Author: তাহের আলমাহদী

  • বিশ

    বিশ

    ভাবে বাংলাদেশে কিছু সময় কেটে গেল। এভাবে বাংলাদেশে ২১শে ফেব্রুয়ারি চলে এল একদিন।

    সারারাত জেগেছিল বলে সফিকুর এখন হাই তুলছে। বড় খাটুনি গেছে। সারারাত সে এবং তার কলেজের বন্ধুরা মিলে শহরময় পোস্টার মেরেছে। ঘরে মেয়েরা পোস্টার লিখে দিচ্ছে আর ওরা দেয়ালে দেয়ালে সেঁটে দিয়ে এসেছে। কলেজের মেয়েদের উপর ছিল পোস্টার লেখার ভার। ওদের কাজ সেগুলি সকাল না হতে মেরে দিয়ে আসা। সকাল হলেই শহরের মানুষেরা দেখবে কারা যেন রাতারাতি এই শহরকে ২১শে ফেব্রুআরির জন্য নানা রঙের ফেস্টুনে সাজিয়ে দিয়ে গেছে। উৎসবের মতো এই শহর—প্রায় ঈদ মুবারক।

    সফিকুর এইমাত্র ঘরে ফিরেছে। ফিরেই হাতমুখ ধুয়েছে। অন্য দিনের মতো সে সাইকেলটা বারান্দায় তুলে রাখেনি। কারণ সে আবার সাইকেলে দেখতে বের হবে রাতে, রাতে ওরা কতদূর পর্যন্ত পোস্টার মেরে আসতে পেরেছে। সুতরাং সাইকেলটা বাইরে রেখে নিত্যদিনের মতো একটু টেবিলে গিয়ে বসা।

    সকালে সে দুটো একটা কবিতা আবৃত্তি করতে ভালোবাসে। অথবা আজ যেন সারাটা দিন শুধু কবিতা আবৃত্তি আর গান। মাঠের ভাষা, বাংলা ভাষা। মানুষের ভাষা, বাংলা ভাষা। এমন দিনে সে কবিতা পড়বে না তো কবে পড়বে। রবীন্দ্রনাথ অথবা নজরুল থেকে সে কবিতা পড়তে ভালোবাসে। ফতিমা এলে সে জীবনানন্দ আওড়ায়। ফতিমা কাছে থাকলে তার অন্য কবিতা আর ভালো লাগে না-সে তখন ফতিমার কালো চোখের দিকে তাকিয়ে হাসে, তারপর ধীরে ধীরে কেমন এক অসীমে ডুবে যাবার মতো সে ফতিমার কাছে ঘন হয়, যেন চুলের ঘ্রাণ নিতে নিতে তার মুগ্ধ স্বভাবের ভিতরে ডুবে যাবে এবার, বলবে, কখন মরণ আসে কে বা জানে—কালীদহে কখন যে ঝড় ফসলের নাল ভাঙে—ছিঁড়ে ফেলে গাংচিল শালিখের প্রাণ জানি নাকো,–তবু যেন মরি এই মাঠঘাটের ভিতর…। এই দেশ, বাংলাদেশ, এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি–ফতিমার ছোট ছোট কালো বেথুন ফলের মতো চোখ দেখতে দেখতে সফিকুরের এমন মনে হলে বলে, আমি যাব তোমার দেশে। সোনালী বালির চরে সূর্য ওঠা দেখব। তরমুজের জমিতে ঈশমনানার ছই দেখব। আর দেখব সেই অর্জুন গাছ। গাছে গাছে এখন কত না ডালপালা। তুমি আমি তার নিচে দাঁড়িয়ে আমাদের বাংলাদেশ দেখব। ফতিমা এসব শুনলে কেমন চুপ হয়ে যায়। চোখমুখ বড় ভারি, গম্ভীর এবং কথা বলতে চায় না। তখন সফিকুর অকারণ হাসে। ফতিমাকে রাগিয়ে দিতে না পারলে সে মজা পায় না। ফতিমা কথা না বললে সে জানে একটু খোঁচা দিলেই সে কথা বলবে। রাগাবার জন্য তখন সে বলবে, ওডা আবার একটা দ্যাশ নাহি! সফিকুর ফতিমার মতো বাঙাল টান রাখবে গলায়। তখন ফতিমা আরও ক্ষেপে যায়। রাগে অভিমানে মুখ ভার করে থাকে। চায়ের কাপ হাতে থাকলে সেটা ফেলে ভিতরে চলে যায়। মাঝে মাঝে সফিকুর ওর কথা নিয়ে বড় বেশি ব্যঙ্গ করে। সে আর রাগ চাপতে পারে না। আর রাগের কথা বললে ওর মুখে তখন আরও বেশি বাঙাল কথা বের হয়ে আসে। সফিকুরের সঙ্গে ফতিমা কিছুতেই বাঙাল কথা বলতে চায় না। যতটা সে পারে ধীরে ধীরে বইয়ের ভাষায় কথা বলার চেষ্টা করে। কঠিন কাঠ কাঠ গলা না করে খুব সুন্দর এক জলতরঙ্গ আওয়াজের মতো গলা করার চেষ্টা করে। এবং তখনই যত দুষ্টুবুদ্ধি সফিকুরের। ওর ইচ্ছা কেবল ফতিমা ওর সঙ্গে বাঙাল কথা বলুক। এমন সুন্দর করে সে যে কী করে কথা বলে; প্রাণের ভিতর কেমন মায়া জাগানো ওর গলার স্বর। ফতিমাকে বাঙাল কথার ভিতর যতটা চেনা যায়, ওর মতো কথা বললে তেমন চেনা যায় না।

    আঞ্জুর সঙ্গে সাধারণত সফিকুর ফতিমাদের বাড়ি যায়। ফতিমাকে যে সফিক ভাই অকারণ রাগিয়ে দিতে ভালোবাসে বার বার বলেও সে তা ফতিমাকে বোঝাতে পারে না। তখন তার সোজাসুজি বাংলা কথা—আর কইয়েন না। ঠিক নিয়া যামু একবার আমাগ নদীর চরে। দ্যাখবেন দ্যাশ কারে কয় একখানা আপনেগ দ্যাশ আবার দ্যাশ নাহি? দুধ-মাছ পাওয়া যায় না। মানুষগুলাইন গঙ্গার পানি খাইয়া থাকে। ইলিশ মাছ মিলে না গণ্ডায় গণ্ডায়। আছে কিডা তবে?

    —কেন আমাদের রবীন্দ্রনাথ আছে। বিদ্যাসাগর নজরুল আছে।

    —ছাড়ান দ্যান। আমাগ নাই কিছু বুঝি মনে করেন? চিত্তরঞ্জন দাশ, হকসাহেব, জীবনানন্দ অগ বাড়ি কলকাতায় আছিল, না!

    —আমি বলেছি ওদের বাড়ি কলকাতায় ছিল?

    —তবে মুর্শিদাবাদে।

    সফিকুর মুর্শিদাবাদের ছেলে। কথায় কথায় ফতিমা রেগে গেলে বলবে, মীরজাফরের দেশের মানুষ ভালো হবে কী করে? বিশ্বাসঘাতক। এ দেশের নুন খাবে এ দেশটাকে বলবে—এডা আবার দ্যাশ নাহি। কোনটা দেশ। এমন পলাশফুল শীতে কোথাও ফোটে? এমন শিমুলের বন আপনি নদীর পাড়ে পাড়ে আর কোথাও দেখেছেন? কী বলুন। চুপ করে কেন? তারপর চুপচাপ যেন বলার ইচ্ছা, বাংলাদেশের মানুষ আমার সোনাবাবুকে পৃথিবীর আর কোথাও গেলে পাবেন? কিন্তু কিছু বলতে পারে না। সোনাবাবুর কথা মনে হলেই গলার স্বর ভারি হয়ে আসে।

    কত অকারণ এই ঝগড়া। অথচ এমন না হলে ভালো লাগে না সফিকুরের। এমন না হলে ফতিমাকে সে ঠিক চিনতে পারে না। অভিমানে তখন ফতিমা আর তার বাড়ি আসে না। সেও যায় না। কিন্তু কতদিন। ফতিমা নিজেই পারে না। আঞ্জুর সঙ্গে চলে আসে। যেন সে সফিকুরের কাছে আসেনি। সফিকুরের সঙ্গে কোনও দরকার নেই। যত দরকার তার মায়ের সঙ্গে। যত গল্প তার মায়ের সঙ্গে। যাবার সময় দেখাও করে যেত না বোধ হয়। কেবল আঞ্জু টেনে নিয়ে আসে বলে দেখা না করে পারে না। সফিকুর তখন এই অকপট মেয়ের কাছে ধরা দিতে ভালোবাসে। সে আর তাকে অবহেলা করে না।

    রাস্তা পার হলেই ফতিমাদের সুন্দর কাঠের রেলিং দেওয়া বাড়ি। নানারকম ফুলের গাছ মাঠে! একটা দেবদারু গাছ আছে। তার নিচে ছোট্ট কাঠের চেয়ার। ঘাস মসৃণ। সামসুদ্দিনসাহেব শীতের দিনে সেখানে বসে রোদ পোহান। ফতিমা যখন বাবাকে চা দিয়ে আসে সফিকুর তার দোতলা ঘর থেকে দেখতে পায়। সুন্দর একটা নীল রঙের শাড়ি পরতে ফতিমা ভালোবাসে। যখন সদর পার হয়ে টুক করে ওদের বাড়িতে ঢুকে যায়, কী অকারণ তখন ফতিমার ভয়। সবাই দেখে ফেলল এই ভয়। সে বার বার আঁচলে মুখ মুছতে থাকে। কেন যে মুখে ঘাম, সফিকের কাছে যেতে গেলেই ঘাম আঁচলে বার বার মুছেও মুখের প্রসাধন সে ঠিক রাখতে পারে না। ফতিমা সফিকের কাছে এলে সেজন্য প্রসাধন করে আসে না। কারণ, সে জানে সফিকের কাছে এসে সে তার প্রসাধন ঠিক রাখতে পারবে না। ফতিমা আসলে কপাল না মুছে পারে না। ভিতর ভিতর এভাবে সফিকের জন্য কী একটা মায়া গড়ে উঠেছে। সফিকও সেটা বুঝতে পারে। কিন্তু মুখ ফুটে কিছু বলতে সাহস পায় না। সামসুদ্দিনসাহেব ওর জন্য খুব করেছেন। এই শহরে সে রিফুজি। সামসদ্দিনসাহেবের আপ্রাণ চেষ্টা না থাকলে সে তার সংসার চালিয়ে পড়াশোনা চালাতে পারতো না। আর এই এক মেয়ে যে তাকে আরও সব নতুন উদ্যমের কথা শোনাচ্ছে। সে মাঝে মাঝে একা একা শীতের রাতে টের পায় কোথাও এই মেয়ের প্রাণে বড় একটা ক্ষত আছে। ফতিমা কেন যে মাঝে মাঝে বড় বিষণ্ণ হয়ে যায়। তখনই দেয়ালের বিচিত্র পোস্টার, সেই পোস্টারে বুঝি নতুন সংগ্রামের কথা লেখা হচ্ছে। সফিক ফতিমার সঙ্গে সেই সংগ্রামের শরিক হতে চায়। ওরা রাত জেগে তখন পোস্টার লেখে।

    সফিকুর বই সামনে রেখে কিছুক্ষণ বসে থাকল। ওর মা কখন চা রেখে গেছে সে টের পায়নি। সে জানালায় শীতের সূর্য উঠতে দেখছে। সূর্যের আলোতে শত শত পোস্টার দেয়ালে সকাল হবার সঙ্গে সঙ্গে ফুটে উঠেছে। বার বার সেইসব পোস্টারের লেখাগুলি ওর চোখের উপর ভেসে যাচ্ছে। পোস্টারে ফতিমা, আঞ্জু আরও সব মেয়েরা সারারাত লিখে গেছে, বড় বড় অক্ষরে লিখে গেছে—মোদের গরব মোদের আশা আ মরি বাংলাভাষা। কোনও পোস্টারে ফতিমা ওর সুন্দর হস্তাক্ষরে লিখেছে— একুশে ফেব্রুআরি পালন করুন। আঞ্জু লিখেছে—নাজিম-নুরুল চুক্তি রোখো, নইলে সুখের গদি ছাড়!

    দেয়ালে দেয়ালে এমন সব বিচিত্র পোস্টার। সে জানালা খুলে, সারারাত যেসব পোস্টার মেরে এসেছে, যা সে দাঁড়িয়ে দেখার সময় পায়নি, এখন এই সকালে তার কিছু কিছু দেখে তার বুক কেমন ভরে উঠেছে। তার হেঁটে যেতে ইচ্ছা হচ্ছে। যেন হেঁটে গেলে অজস্র পোস্টারের ভিতর কোনটা ফতিমার হাতের লেখা সে চিনতে পারবে। এমন নিবিষ্ট হয়ে কে আর রাতের পর রাত পোস্টার লিখে গেছে! সে তার পোস্টারে বার বার বাংলাদেশ কথাটা নিচে লিখে দিতে চেয়েছে। কখনও বোঝা যায় রাগে অথবা বড় অভিমানে সে একটা গাধার লম্বা মুখ এঁকে দিয়ে নাজিম নুরুলের ছবি আঁকতে চেয়েছে। এতটুকু ক্লান্তি ছিল না। কে যে তাকে এমনভাবে প্রেরণা দিচ্ছে সফিক বুঝতে পারছে না। একটানা ফতিমা উপুড় হয়ে কাজ করে গেছে। আজ ভোর রাতে শুধু সে একবার গিয়ে দেখেছে যারা লিখছে তাদের ভিতর ফতিমা নেই। ফতিমাদের নিচের বারান্দায় কাঠের রেলিঙের ধারে মোমের আলোতে সবাই লিখে চলেছে। শেষ রাতের দিকে শহরের আলো নিভে গিয়েছিল—ওরা অন্ধকারে চুপচাপ বসে থাকেনি, মোমের বাতি জ্বালিয়ে নিয়েছে। তুলির এক-এক টানে ওরা এক-একটা পোস্টার শেষ করেছে।

    সফিকুর ফতিমাকে না দেখে কেমন অবাক হয়ে গেছিল। সে নেই, এটা সে ভাবতে পারছে না। সে গিয়ে শুয়ে আছে, আর সবাই লিখছে এটা ভালো দেখাচ্ছে না। সে ভিতরে ভিতরে রুষ্ট হয়ে উঠেছে। পোস্টারগুলি একসঙ্গে করে বড় প্যাকেট করল একটা। কেরিয়ারে বেঁধে নেবার সময় ভাবল আঞ্জু অথবা রমাকে বলবে, ফতিমা কোথায়? কিন্তু যে মেয়ে ওকে না বলে ভিতরে শুতে চলে যায় তার সম্পর্কে খোঁজখবর করতে ইচ্ছা হয় না। কী ভীষণ ঠাণ্ডা। হাত-পা শীতে সাদা হয়ে গেছে। ফতিমার এ সময় এটা ঠিক হয়নি। মনে মনে সে ফতিমার হয়ে কার কাছে যেন ক্ষমা চাইছে। আর তখনই সে দেখল দোতলার রেলিঙে চুপচাপ একা ফতিমা। অস্পষ্ট আলোতেও সফিকুর চিনতে পারে সব। মাথার উপর শীতের আকাশ। বুড়িগঙ্গা থেকে ঠাণ্ডা হাওয়া উঠে আসছে। কিছু পালের নাও হয়তো এখন উজানে বৈঠা মারছে। সে এ-ভাবে একা দাঁড়িয়ে আছে কেন, শীতের রাতে, ঠাণ্ডা হাওয়ার ভিতর দাঁড়িয়ে আছে কেন—এই সব জিজ্ঞাসা করতে সাইকেল ফেলে উপরে উঠে গেল। ডাকল, এই ফতিমা।

    ফতিমা পিছন ফিরে তাকাল না। বুঝি সে শীতের আকাশ দেখছে। রাত ফর্সা হতে দেরি নেই। হাজার হাজার ছাত্রছাত্রী এবার প্রভাতফেরিতে বের হবে। ফতিমা বুঝি ওদের মুখে বাংলাদেশের গান শুনতে পাচ্ছে। সকাল হলেই একুশে ফেব্রুআরির ডাকে মা-বোনেরা জেগে উঠবে।

    সফিক ফের বলল, ফতিমা, তুমি এখানে দাঁড়িয়ে আছ! শরীর খারাপ লাগছে? তারপর সফিক কী বলবে ভেবে পেল না। তা’ছাড়া এখানে এ সময়ে দুজনে একসঙ্গে দাঁড়িয়ে থাকা ঠিক না। কেউ দেখে ফেললে সামসুদ্দিন সাহেবের কানে উঠতে পারে। যতবারই সে ফতিমার সঙ্গে থাকে প্রায় দল বেঁধে থাকে। একবার সে আর ফতিমা মধুর ক্যান্টিনে একা বসে থাকলে, ফতিমা ভীষণ অস্বস্তিতে বিরক্ত বোধ করেছিল। বলেছিল, সফিক ভাই, আমি বাড়ি যাব।

    সফিকুর বুঝতে পেরেছিল সেদিন, ফতিমা চায় না ওরা দু’জনে এভাবে একা পলিয়ে পালিয়ে দেখা করে। নিজের মানুষ চুরি করে দেখতে যাওয়া বড় অপমানের। সে সেই থেকে কখনও ফতিমাকে আর কোথাও একা দাঁড়িয়ে থাকতে বলেনি। এখানেও সে আসত না। তবু কেন যে এমন শীতের রাতে ওকে এভাবে একা দেখে সফিকুর বিচলিত হয়ে পড়েছিল। সে চুপি চুপি উঠে এসেছে। ফতিমা ওর কথার কোনও জবাব দিচ্ছে না। ফতিমা হয়তো এভাবে আসা তার পছন্দ করছে না। সফিকুরের ভিতরটা দুঃখে কেমন ভার হয়ে গেল। বলল, আর তোমার সঙ্গে দেখা হচ্ছে না। আমি শেষবারের মতো এগুলি সেঁটে বাড়ি চলে যাব। তোমরা সাবধানে থেকো।

    ফতিমার কেমন চমক ভাঙল। সে ঘাড় ফেরাল, দেখল সে আর সফিক বড় কাছাকাছি দাঁড়িয়ে আছে। ওর গায়ে সেই বাদামী রঙের পাঞ্জাবী, খোপকাটা লুঙ্গি আর পায়ে এক জোড়া স্লিপার। চোখমুখ দেখলেই মনে হচ্ছে হাত-পা শীতে ঠাণ্ডা হয়ে গেছে। মাঝে মাঝে সফিক কাশছে। এ সময় ওকে একটু চা করে দিলে বড় ভালো হতো। ওকে কাশতে দেখেই যেন বলল, প্যাকেটগুলি রেখে দিন। অন্য কাউকে দিয়ে ওগুলি দেয়ালে সেঁটে দেব। আপনি বরং বসুন। চা করে আনছি। দেরি হবে না।

    —আরে না না। এখন আর ঝামেলা বাড়িয়ো না। রাত ফর্সা হতে না হতে হাতের কাজ সব সেরে ফেলতে হবে। আমি যাচ্ছি। বলেই সে দু’পা গিয়ে আবার ফিরে এল। বলল, কেউ তোমাকে কিছু বলেছে? এখানে একা দাঁড়িয়ে আছ!

    ফতিমা হাসল।—না না। কে কী বলবে?

    —কী জানি কত রকমের কথা উঠতে পারে। এ ক’দিন যেভাবে বেহুঁশ হয়ে আমরা পোস্টার লেখা, সাঁটা এবং দল বেঁধে কাছাকাছি থেকেছি, কথা উঠতে কতক্ষণ।

    —আজ এমন বলতে নেই। তুমি সাবধানে থেকো। এই প্রথম সে সফিককে তুমি বলে লজ্জায় মাথা নিচু করে রাখল। তারপর খুব আস্তে আস্তে বলল, আমার জন্য তুমি ভেবো না।

    সফিকের মনে হল সারা উপত্যকায় ফুল ফুটে আছে। সে ফতিমাকে নিয়ে উপত্যকায় কেবল ছুটছে। শীতের রাতে যে সামান্য উষ্ণতা তার দরকার ছিল ফতিমার এমন কথায় সে তা ভুলে গেল। বলল, যদি খোঁজ করতে চাও মেডিক্যাল হোস্টেলে যেও। আমাকে সেখানে পাবে। আমরা সেখান থেকেই ১৪৪ ধারা ভাঙব ভাবছি।

    ফতিমা বলল, তোমার সঙ্গে সারাদিন ঘুরে বেড়াতে পারলে কী যে ভালো লাগত সফিক। এমন দিন তো আর আমাদের আসবে না।

    সফিকের মনে হল শীতে যেন কাঁপছে ফতিমা। সে বলল, এখানে দাঁড়িয়ে আর ঠাণ্ডা লাগাবে না। ভিতরে যাও।

    ফতিমা অনুগত ছাত্রীর মতো নেমে গেলে ফের ডাকল, আচ্ছা, তুমি এখানে এই ঠাণ্ডায় চুপচাপ কেন দাঁড়িয়েছিলে? এভাবে একা দাঁড়িয়ে থাকলে আমার কেন জানি ভয় হয়।

    বলল, এমনি। মনের ভিতর কী যে কখন থাকে কেউ তা বলতে পারে না। সারারাত ফতিমা আর একজন মানুষের চোখমুখ ভেবেছে এবং গভীরে ডুবে গেলে শরীরে তার চন্দনের গন্ধ টের পায়। সে যেন তার পাশেই দাঁড়িয়ে বলছে, ফতিমা তুই কী ভাল ভাল কথা লিখে যাচ্ছিস রে! আমি কী লিখব? আমাকে তোর পাশে বসে লিখতে দিবি?

    —কেন দেব না?

    —কী জানি, যদি না দিস। যদি বলে দিস, তুমি স্বার্থপর। তুমি বাংলাদেশের মানে জান না। তোমার কোন অধিকার নেই লেখার।

    —যা, এমন বলব কেন! আমি তো বাপু তোমার মুখের দিকে তাকিয়েই লিখে যাচ্ছি। আমি যে এত করছি কার জন্য? তোমার জন্য!

    —আচ্ছা, তোর ঐ সফিক কে হয় রে?

    —সফিক বড় ভালো ছেলে। আমি তাকে ভালোবাসি। আমার বাবাও সেটা টের পেয়েছে। আমি ওকে না পেলে এখন বুঝতে পারছি বাঁচব না।

    —তা হলে আমি তোর কে?

    —তুমি যে আমার কে, বুঝতে পারি না। তুমি আমার কী যে নও মাঝে মাঝে আবার তাই ভাবি যখন আমি মরে যাব, কবরের নিচে চলে যাব বুঝি তখন দেখব তুমি আমার কবরের পাশে বসে আছ। তুমি আছ আমার পাশে পাশে। তুমি বাদে আমি এ-বাংলাদেশে সব থাকলেও একা।

    —যা! তুই সব বানিয়ে বানিয়ে মিথ্যা বলছিস!

    —তুমি চলে যাবার পর আমার এটাই মনে হয়েছে। তুমি এমন বলবে জানতাম। তবে তুমি যেখানে যে ভাবেই থাক, তুমি আমার। আমার মাটির, আমার কাছের মানুষ

    তখনই ওর পাশে এসে সফিকুর দাঁড়িয়েছিল। ফতিমা টের পায়নি সফিকুর পাশে দাঁড়িয়ে আছে। পরে টের পেলে সে যেন ধরা পড়ে গেছে এমনভাবে তাকিয়েছিল। সে সফিককে বলল, আমি আমার মনের মানুষকে ভাবছি সফিক। সে আমাকে ফেলে দূরে চলে গেছে। আর এদেশে আসবে কিনা জানি না। আর দেখা হবে কিনা জানি না। এমন দিনে তাকে না ভেবে থাকতে পারিনি। তুমি বিশ্বাস কর সফিক, আমার মনে হয়েছে শুধু আমি আর তুমি সারারাত জেগে পোস্টার লিখিনি, সেও আমাদের সঙ্গে লিখে গেছে। তাকে ভালো করে দেখার জন্য কতদিন পর এখানে একাকী এসে দাঁড়িয়েছিলাম। তুমি এ-সব না-ই জানলে!

    ফতিমা সফিকুরকে উত্তরে কিছু না বলে অন্য কথায় চলে গিয়েছিল, তুমি আর ঠাণ্ডা না লাগিয়ে সকাল সকাল একটু ঘুমিয়ে নাও। কিন্তু সফিকুরকে তখন ভারি বিমর্ষ দেখাল, ফতিমা আবার না বলে পারল না; ভয়ের কী আছে সফিক? সে তো আমাদেরই মানুষ

    সফিক বলল, কে সে?

    ধরা পড়ে গেল বুঝি! তবু সে কিছুক্ষণ স্থির তাকিয়েছিল সফিকের দিকে। তারপর বলেছিল, সোনাবাবুর কথা বলছি।

    —অ, তোমার সেই সোনাবাবু যে আমার মতো নিজের দেশ ছেড়ে পালিয়েছে। কিন্তু ফতিমা সোনাবাবু সম্পর্কে আর কোনও কথা বলল না। সে বলল, আর দেরি করো না। রাত ভোর হয়ে আসছে।

    সফিক বলল, সাবধানে থেকো।

    সফিক কেন যে বার বার একই কথা বলছে! ফতিমা বলল, ভয়ের কী আছে সফিক! আজকের দিনে আমরা তো আর একা নই! সারা বাংলাদেশ যখন আছে সোনাবাবু যখন আছে তখন আর ভয় কী! সে তো আমাদের সব সময় আরও সাহসী হতে বলছে। তোমাদের সঙ্গে আমরাও মার্চ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঠে যাব। আজকের দিনে অন্তত তুমি আমাকে ঘরে থাকতে বলো না।

    সফিক বলল, আমি বারণ করব না। এমন দিনে বারণ করতে নেই জানি। যা কিছু কাজ সব সেরে ফেলতে হবে। এই শীতের ভোরে এর চেয়ে বেশি কিছু ভাবতে পারি না।

    টেবিলের সামনে বসে তার ভোর রাতের সব কথা মনে হচ্ছিল। জানালা বন্ধ ছিল বলে ঘর অন্ধকার। সে জানালা খুলে দিলে সব কিছু পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছে। শীতের রোদ লম্বা হয়ে নামছে মাটিতে। সে বইয়ের পাতা পর পর উল্টে গেল। যেখানে চোখ আটকে গেল—কী সুন্দর সেই সব পঙ্ক্তি। যেন ওর সামনে ফতিমা দু’হাত তুলে ভালোবাসা মেগে নিচ্ছে। সে চোখ বুজে ওর সেই কথাগুলি যেন বলে গেল—স্থির জেনেছিলাম, পেয়েছি তোমাকে, মনেও হয় নি–তোমার দানের মূল্য যাচাই করার কথা। তুমিও মূল্য কর নি দাবি

    রোদটা তখন আরও লম্বা হয়ে ঘরে ঢুকে যাচ্ছে। শীতের রাস্তায় কারা তখন মার্চ করে চলে যাচ্ছে। ওদের বেয়নেটে নরম রোদ তীক্ষ্ণ ফলার মতো কেঁপে কেঁপে যাচ্ছে। সফিকুর যেন সেইসব শূন্য দেয়ালে বার বার আঘাত হানার জন্য পড়ছিল, জোরে জোরে সে পড়ছে—তোমার কালো চুলের বন্যায়—আমার দুই পা ঢেকে দিয়ে বলেছিলে–তোমাকে যা দিই, তোমার রাজকর তার চেয়ে বেশি—আরো দেওয়া হল না—আরো যে আমার নেই!

    শহরের বড় রাস্তায় মার্চ-পাস্টের দৃশ্য। রাইফেলের বাঁটে রোদ পিছলে যাচ্ছে। কলের পুতুলের মতো দম দেওয়া মনে হচ্ছে ওদের। দম ফুরিয়ে গেলেই যেন সব জারিজুরি ওদের শেষ হয়ে যাবে। সফিকুর এবার জানালাটা বন্ধ করে দিল। কুচকাওয়াজের দাপটে, এমন যে প্রেরণার কথা শোনাতে চেয়েছিল, তারা তা শুনতে পেল না। এবার সে রাস্তায় তাদের হাঁক দিয়ে বলে যাবে, বলে গেলেই শীতের মাঠে আবার পাখিরা এসে বসতে পারবে। কলের পুতুলের ভয়ে ওরা আজ মাঠ ছেড়ে কোথাও যাবে না। সফিকুর তাড়াতাড়ি নাকে মুখে দুটো গুঁজে রাস্তায় বের হয়ে গেল।

    .

    সেই শীতের সকালে সোনাকে দেখা গেল কলকাতার বড় রাস্তা ধরে হাঁটছে। চোখে-মুখে ভীতির ছাপ এই বড় শহর দেখে গাড়িঘোড়া দেখে সে কেমন আড়ষ্ট হয়ে হাঁটছে। যারা বাবুমানুষ, তাদের সে জিজ্ঞাসা পর্যন্ত করতে ভয় পাচ্ছে, কোথায় সেই নির্দিষ্ট বাসটি পাওয়া যাবে। ওরা ওর ওপর রাগ করতে পারে। সে ভয়ে ভয়ে ঠেলাওলা অথবা যাদের দেখলে তার ভয় লাগে না, যারা তার কথা মনোযোগ দিয়ে শুনবে তেমন মানুষকে খুঁজছিল। সে দু’জন ভদ্রলোককে কিছু বলতে গিয়ে দেখেছে—ওরা এত ব্যস্ত যে তার কথা শুনতেই পাচ্ছে না। হাত তুলে কোনও রকমে ওর সঙ্গে দয়া করে দায়সারাভাবে কথা বলে ছুটে যেন পালাচ্ছে। ওর মনে হল ওরা পালাচ্ছে, ওরা ওর কথা কেউ শুনতে চাইছে না। তবু কেন জানি একজন বুড়োমতো মানুষ তাকে খুব যত্নের সঙ্গে বুঝিয়ে দিল, ঐ যে মনুমেন্ট দেখছ, তার নিচে তুমি বাস পাবে।

    কলকাতায় তেমন শীত পড়ে না। তবু ওর ভিতরে শীত ভাবটা বড় বেশি জাঁকিয়ে বসেছে। হাল্কামতো কুয়াশা চারপাশে। সামনের রাস্তাটা যে চৌরঙ্গি, ডান দিকে যে বাড়ি সিংহের ছবি সদর দরজায় এবং ওটা যে লাটভবন, সোনা তাও জানে না। বড় মাঠ দেখলেই গড়ের মাঠ মনে হয়, সে কেবল বুঝতে পেরেছিল, সামনের মাঠটাই গড়ের মাঠ। এবং মাটি, গাছপালা আর মনোরম শীতের সকালে কোথাও র‍্যামপার্ট থাকতে পারে, কোথাও এই মাঠে র‍্যামপার্ট আছে ভাবতেই সে একটু সাহস পেল। সকালের রোদ তেমন জোরালো নয়। শীতের হাওয়া কার্জন পার্কের গাছপালায়। সে একটা গাছের নিচে দাঁড়িয়ে শীতে কাঁপছে। সে শুনে এসেছিল—কলকাতায় তেমন শীত পড়ে না। সুতরাং ওর শীতের জামা না থাকলেও কলকাতায় সে শীতে কষ্ট পাবে না ভেবেছিল। একটা পাতাল পাজামা, কিড্স ব্যাগ কাঁধে, পায়ে কতদিনের পুরানো কেড্স জুতো। কলকাতায় শীত নেই সে শুনে এসেছিল, কিন্তু এসে তক দেখছে সারাক্ষণই শীত। সে শীতে কাঁপতে কাঁপতে বাস ধরার জন্য হাঁটছে।

    বাসের ভিতর উঠেও সে খুব নড়ছিল না। চুপচাপ বসে আছে। বেশি নড়াচড়া করলে ওকে কনডাকটার নামিয়ে দিতে পারে। কোথাকার গ্রাম থেকে ভূত এসে কলকাতা নগরীতে হাজির। কী করে যে সোনা এমন ভীতু মানুষ হয়ে গেল! চার বছরে সে আগের সোনা নেই, অন্য সোনা হয়ে গেছে। সেই যে সে ভেবেছিল, এই দেশে এসেই ওরা সবাই রাজার মতো হয়ে যাবে, কত সমরোহ থাকবে জীবনে, দেশ ভাগের নিমিত্ত ওরা শহিদ হয়ে গেছে—সুতরাং সর্বত্র ওদের জন্য বিজয় পতাকা উড়বে। ওরা রাজার মতো হেঁটে হেঁটে শহর নগর পার হয়ে যাবে। সহসা সোনা এবার নিজেকে বাসের ভিতর চুপি চুপি জিজ্ঞাসা করল, কেমন আছো রাজা? ভালো আছো? শীত করছে খুব? খুব খিদে পেয়েছে? কাল রাত থেকে কিছু খাওনি? আর বেশি দেরি নেই। যেখানে যাচ্ছি, দেখবে কত কিছু খেতে পাবে তুমি। কোন কষ্ট থাকবে না তোমার।

    হালিশহরের ক্যাম্পজীবন, রাইট লেফট আর মার্চপাস্ট করে কল্যাণী ক্যাম্পে যাওয়া এসবের ভিতর কতকালের একটা জীবন নির্ভয়ে কেটে গেছে! সে নিজেও জানত না আজ তাকে এখানে আসতে হবে! সে জানত না, এই শহর ছেড়ে, বাংলাদেশ ছেড়ে তাকে কোথাও চলে যেতে হবে। চিঠিতে কী লিখেছে মজুমদারসাহেব তার জানার কথা নয়। তবু এই চিঠিই তার সব। মজুমদারসাহেব তার হয়ে এই চিঠি দিয়েছেন। ভদ্রা জাহাজের সেকেণ্ড অফিসারকে লেখা। সে চিঠিটা দেখালেই তাকে নিয়ে নেবে। তার ওয়েস্ট বেঙ্গল ভলান্টিয়ার ফোর্সের ট্রেনিং নেওয়া আছে। ট্রেনিং থাকলে নিতে বিশেষ অসুবিধা হয় না। ওর হয়ে মজুমদারসাহেব আর কী লিখেছেন সে জানে না।

    বাসের ভিতর শীতের সকাল, তার পাশে গঙ্গানদী। সে বসে বসেই নদী এবং নদীতে জাহাজ দেখতে পেল। এবং বাসটা মোড় ঘুরতেই সব আবার অদৃশ্য হয়ে গেল। ফোর্ট উইলিয়মের দুর্গ দেখতে পেল। এখানে এক র‍্যামপার্টের পাশে বড় জ্যাঠামশাই এসে বসতেন। এই নদীর পাড়ে এবং কোনও গাছের ছায়ায় তার পাগল জ্যাঠামশায়ের মুখ ভেসে উঠলে সে কেমন অন্যমনস্ক হয়ে গেল।

    মেজ জ্যাঠামশাইর বড় প্রিয় এই গঙ্গা নদী। নদীর পাড়ে তিনি তাঁর দেহ রাখবেন এখন কেবল এই আশা তাঁর। আর কিছু তিনি চান না। শীতের সকালে হেঁটে হেঁটে এক ক্রোশের মতো পথ চলে যান গঙ্গাস্নান করতে। নদীর নামেই তাঁর যত পুণ্য। সংসারের প্রতি এখন মনে হয় মায়া মমতা তাঁর কম। এখানে এসে যে এই বয়সে কী করবেন ভেবে না পেয়ে কেবল বাড়িটার চারপাশে নানারকমের গাছ এনে লাগাচ্ছেন। বাবা দু’মাস পর পর ফেরেন। এখানে আসার পর পর সে আর বাবাকে হাসতে দেখেনি। মা রাতে কাঁথার ভিতর শুয়ে কষ্ট পান। শিয়রে একটা কুপি জ্বলতে থাকলে সোনা টের পায় মার চোখমুখ কতটা বিবর্ণ হয়ে গেছে। এখানে এসে তার পর পর আরও দুটো ভাই হয়েছে। জমি-জায়গা বলতে চারপাশের বন জঙ্গল সাফ করে বসতি করা। জঙ্গল সাফ করতে করতে বড়দার হাঁটু শক্ত হয়ে গেছে। ছোটকাকা আর এখানে থাকেন না। নিজের মতো করে তিনি আলাদা শহরে বাস তুলে নিয়ে গেছেন। কাকিমা এসেই এ ববস্থা করে নিয়েছে। বড় জ্যেঠিমা যেদিন সবাই উপবাস থাকে, অর্থাৎ যেদিন সংসারে কিছু জোটে না, পেঁপে সিদ্ধ অথবা শুধু মিষ্ট কুমড়ো সেদ্ধ খেয়ে থাকতে হয় সেদিন রাতে ভাঙা বাক্‌স থেকে যত চিঠি আছে বের করে পড়েন। রাত জেগে কুপি জ্বালিয়ে জ্যেঠিমা সারারাত বুঝি চিঠি পড়েন। জ্যাঠামশাইর চিঠি। বিয়ের পর পরই যেবার তিনি কলকাতায় শেষবাবের মতো কাজ করতে গিয়ে ছ’মাস ছিলেন, তখনকার কিছু চিঠি। জ্যেঠিমা সকালেই স্নান করে একটা ভাঙা আয়নার সামনে হাঁটু গেড়ে বসেন। কপালে সিঁদুর পরেন বড় বড় ফোঁটায়। এবং তখন জ্যেঠিমাকে দেখলে মনে হয় না সংসারে গতকাল সবার হা-অন্ন গেছে। জ্যেঠিমার এই মুখ দেখলে সোনা চোখের জল রাখতে পারে না। মা না খেয়ে শীতের কাঁথায় শুয়ে থাকলে তার পড়াশুনা করতে ভালো লাগে না। ওরা সবাই আশায় আশায় বসে থাকে বাবা ফিরে আসবেন। যা কিছু অর্থ ছিল বছর তিনের ভিতর শেষ। এখন আছে তিনটে কুঁড়েঘর আর কিছু অন্নহীন প্রাণ। কেউ আর টাকা নিয়ে আসে না। প্রতাপ চন্দের ছেলে লিখেছে তারা দেশ ছেড়ে চলে আসছে। তার কাছে কিছু প্রাপ্য টাকা ছিল। সব খোয়া গেলে সোনা বুঝতে পারে না বাবা এবারে কী করবেন। বাবার চোখমুখের দিকে তাকানো যায় না। ক্রমে বাবা কেমন হয়ে যাচ্ছেন। তবু বাবাই একমাত্র মানুষ যিনি বাড়ি ফিরে এলে ওরা ক’দিন দু’বেলা পেট ভরে খেতে পায়। আবার চলে গেলে সারা সংসারে অন্ধকার। অন্নহীন এই সংসারে সোনার নিজেকে বাড়তি লোক বলে মনে হয়। তখন মনে হয় সকাল হলেই সে ঘুম থেকে উঠে দেখবে, পাগল জ্যাঠামশাই এসে গেছেন এদেশে। তিনি আর পাগল নন। তিনি বড় মানুষ, তাঁর অর্থবল অনেক। কোথাও তিনি এক রাজবাড়ি কিনে রেখেছেন। সবাইকে নিয়ে তিনি এখন সেখানে যাবেন। সবাইকে তৈরি হয়ে নিতে বলছেন।

    বাসটা যাচ্ছে। সোনা এত অন্যমনস্ক হয়ে গেছিল যে সে কতদূর চলে এসেছে জানে না। সে বার বার কণ্ডাক্‌টারকে মনে করিয়ে দিচ্ছে—কে, জি, ডক। তিন নম্বর গেট। সে সেখানে নামবে। তাকে বেশিদূর নিয়ে গেলে সে চিনে ফিরে আসতে পারবে না। পকেটে তার এই বাসভাড়াই সম্বল। তার আর কিছু নেই। এবং এজন্য সোনার বার বারই মনে হচ্ছে সে বড় অকিঞ্চিৎকর মানুষ। তার কথা কণ্ডাক্‌টার মনে নাও রাখতে পারে। মনে না রাখলে সে খুব বিপদে পড়ে যাবে।

    সহসা মনে হল, সোনার বাসের লোকগুলি ওর প্রতি খুব দয়ালু হয়ে উঠেছে। বুড়ো মতো একজন লোক বলল, এখনো অনেক দূর। তুমি বোসো। ঠিক তোমাকে নামিয়ে দেবে। তখন ওর মনে হল তবে বুঝি বেশ দূরই হবে। সে এক ঘুম ঘুমিয়ে নিতে পারে। সে বেশ চুপচাপ বসে এবার জানালার পাশের সব দালানকোঠা লাইটপোস্ট এবং রেলব্রীজ দেখতে দেখতে ভাবল এই শহরেই কোথাও অমলা কমলা থাকে। সে একবার দেখা করবে ওদের সঙ্গে। সে একটা চিঠি লিখবে, কোনওদিন সে কাউকে চিঠি দেয়নি। সে জাহাজে যখন চড়ে বসবে তখন সবাইকে চিঠি লিখবে। লিখবে, অমলা আমি বাংলাদেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছি। অথবা যদি সে অমলার সঙ্গে দেখা করতে যায়, ওকে চিনতে নাও পারে। সে কত বড় হয়ে গেছে। বরং সে চিঠিই লিখবে। সে কী কাজ নিয়ে যাচ্ছে জাহাজে তা লিখতে পারবে না। কাজটার কথা লিখতে ওর ভারি লজ্জা লাগবে।

    এমন সময় কণ্ডাক্টারের গলা শুনতে পেল সোনা। এই যে কে নামবে কে, জি, ডকে। তিন নম্বর গেটে তুমি নামবে বলেছিলে? বলে কণ্ডাক্টর সোনার দিকে তাকাল। আশ্চর্য সোনা! সে এত তাড়াতাড়ি এসে পড়বে বুঝতে পারেনি। বেশ সে শহরের মানুষজন, রেলব্রীজ দেখছিল। ওর শীত করছিল না তেমন। সে ট্রেনিংশিপের সেকেণ্ড অফিসারের কাছে একটা চিঠি নিয়ে যাচ্ছে। এবং চিঠিটা দেখলেই ওকে ডেকে পাঠাবেন তিনি। কড়া মেজাজের মানুষ, ধমক দিয়ে কথা বলার অভ্যাস। এবং এমন সব নিষ্ঠুর ঘটনার সংবাদ সে রাখে যা মনে হলে শরীরের শীতটা বাড়ে। সে বাস থেকে নেমেই আবার কাঁপতে থাকল। গেটের মুখে দু’জন সিনিয়র রেটিঙস্। সামনে মাঠ এবং দূরে ক্রেন,জেটি, জাহাজের আগিল তিমিমাছের পেটের মতো। সে দাঁড়িয়ে ভালো করে দেখে নিল সব। গেটে লেখা, ট্রেনিংশিপ ভদ্রা। নুড়ি-বিছানো পথ। দু’পাশে ফুলের বাগান, তারপর জাহাজের জেটিতে ছোট মাঠ এবং নরম দুর্বা ঘাস। খুব মসৃণ, তার পাশে সোজা রাস্তা লকগেটের দিকে চলে গেছে। ফল ইনে সে কিছু নতুন রেটিঙস্ দাঁড়িয়ে আছে দেখতে পেল। পনের দিন পর পর একটা করে দল আসে। এই দিনেই সে এসেছে। ওর যতই এখন শীত করুক হাতের চিঠিটা সেকেণ্ড অফিসারের কাছে পৌঁছে দিতেই হবে। আর যতক্ষণ তিনি ডেকে তার সঙ্গে কথা না বলছেন ততক্ষণ শরীর থেকে শীত যাবে না। সে রেটিঙদের কাছে চিঠিটা দিল। অনুমতি না পেলে ভিতরে ঢুকতে পারবে না।

    চিঠি নিয়ে ওদের একজন ডাবল মার্চ করে জাহাজের দিকে চলে গেল। সে ঠিকমতো পৌঁছে গেছে। সে যত কঠিন ভেবেছিল এখানে আসা, ঠিক ততটা কিঠন নয়। তার বড় ইচ্ছা করছিল গেটের কাছে দাঁড়িয়ে থাকা রেটিঙদের সঙ্গে গল্প করতে। চিঠিটা পৌঁছে গেলেই তাকে ডেকে পাঠাবে। তার নাম লিস্ট করে নেবে। যারা তখন ফল-ইনে দাঁড়িয়ে আছে তাদের সঙ্গে দাঁড়াতে বলবে। দাঁড়াবার আগে যা যা শুনে এসেছে কতটা তা ঠিক বড় জানার ইচ্ছা তার। জাহাজের মাস্তুলে নিশান উড়ছে। এবং সে এখানে দাঁড়িয়েই দেখল মাস্তুলের মাথায় একটা কাক বসে আছে।

    সে ভিতরে ঢুকে গেলে কাকটা ওর মাথার উপর কা-কা করে ডাকল। ওর ভিতরের শীতটা এবার আরও বেড়ে গেল। ওর দাঁত ঠকঠক করে কাঁপছে। ঠাণ্ডা বাতাস এত বেশি জোরে বইছে যে, সে বেশিক্ষণ এভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে পারবে না। রোদে যেন কোনও তাপ উত্তাপ নেই। মরা রোদের ভিতর ওর চোখদুটো আরও মরা দেখাচ্ছে। যারা ডেকের উপর দাঁড়িয়ে অথবা টুইন ডেকে ডিউটি করছে তাদের শরীরে শুধু গেঞ্জি। ওরা শীতে কাঁপছে না। ওদের দেখে সোনা এতক্ষণে বুঝতে পারছে সে শীতে কাঁপছে না, ভয়ে কাঁপছে। তাকে কারা যেন বেঁধে নিয়ে যাচ্ছে, ঠিক সেই দালানকোঠার ভিতর বলির মোষটার মতো। সে দেখতে পেল চোখের সামনে ঢাকঢোল বাজছে, ধূপধুনোর গন্ধ উঠেছে, চোখ জ্বালা করছে। কচি মোষটাকে টেনে টেনে নিয়ে আসছে। সকাল থেকে বড় শীতে কাপছিল মোষটা।

    বিউগিল বাজলে সোনা টের পেল সেও ফল-ইনে দাঁড়িয়ে গেছে। ডেকের উপর কাপ্তান। সামনে চিফ, সেকেণ্ড এবং থার্ড অফিসার। সেকেণ্ড অফিসার দু’কদম সামনে এসে কমাণ্ড দিচ্ছেন।

    সোনা শুনতে পেল, ঠিক সেই পুরোহিতের মতো গলা, জোরে জোরে মন্ত্র উচ্চারণের মতো হেঁকে ওঠা—ট্রেনিজ বলে তিনি যেন দম নিলেন, তারপর সবার সঙ্গে সোনা অ্যাটেনশান হয়ে গেল। ঠিক সেই কল লাগানো পুতুলের মতো। ওর যা কিছু নিজস্ব, এই যেমন ওর ইচ্ছা, ভালোবাসা এবং বড় হওয়ার স্বাধীন আকাঙ্ক্ষা সব সে ঝেড়ে ফেলে এখন ওরা যা যা বলবে তাই করবে। যদি ওকে ওরা ক্লাউন সাজিয়ে ছেড়ে দেয় সে সারাজীবন একটা ক্লাউন হয়েই থাকবে। সঙ্গে সঙ্গে তিনি আবার ডেকের ওপর হেঁকে উঠলেন, ট্রেনিজ, দি থার্টিফোর ব্যাচ—স্ট্যাণ্ড অ্যাট ইজ। সোনা সহজ হয়ে দাঁড়াতে পেরে একটু হাঁফ ছেড়ে বাঁচল।

    বোট-ডেকের ওপাশে সূর্য কিরণ দিচ্ছে। জাহাজের ওপাশে বড় বড় সব গাদা বোট। এবং দূরে ওপারের জেটিতে ক্ল্যানলাইনের জাহাজ। জাহাজের মাস্তুল পার হলে জেটি এবং শেড আর বড় বড় সব ক্রেনগুলি দৈত্যের মতো দাঁড়িয়ে লম্বা ছায়া ফেলেছে জেটির জলে। অথচ এরই ভিতর সে একটা ঘুঘু পাখির ডাক শুনতে পেল। কোথাও এখানে তবে ঝোপজঙ্গল আছে যেখানে এই শীতের সময়েও ঘুঘু পাখি বাস করতে পারে। ঘুঘুপাখির ডাক শুনলেই বাংলাদেশের কথা মনে হয়। ফতিমার কথা মনে হয়। প্রিয় অর্জুন গাছটার নিচে কেউ দাঁড়িয়ে আছে মনে হয়। গাছটা একাকী নিঃসম্বল মানুষের মতো দাঁড়িয়ে আছে। সে নেই, জ্যাঠামশাই নেই। ফতিমা শহরে থাকে। ফতিমা, জ্যাঠামশাই না থাকলে গাছটারও থাকার কোনও মানে নেই। কিন্তু সেই গাছটার নিচে কে যেন দাঁড়িয়ে আছে। অস্পষ্ট মুখ ধীরে ধীরে স্পষ্ট হলে দেখল ঈশম দাঁড়িয়ে আছে। সে ঘুরেফিরে আবার তার তরমুজের জমিতে নেমে যাচ্ছে। সে এই গাছ এবং তরমুজের জমি ফেলে কোথাও গিয়ে শান্তি পাচ্ছে না। আর এমন সময়ই সে শুনতে পেল, ট্রেনিজ, দি থার্টিফোর স্ট্যাণ্ড ইজি।

    ওরা ফল-ইনে দাঁড়িয়ে হাত-পা হেলাতে পারছে। এমনকি ওরা এখন পরস্পর গা চুলকেও নিতে পারে। সহজ হয়ে দাঁড়াতে পারায় সোনা কেমন সাহস পেল। শীতের সূর্য জাহাজের ওপাশ থেকে মাথার ওপর এপাশে উঠে আসছে। শীতের সূর্য ওকে উত্তাপ দিচ্ছে। সে বাঁচতে পারবে এই উত্তাপে। সে এখানে হাতখরচ পাবে সাত টাকা। দু’বেলা পেট ভরে খেতে পাবে। এটা যে ওর কাছে কী মহার্ঘ ব্যাপার, ক্ষুধায় সে কাতর এবং দুপুর হলেই বোট-ডেকে বড় বড় কলাইকরা থালাতে ভেড়ার মাংস আর ভাত। সূর্যটা যত তাড়াতাড়ি মাথার ওপর উঠে আসবে তত তাড়াতাড়ি সে খেতে পাবে। সে কাজের ফাঁকে ফাঁকে তাই সূর্য দেখে। সূর্য দেখলে কী হবে, সে তো জানে তাদের এখন নিয়ে যাওয়া হবে বোট-ডেকে। তাদের ডেকের কাঠে ক্রমাগত দুঘণ্টা হলিস্টোন মারতে হবে। এই দু’ঘণ্টায় কেউ অজ্ঞান হয়ে গেলে বিদায় করে দেওয়া হবে, তাকে ভেড়ার মাংস-ভাত খেতে দেওয়া হবে না। এমন ভাবতে সোনার বুক গলা শুকিয়ে গেল। সে আজ খেতে না পেলে মরে যাবে। খাবারের জন্য সে আর যাই হোক অজ্ঞান কিছুতেই হবে না।

    বোট-ডেকে সে সবার সঙ্গে উঠে গেল। সারাটা ডেক কারা জল মেরে গেছে। লাইট-বোটের পাশে দু’জন সিনিয়র ট্রেনিজ ওদের উঠে আসতে দেখে ভারি মজা পাচ্ছিল। ওদের হাতে হোস পাইপ। ওদের আরও চার-পাঁচজন জটলা করছে মেসরুমের পাশে। ওদের হাতে বালি। ওরা ডেকের কাঠে বালি ছড়িয়ে যাচ্ছে। যারা নতুন এসেছে, সারি সারি তারা হলিস্টোন মারতে বসে গেল। সাদা রঙের চৌকো পাথর। কিভাবে বসবে, কিভাবে দু’হাতে হলিস্টোন ধরবে, সব একজন সিনিয়র ট্রেনি সামনে বসে দেখিয়ে দিচ্ছে। বসার এদিক-ওদিক হলে পিছন থেকে পাছায় লাথি খেতে হবে। সোনা সব ভাল করে লক্ষ করছে। সে দু’পায়ের ওপর ভর করে আলগা হয়ে বসল। দুহাতে চেপে হলিস্টোন ধরে রাখল। এমন ঘষামাজা ডেক, ফের ঘষতে হবে। কাঠ পাতলা হয়ে গেছে ঘষতে ঘষতে। কোথাও ছোবড়া বের হয়ে পড়েছে। তবু ঘষতে হবে। উপুড় হয়ে বাটনা বাটার মতো ক্রমান্বয়ে ঘষা, ডেক ঘষে যাওয়া। জল মারছে হোস পাইপে। জলে ওদের ভিজিয়ে দিচ্ছে। বালি ছড়িয়ে দিচ্ছে। ঘষে ঘষে হাত-পা গরম। তারপর দু’হাতে পায়ে যেন খিল ধরে আসছে। সেকেণ্ড অফিসার পোর্টহোলে চোখ রেখে সব দেখছেন। হলিস্টোন মারতে মারতে কে হেলে যাচ্ছে, কার হাত শিথিল হয়ে যাচ্ছে, কার হাতে ফোসকা পড়ে ছাল চামড়া উঠে যাচ্ছে, দেখে আরও চালিয়ে যাবার জন্য অর্থাৎ যতক্ষণ ওরা বাপরে মারে ডাক না ছোটাবে, যতক্ষণ দু-কষে ফেনা উঠে না যাবে, এবং কেউ কেউ শরীর খিল মেরে অজ্ঞান হয়ে না যাবে ততক্ষণ চালিয়ে যাবে। সিনিয়র ট্রেনিদের এটা একটা বড়দিনের উৎসবের মতো। প্রথম দিনে ওরাও এমন একটা দৃশ্যের ভিতর পড়ে গেছিল। এখন ওরা সোনাদের দেখে মজা পাচ্ছে। চারপাশে ঘসঘস শব্দ। সোনা কানে এখন কিছু শুনতে পাচ্ছে না। পাশের ছেলেটা চিৎ হয়ে পড়ে আছে। কেউ আসছে না। সে উঠে ওকে ধরবে ভাবল, কিন্তু সে জানে সহসা উঠে দাঁড়ালেই পড়ে যাবে। ঠিক উপনয়নের দিনের মতো—নানারকমের মন্ত্র উচ্চারণের ভিতর চারপাশে নানারকমের মজা। মানুষের শরীরে নতুন এক পরিমণ্ডল তৈরি করা। সোনা তুমি এক মানুষ, তোমার এইদিনে মানুষের জন্য আর মায়া থাকছে না, তোমার হাতে ফোসকা পড়ে দগদগে ঘা হয়ে গেছে। হাত খুলে আর দেখো না। দেখলে তুমিও অজ্ঞান হয়ে যাবে। কিন্তু হলে কী হবে, সোনা তো এসব পারে না। সে ছেলেটাকে ধরে তুলতে গেল। আর আশ্চর্য, সে দেখলে দু’জন রেটিঙস্ ওর মুখের ওপর হোস পাইপে জল মারছে। তাকে প্রায় লাথি মেরে পাশে ঠেলে ওরা আরও মজা দেখার জন্য ছেলেটার মুখে হোস পাইপ ছেড়ে দিল। এমন নিষ্ঠুর ঘটনায় সোনার চিৎকার করে উঠতে ইচ্ছা হল। কিন্তু পারল না। আর কিছুক্ষণ সময় পার করে দিতে পারলেই বোট-ডেকে বসে ভেড়ার মাংস-ভাত। কলাইকরা থালায় সে ভেড়ার মাংস-ভাত খাবে। সে কিছুতেই প্রতিবাদ করতে পারল না। চোখের উপর দেখল, চ্যাঙদোলা করে ওরা ছেলেটাকে নিয়ে যাচ্ছে। টেনে হিঁচড়ে বোট-ডেকের উপর দিয়ে নিয়ে গেলে সোনা চোখ ফিরিয়ে নিল। ছেলেটার হাতে-পায়ের চামড়া ছড়ে যাচ্ছে, তার দেখতে ভীষণ কষ্ট হচ্ছিল।

    সঙ্গে সঙ্গে হুইসল বেজে উঠলে সবাই দাঁড়িয়ে পড়ল। হলিস্টোন শেষ। কেউ আর ঠিকমতো দাঁড়াতে পারছে না। ওরা টলছে। সোনা দু’পায়ের উপর শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকল। সে কিছুতেই পড়ে যাবে না। পড়ে গেলেই ওরা ওকে চ্যাঙদোলা করে নিয়ে যাবে। যতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে পারবে—সে মানুষ, পড়ে গেলেই মানুষ না। তাকে নিয়ে যা খুশি করা। সেকেণ্ড অফিসার আসছেন। বুটের শব্দে সোনা চোখ তুলে তাকাল। পরনে সাদা হাফ প্যান্ট সাদা হাফশার্ট এবং মাথায় জাহাজী টুপি। চোখমুখ কী ভীষণ কঠিন! তিনি যে বাঙালী, তিনি বাংলা ভাষায় কথা বলেন কখনও কখনও, এখন মুখ দেখে তা কিছুতেই বোঝা গেল না। সব কমাণ্ড তাঁর হিন্দিতে, সব কথা হিন্দিতে। সোনার মনে হল তিনি রাতে শুয়ে স্বপ্ন দেখেন হিন্দিতে। তিনি যে পোর্টহোলে মুখ রেখে প্রতিটি রেটিঙসের ওপর কড়া নজর রেখেছিলেন, এবং যাদের ওপর কোনও সংশয় আছে তাঁর, তাদের কাছে গিয়েই দাঁড়াচ্ছেন, তারা তা বুঝতে পারছে না। সূর্য যখন মাথার উপরে উঠে গেছে—আর তখন তিনি বেশি দেরি করবেন না। ছেড়ে দেবেন এবার। হাতে ফোসকা গলে রক্ত পড়ছে, ক্ষুধার জ্বালায় সোনা তা পর্যন্ত টের পাচ্ছে না। যারা হাতে এখন ব্যান্ডেজ বেঁধে দিচ্ছে সে তাদের কিছু বলবে ভাবল। কিন্তু বলতে পারল না। সেকেণ্ড অফিসার এবার ওর দিকে আসছেন।

    সেকেণ্ড অফিসারের কঠিন মুখ দেখে সোনা বুঝি আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারছে না। ভয়ে সে কিছুতেই তাকাতে পারছিল না। তিনি এসে ওর সামনে দু’পা ফাঁক করে দাঁড়ালেন। সে এবার বুঝি সত্যি পড়ে যাবে। সে বলল, ঈশ্বর আপনি আমাকে আর একটু শক্তি দিন। এই দুপুর পর্যন্ত। পড়ে গেলে আমার ভেড়ার মাংস-ভাত আর খাওয়া হবে না। শীতের রোদ, ক্রমান্বয়ে দু’ঘণ্টা হলিস্টোন, সোনার মুখে যে আশ্চর্য এক সুষমা আছে তা নষ্ট করতে পারেনি। ক্লান্ত অবসন্ন মুখে তার কোথায় যে এক আশ্চর্য দীপ্তি! কেন যে সেকেণ্ড অফিসার এদিকে আসছেন, কিভাবে যে সোনা তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকবে এমন ভাবতেই তিনি সোনার শরীর টিপে টিপে দেখলেন। প্রায় হাট থেকে গাই গরু কেনার মতো খোঁচা দিয়ে দেখা। যেন হাত-পা টিপে টিপে পরীক্ষা করলেন সমুদ্রের ভয়ঙ্কর ঝড়, সারেঙের অত্যাচার এবং সফরের কঠিন নিঃসঙ্গতা সে সহ্য করতে পারবে কি-না। না পারলে এক্ষুনি বিদায় করতে হবে। সুন্দর চোখমুখ দেখলেই সেকেণ্ড অফিসারের এমন ভয় হয়। তারপর সহসা ভয় পাইয়ে দেবার মতো চিৎকার করে বললেন, অ্যাটেনশান। সোনার দিকে তাকিয়ে বললেন, ঠিকসে খাড়া রহো। হিলতা কিও?

    সোনা সোজা সামনের দিকে তাকিয়ে থাকল।

    —তোমার নাম কেয়া হ্যায়?

    কাকে বলছে সোনা বুঝতে পারছে না। সে তো সামনের দিকে তাকিয়ে আছে, সে কী করে বুঝবে সেকেণ্ড অফিসার তার দিকে তাকিয়ে কথা বলছেন।

    এবার তিনি ওর চুল টেনে বললেন, তোমার নাম কেয়া হ্যায়?

    সে সামনের দিকে তাকিয়েই বলল, শ্রী অতীশ দীপঙ্কর ভৌমিক।

    —মজুমদারসাহেব কাহাসে এক জংলি আদমি ভেজারে! বলেই তিনি সোনার গালে ঠাস ঠাস দু’চড় বসিয়ে বললেন, ঠিকসে বাত বলনে হোগা।

    সোনার মনে হল দাঁত ক’টা উড়ে গেছে। দাঁতের কষ চিরে যে রক্ত পড়ছে সেটা বোঝা যাচ্ছে। রক্তের নোনতা স্বাদ লালার সঙ্গে জিভ দিয়ে সে চেটে নিল। পেটে তবু যা হোক কিছু যাচ্ছে। সে কাঁদতে পারত আজ। অথচ অদ্ভুত, ওর কান্না পাচ্ছে না। হাতে ব্যাণ্ডেজ বাঁধা। সে অ্যাটেনশান হয়ে আছে। গালে নিজের হাত তুলে দেখতে পারছে না, ক’টা দাঁত আছে ক’টা গেছে। কারণ গোটা মুখ কেমন ভোঁতা মেরে গেছে। সে কিছুতেই বুঝতে পারছে না শুধু নোনতা স্বাদে সে বুঝতে পারছে রক্ত বের হচ্ছে। ক্ষুধার সময় নিজের রক্ত চুষে খেতে মন্দ লাগছে না। সে নিজের রক্ত চেটে খেতে খেতে ভয়ঙ্কর সেই কঠিন মুখ দেখে ফের শীতল হয়ে গেল। কেন যে তিনি তাকে এমন কষ্ট দিচ্ছেন, সে তো তার নাম ঠিকই বলেছে। সে এতদিন ধরে তার এই নাম জেনে এসেছে। এখানে এলে নতুন নামকরণ হয় কি-না সে এখন তা জানে না। জানলে সে এমন বলত না। যখন সে কারণ খুঁজে পাচ্ছিল না অথচ সেকেণ্ড অফিসার ওর কান টেনে সামনে পিছনে মাথা দোলাচ্ছেন তখন ওর বলতে ইচ্ছা হল স্যার, আমাকে যে নামেই ডাকুন, যে ভাবেই মারুন, আমি জাহাজ ছেড়ে যাচ্ছি না। আমি আর একটু বাদে ভেড়ার মাংস-ভাত খাবই।

    তিনি কান ছেড়ে দেবার সময় বললেন, বাত বা পিছু মে স্যার বলনে হোগা, মেরা নাম শ্রী অতীশ দীপঙ্কর ভৌমিক স্যার, বলনে হোগা।

    সোনা সোজা দাঁড়িয়ে বলল, মেরা নাম শ্রী অতীশ দীপঙ্কর ভৌমিক স্যার।

    —ঠিক হ্যায়। তারপর তিনি সোনার পা থেকে মাথা পর্যন্ত ভালো করে দেখলেন। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলেন।—জাহাজ মে বহুত তকলিফ হায়। জাহাজকা নকরি বহুত খতরনাক হ্যায়। সারেঙ লোক দুশমনি করেগা। বহুত লেড়কা লোক আতা হ্যায়, ট্রেনিং লেতা হ্যায়, এক দো সফর বাদ ভাগতা হ্যায়। তুমকো ভি ভাগনা পড়ে গা!

    —না স্যার, আমি ভাগব না।

    —সাকগে তুম?

    —পারব স্যার। সোনা আর কিছু না বলে সোজা তাকিয়ে থাকল। তিনি চলে যাচ্ছেন। সোনার এত কষ্টের ভিতরও মনে হল যাক, তবে এত দিনে একটা তার হিল্লে হয়ে গেল। কিন্তু একি! তিনি যে আবার ফিরে আসছেন! প্রায় কুইক মার্চের মতো মনে হচ্ছে। এসেই মুখের ওপর শক্ত হয়ে বললেন, তুম বিফ খানে সকতা?

    বিফ! আমি বিফ খাব কেন! আমি হিন্দুর ছেলে, হিন্দুস্থানে চলে এসেছি। আমি আবার বিফ খাব কেন! যারা পাকিস্তানে আছে তারা বিফ খাবে। বিফের ভয়ে আমার জ্যাঠামশাই গঙ্গার পাড়ে ঝোপজঙ্গলে বাড়ি করেছেন। আমার বাবা মাঝে মাঝে আসেন। বড় জ্যেঠিমা খেতে না পেলে চিঠি নিয়ে বসে থাকেন, ছোটকাকা চলে গেছেন বাড়ি ছেড়ে, এত হবার পর হিন্দুর ছেলে হয়ে বিফ খাব, সে কি করে হয়! ভাবতে ভাবতে সোনা ঢোক গিলে ফেলল। সোনার এত খিদে যে বিফ মটন সব এক হয়ে যাচ্ছে। তবু এক আজন্ম সংস্কার, তীব্র ঘৃণাবোধ সারা শরীরে দগদগে ঘা হয়ে ফুটে উঠল। তীক্ষ্ণ যন্ত্রণায় শরীর নীল হয়ে যাচ্ছে। সে এবার মরে যাবে যেন। চারপাশে ঋষিপুরুষেরা দাঁড়িয়ে আছেন। কী সব মন্ত্রগাথা তাঁরা উচ্চারণ করে চলেছেন। যেন হোমের কাঠ থেকে এক পবিত্র গন্ধ উঠে সারা শরীরময় ভেসে বেড়াচ্ছে। ওর চিৎকার করে উঠতে ইচ্ছা হল, বলতে ইচ্ছা হল, না না আমি সব পারব। এটা পারব না। আমাকে আমার জন্ম থেকে আমার বাবা মা, আমার পূর্বপুরুষ, মাটি ফুল ফল এক আশ্চর্য পরিমণ্ডলে মানুষ করেছেন, আমি সব পারি স্যার, কিন্তু সেই পরিমণ্ডল ভেঙে দিতে পারি না। ভেঙে দিলে আমার আর কিছু থাকে না।

    এত দেরি দেখে তিনি ক্ষেপে গেলেন।—জাহাজ মে নোকরি করনেসে বিফ তুমকো খানেই হোগা। বোল, সাকোগে কী নেহি?

    আশ্চর্যভাবে সোনার সমনে মায়ের মুখ ভেসে উঠল। শীতের রাতে মা কুপি জ্বালিয়ে বাবার প্রত্যাশায় বসে আছেন। উঠোনে সেই আবহমান কালের সাদা জ্যোৎস্না। উনুনে শুধু জল সেদ্ধ হচ্ছে। বাবা এলেই দু’মুঠো অন্ন সবার পাতে। কী উদগ্রীব চোখমুখ ছোট ছোট ভাইবোনদের। সে তার স্থৈর্য হারিয়ে ফেলছে। মা তার অন্নহীন। ভাইবোনের শুকনো চোখমুখ ভেসে উঠলে, সে বলল, আমি পারব স্যার। সে বলতে বলতে মাথা নিচু করে ফেলল। সেকেণ্ড অফিসার টের পাচ্ছেন ছেলেটি ওর সামনে দাঁড়িয়ে মাথা নিচু করে, এই প্রথম এত যন্ত্রণার পর কাঁদছে। ওর এ সময় সান্ত্বনা দেবার কোনও ভাষা থাকে না। তিনি যেমন বার বার কুইক মার্চ করে যান আসেন, আজও তিনি তেমনি কুইক মার্চ করে চলে গেলেন। তিনি যেন এখন বলতে বলতে যাচ্ছেন, আমার পিতা অঘোরচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, পিতামহের নাম হরিবিলাস চট্টোপাধ্যায়, তস্য পিতামহের নাম যদুনাথ চট্টোপাধ্যায়। তুমি চোখের জল ফেলে আমাকে কী ভয় দেখাচ্ছ হে ছোকরা!

    আহা! তারপর শীতের রোদে ভেড়ার মাংস গরম ভাত। ডেকের উপর বসে পেট ভরে খাওয়া। মাথার উপর খোলা আকাশ। সামনে নদী। ওপারের কলকারখানা, কলের চিমনি এবং নীল আকাশ। কত সব পাখি মোহনার দিকে উড়ে যাচ্ছে। সোনা খেতে খেতে এই সব পাখি দেখল, ওরা উড়ে যাচ্ছে। ট্রেনিং শেষ হয়ে গেলে সেও চলে যাবে, জাহাজে সে বাংলাদেশ ছেড়ে সমুদ্রে চলে যাবে। কবে ফিরবে সে জানে না। আর এই বাংলাদেশে সে ফিরতে পারবে কি-না তাও জানে না। ওর মনটা খেতে খেতে ভারি হয়ে গেল। মার জন্য, ছোট ছোট ভাইবোনদের জন্য ওর কষ্ট হতে থাকল। সে কলাইকরা থালা মগ ধুয়ে বাংকে রেখে এল। তারপর মাস্তুলের নিচে শীতের দুপুরে শুয়ে পড়ল। ওর এখন বিশ্রাম। ওর ভীষণ ঘুম পাচ্ছে। পেট পুরে খেলেই শীতের দুপুরে ওর বড় ঘুম পায়।

    .

    সোনা যখন মাস্তুলের নিচে শুয়ে ঘুমোচ্ছে, যখন বাংলাদেশের আকাশ নীল, মানুষেরা শীতের রোদে উত্তাপ নিচ্ছে তখন সামসুদ্দিন দেখল ডায়াসে বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা কমিটির আহ্বায়ক আবদুল মতিন উঠে দাঁড়িয়েছেন। সামসুদ্দিন দেখছে সকাল থেকে অগণিত ছাত্র সমুদ্র তরঙ্গের মতো ছুটে আসছে। ওরা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে ঢুকে যাচ্ছে। পুলিশের ব্যারিকেড তুচ্ছ করে ওরা ঝাঁপিয়ে পড়ছে ভিতরে। সে দেখছিল। ওর গর্বের অন্ত ছিল না। অজস্র পলাশ গাছ যদি কোথাও থাকে তার লাল পাপড়ি, ওর মনে হল ওরা পলাশের পাপড়িই হবে-নতুন আকাশ এমন রাঙা হতো না, যেন লক্ষ লক্ষ পলাশের পাপড়ি বাংলাদেশের আকাশ নিমেষে ঢেকে দিচ্ছে—আকাশটা রাঙা হয়ে গেলে, মতিনসাহেব বলে উঠলেন, ভাইসাব, ফ্যাসিস্ট লীগ সরকার আমাদের দাবি বানচাল করে দেবার জন্য ১৪৪ ধারা জারি করেছে।

    সামসুদ্দিনের সাদা রঙের শালের উপর নানারকম প্রজাপতি আঁকা। সে শালটা দিয়ে মুখ মুছল। এই শীতের দুপুরে সে নেমে যাচ্ছে। সে শালটা ঝেড়ে কাঁধে ফেলে রাখলে মনে হল প্রজাপতিগুলি উড়ে গেছে। প্রজাপতি উড়ে গেলে আর কিছু থাকে না। আজ এই দিনে মাঠে মাঠে যত ফুল আছে, সব ফুল থেকে প্রজাপতি উড়ে যাচ্ছে। এমনকি জালালির কবরে সে যে প্রজাপতি উড়িয়ে দেবে বলেছিল, পুলিশের অত্যাচার দেখে মনে হচ্ছে তাও সে আর বুঝি পারবে না। ফলে কবর থেকে জালালির মুখ ভেসে ভেসে চলে আসছে। জালালি যেন তাকিয়ে আছে অথবা সেই মহারাত্রির ঘটনা এই প্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে হুবহু মনে পড়ে গেল। জালালি ক্ষুধায় হাঁসটার মাংস চিবুচ্ছে। কড়মড় করে হাঁসের হাড় গিলে ফেলছে। কী নিষ্ঠুর ছিল সেই ক্ষুধার্ত মুখের ছবি! এবং পেট ভরে গেলে জালালির মনোরম মুখ – সে এই বাংলাদেশে এমন সুন্দর মনোরম মুখের ছবি আঁকতে চেয়েছে। পেট ভরে গেলেই মানুষের আর দুঃখ থাকে না। আল্লার দুনিয়ায় বেঁচে থাকতে ভালো লাগে। সে যে একটা শপথপত্র রেখে দিয়েছিল জালালির কবরে, সেই শপথপত্রটাও যেন কবরের নিচ থেকে উঠে এসে একটা ফেস্টুন হয়ে গেছে বাতাসে পতপত করে উড়ছে। সে যা চেয়েছিল তা করতে পারে নি। কারা এসে সব উল্টে পাল্টে দিল। সে আর মুসলিম লীগ জিন্দাবাদ, এমন বলতে সাহস পায় না। কত সব নীচ হীন স্বার্থপর এসে ওর যে শপথপত্র ছিল জালালির কবরে, ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে দিয়েছে। সে মতিনসাহেবের গলার সঙ্গে সুর মিলিয়ে বলে উঠল, ফ্যাসিস্ট লীগ সরকার আমার আপনার মুখের ভাষা কাইড়া নিতে চায়।

    সামসুদ্দিন এই বলে আরম্ভ করল। হাজার হাজার তরুণ, যুবা উন্মুখ হয়ে শুনছে। মহারণে যাবার আগে এই কঠিন প্রতিজ্ঞার কথা ওরা শুনে যাচ্ছে। ওরা কেউ কোনও কথা বলছে না। বাংলাদেশ আমাদেরই বাংলাদেশ, ভাষা আমাদের বাংলা ভাষা, বাংলার জল, বাংলার মাটি আমাদেরই নিকনো ঘরের ছবি, তাকে ফেলে যাব কোথা! তারে ছাইড়া দিলে থাকেডা কি!

    বুঝি ঈশমের হাতে সে এক মুশকিলাসানের লম্ফ দেখতে পেল। কেন যে এতদিন পর ঈশমচাচার কথা ওর মনে এল সে জানে না। যেন সেই ফকিরসাব হাতে মুশকিলাসানের লম্ফ-হেঁটে হেঁটে যাচ্ছেন। তাঁর পিছনে কে যেন বার বার তাঁকে অনুসরণ করতে বলছে। সে এতদিন ঈশমচাচার কোন খোঁজই রাখেনি। ঠাকুর বাড়ির সবাই চলে গেছে—তারপর চাচার কী হল, সে কোথায়, সে জানে না। সে জানে না ঈশম অন্নহীন ভূমিহীন। ঈশম হয়তো গভীর রাতে তরমুজের জমিতে ফিরে আসতে চায়। ঈশম হয়তো দেখতে পায় তখন তার নীলকণ্ঠ পাখিরা সব উড়ে গেছে কোথাও। হাতের তালিতে আর ওরা ফিরে আসবে না। ঠাকুরবাড়ির মানুষদের ও-পারে বুঝি এতদিনে সেই পাখিটার খোঁজ মিলে গেছে। না মিলে গেলে ওরা আবার নদী বন মাঠ পার হয়ে ছুটবে। সামসুদ্দিনের মনে হয়েছিল, তার পাখি আকাশে ওড়ে না, নদীর পাড়ে বসে থাকে। দেশভাগের পর পরই সে ভেবেছিল, তবে বুঝি এবারে সব মিলে গেল—কিন্তু হায়, যত দিন যায়—সে দেখতে পায় সংসারে সবাই পাখিটাকে ছেড়ে দিয়ে বসে থাকে—আবার খুঁজে বেড়ায়। পেলে মনে হয় পাখি মিলে গেছে, দুদিন যেতে না যেতেই মনে হয় পাখিটা আর নীলরঙের নয়, কেমন অন্য রঙ হয়ে গেছে। সে বলল, এটা আমাদের জীবন-মরণের শামিল। থামলে চলবে না। আমাদের সংগ্রাম চলছে, চলবে।

    সামসুদ্দিন একটু দম নিল।

    বড় রাস্তায় সব পুলিশের গাড়ি টহল দিচ্ছে! দোকানপাট বন্ধ। সারা শহর থমথম করছে। পুলিশেরা মাঝে মাঝে কোথাও টিয়ার গ্যাসের শেল ফাটাচ্ছে। অথচ বার বার কেন যে একজন মানুষ, আজ সবচেয়ে বেশি তাকে ইশারায় ডাকছে বুঝতে পারছে না। সে এবার বলতে চাইল, আমি আবার যাব আপনার কাছে। তার আজ সবার কথা মনে হচ্ছে। সেই ছোট ছেলে সোনার কথা মনে হচ্ছে। সে যখন সোনার মতো ছিল তখন ঈশমচাচা গভীর রাতে এসে ডাকতেন, সামু ঘুমাইলি?

    —না ঘুমাই নাই।

    —তর লাইগা আনছি।

    —কী আনছেন চাচা? সে ঘুম থেকে উঠে বাইরে আসত। দশমীর বাজনা বাজছে না। বিসর্জন হয়ে গেছে ঠাকুরের। দশমীর মেলা থেকে সে ফিরে কখন ঘুমিয়ে পড়েছিল টেরই পায়নি। উঠে দেখত চাচা উঠোনে দাঁড়িয়ে আছে। হাতে ঝকঝকে টিনের তলোয়ার।

    সামু ঝকঝকে তলোয়ার দেখে চাচাকে জড়িয়ে ধরত। সে দুগ্‌গাঠাকুরের তলোয়ারটা বালিশের নিচে রেখে দিত। সকাল হলে সে রাজা সেজে বাড়ি বাড়ি ঘুরে আসত. মাথায় তার আমপাতার মুকুট।

    সামুর মনে হল ওর সেই আম-জামপাতার মুকুট এখনও কে যেন মাথায় তার পরিয়ে রেখেছে। সে যতই হিন্দুবিদ্বেষের কথা বলুক মাথার আম-জামপাতার মুকুট সে ফেলে দিতে পারেনি। ফেলে দিতে গেলেই দেখেছে ভিতরটা তার হাহাকার করে উঠেছে। মালতীর কথা মনে আসতেই আবেগে সে বলে উঠল, আজ আমাদের আন্দোলনের দিন, মায়ের ঋণ শোধ করার দিন। আমাদের মা, বাংলামার চেয়ে বড় কিছু নেই। যতদিন ঋণ শোধ না হবে, ততদিন আমাদের রেহাই নেই।

    ধীরে ধীরে ছাত্ররা এবার বের হয়ে গেল। ওরা বন্দুকের নলের সামনে গিয়ে দাঁড়াবে। আমাদের মা, বাংলা মার চেয়ে বড় কিছু নেই। দশজন করে এক একটা দল এগিয়ে যাচ্ছে। কী শান্ত নীল আকাশ। মাথায় সবার আম-জামপাতার মুকুট, রাজার মকুট। মা তাদের যেন পরিয়ে দিয়েছেন। তারা যেতে যেতে গান গাইছে, ওগো মা জননী, আমাগো মুখের ভাষা কাইড়া নিতে চায়, আমরা কি করি!

    সফিকুর দশজনের একটা দল নিয়ে হাঁটছে। হাতে পোস্টার। তাতে লেখা—চলো যাই চলো, যাই চলো যাই—চলো পদে পদে সত্যের ছন্দে, চলো দুর্জয় প্রাণের আনন্দে। কারও পোস্টারে অথবা কণ্ঠে লেখা—ওরা গুলি ছোড়ে এদেশের প্রাণে দেশের দাবিকে রোখে, ওদের ঘৃণ্য পদাঘাত এই বাঙালীর বুকে, ওরা এদেশের নয়, দেশের ভাগ্য ওরা করে বিক্রয়, ওরা মানুষের অন্নবস্ত্র শান্তি নিয়েছে কাড়ি, একুশে ফেব্রুআরি, একুশে ফেব্রুআরি। সব শেষে দোহারের মতো সফিকুর সবার সঙ্গে গায়, আমরা কি যে করি!

    ফতিমা যাচ্ছে দশজনের একটা দল নিয়ে। ওদের শাড়িতে জমিনের রঙ সাদা, পাড়ের রঙ নীল। ওরা বুকে ব্যাজ এঁটে নিয়েছে—একুশে ফেব্রুআরি। শীতের রোদে ওরা এগিয়ে যাচ্ছে। তারাও গাইছে সমস্বরে—আমরা কি যে করি!

    এ-ভাবে যাচ্ছে। একের পর এক দশজনের একটা দল বের হয়ে যাচ্ছে। হাতে নানা রঙের ফেস্টুন। মুখে গরিমা। তারা বন্দুকের নলের সামনে ধীর পায়ে এগিয়ে যাচ্ছে। তারা বাংলার জল, বাংলার বায়ু বলতে বলতে চলে যাচ্ছে। শহরবাসীরা জানালা দরজা বন্ধ করে বসে রয়েছে। ভয়, কখন দাবানলের মতো বিদ্রোহী ছাত্ররা আগুন জ্বালিয়ে দেবে ব্যারাকে ব্যারাকে। ওরা শার্শির ফাঁকে দেখল, কী নির্ভীক ছাত্ররা! ছাত্ররা পুলিশ কর্ডনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, আর অনবরত গাইছে, আমরা কি যে করি!

    আর এই কী করি, কী করি করতেই রাইফেল গর্জে উঠল। মেডিক্যাল কলেজের শেডের নিচে ছাত্ররা এসে জমায়েত হচ্ছিল—তখন এমন এক কাণ্ড। কাণ্ড আর কাকে বলে। মানুষেরা চোখ মেলে দৃশ্যটা দেখতে পর্যন্ত পারছে না। দরজা জানালা বন্ধ করে দিয়েছে। শার্শির ফাঁকটুকু পর্যন্ত রাখেনি। কি জানি ফাঁকে ফোকরে যদি গুলি ঢুকে যায়। দাঁতে দাঁত চেপে কে তখন বলে উঠল বেইমান। এমন হিং ছবির ভিতরও ওরা এগিয়ে যাচ্ছে, ওরা ওদের বুকের বল হারাচ্ছে না, ওরা গাইছে, আমরা কি যে করি! ওরা হাত তুলে যেন পারলে আকাশ থেকে সূর্য উপড়ে আনে—ওরা সমস্বরে বলছিল—আমাদের ভাষা, বাংলা ভাষা। রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই।

    ভাষা রক্তে তখন বাংলার ঘাস মাটি ফুল ভেসে যাচ্ছে। যা কিছু রঙ নীল অথবা সবুজ সবই কেমন লালে লাল হয়ে গেল। মনে হচ্ছে সারা আকাশটাই একটা শিমুলের গাছ, ডালে ডালে অজস্র লাল ফুল, ফুলের পাপড়ি এবার এই রাজপথে, মিনারে গম্বুজে ছড়িয়ে পড়বে। গ্রামে, মাঠে, শহরে, গঞ্জে বাংলার মানুষ আকাশে এতসব শিমূল ফুলের পাপড়ি উড়তে দেখে যেন হা-হুতাশ করছে—এ-ঋণ শোধিবে কে! এই যে হৃদয় ভেঙে টুকরো টুকরো –এ-ঋণ শোধিবে কে! কে মানুষ এমন আছে বলতে পারে, খামু দামু ঘরে যামু তাজা রক্ত মায়েরে দিমু। আর কি দিমু তোমারে, দিমু আমার জান প্রাণ। সফিকুর হাইকোর্টের সামনে তার জানপ্রাণ দিয়ে মায়ের সম্মান রক্ষা করেছে। ওর দু’হাতে শক্ত করে ধরা পোস্টার। সে পড়ে গেলে পোস্টারটা ওর নিচে না পড়ে যায়, মায়ের জন্য তার মাথার কাছে পাতা আছে আসন, সে মাথার কাছে বিছিয়ে রেখেছে পোস্টার—আমার মুখের ভাষা অরা কাইড়া নিতে চায়। সফিকুরের রক্তে পোস্টার ডুবে আছে। পোস্টারের নীল অথবা সবুজ রঙ চেনা যায় না। রক্তের এক রঙ। লাল রঙ। নীল রঙের পোস্টারে অজস্র নক্ষত্রের মতো রক্তবিন্দু লেগে এই মহাকাশকে ব্যঙ্গ করছে। সফিকুরের চোখ বোজা, যেন সে য়ের কোলে ঘুমিয়ে আছে। শিশুর মতো মুখখানি নরম সাদা নীল চোখের মণিকোঠায় একটা মাছি উড়ে উড়ে বসছে।

    ফতিমা পাশে স্থির। সবাই মুহূর্তের জন্য কেমন ঠাণ্ডা মেরে গেছে। সে দাঁড়িয়ে সফিকুরের মুখ দেখছিল। মাছিটা কী নির্ভয়ে ওর চোখের ওপর বসে রয়েছে। সে পাশে বসল। চোখ থেকে মাছিটাকে তাড়াল। তারপর কপালে হাত দিয়ে দেখছে—সেই আম-জামপাতার মুকুট ওর মাথায় আছে কিনা! হাত দিতেই সে অনুভব করল, বড় সুন্দর সেই মুকুট, শিশুবয়সের সেই পাতার মকুট। সবাই পাতার মুকুট পরে যেন রাজা-রানী খেলতে যাচ্ছে। সেও সফিকুরের সঙ্গে নদীর চরে। কোন তরমুজ খেতে বুঝি রাজা-রানী খেলতে নেমে যাচ্ছে। সে কপালে হাত দিয়ে বসে থাকল। ফিনকি দিয়ে যে রক্তটা উপচে এসে মুখের চারপাশে পড়েছে—আঁচল দিয়ে সেটা বড় ভালোবাসায় মুছিয়ে দিল। বলতে ইচ্ছা হল, তুমি খেলবে না আমাদের রাজা-রানীর খেলা? সফিকুর বুঝি হাসছে। কেন, আমাকে রাজার মতো লাগছে না? তুমি মাথায় হাত দিলে টের পাবে আমি পাতার মুকুট পরে আছি।

    এবার সে সফিকুরের বুকে হাত রাখল। সামনে ভীরু কাপুরুষের মতো পুলিশের দলটাকে আজ ভীষণভাবে উপেক্ষা করতে ভালো লাগছে। বুকে উত্তাপ আছে এখনও। ভালোবাসার উত্তাপ। সে জানে, বেশি সময় বসে থাকতে পারবে না। ওরা ছুটে এসে এক্ষুনি সফিকুরকে ঘিরে ফেলবে। তাড়াতাড়ি সে নীল রঙের পোস্টার মাথার উপর তুলে নিল। ওদের আসবার আগেই এই পোস্টার নিয়ে কোথাও পৌঁছে যেতে হবে। সে সফিকুরকে পিছনে ফেলে এবার হেঁটে যাচ্ছে। ভয় লাগলে সাহস ফিরে পাবার জন্য সে কবিতা বলছে মহাকবির—কখন মরণ আসে কে বা জানে—কালীদহে কখন যে ঝড় ফসলের নাল ভাঙে—ছিঁড়ে ফেলে গাংচিল শালিকের প্রাণ জানি নাকো—তবু যেন মরি আমি এই মাঠ ঘাটের ভিতর…।

    .

    এই মাঠ ঘাটের ভিতর তখন আর একজন মানুষ হাঁটছিল। সে ফিরে যাবে তার তরমুজের জমিতে সে কতদিন হল বের হয়েছে দেশ থেকে। তার যেন সহসা মনে পড়ে গেছে, সে এই যে ঘুরে ঘুরে না খেয়ে না দেয়ে কেমন এক ভবঘুরে মানুষের মতো গাছের নিচে বসে থাকছে, কেউ ডেকে খেতে দিলে খাচ্ছে, নয়তো খাচ্ছে না, কেউ বলে না দিলে সে হাঁটছে না—তাকে তরমুজের জমিতে ফিরে যেতে হবে। সে বুঝি বুঝতে পারছে তার মাটির নীচে সামান্য আশ্রয় চাই। সারা দেশ চষে চষে নিজের জন্য সে একখণ্ড জমি পছন্দ করতে পারল না। নদীর চর, তরমুজের খেত মনে হলেই সে বুঝতে পারে ভিতরে তার একটা ভীষণ কষ্ট। অভিমান করে যে সে দেশ ছেড়ে বের হয়ে ছিল, সে-পোড়া দেশে আর সে থাকবে না, শেষ সময়ে মনে হয়েছে সে পৃথিবীর অন্য কোথাও গিয়ে মরে শান্তি পাবে না। সুতরাং অন্নহীন ভূমিহীন ঈশম ফের তার তরমুজের জমিতে গিয়ে বসবে বলে হাঁটছে। গ্রাম মাঠ পার হয়ে সে চলে যাচ্ছে। কারও সঙ্গে কথা বলছে না। সে সোজা হেঁটে যাচ্ছে। না পারলে কোনও গাছতলায় শুয়ে থাকছে। আবার শরীরে সামান্য বল ফিরে এলেই সে হাঁটছে। তার বিরাম নেই বিশ্রাম নেই হাঁটার। তাকে শেষ সময়ে সেখানে যেতেই হবে।

    তারপর একদিন সে তরমুজের জমিটার পাশে যখন দাঁড়াল—কে বলবে তখন এই সেই ঈশম। ছেঁড়া তফন। গায়ে জামা নেই। নাকে সর্দি। চোখে পিচুটি। শীর্ণকায়। ক্ষুধায় থরথর করে কাঁপছে। সে দাঁড়াতে পারছে না। কুকুরটা ওর পায়ে পায়ে ঘুরছে। জমির পাশে এসেই মনে হল, এ-জমি তার নয়। জমিটা যে হাজিসাহেবের বেটাদের দিয়ে গেছন ছোটঠাকুর, এতদিন পর কথাটা ফের মনে হতেই ওর ভারি হাসি পেল। ওর মাথায় কী কোথাও গণ্ডগোল হয়েছে! কী করে যে ভুলে গেল, জমিটা তার নয়, অন্যের! অথচ সে দীর্ঘ পথ হেঁটে এসেছে জমিটা নিজের ভেবে। রাতের আঁধারে ফিরে এসেছে বলে কেউ তাকে দেখতে পাচ্ছে না। দেখতে পেলে সবাই কী হাসাহাসি করত! আরে মিঞা তুমি কই আছিলা এদ্দিন! শরীরের দশা এমন ক্যান। য্যান কেউ নাই তোমার? রাইত বিরাতে একা ঘুরলে তোমায় কেউ মনুষ্য কইব না। ঝোপে-জঙ্গলে পালাইয়া থাক। কে কখন কামড়াইব টের পাইবা না।

    কী এক ভালোবাসা এই জমির জন্য তার সে নিজেও জানে না, বোঝে না কেন এই ভালোবাসা! সে কেন যে আবার তার জমিতে ফিরে এল! সে ক্ষুধায় কাতর। অন্ধকার বলে কিছু দেখতে পাচ্ছে না। না কী সে বছরের পর বছর ঠিকমতো আহার না পেয়ে অন্ধ হয়ে যাচ্ছে। ওর বড় ইচ্ছা দেখার এই জমিতে হাজিসাহেবের বেটারা কত বড় তরমুজ ফলিয়েছে। এই জমিতে শুয়ে থাকার ইচ্ছা। সে ভাবল এখানেই আজ রাত কাটিয়ে দেবে। ওর এই মাটি, কত যত্ন করে সে মাটিতে চাষাবাদ করত, কত কষ্ট করে অনাবাদী জমি সে আবাদী জমি করে তুলেছিল। আর সেই দিনের কথা মনে হলে ওর এখনও চোখে জল আসে। সবার কী ঠাট্টা-তামাশা, ঠাকুরের বড় ছেলের মতো ঈশমটাও পাগল! উরাট জমিতে চাষ। কিছু ফলে না জমিতে, কেবল বেনা ঘাস আর বালি। ঈশম বড় যত্নে এবং ভালোবাসায় আবাদ করে কী যে সে করেছিল জমির জন্য মনে করতে পারে না, কেবল মনে হয় সে আলে দাঁড়িয়ে সব তৃষ্ণার্ত মানুষদের তরমুজ কেটে খাইয়েছিল। সে আবার ফিরে এসেছে। তরমুজের পাতার নিচে সে শুয়ে থাকবে। শুয়ে থাকলেই শান্তি। সে শান্তির জন্য পাতা ফাঁক করে উবু হয়ে অন্ধকারে বসল। মাটতে হাত দিল। থাবড়ে-থাবড়ে সে মাটিটার সঙ্গে কথা বলছে। আবার ফিরা আইলাম মা জননী। তর কাছে ফিরা আইলাম। সে মুঠো-মুঠো মাটি তুলে গায়ে মুখে মেখে নিচ্ছে। কাছাকাছি কোথাও কোনও তরমুজ ফলে আছে কি-না হাত দিয়ে খোঁজার চেষ্টা করছে। যেন পেলেই সে একবার পাঁজাকোলে তুলে নেবে। কত ওজন, কত বড়, মা-জননীর সেবা-যত্ন ঠিক না হলে ফসল ফলে না, সে তরমুজ ওজন করে যেন বলতে পারবে হাজিসাহেবের বেটারা কেমন যত্ন-আত্তি নিচ্ছে। কম ওজনের হলে মনে হবে শালারা বেইমান।

    সে খুঁজে খুঁজে একটাও তরমুজ পাচ্ছে না। বেশি দূর সে খুঁজতে পারছে না। এখানে এসেই শরীরটা তার ক্রমে কেন জানি স্থবির হয়ে আসছে। হাত পা অসাড়। কেবল কুকুরটা ওর পাশে সেই থেকে আছে। কুকুরটা সেই থেকে কতকাল, এতকাল কুকুর বাঁচে না, তবু কোনও ভালোবাসার আকর্ষণে কেন যে এখনও বেঁচে আছে। কুকুরটাও আর কুকুর নেই, বড়মানুষদের কুকুর কামড়ে সারা শরীরে তার ঘা করে দিয়েছে। সুতরাং কুকুরটার জন্য তার ভারী মায়া। সে কুকুরটাকে ফেলে কোথাও যায়নি, কুকুরটাও তাকে ফেলে কোথাও যাচ্ছে না। এখন একটা তরমুজ পেলে সে কামড়ে একটু রস খেলে আবার কিছুদিন বুঝি বাঁচতে পারত। আবার সে তরমুজের জমিতে বসে নামাজ পড়তে পারত। আর তখনই হাতের কাছে ছোট একটা তরমুজ পেয়ে গেল। তরমুজটা টেনে সে কাছে আনতে পারল না। হামাগুড়ি দিয়ে তরমুজটার কাছে যাচ্ছে। দু’হাতে ভর করে সে যেতে চেষ্টা করছে। তরমুজটাকে সে কাছে আনতে পারছে না। হাত থেকে হড়কে যাচ্ছে। ওর ক্ষুধার্ত মুখ জ্বলছিল। কোনও রকমে সে তরমুজটাকে মুখের কাছে এনে কামড় দেবে, কোনওরকমে একটু তৃষ্ণার জল পান করবে, করলেই গলা ভিজে যাবে, ওর যে নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে সেটা আর থাকবে না। সে কামড়ে দেখল তরমুজটাতে রস নেই। ওর গলা ভিজছে না। সে ক্রমে চোখে ঘোলা দেখছে। মাটির উপর সে দু’হাত বিছিয়ে শুয়ে পড়ল। কুকুরটা বুঝতে পারছে না কেন তার মানুষ এমনভাবে পাতার নিচে লুকিয়ে পড়ছে! মাটিতে হাত-পা ছড়িয়ে উবু হয়ে আছে। নড়ছে না। মানুষটা যে মরে যাচ্ছে কুকুরটা তা বুঝতে পারছে না। রাতে গাছের নিচে ঈশম ঘুমালে সে যেমন পাহারায় থাকে—আজও মানুষটা ঘুম যাচ্ছে বলে শিয়রে জেগে বসে থাকল। সে আর ঈশম, মাথার উপর আকাশ, অজস্র নক্ষত্র এবং অন্ধকার, সোনালী বালির নদী, নদীর জল এবং অর্জুন গাছ মাঠের পাশে। কুকুরটা দুরে শেয়ালেরা উঠে আসছে টের পেল। সে সেই অন্ধকার তরমুজের জমিতে বসে সব লক্ষ রাখছে। সে দু’বার মাটি শুঁকে ঈশমের চারপাশটা একবার ঘুরে এসে শিয়রে বসল। ভয় পেয়েই কুকুর এমন করছে। ভয় পেয়েই কুকুরটা শিয়রে বসে ঘেউঘেউ করে ডাকছে। সারারাত সে সতর্ক থাকছে। শেয়াল-কুকুর ঈশমকে খাবে ভেবেই সে ডাকছে। ঈশম তার মাটির কাছে তরমুজের পাতার নিচে মহানিদ্রায় মগ্ন। আশ্বিনের কুকুর এটা টের পেয়ে আর বসে পর্যন্ত থাকতে পারল না। শত্রুপক্ষ সবদিকে। সে শিয়রে আর বসে থাকছে না, সারাক্ষণ ঘুরছে ঈশমের চারপাশে। কোন দিক থেকে শেয়াল-কুকুরেরা উঠে এসে দাঁত বসাবে কে জানে!

    হাজিসাহেবের বেটারা সকালে তরমুজ তুলতে এসে টের পাবে একজন ভিখারি মানুষ তরমুজ পাতার নিচে মরে পড়ে আছে। প্রথমে ঈশমকে ওরা চিনতেই পারবে না। এই ঈশম। ওর কাঠা দুই ভূঁই ছিল বাড়ির পাশে। সেটাও তারা কাঁচা বাঁশের বেড়ায় নিজের করে নিয়েছে। চিনে ফেললেই ভয়। যদি ওটা আবার সে ফিরে চায়। তবু ঈশম এ-পোড়া বাংলাদেশে আবার ফিরে আসতে চায়। আবার জন্ম নিতে চায়। যেন একটা লাঠি দিলে সে এক্ষুনি উঠে দাঁড়াবে। মাথায় পাগড়ি হাতে লণ্ঠন নিয়ে রাতের আঁধারে সে খবর দিতে ছুটবে, ধনমামা, আপনের পোলা হইছে। আমারে কিন্তু একটা তফন দিতে হইব।

    অথচ সকালে অঞ্চলের মানুষেরা দেখল নদীর পাড়ে বড় রাস্তায় ঝকঝকে একটা মোটরগাড়ি। এ-গাড়ি দেখলে সবাই টের পা: সামসুদ্দিনসাহেব শহর থেকে এসেছে। সে নদীর পাড়ে গাড়ি রেখে সোজা নিজের গ্রামের দিকে উঠে গেল না। হিন্দু পাড়ার দিকে উঠে যাচ্ছে। খুব কম আসে সামসুদ্দিন। যাদের বয়স বেড়েছে তারা জানে সামু আজকাল সময়ই পায় না। বাড়িতে ওর এখন কেউ নেই। জমিজায়গা দেখার জন্য শুধু একজন লোক আছে। তবু সে বছরে একবার অন্তত আসে। একদিন দু’দিন থাকে, তারপর আবার শহরে চলে যায়। সে কতবারই এসেছে। ভুলেও হিন্দু পাড়ার দিকে উঠে যায়নি। কী যে ভিতরে ছিল কে জানে! সে ওদিকে একেবারেই মাড়াত না। কার কাছে যেন ধরা পড়ে যাবে, কার কাছে বুঝি কী ফেরত দিতে হবে! সে ভয়ে গোপাটে পর্যন্ত নেমে আসত না। কিন্তু আজ এত সকালে সে এদিকে না এসে ওদিকে যাচ্ছে। ওদিকে কিছু নেই। খালি। পাড়াকে-পাড়া খালি। খাঁ-খাঁ করছে সব। সে একা যাচ্ছে না। সঙ্গে দুই যুবতী মেয়ে। ওরা দেখে চিনতেই পারল না, যে মেয়েটা ভোর হলে বটগাছের নিচে ছাগল দিয়ে আসত, যে মেয়ের নাম ফতিমা, নাকে নোলক ছিল, পায়ে মল ছিল, এখন সে মেয়ে কত ডাগর, কী সুন্দর চোখ-মুখ—গাছের পাতার মতো হাওয়ায় কাঁপছে। ফতিমার সুন্দর লতাপাতা আঁকা শাড়িতে প্রায় যেন এই অঞ্চলের দৃশ্য আঁকা রয়েছে। সামু তার মেয়েকে নিয়ে নীরবে হেঁটে হেঁটে চলে যাচ্ছে সেদিকে। যারা ছোটাছুটি করে ওর কাছে গেছে তাদের সঙ্গে কিন্তু সামু কোনও কথা বলছে না। নীরব। বুঝি ওর শৈশবের কথা মনে পড়ে গেছে। পুকুরপাড়ে দাঁড়িয়ে মালতী বুঝি তাকে ডাকছে সামু, যাবি না চুকৈর আনতে। যাবি না নদী সাঁতরে ও-পার। তুই ডুব দিয়া নদীর অতল থাইকা আমার লইগা মাটি তুলবি না? নদীর অতলে মাটি এঁটেল এবং পুতুল তৈরি করতে এমন মাটি আর নেই। সামুর বুঝি মালতীর পুতুলের জন্য মাটি তোলার কথা মনে হচ্ছে।

    এখন আর একজন এমন ভাবছে। ফতিমা আনজুর পিছনে। সে বাবার সঙ্গে কতদিন পর দেশে ফিরে এসেছে। গাড়ি থেকে নেমেই সে কেবল শুনতে পাচ্ছে—কেউ তাকে গাছের নিচে দাঁড়িয়ে ডাকছে। সফিকুরের মৃত্যুর পর সে বড় হাহাকারে ভুগছিল। তার কিছু ভালো লাগত না। সে চুপচাপ জানালায় একা দাঁড়িয়ে থাকতে ভালোবাসত। সফিকুর তাকে কী কী বলেছে সব মনে করার চেষ্টা করত। কবে প্রথম দেখা, কিভাবে ফতিমার দিকে চোখ তুলে তাকিয়ে আবার সহসা নামিয়ে নিয়েছিল সে-সব মনে করার চেষ্টা করত। এসবের ভিতর ফতিমা জানত না সে ক্রমে বিষণ্ণ হয়ে যাচ্ছে। সে জানত না, ওর চোখ বসে যাচ্ছে। সে রোগা হয়ে যাচ্ছে। এবং সে কথা কম বলছে। আম্মা, বা’জান, যখন যে কেউ ওর সঙ্গে কথা বলেছে, সে-কথা শুনতে শুনতে অন্যমনস্ক হয়ে গেছে। বার বার প্রশ্ন করেও জবাব পাওয়া যায়নি। সামু মেয়ের মুখ দেখে ভয় পেয়ে গেছে। সফিকুরের মৃত্যুর পরই মেয়েটা কেমন শোকে পাষাণ হয়ে গেল। সে কিছু করতে পারছে না। মেয়েটা কখনও কাঁদে কি-না চুপি চুপি দেখার চেষ্টা করেছে। ওরা স্বামী-স্ত্রীতে জেগে থেকেছে রাতের পর রাত। ফতিমা রাতে সংগোপনে যদি কাঁদে। দিনের পর দিন মাসের পর মাস ওরা এমন লক্ষ করতে করতে দেখল মেয়েটা সারারাত না ঘুমিয়ে থাকে কিন্তু কাঁদে না। ভিতরে যে অসহ্য কষ্ট চোখ-মুখ দেখলে টের পাওয়া যায়। হাত-পা ছড়িয়ে যদি ফতিমা কখনও মহাশোকে কাঁদতে পারত, সে তবে নিরাময় হতো। সামুর ডাক্তার বন্ধু শেষপর্যন্ত এমন বলেছে। তুমি ওকে কোথাও নিয়ে যাও! পার তো দেশে নিয়ে যাও। সেখানে গেলে ওর শৈশবের কথা মনে হবে। মনে হলে বুঝতে পারবে, কিছুই থেমে থাকে না। এভাবেই মাটি মানুষ এবং নদীর জল বয়ে যায়। শৈশবের ভিতর ফিরে গেলে মানুষের শোক-দুঃখ অনেকাংশে লাঘব হয়।

    কথাগুলি সামুর ভালো লেগেছে। সে তার বন্ধুর পরামর্শ মতো এসেছে এই দেশে, বাংলাদেশে। নদীর চরে, তরমুজ খেতে, অজুর্ন গাছের ছায়ায়, হাসান পীরের দরগায় সে যাবে। মেয়েকে বলবে, মা, এই আমার দেশ, তোর দেশ, সবার দেশ। এখানে তুই জন্মেছিস, আমি, মালতী, সোনা, ঈশমচাচা, ফেলু সবাই জন্মেছি। মা, এই দেশ বাংলাদেশ, আমরা সবাই বাংলাদেশের মানুষ। তুই একজনের জন্যে পাষাণ হয়ে থাকবি সে ঠিক না। আয়। বলে সে মেয়ের হাত ধরে, শৈশব বলতে সে যা জেনে এসেছে সেই সোনাবাবু, অর্জুন গাছ এবং লটকন ফল, কচুর পাতায় প্রজাপতি এসবের ভিতর মেয়েকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। আর আশ্চার্য, যেতে যেতে সে সবকিছু ভুলে গেছে। মেয়ের হাত ছেড়ে সেই শ্যাওড়া গাছটার নিচে সে কেন একা একা চলে যাচ্ছে! এখানেই প্রথম মালতী কোটা দিয়ে ওর ইস্তাহারটা নামিয়ে এনেছিল, এখানেই মালতী প্রথম শোকে ভেঙে পড়েছিল। সেই থেকে কেন যে অভিমান করে মালতীর ওপর বার বার সে প্রতিশোধ নিতে চেয়েছে। সে দেখল—সেই ইস্তাহার এখন সে নিজেই ছিঁড়ে ফেলেছে। ছিঁড়ে ফেলে বাতাসে উড়িয়ে দিয়েছে। কাগজের সেই হাজার হাজার টুকরো এখন বাতাসে উড়ছে। কে ক’টা সংগ্রহ করতে পারে—এমন বাজি রেখে মালতী এবং সে ছুটছে। ওরা প্রজাপতির মতো একটা একটা ধরে কোঁচড়ে রাখছে—এমন একটা খেলা চোখের উপর জমে উঠলে ওর মনে হল দূরে গাছের নিচে দাঁড়িয়ে কেউ হাউহাউ করে কাঁদছে। কে এমনভাবে কাঁদতে পারে!

