হাঁটতে কষ্ট হচ্ছে ওর। দেহটা কাঁপছে। বুকের মধ্যে একটা চিনচিনে ব্যথা। যন্ত্রণা। কাসেদের মনে হলো এ মুহূর্তে এখান থেকে ছুটে দূরে কোথাও পালিয়ে যেতে পারলে যেন কিছুটা শান্তি পেত সে। স্বস্তি পেতো। মাথাটা ভার হয়ে আসছে। ধীরে ধীরে। মনে হচ্ছে দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গড়িয়ে পড়তে চায় মাটিতে।

কেন এমন হলো?

পা থেকে মাথা পর্যন্ত জাহানারাকে দেখে নিলো কাসেদ। আজ ওকে আগের চেয়ে অনেক বেশি সুন্দর দেখাচ্ছে। অনেক আকর্ষণীয়। ওর চোখের আর মুখের লাবণ্য অনেক বেড়ে গেছে। কথার মধ্যেও আশ্চর্য পরিবর্তন।

কাসেদের মনে হলো সে যেন এ মুহুর্তে আরো বেশি করে ভালবেসে ফেলেছে ওকে। তাকে পাবার আকাঙ্ক্ষা আরো তীব্র হয়ে দেখা দিয়েছে ওর মনে।

না। জাহানারাকে বাদ দিয়ে ভবিষ্যতের কোন কিছুই কল্পনা করতে পারে না কাসেদ। কিছুই না।

জাহানারা শুধালো, চা খাবেন, না কফি?

কাসেদ কোন উত্তর দিলো না। শুধু একদৃষ্টি তাকিয়ে রইলো ওর দিকে।

জাহানারা বললো, আপনার কী হয়েছে বলুন তো? আজ কেমন যেন অন্য রকম মনে হচ্ছে আপনাকে।

কাসেদ মনে মনে ভাবলো, পরিবর্তন আমার মধ্যে নয়, তোমার মধ্যে এসেছে। তুমি আগের সেই মেয়েটি নেই, সম্পূর্ণ ভিন্ন।

কিন্তু মুখে বললো, আমার শরীরটা ভালো নেই।

সে কী, অসুখ করে নি তো? জাহানারার চোখেমুখে আতঙ্কের ছায়াপাত হলো। হাত বাড়িয়ে ওর কপাল স্পর্শ করে দেখলে সে, বললো, কই টেম্পারেচার নেই তো?

শিউলী বললো, ওর তো জ্বর হয়নি যে টেম্পরেচার পাবে। ওর শরীর খারাপ করছে।

জাহানারা বললো, এক কাপ কফি খান, শরীর ভালো হয়ে যাবে।

কাসেদ বললো, থাক। এখন আমার কিছুই খেতে ইচ্ছে করছে না। তাছাড়া এখনই আমাকে উঠতে হবে।

জাহানারা চোখ বড় বড় করে বললো, সেকি, এই এলেন আর চলে যাবেন?

কথাটা কানে গেলো না ওর। ও তখন ভাবছে জাহানারার জন্যে একটা সেতারের মাষ্টার ঠিক না করে দিয়ে কত বড় ভুল করেছে। জাহানারা বারবার করে বলেছিলো, একটা মাষ্টার ঠিক করে দিন। তখন যদি ওর অনুরোধ রক্ষা করতো সে তাহলে হয়তো এত বড় বিপর্যয় ঘটতো না।

শিউলী শুধালো, আপনি কি বাসায় ফিরবেন?

কাসেদ বললো, হ্যাঁ।

খুলে যাওয়া খোঁপাটা ভালো করে বাঁধতে বাঁধতে জাহানারা জানালার পাশে সরে দাঁড়ালো। তারপর সেখান থেকে জিজ্ঞেস করলো, রোববার দিন বিকেলে কি আপনি বাসায় থাকবেন?

কেনো?

যদি থাকেন তাহলে বাসায় আসবো। আপনার সঙ্গে কিছু কথা আছে আমার। বুকটা আবার মোচড় দিয়ে উঠলো ওর। আড়চোখে একবার ওকে দেখে নিয়ে বললো, রোববার ছাড়া অন্য কোন দিন আসতে পারেন না?

জাহানারা বললো, রোববার দিন আমার ছুটি কিনা তাই। অন্যদিন গেলে আমার সেতার শেখা হবে না। মাষ্টার ভীষণ রাগ করবেন।

আবার সেতার শেখা!

