Category: সুকান্ত ভট্টাচার্য

  • দিক্‌প্রান্তে

    দিক্‌প্রান্তে

    দিক্‌প্রান্তে

    ভাঙন নেপথ্য পৃথিবীতে;

    অদৃশ্য কালের শত্রু প্রচ্ছন্ন জোয়ারে,

    অনেক বিপন্ন জীব ক্ষয়িষ্ণু খোঁয়াড়ে

    উন্মুখ নিঃশেষে কেড়ে নিতে,

    দুর্গম বিষণ্ণ শেষ শীতে।

    বীভৎস প্রাণের কোষে কোষে

    নিঃশব্দে ধ্বংসের বীজ নির্দিষ্ট আয়ুতে

    পশেছে আঁদার রাত্রে– প্রত্যেক স্নায়ুতে;–

    গোপনে নক্ষত্র গেছে খসে

    আরক্তিম আদিম প্রদোষে॥

    দিনের নীলাভ শেষ আলো

    জানাল আসন্ন রাত্রি দুর্লক্ষ্য সংকেতে।

    অনেক কাস্তের শব্দ নিঃস্ব ধানেক্ষেতে

    সেই রাত্রে হাওয়ায় মিলাল:

    দিক্‌প্রান্তে সূর্য চমকাল॥

  • চিরদিনের

    চিরদিনের

    চিরদিনের

    এখানে বৃষ্টিমুখর লাজুক গাঁয়ে

    এসে থেমে গেছে ব্যস্ত ঘড়ির কাঁটা,

    সবুজ মাঠেরা পথ দেয় পায়ে পায়ে

    পথ নেই, তবু এখানে যে পথ হাঁটা।

    জোড়া দীঘি, তার পাড়েতে তালের সারি

    দূরে বাঁশঝাড়ে আত্মদানের সাড়া,

    পচা জল আর মশায় অহংকারী

    নীরব এখানে অমর কিষাণপাড়া।

    এ গ্রামের পাশে মজা নদী বারো মাস

    বর্ষায় আজ বিদ্রোহ বুঝি করে,

    গোয়ালে পাঠায় ইশারা সবুজ ঘাস

    এ গ্রাম নতুন সবুজ ঘাগরা পরে।

    রাত্রি এখানে স্বাগত সান্ধ্য শাঁখে

    কিষাণকে ঘরে পাঠায় যে আল-পথ;

    বুড়ো বটতলা পরস্পরকে ডাকে

    সন্ধ্যা সেখানে জড়ো করে জনমত।

    দুর্ভিক্ষের আঁচল জড়ানো গায়ে

    এ গ্রামের লোক আজো সব কাজ করে,

    কৃষক-বধূরা ঢেঁকিকে নাচায় পায়ে

    প্রতি সন্ধ্যায় দীপ জ্বলে ঘরে ঘরে।

    রাত্রি হলেই দাওয়ার অন্ধকারে

    ঠাকুমা গল্প শোনায় যে নাতনীকে,

    কেমন ক’রে সে আকালেতে গতবারে,

    চলে গেল লোক দিশাহারা দিকে দিকে।

    এখানে সকাল ঘোষিত পাখির গানে

    কামার, কুমোর, তাঁতী তার কাজে জোটে,

    সারাটা দুপুর ক্ষেতের চাষীরা কানে

    একটানা আর বিচিত্র ধ্বনি ওঠে।

    হঠাৎ সেদিন জল আনবার পথে

    কৃষক-বধূ সে থমকে তাকায় পাশে,

    ঘোমটা তুলে সে দেখে নেয় কোনোমতে,

    সবুজ ফসলে সুবর্ণ যুগ আসে॥

  • নিভৃত

    নিভৃত

    নিভৃত

    অনিশ্চিত পৃথিবীতে অরণ্যের ফুল

    রচে গেল ভুল;

    তারা তো জানত যারা পরম ঈশ্বর

    তাদের বিভিন্ন নয় স্তর,

    অনন্তর

    তারাই তাদের সৃষ্টিতে

    অনর্থক পৃথক দৃষ্টিতে

    একই কারুকার্যে নিয়মিত

    উত্তপ্ত গলিত

    ধাতুদের পরিচয় দিত।

    শেষ অধ্যায় এল অকস্মাৎ।

    তখন প্রমত্ত প্রতিঘাত

    শ্রেয় মেনে নিল ইতিহাস,

    অকল্পেয় পরিহাস

    সুদূর দিগন্তকোণে সকরুণ বিলাল নিঃশ্বাস।

    যেখানে হিমের রাজ্য ছিল,

    যেখানে প্রচ্ছন্ন ছিল পশুর মিছিলও

    সেখানেও ধানের মঞ্জরী

    প্রাণের উত্তাপে ফোটে, বিচ্ছিন্ন শর্বরী:

    সূর্য-সহচরী!

