Category: মুহম্মদ জালালউদ্দীন বিশ্বাস

  • ঊনবিংশ অধ্যায় : হিঁদুস্তান বিজয়ের পথে বাবুর

    ঊনবিংশ অধ্যায় : হিঁদুস্তান বিজয়ের পথে বাবুর

    ঊনবিংশ অধ্যায় : হিঁদুস্তান বিজয়ের পথে বাবুর

    ফেব্রুয়ারি, ১৫১৯ ঈসায়ী ১৬ ফেব্রুয়ারি তারিখে আমি বাজৌর থেকে ভেড়া অভিমুখে সেনা অভিযানের আদেশ দিয়ে দিয়েছিলাম।1

    এবার আমার মন-মস্তিষ্কে হিঁদুস্তান বিজয়ের কথা পুরোপুরিভাবে দৃঢ় হয়ে গিয়েছিল। ভেড়া সম্পর্কে আগে আমি শুনে রেখেছিলাম। সেটি হিঁদুস্তানের সীমা রেখায় অবস্থিত। আমার হাতে বিশাল সংখ্যক সেনা এসে গিয়েছিল। আফগানদের খুব বড় সহযোগিতা পাচ্ছিলাম। আমি আমার সেনার শীর্ষ-অধিকারীদের সঙ্গে পরামর্শ করলাম। এক অধিকারী পরামর্শ দিতে গিয়ে বললেন—

    ‘যদি হিঁদুস্তান বিজয়ের জন্য রওনা হতে হয় তাহলে পিছনে কাবুলে সেনা শক্তি মজবুত হতে হবে। এর জন্য প্রয়োজন হলো সেনার একটা শক্তিশালী অংশ কাবুলে রেখে যাওয়া। পর্যাপ্ত সংখ্যক সৈনিক বাজৌরে, আপতকালীন অবস্থার জন্য রেখে যাওয়া হোক, প্রয়োজন পড়লেই যেন দ্রুত ডেকে নেওয়া যায়। লামঘানে অশ্বারোহী সেনার শক্তিশালী দল সংরক্ষিত রাখা হোক, কেননা, কাবুল থেকে রওনা হয়ে লামঘান পৌঁছানো অবধি অশ্বারোহী সৈনিক ও অশ্ব এতটা ক্লান্ত হয়ে পড়বে যে, তাদের পক্ষে পরবর্তী সফর জারি রাখা কষ্টদায়ক হয়ে পড়বে।’

    আমার সামনে যে পরামর্শ এল তা খুবই তথ্যপূর্ণ ছিল। আমি তার উপর পুরো গাম্ভীর্যের সঙ্গে আমল করার ব্যবস্থা করলাম।

    ১৫ ফেব্রুয়ারি আমরা দরিয়া-এ-সিন্দ (সিন্ধুনদ)-এর তটে গিয়ে পৌঁছালাম।

    মীর মুহম্মদ ও তার বড় ভাই, যে অনুসন্ধানী দলের সৈনিকদের মধ্যে খুবই চোস্ত দুরুস্ত ও সাহসী সৈনিক ছিল, তাকে আমি সিন্ধু তটের উপরের ও নিচের অংশের পুরো জানকারি নেওয়ার জন্য পাঠালাম।

    ১৬ ফেব্রুয়ারি আমাদের সেনা শিবিরগুলো থেকে বেরিয়ে এল। সিন্ধুনদের ওই ক্ষেত্রটি সোয়াত নামে পরিচিত ছিল। সোয়াত উপত্যকা ছিল ঘন জংলি এলাকা। ওখানকার লোকেরা এই এলাকাকে ‘কর্গখানা’ (গণ্ডারদের বিচরণক্ষেত্র) বলত।

    গণ্ডার সন্ধানে সৈনিকদের একটি দল পাঠানো হলো, কিন্তু ঘন জঙ্গলের মধ্যে তাদের দেখতে পাওয়া গেল না। তবে সন্ধান ব্যর্থ হলো না। একটি বাছুর দেখতে পাওয়া গেল। তাকে আক্রমণাত্মক অবস্থায় দেখে সৈনিকেরা তীর ছুড়ল, তবে লাগল না। কিছুক্ষণ পর আরেকটা দেখা গেল। এবার অগ্নি-উদ্গীরণকারী অস্ত্র দিয়ে নিশানা করা হলো। তাকে মারা হলো। সৈনিকদের আনন্দ ও আবেগের আর সীমা-পরিসীমা রইল না। যে কেউ তাকে দৌড়ে দেখতে যাচ্ছিল। তাকে উঠিয়ে সেনা-শিবির পর্যন্ত নিয়ে আসা হলো!

    সন্ধা নেমে ছিল। নামাজের পর শোওয়ার সময় এসে গেল। ওই সময়ে অনুসন্ধানী দলের লোক ফিরে এল। উৎসাহব্যঞ্জক বার্তা বয়ে এনেছিল সে।

    জুমআ রাতের দিন, ১৬ ফেব্রুয়ারি, ১৫১৯ ঈসায়ী সনে ঘোড়া ও উটের পিঠে সৈনিকদের কাফেলা সিন্ধু নদ পার হওয়ার জন্য অগ্রসর হলো। পদাতিক বাহিনী সবার পিছনে ছিল।

    নদী পার করতে কিছুটা সমস্যা দেখা দিল, তবে বাধা হলো না। আমাদের সেনা দুপুরের পর সিন্ধু নদ পার হয়ে গেল। জোহরের নামাজের পর অর্ধেক রাত পর্যন্ত সফর জারি রইল। নিশ্চিত রূপে এটা দীর্ঘ সফর ছিল। এই সফরে বহু ঘোড়া অসুস্থ ও দুর্বল হয়ে পড়েছিল। তারা আর অগ্রসর হওয়ার মতো অবস্থায় ছিল না। ওখানেই তাদের সড়কের কিনারে ছেড়ে দেওয়া হলো।

    নেমক (লবণ) পর্বতমালা

    ভেড়ার উত্তরে চৌদ্দ মাইল দীর্ঘ নেমক পর্বতমালা ছিল, যার সম্পর্কে কোহ-ই-জুদ নামক পুস্তকে আমি আগেই পড়ে রেখেছিলাম। এই পবর্তমালার নিচের অংশে দুটি উপজাতি বসবাস করত, এদের একটি জুদ ও অপরটি জনজুহা নামে পরিচিত ছিল।

    এই দুই উপজাতির স্ব-স্ব এলাকায় বাদশাহী ছিল। তাদের রাজ্য সীমা ভেড়া ও নিয়াবের মধ্যবর্তী অংশ পর্যন্ত ছিল। উভয় জাতির লোকই মৈত্রীপূর্ণ ব্যবহার রাখত। হুকুমতের ক্ষেত্রের বিষয়ে তাদের মধ্যে একটি চুক্তি ছিল যে, কারো ক্ষেত্রের উপর না কম, না বেশি, কেউ দখল করবে না। তাদের রাজ্যে বলদ ও ইয়াক প্রধানত সওয়ারি রূপে ব্যবহৃত হতো। তাদের কাছে প্রয়োজনীয় সৈনিক ও ছিল। জুদ ও জনজুহা উভয় জাতিই কয়েকটি গোত্রে বিভক্ত হয়ে ছিল।

    চৌদ্দ মাইল বিস্তৃত সেই পাহাড়ি উপত্যকা ভেড়া দেশ থেকে হিন্দুকুশ পবর্তমালায় গিয়ে মিলত, তবে মধ্যে দিনকোট উপত্যকা পড়ত, যেখানে সিন্ধু নদের উৎসমুখ ছিল।

    জুদ উপজাতির সর্বপ্রধান ব্যক্তি হতেন তাদের মুখিয়া। তাঁর ছোট ভাই এবং পুত্র ‘মালিক’ উপাধি ধারণ করতেন।

    জনজুহার মুখিয়া লংগর খানের মামা ছিলেন। সুহানের পানি বাহিত পথ এলাকার শাসক ছিলেন মালিক হাস্ত। এমনিতেই তাঁর আসল নাম অন্য কিছু ছিল। হিঁদুস্তানের লোকেরা কিছু উচ্চারণে স্বর লুপ্ত করে দিতেন-যেমন তারা খায়বরের উচ্চারণকে খবর করে দিত। আসাদ-এর উচ্চারণ করত আস্স্। এই রকমই আমি জেনেছিলাম যে, হাস্ত নামে কিছু বিকৃতি ঘটে থাকবে।

    লংগার খান মালিক হাস্ত-র কাছে আমার বিষয়ে জানকারি দেওয়ার জন্য তাঁর দূত আগেই পাঠিয়েছিলেন। এ জন্য তাঁর এলাকায় পৌঁছাতেই মালিক হাস্ত আমার সামনে অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে উপস্থিত হলেন। আমরা বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশে কথাবার্তা বললাম। সন্ধ্যা নামতেই তিনি ফিরে গেলেন। পরদিন সকালে এলেন তো এক পাল উত্তম জাতের ঘোড়া সাথে করে নিয়ে এলেন। তাঁর বন্ধুত্ব আমার জন্য বেহদ লাভদায়ক ও আমার সামরিক শক্তি বৃদ্ধির সহায়ক বলে প্রমাণিত হলো।

    তিনি হিঁদুস্তানের কয়েকটি দেশের বিষয়ে পূর্ণ জানকারি দিলেন-ভেড়া, খুশআব, চেনাব এবং চিনুট। ওই দেশগুলোতে তুর্কি শাসন কায়েম ছিল।2

    আমি ওই ক্ষেত্রগুলোর নিজের অধিকার কায়েমের জন্য সূদৃঢ় অঙ্গীকার করে নিয়েছিলাম। তিনি ওই এলাকার লোকেদের জন্য সতর্কতামূলক বার্তা লিখে দিলেন—

    এই কাফেলার কোনো প্রকারের ক্ষতি করার চেষ্টা যেন করা না হয়। কাপড় থেকে নিয়ে সুতা পর্যন্ত ক্ষতি হওয়াও উচিত নয়।’

    ২০ ফেব্রুয়ারি আমাদের বাহিনী কালদা-কহারের উদ্দেশে রওনা হয়ে গেল। কালদা-কহার ভেড়া থেকে উত্তর দিকে ২০ মাইল দূরে অবস্থিত ছিল। এই স্থানটি জুদ পার্বত্য এলাকার মধ্যে ছিল। ওখানে ছয় মাইল বৃত্তাকারের একটি ঝিল ছিল। পার্বত্য এলাকার চারদিক থেকে ওই ঝিলে এসে পানি জমা হতো।

    এই ঝিলের উত্তরে একটি সুন্দর উপত্যকা ছিল।

    ওই স্থানে আমি একটি বাগ (বাগান) লাগানোর ব্যবস্থা করালাম। আমি ওই বাগের নাম রাখলাম বাগ-এ-সাফা।

    ওই বাগের বিষয়ে পরে আমি জানতে পারি সেটি অত্যন্ত আকর্ষণীয় ও শান্তি দায়ক আবহাওয়া মণ্ডিত এলাকায় পরিণত হয়েছে। কালদা কহার থেকে পরদিন আমাদের সেনা-কাফেলা আগে বাড়ল। পথিমধ্যে হামতাতু নামক স্থান পড়ল। সেখানে কিছু স্থানীয় লোক আমাদের প্রতীক্ষায় ছিল। তারা তাদের হাতে সম্মানজনক উপহার নিয়ে রেখেছিল।

    তাদের মধ্যে পৌঁছানোর পর আমি জানতে পারিয়ে ভেড়ার মুখিয়া আবদুর রহিম নামক ব্যক্তি তাদের মধ্যে লোক পাঠিয়ে আমার আগমন বার্তা জানিয়েছিলেন। বার্তায় লেখা ছিল—’এ কাফেলা তুর্কিদের, যারা পূর্বেই এই এলাকা অতিক্রম করেছেন। এদের নির্ভয় হয়ে অগ্রসর হওয়ার পথ দেওয়া হোক, স্বাগত জানানো হোক, তাহলে তাঁরা তোমাদের জন্য কোনো প্রকারের ক্ষতির কারণ হবেন না…।’

    এখানে কিছুক্ষণ থেমে আমাদের সেনা আগে বাড়ল। চির্খের কুরবান নামক স্থানে খাস্তের আবদুল মালিক, তাঁর ভৃত্য মীর মুহম্মদ ও মুহম্মদ খাজা আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করলেন। তাঁরা সাত-আটজন ছিলেন। এঁরা সবাই মুখিয়া। তাঁরা লংগর খানকে তাঁদের সঙ্গে করে রেখেছিলেন এবং তাঁরা ভেড়ার লোকেদের সঙ্গে বাক্যালাপ করে অগ্রবর্তী হওয়ার পরিকল্পনা নিয়ে এসেছিলেন।

    জঙ্গল পার হওয়ার পর আমাদের সেনা ভেড়ার উদ্দেশে রওনা হয়ে গেল। আমি ভেড়ার নিকট পৌঁছাতেই কিছু প্রধান ব্যক্তি হিঁদুস্তান থেকে আমার সঙ্গে এসে মিলিত হলেন।

    বাহলুল লোদির পক্ষ থেকে বাবুরকে আমন্ত্রণ

    তাঁরা হিঁদুস্তান থেকে এসেছিলেন। আগতদের মধ্যে প্রধান নাম ছিল দিলওয়ার খাঁয়ের। তিনি বাহলুল লোদির পুত্র ছিলেন। তাঁর সঙ্গে দৌলত খাঁ এবং আরো কিছু ‘খান’ উপাধিধারী যুবক ছিলেন। তাঁরা আমাকে হিঁদুস্তান আক্রমণের জন্য আমন্ত্রণ জানাতে এসেছিলেন। তাঁরা সঙ্গে করে কিছু উত্তম জাতের ঘোড়া ও উট আমাকে উপহার দেওয়ার জন্য নিয়ে এসেছিলেন।

    জোহরের নামাজের পর আমি ভেড়ার পূর্ব এলাকা পার হয়ে বিলাম যা বহত (ঝিলাম) তটে উপস্থিত হলাম। আমরা ভেড়ার ওই এলাকার লোকেদের কিছুই বললাম না। তারাও আমাদের ক্ষতি করার মানসে আমাদের সেনার ধারে-কাছে আসেনি।3

    বাবুরের পরবর্তী সফর

    ২২ ফেব্রুয়ারি আমি অনুসন্ধানী দলের সৈনিকদের পরবর্তী এলাকার জানকারি নেওয়ার জন্য পাঠালাম। ওইদিন আমি ভেড়ায় পৌঁছালাম। ওই দিন সংগুর খান জিনজিহা আমার কাছে অধীনতা স্বীকার করতে এলেন। তিনি একটি ভালো জাতের ঘোড়া উপহার দিলেন। ওই দিন পাহাড়ি উপজাতিদের মুখিয়া যিনি ভেড়ার চৌদর্থ বলে অভিহিত হতেন, তিনি চার লাখ শাহরুখী মুদ্রার সমপরিমাণ ধন মৈত্রীর উপহার স্বরূপ নিয়ে এলেন।

    দুদিন পরে আমরা খুশাবে পৌঁছে গেলাম। শাহসুজা, ঔরংগের পুত্র শাহ হুসাইনকে খুশাবের অবস্থার খবরাখবর নিতে আগে পাঠিয়ে দিলেন।

    ২৬ ফেব্রুয়ারি, ১৫১৯, শনিবার শাহ হুসাইনের নেতৃত্বে খুশাব অভিমুখে সৈন্যরা এগিয়ে চলল।

    বর্ষা ও তুফানের মুখোমুখি

    ২৬ ফেব্রুয়ারি আমাদের সেনা সম্পূর্ণরূপে সমতল এলাকার মধ্যে ছিল। তখন অবস্থাৎ এক ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়ের মুখোমুখি পড়তে হলো। তারপর, বৃষ্টির কহর নাজিল হলো, এমন তুমুল বর্ষণ হলো যে, স্থলভূমি পানির নিচে তলিয়ে গেল। জোহরের নামাজের সময় অবস্থা এমন হলো যে, দূরদূরান্ত পর্যন্তও কোথাও এক ইঞ্চি পরিমাণ ভূমি দর্শনও দুর্লভ হয়ে গেল। সর্বত্র হাঁটু সমান পানিতে ভরে উঠল। সৈন্যদের পায়ে হেঁটে চলা অপেক্ষা সাঁতার কেটে এগিয়ে যেতে হচ্ছিল।

    দুপুরের পরে আমি ঘোড়াকে সাঁতার কাটিয়ে পানি কোথা থেকে আসছে দেখার জন্য এগিয়ে গেলাম। পানি কিরকুন-সু পাহাড়ি এলাকার দিক থেকে প্রবল বেগে ধেয়ে আসছিল। আমি ঘোড়াকে সাঁতার দিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে যেতে সেনাকে এগিয়ে যাওয়ার পথ দেখাতে লাগলাম। এই বিপদের আশঙ্কায় আমার শঙ্কা বাড়ছিল যে, শিবির ফেলার জিনিসপত্র না জানি কোথায় পানি-স্রোতে ভেসে যায়। তাহলে খাওয়া-দাওয়া সহ যাত্রা-সামগ্রী থেকে সম্পূর্ণরূপে বঞ্চিত হয়ে যেতে হবে।