    এতক্ষণে ওর খেয়াল হল যে, সে মেয়ের হাত ধরে আসছিল, অথচ মেয়েটা তার পাশে নেই। সামু এখানে এসেই এমন প্রসন্ন সকাল দেখতে পাবে আশা করেনি। জুন মাসের আকাশ। মেঘ-বৃষ্টি থাকার কথা। অথচ একবিন্দু মেঘ নেই আকাশে, মাঠে ছোট ছোট পাটের চারা। ঠাকুরবাড়ির বড় বড় টিনের ঘরগুলি দেখা যাচ্ছে না, আর কেউ কোনওদিন দেখতেও পাবে না। ওর বুকটা ছ্যাৎ করে উঠল। ঠাকুরবাড়ির কোথায় কবে লাঠি খেলা হতো, কবে বাপ আসত সামুর হাত ধরে এবং লাঠি খেলা হলে ঈশমচাচা বাবাকে কিভাবে জড়িয়ে ধরত, মেয়েকে এমন বলতে বলতে আসছিল। যেন এভাবে দেশের কথা শৈশবের কথা ক্রমান্বয়ে বলে যেতে থাকলে মেয়েটা তার আরোগ্যলাভ করবে। ফতিমা তার মহাশোক ভুলে যাবে এবং তখনই সামুর মনে হল, মেয়েটা এইসব শুনতে শুনতে হঠাৎ হাত ছেড়ে বালিকার মতো ছুটেছিল। সে মেয়েটাকে ছুটে যেতে দেখেছে। ছুটে গিয়ে অর্জুন গাছটার নিচে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছে। ফতিমা তার শৈশবের জগতে ফিরে গেছে, সেও তার শৈশবের জগতে ফিরে যাবার জন্য মেয়েকে ফেলে এই গাছের নিচে এসে দাঁড়িয়েছিল। এবং সে কী সব ভাবছিল, ওর পাশে যে গ্রামের কিছু মানুষ দাঁড়িয়ে আছে তা পর্যন্ত সে বুঝতে পারেনি। কারণ, সে যে শিশু বয়সে একবার কী কারণে সেই মেয়েকে মারতে গিয়ে পিঠে দাগ বসিয়ে দিয়েছিল, তারপর আর সে মারেনি। কসম খেয়েছে, সে আর কোনওদিন মেয়ের গায়ে হাত তুলবে না। মেয়েটা তারপর কোনদিন কাঁদেনি। কেবল হেসেছে। ফতিমা হাসলে সে টের পেত ফতিমা হাসছে। কিন্তু কাঁদলে সে টের পায় না–কারণ, ফতিমা এখন বড় হবে গেছে। বড় হলে কান্নার নিয়মকানুন বদলে যায়। সে তবু এর ভিতর টের পেল কেউ কাঁদছে, বাংলাদেশের জন্য কাঁদছে।

    সুতরাং সে অস্থির হয়ে উঠল। যেদিক থেকে কান্না ভেসে আসছে সেদিকে সে ছুটল। শৈশবের মতো সে মাঠঘাট পার হয়ে যাচ্ছে। যেখানে দাঁড়িয়ে কেউ বাংলাদেশের জন্য কাঁদতে পারে সেখানে সে চলে যাবেই। সে পৌঁছেই দেখতে পেল–ফতিমা অর্জুন গাছটার নিচে দাঁড়িয়ে কাঁদছে। আনজু দু’হাতে আগলে রেখেছে ফতিমাকে। বোবার মতো আনজু দেখছে সব বড় বড় অক্ষর গাছে লেখা। সে অক্ষরগুলি পড়ছে। গাছ বড় হয়ে যাওয়ায় অক্ষরগুলি আরও বড় হয়ে গেছে। যেন দেশের মানুষকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখানোর জন্যই অক্ষরগুলি যতদিন যাবে তত বড় হয়ে যাবে। বাংলাদেশের মানুষ বড় বড় হরফে পড়বে, জ্যাঠামশয়, আমরা হিন্দুস্থানে চলিয়া গিয়াছি—ইতি সোনা।

    বড় বড় অক্ষর কী গভীর ক্ষত নিয়ে এই মহাবৃক্ষ দাঁড়িয়ে আছে। এ দৃশ্যে সামু নিজে বড্ড বেশি অভিভূত হয়ে গেল। মনে হল তার, এই দেশ বাংলাদেশ। এই দেশে অন্য কোনও জাত নেই, ধর্ম নেই, সে মেয়েকে সান্ত্বনা দেবার কোনও ভাষা পেল না। মেয়ের মাথায় হাত রেখে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকল। তখন মাঠ থেকে কিছু লোক ছুটে আসছে। ওরা এসে খবর দিল ঈশম তরমুজের জমিতে মরে পড়ে আছে। কখন সে মরেছে কেউ বলতে পারে না। জমিতে তরমুজ এবার ভাল হয়নি। শুধু পাতা সার। দু’দিনের ওপর হবে জমিতে কেউ তরমুজ তুলতে যায়নি। কেউ জানে না কখন থেকে ঈশম পাতার নিচে মরে পড়ে আছে।

    এই জমির এক অংশে ঈশমের জন্য একটু মাটি চেয়ে নিল সামু। এই জমির নিচে ঈশম চুপচাপ শুয়ে থাকবে আবহমান কাল। নানারকম ঘাস জন্মাবে কবরে। ফুল ফুটবে ঘাসে। ঈশমের এই কবর থেকেই বাংলাদেশের ছবিটা স্পষ্ট বোঝা যাবে।

    ঈশমের কবরে সামু এবার নতুন একটা ইস্তাহার রেখে দিল। ইস্তাহারটার নাম বাংলাদেশ। তারপর ওকে শুইয়ে দিল। নতুন পাজামা পাঞ্জাবি। সাদা দাড়ি ঈশমের। সে লম্বা হয়ে কবরে শুয়ে আছে। ভূমিহীন অন্নহীন ঈশমের কানে কানে মাটি দেবার আগে বলার ইচ্ছা হল, কিছুই করতে পারিনি এতদিন। স্বাধীনতার মানে বুঝিনি। আপনাকে দেখে মানেটা আমার পরিষ্কার হয়ে গেল। তারপর সে ঈশমের কবরে মাটি দিতে দিতে বলল, যার মাটি পেলে আপনি সবচেয়ে খুশি হতেন চাচা, সে নেই। সে থাকলে তাকে বলতাম, তুমি এসে একটু মাটি দিয়ে যাও বাবু। ওঁর আত্মা বড় শান্তি পাবে। সে বেইমান চাচা। আপনাকে ফেলে সে চলে গেছে। লিখে গেছে জ্যাঠামশাই, আমরা হিন্দুস্থানে চলে গেছি। যেন জ্যাঠামশাই ছাড়া তার বাংলাদেশে কেউ নেই।

    তারপর থেকেই মাঝে মাঝে আশ্বিনের কুকুর ঈশমের কবরের পাশে ঘোরাফেরা করলে টের পাওয়া যায় মহাবৃক্ষে সেই ক্ষত আবার মিলিয়ে যেতে শুরু করেছে। অর্জুন গাছটা আরও বড় হচ্ছে। ডালপালা মেলে সজীব হচ্ছে।

    প্রথম পর্ব সমাপ্ত

    ‘দেশভাগ বা নীলকণ্ঠ পাখীর খোঁজে’ সিরিজের পর্বসমূহ —

  • মানুষের ঘরবাড়ি

    মানুষের ঘরবাড়ি

    অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়

    [book]

    মানুষের ঘরবাড়ি

    ‘লেখক অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়ে’র ‘দেশভাগ সিরিজে’র প্রথম বই ‘নীলকন্ঠ পাখির খোঁজে’। বইটাতে দেশ বিভাগের আগের গ্রাম বাংলার মানুষের জীবনযাত্রা, সমাজ ব্যবস্থা, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, একক ও যৌথ পরিবারের সুখ দুঃখের এক অভূতপূর্ব অনুভূতির ছোঁয়া রেখে গেছে।

    ‘দেশভাগ সিরিজে’র দ্বিতীয় বই ‘মানুষের ঘরবাড়ি’ প্রথম পর্বের চরিত্র গুলো আস্তে আস্তে এক অপরের থেকে ছিন্ন হয়ে গেছে এখানে এসে। যেখানে ছিন্ন মূল মানুষ গুলো আশ্রয়ের আশায় খুঁজে চলছে; মানুষের ঘরবাড়ি। সোনা চরিত্রটি এখানে এসে বিলুর মাঝে ঘুমিয়ে গেছে। সব কিছু ছেড়ে আসা মানুষ গুলো পথে পথে ঘুরে, স্টেশনে রাত কাটিয়ে একটা সময় এসে নিজেদের আবিষ্কার করে ‘মানুষের ঘরবাড়ি’র মাঝে।

    দেশভাগ হয়ে গেলে নিজেদের ভিটে ছেড়ে দেশান্তরী হতে হয়েছিল বিলু আর তার পরিবারকে। বিশাল একান্নবর্তী পরিবার ভেঙে গিয়েছিল নতুন দেশে গিয়ে। অতঃপর বাবা, মা, ভাইবোনের সাথে বিলুর নতুন যাত্রা।

    বিলুরা ব্রাহ্মণ, বাবা নিজ দেশে জমিদারের সেরেস্তায় কাজ করতেন। কিন্তু নতুন দেশে এসে কি করবেন বুঝে উঠতে পারছেন না। পৌরোহিত্য করাই স্বাভাবিক কিন্তু রিফিউজিদের যে ঢল নেমেছে তার মাঝে অনেকেই নিজেকে ব্রাহ্মণ বলে দাবি করে। সুতরাং নতুন দেশের মানুষেরা সহজে কাউকে বিশ্বাস করে না। তাই বিলুদের ভেসে যাওয়া চলে। কখনও কোন দূর সম্পর্কের আত্মীয়ের বাসায়, কখনও রেল স্টেশনে কেটে যায় তাদের কয়েকটা দিন। সে সময়ে বাবা তার চলে যায় কোথায়, কাউকে কিছু না বলে। সে সময় বিলুর ছোট ভাই পিলু এদিক সেদিক ঘুরে বেড়ায়। সবার জন্য খাবার চুরি করতেও দ্বিধা করে না।

    এমন অবস্থায় অজ্ঞাতবাস থেকে ফিরে বিলুর বাবা কোথায় নিয়ে এলেন তাদের। এক বনের প্রান্তে এসে বললেন সে জমি কিনেছেন তিনি। ওখানেই হবে তাদের নতুন ঘরবাড়ি।

    সে অসম্ভব সম্ভব হয়েছিল কেবল বিলুদের জন্যই নয়। সাতচল্লিশ পরবর্তী অনেক মানুষের এই একই গতি হয়েছিল। তাদের প্রাথমিক গল্পটা অনেকটা এরকম। নিজ ভিটে, স্বাভাবিক জীবনযাপন থেকে হঠাৎ শেকড় ছাড়া হয়ে যাওয়া। তারপর থিতু হয়ে বসার চেষ্টা। সে চেষ্টায় সফল হয়েছিলেন বিলুর বাবা। অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে হয়েছিল বিলুদের নতুন ঘরবাড়ি। এ পর্যন্ত গল্পটা কেবল বিলুর না, তার মতো অনেকেরই।

    অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘দেশভাগ’ সিরিজের দ্বিতীয় বই ‘মানুষের ঘরবাড়ি’। ‘নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে’ উপন্যাসের সোনা, এখানে বিলু বা বিল্ব। দেশ ছেড়ে আসার পর কেমন করে তাদের দিন কেটেছিল, কেমন করে তাদের নতুন আবাস হলো সে গল্পই লেখক এখানে লিখেছেন। নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে যেমন বিমূর্ত ছিল, এ উপন্যাস তেমন নয়। এখানে নিরেট একটা গল্প আছে, যেখানে ধীরে ধীরে একটি পরিবার বিকশিত হয়। ছিন্নমূল থেকে নিজেদের বসত গড়ে।

    সেই সঙ্গে আছে অবশ্যম্ভাবী প্রকৃতির বর্ণনা। তবে এ পর্বে সে বর্ণনা বিলুদের বাড়ি এবং তার পারিপার্শ্ব কেন্দ্রিক। বিলুর বাবার মাধ্যমে, কখনও পিলুর মাধ্যমে তা লেখায় এসেছে।

    কিন্তু মূলত এ গল্প বিলুর। ইংরেজিতে ‘কামিং অফ এজ’ বলে একটা কথা আছে যার মানে, কৈশোর থেকে কারও প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া। এ উপন্যাসে বিলুর সেই সময়টার চিত্র খুব সুন্দর করে ফুটে উঠেছে। ঘরবাড়ি তৈরি হওয়ার পর তার পরীক্ষা দেওয়া এবং পড়াশোনার প্রতি তার আগ্রহ সত্ত্বেও যখন তাকে কাজে লাগানো হয় তখন বাড়ি ছেড়ে পালায় বিলু। পিতার স্বভাব বর্তেছে পুত্রে। কেবল বিলু একা না, পিলুও ঘরে থাকে না। চলে যায় এদিক সেদিক।

    বিলুর বড় হয়ে ওঠা, নিজের সাথে নিজের সংঘাত, সেই সঙ্গে পরিবার পরিবেশের সাথে ঘটে যাওয়া দ্বিধা দ্বন্দ্ব এ উপন্যাসের উপজীব্য বিষয়। আর তা পরিণতি পায় যখন উপন্যাসে লক্ষ্মীর আগমন হয়। বিলুর প্রথম টিউশন পড়ে যে বাড়িতে তা মূলত কালী মন্দির। সে বাড়িতে আশ্রিতা মেয়ে লক্ষ্মী। বিধবা মেয়েটির সঙ্গে বিলুর একটা সম্পর্ক গড়ে ওঠে না চাইতেই। আর লক্ষ্মীর কারণেই বিলুর সঙ্গে পরিচয় ঘটে মিমির। যে মিমির আসল নাম মৃন্ময়ী। বিলুরই কলেজের সহপাঠিনী। এক পুরুষকে দুই নারী অধিকার করতে পারে না। লক্ষ্মীর বেলায় বিলুকে পাওয়া তার সম্ভব ছিল না।

    অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় এ উপন্যাসে দেখিয়েছেন, ক্রমাগত দারিদ্রের মাঝে বেড়ে ওঠা একটি ছেলের মানসিক দ্বন্দ্ব। বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিবারের কাছ থেকে তার দূরে সরে যাওয়া। যাকে মনে মনে ভালোবাসে, তাকে কাছে টেনে নিতে না পারার দহন আর নিজে কিছু হয়ে ওঠার এক প্রচেষ্টা। কৈশোরের শুরু থেকে যৌবনের প্রারম্ভ পর্যন্ত তার সে টানাপড়েন তাকে ধীরে ধীরে একটা পরিণতির দিকে নিয়ে যায়। মানুষের ঘরবাড়িতে বসে আমরাও সে যাত্রার সঙ্গী হই।

    লেখক-পাঠক সর্বসম্মতিক্রমে এ উপন্যাস অতীনের সিরিজের দ্বিতীয় বই হিসেবে বিবেচিত হলেও এটি লেখা হয়েছে পরে। লেখকের মনে হয়েছিল একটা অংশ বাদ পড়ে গেছে। সেটি তিনি লিখেছিলেন। ‘নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে’-র মতো এ উপন্যাস বহুমুখী ও জটিল নয়। এ উপন্যাসের গল্পটা সরল। কিন্তু মানসিক জতিলতার সাথে সামাজিক অবস্থা মিলে জীবনটা সেখানে কিছুটা জটিল।

    সম্ভবত লেখক এ উপন্যাসের নানা অংশ নানা সময়ে অনেকদিন ধরে লিখেছেন। তাই পুনরুক্তি আছে অনেক জায়গায়। সিরিজের অংশ হলেও এ বই স্বতন্ত্র উপন্যাস। লেখনী সহজ সরল। তবে কৈশোরের মানসিক দ্বন্দ্ব এতোটাই গোলমেলে যে মাঝে মাঝে বিলুকে ধরে মারতে মনে চাইতে পারে পাঠকের।

    উপন্যাসের এক অসামান্য চরিত্র পিলু। বিলুর এ ছোট ভাইটির কোন ভালো নাম লেখক আমাদের বলেননি। কিন্তু পিলু নামেই সে প্রিয় হয়ে উঠবে সকলের। বনে জঙ্গলে ঘুরে বেড়ানো ছেলেটির বড় মায়া। তাই সে কখনও একটা কুকুর ধরে আনে, কখনও হনুমানের বাচ্চা। আবার পরিত্যাক্ত জঙ্গলেই সে খুঁজে পায় এক বুড়ির ঠিকানা। নবমী নামে সে বুড়ি বুঝি হয়ে ওঠে ইন্দির ঠাকরুন। বিলুর মা হয়ে ওঠেন সর্বজয়া আর বিলুর বাবা হরিহর। অন্তত বিলুর বাবা চরিত্রটি কিছুটা হরিহরের মতোই। অদৃষ্টে-দেবতায় বিশ্বাসী মানুষটি কিছুটা বাউন্ডুলে স্বভাবের। অন্তত স্ত্রীর মতো তিনি বিষয়ী নন। অথচ কি মমতা দিয়েই না তৈরি করেছেন মানুষের ঘরবাড়ি। যেখানে বিলুর মতো অন্তর্মুখী ছেলের টানে ছুটে আসে রায় বাহাদুরের নাতনী মিমি। অথচ বিলু পালিয়ে বেড়ায়। পিলু খুঁজে বেড়ায় তার দাদাকে।

    উত্তম পুরুষে বর্ণিত তিন খণ্ডের এ উপন্যাসের মূল চরিত্র বিলু হলেও পুরোটা জুড়ে পিলু বুঝি তার ছায়া হয়ে থাকে। আর মাঝে মাঝে সে ডেকে ওঠে, ‘দাদারে…’। সে ডাক, যে কোন পাঠকের কলজে কামড়ে ধরবে।

    নীলকন্ঠ পাখির খোঁজে সিরিজ লেখার পর অতীন বাবুর মনে হলো, জীবনের আসল পর্বটা বাদ পড়ে গেছে সিরিজ থেকে। সেই পর্বটা পরবর্তীতে লিখে সিরিজের মাঝে আনা হয়। প্রথম পর্বের চরিত্ররা এ পর্বে অনুপস্থিত। সোনা এ পর্বে ঘুমিয়ে আছে বিলুর মধ্যে।

    নামটাতেই অভিমান জড়িয়ে আছে। মানুষের ঘরবাড়ি থাকে। আমাদের তাও নেই। দেশভাগের পর ছিন্নমূল এক পরিবারের সংগ্রাম শুরু হয়। মাথা গোঁজার ঠাঁই নেই, এক স্টেশন থেকে আরেক স্টেশনে যাত্রা। বিনা টিকিটে। আজ এখানে, তো কাল সেখানে। এক সময় তারা দুবেলা পেটপুরে খেয়েছে, গোলাভরা ধান,‌ গাই-গরু কিছুরই অভাব ছিল না। এদেশে এসে তাদের শেষ সম্বলটুকু ক্ষুধার নিমিত্তে আহারে পরিণত করতে হয়েছে। আর বাকি সম্বল‌ এটুকুই—তারা সৎ ব্রাহ্মণ।

    পরিবারের বড় ছেলে বিলু। উপন্যাসের একটি বড় খণ্ড বিলুর ভাষ্যে বর্ণিত। বয়সন্ধিকালে আত্মসম্মানবোধ সবার মধ্যে বেশি কাজ করে। পরিবারের আর্থিক অবনতি, জলে পড়ে যাওয়া, তারা যে আত্মীয়র বাড়িতে আশ্রিত, এদেশের মানুষের কাছে রিফুজি, বারো-তেরো বছরের বিলুর মনে তা ভীষণ পীড়া দেয়।

    ঘুরেফিরে একসময় ঘরবাড়ি মেলে তাদের। দারুণ গর্বের বিষয় ছিন্নমূল পরিবারটির জন্য। থাকা খাওয়া হলে তখন বড় ছেলেটির পড়াশোনায় মন দিতে হয়। বিলুর আলাদা একটা জগত গড়ে ওঠে পরিবারের বাইরে।

    বাবা সরল মানুষ—কার বাড়িতে ঠাকুর পূজা, কোথায় বামুন ভোজের জোগাড় চাই—এসব করে তার দিন যায়। মা বড্ড সাংসারিক—বাগানের বাড়তি সবজিটুকু, গরুর দুধ, হাঁস-মুরগির ডিম বেঁচে যা সামান্য আয়, তা থেকে সঞ্চয়। একসময় সবই হয়ে যায়— ঘরবাড়ি হয়, দুটো তক্তপোশ, বাইরের ঘরে একটা জলচৌকি। বড় পুত্র মাধ্যমিকে দশটা বিষয়ের ন’টাতে পাশ। জীবনে কে কবে সব বিষয়ে পাশ করে। নিম্নবিত্ত থেকে নিম্ন মধ্যবিত্ত হওয়ার আশাবাদী যাত্রা।

    শহর ঘুরে আসে বিলু। পরিবারের আচার-আচরণে যথেষ্ট সচেতন সে। বিব্রত হয় ভাইয়ের খাই খাই স্বভাবে, বাবা-মায়ের সীমাহীন পুত্রগর্বে। কৈশোর তারুণ্যের মাঝামাঝি সময়টাই বুঝি এমন। বড্ড ছোট মনে হয় তখন পরিবারের গণ্ডীটা। যে পরিবার থেকে বেড়ে ওঠা তার জন্যই বিব্রত হওয়া। ভিতরে তাদের জন্য যে গভীর টান, তা প্রকাশ করতেও কুণ্ঠা।

    ছিন্নমূল পিতার সন্তান—যেকোনভাবে পারি তার থেকে পরিত্রাণ চাইছি।

    এভাবে বিলু বড় হয়। জীবনের একটা অচেনা পর্ব তার সামনে প্রকাশ হতে থাকে। বিলুর মাথায় ঘোরে ছোড়দি, লক্ষ্মী, পরী। ভালই তো বেড়ে উঠছিল বিলু, তখনই জীবনের এই অদম্য পর্বে তার প্রবেশ। জানালায় তাকালে সে দেখে ছোড়দির নীল খাম, সাইকেলের ক্যারিয়ারে তাকে উঠিয়ে ছোড়দির দুরন্তপনা। অন্যমনস্ক হয়ে যায় বিলু জীবনের এই গোপন রহস্য অনুধাবন করতে।

    মাথার ভীষণ যন্ত্রণা কবিতায় রূপ নিতে থাকে। জীবনানন্দের সুর সেই কবিতায়।

    ভূমিকায় লেখক লিখেছেন খুব চাপ সৃষ্টি না হলে তাঁর লেখা হয় না। উপন্যাসের বিলু কি লেখক নিজেই— বন্ধুদের চাপে যে কবিতা লেখে।

  • ভূমিকা

    ভূমিকা

    ‘মানুষের ঘরবাড়ি’ উপন্যাসটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৭০ সালের জুনে, প্রকাশক বামাচরণ মুখোপাধ্যায়, করুণা প্রকাশনী, ১৮এ টেমার লেন, কলিকাতা-৯। মুদ্রাকর শ্যামাচরণ মুখোপাধ্যায়, করুণা প্রিন্টার্স, ১৩৮ বিধান সরণী, কলিকাতা-৪; প্রচ্ছদ এঁকেছিলেন গৌতম রায়।
    মানুষের ঘরবাড়ির প্রথম সংস্করণের উৎসর্গে লেখা ছিল— ‘অমিতাভ চৌধুরী, অকৃত্রিম অগ্রজ প্রতিমেষু’; ২০০১ সালে প্রকাশিত অখণ্ড সংস্করণে ‘উৎসর্গ’ পরিবর্তন করা হয়েছে—

    বিদগ্ধ ব্যক্তিত্ব
    শ্রীযুক্ত বাবু অশোক মিত্র
    মান্যবরেষু

    সোনা এই পর্বে বিল্ব হয়ে আছে

    ‘মানুষের ঘরবাড়ি’ কবে লিখতে শুরু করি, তার নির্দিষ্ট সন তারিখ মনে নেই। তবে যতদূর মনে পরে ১৯৭৭ সালে অমৃত শারদীয় সংখ্যায় উপন্যাসটির প্রথম কিস্তি লিখি। নাথ ব্রাদার্স সম্ভবত ১৯৭৮ সালে গ্রন্থাকরে প্রকাশ করে এই চটি উপন্যাসটি। ‘মানুষের ঘরবাড়ি’ নামেই প্রকাশিত হয়। সেই থেকে পরপর আরও কিছু কিস্তি পূজাসংখ্যা গুলোতে প্রকাশ হতে থাকে। সব কিস্তিগুলি এক সঙ্গে এই উপন্যাসের অন্তর্গত হয়। এবং ‘মানুষের ঘরবাড়ি’ নামেই পরিমার্জিত এবং পরিবর্ধিত সংস্করণটি প্রকাশিত হয় করুণা প্রকাশনী থেকে।

    আসলে আমি ব্যক্তিগতভাবে কুঁড়ে এবং অলস মানুষ। খুব চাপ সৃষ্টি না হলে লেখা হয় না। আর যা হয়, যে বিষয় নিয়ে লিখতে শুরু করি, তার রেশ মাথা থেকে কিছুতেই সরে যায় না। ‘নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে’ ‘অলৌকিক জলযান’ এবং ‘ঈশ্বরের বাগান ও প্রায় একই ধরনের রেশ থেকে লেখা। জীবনের প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ অভিজ্ঞতা থেকে এই সব উপন্যাসের সৃষ্টি। এই সব উপন্যাস সৃষ্টির সঙ্গেই বোধ হয় মানুষের ঘরবাড়ির বিষয়টি মাথায় ক্রিয়া করে।

    ১৯৭৬ সালে আমার পিতার মৃত্যু হয়।

    আর তখনই মনে হয় জীবনের আসল পর্ব ‘নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে’ সিরিজ থেকে বাদ গেছে। দেশ ভাগের পর এদেশে এসে পিতার সেই একখণ্ড জমি অন্বেষণ নিয়ে শুরু হয় জীবনের আর এক সংগ্রাম। ‘নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে’ যে সোনা, মানুষের ঘরবাড়িতে সে বিশ্ব বা বিলু। অলৌকিক জলযানে সে ছোটবাবু, ঈশ্বরের বাগানে সে অতীশ দীপংকর—এইভাবে জীবনের অজস্র বিচিত্র বাস্তব, রহস্যময়তা নিয়ে সে উদ্ভাসিত হতে থাকে। পাঠকেরও অভিজ্ঞতা ‘মানুষের ঘরবাড়ি’ আসলে সিরিজের দ্বিতীয় পর্ব। সুতরাং এখন থেকে ‘নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে’ দ্বিতীয় পর্ব বলেই চিহ্নিত করা গেল। এই উপন্যাসটিকে এই পর্বে সোনা বিল্ব হতে পিতার সেই ঘরবাড়ি বানানো মহাকাব্য সুলভ জীবন বোধের কথা লিখে রাখে।

    অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়
    এ সি ১৮৫ প্রফুল্ল কানন
    কলকাতা ৭০০ ১০১
    ৫-৯-২০০১

  • এক

    এক

    এদেশে এসেই আমার বাবা খুব গরীব হয়ে গেলেন। হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছিলাম, দেশে থাকতে আমরা এতটা গরীব ছিলাম না। বাবা মা আমাদের ক’ভাই বোন সম্বল করে এদেশে পাড়ি জমালেন সত্য, কিন্তু থিতু হয়ে বসতে পারছিলেন না। এক জায়গা থেকে আর এক জায়গায় —কখনো কোনো প্ল্যাটফরমে অথবা ভাঙা মন্দিরে, পরিত্যক্ত কারো আবাসে থাকতে থাকতে কিছুটা যাযাবরের মতো জীবন বয়ে যাচ্ছিল। শেষ পর্যন্ত একটা গভীর বনের ভেতর বাবা তাঁর সঠিক আস্তানা খুঁজে বের করলেন।

    আমাদের কাজ ছিল সকাল হলে জমির জঙ্গল কাটা, আগাছা সাফ করা। মানুষের নতুন ঘরবাড়ি যেমনটা হয়ে থাকে। অথবা সেই প্রাচীনকালের মতো, কোথাও জল এবং জমিতে উর্বরা শক্তি থাকলেই যেমন জনপদ গড়ে উঠত আমরাও তেমন একটা জনপদের আদি বাসিন্দার মতো জায়গাটাতে এসে উঠেছিলাম।

    দু’ বছর নানা জায়গায় ঘুরে ঘুরে শেষ পর্যন্ত এমন একটা জায়গায় এসে থিতু হয়ে বসার আশায় বাবা খুব খুশী। বাবা বলতেন, জমি খুবই উর্বরা। রাজরাজড়ার পতিত জমি, নানা রকমের জীবজন্তুর বাস, এই সবই বোধ হয় জমিটার উর্বরা শক্তির উৎস। জমি খুব উর্বরা বলতে বাবা বোধ হয় এ-সবই বোঝাতে চাইতেন। বাবা খুব খুশী থাকলে মাঝে মাঝে বলতেন, দু ক্রোশ হেঁটে গেলে শহর, আড়াই ক্রোশের মাথায় একটা কাপড়ের মিল, বড় মাঠ পার হয়ে গেলে পুলিস ব্যারাক, জলের অভাব নেই, খাবারের অভাবও হবে না।

    এত বড় বনটা কতদূর কোথায় গিয়ে শেষ হয়েছে কিছু বোঝার উপায় নেই। বনটার সামনে একটা বড় শস্যবিহীন মাঠ, তারপর দিঘির মতো কালো জল টলটল করছে, একটা পুকুর এবং আমবাগান ছাড়িয়ে ব্যারাক বাড়ি। হেস্টিংসের আমলের জীর্ণ প্রাসাদ-সংলগ্ন সব বেড়া দেওয়া প্ল্যাটফরমের মতো লম্বা খুপরি ঘর। জায়গাটা সম্পর্কে শেষ পর্যন্ত বাবার কতটা উৎসাহ থাকবে মা বুঝি টের পেত। সংশয় ছিল হয়তো আবার কোন নবর বাবার খবর পেয়ে বাবা উধাও হতে চাইবেন। জমিটার প্রশংসায় মা বেশি রা করত না। প্রায় সময় চুপচাপ শুনে যেত। কিছু বলত না। শেষ পর্যন্ত টিকে থাকতে পারলে হয়।

    হেস্টিংসের আমলের সেই পুরনো বাড়িটাতেই ছিল পুলিসের আরমারি। বিরাট গম্বুজয়ালা বাড়িটার সামনে মাঠ। সকালে বিউগিল বাজলে শ’দুই রিক্রুট ফলইনে দাঁড়াত। তারপর পিটি প্যরেড আরম্ভ হয়ে যেত। মাঠের ভিতর রেলগাড়ির মতো সব লম্বা খুপরি ঘর, আমবাগানের ভিতর সেই কুঠিবাড়ি, পুকুরের টলটলে জল আর মানুষজনের সাড়া শব্দে বনটাকে বাবার কাছে মানুষের আবাসযোগ্য মনে হয়েছিল হয়তো। বাবা এখানেই শেষবারের মতো থিতু হয়ে বসতে চাইলেন।

    বাবার কাছে পরে জেনেছি এই বনভূমির পশ্চিমে রয়েছে কারবালার মাঠ। পুবে ব্যারাকবাড়ি এবং বাদশাহী সড়ক, উত্তরে রাজরাজড়ার পুরনো শ্যাওলা ধরা প্রাসাদ। বাবা ঘুরে ঘুরে সব দেখে এসে খবর দিতেন। অথচ প্রথম দিন এখানে এসে বাবার কথায় মনে হয়েছিল আমাদের সবাইকে একটা গভীর বন দেখাতে নিয়ে এসেছেন। এই যে বনটা দেখছ, এখানে আছে সব বিষধর সর্প। বাবার অভ্যাস গুরুত্বপূর্ণ কথাবার্তায় এলে সাধু ভাষার ব্যবহার। —বিষধর সর্প, একদা ব্যাঘ্র দেখা যেত। তরুলতা বলতে শাল, শিমুল। উত্তরে দক্ষিণে এর বিস্তার ক্রোশের ওপর। রাজরাজড়ার পতিত জমি বিনে পয়সায় বলতে গেলে মিলে গেল। উর্বরা জমিতে চাষাবাদ হলে তখন দেখবে এর চেহারা কত আলাদা।

    বনটা ঘুরে দেখার সৌভাগ্য এখনও আমার কিংবা পিলুর হয়নি। শুধু বাবা বলেছেন, বনের শেষে আছে রাজবাড়ি। পিলখানা আছে একটা। হাতি বাঁধা থাকে। একদিন তোমাদের হাতি দেখাতে নিয়ে যাব।

    দেশ ছেড়ে আসার পর এই নিয়ে বাবা চারবার জায়গা বদল করলেন। কিছুদিন এখানে বসবাস করতে করতে কি কখন মনে হবে বাবার, লোটা কম্বল গুটিয়ে ফের রওনা। তার আগেই রাজবাড়িটা দেখে আসতে হবে। অনেকদিন পর আবার হাতি দেখার এই মৌকা। বাবার মাথায় দুর্বুদ্ধি গজাবার আগেই আমি এবং পিলু কাজটা সেরে ফেলব ভেবেছি।

    আসলে আমাদের অন্নকষ্ট আরম্ভ হলেই বাবা এমন একটা পৃথিবী খুঁজে বেড়াতেন, যেখানে দুবেলা পেট পুরে আহার পাওয়া যায়—সদলবলে তার খোঁজে তখন শুধু রওনা হওয়া। খোঁজখবর করবেন, দেশের লোক কে কোথায় এসে উঠেছে, কি ভাবে বেঁচে আছে। এবং কুপরামর্শ দেবার লোকের অভাব ছিল না। সেই জায়গাটাতে যাবার আগে যা কিছু অসুবিধা ঘটাত আমার মা। মাকে সহজে তিনি বাগে আনতে পারতেন না। মা বলত, এখানেই কোথাও কিছু জোটাতে পার কিনা দ্যাখো। ঘুরে ঘুরে আর পারছি না।

    বাবার বিদ্যা বলতে যজনযাজন। এবং বাবা দেশ ছেড়ে আসার আগে জমিদার বাড়িতে আমলার কাজ করতেন। পুজো-আর্চা করতেন। এখানে এসে তেমন একটা উপযুক্ত কাজের সন্ধানেই আছেন। যদি কোথাও পাওয়া যায়। একবার খবর এল গুপ্তিপাড়াতে সব বনেদী মানুষের বাস। সেখানে গেলে এমন একজন সৎ ব্রাহ্মণের কিছু একটা হয়ে যাবেই। গুপ্তিপাড়াতে আমরা একটা ভাঙা মন্দিরের নিচে আশ্রয় নিয়েছিলাম। বাবা খুব সাত্ত্বিক ব্রাহ্মণের মতো চলাফেরা করলেন কিছুদিন। ঘাটে স্নানের সময় শব্দই ব্রহ্ম—এমন জোরে জোরে স্তোত্র পাঠ করতেন যে মাঝে মাঝে মনে হত প্ল্যাটফরমে রেলগাড়ি পর্যন্ত থমকে দাঁড়িয়েছে। আর নড়তে পারছে না।

    বাবার বোধ হয় আশা ছিল, ঠিক খবর পৌঁছে যাবে ঘরে ঘরে—লাইনবন্দি হয়ে আসবে মানুষজন। যাবতীয় পূজা পার্বণে ডাক পড়বে মানুষটার। এমনই বোধহয় সব মনে হত তাঁর। অথচ গাড়ি যায় ট্রেন আসে। বাবুদের সব কাজ কাম হয়ে যায়, ভাঙা মন্দিরে সাপখোপের উপদ্রব বাড়ে। বাবা তারপর রেগে মেগে কোথায় চলে যান। আহার আমাদের কমে আসে। মন্দিরের চাতালে আমরা উপোসী মানুষ, কখন বাবা আসবে এবং না বলে না কয়ে তিনি কোথায় যে চলে যেতেন! তারপর একদিন ফিরে এসেই যেন একেবারে সদরে গাড়ি দাঁড় করিয়ে রেখেছেন—ওঠো ওঠো। সব ম্লেচ্ছর বাস! মানুষ এখানে থাকে না। গলসীতে নবর বাবা আছে। সে তোমাদের নিয়ে যেতে বলেছে। গোপালদির বাবুরা ওখানে বিরাট খামার করেছে। নবর বাবা চালের আড়ত করেছে বর্ধমান শহরে। না খেয়ে আর মরতে হবে না। স্টেশনে নবর বাবার সঙ্গে ভাগ্যিস দেখা হয়ে গেল।

    বাবার কথাবার্তা শুনে মনে হত চালের আড়তটা আসলে নবর বাবার নয়, আমার বাবার। আর অন্নকষ্ট থাকবে না। কেবল খাও আর খাও। সারাদিন—অহ সে কি স্বপ্ন! যখন তখন খেতে বসে যাব। বাবা কত সহজে সব কিছু নিজের বলে ভাবতে পারতেন। বলতেন, এত বড় আড়ত নবর বাবার—চার পাঁচটা পেটের সংস্থান হবে না সে কি হয়। রওনা হবার আগে ধুমধাড়াক্কা লেগে যেত। এটা নাও ওটা নাও। কিছু পড়ে থাকল না তো। স্নান আহার করার সবুর সইত না বাবার। রওনা হতে পারলেই হল।

    পিলু আর আমার তখন কাজ ছিল স্টেশনে বসে দুর্লভ হাঁড়ি পাতিল, ভাঙা বাক্স, ছেঁড়া শীতলপাটি পাহারা দেওয়া। চারপাশের মানুষজনদের মনে হত চোর বাটপাড়। কে কি ভাবে ঠকিয়ে শীতলপাটি কিংবা ভাঙা বাক্সটা মাথায় করে ভাগবে কে জানে।

    আর ট্রেনে সেই পকেটমার হইতে সাবধান—এমন সব বাক্য জোরে জোরে পড়তে আমাদের ভাল লাগত। আর তখন এই গাড়িতে কে পকেটমার নয় সেটা ঠিক করাই ছিল বড় দুরূহ কাজ। মনে হত সবাই পকেটমার। গাড়িতে সবাই সবাইকে বুঝি পকেটমার ভাবছে। আমাদের যা চেহারা এবং যা অবস্থা সহজেই সবাই পকেটমার ভেবে ফেলতে পারে। গাড়িতে উঠে ভয়ে আমরা দুই ভাই কাঁচুমাচু হয়ে বসে থাকতাম। কারণ আমার আর পিলুর যা পোশাক-আশাক ওতে অন্তত চোর বাটপাড় না ভাবুক, চোর বাটপাড়ের আণ্ডা বাচ্চা ভাবতে পারে।

    মা’র মুখ তখন আরও করুণ। একে বিনা টিকিটের যাত্রী—তার ওপর ট্রেনের গায়ে ও-সব লেখা, মা বোধ হয় ভয়ে কেঁদেই ফেলবে। এত ভয় যে বাংকে না বসে নিচে বসে পড়েছে। বিনা টিকিটের যাত্রী—কখন কোথায় নামিয়ে দেবে—তার চেয়ে নিচে বসে থাকলে কেউ কিছু বলবে না। নিচে তো আর কেউ বসে না। কারো জায়গা দখল করেও মা বসে নেই। কিছুতেই কারো কোনো অসুবিধা হোক মা চাইত না। আমরাও পাশে গোল হয়ে লটবহরের মতো গাদা মেরে পড়ে থাকতাম। বাবার অবস্থা একেবারে অন্যরকমের। যেন সংকীর্তনের দল নিয়ে বের হয়েছেন। গাঁয়ে গঞ্জে ঈশ্বরের নাম দেবে তার আবার ভাড়া কি! এবং সহজেই এত ভাল মানুষ হয়ে যেতেন তখন যে আমার মা পর্যন্ত তাজ্জব বনে যেত।

    আর আমার বাবা তখন এক দণ্ড স্থির হয়ে বসে থাকতে পারতেন না। কামরার জানলায় মুখ বাড়িয়ে কখনও কি দেখতেন। কখনও দরজায়। কোনো স্টেশনে প্ল্যাটফরমে নেমে ঘোরাঘুরি করতেন। যেন বাবার জমিদারি ওটা। কার কি বলার আছে। আর চেকারবাবুকে দেখলেই মুখটা ভয়ে সাদা হয়ে যেত। কিন্তু কাছে এলে একেবারে তিনি দু পাটি দাঁত বের করে হেসে ফেলতেন। বাবার হাসি দেখলেই বোধ হয় টের পেত নির্ঘাত রিফিউজি।

    বাবা তখন সব সামলেসুমলে একেবারে অন্তরঙ্গ মানুষের মতো কথা-বার্তা আরম্ভ করে দিয়েছেন চেকারবাবুর সঙ্গে। যত বাবাকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করছে তত বাবা মনে যেন বেশি জোর পাচ্ছে। এবং সব সময় একটা লোককে স্যার স্যার করলে যা হয়, একসময় চেকারবাবুটি যথার্থই সহৃদয় হয়ে উঠতেন। আর যেই না সামান্য সহৃদয় হয়ে ওঠা, বাবার সেই প্রথম আপ্তবাক্যটি মুখ ফসকে বের হয়ে আসত-স্যার আপনার দেশ ছিল কোথায়?

    বাবার সাহস দেখে চেকারবাবুটি তার কাজকর্মের কথা ভুলে যেত। বোধ হয় বিরক্তও হতো। আচ্ছা ফিচেল লোক তো। তোমার কি এত দরকার আমার দেশ বাড়ির খবরে।

    আমরা নানা জায়গায় বাবার সঙ্গে ঘুরে ঘুরে এই আপ্তবাক্যটির মূল ভাবার্থ ততদিনে আবিষ্কার করে ফেলেছি। ঢাকা জেলার মানুষ আমরা। এতটা সগৌরবের জেলা বাংলাদেশে আর যেন একটা ও নেই। বাবার অহংকার ঢাকা জেলার লোক দেশবন্ধু, ঢাকা জেলার লোক বিজ্ঞানী জগদীশ বসু। আর সেই জেলার লোক বাবার ডাকসাইটে জমিদার দীনেশবাবু। এই তিন ব্যক্তি বাবাকে তাঁর জেলা সম্পর্কে আমাদের এই দুঃসময়ে খুব অহংকারী করে রাখে মাঝে মাঝে। চেকারবাবুটাবুর সঙ্গে দেখা হলেই সেটা তাঁর যেন আরও বেশি করে মনে হয়।

    বাবার বুঝি খুব ইচ্ছে হত, চেকারবাবু যদি ঢাকা জেলার লোক হন। ঢাকা জেলার লোক হলেই নিশ্চিন্ত। একই জেলার মানুষ, সুতরাং ভাই ব্রেদারের মতো। এবং সেই প্রথম আপ্তবাক্যটির পর বাবা আর কি বলবেন, তাও জানা থাকত। ঢাকা জেলার লোক হলেই বাবার পরের আপ্তবাক্যটি হচ্ছে, দীনেশবাবুকে চেনেন?

    চেকারবাবু যদি জবাব না দিত তাতেও তাঁর কিছু আসত যেত না। ঠিক বাবা পরের তিন নম্বর আপ্তবাক্যটি উচ্চারণ করতেন, কি দেশ ছিল বলুন। কত বড় পাপ করলে সে দেশ ছেড়ে মানুষকে আসতে হয়। আমাদের আর কি থাকল। চেকারবাবুটি হয়তো তাঁর একটা কথাও শুনছে না। কিন্তু বাবার কথার কামাই নেই। চার নম্বর আপ্তবাক্যটি আবার বের হয়ে আসত। —দীনেশবাবুকে চেনেন না! ঢাকা জেলার লোক হয়ে তার নাম শোনেন নি। আমার তখন মনে হত, দীনেশবাবু হচ্ছে বাবার দেখা পৃথিবীতে সব চেয়ে সেরা মানুষ। সে মানুষটার নাম জানে না ঢাকা জেলাবাসী চেকারবাবু— কি তাজ্জব! লোকটা আসলে তখন ঢাকা জেলার কিনা বাবার সংশয় হত। তাঁর পাঁচ নম্বর আপ্ত বাক্যটি আর মুখ ফসকে বের হয়ে আসত না। কেমন দমে যেতেন একেবারে। মুড়াপাড়া কত বড় গ্রাম—শীতলক্ষার পারে দীনেশবাবুর সেই প্রাসাদের মতো বাড়ি, দীনেশবাবুর নুন খায় নি ঢাকা জেলার মানুষ বাবার বিশ্বাস করতে কষ্ট হত। আর কি বৈভব। পূজাপার্বণে দোল-দুর্গোৎসবে তিনি ছিলেন সে বাড়ির প্রাণ। দীনেশবাবু এমন মানুষ, যাঁর পরিচয়ে তাঁদেরও পরিচয় মিলে যাবে। এবং বাবার মুখ দেখলেই আমরা টের পেতাম, তাঁর ছ নম্বর এবং শেষ আপ্তবাক্যটি এবারে বের হয়ে এল বলে, আমাদের এমন দিন ছিল না মশাই, যা দেখছেন বুঝছেন আমরা তা নই।

    তখনই আমার মা নড়েচড়ে বসত। বাবার এই অসহায় উক্তি এতবার মা শুনেছে যে আর সহ্য করতে পারত না। বাবার এই দীন হীন উক্তি মাকে ভীষণ ক্ষুব্ধ করে তুলত। এবং তখনই মনে হত বাবার ডাক পড়বে এবার। – দ্যাখ তো বিলু লোকটার সঙ্গে তোদের সেনাপতি কি এত ব্যার্জর ব্যাজর করছে।

    আমি উঠে গিয়ে বলতাম, বাবা, তোমাকে ডাকছে।

    কে ডাকছে, কেন ডাকছে বাবার সব জানা। বলতেন, যাচ্ছি যাচ্ছি। কিন্তু যতই তিনি চড়া গলায় কথা বলুন না কেন, তাঁর আর এক দণ্ড দেরি করার সাহস থাকত না। পৃথিবীতে এখন একমাত্র যাকে সমীহ করার সে হচ্ছে আমার মা। পাশে চলে এসে বলতেন, ডাকছ কেন

    —কি অত ব্যাজর ব্যাজর করছ।

    বাবার রক্ত বোধ হয় গরম হয়ে যেত। এবং সেই এক কথা—আরে রণ-সাজে আছি! এখন কে কোথায় কি করে বসবে তার আমরা কতটুকু জানি। সবাইকে খুশী না রাখলে চলে!

    রণ-সাজে কথাটা বাবা খুব ইদানীং ব্যবহার করছেন। আর মাও বাবাকে সেই সুবাদে সেনাপতি আখ্যা দিয়েছে। এখন আর মা তোদের বাবা না বলে, বলে, তোদের সেনাপতি কোথায় গেল রে। বাবা আবার লাফিয়ে কামরার দরজায় ছুটে গেলে মা বলত, দ্যাখ তোদের সেনাপতি কার সঙ্গে আবার পরামর্শ করতে গেল।

    আমরা বুঝতে পারি মার ভয়টা কোথায়। এমন একটা যুদ্ধের ফ্রন্টে বাবা বোধ হয় তাঁর স্ট্র্যাটেজি ঠিক করতে পারছেন না। মার ভয় সেই চেকারবাবুটির সঙ্গে পরামর্শ করে হয়তো স্টেশনেই নেমে পড়বেন। নেমে পড়বেন না নামিয়ে দেবে কে জানে। কোনো কিছু ঠিকঠাক নেই—কি যে হবে! কিছু বললেই রেগেমেগে বলবেন, যুদ্ধক্ষেত্রে রণ-সাজে আছি। কখন কি হবে কিছু বলা যাবে না।

    মার তখন আর কোনো উপায় থাকে না।—মতিভ্রংশ হয়েছে তোমার। মা খুব বেশি গালাগাল দিলে বাবাকে এমন সব নিষ্ঠুর কথা বলত।

    মা কোনো উপায় না দেখে বলল, যা তো, কি বলছে শোন।

    খুব সন্তর্পণে দরজার কাছে এগিয়ে গেলাম। ট্রেন তেমনি দ্রুত আমাদের নিয়ে কোথাও যাচ্ছে। কাছে যেতেই বাবা বললেন, তোর মাকে বল সামনের স্টেশনে নামব। মার কাছে ফিরতে না ফিরতেই দেখলাম বাবাও ফিরে এসেছেন। সেই আমাদের হাঁড়ি পাতিল, শেতলপাটি, একটা পেতলের কলসি, বালতি দুটো এবং জীবনধারণের যা কিছু প্রয়োজন—কারণ আমাদের সঙ্গে এমন সব মহামুল্য সামগ্রী রয়েছে যে একটা ফেলে গেলে প্রচণ্ড সর্বনাশ হবে। বাবা গুনতে থাকলেন, আমি গুনে দেখলাম। পিলু টেনে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। সব ঠিক নিয়েছে কিনা মা একবার গুনে দেখল—একটা শেষ পর্যন্ত কম পড়ে যাচ্ছে—কি গেল, খোঁজ খোঁজ—যা চোর বাটপাড়ের দেশ, কোনটা কে নিয়ে যাবে— খুঁজে পাওয়া গেল, একটা ছেঁড়া চটের বস্তা। বাবা মহাখুশী কিছুই খোয়া যায়নি দেখে। তাঁর ছেলেরা যে ভীষণ উপযুক্ত হয়ে উঠেছে ভেবে হয়তো গানই ধরে দিতেন—কিন্তু স্টেশনে ট্রেন তখন থেমে গেছে। বাবার আর গান গাওয়া হল না। হাঁকডাক শুরু করে দিলেন। যেন স্টেশনে নেমেই দেখতে পাবেন, নবর বাবা দাঁড়িয়ে আছে। বাবাকে মহামান্য মানুষের মতো স্টেশনে নিতে এসেছে নবর বাবা।

    কেউ স্টেশনে ছিল না। বাবা স্টেশনে নেমেই খোঁজাখুঁজি করলেন। কোথায় নবর বাবা, কোথায় সেই গোপালদি বাবুদের খামার! যাত্রীরা চলে গেলে শুধু ফাঁকা প্ল্যাটফরম পড়ে থাকল। অথচ এমন একটা অচেনা নির্বান্ধব জায়গায় বাবা এতটুকু ঘাবড়ে গেলেন না। সন্ধ্যা হয়ে আসছিল, কোথায় আর অন্ধকারে খোঁজাখুঁজি হবে। স্টেশনেই থাকার মতো ব্যবস্থা হয়ে গেল। স্টেশনের কল থেকে জল নিয়ে এলেন বাবা। প্ল্যাটফরমের একপাশে ছোট মতো একটা সেডও আবিষ্কার করা গেল। সেডটা পাওয়ায় জায়গাটা ভালই মনে হচ্ছে। নবর বাবা কোথায় থাকে, নবর বাবা এবং তার ঊর্ধ্বতন পিতৃপুরুষের পরিচয় দিয়ে দু-একজনের কাছে খোঁজ খবরও নিলেন। সবাই বাবার কথাবার্তা শুনে গা ঢাকা দেওয়াই শ্রেয় মনে করল। কেউ আর দাঁড়ায় না। বাবার কথা শুনলেই পালায়। অন্ধকারে অদৃশ্য জনতার দিকে তখন বাবা হাঁ করে তাকিয়ে থাকেন। গোপালদির বাবুরা আছেন এখানে, কোনদিকটায়—তারও খোঁজখবর পাওয়া গেল না কিছু। বাবা কি বুঝে আর আমাদের কাছে আসতেও সাহস পাচ্ছিলেন না। ঠায় হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেই মার বোধ হয় মায়া হল। বলল, ডেকে আন।

    ফিরে এসে খুব নম্র গলায় বাবা বললেন, ধনবৌ, আজকের মতো এখানেই রাত কাটাতে হবে দেখছি।

    মার কোনো যেন এতে আর আপত্তি নেই। অথবা মার চোখমুখ দেখে বোঝা গেছিল, বিপত্তি বাড়বে বই কমবে না। শুধু বলল, শ্রীশ পাল এখানে কোথায় থাকে না জেনেই চলে এলে।

    —সেই তো বর্ধমান স্টেশনে দেখা। সব বললাম। শুনে বলল, আমাদের দিকে চলে আসুন, বামুনের অভাবে পুজো পার্বণ সব ভুলে যাচ্ছি।

    পিলু ইতিমধ্যে কিছু খড়কুটো সংগ্রহ করে ফেলেছে, ওর খাবার ঠিক না থাকলে মাথা গরম হয়ে যায়। বাবার ওপর ভরসা করে থাকতে সে বোধ হয় আর রাজী নয়। সে আর মায়া কিছু শুকনো প্যাকিং বাক্সের কাঠও নিয়ে এসেছে। মা তাড়াতাড়ি কাঠগুলো লুকিয়ে ফেলল। শিতলপাটি দিয়ে সেই কাঠগুলো ঢেকে রাখা হল। আর প্ল্যাটফরম পার হলে বর্ষার জল, নালা ডোবা। ডোবা থেকে পিলু অন্ধকারেই কিছু কলমি শাক তুলে এনেছে। মা সবই সযত্নে রেখে দিল। কুপি জ্বালানো হল।

    বাবা ফের স্টেশনমাস্টারের কাছে হাজির হয়ে আদ্যোপান্ত খুলে বলছেন। শুনতে চায় না তবু বাবা বার বার বোঝাচ্ছিলেন, শ্রীশ পাল আমাকে কি বিপদে ফেললে বলুন তো। এখন এই ছেলেপুলে নিয়ে কোথায় উঠি!

    ফিরে এসে বাবা খুব মিনমিনে গলায় বললেন, বুঝলে ধনবৌ, একটা চিঠি দিয়ে এলে ভাল হত। ও জানবে কি করে আমরা এসে বসে আছি। আমাকে তিনি বললেন, মার যা লাগে এনে টেনে দিস। আমি একটু খোঁজাখুঁজি করে দেখি কে কোথায় আছে।

    মা বলল, কোথাও যেতে হবে না। সকালে দেখা যাবে।

    আমিও বললাম, সকালেই দেখা যাবে বাবা।

    মা কোলের ভাইটাকে ঘুম পাড়াচ্ছিল। খুব জোরে কথা বলতে পারছে না। পারলে যেন বলত, পুনু ঘুমচ্ছে। ওকে আর জাগিয়ে দিও না। জেগে গেলেই খেতে চাইবে।

    —সকালে কি আর সময় পাব। যেন কত কাজের মানুষ বাবা। আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, দ্যাখ বাবা কোথাও গোটা তিন চার ইঁট পাস কিনা। কিছু তো খেতে হবে।

    মেটে হাঁড়িতে চাল আছে এখনও কিছুটা। চাল থাকলে মার অন্য দুঃখ বড় একটা বেশি থাকত না। চাল ফুটিয়ে দেওয়া যাবে। ঠিক ভাত না। ফ্যানা ভাতও নয়। সবটাই জল, কিছুটা চাল। জাউ। খুবই পাতলা। এনামেলের থালায় ঢেলে পাখার হাওয়া। আমাদের খিদে এত প্রবল থাকে যে ভাঙা পাখার শনশন শব্দ একদম সহ্য হয় না। দেরি হয়ে যাচ্ছে। যত গরমই হোক মুখে দিয়ে হাঁ করে বসে থাকা। আর প্রবল শ্বাসে তাকে ঠাণ্ডা করে নেওয়া। মুখের বাতাসে ঠাণ্ডা হয়ে যায়। পেটে গেলে আরও ঠাণ্ডা। বাবা আমাদের খাওয়া দেখতে দেখতে বলতেন, তোরা বড় হা-ভাতে। এমনভাবে খাস যেন জীবনেও ভাত খাস নি। আস্তে খা। গাল, গলা পুড়ে গেলে ডাক্তার পাব কোথায়। সময় যা যাচ্ছে।

    প্ল্যাটফরম পার হয়ে যাবার সময় কাউন্টারে দেখলাম স্টেশনমাস্টার মশাই টেবিলে ঝুঁকে কি লিখছেন। একবার অফিসঘরটার পাশে দাঁড়ালাম। দরজা খোলা। দু-তিনজন বাবু মতো মানুষ বসে গল্প করছে। টরে টক্কা শব্দ হচ্ছে। কেমন একটা আশ্চর্য স্বপ্নের মতো পৃথিবী। আমি বড় হয়ে স্টেশনমাস্টার হব ভাবলাম। এবং এটা প্রায়ই দেখেছি, যখন কোনো মানুষ বাবাকে ধমকে কথা বলত, অথবা বাবা যাদের সমীহ করে কথা বলতেন তাদের ওপরয়ালা হবার মনে মনে বাসনা জাগত। তখন বাইরে অন্ধকার মতো একটা রাস্তায় বাবা কার সঙ্গে কথা বলছেন। কাছে যেতেই বললেন, সাবধানে থাকিস। আমি একটু ঘুরে আসছি। রাতে আর সত্যি বাবা ফিরলেন না। আমাদের বাবা মাঝে মাঝে এভাবে হারিয়ে যেতেন। কলমি শাক সেদ্ধ আর জাউ ভাত খেয়ে মনটা বেশ প্রসন্ন হয়ে উঠেছিল। অথচ বাবা নেই। মনটা ভার হয়ে গেল। অবশ্য জানি বাবা আবার ঠিক এক সময়ে ফিরে আসবেন। এ ক’দিন কিভাবে যাবে আমরা জানি না। মাও জানে না। আমাদের কথা মনে হলে, মার কথা মনে হলে, বাবা কোথাও গিয়ে বেশিদিন থাকতে পারেন না।

    অনেক রাত এ-ভাবে তখন পরিত্যক্ত আবাসে অথবা প্ল্যান্টফরমে আমাদের কেটে গেছে। আমি, পিলু, মায়া কখনো চুপচাপ প্ল্যাটফরমে বসে থাকতাম। ঘুরতাম। কখনো আকাশে জ্যোৎস্না থাকত, কখনো অন্ধকার। কিছু কুকুর বেড়াল ছিল তখন আমাদের সঙ্গী। ওরাও আমাদের সঙ্গে পায়ে পায়ে ঘুরত। বাবা আমাদের কোথায়, কতদূরে—বাবার জন্য আমাদের ভারি কষ্ট হত তখন। আমরা তবু কিছু খেয়েছি, বাবা কিছু না খেয়েই কোথায় চলে গেলেন। একটা মাল গাড়ি টং লিং টং লিং ঘণ্টা বাজিয়ে চলে আসত। অন্ধকারে কোনো দূরবর্তী ছায়া এগিয়ে আসতে থাকলে মনে হত বাবা বুঝি ফিরছেন। সবার আগে ছুটে যেত পিলু। পেছনে আমি। সবার শেষে মায়া। কিন্তু সে অন্য মানুষ। মাঠের অন্ধকারে মেঘলা আকাশের নিচে আমরা বাবার জন্য এভাবে অপেক্ষা করতাম। বাবা বুঝি ফিরছেন। মাথায় হাতে বাবার রকমারি পোঁটলা-পুঁটলি। ভেতরে পূজা-পার্বণের চাল-ডাল। মা’র জন্য লাল পেড়ে শাড়ি। হাত দিলে বলবেন, ওটা তোমার মা’র। ধরো না।

    এতবড় পৃথিবীতে আমাদের বাবা বাদে আর কিছু নেই। মানুষের ঘরবাড়ি থাকে আমাদের তাও নেই। চুপচাপ থাকলে মায়া বলত, দাদা দ্যাখ, দূরে কেমন একটা নীল বাতি জ্বলছে। সিগন্যালের লাল বাতিটা গাড়ি আসবে বলে নীল হয়ে গেছে। সাইডিং-এ মালগাড়ি সান্টিং হচ্ছে। ইচ্ছে হত এঞ্জিনের ড্রাইভারের পাশে গিয়ে বসে থাকি। সে আমাকে দূরে কোথাও নিয়ে যাক। আমি তো বড় হয়ে যাচ্ছি। ইচ্ছে করলে আমি নিজেও কিছু একটা করতে পারি।

  • দুই

    দুই

    বাবার দূর সম্পর্কের এক ভাই কাছাকাছি শহরটায় থাকেন। তাঁর কাছে খবর পেয়েই এখানে চলে আসা।

    ফলে আমাদের মনে হত, এতদিন আমরা অজ্ঞাতবাসে ছিলাম। এখন থেকে বনবাসের পালা। অন্তত বাবার কথাবার্তা এবং আচরণে এসবই মনে হত। বাবা কোথাও আর জায়গা পেলেন না, এখানে পাণ্ডববর্জিত একটা বনভূমিতে শেষ পর্যন্ত চলে এলেন।

    ঘর বলতে বাঁশের খুঁটিতে দরমার বেড়া। টিনের চালের একটা বাছারি ঘর। আকাশ সামান্য ফর্সা হলে ঘরও ফর্সা হয়ে যায়। জ্যোৎস্না রাতে বেড়ার ফাঁকগুলো এক একটা এক এক রকমের। কোনোটা তারাবাতির মতো, কোনোটা যেন মোমবাতির শিখা। বাঁশ কেটে মাচান করে দিয়েছেন বাবা। লম্বা মাচান। খলফা ফেলে মাচানকে সমতল করা হয়েছে। মা, পিলু, মায়া, পুনু বড় মাচানটায় শোয়। ছোটটা আমার আর বাবার। দুটো ছেঁড়া মশারি। কতকালের পুরনো বাবাও বলতে পারবেন না। রং একেবারে কালো—ধুলো ময়লা লাগলে নতুন করে টের পাবার উপায় নেই। তালিমারা এত যে আসল মশারিটা কবেই উবে গেছে।

    সকালে ঘুম ভাঙলে দেখলাম বাবা পাশে নেই। বোধহয় রাত থাকতেই উঠে পড়েছেন। মানুষের ঘরবাড়ির বুঝি আলাদা একটা গন্ধ থাকে। সকাল না হতেই বাবা গন্ধটা পান। তখন আর বিছানায় থাকতে পারেন না। এত শীতেও কাবু হন না বাবা। এত ঠাণ্ডা যে কাঁথার ভেতর হাত পা জমে যায়। টিনের চাল বলে ঠাণ্ডাটা আরও বেশি। দরমার বেড়ার ফাঁকে হা হা করে শীত ঢুকে যায়। লেপ কাঁথা সব বরফ। বাবা পাশে শুয়ে থাকলে বেশ গরম থাকে। উঠে গেলেই শীতটা যেন আমাকে একলা পেয়ে বেশ জেঁকে বসে।

    সূর্য ওঠার আগে বাবা তাঁর ঘরবাড়ির সীমানাটা প্রতিদিনের মতো একবার ঘুরে দেখবেন। বেশ চিন্তাশীল মানুষের মতো তখন তাঁকে হাঁটতে দেখা যায়। পাঁচ মাসে বিঘে পাঁচেক জমির বেশ কিছুটা সাফ করা হয়ে গেছে। শীতের সময় বলে হিম পড়ে থাকে ঘাস পাতায়। কোথাও শুকনো কাটা জঙ্গল, কোথাও আগুনে ডালপালা পোড়ে নি বলে আধপোড়া ঘাসপাতা। সব মাড়িয়ে খালি পায়ে হেঁটে যাবেন বাবা। কোন দিকটায় হাত দেওয়া দরকার, কোনদিকে হাত লাগালে তাড়াতাড়ি সাফ হবার কথা—সব ভেবে ভেবে দেখা। তারপর যেমন পালংয়ের জমি, পেঁয়াজের জমি, সীমের মাচান, লাউয়ের মাচান, কোথাও সামান্য জমিতে মুলো চাষ, সব জমিতে বীজ বপনের পর কার কতটা বাড়বাড়ন্ত প্রতিদিন সকালে না দেখতে পেলে যেন তাঁর ভাল লাগে না। এ-সময়টুকু এইসব হাতে- বোনা ফসলের সঙ্গে থাকতে পারলে যেন বেঁচে যান মানুষটা। আয়ু বাড়ে তাঁর।

    আর মনে হত বাবা সারারাতই জেগে থাকেন সকাল হবার আশায়। কতক্ষণে সকাল হবে। যে গাছগুলো বড় হয়ে উঠেছে, অথবা যে লতায় ফুল আসবে, কখন কার কি পরিচর্যার দরকার রাতে শুয়ে শুয়ে কেবল বুঝি ভাবেন। কখন কোথাও দাঁড়িয়ে কোথাও বসে অতি সন্তর্পণে সব কিছু ঠিকঠাক করে দিতে দিতে দেখতে পান সকাল হয়ে গেছে। পাখিরা মাথার ওপর দিয়ে উড়ে যাচ্ছে অন্য আকাশে। ঘরবাড়ি মিলে বাবার সকালটা আমাদের চেয়ে কেমন অন্য রকমের মনে হয় তখন।

    বিছানায় শুয়ে বাবার গলা শুনতে পাই—উঠে পড় সবাই। সূর্য উঠে গেছে আর বিছানায় থাকতে নেই।

    পূব আকাশটা সামান্য ফর্সা হলেই বাবা সূর্য ওঠার কথা বলতেন। তখন আমাদের কিছুতেই উঠতে ইচ্ছে হত না। কাঁথা গায়ে শুয়ে থাকার ভেতর ভারি আরাম। কুঁকড়ে শুয়ে থাকি। চোখে রাজ্যের ঘুম। বাবা চান তাঁর সঙ্গে আমিও এই সব চাষ আবাদ ঘুরে ফিরে দেখি।

    এ-ভাবে বুঝতে পারি বাড়িটার চারপাশে ধীরে ধীরে সব শস্যক্ষেত্র তৈরি হচ্ছে। খুব সকালে মাও বোধ হয় শস্যের গন্ধ পায়। আর শুয়ে থাকতে পারে না। প্রায় সঙ্গে সঙ্গে ঘুম থেকে উঠে পড়ে।

    এখানে আসার পর বাবা কিছু পেঁপে গাছ লাগিয়েছেন। কোথা থেকে নিয়ে এসেছেন দুটো চাঁপা কলার গাছ। বড় যত্ন সহকারে গাছ দুটো জমির একপাশে লাগিয়েছেন। এতসব দেখেই বোধ হয় মা বাবাকে আবার নির্ভরশীল মানুষ ভাবতে পারছে। কথায় কথায় বাবাকে সেনাপতি বলে আর ঠাট্টা করে না।

    এবং দেখা গেল, বাবা কিছু কলাপাতা এনে মায়াকে বললেন, অ আ লেখ। আমাকে বললেন, তোর বইগুলো বের কর, মানুর কাছে যা। পরীক্ষাটা দিতে হয়।

    পরীক্ষাটা দিতে হয়, যেন অনেকদিন পর কথাটা বাবার মনে পড়ে গেল। দেশ ছেড়ে আসার পর গত দু’বছর কথাটা আমার এবং বাবার কারো মনে ছিল না। জমিজমা এবং মানুষের ঘরবাড়ি হয়ে গেলেই বুঝি কথাটা মনে হয়। পিলুকে বাবা কিছুতেই পড়াতে বসাতে পারেন না। তা ছাড়া পিলু খুব একটা আজকাল ভয়ও পায় না। অভাবী মানুষের সন্তানেরা বুঝি একটু বেশি বেয়াড়া হয়। পিলু যে বের হয়ে গেল, বাবা পিলুকে কিছু বলতে পর্যন্ত সাহস পেলেন না। পিলু এখন সিক্স-সেভেনে পড়তে পারত। দুটো বছর বাবার সঙ্গে এখানে সেখানে ঘুরে ওর স্বভাবটাও কিছুটা বাউণ্ডুলে হয়ে গেছে। অবশ্য ঠিক বাউণ্ডুলে না বলে বরং বলা যায় পিলু মা’র দুঃখ অথবা অভাববোধটা বোধহয় আমার চেয়ে বেশি টের পায়। সে যতটা পারে মা’র জন্য বাবার জন্য কাজ করে বেড়ায়। কেউ তাকে আর ঘাঁটায় না। দেখা গেল পিলু আসছে, হাতে পায়ে কাদা মাখা— কোঁচড়ে সব পুঁটি ট্যাংরা মাছ। কোনো গর্ত থেকে সব ধরে এনেছে। হয়তো দেখা গেল পিলু মাথায় করে নিয়ে আসছে এক ঝুড়ি গোবর। কখনো কোঁচড়ে গিমা শাক। সে বাড়িতে বাবার মতো ইতিমধ্যেই আংশিক সংসারী মানুষ হয়ে উঠছে।

    বাবা একদিন ভারি আশ্চর্য একটা খবর নিয়ে এলেন। বনটার শেষ প্রান্তে কেউ ঠিক আমাদের মতো মানুষের ঘরবাড়ি গড়ে তুলছে। বাবা সারাটা সকাল তাদের বাড়িতেই ছিলেন এবং কতদিন পর একজন প্রতিবেশী পাওয়া গেল ভেবে বোধহয় বাড়ির কথা ভুলে গিয়েছিলেন। এসে সারাটা দিন, নিবারণ দাস আর নিবারণ দাস। তাঁর দুই বউ। বড় সংসার। বাদশাহী সড়কের ধারে বনের একটা অংশ কিনে ফেলেছে। বাবা এখানটায় তাঁর ঘরবাড়ি করে যে ভুল করেন নি, নিবারণ দাসের মতো বিচক্ষণ লোকের আগমনের সংবাদ দিয়ে সেটা বার বার মাকে বোঝাতে চাইলেন। বিচক্ষণ কে বেশি, যে আগে করল, না যে পরে।

    বিকেলে ঠিক বাবার বয়সী সেই লোকটা আমাদের বাড়িতে এসে ডাকাডাকি শুরু করে দিল, ঠাকুর- কর্তা আছেন। বাবা তাড়াতাড়ি জঙ্গল থেকে হামাগুড়ি দিয়ে বের হলেন। জঙ্গলের ঝোপঝাড় কাটছিলেন বলে মাথায় মুখে ঘাসপাতা লেগে ছিল। নিবারণ দাস এসেছেন, নিবারণ দাস, খোঁজ-খবর করতে এসেছেন—বারে বা দেশ ছেড়ে আসার পর বাবার জীবনে কত বড় ঘটনা, বোধ হয় আর ইহজীবনে এত বড় ঘটনা ঘটেছে বাবার জীবনে, নিবারণ দাসের আসা দেখে, আদর আপ্যায়ন দেখে আমাদের বিশ্বাস করতে কষ্ট হল। বাবা তাকে তামাক খাওয়ালেন, এবং এমন একটা জায়গা বসবাসের জন্য নির্বাচন করেছে বলে তাকে বাবা কত যে সাধুবাদ দিলেন। লোকটা মাকে কর্তা মা কর্তা মা করছিল। মাও বেজায় খুশী, আর লোকটির কথাবার্তা হাবভাব অদ্ভুত আপনজনের মতো। যেন এই ব্রাহ্মণ পরিবারের কথা শুনেই এখানে চলে আসা। সাত পুরুষের ভিটে মাটি ছেড়ে গঙ্গা পাড়ে আসা। পালা পার্বণে যদি একজন নিষ্ঠাবান ব্রাহ্মণ না পাওয়া যায় তবে বেঁচে থাকার আনন্দ থাকে না। এমন কি দুজনে বসে ঠিকও করে ফেলল, আগামী শনিবারে শনিপুজা করবে নিবারণ দাস। বাবার একজন যজমান পাওয়া গেল তবে। ফ্যামিলি ট্যুর প্যাকেজ

    লোকটা চলে যাওয়ার পর বাবা কিছুক্ষণ কেমন ধন্দ লাগা মানুষের মতো বসে থাকলেন। লাখ টাকা লটারি পেয়েছে শুনলে দুঃখী মানুষের মুখে যেমন রা সরে না বাবারও বুঝি তেমন কিছু হয়েছে। বসে আছেন তো আছেনই। আমাদের ভয় ধরে গেল। ডাকলাম, বাবা। মা বলল, হ্যাঁগো তুমি কি ভাবছ অত!

    বাবা কেমন সুদূরের মানুষ হয়ে গেছেন। খুব ধীরে ধীরে বললেন, ভাবছি মানুষের বাড়িঘরের কথা। বাবার এই ধরনের আত্মদর্শন ঘটলেই কেমন আমাদের সব গোলমাল ঠেকে। কাছে বসে বললাম, লোকটা সত্যি শনিপুজা করবে তো বাবা! মাও বলল, হ্যাঁগো, সত্যি করবে তো! এত সুখ শেষ পর্যন্ত কপালে সইবে তো!

    বাবা কেমন গা-ঝাড়া দিয়ে উঠে বসলেন, হ্যাঁ হ্যাঁ করবে। একবার যখন বলে গেছে তখন দ্যাখ মিথ্যে হবে না।

    আর আমার মনে হল, বাবা কাল সকালেই চলে যাবেন, কি দাস মশাই পূজা তা হলে হচ্ছে। আর যদি না হয়, তবে বাবা না আবার ভিরমি খেয়ে পড়ে যান। কে দেখবে তখন! ভয়ে ভয়ে বললাম, আমি কাল তোমার সঙ্গে যাব।

    —কোথায় যাবি?

    —নিবারণ দাসের বাড়ি।

    —কেন?

    তোমার কি হবে-না-হবে শেষ পর্যন্ত বলতে পারলাম না। বললাম শুধু, দেশের মানুষ এসেছে, ঘরবাড়ি করছে, দেখে আসব।

    বাবা খুব ভারিক্কি গলায় বললেন, শনি পূজার দিন নিয়ে যাব।

    শনিবারের জন্য আমাদের তখন কি আকুলি-বিকুলি। মাও শনিপূজা একটা না করলে হয় না এমন বায়না ধরলে বাবা বললেন, হবে হবে। সবই তো হয়ে যাচ্ছে। কোনটা বাকি থাকছে! আগে একটা পঞ্জিকা কিনি। পঞ্জিকা না হলে পুরুত মানুষের মান-সম্মান থাকে না।

    শনিবারের আশায় পিলু পর্যন্ত সুবোধ বালক হয়ে গেল।

    শনিবার সত্যি এসে গেল। বাবা বেশ বিকেলেই আমাদের নিয়ে রওনা হলেন। কতকাল পর আমরা আবার সম্মানিত মানুষ। আমাদের জামা প্যান্ট খারে কাচা হয়েছে। কালীর পুকুরে মা সারা দুপুর আমাদের ছেঁড়া তালিমারা যা জামাকাপড় ছিল সব ধুয়ে ঘাসের ওপর শুকোতে দিয়েছে।

    আমরা যাচ্ছিলাম। রাস্তাটা বেশ মনোরম লাগছিল। কখনও এদিকটায় আসা হয় নি। বাবার গায়ে নামাবলী। মা সঙ্গে থাকলে একেবারে সপরিবারে শনিপূজা সেরে আসা হত। দু-একবার বাবা যে বলেন নি তা নয়। কিন্তু নিবারণ দাস বিশেষ কিছু বলে যায় নি বলে আত্মসম্মানে মা’র লেগেছে। বোধহয় সে জন্যই আসে নি। তবে মা বলেছে, আমি গেলে বাড়িটা খালি থাকবে না!

    আমরা আমাদের তালিমারা ছেঁড়া জামা প্যান্ট পরে রওনা হয়েছি। মা চুলে কাকুই দিয়ে দিয়েছে। ভুরুর ওপরে একটু কাজলের ফোঁটা। মার এতদিন পর মনে হয়েছে তার সন্তানেরা ভারি সুন্দর দেখতে। এবং চারপাশে যা বনজঙ্গল, আর ভূত-প্রেত কখন কার নজর লেগে যাবে ভয়ে মা মাথায় একটু থুথু দিয়ে বা পায়ের গোড়ালী থেকে সামান্য ধুলো মাখিয়ে দিয়েছে মাথায়। যতই রাত হোক, যতই অপদেবতার ভয় থাকুক, আমরা তার বাইরে। মা কত সহজে আমাদের সব বিপদ থেকে যে রক্ষা করে থাকে।

    ব্যারাকবাড়িতে তখন প্যারেডের হুইসিল বাজছে। এখন প্যারেড না থাকলে বাবা বোধহয় ঘুরে ব্যারেকের পথটা ধরে যেতেন। বাবা যে কত বড় নিষ্ঠাবান ব্রাহ্মণের সন্তান এটা বোঝাবার এমন একটা মৌকা হাতছাড়া হয়ে গেল বলে বোধহয় মনে মনে এখন আপসোস করছেন। ক’মাস হয়ে গেল, তবু পুলিসের কোয়ার্টারগুলোতে পূজা পার্বণে বাবার একদিনও ডাক পড়েনি। দেশ ছেড়ে সবাই এদেশে এসে মুচি মেথর সব ঘোষ বোস বনে যাচ্ছে। বাবা যে তেমন একজন কেউ নন কে জানে। বাবা কিছুতেই বিশ্বাস উৎপাদন করতে পারছিলেন না। নামাবলী গায়ে খালি পায়ে শনিপূজা সারতে যাচ্ছেন বাবা, যেন হাবিলদার সুবেদারের সঙ্গে দেখা হলেই বলা, যাচ্ছি শনিপূজা করতে। নিবারণ দাস শনিপূজা করছে। এসে হাতে পায়ে ধরল, কি আর করা যায়, শনিঠাকুর বলে কথা। কিন্তু প্যারেডের সময় কে আর কাকে লক্ষ্য করে! বাবা অগত্যা যেন বনের মধ্যে ঢুকে গেলেন।

    রাস্তাটা বেশ মনোরম লাগছিল। কখনও এদিকটায় আমি আসিনি। দু-পাশে বড় বড় শিরীষ গাছ, তার ছায়া এবং লতাপাতায় ঢাকা আশ্চর্য সব বনঝোপ। আমাদের পায়ের শব্দে পাখিরা উড়ে গেল ঝোপ থেকে। এবং কোথাও সুন্দর কুরচি ফুল ফুটে আছে। নাকে সুবাস এসে লাগছে। পায়ে হাঁটা একটা পথ এঁকে বেঁকে কতদূরে যে চলে গেছে মনে হয়।

    বাবা অনেকটা আগে চলে গেছেন। একটা ছোট বাঁকের মাথায় বাবা অদৃশ্য হয়ে যেতেই কেমন ভয় ধরে গেল। ডাকলাম, বাবা। পিলু বলল, আমি ঠিক চিনি। তুই আয়। মায়া বাবার নাগাল পাবার জন্য দৌড়চ্ছিল। আমি পিলু বাবাকে ধরার জন্য তারপর একসঙ্গে ছুট লাগালাম। বাবাকে আমাদের খুব এখন ভালবাসতে ইচ্ছে করছে। পিলু পর্যন্ত বাবার কথা শুনছে। সে বাবার নাগাল কিছুতেই ছাড়ছে না। আমার গায়ে হাফশার্ট। পা খালি আমাদের সবার। বেশ উঁচুনিচু পথ। দু’পাশের সব ঝোপজঙ্গল রাস্তা ঢেকে রেখেছে। কিছুটা প্রায় লাফিয়ে যেতে হচ্ছে কখনো। মনে হল পিলু এ-সব অঞ্চলে ঘুরে গেছে। সে-ই সব খবর দিচ্ছিল আমাকে। বলল, ডান দিকে ঐ যে দেখছিস, দেখতে পাচ্ছিস না দাদা, বড় বড় দুটো বাঁশঝাড়, ওপাশে গেলে একটা পোড়ো বাড়ি আছে। তারপর আছে তোর কারবালা, পরে মাঠ, রেললাইন। কারবালায় তোকে একদিন নিয়ে যাব। ইঁটের ভাটা আছে একটা। নবমী বলে একটা বুড়ি থাকে। কচু আর বন আলু সেদ্ধ করে খায়। কোনো দুঃখ নেই। লোক দেখলেই ফোকলা দাঁতে হাসে, ওমা তুমি কেগা! সুমার বনে একা ঘুরে বেড়াচ্ছ।

    আমার ভাল লাগল না। পিলুর বেজায় সাহস। কোনো বনের ভেতর বুড়ি থাকলে ডাইনী বুড়ি না হয়ে যায় না। বুড়িটা যদি পিলুকে ছাগল ভেড়া বানিয়ে রাখে।

    পিলু বলেছিল, জানিস দাদা, বুড়িটার দুটো বড় ছাগল আছে। কত বড় শিং। ভাবলাম মাকে বলব, মা, বুড়িটা দেখবে পিলুকে বাঁদর বানিয়ে রেখে দেবে।

    —কত তুকতাক জানতে পারে।

    পিলু হাসত। বলত, তুই খুব ভীতু স্বভাবের। আমরা হেঁটেই যাচ্ছি; রাস্তা আর শেষ হচ্ছে না। বনবাদাড়ের রাস্তা বুঝি কখনও শেষ হতে চায় না। সূর্য আর দেখা যাচ্ছে না। এত ঘন গাছপালা যে মাথার ওপরে আকাশ আছে বোঝা যাচ্ছিল না। দিনের বেলাতেই গা ছমছম করছে। ফিরতে রাত হয়ে যাবে। কেমন ভয় লাগছিল। রাতে আমরা ফিরব কি করে। যদিও বুঝতে পারছিলাম এ- সব বলা যায় না। বাবা খুব গুরুগম্ভীর গলায় বলবেন, তুমি বামুনের ছেলে। তোমার তো ভয় থাকার কথা নয়। বাবার কিছু দৃঢ় বিশ্বাস আছে। যেমন সব ভূতপ্রেতের কথায় এলে বাবা অনায়াসে বলবেন, বামুনের বাচ্চা, কেউটের বাচ্চা এক। সবাই ভয় পায়।

    পিলু বাবার কাছাকাছি হাঁটছে। মায়া মাঝখানে। সবার শেষে আমি। মাঝে মাঝে আমি কতদূরে আছি বাবা ঘাড় ফিরিয়ে দেখছিলেন।

    বাবার ডান হাত ধরে রেখেছে মায়া। সে পুজোর সব খেয়ে নেবে বলছে। পেট ভরে সিন্নি খাবে, মুড়ি খাবে, নারকেল বাতাসা খাবে, যেন এমন অতীব এক ভোজন কতকাল পরে প্রায় উৎসবের মতো এসে গেছে।

    আমি জানি, বাবা, আজ ভারি তন্ময় হয়ে যাবেন পুজোয় বসে। বেশ নিয়ম নিষ্ঠা, যা দেখলে নিবারণ দাস আখেরে আর সাহসই পাবে না, পুজো-পার্বণে অন্য বামুনের কথা ভাবতে। একেবারে বাবা যেন আত্মীয়ের মতো অথবা পরম হিতাকাঙক্ষী মানুষ, পূজার সুফল কি, কেন এইসব পালাপার্বণ, হিন্দুধর্ম, তার দেবদেবীর কি মাহাত্ম্য এবং পাঁচালী পড়লে গেরস্থ মানুষের যা কিছু ফললাভ বাবা ব্যাখ্যা করে যাবেন।

    পিলু বলল তখন, দাদা যাবি?

    —কোথায়?

    —কারবালাতে।

    —আমার ভয় করে।

    —ভয় কি রে!

    —ওখানে মুসলমানদের কবরখানা আছে।

    —তাতে কি!

    —কত সব মানুষের কঙ্কাল!

    —তুই দেখেছিস?

    —দেখব কি করে?

    —তবে। শেষে সে অভয় দেবার মতো বলল, একটাও থাকে না। শেয়ালেরা সব খেয়ে নেয়। সে একবার একটা শেয়ালকে মাঠের ভেতর দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছিল। প্রায়, যা বর্ণনা পিলুর, বাঘ- টাঘের শামিল। সে কিছুদুর পর্যন্ত শেয়ালটার পেছনে দৌড়েছিল। এবং বনের ভেতর ঢুকে যেতেই ভারি একা মনে হয়েছিল নিজেকে। আর বোধ হয় ভয়ও করছিল। দাদা সঙ্গে থাকলে অন্তত সেটুকু থাকত না। এবং এ-জন্যই মাঝে মাঝে তোষামোদ দাদাকে— যাবি দাদা। কত রকমের সব ফলের কথা, এবং বড় বড় বন-আলু তুলে আনা যায়-এক একটা আলু পনের বিশ সের ওজনের। একবার তো সারাদিন পিলুর দেখা নেই। মা বার বার বলেছিল, কোথায় যে গেল ছেলেটা। বাবার সাদাসিধে কথা। গেছে কোথাও ঠিক চলে আসবে। সকালে পিলু কিছু না খেয়ে বের হয়ে গেছে সেদিন। মার সঙ্গে কথা কাটাকাটি করেছে। মা রেগে গিয়ে খেতে দেয় নি কিছু। রাগের মাথায় যদি একটা কিছু করে ফেলে। দুপুর গড়িয়ে বিকেল। মা না খেয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে—আমিও কতবার ডাকাডাকি করেছি। ব্যারাকের মাঠে এবং বাদশাহী সড়কে উঠে দেখে এসেছি। নেই।

    মা তখন প্রায় ভেউভেউ করে কেঁদেই দিত। মায়া এসে বলল, ছোড়দা আসছে। ছোড়দা মাথায় কি একটা অতিকায় বহন করে আনছে। কাছে এলে দেখতে পেলাম অতিকায় বন-আলু। প্রায় হাতির সাদা দাঁতের মতো। মা’র যত রাগ, নিমেষে উবে গিয়েছিল—এতবড় বন-আলু মা জীবনেও দেখে নি। প্রায় দু হাতে মাথা থেকে নামাতে গেলে পিলুর প্যান্ট হড়হড় করে নেমে গেল পেট থেকে। কিছই খায় নি বলে পেটটা কোথায় ঢুকে গেছে। হাতে পায়ে মুখে—শরীরের সর্বত্র মাটি কাদা এবং সেদিন ওকে পুকুরপাড়ে টেনে নিয়ে গিয়ে বাংলা সাবানে শরীর পরিষ্কার করে দিয়েছিল মা। একটা আলুতে আমাদের কতদিন চলে যাবে। খেতে বসে পিলুর সাম্রাজ্য জয়ের কথা শুনতে শুনতে মা কেবল চোখের জল ফেলছিল। বাবার মতো পিলুকে সেই থেকে কেন জানি মাঝে মাঝে আমার ভারী সমীহ করতে ইচ্ছে হত।

    তখনই বাবা বললেন, এসে গেছি।

    বনটার শেষ। এদিকেও সেই বাদশাহী সড়ক ঘুরে গেছে। এবং বোঝাই যায় পুব-উত্তরে কিছু দক্ষিণেও বনটাকে একটা হাঁসুলির মতো এই বাদশাহী সড়ক প্রায় সবটা ঘিরে রেখেছে। ঠিক রাস্তার ধারেই দুটো দোচালা টিনের ঘর নিবারণ দাসের। পুব-দক্ষিণ খোলা বলে সকাল দুপুরের সবটা রোদই বাড়িটা পায়।

    সাঁজ লেগে গেছে। আমাদের দেখে নিবারণ দাস হাতজোড় করে ছুটে আসছে। একটা জলচৌকিতে বাবাকে বসতে দেওয়া হল। বারান্দায় একটা হারিকেন জ্বলছে। খোলা উঠোনে বেশ বড় গামলায় দুধ, চালের গুঁড়ো। সাদা পাথরে ঠাণ্ডা নারকেলের জল। দাসের দুই বউ আমাদের দেখে কি করবে ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না। ছেলেমেয়েরা পরিষ্কার জামাকাপড় পরে সেজেগুজে আছে। বড় মেয়েটা শাড়ি পরেছে। ঢপ ঢপ করে প্রণাম বাবাকে। তারপর আমাকে পিলুকে লুটের বাতাসার মতো প্রণাম করতে থাকল। আমরা কত বড় মানুষের ছেলে এই বুঝি প্রথম টের পেলাম। পিলু দেখলাম মুখ বেশ গম্ভীর করে রেখেছে। ওর জামার নিচে প্যান্ট, প্যান্টে দড়ি পরানো নেই। পরিয়ে দিলেও থাকে না। এখন পিলু এত গম্ভীর যে মনে হয় দম বন্ধ করে আছে। দম আলগা করে দিলেই হয়েছে। প্যান্ট আবার হড়হড় করে নিচে নেমে না যায়। ভাগ্যিস বড় মেয়েটা একটা শতরঞ্চ পেতে বারান্দার একপাশে বসতে দিল। তাড়াতাড়ি যেন নিজের গরজেই আর মান-সম্মানের ভয়ে পিলুকে টেনে নিয়ে গিয়ে বসিয়ে দিলাম। আর আমরা সবাই নিরীহ মানুষের মতো পুজার ভোগসামগ্রী সতৃষ্ণনয়নে দেখার সময় মনে হল বুড়ি মতো কেউ লাঠি ঠুকে ঠুকে এদিকটায় আসছে। হারিকেন তুলে আমাদের মুখ দেখছে। ফোকলা দাঁতে বলছে, এ যে সব কার্তিক ঠাকুর এক একজন। বলেই লাঠি পাশে রেখে মাথা ঠুকতে থাকল। আমাদের তখন একেবারে হতভম্ব অবস্থা।

    বাবা পদ্মাসনে বসে আছেন। আমরা তাঁর ছেলেপুলে কে দেখলে বলবে? আমরা কি করছি, কি- ভাবে আছি একবারও মুখ ফিরিয়ে দেখছেন না। কেবল পুজোর ফুল, নৈবেদ্য, ঘট, আমের পল্লব, সিঁদুরের থান, তিল তুলসী সব ঠিকঠাক আছে কিনা দেখে নিচ্ছেন। নিবারণ দাস বাবার পা ধুইয়ে দিয়েছে জলে। পা মুছে দিয়েছে। এত বড় মানুষটা বাবাকে এ-ভাবে সমাদর করতেই আমরা আরও নিরীহ গোবেচারা হয়ে গেলাম। বাবার মান-সম্মান এখন সব কিছুই আমাদের স্বভাব-ধর্মের ওপর নির্ভর করছে।

    চারপাশে আর কোনো লোকালয় নেই। দূরে এই কিছু জমি পার হয়ে গেলে চৌমাথা। বাদশাহী সড়ক ফুড়ে রাস্তাটা গেছে রাজবাড়ির দিকে। চৌমাথায় বড় পাটের আড়ত।

    বারান্দায় হ্যাজাকের আলো। এখানে বসেও দেখা যায় পাটের আড়তে কাজকর্ম হচ্ছে।

    নিবারণ দাস বলল, পাটের আড়ত দেব ভেবেছি কর্তা। কেমন হবে? চারপাশে বাবা ফুল চন্দন ছিটিয়ে দিচ্ছিলেন। বাড়িটা জুড়ে বেশ পূজা পূজা গন্ধ। বাবা ভারি নিপুণ গলায় বললেন, লক্ষ্মী আপনার বাঁধা দাসমশাই। যাতে হাত দেবেন সোনা ফলবে। বাবার কথা অমৃত সমান ভেবেছে নিবারণ দাস।

    আমার কেবল মনে হয়েছিল, আমাদের জন্য কেন বাবা এমন আশীর্বাদ ঈশ্বরের কাছে চেয়ে নেন না। কত সহজে বাবা নিবারণ দাসকে অমৃত সমান কথা বলে দিতে পারলেন। আমার বাবা বেশ সুশ্রী মানুষ, লম্বা এবং গৌরবর্ণ। আর বাবা এত অভাবের ভেতরও শরীর বেশ কোমল এবং মাথা ঠিক রাখতে পেরেছেন। পূজায় বাবাকে কে কি দিল—এই যে শনির পূজা, একটা বড় গামছা দিতে পারত নিবারণ দাস-কত না জানি দক্ষিণা দেবে, অথচ সে-সব বাবা আদৌ গ্রাহ্য করেন না এবং বেশ সময় নিয়ে নিষ্ঠা সহকারে পূজা করে গেলেন। শান্তির জল দিলেন সবাইকে। সুর ধরে পাঁচালী পাঠ করলেন। সবাইকে প্রসাদ মেখে সিন্নি, চাল কলা এবং আমাদের হাতে হাতেও দিলেন। কাউকে বেশি না কম না। মায়া যে রাস্তায় পইপই করে বলেছে পেট ভরে সিন্নি খাব—সেসব যেন বাবা একেবারেই ভুলে গেছেন। অবস্থা এমন যে শেষ পর্যন্ত বাবা তাঁর ছেলেমেয়েদের বাড়ি পর্যন্ত চিনে নিয়ে যেতে পারলে হয়। এত কমে এত বেশি পুণ্য হয় না—বাবাটা যে কি। রাগে ভেতরটা গরগর করছিল।

    পিলুর দিকে তাকিয়ে আরও বেশি রাগ হচ্ছিল। তুই কি রে! নিজের স্বভাবধর্ম মানুষ এ-ভাবে ভুলে যায়! তুই পর্যন্ত একবার বলতে পারলি না, আমাকে আর একটু দাও বাবা। তুই চাইলে বাবা দুবার আমাকেও দিত। মায়া পেট ভরে সিন্নি খাবে বলেছিল—কথাটা মনে পড়ত বাবার।

    তখনই দাসের মা বলল, কর্তা, এত প্রসাদ খাবে কে?

    দাসের মা’র কথা শুনেই আবার নড়েচড়ে বসা গেল।

    বাবা বললেন, আসবে। মানুষজন আসবে। এলে দেবেন, প্রসাদ নামমাত্ৰ।

    তখন ভগবানকে বললাম, হা ভগবান, মানুষের বাবা এত নিষ্ঠুর হয়। পূজার দক্ষিণা মাত্র তিন আনা পয়সা। তিন আনা পয়সাই তামার। পয়সা কটা বাবা আঁচলের কোণায় শক্ত করে বাঁধলেন। দুবার টেনে দেখলেন, খুলে পড়ে-টড়ে যেন না যায়। গামছায় ভোজ্য দ্রব্য বলতে সামান্য চাল, দুটো নাতি-বৃহৎ বেগুন, একটা হরিতকী, ছোট ছোট লাল জরুলের মতো দুটো আলু খুব যত্নের সঙ্গে নিয়ে নিলেন। এই সামান্য পাওনার বিনিময়ে বাবা লোকটাকে কত বড় কথা বলে গেল! বাবা যখন উঠব ডঠব করছেন, নিবারণ দাস বলল, এরা তো কিছুই খেল না। কর্তামার জন্য একটু এবং এই বলে সে একটা বড় জামবাটিতে অনেকটা সিন্নি, চাল কলা ফল গামছায় বেঁধে দিল নিজে। বাবা কিছুই দেখছেন না, যত কথা বলছেন দাসের সঙ্গে। আমাদের চোখ চকচক করছে। তার মেয়ের একটা ভাল বর খোঁজা দরকার। বাবা নিজের ওপরেই ভারটা নিয়ে নিলেন এবং এমন সব মানুষজনের খবরাখবর দিলেন বাবা, যে নিবারণ দাস বাবাকেই এ-বিপদে একমাত্র কাণ্ডারী ভেবে ফেলল।

    ফেরার পথে একটা হারিকেন দিয়ে দিল। নিবারণ দাস কথা বলতে বলতে কিছুটা পথ এগিয়ে দিচ্ছিল। সিন্নি প্রসাদ নিবারণ দাসের হাতে। যে-ভাবে বাবা আর নিবারণ দাস কথাবার্তায় মশগুল হয়ে গেল, না জানি পুঁটুলিটা দাসের হাতেই থেকে যায়। যা আমার একখানা বাবা, ফেরার পথে শুধু হারিকেনটাই হয়তো ধরা থাকবে হাতে! পিলু বোধ হয় এটা টের পেয়ে বেশ কায়দা করে বলল, জ্যাঠা আমাকে দিন। আমি নিচ্ছি।

    জ্যাঠা বলল, পারবে তো?

    পিলু ঘাড় উঁচিয়ে বলল, খুব।

    যখন কিছুটা পথ এগিয়ে দিয়ে নিবারণ দাস টর্চ জ্বেলে চলে গেল তখন পিলু তার স্বভাব-ধর্ম ঠিক রাখতে পারল না। হাত ঢুকিয়ে একটা কলা বের করে বলল, দাদা খা।

    আবার বের করে নিল দু টুকরো নারকেল। মায়াকে দিল, আমাকে দিল। সে নিজেও রাক্ষসের মতো সব মুখে ফেলছিল।

    বাবা বললেন, বেশ তো ভাল ছেলে হয়ে ছিলে বাবারা। জঙ্গলে ঢুকতে না ঢুকতেই স্বমূর্তি ধারণ করলে বাবারা। তোমার মা’র জন্য কিছু রেখ!

    আমরা এ-ভাবে হেঁটে যাচ্ছিলাম। আমার হাতে হারিকেন। অন্ধকার ঘোলাটে পৃথিবী ফুঁড়ে হেঁটে যাচ্ছিলাম। আলোতে আমাদের ছায়াগুলো কখনও লম্বা কখনও ছোট হয়ে যাচ্ছিল। পিলু সবার আগে। এবং জানি মা খলপার দরজা বন্ধ করে রাস্তায় কোনো শব্দের জন্য উৎকর্ণ হয়ে আছে। মা না একা আবার ভয় পায়। আমরা তখন প্রায় দৌড়ে সেই অন্ধকার বনভূমি পার হবার চেষ্টা করছিলাম। পৃথিবীতে এ-কটা প্রাণী বাদে এই বনভূমি এবং অন্ধকারে কিছু জোনাকি পোকা—বনের মধ্যে মা নিশীথে আমরা কতক্ষণে ফিরছি সেই আশায় বসে রয়েছে। বাড়ির কাছে আসতেই পায়ে ভীষণ জোর এসে গেল। দৌড়ে দরজায় উঠে গেলাম। ডাকলাম, মা আমরা এসেছি। ওঠো। মা লম্ফ হাতে দরজায় দাঁড়িয়ে প্রথমেই বলল, তোর বাবা কোথায়?

    —আসছে।

    আমরা মা’র যেন কেউ না। বাবার জন্য লম্ফ হাতে মা উঠোনে নেমে গেল।

    বাবা যাতে ভাল দেখতে পান সেজন্য লম্ফটা আরো উঁচু করে ধরল।

    মনে হল মা আমার নিমেষে আকাশবাতি হয়ে গেছে। সবার ওপরে হাত। হাতে লম্ফ। লম্ফের আলো দাউদাউ করে জ্বলছে। বাবা আলোর দিকে এগিয়ে আসছেন। বাবাকে খুব শক্তিশালী যুবকের মতো মনে হচ্ছিল।

  • তিন

    তিন

    নিবারণ দাস পরদিনই সকালে এসে হাজির। একটা চাটাই পেতে দিল মায়া। মা ঘোমটা টেনে বলল, তোর বাবাকে ডেকে দে। বাবা এ-সময়টাতে কোথায় থাকেন সংসারে সবাই জানে। সীমানা বরাবর জিয়ল গাছের ডাল পুঁতে নিজের জমি ঠিক করে নিচ্ছেন। বাবা এলে দাস বলল, এলাম কর্তা। একটা দিনক্ষণ দেখে দিন। শুভদিনে আড়ত খুলব ভাবছি।

    বাবা বলল, দাসমশাই, পাঁজি তো নেই।

    এবং দাসমশাই পরদিনই একটা নতুন পঞ্জিকা উপহার দিয়ে গেল। দিনক্ষণ জেনে গেল। বাবা পঞ্জিকাটা হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ ভারি অভিভূত হয়ে বসে থাকলেন। বড় মূল্যবান সামগ্রীর মতো বইটাকে দেখতে থাকলেন। কাছে গেলে ধমকে উঠলেন, এখানে কি, যাও! পাছে বইটাতে আমরা কেউ হাত দিই ভয়ে একদম কাছে ভিড়তে দিলেন না। দূর থেকেই আমরা যতটা পারলাম আশ মিটিয়ে দেখলাম। খুবই ভাগ্যবান মানুষ বাবা—আস্ত একটা পঞ্জিকা নিবারণ দাস উপহার দিয়ে গেল—ভাগ্যে লেখা না থাকলে এ-সব হয় না। এখানে আসার পর কতবার তো চেষ্টা করেছেন শহর থেকে বইটা আনিয়ে নেওয়ার। কিছুতেই হয়ে ওঠে নি। গত জন্মের পুণ্যফলেই এখনও যা কিছু হচ্ছে। বিশেষ করে বইটা পেয়ে বাবা কেমন খুবই ছেলেমানুষ হয়ে গেলেন। পাতা খুলে খুব সন্তর্পণে একের পর এক দেখে যেতে থাকলেন। কোনোদিকে ভ্রুক্ষেপ নেই। এমন অমূল্য ধন তাঁর কাছে আছে, আর যদি জানতে পারে মানুষেরা, অমোঘ দিনক্ষণ বলে দিতে পারে মানুষটা তবে অঞ্চলের একজন সেরা মানুষ হতে বেশী আর সময় লাগবে না।

    বইটা পেয়ে দু-তিন দিন বাবা নাওয়া-খাওয়ার কথাই ভুলে গেলেন। বাড়িঘরের কথা মনে থাকল না। সারাটাক্ষণ উবু হয়ে গোটা পঞ্জিকাটা পড়ে বোধ হয় শেষ করে ফেললেন। কোনো পাতায় আবার দুটো লাইন দেগে দিলেন। বইটা কোথায় রাখা যাবে, এই নিয়েও বড় সমস্যা দেখা দিল। পিলুকেই বেশি ভয় বাবার। ছবি দেখতে গিয়ে ছিঁড়ে না ফেলে। মলাট দেবার মতো বাড়তি কাগজ নেই। তিনি বইটি রাখার মতো কোনো জায়গাই ঘরে নির্বাচন করতে পারলেন না। ট্রাংক ভাঙা। যে কেউ খুলতে পারে। নিবারণ দাস দিলই যখন বাড়তি একটা তালা চাবি দিলে পারত। কোথায় এখন যে রাখা যায়!

    মা বলল, দাও তুলে রাখি।

    —কোথায়?

    —কেন ট্রাংকে।

    —থাকবে ভাবছ?

    —থাকবে না তো কে খাবে!

    —তোমার মূর্তিমান শ্বাপদেরা সব করতে পারে। সব খেতে পারে।

    পিলু বলল, আমি ধরব না তো বলেছি।

    আমিও বললাম, কেউ ধরবে না বাবা, তুমি ভাঙা ট্রাংকটাতেই রাখ। মা বলল, তোরা কিছু বলতে যাস না। তারপর কিছু হলে সব দোষ তোদের।

    কিন্তু সারা দিন ধরে পঞ্জিকাটা বাবাকে ভারি বিভ্রান্তির মধ্যে ফেলে রেখেছে। তিন দিনের দিন বাবা শেষ পর্যন্ত ট্রাংকে রাখাই স্থির করলেন। এত করেও পঞ্জিকার ভবিতব্য সম্পর্কে খুব একটা সংশয় থেকে গেল তাঁর। পিলুর দিকে তাকিয়ে বললেন, তোমার তো সংসারের সব কিছুই কাজে লাগে। এটাকে আর কাজে লাগাতে যেও না।

    পিলু বলল, আমি ধরবই না।

    যতই বলুক, আমিও বাবার মতো শেষ পর্যন্ত পিলুই অনিষ্টের কারণ হবে ভাবলাম। কারণ পিলুকে বিশ্বাস নেই। সে আজকাল সহজেই একশ রকমের মিথ্যে কথা বলতে শিখেছে। এবং সেবারে বাবা প্রায় মাসখানেক বাদে নিরুদ্দেশ থেকে ফিরলে আনন্দে পিলু বনটার এমন সব জীবজন্তুর খবর দিয়েছিল তার সাহসিকতা প্রমাণের জন্য যে একটা কথাও সত্যি না। বাবার একটা আমলকী গাছের চারা পিলু তুলে নিয়ে তার পছন্দমতো জায়গায় ফের পুঁতে দিলে গাছটা মরে গেল। পিলু স্বীকারই করল না সে কাজটা করেছে। আমরাও ঠিক দেখি নি, বাবা বাড়ি নেই, খাওয়া-দাওয়ার ঠিক নেই, পিলু বনবাদাড়ে ঘুরে বেড়ায়—এরই মধ্যে কখন সে কাজটা করেছিল আমরা কেউ জানিও না। অথচ পিলু ছাড়া এত বড় দুঃসাহসিক কাজ আর কেউ করতে পারে না। তিন ক্রোশ দূর থেকে বাবা হেঁটে গিয়ে চারাটা এনেছিলেন। ফিরতে ফিরতে সাঁজ লেগে গেছিল। বাবা সকালে গর্ত করে গাছটা লাগিয়েছিলেন। পিলু বলেছিল, তুমি রাস্তার পাশে লাগালে বাবা! সব আমলকী লোকে চুরি করে নিয়ে যাবে। এই সুমার বনে লোক আসবে কোত্থেকে? পিলু বলেছিল, গাছটা বড় হতে হতে সুমার বনটা আর থাকবেই না। মানুষজন ঠিক চলে আসবে। ফল হলে চুরি যাবে ভয়ে সে ঠিক গাছটা ঘরের পেছনে বেশ একটা নিরিবিলি জায়গায় পুঁতে দিয়েছিল বোধ হয়। এবং শেষে মরে গেছে বলে বেশ কিছুদিন বাবা বাড়ি ফেরা পর্যন্ত ভাল মানুষ হয়েছিল। বাবার চেঁচামেচিতে বুঝতে পেরেছিলাম, পিলুর খুব সদাশয় হয়ে যাওয়ার মূলে ছিল গাছটা।

    তবে আমাদের সৌভাগ্য বাবা রাগ খুব বেশিক্ষণ পুষে রাখতে পারেন না। খেতে বসে বাবা পিলুর পাতে বড় পুঁটি মাছটা তুলে দিয়ে বলেছিলেন, খা। একটা অমালকী গাছ কোথায় আবার পাব! আমলকী ফল অজীর্ণ রোগে কত কাজে লাগে জানিস!

    পিলু বেশ বড় মাছটার লেজ ধরে দুবার মাছটা চাটল। তারপর এক গাল হেসে বলল, জান বাবা ক’টা বাবু মতো লোক এসে না বনটা দেখে গেছে।

    বাবা বললেন, কারা ওরা?

    —আমি তখন না বাবা মাঠে ছিলাম। আমাকে বলল, খোকা তুমি থাকো কোথায়। বনের ভেতরে বাড়িটা দেখালে বলল, এই জঙ্গলে তোমরা থাক। ভয় লাগে না?

    জঙ্গল বলায় পিলুর খুব রাগ হয়েছিল। সে বলেছিল, জঙ্গল কোথায়। এটা তো একটা বন।

    —তোমার বাবা বাড়ি আছেন?

    —বাবা কোথায় গেছেন।

    —কোথায়, জান না?

    —না। বাবা মাঝে মাঝে আমাদের ফেলে চলে যান।

    এতে বোধ হয় বাবার আত্মসম্মানে লেগেছে। তিনি বললেন, কোথায় যাই আবার। দেশ গাঁয়ের লোক কে কোথায় এসে উঠছে খুঁজতে হয় না। এখানে আমাদের আর কে আছে! ওরা কোথাকার লোক জিজ্ঞেস করলি না?

    —বলল কোটালি পাড়ার লোক।

    —কোন কোটালিপাড়া? বুলতার কোটালিপাড়া না ফরিদপুরের কোটালিপাড়া। আর একটা কোটালিপাড়া আছে কিশোরগঞ্জের কাছে। এতকিছু বোঝ আর এটা বোঝ না। কোন কোটালিপাড়া জিজ্ঞেস করতে হয়। ফরিদপুরের কোটালিপাড়ার মজুমদার মশাইরা তো রানাঘাটে বাড়ি করেছে।

    বাবার ভূগোল এত জানা যে মাঝে মাঝে মনে হত অনায়াসে বাবা পৃথিবীর সব খবর দিয়ে যেতে পারেন। আসলে বাবা জমিদার এস্টেটে আদায়ের কাজ করেছেন। নানা জায়গায় ঘুরে বেড়াতে হত বাবাকে। কত সব মানুষ পৃথিবীতে বাবার চেনা হয়ে গেছে। তখন বাবার জন্য আমরা গর্ববোধ না করে পারতাম না।

    বাবা আবার ফিরে আসায় সংসারে সবাই ফের নিশ্চিন্ত। ক’টা দিন আবার পেট ভরে খাওয়া। বাবা একটা দিন কোথায় কি ভাবে কাটিয়েছেন সারাক্ষণ সেই গল্প। কোথায় অনেকদিন পর কার বাড়িতে এই কর্তাঠাকুরটিকে পাবদা মাছের ঝোল খাইয়েছে তার বিশদ ব্যাখ্যা টীকা সহকারে মাকে বোঝাচ্ছিলেন। — পাবদা মাছ, তবে বুঝলে ধনবৌ, দেশের মতো না। তেমন পাবদা মাছ এ দেশে পাওয়া যাবে কেন! এবং এই পাবদা মাছ প্রসঙ্গে বাবা এমন নিদারুণ সব ঝালঝোল শুকতোনির গল্প করছিলেন যে রাতে আর আমাদের কিছুতেই ঘুম আসছিল না। আমরা সবাই মশারির ভেতর থেকে মুখ বার করে বাবার পাবদা মাছ খাওয়ার গল্প শুনছিলাম।

    পিলু বলে ফেলল, আমরা একদিন খাব বাবা।

    —খাবে তো পাবেটা কোথায়। খেতে হলে রানাঘাটে যেতে হয়।

    পিলু বলেছিল, রানাঘাট কতদূর বাবা?

    —অনেক দূর। বড় হলে যাবে।

    আমি বললাম, ও মা, তুই কিরে। আমরা যখন এদেশে এলাম তখন তো রানাঘাটের ওপর দিয়েই এলাম।

    —সত্যি! পিলুর যেন বিশ্বাস হচ্ছিল না।

    মা বলল, ওর মনে না থাকারই কথা।

    —রানাঘাটে আমরা রাতে ট্রেন বদল করলাম না বাবা! স্টেশনে ম্যাজেন্টা রঙের আলো। কি রকম অদ্ভুত একটা দেশ মনে হচ্ছিল আমার। আর কত গাড়ি। এদিকে গাড়ি ওদিকে গাড়ি। মাথার ওপর দিয়ে একটা পুল চলে গেছে। ঘটাং ঘটাং শব্দ।

    পিলুর বুঝি মনে হল ওটা একটা স্বপ্নের দেশ। সে বড় হয়ে একবার রানাঘাটে যাবে বলল। বাবাও খুব আত্মবিশ্বাসের গলায় বললেন, এত দেশে গেছ আর রানাঘাটে যাবে না সে হয়!

    এত দেশ বলতে তো আমাদের নিয়ে বেড়ালছানার মতো দুটো বছর এখানে সেখানে বাবা ঘুরে বেড়িয়েছেন। নবর বাবার খোঁজে তিনি সেই যে আমাদের প্ল্যাটফরমে ফেলে চলে গেলেন আর আসেনই না। সারাদিন না খেয়ে থাকার পর পিলু একটা বাড়ির পাশে শসার মাচান আবিষ্কার করে ফিরে এল। বিকেলে সে আমাকে নিয়ে সব দেখাল। আট দশটা কচি শসা। আমাদের চোখ মুখ এত ক্ষুধার্ত থাকত যে লোকে দেখলেই তেড়ে মারতে আসত। মা তো নির্বিকার। স্টেশনে দিনের পর দিন বাবার ফিরে আসার আশায় বসে আছে। পিলু সারাদিন না খেয়ে থাকলে ভীষণ বেয়াড়া হয়ে যায়। মাকে যা খুশি গাল দেয়। সেদিন সন্ধ্যায় দেখি দূরের মাঠে সোরগোল। পিলু কাছে কোথাও নেই। মাঠে দেখছি একদল ছেলে পিলুকে ঠ্যাঙাবে বলে ধরে নিয়ে যাচ্ছে। আর পিলুর সেই আর্ত চিৎকার- দাদা রে। সেই প্রথম আমার মাথায় ভীষণ একটা বুনো মোষ তাড়া দিয়ে উঠেছিল। ছুটে গিয়েছিলাম। সবার ভেতর ঝাঁপিয়ে পড়ে বলেছিলাম, আমার ভাইকে ছেড়ে দিন। ও শসা চুরি করেনি। আমরা খুব গরীব। বাবা তিন চারদিন হল কোথায় গেছে।

    সেই ষন্ডামতো ছেলেগুলো আমাকে দেখে কি ভাবল জানি না, পিলুকে ছেড়ে দিয়েছিল। বলেছিল, হারামজাদা, তোমার ভাইকে সহ এবার তোমাকে প্যাদাব। আবার যদি দেখি এদিকে ঘুরঘুর করছ কখনও।

    সবিনয়ে বলেছিলাম, আর আসব না ইদিকে। পিলুর দিকে তাকিয়ে খুব গার্জেনি গলায় বললাম, তুই চুরি করেছিস। সত্যি করে বল?

    —নারে দাদা। মিছি মিছি ওরা আমাকে ধরে নিয়ে ঠ্যাঙাবে বলছে।

    ওরা চলে গেলে পিলু ভারি সন্তর্পণে বলল, বাবাকে খুঁজতে যাবি আবার?

    —কোথায়?

    —চল না। বলে সে আমাকে নিয়ে গিয়েছিল বড় একটা ইঁটের ভাটায়। কেবল জঙ্গল আর আগাছা। সামনে বড় বড় সব শিরীষ গাছ। পর পর সব উইয়ের বড় ঢিবি। ঢিবিগুলি পার হলে সুন্দর মতো দুটো মিনার। বোধহয় এখানে কোনো দরগা আছে। মেলা বসে কখনো। সে কি সব চিহ্ন দেখে ক্রমে গভীর জঙ্গলে ঢুকে যাচ্ছিল। এখানে বাবা কেন মরতে আসবে বুঝতে পারছিলাম না। সে একসময় শিশুর মতো সরল গলায় বলল, এই যে পেয়েছি। ঘাস পাতা সরিয়ে ফেলল সে দু হাতে।। জ্বলজ্বল করছে কটা কচি শসা। সত্যি পিলু চুরি করেছে তবে। পিলু চুরি করেছে বাবা জানতে পারলে খুব কষ্ট পাবেন। সে বলল, দাদা, তুই বাবাকে বলে দিস না। কিরে বলে দিবি না তো?

    পিলুর এত ভারি কষ্টের মুখ আর আমি জীবনেও দেখিনি। বললাম, বলব না। পিলুর ওপর রাগটাও আর বেশিক্ষণ থাকল না। পেটের খিদেটা যে কি, যে কোনো কুকর্মই এসময় খুব মহৎ কাজ মনে হয়। কিছুক্ষণ আগে যে, পিলুকে সেই ষন্ডামতো ছেলেগুলো ঠ্যাঙাবে বলে ধরে নিয়ে যাচ্ছিল, শসা ক’টা পিলু বাদে যে আর কেউ চুরি করেনি—ওরা ঠিকই ভেবেছিল, এবং আমার ভাই পিলু, তা ছাড়া পিলু আমার বাবার মতো মানুষের ছেলে, আমার সম্মানে খুব লেগেছিল—সেসব কিছুই আর মনে পড়ছিল না।

    চারপাশে তাকিয়ে বললাম, কেউ আবার যদি দেখে ফেলে?

    —কত বড় জঙ্গল। কেউ এখানে আসেই না।

    সত্যি বনজঙ্গলটা বেশ বড়। অদুরে রেল-লাইন, ইস্টিশান, লাল ইঁটের বাড়ি। পাড়াগাঁয়ের মানুষজনের চলাফেরার শব্দ ছাড়া আর কোনো সাড়াশব্দ পাওয়া যাচ্ছে না। শসা ক’টা জামার তলায় লুকিয়ে ফেলা দরকার। কে কোথায় আবার দেখে ফেলবে। এত সব গাছপালা, পাখি কাউকে যেন বিশ্বাস নেই। প্ল্যাটফরমে আমাদের থাকা খাওয়া এবং শসা ক’টা কি যে অমূল্য ধন তখন, আমি খাব, পিলু খাবে, মা খাবে, মায়া তো সব ক’টা একাই খেয়ে নিতে চাইবে। কিন্তু মা যদি না খায়। চুরি করা শসা মা না-ও খেতে পারে। তা ছাড়া মা’র মাথাও খুব একটা ঠিক নেই। বাবার আক্কেলের কথা ভেবে অদৃষ্টকে শাপমণ্যি করছে। আর কেন যে ইষ্টিশানে ফিরে এলেই আমরা দু ভাই হুটোপুটি লাগিয়ে দিই। এই বুঝি ট্রেন থেকে বাবা নামলেন। কত লোক আসে ট্রেনে অথচ বাবার মতো মানুষ ট্রেন থেকে একজনও নামেন না। তখন পিলুর এই দুর্বুদ্ধিকে দুঃসময়ে বাহবা না দিয়ে পারা যায় না। পিলুর প্রতি বরং প্রগাঢ় ভালবাসাই আমার প্রবল হয়ে উঠল।

    পিলু বলল, দাদা তুই একটা খা, আমি একটা খাই। সে একটা আমাকে দিল, নিজে নিল একটা। আর একটা শসা দেখিয়ে বলল, এটা মায়ার। এটা খাবে মা। দুটো থাকল, কাল সকালে খাব। পিলু খুব হিসেবী মানুষের মতো বলল, বাবা ফিরে না আসাতক আমাদের বেঁচে থাকতে হবে দাদা। সেদিন প্ল্যাটফরমে ফিরে আসতে বেশ রাত হয়ে গেল।

    বাবার হাতে পয়সা নেই। রেলগাড়িতে বাবার টিকিট লাগে না। পয়সা না থাকলে মানুষের যা হয়। খুব মিশুকে স্বভাবের মানুষ—যেখানেই তিনি যান একসময় ঠিক ঠাকুরকর্তা বনে যান। ফলে পয়সা না থাকলেও কিছু আসে যায় না। ঠিক ট্রেনে চড়ে দূরদেশে চলে যেতে পারেন। বাবা কোথায় কি খান, কি পরেন কে জানে! কোথায় ভাল মাছ দুধ পাওয়া যায়, চালের দাম কত কিংবা কোথাও যদি কিছু যজন যাজন করা যায় সেই আশায় বোধ হয় কেবল বাবা ঘুরে বেড়াচ্ছেন। দেশ ছেড়ে এসে বাবা খুব অথৈ জলে পড়ে গেছেন—কিছু একটা করা দরকার, বাবার মুখের দিকে আমরা আর তখন তাকাতে পারতাম না।

    প্ল্যাটফরমের পানি পাড়ে বলল, কোথায় গেছিলে ছেলেরা? বাবার খোঁজ মিলল।

    পিলু বলল, বাবা কি আমার নিখোঁজ হয়েছে?

