Category: সুকান্ত ভট্টাচার্য

  • কাশ্মীর

    কাশ্মীর

    কাশ্মীর

    সেই বিশ্রী দম-আটকানো কুয়াশা আর নেই

    নেই সেই একটানা তুষার-বৃষ্টি,

    হঠাৎ জেগে উঠেছে—

    সূর্যের ছোঁয়ায় চমকে উঠেছে ভূস্বর্গ।

    দুহাতে তুষারের পর্দা সরিয়ে ফেলে

    মুঠো মুঠো হলদে পাতাকে দিয়েছে উড়িয়ে,

    ডেকেছে রৌদ্রকে,

    ডেকেছে তুষার-উড়িয়ে-নেওয়া বৈশাখী ঝড়কে,

    পৃথিবীর নন্দন-কানন কাশ্মীর।

    কাশ্মীরের সুন্দর মুখ কঠোর হল

    প্রচণ্ড সূর্যের উত্তাপে।

    গলে গলে পড়ছে বরফ–

    ঝরে ঝরে পড়ছে জীবনের স্পন্দন :

    শ্যামল আর সমতল মাটির

    স্পর্শ লেগেছে ওর মুখে,

    দক্ষিণ সমুদ্রের হাওয়ায় উড়ছে ওর চুল :

    আন্দোলিত শাল, পাইন আর দেবদারুর বনে

    ঝড়ের পক্ষে আজ সুস্পষ্ট সম্মতি।

    কাশ্মীর আজ আর জমাট-বাঁধা বরফ নয় :

    সূর্য-করোত্তাপে জাগা কঠোর গ্রীষ্মে

    হাজার হাজার চঞ্চল স্রোত।

    তাই আজ কাল-বৈশাখীর পতাকা উড়ছে

    ক্ষুব্ধ কাশ্মীরের উদ্দাম হাওয়ায় হাওয়ায়;

    দুলে দুলে উঠছে

    লক্ষ লক্ষ বছর ধরে ঘুমন্ত, নিস্তব্ধ

    বিরাট ব্যাপ্ত হিমালয়ের অসহিষ্ণু বুক॥

    দম-আটকানো কুয়াশা তো আর নেই

    নেই আর সেই বিশ্রী তুষার-বৃষ্টি,

    সূর্য ছুঁয়েছে ‘ভূস্বর্গ চঞ্চল’

    সহসা জেগেই চমকে উঠেছে দৃষ্টি।

    দুহাতে তুষার-পর্দা সরিয়ে ফেলে

    হঠাৎ হলদে পাতাকে দিয়েছে উড়িয়ে

    রোদকে ডেকেছে নন্দনবন পৃথিবীর

    বৈশাখী ঝড় দিয়েছে বরফ গুঁড়িয়ে।

    সুন্দর মুখ কঠোর করেছে কাশ্মীর

    তীক্ষ্ণ চাহনি সূর্যের উত্তাপে,

    গলিত বরফে জীবনের স্পন্দন

    শ্যামল মাটির স্পর্শে ও আজ কাঁপে।

    সাগর-বাতাসে উড়ছে আজ ওর চুল

    শাল দেবদারু পাইনের বনে ক্ষোভ,

    ঝড়ের পক্ষে চূড়ান্ত সম্মতি–

    কাশ্মীর নয়, জমাট বাঁধা বরফ।

    কঠোর গ্রীষ্মে সূর্যোত্তাপে জাগা–

    কাশ্মীর আজ চঞ্চল-স্রোত লক্ষ :

    দিগ্‌দিগন্তে ছুটে ছুটে চলে দুর্বার

    দুঃসহ ক্রোধে ফুলে ফুলে ওঠে বক্ষ।

    ক্ষুব্ধ হাওয়ায় উদ্দাম উঁচু কাশ্মীর

    কালবোশেখীর পতাকা উড়ছে নভে,

    দুলে দুলে ওঠে ঘুমন্ত হিমালয়

    বহু যুগ পরে বুঝি জাগ্রত হবে॥

  • সিগারেট

    সিগারেট

    সিগারেট

    আমরা সিগারেট।

    তোমরা আমাদের বাঁচতে দাও না কেন?

    আমাদের কেন নিঃশেষ করো পুড়িয়ে?

    কেন এত স্বল্প-স্থায়ী আমাদের আয়ু?

    মানবতার কোন্ দোহাই তোমরা পাড়বে?

    আমাদের দাম বড় কম এই পৃথিবীতে।

    তাই কি তোমরা আমাদের শোষণ করো?

    বিলাসের সামগ্রী হিসাবে ফেলো পুড়িয়ে?

    তোমাদের শোষণের টানে আমরা ছাই হই :

    তোমরা নিবিড় হও আরামের উত্তাপে।

    তোমাদের আরাম : আমাদের মৃত্যু।

    এমনি ক’রে চলবে আর কত কাল?

    আর কতকাল আমরা এমনি নিঃশব্দে ডাকব

    আয়ু-হরণকারী তিল তিল অপঘাতকে?

    দিন আর রাত্রি – রাত্রি আর দিন;

    তোমরা আমাদের শোষণ করছ সর্বক্ষণ–

    আমাদের বিশ্রাম নেই, মজুরি নেই–

    নেই কোনো অল্প-মাত্রার ছুটি।

    তাই, আর নয়;

    আর আমরা বন্দী থাকব না

    কৌটোয় আর প্যাকেটে;

    আঙুলে আর পকেটে

    সোনা-বাঁধানো ‘কেসে’ আমাদের নিঃশ্বাস হবে না রুদ্ধ।

    আমরা বেরিয়ে পড়ব,

    সবাই একজোটে, একত্রে–

    তারপর তোমাদের অসতর্ক মুহূর্তে

    জ্বলন্ত আমরা ছিট্‌কে পড়ব তোমাদের হাত থেকে

    বিছানায় অথবা কাপড়ে;

    নিঃশব্দে হঠাৎ জ্বলে উঠে

    বাড়িসুদ্ধ পুড়িয়ে মারব তোমাদের

    যেমন করে তোমরা আমাদের পুড়িয়ে মেরেছ এতকাল॥

  • দেশলাই কাঠি

    দেশলাই কাঠি

    দেশলাই কাঠি

    আমি একটা ছোট্ট দেশলাইয়ের কাঠি

    এত নগণ্য, হয়তো চোখেও পড়ি না :

    তবু জেনো

    মুখে আমার উসখুস করছে বারুদ–

    বুকে আমার জ্বলে উঠবার দুরন্ত উচ্ছ্বাস;

    আমি একটা দেশলাইয়ের কাঠি।

    মনে আছে সেদিন হুলুস্থূল বেধেছিল?

    ঘরের কোণে জ্বলে উঠেছিল আগুন–

    আমাকে অবজ্ঞাভরে না-নিভিয়ে ছুঁড়ে ফেলায় !

