Category: ভূবনচন্দ্র মুখোপাধ্যায়

  • সপ্তম কল্প : এ আবার কে?

    সপ্তম কল্প : এ আবার কে?

    ভূবনচন্দ্র মুখোপাধ্যায়

    [book-name]

    সপ্তম কল্প : এ আবার কে?

    যখন চৈতন্যোদয় হলো, তখন আমি দেখলেম, বনমধ্যে একখানি কুটির, সেই কুটিরে পর্ণশয্যায় আমি শুয়ে আছি, আমার মাথার কাছে একটি স্ত্রীলোক উপবিষ্ট। কে এই স্ত্রীলোক? মানুষ যখন স্বপ্ন দেখে, তখন মনে করে, সব যেন ঠিক, স্বপ্নভঙ্গ হবার পর সকলের সকল কথা মনে থাকে না, স্বপ্নবৃত্তান্ত কেহ কেহ স্মরণ রাখতে পারে, কেহ কেহ পারে না, কিন্তু মূর্চ্ছার অগ্রে যা যা ঘটে, মূর্চ্ছাভঙ্গের পর সব কথাই মনে হয়। স্মৃতি আমারে পরিত্যাগ কোরে যায় নাই! তিনজন লোক আমার হিতৈষী হয়ে পথপ্রদর্শক হবার অঙ্গীকার কোরেছিল, পদব্রজে কষ্ট হবে বোলে অশ্ব সংগ্রহ কোরে দিয়েছিল, তাদের চক্রে আমার এই দশা। কারা তারা? কেন আমারে এই বিজনস্থানে এনে ফেলেছে, কেনই বা অজ্ঞান অবস্থায় বনমধ্যে পরিত্যাগ কোরে পালিয়েছে, বুঝে উঠতে পাল্লেম না; পালিয়েছে কি লুকিয়ে আছে তাও তখন জানতে পারা গেল না। এই স্ত্রীলোকটি কে?—তাদেরই কেহ হবে কিম্বা বনবাসিনী অন্য কোন কামিনী করুণাবশবর্তিনী হয়ে আমারে রক্ষা কোত্তে এসেছে, বিনা জিজ্ঞাসায় সেটিও আমি অবধারণ কোত্তে অক্ষম হোলেম।

    সূৰ্য-দর্শনে অনুমান হোল বেলা এক প্রহর অতীত। বনমধ্যে কুটীর। কুটীরের চতুর্দিকে দৃষ্টিসঞ্চালন কোরে আমি অনুভব কোল্লেম, কেহই এখানে বাস করে না। বাসের যোগ্য যে সকল স্থান, সে সকল স্থানে মানুষের ব্যবহারের সামগ্রী থাকে; এ কুটীরে কিছুই নাই। পত্রশয্যায় আমি শয়ন কোরে আছি, মাথার কাছে সেই স্ত্রীলোকটি পত্ৰাসনে বসে আছে।

    কিছুই যেন আমি দেখছি না, বাস্তবিক কিন্তু সেই স্ত্রীলোকের মুখের দিকে আমার নজর আছে। তার দিকে আমি চেয়ে দেখছি, তারে কিন্তু সেটি আমি জানতে দিচ্ছি না। আমার চক্ষে যখন তার চক্ষু পড়ে, তখন আমি অন্যদিকে চক্ষু ফিরাই।

    কিঞ্চিৎ অগ্রে আমি ভাবছিলেম, কে এই স্ত্রীলোক? এই সময় অনেক পরিমাণে সে ভাবনা দূরে গেল। একরকমে সেই স্ত্রীলোকটি আমি চিনলেম। সে আমারে চিনতে পেরেছিল কি না, তা আমি বলতে পারি না। বাঙালীর ঘরের কন্যা, মুখশ্রীতে সে লক্ষণ বেশ জানা যাচ্ছে; কিন্তু বাঙালীর মেয়ে আপনাদের ঘরে যেমন থাকে, যেমন অলঙ্কারবস্ত্র পরিধান করে, যে ভাবে মস্তকে কেশবিন্যাস করে, এ মূর্তিতে সে ভাবের অভাব। বাজীকরী ভানুমতীরা যে রকমে কাপড় পরে, সেই ভাবে মালকোঁচ্চা কোরে কাপড় পরা, বক্ষে রক্তবর্ণ কাঁচলি, সেই কাঁচলির উপর বসনাঞ্চল খুব চোস্ত কোরে বাঁধা; গলায় একছড়া তবলকীর মালা, দুই কানে দুটি রূপার মাকড়ী, তাতেও তবলকী গাঁথা; মাথার চুল কিছু খাটো খাটো, সে চলগুলি কপালের দিকে টেনে বামদিকে নাড়ুগোপালের চূড়ার মত চূড়াকরা। একরকম ছদ্মবেশ বোল্লেও বলা যায়। তথাপি মুখ দেখে তারে আমি চিনলেম।

    অনেকক্ষণ আমার দিকে চেয়ে চেয়ে সেই স্ত্রীলোক আমারে জিজ্ঞাসা কোল্লে, “তোমার কি ক্ষুধা হয়েছে? তুমি কি এখন স্নান কোরবে?” প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে আমি তারে জিজ্ঞাসা কোল্লেম, “কোথায় আমি এসেছি? যারা এনেছে, তারা কোথায় গেল?”

    আমার প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে স্ত্রীলোকটি সেখান থেকে উঠে গেল; একটু পরে এক কলসী জল আর একখানি ক্ষুদ্র বস্ত্র এনে সে আমারে স্নান কোত্তে বোল্লে। আমি কথা কোইলেম না। স্ত্রীলোক হড় হড় কোরে আমার মাথায় এক কলসী জল ঢেলে দিলে, মার্জনী অভাবে আমার মস্তক গাত্র জলসিক্ত থাকলো; শুষ্ক বস্ত্রখানি পরিধান কোরে সিক্ত বস্ত্রখানি আমি পরিত্যাগ কোল্লেম। স্ত্রীলোকটি আবার চোলে গেল; আবার একটু পরে গুটিকতক ফল আর এক ভাঁড় জল এনে আমারে খেতে দিলে। দুটি ফল ভক্ষণ কোরে আমি জল খেলেম। কিছুই ভাললাগে না। যে অবস্থায় আমি পতিত, সে অবস্থায় কিছু ভাল লাগাও সম্ভব নয়।

    বেলা যখন প্রায় দুই প্রহর, সেই সময় সেই স্ত্রীলোক কিঞ্চিৎ ইতস্ততঃ কোরে আমারে জিজ্ঞাসা কোল্লে, “যদি তোমার বিশ্বাস হয়, বিশ্বাস কর, আমি গৃহস্থকন্যা, আমার হস্তে অন্ন গ্রহণ কোত্তে তোমার কোন বাধা আছে কি না?”—অন্নগ্রহণে আমার ইচ্ছা ছিল না, গৃহস্থকন্যা সামান্য কথা, ব্রাহ্মণের কন্যা বোলে পরিচয় দিলেও অন্নগ্রহণে আমার রুচি হোতো না। আমি নিরুত্তর থাকলেম। অনেকক্ষণের পর সেই স্ত্রীলোককে আমি জিজ্ঞাসা কোল্লেম, “এ জায়গায় তুমি কেন থাক? আর কে কে এখানে থাকে?”

    স্ত্রীলোক উত্তর কোল্লে, “কেহই থাকে না, আমিও থাকি না, নূতন এসেছি। যারা তোমারে এনেছে, তারাও নূতন, আমিও নূতন। যখন যেখানে তারা যায়, আমারেও সঙ্গে নিয়ে যায়, যেখানে তারা আড্ডা করে, আমারেও সেইখানে থাকতে হয়।”

    আমি মনে কোল্লেম, যখন যেখানে যায়, তখন সেইখানে আড্ডা করে, বেদেদের টোলফেলা; সেই জন্যই এই স্ত্রীলোককে ভানুমতীর সাজে সাজিয়ে রেখেছে। তারা বাজীকর, এখন আমি বেশ বুঝলেম। ঘোড়ার পিঠের জীনটা ঘুরে ঘুরে আমারে নাগরদোলায় দুলিয়েছিল, সেটা বাজীকরের কৌশল, এখন ঠিক বুঝলেম; কিন্তু এই স্ত্রীলোক কি কোরে বাজীকরের দলে মিশে আছে, সেটি আমি ভাল কোরে বুঝতে পাল্লেম না। রাত্রিকালে তাদের মুখে যদি ভাল কোরে আমি দেখতে পেতেম, তা হোলেও এক রকমে কিছু অবধারণ কোত্তে পাত্তেম, কিন্তু ঘোর অন্ধকারে সে তিনটে লোকের মুখ-দর্শনে আমার সুবিধা হয় নাই; অজ্ঞানাবস্থায় আমারে এইখানে ফেলে রেখে তারা গা-ঢাকা হয়েছে, আমি এখন এই স্ত্রীলোকটির জিম্মায়।

    বেলা ক্রমশই অধিক হোতে লাগলো। স্ত্রীলোকটিকে আমি বোল্লেম, “আমার ক্ষুধা নাই, আহারে আমার রুচি নাই, আমার জন্য তুমি কেন আর কষ্ট পাও? তুমি গিয়ে আহার কর, তোমার লোকেরা যদি এসে থাকে, তাদের আহার করাওগে, আর একবার আমারে দেখা দিও।”

    স্ত্রীলোক বোল্লে, “পালিও না, পালাবার চেষ্টা কোরো না, পালাতে পারবে না, এ স্থানটা অরণ্যময়, চারিধারে গড়খাই খালের ভিতর অগাধ জল, পালাবার উপায় নাই, পালাবার চেষ্টা কোল্লেই বিপদে পোড়বে।”

    আমি ঈষৎ হাস্য কোল্লেম, কিঞ্চিৎ উত্তেজিতম্বরে বোল্লেম, “যারা আমারে এখানে এনেছে, তাদের সঙ্গে একবার দেখা না কোরে কোথাও আমি যাব না, তুমি স্বচ্ছন্দে আপনার গৃহকর্মে মনোযোগী থাক। আর দেখ, তোমারে যেন কোথায় আমি দেখেছি, এই রকম মনে হোচ্ছে, তোমার শরীরে দয়া আছে, তাও আমি বুঝতে পাচ্ছি; আমার প্রতি দয়া রেখো; কাজকর্ম সারা হোলে আর একবার তুমি আমার কাছে এসো; তোমার সঙ্গে আমার কতকগুলি কথা আছে।”

    এইবার সটান আমার মুখের দিকে চেয়ে, মুখখানি একটু ভারী কোরে, স্ত্রীলোকটি কুটির থেকে বেরিয়ে গেল। আমি একাকী হোলেম। সূর্য কাহারও অনুরোধ উপরোধ রক্ষা করেন না। আমি বিপদে পোড়েছি, দিনমানে একটু নির্ভয় থাকি রাত্রিকালে বড় যন্ত্রণা, তুমি একটু থেকে যাও; আমার উপকারের জন্য তুমি একটু অপেক্ষা কর। যোড়হাতে মিনতি কোরে এরূপ প্রার্থনা কোল্লেও সূর্যদেব সে প্রার্থনা শ্রবণ করেন না। সেই অবস্থায় আমারে রেখে দিবাকর পশ্চিমাচলে অস্ত গেলেন। অন্ধকারে সেই কুটিরমধ্যে আমি থাকলেম। একাকী। সে স্ত্রীলোক আর ফিরে এলো না।

    স্ত্রীলোকের মুখে আমি শুনেছি, এখানে তারা নূতন। ভালমানুষ নয়; ভালমানুষ হোলে অবশ্য লোকালয়ে থাকতো, বনের ভিতর থাকতো না, বনের ভিতর লুকিয়ে আছে, নিশ্চয়ই দুষ্ট মতলব। যে প্রকারে ঘোড়ায় তুলে এই বনের ভিতরে তারা আমারে এনেছে, তাতে আর নিশ্চয়তার বাকী কিছুই নাই। ঐ স্ত্রীলোকটি আমার চেনা; যা বোলে আমি চিনেছি, তাই ঠিক; বসন-ভূষণের পরিবর্তন হয়েছে, মুখের গঠনের পরিবর্তন হয় নাই, আমার চক্ষেরও ভুল হয় না; যা ভেবে চিনেছি, তাই ঠিক।

    মহা বন, চারিদিকে গড়খাই, এই গড়বন্দী অরণ্যমধ্যে সেই তিনটি লোক আছে আর ঐ স্ত্রীলোকটি আছে, আরও কেহ কেহ থাকলেও থাকতে পারে। কুটির কেবল এই একখানি নয়, আরও কুটির আছে, সেই কুটিরে সেই স্ত্রীলোকটি গিয়েছে। ফিরে আসবার কথা আছে, আমিও ফিরে আসবার আমন্ত্রণ কোরেছি; কিন্তু এলো না। কতক্ষণ আমি এই অন্ধকারে একাকী অবস্থান কোরবো, তাই ভাবতে লাগলেম।

    সে ভাবনা বড় নয়, তদপেক্ষা বড় ভাবনায় আমার হৃদয় ব্যাকুল। আবার আমি অমরকুমারীকে হারালেম! এত কষ্টে উদ্ধার কোরে আনলেম, এনেও নিরুদ্বেগ হোতে পাল্লেম না। হাকিমের বাসায় অমরকুমারী আছেন, মণিভূষণ রক্ষক আছেন, দুষ্টলোকেরা সেখান থেকে অমরকুমারীকে হরণ কোত্তে পারবে না, সেটি আমি বুঝতে পাচ্ছি, কিন্তু অমরকুমারীকে আমি দেখতে পাচ্ছি না; এই বড় আক্ষেপ।

    কোথায় আমি এলেম? সেই তিনজন লোক কোথাকার? কেন তারা তেমন কোরে আমারে এই বনের ভিতর ধোরে নিয়ে এলো? আমি তাদের কাছে কি অপরাধ কোরেছিলেম? কি অপরাধে তারা আমার শত্রু? তারাও কি রক্তদন্তের দলের লোক? তাই হবে। রক্তদন্তের লোক সর্বঠাঁই! যেখানে আমি সেইখানেই রক্তদন্তের চর! প্রতাপ সামান্য নয়! আচ্ছা, রক্তদন্তের লোক তারা, এই যদি ঠিক হয়, তবে তারা একটি মেয়েমানুষের কাছে আমারে রেখে সোরে গেল কেন? সম্মুখে আর এলো না কেন? বেঁধে রাখলে না, প্রহার কোল্পে না, ভয় দেখালে না, অমনি অমনি সোরে গেল; মানে কি? শীঘ্র যদি আমি এখান থেকে মুক্ত না হোতে পারি, অবশ্যই আমার অনুমান একজন হাকিমের বাসাতে আমি থাকি, পূর্বদিন বৈকালে আমি বেরিয়ে এসেছিলেম, সমস্ত রাত্রির মধ্যে ফিরে যাই নাই, আজও সমস্ত দিন গেলেম না, অবশ্যই অনুসন্ধান হবে; হয় তো অনুসন্ধান আরম্ভ হয়েছে, কিন্তু এই নিবিড় জঙ্গলের মধ্যে আমি আবদ্ধ, নগরে আমারে পাওয়া যাবে না; বনে আমি আছি, এ সংবাদও প্রচার হবে না, অন্বেষণকারীরা কোথায় আমার দর্শন পাবে?