    —শুনেছি তোমাদের ফেলে কোথায় চলে গেছে।

    আমার ভীষণ রাগ হচ্ছিল পানি পাঁড়ের কথায়। বলতে ইচ্ছে হয়েছিল, আমার বাবা কি তেমন মানুষ। আমাদের জন্য তাঁর কত দুর্ভাবনা। তবু কিছু বললে, কি আবার ভাববে, ওদের দয়াতেই এখানে পড়ে আছি। আবর্জনার মতো ঝেড়ে ফেললে যাবটা কোথায়!

    পিলু এবং আমি খুবই সন্তর্পণে হাঁটছি। জামার নিচে বাকি ক’টা শসা। ধরা পড়ে গেলেই হয়েছে। সবচেয়ে ভয় আমার নিজের মার্কেই। বলতে পারব না চুরি করে এনেছি। বরং বলা ভাল বড়বাবুর বউ দিয়েছে। কিন্তু মা তবে সকালেই জল আনতে গিয়ে বড়বাবুর বউকে কৃতজ্ঞতা না জানিয়ে পারবে না। আমাদের এই দুঃসময়ে এতটুকু কেউ দয়া দেখালেই মা ভীষণ বিচলিত হয়ে পড়ে। সুতরাং বুদ্ধি- বিবেচনায় যখন মাথায় কিছুই আসছিল না, পিলু বলল, মাকে সত্যি কথা বললে কিছু বলবে না দেখিস। এবং মাকে সব খুলে বলতেই কেমন তাড়াতাড়ি শসা ক’টা লুকিয়ে ফেলল। ধমক খেতে হতে পারে, এমনকি, ঠ্যাঙাতেও পারে—আর কত সহজে মা আমার, শসা ক’টা লুকিয়ে ভাল মানুষের ঝি হয়ে গেল।

    আমি মায়ের যেহেতু খুব সুপুত্র, বললাম, পিলুর কি সাহস মা!

    ছোট বোন মায়া পাশে পা গুটিয়ে ঘুমিয়ে আছে। পুনুটাও ঘুমে অচেতন। কেবল আমরা তিনজন প্ল্যাটফরমে জেগে। যেন যে কোনো সময় দেখব প্ল্যাটফরম পার হয়ে বাবা চলে আসছেন। মা শুধু বললো, ভগবান তো মানুষকে উপোষ রাখেন না।

    পিলু দিগ্বিজয়ী বীরের মতো বলল, মায়া ওঠ। দেখ কি এনেছি।

    মা বলল, না বাবা না। ডাকিস না। অনেক করে ঘুম পাড়িয়েছি, খাব খাব করতে করতে ঘুমিয়ে পড়েছে। থাকুক। সকালে তো হাতের কাছে কিছু নেই। নীল লণ্ঠন দুলিয়ে একটা লোক হেঁটে চলে গেল। মা এই লোকটাকে দেখলেই মাথায় বড় ঘোমটা টেনে দেয়। ছেঁড়া মাদুর কাঁথায় একটা সংসার লেপটে আছে। বড় করুণ দেখায় প্ল্যাটফরমটা। যাত্রীরা তাকায়, দেখে। নতুন এই সব উদ্বাস্তুতে সব স্টেশনগুলি ভরে যাচ্ছে। কোনো সময় অযথা গালিগালাজও করতে থাকে কেউ। আমাদের সব গা- সওয়া হয়ে গেছে। মনেই করতে পারছি না, আমাদের আবাস ছিল একটা। সেখানে শিউলি ফুলের গাছ ছিল। শরৎকালে আমরা ভাইবোনেরা মিলে ফুল তুলেছি। স্থলপদ্ম গাছ থেকে পদ্ম তুলে এনেছি। বাবা হাট থেকে তাজা আস্ত ইলিশ কিনে এনেছেন। বাড়িতে লক্ষ্মীপূজা হয়েছে। আমের দিনে আম, লিচুর দিনে লিচু পেট ভরে খেয়েছি। বড় মাঠ ছিল, কখনও পার হয়ে গেছি তা। পুজোর ছুটি পড়লে স্কুল থেকে ফেরার পথে নৌকা ডুবিয়েছি জলে—কিছুই আর মনে করতে পারছি না। যেন কতদিন থেকে এমন একটা প্ল্যাটফরমে পড়ে আছি। আমাদের বাড়িঘর ছিল এখন দেখলে কে আর এটা বিশ্বাস করবে। আর সেই কবে থেকে একটা ট্রেন আসে যায়, সূর্য ওঠে আকাশে, শরতের জ্যোৎস্নায় পৃথিবী ভেসে যায়, বাবা তবু আসেন না। বাবার মতো মানুষ আর নেমে আসেন না ট্রেন থেকে।

    ঘুম থেকে সকালে উঠেই অবাক। ট্রেন থেকে বাবা নামছেন। ইয়া বড় বড় পুঁটলি। ডেকেডুকে যেন গোটা প্ল্যাটফরমটাকেই কাঁপিয়ে তুলছেন। —নামা নামা। পিলু, ও বিলু, বাবা তাড়াতাড়ি আয়। ধর সব। দেখিস যেন কিছু থেকেটেকে না যায়। শ্রাদ্ধের কাজটাজ কিছু সেরে বাবা ফিরেছেন। আমরা টেনে টেনে নামাচ্ছি। মাথায় করে নিয়ে যাচ্ছি। ছেঁড়া শীতলপাটিতে বসে বাবা তখন তালপাতার হাওয়া খাচ্ছেন।—তা দেরি হল একটু। বামুন মানুষ, হাতের কাছে কাজ, ফেলে আসি কি করে।

    আমার মা তখন শুধু চোখের জল ফেলছিল। কিছু বলছে না। সব গোছগাছ করে রাখছে। সকালের রোদ আমাদের খুব মনোরম লাগছিল। এমন সুন্দর দিন মানুষের জীবনে খুব কমই বুঝি আসে। পিলু তখন ছুটে ছুটে বেড়াচ্ছিল। পুনু বাবাকে দেখেই কোলে গিয়ে বসে পড়েছে। মায়া বাবাকে হাওয়া করছে। টের পেলাম, আমার বাবার হাতেও একটা নীলবাতি আছে। বুঝতে পারলাম, সিগনাল ডাউন। আমাদের গাড়ি ছাড়ার আবার সময় হয়ে গেছে। কোথায় গিয়ে গাড়িটা শেষ পর্যন্ত থামবে জানতাম না। আমাদের ছিল তখন এখানে সেখানে ছুটে বেড়ানোর জীবন। একটা নীলবাতি নিয়ে বাবা তাঁর বাড়িঘর খুঁজে বেড়াচ্ছেন।

  • চার

    চার

    পড়াশোনার ব্যাপারটা আমাদের এখনও কিছু তেমন ঠিকঠাক হয়নি। দেশ ছেড়ে আসার সময় আমার কিছু বই সম্বল ছিল। ইতিহাস, ভূগোল, অঙ্ক সব ক্লাসেই চলবে এমন ভেবে বাবা পাকাপাকিভাবে বাক্সে তুলে রেখেছিলেন। দুটো একটা বের করে নিতে বলেছেন। বাবার ধারণা ঠিকঠাক হয়ে বসতে না পারলে পড়াশোনায় মন বসবে না আমার।

    বিউগিল বাজলেই বুঝতে পারতাম পাঁচটা বাজে। সকাল হয়ে গেছে। ব্যারাকে ফল-ইনের সময়। এবারে দূরে মানুষজন দেখতে পাব বলে, বারান্দায় এসে দাঁড়াতাম আমরা। বাছারি ঘরটার টিনগুলি বাইরে টানা। ছায়া পড়লে বারান্দা হয়ে যায়। ঘরটার একমাত্র দরজা খলপা দিয়ে তৈরি। একটা তেলতেলে বাঁশের খুটি— ঝাঁপটা ধরে রাখার জন্য ঠ্যাকার কাজ করে। একপাশে ছোট্ট বেড়া দিয়ে মাকে ঘরের সংলগ্ন রান্নাঘর বানিয়ে দেওয়া হয়েছে। গোবরে লেপা উনুনের পাশে আছে বড় একটা মেটে হাঁড়ি কাঁঠালের বিচি ভরা। সকালের জলখাবার গোনাগুনতি কাঁঠাল বিচি ভাজা। কারো ভাগে একটা কম হতে পারত না, বেশি হতে পারত না। বাবা কখনও ছেলেমানুষের মত হাত পেতে বলতেন, বেশ খেতে। আর দুটো দাও না।

    মা নির্বিকার। এমন উদাসীন মা, একটা আর কথা বলত না বাবার সঙ্গে। বাবা ভয়ে ভয়ে উঠে যেতেন।

    তখন বাদশাহী সড়কের ওপর দিয়ে মার্চ করে যেত পুলিসেরা। কখনও ডবল মার্চ, কখনও কুইক মার্চ করে তারা যাচ্ছে। আমার ভীষণ ইচ্ছে হত, বড় হলে আর স্টেশনমাস্টার হয়ে কাজ নেই। বরং পুলিস হব। বাবা বলেছেন, এতে খুব উন্নতি। খুব বড় সাহেবসুবা হতে বাধে না। কাজ দেখাতে পারলে দারোগা পর্যন্ত হওয়া যায়। কোনো হাবিলদার বাড়ির পাশ দিয়ে যাবার সময় ডাকতেন, ঠাকুরমশাই আছেন। বাবার সঙ্গে কি সব কথাবার্তা হত। এবং কথাবার্তা শেষে বাবাকে মনে হত খুব অসহায়। এমন অবিষয়ী মানুষের জন্য বোধহয় লোকটারও করুণা হত। বলত, কি ঠাকুরমশাই, মরতে আর জায়গা পেলেন না। এমন পান্ডববর্জিত জায়গায় বাস করতে চলে এলেন।

    বাবা কিছুতেই অবশ্য শেষ পর্যন্ত দমে যেতেন না। কারণ দমে গেলেই মা বাবাকে পেয়ে বসবে। কোথায় কি কথাবার্তা হয় মা’র কান খাড়া করে শোনার অভ্যাস। লোকটা কি বললো গো। সুতরাং বাবা বিচলিত হতেন না শেষ পর্যন্ত। খুব আত্মবিশ্বাসের গলায় বলতেন, মাটি, বুঝলে না, একবার সব আগাছা সাফ করতে পারলে দেখবে ফসল। জমি জুরে শুধু ধান। শীতের দিনে কলাই। সামনের জমিটাতে আম, জাম, লিচুর গাছ লাগিয়ে দেব। বড় হলে কত ফল। কত পাখপাখালি দেখবে তখন উড়ে আসবে। জমির ধানে সমবৎসর চলে গেলে দুটো একটা বাতাবি লেবুর গাছ লাগিয়ে দেব ভাবছি। এমন জমি মানুষ পতিত ফেলে রাখে।

    আসল কথা অবশ্য কাউকে বলা যাবে না। বাবা খবর পেলেন মানুকাকা বহরমপুরে থাকে। বাবার সম্পর্কে পিসতুতো ভাই। খবর পেয়েই লটবহর নিয়ে রওনা। এবং কোনো দ্বিধা না করে পরম আত্মীয়ের মতো ভাই-এর বাড়িতে উঠে পড়লেন। আমাদের সেই কাকাটি বাবাকে দেখে একেবারে হতবাক। এতগুলো ছেলেমেয়ে নিয়ে কোনো খবর না দিয়ে কেউ কখনও আসে! দেশে অবশ্য খুবই যাওয়া-আসা ছিল। কাকার মা, এবং ভাইবোনেরা ঠাকুরদা ঠাকুমা বেঁচে থাকতে বর্ষায় দু-চার হপ্তা বেড়িয়ে যে না গেছেন তাও না। সংসারে কোনো অভাব ছিল না বলে বাবা কিছুতেই তাঁর পিসিকে এবং ভাই বোনেদের যেতে দিতেন না। সেই সুবাদে খবর পেয়েই সোজা সেখানে উঠে বললেন, চলে এলাম মানু। দেশ থেকে যা এনেছি শেষ। শোনলাম তুই এখানে আছিস। তুই যখন আছিস তখন আর ভাবনা কি। কিছু একটা ঠিক হয়ে যাবে। কি বলিস! কাকা ঢোক গিলে বললেন, তা হয়ে যাবে।

    কদিন যেতে না যেতেই কাকীমার গঞ্জনা শুরু হয়ে গেল। কাকা সারাটা দিন বাড়ি থাকে না। অফিসে থাকে। বাবা চুপচাপ বসে থাকেন মাদুরে। আগে তবু একটা চেষ্টা ছিল, এখানে এসে ওঠার পর বাবা কদিনেই কেমন ভালমানুষ হয়ে গেছিলেন।

    কাকা একদিন বলল, সরকারী ক্যাম্পে উঠে যান দাদা। ক্যাম্পের খাওয়াদাওয়া মন্দ না। আমাদের অফিসের বড়বাবুর ভাই ক্যাম্পে চলে গেছে।

    অভাব অনটনের কথা বোধহয় পাড়তে যাচ্ছিল, বাবা বললেন, ক্যাম্পে কোনো জাত বিচার নেই। আমি যাই কি করে! তার চেয়ে এদিকে কোথাও পুজোআর্চা করে যদি থেকে যেতে পারতাম। তোর বৌদির তাই ইচ্ছা।

    অবশ্য আমি বুঝতে পেরেছিলাম, বাবার পৃথিবীটা কবেই ধুয়ে মুছে শেষ হয়ে গেছে। মানুকাকারও বিড়ম্বনা। তাঁর ছেলেমেয়েরা আমার বয়সী, শহুরে মানুষ। পরিচয় দিতে কিছুটা কুণ্ঠাবোধ হওয়া স্বাভাবিক! এবং আমার মা কেমন সেই প্রথম মনে হল বাবাকে ডেকে গোপনে কিছু বলল। বাবা বললেন, তাই বুঝি। এবং পরদিনই বাবা মানুকাকার সঙ্গে কোথায় গেলেন। ফিরলেন রাত করে। বাবা ফিরেই বললেন, সব ঠিক হয়ে গেল, আর তোমাদের ভাবনা নেই।

    .

    সলতে জ্বালাবার শেষ তেলটুকু গোপনে এতদিন কি করে এত কষ্টের মধ্যেও সঞ্চয় করে রেখেছিল মা ভাবলে অবাক হতে হয়। অবশ্য জমি এবং যথার্থ বনভূমিতে হাজির হয়ে মার চোখ ছানাবড়া হয়ে গেছিল—তাই বলে শেষ পর্যন্ত এখানে!

    বাবা বলেছিলেন, একেবারে জলের দরে জমি। একশ টাকায় কত জমি দেখ। তা তোমার পুরো একশও ছিল না। মানু কিছু দিয়েছে। জমির শেষ কোথায়, সীমানা কোথায় কিছুই বোঝার উপায় নেই। বাবা উত্তরে দক্ষিণে পুবে পশ্চিমে চারটে গাছ দেখিয়ে বললেন, এই তোমাদের সীমানা। এ জায়গা তোমাদের। বনের ভেতর সেই যে চারটে গাছ, সব কটাই শিরীষ। এবং লম্বা আকাশ বরাবর আর যা আছে মাঝখানে, তার মালিক আমার বাবা। বাবা বনটার পাশে গ্রীকরাজের মতো দণ্ডায়মান ছিলেন। যেন বনটা রাজা পুরুর মতো বশ্যতা স্বীকার করতে চাইছে না। বাবা বললেন, এখানেই জঙ্গল সাফ করে তোমাদের আবাস তৈরি হবে। আগাছা জঙ্গল সাফ করে বুঝতে হবে কতটা জমি শেষ পর্যন্ত পাওয়া গেল। রাজবাড়ির আমলারা তো বেজায় খুশী। বলেছে, বনটায় লোকবসতি দেখলেই জমির দর বাড়বে! এবং যা বললেন, তাতে মনে হয়েছিল, টাকা না দিলেও প্রথম আবাস করার দুঃসাহসের জন্য মিনি-মাগনায় জমিটা পাওয়া যেত। সুতরাং জলের দরে জমি —অদূরে গাছ দেখে বোঝা যাচ্ছিল জমির সীমানাটা কোথায় শেষ! জঙ্গল সাফ করে শেষ পর্যন্ত কবে সেখানে পৌঁছনো যাবে সেটা বাবার ঈশ্বরই একমাত্র বলতে পারেন। বরং জমি না বলে বন বলা ভাল। বাঘের নিবাস ছিল, এবং যে দুটো-একটা এখনও নেই কে বলবে। বাবা যতই সাহসী হোন অদূরে পুলিস ব্যারাক না থাকলে এখানে বাড়িঘর করার সাহস পেতেন না। সব বাবলা গাছ, নানা রকমের সব লতা, কাঁটা ঝোপ, কোথাও কোথাও সব মরা গাছের গুড়ি, ভাঙা ইঁটের ডাঁই। যত সাফ করে এগোনো যাচ্ছে, তত সব আবিষ্কার করা যাচ্ছে। হেস্টিংসের আমলের কুঠিবাড়িও বনের ভেতর মিলে যেতে পারে—কিংবা নগর-টগর ছিল—এখন শুধু তার ধ্বংসাবশেষ। বাবা সারাদিন কোদাল কুপিয়ে আগাছা তুলছেন, সঙ্গে আমি এবং পিলু। আর ঠুং করে কোদালে শব্দ হলেই বাবা খুব সচকিত হয়ে উঠতেন। বুঝি আছে কোথাও কোন গুপ্তধন। তিনি ঝুঁকে বসতেন, কোদাল মেরে সেই ইষ্টক খণ্ডের নাড়িসুদ্ধু টেনে তুলে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখতেন—ইষ্টকখণ্ড, না আসলে স্বর্ণপিণ্ড—বহুকাল মাটির নিচে পড়ে থাকায় বিবর্ণ হয়ে গেছে।

    সবাই দৌড়ে আসত। মা পর্যন্ত। মার মুখের কাছে নিয়ে বাবা বলতেন, কি মনে হয়? কেমন শক্ত দেখ। পাথর। পাথর আসবে কোত্থেকে। মা কিছু না বলা পর্যন্ত ফেলে দিতে পারতেন না।

    মা বলত, আর কি মনে হয়! আমাদের কপাল খুলবে, তালেই হয়েছে।

    বাবা অভয় দিয়ে বলতেন, পেয়ে যাব। ঠিক পেয়ে যাব। বুঝলে এটা কাশিমবাজার কুঠির কাছাকাছি জায়গা। একসময় খুব বড় নগর ছিল এখানে। কলকাতা শহর আর কত বড়, তার চেয়ে বড় শহর ছিল। মানুষজন, কুঠি সাহেবরা, পৃথিবীর সোনাদানা সব লুটেপুটে এখানে এনেই জড় করেছিল। নবাব বাদশা সদাগর, বেনে কি না ছিল! কত নীলকুঠির ধনরত্ন এখানে সেখানে মাটির নিচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। ঠিক পেয়ে যাব।

    একদিন ছোট দুটো শালগাছের চারা আবিষ্কার করা গেল। বাবা বললেন, থাক, বড় হলে কাজে লাগবে।

    সারাদিনে বাপ বেটা মিলে পাঁচ-সাত হাত জমি সাফ করে ওঠা যেত না। আর মাঝে-মধ্যেই বাবার রহস্যময় অন্তর্ধান তো লেগেই আছে। তখন আমার পিলুর ছুটি। পিলু এখন এই বনভূমিটার ছোটখাটো একজন সামন্ত রাজ। আর আমি হচ্ছি তার দাদা।

    কত রকমের সব যে লতাপাতা! আশ্চর্য নীল ফুল বনের গভীরে ফুটে আছে। জঙ্গলের ভেতরে অদ্ভুত বড় বড় সব গিরগিটি, গোসাপ, বেজি। একটু সমতল মতো জায়গায়, যেখানে বেশ সবুজ ঘাস আছে এবং একটা ছোটখাটো উপত্যকার মতো মনে হয়, ঢুকে গেলে, দেখা গেল দুরন্ত খরগোশেরা ছুটছে। আমাদের মটরশুঁটি গাছগুলোর ডগা রাখা যাচ্ছে না। কারা খায় বোঝাও যাচ্ছে না। সজারু এসে খেতে পারে—পিলু বলেছিল। বাবা বলেছিলেন, সজারু ডগা খায় না। মূল খায়। এবং এক সময় খরগোশের খবর প্রথম পিলুই এনে দিয়েছিল বাবাকে।

    বাবা বললেন, খরগোশের মাংস খুব সুস্বাদু। কখনো খেয়েছ? আমরা কি খাই না খাই বাবার চেয়ে আর কে ভাল জানে। তবু তাঁর এমনধারা প্রশ্ন ছিল। যেন আমরা কত কিছু তাঁকে না দিয়ে খেয়ে নিচ্ছি।

    বাবা আরও বললেন, সজারুর মাংস খেতেও বেশ। তবে একটা দিন মাটির নিচে রাখতে হয়। তা না হলে গায়ের বুনো গন্ধ যায় না।

    বাবার রহস্যময় অন্তর্ধানের সময় আমরা একেবারে শুধু বনআলু খেয়ে দিন কাটাই সেটা বোধহয় তাঁর খুব মনঃপুত ছিল না। সঙ্গে মাংসের ঝালঝোল, বেশ জমবে তবে। আর বাবাও নিশ্চিন্তে দুটো দিন দেরি করে ফেললে, কিছু আসবে যাবে না। এ সব ব্যাপারে বাবা পিলুকে যতটা গুরুত্ব দিতেন, আমাকে তার সিকি ভাগ দিতেন না। এবং একবার বাবা না থাকায় পিলু ঠিক দুটো খরগোশ শিকার করে চলে এল। মা বলল, করেছিস কি। এমন সুন্দর দুটো খরগোশকে মেরে ফেললি!

    পিলু খুব মুষড়ে পড়ল। বলল, বাবা যে বলেছেন খরগোশের মাংস খেতে বেশ।

    —তোমার বাবা এবার আরও কি তোমাদের খেতে বলবেন কে জানে।

    পিলু খুব একটা অপরাধ করে ফেলেছে—কি করা যায়। মা কিছুতেই রাঁধতে রাজী হচ্ছে না। অগত্যা এ-সব ক্ষেত্রে সে আমারই শরণাপন্ন হতে পছন্দ করে। মায়া তো উল্টে-পাল্টে দেখে ওক তুলে ফেলল। এবং আমিই বললাম, ঠিক আছে, তোমরা কেউ খাবে না। আমি, পিলু খাব। এবং যখন কেটেকুটে থালায় রাখা হল, হলুদ বেটে মাখা হল, সামান্য আদা বাটা, রসুন, পেঁয়াজ দিয়ে বেশ সুঘ্রাণ তৈরি হয়ে গেল, তখন মা বলল, দাও রেঁধে দিচ্ছি। তোমরা তো দেশ ছেড়ে এসে এক-একজন বকরাক্ষস হয়ে গেছ। এখন যা পাবে তাই খাবে।

    কিছু চাল ছিল ঘরে, মা দুটো ভাতও ফুটিয়ে দিল। এবং খেতে বসে দেখা গেল, কেউ বাদ গেল না। মা নিজেও বড় পরিতৃপ্তি সহকারে খেয়ে ফেলল শেষটুকু। বলল, খেতে তো বেশ। তোর বাবা এলে আবার দুটো ধরে আনবি তো।

    বাবা বাড়ি থাকলে ঝোপজঙ্গল কেটে রাখা আমাদের কাজ। এবং টেনে আনা, অথবা কোন ঝোপজঙ্গল টেনে আনতে না পারলে রেখে দেওয়া। শুকোলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া। কতসব গাছের গুঁড়ি আর ইঁটের চাতাল। কোনো ঢিবি আবিষ্কার করলেই বাবা গুপ্তধনের গন্ধ পেতেন। সহজে হাত দিতেন না। মনে হত বুঝি ঢিবিটা আছে থাক। সময় মতো খুঁড়ে ধনরত্ন তোলা যাবে।

    জঙ্গল কাটতে কাটতেই বাবা কখনও চেঁচিয়ে বলতেন, ওদিকে না। এদিকে চলে এস। তেনারা পড়ে আছেন।

    তেনারা কে এবং কি রকমের আমাদের এতদিনে বেশ ভাল জানা হয়ে গেছে। বলতাম কোথায় বাবা?

    ঐ দেখ। আলিসান ভুজঙ্গ। এতটুকু ভয় ভীতি নেই। পিলুটার ছিল আবার খুব বাড়াবাড়ি। সে লাঠি তুলে তেড়ে গেলে বাবা বলতেন, তোমার তো কোনো অনিষ্ট করেনি। কেন মারতে যাচ্ছ। এতবড় আলিসান ভুজঙ্গ দেখে আমাদের হৃৎকম্প দেখা দিত। বাবা কিন্তু নির্বিকার। কাজ করে যাচ্ছেন।

  • পাঁচ

    পাঁচ

    আমাদের খাওয়া-দাওয়াটা এখন কোনো নিয়মমাফিক ব্যাপার নয়! ভাত খাওয়াটা আমাদের কাছে ভোজের মতো। ভাত না থাকলে, বনআলু না পাওয়া গেলে শুধু গাছের পেঁপে সিদ্ধ করে খাওয়া। কিছু পেঁপে শহরে নিয়ে যেতে পারলে বিক্রি হত। দু-একদিন পেঁপে বিক্রির পয়সায়ও ভাত মাছ হয়ে যায় কখনো। এবং বাবা একদিন গোটা দশেক বড় সাইজের পেঁপে পেড়ে একটা ঝোলায় নিয়ে চাল সংগ্রহের জন্য চলে গেলেন। কিন্তু আর ফিরলেন না।

    ঠিক শহরে বাবা মানুকাকার কাছে কোনো খবর পেয়ে চলে গেছেন কোথাও। ফিরবেন যখন, মাথায় বড় সব পোঁটলাপুঁটলি। আমার কেবল ধারণা হত, বাবা গোপালদির বাবুরা কোথায় আছে জানতে পারলে গুপ্তধন পেয়ে যাবেন। বাবুদের সঙ্গে দেখা হলে পূজা-পার্বণে বাবাকে ডাকবে। দেশে থাকতে ওরা খুব দিত-থুত। দু আড়াই বছরে বাবার স্বভাবধর্ম আমাদের খুব জানা। না থাকলেও এখন আর মা এবং আমরা তেমন দুশ্চিন্তা করি না। পিলুটা কেবল বনের ভেতর অন্ধকার ঢুকে গেলে রাতে ভয় পায়। ঘর থেকে বের হতে চায় না। ওর ধারণা, বাবা যেহেতু বাড়ি নেই, ভূত- প্রেত দৈত্য-দানোরা সুযোগ বুঝে নিশীথে একটা লম্বা হাত বনের ভেতর থেকে বাড়িয়ে দেবে। এবং আমাদের ছোট বাড়িঘর তুলে নিয়ে মাথায় টোপর পরে বসে থাকবে। এই ভয়টাই খুব কাবু করত পিলুকে।

    আর মা’র মনে হত, বাবা বাড়ি না থাকলে যা হোক একটা লোকের আহার বেঁচে গেল। কারণ তিনি যেখানেই যান বেশ চালিয়ে নেন। কোথাও বাবার কিছু অভাব থাকে না। এবং যদি কোনো শিষ্যবাড়ির খোঁজ পাওয়া যায়—বাবা সেখানে তো ধর্মগুরুর মতো। এমন কি তখন সেখানে মচ্ছব টচ্ছব লেগে যায়। তারপর ফেরার সময় নগদ টাকা, মার জন্য প্রণামীর শাড়ি, আমাদের জন্য শীতের চাদর নিয়ে আসতে পারেন।

    বাবা পরদিনও ফিরলেন না। আশ্চর্য, এবারে মাকে খুব চিন্তিত দেখাল। মানুষের বাড়িঘর হয়ে গেলে এমনটাই বুঝি হয়। সকালের দিকে মা বলল, একবার যা তোর মানুকাকার কাছে। মানুষটা কোথায় গেল খবর নিবি না?

    পিলু বলল, চল দাদা, বাবাকে খুঁজে আসি। এবং দুজনে কাকার বাড়ি গেলে জানলাম, বাবা গেছেন বেথুয়াডহরি। পেঁপে বিক্রির পয়সা কাকার কাছে রেখে গেছেন! কাকা আমাদের খেয়ে যেতেও বললেন। পিলু বলল, দাদা আমার তো খাবার ইচ্ছে খুবই। তোর? আমার কি ইচ্ছে কী করে পিলুকে বোঝাই, তবে অস্বস্তি এই যে, কাকার ছেলেমেয়েদের পোশাক এবং পারিপাট্য এত বেশি যে গেলে চাকর-বাকরের মতো মনে হয় নিজেদের। তবু খেতে বলায় দুজনই খুব খুশি। খাবার লোভে একটা ঘরে দুজনে চোরের মতো বসে থাকলাম। একটা কথা বললাম না ভয়ে। খুড়তুতো ভাইবোনেরা দু-একবার উঁকি মেরে গেল। আমরা তখন অন্য দিকে চেয়ে থেকেছি। যেন আমরা খাওয়া বাদে পৃথিবীতে আর কিছু জানি না বুঝি না। বড়ই সুবোধ বালক। ওদের চোখে চোখ পড়ে গেলেই টের পাই বড়ই অদ্ভুত দুটো জীব আমরা। কাকা অদ্ভুত দুটো জীব ধরে ঘরে পুরে রেখেছে। ওদের কৌতূহল মেটাবার জন্য যতটা পারলাম খাঁচায় পোরা দুটো হরিণ শাবকের মতো মুখ করে রেখেছি। যদিও খুবই অস্বস্তি হচ্ছিল, তবু খাবার লোভে পালাতে পারছি না। খেতে বসে কোনোরকমে ঘাড় গুঁজে আমরা খেয়ে ফেললাম। পিলু ভাত খেতে খুব ভালবাসে বলে আকণ্ঠ খাওয়া কি ঠিক বোঝে না। ও বোধহয় ঘিলুতক ঠেসে খেল। খাওয়া দেখে হাঁ হয়ে গেল আমাদের ভাইবোনেরা। পেটে কি ধামা বাঁধা আছে—এত খায় কি করে। অন্য ঘরে ওরা ফিসফিস করে কথা বলে খুব হাসাহাসি করছিল। সবই শুনতে পাচ্ছিলাম। আর লজ্জায় আমার মাথা হেঁট হয়ে যাচ্ছিল।

    কাকা গুনে দু টাকা দশ আনা পয়সা হাতে দিয়ে বললেন, ধনদার ফিরতে দেরি হবে বলে গেছে। বেথুয়াডহরিতে দেশের লোক এসেছে অনেক। খবর পেয়েই চলে গেল। তাছাড়া তোদের কিছু শিষ্যবাড়িরও খোঁজ নিতে যাবে বলেছে।

    বাবার একটা খেরোখাতায় আজকাল রাজ্যের সব মানুষজনের নাম ঠিকানা লেখা থাকে। পিতামহের আমলের কিছু শিষ্যদের নাম বাবা ‘পুনরায়’ হেডিং দিয়ে লিখে রেখেছেন। বাবা দেশে থাকতে হেলায় এই গুরুগিরির ব্যবসা ছেড়ে দিয়েছিলেন। এখন এই দুঃসময়ে তাদের খোঁজখবর করে বেড়াচ্ছেন বোধহয়। তাছাড়া নিবারণ দাসের দেওয়া পঞ্জিকাটা তো বগলে রয়েছেই। এত বড় একটা মূলধন যাঁর আছে তাঁর আবার ভাবনা কি।

    ট্রেনে বাবার যেহেতু পয়সা লাগে না, বাবা সহজেই যে কোনো সময় খুশিমত সুদূরে চলে যেতে পারেন। যারাই দেশ ছেড়ে এসেছে, সবাই প্রায় রেললাইনের লাগোয়া গ্রামে গঞ্জে অথবা কোনো পতিত জমিতে নিজেদের আবাস গড়ে তুলছে ক্রমশ। রেলে বাবার টিকিট লাগে না এটা বড়ই গৌরবের ব্যাপার আমাদের কাছে। আর বাবার অকাট্য যুক্তি, আমরা ছিন্নমূল মানুষ, সব দেশের স্বার্থে, এটা কত বড় আত্মত্যাগ! আমাদের আবার ভাড়া কি। অথবা কখনও বাবা যেন দেশ ভাগ করে নেহরু যে ভুল করেছেন বিনা টিকিটে ভ্রমণ করে তার খানিকটা উশুল করে নিচ্ছেন। বাবা তাঁর বিনা টিকিটে ট্রেনের ভ্রমণ-কাহিনী ফিরে এসে সগৌরবে বলতে খুবই ভালবাসতেন।

    আর থাকা খাওয়ার ব্যাপারটা বাবার যে কোনো জায়গায়, যে কোনো পরিচিত মানুষের বাড়িতে আজন্ম অধিকারের শামিল হয়ে গেছে। যদি খোঁজখবর মিলে যায়, আর খোঁজখবর না মিললেও কোনো লতাপাতায় সম্পর্ক খুঁজে পেলে একেবারে তখন মৌরসীপাট্টা—থাকা খাওয়া, দেশের গল্প, এমন সোনার দেশ মানুষকে ছাড়তে হয় কত বড় পাপ করলে সে সম্পর্কে নাতিদীর্ঘ তাঁর বক্তৃতা। বাবার কথাবার্তা শুনলে সবার বোধহয় মানুষটার ওপর মায়া পড়ে যায় এবং সহজে ছাড়তে চায় না। এবং বাবা যখন গেছেন, আর মানুকাকাকে বলে গেছেন তখন খুবই নিশ্চিন্ত হওয়া গেল।

    আমরাও ডাল ভাত মাছ খেয়ে বেজায় খুশি। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব কাকার বাড়ি থেকে বের হওয়া দরকার। পেট ভরে খাওয়ার আনন্দটা ঠিক উপভোগ করা যাচ্ছে না। কারণ কাকার ছেলে- মেয়েদের বিরূপ কথাবার্তা খুবই খোঁচা দিচ্ছে পেটে। কাকা এবং কাকীমাকে যত দ্রুত সম্ভব টুগটাপ প্রণাম সেরে বের হয়ে পড়া গেল। এবং শহরের রাস্তায় কতসব অলৌকিক ঘটনা দেখা গেল ক্রমে। রিকশা চড়ে মানুষেরা যায়। জানলায় সুন্দর মতো মেয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। অর্জুনগাছটার নিচে একটা চায়ের দোকান। সবাই চা খাচ্ছে। বিকেল পড়ে আসতেই শহরে ঠাণ্ডা ভাব। সিনেমাহাউসে রামের সুমতি বই হচ্ছে। বাদ্য বাজছিল। বইয়ের কত দোকান, জেলখানার পাঁচিল পার হয়ে গেলে জলের ট্যাঙ্ক। টাউন ক্লাব। পাশে পুলিসের ব্যারাক। উর্দিপরা ব্যাণ্ড-পার্টি আগে আগে ব্যাণ্ড বাজিয়ে যাচ্ছে। পুলিসের সব খাকি পোশাক, আর রূপোর বকলেশ নীল আকাশের নিচে এক চিত্রকরের ছবির মতো। তারপরই বালিকা বিদ্যালয়। একই রকমের নীল ফ্রক পরে দলে দলে মেয়েরা বের হয়ে আসছে। একটা সুন্দর দোতলা বাড়ির টবে গোলাপের গাছ। পাশে ইজিচেয়ারে শুয়ে বালিকা নিবিষ্ট মনে কোনো গল্পের বই পড়ছে। এতসব ঘটনা একটা শহরে রোজ ঘটে। এক জীবনে এতটা দেখা যায় যেন আমার আগে জানা ছিল না।

    তারপরই সোজা সড়ক চলে গেছে রেল-লাইন পার হয়ে। দু পাশে বড় বড় সব শিরীষ গাছ। পাতা ঝরছে। শনশন হাওয়া কবরখানা থেকে উঠে আসছে। সাহেবদের কাবরখানা ডান দিকে। এবং কত সব সমাধি ফলক আর কত প্রাচীন সব ঝাউগাছ। যত শহর শেষ হয়ে আসছে তত নিঝুম পৃথিবী। গাছপালা পাখি তত বেশি। কতশত বছরের পুরনো সেই বাড়িটা যেন, ভাঙা শ্যাওলা ধরা রাজপ্রাসাদের মতো। একটা টগর ফুলের গাছ, চত্বরে আর কিছু নেই। মজা দীঘি, ভাঙা ঘাটলা। আর এ-সব পার হয়ে ডান দিকে গেলেই সেই কারবালা। বনটার আরম্ভ। কোথাও ভিতরে কবে কোন্ আদ্যিকালের ইঁটের ভাটা। এবং এই বনেই নবমী বলে সেই বুড়িটা থাকে। পিলু বাড়ি ফেরার পথ সংক্ষিপ্ত করার জন্য কারবালার মাঠে নিয়ে এল আমাকে। এবং বনের এক আশ্চর্য মোহ আছে পিলুর। সে ইতিপূর্বে এই বনের ভেতর দুটো আমড়া গাছ, কিছু পেয়ারা লিচু গাছ এবং একটা কাঁঠাল গাছও আবিষ্কার করে ফেলেছে। আর নবমীকে এই ফাঁকে দেখিয়ে নিয়ে যাবে—কারণ আমার মতে নবমী একটা ডাইনি না হয়ে যায় না। আমার ভুল ভাঙাবার জন্যই যেন পিলু এই পথটা ধরে যাচ্ছে।

    হাঁটতে হাঁটতে আমরা সামান্য ক্লান্ত বোধ করছিলাম। পিলু তখন বলল, আমি খুব বেশি খেয়েছি নারে দাদা?

    সত্যি কথা বললে যদি পিলু মনে কষ্ট পায়, ভেবে বললাম, কোথায় বেশি খেলি! ওটুকু না খেলে পেট ভরবে কি করে!

    পিলু বলল, আয় দাদা, এখানে একটু আমরা গড়িয়ে নি। বড় উঁচু মতো একটা কড়ই গাছ। নিচে সবুজ ঘাসের মাঠ। বেশ অনায়াসে শোওয়া যায়। বনটার ভেতরে ঢোকার আগে নিরিবিলি জায়গাটাতে বেশ কিছুক্ষণ শুয়ে থাকা গেল। দূরে রেল-লাইন। একটা গাড়ি যায় সন্ধ্যায়। পাশে কাশের বন দিগন্তব্যাপী। কেবল কারবালার মাঠটা একটু দূরে। দুটো একটা মিনার, ভাঙা মসজিদ এবং একটা কুকুর বাদে কিছুই আর চোখে পড়ছিল না।

    পিলু বেশ নিশ্চিন্ত মনে গাছের নিচে শুয়ে আছে। আমিও পাশে। বললাম, তুই এখানে কখনও এসেছিলি?

    সে বলল, কত। কতবার এসেছি। জঙ্গলের ভেতর দিয়ে গরুর গাড়ি যাবার রাস্তা আছে। রাস্তাটা ধরেই যাব।

    আমার কেমন গা ছমছম করছিল। ভয় লাগছিল। পিলুটা কিন্তু দিনের বেলায় একদম ভয় পায় না। ওর শুধু ভূতের ভয়। এছাড়া ওর অন্য কোনো ভয় নেই। তার ধারণা দিনের বেলায় ভূত- টুত বের হয় না।

    বেশ লাগছিল। শহর ঘুরে দেখা গেল। বাবার খোঁজ পাওয়া গেল। আকণ্ঠ খাওয়া গেল। একজন মানুষের জীবনে আর কি দরকার তখন বুঝতে পারছিলাম না। এবং প্রকৃতির ভেতর আমরা দুই ভাই, এক অন্য জগৎ, শুধু পাতা ঝরছে আর নানা বর্ণের সব পাখিরা উড়ে যাচ্ছিল। গাছে বসে ডাকছিল।

    গাছের নিচে শুয়ে দুই ভাই কত কথা বললাম। পিলু আবার বলল, সে বড় হয়ে রানাঘাটে যাবে। বলল, দাদা, তুই লেখাপড়া শিখে মানুষ হবি। আমি একটা দোকান দেব। দুজনে রোজগার করলে বাবার কোনো দুঃখ থাকবে না। পিলু বাবারও খুব প্রশংসা করল। বলল, বাবা ভাগ্যিস জায়গাটা খুঁজে বের করেছিলেন। পিলুর মতে এমন সুন্দর জায়গা আর কোথায় আছে! আসলে তখন আমি বুঝতে পারি এই বনজঙ্গলের আশ্চর্য একটা টান আছে। ছোট্ট ঘর—মা বাবা, রাতে কখনও বাবার ফিরে আসা, কখনও বনজঙ্গলে পিলুর ভ্রমণবিলাস, সব মিলে জায়গাটার আলাদা মাহাত্ম্য সৃষ্টি হয়েছে। পিলু না থাকলে এ-বনজঙ্গলের সব সৌন্দর্যই নষ্ট হয়ে যায়। যেন এতদিন এই বনটা ঘুমিয়েছিল, পিলু আসায় বনটা জেগে গেছে। শীত-গ্রীষ্মে বনের পাতা ঝরা থেকে আরম্ভ করে সব প্রাণীকুল এক ছোট্ট বালকের কাছে কতকাল পর যেন ধরা পড়ে মহীয়সী রূপ ধারণ করেছে।

    পিলু কিছুটা এগিয়ে গিয়ে বলল, ঐ যে ঘরটা দেখছিস ওটার মধ্যে নবমী থাকে।

    —ঘর কোথায়! এ তো পুরনো ইঁটের পাঁজা।

    কাছে গেলেই নবমী পিলুকে দেখে বলল, ওমা, পিলু দাদা যে!

    আমি তো অবাক। ভারি ভাব বুড়িটার সঙ্গে। শনের মতো সাদা চুল। একটাও দাঁত নেই। ঘরের বার হতেও কষ্ট। কচুর মূল, বনআলু এবং মালসার মধ্যে ঘুসঘুসে আগুন এই সম্বল করে বেঁচে আছে। নবমী আমাকে দেখে বলল, এ কেডা পিলু দাদা?

    —আমার দাদা। তোমাকে দেখাতে এনেছি।

    নবমীর শরীরে শুধু শুকনো কলাপাতার পোশাক। কোমর থেকে হাঁটু অবধি। বোধহয় মানুষের সাড়াশব্দ পেয়েই সে তার মহামূল্য পোশাক পরিধান করে অন্ধকার থেকে বের হয়ে এসেছে। নতুবা বনের মধ্যে তার উলঙ্গ হয়ে ঘোরাফেরার অভ্যাস। এবং বয়স খুব কাবু করে ফেলেছে দেখে বললাম, নবমী, তোমার ভয় করে না?

    –না দাদা।

    —তুমি এখানে আছ একা, ভয় করে না?

    –এমন জায়গা কোথায় আর আছে দাদা!

    —অসুখ-বিসুখে তোমাকে কে দেখে?

    সে ওপরে হাত তুলে দেখাল। কি আশায় এখানে পড়ে আছ ভাবতে খুবই বিস্ময় লাগছিল আমার। কতদিন থেকে আছে কে জানে। এবং যা ভয় ছিল, তা একেবারেই নষ্ট হয়ে গেল ওর কথাবার্তা শুনে। একটা ছাগলের তিনটে বাচ্চা হয়েছে। সে পিলুকে বলল, দাদা তুমি বামুনের ছেলে, বলেছিলে একটা ছাগলের বাচ্চা নেবে। আর নিতে এলে না তো।

    পিলু বলল, বাবা বেথুয়াডহরি গেছে। এলে বাবার কাছে পয়সা চেয়ে রাখব।

    —পয়সা দিয়ে কি হবে গো দাদা। ওমা আপনারা দাঁড়িয়ে রইলেন যে গো দাঠাকুরের দল। আমার কত পাপ, বলে সে দুটো ইট পেতে দিল। বলল, বসেন।

    আমার তখন কত রকমের কূট প্রশ্ন মাথায়। বললাম, নবমী, তোমার আর কেউ নেই?

    —কেউ নেই কেন হবে গো। এত বড় একটা সংসার আমার। তার পরে পিলু দাদা শেষ বয়সে এইসে গেল—কি আর লাগে।

    —ওরা খোঁজখবর নেয় না তোমার?

    নবমীর মুখটা সরল হাসিতে ভরে গেল। বড় জানতে ইচ্ছে হয়, ওর সেই শৈশবের কথা। কত বয়স এখন—মনে হয় সত্তর আশি। তার ওপরও হতে পারে। বললাম, তোমার বয়স কত নবমী? সে বলল তিন কুড়ি বছর হবে এখানটায় আছি। সেনবাবুদের ইঁটের ভাটিতে আমার মরদ সর্দার ছিল গো বাবু। দশাসই মানুষ। সে পিলুর দিকে তাকিয়ে বলল, পিলু দাদা, আপনার বাবাঠাকুর আসবেন বলেছিলেন। এল না তো। একবার গড় হতাম। গড় হলে মুক্তি মিলে যেত।

    নবমীর এত বড় সংসারে কে কে আছে জানতে চাইলে বলল, ছিল তো অনেক দাঠাকুর। বয়স বাড়ছে, তেনারাও ছুটি নিচ্ছেন। ঠিক বুঝতে না পেরে বললাম, তেনারা কারা?

    —ঘর বার হতেই কষ্ট। খোঁজখবর করতে পারি না। দু পা হাঁটলেই হাঁটু ব্যথা করে দাঠাকুর। আমি না গেলে ওরাই বা আসবে কেনে বলুন।

    কেমন রহস্যময় কথাবার্তা। বললাম, ওরা কারা?

    নবমী ঘর থেকে দুটো নারকেল বের করে দিল। বলল, বাবাঠাকুরকে দিবেন। ফের বললাম, তাহলে তোমার কেউ নেই?

    —আছে গো আছে। ওপরে হাত তুলে দেখাল—তিনি আছেন। চারপাশে গাছপালা দেখাল হাত তুলে, তেনারা আছেন। দূরে কোনো বন্যপ্রাণীর সাড়াশব্দ পাওয়া গেল—বলল, তেনারা আছেন। তারপর গাছের ফল-মূল, ঋতু পরিবর্তন, ফুলের সৌরভ—তার কাছে সবই অমৃতময় এখানকার। চারপাশে ঘুরে ঘুরে দেখিয়ে বলল, এত সব আমার দাঠাকুর। মানুষটা নেই বলে, ইঁটের ভাটা উঠি গেল বলে, একা ভাববেন না। মানুষটাকে ওই যে দেখছেন শিমুল গাছ তার নিচে রেখে দিইছি। তেনার কথাবার্তাও কানে আসে। বলতে বলতে নবমী হাঁপিয়ে উঠল। একটা কংকালসার প্রাণে কত আকাঙক্ষা। ওর চামড়া কুঁচকে স্থবিরতা এসে গেছে শরীরে। তবু এই বনভূমির মাঝে নবমীকে মনে হচ্ছিল বড়ই সুন্দরী। বয়েসকালে সে আমার মা’র মতো তার মানুষের অপেক্ষায় কত রাত না জানি জেগে থেকেছে। বনটাকে ভালবেসে ফেলেছে। সে আর কোথাও চলে যেতে পারেনি। শেষে নবমী বলল, মানুষের বাড়ি-ঘরের বড় মায়া। কোথায় আর যাব দাঠাকুর।

  • ছয়

    ছয়

    মাকে ফিরে এসে বললাম, বাবা বেথুয়াডহরি গেছেন।

    —কার কাছে?

    —বলে যাননি কিছু।

    –কবে ফিরবে, কিছু বলেনি?

    –না।

    মা’র মুখটা কেমন দুশ্চিন্তায় ভরে গেল। এই আবাস তৈরির পর, না অন্য কোনো কারণে, ঠিক বোঝা যাচ্ছিল না, এবারে বাবা চলে যাওয়ায় মাকে খুবই অসহায় দেখাচ্ছিল। বাবা বাড়ি না থাকায় এবং কবে ফিরবেন বুঝতে না পারায় একটা ভয়ঙ্কর অস্বস্তির ভিতর যেন পড়ে গেছেন। মনে হল, সবাই কাছে আছে, কেবল একটা মানুষ ঘুরছেন, কি খান কোথায় থাকেন এ-সব ভেবেই হয়ত মা’র মুখটা এত করুণ দেখাচ্ছে। সুখে হোক দুঃখে হোক মানুষটা এই নতুন আবাসে একটা বড় গাছের মতো। এটাই বোধ হয় মা’র ভরসা! আগের মতো আর উদাসীন থাকতে পারছে না। মাটিতে শেকড় ঢুকে যেতে থাকলে বুঝি তাই হয়।

    বাবা বাড়ি না থাকলে পিলু সংসারের অভিভাবক গোছের। সে একদিন সকালে উঠে বলল, এই দাদা ওঠ। যাবি না?

    মনে পড়ে গেল রাতে পুলি বলে রেখেছে, খুব সকালে উঠতে হবে। ঝাঁকায় যাবে পেঁপে, কিছু মূলাশাক। আপাতত এই বিক্রি করে যা-কিছু উপার্জন। সকালেই উঠে পড়া গেল। সূর্য ওঠেনি। আকাশে বাতাসে বনভূমি থেকে শেষ সবুজ গন্ধ ছড়াচ্ছে। রোদ উঠলেই গন্ধটা কেমন মরে যায়। গাছপালা পাখ-পাখালি তখন জেগে যায় বলে গন্ধটা বুঝি আর থাকে না।

    জমিতে সুন্দর সতেজ সব মুলাশাক। হেমন্তের শেষাশেষি বলে এবং অসময়ের প্রায় বলা যায় এই সব্জি দামে বিক্রি হবার খুব সম্ভাবনা। পিলু রাতে বলেছিল, মা, আমরা কতদিন আবার পেট ভরে ভাত খাইনি। পিলুর যা কাজকর্ম, দেখে মনে হচ্ছে সে আজ পেট ভরে ভাত খাবে। এটা যে সংসারে কত দরকারী কাজ পিলুর মুখ না দেখলে বোঝা যাবে না। সকাল থেকেই সে একজন বিষয়ী মানুষের মতো গম্ভীর।

    শহরে রওনা হবার সময় মা বলল, দাঁড়া। একটা লাল পেড়ে শাড়ি ট্রাঙ্ক থেকে বের করে বলল, নিয়ে যা। কোথাও বিক্রি করে টাকা নিস।

    পিলু বলল, তুমি এটা কেন দিচ্ছ মা। বাবা জানতে পারলে কত কষ্ট পাবেন।

    মা বলল, জানবে না।

    মাকেও সকালে খুব খুশী খুশী দেখাচ্ছিল। তবু কেন যে গভীরে তাকালে বোঝা যায় আশ্চর্য এক বিষণ্ণতা আছে মায়ের চোখে। বাবা বাড়ি না থাকাতেই বোধ হয় এটা হয়েছে। আমরা সবাই পেট ভরে খাব, বাবা বাড়ি নেই, বাবা খাবেন না, বাবার ছেলেমেয়েরা পেট ভরে খাচ্ছে, তিনি জানতেও পারবেন না। বোধহয় দুঃখটা এ-জন্যই মায়ের এত বেশি।

    এবং যেভাবে তাড়া লাগিয়েছে পিলু, যেন বেশ আমরা আগেকার মতো মানুষ। বাজারহাট, মেলা, টাকচাদা মাছের ঝোল, ঘোড় দৌড় কত কিছুতে ভরে ছিল আমাদের জীবনটা। সকাল থেকেই পিলুর হাঁক ডাক—নিপুণভাবে সবকিছু সাজিয়ে নিয়েছে ধামায়। আমার ভীষণ খারাপ লাগছিল—শহর দু- ক্রোশের ওপর। শহর যেখানে আরম্ভ হয়েছে, সেখানে এখনও রাতে হ্যাজাক জ্বলে। আলো আসেনি। এবং চায়ের দোকান, মোটর গ্যারেজ, কিছু পাইকার মানুষ বসে থাকে— তাদের কাছে কম দামে সব বিক্রি করে দিতে হবে। ঝাঁকায় নিয়ে যাওয়া মুটে মানুষের মতো নিজেকে ভাবতে খুব খারাপ লাগছিল।

    পিলু বলল, কিরে দাদা, আয়। তুলে দে।

    পিলু নিজের ঝাঁকাটায় প্রায় বেশিটা নিয়েছে। আর পিলু বুঝি বুঝতে পেরেছিল, মাথায় এভাবে মুটে মানুষের মতো বয়ে নিয়ে যাওয়া তার দাদাটা পছন্দ করে না। সে তাড়াতাড়ি বলল, মা, একটা ব্যাগ দাও না? পেঁপে কটা দাদা ব্যাগে নিক, যদিও খুব স্বার্থপরের মতো দেখাচ্ছিল তবু পিলুর ওপর সামান্য সদাশয় হওয়া গেল। পিলুকে আগে আগে যেতে বললাম। পেছনে, বেশ দূরে, দূরে আমি। পিলুর সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক আছে রাস্তার মানুষেরা, অথবা কোনো লোকালয়ে ঢুকে গেলে বুঝতেই পারবে না কেউ। সবচেয়ে বেশি সেই দোতলা বাড়ি, টবে, গোলাপফুলের গাছ, বালিকার ইজিচেয়ারে শুয়ে বই পড়া জায়গাটায় দূরত্ব আমাদের আরও বেড়ে গেল। পিলু আমার মান-সম্ভ্রম সম্পর্কে বেশ সচেতন। সে সারা রাস্তায় এমন কি সেই সুন্দর মতো সোনালী ফ্রক গায়ে মেয়েটার কাছে বুঝতেও দিল না আমি তার দাদা হই। পিলুর ওপর কৃতজ্ঞতায় আমার মন ভরে গেল।

    আর পিলু প্রায় রীতিমতো দাম দর করে, কী যে বলছেন, এ দামে দেওয়া যায়। কি পেঁপে দেখেছেন, এক একটা কত বড় দেখেছেন। ভেতরটা কত পুষ্ট, আর যা মিষ্টি হবে সে না বলাই ভাল। একবার খেলে সারাজীবন মনে রাখতে হবে। প্রায় একজন দোকানীর মতো দরদস্তুর করে সবটা বিক্রি করে দিল। তারপর নতুন লাল পেড়ে শাড়িটা বিক্রি করা। সেও ছোট্ট একটা কাপড়ের দোকানে ঢুকে বেশ দামেই বিক্রি করা গেল। এবং গুনে দেখা গেল সবসুদ্ধ বার টাকার কাছাকাছি। এতগুলো টাকা একসঙ্গে আমরা অনেকদিন দেখিনি। প্রায় যেন আমরা জাদুকরের মতো বলশালী মানুষ। আমাদের হাতের মুঠোয় পৃথিবীর যাবতীয় প্রাচুর্য। এত টাকায় কি হবে প্রথমে স্থিরই করা গেল না। কি কিনব, কি না কিনব বাজারসুদ্ধু সব তুলে নিয়ে যাওয়ার ইচ্ছে আমাদের। মাছের বাজারে ঢুকে খুব বড়লোকি চালে কথাবার্তা বলতে থাকল পিলু। মাছ তো তোমার ভাল না। এ-মাছ মানুষে খায়! পচে গেছে। দেখি ওটা। আরে দাদা, দেখ, চাপিলা মাছ—কিনব। চাপিলা মাছ এ-দেশে এসে আমাদের কখনও খাওয়া হয়নি। পিলুর লোভ বেড়ে গেল। বেশ দামেই সে কিনে ফেলল পোয়াটাক মাছ। পুরো আট আনা পয়সা তিনবার গুনে পিলু লোকটার হাতে দেবার আগে ফের আমাকে গুনতে দিল। তারপরও পিলুর সংশয় গেল না। হিসাবে সে খুব পাকা।

    তারপর শহর ছাড়িয়ে আটাকল ফেলে এবং সেই ভুতুড়ে সাঁকোটার কাছে আসতেই পিলু কেমন দুঃখী গলায় বলল, পেট ভরে ভাত খাব। বাবা দেখতে পাবেন না। খুব খারাপ লাগছে।

    সাঁকোটার নিচে নেমে আমি বললাম, দুদিন পরে হলে কি হত। বাবাও থাকতেন। সবাই মিলে খেতাম। পিলু কিছু বলল না। সে ঝাঁকা মাথায় হাঁটছে। ডাল, আলু, মসলাপাতি, আনাজের মধ্যে বড় বড় বেগুন, যেমন দেশবাড়িতে আমাদের হাসিমের মাথায় বাবা হাট ফেরত সওদা করে ফিরতেন, মাছের থলে হাতে আমরাও প্রায় সে-ভাবে ফিরছি। গাছে গাছে রোদ, মানুষজন রাস্তায়, গরুর গাড়ি পাট বোঝাই, ছোট গঞ্জ মতো জায়গা পার হয়ে সোজা মিলের পথ ধরে হাঁটছি। আমাদের বাড়ি ফেরার আর একটা রাস্তা আছে পিলুর সঙ্গে ফেরার সময় টের পেলাম।

    পিলু একটা রাস্তা দেখিয়ে বলল, এদিকে গেলে বিষ্ণুপুরের কালীবাড়ি। মাকে নিয়ে একবার আসব। ওদিকে গেলে রাজবাড়ি। তোকে নিয়ে একদিন যাব। সারা রাস্তায় পিলু সব চিনিয়ে নিয়ে গেল। যাবার সময় শহরটার দক্ষিণের রাস্তায় গেছি, ফেরার সময় উত্তরের রাস্তায়। আর সবই দেখছি পিলুর নখদর্পণে। বড় হলে পিলুর গাড়ি ঘোড়া না হয়ে যাবে না। কত কম বয়সে সে কত বেশি অভিজ্ঞ।

    আমার হাতে চালের ব্যাগ। এবং যেহেতু বাবা বাড়ি নেই, এ-দিয়ে আমাদের কতদিন যে চালিয়ে নিতে হবে। চাল সামান্য, কিছু বন আলুর কুচি, একেবারে মা নিপুণভাবে কেটে নেয়। আলুর কুচি- সেদ্ধ সরু চালের ভাতের মতো মনে হয়—এ-ভাবে ভাত আর আলু কুচি ভাতের মতো আমাদের পাতে— কোনোরকমে জীবনধারণ করা, পেট ভরা নিয়ে কথা—যে কোনো ভাবে, যে কোনো উপায়ে। আজ ভাতে আলুর কুচি থাকবে না, সত্যিকারের ভাত মাছ খাব ভাবতেই মনটা পুলকে ভরে গেল। পিলু বোধহয় সেই আনন্দেই জোরে হাঁটছে। কতক্ষণে মাকে তার এই সওদা নিয়ে দেখাবে! মা হেসে ফেললেই পিলু দুটো লাফ দেবে—আরে ব্বাস, মাগো মা, একদিন তোমায় আমি কালীবাড়ি নিয়ে যাব। ওখানে মানত করলে সব হয়। আমাদের সব হবে না মা! আমরা বেশিদিন আর গরীব থাকব না।

    শেষ হেমন্তের রোদ উঠতেও সময় লাগে না। চলে যেতেও সময় লাগে না। দুপুর হয়ে গেল ফিরতে। মা, মায়া রাস্তায় ছুটে এসেছে। যেন মা আমরা কতক্ষণে ফিরব, সেই আশায় পথ চেয়ে বসেছিল। মাছ দেখে বলল, খুব তাজা মাছ। আনাজপাতি মা কত যত্নের সঙ্গে ঘরে তুলে নিলেন! রাতে আজ পেট ভরে আহার, সত্যিকারের মাছ ভাত। মানুষের জীবনে এর চেয়ে বড় সুখ, বড় আরাম আর কি আছে।

    রাতে বাড়িতে ভোজ। চাপিলা মাছের ঝোল সঙ্গে ধনেপাতা। ভাবা যায় না। যেন বাড়িটাতে রাতে উৎসব হবে কিছু। মা পুকুর থেকে চানটান করে এল। পিলু কাঠ সংগ্রহ করছে। রাতে মা’র রান্না করতে যেন এতটুকু কষ্ট না হয়। মায়া খুব বিনয়ী হয়ে গেছে। যত কাজ কাম, যেমন ঘর ঝাঁট দেওয়া, উঠোন ঝাঁট দেওয়া, সব এক হাতে করে ফেলছে। বাসন-কোসন ধুয়ে রাখছে। মসলা বেটে দেবে মাকে বায়না ধরলে মা বলল, পারবে না। ওটা আমি করে নেব। কেউ রাগ করছে না আজ। বচসা করছে না। পুনুকে মায়া আজ আর কোল থেকে নামাচ্ছেই না। গাছ, পাতা, পাখি, কীট- পতঙ্গ যেখানে যা আছে পুনুকে সব দেখিয়ে বেড়াচ্ছে। রাতে মাছ ভাত, বেগুন ভাজা, ভাজা মুগের ডাল। মাকে পিলু গাছ থেকে একটা ছোট কচি লাউ পর্যন্ত কেটে দিল। সব দেখে বোঝা যায় দিন দিন যথার্থই বনভূমিটা মানুষের ঘরবাড়ি হয়ে উঠেছে। সুতরাং বাড়িটাতে সবাই আমরা উৎসাহী মানুষের মতো যেখানে যা কিছু কাজ সেরে ফেলছি। পিলু একটা কোদাল নিয়ে বের হয়ে গেল। সন্ধ্যার আগে আগে সে ফিরে এল। বনের মধ্যে সারা বিকেল সে কি করেছে আমি জানি। সে বড় একটা আলুর লতা ঠিক আবিষ্কার করে ফেলেছে। একটা অতিকায় বনআলু কাল পরশুর মধ্যে বাড়িতে চলে আসবে বোঝা গেল।

    পিলু ফিরে এলে মা বলল, কিরে পেলি?

    পিলু বারান্দায় কোদাল রেখে ঠিক বাবার মতো কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিল। চোখ মুখ উত্তেজনায় খুব অধীর। সে শুধু বলল, কত বড় মা। সে দু হাত ছড়িয়ে দেখাল।

    মা’র বিশ্বাস হল না। পিলু বলল, দু হাত মাটি তুলেও ওর শেষ নাগাল পেলাম না মা। অর্থাৎ প্রায় মণখানেক ওজন না হয়ে যাবে না। চারপাশে মাটির অভ্যন্তরে আলুর শাখা-প্রশাখা ঢুকে গেছে। সে সবটাই তুলে আনবে বলে, খুব বড় মতো গর্ত করে রেখে এসেছে। কাল বাকি যা আছে গর্ত করে ফেললেই সেই প্রকাণ্ড হাতির দাঁতের মতো, কিংবা তার চেয়েও বড় একটা বনআলু। বাবা ফিরে না আসা পর্যন্ত বনআলুটা গোলায় মজুত শস্যের মতো কিছুদিন পিলুকে অহংকারী করে রাখবে।

    সূর্য অস্ত যাবার মুখে, মা আমাদের সবাইকে হাত পা ধুয়ে আসতে বলল কালীর পুকুর থেকে লণ্ঠন জ্বেলে পড়তে বসতে বলল। দল বেঁধে আমি পিলু মায়া ঘড়া নিয়ে গেলাম সেই মাঠ এবং জঙ্গল পার হয়ে কালীর পুকুরে। হাত মুখ ধোওয়া, সঙ্গে রান্নার জল। পিলু ব্যারাকের টিউকল থেকে খবার জল নিয়ে এল। ফিরে আসার সময় দেখতে পেলাম, দূরে বনের গভীরে বাড়িটাতে পিদিম জ্বলছে। তুলসী গাছের নীচে মা রোজ এই পিদিম দিচ্ছে কদিন থেকে। প্রণিপাত করছে ধরণীকে। জীবন ধারণের সব উপায় মানুষের যেমন থাকা দরকার, তেমনি শুভাশুভর জন্য ঈশ্বর বড় প্রয়োজনীয় জীব। মা তাঁর সব প্রার্থনা এই সময় সেরে নেয়। বনের গভীরে অন্ধকার। মা বারান্দায় লম্ফ জ্বালিয়ে রেখেছে। এখন আর শুধু বাড়িটা নয়, তার চারপাশে যা কিছু আছে, এমনকি আকাশ নক্ষত্র এবং বনভূমি সবটা মিলে আমাদের আবাস। আকাশ থেকে কেউ যদি ছোট্ট একটা নক্ষত্রও তুলে নেয়, টের পাব যেন আমাদের কেউ কিছু চুরি করে নিয়ে গেছে।

    রান্নাঘরে মা রান্না করছে এক হাতে। পুনু আমাদের পাশে বসে ঢুলছিল ঘুমে। পিলু পড়াশোনায় মনোযোগ দিয়ে ফেলল। স্লেট এগিয়ে দিয়ে সে পর পর তিনটে মিশ্র যোগ অঙ্ক করে, হাতের লেখা লিখতে বসে গেল। আমি ডেফোডিলস কবিতাটা মুখস্থ করতে থাকলাম, টেন থাউজেণ্ড আই স এট্‌ এ গ্ল্যান্স…… তারপর পড়লাম—হোম দি ব্রট ওয়ারিয়র ডেড। এবং এই কবিতা পড়তে পড়তে কখন জন কিটসের টু অটাম পড়ছি খেয়ালই নেই—জোরে জোরে, যেন এই আবাস এবং বনভূমি পার হয়ে আমার কণ্ঠস্বর দূরে কোনো এক অলৌকিক ভুবনে ছড়িয়ে পড়ছে। অ্যাণ্ড গেদারিং সোয়ালোজ টুইটার ইন দি স্কাইজ। আমার মা তখন ভাজা মুগের ডালে সম্বার দিচ্ছে। আশ্চর্য সুঘ্রাণ চারপাশে- আমরা কত সহজে কত বেশি মনোযোগী পড়ুয়া হয়ে গেলাম।

    মায়া পড়ছিল, আমাদের ছোট নদী চলে বাঁকে বাঁকে, বৈশাখ মাসে তার হাঁটুজল থাকে। পড়তে পড়তে ঘুমে ঢুলছিল মায়া। পিলু বলল, এই মায়া, ঘুমোচ্ছিস কেন রে?

    মায়া বলল, আমার ঘুম পাচ্ছে দাদা।

    পিলু খুব গম্ভীর গলায় বলল, চোখে জল দিয়ে আয়। ঘুমিয়ে পড়লে খেতে পাবে না। আমরা সব খেয়ে নেব।

    সঙ্গে সঙ্গে মায়া দৌড়ে উঠে গেল। ফিরে এসে পড়ল ফের—আমাদের ছোট নদী চলে বাঁকে বাঁকে, বৈশাখ মাসে তার হাঁটুজল থাকে…। সে কিছুতেই আর ঘুমোবে না ঠিক করেছে।

    ক্রমে অন্ধকার আরও ঘনিয়ে এল। মাথার ওপরে আকাশ, কিছু নক্ষত্র! বনভূমিতে পাতা পড়ার শব্দ পাচ্ছিলাম। কত সব কীট-পতঙ্গের আওয়াজ এবং দূরে শেয়ালের হাঁক। বাবা বাড়ি না থাকলে, বড় ভয় লাগে। যেন বনটা ধীর পায়ে খুব কাছে এগিয়ে আসে। সহজেই আমাদের বাড়িটাকে গ্রাস করে নেয়। চারপাশে গাছপালা অন্ধকার ছাড়া আর কিছুই তখন চোখে পড়ে না।

    ভোজ হবে বলে, পিলু কলাপাতা কেটে রেখেছিল। আমরা অপেক্ষা করছিলাম, কখন মা বলবে, তোমরা খেতে এস। পিলু পড়া ফেলে মাঝে মাঝে উঠে গিয়ে দেখছে—আর কত দেরি। এত বেশি সময় ধরে তার পক্ষে মনোযোগী পড়ুয়া হয়ে থাকা কঠিন। মা কেবল বলছিল আর একটু পড় বাবা। এইতো হয়ে গেল বলে। সে ফের এসে কিম্ভুতকিমাকার গলায় তীব্র আওয়াজে চেঁচিয়ে ফের পড়া শুরু করে দিল। আমি বললাম, এই পিলু, এত জোরে পড়ছিস কেন রে। সে কর্ণপাতই করছে না। মাকে বললাম, দ্যাখো মা, পিলু ষাঁড়ের মতো চেঁচাচ্ছে। পড়তে দিচ্ছে না।

    মা বুঝি বুঝতে পেরেছিল, পিলু আর ধৈর্য ধরতে পারছে না। রাগে দুঃখে সে এখন পড়ার নামে চেঁচাচ্ছে। হেসে বলল, আসন পেতে তোরা বোস। দিচ্ছি। এবং সঙ্গে সঙ্গে পিলু বইটা মাথার ওপরে ছুড়ে ফের কপ করে ধরে বলল, ওঠ ওঠ। বলে প্রায় টান মেরে মাদুর-ফাদুর তুলে আসন পেতে ফেলল। গ্লাসে গ্লাসে জল। কলাপাতা ধুয়ে নুন রাখল পাশে। মা আমাদের ভাত বেড়ে দিচ্ছে। পিলুকে যত দিচ্ছে তত খেয়ে নিচ্ছে। আমার পাতেও ভাত পড়ে থাকছে না। এবং পিলুর খেতে খেতে সহসা মনে পড়ে গেল, সে সবই খেয়ে ফেলছে না তো! সে বলল, মা, তোমার জন্য কিন্তু রেখ।

    —আছে। তোরা খা।

    —কৈ দেখি!

    মা হাঁড়িটা তুলে এনে দেখাল।

    —দি আর দুটো।

    —তোমার তবে থাকবে কি!

    —হয়ে যাবে। নে না।

    আমি বললাম, পিলু তোর পেট ভরেনি?

    সে তাকিয়ে থাকল। গলা অবধি খেয়ে এখন বোধহয় কানে-টানেও কম শুনছে।

    —তুই উঠে দাঁড়া তো দেখি।

    পিলু উঠে দাঁড়াল।

    —জামাটা তোল। পেটটা দেখি।

    সে চাদর সামলে কোনোরকমে জামাটা তুলে পেটটা ভাসিয়ে দিল।

    —পিলু করেছিস কি। তোর পেট ফাটল বলে।

    পিলু আমার কথা শুনে ঘাবড়ে গেল। তবু সে দোনোমোনো গলায় বলল, যা!

    —নুয়ে দেখ, পেটটা কি হয়েছে তোর!

    সে নুতে গিয়ে কেমন হাঁসফাঁস করতে থাকল। বলল, দাদারে, নুতে পারছি না। মাকে বললাম, আর তুমি দিও না। দেখেছ পেটের রগগুলো পর্যন্ত ভেসে উঠেছে। মা এবার লম্ফ তুলে পিলুর পেটের কাছে উঁকি দিয়ে সত্যি দেখল। বলল, কই। তুই যে কি না! ও আরো দুটো খেতে পারবে। বলে মা পিলুর পেটে দুটো টোকা মারল।

    —ঠিক আছে, থাক। পেট ফেটে গেলে আমি কিছু জানি না।

    পিলু সত্যি সত্যি ভয় পেয়ে গেল। সে বলল, না মা, আর লাগবে না। সে ফট করে প্যান্টের গিট খুলে কিছুটা যেন হাঁপ ছেড়ে বাঁচল। তারপর হাত চাটতে বসে গেল।

    মায়ার খাওয়া হয়ে গেছে। আমারও। মায়া শেষ পর্যন্ত মাছটা আস্তই রেখে দিয়েছে পাতে। সবার খাওয়া হলে, সে তারিয়ে তারিয়ে মাছটা খাবে। এটা মায়ার চিরদিনের অভ্যাস। ভাল সুস্বাদু খাবার দিলেই সে হাতে রেখে দেবে। মাঝে মাঝে খাবে, চাটবে। আমাদের শেষ না হলে সে শেষ করবে না।

    তখনই মনে হল রাস্তায় অন্ধকারে কেউ দাঁড়িয়ে আছে। অথবা এগিয়ে আসছে মতো। বাবা বাড়ি না থাকলে, সাঁঝ লাগলেই আমাদের গা ছমছম করতে থাকে। যত রাত হয় তত ভয়টা বাড়ে। গভীর রাতে কখনও ঘুম ভেঙে গেলে গুটিসুটি শুয়ে থাকি পিলুকে জড়িয়ে। রাতে একা আমরা ঘর থেকে কেউ বের হতে সাহস পাই না। মা পাশে না থাকলে ভীষণ ভয় করে—তখন এমন একটা ছায়া- ছায়া মানুষের অবয়ব অন্ধকারে এগিয়ে আসতেই কেমন আমরা সবাই গুটিয়ে গেলাম। ছায়াটা উঠোনে এসে দাঁড়িয়েছে। বোধহয় চিৎকার করে উঠতাম সবাই—তখনই লম্ফের আলোতে দেখলাম—সেই হাবিলদার লোকটা। লম্বা জুলফি, গোঁফ ঝুলে পড়েছে। দশাসই একটা দৈত্যের মতো। উঠোনে দাঁড়িয়ে বলছে, ঠাকুরমশাই আছে?

    মা আমার কেমন ঠাণ্ডা গলায় বলল, পিলু বলে দে, তিনি বাড়ি নেই?

    —কোথা গেছেন?

    অন্ধকারেও লোকটার চোখ জ্বলছিল। লম্বা মোটা গোঁফ, নাক থ্যাবড়া অতিকায় এক পাষণ্ডের মতো চেহারা। হাবিলদার লোকটা ব্যারাকে থাকে। এত রাতে বাবার সঙ্গে এমন কি কাজ বোঝা গেল না।

    —কখন আসবে?

    মা আবার ভেতর থেকে বলল, পিলু বলে দে, কবে ফিরবেন কিছু বলে যাননি। পিলু হঠাৎ মুখিয়ে উঠোনে নেমে বলল, কেন, কি দরকার?

    পিলুর সাহসে আমিও সাহসী হয়ে উঠলাম। এতক্ষণ বারান্দা থেকে কিছুতেই উঠোনে নামতে ভরসা পাচ্ছিলাম না। পিলুর পিছু পিছু এগিয়ে গিয়ে বললাম, বাবা ফিরলে কিছু বলতে হবে?

    —না কিছু বলতে হবে না। শেষে বলল, তোমার পিতাঠাকুর কেমন লোক আছে!

    পিলু বলল, ভাল লোক আছে।

    লোকটার এত কি দায় বোঝা গেল না। পিতাঠাকুর ভাল কি মন্দ আছে আমরা বুঝব। আর লোকটা তেমনি দাঁড়িয়ে আছে। পিতাঠাকুর বাড়ি নেই, আর কি কাজ কার সঙ্গে লোকটার থাকতে পারে। মা ভেতর থেকে কিছুতেই বের হচ্ছে না। এত ভয় মার আমি কখনো দেখিনি। এমন এক বন-জঙ্গলে কেউ খোঁজখবর নিতে এলে ভাল লাগারই কথা।

    পিলু বলল, বাবা কাজে বেথুয়াডহরি গেছেন।

    মা খুব সন্তর্পণে বলল, বলে দে, তোর বাবা এলে যেন আসেন।

    লোকটা তখন খুব আপনজনের মতো বলল, ইতো ঠিক নেহি আছে। ইসান বন-জঙ্গলে রাখকে চলা গিয়া!

    বাবার নামে কেউ খারাপ কিছু বললে, পিলুর মাথা গরম হয়ে যায়। সে কেমন চোয়াড়ে গলায় বলল, কাজ থাকলে যাবেন না। বাবা এলে কিছু বলতে হবে?

    —কুছ বুলতে হবে না। একবার কি ভি মোনে হল, যাই ঠাকুরমশাইর সাথ দেখা করি। লোকটা যেন কি খুঁজছে। কথা বলছে আর ধূর্ত চোখে ঘরের দিকে তাকাচ্ছে। চারপাশের এই নির্জনতা, গভীর অন্ধকার আর জোনাকি জ্বলছিল বলে লোকটার মতলব খুব ভাল ঠেকছে না। মা ঘরেই বসে আছে। মায়া এঁটো বাসনকোসন খুব দ্রুত ঘরে তুলে রাখছে।

    এই লোকটা আরও দুবার আমাদের বাড়ি এসেছিল। বাবা বাড়ি না থাকলেই চলে আসে। কি করে যে টের পায়, বাবা বাড়ি নেই। অন্য দুবার দিনের বেলায় এসেছিল বলে, আমাদের তত ভয় ছিল না। মাও সহজভাবে দুটো একটা কথা বলেছে। কিন্তু আজ মাও কেমন দুর্ব্যবহার করছে লোকটার সঙ্গে। বলছে, পিলু বলে দে, তোর বাবা এলে খবর দিবি।

    —বাবা এলে জানাব। তখন আসবেন।

    তবু লোকটার যাবার নাম নেই। কিছু করলে শত চিৎকারে কেউ কিছু টের পাবে না। অনায়াসে আমাদের সুন্দর ঘরবাড়ি লোকটা লণ্ডভণ্ড করে দিতে পারে। এই প্রথম একজন মানুষ অন্ধকারে দাঁড়িয়ে থাকলে কি ভীষণ এবং ভয়াবহ টের পেলাম। লোকটা অথচ এমন কিছু করছে না, বরং লোকটার যেন দরদের শেষ নেই—তবু মার ভয়ার্ত মুখ দেখে আমরা ভারি কাবু হয়ে যাচ্ছি। এমনিতে মা ভীষণ সাহসী। কোনো ভূত-প্রেত, সাপখোপে মা এতটুকু ভয় পায় না। এ-সময়ে আমরা কি করব ঠিক বুঝতে পারছিলাম না।

    মা তখন কেমন শক্ত গলায় ঘর থেকে বলল, আপনি যান। উনি বাড়ি নেই। এলে বলব, আপনি এসেছিলেন।

    লোকটা তারপর আর দাঁড়াল না। চলে গেল। কেমন রাহুগ্রাস থেকে সমস্ত পরিবারটা যেন রক্ষা পেয়েছে। বাইরে থাকা আর নিরাপদ নয় ভেবে মা আমাদের সবাইকে ঘরে ঢুকে যেতে বলল। পিলু গেল না। সে উঠোনে দাঁড়িয়ে যতক্ষণ দেখা যায় লোকটাকে দেখল। বনজঙ্গলে কীট-পতঙ্গের আওয়াজ, কিছু শেয়ালের হাঁক এবং ক্রমে দুরাগত কোনো নিথর শব্দ বনভূমির অভ্যন্তরে তোলপাড় করে বেড়াচ্ছে যেন। রাতে আর মা বের হতে সাহস পেল না। কেবল বাবাকে গালমন্দ করতে থাকল। রাতে মা আর খেলও না। পিলু সকাল হলে কিছু একটা প্রতিবিধানের জন্য কোথায় যে না বলে না কয়ে বের হয়ে গেল!

  • সাত

    সাত

    সকালে উঠেই দেখি মা’র মুখ ভার। বাবার ওপর অভিমানে মা কারো সঙ্গে একটা কথা বলছে না। পিলু কোথায় গেল, দুপুর হয়ে গেল, এখনও ফিরে আসছে না— অন্য সময়ে মা স্থির থাকতে পারতো না। অথচ আজ সব জ্বলে পুড়ে যাক, কি হবে ঘরবাড়ি দিয়ে—যেমন বাবা, তার ছেলে আর ভাল হবে কোত্থেকে, একটা চিঠি দিয়েও তো জানাতে পারে, তা না। যেন আমরা সব ভেসে এসেছি। এ-সব থেকেই বোঝা গেল মা’র মন-মেজাজ খুব খারাপ। আর মন-মেজাজ খারাপ হলেই আমাদের কপালে দুর্ভোগ বাড়ে। খুব ভয়ে ভয়ে আছি। কার পিঠে কখন কি পড়বে কিছুই বলা যাচ্ছে না। মা’র কাছেপিঠে থাকা আজ আর খুব নিরাপদ নয়।

    তখনই রাস্তায় একটা লোক সাইকেল থেকে নেমে ক্রিং ক্রিং করে বেল বাজাচ্ছে। ডাকছে আমাকে- এই ছেলে, এটা অমুকের বাড়ি? আমি দৌড়ে চলে গেলাম। পোস্টাফিসের লোক। গায়ের জামা প্যান্ট সাইকেলে থলে দেখেই বুঝে ফেলেছি। লোকটাকে বললাম, হ্যাঁ।

    —সুপ্রভা দেবী বলে কেউ আছেন? মনি অর্ডার আছে।

    মাকে দৌড়ে গিয়ে বললাম, মা তোমার নামে মনি অর্ডার এসেছে। মা তো খুব হতবাক হয়ে গেল। বলল, সত্যি!

    লোকটা তখন সাইকেলটা গাছে হেলান দিয়ে বাড়ির ভিতর ঢুকে গেল। মায়া তাড়াতাড়ি আসন পেতে দিল একটা। লোকটা বসেই বলল, এক গ্লাস জল দিন আগে খাই। এখানে বাড়িঘর হয়েছে কি করে জানব বলুন। তিনি-চার দিন ব্যারাকে ঘুরে গেছি, ও নামে কোথায় এখানে কে আছে কেউ বলতে পারে না। ভাগ্যিস একটা চিঠি এসেছে আজ। এবং চিঠিটার ওপর ঠিকানা লেখা, পরম কল্যাণীয়া সুপ্রভা দেবী, গ্রাম নিমতলা। তারপর লিখেছেন, পুলিস ব্যারাকের অদূরে দক্ষিণমুখী বাড়ি। পোঃ কাশিমবাজার। চিঠিটা না এলে আপনাদের মনিঅর্ডার ফিরে যেত।

    মা একটা কথাও বলছে না। সামনে একটা প্রস্তরমূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছে। এত বড় সুখ কপালে কিছুতেই বিশ্বাস হচ্ছে না। মনি অর্ডারে টাকা আসবে, মা স্বপ্নেও ভাবেনি। চিঠি আসবে সেটাও যেন বিশ্বাস করা যায় না। মাসাধিক হয়ে গেছে বাড়ি ছেড়ে গেছেন বাবা—টাকাই বা পাবেন কোথায়! পিয়ন দেখিয়ে দিল, এখানে টিপ দিন। মা হয়ত টিপই দিত, কিন্তু আমি মনে করিয়ে দিলাম, এখানে তুমি মা সই কর। মার হস্তাক্ষর ভারি সুন্দর। এবং মা যখন সই করল, পিয়নটাও হতবাক হয়ে গেল। কেমন নিজের মানুষের মত বলল, দেশ ভাগে কত মানুষের যে কপাল পুড়েছে।

    আমার আর সহ্য হচ্ছিল না। বললাম, চিঠিটা দিন।

    —দিচ্ছি দিচ্ছি। আগে টাকা ক’টা গুনে নাও। তুমি এখানটায় আর একটা সই করে দাও। দেখ চল্লিশ টাকা আছে। সবই এক টাকার নোট। গুনে বললাম, ঠিক আছে। তারপর সেই লোকটা দেবদূতের মতো একটা নীল খাম বের করে দিল। কল্যাণীয়া সুপ্রভা দেবী। মা’র চিঠি। তাকিয়ে দেখলাম, মা’র চোখ জলে ভরে গেছে। মা-টাকা ক’টার দিকে ফিরেও তাকাল না। চিঠিটা নিয়ে কোথায় মুহূর্তে উধাও হয়ে গেল।

    পিলু ফিরে এল, বেশ বেলা করে। কদিন থেকে শীত পড়েছে খুব। সকালে অন্য সব দিনে খড়কুটো সংগ্রহ করে পিলু আগুন দেয়। আমরা তখন আগুনের পাশে গোল হয়ে বসি। রোদ না উঠলে, শীত না কমলে কেউ নড়ি না। মা কাজের ফাঁকে মাঝে মাঝে হাত সেঁকে নেয়। ঠাণ্ডা জলে মা’র হাত তখন সাদা দেখায়। মনে হয় কেমন রক্তশূন্য হাত। সকালবেলায় এত কি কাজ, একটু বেলা হলে সহজেই কাজ করা যায়—কিন্তু রোদ না উঠতে সব বাসি থালাবাসন ধুয়ে রাখা, গোবরছড়া, ঘরের দাওয়া লেপে দেওয়া মা’র বড় জরুরী কাজ। মানুষের ঘরবাড়ি হলে যে যে স্বভাব—মা’রও তাই। পিলু সকালেই বের হয়ে গেছিল বলে আগুন জ্বালানো হয়নি। অন্য দিনের মতো আগুনের উত্তাপে আর আজ আমাদের ঘুম ভাঙেনি। যখন ভাঙল, তখন দেখলাম বেশ বেলা হয়ে গেছে। গাছের মাথায় শীতের রোদ চিকচিক করছে। তারপর কত সুখবর সংসারে — ডাকপিয়ন এসেছিল — বাবার চিঠি এসেছে, টাকা এসেছে। পিলু তখন জঙ্গলে টো টো করে ঘুরে বেড়াচ্ছে। পিলু কিছুই জানে না। সেই পিলু শীতের চাদর গায়ে যখন ফিরল তখন মনে হল বগলের নিচে কিছু একটা কুঁই কুঁই করছে। কি কোথা থেকে ধরে এনেছে কে জানে।

    বললাম, জানিস পিলু, ডাকপিয়ন এসেছিল। মা’র নামে মনিঅর্ডার, নীল খামে চিঠি।

    সে কানেই তুলল না কথাটা। খুব সতর্ক চোখে রাস্তার দিকে কি দেখছে। আমি বললাম, তোর চাদরের নিচে কুঁই কুঁই করছে কে রে? সে খুব ভারিক্কি চালে ঘরে ঢুকে গেল। পিছু পিছু আমরা গেলে দেখলাম, একটা ককুরছানা সে বগলের নিচ থেকে বের করছে। আশ্চর্য কি নরম তুলোর বলের মতো একটা কুকুরছানা পিলু কোত্থেকে নিয়ে এসেছে।

    ভয়ে বাচ্চাটা লেজ গুটিয়ে আছে। এক ফাঁকে পালাতেও চাইছিল কিন্তু পিলু খপ করে ফের ধরে ফেললে—ত্রাহি চিৎকার শুরু করে দিল তুলোর বলটা। মা এসে দেখে তাজ্জব। বলল, হ্যাঁরে তুই এটা আবার কোত্থেকে নিয়ে এলি! দুধের বাচ্চা বাঁচবে কেন? সারাটা সকাল টোটো করে ঘুরে বেড়ালি। একটু পড়াশোনা করলি না। তোরা আর আমার হাড়মাস কত পুড়িয়ে খাবি।

    কারো কোনো কটু কথায় পিলুর যেন এখন কিছুই আসে যায় না। সে খুব সন্তর্পণে চারপাশে কিছু খুঁজছে। আর যেন কান খাড়া করে রেখেছে। মায়া কুকুরের ছানাটাকে কোলে তুলে নিতে গেলে এক ধমক— রাখ বলছি। ঘাঁটবি না। সে বোধহয় কোথাও থেকে বাচ্চাটা চুরি করে এনেছে। সে তাড়াতাড়ি বাচ্চাটাকে নিয়ে ঘরের পেছনে চলে গেল। এবং রাস্তা থেকে দূরে আড়াল মতো জায়গায় লুকিয়ে রাখার সময় বলল, দড়িটড়ি আন তো।

    আমি বললাম, ছেড়ে দে না। ওটুকু বাচ্চা কোথাও আর পালাতে পারবে না।

    —ছেড়ে দিলেই চলে যাবে। ওর মা-টা ভীষণ পাজি। আমার পেছন পেছন এসেছিল। ঢিল ছুঁড়তেই কোথায় পালাল। ও মা, বাড়ির কাছে এসে দেখছি, আবার মা-টা পেছনে।

    —কোত্থেকে আনলি?

    —বাগদীপাড়া থেকে।

    —ওর মা-টা কোথায়?

    —ঠ্যাঙানি খেয়ে পালিয়েছে। তবু মা তো, আবার ঠিক চলে আসতে পারে।

    মা তখনও কাজকাম করতে করতে চেঁচাচ্ছিল, পিলু বাচ্চাটা দিয়ে আয়। দুধের বাচ্চা, বাঁচবে না। এটুকু বাচ্চা মা ছাড়া থাকবে কি করে। ঘরে দুধ নেই যে দুধ দেব।

    আমারও ইচ্ছে ছিল না—ওটা আবার পিলু রেখে আসে। রাতে যে-ভাবে হাবিলদার লোকটা আমাদের ভয় ধরিয়ে দিয়ে গেল, তাতে করে পিলুর এমন কাজকে প্রশংসা না করে পারা যায় না।

    লোকটা ভয় দেখিয়ে চলে যাবার পর বোধহয় পিলু সারা রাত ভেবেছে কি করা যায়। রাতে বোধহয় ওর ভাল ঘুমও হয়নি। বাবা নেই, বাবা মাঝে মাঝে এভাবে থাকে না, বনের অন্ধকারটা তখন রাতে দাঁত বের করে হাসে। যে বনটা দিনের বেলায় পিলুর সঙ্গী রাতে সেটাই কেমন তার শত্রু হয়ে যায়। তারপর চোর-ছ্যাঁচোড়ের মতো যদি আবার সেই বাটপাড় লোকটা রাতে চলে আসে তখন কি হবে? সে এত সব ভয়ের কথা ভেবেই শেষ পর্যন্ত একজন তার উপযুক্ত সঙ্গী খুঁজে এনেছে।

    সে ফিরে এসে ভেবেছিল, কুকুরের এমন সুন্দর বাচ্চাটা দেখে মাও খুব খুশী হবে। কিন্তু মাকে তেমন খুশী দেখাল না বলে সে বেশ মুষড়ে পড়েছে। বাচ্চাটার ভাল করে চোখ ফোটেনি। ঠিকমতো দেখতে পায় না। দুধ না পেলে বাঁচবে না। মা তখনও পাঁচালী পাঠ করে যাচ্ছে—দুধের বাচ্চাটা তুলে নিয়ে এলি, তোর মায়াদয়া কিছু নেই রে পিলু। মা এমন সব হরবখত বলে যাচ্ছিল।—দিয়ে আয়। এমনিতেই কি পাপে যে পড়েছি, দেশ ছাড়া, দু-মুঠো পেট ভরে খেতে দিতে পারি না- আর পাপ বাড়াস না বাবা। বড় হলে আনবি। যা লক্ষ্মী বাবা, দিয়ে আয়। পিলু এখন কি করবে ভেবে পাচ্ছে না। সে আমার দিকে তাকিয়ে সামান্য ভরসা খুঁজছে। অন্তত একজনও যদি তার এই দুঃসময়ে পিছনে না দাঁড়ায় তবে সে যায়টা কোথায়। মায়া ততক্ষণে কোলে নিয়ে বাচ্চাটাকে আদর করতে বসে গেছে। পেটের কোথায় লুকিয়ে আছে বাচ্চাটা টেরও পাওয়া যাচ্ছে না।

    মা রেগে গেলে ভারি মুশকিল আমাদের। সারাদিন পাঁচালী পাঠ চলবে। রাজা শ্রীবৎস থেকে আরম্ভ করে পুরাণের সব দুঃখী মানুষদের গল্প এক এক করে কপালে করাঘাত করার মতো শোনাবে আমাদের।

    এ-সব সময়ে আমার মধ্যস্থতা খুব কাজ দেয়। তখন আমি পিলুর পক্ষেও না, মায়ের পক্ষেও না। একেবারে নিরপেক্ষ মানুষ। পিলুকেই প্রথম আসামীর কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দিলাম। বললাম, তুই যে আনলি, ওর মা-টা কোথায় থাকে জানিস?

    —ঐ যে তোর বড় শিশুগাছটা আছে না, একটা চালতা গাছ, আরে ঐ যে তোর বাগদিপাড়ার মুখে একটা ঝুপসি মতো ছিটকিলার জঙ্গল আছে—বুঝতে পারছিস না, খড়ের গাদা আছে একটা তার নিচে মা-টা থাকে।

    বুঝতে পারলাম, বেশ খানিকটা পথ হেঁটে যেতে হবে। বাদশাহী সড়ক পার হয়ে মাঠের ওপর দিয়ে কিছুটা পথ হেঁটে যেতে হবে। সকালে বিকেলে দুবার দুধ খাওয়ানো দরকার। এবারে মাকে একটু বাজিয়ে দেখা যাক। বললাম, ওর মা-টা কাছেপিঠেই থাকে।

    মা বিছানা রোদে দিচ্ছিল। শুনতে পেল কি না কে জানে। বেশ চেঁচিয়ে বললাম, ওর মা-টা কাছেপিঠেই থাকে মা!

    —তা কাছেপিঠেটা কোথায়?

    —ঐ তো রাস্তাটা আছে না!

    —রাস্তায় কখনও কুকুর বাচ্চা নিয়ে থাকে? তার বাড়িঘর থাকবে না।

    বাড়িঘরের কথায় আসতেই বললাম, ব্যারাক বাড়িতে থাকে।

    বাড়িঘরের কথা শুনে মা বেশ খুশীই হল। মা বলল, পুলিস ব্যারাকে থাকে বলছিস?

    পিলু চোখ টিপে দিল। বললাম, হ্যাঁ।

    কাছেপিঠে যখন থাকে মা-টা তখন আর ভাবনা নেই। মারও বেশ আগ্রহ বাড়ছে বাচ্চাটার জন্য। মা বলল, দু দিন বাদে আবার কেউ না নিয়ে যায়।

    মা এবার পুনুকে কোলে নিয়ে বাচ্চাটার কাছে এসে বসল। পুনু দুহাতে বাচ্চাটাকে চটকাতে চাইছে। আমরাও তখন গোল হয়ে ফের একজন অতিথি, ঠিক অতিথি বলা চলে না, একেবারে আর একজন এই সংসারের ভেবে আনন্দে মেতে গেলাম। সংসারের আর পাঁচটা কাজের মতো এই বাচ্চাটাকে বড় করার দায়িত্বও আমাদের পড়ে গেল।

    পিলু তখন বলল, মা, বাবা সত্যি চিঠি লিখেছেন?

    মা বলল, হ্যাঁ লিখেছে। চিঠি লিখেছে, টাকা পাঠিয়েছে।

    –কবে আসবেন বাবা?

    —তা কিছু লেখেনি। এখন জলপাইগুড়িতে আছে। সেখান থেকে কোথায় আসামে অভয়াপুরী আছে সেখানে যাবে। দু-দশ ঘর শিষ্যের খোঁজ পেয়েছে। আরো পাবে বলেছে। ওদের প্রণামী টাকা সব একসঙ্গে করে পাঠিয়ে দিয়েছে। বোঝা গেল বাবার ফিরতে আরও মাসাধিককাল।

    মা ফের বলল, তোমাদের পড়াশোনা করতে বলেছে মন দিয়ে।

    মায়া বলল, আমার কথা কিছু লেখেনি মা?

    —সবার কথাই লিখেছে।

    তাছাড়া মা’র কাছে আরও জানা গেল, বাবা শিলচর কাছাড় হয়ে ফিরবেন। দেশ থেকে হরমোহন জ্যাঠামশাইরা চলে এসেছেন। আসার সময় হরমোহন জ্যাঠামশায়ের কাছে বাড়ির বিগ্রহ রেখে এসেছিলেন বাবা। বিঘে দুই ভুঁই ঠাকুরের নামে রেখে এসেছিলেন। সব বিক্রি করে নগদে বাবা যা পেয়েছিলেন, সবটা আনতে পারলে, আমাদের এখানে পাঁচ-সাত বছর রাজার হালে চলে যেত। কিন্তু ঐ তো দোষ বাবার, বাই উঠলে রক্ষা নেই—দেশ ভাগ হবার সঙ্গে সঙ্গে বাবার এক দণ্ড সবুর সইল না। জলের দরে তারক মাঝির কাছে সব বিক্রি। তাও তারক মাঝি বলল, কর্তা, এত টাকা নিয়ে তো যেতে পারবেন না, দর্শনায় সব কেড়েকুড়ে নেবে। বরং বাকিটা আমি হুণ্ডি করে পাঠিয়ে দেব। সেই দেব বলে আর দিল না। চিঠি দিলে লিখত, সব ফিরিয়ে নিন কর্তা। আমার আগাম টাকা আর আপনাকে ফেরত দিতে হবে না!

    বাবা খুব উত্তেজিত হলে বলতেন, তারক আমাকে এমনভাবে ডোবাবে ভাবিনি।

    মা বলত, আসলে লোকটা বিষয়ী মানুষ। ধূর্ত। তুমি ওর কথা বিশ্বাস করলে কত বললাম, নিয়ে নাও। রাস্তায় যা হবার হবে।

    বাবা খুব চড়া গলায় বলতেন, মেয়েছেলের বুদ্ধি আর কাকে বলে। রাস্তায় কেড়ে নিলে একেবারেই যেত। তবু তো আশা আছে, তারকের সুমতি হলে টাকাটা পাঠিয়েও দিতে পারে।

    —আর দিচ্ছে।

    —বামুনের টাকা কেউ মারে!

    বাবার এমন ধরনের কথা শুনে শুনে মা শেষ পর্যন্ত মাথা ঠিক রাখতে পারত না। বলত, দ্যাখো তোমার কি হয়! নিজের ভালটা একটা কুকুর বেড়ালও বোঝে, তুমি তাও বোঝ না। লোকের কথায় কেবল নাচ।

    —লোকের কথায় নাচব না, তোমার কথায় নাচব! বাবা তারপর ধৃতরাষ্ট্র থেকে দশরথের কৈকেয়ী পর্যন্ত নির্বিঘ্নে নারীবুদ্ধি সংসারে কত বিপত্তিকর সব উদাহরণসহ এক এক করে তুলে ধরতেন। আমরা ঐ সময়ে কার কত বেশি রামায়ণ মহাভারতে দৌড় টের পেতাম। বাবা শেষ পর্যন্ত পরাস্ত হলে মাকে মহারোষে চণ্ডীপাঠ আবৃত্তি করে শোনাতেন। মার হাজার কথার এক বর্ণও আর যেন কানে না ঢোকে। বলতেন :

    যা দেবী সর্বভূতেষু সৃষ্টিরূপেন সংস্থিতা
    নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমো নমঃ

    মা তখন আমার আরও রেগে যেত। চেঁচিয়ে বলত, তোমার বুদ্ধিনাশ হয়েছে। তোমার মতিভ্রংশ হয়েছে। তুমি আমাকে আর কত জ্বালাবে। হাড়মাস তো কিছু আর রাখনি। সব গেছে আমার।

    বাবার চণ্ডীপাঠ তত দ্রুত বাড়ত। প্রায় পাল্লা দেবার মতো, কেউ কম যায় না, একদিকে বাবার উদাত্ত কণ্ঠে স্তোত্র পাঠ অন্য দিকে মায়ের সারাজীবনের জ্বালা, সারা বাড়িটায় তখন খোল-করতাল সহ হরিসংকীর্তনের মতো। আর আমরা তখন একেবারে স্বাধীন নাগরিক। খুশিমতো পেলে খাই, না পেলে খাই না, যা পাই তাই খাই। উদাহরণ দেবার মতো স্বাধীন নাগরিক অধিকার রক্ষা করে যাচ্ছি। যেখানে সেখানে চলে যেতে পারি।

    এখন সে-সব খণ্ড-যুদ্ধের মলিন দিনগুলি আর ভাসে না চোখে। বাড়িঘর হয়ে যাওয়ায় আমরা মা বাবার খুবই অনুগত হয়ে উঠেছি। মা দেখছি সব কিছু, সময় মতো মনে করিয়ে দেয়। টাকাটা দিয়ে মোটামুটি আমাদের বেশ কিছু দিন খুব ভালভাবে চলে যাবে বলে, একটা হিসাবপত্রও হয়ে গেল। এক মণ চাল, সতের টাকা দশ আনা, মায়ার ফ্রক, তিন টাকা ছ আনা, পিলু এবং আমার প্যান্ট শার্ট সাত টাকা চোদ্দ আনা, বাকি টাকায় মজুত ভাণ্ডার গড়ে উঠবে—এত সব পরিকল্পনার পর মা মনে করিয়ে দিল, মনার দুধ খাবার সময় হয়ে গেছে, কৈ রে পিলু যা বাবা, দেখ ওর মা-টা কোথায় আছে, একটু দুধ খাইয়ে আন।

    তখন হয়ত সকালের রোদ উঠে গেছে। আমরা দু ভাই সেই নেড়ি কুকুরটাকে খুঁজে বেড়াচ্ছি। কোলে তুলোর বলের মতো বাচ্চাটা চোখ বুজে ঘুমোচ্ছ। কোথাও নেড়ি কুকুরটাকে দেখা যাচ্ছে না। আস্তানায় নেই। মাঠঘাট এবং গাছপালার অভ্যন্তরে কুকুরের আভাস পেলেই ছুটছি। আস্তানায় অন্য বাচ্চাগুলি সারারাত দুধ খেয়ে অঘোরে জড়াজড়ি করে ঘুমোচ্ছে। মনা রাতে দুধ খায়নি। ভোর রাতে কেঁদেছে। খিদেয় মাঝে মাঝে কোলের মধ্যে কোঁ কোঁ করেছে। সারারাত মনা থাকে পিলুর লেপের নিচে। তারপর কিছুদিনের মধ্যে পিলু বনবাদাড়ে গেলে বাচ্চাটাও যায়। পিলু ঘাটে গেলে বাচ্চাটাও হেলতে দুলতে চলতে থাকে। পড়তে বসলে দু পা সামনে রেখে হিজ মাস্টারর্স ভয়েস হয়ে যায়। কান খাড়া রেখে আমাদের পড়াশোনা মন দিয়ে শোনে। আমরা তখন আরও মনোযোগী ছাত্র হয়ে যাই বাচ্চাটার জন্য। মা বাটিতে করে সবার জন্য ভাগে ভাগে তেল পেঁয়াজ মাখা মুড়ি রেখে যায়। পুনু বারান্দায় উঠোনে হেঁটে বেড়ায় তখন। কখনও হাঁটতে হাঁটতে পড়ে যায়। আমরা মুড়ি খাই, পড়ি। মনা মুড়ি খায়, পড়া শোনে। পুনু মা মা করে তখন ফ্যাক করে কাঁদে। আর তখনই মায়ার পড়া থেকে ছুটি— সে পড়ার চেয়ে ভাইকে আদর করা, কোলে নিয়ে ঘুরে বেড়ানো সংসারে বেশি দরকারী কাজ মনে করে থাকে। মা’রও বোধহয় এতে সুবিধা হয়। মায়া পড়ছে না বলে তার বাড়ির কোনো ক্ষতি হচ্ছে না। পিলু এতটা সহ্য করতে পারে না। সেও পড়া ফেলে তখন উঠে পড়ে এবং কুকুরের বাচ্চাটার সঙ্গে তু-তু খেলা শুরু করে দেয়। পড়া ছেড়ে ওঠার আমার কোনো অছিলাই থাকে না। মনটা ঘরবাড়ির উপর বেজায় ক্ষেপে যায়।

    মাস শেষ হতে না হতেই বাচ্চাটা সেয়ানা হয়ে গেল। অচেনা ঘ্রাণে চিৎকার করে উঠতে শিখে গেল এক সময়। গাছ থেকে পাতা পড়লে দৌড়ে যায়, কোনো শব্দ পেলে ঘেউ ঘেউ করে ওঠে। রাস্তায় লোকজন দেখলে তাড়া করে যায় মানুষকে।

    বনভূমির অভ্যন্তরে আমাদের বাড়িটার প্রায় রক্ষাকারী বাচ্চাটা। বাচ্চাটারও নিজস্ব একটা নাম হয়ে যাওয়ায় পিলু, পুনুর মতো সে সংসারে বেশ একজন হয়ে গলে। —মনা কোথায়, মনাকে খেতে দে। তোরা স্নান করতে যাচ্ছিস, মনাকে নিয়ে যা। গায়ে খুব ময়লা পড়েছে।

    আমার মা সবার সঙ্গে মনার ভাল মন্দ নিয়ে ভাবে। যা শেয়ালের উপদ্রব, কিছুতেই রাতে বাইরে রাখা নিরাপদ নয়। সে ঘরেই থাকে রাতে। আর যখন তখন এলোপাথাড়ি চিৎকার। মাঝে মাঝে ঘুম ভেঙে গেলে পিলু বিছানা থেকে নেমে কান মুচড়ে দিয়ে বলে, হয়েছে। খুব হয়েছে। এখন ঘুমোতে দে।

    আসলে বোধহয় কুকুরটার রাতে লেপের তলায় থাকা অভ্যাস ছিল বলে নিচে একা থাকতে কিছুতেই রাজি না। ক্ষোভে দুঃখে বোধহয় সারারাত ঘেউ ঘেউ করত। তারপর একা থাকা অভ্যাস হয়ে গেলে আর কুঁই কুঁই করত না। সত্যিকারের ঘ্রাণ টানে সে যখন ভাল মন্দ বুঝতে শিখে গেল, তখনই এই ঘরবাড়ির আসল চোরের ঘ্রাণ পেয়ে একদিন গভীর রাতে ত্রাহি চিৎকার। আমাদের ঘুম ভেঙে গেল। দরজায় সত্যি খুট খুট শব্দ করছে কে। মাও উঠে পড়েছে। লম্ফ জ্বেলে দরজার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে! আর কুকুরটা একেবারে লাফিয়ে, সত্যি বাঘা কুকুর, বাঁচলে হয়—না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না, আঁচড়ে কামড়ে ফালা ফালা করে দিতে চাইছে খলপার দরজা। বারান্দায় দাঁড়িয়ে কে কথা বলছে, কি বলছে, বোঝা যাচ্ছে না। তখন মা আমার না পেরে অত্যন্ত সরল গলায় বলছে, থাম বাপু, খুব হয়েছে। আলো হাতে মা দরজা খুলে দিলে দেখলাম, বাবা আমার ফিরে এসেছেন। হাতে কাঁধে কত সব ছোট বড় মাঝারি পোঁটলা-পুঁটলি। আর তখনই বুঝি পিলুর মনে হল, কুকুরের স্বভাব কামড়ানো। যেভাবে বাবার দিকে একবার এগোচ্ছে পিছোচ্ছে, কখন না কামড়ে দেয়। সে প্রায় সার্কাসের রিং মাস্টারের মতো কুকুরটাকে গম্ভীর গলায় বলল, এদিকে এস। আমার বাবা। বেয়াদবি করবে না।

    কে কার কথা শুনছে! কুকুরের বাচ্চাটা পিলুকে আমলই দিচ্ছে না। বাবাও খুব বিব্রত বোধ করছেন। গলায় আবার একটা গামছা বাঁধা বাবার। গামছার মধ্যে ভারি কিছু পাথরটাথর ঝুলছে গলায়। একটা বড় সাইজের মাদুলির মতো লাগছিল পুঁটলিটাকে। এক গাল দাড়ি। বাবাকে ঠিক চেনাই যাচ্ছে না। পিলুর মতো কুকুরের বাচ্চাটাকে সাহসের সঙ্গে বলতে পারছিলাম না— হ্যাঁরে আমাদের বাবা। সত্যিকারের বাবা। একা পিলু বললে কুকুরের বাচ্চাটা বিশ্বাস করবে কেন।

    পিলু ফের গম্ভীর গলায় বলল, মনা ভাল হচ্ছে না। বাবা কত দূরদেশ থেকে এসেছেন। বাবাকে বসতে দাও।

    বাবাও কুকুরটাকে দেখে ভারি ভীতবিহ্বল হয়ে পড়েছেন। এক পা এগোচ্ছেন না, পিছোচ্ছেনও না। কি বলবেন যেন ঠিক করতে পারছেন না। আর গলায় যা আছে সেটাও একটা যেন বাবার পক্ষে বাধা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

    তখন আমি বললাম, এই মনা, আমার বাবা, সত্যিকারের চোর-ছ্যাঁচোড় না। থাম বলছি।

    তবু যখন থামল না, পিলু বেজায় চটে গেল। রিং মাস্টারের মতো ঘুরে দাঁড়াল। তারপর ধাঁই করে ফুটবলের মতো সজোরে লাথি, বেশ উঁচুতে উঠে টপকে পড়ে গেল। এবং সঙ্গে সঙ্গে লেজ গুটিয়ে কুঁই কুঁই করতে করতে ঘরের কোণায় গিয়ে বসে পড়ল। বাবা বললেন, আহা মারছিস কেন, ওর কি দোষ। না বলে না করে এসেছি, চোর-ছ্যাঁচোড় তো ভাববেই।

    বাবার দিকে তাকিয়ে মা আর একটা কথাও বলতে পারছিল না। বাবার চেহারাটা সত্যি খুব খারাপ হয়ে গেছে যেন। খুব বড় অসুখ-বিসুখ থেকে উঠলে যেমন দেখায়—লণ্ঠনের আলো তুলে বিস্ময়ে তাকিয়ে আছে মা। তখন ক্ষীণ গলায় বাবা বললেন, একটা মাদুর পেতে দাও। বিছানায় বসব না। গলায় ব্রহ্মাণ্ড।

    মা ঠিক বুঝতে না পেরে অত্যন্ত বিচলিত বোধ করল কথাটাতে। বলল, তোমার কিছু হয়েছে?

    —আরে না না।

    —বড় অসুখ-টসুখ? তারপরই বুঝি মনে হয় মা’র, বাবা আর দু দন্ড দাঁড়িয়ে থাকতে পারবেন না। মাথা ঘুরে পড়ে যাবেন। তাড়াতাড়ি মাদুর পেতে বলল, বোস।

    বাবা নিস্তেজ গলায় বললেন, জল দাও। তিন দিন থেকে জল খেয়ে আছি। আজও থাকতে হবে। নিরম্বু উপবাস করতে ভরসা পেলাম না। সবই তাঁর ইচ্ছে। এবং গলায় এত বড় পুঁটলিটা নিয়ে বাবার কতটুকু অস্বস্তি হচ্ছিল জানি না, কিন্তু আমাদের কেমন হাঁসফাঁস লাগছিল। বললাম, বাবা ওটা খুলে ফেল। ওতে কি আছে?

    বাবা বললেন, ওতে বিশ্বব্রহ্মান্ড আছে।

    বাবার হেঁয়ালি বুঝতে না পেরে পিলু বাবার মুখের ওপর ঝুঁকে বলল, কি বললে বাবা? বিশ্বব্রহ্মান্ড!

