Category: মোহাম্মদ নজিবর রহমান

  • আনোয়ারা

    আনোয়ারা

    আনোয়ারা

    আনোয়ারা বাঙ্গালী ঔপন্যাসিক মোহাম্মদ নজিবর রহমান রচিত একটি কালজয়ী সামাজিক উপন্যাস। এটি তার রচিত প্রথম ও সর্বাধিক সার্থক উপন্যাস। এটি ১৯১৪ সালের ১৫ জুলাই (১৩২১ বঙ্গাব্দে) কলকাতা থেকে সর্বপ্রথম প্রকাশিত হয়। বাঙালি মুসলমান সমাজে মীর মশাররফ হোসেন রচিত “বিষাদ সিন্ধু”র পর এটিই সর্বাধিক পঠিত ও জনপ্রিয় উপন্যাস। ২০১৪ সালে এ উপন্যাসের শতবর্ষ পূর্তি পালন করা হয়। এই উপন্যাসে সপ্তাদশ শতাব্দীতে গ্রামীণ বাঙালি মধ্যবিত্ত মুসলমান সমাজের সামাজিক ও পারিবারিক জীবনের চিত্র ফুটে উঠে।

    চরিত্রসমূহ হচ্ছে— আনোয়ারা; হামীদা; নূর ইসলাম; উকিল সাহেব; দাদীমা; গোলাপজান (আনোয়ারার সৎমা); সালেহা; সালেহার মা প্রমুখ।

    ১৯৫৬ সালে ‘আনোয়ারা’ সম্পর্কে ড. মুহম্মদ আবদুল হাই ও সৈয়দ আলী আহসান বাংলা সাহিত্যের ইতিবৃত্ত (আধুনিক যুগ) এ বলেছেন,

    “জনপ্রিয়তা দিয়ে যদি কোন বইয়ের বিচার করতে হয়, তাহলে মোহাম্মদ নজিবর রহমান রচিত ‘আনোয়ারা’র দাবিই সর্বাগ্রে বিবেচ্য। ১৯১১ থেকে ১৪ সালের মধ্যে এ বইটি প্রথম প্রকাশিত হয়। ১৯৪৯ সালে এ বইটির ত্রয়োবিংশতি সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে এবং এ যাবৎ ‘আনোয়ারা’র দেড়লক্ষ কপি নিঃশেষিত হয়েছে।”

    ১৯৬১ সালে (বাংলা ১৩৬৮ সনের চৈত্র মাসে) এর সাতাশতম সংস্করণ প্রকাশিত হয় এবং ঐ সময় পর্যন্ত এর সাড়ে পাঁচ লক্ষ কপি বিক্রয় হয় বলে জানা যায়। কলকাতা ও ঢাকা থেকে এ পর্যন্ত এ উপন্যাসের ৬০টিরও বেশি সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে। ‘আনোয়ারা’ এক সময় পাঠ্য-তালিকাভুক্ত ছিল।

    নজিবর রহমান সাহিত্যরত্ন তাঁর উপন্যাসে তাঁর সমকালীন জীবন ও সমাজকে যথাযথভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। সে সময়কার মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা, স্বপ্ন-কল্পনা ও স্খলন-পতনকে তিনি বাস্তবসম্মতভাবে রূপায়িত করতে সচেষ্ট হয়েছেন। তাছাড়া মানবজীবনের কতগুলো চিরায়ত মূল্যবোধ যেমন-প্রেম, ন্যায়পরায়ণতা ও মানুষের প্রতি মানুষের মমত্ববোধ ইত্যাদি তাঁর লেখায় যথাযথভাবে ফুটে উঠেছে। এসব কারণেই তাঁর রচনা সেসময়ে যেমন ব্যাপকভাবে সমাদৃত ও জনপ্রিয়তা লাভ করেছে, তেমনি তা চিরকালীন মানুষের কাছেও প্রশংসিত হয়েছে, বিশেষত তাঁর রচিত ‘আনোয়ারা’ উপন্যাস বাংলা সাহিত্যে ক্লাসিক মর্যাদা পেয়েছে।

    ১৯১৭-১৯১৮ সালের মধ্যে ‘আনোয়ারা’ উপন্যাসের পরিশিষ্ট বা সিকুয়্যাল হিসাবে ‘প্রেমের সমাধি’ প্রকাশিত হয়। ১৯৬৩ সালে (বাংলা ১৩৭০ বঙ্গাব্দে) এর উনিশতম সংস্করণ প্রকাশিত হয়। আনোয়ারার মত এটিও ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে।

    ১৯৬৭ সালে প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার ও সাহিত্যিক জহির রায়হান এ উপন্যাস অবলম্বনে একই নামে একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। প্রযোজনা করেছেন ইফতেখারুল আলম। চলচ্চিত্রটিতে প্রধান চরিত্রসমূহে অভিনয় করেন রাজ্জাক, সূচন্দা, বেবী জামান, রুবিনা, রানী সরকার, আমজাদ হোসেন প্রমুখ। বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি) ১৯৮৭ সালে এ উপন্যাসের ধারাবাহিক নাট্যরূপ সম্প্রচার করে।

    পুরুষতন্ত্রের প্রতিনিধিত্ব করেছে এই দুই নারী। তাই নিজেরা নারী হয়ে অপর নারীর প্রতি সামান্যতম ভালোবাসা বা করুণা মনে জন্ম নেয়নি। বরং প্রতিনিয়ত কিভাবে আনোয়ারাকে মানসিক অত্যাচার করা যায় সে ব্যাপারে তৎপর থেকেছে।