    কপট-চাতুরীতে যারা আমারে এই বনের ভিতর এনেছে, তারা আর এখন দেখা দিচ্ছে না। কি মতলবে এনেছে, তাও আমি জানতে পাচ্ছি না। প্রাণে মারবে কি বাঁচিয়ে রাখবে, তারাই জানে। আমি মরি আর বাঁচি, তাতে আর আমার ক্ষোভ থাকছে না। কেন যে আমি পৃথিবীতে এসেছিলেম, পাঠাবার অগ্রে বিধাতার মনে যে কি ছিল, সে তত্ত্ব বিধাতারই সুগোচর; আমার ভাবনা বৃথা। জন্ম হয়েছে, বেঁচে আছি, এইমাত্র। এই বয়স পর্যন্ত জীয়ন্তে আমি মৃতবৎ; মরণেও আমার ক্ষোভ নাই। যদি মরি, অমরকুমারী নিরাপদ, এটি আমি জেনে যাব। আপাততঃ রক্ষক একজন হাকিম, অভিভাবক মণিভূষণ দত্ত। এখানকার কার্য সমাধা হবার পর অমরকুমারীকে সঙ্গে কোরে মণিভূষণ দেশে যাবেন, বৃদ্ধ শান্তিরাম দত্ত অমরকুমারীরে সযত্নে পালন কোরবেন, দীনবন্ধুবাবু পশুপতিবাবু তত্ত্বাবধান কোরবেন। অমরকুমারীর বিবাহ হবে।

    অহো! অকস্মাৎ আমার প্রাণ কেন এমন করে? বড় গরম! প্রাণ আই ঢাই কোচ্ছে! এতক্ষণ তো এ রকম ছিল না, হঠাৎ কেন এমন হয়? অমরকুমারীর বিবাহ হবে, আমি দেখতে পাব না, সেই জন্যই কি প্রাণ আমার এত অস্থির?

    ছুঁড়িটা কোথায় গেল? আমারে চৌকি দিবার জন্য নষ্টলোকেরা তারে এখানে বোসিয়ে রেখেছিল, আমি পালাতে পারবো না; ছুঁড়ী আমারে এই কথা বোলে ভয় দেখিয়ে গেল, আর এলো না। পিপাসায় যদি আমার ছাতি ফাটে, এক বিন্দু জল পাবো না। ছুঁড়িটা গেল কোথায়? কেন এলো না? বোধ হয়, আমারে চিনতে পেরেছে। যখন আমার জ্ঞান ছিল না, তখন সে ছিল; যখন আমি চৈতন্য পাই, তখনও সে ছিল, কথাও কোয়েছিল, চিনেছে, তেমন ভাব কিছুই জানায় নাই। আমি চিনেছি, সে ভাবটি আমিও তারে জানাই নাই। এখন আমি কি করি?

    ভাবছি, এমন সময় একটা জলন্ত মশাল হাতে কোরে একটা লোক সেই কুটিরের মধ্যে প্রবেশ কোল্লে, একবার তার মুখের দিকে চেয়ে আমি মাথা হেঁট কোল্লেম। সে লোককে পূর্বে আমি কখন দেখি নাই, রাত্রে যারা আমাকে ঘোড়ায় তুলে বনে এনেছে, সেই লোকটা তাদের মধ্যে একজন, তাতে আমি কোন সন্দেহ রাখলেম না, কিন্তু তারে দেখে আমার কোন প্রকার ভয় হলো না। প্রাণে যার মায়া নাই, শত্রু-দর্শনে তার কোন প্রকার ভয় হোতেও পারে না। আমি ভয় পেলেম না। পূর্বরাত্রে পথের ধারে যখন তারা আমাকে দেখে, আমি যখন তাদের দেখি, রাত্রের অন্ধকারে তখন আমি তাদের মুখ ভাল কোরে দেখতে পাই নাই; তথাপি আমি স্থির কোল্লেম, সেই তিনজনের মধ্যেই এই একজন।

    মশাল হাতে কোরে লোকটা খানিকক্ষণ নীরবে আমার সম্মুখে দাঁড়িয়ে থাকলো। তার পর ভাঙা কাঁসি যেমন খন খন শব্দে বাজে, সেইরূপ আওয়াজে সগর্জনে আমারে জিজ্ঞাসা কোল্পে, “কি রে ছোকরা! তোর নাম হরিদাস? এই বয়সে ততটা ধূৰ্ততা তুই কোথায় শিখেছিস? আমাদের হাতে এইবার সেই ধূর্তটা ভাঙবে।”

    প্রথমে তার মুখ দেখে আমি মাথা হেঁট কোরেছিলেম, এই সময় মাথা তুলে তার মুখে পানে চেয়ে আমি জিজ্ঞাসা কোল্লেম, তোমরা কে?

    হি হি শব্দে হাস্য কোরেই সেই লোক উত্তর কোলে, “আমরা কে? কোন আমরা? আমাদের পরিচয় অনেক। সে সকল পরিচয়ে তোর কি দরকার?”

    ধীরস্বরে আমি বোল্লেম, দরকার আমার কিছুই নাই, তবে কি না, বিনা দোষে আমারে বনবাসে এই কারাযন্ত্রণা ভোগ কোত্তে হোচ্ছে, অকারণে তোমরাই আমার এই যন্ত্রণার হেতু, সেই জন্যই আমি জানতে চাই, তোমরা কে? কেন আমারে ধোরেছ? একবার আমি ভেবেছিলেম, অদ্য কোন লোককে ধরবার তোমাদের মতলব ছিল, অন্ধকারে ঠিক কোত্তে না পেরে আমারেই ধোরে ফেলেছ, এখন দেখছি, তুমি আমার নাম পর্যন্ত জানো, কেন আমারে ধোরেছ, সেইটি জানতে পারলে,—

    মশালটা একধারে নামিয়ে রেখে উগ্রমূর্তি ধারণ কোরে, উগ্রস্বরে সেই লোক বোলে উঠলো, “জানতে পারলে তুই কি কোরবি? ভারী চালাক! এবারে আর চালাকী খাটছে না যাদু! গুজরাটের বরদা রাজ্য নয়! এ রাজ্য প্রবল প্রতাপ ইংরেজের, এখানে লোকের চক্ষে ধূলা দেওয়া বড় শক্ত কথা! একজন বিশ্বাসঘাতক রাজকুমার, কে জানে রাজকুমার কি প্রেতকুমার, সে ব্যক্তি ছদ্মবেশে বীর মল্লের আশ্রয়ে থেকে, বীরমল্লকে ধোরিয়ে দিয়েছে। হস্তী-পদতলে নিক্ষেপ কোরে সেই বীর-পুরুষের বীরদেহ ধূলিসাৎ কোরেছে, তুই তার সহায় হয়েছিলি, সেই নিমখারাম তোর মুরব্বি হয়েছে, এইবার দেখা যাবে, কে তোরে রক্ষা করে! তুই হয় তো মনে করেছিস, আমরা নিকটে থাকি না, তোরে আমরা বেঁধে রাখি নাই মনে কোল্লেই তুই পালাতে পারিস, সেই সাহসেই তোর বুকে ভয় নাই। হাঁ, আমরা নিকটে থাকি না, সম্মুখে আসি না, এ কথা সত্য, কিন্তু দূরে দূরে আমরা বিচরণ করি। দূরে থেকে তোকে পরীক্ষা করি। আমরা কেবল তিনজন নহি। তুই যা মনে ভাবিস, তা নয়, আমরা অনেক, আমাদের তাঁবেদার বন্দুকধারী লোকেরা গড়ের ধারে ধারে দিবারাত্রি পাহারা দেয়। পালাবার চেষ্টা কোল্লেই তুই মারা যাবি।

    লোকটা নিস্তব্ধ হলো। মশাল জ্বোলছিল, লোকের মুখের দিকে চেয়ে আমি বুঝলেম, তার কথাগুলো আমার উপর কতদূর কাজ কোরেছে, রক্ত বর্ণ বক্রনয়নে আমার মুখের দিকে চেয়ে চেয়ে সেই লোকটা তাই পরীক্ষা কোচ্ছে। বাস্তবিক ঔষধ ধরে নাই, কথাগুলো আমার উপর কিছুই কাজ করে নাই;—

    কাজ করা মানে আমার ভয় পাওয়া। আমি কিছু মাত্র ভয় পাই নাই, আমি তখন ভাবছিলেম, লোকটা মিথ্যাবাদী; দুষ্টলোকে সত্যবাদী হয় না। ধূর্তলোকে সত্যকথা বলে না। জানি, তথাপি আমি মনে কোল্লেম, এ লোকটার আগাগোড়া সমস্তই মিথ্যাকথা। যে স্ত্রীলোকটা আমার কাছে ছিল, আমি তারে চিনেছি, সে এখনও এ সব লোকের দলে দস্তুরমত অভিষিক্ত হয় নাই। অকপটে সে আমারে বোলেছে এ বনে তারা নূতন; এ লোকটা বোলছে, তাঁবেদার লোকেরা দিবারাত্রি গড়ের ধারে পাহারা দেয়। গড় যেন এই সব লোকের ইন্তমুবারী ভোগ-দখলী মৌরাশী পাট্টাই। পুরষানুক্রমে এরা যেন এই গড়বন্দী অরণ্যের অবিরোধ অধিকারী! কাণ্ডই মিথ্যা।

    নানা কথায় আমারে ভয় দেখিয়ে, লোকটা সেখান থেকে চলে গেল। মশালটা নিয়ে যেতে ভুলে গেল না। কুটির অন্ধকার। আবার আমি ঘোর অন্ধকারে একাকী স্ত্রীলোকটা এলো না। গত রাত্রে আমি উপবাস কোরেছি, আজি দিবাভাগে গোটা দুই ফল খেয়েছি; ক্ষুধার উদ্রেক নাই, কিন্তু পিপাসা ধারণ করা যায় না। পিপাসা হোচ্ছে; স্ত্রীলোকটা যদি আসে, একটু জল পাবার আশা হয়। জল পিপাসা অপেক্ষা সে সময় আমার আর একটা পিপাসা ছিল। যা আমি ভেবেছি, যা আমি স্থির করেছি, যা বলে চিনেছি, বাস্তবিক সেই স্ত্রীলোকটি, সেই স্ত্রীলোক কি না, সেই তত্ত্বটি পরিজ্ঞাত হবার পিপাসা।

    অন্ধকারে আমি বসে আছি, প্রায় অর্ধদণ্ড অতীত। বাহির দিকে একটু দূরে অল্প অল্প আলো দেখা গেল। যে লোকটা মশাল হাতে কোরে বেরিয়েছে, সেই লোক হয় তো আবার ফিরে আসছে, এইরূপ আমি মনে কোল্লেম। তা নয়, সে নয়; আলো যখন ক্রমশঃ নিকটবর্তী হলো, তখন দেখলেম, সেই পূর্বে কথিত স্ত্রীলোক। কুটিরদ্বারে ক্ষুদ্র এক লণ্ঠন হস্তে সেই স্ত্রীলোক।

    স্ত্রীলোক কুটিরমধ্যে প্রবেশ কোল্লে, লণ্ঠনটি পাশে রেখে আমার নিকটে এসে বোসলো, অতি নিকটে। আমি তার মুখ দেখলেম। মুখে ম্লানও নয়, মাঝে হাসিও নাই; অথচ ভাবে যেন একটু হাসি হাসি বুঝা গেল। সেইভাবে সেই মুখখানি ঘুরিয়ে সে আমারে বোল্লে, “কেমন শুনলে? যা আমি বোলেছিলেম, তাই ঠিক কি না? পালাবার উপায় নাই।”

    সে প্রশ্নের উত্তর দেওয়া আমি অনাবশ্যক বিবেচনা কোল্লেম। পূর্বাবধি যে কথাটি আমার মনে মনে জাগছিল, সেই কথাই অগ্রে উত্থাপন করি এই আমার অভিলাষ; কিন্তু হলো না, স্ত্রীলোক পুনরায় আমারে জিজ্ঞাসা কোল্লে, “যে লোকটি এসেছিল, তোমারে আর কি কি কথা বোলে গেল? আমি তোমার কাছে অনেকক্ষণ ছিলেম, তার পর অনেকক্ষণ অনুপস্থিত ছিলেম, তাতে কি তার রাগ রাগ ভাব দেখলে?”

    আর আমি ধৈর্য রাখতে পাল্লেম না, ক্ষুধা আমার পূর্বেই দূর হয়েছিল, একটু পূর্বে একটু পিপাসা এসেছিল, ছুঁড়িটার বাচালতা দেখে, সে পিপাসাও দূর হয়ে গেল। এক নিশ্বাসে আমি জিজ্ঞাসা কোল্লেম, “নবীন! এ বনে কি তুমি নবীন তপস্বিনী?”

    প্রশ্ন শ্রবণ মাত্র, স্ত্রীলোকটা চমকে গেল। আঁতে ঘা লাগলো। তার চক্ষু তখন আমার চক্ষের দিকে ছিল না। সহসা সমসূত্রে আমার চক্ষের দিকে চক্ষু উত্তোলন কোরে ছুঁড়ী খানিকক্ষণ হাঁ কোরে থাকলো; যতক্ষণে অন্ততঃ দশবার চক্ষের পলক পড়া সম্ভব, ততক্ষণের মধ্যে একটিবারও পলক ফেলে না। ভাব আমি তৎক্ষণাৎ বুঝতে পাল্লেম তার নাম আমি জানতে পেরেছি, নাম ধোরেই সম্বোধন কোরেছি, তার পরিচয় আমি জানি, সে জন্যই তার বিস্ময়।

    বিস্ময়ে জড়ীভূতা সেই নবীন বন-বাসিনী চমকিতনয়নে চেয়ে অবাক হয়ে আছে, সেই ভাব দর্শন কোরে পুনরায় আমি জিজ্ঞাসা কোল্লেম, “নবীন! তোমার এ দশা কতদিন? কতদিন তুমি এই দস্যুদলের সহচারিণী? আমি এখান থেকে পালাতে পারবো না, সেই কথা তুমি বোলেছিলে, এবার তুমি আসবার কিছু পূর্বে যে লোক এখানে এসেছিল, সেই লোকটিও সেই কথা বোলে গেল। তার সঙ্গে তোমার কি সম্বন্ধ? আমার সঙ্গে তোমার কি শত্রুতা? আমারে তুমি চিনতে পেরেছ? তোমার চাউনি দেখেই তা আমি বুঝতে পেরেছি। তোমার ভাগ্যে এই ছিল, স্মরণ কোরে আমার প্রাণে কষ্ট হোচ্ছে; কিন্তু এ কি বিপরীত! আমি বিপদে পড়েছি, তাতে তুমি আহ্লাদিনী! ধর্ম ভাবটা তুমি একেবারেই ভুলে গিয়েছ। যে পথে তুমি এখন দাঁড়িয়েছ, যারা যারা সে পথে আসে, তারা সকলেই ধর্মভাব ভুলে যায়। দেখ নবীনকালি! দুই একদিন নয়, অনেকদিন তোমাদের বাড়ীতে আমি ছিলেম, তোমাদের সংসারে যাতে মঙ্গল হয়, তোমরা যাতে সুখে থাক, সাধ্যমত সেই চেষ্টাই আমি কোরেছি, তাও তুমি জানো; কি অবস্থায় কি প্রকারে এই বিজন বনমধ্যে আমি এসে পড়েছি, তাও তুমি জেনেছ; এ অবস্থায় তোমার কি করা কর্তব্য, সেটা তুমি ভাবলে না; যাতে আমি এখানে থেকে পালাতে না পারি, তাই তুমি ইচ্ছা কোচ্ছো! চিরদিন আমি সত্যধর্মের সেবা করি, তুমি নিশ্চয় জেনো, তোমার ইচ্ছা কখনই ফলবতী হবে না। মানুষ পৃথিবীতে আসে, চিরকাল পৃথিবীতে থাকে না। মানুষ কখনও অমর হয় না। কিছুদিন ইহসংসারে সুখভোগ অথবা দুঃখভোগের পর, মানুষকে এক অজ্ঞাত দেশে চলে যেতে হয়; সে দেশের নাম পরলোক। সে লোকের অবস্থার নাম পরকাল। সে লোকে সে কালেও সুখ-দুঃখের ভোগ আছে। তুমি অভাগিনী, পাপবুদ্ধির বশবর্তিনী, পাপীলোকের সঙ্গিনী, এ সব ঠিক; কিন্তু অবকাশ কালে নির্জনে এক একবার পরকালের কথাটা মনে কোরো।”

    এইবার নবীনকালীর ঘন ঘন চক্ষের পলক পড়তে লাগলো। তার সর্বশরীর সিউরে উঠলো; কি যেন আমারে বোলবে বোলবে। মনে কোল্পে, দুই তিনবার একটু একটু হাঁ কোল্লে, কথা ফুটলো না, বোলতে পাল্লে না।

    পাঠক মহাশয় হয় তো এই স্ত্রীলোকটির পরিচয় জানবার নিমিত্ত উৎসুক হয়ে থাকবেন। এই স্ত্রীলোক বঙ্গবাসিনী। শেষকালে কাশীবাসিনী হয়েছিল। কাশী রমণবাবুর বাড়ীতে যখন আমি আশ্রয় পাই, তখন তাঁর পরিবারবর্গের সঙ্গে আমার জানাশুনা হয়। রমণবাবুরা তিন সহোদর। তিনি জ্যেষ্ঠ, রামশঙ্কর মধ্যম, মতিলাল কনিষ্ঠ। তাঁদের পিসীমার দুটি কন্যা, সেই দুটি কন্যার মধ্যে একটি কন্যা এই নবীনকালী। রামশঙ্কর একরাতে পিসীমার হাতের অঙ্গুলিগুলি ছেদন কোরে, মেজ বৌমার গায়ের অলঙ্কারগুলি কেড়ে নিয়ে, বাড়ী থেকে পলায়ন করে। সেই রাত্রেই এই নবীনকালী নিরুদ্দেশ! এতদিন কোথায় ছিল, প্রকাশ ছিল না; এতদিনের পর পড়বি তো পড়, আমারই নজরের উপর! দর্শনমাত্রেই আমি চিনেছি; অংশ চিনতে কিছু, বাকী আছে। সঙ্গে সঙ্গে রামশঙ্কর আছে কি না, সেইটি এখন অনিশ্চিত।

    পরকালের নামে নবীনকালী সিউরে উঠছে, চমকে উঠেছে; এতক্ষণ ডেকে ডেকে কথা কোচ্ছিল, এই সময় কিছু, নরমসুর ধোল্পে; বিষাদে ম্লানমুখী হয়ে নরমসুরে আমারে বোল্লে “না হরিদাস! অমন কোরে তুমি আমারে ভয় দেখিও না! কাশীবাস আমার ভাগ্যে নাই; বিশ্বেশ্বর আমারে কাশীতে রাখলেন না, তাড়িয়ে দিলেন, সেই জন্যই আমার নরকভোগ!”

