Category: সুকান্ত ভট্টাচার্য

  • সহসা

    সহসা

    সহসা

    আমার গোপন সূর্য হল অস্তগামী

    এপারে মর্মরধ্বনি শুনি,

    নিস্পন্দ শবের রাজ্য হতে

    ক্লান্ত চোখে তাকাল শকুনি।

    গোধূলি আকাশ ব’লে দিল

    তোমার মরণ অতি কাছে,

    তোমার বিশাল পৃথিবীতে

    এখনো বসন্ত বেঁচে আছে।

    অদূরে নিবিড় ঝাউবনে

    যে কালো ঘিরেছে নীরবতা,

    চোখ তারই দীর্ঘায়িত পথে

    অস্পষ্ট ভাষায় কয় কথা।

    আমার দিনান্ত নামে ধীরে

    আমি তো সুদূর পরাহত,

    অশত্থশাখায় কালো পাখি

    দুশ্চিন্তা ছড়ায় অবিরত।

    সন্ধ্যাবেলা, আজ সন্ধ্যাবেলা

    নিষ্ঠুর তমিস্রা ঘনাল কী!

    মরণ পশ্চাতে বুঝি ছিল

    সহসা উদার চোখাচোখি॥

  • স্মারক

    স্মারক

    স্মারক

    আজ রাতে যদি শ্রাবণের মেঘ হঠাৎ ফিরিয়া যায়

    তবুও পড়িবে মনে,

    চঞ্চল হাওয়া যদি ফেরে হৃদয়ের আঙ্গিনায়

    রজনীগন্ধা বনে,

    তবুও পড়িবে মনে।

    বলাকার পাখা আজও যদি উড়ে সুদূর দিগঞ্চলে

    বন্যার মহাবেগে,

    তবুও আমার স্তব্ধ বুকের ক্রন্দন যাবে মেলে

    মুক্তির ঢেউ লেগে,

    বন্যার মহাবেগে।

    বাসরঘরের প্রভাতের মতো স্বপ্ন মিলায় যদি

    বিনিদ্র কলরবে

    তবুও পথের শেষ সীমাটুকু চিরকাল নিরবধি

    পার হয়ে যেতে হবে,

    বিনিদ্র কলরবে।

    মদিরাপাত্র শুষ্ক যখন উৎসবহীন রাতে

    বিষণ্ণ অবসাদে

    বুঝি বা তখন সুপ্তির তৃষা ক্ষুব্ধ নয়নপাতে

    অস্থির হয়ে কাঁদে,

    বিষণ্ণ অবসাদে।

    নির্জন পথে হঠাৎ হাওয়ার আসক্তিহীন মায়া

    ধূলিরে উড়ায় দূরে,

    আমার বিবাগী মনের কোণেতে কিসের গোপন ছায়া

    নিঃশ্বাস ফেলে সুরে;

    ধূলিরে উড়ায় দূরে।

    কাহার চকিত-চাহনি-অধীর পিছনের পানে চেয়ে

    কাঁদিয়া কাটায় রাতি,

    আলেয়ার বুকে জ্যোৎস্নার ছবি সহসা দেখিতে পেয়ে

    জ্বালে নাই তার বাতি,

    কাঁদিয়া কাটায় রাতি।

    বিরহিণী তারা আঁধারের বুকে সূর্যেরে কভু হায়

    দেখেনিকো কোনো ক্ষণে।

    আজ রাতে যদি শ্রাবণের মেঘ হঠাৎ ফিরিয়া যায়

    হয়তো পড়িবে মনে,

    রজনীগন্ধা বনে॥

  • নিবৃত্তির পূর্বে

    নিবৃত্তির পূর্বে

    নিবৃত্তির পূর্বে

    দুর্বল পৃথিবী কাঁদে জটিল বিকারে,

    মৃত্যুহীন ধমনীর জ্বলন্ত প্রলাপ;

    অবরুদ্ধ বক্ষে তার উন্মাদ তড়িৎ;

    নিত্য দেখে বিভীষিকা পূর্ব অভিশাপ।

    ভয়ার্ত শোণিত-চক্ষে নামে কালোছায়া,

    রক্তাক্ত ঝটিকা আনে মূর্ত শিহরণ–

    দিক্‌প্রান্তে শোকাতুরা হাসে ক্রূর হাসি,

    রোগগ্রস্ত সন্তানের অদ্ভুত মরণ।

    দৃষ্টিহীন আকাশের নিষ্ঠুর সান্ত্বনা :