    উপন্যাসে শেষপর্যন্ত গোলাপজান তার লোভ, আক্রোশের জালে বন্দি হয়েছে। অতি লোভে তার ঘড়া পূর্ণ হয়। যদিও গোলাপজান আগের পক্ষের ছেলে বদসার খুনের দায় দিয়েছে স্বামীর ওপর। গোলাপজান চরিত্রের মধ্যে পরিপূর্ণভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন সমাজে বহুবিবাহের কুফল। অন্যদিকে সংসারে সৎ মায়ের উপস্থিতি সন্তানের জীবনে অভিশাপ হয়ে দেখা দেয় তার চিরন্তন রূপ। জাফর বিশ্বাসের মেয়ে গোলাপজান। বাবা ছিল ডাকতের সর্দার। শেষ জীবনে পুলিশের চেষ্টায় ধরা পড়ে ৮ বছর জেল খাটে। সেখানেই তার মৃত্যু হয়। বাপের মতো ডাকসাইটে স্বভাব গোলাপজানেরও। যদিও ভাই আজিমুল্লা বাপের পথে পা বাড়ায়নি। কিন্তু গোলাপজান দেখতে সুন্দরী। বিয়ে হওয়ার পর স্বামীর ঘর থেকে পালিয়ে আসে। কিন্তু অজিমুল্লা এবং মায়ের শাসনে খোরশেদের সংসারে টিকে যায়। কিন্তু আনোয়ারার বাপ খোরশেদ স্ত্রীর কাছে সর্বদাই অবহেলিত। মেয়ের প্রতি অত্যাচারেও সে নির্বিকার। নুরল এসলামের হত্যার ষড়যন্ত্র করলেও গোলাপজানের পাপেই সে নিজ সন্তানকে হত্যা করে বসে।

    অন্যদিকে আনোয়ারার সৎ শাশুড়ির অত্যাচার অভিশাপ ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকে কিন্তু আনোয়ারা এখানেও নির্বিকার। দুই মায়ের অত্যাচার নীরবে সয়ে যাওয়ার মধ্যে দিয়ে ঔপন্যাসিক নারী জীবনে দুঃখ-কষ্টের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার দিকেই ঝুঁকেছেন। তবে উপন্যাসে তিনি সর্বোপরি দেখাতে চেয়েছেন স্বামী-স্ত্রী পরস্পর বোঝাপড়া, ঘরের সুখ বজায় থাকে নারীর ওপর, নারীর কোমল স্বভাবই সর্বত্র জয়ী, সতীত্বের গৌরব, ধর্ম জীবনের মাহাত্ম্য। আনোয়ারার দুঃখী জীবনের মাঝে স্বস্তি যেন এটুকুই নুরল এসলামের মতো পতি তার ভাগ্যে জুটেছে। নারীর অন্তঃপুরে অবস্থান এবং স্বামীর প্রতি স্ত্রীর ভালোবাসা, বিশ্বাস, আস্থা ও আনুগত্য উপন্যাসটিতে বিশেষভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।

    আনোয়ারার পতিপরায়ণ স্বভাবই সংসারের সুখ-শান্তি বয়ে আনে সে লক্ষেই এগিয়েছেন লেখক। নারীর গুনেই শুধু অন্তঃপুরের শোভা বৃদ্ধি পায়। আর সে নারী যদি হয় গোলাপজান বা সালেহার মায়ের মতো তবে সংসার চির অশান্তিতে ডুবে যায়। লেখক সর্বোপরি নারীর জীবনের সঠিক দিশা দেখাতে চেয়েছেন আনোয়ারার জীবন রূপায়নের মধ্যে দিয়ে।

  • প্রথম-পর্ব

    প্রথম-পর্ব

    প্রথম-পর্ব
    প্রথম পরিচ্ছেদ

    ভাদ্রমাসের ভোরবেলা। স্বর্গের ঊষা মর্ত্যে নামিয়া ঘরে ঘরে শান্তি বিলাইতেছে; তাহার অমিয় কিরণে মেদিনী-গগন হেমাভ বর্ণে রঞ্জিত হইয়াছে। উত্তর বঙ্গের নিম্ন সমতল গ্রামগুলি সোনার জলে ভাসিতেছে; কর্মজগতে জাগরণের সাড়া পড়িয়াছে; ছোট বড় মহাজনী নৌকাগুলি ধবল-পাখা বিস্তার করিয়া গন্তব্য পথে ঊষা যাত্রা করিয়াছে; পাখিকুল সুমধুর স্বরলহরী তুলিয়া জগৎপতির মঙ্গল গানে তান ধরিয়াছে; ধর্মশীল মুসলমানগণ প্রাভাতিক নামাজ অন্তে মসজিদ হইতে গৃহে ফিরিতেছেন, হিন্দু-পল্লীর শঙ্খ-ঘণ্টার রোল থামিয়া গিয়াছে।

    এই সময় মধুপুর গ্রামের একটি চতুর্দশবর্ষীয়া বালিকা তাহাদের খিড়কী-দ্বারে বসিয়া বন্যার জলে ওজু করিতেছিল। তাহার মুখ, হস্তদ্বয়ের অর্ধ ও পদদ্বয়ের গুল্ফমাত্র অনাবৃত এবং সমস্ত দেহ কাল ইঞ্চিপেড়ে ধুতি কাপড়ে আবৃত। গায়ে লালফুলের কাল ডোরাছিটের কোর্তা। দুই হাতে ছয় গাছি চুড়ি। অযত্ন বিন্যস্ত সুদীর্ঘ কেশরাশি আল্ল্গাভাবে খোপা বাঁধা; বালিকার মুখমণ্ডল বিষাদে ভরা!