    এই দেখ! পাপিয়সী! কেমন কোরে আপনার মুখে আপনি আগুন দেয় দেখ! হতভাগিনী স্বৈরিনী। বিশ্বেশ্বর তোমারে তাড়িয়েছেন, পাপমুখে এমন কথা বোলো না। বিশ্বেশ্বরপুরী তোমারে ভাল লাগলো না, রামশঙ্করের প্রেমে মন মজে গেল, মুক্তিক্ষেত্র পরিত্যাগ কোরে রাতারাতি রামশঙ্করের সঙ্গে তুমি পালিয়ে এলে! বিশ্বেশ্বরের নিন্দা করবার সময় তোমার পাপ-রসনা অবসন্ন হয় না, এই বড় আশ্চর্য।

    নবীনকালী আরও জড়সড়; আরও নরম হয়ে আরও অনুতাপ কোরে বোল্লে, “না হরিদাস! আর তুমি আমারে ওরকম তিরস্কার কোরো না; বিশ্বেশ্বর আমারে তাড়ান নাই; পাপে আমার মতি ছিল, কালভৈরব আমারে তাড়া কোরেছিল! তাও না! পাপে আমার মতি হয় নাই, একজন আমারে কুমতি দিয়ে ছিল! সেই রামশঙ্কর আমার পরকালের পথ বিষময় কোরে দিয়েছে, নরকের অগ্নি নরকের বিষ অহরহ আমারে দগ্ধ কোচ্ছে, জর্জরীভূত কোচ্ছে; ভুলিয়ে দাও, ভুলিয়ে দাও; নরকের মূর্তি আর আমারে তুমি দেখিও না! আচ্ছা হরিদাস! আমি যে সেই কুলকলঙ্কিনী নবীনকালী, এখানে এ বনে, তা তুমি কেমন কোরে চিনেছ?”

    মৃদুহাস্য কোরে আমি বোল্লেম, ভানুমতী সেজে যে হরিদাসের চক্ষে ধাঁধা লাগান বড় শক্ত কথা! তোমার মত শত শত নবীনকালীও আমার চক্ষে ধাঁধা দিতে পারে না। একবারমাত্র তোমার মুখখানি দর্শন কোরেই আমি ছদ্মবেশের ছদ্ম-আবরণ ভেদ কোরে ফেলেছি। ধরা তুমি দাও কি না দাও, তোমার নিজমুখে নিজ পরিচয় প্রকাশ হয় কি না হয়, সেই প্রতীক্ষায় আমি চুপ কোরেছিলেম। বোধ হয়, তোমার ইচ্ছাও ছিল না, পরিচয় দেওয়া; বিশ্বেশ্বর দেওয়াইলেন। তুমি এখন বুঝতে পেরেছ, নরকভোগ। নিজ মুখে স্বীকার। দয়াময় বিশ্বেশ্বর তোমার প্রতি দয়া প্রকাশ কোরেছেন। আচ্ছা, নবীন! রামশঙ্কর কি তোমার সঙ্গে আছে?

    এ প্রশ্ন আমি জিজ্ঞাসা কোরবো, কলঙ্কিনী সেটা ভাবে নাই; প্রশ্নের উত্তর পাওয়া গেল না। প্রশ্নটা ঘুরিয়ে দ্বিতীয়বার আমি জিজ্ঞাসা কোল্লেম, তুমি কি রামশঙ্করের সঙ্গে আছ? সে প্রশ্নেও নবীনকালী কোন উত্তর দিল না। কাশী থেকে ঢাকা! পলায়নের দৌড় কম নয়! সরাসর এক যাত্রায় ঢাকা, এমনও সম্ভব নয়। এরূপ পাপ কার্যের রীতিপদ্ধতি যে প্রকার, সেই প্রকার পদ্ধতিতেই নানা স্থানে এরা পরিভ্রমণ কোরেছে, সেটি আমি অনুভবে বুঝে রাখলেম। আর এক তত্ত্ব আমার মনে এলো। মশালহাতে কোরে যে লোকটা আমার কাছে এসেছিল, সে লোক রামশঙ্কর নয়; কিন্তু সে বোলে গিয়েছে, তারা অনেক লোক; দিবারাত্রি গড়ের ধারে ধারে বন্দুকধারী পাহারা। কথাটা সত্য কি না? নবীনকালীকে আমি জিজ্ঞাসা কোল্লেম, সমান প্রকৃতির কত লোক এই বনে বাস করে? পথে আমার দেখা পেয়ে তিনজনে আমারে এখানে এনেছে। সত্য কি কেবল তিনটি লোক তোমার রক্ষাকর্তা?

    নির্বাকে অল্পক্ষণ আমার নয়ন নিরীক্ষণ কোরে নবীনকালী আমারে এক প্রশ্ন দিলে। সে প্রশ্ন আমার অভাবনীয়। নবীনকালী জিজ্ঞাসা কোল্পে, কথা তুমি কেন জিজ্ঞাসা কর? কম লোক যদি হয়, তা হলে কি তুমি পালাবে? পালাবার উপায় থাকলে আমি পালাবো, এই ভাব আমার মনে ছিল। কাপুরুষের মত পলায়ন কোত্তে আমার ইচ্ছা ছিল না; যদি পালাতে হয়, বীরত্ব দেখিয়ে জয়ী হয়ে পালাবো, এই আমার মতলব। প্রশ্নের উত্তরে আমি বোল্লেম, আমার প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে আমারে তুমি নূতন প্রশ্ন দিচ্ছ, এটা ঠিক হোচ্ছে না; আগে আমার প্রশ্নের উত্তর কর, তার পর আমার মনের কথা শুনতে পাবে।

    নবীনকালী বোল্লে, “অল্প দিন হলো, আমরা এখানে এসেছি। যে তিনজনকে তুমি দেখেছ, তারাই এখানে থাকে। রাত দিন এক জায়গায় বোসে থাকে না, ঠাঁই ঠাঁই ঘুরে ঘুরে বেড়ায়; তাদের ভিতর রামশঙ্কর আছে কি না, সে কথা তুমি আমারে জিজ্ঞাসা কোরো না, সে প্রশ্নের উত্তর আমি দিতে পারবো না। এখন তোমার কথা হোচ্ছে, কেবল সেই তিনজন মাত্র এ বনের অধিকারী কি না। হাঁ, আপাততঃ অধিবাসী তিনজন, কিন্তু এই কদিনের মধ্যে আমি দেখেছি, আরও দুটি লোক একদিন এখানে এসে ঐ তিনজনের সঙ্গে ফুসফুস কোরে কি পরামর্শ কোরে গিয়েছে; পরামর্শ সব আমি শুনতে পাই নাই। একজন কেবল দুই একবার একটু বড় বড় কোরে তোমার নাম কোরেছিল, তাই আমি শুনেছি; তাই শুনেই আমি বুঝেছিলেম, তুমি ঢাকায় এসেছ; তার পর আর কোন উচ্চবাচ্য ছিল না; আজ সকালবেলা তোমারে আমি এখানে দেখলেম।”

    আমি জিজ্ঞাসা কোল্লেম, “দেখে তোমার মনে কিরূপ ভাবের উদয় হয়েছিল? আপন ইচ্ছায় আমি এসেছি, কিংবা আর কেহ আমারে এনেছে, কি তুমি ভেবেছিলে?”

    নবীনকালী উত্তর কোল্লে, “নিবিড় বন, হিংস্র জন্তুর বাসভূমি, বিরামকানন অথবা ক্রীড়াকানন নয়, ইচ্ছাপূর্বক রাত্রিকালে তুমি এখানে আসবে এমন আমি ভাবি নাই; কারা তোমারে ধোরে এনেছে, সেই কথাই আমি ভেবেছিলেম।

    আমি।—ভেবে তোমার আনন্দ হয়েছিল, কিংবা আমার এই অবস্থা দেখে আমার কষ্টে তুমি কষ্ট অনুভব কোরেছিলে?

    নবীন।—আমি তোমারে চিনেছিলেম। কাদের হাতে তুমি ধরা পড়েছ, সেইটি মনে কোরে আমি কষ্ট অনুভব কোরেছিলেম।

    আমি।—হাঁ হাঁ, তা হোতে পারে! তোমার মনটি বড় ভাল! কারা আমারে ধোরেছ তা তুমি জানতে না, এখনো বোধ হয় জান না, প্রাতঃকালে আমারে এখানে দেখেই তোমার কষ্ট হয়েছিল, আনন্দ হয় নাই, এই তো তোমার কথা? আচ্ছা, এখন জানতে পেরেছ, কাদের হাতে আমি ধরা পোড়েছি?

    নবীন।—(নিরুত্তর)।

    আমি।—চুপ কোরে থাকলে হবে না, মিথ্যাকথাও খাটবে না, আমার সরল প্রশ্নের সরল উত্তর দাও।

    নবীন।—উত্তর আমি দিতে পাচ্ছি না, গুর গুর কোরে বুক কাঁপছে! যারা তোমারে ধোরেছে, এখন তারা আমার দণ্ডমুণ্ডের কর্তা।

    আমি।— দেখ নবীনকালী, পূর্বাবস্থা মনে কর। এখন তুমি কাশীবাসিনী নও; কাশীতে তুমি যেমন ছিলে, তোমার মন সেখানে যেমন ছিল, এখানে এখন তার সম্পূর্ণ বিপরীত; নষ্ট সংসর্গে স্বভাব নষ্ট হয়, মনও নষ্ট হয়; তাই তোমার ঘোটেছে। কাশীতে আমি তোমারে দেখেছি, তোমার কার্যকলাপ পরীক্ষা কোরেছি, আমার প্রতি তোমার স্নেহ-যত্ন ছিল, সদয় ব্যবহার ছিল, তাও আমি অনুভব কোরেছি; এখন সম্পূর্ণ ভাবান্তর; যাদের কাছে এখন তুমি আছ, তাদের প্রকৃতি প্রাপ্ত হয়েছ; পাকা পাকা মিথ্যাকথাও শিখেছ; জটিলতা কুটিলতা অভ্যাস কোরেছ; রামশঙ্কর এ বনে আছে কি না, সে কথাটাও তুমি আমার কাছে বোলছ না; সকালে তুমি আমারে চিনেছিলে, সঙ্কেতেও সে ভাবটি আমার কাছে প্রকাশ কর নাই; বনবাসী দস্যুরা আমারে নিয়ে কি কোরবে, তাও তুমি আমারে বোলছো না; সব একযোগ! কাশীতে তোমারে দেখে আমার আনন্দ হতো, এখানে তোমারে দেখে ভয় হয়! কাশীতে তুমি এক প্রকার দেবী ছিলে, এখানে এখন তুমি ভয়ঙ্করী পিশাচী হয়েছ।

    নবীন।—আর আমারে লাঞ্ছনা দিও না হরিদাস, আর লাঞ্ছনা দিও না! তোমার কথা শুনে আমার প্রাণের ভিতর যেন আগুন জ্বোলে উঠছে! আগুন নির্বাণ করবার ঔষধ নাই! হাঁ, ভাল কথা! তুমি কি এখানে উপবাস কোরেই থাকবে? দিনমানে তো কিছুই আহার কোল্লে না, রাত্রেও কি কিছু খাবে না? অনাহারে বাঁচবে কিরূপে? সেই কথা জিজ্ঞাসা কোত্তেই আমি এসেচি।

    আমি।— বাঃ! সব দয়া-মায়া তবে তুমি হারাও নাই! আমার আহারের কথা জিজ্ঞাসা কোত্তে এসেছ! তারা বুঝি এই কথা তোমারে শিখিয়ে দিয়েছে? দেখ নবীন, আহারে আমার রুচি নাই, একটু পূর্বে পিপাসা হয়েছিল, তখনি তখনি তা আবার মিলিয়ে গিয়েছিল, এখন আবার একটু একটু পিপাসা আসছে। মনে দুশ্চিন্তা থাকলে কিছুই ভাল লাগে না, এক দণ্ডও আর এখানে থাকতে আমার ইচ্ছা নাই।

    নবীন।—তবে কি তুমি পালাবে?

    আমি।—বিদ্রূপ কর কেন? নিজেই তুমি বোলছ, পালাবার উপায় নাই, তুমি আসবার আগে তোমাদের একটা লোক এখানে এসেছিল, সে লোকটাও বোলে গিয়েছে, পালাবার চেষ্টা কোল্লেই মারা যাবে। তোমাদের দুজনের মুখেই এক রকম কথা। এখন আবার এ কিসের ছলনা? ছলনা কোরে তুমি বুঝি আমার মন জানতে এসেছ?

