ারিজমে ঠান্ডার দাপট সুলতানিয়া ও তবরিজের মতোই হতে থাকে। এ মামলায় ইরাক এবং আজারবাইজানের মধ্যেও সমতা রয়েছে।

    কাবুল থেকে দক্ষিণ ও গজনী থেকে দক্ষিণ-পূর্বে জুর্মত নামক একটি জনবসতি আছে। সেখানে গিরদিজের দারোগার প্রধান কার্যালয় রয়েছে। ওখানকার বাড়ি-ঘর তিন-চারতলা বিশিষ্ট ওখানকার লোক শক্ত-পোক্ত ও সুগঠিত দেহের অধিকারী হয়। তারা ওই সময়ে নাসির মির্জার বাহিনীর সঙ্গে অত্যন্ত জোরালো মোকাবিলা করে, যখন তিনি সেখানে আধিপত্র প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন। তারা নাসির মির্জার বাহিনীকে তাদের উপর জয়ী হতে দেয়নি। ওখানকার বাসিন্দাদের ওঘন-শাল বলে। তারা মক্কার চাষ করে। সেখানে বাগিচা দেখা যায় না। এখানে শায়খ মুহম্মদ মুসালমানের মাজার রয়েছে। যে পাহাড়ের উপর তাঁর মাজার অবস্থিত সেটি বরকিস্তান নামে পরিচিত।

    অন্য একটি কসবা ফারমুল নাম পরিচিত। এটিও ধর্মবিশ্বাসের একটি পবিত্র স্থান। এখানে খুব উত্তম জাতের আপেল জন্মায়। এই আপেল হিঁদুস্তান বিক্রির জন্য পাঠানো হয়। এখানকার লোকেরা শেখজাদা বলে অভিহিত হন। এরা নিজেদের শায়খ মুহম্মদ মুসালমানের বংশধর বলে পরিচয় দেন। আফগানরা যখন হিঁদুস্তান আক্রমণ করেছিল, তখন এখানকার বাহাদুর বাসিন্দারা আফগান বাহিনীতে খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন।

    বংগস নামে অন্য একটি কসবাই জনবসতি রয়েছে। আফগান জাতির সকল লোক এখানে বসবাস করে-খুগলানী, খিরিচাল, তুর্ল এবং লানদার এদের মধ্যে প্রধান। এরা সবাই চলাচলকারী রাস্তার বাইরের বস্তিতে বসবাস করে। এখানকার লোকেরা একরোখা, জেদী ও লড়াকু প্রকৃতির। এরা সন্তুষ্ট চিত্তে সহজে রাজস্ব দেওয়া পছন্দ করে না। অবশ্যই চাপ দিয়ে আদায় করতে হয়। এরা রাজসত্তার প্রতি পূর্ণরূপে অনুগত হয় না। সেনা শক্তির ভয়ই তাদের অনুগত করে রাখে।

    এ রকম স্বভাববিশিষ্ট লোকেদের সঙ্গে আমার সম্পর্ক কান্দাহার, বলখ, বাদাখশানে সমানভাবে থেকে যায়। আল্লাহর রহমতে, যখনই আমার প্রয়োজন পড়েছে যে, এরকম স্বভাব বিশিষ্ট লোকেদের দাবিয়ে রাখা জরুরি, তখনই আমি তাতে পূর্ণরূপে সাফল্য পেয়েছি।

    আমাকে, এই হঠকারী লোকেদের পথে আনার জন্য কঠোরভাবে সামরিক শক্তি দেখাতে হয়েছে। বংগসের চোর-ডাকাতদের দমনেও আমি সফল হই।

    কাবুলের পূর্বে ৪-৬ মাইল দূরে নিজেরৌ নামে একটি এলাকা আছে সেখানকার জন্য সোজা সড়ক চলে গেছে। এখানে দুটি মোড়ে ছোট-ছোট বসতি রয়েছে। দুই বসতির বিশেষত্ব হলো এই যে, সেখানে আলাদা-আলাদা মৌসুমের আভাস দেওয়া হয়। যদিও বসতিগুলোর মধ্যে দূরত্ব বেশি নয়, তা সত্ত্বেও সেখানকার পার্বত্য এলাকার আলাদা-আলাদা বিশেষত্ব থাকার কারণে বসতিগুলোর একটিতে গরম মৌসুমের আভাস হয় তো অন্য বসতিতে শীতের।

    এই বসতিগুলোতে ছোট ছোট পাখি ভরে রয়েছে। তারা সকাল বেলা দলে-দলে ঋতু-অনুকূলতার কারণে এক বসতিতে পৌঁছে যায় তো দুপুরের সময় অন্য বসতিতে। এইভাবে পাখিদের প্রবাসের জন্য খুব কম দূরত্ব অতিক্রম করতে হয়।

    তারা পাখি-শিকারিদের থেকে খুব সতর্ক থাকে। শিকারিদের থেকে দূরত্ব বজায় রাখার জন্য তাদের খুব কুশলী হতে হয়, যারা তাদের ক্ষতি করতে পারে। তারা এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে পৌঁছানোর জন্য খুব দ্রুত উড়ে চলে। প্রয়োজন পড়লে তারা দলে-দলে পাহাড়তলিতে বেলে মাটি ও পাথরের উপর গিয়ে বসে।

    তবে, সকাল-সন্ধ্যার প্রবাসী পাখিদের শিকারের লোভে বসে থাকা শিকারিরা উৎকণ্ঠায় থাকে। তারা তাদের ধরার জন্য গোপন জায়গায় জাল পেতে রাখে। তিন-চার গজ দূরে-দূরে জালকে বাঁশের খাপচির সাহায্যে বেঁধে দাঁড় করিয়ে রাখে।

    লুকিয়ে থাকা শিকারিরা এই আশায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকে যে, কখন পাখিদের দল এই জালে এসে পড়বে। পাখিদের দল সেখানে পৌঁছানোর সাথে-সাথেই জাল উপর থেকে নিচে নামিয়ে দেওয়া হয়। পাখিরা আওয়াজ শুনতেই ফুরফুর করে ওড়া মাত্রই ওদের জালে আটকে যায়। শিকারিদের জাল থেকে পাখি ছাড়ানোই যা সময়। তারপর তাদের খাদ্য বানিয়ে ফেলে।

    নিজরৌ থেকে কিছু দূরে আলাসা এলাকার বসতি। এখানে আনার ফলে। তবে এ আনার কোনো বিশেষ জাতের নয়। তার চাহিদা স্থানীয় ক্ষেত্রেই সীমিত থাকে। হিঁদুস্তানের বাজারেও বিক্রির জন্য পাঠানো হয়। সস্তা হওয়ার কারণে তার চাহিদা থেকেই যায়। এখানে আঙুর উৎপাদনও হয়। আঙুরের প্রশংসাও করা যায় না, তবে সস্তা হওয়ার কারণে বাজারে তার ভালো চাহিদা আছে। আঙুর নগদ বিক্রি থেকে বেঁচে গেলে তা দিয়ে শরাব তৈরি করা হয়। নিজরৌয়ের শরাবের মোকাবিলায় এখানকার তৈরি আঙুরের শরাব দ্রুত নেশা ধরায় এবং স্বাদে উমদা হয়।

    বদরৌ আলাসাল সংলগ্ন একটি এলাকা। এখানকার অধিবাসীদের কাফির বলা হয়। এখানে ফল জন্মায় না। তারা মক্কার চাষ করে তারই উপর জীবিকা নির্বাহ করে। পার্বত্য বসতিগুলোতে বসবাসকারীরা হাজারা উপজাতির লোক বলে পরিচিত।

    কাবুলে পূর্ণ আধিপত্য প্রতিষ্ঠার পর প্রায় আট লক্ষ লোক রাজস্ব দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করে।

    কাবুলের পার্বত্য ক্ষেত্রে ওই রকমই শৃঙ্খলাযুক্ত খাড়া এবং বীহড় রয়েছে যেমনটি হিসার, খুতলাম ও ফারগানা, সমরখন্দ ও মোগলিস্তান উপত্যকা। সকল পর্বতমালায় খাড়া পাহাড়ও আছে এবং সমতলও।

    নিজরৌ, লামঘানাত ও সওয়াদের পাহাড়ি ক্ষেত্র কিছুটা ভিন্ন রকমের। এগুলো অপেক্ষাকৃত বেশি উঁচু নয়। এখানে সায়প্রাস ও দেবদারু এবং জায়তুন বৃক্ষের আধিক্য দেখা যায়। এখানে জন্মানো ঘাস শক্ত ও লম্বা হয়। এখানে জন্মানো ঘাস না ঘোড়া চরার কাজে আসে, আর না ভেড়ার।

    এখানকার পাহাড় খাড়া না হয়ে ঢালু হয়। এই পাহাড়গুলোর কঠিন পাথরের হয়। তা ভেঙে পড়ে না। এই পাহাড়গুলোতে প্রচুর চামবাদুড়ের বাস। এখানে হিঁদুস্তানি পাখিদের দেখা মেলে-তোতা, ময়না, ময়ূর, লুজা ইত্যাদি নামে এরা পরিচিত। লেংগুর, নীলগাইও এখানে হিঁদুস্তান থেকে এসে যায়। এক বিশেষ রকমের হরিণও এখানে পাওয়া যায়। এদের পশম হয় ভেড়ার মতো, উচ্চতাও ভেড়ায় মতো। এর নাম দেওয়া হয়েছে পাহাড়ি হরিণ। এই পাহাড়ি হরিণ হিঁদুস্তানে পাওয়া যায় না।

    কাবুলের পশ্চিমে জিন্দান-ভ্যালির মতো বিপজ্জনক উপত্যকা রয়েছে। এগুলোর নাম গর্জওয়ানও ঘরজিস্তান। সে সবের নিচে বিস্তৃত তৃণভূমি রয়েছে। এখানকার ঘাস শুধু ময়দানেই নয়, পাহাড়ের উপর পর্যন্ত জন্মায়। পাহাড়গুলোতে সবুজ গাছপালা জন্মায়। এখানকার ঘাস ঘোড়ার খুব পছন্দ। উপত্যকার উপরে চতুর্দিকে সমতল এলাকায় ভালো চাষবাস হয়। চতুর্দিকের সমতল এলাকার বাসিন্দারা প্রধানত ব্যবসায়িক ভিত্তিতে ঘোড়া ও ভেড়া পালন করে। এই দুই পশুকে সকাল হলেই খোলা ময়দানে ছেড়ে দেওয়া হয়। এরা দিনভর সবুজ খাস খেয়ে উপরপূর্তি করে সন্ধ্যায় সেই আলয়ে ফিরে আসে। এদের দেখ-ভালের জন্য রাখালেরও বিশেষ দরকার পড়ে না।

    কাবুলের দক্ষিণ-পূর্ব দিকে খাজা ইসমাঈল দাস্ত-র পাহাড় রয়েছে। এ পাহাড়গুলো ছোট-ছোট। এই পার্বত্য-ভূমি সবুজ-বিহীন, এখানে পানির অভাব রয়েছে। গাছের দেখা মেলে না। এই পাহাড়গুলো এবড়ো-খেবড়ো এবং কুরূপ। কোনো কাজে আসে না।

    দুনিয়ায় এমন দেশ খুব কমই হবে যেখানে এরকম ব্যর্থ পাহাড় শ্রেণি থেকে থাকবে। যা কোনো ভাবে মানুষের জন্য উপযোগী নয়।

    কাবুলের জ্বালানি কাঠ

    কাবুলে যেসকল এলাকায় প্রচুর তুষারপাত হয়, ওই সকল এলাকায় সৌভাগ্য বশত সেখানকার আশপাশেই খুবই উত্তম প্রকারের জ্বালানি কাঠও পাওয়া যায়। এই কাঠগুলো খনজক, বিসুত, বাদামচা ও কারকন্দের হয়। এগুলোর মধ্যে খনজক কাঠ সবচেয়ে উমদা হয়। এটি আগুনের শিখা হয়ে জ্বলে এবং তার সুগন্ধিও খুব সুন্দর হয়। পুড়ে শেষ হয়ে যাবার পর তার ছাই বহুক্ষণ পর্যন্ত গরম থাকে।

    বিলুতও খুব ভালো জ্বালানি কাঠ। এর শিখা তো কম হয়, তবে তা অনেকক্ষণ পর্যন্ত জ্বলে, এর ছাইও বহুক্ষণ যাবৎ গরম থাকে। ছোট জায়গার জন্য এই কাঠ সবচেয়ে উপযোগী বলেই সিদ্ধ হয়, তবে বড় জায়গায় জ্বালানোর জন্য খনজক কাঠই ভালো। বিলুতের সুগন্ধও ভালো হয়। বিলুত গাছের কাঠের একটা বিশেষত্ব বিশেষভাবে আমার নজরে পড়ে তা হলো এর শুকনো ডালে যদি পাতা সমেত আগুন জ্বালিয়ে দেওয়া হয় তাহলে তা জ্বলার সময়ে আশ্চর্য রকমভাবে নানা রকমের আওয়াজ করে জ্বলতে জ্বলতে উপর থেকে নিচের দিকে আসে। জ্বলা শেষ না হওয়া পর্যন্ত তার আওয়াজ বন্ধ হয় না। লোকে এগুলো এভাবেই জ্বালাতে খুব আনন্দ পায়।

    এখানে বাদামচা জন্মায়। এর কাঠ খুব মেলে। সাধারণভাবে এর কাঠ জ্বালানি রূপে এবং তুষারপাতের দিনগুলোতে সাধারণত বাড়িঘর গরম রাখার উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়। তবে তা দ্রুত পুড়ে শেষ হয়ে যায়।

    কুরকন্দ কাঠ কাঁটাদার এবং ঘন ঝাড়রূপে পাওয়া যায়। এটি খুব ভালোমতো শুকিয়ে নেওয়ার পর তবে জ্বালানো হয়। এ কাঠ বিশেষ করে গজনী এলাকায় জন্মায়, এ কাঠ গজনীবাসীদের জ্বালানি।

    কাবুলে সেচের সাধন

    কাবুলের ফল ও কৃষি উৎপাদক এলাকা প্রধানত পার্বত্য এলাকার নিচেই অবস্থিত। এই এলাকায় প্রাকৃতিকভাবে সেচের জন্য পাহাড় থেকেই পানি পাওয়া যেতে থাকে। পাহাড়ের নিচে পার্বত্য ক্ষেত্র হোক কিংবা সমতল এলাকা, সকল জায়গাতেই ছোট-বড় লোকালয়ের রূপে লোকেরা বসতি গড়ে তুলেছে। প্রাকৃতিকভাবে পাহাড়ি বাঁধের কাজ করে যাওয়া পর্বতগুলোর মধ্যে কিয়িক এবং অহিল-এর নাম বিশেষভাবে উল্লেখ করা যেতে পারে।

    এই পাহাড়ি উপত্যকার প্রান্তে বসবাসকারী লোকেরা শীত ও গ্রীষ্মকালের জন্য আলাদা-আলাদা ঠিকানা বানিয়ে রেখেছে। তারা গ্রীষ্মকালে উঁচু স্থানে নির্মিত ঠিকানায় গিয়ে বসবাস করতে থাকে এবং শীতকালে নিচের সমতল এলাকায় এসে যায়। এরা বড় পশম ওয়ালা ভেড়া পালন করে, যা থেকে প্রচুর পরিমাণে পশম পাওয়া যায়, বাজারে যা ভালো দামে বিকোয়।

    কিছু পাহাড়ি প্রজাতির মানুষ জন্মগতভাবে সাহসী ও বাহাদুর হয়। এরা চাষবাস বা পশু পালনের উপর নির্ভরশীল না থেকে ঘুরে ঘুরে শিকারি জীবন যাপন করাকেই প্রাধান্য দেয়। কেউ-কেউ শিকারি পাখি ও শিকারি কুকুর পালন করে। শিকারি পাখিদের এরা শিখিয়ে রাখে। তারা তাদের জন্য পালিত হয়ে যায়। পালিত পাখি তার মালিকের ইশারায় আকাশে উড়ে যায় এবং শিকার রূপে তার মালিককে পাখি ধরে এনে দেয়।

    এরকম শিকারি প্রজাতির লোকেরা নিজেদের কুকুর ও শিকারি পাখিদের সঙ্গে নিয়ে খুর্দ-কাবুল (ছোট কাবুল) ও সুর্খ-রুদর দিকে শিকারের জন্য বেরিয়ে যায়। ওই এলাকার দুর্গম চরণ-ক্ষেত্রে দলে-দলে বুনো গাধাদের তারা পেয়ে যায়।

    গ্রীষ্মকালে কাবুলের সমতল এলাকায় স্থায়ী রূপে বসবাসকারীদের মধ্যে খুব ভিড়-ভাড় হয়ে ওঠে। প্রবাসী পাখি বারান তটে এসে বিচরণ করে। এখানকার সৈকত এ জন্যই পছন্দ যে, এই নদীর আশপাশ, পূর্ব-পশ্চিমে কোথাও পাহাড় নেই। কেবলমাত্র হিন্দুকুশ পর্বতমালার প্রান্ত ভূমিটিই সেখানে রয়েছে। এই এলাকায় না আছে কোনো জনবসতি আর না আছে কোনো চারণ-ক্ষেত্র। অতএব, এখানে আগত প্রবাসী পাখিরা সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে বিচরণ করতে পারে। ওই সময় পর্যন্ত তারা সেখানে ডেরা বেঁধে থাকে যতদিন পর্যন্ত না উত্তুরে হাওয়া বইতে শুরু করে কিংবা হিন্দুকুশ পাহাড়ে আবার মেঘের গর্জন শোনা যায়। পাখি শিকারিদের জন্য বিস্তৃত ক্ষেত্রে প্রবাহিত বারান নদীর দুই তট প্রবাসী প্রজাতির পাখিদের শিকারের জন্য খুবই আকৃষ্ট করে। শিকারিরা এই দুই তটে মালার্দ প্রজাতির পাখিদের শিকার করতে খুব পছন্দ করে। কেননা তারা খুব বড়-বড় ও স্বাস্থ্যবান হয়। এখানে সারস ও বগুলার মতো বড় পাখিদের দলও ঝাঁকে ঝাঁকে আসে।

    পাখি শিকারিদের আকর্ষণীয় ফন্দি

    কাবুলের পাখি শিকারিদের পাখি শিকারের ফন্দি-ফিকিরও বেশ আকর্ষণীয়। এরা অনেক দূর পর্যন্ত ছুড়ে দেওয়া তীর ফাঁদ রূপে সুতোয় বেঁধে ব্যবহার করে। নিক্ষিপ্ত তীরের পিছনের অংশে ফাঁদ পাতা সুতোর একটি মুখ বাঁধা থাকে। হাওয়ার অভিমুখ দেখে তীরকে নদীর মধ্য ভাগে নিক্ষেপ করা হয়। মধ্য ধারায় পাখিদের দল সাঁতার দিতে থাকে। তীর ওদের মাঝখানে কোথাও গিয়ে পড়ে। শিকারির উদ্দেশ্য তীর দিয়ে পাখিদের জখম করা নয়, বরং তার পিছনে বাঁধা ফাঁদে ফেলা।

    নিক্ষিপ্ত তীর নিজেদের মধ্যে পড়ার আওয়াজ শুনতেই পাখিরা ফুরফুর করে উড়তে শুরু করে, তখনই বেঁধে দেওয়া ফাঁদে তাদের পাখা বা গলা আটকে যায়। পাখি যতই ফরফর করে ততই তারা আটকা পড়ে। ফাঁদের বাঁধন কিছুটা এই রকমের হয় যে, জালে আটকে গিয়ে বেশি নড়াচড়া করলে তাদের বাঁধন আরো কসে যায়।

    ফাঁদে আটকা পড়া পাখিরা অসহায় হয়ে পড়ে তখন তাদের ধীরে-ধীরে কিনারায় টেনে আনা হয়। এক-একবার কয়েকটা করে পাখি ফাঁদে পড়ে চলে আসে।

    তারপর কিনারে টেনে এনে ফাঁদ ঢিলা করে পাখিদের ধরে নেওয়া হয়।

    এ ধরনের শিকার শুধু দিনে নয়; বরং রাতেও হয়। তা সে রাত আলো হোক আর আঁধারি হোক উভয়তেই শিকারিরা তাদের কাজ করে যায়। আঁধার রাত বরং কিছুটা লাভজনক হয়… তাতে পাখিদের বাঁচার রাস্তা কম থাকে, অতএব, তারা অধিক সংখ্যায় ফাঁদে পড়ে যায়।

    আমি একদিন রাতে বারান নদীর তটে গিয়ে এরকমের তীর ও ফাঁদ পেতে শিকারের ঢং দেখলাম।

    এখানে ক্রীতদাস শিকারিদের শিকারের কাজ বাধ্যতামূলক, তাদের কেবল তাদের মালিকদের সঙ্গে শিকারের কাজে লাগানো হয়। ওই এলাকায় ক্রীতদাসদের বস্তি রয়েছে। দু-তিন হাজার পরিবারের সেখানে বসবাস। ওখানে যারা বসবাস করে তাদের সম্বন্ধে কথিত আছে যে, তাইমুর বেগের মুলতান আক্রমণের সময় তারা মুলতান থেকে পালিয়ে এসে বারান নদীর তটে এসে বসত গড়ে তুলেছিল। পাখি ধরা তাদের বংশগত পেশা।

    শিকারি পেশার কিছু লোক তাদের বস্তি থেকে বাইরে গিয়ে ছোট-ছোট পুকুর কেটে ৫-৬ টি পালিত পাখি তাতে ছেড়ে দিয়ে রেখে দেয়। ওই পুকুরগুলোতে সাঁতাররত পাখিদের দেখে প্রবাসী পাখিরাও সেখানে নেমে আসে। তাদের নেমে আসার পর জাল ফেলে তাদের সহজে ধরে ফেলা হয়।

    শুধু পেশাদার শিকারিরাই পাখি ধরার কাজ করে না, বারান নদীর বসবাসকারী সকল লোকেরাই পাখি ধরার শখ রাখে। শিকারিদের শিকার করার এই ধারাবাহিকতা বসন্ত ঋতু পর্যন্ত চলতে থাকে।

    বারান নদীর তটে বসবাসকারী লোকেরা পাখি শিকারের সাথে সাথে ওই নদীতে মাছ শিকারও করে। অদ্ভুত ব্যাপার হলো এই যে, তারা বড়শি দিয়ে মাছ ধরে। মাছ ধরার জন্যও পাখি ধরার যুক্তি অবলম্বন করা হয়, এ যুক্তি সম্পূর্ণভাবে কার্যকর হয়ে থাকে।

    যখন প্রবাসী পাখিদের শিকার করার মওসুম না থাকে তখন অবশিষ্ট দিনগুলোতে পেশাদার আজন্ম শিকারিরা, সুতো গিয়ে জাল বোনার কাজে লিপ্ত থাকে। তারা শিকার মওসুমে এতটা কামিয়ে নেয় যে, খালি এবং আগামী মওসুমের প্রস্তুতি পর্যন্তকার দিনগুলো খুব ভালোমতেই গুজরান করে নেয়।

    পাখিদের পাখনা সাজানো রঙিন টুপির কাজে লাগানোর জন্য রফতানি হয়। পাখনাওয়ালা টুপি তৈরির কেন্দ্র হলো হিঁদুস্তান। সেখানে গিয়ে পাখনা বেচলে ভালোমতোই ধন মিলে যায়।