    ধূ-ধূ করে চেরাপুঞ্জি-সহিষ্ণু হৃদয়।

    ক্লান্তিহারা পথিকের অরণ্য ক্রন্দন :

    নিশীথে প্রেতের বুকে জাগে মৃত্যুভয়॥

  • স্বপ্নপথ

    স্বপ্নপথ

    স্বপ্নপথ

    আজ রাত্রে ভেঙে গেল ঘুম,

    চারিদিক নিস্তব্ধ নিঃঝুম,

    তন্দ্রাঘোরে দেখিলাম চেয়ে

    অবিরাম স্বপ্নপথ বেয়ে

    চলিয়াছে দুরাশার স্রোত,

    বুকে তার বহু ভগ্ন পোত।

    বিফল জীবন যাহাদের,

    তারাই টানিছে তার জের;

    অবিশ্রান্ত পৃথিবীর পথে,

    জলে স্থলে আকাশে পর্বতে।

    একদিন পথে যেতে যেতে

    উষ্ণ বক্ষ উঠেছিল মেতে

    যাহাদের, তারাই সংঘাতে

    মৃত্যুমুখী, ব্যর্থ রক্তপাতে॥

  • সুতরাং

    সুতরাং

    সুতরাং

    এত দিন ছিল বাঁধা সড়ক,

    আজ চোখে দেখি শুধু নরক!

    অত আঘাত কি সইবে,

    যদি না বাঁচি দৈবে?

    চারি পাশে লেগে গেছে মড়ক!

    বহুদিনকার উপার্জন,

    আজ দিতে হবে বিসর্জন।

    নিষ্ফল যদি পন্থা;

    সুতরাং ছেঁড়া কন্থা

    মনে হয় শ্রেয় বর্জন॥

  • বুদ্বুদ মাত্র

    বুদ্বুদ মাত্র

    বুদ্বুদ মাত্র

    মৃত্যুকে ভুলেছ তুমি তাই,

    তোমার অশান্ত মনে বিপ্লব বিরাজে সর্বদাই।

    প্রতিদিন সন্ধ্যাবেলা মৃত্যুকে স্মরণ ক’রো মনে,

    মুহূর্তে মুহূর্তে মিথ্যা জীবন ক্ষরণে, –

    তারি তরে পাতা সিংহাসন,

    রাত্রি দিন অসাধ্য সাধন।

    তবুও প্রচণ্ড-গতি জীবনের ধরা,

    নিয়ত কালের কীর্তি দিতেছে পাহারা,

    জন্মের প্রথম কাল হতে,

    আমরা বুদ্বুদ মাত্র জীবনের স্রোতে।

    এ পৃথিবী অত্যন্ত কুশলী,

    যেখানে কীর্তির নামাবলী,

    আমাদের স্থান নেই সেথা –

    আমরা শক্তের ভক্ত, নহি তো বিজেতা॥

  • আলো–অন্ধকার

    আলো–অন্ধকার

    আলো–অন্ধকার

    দৃষ্টিহীন সন্ধ্যাবেলা শীতল কোমল অন্ধকার

    স্পর্শ ক’রে গেল মোরে। স্বপনের গভীর চুম্বন,

    ছন্দ-ভাঙা স্তব্ধতায় ভ্রান্তি এনে দিল চিরন্তন।

    অহর্নিশি চিন্তা মোর বিক্ষুব্ধ হয়েছে; প্রতিবার

    স্নায়ুতে স্নায়ুতে দেখি অন্ধকারে মৃত্যুর বিস্তার।

    মুহূর্ত-কম্পিত-আমি বন্ধ করি অলৌকিক গান,

    প্রচ্ছন্ন স্বপন মোর আক্ষরিক মিথ্যার পাষাণ,

    কঠিন প্রলুব্ধ চিন্তা নগরীতে নিষ্ফল আমার।

    তবু চাই রুদ্ধতায় আলোকের আদিম প্রকাশ,

    পৃথিবীর গন্ধ নেই এমন দিবস বারোমাস।

    আবার জাগ্রত মোর দুষ্ট চিন্তা নিগূঢ় ইঙ্গিতে;

    ভুঁইচাঁপা সুরভির মরণ অস্তিত্বময় নয়,

    তার সাথে কল্পনার কখনো হবে না পরিচয়;

    তবু যেন আলো আর অন্ধকার মোর চারিভিতে॥

  • প্রতিদ্বন্দ্বী

    প্রতিদ্বন্দ্বী

    প্রতিদ্বন্দ্বী

    গন্ধ এনেছে তীব্র নেশায়, ফেনিল মদির,

    জোয়ার কি এল রক্ত নদীর?