    কত ঘরকে দিয়েছি পুড়িয়ে,

    কত প্রাসাদকে করেছি ধূলিসাৎ

    আমি একাই—ছোট্ট একটা দেশলাই কাঠি।

    এমনি বহু নগর, বহু রাজ্যকে দিতে পারি ছারখার করে

    তবুও অবজ্ঞা করবে আমাদের?

    মনে নেই? এই সেদিন–

    আমরা সবাই জ্বলে উঠেছিলাম একই বাক্সে;

    চমকে উঠেছিলে—

    আমরা শুনেছিলাম তোমাদের বিবর্ণ মুখের আর্তনাদ।

    আমাদের কী অসীম শক্তি

    তা তো অনুভব করেছ বারংবার;

    তবু কেন বোঝো না,

    আমরা বন্দী থাকবো না তোমাদের পকেটে পকেটে,

    আমরা বেরিয়ে পড়ব, আমরা ছড়িয়ে পড়ব

    শহরে, গঞ্জে, গ্রামে–দিগন্ত থেকে দিগন্তে।

    আমরা বার বার জ্বলি, নিতান্ত অবহেলায়—

    তা তো তোমরা জানোই!

    কিন্তু তোমরা তো জানো না :

    কবে আমরা জ্বলে উঠব—

    সবাই শেষবারের মতো।

  • বিবৃতি

    বিবৃতি

    বিবৃতি

    আমার সোনার দেশে অবশেষে মন্বন্তর নামে,

    জমে ভিড় ভ্রষ্টনীড় নগরে ও গ্রামে,

    দুর্ভিক্ষের জীবন্ত মিছিল,

    প্রত্যেক নিরন্ন প্রাণে বয়ে আনে অনিবার্য মিল।

    আহার্যের অন্বেষণে প্রতি মনে আদিম আগ্রহ

    রাস্তায় রাস্তায় আনে প্রতিদিন নগ্ন সমারোহ;

    বুভুক্ষা বেঁধেছে বাসা পথের দু’পাশে,

    প্রত্যহ বিষাক্ত বায়ু ইতস্তত ব্যর্থ দীর্ঘশ্বাসে।

    মধ্যবিত্ত ধূর্ত সুখ ক্রমে ক্রমে আবরণহীন

    নিঃশব্দে ঘোষণা করে দারুণ দুর্দিন,

    পথে পথে দলে দলে কঙ্কালের শোভাযাত্রা চলে,

    দুর্ভিক্ষ গুঞ্জন তোলে আতঙ্কিত অন্দরমহলে!

    দুয়ারে দুয়ারে ব্যগ্র উপবাসী প্রত্যাশীর দল,

    নিষ্ফল প্রার্থনা-ক্লান্ত, তীব্র ক্ষুধা অন্তিম সম্বল;

    রাজপথে মৃতদেহ উগ্র দিবালোকে,

    বিস্ময় নিক্ষেপ করে অনভ্যস্ত চোখে।

    পরন্তু এদেশে আজ হিংস্র শত্রু আক্রমণ করে,

    বিপুল মৃত্যুর স্রোত টান দেয় প্রাণের শিকড়ে,

    নিয়ত অন্যায় হানে জরাগ্রস্ত বিদেশী শাসন,

    ক্ষীণায়ু কোষ্ঠীতে নেই ধ্বংস-গর্ভ সংকটনাশন।

    সহসা অনেক রাত্রে দেশদ্রোহী ঘাতকের হাতে

    দেশপ্রেমে দৃপ্ত প্রাণ রক্ত ঢালে সূর্যের সাক্ষাতে।

    তবুও প্রতিজ্ঞা ফেরে বাতাসে নিভৃত,

    এখানে চল্লিশ কোটি এখনো জীবিত,

    ভারতবর্ষের ‘পরে গলিত সূর্য ঝরে আজ–

    দিগ্বিদিকে উঠেছে আওয়াজ,

    রক্তে আনো লাল,

    রাত্রির গভীর বৃন্ত থেকে ছিঁড়ে আনো ফুটন্ত সকাল।

    উদ্ধত প্রাণের বেগে উন্মুখর আমার এ দেশ,

    আমার বিধ্বস্ত প্রাণে দৃঢ়তার এসেছে নির্দেশ।

    আজকে মজুর ভাই দেশময় তুচ্ছ করে প্রাণ,

    কারখানায় কারখানায় তোলে ঐক্যতান।

    অভুক্ত কৃষক আজ সূচীমুখ লাঙলের মুখে

    নির্ভয়ে রচনা করে জঙ্গী কাব্য এ মাটির বুকে।

    আজকে আসন্ন মুক্তি দূর থেকে দৃষ্টি দেয় শ্যেন,

    এদেশে ভাণ্ডার ভ’রে দেবে জানি নতুন য়ূক্রেন।

    নিরন্ন আমার দেশে আজ তাই উদ্ধত জেহাদ,

    টলোমলো এ দুর্দিন, থরোথরো জীর্ণ বনিয়াদ।

    তাইতো রক্তের স্রোতে শুনি পদধ্বনি

    বিক্ষুব্ধ টাইফুন-মত্ত চঞ্চল ধমনী :

    বিপন্ন পৃথ্বীর আজ শুনি শেষ মুহুর্মুহু ডাক

    আমাদের দৃপ্ত মুঠি আজ তার উত্তর পাঠাক।

    ফিরুক দুয়ার থেকে সন্ধানী মৃত্যুর পরোয়ানা,

    ব্যর্থ হোক কুচক্রান্ত, অবিরাম বিপক্ষের হানা॥

  • চিল

    চিল

    চিল

    পথ চলতে চলতে হঠাৎ দেখলাম :

    ফুটপাতে এক মরা চিল!

    চমকে উঠলাম ওর করুণ বীভৎস মূর্তি দেখে।

    অনেক উঁচু থেকে যে এই পৃথিবীটাকে দেখেছে

    লুণ্ঠনের অবাধ উপনিবেশ;

    যার শ্যেন দৃষ্টিতে কেবল ছিল

    তীব্র লোভ আর ছোঁ মারার দস্যু প্রবৃত্তি–

    তাকে দেখলাম, ফুটপাতে মুখ গুঁজে প’ড়ে।

    গম্বুজশিখরে বাস করত এই চিল,

    নিজেকে জাহির করত সুতীক্ষ্ণ চীৎকারে;

    হালকা হাওয়ায় ডানা মেলে দিত আকাশের নীলে-

    অনেককে ছাড়িয়ে; একক :

    পৃথিবী থেকে অনেক, অনেক উঁচুতে।

    অনেকে আজ নিরাপদ;

    নিরাপদ ইঁদুর ছানারা আর খাদ্য-হাতে ত্রস্ত পথচারী,

    নিরাপদ–কারণ আজ সে মৃত।

    আজ আর কেউ নেই ছোঁ মারার,

    ওরই ফেলে-দেওয়া উচ্ছিষ্টের মতো

    ও পড়ে রইল ফুটপাতে,

    শুক্‌নো-শীতল, বিকৃত দেহে।

    হাতে যাদের ছিল প্রাণধারণের খাদ্য

    বুকের কাছে সযত্নে চেপে ধরা–

    তারা আজ এগিয়ে গেল নির্ভয়ে;

    নিষ্ঠুর বিদ্রূপের মতো পিছনে ফেলে

    আকাশচ্যুত এক উদ্ধত চিলকে॥

  • চট্টগ্রাম : ১৯৪৩

    চট্টগ্রাম : ১৯৪৩

    চট্টগ্রাম : ১৯৪৩

    ক্ষুধার্ত বাতাসে শুনি এখানে নিভৃত এক নাম–

    চট্টগ্রাম : বীর চট্টগ্রাম!