    বালিকা যে স্থানে বসিয়া ওজু করিতেছিল, তাহার সম্মুখ দিয়া উত্তর-দক্ষিণে লম্বা অনতিবিস্তৃত খাল, দক্ষিণমুখে ঢালু বারিরাশি দুকূল প্লাবিত করিয়া স্রোত-বেগে প্রবাহিত হইতেছে। পূর্বপারে একখানি পাসী নৌকা পাট ক্রয়ের নিমিত্ত উত্তর-দক্ষিণ মুখে লাগান রহিয়াছে। একজন যুবক সেই নৌকার ছৈ-মধ্যে বসিয়া স্বাভাবিক মধুর কণ্ঠে কোরান শরীফ পাঠ করিতেছেন। নৌকায় তিনজন মাঝি, একজন যাচনদার, একটি পাচক ও যুবক স্বয়ং ছিলেন। যুবকের আদেশে যাচনদার মাঝিগণ সহ পাটের সন্ধানে ভোরেই পাড়ার উপর নামিয়া পড়িয়াছে।

    যুবক নৌকায় বসিয়া কোরান পাঠ করিতেছেন। যুবকের দেহের বর্ণ ও গঠন সুন্দর; নবোদ্ভিন্ন ঘনকৃষ্ণ-গুম্ফ-শ্মশ্রু তাঁহার স্বাভাবিক সৌন্দর্য আরও বাড়াইয়া তুলিয়াছে। যুবকের বয়স ত্রয়োবিংশ বৎসর। মাথায় রুমীটুপী, গায়ে সাদাশার্ট ও পরিধানে রেঙ্গুনের লুঙ্গী। এই সাধারণ পরিচ্ছদেও তাহাকে কোন আমিরের বংশধর বলিয়া মনে হইতেছে।

    বালিকা ওজু করিতেছে; কিন্তু সদ্য-ঘটনা-পরম্পরার যুগপৎ ঘাত-প্রতিঘাতে তরঙ্গায়িত হৃদয়ের ভাব যেন তাহার মুখে ক্রীড়া করিতেছে। আবার এই অবস্থায়ও গাঢ় অন্ধকারময় রজনীতে নিবিড় জলদ-জাল-মধ্যবর্তী ক্ষণপ্রভা বিকাশবৎ আশার একটি ক্ষীণোজ্জ্বলরেখা বালিকাকে যেন কোন্ এক সুধাময় শান্তি-রাজ্যের পথ দেখাইয়া দিতেছে।

    বালিকা নৌকার উপর কোরান শরীফ পাঠ শুনিয়া মস্তকোত্তোলন করিল। সে মায়ের মুখে শুনিয়াছিল কোরানের মত উত্তম জিনিস আর কিছুই নাই, উহা যে পড়ে বা শুনে তাহার জন্য বেহেস্তের দ্বার উন্মুক্ত। বালিকার দাদিমাও সদা সর্বদা বলেন, কোরান শরীফ-রূপ শরাবন তহুরা পাঠে ও শ্রবণে মানুষের অন্তর্নিহিত অশান্তি-আগুন নিভিয়া যায়। বালিকা জননী ও দাদিমার উপদেশ হৃদয়ে গাঁথিয়া রাখিয়াছে। সে প্রতিদিন প্রাতে কোরান শরীফ পাঠ করে; আজও তজ্জন্য ওজু করিতে বসিয়াছে। কিন্তু নৌকার মধুবর্ষী স্বরে কোরান পাঠ বালিকাকে আত্মহারা করিয়া তুলিল। সে ওজু ভুলিয়া গিয়া অনন্যচিত্তে কোরান শরীফ পাঠ শুনিতে লাগিল।

    যুবক কোরান পাঠ শেষ করিয়া দুইহাত তুলিয়া নির্মীলিত-নেত্রে মোনাজাত করিতে লাগিলেন——

    “দয়াময়! তোমার পবিত্র নামে আরম্ভ করিতেছি। সমস্ত প্রশংসা তোমার। তুমি অনাদি, অনন্ত, সর্বজ্ঞ, সর্বশক্তিমান। তুমি ধৈর্য্য ও ক্ষমার আধার, তুমি অসীম করুণার উৎস। তুমি কোটি বিশ্ব-ব্রহ্মাণ্ডের স্রষ্টা ও ত্রাতা। সন্তান জন্মিবার পূর্বেই তোমার দয়ায় মায়ের বুকে তাহার আহারের বন্দোবস্ত হইতেছে। করুণাময়! অগাধ সাগরের তলে, কঠিন পাথরের মধ্যে থাকিয়াও অতি ক্ষুদ্রকীটসকল তোমার কৃপায় আহার পাইয়া সানন্দে বিহার করিতেছে। তাই বলিতেছি, হে প্রভো! তোমা অপেক্ষা আর বড় কে? তোমার চেয়ে আর দয়ালু কে? বিভো! তুমি যে কি তাহা তুমিই জান, তোমাকে জানে বা বুঝে, তোমার অনন্ত বিশ্বে এমন কে আছে? তা নাথ! তুমি যত বড়—যেমনটি হও না কেন, আমাকে তুমি অবহেলা করিতে পার না, আমি তোমার আঠার হাজার আলমের শ্রেষ্ঠতম জীবমধ্যে একজন। আমার গ্রাসাচ্ছাদন তোমাকে যোগাইতে হইবে। আমার আকাঙ্খার বিষয়ও তোমাকে শুনিতে হইবে।

