Category: সুকান্ত ভট্টাচার্য

  • হদিশ

    হদিশ

    হদিশ

    আমি সৈনিক, হাঁটি যুগ থেকে যুগান্তরে

    প্রভাতী আলোয়, অনেক ক্লান্ত দিনের পরে,

    অজ্ঞাত এক প্রাণের ঝড়ে।

    বহু শতাব্দী ধরে লাঞ্ছিত, পাই নি ছাড়া

    বহু বিদ্রোহ দিয়েছে মনের প্রান্ত নাড়া

    তবু হতবাক্ দিই নি সাড়া!

    আমি সৈনিক, দাসত্ব কাঁধে যুদ্ধে যেতে

    দেখেছি প্রাণের উচ্ছ্বাস দূরে ধানের ক্ষেতে

    তবু কেন যেন উঠি নি মেতে।

    কত সান্ত্বনা খুঁজেছি আকাশে গভীর নীলে

    শুধু শূন্যতা এনেছে বিষাদ এই নিখিলে

    মূঢ় আতঙ্ক জন-মিছিলে।

    ক্ষতবিক্ষত চলেছি হাজার, তবুও একা

    সামনে বিরাট শত্রু পাহাড় আকাশ ঠেকা

    কোন সূর্যের পাই নি দেখা।

    অনেক রক্ত দিয়েছি বিমূঢ় বিনা কারণে

    বিরোধী স্বার্থ করেছি পুষ্ট অযথা রণে;

    সঙ্গীবিহীন প্রাণধারণে।

    ভীরু সৈনিক করেছি দলিত কত বিক্ষোভ

    ইন্ধন চেয়ে যখনি জ্বলেছে কুবেরীর লোভ

    দিয়েছি তখনি জন-খাণ্ডব!

    একদা যুদ্ধ শুরু হল সারা বিশ্ব জুড়ে,

    জগতের যত লুণ্ঠনকারী আর মজুরে,

    চঞ্চল দিন ঘোড়ার খুরে।

    উঠি উদ্ধত প্রাণের শিখরে, চারিদিকে চাই

    এল আহ্বান জন-পুঞ্জের শুনি রোশনাই

    দেখি ক্রমাগত কাছে উৎরাই।

    হাতছানি দিয়ে গেল শস্যের উন্নত শীষ,

    জনযাত্রায় নতুন হদিশ –

    সহসা প্রণের সবুজে সোনার দৃঢ় উষ্ণীষ॥

  • দেয়ালিকা

    দেয়ালিকা

    দেয়ালিকা

    এক

    দেয়ালে দেয়ালে মনের খেয়ালে

    লিখি কথা।

    আমি যে বেকার, পেয়েছি লেখার

    স্বাধীনতা।

    দুই

    সকালে বিকালে মনের খেয়ালে

    ইঁদারায়

    দাঁড়িয়ে থাকলে অর্থটা তার

    কি দাঁড়ায়?

    তিন

    কখন বাজল ছ’টা

    প্রাসাদে প্রাসাদে ঝলসায় দেখি

    শেষ সূর্যের ছটা –

    স্তিমিত দিনের উদ্ধত ঘনঘটা।

    চার

    বেজে চলে রেডিও

    সর্বদা গোলমাল করতেই

    ‘রেডি’ ও।

    পাঁচ

    জাপানী গো জাপানী

    ভারতবর্ষে আসতে কি শেষ

    ধরে গেল হাঁপানী?

    ছয়

    জার্মানী গো জার্মানী

    তুমি ছিলে অজেয় বীর

    এ কথা আজ আর মানি!

    সাত

    হে রাজকন্যে

    তোমার জন্যে

    এ জনারণ্যে

    নেইকো ঠাঁই–

    জানাই তাই।

    আট

    আঁধিয়ারে কেঁদে কয় সল্‌তে :

    ‘চাইনে চাইনে আমি জ্বলতে।’

  • প্রথম বার্ষিকী

    প্রথম বার্ষিকী

    প্রথম বার্ষিকী

    আবার ফিরে এল বাইশে শ্রাবণ।

    আজ বর্ষশেষে হে অতীত,

    কোন সম্ভাষণ

    জানাব অলক্ষ্য পানে?

    ব্যথাক্ষুব্ধ গানে

    ঝরাব শ্রাবণ বরিষণ!

    দিনে দিনে, তিলে তিলে যে বেদনা

    উদাস মধুর

    হয়েছে নিঃশব্দ প্রাণে

    ভরেছে বিপুল টানে,

    তারে আজ দেব কোন সুর?

    তোমার ধূসর স্মৃতি, তোমার কাব্যের সুরভিতে

    লেগেছে সন্ধ্যার ছোঁওয়া, প্রাণ ভরে দিতে

    হেমন্তের শিশিরের কণা

    আমি পারিব না।

    প্রশান্ত সূর্যাস্ত পরে দিগন্তের যে রাগ-রক্তিমা,

    লেগেছে প্রাণের ‘পরে,

    সহসা স্মৃতির ঝড়ে

    মুছিয়া যাবে কী তার সীমা!

    তোমার সন্ধ্যার ছায়াখানি

    কোন পথ হতে মোরে

    কোন পথে নিয়ে যাবে টানি’

    অমর্ত্যের আলোক সন্ধানী

    আমি নাহি জানি।

    একদা শ্রাবণ দিনে গভীর চরণে,

    নীরবে নিষ্ঠুর সরণিতে

    পাদস্পর্শ দিতে

    ভিক্ষুক মরণে।

    পেয়েছ পথের মধ্যে দিয়েছ অক্ষয়

    তব দান,

    হে বিরাট প্রাণ!