    সাঁতার কাটার সময় সৈন্যদের কাঁধের চাপানো বোঝা সামলাতে বড়ই কষ্টদায়ক হয়ে পড়ছিল। জিনিসপত্র তাঁদের হাত থেকে পড়ে যাচ্ছিল। তারপর তো, সামরিক সরঞ্জাম সামলানো অনেক দূরের কথা ছিল।

    সমস্ত পানি ও তুফান ওই সমতল ক্ষেত্রেই আটকা পড়ছিল। ২৮ ফেব্রুয়ারি ঝিলাম নদীর তট থেকে নৌকার ব্যবস্থা করা হলো। সৈনিকদের হারানো সামগ্রীর সন্ধানে নৌকা পাঠানো হলো।

    সৈনিকরা তাদের হারিয়ে যাওয়া সফরের এবং শিবিরের সরঞ্জামগুলো আধা বেলার মধ্যে খুঁজে নিয়ে এল। ওই দিন বৃষ্টি থেমে গিয়েছিল। পানি-স্তর অনেক নেমে এসেছিল। জিনিসপত্র সহজে পাওয়া যাচ্ছিল।

    কুজ-বেগদের দলটি সামনে দু’মাইল পর্যন্ত গিয়ে শুকনো রাস্তার সন্ধান করে এল। সেখানে পৌঁছে সেনা আগে বাড়তে পারল।

    ১ মার্চ ভেড়া কেল্লায় রাত কাটানোর পর সেনা আগে বাড়ল। সামনের জন্যও এ চিন্তা ছিল যে, বৃষ্টি ও বন্যার মুখোমুখি ভেড়ার উত্তর এলাকায় আর যেন না হতে হয়।

    ভেড়া চার জেলায় বিভক্ত ছিল। ওই রাজ্যকে তুর্কিরা প্রথমে নিজেদের অধীনস্ত করে নিয়েছিল। ওখানকার অধিবাসীরা তুর্কি-অধীনতা স্বীকার করতে অভ্যস্ত ছিল।

    যেহেতু গত দিনে বৃষ্টি ও তুফানের ফলে সেনাদের খাদ্যসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রীর ঘাটতি পড়ে গিয়েছিল, সেহেতু তার ব্যবস্থা আবশ্যিক ছিল। ব্যবস্থার জন্য হাতে ধন থাকা জরুরি ছিল। ভেড়ার শাসক রূপে আমি ভেড়ার চার জেলা থেকে ধন সংগ্রহের ঘোষণা দিয়ে দিলাম। এরকম ধনকে তকাব্বুল বলা হয়। আমি তকাব্বুলরূপী ধন উসুলের জন্য খলিফাকে এক জেলায়, কুজবেগদের দ্বিতীয়টিতে, নাসির দোস্তকে তৃতীয়টিত ও সৈয়দ কাশিম ও মুহিব্ব আলী খানকে চতুর্থ জেলায় পাঠালাম। ভেড়ার জনতা পুরো সহযোগিতা করল। যে যে লোকেদের যেখানে-যেখানে পাঠানো হয়েছিল, সে সব স্থান থেকে তারা কাজ পুরো করে কেল্লায় ফিরে এলেন।

    দিল্লি দরবারে বার্তাবাহক পাঠানোর সিদ্ধান্ত

    ৩ মার্চ আমার সাথিরা রায় দিলেন— ‘এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই যে, দিল্লি দরবারে বার্তাবাহক পাঠিয়ে শান্তি পূর্ণভাবে রাজ্য সমর্পণের জন্য বলা হোক।’4

    পরিকল্পনা কার্যকর করার উদ্দেশ্যে পয়লা রবিউল আউয়াল, ৩ মার্চেই মোল্লা মুরশিদের জিম্মায় এ দায়িত্ব অর্পণ করা হলো যে, তিনি হিঁদুস্তানে ইব্রাহীম লোদির কাছে গিয়ে, বাবুরের বার্তা হস্তান্তর করবেন। ইব্রাহীম লোদি ৫-৬ মাস পূর্বে ইস্কান্দার মির্জার মৃত্যুর পর ক্ষমতাসীন হন। মোল্লা মুরশিদ আমার লিখিত আদেশ নিয়ে রওনা হয়ে গেলেন।

    সর্বপ্রথম, মোল্লা মুরশিদ লাহোরে পৌঁছালেন। যা ছিল হিঁদুস্তান থেকে প্ৰথম দেশ। ওখানকার ক্ষমতা দৌলত খাঁর হাতে ছিল। দৌলত খাঁ জবাব দেওয়ার জন্য মোল্লা মুরশিদকে কিছুদিনের জন্য ঝুলিয়ে রাখলেন। টালবাহানা করতে থাকলেন।

    লাহোর থেকে মোল্লা মুরশিদ ইব্রাহীম লোদির কাছে বার্তা পৌঁছে দিলেন।

    কয়েক মাস পরে মোল্লা মুরশিদ আমার কাছে ফিরে এলেন তবে কোনো উত্তর ছাড়াই।

    হিন্দালের জন্ম

    মোল্লা মুরশিদকে হিঁদুস্তানে রওনা করানোর পরের দিন ৪ মার্চ সায়ক-আল-দরবেশ নামক সৈনিক দ্বারা, কাবুল থেকে আমার কাছে সুসংবাদ নিয়ে আনা হলো যে, আমি একটি পুত্র সন্তান লাভ করেছি। যেহেতু আমি ওই সময়ে হিঁদুস্তান বিজয়াভিযানে ছিলাম, সেহেতু সেই অভিযানের সঙ্গে মিলিয়ে আমি তার নাম রাখলাম হিন্দাল।

    পুত্র জন্মের পর আনন্দোৎসব ও দাওয়াত চলল। সেখানে চাল ও খেজুরের মিশ্রণে এক বিশেষ রকমের পেয় আমাদের জন্য প্রস্তুত করানো হলো। ওখানকার লোকে একে বলত রাউশ। বাস্তবিকই এ খুব সুস্বাদু ছিল। কিছু লোক একে আরকও বলত।

    ৫ মার্চ, সোমবার, ভেড়ার শাসনভার হিন্দু বেগের হাতে তুলে দিয়ে আমি অগ্রবর্তী হওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম।

    সেনা চেনাব অভিমুখে চলতে লাগল। ওই সময়ে সৈয়দ আলী খানের পুত্র শুনাচির খান চেনাব তটে তাঁর নিজের সেনাদলসহ আমাদের সেনার আগমনের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। ওখান থেকে তার পথ প্রদর্শনের কথা ছিল।

    খাখর জাতিদের উপর বিজয়

    পরবর্তী এলাকা ছিল খাখর উপজাতিদের। খাখরদেরও জুদ ও জনজুহা জাতিগুলোর মতো মুখিয়া ছিল। খাখররাও দুই উপজাতি দলে বিভক্ত ছিল, একটি তাতার খাখর, ও অন্যটি হাতী খাখর। এ দুই উপজাতি পরস্পরে আত্মীয়তার বন্ধনে আবদ্ধ ছিল।

    হাতী উপজাতির লোকেরা পর্বতমালার নিচু-নিচু এলাকায় বসবাস করত।

    তাতার খাখর গোত্রগুলোর মুখিয়া দৌলত খাঁর অধীনতা স্বীকার করত। তাদের গর্ব ছিল যে তারা দৌলত খাঁ-র পুরো অনুগত ছিল।

    হাতী গোত্রের সরদারের তখনও পর্যন্ত দৌলত খাঁ-র সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়নি।

    হাতী গোত্রের লোকেদের উপর যখন তাতাররা হামলা চালায় তখন তার মোকাবিলায় ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তারা তাদের দ্বারা শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়। তাদের প্রাণ দিতে হয়, নিজেদের রাজ্যও হারাতে হয় এবং স্ত্রীদেরও। তাতাররা তাদের সুন্দরী স্ত্রীদেরও সাথে করে নিয়ে গিয়েছিল।

    হাতী গোত্রের লোকেদের বহিরাগমনের অভিজ্ঞতা ছিল। সে জন্য তারা আমাদের সেনার মোকাবিলায় অবতীর্ণ হওয়ায় মতো ভুল করেনি। তারা অধীনতা স্বীকার করে নেয়।

    হাতী গোত্রের রাজ্যে অবস্থান করে আমাদের সৈনিকেরা খুব আনন্দ ফুর্তি করেছিল। আমি সেখানে বেশ কিছুদিন যাবৎ সেনা শিবির ফেলে রাখি, যাতে তারা সম্পূর্ণ রূপে সুস্থ-দুরুস্ত থাকার অবসর পায়।

    ৯ মার্চ আমাদের সেনা নৌকা যোগে ঝিলাম নদী পার হলো। ঝিলাম পারের এলাকা ছিল বাগান সদৃশ। এখানে বৃক্ষ ছিল খুব ছায়াদার এবং ঘন। ওখানকার ভূমিতে খুব আখের চাষ হতো। সেখানে আমি সেচের কাজে পায়াওয়ালা বালতি ব্যবহার হতে দেখেছিলাম। চক্রাকার ঘেরার মধ্যে দিয়ে নিচে থেকে উপরে বালতি ভরে পানি তোলা হচ্ছিল, উপরে তুলেই বালতি উপুড় করে পানি ঢেলে দেওয়া হচ্ছিল। এইভাবে সেচের জন্য পানি সামনে বয়ে যাচ্ছিল। একই ক্রিয়া বারবার করা হচ্ছিল।

    ১২ মার্চও আমাদের সেনা খুব আনন্দোৎসব করল। ওই দিন শাহ হাসান খুশাব থেকে ফিরে আসেন। তাকে ধন উসুলের জন্য পাঠানো হয়েছিল। এ ধন উসুলি রাজকর স্বরূপ ছিল। খুশাবের লোকেরা স্বেচ্ছায় ও সানন্দে রাজকর (বা রাজস্ব) আদায় করেছিল। সে অনেক ধন নিয়ে ফিরেছিল।

    অন্য তিন এলাকা থেকে রাজকর উসুলে পূর্ণ সাফল্য পাওয়া গেল। হাতী গোত্রগুলোর একটি এলাকার নাম ছিল পরহাল। ওখান থেকে কুজবেগদের দ্বারা খবর আনা হলো যে, ওখানকার লোকেরা অধীনতা স্বীকারে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।

    পরহালা, উপত্যকা স্থিত এলাকা ছিল। সেখানে উত্তর-পূর্ব দিক থেকে পৌঁছানো যেত। আমি একটি সেনাদল পাঠালাম পরহালাদের দমনের জন্য। এক মাইলের পর রাস্তা পাঁচটি ভাগ হয়ে চলে যেত। আমাদের সেনা সেখানে পৌঁছাতেই পরহালার আদিবাসীরা তীর-ধনুক নিয়ে তাদের সামনে এসে গেল। তারা পাহাড়ের প্রতিটি চাতালে দল বেঁধে দাঁড়িয়ে ছিল।

    সৈনিকেরা অগ্নি-উদ্গীরণকারী অস্ত্র চালিয়ে তাদের নিধন করল। আরো সামনে হাতীদের প্রধান তখবাদীর দিকে অগ্রসর হলে ত্রিশ-চল্লিশ জন ধনুর্ধরের সঙ্গে মোকাবিলা হলো। তাদের কিছু অশ্বারোহী ছিল আর ছিল পদাতিক।

    দোস্ত বেগ আমাদের সেনার নেতৃত্ব দিচ্ছিল। সে হাতীদের উপর জবরদস্ত হামলার হুকুম দিল।

    কিছু তীরন্দাজের লাশ পড়তেই তাদের মধ্যে ছোটাছুটি শুরু হয়ে গেল। উত্তর-পশ্চিমে তাদের একটা কেল্লা ছিল। কেল্লা পর্যন্ত ধাওয়া করে সৈনিকেরা তাদের আত্মসমর্পণে বাধ্য করল। আমাদের সেনা কোল্লা অধিকার করল।

    পিছে-পিছে আমিও তাতার খাখরদের এলাকা যখন পার হচ্ছিলাম তখন অনেক খাখর যোদ্ধা আমাদের কাছে এসে অধীনতা স্বীকার করে নিল। তাদের মধ্যে আমীন মুহম্মদ তরখান, আরঘম ও করাচা নামক ব্যক্তিরা প্রধান ছিলেন। তাঁরা সরুপা-কে স্বেচ্ছায় আমাদের কাছে সমর্পণ করলেন। সেখানে কিছু গুর্জর জাতির লোকও বসবাস করত।

    মাগরিবের নামাজের পর আমরা খাখরদের সম্পূর্ণভাবে নিপাত করে দিয়েছিলাম।

    ওই দিন কালকা-কোহাত নামক স্থানটিও আমি অধিকার করে নিয়েছিলাম। এখানকার সরদার যথেষ্ট বুদ্ধিমান ছিলেন। তিনি আমাকে সম্মান প্রদর্শন মূলক খিলআত পেশ করলেন। তিনি সম্মুখবর্তী হাতী উপজাতিদের পত্র লিখে আমার অধীনতা স্বীকার করার পরামর্শ দিলেন। তিনি এক ভৃত্যকে মুহম্মদ অকশি জংগের কাছে পাঠালেন।

    আমি ওখানকার হাজারা এলাকাটিকে আমার পুত্র হুমায়ূনকে উপহার দিলাম (হুমায়ূনের বয়স তখন ১২ বছর ছিল)। তার সাহায্যের জন্য নিজের কিছু বিশ্বস্ত ভৃত্যকে বাবা দোস্ত বেগের সরপরস্তিতে রেখে গেলাম। হলাহিলের দারোগার পদ দিয়ে তাকে সেখানকার সাথে সম্পর্কিত রাজ্য ব্যবস্থা বিষয়ক কিছু বিশেষ অধিকার দিলাম।

    ১৯ মার্চ আমি সসৈন্যে অগ্রবর্তী হলাম। ওই সময় আমার কাছে ৫৭০ উট ছিল। তাদের পিঠে করে সেনা শিবিরের সরঞ্জামাদি সহজে বহন করা যেত।

    আমি নীল-আব যেখানে দুই নদীর সঙ্গম রয়েছে, নৌ-যোগে পার হলাম।

    ওই সময় মুহম্মদ আলী জংগ আমার কাছে আবেদন জানাল, ভেড়া দেশটিকে শাসনের জন্য তাকে দিয়ে দেওয়া হোক। তার আবেদন স্বীকার করা সম্ভব ছিল না, কেননা, সেখানকার শাসন-ব্যবস্থা আমি হিন্দু বেগকে আগেই দিয়েছিলাম। আমি পরবর্তীকার রাজ্যটি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তার উৎসাহ বাড়িয়ে রাখলাম।

    ২৬ মার্চ শাইকিমে পৌঁছানোর পর, প্রদেশের ১০০ মুখিয়া হাঁটু গেড়ে বসে আমার অধীনতা স্বীকার করার রসম আদায় করলেন। তাঁরা রুপা ও বস্ত্র একটি গরুর গাড়িতে এবং একটি মহিষের পিঠে চাপিয়ে নিয়ে এসেছিলেন। হিঁদুস্তানের মাটিতে তাঁরা আমাকে স্বাগত জানাচ্ছিলেন। তাদের মধ্যেকার ছয় ব্যক্তি মুখ্য ভূমিকা পালনের জন্য সামনে এলেন। একজনের নাম ছিল দিলজাক আফগান-তিনি বললেন; তাঁকে মালিক বুখান ও মালিক মূসার পক্ষ থেকে আমাকে আপনার খিদমতে পাঠানো হয়েছে।

    অন্যরাও তাঁদের পাঠানো লোকেদের নাম বললেন।

    ২৭ মার্চ ‘আলী মসজিদ’ এলাকা পার হওয়ার পর ইয়াকুর খায়েল নামক ব্যক্তি এসে মিলিত হলেন। তাকে মারুফ নামক এলাকেদারের পক্ষ থেকে পাঠানো হয়েছিল। তিনি ১০ ভেড়া ও দুই গাধার বোঝা পরিমাণ চাল আমাকে নজরানা স্বরূপ পাঠিয়েছিলেন। এইভাবে প্রতিদিন আমার সফর জারি রইল এবং নির্বিরোধে এলাকেদারদের দ্বারা অধীনতা স্বীকার করা হতে লাগল আর উপহার আসতে লাগল।

    এই সফরে যদিও কোনো বড় যুদ্ধের মুখোমুখি হতে হলো না তা সত্ত্বেও আমার কিছু বিশ্বস্ত, অনুগত যোদ্ধা সাথি মৃত্যুবরণ করে আমাকে ছেড়ে চলে গেলেন। তাদের মধ্যে দোস্ত বেগও ছিলেন। পথিমধ্যে জ্বরে আক্রান্ত হয়ে তিনি মারা যান। তিনি তরবারি চালাতে সিদ্ধহস্ত ছিলেন। তাঁর মৃত্যুতে আমি গভীরভাবে মর্মাহত হলাম। অকশা থেকে এখান পর্যন্তকার সফরের মধ্যে দোস্ত বেগসহ আট যোদ্ধা সাথি আমার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিলেন।

    দোস্ত বেগের অকাল মৃত্যুর পর আমি পারহালার হাকিম নিযুক্ত করলাম তার ছোট ভাই নাসির মুহম্মদকে।

    ৩০ এপ্রিল মঙ্গলবারের দিনে খাজা শিহায়ারানকে আমি সামনের রাস্তায় জানকারির জন্য পাঠালাম। তিনি নিজের কাজ সম্পন্ন করে দুপুরের সময় ফিরে এলেন। ওই দিন আমি রোজা রেখেছিলাম।5 আমার রোজা রাখা নিয়ে ইউনুস আলী, যাকে আমি বন্ধু বলতে পারি, সে রসিকতা করে বলল— ‘মঙ্গলবারের দিন! যাত্রাবসর, তার উপর রোজা রাখা, এটা কি অলৌকিক কিছু?’