    বিক্ষত বিধ্বস্ত দেহে অদ্ভুত নিঃশব্দ সহিষ্ণুতা

    আমাদের স্নায়ুতে স্নায়ুতে

    বিদ্যুৎপ্রবাহ আনে, আনে আজ চেতনার দিন।

    চট্টগ্রাম : বীর চট্টগ্রাম!

    এখনো নিস্তব্ধ তুমি

    তাই আজো পাশবিকতার

    দুঃসহ মহড়া চলে,

    তাই আজো শত্রুরা সাহসী।

    জানি আমি তোমার হৃদয়ে

    অজস্র ঔদার্য আছে ; জানি আছে সুস্থ শালীনতা

    জানি তুমি আঘাতে আঘাতে

    এখনও স্তিমিত নও, জানি তুমি এখনো উদ্দাম—

    হে চট্টগ্রাম!

    তাই আজো মনে পড়ে রক্তাক্ত তোমাকে

    সহস্র কাজের ফাঁকে মনে পড়ে শার্দুলের ঘুম

    অরণ্যের স্বপ্ন চোখে, দাঁতে নখে প্রতিজ্ঞা কঠোর।

    হে অভুক্ত ক্ষুদিত শ্বাপদ—

    তোমার উদ্যত থাবা, সংঘবদ্ধ প্রতিটি নখর

    এখনো হয় নি নিরাপদ।

    দিগন্তে দিগন্তে তাই ধ্বনিত গর্জন

    তুমি চাও শোণিতের স্বাদ—

    যে স্বাদ জেনেছে স্তালিনগ্রাদ।

    তোমার সংকল্পস্রোতে ভেসে যাবে লোহার গরাদ

    এ তোমার নিশ্চিত বিশ্বাস।

    তোমার প্রতিজ্ঞা তাই আমার প্রতিজ্ঞা, চট্টগ্রাম!

    আমার হৃৎপিণ্ডে আজ তারি লাল স্বাক্ষর দিলাম॥

  • মধ্যবিত্ত ‘৪২

    মধ্যবিত্ত ‘৪২

    মধ্যবিত্ত ‘৪২

    পৃথিবীময় যে সংক্রামক রোগে,

    আজকে সকলে ভুগছে একযোগে,

    এখানে খানিক তারই পূর্বাভাস

    পাচ্ছি, এখন বইছে পুব-বাতাস।

    উপায় নেই যে সামলে ধরব হাল,

    হিংস্র বাতাসে ছিঁড়ল আজকে পাল,

    গোপনে আগুন বাড়ছে ধানক্ষেতে,

    বিদেশী খবরে রেখেছি কান পেতে।

    সভয়ে এদেশে কাটছে রাত্রিদিন,

    লুব্ধ বাজারে রুগ্ন স্বপ্নহীন।

    সহসা নেতারা রুদ্ধ–দেশ জুড়ে

    ‘দেশপ্রেমিক’ উদিত ভুঁই ফুঁড়ে।

    প্রথমে তাদের অন্ধ বীর মদে

    মেতেছি এবং ঠকেছি প্রতিপদে;

    দেখেছি সুবিধা নেই এ কাজ করায়

    একক চেষ্টা কেবলই ভুল ধরায়।

    এদিকে দেশের পূর্ব প্রান্তরে

    আবার বোমারু রক্ত পান করে,

    ক্ষুব্ধ জনতা আসামে, চাটগাঁয়ে,

    শাণিত-দ্বৈত-নগ্ন অন্যায়ে;

    তাদের স্বার্থ আমার স্বার্থকে,

    দেখছে চেতনা আজকে এক চোখে॥

  • সেপ্টেম্বর ‘৪৬

    সেপ্টেম্বর ‘৪৬

    সেপ্টেম্বর ‘৪৬

    কলকাতায় শান্তি নেই।

    রক্তের কলঙ্ক ডাকে মধ্যরাত্রে

    প্রতিটি সন্ধ্যায়।

    হৃৎস্পন্দনধ্বনি দ্রুত হয় :

    মূর্ছিত শহর।

    এখন গ্রামের মতো

    সন্ধ্যা হলে জনহীন নগরের পথ;

    স্তম্ভিত আলোকস্তম্ভ

    আলো দেয় নিতান্ত সভয়ে।

    কোথায় দোকানপাট?

    কই সেই জনতার স্রোত?

    সন্ধ্যার আলোর বন্যা

    আজ আর তোলে নাকো

    জনতরণীর পাল

    শহরের পথে।

    ট্রাম নেই, বাস নেই–

    সাহসী পথিকহীন

    এ শহর আতঙ্ক ছড়ায়।

    সারি সারি বাড়ি সব

    মনে হয় কবরের মতো,

    মৃত মানুষের স্তূপ বুকে নিয়ে পড়ে আছে

    চুপ ক’রে সভয়ে নির্জনে।

    মাঝে মাঝে শব্দ হয় :

    মিলিটারী লরীর গর্জন

    পথ বেয়ে ছুটে যায় বিদ্যুতের মতো

    সদম্ভ আক্রোশে।

    কলঙ্কিত কালো কালো রক্তের মতন

    অন্ধকার হানা দেয় অতন্দ্র শহরে;

    হয়তো অনেক রাত্রে

    পথচারী কুকুরের দল

    মানুষের দেখাদেখি

    স্বজাতিকে দেখে

    আস্ফালন, আক্রমণ করে।

    রুদ্ধশ্বাস এ শহর

    ছট্ফট করে সারা রাত–

    কখন সকাল হবে?

    জীয়নকাঠির স্পর্শ

    পাওয়া যাবে উজ্জ্বল রোদ্দুরে?

    সন্ধ্যা থেকে প্রত্যুষের দীর্ঘকাল

    প্রহরে প্রহরে

    সশব্দে জিজ্ঞাসা করে ঘড়ির ঘণ্টায়

    ধৈর্যহীন শহরের প্রাণ :

    এর চেয়ে ছুরি কি নিষ্ঠুর?