আবার সেতারের মাষ্টার!

রাগে দেহটা জ্বালা করে উঠলো ওর। পরক্ষণে উঠে দাঁড়িয়ে বললো, ঠিক আছে, আমি বাসায় থাকবো, আসবেন। এখন চলি।

ওর সঙ্গে শিউলীও উঠে দাঁড়ালো। আমার একটা কথা রাখবেন কাসেদ সাহেব?

কী?

বাড়ি যাবার পথে আমাকে হোষ্টেলে পৌঁছে দিয়ে যাবেন?

কিন্তু…কাসেদ ইতস্তত করে বললো, পথটা তো এক হলো না। উল্টো।

শিউলী বললো, আমার জন্যে না হয় একটু উল্টো পথ ঘুরেই গেলেন। যাবেন কি?

কাসেদ জাহানারার দিকে এক পলক তাকালো; ও জানালা গলিয়ে বাইরে আকাশ দেখছে, দেখুক।

কাসেদ বললো, যাবো বইকি, চলুন। গলার স্বরে উৎসাহের আধিক্য দেখে নিজেই চমকে উঠলো। বুঝতে পারলো না কথাটা হঠাৎ এত জোরের সঙ্গে কেন বলতে গেলো সে।

জানালা থেকে সরে এলো জাহানারা।

শিউলী শুধালো, তুমি এখন ঘরে বসে বসে করবে কী জাহানারা?

জাহানারা ধীর গলায় বললো, কী আর করবো, মাষ্টার একটা নতুন গদ দিয়ে গেছেন, বসে বসে সেতার বাজাবো।

আবার মাষ্টার!

আবার সেতার!

শিউলীকে সঙ্গে নিয়ে বাইরে বেরিয়ে এলো কাসেদ।

কিছুই ভালো লাগছে না।

মনটা একেবারে শূন্য হয়ে গেছে ওর।

আকাশে অনেক তারা জ্বলছে। রাস্তায় অনেক লোক। বাতাসে কার বাগানের মিষ্টি গন্ধ আসছে ভেসে। কিন্তু এর কোন কিছু দিয়ে এ শূন্যতা ভরানো যাবে না।

শুনেছেন? সহসা কাসেদ বললো, আপনার প্রস্তাব মেনে নিয়েছি। আপনি আমার একটা কথা রাখুন। আজ।

কী কথা? শিউলীর দুচোখে ঔৎসুক্য ভীড় করেছে এসে।

কাসেদ মৃদু গলায় বললো, আমার সঙ্গে একটু বেড়াবেন। ঘুরবেন যেখানে যেখানে আমি নিয়ে যাই। আজ বড় একা লাগছে আমার।

শিউলী ভ্রূজোড়া প্রসারিত করে তাকালো ওর দিকে, তারপর হেসে বললো, কিন্তু আমাকে যে ন’টার মধ্যে হোষ্টেলে ফিরতে হবে, নইলে সুপার ভেতরে ঢুকতে দেবে না। শেষে অনেক ঝামেলা পোহাতে হবে।

কাসেদ ম্লান হেসে বললো, আমি যদি আপনার জন্যে উল্টো পথে পাড়ি দিতে পারি, আপনি আমার জন্য এ ঝামেলার ঝুঁকিটা নিতে পারেন না?

কিন্তু কেন বলুন তো? কণ্ঠে ঈষৎ বিস্ময় নিয়ে শিউলী শুধালো, আজ হঠাৎ বেড়াতে ইচ্ছে হলো কেন আপনার? বিশেষ করে আমাকে সঙ্গে নিয়ে।

কাসেদ সহসা জবাব দিলো না।

নীরবে কী যেন ভাবলো।

জাহানারা, কেন এমন করলে তুমি! তোমাকে ভালবেসে পরিপূর্ণ ছিলাম আমি। যেদিকে তাকাতাম ভালো লাগতো আমার। আজ আকাশের নীল আর নিওনের আলো সব কিছু বিবৰ্ণ মনে হচ্ছে আমার চোখে।

কেন এমন হলো জাহানারা?

আমি জাহানারা নই, শিউলী। শিউলী মিটমিটি হাসছে। কপালে কয়েকটা ভাঁজ পড়েছে ওর।

কাসেদ অপ্ৰস্তুত হয়ে গিয়ে বললো, না–মানে। কথাটা শেষ করলো না সে। সহসা শিউলীর একখানা হাত নিজের হাতে তুলে নিয়ে আবেগভরা গলায় কাসেদ বললো, আচ্ছা! বলতে পারেন, আমি যা চাই তা পাইনে কেন?