    বসন্ত মৌসুমে মাছ শিকারের যুক্তি

    পাহাড়ি উপজাতিরা বসন্ত মৌসুমে মাছ শিকারের পক্ষে অদ্ভুত যুক্তি দেখায়, যা আমি কাবুলেই দেখেছি।

    বসন্ত ঋতু আসা পর্যন্ত কিছু বিশেষ রকমের উদ্ভিদ এতই মোটা হয়ে যায় যে, তারা ‘বুনো গাধার লেজ’ বলে অভিহিত হয়ে গেছে। ওই সময়ে তারা পূর্ণ বিকশিত অবস্থায় পৌছে যায়। তারা ফুল ও বীজ দেওয়া শুরু করে দেয়। লোকেরা এমন উদ্ভিদ বা গাছপালাগুলো ১০-২০ বোঝা করে কেটে নেয়। এ ছাড়া ২০-৩০ বোঝা করে, শায়বাক গাছের ডাল কেটে বাড়ি নিয়ে আসে।

    ডালগুলো এক সঙ্গে বেঁধে, তার উপর গাধার লেজওয়ালা ঘাস বিছিয়ে তাকে গাদার রূপ দেয়। এগুলো তখন ছাতার মতো দেখায়। এগুলো আসলে ঘর-ছাওয়ার ছাদ নয়; বরং নদীর পানিতে শিকার করা মাছেদের বিছানা হয়। এগুলো শুকিয়ে আসা নদীর কম গভীরতা বিশিষ্ট এলাকা থেকে কিংবা কর্দমময় ভূমিতে ওই বিছানার সাহায্যে আগে চলে যাওয়া হয়। তারা এমন স্থানে পৌঁছায় যেখানে নদীর পানি শুকিয়ে যায়। মাটি পরিষ্কার হওয়ার পর কঠিন হয়ে যায়। তারা এমন ভূমিতে আঙুল দিয়ে গর্ত করে তাতে পানি ঢেলে দেয়। পানিতে বুদবুদ সৃষ্টি হলেই তারা বুঝতে পারে নিচে মাছ আছে। মাছের অস্তিত্ব টের পেতেই তারা সেখানে গর্ত করে তাদের ধরে নেয়।

    এইভাবে ধরা মাছগুলো বড় হয়। পানি শুকিয়ে গেলে কর্দমাক্ত ভূমির নিচে গিয়ে তারা তাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখে। নদীতে পানি ভরে গেলে তারা পুনরায় মুক্ত পানিতে জীবন গুজরাতে থাকে।

    নদীর নরম ভূমিতে গিয়ে তারা তাদের কবল থেকে বেঁচে থাকে, তবে শিকারিদের হাতে তারা কিছু শিকারও হয়ে যায়।

    এই ধরনের মাছ শিকারে গুলবাহার ও পরওয়ান ক্ষেত্রের লোকেরা সিদ্ধহস্ত হয়।

    লামঘানাতের লোকেরা শীতের মৌসুমে, মাছ প্রাপ্তির জন্য অদ্ভুত উপায় অবলম্বন করে। এরা ঘরের মধ্যে গভীর গর্ত করে রাখে। গর্ত পর্যন্ত পানিস্রোত পৌঁছানোর ব্যবস্থা রাখে। গর্তের নিচের স্তরে ছোট-বড় মাঝারি আকৃতির পাথর বিছিয়ে দেয়। দেওয়াল পাথর দিয়ে আটকে দেয়। দেওয়াল পাথর দিয়ে ঘেরা থাকায় মাছ সুড়ঙ্গ করে কোনো দিকে যেতে পারে না, তবে নিচে পাথর বিছানোর ফলে তারা পাথরের গর্তের ফাঁকে গিয়ে প্রয়োজনে বিশ্রাম নিতে পারে, তারপর উপরে এসে যায়।

    ছোট মাছ পুকুর-রূপী গর্তে পালন করে। শীতকালে প্রয়োজন মতো ত্রিশ-চল্লিশটা করে মাছ সেখান থেকে ধরা হয়। মাছ কতটা বড় হয় বা হয়েছে পালনকারীরা তা ভালোমতোই জানে। প্রয়োজন হলে তারা সব মাছই ধরে নেয়।

    বিশ্বস্ত মুকিম ফিরে যাবার জন্য বাবুরের কাছ থেকে অনুমতি নিলেন

    আমার কাবুল বিজয়ের কিছু বিশেষ ঘটনার মধ্যে একটি স্মরণীয় ঘটনা আছে-আমার এক বিশ্বস্ত জানবাজ, মুকিম নামক ব্যক্তির আমার কাছ থেকে চলে যাওয়ার অনুমতি নেওয়া। আমার দুঃখ-কষ্টের দিনগুলোতে সব সময় সে আমার সঙ্গে ছিল।

    মুকিম এসে আমাকে বলল—

    ‘আমি কিছুদিনের জন্য আমার বাপ, বড় ভাই ও আত্মীয়-পরিজনদের সঙ্গে দেখা করতে যেতে চাই…। কাবুলে আমার মন লাগে না।’

    ‘মন না লাগে তো তোমাকে কান্দাহারের প্রশাসক করে পাঠিয়ে দিই…।’

    আমি তার সামনে প্রস্তাব রাখলাম-’সেখানে তুমি তোমার সব মূল্যবান জিনিসপত্র সঙ্গে করে নিয়ে বসে যেতে পারো।’

    তবু সে কাবুল দেশ থেকে চলে যাবার কথার উপর অনড় রইল। আমাকে তার চলে যাবার অনুমতি দিতে হলো।

    পরে আমি খোঁজ-খবর নিয়ে জানতে পারি যে, আফগান ও কাবুলবাসীদের সঙ্গে তার বনিবনা হচ্ছিল না, যেখানে দুনিয়া-জাহানের আরাম-আয়েশ তাকে পেয়ে বসেছিল। সে মির্জাদের মধ্যে, মির্জাদের নগরীতে গিয়ে সুখ-শান্তিতে বাস করতে চাচ্ছিল। সে আমার পুরনো কর্মচারী ছিল। আন্দিজানের দিনগুলোতে সে আমার সাথি ছিল। তাকে যেতে দেখে আমার ভীষণ কষ্ট হচ্ছিল। আমি এও ভাবছিলাম যে, মুকিম চলে যাবার পর লোকে আমার বিষয়ে ভাববে যে, আমি আমার দুর্দিনের সাথিকে পুরো সুখ-সান্ত্বনা দিতে পারিনি, যার কারণে সে আমাকে ছেড়ে চলে যাচ্ছে। লোকেদের মধ্যে এ বার্তাও যাবে যে, আমি আমার পুরাতন সেবককে খুশি রাখতে পারিনি।

    তাছাড়া তাকে জোর করে নিজের কাছে রেখে দেওয়াটা না-ইনসাফি ছিল। তার আমার সঙ্গ ছেড়ে যাবার পর আমি অনুভব করছিলাম যে, আমার দুশমনেরা না-জানি কত কথা তৈরি করবে।

    একটি তুর্কি প্রবাদের কথা আমার স্মরণে আসছিল—’দুশমনেরা পিছনে যত ক্ষতি করে, তা তো স্বপ্নেও ভাবা যায় না।’

    ফারসি প্রবাদও আমার মনে আসছিল—

    ‘নগরের দ্বার তো বন্ধ করা যেতে পারে, তবে দুশমনের মুখ কখনো বন্ধ করা যায় না।’

    আমার বিশ্বস্ত পুরাতন ভৃত্য মুকিম আমাকে কাবুলের শাহী ও শান্তিপ্রদ দিনগুলোতে কেন ছেড়ে চলে গেল? এ কথা কখনোই আমার বোধগম্য হলো না। মনের সান্ত্বনার জন্য এ কথা ভাবাই যথেষ্ট ছিল যে, এখানকার আবহাওয়া তার পছন্দ হয়নি অথবা তার পরিবার-পরিজনদের জন্য সে কষ্ট পাচ্ছিল।।

    পরিবার-পরিজনদের জন্য কষ্টের কথাটিই বেশি মজবুত ছিল।

    রাজস্ব উসুলের কথা

    কাবুলে শাসন কায়েমের পর আমি রাজস্ব উসুলের জন্য নতুন নিয়ম তৈরি করলাম। কাবুলে আমি সমরখন্দ, কুন্দুজ ও হিসারে বাণিজ্য করতে আসা জাতিগত ঘোড়সওয়ারদের উপরও আনাজের রূপে রাজস্ব উসুলের আদেশ দিয়ে দিলাম।

    আনাজ (খাদ্যশস্য) উৎপাদনের জন্য ওই সময়ে কাবুলের অবস্থা অন্য খাদ্যোৎপাদক এলাকাগুলোর তুলনায় অনেক দুর্বল দিল। আগত বণিকেরা রাজস্ব রূপে খাদ্য-শস্যের বস্তা নিজেদের সঙ্গে করে নিয়ে আসতে লাগলেন। এর ফলে কাবুলবাসীদের অনেক স্বস্তি মিলল। কাবুলবাসীরা ‘তলওয়ার’-এর উপর বেশি মনোযোগ দেয়, চাষ-বাসের দিকে কম। এমনিতেই তো ফল এবং অন্যান্য ফসল অধিক হয় তবে খাদ্য-শস্য উৎপাদনের মামলায় তারা সম্পূর্ণরূপে ব্যবসায়ের উপর নির্ভরশীল থাকে। খাদ্য শস্য কিনে নিয়ে আসা খুব সহজ কাজ ছিল না। তবে রাজস্ব রূপে খাদ্য পণ্য গ্রহণ অনেক সহজ ছিল, একে আগতদের দিতেও সুবিধা হতো এবং ঘরে বসে কাবুলের লোকেদের প্রয়োজনের পূর্তিও হতো। আমার এই ব্যবস্থার পর রাজস্ব রূপে প্রথম বর্ষেই ৩০,০০০ ঘোড়ার বোঝার সমান খাদ্যশস্য কাবুল, গজনী ও অন্যান্য ছোট ক্ষেত্র থেকে পাওয়ার গেল।

    ওই সময়ে গ্রামে খাদ্য প্রাপ্তির সাধন কাবুলবাসীদের জন্য দুষ্কর ছিল। তারা নিজেরা খাদ্য-শস্যের চাষ করতে পারত না। গিয়ে অন্য দেশ থেকে কিনে আনার উপর নির্ভরশীল ছিল, যা দুষ্কর ছিল। তবে এখন তার প্রাপ্তি সহজ হয়ে গেল।

  • ত্রয়োদশ অধ্যায় : হিঁদুস্তান অভিমুখে বাবুর

    ত্রয়োদশ অধ্যায় : হিঁদুস্তান অভিমুখে বাবুর

    ত্রয়োদশ অধ্যায় : হিঁদুস্তান অভিমুখে বাবুর

    কাবুলে আমার শাসনের শুরুআতির দিনগুলোতে আমি কিছু সংস্কারমূলক কাজ সম্পন্ন করি। লোকেদের সুদিন এল। কুসংস্কারগুলো নির্মূল করলাম। যাতায়াত ব্যবস্থার সুবিধার দিকে মনোযোগ দিলাম।

    কাবুলের জনতার পূর্ণ বিশ্বাস লাভ করার পর আমি সেনা ভর্তি করলাম। কাবুলের প্রত্যেক ভূ-ভাগ থেকে সৈন্য সংগ্রহ করলাম। সুসংহত সেনাবাহিনী গঠন করার পর সেনা কর্তাদের সঙ্গে এ বিষয়ে পরামর্শ করলাম যে, এই সামরিক

    শক্তির ব্যবহার কোথায় করা উচিত? অধিকাংশের রায় ছিল—হিঁদুস্তান অভিমুখে চালনা করা উচিত।

    শাবান (আরবি মাস) মাসে, জানুয়ারি, ১৫০৫ এ আমি অশ্বপৃষ্ঠে সওয়ার হলাম। আমার অশ্বারোহী সেনা তাদের ঘোড়াগুলো হিঁদুস্তান অভিমুখে চালিয়ে দিল।

    আমরা বাদাম চাশমা ও জগদলিকের সড়ক ধরলাম এবং ছ’দিনের পড়াওয়ের পর আদিনাপুর পৌঁছে গেলাম।

    ওই সময় পর্যন্ত আমি হিঁদুস্তানের কোনো গরম শহর দেখিনি। কাবুল হিদুস্ত ানের সীমান্ত ক্ষেত্র ছিল নিংগনহর। আমরা ওই পর্যন্ত পৌঁছেছিলাম। এখন আমার সামনে এক নতুন দুনিয়া দেখার সুযোগ ছিল। সেখানকার তৃণভূমি, সেখানকার গাছপালা, পশুপাখি সবকিছু আমার দেখা দুনিয়া থেকে আলাদা ছিল।

    লোকেদের রীতি-রেওয়াজ আমার জন্য নতুন ছিল। উপজাতিদের, যাযাবার শ্রেণির লোকেদের দলগুলোর জীবনযাত্রার ঢং সম্পূর্ণ অন্য রকম ছিল।

    প্রতি পদে পদে আমাদের বিস্মিত হতে হচ্ছিল। প্রকৃত সত্য ছিল এই যে, ওখানকার ভূমিই ছিল বিস্ময়কর।

    ভারত-সীমায় বাবুরের প্রবেশ

    নাসির মির্জা, যে সেনাদলের সঙ্গে আমার আগে আদিনাপুর পৌঁছে গিয়েছিল, সেখানে সে যাত্রা বিরতি করে আমার জন্য প্রতীক্ষায় রইল। আমি সেখানে কিছুটা দেরিতে পৌঁছাতে পেরেছিলাম, এর কারণ হলো, আমার পিছনে পড়ে যাওয়া সৈনিকদের জন্য আমি যাত্রা-বিরতি করে অপেক্ষা করেছিলাম। তাদের সঙ্গে নিয়েই অগ্রসর হয়েছিলাম।

    সবাই এসে একত্রিত হবার পর আমি জুলশহলের তটবর্তী এলাকা পেরিয়ে এলাম। তারপর, কুশগম্বুজ পাহাড়ি উপত্যকায় উঠে গেলাম।

    ওখান থেকে নাসির মির্জা আমার পিছু ধরে অগ্রসর হওয়ার নীতি গ্রহণ করল। এর মূল কারণ ছিল, তার নেতৃত্বাধীন সেনা তার পিছনে ছিল। তাদের খাওয়া-দাওয়া ও তাদের উৎসাহিত করে অগ্রবর্তী হওয়ার কাজ সে নিপুণভাবে করতে পারত। তার নেতৃত্বাধীন সেনা সংখ্যা অনেক বড় ছিল।

    কুশগম্বুজ পাহাড়ি উপত্যকা পার হয়ে আসার পর আমরা গরম চশমা নামক স্থানে গিয়ে পৌঁছালাম। ওই এলাকার মুখিয়া (প্রধান ব্যক্তি বা দলপতি) তার পুরো কাফেলা সহ আমার অধীনতা স্বীকার করে নিলেন। আমি তাকে পথ-প্রদর্শক রূপে আমার সঙ্গে নিলাম।

    ১৫০৫ ঈসায়ী সনে খয়বর পায় হয়ে আমরা জাম পাহাড় পার হলাম। ওখানকার পরে গুর-খত্রী সম্পর্কে আমি কিছু কথা শুনে রেখেছিলাম। বলা হতো, ওই স্থানটি যোগী ও হিদুদের জন্য পবিত্র বিশ্বাসের ক্ষেত্র। লোকেরা দূর-দূরান্তের পথ অতিক্রম করে ওখানে তাদের দাড়ি ও মাথা কামাতে আসে।

    জামের চড়াই অতিক্রম করার পর আমরা বিলগ্রামে গিয়ে পৌঁছালাম। সেখানে বিশাল বৃক্ষ ছিল, যার উপরে উঠে পুরো নগর দেখা যেতে পারত।

    আমি বিল খত্রীর বিষয়ে মুখিয়াকে প্রশ্ন করলাম। তার নাম ছিল মালিক বু-সাদ-কমর্ত। তিনি বিল খত্রী সম্পর্কে কিছু বলতে পারলেন না। আমি শিবির ফেললাম। আমি মালিক বু সাদ (পথ-প্রদর্শক)-এর সঙ্গে আরো একবার তাঁবুর পিছনোর অংশে গিয়ে মিলিত হলাম। সেখানকার বিষয়ে বিস্তারিতভাবে পুরো জানকারি নেওয়ার কাজ করতে লাগলাম।

    তিনি বিলগ্রামের খাজা মুহম্মদ আমীনের বিষয়ে কিছু তথ্য দিলেন, অন্য কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোকপাত করলেন না। তথ্য প্রদান বাবদ তাঁর জ্ঞানের স্বল্পতার কারণ এটাই যে, তিনি যে গোত্রের মুখিয়া ছিলেন তারা শুধুমাত্র উপত্যকা, নির্জন পথ-ঘাট ও পাহাড়ি ক্ষেত্রগুলোতে বসবাস করত, সেখান থেকে কখনো সামনে এগোনোর চেষ্টা করেনি। তিনি খাজা আমীনের বিষয়ে বলেন যে, খাজা একদিন তাঁর কাছে এসেছিলেন। তাঁকে বেশি-কম বলেছিলাম, সোজা রাস্তার উপরে চলে গিয়েছিলেন।

    সৈন্যদের কোহাত অভিমুখে অগ্রযাত্রা

    আমাদের পঞ্চম সেনাদলের সেনাপতি ছিলেন বকী ছগানিয়ানী। ওই সময় তাঁর সেনাদল আগে আগে চলছিল। তাঁর সঙ্গে আমি পরামর্শ করলাম-’আমাকে কী এখন সিন্ধুনদ পার হওয়া উচিত না-কি অন্য পথ ধরা উচিত?

    বকী আমার প্রশ্নের উত্তরে বলল—

    ‘অন্য একটি পথ আছে, সেখান দিয়ে গেলে সিন্ধুনদ পার হওয়া ছাড়াই সামনে এগুনো যাবে। সে বলল, ওই স্থানটি কোহাত নামে পরিচিত। এক রাতের দূরত্বে সেখানে পৌঁছানো যাবে।’

    বকীর কথা শুনে আমি কোহাতের রাস্তা ধরার কথা চিন্তা করলাম। তবে সিন্ধু নদ পার হওয়া ছাড়াও ভারতে পৌঁছানোর আরো কয়েকটি স্থল পথও আছে একথা আমার শোনা ছিল না। এ জন্য প্রামাণিকতার জন্য আমি কিছু ঘোড়সওয়ারকে বকীর জানানো পথে দ্রুতগতিতে রওয়ানা করিয়ে দিলাম।

    তারা ফিরে এসে বকীর কথাকেই সমর্থন করল।

    তথ্য প্রমাণ হয়ে যাবার পর আমি সিন্ধু পার হওয়ার ইচ্ছা জ্ঞাপন করলাম।

    ফৌজকে জামের রাস্তা ধরে এগিয়ে চলার আদেশ দিলাম।

    বারাবফাতের (আরবি) মাস ছিল। মুহাম্মদ পার্বত্য এলাকা অতিক্রম করলাম।

    সমতল ক্ষেত্রে পৌঁছাতেই গাগলানী আফগানদের বস্তি পেলাম। এই স্থানটিকে পারাসাবার বলা হতো। আমার বিশাল বাহিনীকে পাহাড়ি উপত্যকা থেকে নামতে দেখে, পাগলানী আফগানরা স্ত্রী-পুত্র-পরিজনসহ নিজেদের বস্তি ছেড়ে পালাতে লাগল। তারা পাহাড়-বেষ্টিত এলাকার মধ্যে গিয়ে লুকাল। আমরা সেখানে শিবির ফেললাম। যখন তারা দেখল যে, আমাদের সৈন্যদের দ্বারা তাদের কোনো ক্ষতি করা হচ্ছে না তখন তাদের এক মুখিয়া ভীতসন্ত্রস্ত ভাবে আমাদের তাঁবুর মধ্যে এল।

    আমি তাকে, নির্ভয় হতে বললাম। তাকে বসিয়ে আন্তরিকতার সঙ্গে কথাবার্তা বললাম।

    তার নাম ছিল মুহম্মদ ফাজ্জি। সে সন্তুষ্ট চিত্তে আমাদের পথ দেখাতে সানন্দে রাজি হয়ে গেল।

    ওখান থেকে সামনের পথ সম্পর্কে তার খুব ভালো জানা-শোনা ছিল। সে পরবর্তীর জন্য আমাদের পথ-প্রদর্শক হয়ে গেল।

    আমি মাঝরাতে শিবির তুলে নেওয়ার আদেশ দিলাম। ভোরের আলোয় আমরা অনেকটা এগিয়ে এসেছি। পুরো সকাল হয়ে যাবার পর আমরা কোহাতে প্রবেশ করলাম।

    অসংখ্য গরু-মহিষ দিয়ে ওখানকার অধিবাসীরা আমাদের সেনা চলাচলের রাস্তা বন্ধ করে দিল। সেখানকার অধিবাসীরা ছিল আফগান উপজাতির লোক। তারা বিরোধিতার জন্য তাদের গরু-মহিষদের পিছন পিছন হইচই ও শোরগোল তুলছিল। যদিও বিরোধিতার শক্তি তাদের ছিল না, তা সত্ত্বেও জানোয়ারদের দিয়ে রাস্তা বন্ধ করে বিরোধিতার নতুন পদ্ধতি অবলম্বন করে বসেছিল। আমাদের সৈনিকেরা জানোয়ার ও মহিষসহ বিরোধ প্রদর্শনকারী আফগানদের সহজে কাবু করে ফেলল।

    তাদের সবাইকে একত্রিত করা হলো। তারা প্রাণভয়ে কাঁপছিল। আমি আমার প্রতি তাদের বিশ্বাস জন্মিয়ে দিতে গিয়ে বললাম যে, আমার পক্ষ থেকে তোমাদের কোনো ক্ষতি করা হবে না।

    বিশ্বাস পাওয়ার পর তারা আমার অধীনতা স্বীকার করে নিল। আমি তাদের সবাইকে আজাদ করে দেওয়ার আদেশ দিলাম।

    আমি সেখানে সেনা-শিবির ফেললাম। তারপর, কোহাত ভ্রমণের জন্য বেরোলাম।

    সেখানকার লোকেরা সহায়-সম্পত্তি নিয়ে খুব অবস্থাপন্ন জীবন-যাপন করছিল। তাদের বাড়ি ঘরগুলোতে মক্কা গাদা দিয়ে রাখা ছিল। আমরা সেখান থেকে পরবর্তী সফরের জন্য খাদ্য-সামগ্রীর ব্যবস্থা করে নিলাম।

    সেখানে আরো এক রাত শিবির ফেলে অবস্থান করলাম। আমি আমার সেনাকে পরবর্তী লোকেদের কাছ থেকে পরবর্তী রাস্তা ও প্রয়োজনীয় তথ্য-সামগ্রী জুটিয়ে আনতে বললাম।

    তারা পথের খোঁজ-খবর নিয়ে ফিরে এসেছিল। কোহাতে আমরা দু’রাত কাটিয়েছিলাম। সেখানকার বাসিন্দারা আমার বিশ্বস্ত হয়ে হয়ে গিয়েছিল।

    সামনের রাস্তার খবরাখবর নিয়ে ফিরে আসা লোকেদের কাছ থেকে আশাব্যঞ্জক খবর মেলেনি। এমন কোনো পথের সন্ধান পাওয়ার গেল না যেখান থেকে দরিয়া-এ-সিন্দ পার হওয়া ছাড়া হিঁদুস্তান পৌঁছানো যেতে পারে।