    সফর জারি রেখে আমাদের সেনা বিহজাদী নামক নগরে গিয়ে পৌঁছাল। ওখানকর কাজির বাড়িতে আমি আমার আগমন বার্তা পূর্বেই পাঠিয়ে দিয়েছিলাম। কাজি আমাকে তাঁর বাড়ির দরজায় পেয়ে গদগদস্বরে নিজের ভাব ব্যক্ত করলেন—

    ‘আমার বাড়িতে আপনার আগমন। আল্লাহর শান! আমার বাড়িতে পাদশাহ (বাদশাহ) এসে রওনক বাড়িয়েছেন।’

    তিনি অত্যন্ত সুন্দর দাওয়াতের ব্যবস্থা করলেন।

    পরদিন আমরা খাজায় সিহ-ইয়ারান (তিন খাজার সমাহার)-র উদ্দেশে রওনা হলাম। এ হলো বাগিচার নগর। বাগিচাও পর্বতমালার সঙ্গে নিচে বহুদূর পর্যন্ত বিস্তৃত।

    শুক্রবারের দিন যখন আমরা একটি পুলের রাস্তা অতিক্রম করছি তখন ওখানকার চিড়িমার (পাখি ধরা)-রা আমাদের স্বাগত জানাতে রাস্তায় এসে দাঁড়াল। তারা অদ্ভুত একটা পাখি সঙ্গে নিয়ে রেখেছিল। তারা তার নাম বলল, ‘ডাংগ’। তার আকৃতি ছিল ঘণ্টার মতো। ওই জাতের পাখি এর আগে আমি আর কখনো দেখিনি। পাখিটকে বুড়ো দেখাচ্ছিল। সম্ভবত সেটি হিঁদুস্তানে প্রাপ্য কোনো বিশিষ্ট পাখি ছিল।

    শনিবারের দিন জোহরের নামাজের জন্য শিবির ফেলা হলো। নামাজের পর মদিরা ভোজের আনন্দ করা হলো।

    আমাদের মধ্যে খাজা হাসান আবদুল্লাহ নামক একজন মাতালও ছিল। সে এত বেশি মদিরা পান করেছিল যে, নেশায় মত্ত হয়ে সে বহমান নদীর ধারায় নিজেকে ফেলে দিল। সে নদী বরফাবৃত পাহাড় থেকে বয়ে আসত। পানি এত ঠান্ডা ছিল যে, মানুষের রক্ত জমিয়ে দিত। পানিতে পড়ার পর সে তার নিজের চেষ্টায় উঠে আসতে ব্যর্থ হলো। অন্য সাথিরা তাকে কোনো রকমে তুলে আনল। সে আর কিছুক্ষণ পানিতে থাকলে নিশ্চিতভাবে মারা যেত।

    তার এই মূর্খতাপূর্ণ হরকত দেখে আমি তার উপর খুব অসন্তুষ্টি প্রকাশ করলাম। আমি এও বললাম যে, তাকে এখানেই রেখে যাব।

    সে ভবিষ্যতে কোনো দাওয়াতের উপলক্ষ ছাড়া আর কখনো মদিরা পান করবে না বলে কসম খেল। তখন আমি তাকে সঙ্গে নিয়ে যেতে রাজি হলাম।

    সে কয়েক মাস যাবৎ কসম পালন করল, তবে অধিক দিন পর্যন্ত তার মাতাল স্বভাব থেকে সে দূরে থাকতে পারল না।

    পরের দিন হিন্দু বেগ কিছু সৈন্য নিয়ে পেরেশান অবস্থায় এসে মিলিত হলো। সে বলল, ভেড়া ও বাজৌরে ইউসুফজাঈ উপজাতিরা বিদ্রোহ ঘোষণা করেছে।

    ভেড়া ও বাজৌরের পুনৰ্বিজয়

    আমি অগ্রবর্তী বিজয়াভিযান স্থগিত করে ভেড়া ও বাজৌরে বিদ্রোহ দমনের জন্য রওনা করিয়ে দিলাম। এই অভিযানে অগ্নি-উদ্গীরণকারী অস্ত্রও তাদের সঙ্গে পাঠিয়ে দিলাম।6

    ইতোমধ্যে আমি নিজে অসুস্থ হয়ে পড়লাম। প্রচণ্ড জ্বরে শরীর উত্তপ্ত হয়ে উঠতে লাগল। জ্বরের তীব্রতা এতই ছিল যে, মনে হতো শরীরের রক্তে আগুন লেগে গেছে।

    তার আগে আমি জ্বরে যখনই আক্রান্ত হয়েছি, তা খুব জোর দু-তিন দিন থাকত। কিন্তু ইতোমধ্যে দশ-বারো দিন পেরিয়ে গেল। আমার স্বাস্থ্যের উন্নতি হলো না। মোল্লা খাজা আমাকে মদিরায় মিশিয়ে দিনে দু-তিন বার করে ওষুধ খাওয়ালেন, তা সত্ত্বেও কোনো ফায়দা হতে দেখলাম না।

    ইতোমধ্যে খোয়াস্ত থেকে খাজা মুহম্মদ আমার কুশলবার্তা জানতে এলেন। তিনি নজরানা স্বরূপ ঘোড়া নিয়ে এলেন। মুহম্মদ শরিফ নামক জ্যোতির্বিদ ও খোয়াস্ত থেকে এলেন। তিনি আমার গ্রহ-নক্ষত্রের চাল-চলনের বিচার করে আমার দ্রুত আরোগ্য লাভের ভবিষ্যদ্বাণী করলেন।

    কাশগড় থেকে মোল্লা কবীর আমার স্বাস্থ্যের খবর নিতে এলেন। তিনি আন্দিজান ও কাবুল হয়ে এসেছিলেন। তিনি আমাকে সেখানকার অবস্থার সান্ত্বনামূলক জানকারি দিলেন।

    ২৩ মে, সোমবার দিন সওয়াদ থেকে ছয়-সাত মুখিয়াসহ মালিক শাহ মনসুর ইউসুফজাঈও আমাকে দেখতে এলেন।

    মালিক শাহ মনসুর তার সঙ্গে করে ইউসুফজাঈ উপজাতির মুখিয়াদের নিয়ে আসা আমার জন্য খুব নিশ্চিন্ততার বিষয় ছিল। আমি তাঁদের সবাইকে সম্মানিত করার এবং পদমর্যাদা প্রদানের কথা ভাবলাম।

    মালিক শাহ মনসুরকে আমি রেশমি লবাদা এবং তার নিচে পরিধানের লবাদা এবং তার বোতামের স্থলে তাকে আমার দ্বারা প্রদত্ত সম্মানচিহ্ন প্রদান করলাম। সঙ্গে আসা মুখিয়াদেরও কোমরবন্দ ও রেশমি জামা উপহার দিয়ে তাদের মর্যাদা বৃদ্ধির কাজ করে দিলাম।

    তাদের সবার মধ্যেকার বার্তায় আমি সওয়াদ দেশের শাসন কার্য চালানোর ভারও তাদের উপর অর্পণ করলাম। প্রত্যেককে আলাদা-আলাদা এলাকার এলাকেদারের নিয়োগ পত্র দিয়ে আমি তাদের এই অধিকার দিলাম যে, আফগানদের উর্বর এলাকা-বাজৌর ও সওয়াদসহ অন্য এলাকায় রাজস্ব রূপে ৬,০০০ গাধার বোঝা সমান চাল উসুল করবে।

    সবাই সম্পূর্ণভাবে প্রসন্ন ও সন্তুষ্ট হয়ে আমার কাছ থেকে প্রস্থান করলেন। যেতে-যেতে তারা সম্পূর্ণরূপে আশ্বস্ত করে গেলেন যে, ইউসুফজঈয়েরা আমাকে সম্পূর্ণরূপে তাদের বাদশাহ বলে মেনে নিয়েছে। এবার ইউসুফজাঈ আফগানদের পুরো নিষ্ঠা ও আনুগত্য আমার প্রতি থাকবে। এখন আর সেখানে কোনো বিরোধ বা বিদ্রোহ হবে না। যদি কোনো বিদ্রোহী মাথা তুলে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে তাহলে এবার আর বাদশাহি ফৌজের তাদের বিরুদ্ধে নামার আর প্রয়োজন হবে না। তাঁরা স্বয়ং নিজেরা মিলে বিদ্রোহীদের দফা রফা করবেন।

    আমি তাঁদের আশ্বাসে সম্পূর্ণরূপে সন্তুষ্ট হলাম।

    ২ জুন, বুধবার আমি হাকিমের পরামর্শে জোলাব নিলাম। ৫ জুন নিজে সুস্থবোধ করতে লাগলাম।

    ৭ জুন, সোমবারের দিন কাশিম বেগের ছোট পুত্র হামজা বেগের বিবাহ খলিফার বড় মেয়ের সঙ্গে হওয়ার খবর শুনলাম। ওই অবসরের জন্য উপহার রূপে ১,০০০ শাহরুখী (শাহ মুদ্রা) ও কিছু সুসজ্জিত ঘোড়া পাঠালাম।

    ৮ জুন, মঙ্গলবারের দিন শাহ বেগ শাহ হাসান আমার স্বাস্থ্য লাভের খুশিতে মদিরা ভোজের অনুমতি চাইলেন। তাদের প্রস্তাব পেশ হতেই খাজা মুহম্মদের পক্ষ থেকে কয়েকজন বেগও তাদের পিছনে সমর্থনের কাতারে দাঁড়িয়ে গেল। তাদের মধ্যে ইউনুস আলী ও গদল তগাইয়ের মতো আমার প্রিয় পাত্ররাও ছিল। তাদের প্রস্তাব আমি প্রত্যাখ্যান করতে পারতাম না। আমি সবিনয়ে বললাম—

    ‘আমার জন্য শরাব এখনও নিষিদ্ধ…।’ আমি পরে বললাম, ‘কিন্তু, দাওয়াত হবে, তবে এইভাবে হবে যে, আমি তোমাদের মধ্যে থেকে শুধুমাত্র পানি পান করব, শরাব নয়। তোমরা সবাই প্রাণ ভরে শরাব পান করে আনন্দ করবে, কিন্তু সব কিছু শালীনতার সঙ্গে হতে হবে। নেশায় মাতাল হওয়ার অনুমতি হবে না…।’

    সবার চেহারা আনন্দে উৎফুল্ল হয়ে উঠল। ছোট একটা তাঁবু ওই মদিরা উৎসবের জন্য আলাদাভাবে ফেলা হলো। তাঁবুকে সাজানো হলো। তাঁবু সেখানে ফেলা হয়েছিল তার দক্ষিণ-পূর্ব দিকে সবুজ বাগ-বাগিচার নজর কাড়া দৃশ্য বিরাজমান ছিল।

    তাঁবুর একটি পথ গিয়াসের বাড়ির সামনের দিকে ছিল। পানাহারের সমস্ত বস্তু ওই বাড়ি থেকে আনা হচ্ছিল।

    কিছু সময় পর্যন্ত তো উৎসব ঠিকঠাক চলছিল। তবে, ওই লোকেরা তর্কি মুহম্মদ কুল বেগকেও উৎসবে শামিল হওয়ার দাওয়াত দিয়ে দিয়েছিল, মোল্লা কিতরবঘরকেও ডেকে নিয়েছিল।

    ওই দুজনের শামিল হওয়ার পর আমার মনে চিন্তা এসেছিল—

    ‘যদি তুমি তোমার ফুলশয্যায় কম্বল পরিহিত বন্ধুদের শামিল করে নাও তাহলে কী পরিণাম হবে?’

    এই চিন্তা আমার মনে এজন্যই এসেছিল, কেননা, ওই দুই ব্যক্তি ছিল ‘চরম মদখোর’। খেয়ে মত্ত হয়ে যাওয়াটা তাদের স্বভাবের অংশ ছিল।

    এ রকমের দাওয়াতগুলোতে কেউ মদ খেয়ে মাতাল হোক এ চলন আমাদের মধ্যে ছিল না। মাতাল ব্যক্তি তা সে যতই জো হুজুরকারী হোক, তাদের এ মাতলামো আমার পছন্দ ছিল না।

    তবে, আল্লাহর শোকর যে, তারা দুজন মাতাল হয়নি, দাওয়াতের কার্যক্রম সাধারণভাবে চলতে থাকল।

    ইব্রাহীম চুহরার দ্বারা জোহরের নামাজের খবর পাঠানোর পর দাওয়াত কার্যক্রম থামিয়ে দেওয়া হলো।

    আমি কিছুদিন যাবৎ মদ স্পর্শ করিনি। আমার চিকিৎসক মদ খাওয়া কঠোরভাবে নিষিদ্ধ রেখেছিলেন।

    কয়েক দিন পরে চিকিৎসকের কাছ থেকে অনুমতি মেলার পর আমি আবারও শরাব পান করতে শুরু করি। তখন আরো একবার ওই রকমই মদিরা উৎসবের ব্যবস্থা করা হলো। এবার তালার বাগিচায় যা দক্ষিণ-পূর্ব দিকে অবস্থিত ছিল, সেখানে আপেল গাছের নিচে উৎসবের আয়োজন হলো।

    ২৮ জুলাইয়ের দিন, যখন আমি আমার বিশেষ সৈনিকদের উপত্যকার দিকে পাঠিমে দিয়েছিলাম। আমি পরবর্তী সফরের পরিকল্পনা করছিলাম তখন কিছু সৈনিক দৌড়ে পালিয়ে আমার সামনে চলে এল। তারা আমাকে একটি দুঃসংবাদ ছিল। খবর ছিল, চল্লিশ-পঞ্চাশ জন আফগান-বিদ্রোহীর একটি দল তাদের সেনা শিবিরে হামলা চালিয়েছে। বলল, হুসাইন হাসান নামক অশ্বারোহী সৈনিক ওই বিদ্রোহী আফগানদের দূর থেকে দেখতেই তাদের তাড়া করতে ঘোড়া ছুটিয়ে দিয়েছিল। সে একাই বিদ্রোহীদের সঙ্গে লড়াইয়ে লিপ্ত হয়েছিল। তাকে ঘিরে ফেলে আফগানরা তরবারির আঘাতে আঘাতে তাকে ঘোড়া থেকে ফেলে দেয়। তারা ঘোড়াটিকেও হত্যা করেছে এবং ছুরি দিয়ে তাকে টুকরো টুকরো করেছে।

    হয়রান হওয়ার মতো কথা এইটাই ছিল যে, শিবিরের কোনো সৈনিক হুসাইন হাসানের সাহাযার্থে এগিয়ে যায়নি।

    এ খবর পেতেই আমি অতি দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে পৌঁছালাম। তখন পর্যন্ত বিদ্রোহী আফগানরা শিবিরে হামলা চালিয়ে চলে গিয়েছিল। তবে, তখনও তারা বড় কোনো ক্ষতি করতে পারেনি, কেননা, আমার সহযোগিতার জন্য গদল তোগাই, পায়েন্দা মুল্ক, আবুল হাসান ও তীরন্দাজ মোমিন আতাকা এসে সেখানে ধমকাল। তারা সবাই উপত্যকার দিক থেকে ফিরে এসেছিল। হামলার খবর তারাও পেয়ে গিয়েছিল।

    মোমিন আতাকা দূর থেকেই দৌড়ে আসতে আসতে দুশমনদের উপর তীরন্দাজি শুরু করেছিল। সে দ্বিগুণভাবে তীর চালিয়ে দুশমনদের মুণ্ডু উড়িয়ে দিচ্ছিল। সে কিছু দুশমনকে দেখতে-দেখতেই মাটিতে ফেলে দিয়ে তাকে মৃত্যুমুখী হতে বাধ্য করল।

    আমি ও আমার বাহাদুর সাথিরা দুশমন আফগানদের তরবারির ঘেরার মধ্যে আবদ্ধ করে ফেললাম।

    তাদের মুণ্ডুপাত হতে লাগল। তারা আমাদের শিবিরের সাথিদের সামান্যতম ক্ষতিও করতে পারেনি, এর জন্য আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞ ছিলাম। দেখতে দেখতেই ৪০-৫০ আফগানের সবার মাথাকাটা দেহ শিবিরের চারপাশে পড়ে ছিল। যাদের সবাইকে নিপাত করার পর আমি শিবিরের সকল সৈনিককে বাইরে বেরিয়ে আসতে আদেশ করলাম। ওই সময়ে আমি ভীষণ ক্রুদ্ধ ছিলাম। আমি চিৎকার করে ওই সৈনিকদের লজ্জাম্বিত করতে গিয়ে বললাম—

    ‘কী লজ্জায় কথা, তোমাদের ভাগ্য ভালো যে, তোমরা এখনও এই মাটির উপরে নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে আছো আর দুশমনদের লাশ তোমাদের সামনে পড়ে আছে।

    যে দুঃসাহসিক ঢঙে এই শিবিরে তারা পৌঁছেছে, সেখানে আমরা যদি দ্রুত তোমাদের সাহায্যের জন্য এসে না পড়তাম তাহলে তাদের পরিবর্তে তোমাদের লাশ এখানে পড়ে থাকত। তারা তোমাদের দেহ টুকরো-টুকরো করে ফেলে যেত।

    তোমাদের বাহাদুরি ওই সময়ে কোথায় গিয়েছিল যখন আমাদের বাহাদুর শহীদ হুসাইন হাসান দুশমনদের তাড়া করে নিয়ে গিয়ে তাদের মধ্যে গিয়ে ঢুকে পড়েছিল… সে তোমাদের রক্ষার জন্যই তো তাদের উপর সিংহের মতো ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, সে যখন অবরুদ্ধ হয়ে গেল তখন কি তোমরা দাঁড়িয়ে তামাশা দেখছিলে? তোমাদের সংখ্যা আক্রমণকারী আফগানদের চেয়ে অনেক বেশি ছিল। বাহাদুরিতে তোমরা তাদের তুলনায় কিছুমাত্র কম ছিলে না… তোমাদের কাছে অস্ত্রেরও ঘাটতি ছিল না তা সত্ত্বেও তোমরা কেন দাঁড়িয়ে ছিলে?