    তোমার চরণ স্পর্শে রোমাঞ্চিত পৃথিবীর ধূলি

    উঠিছে আকুলি’,

    আজিও স্মৃতির গন্ধে ব্যথিত জনতা

    কহিছে নিঃশব্দ স্বরে একমাত্র কথা,

    “তুমি হেথা নাই”।

    বিস্ময়ের অন্ধকারে মুহ্যমান জলস্থল তাই

    আদো তন্দ্রা, আধো জাগরণে

    দক্ষিণ হাওয়ায় ক্ষণে ক্ষণে

    ফেলিছে নিঃশ্বাস।

    ক্লে¬দক্লি¬ষ্ট পৃথিবীতে একী পরিহাস।

    তুমি চলে গেছ তবু আজিও বহিছে বারোমাস

    উদ্দাম বাতাস,

    এখনো বসন্ত আসে

    সকরুণ বিষণ্ণ নিঃশ্বাসে,

    এখনো শ্রাবণ ঝরোঝর

    অবিশ্রান্ত মাতায় অন্তর।

    এখনো কদম্ব বনে বনে

    লাগে দোলা মত্ত সমীরণে,

    এখনো উদাসি’

    শরতে কাশের ফোটে হাসি।

    জীবনে উচ্ছ্বাস, হাসি গান

    এখনো হয় নি অবসান।

    এখনো ফুটিছে চাঁপা হেনা,

    কিছুই তো তুমি দেখিলে না।

    তোমার কবির দৃষ্টি দিয়ে

    কোন কিছু দিলে না চিনিয়ে

    এখন আতঙ্ক দেখি পৃথিবীর অস্থিতে মজ্জায়,

    সভ্যতা কাঁপিছে লজ্জায়;

    স্বার্থের প্রাচীরতলে মানুষের সমাধি রচনা,

    অযথা বিভেদ সৃষ্টি, হীন প্ররোচনা

    পরস্পর বিদ্বেষ সংঘাতে,

    মিথ্যা ছলনাতে –

    আজিকার মানুষের জয়;

    প্রসন্ন জীবন মাঝে বিসর্পিল, বিভীষিকাময়॥

  • তারুণ্য

    তারুণ্য

    তারুণ্য

    হে তারুণ্য, জীবনের প্রত্যেক প্রবাহ

    অমৃতের স্পর্শ চায়; অন্ধকারময়

    ত্রিকালের কারাগৃহ ছিন্ন করি’

    উদ্দাম গতিতে বেদনা-বিদ্যুৎ-শিখা

    জ্বালাময় আত্মার আকাশে, ঊর্ধ্বমুখী

    আপনারে দগ্ধ করে প্রচণ্ড বিস্ময়ে।

    জীবনের প্রতি পদক্ষেপ তাই বুঝি

    ব্যাথাবিদ্ধ বিষণ্ণ বিদায়ে। রক্তময়

    দ্বিপ্রহরে অনাগত সন্ধ্যার আভাসে

    তোমার অক্ষয় বীজ অঙ্কুরিত যবে

    বিষ-মগ্ন রাত্রিবেলা কালের হিংস্রতা

    কণ্ঠরোধ করে অবিশ্বাসে। অগ্নিময়

    দিনরাত্রি মোর; আমি যে প্রভাতসূর্য

    স্পর্শহীন অন্ধকারে চৈতন্যের তীরে

    উন্মাদ, সন্ধান করি বিশ্বের বন্যায়

    সৃষ্টির প্রথম সুর। বজ্রের ঝংকারে

    প্রচণ্ড ধ্বংসের বার্তা আমি যেন পাই।

    মুক্তির পুলক-লুব্ধ বেগে একী মোর

    প্রথম স্পন্দন! আমার বক্ষের মাঝে

    প্রভাতের অস্ফুট কাকলি, হে তারুণ্য,

    রক্তে মোর আজিকার বিদ্যুৎ-বিদায়

    আমার প্রাণের কণ্ঠে দিয়ে গেল গান;

    বক্ষে মোর পৃথিবীর সুর। উচ্ছ্বসিত

    প্রাণে মোর রোমাঞ্চিত আদিম উল্লাস।

    আমি যেন মৃত্যুর প্রতীক। তাণ্ডবের

    সুর যেন নৃত্যময় প্রতি অঙ্গে মোর,

    সম্মুখীন সৃষ্টির আশ্বাসে। মধ্যাহ্নের

    ধ্যান মোর মুক্তি পেল তোমার ইঙ্গিতে।

    তারুণ্যের ব্যর্থ বেদনায় নিমজ্জিত

    দিনগুলি যাত্রা করে সম্মুখের টানে।

    নৈরাশ্য নিঃশ্বাসে ক্ষত তোমার বিশ্বাস

    প্রতিদিন বৃদ্ধ হয় কালের কর্দমে।

    হৃদয়ের সূক্ষ্ম তন্ত্রী সঙ্গীত বিহীন,

    আকাশের স্বপ্ন মাঝে রাত্রির জিজ্ঞাসা

    ক্ষয় হয়ে যায়। নিভৃত ক্রন্দনে তাই

    পরিশ্রান্ত সংগ্রামের দিন। বহ্নিময়

    দিনরাত্রি চক্ষে মোর এনেছে অন্তিম।

    ধ্বংস হোক, লুপ্ত হোক ক্ষুধিত পৃথিবী

    আর সর্পিল সভ্যতা। ইতিহাস

    স্তুতিময় শোকের উচ্ছ্বাস! তবু আজ

    তারুণ্যের মুক্তি নেই, মুমূর্ষু মানব।

    প্রাণে মোর অজানা উত্তাপ অবিরাম

    মুগ্ধ করে পুষ্টিকর রক্তের সঙ্কেতে!

    পরিপূর্ণ সভ্যতা সঞ্চয়ে আজ যারা

    রক্তলোভী বর্ধিত প্রলয় অন্বেষণে,

    তাদের সংহার করো মৃতের মিনতি।

    অন্ধ তমিস্রার স্রোতে দূরগামী দিন

    আসন্ন রক্তের গন্ধে মূর্ছিত সভয়ে।

    চলেছে রাত্রির যাত্রী আলোকের পানে

    দূর হতে দূরে। বিফল তারুণ্য-স্রোতে

    জরাগ্রস্ত কিশলয় দিন। নিত্যকার

    আবর্তনে তারুণ্যের উদ্গত উদ্যম

    বার্ধক্যের বেলাভূমি ‘পরে অতর্কিতে

    স্তব্ধ হয়ে যায়। তবু, হায়রে পৃথিবী,

    তারুণ্যের মর্মকথা কে বুঝাবে তোরে!