    তাই নিত্যবুভুক্ষিত মন

    চিরন্তন

    লোভের নিষ্ঠুর হাত বাড়াল চৌদিকে

    পৃথিবীকে

    একাগ্রতায় নিলো লিখে।

    সহসা প্রকম্পিত সুষুপ্ত সত্তায়

    কঠিন আঘাত লাগে সুনিরাপত্তায়।

    ব্যর্থ হল গুপ্ত পরিপাক,

    বিফল চীৎকার তোলে বুভুক্ষার কাক

    –পৃথিবী বিস্ময়ে হতবাক॥

  • বৈশম্পায়ন

    বৈশম্পায়ন

    বৈশম্পায়ন

    আকাশের খাপছাড়া ক্রন্দন

    নাই আর আষাঢ়ের খেলনা।

    নিত্য যে পাণ্ডুর জড়তা

    সথীহারা পথিকের সঞ্চয়।

    রিক্তের বুকভরা নিঃশ্বাস,

    আঁধারের বুকফাটা চীৎকার–

    এই নিয়ে মেতে আছি আমরা

    কাজ নেই হিসাবের খাতাতে।

    মিলাল দিনের কোনো ছায়াতে

    পিপাসায় আর কূল পাই না;

    হারানো স্মৃতির মৃদু গন্ধে

    প্রাণ কভু হয় নাকো চঞ্চল।

    মাঝে মাঝে অনাহূত আহ্বান

    আনে কই আলেয়ার বিত্ত?

    শহরের জমকালো খবরে

    হাজিরা খাতাটা থাকে শূন্য।

    আনমনে জানা পথ চলতে

    পাই নাকো মাদকের গন্ধ!

    রাত্রিদিনের দাবা চালেতে

    আমাদের মন কেন উষ্ণ?

    শ্মশানঘাটেতে ব’সে কখনো

    দেখি নাই মরীচিকা সহসা,

    তাই বুঝি চিরকাল আঁধারে

    আমরাই দেখি শুধু স্বপ্ন!

    বার বার কায়াহীন ছায়ারে

    ধরেছিনু বাহুপাশে জড়িয়ে,

    তাই আজ গৈরিক মাটিতে

    রঙ্গিন বসন করি শুদ্ধ॥

  • নিভৃত

    নিভৃত

    নিভৃত

    বিষণ্ণ রাত, প্রসন্ন দিন আনো

    আজ মরণের অন্ধ অনিদ্রায়,

    সে অন্ধতায় সূর্যের আলো হানো,

    শ্বেত স্বপ্নের ঘোরে যে মৃতপ্রায়।

    নিভৃত-জীবন-পরিচর্যায় কাটে

    যে দিনের, আজ সেখানে প্রবল দ্বন্দ্ব।

    নিরন্ন প্রেম ফেরে নির্জন হাটে,

    অচল চরণ ললাটের নির্বন্ধ?

    জীবন মরণে প্রাণের গভীরে দোলা

    কাল রাতে ছিল নিশীথ কুসুমগন্ধী,

    আজ সূর্যের আলোয় পথকে ভোলা

    মনে হয় ভীরু মনের দুরভিসন্ধি॥

  • কবে

    কবে

    কবে

    অনেক স্তব্ধ দিনের এপারে চকিত চুতুর্দিক,

    আজো বেঁচে আছি মৃত্যুতাড়িত আজো বেঁচে আছি ঠিক।

    দুলে ওঠে দিন; শপথমুখর কিষাণ শ্রমিকপাড়া,

    হাজারে হাজারে মাঠে বন্দরে আজকে দিয়েছে সাড়া।

    জ্বলে আলো আজ, আমাদের হাড়ে জমা হয় বিদ্যুৎ,

    নিহত দিনের দীর্ঘ শাখায় ফোটে বসন্তদূত।

    মূঢ় ইতিহাস; চল্লিশ কোটি সৈন্যের সেনাপতি।

    সংহত দিন, রুখবে কে এই একত্রীভূত গতি?

    জানি আমাদের অনেক যুগের সঞ্চিত স্বপ্নেরা

    দ্রুত মুকুলিত তোমার দিন ও রাত্রি দিয়েই ঘেরা।

    তাই হে আদিম, ক্ষতবিক্ষত জীবনের বিস্ময়,

    ছড়াও প্লাবন, দুঃসহ দিন আর বিলম্ব নয়।

    সারা পৃথিবীর দুয়ারে মুক্তি, এখানে অন্ধকার,

    এখানে কখন আসন্ন হবে বৈতরণীর পার?

  • অলক্ষ্যে

    অলক্ষ্যে

    অলক্ষ্যে

    আমার মৃত্যুর পর কেটে গেল বৎসর বৎসর;

    ক্ষয়িষ্ণু স্মৃতির ব্যর্থ প্রচেষ্টাও আজ অগভীর,

    এখন পৃথিবী নয় অতিক্রান্ত প্রায়ান্ধ স্থবির :

    নিভেছে প্রদূম্রজ্বালা, নিরঙ্কুশ সূর্য অনশ্বর;

    স্তব্ধতা নেমেছে রাত্রে থেমেছে নির্ভীক তীক্ষ্ণস্বর–

    অথবা নিরন্ন দিন, পৃথিবীতে দুর্ভিক্ষ ঘোষণা;

    উদ্ধত বজ্রের ভয়ে নিঃশব্দে মৃত্যুর আনাগোনা,

    অনন্য মানবসত্তা ক্রমান্বয়ে স্বল্পপরিসর।

    গলিত স্মৃতির বাস্প সেদিনের পল্লব শাখায়

    বারম্বার প্রতারিত অস্ফুট কুয়াশা রচনায়;