    তোমাদের পদ ও পরগনা (জীবিকার জন্য প্রদত্ত এলাকা) ফিরিয়ে নেওয়া উচিত…।’ ক্রোধে অগ্নিশর্মা হয়ে তাদের প্রতি কুপিত হতে থাকলাম-“তারা তোমাদের দাড়ি কামিয়ে দিত, তোমাদের নির্মমভাবে মেরে বেহাল অবস্থায় নগরীর আবাদির দিকে খেদিয়ে দিত। যাতে নগরবাসী দেখে যে, বাবুর বাহিনীর বাহাদুর সিপাই কেমন কাপুরুষ। নিশ্চিতভাবে ওই অবস্থায় তোমাদের পদ ও পরগনা কেড়ে নেওয়া হতো…। তোমাদের দিকে কি কেউ সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে পারত?’

    সৈনিকেরা মাথা ঝুঁকিয়ে তাঁদের বাদশাহের কুপিত ভর্ৎসনা শুনতে লাগল।

    আমি কিছুক্ষণ যাবৎ তাদের ভর্ৎসনা করার পর, নিজের ক্রোধ সামলে নিলাম। ক্রোধ সামলানোর জন্য ওই লাশগুলো দেখাই যথেষ্ট ছিল, যারা আক্রমণকারী বিদ্রোহী আফগান ছিল। যাদের ইচ্ছাকে ভেঙে চুরমার করে দেওয়া হয়েছিল। তাদের মৃত্যুর কোলে চির-নিদ্রায় শায়িত করে দেওয়া হয়েছিল।

    আমাকে ধনুর্ধর মোমিন আতকার জ্ঞান-বুদ্ধির প্রশংসা করতে হলো, যে দূর থেকে তীরন্দাজি করে দুশমনদের কাবু করে ফেলেছিল, বাকি কাজগুলো আমি আমার সরদারদের সঙ্গে করে পৌঁছে গিয়ে পুরো করে দিয়েছিলাম।

    বাক্য-বিদ্ধ সৈনিকেরা ক্ষমা প্রার্থনা করল। তারা বলল যে, হুসাইন হাসানকে ঘোড়া হাঁকিয়ে দুশমনদের দিকে ছুটে যাওয়ার পর কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে বুঝতে পারছিল না যে, তাদের কী করা উচিত। ক্ষণেকের জন্য সঠিক সিদ্ধান্তটা না নিতে পারাটাই তাদের ভয়াবহ ভুল প্রমাণ হয়েছে।

    আমি তাদের ক্ষমা করে দিলাম। তারা আন্তরিক, বিশ্বস্ত ও সুদক্ষ সৈনিক ছিল। তাদের মধ্যে যেহেতু কোনো সরদার ছিল না, তারা অনুগত স্বভাবের হওয়া সত্ত্বেও নিজেরা সিদ্ধান্ত নিতে ব্যর্থ হয়েছিল।

    এ কথা অনুভব করে পর আমি তাদের এরকম অবস্থায় সৈনিকদের নিজেদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা দিয়ে দিলাম।

    কাবুলে পুনঃপ্রত্যাবর্তন

    ইতোমধ্যে আরো একবার খবর এল যে, কাবুলে অরাজক অবস্থার সৃষ্টি হচ্ছে। খবর পেতেই আমি সামনে না এগিয়ে কাবুলের দিকে মুখ করলাম। আমি চাচ্ছিলাম যে, ফারগানা ও সমরখন্দ, দুটিই যেভাবে আমার হাত থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল, সেরকম পরিস্থিতি যেন সামনে আর না আসে। যদিও এখন শুধু কাবুলই নয়, কাবুল থেকে হিঁদুস্তানের মধ্যে আমার অধীনে ছোট বড় অনেক রাজ্য ছিল। প্রথমকার অবস্থা তো আসতে পারত না, তা সত্ত্বেও সামান্যতম গালিফতিও করা সম্ভব ছিল না। কাবুলে পৌঁছানোর পর আমার বিশেষ কোনো প্রয়াস করতে হলো না, অবস্থা আপনিই নিয়ন্ত্রণে এসে গিয়েছিল। আমার বিরুদ্ধে ষড়ন্ত্রকারীরা যেইমাত্র আমার কাবুল প্রত্যাবর্তনের খবর পেল, অমনি তারা কাবুল ছেড়ে পালিয়ে গেল।

    কাবুল পৌঁছানোর পর আমি একদিনও আরামে কাটাতে পারিনি। কাবুলের অবশিষ্ট উপজাতি আফগানদের এলাকাগুলোকে আমার নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার প্রয়াস শুরু করলাম এবং যে এলাকাগুলো প্রথমেই নিয়ন্ত্রণে এসে গিয়েছিল তার নিয়ন্ত্রণ মজবুত করার জন্য আমি সেখানকার সরদারদের কাজে লাগালাম। তাদের পদমর্যাদা বাড়ালাম এবং শাহী ফরমান দিয়ে রাজস্ব উসুলের কাজে লাগালাম।

    এর লাভ আমার সাম্রাজ্যেরও ছিল এবং রাজস্ব উসুলকারী সরদারদেরও ছিল। শাহ ফরমান দিয়ে তাদের এলাকেদারের পদ দেওয়া হয়েছিল। এবার তারা কোনো এলাকায় মুখিয়া মাত্র না থেকে গিয়ে আমার বিশাল সাম্রাজ্যের এক ওহদেদার হওয়ার গর্ব করতে পারত! তারা যে রাজস্ব উসুল করত তার একটা ভালো অংশ তাদের ভাগে আসত। অবশিষ্ট কিছু না কিছু কাবুলের রাজকোষ বৃদ্ধি করত।

    এ ব্যবস্থা যথেষ্ট কার্যকর সিদ্ধ হলো। এবার আফগান উপজাতি সরদাররা নিজেদের হিতের স্বার্থে সাম্রাজ্যের সঙ্গে জুড়ে গিয়েছিল। তাতে তাদের নিজস্ব অস্তিত্বের প্রতি নিশ্চিত্ততার ভাব সৃষ্টি হয়ে গিয়েছিল। এ নিশ্চয়তা পরেও কার্যকর থাকুক, এর জন্য একই লাভ প্রাপকরা নিজেরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে গিয়েছিল। তারা নিজেরা এ জন্য সতর্কতা অবলম্বন করতে লাগল যে, না কোনো বহিঃশত্রু যেন কাবুলে ঢুকতে না পারে আর না কোনো ছোট-বড় অসভ্য উপজাতির বিদ্রোহী হতে পারে। তাদের সম্মিলিত শত্রু যে কোনো রাজ্যের সঙ্গে সংঘর্ষের শক্তি লাভ করে নিয়েছিল, তারা ছোট-বড় যেকোনো উপজাতির সঙ্গে হওয়া অরাজকর্তা দমনের জন্য তারা নিজেরাই সম্পূর্ণরূপে সক্ষম হয়ে উঠেছিল।

    এলাকেদার বানানোর পরে তাদের এ অধিকারও ছিল যে নিজের এলাকায় সুরক্ষা-ব্যবস্থার জন্য তারা প্রয়োজনীয় সৈনিকও রাখতে পারবে। প্রয়োজন পড়লে তারা শাহী সৈন্যের জন্যও দরখাস্ত করতে পারবে।

    ৮ সেপ্টেম্বর, ১৫১৫ ঈসায়ী সনে আরো একবার আমি ইউসুফজাঈ আফগানদের প্রতি মনোযোগ দিলাম। আমি তাদের এলাকায় একটি বড় ফৌজ নিয়ে ভ্রমণ করলাম। প্রত্যেক এলাকায় থেমে থেমে সেখানকার আফগান সরদারদের কাছ থেকে ব্যবস্থা সম্পর্কিত প্রতিবেদন তলব করলাম।

    আমি যে ভ্রমণ করলাম, তা প্রয়োজন ছিল। কাবুলে ইউসুফজাঈ আফগানরাই এমন ছিল যাদের পক্ষ থেকে আমার সাম্রাজ্যকে বারবার সমস্যার মুখোমুখি হতে হতো। যদিও এখন আর আগের মতো অবস্থা ছিল না, আমার বিশাল সেনাবাহিনী প্রস্তুত হয়ে গিয়েছিল। তাদের মধ্যে আফগানদের সংখ্যা যথেষ্ট বেশি ছিল। ওই আগমন সেনাই ইউসুফজাঈদের বিদ্রোহ দমনের জন্য যথেষ্ট সক্ষম ছিল। তবে আমি চাইতাম না যে, ইউসুফ জাইদের পক্ষ থেকে এরকম কোনো অবস্থা ফের কখনো পয়দা হোক, যা উদ্বেগের কারণ হয়ে ওঠে।

    ২৬ সেপ্টেম্বর আমার সেনা অগ্রসর হয়ে কিরিক-অরিক নামক স্থানে গিয়ে পৌঁছাল। এই স্থানটি নূর ঘাটে অবস্থিত। সেটি দরবেশদের একটি মশহুর এলাকা। খাজা মুহম্মদ ওই সময়ে সেখানে থেকে দূর-দূরান্ত অবধি মশহুর দরবেশ ছিলেন।

    আমি সেখানে পৌঁছে দীনের দাওয়াতের ব্যবস্থা করলাম। আমার অহলদার খুনতুল নামক বড় একটি ফল নজরানা রূপে নিয়ে এল। ওই ফলের বিষয়ে তো আমার জানা ছিল, কিন্তু খাজা মুহম্মদ ওই ফল কখনো দেখেননি।

    আমি তাঁকে বললাম— ‘এটি হিঁদুস্তানের খরবুজা।’

    তা টুকরো-টুকরো করে তাঁকে খেতে দেওয়া হলো। তিনি ফলকে মুখে দিয়ে দাঁতে কাটতেই তার স্বাদের ভূরি ভূরি প্রশংসা করতে লাগলেন।

    পরদিন খায়বরের পথ ধরে আমি বাজৌর পৌঁছালাম। ওখানকার খাজা কলাকে আমি আগেই খবর পাঠিয়েছিলাম। তিনি আমাকে সাদর অভ্যর্থনা জানালেন। আমি সান্ত্বনা পেলাম যে, বাজৌরে এখন আর আমার কোনো বিরোধী অবশিষ্ট নেই।

    আমি বিবি পুবারকাকে বাজৌরের প্রশাসক বানিয়ে দিলাম, যার অধীনে খাজা কলার বাজৌরের প্রশাসন সামলানোর কাজ ছিল।

    আমি এই দিনগুলোতে বাদাখশান ভ্রমণও করি। সেখানকার প্রশাসক লংগর খানের ব্যবস্থার খোঁজ-খবর নিই।

    খায়বর উপত্যকার নিচের এলাকায় খিজির খায়েলের আফগানদের মধ্যে পৌঁছে আমি তাদের বিশ্বস্ততার প্রশংসা করি। তাদের বিশ্বস্ততার পুরস্কার স্বরূপ সেখানকার নও-জওয়ানদের সেনাবাহিনীতে ভর্তি করে তাদের প্রতি বিশ্বস্ততা আরো পোক্ত করি

    অক্টোবর ১৫১৯ এর মাসটি আমি কুর্শল ভ্রমণে কাটিয়ে দিই। সেখানকার আবহাওয়া এ সময় বড়ই মনোরম ছিল।

    ২৬ অক্টোবর, বৃহস্পতিবারের দিন, আমার কাবুল প্রত্যাবর্তনের পর আমি হিঁদুস্তানের কিছু সওদাগরকে আমার প্রতীক্ষায় পেলাম। তাদের মুখিয়া ছিল ইয়াহিয়া নুমানি নামক ব্যক্তি। সে আমার কাছ থেকে কাবুলে তার ব্যবসায়ী দ্রব্য বিক্রি করার অনুমতিপত্র নেওয়ার জন্য অবস্থান করছিল। আমি তাকে সানন্দে অনুমতি দিয়ে দিলাম।

    ২৯ ডিসেম্বর, শক্রবারের দিন আমি তাজিকের নিজরৌ এলাকায় গিয়ে পৌঁছালাম। যেখানে আমার শিকারে যাওয়ার ইচ্ছে হলো। ওই এলাকায় হরিণ, শিকারিদের আকর্ষণের মূল কেন্দ্র ছিল। আমি সৌখিন শিকারিদের সঙ্গে নিলাম। আমি অন্য শিকারিদেরও শিকার করতে দেখলাম। আমি নিজে কোনো শিকার করলাম না, কেননা, ওই দিন আমার হাতে চোট লেগেছিল। আমি ধনুক থেকে তীর ছোড়ার মতো অবস্থায় ছিলাম না।

    ১৫২০-র জানুয়ারিতে আমি লমঘান গেলাম। ১৪ দিন পর আমি সেখানকার মন্দরাবার নামক এক নতুন ক্ষেত্র অধিকার করে নিলাম। ওখান থেকে চলার সময় আমি নিংগনজর কাইয়ুম নামক এক ব্যক্তিকে সেখানকার সুবেদারি প্রদান করলাম। নিংগনজকে কাইয়ুমের জন্য সুপারিশ লংগর খান করেছিল। সে আমাকে বলেছিল যে, সে আমার বিশ্বস্ত অনুগতদের অন্যতম।

    ২৪ জানুয়ারি, ১৫২০, মঙ্গল বারের দিন আমি কাবুলের দিকে য়াংগ বুলগা সড়ক ধরে রওনা হলাম। আমি সকাল বেলা পবিত্র কুরআন তিলাওয়াত করলাম। তারপর ঔলংগনুর পাহাড়তলি ও নদী এলাকা পার হলাম। মাগরিবের নামাজের সময় আমি কারাতু এলাকায় পৌঁছালাম। সেখানকার লোকেরা আমাকে সাদর অভ্যর্থনা জানাল। ঘোড়াদের খাওয়ার জন্য মক্কার পাত্র সামনে নিয়ে রাখল। সান্ধ্য ভোজনে আমার জন্য উত্তম আহারের ব্যবস্থাও তারা করে রেখেছিল।7

  • বিংশ অধ্যায় : বিবিধ ব্যস্ততার মধ্যে বাবুর

    বিংশ অধ্যায় : বিবিধ ব্যস্ততার মধ্যে বাবুর

    বিংশ অধ্যায় : বিবিধ ব্যস্ততার মধ্যে বাবুর

    ডিসেম্বর, ১৫২১ থেকে ২০ নভেম্বর ১৫২২ এর মধ্যবর্তী সময়ে বাবুরে ব্যস্ততার বিবরণ এরকম—