    কালের গহ্বরে খেলা করে চিরকাল

    বিস্ফোরণহীন। স্তিমিত বসন্তবেগ

    নিরুদ্দেশ যাত্রা করে জোয়ারের জলে।

    অন্ধকার, অন্ধকার, বিভ্রান্ত বিদায়;

    নিশ্চিত ধ্বংসের পথে ক্ষয়িষ্ণু পৃথিবী।

    বিকৃত বিশ্বের বুকে প্রকম্পিত ছায়া

    মরণের, নক্ষত্রের আহ্বানে বিহ্বল

    তারুণ্যের হৃৎপিণ্ডে বিদীর্ণ বিলাস।

    ক্ষুব্ধ অন্তরের জ্বালা, তীব্র অভিশাপ;

    পর্বতের বক্ষমাঝে নির্ঝর-গুঞ্জনে

    উৎস হতে ধবমান দিক্-চক্রবালে।

    সম্মুখের পানপাত্রে কী দুর্বার মোহ,

    তবু হায় বিপ্রলব্ধ রিক্ত হোমশিখা!

    মত্ততায় দিক্ভ্রান্তি, প্রাণের মঞ্জরী

    দক্ষিণের গুঞ্জরণে নিষ্ঠুর প্রলাপে

    অস্বীকার করে পৃথিবীরে। অলক্ষিতে

    ভূমিলগ্ন আকাশ কুসুম ঝরে যায়

    অস্পষ্ট হাসিতে। তারুণ্যের নীলরক্ত

    সহস্র সূর্যের স্রোতে মৃত্যুর স্পর্ধায়

    ভেসে যায় দিগন্ত আঁধারে। প্রত্যুষের

    কালো গোধূলির রক্তিম ছায়ায়

    আকাশের বার্তা নিয়ে বিনিদ্র তারার

    বুকে ফিরে গেল নিস্তব্ধ সন্ধ্যায়।

    দিনের পিপাসু দৃষ্টি, রাত্রি ঝরে

    বিবর্ণ পথের চারিদিকে। ভয়ঙ্কর

    দিনরাত্রি প্রলয়ের প্রতিদ্বন্দ্বে লীন;

    তারুণ্যের প্রত্যেক আঘাতে কম্পমান

    উর্বর-উচ্ছেদ। অশরীরী আমি আজ

    তারুণ্যের তরঙ্গের তলে সমাহিত

    উত্তপ্ত শয্যায়। ক্রমাগত শতাব্দীর

    বন্দী আমি অন্ধকারে কেন খুঁজে ফিরি

    অদৃশ্য সূর্যের দীপ্তি উচ্ছিষ্ট অন্তরে।

    বিদায় পৃথিবী আজ, তারুণ্যের তাপে

    নিবদ্ধ পথিক-দৃষ্টি উদ্বুদ্ধ আকাশে,

    সার্থক আমার নিত্য-লুপ্ত পরিক্রমা

    ধ্বনিময় অনন্ত প্রান্তরে। দূরগামী

    আমি আজ উদ্বেলিত পশ্চাতের পানে

    উদাস উদ্ভ্রান্ত দৃষ্টি রেখে যাই

    সম্মুখের ডাকে। শাশ্বত ভাস্বর পথে

    আমার নিষিদ্ধ আয়োজন, হিমাচ্ছন্ন

    চক্ষে মোর জড়তার ঘন অন্ধকার।

    হে দেবতা আলো চাই, সূর্যের সঞ্চয়

    তারুণ্যের রক্তে মোর কী নিঃসীম জ্বালা!

    অন্ধকার অরণ্যের উদ্দাম উল্লাস

    লুপ্ত হোক আশঙ্কায় উদ্ধত মৃত্যুতে॥

  • মৃত পৃথিবী

    মৃত পৃথিবী

    মৃত পৃথিবী

    পৃথিবী কি আজ শেষে নিঃস্ব

    ক্ষুধাতুর কাঁদে সারা বিশ্ব,

    চারিদিকে ঝরে পড়া রক্ত,

    জীবন আজকে উত্যক্ত।

    আজকের দিন নয় কাব্যের

    পরিণাম আর সম্ভাব্যের

    ভয় নিয়ে দিন কাটে নিত্য,

    জীবনে গোপন-দুর্বৃত্ত।

    তাইতো জীবন আজ রিক্ত,

    অলস হৃদয় স্বেদসিক্ত;

    আজকে প্রাচীর গড়া ভিন্ন

    পৃথিবী ছড়াবে ক্ষতচিহ্ন।

    অগোচরে নামে হিম-শৈত্য,

    কোথায় পালাবে মরু দৈত্য?

    জীবন যদিও উৎক্ষিপ্ত,

    তবু তো হৃদয় উদ্দীপ্ত,

    বোধহয় আগামী কোনো বন্যায়,

    ভেসে যাবে অনশন, অন্যায়॥

  • দুর্মর

    দুর্মর

    দুর্মর

    হিমালয় থেকে সুন্দরবন, হঠাৎ বাংলাদেশ

    কেঁপে কেঁপে ওঠে পদ্মার উচ্ছ্বাসে,

    সে কোলাহলে রুদ্ধস্বরের আমি পাই উদ্দেশ

    জলে ও মাটিতে ভাঙনের বেগ আসে।

    হঠাৎ নিরীহ মাটিতে কখন

    জন্ম নিয়েছে সচেতনতার ধান,

    গত আকালের মৃত্যুকে মুছে

    আবার এসেছে বাংলাদেশের প্রাণ।

    “হয় ধান নয় প্রাণ” এ শব্দে

    সারা দেশ দিশাহারা,

    একবার মরে ভুলে গেছে আজ

    মৃত্যুর ভয় তারা।

    সাবাস, বাংলাদেশ, এ পৃথিবী

    অবাক তাকিয়ে রয় :