    সেনাপতি বকী যে তথ্য দিয়েছিল, সেই মতো কাজ করতে দেখে সে লজ্জিত হলো।

    ‘কোনো ব্যাপার নেই…।’ আমি আমার সেনাপতি বকীর কাঁধে হাত রাখলাম, তার পিঠ চাপড়ে বললাম-’দুনিয়ায় রাস্তার সন্ধানে বেরিয়ে কত বড়-বড় বিখ্যাত লোক রাস্তা হারিয়ে ফেলে। তবে, রাস্তা হারানোর পরেও এমন প্রাপ্তি মিলে গেছে যে জগৎ তাতে চমৎকৃত হয়ে রয়ে গেছে।’ আমি বলতে থাকলাম-’এমনও নয় যে, আমরা কিছু পাইনি। আমরা কোহাত নামক একটি নতুন প্রদেশ পেয়ে গেলাম। এখানকার লোকেরা সহজে আমাদের অধীনতা স্বীকার করে নিল। আমার কোহাত জয় করেছি। এমন একটা প্রদেশ আমরা পেয়েছি, যা ধন-সম্পদ ও সুখ-শান্তিতে ভরপুর। এখানে আমরা খাদ্য সামগ্রীর ভাণ্ডার পেয়ে গেছি, যা আমাদের দীর্ঘ সফরের জন্য পর্যাপ্ত…। হতে পারে যে আমরা কোহাত না পৌঁছালে এখানকার রাজ-ক্ষমতা বছরের পর বছর ধরে আমাদের হাত থেকে দূরে থেকে যেত।

    আমার যুক্তিপূর্ণ কথায় বকী সন্তুষ্ট হলো। তার বিবর্ণ চেহারা উজ্জ্বল হয়ে উঠল। সে সন্তুষ্টি ও বিশ্বাসে পূর্ণ হয়ে উঠল, এমন এক বিশ্বাস যা সেনানায়কদের মধ্যে অবশ্যই বিদ্যমান থাকা উচিত। সেনানায়কই যদি হতাশার মধ্যে ডুবে থাকে তবে তো পুরো সেনাদলই নিরুৎসাহিত হয়ে যায়।

    বীর যোদ্ধাদের কথা আমার সদা-সর্বদা স্মরণ থাকে যে, ‘যুদ্ধ অস্ত্রবলে নয়, বুদ্ধিবলে জিততে হয়।

    আমি কঠিন হতেও-কঠিনতর পরিস্থিতিতে নিজের সেনানায়কদের উৎসাহ বাড়ানোর নিয়ম মেনে চলেছি। এর ফলে, আমি সাফল্য পাচ্ছি। এর প্রমাণ এই রূপে সামনে এল যে, যখন আমার সবচেয়ে কষ্টের দিনগুলো ছিল তখনও আমার বিশ্বস্ত সাথিরা আমাকে ত্যাগ করেনি। এমন লোকেরা বরাবরই আমার সঙ্গে রয়ে গেল যাদের এ চিন্তাও ছিল না যে, তাদের পরিবার-পরিজনদের আর্থিক দুরবস্থার মধ্যে পড়ে যেতে হবে।

    আমার উৎসাহী স্বভাবের কারণে আমার এমন সাথিদের হামেশাই এমন বিশ্বাস জন্মে যাচ্ছে যে, আমি অনতিবিলম্বেই একটি বিরাট সাম্রাজ্যের মালিক বনে যাব।

    কোহাত শিবিরের মধ্যে আমি আমার সেনানায়কদের সঙ্গে এই বিষয়ের জন্য পরামর্শ করলাম যে, আমাদের পরবর্তী সফল পদক্ষেপ কী হতে পারে?

    এই বিষয়েও আলোচনা হলো যে, বংগাশ আফগানদের উপর আক্রমণ করা হবে, না প্রতিবেশী রাজ্য বন্নুর উপর আক্রমণ করা হবে। কাবুলে ফেরার উপরেও আলোচনা হলো। ফারমুল সড়কের দিকে টোহি উপত্যকা থেকে অগ্রসর হওয়ার কথাও আলোচনা হলো।

    এ সব সলা-পরামর্শের মধ্যে ইয়ার হুসাইন, তিনি দরিয়া খাঁ-র পুত্র ছিলেন, আমার কাছে একটি লিখিত প্রস্তাব রাখলেন।

    এই প্রস্তাবে তিনি লিখেছিলেন—

    ‘যদি আমাকে এ বিষয়ে শাহী-আদেশনামা প্রদান করা হয় যে, দিলজক, ইউসুফ জক ও আফগানি সেনার ফৌজি টুকরি আমার আদেশ পালন করবে তাহলে আমি কথা দিচ্ছি যে, আপনার নামের তরবারির ছায়ায় আমরা সিন্ধুনদ পার হয়ে যাব।’

    তার এই উদ্যম আমার পছন্দ হলো। আমি তাঁকে শাহী-ফরমাননামা লিখে দিলাম। তাকে এ অনুমতিও দেওয়া হলো যে, সে তার পছন্দমতো ফৌজি টুকরিকে বেছে নিয়ে নিজের নেতৃত্বে কোহাত থেকে সিন্ধু নদ পার হওয়ার জন্য দ্রুত অগ্রসর হয়ে যাক।

    থাই বা তিল অভিমুখে রওনা

    আমি কোহাত থেকে বংগাশের উদ্দেশে হংগু সড়ক ধরলাম। এই পথটি কোহাত ও হংগু উপত্যকা হয়ে যেত। এই উপত্যকার পথ দুই দিক থেকে উঁচু-উঁচু পাহাড় দিয়ে ঘেরা।

    আমরা যখন উপত্যকায় প্রবেশ করলাম তখন কোহাত পাহাড়ি এলাকার আফগান বাসিন্দারা দু’দিকের পাহাড় অবরোধ করে হইচই বাধিয়ে হামলার নীতি অবলম্বন করল।

    মালিক বুশাদ কমারী, যিনি ওই সময়, কোহাত থেকে আমাদের পথ-প্রদর্শক রূপে চলেছিলেন তাঁর অতি উৎসাহী যুবা এবং চপল যোদ্ধার গুণ ছিল। তিনি আমাকে সম্পূর্ণরূপে আশ্বস্ত করলেন যে, তাদের হইচই করে হামলার জন্য মোটেও বিচলিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। তারা লড়াকু প্রকৃতির নয়। তাদের হরকত গাধা-বাঁদরদের মতো। তারা হইচই করে পাহাড়ি উপজাতিদের একত্র তো করতে পারে কিন্তু বেশি ক্ষতি করতে পারবে না।

    মালিক রুশাদও এই রণনীতি গ্রহণ করলেন যে, কীভাবে তাদের কাবু করা যায়। তিনি উপত্যকার পথ ধরেই ডান দিককার পাহাড়ি পথে উঠে গেলেন। তারপর তার পিছু ধরে একটি বড় সেনাদলকে আসার জন্য ইশারা করলেন। উপরে পৌঁছে তিনি পাহাড়ি উপজাতিদের চারদিক থেকে ঘিরে ফেললেন। তরবারির জোরে তাদের উপর থেকে উপত্যকার নিচে নেমে আসতে বাধ্য করলেন।

    উপর থেকে নিচে নেমে আসার পর আমি এক সেনাদলকে আদেশ দিলাম পাহাড়ি উপজাতিদের ঘাড় ধরে নিয়ে আসতে।

    সৈনিকেরা তাদের ঘাড় ধরল। তাদের ঘাড়ের উপর তরবারি রেখে তারা অগ্রসর হতে লাগল। দুই দিক থেকে পাহাড় বেষ্টিত আফগানরা তাদের লোকেদের ঘাড়ে তরবারি লটকাতে দেখে হিংস্র হয়ে উঠল এবং পাথর ছুড়তে লাগল।

    তখন আমি ধরে আফগানদের মুণ্ডু উড়িয়ে দেওয়ার আদেশ দিলাম। আদেশের সাথে সাথে শত-শত মাথা ধড় থেকে আলাদা করে দেওয়া হলো। কাটা মাথাগুলো সৈনিকেরা উঁচু করে পাহাড়ি উপজাতিদের দেখাল, হামলা একেবারেই থেমে গেল।

    তারপর, এক বিস্ময়কর দৃশ্য সামনে এল। এ দৃশ্য বিস্ময়কর হওয়ার সাথে সাথেই কৌতূহলজনকও ছিল। তা ছিল সমস্ত আফগানের দল পঙ্গপালের মতো মাটিতে শুয়ে পড়ল। তারা তাদের মুখ ঘাসের সাথে রগড়াচ্ছিল আর কিছু ঘাস দাঁত দিয়ে কেটে-কেটে খাচ্ছিল।

    ‘এটা কী হচ্ছে?’ আমি মালিক বুশাদকে প্রশ্ন করলাম।

    তারা বলছে— ‘আমরা আপনাদের গরু…।’

    তারপর তিনি আরো বললেন— ‘এখানকার আফগান উপজাতিদের এইটাই পরম্পরাগত ঐতিহ্য যে, তারা কারো বিরুদ্ধে যখন বিরোধিতা ত্যাগ করে তখন তারা ঘাস ছিঁড়ে দাঁত দিয়ে কাটতে কাটতে তারা তাদের আত্মসমর্পণের ঘোষণা দেয়। তাদের এই পরম্পরা এ কথারও দ্যোতক যে পরেও তারা গরু হয়ে থাকবে। অর্থাৎ অধীনতা স্বীকার করে নেবে।

    আমাদের সৈন্যরা উপত্যকা থেকে পাহাড়ে গিয়ে কাটা মাথাগুলোকে স্তম্ভের রূপে খাড়া করে দিল। আফগানদের মাথাগুলোকে যেখানে স্তম্ভ বানানো হয়েছিল, তার পিছনে তাঁবু ফেলা হলো।

    কাটা মাথাগুলোর স্তম্ভ এ কথারই প্রতীক ছিল যে, পাহাড়ি আফগান উপজাতির লোকেরা তা দেখুক আর ভীতত্রস্ত থাকুক যে, এর পরে অধীনতা পাশ ছিন্ন করার চেষ্টা করা হলে তাদেরও ওই দশা হবে।

    এই যুক্তি ছিল মালিক বুশাদের দেওয়া। এই যুক্তি তিনি পাহাড়ি আফগানদের রীতি-রেওয়াজ ও সোচ-বিচারের সঙ্গে ভালোমতো পরিচিত থাকার ফলেই দিয়েছিলেন।

    যুক্তি সম্পূর্ণরূপে কার্যকর ছিল। ওই এলাকার সমস্ত আফগান উপজাতি অধীনতা স্বীকার করে ভবিষ্যতে ওই ধরনের হরকত না করার জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকল।

    পরদিন হাংগু পৌঁছানোর জন্য পাহাড়ি পথ অতিক্রম করলাম।

    ওখানকার পথে পড়া স্থানীয় আফগানরা সেনাদের সামনে বড়ই বিরোধ করল। তারা তাদের সংগুর এলাকা থেকে সেনাবাহিনীকে অতিক্রম করতে না দেওয়ার জন্য জীবন মরণ পণ করে ময়দানে নেমে এল। সংগুর এলাকার কথা এর আগে আমি কখনো শুনিনি।

    আমাকে অগ্রবর্তী একটি সেনাদলকে তাদের বিরুদ্ধে পাঠানো হলো। প্রথমে তাদের বোঝানোর চেষ্টা করা হলো। তারা জীবন-মরণ-পণ করেই ডেটে রইল তখন সৈনিকেরা অস্ত্র ব্যবহার করতে বাধ্য হলো এবং তাদের মুণ্ডু উড়িয়ে দিল। তাদের দু’-একশো সৈনিকের যখন মুণ্ডু গেল তখন তারা ঠান্ডা হলো।

    ওখানেও তাদের ছিন্ন-মস্তক দিয়ে স্তম্ভ খাড়া করে দেওয়া হলো। এই পরম্পরা নির্বাণের পরেই তারা অধীনতা স্বীকার করল। অবশ্য, এই এলাকার লোকেরা দাঁতে ঘাস কেটে নিজেদের ‘গো-রূপ’ প্রদর্শন করল না।

    হংগুতে এক রাতের অবস্থানের পর আমাদের সেনা থাই-য়ের উদ্দেশ্যে রওনা হলো। আমার লক্ষ্য ছিল থাই হয়ে বংশ পৌঁছানোর। ওই পথেও পাহাড়ি আগফানদের বিরোধিতার মোকাবিলা করতে হলো। সেনা আগ্রসর হয়ে তাদের বিরোধিতার জবাব দেওয়ার ইঙ্গিত করল। তবে তাদের সংখ্যা সংগুরের আফগানদের মতো ছিল না। বিরোধ প্রবল ছিল না। তারা সেনা-সংখ্যার শক্তি এবং তাদের আক্রমণের মনোভাব দেখে পালিয়ে গেল।

    বননু সড়কের সফর

    থাই বা তিল এলাকা পার হওয়ার পর অগ্রসর হওয়ার জন্য কোনো সড়ক পথ ছিল না। এবড়ো-খেবড়ো পাহাড় ও নির্জন উপত্যকা অতিক্রম করেই তবে অগ্রসর হওয়া যেতে পারত।

    বননু পর্যন্ত পৌঁছানোর জন্য এক রাতের বিশ্রামের পর যখন আমাদের সেনা সমতল এলাকায় প্রবেশ করল তখন আমার চোখের সামনে যেন পশুদের সাগর ভেসে উঠল। উটের লম্বা কাফেলা, ভেড়া ছাগলের পাল, ঘোড়াদের দল… কয়েক মাইল পর্যন্ত শুধু পশু-আর পশু …। আমি নানা রকমের পশুতে ভরা এত বড় ময়দান এর আগে আর কখনো দেখিনি। সমস্ত পথ পশুতে ভরে ছিল। একটি এলাকায় তো ভেড়াদের চারণ ক্ষেত্র নজরে আসছিল। ঘোড়ায় চড়া লোকেরা, যারা অবশ্যই মেষ-পালক ছিল, তারা ভেড়া হাঁকানো ও তাদের উপর রাখালির কাজে নিয়োজিত ছিল।

    মালিক বুশাদের নির্দেশে সেনাদল আগে বাড়ল। তিনি বাম দিকের রাস্তা ধরলেন।

    আমার সেনাবাহিনীকে এগিয়ে যাওয়ার রাস্তা দেওয়া হতে লাগল। পশুদের রাখলেরা সেনাবাহিনীকে অগ্রসর হতে দেখে দৌড়ে দৌড়ে নিজেদের পশুদের কিনারা করে দিতে লাগল। তাদের এই ব্যবহার দেখে বোঝা গেল যে, আমাদের সেনাদলের বিরোধিতা করার জন্য এসব পশু দিয়ে পথ অবরোধ করা হয়নি; বরং এটা তাদের পশু-চারণের ক্ষেত্রই।

    তাদের জন্য আমাদের সেনাদলের অগ্রবর্তী হওয়াটা কৌতূহলজনক অবশ্যই ছিল। তবে তারা কোনদিকে, কোন রাস্তায় যাচ্ছে, এ সবের সঙ্গে তাদের কোনো দরকার ছিল না।

    বননু ও ঈসা খায়েলের দেশ

    বননুর ওই বিশাল ময়দান বংগশ ও নেড়া পাহাড়ের মধ্যস্থলে অবস্থিত ছিল। এটি উত্তর দিকে। বংগশে বর্ষার আগে পাহাড়ে তুষার পড়তেই সেখানকার অধিবাসীরা সমতল এলাকায় জমি চাষ করতে এবং ফসল ফলাতে এসে যায়। এরা দক্ষিণ এলাকার অধিবাসী। এদের এলাকা চৌপার নামে পরিচিত। চৌপায় সিন্ধু তটের একটি আবাদ ছিল। পশ্চিম ক্ষেত্রের নাম দিনকোট। পশ্চিমের সমতল ভাগকে দাস্ত বলে। সেখানে বাজার বসে।

    বননুর ভূমিকে কুরানী, সূর, ঈসা খায়েল এবং নলাপল আফগান উপজাতিরা উর্বর করে রেখেছিল।

    বননুর পাহাড়ি ক্ষেত্র পেরিয়ে আরো অগ্রসর হয়ে আমি জানতে পারি যে, পাহাড়ি উপজাতিদের বহুসংখ্যক লোক আমাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর জন্য উত্তর পাহাড়ি এলাকায় এসে একত্রিত হচ্ছে। ওদের সঙ্গে আমাদের বড় টক্কর দেওয়া লাগবে। এ খবর পাওয়ামাত্রই আমরা জাহাঙ্গীর মির্জার নেতৃত্বে একটি বড় সেনাদলকে রওনা করিয়ে দিলাম।

    খবর সঠিক ছিল।

    উত্তর পাহাড়ির দিকে পৌঁছাতেই জাহাঙ্গীর মির্জার নেতৃত্বাধীন বাহিনীর উপর আফগান উপজাতির লড়াকুরা হামলা চালিয়ে দিল। সেনাদলের উপর হামলা হতেই জাহাঙ্গীর মির্জা সোজা গণহত্যার হুকুম দিয়ে দিলেন।

    দেখতে দেখতেই সৈনিকেরা শত শত লড়াকুর মাথা ধড় থেকে আলাদা করে দিল। কিছু সৈনিক এক হাতে কাটা মাথা ঝুলিয়ে রেখে আরেক হাত দিয়ে তরবারি চালাতে লাগল।

    সেখানেও কাটা মুণ্ডুগুলো দিয়ে স্তম্ভ খাড়া করে দেওয়া হলো। এটা করতেই লড়াকুরা কাবু হয়ে গেল। অনেক লড়াকুকে বন্দী করা হলো। তারা কিউরি উপজাতি গোষ্ঠীর লোক ছিল। তাদের মুখিয়া ছিলেন শাদুল খান নামক ব্যক্তি। তিনি তাঁর দাঁত দিয়ে ঘাস চেপে ধরে আমার সামনে এসে হাজির হলেন। তার দ্বারা আত্মসমর্পণ হতেই আমি তাঁর জীবন দানের ওয়াদা করলাম। বন্দীকৃত তাঁর সকল লোককেই মুক্ত করে দেওয়া হলো।

    কোহাত থেকে বংগশের মধ্যেই ভাবনা জাগতে লাগল আমার কাবুলে ফিরে যাওয়া উচিত। তবে বননু বিজয়ের পর সেখানকার সমতল এলাকা ভালো করে দেখার পর আমি অগ্রসর হওয়ার ক্রম জারি রাখলাম।

    পরদিন আমরা অগ্রসর হতে শুরু করলাম তো ঈসা খায়েল নামক একটি গ্রাম পড়ল।

    আমাদের অগ্রসর হতেই সেখানকার লোকেরা চৌপারা পাহাড়ের উপরে গিয়ে উঠল।

    তাদের মনোভাব খারাপ ছিল। আমি তাদের পিছনে আশ্বারোহী সৈনিকদের পাঠিয়ে দিলাম।

    সৈনিকরা পাহাড়কে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে তাদের নিচে নেমে আসতে বাধ্য করল। সকল ঈসা খায়েলবাসী তাদের ছাগল-ভেড়া ও কাপড়-চোপড়সহ আমাদের সামনে এসে হাজির হলো।

    তারা আতঙ্কিত ছিল, ভীতত্রস্ত ভাব তাদের চেহারাগুলোকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল। আমি তাদের কোনো ক্ষতি করা হবে না বলে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করলাম। তারপর, তাদের নিজ নিজ বাড়ি-ঘরে ফিরে যেতে বললাম। তারা ফিরে গেল। তবুও তারা তাদের মন থেকে ভয় দূর করতে পারল না। আমি সেখানকার বিশাল ময়দানে শিবির ফেলার আদেশ দিলাম। সৈন্যরা ক্লান্ত ছিল। শিবিরের জায়গাটি বড় মনোরঞ্জক ছিল।

    ঈসা খায়েল গ্রামের জীবনযাত্রা স্বাভাবিক হতে না দেখে আমি অনুভব করলাম যে, তারা এখান আমার প্রতি ভীতসন্ত্রস্ত। উদ্বেগজনক অবস্থায় নানা রকমের ভুলভ্রান্তি হয়ে যায়। ভুলভ্রান্তির সময়ে পরিণামের কথা আর চিন্তায় আসে না।

    ঈসা খায়েলবাসীদের পক্ষ থেকে আমার আশঙ্কা ছিল। যদিও তারা সমতল ক্ষেত্রের বাসিন্দা ছিল, তা সত্ত্বেও পাহাড়ি উপজাতিদের স্বভাব-প্রকৃতি তাদের মধ্যে ছিল, নইলে আমাদের ফৌজকে দেখে তারা চৌপারা পাহাড়ের উপরে গিয়ে উঠত না।

    আরেকটি অসুবিধা ছিল, তা হলো ঈসা খায়েল গ্রামের কোনো প্রধান ব্যক্তি (মুখিয়া) আমার সামনে আসেননি, তাহলে আমি তাকে নির্ভয় হওয়ার জন্য আশ্বস্ত করতাম। যিনি আমার কথা গ্রামের প্রত্যেক মানুষের নিকট পর্যন্ত সহজে পৌঁছে দিতেন।

    ঈসা খায়েলবাসীদের মনোভাব আমার কাছে ঠিক বলে মনে হচ্ছিল না। এ জন্য রাতে আমি বিশেষ সতর্কতার পরিকল্পনা নিলাম।

    যেখানে শিবির ফেলা হয়েছিল, সেখানকার ব্যবস্থা এই ঢঙে করলাম যে, ঈসা খায়েলবাসী যদি নিজেদের জান বাজি রাখার দুঃসাহসও দেখায় তাহলে তারা আমার ফৌজের সামান্যতম ক্ষতিও যেন করতে না পারে।

    শিবিরের ডান-বাম দুই দিকে সশস্ত্র প্রহরীদের পাহারা বসিয়ে দিলাম। শিবিরের মধ্য ভাগেও এমন ব্যবস্থা করা হলো যে, যদি কেউ, কোনো দিক থেকে কাউকে পাহাড়ে চড়তে দেখে তাহলে তার গতিবিধি যেন লক্ষ করা যায়। শিবিরের পাহারাদারির কাজে লাগানো সৈনিকদের কয়েক ঘণ্টার জন্য নিযুক্ত করা হলো যাতে ক্লান্তি কিংবা নিদ্রার কারণে চোখ বন্ধ করার জন্যও গাফিল না হতে পারে। কিছু লোককে জ্বলন্ত মশালসহ নিযুক্ত করা হলো।

    আমি স্বয়ং, রাতের বেলা তাঁবুগুলোর চারদিকে, সময় সময় চক্কর লাগানোর সিদ্ধান্ত নিলাম।

    জাহাঙ্গীর মির্জার নেতৃত্বাধীন দলের তাঁবু, ডান দিককার ঘেরার মধ্যে ফেলা হলো। তার সঙ্গে বকী শেরিম তগফ, সৈয়দ হুসাইন আকবর এবং অন্য বেগদের টুকরিকে রাখা হলো।

    বামদিকে নির্মিত তাঁবুগুলোর জিম্মেদারি মির্জা খানের উপর রাখা হলো। তাঁর সঙ্গে আব্দুর রজ্জাক মির্জা, কাশিম বেগ এবং অন্য বেগদেরও সেনা টুকরি রাখা হলো।