    বাদুড়ের মতো কালো অন্ধকার

    ভর ক’রে গুজবের ডানা

    উৎকর্ণ কানের কাছে

    সারা রাত ঘুরপাক খায়।

    স্তব্ধতা কাঁপিয়ে দিয়ে

    কখনো বা গৃহস্থের দ্বারে

    উদ্ধত, অটল আর সুগম্ভীর

    শব্দ ওঠে কঠিন বুটের।

    শহর মূর্ছিত হয়ে পড়ে।

    জুলাই! জুলাই! আবার আসুক ফিরে

    আজকের কলকাতার এ প্রার্থনা;

    দিকে দিকে শুধু মিছিলের কোলাহল–

    এখনো পায়ের শব্দ যাচ্ছে শোনা।

    অক্টোবরকে জুলাই হতেই হবে

    আবার সবাই দাঁড়াব সবার পাশে,

    আগস্ট এবং সেপ্টেম্বর মাস

    এবারের মতো মুছে যাক ইতিহাসে॥

  • ঐতিহাসিক

    ঐতিহাসিক

    ঐতিহাসিক

    আজ এসেছি তোমাদের ঘরে ঘরে–

    পৃথিবীর আদালতের পরোয়ানা নিয়ে

    তোমরা কি দেবে আমার প্রশ্নের কৈফিয়ৎ :

    কেন মৃত্যুকীর্ণ শবে ভরলো পঞ্চাশ সাল?

    আজ বাহান্ন সালের সূচনায় কি তার উত্তর দেবে?

    জানি ! স্তব্ধ হয়ে গেছে তোমাদের অগ্রগতির স্রোত,

    তাই দীর্ঘশ্বাসের ধোঁয়ায় কালো করছ ভবিষ্যৎ

    আর অনুশোচনার আগুনে ছাই হচ্ছে উৎসাহের কয়লা।

    কিন্তু ভেবে দেখেছ কি?

    দেরি হয়ে গেছে অনেক, অনেক দেরি!

    লাইনে দাঁড়ানো অভ্যেস কর নি কোনোদিন,

    একটি মাত্র লক্ষ্যের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে

    মারামারি করেছ পরস্পর,

    তোমাদের ঐক্যহীন বিশৃঙ্খলা দেখে

    বন্ধ হয়ে গেছে মুক্তির দোকানের ঝাঁপ।

    কেবল বঞ্চিত বিহ্বল বিমূঢ় জিজ্ঞাসাভরা চোখে

    প্রত্যেকে চেয়েছ প্রত্যেকের দিকে;

    –কেন এমন হল?

    একদা দুর্ভিক্ষ এল

    ক্ষুধার ক্ষমাহীন তাড়নায়

    পাশাপাশি ঘেঁষাঘেঁষি সবাই দাঁড়ালে একই লাইনে

    ইতর-ভদ্র, হিন্দু আর মুসলমান

    একই বাতাসে নিলে নিঃশ্বাস।

    চাল, চিনি, কয়লা, কেরোসিন?

    এ সব দুষ্প্রাপ্য জিনিসের জন্য চাই লাইন।

    কিন্তু বুঝলে না মুক্তিও দুর্লভ আর দুর্মূল্য,

    তারো জন্যে চাই চল্লিশ কোটির দীর্ঘ, অবিচ্ছিন্ন এক লাইন।

    মূর্খ তোমরা

    লাইন দিলে : কিন্তু মুক্তির বদলে কিনলে মৃত্যু,

    রক্তয়ের বদলে পেলে প্রবঞ্চনা।

    ইতিমধ্যে তোমাদের বিবদমান বিশৃঙ্খল ভিড়ে

    মুক্তি উঁকি দিয়ে গেছে বহুবার।

    লাইনে দাঁড়ানো আয়ত্ত করেছে যারা,

    সোভিয়েট, পোল্যান্ড, ফ্রান্স

    রক্তমূল্যে তারা কিনে নিয়ে গেল তাদের মুক্তি

    সব প্রথম এই পৃথিবীর দোকান থেকে।

    এখনো এই লাইনে অনেকে প্রতীক্ষমান,

    প্রার্থী অনেক; কিন্তু পরিমিত মুক্তি।

    হয়তো এই বিশ্বব্যাপী লাইনের শেষে

    এখনো তোমাদের স্থান হতে পারে–

    এ কথা ঘোষণা ক’রে দাও তোমাদের দেশময় প্রতিবেশীর কাছে।

    তারপর নিঃশব্দে দাঁড়াও এ লাইনে প্রতিজ্ঞা আর প্রতীক্ষা নিয়ে

    হাতের মুঠোয় তৈরী রেখে প্রত্যেকের প্রাণ।

    আমি ইতিহাস, আমার কথাটা একবার ভেবে দেখো,

    মনে রেখো, দেরি হয়ে গেছে, অনেক অনেক দেরি।

    আর মনে ক’রো আকাশে আছে এক ধ্রুব নক্ষত্র,

    নদীর ধারায় আছে গতির নির্দেশ,

    অরণ্যের মর্মরধ্বনিতে আছে আন্দোলনের ভাষা,

    আর আছে পৃথিবীর চিরকালের আবর্তন॥

  • শত্রু এক

    শত্রু এক

    শত্রু এক

    এদেশ বিপন্ন আজ; জানি আজ নিরন্ন জীবন–

    মৃত্যুরা প্রত্যহ সঙ্গী, নিয়ত শত্রুর আক্রমণ

    রক্তের আল্পনা আঁকে, কানে বাজে আর্তনাদ সুর;

    তবুও সুদৃঢ় আমি, আমি এক ক্ষুধিত মজুর

    আমার সম্মুখে আজ এক শত্রু : এক লাল পথ,

    শত্রুর আঘাত আর বুভুক্ষায় উদ্দীপ্ত শপথ।

    কঠিন প্রতিজ্ঞা-স্তব্ধ আমাদের দৃপ্ত কারখানায়,

    প্রত্যেক নির্বাক যন্ত্র প্রতিরোধ সংকল্প জানায়।

    আমার হাতের স্পর্শে প্রতিদিন যন্ত্রের গর্জন

    স্মরণ করায় পণ; অবসাদ দিই বিসর্জন।

    বিক্ষুব্ধ যন্ত্রের বুকে প্রতিদিন যে যুদ্ধ ঘোষণা,

    সে যুদ্ধ আমার যুদ্ধ, তারই পথে স্তব্ধ দিন গোনা।

    অদূর দিগন্তে আসে ক্ষিপ্র দিন, জয়োন্মত্ত পাখা–

    আমার দৃষ্টিতে লাল প্রতিবিম্ব মুক্তির পতাকা।

    আমার বেগান্ধ হাত, অবিরাম যন্ত্রের প্রসব

    প্রচুর প্রচুর সৃষ্টি, শেষ বজ্র সৃষ্টির উৎসব॥

  • মজুরদের ঝড়

    মজুরদের ঝড়

    মজুরদের ঝড়

    (ল্যাংস্টন হিউজ)

    এখন এই তো সময়–

    কই? কোথায়? বেরিয়ে এসো ধর্মঘটভাঙা দালালরা;

    সেই সব দালালরা-

    ছেলেদের চোখের মতো যাদের ভোল বদলায়,

    বেরিয়ে এসো।

    জাহান্নামে যাওয়া মূর্খের দল,

    বিচ্ছিন্ন, তিক্ত, দুর্বোধ্য

    পরাজয় আর মৃত্যুর দূত–

    বেরিয়ে এসো!