    নইলে কখনো নিস্তার নেই বন্দীশালায়।

    সচারাচর কি সামনা সামনি ধূর্ত পালায়?

    কাজ নেই আর বল্লাল সেন-ই আমলে,

    মুক্তি পেয়েছি ধোঁয়াতে নিবিড় শ্যামলে,

    তোমাতে আমাতে চিরদিন চলে দ্বন্দ্ব।

    ঠাণ্ডা হাওয়ায় তীব্র বাঁশির ছন্দ।

    মনেরে জাগায় সাবধান হুঁশিয়ার।

    খুঁজে নিতে হবে পুরাতন হাতিয়ার

    পাণ্ডুর পৃথিবীতে।

    আফিঙের ঘোর মেরু-বর্জিত শীতে

    বিষাক্ত আর শিথিল আবেষ্টনে

    তোমারে স্মরিছে মনে।

    সন্ধান করে নিত্য নিভৃত রাতে

    প্রতিদ্বন্দ্বী, –উচ্ছল মদিরাতে॥

  • আমার মৃত্যুর পর

    আমার মৃত্যুর পর

    আমার মৃত্যুর পর

    আমার মৃত্যুর পর থেমে যাবে কথার গুঞ্জন,

    বুকের স্পন্দনটুকু মূর্ত হবে ঝিল্লীর ঝংকারে

    জীবনের পথপ্রান্তে ভুলে যাব মৃত্যুর শঙ্কারে,

    উজ্জ্বল আলোর চোখে আঁকা হবে আঁধার-অঞ্জন।

    পরিচয়ভারে ন্যুব্জ অনেকের শোকগ্রস্ত মন,

    বিস্ময়ের জাগরণে ছদ্মবেশ নেবে বিলাপের

    মুহূর্তে বিস্মৃত হবে সব চিহ্ন আমার পাপের।

    কিছুকাল সন্তর্পণে ব্যক্ত হবে সবার স্মরণ।

    আমার মৃত্যুর পর, জীবনের যত অনাদর

    লাঞ্ছনার বেদনায়, ষ্পৃষ্ট হবে প্রত্যেক অন্তর॥

  • স্বতঃসিদ্ধ

    স্বতঃসিদ্ধ

    স্বতঃসিদ্ধ

    মৃত্যুর মৃত্তিকা ‘পরে ভিত্তি প্রতিকূল –

    সেখানে নিয়ত রাত্রি ঘনায় বিপুল;

    সহসা চৈত্রের হাওয়া ছড়ায় বিদায় :

    স্তিমিত সূর্যের চোখে অন্ধকার ছায়।

    বিরহ-বন্যার বেগে প্রভাতের মেঘ

    রাত্রির সীমায় এসে জানায় আবেগ,

    ধূসর প্রপঞ্চ-বিশ্ব উন্মুক্ত আকাশে

    অনেক বিপন্ন স্মৃতি বয়ে নিয়ে আসে।

    তবু তো প্রাণের মর্মে প্রচ্ছন্ন জিজ্ঞাসা

    অজস্র ফুলের রাজ্যে বাঁধে লঘু বাসা;

    রাত্রির বিবর্ণ স্মৃতি প্রভাতের বুকে

    ছড়ায় মলিন হাসি নিরর্থ-কৌতুকে॥

  • মুহূর্ত

    মুহূর্ত

    মুহূর্ত

    এমন মুহূর্ত এসেছিল

    একদিন আমার জীবনে

    যে মুহূর্তে মনে হয়েছিল

    সার্থক ভুবনে বেঁচে থাকা :