    তাঁবুগুলোর মধ্য ভাগে পেশাদার যোদ্ধাদের পরিবর্তে সাধারণ সৈনিকদের এবং তাদের সঙ্গে আমার গুরুত্বপূর্ণ সাথিদের, পরামর্শকদের এবং বংশের সঙ্গে সম্পর্কিত লোকেদের রাখার ব্যবস্থা করলাম। মধ্য অংশের সুরক্ষার নেতৃত্ব সৈয়দ কাশিমকে দেওয়া হলো। তার উপর দ্বার রক্ষকের ভার অর্পণ করা হলো। তার সঙ্গে বাবা ঔধুল্লা বিরদি এবং অন্য বিশ্বস্ত বেগদের রাখা হলো। পুরো সেনাদলকে ছয় ভাগে বিভক্ত করা হলো। প্রত্যেকের জন্য দিন ও রাতের পাহারাদারির ক্রম কেমন হবে, তা নির্দিষ্ট করে দেওয়ার হলো।

    এই ব্যবস্থা শুধুমাত্র ওই দিনের জন্য নয়; বরং পরবর্তী সময়কার জন্যও নির্দিষ্ট করে দেয়া হলো। আমি এই ব্যবস্থাকে ওই সময় পর্যন্ত চালু রাখার সিদ্ধান্ত নিলাম, যতদিন যাবৎ সেনাবাহিনীর অগ্রবর্তী হওয়ার এবং শিবির ফেলার প্রয়োজন ছিল। রাতে কোনো ঘটনা ঘটেনি।

    সকাল বেলা ওই পাহাড়ি ঘেরা থেকে শিবির তুলে নেওয়া হলো এবং পশ্চিম অভিমুখে অগ্রসরের প্রস্তুতি নেওয়া হলো।

    আমরা ওই পাহাড়ি উপত্যকা পার হলাম, যেখানে সমতল এলাকা শুকনো থাকে। দূর-দূরান্ত পর্যন্ত কোথাও পানির দেখা মিলল না। ওখানকার পাহাড়ি এলাকাও শুষ্ক। সমতল এলাকা বর্ষার পানির উপর নির্ভরশীল থাকে।

    তখনও বননু ক্ষেত্রের মধ্যে আসা সমতল এলাকা অতিক্রম করছিলাম।

    ওখান থেকে সৈনিকদের নিজেদের জন্য পানি প্রাপ্তির ব্যবস্থা করেও চলতে হচ্ছিল।

    ওই সমতল ক্ষেত্রের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল এই যে, এক দেড় গজ মাটি খুঁড়লেই পানি-স্রোত পাওয়া যেত। এই পানি-স্রোতের বৈশিষ্ট্যের বিষয়ে আমি সামনে গিয়ে জানতে পারি যে, পানি-প্রাপ্তির এই প্রাকৃতিক সাধনের ব্যবস্থা এ জন্য ছিল হিঁদুস্তানের কোনো একটি বড় নদী ওই এলাকা দিয়ে প্রবহমান ছিল। কখনো-কখনো তো দেড়-দু’হাত খুঁড়লেও পানি পাওয়া যেত।

    ওই এলাকায় আল্লাহর অসীম রহমত ছিল। ওখানে প্রবহমান নদী না থাকা সত্ত্বেও নদীর ভূমিগত পানি-স্রোতের ব্যবস্থা ছিল।

    ওখান থেকে ফারমুলের জন্য দুটি পথ ছিল—উত্তর দিক থেকে দরিয়া-এ-গজক পার হয়ে এবং পশ্চিম দিক থেকে শকবাদ উপত্যকা পার হয়ে পৌঁছে যাওয়া যেত। আমরা পরদিন সকালে শুষ্ক পথ ধরে ধরে (উপত্যকার রাস্তা) এলাকা অতিক্রম করলাম। দুপুরের মধ্যে আমরা সমতলে অবস্থিত গ্রামীণ ক্ষেত্র থেকে অতিক্রম করলাম। ওখানকার অধিবাসীরা সহজ-সরল ও শান্ত স্বভাবের ছিল। তারা দলে দলে আমাদের জন্য কাপড়, ঘোড়া ও পানাহারের বস্তু-সামগ্রী নিয়ে এল। তাদের আশা যে, তার বদলে তারা উপযুক্ত মূল্য লাভ করবে।

    আমার এবং আমার সৈনিকদের মাধ্যমে তাদের আশা পুরো করা হলো। আমি সেখানে শিবির ফেলার আদেশ দিলাম। প্রায় সন্ধ্যার মুখে শিবির ফেলা শেষ হলো। পরদিন সকাল এবং দুপুর পর্যন্ত আমরা সেখানে অবস্থান করলাম। গ্রামীণ লোকেরা ভেড়া এবং অন্য দুগ্ধবতী পশুদের নিয়ে আবারও সেখানে সকাল থেকেই এসে ভিড় করল। ওদের যেমন আশা ছিল যে, পশুর দুধের উপযুক্ত মূল্য পাওয়া যাবে, তাদের এ আশাও পুরো হলো।

    পরবর্তী সফর জারি হলো তো পথিমধ্যে আফগান সওদাগরদের কাফেলা আসতে দেখা গেল।

    ওই কাফেলা হিঁদুস্তান থেকে ফিরে আসছিল। ওই কাফেলার সওদাগররা বস্ত্র, জড়ি-বুটি, চিনি ও অন্যান্য খাদ্যসমাগ্রী কিনে নিয়ে আসছিল। তাদের বহুসংখ্যক ঘোড়ার বাচ্চাও ছিল। যা বিক্রি করার জন্য তারা কিনে নিয়ে এসেছিল।

    আফগান সওদাগরদের কাফেলার সরদার খাজা খিজির সুহন্দ নামক আফগান বণিক খুব নামী-দামি ব্যক্তি ছিলেন।

    তিনি একজন নামী যোদ্ধাও ছিলেন। কাফেলার লোকেরা তাঁর উপরে ভরসা করে চলতে পছন্দ করত। রাস্তায় লুটেরাদের দ্বারা লুটপাট করার চেষ্টা হলে খাজা খিজির তাদের উপর বাজের মতো ঝাঁপিয়ে পড়তেন। তিনি দুর্দান্তভাবে আক্রমণ চালিয়ে তরবারির আঘাত করতে করতে তাদের মুণ্ডুপাত করতে করতে এগিয়ে যেতেন। তার সঙ্গে একবার সামনা-সামনি হলে, লুটেরাদের অবস্থা এমনই কাহিল হয়ে পড়ত যে, তারা তাদের পরবর্তী প্রজন্মদেরও নসিহত করে যেত যে, কাফেলার সরদার খাজা খিজিরের সামনে পড়ে গেলে, তার কবল থেকে বাঁচতে দূরের রাস্তা ধরাই মঙ্গল।

    খাজা খিজির এরকমই এক লুটেরা দলের উপর তরবারি চালিয়েছিলেন। তাঁর হাতের একটি আঙুল কেটে গিয়েছিল, তবে তিনি লুটেরাদের এলাকা ছাড়া করেছিলেন এবং কাফেলা সওদাগরদের লুট হয়ে যাওয়া মাল ফিরিয়ে নিয়েই তবে পিছু ছেড়েছিলেন। আফগান খাজা খিজির যখন আমার সেনাদলকে আসতে দেখলেন তখন তিনি সাথে সাথে ঘোড়া থেকে নেমে পড়লেন। তাঁর দেখাদেখি অন্য সওদাগররাও ঘোড়া থেকে নেমে এলেন।

    খাজা খিজিরকে আমি ব্যক্তিগতভাবে চিনতাম এবং তিনিও আমাকে পাদশাহ (বাদশাহ) রূপে সম্মান করতেন।

    তিনি আমার কদমবুসির জন্য এগিয়ে এলেন। তাঁর দেখাদেখি কাফেলার অন্যান্যরাও তাই করলেন।

    তাঁর সঙ্গে কথা বলে আমি হিঁদুস্তান যাওয়ার রাস্তার বিস্তারিত খোঁজ-খবর জানলাম।

    তাঁর হিঁদুস্তান যাত্রার বিবরণ থেকে যে তথ্য আমি জানলাম, তা হলো তিনি সঠিক মৌসুমে হিঁদুস্তান থেকে ফিরে এসেছেন এবং আমি ভুল মৌসুমে সেই পথে যাত্রা করছি। তাঁর দেওয়া তথ্যানুসারে নদী না পেরিয়ে হিঁদুস্তানে যাওয়াই যেতে পারে না। তিনি যখন এসেছিলেন তখন নদী শুকনো ছিল, আর আমি যখন যাব তখন আমাকে বিক্ষুব্ধ নদী পার হতে হবে।

    তাঁর কথায় দম ছিল। তিনি একজন কর্মকুশল কাফেলা সরদার ছিলেন। তাঁর কাফেলা এগিয়ে চলে গেল তো দূরে আর এক কাফেলার ঝলক দেখা গেল। কিছুক্ষণ পর দৃশ্য স্পষ্ট হতেই বোঝা গেল যে, সেটা কোনো কাফেলা নয়, আমার নিজেরই সেনাদল। সেই সেনাদল, ইয়ার হুসাইন যাদের বড় সাহসিকতার সাথে নিজের সঙ্গে করে নিয়ে গিয়েছিল। ইয়ার হুসাইন ফিরে এসেছিল। উল্লেখ্য যে, সে সামনে যাবার রাস্তা বদলে দিয়েছিল। সে ফিরে আসাতে আমি বড় খুশি হলাম। সে সামনের রাস্তার অভিজ্ঞতা লাভ করেই ফিরে এসেছিল।

    বাবুরের কাবুল প্রত্যাবর্তন

    আমি কাবুল-কান্দাহার, গজনীর এক বড় ভূ-ভাগ জয় করে নিয়েছিলাম। তার সামনে হিঁদুস্তানের সীমান্ত ছিল।

    আমি যতদূর পর্যন্ত এসে পৌঁছেছিলাম সেখান থেকে গজনীর যাওয়ার জন্য দুটি রাস্তা ছিল। একটি তো সংখ-এ-সুর্খ হয়ে যা বিক্ গিয়ে ফারমুলের সঙ্গে মিলত। আর অন্যটি গোমাল হয়ে যেত। সেটিও ফারমুলে গিয়ে মিলত। ওই পথে বিক্ মাঝপথে পড়ত না।

    এই দিনগুলোতে আমাদের সেনাবাহিনী সমতল এলাকায় বিশ্রামের জন্য অভ্যন্ত হয়ে পড়েছিল। গোমালের রাস্তা এই দৃষ্টিতে কষ্টপ্রদ ছিল। ওই রাস্তায় উপত্যকা ও পাহাড়-পর্বত খুব বেশি পরিমাণে পড়ত। অন্য পথটি আপেক্ষাকৃত বেশি সমতল ছিল।

    আমি সেনানায়কদের সঙ্গে এ বিষয়ে পরামর্শ করলাম যাকে আমি অপেক্ষাকৃত উত্তম রাস্তা মনে করছিলাম, এ বিষয়ে বিচার-বিবেচনার পর এ কথাই সামনে এল যে, ওদিকে পানি স্রোতের মোকাবিলা করতে হবে।

    ওই দিন কোনো সিদ্ধান্ত হলো না।

    পরদিন শিবির তুলে নেওয়ার আদেশ দিলাম। এটি ঈদ-উল-ফিতরের দিন ছিল। রওনার প্রস্তুতি ছিল, তবে এখনও পথ ঠিক ছিল না। জাহাঙ্গীর মির্জাকে আমি দায়িত্ব দিয়েছিলাম যে, সকল মির্জা সরদারের মধ্যে বিষয়টি উত্থাপন কর।

    আমি যে পথটি নির্বাচন করেছিলাম সে বিষয়ে তথ্য সংগ্রাহকদের মাধ্যমে যা জানা গেল তা হলো ওই পথ সুলেমান পর্বতমালায় কারণে যথেষ্ট দুর্গম। তখন গোমালের পথই সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হলো। আমাদের মধ্যেকার একজন ব্যক্তিও ওই পথ দেখেনি। পথ সম্পর্কে যা তথ্য ছিল তা ছিল শোনা কথা।

    ঈদের নামাজ গোমাল নদীর তটে আদায় করা হলো। সামান্য রাস্তা অতিক্রম করতেই গোমাল নদী পড়েছিল। তখন সিদ্ধান্ত হলো ঈদের খুশি ওখানেই উদযাপন করা হোক।

    ঈদের দিন ছিল। গোমাল তটে শিবির ফেলা হলো। নামাজ শেষে সবাই একে অন্যকে অভ্যর্থনা জানাতে লাগালেন।

    মুসলমানরা ঈদের আনন্দ তিন দিন যাবৎ উদযাপনে মুখর থাকেন। আমাদের সামনে কোনো যুদ্ধ ছিল না। এটা ছিল প্রত্যাবর্তনের সফর। সফরের পথ যেহেতু অজানা ছিল, সেহেতু এর জন্য দিনক্ষণ নির্দিষ্ট করা হয়নি যে, কতদিনে কাবুলে পৌঁছানো যাবে। এমতাবস্থায় ঈদের আনন্দ উদযাপনের জন্য আমি তিন দিনের অবসর দিলাম।

    আমিও খুব আনন্দাপুত ছিলাম। ঈদের ওই মুবারক দিনে আমার মনে কাব্য-কবিতার লহর উঠছিল। আমি তুর্কি ভাষায় কবিতার কয়েকটি পঙক্তি লিখলাম। এই কাব্য-পঙক্তিগুলো কিছুটা একরম ছিল—

    “ওগো ঈদের চাঁদ, সবার জন্য খুশির বার্তা আনো

    যারা তোমায় দেখে।

    তোমায় দেখার জন্য সবাই লালায়িত থাকে

    পরস্পরে কোলাকুলি ও শান্তি প্রকাশ করে।

    যারা তোমায় দেখে।

    তবু অনেকের হৃদয়-মনে শান্তি থাকে নাকো

    আত্ম-স্বজন থেকে যারা অনেক দূরে থাকে

    ভাবে তারা খুশির বার্তা দেব আমরা কাকে॥

    ও বাবুর! স্বপ্ন তোমার ভাগ্য হয়ে থাকে

    নয়া বছরের শান্তি-বার্তা দাও লোকেদের তুমি,

    কেননা, ঈদের চাঁদকে তুমিও দেখ, সে-ও তোমায় দেখে॥

    কামনা করো, আজির মতো চলুক খুশির দিন

    ঈদের খুশির মতোই যেন জীবন চলতে থাকে॥”

    ঈদের খুশি উদযাপনের পর আমি সসৈন্যে গোমাল নদীর পাহাড়ি জলাধার পার হলাম। পাহাড় পরিবেষ্টিত উপত্যকার নিচু জায়গা দিয়ে সফর শুরু করলাম। আমাদের সামনের গন্তব্য ছিল দক্ষিণ দিক।

    আমাদের অগ্রবর্তী সেনা দু-এক মাইল পথ যেতে-না-যেতেই দেখল, পাহাড়ি আফগানরা পাহাড়ের মাথায় একত্রিত হচ্ছে। তাদের আক্রমণমুখী বলে মনে হচ্ছিল।

    তাদের সবার মধ্যে নেতা গোছের এক আফগান একাই আলাদা একটি পাহাড়ে দাঁড়িয়ে আমাদের বাহিনীকে অগ্রবর্তী না হওয়ার জন্য সতর্ক করছিল।

    সে ছিল একজন কান কাটা লোক। অবশ্যই সে একজন যুদ্ধবাজ লোক ছিল। কোনো যুদ্ধে শত্রুর তরবারির আঘাতে তার একটা কান কাটা গিয়েছিল।

    আমার সেনার অনুসন্ধানী দলের সাথিরা এরকম অবরোধ হটানোর কাজে বিশেষ দক্ষতা লাভ করেছিল। তারা উঁচু পাহাড়ের চারদিক থেকে এগিয়ে গিয়ে পিছন থেকে তাদের ঘিরে ফেলল এবং তরবারির জোরে তাদের নিচে নামিয়ে ফেলার কাজ করল।

    তারা পাহাড়ি গোত্রের আফগান ছিল। তাদের খুব দ্রুত একথা বোঝানোর পর তারা বুঝে গেল যে, আমি কাবুলের বাদশাহ। কাবুলের বাদশাহ হওয়ার পর কাবুল সীমান্তের সমস্ত ক্ষেত্রই আমার সাম্রাজ্য। ওই এলাকা আমারই যেখানে তারা বসবাস করছে।

    কানকাটা সরদারের মগজে আমার কথা ঢুকল। সে আর কোনো বিরোধিতা ছাড়াই আমার অধীনতা স্বীকার করে নিল। সামনে আমি ফেরার পথে পীর কামীর মকবরা জিয়ারত করলাম। এটি দীখী পাশাবত পথের উপরে অবস্থিত। গজনীর পথে আব-এ-আস্তাদার ঝরনা রয়েছে।

    গজনী থেকে সামনে কাবুলের পথে ভীষণ বন্যার মুখে পড়তে হলো।

    পূর্ণ মাত্রায় বর্ষার মৌসুম চলছিল। প্রবল বর্ষণে নদী-নালা সবই বিপদ সীমার উপর দিয়ে চলছিল। আমাকে দীর্ঘ সময় ধরে গজনীতে যাত্রাবিরতি করে আগে বাড়ার জন্য অপেক্ষা করতে হলো। সেখানে যাত্রাবিরতির সময় আমার বোধগম্য হলো যে, এ সময়ে হিঁদুস্তানের দিকে না যাওয়াটা কতটা সমঝদারি ছিল। ওদিকে নদী তো আরো ভয়ংকর রূপ ধারণ করে। তরঙ্গ-সংকুল নদী ও পাহাড়ি ঢলের কারণে কাবুল পৌঁছাতে আমার চার মাস লেগে গেল। কাবুল পৌঁছানোর পর আমি জানতে পারলাম, দু’জন বেগ সেনাপতি অসন্তুষ্ট হয়ে ওখান থেকে চলে গেছে। জানা গেল যে, আমার পিছনে নাসির মির্জা তাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেছিলেন। তারা বাদাখশান চলে গিয়েছিল। আরো একটি খবর পাওয়া গেল যে, খুসরো শাহ, যিনি এ সময়ে হেরাতে ছিলেন, নাসির শায়বানির সঙ্গে তার বিরোধী তুঙ্গে উঠেছিল।

    আমি সময়মতো কাবুলে পৌঁছে গিয়েছিলাম। ক্ষমতা পূর্ণরূপে আমার হাতে তুলে নিয়ে আমি ওই সকল লোকেদের বিরুদ্ধে দ্রুতগতিতে পদক্ষেপ নিতে শুরু করলাম, যাদের বিদ্রোহের মাথা উঁচু হয়ে উঠছিল।

    আমি আমার বিরুদ্ধে বিদ্রোহের ষড়যন্ত্রকারীদের অতি দ্রুত দমন করে ফেললাম। বিদ্রোহীদের নির্মূল করে দেওয়া হলো। আমি নতুন করে সেনা ভর্তি শুরু করলাম।

  • চতুর্দশ অধ্যায় : বাবুরের মা ও হুসাইন বাইকারার মৃত্যু

    চতুর্দশ অধ্যায় : বাবুরের মা ও হুসাইন বাইকারার মৃত্যু

    চতুর্দশ অধ্যায় : বাবুরের মা ও হুসাইন বাইকারার মৃত্যু

    কাবুল প্রত্যাবর্তনের পর কাবুল ও কান্দাহারের প্রশাসনকে মজবুত করার জন্য আমি সবার আগে পাহাড়ি উপজাতি সেই আফগানদের বিদ্রোহ দমনের পর তাদের সরদারদের উচ্চ পদমর্যাদা প্রদান করে আমি আমার প্রতি তাদের বিশ্বস্ততা হাসিল করলাম। আমার কাবুলের শাসনকার্য ঠিকমতো সামলানোর জন্য আফগানদেরও নিজের প্রতি বিশ্বস্ত করে তোলার প্রয়োজন ছিল, যেমনটি বেগ ও তুর্কি সৈনিকেরা আমার প্রতি বিশ্বস্ত ছিল।

    আমি আফগান যুবকদের আমার বাহিনীতে ব্যাপক সংখ্যায় ভর্তি করলাম। ভর্তিতে এই কথাই বিশেষভাবে মনে রাখলাম যে, যারা ঐতিহ্যগতভাবে লড়াকু প্রকৃতির এবং উপজাতির লোক তাদের প্রাধান্য দেওয়া হোক।

    কাবুল-কান্দাহারের প্রশাসনিক ব্যবস্থা সুদৃঢ় করে নেওয়ার জন্য দুটিই সুখ-সমৃদ্ধিতে পরিপূর্ণ রাজ্য বনে গেল।

    কাবুল ধনী ও সমৃদ্ধিশালী দেশগুলোর অন্যতম বলে গণ্য হতে লাগল।

    আমার দৃষ্টি তখনও মধ্য এশিয়ার প্রতি নিবদ্ধ ছিল। আমি আমার পূর্ব পুরষদের রাজ্যের দিক থেকে চোখ বন্ধ করে বসে থাকতে পারি না।

    আমি শুধু কাবুল ও কান্দাহারের শাসক হিসেবে তার উপর সন্তুষ্ট থাকতে পারি না।

    আমি ওই সকল লোকেদের কীভাবে ভুলতে পারতাম যারা আমার ক্ষমতা কেড়ে নিয়ে আমাকে দোরে দোরে আঘাত খেয়ে খেয়ে বেড়াতে বাধ্য করেছে! আমি সমরখন্দকেও ভুলতে পারতাম না। আর না চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী শায়বানি খানকে। আমি হেরাতের শাসক হুসাইন বাইকারার প্রতি মিত্রতায় হাত বাড়ালাম। তারপর তাইমুর বংশীয় আপনজনদের সঙ্গেও মধুর সম্পর্ক স্থাপন করলাম।

    এ সবের পিছনে আমার একমাত্র লক্ষ্য ছিল মুহম্মদ শায়বানি। তার কথা আমি ভুলতে পারছিলাম না। দিন-রাত আমার একটাই স্বপ্ন ছিল যে, আমি শায়বানীকে হারিয়ে সমরখন্দ আবার ফিরে পাব, আমার পরাজয়কে আমি বিজয়ে পরিণত করব। আমার কাবুল প্রত্যাবর্তনের কিছুদিন পর আমার মা রোগাক্রান্ত হয়ে মারা গেলেন। আমি তখন মাতৃশোক সামলে উঠতে পারিনি, তখনই খবর এল যে, ১৫০৬ ঈসায়ী সনে হুসাইন বাইকারার আকস্মিক মৃত্যু হয়েছে।

    হুসাইন বাইকারার মৃত্যুসংবাদ আমি তখনই পেলাম যখন আমি আমার বিশাল বাহিনী নিয়ে মধ্য এশিয়া বিজয়াভিযানের জন্য রওনা হয়েছিলাম।

    আমার বাহিনীর অভিমুখ হেরাতের দিকেই ছিল। আমার ও হুসাইন বাইকারার মধ্যে সিদ্ধান্ত হয়েছিল যে, আমার এবং তার বাহিনীর যৌথ অভিযান শায়বানির বিরুদ্ধে চলবে। তবে হুসাইন বাইকারার অকালমৃত্যু কিছুক্ষণের জন্য আমাকে নিরাশার মধ্যে ফেলে দিয়েছিল।