    নবীন।—না হরিদাস, ছলনা আমি শিখি নাই; আমার মনের কথা শুন। যে অবস্থায় পোড়ে কুল হারিয়ে আমি বেরিয়েছি, কতক কতক তুমি জান, কিন্তু গোড়ার কথা জান না; তুমি হয় তো মনে কোচ্ছো, আমি এখানে সুখে আছি। হায় হায়! যে সুখে আমি আছি, জগতের সৃষ্টিকর্তা যিনি, তিনিই তা জানছেন। এখানে আমি এক রকম পিঞ্জরবদ্ধ বিহঙ্গিনী। গাছতলায় বোসে বোসে পালাই পালাই ডাক ছাড়ি! পালাতে পারি না; তুমি কি পালাবে? তুমি যদি পালাও, সত্য বোলছি হরিদাস, তুমি যদি পালাও, আমিও তোমার সঙ্গে পালাবো। হাঁ, কি কথা বোলছিলে? পিপাসা হয়েছে? রোসো একটু শীঘ্রই আমি আসছি।

    নবীনকালী উঠে দাঁড়ালো; আলো এনেছিল, সে আলোটি হাতে কোরে আমার মুখের দিকে চাইতে চাইতে কুটির থেকে বেরিয়ে গেল; একটু পরেই ফিরে এলো; হস্তে একটা মাটির ভাঁড়; এসেই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ত্বরিতম্বরে বোলে, “এ বনে এক রকম ফল হয়, সে ফলের রস অতি সুসম্বাদু; পান কোল্লে তৎক্ষণাৎ পিপাসাশান্তি হয়, অনেকক্ষণ আর পিপাসা আসে না; সেই ফলের সরবত কোরে এনেচি, খাও, এক চুমকে সবটুকু খেয়ে ফেলো, শরীর জুড়িয়ে যাবে।”

    ফলের গুণ ব্যাখ্যা কোরে, ঐ সব কথা বোলে, নবীনকালী সেই মৃৎপাত্রটি আমার হাতে দিলে, যথার্থই আমার পিপাসা হয়েছিল, যথার্থই এক চুমুকে সেই সরবতটকু আমি পান কোল্লেম। কতক্ষণ নবীনকালী আমার কাছে বোসে ছিল, কতক্ষণ আমার সঙ্গে কথা কোয়েছিল, মনে হয় না, কেবল এইটুকুমাত্র মনে হয়, আমার চক্ষের সম্মুখে যেন ঝাঁক ঝাঁক জোনাকী পোকা উড়ে বেড়াতে লাগলো, একপাল কালো কালো কুকুর আমার সম্মুখ দিয়ে ছুটে গেল, ঘুমের ঘোরে অবশাঙ্গ হয়ে আমি যেন সেইখানে তৃণাসনের উপর ঢোলে পোড়লেম।

  • অষ্টম কল্প : ভূতের বাড়ী

    অষ্টম কল্প : ভূতের বাড়ী

    ভূবনচন্দ্র মুখোপাধ্যায়

    [book-name]

    অষ্টম কল্প : ভূতের বাড়ী

    একখানা দোতালা বাড়ীর একটি ঘরে আমি শয়ন কোরে আছি; বড় বড় জানালার ফাঁক দিয়ে প্রখর সূর্য-কিরণ সেই ঘরের ভিতর প্রবেশ কোচ্ছে; রৌদ্র আমার গাত্র স্পর্শ কোচ্ছে; রৌদ্রের প্রখরতা দর্শনে অনুভব, বেলা দ্বিতীয় প্রহর। কোথায় এসেছি, যে রাত্রে নবীনকালীর হস্তে ফলের সরবত পান কোরেছিলেম, সেই রাত্রের পরদিনের সূর্য আমার গাত্রে উত্তাপ দিচ্ছিলেন কি না, অবধারণ কোত্তে অক্ষম হোলেম। শুয়ে আছি, ঘরের চতুর্দিকে চেয়ে চেয়ে দেখছি, অপরিচিত গৃহ সেটাও বেশ বুঝতে পাচ্ছি, কিন্তু কোথায়?

    শয্যার উপর একবার আমি উঠে বোসলেম; বোসে থাকতে পাল্লেম না, ভোঁ ভোঁ কোরে মাথা ঘুরতে লাগলো; মাথা অত্যন্ত ভারী, চক্ষেও ঝাপসা দেখতে লাগলেম। আবার শয়ন কোল্লেম, কত যে কি ভাবনা তখন আমার মানসক্ষেত্রে তোলাপাড়া কোত্তে লাগলো, নিরূপণ করা দুঃসাধ্য। প্রায় আধ ঘণ্টা এইরকম। একখানা পাখা ঘুরিয়ে বাতাস খেতে খেতে একজন ভুড়িওয়ালা লোক সেই ঘরে প্রবেশ কোল্লে। আমি শয়ে ছিলেম, নিদ্রা আসছিল না, দিনমানে কখনই আমার চক্ষে নিদ্রা আসে না, নেত্র উন্মীলিত ছিল, তাই দেখে লোকটি বিকৃতস্বরে আমারে জিজ্ঞাসা কোল্লে, “কি হে নবাবপুত্র! জেগে আছ? ছি! ছি! ছি! এই বয়সে অত নেশাও করে? দু দিন দু রাত্রি একেবারেই বেহুঁস, বে-একতার! উঠ, স্নান কর, কিছু, আহার কর, শরীর তাজা হবে, উঠতে পারবে কি, না এই বিছানার উপর হড় হড় কোরে জল ঢেলে দিতে হবে? বুঝচো কেমন? নেশাটা ছুটেছে তো? দেখ দেখি চেষ্টা কোরে, উঠতে পারবে কি না?”

    আমি অত্যন্ত লজ্জা পেলেম। লজ্জা পাওয়া অকারণ, মনে মনে বিরক্ত হোলেম। আধ ঘণ্টা পূর্বে আর একবার উঠে বোসেছিলেম, মাথা অত্যন্ত ভারী, শরীর অত্যন্ত দুর্বল, বোসে থাকতে পারি নাই, সেই ভাবটা স্মরণ হলো; কি করি, অতিশয় কষ্ট থাকলেও ধীরে ধীরে উঠে বোসলেম। লোক বোল্লে “এই ঠিক, নেশা তবে ছুটেছে; এসো, আমার সঙ্গে বাহিরে এসো।”

    কষ্টে আমি দাঁড়ালেম, বিছানা থেকে নামলেম; কষ্টে সেই লোকের অনুগামী হোলেম। চোলে যেতে টোলে পড়ি, লোক আমার সে ভাবটা দেখতে পেলে না, দরজার দিকে মুখ কোরে আগে আগে চোলেছিল, আমি পশ্চাতে ছিলেম, বারান্দায় এলেম। ভাঙা ভাঙা রেল দেওয়া সুদীর্ঘ বারান্দা। এক-ধারে একখানা চৌকী পাতা ছিল, সেই চৌকীর উপরে আমি বোসে পোড়লেম। একজন চাকর আমার মাথায় প্রায় একপোয়া তেল ঢেলে দিয়ে কলসী কলসী জল ঢাল্লে, বোসে বোসেই আমি স্নান কোল্লেম। শরীর একটু সুস্থ বোধ হলো। তারা দয়া কোরে আমারে একখানি কাপড় দিলে, আমি কাপড় ছাড়লেম। আমার সম্মুখে এক গেলাস সরবত; দেখেই আমি মনে মনে কেঁপে উঠলেম, এক সরবতে এত হুলুস্থূল, আবার সরবত! খাই কি না খাই, মনে মনে তর্ক; কিন্তু অত্যন্ত পিপাসা হয়েছিল, এক চুমুক সরবত আমি পান কোল্লেম। সেই ভুড়িওয়ালা লোকটা আবার আমারে সঙ্গে কোরে ঘরের ভিতরে নিয়ে গেল; সেই শয্যার উপরে আবার আমি বোসলেম। লোকটা তখন আমারে বোল্লে, “আমরা ব্রাহ্মণ, ব্রাহ্মণী এখানে অন্নপাক করে, আহার কর, তাহার পর আবার নিদ্রা যেয়ো; শরীর সেরে যাবে; সব অসুখ ভাল হবে।”

    সে কথায় কান না দিয়ে সহসা আমি জিজ্ঞাসা কোল্লেম, “কোথায় আমি এসেছি?”

    আমার মুখপানে চেয়ে ব্রাহ্মণ বোল্লেন, “ঐ জন্যই তোমার এই দশা! হিতকথা বোল্লে তাতে তুমি কান দাও না, তোমার কান হিতকথা ভালবাসে না, সেই কারণেই তুমি কষ্ট পাও। একরত্তি ছেলে, আজিও ফুল ছাড়ে নাই, মুখে এখনো দুধের গন্ধ ঘুচে নাই, এই বয়সেই নেশা ধোরেছ! তিনদিন নেশায় বিভোর হয়ে অজ্ঞান ছিলে, সবে মাত্র চৈতন্য হয়েছে: ভালর জন্য আমি বোল্লেম, আহার কর; কথাটা তোমারে ভাল লাগলো না; কথার উপর কথা দিয়ে তুমি জিজ্ঞাসা কোল্লে, কোথায় এসেছ? সে কথায় এখন তোমার কি দরকার? আহার কর, সুস্থ হও, নিদ্রা যাও, তার পর যে যে কথা জিজ্ঞাসা কোত্তে ইচ্ছা হয়, জিজ্ঞাসা কোরো। তা নয়, এত অবাধ্য কেন তুমি?”

    তিরস্কার সহ্য কোরে তৎক্ষণাৎ আমি বোল্লেম, “আহারে আমার ইচ্ছা নাই। কোথায় আমি এসেছি, সেই তত্ত্বটি অগ্রে আমি জানবো। আমার ভাগ্য বড় মন্দ, ভাগ্যদোষে লোকের কাছে আমি নিন্দাভাজন হই। যে সব কথা আপনি আমারে বোলছেন, তার বিন্দু-বিসর্গও আমি বুঝতে পাচ্ছি না। নেশা করা, অজ্ঞান থাকা, অবাধ্য হওয়া, এ সব কথার অর্থ কি? আচ্ছা মহাশয়, সব কথা না বলুন আমার একটি কথার উত্তর দিন। যেখানে এখন আমি আছি, এ স্থানটি কি ঢাকাজেলার এলাকা?”

    ভুঁড়ি নাচিয়ে হাস্য কোল্লে ব্রাহ্মণ বোল্লেন, “রোগে ধোরেছে, রোগে ধোরেছে! রোগ বড় শক্ত! নেশা এখনো ছাড়ে নাই! নেশায় লোকে পাগল হয়; তাতে আবার কচি বাঁশে ঘুণ ধরা; মাথাটা খারাপ হয়ে গিয়েছে। হায়, হায়! পাগল রে পাগল! বলে কি না ঢাকাজেলা! কোথায় তোদের ঢাকাজেলা?”

    বিষাদে দীর্ঘনিশ্বাস পরিত্যাগ কোরে পুনরায় আমি বোল্লেম, “তবে কি এটা ঢাকাজেলার এলাকা নয়? কোথায় তবে আমি এসেছি? আমার অজ্ঞাতে কারা আমারে এখানে এনে ফেলেছে?”

    ব্রাহ্মণের ক্রোধ উপস্থিত। চক্ষু পাকল কোরে ঘাড় বাঁকিয়ে ব্রাহ্মণ বোলে উঠলেন, “অধঃপাতে এসেছিস! কারা এনেছে, কোথায় এনেছে, কিসের এলাকা, এ সব নিকাস আমার কাছে নাই। বেহুঁস দেখেছিলেম, দয়া হয়েছিল, যত্ন কোরে রেখে দিয়েছিলেম। কপালে সুখ না থাকলে জোর কোরে কি সুখী করা যায়?”

    আলাৎ-পালাৎ কত কথাই ব্রাহ্মণের মুখে বর্ষিত হলো, শুনে শুনে আমি যেন হতজ্ঞান হোলেম। সকল কথা আমার কানেও গেল না। অত্যন্ত উত্তেজিত হয়ে শেষবারে তাঁরে আমি জিজ্ঞাসা কোল্লেম, “আপনি আমারে বোলতে চান কি? কোথা থেকে কোথা আমি এসেছি, সেইটি আমি জানতে চাই, আর কোন বেশী কথা আমি জানতে চাই না, অনুগ্রহ কোরে সেইটি আপনি বলনে। বার বার আপনি আমার আহারের জন্য অনুরোধ কোচ্চেন, কলির মানুষের অন্নগত প্রাণ, অন্নাহার ব্যতিরেকে প্রাণধারণ করা যায় না, তাহা আমি জানি, কিন্তু ক্ষুধা নাই, রুচি নাই, প্রবৃত্তি নাই। কত স্থানে কত বিপদে আমি পতিত হয়েছি, তা যদি আপনি শুনেন, আমার প্রতি আপনার দয়া হবে। ঢাকাতে আমার আত্মীয়বন্ধু আছেন, আমার অদর্শনে তাঁরা ভাবিত হয়েছেন, আমারো দুর্ভাবনা অনেক। একখানি চিঠি লিখে সেখানকার একটি ডেপুটি বাবুকে আমার এই দুর্দশার কথা জানাব, এই আমার আকিঞ্চন, সেইজন্যই বারবার আমি আপনাকে মিনতি কোরে বোলছি, আপনি আমার প্রতি একটু সদয় হোন, কোথায় আমি এসেছি, দয়া কোরে কেবল সেইটি আমাকে বলুন।”

    বিরক্তবদনে ব্রাহ্মণ তখন বোল্লেন, “কুমিল্লার এলাকা, ত্রিপুরাজেলা, রুদ্রাক্ষ গ্রাম। তুমি কিঞ্চিৎ আহার কর, তার পর অপরাপর কথা জানতে পারবে। একটা কথা কি জানো, এখান থেকে এখন তুমি কোথাও যেতে পাবে না, কিছুদিন এই বাড়ীতেই থাকতে হবে, যে যে কাজ আমরা বোলবো, সেই সব কাজ তোমাকে কোত্তে হবে; মুটে-মজুরের কাজ নয়, আমাদের সেরেস্তায় লেখা-পড়ার কাজেই তোমাকে নিযুক্ত রাখা আমাদের ইচ্ছা, লেখা-পড়া তুমি জানো?”

    সংক্ষেপে তাঁর কথাগুলির উত্তর দিয়ে বিষাদে আমি একটি নিশ্বাস ফেল্লেম। ব্রাহ্মণ একজন বৃদ্ধা ব্রাহ্মণীর দ্বারা আমার জন্য কিঞ্চিৎ খাদ্যসামগ্রী আনিয়ে দিলেন। নামমাত্র আহার কোরে এক গেলাস জল খেয়ে আমি পিপাসা-শান্তি কোল্লেম। আমারে শয়ন কোত্তে বোলে ব্রাহ্মণ তখন সে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন; আমাকে স্বাধীনতা দিয়ে গেলেন না, দ্বারের বাহিরে চাবী বন্ধ কোরে গেলেন। বেলা আড়াই প্রহর অতীত হয়েছিল, আমি একটু শয়ন কোল্লেম; নিদ্রার জন্য শয়ন কোল্লেম না, ক্লান্তি দূর করা প্রয়োজন ছিল, সেই কারণেই শয়ন। যখন আমি বোসে থাকি, যখন দাঁড়িয়ে থাকি, যখন কোন কাজকর্মে অন্যমনস্ক থাকি, চিন্তা তখন আমার উপর বেশী শক্তি প্রকাশ কোত্তে পারে না; শয়ন কোল্লেই প্রবল পরাক্রম প্রকাশ করে। বিনা সংগ্রহে চিন্তার উপকরণ আমার বিস্তর। অমরকুমারীর রূপখানি মনের মধ্যে আনয়ন কোরে আনুসঙ্গিক কত ভাবনা যে আমি ভাবলেম, অক্ষরে অক্ষরে লিখে জানানো যায় না। অমরকুমারী আমার জন্য কত ভাবছেন, মণিভূষণ কতই উৎকণ্ঠিত হয়েছেন, অন্যান্য স্থানে যাঁরা যাঁরা আমার হিতৈষী বন্ধু আমার সমাচার না পেয়ে তাঁরা কত উদ্বিগ্ন আছেন, সেই সকল ভাবনা তখন আমার মনে একত্র। ভাবনার কথা পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে ব্যক্ত কোরে পাঠকমহাশয়কে বিরক্ত করা কিম্বা ভাবনাযুক্ত করা আমার এখনকার কার্য নয়, গোটাকতক নূতন কথা বলি।

    ত্রিপুরা জেলার কুমিল্লার এলাকা রুদ্রাক্ষ গ্রাম; ব্রাহ্মণের বাড়ী; যে ব্রাহ্মণ আমারে তিক্তমধুরমিশ্র সম্ভাষণে প্রপীড়িত করবার অথবা পরিতুষ্ট রাখবার চেষ্টা কোল্লেন, তাঁর কথা শুনে, কার্য দেখে আর ক্ষমতার পরিচয় পেয়ে, অনুমানে আমি বুঝলেম, তিনিই সেই বাড়ীর কর্তা—নামটি তখনো পাওয়া যায় নাই, কিন্তু পাঠকের মনে একটু ধারণা জন্মাবার উদ্দেশে ব্রাহ্মণটির রূপ বর্ণনা করা আবশ্যক।