    কালের আরণ্য পদপাত

    ঘটেছিল আমার গুহায়।

    জরাগ্রস্ত শীতের পাতারা

    উড়ে এসেছিল কোথা থেকে,

    সব কিছু মিশে একাকার

    কাল-বোশেখীর পদার্পণে

    সেদিন হাওয়ায় জমেছিল

    অদ্ভুত রোমাঞ্চ দিকে দিকে;

    আকাশের চোখে আশীর্বাদ,

    চুক্তি ছিল আমৃত্যু জীবনে।

    সে সব মুহূর্তগুলো আজো

    প্রাণের অষ্পষ্ট প্রশাখায়

    ফোটায় সবুজ ফুল,

    উড়ে আসে কাব্যের মৌমাছি।

    অসংখ্য মুহূর্তে গ’ড়ে তোলা

    স্বপ্ন-দুর্গ মুহূর্তে চুরমার।

    আজ কক্ষচ্যুত ভাবি আমি

    মুহূর্তকে ভুলে থাকা বৃথা; –

    যে মুহূর্ত অদৃশ্য প্লাবনে

    টেনে নিয়ে যায় কক্ষান্তরে।

    আজ আছি নক্ষত্রের দলে,

    কাল জানি মুহূর্তের টানে

    ভেসে যাব সূর্যের সভায়,

    ক্ষুব্ধ কালো ঝড়ের জাহাজে॥

  • তরঙ্গ ভঙ্গ

    তরঙ্গ ভঙ্গ

    তরঙ্গ ভঙ্গ

    হে নাবিক, আজ কোন্ সমুদ্রে

    এল মহাঝড়,

    তারি অদৃশ্য আঘাতে অবশ

    মরু-প্রান্তর।

    এই ভুবনের পথে চলবার

    শেষ-সম্বল

    ফুরিয়েছে, তাই আজ নিরুক্ত

    প্রাণ চঞ্চল।

    আজ জীবনেতে নেই অবসাদ!

    কেবল ধ্বংস, কেবল বিবাদ–

    এই জীবনের একী মহা উৎকর্ষ!

    পথে যেতে যেতে পায়ে পায়ে সংঘর্ষ।

    (ছুটি আজ চাই ছুটি,

    চাই আমাদের সকালে বিকালে দুটি

    নুন-ভাত, নয় আধপোড়া কিছু রুটি!)

    –একী অবসাদ ক্লান্তি নেমেছে বুকে,

    তাইতো শক্তি হারিয়েছি আজ

    দাঁড়াতে পারি না রুখে।

    বন্ধু, আমরা হারিয়েছি বুঝি প্রাণধারণের শক্তি,

    তাইতো নিঠুর মনে হয় এই অযথা রক্তারক্তি।

    এর চেয়ে ভাল মনে হয় আজ পুরনো দিন,

    আমাদের ভাল পুরনো, চাই না বৃথা নবীন॥

  • আসন্ন আঁধারে

    আসন্ন আঁধারে

    আসন্ন আঁধারে

    নিশুতি রাতের বুকে গলানো আকাশ ঝরে –

    দুনিয়ায় ক্লান্তি আজ কোথা?

    নিঃশব্দে তিমির স্রোত বিরক্ত-বিস্বাদে

    প্রগল্‌ভ আলোর বুকে ফিরে যেতে চায়।

    –তবে কেন কাঁপে ভীরু বুক?

    স্বেদ-সিক্ত ললাটের শেষ বিন্দুটুকু

    প্রখর আলোর সীমা হতে

    বিচ্ছিন্ন করেছে যেন সাহারার নীরব ইঙ্গিতে।

    কেঁদেছিল পৃথিবীর বুক।

    গোপনে নির্জনে

    ধাবমান পুঞ্জ পুঞ্জ নক্ষত্রের কাছে

    পেয়েছিল অতীত বারতা?