    আমার পিছে-পিছে আমার সেনাও হেরাতে এসে প্রবেশ করল।

    যেহেতু হুসাইন বাইকারার আকস্মিক মৃত্যু ঘটেছিল, যেহেতু হেরাতের জন্য তিনি তাঁর কোনো উত্তরাধিকার ঘোষণা করে যেতে পারেননি।

    আমি হেরাতকে দুশমনদের রক্তপাতের মধ্যে চলে যেতে দিতে কখনোই পারতাম না। অতএব, নিজেকে হেরাতের শাসক ঘোষণা করে সেখানকার পুরো শাসনভার হাতে তুলে নিলাম। আমি আমার মিত্র হুসাইন বাইকারার অন্তিম সৎকার করলাম।

    আমি সেনাবাহিনীর একটি দলকে নাসির মির্জার নেতৃত্বে বাদাখশান অভিমুখে রওনা করিয়ে দিলাম। পথে শায়বানির সেনাদলের সঙ্গে তার একটি বড় লড়াই হলো। ওই লড়াইয়ে শায়বানির সৈন্যদের পরাজয়ের মুখে পড়তে হলো। একথায় আমি খুবই সান্ত্বনা পেলাম যে, শায়বানিকে পরাজয়ের কথা শুনতে হয়েছে।

    তারপর আমি জাহাঙ্গীর মির্জার হাতে হেরাতের শাসনভার অর্পণ করি। নিজে খোরাসানের মির্জাদের একত্রিত করার কাজে নেমে পড়লাম। আমার প্রয়াস সফল হতে শুরু করেছিল। আমি ওই সময় তুখান হাজারায় মির্জাদের সঙ্গে একটি বড় দাওয়াতে শামিল ছিলাম, তখন আমি কাবুলে বিদ্রোহের খবর পেলাম।

    কষ্টদায়ক ঠান্ডার দিন ছিল। আমি তুষারাবৃত উপত্যকার রাস্তা ধরলাম। অতি দ্রুত কাবুলে পৌঁছে বিদ্রোহীদের কঠোরভাবে দমন করলাম। আর বিদ্রোহের ষড়ন্ত্রকারীদের কঠোর সাজা দিলাম।

    এ বছর প্রাকৃতিক দুর্যোগ যেন আমার সামাজ্যকে ঘিরে ফেলেছিল। গজনী ভয়াবহ বন্যার কবলে পড়ল এবং তার ফলস্বরূপ ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়তে হলো তো অন্যদিকে কান্দাহারকে ভূমিকম্পে কাঁপতে হলো। ভূমিকম্প হাজার-হাজার মানব-জীবনকে গ্রাস করে নিল।

    গজনী ও কান্দাহার তো ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল, এই সময়টিতে আমি চেয়েও দু’জায়গায় গিয়ে তাদের দুঃখ-কষ্টের অংশীদার হতে পারলাম না। কারণ ছিল, আমি নিজে এই সময়ে বড়ই অসুস্থ হয়ে পড়েছিলাম।

    ভূ-কম্প পীড়িত কান্দাহার সম্পূর্ণভাবে অব্যবস্থিত হয়ে পড়ে গিয়েছিল। তবে নিজের অসুস্থতার কারণে আমি ওদিকে যেতে অপারগ ছিলাম।

    গজনীর কিছু আফগান বিদ্রোহী গাধাদের জন্য চারণক্ষেত্রের প্রশ্ন তুলে গজনীতে আমার দ্বারা নিয়োজিত প্রশাসককে সম্পূর্ণরূপে নাস্তানাবুদ করে তুলল। তারা এই বলে ধমকানি দিল যে, যদি তাদের গাধাদের জন্য তৃণভূমির স্বাধীনতা দেওয়া না হয় তাহলে তারা খোরাসানের দিকে চলে যাবে এবং শায়বানির সাহায্য নিতেও পিছপা হবে না।

    এই সময়ে শায়বানি তার বাহিনীর পরাজয় নিয়ে সম্পূর্ণভাবে খিজলে ছিলেন।

    গজনীয় আফগান বিদ্রোহীরা শুধুমাত্র হুমকি দিয়েছিল, আসলে তারা শায়বানিকে গজনী আক্রমণের জন্য আমন্ত্রণ জানিয়ে এসেছিল। তবে শায়বানি গজনীর লালসায় না ফেঁসে মধ্য এশিয়াতেই সাম্রাজ্য বিস্তারের পরিকল্পনা প্রস্তুত করেন এবং হেরাত আক্রমণ করেন।

    হেরাতে জাহাঙ্গীর মির্জা শায়বানির আক্রমণকে রুখতে পারেনি। সে শায়বানির হাতে নিহত হলো। শায়বানি হেরাতের বাইকুরা-বংশীয় ওই দুই পুরষকেরও হত্যা করল, যারা হেরাতের শাসন ক্ষমতার দাবিদার হতে পারত।

    হেরাতের শায়বানির অধিকারে চলে যাওয়ার খবর আমি যেভাবে পাই তা-ও আমার কাছে স্মরণীয় হয়ে আছে। হয়েছিল কি, হেরাত থেকে সওদাগরদের একটি কাফেলা হিঁদুস্তানের দিকে যাচ্ছিল। ওই কাফেলা জাহাঙ্গীর মির্জার বিধবা এবং তার অবোধ শিশুকে খুবই দুরবস্থার মধ্যে রাস্তায় দেখেছিল। ওই কাফেলার লোকেরা আমার কাছ পর্যন্ত খবরটি পৌঁছে দিয়েছিল।

    আমি আমার অসুস্থতা ভুলে, সেনা নিয়ে কাবুল থেকে বেরিয়ে পড়েছিলাম। আমি তখন কাবুল ত্যাগ করতেও পারিনি, এমন সময় খবর এল শায়বানি খান কান্দাহার দুর্গ অধিকারের জন্য সসৈন্যে এগিয়ে আসছেন। ওদিকে হেরাত থেকে আমার কাছে খবর এল যে, বাইকুরা ভাইদের অকারণে হত্যা করার ক্ষোভে তার বংশীয়রা আলাদা-আলাদা এলাকা থেকে প্রতিশোধের জন্য শায়বানির দিকে ধেয়ে আসছে।

    তিনি (শায়বানি), দু’দিক থেকে অবরুদ্ধ হতে পারেন, সেদিকে দৃষ্টি রেখে শায়বানি কান্দাহার থেকে দিক বদল করলেন।

    তবে তাঁর পশ্চাদ ভাগের সৈন্যরা অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছিল। এটা হওয়াতে শায়বানির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হলো। তবে তাঁর অগ্রবর্তী দলের সঙ্গে আমার হাত থেকে বেঁচে পালিয়ে যেতে সমর্থ হলেন।

    আমার মনে আরো একবার শায়বানির সঙ্গে সামনা-সামনি লড়াইয়ের সাধ রয়ে গেল। তার কাছে পরাজয়ের যন্ত্রণা আমি ভুলতে পারিনি। আমার সংকল্প ছিল তার সঙ্গে ময়দানি যুদ্ধে সামনা-সামনি অস্ত্রের মোকাবিলা করা। এ থেকেই শেষ ফায়সালা হয়ে যাক যে, সে বড় যোদ্ধা, না আমি।

    এই শেষ ফয়সালায় এ-ও নির্দিষ্ট ছিল যে, তারপর দুনিয়ায় দুজনের মধ্যে একজনকেই বেঁচে থাকতে হবে।

    আমি কান্দাহারে প্রবেশ করলাম।

    কান্দাহার কেল্লায় পৌঁছে আমি দেখলাম যে, প্রধান রক্ষক শাহ বেগ, না ওখানে ছিল আর না মুকিমও। শাহ বেগের বিষয়ে খবর নিয়ে জানলাম, সে সেনাদল নিয়ে শাল ও কোয়েটার দিকে গিয়েছে। সেখানকার জন্য জামিনদাওয়ারে অবস্থানের জন্য পাঠানো হয়েছে।

    ওখানকার কেল্লা রক্ষার ভার তরখানদের দায়িত্বে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল। হাতে তুলে নেওয়া দায়িত্ব তরখানরা পুরো সাহসিকতার সঙ্গে পালন করার জন্য কেল্লায় চারদিকে অবস্থান নিয়েছিল। তাদের সাহসিকতা ও বিশ্বস্ততা প্রশংসার যোগ্য ছিল।

    আমার নগরে প্রবেশ করা মাত্রই মশকর দরওয়াজা খুলে দেওয়া হলো। তার দরওয়াজায় তঘাল ও শোরিম বেগ নিযুক্ত ছিল। সেখানকার সুরক্ষা ব্যবস্থা পর্যালোচনা করে আমি এই সিদ্ধান্তে পৌঁছালাম যে, শায়বানি এখানে ঢুকলে তাকে কঠিন পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে হবে, তবেই তিনি কান্দাহার কেল্লা কবজা করতে সফল হতে পারেন।

    আমি কান্দাহার কেল্লার রাজকোষের খোঁজ-খবর নিলাম। কোষাগার থেকে ধনের এক বড় অংশ বের করিয়ে আমি ওই সমস্ত বিশ্বস্তদের বণ্টন করতে শুরু করলাম যাদের আমি কেল্লা রক্ষার জন্য সদা-সতর্ক পেয়েছিলাম। বিশ্বস্তদের ইনাম দিয়ে তাদের সম্মানিত করা আমার জন্য অবশ্যবর্তব্য ছিল। আমি আবদুর রজ্জাক মির্জা, দোস্ত নাসির বেগ, মুহম্মদ বখশী, খাজা মুহম্মদ ও তগাই শাহ বখশীকে ইনাম পাওয়ার উপযুক্ত রূপে পেয়েছিলাম।

    ওই দিন রাতে আমি কান্দাহার কেল্লায় অবস্থান করলাম। পরদিন ফররুখজাদ বেগের ছাউনির দিকে গেলাম, যা চারবাগে অবস্থিত ছিল। সেখানকার সৈন্যদের তদন্ত করে উৎসাহিত করলাম।

    কান্দাহার থেকে প্রত্যাবর্তনের পথে আমি নাসির বেগকে সেখানকার শাসক নিযুক্ত করলাম। রওনার আগে আমি ফায়সালা করে নিয়েছিলাম যে, কান্দাহার কেল্লায় প্রয়োজনাতিরিক্ত ধন-সম্পদ রয়েছে। প্রয়োজনমতো কোষ সেখানে রেখে অবশিষ্টটি উটের পিঠে চাপিয়ে আমি কাবুলের উদ্দেশে রওয়ানা হয়ে গেলাম। কাবুল পৌঁছানোর পর কান্দাহার থেকে নিয়ে আসা কোষকে উটের পিঠ থেকে নামানো হলো। সেগুলোকে বড় বড় থলিতে ভরে আনা হয়েছিল। থলি থেকে নামালে দেখা গেল মুদ্রার পাহাড় জমে উঠেছে। সেগুলোকে গুনে শেষ করা অসম্ভব ছিল। আমি তাদের ওজন করিয়ে কাবুলের কোষে জমা করে দেওয়ার আদেশ দিলাম।

    বাবুরের মাসুমা সুলতানার সঙ্গে বিবাহ

    কাবুল প্রত্যাবর্তনের পর আমি আহমদ মির্জার কন্যা মাসুমা সুলতান বেগমের সঙ্গে পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ হলাম। খুরাসানেই আমি মাসুমা সুলতানার কাছ থেকে সম্মতি নিয়ে নিয়েছিলাম। মাসুমা সুলতানকে নিয়ে আমার জন্য খুরাসানে আমি সওয়ারি পাঠাই এবং কাবুলে আসার পর আমি তাকে বিয়ে করি।

    বিয়ের কিছুদিন পর আমি খবর পাই যে, সায়ক খান ও অন্য কিছু উজবেক সরদার আমার সেবায় আসতে চাইছে। তারা নাসির মির্জার মাধ্যমে আমার কাছে এই বার্তা পাঠিয়েছিল। আমার জন্য এটা সুসংবাদ ছিল। এতদিন পর্যন্ত উজবেকদের পুরো সমর্থন শায়বানির পক্ষেই ছিল। শায়বানি উজবেক সরদারদের ঐক্যবদ্ধভাবে পেয়ে শক্তিশালী শাসক বনে গিয়েছিলেন। তাদেরই শক্তিতে তিনি সমরখন্দ জয় করতে পেরেছিলেন। যদি উজবেক সরদারদের ঐক্যে ভাঙন ধরে তাহলে শায়বানির শক্তি খুবই দুর্বল হয়ে যেতে পারত। আমি উজবেক সরদারদের পক্ষ থেকে আগত বার্তায় মনোযোগ দিলাম। আমি তাদের সাক্ষাতের আমন্ত্রণ জানালাম।

    তারা আমর সঙ্গে সাক্ষাৎ করল। আমার প্রতি নিষ্ঠা স্বীকার করল। আমি তাদের এদের হিসাব থেকে কিছুটা বাড়িয়ে চড়িয়ে বাদাখশানের কিছু এলাকার আলাদা-আলাদা প্রশাসন তাদের দায়িত্বে তুলে দিলাম।

    এখনও পর্যন্ত তারা শুধু নিজ-নিজ গোত্রের সরদারের পদমর্যাদা রাখত। আমার পক্ষ থেকে তদের বিভিন্ন এলাকার প্রশাসক বা সুবেদারি প্রদান করা, তাদের জন্য খুব বড় প্রাপ্তি ছিল। তাদের মর্যাদা বেড়ে গিয়েছিল, সেই সঙ্গে মান-সম্মানও।

    তারপর, আমি সম্পূর্ণরূপে আশ্বস্ত হয়ে গিয়েছিলাম যে, উজবেকদের ঐক্যজোট শায়বানির পক্ষ থেকে খান-খান হয়ে যাবে। তাইমুর এবং চেঙ্গিসের শাসনকালে উজবেকদের আনুগত্য তাঁদের পক্ষে ছিল।

    কিছুদিন পর আমি কলাত এবং তুর্মিক রাজ্য দুটি জয়লাভ করে সেখানকার সুবেদারি আবদুর রজ্জাক মির্জার হাতে তুলে দিলাম। যতদূর পর্যন্ত বাদাখশানের কথা ছিল, বাদাখশানে ওই সময় পর্যন্ত কোনো শাসক বা উত্তরাধিকারী ছিল না। অবশ্য, এর পুরো এলাকা মির্জা বহুল তথা মির্জাদের ছিল। শাহ বেগমের নামে সেখানে হুকুমতও চলত।17

    আমার খালা মেহের নিগার খানম, যিনি আমার সঙ্গে কাবুলে থাকতেন, তিনি তাঁর বোন (বাবুরের মা)-এর মৃত্যুর কিছুকাল পর বাদাখশানে গিয়ে বসবাসের ইচ্ছা প্রকাশ করলেন। আমি তাতে সানন্দে অনুমতি দিয়ে দিয়েছিলাম। বাদাখশানে গিয়ে বসবাসের কোনো অসুবিধাই তাঁর ছিল না, কেননা, তিনিও মির্জা ঘরানার ছিলেন। মির্জাদের যে কারোর জন্য বাদাখশানের দ্বার সব সময় উন্মুক্ত ছিল।

    হিঁদুস্তানের উদ্দেশে বাবুরের দ্বিতীয় অভিযানের প্রয়াস

    হিঁদুস্তান অভিযানের দ্বিতীয় প্রয়াসে আমার সেনাবাহিনী কাবুল থেকে বেরিয়ে পড়েছিল। এটা ছিল জমাদিউল আউয়াল মাস (সেপ্টেম্বর, ১৫০৭)। সড়ক পথে সুখ-রবাত হয়ে আমরা কুরসাল পৌঁছে গিয়েছিলাম।

    কাবুল ও লামঘানের মধ্যবর্তী এলাকায় বসবাসকারী উপজাতির লোকেরা তখনও পর্যন্ত স্ব-শাসন ভোগ করত। তারা ছোট-ছোট গোত্রে বিভক্ত ছিল। প্রত্যেক গোত্রের একজন করে মুখিয়া থাকত। তারা পরস্পরে সেখান পর্যন্তকার এলাকা নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করে নিত যেখান পর্যন্ত তারা নিজেদের শাসনাধীন বলে মনে করতেন। আমাদের সেনা যেইমাত্র লামঘান ক্ষেত্রে দাখিল হলো অমনি উত্তর পাহাড়ি ক্ষেত্রের তার পাহাড়ি গোত্রের তীরন্দাজ লড়াকুরা এসে অবস্থান নিল।

    তাদের ক্ষেত্রেগুলোর নাম ছিল খিজির খায়েল, শিমু খায়েল, খিরিলচ এবং খুঘলানী। তারা অগ্রবর্তী সেনার পথ রোধ করেছিল। তারা নাকাড়া বাজিয়ে দূর-দূরান্তের লোকেদের সেখানে এসে জড়ো হওয়ার বার্তা দিচ্ছিল। কিছু লোকের হাতে তলোয়ার চমকাচ্ছিল। তীর-ধনুক নিয়ে তাদের মুখিয়াদের আদেশের অপেক্ষা করছিল। তারা পাহাড়ি উপত্যকার প্রত্যেকটি উঁচু পাথরের উপর মোতায়েন ছিল।

    তখনও পর্যন্ত ওদের দিক থেকে একটি তীরও আমাদের সৈনিকদের উপর নিক্ষিপ্ত হয়নি।

    আমি সেনাকে তাদের উপর আক্রমণের আদেশ দিলাম। আদেশ পেতেই সৈনিকেরা তাদের ধাওয়া করল।

    আমি নিজে তাড়া করে এক তীর ধনুকধারীকে ধরে তাকে হাওয়ায় উড়িয়ে দিলাম। তার গলায় তলোয়ায়ের নোক ধরলাম। সে মৃত্যু ভয়ে ছটফট করতে লাগল।

    সৈনিকদের হামলায় গোত্রগুলোর মধ্যে দৌড়াদৌড়ি শুরু হয়ে গেল। কিছু তীরন্দাজকে ধরে ফেলা হলো। সৈনিকেরা তাদের মুণ্ডু উড়িয়ে দিল। কিছুকে বন্দী করে আনা হলো। আমি তাদেরও মুণ্ডু উড়িয়ে দেওয়ার আদেশ দিলাম। তাদের এই সাজায় প্রয়োজন ছিল। যাতে ভবিষ্যতে মৃত্যুভয় তাদের বংশধরদের বিদ্রোহী হওয়া থেকে বিরত রাখে।

    আমি সৈনিকদের আদেশ দিলাম দূর-দূরান্ত পর্যন্ত পাহাড়ি এলাকার ওই উপজাতিদের খালি করে দেওয়া হোক। এটা জরুরি ছিল, কেননা, ওই পথ দিয়ে যাতায়াতকারী পথিক ও কাফেলাদের মধ্যে তারা লুটতরাজ চালাত।

    ওদিকে পাহাড়ি আদিবাসীদের কবল থেকে এলাকা খালি করার অভিযানে আমাকে কিছুদিন সেখানে শিবির ফেলে অবস্থান করতে হলো। আমি পরবর্তী কালের জন্যও এমন ব্যবস্থাই করতে চাচ্ছিলাম, কেননা, ওদিকে যেন ওরা আর নিজেদের ঠিকানা বানাতে না পারে।

    উত্তর পাহাড়ির নিরাপত্তা ব্যবস্থা সুদৃঢ় করানোর পর আমি সেনাকে অগ্রবর্তী হওয়ায় আদেশ দিলাম।

    সেনা শিবির ফেলতে তুলতে আমরা মিল-কাফির পর্যন্ত পৌঁছে গেলাম। ওখানে উত্তম জাতের চাল উৎপন্ন হয়। মণ্ডিগুলোতে ওই সময় প্রচুর পরিমাণে চালের সমারোহ দেখা যাচ্ছিল। আমি সেনাবাহিনীর জন্য প্রচুর পরিমাণে চাল খরিদ করালাম।

    তবে বেশিদিন পর্যন্ত এ সফর জারি রাখতে পারলাম না। পথে আমি গুপ্তচর মারফত খবর পেলাম যে, আমার কাবুলে অনুপস্থিতির সুযোগে শায়বানি খান ফায়দা তোলার পরিকল্পনা করেছেন।

    সঠিক খবর ছিল। এ আশঙ্কা অস্বীকার করা যেত না। অতএব, আমি হিঁদুস্ত ান অভিযানের পরিকল্পনা স্থগিত করে দিলাম। আমি পাশাগড়ের মোল্লা বাবার নেতৃত্বে ফৌজের একটি বড় অংশকে তৎক্ষণাৎ কাবুল অভিমুখে রওনা করিয়ে দিলাম। আমি নিজে মন্দখার, অতার এবং শেলাব এলাকার দিকে রওনা হয়ে গেলাম। এদিক থেকে ছোটখাটো উপদ্রবের খবর আসছিল। তা দমনের জন্য আমার নিজেরই যাওয়া প্রয়োজন পড়েছিল।

    কাবুলে সেনা পৌঁছে যাবার পর আমার কাছে খবর এল যে, শায়বানির পরিকল্পনা মাঠে মারা গেছে। শরৎ ঋতুতে আমি নিজে কাবুল পৌঁছে গেলাম।

    বাবুরের প্রথম পুত্র সন্তান লাভ

    ১৫০৮ ঈসায়ী সনের ৮ মার্চ, সূর্য যখন পশ্চিমাকাশে অস্ত যাচ্ছিল, তখন আমি কাবুল দুর্গে আমার পুত্র সন্তান লাভের সুসংবাদ পেলাম। মওলানা মসনাদ আমার নবজাত শিশুপুত্রের নাম রাখলেন হুমায়ূন। আমার এক দরবারি কবি, শাহ ফিরোজ কদর’ নাম রাখলেন।

    ‘হুমায়ূন’ নামটি আমার বেশি পছন্দ হলো।

    হুমায়ূনের যখন পাঁচ বছর বয়স, তখন তাকে নিয়ে আমি চারবাগ গেলাম। সেখানে তার মাতুল কুলের সমস্ত ছোট-বড় বেগ একত্রিত হয়ে এক দাওয়াতের ব্যবস্থা করলেন। ওই দাওয়াতে হুমায়ূনকে হালকা এবং ভারী, দামি এবং সস্তা উপহার পেশ করা হলো। দাওয়াতের ব্যবস্থা এতটাই জাঁকজমক ছিল যে, আমি তাকে আমার জীবনের একটি স্মরণীয় দাওয়াত রূপে মনে রেখেছি।

  • পঞ্চদশ অধ্যায় : মোগলদের বিদ্রোহ

    পঞ্চদশ অধ্যায় : মোগলদের বিদ্রোহ

    পঞ্চদশ অধ্যায় : মোগলদের বিদ্রোহ

    কুজ বেগদের বিদ্রোহ দমন করে আমি সবে কাবুলে ফিরেছিলাম, তখনই খবর এল যে, করিমদাদ ও বাবা কিফরা, অস্তরাগচে আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে। তারা জাহাঙ্গীর মির্জার কিছু সাথি সরদারকেও আমার বিরুদ্ধে প্ররোচিত করেছে।

    এটা কোনো ভালো খবর ছিল না। আমি তৎক্ষণাৎ কঠোরভাবে হুকুমনামা জারি করলাম যে, ষড়যন্ত্রকারীদের প্রকাশ্য মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হোক।

    তাদের ধরা হলো। ফাঁসি দেওয়ার জন্য তাদের প্রকাশ্য বাজারে নিয়ে যাওয়া হলো।

    যখন তাদের ফাঁসি কার্যকর হতে চলেছিল সে সময় কাশিম বেগের সুপারিশে খলিফা আমার কাছে এলেন। তিনি অসময়ে আগমনের জন্য খেদ প্ৰকাশ করলেন।