    ‘দীননাথ। দীনের প্রার্থনা, আমাদের ভব-সমুদ্রের কাণ্ডারী হযরত মোহাম্মদ (দঃ) যিনি তোমারই একত্বের পূর্ণপ্রচারক এবং তাঁহার বংশধর মহাপুরুষেরা সমস্ত মানবজাতির জ্ঞানবর্তিকা। অতএব, সর্বাগ্রে তাহাদের পবিত্র আত্মার উপরে তোমার শুভাশীর্বাদ বর্ষিত হউক। সমস্ত মুসলমান নর-নারীর সুখ-শান্তির নিমিত্ত তোমার বরকতের দ্বার উন্মুক্ত করিয়া দাও। তোমার দাসগণ ঈমান-ধন হারাইয়া দ্রুতবেগে ধ্বংসের পথে যাইতেছে, তুমি দয়া করিয়া তাহাদিগকে রক্ষা কর। নিজ গুণে ক্ষমা করিয়া তাহাদিগকে গুণবাণ কর। ভ্রাতৃভাবে প্রীতির পবিত্র সূত্রে সমস্ত মানব জাতিকে ঐক্যসূত্রে আবদ্ধ হইতে মতি দাও, স্বর্গীয় শোভায় মর্ত্য উদ্ভাসিত হউক।

    অনাথনাথ! কৈশোরে মাতৃস্নেহে বঞ্চিত হইয়াছি, এই যৌবনে পিতৃশোকে সংসার অন্ধকার দেখিতেছি। প্রভো! তুমি সকলই জান, দাস অকৃতদার, যদি গোলামকে সংসারী কর, তবে যেন প্রেমের পথে তোমাকে লাভ করিতে পারি। আমিন।”

    যুবক বহির্জগৎ ভুলিয়া একাগ্রমনে মোনাজাত করিতেছিলেন। তন্ময়চিত্ততায় তাহার পবিত্র হৃদয়োদ্ভূত ভক্তিবারি নয়নপ্রান্তে বহিয়া গণ্ডস্থল প্লাবিত করিতেছিল।

    বালিকা কোরান শরীফ, মোহুলজান্নাত, রাহেনাজাত, পান্দেনামা, গোলেস্তাঁ প্রভৃতি আরবী, পারসিও উর্দু কেতাব তাহার দাদিমার নিকট শিক্ষা করিতেছিল। মোনাজাত আরবি মিশ্রিত উর্দুতে উচ্চারিত হইতেছিল, সুতরাং সে তাহার অর্থ অনেকাংশে বুঝিতে পারিতেছিল। বুঝিয়া শুনিয়া বালিকার চক্ষুও অশ্রুপূর্ণ হইয়া উঠিল। সে অসহ্য মনোবেদনা ভুলিয়া চিন্তা করিতে লাগিল, “আহা আজ কি শুনিলাম। এমন খোএল্হানে কোরান শরীফ পাঠ ত’ কখনও শুনি নাই, এমন মধুর উচ্চারণও ত’ কখনও শ্রুতিগোচর হয় নাই। কি মধুমাখা মোনাজাত। এমন মধুমাখা সুন্দর মোনাজাত ত’ কখনও শুনি নাই। বুঝি বা কোন ফেরেস্তা মানবমূর্তি পরিগ্রহ করিয়া মধুপুরে আসিয়াছেন, নচেৎ এমন বিশ্বপ্রেমভরা মোনাজাত কি মানবমুখে উচ্চারিত হইতে পারে? মোনাজাতে যেন হৃদয়ের ভাব ফুটিয়া বাহির হইয়াছে।” এইরূপ ভাবিতে ভাবিতে যখন, “দাস অকৃতদার, যদি গোলামকে সংসারী কর, তবে যেন প্রেমের পথে তোমাকে লাভ করিতে পারি।”— যুবকের মোনাজাতের এই শেষ কথা কয়টি বালিকার কর্ণে প্রবেশ করিল, তখন সহসা অলক্ষিতে তাহার গোলাপ-গ রক্তিমাভ হইয়া উঠিল, স্বেদ-বারিবিন্দু মুখমণ্ডলে ফুটিয়া বাহির হইতে লাগিল। পাঠক, সোনার গাছে মুক্তাফল বুঝি এইরূপেই ফলে। বালিকা এক্ষণি সেই দূর ভবিষ্যৎ আশার আলোকে আপনাকে ডুবাইয়া দিয়া অস্ফুটস্বরে বলিয়া উঠিল, “তবে ইনিই কি—তিনি?”