    বাবুরের বাদাখশান ভ্ৰমণ

    ১৫২১ ঈসায়ী সনের শুরু অথবা বিগত বছরের শেষ দিনগুলোতে বাবুর মাহিমের সাথে তাঁর জ্যেষ্ঠ-পুত্র হুমায়ুনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে বাদাখশান গেলেন। বাবুর বাদাখশানের শাসনকার্য হুমায়ূনকে আগে থেকেই দিয়ে রেখেছিলেন। সেখানে তিনি কিছুদিন হুমায়ূন ও গুলবদনের সঙ্গে অবিবাহিত করেন।

    এই সময়কালে তিনি কান্দাহারের কিছু অবিজিত প্রদেশ জয় করেন এবং রাজ্য বিস্তার করেন। উল্লেখ্য যে, কান্দাহারের শাসক শাহ বেগ ওই সময়ে মারা যান।

    ২০ জুলাই ১৯২২ অবধি বাবুর কান্দাহারে ছিলেন। তিনি শাহ হাসানকে কান্দাহারের শাসক নিযুক্ত করেন। শাহ হাসান বাবুরের নামে খুৎবা পড়েন।

    হিঁদুস্তান অভিযানের নয়া পরিকল্পনা

    ২০ নভেম্বর, ১৫২২ থেকে ১০ নভেম্বর, ১৫২৩ এর মধ্যে বাবুর হিঁদুস্তান অভিযানের জন্য নয়া পরিকল্পনা করেন।

    মনোযোগের বিষয় হলো এই যে, ওই সময় থেকে বাবুর পূর্বে তিনবার হিঁদুস্তান বিজয়ের পরিকল্পনা করেছিলেন, তবে প্রাকৃতিক এবং রাজনৈতিক কারণে বারবার তাঁকে কাবুলে ফিরতে হয়েছিল। অবশ্যই তিনি বাজৌর ও ভেড়া এবং ইউসুফজাঈদের এলাকা পর্যন্ত জয় করে নিয়েছিলেন। একে হিঁদুস্তান বিজয়ের একটি অংশ বলে ঐতিহাসিকেরা অভিমত ব্যক্ত করেছেন।

    ওই সময়ে হিঁদুস্তান থেকে, দৌলত খাঁ লোদি (ইউসুফ খায়েল), আলাউদ্দীন ‘আলম খাঁ লোদি’র প্রতিনিধিদল এসে বাবুরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং হিদুস্ত ানের শাসক ইব্রাহীম লোদির বিরুদ্ধে আক্রমণের আমন্ত্রণ জানান।

    তারপর বাবুর এক বিয়ের দাওয়াতের অবসরে হিঁদুস্তান থেকে দিলাওয়ার খাঁকে বিশেষভাবে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। দিলওয়ায় খাঁ-ও ইব্রাহীম লোদির বিরোধী ছিলেন। তিনি হিঁদুস্তানের আমিরদের (শাহী পদমর্যাদা প্রাপ্ত ব্যক্তিদের) মুখিয়া ছিলেন। বিবাহ ভোজের পর দিলওয়ার খাঁয়ের সঙ্গে বেশ কিছুক্ষণ যাবৎ বার্তালাপ করেছিলেন। তিনি প্রশ্ন করেছিলেন—

    ‘তোমরা (আমির) চল্লিশ বছর যাবৎ ইব্রাহীম লোদির নেমক খেয়েছ, এখন বিরোধী কেন হয়ে গেলে?’

    দিলওয়ার খাঁ যেন বাবুরের প্রশ্নের উত্তরের জন্য প্রস্তুত হয়ে এসেছিলেন। তিনি বললেন—

    ‘বাদশাহ! আপনার প্রশ্ন খুবই স্বাভাবিক। আমরা আমিরেরা লোদি খানদানের নেমক খেয়েছি, তবে এখন আমরা নেমক হারামির কাজে নেমে পড়িনি। আমরা আমাদের শাহের জুলুম-অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছি। আজ হিঁদুস্তানের কোনো আমিরের মান-সম্মান-ইজ্জত-সম্ভ্রমের আর কোনো নিরাপত্তা নেই। আমাদের শাহ ইব্রাহীম আজ কিছু কুমন্ত্রণাদাতার ষড়যন্ত্রের জালে ফেঁসে গেছেন। তিনি আমাদের ন্যায় পুরনো আমিরদের ঝাড়ে বংশে নিপাত করে আমাদের জায়গায় নতুন লোক রাখতে চাচ্ছেন। আমাদের শাহ বিগত দিনগুলোতে ২৫ আমিরকে অকারণে রুষ্ট হয়ে হয় শূলে চড়িয়েছেন নতুবা তাঁকে আগুনে পুড়িয়ে মেরেছেন। এসবই হয়েছে মিথ্যা কানভাঙানির ফলে। কোনো আমিরের বিরুদ্ধে কোনো দোষারোপ করা হলো, শাহ কোনো তদন্ত করা কিংবা তাঁর আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ ছাড়াই তাঁকে মৃত্যুর কোলে পৌঁছে দেওয়ার আদেশ দিচ্ছেন। আজ হিঁদুস্তানের আমির তাঁদের জান-মাল-ইজ্জত-সম্ভ্রম নিয়ে আর নিরাপত্তা বোধ করছেন না।’

    দিলওয়ার খাঁ পরে বললেন—’আমরা আল্লাহর পক্ষ থেকে পাঠানো আলোর কিরণ রূপে আপনাকেই আমাদের সাহায্যকারী রূপে দেখতে পাচ্ছি। এ জন্য আমি অন্যান্য আমিরদের নিয়ে আপনার খিদমতে হাজির হয়েছি। আপনি আমাদের প্রাণ রক্ষায় জন্য হিঁদুস্তানে আসুন… ‘

    বাবুর কর্তৃক নজরানার দাবি

    দিলওয়ার খাঁ-র কথা শুনে বাবুর বললেন— ‘এ কথা আমি তখনই বিশ্বাস করব যখন সেখানকার আমিরদের পক্ষ থেকে পান, আম, ফল এবং এরকম কিছু বস্তু তাদের নামসহ আমাকে উপহার হিসেবে পাঠানো হবে। এমন উপহারের পরই আমি বিশ্বাস করব যে, সেখানকার আমিররা আমাকে আমন্ত্রণ জানাচ্ছেন।’

    বাবুরের কথা শুনে দৌলত খাঁ সেখান থেকে খুশি-মনে প্রস্থান করলেন।

    কিছুদিন পরই বাবুরের কাছে আধপাকা আমের ঝুড়ি, পানের টুকরি, অন্যান্য ফল এবং মধুর মটকা আমিরদের আলাদা-আলাদা নামসহ আসতে লাগল।

    এবার বাবুর বিশ্বাস করলেন যে, এটাই হিঁদুস্তান আক্রমণের উপযুক্ত সময়।

    এরই মধ্যে আলম খাঁ কাবুলে এসে, নিজে সাক্ষাৎ করে ইব্রাহীম লোদির বিরুদ্ধে আক্রমণের আমন্ত্রণ জানালেন। আলম খাঁ সুবেদার পদমর্যাদার ব্যক্তি ছিলেন।

    গুলবদনের জন্ম

    বাবুর হিঁদুস্তান বিজয়াভিযানে রওনা হওয়ায় প্রস্তুতির মধ্যে ছিলেন এমন সময় তিনি খবর পেলেন তাঁর পত্নী দিলদার বেগম তৃতীয় সন্তানের জন্ম দিয়েছেন। ওই শিশুর অপত্য স্নেহে পড়ে বাবুর কিছুদিনের জন্য বিজয়াভিযান স্থগিত রাখলেন। ওই কন্যা শিশুর নাম রাখা হলো ‘গুলবদন’।

    হিঁদুস্তানের উদ্দেশে বাবুরের চতুর্থ অভিযান

    ১০ নভেম্বর, ১৫২৩ থেকে ২৯ অক্টোবরের ঈসায়ী পর্যন্ত সময় কালটি ছিল বাবুরের হিঁদুস্তান অভিযানের চতুর্থ কার্যকাল। এবার তিনি ইব্রাহীম লোদির বিরুদ্ধে কাবুল থেকে সসৈন্যে রওনা হয়ে চিনাব ও ঝিলাম নদী পেরিয়ে লাহোর সীমান্ত পর্যন্ত পৌঁছালেন। যেখানে তিনি শিবির ফেললেন সেখান থেকে লাহোরের দূরত্ব ছিল মাত্র কয়েক মাইল।

    লাহোর ছিল দৌলত খাঁ-র প্রধান কার্যালয়। সেখানকার শাসনভার ইব্রাহীম লোদি তাঁকে দিয়েছিলেন, তবে বাবুরের সেনা যখন লাহোরে প্রবেশ করে তখন তার আগেই তিনি সসৈন্যে রওনা হয়ে গিয়েছিলেন।

    লাহোর বিজয়

    লাহোরে বেলুচ সৈনিকদের একটি শক্তিশালী বাহিনী ছিল। তারা ইব্রাহীম লোদির পক্ষ থেকে লাহোর রক্ষায় জন্য নিযুক্ত ছিল।

    বাবুর ও বিহার খাঁ লোদির মধ্যে রক্তাক্ত যুদ্ধ হলো। অবশেষে বিহার খাঁ পরাজয় বরণ করলেন। বিহার খাঁ বাবুরের সামনেই রণক্ষেত্র ত্যাগ করে পলায়নপর হলেন। বাবুর পুরো লাহোরে তাঁকে ধাওয়া করলেন। তার জন্য তিনি অনেক নগরে আগুন লাগিয়ে দিলেন।

    দীপালপুর বিজয়

    ২২ জানুয়ারি, ১৫২৪ এ বাবুরের সেনা দীপালপুরে প্রবেশ করল। সেখানে তাঁকে বিরোধিতার মুখে পড়তে হলো না। দীপালপুর সহজেই বাবুরের অধিকারে এসে গেল।

    তারপর বাবুরের সেরহিন্দ অভিমুখে রওনা হওয়ার কথা শুনল সেখানকার বসিন্দারা। পরে, স্পষ্ট হলো যে, বাবুর সেরহিন্দে না গিয়ে সেনা অভিমুখ ঘুরিয়ে দিয়েছিলেন।

    উল্লেখ্য যে, পরে দীপালপুরে দিলওয়ার খাঁ বাবুরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন। তিনি তার পক্ষে সাফাই দিয়েছিলেন যে, লাহোরে আক্রমণের সময় সেখানে থাকার সাহস তাঁর ছিল না, সেজন্য সেখান থেকে তিনি চলে গিয়েছিলেন।

    এ কথাও বলা হয় যে, ধোঁকা দেওয়ার অভিযোগে বাবুর তাঁকে গ্রেফতার করেছিলেন। তারপর, কিছুদিন বাদে তাঁকে সুলতানপুরে ছেড়ে দেওয়া হয়। ছাড়া পাওয়ামাত্রই দৌলত খাঁ পাঞ্জাব থেকে দূরে চলে যাওয়াটাই মঙ্গল ভেবেছিলেন। তরপর পার্বত্য এলাকা ধরে চলে গিয়েছিলেন।

    লাহোরে কিছুদিন অবস্থানের পর বাবুর শাসন ব্যবস্থা সংক্রান্ত কিছু রদবদল করেন। তিনি দীপালপুরে তাঁর অশ্বারোহী সেনার প্রধান আবদুল আজিজ-কে প্রশাসক নিযুক্ত করে আলম খাঁ ও বাবা কহকশাঁ মোগলকে তার অধীনস্ত করে দেন। শিয়ালকোটে খুসরো কুকুলদাসকে, কালানৌরে মুহম্মদ আলী তাজিককে নিযুক্ত করেছিলেন।

    এই বছরের ঘটনাবলির বিবরণে ঐতিহাসিকেরা একথাও লিখেছেন যে, বাবুর হিঁদুস্তান থেকে কলাগাছ নিয়ে গিয়েছিলেন, যা তিনি আদলনাপুরে লাগিয়েছিলেন। কলার বাগানকে তিনি ‘বাগ-এ-ওয়াফা’ নাম দিয়েছিলেন।

    ২৯ অক্টোবর, ১৫২৪ থেকে ১৮ অক্টোবর, ১৫২৫ ঈসায়ীর মধ্যেকার, ঘটনাবলি সম্পর্কে ঐতিহাসিকদের বিবরণ থেকে পাওয়া যায় যে, বাবুর দীপালপুর থেকে অগ্রসর হওয়ার পর, ইব্রাহীম লোদির পক্ষ থেকে ৫,০০০ সেনা শিয়ালকোটে পাঠানো হয়েছিল, যাদের অগ্রগতিকে লাহোরের বেগরা বাবুরের পক্ষ থেকে রুখে দিয়েছিল।

    দীপালপুরের শাসক আলম খাঁর বিষয়ে বলা হয় যে, তিনি ইব্রাহীম লোদির পক্ষ থেকে হামলার ফলে ভয়াক্রান্ত হয়ে পালিয়ে সোজা কাবুলে গিয়ে পৌঁছান। তিনি বাবুরের কাছে আরো বেশি সেনা দাবি করেন। বাবুর তাঁর সাহায্য বাবদ শর্ত দিয়েছিলেন যে, তিনি সেনা অবশ্যই দেবেন তবে তিনি যখন দিল্লির শাসক ইব্রাহীমকে হারিয়ে দেবেন তখন তাকে সেখানকার শাসন ব্যবস্থা সামলানোর জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।

    আলম খাঁ তাতে রাজি হয়ে যান। তারপর তিনি বাবুরের পক্ষ থেকে বেগদের থেকে একটি পত্র পেয়েছিলেন, যাতে বলা হয়েছিল আলম খাঁকে পুরো সাহায্য দেওয়া হোক।

    হিঁদুস্তানে বাবুরের পঞ্চম অভিযান

    কাবুল, বলখসহ অন্যান্য এলাকায় সুব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার পর বাবুর আরো একবার হিঁদুস্তান বিজয়ের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়লেন। এ তাঁর পঞ্চম এবং শেষ ভারত অভিযান ছিল। বাবুর হিঁদুস্তান অভিমুখে অগ্রসরই হচ্ছিলেন তখন বাদাখশান থেকে তাঁর পুত্র হুমায়ূন পিতার সাহায্যের জন্য বেরিয়ে পড়লেন। তিনি তাঁর পিতার একদিন পিছনে থেকে অগ্রসর হচ্ছিলেন, একই পথ ধরেই তাঁরা এগুচ্ছিলেন।8

    ১১ ডিসেম্বর, ১৫২৫ ঈসায়ীতে দৌলত খাঁ ও গাজী খাঁর পক্ষ থেকে আমার কাছে খবর পাঠানো হলো যে, তাঁরা কুড়ি থেকে ৩০ হাজার সেনাসহ কিলানপুরে পৌঁছে গেছেন, তাঁরা লাহোরের দিকে অগ্রসর হচ্ছেন।

    ১৪ ডিসেম্বর দুই রাতের শিবির সিন্ধুনদের তটে ফেলার পর আমাদের সেনা নৌ-যোগে নদী পার হলো। নৌযোগে নদী পার হওয়া সৈন্যের সংখ্যা ছিল বারো হাজার।

    শিয়ালকোট অভিমুখে অগ্রসর হওয়ার সময় প্রবল বৃষ্টিপাত হয়েছিল। সেখানকার পুকুর-দিঘি মাঠঘাট পানিতে টই-টম্বুর হয়ে ছিল। ওই পুকুরগুলোর পানি এত ঠান্ডা ছিল যে, পানির উপরে বরফের পাতলা স্তর পড়ে যাচ্ছিল।

    ২৪ ডিসেম্বর আমরা ঝিলাম নদী পার হলাম।

    ওই দিন, জায়গায় জায়গায় আলোচনা চলছিল যে, গাজী খাঁ ও দৌলত খাঁ-র পক্ষ থেকে ৩০ থেকে ৪০ হাজার সেনা আসছে। তবে, এ কথা আমি বিশ্বাস করছিলাম না। আমার শুধু নিজের শক্তির উপরেই ভরসা ছিল যা ওই সময়ে আমার সঙ্গে ছিল, অথবা আমি আমার নিজের তরবারির উপরেই ভরসা করছিলাম। ২৬ ডিসেম্বর আমাদের সেনা চেনাব তটে পৌঁছে গেল।

    জাঠ ও গুর্জরদের মুখোমুখি

    সামনে এগোনোর সাথে সাথে কিছু পাহাড়ি ও কিছু সমতল এলাকায় লুটতরাজকারী ও হানাদার পাহাড়ি জাতির লোকেদের সঙ্গে আমাকে যুঝতে হলো। তাদের জাঠ ও গুর্জর বলা হতো। তাদের আক্রমণকে দমন করার জন্য আমাকে বিশেষ প্রয়াস নিতে হলো।

    ডিসেম্বরের শেষ তারিখে আমরা কলাভার পৌছে গেলাম। সেখানে জানী বেগ ও শাহ হাসানের সেনাদল এসে আমাদের সঙ্গে মিশে গেল। মাহমুদ মির্জা ও আদিল শাহও বেগ সৈনিকদের নিয়ে ওখানেই মিলিত হলো।