    তিনি নিজের কথা তুললেন। তাঁকে খুশি করার জন্য আমি দোষীদের ফাঁসি রদ করে দিলাম। কিন্তু তাদের হেফাজতে রাখার আদেশ দিলাম।

    খলিফার কথার মর্যাদা রাখা আমার জন্য প্রয়োজন ছিল। তাঁর শুধু সামাজিকই নয়, ধর্মীয় সম্মানও এত পরিমাণ ছিল যে, এ কথা যদি দেশে ছড়িয়ে পড়ত যে, আমি খলিফার কথা মানিনি তাহলে পুরো দেশের মানুষ বিদ্রোহ ঘোষণা করে দিত।18

    এই সময়ে খুসরো শাহের অধীনস্ত সেবকরা হিসার থেকে কুন্দুজ পর্যন্ত মোগল, চিলমা, সৈয়দ ও সকমা সরদারদের মধ্যে গিয়ে গিয়ে আমার বিরুদ্ধে প্রচার করা শুরু করে দিল।

    দুই তিন হাজারের মতো তুর্কি যুবক খোদা বখ্‌শের নেতৃত্বে শব্দক থেকে শাহনুর পর্যন্ত বিদ্রোহী মনোভাব নিয়ে এগিয়ে এসে গেল। ওই পর্যন্ত পৌঁছানোর মধ্যে তারা মোগল, চিলমা, সৈয়দ ও শকমা সরদারদের কাছ থেকে খুব বড় সাহায্য পাওয়ার আশা করেছিল। তবে, শাহনজর পর্যন্ত এসে যাওয়ার পর যখন তুর্কিদের মনে হলো যে, আমার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার জন্য তাদের শক্তি যথেষ্ট নয় তখন তারা খাজা রিয়াজের আশ্রয়ে গিয়ে পৌঁছাল। তারা খাজা সাহেবের কাছ থেকে আমার বিষয়ে রায় জানল।

    খাজা সাহের তাদের কী রায় দিলেন, তা আমি জানতে পারলাম না। তবে একথা জানতে পারলাম যে, আবদুর রজ্জাক চালাক উপত্যকায় তাদের কাছে এসে মিলিত হয়েছে। ওই সময়ে আমার প্রতি আবদুর রজ্জাকের মনোভাবও বিগড়ে ছিল। ওই সময়ে খলিফা ও মোল্লা বাবা আমাকে এক-দুবার পরামর্শ দিতে এলেন। তাঁরা আমাকে ইঙ্গিত দিলেন যে, আমার বিরুদ্ধে মোগলদের বিদ্রোহ দিনের-পর দিন তপ্ত হয়ে উঠছে।

    এখনও পর্যন্ত আমার সৈনিক জীবন এরই মধ্যেই অতিবাহিত হয়েছিল। কারা বিদ্রোহ করছে, কোথায় আমার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হচ্ছে এ সবের উপর দৃষ্টি রাখা এবং সময়মতো সঠিক পদক্ষেপ নেওয়াটা আমার কাজ ছিল। এ জন্য তাদের ইঙ্গিতের উপর আমি মনোযোগ দিলাম না।

    একদিন রাতে, যখন আমি নামাজ পড়ে চারবাগের দরবারে এসে বসে ছিলাম, ওই সময়ে মুসা খাজা একজনকে সঙ্গে নিয়ে খুবই দ্বিধা-সংকোচের সঙ্গে আমার কাছে এলেন। তিনি আমার কানে কানে বললেন—মোগলদের সম্পর্কে পাওয়া তথ্য সঠিক যে তারা বিদ্রোহী হয়ে গেছে। একথাও জানা গেছে যে, আবদুল রজ্জাককে তারা তাদের পক্ষে টেনে নিয়েছে, তবে এ খবর পুরো ঠিক নয়। আজ রাতে তারা কোনো বড় পদক্ষেপ নিতে পারে।

    আমি সহজ রইলাম। কিছুক্ষণ পর আমি হেরেমের দিকে গেলাম যা ওই সময়ে ওই দুই বাগের মধ্যে অবস্থিত ছিল।

    আমি সেখান থেকে এক বাহাদুর গোলামকে সাথে করে নিলাম এবং নীরবে শহরে বের হলাম। আমি নিজেই আমার বিরুদ্ধে উত্থিত বিদ্রোহের সঠিক জায়গায় যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। শহরের বাজারগুলোতে সাধারণ দিনের মতেই দিনটা ছিল। কোথাও বিদ্রোহ বা আমার নাম নিয়ে কোনো চর্চা চলছিল না।

    আমি নগরের প্রধান দরওয়াজা, যাকে লৌহদ্বার বলা হতো, সেখান পর্যন্ত গিয়ে পৌঁছালাম। খাজা মুহম্মদ এবং অন্য পাহারাদাররাও সাধারণ দিনের মতো পাহারাদারি করছিল। সে আমাকে তার দিকে, বাজারের দিক থেকে চলে আসা সড়কে দেখেছিল। সে আমার পানে আসতে লাগল।

    আমি ওই বিদ্রোহীদের সম্পর্কে কথাবার্তা বললাম। তাকে সতর্কতা অবলম্বনের আদেশ দিলাম।

    আমি রাতারাতি প্রস্তুত করিয়ে নিয়েছিলাম। সকাল হতেই আমি পাঁচশো বিশ্বস্ত, বাহাদুর সৈনিককে বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে পাঠিয়ে দিলাম।

    অনতিবিলম্বেই আমি সুসংবাদ পেলাম যে, তিন হাজার সশস্ত্র বিদ্রোহীর উপর আমার পাঁচশো সৈনিক এমন আক্রমণ চালাল যে, তাদের জন্য পালাবার পথ পাওয়াও কষ্টকর হয়ে ওঠে। তাদের মধ্যেকার অধিকাংশকেই মৃত্যুর দুয়ারে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে।

    আমার বিশ্বস্ত সৈনিকেরা বিদ্রোহীদের কাবুলে ঢোকার আগেই ঘিরে ফেলেছিল। বিদ্রোহীদের কোনো রকমের সুযোগ না দিয়ে তাদের উপর আক্রমণ চালিয়ে নিকেশ করতে শুরু করে দিয়েছিল।

    এইভাবে অতি দ্রুত গতিতে বিদ্রোহীদের দমনের পর জ্বলে ওঠা আগুনের শিখা ওখানেই চাপা পড়ে রয়ে গেল। বিদ্রোহীদের দমনের খবর শুনতেই আমি ওই দুই বন্দীকেও মৃত্যুর স্বাদ চাখিয়ে দিলাম। খলিফার সুপারিশে যাদের আমি প্রকাশ্য ময়দানে মৃত্যুদণ্ড রদ করেছিলাম। তারাই ছিল বিদ্রোহের মূল। বিদ্রোহের আগুন তারাই জ্বালিয়েছিল। তাদের জীবন দান আমার জন্য এক ভয়ংকর ভুল বলে প্রমাণিত হতে পারত।

  • ষোড়শ অধ্যায় : বাবুরের গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য

    ষোড়শ অধ্যায় : বাবুরের গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য

    ষোড়শ অধ্যায় : বাবুরের গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য

    এ বছরের শুরুতে শাহ ইসমাঈল ও মুহম্মদ শায়বানি খান উজবেকের মধ্যে উত্তেজনা বেড়ে যাওয়ার খবরে কাবুল সরগরম হয়ে রইল। শাহ ইসমাইল শায়বানির বিরুদ্ধে সেনাভিযানের আদেশ দিয়েছেন, এ খবর বছরের মধ্যভাগে এসে আমার কাছে এসে পৌঁছাল।

    রমজান মাসে (ডিসেম্বর, ১৫০৯ ঈ.) মির্জা খান বেগ এসে একটি চাঞ্চল্যকর খবর দিলেন। তা ছিল ‘শাহ, ইসমাঈল নর্ভ-এর নিকট শায়বানিকে পর্যুদস্ত করে দিয়েছেন।

    আগে আমার কাছে একটি অপুষ্ট খবরও এসেছিল যে, শাহ ইসমাঈল শায়বানিকে শুধু পর্যুদস্তই করেননি, তার মাথাও ধড় থেকে নামিয়ে দিয়েছেন।19

    খবর নিঃসন্দেহে অপুষ্ট ছিল তবে আমার আকাঙ্ক্ষা অপূর্ণকারী ছিল। আমি নিজে বহুকাল ধরে শায়বানির সঙ্গে সামনা-সামনি মোকাবিলার আকাঙ্ক্ষা পোষণ করে আসছিলাম। যদি শাহ ইসমাঈলের হাতে শায়বানির মৃত্যু হয় তাহলে আমার অংশে বদলা নেওয়ার জায়গাটা আর কোথায় অবশিষ্ট থাকত?

    মির্জা খান পরে এ খবরও দিলেন—

    ‘উজবেকদের মধ্যে ছোটছুটি শুরু হয়ে গেছে। তারা সবাই আমু এলাকা সম্পূর্ণভাবে ত্যাগ করে চলে গেছে। আমু-র, তা সে উজবেক আমির হোক কিংবা সাধরণ মানুষ হোক, তারা আমু-র সাথে সাথে কুন্দুজ ছেড়েও পালিয়ে যাচ্ছে। কুড়ি হাজার মোগল সৈনিক মরগুয়া থেকে নিয়ে কুন্দুজ পর্যন্তকার সমস্ত এলাকা উজবেক-মুক্ত করে তুলোছে ‘

    মির্জা খান পরে আরো বললেন—

    আমি কুন্দুজ থেকে আসছি। আমি সবকিছু স্বচক্ষে দেখেছি।’

    আমি মির্জা খানের কথা সম্পূর্ণরূপে বিশ্বাস করলাম। অবিশ্বাসের কোনো কারণ ছিল না।

    শাহ ইসমাঈলের পক্ষ থেকে বাবুরকে আমন্ত্রণ

    মির্জা খান ওয়াইস কুন্দুজ ফিরে গিয়ে বাবুরকে পত্রবাহক দ্বারা বার্তা পাঠালেন। বার্তায় লেখা ছিল— ‘শাহ ইসমাঈল, তাঁকে (বাবুর) আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। বলেছেন তিনি এসে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করুন। একথাও বলেছেন যে, তিনি তাঁকে সহযোগিতা দিয়ে তাঁর পূর্বপুরুষদের এলাকাকে তাঁকে দেওয়ানোর ইচ্ছা রাখেন।’

    মির্জার পত্র যখন আমার কাছে পৌঁছাল, তখন পর্যন্ত তুষারপাতের কারণে কুন্দুজ পর্যন্ত উপত্যকা প্রায় সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ হয়ে পড়ছিল।

    আমি আব-দারার রাস্তা ধরলাম। রমজানের শুরুয়াতি দিনগুলোতে আমি বারমান হয়ে অগ্রসর হতে থাকলাম।

    আমি যখন কুন্দুজে পৌঁছালাম তখন পরিবর্তিত পরিস্থিতির খবর খুব উৎসাহব্যঞ্জকভাবে মির্জা খানের পক্ষ থেকে আমাকে দেওয়া হলো। তিনি মরওয়ার সমস্ত ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছিলেন। ইরানের সুলতান শাহ ইসমাঈল কীভাবে শায়বানিকে পর্যুদস্ত করেছিলেন, এ কথা তিনি খুব আবেগভরে বলতে লাগলেন।

    তাঁর এবারের বিবরণে এ কথা স্পষ্ট হলো যে, যুদ্ধে শয়বানি বীরের মতো লড়ে মৃত্যুবরণ করেছিলেন। তিনি একথাও বলেন যে, শাহ ইসমাঈল তাঁর জন্য সমরখন্দের শাসন প্রকাশ্যে ছেড়ে দিয়েছেন। তিনি ওদিকে অগ্রসর হয়ে সহজে সমরখন্দ অধিকার করতে পারেন। অন্যান্য উৎসাহব্যঞ্জক তথ্যাবলির মধ্যে মির্জা খানের পক্ষ থেকে যা পাওয়া গেল, তা ছিল এরকম—

    ‘আমার চাচা মাহমুদ মির্জা ও আহমদ মির্জার ফৌজ অকশায় শয়াবানির দ্বারা মর্মান্তিকভাবে পরাজিত হয়েছিলেন। তাঁরা এ সময়ে খুরাসানে গিয়ে মুগলিস্তানে পলায়িত আছেন। অনেক বড় সংখ্যক মোগল ফৌজ কাশগড়ে আমার প্রতীক্ষায় রয়েছেন। তাঁরা হলেন সেই ফৌজ, শায়বানি যাদের পরাজিত করে বন্দী করে রেখেছিলেন। শায়বানির মৃত্যুর পর তাঁরা মুক্ত। কিছু মোগল সৈনিক পশ্চিম দিক থেকে এসে আমার প্রতীক্ষায় আছেন।

    এরকম মোগল সৈনিকের সংখ্যা ছিল প্রায় কুড়ি হাজার। ওই সৈনিকদের এক শক্তিশালী নেতৃত্বের খুব প্রয়োজন ছিল। তারা হতাশ ছিল, নেতাবিহীন ছিল। আমি কুন্দুজ অভিমুখে রওনা হয়ে গেছি। ওখানে আমি দ্রুত পৌঁছাব, মির্জা খান ওয়াইস এই বার্তা পাঠিয়ে তাদের উৎসাহিত করে রেখেছিলেন।

    মির্জা খান ওয়াইসের সফল রাজনীতি ওই সময় তুঙ্গে উঠেছিল। তিনি তাদের আশ্বস্ত করে রেখেছিলেন এবং বিশ্বাস দিয়ে রেখেছিলেন যে, আমার নেতা পেলেই তাদের হৃত মর্যাদা শুধু পুনরুদ্ধারই হবে না; বরং তারা এই ভেবে গর্বিত হবেন যে, তাঁরা কাবুল ও মধ্য এশিয়ার সবচেয়ে বড় যোদ্ধা বাবুরের বাহিনীর সৈনিক।

    আমি যে ফৌজ নিয়ে মির্জা খানের কাছে পৌঁছেছিলাম, তার সংখ্যা ছিল পাঁচ হাজার। তারাও মোগল সৈনিক ছিল। পাঁচ হাজার মোগল সৈনিকের সঙ্গে কুড়ি হাজার মোগল সৈনিক বেড়ে যাওয়া গর্বের কথা ছিল।

    আমি তাদের সবাইকে সঙ্গে নিয়ে খাকান থেকে নিয়ে আন্দিজান অবধি জয় করতে করতে মোগলদের নিষ্কণ্টক মোগলিস্তান দিলাম। ওই এলাকাগুলোতে শাসনকারী উজবেক প্রশাসকদের খেদিয়ে সেগুলো মোগল প্রশাসকদের হাতে তুলে দিলাম। মোগলদের ‘খান’ উপাধি প্রদান করলাম।

    অল্পকিছু সময় কুন্দুজে অতিবাহিত করে আমি হিসার অভিমুখে রওনা হয়ে গেলাম। ওখানে উজবেক সুলতান মেহেদি ও হামজা শাসন করছিলেন।

    আমার হিসার আগমনের খবর পেয়ে পথিমধ্যে দু’জনেই আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। বিনা যুদ্ধে তাঁরা আমার বশ্যতা স্বীকার করে নেন।

    বাবুরের প্রতি শাহ ইসমাঈলের অনুকম্পা

    আমি তখনও কুন্দুজেই ছিলাম, তখন আমার বোন খানজাদাকে শাহ ইসমাঈল কর্তৃক তাঁর সামরিক সুরক্ষায় পাঠানো হলো। এটি শাহ ইসমাঈলের অনুকম্পা ছিল। আমার বোন খানজাদাকে শায়বানি জোরপূর্বক বিয়ে করেছিল। মরওয়ায় শায়বানি ও তার সিপাহসালার সৈয়দ হায়দারের পরাজয়ের পর তার সৈন্যরা পালিয়ে গিয়েছিল। এরপর, শাহ ইসমাঈল পরাজিত উজবেকদের শিবির পরিদর্শন করেছিলেন। কিছু শিবির জেনানখানা (মহিলা আবাস) রূপে ছিল। সেগুলোতে নারী ও শিশুরা ছিল।

    শাহ ইসমাঈল প্রত্যেকের সঙ্গে রাজকীয় আচরণ করেছিলেন। তিনি তাঁর শাহী বাহিনীয় সুরক্ষায় নারী ও শিশুদের ওই আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন যেগুলোকে তারা নিরাপদ বলে মেনে নিতে চাচ্ছিল।

    খানজাদার পরিচয় পাওয়ার পর শাহ ইসমাঈল তাকে সেখানে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন।

    শাহ ইসমাঈলের এই মানবিক ব্যবহারের প্রতি আমি আন্তরিকভাবে কৃতজ্ঞ ছিলাম। আমি সুদীর্ঘ কৃতজ্ঞতাসূচক পত্র শাহ ইসমাঈলকে লিখলাম এবং মির্জা খানকে তাঁর সেবায় পাঠালাম। কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন পত্রের সঙ্গে আমি মূল্যবান উপহার ও কিছু মৌখিক বার্তা পাঠালাম, যা মির্জা খান শাহ ইসমাঈলের সামনে উত্তম ভাবে বয়ান করতে পারেন।

    আমি শাহ ইসমাঈলের বিশ্বস্ত হওয়ার জন্য নিবেদন করেছিলাম, তাঁর আন্ত রিকতা প্রার্থনা করেছিলাম।

    আমি হিসার অভিমুখে পুনরায় রওনা হয়ে গেলাম। সেখানকার শাসন ব্যবস্থা শক্ত-পোক্ত করে তোলা এবং তাকে শত্রুদের কুদৃষ্টি থেকে রক্ষা করাটা ছিল আমার জজবাতি মামলা। সেখানে আমার পূর্ব পুরুষ তাইমুরের সালতানাত ছিল। উজবেকরা অনেক কাল ধরে তা অধিকার করে রেখেছিল। যদিও আমি হিসারকে, উজবেকদের কবল থেকে মুক্ত করিয়ে নিয়েছিলাম, তবুও এ সম্ভাবনা আমি অস্বীকার করতে পারতাম না যে আমার শক্তি বিকেন্দ্রিত করতেই তারা হিসারকে পুনরাধিকার করার চেষ্টা করতে পারে।

    হিসার পৌঁছাতেই এ সম্ভাবনা সত্য রূপে সামনে আসতে দেখলাম। পুল-এ-সঙ্গ (পাথরের সেতু)-এ উজবেকদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার খবর এল। তারা আক্রমণমুখী ছিল।

    একদিন মির্জা খান, শাহ ইসমাঈলের কাছ থেকে ফিরে হিসারে আমার কাছে এসে সাক্ষাৎ করলেন। তিনি খবর দিলেন যে, শাহ ইসমাঈল তার ইরানি বাহিনীর কিছু অংশ উপহার স্বরূপ পাঠিয়ে দিয়েছেন। ইরানি সেনা দ্রুত এসে আমার বাহিনীতে যোগ দেবেন।

    মাসের শেষের দিকে উজবেক বাহিনী একদিন সকালে দ্রুত এসে সুখ-আব সেতুর নিচে পৌঁছে গেল।

    খবর পেতেই আমি দ্রুতগতিতে পাহাড়ি রাস্তা ধরে আব-দারা পর্যন্ত এসে পৌঁছালাম। সেখানে পৌঁছেই যুদ্ধক্ষেত্রে ঝাঁপিয়ে পড়লাম।

    উজবেকদের উপর, পাহাড়ি রাস্তা ধরে এসে আমার সৈন্যরা যে হামলা চালাবে এ আশঙ্কা ছিল তাদের কল্পনাতীত। তারা তো সেতুর রাস্তা ধরে সে আগমনেরই আশা করছিল। মধ্যভাগ থেকে তাদের উপর হামলা হওয়াতে তারা ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল। ওই হামলায় উজবেকরা দলে দলে মারা পড়ল। পিছনে ফেরার কোনো সুযোগই তাদের দেওয়া হয়নি। জান বাঁচানোর জন্য তারা সামনে দরবন্দ-এ-আহন (ইরান দওয়াজা) র দিকে ছুটল। তারা এক রকম নিজেরাই দলে দলে মৃত্যুর মুখের দিকে ছুটছিল। পরে, হিসার সীমান্তে অবস্থিত কুসল থেকে কছম খান এক বড় বাহিনী নিয়ে নেমে পড়ল।

    কছম খান ছিল সয়ারানির উত্তরাধিকারী। সে উজবেক সরদারদের পক্ষ থেকে ‘উজবেক খাকান’ উপাধি লাভ করেছিল।

    কছম খান জান বাজি রেখে আমার সৈন্যদের বিরুদ্ধে যে তুমুল যুদ্ধ চালিয়ে গেল, সে কথা আমি হায়দার নামক ব্যক্তির কাছ থেকে শুনে স্তম্ভিত হয়ে গেলাম। হায়দায় যুদ্ধের পুরো দৃশ্যটি স্বচক্ষে দেখেছিল।

    আমি স্বয়ং যেহেতু সুখ-আব-এর মোর্চা থেকে উজবেকদের যুদ্ধের মজা চাখাচ্ছিলাম, সে জন্য কুরসলের উত্তরে উজবেক বাহিনীর যুদ্ধ দেখতে পারি নি। তাদের সঙ্গে লড়াই চালাচ্ছিল হিসার দরওয়াজায় প্রধান রক্ষকের নেতৃত্বাধীন বাহিনী।

    হায়দারের বয়ান অনুসারে-’কছম খান বাঘের মতো লম্বা-লম্বা লাফ দিয়ে মোগল সেনার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ছিল। সে যেখানেই পৌঁছাচ্ছিল, সেখানেই মোগল সৈনিকদের পংক্তি ফাঁকা করে দিচ্ছিল। এক মুহূর্তের জন্য তার সামনে দাঁড়ালে তার মুণ্ডু গড়াগড়ি যেত। সে অত্যন্ত ভয়ংকর ভাবে জান বাজি রেখে যুদ্ধ করছিল।’

    বাবরনামা অনুসারে-সমরখন্দ পুনঃপ্রাপ্তির জন্য যখন আমি (বাবুর) অগ্রসর হচ্ছিলাম, তখন এইরকমই একটি ‘পুল’-এর উপর উজবেকদের সঙ্গে হওয়া যুদ্ধে আমাকে পরাজয় বরণ করতে হয়েছিল। আমি সমরখন্দে পৌঁছাতে পারিনি।

    ওই দিনও যদি ‘পুল’-এর যুদ্ধে হেরে যেতাম তাহলে হিসার আমার হাত থেকে বেরিয়ে যেত, তবে, বিপুল সংখ্যক মোগল সেনার সামনে, সন্ধ্যা পর্যন্ত টেনে আনা যুদ্ধে উজবেক সেনা ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। তার কিছু শীর্ষ সরদারই মাত্র বেঁচে ছিল, আমার সৈন্যরা যাদের জীবিতাবস্থায় ধরে আনতে সক্ষম হয়েছিল।

    অস্ত্র সমর্পণকারী প্রধান লোকেদের মধ্যে য়াহুদি, হামজা ও তার পুত্র মামক ছিল প্রধান। আমার সামনে তাদের নিয়ে আসা হলো।