    —হ্যাঁ, বিশ্বব্রহ্মান্ড আছে। বলছি না বিশ্বব্রহ্মান্ড— বুঝলে ধনবৌ, আর রাত জেগে কি হবে, নিচে শুয়ে থাকছি। সকালে তোমাদের কাজের অন্ত থাকবে না। লোকজন ডাকতে হবে।

    আমরা বাবার কথায় খুবই ভয় পেয়ে যাচ্ছিলাম। লোকজন ডাকতে হবে কেন। কিছু একটা তবে সকালে হচ্ছে। সেটা কি—কিন্তু বাবা একে নিস্তেজ তায় আবার গম্ভীর, গলায় গামছা ঝুলিয়ে তদুপরি বিশ্বব্রহ্মান্ড বয়ে বেড়াচ্ছেন—সুতরাং কিংকর্তব্য বিমূঢ়ের মতো আমাদের রা সরছিল না।

    মা কেমন অসহায় বালিকার মতো কেঁদে ফেলল। বলল, কি হয়েছে বলবে তো? বাবার মুখে সুমধুর হাসি ফুটে উঠল। বললেন সব। কোথায় হরকুমার জ্যাঠারা বাড়ি করেছেন, কোথায় দাদুর শিষ্যরা কে কি ভাবে বেঁচে আছেন, কে কত টাকা দিয়েছে—সব। হরকুমার জ্যাঠার কাছ থেকে বাড়ির গৃহদেবতা চেয়ে নিয়ে এসেছেন। দুটো রাধাগোবিন্দের মাঝারি সাইজের পেতলের মূর্তি, শালগ্রামশিলা – এবং ওজনে সের দশেক হবে। তেনারা গলায় ঝুলছেন একটা ছোট মাপের ঢোলের মতো। তিন দিন তিনি অনাহারী, গলায় বিশ্বব্রহ্মান্ড ঝুলিয়ে আহার করেন কি করে। কালই দেবতাদের জন্য ঠাকুরঘর উঠবে। সকালে সবাইকে তুলে নিয়ে যাবেন নদীতে। গঙ্গাস্নান করবেন। ভিজে কাপড়ে ফিরে আসতে হবে সবাইকে। দুলে-বাগদিকে ডাকতে হবে। সে ছোট মতো ঠাকুর ঘর বানাবে, ১লা বৈশাখ ঠাকুরের অভিষেক। লোকজন খাবে, চন্ডীপাঠ হবে। দু-দশজন ব্রাহ্মণ ভোজন। এতসব শুনে আমরা হাঁ হয়ে গেছি। কুকুরের বাচ্চাটাও লেজ নাড়ছে। আনন্দ প্রকাশের কোনো ভাষা আমাদের জানা নেই। শুধু নিঝুম এক অন্ধকারে এই বাড়িঘর বড় বেশি সজাগ হয়ে উঠেছে। আর আমার মনে হল আজ থেকে আকাশের ছোট একটা নক্ষত্র সারাক্ষণ রাতে বাড়িটার মাথায় পাহারায় থাকবে। বাড়িটার ভেতর কোনো দুঃখ ঢুকতে দেবে না। বাবার বিশ্বব্রহ্মান্ড একটা তালপাতার ঘরে, সত্যি ভাবা যায় না। জীবনে কত বড় সুখ কত সহজে বাবা আমাদের জন্য মাঝে মাঝে যে নিয়ে আসেন।

  • আট

    আট

    সকালে ঢাকের বাদ্যিতে বনভূমিটা জেগে গেল। ঠাকুরের নতুন ঘর উঠছে। ঠাকুর ঘরের জন্য শেষ পর্যন্ত দু বান টিন কিনে এনেছেন বাবা। এক বান টিন দিয়ে ঠাকুরের দোচালা ঘর, বাঁশের চাটাই-এর বেড়া। ছোট্ট একটা কাঠের সিংহাসনও রাজু মিস্ত্রি বানিয়ে দিয়ে গেছে।

    বাবা ফেরার পর একটা দিন আমরা দিনের বেলায় দম ফেলার ফুরসত পাচ্ছি না। মাঝে মাঝে বাবা কথাবার্তায় সাধু ভাষা প্রয়োগ করলে টের পেতাম, বসে থাকার সময় আর নেই। শুধু কাজ কাজই মানুষকে বড় করে দেয়। সুতরাং লিস্টি মিলিয়ে সওদা এল শহর থেকে। জীবনে প্রথম বাবার সঙ্গে রিক্‌শয় চড়ে সওদা করে ফিরলাম। অবশ্য এই নিয়ে একটা গন্ডগোল দেখা দিয়েছিল— রিক্‌শয় ফিরব শুনে পিলু এবং মায়া বায়না ধরেছিল, তারাও যাবে। কিছুতেই যখন বাবা নিয়ন্ত্রণ করতে পারছিলেন না, তখন কথা দিতে হল, একদিন বাবা ওদের দুজনকে নিয়ে রিক্‌শয় চড়বে। এবং যখন ফিরলাম, আমার সৌভাগ্যে পিলু ভীষণ হতাশ গলায় বলল, সে কোনো কিছুই বাড়ি অবদি বয়ে নেবে না। বড় রাস্তা থেকে বেশ দূরে বাড়িটা বড় বড় ব্যাগ, চালের বস্তা। এবং আলু, পটল, ঝিঙে, আতপ চাল, মুগের ডাল, সব মিলে একটা বেশ বড় রকমের উৎসবই বাবা যখন করছেন, তখন পিলুর এই বাঁদরামো আমার কাছে ভীষণ অসহ্য ঠেকল। ইচ্ছে হল বলি তোর ঘাড় নেবে, কিন্তু পিলুকে জানি বলেই অমন রূঢ় গলায় কিছু বলতে সাহস হল না।

    বাবা রিক্‌শ থেকে নেমেই বললেন, পিলু ধর বাবা। ব্যাগটা ধর, পিলু যখন ভাল করে চেয়ে দেখল, রিকশ ভর্তি ছোট বড় ব্যাগ, হাঁড়ি পাতিল, চালের বস্তা, তখন সে আর স্থির থাকতে পারল না। ব্যাগ নিয়ে দৌড়ল। আমিও দুটো ব্যাগ নিয়ে ফিরলাম। মায়া খবর পেয়ে ছুটে এল বড় রাস্তায়। সে হাঁড়ি পাতিল যতটা পারল নিল। বাবা বাকিটা। চালের বস্তাটা রিশওয়ালা মাথায় নিয়ে যখন এল মা তখন গাছের নিচে বাড়ির রাস্তায় দাঁড়িয়ে।

    ক’দিন ধরে বাবা পড়াশোনার কথা একদম বলছেন না। কুলদেবতাকে নিয়ে এসেছেন, এবং কত বড় ভরসা এখন তাঁর এই বাড়িতেই আছে, ছেলেরা এখন ঠাকুরের কৃপাতেই সব পার হয়ে যাবে। বাবার কথাবার্তায় বোঝা যাচ্ছিল, মাথায় তাঁর ঠাকুরের অভিষেক ভিন্ন অন্য কোনো ভাবনা নেই। ঠাকুরঘর, তেপায়া দুটো, তামার পাত্র, কোষাকুষি, পেতলের থালা দুখানা—গজ খানেক নতুন গরদ এবং লাল সিল্ক অর্থাৎ ঠাকুরের পোশাক-আশাক, তারপর শঙ্খ ঘন্টা কাঁসি, একটা জল-শঙ্খ দরকার।— বাবা সারাক্ষণ মার সঙ্গে পরামর্শ করছেন, আর কি লাগবে দ্যাখো। কিছু বাদ গেল না তো।

    মা কি বলবে! একেবারে মুহ্যমান মা। মানুষটা ঈশ্বর ভরসা করে আছে, তাঁর ঈশ্বর দুটো পয়সার মুখ দেখিয়েছেন। তিনি দিচ্ছেন। এবং মার কাছে বাবা একসময় সবই খুলে বললে, মা বলল; শেষ পর্যন্ত দেবে তো।

    —দেবে না কেন? ওরাই তো বলল, কর্তা, বাড়ির ঠাকুর, বাড়ি নিয়ে যান। আমরা তো আছি। ঈশরের সেবায় কিছু দিলে পুণ্যটা আপনার হবে না। আমাদের হবে।

    এবং বোঝা গেছিল আমার দাদুর বড় বড় শিষ্যদের বাবা ঠিক খুঁজে বের করেছেন। দেশের সব যজমান, কে কোথায় আছে খুঁজে খুঁজে বের করেছেন। কেউ বোধহয় বাদ যায়নি। তারাই বাবাকে ঠাকুরের নামে মাসোহারা পাঠাবে বলেছে। এবং সঙ্গে যে কিছু দিয়েও দিয়েছে খরচ-পত্তরের বহর দেখেই তা আমরা টের পাচ্ছিলাম। কে কে খাবে, তারও একটা লিষ্টি হয়ে গেছে। মানুকাকা আসবেন, ছেলেরা মেয়েরা আসবেন তাঁর। নিবারণ দাসের বাড়িতে সবাইকে বলা হয়েছে। শহর থেকে আসবেন দুজন পন্ডিত। বাবা এ-সব ব্যাপারে মানুকাকার পরামর্শ ছাড়া চলেন না। এবং সকালে উঠে পিলু চলে গেছে গোবর আর ষাঁড়ের চনা সংগ্রহ করতে। দুটো বড় গর্ত করা হচ্ছে উনুনের জন্য। মা ঘর, দরজা উঠোন লেপে বাড়িটাকে ঝকঝকে করে তুলেছে। পুনুও বুঝেছে বাড়িতে কিছু একটা হচ্ছে। এক্কা দোক্কা সে বেশ একা একাই খেলছিল। আর ঢাকের বাদ্যি বাজতেই মায়া পুনুকে কোলে নিয়ে ঢাকির সামনে গিয়ে দাঁড়াল। আর বেশ বাজাচ্ছিল লোকটা। ঘুরে ঘুরে আর নেচে নেচে বাজাচ্ছিল। কাঁসি বাজছিল ট্যাং ট্যাং করে। দুলে বাগদি খুব খাটছে। সে-ই প্রায় এক হাতে সামিয়ানা টাঙিয়েছে- সকালেই সব লোকজন চলে আসবে। তাদের বসার জায়গা চাই। এবং আমাদের পরিবারে এমন একটা দিন আসবে আমরা কেউ ভাবতেই পারিনি। নিবারণ দাস এলে বাবা বলেছিলেন, দাসমশাইকে বসতে দে।

    —তা হলে কর্তা সব ঠিকমতোই হয়ে যাচ্ছে।

    বাবা নতুন ধুতি পরেছেন। দুলে তামাক সেজে দিচ্ছিল। কে বলবে, আমরা এখানে এসে একটা প্ল্যাটফরমে পড়ে থেকেছি দিনের পর দিন। কি করে যে মানুষ তার বাড়িঘর ঠিক এক সময় বানিয়ে ফেলে। বাবার হয়ে আজ নিবারণ দাস সব দেখাশোনা করবে। কারণ বাবা তো সারাটা দিন ঠাকুরঘরেই থাকবেন। এবং নিবারণ দাস বেশ নিজের বাড়ির লোকের মতো বলল, কর্তা মা, উনুনে কটা কাঠ ফেলে দিই। আগুন ধরিয়ে দিই। কাকিমা এলে মা বঁটি দিয়ে বলল, বসে যা নেরু। পটলের ঝুড়ি এগিয়ে দিল মা। নিবারণ দাসের লোক গেছে বাজারে। সে পছন্দমতো মাছ কিনে আনবে বলেছে।

    এক একজন আসছে আর আমি পিলু মায়া হৈ-চৈ করে খবর দিচ্ছি বাড়িতে। মা আরতিদিরা আসছে, মা সুজয়দারা আসছে। যাদের চিনি না, বাবাকে বলছি ঠাকুরঘরে গলা বাড়িয়ে—বাবা কে এসেছেন দ্যাখো। এবং বেশ বোঝা গেল বাবা এখানে আসার পর পরিচিত ব্যক্তি বলতে আর কাউকে বাদ রাখেননি। যেখানে যার সঙ্গে দু দন্ড কথা হয়েছে, পরিচয় হয়েছে, সুখ-দুঃখের দুটো কথা হয়েছে তারা সবাই আজ আমাদের উৎসবে আমন্ত্রিত।

    দুপুরের মধ্যেই বাড়িটা লোকজনে ভরে গেল। দুলে রাশি রাশি কলাপাতা কেটে রেখেছে। পিলু মায়া কলাপাতার মুখোস পরে সবাইকে ভয় দেখাচ্ছে। কাকপক্ষিদেরও যেন জানতে বাকি নেই। সবাই টের পেয়ে গেছে আজ আমার বাবা তাঁর কুলদেবতার অভিষেক করছেন। সারা রাস্তায় রেলগাড়িতে ঠাকুর গলায় ঝুলেছে… বাছ-বিচার কিছু ছিল না, শোধন করে নিচ্ছেন সে-জন্য।

    নিবারণ দাসের বড় মেয়ে আরতি এসে বলল, সাধন মামা আসছে। বড় ঝুড়িতে বিরাট একটা রুই মাছ। সবাই রাস্তায় ছুটে গেছি। মাছটা নামালে আমরা ঘিরে বসলাম। পিলু খুঁটে দুটো আঁশও তুলে ফেলল। সাধনদা নিবারণ দাসের শ্যালক। সে বড় বঁটি নিয়ে এল। মাছ কাটা দেখার জন্য আমাদের উৎসাহের শেষ ছিল না। বড় গামলা কেউ টেনে আনছে। কেউ ড্রামে জল ভর্তি করছে। রান্না হচ্ছে দুটো বড় উনুনে। মুগের ডাল, তিতের ডাল, বেগুন ভাজা, শাক হয়ে গেলে সব মা আর কাকিমা ঘরে নিয়ে সাজিয়ে রাখছে। তখনই পিলু বলল, মা নবমীর জন্য দুটো ভাত নিয়ে যাব? সবাই খাবে, এই বনভূমির কাক পক্ষীরাও যখন বাদ যাচ্ছে না, তখন নবমী খাবে না সে হয় না। পিলু বোধহয় সেই ভেবে কথাটা বলেছে।

    অন্যদিন হলে নিজেই দেওয়া যাবে কি যাবে না মা সাফ বলে দিতে পারত। সংসারে আমার মা’র ওপর আর কারো কোনো কথা নেই, কিন্তু মা কেন জানি আজ বড় বেশি বাবার অনুগত। বলল, তোর বাবাকে বলে দেখ, কি বলে।

    পিলু ঠাকুরঘরের দরজায় এসে বলল, বাবা নবমী কতদিন কিছু খায় নি। দুটো ভাত দিয়ে আসব? বাবা তখন গদগদ চিত্তে ঠাকুরের দিকে তাকিয়েছিলেন। কেমন বাহ্যজ্ঞানশূন্য মানুষ। পিলুর মনে হল বাবা ইচ্ছে করেই তার কথা শুনছেন না। এবং এ-সব সময়ে পিলুর যা হয়, মেজাজ চড়ে যায়, সে হেঁকে ডাকল, বাবা!

    বাবা ঘাড় ফিরিয়ে পিলুকে দেখল।

    —নবমীকে দুটো খেতে দেব?

    বাবা বললেন, নবমী!

    —ইটের ভাটার ওদিকটায় একটা বুড়ি থাকে না!

    —দাও। যখন ইচ্ছে হয়েছে দেবে বৈ কি। সংসারে সবাই খাবে নবমী খাবে না সে কি করে হয়!

    আশ্চর্য এক সুঘ্রাণ। ফল, বাতাসা, ধুপ দীপের গন্ধে বাড়িটা ভরে আছে। সকালে মা বাড়ির আঙিনায়, ঠাকুরঘরের মেঝেতে আলপনা এঁকে দিয়েছিল। মানুষজনের হাঁটাহাটিতে সব মুছে যাচ্ছে। ঠাকুরঘরে পূজা-আর্চা চলছে সেই কখন থেকে, ঢাকের বাদ্য বাজছে সেই কখন থেকে। বাবা কাপড়ের খুঁট থেকে এটা ওটা আনার জন্য মাকে টাকা পয়সা বের করে দিচ্ছিলেন কখনো। সাধন এবং মানুকাকা এবং আর যারা যারা এসেছে সবাই প্রণিপাত হচ্ছে, ধুলোয় গড়াগড়ি দিচ্ছে। নিবারণ দাস কিছুক্ষণ ঠাকুরঘরের বাইরে থম মেরে বসেছিল। দেব-দেবীর মুখ দেখতে দেখতে কখনও মা মা বলে চিৎকার দিয়ে উঠছিল। কেউ কেউ বাবার বাড়িটা ঘুরে ফিরে দেখছে। আশ্রমের মতো মনে হচ্ছে, একটা আগাছা নেই, জমি উঁচু নিচু নেই—দুটো চারটা ফলের গাছ মাথা বাড়িয়ে দিয়েছে আকাশে।

    কুকুরটা আরও বড় হয়েছে। মানুষজন দেখে প্রথমে ক্ষেপে গিয়েছিল, পরে বোধহয় বুঝতে পেরেছে ওরা বাড়িরই লোক, কিছু আর বলছে না। লেজ নাড়ছে আর পায়ে পায়ে ঘুরঘুর করছে। মাঝে মাঝে পিলুর খবরদারি, ওদিকে যাবে না। এদিকে এস। ওখানে রান্না হচ্ছে। কথা না শুনলে বেঁধে রাখবে ভয় দেখাচ্ছে।

    এত সবের মধ্যে সবই হয়ে যাচ্ছিল। সামিয়ানার নিচে শতরঞ্চ পাতা। বাবা সবাইকে ঠাকুরঘর থেকেই বসতে বলছেন। বিকেল হলেই খেতে বসবে সবাই। দূর দূর থেকে যারা এসেছে সন্ধ্যার মধ্যেই রওনা হয়ে যাবে। দুটো প্যাট্রোম্যাক্স আনিয়ে রেখেছে নিবারণ দাস। বড় আপনজনের মতো সে কোনো কিছুর ত্রুটি রাখছে না।

    এবং নিবারণ দাসই বলল, কর্তা, পূজো শেষ হতে আর কত দেরি?

    বাবা বললেন, এর শেষ নেই দাসমশাই। যতদিন আছি ততদিন শুধু তাঁর সেবা করে যেতে হবে।

    ধার্মিক মানুষের কথাবার্তা শুনতে আমার খুব ভাল লাগে না। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বাবা এবং অন্য সকলের কথাবার্তা শুনে বুঝতে পারতাম, জীবনে সব কিছু বলতে আমার বাবা এর চেয়ে বেশি কিছু বোঝেন না। বাবা এতদিন একটা ছিন্নমূল, ছন্নছাড়া মানুষ ছিলেন। এই বাড়িঘর এবং দেব- দেবীর প্রতিষ্ঠা করে বাবা ফের তার শেকড়-বাকড় মাটিতে ছড়িয়ে দিতে দিতে কখন দেখি বাবার মুখে ভারি প্রসন্নতা বিরাজ করছে। বাবার এমন সুন্দর মুখ কখনও আর এর আগে দেখিনি। অকারণে আমার চোখ দুটো জলে ভার হয়ে এল। বাবার মুখ দেখে এই প্রথম বুঝি টের পেলাম জীবন কত বড়।

  • নয়

    নয়

    বাড়িতে ঠাকুরের অভিষেক হয়ে যাবার পর গাছপালা বনের মধ্যে আমাদের অনেকটা ভয় কেটে গেল। কাছে পিঠে নতুন আবাস এখনও তেমন গড়ে ওঠেনি। তেমনি মাঠ পার হলে পুলিসের ব্যারাক, কালীর দীঘি, বাদশাহী সড়ক— কেবল সেই চৌমাথায় নিমতলার কাছে নিবারণ দাসের বাড়ি এবং তার আশেপাশে আরও সব বাড়ি উঠছে। নতুন কলোনির পত্তন হচ্ছে। সাপ-খোপের উপদ্রব তেমন একটা কমেনি। বৈশাখ শেষ না হতেই জ্যৈষ্ঠ। খরা। ঝাঁ-ঝাঁ রোদ্দুর, মাঠ-ঘাট ঘাস সব হেজে গেছে। মাটি ফেটে চৌচির। মনে হত দুপুরটা এক গনগনে আঁচের আগুনের কুন্ড। এরই মধ্যে পিলু কোথা থেকে কোঁচড় ভর্তি করে আম সংগ্রহ করে আনত। ঝড়-বৃষ্টি রোদ্দুর সবই সে সহজে সহ্য করতে পারে।

    এখন এই বাড়িতে আমার বাবার সাধ বলতে আর কিছু ফল টলের গাছ লাগানো। পাঁচ বিঘে জমির সবটা এখনও সাফ হয়নি। উত্তরের দিকে একটা বড় জঙ্গল রয়েই গেছে। বছরের ওপর হল আমাদের এই নতুন আবাস। এখন আর এ জায়গাটাকে মনেই হয় না অচেনা-অজানা, ভুতুড়ে সাপখোপ অথবা শেয়াল-খাটাশের একমাত্র আস্তানা। ঠাকুরঘরটা হয়ে যাবার পর বাবা একদিন দুটো জবা ফুলের ডাল নিয়ে এলেন। তিনি গেছিলেন বেলডাঙার কাছে বহুলা গাঁয়ে। নিবারণ দাসের বড় শ্যালকের বিয়ে। বিয়ের কাজ সেরে ফেরার সময় দুটো জবা ফুলের ডাল সঙ্গে এনেছেন। বিয়ে দিয়ে পেয়েছেন প্রণামীর টাকা আর একটা পুরোহিত বরণ। কিছু চাল-ডাল। অন্য সময় বাবা যখন এ-ভাবে ফিরে আসেন তখন উপার্জনের নিমিত্ত কতদূর যেতে হয়, এমন সব সাধুবাক্য সংকল্পের মতো পাঠ করেই থাকেন। এবারে অন্য রকম। সব কোনো রকমে নামিয়ে রেখে হাঁকতে থাকলেন—ও ধনবৌ, তোমার সুপুত্ররা সব কোথায়? কাউকে দেখছি না। বাবা ফিরেছেন বিকেলে, তখন কী আর বাড়ি থাকা যায়। এবং বাড়ির পাশে কোথাও কোনো বাড়ি ছিল না বলে, শুধু বন-জঙ্গল ছিল বলে, বনের গাছপালা, লতাপাতা, সরু পথ, বুনো ফলের সন্ধান অথবা কোথায় গভীর বনে লিচু গাছ আবিষ্কার করা যায় সেই নেশায় বিকেল হলেই আমি পিলু কখনও মায়া সঙ্গে থাকত— বের হয়ে পড়তাম, কারণ আমরা কয়েক বারই এমন কিছু আবিষ্কার করেছি এই বড় বনটাতে যাতে বাবা পর্যন্ত স্তম্ভিত হয়ে গেছেন। এবং আমাদের কাছে বাবাকে স্তম্ভিত করার আনন্দ ছিল পৃথিবী জয় করার মতো। বাবা দু’দিন বাড়ি নেই, বাবা ফিরে এলে তাঁকে নতুন কোনো খবর দিতে পারব না, সেটা কেমন আমাদের কাছে খারাপ লাগত। এটা লিচুর সময়। আম, কাঁঠাল, লিচু, গোলাপজাম, জাম, জামরুল সবই এ সময়টাতে হয়। কাঁঠাল গাছ এবং দুটো আনারসের গাছ প্রথম আবিষ্কার করেছিল পিলু। আমি একবার একটা সরু পথ ধরে যাবার সময় প্রথম একটা আম গাছ তারপর আরও বনের গভীরে ঢুকে গেলে বুঝলাম, ওটা আমেরই বাগান, তারপর পিলু খবর নিয়ে এল বনটায় একটা বাতাবী লেবুর গাছও আছে, তখন আমি আর কি আবিষ্কার করব—একটা বাঁশ বাগানের মধ্যে যে ছোট্ট ঢিবি ছিল, সেখানে একটা কচ্ছপ আবিষ্কার করে এসে বাবাকে খবরটা দিলাম। বাবা বাড়ি না থাকলে যথার্থ স্বাধীন, খাও-দাও ঘুরে বেড়াও। তারপর মায়া আমি কখনও কোনো গভীর বনের মধ্যে ঢুকে নিরিবিলি গিমা শাক খুঁজে বেড়াই। বাবা আমার খুব গিমা শাক খেতে ভালবাসেন।

    এ-হেন দিনে বাবা বাড়ি ফিরে স্বাভাবিকভাবেই অমাদের তাঁর স্বগৃহে উপস্থিত থাকতে না দেখে খুব ক্ষেপে গেলেন। মাকে বোধহয় দুটো মন্দ কথাও বলে ফেললেন। আগের মতো আর তো মা’র প্রতি বাবার শংকাভাবটা নেই। নানা জায়গায় ঘুরে বাবা তাঁর খেরো খাতার লিস্টি মিলিয়ে সব যজমান এবং শিষ্যদের পুরো একটা তালিকা রচনা করে ফেলেছেন। এ দেশে আসার পর এতদিন লিস্টি ঠিক করতেই চলে গেছে।

    এখন আমাদের অবস্থা যেন ফিরে গেছে, মা’র এবং বাবার আচরণে এটাই মনে হত। এবং অবস্থা ফিরে যাওয়ার মূলে বাবা, তিনি তাঁর গাছের শেকড়-বাকড় সত্যি মাটিতে এবার পুঁতে দিতে পেরেছেন। বনের শাক, কচু লতাপাতার ওপর আর যেহেতু সংসারটা নির্ভরশীল নয়, তখন তাঁর ছেলেমেয়েরা যখন-তখন বাড়ি থেকে বের হয়ে যাবে, বনবাদাড়ে ঘুরে বেড়াবে, এটা তিনি আর সহ্য করতে পারছেন না। বাবা জবা ফুলের ডাল দুটো নিয়ে সমস্যায় পড়েছেন। ঠাকুরঘরের পাশে লাগাবেন, না একটি সুন্দর ফুলের বাগান তৈরি করবেন, ফুলের বাগান তৈরি করতে হলে এলোমেলোভাবে লাগালে চলবে না। ক’হাত বাই ক’হাত বাগানটা হবে, রাস্তা থেকে কিভাবে বাগানের সবটা দেখা যাবে এ-সব ভাবনায় পীড়িত হচ্ছিলেন। তাছাড়া যার ওপর ভরসা করে সব তিনি লাগাবেন, সেই মেজ পুত্রটি এখন বাড়ি নেই। মেজ পুত্রটি তাঁর তো পুত্র নয় সাক্ষাৎ দেবতা। পছন্দমতো জায়গায় গাছ লাগানো ঠিক না হলে তিনি সেটি তুলে তাঁর পছন্দমতো জায়গায় লাগাবেন। তাতে গাছ বাঁচুক-মরুক কিছুই আসে যায় না। আর কাজটি এমন নিখুঁত সতর্কতার সঙ্গে করা হবে যে বাড়ির কাক-পক্ষিটি পর্যন্ত টের পাবে না। এভাবে দামী দামী কটা গাছের চারাই তিনি বিনষ্ট করেছেন। সুতরাং বাবার সমস্যার শেষ নেই। তিনি তাঁর স্ত্রী সুপ্রভা দেবীকে খুব মোলায়েম গলায় বললেন, আপনার মেজ পুত্রটির কি এখন আসার সময় হয়েছে?

    মা বুঝতে পারে বাবা তাঁর সন্তান-সন্ততিদের বাড়ি ফিরে না দেখতে পেয়ে খুব রেগে গেছেন। আজকাল যজমান এবং শিষ্যরা মাসান্তে ঠাকুরের নামে দু-পাঁচ-দশ টাকা মনিঅর্ডার করে থাকে। অন্যান্যবার এসেই প্রথম বাবা সাধারণত বারান্দায় বসে হুঁকো সাজতে না সাজতেই বেশ মধুর স্বরে বলতেন, ও ধনবৌ, টাকা-পয়সা কিছু এল? সাধারণত কিছু এসেই থাকে। দু টাকা পাঁচ টাকা মাঝে মাঝেই এসে থাকে। তাতে খুব একটা সমারোহে সংসার চলে যায় না—কোনো রকমে ডালভাতের সংস্থান হতে পারে—এই ডালভাতের সংস্থান করতে পারাটা একটা উদ্বাস্তু পরিবারের পক্ষে কত কৃতিত্বের ব্যাপার সেটা বাবার হুঁকো খাওয়ার সময় মুখ না দেখলে বিশ্বাস করা যেত না। এবারে তিনি হুকোটি পর্যন্ত ছুঁলেন না। মা নিজেই হুঁকো সেজে বাবার সামনে এনে দিয়ে বলল, কোথাও গ্যাছে, আসবে। বাবার মাথা ঠাণ্ডা করার এর চেয়ে মোক্ষম দাওয়াই আর কি থাকতে পারে! এতদূর থেকে এসে স্ত্রীর এমন আপ্যায়নে বিগলিত হয়ে গেলেন। বললেন, গেছে কোথায়?

    —কোথায় যাবে আবার। পিলু বোধহয় ব্যারেকে গেছে। মায়া বিলুকে বলেছি, তোর বাবা ফিরবে, দেখা দুটো গিমা শাক পাস কি না। এখন বর্ষা পড়েছে, কোথাও গজাতে পারে। তুমি তো গিমা শাক খেতে খুব ভালবাস। গাছে দুটো বেগুন হয়েছে। বেগুন দিয়ে রাতে গিমা শাক করব ভেবেছি।

    এ-সবই হয়ে থাকে সংসারে এখন। সামান্য চাল ডাল নুন তেল থাকলে আর কোনো উচ্চাশার কথা ভাবা হয় না। বাবা জবা ফুলগাছটা লাগাবার ঠিক আগেই আমরা পৌঁছে গেলাম। আমি আর মায়া। আমাদের কোঁচড় ভর্তি গিমা শাক। বাবা দেখে তো বেজায় খুশী। বললেন, জবা ফুলের ডাল দুটো কোথায় লাগাবি? যেন আমি যেখানে পছন্দ করব সেখানেই লাগানো হবে। বাবা তাঁর নতুন আবাসটির কোথাও আর কোনো ত্রুটি রাখতে চাইছেন না। এই সুমার বন-বাদাড়ে পূজার ফুলের খুবই অভাব। বিশেষ করে শ্বেত জবা রক্ত জবা এই দুটো ফুল পূজার অপরিহার্য অঙ্গ। পুজায় বসে বাবা সে সব ফুল পাবেন কোথায়? বাগদি পাড়ার কাছে একটা করবী ফুলের গাছ শেষ পর্যন্ত কিছুটা বাবাকে স্বস্তি দিয়েছে। পুলিস ব্যারাকে ফুলের গাছ বলতে ম্যাগনলিয়া, গোলাপ, বোগেনভেলিয়া। এমন সব ফুল যা একটাও পূজায় লাগে না। সেজন্য বাবা রোজ সকালে স্নান করার সময় ল্যাংড়ি বিবির হাতা থেকে দুটো একটা পদ্ম তুলে আনেন। ভবিষ্যতে যাতে পূজায় ফুলের অভাব না হয়, স্থলপদ্ম গাছ, শিউলি ফুলের গাছ এবং কিছু দোপাটি ফুলের চারা ইতিমধ্যেই লাগিয়ে ফেলেছেন। আর বাবা বাড়ি না থাকলে পূজার ভার আমার ওপর। পঞ্চদেবতার পূজা, গনেশের পূজা, লক্ষ্মীর ধ্যান, এই সব মন্ত্র একটা খাতায় লেখা থাকে। আমি দেখে দেখে মন্ত্র আওড়াই আর ‘এষ দীপায় নম, এষ ধুপায় নম’ করি। তখনই সংসারে পিলু সব চেয়ে বেশি খাপ্পা হয়ে যায় আমার ওপর। যেহেতু আমাদের খুব শৈশবে পৈতা হয়েছে—পিলুর ধারণা পূজা করার এক্তিয়ার তারও আছে। কিন্তু বাবা বাড়ি থেকে যাবার আগে পূজার ভার যেমন আমার ওপর অর্পণ করেন, তেমনি বাড়িঘর দেখাশোনার ভার পিলুর ওপর অর্পণ করে যান। এতে পিলু বাবার ওপর রুষ্ট হয়ে ওঠে। কিন্তু মুশকিল পিলু সকাল হলেই পেট ভরে খেতে চাইবে। পিলুর পুজো করার কথা থাকলে সে না খেয়ে পূজোয় বসবে না, আসলে অত বেলা পর্যন্ত আজকাল আর না খেয়ে একেবারেই সে থাকতে পারে না। আর ওর ঈশ্বরে বিশ্বাসও খুব একটা প্রবল নয়। যদিও ঈশ্বরের প্রতি ভূতের ভয়ের মতো একটা ভয় তার সব সময়ই আছে।

    বাবা বললেন, আমার মেজ পুত্রটি না এলে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া যাচ্ছে না। এবং এক সময় মেজ পুত্রটি এক বোঝা কাঠ মাথা থেকে নামিয়েই বাবার কাছে ছুটে এল। পিলু কাছে এলে হুকোটি ওর হাতে দিয়ে বললেন, এখন অনেক কাজ। পিলু হুঁকোটি যথাস্থানে রেখে এলে বাবা বললেন, দুটো জবা ফুলের ডাল এনেছি। একটা শ্বেত জবা, একটা রক্ত জবার। কোথায় লাগাবি?

    পিলু এত বড় গুরুদায়িত্বের কথা ভেবে প্রথমে সামান্য হকচকিয়ে গেল। বাবা গাছটাছ তাঁর মর্জি মতোই লাগান। তারপর দ্বিতীয়বার আবার সেই গাছটাছ পিলুর মর্জি মতো লাগানো হয়। কোনোটা বাঁচে কোনোটা মরে। কিন্তু জবা ফুলের ডাল দুটিকে দু’বার দুজনের মর্জিমতো লাগালে ধকল সইতে পারবে না। এবং এমন মহার্ঘ ডাল দুটোকে অবধারিত মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচাবার জন্য বাবা বাধ্য হয়ে তাঁর দ্বিতীয় পুত্রের শরণাপন্ন হলেন।

    বাবার দ্বিতীয় অথবা মেজ পুত্রটি পেছনে দু’হাত রেখে প্রথমে ঠাকুরঘরের চারপাশটা ঘুরে দেখল। যেসব গাছটাছ আছে, যেমন একটা স্থলপদ্মের গাছ, পাশে দুটো গোলাপের গাছ, টগর এবং জুঁই ফুলের গাছ, তার পাশে সুন্দর মতো একটা করবীর চারা বেশ সতেজ ডাল মেলে দিয়েছে, পিলুর জায়গাটি কেন জানি লাল জবাফুলটির জন্য পছন্দ হয়ে গেল। সে উঠোনে গিয়ে বলল, বাবা দাও, লাগাচ্ছি।

    ওই লাগাক, ওর মর্জিমতো কাজটা হলেই শেষ পর্যন্ত গাছটা বাঁচবে ভেবে বাবা বললেন, কোথায় লাগাবি ঠিক করেছিস?

    —করবী গাছটার পাশে।

    মেজ পুত্রটি এমনিতে তাঁর বেশ বুদ্ধিমান। কিন্তু জায়গা নির্বাচনের কাজটি যে ঠিক হয়নি এবং সোজাসুজি ঠিক হয়নি বললেও মেজ পুত্রটির শেষমেষ যদি নিজের জেদ বজায় রাখার নিমিত্ত আবার দু’বারের ঠেলা সামলাতে হয় গাছটাকে তবেই গেছে। তিনি ডালটি এবং একটা খুরপি নিয়ে ওর সঙ্গে এলেন। বললেন, সত্যি জায়গাটা খুব ভাল। গরু-ছাগলে খেতে পারবে না। কিন্তু করবী গাছটা বড় হয়ে গেলে তোর জবার ডালটা আলো-বাতাস একেবারেই পাবে না।

    এমন একটা সাধারণ সত্য-জ্ঞানের অভাব ভেবে পিলু কেমন বাবার ওপরই কাজের ভারটা ছেড়ে দিল। তারপর আমাকে, মাকে ডাকল। আমরা প্রায় বাড়ির সবাই, এমন কি কুকুরটা পর্যন্ত যতক্ষণ ডাল দুটো লাগানো না হল দাঁড়িয়ে থাকলাম। এবং বাবা এবারে যেন নিশ্চিন্ত মনে বললেন, যাক ধনবৌ, তোমার লাল জবা, শ্বেত জবাও হয়ে গেল।

    আসলে বাবা আমার তাঁর সেই দেশ বাড়ির কথা বুঝি এতদিনেও এক বিন্দু ভুলতে পরেননি। বাড়িটার জন্য বাবা কী যে না করছেন। ফলের গাছের একটা লিষ্টিও বাবা এক রাতে বসে কুপির আলোতে বানিয়ে ফেললেন। মানুষের ঘরবাড়ি করতে যা যা লাগে তার কোনো ত্রুটি থাকুক বাবা সেটা একদম পছন্দ করতেন না।

    মা একদিন বাবার এত উৎসাহের মধ্যেই বলে ফেলল, সবই হচ্ছে, খুঁজে পেতে সব শিষ্য যজমানদের ঠিকানা নিয়েছ, সব খেরো খাতায় লিখে রেখেছ, ছেলে ক’টাও বড় হচ্ছে। শুধু তোমার ঘর-বাড়ি বানালেই চলবে, বিলু পরীক্ষাটা দেবে না? পিলুকে শহরের স্কুলে দেবে না? মায়া বাড়িতেই পড়তে পারে। ছোটটার না হয় বয়স হয়নি…।

    বাবা নিশ্চিন্ত মনে বললেন, ও হয়ে যাবে। মানুষের বাড়িঘর হয়ে গেলে সব হয়ে যায়। তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, বাক্স থেকে বইগুলো বার কর। বসে থাকলে তো পেট ভরবে না।

    বাবা তাঁর পছন্দমতো কাজ না হলে নির্বিঘ্নে সব ভুলে যেতে ভালবাসেন। তিনি বই বাক্স থেকে কবেই বের করে দিয়েছেন। যখন দু-চার দিনের মতো খাবার মজুত ঘরে থাকত, তখন আমাদের পড়ার কথাটা বাবার মনে পড়ত। প্রায় সকালেই উঠে বাবা হুড়োহুড়ি লাগিয়ে দিতেন। নিজেই মাদুর পেতে বলতেন, পড়তে বোস। বইটই নিয়ে এস, দেখি কে কতটা এগোলে। মাসাধিককাল পর পর তিন-চার দিনের বাবার এই প্রচেষ্টা সম্পর্কে আমরা খুবই ওয়াকিবহাল ছিলাম। আমরাও তখন উচ্চস্বরে পড়তাম। সবচেয়ে উচ্চস্বরে পড়ত তাঁর মেজ পুত্রটি। সে রাজ্যবর্ধনের বোন রাজশ্রীর সেই আগুনে ঝাঁপ দেবার মুখের দৃশ্যটি খুব মনোযোগসহকারে পড়ত। গ্রহবর্মা মালবরাজ দেবগুপ্ত আর বাংলার রাজা শশাঙ্কের মিলিত সৈন্যবাহিনীর কাছে পরাজয়ের পাতাগুলিও সে পড়ত গলা ফাটিয়ে। আর মাঝেমাঝে নিজের বোন মায়া দেবীকে কিল চড় ঘুষি বাবার অলক্ষ্যে যখন যেটা সুবিধা ব্যবহার করে চলত।

    আমাদের এই তিনজন পড়ুয়ার মধ্যে মধ্যমণি হয়ে বসে থাকতেন বাবা। বাবার কোলে যিনি থাকতেন, তার প্রতাপ সবার চেয়ে বেশি। সে খুশিমতো যার তার বই টেনে নিত, চিবুত, কখনও কোনো বই-এর পাতা ছিঁড়ে ফেলত। তার সব অধিকার ছিল। বাবা মাঝে মাঝে তার ছোট পুত্রটির কান্ডকারখানায় বিব্রত হয়ে বলতেন, আহা কী করলি। দিলি তো ছিঁড়ে। ধমক দিলেই ছোট ভাইটির ভারী বদ অভ্যাস ছিল। নির্ঘাত সে বাবার কোলে পেচ্ছাব করে দেবে। বাবাও সেই ভয়ে খুব জোরে কিছু বলতে সাহস পেতেন না। কোল থেকে তুলেও দিতেন না। কারণ মা’র তো সকাল থেকে কাজের অন্ত থাকে না। মাকে গিয়ে জ্বালাতন করবে ভয়েই বাবা সব উপদ্রব সরল মানুষের মতো সহ্য করে যেতেন। ছোট সন্তানকে তাঁর শাসন করার কোনো অধিকারই মা বাবাকে দেয়নি। এছাড়া এ-সব ব্যাপারে বাবার ভীষণ আপেক্ষিক তত্ত্বে বিশ্বাস ছিল।

    আমি প্রথমে কিছু ইংরেজি কবিতা পড়লাম। কবিতাগুলি ক’দিন পড়লে বেশ মুখস্থ হয়ে যায়, না পড়লে আবার সহজেই ভুলেও যাওয়া যায়। বাবার সামনে কখনই বাংলা সংস্কৃত পড়ি না। কারণ বাংলা এবং সংস্কৃত পড়লেই তাঁর অধীত বিদ্যার মধ্যে পড়ে যায়। তিনি তখন এমন সব অদ্ভুত প্রশ্ন করতে থাকেন যে, আমার আসল পড়াটাই আর হয়ে ওঠে না। অর্থাৎ বাবা আমার সংস্কৃতে এবং বাংলাভাষায়, এমন কী ইতিহাস, ভূগোল, স্বাস্থ্য সম্পর্কে তাঁর জ্ঞানের বহর বোঝাতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত সকালটা কীভাবে যে নষ্ট করে দেন! তাঁর মেজ পুত্রটি বাবার এই দুর্বলতা বিলক্ষণ টের পায় বলেই প্রথমে ইতিহাস ধরেছে। বাবা একটা কথাও বলেননি। তারপর বাংলা–বাবা তেমনি চোখ বুজে শুনে যাচ্ছেন। উচ্চারণে ত্রুটি ঘটলে কেবল সেটা ধরিয়ে দিচ্ছেন। বাবা কিছুদিন আগে তাঁর জ্ঞানের বহর বোঝাতে গিয়ে যে শেষ পর্যন্ত একবিন্দু আমাদের কারো পড়া হয়নি, মা সেটা ধরিয়ে দিতেই মৌনীবাবা সেজে এখন ছেলে কোলে নিয়ে প্রায় মহাদেবের মতো বসে আছেন।

    আর সেই বাবা সহসা বলে উঠলেন, ওরে বিলু অঙ্ক করছিস না কেন?

    বললাম বইটার হাফ নেই বাবা।

    —জ্যামিতি?

    —ওটা আনতে হবে।

    বাবা তারপর মোটামুটি হিসাব নিয়ে বুঝতে পারলেন, আমার বই-এর সংখ্যা যথার্থই কম। এবং বাবা যেন এটা আজই জানলেন, তেমনভাবে বললেন, তবে শহরে চল, মানুকে বলে-কয়ে কিছু পুরনো বইটই পাওয়া যায় কিনা দেখি। কি কি নেই একটা লিষ্টি করে ফেল।

    এই লিষ্টি আজ নিয়ে মোট পাঁচবার করা হল। কে. পি. বসুর অ্যালজাব্রা আছে। তবে সবটা নেই। জ্যামিতির হাফ আছে। কারণ দু’বছরের টানা হ্যাঁচড়া। এবং আমার আর কখনও পড়াশোনা হবে ভাবিনি। যতই বাবা বলুন, বাড়িঘর হয়ে যাক তখন দেখা যাবে। কখনও প্ল্যাটফরমে, কখনও পোড়ো বাড়িতে থাকতে থাকতে ভাবতেই পারিনি, এ দেশে এসে কখনও আমাদের শেষ পর্যন্ত বাড়িঘর হবে। সুতরাং বেশ নিশ্চিন্তই ছিলাম। কিন্তু বাড়িঘর হয়ে যাওয়ার পর পরীক্ষাটা না দিলে যেমন বাবার সম্মান থাকে না, তেমনি এই বাড়িঘর বানানোর কোনো অর্থ হয় না।

    বিকেলেই বাবা শহরে মানুকাকার কাছে নিয়ে গেলেন। রাস্তায় বললেন, কাকাকে বলো তোমার কী কী বই নেই। যখন পুরো লিষ্টি দিলাম, তখন সেই কাকাটি হতবাক। বললেন, কি করে পরীক্ষা দিবি? চার মাসও তো বাকি নেই। কলেজিয়েট স্কুলের হেড মাস্টারমশাই কাকার বন্ধু লোক। কাকা আবার আমাকে তাঁর কাছে নিয়ে গেলেন। তিনি একটি চিরকুট লিখে তাঁর এক শিক্ষকের কাছে পাঠালেন। তিনি তাঁর দুই ছাত্রের ঠিকানা দিলেন। ওদের বাড়তি বই-টই যদি থাকে। ওরা পাঠালো খেলোয়াড় বিনয় দাসের কাছে। সে এবারে পরীক্ষা দিচ্ছে না। তার বইগুলি যদি পাওয়া যায়। কিছু পাওয়া গেল, কিছু পাওয়া গেল না। বইগুলি যে নেই বলল না। বললে, বিনয় দাসের বাবা মুদিখানার মালিক তাকে আর আস্ত রাখত না। যাই হোক এই করে যখন কিছু বই নিয়ে শেষ পর্যন্ত অনেক রাতে বাড়ি ফিরলাম, মা আমার খুবই আশ্বস্ত হলেন। যে মা, কখনও জানেই না, কোন্ বই-এর কি নাম সেও লণ্ঠন জ্বেলে উবু হয়ে বসল। সব বই দেখে বলল, এর তো দেখি ভেতরে সব পাতা কাটা রে। কেমন সুন্দর করে কেটেছে দেখ।

    বাবা বললেন, সত্যি তো!

    আমি বললাম, বাবা বিনয় দাস চারবার চেষ্টা করে পারেনি। বোধহয় সেজন্য মা সরস্বতী রাগ করে সব ভাল ভাল জায়গাগুলি বই থেকে চুরি করে নিয়েছেন।

    বাবা বললেন, তবু তো বই। এই বা কে দেয়। মন দিয়ে পড়লে ওতেই পাস করে যাবে।

    বাবা বলতে কথা। বাবার কথা ফেলা যায় না। তখন সেই বই সম্বল করেই আমার পড়াশোনা আরম্ভ হয়ে গেল। প্রাইভেট পরীক্ষার্থী আমি। বাবা এক ফাঁকে নিবারণ দাসের আড়তেও চলে গেলেন। বলে এলেন, দাসমশাই বড় ছেলে আমার এবার ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিচ্ছে। শুধু নিবারণ দাস কেন, যার সঙ্গেই দেখা হত একথা সেকথার ফাঁকে বাবা বলতেন, বড়টা এবার প্রবেশিকা পরীক্ষা দেবে। বাবার কাছে প্রবেশিকা পরীক্ষা দেওয়ার বিষয়টা বড়ই গৌরবের ব্যাপার হয়ে দাঁড়াল শেষ পর্যন্ত। ম্যাট্রিক পরীক্ষার চেয়ে প্রবেশিকা পরীক্ষাটা আরও যেন গম্ভীর শোনায়। বাবা সব সময় খুব জরুরী কথাবার্তায় খুব সাধুভাষা ব্যবহারের পক্ষপাতী। এবং এভাবেই এই বাড়িতে শীতকালও এসে গেল। এখন পিলু পর্যন্ত আমাকে সমীহ করতে শুরু করেছে। আমার পড়ার জন্য বাবা শেষ পর্যন্ত একটা হারিকেনও কিনে ফেললেন।

    আর আমি জানি, বাবা যেখানেই এখন যাচ্ছেন, বিয়ের কাজে অথবা কোনো পুজো-আর্চার ব্যাপারে- ঠিক কথায় কথায় তাঁর বড় ছেলে কত লায়েক, কী পরীক্ষা দিচ্ছে সে-সম্পর্কে বিশদ আলোচনা না করে ছাড়ছেন না। বাড়ি ফিরলেই বাবা বলতেন, জগদীশ বলল, প্রবেশিকাটা পাস করলেই কর্তা আপনার আর কোনো ভাবনা নেই। অফিসে চাকরি হয়ে যাবে। বাবার ছেলে অফিসবাবু হবে শুনে মা খুব অমায়িক হয়ে যেতেন। মা বলতেন, হাত-মুখ ধুয়ে একটু কিছু খাও। কোন সকালে তো বের হয়েছ।

    এই বাড়িঘর, গাছপালা এবং বনভূমির মধ্যে রাতে আমার উচ্চস্বরে পড়া বাবার চোখে-মুখে এক আশ্চর্য প্রশান্তি এনে দিত। তিনি মাঝে মাঝে গুড় ক গুড়ক করে তামাক টানতেন। আর কখনও সকালে সেই পড়াশোনার মধ্যেই পিলু খবর দিত এই বিরাট বনভূমির কোন দিকটার সব গাছপালা কেটে লোকে নতুন আবাস তৈরি করছে এবং আমার মনে হত পিলুর ভারি কষ্ট হত এতে। এই বনভূমিটা যেন পিলুর সাম্রাজ্য—সবাই কে কোথা থেকে এসে সব গাছপালা কেটে ফেলছে। বনভূমির সেই আদিম আশ্চর্য রহস্যটা মরে যাচ্ছে বলে পিলুকে প্রায়ই খুব ম্রিয়মান দেখাত। কুকুরটাকে নিয়ে সে আগে যেমন এই বনভূমির অভ্যন্তরে ঢুকে অদ্ভুত সব খবর নিয়ে আসত আমাদের জন্য, এখন আর তেমন পারে না। গাছপালা কেটে ফেলায় উষর জমির মতো দেখায় এবং সেখানে মাঝে মাঝে শোনা যায় বাঁশ কাটার শব্দ। বাবার খুব তখন আনন্দ। পূজা শেষ করে বাবা যত জোরে সম্ভব শঙ্খে ফুঁ দিতেন। কাঁসর ঘণ্টা বাজাতেন। পিয়ন আসত ঠাকুরের নামে আসা যজমান অথবা শিষ্যদের মনি অর্ডার নিয়ে। কেউ পাঁচ টাকা, কেউ দশ টাকা মাসোহারা দেয়। আর বাবার কিছু যজমান নিবারণ দাসই ঠিক করে দিয়েছে। শহরের মানুকাকাও ভাল পুরোহিতের খোঁজে কেউ এলে বাবাকে খবর পাঠায়। আর যারা বাবার মতো নতুন ঘরবাড়ি করছে, দিনখন দেখাতে এলে বলে দেন, ঠাকুরের ফুল-তুলসী নিয়ে যাও। ওতেই হয়ে যাবে। জায়গাটার কথা বললে বলেন, মাটি মাটি। তার তুলনা নেই ভুবনে। যেখানেই আবাস, সেখানেই মানুষের সবকিছু। বাবার এমন সুন্দর কথা ওদের খুব ভাল লাগত। পূজা-পার্বণে দিন দিন যে শ্রীবৃদ্ধি ঘটছে এটা বোঝা যাচ্ছিল—সবই বাবার স্বভাবগুণে।

    এ-ভাবে শীতকাল শেষ হয়ে গেল এই বনভূমিটায়। এখন আর আগের মতো একে আমরা ঠিক বনভূমি বলতে পারি না। কারণ বাদশাহী সড়কের ধারে ধারে সর্বত্রই মানুষের নতুন বাড়িঘর উঠে যাচ্ছে। ভেতরের দিকে, অর্থাৎ যে সুমার বনটা প্রায় মাইলব্যাপী কারবালা পর্যন্ত চলে গেছে এবং যেখানে কবে কোন আদ্যিকালে একটা ইটের ভাটাও কেউ করেছিল—কেবল সে জায়গাটা কেন জানি মানুষ এখনও ঠিক পছন্দ করছে না। ফলে ওদিকটার বড় বড় শিরিষ গাছগুলি থেকে পাতা ঝরতে লাগলো ঠিক আগের মতই; কিছু শাল গাছ অথবা পিটুলি গাছের পাতাও ঝরছে। রোদের তাত বাড়ছে। মাঠে অথবা কোনো শস্যক্ষেত্রে আগে যে খরগোস সজারুর উপদ্রব ছিল তাও ক্রমে কমে আসতে লাগল। কিছু বড় বড় গো-সাপ ছিল বনটাতে, ওদের আর বিশেষ দেখা পাওয়া যেত না। রাতে শিয়ালের সেই তীব্র চিৎকার ক্রমে দূরবর্তী শব্দের মতো মিহি হয়ে যেতে থাকল। এবং এত সবের মধ্যেই আমায় একদিন শহরে যেতে হল পরীক্ষা দিতে। মা কপালে চন্দনের ফোঁটা দিয়ে দিল। বাবা-মাকে প্রণাম করতে হল। ঠাকুরের ফুল বেলপাতা বাবা পকেটে দিয়ে দিলেন। অর্থাৎ পরীক্ষায় কৃতকার্য হবার জন্য বাবার বিশ্বাসে যা কিছু দরকার সবই করা হল।

    পরীক্ষার কটা দিন বাড়ি থেকে বাবা কোথাও বের হলেন না। পূজার সময় বেড়ে গেল। শালগ্রামের মাথায় বোঝা বোঝা তুলসী পাতা চাপাতে থাকলেন বাবা। শহরে আমি পরীক্ষা দিচ্ছি। বাড়িতে বাবা ঠাকুরের কাছে পরীক্ষা দিচ্ছেন। ধৈর্যের পরীক্ষা বোধহয়। কারণ বাবার জানা যত দেবতা আছেন সবার উদ্দেশেই ফুল চন্দন দিতে দিতে বিকেল হয়ে যেত বাবার। কেউ বাদ গেলে ষড়যন্ত্র করে বাবার সব ভণ্ডুল করে দিতে পারে। শেষ পরীক্ষা দিয়ে বাড়ি ফিরতে সেদিন সন্ধ্যা হয়ে গেছে। দেখি মা খুবই উৎকণ্ঠায় বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছেন। মায়া ভাইকে কোলে নিয়ে রাস্তার গাছপালা দেখাচ্ছে। পিলু রাস্তায় দাঁড়িয়েছিল আমি কখন ফিরব। কেবল বাবা নেই। ঠাকুর ঘরের দরজা বন্ধ। মাকে বললাম, বাবা কোথায়?

    ঠাকুর ঘরে সেই সকালে ঢুকেছে এখনও পুজোই শেষ হচ্ছে না।

    বুঝলাম, তাঁর বড় পুত্রের জন্য বাবা আজ তেত্রিশ কোটি দেবতাকেই খুশী করতে ব্যস্ত। তাঁর নিজের এত সখের বাড়িঘরের কথা মনে নেই। প্রিয় কুকুরটার কথা মনে নেই। দেবতাদের তুষ্ট করতে গিয়ে দিন শেষে বেলা যায় তাও তিনি বুঝি ভলে গেছেন।

    ঠাকুর ঘরের দরজার সামনে এগিয়ে গেলাম। খুব সতর্ক গলায় ডাকলাম,—বাবা।

    বাবা রা করলেন না।

    আবার ডাকলাম, বাবা, আমার পরীক্ষা শেষ হয়ে গেল।

    বাবা কেমন ধ্যানমগ্ন গলায় বললেন, শেষ বলো না। পরীক্ষা সবে শুরু হল। কী অর্থে কথাটা বললেন, বুঝতে পেরে খানিকক্ষণ স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকলাম। বাবা তখন ডাকলেন, হাত-পা ধুয়ে ঠাকুর প্রণাম কর এবং এ-সবে আমার কিঞ্চিৎ বিশ্বাসের অভাব ছিল। তবু বাবার কথা। ঘরে ঢুকে ঠাকুর প্রণাম করলে সামান্য চরণামৃত দিলেন হাতে। এত সবের পর বাবার পুজো শেষ ধরতে পারলাম। তিনি উঠে দাঁড়ালেন। পরীক্ষার ভালমন্দের কথা তিনি আজ পর্যন্ত একবারও জিজ্ঞেস করলেন না। সবই ঠাকুরের কৃপা, ভাল-মন্দ বলে যেন কিছু নেই। শুধু নিজের কাজটুকু করে যাও। বাবার এমন সব কথা আমরা অনেকবার শুনেছি। মা মাঝে মাঝে একই কথা শুনে রেগে যেত। কিন্তু পরীক্ষার কটা দিন বাবার পুজো আর্চায় মা সাংসারিক অনটনের কথা বলে এতটুকু বিব্রত করল না। বাবার সঙ্গে মাও এ-ক’টা দিন খুবই ঈশ্বরবিশ্বাসী হয়ে উঠেছে বুঝতে পারলাম।

    ফল বের হবার আগ পর্যন্ত বাবা আমাকে কোথাও গেলে সঙ্গে নিতে শুরু করলেন। শহরে মানুকাকার বাড়ি গেলে বললেন, সব তাঁরই ইচ্ছে। তোমার ভাইপো তো এবারে প্রবেশিকা পরীক্ষা দিল। তোর তো জানাশোনা আছে অনেক। দেখিস যদি কিছু করতে পারিস। নিবারণ দাসের আড়তে নিয়ে গেলেন একদিন। বললেন, প্রবেশিকা পরীক্ষা দিয়েছে পুত্র।

    এই প্রবেশিকা পরীক্ষা বাবার জীবনে তাঁর বাবার জীবনে কখনও ঘটেনি। অতবড় পরীক্ষা দিয়েছে ছেলে, তাকে দশজনের কাছে নিয়ে যাওয়া বাবার খুবই দরকার। তাঁর বড় ছেলে প্রবেশিকা পরীক্ষা দিয়েছে, কত বড় কথা!

    ফল বের হবার দিন শহরে গেলাম। মানুকাকা বললেন, তুমি এক বিষয়ে ফেল করেছ। স্কুলের মন্টু মাস্টার খবরটা দিয়ে গেছে। খুব দমে গেলাম। তিনি ফের বললেন, দু’ মাস পরে পরীক্ষা হবে। তখন পরীক্ষাটা দিতে পারবে। অঙ্ক পরীক্ষা। দুটো মাস আর কতই বা সময়। মন দিয়ে পড়াশোনা করলে পাস করে যাবে। কিছুই ভাল লাগছিল না। বাড়ি ফেরার পথে সাহেবদের একটা নির্জন কবরখানা পড়ে। বড় বড় সব ঝাউগাছ। সেখানে সারাটা দুপুর শুয়ে থাকলাম। কেবল বাবার মুখটা আমার চোখে ভেসে উঠছে। তাঁর কত বিশ্বাস আমার ওপর। এখন মুখ দেখাব কী করে। কী করি। ফেরার হলে কেমন হয়। তখনই মা’র সেই বিষণ্ণ মুখ ভেসে উঠল। বাবার সব আশা-আকাঙ্ক্ষা এবং তাঁর পুত্র গৌরব নিমেষে কেউ হরণ করে নিয়ে গেল। তবু কেন জানি পিলু মায়া ছোট ভাইটার কথা ভেবে ফেরার হতে ইচ্ছে হল না। সাঁঝ লাগার আগে গুটি গুটি বাড়ির দিকে হাঁটতে থাকলাম। রাস্তাটা যেন আজ কিছুতেই শেষ হচ্ছে না। পুলিস ব্যারাক পার হতেই বড় মাঠ। মাঠে পড়েই দেখলাম, সবাই বাড়ির রাস্তায় গাছের নিচে আমার জন্য দাঁড়িয়ে আছে। পিলু ছুটতে ছুটতে আসছে। মায়া ছুটতে গিয়ে পড়ে গেল। অন্য দিন হলে ভ্যাক করে কেঁদে দিত। আজ তার কান্নার কথা মনে পড়ল না। কতক্ষণে আমার কাছে পৌঁছবে! ওরা কাছে এলে কীভাবে যে বলব, পরীক্ষায় পাস করতে পারিনি পিলু। পিলু এ-কথায় সবচেয়ে বোধহয় বেশি ভেঙে পড়বে এবং বনভূমিটা থেকে আমরা যে ঘরবাড়ি ছিনিয়ে নিয়েছি, আমার মনে হল খবরটা পাবার সঙ্গে সঙ্গে আবার সেই বনভূমি বাড়িটাকে গ্রাস করে ফেলবে। পিলু চিৎকার করে বলল, দাদা, পাস করেছিস?

    কিছু বললাম না। কারণ বলতে পারছিলাম না কিছু। আমার চোখ ফেটে জল আসছে! বাবা এগিয়ে এসে বললেন, পাস করলি?

    আমি আর নিজেকে সামলাতে পারলাম না, কেঁদে ফেললাম।

    বাবা বললেন, কান্নার কী আছে? সবাই বুঝি পাস করে!

    বাবার কথায় ভেতরের দুঃখটা সহজেই কত লাঘব হয়ে গেল।

    বাবা আবার বললেন, ক’ বিষয়ে পাস করেছিস?

    এটাই বোধহয় বাবার শেষ সান্ত্বনা। বললাম, ন’ বিষয়ে পাস। অঙ্কে ফেল।

    বাবা বিজয় গৌরবে এবার আমার হাত ধরে ফেললেন। বললেন, দশটা বিষয়ের মধ্যে ন’টা বিষয়ে পাস—কম কথা হল! এটা তো পাসই। জীবনে কে কবে সব বিষয়ে পাস করেছে। বড় হলে বুঝতে পারবি। –

    এবং তারপর থেকে আমার সেই নির্দিষ্ট অঙ্ক পরীক্ষার দিনটি পর্যন্ত যার সঙ্গে দেখা হত বাবা বলতেন, বড় পুত্র দশটা বিষয়ের মধ্যে নটাতেই পাস করেছে। একদিন নিবারণ দাসের পাটের আড়তেও খবরটা দিতে চলে গেলেন বাবা। বললেন, কম বড় কথা না। কী বলেন দাসমশাই!

    দাসমশাই আড়তে বসে হুঁকাটি বাবার হাতে দিয়ে বললেন, সত্যি ভারি গৌরবের কথা। বাবা আনন্দে তখন তন্ময় হয়ে তামাক টানছেন। পুত্র-গৌরবের হাসিটি তাঁর মুখে লেগেই আছে।

  • দশ

    দশ

    দেশ ছেড়ে আসার পর, দু-তিন বছর আমাদের কারো কেনো অসুখ হয়নি। এমন কি সামান্য সর্দি কাশিতেও কেউ ভুগিনি। মানুষের অসুখ বিসুখ থাকে আমরা প্রায় ভুলতেই বসেছিলাম। গাছপালা আর মাটির সঙ্গে লেপ্টে থাকলে তাই বুঝি হয়। শীতের চাদর থাকত না, খালি গায়ে দিন দুপুরে ঘুরে বেড়ানো, গাছ পাতা বনআলু খেয়ে আমাদের আশ্চর্যভাবে জীবনীশক্তি বেড়ে গিয়েছিল। ঠাকুর প্রতিষ্ঠার পর আমাদের এখন প্রায় সুদিনই বলা চলে। শীতের চাদর পর্যন্ত বাবা কিনে দিয়েছেন। আর তখন থেকেই আমরা কেউ কেউ সর্দি কাশির শিকার হতে থাকলাম। সর্দি কাশিতে বাবা গা করতেন না। হয়েছে সেরে যাবে। মানুষের ঘরবাড়ি হবে অসুখ বিসুখ হবে না সে আবার কেমনতর কথা! আমার মা, বাবার হাবভাব কিছুদিন শুধু লক্ষ্য করেই গেল। পিলুর সর্দি-কাশি, মায়ার আমাশয়, আমারও ক’দিন জ্বর, মাও কিছুদিন অম্বলের রোগে ভুগে উঠল। সবই বিনা ওষুধে সেড়ে যাওয়ায় বাবা বললেন, নিজের মধ্যেই আছে, সঞ্জীবনী সুধা। তাকে ধনবৌ বাঁচিয়ে রাখতে হয়। কিন্তু বর্ষা পড়তেই একদিন পিলু খুব জলে ভিজে বাড়ি ফিরে এল। পুকুর ডোবা খাল বিল জলে ভেসে গেছে। পিলু ব্যারেকের পুকুরে উজানী মাছের খোঁজে গিয়েছিল। কটা কৈ, মাগুর, সিংগি মাছ সে জলে ভিজে ধরেছে। সারা আকাশ জুড়ে ছিল প্রচণ্ড কালো মেঘ। আর ঝড়ো বাতাস। গাছপালা জলে ভিজে চুপসে যাচ্ছিল। এরই মধ্যে পিলু বৃষ্টি মাথায় করে মাছ নিয়ে যখন ফিরল, তখন মা ঠাকুরঘরে প্রদীপ জ্বেলে দিচ্ছে। বাবা বাড়ি নেই। ঠাকুরের বৈকালির কাজ আমাকেই সারতে হবে। সে সময় পিলু গামছা খুলে বলল, দাদা দেখবি আয়। বারান্দায় বের হয়ে দেখলাম, সত্যি কত বড় সব সিঙ্গি, কৈ, মাগুর। সে বলল, কী মাছরে দাদা। আবার যাবি? এমন ঝড় বৃষ্টিতে আমার যেতে সাহস হল না। আর মাও দেখলাম বেশ চুপচাপ। পিলু আবার বলল, মাঠে মাছ উঠে আসছে। কত মাছ ফসকে গেল। মা কুপি জ্বেলে মাছ দেখতেই সহসা চিৎকার করে উঠল, ওরে পিলু, তোর প্যান্টে এত রক্ত কেন রে!

    পিলু হাসতে হাসতে বলল, সিঙ্গি মাছের কাণ্ড মা। হাত ফুঁড়ে দিয়েছে। কিন্তু পিলুর মুখ দেখে আমার ভাল লাগল না। কেমন সাদাটে আর নীল দেখাচ্ছে মুখটা। মা তাড়াতাড়ি কিছুটা হলুদ গরম করে আনতে গেল। পিলু এত সবের মধ্যেও মাছগুলি নিয়ে রাখল হাঁড়িতে। প্যান্ট ছেড়ে একটা খোট পরে নিল। বলল, খুব শীত করছে রে দাদা। বলে সে মার একটা শাড়ি দু ভাঁজ করে গায়ে দিয়ে কেমন ঝিম মেরে বসে থাকল।

    মায়া তখন কাছে গিয়ে বলল, এই ছোড়দা ঝিমুচ্ছিস কেন?

    —খুব শীত করছে।

    —শীতে কেউ ঝিমোয়?

    —মেলা কথা বলবি না। যা তো!

    ঝিমুনোর কথায় আমারও খুব একটা ভাল লাগছিল না। বললাম, সত্যি সিঙ্গি মাছে কুঁড়েছে না অন্য কিছু।

    —অন্য কিছু আবার হতে যাবে কেন!

    —তুই দেখেছিস?

    —জলে দেখা যায়। ঘাসের মধ্যে অন্ধকারে হাত দিতেই ফুঁড়ে দিল। লম্বা। ধরতে পারলাম না। কত বড় যে না! বলেই ওর চোখ বুজে আসছিল।

    আমার কেমন ভয় ধরে গেল। মাকে তাড়াতাড়ি ডেকে বললাম, পিলু কেমন করছে। মা দৌড়ে এল। বলল, কি হয়েছে?

    পিলু ঝিমোচ্ছে।

    মা তাড়াতাড়ি গরম হলুদ আঙুলে লাগিয়ে বলল, ব্যথা করছে?

    —না।

    —জ্বালা করছে?

    —না।

    —তোমার কিছুই করছে না। তবে ঝিমোচ্ছ কেন?

    —ঘুম পাচ্ছে।

    —পোকামাকড়ে কাটেনি তো?

    পিলু বলল, না।

    আমি বললাম, যখন ফুঁড়ে দিল, তখন ব্যথা করছিল?

    —টের পাইনি।—কত মাছ! মাছ ধরব, না ব্যথা টের পাব।

    মা কেমন হাউমাউ করে কাঁদতে বসে গেল। পিলু ঝিম পায় কেনরে! সিঙ্গি মাছে ফুঁড়ে দিলে ব্যথা করবে। তুই কী ধরতে কীসে হাত দিয়েছিস রে!

    মহা জ্বালা দেখছি। মা কাঁদতে কাঁদতে ওর হাতের কব্জিতে মশারির দড়ি বাঁধাতে গেলে, পিলু মহারোষে উঠে দাঁড়াল। বলল, বলছি তো পোকামাকড়ে কামড়ায়নি। এবং আমার সামনে তখন একটা মহাভুজঙ্গ ফণা তুলে দাঁড়িয়ে আছে—দেখতে পাচ্ছি, পিলুর সর্বনাশ হয়ে গেছে। সংসারে মহা সর্বনাশ। বাবা কাল ফিরে এসে কি দেখতে পাবেন বুঝতে পারছি না। ভেবেচিন্তে কিছুই করতে পারছি না। আর মার এই হাউমাউ কান্না বনটার মধ্যে কেউ শুনতে পাবে না— মানুষের এটা কত বড় বিপদ এই প্রথম টের পেয়ে এক দৌড়ে নিবারণ দাসের বাড়ি যাব ভাবতেই মা বলল, অন্ধকারে কোথায় যাচ্ছিস! শুধু সেই অন্ধকার এবং ঝড় বৃষ্টি থেকে চিৎকার করে বললাম, নিবারণ দাসের বাড়িতে যাচ্ছি মা। জ্যাঠাকে খবরটা আগে দিই।

    পাল্লা দিয়ে ঝড়ো বাতাস আর বৃষ্টি। শাঁ শাঁ শব্দ। অন্ধকারে কিছুই দেখা যাচ্ছে না। পথের যখন যেখানে পা দিচ্ছি, মনে হচ্ছে কেবল সাপ। যেন হাঁটলেই পাটা সাপের মাথায় পড়বে। আর এ- সময়ে মনে পড়ল বাবার সেই মহাবাণী, উচ্চারণ করলাম, দোহাই আস্তিকমুনি। আমরা এই বনভূমি সাফ করার সময় কত বড় বড় গোখরো সাপ দেখেছি। বাবা একটাও মারতে দেননি। দেখলেই তিনি বলতেন, দোহাই আস্তিকমুনি। সাপেরা তখন মাথা নিচু করে ঝোপে জঙ্গলে ঢুকে যেত। এবং এসবে আমার এবং মার তাছাড়া পিলুর কোনই বিশ্বাস ছিল না। কেবল মনে হত বাবাকে ভালমানুষ পেয়ে নির্ঘাত মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা পেয়ে যাচ্ছে সাপগুলো। অথচ এখন ঝড় বৃষ্টিতে অন্ধকারে হাতের কাছে এমন মহাসম্বল পেয়ে আরও বেগবান হয়ে গেলাম। মানুষের কি যে থাকে। আকাশ ফালা করে দিচ্ছে তখন বিদ্যুতের শেকড়বাকড়।

    একবিন্দু আর ভয় নেই। যেন সেই আস্তিকমুনির দোহাই শুনে সব আস্তিকেরা আমাকে দেখলেই পালাচ্ছে। এবং মহাভারতের পুণ্যশ্লোকের মতো আকাশ ধরণী নিমেষে বড় পবিত্র হয়ে গেল। বুঝলাম বাবার সব বিশ্বাসই বড় পবিত্র ইচ্ছের দ্বারা চালিত। বুঝতে পারলাম মানুষের ঘরবাড়ির সঙ্গে এমন সহায় সম্বল না থাকলে সে খুবই অসহায়। এবং কখন নিবারণ দাসের বাড়ি পৌঁছে গেছি খেয়ালই করিনি। এত বড় একটা দুর্যোগের মধ্যে এতটুকু ক্লেশ নেই শরীরে। রাস্তার দু-পাশে আকাশে বাতাসে কি ছিল টের পাইনি। সামনে নিবারণ দাসের বাড়ি আর মুখে দোহাই আস্তিকমুনি, এতক্ষণ এই ছিল আমার অস্তিত্ব।

    দাসের মা বলল, আড়ত থেকে তো ফেরেনি। এই ঝড় বাদলায় ভিজে। কি খবর কর্তা। কেবল কোনরকমে বললাম, পিলুকে কিসে কেটেছে।

    নিবারণ দাসের মা হাঁ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকল। ওর ছোট মেয়ে বলল, ঠাকুর ছাতা নিয়ে যান। আমি আর কিছুই শুনতে পাইনি। কারণ শরীর তখনও ভারি বেগবান। একটা পাগলা ঘোড়ার মতো দৌড়চ্ছি। দু-বার আছাড় খেয়েছি। সারা শরীর কাদায় লেপ্টে গেছিল, আবার যেতে যেতে কখন তা বৃষ্টিতে ধুয়েও গেছে। পেছনে একবার তাকাতেই মনে হল, বাড়িটা বৃষ্টির ঝাপটায় কুয়াশার মধ্যে যেন আবছা হয়ে গেছে। নিবারণ দাসের আড়ত সামনে। ঝড় বৃষ্টির জন্য পাল্লা ভেজানো! ফাঁক দিয়ে হ্যাজাকের আলো বাইরে এসে পড়ছে। সামনে দুটো গরুর গাড়ি। গাড়িগুলোর ওপর দিয়ে লাফ মেরে নেমে গেলাম। একটা গরুর পিঠে পা পড়ল, এবং পাল্লা ফাঁক করে হাঁপাতে হাঁপাতে বললাম, জ্যাঠা, বাবা বাড়ি নেই, পিলুকে কিসে কেটেছে। মা কাঁদছে।

    নিবারণ দাস বলল, কী বলছেন, কিসে কাটবে!

    —মাছ ধরতে গেছিল। শীতে শরীর কাঁপছে পিলুর। আর ঝিমুনি। কিছুতে যদি কেটে থাকে, কি করব?

    নিবারণ দাস সাহস দেবার জন্য বলল, কিচ্ছু হয়নি। দাঁড়ান। সব তো ভিজে গেছে! ছাতা আনেননি কেন? এই গোপাল, টাকাগুলো তুলে রাখ। চাবিটা দে। শিগরির কর।

    গরীব মানুষের ঈশ্বর বিশ্বাস ছাড়া কিছু সম্বল থাকে না। বাবারও তাই সম্বল। অথচ আমরা, বিশেষ করে মা এবং পিলুর ঈশ্বর বিশ্বাসে ঘাটতি ছিল খুব। সারাটা রাস্তা ভারি দুর্গম। ঝড় জলে সাপখোপের উপদ্রব বাড়ে। এতটা পথ একা অন্ধকারে ঝড় জলের মধ্যে কী করে এলাম! নিবারণ দাসের কথায় যেন সংবিৎ ফিরে পেয়েছি। শীত করছে। জানি একা এতটা পথ আর অন্ধকারে যেতে পারব না। ভূতের ভয় এবং সাপখোপের ভয়। কি করব বুঝতে পারছিলাম না। নিবারণ দাসের জন্য অপেক্ষা করব না আবার যেমন এসেছিলাম তেমনি ঝড় জলে বের হয়ে পড়ব। বাবা বাড়ি নেই। মা একা। বনভূমির মধ্যে মা’র অসহায় চোখ মুখ একদণ্ড স্থির থাকতে দিচ্ছে না। সম্বল বলতে আমার গলায় পৈতা আছে আর সাপখোপের জন্য আছেন, আস্তিকমুনি। এবং এই সম্বল করে আবার বের হয়ে ছুটব ভাবছি, খবরটা যখন দিয়েছি, নিবারণ দাস ঠিক যাবে, ওর দেরি হতে পারে, আমার দেরি হলে মা আরও ভেঙে পড়বে। বললাম, জ্যাঠা আপনি আসুন। আমি যাচ্ছি।

    নিবারণ দাস রে রে করে উঠল।—আরে না না। আমি যাচ্ছি সঙ্গে। গোপাল, বাবা তাড়াতাড়ি কর।

    তাড়াতাড়ি বললেই তো আর হয় না। পাটের আড়ত। কত কাজ গোপালের। দুজন দেহাতী লোক পাটের গাঁট সব তুলে ভিতরে নিয়ে রাখছে। সব রাখতে দেরি হবারই কথা। তারপর দরজা বন্ধ করা, গোটা দশেক তালা ঝোলানো, এতসব কাজের জন্য দেরি হতেই পারে। আমার কাছে একদণ্ড কত অমূল্য সময় এই প্রথম টের পেলাম।

    রাস্তায় নিবারণ দাস ছাতা মাথায় বড় ঠুকে ঠুকে হাঁটছিল। টর্চ মেরে গোপাল আগে আগে যাচ্ছে। আমি আরও আগে। নিঝুম অন্ধকার, গাছপালার সাঁই সাঁই শব্দ আর কড়াৎ করে বাজ পড়ার মাঝে মাঝে বিকট আওয়াজ। সব কিছুই কত সহজে এক নিমেষে তুচ্ছ করতে শিখে গেলাম। কেবল আশঙ্কা ভেতরে, পিলু এখন না জানি কেমন আছে। পিলু তোর এত মাছ ধরার বাই কেনরে। পিলুর ওপর অভিমানে চোখ ফেটে জল আসছিল—কিছু যদি ওর হয়ে যায় দেখ তোমাকে আমি কি করি। তারপরই মনে হল বাবার যখন ভগবান আছে, তখন খুব একটা কিছু হবে না। শুধু দুর্ভোগ কিছুটা ওর। মনে মনে বললাম, ঠাকুর পিলুকে ভাল করে দাও। ও খুব দুষ্ট ছেলে। ওকে কষ্ট দিও না ঠাকুর। ও সংসারে না থাকলে আমাদের কিছুই থাকবে না। এবং যতভাবে দরকার ঈশ্বরকে ডাকতে ডাকতে কখন যে বাড়ির রাস্তায় হাজির টেরই পাইনি। দু-লাফে একেবারে উঠোন ডিঙিয়ে ঘরের মধ্যে ঢুকে বললাম, জ্যাঠা আসছে। পিলু, এই পিলু। কোন সাড়া দিচ্ছে না। এই পিলু জ্যাঠা আসছে রে। আর কোন ভয় নেই।

    পিলু খুব ক্ষীণ গলায় বলল, দাদা তুই খুব ভীতু। আমার কিছু হয়নি রে!

    পিলুকে তো জানি। সে দশটা কথা বললে পাঁচটা মিছে কথা বলে। এখন দাদাকে ঘাবড়ে যেতে দেখেও মিছে কথা বলছে।

    নিবারণ দাস ঘরে ঢুকতেই মা উঠে দাঁড়াল। মা একটা কথা বলল না। এতক্ষণ পিলুকে জাগিয়ে রাখার জন্য জোরজার করে বসিয়ে রেখেছে। ঘুমিয়ে পড়লেই সব শেষ। দাস লাঠিটা বেড়ার পাশে রেখে পিলুর কপালে হাত দিল। বলল, ও কি তাত? খুব জ্বর হয়েছে দেখছি! জলে কাদায় ঘুরে বেড়ালে তো জ্বর হবেই কর্তামা। ওকে শুইয়ে দিন।

    মা ঘোমটা সামান্য আরও টেনে বলল, কিসে কেটেছে। ও দেখেনি। হাত বেঁধে দিয়েছি।

    নিবারণ দাস হা হা করে হেসে দিল। বলল, কর্তামা পোকামাকড়ে কাটলে শরীরে তাপ ওঠে না। কৈ দেখি হাতটা মেজ ঠাকুর? বলে টর্চ জ্বেলে আঙুলের কানা দেখল। টিপে টিপে বলল, বেশ জাঁদরেল মাছ ছিল দেখছি। ধরতে পারলেন না!

    পিলু কেমন সাহস পেয়ে গেছে। সে বলল, খুব বড় ছিল। এই বড় জ্যাঠা। মাছটা না…..। নিবারণ দাস দড়ির গিঁটগুলি খুলে দিতে দিতে বলল, ও কি বেঁধেছেন, হাতে দাগ বসে গেছে! এতক্ষণ বোধহয় হাতটা পিলুর ভীষণ টনটন করছিল, বাঁধন খুলে দিতেই পিলু যেন প্রাণ পেয়ে গেল। বলল, জ্যাঠাকে দেখা না দাদা, কত বড় বড় সিঙ্গি মাগুর ধরেছি। যেন ওর কিছুই হয়নি। মারও মনে জোর এসে গেছে। মা তাড়াতাড়ি মাছগুলি টেনে নিয়ে এনে দেখাল, দেখুন কী কাণ্ড, কত বড় মাছ। নিবারণ দাস বলল, মেজ ঠাকুর আপনার কিছু হয়নি। জলে কাদায় ভিজে জ্বর হয়েছে, সেরে যাবে। এত বড় বড় মাছ ধরেছেন একটু জ্বর জ্বালা হবে না সে কি করে হয়।

    এই বলে নিবারণ দাস গোপালের সঙ্গে বের হয়ে গেল। মা বসতে বলল একটু। আমাকে তামাক সেজে দিতে বলল, নিবারণ দাস জানাল, বাবা এলে বসবেন। তামাক খাবেন। কেমন থাকে পিলু, সকালে একটা খবর দিতেও বলে গেল। মানুষের ঘরবাড়ির সঙ্গে একজন ভাল প্রতিবেশী কত দরকার এই প্রথম আমরা টের পেলাম। নিমেষে সব ভয় আতঙ্ক কত সহজে দূর হয়ে গেল। আমার মা দেখলাম আবার বীরাঙ্গনার মতো চলাফেরা করছে। বলছে, ওরে, ঠাকুর শোওয়ানো হয়নি। যা বাবা বৈকালিটা দিয়ে আয়। পিলু তুমি আর বসে থেক না। মায়া কখন ঘুমিয়ে পড়েছে। বাড়িঘরে এমন একটা আতঙ্ক এসে ভর করেছিল সে টেরই পায়নি।

    কাপড় ছেড়ে ঠাকুরঘরে ঢুকতে গিয়ে দেখি প্রদীপটা ঝড়ো হাওয়ায় কখন নিভে গেছে। কিছুই দেখা যাচ্ছে না। সাঁ সাঁ শব্দ খড়ের বাড়িটার মাথার ওপর দিয়ে উড়ে যাচ্ছে। জোরে কথা না বললে, ও-ঘর থেকে কিছুই শোনা যায় না। ডাকলাম, মা দেশলাইটা দাও। প্রদীপ জ্বালাতে হবে। অন্ধকারেই দেখলাম দরজায় একটা লম্বা হাত। মা আলো জ্বালাবার জন্য দেশলাই বাড়িয়ে ধরেছেন। আলো জ্বালা হলে দেশলাইটা আবার নিয়ে যাবে। বললাম, তুমি আবার বাইরে দাঁড়িয়ে জলে ভিজছ কেন মা। তোমরা সবাই দেখছি একরকমের। মা হেসে বলল, আমার কিছু হবে না! তুই আলোটা ধরা তো।

    প্রদীপটা জ্বাললে দেখলাম, মা আমার প্রণিপাত করছেন। জল ঝড়ে কার উদ্দেশ্যে এই প্ৰণিপাত জানি। সামান্য দুটো পেতলের মূর্তি সাক্ষাৎ দেবতার মতো মিটি মিটি হাসছেন তখন। শালগ্রাম-শিলার মাথায় তুলসীপাতাটি চন্দনের গন্ধ ছড়াচ্ছে। বাবার কথা মনে হল। দূর থেকে তিনি কি সব টের পান। তিনি বুঝতে পারেন, আমরা কেমন আছি। বাবা গলায় ঝুলিয়ে যে বিশ্বব্রহ্মাণ্ড নিয়ে এসেছিলেন, এখন আমার তালুতে সেই বিশ্বব্রহ্মাণ্ড। কত সহজে তাকে ধারণ করে আছি। পিলু তখন, চেঁচিয়ে বলছে, দাদা, বাতাসা সব তুই একা খেয়ে ফেলবি না। আমার জন্য রাখিস। বৈকালির গোনাগুনতি তিনটে বাতাসা। এবং আমার পূজার পালা থাকলে, পূজা শেষে চুরি করে সবটাই খেয়ে ফেলার স্বভাব আছে। প্রসাদ কণিকা মাত্র, এক কণিকা প্রসাদ দিলে পিলু চিৎকার করে বলত, দেখ মা দাদাটা কি রাক্ষস। সব একা একা খেয়ে আমাদের শুধু হাত ছোঁয়াচ্ছে। বৈকালি শেষে, দুর্লভ তিনটি বাতাসাই ঘরে ঢুকে পিলুর হাতে দিয়ে বললাম, পিলু ওঠ। প্রসাদ নে। বলে তিনটে বাতাসা ওর হাতে দিলে সে খুব অবাক হয়ে গেল। বলল, কিরে দাদা, সবই আমাকে দিলি। তুই নে মাকে দে। প্রসাদ সবাইকে খেতে হয়। বলে পিলু নিজের জন্য একটা রাখল, মাকে একটা দিল, আমাকে একটা। অন্যদিন আমি জানি, পিলু কিছুই পেত না, কণিকা ছাড়া, আজ পিলুর চেয়ে আমি সদাশয়। পিলুকে বললাম, আমারটা তুই খা পিলু। আসলে মানুষের ঘরবাড়ির মায়া এমনিতেই বাড়ে। পিলুর মতো আমার একটা ভাই আছে বলেই বাড়ে। কিছুক্ষণ আগে টের পেয়েছি, বাবার ঘরবাড়িতে পিলুর বেঁচে থাকা কত দরকার। সে না থাকলে অন্ধকার কি গভীর তাও জানি! সামান্য একটা বাতাসা দিয়ে তা কেনা যায় পিলুর আশ্চর্য অকৃত্রিম হাসিটুকু না দেখলে বিশ্বাস করা শক্ত।

  • এগার

    এগার

    সকালেও পিলুর জ্বরটা সারল না। মা গায়ে হাত দিয়ে বলল, দেখি। পিলু হাত সরিয়ে দিয়ে বলল, বলছি তো জ্বর নেই। মা তবু কপালে হাত রেখে বলল, জ্বর আছে। বের হবে না কোথাও। সকালে কিছু খাবে না। দুপুরে বার্লি। পিলু রেগে গেল। বলল, কিছু খাব না! জ্বর আছে! সে মুখ ভেংচাল মাকে।—আমার শরীর, আমি বুঝি না, তুমি বোঝ।

    অগত্যা আমার পালা। হাত দিয়ে দেখলাম, গায়ে জ্বর বেশ। বললাম, যা শুয়ে থাকগে। ঘোরাঘুরি করলে জ্বর বাড়বে।

    বেশ রোদ উঠেছে। আকাশ পরিষ্কার। গাছপালা সকালের হাওয়ায় তিরতির করে কাঁপছে। কুকুরটা দু’দিন হল বাড়ি ফিরছে না। বাবার মতো কেমন বাউণ্ডুলে স্বভাবের। এক দণ্ড বাড়ি ঘরে তিষ্টোয় না। কেবল সারা মাঠ, এবং সড়কে ঘুরে বেড়াবে।

    গতকাল আমাদের এমন একটা আতঙ্কের দিনেও কুকুরটা রাতে ফিরে আসেনি বলে পিলু বসে বসে গজগজ করছিল। আসলে আমরা বুঝতে পারি কুকুরটা কোথায় আছে খুঁজে দেখার নাম করে পিলু এখন একটু মাঠঘাটে অথবা গাছপালার অভ্যন্তরে ঘুরে আসতে চায়। আমি বললাম, ঠিক আসবে। যাবে কোথায়!

    —এলে দেখ না কি করি। খেতে পাবে না ভেবে পিলুর মেজাজ চড়ে যাচ্ছে। কাউকে সকালে খেতে দেওয়া হোক পিলু এখন সেটাও চাইছে না। পিলুর জ্বরের সঙ্গে সামান্য সর্দি কাশি আছে। সামান্য বাসক পাতার রস দিলে খুব কাজে আসত। বাবা থাকলে কোন ঝামেলা ছিল না। ঠিক জঙ্গল থেকে এটা ওটা খুঁজে এনে রস করে দিতেন। অবশ্য বাবা অসুখের তিন-চারদিন না দেখে কিছু করার পক্ষপাতী নন। আমরা গত শীতে যে সামান্য জ্বর জ্বালায় ভুগেছি তাতে টের পেয়েছি, অসুখ-বিসুখে আমার বাবা বড়ই নিস্পৃহ। কেবল পাঁচদিনের মাথায় যখন সর্দি কফ বুক থেকে নড়ানড়ি করার নাম করছে না তখনই বাবা বলেছিলেন, বাসক পাতার একটা গাছ লাগানো দরকার। বাসক পাতা, তুলসীপাতা, শিউলীপাতা আর আদার রস, একটু লোহা পুড়িয়ে দেব। সব ঠিক হয়ে যাবে।

    মা বলেছেন, বাসক গাছ কোথায়?

    —আরে লাগালেই হবে।

    —গাছ লাগাবে, বড় হবে, পাতা হবে, তবে রস হবে। সে তো এ-জন্মে হবে বলে মনে হচ্ছে না।

    বাবা বিরক্ত হয়ে বলেছিলেন, ধনবৌ তোমার জিভ বড়ই ক্ষুরধার। মা, বাবার এই উক্তিতে খুবই ক্ষোভ প্রকাশ করেছিল। জ্বরজ্বালা হলে লোকে ডাক্তার ডাকে। একটা কিছু করে। তা না করে মানুষটা কেবল বসে বসে হিতোপদেশ ঝাড়ে। কিছু বললেই জিভ ক্ষুরধার হয়ে যায়। উচিত কথা বলা যাবে না। মা আর অসুখ-বিসুখ নিয়ে বাবাকে একটা কথা বলেনি। ছ’দিনের মাথায় আমার বুকের কফ নড়ে উঠল। সাতদিনের মাথায় বেশ তরল হয়ে গেল। বাবা স্নান করতে বললেন। অবগাহন স্নান এবং অবগাহন স্নানের পরই শরীর কেমন ঝরঝরে হয়ে গেল। তারপর তিন দিন তিন রাত মানুষের শরীর সম্পর্কে প্রাচীন আয়ুর্বেদ চিকিৎসকরা কে কি বলে গেছেন, ফাঁকে ফাঁকে তা মার প্রতি সামান্য কটাক্ষ হেনে বলতেন, শরীরের নাম মহাশয়, বাকিটা বলতেন না। যেন ভাবটা এই বুঝে নাও আর সব।

    বাবার চিকিৎসা শাস্ত্রে বেশ ব্যুৎপত্তি আছে এটা বোঝা গেল বিকেলবেলায়। বাবা বিকেলের ট্রেনে ফিরে এসে পিলুকে বাড়ি দেখতে পেয়ে ঘাবড়ে গেলেন। পিলু এমন নিরীহ শান্ত-শিষ্ট হয়ে জলচৌকিতে বসে আছে, আসলে পিলু না অন্য কেউ, যেন চশমা থাকলে খুলে দেখতেন। বাবার পোঁটলা-পুঁটলি এবার খুবই ছোট সাইজের। বাবা সামান্য নুয়ে বারান্দায় উঠে এলে পিলু বেশ ক্ষীণ গলায় বলল, মা, বাবা এসেছে। আমি ঘরে অঙ্ক করছিলাম। বাইরে বের হয়ে এলাম। আর মা রান্নাঘর থেকেই বলল, বসতে দে। বাবা বুঝতে পারলেন এবারের দোষ ত্রুটি একটু বেশি মাত্রায় হয়ে গেছে। মার অতিথিপরায়ণতা দেখেই বুঝি সেটা টের পেয়েছেন। বের হলে ঘরে ফেরা কবে হবে যেন তিনি নিজেও ঠিক জানেন না। ঘোরাঘুরি করার সময় মানুষজন, ট্রেনে ভ্রমণ, শিষ্যবাড়ির গুরু ভোজনে মনে থাকে না, বনভূমিতে একটা তাঁর আবাস রয়েছে। চিঠিপত্র দিতেও ভুলে যান। নাকি তাঁর মনে হয়, কালই তো ফিরছি, কাল আবার যে কি কালে গ্রাস করে ফেলে, কারণ রোজই তাঁর বাড়ি ফেরার উদ্যোগ আয়োজন করার সময়ই বুঝি মনে পড়ে যায়, লক্ষ্মণ মল্লিকের সঙ্গে কতদিন দেখা নেই, যখন এসেছেন, তখন ঘুরেই যাবেন। এমন সব বহুবিধ লক্ষ্মণ মল্লিক বাবার ঝোলায় রয়েছে। ফলে প্রতিদিনই একবার করে বাড়ি ফেরার তাগিদ, একবার করে লক্ষ্মণ মল্লিকদের তাগিদ। ফলে দুই তরফের ঠোকাঠুকিতে বাবার শেষ পর্যন্ত বুঝি চিঠি লেখাটাও হয়ে ওঠে না। বাড়ি ফিরেই বাবা টের পেলেন, মা আর ধনবৌ নেই, সুপ্রভা দেবী হয়ে আছেন। তখন সামান্য গলা খাকারি দিলেন। মেজ পুত্রটিকে বললেন, তোমরা সবাই ভাল আছ তো? মাকে জ্বালাওনি তো? তবু যখন ভেতর থেকে কোনো উচ্চবাচ্য নেই, আমাকে বললেন, মানুর কাছে গেছিলি? পরীক্ষা কবে জেনেছিস? আমি গেছিলাম কি গেছিলাম না ওটা বড় কথা নয়। আসলে বুঝি বাবা কোনো কথা খুঁজে পাচ্ছেন না! মায়া তখন বলল, জান বাবা, ছোড়দাকে সিংগি মাছে আঙুল ফুঁড়ে দিয়েছে। দাদার জ্বর হয়েছে।

    পিলু বলল, হ্যাঁ বলেছে, আমার জ্বর হয়েছে। না বাবা, কিছু হয়নি। মা আমাকে কিছু খেতে দিচ্ছে না।

    বাবা এবারে বললেন, দেখি কোথায় ফুঁড়েছে।

    মা ভেতর থেকেই খুবই নিরুত্তাপ গলায় বলল, দেখা, সাক্ষাৎ ধন্বন্তরী এসেছেন, দেখা।

    বাবার মুখটা খুবই অসহায় দেখাল। পিলুর আঙুলটা খুবই ফুলে আছে। বাবা মা’র বিদ্রূপ এতটুকু গায়ে মাখলেন না। আঙুল বিশিষ্ট চিকিৎসকের মতোই টিপে টিপে দেখলেন। তারপর বললেন, ভয় নেই সেরে যাবে। মায়া, একটা ছোট বাটি দিতে পারবি। কারণ বাবা এবং মায়ের মধ্যে অদৃশ্য খোঁচাখুঁচি আরম্ভ হলেই আমরা সংসারে ভীষণ গুরুত্ব পেয়ে যাই। বাবা এখন সব কথাই আমাদের সঙ্গে বলবেন। মাও। যেন বাবা মাকে চেনেন না। অথবা দুজনই দুই বিপরীত মেরুতে বসে অদৃশ্য সুতো জুড়ে আমাদের দিয়ে টরে টক্কা বাজাচ্ছে।

    পিলু বলল, বাবা, কাল আমি ভাত খাব?

    —খাবে।

    বাবা এখন কল্পতরু। সুপ্রভা দেবী বুঝোক সংসারে তাঁর দাম কম নয়। পিলু বুঝি ভাবছে, আর কি চাওয়া যায়। মায়া তখন ছোট্ট একটা বাটি এনে দিলে বাবা কোথা থেকে অনেকটা ভেরেণ্ডার কষ নিয়ে এসে হাতে লেপ্টে দিলেন। বললেন, রাতে শোবার সময় আর একবার। সকালেও দেবে। আঙুলের ফোলা কমলে জ্বরও সেরে যাবে। পরদিন পিলুর জ্বর সেরে যাওয়ায় সুপ্রভা দেবী আবার সংসারে ধনবৌ হয়ে গেল। বাবাকে বলল, কিগো চানটান করবে না। কত বেলা হল? কখন ঠাকুরঘরে ঢুকবে!

    বাবা জমিতে গাছপালা লাগাবার সময় কথা কম বলেন। আজ সকাল থেকেই গাছপালা লাগাবার কাজে ব্যস্ত। কত সব শেকড়-বাকড় নিয়ে এসেছেন তিনি, পোঁটলাপুঁটলি খুললে টের পেয়েছিলাম। একটাতেও প্রণামীর কাপড় কিংবা চাল ডাল বলতে কিছু নেই। ছোট ছোট অঙ্কুরের মতো গাছ আর শুধু শেকড়বাকড়। বাবা একটা মূল তুলে রোপণ করছেন আর কাঠি পুঁতে দিচ্ছেন। বলছেন এটা হল হরতকী গাছের চারা। এখানে পুনর্ণবার ঝাড়ু এদিকটায় থানকুনিপাতা, এখানে থাকল গন্ধ পাদাল। বাসকের ডাল লাগাবার সময় জায়গাটার উর্বরা সম্পর্কে সংশয় দেখা দিল। বাবা ডালটা তুলে অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে গেলেন। অর্থাৎ কাঠা খানেক জমি জুড়ে তিনি আজ যাবতীয় ভেষজ রোপণে ব্যস্ত। কারো কথায় কর্ণপাত করার সময় এটা নয় বুঝে মা সটকে পড়েছে। কেবল পিলু পাশে দাঁড়িয়ে দেখছিল। কুকুরটা রাতে ফিরে এসেছে। সে পিলুর পায়ের কাছে বসে লেজ নাড়ছে।

    বাবা গাছ লাগাবার সময় কোন গাছে কি ফল দেবে বলে যাচ্ছেন। আর কি ভাবে সংগ্রহ করেছেন, তিনি এই শেকড়-বাকড়ের জন্য কতদূর গিয়েছিলেন তার আদ্যোপান্ত বিবরণ। সব জায়গায় সব গাছ হয় না। কিন্তু এখানকার যা মাটি তাঁর ধারণা সব গাছই ফলবতী হবে। একটা অর্জুনের বিচি পুঁতে বললেন যদি গাছটা হয়, দেখবে কি সুন্দর তার ডালপালা। গাছের ছাল হৃদরোগের মহৌষধ। হালিশহরের পঞ্চানন কবিরাজ বীজ দিল। পঞ্চানন কবিরাজ বলল, কর্তা নিয়ে যান, সব সময় পাওয়া যায় না। সব বীজ থেকে গাছও হয় না। আমার কাছে এই অমূল্য রত্নটি পড়ে আছে এখন কাকে দিই ভাবছিলাম। আপনার মতো সদাশয় মানুষের হাতে বীজ কথা বলতে পারে। নিয়ে যান যদি কথা বলে। পিলুর দিকে একবার আড়চোখে তাকিয়ে দেখলেন। তারপর বললেন, তোর কি মনে হয়, গাছটা হবে তো?

    পিলু বলল, তুমি লাগালে সব হয় বাবা।

    পিলু এই কথাটা যেন আরও জোরে বলে, এমন ইচ্ছাতে বাবা বললেন, তুই কি শরীরে জোর পাস না?

    পিলু বলল, পাই তো!

    না, ভাল মনে হচ্ছে না। তোমার শরীরটা ঠিক হচ্ছে না পিলু, ভেতরে ভেতরে ঘুসঘুসে জ্বর হচ্ছে হয়তো। খাওয়া দাওয়া ভাল দরকার। দুধ খেতে হবে।

    দুধ খেতে হবে বললেই আর খাওয়া হয় না। মানুষের ঘরবাড়িতে একটি সবৎসা গাভী কত দরকার পিলুর দিকে তাকিয়ে যেন সেটা মনে পড়ে গেল। বাবা তারপর কি ভাবলেন, দুপুরে খেতে বসে বললেন, বুঝলে ধনবৌ, সবই তো হয়ে গেল, চাঁপাকলার গাছও বড় হচ্ছে। এবারে কার্তিক অঘ্রানে ছড়া পড়বে। চাঁপাকলা দুধ হলে বেশ হয়। বারান্দায় খেতে বসে বাবার দুধ খাবার বাসনার কথা ভেবে মা’র চোখে কি যেন সংশয় দেখা দিল। বলল, এই তো ঘুরে এলে। কটা দিন অন্তত বাড়ি থাক। কারণ মা বুঝি বুঝতে পারে ঠিক সবৎসা গাভীর সন্ধানের অজুহাতে বাবা আবার বাড়ি থেকে উধাও হবার ধান্ধায় আছে।

    –পিলুর দুধ খাওয়া দরকার। বাবা নিজের প্রয়োজনের কথা না বলে পুত্রদের প্রয়োজনের ওপর গুরুত্ব দিতে চাইলেন।

    মা বলল, পাবে কোথায়?

    সত্যি কথাটা ভেবেই খাবার ব্যাপারে বাবা অত্যধিক মনোযোগী হয়ে গেল।

    এতগুলো টাকা একসঙ্গে—না ভাবা যায় না।

    পিলু বলল, নবমী বলেছিল, একটা ছাগলের বাচ্চা দেবে বাবা। নিয়ে আসব?

    এই নিয়ে বছরখানেক ধরে একটি ছাগলছানা আনার জন্য কতবার বাবার কাছে পিলু আর্জি পেশ করেছে। বারবারই বাবার প্রত্যাখ্যানে পিলু চেয়ে আনতে সাহস পায়নি। মোক্ষম সময় বুঝে আবার পিলু কথাটা পাড়ল।

    বাবা বললেন, বামুনের বাড়ি এটা। বামুনের বাড়িতে ছাগল পোষে না!

    সুতরাং যতই দুধের প্রয়োজন থাকুক একটা ছাগলছানা তার জন্য এনে হাজির করা যায় না। পিলু কি ভাবল কে জানে, ক’দিন পর ঠিক একটা ছাগলছানা বগলে করে নিয়ে এল। বাবা হয়ত প্রথম বকাঝকা করবে, পরে সব ঠিক হয়ে যাবে। এখন দরকার আপাতত ছাগলছানাটিকে বাবার চোখের সামনে থেকে কিছুদিনের জন্য সরিয়ে রাখা। আমাদের পাঁচ বিঘে ভূঁইর শেষ দিকে, যেখানে একটা ইঁটের ভাঙা পাঁচিল আবিষ্কৃত হয়েছে, যেখানে এখনও গাছপালার জন্য রোদ আসে না, তার পাশে নিরিবিলি একটা জায়গায় ভাঙা ইঁটের খুপরি বানিয়ে ফেলল পিলু। ছাগলের বাচ্চাটাকে কিছু ঘাস দিল খেতে। বাবা সারাদিন ওদিকটায় বড় যান না।

    কেন যান না রহস্যটা অবশ্য অনেকদিন পর আবিষ্কৃত হয়েছিল। এবং যেহেতু সেদিকে যান না, পিলুর কাছে সব চেয়ে নিরাপদ মনে হয়েছিল জায়গাটাকে। সে বাড়ির দশটা কাজের কথাও ভুলে গেল। কখন ডেকে উঠবে কে জানে। এই ভয়ে সারাদিন ঘাসপাতা খাওয়াল গোপনে। বাবা যখন সন্ধ্যায় নিবারণ দাসের আড়তে জম্পেস করে আড্ডা দিতে রওনা হলেন তখনই পিলু ছাগলের বাচ্চাটাকে বগলে করে একেবারে বাড়ির মধ্যে।

    এবং আমরা সবাই মিলে ঠিক করলাম, আপাতত বাচ্চাটাকে রান্নাঘরে রাখা যাক। ও-ঘরটায় বাবা পারতপক্ষে ঢোকেন না। কারণ এ এলাকার সবটাই সুপ্রভা দেবীর একান্ত নিজস্ব। ভেতরের দিকে ছোট বারান্দায় খাওয়া-দাওয়া হয়। বাবা শুধু দরজায় উঁকি দিলে দেখতে পাবেন। এতসব ভেবে বাচ্চাটাকে রাখা গেল ঠিক, কিন্তু হলে কি হবে, ছাগলের বাচ্চা, বুদ্ধি আর কতটা হবে, দুপুর রাতে সহসা ত্রাহি চিৎকার। বাবা ধড়ফড় করে উঠে গেলেন। আমরা সবাই। শেয়ালের উপদ্রব হতে পারে ভেবেও পিলু টু শব্দটি করছে না। কারণ বাবার কি মর্জি হবে কে জানে। তখনই বাবা বললেন, কিসে ডাকে।

    মা বলল, তাই তো!

    বাবার জীব-জন্তুর প্রতি মমতা এমনিতে একটু বেশি। সাপ-খোপের বেলায় এটা যথার্থ টের পেয়েছি। তিনি খুবই উদ্বিগ্ন গলায় বললেন, তাড়াতাড়ি লম্ফটা জ্বাল ধনবৌ। মনে হচ্ছে শেয়ালে ছাগলের বাচ্চা ধরেছে। বাইরে বের হয়ে লম্ফের আলোতে কোথায় বাচ্চাটা খোঁজাখুঁজি করতে থাকলেন। কোথা থেকে এল, অথবা এখানে ব্যারেকে যে সুবাদার সাবের ছাগল রয়েছে, বাচ্চাটা তারও হতে পারে, পথ ভুলে চলে আসতে পারে, অন্ধকারে কোথাও ডাকছে তিনি হন্যে হয়ে খোঁজাখুঁজি করতে থাকলেন।

    আশ্চর্য, পিলু আগের মতোই লম্বা হয়ে শুয়ে আছে। সে উঠছে না, নড়ছে না।

    পিলু জোরে জোরে নাক ডাকতে থাকল।

    বাবা বললেন, কোথায় দেখছি না তো! রান্নাঘর থেকে বাচ্চাটা মানুষের সাড়া পেয়ে আরও জোর গলায় ব্যাঁ ব্যাঁ করতে থাকল। দু-তরফের ডাকাডাকিতে বাবাকে সত্যি কথাটা বলে দিলে এখন বেশ হয়, পিলুকে জব্দ করা যায়। পিলুর নাক ডাকানি বন্ধ করা যায়—তখনই মা বলল, দাঁড়াও। মনে হচ্ছে রান্নাঘরে আছে। মা রান্নাঘরে ঢুকে গেলে বাবাও ঢুকে গেলেন। বাচ্চাটা দেখে কিছুক্ষণ বিমূঢ় হয়ে থাকলেন বাবা। মেজ পুত্রটির কাজ, ছাগলের জন্য কত হরেক রকমের কচি ঘাস, ছেঁড়া আসন, জলের পাত্র সাদা রঙের একটা কচি বাচ্চার সেবাযত্নের বহর দেখে বাবা বোধ হয় ধীরে ধীরে সংবিৎ ফিরে পেলেন। কিছু বললেন না। সোজা শোবার ঘরে ঢুকে বললেন, হয়েছে, এবারে নাক ডাকা বন্ধ কর বাবাধন। সঙ্গে সঙ্গে পিলু কেমন নির্জীব হয়ে গেল। নাক ডাকল না আর।

    বললেন, ওঠ। কথা আছে।

    পিলু উঠে বসল।

    বললেন, নাম এবার।

    পিলু নেমে এল।

    —কোথা থেকে চুরি করেছিস?

    —চুরি না তো বাবা!

    —তবে লুকিয়ে রেখেছিস কেন?

    —তুমি দেখলে যদি কষ্ট পাও। বামুনের বাড়িতে ছাগল পুষতে হয় না যে বলেছিলে।

    -–সত্যি, তবে নবমী দিয়েছে? না বুড়িটাকে ঠকিয়েছিস? না বলে কয়ে নিয়ে এসেছিস?

    পিলু আমার দিকে তাকাল। পিলুর সাংঘাতিক বিপদের সময় আমি তার বড়দা হয়ে যাই। সেই একবার নবমীর কাছে আমাকে নিয়ে গেছিল। পিলুর প্রতি নবমীর ভক্তি স্বচক্ষে দেখেছি। পিলু আমার দিকে তাকিয়ে আছে—যদি আমি ওর হয়ে কিছু বলি।

    বাবা ফের বললেন, একটা গরীব ভিখিরি বুড়ি, তিন কুলে কেউ নেই, জঙ্গলে থাকে, কত কষ্টে থাকে আর তুই না বলে না কয়ে……

    পিলু বলল, আমাকে সত্যি দিয়েছে বাবা। চুরি করে আনিনি।

    পিলুর অসহায় মুখ দেখে আমারও কষ্ট হচ্ছিল। বাড়িঘর হয়ে যাবার পর বাবা মাঝে মাঝে দু- এক ঘা আজকাল পিলুকে দিয়ে থাকেন। এই পুত্রটির উপদ্রবে দু-একজন পড়শী ইতিমধ্যেই নালিশ জানিয়ে গেছে। এখন বাবা বাড়িতে কিছুদিন আছেন বলে, মার কৃতজ্ঞতার শেষ নেই এবং এই সূত্রে বাবার শাসনের অধিকার বোঝাই যাচ্ছে আজ একটু বেশি। মাও যে বলবে, হয়েছে থাক, নিয়ে যখন এসেছে থাক, নবমীকে জিজ্ঞেস করলেই হবে—সেই মাও কেমন চক্রে জড়িত হয়ে পড়ায় পিলুর হয়ে সাফাই গাইতে সংকোচ বোধ করছিল। অগত্যা আর কি করি, বললাম, না বাবা, পিলু, সেই ছেলেই নয়। নবমী ওকে দাঠাকুর ডাকে। নবমীকে পিলু ফল পাকুড় দেয়। পাতা কেটে দেয়। শুকনো কাঠ দিয়ে আসে। শীতে মরে যাবে ভেবে পিলু মাকে না বলে নবমীকে একটা পুরনো শাড়ি পর্যন্ত দিয়ে এসেছে। মারবে ভেবে মা তোমাকে কিছু বলেনি।

    বাবা পিলুকে আর একটা কথাও বললেন না। সহসা পুত্রগৌরবে বাবার মুখ উদ্ভাসিত হয়ে উঠল। আর সঙ্গে সঙ্গে দু-চোখ বাবার জলে ভার হয়ে গেল। বললেন, তোদের একটু ভাল কিছু খাওয়াতে পারি না। ছাগলের বাচ্চাটা বড় হয়ে যদি একটু তবু দুধ দেয়। তারপর কেমন দুঃখী মানুষের মতো নিজেকে মশারির মধ্যে গুটিয়ে নিলেন। আর বোঝাই গেল না, বাবা আমার এ-বাড়ি-ঘরেই আছেন; এ-বাড়িঘরেই থাকেন।

  • বারো

    বারো

    এই বনভূমিটা তার জঙ্গল গাছপালা নিয়ে আগে একরকমের ছিল, মানুষের বাড়িঘর হয়ে যাওয়ায় এখন অন্যরকমের। দূরে দূরে দরমার বেড়া দিয়ে মানুষজন ঘরবাড়ি কেবল তুলছেই। বনজঙ্গল ক্রমশ শ্রীহীন হয়ে যাচ্ছিল। তবু বাবা তাঁর বাড়িঘরে নিয়ে আসছেন যাবতীয় ফুল ফলের গাছ। যেমন বাবা এর মধ্যে গোটা কয়েক আমের কলম পুঁতেছেন। নারকেল গাছ দুটো। একটা সফেদা ফলের গাছ, পেয়ারা তিনটে, লেবুর কলম কিছু রোপণ করেছেন বাড়িটাতে। আর পেঁপে গাছগুলি বুড়ো হয়ে যাওয়ায় নতুন কিছু পেঁপের চারা। করমচা লাগিয়েছেন টক ডাল খাবেন ভেবে। অর্থাৎ দেশ বাড়িতে বাবার যা কিছু ছিল, এই আবাসে প্রায় তার সবই তিনি এনে হাজির করার চেষ্টা করছেন। কিছুই বাদ দিচ্ছেন না। এক একদিন বাবা ফিরতেন এক এক রকমের গাছের সংবাদ নিয়ে। একবার মাঝে বাবা দশ ক্রোশ দূরে হেঁটে গেছিলেন, শুধু শহরে মানু কাকার এক বন্ধু বলেছিল, বাড়িতে তার একটা জামরুল গাছ আছে। গাছটার কলম বাঁধার জন্য একবার যেমন দশ ক্রোশ হেঁটে গেছিলেন, আবার কলমটি আনার জন্যও তাঁকে দশ ক্রোশ ভাঙতে হয়েছিল।

    জঙ্গল সাফ করে যত এগিয়েছি, তত গাছগুলো বাবা পুঁতে গেছেন। শুধু বিঘা দুই ভূঁই শাক- সব্জীর জন্য আলাদা রেখে দিয়েছেন। আর বাবার গাছপালা-অন্ত প্রাণ ছিল বলে, এক একটা গাছের পরিচর্যায় বড় সময় দিতেন। ঋতু বদলের সঙ্গে গাছের গোড়া কুপিয়ে সামান্য শেকড়-বাকড় আলগা করে বর্ষার জল খাওয়াতেন। কোন গাছে কি সার দরকার বাবার চেয়ে কেউ ভাল জানত না। ফলে এই বছর দুই যেতে না যেতেই জমির রুক্ষ ভাবটা কেটে গেছে। ছায়া শীতল এক সুষমা বাড়িটার চারপাশে গড়ে উঠেছে, আমরা ধীরে ধীরে টের পাচ্ছি। আর বাবার সঙ্গে এই গাছপালা, কুকুর, ছাগলছানা বাড়িঘর আমাদের নতুন এক সাম্রাজ্য। দূরে রাজবাড়ি। যেখানে পূজায় মেলা বসে, যাত্রাগান হয়। হাতী দেখা যায়। শহরে গেলে সুন্দর সুন্দর মেয়েদের দেখা যায় ফ্রক পরে স্কুলে যাচ্ছে। নিমতলায় গেলে আজকাল মানুষজনের অনেক মুখ দেখা যায়। আর রয়েছে মাঠ, বাদশাহী সড়ক, ল্যাংড়া বিবির হাতা, বিষ্ণুপুরের কালীবাড়ি। পৌষে মেলা বসে। এইসব মিলে আমাদের ঘরবাড়ির চারিদিকে বেঁচে থাকার এক আশ্চর্য রহস্যময়তা গড়ে উঠেছিল। বাবা কত সহজে আমাদের একটা নতুন পৃথিবী উপহার দিলেন।

    যারা বাড়িঘর করছে, অথবা নতুন বাড়িঘর করে চলে এসেছে, তারা অনেকেই সপরিবারে আজকাল আমাদের বাড়ি আসে। মা তাদের বসতে দেয়। বিকেলবেলায় মা মায়াকে নিয়ে কখনও নতুন নতুন বাড়িতে বেড়াতে যায়, গল্প করে এবং কখনও দেখা যায়, ওদের কেউ দিয়ে গেছে বড় একটা লাউ। পঞ্চানন চন্দ, কাঙ্গালী আইচ সকাল হলেই আসে। ঠাকুরঘরের দাওয়ায় মাথা ঠোকে। চরণামৃত নেয়। মুখে মাথায় মাখে। ওদের ছেলেরা মেয়েরা মাকে মাসিমা ডাকে। বাবাকে মেসোমশাই। কত দূর দেশে সবার বাড়িঘর ছিল। অথচ সব কিছু ফেলে আসার শোক ক’দিনেই মানুষের বুঝি উবে যায়। নতুন এক জীবন, মানুষেরা বেঁচে থাকার জন্য তৈরি করে নেয়। বাবা ট্রেনে এখন কোথাও গেলে টিকিট কাটেন। বিনা টিকিটে ভ্রমণ করা আজকাল পছন্দ করেন না।

    এরই মধ্যে একদিন বাবা একটি খবরের কাগজ নিয়ে এলেন। এই কাগজ আমরা বাড়িতে বসে গোল হয়ে প্রথম পড়ি। বাবা কাগজটা সারাদিন পড়লেন। পরদিনও পড়লেন। বাবার কাছে খবরের কাগজ পড়াটা একটা সম্ভ্রমের ব্যাপার। বাবা কাগজের খবরগুলি নিয়ে নিবারণ দাসের আড়তে সন্ধ্যায় ঘুরে এলেন। এবং সব খবর দিয়ে ভাব দেখালেন বাবা খুব হেজিপেঁজি মানুষ আর নন। পূজার মাস আসছে, একটা দুর্গাপূজার বায়না পাওয়া যায় কিনা, সেই আশায় তিনি প্রায়ই বহরমপুরে গিয়ে মানুকাকার বাসায় আজকাল বসে থাকছেন।

    আর আসা যাওয়া করতে করতে একদিন বাবা খুব বড় একটা খবর নিয়ে এলেন। বললেন, বুঝলে ধনবৌ, কালুবাবুর মা’র কাজ। খুব দেবে থোবে মনে হয়। বেলডাঙা স্টেশনে নেমে যেতে হবে। খুবই ধনী ব্যক্তি কালুবাবু। একজন নিষ্ঠাবান ব্রাহ্মণের খোঁজে এসেছিল মানুর কাছে। তা কালই রওনা হয়ে যাব। মানুকে বলে রেখেছি, শহরেও তো অনেক সার্বজনীন পূজা হয়—একটু খোঁজখবর রাখিস। বিলুটা তো বড় হয়ে গেছে। ওকে তন্ত্রধার করে নেব। কিরে পারবি না?