    ১ জানুয়ারি, ১৫২৬ আমাদের সেনা অগ্রসর হয়ে মেওয়াত পর্যন্ত গিয়ে পৌঁছাল। আমি গাজী খাঁ-র নেতৃত্বাধীন সেনার অপেক্ষায় ছিলাম। অন্য কিছু সেনানায়ক-মুহম্মদ, আহমদ, কতলক কদমেরও সেখানে এসে মিলিত হওয়ার আশায় ছিলাম।

    মেওয়াত বিজয়

    ২-৩ জানুয়ারি, ১৫২৬ বেগ সরদারের সঙ্গে এসে মিলিত হবার পর আমাদের সেনা ব্লাহ-ওয়াটার পার হলো, যা খানুয়া পাহাড়ের নিচে অবস্থিত। সেখান থেকে পদাতিক সেনাসহ আমি মেওয়াত উপত্যকায় অবস্থিত কেল্লার দিকে অগ্রসর হতে লাগলাম।

    ওই পর্যন্ত পৌঁছাতে আমাদের দুদিন সময় লাগল। সেখানে কিছু বেগ সরদার আমার আগে সেনা নিয়ে পৌঁছে গিয়েছিল। আমি ওই পর্যন্ত পৌঁছে পরবর্তী রণনীতি প্রস্তুত করি। আমি সেনাকে আদেশ দিলাম ছড়িয়ে-ছিটিয়ে না চলে সোজাভাবে পরস্পরের মধ্যে নৈকট্য রেখে অগ্রসর হতে। দৌলত খাঁ-র জ্যেষ্ঠ পুত্র আলী খাঁ-র ছেলে ইসমাঈল খাঁ মেওয়াতে আমার শরণ গ্রহণ করে। সে আনুগত্যের শপথ নিল। শেষ রক্তবিন্দুটুকু দিয়েও সে আমার জন্য লড়বে বলে প্রতিশ্রুতি দিল। আমি আমার বিজয়াভিযানে তাকে সাথে নিয়ে নিলাম।

    ৫ জানুয়ারি, শুক্রবারের দিন কেল্লা থেকে এক মাইল আগে আমি শিবির ফেলার আদেশ দিলাম। লোকেরা কাজে নেমে পড়ল তো সেই ফাঁকে আমি ডাইনে-বামে সামনের সমস্ত এলাকা নিরীক্ষণ করার উদ্দেশ্যে বেরুলাম। কিছুক্ষণ পর দৌলত খাঁর পক্ষ থেকে খবর এল যে, মেওয়াতের কিলেদার (কেল্লারক্ষক) গাজী খান কেল্লা ছেড়ে পাহাড়ের দিকে পালিয়ে গেছেন। তিনি তাঁর বার্তায় পরে বললেন যে, যদি তাঁর দোষ-ত্রুটি মার্জনা করে দেওয়া হয় তাহলে সে নিজে আপনার সামনে আত্মসমর্পণ করতে চায়।

    আমি খাজা মীর ইমরানকে তাকে নিয়ে আসার জন্য পাঠালাম। আমি বলে পাঠালাম তাকে সর্বপ্রকারে অভয় দিয়ে আমার কাছে নিয়ে আসা হোক।

    আমার সৈনিকেরা তাঁকে ঘিরে আমার কাছে নিয়ে এল। আমি তার গর্দানে তলোয়ার রাখার আদেশ দিলাম। আমার আদেশ শুনতেই দৌলত খাঁ হাঁটু গেড়ে আমার পায়ে এসে পড়লেন।

    আমি আমার পা ছেড়ে দাঁড়াবার আদেশ দিলাম। আমি তাঁকে আমার সামনে বসালাম। এক দোভাষীকে ডাকলাম যিনি আমার ভাষা দৌলত খাঁকে বোঝাতে পারেন।

    আমি তাকে বললাম— ‘আমি তোমাকে পিতৃতুল্য জ্ঞান করি। আমি তোমাকে এত মান-সম্মান দিয়েছি যা তুমি কল্পনাও করোনি। আমি তোমার পরিবারের সদস্যদের, তোমাদের হেরেমকে তোমাদের শত্রুদের কবল থেকে রক্ষা করেছি। ইব্রাহীমের কারাগারে ঢোকার কবল থেকে তোমাকে রক্ষা করেছি। তাতার খানের ভূমির একটা বড় অংশ তোমাকে দিয়েছি। এ বিষয়ে কী তুমি কিছু বলবে? তা সত্ত্বেও তুমি তোমার কথার উপর কায়েম থাকোনি। আমি তোমাকে সেনা দিয়েছি, রাজকাজের জন্য ভূমি দিয়েছি, এরপর তোমার কী কষ্ট ছিল যে, আমাকে তুমি ধোঁকা দিতে বাধ্য হয়েছ। আমার থেকে দূরে দূরে থাকছ?’9

    আমার কথার উত্তর ওই বুড়ো মানুষটি (দৌলত খাঁ)-র জানা ছিল না। তিনি বোবার মতো হয়ে রয়ে গেলেন। সে কোনো উত্তর দিতে না পারায় আমি খাজা মীর ইমরানকে তাকে সামলাবার আদেশ দিলাম। দৌলত খাঁ-র প্রতি রাগ ঠান্ডা হয়ে গিয়েছিল। আত্মসমর্পণের জন্য আসা লোকেদের আমি ক্ষমা করে এসেছি আমার জন্য খুশির কথা ছিল এটাই যে, মেওয়াতের কিলেদার গাজী খাঁ কেল্লা ছেড়ে পাহাড়ের দিকে পালিয়ে গিয়েছিল।

    কেল্লা অবরোধের পর আর কোনো বিরোধিতার সম্ভাবনা ছিল না। পরদিন, কেল্লার প্রধান দ্বারে গিয়ে সৈন্যরা দরওয়াজা খুলল। কোনো রকমের বিরোধিতা সামনে এল না। পারিবারিক স্ত্রী-পুত্র-পরিজন-চাকর-নোকররা ভীতসন্ত্রস্ত ছিল। আমি তাদের সবাইকে বাইরে পাঠালাম। কারো সঙ্গে যাতে দুর্ব্যবহার না হয়-এ আদেশ সৈনিকদের কঠোরভাবে দিয়ে দিলাম।

    মুহম্মদী, আহমদী, জুনাইদ, আবদুল আজিজ, মুহম্মদ আলী জংগ ও কুতল কদমকে, আমি মহলকে সম্পূর্ণরূপে খালি করার পর কবজা করে নিতে আদেশ দিলাম।

    ওই সময়কালে আমার জ্যেষ্ঠ পুত্র হুমায়ূন আমার সঙ্গে এসে মিলিত হয়েছিল। আমি গাজী খাঁ-র কিতাবঘর (গ্রন্থাগার)-এ গেলাম। সেখানে অতি মূল্যবান সব গ্রন্থের সংগ্রহ ছিল। সমস্ত কিতাব অধিকার করার পর আমি হুমায়ূনের পছন্দের কিছু কিতাব তাকে উপহার দিলাম। কিছু পুস্তক কামরানের জন্য সংরক্ষিত করে নিলাম। ওই সময়ে কামরান কান্দাহারে ছিল। আমি কান্দাহার শাসনের ভার কামরানের হাতে দিয়ে রেখেছিলাম।

    মেওয়াতকে মুহম্মদ আলী জঙ্গের দায়িত্বে এবং দু’আড়াইশো আফগান সৈনিকের সংরক্ষণে রেখে আমি জাসওয়ান উপত্যকার দিকে অগ্রসর হবার আদেশ দিলাম।

    শস্য-শ্যামল-সবুজ প্রান্তর পেরিয়ে আমি হিঁদুস্তানে প্রবেশ করলাম। রাস্তায় অনেক গ্রাম দেখা গেল, যেগুলো জাসওয়াল পরগনার অন্তর্গত ছিল। সেখানকার বিষয়ে জানা গেল যে, সেটি দিলওয়ার খাঁ-র মামার শাসনাধীনে ছিল। তবে সে বিরোধিতার জন্য সামনে এল না। এই এলাকায় ময়ূর ও বানরের রমরমা ছিল। কিছু লোকের পাখি মারা পেশা ছিল। কেননা, স্থানটি রঙ-বেরঙের পাখিতে ভরে ছিল।

    উপত্যকার পাহাড় এলাকায় একটি শক্তিশালী দুর্গ উত্তর-দক্ষিণে বিস্তৃত ছিল, সেটি কুটিলা দুর্গ নামে পরিচিতি ছিল। সেটি ৭০-৮০ গজ বর্গক্ষেত্র জুড়ে ব্যাপ্ত ছিল। তার দ্বার ছিল ৭-৮ গজ। তবে ওই সময়ে দুর্গটি বিরান হয়ে পড়ে ছিল।

    বাবুর ইব্রাহীম লোদির সঙ্গে যুদ্ধের পথে

    এবার আমার সেনা সিকান্দার লোদির পুত্র ইব্রাহীম লোদির এলাকার দিকে অগ্রসর হচ্ছিল। ইব্রাহীম লোদি দিল্লিকে তাঁর ক্ষমতার কেন্দ্র বানিয়ে রেখেছিলেন।

    আমি শুনেছিলাম যে, তার সৈন্য সংখ্যা এক লক্ষ (১,০০,০০০) এবং তাঁর বিশালকায় এক হাজার হাতির একটি বাহিনী আছে।

    আমি রাতে শিবির ফেললাম। পরদিন প্রভাতের পূর্ণ প্রস্তুতি ছিল। শাহ মীর হুসাইন ও জানবেগের সেনাপতিত্বে আমি সেনাকে রণক্ষেত্রে নামানোর সিদ্ধান্ত নিলাম।

    আমি খাকর এলাকা পার হলাম। ওই সময় পর্যন্ত আমার কাছে খবর ছিল যে, ইব্রাহীম লোদি দিল্লি থেকে সসৈন্যে রওনা হয়ে গেছেন।

    আমি কিন্তা খাঁকে ৩০-৪০ মাইল আগে পাঠালাম, যাতে সে ইব্রাহীম লোদির সেনার সঠিক অবস্থার সংবাদ নিয়ে আসতে পারে।

    আমি হুমায়ূনকে শত্রু-সেনার প্রতিরোধের জন্য আগে পাঠালাম। ২৬ ফেব্রুয়ারি, সোমবারের দিন হুমায়ূনের সঙ্গে পাঠানো সেনার হামিদ খাঁ-র সেনার সঙ্গে সংঘর্ষ হলো।

    হামিদ খাঁ হিসারের রাজস্ব আধিকারিক ছিলেন। তিনি ইব্রাহীম লোদি কর্তৃক হিসারে নিযুক্ত ছিলেন। আমি এ খবর পেয়ে গিয়েছিলাম যে, ইব্রাহীমের পক্ষ থেকে হামিদ খাঁর প্রতি আদেশ ছিল যে, তিনি যেন আমার অগ্রসরমান সেনাকে রুখে দেন।

    অনতিবিলম্বেই আমি হামিদ খানের পরাজয় ও হুমায়ূনের বিজয়ের সংবাদ পেলাম। এটা ছিল হুমায়ূনের প্রথম যুদ্ধজয় ও যুদ্ধের প্রথম অভিজ্ঞতা।

    হুমায়ূনের সেনা হামিদ খাঁ-র হস্তীবাহিনীর ৭-৮টি হাতি ও ১০০ সেনা বন্দী করে নিয়ে এল।

    হাতি ও যুদ্ধবন্দিদের নিয়ে হুমায়ূন আমার সঙ্গে মিলিত হলো তো আমার আর আনন্দের সীমা-পরিসীমা রইল না। তবে, আমি তাঁকে যুদ্ধের নিয়ম শেখানোর জন্য উস্তাদ আলী কুলি তোপচিকে হুকুম দিলাম যে, যুদ্ধবন্দিদের কামান দেগে উড়িয়ে দেওয়া হোক।

    যুদ্ধবন্দিদের তোপের মুখে উড়িয়ে দেওয়ার আদেশ দিয়ে আমি হুমায়ূনকে শেখাতে চাচ্ছিলাম যে, এই অবসরে, যখন কোনো বড় যুদ্ধ সামনে থাকে তখন দুশমন বন্দীদের সাথে করে নিয়ে চলাটা মূর্খতা ছাড়া আর কিছুই নয়।

    আমি পরবর্তী শিবির সাহফিবাদে ফেললাম। আমার এক সৈনিককে হুমায়ূনের বিজয়-বার্তা দিয়ে আমি কাবুলে পাঠিয়ে দিলাম।

    ওই রাতেই আমার কাছে খবর এল যে, ইব্রাহীমের সেনা দু-চার মাইল আগে এসে তাঁর শিবির ফেলেছেন।

    এ খবরও এল যে, ইব্রাহীমের এই সেনা-শিবির সেখানে দুই-তিন দিন থাকবে। তারপর, তিনি যমুনা নদী অভিমুখে রওনা হয়ে যাবেন।

    আমি ইব্রাহীমের প্রতীক্ষা ছাড়াই সসৈন্যে সারসাওয়ার দিকে অগ্রসর হলাম। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের দৃষ্টিতে সারসাওয়া খুব সুন্দর ক্ষেত্র ছিল।

    আমাকে দোয়াব পেরিয়ে রণক্ষেত্রে অবতীর্ণ হওয়ার কথা। নৌকার ব্যবস্থা করা হলো।

    নদীর ওপারে আমার সেনার অবতরণ মাত্রই হায়দার কুলের দিক থেকে খবর এল যে, ইব্রাহীম, দাউদ খাঁ লোদি ও হাতিম খাঁ লোদির নেতৃত্বে দোয়াব তটে ৫-৬ হাজার সেনা রওনা করিয়ে দিয়েছেন।

    নদী পার হতে থাকা আমার সেনাকে রোখার জন্য অগ্রসরমান দাউদ খাঁ ও হাতিম খাঁ যিনি তাঁর সহোদর ভাই ছিলেন তাদের সঙ্গে মোকাবিলার জন্য জুনাইদ শাহ, মীর হুসাইন, কুতল কদম, আবদুল ও কিস্তা বেগের নেতৃত্বে আমার সেনাদল অগ্রসরমান শত্রুসেনার উপর হামলা চালিয়ে দিল।

    দাউদ খাঁ ও হাতিম খাঁ সহ ৬০-৭০ যুদ্ধবন্দি এবং ৬-৭টি হাতি আমাদের হাতে এসে গেল। অবশিষ্ট সৈন্যদের হয় শেষ করা হলো নতুবা কোথাও পালিয়ে গেল।

    আমি আমার সেনাকে নতুন ঢঙে সাজালাম। ডান ও বাম দিককার দলের সঙ্গে মধ্যবর্তী দলে বিশেষভাবে অভিজ্ঞ যোদ্ধাদের শামিল করলাম।

    পরবর্তী তাঁবু ফেলার পূর্বে আমি দু’চাকা ওয়ালা গাড়ির ব্যবস্থা করলাম। এরকম ৭০০ গাড়ির ব্যবস্থা করা হলো।

    আমি উস্তাদ আলী কুলিকে নিযুক্ত করলাম যে, তিনি এই গাড়িগুলো দড়ি দিয়ে এমনভাবে বাঁধাবেন যেন তার দড়িগুলো ভিতরের দিকে যাকে। ওই গাড়িগুলোর পিছনে কামান বসানো হলো। বারুদ ও মশাল প্রস্তুত রাখা হলো।

    গাড়িগুলোর পিছনে সেনা শিবির ফেলা হলো।

    ওই সেনা শিবিরকে ৫-৬ দিন পর্যন্ত জমিয়ে রাখা হলো। তবে ইব্রাহীম লোদির সেনা অগ্রসর হয়ে সে পর্যন্ত এল না।

    আমি ১২ এপ্রিল তাঁবু গুটিয়ে নেওয়ার আদেশ দিলাম। এবার আমাকে আক্রমণের জন্য সামনে এগুতে হবে।

    এবার আমাদের অভিমুখ পানিপথের দিকে ছিল।

    শত্রু সেনাদের সম্পর্কে বড়-বড় কথা আসছিল যে, এক লাখের সেনা সহ এক হাজার হাতির বাহিনী রয়েছে। এ সব শুনে আমার সৈনিকদের মনোবল নষ্ট হয়ে যাচ্ছিল।

    কিন্তু সাহস অটুট ছিল। আমি সৈনিকদের মনোবল বাড়ানোর জন্য বললাম–

    ‘আমরা আমাদের পূর্বপুরুষদের বিজিত ভূমি পুনরুদ্ধার করতে যাচ্ছি। আমরা হক (ন্যায়ধর্ম)-এর উপরে আছি। ধর্মের জয় সর্বত্রই।’

    ৭-৮ দিন ধরে পানিপথের প্রান্তরে শিবির ফেলে বসে আছি। ইব্রাহীম লোদির সেনাও ময়দানে অবস্থান নিয়েছিল।