    বেরিয়ে এসো শক্তিমান আর অর্থলোভীর দল

    সংকীর্ণ গলির বিষাক্ত নিঃশ্বাস নিয়ে।

    গর্তের পোকারা!

    এই তো তোমাদের শুভক্ষণ,

    গর্ত ছেড়ে বেরিয়ে পড়ো

    আর বেরিয়ে পড়ো ছোট ছোট সাপেরা

    বড় আর মোটা সাপেদের যারা ঘিরে থাকো।

    সময় হয়েছে,

    আসরফি আর পুরনো অপমানের বদলে

    সাদা যাদের পেট–

    বংশগত সরীসৃপ দাঁত তারা বের করুক,

    এই তো তাদের সুযোগ।

    মানুষ ভালো করেই জানে

    অনেক মানুষের বিরুদ্ধে একজনকে লাগানোর সেই

    পুরনো কায়দা।

    সামান্য কয়েকজন লোভী

    অনেক অভাবীর বিরুদ্ধে–

    আর স্বাস্থ্যবানদের বিরুদ্ধে

    ক্ষয়ে-যাওয়ার দল।

    সূর্যালোকের পথে যাদের যাত্রা

    তাদের বিরুদ্ধে তাই সাপেরা।

    অতীতে অবশ্য এই সাপেরা জিতেছে বহুবার।

    কিন্তু এখন সেই সময়,

    সচেতন মানুষ ! এখন আর ভুল ক’রো না–

    বিশ্বাস ক’রো না সেই সব সাপেদের

    জমকালো চামড়ায় যারা নিজেদের ঢেকে রাখে,

    বিপদে পড়লে যারা ডাকে

    তাদের চেয়ে কম চটকদার বিষাক্ত অনুচরদের।

    এতটুকু লজ্জা হয় না তাদের ধর্মঘট ভাঙতে

    যে ধর্মঘট বেআব্রু ক্ষুদার চূড়ান্ত চিহ্ন।

    –অবশ্য, এখনো কোনো সম্মানিত প্রতিষ্ঠান হয় নি

    যার অজ্ঞাত নাম :

    “ধর্মঘট ভাঙার দল”

    অন্তত দরজায় সে নাম লেখা থাকে না।

    ঝড় আসছে–সেই ঝড় :

    যে ঝড় পৃথিবীর বুক থেকে জঞ্জালদের টেনে তুলবে।

    আর হুঁশিয়ার মজুর :

    সে ঝড় প্রায় মুখোমুখি॥

  • ডাক

    ডাক

    ডাক

    মুখে-মৃদু-হাসি অহিংস বুদ্ধের

    ভূমিকা চাই না। ডাক ওঠে যুদ্ধের।

    গুলি বেঁধে বুকে উদ্ধত তবু মাথা–

    হাতে হাতে ফেরে দেনা-পাওনার খাতা,

    শোনো হুঙ্কার কোটি অবরুদ্ধের।

    দুর্ভিক্ষকে তাড়াও, ওদেরও তাড়াও–

    সন্ধিপত্র মাড়াও, দু’পায়ে মাড়াও।

    তিন-পতাকার মিনতি : দেবে না সাড়াও?

    অসহ্য জ্বালা কোটি কোটি ক্রুদ্ধের!

    ক্ষতবিক্ষত নতুন সকাল বেলা,

    শেষ করব এ রক্তের হোলিখেলা,

    ওঠো সোজা হয়ে, পায়ে পায়ে লাগে ঠেলা

    দেখ, ভিড় দেখ স্বাধীনতালুব্ধের।

    ফাল্গুন মাস, ঝরুক জীর্ণ পাতা।

    গজাক নতুন পাতারা, তুলুক মাথা,

    নতুন দেয়াল দিকে দিকে হোক গাঁথা–

    জাগে বিক্ষোভে চারিপাশে ক্ষুব্ধের।

    হ্রদে তৃষ্ণার জল পাবে কত কাল?

    সম্মুখে টানে সমুদ্র উত্তাল :

    তুমি কোন্ দলে? জিজ্ঞাসা উদ্দাম :

    ‘গুণ্ডা’র দলে আজো লেখাও নি নাম?

  • বোধন

    বোধন

    বোধন

    হে মহামানব, একবার এসো ফিরে

    শুধু একবার চোখ মেলো এই গ্রাম নগরের ভিড়ে,

    এখানে মৃত্যু হানা দেয় বারবার;

    লোকচক্ষুর আড়ালে এখানে জমেছে অন্ধকার।

    এই যে আকাশ, দিগন্ত, মাঠ স্বপ্নে সবুজ মাটি

    নীরবে মৃত্যু গেড়েছে এখানে ঘাঁটি;

    কোথাও নেইকো পার

    মারী ও মড়ক, মন্বন্তর, ঘন ঘন বন্যার

    আঘাতে আঘাতে ছিন্নভিন্ন ভাঙা নৌকার পাল,

    এখানে চরম দুঃখ কেটেছে সর্বনাশের খাল,

    ভাঙা ঘর, ফাঁকা ভিটেতে জমেছে নির্জনতার কালো,

    হে মহামানব, এখানে শুকনো পাতায় আগুন জ্বালো।

    ব্যাহত জীবনযাত্রা, চুপি চুপি কান্না বও বুকে,

    হে নীড়-বিহারী সঙ্গী! আজ শুধু মনে মনে ধুঁকে

    ভেবেছ সংসারসিন্ধু কোনোমতে হয়ে যাবে পার

    পায়ে পায়ে বাধা ঠেলে। তবু আজো বিস্ময় আমার–

    ধূর্ত, প্রবঞ্চক যারা কেড়েছে মুখের শেষ গ্রাস

    তাদের করেছ ক্ষমা, ডেকেছ নিজের সর্বনাশ।

    তোমার ক্ষেতের শস্য

    চুরি ক’রে যারা গুপ্তকক্ষতে জমায়

    তাদেরি দু’পায়ে প্রাণ ঢেলে দিলে দুঃসহ ক্ষমায়;

    লোভের পাপের দুর্গ গম্বুজ ও প্রাসাদে মিনারে

    তুমি যে পেতেছ হাত; আজ মাথা ঠুকে বারে বারে

    অভিশাপ দাও যদি, বারংবার হবে তা নিস্ফল–

    তোমার অন্যায়ে জেনো এ অন্যায় হয়েছে প্রবল।

    তুমি তো প্রহর গোনো,

    তারা মুদ্রা গোনে কোটি কোটি,

    তাদের ভাণ্ডার পূর্ণ; শূন্য মাঠে কঙ্কাল-করোটি

    তোমাকে বিদ্রূপ করে, হাতছানি দিয়ে কাছে ডাকে–

    কুজ্ঝটি তোমার চোখে, তুমি ঘুরে ফেরো দুর্বিপাকে।

    পৃথিবী উদাস, শোনো হে দুনিয়াদার!