    মেরুদণ্ড জীর্ণ তবু বিকৃত ব্যথায়

    বার বার আর্তনাদ করে

    আহত বিক্ষত দেহ, –মুমূর্ষু চঞ্চল,

    তবুও বিরাম কোথা ব্যগ্র আঘাতের।

    প্রথম পৃথিবী আজ জ্বলে রাত্রিদিন

    আবাল্যের সঞ্চিত দাহনে

    চিরদিন দ্বন্দ্ব চলে জোয়ার ভাঁটায়,

    আষাঢ়ের ক্ষুব্ধ-ছায়া বসন্তের বুকে

    এসে পড়েছিল একদিন–

    উদ্‌ভ্রান্ত পৃথিবী তাই ছুটেছে পিছনে

    আলোরে পশ্চাতে ফেলি, দূরে– বহু দূরে

    যত দূরে দৃষ্টি যায় –

    চেয়ে দেখি ঘিরেছে কুয়াশা।

    উড়ন্ত বাতাসে আজ কুমেরু কঠিন

    কোথা হতে নিয়ে এল জড় অন্ধকার,

    –এই কি পৃথিবী?

    একদিন জ্বলেছিল বুকের জ্বালায় –

    আজ তার শব দেহ নিঃস্পন্দ অসাড়॥

  • পরিবেশন

    পরিবেশন

    পরিবেশন

    সান্ধ্য ভিড় জমে ওঠে রেস্তোরাঁর দুর্লভ আসরে,

    অর্থনীতি, ইতিহাস, সিনেমার পরিচ্ছন্ন পথে –

    খুঁজে ফেরে অনন্তের বিলুপ্ত পর্যায়।

    গন্ধহীন আনন্দের অন্তিম নির্যাস

    এক কাপ চা-এ আর রঙিন সজ্জায়।

    সম্প্রতি নীরব হল; বিনিদ্র বাসরে

    ধূমপান চলে : তবে ভবতরী তাস।

    স্মৃতি-ভ্রষ্ট উঞ্ছজীবী চলে কোন মতে।

    জড়-ভরতের দল বসে আছে পার্কের বেঞ্চিতে,

    পবিত্র জাহ্নবী-তীরে প্রার্থী যত বেকার যুবক।

    কতক্ষণ? গঞ্জনার বড় তীব্র জ্বালা–

    বিবাগী প্রাণের তবু গৃহগত টান।

    ক্রমে গোঠে সন্ধ্যা নামে : অন্তরও নিরালা,

    এই বার ফিরে চলো, ভাগ্য সবই মিতে;

    দূরে বাজে একটানা রেডিয়োর গান।

    এখনো হয় নি শূন্য, ক্রমাগত বেড়ে চলে সখ।

    ক্ষীণ শব্দ ভেসে আসে, আগমনী পশ্চিমা হাওয়ায়,

    সুপ্রাচীন গুরুভক্তি আজো আনে উন্মুক্ত লালসা।

    চুপ করে বসে থাকো অন্ধকার ঘরে এক কোণে :