    বিলুপ্ত বজ্রের ঢেউ নিশ্চিত মৃত্যুতে প্রতিহত।

    আমার অজ্ঞাত দিন নগণ্য উদার উপেক্ষাতে

    অগ্রগামী শূন্যতাকে লাঞ্চিত করেছে অবিরত

    তথাপি তা প্রস্ফুটিত মৃত্যুর অদৃশ্য দুই হাতে॥

  • মহাত্মাজীর প্রতি

    মহাত্মাজীর প্রতি

    মহাত্মাজীর প্রতি

    চল্লিশ কোটি জনতার জানি আমিও যে একজন,

    হাঠাৎ ঘোষণা শুনেছি; আমার জীবনে শুভক্ষণ

    এসেছে, তখনি মুছে গেছে ভীরু চিন্তার হিজিবিজি।

    রক্তে বেজেছে উৎসব, আজ হাত ধরো গান্ধীজী।

    এখানে আমরা লড়েছি, মরেছি, করেছি অঙ্গীকার,

    এ মৃতদেহের বাধা ঠেলে হব অজেয় রাজ্য পার।

    এসেছে বন্যা, এসেছে মৃত্যু, পরে যুদ্ধের ঝড়,

    মন্বন্তর রেখে গেছে তার পথে পথে স্বাক্ষর,

    প্রতি মুহূর্তে বুঝেছি এবার মুছে নেবে ইতিহাস–

    তবু উদ্দাম, মৃত্যু-আহত ফেলি নি দীর্ঘশ্বাস;

    নগর গ্রামের শ্মশানে শ্মশানে নিহিত অভিজ্ঞান;

    বহু মৃত্যুর মুখোমুখি দৃঢ় করেছি জয়ের ধ্যান।

    তাইতো এখানে আজ ঘনিষ্ঠ স্বপ্নের কাছাকাছি,

    মনে হয় শুধু তোমারই মধ্যে-আমরা যে বেঁচে আছি–

    তোমাকে পেয়েছি অনেক মৃত্যু-উত্তরণের শেষে,

    তোমাকে গড়ব প্রাচীর, ধ্বংস-বিকীর্ণ এই দেশে।

    দিক্‌দিগন্তে প্রসারিত হাতে তুমি যে পাঠালে ডাক,

    তাইতো আজকে গ্রামে ও নগরে স্পন্দিত লাখে লাখ॥

  • পঁচিশে বৈশাখের উদ্দেশে

    পঁচিশে বৈশাখের উদ্দেশে

    পঁচিশে বৈশাখের উদ্দেশে

    আমার প্রার্থনা শোনো পঁচিশে বৈশাখ,

    আর একবার তুমি জন্ম দাও রবীন্দ্রনাথের।

    হাতাশায় স্তব্ধ বাক্য; ভাষা চাই আমরা নির্বাক,

    পাঠাব মৈত্রীর বাণী সারা পৃথিবীকে জানি ফের।

    রবীন্দ্রনাথের কণ্ঠে আমাদের ভাষা যাবে শোনা

    ভেঙে যাবে রুদ্ধশ্বাস নিরুদ্যম সুদীর্ঘ মৌনতা,

    আমাদের দুঃখসুখে ব্যক্ত হবে প্রত্যেক রচনা।

    পীড়নের প্রতিবাদে উচ্চারিত হবে সব কথা।

    আমি দিব্যচক্ষে দেখি অনাগত সে রবীন্দ্রনাথ :

    দস্যুতায় দৃপ্তকণ্ঠ (বিগত দিনের)

    ধৈর্যের বাঁধন যার ভাঙে দুঃশাসনের আঘাত,

    যন্ত্রণায় রুদ্ধবাক, যে যন্ত্রণা সহায়হীনের।

    বিগত দুর্ভিক্ষে যার উত্তেজিত তিক্ত তীব্র ভাষা

    মৃত্যুতে ব্যথিত আর লোভের বিরুদ্ধে খরধার।

    ধ্বংসের প্রান্তরে বসে আনে দৃঢ় অনাহত আশা;

    তাঁর জন্ম অনিবার্য, তাঁকে ফিরে পাবই আবার।

    রবীন্দ্রনাথের সেই ভুলে যাওয়া বাণী

    অকস্মাৎ করে কানাকানি:

    ‘দামামা ঐ বাজে, দিন বদলের পালা

    এ ঝড়ো যুগের মাঝে’।

    নিষ্কম্প গাছের পাতা, রুদ্ধশ্বাস অগ্নিগর্ভ দিন,

    বিষ্ফারিত দৃষ্টি মেলে এ আকাশ, গতিরুদ্ধ রায়ু;

    আবিশ্ব জিজ্ঞাসা এক চোখে মুখে ছড়ায় রঙিন

    সংশয় স্পন্দিত স্বপ্ন, ভীত আশা উচ্চারণহীন

    মেলে না উত্তর কোনো, সমস্যায় উত্তেজিত স্নায়ু।

    ইতিহাস মোড় ফেরে পদতলে বিধ্বস্ত বার্লিন ,

    পশ্চিম সীমান্তে শান্তি, দীর্ঘ হয় পৃথিবীর আয়ু,

    দিকে দিকে জয়ধ্বনি, কাঁপে দিন রক্তাক্ত আভায়।

    রামরাবণের যুদ্ধে বিক্ষত এ ভারতজটায়ু

    মৃতপ্রায়, যুদ্ধাহত, পীড়নে-দুর্ভিক্ষে মৌনমূক।

    পূর্বাঞ্চল দীপ্ত ক’রে বিশ্বজন-সমৃদ্ধ সভায়

    রবীন্দ্রনাথের বাণী তার দাবি ঘোষণা করুক।

    এবারে নতুন রূপে দেখা দিক রবীন্দ্রঠাকুর

    বিপ্লবের স্বপ্ন চোখে কণ্ঠে গণ-সংগীতের সুর;