    সামনে দাঁড়িয়ে মৃত্যু-কালো পাহাড়

    দগ্ধ হৃদয়ে যদিও ফেরাও ঘাড়

    সামনে পেছনে কোথাও পাবে না পার :

    কি করে খুলবে মৃত্যু-ঠেকানো দ্বার-

    এই মুহূর্তে জবাব দেবে কি তার?

    লক্ষ লক্ষ প্রাণের দাম

    অনেক দিয়েছি; উজাড় গ্রাম।

    সুদ ও আসলে আজকে তাই

    যুদ্ধ শেষের প্রাপ্য চাই।

    কৃপণ পৃথিবী, লোভের অস্ত্র

    দিয়ে কেড়ে নেয় অন্নবস্ত্র,

    লোলুপ রসনা মেলা পৃথিবীতে

    বাড়াও ও-হাত তাকে ছিঁড়ে নিতে।

    লোভের মাথায় পদাঘাত হানো–

    আনো, রক্তের ভাগীরথী আনো।

    দৈত্যরাজের যত অনুচর

    মৃত্যুর ফাঁদ পাতে পর পর;

    মেলো চোখ আজ ভাঙো সে ফাঁদ-

    হাঁকো দিকে দিকে সিংহনাদ।

    তোমার ফসল, তোমার মাটি

    তাদের জীয়ন ও মরণকাঠি

    তোমার চেতনা চালিত হাতে।

    এখনও কাঁপবে আশঙ্কাতে?

    স্বদেশপ্রেমের ব্যাঙ্গমা পাখি

    মারণমন্ত্র বলে, শোনো তা কি?

    এখনো কি তুমি আমি স্বতন্ত্র?

    করো আবৃত্তি, হাঁকো সে মন্ত্র :

    শোন্ রে মালিক, শোন্‌রে মজুতদার!

    তোদের প্রাসাদে জমা হল কত মৃত মানুষের হাড়–

    হিসাব কি দিবি তার?

    প্রিয়াকে আমার কেড়েছিস তোরা,

    ভেঙেছিস ঘরবাড়ি,

    সে কথা কি আমি জীবনে মরণে

    কখনো ভুলতে পারি?

    আদিম হিংস্র মানবিকতার যদি আমি কেউ হই

    স্বজনহারানো শ্মশানে তোদের

    চিতা আমি তুলবই।

    শোন্‌ ‌রে মজুতদার,

    ফসল ফলানো মাটিতে রোপণ

    করব তোকে এবার।

    তারপর বহুশত যুগ পরে

    ভবিষ্যতের কোনো যাদুঘরে

    নৃতত্ত্ববিদ্ হয়রান হয়ে মুছবে কপাল তার,

    মজুতদার ও মানুষের হাড়ে মিল খুঁজে পাওয়া ভার।

    তেরোশো সালের মধ্যবর্তী মালিক, মজুতদার

    মানুষ ছিল কি? জবাব মেলে না তার।

    আজ আর বিমূঢ় আস্ফালন নয়,

    দিগন্তে প্রত্যাসন্ন সর্বনাশের ঝড়;

    আজকের নৈঃশব্দ হোক যুদ্ধারম্ভের স্বীকৃতি।

    দুহাতে বাজাও প্রতিশোধের উন্মত্ত দামামা,

    প্রার্থনা করো :

    হে জীবন, যে যুগ-সন্ধিকালের চেতনা-

    আজকে শক্তি দাও, যুগ যুগ বাঞ্ছিত দুর্দমনীয় শক্তি,

    প্রাণে আর মনে দাও শীতের শেষের

    তুষার-গলানো উত্তাপ।

    টুকরে টুকরো ক’রে ছেঁড়ো তোমার

    অন্যায় আর ভীরুতার কলঙ্কিত কাহিনী।

    শোষক আর শাসকের নিষ্ঠুর একতার বিরুদ্ধে

    একত্রিত হোক আমাদের সংহতি।

    তা যদি না হয় মাথার উপরে ভয়ঙ্কর

    বিপদ নামুক, ঝড়ে বন্যায় ভাঙুক ঘর;

    তা যদি না হয়, বুঝবো তুমি মানুষ নও-

    গোপনে গোপনে দেশদ্রোহীর পতাকা বও।

    ভারতবর্ষ মাটি দেয়নিকো, দেয় নি জল

    দেয় নি তোমার মুখেতে অন্ন, বাহুতে বল

    পূর্বপুরুষ অনুপস্থিত রক্তে, তাই

    ভারতবর্ষে আজকে তোমার নেইকো ঠাঁই॥

  • রানার

    রানার

    রানার

    রানার ছুটেছে তাই ঝুম্‌ঝুম্ ঘণ্টা বাজছে রাতে

    রানার চলেছে, খবরের বোঝা হাতে,

    রানার চলেছে রানার!

    রাত্রির পথে পথে চলে কোনো নিষেধ জানে না মানার।

    দিগন্ত থেকে দিগন্তে ছোটে রানার–

    কাজ নিয়েছে সে নতুন খবর আনার।

    রানার! রানার!

    জানা-অজানার

    বোঝা আজ তার কাঁধে,

    বোঝাই জাহাজ রানার চলেছে চিঠি আর সংবাদে;

    রানার চলেছে, বুঝি ভোর হয় হয়,

    আরো জোরে,আরো জোরে, এ রানার দুর্বার দুর্জয়।

    তার জীবনের স্বপ্নের মতো পিছে স’রে যায় বন,

    আরো পথ, আরো পথ- বুঝি হয় লাল ও-পূর্বকোণ।

    অবাক রাতের তারারা, আকাশে মিট্‌মিট্ ক’রে চায়;

    কেমন ক’রে এ রানার সবেগে হরিণের মতো যায়!

    কত গ্রাম, কত পথ যায় স’রে স’রে–

    শহরে রানার যাবেই পৌঁছে ভোরে;

    হাতে লণ্ঠন করে ঠন্‌ঠন্, জোনাকিরা দেয় আলো

    মাভৈঃ, রানার! এখনো রাতের কালো।

    এমনি ক’রেই জীবনের বহু বছরকে পিছু ফেলে,

    পৃথিবীর বোঝা ক্ষুধিত রানার পৌঁছে দিয়েছে ‘মেলে’।

    ক্লান্তশ্বাস ছুঁয়েছে আকাশ, মাটি ভিজে গেছে ঘামে

    জীবনের সব রাত্রিকে ওরা কিনেছে অল্প দামে।

    অনেক দুঃখে, বহু বেদনায়, অভিমানে, অনুরাগে,

    ঘরে তার প্রিয়া একা শয্যায় বিনিদ্র রাত জাগে।

    রানার! রানার!