    তন্ত্রধারের কাজ কি আমি জানি। ধুতি পরতে হবে। নামাবলী গায়ে দিতে হবে। দেবীর সামনে আসনে বসে পুরোহিতদর্পণ আওড়ে যাব। মন্ত্র শুনে শুনে বাবা দেবীর নামে মন্ত্রপাঠ করবেন। বাবাকে কি বলব বুঝতে পারছিলাম না। এতসব মানুষের মধ্যে আমি বাবার পুত্র, আমার খালি গা, জোরে জোরে মন্ত্রপাঠ, দেবীর মুখে গর্জন, ধুপ ধুনোর গন্ধ, চন্দনের গন্ধ আর আমি বাবার পুত্র হয়ে বসে আছি ভাবতেই ভারি বিভ্রমে পড়ে গেলাম। বাবাকে ঠিক আগের মতো আর অত সহজে বলতে পারলাম না, হাঁ পারব বাবা। কি যেন একটা সংকোচ অথবা লজ্জা বলা যেতে পারে মনের মধ্যে তিরতির করে মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে।

    বাবা ফের বললেন, অন্য তন্ত্রধার নিলে সে তো ভাগ নেবে। পুরোহিত বরণ পাবে। পাঁচ দশ টাকা দক্ষিণা পাবে। সেটা তুই গেলে ঘরেই আসবে। কোনো অসুবিধা হবে না। যেখানে ঠেকে যাব, সেখানে একটু ধরিয়ে দিবি।

    মা বলল, পূজার দেখা নেই। হবে কি হবে না এখন থেকেই….

    –এই তো ধনবৌ, সবটাতেই আগ বাড়িয়ে বাধা। হবে না কে বলেছে! কী হয়নি। তারপর কালুবাবুর মতো ধনী ব্যক্তির বাড়িতে বাবার চণ্ডীপাঠে আমন্ত্রণ—কোথায় ওঠা গেছে, ধনবৌ বুঝেও কেন যে বোঝে না বাবার মুখ দেখে এমন মনে হল আমাদের।

    বাবা ফের বললেন, বিগ্রহের কৃপায় সবই হচ্ছে, বাকিটুকু হবে। একটা গরু হয়ে গেলে দেখবে, তোমার আকাঙ্ক্ষার কত নিবৃত্তি।

    আমরা বুঝতে পারলাম, বাবার মনে শুধু এখন একটাই দুঃখ, সন্তানদের পাতে সামান্য দুধ দিতে পারছেন না। দুঃখটা ঘোচাবার তালে আছেন সেটা ক’দিন থেকে বাবার কথাবার্তা থেকেই বুঝতে পারছি। এখন শেষ পর্যন্ত ব্যাপারটা কতদূর গড়ায় সেটাই দেখার বিষয়।

    পিলু পাশেই ছিল। ছাগলের বাচ্চাটার জন্য একটা খোঁয়াড় তৈরি করছে। সে বলল, দাদা না গেলে আমি যাব বাবা। আমি ঠিক পারব।

    আমি বললাম, তুই গেলেই হয়েছে। পরের বারে বাবা আর পূজাই পাবেন না।

    পিলু বলল, কেন পাবেন না?

    মা বলল, লোকে ভাববে ছানাপোনা দিয়ে কি কাজ হয়। আর তন্ত্রধার হেলাফেলার কাজ না! ঠাকুরমশাই-এর কি ভীমরতি হয়েছে!

    বাবা খুব গম্ভীর গলায় বললেন, পারলে পিলুই পারবে। তোকে পিলু আমি সব শিখিয়ে দেব। এবং কথা হল, একটা পুরোহিতদর্পণ বাবা যে করেই হোক সংগ্রহ করবেন। কোথায় যে পাওয়া যেতে পারে, পঞ্জিকাটা না হয় প্রতিবছর নিবারণ দাসই এনে দেয়, কিন্তু পুরোহিতদর্পণ! বাবার বোধহয় মনে হল, কালুবাবুর কাছে তাঁর এই বাসনা নিবেদন করলে তিনি দয়াপরবশে দিয়েও দিতে পারেন। মানুষই তো দেয়। তবে আর ভাবনা কেন

    অবশ্য বাবার কাছে একটা পুরনো পুরোহিতদর্পণ থাকার কথা। দেশ বাড়িতে দুর্গাপূজা বাঁধা ছিল। আসার সময় ওটা আনতে ভুলে গেছেন, না হারিয়ে গেছে বাবার কথাবার্তা শুনে বোঝা গেল না। শুধু বললেন, কাল চণ্ডীপাঠ। বোধহয় বাবা এখন মনে মনে হেঁকে উঠবেন, কাল চণ্ডীপাঠ। কতবড় একটা ঘটনা এটা ছেলেরা যদি বুঝতো! বাবা সকাল সকাল স্নান করলেন। ঠাকুরঘরে আরও সকালে ঢুকে গেলেন। একটা নতুন গামছায় বাবার সব অমূল্য গ্রন্থাদি সযত্নে বাঁধা। ঠাকুরের সিংহাসনের ওপর ওটা রাখা থাকে। বাবার যা কিছু জরুরী কাগজপত্র, সবই ঐ গামছায়। এমন কি দলিল দস্তাবেজ। তাছাড়া বাবার ধারণা, ঠাকুরের মাথার ওপর থেকে হাত দিয়ে কেউ কিছু সরাবার তালে থাকলে, অপহরণকারী ধনে জনে মারা পড়বে। ফলে টাকা পয়সা ঐ একটা গামছায়। ঠাকুরঘরে যেহেতু আমার প্রবেশ করার অনুমতি আছে, সিংহাসনের সবটাই ঘেঁটেঘুঁটে দেখার সৌভাগ্য হয়। বাবার গামছার পুঁটলি খুলে যা যা দেখেছিলাম—একটা তালপাতার পুঁথি। কতকালের জানি না। স্বহস্তে লিখিত কার সেটা বাবা নিজেও জানেন না। বাবার বাবার, না তস্য বাবার, কোন বাবার জানা ছিল না বলে, আমার পিতৃদেব সেটি লাখ টাকার শামিল ভাবতেন। ওতেই পুরো চণ্ডীর বর্ণনা আছে। নিবারণ দাসের দেওয়া পঞ্জিকা, একটা রুদ্রাক্ষের মালা আর নানারকম গাছগাছালির গুণাগুণের একটি বই। দুটো তামার পয়সা। কাশীর কোন এক সাধু বাবাকে দিয়েছিল। এই পয়সার গুণে সংসারে কোনো অপমৃত্যু ঘটবে না। একটা আসন, ওটা কার দেওয়া বাবা আজ পর্যন্ত বলেননি। আসনটাতে বাবা বসেন না। সব সময় তোলা থাকে। আর কিছু লাল নীল পাথর। এগুলি দিয়ে কি হবে বললেও বাবা ভীষণ অহংকারী হয়ে যেতেন। রেখে দাও। তোমাদের কতদিন বলেছি, আমার জিনিসে হাত দেবে না। কিছু ভূর্জপত্র। সঙ্গে আমার আর পিলুর ঠিকুজী কুষ্ঠি। গামছার পুঁটলিটাতে যখন পুরোহিতদর্পণটা নেই, তখন সেটা খোয়া গেছে ধরে নেওয়া গেল। থাকলে ওটা পুঁটলিতেই থাকত।

    কোথাও পূজা-আর্চা থাকলে বাবা খুব সকাল সকাল ঠাকুর ঘরে ঢুকে যান। সূর্য উঠতে না উঠতে কোনো দিন পুজাও শেষ হয়ে যায়। সকালে প্রাতঃস্নান সেরে নেন তাড়াতাড়ি। জোরে জোরে মন্ত্রপাঠ করেন। এবং গলায় পৈতার যে কী মাহাত্ম্য বাবাকে এই সময়টায় না দেখলে বোঝা যাবে না। একেবারে পরম নিষ্ঠাবান মানুষ। পৃথিবীতে হিংসা-দ্বেষ আছে, চুরি-চামারি, কোর্ট-কাছারি আছে, যুদ্ধ আছে, সিনেমা- বায়স্কোপ আছে, নাটক-নভেল আছে কিছুতেই বিশ্বাস করা যেত না। শুধু ঠাকুরঘর, আমরা ক’জন আর মা’র ব্যস্ততা বাবার ব্যস্ততা, ফুল জল, তিল, তুলসী, দূর্বা প্রভৃতির মধ্যে বাবা একসময় ঢং ঢং করে ঘণ্টা বাজিয়ে শাঁখে ফুঁ দিয়ে কাঁসি বাজিয়ে যখন বের হতেন, তখন হয়তো পিলু দুলে দুলে পড়ছে। বাবা বাড়ি থেকে তাড়াতাড়ি বের হচ্ছে সুবাদে পিলুর পড়ায় এত উৎসাহ। যত খুশী থাকবেন, তত তাড়াতাড়ি হবে কাজকর্ম। বের হতে সময় লাগবে না। পিলু সুপুত্র হওয়ার তখন প্রাণপণ চেষ্টা করত।

    আজ বাবার কোথাও যাবার কথা নেই। পূজা-আর্চা থাকলে, ঘটা করে আগের দিনই সবাইকে বাবা জরুরী খবরটা দিয়ে রাখেন। মায়া খুব সকালে উঠে ফুল দুর্বা তুলে রাখে। ভাইটা মা’র সঙ্গে সঙ্গে উঠে পড়বে ভেবে, আমার পাশে রেখে যায়। বাবাকে জলখাবার যা হোক কিছু, এই মুড়ি খৈ অথবা যবের ছাতু। বাবা যবের ছাতু জলে ভিজিয়ে গুড় দিয়ে খেতে খুব ভালবাসেন। মাকে তার আগে ঘরদোর লেপে ফেলতে হয়। ঠাকুরঘরের বাসনপত্র মেজে রাখতে হয়। বাবার সঙ্গে মা’রও কাজের তখন অন্ত থাকে না। অথচ আজ এত সকালে কেন বাবা ঠাকুরঘরে প্রবেশ করলেন বোঝা গেল না। পিলু মাদুর বিছিয়ে পড়তে বসে, দেখে বাবা ঠাকুরঘরে পদ্মাসনে বসে আছেন। সে ভেবে পেল না, সুপুত্র হবে, না ছাগলটাকে নিয়ে ঘাস খাওয়াবে এখন। বাবার তো যাবার কথা নেই কোথাও। সে তবু খুব ভাল ছেলের মতো বলল, বাবা, তুমি কোথাও যাচ্ছ?

    —কেন রে?

    —না এমনি, এত সকালে ঠাকুরঘরে তুমি……

    বাবা বললেন, পড় পড়। লেখাপড়া করে যে গাড়িঘোড়া চড়ে সে। কেবল আমি কখন বের হব সেই তালে থাকে।

    পিলু ধরা পড়ে গিয়ে খুব লজ্জায় পড়ে গেল। সে পড়তে থাকল গলা ফাটিয়ে।

    ছাগলের বাচ্চাটা কি মরে গেছে। কোনো সাড়াশব্দ নেই। সে দু-পাতা পড়ে মাকে বলল, বাচ্চাটা রা করছে না কেন মা?

    বাবা ঠাকুরঘর থেকেই বললেন, বাচ্চাটা রা করছে না কেন তা তোমার মা কি করে বলবে?

    —আমি একবার দেখে আসব?

    বাবা বুঝতে পারলেন বুঝি পুত্রটি বাচ্চাটা সম্পর্কে নাছোড়বান্দা। বললেন, দেখে আয়। না দেখলে তো শাস্তি হবে না। দেখে এস। তারপর একটু পড়ে আমার ঘরবাড়িকে উদ্ধার কর।

    বাচ্চাটা দেখে এসে পিলু বলল, খুব খিদে পেয়েছে বাবা।

    কার খিদে পেয়েছে, পিলুর না বাচ্চাটার ঠিক বোঝা গেল না। বাবা তখন পূজায় মগ্ন হয়ে পড়েছেন। এখন পিলু পড়ল কি পড়ল না, সংসারে কোথায় কি হচ্ছে জানার কোনো উৎসাহ নেই। তিনি আচমন করার পর কোনো কথাই বলবেন না। তারপর গণেশের পূজা আরম্ভ হবে। বাবা জোরে জোরে বললেন, খর্বং স্থূলতং গজেন্দ্র বদনং লম্বোদর সুন্দর এবং আরও সব মন্ত্রপাঠ আরম্ভ হলে পিলু বইটই ভাঁজ করে প্রথম কুকুরটাকে ডাকল, মনা মনা। মনা তো ছুটে এসে পায়ে গড়াগড়ি। সে এবার বাচ্চাটাকে বগলে নিল। পিলুকে বের হয়ে যেতে দেখে মা আর চুপ করে থাকতে পারল না—পিলুরে তোর কি হল? সাত সকালে কিছু মুখে না দিয়ে বের হয়ে যাচ্ছিস। তোর বাবাকে ডাকবো! পড়াশুনা লাটে ওঠালি!

    পিলু জানে সব অহেতুক। বাবা আর কথা বলছেন না। যতই মা চেঁচামেচি করুক বাবা পূজা শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোন বাক্য নয়। কটু বাক্যও নয়। বরং মা’র চেঁচামেচি যত আরম্ভ হবে, বাবার মন্ত্রপাঠের স্বরগ্রাম তত উঁচুতে উঠবে। ততক্ষণে মাও আরম্ভ করে দিয়েছে যেমন বাপ, তেমন ছেলে। একটা কথা বলছে না! হ্যাঁগো শুনতে পাচ্ছ, পিলু দ্যাখো কোথায় বের হচ্ছে।

    —কোথায় বের হব আবার। বাচ্চাটার খিদে পায় না! একটু ঘাসপাতা ছিঁড়ে খাওয়াব তাও তোমার সহ্য হয় না মা। না খাইয়ে শেষ পর্যন্ত তোমরা সবাই বাচ্চাটাকে মারবে!

    অকাট্য কথা। বাচ্চাটা খেল কি খেল না সংসারে আর কারো দেখার অবসর নেই। সেই দেখে থাকে। বাচ্চাটাকে নিয়ে এসে না খাইয়ে মেরে ফেলে সে তো পাপের ভাগী হতে পারে না। সুতরাং সে সোজাসুজি কিছু গ্রাহ্য না করে বের হয়ে গেল। বগলে ছাগলের বাচ্চা, পায়ে পায়ে কুকুরটা। পিলু এখন সোজা হেঁটে চলে যাচ্ছে। ঘরবাড়ির প্রতি তার এখন এতটুকু আকর্ষণ নেই। বাবা যতই মন্ত্রপাঠ করুন, যতই রাগে দুঃখে স্বরগ্রাম একবার উঁচুতে একবার নিচুতে নামিয়ে আনুন, পিলুর কিছু আসে যায় না। আসলে সে বাবাকে বোবা বানিয়ে রেখে চলে যাচ্ছে। ফিরে আসার পর এই বাবা আর সেই বাবা থাকবেন না। এইটুকুই পিলুর ভরসা। সে এখন পরিত্যক্ত বনভূমিতে, নবমীর ইঁটের ভাটায়, ঝোপ জঙ্গলে রাজার মতো ঘুরে বেড়াবে। আমরা বুঝে নিয়েছি, বাবা বিদেশে, পিলু স্বদেশে দু’জনই সমান। দুজনে কোন ফারাক নেই। পিলু ফিরে এলে মা’র সামনে বাবার তখন কোন সাহসও নেই কিছু বলার। কারণ কোথাকার জল কতদূর গড়াবে কেউ বলতে পারে না। বোবার শত্রু নেই। এই মহামন্ত্র সম্বল করে বাবা তখনকার মতো সব সামলে নেবেন।

  • তেরো

    তেরো

    এইভাবে আমাদের দিন যায়। বাবা কালুবাবুর মা’র কাজে চণ্ডীপাঠের জন্য সকালে রওনা হয়ে গেলেন। বেলডাঙ্গা থেকে বাবাকে সাত ক্রোশের মতো পথ হেঁটে যেতে হবে। সকালের ট্রেনে স্টেশনে নামলে, রাতে রাতে পৌঁছে যাবেন। পরদিন কাজ। বাবা নামাবলী গায়ে বগলে পুঁথি, হাতে ব্যাগ। আমরা বাবাকে বাদশাহী সড়ক পর্যন্ত এগিয়ে দিতে গিয়েছি। বাবা যেতে যেতে পিলুকে অমৃতবাণী শোনাচ্ছিলেন। পিলু এক কান দিয়ে শুনছে, অন্য কান দিয়ে বের করে দিচ্ছে।

    বাবা বললেন, তোমরা ভাল হয়ে থেকো।

    পিলু বলল, থাকব বাবা।

    —মা’র কথা শুনবে।

    পিলু বলল, তুমি কবে ফিরবে বাবা?

    খুবই বিস্মিত গলায় বাবা বললেন, কাজ হলেই ফিরে আসব।

    কবে কাজ শেষ হবে বাবা?

    —কালই হবে।

    —কতদিন লাগবে ফিরতে?

    মনে হল বাবা হাঁটতে গিয়ে হোঁচট খেলেন। বললেন, কালই ফিরে আসতে পারব বোধহয়।

    আমি বললাম, বোধহয় কেন বাবা?

    আসলে এত সব প্রশ্ন করার সাহস আমার কিংবা পিলুর কারো নেই। বাবা আমার দিকে তাকালেন। পিলুটা না হয় বেয়াদপ হয়ে গেছে, মায়ের আসকারাতে জাহান্নমে যেতে বসেছে, তাই বলে তুমিও। বাবা আমার দিকে তাকিয়েই কিছু আঁচ করতে পারলেন। বললেন, তোমার মাকে বল, কাল রাতেই ফিরব।

    সকাল থেকেই মা’র সঙ্গে বাবার বাক্যালাপ বন্ধ ছিল। কেন বাক্যালাপ বন্ধ থাকে আমরা দু ভাই আজকাল কিছুটা বুঝি। আজকাল মা মাঝে মাঝে কেন যে যা দেবী সর্বভূতেষু হয়ে যায়! কেবল গজগজ করে। কথা দিয়ে বাবা কথা রাখে না, একটা মানুষ বাইরে বাইরে ঘুরলে, খবর না পাওয়া গেলে কত চিন্তা হয়, মানুষটার যদি সেই আক্কেল থাকে। ছেলেরা বড় হয়ে গেল, এই ধরনের অজস্র কথা, আর যত অভাব তখন মা’র বেড়ে যায়। মা খুব সামান্য উপকরণ সম্বল করে বাবার সঙ্গে কুরুক্ষেত্র বাধিয়ে দিতে পারে তখন।

    বাবাকে বাদশাহী সড়ক পর্যন্ত এগিয়ে দিলাম আমরা। বাবা হেঁটে হেঁটে চলে যাচ্ছেন। আমাদের দিকে হাত তুলে বললেন, বাড়ি যা। রাস্তায় অন্য সব অনেক কাজের কথাও বলেছেন। তার মধ্যে আমার বড় কাজ মানুকাকার কাছে যাওয়া। বাবার জন্য কার কি হয় জানি না, আমার ভারি কষ্ট হয়। গতকাল বাবা সারাদিন চণ্ডীপাঠ করে ঝালিয়ে নিয়েছেন। সংসারে কি হল না হল, একবারও মুখ বার করে দেখেননি। পিলু কখন ফিরে এল, কখন কে খেল, ভাইটা এখন হাঁটতে পারে, দৌড়তে পারে, সেই ভাইটা দুবার ঠাকুরঘরে মুখ বাড়িয়ে ডেকেছে, বাবা, বাবা, কোনো উত্তর দেননি। চণ্ডীপাঠের মধ্যে এতই নিমগ্ন ছিলেন যে মা না পেরে আমাকে বলল, দেখ তো তোর বাবার বাহ্যজ্ঞান আছে কি না? আমি মা’র কথায় কোনো গুরুত্ব দিইনি। কিন্তু মা না খেয়ে বসে আছে। বাবা বাড়ি থাকলে যতই বেলা হোক মা খায় না। বাবার খাওয়া হলে মা পাতেই বসে যায়। বেলা পড়ে গেছে কখন, গাছের ছায়া লম্বা হতে শুরু করেছে এবং যখন সাঁজ নেমে আসার দেরি নেই, তখনই মা না পেরে কথাটা আমাকে বলেছিল। মা’র কথায় গুরুত্ব না দেওয়ায়, পিলু দেখলাম দায়িত্বটা সহজে নিয়ে নিল। সে সোজা ঠাকুরঘরে গলা বাড়িয়ে ডাকল, বাবা।

    বাবা চোখ উন্মীলন করে সামান্য তাকালেন। তারপর ফের চোখ বুজে চণ্ডীপাঠে লিপ্ত হতে গেলে, সে বলল, বাবা।

    বাবা সোজা হয়ে বসলেন।

    পিলু বলল, মা জানতে চেয়েছে….

    বাবা তাকিয়েই আছেন। বোধহয় সামান্য বাকি আছে। সেটুকু শেষ করে কথা বলবেন।

    পিলু শেষ করল কথাটা, মা জানতে চেয়েছে, তোমার বাহ্যজ্ঞান আছে তো!

    বাবা চণ্ডীপাঠ অসমাপ্ত রেখেই উঠে পড়লেন। শুধু বাইরে এসে বলেছিলেন, চণ্ডীপাঠে ঘরবাড়ির সব অকল্যাণ দূর হয়। জীবনে খাওয়াটাই সব নয়।

    মা খোঁচা হজম করে গেল। তখনকার মত কিছু বলল না, পরে বাবাকে খেতে দিয়ে নিজে আর খেল না। খাওয়া নিয়ে খোঁটা শেষ পর্যন্ত। বাবা তারপর সাধ্য সাধনা করলেন অনেক। মা’র দিক থেকে সাড়া পাওয়া যায়নি। এবং আজ সকালেও অভিমানবশে মা জলগ্রহণ করেনি। বাবার অনেকদূর পর্যন্ত যেতে হবে বলে জলগ্রহণ না করলে চলে না। বাবার জন্য মা সবই রান্নাবান্না করেছে। বরং অন্যদিনের চেয়ে একটু বেশিই করেছে, নিজে খায়নি। বাবা বলেছেন কপাল। দুর্ভাগ্য বলতে পার। আমাকে বলেছে, তোমার মা’র সবই ভাল, তবে বড্ড জেদ। যাই হোক, আমি তো কাজে যাচ্ছি, খেতে বল। না খেয়ে যেন থাকে না। গৃহলক্ষ্মী অভুক্ত থাকলে ঘরবাড়ির অকল্যাণ হয়।

    বাড়ি ফিরতেই মা বলল, কবে ফিরবে কিছু বলে গেল?

    পিলু বলল, কালই।

    —আর কাল! মা কেমন বিমর্ষ হয়ে গেল।

    আমি বললাম, বাবা বলেছে তোমাকে খেয়ে নিতে। না খেয়ে থাকলে নাকি অকল্যাণ হয়।

    বাবা বাড়ি নেই বলে মা’র কাজে কর্মে কোনো তাড়াহুড়ো নেই। প্রথম দাওয়ায় বসে রাস্তায় বাবার সঙ্গে আমাদের কি কি কথা হল সব শুনল। তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বলল, হরেন মল্লিক এসেছিল। মঙ্গলচণ্ডী পূজা।

    বাবা বাড়ি না থাকলে সাধারণ পূজা-আর্চার কাজ এখন আমাকেই করতে হয়।

    পালা-পার্বণে বাবা আজকাল একা পেরে ওঠেন না বলে, লক্ষ্মীপূজা, সরস্বতী পূজার সময় বাড়ি বাড়ি আমিও যাই। প্রথম প্রথম খুবই ভুল হত। বাচ্চা ঠাকুর বলে যজমানরা ক্ষমাও করে দিত।- ও কর্তা সংকল্প করলেন না। ও কর্তা প্রাণ প্রতিষ্ঠা করলেন না। মূর্তি পূজা থাকলে প্রায়ই ভুল হত চক্ষুদানের সময়। কাজল যেমনকার তেমন পড়ে থাকত। একটুও আঁচড় পড়ত না। মাঝে মাঝে মন্ত্রপাঠ গুলিয়ে ফেলতাম—মনে থাকত না, বাবার কথামত তখনই গায়িত্রী জপ করে সংকট থেকে ত্রাণ পেতাম। বাবার মতে গায়িত্রী পাঠের মতো মহামন্ত্র আর কিছু নেই। বামুন ঠাকুরের ওটা ব্রহ্মাস্ত্র বলতে পার। সুতরাং পূজায় অসুবিধায় পড়লেই বাবার ব্রহ্মাস্ত্রটি প্রয়োগ করতাম। ফলে পূজা-আর্চায় ভয় ভীতির চেয়ে, খেয়ে না থাকার কষ্টটাই বেশি। যেমন এই এখন, আমাকে স্নানটান সেরে সড়কের ও-পাশে যে নতুন কলোনি হয়েছে, যেখানে হরেন মল্লিকরা থাকে সেখানে ছুটতে হবে। তারপর বাড়ি ফেরা বাড়ির বিগ্রহে ফুল জল দেওয়া এবং এত সবের পর খাওয়া। দুপুর গড়িয়ে যাবে। মেজাজটা খুবই বিগড়ে গেল। বললাম, পিলুকে বলো করতে। আমি পারব না।

    পিলু এক পেট খেয়ে এক পায়ে খাড়া। কারণ দ্বিতীয়বারের সময় হতে হতে সে দুটো পূজাই শেষ করে ফেলতে পারবে। পূজা করার সময় সে বিধি বিধান গ্রাহ্য করে না। মোটামুটি গণেশের পূজা আর পঞ্চদেবতার পূজা জানা আছে। বাকিটা তো এষ গন্ধ পুষ্প, অথবা দীপায় নম, নৈবেদ্যায় নম—আর বামুন ঠাকুর যা বলবে—সবই ঈশ্বর দু হাত পেতে করজোড়ে গ্রহণ করবে—সুতরাং তার ভয় ভাবনা এত কম যে, মঙ্গলচণ্ডীর ধ্যানের সময় সে অত্যন্ত তদগতচিত্তে গণেশের ধ্যান জপ করে যাবে। বিন্দুমাত্র সংশয় থাকবে না কারো যে সে এক দেবতার পূজা করতে এসে অন্য দেবতার পূজা সেরে উঠে যাচ্ছে।

    চুল বড় চোখ বড় পিলুর। চোখ দুটোতে ওর আশ্চর্য এক ভালবাসা। সব কিছুতেই সে পা বাড়িয়ে থাকে। পেট ভরা থাকলে, সব কাজই সে কত সহজে করে আসতে পারে। চারপাশে তাকালে বোঝা যায় পিলু সব সময় এই বাড়ি-ঘরের জন্য ঠিক বাবার মতো অহংকারী।

    আমি বললাম, তুই তো ঠিক মন্ত্র পড়িস না!

    —কে বলেছে!

    —তুই লক্ষ্মীর ধ্যান জানিস?

    —হ্যাঁ।

    —বল তো।

    —ওম পাশাক্ষ মালিকান্তুজ…এইটুকু বলেই বলল, তারপর কিরে দাদা?

    —ঐ তো!

    —কেন বাবা তো বলেছে না পারলে, গায়িত্রী পাঠ করতে।

    —তাও তুই করিস না।

    —দক্ষিণা কম দিলে কি করব?

    —দক্ষিণার সঙ্গে পূজার কি সম্পর্ক রে!

    —বারে সব জিনিসের দামদর থাকে, খাঁটি জিনিসের এক দাম, ভেজাল জিনিসের এক দাম, দক্ষিণা কম দিলে কম মন্ত্র, বেশি দিলে বেশি মন্ত্র।

    আমি মা’র দিকে তাকিয়ে বললাম, শুনছ মা, পিলু কি বলছে!

    মা বলল, ঠিকই তো বলছে। তোমার বাবার মতো হলে সংসার চলে না।

    সুতরাং ঠিক হল, পিলুই যাবে হরেন মল্লিকের পূজা সারতে। আমি যাচ্ছি না। সে কিছুক্ষণ ঘাসপাতা সংগ্রহের জন্য ব্যস্ত থাকল। ছাগলের বাচ্চাটা এই পরিবারের আর একজন হয়ে গেছে। তার নামকরণ পর্যন্ত করে ফেলেছে পিলু। অনেক ভেবেচিন্তে নাম রেখেছে রত্না। গতকাল থেকেই সংসারে পিলু, মায়ার মতো, মনার মতো বাচ্চাটা আমাদের এক পরিবারভুক্ত জীব। পিলুকে যদি কেউ বলে সংসারে তোমরা ক’জন প্রাণী, সে গর্বের সঙ্গে বলবে আটজন। দেশ থেকে আসার পর আরও দুজন বেড়েছে।

    এবং পিলু বাচ্চাটাকে ঘরবার করে থাকে। একটা বস্তা বিছিয়ে দেয়। হেগে মুতে বস্তাটা নোংরা করে ফেলে বলে, সন্ধ্যাবেলা দেখা গেল পিলু রত্নাকে প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। রত্নাকে বলছে, তোমার বড়ই স্বভাব খারাপ। মুতে নাও বলছি। রত্না যত ঘরের দিকে ছুটতে চাইছে, তত শক্ত হাতে দড়ি ধরে রেখেছে। বলছি না মুতে নিতে। মুতে নিলে রান্নাঘর নোংরা হয় না।

    দু’দশবার বলার পর সত্যি রত্না শিরদাঁড়া লম্বা করে দিল। এবং মুতে দিল। পিলুর অদ্ভূত আত্মতৃপ্তির হাসি। এই সংসারে মনার মতো রত্নাও তার কথাবার্তার মানসম্মান রাখছে। সে ঘরে নিয়ে রত্নাকে শুধু বেঁধেই রাখল না, রাতে খিদে পেলে যাতে খেতে পায়, সেজন্য কিছু ঘাসপাতা দড়িতে বেঁধে মুখের সামনে ঝুলিয়ে রাখল। ঘুম ভাঙলে চেঁচেমেচি করার সুযোগ পাবে না। সামনে দেখতে পাবে কচি ঘাসপাতা। শুধু একটাই ভয় পিলুর, শিয়ালে না নিয়ে যায়। এ জন্য সে মনাকে কয়েকবার শাসিয়েছে। পাহারা দেবার জন্য রান্নাঘরের ঠিক দরজার সামনে শুয়ে থাকতে বলেছে। এবং রাতে যখন পড়াশোনা সেরে খেতে বসেছি, দেখি, ঠিক রান্নাঘরের দরজার এক পাশে মনা মুখ তুলে বসে আছে। পিলু কিছুটা খেয়ে বাকিটা তুলে নিয়ে গেল। মনাকে খাইয়ে বলল, কোথাও যাবে না। তোমারও দেখছি বাউন্ডুলে স্বভাবে পেয়েছে। যখন খুশি যেদিকে চলে যাও। ঘরবাড়িতে ফেরার কথা মনে থাকে না।

    মা বলল, তোমরা সবাই একরকমের। শুধু মনাকে দোষ দিয়ে কি হবে।

    তারপর আমাদের এই বাড়িঘরে রাত ক্রমে গভীর হতে থাকে। টের পাই রত্না চোখ বুজে জাবর কাটছে, মনা ঘরের দাওয়ায় মুখ গুঁজে শুয়ে আছে, একটা পাতা পড়ার শব্দে সতর্ক, কান খাড়া হয়ে উঠছে। বাড়িঘরের গাছগুলি বর্ষার জল পেয়ে সতেজ — বনভূমিটা পায়ে পায়ে সরে যাচ্ছে। আর ইচ্ছে করলেই হাত বাড়িয়ে টোপরের মতো বাড়িটা তুলে নিতে পারছে না। মা শুয়ে শুয়ে কেবল সারাক্ষণ আমাদের সুসময়ের গল্প বলতে বলতে কখন ঘুমিয়ে পড়েছে। গল্পে সারাক্ষণ বাবার কথায় ঘুরে ফিরে আসছিল। বুঝতে পারি মা বাবার কথা ছাড়া আর কিছুই ভাবতে পারে না। মা হয়ত ঘুমিয়েও বাবার স্বপ্নই দেখছে। স্বপ্নে বোধহয় এই ঘরবাড়ির মাথার ওপর রয়েছে তেমনি আকাশ, দূরবর্তী নীহারিকাপুঞ্জ। বাবা নীলবাতি হাতে মাঠ পার হয়ে ক্রমে বাড়িঘরের দিকে এগিয়ে আসছেন।

  • চোদ্দ

    চোদ্দ

    যথারীতি বাবা তাঁর কথামত রাতে ফিরে এলেন না। মানুষটা আসবে ভেবে মা অনেক রাত পর্যন্ত জেগে বসেছিল। আমি রাত জেগে অঙ্ক কষছিলাম। বাকি সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে। মা দরজায় হেলান দিয়ে—কেমন নিরুপায় রমণীর মতো মুখ তাঁর। মাঝে মাঝে উঠোনের দিকে চোখ সরে যাচ্ছে। কোনো শব্দে মা সতর্ক হয়ে উঠছে। এবং সারা মাঠঘাট জ্যোৎস্নায় ডুবে। উঠোনে জ্যোৎস্না। গাছের মাথায় বনভূমিতে জ্যোৎস্না। যেন জ্যোৎস্না নিরিবিলি আকাশে বাতাসে উড়ে বেড়াচ্ছে। শুধু বাবা ফিরে আসেনি বলে সবই কেমন অর্থহীন মায়ের কাছে।

    একসময় বললাম, তুমি খেয়ে শুয়ে পড় মা।

    মা বলল, দেখি আর একটু।

    সুতরাং আবার দুটো ঐকিক নিয়মের অঙ্ক করে বর্গমূলে চলে এলাম। মা একসময় কেমন ছোট্ট বালিকার মতো উবু হয়ে বসল। আমার বইগুলির পাতা উল্টে গেল অযথা। বইয়ের ছবি দেখল। এক একটা ছবির নিচে কি লেখা আছে পড়ল। যেহেতু বইয়ের তাকটা সামনে, বইগুলি নামিয়ে আবার সুন্দর করে ভাঁজ করে তাকে সাজিয়ে রাখার সময় কেমন ছোট্ট বালিকা হয়ে গেল। মা’র পাশে বসে থাকতে এখনও আমার ভাল লাগে। মায়ের শরীরে এক আশ্চর্য ঘ্রাণ। অঙ্ক কষতে খুবই ভাল লাগছিল। বুঝতে পারি মা আমাকে মাঝে মাঝে সহসা চুরি করে দেখছে। মুখে সামান্য গোঁফের রেখা, আমি বাবার মতো বড় হয়ে যাচ্ছি, বোধহয় মা’র কোথাও ভেতরে সন্তান বড় হলে যে সুখ অথবা বাবার মতো একজন পুরুষমানুষ আমার মধ্যে জেগে উঠছে ভেবে কেমন মুহ্যমান। জননী গো বলতে ইচ্ছে হল একবার। আর তখনই মা’র দু ঠোঁট ভেঙে গেল। তাকিয়ে দেখি মা’র দু চোখ কি এক বেদনায় ভার হয়ে গেছে। বললাম, বাবা ঠিক আসবে।

    মা উঠে পড়ল। উঠোনে নেমে রাস্তাটার দিকে তাকিয়ে থাকল। এমনটা তো আমার মা ছিল না। বাবা ফিরে না এলে কখনও এমন বিচলিত বোধ করেনি। উঠোনে নেমে বললাম, বাবা তো প্রায়ই দেরি করে আসে। তবে এত ভয় পাচ্ছ কেন?

    মা বলল, তোরা বড় হয়ে যাচ্ছিস।

    বড় হয়ে যাচ্ছি বলে মা’র ভয়টা কোথায় বুঝতে পারলাম না। আমরা বড় হব না কাজ করব না, বাবার দুঃখ ঘোচাব না—তবে মানুষের ঘরবাড়ি দিয়ে কি হবে।

    মা লালপেড়ে শাড়ি পরেছে। মাথায় ঘোমটা। আকাশ নীল এবং কোথাও ঝিঁঝি পোকা ডাকছিল। বাবার গাছপালা মা’র চারপাশে কেমন প্রহরীর মতো সজাগ। তখন মা বলল, বড় হলে তোরাও তো তোদের বাবার মতো হবি। যাবি আর ফিরতে চাইবি না।

    তখন বাড়িঘরে দাঁড়িয়ে বুঝতে পারি কেউ আমায় দূরে ডাকে। সংগোপনে শহরের সেই ব্যালকনিটা মগজের মধ্যে ভরা থাকে। পায়ের কাছে গোলাপের টব। ইজিচেয়ারে বালিকা ফ্রক গায়ে দিয়ে শুয়ে থাকে। শীতের পাখিরা আকাশে বাতাসে ঘুরে বেড়ায়। এক একটা পালক নেমে আসে এবং জীবনের অর্থ পাল্টে যায়। বালিকার জন্য বুকে আমার কোথায় যেন টান ধরে গেছে। নিশীথে লণ্ঠনের আলোতে মা আমার মুখ দেখে ধরে ফেলেছে সেটা। বড় হয়ে যাচ্ছি ভেবে দুঃখটা কোথায় মা’র টের পেয়ে বললাম, মা তুমি ভেব না, আমরা এই বাড়িঘরেই থাকব।

    মা’র মুখে অদ্ভুত কূট হাসি ফুটে উঠল। জ্যোৎস্নায় সেই হাসিটুকু আমাকে সত্যি কষ্টের মধ্যে ফেলে দিল। একটা কথাও আর মাকে বলতে পারলাম না। চুপচাপ ঘরে ঢুকে মাথা গুঁজে থাকলাম। যেন আমি সত্যি এখন আগের মতো এই বাড়িঘরের জন্য টান অনুভব করি না। কেউ নদীর পাড়ে, অথবা গাছপালার অভ্যন্তরে এখন আমাকে নিয়ে হারিয়ে যেতে চায়। মা সেটা টের পেয়ে ভারি নিঃসঙ্গ বোধ করছে।

    তারপর মাও আর আমার সঙ্গে কোনো কথা বলল না। খেয়ে নিল। দরজা বন্ধ করে দিল। মশারির ভেতর ঢুকে যাবার সময় শুধু বলল, শুয়ে পড়ার সময় আলোটা কমিয়ে রাখিস। নিভিয়ে দিস না। মা’র আশা যে কোনো মধ্যরাতে বাবা ফিরে আসতে পারে। আলোটা সে জন্য কমিয়ে রাখতে বলল।

    শুয়ে পড়ার সময় মনে হল, খুবই নিস্তব্ধ ধরণী। এমন কি কোনো কীটপতঙ্গের আওয়াজ পর্যন্ত পাওয়া যাচ্ছে না। মা ঘুমিয়ে পড়েছে কি না বোঝা যাচ্ছে না। মা যে ঘুমোয়নি টের পেলাম, কারণ শুয়ে পড়ার সময় মা বলল, দরজায় খিল দিয়েছিস তো।

    বললাম, হ্যাঁ মা দিয়েছি। খুব সকালে ডেকে দিও।

    —সে দেব। তুমি এখন ঘুমোও।

    রাত থাকতে উঠে আবার অঙ্ক নিয়ে বসব ভেবেছি। আসলে এখন বুঝতে পারছি, অঙ্কটা আমার আদৌ করা হয়নি। পরীক্ষার দেরি নেই। দু-একদিনের মধ্যেই ঠিক খবর আসবে কোথায় কবে পরীক্ষা। হপ্তা দুই হয়ত সময় পাব আর। যে করেই হোক দশটা বিষয়েই পাস করতে হবে। নটা বিষয়ে পাস বাবার আমলে চলতে পারে, এই আমলে দশটা বিষয়ে পাস খুবই জরুরী।

    পরদিনও বাবা এলেন না। সকাল সকাল বহরমপুরে কাকার কাছে গেলাম। পরীক্ষা কবে, কোথায় জানা হয়ে গেল। পরীক্ষার সিট পড়েছে কলকাতায়, দ্বারভাঙা হলে। কলকাতা খুবই বড় শহর, মানুকাকা এমন বলেছে। সেখানে কোথায় উঠব, কার কাছে উঠব এই নিয়ে কাকা কিছুক্ষণ সমস্যা বোধ করলেন। তারপর কি ভেবে বললেন, নীলমণির দাদা তো কলকাতায় থাকে। শেষ পর্যন্ত বোধহয় ওখানেই তোমাকে উঠতে হবে।

    বাড়ি ফিরতে ফিরতে বেলা হয়ে গেল। পিলুর সোজা পথটায় না এসে ঘুরে এলাম। ও-পথটায় সেই ব্যালকনি—টবে গোলাপের গাছ, সামনে ছোট্ট বাগান এবং জানালায় বালিকার মুখ। ওদিক দিয়ে গেলে শুধু একবার সেই বালিকাকে দেখতে পাব ভেবে ঘুরে এসেছি। সে নেই। তাকে দেখতে না পেয়ে মনটা বেশ খারাপ হয়ে গেল। মানুষের বড় হতে হতে কি যে সব হয়। সারা রাস্তাটা বড়ই দীর্ঘ মনে হয়েছিল। মা বাবা ভাই বোন বাদে কোথায় যেন আরও একটা ছোট্ট পৃথিবী বাবার মতো আমি এখন কেবল খুঁজে বেড়াচ্ছি।

    বাড়ি এসে দেখলাম, মা বেশ উগ্রচন্ডা। মা ভীষণ গোলমাল বাধিয়ে দিয়েছে। পিলুকে সকালে বেদম প্রহার করেছে। মায়া ভয়ে ভয়ে মা’র কাছে ঘেঁষছে না। ছোট ভাইটা পড়ে গিয়ে রক্তপাত ঘটিয়েছে। সকালে যারা দিনক্ষণ তিথি-নক্ষত্রের খবর জানতে বাবার কাছে আসে তাদের সবাইকে বলে দিয়েছে, বাড়ি নেই। কবে ফিরবে বললে জানিয়েছে, সে তেনার মর্জি। অন্যদিন সকালে বাবার এসব কাজ আমিই করে থাকি। তিথি নক্ষত্র শুভদিন পঞ্জিকায় লেখা থাকে। কেউ ফিরে যায় না।

    ফিরতেই মা বলল, তোর মানুকাকা কিছু বলল?

    —কলকাতায় সিট পড়েছে।

    —তোর বাবার কথা কিছু?

    বুঝতে পারলাম, মা এখন বাবার খবরের জন্য খুব উদ্বিগ্ন। আমার পরীক্ষা নিয়ে মা’র কোনো মাথাব্যথা নেই। কি বলি!

    একটু ঘুরিয়ে বললাম, কালুবাবু খুব সদাশয় লোক। বাবার মতো মানুষকে পেয়ে ছাড়তে চাননি। দু-একদিন হয়ত ঘুরে ফিরে কালুবাবুর ঘরবাড়ি, চাষবাস দেখছেন।

    —মানুকাকা তোমায় কি বলল?

    —এই তো বলল।

    —বেশ। তাহলে তোমরাও এবার সদাশয় কালুবাবুর বাড়ি গিয়ে ওঠ। সংসারে আমার আর কারো দরকার নেই।

    বাবার ওপর এই প্রথম কেন জানি আমারও ভীষণ রাগ হল। সত্যি তো, আগে একরকমের দিন ছিল, কোথায় কে থাকছে, খুব একটা ভাববার ছিল না। বরং বাবা কোথাও গেলেই কিছু তখন হয়ে যেত। এখন কেন জানি মা’র এবং আমাদেরও সময় মতো বাবা না ফিরলে চিন্তা হয়। বাবা সেটা কেন যে বোঝেন না। মানুষের বাড়িঘরও হবে, বাউন্ডুলে স্বভাবও থাকবে সে হয় না। দুটো একসঙ্গে মানায় না। মা বোধহয় সেজন্যই বাবার ওপর এবার হাড়ে হাড়ে ক্ষেপে গেছে।

    মা বলল, তুমি বেলডাঙা স্টেশনে নেমে যেতে পারবে?

    —কোথায় যাব?

    —সদাশয় কালুবাবুর বাড়ি।

    –কত দু…র। সাত ক্রোশ রাস্তা, সোজা কথা!

    –স্টেশন থেকে সাত ক্রোশ দূর হয়ে গেল!

    অগত্যা আর কি করা! বললাম যাব।

    —কালই সকালে রওনা হয়ে যাবে।

    এ সময় কথা বাড়িয়ে লাভ নেই। পিলুটা মার খেয়ে বাড়িঘরের কাছে পিঠে নেই। মায়া রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে। ভাইটা মায়ার কোলে। সবাইকে মা সকালে বাড়িছাড়া করেছে। কেবল আমি বাকি। এ সময় কিছু বুঝিয়ে বলাও নিরর্থক। সব কিছুরই মা এখন অন্যরকম অর্থ দাঁড় করাবে। বললাম, ঠিক আছে, যাব।

    তারপরই বাবাকে উপলক্ষ করে সেই গজগজ করা, ছেলেরা মানবে কেন! ছেলেরা ভাল হবে কোত্থেকে। সব একরকমের। আমি না হয় কেউ না। ছেলেদের কাছে পর্যন্ত কথা রাখলে না।

    মা’র আঘাতটা কোথায় এতক্ষণে ধরা গেল। আর তখনই দেখি দূরে পিলু চিৎকার করছে, মা বাবা আসছেন। মা বাবা একটা গরু নিয়ে আসছেন।

    মা রাস্তা পর্যন্ত এগিয়ে গেছে। আমিও। পিলু মাঠ পার হয়ে জোরে ছুটে আসছে। আর চিৎকার— বাবা গরু নিয়ে আসছেন।

    বাবা অথবা গরু কিছুই রাস্তা থেকে দেখা গেল না। পিলু খবরটা দিয়েই ফের উল্টো মুখে ছুটতে থাকল। মুহূর্তের মধ্যে পিলু মাঠঘাট পার হয়ে বাদশাহী সড়কে উঠে গেল। আশ্চর্য দ্রুতগামী পিলু। তাকে দৌড়ে নাগাল পাওয়া খুবই অসম্ভব। মুহূর্তের মধ্যে সে অন্তর্হিত হয়ে যেতে পারে, আবার দেখা দিতে পারে। আর এত বড় একটা খবর, একটা সত্যি সত্যি আস্ত গরু বাবা নিয়ে আসছেন, সে স্থির থাকে কি করে! ডাকলাম, পিলু দাঁড়া।

    আমার ডাকে সে সহসা ঝোপঝাড়ের ফাঁক থেকে উঁকি দিল। বলল, আয়। তারপরেই ডুব। রাস্তার দিকে না গিয়ে সে লেংড়ি বিবির হাতার দিকে ছুটছে। আবার ডাকলাম, দাঁড়া পিলু।

    মা সেই বাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে। মায়া কিছুটা মাঠের মধ্যে আমি কালীর পুকুর পার হয়ে গেছি— পিলু আরও আগে। সে কোথায় বাবাকে দেখেছে, কতদূরে বোঝা যাচ্ছে না। না কি পিলুর সংশয় আছে, বাবা এই ফাঁকে না আবার অদৃশ্য হয়ে যায়। বাবা যা একখানা মানুষ। বাবার জন্য সকালে মায়ের জ্বালায় সে বাড়িছাড়া, সেই বাবাকে যখন কোথাও একটা আস্ত গরুর সঙ্গে আবিষ্কার করা গেছে তখন আর কিছুতেই ছাড়ছে না। সেই জন্যেই মনে হয় পিলু ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটছে। গরুটাকে নিয়ে সে তার বাবাসহ মায়ের কাছে ফিরবে।

    —ওরে পিলু দাঁড়া।

    আর দাঁড়া। সে একবার মুখ ফিরিয়ে বলল, আয় না। ছুটতে পারছিস না! সত্যি আমি আর ছুটতে পারছিলাম না। সড়কে এসে ভীষণ হাঁপিয়ে গেছি। দেখি, মায়া আমার পেছনে দাঁড়িয়ে আছে। বলছে, বাবা কোথায় রে দাদা?

    —দেখছি না তো।

    —গরুটা কোথায়?

    —কিছুই দেখছি না।

    —ছোড়দা কোন দিকে গেল?

    —লেংড়ি বিবির হাতায় ঢুকে গেল।

    আর তারপরই মূর্তিমান তিনজন, বাবা আগে, পিছনে গরুটা তার পিছনে মায়ার ছোড়দা। পাটক্ষেতের ভেতর থেকে বাবা একবার ভেসে উঠছে, গরুটা একবার ভেসে উঠছে। মায়ার ছোড়দা একবার ভেসে উঠছে, মেস্তা পাটের জমি, উঁচু নিচু বলে তিনজনেই আবার মেস্তা পাটের জমিতে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে। আমরা খুবই অধীর। কতক্ষণে বাবা এবং গরুটা দূরে আবার ভেসে উঠবে। ভেসে উঠেই আবার ডুবে গেল। এবং এভাবে আমার বাবা মায়ার ছোড়দা আর বাবার গরুটা পাটের জমির ওপর দিয়ে এগিয়ে আসতে থাকল। পেছনে দিগন্ত, তার মধ্যে একটা প্রাণীর দুদিকে দুজন, এবং আমরা সড়কে ভাই বোন, অনেক পেছনে, বাড়ির রাস্তায় মা, আর ভাই–বোঝাই যাচ্ছিল, বাড়িঘরে এটা কত বড় সুখবর। আমি যে আমি, যে একটু সব তাতেই ইয়ে ইয়ে ভাব সেও, শেষ পর্যন্ত খুশীতে মেস্তা ক্ষেতের মধ্যে ছুটে ঢুকে গেল। আর গরুটা নিয়ে যখন সে উঠে এল, তখন অবাক

    গরুটা কালো রঙের। শিং ভীষণ লম্বা। শিরদাঁড়া হাড়গোড় বের করা, এ পর্যন্ত সহ্য করা যায়। গরুটা খোঁড়া। চারটে পায়ের মধ্যে একটা নড়বড়ে। পাটা মাটিতে পড়ে না। ঘুরে ঘুরে নড়ে চড়ে বেড়ায়। কিন্তু রাস্তায় বাবাকে ঘাবড়ে দিতে মন চাইল না। কেবল পিলু একবার কি ভেবে বলল, বাবা গরুটার একটা পা ঠিক নেই, না বাবা?

    পিলু খোঁড়া শব্দটি উচ্চারণ করল না। যাতে বাবা মনে আঘাত না পান, সেজন্য সে পা ঠিক নেই বলল। বাবার যা চেহারা, হাঁটু অবধি কাদা উঠে গেছে, সারা রাস্তা হেঁটে এসে বাবা আমাদের দেখে খুবই গম্ভীর—বাবা এমনটা কখনও থাকেন না, বোঝাই যাচ্ছিল সারা রাস্তায় বাবা গরুটাকে নিয়ে বেশ ধকল সয়ে তবে পুত্র কন্যাদের জন্য দুধের বন্দোবস্ত করতে সক্ষম হয়েছেন।

    পিলু শুধু বলল, বাবা আমাকে দড়িটা দাও।

    বাবা বললেন, না পারবি না।

    —পালাতে পারবে না, দাও না।

    বাবা বললেন, তুই ধরলেই শুয়ে পড়বে। ওঠানো যাবে না।

    আমরা লক্ষ্য করলাম, বাবা গরুটার গলার কাছে বেশ রশির টান রেখেছেন। গরুটাকে বাবা টেনে টেনে নিয়ে আসছেন, আর কি যেন ভয়ে ভয়ে আছেন। বাড়ির কাছে এসে নেতিয়ে পড়লে, শুয়ে পড়লে কেলেঙ্কারির এক শেষ। এভাবে টেনে টেনে বাবা কতক্ষণে নিয়ে যাবেন, পিলুর তর সইল না। মা কতক্ষণ ধরে রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে, ভাইটা—সে লেজটা মুচড়ে দিল একটু তাড়াতাড়ি হাঁটবে বলে। সেই যেমন কে তেমন, পাটা ঘুরে ফিরে পড়ছে, এক পা এগুলে দু পা পিছিয়ে যায় মনে হচ্ছে। ততক্ষণে পিলু বুঝতে পারল, এমন একটা গরু নিয়ে তাদের বাবার পক্ষেই সম্ভব এতটা পথ হেঁটে আসা। কিন্তু এখন পিলু এবং আমাকে যে ভয়টা সব চেয়ে বেশি কাবু করছিল, সেটা আমাদের মা। আজ বাবার না জানি কি হবে। বাবা আমাদের সাহস দেবার মতো করে বললেন, অনেকটা পথ হেঁটে এসেছে তো, একটু নেতিয়ে পড়েছে। লেজ মুচড়ে কিছু হবে না।

    বাবা এবং গরুর দুরবস্থা দেখে পিলু খুবই সংকটে পড়ে গেল। বলল, জল আনব বাবা, গরুটার জলতেষ্টা পেয়েছে। বলেই সে ছুট লাগালে বাবা বিষম খেলেন। ডাকলেন আর তো দূর নেই। জলটল বাড়ি গিয়ে দেখানো যাবে। টানাটানিতে গরুর ছাল চামড়া উঠে আসতে পারে ভেবে বাবা আমাকে বললেন, ধর তো। দড়িটা টান করে ধর। যতটা সম্ভব টেনে ধরতে গেলে বললেন, আহা লাগবে। ফাঁস লেগে যাবে। অত জোরে নয়। বলে পেছন থেকে বাবা যতটা জোরে পারলেন ঠেলে ঠেলে নিয়ে আসতে থাকলেন।

    সুতরাং বাবা পেছনে আমি আগে। পিলু কি করবে বুঝতে পারছে না। সে একবার ছুটে বাড়িতে চলে গেল, এক বালতি জল নিয়ে আসতে দেখে বাবা কেমন ক্ষেপে গেলেন। বললেন জলটা গরুকে না দেখিয়ে আমাকে খাওয়াও, কাজে লাগবে। পিলুর এই আচরণ বাবার পছন্দ না বোঝা গেল। সে বলল, কোথা থেকে আনলে বাবা?

    বাবার তখন কাছার কাপড় সব খুলে যাচ্ছিল। কোনোরকমে সামলে বললেন, গরুর মতো গরু কত দুধ দেবে দেখ।

    পিলু বলল, ল্যাংড়া গরু বেশি দুধ দেয় বুঝি বাবা?

    বাবা কপালে দুর্গতি আছে ভেবে বললেন, তা দেয়। তোমাদের জননী কি বলে?

    —কিছু বলেনি।

    —খাওয়াদাওয়া ঠিক মতো করেছে তো?

    —তুমি কাল ফিরে আসবে বলে গেলে, কৈ এলে না তো।

    —কপালে এমন একটা গরু জুটবে কে জানত। বাবা কথা বলছিলেন আর গরুটাকে হেঁইয় মার টান বলে ঠেলছিলেন। পিলু মাঝে মাঝে বাবাকে সাহায্য করছে। সেও শীর্ণকায় গরুটাকে যতটা সম্ভব বাবার সঙ্গে ঠেলতে ঠেলতে মা’র এজলাসে হাজির করতে চাইল।

    গরুটাকে নিয়ে বাড়ির রাস্তায় উঠতেই মা সহসা হাউমাউ করে উঠল, ওমা, একি গো, হাড়মাস বের করা গরু, একটা ল্যাংড়া গরু।

    বাবা এসব সময় খুবই রাশভারি হয়ে যান। মা’র কাছে এসে বাবা আরও গম্ভীর। এতটা হেঁটে জ্যান্ত একটা গরু নিয়ে শেষ পর্যন্ত পৌঁছানো গেল সেজন্য এদের যদি এতটুকু কৃতজ্ঞতা বোধ থাকে। বাবা ভীষণ ঘর্মাক্ত কলেবরে গরুটাকে উঠোনে দাঁড় করিয়ে বারান্দায় সোজা বসে পড়লেন। তারপর ক্লিষ্ট গলায় বললেন, জল।

    বাবার কাছে যেতে কেউ আমরা সাহস পাচ্ছিলাম না। বাবা কখনও বিষয়ী মানুষ হয়ে গেলে ভয় পেতাম। যেন আঙুল উঁচিয়ে বলা, বসে নেই। মাথার ঘাম পায়ে ফেলে এত করছি তবু সুখ নেই। তিনি সে সবের কিছু বললেন না। মাও বুঝতে পারছিল না, সেবাশুশ্রূষা কার আগে দরকার। বাবার না গরুটার। মায়া ইতিমধ্যে ছুটে এক গ্লাস জল এনে দিলে সবটা বাবা এক নিঃশ্বাসে খেয়ে ফেললেন। মা তাড়াতাড়ি তালপাতার পাখা এনে বাবাকে বাতাস করতে লাগল। আমরা উঠোনে গরুটার সঙ্গে ঠায় দাঁড়িয়ে। পিলু ফাঁক বুঝে গরুটার তেজ দেখার জন্য বাঁটে হাত দিলে বাবা তেড়ে উঠলেন, লাথি-ফাতি খেয়ে মরবে দেখছি সব।

    গরু পা তোলা তো দূরে থাক, এতটুকু নড়ল না পর্যন্ত। পিলু বলল, ভারি ঠান্ডা গরু বাবা।

    আমার মনে হল ঠান্ডা গরু না বলে সভ্রান্ত গরু বলা ভাল। বাবা হয়ত এখন তাই বলতেন। কিন্তু মা কেমন বিমূঢ়ের মতো বলল, হ্যাঁগো দেখছ গরুটা তো নড়ছে-টড়ছে না।

    —নড়বে নড়বে। অত তপ্ত খোলা হলে হয়। কতটা পথ হেঁটে এসেছে।

    —তাই বলে গরুর লেজ নাড়া বন্ধ থাকে কখনও।

    —সবই নড়বে। সময় দিতে হয়। এই বিলু, বাবা গরুটাকে একটু জল দেখা তো।

    এতটা পথ হেঁটে এসে সত্যি গরুটা জীবিত না মৃত বাবারও বোধহয় সংশয় দেখা দিল। বাজপড়া প্রাণীর মতো উঠোনে দাঁড়িয়ে। মা’র ভয়ে কিছুতেই বুঝি সত্যি কথাটা বলতে পারছেন না। জল দিলে বোঝা যাবে। এক বালতি জলও গরুটার সামনে রাখা গেল। তবু সে দাঁড়িয়ে আছে। পিলু ছুটে গিয়ে আহ্লাদে এক আঁটি ঘাসও তুলে এনেছে। তাও দৃকপাত নেই।

    মা বলল, ওমা কি গরু গো, ঘাস খায় না, জল খায় না। নড়ে না চড়ে না।

    বাবা প্রায় উঠে বসলেন এবার। –আরে খাবে খাবে। ঠান্ডা হয়ে নিক খাবে।

    —আর খেয়েছে। মা বোধহয় দু হাত ছুঁড়েটুড়ে বাবার কান্ড দেখে কাঁদতে বসে যাবে এবার।

    বাবা তেমনি আমাদের সবাইকে সাহস দিয়ে যাচ্ছেন। –ভাল গরু। জাত ভাল। দুধ দেবে। গেরস্থ বাড়িতে গরু না থাকলে মা লক্ষ্মী থাকেন না। কতটা পথ হেঁটে এসেছে। গরু বলে কি আরাম বিরাম থাকতে নেই!

    মানুষটাও অনেকটা পথ হেঁটে এসেছে। সঙ্গে গরুটা। হাঁটু অবধি কাদা। চোখমুখ কোথায় ঢুকে গেছে। সারারাত গরুটাকে নিয়ে রাস্তায় হাঁটাহাঁটির চিহ্ন। দু দিন আগে বের হয়ে গিয়েছিলেন। ফিরছেন আজ। চন্ডীপাঠের নাম করে শেষপর্যন্ত সোজা একটা ভাগাড়ের গরু নিয়ে হাজির। কার এত কৃপা হল মানুষটার ওপর। মা বাবাকে দেখতে দেখতে বোধহয় এসবই ভাবছিলেন। রাগে দুঃখে চোখ ফেটে বোধহয় এবারে জল বের হয়ে আসবে মা’র।

    মা’র চেহারা দেখা বাবা ঘাবড়ে গিয়ে পায়ের ওপর পা রেখে নাচাতে থাকলেন। খুবই তেজী অহংকারী মানুষ। ভেঙে পড়লেই গেছে। সংসারে আগুন জ্বলে উঠবে। বলছিলেন, হবে হবে সব ঠিক হয়ে যাবে। গরুটা দুধ দিতে থাকলেই তোমার আর দুঃখ থাকবে না ধনবৌ।

    এবং এবারে দেখা গেল গরুটা সত্যি লেজ নাড়াচ্ছে। বাবা লাফিয়ে উঠলেন। ওগো দ্যাখো লেজ নাড়াচ্ছে। বাবার বুকে যেন দুগুণ বল এসে গেল। –বললাম গরু লেজ নাড়াবে না সে হয়। দে ব্রে জল দে।

    জলের বালতিটা মুখের কাছে নিয়ে গেলাম। গরুটা নাক টানল দুবার। মুখ খানিকটা জলে ডুবিয়ে ফের তুলে নিল। খেল না।

    বাবা বললেন, ফ্যান আছে ধনবৌ, থাকলে দাও না। একটু নুন মিশিয়ে দাও। মা ফ্যান এনে নুন মিশিয়ে দিল। না, খাচ্ছে না। শত হলেও গরু একটু অদর যত্ন চায়। মা গায়ে হাত বুলিয়ে দিতে গিয়ে বুঝল, কঙ্কাল বাদে গরুটার আর কোনো সম্বল নেই। মা অগত্যা বলল, খাবে কি? শরীরে কিছু আছে!

    —বাঁধা খাওয়া সইবে কেন? ছেড়ে খাওয়ালে দেখবে দু দিনে ঠিক হয়ে যাবে।

    মা এতক্ষণ যা বলতে চেয়েছিল, এবারে তা বলে ফেলল, কে দিল গরুটা? বের হলে তো চন্ডীপাঠের নাম করে। আর নিয়ে এলে একটা মরা গরু। কার এমন কৃপা হল কর্তার ওপর। আর লোক পেল না! ভয়ে বাবা মা’র দিকে না তাকিয়েই বললেন, কালুবাবুই দিল। সবৎসা গাভীর কথা পাড়তেই ওনার দয়া হল। বলল, গোয়াল থেকে রাইমণিকে নিয়ে যান। ভাল জাতের গরু। বয়স হয়েছে। তবে কার বয়স না হয় বলুন!

    বাবা দেখছি আসলে গরু নিয়ে আসেনি, নিয়ে এসেছে রাইমণিকে।

    মা কেমন স্বগতোক্তি করল—কি যে তার এত দায় ছিল, এমন অবলা জীবকে এমন একজন অবলা মানুষের জিম্মায় তুলে দেওয়া।

    আমরা যে ঝড়ের আশঙ্কা করেছিলাম, দেখলাম সেটা কেটে গেছে। মা গরুটার জন্য দুব্বো তুলতেও বলল মায়াকে। বুড়ো হোক, গায়ে কিছু না থাক, সাক্ষাৎ ভগবতী। রাইমণির জন্য বাবা আমাদের নিয়ে একটা নতুন দড়িও পাকালেন। খালের জলে ঘষে ঘষে স্নান করানো হল সাক্ষাৎ ভগবতীকে। বেশি জোরে ঘষা গেল না, ঘষতে গেলেই রাইমণির ছাল চামড়া উঠে যাচ্ছে। স্নান-টান সেরে রাইমণি ঘাস এবং জল দুই খেয়ে ফেলল।

    রাইমণিকে বাবা আমি এবং পিলু মিলে যখন ঠেলাঠেলি করে জল থেকে তুলে আনছিলাম, শেষবারের মতো মা বলেছিল, গরুটাকে দিয়ে কালুবাবু ভাল করেনি। ভোগাবে। বাবা তখন কেমন শোকসন্তপ্ত গলায় বললেন, দানের গরু আর কত ভাল হবে ধনবৌ? সংসারে এত করেও কিছু করা গেল না। তোমাকে সুখী করতে পারলাম না। খুব ভালমানুষের মতো বাবা রাইমণিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছেন। তিনি যে ভারি দুঃখী মানুষ কিছুতেই কাউকে টের পেতে দিচ্ছেন না। তখন বাবার জন্য আমার কেন জানি চোখে জল আসছিল। বললাম, রাইমণি কি সুন্দর দেখতে, না?

    বাবা আমার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বললেন, সত্যি বলছিস?

    —হ্যাঁ বাবা। রাইমণি সত্যি ভাল। নিরীহ।

    বাবা বললেন, এখন কত কাজ। দাঁড়িয়ে থাকিস না। রাইমণির একটা ঘর করতে হবে। দুলেকে ডেকে আনতে হবে। দুলে এলে সবাই মিলে সাঁজ লাগতে না লাগতেই রাইমণির পাতার ঘর বানিয়ে ফেললাম। বাঁশের বন থেকে বাঁশ এল। কাশের বন থেকে কাশ। পাটের দড়িতে বাতা বেঁধে দিলাম। বাবলা গাছের খুঁটিতে রাইমণিকে বেঁধে বাবা বাড়ির কোণায় দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ কি দেখছেন! সাঁজ লেগে গেছে। সারাটা দিন বাবা একদন্ড বসে নেই। এখনও এই সন্ধ্যার অন্ধকারে দাঁড়িয়ে এত কি দেখছেন!

    ডাকলাম, বাবা।

    অন্ধকারে সংবিৎ ফিরে পাবার মতো বললেন, বিলু।

    —হ্যাঁ বাবা।

    —এদিকে আয়।

    কাছে গেলাম বাবার।

    —দ্যাখ তো!

    ঠিক বুঝতে না পেরে বললাম, কি দেখব বাবা?

    —বাড়িটা দ্যাখ। ঠিক এতদিনে এটা মানুষের ঘরবাড়ি মনে হচ্ছে না? থাকার ঘর, খাবার ঘর, ঠাকুরঘর, গোয়ালঘর—সব মিলে মানুষের ঘরবাড়ি।

    আমি বললাম, হ্যাঁ, সত্যি মানুষের ঘরবাড়ি।

    –তোর মা বোঝে না। রাইমণিকে এনে ভাল করিনি?

    —খুব ভাল হয়েছে।

    —রাইমণি না থাকলে বাড়িটা ঠিক বাড়ি মনে হত না। দুধ না দেয় গোবরটা তো পাওয়া যাবে। ব্রাহ্মনের বাড়ি গোবর ছাড়া চলে।

    —দুধও দেবে বাবা।

    বাবাকে আর কি বলে সুখী করব বুঝতে পারলাম না। অন্ধকারে পিতাপুত্র আমাদের এতদিনের গড়ে ওঠা আবাস দেখছিলাম। সত্যি ধীরে ধীরে রাইমণির প্রতি ঠিক অন্য সবের মতো আমারও মায়া পড়ে যাচ্ছে। রাইমণি অন্ধকারে ঘাস চিবুচ্ছিল—তার শব্দ, এবং দূরে ব্যারেক বাড়িতে বিউগিল বাজছে। গাছপালার ভেতর মানুষের ছোট্ট একটা ঘরবাড়ি ক্রমে গভীর অন্ধকারে ডুবে যাচ্ছিল। জোনাকির আলোতে বাবার মুখে অস্পষ্ট সুখের আভাস। গাছপালা ঘরবাড়িটাতে সতর্ক প্রহরীর মতো বড় হয়ে উঠেছে।

    বাবা বাড়ির দিকে একসময় যেতে যেতে শুধু বললেন, বেঁচে থাকার জন্য মানুষের আর কি লাগে।

  • পনের

    পনের

    খোঁড়া গরুটাকে নিয়ে আসার পর বাবার ঘরবাড়ি ষোলকলা পূর্ণ হয়ে গেল। কারণ অভাব বলতে তাঁর তখন সন্তান-সন্ততিদের পাতে একটু দুধ দেওয়াই ছিল প্রাণাধিক ইচ্ছা। ইচ্ছা-পূরণে বাবা আমার ক’দিন থেকে মেজাজী মানুষ। তারপর এল বাবার জীবনে আরও বড় সুখবর—তাঁর প্রথম সন্তান বিলু সব বিষয়ে পাস। বিলু অর্থাৎ এই অধম জীবনে ন’টা বিষয়ে পাস করে বসে আছে—বাবা আমার তাতেই খুশি ছিলেন। জীবনে কে কবে সব বিষয়ে পাস করে। বাকি একটা বিষয়ে পাসের খবর আসায় বাবা আমার একবারে হতভম্ব।

    বাবা আমার দেশে থাকতে জমিদারী সেরেস্তায় আদায়পত্র করতেন। আর ছিল যজন-যাজন। পৈতৃক সম্পত্তি মন্দ ছিল না। ভালভাবে চলে যেত। বাবার জীবনে পরীক্ষায় পাস করার কোন দায় ছিল না, এ দেশে এসে অথৈ জলে পড়ে গেলেও খুব একটা ঘাবড়ে যান নি। আমার সব বিষয়ে পাস করার কথা শুনে কেমন হয়ে গেলেন। ঠাকুরঘরে ঢোকার আগে ডেকে বললেন, সত্যি তুমি সব বিষয়ে পাস করেছ?

    বললাম, হ্যাঁ বাবা।

    মা রান্নাঘর থেকে বললেন, ওটা কি আবার হাতি-ঘোড়া নাকি, পাস করতে পারবে না।

    —না, বলছিলাম, সব বিষয়ে পাস ভাবা যায়না।

    আসলে আমাদের পরিবারের জীবনে কেউ কোন বড় পাস দেয় নি। আমিই প্রথম, এবং এতে বাবা খুব অহংকারী ছিলেন—বাবার কাছে পাস করাটা কোন কৃতিত্বের বিষয় নয়, এমনই জানতাম। কিন্তু আজ দেখছি অন্যরকম। পিলু তখন তাড়া লাগাচ্ছিল, চল না দাদা? ঠাকুরঘর থেকে বাবার গম্ভীর গলা, না, দাদা যাবে না। বিলু তুমি চান করে এস। আমার পাশে বসে থাক। ঠাকুর সুপ্রসন্ন না হলে মানুষ কখনও এত বড় কাজ করতে পারে না।

    আমরা বাবাকে ভয় করি কি সমীহ করি, ঠিক বুঝি না। এই ভয় কিংবা সমীহ সবটাই নির্ভর করত মা’র উপর। তিনি বাবার উপর প্রীত থাকলে বুঝতে পারতাম, পিতৃদেবের উপর কোন কথা নেই। প্রীত না থাকলে বুঝতাম, নির্দেশ অমান্য করাই বিধেয়। কিন্তু বাবা দীর্ঘ তিন চার মাস বাড়ি ছাড়া হন নি বলে, মা’র এখন বাবা ছাড়া কথা নেই। আমরা মায়ের সন্তান। বাবা সংসারী মানুষ হয়ে গেছেন প্রমাণ করার জন্য শেষ পর্যন্ত একটা দানের গরু পর্যন্ত সংগ্রহ করে এনেছিলেন। এ- হেন সময়ে পিলুর সঙ্গে বন-বাদাড়ে ঢুকে যাব না বাবার ঠাকুর ঘরে বসে স্তোত্র পাঠ শুনব, বুঝতে পারছিলাম না।

    পিলু অবশ্য বাবার কথা খুব গ্রাহ্য করে না। মা’র কথাও না। তার উপর দাদা প্রবেশিকা পরীক্ষা পাস করে যাওয়ায় কিছুটা বিজয়ী আলেকজাণ্ডার সে আজ। বাতা কেটে তরবারি বানিয়ে ইতিমধ্যেই কোমরে গুঁজে ফেলেছে। মাথায় পাতার টুপি পরে পড়শীদের বাড়ি, বাড়ি খবর দিয়ে এসেছে, দাদা সব বিষয়ে পাস করেছে। কারণ এত বড় খবরটা পৃথিবীর কেউ জানবে না, সে হয় না। বাকি আছে, নবমী বুড়ী, সে থাকে ইটের ভাটা পার হয়ে, কারবালার রাস্তার ধারে। এখনও সে দিকটায় মানুষের বসতি হয়নি। কবরভূমি বলেই হয়ত মানুষের ভয়। দলে দলে যে সব ছিন্নমূল মানুষ আসছে তারা তো খালি জায়গা দেখলেই বাঁশ পুতে খুপরি বানিয়ে আস্তানা গেড়ে নিচ্ছে। আগে অনেকটা হেঁটে গেলে শহরের ঘরবাড়ি দেখা যেত, এখন রেল-লাইন ঘর বাড়ি পর্যন্ত এসে যাওয়ায় বাবা আরও স্থিতিশীল মানুষ হয়ে গেছেন। কারণ জমির দাম যে ভাবে বাড়ছে তাতে কবে না হাজার টাকা বিঘে হয়ে যায়—আজকাল এমন স্বপ্ন বাবা প্রায়ই দেখতে পেতেন বলে বোধহয় এখন আর ঘরবাড়ি ছেড়ে ডুব দিচ্ছেন না কোথাও।

    এ-সব মুহূর্তে পিলুই আমার ত্রাণকর্তা, সে হাত ধরে টানতে থাকল, চল না দাদা! ও দাদা, যাবি না?

    বাবা পাটায় চন্দন ঘষছিলেন, হাত থামিয়ে বললেন, কোথায় যাবে শুনি? তুমি ওকে কোথায় নিয়ে যেতে চাও? সে তো তোমার মতো বাউণ্ডুলে নয়।

    পিলু বলল, আমার কী দোষ?

    বাবা এ সময় প্রশ্ন করতে পারতেন, তবে কার? কিন্তু তিনি জানেন, উত্তরটা সুখের হবে না। পিলুর যা একখানা স্বভাব, বলেই না ফেলে, তোমার। বাবার বাউণ্ডুলে স্বভাবের জন্য মা আমাদের গালাগাল দিয়ে বলতেন, যেমন বাপ, তেমনি ছেলে। সেই থেকে পিলু জেনে ফেলেছে, আসল দুরাত্মা সংসারে বাবা। বাবার স্বভাব সে পেয়েছে, এটা তার কাছে বড়ই অহংকারের বিষয়। চন্দন ঘষতে গিয়ে বাবা টের পেয়েছেন, দ্বিতীয় পুত্রটির মাথা তার মা চিবিয়ে খেয়েছেন। সুতরাং কিছুটা ইতস্তত করে বললেন, তোমার মাকে জিজ্ঞেস কর।

    কি জিজ্ঞেস করবে পিলু বোধহয় বুঝতে পারেনি। বাবার বাউণ্ডুলে স্বভাব সম্পর্কে সত্যাসত্য যাচাই করবে, না সে এ সময় কোথাও দাদাকে নিয়ে যেতে পারবে কিনা জিজ্ঞেস করবে,–কোনটা? সে মাকে ডেকে বলল, মা, বাবা আমাকে বাউণ্ডুলে বলছে। দাদাকে নিয়ে যাব?

    মা রান্নাঘর থেকে আঁচলে হাত মুছে বের হয়ে আসছে। বড় সুন্দর দেখাচ্ছিল মাকে। লাল পেড়ে শাড়ি পরনে, শরীরে মা মা গন্ধ। আমি বললাম, পিলু বলছে নবমী বুড়ীর কাছে আমাকে নিয়ে যাবে।

    —তা যা না, ধরে রেখেছে কে?

    —এই তো ধনবৌ, সংসারের ভাল-মন্দটা তুমি বোঝ না। যার কৃপায় সব হয়, এই যেমন ধর ঘরবাড়ি, গাছপালা, দুধালো গাই, তার কাছে না বসে তুমি বিলুকে নবমীর কাছে পাঠাচ্ছ। বাবা যে বিষয়ী মানুষ সেটা প্রমাণ করার জন্য বললেন, রোদে ঘুরে জ্বরজ্বালা হলে ওকে মানুর কাছে নিয়ে যাব কী করে? একটা কাজটাজ হয়ে গেলে, তোমার হাতে দুটো পয়সা বেশি পড়বে।

    মা বলল, কেন দুধালো গাই!

    বাবা মার কথায় ভড়কে গেলেন।

    দুধালো গাই বলার অর্থ গরুটার পর সংসারে আর একজন আমি, যাকে নিয়ে সাশ্রয়ের স্বপ্ন দেখছেন বাবা।

    দানের গরুটি অস্থিচর্মসার এবং বুড়ো তা ছাড়া তিন পা অবলম্বন করে যার বেঁচে থাকা সে সংসারে উৎপাত ছাড়া আর কি। তবু বাবা পুজো-আর্চার নাম করে বের হয়ে পড়ছেন না, এবং খোঁজখবর না দিয়ে দেশের মানুষের খোঁজে ঘুরে বেড়ানোর বাতিক কমে গেছে বলে গরুটির প্রতি সদয়ই ছিলেন মা। দুধালো গাই বলাটা বাড়াবাড়ি। দুধ না হয়, গোবরটুকু তো হয়, এই আপ্তবাক্য সার করে মা মুখ বুজে সব সয়ে গেছেন। তা ছাড়া দানের গরু আর কতটা ভাল হতে পারে, এমনও একটা সংশয় তিন মাস ধরে মা’র মধ্যে কাজ করছিল। তার সেবাযত্ন একটু অধিক মাত্রাতেই চলছে। পিলু কচি ঘাসের খোঁজে একটু বেলা বাড়লেই বের হয়ে যায়। মা জল গরম করে ভাতের মাড় সহ কিছু খোল মিশিয়ে দেয়। সন্ধ্যায় পিতা, পুত্র এবং জননী মিলে সাধ্য-সাধনা চলে—যদি শরীরে ভগবতীর মাংস লাগে। কিন্তু তিনি যেমন ছিলেন, তার বেশি এক পা নড়ছেন না। এই নিয়ে মহাভারত পাঠ যে কোন সময় শুরু হয়ে যেতে পারে। প্রতিদিনই আমরা এমন একটা প্রবল আশঙ্কায় ভুগছিলাম— এখন পর্যন্ত পাঠ শুরু হয়নি। মা বরং আজকাল সাংসারিক বিরোধে বাবার পক্ষই নিয়ে থাকেন। মা, বাবার পক্ষ নিলে আমার পিলুর সংসারে গুরুত্ব কমে যায়, বিশেষ করে পিলুর স্বাধীনতা খর্ব হয়। বাবার সংসারী মানুষ হয়ে যাওয়াটা পিলুর পক্ষে খুবই বিপজ্জনক।

    মা শুনে বললেন, তাই তো। এই দুপুরে যাবার কী হল?

    পিলুর প্যান্ট কোমরে থাকে না। হড়হড় করে নেমে যায়। নাকে সর্দি স্থায়ী বন্দোবস্ত করে নিয়েছে। যতবার প্যান্ট নেমে যায় ততবার তাকে ওটা তুলে পরতে হয়, নাক মুছতে হয় বারবার। এজন্য সে কিছুটা সময় নিয়ে বলল, মা, তুমি বুঝছ না দাদা পাস করেছে খবরটা না দিলে নবমী বুড়ী খারাপ ভাববে। ওকে ভাল খবর দেবার তো কেউ নেই।

    এমন কথায় বাবা ভিতরে কেমন চমকে উঠলেন। দ্বিতীয় পুত্রটির কথাবার্তাই এই রকমের। নবমীর কেউ নেই, বাড়ির ভালমন্দ হলে কলাপাতায় বনজঙ্গল ঠেঙিয়ে দিয়ে আসার মধ্যে পিলুর কী যেন এক আলাদা জগৎ আছে। যা তিনি ঠাকুরঘরে বসে টের পাবার চেষ্টা করেন, পিলু সেটা টের পায় বন-জঙ্গলের ভিতর দিয়ে যেতে যেতে। তিনি বললেন, যাও, তবে ওখানে আটকে থেকো না।

    সঙ্গে সঙ্গে মাও বললেন, হ্যাঁ, যাও—তবে ওখানে আটকে থেকো না।

    এত সহজে ছাড়পত্র মিলে যাবে, অনুমান করতে পারি নি। মনে হল বাবা-মা আমাদের কত ভাল। আমরা হাঁটতে থাকলাম। বাড়িটা আম জাম কাঁঠালের চারাগাছে ভর্তি। বাবার সংসারে এখন একটাই কাজ, গাছপালা পুঁতে যাওয়া। কত যে গাছের খবর নিয়ে আসছেন। আমলকী গাছটা ঘরবাড়ির উপর দু’বছরেই মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। আশ্রমের মতো বাড়িটার জন্য দিন দিন মায়া বেড়ে যায়। হাঁটতে হাঁটতে সব কেমন টের পাচ্ছিলাম। আমরা, বাবার ঘরবাড়ির সব। আমরা না থাকলে বাবার কিছু থাকে না। বাবা না থাকলে আমাদের কিছু থাকে না।

    শরৎকাল বলে সূর্যের তাত কম। চারপাশে সবুজের সমারোহ। যেতে যেতে বন-জঙ্গলের সুঘ্রাণ পাচ্ছিলাম। তখনই কেউ যেন ডাকল, দাদা, দাঁড়া, আমি যাব। দেখি পেছনে মাঠের ভেতর দিয়ে দৌড়ে আসছে মায়া। পিলু মায়াকে দেখে ভারি গম্ভীর হয়ে গেল।

    বন-জঙ্গলের ভেতর তার দুই দাদা যাচ্ছে, সে বাড়িতে একা থাকে কি করে। আর সঙ্গে আসছে হেমন্তের কুকুর। সংসারে সেও আমাদের একজন। মায়া, হেমন্তের কুকুর, আমি, পিলু এই মিলে যাত্রা, মন্দ না। কিন্তু পিলু মায়ার ছোড়দা। শাসন করার সুবর্ণ সুযোগ—সে বলল, বাড়ি যা বলছি। মা’র কত কাজ।

    মায়া বলল, না, আমি যাব।

    —যাবে না! পিলু ধমক লাগাল।

    মায়া আমার দিকে তাকিয়ে বলল, দাদার সঙ্গে যাব। তোর সঙ্গে যাচ্ছি না।

    পিলু ক্ষেপে গেল—যা, যা না। দাঁড়ালি কেন? আমি যাচ্ছি না।

    পিলুকে অগত্যা বললাম, আসুক না। নবমী আমাদের সবাইকে দেখলে খুশি হবে। এমন কথায় পিলুর মনটা নরম হয়ে গেল। বলল, দাদা, তুই চাকরি করলে, নবমীকে বাড়িতে নিয়ে আসব, কেমন। পিলুর এই স্বভাব। আমাদের ভারি অভাব-অনটনের সংসার। সম্বল বলতে ক’ বিঘা উড়াট জমি, কিছু শিষ্য আর বাবার বাড়ি বাড়ি পূজা-আর্চা। পিলুর বড়ই অভিযোগ, এ-দেশে এসে আমরা কত গরিব হয়ে গেলাম! অভিযোগটা আমারও। আমাদের বাবা এ-দেশে এসে বড় গরিব হয়ে গেলেন, এ-কথা আমরা কিছুতেই ভুলতে পারছি না।

    তবু একটা আশ্রয় মানুষের জন্য কত দরকার, আমাদের ঘরবাড়ি হয়ে গেলে টের পেলাম। আমরা যে অন্য একটা পৃথিবীতে এসে উঠেছি, এখন আর মনেই হয় না। উঁচু নীচু মাঠ, কাঁটা গাছ, কোথাও ঢিবি, কোথাও অজানা ফুলের গন্ধ, পাখির ডাক, নীল আকাশ মিলে আমাদের যেন সেই পুরনো অস্তিত্ব। কোথাও একটা খেজুর গাছ দাঁড়িয়ে আছে, যেন কতকালের চেনা। কোথাও বাবলার বন, তারপর সেই প্রাচীন ইঁটের ভাটা। অনেকটা জায়গা জুড়ে। বড় মজা দীঘি, শান বাঁধানো পরিত্যক্ত ঘাটলা, পাড়ে পাড়ে অজস্র দেবদারু গাছ। জনহীন গভীর নির্জনতা তখন আমাকে গ্রাস করে। দূরের স্বপ্ন দেখতে পাই। কেউ যেন আমার সামনে ফুলের টব হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। সে কে, এখনও বুঝতে পারি না। মা-বাবা ভাই-বোন ছাড়া আরও কেউ পাশাপাশি পথ হাঁটছে, শুধু এইটুকু টের পাই।

    পিলু, মায়া, অজস্র কথা বলছিল।

    পিলু বলছিল, দাদা, তুই চাকরি করলে, একদিন পেট ভরে রসগোল্লা খাব।

    মায়া বলল, দাদা কলেজে পড়বে। কি মজা!

    পিলু বলল, বাবা যে বলল, মানুকাকাকে চাকরির কথা বলে এয়েছে।

    সংসারে বাবার দু’জন মানুষ সম্বল। দেশে থাকতে বাবার জমিদার দীনেশবাবু।

    আর এখানে এসে মানুকাকা। তিনি যা বলবেন তাই হবে।

    পিলুই বলল, মানুকাকা বলেছে, পড়িয়ে আর কি হবে। একটা কাজেটাজে ঢুকে যাক।

    কবে বলেছে? মজা দীঘির ধারে কেমন একটু অন্যমনস্ক হয়ে পড়লাম। গাছপালা, নীল আকাশ নির্জনতা ভেঙে কেমন খানখান হয়ে গেল। চিৎকার করে ফের বললাম, কবে বলেছে? বল কবে বলেছে! আমার স্বভাব নয় জোরে কথা বলা। কেন যে এত রেগে গেলাম! কার উপর রাগ, তাও বুঝতে পারছি না। বাবার উপর, না মানুকাকার উপর। না দেশ ভাগ—কারণ দেশ ভাগ না হলে আমরা এত গরিব হয়ে যেতাম না। পিলু দাদার চণ্ডমূর্তি দেখে ঘাবড়ে গেল। তার দাদাটি বড় শান্ত স্বভাবের। মায়া বলল, দাদা, তুই কলেজে পড়বি। কারো কথা শুনবি না।

    নবমীকে খবর দেবার আমার আর কোন ভরসা থাকল না। আসলে যে ফুলের টব হাতে নিয়ে আমার সামনে মাঝে মাঝে এসে দাঁড়ায়, সে কেমন ভ্রু কুঁচকে বলল, ও মা, তুমি আর পড়বে না! তালে তুমি মানুষ হবে কী করে? বড় হবে কী করে?

    বড় হওয়াটা যে আমার খুবই দরকার। পিলুকে বললাম, আমি যাব নারে। তোরা যা!

    তবু পিলু ছাড়ল না। বন-জঙ্গলের মধ্যে নবমী থাকে। ট্যানাকানি পরে। না থাকলে পরে না। এখানে আসার পর পিলুর সাম্রাজ্যের মধ্যে নবমী বুড়ীও পড়ে গেছে। বাড়িতে ভালমন্দ হলে আগে নবমীর জন্য চুরি করত, এখন করে না। বাবার ছাড়পত্র মিলে গেছে।

    অভাবের সংসারে মা গজগজ করলে বলতেন, আরে দিলে কখনও ফুরায় ধনবৌ? যতটুকু দিতে পারলে, ততটুকুই আখেরের কাজ করলে। তেনার মাপা জিনিস। তাঁর সব। তুমি দেবার কে ধনবৌ?

    পিলু মজা দীঘির পাড়ে দাঁড়িয়ে হাঁক পাড়ল, নবমী! কারণ সে জানিয়ে দিল, নবমীর দাঠাকুর এই বনের মধ্যে হাজির। যেন তাড়াতাড়ি গায়ে ট্যানাকানি না থাকলে পরে নেয়। আগে বোধ হয় কখনও পিলু বন-বাদাড়ে ঘুরতে গিয়ে দেখেছে—উলঙ্গ এক বুড়ী বনের মধ্যে ঘুরে বেড়ায়। পিলুর কেমন লজ্জা লেগেছে। আবার পূজা-পার্বণের দানের কাপড় একটা চুরি করলেই হয়ে যায়। এবং তা দিতেই পিলু বোধ হয় নবমীর দা-ঠাকুর হয়ে গেছিল। দা-ঠাকুরের জন্য নবমীও কিছু রেখে দেয়। এই সেদিন একটা ঝুনো নারকেল নিয়ে গেছে পিলু। গাছতলায় কুড়িয়ে পেয়েছে নবমী। দা-ঠাকুরকে না খাইয়ে সে খায় কী করে? এই বনটার মধ্যে আমরা এখন তিনজন প্রাণী। আর আমাদের হেমন্তের কুকুর। পিলুর পার্টনার। কুকুরটাও মুখ তুলে ঘেউঘেউ করে উঠল। পিলু ডাকছে, সে ডাকবে না, কী করে হয়? আর তখনই খসখস শব্দ। খুব ক্ষীণ গলায় সাড়া দিচ্ছে নবমী, আসেন গা দা-ঠাকুর।

    মণীন্দ্র কাঁটাগাছের জঙ্গলে জায়গাটা ভরা। ইচ্ছে করলেই ছোটা যায় না। পিলু ছুটতে চেয়েছিল, কাঁটায় জামা আটকে গেছে। মায়া উবু হয়ে জামাটা ছাড়িয়ে দিচ্ছে। তার অবশ্য হুঁশ নেই। চিৎকার করে বলছে, আমার দাদা পাস করেছে নবমী। দাদাকে নিয়ে এসেছি। মায়া এয়েছে।

    এবং যখন কাঁটা গাছ এবং আগাছা মাড়িয়ে ভিতরে ঢুকে গেলাম, নবমীর কি আনন্দ। যেন তার কত নিকট আত্মীয়স্বজন আমরা। নবমী বলল, কি পাস গ‍

    পিলু বলল, ওমা তোমাকে বলেছি না, দাদা এ বছর একটা পাস দেবে। মেট্রিক পরীক্ষা। সে তুমি বুঝবে না। তোমার কিছু মনেও থাকে না। কত বার বলেছি, দাদা ন’টা বিষয়ে পাস করে গেছে। আর একটা বিষয়। ব্যস, তাও পাস। বাবা তো বিশ্বাসই করেন না, সব বিষয়ে মানুষ পাস করতে পারে। জীবনে নাকি সেটা হয় না।

    বাবার কথায় নবমী কপালে হাত ঠেকিয়ে প্রণাম করল, তিনি দেবতা আছেন গ। তারপরই নবমীর যা স্বভাব গড় হয়ে গেল। পিলু এটা তার প্রাপ্যই মনে করে থাকে। কিন্তু আমার বড় সংকোচ হল। বললাম, ছি ছি, কী করছ? বলে পা সরিয়ে নিতেই শীর্ণ হাতটা কেমন কেঁপে গেল। যেন সে কি অপরাধ করে ফেলেছে! খোনা গলার স্বর স্পষ্ট নয়। এখন তার চলতে ফিরতেও কষ্ট। একদিন পিলু তাকে ধরে ধরে নিয়ে গেছিল, বাবার ঠাকুরঘরে সে মাথা ঠেকিয়ে আসতে পেরেছে—আর এই যে আমাদের দর্শন, সেটা তার নিতান্ত পুণ্যফল। এ-হেন সময়ে আমার এমন বলা বোধহয় উচিত হয় নি। নবমী কেমন শুকনো গলায় বলল, দা-ঠাকুর, কত ভাগ্যিমানী হলে পায়ের ধুলো পড়ে। দ্যান চরণখানা মুঠা করে লই।

    ওকে বঞ্চনা করতে কেন জানি আর মন চাইল না। পা দু’খানা পিলুর মতো আমিও বাড়িয়ে দিয়ে গম্ভীর হয়ে গেলাম।

    আসলে এ সবই আমায় কোন দূরবর্তী নক্ষত্রের খবর দিচ্ছিল। সেটা কোথায় খুঁজে বের করতে হবে। নবমী আমার দিকে কিছুটা হতবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। ভাল দেখতে পায় না। একটা পাস দেওয়া মানুষ তার সামনে। সে কোন রকমে উঠে, সারা গায়ে হাত বুলিয়ে বলল, বাপের মুখ উজ্জ্বল করেন গ দা-ঠাকুর।

    মায়া বলল, জান নবমী, আমার দাদা কলেজে পড়বে।

    নবমী এ সব কিছুই বোঝে না। মুখে তার আশ্চর্য সরল হাসি। যেন এটা এমন কাজ, যা আমিই একমাত্র পারি। কম্পার্টমেন্টালে পাস করার মত এত বড় কাজ আমার পক্ষেই সম্ভব। সে বলল, একটা শীতের চাদর দেবেন গ দা-ঠাকুর? বড় হয়ে গেলে দিতে হয়।

    নবমীর পক্ষে এত দিন বেঁচে থাকা সম্ভব না। এই শীতে অথবা আগামী শীতে সে মরে যাবে। তবু মানুষের মরণ বাঁচন বলতে কথা দিলাম, বড় হয়ে তাকে একটা শীতের চাদর দেব। এই আমার কাউকে প্রথম কথা দেওয়া।

    .

    বাবার ফিরতে বেশ রাত হল। শরতের শেষ বেলা বলে বেশ ঠাণ্ডা হাওয়া দিচ্ছে। মা বারান্দায় হারিকেন জ্বালিয়ে বাবার প্রতীক্ষায় বসে আছেন। মানুষটা ফিরলে তাঁর অনেক কাজ। আমারও ঘুম আসছিল না। বাবা কি খবর নিয়ে আসবেন কে জানে? কারণ মানুকাকার ইচ্ছা না হলে আমার কলেজে পড়া হবে না জানি। ঈশ্বরের কাছে কেবল প্রার্থনা করছি, হে ঠাকুর, বাবা-মানুকাকার সুমতি দাও। ওঁরা যেন এখনই আমার পড়াশোনা বন্ধ করে না দেন। রাস্তা থেকেই বাবার গলা পাওয়া গেল।— বেড়াটা কে ভেঙেছে? তিনি বাড়িঘরে যখন থাকেন, খুবই সংসারী মানুষ। গাছের একটা পাতা খসে পড়লেও তিনি টের পান। মা বললেন, দানের গরু ভেঙেছে। মানু ঠাকুরপো কি বলল?

    দানের গরু ভেঙেছে যখন সাত খুন মাপ। বাবা খুব সদাশয় ব্যক্তি হয়ে গেলেন। অবলা জীব বলে কথা।

    বারান্দায় উঠে এলে ফের মা বললেন, ঠাকুরপো কি বলল?

    —খুব সুখবর।

    আমার ভেতরে উল্লাস। তবে ঈশ্বর মানুকাকার সুমতি দিয়েছে।

    বাবা আরও কি বলতে যাচ্ছিলেন, মা মাঝপথে থামিয়ে বললেন, পরে শুনছি। আগে হাত-মুখ ধুয়ে নাও! ঠাকুরের বৈকালী হয় নি।

    —কেন, কেন তোমার বড় পুত্র, কি করছিল?

    —দেয় নি তো! কিছু নাকি ওর ভাল লাগছে না।

    —পিলু!

    —সারাক্ষণ ঝগড়া করেছে মায়ার সঙ্গে। আমার কথা কে শোনে?

    বাবা ওসব কথা একদম শুনতে চাইছেন না।—সব হবে ধনবৌ। তোমার বাড়িঘর যখন হয়ে গেছে, সব হবে। মানু যা আমাদের জন্য করছে!

    মা বললেন, ভাই হয়, করবে না?

    —না করলেও পারত। বাড়িঘর সব তো বলতে—

    —তোমার আবার বাড়াবাড়ি।

    আসলে বুঝতে পারছিলাম, বাবাকে মানুকাকা খুব বড় খবর দিয়েছেন। বাবা এজন্য মানুকাকার ওপর খুবই প্রসন্ন। বাবা প্রসন্ন হলে একটু বেশি বাড়াবাড়ি করে ফেলেন। আগের দুর্ব্যবহারের কথা মনে রাখতে পারেন না। মা’র সব মনে থাকে। কারণ দেশ থেকে এসে মানুকাকার বাড়িতে উঠলে কাকা যে খুব বিরক্ত বোধ করেছিলেন, সেটা চোখ বুজলে এখনও টের পাই। আমাদের ক্যাম্পে পাঠাবার জন্য তিনি অনেক হাঁটাহাঁটিও করেছেন। কিন্তু বাবার এক কথা। জাত খোয়াব মানু! ও তো হয় না। মা তখন তাঁর শেষ সম্বলটুকু মানুকাকার হাতে দিয়ে বলেছিলেন, একটু জমি, আর কিছু চাই না। ক’দিনেই হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছিলাম, আমরা মানুকাকার সংসারে উচ্ছিষ্ট। অবশ্য বাবার স্বভাব কিছুই গায়ে না মাখা। সুতরাং এ-হেন বাবা আজ কি না জানি খবর নিয়ে এসেছেন। বিছানা থেকে লাফিয়ে নামতেই শুনলাম, বাবার বেশ ক্ষুণ্ণ গলা—ধনবৌ, মানুষের খারাপটা মনে রাখতে নেই। ভালটা মনে রাখলে কষ্ট পাবে কম। মানুষ এতে বেশি সুখী হয়, ঈশ্বর প্রসন্ন থাকেন।

    বাবা তারপর খাটো গলায় বললেন, বিলুটা ঘুমিয়ে পড়েছে?

    মা বললেন, বোধ হয়।

    ভেতর থেকে বললাম, না বাবা, ঘুমাই নি।

    এবং সঙ্গে সঙ্গে পিলুর গলা, আমিও ঘুমাই নি বাবা।

    মায়া বলল, আমার খুব ভয় লাগছিল তুমি আসছ না, চিন্তা হয় না?

    মায়া আজকাল পাকা পাকা কথা বলে। আসলে সবাই জেগে আছে। বাবা আমার কি ভাগ্যফল লিখে আনছেন জানার জন্য কেউ ঘুমোতে পারছে না।

    অনেকক্ষণ হয়ে গেল, বাবা আর মানুকাকার কথায় যাচ্ছেন না। বাধ্য হয়ে বললাম, মানুকাকা কি বলেছে?

    —বলেছে। অনেক কথা বলেছে। তোমার তা শুনে দরকার নেই। তোমার একটা কাজও ঠিক করে ফেলেছে।

    —কাজ!

    —হে, যে সে কাজ নয়, বড় কাজ। মানু বলল, কলেজে পড়লে ত, কেরানীগিরি করতে হয়, মাথা ঠিক থাকে না। তোমার পাসটাও খুব ভাল না বলল। বললাম কত, দেখ মানু, আমাকে পাস নিয়ে বোঝাস না। সব বিষয়ে পাস কে করে রে? তুই করেছিস? করলে তোকে কেরানীগিরি করতে হত?

    আমি জানি, আসলে বাবা এসব কিছুই বলেন নি। তবে মনে মনে হয়তো বলেছেন! মনে মনে বলাটাকেও তিনি ভাবেন বলাই হল। আমার সব কেমন গোলমাল ঠেকছে। বললাম, কি কাজ?

    —খুব বড় কাজ। এ কাজ করে মানুর বন্ধু শহরে তিনটে বাড়ি করেছে, গাড়ি করেছে। বাসরুট করেছে। জলঙ্গী ডোমকল বাস যায়, সব ওদের। কত বড় কথা!

    মা বললেন, কাজটা কি বলবে তো।

    —মোটর মেকানিকের কাজ। এই যে গাড়ি দেখছ, বেগড়বাই করলে তোমার পুত্র কান মলে দিতে পারবে। তোমার পুত্র কত দূরে যেতে পারবে জান। একটু-আধটু কালি-ঝুলি মাখতে হবে, তা বড় কাজে মাখতেই হয়। সাধু-সন্ন্যাসীরা ছাইভস্ম মাখেন, সে কি খুব খারাপ কাজ?

    বাবা জলচৌকিতে বসে অনর্গল কথা বলছেন—কোথায় কবে মানুকাকার বন্ধু এমন একটা কাজেই প্রথম হাত দিয়েছিল। গাড়ি চালাতে শিখল। দূর দূর জায়গায় চলে যেত। যখন খুশি তুমিও যেতে পারবে, ইচ্ছে হলে একটু পদ্মাপাড়ে ঘুরে আসবে, সে তোমাকে গাড়ি চড়িয়ে নিয়ে যাবে। মাকে বাবা খুশি রাখবার জন্য বললেন, এখন তুমি যা বলবে তাই হবে।

    –বিলু তো বলছিল কলেজে পড়বে।

    —কলেজ! না না ধনবৌ, তোমাদের সবারই দেখছি মতিভ্রম হয়েছে। হাতের লক্ষ্মী পায়ে ঠেলতে নেই। একটা আস্ত গাড়ি চালিয়ে নিয়ে যাওয়া কি কম বড় কথা। গাড়িতে কত মানুষ, কত কাজ, অফিস কাছারি সব সে টাইম মতো করাবে। ওর মর্জির ওপর সব।

    আমার রা সরছিল না। বুঝতে পারছিলাম, মানুকাকা আমার যে কাজটি ঠিক করেছে, তা তার বন্ধুর গ্যারেজে। প্রথমে হেপ্পার নাম দিয়ে সব রকমের কাজ চালিয়ে নেওয়া। মানুকাকা আমাদের দুরবস্থার কথা ভেবে, তাড়াতাড়ি কাজে লাগিয়ে দিতে চান। যা বিদ্যে হয়েছে, ওতেই ও কাজ চলে যাবে। আমরা গাঁয়ের মানুষ, দেশের বাড়িতে ঠাকুরদার টোল ছিল, সেই সুবাদে বাবার মন্ত্রপাঠ, পুজা- আর্চা নিখুঁত। প্রথমে এ দেশে এসে বাবা ভেবেছিলেন, তাঁর হাতের সম্বলটুকুই যথেষ্ট। গ্রাসাচ্ছাদনের পক্ষে খুব বেশি আর কিছুর দরকার নেই। কিন্তু তাঁর যে মন্ত্রপাঠের ঠিকুজী কুষ্ঠি ঠিক আছে, এই নিয়েই বড় সংশয় মানুষের। মানুকাকাই পূজা-পার্বণে শ্রাদ্ধে বাবার হয়ে পার্টি ঠিক করে দিতেন। ঠাকুর প্রতিষ্ঠার সময় কিছু লোকজনও বাবা খাইয়েছিলেন। তাঁর খেরো খাতায় দেশের মানুষজনের সব খবর লেখা আছে। তারা কোথায় কে থাকে, তিনি চোখ বুজে বলে দিতে পারেন। অভাবের তাড়নায় পূজা-পার্বণের নাম করে বের হলে আর বাড়ি ফিরতে চাইতেন না। সেই বাবার ছেলের এ-দেশে একটা কাজ জুটিয়ে দিয়েছে মানু, তাতেই আমার সুমহান পিতৃদেব গদ্‌গদ।

    আমি বললাম, বাবা!

    বাবা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে কিছুটা স্তব্ধ হয়ে গেলেন। আমার চোখে মুখে কি লেখা ছিল জানি না, বাবা কি পড়লেন জানি না—তিনি আর কিছু বলতে পারলেন না। মাথা নীচু করে বসে থাকলেন। আর ঠিক এ সময়েই বাবা আমার কত অসহায় উপলদ্ধি করলাম। কলেজে পড়ানো বাবার ক্ষমতার বাইরে। পিতার এই চোখ-মুখ আমাকে বড় পীড়া দিল। বাবাকে সান্ত্বনা দেবার জন্য বললাম, গাড়ি চালিয়ে নেওয়া কত বড় কাজ না বাবা!

    বাবা খুব প্রফুল্ল হয়ে উঠলেন, তালে তুই বুঝেছিস। কথায় বলে না, বড় যদি হতে চাও, ছোট হও তবে। ছোট কাজে কোন লজ্জা রাখতে নেই বিলু। সব কাজই মানুষ করে। আসল কথা স্বভাব। স্বভাব ঠিক থাকলে সব কাজ বড় কাজ

    আমাদের স্বভাব ঠিক আছে, এটাই বাবার এখন আপ্তবাক্য। তাঁর কথা পরের দ্রব্য না বলিয়া লইলে অপহরণ করা হয়। আমি এ বিষয়ে পিতার মতোই শুচিবাইগ্রস্থ। অবশ্য পিলুটা অন্য রকমের। তার এতটা শুচিবাই নেই। বাবা একবার স্টেশনে ফেলে রেখে আমাদের উধাও হয়েছিলেন। পিলু তখন সংসারে স্বাধীনতা সংগ্রামী। যত্র তত্র তার বিচরণ। সে যেখানে যা পেত, তুলে নিয়ে আসত। শসা চুরি করতে গিয়ে সে মারও খেয়েছে। অবশ্য অতটা দৈন্যদশা এখন আমদের আর নেই। মানুষের ঘরবাড়ি হয়ে গেলে যা হয়। আকাশ মাটি শস্যক্ষেত্র সব এখন পাপপুণ্যের কথা বলে। বাড়িঘর করার পর পাপপুণ্য বোধ সংসারে বাড়ে। বাবা বললেন, বুঝলে না, এ সব কাজে বিশ্বাসী মানুষদের দরকার। আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, তুই কিন্তু বংশের মান রাখিস। মানুর মুখ রক্ষা করিস।

    পিলু বলল, দাদা, তুই এ কাজ করবি না।

    মায়া বলল, দাদা আমার কলেজে পড়বে না বাবা?