  • বিবাহ-পৰ্ব

    বিবাহ-পৰ্ব

    বিবাহ-পৰ্ব
    প্রথম পরিচ্ছেদ

    আজ ২৫ শে ভাদ্র, বৃহস্পতিবার। আনোয়ারাকে দেখিবার ও তাঁহার বিবাহের লগ্নপত্রাদি স্থির করিবার জন্য আবুল কাসেম তালুকদার, জব্বার আলি খাঁ প্রমুখ ২০/২৫ জন ভদ্রলোক লইয়া আজিমুল্লা ভূইঞা সাহেবের বাড়িতে আসিয়াছে। ভ্রাতুষ্পুত্রের বিবাহোপলক্ষে লোকজন আসিয়াছে, তাই গোলাপজান আজ পরমানন্দে তাহাদের নাস্তার আয়োজনে ব্যস্ত। এই সময় তাহার আদেশে একজন দাসী কূপের পারে পানি আনিতে গিয়াছিল, কিন্তু পূর্ণ কলসী উত্তোলন কালে হঠাৎ দড়ি ছিঁড়িয়া তাহা কূপ মধ্যে ডুবিয়া গেল, দাসী অপ্রতিভ হইয়া কূপের পাশে দাঁড়াইয়া রহিল। এ ঘটনা অল্প সময়েই রাষ্ট্র হইয়া পড়িল।

    এই বিবাহে আনোয়ারার দাদিমার সম্পূর্ণ অমত পূর্ব হইতেই ছিল। অর্থ লোলুপ ভূঁইঞা সাহেব জননীর পায়ে ধরিয়া অনেক অনুনয়-বিনয় করিয়া তাঁহার মত গ্রহণের চেষ্টা করেন; শেষে অসমর্থ হইয়া বলেন, “মা, তুমি এ বিবাহে মত না দিলে আমাকে আর মধুপুরে দেখিতে পাইবে না।” একমাত্র পুত্র, তাই মায়ের প্রাণ পুত্রের কথায় শিহরিয়া উঠিল। তিনি ভাবিলেন, পুত্র হয় আত্মহত্যা করিবে, না হয় দেশান্তরে চলিয়া যাইবে। পুত্রস্নেহাকর্ষণে তখন বৃদ্ধার পৌত্রী বাৎসল্য শিথিল হইয়া পড়িল। তিনি এই বিবাহ সম্বন্ধে অন্য কোন বাধা-বিঘ্ন না দিয়া মিয়মনা হইয়া রহিলেন। এক্ষণে উপস্থিত দুর্ঘটনায় পুত্রকে ডাকিয়া কহিলেন, “খোরশেদ! শুভক্ষণে কুয়ার কলসী ডুবিল, সুতরাং এ বিবাহে আর কিছুতেই তোমার মঙ্গল নাই। এখনও বলিতেছি, এই বিবাহদানে নিরস্ত হও।” মায়ের কথায় পুত্রের মনে অমঙ্গলের ছায়া পড়িল বটে; কিন্তু তিনি স্ত্রী ও সম্বন্ধীর মনস্তুষ্টির জন্য ও অর্থলোভে কহিলেন, “মা, তোমাদের ও-সব মেয়েলী কথার কোন মূল্য নাই। দড়ি ছিঁড়িয়া কুপে কি আর কখনও কলসী ডুবে না?”

    মা একান্ত ক্ষুব্ধ হইয়া আর কোন দ্বিরক্তি করিলেন না।

    এদিকে ষোড়শোপচারে পাত্রপক্ষকে নাশতা খাওয়ান হইল। আহারান্তে তাহারা পান- তামাক ধ্বংস ও নানাবিধ গল্প-গুজবে প্রবৃত্ত হইলেন। বিবাহ সম্বন্ধে কথাবার্তাও ২/১ জন ফুসফাস ইশারা-ইঙ্গিতে পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষে কহিতে লাগিলেন। কিন্তু কাল কাহারও মুখাপেক্ষী নহে, তাহার অপরিবর্তিত নিয়মে সূর্য মধ্যগমন ত্যাগ করিয়া ক্রমে পশ্চিম দিকে হেলিয়া পড়িল। এই সময় ধীরে ধীরে উত্তর-পশ্চিম আকাশ-প্রান্তে গাঢ় মেঘের সঞ্চার হইল, তৎসঙ্গে গগনের বিশাল বক্ষ হইতে গুড় ম গুড় ম ধ্বনি হইতে লাগিল, বাতাস অল্পে অল্পে বহিয়া ক্রমশ প্রবলবেগ ধারণ করিল, শেষে ঝাঞ্ঝাবাতের সৃষ্টি করিয়া দিল। বৃষ্টিপাত আরম্ভ হইল; কিন্তু গর্জন যেরূপ হইল বর্ষণ সেরূপ হইল না। ঝঞ্ঝাবাতে সুযোগ পাইয়া লঘু সূক্ষ্ম বারিধারা আছড়াইয়া আছড়াইয়া দিগন্তে ছড়াইতে লাগিল। সঘন-বিকশিত বিদ্যুৎ-বিভায় লোক-লোচনের অশান্তি ঘটাইয়া তুলিল। দুর্বিসহ যন্ত্রনায় নারকীয় চিৎকারের ন্যায় আকাশ ভেদ করিয়া থাকিয়া থাকিয় চড়ু চড়ু কড়ু কড়ু শব্দ হইতে লাগিল। লোকে মনে করিল এইবার বুঝি মাথায় বাজ পড়ে। দুর্যোগ থামিল না; বৃষ্টি, বায়ু ও বিদ্যুৎ মিলিয়া মিশিয়া প্রকৃতিকে ক্রমশ অস্থির করিয়া তুলিল। গাছপালা তরণী-আরহী প্রভৃতি উলট পালট খাইতে লাগিল। সহসা একটা বজ্ৰ ভূঞা সাহেবের বাড়ির উপর পড়িল! ভীষণ অশণিপাতে বাটীস্থ সকলের কানে তালা লাগিল। আনোয়ারা তাহার দাদিমাকে জড়াইয়া ধরিয়া কাঁদিয়া উঠিল, ভূইঞা সাহেবের অন্তরাত্মা শুকাইয়া গেল; তিনি সভয়ে তথাপি সকলকে কহিলেন, “ভয় নাই। ‘ পরক্ষণে দেখা গেল, তাঁহার গো-শালার চালে আগুন ধরিয়াছে। নিমন্ত্রিত ভদ্রলোকেরা আগুন নিভাইতে যাইয়া দেখিলেন, ভূঞা সাহেবের পালের প্রধান গরুটি মরিয়া গিয়াছে, পাশের আরও ২/১ টি গরু ও একটি ছোট রাখাল বালক আধপোড়া হইয়া মৃতবৎ অজ্ঞান রহিয়াছে। এই রাখাল-বালকটি বৃষ্টির প্রারম্ভে গো-শালায় গরু দিয়া বৃষ্টি থামার অপেক্ষায় সেখানেই বসিয়াছিল। পলকে প্রলয়কাণ্ড ঘটিয়া গেল, ভদ্রলোকেরা তাড়াতাড়ি ঘরের আগুন নিভাইয়া ফেলিলেন। সকলে বালকটিকে সেবা-শুশ্রূষা করিয়া বহু কষ্টে কথঞ্চিৎ সুস্থ করিলেন। সৌভাগ্যবশত বৃষ্টি হওয়ায় ভূঞা সাহেবের অন্যান্য ঘরগুলি আগুনের হাত হইতে বাঁচিয়া গেল।