    ব্রাহ্মণের রূপবর্ণনে আমি অভিলাষী। সংক্ষেপে কেবল এইমাত্র বোলেছি, ভুড়িওয়ালা ব্রাহ্মণ। যারা যারা স্থূলাঙ্গ, সর্ব অবয়ব যাদের বিলক্ষণ স্থূল প্রায়ই তাদের ভুড়ি হয়, সে সকল অঙ্গে ভুড়িও মানায়; কিন্তু এ ব্রাহ্মণ স্থূলাঙ্গ নয়;—হাত দু-খানা সরু সরু পা দু-খানা সরু সরু, বুকখানাও সরু গলাটিও সরু, অঙ্গের সম্ভাবিত সমস্ত মাংস কেবল উদরেই আশ্রয় কোরেছে; ভুড়ি প্রকাণ্ড। উদরীরোগগ্রস্ত লোকের চেহারা যেমন হয়, মুখে যেমন পাণ্ডুবর্ণ দেখায়, এ ব্রাহ্মণের চেহারাও সেই প্রকার। গঠন দীর্ঘাকার, বর্ণ পিঙ্গল, চক্ষু বড় বড়, নাসিকা খর্ব, কপাল প্রশস্ত, মস্তক প্রায় কেশশূন্য, মধ্যস্থলে প্রায় এক হাত লম্বা এক টিকি, পৃষ্ঠদেশের অর্ধেক দূর পর্যন্ত লম্বিত; পরিধান একখানি সরু ফিনফিনে মলমলের ধুতি; ভুঁড়ি আচ্ছাদনেই সে ধুতির অর্ধাংশ অপেক্ষা অধিক পর্যবসিত, অপর অংশে নিম্নাঙ্গের জানু পর্যন্ত আচ্ছাদিত। মূর্তিদর্শনে সহসা ভয়ের আবির্ভাব হয়; ঘৃণা বলা গেল না,—ব্রাহ্মণের চেহারা দেখে ঘৃণা কোত্তে নাই; বস্তুতঃ ঘৃণা যেন আপনা হোতেই অগ্রে অগ্রে এসে উপস্থিত হয়।

    এই অনুমানে আমার যদি ভুল না থাকে, তবে এই ব্রাহ্মণ এই বাড়ীর কর্তা। বাড়ীখানা কেমন, বাড়ীখানা কত বড়, তখনো পর্যন্ত তা আমি জানতে পারি নাই; কিন্তু যে ঘরে আমি আছি, সে ঘরের আয়তন আর সাজসরঞ্জামের পারিপাট্য দেখে মনে হয় বৃহৎ বাড়ী, ব্রাহ্মণ একজন বড়মানুষ।

    বেলা যখন প্রায় অবসান, সেই সময় দ্বারের চাবী খুলে সেই ব্রাহ্মণ গৃহমধ্যে প্রবেশ কোল্লেন, সঙ্গে একটি লোক। প্রবেশ কোরেই গম্ভীরস্বরে ব্রাহ্মণ আমারে জিজ্ঞাসা কোল্লেন, “কি গো! ঐ দেখ, কথায় কথায় আমি তোমার নামটা ভুলে ভুলে যাই; কি নাম?—হাঁ, হরিদাস। কি গো হরিদাস! ঘুম ভেঙেছে?”

    আমি উঠে বোসলেম; ব্রাহ্মণের প্রশ্নের উত্তর দিলেম, “ঘুম আমার আসে না; ঘুমের সঙ্গে আমার যে সম্বন্ধ ছিল, চিন্তা-পিশাচী সে সম্বন্ধটি যেন বিচ্ছিন্ন কোরে দিয়েছে: প্রকৃতির উপরেও যেন চিন্তা আপনার পরাক্রম প্রকাশ কোরেছে!”

    সাপের মত বারকতক ফোঁস ফোঁস কোরে ব্রাহ্মণ বোল্লেন, “তাই তো! প্রকৃতির দোষ, চিন্তার দোষ, তোমার দোষ নাই! তাই তো বটে! তিন দিন তিন রাত বেহুঁস—বেহুঁসে ঘুমিয়েছ, তবে আর নিদ্রাকে দোষ না দিয়ে তুমি আর কি কোত্তে পার? আচ্ছা, আমার কাছে তুমি একটা প্রতিজ্ঞা কোত্তে পার? জন্মে আর কখনো কোন নেশার জিনিস তুমি ছোঁবে না, যারা নেশা করে, তাদের কাছে যাবে না, এই প্রতিজ্ঞা কোত্তে যদি রাজী হও, তা হোলে নিদ্রাকে উপরোধ কোরে আমি তোমার বশীভূত রাখতে পারবো।”

    আমার অন্তরে অত্যন্ত আঘাত লাগলো। ম্লান বদনে ব্রাহ্মণকে আমি বোল্লেম, “বারম্বার কেন আপনি একটা মিথ্যাকথা নিয়ে আমারে ঐরূপ তিরস্কার কোচ্ছেন? নেশা কারে বলে, নেশার জিনিস কি প্রকার, জন্মেও কখন তা আমি জানি না। যারা আমারে অজ্ঞান অবস্থায় এখানে এনে ফেলে রেখে গিয়েছে, তারা আপনাকে কি একটা মিথ্যাকথা শুনিয়ে দিয়েছে, ধ্রুব-বিশ্বাসে তাই আপনি মনে কোরে রেখেছেন, তাই মনে কোরেই বার বার আপনি আমারে অপরাধী কোচ্ছেন। আমি গরীব। জন্মাবধি আমি ফকিরের মতন পর্যটক, দোষের কাছে জন্মাবধি আমি অপরিচিত; পরের মুখে রচা কথা শুনে আপনি আমারে দোষী করেন, শুনে শুনে আমার প্রাণে বড় ব্যথা লাগে!”

    কেমন এক প্রকার হাস্য কোরে ব্রাহ্মণ তৎক্ষণাৎ আবার সক্রোধে বোলে উঠলেন, “কি কথা বোলছো তুমি? পরের কথা আমি শুনেছি? কাদের কথা আমি শুনেছি? বেহুঁস হয়ে পথে তুমি পোড়ে ছিলে, কুড়িয়ে এনে যত্ন কোরে নিজ বাড়ীতে আমি তোমায় আশ্রয় দিয়েছি, তারই বুঝি এই ফল? পরের কথা আমি শুনেছি, কে তোমাকে এমন কথা বোলে?”

    আমি আর সে সময় বেশী শিষ্টাচার দেখাতে পাল্লেম না, তৎক্ষণাৎ উত্তর কোল্লেম, “কেহ কিছু বলে নাই, নিজেই আমি বুঝতে পাচ্ছি, পরের কথা আপনি শুনেছেন। তা না শুনলে আমার নাম আপনি কেমন কোরে জানলেন? আমি তো আপনার কাছে আমার নাম বলি নাই। অবশ্যই আপনি পরের কথা শুনেছেন। যা যা শুনেছেন, আমি বুঝতে পাচ্ছি, আমার নামটি ছাড়া সমস্তই মিথ্যা!”

    ব্রাহ্মণ এইবার অপ্রতিভ হোলেন; অল্পক্ষণ নিরুত্তর থেকে, তেজটা একটু কোমিয়ে এনে, একটু নম্রস্বরে বোল্লেন, “তাই তো! তোমার মাথাটা এখনো গরম আছে! এসো, এই লোকটির সঙ্গে বাহিরের বাতাসে একট বেড়িয়ে এসো; ঠাণ্ডা হবে। আর কোথাও যেয়ো না, এখান থেকে পালিয়ে যাবার চেষ্টা কোল্লে ভারী বিপদে পোড়বে।”

    প্রথমের কথাকটি আমি শুনলেম, শেষের কথায় কান দিলেম না; বাহিরের বাতাসে বেড়াবার একান্ত ইচ্ছা হয়েছিল, আবশ্যকও হয়েছিল, ব্রাহ্মণের সমভিব্যাহারী লোকটির সঙ্গে উপর থেকে নেমে বাড়ী থেকে আমি বেরুলেম।

    যদিও শেষ বেলা, তথাপি তখনো আকাশে সূর্য ছিলেন। বাড়ীখানি আমি ভাল কোরে দেখলেম। প্রকাণ্ড বাড়ী। পূর্বে-পশ্চিমে লম্বা বৃহৎ বারান্দা; অর্ধেকটা ভগ্নদশাপ্রাপ্ত, অর্ধেকটা বে-মেরামতে মলিন। বারান্দার সম্মুখে বাগান ছিল, ফুলবাগান: চারিদিকে ছোট ছোট থাম দিয়ে ঘেরা ছিল; অনেকগুলি থাম কেবল ইষ্টকসার হয়ে আছে, ফুলগাছগালিও আধমরা। কিসের শোকে গাছেরা যেন কাঁদছে, এই রকম বোধ হলো। একদিকে দেখলেম, মস্ত একটা ঢিবি। যে লোকটি আমার সঙ্গে এসেছিল, তার নাম রামদাস। তারে আমি জিজ্ঞাসা কোল্লেম, “ঐ ঢিবিতে কি হয়?”

    রামদাস উত্তর কোলে, “বাবুদের বাড়ীতে পূর্বে রাস হোতো, এখনো হয়, ঘটা হয় না; ঐখানে দিব্য একটি পাকা রাসমঞ্চ ছিল, ১২৫৯ সালের ঝড়ে সেটি সমভূমি হয়ে যায়; কেবল ঐ ঢিবিমাত্র অবশিষ্ট থাকে; এখনো তাই আছে; অবস্থা সিকস্ত; বাবুরা আর সেই রাসমঞ্চ খাড়া কোরে তুলতে পারেন নাই। তদবধি রাসের সময় ঐ ঢিবির উপর গোটাকতক বাঁশ খাড়া কোরে চাঁদোয়া টাঙিয়ে ঠাকুর বসানো হয়।”

    আমি রামদাসের মুখের দিকে চেয়ে থাকলেম; কিন্তু আকার-প্রকারে বুঝতে পেরেছিলেম, রামদাস সে বাড়ীর একজন সামান্য চাকর মাত্র; মূলতত্ত্বে তার সঙ্গে অধিক কথা কওয়া আমি তখন অনাবশ্যক ভাবলেম। রাসমঞ্চের পরিচয় দিয়ে রামদাস আরো বোল্লে, “বাহিরে তো এই দশা দেখছো, ভিতরদিকে আরো দুর্দশা। অন্দরমহল একেবারে নাই, সমভূম; পূজাবাড়ীর দালানের তিনদিকে বারান্দা দেখেছ, পশ্চিমের বারান্দার পশ্চাদ্দিকে যতগুলি ঘর আছে, ফাটা চটা নোণাধরা, সেই সকল ঘরে এখন অন্দরমহল হয়েছে, দক্ষিণের আর পূর্বের বারান্দায় দিবারাত্রি চিক ফেলা থাকে।”

    ও সব কথায় আমার তত প্রয়োজন ছিল না, কেবল শুনলেম এই মাত্র, বাবুদের এখন দূরবস্থা, সেইটি বুঝে রাখলেম। গল্প কোত্তে কোত্তে রামদাস আমারে সম্মুখদিকে খানিক দূর এগিয়ে নিয়ে গেল। চারিদিক আমি নিরীক্ষণ কোল্লেম। রামদাসের মুখে শুনলেম, অনেক দূর পর্যন্ত বাবুদের ভদ্রাসনের সীমা। বাবুদের দূরবস্থা ঘোটেছে, কিন্তু বিশ্বজননী প্রকৃতির যেরূপ মধুর ভাব, সে ভাবের কিছুই ব্যত্যয় ঘটে নাই; অপরাহ্নের সংশীতল সমীরণ সেবন কোরে অনেক পরিমাণে আমি শীতল হোলেম। বুকের ভিতর যে আগুনে জ্বোলছিল, তার কিছু উপশম হলো না, কিন্তু বাহিরে অনেকটা ঠাণ্ডা বোধ কোল্লেম।

    সূর্যদেব অস্তগত। বেড়াতে বেড়াতে আমরা বাড়ীর দিকে ফিরলেম। যাবার সময় দেখি নাই,

    আসবার সময় দেখলেম, বাহিরের বারান্দার যে অর্ধাংশ ভেঙে গিয়েছে, সেই অংশের শেষভাগের সর্ব পশ্চিম সীমায় একটি ভগ্নগৃহ বিদ্যমান; বাঁশের সিঁড়ির সাহায্য ভিন্ন সে গৃহে প্রবেশ করবার উপায় নাই। একবার পশ্চিমাকাশে, একবার সেই ভগ্নগৃহের দিকে দৃষ্টিদান কোরে, রামদাস তাড়াতাড়ি বোলে উঠলো, “চলো চলো, চলো, শীঘ্র চলো। অন্ধকার হয়ে এলো! এ জায়গায় অন্ধকারে বড় ভয় আছে!”

    কথা বোলতে বোলতে,—পশ্চাতে হাত ফিরিয়ে হাতছানি দিয়ে আমারে ডাকতে ডাকতে রামদাস একদৌড়ে দেউড়ীর ভিতর ঢুকে পোড়লো; পূর্বাপর কিছুই চিন্তা না কোরে আমিও দ্রুতপদে তার অনুগামী হোলেম। বাবুর বাড়ীর দেউড়ী তখনো ছিল, কিন্তু দেউড়ীগুলি যারা শোভিত করে, তারা কেহ উপস্থিত ছিল না। দেউড়ী পার হয়ে রামদাসের সঙ্গে আমি উপরে গিয়ে উঠলেম। অল্পকথায় আমি বুঝে নিলেম, রামদাসটি লোক সরল, কিন্তু অত্যন্ত ভীরু।

    দিনমানে যেখানে ছিলেম। সেইখানে প্রবেশ কোরে দেখলেম, ঘরের একধারে একটি প্রদীপ জ্বোলছে, যে বিছানায় আমি শয়ন কোরেছিলেম, সেই বিছানার উপর দুটি যুবা চুপ কোরে বোসে আছে; যে বৃদ্ধা স্ত্রীলোকটি আমার খাবার সামগ্রী দিয়ে গিয়েছিল, একধারে দেয়াল ঠেস দিয়ে সে স্ত্রীলোকটিও দাঁড়িয়ে আছে। আমারে দেখেই সেই স্ত্রীলোক একটু হাসতে হাসতে বোল্লে, “ওগো হরিদাস, এই দুটি বাবু তোমায় দেখতে এসেছেন। কর্তাবাবুর ছেলে।”

    কর্তাবাবুর ছেলেদের মুখপানে আমি চাইলেম, তাঁরাও খানিকক্ষণ আমার মুখের দিকে চেয়ে থাকলেন। আমার মুখে দেখা শেষ হয়ে গেলে ভাই দুটি পরস্পর চক্ষু ঠারাঠারি কোরে মৃদু মৃদু হাস্য কোল্লেন, বিছানার উপর এক চাপড় মেরে একটি বাবু আমারে তাঁদের কাছে বসবার ইঙ্গিত কোল্লেন; ঠিক নিকটে না বোসে একটু দূরে গিয়ে আমি বোসলেম।

    বাবুর ছেলে। ক্ষমতা না থাকলেও কর্তাবাবুর রূপ আমি বর্ণনা কোরেছি, বৃহৎ এক ভূঁড়ি থাকলেও কর্তাবাবু একটি কাহিল মানুষ, সোজাকথায় রোগা মানুষ; এই দুটি বাবুও রোগা রোগা;— আর সেই প্রাচীনা স্ত্রীলোক, নিশ্চয়ই পরিচারিকা, সেই পরিচারিকাটিও রোগা; যে রামদাসটি আমার সঙ্গে বেড়াতে গিয়েছিল, সেই রামদাসটিও খুব রোগা; বাড়িতে যতগুলিকে আমি দেখলেম, সকলগুলিই রোগা রোগা। এ এক আশ্চর্য ব্যাপার!