    আমার মন-মস্তিষ্কে তখন হায়দার দ্বারা বর্ণিত উজবেকদের সাহসিক যুদ্ধের দৃশ্য ভাসছিল। আমার মস্তিষ্কে এটাই ভাসছিল যে, ওরা আমার বাহাদুর সঙ্গীদের রক্ত বইয়ে দিয়েছে, এ কথা মনে আসতেই আমি হুকুম দিলাম—

    ‘খুন কা বদলা খুন! ইনকে কাপড়ে ভী খুন সে রংগ দো।’

    ‘রক্তের বদলে রক্ত! এদের বস্ত্রও রক্তে রাঙিয়ে দাও।’

    ইরানি সেনা উপহার

    যুদ্ধ সমাপ্তির পর আমি হিসারের নাগরিক বসতির দিকে অগ্রসর হতে লাগলাম। রাস্তায় স্থানীয় উপজাতির বহুসংখ্যক লোক আমাকে স্বাগত জানাতে এগিয়ে এল।

    ওখানেই আমি এক বিশাল ইরানি সেনাকে এগিয়ে আসতে দেখলাম। ওই সেনা শাহ ইসমাঈলের পক্ষ থেকে আহমদ বেগের নেতৃত্বে আমার কাছে পাঠানো হয়েছিল।

    শাহ ইসমাঈল সিল করা লিফাফাও পাঠিয়েছিলেন, যেটি খান্দ আমির নিয়ে এসেছিলেন। আমি লিফাফা খুললাম। পত্র পড়লাম। শাহ ইসমাঈল ট্রান্স অক্সিনিয়া বিজয়ের জন্য আমাকে পূর্ণ সহায়তা দানের আশ্বাস দিয়েছিলেন।

    আমি পত্রবাহক খান্দ আমিরের সামনে শাহ ইসমাঈলের নামে খুৎবা পড়লাম। মুদ্রায় আমি স্বেচ্ছায় ওই বারো ইমামের নামের মোহর লাগানোর কথা বললাম, শাহ ইসমাঈল যাদের মান্য করতেন। আমি উজবেকদের শক্তি সম্পূর্ণরূপে বিনাশ করার কথাও বললাম।

    এ সব কথা আমি শাহ ইসমাঈলকে বেশির চেয়েও বেশি করে প্রসন্ন করার জন্য বলেছিলাম। ওই সময়ে ইরানের শাহের ন্যায় বড় কোনো বাদশাহ মধ্য এশিয়ায় ছিলেন না। তিনি নিজে একজন শক্তিশালী যোদ্ধা ছিলেন। তাঁর বিশাল সেনা ছিল। তিনি তাঁর সম্প্রদায়কে মান্যকারী অথবা সম্প্রদায়ের সঙ্গে নৈকট্য রক্ষাকারীদের প্রতি সম্পূর্ণ উদার ছিলেন।

    তাঁর সম্প্রদায়ের প্রতি যে লোক বা জাতি বিরুদ্ধাচরণ করতেন, তিনি তাদের কট্টর শত্রু ছিলেন। মোগল ও মির্জা ঘরানার লোক শাহ ইসমাঈলের সম্প্রদায়ের উদার রুখের সমর্থক ছিলেন, যেখানে উজবেকবিরোধী বিরোধী ছিলেন। উজবেকরা যখন শক্তি বাড়িয়ে মির্জা ও মোগলদের ক্ষেত্র অধিকার করতে নেমে পড়েছিল, তখন শাহ ইসমাঈল খোদায়ী ফৌজদার হয়ে উজবেকদের নাশ করতে ইরান থেকে বেরিয়ে পড়েছিলেন।

    তিনি তখনও মধ্যে এশিয়ার উজবেকদের বিতাড়িত করে, বিজিত এলাকায় সেনা ছাউনি ফেলে রেখেছিলেন।

    তিনি মির্জাদের নির্ভয় করে দিয়েছিলেন। মোগলদের নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছিলেন। তিনি এটাই ওজন করেছিলেন যে, মধ্য এশিয়ায় উজবেকদের মাথা তোলার আগেই কে তাদের দমন করতে পারে। আমার নামই তিনি নিয়েছিলেন। তিনি না চাইতেই সেনা সাহায্য পাঠিয়ে দিয়েছিলেন এবং আগেও দিতে থাকার আশ্বাস দিয়েছিলেন।

    আমি তাঁর মেজাজ বুঝে নিয়ে আমার পক্ষ থেকে কিছু মুখ্য বিষয়কে পত্রে লিখলাম। আমি জানতাম যে, ওই কথায় শাহ ইসমাঈল খুশি হয়ে যাবেন।

    আমি তৎক্ষণাৎ লড়াইয়ে উজবেকদের পতন, মেহেদি ও হামজার উপর বিজয়ের কথাও লিখে দিয়েছিলাম

    শাহ ইসমাঈলের দূতকে পত্র লিখে রওনা করিয়ে দেওয়ার পর আমার সেনানায়কদের সঙ্গে সলা-পরামর্শে বসে গেলাম। পরামর্শে একথা সর্বসম্মতিক্রমে সামনে এল যে, আমাকে সমরখন্দ ও বুখারা দ্রুত নিয়ন্ত্রণের মধ্যে নিয়ে আসা উচিত।

    এক সেনানায়ক বললেন— ‘বুখারা এখন সেনামুক্ত এবং মুর্খদের দ্বারা ভয়ে আছে।’

    বুখারার শাসক উবাইদ খাঁ এ সময়ে পালিয়ে গিয়ে কুর্শলের মধ্যে নিজেকে সীমিত করে নিয়েছিলেন।

    আমার সেনা বুখারা অভিমুখে রওনা হয়ে গেল। সেনার অনুসন্ধানী দলকে আমি কুর্শলের দিকে রওয়ানা করিয়ে দিলাম। উবাইদ খাঁ কুর্শল থেকে বেরিয়ে বুখারার দিকে পালিয়ে গেলেন। আমার সেনা তাকে ধাওয়া করল। তিনি উপত্যকা ও পাহাড়ি পথে সমতল এলাকায় নেমে তুর্কিস্তানে পৌঁছালেন। তুর্কিস্তান থেকে আরো কিছু রাস্তা যেত। তিনি কোন রাস্তা ধরে কোথায় যে পালিয়ে গেলেন তার আর হদিস পাওয়া গেল না।

    উবাইদ খাঁ-র দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাবার পর, আমার সেনার জন্য বুখারা খালি পড়ে ছিল। তখন কোনো বাধা ছাড়াই বুখারা আমার অধিকারে এসে গেল।

  • সপ্তদশ অধ্যায় : বাবুরের সমরখন্দ পুনবিজয়

    সপ্তদশ অধ্যায় : বাবুরের সমরখন্দ পুনবিজয়

    সপ্তদশ অধ্যায় : বাবুরের সমরখন্দ পুনবিজয়

    আমার বুখারা পৌঁছানোর পর সেখানকার আমিররা আমাকে ভরপুরে স্বাগত জানালেন। তাঁরা মূল্যবান উপহার-সামগ্রী নিয়ে এলেন। বুখারা থেকে আমি সমরখন্দে ১৫১১ ঈসায়ী সনের অক্টোবরে পৌঁছালাম। সেখানেও আমাকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানানো হলো।

    কাবুল ত্যাগের দশ মাস পরে আমি সমরখন্দে পৌঁছেছিলাম। নয় বছর পরে আমি সমরখন্দ আবারও লাভ করেছিলাম। আমি সমরখন্দের যে পথ ধরে এগিয়ে চলেছিলাম, দুই দিক থেকে নাগরিকেরা সড়ক সাজিয়ে রেখেছিল।

    তারা আমাকে সাদর অভ্যর্থনা নিজ-নিজ ঢঙে করছিলেন। একজন বাদশাহ হিসেবে আমার কর্তব্য ছিল সমরখন্দের অধিবাসীদের তাদের ঐতিহ্যগত রীতি-রেওয়াজকে স্বাধীনভাবে পালন করতে দেওয়া, তবে ওই সময় আমাকে রাজনৈতিক বুদ্ধিবৃত্তির গুরুত্ব দিতে হচ্ছিল।

    শাহ ইসমাঈল সমরখন্দে মুহম্মদ জান ও নজমে সানী নামক দুই ব্যক্তিকে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ রক্ষক রূপে নিযুক্ত করে রেখেছিলেন। নিশ্চিত রূপে তিনি তাদের সমরখন্দে এই বিষয়ের উপর নজর রাখার জন্য রেখে গিয়েছিলেন যে, আমি সমরখন্দে পৌঁছে কোন কোন রীতি-রেওয়াজকে প্রাধান্য দিচ্ছি।

    সমরখন্দে অনেক কাল ধরে উজবেকদের প্রভুত্ব ছিল, তারা হামেশাই শিয়া সম্প্রদায়ের রীতি-রেওয়াজের বিরোধিতা করত। তাদের এমন কোনো নৈকট্য শিয়াদের সঙ্গে হয়নি, যেমন নৈকট্য মির্জা ও মোগলদের সঙ্গে মিলে যায়। সমরখন্দে উজবেকদের প্রভুত্বের কারণে অধিকাংশ সমরখন্দিই উজবেকদের নিয়ম-কানুন গ্রহণ করেছিল। যদিও তাদের উজবেক নয়, সমরখন্দি বলা হতো, তবে উজবেকদের রীতি-রেওয়াজ অবলম্বনের ফলে তাদের আলাদা পরিচিতি গড়ে উঠেছিল।

    সমরখন্দে প্রবেশ করার সময় সাদর অভ্যর্থনা লাভের পর আমি এই বিষয়ে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করেছিলাম যে, উজবেকদের চিন্তাধারা অবলম্বনকারী লোকেদের অভ্যর্থনা স্বীকার করব না।

    এ সতর্কতা এ জন্যই আবশ্যক ছিল, কেননা, আমি শাহ ইসমাঈলের চিন্তাধারা স্বীকার করার ওয়াদা লিখিতরূপে দিয়েছিলাম। এ কথা আমার মনে রাখতে হচ্ছিল যে, মুহম্মদ জান ও নজমে সানীর দৃষ্টি আমার উপর নিবদ্ধ থাকতে পারে। তাঁরা আমার বিরুদ্ধে ইসমাঈলকে বার্তা দিতে পারেন।

    উজবেকদের প্রত্যাবর্তন

    শাহ ইসমাঈলের সৈন্যদের ইরানে ফিরে যাওয়ার কিছুদিন পরেই উজবেকরা পুনরায় পঙ্গপালের মতো তুর্কিস্তানে ঢুকতে লাগল। তখন পাতাঝরার মৌসুম চলছিল।

    উজবেকদের উদ্দেশ্য ছিল তাসখন্দ পুনরাধিকার।

    ওই সময়ে উজবেকদের মুখিয়া ছিল উবাইদ খাঁ নামক এক যুবা সরদার। সে বুখারায় প্রবেশ করতেই প্রতিজ্ঞা করল যে, সে যদি তাসখন্দ বিজয়ে সফল হয় তাহলে সে মুসলমানদের নিয়ম গ্রহণ করবে।

    উবাইদ খাঁ এই প্রতিজ্ঞা ‘হজরত তুর্কিস্তান’-এর মাজারে গিয়ে সেখানে উপস্থিত লোকেদের সামনে করল। সুফি সন্ত খাজা আহমদ মসাজভী ‘হজরত তুর্কিস্তান’ নামে প্রসিদ্ধ।

    হজরত খাজা আহমদ মসাজভী মধ্য এশিয়ার এমন এক সুফি সন্ত যিনি বহু দেশেই মান্য। ১১২০ ঈসায়ী সনে তিনি ইন্তেকাল করেন। তাঁর নেক যশের কীর্তি চারদিকে এইভাবে ছড়িয়ে পড়ে যে, ১৩৩৭ ঈসায়ী সনে তাইমুর বেগের মতো বাদশাহও তীর্থাযাত্রার রূপে হজরত তুর্কিস্তানের মাজারে শ্রদ্ধাবনত চিত্তে হাজিরা দিয়েছিলেন। তিনি সেখানে একটি মসজিদও বিনির্মাণ করিয়েছিলেন যেটি ছিল নগরের সবচেয়ে সুন্দর মসজিদ। তীর্থ যাত্রীদের জন্য হজরত তুর্কিস্তানের মাজারের সাথে সাথে ওই মসজিদেরও গুরুত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়ে গিয়েছিল।

    উবাইদ খাঁ কর্তৃক হজরত তুর্কিস্তানের মাজারে কৃত প্রতিজ্ঞাকে এমন লোকও শুনেছিলেন যাঁরা আমার নিকটজন ছিলেন। ওই নিকটজনদের মধ্য থেকেই একজন আমাকে উবাইদ খানের প্রতিজ্ঞার কথা জানিয়েছিলেন।

    কুল্লে মালিকে বাবুরের পরাজয়

    এপ্রিল-মে ১৫১৩ ঈসায়ী সনে আমি উবাইদ খাঁ-র বিরুদ্ধে কুল্লে মালিকে আমার সেনা নামাই এবং আমাকে পরাজয় বরণ করতে হয়।20

    ওই সময় আমি আমার তাঁবুতেই ছিলাম, তখন আমি আমার সেনার ধ্বংস ও উজবেকদের বিজয়বার্তা এল। এবার বুখারায় শরণার্থীর মতো অবস্থায় রয়ে গেলাম।

    সমরখন্দ ছাড়লেন বাবুর

    ওই সময় আমার পক্ষে শরণার্থী অবস্থায় সমরখন্দ ফিরে যাওয়ার সম্ভব ছিল না। আমি আমার পরিবারের সদস্যদের কোনো রকম একত্রিত করলাম এবং হিসারের উদ্দেশে রওনা হয়ে গেলাম।

    ওই সময়ে আমার সঙ্গে মাহম ও তার পুত্র হুমায়ূন ছিল। মোহরজাহী ও বারবুল ছিল। মাসুমা গুলরুখ (গুলবদন) নিজের পুত্র কামরানের সাথে ছিল। সঠিক রাস্তা আমার জানা ছিল না। কিছু স্থানীয় বাসিন্দা আমাকে পরামর্শ দেয় যে, ফারগানা হয়ে হিসার যাই।

    আমি আশা নিয়ে ফারগানা যাওয়াই উত্তম বিবেচনা করলাম যে, সেখানে সৈয়দ খায়ের কাছ থেকে কোনো প্রকারের সাহায্য পাওয়া যাবে। আমার কাছে খবর আসতে থাকে যে, তাশখন্দ এখনও আহমদ কাসিম কোহবরের অধিকারে রয়েছে। আহমদ কাসিম কোহবরকে আমিই আমার পিছনে তাসখন্দের প্রতিনিধি করে রেখে এসেছিলাম। তবে আমি জানতাম যে, এ অধিকার বেশি সময় পর্যন্ত থাকবার নয়। উজবেকদের পক্ষ থেকে পুরো প্রস্তুতি সহকারে তাসখন্দ আক্রমণ করা হবে। আমার অনুপস্থিতির কারণে আমার সেনাপতি সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারবে না। তাসখন্দ তাঁর হাত থেকে বেরিয়ে আরো একবার উজবেকদের হাতে চলে যাবে।

    বাবুর হিসারে

    বুখারার পর অনতিবিলম্বেই সমরখন্দ উজবেকদের অধিকারে চলে গেল। সমরখন্দ অধিকারের সময় তারা সেখানকার বাসিন্দাদের সঙ্গে সদ্‌ব্যবহার করল।

    আমি জুলাই-আগস্টে হিসার পৌঁছে গেলাম। মির্জা খান দ্বারা প্রেরিত সামরিক সাহায্য আমি হিসারে প্রবেশ করেই পেয়ে গিয়েছিলাম। যে ফৌজি পাঠানো হয়েছিল তারা আমার জন্য তাদের শেষ রক্তবিন্দুটুকু বইয়ে দেওয়ার সাহস রাখত। বখ্ থেকে বৈরাম বেগও আমার কাছে সৈনিক পাঠালেন, কিন্তু তারা সংখ্যায় কেবল ৩০০ ছিল।

    আমি একথাও শুনলাম যে, নজমে সানী একটি বড় সেনাদল নিয়ে বলখের রাস্তা ধরে আমার কাছে আসার জন্য রওনা হয়ে গেছেন।

    নজমে সানীর বিষয়ে পরে আমি জানতে পারি যে, তিনি ১১,০০০ সৈন্য নিয়ে রওনা হয়েছিলেন, তবে যেইমাত্র খুরাসান সীমান্তে পৌঁছান তিনি খবর পেলেন যে, কুল্লে মালিকের কাছে আমার পরাজয় ঘটেছে, তখনই তিনি বলখ অভিমুখে রওনা দিলেন। তিনি সেখানে বৈরাম বেগের কাছে কুড়ি দিন পর্যন্ত অবস্থান করলেন।

    তিনি শাহ ইসমাঈলের কাছে নিজের লোক পাঠিয়ে দিয়েছিলেন যাকে তাঁর পরবর্তী আদেশ বয়ে নিয়ে আসার কথা ছিল। শাহ ইসমাঈলের কাছ থেকে আসার পরই নজমে সানী কোনো পদক্ষেপ নিতে চাচ্ছিলেন।21

    মোগলদের আক্রমণের আশংকা

    হিসারে আমি আমার শিবির নগর বসতির বাইরে ফেললাম। এর কারণ ছিল হিসারের মোগলরা আমাকে পছন্দ করত না। এরকম আগেও ছিল। তারা আমার সঙ্গে বিদ্রোহ করেছিল। আমার হিসারে অবস্থানের কথা শুনে তারা আবারও এমন পদক্ষেপ নিতে পারত।

    আমি কিছু সময় কিম্‌-এ কাটালাম। এটা শাহ ইসমাঈলের শাসনের অন্তর্ভুক্ত ছিল। এখানে আমি সম্পূর্ণ রূপে নিরাপদ ছিলাম। বাবুরের এই সময়কার বিষয়ে বাবুরের সমকালীন ঐতিহাসিক হায়দার লিখেছেন, তিনি ওই সময়টি কুন্দুজে কাটান। তিনি সে সময়ে আর্থিক দুর্দশায় পড়েন। তিনি সময় কাটানোর জন্য বিনম্র ও সাদামাটা ভাবে ছিলেন। তিনি কোনো রকমে কাবুল পৌঁছানোর জন্য সামরিক সাহায্যের অপেক্ষা করছিলেন।

    তিনি ১৫১৪ ঈসায়ী সনের শেষে কাবুল পৌঁছাতে সমর্থ হন। তিনি সমরখন্দ পুনর্বিজয়ের চেষ্টায় নেমে পড়লেন। ওই সময় পর্যন্ত কাবুলের শাসনভার তাঁর সভাই নাসির মির্জা সামলেছিলেন।

    উল্লেখ্য যে, বাবুরের কাবুল পৌঁছানোর পর নাসির মির্জা পরম বিনয় ও শ্রদ্ধা-সম্মানের সঙ্গে তাঁকে ওই প্রকারের স্বাগত জানিয়েছিলেন যেমনটি কোনো প্রতিনিধি তাঁর বাদশাহর নিজের সামাজ্যে প্রবেশ করলে জানানো হয়। তিনি বাবুরকে বলেছিলেন, তাঁর অনুপস্থিতিতে তিনি গজনী থেকে কাবুলে এসে সেখানকার দেখাশোনার দায়িত্ব পালন করাটা তাঁর কর্তব্য বলে মনে করেছিলেন।

    নাসির মির্জার এই ব্যবহার বাবুরকে দয়াবান করে দিয়েছিল। তিনি তাঁর প্রতি অত্যধিক খুশি হয়েছিলেন। এই সময়ের জন্য অন্য ঐতিহাসিক লিখেছেন, গজনীতে ফেরার সময় পথিমধ্যে নাসির মির্জার আকস্মিক মৃত্যু হয়ে গেল। তাঁর মৃত্যুর সাথে-সাথেই গজনীতে ক্ষমতার জন্য দ্বন্দ্ব ছড়িয়ে পড়ল। শেরিম তঘাল ক্ষমতার দাবিদারদের অন্যতম ছিলেন। তিনি মোগলদের সমর্থন পেয়েছিলেন। অন্য কিছু লোক যারা ক্ষমতাসীন হতে চাচ্ছিল, তাদের মধ্যে পাশাগড়ের বাবার নামও জুড়েছিল।

    কিছু সরদার পরস্পরের মধ্যে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়েছিলেন। তাঁরা বাবুরের পক্ষ থেকে গজনীর ক্ষমতার জন্য কারো নাম আসার পূর্বেই গায়ের জোরে গজনীর ক্ষমতায় নিজেই বসে যেতে চাচ্ছিলেন। ক্ষমতার দাবিদারি নিয়ে অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহও হয়ে গিয়েছিল।

    তাঁরা বাবুরের দুর্বল অবস্থার সুযোগ নিতে চাচ্ছিলেন, অথবা তাঁরা একথা জানতেন না যে, বাবুর কাবুলে পৌঁছে গিয়েছেন।

    দোস্ত বেগ হিসেব মতো অন্য দাবিদারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের হুমকি দিয়ে বসেছিলেন।

    ওই সময় কাশিম বেগের পুত্র কম্বর আলী, কুন্দুজ থেকে একটি বড় ফৌজ নিয়ে গজনী পৌঁছালেন। (কাশিম বেগের সঙ্গে বাবুরের অতি নিকট রক্তের সম্পর্ক ছিল) তিনি বাবুরের প্রতিনিধি রূপে বিদ্রোহীদের সতর্ক করলেন। তাদের মন-মস্তিষ্ক ঠিক করতে শক্তি প্রদর্শনকারীদের ধরে এনে এনে মৃত্যুর ঠিকানায় পাঠিয়ে দেওয়া হলো। অনতিবিলম্বেই কাশিম বেগ শক্তি প্রদর্শনকারীদের দমন করে ফেললেন। মৃত্যুর কবল থেকে মুক্তি পাওয়া দাবিদাররা প্রাণভয়ে পালিয়ে গেল। শেরিম তঘাল কাশগড়ের দিকে পালিয়ে গেল। কাশগড়ের শাসন সৈয়দ খান নামক ব্যক্তির হাতে ছিল। তিনি তাঁকে আশ্রয় দিতে আপত্তি করলেন। শেরিম তঘাল কাশিম বেগের হাতে নিহত হওয়ার চেয়ে বাবুরের পায়ে পড়ে মৃত্যুবরণকে অধিক শ্রেয় বলে মনে করলেন।

    তিনি অত্যন্ত মারাত্মক অবস্থায় কোনো রকমে বাবুরের নিকট পর্যন্ত পৌঁছালেন, বাবুরও তাঁর দিক থেকে নজর ফিরিয়ে নিলেন। অবশ্য, তাঁর পুরনো সেবার কথা মনে করে তাঁকে জীবনদান করা হলো। তাঁর চিকিৎসারও ব্যবস্থা করা হলো। তবে কিছুদিন পর তিনি মৃত্যুবরণ করলেন।

    এই পর্যন্ত সময়-কালের মধ্যে বাবুর তাঁর অধিকাংশ সময় কাবুল এবং তার আশপাশের নগরগুলোতে মোগলদের ঐক্যবদ্ধ করার কাজে কাটিয়ে দিলেন। এই পর্যন্তকার সময় কালের মধ্যে বাবুরের দ্বিতীয় পুত্রের জন্ম হলো। তাঁর নাম রাখা হলো মুহম্মদ। পরে তিনি আসকারি নামে পরিচিত হন। আসকারির মা ছিলেন গুলরুখ বেগম। এক তাঁবুতে তাঁর জন্ম হয়েছিল।