    জ্বলে পুড়ে-মরে ছারখার

    তবু মাথা নোয়াবার নয়।

    এবার লোকের ঘরে ঘরে যাবে

    সোনালী নয়কো, রক্তে রঙিন ধান,

    দেখবে সকলে সেখানে জ্বলছে

    দাউ দাউ করে বাংলাদেশের প্রাণ॥

  • মিঠেকড়া

    মিঠেকড়া

    মিঠেকড়া

    বড়োরা অবাক হয় সুকান্তর কবিতা পড়ে। এবার সুকান্তর ছড়া পড়ে অবাক হবে ছোটরা। আদ্যিকালের বদ্যিবুড়ির ছড়া নয়, একেবারে একালের টাট্কা হাতে-গরম ছড়া। হাসতে হাসতে হঠাৎ হাত মুঠো হয়ে যাবে রাগে, চোখ দুটো জ্বলে উঠবে লাল-টক্‌টকে সূর্য-ওঠা দিনের কথা ভেবে। এমন ছড়া বাংলা দেশে আর কেউ লেখে নি।

    কলকাতার রাস্তায় বিষম এক খেলা। বন্দুকের সঙ্গে শুধু হাতের লড়াই। আশ্চর্য! এমন এক সাংঘাতিক কাণ্ড তার মধ্যেও মজা পেয়েছে সুকান্ত। গোটা বইতে এমনি সব মিঠে রসে ভেজানো কড়া পাকের ছড়া। সুকান্তই নিজে তাই তার বইয়ের নাম দিয়েছিল ‘মিঠেকড়া’।

    ‘পৃথিবীর দিকে তাকাও’—এই ছড়াটি একটি ইংরেজি কবিতার ভাবানুসরণে লেখা। বত্রিশ পৃষ্ঠার ছবিটি একটি বিদেশী ছবির ভাবাবলম্বনে আঁকা।

    ‘মিঠেকড়া’র ছবিগুলি এঁকেছেন শিল্পী দেবব্রত মুখোপাধ্যায়। সুকান্ত এই ছড়াগুলো লেখার পর ছবি আঁকার জন্যে তারই হাতে প্রথম দেয় এবং এ বইয়ের পরিকল্পনা দুজনে মিলে করে। এতদিন পরেও দেবব্রতবাবু সুকান্তর মনের কথা যেভাবে ছবির রেখায় ফুটিয়ে তুলেছেন, তাতে তাকে অভিনন্দন না জানিয়ে পারছি না। সুকান্ত এ বই দেখলে কী খুশিই যে হ’ত।

    সুভাষ মুখোপাধ্যায়

  • অতি কিশোরের ছড়া

    অতি কিশোরের ছড়া

    অতি কিশোরের ছড়া

    তোমরা আমায় নিন্দে ক’রে দাও না যতই গালি,

    আমি কিন্তু মাখছি আমার গালেতে চুনকালি,

    কোনো কাজটাই পারি নাকো বলতে পারি ছড়া,

    পাশের পড়া পড়ি না ছাই পড়ি ফেলের পড়া।

    তোতো ওষুধ গিলি নাকো, মিষ্টি এবং টক

    খাওয়ার দিকেই জেনো আমার চিরকালের সখ।

    বাবা-দাদা সবার কাছেই গোঁয়ার এবং মন্দ,

    ভাল হয়ে থাকার সঙ্গে লেগেই আছে দ্বন্দ্ব।

    পড়তে ব’সে থাকে আমার পথের দিকে চোখ,

    পথের চেয়ে পথের লোকের দিকেই বেশী ঝোঁক।

    হুলের কেয়ার করি নাকো মধুর জন্য ছুটি,

    যেখানে ভিড় সেখানেতেই লাগাই ছুটোছুটি।

    পণ্ডিত এবং বিজ্ঞজনের দেখলে মাথা নাড়া,

    ভাবি উপদেশের ষাঁড়ে করলে বুঝি তাড়া।

    তাইতো ফিরি ভয়ে ভয়ে, দেখলে পরে তর্ক,

    বুঝি কেবল গোময় সেটা,— নয়কো মধুপর্ক।

    ভুল করি ভাই যখন তখন, শোধরাবার আহ্লাদে

    খেয়ালমতো কাজ করে যাই, কষ্ট পাই কি সাধে?

    সোজাসুজি যা হয় বুঝি, হায় অদৃষ্ট চক্র!

    আমার কথা বোঝে না কেউ পৃথিবীটাই বক্র॥

  • এক যে ছিল

    এক যে ছিল

    এক যে ছিল

    এক যে ছিল আপনভোলা কিশোর,

    ইস্কুল তার ভাল লাগত না,

    সহ্য হত না পড়াশুনার ঝামেলা

    আমাদের চলতি লেখাপড়া সে শিখল না কোনোকালেই,

    অথচ সে ছাড়িয়ে গেল সারা দেশের সবটুকু পাণ্ডিত্যকে।

    কেমন ক’রে? সে প্রশ্ন আমাকে ক’রো না॥

    বড়মানুষীর মধ্যে গরীবের মতো মানুষ,

    তাই বড় হয়ে সে বড় মানুষ না হয়ে

    মানুষ হিসেব হল অনেক বড়।

    কেমন ক’রে? সে প্রশ্ন আমাকে ক’রো না॥

    গানসাধার বাঁধা আইন সে মানে নি,

    অথচ স্বর্গের বাগান থেকে সে চুরি করে আনল

    তোমার আমার গান।

    কবি সে, ছবি আঁকার অভ্যাস ছিল না ছোট বয়সে,

    অথচ শিল্পী ব’লে সে-ই পেল শ্রেষ্ঠ শিল্পীদের সম্মান।

    কেমন ক’রে ? সে প্রশ্ন আমাকে ক’রো না॥

    মানুষ হল না বলে যে ছিল তার দিদির আক্ষেপের বিষয়,

    অনেক দিন, অনেক বিদ্রূপ যাকে করেছে আহত;