    জনতার পাশে পাশে উজ্জ্বল পতাকা নিয়ে হাতে

    চলুক নিন্দাকে ঠেলে গ্লানি মুছে আঘাতে আঘাতে।

    যদিও সে অনাগত, তবু যেন শুনি তার ডাক।

    আমাদেরই মাঝে তাকে জন্ম দাও পঁচিশে বৈশাখ॥

  • পরিশিষ্ট

    পরিশিষ্ট

    পরিশিষ্ট

    অনেক উল্কার স্রোত বয়েছিল হঠাৎ প্রত্যুষে,

    বিনিদ্র তারার বক্ষে পল্লবিত মেঘ

    ছুঁয়েছিল রশ্মিটুকু প্রথম আবেগে।

    অকস্মাৎ কম্পমান অশরীরী দিন,

    রক্তের বাসরঘরে বিবর্ণ মৃত্যুর বীজ

    ছড়াল আসন্ন রাজপথে।

    তবু স্বপ্ন নয়:

    গোধূলীর প্রত্যহ ছায়ায়

    গোপন স্বাক্ষর সৃষ্টি কক্ষচ্যুত গ্রহ-উপবনে :

    দিগন্তের নিশ্চল আভাস

    ভস্মীভূত শ্মশানক্রন্দনে,

    রক্তিম আকাশচিহ্ন সবেগে প্রস্থান করে

    যূথ ব্যঞ্জনায়।

    নিষিদ্ধ কল্পনাগুলি বন্ধ্যা তবু

    অলক্ষ্যে প্রসব করে অব্যক্ত যন্ত্রণা,

    প্রথম যৌবন তার রক্তময় রিক্ত জয়টীকা

    স্তম্ভিত জীবন হতে নিঃশেষে নিশ্চিহ্ন ক’রে দিল।

    তারপর :

    প্রান্তিক যাত্রায়

    অতৃপ্ত রাত্রির স্বাদ,

    বাসর শয্যায়

    অসম্বৃত দীর্ঘশ্বাস

    বিস্মরণী সুরাপানে নিত্য নিমজ্জিত

    স্বগত জাহ্নবীজলে।

    তৃষ্ণার্ত কঙ্কাল

    অতীত অমৃত পানে দৃষ্টি হানে কত!

    সর্বগ্রাসী প্রলুব্ধ চিতার অপবাদে

    সভয়ে সন্ধান করে ইতিবৃত্ত দগ্ধপ্রায় মনে।

    প্রেতাত্মার প্রতিবিম্ব বার্ধক্যের প্রকম্পনে লীন,

    অনুর্বর জীবনের সূর্যোদয় :

    ভস্মশেষ চিতা।

    কুজ্ঝটিকা মূর্ছা গেল আলোক-সম্পাতে,

    বাসনা-উদ্গ্রীব চিন্তা

    উন্মুখ ধ্বংসের আর্তনাদে।

    সরীসৃপ বন্যা যেন জড়তার স্থির প্রতিবাদ,

    মানবিক অভিযানে নিশ্চিন্ত উষ্ণীষ!

    প্রচ্ছন্ন অগ্ন্যুৎপাতে সংজ্ঞাহীন মেরুদণ্ড-দিন

    নিতান্ত ভঙ্গুর, তাই উদ্যত সৃষ্টির ত্রাসে কাঁপে :

    পণ্যভারে জর্জরিত পাথেয় সংগ্রাম,

    চকিত হরিণদৃষ্টি অভুক্ত মনের পুষ্টিকর :

    অনাসক্ত চৈতন্যের অস্থায়ী প্রয়াণ।

    অথবা দৈবাৎ কোন নৈর্ব্যক্তিক আশার নিঃশ্বাস

    নগণ্য অঙ্গারতলে খুঁজেছে অন্তিম।

    রুদ্ধশ্বাস বসন্তের আদিম প্রকাশ,

    বিপ্রলব্ধ জনতার কুটিল বিষাক্ত পরিবাদে

    প্রত্যহ লাঞ্ছিত স্বপ্ন,

    স্পর্ধিত আঘাত!