    আশ্চর্য ভেবে একদিকে আমি চেয়ে আছি, বাবু দুটির মধ্যে একটি বাবু সেই সময় আমারে সম্বোধন কোরে বোল্লেন, “তোমাকে দেখে আমরা বড় তুষ্ট হোলেম। শুনেছিলেম, তুমি একটা দোষ কোরেছ, তোমার মুখ দেখে সে কথায় আমার বিশ্বাস হোচ্ছে না। দেখ হরিদাস, তুমি খুব সাবধানে থেকো; লোকের মুখে শুনতে পাই, এখানে কিছু ভয় আছে। রাত্রিকালে যদি কিছু ভয়ের লক্ষণ বুঝতে পার,— ঘরের ভিতর নয়, বাহিরে যদি কোন প্রকার শব্দ শুনতে পাও, বিছানা থেকে উঠো না, দরজা খুলে দেখো না, কোন প্রকার তত্ত্ব জানবার চেষ্টা কোরো না, ভয়টা আপনা আপনি দূর হয়ে যাবে। বুঝলে কি না?”

    আর একটি বাবু বোল্লেন, “ভয়ের কথা বোলে দাদা তোমাকে সাবধান কোচ্ছেন, আমি কিন্তু আর একটি কথা বোলতে চাই। শুনলেম, কিছুই তুমি আহার কোচ্ছো না। কেন উপবাস কর? ব্রাহ্মণের বাড়ীতে আহার করায় কোন দোষ নাই। আহার কোরো,—অনাহারে শরীর শীর্ণ হোলে দাদার কথায় ভয়টা আরো তোমাকে জোড়িয়ে জোড়িয়ে ধোরবে। আহার কোরো।”—এই পর্যন্ত বোলে সেই প্রাচীনা স্ত্রীলোকের দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ কোরে ছোটবাবুটি আরো বোল্লেন, “এই ইনি আমাদের পাচিকা, কুলীনব্রাহ্মণের কন্যা, রাত্রিকালে ইনি তোমার জন্য অন্ন-ব্যঞ্জন এনে দিবেন, আহার কোরো; কল্য আমরা শুনবো; কল্য আবার এক সময় আমরা দুজনে এসে তোমার সঙ্গে ভাল কোরে আলাপ কোরবো।”

    বাবু দুটি উঠে দাঁড়ালেন, আমি তাঁদের উভয়কে দুই হাত তুলে প্রণাম কোল্লেম; তাঁরা চেলে গেলেন; প্রাচীনা ব্রাহ্মণীও তাঁদের সঙ্গে সঙ্গে গেলেন। অল্পক্ষণ আমি একাকী থাকলেম। একটু পরেই সেই রামদাস।

    চুপি চুপি ঘরের ভিতর এসে রামদাস আমার বিছানার কাছে ছোট একখানা চৌকীর উপর বোসলো; নানা রকম গল্প জুড়ে দিলো। এ কথা সে কথা পাঁচ কথার পর ঘন ঘন নিশ্বাস নিল, পরে রামদাস একটু কৌতুকস্বরে বোল্লে, “রাম নামের চেয়ে আর নাম নাই; এই নামে ভয় যায়, রাম রাম বোলে শয়ন কোরো, কোন ভয় থাকবে না। এ বাড়ীতে ভূতের ভয় আছে শুনেছি, বড়বাবুও বোলে গেলেন; ভয় আছে সত্য, কিন্তু ‘রাম’ নাম শুনে ভূতেরা ছুটে পালায়।”

    যখনই রামদাস বোলছে, তৎক্ষণাৎ তা আমি বুঝতে পাল্লেম, মনে মনে হানা কোরে আমি বোল্লেম, “রাম নামের অভাব কি? তোমার নাম রামদাস, আমার নাম হরিদাস, দুজনেই আমরা রামচন্দ্রের সেবক; তোমারো ভয় নাই, আমারো ভয় নাই। আচ্ছা রামদাস! এ বাড়ীর কর্তাবাবুর নাম কি? যে দুটি বাবু এসেছিলেন, সে দুটি বাবুর নাম কি?”

    রামদাস উত্তর কোল্লে, “কর্তার নাম জয়শঙ্করবাবু, বড়বাবুর নাম প্রাণগতিবাবু, ছোটবাবুর নাম মিহিরচাঁদ। উপাধি চৌধুরী।”

    রামদাসের সঙ্গে আমি অনেক রকম গল্প কোল্লেম, তার মুখেও অনেক রকম গল্প শুনলেম। রাত্রি প্রায় দেড় প্রহর পর্যন্ত কেবল রামদাসটি আমার দোসর। দেড় প্রহরের পর রামদাস উঠে গেল। সেই প্রাচীনা স্ত্রীলোকটি আমার জন্য অন্ন-ব্যঞ্জন প্রস্তুত কোরে সেই ঘরেই এনে উপস্থিত কোল্লেন। আগে আমি তাঁরে পরিচারিকা মনে কোরেছিলেম, শেষে জানলেম, তাদৃশী পরিচারিকা নন, বাবুদের পাচিকা। তিনি একাকিনী এলেন না, জল, আসন আর লবণাদি হাতে কোরে একটি পরিচারিকা তাঁর সঙ্গে এলো। আমার আহারাদির আয়োজন কোরে দিয়ে পাচিকাঠাকুরাণী একখানি চৌকীর উপর বোসে থাকলেন, কপাটের ধারে পরিচারিকা দাঁড়িয়ে থাকলো।

    পরিচারিকার বয়স অল্প; বড় জোর পঁচিশ ছাব্বিশ বৎসর, বর্ণ অগৌর নয়, কিন্তু গায়ে ঠাঁই ঠাঁই বসন্তের দাগ, মুখেও বসন্তের দাগ; মাথায় চলু অল্প, মুখখানি কিন্তু দেহের সঙ্গে মানানসই, চক্ষু দুটি ভাসা ভাসা। গায়ে অলঙ্কার ছিল না, পরিধান একখানা লালপেড়ে শাড়ী। দেখতে নিতান্ত মন্দ নয়; কিন্তু রোগা। আমি মনে কোল্লেম, এ বাড়ীর বাতাসের কোন রকম দোষ আছে; যারা এ বাড়ীতে থাকে, যারা এ বাড়ীতে জন্মে, তারাই রোগা হয়।

    আমার আহার-সামগ্রী প্রস্তুত। যদিও ব্রাহ্মণের বাড়ী, তথাপি সর্ব-প্রথমে বাড়ীর কর্তা আমার সঙ্গে যে রকম কর্কশ ব্যবহার কোরেছিলেন, আমায় যে সকল কটু বাক্য বোলেছিলেন, সে সব মনে কোরে সে বাড়ীতে অন্নগ্রহণ কোত্তেও আমার প্রবৃত্তি ছিল না। কর্তার ছেলে দুটির শিষ্টাচার দর্শনে আর সেই প্রাচীনা ব্রাহ্মণ-কন্যার স্নেহ-যত্ন দর্শনে আমার সে ভাবের পরিবর্তন হয়েছিল। রাত্রে আমি আহার কোল্লেম।

    যতক্ষণ আমি আহার কোল্লেম, সেই পরিচারিকা ততক্ষণ সেই কপাটের কাছে দাঁড়িয়ে আমার দিকে চেয়ে থাকলো; চাউনি কি প্রকার, আড়ে আড়ে চেয়ে চেয়ে এক একবার তাও আমি দেখলেম। আহার যখন প্রায় শেষ হয়ে এলো, সেই সময় পাচিকাঠাকুরাণী সেই পরিচারিকাকে সম্বোধন কোরে বোল্লেন, “রূপসি! যা দুধ-সন্দেশ নিয়ে আয়!”

    পরিচারিকার নাম রূপসী। পাচিকার আদেশে রূপসী একবার অন্দরের দিকে গেল; বোলে রেখেছি, বারান্দার পাশেই অন্দর, শীঘ্রই দুধ-সন্দেশ নিয়ে ফিরে এলো। আহার সমাপন কোরে বাহিরদিকের বারান্দায় আমি আচমন কোল্লেম। আহারান্তে তাম্বুল চর্বণ অথবা তাম্রকুট সেবন আমার অভ্যাস হয় নাই, সুতরাং সেই দুই দায় থেকে রূপসী অনিচ্ছায় অব্যাহতি পেলে। সাবধানে আমারে শয়ন কোত্তে বোলে পাচিকাঠাকুরাণী চোলে গেলেন, কিঞ্চিৎ ইতস্ততঃ কোরে, কপাটে চাবী লাগিয়ে রূপসীও চোলে গেল, যাবার সময় বোলে গেল, “প্রদীপে অনেক তেল থাকলো, ইচ্ছা হয়, জেলে রেখো, ইচ্ছা হয় নিবিয়ে দিও।”

    ঘরে মানুষ থাকলো, দরজায় চাবী পোড়লো, এটাই বা কেমন? এখানেও কি আমি কয়েদী? গতিক ভাল নয়! সেই যে গোড়ায় রক্তদন্তের চক্র, এখনো সর্বত্র সেই চক্রের জের চোলে আসছে; রক্তদন্তের লোকেরা নিশ্চয়ই সেই চক্র ঘুরাচ্ছে! যাই হোক, দক্ষিণদিক খোলা, বাহিরদিকের দক্ষিণের বারান্দা উদার মুক্ত, বাতাসের অভাবে দম আটকে মারা যাব না, মনে তখন এইটুকু শান্তি।

    আমি শয়ন কোল্লেম। ঘরে ঘড়ী ছিল না, অভ্যাসের অনুমানে অবধারণ কোল্লেম, রাত্রি দুই প্রহর। গুরুমহাশয়ের পাঠশালায় যত দিন ছিলেম, তত দিন কি রকম হতো, ঠিক মনে হয় না, কিন্তু পাঠশালা থেকে দূরীভূত হবার পর অবধি শয়নমাত্রই নিদ্রা আসে না, অনেকক্ষণ জেগে থাকতে হয়; জেগেই আছি। যে সকল ভাবনা নিত্য আসে, সে সকল ভাবনা তো আছেই, তার উপর নূতন জায়গায় নূতন ভাবনা। বেহুঁস হবার কথা, নেশা করবার কথা, কিছুদিন এই বাড়ীতে বাস করবার কথা আমার মনের ভিতর আসছে; ত্রিপুরাজেলার এলাকামধ্যে এসে পোড়েছি, সে কথাও ভাবছি; অমরকুমারী ঢাকায়, মোকদ্দমা বহরমপুরে, সে সব কথা মনে কোরে অন্তরে অন্তরে উদ্বেগ বাড়ছে; অন্যমনস্ক হবার চেষ্টা কোচ্ছি, পাচ্ছি না। এই নূতন বিপদের মূল সেই কুলকলঙ্কিনী নবীনকালী। ঘনিষ্ঠতা কোরে, আত্মীয়তা কোরে, নবীনকালী আমারে বোলেছিল, সে আমার পালাবার সহায় হবে, সে নিজেও আমার সঙ্গে পালিয়ে আসবে। বোলেছিল, তার কথায় আমি প্রত্যয় কোরেছিলেম; সেই প্রত্যয়ের ফল এই! হায়, হায়! কেন আমি তার কথায় বিশ্বাস কোরেছিলেম? কেন আমি তার হাতে কাল-সরবৎ পিয়েছিলেম? নিশ্চয় সে সরবতে মাদকদ্রব্য মিশানো ছিল! দুষ্টলোকের পরামর্শে নিশ্চয়ই নবীনকালী সে সরবতের সঙ্গে ভাং-ধুতুরা অথবা আর কোন উৎকট বিষ মিশিয়ে দিয়েছিল, তাতেই আমি অজ্ঞান হয়ে পোড়েছিলেম! অজ্ঞান অবস্থায় এক একবার যেন আমার মনে হয়েছিল, আমি যেন কিসের উপর দুলছি, হেলে দুলে যেন গোড়িয়ে গোড়িয়ে পোড়ছি; এক একবার ঝনঝনে ঘর্ঘরশব্দ আমার কানের ভিতর প্রবেশ কোরেছিল, এখনো সেই ভাবটা একটু একটু মনে পোড়ছে। লোকেরা হয় তো নৌকায় তুলে, গাড়ীতে তুলে কুমিল্লা এলাকায় আমাকে এনে ফেলেছে! নৌকার গতি আর গাড়ীর গতি এখনো যেন আমি অনুভব কোচ্ছি! এ অনর্থের মূল সেই নবীনকালী। পাপিনী, বিশ্বাসঘাতিনী নবীনকালী আমার সঙ্গে বিলক্ষণ চাতুরী খেলেছে! ব্যভিচারপাপে যে সকল স্ত্রীলোক রত হয়, অধিকন্তু পরিবারস্থ নিজসম্পর্কীয় পুরুষের সঙ্গে যারা কুলের বাহির হয়, তাদের মায়া এই প্রকার। যে সকল কুলকন্যা এইরূপে অপথে পদার্পণ করে, তাদের বিশ্বাস করা আর কালসাপ গলায় কখন করা এক সমান!

    শুয়ে শুয়ে এই সকল আমি ভাবছি, হঠাৎ ছাদের উপর ভয়ঙ্কর ভয়ঙ্কর শব্দ। দুম দুম, গুম গুম, দুপ দাপ, ধূপ ধাপ, হুপ হাপ, এই প্রকার বিকট বিকট শব্দ! একবার বোধ হলো, ঠিক যেন আমার মাথার উপর, একটু পরে আবার বোধ হলো যেন আমার শয়নঘরের বারান্দায়, একটু পরে আবার বোধ হলো যেন খানিকটা তফাতে! একবার এখানে, একবার ওখানে, একবার ছাদের উপর, একবার বারান্দায়, নানা স্থানে নানাপ্রকার শব্দ! এক একবার বোধ হোতে লাগলো যেন সূতিকাগারে শিশুর ক্রন্দন, এক একবার বোধ হলো যেন কোন বন্যজন্তুর সক্রোধ অস্ফূট গর্জন, একবার শুনলেম যেন দুই তিনজন মনুষ্যের বেতালা নৃত্যের সঙ্গে অট্ট অট্ট হাস্য!

    কি ব্যাপার! এই গভীর রজনীতে বাড়ীর ভিতর এ সব কি হয়! যারা আমার প্রাণান্ত করবার চেষ্টায় ফেরে, তারাই কি রাত্রিকালে বাড়ীর কিছু ভিতর প্রবেশ কোরে এই রকমে আমারে ভয় দেখাচ্ছে? এই স্থির কোত্তে পাল্লেম না। উপর্যুপরি কেবল সেইরূপ শব্দ, সেইরূপে গর্জন আর সেইরূপ উচ্চ উচ্চ হাস্য শ্রবণ কোত্তে লাগলেম! ভূতে যার বিশ্বাস আছে, তারা অবশ্যই ভয় পেতো, ভূত আমি বিশ্বাস করি না, সুতরাং ভূতের ভয় আমার এলো না, কিন্তু অন্য এক প্রকার সন্দেহ আমার মনোমধ্যে সম্পদিত হয়ে কোন এক প্রকার অজ্ঞাত কারণে আমার চিত্তকে অত্যন্ত বিচলিত কোরে তুল্লে।

    ওঃ! এই জন্যই বটে! এই জন্যই রামদাস আমারে সাবধান থাকতে বোলেছিল, এই জন্যই কর্তার বড়ছেলেটি আমারে সাবধান কোরে গিয়েছিলেন, এই জন্যই আমার আহারের পর পাচিকাঠাকুরাণী বার বার আমারে সতর্ক কোরে গিয়েছেন; তাঁরা বোধ হয় নিত্য রাত্রে ঐরূপ শব্দ শুনতে পান, শুনে শুনে তাঁরা বোধ হয় ভূত মনে কোরে ভয় পান। অনেক দিনের পুরাতন বাড়ীতে পরিবার বেশী না থাকলে ভূতেরা এসে বাসা করে, অনেক জায়গায় অনেকের মুখে এরূপ কথা শুনা যায়; কেহ কেহ তালগাছের মত ভূত দেখেন, শাদা কাপড় পরা, কালো কালো কোপনী পরা, লাল কাপড়ের জাঙ্গিয়াপরা, বিকটাকার ভূত অনেক লোকের চক্ষে পড়ে, কালো কালো ভূতেরা অনেক লোকের ঘাড়ে চাপে, যুবতী স্ত্রীলোকের প্রেমে পড়ে, এমন কথাও শুনা যায়, আমার মনে কিন্তু সে রকম ভাব কিছুই এলো না, ভূতের ভয়ে আমি অভিভূত হোলেম না। ব্যাপার কি, যদি কিছু জানা যায়, জানবার অভিপ্রায়ে দক্ষিণদিকের একটা দরজা খুলে বারান্দায় আমি বেরুলেম। নীচে দিব্য পরিষ্কার, আকাশ দিব্য পরিষ্কার, দিব্য জ্যোৎস্না, সকল দিকে চেয়ে দেখলেম, কোথাও কিছু নাই, ছাদের দিকে চাইলেম, কিছুই দেখা গেল না; ভগ্ন বারান্দার পশ্চিম প্রান্তে যে একটা ভগ্নাগৃহ রামদাস আমারে দেখিয়েছিল, সেই গৃহের দিকেও চাইলেম, সেখানেও কিছু নাই; মনে মনে হাস্য কোরে গৃহমধ্যে পুনঃপ্রবেশ কোল্লেম; দরজাটা বন্ধ কোরে দিলেম; প্রদীপটা তখনো জ্বোলছিল, নির্বাণ কোরে দিয়ে পুনর্বার আমি শয়ন কোল্লেম। পুনর্বার সেইরূপ শব্দ। যতক্ষণ আমি বারান্দায় ছিলেম, ততক্ষণ থেমেছিল, পুনর্বার সেইরূপ নৃত্য, সেইরূপ হঙ্কার, সেইরূপ হাস্য। কি এ? ভূত যদি হয়, তবে তো ভূতেরা বিলক্ষণ চালাক, বিলক্ষণ হুঁশিয়ার! সজাগ মানুষ দেখে সাবধান হয়! ভূত যদি হয়, এ রকম ভূত ভাল!