    সে-ই একদিন চমক লাগিয়ে করল দিগ্বিজয়।

    কেউ তাকে বলল, ‘বিশ্বকবি’, কেউ বা ‘কবিগুরু’

    উত্তর-দক্ষিণ-পূর্ব-পশ্চিম চারদিক করল প্রণাম।

    তাই পৃথিবী আজো অবাক হয়ে তাকিয়ে বলছে:

    কেমন ক’রে? সে প্রশ্ন আমাকে ক’রো না,

    এ প্রশ্নের জবাব তোমাদের মতো আমিও খুঁজি॥

  • ভেজাল

    ভেজাল

    ভেজাল

    ভেজাল, ভেজাল, ভেজাল রে ভাই, ভেজাল সারা দেশটায়,

    ভেজাল ছাড়া খাঁটি জিনিস মিলবে নাকো চেষ্টায়!

    ভেজাল তেল আর ভেজাল চাল, ভেজাল ঘি আর ময়দা,

    ‘কৌন ছোড়ে গা ভেজাল ভেইয়া, ভেজালসে হ্যায় ফয়দা।’

    ভেজাল পোষাক, ভেজাল খাবার, ভেজাল লোকের ভাবনা,

    ভেজালেরই রাজত্ব এ পাটনা থেকে পাবনা

    ভেজাল কথা— বাংলাতে ইংরেজী ভেজাল চলছে,

    ভেজাল দেওয়া সত্যি কথা লোকেরা আজ বলছে।

    ‘খাঁটি জিনিস’ এই কথাটা রেখো না আর চিত্তে,

    ‘ভেজাল’ নামটা খাঁটি কেবল আর সকলই মিথ্যে।

    কলিতে ভাই ‘ভেজাল’ সত্য ভেজাল ছাড়া গতি নেই,

    ছড়াটাতেও ভেজাল দিলাম, ভেজাল দিলে ক্ষতি নেই॥

  • গোপন খবর

    গোপন খবর

    গোপন খবর

    শোন একটা গোপন খবর দিচ্ছি আমি তোমায়,

    কলকাতাটা যখন খাবি খাচ্ছিল রোজ বোমায়,

    সেই সময়ে একটা বোমা গড়ের মাঠের ধারে,

    মাটির ভেতর সেঁধিয়ে গিয়ে ছিল এক্কেবারে,

    অনেক দিনের ঘটনা তাই ভুলে গেছ্‌ল লোকে,

    মাটির ভেতর ছিল তাইতো দেখে নি কেউ চোখে,

    অনেক বর্ষা কেটে গেল, গেল অনেক মাস,

    যুদ্ধ থামায় ফেলল লোকে স্বস্তির নিঃশ্বাস,

    হাঠাৎ সেদিন একলা রাতে গড়ের মাঠের ধারে,

    বেড়িয়ে ফেরার সময় হঠাৎ চমকে উঠি : আরে!

    বৃষ্টি পেয়ে জন্মেছে এক লম্বা বোমার গাছ,

    তারই মাথায় দেখা যাচ্ছে চাঁদের আলোর নাচ,

    গাছের ডালে ঝুলছে কেবল বোমা-ই সারি সারি,

    তাই না দেখে ভড়কে গিয়ে ফিরে এলাম বাড়ি।

    পরের দিনই সকাল বেলা গেলাম সে ময়দানে,

    হায়রে!— গাছটা চুরি গেছে কোথায় কে তা জানে।

    গাছটা ছিল। গড়ের মাঠে খুঁজতে আজো ঘুরি,

    প্রমাণ আছে অনেক, কেবল গাছটা গেছে চুরি॥

  • জ্ঞানী

    জ্ঞানী

    জ্ঞানী

    বরেনবাবু মস্ত জ্ঞানী, মস্ত বড় পাঠক,

    পড়েন তিনি দিনরাত্তির গল্প এবং নাটক,

    কবিতা আর উপন্যাসের বেজায় তিনি ভক্ত,

    ডিটেক্‌টিভের কাহিনীতে গরম করেন রক্ত;

    জানেন তিনি দর্শন আর নানা রকম বিজ্ঞান

    জ্যোতিষশাস্ত্র জানেন তিনি, তাইতো আছে দিক্-জ্ঞান;

    ইতিহাস আর ভূগোলেতে বেজায় তিনি দক্ষ,—

    এসব কথা ভাবলেই তাঁর ফুলতে থাকে বক্ষ।

    সব সময়েই পড়েন তিনি, সকাল থেকে সন্ধ্যে,

    ছুটির দিনে পড়েন তিনি, পড়েন পূজোর বন্ধে।

    মাঝে মাঝে প্রকাশ করেন গূঢ় জ্ঞানের তত্ত্ব

    বিদ্যাখানা জাহির করেন বরেন্দ্রনাথ দত্ত :

    হঠাৎ ঢুকে রান্নাঘরে বলেন, ওসব কী রে?

    ভাইঝি গীতা হেসে বলেন, এসব কালো জিরে।

    বরেনবাবু রেগে বলেন, জিরে তো হয় সাদা,

    তিলও কালো, জিরেও কালো? পেয়েছিস কি গাধা?

    রান্না করার সময় কেবল পুড়িয়ে হাজার লঙ্কা,

    হনুমতী হয়েছিস তুই, হচ্ছে আমার শঙ্কা।

    হঠাৎ ছোট্ট খোকাটাকে কাঁদতে দেখে, দত্ত

    খোলেন বিরাট বইয়ের পাতা নামটি “মনস্তত্ত্ব”।

    খুঁজতে খুঁজতে বরেনবাবু হয়ে গেলেন সারা—

    বুঝলেন না, কেন খোকা মাথায় করছে পাড়া।

    হঠাৎ এসে ভাইঝি গীতা দুধের বাটি নিয়ে,

    খাইয়ে দিয়ে পাঁচ মিনিটে দিল ঘুম পাড়িয়ে।

    বরেনবাবু ভাবেন, ‘খোকার কেমনতর ধারা

    আধ ঘণ্টার চেঁচামেচি পাঁচ মিনিটেই সারা?