    সুষুপ্ত প্রকোষ্ঠতলে তন্দ্রাহীন দ্বৈতাচারী নর

    নিজেরে বিনষ্ট করে উৎসারিত ধূমে,

    অদ্ভুত ব্যাধির হিমছায়া

    দীর্ণ করে নির্যাতিত শুদ্ধ কল্পনাকে;

    সদ্যমৃত-পৃথিবীর মানুষের মতো

    প্রত্যেক মানবমনে একই উত্তাপ অবসাদে।

    তবুও শার্দূল-মন অন্ধকারে সন্ধ্যার মিছিলে

    প্রথম বিস্ময়দৃষ্টি মেলে ধরে বিষাক্ত বিশ্বাসে।

    বহ্নিমান তপ্তশিখা উন্মেষিত প্রথম স্পর্ধায়–

    বিষকন্যা পৃথিবীর চক্রান্তে বিহ্বল

    উপস্থিত প্রহরী সভ্যতা।

    ধূসর অগ্নির পিণ্ড: উত্তাপবিহীন

    স্তিমিত মত্ততাগুলি স্তব্ধ নীহারিকা,

    মৃত্তিকার ধাত্রী অবশেষে॥

  • মীমাংসা

    মীমাংসা

    মীমাংসা

    আজকে হঠাৎ সাত-সমুদ্র তের-নদী

    পার হতে সাধ জাগে মনে, হায় তবু যদি

    পক্ষপাতের বালাই না নিয়ে পক্ষীরাজ

    প্রস্রবণের মতো এসে যেত হঠাৎ আজ–

    তাহলে না হয় আকাশ বিহার হত সফল,

    টুকরো মেঘেরা যেতে যেতে ছুঁয়ে যেত কপোল।

    আর আমি বুঝি দৈত্যদলনে সাগর পার

    হতাম; যেখানে দানবের দায়ে সব আঁধার।

    মত্ত যেখানে দৈত্যে দৈত্যে বিবাদ ভারি;

    হানাহানি নিয়ে সুন্দরী এক রাজকুমারী।

    (রাজকন্যার লোভ নেই, –লোভ অলঙ্কারে,

    দৈত্যেরা শুধু বিবস্ত্রা ক’রে চায় তাহারে)।

    আমি একজন লুপ্তগর্ব রাজার তনয়

    এত অন্যায় সহ্য করব কোনোমতে নয়–

    তাই আমি যেতে চাই সেখানেই যেখানে পীড়ন,

    যেখানে ঝল্‌সে উঠবে আমার অসির কিরণ।

    ভাঙাচোরা এক তলোয়ার আছে, (নয় দু’ধারী)

    তাও হ’ত তবে পক্ষীরাজেরই অভাব ভারি।

    তাই ভাবি আজ, তবে আমি খুঁজে নেব কৌপীন

    নেব কয়েকটা বেছে জানা জানা বুলি সৌখিন॥

  • অবৈধ

    অবৈধ

    অবৈধ

    আজ মনে হয় বসন্ত আমার জীবনে এসেছিল

    উত্তর মহাসাগরের কূলে

    আমার স্বপ্নের ফুলে

    তারা কথা কয়েছিল

    অস্পষ্ট পুরনো ভাষায়।

    অস্ফুট স্বপ্নের ফুল

    অসহ্য সূর্যের তাপে

    অনিবার্য ঝরেছিল

    মরেছিল নিষ্ঠুর প্রগল্‌ভ হতাশায়।

    হঠাৎ চমকে ওঠে হাওয়া

    সেদিন আর নেই–

    নেই আর সূর্য-বিকিরণ

    আমার জীবনে তাই ব্যর্থ হল বাসন্তীমরণ!

    শুনি নি স্বপ্নের ডাক :

    থেকেছি আশ্চর্য নির্বাক

    বিন্যস্ত করেছি প্রাণ বুভুক্ষার হাতে।

    সহসা একদিন

    আমার দরজায় নেমে এল

    নিঃশব্দে উড়ন্ত গৃধিনীরা।

    সেইদিন বসন্তের পাখি

    উড়ে গেল

    যেখানে দিগন্ত ঘনায়িত !

    আজ মনে হয়

    হেমন্তের পড়ন্ত রোদ্দুরে,

    কী ক’রে সম্ভব হল

    আমার রক্তকে ভালবাসা!

    সূর্যের কুয়াশা

    এখনো কাটে নি

    ঘোচে নি অকাল দুর্ভাবনা।

    মুহূর্তের সোনা

    এখনো সভয়ে ক্ষয় হয়,

    এরই মধ্যে হেমন্তের পড়ন্ত রোদ্দুর

    কঠিন কাস্তেতে দেয় সুর,

    অন্যমনে এ কী দুর্ঘটনা–

    হেমন্তেই বসন্তের প্রস্তাব রটনা॥

  • ১৯৪১ সাল

    ১৯৪১ সাল

    ১৯৪১ সাল

    নীল সমুদ্রের ইশারা–

    অন্ধকারে ক্ষীণ আলোর ছোট ছোট দ্বীপ,

    আর সূর্যময় দিনের স্তব্ধতা;

    নিঃশব্দ দিনের সেই ভীরু অন্তঃশীল

    মত্ততাময় পদক্ষেপ :

    এ সবের ম্লান আধিপত্য বুঝি আর

    জীবনের ওপর কালের ব্যবচ্ছেদ-ভ্রষ্ট নয়

    তাই রক্তাক্ত পৃথিবীর ডাকঘর থেকে

    ডাক এল–

    সভ্যতার ডাক

    নিষ্ঠুর ক্ষুধার্ত পরোয়ানা

    আমাকে চিহ্নিত ক’রে গেল।

    আমার একক পৃথিবী

    ভেসে গেল জনতার প্রবল জোয়ারে।

    মনের স্বচ্ছতার ওপর বিরক্তির শ্যাওলা

    গভীরতা রচনা করে,

    আর শঙ্কিত মনের অস্পষ্টতা

    ইতস্ততঃ ধাবমান।

    নির্ধারিত জীবনেও মাটির মাশুল

    পূর্ণতায় মূর্তি চায়;

    আমার নিষ্ফল প্রতিবাদ,

    আরো অনেকের বিরুদ্ধে বিবক্ষা

    তাই পরাহত হল।

    কোথায় সেই দূর সমুদ্রের ইশারা

    আর অন্ধকারের নির্বিরোধ ডাক!