    মা খুবই নিরুপায় চোখেমুখে তাকাচ্ছিলেন। লণ্ঠনের আলোটা দপদপ করে জ্বলছে। শরতের গাছপালা বাতাসে দুলছিল। অন্ধকার অরণ্যে একটি ছোট্ট ঘরের বারান্দায় আমরা চার জন মুখোমুখি বসে। কেউ আর কোন কথা বলছিলাম না। আমার কেমন কান্না পাচ্ছিল। কারণ কোন দূরবর্তী নক্ষত্রে কে যেন ডাকে। বড় হই, গাছপালা মাঠের সঙ্গে সেও আমার পাশাপাশি হাঁটে। গোপনে কত কথা বলি। কখনও সুদূরের মাঠ পার হই হাত ধরে। কখনও শস্যক্ষেত্র মাড়িয়ে যাই দুজনে। কেউ পৃথিবীর এই গোপন খবর টের পায় না। রাতে ঘুম হয় না। ছটফট করি। মাথার ঘিলু পোকায় কাটে। এবং সেদিনটি এসে যায়। বাবা আমাকে মানুকাকার দোকানে বুঝিয়ে দিয়ে আসেন। মানুকাকা একটা স্যাঁতসেঁতে পুরনো ভাঙা চালাঘরে ঢুকিয়ে দিয়ে বলল, গোবিন্দ, ওকে দেখে-টেখে রাখিস। লোহালক্কড়ে ভর্তি ভাঙা গাড়ি, মানুষের ভিড়ভাড়াক্কা দিনের বেলায়। নাট-বোল্ট খোলা, রেঞ্চ আর হাতুড়ি সম্বল, সকালে একখানা পাঁউরুটি দুপুরে ডাল ভাত, রাতে তড়কা আর রুটি। খিস্তি-খেউড় আর দাবানলের মতো অনন্ত জ্বালা। বিকেলে দেখি লালদীঘির পাড় ধরে ছেলেরা যায় মেয়েরা যায়। কী সুন্দর নীল রঙের পোশাক শরীরে। মনে হয়, ওরা কোন স্বপ্নের জগতের বাসিন্দা। আমার বুঝি সেখানে আর কোনকালে যাওয়া হবে না। গাড়ির ফুটবোর্ডের নীচে মাথা, ভিতরে গাড়ির কলকব্জা, তার নীচে জীবনের সব বিষয়ে পাস বাবার নিরীহ এক কৃতী ছেলে।

    সবই সহ্য হচ্ছিল। কেবল খিস্তি-খেউড় বাদে। গোবিন্দ-পঞ্চানন আমার মনিব। তার মনিব গোলক দাস। বাসে ঘন্টি বাজায়। বাস মালিক কিংবা কাকার সেই বন্ধুটির সাক্ষাৎ আর পাই না। পেলে একটা আর্জি ছিল। কারণ সহনীয় নয়, এমন কিছু কাজ গোবিন্দ আমাকে দিয়ে করাতে চায়। আইন অমান্য করি বলে তার সহ্য হয় না। না পেরে ছুতোয়-নাতায় কিল ঘুষি। ভাবি পালাই, কিন্তু বাবার বংশের মুখ রক্ষা না হয় ভেবে পড়ে থাকি। কিন্তু জীবন মানবে কেন, সে বিদ্রোহ করে। এই বিদ্রোহ থেকেই আমার প্রথম নিরুদ্দেশ যাত্রা।

    সেটা কৃষ্ণপক্ষের রাত-টাত ছিল। শহরের রাস্তায় আলো ছিল না। আমাকে স্টেশনে যেতে হলে মাঠ ভাঙতে হবে। সাহেবদের কবরখানা পার হয়ে যেতে হবে। ভূতের ভয় বড় প্রবল। অনেকটা পথ ঘুরে, ফলে স্টেশনে পৌঁছতে দেরি হয়ে গেল। ভেতরে প্রচন্ড অভিমান সবার উপর। বাবা, মা, মানুকাকা সবাই যেন সংসারে ষড়যন্ত্র করে চলেছে। সব তছনছ করে দিয়ে পালাচ্ছি। রেলগুমটি দেখা যাচ্ছে। সিগনালের নীল বাতি। গাড়ি আসছে। গাড়িতে উঠে পড়লেই মনে হল, আমার নতুন জীবন শুরু। সম্বল বলতে এখন আমি একজন উদ্বাস্তু বাবার সন্তান। তবে সাত খুন মাপ। গাড়িতে টিকিট লাগে না। চেকার হলে শুধু বাবার পুরনো স্বভাবটা ঝালিয়ে নেওয়া। আমাদের বেড়ালছানার মত নিয়ে যখন তিনি ট্রেনে এখানে সেখানে আশ্রয় খুঁজছিলেন, তখন বাবার স্বাভাবিক বুদ্ধি আমাদের কত অপমান থেকে যে রক্ষা করেছে। বাবা দিলখোলা মানুষ। আমি একেবারে বিপরীত। মুখচোরা স্বভাবের বলে ঠিক কথার পৃষ্ঠে ভাল কথাও যোগাতে পারি না।

    ট্রেন ছেড়ে দিতেই হু-হু করে কান্না উঠে এল বুক থেকে। আমি আমার প্রিয় গাছপালা, হেমন্তের কুকুর পিলু মায়াকে ছেড়ে চলে যাচ্ছি। কবে ফিরব জানি না। ফিরলেও মানুষ হয়ে ফেরা দরকার। বাবার যেন বংশের মান রক্ষা হয়। এমন কিছু করব কি করে, তাও জানি না। কেন জানি সব সময় মনে হয়, আমার দুরবস্থা দেখে কেউ আমায় ঠিক আশ্রয় দেবে। আর কিছু না পাই, বাবার আকৃতি পেয়েছি। বাবা আমার বড় সুপুরুষ মানুষ। দীর্ঘদেহী, উজ্জ্বল গাত্রবর্ণ এবং বড় পুষ্ট গোঁফ আর মজবুত শরীরের খানিকটা আমার মধ্যে ইতিমধ্যে এসে গেছে। চোখ বড় বড়। যে চোখ দেখলে মানুষের মায়া হবার কথা।

    রাতের ট্রেন ছুটছে। রাতের ট্রেন বলে যাত্রী কম। শুয়ে বসে থাকা যায়। এক কোণে ঘাপটি মেরে বসে আছি। অপরিচিত মানুষজনের মধ্যে আছি, কেউ একবার জিজ্ঞেসও করছে না খোকা কোথায় যাবে? এ সময় কেউ দুটো কথা বললেও যেন সাহস পেতাম। সব যাত্রীদের দিকেই চোখ বুলিয়ে নিলাম। আমার সমবয়সী মেয়েটি মাত্র দুবার তাকিয়েই মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছে। এতক্ষণে লক্ষ্য করলাম, গায়ে আমার কোন ভদ্রলোকের বাচ্চার ছাপ নেই। হাফ প্যান্ট, কালিঝুলি মাখা, মুখটা কেমন দেখাচ্ছে তাও জানি না। পা খালি। এই সম্বল করে আমি আপাতত কলকাতা যাচ্ছি। শুনেছি শহরটাতে মাটি নেই। যেখানে মাটি নেই, সেখানে মানুষের পাপপুণ্য বোধও কম। কলকাতার নামে বাবা সব সময়ই ক্ষেপে থাকতেন। সেই শহরে আমি গেছি জানলেই বাবা ভারি মনোকষ্টে ভুগবেন। কিন্তু যাঁর সঙ্গে আমার আপাতত দেখা হওয়া দরকার, তাঁকে পেতে হলে শহরটা না মাড়িয়ে যাবার উপায় নেই। তিনি দিল্লীতে থাকেন। মানুষের জন্য তাঁর ভারি কষ্ট। কাগজে পড়েছি, তিনি যে কোন মানুষকে ইচ্ছে করলে অর্ধেক রাজত্ব এবং রাজকন্যা দিতে পারেন। আমার এতটা দরকার নেই, একটু আশ্রয় আর খাদ্য আর নীল মলাটের বই। সঙ্গে ভদ্রগোছের কাজ। বাবার জন্য মাসে মাসে কিছু টাকা, ফেরার সময় পিলু-মায়ার জন্য জামাপ্যান্ট। ছুটিছাটায় বাড়ি ফিরব যখন, মার জন্য জামদানি একখানা শাড়ি।

    গ্যারেজে তাঁর ছবি কাগজে দেখেছি, আর মনে মনে কথা বলেছি। তাঁর কোটে লাল গোলাপ ফুল। শিশুদের তিনি গলা জড়িয়ে ধরে আদর করছেন। এই দেশবাড়ির কাকা জ্যাঠার মতো—তিনি আমায়ও বুকে জড়িয়ে যেন কথা বলছেন, বিলু তোমার খুব কষ্ট। বলব, হ্যাঁ, এই দেখুন না, গোবিন্দ আমাকে শুধু শুধু মারে। আমার খুব পড়াশোনা করতে ইচ্ছে হয়। আমি কি ইচ্ছে করে অঙ্কে ফেল করেছিলাম? বাবা বলতেন, বাড়িঘর না হলে মানুষের পড়াশোনারও দরকার হয় না। যাও বাড়িঘর হল, বই নেই। পরীক্ষার আগে একটা কাটাছেঁড়া অঙ্কের বই—ও পড়ে কেউ পাস করতে পারে? ১৬-র উপপাদ্যটা পর্যন্ত উপড়ে নিয়েছে। আঃ, যদি ওটা থাকত, ফেল করতাম না অঙ্কে। কিন্তু আমার বাবা যখন জানলেন, দশটা বিষয়ের মধ্যে ন’টা বিষয়ে পাস করেছি, তখন কি খুশি। আমার কাঁদো কাঁদো মুখ দেখে বললেন, বিলু, জীবনে কে কবে সব বিষয়ে পাস করেছে রে? মন খারাপ করছিস কেন? দেশের যে অত বড় মানুষ আপনি, আপনার নাকি ন’টা বিষয়ে পাস। বাবার কাছে সব বিষয়ে আপনি পাস করতে পারেন নি কেন? দেশ ভাগে আপনার মদত না থাকলে বাবা বোধ হয় আপনাকে সব বিষয়েই পাস মার্ক দিয়ে দিতেন। আমি কিন্তু বাবার কাছে জীবনে সব বিষয়ে পাস করা ছেলে। আমার কিছু একটা হিল্লে করে দিতেই হবে।

    এসব কথাগুলিই ঘুরে-ফিরে আমার মাথায় আসছে। মাঝে মাঝে দরজায় শব্দ হলেই তাকাচ্ছি। চোর-বাটপাড়ের মতো বসে থাকা। চেকারবাবু কোন দরজা দিয়ে ঢুকবে কে জানে? মাঝে মাঝে জানলায় উঁকি মেরে দেখছি। গোটা দুই-চার স্টেশন পার হয়ে গেলে বড় একটা স্টেশনে গাড়ি এল। এখানে এত বিলম্ব কেন বুঝতে পারছিলাম না। তবে কি দেশের সব পুলিস আর চেকারবাবুরা দেখে ফেলেছে, ট্রেনে একজন বিনা টিকিটের যাত্রী আছে? বুকটা গুরগুর করছে। উপরে বাঙ্ক। পা ঝুলিয়ে বেশ নির্বিঘ্নে ঘুমাচ্ছে কেউ। টিকিট কেটে যেদিন আমি ট্রেনে চড়ব, ঠিক এভাবে একটা ঘুম। অনেক আকাঙক্ষার মধ্যে আরও একটা আকাঙ্ক্ষা জীবন আমার এ মুহূর্তে পকেটে পুরে ফেলল। ট্রেনে যেতে যেতে কত সুন্দর সব গাছপালা শস্যক্ষেত্র শহর গঞ্জ চোখে পড়ে—কিছুই তারিয়ে তারিয়ে দেখতে পারছি না। সাত খুন মাপ ঠিক, কিন্তু আমি যে উদ্বাস্তু তার প্রমাণ? কথা বলি বাঙাল ভাষায়, ওটা একটা বড় রকমের সার্টিফিকেট-আর যদি নাই শোনে, বলে দেব বাবার আমি জীবনে সব বিষয়ে পাস করা কৃতী ছেলে—কাজের খোঁজে বের হয়েছি। আমার মা-বাবা বড় গরিব। আমি কলেজে পড়ব, ভাইবোনেদের কত আশা। যখন বড় হব, আমার টাকা হবে, মান যশ হবে, কড়া ক্রান্তি মিটিয়ে দেব।

    মনে মনে নানা ভাবে সাহস সঞ্চয় করে যাচ্ছি। আর সারাক্ষণ নেংটি ইঁদুরের মতো এ দরজায় ও দরজায় পালাচ্ছি। কখনও উঁকি মারছি, কখনও রড ধরে এ কামরা ও কামরা করছি। যতক্ষণ সম্মানের সঙ্গে ট্রেনযাত্রা শেষ করা যায়। ও মা, কখন আমি এ সব করতে করতে বাঙ্কের নিচে ঘুমিয়ে পড়েছি জানিই না। সকালবেলায় ঝাড়ুদার এসে পা টানতেই জেগে গেলাম। ও বাবা, মরা মানুষ নাকি!

    খুব কাঁচুমাচু মুখে তাকালাম। কথা বললাম না। টেনে বের করে দিয়েছিল কতকটা আর কিছুটা বের করে দিলে কামরার বাইরে। সেটা দয়া করে করে নি। করলে রক্ষা পাওয়া যেত। ট্রেনে যে এসেছি, তার কোন চিহ্ন থাকত না। ফলে কামরাটা পার হতে হল নিজেকে। আর নেমেই দেখি, কি পরিচ্ছন্ন আকাশ, শরতের মিষ্টি রোদ। রেলের অজস্র লাইন বাড়িঘর পেছনে ফেলে কত দূরদূরান্তে ছুটেছে। আর তখনই দেখলাম পায়ের কাছে একটা ডাইরি কার পড়ে আছে। কুড়িয়ে পাওয়া জিনিস নিতে নেই। বাবার শিক্ষা। কিন্তু আমার ইতিমধ্যে নানাভাবে নিয়মভঙ্গ হয়েছে। কাজেই ডাইরিটা পকেটে পুরে ফেললাম। কেউ না আবার দেখে ফেলে। একা মানুষ, সব কিছুই এখন জীবনে বড় দরকারী বস্তু হয়ে গেছে। আর সবচেয়ে বিস্ময়, কত গাড়ি, কত ইঞ্জিন, এটা যে কোন স্টেশন নয়, বুঝতে অসুবিধা হল না। শান্টিং করছে গাড়ি। ঝমঝম শব্দ। খুব সন্তর্পণে লাইনগুলি পার হয়ে ছোট্ট একটা নিমের ছায়ায় বসা গেল। এবং মনে হল ডাইরিতে সব লিখে রাখা দরকার। কারণ সব আবার ভুলে না যাই। বিশেষ করে ধার-দেনা যার কাছে যা জমছে। প্রথমেই লিখলাম গোবিন্দ-বিশ টাকা। পরে লিখলাম, রেলগাড়ি—তিন টাকা দশ আনা। গোবিন্দের কৌটায় রাখা কুড়িটা টাকা না বলে নিয়ে এসেছি। একটা চিরকুটে লিখে এসেছি, গোবিন্দদা, তুমি আমাকে মার কেন? আমি তোমার কুড়ি টাকা নিলাম। যখন বড় হব, মান যশ হবে, তখন টাকা ফেরত দেব। বাবার নামে চিরকুট — বাবা, আমি আপনার কাছে ন’ বিষয়ে পাস করা লোকটার সঙ্গে দেখা করব বলে বের হয়ে পড়েছি। আমার জন্য ভাববেন না। আর যাই মানাক, আপনার সব বিষয়ে পাস করা ছেলেটির কিন্তু গ্যারেজে লাথি- ঝাঁটা খাওয়া মানায় না। গোবিন্দদা আমাকে অনর্থক মারধোর করতো। আমরা গরিব বলেই ও এতটা সাহস পায়।

    তা হলে মোটামুটি ধার-দেনার হিসাব লেখা হয়ে গেল। এখন কিছু খাওয়া দরকার। দিল্লীর গাড়িটা কোথা থেকে ছাড়ে খোঁজখবর নিতে হবে।

    একটা লোককে জিজ্ঞেস করে জানা গেল, সামনে কিছুটা হেঁটে গেলেই শিয়ালদা স্টেশন। স্টেশনেই গাড়ি ছিল। শেষ মাল খালাস করার জন্য আবার বুঝি নিয়ে এসেছিল এখানটায়। সেটা খালাস পেয়ে যাওয়ায় গাড়ি হালকা হয়ে গেছে। চলেও গেছে। এখন খালাস মালের বিড়ম্বনা। সে কি করে?

    খালাস মালটি আসলে খুবই ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেছে। কি সব বড় বড় বাড়ি, যেদিকে চোখ যায় গিজগিজ করছে টিনের চাল, অজস্র রাস্তা। দালান কোঠার মেলা বসে গেছে। খালাস মালটির পেটে খিদের উদ্রেক হয়েছে। চোখে-মুখে জল দিয়ে কিছু খাওয়া দরকার।

    খালাস মালের খিদেটা একটু বেশি। যাকে বলে খিদে সম্পর্কে নাড়ি তার টনটনে। কিন্তু এখানে সবই গোলকধাঁধা। লোহার রেলিং দু’ধারে। সুতরাং কাউকে অনুসরণ করা ভাল। শেষ পর্যন্ত যেখানটায় আসা গেল, ওটার নাম তার জানা নেই। পিছনের দিকে তাকাতেই বুঝল জায়গামতই এসে গেছে। বড় বড় হরফে লেখা স্টেশনের নাম। চা-বিস্কুটের দোকান। ডিম ভাজা, মাছ ভাজা, মানুষজন, মলমূত্র গাদাগাদি। ভারি দুর্গন্ধ। স্টেশন চত্বরে শুয়ে বসে কালিমাখা সব মুখ। হোগলা চাটাই পাতা, মুড়ি চিড়া ভাত যে যা পারছে খাচ্ছে।

    বুঝতে কষ্ট হল না, এরাও আমার মত খালাস মাল। বুকে সাহস এসে গেল। এক আনার চিনাবাদাম কিনে খাচ্ছি, আর ভাবছি, গাড়িটার খবর কে দেবে? কাকে বলি, দিল্লীর গাড়ি ক’টায় ছাড়ে? বেশি কথাও বলা যায় না, যদি ধরে ফেলে পালাচ্ছে। পুলিস তো না পারে, হেন কাজ নেই। পালাচ্ছে যখন, নির্ঘাত চুরি-চামারি করেছে। তা করেছে, কিন্তু গোবিন্দদার কাছে সে তো চিঠিতে জানিয়ে এসেছে, অর্থ ফেরত যোগ্য। তাছাড়া যদি পুলিস ধরেও ফেলে, ডাইরি খুলে দেখাবে, এই দেখুন কে কি পাবে, সব লিখে রেখেছি। টাকা মান যশ হলে সব ফেরত। টাকা মান যশ হলে টিকিট কেটে ট্রেনে উঠব। একটা লম্বা ঘুম দেব। কেউ বিরক্ত করলে ধমক দেব। ওঃ, কি মজা! ট্রেনটা যাচ্ছে আর যাচ্ছে।

    তখনই খ্যাঁক করে উঠল একটা মুখ, এই উল্লুককা বাচ্চে। আমাকে ঠেলা দিয়ে একটা গাড়ি চলে গেল। গাড়ি চাপা পড়ি নি, ভাগ্য। এত দিকে নজর রাখি কী করে? কলকাতা শহর—বাবা ঠিকই বলেছেন, এখানে মানুষ থাকে! এখনই বাবার কৃতী ছেলেটা যেত। আসলে বুঝতে পারছিলাম, এই শহরে আসতে হলে আগে থেকে ট্রেনিং দরকার। কিছুতেই রাস্তা পার হতে পারছিলাম না। এত গাড়ি যে কোথায় থাকে! তারপর চোখ বুজে লম্বা দৌড়। যা হয় হবে। তারপর চোখ খুলে দেখি না সত্যি পার হয়ে এসেছি। যাক্। আর পায় কে? ফিসফিস করে রাস্তাটাকে বললাম, এই বাচ্চে, আটকে রাখতে পারলি? সামনে দেখলাম লেখা, এনকোয়ারি। এই তো সেই জায়গা। ভিড় ঠেলে মুখ বার করে বললাম, দিল্লীর গাড়ি ক’টায় ছাড়বে? লোকটা কি ভাবল, কে জানে? হঠাৎ তেড়ে এল, এই ধর ধর। ধর তো ওটাকে। চ্যাংড়ামো করার জায়গা পায় না। ধরতে বললেই কি আর ধরা যায়? নিজের ভাবনা- চিন্তা না করে দৌড়। একটু আড়ালে এসে দাড়াতেই হুঁশ হল, আমি কি অন্যায় বলেছি, লোকটা আমাকে ধরতে বলল? সামান্য ঘাড় তেড়া করে এগিয়ে গেলাম—আমার কি দোষ? আমায় এত অবজ্ঞা করছেন কেন? দিল্লীর গাড়িতে আমি উঠতে পারি না? শেষে মনে হল, যাক গে, বয়স্ক মানুষ! যা ভিড়, মাথা খারাপ হতেই পারে। আর আমার তো এক জামা প্যান্ট সম্বল। পায়ে জুতো পর্যন্ত নেই। যার এমন হতশ্রী অবস্থা তার বোধ হয় দিল্লীর গাড়িতে ওঠার নিয়ম নেই। মানুষজন পঙ্গপালের মত উড়ছে। কাকে বলা যায়? আমারই বয়সী একটা ছেলে লজেন্স বিক্রি করছে। সমবয়সী ভেবে টান ধরে গেল। আপাতত ত্রাণকর্তা ভেবে বললাম, এই যে শুনছ।

    —লজেন্স? কটা দেব?

    —না। দিল্লীর গাড়ি ক’টায় ছাড়ে?

    —এটা তো এখানে ছাড়ে না। হাওড়া যেতে হবে।

    —কোন্ দিকে?

    —সামনের মোড়ে বাস পাবে।

    সামনেটা কোথায়? কারণ যেদিকে তাকাই, মানুষের মিছিল। যাচ্ছে আসছে। গাড়ির মিছিল। যাচ্ছে আসছে। এত সব পার হয়ে সেই সামনেটাকে খোঁজা কত যে দুরূহ এবং মনে হল চড়চাপড় খেয়ে জায়গার মাল জায়গাতেই পড়ে থাকা ভাল ছিল। কি যে দুর্মতি হল। বেলা বাড়ছে। পেটে কামড় বসাচ্ছে। সামান্য ভাত মাছ, আমার একান্ত প্রিয় খাদ্য। সুস্বাদু খাবার বলতে এই বুঝি। নিচে নেমে ট্রাম লাইনও পাওয়া গেল। আর কোথা থেকে আসছে ইলিশ মাছ ভাজার ঘ্রাণ। সব গুবলেট করে দিল। দিল্লীর ট্রেন, হাওড়া, টাকা মান যশ, সব মাথা থেকে ফাঁকা হয়ে গেল। শুধু এক টুকরো ইলিশ মাছ ভাজা—আপাতত মাছ ভাজা ভাত হলে মন্দ হয় না। সূর্য মাথার উপর কখন উঠে গেছে— এত কি ভাবনা গেল মাথার মধ্যে দিয়ে যে বেলা যায় টের করতে পারি না। ও মা, এই সেই বেরন হোটেল। গোবিন্দদা বলেছিল, কলকাতায় গেলে বেরন হোটেলে খাস। তখন কলকাতার স্বপ্ন বড় শহরে গেলেই নাকি মানুষের হিল্লে হয়ে যায়। এখন আর কিছু খোঁজাখুঁজি না। চটপট ঢুকে বললাম, ভাত দিন।

    কাউন্টারের লোকটা তাকাল। আমি যে ভাত মাছ খেতে পারি, আমার যে রেস্ত আছে, লোকটার বোধ হয় বিশ্বাস হল না। তাকিয়ে হঠাৎ বলল, যা ভাগ! বেটা কোথাকার ভিখারী-

    খুব রাগ হয়ে গেল। আচ্ছা দেখা যাবে। টাকা মান যশ হোক। দেখা যাবে। তবে এখন কোন গন্ডগোল করা ঠিক হবে না। সময়টা আমার ভাল যাচ্ছে না। বললাম, টাকা দেব। এই দেখুন আমার কাছে টাকা আছে। বলে টাকা বের করে দেখাতেই লোকটার মায়া পড়ে গেল।

    বলল, বস। কি খাবি?

    —ভাত খাব। মাছ খাব। ওদিকের টেবিলে একটা লোক মাছের মুড়ো তারিয়ে তারিয়ে খাচ্ছে। লোভে পড়ে বলে ফেললাম, মাছের মুড়ো খাব।

    সামনের বেসিনে হাত ধোওয়া গেল। মুখে চুরি করে সামান্য সাবান মেখে ফেললাম। আড়চোখে দেখছি, কারণ হাতমুখ ধোবার এমন সুযোগ আর কখন পাব জানি না। মুখটা ধুতেই বাবার মুখশ্রী ভেসে উঠল। আমায় এখন দেখলে লোকটা নিশ্চয়ই আর ভিখিরীর বাচ্চা ভাববে না। জামার আস্তিনে মুখ মুছে যখন খেতে বসলাম, তখন আমার প্রায় জ্ঞানগম্যি লোপ পেল। ঝোল, ভাত, ভাজা, মুগের ডাল, মাছের মুড়ো সব চেয়ে খেতে লাগলাম। চারপাশের টেবিলের লোকগুলি হাঁ করে দেখছে, তাও খেয়াল নেই। ওরা তো জানে না, কাল দুপুর থেকে পেটে কোন দানা পড়ে নি। খিদে পেলে মানুষ বোধ হয় কিছুটা আহাম্মক হয়ে যায়। খাবার শেষে বিল দেখে টের পাওয়া গেল, পুরো দু’ টাকা পাঁচ আনা বিল। এত টাকা একসঙ্গে খেয়ে মনটা ভারি দমে গেল। হিসাব করে বুঝলাম রেস্ত বলতে এখন সম্বল সতের টাকা এগার আনা। এটা যে কত বড় সম্বল, এই বড় আগাপাশতলাবিহীন শহরে না এলে বোঝা যেত না। কারণ শহরটার মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝছি না। সব বড় বড় রাস্তা, এত বড় রাস্তা আমার বাপের জন্মে কে কবে দেখেছে? এক সঙ্গে দু’তিনটে গাড়ি রাস্তা ধরে যায় আসে। বড় বড় ট্রাম গাড়িগুলি গলে যায়। আর ভেপোঁ বাজে, ক্রিং ক্রিং শব্দ। যেন পাগলা ঘন্টি— হুঁশিয়ার! সামনে পড়লেই ভোগে লেগে যাবে।

    আর যাই হোক, ভোগে লাগছি না। কারো হাত ধরে রাস্তা পার হওয়া যায় না? হাত না হোক, জামার আস্তিন। তাও যখন সাহসে কুলাল না, লোকের পিছু পিছু যাওয়াই ভাল। একজন মুটের পেছনে যেতে গিয়ে রাস্তা পার হবার জ্ঞানগম্যি মিলে গেল। একার ভয় অনেক। অনেকের পেছনে থাকলে গাড়িও ভয় পাবে। মোড়ে শরবতের দোকান। কাপড়ের দোকান। মিষ্টির দোকান। পান সিগারেটের দোকান। মানুষের শুধু অগুনতি মাথা। এত লোক কলকাতায় থাকে? এতটুকু নির্জন জায়গা নেই যে এমন সুস্বাদু খাবার খেয়ে টেনে ঘুম দেওয়া যেতে পারে! তার পরই মনে হল, পকেটে টাকাটা থাকতে থাকতে দিল্লীর গাড়ি ধরা দরকার। কোনদিকে গেলে হাওড়া স্টেশন পাওয়া যাবে? শহরের উত্তরে না দক্ষিণে? মুশকিল শহরের উত্তর দক্ষিণও টের পাচ্ছি না। সূর্য আকাশছোঁয়া সব বাড়ির ‘পেছনে লুকিয়ে আছে।

    মানুষের সঙ্গে কথা বলা কী যে নিদারুণ বিপত্তিকর, রাস্তায় ট্রেনে সর্বত্র টের পাচ্ছি। সবার যেন টাকার থলে হারিয়ে গেছে। হন্যে হয়ে খুঁজছে। কেউ দু’দণ্ড দাঁড়াচ্ছে না। দাঁড়ালেই অন্য কেউ থলেটা বুঝি গস্ত করবে! মনে অবশ্য অনেক প্রশ্নটশ্ন কখন থেকে থিকথিক করছে। হাওড়া কোন্ দিকে? হাওড়ার বাস কোথায় পাওয়া যায়? কখন ছাড়ে? এতগুলি প্রশ্ন শুনে যদি বিরক্ত হয়। পালিয়ে হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি, সদাশয় মানুষের বড় অভাব পৃথিবীতে। সবারই টাকার থলে হারিয়ে গেলে যা হয়। শরবতওয়ালাকে বললে কেমন হয়? সে তো নিশ্চিন্তে শুধু ঢালাঢালি করছে। আর লাল নীল রঙের বাহারী শরবত এগিয়ে দিচ্ছে। টুক করে মুখ বাড়িয়ে বললাম, হাওড়ার বাস কটায় ছাড়ে? কে বলছে, লোকটির যেন লক্ষ্য করার কথা না। কী বলছে, তার জবাব দেওয়াই সারকথা। গ্লাসে ঢালাঢালি করতে গেলেও গভীর মনোযোগের যে দরকার হয়, অর্থাৎ সারা মাস কাল বছর যুগ যুগ ধরে অনন্ত এই ঢালাঢালি করতে করতেই জীবন যায়, এমন মনে হবার সময় শুনলাম—ঐ তো যায়।

    ঐ তো যায় কাকে বলা। তাই তো, বাসটা আমারই সামনে দিয়ে চলে গেল। এটা হাওড়ার বাস! কী যে দুর্গতি এখন! মনে মনে বললাম, শরবতওয়ালা, বাস আবার কখন আসবে? জোরে বলতে পারছি না। যদি মনোযোগ ভঙ্গের দরুন খ্যাক করে ওঠে। আসলে এদেশে আসার পরই বাবার পায়ের তলাকার মাটি সরে যায়। ক্রমে আমরা বাবার সঙ্গে কেমন যেন ভীরু স্বভাবের হয়ে যাই। কেবল পিলুটা অন্য রকমের। ও সঙ্গে থাকলে কখন হাওড়া পৌঁছে যেতে পারতাম।

    পিলুর জন্য, বাড়ির জন্য আবার মনে টান ধরে গেল। কিছুটা অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছি। সকালের মধ্যেই বাড়িতে খবর পৌঁছে যাবার কথা। মা হয়ত হাউ হাউ করে কান্নাকাটি জুড়ে দেবে। বাবার স্বভাব অন্য রকমের। তিনি শুধু একটা কথাই বলবেন, ভবিতব্য। পিলুটা গুম মেরে থাকবে। তার দাদাটা হারিয়ে গেছে। বনে-জঙ্গলে তার ঘোরাঘুরিটা হয়ত একটু বেড়ে যাবে। মায়ার যা স্বভাব- সে রোজই আশা করবে, মাঠ পার হয়ে দাদা ফিরে আসছে। ফাঁক পেলেই সে বড় রাস্তায় চলে যাবে।

    হাওড়ার বাসের জন্য খুব আর একটা ভাবছি না। আবার ক’টায় হাওড়ার বাস আসবে জিজ্ঞেস করলেই হয়ে যাবে। এখন হাতে কিছুটা সময় যখন আছে, এদিক ওদিক দেখে এলে হয়। এই যেমন চিড়িয়াখানা, জাদুঘর—এই কলকাতাতেই এগুলি আছে। বেশি দূরে যেতে হবে না। তারপরই মনে হল, ফিরে এসে যদি বাস ফেল করি, এই সব ভয়ে জায়গা থেকে কেন জানি নড়তে সাহস হল না।

    শরবতওয়ালার নজর আছে বলতে হবে। আমি যে দাঁড়িয়ে আছি—কেন দাঁড়িয়ে আছি, রাস্তায় ‘কেউ কলকাতায় দাঁড়িয়ে থাকে না, দাঁড়িয়ে থাকলে কিছু একটা অপকর্মের ধান্ধা আছে—তার কাঁচা পয়সা কেড়ে নিতে কতক্ষণ? সে বেশ সতর্ক গলায় বলল, এই সামনে দাঁড়িয়ে আছিস কেন? সরে দাঁড়া।

    কথা যখন বলেছে, সাহস আমারও কম না। কিছুটা সরে গিয়ে বললাম, হাওড়ার বাস আবার ক’টায় আসবে?

    লোকটা হয়ত আমাকে ত্যাঁদড় ভাবল। আমি যে সদ্য কাঁচামাল, এই কলকাতায়, সে বিশ্বাস করল না। আপদটা দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে নেই, এটাই তার বোধহয় এখন বড় ভরসা। সে আবার নিজের কাজে মনোযোগ দিতেই কলকাতার শেষ চেনা লোকটা আমার আবার কেমন অচেনা হয়ে গেল।

    আবার সামনে একের পর এক বাস চলে যাচ্ছে। বাপস্! বাসের কপালেও যে লেখা আছে কী সব? এতক্ষণ এটা খেয়ালই করি নি। সারাক্ষণ মানুষজন, বাস-ট্রাম আর গাড়িঘোড়া কেবল দেখে যাচ্ছি। স্টেশনের ও পাশটায় সারি সারি ঘোড়ার গাড়ি, একটা ভাড়া করলে সে নিশ্চয়ই হাওড়ায় পৌঁছে দিত। কিন্তু কত দূর কে জানে? হাওড়ার ব্রীজ জানা আছে, তাই বলে রাস্তাটা কত লম্বা, কি করে জানব? শহরে এসে কত কিছু ইচ্ছে হচ্ছে। ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গ, ইডেন গার্ডেন—সব নাম শুনেছি, অথচ বাবার সেই ন’ বিষয়ে পাস করা লোকটার সঙ্গে আমার বড় জরুরী কাজ। কখন কোথায় আবার চলে যায়? এবারে স্বাদ আহ্লাদ না মিটুক, পরের বারে হবে। টাকা মান যশ হলে সবাইকে কলকাতা দেখিয়ে নিয়ে যাব। সবাইকে নিয়ে ট্রামে চড়ব। পিলু প্রথম ভড়কে গিয়ে এত ভাল ছেলে হয়ে যাবে যে রাস্তাই পার হতে পারবে না। আমার তখন হাসি পাবে।

    বাবা, রানাঘাটের বড় পাবদা মাছ খাবার গল্প করলে, পিলুর বড় বাসনা হয়েছিল রানাঘাট দেখার। সেটা কত দূর, সে বাবাকে বার বার প্রশ্ন করে জানতে চেয়েছিল। পিলু জানেই না তার দাদা রানাঘাট পার হয়ে আরও কত দূর চলে এসেছে। ফাঁকে ফাঁকে বাসের কপালে নাম পড়ে যাচ্ছে—এই নামগুলিই গন্তব্যস্থল বাসের, এই অনুমান নির্ভরের উপর ভরসা করে শেষ পর্যন্ত হাওড়াগামী বাসে ওঠা গেল। কিন্তু সংশয় প্রবল। কোথাকার মাল কোথায় নিয়ে আবার খালাস করে দেবে কে জানে? বললাম, বাস হাওড়া যাবে? লোকটা ঘণ্টা বাজিয়ে দিয়ে বলল, যাবে। ভিতরে ঢুকে মনে হল, স্টেশনের কথা বলা হয় নি। আবার মুখ বাড়িয়ে ভিড়ের মধ্যে প্রশ্ন, হাওড়া স্টেশন যাবে?

    —যাবে।

    সে তো যাবে। স্টেশনটা আমি চিনব কী করে? ন’ বিষয়ে পাস করা লোকটার সঙ্গে দেখা করার এত ফ্যাসাদ আগে জানলে, মাথা গরম করতে সাহস পেতাম না। এমন একটা ব্যস্ত শহরে একই লোককে পর পর দুটো প্রশ্ন করেছি এবং জবাব পেয়েছি—ভাবাই যায় না। গাদাগাদি বাসে দাঁড়িয়ে। বাইরের কিছুই দেখা যাচ্ছে না। মাঝে মাঝে ঘণ্টা বাজিয়ে লোকটা কি সব হাঁকছে। এই হাঁকগুলি কিসের সংকেত? কারণ পিলুটা যা, সে তো হাঁ করে দাদার অভিযানের প্রতিটি পথ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে শুনবে। কি ভাবে হাওড়া পৌঁছলাম, তাকে কোন বর্ণনাই দিতে পারব না। আসলে মনে হচ্ছিল, টানেলের মধ্যে দিয়ে আমরা যাচ্ছি। মানুষজন চারপাশে এত ঘন হয়ে দাঁড়ালে পৃথিবীটা গোলকধাঁধা হওয়া স্বাভাবিক। একবার অতি কৌতূহলে মাথা গুঁজে দেখার চেষ্টা করলে কনুইয়ে গুঁতো মেরে জায়গারটা জায়গায় ফিরিয়ে দিল। কোনরকমে টাল সামলে কনুইওয়ালাকে বললাম, দাদা, হাওড়া স্টেশন এলে বলবেন।

    লোকটা এবারে খুব ভালমানুষ হয়ে গেল। বলল, বাসটা স্টেশনেই যাবে।

    কিছুটা স্বস্তি। লোকটার কনুই সোজা হয়ে আছে, ওটা আরও স্বস্তি। নাকে লেগেছে। টনটন করছে। একবার হাত বুলিয়ে দেখলাম, হাতে রক্ত-টক্ত লাগে কিনা? না, এখন পর্যন্ত হাত-পা-মুখ সবই অক্ষত রাখতে পেরেছি। বাবা-মার আর্শী বাদেই সব। বাবা-মার আশীর্বাদে স্টেশনেও ঠিক পৌঁছে যাব। কিন্তু লোকটা ভুলে যায় নি তো? আমার কথা মনে রাখার তার কোন দায় নাও থাকতে পারে। এত ভিড় ঠেলাঠেলি, গুঁতোগুঁতির মধ্যে বাবার নাম ভুলে গেলেও দুঃখ করার নেই। সুতরাং ফের প্রশ্ন— স্টেশন আর কত দূর?

    লোকটা বলল, অনেক দূর। বাসটা যাচ্ছে না, সেই থেকে হর্ন বাজাচ্ছে। অনেকক্ষণ হয়ে গেল, এত কি রাস্তায় পড়ে আছে যে, বাসটাকে এগুতে দিচ্ছে না? এটা কেমন আজব শহর, যেখানে গাড়িঘোড়া চলে গোযানের মত। বাবার কথাই ঠিক, শহরটায় মাটি নেই, মাটি না থাকলে মানুষের ধর্ম থাকে না। শান পাথর শুধু, গরমে ভ্যাপসা হয়ে যায়। শহর তো নয়, যেন অতিকায় এক উত্তপ্ত তাওয়া। মানুষজন ঘরবাড়ি তার উপর ভাজাভুজি হচ্ছে।

    এখন আমি বাসে নিরালম্ব মানুষ। কোন ভয় নেই। ভেসে আছি মতো। আঠার মধ্যে লেপটে আছি, উড়ে যাবার ভয় নেই। তারপরই বাসটা প্রবল ঝাঁকুনি দিয়ে কোথাও উঠে গেল। মৃদুমন্দ হাওয়া আসছে। পাশের লোকটা তখনও আমার কথা মনে রাখতে পেরেছে। আমার তৃতীয় বার প্রশ্ন করার সাহস কম। সে নিজ থেকেই যখন বলল, এসে গেছি, তখন তার কাছে আমার ঋণের শেষ থাকল না।

    .

    বাস খালি করে সব নেমে গেল। সামনে অতিকায় লাল রঙের বাড়ি। পিঁপড়ের সারি যেন মানুষজনের . মিছিল। এর মধ্যে আমার পা গুটিগুটি চলছে। বড় বড় সাইনবোর্ড, খেজুর, আপেল, আঙুরের দোকান, বইয়ের দোকান। মানুষজন দৌড়াচ্ছে কেন? কোথাও আগুন লাগে নি তো? ভিতরে ঢুকে রহস্যটা ধরা গেল। গাড়িগুলি উগরে দিচ্ছে মানুষজন। আবার উদর ভর্তি করে চলে যাচ্ছে। কি সব এলাহি কাণ্ডকারখানা! একটা বড় ঘড়ি, কত সব ফাঁক ফোঁকরে মেমসাবের মুখ। আর অজস্র ভিখারী। সবাইকে একটা করে পয়সা যদি দিই, তালেও কুলাবে না। মানুষের আর্ত চিৎকার শুনলে নিজের মধ্যে কেউ যেন আমার কথা বলে ওঠে, বিলু, তুমি পথ হারিয়ে ফেলেছ। এদের মধ্যে মিশে গেলে, তোমার মা-বাবা আর তোমাকে চিনতে পারবে না।

    সহসা ঘুম ভেঙে যাওয়ায় ধড়মড় করে উঠে বসলাম। কেউ যেন আমায় ডাকছে। সে কে, বুঝতে পারছি না। চারপাশে গভীর অন্ধকার। কোন আলো জ্বলছে না। কোথায় আমি আছি, ঠিক মনে করে উঠতে পারছি না। ঘুমের জড়তায় মাথাটা বড় নির্বোধ। ভ্যাবলার মতো বসে থাকা ছাড়া যেন আর কোন উপায় নেই। জড়বুদ্ধি, স্থির চোখ, ভেতরে চাপা অসহায়তা। মাথার উপরে আকাশ, নক্ষত্র, গাছপালা আরও দূরে কোন জংশন স্টেশন কিংবা কোন লোকালয়ে আছি বিশ্বাস হচ্ছিল না। মাথার মধ্যে একটা রেলগাড়ি সহসা ঝমঝম করে চলে গেল। মনে পড়ে গেল, ট্রেনে চড়ে কোথাও যাচ্ছিলাম— এই পর্যন্ত। না, তারপর মনে কিছু আসছে না।

    অন্ধকারে টের পেলাম, কেমন আবছা মতো একটা মানুষ যেন এগিয়ে এসে আমাকে দেখছে। আবছা ছায়ামূর্তিটাকে জায়গা করে দেবার জন্য সরে বসলাম। এটা একটা বাড়ির গেট, বসার রোয়াক দু’পাশে। একটা ধাপের সিঁড়িতে এতক্ষণ এক পলাতক শুয়েছিল তবে। নীচে কাঁচা নর্দমা—গুনগুন করছে মশার পঙ্গপাল। আবছা মূর্তিটা এবারে টর্চ জ্বেলে আমার কি দেখল কে জানে? জায়গা বেদখল দেখে লোকটা রাগ করতে পারে। কেউ রাগ করলে আমার বড় খারাপ লাগে। অন্ধকারে সরে পড়াই শ্রেয়—হাঁটা দিলাম। মাথাটা ঘুরছে। তিন-চার দিন অনাহারে থাকলে মাথার কি দোষ! যতটা পারা যায় ঠিক থাকার চেষ্টা করছি।

    —এই কোথায় যাচ্ছ?

    তাহলে এই লোকটাই আমাকে ডাকছিল। আমাকে ঘুমের নেশায় পেয়ে গেছে। কাল থেকে, যেখানে পারছি শুয়ে পড়ছি। পৃথিবীতে আমার ঘরবাড়ি আছে, মা-বোন আছে, পিলু আছে, কিছুই মনে আসছিল না। আমার পলাতক জীবনে কেউ আজ পর্যন্ত এমন প্রশ্ন করে নি। আমি কোথায় যাচ্ছি, এ নিয়ে কারো কোন মাথাব্যথা ছিল না। থমকে দাঁড়ালাম। অনেকদিন পর কেউ আমায় ডাকল।

    লোকটা নেমে এল। কাছে এসে দাঁড়াল। কেমন টলছে। আপাদমস্তক টর্চ মেরে কি দেখে বলল, রাগ দ্যাখ ছোকরার। আমি খুব খারাপ মানুষ! তুমিও। মশারা যে ষড়যন্ত্র করছে, টের পাও নি। যা ঝাঁক বেঁধে বসেছিল, উড়িয়ে নিত। আমার সামনে হাপিস করে দেবে-না, সে হবে না। হতে দেব না। তার পরই লোকটা ওক দিল। মাথার ওপরে হাত তুলে ঘড়ির পেণ্ডুলামের মতো মুখের ওপর দুলতে থাকল।

    লোকটা টেনে টেনে কথা বলছিল। সব কথা স্পষ্ট নয়। জড়তা রয়েছে কথায়। লোকটা মাতাল টের পেলাম। কেমন ভয় ধরে গেল। দৌড়ে পালাব ভাবছি। কিন্তু হাঁটুতে জোর পাচ্ছি না। খেতে না পেলে যা হয়। মাথা ঠিক থাকে না। হলে কি হবে, জ্ঞানের নাড়ি টনটনে। মর্যাদার বড় দন্ত মনে।

    সে বলল, রোয়াকে শুয়ে ছিলে কেন? বাড়িঘর নেই? আমার আছে। চিনতে পারছি না। ওক। আবার কথা, কিন্তু শেষ করতে পারল না। তার আগেই পড়ে যাচ্ছিল। তাড়াতাড়ি ধরে ফেললাম। পড়লে কাঁচা নর্দমায় ডুবে যাবে। মানুষের এত কষ্ট আমার সহ্য হয় না। বললাম, হাত ধরুন, দিয়ে আসি।

    –সেই ভাল। একটা হেঁচকি দিল। তারপর টর্চটা আমার হাতে দিয়ে বলল, খুঁজে দেখ জুঁই ফুলের গাছ।

    —জুঁই ফুলের গাছ এত রাতে কোথায় খুঁজব?

    লোকটা আমাকে অবলম্বন করে হাঁটছে। টর্চ মেরে মানুষটির অবয়ব দেখার চেষ্টা করতেই, কেমন আর্ত চিৎকার—না না। আলো না। মানুষটিকে বড় সম্ভ্রান্ত মনে হল। পাজামা পাঞ্জাবী গায়।

    –কী — পেলে?

    –না।

    —দুটো পাম গাছ?

    —না।

    —তবে কোথায় নিয়ে এলে?

    —জানি না।

    —আলবত জানতে হবে। তোমার বাপকে জানতে হবে।

    —বাপ তুলে কথা বলবেন না। রাগ করব।

    লোকটা কেমন চুকচুক করে বলল, আমার মনু-

    তারপরই পাম গাছ, রোয়াক পার হতেই এটা টের পাওয়া গেল। একটা পেয়ারা গাছ, উঠোন, জুঁই ফুলের গাছ। রঙিন ফুলের ঝাড়। সুঘ্রাণ ফুলের। কি ফুলের এমন ঘ্রাণ হয়! সামনে সিঁড়ি। সিঁড়িতে উঠেই লোকটা কি হাতড়াতে থাকল এবং পেয়েও গেল যেন। ভিতরে সহসা আলো, লণ্ডভণ্ড এক ঘরের ছবি।

    লোকটা আমার হাতে চাবি দিয়ে সংকেত করল কিছুর। তারপর ধপাস করে সিঁড়িতে বসে পড়ল। দরজা লক করা, চাবি ঘুরিয়ে দিতেই দরজা খুলে গেল। বললাম, উঠুন। কোন সাড়া শব্দ নেই। উঠুন।

    লোকটা হুঁম শব্দ করল।

    —আপনার ঘরবাড়ি?

    ঘরবাড়ির কথা মনে পড়তেই লোকটা হামাগুড়ি দিতে থাকল। এবং ঘরে ঢুকে খাটের ওপরও উঠে গেল হামাগুড়ি দিয়ে। শুধু বলল, বড় সমুদ্র পার হওয়া যায় না?

    এমন প্রশ্নের কি জবাব হবে জানি না। এখানে সমুদ্রই বা কোথা থেকে এল? তবে খাটটা বড়ই প্রশস্ত। সাদা চাদর জ্যোৎস্নার মতো ফুটফুটে। বালিশ ঠিকঠাক করে দিলে পরিপাটি বিছানা। বিছানাতে উঠেই লোকটা লম্বা হয়ে গেল। মরার মতো পড়ে থাকল।

    এ আবার কোন্ ফ্যাসাদ। কথা বললে আর জবাব দেয় না। কেবল হুঁম করে ওঠে। দরজাটা ভিতর থেকে বন্ধ করে দেওয়া দরকার। আর কি কেউ নেই। ভাই-বোন, স্ত্রী-পুত্র, আত্মীয়-পরিজন- মানুষটার ভূগোল জানতে ইচ্ছে করছে। তবে ক্ষুধার্ত মানুষের যা হয়। অবসাদ — অবসাদ ক্রমেই আমাকে আরও বেশি জড়বুদ্ধি করে তুলছে। খাটের একপাশে আমিও কেমন লম্বা হয়ে গেলাম। রাত অনেক। চোখ আমার আবার জড়িয়ে আসছে।

    সকালে ঘুম ভাঙলে দেখলাম, লোকটা নেই। দরজা ভেজানো। আর বসে থাকা ঠিক না। রাতের কাণ্ডজ্ঞান বর্জিত লোকটার ভূগোলে বুঝতে পারছিলাম বড় বেশি পাহাড় জঙ্গল। যে কোন সময় বাঘ লাফিয়ে পড়তে পারে। আর তখনই লোকটা হাজির। ব্যাগে কি সব ভর্তি করে নিয়ে এসেছে। কাঁধে ফ্লাস্ক। হাসি-খুশি মেজাজী মানুষ! কি, ঘুম হল?

    –কথা বলতে পারলাম না।

    —কাল খুব জ্বালিয়েছি।

    মুখে রা সরছে না। অজ্ঞাতকুলশীল এক লোককে এত বড় বান্ধব কি করে মানুষটা ভাবে? তারপরই হাসতে হাসতে বলল, তুমি একটা পাগল আছ। দেশ কোথায়? ঠিক আছে, এখন ওসব থাক। আগে চান করে এস। সামনে গুরুদুয়ারা আছে, কল আছে—এই নাও সাবান। ভাল করে চান করবে। ঘুরে ঘুরে গায়ে বোটকা গন্ধ লাগিয়েছ।

    বসে আছি। এতটুকু জোর পাচ্ছি না। চোখ জ্বলছে। সারা গায়ে এক অপার্থিব যন্ত্রণা। টাকা, মান, যশ—না, আর ভাবতে পারছি না। সব বড় সুদূরের হয়ে যাচ্ছে। কেবল লোকটা সদাশয় হয়ে ওঠায় কোথায় যেন মাথায় এক কী-লক গেঁথে দিল কেউ। তাতে পা রেখে ওপরে ওঠা যেতে পারে। মনের মধ্যে অদ্ভুত ঘোলা জল, বেনো জল, নদীর জল, জলপ্রপাতের জল ঢুকে যাচ্ছে। সব কেমন গুলিয়ে উঠছে।

    লোকটা ফের বলল, কী হল। বসে থাকলে কেন? যাও। আমার কত কাজ। সামনে গুরুদোয়ারা আছে। রাস্তা পার হলেই পাবে। এই সাবান। জামা-প্যান্ট কাচবে।

    তবু বসে থাকলাম। হাই উঠছে।

    সদাশয় মানুষটি লুঙ্গি দিল পরতে। ঢোলা ফতুয়া। হাতে তুলে দিয়ে বলল, শীগগির যাও। আমায় আবার বের হতে হবে।

    এত সকালে মানুষটি স্নান-টান করে ফিটফাট। কে বলবে, অনেক রাতে মানুষটা তার আবাসে – নেশা করে ফিরেছিল। আর যাই হোক, মানুষটিকে ভয় পাবার কিছু নেই। মানুষের আচরণ কত সহজে বিশ্বাসযোগ্য হয়ে যায় কখনো। স্নান সেরে এসে দেখি, চারপিস পাউরুটি, ডিম ভাজা আর ডালমুট সাজিয়ে বসে আছে। আহার শব্দটি এদেশে আসার পরই একটু বেশি মনোরম। আহার শব্দটি মনে এলে মাথা আমার এমনিতেই ঠিক থাকে না। দেরি করলে কোন অদৃশ্য আত্মা কেড়েকুড়ে খাবে, ভয়ে প্রায় হামলে পড়লাম। নিমেষে শেষ করে ফেলতেই মানুষটি হাত মুছতে বলল, কত দিন হল?

    মুখে পাউরুটির শেষটুকু। কোঁত করে গিলে বোকার মতো তাকালাম।

    —কত দিন পর খাওয়া হল তোর?

    আমার চোখে জল এসে গেল। মাথা নীচু করে ফেললাম। মানুষটি বোধহয় চোখের জল দেখতে পারে না। অন্যদিকে তাকিয়ে বলল, ঠিক আছে—মনু শোন, বের হচ্ছি। পায়ে জুতো গলিয়ে বলল, তোমার কি নাম?

    নাম বললে মানুষটা কেমন আঁতকে উঠে বলল, এই রে, তোর তো ভাই জাত গেল। ছিঃ ছিঃ আগে বলতে হয়-

    জাত বিষয়টা আমার বাবার পরম গৌরবের বিষয়। কুলীন ব্রাহ্মণ তিনি। তাঁর কাছে ঘরবাড়ি আশ্রয় সব যেতে পারে—কিন্তু জাত যেতে পারে না। সগৌরবে তাকে টিকিয়ে রাখতে হয়। জন্ম মৃত্যু সব অর্থহীন, জাত ঠিকঠাক না থাকলে। আমার স্বভাবটা অন্যরকমের। বাবার কাছে এজন্য মাঝে- সাজে কুলাঙ্গার। যে মানুষটি আমাকে খাদ্য এবং আশ্রয় দিয়েছে, তার সংস্পর্শে জাত যায় কি করে ভেবে পেলাম না। আমার বাবা তো জাত যাবে বলে দেশ ছেড়ে চলেই এলেন।

    মানুষটির পরনে দামী প্যান্ট শার্ট। শৌখিন। যা কিছু অগোছালো ছিল, সব গোছগাছ করে বের হচ্ছে। একটাই ঘর। পাশে পাঁচিল। জানালা দিয়ে মুখ বাড়ালে পাঁচিল সংলগ্ন সুন্দর ছিমছাম বাড়িটা দেখা যায়। সামনে বড় পাকা রাস্তা—কোথায় কত দূর চলে গেছে! স্নান সেরে আসার সময় কিছু শিউলি ফুল মাড়িয়ে এসেছি। তখনই মনে হয়েছিল একবার — দুর্গাপূজার সময়-শরৎকালে কাশ ফুল ফোটে শিউলি ফুল ফোটে।

    আমি কিছু না বলায় মানুষটিকে গম্ভীর দেখাল। তাড়াহুড়ো করে বের হচ্ছিল। আবার সামনে এসে দাঁড়াল। এখন দেখলে মনে হয় না আর কোন তাড়া আছে। রাস্তায় একটা গাড়ি হর্ন দিচ্ছিল। কি যেন ভাবছে।

    মানুষটি এবার কি ভেবে বলল, এ হারামের নাম সামসুর রহমান।

    আমি বললাম, এখানে কোন কাজটাজ পাওয়া যাবে না?

    —কি কাজ করবে?

    —এই যে কোন কাজ।

    দুজনই কিছুটা এবারে স্বাভাবিক হয়ে আসছি।

    —তোর বাবা-মা আছেন?

    —আছেন।

    —পড়াশোনা কতটুকু?

    —আমি চুপ।

    —তোর তো পড়াশোনার বয়স। কাজ করবি কি?

    —না, আমাকে একটা কাজ দিন। যে কোন কাজ। বলতে সাহস হল না, ন’ বিষয়ে পাস করা লোকটার সঙ্গে দেখা করার জন্য বের হয়েছিলাম। কত বড় আহাম্মক হলে এটা হয়, এখন বুঝতে পারছি। মনের মধ্যে একটা বিড়াল এতদিন বাঘের মতো হালুম ডাকছিল – ঘুরেফিরে মনে হয়েছে বেড়াল বেশি হলে ইঁদুর মেরে খেতে পারে। হরিণের মাংস সে পাবে কোত্থেকে! আসলে এই প্রথম আমার বোধোদয় ঘটল। মানুষই মানুষকে ভালবাসে। মানুষই মানুষকে বাস্তুচ্যুত করে। আবার আশ্রয় দেয়, খাদ্য দেয়। মানুষ স্বার্থপর, কুটিল, হিংস্র, নিরাভরণ, যখন যা দরকার তার সবই ঘটে।

    —যে কোন কাজ তুই পারবি কেন? চোখ মুখ তো সে কথা বলে না।

    আমাকে আবার চুপ করে থাকতে দেখে মানুষটি বলল, ঠিক আছে। এখনকার মতো দশ আনা রেখে দাও। আমার ফিরতে রাত হবে। পাঁড়েজীর দোকানে দুপুরে খেয়ে নেবে। ভাত, মাছ, ডাল। ফ্লাস্কে চা আছে—ও আর খেতে হবে না। খেতে ইচ্ছে হলে দোকানে চলে যাবে। বলেই মুখ বার করে দোকানটা দেখিয়ে দিল।

    —চা তো খাই না।

    —চা খাও না! অসুখ আছে?

    —না। চা খাই না। আসলে আমাদের পরিবারের ভূগোলটাই ছিল আলাদা। বাবা চা, ধুমপান, মদ্যপান—একটি ত্রিভুজের তিনটি কোণ মিলে দুই সমকোণ ধরে নিয়েছিলেন। চা না খাওয়াটাই ভাল মানুষের লক্ষণ। আমার পক্ষে বাড়তি বিপজ্জনক কিছু করা এ সময় আর ঠিক হবে না। ফের বললাম, সত্যি বিশ্বাস করুন, চা খাই না।

    মানুষটি এবার উঠে বের হয়ে গেল। যাবার সময় শুধু বলে গেল, পাড়েজী দশ আনা — দশ আনায় মিল দেবে পেট ভরে খাবে।

    দুটো খাঁজকাটা চৌ-আনি, একটা দো-আনি, মোট দশ আনি! দশ আনায় পেট ভরে ভাত। দশ আনা কত বড় ব্যাপার, এ সময় আমার চোখমুখ না দেখলে বোঝা যাবে না। বাইরে রোদ উঠেছে। তারে জামাপ্যান্ট মেলা দরকার। কালো রঙের চেক-কাটা লুঙ্গিটা সাইজে বড়। কালো রঙের ফতুয়াটা ঢোলা। বামুনের ছেলের পক্ষে বড় বেশি বেমানান। ওটা পরে বের হতে লজ্জা করছিল। কিন্তু আয়নায় যখন দেখলাম, বামুনের ছেলেকে লুঙ্গি পরে খারাপ দেখাচ্ছে না, তখন নিশ্চিন্তে বের হওয়া যাক। পয়সা ক’টা হাতছাড়া করছি না। সেই ট্রেনে চলে যাব, টিকিট কেটে যাব, লাটসাহেবের মত বাঙ্কে পড়ে ঘুমোব এবং চেকার এলে ইঁদুরছানা ভয়ে মরে করতে হবে না—আসলে পয়সা থাকলে কত না কাব্য হয়—আর কাব্য করতে গিয়ে কাল—টিকিট কেটে যাও বা ছিল, এটা ওটা খেয়ে শেষ। বামুন হলে যা হয়। অভাবী হলে যা হয়। পয়সা হাতে থাকলেই খাই খাই—সব খাই, কমলালেবু খাই, লজেন্স খাই, ঝালমুড়ি খাই—খেতে খেতে কখন ট্রেনে ভিড়ের চাপে উড়ন্ত চাকির মত প্ল্যাটফরমে ভেসে পড়েছিলাম মনে করতে পারছি না। পেট ভরে খেলে বোধহয় বাকিটা মনে পড়বে। পয়সা কটা মুঠো করা। বাইরে বের হতেই ছিমছাম বাড়িটা থেকে পাখির মতো এক বালিকা উড়ে এল সাইকেলে। একেবারে সামনে।

    তাড়াতাড়ি এবাউট টার্ন। আবার ভিতরে। খেতে পাব ভেবে লজ্জা-সরম যা এতদিন উবে গিয়েছিল তা আবার ফিরে এসেছে। এতদিন মনেই হয় নি কেউ আমায় দেখে। হাতে দশ আনা পয়সা আসতেই নিজের অস্তিত্ব ফের টের পাচ্ছি। পয়সার এত বড় মাহাত্ম্য। চুপি দিয়ে দেখছি মেয়েটা আবার ভিতরে কখন ঢুকে যায়। আর যাই করা যাক, একটা লুঙ্গি আর ফতুয়া গায়ে দিয়ে একজন কিশোরের পক্ষে কোন কিশোরীর সামনে যাওয়া যায় না। মেয়েটা টুক করে ভিতরে ঢুকে গেলে আমিও টুক করে তারে জামাপ্যান্ট ফেলে আবার ঘরে। একের পর এক ধাক্কা খেয়ে সকালবেলায়ও চারপাশটা ভাল করে দেখা হয় নি। ছিমছাম সাদা রঙের বাড়ি— বাংলো গোছের—এই পর্যন্ত। বাড়িটার লাগোয়া বেশ বড় একটি ফুল-ফলের বাগান, পুকুর আছে। ঘরের উত্তরের জানলাটা খুলতেই তা দেখা গেল।

    মেয়েটা ভেতরে কোথায় যায়, কোন্ রহস্যময় জগৎ থেকে বা ভেসে এল—দেখা দিয়ে আবার উধাও —পালিয়ে চুপি চুপি দেখছি। আশ্চর্য মায়াময় ছায়ায় ঘেরা এক পৃথিবী। সেখানে মেয়েটা গাছে সাইকেল হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কাউকে ডাকছে। সাইকেল পেলে আমিও অনেক দূর চলে যেতে পারি। আমি কেমন মুগ্ধ বিস্ময়ে ফ্রকপরা বালিকাটিকে দেখছিলাম। গাছের মতো ঋজু এক বালিকা দাঁড়িয়ে আছে। আর একটু বাদেই আমি পেট ভরে খেতে পাব। আয়নায় মুখ দেখা যাচ্ছে। লুঙ্গি পরে যাই কি করে? তারপরই দেখলাম, সাদা ফ্রকপরা মেয়েটা কোথায় অদৃশ্য! চিঠি দিলে পিলুকে লিখতে হবে, জানিস পিলু, সার্কাসের একটা মেয়ে এখানে থাকে। সাইকেল চালাতে জানে। স্বচক্ষে দেখেছি, বিশ্বাস না হয় তুই আসিস, তোকে দেখাব।

    মেয়েটি অদৃশ্য হয়ে যেতেই কেমন জায়গাটা ফাঁকা এবং অর্থহীন হয়ে গেল। বসে থেকে লাভ নেই। এ মুহূর্তে সবচেয়ে বড় কাজ পাড়েজীর দোকান খুঁজে বের করা। স্টেশন রোডে গেলে পাওয়া যাবে। সেটা কত দূর জানা নেই। যা দিনকাল, সব মানুষ রাক্ষুসে হয়ে আছে, আগে থেকে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকাই ভাল। কিন্তু মুশকিল, লুঙ্গি আর ফতুয়া। মেয়েটিকে দেখার পর আমি মুশকিলাসান হয়ে গেছি। হাতে সেঁজবাতি আর গলায় পাথরের মালা ব্যস। ষোল আনা কাজ শেষ। কালো অন্ধকারে কিম্ভূতাকার সেই মানুষের মতো এখন লাগছে নিজেকে। তবে ক্ষুধার তাড়নার কাছে মান- সম্মান বালাই ষাট। লুঙ্গি তুলে খিঁচে এক দৌড় মারব। রাস্তায় পড়লে কে আর কার চেনা! যত অসুবিধা, আম গাছ, জুঁই গাছ, রঙ্গন ফুলের গাছের মাঝখানে। বাংলোবাড়িটা উঠোনে বের হলেই দেখা যায়। ব্যালকনিতে যদি সে দাঁড়িয়ে থাকে। গলা বাড়ালাম। নেই। চুপি চুপি বের হলাম। লুঙ্গি খিঁচে দৌড়। আ-হা-হা আবার সাইকেল। পাক খাচ্ছে। দৌড় দৌড়। সোজা ঘরে। দেখার আগেই দরজার আড়ালে। এ আবার কী বিড়ম্বনা শুরু হল। খেতে যেতে পর্যন্ত দেবে না।

    উঁকি দিলাম। সামনের উঠোনটা ফাঁকা। পেয়ারা গাছটা একা দাঁড়িয়ে। নীচে খাটিয়া পাতা, রাস্তায় মানুষজন, গাড়ি, রিকশা এবং প্রসন্ন রোদ। গুরুদোয়ারাতে ভজন হচ্ছে। লুঙ্গিটা তুলে নিলাম। লুঙ্গিটা তুলে না নিলে তাড়াতাড়ি ছোটা যাবে না। জড়িয়ে গিয়ে রাস্তাঘাটে চৌপাট হলে আবার দশ রকমের প্রশ্ন—কোন্ বাড়ির ছেলে—আহা লাগল না তো? ওঠো ওঠো, গাড়ি আসছে, এত সবের পর ভাত খেতে লেট হয়ে যেতে পারে। পেট পুরে খাওয়া ভাবা যায় না। এ কদিন বেশ ছিলাম, অনাহার সয়ে গেলে যা হয়। কেমন বোধগম্যিহীন এক কিশোর—রাস্তায় হেঁটে বেড়ায়। চোখে ঘোলা ঘোলা দেখা—পৃথিবীতে তখন অন্যরকমের মজা দেখা যায়। সকালে পেটে কিছু পড়তেই পুরনো রোগটার উদ্রেক হয়েছে। পেটে ক্ষুধার জ্বালা। মেয়েটা বুঝতে পারে না কেন এ-সময় সাইকেলে পাক খেলে ক্ষুধার্ত ছেলেটির পথ আগলে থাকা হয়।

    ফাঁকা দেখে বের হওয়া মাত্র সহসা পাঁচিল থেকে মুখ বাড়িয়ে ঘেউ করে উঠল একটা কুকুর। ঐই রে—আমাকে ধরার জন্য পাঁচিল খামচাচ্ছে। নতুন লোকের গন্ধ পেয়ে ক্ষেপে গেছে। বুঝতে পেরেছে কাছেই চোর-বাটপাড়ের আস্তানা। মনে মনে আওড়ালাম, সব লিখে রেখেছি। টাকা মান যশ হলে কড়া-ক্রান্তি মিটিয়ে দেব। তুমি একখানা বিলিতি কুকুর। তোমার মান-সম্মানই আলাদা। আমায় ছেড়ে দাও বাছা।

    মুশকিল হচ্ছে, এখনও ঘরে আছি। বিলাইতি পাঁচিল টপকালে দরজা বন্ধ করে দেব। বোঝাই যাচ্ছে, বাংলোবাড়ির শখের কুকুর। উঠোনে নেমে গেলে, বিলাইতি পাঁচিল টপকাতে না পারুক, সদর দিয়ে বের হয়ে আসতে পারে। সুতরাং এ বেলার মতো আমার আর খাওয়া হল না বোধ হয়। রহমানদা না ফিরলে কিছু হচ্ছে না।

    ঘরে পায়চারি করছি। একটা টেবিলক্লক দেয়াল-আলমারিতে। টিকটিক করছে। দশটা, দশটা এক মিনিট, দু’ মিনিট— মিনিটের কাঁটাও এত লম্বা হয়। ভারি অস্বস্তি বোধ করছি। আমােেক নিয়ে তোমরা মজা পেয়ে গেছ! দেখাচ্ছি—দরজা খুলে তাড়াতাড়ি ফের চাবি দিয়ে সোজা চোখ বুজে দৌড়। পেটের জ্বালা বড় জ্বালা। রোয়াক পর্যন্ত দৌড়ে এসেই টের পেলাম, পেছনে আমার লুঙ্গি কে খিঁচে ধরেছে। পালাতে হলে লুঙ্গি খুলে পালাতে হয়। এমন অব্যবস্থার ভেতর আমি জীবনেও পড়ি নি। পেছনে চোখ খুলতেই অবাক। বিলাইতি আমার লুঙ্গিটা চামড়া ছেঁড়ার মতো টেনে পালাতে চাইছে। বিকট কুকুরের এই অসম্ভ্রান্ত আচরণে মর্মাহত তরুণ ফের চোখ বুজে ফেলল ভয়ে। বাবার ঈশ্বর কত করুণাঘন, টের পেল সে। আর তখনই সাইকেলওয়ালী কোথা থেকে উদয়। খিলখিল করে হাসছে। মা-মা, দেখ টাইগারের কাণ্ড।

    দোতলায় ব্যালকনি থেকে কারো গম্ভীর গলা, এ কি অসভ্যতা হচ্ছে টাইগার। রুমকি, তুমিই বা কেমন, দাঁড়িয়ে হা-হা করে হাসছ। লোকটা কে রে?

    বলতে পারতাম মা জননী, আমি রিফুজি। বাবার সুপুত্র, জীবনের সব বিষয়ে পাস কৃতী ছেলে। কিন্তু যা অবস্থা, গলা শুকিয়ে কাঠ। দু’হাতে লুঙ্গি চেপে ধরে আছি কোমরে। কথা বের হচ্ছে না। আসলে তোতলাচ্ছি ভয়ে।

    —এই, ছেড়ে দে—ছেড়ে দে বলছি। বুঝতে পারছিলাম, আমার মত হতভাগার লুঙ্গি কামড়ে ধরায় বিলাইতির ইজ্জত গেছে। সাইকেলওয়ালী ধমকাচ্ছে কুকুরটাকে।

    —কে রে লোকটা? ব্যালকনি থেকে ফের হাঁক।

    —এই, ছাড়, কে জানি না তো! ছাড় বলছি। টাইগার, ভাল হবে না।

    —কোন রকমে বললাম, রহমানদা দশ আনা পয়সা দিয়েছে। সত্যি বলছি, চুরি করি নি। হাতের মুঠোয় পয়সা ক’টা খুলে দেখালাম।

    —রহমান কে হয়?

    চোখ বুজেই বলছি, কে হয়—কুকুরটাকে বলুন না ছেড়ে দিতে। খুব ভাল কুকুর। ভাবি ভদ্র। কে হয় মনে করতে পারছি না।

    —ছেড়ে দেবে? তুমি এখানে কেন? সময় হলেই দেবে।

    —কুকুরটা কি দামী না। কত ভাল। আপনার কুকুর বুঝি। কুকুরের শিক্ষাদীক্ষা আছে।

    রুমকির শাসনের গলা, জানালা খুলে বাগানে কি দেখছিলে? কুকুরের শিক্ষাদীক্ষা নিয়ে তোমায় ভাবতে হবে না।

    অপরাধ টের পেয়ে গেছে। স্বীকারোক্তি চায়—আর খুলব না।

    —রহমান তোমার কে হয়?

    –দাদা হয়।

    —কেমন দাদা?

    —কেমন দাদা। তাই তো—কেমন দাদা হয় জিজ্ঞেস করা হয় নি। বললাম, অরে কন ছাইড়া দিতে। বুঝতে পারছিলাম, সম্বিত হারাবার আগের অবস্থা। না হলে আমার মাতৃভাষা মুখ থেকে খসে যাবে কেন!

    —মা, ছেলেটা বাঙ্গাল। মিছে কথা বলছে।

    সত্যি কই, বিশ্বাস করেন, আমি বাঙ্গাল না। রহমানদা আমার সত্যিকারের দাদা হয়। আর তখনই মনে হল, গেল, সব গেল। করছি কি। নিজের মাতৃভাষাটিকে কিছুতেই সামলাতে পারছি না। হড় হড় করে যে বমি ওঠার মতো উঠে আসছে। যা এখানে আসার পর চেপেচুপে রেখেছি, বিলাইতির ডরে ফাঁস। আসলে মাথা ঠিক নেই। ববকাটা সুন্দর মতো মেয়েটা যে এত প্রশ্ন করতে জানে, ভাবতেই পারি নি। দাদা বলেছি, বিশ্বাস হয় নি। চাচা বলব। আমার কাছে এখন দাদা চাচা সমান। ছাড়া পেতে চাইছি।

    —বাঙ্গাল তো এখানে কেন?

    সেই তো। বাঙ্গাল, বাঙ্গালদের দেশে থাকবে। এখানে কেন? হক কথা।

    —যেখানে সেখানে বাঙ্গাল দেখা যাচ্ছে। দেশটার যে কী হবে।

    তাই মা দেশটার বড়ই অধোগতি। আপাতত ছেড়ে দিতে বলুন। এত সব ভেবেই যাচ্ছি। কিন্তু বলতে পারছি না কিছু। একবার ফস করে মুখ থেকে মাতৃভাষা বের হয়ে যাওয়ায় বড়ই করুণ অবস্থা। যাও সহৃদয়তা পাওয়া যাবে ভেবেছিলাম, বাঙ্গাল বলে সেটাও গেল বুঝি!

    রুমকি এবার কুকুরটার বকলস ধরে ফেলল। এক হাতে সাইকেল, আর এক হাতে বিলাইতি। হুকুম হল, যাও। জানালা খুলবে না। জানালা খুললে মা রাগ করে।

    ছাড়া পেয়ে ছুটতে ইচ্ছে হল। ছুটতে গিয়ে মনে হল কাপুরুষতার লক্ষণ। রুমকি হা-হা করে আবার হাসবে। রুমকি হাসলে আমার খারাপ লাগবে। বেশ একজন সবল মানুষের মতো হাঁটার চেষ্টা করছি। ফতুয়া ঝেড়ে লুঙ্গি ঝেড়ে এই ধুলোবালি লাগার মতো আর কি, কিন্তু ঝাড়তে গিয়েই টের পেলাম, লুঙ্গির পেছনটা খাবলাখানেক বিলাইতি হজম করে দিয়েছে। একজন মানুষের পেছনে খাবলাখানেক নেই ভাবা যায় না। হাঁটছি আর ভাবছি, কি করা যায়—ঘুরিয়ে লুঙ্গিটা সামনে নিয়ে এসেও খাবলাখানেককে হজম করা গেল না। কেবল হাঁটুর উপর লুঙ্গিটা কোঁচার মতো ধরে রাখলে কিছুটা সামাল দেওয়া যায়। কিন্তু হাঁটুর উপর বেশি তুলতে গেলে কি হবে কে জানে? অনভ্যাসের ফোটা কপালে চড়চড় করে। ফলে খুবই সন্তর্পণে অঙ্গ ঢাকাঢাকি চলছে। অনেকটা দূরে চলে এসেছি। পাম গাছগুলি দেখা যায়। স্টেশন রোড বিজ্ঞাপনের গায়ে লেখা। পাঁড়েজীর দোকান একেবারে সামনে। মাছ ভাজার গন্ধ। নিমেষে সব দুঃখ হাওয়া। খাওয়া বাদে মানুষের আর কোন অস্তিত্ব আছে, এ মুহূর্তে বিশ্বাস করতে ভাল লাগল না। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বিস্ময়ের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছি—তার নাম খাওয়া। চোখ বড় বড় হয়ে গেল।

    খড়ের ছাউনির নীচে পাকা মেঝে। একপাশে ভুঁড়িয়ালা একজন মানুষ ক্যাশবাক্স আগলে বসে আছে। উপরে টিনের পাতে লেখা, ‘রামভরসা হোটেল’। নীচে স্বাক্ষর পাড়েজীর। এবং এক কোণায় ঝুড়ির মধ্যে ভাজা মাছ—হাঁড়িতে ডাল সেদ্ধ হচ্ছে। খদ্দের এখনও লাগে নি। আমি বোধ হয় প্রথম খদ্দের। ঢুকতেই বলল, হোয়া নেহি।

    কি হয় নি, বোঝা গেল না। আমাকে চিনতে পেরেছে যেন। রোজকার খদ্দের যেমনটা হয় আর কি। দাঁড়িয়ে আছি দেখে কিছুটা অস্বস্তি। তালপাতার পাখায় হাওয়া খাচ্ছে। মাছি ভনভন করে উড়ছে। কারণ পাশেই কাঁচা নর্দমা। মাঝে মাঝে ভাজাভুজির গন্ধ বেমালুম হাপিস করে দিচ্ছে পচা নর্দমার দুর্গন্ধ। তবে ক্ষুধার্তের নাকু কান চোখ বোধহয় বেশি খোলা থাকে। অনেক দূর থেকেই টের পাচ্ছিলাম সেদ্ধ ভাতের ঘ্রাণ। এখন বুঝতে পারছি, আসলে ছলনা। সব কিছুর মতো নিজের বিবেককেও ছলনা করছে। সব সময় খাব বলে বুঁদ হয়ে থাকলে বিবেকেরই বা আর দোষ কি। পাড়েজী তখন বলল, ঘুমকে আও। রহমান সাব বোলে গেছে।

    যে সাব রাতে এত কাণ্ডজ্ঞানশূন্য থাকে, সকালে তার চারপাশে এত সতর্ক নজর! যাবার আগে বলে গেছে। কোথায় যায়, কী করে মানুষটা! মানুষটা সম্পর্কে কেমন ধন্দের মধ্যে পড়ে আছি। ঘুমকে আও যখন বলেছে, তখন পেয়ারা গাছটার কথা মনে পড়ল। নিচে খাটিয়া পাতা। সেখানে ফিরে লম্বা হয়ে থাকতে পারি। তাছাড়া ঘুমকে আও কতটা সময়ের মধ্যে— পাঁড়েজী আবার বলল, ঘুমকে আও। ভাত ডাল মাছ সব্জি-দেখলাম বাবার মতো লোকটার কাছেও একটা লম্বা লাল মলাটের খেরো খাতা আছে। তাতে কিছু লেখা। এই খেরো খাতাটা না থাকলে বুঝি জীবন সম্পূর্ণ হয় না।

    লোকটা এবার বিরক্ত হয়ে বলল, বুলছি না ঘুমকে আও। আর দেরি করা গেল না। মানুষ আমাকে দেখলে বিরক্ত হয় কেন? পাছে রাগ করে, বের হয়ে পড়লাম। বলতে সাহস হল না, কখন? কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটি করে আবার ফিরে আসতেই পাঁড়েজীর পাখার হাওয়া খুব বেড়ে গেল। হাঁটু নাচাচ্ছে। এখনও তবে ঘুমকে আও। রোদ মাথার উপর—খটিয়া বেশ মন্দ না, কিন্তু যেই না ব্যালকনিটা মাঠ থেকে চোখে ভেসে উঠল, সঙ্গে সঙ্গে এবাউট টার্ন। ওখানে জানালা খুললে কুকুর দিয়ে খাইয়ে দেওয়া হয়।

    পালাবার সময় মনে হয়েছিল, পৃথিবীর সবাই আত্মীয়। শুধু মা-বাবাই আমার সঙ্গে শত্রুতা করে গেল। এখন বুঝতে পারছি, পৃথিবীতে আত্মীয়ের বড় আকাল। সবাই স্টেশনে তল্পিতল্পা নিয়ে বসে আছে। গাড়ি এলেই উঠে যাবে। আমার মতো মানুষ সামনে ঘোরাফেরা করলে কখন কি না জানি খোয়া যায়। যেভাবে বাসে ট্রেনে সর্বত্র লেখা, পকেটমার হইতে সাবধান—মানুষের আর দোষ কি। শুধু বাড়ি ফিরে গেলেই আবার বাবার সুপুত্র হয়ে যেতে পারি—কিন্তু চিরকুটে যে লেখা আছে, আমি ফিরছি না। মানুষ না হয়ে ফিরছি না। সাত-আট দিন পর ফিরে গেলে মনুষ্যত্বের অবমাননা। হেরে যাবার লজ্জা! পিলু পর্যন্ত বলবে, তুই না দাদা, একটা কি! বাড়িঘর ছেড়ে কেউ পালায়। মা- বাবার মতো নিজের মানুষ আর কে আছে রে?

    সবই বুঝি রে পিলু। জাঁতাকলে পড়ে গেলে বুঝতিস। রহমানদাকে বলেছি, একটা কাজের কথা এটা একটা জংশন স্টেশন। সব ঘুরে দেখা হয় নি। ফাঁকা ফাঁকা ঘরবাড়ি। দূরে পাহাড় দেখা যায়। তুই এলে একদিন আমরা পাহাড়টায় ঘুরে আসব।

    আবার পাঁড়েজীর দোকান। পা দুটোও বলি, ঘুরে-ফিরে আর কোনদিকে যেতে জানে না। যেন গণ্ডি এঁকে দিয়ে গেছে কেউ। এবারে নিজেই বললাম, হোক না। দাঁড়িয়ে আছি। হলেই বসে পড়ব। কেউ কেউ খাচ্ছে। আমায় দিচ্ছে না কেন! অবশ্য প্রশ্নকর্তার আর বেশি কথার হক নেই। কারণ পাঁড়েজী বড়ই সদয় এবার—সবজি হোয়ারে?

    —থোড়া বাকি হ্যায়।

    –থোড়া বাকি হ্যায় তো কিয়া হ্যায়? হামকো বৈঠনে দিজিয়ে না। আসলে মেহমান আমি, সবজি না দিলে আপ্যায়নে ত্রুটি থেকে যাবে।

    —না বেটা, রহমান সাব বহুত গোঁসা করবে। বহুত মেজাজী আদমী আছে। তিন কিসিম নেই দেনে সে হুজ্জোতি করবে।

    তাহলে রহমানদাকে পাঁড়েজী ভয় পায়। আমার যে কী আনন্দ হচ্ছিল! অহংকারী হয়ে গেলাম। বেশ গম্ভীর গলায় বললাম, পাত লাগাইয়ে, ভাত-ডাল পয়লা দিজিয়ে তো। বলে আর অপেক্ষা করা গেল না। একটা চাটাই পেতে সোজা নিজের গরজেই পদ্মাসন।

    পাঁড়েজীর লোক শালপাতা দিল। সেটার গন্ধ শুঁকে নিচে বিছিয়ে রাখলাম। খুরিতে জল। জল ছিটিয়ে যতটা পারা যায় সাফসোফ করে ভাতের ঝুড়ির দিকে তাকিয়ে আছি। আসছে। আমার পাশের লোকটি ওম ব্রহ্মানেভ্য নমঃ করে গণ্ডয় করছে। ভাত মাখছে ডাল দিয়ে। রসনা বড় বেশি সিক্ত। তাড়াতাড়ি জল খেলাম। এভাবে ক্ষুধার দুর্বলতাকে কিছুটা পরিহার করা। আসলে আমার তর সইছিল না। শালপাতায় ভাত পড়লে ডাল দেবার ফুরসত দিলাম না। শেষ। লোকটা ডালের হাতা নিয়ে সামনে থ। নিজেকে সামলে নিলাম। ক্ষুধায় এতটা বুঁদ হয়ে থাকা ঠিক না। স্বাভাবিক মানুষের আচরণ ভুলে যাচ্ছি। এবারে ডাল দিলে, একটু চেটে দেখলাম। ভাত আসছে। ভাতের সঙ্গে ডাল, তারপর গোগ্রাসে হাত চালাচালি – শেষ। হঠাৎ খটাস শব্দ। পাড়েজীর পাখা হাত থেকে পড়ে গেছে। আমি বোকার মতো বললাম, না এই খাচ্ছি, খাওয়া তো। অনেক দিন পর খাওয়া তো, আর বলা হল না। রহমানদার সম্মানে লাগতে পারে। বললাম, বেশ রান্না। সবজি এসে গেল। ভাত নেই। পাঁড়েজী কি রাগ করছে! এক বেলায় আর কতটা রাগ বাড়তে পারে। সুসময় তো মানুষের সব সময় আসে না। যখন এসেছে, তার সদ্ব্যবহার করাই ভাল। বাবা বলেছেন, হাতের পাঁচ ছাড়তে নেই। যখন সুযোগ এসে গেছে, তাকে অবহেলা করা ঠিক না। ভাতের অপেক্ষায় সোজা হয়ে বসলাম।

    পাঁড়েজী এবং ঠাকুরের মধ্যে ইশারায় কিছু কথা হল। চোখ তুলতেই সেটা লক্ষ্য করলাম। ভাত দিতে এত দেরি হয় কেন! দুটো না হয় বেশিই খাচ্ছি। খেতে দিয়ে বসিয়ে রাখলে নিন্দা হবে। হোটেলের বদনাম হবে। বললাম, ঠাকুর, ভাত। ভাত মাছ এল। মেখে মনে হল, ভাত আর একটু লাগবে। হাতায় ঠাকুরের ভাত উঠতে চাইছে না। আবার ভাত চাইলাম। পাঁড়েজীর হাঁটু নড়া বেড়ে যাচ্ছে। আমার কী দোষ, রহমানদা বলে দিয়েছে, পেট ভরে খেতে। পেট না ভরলে আমি কী করব। আমি তো আর শত্রুতা করে বেশি খাচ্ছি না। কারো অনিষ্ট হয়, এটা আমি কখনও চাইও না। খেতে বসে কম খেয়ে উঠি কী করে?

    ভাত মাখতে গিয়ে মনে হল, একটু ঝোল হলে বেশ হয়। ঠাকুর, তোমার ঝোল একটু বেশি হবে?

    পাঁড়েজী বলল, ঝোল মাংতারে?

    ঠাকুর আমার কথা শুনতে পায় নি। দোষ নেই। এক হাতে সব খদ্দের সামলাচ্ছে। আমার দিকে নজর দেবার ফুরসত কম হতেই পারে। আপাতত খেয়ে নেয়া যাক। ঝোল দিলে ফের ভাত চেয়ে নেব। না দিয়ে পারবে না। ঝোল আছে, ভাত নেই, খদ্দের বলতে কথা। কী হল! শেষ, তবু ঠাকুর তাকাচ্ছে না। কড়াইয়ে খুন্তি চালাচ্ছে তার তাবৎ শক্তি প্রয়োগ করে। খুব জোর দেখাচ্ছে ঠাকুর। পেট ভরে খেলে সবই হয়। আমারও হবে।

    খালি পাতে গ্যাঁট হয়ে বসে আছি দেখে পাঁড়েজীর বোধ হয় ধৈর্যচ্যুতি ঘটছে! উঠে দাঁড়াল। ভাবলাম, বাড়াবাড়ি ভাল না। বিদেশ-বিভুঁয়ে মানুষের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখা দরকার। সম্পর্ক নষ্ট করে লাভ নেই। এক বেলা একটু কম খেলে মরে যাব না। পাঁড়েজীর প্রতি সম্মান দেখানোর জন্যই উঠে দাঁড়ানো গেল। দেখে মনে হল, পাঁড়েজীর যেন ধড়ে প্রাণ এসেছে। সান্ত্বনা দেওয়া দরকার ছিল। রোজ এমন হবে না। অনেকদিন পর তো। সব ঠিকঠাক হয়ে গেলে এভাবে আর মরা মাছের মতো আমার দিকে তাকাতে হবে না। সঙ্গে সঙ্গে মাথাটা ঘুরে গেল। পয়সা দশ আনা ঠিক আছে তো। এরপর যদি পয়সায় খামতি হয়, যেভাবে রুমকি আর বিলাইতির হেনস্থা, কখন কোথায় কি ছিটকে পড়েছে কে জানে? ফতয়ার পকেটে হাত দিলাম—আছে। বের করে গুনে দেখলাম, আছে। ঠিক আছে। কোথাও কিছু ছিটকে পড়ে নি। দশ আনা পয়সা দেবার সময় তিন বার গুনে তারপর হাতে দিয়ে বললাম, দো চৌ-আনি। এই দু-আনি। মোট দশ আনা। মনে মনে বললাম, পাঁড়েজী, কথা ঠিক রেখেছি। তুমি রাখলে না। আরও দুটো খেলে ঠিক হত।

    বাইরে বের হয়ে আসতেই খর রোদ মাথার উপর। দূরে ট্রেন যাচ্ছে। টং-লিং টং-লিং শব্দ। মগজের মধ্যে ঘুমপাড়ানির গান কেউ গেয়ে যায়। সুস্বাদু আহারের পর কোন গাছের ছায়ায় শুয়ে পড়তে ইচ্ছে হচ্ছে। সেই গাছটার নিচে খাটিয়া। দেওড়ি শুধু পার হয়ে যাওয়া। রাজপুত্র কোটালপুত্রের গল্প মনে আসে। পদ্মমানিক হাতে। কোথাও রাজকন্যা শুয়ে পায়ে রূপোর কাঠি, মাথায় সোনার কাঠি। ঘুমে অচেতন। রাক্ষস-খোক্কসেরা গেছে যুদ্ধ করতে। বন্দিনী রাজকন্যার জন্য রাজপুত্রের হাহাকার। কখনও মনে হয়, তেপান্তরের মাঠ পার হয়ে যাচ্ছে একটা সবল লাল রঙের ঘোড়া—রাস্তা আর ফুরোয় না, ঘোড়াটা কদম দিচ্ছে—রাত হয়, আকাশে নক্ষত্র ওঠে। গভীর বনভূমিতে রাজপুত্র পথ হারায়। কোথায় যে সেই রাজকন্যা আর অর্ধেক রাজত্ব, মাঠটা পার হয়ে খুঁজছি! দেখি রাজকন্যাও নেই, রাজত্বও নেই। ব্যালকনিতে আম গাছের ফাঁকে শুধু কুকুরের বকলস ধরে কেউ দাঁড়িয়ে আছে। এই রে! সেই কুকুরটা। দেখার সঙ্গে সঙ্গে এক মহাপ্লাবনের ছবি। টুক করে পেয়ারা গাছ আর খাটিয়াটা চোখের ওপর থেকে ভাসিয়ে নিয়ে গেল। জায়গাটায় আর কিছু নেই—শুধু প্লাবনের জল থিকথিক করছে। জলে নাক জাগিয়ে রেখেছে শয়তান কুকুরটা। কাছে পেলেই খক করে কামড়ে ধরবে।

    আর যাই! বরং স্টেশনের দিকে গেলে হয়। সেখানে একটা শোবার জায়গা মিলে যাবে। আমাকে আবার দেখছে না তো। টুক করে মাথাটা শেডের পাশে আড়াল করে দিলাম। এই সেই ছোকরা যে জানালা খুলে গোপনে কিছু দেখার চেষ্টা করছিল। রহমানদাকে নালিশও দিতে পারে। পাঁড়েজীও বলতে পারে, কি লড়কা আদমি ভেজিয়েছিলে সাব, পাতে ভাত পড়ে থাকে না, ডালও পড়ে থাকে না। কেবল কব্জি ডুবিয়ে রাক্ষসের মতো খায়। তা খেয়েছি। তাই বলে, রাক্ষস নই। অভাবী মানুষের এটা হয়। আবার কবে খাবার জুটবে, ভয়ে ভয়ে বেশি খেয়ে ফেলে। খুব দোষের না।

    আসলে একা হয়ে গেলে মানুষ নিজের সঙ্গেই বেশি কথা বলে। এই সাত-আট দিনে টের পেয়েছি, কত শত কোটি কথা মনের মধ্যে বুড়াবুড়ি দিয়েছে। নিজের সঙ্গেই বোধ হয় মানুষ প্রিয় কথা বলতে ভালবাসে। রুমকিটা কি! আমাকে মানুষের মধ্যে গ্রাহ্য করল না। পেটে দানা পড়ার পর অপমানটা খুব গুড়গুড় করছে! তখনও দাঁড়িয়ে আছে ব্যালকনিতে। ফিরলেই আবার কুকুরটাকে লেলিয়ে দেবে। এত নিষ্ঠুর হয় মানুষ। নিজের দিকে তাকিয়ে অবশ্য খুব জোর থাকল না। রাস্তায় মেলা লোকজন, আমাকে কেউ দেখছেই না। এত বড় পৃথিবীতে একেবারে উহা হয়ে আছি—অথবা একেই বুঝি বলে ছায়াবিহীন মানুষ। পেছন ফিরে দেখলাম, ছায়াটা ঠিক আছে তো! নেই। এই রে! ওঃ, এটা তো একটা শেডের তলা। বাইরে গিয়ে দাঁড়াতেই নিজের আত্মবিশ্বাস ফিরে এল। আমার ছায়াটা এখনও সঙ্গে আছে। প্রতারণা করে নি। তাহলে আমি মধ্যযুগীয় নাইটদের মতো এখন যে কোন জায়গায় এ বেলাটা ঘুমিয়ে নিতে পারি। রাতে ঘুম হয় না। ভয়। একা অন্ধকারে মনে হয় সব সময় ভূত দানোদের উপদ্রব। লোক যেখানে গিজগিজ করছে, সেখানেই ওম পাবার মতো জায়গা খুঁজি। কিন্তু কেউ ভালবাসে না। কেবল দেখলে দূর ছাই করে।

    হাঁটতে হাঁটতে ফাঁকা জায়গায় হাজির। ধান সিঁড়ি ক্ষেত, পরে শালবন। মাঠ চিরে রেল-লাইন চলে গেছে কত দূর। ঘাস, মাঠ এবং বুনো ফুল। নিরিবিলি বেশ। এখানটায় শুয়ে থাকলে কেউ টের পাবে না, কুকুরের ভয়ে এত দূর কেউ চলে আসতে পারে ভাবা যায় না।

    কিছু পাখির ডাকে এক সময় ঘুম ভেঙে গেল। বেলা পড়ে গেছে। শরতের বিশাল সবুজ মাঠ সামনে। ধানের ক্ষেত। মাঝে মাঝে উঁচুনীচু পাহাড়া টিলা। জায়গাটা ভারি সুন্দর। কোন সুন্দর জায়গা দেখলেই মনে হয় পিলুকে নিয়ে আসতে হবে। সে বিশাল মাঠ এবং অরণ্য দেখলে খুশি হয়। পাহাড়ী টিলা, বনজ ফুলের গন্ধ পেলে পাগলা হয়ে যাবে। কিছু দূরেই বোধহয় কোন পাহাড়ী নদী বয়ে গেছে। একটা সাঁকোয় সূর্যাস্তে মানুষের পারাপারের ছবি। এ সব দেখে মনটা কেমন নরম হয়ে যাচ্ছে। বাবাকে কবে যে লিখতে পারব, একটা কাজ পেয়েছি। দুপুরে কাজ। সকালে মর্নিং কলেজ। না হলে প্রাইভেটে পড়াশোনা চালিয়ে যাব। একটা কাজ হলে সব হয়ে যাবে। হাই উঠছিল। কত বড় আকাশ, কত বিশাল এই পৃথিবী, বের হয়ে টের পেয়েছি। শেষ নেই। গাড়ি যায়—আর যায়। গ্রাম মাঠ তেপান্তরের মাঠ পার হয়ে যায়। কত রকম ভাষা মানুষের। কত বিচিত্র পোশাক। যেন এ ক’দিনে পৃথিবীর অনেক গূঢ় গোপন খবর আমি পেয়ে গেছি। সন্ধ্যা হয়ে আসছে। আবছা অন্ধকার। দুটো একটা নক্ষত্র এবার উঠবে। ঘাসের মধ্যে কিছু কীটপতঙ্গ লাফালাফি শুরু করে দিয়েছে। আমাকে এবারে উঠতে হয়— বাড়িটায় না ফিরে আর কোথায় যাওয়া যায়। একটা কুকুর আর একটা মেয়ে জীবনে এত ত্রাসের সৃষ্টি করতে পারে, অনুমানই করতে পারি নি।

    স্টেশনে সব সময় মানুষজন থাকে। রাত্রিবাসের পক্ষে ভাল জায়গা। রোয়াকে বসে থাকতে থাকতে কখন কাল ঘুমিয়ে পড়েছিলাম, রহমানদা আবিষ্কার না করলে ফের স্টেশনেই চলে যেতাম। রহমানদা কখন ফিরে আসবে কে জানে। কিছু বলেও যায় নি। ফিরে এলেও, ভয় কমছে না। একা থাকলেই কুকুরটা আর মেয়েটা পেছনে লাগবে। মানুষ বলে যে ইজ্জত দেয় না, তার পক্ষে সব সম্ভব। টাকা মান যশ হোক তখন দেখব—সব লিখে রাখছি। রহমানদা টের পাবার আগেই এখান থেকে ভেগে পড়া দরকার কি না, এই নিয়ে কুট তর্ক। যা হোক তবু তো একটা আশ্রয়। মানুষটা ভাল।

    দুত্তোরি ভাল। কুকুর দিয়ে খাইয়ে দেবে যখন?

    ও হয় না। কুকুর দিয়ে মানুষ খাওয়ানো যায় না।

    যা নিরিবিলি বাড়ি, সব সম্ভব।

    আফটার অল মেয়ে তো?

    সাইকেলওয়ালী বলুন। সারকাসের জাদুকর একবার আস্ত একটা মুরগী গিলে ফেলেছিল। জাদুকর পারে না, এমন কাজ নেই।

    ভিতর থেকে আমায় সে বলল, তাড়াতাড়ি যা করার কর। তোমার যা অন্ধকারের ভয়!

    তাহলে কি করব? য পলায়তি স জীবতি।

    খুব যে সংস্কৃত ও গরাচ্ছ?

    আর কি করা! বাবা যে ওটাই কেবল সার জেনেছেন।

    তখনই দুরে ঘেউঘেউ করে একটা কুকুর ডাকছে। আর সঙ্গে আমার নাম ধরে কেউ ডাকছে, বিলু, বিলু তুই কোথায়? আমরা তোকে খুঁজছি?

    এই রে! আবার! রহমানদা আর সেই মেয়েটা। কুকুরটা এদিকেই ছুটে আসতে আসতে গন্ধ শুঁকছে। দৌড়—দৌড়। রহমানদা চিৎকার করছে, বিলু, যাস না। ফিরে দেখি ঘরের দরজা বন্ধ। কোথায় ঘুরছিলি? পাঁড়েজী বলল, কখন তো খেয়ে চলে গেছে।

    কে শোনে কার কথা? কিচ্ছু কানে আসছে না। পিছন ফিরে তাকিয়ে দেখছি, রহমানদা হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে গেছে। মেয়েটাও রহমানদার মতো কেমন স্তম্ভিত হয়ে গেছে আমার ছোটা দেখে। আর থাকি। নির্ঘাত কোন ষড়যন্ত্র। হলে কি হবে, বিধির বিধান। লাঞ্ছনা কপালে লেখা থাকলে কে খণ্ডায়? সেই বদমেজাজী শয়তানটা গোটা কয়েক লাফ দিয়ে এসেই পেছন থেকে লুঙ্গি জাপটে ধরল। এ শিক্ষাটা যে কার কাছে পেল। না কি কুড়ি টাকা চুরি করার খেসারত। গন্ধটা গায়ে এখনও লেগে আছে। লুঙ্গি খুলে একমাত্র পালাতে পারি। জলজ্যান্ত মেয়েটা না থাকলে কি করতাম জানি না। আর লুঙ্গি খুলে ফেলতে সাহস হল না। থাক ব্যাটা তোর লুঙ্গি নিয়ে, আমি আমার পথ দেখছি বলতে কিঞ্চিত সম্ভ্রমে বাধল।

    মরেছি যখন মেরে মরব। যতটা জোরে পারলাম, নিজেকে মুক্ত করার জন্যে লাথি মারতে থাকলাম।

    রহমানদা চিৎকার করছে, ছোড়দি কুকুরটাকে সামলাও। বিলুটা ক্ষেপে গেছে। কুকুরটাও ক্ষেপে গেছে।

    রুমকিকে রহমানদা ছোড়দি বলে। ছোড়দির তবে এত সব কাণ্ড। ছোড়দি গম্ভীর গলায় বলল, ওকে মের না। টাইগার—টাইগার।

    সঙ্গে সঙ্গে টাইগার কি এক জাদুমন্ত্রে আমাকে ছেড়ে দিয়ে কুঁইকুঁই করতে থাকল। ছোড়দির এত প্রভাব।

    পালাবার পথ নেই। পেছন থেকে আসছে রুমকি আর রহমানদা। সামনে টাইগার। সত্যি ছোটখাট জ্যাস্ত বাঘ। কুকুরটা কত বিশাল, টের করতে পেরে মুখ চুন করে দাঁড়িয়ে থাকলাম।

    রহমানদা বলল, তুই কী রে? তুই মানে, তোর কি ভালমন্দ জ্ঞানগম্যি নেই?

    কথা বলছি না।

    —বিশ্বাস করে চাবিটাবি সব—তুই কি না—রহমানদা রাগে সব কথা শেষ করতে পারছে না।

    —ফিরে দেখি, দরজা বন্ধ। তুই নেই। কোথায় ঘুরছিলি?

    কিছু বলতে হয়—এখানে শুয়েছিলাম।

    —বন্য স্বভাবের কেন রে তুই?

    রুমকি বলল, তুই না রহমান মরবি। আর একবার সেই ছেদি না কি নাম, তোর সব নিয়ে পালাল। বিশ্বাস করে থাকতে দিলি, খেতে দিলি, রাতে একদিন হাওয়া।

    রাগ দুঃখ ক্ষোভ— এই সেই পুচকে মেয়েটা—যার দাপটে পরিত্রাহি জীবন আমার চোখে জ্বালা, রহমানদা পর্যন্ত পুচকিটাকে ছোড়দি বলে। লুঙ্গির খানিকটা কুকুর দিয়ে খাইয়ে দিয়েছে, বাকিটাও আমার খাইয়ে দিত— পাজিটা কেমন বলছে, রহমান তুই মরবি। বেশ মরবে, তোমার কি। তারপরই কি হল কে জানে, বোধহয় ক্ষোভে মাথা ঠিক ছিল না—এই তো সেই, যে আমাকে এত দূর পর্যন্ত পালিয়ে আসতে উসকে দিয়েছে, কোন দূরবর্তী নক্ষত্র যাকে ভেবেছি—তার এই আচরণ। হঠাৎ বলে ফেললাম, আমি যাব না।

    —যাবি না, থাকবি কোথায়? খাবি কোথায়?

    আবার কথা নেই। আসলে আমি যে বাবা-মার ছেলে, ঘরবাড়ি আছে, পিলু আছে, নবমী আমাকে দা-ঠাকুর বলে, এত সব অহংকার থাকলে যা হয়—অথবা কিছুটা অভিমান, কার উপর জানি না, এ বয়সে এটা বোধহয় খুব বেশি থাকে, না হলে, পালাব কেন?

    —এই, দাঁড়িয়ে থাকলি কেন? হাঁট। রুমকি শাসাচ্ছে। বাবা আসুক, তোকে পুলিসে দেব। রহমানের চাবি নিয়ে হাওয়া। ভাগ্যিস টাইগার ছিল।

    পুলিসকে আমি ভয় করি, আমার বাবা ভয় করে- সেই পুলিস আবার? জল ঘোলা দেখছি। মুখ শুকিয়ে গেছে। দিতেই পারে। না বলে কয়ে উত্তরের জানালা খুলেছি, না বলে কয়ে বাড়ি থেকে পালিয়েছি, কুড়ি টাকা চুরি করেছি—এর জন্য কত বছর জেল হয়, জেল না ফাঁসি, নিয়মকানুন পুলিসের একেবারেই জানি না, খুব ভীতু বালকের মতো আর কথা না বলে হাঁটা দিলাম। কিন্তু মনে অস্বস্তি, রুমকির বাবা এলে কি সত্যি আমাকে পুলিসে দেওয়া হবে। তার চেয়ে বরং কুকুর দিয়ে খাইয়ে দিক না। পুলিসে দাগী আসামীদের ধরে নিয়ে যায়। বাবার সব বিষয়ে পাস করা ছেলেটা শেষ পর্যন্ত দাগী আসামী হয়ে যাবে!

    রহমানদা খুব মুখ গম্ভীর করে হাঁটছে। আগে আমি। কুকুরটাকে বকলশে শেকল পরিয়ে রুমকি পেছনে আসছে। যেন পালাতে না পারি। আর পারছিলাম না—এরা আমাকে যদি পুলিসে দেয়, আর বাবা যদি জানতে পারে আমি হাজতে আটকে আছি, বাবার এ-দেশে এসে বাড়িঘর করার গৌরব সব এক সেকেণ্ডে ধূলিসাৎ হয়ে যাবে। বাবা আমার না অপমানে আবার তাঁর ঘরবাড়ি ছেড়ে উধাও হয়ে যান।

    পায়ে জোর পাচ্ছি না। একটা টিলার ওপর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছি। সন্ধ্যা হয়ে গেছে। দূরের পাকা সড়কে ট্রাকের শব্দ। গরুর গাড়ির শব্দ। মাঠ থেকে চাষীরা ফিরছে ঘরে। শহরের আলো কেমন মায়াবী পৃথিবীর কথা বলছে। কান পাতলে শস্যক্ষেতের কীটপতঙ্গের আওয়াজ পাওয়া যায়। আর এ সময় কি না একটা কুকুর, একটা মানুষ আর একজন নারী আমাকে নিয়ে যাচ্ছে পুলিসে দেবে বলে। ভেতরে যখন ভয় এভাবে দাপাদাপি করছে তখন আর পারলাম না—রহমানদার সামনে গিয়ে সহসা শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে গেলাম। মাথা নিচু করে বললাম, আমাকে আপনারা পুলিসে দেবেন রহমানদা? খুব কাতর চোখে-মুখে তাকিয়ে থাকলাম।

    জাঁহাবাজ মেয়েটা লাফিয়ে এসে পড়ল মুখের উপর বলল, না দিলে ধরে নিয়ে যাচ্ছি কেন? আমি রহমানদার দিকে তাকালাম— আমার চোখে কি ভয়ে অভিমানে জল এসে গেছে। রহমানদা কিছু টের পেয়ে বলল, দূর পাগলা, আয় তো!

    .

    ফেরার সময় সারাটা রাস্তা ভারি বিমর্ষ থাকলাম। রুমকিকে বিশ্বাস নেই। যা জাঁহাবাজ মেয়ে, সব করতে পারে। ওর বাবা মানুষটিকে আমি দেখি নি। খুবই জাঁদরেল হবে। রুমকি যাঁর মেয়ে আর যাঁদের ঘরবাড়ি সাহেব-সুবোদের মতো, তাঁরা জাঁদরেল না হয়ে যায় না। রহমানদা খুব তাড়াতাড়ি হাঁটছিল। আমরা টিলা পার হয়ে শহরে ঢোকার পথ ধরে হাঁটছি। রাস্তার দু’পাশে সব বড় বড় গাছ। ইতস্তত লাইট-পোস্ট। আলো জ্বলছে। চারপাশে তাকালে শহরটা যে এখনও ভারি ব্যস্ত, বোঝা যায়। রাস্তায় বড় বড় ট্রাক বোঝাই মাল চলে যাচ্ছে। আর পাশ দিয়েই গেছে রেলের লাইন। আমরা একটা গুমটি ঘর পার হলাম। কুকুরটা মাঝে মাঝে আমার পাশে এসে গা ঘষটাতে চাইছে। মনে মনে বিরক্ত হচ্ছি। ভয়ও হচ্ছে। কিছু বলতেও পারছি না। কুকুরটা আমার অসহায়তা ধরতে পেরে যখন তখন ইয়ার্কি করছে। বিদ্রুপ করছে। কখনও ঘাড়ের ওপর লাফিয়ে উঠছে। কখনও পায়ের কাছে হুমকি দিচ্ছে। রুমকি হাসছে। যত কুকুরটা রাস্তায় আমাকে বিব্রত করছে, তত রুমকি মজা পাচ্ছে। কিছু বলাও যাচ্ছে না। কারও মজার বিষয় যে কারও প্রাণ নিয়ে খেলা এটা প্রথম রুমকির কুকুর আমাকে বুঝিয়ে দিল। কুকুরটাকে যখন তখন পেছন থেকে লেলিয়ে দিলে আমি আর কি করতে পারি? রহমানদা দেখেও দেখছে না। রহমানদা অন্তত আশা করেছিলাম আমার হয়ে কিছু বলবে। আমার তো বলা শোভা পায় না। যাকে পুলিসে দেবার কথা হচ্ছে, সে কি করে কুকুরটাকে কষে লাথি মারে। এ সময়ে মানুষের কাছ থেকে কুকুরটার প্রাপ্য বলতে ধমাস করে মুখে সজোরে লাথি। যা আমার থেকেও নেই।

    গুরুদোয়ারার সামনে আসতেই রহমানদা বলল, চাবিটা আছে তো?

    —আছে।

    —না থাকলে দুজনকেই বাইরে। চাবিটা দে।

    চাবি দিলে রহমানদা দরজা খুলে বলল, তুই পালিয়েছিলি কেন বল তো!

    সব বলতে পারি। কিন্তু টাইগার আর রুমকি থাকলে বলা সহজ নয় খুব। কতক্ষণে যাবে সেই আশায় আছি।

    সুইচ খুঁজতে গিয়ে রহমানদা বলল, কথা বলছিস না কেন? তুই কি কালা আছিস?

    আলো জ্বলে উঠলে বললাম, রহমানদা, কুকুরে কামড়ায়।

    —টাইগার তোকে কামড়েছে?

    —না, মানে—দেখি, রুমকি টাইগারের বকলস ধরে আমার দিকে ত্যারছা চোখে তাকিয়ে আছে।

    –টাইগার তো খুব ভাল। একটা কাকপক্ষী বাড়িতে এলাউ করে না। কামড়ায় না তো! ভাল ছেলের মতো হাসতে হাসতে বললাম!

    লুঙ্গিটা উল্টে পরেছিলাম। ফলে বস্ত্রখানি অটুট দেখাচ্ছে। খুলে দেখাতেও পারছিলাম না। কি জানি, রেগে গিয়ে সত্যি যদি পুলিসে দিয়ে দেয়। তার চেয়ে বলা ভাল, কুকুরে কামড়ায় না।

    রহমানদা রুমকিকে বলল, ছোড়দি, তোমায় বোধহয় ডাকছেন মা।

    —ডাকুক গে।

    —মা-বাবার কথা শুনতে হয়, না রহমানদা? এর চেয়ে বেশি বলার সাহস হল না। আসলে বলতে চেয়েছিলাম, ভাগ এখান থেকে। হতচ্ছাড়া মেয়ে। মায়া হলে কান মলে বাড়ি পাঠিয়ে দিতাম।

    —রহমান—রহমান—

    —আজ্ঞে যাই।

    রহমানদা বাইরে বের হয়ে দ্বিতীয় সদরটায় গিয়ে দাঁড়ালো।

    —রুমকি কি করছে! ওকে পাঠিয়ে দাও। খাবে না! সেই কখন তোমার সঙ্গে লাফিয়ে বের হয়ে গেল! লোকটাকে খুঁজে পেলে!

    —পেয়েছি। লোক না মা। ছেলেমানুষ

    —ছেলেমানুষ তো এখানে কেন?

    —বাড়ি থেকে বোধ হয় পালিয়েছে?

    —পালিয়েছে!

    আমার মাথাটা ঘুরছিল।

    রহমানদা বলল, ঠিক পালায় নি। কাজের ধান্ধায় বের হয়েছে।

    —ছেলেমানুষের আবার কাজের ধান্ধা কেন? ছেলেমানুষ তো পড়াশোনা করবে।

    গাছপালার অভ্যন্তর থেকে অথবা অন্য গ্রহ থেকে কেউ যেন কথা বলছিল; আমরা নিচের গ্রহে দাঁড়িয়ে শুনছি। অমোঘ বাণীর মতো রহমানদা সেই দেবলোকের কথাবার্তা অবধান করছে।

    হঠাৎ গ্রহ থেকে আবার অমোঘ কথাবার্তা ভেসে এল, ছেলেটা বাঙ্গাল নাকি!

    আমি উৎকর্ণ হয়ে আছি। তক্তপোশে বসে আছি, তবু পা হাঁটু কাঁপছে। একজন মানুষের এত অপরাধ থাকলে তাকে রহমানদা রাখবে কী করে!

    —তা তো জানি না মা।

    —জিজ্ঞেস করে দেখ। না জেনে-শুনে লোককে জায়গা দিতে নেই। তোমার ক্ষেপামিতে শেষে না আমাদের সব যায়।

    ওদের সব যাবে কেন! বাঙ্গাল আমি ঠিক। ইস, কী যে রাগ হচ্ছিল নিজের উপর। এত করেও দমন করা গেল না।

    আবার গ্রহলোকে কথাবার্তা— পীলখানার মাঠে সব ছেয়ে গেছে শুনেছ!

    —আজ্ঞে শুনেছি!

    —তরফদাররা থাকতে দিয়েছিল। এখন সব দখল করে নিয়েছে। কত বড় সম্পত্তি। বেহাত হয়ে যাবে। উনি তো বললেন, আইন-আদালতেও কিছু হবে না। বাঙ্গালরা নাকি ভগবান। বসলে উঠতে চায় না। ঠাকুর দেবতার মতো। আমাদের গ্রহ থেকে সংযোজনকারীর আক্ষেপ- সেই মা—কী যে হবে। হুড়হুড় করে সব ভিটেমাটি ছেড়ে চলে আসছে। ফাঁকা জায়গা পতিত জায়গা আর থাকছে না।

    —দেখ না, যা অবস্থা, দেশটা বাঙ্গালদের হয়ে যাবে। সেই কবে একবার কলকাতায় বাবা আমাদের বাঙ্গাল দেখিয়েছিলেন। জজ মানুষ— বললেন, আজ দেখবি একজন বাঙ্গাল আসবে। বাবার সঙ্গে কাজ করতেন। তিনিও জজ। খুব ডাকসাইটে জজ। অথচ বুঝলে, এসেই ডাকাডাকি— অ নিবারণবাবু, বাড়ি আছেন নাকি? বাবা বললেন, এসেছেন? —আরে আইছি। দরজা বন্ধ কইরা বইসা আছেন। বাঙ্গালরে ডরান দ্যাখতাছি খুব। না না, বাবা বিগলিত। বুঝলে রহমান, সেই আমাদের বাঙ্গাল দেখা। লোকটা কি চেঁচিয়ে কথা বলত! যেন আমরা সব কানে কম শুনি।

    রুমকি কুকুরটার বকলস ধরে দরজায় পাহারা দিচ্ছে। কুকুরটার লম্বা জিভ হা-হা করছে। হাঁ করলে আমার পুরো মুখটা মুখে ঢুকে যাবে। দু’পা সরে বসলাম।

    রহমানদা ফিরে এসে বলল, তুই বাঙ্গাল?