    বরেনবাবুর কাছে আরো বিরাট একটি ধাঁধা,

    হলদে চালের রঙ কেন হয় ভাত হলে পর সাদা?

    পাথর বাটির গরম জিনিস ঠাণ্ডা হয় তা জানি,

    পাহাড় দেশে গরম কেন এমন ছটফটানি?

    পথ চলতে ভেবে এসব ভিজে ওঠেন ঘামে,

    মানিকতলা যেতে চাপেন ধর্মতলার ট্রামে।

    বরেনবাবু জানেন কিন্তু নানা রকম বিজ্ঞান,

    জ্যোতিষশাস্ত্র জানেন তিনি তাইতো এমন দিক্-জ্ঞান॥

  • মেয়েদের পদবী

    মেয়েদের পদবী

    মেয়েদের পদবী

    মেয়েদের পদবীতে গোলমাল ভারী,

    অনেকের নামে তাই দেখি বাড়াবাড়ি;

    ‘আ’কার অন্ত দিয়ে মহিলা করার

    চেষ্টা হাসির। তাই ভূমিকা ছড়ার।

    ‘গুপ্ত’ ‘গুপ্তা’ হয় মেয়েদের নামে,

    দেখেছি অনেক চিঠি, পোষ্টকার্ড, খামে।

    সে নিয়মে যদি আজ ‘ঘোষ’ হয় ‘ঘোষা’,

    তা হলে অনেক মেয়ে করবেই গোসা,

    ‘পালিত’ ‘পালিতা’ হলে ‘পাল’ হলে ‘পালা’

    নির্ঘাৎ বাড়বেই মেয়েদের জ্বালা;

    ‘মল্লিক’ ‘মল্লিকা’, ‘ দাস’ হলে ‘দাসা’

    শোনাবে পদবীগুলো অতিশয় খাসা;

    ‘কর’ যদি ‘করা’ হয়, ‘ধর’ হয় ‘ধরা’

    মেয়েরা দেখবে এই পৃথিবীটা— “সরা”।

    ‘নাগ’ যদি ‘নাগা’ হয় ‘সেন’ হয় ‘সেনা’

    বড়ই কঠিন হবে মেয়েদের চেনা॥

  • বিয়ে বাড়ির মজা

    বিয়ে বাড়ির মজা

    বিয়ে বাড়ির মজা

    বিয়ে বাড়ি : বাজছে সানাই, বাজছে নানান বাদ্য

    একটি ধারে তৈরি হচ্ছে নানা রকম খাদ্য;

    হৈ-চৈ আর চেঁচামেচি, আসছে লুচির গন্ধ,

    আলোয় আলোয় খুশি সবাই, কান্নাকাটি বন্ধ,

    বাসরঘরে সাজছে কনে, সকলে উৎফুল্ল,

    লোকজনকে আসতে দেখে কর্তার মুখ খুলল :

    “আসুন, আসুন—বসুন সবাই, আজকে হলাম ধন্য,

    যৎসামান্য এই আয়োজন আপনাদেরই জন্য;

    মাংস, পোলাও, চপ-কাটলেট, লুচি এবং মিষ্টি।

    খাবার সময় এদের প্রতি দেবেন একটু দৃষ্টি।”

    বর আসে নি, তাই সকলে ব্যস্ত এবং উৎসুক,

    আনন্দে আজ বুক সকলের নাচছে কেবল ধুক্-ধুক্,

    ‘হুলু’ দিতে তৈরী সবাই, শাঁক হাতে সব প্রস্তুত,

    সময় চলে যাচ্ছে ব’লে মনটা করছে খুঁত-খুঁত।

    ভাবছে সবাই কেমন ক’রে বরকে করবে জব্দ;

    হঠাৎ পাওয়া গেল পথের মোড়ে গাড়ির শব্দ :

    হুলুধ্বনি উঠল মেতে, শাঁক বাজলো জোরে,

    বরকে সবাই এগিয়ে নিতে গেল পথের মোড়ে।

    কোথায় বরের সাজসজ্জা? কোথায় ফুলের মালা?

    সবাই হঠাৎ চেঁচিয়ে ওঠে, পালা, পালা, পালা।

    বর নয়কো, লাল-পাগড়ি পুলিশ আসছে নেমে।

    বিয়েবাড়ির লোকগুলো সব হঠাৎ উঠল ঘেমে,

    বললে পুলিশ : এই কি কর্তা, ক্ষুদ্র আয়োজন?

    পঞ্চাশ জন কোথায়? এ যে দেখছি হাজার জন !

    এমনি ক’রে চাল নষ্ট দুর্ভিক্ষের কালে?

    থানায় চলো, কাজ কি এখন এইখানে গোলমালে?

    কর্তা হলেন কাঁদো-কাঁদো, চোখেতে জল আসে,

    গেটের পাশে জড়ো-হওয়া কাঙালীরা হাসে॥

  • রেশন কার্ড

    রেশন কার্ড

    রেশন কার্ড

    রঘুবীর একদিন দিতে গিয়ে আড্ডা,

    হারিয়ে ফেলল ভুলে রেশনের কার্ডটা;

    তারপর খোঁজাখুজি এখানে ও ওখানে,

    রঘু ছুটে এল তার রেশনের দোকানে,

    সেখানে বলল কেঁদে, হুজুর, চাই যে আটা—

    দোকানী বলল হেঁকে, চলবে না কাঁদা-কাঁটা,

    হাটে মাঠে ঘাটে যাও, খোঁজো গিয়ে রাস্তায়

    ছুটে যাও আড্ডায়, খোঁজো চারিপাশটায়;

    কিংবা অফিসে যাও এ রেশন এলাকার,

    আমার মামার পিসে, কাজ করে ছেলে তার,

    তার কাছে গেলে পরে সবই ঠিক হয়ে যাবে,

    ছ’মাসের মধ্যেই নয়া এক কার্ড পাবে।

    রঘুবীর বলে কেঁদে, ছ’মাস কি করব?