    শুভ বিবাহের প্রস্তাবদিনে উপর্যুপরি দুইটি অশুভজনক ঘটনা ঘটিল দেখিয়া ভূঞা সাহেব কেমন যেন হতবুদ্ধি হইয়া পড়িলেন, বিবাহ দেওয়ার দৃঢ়সংঙ্কল্প শিথিল হইয়া আসিল; সন্দেহের গাঢ় ছায়ায় তাঁহার অর্থলুব্ধ হৃদয় সমাছন্ন হইল। তিনি একান্ত বিমর্ষ-চিত্তে মায়ের নিকট উপস্থিত হইলেন। পুত্রকে দেখিয়া মা কহিলেন, খোরশেদ! তুমি আমার কথা শুনিতেছ না, এ বিবাহে তোমার সর্বনাশ হইবে।” ভূঞা সাহেব কহিলেন, “মা সর্বনাশের আর বাকি কি? আমার দারগা (গরুর নাম) মরায় আমি দশদিক অন্ধকার দেখিতেছি। সেই গোধনই আমার ঘরে বকরত আনিয়াছিল।” এই বলিয়া ভূঞা সাহেব বালকের ন্যায় চোখের পানি মুছিতে লাগিলেন। মা নিজ অঞ্চলে পুত্রের চোখ মুছিয়া দিয়া কহিলেন, “বাবা, সাবধান হও, তোমার পিতা বলিতেন—’নীচ বংশে কন্যা আনিলে যত দোষ না হয়, নীচ ঘরে মেয়ে বিবাহ দেওয়ায় তাহা অপেক্ষা বেশি দোষ।’ তোমার পিতার উপদেশ স্মরণ করিয়া চল; বিবাহের কথা আর মুখেও আনিও না, আমি দেখিয়া শুনিয়া সত্বরই ভাল ঘরে ভাল বরে— আমার আনারকে সমর্পণ করিতেছি। ভূঞা সাহেব মাতার কথায় অনেকটা আশ্বস্ত হইলেন।

    এদিকে প্রকৃতি শান্ত হইল। পাত্রপক্ষকে কোন প্রকারে আহার করান হইল। তাঁহার ভূইঞা সাহেবের বিমর্ষভাব দেখিয়া ও আকস্মিক দুর্ঘটনার বিষয় চিন্তা করিয়া বিবাহের প্রসঙ্গ উত্থাপন করা তখন যুক্তিযুক্ত মনে করিলেন না। সকলে ভগ্নমনোরথ হইয়া বিদায় গ্রহণ করিলেন। প্রকারান্তরে বিবাহ ভাঙ্গিয়া গেল, ভূইঞা সাহেব হাঁপ ছাড়িয়া বাঁচিলেন, আনোয়ারার দাদিমা বিবাহভঙ্গে উপস্থিত বিপদেও খোদাতায়ালার নিকট শোকর-গোজারী করিতে লাগিলেন। গোলাপজান বড় আশায় নিরাশ হইল।