    মাথা গোঁজ করে বসে থাকলাম।

    মা তো বলল, তোরা নাকি এখন ঠাকুর দেবতা। বসলে আর উঠতে চাস না। বলেই হেসে দিল ছোড়দি, তুমি যাও। এখন আমরা খাব। বাবুসাব এলে রাগ করবেন।

    বাবুসাবের কথায় রুমকির মনে হল, আমাকে নিয়ে বোধ হয় বেশি বাড়াবাড়ি করে ফেলেছে।

    রুমকি চলে গেলে রহমানদা বলল, ছোড়দি খুব ভাল মেয়ে। তুই ওকে ছোড়দি ডাকবি। এতক্ষণ যাও সহ্য হচ্ছিল, আর পারা গেল না। আমি ওকে ছোড়দি ডাকব বলছেন, পুচকে মেয়েটাকে আমি, না আমি পারব না। আমায় কী করেছে আজ? কুকুরটাকে লেলিয়ে দিয়েছে।

    সঙ্গে সঙ্গে হাজির সেই মহীয়সী — মিছে কথা বলছিস?

    আমার সব বলা এক দণ্ডে উবে গেল। স্থির হয়ে বললাম, হ্যাঁ, মিছে কথা।

    —তবে।

    রুমকি যে চলে যায় নি, এ বোধটা থাকা উচিত ছিল। উঁকি দিয়ে দেখে নিলে আবার বিপর্যয়ের মুখে পড়তে হত না। বললাম, না, সব ঠিক আছে। আমি তোমাকে ছোড়দিই ডাকব। এই কথা বলার পর ছোড়দি কেমন ভালমানুষ হয়ে গেল। বলল, পালাবার চেষ্টা করবি না। টাইগার দিনরাত ওত পেতে থাকে। সব টের পায়।

    তা যে পায়, তার ঠ্যালা আমি হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছি। ছোড়দি কিছু আর বলল না। কুকুরটাকে নিয়ে এক দৌড়ে ভেতরে গাছপালার মধ্যে হারিয়ে গেল। সেদিকে তাকিয়ে থাকলে রহমানদা বলল, এ বাড়িতে ছোড়দির দাপট খুব। ওকে খুশী রাখতে পারলে আর কথা নেই। তোর সাতখুন মাপ। নে আর দেরি করিস না, কখন তো খেয়েছিস। তারে জামাপ্যান্ট রয়েছে, নিয়ে আয়। হাতমুখ ধুয়ে জামাকাপড় পাল্টে নে। খাবার দিতে বলে এয়েছি।

    খাবার এলে রহমানদা বলল, তোদের তো আবার জাতের মাথামুণ্ডু নেই। কি করতে কোটা কাটা যাবে—তার চেয়ে বরং তুই খেয়ে নে। পরে আমি খাচ্ছি বলে উঠে দাঁড়াল। ভিতরের দিকে আর একটা দরজা আছে, ওটা খুললে টের পেলাম, রহমানদার সব কিছু ঐ ছোট্ট কুঠরির মধ্যে। আসলে তবে দুটো ঘর। ঐ ঘরটায় রহমানদার যাবতীয় মহার্ঘ জিনিস, বাক্স পেটরা লকার সব কিছু। ওখান থেকে কি বের করতে ঘরে ঢুকল। বাইরের ঘরটা এ জন্য খুবই নিরাভরণ।

    শুধু একটা টেবিল ক্লথ বাদে বলতে গেলে আর কিছুই নেই। খাট এবং বিছানা টেবিল আর গোটা তিনেক চেয়ার। এই সম্বল করে সে সব কিছু অসংকোচে আমার মতো একজন পলাতকের কাছে গচ্ছিত রেখে চলে যেতে পেরেছে। মানুষকে বিশ্বাস নেই, এ বোধটা রহমানদাকে বোধহয় ছোড়দি বুঝিয়ে দিয়ে গেছে।

    মানুষের স্বভাব এ-রকমেরই। তবু মানুষ অধিকাংশ এক একজন স্বার্থপর দৈত্য। ট্রেনে এটা খুব মালুম হয়েছে। তা না হলে যে দাড়িওলা লোকটিকে ভিড়ের ট্রেনে একটু জায়গা করে বসতে দিয়েছিলাম, তারই চাপ কেন ব্লাডারের মতো আমাকে উদ্বাস্তু করে ছাড়বে। চাপে প্রায় ছিটকে গেলাম। ভিন রাজ্যের মানুষটি আমার জায়গা সম্পূর্ণ বেদখল করে নিয়েছে বলে এতটুকু অনুকম্পা নেই। স্টেশন যত পার হয়ে যাচ্ছি, তত কোন এক অদৃশ্য শক্তি দরজার কাছে আমাকে ঠেলে নিয়ে চলে এসেছে। যে যেখান থেকে পারছে উঠছে। বাক্সপেটরা যে যার মতো জানালায় দরজায় গলিয়ে দিচ্ছে। দেখে মনে হয়েছিল, ট্রেনে জায়গা না পেলে মহাপ্লাবনে সব তাদের ভাসিয়ে নেবে।

    —কি রে, বসে আছিস কেন? ওঠ, খাবি না?

    হাত-মুখ ধুয়ে জামাপ্যান্ট পরার পর আগেকার বিলু হয়ে গেলাম। উঁকি দিয়ে দেখলাম, কেউ আবার দেখছে কিনা। না, নেই। কেবল গাছগাছালির ফাঁকে একটা আলোর ডুম জ্বলছে। এবং বাড়িটাকে এত রহস্যময় করে রেখেছিল যে রহমানদাকে লুঙ্গিটা দেখানো দরকার আছে, ভুলে গেছিলাম।

    রহমানদা লুঙ্গি পরে একটা হাফ হাতা গেঞ্জি গায়ে আবার হাজির। চোখে মুখে বুঝি আশঙ্কার ছাপ টের পেয়েছে। বলল, তুই কি খুন-টুন করে পালিয়েছিস? সব সময় কেমন সিঁটিয়ে আছিস?

    কি করে বোঝাব খুনেরই শামিল। গোবিন্দদার কৌটা থেকে কুড়ি টাকা চুরি আর খুনে আমার কাছে তফাত এক গাছি সুতোর। বাবার কাছে সব সমান! খুনেও পাপ, চুরিতেও পাপ। দুটোতেই ঈশ্বর তাঁর রাগ করেন। এ হেন মানুষের সন্তানের পক্ষে স্বাভাবিক থাকা খুবই কঠিন। সামান্য হাসার চেষ্টা করে বললাম, না না, খুন করব কেন? আমি গুণ্ডা না ডাকাত? তা ছাড়া ভাবলাম, আমাকে পুলিসে দেবার কথা হচ্ছে। মাথা ঠিক থাকে কি করে?

    —সে তো চেহারা দেখেই মালুম পাওয়া যাচ্ছে।

    খেতে বসে দেখলাম, বড় টিফিন ক্যারিয়ারে মাংস ভাত রুটি আলাদা করা।

    রহমানদা বললে, যা লাগে নে

    সবটাই খেতে পারি। খিদে তখন ঘোড়ার পিঠে জিন লাগিয়ে বসে আছে। যা পায় তাই নিয়ে দৌড়াতে চায়। কি নেব, কতটা নেব আন্দাজ করতে পারছিলাম না।

    —ভাত খাস রাতে?

    ঘাড় কাত করে দিলাম।

    —ভাতই খা। আমার আবার রাতে ভাত সহ্য হয় না।

    রহমানদা বললে, দুপুরে পেট ভরে খেয়েছিলি তো?

    না, বলতে সংকোচ হচ্ছে। আসলে কতটা খেলে পেট ভরে তার আন্দাজ আমার গেছে। হয় তো যতটা খেয়েছি, তারই নাম পেট ভরতি খাওয়া। পাঁড়েজী দীর্ঘদীন এ লাইনে আছে। তার চোখকে ফাঁকি দেওয়া কঠিন। সে জানে কতটা খাওয়ার নিয়ম। বেশি খেলে সইবে কেন? পেট ভরেছে, গলা অবধি হয় নি। পাইস হোটেলে আকণ্ঠ কে খেতে দেয়? যে দেয়, সে লাটে ওঠে।

    —বললাম, খুব খেয়েছি।

    —খাবি। লজ্জা করবি না। এত যার বিবেক তার আবার বাড়ি থেকে পালানো কেন! কাজের ধান্ধা দেশে থেকে করলেই হত।

    এ সব কথা কানে যাচ্ছিল না। একবার ভাবি বলি, আচ্ছা রহমানদা, ছোড়দি কি সত্যিই থানা পুলিসের কথা ভাবছে। কিন্তু রহমানদা তখনও কথা বলে যাচ্ছে, আমার কথা শোনার সময়ই নেই।

    —তোর মতো আমিও বের হয়েছিলাম। সে বেশ একটা জীবন গেছে। এখন মুঠো মুঠো পয়সা। না, তা বলে ভাবিস না, তোর মতো অনেক লেখাপড়া জানা ছেলে। লেখাপড়া জানলে দুনিয়া উল্টে দিতে পারতাম।

    মানুষটা কী করে জানি না। বাংলো বাড়িটার সঙ্গে তার কি সম্পর্ক তাও জানি না। নেমপ্লেটে আছে, ডাঃ এস. কে. দত্ত। এই সহরটা খুব বড় নয়—জংশন স্টেশন, আর মহকুমা শহর মিলে যা ঘরবাড়ি থাকার কথা তাই আছে। বাড়িটা শহরের একপাশে, অনেকখানি জমিজমা নিয়ে বাগান নিয়ে বাড়ি। যেন মানুষটা নিজের একটা আলাদা পৃথিবী বানাবার তালে আছে। আসলে সবাই নিজের জন্য একটা আলাদা পৃথিবী তৈরী করতে চায়। আমারও সেই বাসনা।

    খাওয়া হলে রহমানদা বলল, শুয়ে পড়। এখন আমি একটু বসব।

    তা বসুন, আপনার জায়গায় আপনি বসবেন শোবেন—তা আবার বলা কেন। কিন্তু বসা যে মানুষের এ রকমের হয়, জানতাম না। বোতল গ্লাস, পরিপাটি করে চানা ভাজা এবং ভক করে ঝাঁজটা নাকে লাগলে এক কোণায় সরে গেলাম।

    —তোর অসুবিধা হচ্ছে। তবে পেয়ারাতলায় খাটিয়াতে শুয়ে থাক। পরে ডেকে আনব।

    সেই ভাল। আপনি খান। একটা বালিশ নিয়ে সামনের পেয়ারাতলায় চিৎপাত হওয়া গেল। রাস্তার আলো আসছে। পাতার জাফরিকাটা ছায়া ছড়িয়ে আছে খাটিয়াটার ওপর। শুয়ে মনে হল, ভয় করবে। বাড়িতে হলে কিছুতেই পারতাম না। মানুষের বসবাসের জায়গায় কিছু অদৃশ্য আত্মা সঙ্গী হয়ে যায়। আবাস নয়, এবং অপরিচিত জায়গা বলে কোন প্রেতাত্মা বোধ হয় সঙ্গী হতে চাইছে না। জংশন স্টেশনে মাঝে মাঝে হুইসিল দিয়ে গাড়ি যায়, রাস্তায় ট্রাক-বাস রিক্‌শর শব্দ এবং আলোর মধ্যে প্রেতাত্মার কোন অস্তিত্ব টের পাওয়া গেল না। বরং প্রেতাত্মা বলতে এখন রুমকি। সে আমাকে পুলিসের ভয় দেখিয়ে রেখেছে।

    ঘুম আসছিল না। এপাশ ওপাশ করছিলাম। মাঝে মাঝে টাইগার গলা ফাটিয়ে ওপাশে চিৎকার করছে। জেগে আছে জানান দিচ্ছে। সকালে ছোড়দিকে বোধহয় সব খুলে বলাই ভাল হবে। কুড়ি টাকা চুরি করেছি ঠিক তবে ডাইরিতে লিখে রেখেছি। কে কি পাবে, সব লিখে রেখেছি। টাকা মান যশ হলে ফেরত। আজ যে দশ আনা পয়সা দিয়েছে রহমানদা, তাও লিখে রাখব। আশ্রয় দিয়েছে, তাও। কাজ দিলে তাও লেখা থাকবে, কারো কাছে কোন ঋণ রাখব না। বাবা বলেছেন, অঋণী অপ্রবাসী থাকতে। তবে দেশ ছেড়ে আসার পর তাঁর মুখে অপ্রবাসী কথাটা আর বের হত না। শরণার্থীদের জন্য সরকার লোন দিচ্ছে, বাবা সেদিকটাতে যানই নি। কে কার ঋণ শোধ করবে! যা সব সন্তান- সন্ততি, তাদের আর ঋণের মধ্যে রেখে পিতৃদায় বাড়াতে চান না। শিষ্যদের মানি অর্ডার এলে শুধু জবাবে লিখতেন, ঠাকুরসেবার জন্য প্রেরিত তোমার প্রণামী যথাসময়ে পেয়েছি। প্রণামী কখনও ঋণের পর্যায়ে পড়ত না। যে যার মঙ্গলের জন্য পাঠায়। তিনি শুধু উৎসর্গকারী, বাবার এসব ধারণা মনে হওয়ায় গোপনে হেসে ফেললাম। মানুষ বোধহয় নিয়মকানুন এভাবেই নিজের মতো করে তৈরি করে নেয়। নেশা করা, মাতলামি করা পাপ কাজের মধ্যে পড়ে রহমানদার খেরো খাতায় বোধ হয় লেখা নেই। থাকলে বলতে পারত না, তুই শুয়ে পড়। আমি একটু বসব।

    রহমানদা কী করে মুঠো মুঠো টাকা রোজগার করে জানি না। একদিনে জানা সম্ভবও নয়। শহরটায় এসে বুঝেছি, সব মানুষই রোজগারের ধান্ধায় ঘুরছে। যার যেমন ক্ষমতা। আমার ক্ষমতার মধ্যে আছে ইতিহাস ভূগোল অঙ্ক ইংরেজি। বাংলা ভাষাটা ধর্তব্যের মধ্যে নয়। ওটা রহমানদাও জানে। একজন ভিখিরীও জানে। হিসাবপত্র রাখতে পারি, সরকারী অফিসের কাজে লাগতে পারি—কোন একটা বাবু-কাজ আমার চাই। রুমকির বাবা যদি পুলিসে দেয়, তবে সব যাবে। দাগী আসামী জানলে কুকুর পর্যন্ত পেছনে লাগে। ওদের ঘ্রাণশক্তি প্রবল। আসলে কি টাইগার টের পেয়ে গেছে, পাঁচিলের পাশে একটা খুদে চোর শুয়ে আছে?

    না, ঘুম আসছে না। ইচ্ছে হচ্ছে পাঁচিল টপকে কুকুরটার গলা টিপে ধরি। সত্যিকারের একটা খুন-টুন না করলে চলছে না। কুকুর তুমি মরবে। ফাঁক পেলেই দড়ির ফাঁস পরিয়ে ঝুলিয়ে দেব। বেশি হুজ্জোতি আমি সহ্য করব না। প্রাণীদের প্রতি বাবার সব সময়ই একটু বেশি আবেগ। মনাকে পিলু কোন কারণে লাথি-ফাথি মারলে বাবা বলতেন, দেব নাকি এক ঘা। মনার বুঝি লাগে না। বাবার কাছে মানুষ এবং জীবজন্তু তেনারই সৃষ্টি। তুমি শাসন করার কে হে?

    কিন্তু এমন পেছনে লাগলে রাগ হয় না! আচ্ছা, ঠিক আছে—কিছু করব না। খুনের কথায় বাবার মুখটা ভেসে উঠল!

    তুমি শেষ পর্যন্ত নিরীহ একটা অবলা জীবের প্রাণ হরণ করলে। পারবে তুমি কারো প্রাণ দিতে? যা পার না, তা তুমি মারতেও পার না। হতাশায় কেমন ম্রিয়মাণ হয়ে গেলাম। আমাকে দিয়ে আসলে কিছুই সম্ভব নয়। উচ্চাশা বাদে আমার আর কোন সম্বল নেই—এত সব ভাবনার মধ্যেই কখন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম—সকালে দেখি গাছতলাতেই শুয়ে আছি। রহমানদা ডেকে ডেকে সারা—রহমানদার স্নান সারা।

    —এবারে ওঠ। আর কত ঘুমাবি। হাত-মুখ ধুয়ে এলে সেই ডিম ভাজা, পাঁউরুটির পিস। এখন দেখছি খাবার সামনে থাকলে মাথায় আর কোন দুশ্চিন্তা থাকে না। রুমকি যে কুকুরটা নিয়ে যে কোন মুহূর্তে হাজির হতে পারে, তাও মনে নেই।

    দুশ্চিন্তা থেকে রক্ষা পাবার মোক্ষম একটা উপায় খুঁজে বার করা গেল। সারাদিন খাদ্যসামগ্রী সামনে নিয়ে বসে থাকলে হয়। কিন্তু পাব কোথায়। দিতেই সব যার সারা হয়ে যায়, তাকে কোন সরবরাহকারী আছে যে, এটার পর এটা খান, তারপর এটা, তারপর মিহিদানা, খান না আর দুটো রসগোল্লা —সুতরাং মোক্ষম উপায়টা কাজে লাগতে পারত একমাত্র কোন যদি সদাশয় সরবরাহকারী বিনা শর্তে রাজী থাকতেন।

    রহমানদা বলল, অসীমকে বলেছি, ওর মোটর পার্টসের দোকান আছে। তার যদি কোন কাজে লাগে—

    তাহলে রহমানদা কাজে লেগে গেছে।

    —কাজ পাওয়া বড় কঠিন বিলু। তার চেয়ে ব্যবসায় নেমে পড়

    —কি ব্যবসা?

    –আমার সঙ্গে থেকে থেকে শিখবি। বিচারবুদ্ধি একটু থাকলেই হয়ে যায়। কি করবি?

    –কোন অফিসে-টফিসে–

    —তুই ক্ষেপেছিস। সরকারী অফিসে চাকরি, সে হয় না। আমি পারব না। সব চোর, বুঝলি। পকেটমার, ছিনতাইবাজদের আমি ক্ষমা করে দিই। দেবে না, কেড়ে খাবে। কিন্তু ব্যাটারা সাধু সেজে বসে থাকে। এক দু’টাকার কাঙ্গাল। বেটারা সব লেঙ্গু।

    লেঙ্গু শব্দটি নতুন। লুঙ্গির অপভ্রংশ কি না ঠিক জানি না, কিংবা লেজুড়ের। যাই হোক, রহমানদা আপাতত খেয়ে ওঠার পর বলল, দশ আনা থাকল। আজ আবার পালাস না। ফিরতে দেরি হলে রোয়াকে বসে থাকিস। গাড়িটাড়ি গেলে লক্ষ্য রাখবি। কেউ এলে বলবি, রহমানদা নেই। তুই যে এখানে এসে উঠেছিস, স্যাঙাতরা সব জেনে ফেলেছে। কোথায় ঘুরছি ফিরছি জানতে চাইবে।

    —তুমি কী কর রহমানদা?

    এই প্রথম ওকে ‘তুমি’ বললাম। এবং কিছুটা চমকে গেলাম। মানুষ কত সহজে একজনকে নিজের করে নিতে পারে।

    —থাকলে টের পাবি। বলতে হবে না। তোকেও লাইনে ভিড়িয়ে দেব। হিসাব ঠিক থাকলে পাঁচ সাত বছরেই গাড়ি-বাড়ি। তুই লেখাপড়া জানা ছেলে, তোর সহজেই হবে।

    রহমানদা প্রচণ্ড জোরে একটা হাই তুললে। মুখে তুড়ি দিলে। শেষে বললে — স্বাধীন দেশ তো। লোকজন সব স্বাধীন। আগে পরাধীন ছিলাম। শৃঙ্খলিত বলে দেশনেতারা। হাত-পা বাঁধা থাকলে কাজে অসুবিধা। না থাকলে কত সুবিধা। বল। যাই করবি, তাতেই ফসল। কেবল কোন্ গাছে কি কি সার লাগে জানতে হয়।

    একটা টিকটিকি সে সময় ধপাস করে আমার মাথায়—ভয়ে উঠে দাঁড়ালে বললে –তুই খুব পয়া আছিস। কাল ভাল রোজগার হয়েছে। আরও হত, লেখাপড়া জানি না। অক্ষরজ্ঞান নেই, ছোড়দিদের গাড়ি চালিয়ে পেট ভরত। আর এখন সময়ে ছোড়দির বাবাই বলে—হবে নাকি?

    —কি হবে নাকি?

    — টাকা।

    —টাকা চায়?

    —চায় মানে? নেশা। জমিজমার নেশা। শহরের ফাঁকা জায়গা পেলেই কিনে ফেলে। নেশা না থাকলে হয় না। যেমন নেশা না থাকলে কার দায় বল এত সকালে দুটো মুখে দিয়ে ছোটার? বড় হ’, বুঝবি।

    রহমানদার এত কথা বলার দায় আমার সঙ্গে নেই। বরং গম্ভীর থাকলেই মানাত। যার আশ্রয়ে যে থাকে, সেই তার মনিব। সব সময় গোবিন্দদার মত রহমানদাও আমার মনিব—মনিবের এমন দিলখোলা কথাবার্তায় আরও বেশি মজে গেলাম। রহমানদা চলে গেলেই সারাদিন একা। পেয়ারা গাছ এবং পাঁচিল, রাস্তার লোকজন দেখা আর পাশের বাংলোবাড়িটায় রুমকি, টাইগার ভয় দেখাবে। সদর দরজায় পুলিস।

    দুম করে বলে ফেললাম, না বলে কিছু নিলে চুরি করা হয় না রহমানদা?

    —চুরি!

    —না, এই আর কি, কেউ যদি নেয়, নেবার পর যদি চিরকুটে লিখে রাখে, নিয়েছি। তবে কি চুরি হয়?

    —মরণ হয়।

    —তার মানে?

    —কিছু লিখে রাখতে নেই রে। শতং বদ মা লিখতি’ কি না বলে যেন। কোনদিন এমন কাজ করবি না। লেখাপড়া শিখে তোর এই বুদ্ধি হল। কেউ নিয়ে আবার লিখে রাখে নাকি?

    —লেখে না?

    —লিখলেই তো ধরা পড়তে হয়।

    গ্যাছে। সব গেল। নিজের হাতে মরণ ফাঁদ পেতে এসেছি। কি করি? মুখ কেমন ফ্যাকাসে হয়ে গেল। পৃথিবীতে কত বড় নির্বোধ হলে এমন হয়। নিজের হাত কামড়াতে ইচ্ছে করছে। চুপ করে থাকলে বললে, যাকে যা দিই মুখে মুখে হিসাব। লেখা থাকলে হিসাবে গন্ডগোল হয়। লোকও সব তক্কে তক্কে আছে, পেলেই খপ করে ধরে ফেলে।

    তারপর রহমানদা কখন চলে গেল, টের পাই নি। রাস্তার দিকে তাকিয়ে আছি—রাস্তাই একমাত্র মুক্তির পথ—ফেরার হওয়া ছাড়া আর ভাগ্যে কিছু লেখা নেই। টেবিলে দশ আনা পয়সা। বাইরে দরকার পড়লে তালা দেবার চাবি। আর কিছু নেই। একটা তোয়ালে স্নানের জন্য, আর কিছু নেই। টেবিল ঘড়িটা টিকটিক করে বাজছে, না মস্করা করছে, ঝুঝতে পারছি না। রাস্তার হাতছানি তখনই ঘেউ—এই রে, যাব কোথায়? সে তো জেগে আছে। দিনরাত কেউ জেগে থাকলে, আমি করি কি? অগত্যা ছোড়দিই আমার সব। হাতজোড় করে অপরাধ স্বীকার করলে, পুলিসে দেবার কথা ভাবতে নাও পারে। বাইরে পেয়ারাতলায় বসে আছি, ছোড়দির সঙ্গে দেখা করব বলে। আর সেই সময় একটা সাদা রঙের গাড়ি। গাড়িতে নীল ফ্রক গায়ে ছোড়দি। গাড়িটা হুস করে বের হয়ে যাবার সময় হাত নেড়ে বলল, তাহলে পালাস নি, এখনও আছিস?

    দৌড়ে গেলাম, ছোড়দিকে কিছু বলব বলে। ছোড়দির গাড়িটা চলে যাচ্ছে। কী সুন্দর দেখতে ছোড়দি। পায়ে সাদা মোজা, কালো পাম্পশু। ফাঁপানো ববকাটা চুল। কপালের অর্ধেকটা ঢেকে আছে। একটা সাদা রঙের গাড়ি যেন আশ্চর্য এক পৃথিবীর খবর দিয়ে অদৃশ্য হয়ে গেল। দূরবর্তী নক্ষত্র বুঝি মানুষের শৈশবে, এভাবেই আকাশে আলো দেয়। কেন জানি বিশ্বাস হল, ছোড়দি আর যাই করুক পুলিসে দেবে না। টের পেলাম, ছোড়দির দুষ্টু চোখে বড় বেশি সুষমা। অন্য গ্রহ থেকে তখন কেউ যেন সংকেত পাঠায়—আমি আছি, আমি বড় হচ্ছি। মনের সব গ্লানি নিমেষে কেউ হরণ করে নেয়। প্রসন্ন মনে ভাবি, আমার বড় হওয়া তারই হাত ধরে। বাবা-মা ভাই বোনের মতো সেও জীবনে অংশীদার হয়ে যাচ্ছে। ভারি গোপনে পা টিপে টিপে সে আসছে।

    এখন আমি স্বাধীনও বলা যায়, পরাধীনও বলা যায়। স্বাধীন এ জন্যে, আমার মনিব রহমানদা নেই। দরজায় তালা মেরে শহরটা ঘুরে দেখে আসতে পারি। মানুষজন দেখলে, জীবন সম্পর্কে আগ্রহ বাড়ে। বাবার কথা। বনের মধ্যে বাড়িটা করার পর, বাবা বোধহয় এটা টের পেয়েছিলেন। ভিটেমাটি ছেড়ে বনের মধ্যে বাড়িঘর করতে কেউ এলেই, বাবার অহংকার বেড়ে যেত। মাটি মানুষ এবং গাছপালা সম্পর্কে নানা রকমের কৌতূহলোদ্দীপক কথাবার্তা বলতেন। মানুষ নিজের ঘরবাড়ি চায়। প্রতিবেশী চায়। গাছপালা চায়। প্রতিবেশী না থাকলে, তোমার অহংকার কার কাছে? প্রতিবেশী আছে তাই মানুষ এত উদ্যোগী, জীবন সম্পর্কে মানুষের এত আগ্রহ। বাবা গভীর বনটার প্রথম ইজারাদার। নিজের মতো একখানা গ্রাম তাঁর আবার দরকার। তিনি ঘুরে ঘুরে খবর দিয়েছেন, চলে যাও, বহরমপুর স্টেশনে নেমে রেল-লাইন বরাবর। সামনে পাবে বাদশাহী সড়ক। পাশে পুলিস ট্রেনিং সেন্টার। পরে মাঠ। আরও পরে রাজরাজড়াদের আম-কাঁঠালের বাগান। জঙ্গল গড়িয়ে এখন সুমার বন। জঙ্গল সাফ করে ঘর বানাও। কত কাল আবাদ নেই—বীজ বুনলেই গাছ। খাবার থাকবার ভাবনা নেই।

    বাবাকে তখন আমার কিছুটা মোজেসের মতো মনে হত। অথবা বাবা যেন সেই মহাপ্লাবনের সময়কার মানুষ—নৌকায় তিনি সব জোড়ায় জোড়ায় পাখি, জীবজন্তু এবং মানুষের প্রজাতি তুলে নিচ্ছেন। নোয়ার নৌকা এখন বাবার গ্রামের আবাসটি। সেই বাবার ছেলে এইমাত্র নিজেকে স্বাধীনও মনে করছে—আবার পরাধীনও ভাবছে।

    পরাধীন এই জন্য যে একটা কুকুর নোয়ার বংশধরকে আটকে রেখেছে—বাবা এটা ভাবতেই পারতেন না। কুকুর গৃহপালিত জীব। তার এত আসকারা হবে কেন! মানুষের কাছে সে তো মাথা হেঁট করে রাখবে। সেই কুকুরের ভয়ে নোয়ার বংশধর খাটিয়ায় শুয়ে আছে। মাথার ওপর নিষ্ফলা পেয়ারা গাছ। শরতের বাতাসে, দুটো একটা পাতা ঝরে পড়ছে মাথায় পায়ে। রাস্তায় রিক্‌শর প্যাক প্যাক শব্দ। জংশন স্টেশনে গাড়ি—নীল আকাশ গুরুদোয়ারার গম্বুজ পার হয়ে একটা কলের চিমনির কাছে আটকে গেছে। নোয়ার বংশধর ভারি বিপাকে। পা নাড়লেও মনে হচ্ছে পাঁচিলের ওপাশে টাইগার গরগর করছে। এ হেন অবস্থায় বাবার বিচারবুদ্ধি সাফ। ট্রেনে দেখেছি, বিনা টিকিটে বাবা আমাদের তুলে দিয়ে এ-কামরা ও কামরায় ঘুরে বেড়াচ্ছেন। চেকার দেখলেই পরিপাটি হাসি এবং সখ্যতা। সখ্যতার মতো বড় শত্রুতা অপহরণকারী আর কিছু নাকি নেই। সুতরাং টাইগারের বেলায় বাবার স্বতঃসিদ্ধ ধারণা প্রয়োগ করে দেখবার একটা বাসনা গজাল। একটা কুকুরের হেপাজতে থাকতে মানুষের কতক্ষণ ভাল লাগে? কুকুরটাকে হাত করতে পারলেই খোলামেলা স্বাধীন জীবন। ভাবা যায় না।

    ডাকলাম, কুঁ।

    কুঁ ডাকলে, কুকুর আসে। পায়ে লুটায়। ঘাউ ঘাউ করে উঠল কিন্তু কুকুর এল না।

    আবার–কুঁ!

    রাস্তা থেকে দুটো নেড়ি কুকুর ঘাড় বেঁকিয়ে দেখল। এল না। তাহলে কুঁয়ে হবে না। রাস্তার কুকুরও আমায় চিনে ফেলেছে। দেবার মুরদ নেই, ডাকে। হন্যে হয়ে ঘুরছি, শুঁকছি সব কিছু, কোথাও কিছু নেই—কুঁ দিলেই হল। আর টাইগারের ইজ্জত কত! ছোড়দির নফর, সে কুঁ দিলে ঘাউ ঘাউ করবে শুধু। আপাতত তবে উঁকি দেওয়া যাক। পাঁচিলে উঁকি দিতেই মনটা ভারি প্রসন্ন হয়ে গেল। টাইগার জাফরিকাটা বারান্দায় বন্দী হয়ে আছে।

    শত হলেও স্বভাবে কুকুর—খেতে দিলে সব হয়— ছোড়দি সেই ভয়ে বোধহয় আটকে রেখে গেছে। লাফিয়ে পাঁচিল টপকে নোয়ার বাচ্চার সঙ্গে ভাব জমালেই গেছে। সব প্রভুত্ব ছোড়দির তবে যাবে। তারপরই মনে হল, বাড়ি থেকে বের হওয়া তক আমি কেবল মানুষের খারাপ দিকটাই দেখছি। এও তো হতে পারে, পাঁচিল টপকে আমাকে কামড়াতে পারে ভেবে আটকে রেখে গেছে। ছোড়দি নেই, স্কুলে গেছে, গাড়িটা ফিরে এলে, সাহেব-সুবো মানুষ বের হয়ে গেল গেট দিয়ে। খাটিয়ায় শুয়ে থাকলে খারাপ দেখাতে পারে ভেবে গাছের নিচে খুব অবলা জীবের মতো দাঁড়িয়ে থাকলাম। ছোড়দির যখন এত প্রতাপ, তার বাবা কিনা জানি একজন। আমাকে দেখে তিনি যখন কিছু বললেন না, তখন কেন জানি মনে হল ফাঁড়া কেটে গেল। এখন ছোড়দি ফিরে এলে শুধু বলে রাখা, আমি মাত্র কুড়িটা টাকা চুরি করেছি। টাকাপয়সা হলে ফেরত দেব। এবারের মতো ক্ষমা করে দাও। কান মলছি, আর কখনও এ কাজ করব না। আমাকে আর যাই কর, পুলিসে দিও না। পিলু জানতে পারলে ক্ষেপে যাবে।

    এই সব সাত পাঁচ ভাবনা—যার খাচ্ছি, তার তো কিছু কাজ করা দরকার। ঘরটা খুলে ঝাঁট দিলাম, কুঁজোতে জল রাখলাম—রহমানদা এসে সব দেখে যেন খুশি হয়—আর একটা বড় কাজ করে যাচ্ছি ফাঁকে ফাঁকে—সেটা ঘড়িতে সময় দেখা—লুঙ্গি, গামছা নিয়ে চানও করে আসা গেল। দশটায় পাড়েজী গেলে আবার রাগ করতে পারে পা বাড়িয়েই রেখেছ! তার চেয়ে আর একটু পায়চারি করলে সময়ও কাবার হবে, ক্ষুধারও ষোল আনা বেগ আসবে। পায়চারি করার পক্ষে উঠোনটা প্রশস্ত। পুবে-পশ্চিমে পা ফেলে দেখলাম ছাব্বিশ বার, উত্তরে-দক্ষিণে আঠারোবার। আরও দশ দফে উত্তর- দক্ষিণ, পুব-পশ্চিম আপাতত করা যাক। করা শেষ হলে দৌড়ে গিয়ে ঘড়িটা দেখলাম—মাত্র চার মিনিট। মিনিটে এতটা হাঁটা যায়, এর আগে কখনও জানতাম না। বুঝতে পারছি, ক্ষুধার বেগের তালে হাঁটার বেগ জ্যামিতিক হারে বেড়ে যাচ্ছে। তার চেয়ে বরং এই ধরনের বেগ নিয়ে পৃথিবী পরিক্রমা করতে কত সময় লাগতে পারে, তার গণিত সেরে রাখা ভাল। পৃথিবীর পরিধি জানা, তাকে গুণ, ভাগ করলে সময়টা পাওয়া যাবে। এতে সময়ও পার করা যাবে অনেকটা। অর্থাৎ এগারোটায় গেলে পাঁড়েজী খুব একটা বেশি রাগ করবে না। বসে বসে অঙ্কটা সেরে ফেলাই যুক্তিযুক্ত। উঠোনের মাটিতে একটা কাঠি দিয়ে অঙ্কটা করতে গিয়ে দেখা গেল, সারা উঠোন যোগ-ভাগে ভরে যাচ্ছে— কিন্তু অঙ্কটা মিলছে না। এই সমস্যাটা তৈরি হওয়ায় বেশ অনেকটা সময় কাটিয়ে দেওয়া গেছে, টেরই পাই নি। যখন পিছুতে পিছুতে পিঠ পাঁচিলে ঠেকেছে তখন হুঁশ ফিরে এলকার জন্য এত বড় অঙ্ক, মনে পড়ে গেল দুটো আহারের জন্য। আর সঙ্গে সঙ্গে সব অর্থহীন। রাস্তায় এসে মনে হল, নেশার ঘোরে তালা দিতে ভুলে যাই নি তো। ফিরে এসে দু’লাফে দেখে যাওয়া গেল—তারপর কতটা দ্রুতবেগে মাঠ পার হয়ে পাড়েজীর দোকানে হেঁটে গেছলাম, টের পাই নি। শালপাতা জল দিয়ে ধুয়ে মুছে ঠিক করে বসে আছি। পাঁড়েজীর কত আপনজন আমি দেখুক।

    কিন্তু–

    কিন্তু কি?

    ভাত আসছে না কেন?

    আমায় সে বলল, জল খাও।

    পাঁড়েজী আমার দিকে গোল গোল চোখে তাকিয়ে আছে।

    এনামেলের গ্লাসে জল। ঢকঢক করে জল খেলাম।

    পাঁড়েজী আমাকে দেখে প্রথমে কিছুটা হতচকিত হয়ে গিয়েছিল বোধহয়—অথবা চিনতে পারছিল না—কোথাকার কে হে, বলা নেই, কওয়া নেই, পাত পেতে বসে যাওয়া। তারপর চিনতে পেরে ‘ওফ’ শব্দ শুধু।

    আমি দেখেছি, বাবা শিষ্যবাড়ি গেলে কিংবা ঠাকুরের ভোগ হলে সব সময় অন্ন বলতেন। ভাত বলতেন না। গাম্ভীর্য রক্ষা করার প্রয়াসে বলতেন, অন্ন। কাজেই গাম্ভীর্য রক্ষার্থে বোধহয় অন্ন বলারই নিয়ম। আপাতত পাঁড়েজীর গাম্ভীর্য দেখে মুখ ফসকে বের হয়ে গেল, ঠাকুর অন্ন।

    —কিয়া বলতা? কি বলছ?

    —অন্ন।

    –দশ আনায় অন্ন হয় না।

    —ঠিক আছে, দশ আনায় ভাতই হোক।

    —ভাতও হবে না।

    কেন হবে না বলার জোর আমার নেই। পাঁড়েজীর পাইস হোটেলে দশ আনার মিল তবে উঠে গেল! বসে থেকে বোধহয় লাভ নেই। আমার দিকে আর ফিরেই তাকালো না। এত আহ্লাদ করে ক্ষুধার বেগ বাড়িয়ে এই ফল। কোন রকমে, বললাম, দিন আজকের মতো।

    –পোষাবে না।

    এ বেলায় বেশ বাংলা বলে। পোষাবে না। মাথায় বজ্রাঘাত কাকে বলে এই প্রথম টের পেলাম। না খেয়ে আছি, থাকছি এক কথা—সয়ে যায়, কিন্তু আশা করে থাকা খাব, সময় হলেই ডাল, ভাত, মাছ, তরকারি সেই স্বপ্নের মধ্যে, যেন কত কাল ধরে শখ করে খাব কথাটা পুষে রেখেছি মনে- খাব অন্ন খাব—আর পাঁড়েজী বলে কিনা পোষাবে না। কত হলে পোষাবে আর বলার সাহস হল না। বেশি চাইলে দেব কোত্থেকে? দশ আনা বরাদ্দ মিলের জন্য। বেশি চেয়ে রহমানদাকে বিগড়ে দিলে অভিমানের জাত রক্ষা করার আশ্রয়টুকু পর্যন্ত যাবে। মানে মানে উঠে পড়াই ভাল। চারপাশে হালুম হুলুম শব্দ। পিঁপড়া কাঁদিয়া যায় পাতে—কি যেন একটা লাইন বার বার মনে আসছে। খুব খিদে পেলে মানুষের বোধহয় চোখে জল আসে। বের হয়ে আসার সময় কেমন সব ঝাপসা দেখছিলাম— সামনের মাঠটা সহসা কেন যে এত কুয়াশায় ছেয়ে গেল। কুয়াশার মধ্যে দিয়ে হাঁটছিলাম। মাঠটা বেশ বড়। দুটো ন্যাড়া বেলগাছ পার হয়ে রাস্তা। রাস্তা পার হলে কাঁচা নর্দমা, খুপরি ঘর, লরি- টেমপোর গ্যারেজ। সারি সারি ট্রাক। তারপরই গুরুদোয়ারা এবং বাংলোবাড়ির সদর। দু’দিনেই জায়গাটার মধ্যে একটা নিজস্ব ভাব এসে গেছে। খাটিয়ায় লম্বা হয়ে পড়ে থাকার বড় সুসময় এটা আমার। কিন্তু পেটের জ্বালা, বড় জ্বালা, সে কেন মানবে? গুরুদোয়ারার কলে জল, সেখানে হাঁটু গেড়ে বসলাম। অনেকক্ষণ ধরে জলপান করতে হবে। আঁজলা পেতে আকণ্ঠ জল খেলাম। হা-অন্ন পেট এতটা জল সইবে কেন? কিছুটা বমি হয়ে সে তার নিজের সমতা রক্ষা করতেই ভাবলাম, ঠিক হয়েছে। ঢেকুর। জল খাবে, তাতেও রাক্ষুসেপনা। দশ আনায় মিল তোমার মিলবে কেন? এখন খাটিয়ায় শুয়ে পড়তে পারলে কথা নেই। নির্ভেজাল ঘুম। ঘুম মানুষের কত বড় সম্বল, এ সব সময়ে টের পাওয়া যায়। ঘুমিয়ে পড়লে মরা। কাকপক্ষীতে ভয় পায় না। আমার চারপাশটায় বিচিত্র সব পাখিরা এ সময়টা ওড়াউড়ি করবে জানি। ডাক খোঁজ করবে। —হ্যাঁরে ওঠ, খাবি না? কেউ যেন দূর থেকে তখন ডাকে। কে ডাকে। ঘুমটা লেগে আসছিল—কার মুখ। দরজায় দাঁড়িয়ে আছেন। ডাকছেন, ওঠ। খাবি না? কত বেলা হল রে!

    আমি যে না খেয়ে আছি, পলাতক জীবন, আমার কিছুই মনে আসছিল না। বাড়িঘর, উঠোন, ঠাকুরঘর যেন ডাকলেই পিলু দৌড়ে বের হয়ে আসবে, বলবে যাবি না দাদা, মাছ ধরতে যাবি না, কিংবা আরও দূরের খবর সে দেবার জন্য মুখ বার করে রেখেছে। চোখ কচলে যখন তাকালাম, দেখি সাদা রঙের গাড়িটা ঢুকছে। ছোড়দি ফিরল। ছোড়দি আমার দিকে তাকালও না। আমি যে আছি, কাল থেকে, ছোড়দি যেন ভুলে গেছে। গাড়িটা থামলে বলতাম, জান ছোড়দি, মানুষের স্বপ্ন কত সুন্দর হয়। পিলুটা দরজায় মুখ বাড়িয়ে আছে। কিছু একটা হলেই পিলুকে নিয়ে আসব। ও পাহাড় দেখে নি। তোমাকে নিয়ে আমরা দু’ ভাই একদিন কাছের পাহাড়টায় ঘুরে আসব।

    ছোড়দি কথা বলুক চাই না বলুক- আমার কিছু আসে যায় না। ছোড়দি এসে গেছে— বাড়িটার মধ্যে ছোড়দি আছে—ঠিক যেন কি থেকে যায় ছোড়দি থাকলে ঠিক কাউকে বোঝাতে পারছি না— অসীম হাহাকার সমুদ্রে একটা ছোট্ট দ্বীপের মতো ছোড়দি। ছোড়দিকে কখন যে কথাটা বলব। উঠে দু’বার পাঁচিলে উঁকি দিলাম। জানালা খুললে ছোড়দিকে বাগানের মধ্যে দেখা যেতে পারে—কিন্তু বারণ। সুতরাং একবার রোয়াকটায় উঠে আসা গেল—দেখলাম রোয়াকে উঠে বসলে বাড়ির ভেতরের অনেকটা দেখা যায়—কিন্তু ছোড়দিটা কোথায়? গাড়ি গ্যারেজে ঢোকাচ্ছে লোকটা—দেখা যায়, অথচ ছোড়দি কেমন অদৃশ্য।

    ছোড়দি আমার শত্রুপক্ষ, পুলিসের ভয় দেখিয়ে রেখেছে—সবই ভুলে যাই—কারণ এই প্রথম টের পেয়েছি, এবাড়িতে আমার জন্য কেউ জেগে থাকে— যাতে পালাতে না পারি, টাইগারকে সতর্ক করে দিয়ে যায়। সম্পর্ক মধুর নয়, তবু কোথায় যেন একটা টান বোধ করতে পারছি। সদ্য গাঁ থেকে আসা নোয়ার বংশধরের পক্ষে এই আশা কুহকিনী কত দূর নিয়ে যাবে, সে অবশ্য তা অনুমান করতে পারে না। তবু সখ্যতা, এবং নক্ষত্রের সংকেত-বার্তা মিলে ছোড়দি আমার এক ভয়ঙ্কর অরণ্য। সে কাছে এলে ভয় লাগে, দূরে চলে গেলে কষ্ট পাই।

    শরতের আকাশ এমনিতেই একটু বেশি নীল থাকে, আজ একটু বেশি গভীর নীল মনে হল। এগুলো কি মানুষের বড় হওয়ার লক্ষণ? এক অপরিচিতা বালিকার সঙ্গে দুটো কথাবার্তা তাও কত ভয়ের কথাবার্তা অথচ কেন যে সম্পর্কের গভীরে নিয়ত এক টান থেকে যায় এবং কখনও কিছুটা ঝড়ো হাওয়ার মতো কেউ যেন উঁকি দেয় পাঁচিলে। ছোড়দি টাইগারকে নিয়ে বের হয়ে পড়েছে রাউন্ড দিতে। এদিকেই ছুটে আসছে। হাওয়ায় ছোড়দির চুল উড়ছিল, ফ্রক উড়ছিল। কোথা থেকে এই প্রবল হাওয়া আসছে টের পাচ্ছি না। আমার কাছে এসে ঠিক উল্টো রোয়াকে বসে পড়ল। টাইগার পায়ের কাছে। সোজাসুজি বলল, গাছে উঠতে পারিস?

    পিলু পারে। আমি গাছে চড়তে ভাল পারি না। তবু বললাম, হ্যাঁ, গাছে চড়তে জানি।

    —লাফাতে পারবি?

    —হ্যাঁ পারব।

    —আয় তো। দেখি, কেমন লাফাস?

    ছোড়দি আমাকে কোথায় নিয়ে যেতে চায়। এখনই বলে দিলে হয়। ছোড়দির কুকুরটা টের পেয়েছে, আমি একটা চোর। চুরি করা পাপ না ছোড়দি? বাবা তো চুরি করাকে মহাপাপ মনে করে। চুরি করি নি ঠিক—

    —এদিকটায়। ওদিকে না।

    দু’ লাফে ছোড়দির বাগানের মধ্যে চুপি চুপি ঢোকা গেল।

    —ঐ দ্যাখ অকালের গোলাপজাম। পেড়ে আন।

    তাকিয়ে দেখলাম, অনেক উপরে গাছের মগডালে চাঁপা ফুলের মতো ক’টা গোলাপজাম ঝুলে আছে। বললাম, কী সুন্দর!

    গাছের মগডালে এক গুচ্ছ পাকা গোলাপজাম। মানুষের সাধ্য নয়—কিন্তু আমার অসাধ্য কাজ বলতে কিছু নেই। প্রাণ দিয়েও ছোড়দির কাছে ভালো মানুষ প্রমাণের দরকার। গাছটা সরু লম্বা, যেন আকাশ ছুঁয়ে দাঁড়িয়ে আছে। যত উঠছি, তার চেয়ে বেশি নেমে আসছি। এত পিছল যার কান্ড সে কেন আমাকে সহজে রেয়াত দেবে। তবু রবার্ট ব্রুসের কথা মনে পড়ল। আমাদের পড়াশোনার সময় অমনোযোগী হলে বাবার দুটো আপ্তবাক্য সার ছিল। পারিব না কথাটি বলিও না আর, একবার না পারিলে দেখ শতবার। তারপরই রবার্ট ব্রুসের গল্প। পড়াশোনার বিষয়ে দ্বিতীয় আপ্তবাক্যটি বিদ্যাসাগরমশাই। বই নেই –বিদ্যাসাগর, খাতা-পেনসিল নেই—বিদ্যাসাগর, আলো নেই—বিদ্যাসাগর।

    বড়ই রাগ হত, ঠাকুরদাস বন্দ্যোপাধ্যায় কেন যে একজন ঈশ্বরচন্দ্র রেখে গিয়েছিলেন বাবাদের জন্য। পড়ার কথা উঠলে রাস্তার গ্যাসের আলো থেকে দামোদর নদ পার হওয়া পর্যন্ত বাবা আমাদের সবটা না বলে নিস্তার দিতেন না। এতে করে বাবার প্রশান্তি বাড়ত। সব সদগুণই ছেলেরা পাবে এবং তুলনায় বাবা যে একজন ঠাকুরদাসের সর্বশেষ সংস্করণ, হাবে ভাবে তা প্রকাশ করতে চাইতেন।

    গাছ থেকে নেমে দেখলাম, জামা-প্যান্টের খানিকটা গাছে এবং ডালে। সঙ্গে শরীরের কিছু ছাল- চামড়া। গোলাপজাম পেড়ে হাতে দিলে ছোড়দি বলল, শীগগির পালা, মা আসছে।

    গাছ এবং আগাছার জঙ্গলে পুকুরের এদিকটায় ভর্তি। মাথা নুয়ে দৌড়। পকেটে দুটো গোলাপজাম। ছোড়দির অলক্ষ্যে রেখে দিয়েছি। গাছে থাকতেই নিরন্ন পেট এবং নীতিবোধের ঠোকাঠুকি হচ্ছিল— কখন হাতসাফাই হয়ে গেছে টের পাই নি। ছোড়দি যদি পকেট সার্চ করত— ভয়ে কেমন কাঁটা হয়ে গেলাম। তারপর দৌড়। কারণ চারপাশে মানুষজন, চুরি করে গোলাপজাম খাচ্ছি—কে কোথা থেকে টের পাবে—একটু নিরিবিলি জায়গা হলে ভাল হয়। বারবার পেছনে তাকাচ্ছি। বাড়িটা, মায় তার গাছপালা যতক্ষণ না অদৃশ্য হল, ততক্ষণ পর্যন্ত থিতু হতে পারলাম না। শেষে মনে হল, নিরাপদ দুরত্বে এসে গেছি, এবং শরীরও আর দিচ্ছে না। সন্তর্পণে খেলে কেউ টের পাবে না। একসঙ্গে দুটোই মুখে পুরে প্রায় গিলে ফেলার মতো—তারপর মুখ মুছে ভারি নিরীহ ছোকরা হেঁটে যাচ্ছে, মুখে চোখে এমন অভিনয় ফুটিয়ে হাঁটা দিতেই টের পাওয়া গেল, ছাল-চামড়া ওঠা জায়গাগুলো জ্বলছে। আর চকিতে দশ আনা পয়সার যে মালিক আমি, পকেটে আছে তো, দেখতেই সব ফাঁকা। দৌড়ঝাঁপে কোথায় ছিটকে পড়েছে। সঙ্গে সঙ্গে ইস্ শব্দ বের হয়ে এল মুখ থেকে। কি বোকা আমি, দশ আনায় মিল না হোক, পাঁউরুটি জিলিপী, মিষ্টি, মিহিদানা কত কিছু খেতে পারতাম। এতক্ষণে বুঝতে পারলাম, ভাতখেকো বাঙ্গালের মিল না খেয়ে মাথাটা গোলমাল হয়ে গেছে।

    দশ আনা পয়সা এখন সারাটা রাস্তায় খোঁজা। কিন্তু যদি পয়সা ক’টা ছোড়দির বাগানে পড়ে গিয়ে থাকে। সেখানে তো একা যাবার নিয়ম নেই। তবু যে পথে আসা গিয়েছিল, ঠিক ঠিক পথটা অনুসরণ করে আসা গেল। রাংতা এবং নাট-বল্টু যাই দেখি উবু হয়ে তুলে নিই। না, সবই আশা কুহকিনী। বাবার ঠাকুরদাস হওয়ার মতো। এমন একজন পিতৃদেব কি করে যে আমাকে মোটর ড্রাইভার করার কথা শেষ পর্যন্ত ভেবেছিলেন। কারণ ঈশ্বরচন্দ্রের সঙ্গে একজন ড্রাইভারের তুলনামূলক সম্পর্কের কথা ভাবলে নির্বুদ্ধিতা বৃদ্ধি পেতে পারে—সমস্যার সমাধান খুঁজে পাওয়া যায় না। ঐ তো কি চকচক করছে। টী-ষ্টলের পাশটায় না, সোডার বোতলের ছিপি। একটা আস্ত সিকি যেন—আসলে পয়সা ক’টা কত দুর্লভ বস্তু, আমার চোখ না দেখলে তখন কেউ টের পেত না। একটা আবর্জনার ঢিবিতে লাফিয়ে গেছি, সেখানে বসে কিছুক্ষণ ঘাঁটাঘাঁটি করা গেল। তবু নিরাশ হতে শিখি নি না পারিলে দেখ শতবার। এই শতবার করতে গিয়ে কখন যে বেলা পড়ে গেছে, কখন ডুবন্ত জাহাজের হতাশ নাবিকের মতো খাটিয়ায় লম্বা হয়ে শুয়ে পড়েছি, টের পাই নি। আকাশে চাঁদ উঠেছে, বাংলোবাড়িটায় মিউজিক বাজছে—কোথাও হাউই গুড়ছে—পৃথিবীতে মানুষের অনন্ত সুখ, শুধু আমার কাছেই সে মুখ ফিরিয়ে আছে। কবে যে সদয় হবে—

    রহমানদা ফিরে আমাকে দেখল শুয়ে আছি। পালাই নি, এতেই তার মুখ উজ্জ্বল। তাড়াতাড়ি উঠে গিয়ে দরজা খুলে দিলাম। ঘরের সব কিছু ছিমছাম দেখে খুব খুশি। তারপর আমার মুখের দিকে তাকাতেই কেমন বিস্ময়—হ্যাঁরে, তোর চোখ-মুখ কোথায় গেছে? কি হয়েছে তোর? মুখ এত শুকনো কেন?

    সারাটা দিন যা গেছে, সব বললে বিশ্বাসই করবে না। মানুষের এত হুজ্জোতি হয়, তার ধারণায় হয়ত নেই। খাই নি বলতে গিয়ে গলাটা কেমন বুজে এল। অভিমান এত যে আমার কোথা থেকে আসছে! বুঝি, সব মানুষের উপর অভিমান। মা-বাবা, পাঁড়েজী এমন কি পিলুটা পর্যন্ত আজ আমার শত্রু। পিলু যদি এক-আধ দিন শহরের সেই গ্যারেজে দেখা করতে যেত, তবে হয়তো পালাতাম না। পিলুরও যে অভিমান হতে পারে, তার দিগ্‌বিজয়ী দাদাটা শেষ পর্যন্ত মোটর গ্যারেজে ঝুল- কালি মেখে একটা ক্লিনারের কাজ করছে—সহ্য হবে কেন? পিলু তো কত দিন বলেছে, তুই দাদা যখন বড় হবি, কলেজে পড়ে এইয়া বড় মানুষ হবি, তখন আমাদের কোন দুঃখ থাকবে না। সেই মস্ত বড় দাদাটা কিনা গ্যারেজে কাজ করতে রাজী হয়ে গেল!

    —কী হয়েছে বলবি তো? রহমানদা জুতো মোজা খুলে, হাতঘড়ি খুলে ভেতরের ঘরটায় রেখে এল।

    —পাঁড়েজী খেতে দেয় নি।

    —ঝগড়া করেছিস?

    —না-না। বলল, দশ আনায় মিল হবে না।

    —মগের মুল্লুক। সহসা একটা ধনুকের ছিলা কেটে গেলে যেমন হয়, রহমানদা সেরকম সোজা হয়ে বলল, চল তো, শালার থুতনি নেড়ে দেব।

    —ওর দোষ নেই দাদা তুমি শুধু শুধু রাগ করছ।

    এমন কথায় রহমানদা আমার হাত ছেড়ে দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল—তবে কার দোষ?

    —আমারই।

    —তোর মানে তুই কি কিছু….

    —না, না। আমি কিছু চুরি করি নি। মানে…

    —চুরি। চুরি করবি কেন? চুরির কথা আসে কি করে? এতটুকুন একটা ছেলেকে পারল, না খাইয়ে রাখতে?

    —না পোষালে কি করবে?

    —তোর কোন কথা বুঝতে পারছি না। বলে ফের হাত ধরে টানতে টানতে নিয়ে যাচ্ছিল। দশ আনা পয়সা সোজা! দশ আনায় সব জায়গায় মিল দেয়, ও দেবে না মানে? তুই ব্যাটা জরু-গরু বৌ ক্ষেত সব করবি আমাদের মাথায় কাঁঠাল ভেঙে আর মিল দেবার বেলায় জুচ্চুরি। পাষন্ড কোথাকার। হারামির সব ক’টা দাঁত যদি তুলে না দিই। ইস, সেই থেকে না খেয়ে আছিস?

    প্রায় আমাকে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে গেল শেষ পর্যন্ত। আমার কোন কথাই কানে তুলছে না।

    দোকানের সামনে গিয়ে রহমানদা হাঁক পাড়ল, পাঁড়েজী—

    —আজ্ঞে যাই জনাব।

    কী ভাল মানুষ!

    —তুমি ওকে খেতে দাও নি?

    বুঝতে পারছি, রহমানদা ক্ষেপে গিয়ে হয়ত এখন তুই তুকারি করবে। এতটা আমার ভাল লাগছিল না। ভিতরে আবার মজাও পাচ্ছিলাম। একটা কুকুর থাকলে, আরও ভাল দেখানো যেত। লুঙ্গি খুলে দিতে পারত।

    —দিচ্ছি।

    —ও পেট ভরে খাবে। কত লাগবে তোমার?

    —যা খায়, চোদ্দ আনা লাগে জনাব

    লোকটা একেবারে বাঙালী হয়ে গেছে দেখছি।

    —তাই দাও। মাছের মুড়ো আছে?

    —আছে।

    —টক?

    —আছে?

    —দুটো মিষ্টি?

    —দেব।

    —সব মিলে কত?

    —এক টাকা।

    —ব্যস তো এই কথা। দেখবে নড়েচড়ে বসেছ তো আগুন ধরিয়ে দেব চালায়। পাঁড়েজী একটা “হাতল ভাঙা চেয়ার টেনে এনেছে। খুব বিনয়, বলছে, বসুন রহমান সাব। কি খায় দেখুন! তারপর রাগ করতে হয় করবেন।

    —তাই দেখব। এই বিলু, পেট ভরে খাবি। তুই এমন কি খাস যাতে ওর পোষায় না। আর যদি দেখি লজ্জা করছিস খেতে, লাথি মেরে তাড়িয়ে দেব।

    এমন উভয় সংকটে জীবনে কমই পড়া গেছে। বিশ্বস্ততা রক্ষা করা আগে দরকার। পেট ভরে খাব। সেটা আকন্ঠ হবে। এবং আর যাই করি, কোন কারণে রহমানদার সঙ্গে অবিশ্বাসের কাজ করতে পারি না। বড় আসনে আসন পিঁড়ি হয়ে বসা গেল। অনেক দিন পর ভোজের খাওয়া। গন্ডুষও করা গেল। অর্থাৎ খাবার আগে দেবতারা তুষ্ট হোন, পেল্লাই জবরদস্ত ভোজ—যত দেয় তত খেয়ে যাই। কিছুক্ষণের মধ্যে দেখছি পাড়েজীর চোখ ছানাবড়া হয়ে উঠছে। এদিক থেকে রহমানদা বলছে, ওর ভাত লাগবে। এই ঠাকুর তোমার কি বাতে ধরেছে, হাতায় ভাত ওঠে না কেন? বিলু চালিয়ে যা।

    যত বলছি আর লাগবে না, তত রহমানদা বলছে, লাগবে। তুই খা তো। ব্যাটা পেট ভরে খেতে পর্যন্ত দেবে না। কুনজুস। পাপ হবে না। মানুষকে কখনও আধপেটা খাইয়ে রাখতে হয়? না খাইয়ে ফিরিয়ে দিতে হয়? চিল্লাচিল্লিতে আরও দশটা লোক জমে গেছে। রহমানদা দুপুরের ঘটনা সবিস্তারে বলছে। বলুন, বেটা তুই কোন মুলক থেকে এয়েছিস পয়সা কামাতে, পয়সা কামা, বারণ করেছে কে? তাই বলে এমন নিষ্পাপ ছেলেটাকে না খাইয়ে রাখা। আপনারা বলুন, দশ আনায় মিল হয় কি না? সবার যদি হয়, ওর হবে না কেন!

    সঙ্গে সঙ্গে ওরাও সায় দিচ্ছে— রহমান সাব, এক পয়সা বেশি দেবেন না। যেমন দেশের গরমেন্ট, সব শালা লুটেপুটে খেতে এসেছে। এক পয়সা বেশি দেবেন না।

    রহমানদা বেশিই দিল। পুরো এক টাকা। এতটা খেয়েছি যে উঠতে কষ্ট হচ্ছে। রহমানদা বলল, বোস। আমি আসছি। বোধহয় রহমানদা তার রাতের সিগারেট আনতে গেল—কিংবা ওদিকটায় যে সার্বজনীন হোটেল আছে সেখানে খেতে চলে গেল। আমি বসে থাকলাম।

    রহমানদা ফেরার সময় দুটো পান নিয়ে এসেছে। খা, খেলে হজম হবে। পাঁড়েজী অন্য খদ্দের সামলাচ্ছে। ভয়ে রহমান কিংবা আমার দিকে তাকাচ্ছে না। একা পেলে লোকটা কি করবে কে জানে? রাস্তায় বললাম, কাল খেতে দেবে তো?

    —ওর বাপ দেবে। আরে তুই কি! না খেয়ে থাকলি। পয়সা তো ছিল, অন্য কোথাও কিছু খেয়ে নিতে পারলি না?

    দৌড়ঝাঁপে পয়সা হারিয়েছে, ছোড়দির বাগানেই পড়েছে পয়সা ক’টা, কাল খুঁজলে পেয়ে যাব। পয়সা হারিয়েছি বলতে সাহস হল না।

    রহমানদা রোয়াক পার হবার সময় বলল, কেউ এসেছিল?

    —না।

    —জামাপ্যান্ট ছিঁড়লি কি করে?

    —ছোড়দির গোলাপজাম পাড়তে গিয়ে। তারপর রহমানদা যদি প্রশ্ন করে, গাছে উঠলি কখন? পয়সা ক’টা দে। রেখে দি। বলে ফেলাই ভাল—রহমানদা!

    ঘরে ঢুকে আমার দিকে ঘুরে দাঁড়াল—কিছু বলবি?

    —গাছে উঠতে গিয়ে পয়সা ক’টা কোথায় পড়ে গেছে।

    –তোকে দিয়ে কিচ্ছু হবে না। খুঁজেছিলি?

    —হ্যাঁ। পাই নি। বাগানে আছে মনে হয়।

    —কাল খুঁজে দেখিস।

    —ঢুকতে দেবে?

    —ছোড়দিকে বলে দিয়ে যাব। পয়সা হল গে মানুষের ইজ্জত। যেখানে সেখানে তাকে হারাতে নেই। ঠিক এই সময়ই কড়া নাড়ার শব্দ।

    এই খুলিস না। কেমন ফ্যাকাসে মুখ রহমানদার। বলল, কে?

    —আমি

    —আমিটা কে?

    —পাঁড়ে রহমান-সাব।

    —অঃ। আসুন।

    ভিতরে এলে বলল, বসুন।

    —বৈঠেগা নেহি। আপনি মেহেরবান আদমি।

    —তা বুঝছি। টাকা পয়সা এখন নেই।

    —ও বাত নেহি।

    —তবে কি বাত আছে?

    পাঁড়েজী আমার দিকে চশমার উপর দিয়ে তাকাল। চোখ দুটো পিটপিট করছে। গোবদা মুখ, ঝাঁটা গোঁফ। গলায় ঢোলের মতো তাবিজ। তাগা কনুইতে বাঁধা। চেহারাতে রাম নাম সত্ হ্যায় হয়ে আছে।

    —আজ্ঞে, রহমান সাব বলছিলাম…

    —বলে ফেলুন না।

    —দশ আনা আচ্ছা থা সাব।

    —মানে

    — চোদ্দ আনা মিল দিলে পোষাবে না সাব। বহুত খা লিয়া।

    —কতয় পোষাবে?

    —না বলছিলাম, আপনার না যায়, হামার ভি না যায়। খাস বাত এক—দশ আনাই। দশ আনা দিলেই হবে।

    —এত সুমতি!

    —সুমতি না সাব, বাত এই হ্যায় ও ভি দশ আনা খাবে। হাম ভি দশ আনা মিল দেবে। চুক্তি বাতিল হলে আবার কোথায় গিয়ে পড়ব কে জানে? যা দশা চলছে। বললাম, রহমানদা, ঐ কথাই থাক।

    —মানে?

    —দশ আনা মিল।

    —পেট ভরবে?

    –খেতে খেতে অভ্যাস হয়ে যাবে? ক্ষুধার সঙ্গে কিছুটা চোখের খিদে আছে, ওটা আর বিশদ করে বোঝালাম না। আমার কথা পেয়ে পাড়েজীর হাতে স্বর্গ মিলে গেল।

    —খোকাবাবু বহুত ইমানদার আদমি আছে সাব। হাম চলে। রাম রাম।

    চোদ্দ আনায় আমার আকণ্ঠ খাবার স্বাধীনতা রহমানদা দিয়েছিল। পাঁড়েজীর এত বড় স্বাধীনতা পছন্দ নয়। সে আমার সেটুকু হরণ করে দিব্যি রাম নাম বলতে বলতে চলে গেল।

    সকালে আজ ঘুম থেকে রহমানদার আগেই উঠেছি। রহমানদা সকালে উঠে ঘরের কাজকর্ম কিছু সেরে রাখে। কুঁজোতে জল রাখা, ঘর ঝাঁট দেওয়া, কিছু কাচাকাচি থাকলে তাও। জানি না, কেন মানুষটাকে অত্যন্ত কাছের মনে হচ্ছে দিন দিন। বিশ্বস্ত থাকার চেয়ে বড় কাজ কিছু নেই। কী পরিবারে, কী বাইরে। বাবার কথা। রামায়ণ থেকে মহাভারত থেকে তার ভূরি ভূরি উদাহরণ। যিনি অন্ন দেন, তিনি ঈশ্বর। জমিদারী সেরেস্তায় বাবা কাজ করতেন—জমিদার মানুষটি তাঁর দেখা শ্রেষ্ঠ মানুষ।

    কাজেই এখানে যিনি অন্ন দিচ্ছেন, তাঁর কাছে আমার কিছু ঋণ থেকে যাচ্ছে। গৃহকর্ম করে আপাততঃ সে ঋণ থেকে আংশিক মুক্তিলাভের উপায় খুঁজছি। ঘুম থেকে উঠে রহমানদা আমাকে এ সব করতে দেখে ভারি ক্ষেপে গেল বের হয়ে যা। এক্ষুনি বের হ বলছি। তোকে বলেছি কাচাকাচি করতে? নিকালো হিয়া সে।

    খুব কাতর গলায় বললাম, সরাদিন বসে থাকতে ভাল লাগছে না।

    রহমানদা এ দু’দিনে আমার মোটামুটি পরিচয় জেনে নিয়েছে। তমাকে যে নবমী দা-ঠাকুর বলে তাও। বাবার কিছু কথাবার্তা তাকে আমার সম্পর্কে নতুন করে ভাবতে বোধহয় শিখিয়েছে। অবস্থা বিপাকে আমরা গরিব হয়ে গেছি, এবং এ সব কারণেই বোধহয় বাড়াবাড়ি করতে সাহস পেল না। বলল, ঠিক আছে, কাল থেকেই কাজে লেগে যা। নিমতা যাবি। গড়ি আসবে। গাড়িতে যাবি।

    —কখন যাব?

    —বিকেলের দিকে তুলে নেবে। তোর জামাপ্যান্ট জুতোর দরকার। ভাল হয়ে থাকতে শেখ। দুপুরের দিকে রহমানদা আমাকে নিয়ে কিছু সওদাপাতি করল। তখনই কথায় কথায় বলল, আমি এক রকমের, তুই আর এক রকমের। তুই দেখছি তোর বাবার স্বভাব পেয়েছিস। আরও জানলাম, ওর দু’রকমের ব্যবসা আপাতত আছে। কোলিয়ারি থেকে কয়লা আনা আর পারমিটের পেট্রল ব্ল্যাক করা। বাবুদের পয়সা দিলেই পারমিট। পারমিট বেচলে পাঁচ-সাতশো টাকা হয়ে যায়। পুলিস, সরকারী বাবু, সবাই অংশীদার। রহমানদার পয়সার অভাব নেই। লেখাপড়া শিখে যদি মানুষ অধর্ম করে, চুরি-চামারি করে, তবে লেখাপড়া না-শেখা মানুষের আর ধর্ম থাকে কোত্থেকে। কাজেই এ-সব কাজে তার কোন পাপবোধ নেই।

    এটা যে খুব একটা অধার্মিক কাজ, আমারও তেমন মনে হল না। কারণ বিষয়টা প্রথমে ভারি গোলমেলে। যুদ্ধের সময়কার কথা। ব্ল্যাক-মার্কেট শব্দটি তখন আমাদের শোনা। বয়সে খুব বাচ্চা, ব্ল্যাক-মার্কেট করে টাকা কামাচ্ছে কথাটা চুরি-চামারির পর্যায়ে পড়ত না। বরং যুদ্ধের কালোবাজারী একজন মানুষের পিতৃশ্রাদ্ধে যে এলাহি ভক্তির প্লাবন দেখেছিলাম, তাতে তার ধর্মবোধে এখনও বিস্মিত হই। ফলে রহমানদার ধর্মাধর্মে কিছুটা খামতি আছে, আদৌ বিষয়টা আমাকে স্পর্শ করল না। মানুষটা সোজাসুজি কথায়—বরং অনুরাগ আরও বেড়ে গেল। বললে জীবন দিতে পারি এমন অবস্থা।

    সেদিন বিকেলের দিকটায় সেজেগুজে বসে আছি। এ সময়টাতে প্রায়ই আমার চোখ বাংলোবাড়িটায় গিয়ে পড়ছে। সকাল থেকে আজ ছোড়দি-কে দেখি নি। ইস্ত্রি করা জামাপ্যান্ট পরে কেমন দেখাচ্ছে, যদি ছোড়দি দেখত। দেখলে বোধহয় আর আগের মতো কুকুর দিয়ে খাইয়ে দেবার সাহস পাবে না। দেখা হলে, বাগানে যেতে পারতাম। কবে থেকে বাগানে পড়ে আছে দশ আনা পয়সা। কেউ নেই দেখছি। এমন কি, মালীটা যে ওদিকে কি টুকটাক কাজ করে, সেও নেই। কুকুরটার সাড়াশব্দ পাওয়া যাচ্ছে না। পাঁচিল টপকে পালিয়ে দেখে এলে হয়। যেই টপকেছি, আর কোত্থেকে সেই বিশাল কুকুরটা এসে হামলে পড়েছে। ভয়ে কাঁটা। হাত তুলে দাঁড়িয়েছি। দৌড়ে আসছে কেউ। তাকে চিনি না। বাড়িতে কে কোথায় থাকে টের পাওয়া ভার। এসেই খপ করে হাত ধরে ফেলল, ক্যারে তুই?

    যত বলি আমি বিলু, ছোড়দি আমাকে চেনে, তত লোকটা ক্ষেপে যায়। টানতে টানতে নিয়ে যাচ্ছে। যত বলছি, গোলাপজাম পাড়তে গিয়ে আমার পয়সা হারিয়েছে, তত লোকটা রেগে যায়। এত রাগ থাকলে মানুষ যায় কোথা?

    সিঁড়ি ধরে উঠতেই বিশাল বারান্দা, একদিকে চিক ফেলা। নানারকম পাথরের কাজ করা মেঝে। আমার কেন জানি বিশ্বাস- ছোড়দি আমাকে আর তাড়া করবে না। ভাল জামাকাপড় পরলে মানুষের অন্য রকম চেহারা হয়ে যায়। ভিতর থেকে কেউ ছুটে আসছে—কে ঢুকে ছিল রে বাগানে?

    —এই ছোঁড়াটা মা।

    ছোড়দির মা! এত সুন্দর। কেমন বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকলাম। দূর থেকে দেখেছি। ছবির মতো দেখতে পৃথিবীতে মানুষ জন্মায়, ছোড়দির মাকে দেখে প্রথম সেটা বিশ্বাস হল। আর কি জানি, জানি না, আমার পোশাক-আশাক দেখে ছোড়দির মা যেন কিছুটা বিড়ম্বনার মধ্যেই পড়ে গেছে—তুমি খোকা বাগানে?

    —পয়সা পড়েছে।

    –পয়সা!

    —ছোড়দি জানে।

    —ওর তো জ্বর। দাঁড়াও দেখছি। কিসের পয়সা? বলে ফের ঘুরে দাঁড়ালেন। কুকুরটা বারান্দায় এখন লম্বা হয়ে শুয়ে আছে। লোকটা আমাকে ছোড়দির মার হেপাজতে রেখে কোথায় হাওয়া। ছোড়দির মা বুঝতেই পারছে না আমিই সেই বাঙ্গাল।

    কী বলি! কারণ গোলাপজাম পাড়তে গিয়ে পয়সা ক’টা বাগানে পড়তে পারে বলা ঠিক হবে কি না বুঝতে পারছিলাম না। আসলে একটাই ইচ্ছে আমার—যা হয় হোক, ছোড়দি আমাকে দেখুক। ভাল জামাপ্যান্ট পরলে আমিও যে কম যাই না, এবং এতক্ষণে মনে হল, পয়সা খোঁজার অজুহাতে এ বাড়িটার মধ্যে আমি ঢুকতে চাইছি। কিন্তু ছোড়দির জুর—কেন জ্বর হল, বড় চঞ্চল ছোড়দি- তার যদি জ্বর হয় কি হবে? ছোড়দির মা আমাকে চুপচাপ দেখে হঠাৎ বললেন—কে আছিস রে? রুমকিকে পাঠিয়ে দে তো।

    ছোড়দি পুরু হাতা জামা, লম্বা পাজামা পরে অনেক দূর থেকে যেন হেঁটে আসছে। গায়ে নরম উলের চাদর। আর আশ্চর্য উষ্ণ এক ঘ্রাণ সঙ্গে বয়ে আনছে। কাছে আসতেই কেমন চমকে উঠল ছোড়দি—আমাকে দেখে! বিশ্বাস হল না, সেই বাঙ্গালটা। কাছে এসে বলল—তুই? বলে বেশ নরম চোখে আমার দিকে তাকিয়ে থাকল।

    —ছোড়দি?

    ছোড়দি কেমন চকিত চোখে ফের তাকাল।

    —পয়সা হারিয়েছি।

    —কোথায়?

    —তোমার বাগানে!

    —কখন?

    —সেই যে গোলাপজাম পাড়তে গিয়ে। খুঁজে দেখব?

    ছোড়দির মা ভিতরে ঢুকে গেছেন। ছোড়দি কি খুঁজল যেন, তারপর বলল—আয়। ভিতরে আয় না।

    আমার ভারি সংকোচ হচ্ছিল। বাবার জমিদারের প্রাসাদ আমি দেখেছি, কিন্তু এত ছিমছাম নয়। সব কিছু সাজানো, এতটুকু ধুলোবালি কোথাও নেই। মেঝেতে আমার প্রতিবিম্ব ভাসছে। হলুদ নীল রঙের দেয়াল, লতাপাতা আঁকা পর্দা হাওয়ায় উড়ছে। একটা ঘরের মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়ে বলল – বোস, আসছি। তারপর মা মা করে ডাকতে থাকল।

    মা এলে বলল—এই সেই বাঙ্গাল মা, রহমানের কাছে থাকে।

    ছোড়দির মা কি ভেবে বললেন—বাঙ্গাল বলে কী মানুষ না? আমার দিদিমা তো শুনেছি বাঙ্গাল ছিল। জানিস, বাঙ্গালরা দেখতে খুব সুন্দর হয়। দিদিমার মায়ের কি রঙ ছিল। আমি আর তার কী পেয়েছি?

    ছোড়দির সান্নিধ্য আমাকে ভারি আপ্লুত করছিল। ছোড়দি আমাকে তার ঘরে নিয়ে বসিয়েছে। কত সব জিনিস। একটা বাক্সে কি ঢাকা দেওয়া—কিছুই চিনি না। টেবিল চেয়ার বই আলমারি, সব কিছুতেই আমার কৌতূহল—এটা কি ছোড়দি?

    ছোড়দি বলল—রেকর্ড প্লেয়ার।

    —কি হয়

    —গান। শুনবি?

    —দেখব।

    –দ্যাখ না।

    –কত বই, না ছোড়দি? এত বই তুমি পড়েছ।

    –এগুলো তো সব গল্পের বই রে।

    —কখন পড়তে হয়? স্কুলে পড়লে এ সব পড়া বারণ নয়?

    —বারণ হবে কেন?

    ছোড়দি ছোট্ট সবুজ সোফায় গা এলিয়ে বসে পড়ল।

    এত বই ছোড়দিকে তার বাবা কিনে দিয়েছে। বললাম—এ ঘরের সব কিছু তোমার?

    –সব।

    পৃথিবীতে ছোড়দি এত সব শৌখিন জিনিস নিয়ে বড় হচ্ছে। ছোড়দির বর কি রকম হলে মানায়, আমার ধারণায় আসছিল না। বললাম—ছোড়দি, যাবে?

    —কোথায়?

    —পয়সা ক’টা খুঁজে দেখব। পয়সা নাকি হারাতে নেই!

    —কি হয় হারালে? তুই কি বোকা রে। তোর কথাবার্তা শুনলে হাসি পায়। কবে পয়সা পড়েছে, এতদিনে মনে পড়ল।

    —পয়সা হারালে নাকি মানুষের ইজ্জত যায়।

    —ধুস। আমার তো কিছু ঠিক থাকে না। মা কত বকে।

    তখনই মনে হল, ছোড়দির সঙ্গে এক ঘরে বসে এতক্ষণ কথা বলা উচিত হচ্ছে কি না। লাই দিলে ঘাড়ে চড়ে—এমনও তো ভাবতে পারে। বিচারবুদ্ধি সজাগ রাখা ভাল। বললাম- ছোড়দি, আমি বরং উঠি। তোমার জ্বর-

    —বোস না। বিকেলের জলখাবার হচ্ছে।

    বিকেলের জলখাবার বিষয়টি আমার মাথায় ঠিক আসছে না। লোকে সকালে জলখাবার খায়। দুপুরে পেট ভরে, রাতে পেট ভরে খেতে হয়। আমরা ভাই-বোনেরা দেশের বাড়িতে থাকতে তিন- বেলাই পেট ভরে ভাত খেতাম। জলখাবার খেত বড়রা। তাও সকালে।

    বললাম, বিকেল কে আবার জলখাবার খায়? যেন বড়ই অনাসৃষ্টি কারবার। বড়ই নিয়ম-বহির্ভূত কাজ।

    আর তখনই দেখি গরম লুচি ভাজা দু’প্লেট, বেগুন ভাজা, এক গ্লাস করে জল। মীনা করা গ্লাসগুলি সাজিয়ে রাখা হল। ছোড়দির সঙ্গে আর কেউ খাবে। এ সময় আমার থাকা ঠিক না। হ্যাংলা ভাবতে পারে। ছোড়দি জলখাবার খেয়ে হয়ত বাগানে যাবে। এজন্য বসতে বলেছে। কাজেই খুব সঙ্কোচের সঙ্গে বললাম, ছোড়দি, আমি বাইরে দাঁড়াচ্ছি। তুমি খেয়ে এস।

    —তোরটা কে খাবে?

    এতটা আমার সাহস নেই, অথবা ভাবতে পারি, কেউ আমার জন্য গরম লুচি ভেজে বসে থাকতে পারে? প্রথমে ভুল শুনতে পারি, এমন মনে হল। আমার এখন কিছুতে বিশ্বাস নেই। আশা করেছিলাম ছোড়দি পোশাক দেখে বলবে, ভারি মানিয়েছে তোকে। কিছুই বলে নি। যেন আমার পক্ষে যা স্বাভাবিক, আজ তাই পরে এসেছি। এতদিন শুধু আমার নাটক গেছে।

    লুচির প্লেটটা থেকে ভারি সুঘ্রাণ আসছে। পাশে দুটো মিষ্টি। কোনরকমে সামলে বললাম, আমাকে খেতে বলছ?

    —তবে কাকে?

    —না। মানে ভুল হচ্ছে না তো?

    ছোড়দি এবারও ভাবল, ঠাট্টা করছি। উঠে এসে বলল—মারব এক থাপ্পড়। খা তো।

    এ সব বিষয়ে প্রথমে নানা সংশয় দেখা দেয়। প্রথম কথা, আমি কে? আমাদের বাড়িতে ছোড়দির মত বয়েস হলে বিয়ের কথা ওঠে। আমার এবং ছোড়দির বয়সটা বোঝাবুঝির মাঝখানটায়। কিছুটা এগিয়ে এসেছি। সবটা হয় নি। কি এক রহস্য, ঠিক বুঝতে পারি না, তবু টানে। প্রকৃতি আমাদের সামনে জাদুকরের গালিচা পেতে রেখেছে। শুধু আজীবন তা হেঁটে পার হয়ে যাওয়ার চেষ্টা। ছোড়দি-কে বললাম, তুমি সাইকেল চড় কেন? যেন এই যে খাওয়া, এখনই যথার্থ সময় সব ঝাল মিটিয়ে নেবার।

    —ছোড়দি বলল, তুই মেট্রিক পাস করেছিস?

    —সব বিষয়ে পাস করেছি। শুধু পাস নয়, সব বিষয়ে পাস।

    –তবে এত বোকা বোকা কথা বলিস কেন?

    –ছোড়দি ভয়ে। ট্রেনে চড়ে যাচ্ছিলাম সব বিষয়ে পাস না করা একটা লোকের সঙ্গে দেখা করতে। বাপস, এত ঝামেলা কে জানে?

    সব শুনে ছোড়দি হা হা করে হেসে উঠল। যত বলি হাসছ কেন, হাসার কি হল, তত ছোড়দি হাসতে হাসতে সোফায় লুটিয়ে পড়ছে। যত বলছি, আমার কি দোষ বল, আমাকে তো তিনিই একটা পছন্দমত কাজ দিতে পারেন। পড়তেও পারি, বাবা মাকেও খাওয়াতে পারি, কে না চায়?

    ছোড়দির হাসি থামছে না। আর মাঝে মাঝে ডাকছে—মা, শীগগির এস। বিলু কী কাণ্ড করেছে শোন। মা-মা-

    তিনি এলে, ছোড়দি আবার হাসতে থাকল—মা বিলুটা না, বিলুটা কোথায় গিয়েছিল জান? মা, ও না প্রাইম মিনিস্টারের সঙ্গে দেখা করবে বলে বাড়ি থেকে পালিয়েছিল। হাসছে আর বলে যাচ্ছে। শুনে দেখি তিনিও হাসছেন—তুই কী রে? তুই দেখছি সত্যি বাঙ্গাল। এবং আমার এমন পরিচয় পেয়ে তাঁরা কিছুটা বোধহয় আমার মধ্যে একজন সরল সহজ মানুষকে খুঁজে পেয়ে গেল। এই নিয়ে রহমানদা থেকে জজ মানুষটিও বেশ আমাকে নিয়ে মজা করল। এতে কি মজা আছে, আমার মাথায় কিছুতেই ঢুকছে না। মানুষই তো মানুষের কাছে যায়। আর সে মানুষ যদি বড় হয়, তবে তার কাছে তো অনেকে যাবেই। দেশটা যে চালায়, মানুষগুলির ভাবনাও তো তার। এটা এমন কি হাসির কাজ হল ভেবে পাচ্ছি না। কেমন বোকার মত ওদের দিকে তাকিয়েছিলাম শুধু।

    ছোড়দি বললনে, খা। খেতে খেতে পাঁড়েজীর কথা উঠল। দশ আনা মিল ঠিক হয়েছে শেষ পর্যন্ত। শর্তের কথাগুলোও ছোড়দিকে বললাম। তা ছাড়া দুপুরে মিল পর্যন্ত দেয় নি লোকটা কি কুনজুস। ছোড়দি বোধহয় হেসে ফেলবে। না, আর বলা ঠিক না। সারাদিন না খেয়ে ছিলাম শুনলে আরও মজা পাবে। হঠাৎ দেখি তখন ছোড়দি ভারি গম্ভীর হয়ে গেছে। বলল, তুই না খেয়েছিলি?

    —তুমি আবার হেসে ফেলবে না তো?

    —যা বলছি, উত্তর দে।

    পুলিসের ভয়টা একবার উঁকি দিয়ে গেল। কুকুরটা কোথায় দেখছি।

    —কি, না খেয়েছিলি?

    —হ্যাঁ ছোড়দি।

    —খাস নি, বলিস নি কেন?

    —তুমি যে বললে পুলিসে দেবে?

    —কবে বললাম?

    —বা রে। মনে নেই? আমাকে ধরে নিয়ে আসার সময়।

    ছোড়দি আমার দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ গুম হয়ে বসে থাকল। ভয় লাগছে। এত সুন্দর ব্যবহার ছোড়দির মার, ফুলকো লুচি, বেগুন ভাজা, সন্দেশ, সব তবে যাবে। বললাম- খেয়েছি। দুটো গোলাপজাম খেয়েছি। তোমাকে সত্যি কথা বলাই ভাল। গোবিন্দদার কাছ থেকে পালাবার সময় কুড়িটা টাকা নিয়েছি। বলে নিই নি। বাবা তো বলেন, না বলে কিছু নিলে অপহরণ করা হয়। আমি সেজন্য লিখে রেখে এসেছি। টাকা মান যশ হলে সব ফেরত। ছোড়দি, আর যাই কর, পুলিসে দিও না। পিলু বাবা জানতে পারলে দুঃখ পাবেন।

    ছোড়দি কিছু বলছে না। তাকিয়েই আছে। চোখ দুটো ছোড়দির চকচক করছে কেন? কেমন জলে ভার। ছোড়দির এটা কি হচ্ছে? ছোড়দির চোখে জল—এই ছোড়দি, ছোড়দি, ঠিক আছে, আর বলব না।

    ছোড়দি কোন কথা না বলে উঠে চলে গেল। সমবয়সী যদি কেউ এভাবে চোখের জল ফেলে, আমার বড় খারাপ লাগে। ধুস, না বললেই হত। কেন যে বলতে গেলাম? ছোড়দি ফিরে এল কেমন অন্য এক ছোড়দি হয়ে। বলল — বিলু চল, তোমার পয়সা ক’টা খুঁজে পাই কিনা দেখি। ছোড়দি তার কুকুরের চেনটা এবার আমার হাতে দিয়ে বলল—শক্ত করে ধরে রাখ। তুমি যা মানুষ, যে কেউ তোমার হাত থেকে পালাতে পারে।

    সেই থেকে ছোড়দি কেমন অন্য মানুষ হয়ে গেল। সারাটা বিকেল গাছের নিচে, ঝোপ-জঙ্গলের মধ্যে শুকনো ডাল পাতার ভেতর পয়সা ক’টা খুঁজল। আমার কাছে পয়সা ক’টা কত দামী, ছোড়দির খোঁজা না দেখলে বিশ্বাস করা যেত না। কিছুই পাওয়া গেল না।

    বাড়ি থেকে এক সময় ছোড়দির মাও হাজির। বললেন—পেলি?

    ছোড়দি কিছু বলল না।

    যেন বড় একটা অন্যায় কাজ করে ফেলেছে ছোড়দি। পয়সা ক’টা খুঁজে পেতেই হবে। আমি বললাম—যাক গে। রহমানদাকে বলব, খুঁজে পাই নি।

    ছোড়দির মা বললেন—আমার সঙ্গে এস। দশ আনা দিয়ে দিচ্ছি। রহমানকে দিয়ে দিও।

    আমি বললাম— সেই ভাল।

    ছোড়দি কিন্তু আমার সঙ্গে গেল না। ছোড়দির মা পয়সা ক’টা দিয়ে চলে গেলে, ছোড়দি সামনে এসে দাঁড়াল। কেমন অপমানে থমথম করছে চোখ। ছোড়দিকে নিয়ে সত্যি পারা গেল না। জ্বর নিয়ে খোঁজাখুঁজি, তার চেয়ে এই ভাল-রহমানদাকে ফিরিয়ে দেওয়া যাবে—তা না, কেমন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ফুঁসছে। বলছে, কেন নিলে বিলু?

    —কী হয়েছে? উনি তো ভালবেসে দিয়েছেন।

    –দাও, পয়সা ক’টা দাও।

    —তুমি নিয়ে নেবে?

    —হ্যাঁ। আমাদের পয়সা ভিক্ষা নেবে কেন? লজ্জা করে না! বলে প্রায় কেড়েই পয়সা ক’টা হাত থেকে নিয়ে নিল। যাবার সময় ক্ষোভে দুঃখে বলে গেল, দ্যাখনা আজই রহমানকে বলে দেব, তোমার বাবাকে যেন চিঠি লিখে দেয়। তিনি যেন তোমাকে এখান থেকে নিয়ে যান। তারপর ছোড়দি যেমন গাছপালার মধ্যে অদৃশ্য হয়ে যায়, আজও তেমনি হারিয়ে গেল।

    খাটিয়ায় ফিরে কেমন হতাশায় ভেঙে পড়লাম। ছোড়দিকে কিছুতেই খুশি করা যাচ্ছে না। এই রোদ, এই বৃষ্টি। এমন দুরন্ত পৃথিবী নিয়ে কে আর কত দূর যেতে পারে? কী যে অপরাধ আমার বুঝি না!

    কিছু ভাল লাগছিল না। ক্রমে রাত বাড়ছে। চারপাশে আলো। গুরুদোয়ারাতে ভজন হচ্ছে। তেমনি নীল আকাশ, নক্ষত্র সব ফুটে আছে। সেই নক্ষত্র থেকে বার বার সংকেত ভেসে আসছে। বিলু, আমি তোমার জন্য বড় হচ্ছি। গ্রাম মাঠ শস্যক্ষেত্র আমার দু’হাতের মুদ্রায় নাচানাচি করে। ফুল ফোটে। শস্য জন্মায়। নদীর পাড়ে আমরা হেঁটে যাই। কোন দূরবর্তী উপত্যকায় আমি ছুটি। তুমি আছ বলেই আমি আছি। আমি ছুটি, আমি বাঁচি।

    ছোড়দিকে একদিন বলেই ফেললাম, আমার টাকা না হলে চলছে না, কিছু টাকা জমলেই চলে যাব। কলেজে ভর্তি হব। প্লিজ বাবাকে তোমরা চিঠি লিখতে যেও না।

    ছোড়দির চোখে জল। ছোড়দি বাবাকে আসতে লিখতে পারে, নাও লিখতে পারে—কিন্তু আমার যে সংকেত আসছে দূরবর্তী নক্ষত্র থেকে বড় হও, বড় হও। আমি কাকে নিয়ে বড় হব? সে আমার কে? কি সংকেত তার আমার জন্য? কেন চোখে জল? কে যেন আশ্চর্য ইশারায় বলে গেল, বিলু, তোমার মধ্যে এক ভয়ঙ্কর ভালবাসা দাপাদাপি করে বেড়াচ্ছে। তার টানে তুমি ভেসে পড়েছ। সে তোমাকে ঠিক কোথাও পৌঁছে দেবে। কোন গভীর অরণ্যে অথবা ফুলের উপত্যকায়

    এভাবে অনাবৃত আকাশের নীচে আমি আবার কখন ঘুমিয়ে পড়েছি। স্বপ্ন দেখছি, ছোড়দি আমার শিয়রে চুপচাপ বসে আছে।

  • ষোল

    ষোল

    আমি বাড়ি ফিরে আসায় পিলু ধড়ে যেন প্রাণ ফিরে পেয়েছে। পিলুর সব ছিল, গাছপালা, শস্যক্ষেত্র, বনজঙ্গল, খোঁড়া গরু—সব। কেবল দাদা নেই। দাদা ফেরার। সে নিজে কত জায়গায় দাদাকে খুঁজতে গেছে। নিবারণ দাসের আড়তে গিয়ে বলেছে, দাদা আমার কোথায় চলে গেছে! রেলগাড়ি চড়ে দাদা চলে গেছে। রেলগাড়ি কতদূর যায়। সকাল বিকেল সে স্টেশনে গিয়ে বসে থাকত, দাদাটা যদি ফেরে। বাবা বলতেন, মতিচ্ছন্ন। মতিচ্ছন্ন না হলে এমন হয় না।

    বাবার সম্বল ছিল তখন গ্রহগুরু। সকাল হলেই গ্রহগুরুর দরজায় হাজির হয়ে ডাকতেন, ও সুবল, কিছু টের পেলে?

    গ্রহগুরু বলত, ভালই আছে কর্তা। ভাববেন না। সব গ্রহের ফের। ফিরে আসবে।

    বাবা বলতেন, এমন একটা ভাল কাজ মানু ঠিক করে দিল, ক’জনের হয়! মানুর বন্ধু এই করে বাড়ি গাড়ি সব করেছে। তোর যে হত না কে বলবে। তুই একটু ধৈর্য ধরে কাজটা শিখতে পারলি না। চিরকুটে লিখে রেখে গেছে,—আমি যাচ্ছি, ভাববেন না। বড় হয়ে ফিরব।

    বাড়ি ফেরার আমার খুব একটা মুখ ছিল না। কত দিন বাড়ি ছাড়া-মা নাকি একদিন ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদেছিল। আর বাবাকে দোষারোপ করছিল। আমি যা ছিলাম তাই আছি। বড় হয়ে ফিরব এই চিরকুটটি বাবা পুঁটলিতে ঠিক যত্ন করে বোধহয় রেখে দিয়েছেন। আসলে আমার মুখ নেই। বাবাই খবর পেয়ে আমাকে গিয়ে নিয়ে এসেছেন। আমার বড় হওয়াটা কী, বাড়ি ফিরে নিজেও বুঝতে পারছিলাম না।

    দু-তিনদিন পিলু আমার সঙ্গ ছাড়ল না। আমি যেখানে পিলু সেখানে। কী জানি, আবার যদি দাদা ফেরার হয়! দাদাটি তার বড় হয়ে কেমন জানি হয়ে যাচ্ছে। মা-বাবার জন্য টান নেই। ভাই- বোনের জন্য ভাবে না। মায়া তো বাড়ি ফিরে এলে রাস্তায় দৌড়ে গিয়েছিল। তারপর জড়িয়ে ধরে ভ্যাক করে কেঁদে দিয়েছিল। –দাদা তোর সঙ্গে আর আমরা কথা বলব না। কোনদিন কথা বলব না। তারপর দৌড়। –মা, বাবা দাদাকে ধরে এনেছে। প্রায় চোরের মতো দেখছি সব। পলাতককে দেখার জন্য কলোনির ধীরেনের মা, গোপালের পিসি, সুবোধ, পল্টু যেখানে যে ছিল ছুটে এসেছিল।

    —কোথা থেকে ধরে আনলেন? কত রকমের প্রশ্ন। তখন পিলুই আমার ত্রাণকর্তা। সে ডাকল, দাদা, এদিকে আয়। বলে সে আমাকে বাড়ির পেছনটাতে নিয়ে গেল। —খোঁড়া গরুটার বাচ্চা হয়েছে- আয়, দেখবি।

    বাড়ি থেকে ফেরার হবার পর কী ঘটেছিল পিলুই সব এক এক করে বলল। দু-তিনদিন শুধু এই। একটা কথা মনে হয় আর বলে, – বুঝলি দাদা, সেই লোকটা রেগোবিন্দ না কী নাম, সকালে মানুকাকার কাছে হাজির। বলল, মানুকর্তা, আপনার ভাইপো কুড়ি টাকা চুরি করে পালিয়েছে।

    —বলল!

    —কী মিছে কথা, বল। তুই কখনও চুরি করতে পারিস? আমি বড় হলে লোকটার মুখ ঘুষি মেরে ভেঙে দেব। কী সাহস, আমার দাদার নামে মিছে কথা! আমি বললাম, না, মিছে কথা বলেনি রে! গোবিন্দর কৌটো থেকে কুড়ি টাকা নিয়েছি।

    —সত্যি নিয়েছিস?

    —তা না হলে ট্রেনে চড়ে যাব কী করে।

    পিলু কেমন গুম মেরে গেল। এতদিন যে বিশ্বাস দাদার উপর ছিল তা যেন নিমেষে উবে গেল। খুব কষ্ট হচ্ছে পিলুর। সান্ত্বনার স্বরে বললাম, গোবিন্দদার কৌটোয় আর একটা চিরকুটে লিখে গেছি।

    —কী লিখে গেছিস?

    —টাকা মান যশ হলে সব দিয়ে দেব।

    পিলুর পায়ে বোধহয় একটা পিঁপড়ে কামড়ে ছিল, সেটা সে ঝেড়ে ফেলে বলল, মানুকাকাকে তো বলেনি সে-কথা। জানিস দাদা, তুই কাউকে বলিস না, একদিন বিকেলে আমি না গেছি। রেললাইন পার হয়ে গেছি। লোকটাকে আমি চিনে রেখেছি। বড় হই, তারপর মজা দেখাব।

    পিলু কি জানে, গোবিন্দ আমাকে মারধোর করত? বাবার কত বড় বাসনা ছিল, আমি একজন মোটর মেকানিক হই। একটা গ্যারেজে মানুকাকা ঢুকিয়ে দিয়েছিল। কমপারমেনটাল পরীক্ষায় পাস করলে এর চেয়ে বড় সুযোগ আর নাকি মিলবে না। বাবাকে মানুকাকা এমন বোঝাবার পরই গ্যারেজের কাজটা বাবার কাছে হাতে পাওয়া স্বর্গ ছিল। সেসব ছেড়ে ফেরার হওয়ায় বাবা নাকি খুব মনোকষ্টে ভুগছিলেন।

    —মা, জানিস, খুব ক্ষেপে যেত। একেবারে রণচণ্ডী। কি মানুষ রে বাবা, ছেলেটা কোথায় ফেরার হল কোনো খোঁজখবর করছে না কেউ!

    বাবা বলতেন, গেছে যখন ফিরে আসবে। কার জন্য তবে গাছপালা লাগিয়েছি, বাড়িঘর করেছি। ছেলে বোঝে না—কার জন্য!

    —আর ফিরেছে!—বলেই মা’র কান্না।

    —আরে ফিরবে। দেখো না দু-চারদিন! না খেতে পেলেই সুড়সুড় করে ফিরে আসবে।

    —তুমি আমাকে জ্বালিও না।

    সেই বাবা নাকি তিন-চারদিন পর নিজেই সকালে উঠে গ্রহগুরুর কাছে গেছিলেন। এ-দেশে আসার পর বাবার অনেক নতুন বিষয়ের উপর বিশ্বাস বেড়ে গিয়েছিল। যেমন তাঁর গ্রহগুরু। তিনিই ভূত ভবিষ্যৎ ও বর্তমান। গ্রহগুরুর কাছ থেকে খবর নিয়ে এসে মাকে জানালেন, খুব বেশি দুরে যায়নি। কাছে পিঠে কোথাও আছে। মতিচ্ছন্নভাব কাটলেই চলে আসবে। ওটা এ বয়সে হয়। একটু গৃহহারা হবার শখ জাগে। তারপর নাকানিচুবানি —সংসার নিত্য হাঁ-করা জিভ, সব গিলে খেতে চায়। যখন বুঝতে পারবে সুড়সুড় করে বাছাধন ফিরে আসবে। তারপরই বাবা গাছের সবচেয়ে পুষ্ট আতা, পেঁপে এবং একথালা চাল ডাল গ্রহগুরুর সেবার জন্য পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। বাবার বিশ্বাস, গ্রহগুরু সন্তুষ্ট থাকলে সংসারে কোনো অমঙ্গল ঢুকতে পারে না। তাঁর পুত্র যেখানেই অবস্থান করুক কোনো অমঙ্গলের ভয় নেই।

    মা আমার জেদি এবং একরোখা। দেশ ছেড়ে আসার পর ওটা আরও বেড়েছে। বাবার প্রতি তাঁর বিশ্বাস কম্। সবকিছুতে অদৃষ্টবাদী যে মানুষ তাঁকে মা বিশ্বাস করেন কী করে। সেই বাবার ছেলে আমি। বাপের স্বভাব ছেলে পাবে, মার এটা জানাই ছিল। বাবার অবিচল গ্রহভক্তিতে মার মেজাজ নাকি খুবই তিরিক্ষি ছিল। কথায় কথায় কান্না জুড়ে দিত। রাতে ঘুমাত না। গাছের একটা পাতা খসে পড়লেও উঠে বসত। পিলু জানাল, বাবা ঘুমালে মা আর সহ্য করতে পারত না। যার ছেলে নিখোঁজ সে এভাবে নিদ্রা যেতে পারে! তুমি কি মানুষ না। দেখ পিলু, কে বলবে তোর দাদা বাড়ি নেই। কে বলবে দেখে, আমাদের সময় খারাপ। কেমন নিশ্চিন্তে হাঁ করে ঘুমাচ্ছে। চেঁচামেচিতে রাতে বাবার ঘুম ভেঙে গেলে বলতেন, ঘুমাও ধনবৌ। মন শান্ত কর। শরীর নষ্ট করে লাভ নেই। তেনার ইচ্ছের উপর আমাদের হাত নেই। শুধু লড়ালড়ি সার। বলে বাবা আবার শুয়ে পড়তেন এবং কুম্ভকর্ণের মতো নিদ্রায় মগ্ন হতেন। বাবার নিস্পৃহতা যখন চরম বোধ হত, মা আহার বন্ধ করে দিতেন। এটাই ছিল বাবার প্রতি মার মোক্ষম ওষুধ প্রয়োগের বিধি। বাবা খুব বিড়ম্বনাবোধ করতেন। খোঁজাখুঁজি শুরু হতো। মানুকাকার কাছে ছোটাছুটি, গ্যারেজে ছোটাছুটি, চিরকুটটি আমার হস্তাক্ষরে লিখিত কিনা, না গুমখুন, এসব নিয়ে বাবার দুশ্চিন্তা দেখা দিলে, ঠাকুরঘরে ঢুকে যেতেন। যখন একান্ত অসহায় তখন দেশ থেকে আনা শালগ্রামশিলা ভরসা। পুজোর ঘরে বসে রোজ একশ একটা তুলসীপাতা শালগ্রামশিলার মাথায়। মা’র তাতেও ভরসা কম। বিপদনাশিনী ব্রত প্রতি বৃহস্পতিবার শুরু করে দিল। এই করতে করতে বাবার কাছে এক চিঠি হাজির। আপনাদের বিলু রহমানের কাছে আছে। ঠিকানা সমেত চিঠি পেতেই বাবা দুর্গানাম সম্বল করে সোজা সেই শহরে।

    ফিরে আসার পর পিলু কলোনির সর্বত্র খবর দিয়ে এসেছে, দাদা ফিরেছে।

    দাদা আমার কত বড় হবে, দেখিস। একা একা বর্ধমান পার হয়ে চলে গেছে। দাদা এম এ বি এ পাস করবে। আমার বাবাটা না দাদাকে ড্রাইভার বানাতে চায়। আচ্ছা, বাবা যে কী না! মানুকাকা- যে কী না। এক বিষয়ে ফেল করলে কী হয়? বাবা তো বলেছে, কিছু হয় না। সেই বাবাটাই মানুকাকার বুদ্ধিতে দাদাকে গ্যারেজে ঢুকিয়ে দিল। আমরা গরিব বলে মানসম্ভ্রম নেই। দেশবাড়িতে থাকলে মানুকাকা এমন বলতে সাহস পেত! দাদা চলে গিয়ে বেশ করেছে। এখন বোঝো!

    এক বিকেলে আমরা সবাই বারান্দায় বসেছিলাম। অঝোরে বর্ষণ শুরু হয়েছে। ব্যাঙ ডাকছে। মাঠঘাট জলে ভেসে গেছে। অঘ্রাণের মাঝামাঝি খুব বর্ষা হলে যা হয়। এখানে আসার পর এবারেই প্রথম বাবার লাগানো গাছে কাঁঠাল ধরেছে। আম গাছগুলিতে মুকুল দেখে গিয়েছিলাম। কিছু আমও হয়েছে। বাড়ি ফিরে আসব আসব করে মা কটা আম রেখেছিল, কিন্তু শেষে পচে যায় দেখে আমার জন্য আমসত্ত্ব বানিয়ে রেখেছে। আঝোরে বর্ষণ হলে আমার খুব ভালো লাগে। সব গাছপালা বাড়ির চারপাশে সজীব। মা রান্নাঘরে কাঁঠাল বীচি ভাজছে। গরম গরম কাঁঠাল বীচি ভাজা অঝোর বর্ষণের দৃশ্য দেখতে দেখতে খাওয়ার কী যে মজা! পিলু খোঁড়া গরুটাকে নিয়ে আসছে। দু’জনেই ভিজে গেছে। দূর থেকেই বললে, দাদা, কী খাচ্ছিস রে!

    বললাম, কাঁঠাল বীচি ভাজা।

    —মা, আমি খাব।

    মা বলল, কটা তো ছিল। সব তো সাবাড় করেছিস। মা যে গোপনে কাঁঠাল বীচি ও আমসত্ত্ব আমার জন্য তুলে রেখে দিয়েছে, পিলু জানত না। পিলু অন্য সময় হলে মারদাঙ্গা শুরু করে দিত, কিন্তু আমি ফিরে এসেছি এই পুণ্যফলে সে কিছু আর বলল না! বারান্দায় উঠে গামছা দিয়ে গা মুছতে মুছতে পিলু বলল, দাদা, আমাকে একটা দিবি?

    আমি বললাম, সবার জন্যই করেছে!

    মায়া কোঁচড় থেকে তুলে বলল, নে না।

    পিলু কিন্তু নিল না।

    আমি বললাম, নে, আমার কাছ থেকে।

    পিলু বলল, না, খা। আমাকে মা দেবে।

    মা বলল, খুব যে ভালো ছেলে রে! সইবে তো! বলেই মা একটা বাটিতে বীচি ভাজা এনে পিলুকে দিল। বাবার দিকে তাকিয়ে বলল, কী গো, খাবে? খাও না দুটো! বিলুর জন্য তুলে রেখেছিলাম।

    আমাদের বারান্দাটা টালির। বেশ লম্বা বারান্দা। আগে খুব ছোট ছিল। পা ছড়িয়ে বসা যেত না। বাবার কাছে শুভাশুভ জানতে সব যজমানরা আসে। তাদের বসার জন্যই বারান্দাটা করা হয়েছে। এবং বড় বলে, আমাদের পোষা কুকুরটাও ভিজতে ভিজতে উঠে এল। ছোট ভাইটা হাঁটতে শুরু করেছে। ঝড়বৃষ্টিতে বড় ভয় পায়। মেঘ ডাকলে ভয় পায়। সে বাবার কোলে ভালো মানুষটি হয়ে বসে আছে। আমাদের সংসারে এই আমরা ক’জন। সামনের জমিতে বাবা কিছুটা জায়গায় পাট, লাগিয়েছিলেন। সেগুলো কবেই কাটা হয়ে গেছে। নারকেল গাছের মাথায় বসে একটা কাক ভিজছিল। ছাতা মাথায় রাস্তায় লোকজন দেখা যাচ্ছে। পরে খালের মতো একটা সরু ফালি বাদশাহী সড়কের দিকে গেছে। জল উপচে পড়লে কই, শিঙি, মাগুর, বড় পুঁটি, ট্যাংরা বৃষ্টির জলে ভেসে আসবে। বৃষ্টিটা আরো হোক, আরও জোরে, মেঘের দিকে তাকিয়ে পিলু এমনই বোধ হয় ভাবছে। লেখাপড়া করা ছাড়া পিলুর সব কাজেই ভারি উৎসাহ। কত খবর সে রাখে। কোন মাছ কখন ডিম পাড়ে, কোন মাছ বর্ষা হলে রঙবেরঙের হয়ে যায় সে ছাড়া এ খবর আমাদের আর কেউ রাখে না। সেই পিলু বীচি ভাজা খেতে খেতে বলল, দাদা, যাবি? মাছ উঠবে!

    মা বলল, সেবারের কথা মনে নেই? তোমাদের আক্কেল বড় কম।

    —কী হয়েছে। পিলু তেতে উঠল।

    বাবা খুব উদাস গলায় বললেন, ধনবৌ, রাখে কৃষ্ণ মারে কে।

    মা খুব তপ্ত হয়ে উঠল—হয়েছে ধর্মের কথা আর শুনিও না। ঐ করে তো গেলে!

    কী যে গেল বাবা বুঝল না। কপর্দকশূন্য মানুষের এখন যা হোক বাড়িঘর হয়েছে, ছেলেপুলে বড় হচ্ছে, বিলুটাকে নিয়ে সমস্যা দেখা দিয়েছে, মানুকেও খবর দেওয়া হয়েছে, শ্রীমান ফিরে এসেছেন। নিয়ে আসা হল, এখন কিছু একটা করতে হয়। শ্রীমানের বড় ইচ্ছা কলেজে পড়ে। এই পড়া নিয়ে একটা গণ্ডগোল বাধবে বোঝাই যাচ্ছিল। মানুকাকার জবাব, পড়াবেন কী করে! খাওয়াতে পারেন না, ছেলেরা বোঝে না? এখন সংসারে কী করে দুটো পয়সা আসবে না দেখলে চলবে কেন? বাবার কাছে মানুকাকার কথাই শেষ কথা। কিন্তু এবারে মানুকাকার পরামর্শমতো কাজ করবেন কিনা, সেই নিয়ে তাঁর কিছু বোধ হয় সংশয় জন্মেছে। মানু তো বলেই খালাস, হয়তো চেনাজানা কোনো কাপড়ের দোকানে লাগিয়ে দেবে। সে তো জানে না তার ধনবৌদিটি কী বস্তু!

    আমি বাড়ি ফেরার পরই মা বাবাকে শাসিয়ে রেখেছিল, ছেলে যা চায় তাই কর। পড়তে চায়। ভর্তি হবার টাকা ছেলে তোমার রোজগার করে এনেছে। বাধা দিলে অনর্থ ঘটবে।

    তা সত্যি, রহমানদা ফেরার সময় বাবাকে লেছে, এই নিন, কটা টাকা দিলাম। বাবা এখানে আসার পর একসঙ্গে এত টাকা কখনও হাতে পাননি। শিষ্যরা পাঁচ দশ টাকা বেশি হলে দেয়। ঠাকুরের নাম করে পাঠায়। কলোনিতে নিত্যপূজা আছে নিবারণ দাসের ঘরে। কিছু জমি এবং যজমান এই ভরসা বাবার। পড়াবার জন্য বাড়তি টাকা হাতে কমই আসে। বাবার সাহসে কুলোচ্ছিল না। কিন্তু মা এবং পিলু ও মায়া চায় তাদের দাদা কলেজে পড়ুক। এতে সংসারের ইজ্জত বাড়ে, বাবাটা কেন যে বোঝে না! মা তো সবাইকে বলে বেড়িয়েছে, ছেলে আমার কলেজে পড়বে। বাবা বুঝতে পারেন, মানুষের বাড়ি-ঘর হয়ে যাবার পর একটা নীল লণ্ঠনের দরকার। সেটা ধনবৌ এখন জ্বালতে চায়। সলতে পাকানো আছে। শুধু জ্বেলে দেওয়া বাকি।

    বাবা বললেন, মানুকে বলে দেখি, দু-একটা টিউশন ঠিক করে দিতে পারে কিনা।

    অনেকদিন পর আবার মনে হলো, মানুষটার বিষয়-আশয়ে ভক্তি বেড়েছে। সুবুদ্ধি গজিয়েছে মাথায় প্রবল বর্ষণে বাবার কথা শোনা যাচ্ছিল না। টিনের চালে ঝমঝম বৃষ্টির শব্দ। গরুটা ডাকছে। আমাদের কাঁঠাল বীচি খাওয়া শেষ। সন্ধ্যে হয়ে আসছে। মা ঘরে ঢুকে হারিকেন জ্বালাল। দুদিকে দুটো বড় বাঁশের মাচান। বাবার অনেকদিন থেকে শখ একটা তক্তপোশ করাবেন। উত্তরের দিকের জমিতে বড় একটা শিশুগাছ আছে। ওটা কেটে বানালে শুধু মজুরির খরচা। আমি যদি দুটো টিউশন করি, বাড়তি পয়সা আসবে সংসারে। মারও মনঃপুত হয়েছে কথাটা। কবে যাওয়া হবে এই নিয়ে কথা হতেই বারান্দায় হারিকেন রেখে মা বলল, কালই যাও। ঠাকুরপোকে বলো, তার তো শহরে চেনাজানা মানুষজন আছে। ওকে বললে ঠিক করে দিতে পারবে।

    রাতে পিলু ঘুমাচ্ছিল না। কেবল এ-পাশ ওপাশ করছিল। এটা হয়। রাতে আমাকে কিছু বলতে চাইলেই তার এটা হয়। কিন্তু আমি যদি ঘুমিয়ে পড়ি, ডাকলে ঘুম ভেঙে যাবে, ঘুম ভাঙলে আমার ভারি রাগ হয় সেটা সে জানে। বুঝতে পারছিলাম, আমি সাড়া না দিলে সে কিছু বলবে না। বললাম, কীরে ঘুম আসছে না।

    পিলু খুব সতর্ক গলায় বলল, দাদা তুই সত্যি কলেজে পড়বি? তুই টাকা রোজগার করেছিস?