    রাম আর রাবণের উভয়েরই হাতে তীক্ষ্ণ কশা॥

  • অসহ্য দিন

    অসহ্য দিন

    অসহ্য দিন

    অসহ্য দিন! স্নায়ু উদ্বেল। শ্লথ পায়ে ঘুরি ইতস্তত

    অনেক দুঃখে রক্ত আমার অসংযত।

    মাঝে মাঝে যেন জ্বালা করে এক বিরাট ক্ষত

    হৃদয়গত।

    ব্যর্থতা বুকে, অক্ষম দেহ, বহু অভিযোগ আমার ঘাড়ে

    দিন রাত শুধু চেতনা আমাকে নির্দয় হাতে চাবুক মারে।

    এখানে ওখানে, পথে চলতেও বিপদকে দেখি সমুদ্যত,

    মনে হয় যেন জীবনধারণ বুঝি খানিকটা অসঙ্গত॥

  • উদ্যোগ

    উদ্যোগ

    উদ্যোগ

    বন্ধু, তোমার ছাড়ো উদ্বেগ, সুতীক্ষ্ণ করো চিত্ত,

    বাংলার মাটি দুর্জয় ঘাঁটি বুঝে নিক দুর্বৃত্ত।

    মূঢ় শত্রুকে হানো স্রোত রুখে, তন্দ্রাকে করো ছিন্ন,

    একাগ্র দেশে শত্রুরা এসে হয়ে যাক নিশ্চিহ্ন।

    ঘরে তোল ধান, বিপ্লবী প্রাণ প্রস্তুত রাখ কাস্তে,

    গাও সারিগান, হাতিয়ারে শান দাও আজ উদয়াস্তে।

    আজ দৃঢ় দাঁতে পুঞ্জিত হাতে প্রতিরোধ করো শক্ত,

    প্রতি ঘাসে ঘাসে বিদ্যুৎ আসে জাগে সাড়া অব্যক্ত।

    আজকে মজুর হাতুড়ির সুর ক্রমশই করে দৃপ্ত,

    আসে সংহতি; শত্রুর প্রতি ঘৃণা হয় নিক্ষিপ্ত।

    ভীরু অন্যায় প্রাণ-বন্যায় জেনো আজ উচ্ছেদ্য,

    বিপন্ন দেশে তাই নিঃশেষে ঢালো প্রাণ দুর্ভেদ্য!

    সব প্রস্তুত যুদ্ধের দূত হানা দেয় পুব-দরজায়,

    ফেনী ও আসামে, চট্টগ্রামে ক্ষিপ্ত জনতা গর্জায়।

    বন্ধু, তোমারা ছাড়ো উদ্বেগ সুতীক্ষ্ণ করো চিত্ত,

    বাংলার মাটি দুর্জয় ঘাঁটি বুঝে নিক দুর্বৃত্ত॥

  • পরাভব

    পরাভব

    পরাভব

    হঠাৎ ফাল্গুনী হাওয়া ব্যাধিগ্রস্ত কলির সন্ধ্যায়:

    নগরে নগররক্ষী পদাতিক পদধ্বনি শুনি; –

    দুরাগত স্বপ্নের কী দুর্দিন, – মহামারী,অন্তরে বিক্ষোভ –

    অবসন্ন বিলাসের সংকুচিত প্রাণ।

    ব্যক্তিত্বের গাত্রদাহ; রন্ধ্রহীন স্বধর্ম বিকাশ

    অতীতের ভগ্ননীড় এইবার সুপুষ্ট সন্ধ্যায়।

    বণিকের চোখে আজ কী দুরন্ত লোভ ঝ’রে পরে, –

    বৈশাখের ঝড়ে তারই অস্পষ্ট চেতনা।

    ক্ষয়িষ্ণু দিনেরা কাঁদে অনর্থক প্রসব ব্যথায়…

    নশ্বর পৌষের দিন চারিদিকে ধূর্তের সমতা:

    জটিল আবর্তে শুধু নৈমিত্তিক প্রাণের স্পন্দন।

    গলিত উদ্যম তাই বৈরাগ্যের ভান, –

    প্রকাশ্য ভিক্ষার ঝুলি কালক্রমে অত্যন্ত উদার;

    সংক্রামিত রক্ত-রোগ পৃথিবীর প্রতি ধমনীতে।

    শোকাচ্ছন্ন আমাদের সনাতন মন,

    পৃথিবীর সম্ভাবিত অকাল মৃত্যুতে,

    দুর্দিনের সমন্বয়, সম্মুখেতে অনন্ত প্রহর।

    বিজিগীষা? – সন্দিহান আগামী দিনেরা:

    দৃষ্টিপথ অন্ধকার, (লাল-সূর্য মুক্তির প্রতীক?

    –আজ তবে প্রতীক্ষায় আমাদের অরণ্যবাসর।)

  • বিভীষণের প্রতি

    বিভীষণের প্রতি

    বিভীষণের প্রতি

    আমরা সবাই প্রস্তুত আজ, ভীরু পলাতক

    লুপ্ত অধুনা এদেশে তোমার গুপ্তঘাতক,

    হাজার জীবন বিকশিত এক রক্ত-ফুলে,

    পথে-প্রান্তরে নতুন স্বপ্ন উঠেছে দুলে।

    অভিজ্ঞতার আগুনে শুদ্ধ অতীত পাতক,

    এখানে সবাই সংঘবদ্ধ, হে নবজাতক।

    ক্রমশ এদেশে গুচ্ছবদ্ধ রক্ত-কুসুম

    ছড়ায় শত্রু-শবের গন্ধ,  ভাঙে ভীত ঘুম।

    এখানে কৃষক বাড়ায় ফসল মিলিত হাতে,

    তোমার স্বপ্ন চূর্ণ করার শপথ দাঁতে ,

    যদিও নিত্য মূর্খ বাধার ব্যর্থ জুলুম:

    তবু শত্রুর নিধনে লিপ্ত বাসনার ধূম।

    মিলিত ও ক্ষত পায়ের রক্ত গড়ে লালপথ,

    তাইতো লক্ষ মুঠিতে ব্যক্ত দৃঢ় অভিমত।

    ক্ষুধিত প্রাণের অক্ষরে লেখা, “প্রবেশ নিষেধ,

    এখানে সবাই ভুলেছে দ্বন্দ্ব ভুলেছে বিভেদ।”

    দুর্ভিক্ষ ও শত্রুর শেষ হবে যুগপৎ,

    শোণিত ধারার উষ্ণ ঐক্যে ঘনায় বিপদ॥

  • জাগবার দিন আজ

    জাগবার দিন আজ

    জাগবার দিন আজ

    জাগবার দিন আজ, দুর্দিন চুপি চুপি আসছে;

    যাদের চোখেতে আজো স্বপ্নের ছায়া ছবি ভাসছে –

    তাদেরই যে দুর্দিন পরিণামে আরো বেশী জানবে,

    মৃত্যুর সঙ্গীন তাদেরই বুকেতে শেল হানবে।

    আজকের দিন নয় কাব্যের –

    আজকের সব কথা পরিণাম আর সম্ভাব্যের;

    শরতের অবকাশে শোনা যায় আকাশের বাঁশরী,

    কিন্তু বাঁশরী বৃথা, জমবে না আজ কোনো আসর-ই।

    আকাশের প্রান্তে যে মৃত্যুর কালো পাখা বিস্তার –

    মৃত্যু ঘরের কোণে, আজ আর নেই জেনো নিস্তার,

    মৃত্যুর কথা আজ ভাবতেও পাও বুঝি কষ্ট

    আজকের এই কথা জানি লাগবেই অস্পষ্ঠ।

    তবুও তোমার চাই চেতনা,

    চেতনা থাকলে আজ দুর্দিন আশ্রয় পেত না,

    আজকে রঙিন খেলা নিষ্ঠুর হাতে করো বর্জন,

    আজকে যে প্রয়োজন প্রকৃত দেশপ্রেম অর্জন;

    তাই এসো চেয়ে দেখি পৃথ্বী

    কোনখানে ভাঙে আর কোনখানে গড়ে তার ভিত্তি

    কোনখানে লাঞ্ছিত মানুষের প্রিয় ব্যক্তিত্ব,

    কোনখানে দানবের ‘মরণ-যজ্ঞ’ চলে নিত্য;

    পণ করো, দৈত্যের অঙ্গে

    হানবো বজ্রাঘাত, মিলবো সবাই এক সঙ্গে;

    সংগ্রাম শুরু করো মুক্তির,

    দিন নেই তর্ক ও যুক্তির।

    আজকে শপথ করো সকলে

    বাঁচাব আমার দেশ, যাবে না তা শত্রুর দখলে;

    তাই আজ ফেলে দিয়ে তুলি আর লেখনী,

    একতাবদ্ধ হও এখনি॥

  • ঘুমভাঙার গান

    ঘুমভাঙার গান

    ঘুমভাঙার গান

    মাথা তোল তুমি বিন্ধ্যাচল

    মোছ উদ্‌গত অশ্রুজল

    যে গেল সে গেল, ভেবে কি ফল?

    ভোল ক্ষত!

    তুমি প্রতারিত বিন্ধ্যাচল,

    বোঝ নি ধূর্ত চতুর ছল,

    হাসে যে আকাশচারীর দল,

    অনাহত।

    শোন অবনত বিন্ধ্যাচল,

    তুমি নও ভীরু বিগত বল

    কাঁপে অবাধ্য হৃদয়দল

    অবিরত।

    কঠিন, কঠোর বিন্ধ্যাচল,

    অনেক ধৈর্যে আজো অটল

    ভাঙো বিঘ্নকে : করো শিকল

    পদাহত।

    বিশাল, ব্যাপ্ত বিন্ধ্যাচল,

    দেখ সূর্যের দর্পানল;

    ভুলেছে তোমার দৃঢ় কবল

    বাধা যত।

    সময় যে হল বিন্ধ্যাচল,

    ছেঁড় আকাশের উঁচু ত্রিপল

    দ্রুত বিদ্রোহে হানো উপল

    শত শত॥