  • ভক্তি-পর্ব

    ভক্তি-পর্ব

    ভক্তি-পর্ব
    প্রথম পরিচ্ছেদ

    লৌকিক প্রথামতে নুরল এসলামের বিবাহের ক্রিয়াপর্ব সমাধা হইয়া গিয়াছে। তিনি এক্ষণে অফিসের কার্যে নিযুক্ত হইয়াছেন। স্ত্রী আপন পিত্রালয়ে। মাসাধিক পর নুরল এসলাম তাহাকে পত্র লিখিলেন, “প্রাণাধিকে! এত অল্প সময়ে ভক্তি ও সদ্ব্যবহারে নাকি তুমি ফুফু- আম্মার মন কাড়িয়া লইয়া গিয়াছ; তাই তিনি তোমাকে আনিবার নিমিত্ত উতলা হইয়াছেন। আগামী ১৭ই অগ্রহায়ণ তিনি তোমাকে আনিবার নিমিত্ত এখান হইতে লোক পাঠাইবেন। তোমার সই এখন কোথায়? দোস্ত সাহেব বি-এল পরিক্ষায় প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হইয়াছেন। খবরের কাগজে নাম দেখিয়া বেল্লায় ‘তার’ করিয়াছি। তুমি কেমন আছ? খোদার ফজলে আমরা সকলে ভাল আছি। আগামীতে তোমাদের সর্বাঙ্গীন কুশল সংবাদ লিখিবে।” ইতি— তারিখ, ১৩ই অগ্রহায়ণ।

    তোমারই–
    নুরল এসলাম

    আনোয়ারা পত্র পাইয়া স্বামীকে পত্র লিখিল। ইহাই তাহার প্রেমময় জীবনের প্রথম পত্র–

    “পাক্ জনাবে কোটি কোটি কদমবুসি পর আরজ,

    আপনার পবিত্র হস্তের সুধালিপি পাইয়া সুখী হইলাম। আমার একমাস ‘নফল রোজা’ মানত ছিল, এখানে আসিয়া কয়েকদিন পর তাহা আরম্ভ করিয়াছিল। আজ রোজার ১১ দিন, আর তিন সপ্তাহ পর আমাকে লইয়া গেলে ভাল হয়; কারণ তথায় যাইয়া রোজা করিবার নানারূপ অসুবিধা হইতে পারে। পত্রমধ্যে যে টুক্রা কাগজগুলি পাঠাইলাম সেগুলি স্বহস্তে পোড়াইয়া ফেলিবেন। দাসীর বেয়াদবী ও ধৃষ্টতা মাফ করিবেন। আমি এখানে আসিবার এক সপ্তাহ বাদ সই বেল্লা গিয়াছে। সে-ও তথা হইতে আমাকে লিখিয়াছে, তাহার স্বামী প্রশংসার সহিত বি-এল পাস করিয়াছেন। আমি পরমানন্দে সন্দেশ চাহিয়া তাহাকে পুনরায় পত্র লিখিয়াছি। আপনার শরীর কেমন আছে? দাদী আম্মার দোওয়া জানিবেন। বাটীস্থ আর আর সকলের মঙ্গল জানিবেন। খোদার মরজি এখানে সকলে ভাল আছেন। আরজ ইতি তারিখ, ১৫ই অগ্রহায়ণ।

    সেবিকা–
    আনোয়ারা

    নুরল এসলাম যথাসময়ে পত্র পাইলেন। খুলিবামাত্র কতকগুলি টুকরা কাগজপত্র বাহির হইয়া পড়িল। তিনি বিস্মিত হইয়া কাগজগুলি যথাযথভাবে জোড়াতালি দিয়া দেখিলেন; তাহা তাঁহার নিজহস্তে লিখিত পূর্বকথিত সেই তিন হাজার টাকার কাবিননামা। অনেকক্ষণ পর্যন্ত নুরল ইস্লাম অবাক ও স্তম্ভিত হইয়া রহিলেন। তারপর স্বাগত ভাবিলেন, “প্রিয়ে! তুমি সত্য সত্যই স্বর্গের আনোয়ারা (জ্যোতির্মালা), তোমার তুলনা মর্ত্যে সম্ভবে না।”

  • পরিণাম-পর্ব

    পরিণাম-পর্ব

    পরিণাম-পর্ব
    প্রথম পরিচ্ছেদ

    নুরল এসলামের পরবর্তী জীবনের ঘটনা বর্ণনা করিবার পূর্বে, বেলগাঁও বন্দরের একটি চিত্র এস্থলে পাঠকগণের হৃদয়ঙ্গম করিয়া দেওয়ার আবশ্যক হইয়াছে।