    দিনের মুখে মৃত্যুর মুখোস।

    যে সব মুহূর্ত-পরমাণু

    গেঁথেছিল অস্থায়ী রচনা,

    সে সব মুহূর্ত আজ

    প্রাণের অস্পষ্ট প্রশাখায়

    অজ্ঞাত রক্তিম ফুল ফোটে॥

  • রোম : ১৯৪৩

    রোম : ১৯৪৩

    রোম : ১৯৪৩

    ভেঙ্গেছে সাম্রাজ্যস্বপ্ন, ছত্রপতি হয়েছে উধাও;

    শৃঙ্খল গড়ার দুর্গ ভূমিসাৎ বহু শতাব্দীর।

    ‘সাথী, আজ দৃঢ় হাতে হাতিয়ার নাও’ –

    রোমের প্রত্যেক পথে ওঠে ডাক ক্রমশ অস্থির।

    উদ্ধত ক্ষমতালোভী দস্যুতার ব্যর্থ পরাক্রম

    মুক্তির উত্তপ্ত স্পর্শে প্রকম্পিত যুগ যুগ অন্ধকার রোম।

    হাজার বছর ধ’রে দাসত্ব বেঁধেছে বাসা রোমের দেউলে,

    দিয়েছে অনেক রক্ত রোমের শ্রমিক–

    তাদের শক্তির হাওয়া মুক্তির দুয়ার দিল খুলে,

    আজকে রক্তাক্ত পথ; উদ্ভাসিত দিক।

    শিল্পী আর মজুরের বহু পরিশ্রম

    একদিন গড়েছিল রোম,

    তারা আজ একে একে ভেঙে দেয় রোমের সে সৌন্দর্যসম্ভার,

    ভগ্নস্তূপে ভবিষ্যৎ মুক্তির প্রচার।

    রোমের বিপ্লবী হৃৎস্পন্দনে ধ্বনিত

    মুক্তির সশস্ত্র ফৌজ আসে অগণিত,

    দুচোখে সংহার স্বপ্ন, বুকে তীব্র ঘৃণা

    শত্রুকে বিধ্বস্ত করা যেতে পারে কিনা

    রাইফেলের মুখে এই সংক্ষিপ্ত জিজ্ঞাসা।

    যদিও উদ্বেগ মনে, তবু দীপ্ত আশা–

    পথে পথে জনতার রক্তাক্ত উত্থান,

    বিস্ফোরণে বিস্ফোরণে ডেকে ওঠে বান।

    ভেঙে পড়ে দস্যুতার, পশুতার প্রথম প্রাসাদ

    বিক্ষুব্ধ অগ্ন্যুৎপাতে উচ্চারিত শোষণের বিরুদ্ধে জেহাদ।

    যে উদ্ধত একদিন দেশে দেশে দিয়েছে শৃঙ্খল

    আবিসিনিয়ার চোখে আজ তার সে দম্ভ নিষ্ফল।

    এদিকে ত্বরিত সূর্য রোমের আকাশে

    যদিও কুয়াশাঢাকা আকাশের নীল,

    তবুও বিপ্লবী জানে, সোভিয়েট পাশে॥

  • জনরব

    জনরব

    জনরব

    পাখি সব করে রব, রাত্রি শেষ ঘোষণা চৌদিকে,

    ভোরের কাকলি শুনি; অন্ধকার হয়ে আসে ফিকে,

    আমার ঘরেও রুদ্ধ অন্ধকার, ষ্পষ্ট নয় আলো,

    পাখিরা ভোরের বার্তা অকস্মাৎ আমাকে শোনালো।

    স্বপ্ন ভেঙে জেগে উঠি, অন্ধকারে খাড়া করি কান–

    পাখিদের মাতামাতি, শুনি মুখরিত ঐকতান;

    আজ এই রাত্রিশেষে বাইরে পাখির কলরবে

    রুদ্ধ ঘরে ব’সে ভাবি, হয়তো কিছু বা শুরু হবে,

    হয়তো এখনি কোনো মুক্তিদূত দুরন্ত রাখাল,

    মুক্তির অবাধ মাঠে নিয়ে যাবে জনতার পাল;

    স্বপ্নের কুসুমকলি হয়তো বা ফুটেছে কাননে,

    আমি কি খবর রাখি? আমি বদ্ধ থাকি গৃহকোণে,

    নির্বাসিত মন চিরকাল অন্ধকারে বাসা,

    তাইতো মুক্তির স্বপ্ন আমাদের নিতান্ত দুরাশা।

    জন-পাখিদের কণ্ঠে তবুও আলোর অভ্যর্থনা.