    এ বোঝা টানার দিন কবে শেষ হবে?

    রাত শেষ হয়ে সূর্য উঠবে কবে?

    ঘরেতে অভাব; পৃথিবীটা তাই মনে হয় কালো দোঁয়া,

    পিঠেতে টাকার বোঝা, তবু এই টাকাকে যাবে না ছোঁয়া,

    রাত নির্জন, পথে কত ভয়, তবুও রানার ছোটে,

    দস্যুর ভয়, তারো চেয়ে ভয় কখন সূর্য ওঠে।

    কত চিঠি লেখে লোকে–

    কত সুখে, প্রেমে, আবেগে, স্মৃতিতে, কত দুঃখে ও শোকে।

    এর দুঃখের চিঠি পড়বে না জানি কেউ কোনো দিনও,

    এর জীবনের দুঃখ কেবল জানবে পথের তৃণ,

    এর দুঃখের কথা জানবে না কেউ শহরে ও গ্রামে,

    এর কথা ঢাকা পড়ে থাকবেই কালো রাত্রির খামে।

    দরদে তারার চোখ কাঁপে মিটিমিটি,–

    এ-কে যে ভোরের আকাশ পাঠাবে সহানুভূতির চিঠি-

    রানার! রানার! কি হবে এ বোঝা ব’য়ে?

    কি হবে ক্ষুদার ক্লান্তিতে ক্ষয়ে ক্ষয়ে?

    রানার! রানার! ভোর তো হয়েছে–আকাশ হয়েছে লাল

    আলোর স্পর্শে কবে কেটে যাবে এই দুঃখের কাল?

    রানার! গ্রামের রানার!

    সময় হয়েছে নতুন খবর আনার;

    শপথের চিঠি নিয়ে চলো আজ

    ভীরুতা পিছনে ফেলে–

    পৌঁছে দাও এ নতুন খবর

    অগ্রগতির ‘মেলে’,

    দেখা দেবে বুঝি প্রভাত এখুনি–

    নেই, দেরি নেই আর,

    ছুটে চলো, ছুটে চলো আরো বেগে

    দুর্দম, হে রানার॥

  • মৃত্যুজয়ী গান

    মৃত্যুজয়ী গান

    মৃত্যুজয়ী গান

    নিয়ত দক্ষিণ হাওয়া স্তব্ধ হল একদা সন্ধ্যায়

    অজ্ঞাতবাসের শেষে নিদ্রাভঙ্গে নির্বীর্য জনতা

    সহসা আরণ্য রাজ্যে স্তম্ভিত সভয়ে;

    নির্বায়ুমণ্ডল ক্রমে দুর্ভাবনা দৃঢ়তর করে।

    দুরাগত স্বপ্নের কী দুর্দিন! মহামারী অন্তরে বিক্ষোভ,

    সঞ্চারিত রক্তবেগ পৃথিবীর প্রতি ধমনীতে :

    অবসন্ন বিলাসের সঙ্কুচিত প্রাণ।

    বণিকের চোখে আজ কী দুরন্ত লোভ ঝ’রে পড়ে :

    মুহুর্মুহু রক্তপাতে স্বধর্ম সূচনা;

    ক্ষয়িষ্ণু দিনেরা কাঁদে অনর্থক প্রসব ব্যথায়।

    নশ্বর পৌষদিন, চারিদিকে ধূর্তের সমতা

    জটিল আবর্তে শুধু নৈমিত্তিক প্রাণের স্পন্দন;

    শোকচ্ছন্ন আমাদের সনাতন মন

    পৃথিবীর সম্ভাবিত অকাল মৃত্যুতে :

    দুর্দিনের সমন্বয়, সম্মুখেতে অনন্ত প্রহর–

    দৃষ্টিপথ অন্ধকার, সন্দিহান আগামী দিনেরা।

    গলিত উদ্যম তাই বৈরাগ্যের ভান,

    কণ্টকিত প্রতীক্ষায় আমাদের অরণ্যবাসর।

    সহসা জানালায় দেখি দুর্ভিক্ষের স্রোতে

    জনতা মিছিলে আসে সংঘবদ্ধ প্রাণ–

    অদ্ভুত রোমাঞ্চ লাগে সমুদ্র পর্বতে;

    সে মিছিলে শোনা গেল

    জনতার মৃত্যুজয়ী গান॥

  • কনভয়

    কনভয়

    কনভয়

    হঠাৎ ধূলো উড়িয়ে ছুটে গেল

    যুদ্ধফেরত এক কনভয় :

    ক্ষেপে-ওঠা পঙ্গপালের মতো

    রাজপথ সচকিত ক’রে

    আগে আগে কামান উঁচিয়ে,

    পেছনে নিয়ে খাদ্য আর রসদের সম্ভার।

    ইতিহাসের ছাত্র আমি,

    জানালা থেকে চোখ ফিরিয়ে নিলাম

    ইতিহাসের দিকে।

    সেখানেও দেখি উন্মত্ত এক কনভয়

    ছুটে আসছে যুগযুগান্তের রাজপথ বেয়ে।

    সামনে ধূম-উদ্‌গীরণরত কামান,

    পেছনে খাদ্যশস্য আঁকড়ে-ধরা জনতা–

    কামানের ধোঁয়ার আড়ালে আড়ালে দেখলাম,

    মানুষ।

    আর দেখলাম ফসলের প্রতি তাদের পুরুষানুক্রমিক

    মমতা।

    অনেক যুগ, অনেক অরণ্য,পাহাড়, সমুদ্র পেরিয়ে

    তারা এগিয়ে আসছে : ঝল্‌সানো কঠোর মুখে॥

  • ফসলের ডাক : ১৩৫১

    ফসলের ডাক : ১৩৫১

    ফসলের ডাক : ১৩৫১

    কাস্তে দাও আমার এ হাতে

    সোনালী সমুদ্র সামনে, ঝাঁপ দেব তাতে।

    শক্তির উন্মুক্ত হাওয়া আমার পেশীতে

    স্নায়ুতে স্নায়ুতে দেখি চেতনার বিদ্যুৎ বিকাশ :

    দু পায়ে অস্থির আজ বলিষ্ঠ কদম;

    কাস্তে দাও আমার এ হাতে।

    দু চোখে আমার আজ বিচ্ছুরিত মাঠের আগুন,

    নিঃশব্দে বিস্তীর্ণ ক্ষেতে তরঙ্গিত প্রাণের জোয়ার

    মৌসুমি হাওয়ায় আসে জীবনের ডাক :