    ছ’মাস কি উপবাস ক’রে ধুঁকে মরব?

    আমি তার করব কী?— দোকানী উঠল রেগে—

    যা খুশি তা করো তুমি— বলল সে অতি বেগে;

    পয়সা থাকে তো খেও হোটেলে কি মেসেতে,

    নইলে সটান্ তুমি যেতে পার দেশেতে॥

  • খাদ্য সমস্যার সমাধান

    খাদ্য সমস্যার সমাধান

    খাদ্য সমস্যার সমাধান

    বন্ধু :

    ঘরে আমার চাল বাড়ন্ত

    তোমার কাছে তাই,

    এলাম ছুটে, আমায় কিছু

    চাল ধার দাও ভাই।

    মজুতদার :

    দাঁড়াও তবে, বাড়ির ভেতর

    একটু ঘুরে আসি,

    চালের সঙ্গে ফাউও পাবে

    ফুটবে মুখে হাসি।

    মজুদতার :

    এই নাও ভাই, চালকুমড়ো

    আমায় খাতির করো,

    চালও পেলে কুমড়ো পেলে

    লাভটা হল বড়॥

  • পুরনো ধাঁধা

    পুরনো ধাঁধা

    পুরনো ধাঁধা

    বলতে পার বড়মানুষ মোটর কেন চড়বে?

    গরীব কেন সেই মোটরের তলায় চাপা পড়বে?

    বড়মানুষ ভোজের পাতে ফেলে লুচি-মিষ্টি,

    গরীবরা পায় খোলামকুচি, একি অনাসৃষ্টি?

    বলতে পার ধনীর বাড়ি তৈরি যারা করছে,

    কুঁড়েঘরেই তারা কেন মাছির মতো মরছে?

    ধনীর মেয়ের দামী পুতুল হরেক রকম খেলনা,

    গরীব মেয়ে পায় না আদর, সবার কাছে ফ্যালনা।

    বলতে পার ধনীর মুখে যারা যোগায় খাদ্য,

    ধনীর পায়ের তলায় তারা থাকতে কেন বাধ্য?

    ‘হিং-টিং-ছট্’ প্রশ্ন এসব, মাথার মধ্যে কামড়ায়,

    বড়লোকের ঢাক তৈরি গরীব লোকের চামড়ায়।

  • ব্ল্যাক-মার্কেট

    ব্ল্যাক-মার্কেট

    ব্ল্যাক-মার্কেট

    হাত করে মহাজন, হাত করে জোতদার,

    ব্ল্যাক-মার্কেট করে ধনী রাম পোদ্দার,

    গরীব চাষীকে মেরে হাতখানা পাকালো

    বালিগঞ্জেতে বাড়ি খান ছয় হাঁকালো।

    কেউ নেই ত্রিভুবনে, নেই কিছু অভাবও

    তবু ছাড়ল না তার লোক-মারা স্বভাবও।

    একা থাকে, তাই হরি চাকরটা রক্ষী

    ত্রিসীমানা মাড়ায় না তাই কাক-পক্ষী।

    বিশ্বে কাউকে রাম কাছে পেতে চান না,

    হরিই বাজার করে, সে-ই করে রান্না।

    এমনি ক’রেই বেশ কেটে যাচ্ছিল কাল,

    হঠাৎ হিসেবে রাম দেখলেন গোলমাল,

    বললেন চাকরকে : কিরে ব্যাটা, কি ব্যাপার?

    এত টাকা লাগে কেন বাজারেতে রোজকার?

    আলু তিন টাকা সের? পটল পনেরো আনা?

    ভেবেছিস বাজারের কিছু বুঝি নেই জানা?

    রোজ রোজ চুরি তোর? হতভাগা, বজ্জাত!

    হাসছিস? এক্ষুণি ভেঙে দেব সব দাঁত।

    খানিকটা চুপ করে বলল চাকর হরি :

    আপনারই দেখাদেখি ব্ল্যাক-মাকের্ট করি।

  • ভাল খাবার

    ভাল খাবার

    ভাল খাবার

    ধনপতি পাল, তিনি জমিদার মস্ত;

    সূর্য রাজ্যে তাঁর যায় নাকো অস্ত

    তার ওপর ফুলে উঠে কারখানা-ব্যাঙ্কে

    আয়তনে হারালেন মোটা কোলা ব্যাঙকে।

    সবার “হুজুর” তিনি, সকলের কর্তা,

    হাজার সেলাম পান দিনে গড়পড়তা।

    সদাই পাহারা দেয় বাইরে সেপাই তাঁর,

    কাজ নেই, তাই শুধু ‘খাই-খাই’ বাই তাঁর।

    এটা খান, সেটা খান, সব লাগে বিদ্ঘুটে,

    টান মেরে ফেলে দেন একটু খাবার খুঁটে;

    খাদ্যে অরুচি তাঁর, সব লাগে তিক্ত,

    খাওয়া ফেলে ধমকান শেষে অতিরিক্ত।

    দিনরাত চিৎকার : আরো বেশি টাকা চাই,

    আরো কিছু তহবিলে জমা হয়ে থাকা চাই।

    সব ভয়ে জড়োসড়ো, রোগ বড় প্যাঁচানো,

    খাওয়া ফেলে দিনরাত টাকা ব’লে চেঁচানো।

    ডাক্তার কবিরাজ ফিরে গেল বাড়িতে;

    চিন্তা পাকালো জট নায়েবের দাড়িতে।

    নায়েব অনেক ভেবে বলে হুজুরের প্রতি :

    কী খাদ্য চাই? কী সে খেতে উত্তম অতি?