    ভূতের কথা আর আমি ভাবলেম না। নাচে নাচুক, মাতে মাতুক, হাসে হাসুক, আমার তাতে কি? ভূতের ভাবনা দূরে রেখে আমি নয়ন মুদিত কোল্লেম; রাত্রিও প্রায় শেষ হয়ে এসেছিল, নয়ন মুদে থাকতে থাকতে নিদ্রা এলো, গাঢ়নিদ্রায় আমি অভিভূত হোলেম। প্রভাতে দরজার চাবী খুলে একজন সেই ঘরের মধ্যে প্রবেশ কোল্লে; সেই শব্দে আমার নিদ্রাভঙ্গ হলো; চেয়ে দেখি, সম্মুখে সেই রূপসী।

    বারান্দার খড়খড়ী খোলা ছিল, ঘরের ভিতর রৌদ্র এসেছিল, রূপসীকে জিজ্ঞাসা কোরে জানলেম, বেলা প্রায় ছয়দণ্ড। কি আমি বলি, শুনবার অভিলাষে রূপসী আমার মুখের দিকে চেয়ে রইলো, কিছুই আমি বোল্লেম না; রাত্রে যে সকল আশ্চর্য আশ্চর্য শব্দ আমি শ্রবণ কোরেছিলেম, সে সব শব্দের কথা আমার মনের ভিতরেই চাপা থাকলো। ঘরের আবর্জনা পরিষ্কার কোরে, ঘরে ঝাড়ু দিয়ে, রূপসী নিঃশব্দে তখনকার মত বাহির হয়ে গেল। তার পর স্নান, আহার, বিশ্রাম; অপরাহ্ণ সমাগত।

    রামদাসকে সঙ্গে কোরে প্রাণগতিবাবু প্রবেশ কোল্লেন। তখনো আমি শয়ন কোরে ছিলেম, বাবুকে দেখে উঠে বোসলেম। শয্যার এক পার্শ্বে উপবেশন কোরে সহাস্যবদনে বড়বাবু আমাকে জিজ্ঞাসা কোল্লেন, “কি হরিদাস! গত রাত্রে কেমন ছিলে? কোন রকম ভয় পাও নাই তো?”

    প্রশ্ন শুনে আমি ভাবলেম, ভয় পাওয়াটা এ বাড়ীর একটা দৈনিক কার্যের মধ্যেই গণ্য হয়ে পোড়েছে। বাড়ীতে যাঁরা আছেন, তাঁরা হয় তো সকলেই ভয় পান কিম্বা হয় তো অভ্যাস হয়ে গিয়েছে, ততটা আর গ্রাহ্য করেন না; নতুন লোক এলেই ভয়ের কথাটা ভয়ের কাণ্ডটা নূতন হয়ে জেগে উঠে। কাজ কি আমার সে সব কথায়? বিনা সঙ্কোচে সপ্রতিভ হয়েই আমি উত্তর কোল্লেন, “বেশ ছিলেম, কিছুই ভয় পাই নাই, ভয় পেতে হয়, তেমন কোন লক্ষণও আমি জানতে পারি নাই।”

    বড়বাবুর উভয় নেত্র বিস্ফারিত। নিষ্পলকে আমার নিষ্পলক নয়ন নিরীক্ষণ কোরে ক্ষণকাল তিনি নির্বাক থাকলেন, তার পর একটু গুঞ্জনস্বরে বোল্লেন, “ছেলেমানুষের ঘুম বেশী। তা বেশ! রাত্রিকালে জেগে থাকলেই অনেক রকম ভয় আসে, চক্ষের কাছে যেন কত রকম বিভীষিকা দেখা যায়। অচেতনে ঘুমালে আর কোন উৎপাত থাকে না। তা বেশ! এখন একটু বেড়াতে যাবে?”

    অছিলা একটু পেলেই হয়। বেড়াতে যাওয়ায় আমার বড় আমোদ। নানা দিকে নানা বস্তু দর্শন কোরে মন একটু প্রফল্ল থাকে, চিন্তা-ভাণ্ডারের দ্বার খানিকক্ষণ অবরুদ্ধ থাকে, খানিকক্ষণ বেশ অন্যমনস্ক থাকা যায়। বড়বাবুর প্রশ্নে তৎক্ষণাৎ আমি উত্তর দিলেম, “যাব। নূতন জায়গায় এসেছি দেখে শূনে রাখা ভাল। বিশেষতঃ কর্তার মুখে শুনেছি, কিছুদিন আমারে এখানে থাকতে হবে, সেরেস্তায় লেখাপড়া কোত্তে হবে, স্থানটা ভালরূপে জেনে রাখা দরকার। কল্য বৈকালে রামদাস অল্প অল্প দেখিয়ে এনেছে। রামদাসটি বেশ লোক। আজিও কি রামদাস আমার সঙ্গে যাবে?”

    বড়বাবু বোল্লেন, “হাঁ, রামদাসও যাবে, আমিও যাব। চল; এসো।”

    তৎক্ষণাৎ প্রস্তুত হয়ে ঘর থেকে আমি বেরুলেম। দক্ষিণের জানালা দরজা বন্ধ হলো, ঘরের প্রবেশ-দ্বারে রামদাস চাবী দিল, আমরা বেড়াতে চোল্লেম। আমি আর বড়বাবু পাশাপাশি,— সারি সারি, পশ্চাতে রামদাস।

    রুদ্রাক্ষ গ্রাম। যে বাড়ীতে আমারে থাকতে হয়েছে, গ্রামের উত্তর প্রান্তে সেই বাড়ী। বাড়ী থেকে বেরিয়ে আমরা পশ্চিমের রাস্তা ধোল্লেম। পল্লীগ্রামের রাস্তা, সর্বত্রই প্রায় সঙ্কীর্ণ, ঠাঁই ঠাঁই কিছু প্রশস্ত; ধারে ধারে দূরে দূরে এক একখানা সামান্য রকমের বাড়ী, দূরে নিকটে ক্ষুদ্র বৃহৎ বৃক্ষ মালা। শ্রেণীবদ্ধ বৃক্ষ, এমন কথা আমি বোলছি না, কোথাও একটি, কোথাও দুটী পাঁচটী, কোথাও বা আট-দশটী, স্থানে স্থানে এই রকমে নানাজাতি বৃক্ষ দণ্ডায়মান, মধ্যে মধ্যে এক একখানি বাগান। এইখানে আমি একটা আশ্চর্য দেখলেম। সকল গাছে পাতা নাই; যে সব গাছে পাতা আছে, সে সব গাছ যেন একটু একটু ঝলসানো ঝলসানো; পাতাগুলিও ছোট ছোট। পাতার বর্ণও অন্য প্রকার; নিখাত হরিৎবর্ণের বৃক্ষপত্র অতি অল্পই দেখা গেল। আর এক আশ্চর্য, কোন বৃক্ষশাখায় একটিও পাখী দেখলেম না।

    গল্প কোত্তে কোত্তে আমরা চোলেছিলেম, প্রকৃতির ঐরূপ বিপর্যয় দর্শনে বড়বাবুকে আমি সেই বিপর্যয়ের হেতু জিজ্ঞাসা কোল্লেম। বড়বাবু বোল্লেন, “দ্বাদশ মাসের মধ্যে এই অঞ্চলে পাঁচবার অগ্নিকাণ্ড হয়েছিল, অনেক লোকের ঘর-বাড়ী ভস্ম হয়ে গিয়েছে, অনেক বড় বড় বৃক্ষ সমূলে দগ্ধ হয়েছে, অগ্নিক্ষেত্রের নিকট বৃক্ষ একটিও সতেজ নাই; যে সকল বৃক্ষ দূরে ছিল, সেইগুলিই বেঁচে আছে, এগুলিও দূরে থাকাতে রক্ষা পেয়েছে, কিন্তু ভীষণ অনলের উত্তাপে শাখাপত্রাদির অবস্থা ঐ রকম। এ অঞ্চলে তৃণগৃহ অনেক ছিল, অগ্নিকাণ্ডে প্রায় সমস্তই ভস্মীভূত; পুনর্নির্মাণে যারা অসমর্থ ছিল, তারা পালিয়ে গিয়েছে, কাজেই গ্রামবাসীর সংখ্যা কম হয়ে পোড়েছে।”

    পশ্চাতে ছিল রামদাস। বড়বাবুর অপেক্ষা রামদাসের বয়স অনেক বেশী : রামদাস তাঁদের বাড়ীর অনেক দিনের চাকর, রামদাস বড়বাবুর জন্ম দর্শন কোরেছে; বড়বাবুর কথা সমাপ্ত হবামাত্র রামদাস আমাদের সম্মুখে এগিয়ে এসে হস্ত বিস্তার কোরে বোলে উঠলো, “সে কথাটা বুঝি বোল্‌বে না? ঘর পুড়ে গিয়েছে, গাছ পুড়ে গিয়েছে, মানুষেরা পালিয়ে গিয়েছে, এই কথা বোল্লেই বুঝি সব বলা হলো? আসল কথাটা চেপে রাখ কেন? ভয় করে বুঝি বোলতে?” বড়বাবুকে ঠেস দিয়ে দিয়ে ঐ কথাগুলি বোলে আমার দিকে চেয়ে রামদাস বোলতে লাগলো, “না গো হরিদাস, সে রকম আগুন লাগা নয়; লোকেরা সব লোকের ঘরে ঘরে আগুন দিয়ে দিয়ে বেড়াতো। কাজ পাবার মৎলবে এক এক জায়গায় গুপ্তভাবে ঘরামী লোকেরা যেমন লোকের ঘরে আগুন লাগিয়ে দিয়ে যায়, এ গাঁয়ের কাণ্ডটা সে রকম নয়;—রাম! রাম! রাম!—এ গ্রামে মাসকতক অত্যন্ত ভূতের ভয় হয়েছিল, সন্ধ্যার পর ভূতের ভয়ে কেহই ঘরের বাহির হোতে পাত্তো না; না বেরুলে নয়, এমন কোন প্রয়োজন উপস্থিত হোলে পাঁচ সাতজন একত্র হয়ে মশাল জ্বেলে জ্বেলে রাস্তায় বেরুতো। কেন জানো? ভূতেরা আগুন দেখলে ভয় পায়, আলো দেখলে পালিয়ে যায়, সেই জন্য। সেই রকম হোতে হোতে গ্রামের জনকতক ডানপিটে লোক একটা দল বেঁধে পরামর্শ কোল্লে, আগুন দেখে যদি ভূত পালায়, তবে গ্রামে আগুন দিয়ে ভূত তাড়াবার ব্যবস্থা করা যাক। সেই ব্যবস্থায় বার বার অগ্নিকাণ্ডে লোকের ঘর-বাড়ী গেল, গাছপালা গেল, ভূত কিন্তু পালালো না।”

    কিঞ্চিৎ বক্রদৃষ্টিতে চেয়ে একটু উচ্চকণ্ঠে বড়বাবু বোল্লেন, “ও কি কর রামদাস বালকের কাছে ও সব পরিচয় কেন? রেতের বেলা ভয় পাবে। কত জায়গায় কত গ্রামে কতবার আগুন লাগে, ও রকমে হেতুর নির্ণয় কোরে কেহ কাহাকেও বুঝায় না, বুঝাতে হয়ও না।”

    রামদাস চুপ্‌ কোরে থাকলো। আমি মনে মনে হাস্য কোল্লেম। বালক রেতের বেলা ভয় পাবে! ভূতের নামে ভয় পায়, এ বালক নয়, প্রাণগতিবাবু সেটি জানেন না, সেই জন্যই রামদাসকে সাবধান কোরে দিলেন। একরকম ইতিহাস আমি শুনলেম, মুখ বুজে চাপ কোরে থাকাও ভাল দেখায় না, বড়বাবুকেই আমি জিজ্ঞাসা কোল্লেম, “আগুন লেগেছিল, অনেক লোকের ক্ষতি হয়ে গিয়েছে, হোতেই পারে, হয়েই থাকে, গাছে একটীও পাখী বসে না কেন? পাখীরাও কি ভূতের ভয়ে পালিয়ে গিয়েছে?”

    বড়বাবু উত্তর করবার পূর্বে আমার নূতন প্রশ্নে রামদাস উত্তর কোল্লে, “ভূতের ভয়ে পাখী পালায় না, ভূতের ভয়ে পালায় নাই; বৎসরের মধ্যে বার বার আগুন লাগতে লাগলো, পাখীদের বাসাগুলি সব পুড়ে গেল, ছানাগুলিও মারা গেল, বাসাতে যে সকল ডিম ছিল, সেগুলি সব দগ্ধ হলো, কাজে কাজে আগুনের ভয়ে পাখীরা সব উড়ে পালালো; আগুনের ভয়,— ভূতের ভয়ে নয়। আমি তো মনে করি, অনেক মানুষের চেয়ে অনেক পশু-পক্ষীর বুদ্ধি বেশী। পশু-পক্ষীরা মুখে কথা কোয়ে কিছু প্রকাশ কোত্তে পারে না, কিন্তু মনে মনে ভালমন্দ সমস্তই বুঝতে পারে; পেটে পেটে বুদ্ধি।”

    আমরা বেড়াচ্ছি, রুদ্রাক্ষগ্রামের পশ্চিমসীমা যেখানে শেষ, সেইখানে একটা নদী, আমরা সেই নদী-কূলে উপস্থিত হোলেম। আর অগ্রসর হওয়া গেল না, নদীতীরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে চারিদিকের শোভা আমরা দর্শন কোত্তে লাগলেম। খানিকক্ষণ আপন মনে কি আলোচনা কোরে একটা ম্লানবদনে রামদাস আমাকে বোল্লে, “পাড়াগাঁয়ে গরীবের বাস অধিক; গরীবলোকেরা পাতার ঘরে, খড়ের ঘরে বাস করে; এ গ্রামেও তাই ছিল, দেখে এসেছো খানকতক কুড়ে ঘর নূতন হয়েছে, আগেকার পোড়া-ঘর পোড়ে আছে, বড়ই দুর্দশা। আমাদের গাঁয়ে পাকাবাড়ী বড়ই কম; আমাদের বাবুদের ঐ একখানি আর গ্রামের পূর্বদিকে তিন ঘর তন্তুবায়ের তিনখানি, এই মাত্র। পাকাবাড়ীতে আগুনের ভয় বড় একটা থাকে না, বাবু লোকের উপর ভূতের উপদ্রবও বেশী হয় না, যত কোপ গরীবদের উপর!”