    আমি আমার রণনীতিতে গাড়ির সারিকে সামনে রাখা, তার পিছনে কামান সাজিয়ে রাখার নীতি ওই ময়দানেও অবলম্বন করলাম। আমি হুমায়ূনকে দু-তিন মাইল সামনে পাঠালাম, যাতে সে শত্রু-বাহিনীর সঠিক অবস্থাটা বুঝে আসতে পারে।

    ইব্রাহীম লোদির সেনা ময়দানে জমা হয়ে ছিল। আগে বাড়ছিল না। যুদ্ধনীতি কী ছিল আমার বোধগম্য হচ্ছিল না।

  • একবিংশ অধ্যায় : পানিপথের ঐতিহাসিক যুদ্ধ

    একবিংশ অধ্যায় : পানিপথের ঐতিহাসিক যুদ্ধ

    একবিংশ অধ্যায় : পানিপথের ঐতিহাসিক যুদ্ধ

    দুশমনদের পক্ষ থেকে হামলা হতে না দেখে ২০ এপ্রিল রাতে আমার চার-পাঁচ হাজার সৈনিককে ইব্রাহীম লোদির আফগান শিবিরে আক্রমণের আদেশ দিলাম।

    আফগান সেনাও সচেতন ছিল তারা জবাবি কার্যক্রম চালাল। আমাদের সেনার কোনো প্রাপ্তি ছাড়াই ফিরে আসতে হলো।

    ২১ এপ্রিল ইব্রাহীম লোদিয় সৈন্য আগে বাড়ল। আমি বড় যোগ্যতার সঙ্গে আমার সেনাকে ব্যূহে খাড়া করে দিয়েছিলাম। হামলার জন্য আফগান সেনা এগিয়ে এল তো ওই অবসরে আমি দক্ষিণ এবং বাম দিক থেকে আমার সেনাদলকে ধাওয়া করার জন্য আদেশ দিলাম।

    শত্রুসেনার অগ্রসর হতে গাড়িগুলোই বাধা হয়ে দাঁড়াল। আমার এই ধাওয়া করার ওই নীতি ছিল ‘তুলুগামা’।10 তাতে ডাইনে-বামে সেনাকে ধাওয়া করা হয়, আর সামনে অবরোধ হয়। অবরোধের পিছনে আমার কামান বসানো ছিল। যেইমাত্র আফগান আক্রমণ শুরু হলো অমনি উস্তাদ আলী কুলি খাঁ কামানের মুখ খুলে দিলেন।

    আফগান সেনা কামানোর মার সইতে পারল না। তাদের পা উপড়ে গেল।

    এবার ভয়ংকর ময়দানি যুদ্ধ শুরু হলো। আমি ময়দানে নেমে পড়লাম। হুমায়ূন আমার দক্ষিণে ছিল, তার সাথে খাজা কলা, সুলতান মুহম্মদ, হিন্দু বেগ, প্রাচীরের মতো রক্ষাকবচ হয়ে শত্রুদের মুণ্ডুপাত করতে করতে এগিয়ে যাচ্ছিল।

    বাম দিকে মুহম্মদ মির্জা, মুহম্মদ খাজা, আদিল সুলতান শাহ, মীর হুসাইন, জুনাইদ, কুতলক কদম, জানী বেগ, মুহম্মদ ও শাহী হুসাইন ছিলেন।

    ডান দিকে মাঝের নেতৃত্বে তুমুর সুলতান, সুলেমান মির্জা, মুহম্মদ কুকুলদাস, শাহ মনসুর, ইউনুস আলী দরবেশ, মুহম্মদ সরওয়ান ও আবদুল্লাহ ছিলেন।

    মধ্য নেতৃত্বের বাম দিকে ছিলেন খলিফা খাজা মীর ইমরান আহমদী, তরদী বেগ, খলিফা মুহিব্বে ও মির্জা বেগ তরখান।

    আগে-আগে খুসরো কুকুলদাস ও মুহম্মদ আলী জংগ ও আবদুল আজীজ যিনি অশ্বারোহী বাহিনীর সেনাপতি ছিলেন, এগিয়ে চলেছিলেন।

    যুদ্ধের নির্ণায়ক ক্ষেত্রসমূহর ডান ব্যূহে মালিক কাসিম খুব দক্ষ নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন, বাম দিক থেকে কারাকাজী ও আবদুল মুহম্মদ, শেখ জামাল, শেখ আলী মেহেদির দল শত্রুবাহিনীর ওপর দুর্ধর্ষ আক্রমণ চালাল।

    যুদ্ধের এই ক্ষণটি যথেষ্ট নির্ণায়ক ছিল, তখন ডান দিক থেকে ইব্রাহীম লোদি নিজেই লড়তে-লড়তে নিজের যোদ্ধা সৈনিকদের সঙ্গে আমাদের সেনার সামনে এসে গেলেন।

    তিনি অত্যন্ত ক্ষিপ্ততার সঙ্গে আমাদের দলের উপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন। তিনি আমাদের রক্ষা ব্যূহের যুদ্ধকলা সম্পর্কে কোনো ধারণা নিতে পারেননি। তিনি যুবা ছিলেন, অনভিজ্ঞ ছিলেন, আমাদের সামরিক ক্ষমতা সম্পর্কে সামান্যতম ধারণাও তিনি নিতে পারেননি। তিনি জানতেন না যে, ময়দানি যুদ্ধে কতক্ষণ বিরতি দেওয়া উচিত। কতক্ষণ পর এদিক-ওদিক হয়ে যাওয়া উচিত।

    আমি আমার সেনাকে যুদ্ধনীতি দিয়ে রেখেছিলাম-হই-হল্লা করে দুশমনদের প্রতি একদম ঝাঁপিয়ে পড়ো এবং ছড়িয়ে পড়ো, পিছনে তীরন্দাজদের তীরন্দাজির সুযোগ দাও যে, এবার তোমরা জোশ দেখাও।

    আমাদের তীরন্দাজ বাহিনী এমনভাবে তীর নিক্ষেপ করছিল যেন সত্যি-সত্যিই তীরের বর্ষণ হচ্ছে।

    মেহেদি খাজা দুশমনদের হস্তীবাহিনীর সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। হস্তীবাহিনীর গতি তীর বর্ষণের দ্বারা রোখা হচ্ছিল। এর জন্য কুজ বেগ ও তরদী বেগের নেতৃত্বে তীরন্দাজদের দলকে কাজে লাগানো হয়েছিল।

    এই অবসরে উস্তাদ কুলী তোপচির বড় ভূমিকা ছিল। তিনি অগ্রসরমান শত্রুবাহিনীর উপর গোলার-পর-গোলা দাগছিলেন। কামানোর গোলার আঘাতে দিশেহারা হস্তীসেনা কিছুই করতে পারছিল না।

    তোপচি সেনায় মুস্তাফা তোগচি মধ্যবর্তী নেতৃত্বের বাম দিককার নেতৃত্ব সামনে রেখেছিলেন।

    আমাদের ডান-বাম দিককার সেনা দল শত্রুবাহিনীকে সম্পূর্ণরূপে চেপে রেখেছিল। তাদের তীর বর্ষণের গতি ছিল বেহদ উৎসাহব্যঞ্জক। দুশমনদের সৈনিকরা ঘোড়া থেকে, হাতি থেকে পড়ে ভূপাতিত হচ্ছিল।

    দুশমনদের হস্তীবাহিনী তোপের মারে ভীতত্রস্ত হয়ে পিছু হটে নিজেদেরই সৈনিকদের পদদলিত করতে লাগল। তখন শত্রুবাহিনীতে দৌড়াদৌড়ি শুরু হয়ে গেল। যাতে বহু সৈনিক পদদলিত হয়ে মারা গেল।

    এমন হতেই শত্রুবাহিনীর অবশিষ্ট সেনা কিছুক্ষণ পরে পলায়নপর হয়ে উঠেছিল। যার সুযোগ নিয়ে আমাদের সেনার বীরযোদ্ধারা বাজের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে, শত্রুদের দেহ থেকে মাথা ফেলে দিতে লাগল।

    দুপুরের সূর্য মধ্যাকাশে পৌঁছে গিয়েছিল। তখনও যুদ্ধ জারি ছিল।

    তীর, তলোয়ার ও কামানের গোলার আঘাতে ইব্রাহীমের রক্ষাব্যূহ সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস হয়ে গেল। খোদ ইব্রাহীম লোদিও অশ্বপৃষ্ঠ থেকে ভূপাতিত হয়ে বীরগতি লাভ করলেন।

    সুলতানের মৃত্যুর খবরে হাহাকার পড়ে গেল। শত্রুবাহিনীর পায়ের তলায় মাটি সরে গেল।

    আল্লাহতায়ালার প্রতি লক্ষ-কোটি শুকরিয়া যে, তাঁর রহমত আমার উপরে ছিল। এক কঠিন যুদ্ধের বিজয় সহজে আমার পক্ষে এসে গিয়েছিল।

    আধা দিনেই যুদ্ধের জয়-পরাজয় নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিল।

    আমি ওই জায়গায় পৌঁছালাম যেখানে তুমুল যুদ্ধ হয়েছিল। রণভূমির ওই অংশে পাঁচ-ছ’হাজার সৈনিক মরে পড়ে ছিল, যারা ইব্রাহীমের সৈনিক ছিল। আমি রণভূমির অন্যান্য অংশ পরিদর্শন করলাম তো পনেরো-ষোলো হাজার সৈনিকের লাশ দেখলাম।

    তবে, পরে আমি যখন আগ্রায় গেলাম তখন আমি জানতে পারলাম যে, হিঁদুস্তানি বাহিনীর চল্লিশ-পঞ্চাশ হাজারের মতো সৈনিক ওই রণক্ষেত্রে নিহত হয়েছিল।

    দিল্লি ও আগ্রা অধিকারের কার্য

    ওই দিন (২১ এপ্রিল ১৫২৬) আমি অশ্বারোহী সেনাসহ হুমায়ূনকে আগ্রা অধিকারের জন্য পাঠিয়ে দিলাম। তার সঙ্গে খাজা কলা, মুহম্মদী, শাহ মনসুর, ইউনুস আলী, আবদুল্লাহ খাজাজ্ঞি ওলির সেনাদলকে রওনা করালাম।

    মুহম্মদ খাজা, মুহম্মদ মির্জা, আদিল সুলতান, জুনাইদ বখশ ও কুতলক কদমকে সাজ-সরঞ্জামসহ  দিল্লি অধিকারের জন্য ওই সময়ে পাঠিয়ে দিলাম। আমি তাদের এ বিষয়ে হেদায়েত দিলাম যাওয়ামাত্রই যেন  দিল্লির রাজকোষ সাথে সাথে অধিকার করে নেওয়া হয়।

    ২১ এপ্রিল আমাদের সেনা রওনা হয়ে গেল।

    ২৪ এপ্রিল, মঙ্গলবার শায়খ নিজামউদ্দীন আউলিয়ার মকবরায় আমি হাজিরা দিলাম।

    ওই রাতে দিল্লির জন্য রওনা হয়ে আমরা পরের দিন দিল্লি কেল্লায় রাত কাটালাম।

    ২৫ এপ্রিল আমি খাজা কুতুবউদ্দীনের মকবরায় গেলাম। ওই স্থানটি এক সময় গিয়াসউদ্দীন বলবন ও আলাউদ্দীন খিলজির বাসস্থান ছিল।

    আমি সেখানকার আশপাশের সকল দ্রষ্টব্য স্থান ভ্রমণ করলাম।

    ২৬ এপ্রিল আমি তুঘলকাবাদ পৌঁছে ওই স্থান ভ্রমণ করলাম।

    বাবুরের জন্য দিল্লিতে খুৎবা

    ২৭ এপ্রিল মওলানা মাহমুদ ও শায়খ জেন কিছু বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে নিয়ে দিল্লি এলেন। আমার সালামতির জন্য দোয়া করলেন। আমার নামে খুৎবা পড়লেন। আমি দিল্লির রাজকোষের বড় একটি অংশ গরিব ও দীনদুঃখীদের মধ্যে বণ্টন করে দিলাম।

    ২৮ এপ্রিল, শনিবার কিছু সেনা নিয়ে আগ্রার উদ্দেশে রওনা হয়ে গেলাম।

    আমার আগে হুমায়ূন আগ্রা পৌঁছে সেখানকার শাসন-ক্ষমতা নিজের হাতে তুলে নিয়েছিলেন।

    বহুমূল্য হীরে লাভ

    সুলতান ইব্রাহীম লোদির সঙ্গে যুদ্ধে গোয়ালিয়রের রাজা বিক্রমজিৎও যুদ্ধে পরাজিত ও নিহত হয়েছিলেন। বিক্রমজিতের স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততিরা ওই সময়ে আগ্রাতেই ছিলেন, যখন ইব্রাহীম লোদি পরাজিত ও নিহত হয়েছিলেন। হুমায়ূন যখন আগ্রায় পৌঁছান তার আগেই ইব্রাহীম লোদির পরাজয় ও মৃত্যু সংবাদ সেখানে পৌঁছে গিয়েছিল। বিক্রমজিতের পরিবার সেখান থেকে পলায়ন করার চেষ্টায় ছিল কিন্তু হুমায়ূনের সেনা তাদের পথেই আটক করে।

    তাদের ফিরিয়ে আগ্রায় আনা হয়। আগ্রায় বিক্রমজিতের পরিবার-পরিজনদের কাছ থেকে বহুমূল্য হীরে জহরত জব্দ করা হয়। সেগুলোর মধ্যে এমনই একটি হীরাও ছিল যার মূল্য দিয়ে পুরো দুনিয়াবাসীর আড়াই দিনের আহার মিলতে পারত। (এটি ছিল জগদ্বিখ্যাত কোহিনূর হীরে)।

    আমার আগ্রায় পৌঁছাতেই হুমায়ূন সেই বহুমূল্য হীরে আমার কাছে পেশ করে। আমি সেই হীরে হুমায়ূনকে উপহার দিই।

    ইব্রাহীম লোদির মাতা ও নিকটস্থদের প্রতি বাবুরের দয়ালুতা

    আগ্রা কেল্লায় পৌঁছানোর পর সেখানে যাদের পাওয়া যায় তাদের অন্যতম ছিলেন ইব্রাহীম লোদিয় মা। অন্যদের মধ্যে মালিকদাদ করঘানী, সিদুক ও ফিরোজ খাঁ মেওয়ারতী ছিলেন।

    আমি ইব্রাহীম লোদির মাতার নামে সাত লক্ষ টাকা মূল্যের একটি পরগনা দিয়ে দিলাম। অন্য কিছু লোককেও আমি এই ধরনের পরগনা দিয়ে, কেল্লার বাইরে তাদের চাকর-বাকদের সাথে, আগ্রা থেকে দু’মাইল দূরে অবস্থিত এক স্থানে বসবাসের জন্য পাঠিয়ে দিলাম।

    ১০ মে, ১৫২৬-এ আমি সম্পূর্ণরূপে আগ্রা ও দিল্লির সালতানাত আমার অধীনে নিয়ে নিয়েছিলাম।

    আমি কিছু সময় লাগালাম আমার সেনা ব্যবস্থাকে সুচারু করার কাজে। তারপর আধাআধি সেনা দিল্লি ও আগ্রায় রেখে দিল্লির তখত-এর শাসনভার নিয়ে নিলাম।

    ইব্রাহীম লোদির পরাজয় ও তাঁর দিল্লি শাসনের অবসানের পর থেকে হিন্দুস্তানের শাসন নিষ্কণ্টক ছিল না। ভারতে রাজপুত রাজাদের গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান ছিল।

    ইতোমধ্যে বিয়ানার শাসকের উপর রাজপুত রাজা রানা সাংগা আক্রমণের পরিকল্পনা নিল।

    বিয়ানার শাসক ছিলেন নিয়াজ খাঁ। তিনি রানা সাংগার সুগঠিত সেনার সামনে নিজেকে অসমর্থ দেখে সাহায্যের জন্য আমার কাছে এলেন।

    আমি তাঁকে সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দিয়ে আমার সেনাকে তাঁর সঙ্গে পাঠিয়ে দিলাম। রানা সাংগা যখন দেখেন নিয়াজ খাঁ আমার সাহায্য পেয়ে গেছেন তখন বিয়ানায় নিয়াজ খাঁর শাসন সুরক্ষিত থাকতে দিল।

    তবে, আমার সেনা যখন ফিরে এল তখন রানা সাংগা বিয়ানায় পুনরাক্রমণ চালিয়ে তা নিজের অধিকারে নিয়ে নিল।

    যে মোগল সৈনিকেরা রাজপুতদের মোকাবিলায় রণক্ষেত্রে নেমেছিল তারা রাজপুতদের বীরত্বের বড়ই প্রশংসা করল।

    ইতোমধ্যে হাসান খাঁ মেওয়াতি, রাজা সাংগার সাথে গিয়ে মিলিত হলো। প্রকৃতপক্ষে, পানিপথের যুদ্ধে হাসান খাঁ মেওয়াতির পুত্র, ইব্রাহীম লোদির পক্ষে নেমেছিল। যুদ্ধে পরাজয়ের পর আমি তাকে বন্দী করেছিলাম।