    আমি যে টাকা রোজগার করে এনেছি, পিলু জানে না। রহমানদার সামান্য কাজকর্ম করেছি। ট্রাক নিয়ে কয়লা খনিতে গেছি। ওজন মিলিয়ে কয়লা চালকলে সাপ্লাই করেছি এবং রহমানদার খুব বিশ্বাসভাজন লোক হয়ে গেছিলাম, সে তা জানে না। আমার ইচ্ছে ছিল, টাকা জমলে বাড়ি ফিরে আসব। কিন্তু রহমানদা আমাকে আশ্রয় দেওয়ায় কী দেবে-থোবে জিজ্ঞেস করতে পারিনি। আসার সময় যে সে এতগুলি টাকা বাবাকে দেবে তাও বিশ্বাস হয়নি। টাকা কটা আসার সময় বাবার কাছেই ছিল। বাড়ি ফিরে বাবা টাকা কটা আমার হাতে দিয়ে বলেছিলেন, মার হাতে দাও। প্রথম উপার্জনের টাকা মার হাতেই দিতে হয়। হাতে দেওয়ার পর মাকে প্রণাম করবে। পৃথিবীতে আজীবন তিনিই তোমার সবচেয়ে অধিক মঙ্গলাকাঙক্ষী।

    .

    আমাদের বাড়ি থেকে শহরটা বেশি দূর নয়। ক্রোশ দুই লাগে যেতে। পুলিস ক্যাম্পের ভিতর দিয়ে একটা রাস্তা বাদশাহী সড়কে উঠে গেছে। বিরাট এলাকা নিয়ে ট্রেনিং ক্যাম্প। দেশছাড়া মানুষ যারা, বনজঙ্গল কেটে ঘর বানাচ্ছে যারা, তাদের পক্ষে ক্যাম্পটা বড় কাজে লাগে। সুমার মাঠ ক্যাম্পের মধ্যে। সবুজ ঘাসপাতা—গরু-বাছুর সব ছাড়া থাকে সেখানে। ক্যাম্পের সব হাবিলদার সুবাদার থেকে সি ডি আই পিলুর অনুগত। ফলে গোটা এলাকাটাই যেন তার নিজস্ব জায়গা। অন্যের গরুবাছুর চরে বেড়াচ্ছে কে খবর রাখে। কেবল পিলু সব খবর রাখে। তাকে মাঠে দেখলে মনে হবে, সে এত বড় বিশাল ক্যাম্পের তত্ত্বাবধায়ক। ক্যাম্পের ভিতর দিয়ে বাদশাহী সড়কে উঠতে আমাদের কম সময় লাগত। এমনিতে সাধারণের যাওয়া নিষিদ্ধ। পিলু আমাদের গাড়াটার পাসপোর্ট। বন্দুক উঁচিয়ে যে যখন সেনট্রি দেয়, পিলুর নাম বললেই হল, পিলুদের পাড়ার লোক আমরা।

    সেই পিলু এখন বাড়ি-ছাড়া হচ্ছে না। দাদা কলেজে পড়বে, এটা ঠিক হয়ে যাওয়ার পর সে আরও অহংকারী হয়ে উঠল। তার দলবলের সংখ্যা বেড়েছে। সেখানে এখন তার একটাই গল্প। দাদা কীভাবে ট্রেনে চড়ে কলকাতায় গেছে। কলকাতা কত বড় শহর। রেলগাড়ি চড়ে যেতে হয়। চেকার টিকিট চায়। টিকিট না থাকলে তোমাকে ট্রেনে উঠতে দেওয়া হবে না। রেলগাড়ি চড়ে পিলু যখন এদেশে আসে, তখন তার সব ভালো মনে ছিল না। দাদার কাছ থেকে আবার জেনে নিচ্ছে সব। বাবার কাছে রানাঘাটের গল্প শুনেছে। দাদার কাছে কলকাতার। আর একটা শহর বর্ধমান পার হয়ে। এখন এই তিনটি শহর সম্পর্কে সে প্রায় অভিধান, এমন একটা ভাব নিয়ে আছে দলবলের কাছে। ট্রামগাড়ি দেখতে কেমন লম্বা স্কুলবাড়ির মতো। শিয়ালদা ইস্টিশনে রেলগাড়ি বিরাট একটা বাড়ির মধ্যে ঢুকে যায়। টিকিট না কেটে ট্রেনে উঠলে জেল।

    পিলুর যে কত প্রশ্ন থাকে। পিলু যে ভাবে কথা বের করে নিচ্ছে, কখন না জানি ফস করে ছোড়দির কথা বলে দিই। সেই লম্বা ফ্রক গায় দেয়া মেয়েটা, সুন্দর মুখ, সবসময় বাড়িতে জুতো পরে থাকে। সবসময় পরীর মতো বাগানে ঘুরে বেড়াত। রহমানদাকে নাম ধরে ডাকত। একসময় ছোড়দির বাবার গাড়ি রহমানদা চালাত। একটা এত্ত বড় কুকুর ছিল ছোড়দির সঙ্গী। তেমন একটা পরীর মতো মেয়ে আমার খুব বন্ধু হয়ে গেছিল। বাবা নিয়ে আসার পর আমার এখন একটাই কষ্ট। সকাল হলে আর ছোড়দিকে দেখতে পাই না। কী যে থাকে মনে। ছোড়দির কথা মনে হলেই কেমন একটা রূপকথার রাজত্ব চোখে দেখতে পাই। ছোড়দি গাড়িতে উঠছে। পায়ে সাদা কেডস, সাদা মোজা, ফ্রক, নীল বেল্ট, মাথায় নীল চুল। বিকেলে সাইকেল চালাচ্ছে বাড়ির লনে। আমাকে পিছনে নিয়ে সাইকেল চালাচ্ছে। ছোড়দি যা বলত, তাই করতাম। একদিন ছোড়দি সাইকেলটা হাতে দিয়ে বলল, বিলু ধর। আসছি—ছোড়দি সেই যে গেল, আর এল না। পাঁচিলের পাশে সাইকেল নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে রহমানদা বলেছিল, কীরে, ছোড়দির সাইকেল নিয়ে কী করছিস! পরে ব্যাপারটা বুঝতে পেরে বলেছিল, ছোড়দি ভুলেই গেছে। সাইকেলটা দিয়ে আয় বাড়িতে। ছোড়দি এমন স্বভাবেরই ছিল। সে-ই বাবাকে চিঠি লিখেছিল, বিলুকে নিয়ে যান। বিলু আমাদের এখানে আছে। ছোড়দির প্রতি আমার এজন্য একটা অভিমানও আছে। কিন্তু কেন জানি পিলুকে সব কথা বললেও ছোড়দির কোনো গল্প তাকে করতে পারিনি। কোথায় যেন এই প্রথম কিছু গোপন করতে শিখে গেছি।

    পুলিস ক্যাম্প পার হলেই বাদশাহী সড়ক। দু’পাশে আম জামের গাছ। কোথাও বড় বড় রেনট্রি। সোজা জেলা বোর্ডের অফিসের পাশ দিয়ে রেললাইনে উঠেছে। একটা জেলখানা, তারপর সাহেবদের কবরভূমি। শেষে সরকারি খামার ডাইনে ফেলে রাস্তাটা শহরে ঢুকে গেছে। যেতে আসতে আমার এই রাস্তাটার প্রতি একটা মায়া পড়ে গেছিল। পৃথিবীতে এমন সুন্দর রাস্তা আর কোথাও বোধ হয় নেই। দু’পাশে দিগন্তবিস্তৃত ধানখেত এবং মাঝে মাঝে আকাশের প্রান্ত দিয়ে পাখিদের উড়ে যাওয়া আমাকে মুগ্ধ করত। ছোড়দির কথা মনে এলে রাস্তাটায় একা একা হেঁটে বেড়াতাম। ইট সুরকির তৈরি রাস্তা। বৈশাখের ঝড়ে কখনও সেই লাল ধুলো আমাদের বাড়ি পর্যন্ত উড়ে আসত। বাবা এখানটায় বাড়ি করার পর সব কিছুর সঙ্গে কী করে যেন একাত্ম হয়ে উঠছি। আমার মা, বাড়ির গাছপালা, খোঁড়া গরু, শালগ্রামশিলা, পিলুকে নিয়ে শীতকাল পর্যন্ত একরকম কাটল। বাবা একদিন শহর থেকে ফিরে এসে বললেন, হয়ে গেল।

    বাবার এমনই স্বভাব। বাড়ি এসে বারান্দায় বসলেন। মায়া পাখা দিয়ে হাওয়া করছে। কি হয়ে গেল কিছু বলছেন না। বাড়িতে দু’জন অতিথি আছেন সপ্তাখানেক ধরে। দেশ থেকে বাবা খবর দিয়ে আনিয়েছেন। এখনও সময় আছে, চলে এসো। জমিজমা কিনে এদেশে ঘরবাড়ি করে ফেল। মা এতে মনে মনে সাংঘাতিক চটে থাকে। নিজেরই খাবার নেই, শংকরাকে ডাকে। —মার এই রকম ক্ষুরধার বাক্যে বাবা কিঞ্চিৎ ঘাবড়ে গেলেও দমে যান না।

    বাবার কথা, মানুষের দুঃসময় যাচ্ছে ধনবৌ—খোঁটা দিয়ে কথা বল না। চলে তো যাচ্ছে। কোনদিন না খেয়ে আছ বল!

    এসব কথাবার্তা অতিথিরা বাড়িতে না থাকলে বলতেন। এরাই নয়—বাবা যেখানেই যান, সবাইকে বলে আসেন, আসবেন, ঘরবাড়ি কেমন করলাম দেখে যাবেন। দেশের মানুষের সঙ্গে দেখা হলেই এই কথা। লোকজন, আত্মীয় কুটুম বাড়ি না এলে ঘরবাড়ি কার জন্য। বাবা নিজে খেতে ভালোবাসতেন, আত্মীয় কুটুমের বাড়ি বেড়াতে ভালোবাসতেন। খাওয়াতে ভালোবাসতেন। বাড়িঘর হয়ে যাওয়ার পরই দেশের আত্মীয় কুটুম চেনাজানা লোকের কাছে চিঠি। ও-দেশে আর থাকতে পারবে না। বৃথা আশা। দেশটা আবার এক হয়ে যাবে ভেব না। থাকার তো অভাব হবে না। আমি যখন আছি

    মা’র কাছে এই ‘আমি যখন আছি’ খুবই বিরক্তিকর। ছেলেটাকে যার পড়াবার মুরদ নেই, তার আবার এসব লেখা কেন। বাবার চিঠির বিশ্বাসেই দেশ থেকে দুই চৌধুরী এখন এখানে এসে উঠেছেন। রোজই রাজবাড়ি যেতে হচ্ছে। জমির বিলি বন্দোবস্ত দেখতে। বাবা প্রথম দু’দিন গেছিলেন সঙ্গে। উপেন আমিনের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিয়েছেন। এখন ওরা নিজেরাই যায়। আমাদের বাড়ির পেছনটাতে কিছু ডোবা জঙ্গল আমবাগান আছে। তাই আপাতত কিনে রাখা। বাবা যে ভালো আছেন, সচ্ছল পরিবার বাবার, এসব বোঝানোর জন্য বেশ ভালো মাছ-টাছ বাজার থেকে আসছে। একটা আস্ত ইলিশ পর্যন্ত। যে দামই হোক বাবার যেন অর্থের কমতি নেই—ফিরে গিয়ে কেউ না বলে বাবা আমার ভারি কষ্টে আছেন।

    বাবা মনে করেন সংসারের অভিভাবক হিসাবে এটা তাঁর বড়ই কৃতিত্ব। বিলুটা কলেজে পড়বে— এই খবর দিতে নিবারণ দাসের আড়তে ছাতা বগলে চলে গেছেন কদিন। নতুন বাজার বসেছে সেখানে চেনাজানা লোকের সঙ্গে দেখা হয়ে যায়। –কি কত্তা ছেলের খোঁজ পেলেন?

    —পাব না কেন! ও তো আর বাড়ি ছাড়া হয়নি। মতিচ্ছন্ন হয়েছিল। আবার সব ঠিক হয়ে গেছে। ফিরে এসেছে। কলেজে পড়তে চায়। যখন চাইছে পড়ুক। আমার একভাবে চলে যাবে। আসলে বাবার এতসব কথা বাড়িঘর করার মতোই। ছেলে আমার আর একটা পাস দেবে। এখানে যারা বাড়িঘর করেছে, কেউ কলেজের মুখ দেখার সুযোগ পায়নি, কেবল তার ছেলে বিলু কলেজে পড়ে। এই একটা বড় খবরে বাবা কিছুদিন মশগুল থাকলেন। যজমান বাড়ি গেলেও আমি জানি একথা সে কথায় তিনি তাঁর পুত্রের কথা টেনে আনবেন। এবং এমন যখন চলছিল তখনই সেদিন শহর থেকে ফিরে এসে বাবা বারান্দায় বসতে না বসতেই জানালেন, হয়ে গেল। হয়ে গেল কথাটার কত রকম মানে হতে পারে বাবা যদি বুঝতে পারতেন। মা কুমড়ো ফুলের বড়া করছিল, খুন্তির শব্দে ঠিক শুনতে পায়নি। কেবল বলল, কি বললে?

    —হয়ে গেল।

    মা এবার সবটা শোনার জন্য কড়াই নামিয়ে বারান্দায় উঠে এল। –কি হয়ে গেল!

    —বিলুর পড়ার ব্যবস্থা। সামনের ছুটির পরই ভর্তি হবে। কি যেন বলল, মানু, তবে হয়ে যাবে। কোনো চিন্তার কারণ নেই। সব ক্লাস ভর্তি হয়ে গেলেও মানু যখন আছে, বিলুর জন্য আটকাবে না। মা বোধ হয় বাবার সব কথা বুঝতে পারছিল না। আমাকে ডেকে আনল। কাছে গেলে বলল, তোর বাবা দেখ কি বলছে। আটকাবে না বলছে।

    বাবা বলল, আগে এক গেলাস জল দাও, খাই। বাবা জলটা খেয়ে পিলুকে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন গরুটা নেড়ে দিয়েছে কিনা, না এক খোঁটাতেই আছে। বাবা তাঁর দ্বিতীয় পুত্রটিকে সব সময় সংশয়ের চোখে দেখেন। সে সহজেই কাজ না করেও বলে দিতে পারে, হ্যাঁ দিয়েছি। এই তো দিয়ে এলাম। বাবা বাড়ি না থাকলে দ্বিতীয় পুত্রটি একটু বেশি স্বাধীনতা ভোগ করে থাকে। এতে সংসারের অনিষ্ট হলেও প্রতিবেশীরা পিলুর সুখ্যাতি করতে ছাড়ে না। সে তার বাবার কাজের প্রতি বড়ই অমনোযোগী। বাবা আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, দেখে আয় নেড়ে দিল কি না।

    গরুবাছুর আমি নাড়ানাড়ি করি পিলুর পছন্দ নয়। দাদার আভিজাত্য নষ্ট হবে ভাবে। দাদা কলেজে পড়বে, সেই দাদা মাঠে গরুবাছুর টানাটানি করুক সে চায় না। সে বাবাকে আশ্বস্ত করে বলল, যাচ্ছি। তোমার যে বাবা-আর কি যেন বলার ছিল বলতে পারল না। মুগুরটা কাঁধে ফেলে চলে গেল। যাবার সময় বাবা হেঁকে বললেন, শোনো, পুকুরে এখন নেমো না। যদি নামো দু’ডুব দিয়ে উঠে আসবে। যদি দেখি দেরি হচ্ছে ভালো হবে না।

    এটা অবশ্য পিলুর হয়। গরমকালটায় সে পুকুর পাড়ে গেলেই কিছুক্ষণ পুকুরে সাঁতরে নেয়।

    কখনও সখনও গামছায় ছেঁকে কুচো চিংড়ি ধরে আনে। আর কিছু না পারুক, ঘাসপাতা পেলে তাও জড় করে নিয়ে আসবে। বাইরে গেলে ফেরার সময় তার হাতে কিছু থাকবেই। পিলু খালি হাতে বাড়ি ঢুকতে শেখে নি। মা’র তর সইছিল না। এমনই স্বভাব মানুষটার। সবটা না বলে অস্বস্তির মধ্যে রাখা। মা একটু রুখে উঠল, কি বলছিলে বিলুকে বল।

    —বলছি বলছি। বলে কাপড়ের খুঁট দিয়ে মুখের ঘাম মুছলেন। মানু তো বলল, আই এস সি না কি বলে ওটা হবে না। এফ এ-টাও হবে না। আই কম-টা হবে। নতুন খুলেছে। কিছু সিট খালি আছে।

    আমার অবস্থা যা হয়। কলেজে পড়া নিয়ে কথা। ছোড়দিও আমাকে বলে দিয়েছে, পড়াটা ছেড় না বিলু। আমি বুঝি আমাকে বড় হতে হলে পড়তে হবে। বড় হওয়ার সঙ্গে কলেজে পড়াটার এমন একটা নিগূঢ় সম্পর্ক আছে আগে যদি বুঝতাম। মাকে বুঝিয়ে বললাম, কমার্স নিয়ে পড়ব।

    বাবা যা বললেন, তার মধ্যে এফ এ-টা বুঝেছে। মা’র এক মামা এফ এ পাস ছিল। স্বদেশী করত। মানুষজন তাকে ভক্তিশ্রদ্ধা করত। তার মতো ছেলে হবে ভাবতেই মা’র গর্ব বোধ হত। কিন্তু সেটা হচ্ছে না শুনে খুব দমে গেল। আর জেদি এক রোখা হলে যা হয়, বলল, বিলুকে এফ এ পড়তে হবে। ও সব আইকোম টোম চলবে না। ওতে কিছু হয় না।

    বাবা নিরাশ গলায় বললেন, বোঝো।

    —বোঝার কি আছে। সারাজীবন বুঝিয়ে তো এই হাড়মাসে এনেছ।

    এ-দেশে আসার পর দুশ্চিন্তা দুর্ভাবনায় মা’র শরীরটা বেশ ভেঙে গেছে। বাবা আমার কেমন অতলে ডুবে যাচ্ছিলেন। কি করে বোঝান, বিষয়টা একই। লাইন আলাদা। বাবা অগত্যা পার পাবার জন্য বললেন, মানু তো বলল, আজকাল আর এফ এ পড়ে লাভ নেই।

    –রাখ তোমার মানু। উই তো ডোবাল। কে বলেছিল একটা গ্যারেজে ঢুকিয়ে দিতে। জলে পড়ে গেছি বলে, আমরা বুঝি আর মানুষ না।

    বাবা অগত্যা বললেন, তালে মানুকে বলতে হবে বিলু এফ এ পড়বে। তার ব্যবস্থা কর।

    —তাই বলগে।

    মা এইটুকু বলে নিষ্ক্রান্ত হলেন। বাবার অবস্থা এখন খুবই বিপজ্জনক। মানুকাকাকে চটাতে পারেন না। মাকেও না। আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, কি করবি?

    তখনই আবার আমার মা রান্নাঘর থেকে বারান্দায় হাজির, টিউশনির কথা কিছু বললে না?

    বাবা খুব ক্ষিপ্ত। বোঝে না সোঝে না—কেবল ত, বাবা বললেন, জানি না! মা আরও এক ধাপ ক্ষেপে গেল। —ঠিক আছে, নিবারণ দাসকে বলছি। সেতো মরে যায় নি।

    নিবারণ দাস বাবার অবস্থাপন্ন যজমান। বাবা না থাকলে বিপদে আপদে সে আমাদের দেখে থাকে। বাবা নিবারণ দাসকে শেষ সম্বল মনে করেন। কোথাও কিছু না হলে সেতো আছেই। তাকে এ- নিয়ে জ্বালাতন করা বাবার বোধহয় পছন্দ নয়। অগত্যা বললেন, বলেছি। সব বলেছি। ঠিকও হয়েছে। কালীবাড়িতে বিলু থাকবে। ওখানকার সেবাইত নাকি একজন মাস্টার খুঁজছে। বিলুকে দিয়ে হয়ে যাবে মানু বলল। বাবার এই আশ্বাসে মানুকাকার উপর মা’র আবার আস্থা ফিরে এল। একেবারে শান্তশিষ্ট বালিকা তখন মা আমার। খুব অল্পতেই মা’র বিশ্বাস নষ্ট হয়ে যায় আবার খুব অল্পতেই মা’র আস্থা চলে আসে। যাবার সময় শুধু বলল, তোমরা যা ভালো বোঝো কর। বিলু আবার যেন ফেরার না হয়। বড় চাপা স্বভাবের।

    বুঝতে পারছিলাম মা তার পছন্দ-অপছন্দের চেয়ে আমার পছন্দ অপছন্দ নিয়ে বেশি ভাবছিল। মাকে বললাম, কর্মার্স পড়লে সহজেই চাকরি পাওয়া যায়। আমার ওটাই পড়ার ইচ্ছে!

    সুতরাং পুজোর পর বাবা আমার যাত্রার আয়োজন করলেন। খুব দূর নয়। আমাদের বাড়ির পেছনটাতে বড় একটা পুরনো ইটের ভাটা আছে। ওখানে নবমী থাকে। পিলু আমাকে নিয়ে সেখানে দু-একবার গেছেও! আমি ফেরার হলে পিলু নবমীকে বলে এসেছিল, দাদাটা যে কোথায় চলে গেল! পিলুকে মনমরা দেখে নবমী বলেছিল, আপনার দাদা একজন গুণীমানী মানুষ হবে গ দাঠাকুর। তার কি কলোনি ভালো লাগে। বড় হলেই চলে আসবে। সেই থেকে পিলু নাকি স্বপ্ন দেখত, দাদা রোজই সকাল বিকেল একটা গাড়িতে বাড়ি আসছে। পিলুর জন্য নতুন প্যান্ট, মার জন্য শাড়ি, আর এক হাঁড়ি রসগোল্লা। পিলু রসগোল্লার কাঙাল। স্বপ্নে সে কতদিন নাকি দাদার হাত থেকে নিয়ে রসগোল্লা খেয়েছে।

    আমি বাড়ি ফিরলেও পিলু নবমীকে গিয়ে খবর দিয়ে এসেছে। দাদাকে বাবা গিয়ে নিয়ে এসেছেন। ছোড়দির চিঠি পেয়ে বাবা যে আমাকে আনতে রওনা হয়েছে, সে খবরও দিয়েছিল। পিলুর সব সুখ- দুঃখের খবর নবমী বুড়িকে দেওয়া চাই। তার যত কাজ থাক, যত ফলপাকুড় সংগ্রহের বাতিক থাক, নবমীকে সব খবর না দিয়ে থাকতে পারে না। সেই নবমী বুড়ির বনটা পার হলে, কারবালা। তারপর একটা ইট সুরকির রাস্তা এবং পরে কাশের বন—রেল লাইন। রেললাইন পার হলেই সেই কালীবাড়ি। পিলু শুনে বলল, ওতো খুব কাছেরে দাদা। আমি রোজ এক দৌড়ে যাব, এক দৌড়ে আসব। পিলু বোধহয় ভেবেছে বাড়ি ছেড়ে আমার থাকতে কষ্ট হবে। দাদা ঘাবড়ে না যায়। সে দাদাকে সাহস দিচ্ছে।

    বাবা সকাল থেকেই আমার যাবার আয়োজনে ব্যস্ত। পঞ্জিকায় শুভ দিন দেখে যাওয়া হবে। যাবার আগে বাবার পুজো-আর্চার সময় বেড়ে গেল। বিগ্রহ খুশি থাকলে সব ঠিক থাকবে। আগে তাঁকে খুশি করা দরকার। নীল অপরাজিতা তুলে এনেছেন—নেংড়ি বিবির হাতা থেকে পদ্মফুল তুলে এনেছেন, একশ একটা। খোঁড়া গরুটার দুধের সবটাই পায়েস হয়েছে। মা সকাল সকাল রান্নাঘরের কাজ সেরে ঠাকুরঘরে ঢুকে গেছে। বাবা এক হাতে পুজোর আয়োজন করতে দেরি করে ফেলবেন—কারণ সব সময়ই বাবার ধারণা পুজোর কোনো ত্রুটি থাকলে বাড়িঘরে অমঙ্গল ঢুকবে। কিনা অঘটন ঘটে। কাজেই সব দিক বজায় রাখতে হলে মা টের পায়, তারও হাত লাগানো দরকার। মায়া আজ পিলুকে আমাকে সকালের খাবার দিল। দুপুরের খাবার মা পুজোর ঘর থেকে বের হয়ে দেবে। স্নান করে গরদের শাড়ি পরে পায়েস রান্না, তারপর ঠাকুরঘরে মা চন্দন বেটে আতপ চাল ধুয়ে তিল তুলসী হরিতকী সাজিয়ে এবং ধূপ দীপ জ্বেলে যখন বুঝল বাবা খুব প্রসন্ন তখনই বের হয়ে এল। আমাকে বলল, চান করে ঠাকুরঘরে গিয়ে বস।

    পুজোর সময় বাবা কেমন নির্বিকল্প মানুষ হয়ে যান। পুত্র-কলত্র সব তাঁর কাছে তখন অর্থহীন। ধ্যানে মগ্ন থাকেন আর আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে ঘণ্টা বাজান। তুলসীপাতা একের পর এক চাপান বিগ্রহের মাথায়। বাবার ধারণা বিগ্রহের সেবা ঠিকঠাক হচ্ছে বলেই আমরা সব বেঁচে বর্তে আছি। আমি যে ফিরে এসেছি, সেও বিগ্রহের অসীম কৃপায়। বোঝাই যায় বাবা কেমন এক মহাবিশ্বের খবর পেয়ে যান এই ধ্যানমগ্ন অবস্থায়। মানুষের জন্মমৃত্যু, বেঁচে থাকা সবই অপার রহস্যময়। যেন সব কিছুর অস্তিত্বের মূলে তিনি।

    বাবার পুজো শেষ হলো বেলা করে। একসঙ্গে আমরা খেলাম। খেতে বসে বাবা বললেন, বিলু তোমার নতুন জীবন শুরু। মনে রেখ পৃথিবীতে কেউ তোমার পর নয়। বাবা সংস্কৃত শ্লোক উচ্চারণ করলেন—তার অর্থ বোঝালেন। তুমি একা এ বিশ্বসংসারে। আবার তুমিই এই বিশ্বসংসার। তুমি নিজেও একজন ঈশ্বর। সবই তাঁর লীলা তোমার মধ্যে।

    বাবা খুব বিচলিত হয়ে পড়লে এমন সাধুবাক্য সব আমাদের বলেন। আমার কষ্ট হচ্ছিল, কারণ যত কাছেই হোক— অন্যের বাড়ি—তারা কেমন হবে জানি না, তাছাড়া পিলুকে ছেড়ে থাকতে আমার কেন জানি কষ্ট হয়। সেই শহরটাতেই হয়েছিল, কিন্তু ছোড়দি অনেকটা জায়গা জুড়ে ছিল–অত খারাপ লাগে নি। পিলুকে বললাম, যাস কিন্তু!

    যাবার সময় দেখলাম মা আড়ালে দাঁড়িয়ে আছে। বাবা বললেন, এখন মন খারাপ করতে নেই।

    মা’র মন খারাপ। এটা কি মা টের পায় আমি তার কাছ থেকে দূরে সরে যাচ্ছি। খুব বেশি দূর না। কালই হয়তো সকালে চলে আসব হাঁটতে হাঁটতে। কিন্তু মা কি আমার সেই গোপন রহস্যের খবর জেনে গেছে। মা কি জানতে পেরেছে বিলুর পৃথিবীতে আর কেউ ঢুকে যাচ্ছে। সাদা জ্যোৎস্নায় সে কোন এক পরী কে জানে।

    বেলা থাকতেই রওনা দিলাম। বাবা পিছনের বনজঙ্গল পর্যন্ত আমাদের সঙ্গে হেঁটে এলেন। পিলুর হাতে আমার জামাকাপড়ের পুঁটলি। ওতে আছে দুটো প্যান্ট, গোটা তিনেক হাফ শার্ট। একটা বাবার পুজো-পার্বণে পাওয়া কোরা অল্পদামের ধুতি। বাবার ধারণা একজন মানুষের পক্ষে এর চেয়ে বেশি পোশাক-আশাক নিষ্প্রয়োজন। বাড়িতে খালি গা, খালি পা এবং হাফ প্যান্ট পরনে—কারণ বাবার কাছে আমি এখনও খুব ছোট আছি। আমারও মনে হয় এই যথেষ্ট। কেবল ছোড়দি আমাকে বুঝিয়েছে, খালি গায়ে থাকিস না। অসভ্যতা। ছোড়দির ভয়ে সবসময় গায়ে জামা রাখতে ভারি কষ্ট হতো। এখন এসব দেখার কেউ নেই। কিন্তু যেখানে যাচ্ছি, সেখানে আবার যদি কোনো ছোড়দির উদয় হয় তবেই হয়েছে। পায়ে জুতো পর্যন্ত আছে! শার্ট গুঁজে পরতে শিখেছি। পিলুর কাছে আমি এখন একজন বাবু মানুষ। বাবু মানুষের হাতে গামছার পুঁটুলি শোভা পায় না। সে সেজন্য আমার সঙ্গে যাচ্ছে। তার হাতেই সব। পরনে তার ইজের। মা যত্ন করে দু-জায়গায় তালি মেরে দিয়েছে। সেই পরে একটা মারকিন কাপড়ের জামা গায় সে আমার সঙ্গে লাফিয়ে লাফিয়ে হাঁটছে। সে ওটা কালীবাড়িতে রেখে আবার দৌড়ে ফিরে আসবে। দাদার জায়গাটাও ভালো করে ঘুরে ফিরে দেখে আসবে। তার দাদা মাস্টার—ছাত্র পড়াবে। কেমন বয়সের ছেলে বোধহয় সেও দেখার বাসনা। যেতে যেতে কত গল্প তার। কিছুদূর এসেই পিছনে তাকিয়ে দেখলাম গাছপালার আড়ালে আমাদের বাড়িটা অদৃশ্য হয়ে গেছে। আমরা নবমীর বনটায় ঢুকে গেছি।

    —দাদারে?

    দাঁড়ালাম। —কিছু বলবি।

    —নবমীর সঙ্গে দেখা করবি না?

    —দেরি হয়ে যাবে। তোকে আবার ফিরতে হবে। অবশ্য বললাম না, বনজঙ্গলে সাপখোপের উপদ্রব থাকে। পিলুর অবশ্য বেজায় সাহস। এ ব্যাপারে সে বাবার স্বভাব পেয়েছে। রাতবিরেতে বাবা কখনও আলো নিয়ে বের হন না। বাবার কথা—তুমি অনিষ্ট না করলে তিনি তোমার অনিষ্ট করবেন কেন। তিনি বলতে মা মনসা। মনসার বাহন মাত্রেই দেবতা। তাঁকে সংশয়ের চোখে দেখলে সেও সংশয়ের চোখে দেখবে। সংসারে এমনই নাকি নিয়ম। পিলু এ বিষয়ে বাবার কিছুটা স্বভাব পেলেও সবটা পায়নি। সে সাপের খোঁজ পেলে তেড়ে যাবেই। বাবা কতবার সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, পিলু ওটা করিস না। বনজঙ্গলে থাকি। জলে থেকে কুমীরের সঙ্গে লড়াই ঠিক না। তুই কবে যে তেনার কোপে পড়ে যাবি।

    নবমীর সঙ্গে দেখা না করে যাব ভাবতেই পিলু বোধহয় রুষ্ট হলো। সে আর একটাও কথা বলছে না! পুঁটুলিটা বইতেও কষ্ট যেন।

    অ্যাঁ, নিজে বাবুর মতো যাবে। আমি নিতে পারব না। বলেই পুঁটুলিটা মাটিতে ফেলে দিল। পিলু আমার চেয়ে বেশ ছোট। তবু মনে হয় বিষয়বুদ্ধিতে সে আমার চেয়ে প্রবল। আমার আলাদা একটা সম্ভ্রমবোধ গড়ে উঠেছে সেও যেন পিলুর জন্য। সেই এমন ভাব করে যে আমি আলাদা জাতের। দাদার সুখ্যাতির জন্য সে বড় কাঙাল। নিজে যা পারছে না, দাদার মধ্যে সেটা দেখতে পেলে সে খুশি হয়। সেই দাদার পুঁটুলিটা এখন মাটিতে গড়াগড়ি খাচ্ছে। পিলু কি নবমীর সঙ্গে দেখা করা না করার মধ্যে কোনো মঙ্গল-অমঙ্গলের আভাস দেখতে পায়। নবমীর সঙ্গে দেখা না করলে দাদাটার কি না জানি অনিষ্ট হবে—এমন সংস্কারে তাকে পেয়ে বসতে পারে। পাশ দিয়ে যাচ্ছ, একটু ভিতরে ঢুকে দেখা করে যাওয়া এমনকি কষ্টের। আর কতটুকুনই বা দেরি হবে। বললাম, সেই ভালো পিলু। নবমীর সঙ্গে দেখা করেই যাব।

    পিলুর মুখে আশ্চর্য সরল মধুর হাসি। এমন উজ্জ্বল চোখ মুখ যে নিমেষে সে ভুলে গেল দাদাটার উপর তার অভিমান হয়েছিল। পুঁটুলিটা তুলে ঝেড়েঝুড়ে আবার বগলে নিল। শেষে একটা কচুবন পার হয়ে যেমন অন্যবার ডাকে, এবারেও ডাকল, আমি দাঠাকুর, নবমী। নবমী টের পায় সেই সরল বালক, তার জন্য কোনো খবর বয়ে এনেছে। পৃথিবীতে নবমীর কাছে খবর পৌঁছে দেবার কেউ নেই। সে বনের ফল-পাকুড় খেয়ে থাকে, কচু-ঘেচু সিদ্ধ করে খায়। আর আছে একটা ছাগল আর তার দুধ। বনটা পুরো পার হয়ে যাবার ক্ষমতা সে কবেই হারিয়েছে। পিলুই একমাত্র তার ডাকপিয়ন। বনটার বাইরে কি হচ্ছে না হচ্ছে সব খবর দেয়। বন কেটে যারা ঘরবাড়ি বানাচ্ছে তাদেরও।

    বুঝতে পারি, নবমী এক্ষুনি সাড়া দেবে। ঠিক জবাব এল, একটু দাঁড়াওগো দাঠাকুর। এই ফাঁকে সে পিলুর দেওয়া বাবার পুজো-পার্বণে পাওয়া খোঁট পরে নেবে। বনের ভিতরে কে আর দেখে। লজ্জা নিবারণের দায় তার থাকে না। গাছপালার মধ্যে অবিরাম যে কথাবার্তা চলে তার মধ্যে লজ্জা নিবারণের কথা থাকে না। সে পিলুর ডাকে সাড়া দেয়। ছাগলটা ব্যা ব্যা করে ডাকে মানুষের, সাড়া পেয়ে। ছাগলটার যে বাচ্চাটা নবমী বুড়ি পিলুকে দিয়েছিল, পিলুর অত্যধিক যত্ন এবং পর্যাপ্ত আহারে পেট ফেঁপে মরে গেছে। নবমী বলেছে, বাচ্চা হলে আবার তাকে একটা দেবে।

    নবমীকে সহসা দেখলে এখন সত্যি ডাইনী বুড়ির মতো মনে হয়। চেহারাটা হাড় জিরজিরে আরও কঙ্কালসার। দাঁত দু’পাশে দুটো বের হয়ে আছে। আলগা মতো দাঁত দুটো কথা বলতে গেলে নড়ে। চোখ কোটরাগত। নাক বাজপাখির মতো লম্বা। ত্যানাকানি পরে সে যখন বনের ভিতর থেকে লাঠি ঠুকতে ঠুকতে বের হয়ে এল তখন পিলুর কি আনন্দ! পিলু বোধহয় ভাবে, একদিন নবমী বুড়ি আর তার ডাকে সাড়া দেবে না। মরে যাবে। যেতে আসতে একবার খোঁজ নিয়ে যায়, সে শুধু বুড়ি বেঁচে আছে কি না। বুড়ির খোঁজ-খবর নেয়। কি খায় জিজ্ঞেস করে। সেই নবমী কাছে এলে পিলু বলল, আমার দাদা। চিনতে পারছ।

    —ও মা, কি মানুষগো। আমি কি কালা না হাবা চিনতে পারব না। তারপরেই লম্বা হয়ে গেল। গড় হলে আমার ভারি লজ্জা করে। পিলুকে এখন সাক্ষাৎ দেবতা ভেবে থাকে। সেই যেন কখন আসে, এমন এক অপেক্ষা তার। কে জানে, এভাবেই কোন শবরীর প্রতীক্ষা ছিল কি না সেকালে। নবমী আর পিলুকে দেখে আমার কেন জানি চোখে রামায়ণের সেই সুন্দর কাহিনীটি ভেসে ওঠে।

    পিলু বলল, দাদা আমার মাস্টার হয়েছে!

    —মাস্টার!

    —হ্যাঁগো, দাদা ছাত্র পড়াবে। কালীবাড়ি চেন? আমরা সেখানে যাচ্ছি। দাদাকে পৌঁছে দিয়ে আবার ফিরব।

    —তবে আর দেরি করবেন না গো দাঠাকুর। ফিরতে ফিরতে সাঁজ লেগে যাবে। ভয় পেলে বুলবেন, বন-বাদাড়ে কতকিছু থাকে, এরা আমাকে চেনে আমার কথা বুলবেন—নবমী বুড়ির দাঠাকুর আমি। কেউ ছুঁতে সাহস পাবে না।

    নবমীর কাছ থেকে এভাবেই বুঝি পিলু ভয় জয় করার সাহসের মন্ত্র পায়। সে বলল, আমার দাদার গায়ে হাত বুলিয়ে দাও। আমায় যে দিয়েছিলে।

    আমার গাটা ভয়ে কেমন শিরশির করছিল। পিলুর যে কতরকমের বিশ্বাস গড়ে উঠেছে। লাঠি ঠুকে ঠুকে নবমী আমার দিকে এগিয়ে আসছে। আমি পালাব কিনা ভাবছি। পিলু বুঝতে পেরে বলল, ভয় পাস না দাদা। নবমী বলেছে, আমি ওর মতো পরমায়ু পাব! এখন দাদারও এমন হয় সে চায়। ততক্ষণে নবমী আমার গায়ে হাত বুলিয়ে দিল। বলল, আমার মতো পেরমায়ু পানগো দাঠকুর। আমার কেশের মতো।

    দেশ ছাড়া হয়ে আমরা কত অসহায় পিলুর আচরণ দেখলেই টের পাওয়া যায়। এদেশে এসে হেজেমজে না যাই তার জন্য পুিল সব দিকে খেয়াল রেখে চলে। নবমীকে দেখলে পুণ্য হয়, আয়ু বাড়ে, পিলুর ধারণা। বাবার সম্বল, শালগ্রাম শিলা। মা’র বিপদনাশিনী ব্রত। এত সব আছে বলেই কেন জানি মনে হলো আমরা ঠিক বেঁচে থাকব। পিলুর এখন আর কোনো ভয় নেই। দাদাকে বনবাসে দিয়ে এলেও না। সে বরং আমাকে গার্জিয়ানের মতো শেখাচ্ছে।

    –দাদারে!

    –কী!

    আমরা হাঁটছি আর কথা বলছি। ইঁটের ভাটা পার হলে সেই কারবালা। ডান দিকে মাইলখানেক জুড়ে মাঠ, মুসলমানদের সারি সারি কবরখানা, মিনার, বাঁধানো শান, রুপোলি চাঁদ তারা আঁকা। আর উপরে বিশাল সব বৃক্ষ। মিনারে কত স্মৃতিকথা লেখা। পড়া যায় না। উর্দু ভাষায় লেখা। সোজা গরুর গাড়ি চলার মতো। একটা পথ, উঁচু নিচু ঝোপঝাড়।

    পিলু দু-লাফে আমার আগে এসে গেল—বলল দাদারে!

    —কী বলবি তো!

    –পেট ভরে খাবি।

    —খাব না কেন।

    —তুই ঠিক লজ্জায় পেট ভরে খাবি না।

    —হ্যাঁ বলেছে।

    —ঠিক জানি। আমরা কাঙাল হয়ে গেছি

    –কাঙাল হব কেন?

    —মা যে বলে তোমাদের রাক্ষুসে ক্ষুধা, কার ক্ষমতা নিবারণ করে।

    পিলু ঠিকই বলেছে। ছোড়দির ওখানে এর জন্য আমার ভোগান্তি গেছে। পিলু কষ্ট পাবে বলে তাকে গল্পটা বলিনি। পাইস হোটেল বলে অবশ্য সেখানে আমার খেতে কোনো লজ্জা ছিল না। পয়সা দিয়ে খাব—যত খুশি খাব। যত খুশি খেতে গিয়েই ঝামেলাটা হয়েছিল। কিন্তু যদি কালীবাড়িতে ছোড়দির মতো কেউ থাকে, মুখ তুলে খেতেই পারব না। পিশু কি করে যে টের পায়!

    —কি রে খাবি তো?

    —হ্যাঁ হ্যাঁ খাব।

    —আমার কি, না খেলে নিজেই কষ্ট পাবি। বড় হলে কেউ সঙ্গে থাকে না। নিজেরটা নিজেই দেখে নিতে হয়।

    —হয়েছে, আর পাকা পাকা কথা বলতে হবে না।

    রেল লাইনে উঠে বলল, জানিস দাদা, এখানে একটা লোক কাটা পড়েছিল।

    –কবে?

    –সেই যে মেলা গেল। মেলাতে লোকটা এসেছিল কালীথানে পুজো দিতে। পিলু কেমন ভয়ে কাঁটা হয়ে আছে। ভয় ভিতরে ঢুকে গেলে পিলুর চোখ খুব ভ্যাবলা হয়ে যায়। সে গুছিয়ে তখন কথা বলতে পারে না।

    —কি করে কাটা পড়ল। কথা বলছিস না কেন। এসে তো গেলাম।

    দূর থেকে কালীবাড়ির বিশাল নিমগাছটা দেখা যাচ্ছে। রেল লাইনের গুমটি ঘর পার হলেই দেখা যায়। ওকে বললাম, তুই আর যাবি? পিলু কিছুক্ষণ কি ভাবল। আমার উপর বিশ্বাস কম। বলল, তুই যেতে পারবি।

    —খুব পারব। তুই যা। নালে বাড়ি ফিরতে সন্ধ্যা হয়ে যাবে।

    আবার ডাকে, দাদারে!

    —বল।

    — তুই কিন্তু রেল-লাইন পার হোস না।

    —কেন?

    —কখন গাড়ি এসে ঘাড়ের উপর পড়বে।

    এতক্ষণে বুঝতে পারলাম পিলুর ভয়টা কোথায়। কালীবাড়ির সীমানা ঘেঁষে রেল লাইন চলে গেছে। পিলুর ধারণা রেল লাইনটা ভাল না। কালীবাড়ির কাছটায় ফি বছর কেউ না কেউ কাটা যায়। কেউ এখানে আত্মহত্যা করতে চলে আসে। জায়গাটার কোনো অশুভ প্রভাব আছে। কেউ বলে মা কালীর ভোগে গেছে। তার দাদাটাকে কাজে অকাজে রেল লাইন পার হতেই হবে। যা অন্যমনস্ক। যদি কিছু হয়ে যায়। সেই ভয়ে কেমন ভ্যাবলু বনে গেল পিলু।

    —আমি ঠিক দেখে পার হব। ভাবিস না।

    পিলুর এইভাবে কতরকমের যে ভয় তার দাদাটাকে নিয়ে। সে নিমগাছটার কাছে এসে বলল, আমি যাই।

    কিন্তু আশ্চর্য কালীবাড়ির সামনের রাস্তাটায় কেউ নেই। সেবাইত কোন দিকটায় থাকে জানি না। পকেটে মানুকাকার দেওয়া একখানা চিঠি সম্বল। লম্বা পাঁচিলের মতো মন্দির চলে গেছে। কিছু কাক হাহাকার করে ডাকছে অশ্বত্থ গাছের মাথায়। দুটো বড় পেল্লাই দরজা। দুটোই বন্ধ। মন্দিরের বাঁ দিকে এক ফালি একটা দরজা চোখে পড়ল। দুটো লোক মন্দিরটার দক্ষিণের মাঠে ঘাস কাটছে। একটা রিকশ ক্রিং ক্রিং করে বেল বাজিয়ে এল আবার নিমেষে উধাও হয়ে গেল। পিলু তার দাদাকে এভাবে একা ফেলে যেতে ভরসা পেল না। এ যেন দাদাকে একটা রাস্তায় ছেড়ে দিয়ে যাওয়া হবে। সে খুব সাহসী হয়ে যায়।

    আমি খুব সন্তর্পণে এগোচ্ছি। গাছপালার ফাঁকে বিকেলের রোদ নেমে যাচ্ছে। বিরাট এলাকা জুড়ে এই মন্দির। শনি-মঙ্গলবারে মানত দিতে লোকজন আসে। আমরাও দু-একবার ওইসব দিনে ঘুরে গেছি। ঢাক বাজছে ঢোল বাজছে। বলির পাঁঠার আর্তনাদ আর মন্দিরের ভিতর কেউ জোরে জোরে মন্ত্রপাঠ করছে। লোকজনে ভরে থাকে। মাথায় কপালে পাঁঠার রক্ত। বৌ-ঝিরা নানারকম মানতে ব্যস্ত। সারি সারি রিকশ, গাড়ি লেগে থাকে। আজ সে সবের কিছু নেই। কেমন খাঁ-খাঁ করছে। মন্দির থেকে কাউকে বের হতে দেখা গেল না। মহামারীতে সব শেষ হয়ে গেলে যেমন জনশূন্য হয়ে যায় গাঁ-গঞ্জ আমার আর পিলুর কাছে এখন জায়গাটা সে রকমের

    পিলু তবু এগিয়ে যাচ্ছে। সে ইঁটের রাস্তাটা পার হয়ে মন্দিরের রোয়াকে উঠে গেল। তারপর ফালি দরজাটা ঠেলতেই দেখল—সামনে বড় কোঠাঘর—তক্তপোশে তিনচারজন ছেলে বুড়ো শুয়ে। আসলে সবাই দিবানিদ্রা যাচ্ছে। সে সন্তর্পণে নেমে এসে বলল, দাদা সবাই ঘুমোচ্ছেরে। এ কেমন জায়গারে! বেলা পড়ে এল, তবু ঘুমোচ্ছে। তারপর বলল, ডাকব!

    আমার কেমন অস্বস্তি হচ্ছিল। পরের বাড়ি। আমি এদের আশ্রিত হয়ে থাকব। আমার এ অসময়ে কতটা ডাকার দাবি আছে সে নিয়ে যখন ভাবচি, তখনই মন্দিরের দরজা খোলার শব্দ পাওয়া গেল। বিরাট পেল্লাই দরজা ঠেলে ঠেলে কেউ খুলে দিচ্ছে। আমারই বয়সী একটি মেয়ে। ডুরে শাড়ি পরনে। মাথায় ঘোমটা। পিলু ছুটে গিয়ে বলল, আমার দাদা, এখানে থাকবে। ভিতরে খবর দাও না। বালিকাটি কিছু বুঝতে পারল না। সে ঘড়া করে জল এনে ঢেলে দিচ্ছে মন্দিরের চাতালে। উঁকি দিয়ে দেখলাম, কেউ যেন মন্দিরের ভিতর গেরুয়া নেংটি পরে শুয়ে আছে। মানুষ না বলে কঙ্কালই বলা ভালো। আমাদের কথাবার্তায় কারো ঘুমের ব্যাঘাত ঘটতে পারে ভেবে বালিকাটি সদর দরজার বাইরে বের হয়ে বলল, কাকে খুঁজছ

    আমি বলতে যাচ্ছিলাম, কিন্তু পিলু বাধা দিয়ে সামনে এগিয়ে গেল। বলল, আমার দাদা। মাস্টার। পকেটে চিঠি আছে। দেখানারে দাদা।

    বালিকাটি হঠাৎ ফিক করে হেসে দিল, অমা! আমাদের নতুন মাস্টার দরজায় দাঁড়িয়ে আছে গো। আসেন, আসেন। তা অত ছোট কেন? ভিতরে আসেন। আপনার সকালে আসার কথা ছিল না? বলেই সে ভিতরে দৌড়ে খবর দিতে গেল। কোন দিক দিয়ে যায় লক্ষ্য করছি। চাতালের পাশে মন্দিরের মিনা করা থাম। মেয়েটি থামের আড়ালে হারিয়ে গেল। তারপরই ফের হাজির। — অমা, দাঁড়িয়ে রইলেন কেন গো? আমার সঙ্গে আসেন।

    –এটা কে?

    —আমার ভাই।

    —আপনিও আসেন।

    পিলু বলল, দাদাকে দিয়ে গেলাম। আমি যাব না। বাড়ি ফিরতে হবে। দাদাকে দেখে রাখবে কিন্তু। বলেই দৌড়।

    মেয়েটি এবারেও হাসল। বলল, আমরা খেয়ে ফেলব না। আপনার দাদাটি আস্তই থাকবে।

    বুঝতে পারছি বয়েস কম হলেও অনেক অভিজ্ঞতার ছাপ মেয়েটির মুখে। জানি না, এ বাড়ির সে কে হয়। এতটুকুন মেয়ের ঘোমটা কেন। চোখ ডাগর। মুখে আশ্চর্য সজীবতা। শরীরে বড় বেশি লাবণ্য। পিলুর চেয়েও বেশী পাকা, পাকা কথা। চাতাল পার হয়ে যাবার সময় বলছিল, ভয়ে কুঁকড়ে আছেন গো দেখছি। দিন পুঁটুলিটা হাতে দিন। বলেই আমার দিকে ভারি চোখে তাকাল। এমন চোখ এবং চোখে টান আমি জীবনেও দেখিনি। যেতে যেতে আমার শরীর কাঁটা দিয়ে উঠল। পুঁটুলিটা সে যেন জোর করেই হাত থেকে কেড়ে নিল।

    এভাবে আমার পৃথিবী ক্রমেই বড় হয়ে যেতে থাকল। এখানে এসে টের পেলাম, ধর্মস্থানে খাবারের অভাব হয় না। দেশ ছেড়ে আসার পর এই প্রথম পর্যাপ্ত আহারের মুখ দেখলাম। সেবাইত মানুষটি যে এ অঞ্চলের একজন মানী ব্যক্তি, দু-একদিনেই তা টের পাওয়া গেল। জেলা কংগ্রেসের প্রভাবশালী ব্যক্তি। মানুকাকাও কংগ্রেসের হয়ে জেল খেটেছে—সেই সুবাদে আলাপ এবং ঘনিষ্ঠতা। ফলে আমার আরও দু-চারজন আশ্রিতের মতো এখানটায় জায়গা হয়ে গেল। তবু প্রথমটায় দু-দিন খুবই আড়ষ্ট ছিলাম। বাইরের ঘরে চুপচাপ বসে থাকতাম। স্নানের সময় হলে সেই ঘোমটা দেওয়া বালিকাটি আসত। বলত, চান করে নিন। খাবেন না? জড়ভরত হয়ে থাকেন কেন?

    মেয়েটা এত চোপা করে কেন বুঝি না। এখানে বোধহয় সবাই হৈচৈ করে থাকতে ভালবাসে। বাড়ির হালচাল বুঝতে সময় লাগে, এই কথাটা কি করে যে মেয়েটাকে বোঝাই। ওর নামও জেনে গেছি। সবাই লক্ষ্মী বলে ডাকে। ভিতরে গেছি—দেখেছি পাকশালার দরজায় কলসি কাঁখে দাঁড়িয়ে আছে। একবারও ওকে কাঁখে কলসি ছাড়া দেখিনি। এর কি শুধু এই কাজ। আর মাঝে মাঝে ইদানীং আর ও একটা কাজ পেয়েছে, সেটা বোধহয় আমার দেখাশুনা করা।

    চিঠিটা দেখার পরই সেবাইত মানুষটি বলেছিল, থাকতে পারবে তো! বাড়ির জন্য মন কেমন করবে না তো?

    মাথা হেঁট করে দাঁড়িয়েছিলাম।

    —যখন যা দরকার বলবে। কোনো সংকোচ করবে না। নিজের বাড়ি মনে করবে। যে যার মতো এখানে থাকে খায়। এটা এজমালি সংসার। লক্ষ্মীকে ডেকে বলল, ওর ঘরটা দেখিয়ে দে। হাত-পা ধুয়ে নাও। চা খাও তো? চা না খাও মুড়ি সন্দেশ, যেটা ভালো লাগে বলবে! তারপরই ডেকেছিল, শুনছ—মাথায় বেশ ঘোমটা দিয়ে যিনি এলেন তাঁর দিকে তাকিয়ে বললেন, মাস্টারদার ভাইপো। দেশ থেকে সবাই এরা চলে এসেছে। তোমাদের নতুন মাস্টার। খেয়াল রেখ। এত ছেলেমানুষ বুঝতে পারিনি। এখান থেকেই কলেজে পড়বে। নটু পটুকে পড়াবে। পছন্দ কিনা দেখ।

    আমি বাড়িতে থাকব শুনেই তিনি মাথার ঘোমটা কিছুটা টেনে কপালের উপর তুলে নিলেন। নিজের লোক—ঘোমটা দেওয়া ঠিক না। – ছেলে দুটো ভারি দুষ্টু। পড়তে চায় না। তোমার নাম কি?

    — বিলু।

    —আমি কিন্তু বিলু বলেই ডাকব।

    সেবাইত বললেন, তোমার বৌদি। যা কিছু দরকার এর কাছে চাইবে! কোনো সংকোচ করবে না।

    আমার বৌদিটির রূপের বর্ণনা দিলাম না। কারণ এমন কিছু সৌন্দর্য থাকে যার বর্ণনা দেওয়া যায় না। এতে বৌদিকে আমার খাটোই করা হবে। দীর্ঘাঙ্গী। পরনে লাল পেড়ে শাড়ি। হাতে দুটো সাদা শাঁখা। খুব লক্ষ্য না করলে শাঁখা এবং হাতের রঙ পার্থক্য করা যায় না। বৌদি লক্ষ্মীকে ডেকে বলল, নটু পটুকে ডেকে দে। ওদের মাস্টারমশাই এয়েছেন। প্রণাম করে যেতে বল। লক্ষ্মী বলেছিল, তোমার ছেলেরা ঘুমাচ্ছে।

    —ঘুমাচ্ছে, তুলে দে।

    ভাবতে পারছি না, কার্তিকের বেলা পড়ে আসে সহজে, সহজেই সন্ধ্যা নেমে আসে। অবেলায় কেন এরা ঘুমায়। লক্ষ্মী আমাকে বারান্দায় টুলে বসিয়ে সেদিন প্রায় সবাইকে চেঁচামেচি করে জাগিয়ে দিয়েছিল। নিজেই বিরক্ত বোধ করছিলাম ওর চেঁচামেচিতে। কি না জানি ভাবে। অথচ সেবাইত মানুষটি ঠাণ্ডা মাথায় বলেছিলেন, কে এসেছে বললি?

    —নতুন মাস্টার এয়েছে। তোমরা ঘুমোচ্ছ আর মানুষটা কি ভাববে বলত! মানুষটা মানে আমি।

    —নতুন জায়গা, ভিনদেশী। দেখলে সব কি ভাবে!

    এ বাড়ি কার বাড়ি, কে আসল মহাজন, কাকে বেশি সমীহ করতে হবে এখনও ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না। নটু পটু এসেছিল, তবে তখন নয়। সন্ধ্যায় লক্ষ্মী হারিকেন জ্বালিয়ে দেবার পর। কারণ ভিতর বাড়িটাতে অসংখ্য ঘর। ছোট ছোট দরজা, জানালা আরও ছোট। ছোড়দির বাড়ির মতো বিশাল বিশাল দরজা জানালা এ বাড়িতে নেই। মন্দিরের দুটো বিশাল দরজা বাদে আর সর্বত্র কেমন কানা গলিগুঁজির মধ্যে ঘরগুলি হারিয়ে গেছে। আমাকে লক্ষ্মী যখন পড়ার ঘরটায় নিয়ে গেছিল তখন প্রায় হাঁপ ছেড়ে বেঁচেছিলাম। রাস্তার পাশে, রোয়াকের উপর ঘর। একটা দরজা সামনে, ভিতরের দিকে আর একটা দরজা। রাস্তার উপর দু-দিকে দুটো জানালা। আর দক্ষিণের দিকেও একটা জানালা আছে। ওটা খুলে দিতেই সামনের মাঠ দেখতে পেয়েছিলাম। আর মনে হয়েছিল এই ঘরটাই সবচেয়ে বেশি বড়। দু-পাশে দুটো বড় তক্তপোশ। মাঝে তিনটে হাতল ভাঙা চেয়ার। একটা টেবিল চাকচিক্যবিহীন। সামনে তাক। নটু পটুর স্লেট পেন্সিল খাতা বইতে ঠাসা। বাড়িতে ঢোকার আগে এখানেই তিন চারজন লম্বা হয়ে শুয়েছিল। ঘুমোচ্ছিল। পিলু দরজা ফাঁক করে বলেছিল, এ কেমন বাড়িরে দাদা। অবেলায় সবাই ঘুমায়।

    দু-রাত কাটাবার পর কিছুটা ধাতস্থ হয়ে গেছি। বাড়িতে অতিথি অভ্যাগত, আশ্রিতের সংখ্যা অনেক। সবার সঙ্গে আলাপ হয়ে গেছে—শুধু একজন বাদে। তিনি মন্দিরেই থাকেন খান। একটা গেরুয়া নেংটি পরে থাকেন। গায়ে জামা দেন না। চোখ সব সময় লাল। যেন সেই মহাভারতের দুর্বাশা মুনি। সকালবেলায় হোতার সাঁকো থেকে বড় নিমগাছটা পর্যন্ত কেবল পায়চারি করেন— আর সংস্কৃত শ্লোক অনর্গল আওড়ে যান। যেন পৃথিবীটাকে পবিত্র রাখার দায়িত্ব, ধর্মাধর্ম রক্ষার দায়িত্ব তাঁকে কেউ অর্পণ করে গেছেন। এমন কঙ্কালসার মানুষ অথচ কি দৃপ্ত আর তেজী। মন্দিরের আসনে যখন বসে থাকেন, আমার মাঝে মাঝে তাঁকে কাপালিকের মতো লাগে। যদি কখনও তার চিৎকার ভেসে আসে, বাড়ির সবাই কেমন তটস্থ হয়ে পড়ে। নটু বলেছিল, নরেন খ্যাপা। কাছে যাবেন না। চোখ পড়ে গেলে রক্ষা নেই। মন্দিরে বসিয়ে সারাদিন গীতাপাঠ করাবে। উঠতে দেবে না। চান করতে দেবে না। কেবল বলবে, খা খা। আমারে খা। ভয়ে এই ঘরটা থেকে সহজে তাই বের হই না।

    সেবাইতের ছেলে নটু। পটু ওর বোনের ছেলে। বোন এখানেই থাকে। মাথায় সিঁদুর নেই। হাতে শাঁখা নেই। পটুর বাবা কোথায় থাকে জানি না। তবে তিনি বেঁচে আছেন জানি। গতকাল পিয়ন পটুর বাবার চিঠি দিয়ে গেছে। ধনঞ্জয় বলে একজন এ বাড়ির আশ্রিত, পটুর জ্যাঠতুতো দাদা। পঁয়ত্রিশ চল্লিশ দেখতে। ধনঞ্জয়ও ঘরের বার হয় না। পটুর মার ঘরে দিন রাত শুয়ে থাকে। ঘরটার জানালা ছোট বলে বারান্দার আলো থেকে সব কিছু ভিতরে স্পষ্ট দেখা যায় না। পটুর মাকে আমি দিদি ডাকার পর স্নেহশীলা রমণীর আচরণ লক্ষ্য করেছি। বাইরে বড় কম বের হন। সকালবেলায় তাঁকে দেখলে মনে হবে, সারারাত যেন না ঘুমিয়ে কাটিয়েছেন। চোখ বসে গেছে। সুশ্রী দেখতে, তবে লাবণ্য নেই তেমন। কোনো রোগ-টোগ থাকলে মেয়েদের যেমন লাগে দেখতে পটুর মা সে রকমের।

    আমার ঘরের ও পাশের তক্তপোশটায় আরও একজন এ বাড়ির আশ্রিতজন থাকেন। কালো কুচকুচে দেখতে। মাথায় বিশাল টাক। বেঁটেখাটো মানুষ। এ বাড়ির আদায়পত্র তাঁর হাতে। নটু পটু দাদু ডাকে- আমি আর কি ডাকি, দাদুই ডাকতে শুরু করেছি। এতে খুব খুশী তিনি। আমার খাওয়া চান নিয়ে তাঁর দেখছি বেশ একটা ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে।

    আমার জামা প্যান্ট কোরা কাপড় দু’দিন ধরে কুলুঙ্গিতে পড়ে আছে। সকালে লক্ষ্মী মুড়ি সন্দেশ আর গ্লাসে জল নিয়ে এ-ঘরে একবার আসে। তিন চেয়ারে আমরা তিনজন। পড়ার চেয়ে নানারকম মুখরোচক খবর নিতে নটু পটু বেশি ভালোবাসে। খাবার এলে সেটা বেড়ে যায়। আমি আশ্রিত বলে, সন্দেশের পরিমাণ কখনও কম হতো না। বরং আমার মুড়ির সঙ্গে চারটে কাঁচা গোল্লা থাকলে নটু পটুর ভাগে দুটো বরাদ্দ থাকত। সকালের জলখাবার আমাদের তিনজনের একসঙ্গে, দুপুরের খাবার একসঙ্গে রাতেও তাই। সকালের তদারকির দায় লক্ষ্মীর। দুপুরে বৌদি নিজ হাতে দেন। রাতেও তাই। নটু পটুর স্কুল নেই। আমার কলেজে ভর্তি হওয়ার বিষয়টি দাদাই ভার নিয়েছেন। সময় মতো হবে। লক্ষ্মী দু’দিনেই কেমন তেরিয়া হয়ে বলল, মাস্টার, তোমার কিছু হবে না। ও ভাবে সব ফেলে রাখে। বলে সে নিজেই নিয়ে এল একটা তার। সেটা টানিয়ে দিয়ে বেশ সুন্দর করে ভাঁজ করে রেখে দিল জামাকাপড়। লক্ষ্মীর এ ঘরে আর একটা কাজ রাতে থাকে। আমাদের বিছানা করে মশারি টানিয়ে দেওয়া। নটু পটু আর আমি এক বিছানায় পাশাপাশি। পটুর শোওয়া খারাপ বলে লক্ষ্মী বলে গেছে, ওটারে একপাশে দেবেন। খুব লাথি মারে।

    জামা প্যান্টের দুরবস্থা নিয়ে এখন আর আমার ভাবনা হয় না। একটা হাফপ্যান্ট পরে সহজেই এ-ঘর ও-ঘর করতে পারি। এ বাড়িতে পোশাক-আশাকের প্রাবল্য খুব কম। আমার ছাত্ররাও দেখছি খদ্দরের প্যান্ট জামা পরে। বদরিদাও তাই। বদরিদা হাতে কাচা কাপড় পরেন। ধোপা বাড়ির সঙ্গে এ বাড়ির সম্পর্ক কম। কেবল দিদি একটু সাজগোজ করতে ভালোবাসেন। তাঁকে কখনও দেখেছি, আয়নার সামনে বসে সাজগোজ করছেন। বৌদির তিনবেলা স্নানের অভ্যাস। বাড়িতেই চান করেন। আমারও তাই নির্দিষ্ট ছিল। কিন্তু কালীবাড়ির পিছনে বিশাল ঝিল, বাঁধানো ঘাটলা দেখার পর দাদুর সঙ্গে সেখানে চান করাই শ্রেয় বোধহয়। সারাদিন লক্ষ্মীর কাজ ছিল ঝিল থেকে জল টানা। আমার জন্য বাড়তি জল ওর আর টানতে না হয় সেটাও বোধহয় মনের মধ্যে কাজ করছিল। আর তারপরই লক্ষ্মী কেমন আমার প্রতি সদয় হয়ে গেল। কোনো কথায় আর চোপা করত না। বরং মাঝে মাঝে লক্ষ্য করেছি কথা বলতে বলতে চোখ নামিয়ে নেয় সে অন্ত্যজ শ্রেণী থেকে এসেছে, এটাও টের পেলাম আর টের পেলাম লক্ষ্মীর ইতিপূর্বে দুবার বিয়ে হয়েছে। বর কপালে সয়নি। মা বাবা নেই। শেষে কাগে বগে ঠুকরে খাবে এই ভয়ে এ বাড়ির আশ্রয়ে এসে উঠেছে। ধীরে ধীরে বুঝতে পারছিলাম, লক্ষ্মীর জন্য আমার ভিতরে আর একটা কষ্ট তৈরি হচ্ছে। কেন এমন হয় বুঝি না!

    আসলে এরি নাম বড় হওয়া। খেপে খেপে কষ্ট রেখে যাচ্ছি এক এক জায়গায়। আগে দেশ বাড়ির জন্য কষ্ট হতো। পরিচিত গাছপালা, মানুষজন, গোপাট, স্কুলবাড়ির সঙ্গে মানুষের নাড়ির টান জন্মে যায়। চলে আসার সময় কেবল মনে হতো এখানে আর আমি থাকব না, কখনও আর আসব না, অথচ এরা শীত গ্রীষ্মে একই রকমভাবে দাঁড়িয়ে থাকবে। যে বালক দৌড়ে যেত, গ্রীষ্মের দিনে আম পাড়ত, সে থাকবে অনেক দূরে। শস্যক্ষেত্রগুলিতে ফসল ফলবে, কিন্তু যে বালক ক্ষেতে ফসল বেড়ে ওঠার সৌন্দর্য উপভোগ করত, সে আর থাকবে না। দেশ ছাড়ার সময় আমার চোখে জল এসে গেছিল। এদেশে এসেও যখন যেখানে ছিলাম সে জায়গাটার জন্য মায়া পড়ে গেছে। এখানে এসেও তাই। এত কম বয়সে লক্ষ্মীর দুবার বিয়ে হয়েছে। অথচ কেউ বেঁচে নেই। মা নেই, বাবা নেই। লক্ষ্মীর চালচলন দেখলে বোঝাই যায় না সে এত শোকতাপ পেয়েছে। বরং ওই যেন এত বড় বাড়িটার আসল চাকা। কারণ এ বাড়িতে সবাই যে যার, নিজের নিজের কাজে ব্যস্ত, এমন কি তারা চান করে জামা কাপড় পর্যন্ত কেচে দেয় না। সব লক্ষ্মীর জন্য পড়ে থাকে। পাকশালায় আর দু’জন মাঝবয়সী বৌ থাকে। কার্তিকের বৌ আর সদি পিসি। ওরা রান্নাবান্নার তদারক করে। উত্তর দিকের অতিথিশালার পাশে কার্তিকের থাকার ঘর। সে মোড়ে একটা মুদি দোকান করেছে। বৌ তার পাকশালে থাকে। বিনিময়ে সেও খেতে পায়। সে অবশ্য বলে, দুবেলা প্রসাদ পায়। বদরিদাকে মামা ডাকে। সম্পর্কে তাই হয়। আমি বদরিদাকে দাদা ডাকি বলে সে আমাকে মামা ডাকে। মাস্টার ডাকে না। আমার ঘরটার ভিতর দিয়েই যেতে হয় সবাইকে। চার পাঁচটা সাইকেল আছে, সাইকেলগুলি সব পড়ার ঘরের এক কোণায় জমা হয়ে থাকে। সাইকেলের গায়ে কারো নাম লেখা নেই। যার যখন যেটা দরকার নিয়ে বের হয়ে যায়। বদরিদা বলেছে, এজমালি সংসার। আসলে বুঝি তিনি বলতে চেয়েছিলেন, পান্থশালা।

    সকাল থেকেই পান্থশালায় লোক আসা শুরু হয়। মন্দিরের সদর দরজা দিয়ে ঢুকলে ঘুরে যেতে হয় বলে আমার ঘরটা দিয়ে সর্টকাট করে। যাবার সময়, সবার একটা কথা, কি মাস্টার তোমার ছাত্ররা পড়ছে ত। এরা এখন ভিতরে গিয়ে বদরিদার ঘরে তাস খেলতে বসবে। তারপর দুপুরে খেয়ে কখনও ঘুমিয়ে শেষ বেলায় বাড়ি ফেরে। কেউ যাবার সময় নটু পটুর মাথায় গাঁট্টা মেরে যায়। নটু যে এ বাড়ির হব মালিক কেউ মানতেই চায় না। তার বাবার বন্ধুরা আসে শহর থেকে। কেউ আবার বৌ বাচ্চা নিয়েও চলে আসে। ভিতর বাড়িতে ঢুকলেই বোঝা যায় কত বিচিত্র মুখ। সবারই লোভ প্রসাদে। এবং এই লোভেই বোধহয় বদরিদার চেনাজানার জগৎ এত বিশাল হয়ে যাচ্ছে। বদরিদার এক কথা, এসেছ, মার প্রসাদ না নিয়ে যাবে কি করে।

    নটু বলল, স্যার শনিবার কিন্তু সকালেই দরজাটা বন্ধ করে দেবেন।

    আমি বললাম, কেনরে?

    —শনি মঙ্গলবারে বড় ভিড় হয়। সকাল থেকেই দেখবেন কতদূর থেকে সব লোকজন আসছে। মানত দিতে আসে। নটু আমাকে আরও খবর দিল, রাতে সদু পিসির ভর উঠবে কালীর থানে। লোকজন তখন—এ ঘর দিয়েই ছোটাছুটি করবে। আপনারও পড়া হবে না। আমাদেরও না।

    শনিবারে সেটা যথার্থই টের পেলাম। সকাল হতে না হতেই হুড়োহুড়ি পড়ে গেল। মন্দিরের চতালে ঢাক বাজছে। পাঁঠার আর্তনাদ। যে-সব ছাড়া পাঁঠাগুলি অতিথিশালার ওদিকটায় শুয়ে থাকে তারাও আর্তনাদ করছে। চাতালে ঢাক বাজলে কেমন গুমগুম শব্দ হয়। কার্তিক সকাল থেকেই কপালে সিঁদুরের ফোঁটা দিয়ে বসে থাকে। শনি মঙ্গলবার তার দোকান বন্ধ থাকে। বড় রামদাটা বালিতে ঘষে ধার তোলে। পট্টবস্ত্র পরে নেয়। এবং তাকে দেখলে বোঝা যায়, সে একজন তখন তান্ত্রিক মানুষ। আমাকে মামা পর্যন্ত ডাকে না। গাঁজা ভাঙ খায় বোধহয়। না হলে এত গুম মেরে থাকে কেন? মানত করা পাঁঠাগুলি চাতালের এক কোণায় জড় থাকে। মন্দিরের মধ্যে কেউ যেতে পারে না। বাইরে অনেক দূরে দাঁড়িয়ে সন্দেশের ঠোঙা, অথবা নৈবেদ্য ছুঁড়ে দিতে হয়। সবারই কত রকমের যে দুঃখ। কত রকমের যে প্রার্থনা। ছেলেবুড়ো যুবতী মেয়ে বৌ বেটি সবার এত কি প্রার্থনা থাকে। অবশ্য আমি একবার মাত্র বের হয়ে দেখেছিলাম। তারপর মনে হয়েছে, ঐ গণ্ডগোলের মধ্যে বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলে মাথা ঘুরবে। নিজের ঘরে এসে নটু পটুকে নিয়ে বসলাম। ওদের এ ব্যাপারে কৌতূহল খুবই কম। বরং নটুর ‘দেখলাম সিঁড়িভাঙা অঙ্ক শেখার আজ বেশ আগ্রহ। এটা দেখে আমার মাস্টারি করার প্রবণতা চাঙ্গা হয়ে উঠল। খুব অভিনিবেশ সহকারে পড়াচ্ছি। পটু কিন্তু জানালায় বার বার কি দেখছে। পটুর টাস্ক দেওয়া আছে সেটা সে করছে না।

    —কি হচ্ছে পটু, ওদিকে মন কেন! একেবারে গুরুজনের মতো গলা আমার।

    পটু বলল, এই ওখানে কি করছিস রে! জানালায় কাকে উদ্দেশ্য করে কিছু বলছে।

    তাকিয়ে আমি অবাক! দেখি ওখানটায় পিলু দাঁড়িয়ে আছে। সে দাদার টানে চলে এসেছে। আমি কিভাবে পড়াচ্ছি, ভীষণ গর্বের সঙ্গে দেখছে।

    পিলুকে দেখে যতটা চঞ্চল হয়ে পড়ব ভেবেছিলাম, ঠিক ততটা হওয়া গেল না। আমার ভাই বলতেও কেমন সংকোচ হচ্ছিল। সে জানালার সিক ধরে দাঁড়িয়ে আছে। পরনে ইজের, খালি গা, উষ্কখুষ্ক চুল। ও এরকমভাবেই থাকে। সকালবেলায় উঠে ঠিক দাদার জন্য মন কেমন করায় দৌড়ে চলে এসেছে। দরজা খুলে দিয়ে বললাম, ভিতরে আয়। তারপর একটু শাসনের গলায় বললাম, কি করতে এসেছিস?

    নটু বলল, স্যার কে ছেলেটা?

    আমি বললাম, তোমরা ভিতরে যাও। তারপরই মনে হলো হাফপ্যান্ট পরা স্যারের এত গাম্ভীর্য শেষ পর্যন্ত টিকতে নাও পারে। বললাম, পিলু।

    পিলু কিন্তু বেশ খোস মেজাজে তক্তপোশে বসে পা দোলাচ্ছে—আমার দাদা। আমি দাদার ছোট ভাই। তোমরা দাদার স্টুডেন্ট? নটু বলল, হ্যাঁ। নটু পটু সঙ্গে সঙ্গে যেন হাতে চাঁদ পেয়ে গেল। ওদের সমবয়সী আমার একটা ভাই থাকতে পারে বিশ্বাসই ছিল না। আমার দিকে তাকিয়ে বলল, স্যার ভিতরে যাব। পিলুর দিকে তাকিয়ে বলল, আমি নটু, ওর নাম পটু।

    —যাও।

    —এই পিলু ভিতরে যাবি?

    পিলু আমার দিকে তাকাল। নটু কি তার মাকে দেখাতে চায়—এই পিলু মাস্টারমশাইর ভাই। সকালবেলায় দাদাকে দেখতে চলে এসেছে। বৌদি যদি কিছু ভাবে, কিংবা বদরিদা। বাড়িটার এমনিতেই এত বেশি আকর্ষণ যে কেউ এলে যেতে চায় না। পিলু যা স্বভাবের তাকে এমন বাড়িই মানায়। আমি বললাম, পিলু এক্ষুনি চলে যাবে। ওকে ভিতরে নিয়ে যেও না। যেন নিয়ে গেলেই পিলু ধরে ফেলবে, এখানে দাদার মতো সেও থেকে যেতে পারে। কেউ কিছু বলবে না। মন্দিরের ডাঁই করা সন্দেশ, দুপুরে সরু আতপ চালের ভাত, মাছ ভাজা, পটল ভাজা, মুগের ডাল, শনি মঙ্গলবারে বাটি ভর্তি পাঁঠার মাংস, চাটনি। পাত পেতে বসে গেলেই হলো। যে আসে সেই যখন পাত পেতে বসে যেতে পারে তবে তার বেলায় কতটা আর রামায়ণ মহাভারত অশুদ্ধ হবে। কিন্তু পিলটা বোঝে না কেন, আমার ইজ্জত আছে। তুই তো আর কার্তিক ভাদুড়ি নোস, যে পাঁঠা কেটে বাড়ির লোক হয়ে যাবি তুই যে নটু পটুর স্যারের ভাই। কিন্তু ততক্ষণে যা হবার হয়ে গেল। লক্ষ্মী এসে গেছে এক বাটি মুড়ি আর চারটে কাঁচাগোল্লা নিয়ে। তার সকালের টিফিন। পিলু বড় বড় চোখে বাটিটা দেখছে।

    লক্ষ্মী বলল, ধরো মাস্টার। তারপরই পিলুর দিকে তাকিয়ে বলল, ও মা এ যে তোমার সেই ভাইটাগো। লক্ষ্মী পিলুকে একবার দেখেই চিনে রেখেছে। কি গো দেখতে এলে দাদাকে খেয়ে ফেলেছি কি না।

    লক্ষ্মীর ভিতরে অন্য এক ব্যথা কাজ করে বুঝতে পারি। সে কি টের পায়, যাকে সে ভালোবাসে সে মরে যায়। তার কি ভয় থাকে গভীরে। কোনো গোপন ভালোবাসায় পড়ে গেলে আমাকে নির্ঘাত গিলে ফেলা হবে। এবং লক্ষ্মীর আচরণ মাঝে মাঝে আমাকে বিস্মিত করে। আমার সমবয়সী অথচ এই বাড়িতে তার কি হম্বিতম্বি। সারাটা দিন কাজ, কেবল সন্ধ্যার পর সে আর কোনো কাজ করে না। ভিতর বাড়ির বারান্দার এক পাশে শরীর মুখ ঢেকে শুয়ে থাকে— ভোঁসভোস করে ঘুমায়। রাত বারোটার পর শিবা ভোগ হয়। তারপর বদরিদা, বৌদি নটু পটু দিদি অর্থাৎ সেবাইত বংশের সবাই খাবে। অবেলায় কেন ঘুমায় সবাই, এখন বুঝতে পারি। বৌদি আমাকে বলেছিলেন, তুমি কি আগে খেয়ে নেবে ভাই। খেলে বলো। আমার কেমন সংকোচ হয়েছিল বলতে, এত রাতে কখনও খাই না বৌদি। আবার মনে হয়েছিল, আমার দুই ছাত্র যদি এত রাত করে খেতে পারে, আমি পারব না কেন। বলেছিলাম, না না, ঠিক পারব। কোনো অসুবিধে হবে না। রাত জাগা অভ্যাস নেই বলে ঘুমিয়ে পড়তাম। লক্ষ্মী এসে ডেকে দেয়, ও মাস্টার ওঠো। খাবে চলো। দাদা বৌদি সবাই বসে আছে। আমার এত ঘুম যে কখনও বিরক্ত হয়ে যেত ডাকতে ডাকতে—কি যে মরণ, বুঝি না বাপু। খিদে পায় না। খিদের চেয়ে ঘুমটা বেশি। সেই কখন চাট্টি খেয়েছ—দেখ কেমন হাঁ করে ঘুমাচ্ছে। দেব জল ঢেলে বলছি। উঠে বসলে দেখতাম লক্ষ্মী আমার দিকে তাকিয়ে নেই। যেন দেয়াল টেয়াল দেখছে। আসলে এ বাড়িতে লক্ষ্মীর পছন্দ মতো লোকের অভাব। আমাকে তার পছন্দ, সেটা প্রথম দিনেই বুঝতে পেরেছিলাম। বয়সের তুলনায় হাতে পায়ে লম্বা হয়ে গেছি বেশি। সোনালী দাড়ি গোঁফ অল্প অল্প সারা গালে। লক্ষ্মী ঠাট্টা করে কাল বলেছিল, নবীন সন্ন্যাসী ঠাকুর গো, কি যে আমার হবে?

    সেই লক্ষ্মী পিলুকে দেখে ছাড়বে না বোঝাই যাচ্ছিল। এতেই আমি আরও বেশি কাবু হয়ে গেছিলাম। নটু পটু দাঁড়িয়ে আছে সঙ্গে করে ভিতরে নিয়ে যাবে বলে। পিলু পা পা করে এগুচ্ছিল। কিন্তু চারটে বড় বড় কাঁচাগোল্লা এক জামবাটি মুড়ি দেখে তার এগোনো বন্ধ হয়ে গেল। লক্ষ্মী সব রেখে ছুটে গেছে ভিতরে। কেন গেল বুঝি না। পিলু কি সং। তামাশা! ভিতরে ভিতরে পিলুর উপর ক্ষেপে যাচ্ছিলাম। এলি তো একটা জামা গায়ে দিয়ে আসতে কি ক্ষতি ছিল। জামাটা ছেঁড়া— তাহোক না, জামাতো। ওর নাকটা দেখলাম। পোঁটা লেগে থাকে— বড় খারাপ স্বভাব। সেই কবে থেকে গায়ে রিফ্যুজি ছাপ লেগেছিল, সেটা বাড়িঘর হয়ে যাওয়ার পর থাকা ঠিক না। তবে রক্ষে নাকে পোঁটা নেই। ওর রঙ শ্যামলা। মুখে মায়ের আদল। চোখ দুটো বড়ই মায়াবী। যা কিছু দেখে, তাই ওর কাছে বিস্ময়। ফলে চোখ দুটো বোধহয় দিনে দিনে আরও বেশি ডাগর হয়ে উঠছে। এ হেন বালকের প্রতি লক্ষ্মী নটু পটু সবাই টান বোধ করবে সেটা আর বেশি কি। কিন্তু ওর এই বিস্ময়ে আমার যে সম্ভ্রম যায়। চকিতে এতসব ভাবনা মাথায় খেলে গেল। কেউ নেই দেখে বললাম, পিলু বাড়ি যা। এক্ষুনি চলে যা।

    পিলু যেন আমার কথা শুনছে না। দাদা তুই চারটে কাঁচাগোল্লা খাবি? তারপর আর আমার জবাবের প্রতীক্ষা না করে নিজেই ছুটে কাঁচাগোল্লা তুলে একটা মুখে পুরে দিল। কাঁচাগোল্লা একসঙ্গে মুখে পুরে দিলে গলায় আটকে যায়। পিলুর অভ্যাস নেই—সে মুখে দিয়েই বুঝল, গলা দিয়ে ঢুকছে না। আমি চিৎকার করে উঠলাম, শিগগির জল খা। জল খেলে এমন সুস্বাদু খাবার মিলিয়ে যাবে–সে কিছুতেই জল খেতে রাজি না। কিন্তু চোখ মুখের অবস্থা খারাপ। জল ঠেসে ধরলাম মুখে। বিষম খাচ্ছে—এক বিতিকিচ্ছিরি অবস্থা—আর তখনই দেখি, বৌদি, লক্ষ্মী নটু পটু হাজির। সবাই পিলুকে দেখতে এসেছে। দেখবে কি, সে তো বিষম খেয়ে অস্থির। তার হাতে আরও একটা কাঁচাগোল্লা। বৌদি কাছে গিয়ে মাথায় ফুঁ দিল, এবং দেখলাম পিলুর চোখ আবার সহজ হয়ে আসছে। হাতে আর একটা কাঁচাগোল্লা, দাদার বাটি থেকে তুলে নিয়েছে—কে কি না জানি ভাবে, সে পিছনে নিয়ে গেল হাতটা। কেউ আর দেখতে পাবে না। বৌদি বলল, তোমার ভাই?

    —হ্যাঁ।

    —কি নাম?

    —পিলু।

    —কি সুন্দর দেখতে। এ যে একেবারে যশোদা দুলাল। এ-বাড়ির কথাবার্তাই এই রকমের। বৌদির ঘরে একটা ছবি দেখেছি। মুখটা ঠিক পিলুর মতো মাথায় ময়ুরের পালক— ওটা না থাকলে হুবহু পিলুর ছবি হয়ে যেত। বৌদি বলল, লক্ষ্মী ওকেও দুটো খেতে দে। আমার দিকে তাকিয়ে বলল, পিলু দুপুরে মার প্রসাদ খেয়ে যাবে। পিলুর দিকে তাকিয়ে বলল, তুমি কিন্তু যেও না।

    এ সময় আমার গম্ভীর থাকা ছাড়া উপায় ছিল না। পিলুকে এরা জানে না। পিলু যদি আসকারা পেয়ে যায় তবে এমন সুস্বাদু খাবার হাতছাড়া ক ে নড়বেই না। পিলু আরও একজন আশ্রিতজন হয়ে যেতে পারে ভাবতেই আমার কেমন সম্ভ্রমে লাগল। যেভাবেই হোক পিলুকে বুঝিয়ে সুজিয়ে বাড়ি পাঠিয়ে দিতে হবে। লক্ষ্মীর ছোটাছুটি বেড়ে গেছে। সে পিলুর জন্য দুটো কলা, এক বাটি মুড়ি, চারটে কাঁচাগোল্লা নিয়ে এসেছে। পিলু এখন খুব ভালো ছেলে। সে কলা দুটো খেয়ে ফেলল, কাঁচাগোল্লা খেল। মুড়ি খেল। তারপর আমার পড়ে থাকা বাটর দিকে তাকিয়ে থাকল।

    —খাবি।

    —তুই খাবি না দাদা?

    —না!

    —দে। বলে সে বাকি দুটো কাঁচাগোল্লা খেয়ে কুর তুলে বলল, এদের বাড়িতে কাঁচাগোল্লার গাছ আছে নারে দাদা?

    —তাই। আমার ক্ষোভে দুঃখে কথা বলতে ইচ্ছে হচ্ছিল না। পিলু তুই বুঝলি না, এ বাড়ির আমি কে? লক্ষী বৌদি নটু পটু না কি ভাবল! আমরা হাভাতে, তাই বলে লোকের কাছেও সেটা প্রকাশ করতে হবে। তোর বুদ্ধি সুদ্ধি কবে হবে। ভালো খাবার দেখলে তুই মাথা ঠিক রাখতে পারিস না। এসব কথা বললে পিলু দুঃখ পেতে পারে, বলাও যায় না—বড় অবোধ আমার এই ভাইটি। নটু পটু দাঁড়িয়েছিল—খাওয়া হলেই তাকে নিয়ে যাবে – ঘুরবে, সব গাছপালার ভিতর হেঁটে বেড়াবে সমবয়সী হলে যা হয়। ওরা আমার শুধু অনুমতির অপেক্ষায় আছে। নটু পটুকে বললাম, তোমরা এখন যাও।

    ওরা চলে গেল। পিলু অবাক হয়ে দেখল। দাদাটার কি প্রভাব প্রতিপত্তি। সে তো তার দাদাকে একদম মানে না। আর সে দাদার এমন গম্ভীর ভারিক্কি মুখ কখনও দেখেনি। সে যেন কিছুটা ঘাবড়েই গেল। বলল, দাদারে আমি চলে যাব?

    —এখুনি যা।

    —খেতে বলল যে!

    —আর একদিন খাবি। ওকে বলতে পারতাম, ওরা জানে আমরা খুব গরিব পিলু। গরিব হলেই কি সব সময় হাভাতে হতে হয়। তুই বাবার মানসম্ভ্রম বুঝবি না। কিন্তু সেসব বলতে কষ্ট হলো। সে চুপচাপ বের হয়ে গেল। লাফিয়ে নেমে গেল রোয়াক থেকে। তারপর রেললাইন পার হয়ে গাছপালার মধ্যে অদৃশ্য হয়ে গেল।

    পিলু চলে যেতেই মনটা ভারি খারাপ হয়ে গেল। একবার ইচ্ছে হলো, বের হয়ে ডাকি – পিলু যাস না। খেয়ে যাবি। এমন সুস্বাদু খাবার পিলু কতদিন খায়নি। টানাটানির সংসারে নিত্য দিনের খাওয়া খুব একটা ভালো হয় না। পিলু এখানে খেলে বাড়ি গিয়ে বলত, মা কালীবাড়িতে ভোজ খেয়ে এসেছি। শুধু মাকে কেন, যাবার সময় নবমীকেও খবরটা দিয়ে যেত। কি সরু চাল নবমী, আর কি সুঘ্রাণ। পাঁঠার মাংস এক বাটি। মুগের ডাল, মাছভাজা, টক মিষ্টি। কালীবাড়িতে শনি- মঙ্গলবারে এত প্রসাদ হয় কি বলব। ভোগের রান্না, স্বাদই আলাদা। মুখে লেগে আছে। তোমাকে একদিন ধরে ধরে নিয়ে যাব। তারপর মনে হল ভালোই হয়েছে। পিলুর বড় পেটুক স্বভাব! খাবার লোভে পড়ে গেলে সে সহজে নড়তে চায় না। সে দাঁড়িয়ে থাকে। রোজ এসে জানালায় দাঁড়িয়ে থাকতে পারে। বাড়িতে খাওয়া নিয়ে যত ঝামেলা তার। সে মাছ ছাড়া ভাত খেতে পারে না। বাজার না হলে সে নিজেই যায় ডোবা নালায়। কুঁচো চিংড়ি, কাঁকড়া যা পায় কোঁচড়ে করে নিয়ে আসে। আর মাংস কেনার এত পয়সা কোথায়। একবার মাংস খাব খাব করছিল—কিন্তু হয় না। সে নিজেই গুলতি মেরে দুটো খরগোশ শিকার করে নিয়ে এল।

    নটু পটু দুবার উঁকি দিয়ে গেছে। কিন্তু মাস্টারমশাইয়ের মুখ গম্ভীর দেখে ঢুকতে সাহস পায়নি। তবু নটু একবার সাহস করে ঢুকে বলল, পিলু কোথায় স্যার?

    —পিলু? পিলু তো চলে গেল।

    —পিলু চলে গেছে। মা যে বলল, মাস্টারের ভাই এয়েছে। ও খাবে এখানে। রান্নাঘরে খবর দিল।

    লক্ষ্মীও হাজির, কৈগো মাস্টার তোমার ভাইটি কোথায়! বদরিদা ভিতরে নিয়ে যেতে বলল। দেখতে চেয়েছে।

    ওরা কি ভাবে! পিলু কি সং। ভিতরে আমার কেমন অহংকারে বাধল। তারপরই মনে হলো, আমি অন্যায় অভিমানে ভুগছি। মানুষ মানুষকে ভালোবাসতে পারে, ঘৃণাও করতে পারে। সব মানুষ সমান হয় না। পিলুকে পাঠিয়ে দিয়ে নিজের সম্ভ্রম রক্ষা করেছি ঠিক, বাবারও সম্ভ্রম রক্ষা করা গেছে কিন্তু ঠিক মনুষ্যত্ব রক্ষা হয়নি। এমন একটা সরল বালকের প্রতি আমি ভারি অবিচার করেছি। ততক্ষণে খবরটা ভিতরে পৌঁছে গেছে।

    লক্ষ্মী কলসী কাঁখে ঠায় টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে। আর হাজার রকমের প্রশ্ন, চলে গেল কেন?

    —চলে গেছে। আমি কি করব। নিজের ইচ্ছায় এসেছিল, নিজের ইচ্ছাতে চলে গেছে। ও কারো কথা শোনার পাত্র নয়।

    —তুমি মিছে কথা বলছ মাস্টার। কালীর থানে মিছে কথা বলতে হয় না জান! যেচে খেতে এসেছে ভেবেছ!

    আমার ভিতরে ক্ষোভ বাড়ছিল। মেয়েটার এমন রূঢ় কথা আমার সহ্য হচ্ছে না। মিছে কথা বলছি, তুই তো এ বাড়িতে জল তুলিস, খেটে খাস—তোর এত আস্পর্ধা হয় কি করে! বললাম, লক্ষ্মী তুমি পিলুকে চেন না। মিছে কথা বলার কি আছে।

    কিন্তু যখন বৌদি আর বদরিদা এলেন, আমার সত্যি তালগোল পাকিয়ে গেল। এবার আর খুব জোর ছিল না কথায়। বদরিদা বললেন, কোথায় সে? কোথায় গেল!

    লক্ষ্মীই জবাব দিল, কোথায় আবার যাবে! বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছেন মাস্টার।সম্ভ্রমে লাগে।

    মেয়েটা এত বোঝে কি করে। কিন্তু সবার সামনে লক্ষ্মীকে বলতেও পারছি না, কেন বাজে বকছ। সম্ভ্রমের কি আছে। আমিও তো আশ্রিতজন।

    বদরিদা রোগা মানুষ। গলায় লম্বা পৈতা। খদ্দরের মোটা ধুতি মালকোচা করে পরা। দেখলে মনে হবে, যেন ক্ষিপ্ত হয়েই ভিতর বাড়ি থেকে উঠে এসেছেন। কিন্তু আমি জানি, এই অমায়িক মানুষটির ভিতরে একটা বড় মাপের মানুষ বাস করে। তার কাছে মিছে কথা বলতেও বাধছে। বৌদি শুধু বলল, মাস্টার এটা ভালো কাজ হলো না। কতদূর থেকে দাদাকে দেখতে এয়েছে। আবার যাবে রোদে!

    আমার চোখে জল এসে যাচ্ছিল। কোনোরকমে সামলে বললাম, বাড়িতে কিছু বলে আসেনি। খেয়েদেয়ে ফিরলে বাবা মা খুব চিন্তায় পড়ে যেতেন।

    বৌদি-দাদা কথাটার মধ্যে যুক্তি খুঁজে পেয়ে আর কিছু বললেন না। নটু পটু পিছনে দাঁড়িয়ে। লক্ষ্মী দাঁড়িয়ে। ওকে বড় ভয় করছে। সে সবার সামনেই না বলে দেয়, সব মিছে কথা। মাস্টারের বানানো কথা। কি নিষ্ঠুররে বাবা! ভাইটাকে দুটো ভালো মন্দ খেতে পর্যন্ত দিল না।

    খেতে খেতে বেলা দুটো আড়াইটা বেজে যায় এবাড়িতে। ভোগের রান্না শেষ হয় দেরি করে। পাঁঠা বলি হয় বারোটার মধ্যে, মানুষের তো মানতের শেষ নেই। যারা বলি পছন্দ করে না, পাঁঠা উৎসর্গ করে ছেড়ে দেয়। শনি মঙ্গলবারে একটা দুটো ছাড়া পাঁঠা থাকেই। দিনে দিনে এরা জমে যায়। বাড়ে— বড় হয়। শনি মঙ্গলবারে মানতের পাঁঠা না পাওয়া গেলে, ছাড়া পাঁঠা বলি হয়। ওদিকটায় আমি যাই না। ঘরের মধ্যে বসেই টের পাই কার্তিক রামদা নিয়ে এগোচ্ছে। ঢাক কাঁসি এবং গুরুগম্ভীর মন্ত্রোচ্চারণ আরম্ভ হলেই বুকটা আমার কাঁপে। পাঁঠা ধরার লোক ধনঞ্জয়। সে সকাল সকাল চান করে মন্দিরে এ দিনে চলে যায়।

    পিলু চলে যাবার পর আমার কিছুই ভালো লাগছিল না। এমনকি মন্ত্রপাঠ ঢাক-ঢোলের বাজনা সব কিছুতেই মেজাজ অপ্রসন্ন হয়ে উঠছে। ঝিল থেকে স্নান সেরে আসার সময় দেখেছিলাম – কত বিচিত্র মানুষ মন্দিরের চারপাশে জড় হয়ে আছে। সাধু, ভিখিরি, ছেলেমেয়ে বউ বুড়ি গর্দানমোটা ব্যবসায়ী, জমিদার বাড়ির মানুষজন সব যে যার মতো অশ্বত্থ গাছগুলির নিচে শুয়ে বসে আছে। চা খাচ্ছে ফ্লাস্ক থেকে। পিলু এসেছিল দাদাকে শুধু দেখতে। তার কিছু আশা ছিল না। এত মানুষের মধ্যে পিলু থাকলে কি আর বেশি বাড়তি মানুষ হতো। লক্ষ্মী এসে বলল, খেতে যান গো মাস্টার। খাবার দেওয়া হয়েছে।

    বলার ইচ্ছে ছিল, খিদে পায়নি। কিন্তু জানি কথাটা লক্ষ্মী শেষও করতে দেবে না। খিদে পায়নি কেন? মন খারাপ। অত দেমাক ভালোনাগো মাস্টার। কালীর থানে এয়েছ, কপালে না থাকলে হয় না। মান অভিমান কমাও। গরিব বলে কি মানুষ ছোট হয়ে যায়।

    খেতে গেলাম অগত্যা। কিন্তু খেতে পারলাম না। বার বারই চোখ ঝাপসা হয়ে উঠছে। পিলুটা হয়ত ডাল দিয়ে ভাত খেয়ে উঠে গেছে। কিছু ভাজা, কুমড়ো ফুলের বড়া আর কি বেশি রান্না হতে পারে। দুই চৌধুরী থাকার সময়ই বাবা ফতুর। আমার উপার্জনের টাকাও বোধহয় শেষ। খাওয়া- দাওয়া কষ্টে চলছে এখানে থেকেও তা বুঝতে পারি। লক্ষ্মী বারান্দায় একপাশে দাঁড়িয়ে। কলাপাতায় নুন, লেবু, কাঁচালঙ্কা জল সে সবাইকে দেয়। তার চোখ ফাঁকি দেওয়া কঠিন বলে, চোখ ঝাপসা হলে মুখ নিচু করে রেখেছি। যতদুর জানি ভিতরের দুঃখটা কেউ টের পায়নি। লক্ষ্মীকেও পেতে দিইনি। চুপচাপ খেয়ে উঠে নিজের ঘরে চলে এলাম। তক্তপোশে মাদুর পেতে জানলা ঘেঁষে শুয়ে পড়েছি। চোখে হাত রেখে কত কিছু ভাবছি। নতুন জীবন শুরু। বদরিদা দু-একদিনের মধ্যে কলেজে যাবেন বলেছেন আমাকে নিয়ে। ভর্তি করার দায়িত্বটা মানুকাকার কথায় তিনিই ভার নিয়েছেন। মানুকাকা নাকি বলেছেন, বাবা খুব অসহায় মানুষ! তা বলতেই পারেন। যজনযাজন ছাড়া তাঁর আর কিছু কাজ জানা নেই। এদেশের মানুষদের এমনিতেই ধারণা, দেশ ছেড়ে এসে সবাই কুলীন বামুন কায়েত হয়ে গেছে। বাবা যে তেমন নয় কে জানে। মানুষের বিশ্বাস অর্জন করতে সময় লাগে।

    আর তখনি কার মৃদু পায়ের শব্দ। টেবিলে খুটখুট করছে। নটু আসতে পারে পটুও। এরাও আমার পাশে শুয়ে দিবানিদ্রা দেবে। বদরিদা ওদের ভালোমন্দ দেখার দায়িত্ব আমার উপর ছেড়ে দিয়েছেন। পাশে শোয় ঠিক, কিন্তু ঘুমাতে চায় না। এ-পাশ ও পাশ করে। কখনও দু’জনে মারামারি পর্যন্ত শুরু করে দেয়। সবকিছুর মীমাংসা আমাকে করতে হয়। চোখ খুলে দেখলাম, তারা কেউ কিনা। না। তারা নয়। লক্ষ্মী। সে সোজা আমার দিকে তাকিয়ে বলল, খেলে না কেন মাস্টার।

    একটা কড়া জবাব দেব ভাবলাম। কিন্তু চোখ দুটো এত মায়াবী যে কড়া কথা বলা গেল না। আমি খাইনি বলে যেন এক গোপন কষ্ট বয়ে বেড়াচ্ছে। থাকতে না পেরে এখানে চলে এসেছে। বললাম, খেলাম তো।

    —এটা খাওয়া। তুমি কতটা খাও আমি দেখি না। তুমি খেতে খেতে চোখের জল ফেলছিলে কেন?

    —লক্ষ্মী। কেমন চিৎকার করে উঠতে গিয়েও পারলাম না। পাশ ফিরে শুয়ে বললাম, এখন যাও। আমি ঘুমাব।

    —ঘুমাতে কে বারণ করেছে। ঘুমাও না। তাই বলে তুমি আমাকে ফাঁকি দিতে পারবে না। একবার বলার ইচ্ছে হল, তুমি কি এ বাড়ির গোয়েন্দা। বৌদিকে না আবার বলে দেয়। ওরা তবে কি ভাববে! উঠে বসলাম। ধরা পড়ে গেছি যখন উপায় কি! বললাম, কাউকে বলো না।

    লক্ষ্মী কেমন মাথা নিচু করে বলল, তুমি এটা মাস্টার ভাবলে কি করে আমি সবাইকে বলে বেড়াব। আমি ছোট জাতের বলে মনটা ছোট হবে কেন। কালীর থানে থাকলে মন ছোট রাখতে নেই। তিনি তো সব দেখতে পান। গোঁসা হবে না তাঁর।

    এ-হেন মেয়েটির সঙ্গে আমি কথায় কি করে পারি। চুপচাপ থাকলাম। লক্ষ্মী তবু দাঁড়িয়ে আছে। যাচ্ছে না। কি ভাবছে কে জানে। লক্ষ্মী গায়ে কিছু পরে না। অথচ শরীর আশ্চর্যভাবে ঢেকে ঢুকে রাখতে শিখেছে। এ বয়সটা এমন যে সব কিছু ফুটে বের হতে চায়। লক্ষ্মী টের পায় বলেই শরীর নিয়ে এবং তার ডুরে শাড়ি নিয়ে সব সময় খুব সতর্ক থাকে। আমার ঘরে হুট হাট চলে আসে, ওতে আমি শঙ্কিত থাকি। এই সেদিনও এটা ছিল না। ছোড়দির কথা মতো সব করতে পারতাম। ছোড়দির পিছনে সাইকেলে চেপে কতদিন দামোদরের পাড়ে চলে গেছি। নদীর চরায় হেঁটে বেড়িয়েছি। ছোড়দি কত কথা বলত, বিলু তুই বড় হবি কিন্তু। পিলু ছোড়দি মা বাবা সবাই চায় আমি বড় হই। সেই বড় হওয়াটা লক্ষ্মীও চায় বুঝি। কলেজে যাবার দিন দেখলাম, আমার একটা মাত্র ফুলপ্যান্ট ধুয়ে সুন্দর করে ভাঁজ করে বালিশের নিচে রেখে দিয়েছে। আমি কি পরে যাব না যাব, আমার চেয়ে লক্ষ্মী সেটা যেন বেশি জানে। কে তাকে এই দায়িত্ব দিয়েছে। বৌদি, বদরিদা না সে নিজেই এভাবে মানুষের দায়িত্ব নিতে ভালোবাসে। অন্যমনস্ক হলেই দেখছি, লক্ষ্মী কখন এসে আমার জীবনের অনেকটা জায়গা জুড়ে বসে গেছে। বুঝতে পারছি সাপের খোলস ছাড়ার মতো আমার পুরনো খোলসটা এবার শরীর থেকে ধীরে ধীরে খসে যাচ্ছে। নতুন খোলস—নতুন এক আশ্চর্য ছাপ এবং দারুচিনি গাছের মতো সুঘ্রাণ—কে যেন ধীরে ধীরে এসে একটা সঠিক আস্তানা গাড়তে চাইছে। তার জন্য প্রায় জানালায় অথবা জ্যোৎস্না রাত্রে, কোন নিরিবিলি আকাশের নিচে নক্ষত্র দেখতে দেখতে ভাবি সে কে! সে কোনো রহস্যময়ী নারী-যে আমায় কোনো ফুলের উপত্যকায় নিয়ে যেতে চায়। পিলু সেটা টের পেয়ে গেছে কিনা কে জানে। সে আর আসে না। প্রায়ই জানালায় মনে হয় সে এসে দাঁড়িয়ে ডাকবে, দাদা আমি রে। সেই স্বর্গীয় হাসিটি লেগে থাকবে পিলুর মুখে। আমি বলব, আয় ভিতরে আয়। আজ তুই এখানেই খেয়ে যাবি। লক্ষ্মী টের পেয়ে বলেছিল, বাড়ি যাও না মাস্টার। ভাইয়ের জন্য মন কেমন করছে!

    কেমন উদাস গলায় বললাম, অনেকের জন্যই মন কেমন করে। কিন্তু কাউকে বলতে পারি না। পিলু কেবল সেটা ধরে ফেলেছে। সে আর সে ভাবে বুঝি আমার কাছে আসবে না। লক্ষ্মী কি বুঝে মাথা নিচু করে রাখল। যে মেয়েটা সারাদিন চোপা করে তার চোখও দেখলাম কেমন জলে ভার হয়ে উঠছে। ধরা পড়ে যাবে বলে, সে দৌড়ে ভিতরে চলে গেল।

    এরপর অনেকদিন লক্ষ্মী আমার সামনে আসেনি। তাকে আর আগের মতো কাছাকাছি দেখতে পাই না।

    রাতে যখন খেতে যাই ভিতর বাড়িতে তখন সে বিছানা করে রাখে। কলেজ থেকে ফিরে দেখি আমার বইপত্র খাতা সব তাকে সুন্দর করে সাজিয়ে রেখেছে। সকালের খাবার নটু পটুকে নিয়ে আসতে হয়। আমারটাও তারাই নিয়ে আসে। লক্ষ্মীকে কাছে পাবার যা কিছু উপলক্ষ্য ছিল, সব থেকেই সে কেমন দূরে সরে থাকছে। লক্ষ্মী যত দূরে সরে যাচ্ছিল, তত ভিতরে এক আশ্চর্য টান বোধ করছি। সে দুরে থেকে আমার সব কিছু লক্ষ্য রাখছে। আমার সব কিছুতেই তার অদৃশ্য হাত কাজ করে চলেছে। এমন কি সে আমার জন্য আলাদা স্নানের জলও তুলে রাখে। জামাপ্যান্ট ধুয়ে মেলে দেয়। তারপর যেখানে যা রাখবার রেখে দেয়। সাঁঝবেলায় জানি লক্ষ্মী জল আনতে যাবে ঝিলে। তাকে সেখানে একা পেতে পারি ভেবেই কেন যে গিয়ে সিঁড়ির চাতালে বসে থাকলাম। লক্ষ্মী এল, দুবার জল নিয়ে গেল। সে যেন আমাকে চিনতেই পারে না। মরিয়া হয়ে শেষ বেলায় বললাম, লক্ষ্মী, দাদাকে বলে তোমার বিয়ের ব্যবস্থা করছি। মজা বুঝবে। লক্ষ্মী কেমন আঁৎকে উঠল। লক্ষ্মী ভারি যুবতী নারীর মতো বলল, মাস্টার, কপালে আমার সয় না। সে মানুষটার অনিষ্ট হোক আমি চাই না। এই ভাল আছি। এইটুকু বলে সে চলে গেল। বুঝতে পারছিলাম, লক্ষ্মী নিজেকে আর জড়াতে চায় না। তার ধারণা, সে মানুষের জন্য টান বোধ করলে জগৎ-জননী রাগ করে। তাকে কেড়ে নেয়। সে সারা জীবনের জন্য বোধহয় এইখানে সেবাদাসী হয়ে পড়ে থাকতে চায়। আর কিছু জীবনে তার কাম্য নয়।

    ঝিলে কিছু পাখি উড়ে এল, ওপাড়ের বাঁশবনে কারা আগুন জ্বেলেছে। শীত শীত করছিল। কিন্তু উঠতে ইচ্ছা হচ্ছিল না। আকাশে কিছু নক্ষত্র। নিরিবিলি এক জনশূন্য পৃথিবীর আমি বাসিন্দা। মানুষের কত রকমের সংস্কার গড়ে ওঠে বড় হয়ে উঠতে উঠতে। এক সময় দেখলাম, লক্ষ্মী লন্ঠন হাতে চলে এসেছে। হাতে শীতের চাদর। শুধু বলল, বাড়ি চল মাস্টার। ঠান্ডা লাগবে। এটা গায়ে দাও। ঠান্ডা লাগিয়ে জ্বর বাধালে কে দেখবে।

    –কেন তুমি।

    —আমি তোমার কে? কেউ না। আমার দায় পড়েছে দেখার। অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে কথাগুলি বলল লক্ষ্মী। লণ্ঠনের আলোয় মুখ দেখা যাচ্ছিল না। বুঝতে পারছি লক্ষ্মী আমার অমঙ্গল আশঙ্কায় কাতর হয়ে পড়ছে। কিছু একটা না আবার মাস্টারের হয়। সে তারপর বলল, বাড়ি চল মাস্টার। মানুষের মুখে আকথা কুকথা লেগেই থাকে। তুমি আর আমাকে জ্বালিও না। অনেক রাত হয়েছে। এবারে ওঠো। তারপর লক্ষ্মী আমাকে দরজায় পৌঁছে দিয়ে চলে গেল। যাবার সময় শুধু বলল, ভারি ছেলেমানুষ তুমি।

    এ কথায় কেন যে ক্ষিপ্ত হয়ে গেলাম। দৌড়ে গেলাম, সে মন্দিরের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে। লন্ঠনটা কেড়ে মুখের কাছে নিয়ে গেলাম। —দেখি তোমার মুখ। আমি ছেলেমানুষ, তুমি কে! কেমন মাথাটা লক্ষ্মীর কথায় ঝাঁ ঝাঁ করে উঠেছিল। প্রায় পাগলের মতোই কান্ডটা করে ফেলেছি। —দেখি মুখ, খোল। খোল বলছি। লক্ষ্মীর আঁচল নিয়ে কাড়াকাড়ি করছি।

    লক্ষ্মী শাড়ির আঁচলে মুখ ঢেকে রেখেছে। না না দেখ না মাস্টার, পায়ে পড়ি। আমার মুখ দেখলে তোমার অনিষ্ট হবে মাস্টার। তারপরই কেমন আকুল কান্নায় ভেঙে পড়ল। সত্যি ভারি ছেলেমানুষী করে ফেলেছি। কেউ দেখে ফেললে কি ভাবত। চুপচাপ ঘরে এসে বসলাম। নটু পটুকে বললাম, আজ তোদের ছুটি।

    আজ পড়াব না। ওরা চলে গেলে রেল লাইন ধরে অনেকটা হেঁটে গেলাম। জ্যোৎস্না রাত— আমার কেন জানি কিছুই ভালো লাগছে না। কেমন ভিতরে চঞ্চল বালকের মতো এক তীব্র অস্থিরতায় পাগল হয়ে উঠেছিলাম। তারপরই দেখলাম হাঁটতে হাঁটতে সেই নবমী বুড়ির বনটার কাছে এসে গেছি। মানুষ বুঝি শেষ পর্যন্ত এখানেই এসে থামে। কখনও খর রোদ, কখনও জ্যোৎস্না, কখনও গাছপালার নিরন্তর ছায়া। মানুষ এভাবেই সামনে হেঁটে যায়। বনভূমির এক আশ্চর্য নিথর সৌন্দর্যে আমি কেমন মুগ্ধ হয়ে গেলাম। আমার চাঞ্চল্য কমে গেল। ধীরে ধীরে ফের রেল লাইন ধরে হেঁটে ফিরতে থাকলাম। মনে হচ্ছিল যেন কারা আমার চারপাশে ঘোরাফেরা করছে। তাদের পায়ের শব্দ আমাকে ঘরবাড়ি ছেড়ে অন্য কোথাও যেন যেতে বলছে। হাহাক্কার হাসিতে টের পাচ্ছিলাম। তারা আমায় কোন ফুলের উপত্যকায় নিয়ে যেতে চায়। আমি সব ছেড়ে, ঘরবাড়ি ফেলে, এখন সেদিকেই হাঁটছি। উপত্যকার দুই প্রান্তে আমি আর পিলু দাঁড়িয়ে। নির্জন সেই উপত্যকায় আমাদের দু’জনের মাঝখানে কেউ কেবল আঁচল উড়িয়ে নৃত্য করছে। পিলুর আর সেই ডাক ‘দাদারে’ শুনতে পাচ্ছি না। সে বার বার ডেকেও আমার সাড়া পাচ্ছে না।