    দিকে দিকে প্রতিদিন অবিশ্রান্ত শুধু যায় শোনা;

    এরা তো নগণ্য জানি, তুচ্ছ বলে ক’রে থাকি ঘৃণা,

    আলোর খবর এরা কি ক’রে যে পায় তা জানি না।

    এদের মিলিত সুরে কেন যেন বুক ওঠে দুলে,

    অকস্মাৎ পূর্বদিকে মনের জানালা দিই খুলে:

    হঠাৎ বন্দর ছাড়া বাঁশি বুঝি বাজায় জাহাজ,

    চকিতে আমার মনে বিদ্যুৎ বিদীর্ণ হয় আজ।

    অদূরে হঠাৎ বাজে কারখানার পাঞ্চজন্যধ্বনি,

    দেখি দলে দলে লোক ঘুম ভেঙে ছুটছে তখনি,

    মনে হয়, যদি বাজে মুক্তি-কারখানার তীব্র শাঁখ

    তবে কি হবে না জমা সেখানে জনতা লাখে লাখ?

    জন-পাখিদের গানে মুখরিত হবে কি আকাশ?

    – ভাবে নির্বাসিত মন, চিরকাল অন্ধকারে বাস।

    পখিদের মাতামাতি: বুঝি মুক্তি নয় অসম্ভব,

    যদিও ওঠে নি সূর্য, তবু আজ শুনি জনরব॥

  • রৌদ্রের গান

    রৌদ্রের গান

    রৌদ্রের গান

    এখানে সূর্য ছড়ায় অকৃপণ

    দুহাতে তীব্র সোনার মতন মদ,

    যে সোনার মদ পান ক’রে ধন ক্ষেত

    দিকে দিকে তার গড়ে তোলে জনপদ।

    ভারতী! তোমার লাবণ্য দেহ ঢাকে

    রৌদ্র তোমায় পরায় সোনার হার,

    সূর্য তোমার শুকায় সবুজ চুল

    প্রেয়সী, তোমার কত না অহংকার।

    সারাটা বছর সূর্য এখানে বাঁধা

    রোদে ঝলসায় মৌন পাহাড় কোনো,

    অবাধ রোদ্রে তীব্র দহন ভরা

    রৌদ্রে জ্বলুক তোমার আমার মনও।

    বিদেশকে আজ ডাকো রৌদ্রের ভোজে

    মুঠো মুঠো দাও কোষাগার-ভরা সোনা,

    প্রান্তর বন ঝলমল করে রোদে,

    কী মধুর আহা রৌদ্রে প্রহর গোনা!

    রৌদ্রে কঠিন ইস্পাত উজ্জ্বল

    ঝকমক করে ইশারা যে তার বুকে

    শূন্য নীরব মাঠে রৌদ্রের প্রজা

    স্তব করে জানি সূর্যের সম্মুখে।

    পথিক-বিরল রাজপথে সূর্যের

    প্রতিনিধি হাঁকে আসন্ন কলরব,

    মধ্যাহ্নের কঠোর ধ্যানের শেষে

    জানি আছে এক নির্ভয় উৎসব।

    তাইতো এখানে সূর্য তাড়ায় রাত

    প্রেয়সী, তুমি কি মেঘভয়ে আজ ভীত?

    কৌতুকছলে এ মেঘ দেখায় ভয়,

    এ ক্ষণিক মেঘ কেটে যাবে নিশ্চিত।

    সূর্য, তোমায় আজকে এখানে ডাকি–

    দুর্বল মন, দুর্বলতর কায়া,

    আমি যে পুরনো অচল দীঘির জল

    আমার এ বুকে জাগাও প্রতিচ্ছায়া॥

  • দেওয়ালী

    দেওয়ালী

    দেওয়ালী

    শ্রীভূপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য-কে

    তোর সেই ইংরাজীতে দেওয়ালীর শুভেচ্ছা কামনা

    পেয়েছি, তবুও আমি নিরুৎসাহে আজ অন্যমনা,

    আমার নেইকো সুখ, দীপান্বিতা লাগে নিরুৎসব,

    রক্তের কুয়াশা চোখে, স্বপ্নে দেখি শব আর শব।

    এখানে শুয়েই আমি কানে শুনি আর্তনাদ খালি,

    মুমূর্ষু কলকাতা কাঁদে, কাঁদে ঢাকা, কাঁদে নোয়াখালী,

    সভ্যতাকে পিষে ফেলে সাম্রাজ্য ছড়ায় বর্বরত :

    এমন দুঃসহ দিনে ব্যর্থ লাগে শুভেচ্ছার কথা;

    তবু তোর রঙচঙে সুমধুর চিঠির জবাবে

    কিছু আজ বলা চাই, নইলে যে প্রাণের অভাবে

    পৃথিবী শুকিয়ে যাবে, ভেসে যাবে রক্তের প্লাবনে।

    যদিও সর্বদা তোর শুভ আমি চাই মনে মনে,

    তবুও নতুন ক’রে আজ চাই তোর শান্তিসুখ,

    মনের আঁধারে তোর শত শত প্রদীপ জ্বলুক,

    এ দুর্যোগ কেটে যাবে, রাত আর কতক্ষণ থাকে?