    বাবুরের এই সময় কালের বিষয়ে খাবন্দ আমির নামক ঐতিহাসিক আলোকপাত করেছেন।

    খাবন্দ আমির কয়েক বছর আগে পর্যন্ত বদিউজ্জামান বাইকুরার নিকটতম ব্যক্তি ছিলেন। তিনি ছিলেন মির্জা বংশীয়। তিনি কিছুকাল শাহ ইসমাঈলের বখ্-এ অনুগ্রহভাজন হয়ে থেকেছিলেন। কাবুল পৌঁছানোর পর বাবুর খাবন্দ আমিরকে কাবুলের ডেকে নিয়েছিলেন।

    এই সময়টা বাবুরের কিছুটা স্বস্তিতে কাটছিল। ওই সময়ে মির্জাদের ঐক্যজোট বাবুরের পক্ষে এসে গিয়েছিল। মধ্যে এশিয়ার সকল প্রধান মির্জা সরদার মুহম্মদ খাজার নেতৃত্বে কাবুলে এসে বাবুরের সঙ্গে মিলিত হয়েছিলেন। বাবুরের প্রতি তাঁরা তাঁদের পূর্ণ সমর্থন জ্ঞাপন করেছিলেন। বাবুর এই সময়কালে ঘুর ও ফিরোজ কোহে যাত্রা করেন।

    বাবুর মির্জাদের সম্বন্ধকে আরো নিকটতর করে নেওয়ার জন্য নিজের এক কন্যাকে এক মির্জা যুবকের সঙ্গে বিবাহ দিয়েছিলেন। জামাতা হয়ে যাওয়া মির্জা যুবকের বয়স ছিল ২১ বছর, যেখানে বাবুরের কন্যা বয়স ছিল কেবল ৯ বছর। যুবক বলখের অধিবাসী ছিল।

    এই সময়ে বাবুর কান্দাহারও যান। কান্দাহারে শান্তি ছিল। সেখানকার রাজনৈতিক বাতাবরণ সম্পূর্ণরূপে বাবুরের পক্ষে ছিল।

    খাবন্দ আমিরের ভাষায়-’বহুমূল্য মণিমাণিক্য দিয়ে বাবুরকে স্বাগত জানানো হলো।

    এই দিনগুলোতে বাবুর অনেক মির্জাকে কান্দাহারে উচ্চপদ দিয়ে সম্মানিত করেন। এই পদগুলো ইতোপূর্বে ইরানি ও উজবেকিদের অধীনে ছিল এবং ওই সময়ে শূন্য পড়ে ছিল।

    এই সময়ে বাবুর কাবুলের উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত এলাকাগুলোকে পূর্ণরূপে নিজের অধিকারে নিয়ে নেন। এই অভিযানে বাবা-কারা উপত্যকাসমূহ বাবুরের অধিকারে চলে আসে।

  • অষ্টাদশ অধ্যায় : বাবুরের বাজৌর বিজয়

    অষ্টাদশ অধ্যায় : বাবুরের বাজৌর বিজয়

    অষ্টাদশ অধ্যায় : বাবুরের বাজৌর বিজয়

    মুহররম-উল-হারাম মাসের পয়লা তারিখ, সোমবার, চন্দাবল উপত্যকায় এক প্রবল ভূমিকম্পের সংবাদ পাওয়া গেল।

    ভূকম্পের ধ্বংসলীলার খবর পেতেই আমি সসৈন্যে ভূমিকম্প-পীড়িতদের সাহায্যের জন্য রওনা হয়ে গেলাম।

    উপত্যকা পর্যন্ত পৌঁছানোর পথেই বাজৌর কেল্লা পড়ত। সেটি খাহর গোত্রের লোকেদের অধিকারে ছিল। তারা আমার অধীনতা পাশে আসতে পারেনি। বাজৌর কেল্লায় অধিপতি খাহরদের সরদার নিজেকে সুলতান বলতে পছন্দ করতেন।

    আমি আমার এক বিশ্বস্ত সৈনিক দিলাজক আফগানকে কেল্লা অভিমুখে পাঠালাম যাতে সে সুলতানকে বলে কয়ে অধীনতা স্বীকার করানোর জন্য রাজি করাতে পারে।

    সুলতান নামক ব্যক্তিটি ছিল একেবারেই অসভ্য, মূর্খ। সে দিলাজক আফগানের কোনো কথাই শুনল না। দুর্ব্যবহার করল। অত্যন্ত হিংস্রতার সঙ্গে দিলাজক আফগানকে ফিরে আসার রাস্তা দেখিয়ে দিল।

    এবার ওই আদিবাসীদের উপর আক্রমণ চালিয়ে কেল্লা অধিকার করা ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না। ভূমিকম্প পীড়িতদের উপত্যকা পর্যন্ত লোকেদের সাহায্য পৌঁছে দেওয়ার জন্য ওই রাস্তাটাই শুধুমাত্র অবশিষ্ট ছিল। ওই রাস্তা দিয়ে এগুনোর পথে খাহর উপজাতিরাই একমাত্র বাধা ছিল। তাদের বিজিত করেই তবে মাত্র এগিয়ে যাওয়া যেত, নইলে তাদের আক্রমণে আমার সৈন্যদের ভয়ানক ক্ষতি হয়ে যেত।

    বৃহস্পতিবার, চার মুহররম তারিখে আমি কাবুল থেকে তীরন্দাজ ও ঘোড়সওয়ারদের একটি বড় সেনা আনিয়ে নিলাম। আগত সৈন্যদের আমি বাজৌর কেল্লার বাম দিকের পাহাড়ি অংশের দিকে পাঠালাম।

    আমি পদাতিক সৈন্যদের উত্তর দিকে নামালাম। ওই রাস্তাটি চারদিক থেকে পানিতে ভরা ছিল। উত্তর-পশ্চিমের পথ ধরে কেল্লা অবধি পৌঁছানোর রাস্তা নেহাত এবড়ো-খেবড়ো ছিল।

    কেবলমাত্র দক্ষিণ দিককার রাস্তাটি সমতল ছিল, যেখানে কেল্লার প্রধান দ্বার ছিল। পাহাড়ের দিক থেকে অবরোধ করার জন্য দোস্ত বেগের নেতৃত্বে সৈনিকদের পাঠানো হলো। তারা তখনও পর্যন্ত কেল্লা পর্যন্ত পৌঁছাতেই পারেনি, এমন সময় পানি বাহিত পথ ধরে চলমান সৈনিকদের সামনে এক-দেড়শো তীর-ধনুক সজ্জিত জংলি লোক এসে গেল। তারা হই-হল্লা করতে করতে সৈনিকদের উপর তীর বর্ষণ শুরু করে দিল।

    মোল্লা আবদুল মালিক, যাকে আমরা মজা করে ‘সিরফিরা’ সৈনিক বলতাম, সে ওই সময় তার সিরফিরা হওয়ারই পরিচয় দিল। আমার সৈনিকদের উপর জংলিদের তীর বর্ষণ হতে দেখেই সে ঘোড়ায় লাগাম পরাল এবং তাকে এবড়ো-খেবড়ো রাস্তা দিয়ে ছুটিয়ে দিল।

    কোনো সাধারণ মানুষ এমন বিপজ্জনক কাজ করতে পারত না। একজন সিরফিরাই তা পারত। এবড়ো-খেবড়ো রাস্তা ধরে ঘোড়া ছোটানোর এই পথে প্রতি পদে-পদে মৃত্যু অপেক্ষা করছিল। তবে সে পলক ফেলতেই পাহাড়-সংলগ্ন কেল্লার প্রাচীর পর্যন্ত পৌঁছে গেল। তীরন্দাজদের তীর ঢাল দিয়ে রুখতে রুখতে সে লাফ গিয়ে কেল্লায় প্রাচীরে উঠে পড়ল। তারপর তরবারি দিয়ে তীরন্দাজদের মাথা নামিয়ে দিতে লাগল।

    তাঁর এই অকস্মাৎ বীরত্ব দেখে ওই রাস্তায় অগ্রসরমান সৈনিকদের উৎসাহ বেড়ে গেল। পদাতিক সৈনিক, যারা সিঁড়ি ও দড়িতে সজ্জিত ছিল, দ্রুত দৌড়ে কেল্লার প্রাচীর পর্যন্ত পৌঁছে গেল। দড়ি কমন্দ ফেলে, সিঁড়ি লাগিয়ে কেল্লার দেওয়ালে উঠে গেল।

    মোল্লা তির্কি আলী ও তার এক অধীনস্ত তিংরি বিদিও তরবারি ও ঢালের শক্তি দেখাতে দেখাতে কেল্লায় দাখিল হয়ে শত্রুদের মুণ্ডুপাত করতে লাগল।

    উস্তাদ আলী কুল পাঁচ জনকে কেল্লা প্রাচীরের উপর থেকে মেরে ফেলে দিল। দুজনকে জীবিত ধরে নিচে টেনে আনল। ওর দিককার অন্য সবাই পুরো জোশের সঙ্গে নিজেদের কর্তব্য পুরো করল। দাস বাজৌরিয়াদের অগ্নি-উদ্গীরণকারী অস্ত্র দিয়ে মারা হলো।

    এ সবের মধ্যেই সন্ধ্যা নেমে এসেছিল। রাত হয়ে আসছিল। বাজৌর কেল্লা সম্পূর্ণ রূপে অধিকৃত হতে পারল না। আমার সেনাকে আক্রমণ বন্ধ করার আদেশ দিলাম।

    মুহররম মাসের পঞ্চম তারিখ, শুক্রবার ভোরেই যুদ্ধের নাকাড়া বাজানো হলো। সেনা যুদ্ধের জন্য রণাঙ্গণে নেমে পড়ল। প্রত্যেক সৈনিককে নিজ-নিজ দলে থেকে যুদ্ধ করার কথা জানিয়ে দেওয়া হলো।

    কেল্লার মধ্য ভাগ্যের বাম দিককার অবরোধের নেতৃত্ব খলিফা শাহ হাসান অধিম’ এবং ‘ইউসুফ আহমদ’ এর হাতে অর্পণ করা হলো।

    দোস্ত বেগের নেতৃত্বাধীন দলকে উত্তর-পশ্চিম দিকে হাঁটা পথে রওনা করানো হলো।

    উস্তাদ আলী কুলকে পূর্বের দিনেরই নেতৃত্ব দেওয়া হলো। ওই দিনও তিনি খুব বীরত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করলেন।

    অবশিষ্ট সৈনিকদের সিঁড়ি ও অগ্নি উদ্গীরণকামী অস্ত্রসহ ডান দিকের মোর্চার সঙ্গে রওনা করা হলো।

    মধ্য অংশে মুহম্মদ আলী জংগ ও তাঁর ছোট ভাই নৌরোজকে লাগানো হলো।

    বাজৌরিয়া বিজয় ও যুদ্ধ এতটা সহজ ছিল না যেমনটি আমি পূর্বে মনে করেছিলাম। এই এলাকা আমার জন্য নতুন ছিল। তাদের শক্তি ও রণকৌশল সম্পর্কে সঠিক জানকারি আমার ও আমার সৈন্যদের ছিল না।

    পরদিনের যুদ্ধে আমার সৈনিকেরা পুরো শক্তি প্রয়োগ করল। তারা কুড়াল, তীর-ধনুক, অগ্নি-উদ্গীরণকারী অস্ত্র, তলোয়ার, বর্শাও ভালার মতো সকল যুদ্ধ সরঞ্জাম ব্যবহার করছিল।

    দু-তিন ঘণ্টার পর দোস্ত বেগের নেতৃত্বাধীন দল উত্তর-পূর্বের মিনারে পৌঁছে যেতে সমর্থ হলো। বাজৌরিয়ার ওই দিককার রক্ষণভাগ সম্পূর্ণরূপে ভেঙে দেওয়া হলো।

    অন্য অংশ থেকে সৈনিক, সিঁড়ি ও কমন্দ ফেলে কেল্লায় উপর উঠে পড়তে লাগল।

    আল্লাহর অসীম কৃপায় পরবর্তী দু-তিন ঘণ্টার পর কেল্লার উপরি অংশটি পুরোপুরি আমার সৈনিকদের কবজায় এসে গেল। কেল্লার নিচের অংশ ও কেল্লার মূল ফটকে তখনও যুদ্ধ চলছিল।

    সেখানেও তারা সুদক্ষ যোদ্ধার পরিচয় দিয়ে যুদ্ধ জিতে নিল। বাজৌর কেল্লা পুরো অধিকৃত হয়ে যাবার পর বাজৌরি জাতির বিষয়ে আমি জানতে পারলাম যে, ইসলামের সঙ্গে কোনো দূরতম সম্পর্কও তাদের ছিল না। তাদের রসম-রেওয়াজ সম্পূর্ণরূপে প্রকৃতিবাদী ও অসভ্য ছিল।

    প্রায় ৩,০০০ বাজৌরি যুদ্ধে মারা গেল। তাতে তাদের সুলতান ও তার নিকটতম লোকেরাও ছিল।

    কেল্লা নিরীক্ষণ করার জন্য যখন আমি প্রবেশ করলাম তখন চারদিকে শুধু লাশ আর লাশ দেখলাম। বাজৌর সুলতানের সুরক্ষিত কক্ষটিও নিরীক্ষণ করলাম।

    আমি বাজৌর রাজ্যকে, খাজা কলার রাজ্যের অংশ বলে ঘোষণা করলাম। মাগরিবের নামাজের পর আমি সেনা ছাউনিতে ফিরে এলাম।

    বাজৌর ভ্রমণ

    ৬ মুহররম তারিখে আমি বাজৌরের বাবা কলার উপত্যকায় অবতরণ করলাম। উপত্যকার ভূকম্প-পীড়িতদের কাছে গিয়ে তাদের উপর আসা প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের প্রতি আমার সমবেদনা প্রকাশ করলাম এবং তাদের জন্য সাহায্যের ব্যবস্থা করলাম।

    তারপর আমি খাজা কলায় ফিরে এলাম, তখন বাজৌরির কয়েদিরা ক্ষমা চেয়ে বলল, তাদের বউ-বাচ্চাদের মুক্ত করে দেওয়া হোক। কেউ কেউ তাদের বউ-বাচ্চাদের নিয়ে বাজৌর ছেড়ে চলে যাবার প্রার্থনা জানাল তো কেউ-কেউ তাদের মৃত আত্মীয়-স্বজনদের অন্তিম সৎকার করার জন্য অনুমতি চাইল।

    আমি তাদের প্রার্থনা মঞ্জুর করে নিলাম।

    তবে সুলতানের আত্মীয়-পরিজন ও তার পদাধিকারীদের মুক্ত করে দেওয়াটাকে আমি উচিত বলে মনে করলাম না। এরকম কিছু বন্দীকে আমি কাবুলের দিকে, বাজৌর বিজয়ের সুসংবাদ সহ রওনা করিয়ে দিলাম। কিছু কয়েদিকে বাদাখশান, কুন্দুজ ও বলখের দিকে বিজয়পত্রসহ পাঠিয়ে দিলাম। “শাহ মনসুর ইউসুফজাঈ’ নামক ব্যক্তি, যিনি ওই বাজৌরিয়া উপজাতির সঙ্গেই সম্পর্ক রাখতেন পরে কিছুকাল যাবৎ সুলতানের বিরোধী ছিলেন, তিনি সুলতানের বিরুদ্ধে অভিযানে আমার সঙ্গে এসে যোগ দিয়েছিলেন। তিনি আমার বিজয়ের প্রত্যক্ষ সাক্ষী ছিলেন।

    যুদ্ধ জয়ের পর আমি তাঁকে চলে যাওয়ার জন্য অনুমতি দিয়ে দিয়েছিলাম। তাঁকে আমি সম্মান এবং বিশেষ পরিচিতির জন্য আমার ‘তূন’-এর এক বিশেষ প্রকারের পরিচিতি-বিশিষ্ট আংরাখা পরিয়েছিলাম এবং লিখিত অধিকার-পত্র দিয়ে দিয়েছিলাম যে, ইউসুফজাঈকে আমি ওখানকার প্রতিনিধি নিযুক্ত করেছি। ওখানকার অধিবাসীরা যেন তাঁর হুকুম মেনে চলে।

    ৯ মুহররম থেকে ১০ মুহররম পর্যন্ত আমি বাজৌর কেল্লাতেই রইলাম। সেখানকার ব্যবস্থা আমি উপযুক্ত লোকেদের হাতে অর্পণ করলাম। আমার সম্মানে খাজা কলার বহুসংখ্যক লোক ও আমির-উমরা এসে গিয়েছিলেন। তাঁরা আমার জন্য মূল্যবান দাওয়াত সামগ্রী নিয়ে এসেছিলেন। নিজেদের সঙ্গে করে নিয়ে আসা উপহার-সামগ্রীর মধ্যে ছাগল ও শরাবের মশকও ছিল।

    বাজৌরের চারদিকে সীমা সংলগ্ন এলাকায় কাফিরিস্তানিদের বস্তি ছিল। লোকেরা ওখান থেকে এই উমদা কিসিমের শরাব প্রস্তুত করে নিয়ে এসেছিল।

    বাজৌর কেল্লায় বিজয়োৎসব করার পর ১১ মুহররম আমি সেনা শিবিরে ফিরে এলাম। ১২ মুহররম আমার সেনাদল খাজা খিজিরের স্রোত ধারার তটে যাত্রা বিরতি করে ক্লান্তি নিবারণ করল।

    ১৪ মুহররম আমি খাজা কলার দরবারে গিয়ে, সেখান থেকে প্রত্যাবর্তনের অনুমতি নিলাম।

    বিজয়ানন্দে পরিপূর্ণ থেকে ওই রাতে কিছু কবিতা আমার মনে জেগে ওঠে। তার কয়েকটি পঙক্তি এরকম—

    ‘আমার বন্ধু সেনাদের সাথে রয়েছে যেমন আত্মীয়তা।

    এই দুনিয়ার অন্য কোথাও কখনো দেখা মিলবে না তা॥

    আমার সেনা যুদ্ধ করে, অস্ত্রে নয়, মনে ও প্রাণে।

    শক্তিতেও, সামর্থ্যেও, বুদ্ধিতেও লড়তে জানে॥

    তারা যেমন যুদ্ধ-কুশলী, তেমনই তারা শক্তিমান।

    বাজোর বিজয় করল তারা, জুড়াল আমার মন ও প্রাণ॥’

    ১৭ মুহররম সাওয়াদের ওয়াইসের কট্টর-বিরোধী আলাউদ্দীন নামক ব্যক্তি আমার সঙ্গে দেখা করতে এলেন। আমি সাক্ষাৎ করলাম। তাঁকে আশ্বাস দিলাম যে, অনতিবিলম্বেই তাঁর শিকায়তের নিদান দেওয়া যাবে।

    ১৯ মুহররম আমার সেনা সাওয়াদ অভিমুখ রওনা হয়ে গেল! আমি ইউসুফজাঈর আফগানদের বিদ্রোহ দমনের জন্য ওই দিকে অগ্রসর হলাম। পকলা ও চন্দাবলের নদীপথ শাহ ইউসুফজাঈয়ের পথ-নির্দেশনায় পার হলাম।

    ইউসুফজাঈ আফগানরা বিনা যুদ্ধে আমার অধীনতা স্বীকার করে নিল। তারপর, কহরোজ ও পাশগড়ের বিদ্রোহীদের দমন করা হলো।

    ওই সময়ে পায়ের গিরা সমান তুষারপাতে ওই উপত্যকা ঢেকে গিয়েছিল। চারদিকে শুধু বরফ-আর-বরফই ছিল, কোথাও মাটি দেখা যাচ্ছিল না।

    সাওয়াদের হাকিম ছিলেন ওয়াইস নামক ব্যক্তি। তিনি অত্যন্ত বিনয়-ভাব প্রকাশ করলেন। তিনি কহরোজ গোত্রের লোকেদের কাছে আমার পরিচয় করাতে নিয়ে গেলেন। সেখানকার লোকেরা তাদের হাকিমের হুকুমে, বাদশাহের খিদমতে নজরানার জন্য ৪,০০০ ঘোড়ার বোঝার সমান উমদা কিসিমের চাল আমার সেনার জন্য উপহার দিল। ওই এলাকায় খুব উন্নত মানের ফসল ফলত। ওখানকার লোকেরা আমার সঙ্গে ওয়াদা করে যে, তারা প্রতি বছর বাদশাহের নজরানা স্বরূপ ৪,০০০ গাধার বোঝা পরিমাণ চাল আমার সৈন্যদের জন্য পাঠিয়ে দেবে।

    ২৩ মুহররম আমি পন্জাকুরা অধিকারের জন্য সেনা পাঠালাম, যাতে কোনো প্রকারের বিরোধিতার মোকাবিলা করতে হলো না। সেখানকার লোকেরা বাদশাহের নজরানা স্বরূপ বস্তা বস্তা মক্কা পাঠাল।

    তৃতীয় পুত্র সন্তান লাভ

    আমার সেনাদল সাম্রাজ্যের ক্ষেত্র বাড়াতে বাড়াতে লাগাতারভাবে এগিয়ে চলেছিল। ইউসুফজাঈ জাতির লোকেদের উপর জয় এবং বাজৌরের মতো শক্তিশালী দুর্গ হাতে এসে যাওয়ার পর আমার সাম্রাজ্যের শক্তি অনেক বেশি বেড়ে গিয়েছিল।

    আমার এগিয়ে চলার অভিযান তখনও জারি ছিল। এবার আমার লক্ষ্য ভেড়া অধিকার। যেখানে তাদের একটি স্বাধীন রাজ্য ছিল। ভেড়া বিজয়ের পর আমার জন্য হিঁদুস্তান বিজয়ের পথ অনেকটাই পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল।

    তখনও আমি রাস্তাতেই ছিলাম, পথিমধ্যে কাবুল থেকে মাহম দ্বারা লিখিত সুসংবাদের বার্তা এল—

    ‘২৬ জানুয়ারি ১৫১৯ ঈসায়ী সনে জুমআর দিন মহলে তাঁর জন্য আরো এক সৌভাগ্য প্রাপ্তি ঘটেছে।’

    বাবুর তাঁর নাম রাখলেন। ‘হিন্দাল’।22

    বিবি মুবারকার সঙ্গে বাবুরের বিবাহ

    ইউসুফজাঈ আফগানরা বাবুরের প্রতি তাদের নিষ্ঠা জ্ঞাপন করতে গিয়ে তাদের নিজেদের ঘরানার সুন্দরী যুবতি বিবি মুবারকার সঙ্গে বাবুবের বিয়ে দিলেন। বিবি মুবারকার বিষয়ে কথিত আছে যে, তিনি আফগানি অগাচা রক্তধারার সঙ্গে সমন্বিত ছিলেন এবং আফগানদের মধ্যে তাঁর নাম ছিল গুলবদন। তিনি শাহ মনসুরের কন্যা ছিলেন।

    আমি খাজা কলা এলাকা থেকে অগ্রসর হওয়ার সময় বিবি মুবারকাকে ওখানেই তাঁর পিতৃগৃহে থাকার অনুমতি দিয়েছিলাম।

    শাহ ওয়াইস, শাহ আলাউদ্দীন, শাহ মনসুর, শাহ ইউসুফজাঈ এবং মুহম্মদী কুলের সমস্ত আফগান এখন আমার প্রতি পূর্ণ নিষ্ঠাবান এবং তাদের সৈনিকেরা আমার সেনার অঙ্গ হয়ে গিয়েছিল।