    শহরের চুল্লী ঘিরে পতঙ্গের কানে।

    বহুদিন উপবাসী নিঃস্ব জনপদে,

    মাঠে মাঠে আমাদের ছড়ানো সম্পদ,

    কাস্তে দাও আমার এ হাতে।

    মনে আছে একদিন তোমাদের ঘরে

    নবান্ন উজাড় ক’রে পাঠিয়েছি সোনার বছরে,

    নির্ভাবনার হাসি ছড়িয়েছি মুখে

    তৃপ্তির প্রগাঢ় চিহ্ন এনেছি সম্মুখে,

    সেদিনের অলক্ষ্য সেবার বিনিময়ে

    আজ শুধু কাস্তে দাও আমার এ হাতে।

    আমার পুরোনো কাস্তে পুড়ে গেছে ক্ষুধার আগুনে,

    তাই দাও দীপ্ত কাস্তে চৈতন্যপ্রখর—

    যে কাস্তে ঝল্সাবে নিত্য উগ্র দেশপ্রমে।

    জানি আমি মৃত্যু আজ ঘুরে যায় তোমাদেরও দ্বারে,

    দুর্ভিক্ষ ফেলেছে ছায়া তোমাদের দৈনিক ভাণ্ডারে;

    তোমাদের বাঁচানোর প্রতিজ্ঞা আমার,

    শুধু আজ কাস্তে দাও আমার এ হাতে।

    পরাস্ত অনেক চাষী; ক্ষিপ্রগতি নিঃশব্দ মরণ—

    জ্বলন্ত মৃত্যুর হাতে দেখা গেল বুভুক্ষুর আত্মসমর্পণ,

    তাদের ফসল প’ড়ে, দৃষ্টি জ্বলে সুদূরসন্ধানী

    তাদের ক্ষেতের হাওয়া চুপিচুপি করে কানাকানি—

    আমাকেই কাস্তে নিতে হবে।

    নিয়ত আমার কানে গুঞ্জরিত ক্ষুধার যন্ত্রণা,

    উদ্বেলিত হাওয়া আনে মাঠের সে উচ্ছ্বসিত ডাক,

    সুস্পষ্ট আমার কাছে জীবনের সুতীব্র সংকেত :

    তাই আজ একবার কাস্তে দাও আমার এ হাতে॥

  • কৃষকের গান

    কৃষকের গান

    কৃষকের গান

    এ বন্ধ্যা মাটির বুক চিরে

    এইবার ফলাব ফসল–

    আমার এ বলিষ্ঠ বাহুতে

    আজ তার নির্জন বোধন।

    এ মাটির গর্ভে আজ আমি

    দেখেছি আসন্ন জন্মেরা

    ক্রমশ সুপুষ্ট ইঙ্গিতে :

    দুর্ভিরে অন্তিম কবর !

    আমার প্রতিজ্ঞা শুনেছ কি?

    (গোপন একান্ত এক পণ)

    এ মাটিতে জন্ম দেব আমি

    অগণিত পল্টন-ফসল।

    ঘনায় ভাঙন দুই চোখে

    ধ্বংসস্রোত জনতা জীবনে;

    আমার প্রতিজ্ঞা গ’ড়ে তোলে

    ক্ষুধিত সহস্র হাতছানি।

    দুয়ারে শত্রুর হানা

    মুঠিতে আমার দুঃসাহস।

    কর্ষিত মাটির পথে পথে

    নতুন সভ্যতা গড়ে পথ॥

  • এই নবান্নে

    এই নবান্নে

    এই নবান্নে

    এই হেমন্তে কাটা হবে ধান,

    আবার শূন্য গোলায় ডাকবে ফসলের বান–

    পৌষপার্বণে প্রাণ-কোলাহলে ভরবে গ্রামের নীরব শ্মশান।

    তবুও এ হাতে কাস্তে তুলতে কান্না ঘনায় :

    হালকা হাওয়ায় বিগত স্মৃতিকে ভুলে থাকা দায়;

    গত হেমন্তে মরে গেছে ভাই, ছেড়ে গেছে বোন,

    পথে-প্রান্তরে খামারে মরেছে যত পরিজন;

    নিজের হাতের জমি ধান-বোনা,

    বৃথাই ধুলোতে ছড়িয়েছে সোনা,

    কারোরই ঘরেতে ধান তোলবার আসেনি শুভক্ষণ–

    তোমার আমার ক্ষেত ফসলের অতি ঘনিষ্ঠ জন।

    এবার নতুন জোরালো বাতাসে

    জয়যাত্রার ধ্বনি ভেসে আসে,

    পিছে মৃত্যুর ক্ষতির নির্বাচন–

    এই হেমন্তে ফসলেরা বলে : কোথায় আপন জন?

    তারা কি কেবল লুকোনো থাকবে,

    অক্ষমতার গ্লানিকে ঢাকবে,

    প্রাণের বদলে যারা প্রতিবাদ করেছে উচ্চারণ?

    এই নবান্নে প্রতারিতদের হবে না নিমন্ত্রণ?

  • আঠারো বছর বয়স

    আঠারো বছর বয়স

    আঠারো বছর বয়স

    আঠারো বছর বয়স কী দুঃসহ

    স্পর্ধায় নেয় মাথা তোলবার ঝুঁকি,

    আঠারো বছর বয়সেই অহরহ

    বিরাট দুঃসাহসেরা দেয় যে উঁকি।

    আঠারো বছর বয়সের নেই ভয়

    পদাঘাতে চায় ভাঙতে পাথর বাধা,

    এ বয়সে কেউ মাথা নোয়াবার নয়–

    আঠারো বছর বয়স জানে না কাঁদা।

    এ বয়স জানে রক্তদানের পুণ্য

    বাষ্পের বেগে স্টিমারের মতো চলে,

    প্রাণ দেওয়া-নেওয়া ঝুলিটা থাকে না শূন্য

    সঁপে আত্মাকে শপথের কোলাহলে।

    আঠরো বছর বয়স ভয়ঙ্কর

    তাজা তাজা প্রাণে অসহ্য যন্ত্রণা,

    এ বয়সে প্রাণ তীব্র আর প্রখর

    এ বয়সে কানে আসে কত মন্ত্রণা।

    আঠারো বছর বয়স যে দুর্বার

    পথে প্রান্তরে ছোটায় বহু তুফান,

    দুর্যোগে হাল ঠিক মতো রাখা ভার

    ক্ষত-বিক্ষত হয় সহস্র প্রাণ।

    আঠারো বছর বয়সে আঘাত আসে

    অবিশ্র্রান্ত; একে একে হয় জড়ো,

    এ বয়স কালো লক্ষ দীর্ঘশ্বাসে

    এ বয়স কাঁপে বেদনায় থরোথরো।

    তব আঠারোর শুনেছি জয়ধ্বনি,

    এ বয়স বাঁচে দুর্যোগে আর ঝড়ে,

    বিপদের মুখে এ বয়স অগ্রণী

    এ বয়স তবু নতুন কিছু তো করে।

    এ বয়স জেনো ভীরু, কাপুরুষ নয়

    পথ চলতে এ বয়স যায় না থেমে,

    এ বয়সে তাই নেই কোনো সংশয়–

    এ দেশের বুকে আঠারো আসুক নেমে॥