    নায়েবের অনুরোধে ধনপতি চারিদিক

    দেখে নিয়ে বার কয় হাসলেন ফিক্-ফিক্;

    তারপর বললেন : বলা ভারি শক্ত

    সবচেয়ে ভালো খেতে গরীবের রক্ত।

  • পৃথিবীর দিকে তাকাও

    পৃথিবীর দিকে তাকাও

    পৃথিবীর দিকে তাকাও

    দেখ, এই মোটা লোকটাকে দেখ

    অভাব জানে না লোকটা,

    যা কিছু পায় সে আঁকড়িয়ে ধরে

    লোভে জ্বলে তার চোখটা।

    মাথা উঁচু করা প্রাসাদের সারি

    পাথরে তৈরি সব তার,

    কত সুন্দর, পুরোনো এগুলো!

    অট্রালিকা এ লোকটার।

    উঁচু মাথা তার আকাশ ছুঁয়েছে

    চেয়ে দেখে না সে নীচুতে,

    কত জমির যে মালিক লোকটা

    বুঝবে না তুমি কিছুতে।

    দেখ, চিমনীরা কী ধোঁয়া ছাড়ছে

    কলে আর কারখানাতে,

    মেশিনের কপিকলের শব্দ

    শোনো, সবাইকে জানাতে।

    মজুরেরা দ্রুত খেটেই চলেছে—

    খেটে খেটে হল হন্যে ;

    ধনদৌলত বাড়িয়ে তুলছে

    মোটা প্রভুটির জন্যে।

    দেখ একজন মজুরকে দেখ

    ধুঁকে ধুঁকে দিন কাটছে,

    কেনা গোলামের মতই খাটুনি

    তাই হাড়ভাঙা খাটছে।

    ভাঙা ঘর তার নীচু ও আঁধার

    স্যাঁতসেঁতে আর ভিজে তা,

    এর সঙ্গে কি তুলনা করবে

    প্রাসাদ বিশ্ব-বিজেতা?

    কুঁড়েঘরের মা সারাদিন খাটে

    কাজ করে সারা বেলা এ,

    পরের বাড়িতে ধোয়া মোছা কাজ—

    বাকিটা পোষায় সেলায়ে।

    তবুও ভাঁড়ার শূন্যই থাকে,

    থাকে বাড়ন্ত ঘরে চাল,

    বাচ্চা ছেলেরা উপবাস করে

    এমনি করেই কাটে কাল।

    বাবু যত তারা মজুরকে তাড়া

    করে চোখে চোখে রাখে,

    ঘোঁৎ ঘোঁৎ ক’রে মজুরকে ধরে

    দোকানে যাওয়ার ফাঁকে।

    খাওয়ার সময় ভোঁ বাজলে তারা

    ছুটে আসে পালে পাল,

    খায় শুধু কড়কড়ে ভাত আর

    হয়তো একটু ডাল।

    কম-মজুরির দিন ঘুরে এলে

    খাদ্য কিনতে গিয়ে

    দেখে এ টাকায় কিছুই হয় না,

    বসে গালে হাত দিয়ে।

    পুরুত শেখায়, ভগবানই জেনো প্রভু

    (সুতরাং চুপ; কথা বলবে না কভু)

    সকলেরই প্রভু— ভালো আর খারাপের

    তাঁরই ইচ্ছায় এ; চুপ করো সব ফের।

    শিক্ষক বলে, শোন সব এই দিকে,

    চালাকি ক’রো না, ভালো কথা যাও শিখে।

    এদের কথায় ভরসা হয় না তবু?

    সরে এসো তবে, দেখ সত্যি কে প্রভু।

    ফ্যাকাশে শিশুরা, মুখে শাস্তির ভীতি,

    আগের মতোই মেনে চলে সব নীতি।

    যদি মজুরেরা কখনো লড়তে চায়

    পুলিশ প্রহারে জেলে টেনে নিয়ে যায়।

    মজুরের শেষ লড়াইয়ের নেতা যত

    এলোমেলো সব মিলায় ইতস্তত—

    কারাপ্রাচীরের অন্ধকারের পাশে।

    সেখানেও স্বাধীনতার বার্তা আসে।

    রাশিয়াই, শুধু রাশিয়া মহান্ দেশ,

    যেখানে হয়েছে গোলামির দিন শেষ;

    রাশিয়া, যেখানে মজুরের আজ জয়,

    লেনিন গড়েছে রাশিয়া! কী বিস্ময়!

    রাশিয়া যেখানে ন্যায়ের রাজ্য স্থায়ী,

    নিষ্ঠুর ‘জার’ যেই দেশে ধরাশায়ী,

    সোভিয়েট—‘তারা’ যেখানে দিচ্ছে আলো,

    প্রিয়তম সেই মজুরের দেশ ভালো।

    মজুরের দেশ, কল-কারখানা,

    প্রাসাদ, নগর, গ্রাম,

    মজুরের খাওয়া মজুরের হাওয়া,

    শুধু মজুরের নাম।

    মজুরের ছুটি, বিশ্রাম আর

    গরমে সাগর-ধার,

    মজুরের কত স্বাধীনতা! আর

    অজস্র অধিকার।

    মজুরের ছেলে ইস্কুলে যায়

    জ্ঞানের পিপাসা নিয়ে,

    ছোট ছোট মন ভরে নেয় শুধু

    জ্ঞান-বিজ্ঞান দিয়ে।

    মজুরের সেনা ‘লাল ফৌজ’ দেয়

    পাহারা দিন ও রাত,

    গরীবের দেশে সইবে না তারা

    বড়লোকদের হাত।

    শান্ত-স্নিগ্ধ, বিবাদ-বিহীন

    জীবন সেখানে, তাই

    সকলেই সুখে বাস করে আর

    সকলেই ভাই-ভাই;

    এক মনেপ্রাণে কাজ করে তারা

    বাঁচাতে মাতৃভূমি,

    তোমার জন্যে আমি, সেই দেশে,

    আমার জন্যে তুমি॥