হাতখানা সরিয়ে নিলো না শিউলী। মৃদু চাপ দিয়ে শুধু বললো, চাওয়া পাওয়ার সঙ্গে সাপে-নেউলের সম্পর্ক রয়েছে যে। এই দেখুন না, আমি চাই ছেলেদের সঙ্গে বন্ধু হিসেবে মিশতে আর ওরা চায় আমাকে ঘরের গিনী হিসেবে পেতে। ভাবুন তো কেমন বিচ্ছিরি ব্যাপার। শিউলী হাসল শব্দ করে। কিন্তু আপনাকে যদি কেউ গিনী হিসেবে পেতে চায়, সেটা কি অন্যায়?

ওর হাতে একটা নাড়া দিলো শিউলী।

শিউলী পরক্ষণে বললো, একতরফা চাওয়াটা অন্যায় বইকি।

কথাটা তীরের ফলার মত এসে বিঁধল ওর বুকে।

শিউলী কি বলতে চায় জাহানারার সঙ্গে একতরফা প্ৰেম করে অন্যায় করেছে কাসেদ? না। আপনার সঙ্গে একমত হতে পারলাম না। আমি। কাসেদ জোরের সঙ্গে বললো, ভালবাসা অন্যায় নয়। সে একতরফা হোক কিম্বা দুতরফা। হাতখানা ওর হাত থেকে টেনে নিয়ে শিউলী অপূর্ব কণ্ঠে বললো, ধরুন আমি যদি আপনাকে ভালবাসি। আপনি কি তা সহজ করে নিতে পারেন? অবশ্য, আপনাকে ভালবাসতে যাওয়ার কোন প্রশ্নই আসছে না।

কেন, কেন বলুন তো; শিউলীর কথার জবাব দিতে গিয়ে বিচলিত বোধ করলো কাসেদ। সে বুঝে উঠতে পারলো না। আর পাঁচটি ছেলেকে যদি ভালবাসা যেতে পারে, ওকে কেন নয়।

শিউলী কিছুক্ষণ স্থির চোখে তাকিয়ে রইলো তার দিকে, তারপর বললো, এসব কেনর উত্তর দেয়া কঠিন কাসেদ সাহেব। আমার তরফ থেকে কিছু বলতে গেলে বলতে হয়, আপনি বন্ধু হিসেবে অত্যন্ত ভালো, কিন্তু প্রেমিক হিসেবে নন। বলে মুখ টিপে হাসলো সে।
নিজেকে বড় অসহায় মনে হলো কাসেদের।

হাত-পাগুলো ভেঙ্গে আসছে।

না, আমি তো বন্ধু হিসেবে জাহানারাকে পেতে চাইনে।

আমি চাই আরো আপন করে।

একান্তভাবে নিজের করে।

কেন, কেন আমাকে ভালবাসা যেতে পারে না? আবেগের চাপে গলাটা ভেঙ্গে আসছে তার। আপনি কী মনে করেন- কথাটা শেষ করতে পারলো না কাসেদ। শিউলীর হাসির শব্দে থেমে গেলো। শিউলী বললো, আপনার কী যেন হয়েছে আজ। এসব বাদ দিয়ে এখন বাসায় ফিরে যান; আমারও হোষ্টেলে যেতে হবে।

কাসেদ কোন জবাব দেবার আগেই রিক্সাওয়ালাকে হোষ্টেলের পথে যাবার নির্দেশ দিলো শিউলী।

পথে আর কোন কথা হলো না।

শিউলী চুপ। ঠোঁটের কোণে শুধু একটুখানি হাসি। মাঝে মাঝে জেগে আবার মিলিয়ে যাচ্ছে।

কাসেদ নীরব। মাথাটা ভীষণ ব্যথা করছে ওর।

সারা রাত ঘুমালো না সে।

সকালে স্নান সেরে বড় সাহেবের কাছে একখানা দরখাস্ত লিখলো কাসেদ। দিন সাতেকের ছুটি চাই।

এ সাত দিন কোথাও বেরুবে না সে।

একা ঘরে বসে থাকবে। শুধু ভাববে। আর ভাববে।

কেন এমন হলো?

Leave a Reply