    হাসান খাঁ মেওয়াতির কাছে তখনও মেওয়াত ক্ষেত্রের একটি বড় শক্তি ছিল। আমি মেওয়াতিকে রানা সাংগা থেকে বিচ্ছিন্ন করার জন্য, তার পুত্রকে মুক্তি দিয়ে দিই। তবে, এর পরেও মেওয়াতির উপর কোনো প্রভাব পড়ল না।

    রানা সাংগার সেনা আমার সঙ্গে যুদ্ধে নামার জন্য বড়ই উদগ্রীব ছিল। রানা সাংগা হাসান মেওয়াতির সঙ্গে সসৈন্য আমার দিকে রওনা দিল।

    আমিও সেনাকে ময়দানে নামার আদেশ দিলাম। তবে, ওই সময়ে আমার সৈনিকেরা লাগাতার যুদ্ধে লিপ্ত থাকার ফলে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। তার উপর, কাবুল থেকে আসা এক তথাকথিত জ্যোতিষী ভবিষ্যদ্বাণী করল, যার মধ্যে আমার পরাজয় এবং সেনাবাহিনীর নাশ হওয়ার অর্থ লুকিয়ে ছিল।

    আমি আমার সৈনিকদের উৎসাহ বাড়ানোর জন্য মদ্যপানের বহুমূল্য পাত্রগুলোকে আনিয়ে নিয়ে তাদের সামনে ভেঙে ফেলার আদেশ দিলাম, ভবিষ্যতে মদ্যপান না করার শপথ নিলাম। ওই মদ্যপাত্রগুলোকে দীনদুঃখীদের মধ্যে বিতরণ করিয়ে দিলাম।

    আমি আমার সৈনিকদের এক মর্মস্পর্শী ভাষণ দিতে গিয়ে বললাম—

    ‘আমির এবং সৈনিকগণ! যে ব্যক্তি এই সংসারে আসে তার অন্ত অবশ্যই হয়। আমাদের সবারই মৃত্যু হবে এবং শুধু একমাত্র আল্লাহই থাকবেন। যারা জীবনের আনন্দ গ্রহণ করে তাদের মুত্যুভয় থাকা উচিত নয়।

    এই সংসারে যে আসে তাকে এই দুঃখরূপী সংসার ছেড়ে একদিন-না-একদিন অবশ্যই যেতে হয়।

    যখন এ সংসার থেকে প্রত্যেক ব্যক্তিকেই যেতে হবে তখন তার চিন্তা করা উচিত যে, গৌরবের সাথেই মৃত্যুকে আলিঙ্গন করা, অপমানের সাথে জীবিত থাকার চেয়ে অনেক বেশি শ্রেয়।

    আমার হার্দিক ইচ্ছা যে, আমার মৃত্যু সম্মানের সাথে হোক। আমার গৌরব লাভ হোক… আল্লাহর শোকর যে, এই যুদ্ধে যদি আমরা মৃত্যু লাভ করি তাহলে আমরা শহিদ হব আর যদি বেঁচে থাকি তাহলে গাজী হব। গাজী হয়েই আমরা জগৎ-সংসারের সমস্ত বস্তুকেই সুখ-শান্তির সঙ্গে উপভোগ করব।

    আসুন, আমরা সবাই কুরআন শরিফের শপথ নিয়ে প্রতিজ্ঞা করি যে, আমরা সবাই ওই সময় পর্যন্ত যুদ্ধ করব, যতক্ষণ পর্যন্ত আমাদের শরীরে প্রাণ আছে।’

    আমার এই ভাষণ সৈনিকদের উপর গভীর প্রভাব বিস্তার করল। তারা যুদ্ধক্ষেত্রে নামার জন্য প্রস্তুত হয়ে গেল।

    ওদিকে রানা সংগা পুরো প্রস্তুতি নিয়ে এসেছিল। সে তার সঙ্গে হিঁদুস্তানি শব্দ জুড়ে দিয়ে হিঁদুস্তানের কিছু মুসলিম আমির সরদার ও শাসককে জুড়ে দিয়েছিল।

    খানুয়ার যুদ্ধ

    ১৫ আগস্ট ১৫২৭ খানুয়ার প্রান্তরে আমার ও রানা সাংগার সেনা মুখোমুখি হলো। আমি পানিপথের যুদ্ধের মতোই খানুয়াতেও যুদ্ধ ব্যূহ রচনা করলাম।

    রাজপুতরা বেশ বীরত্বের সঙ্গে যুদ্ধ করল। একবার তো আমার সেনার পিছু হটার মতো অবস্থা হয়েছিল। তবে সেনার পিছন থেকে নতুন দল এসে পিছ হটা সৈন্যদের সাহস বাড়িয়ে দিল। এখানেও আমি তুলুগামা নীতি গ্রহণ করলাম এবং কামানের প্রয়োগ উৎসাহবর্ধক ভূমিকা পালন করল। কামানের মুখ খোলায় পর রাজপুত বাহিনী আর ময়দানে দাঁড়াতে পারল না।

    যুদ্ধে রানা সাংগা পরাজিত হলো। তবে, রাজ পুতানা এত বিশাল রাজ্য ছিল যে, তার উপর পূর্ণ অধিকার লাভ করা যথেষ্ট কঠিন কাজ ছিল।

    ১৫৩০ সালে আমি রাজপুতদের অধীনস্ত ভূ-ভাগে অবস্থিত চান্দেরি নামক দুর্গ অধিকারে সাফল্য পাই।

  • দ্বাবিংশ অধ্যায় : ঘাঘরার যুদ্ধ

    দ্বাবিংশ অধ্যায় : ঘাঘরার যুদ্ধ

    দ্বাবিংশ অধ্যায় : ঘাঘরার যুদ্ধ

    ২ ফেব্রুয়ারি, ১৫২৯ ঈসায়ী সনে আমাকে ঘাঘরার রণক্ষেত্রে আমার মোগল সেনাকে আফগানদের বিরুদ্ধে নামতে হলো।

    পানিপথের যুদ্ধে প্রকৃতপক্ষে আমি আফগানদের দিল্লি পাঞ্জাব ও আশপাশের প্রদেশগুলো থেকে দূর করে দিই, তবে তারা পূর্ব প্রান্তের প্রদেশগুলোতে অন্তিম প্রয়াস রূপে সংগঠিত হতে শুরু করেছিল।11

    মাহমুদ লোদি আফগানদের সংগঠিত করে বিহারকে তার নিজের অধিকারে নিয়ে এসেছিলেন। তারপর, তারা সংগঠিত সেনা নিয়ে দোয়াবের দিকে এগুতে শুরু করেছিল।

    দোয়াবের দিকে আফগান সেনাদের অগ্রসর হতে দেখে আমার সৈনিকদের মধ্যে হইচই শুরু হয়ে গেল। তখন আমি ঘাঘরার প্রান্তরে গিয়ে অবস্থান নিলাম।

    এই যুদ্ধে আফগানদের সহজে হারিয়ে দেওয়া হলো এবং তাদের বিহারের দিকে পালিয়ে যেতে বাধ্য করা হলো।

    আমি ওই স্থানে, যুদ্ধের জয়লাভের পর বেশি সময় পর্যন্ত থাকতে পারলাম না, কারণ বর্ষা ঋতু এসে যাওয়াতে ওই এলাকায় সেনার পক্ষে শিবির ফেলে অবস্থান করা অসম্ভব কাজ ছিল।

    কিছুদিন বাদেই আফগানরা পুনরায় একত্রিত হয়ে চুনার কেল্লা অবরোধ করল তো আমাকে একটি বড় সেনাদল নিয়ে ওই দিকে প্রস্থান করতে হলো।

    মোগল সেনার আগমন বার্তা পেয়েই আফগান সরদাররা পলায়নপর হলো। কিন্তু এ কথা জানার পর যে তারা বারবার পেরেশন করতে পারে, আমি তাদের সম্পূর্ণরূপে দমন করার সিদ্ধান্ত নিলাম। আমি তাদের পিছু ধাওয়া করে বাংলার দিকে অগ্রসর হলাম।

    ৬ মে, ১৫২৯ ঈসায়ীতে বাংলার শাসক নুসরত খাঁ এ বিষয়ে স্বাক্ষর করলেন যে, তিনি বিদ্রোহীদের আশ্রয় দেবেন না, বিদ্রোহী বলতে এখানে আফগানদের বোঝানো হয়েছে।

    এই সন্ধি তথা নুসরত শাহের পরাজয়ের পর আফগানদের সাহস চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গিয়েছিল।

  • ত্রয়োবিংশ অধ্যায় : বাবুরের ইন্তেকাল

    ত্রয়োবিংশ অধ্যায় : বাবুরের ইন্তেকাল

    ত্রয়োবিংশ অধ্যায় : বাবুরের ইন্তেকাল

    ১৫৩০ ঈসায়ী সনের ২৪ ডিসেম্বর আগ্রা কেল্লায় বাবুর ইন্তেকাল করলেন।

    এই বীরসেনানী, যোদ্ধা, বিদ্বান ও মোগল সামাজ্যেরে প্রতিষ্ঠাতার ইন্তেকালের বিষয়ে ঐতিহাসিকেরা এক আকর্ষণীয় বিবরণও দিয়েছেন। তবে এই বিবরণ থেকে পৃথকভাবে এ কথাও বলা হয় যে, ১৫৩০ খ্রিষ্টাব্দের গ্রীষ্মকালে হুমায়ূন বাদাখশান থেকে আগ্রায় এসেছিলেন। বাবুর তাঁর উপর বাদাখশানের শাসনভার অর্পণ করেছিলেন।

    হুমায়ূনের বাদাখশান থেকে আগ্রা আসার মূল কারণ ছিল লাগাতার যুদ্ধে রত থাকার কারণে বাবুরের স্বাস্থ্য প্রায় এক বছর ধরে খারাপ চলছিল। তিনি কোনো যুদ্ধে না নেমে স্বাস্থ্যোদ্ধার করছিলেন। এমতাবস্থায় বাবুরের অন্তিম সময় ঘনিয়ে আসতে দেখে, বাবুরের কিছু দরবারি গুপ্ত পরামর্শ করে বাবুরের পর তাঁর পুত্র হুমায়ূনের স্থলে বাবুরের ভগ্নিপতি মুহম্মদ মেহেদি খাজাকে রাজ-সিংহাসনে আসীন করার জন্য চিন্তাভাবনা শুরু করে দিয়েছিলেন।

    হুমায়ূন যেইমাত্র এই খবর পেলেন, অমনি তিনি বাদাখশান থেকে আগ্রা চলে এলেন। ষড়যন্ত্রকারীদের সমস্ত প্রচেষ্টা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হলো। বাদাখশান থেকে ফেরার পর অন্তিম সময় পর্যন্ত হুমায়ূন পিতার কাছেই থাকেন। বাবুর তাঁর উপস্থিতিতে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করলেন। মৃত্যুকে আলিঙ্গন করার পূর্বে বাবুর হুমায়ূনকে সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকারী ঘোষণা করেন। বাবুর হুমায়ূনকে এ নসিহতও দেন যে, তিনি অন্য তিন ভাই কামরান, আসকারি ও হিন্দালের সঙ্গে যেন সর্বদাই ন্যায়াচার করেন।

    আকর্ষণীয় বিবরণটি হলো এরকম—

    ১৫৩০ ঈসায়ী সনের গ্রীষ্মকালে হুমায়ূন অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাঁর অসুস্থতা বেড়ে চলল। বাবুর বেহদ চিন্তিত হলেন। কেননা, পুত্রের উপর কোনো ওষুধই কাজ করছিল না। তখন এক বুজুর্গ বলেন, হুমায়ূন তখনই সুস্থ হতে পারেন, যখন বাবুর তাঁর সর্বাধিক প্রিয় বস্তুটি আল্লাহর রাহে কুরবান করতে পারবেন।

    বাবুর জানেন যে, পুত্রের জীবন রক্ষার জন্য তাঁর কাছে সবচেয়ে বহুমূল্য আর প্রিয় বস্তুটি হলো তাঁর জীবন। এ কথা ভেবেই বাবুর পুত্রের জীবন রক্ষার জন্য নিজের জীবন খোদার রাহে কুরবান করার জন্য সংকল্প করলেন। এই সংকল্পের কথা পুনরাবৃত্তি করে তিনি অসুস্থ হুমায়ূনের পালঙ্কের চারপাশে তিনবার প্রদক্ষিণ করলেন। আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করলেন, তাঁর জীবনের বিনিময়ে হুমায়ূনের জীবন দান করা হোক।

    বাবুরের এই প্রার্থনায় সাথে সাথেই হুমায়ূন সুস্থ হয়ে উঠতে লাগলেন। আর বাবুর রোগশয্যা নিলেন। তারপর, ওই রোগে তিনি মৃত্যুবরণ করলেন।

    উপসংহার

    সম্ভবত, বাবুরের মৃত্যু সম্বন্ধে দুটি কথাই সঠিক। তবে এ কথা তো মানতেই হবে যে, হুমায়ূনের আগে থেকেই বাবুরের অসুস্থতা চলছিল। তিনি এক বছর আগে থেকে তাঁর আত্মকথা ‘তুজুক-ই-বাবরী’ (বাবরনামা) লেখা বন্ধ করে দিয়েছিলেন। তিনি যুদ্ধের জন্য আর যুদ্ধক্ষেত্রে নামছিলেন না, যেখানে ভারতের বিশাল অংশ তার হাতে অবিজিত হয়ে পড়ে ছিল।

    বাবুরের ন্যায় যোদ্ধার অসুস্থতা ব্যতীত, যুদ্ধক্ষেত্রে না নামা, বিস্ময়কর বলেই অভিহিত করা যেতে পারে।

    তাঁর, হুমায়ূনের বদলে নিজের জীবন আল্লাহর রাহে দান করার বিষয়টি সঠিকভাবে জুড়ে যায়। যে কোনো পিতাই তাঁর পুত্রকে অনিরাময়যোগ্য রোগে আক্রান্ত, পালঙ্কে পড়ে থাকতে দেখে স্থির থাকতে পারেন না, তখন তিনি এই দোয়াই করতে পারেন যে, হে আল্লাহ আমার জীবনের বিনিময়ে আমার পুত্রের জীবন ফিরিয়ে দাও…।

    এই প্রসঙ্গটি আল্লাহর কাছে বাবুরের প্রার্থনা রূপেই দেখা উচিত। অলৌকিক কোনো ঘটনা রূপে দেখাটা বোধ হয় ঠিক হবে না।

    অবশেষে ১৫৩০ ঈসায়ী সনের ২৪ ডিসেম্বর তারিখে এই নশ্বর সংসারকে আল-বিদা জানিয়ে বাবুর জান্নাতবাসী হলেন। তার পূর্বেই তিনি তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র হুমায়ূনকে ভারত-সাম্রাজ্য অর্পণ করেন। বাবুর কর্তৃক ভারতে স্থাপিত সাম্রাজ্য মোগল সাম্রাজ্য নামে সুপ্রতিষ্ঠিত হয়ে গেল। বাবুরের পর হুমায়ূন, তাঁর পর আকবর, তাঁর পর জাহাঙ্গীর, তাঁর পর শাহজাহাঁ এবং শাহজাহার পর ঔরঙ্গজেব অবধি মোগল সাম্রাজ্যের বিস্তারের ধারা অব্যাহত থাকে।

    বাবুরের পর তাঁর পঞ্চম প্রজন্ম অবধি মোগল সাম্রাজ্যের গৌরবদীপ্ত ধারা অব্যাহত থাকে।

    ঔরঙ্গজেবের পর সাম্রাজ্যের বিকেন্দ্রীকরণ শুরু হয়ে যায় এবং অবশেষে সম্রাট দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ ‘জাফর’ পর্যন্ত এসে তা নিঃশেষ হয়ে যায়। শেষ মোগল, বাহাদুর শাহ ‘জাফর’ নামমাত্র বাদশাহ ছিলেন। মোগল সাম্রাজ্যের সেই জৌলুস ও মর্যাদা আর ছিল না। তিনি বাস্তবিক ইংরেজ সাম্রাজ্যবাদীদের কৃপাপাত্র রূপে অবসরকালীন বেতনভুক রূপে দিল্লির বাদশাহ মাত্র রয়ে গিয়েছিলেন।

    যদি, ১০ মে, ১৮৫৭ ঈসায়ী সনে সিপাহী বিদ্রোহের পতাকা উত্তর ভারতে উত্তোলিত না হতো এবং মিরাট ছাউনি থেকে বেরিয়ে আসা বিপ্লবীরা ১১ মে, ১৮৫৭ ঈসায়ীতে দিল্লি পৌঁছে বাহাদুর শাহকে নিজেদের নেতৃত্বে বরণ করে না নিতেন, তাহলে সম্ভবত মোগল বংশের এই শেষ প্রদীপটির নাম ইতিহাসের পৃষ্ঠায় বড়ই কঠিনতার সঙ্গে সন্ধান করলেই তবে পাওয়া যেত।

    ***