    স্রোতোবাহিনী-সরিতের সৈকতসমন্বিত পশ্চিম তটে অর্ধবৃত্তাকারে বেলগাঁও বন্দর অবস্থিত। বন্দরের দক্ষিণ উপকণ্ঠে কোম্পাণির পাটের কারখানা ও অফিস ঘর। নাতিবৃহৎ অফিস-গ্রহ করগেট টিনে নির্মিত, দুই প্রকোষ্ঠে বিভক্ত; সদর দরজা দক্ষিণ মুখে। পশ্চিমের প্রকোষ্ঠে বড়বাবু নুরল এসলাম, পূর্ব-প্রকোষ্ঠে ছোটবাবু রতীশচন্দ্র সরকার কার্য করেন। প্রকাণ্ড লোহার সিন্দুকে কোম্পানির মূলধন থাকে, তাহা পশ্চিম প্রকোষ্ঠে বড়বাবুর জিম্মায়। গ্রীষ্মকালে তটিনীর সৈকতসীমা পূর্বদিকে বহুদূর বিস্তৃত হয়, এইজন্যে এই সময় বন্দরে পানির বড়ই কষ্ট হয়। সদাশয় জুট ম্যানেজার সাহেব সর্বসাধারণের এই পানির কষ্ট নিবারণের জন্যে কোম্পানির অর্থে, অফিস ঘরের পশ্চিমাংশে একটি পুষ্করিণী খনন করিয়া দিয়াছেন। পুষ্করিণীর পূর্বে ও উত্তরে দুইটি শানবাঁধা ঘাট। পূর্বের ঘাট দিয়া অফিসের লোক ও উত্তরের ঘাট দিয়া সাধারণ লোক পানির জন্যে যাতায়াত করে। পশ্চিম পাড় নানাবিধ আগাছা লতাগুল্মে পূর্ণ, দক্ষিণ দিকে কোম্পানির ফলবান বৃক্ষের বাগান। অফিস ঘরের উত্তর দিকে অনতিদূরে বড়বাবুর বাসা। বাসার উত্তর প্রান্তে জুম্মা মসজিদ। মসজিদের বায়ু-কোণে বাজার, সোম ও শুক্রবারে বন্দরে হাট বসে। বন্দরের পশ্চিম অংশে থানার ঘর। তাহার পশ্চিম দক্ষিণে কিছু দূরে বারাঙ্গনা-পল্লী। রতীশবাবুর বাসা বন্দরের উপর সদর রাস্তার ধারে। তাঁহার চরিত্র মন্দ;—এক রক্ষিতা রাখিয়াছেন। উপার্জিত অর্থ তাহার সেবাতেই ব্যয়িত হয়। রতীশবাবু বড়বাবু অপেক্ষা কিছু বেশিদিনের চাকর। তিনি ধূর্তের শিরোমণি অসৎকার্যে তাঁহার অদম্য সাহস; মাসিক বেতন ১৫ টাকা। বড়বাবুর নিযুক্তির পূর্বে তিনি অসদুপায়ে ৫০, ৬০ টাকা উপার্জন করিতেন। যাচনদার দাগু বিশ্বাস পুরাতন চাকর। সে শয়তানের ওস্তাদ; মাসিক বেতন ৯ টাকা। বড়বাবু আসিবার পূর্বে তাহারও ৩০, ৩৫ টাকা আয় হইত। নিম্নপদে আরও ৩/৪ জন চাকর আছে। তাহাদের উপরি আয়ও ঐ অনুপাতে হইত। ভিজা পাট শুক্‌না বলিয়া চালাইয়া, ১০০ মণে একমণ করিয়া পাইকার বেপারীগণের নিকট দস্তুরী ও ঘুষ লইয়া দুষ্টেরা উল্লিখিতরূপে উপরি আয় করিত। এইরূপ করিয়া তাহারা কোম্পানির সমূহ টাকা ক্ষতি করিত। আবার ভিজা পাট চালান দেওয়ার দরুন অনেক সময় কলিকাতার ক্রয়মূল্য অপেক্ষা কমদরে কোম্পানির পাট বিক্রয় হইত। ইহাতেও কোম্পানির অনেক টাকা লোকসান হইত। নুরল এসলাম কার্যে নিযুক্ত হইয়া অল্পদিনেই ব্যবসায়ের অবস্থা বুঝিয়া উঠিলেন। নিমকহারাম চাকরদিগের বিশ্বাসঘাতকতায় কোম্পানি যে আশানুরূপ লাভ করিতে পারে না তিনি তাহা টের পাইয়া অত্যন্ত দুঃখিত হইলেন এবং দুষ্টদিগের কার্যের প্রতি তীব্র দৃষ্টি রাখিতে আরম্ভ করিলেন। ইহাতে অল্পদিনেই দুষ্টদিগের উপরি আয় বন্ধ হইয়া আসিল। বুভুক্ষিত আহারনিরত হিংস্র পশুর মুখের গ্রাস সরাইলে তাহারা যেমন রুখিয়া উঠে, ভৃত্যগণ নুরল এসলামের প্রতি প্রথমত সেইরূপ খড়গহস্ত হইল। শেষে তাঁহাকে জব্দ ও পদচ্যুত করিবার জন্য নানা ফন্দী পাকাইতে লাগিল। সেই সময় হইতে সামান্য খুঁটিনাটি ধরিয়া তাহারা তাঁহার বিরুদ্ধে আলোচনা আরম্ভ করিল। কিন্তু গত তিন বৎসরের মধ্যে নীচাশয়দিগের বাসনা পূর্ণ হইল না। এদিকে বিশ্বস্ততা ও ব্যবসায়নৈপুণ্যে উত্তরোত্তর নুরল এসলামের পদোন্নতি হইতে লাগিল। তিনি ছয়মাস কাতর থাকায় রতীশবাবু তাঁহার স্থলে কার্য করিয়াছিলেন। এই সময়ের মধ্যে অফিসের সমস্ত চাকরের উপরি আয়ের পুনরায় বিশেষ সুবিধা হইল, এজন্যে তাহারা রতীশবাবুর একান্ত অনুগত হইয়া পড়িল। ছয়মাস পরে রোগমুক্ত হইয়া নুরল এসলাম যখন পুনরায় কার্য গ্রহণ করিলেন, তখন অর্থ-পিশাচ ভৃত্যগণের মাথায় যেন আবার বজ্র পড়িল। তাহারা এখন হইতে প্রাণপণ চেষ্টায় নুরল এসলামের ছিদ্রান্বেষণে ও অনিষ্টসাধনে প্রবৃত্ত হইল।