    আবার সবাই মিলবে প্রত্যাসন্ন বিপ্লবের ডাকে,

    আমার ঐশ্বর্য নেই, নেই রঙ, নেই রোশনাই–

    শুধু মাত্র ছন্দ আছে, তাই দিয়ে শুভেচ্ছা পাঠাই॥

  • পূর্বাভাস

    পূর্বাভাস

    পূর্বাভাস

    কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অসামান্য জনপ্রিয় এবং শক্তিমান কবি ছিলেন। কৈশোর থেকেই তিনি যুক্ত হয়েছিলেন সাম্যবাদী রাজনীতির সঙ্গে। পরাধীন দেশের দুঃখ দুর্দশাজনিত বেদনা এবং শোষণ মুক্ত স্বাধীন সমাজের স্বপ্ন, শোষিত মানুষের কর্ম জীবন এবং ভবিষ্যৎ পৃথিবীর জন্য সংগ্রাম তাঁর কবিতার মূল প্রেরণা। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ছাড়পত্র (১৯৪৮) বাংলা সাহিত্যে বিষয়বস্তুর অভিনবত্বের চেয়েও প্রকাশ ভঙ্গির বলিষ্ঠতা এবং প্রতিমা নির্মাণের অভিনবত্বের জন্য পাঠক সমাজে অকুণ্ঠ প্রশংসা পেয়েছে। ঘুম নেই (১৯৫০), পূর্বাভাস (১৯৫০), মিঠে কড়া (১৯৫২) প্রভৃতি কবির প্রতিভার উজ্জ্বল সাক্ষ্য।

    পূর্বাভাস সুকান্ত ভট্টাচার্যের তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ। এতে মোট ২৯টি কবিতা রয়েছে। কবিতাগুলো হল—পূর্বাভাস, হে পৃথিবী, সহসা, স্মারক, নিবৃত্তির পূর্বে, স্বপ্নপথ, সুতরাং, বুদ্বুদ মাত্র, আলো–অন্ধকার, প্রতিদ্বন্দ্বী, আমার মৃত্যুর পর, স্বতঃসিদ্ধ, মুহূর্ত (ক), মুহূর্ত (খ), তরঙ্গ ভঙ্গ, আসন্ন আঁধারে, পরিবেশন, অসহ্য দিন, উদ্যোগ, পরাভব, বিভীষণের প্রতি, জাগবার দিন আজ, ঘুমভাঙার গান, হদিশ, দেয়ালিকা, প্রথম বার্ষিকী, তারুণ্য, মৃত পৃথিবী ও দুর্মর।

  • পূর্বাভাস (কবিতা)

    পূর্বাভাস (কবিতা)

    পূর্বাভাস (কবিতা)

    সন্ধ্যার আকাশতলে পীড়িত নিঃশ্বাসে

    বিশীর্ণ পাণ্ডুর চাঁদ ম্লান হয়ে আসে।

    বুভুক্ষু প্রেতেরা হাসে শাণিত বিদ্রূপে,

    প্রাণ চাই শতাব্দীর বিলুপ্ত রক্তের–

    সুষুপ্ত যক্ষেরা নিত্য কাঁদিছে ক্ষুধায়

    ধূর্ত দাবাগ্নি আজ জ্বলে চুপে চুপে

    প্রমত্ত কস্তুরীমৃগ ক্ষুব্ধ চেতনায়

    বিপন্ন করুণ ডাকে তোলে আর্তনাদ।

    ব্যর্থ আজ শব্দভেদী বাণ–

    সহস্র তির্যকশৃঙ্গ করিছে বিবাদ –

    জীবন-মৃত্যুর সীমানায়।

    লাঞ্ছিত সম্মান।

    ফিরে চায় ভীরু-দৃষ্টি দিয়ে।

    দুর্বল তিতিক্ষা আজ দুর্বাশার তেজে

    স্বপ্ন মাঝে উঠেছে বিষিয়ে।

    দূর পূর্বাকাশে,

    বিহ্বল বিষাণ উঠে বেজে

    মরণের শিরায় শিরায়।

    মুমূর্ষু বিবর্ণ যত রক্তহীন প্রাণ–

    বিস্ফারিত হিংস্র-বেদনায়।

    অসংখ্য স্পন্দনে চলে মৃত্যু অভিযান

    লৌহের দুয়ারে পড়ে কুটিল আঘাত,

    উত্তপ্ত মাটিতে ঝরে বর্ণহীন শোণিত প্রপাত।

    সুপ্তোত্থিত পিরামিড দুঃসহ জ্বালায়

    পৈশাচিক ক্রূর হাসি হেসে

    বিস্তীর্ণ অরণ্য মাঝে কুঠার চালায়।

    কালো মৃত্যু ফিরে যায় এসে॥

  • হে পৃথিবী

    হে পৃথিবী

    হে পৃথিবী

    হে পৃথিবী, আজিকে বিদায়

    এ দুর্ভাগা চায়,

    যদি কভু শুধু ভুল ক’রে

    মনে রাখো মোরে,

    বিলুপ্ত সার্থক মনে হবে

    দুর্ভাগার!

    বিস্মৃত শৈশবে

    যে আঁধার ছিল চারিভিতে

    তারে কি নিভৃতে

    আবার আপন ক’রে পাব,

    ব্যর্থতার চিহ্ন এঁকে যাব,

    স্মৃতির মর্মরে?

    প্রভাতপাখির কলস্বরে

    যে লগ্নে করেছি অভিযান,

    আজ তার তিক্ত অবসান।

    তবু তো পথের পাশে পাশে

    প্রতি ঘাসে ঘাসে।

    লেগেছে বিস্ময়!

    সেই মোর জয়॥