    রামদাসের শেষ কথাগুলির উপর টীকা করবার কোন প্রয়োজন হলো না, আমি চুপ কোরে থাকলেম। রামদাসের মুখখানি একটু ভারী হলো, ভাবে বুঝা গেল অভিমান। যারা বেশী কথা কয়, তারা মনে করে, আমাদের কথায় সকল লোকের আমোদ হবে সকলে আমাদের বাকশক্তির প্রশংসা কোরবে, অবশ্যই কেহ না কেহ মনোযোগ দিয়ে শুনে শুনে বড় বড় কথার উত্তর দিবে। রামদাস এখানে কোন উত্তর পেলে না, তাতেই তার অভিমান হলো। রামদাস হঠাৎ পাকাবাড়ীর কথা কেন তুলেছিল, আমি সেটা কতক কতক বুঝতে পেরেছিলেম; ভূতেরা পাকাবাড়ীতে বাসা করে কি না, রামদাস হয় তো সেই কথাই বোলতো; উত্তর পেলো না বোলেই ভূমিকাতেই ইতিহাসটা সাঙ্গ কোরে দিলে; সাঙ্গ কোত্তেই বাধ্য হলো। সেইজন্যই অভিমান, তার তখনকার মুখের ভাব দেখে আমি সেইরূপ অনুমান কোল্লেম।

    নদীর জল তলে রক্তবর্ণ সূর্যমণ্ডলের ছায়া। সূর্যদেবের অস্তাচলে গমনের সময় সন্নিহিত। প্রাণগতিবাবু আকাশের দিকে একবার চেয়ে আমার মুখের দিকে ফিরে প্রসন্নবদনে বোল্লেন, “দেখ হরিদাস, তুমি আমাদের কাছে নূতন, তথাপি তোমার চক্ষু দেখে আমি বুঝতে পেরেছি, তুমি বেশ বুদ্ধিমান। ভূতের প্রসঙ্গে যে সব কথা আমরা বলাবলি কোল্লেম, তত হোক না হোক, সব কথায় মনে এক প্রকার ভয় আসে; পৃথিবীর সকল দেশেই ভূতের অস্তিত্বে আশ্চর্য আশ্চর্য গল্প শুনা যায়; বিশ্বাসের সঙ্গে যারা গল্প করে, তারা অবশ্যই ভয় পায়। দিনমানে ততটা ভয় না আসুক, রাত্রিকালে নিশ্চয়ই ভয় হয়; আর এখানে আমাদের বিলম্ব করবার প্রয়োজন নাই; সন্ধ্যা আগতপ্রায়।”

    সন্ধ্যার পূর্বেই আমরা বাড়ীতে ফিরে গেলেম। নূতন জায়গায় প্রথম প্রথম যেমন হয়ে থাকে, সেই রকমে সে রাত্রিও আমি যাপন কোল্লেম, সে রাত্রেও পূর্বে রাত্রের ন্যায় নানা প্রকার উৎকট শব্দ আমার শ্রুতিগোচর হলো; ভ্রক্ষেপ না কোরে নির্ভয়ে আমি শয়ন কোরে থাকলেম। নিদ্রার অগ্রে সে রাত্রে আমি একটা নূতন কথা ভাবছিলেম। গ্রামের পশ্চিমদিকে অগ্নিকাণ্ডের নিদর্শন। প্রাণগতিবাবু অন্য কোন দিকে না গিয়ে সেই দিকে আমারে নিয়ে গিয়েছিলেন কেন? অগ্নিকাণ্ডের হেতু জানবার ইচ্ছা হোলে আমারে তিনি ভূতের উৎপাতের কথা শুনাবেন, শূনে আমি ভয় পাব, এই কি তাঁর মতলব? পূর্বদিনের সতর্কতার উপদেশ, রামদাসের মুখে, পাচিকার মুখে আর তাঁর নিজমুখে সাবধানতার বার্তা, আজ আবার স্পষ্ট স্পষ্ট ভয়-প্রদর্শন-ভূমিকা। এ প্রকার ভূমিকার কারণ কি? আমারে ভূতের ভয় দেখিয়ে কার কি অভীষ্ট সিদ্ধ হবে? যারা আমারে আমার অজ্ঞাতে এ বাড়ীতে রেখে গিয়েছে, তারাই কি ঐরূপে উপদেশক? তাই যদি হয়, তবে ভূতের কথা কেন? ভয়ের হেতু অনেক রকম আছে, অনেক কারণেই লোক ভয় পায়, ভূতের ভয় দেখিয়ে ছলনা করবার উদ্দেশ্য কি? কিছুই মীমাংসা আনতে পাল্লেম না। নিদ্রা এলো, ঘুমালেম, সব ভয়—সব তর্ক ভুলে গেলেম।

    উপর্যুপরি পাঁচ রাত্রি আমি ঐ প্রকার শব্দ শ্রবণ কোল্লেম, একবারও আমার ভয় হলো না; কেবল একটা সন্দেহ বাড়লো মাত্র। যা যা আমি শুনি, কাহারও কাছে প্রকাশ করি না, কেহ জিজ্ঞাসা কোল্লেও সে সব কথা বলি না। বড়বাবু পাচিকা ও রামদাস আমার নির্ভীকতা অনুভব কোরে বিস্ময়াপন্ন। কর্তাবাবু সেই একদিন ভিন্ন আর কোন দিন আমারে দেখা দেন নাই, ছোটবাবুও সেই একবার ভিন্ন আর আমার কাছে আসেন না। বড়বাবু, রামদাস, পাচিকা আর রূপসী, এই চারিজনের সঙ্গেই আমার দেখাসাক্ষাৎ কথাবার্তা চলে। রূপসী দিবারাত্রির মধ্যে পাঁচ সাতবার আমার ঘরে আসে, কাজ-কর্ম করে, কথা কবার প্রয়োজন না থাকলেও সামান্য একটা অছিলা ধোরে নানা রকম কথা কয়, হাস্যের কারণ না থাকলেও মুখ মুচকে মুচকে হাসে, আমি যখন অন্যদিকে চেয়ে থাকি, রূপসী তখন একদৃষ্টে আমার দিকে চেয়ে থাকে, ঘর থেকে যখন বেরিয়ে যায়, আমি তখন তার বিলক্ষণ কটাক্ষ-ভঙ্গী দর্শন করি; মনে সন্দেহ আসে।

    এইভাবে দশদিন আমি সেই বাড়ীতে থাকলেম। সকল রকমেই সেই দশদিন সমভাব। কর্তা আমারে বোলেছিলেন লেখা-পড়ার কাজ-কর্মে নিযুক্ত থাকতে হবে। কথা আমার মনে ছিল, কাজে কিন্তু কিছুই না; কাগজ-কলমের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ মাত্র নাই। আমি তবে কি করি?—উত্থান করি, ভোজন করি, ভ্রমণ করি, শয়ন করি, চিন্তা করি, মাঝে মাঝে আজগুবী আজগুবী গল্পগুজব শ্রবণ করি, এই পর্যন্ত আমার কর্ম। দশদিন দশ রাত্রি ঠিক একভাবে কেটে গেল। থাকতে থাকতে বাবুদের পরিবারবর্গের পরিচয় পেলেম।

    পুরুষের মধ্যে কর্তা স্বয়ং আর দুটি পুত্র; স্ত্রীলোকের মধ্যে গৃহিণী, বড়বধু, ছোটবধু, আর কর্তাবাবুর এক শ্যালকের একটি স্ত্রী; চাকরের মধ্যে রামদাস, চাকরাণীর মধ্যে রূপসী; এইগুলি ছাড়া সেই বৃদ্ধা পাচিকা-ঠাকুরাণী। বড়বাবুর বয়ঃক্রম পঞ্চবিংশতি বর্ষ, ছোটবাবুর বয়ঃক্রম ত্রয়োবিংশতি বর্ষ; বড়-বৌমার বয়স বাইশ বৎসর, ছোট-বৌমার বয়স ঊনিশ বৎসর। কর্তার যে শ্যালক-পত্নীটি বাড়ীতে আছেন, তিনি বিধবা, বয়স অনুমান তেইশ চব্বিশ বৎসর; দেখতে দিব্য সুশ্রী, বর্ণ গৌর, সে গৌরবর্ণের উপর রক্তবর্ণ আভা; কর্তা সেটিকে রাঙা-বৌ বোলে আদর করেন, গৃহিণীও বলেন, রাঙা-বৌ। সেই রাঙা-বৌটি ছেলেবাবুদের মামী হন; রামদাস আর রূপসী সেই সম্পর্কে রাঙা-বৌকে রাঙা-মামী বোলে সম্মান দেয়।

    বাবুদের একটি ভগ্নী আছে, তার নাম শুকতারা। সেই ভগ্নীটি সর্ব-কনিষ্ঠা। সেটা প্রায় বারমাস শ্বশুরালয়ে থাকে, মাঝে মাঝে এক একবার আসে, সপ্তাহের মধ্যেই আবার চলে যায়। পূর্বে বলেছি, এ বাড়ীর ভিতরমহল বাহিরমহল প্রায় এক, কেবল একটি বারান্দা মাত্র ব্যবধান; তথাপি আমি প্রথম প্রথম কেবল বাহির-মহলেই থাকতেম, নারী মহলে প্রবেশের অনুমতি পেতেম না, বেশীদিন থাকতে থাকতে আমার রীতি চরিত্র দেখে, কর্তা আমারে অন্দরে গিয়ে আহার করবার অনুমতি দিলেন। সেই কর্তা; যিনি আমারে নেশাখোর ভেবে অগ্রাহ্য কোরেছিলেম, ঠাট্টা-বিদ্রূপ ঝেড়েছিলেন, একমাস পূর্ণ হোতে না হোতেই সেই কর্তা আমার প্রতি সুপ্রসন্ন।

    ভিতরমহলে আমি প্রবেশ করি, গৃহিণীকে আমি মা বোলে ডাকি, বৌ দুটী আমারে দেখে ঘোমটা দেন, রাঙা-মামী ঘোমটা দেন না। দুই বেলা আহারের সময় বাড়ীর ভিতর আমি যাই, অন্য কোন প্রয়োজন উপস্থিত হোলেও অন্দরে আমার ডাক পড়ে; অবাধ গতিবিধি; কিন্তু রাত্রিকালে শয়নটা আমার বাহিরেই হয়। বাহিরে শয়ন করি বটে, কিন্তু রাত্রিকালে সমস্ত কলরব নিবৃত্তি হোলে ভিতরমহলের উচ্চ উচ্চ কথাবার্তা আমার শ্রবণগোচর হয়। আমার শয়ন-ঘরের ঠিক পাশেই অন্দর; বারান্দার দরজা পার হয়ে অন্দরের পথের বামদিকে যে ঘরটী, রাত্রিকালে সেই ঘরে রাঙা-মামী শয়ন করেন, সেই ঘরের পশ্চিমের দুটি ঘরে বড়বাবু আর ছোটবাবু। সেই তিনটি ঘর উত্তরদ্বারী, পূর্ব-পশ্চিমে দীর্ঘ। অপর ধারে ঐরূপ তিনটি ঘর দক্ষিণ-দ্বারী; একটিতে কর্তা-গৃহিণী থাকেন, একটিতে পাচিকা আর রূপসী, তৃতীয়টী ভাঁড়ার ঘর। রন্ধনগৃহ নিম্নতলে। অন্দরের চিত্র এইরূপ। বাহির-দিকেও উত্তর বারান্দার দক্ষিণাংশে সারি সারি তিনটি ঘর। একটি ঘরে আমি থাকি, তার পাশে পূর্বদিকের একটা ঘরে রামদাস শয়ন করে, তৃতীয় ঘরটী খালি থাকে। পূর্বে পূর্বে বাড়ীতে যখন পূজা-পার্বণ হতো, সেই সময় লণ্ঠনদেয়ালগিরি অনেক ছিল, অনেক এখন নষ্ট হয়ে গিয়েছে, অবশিষ্ট গোটাকতক এখন সেই খালি ঘরে রক্ষিত হয়েছে।

    প্রতি রজনীতে আমি ভয়ঙ্কর ভয়ঙ্কর শব্দ শুনি, কোথা থেকে শব্দ আসে, কারা সেই সকল শব্দ করে, কিছুই আমি ঠিক কোত্তে পারি না; দিনের বেলা আমি কাহাকে কিছু জিজ্ঞাসাও করি না। সেই ভাবে প্রায় একমাস গেল। আমার মন ক্রমশ‍ই চঞ্চল। যাঁরা আমারে ভালবাসেন, আমি যাঁদের ভালবাসি, তাঁরা কে কেমন আছেন, মামলা-মোকদ্দমার সংবাদ কি কিছুই জানতে পাচ্ছি না। একদিন বেলা এক প্রহরের পূর্বে আপন ঘরের একটি গবাক্ষে বোসে গালে হাত দিয়ে আমি ভাবছি, এত দিনের পর কর্তা হঠাৎ সেইখানে এলেন। ভাবনায় অন্যমনস্ক ছিলেম, চক্ষু ও অন্যদিকে ছিল, নিঃশব্দে টিপি টিপি প্রবেশ কোরে আচম্বিতে কর্তা আমারে জিজ্ঞাসা কোল্লেন, “কি হরিদাস, এত গভীর কিসের চিন্তা? কিসের ধ্যানে নিমগ্ন আছ?”

    চমকে উঠে থাড়িমাড়ি খেয়ে আমি নেমে দাঁড়ালেম। একটু পূর্বে যে একটি কল্পনা, আমার অন্তরে খেলা কোচ্ছিল, কোন কথা মনে আনবার অগ্রেই সেই কল্পনাটি কর্তাকে জানিয়ে বিনম্রবচনে নিবেদন কোল্লেম, “আপনার নিকটে আমার একটি প্রার্থনা। নিরাশ্রয় অবস্থায় যাঁরা আমারে আশ্রয় দিয়েছিলেন, তাঁদের জন্য সর্বদা আমার প্রাণ কেমন করে; ডাকযোগে চিঠি লিখে তাঁদের শুভসমাচার আনাই, এই আমার ইচ্ছা। আপনি অনুগ্রহ কোরে অনুমতি দান করুন।”

    গম্ভীর বদনে কি একটা চিন্তা কোরে কর্তামহাশয় আমারে বোল্লেন, “যা লিখতে চাও, লিখতে পার, কিন্তু শিরোনামগুলি আমি দেখে দেখে দিব।” —আমি বোল্লেম, “আজ্ঞে, কেবল শিরোনামা কেন, পত্রে যা যা আমি লিখবো, সমস্তই আপনি দেখে দিবেন।”

    আমার বিছানার উপর কর্তা বোসলেন; একটু দূরে বোসে মনের উল্লাসে আর কিছু আমি বলবার উপক্রম কোচ্ছিলেন, সেই অবসরে এক রকম বিমর্ষস্বরে কর্তা আবার বোল্লেন, “না না, তা তুমি পার না। চিঠি যদি তুমি লিখতে চাও, তাতে কেবল এই কথা লিখতে পার যে, তুমি বেঁচে আছ, সুখে আছ, পীড়া হয় নাই, এই রকম খোলসা খোলসা কথা। কোথায় আছ, কি বৃত্তান্ত, সে সব কথা লিখতে পাবে না। আরও একটি কথা বোলে রাখি। চিঠিগুলি লেখা হোলে আমার হাতে দিও, আমি সেইগুলি কলিকাতা যাত্রী বিশ্বাসীলোকের হাতে দিয়ে রওনা কোরে দিব, তাঁরা সেগুলি কলিকাতার ডাক ঘরে অর্পণ কোরবেন। ত্রিপুরা, ঢাকা অথবা পূর্বাঞ্চলের কোন ডাকঘরের নাম নিদর্শন কোন চিঠিতেই থাকতে পারবে না। বুঝতে পেরেছ আমার কথা?”

    বিষণ্ণ বদনে আমি উত্তর কোল্লেম, “বুঝতে পাল্লেম সব, যাঁদের আমি লিখবো, তাঁরা সে সকল পত্র পাবেন, সে কথাও সত্য, কিন্তু যে জন্য আমার প্রাণ আকুল, সে পক্ষে কোন উপকার হবে না;  ঠিকানা লেখা না থাকলে পত্রের প্রত্যুত্তর আমি প্রাপ্ত হব না।”

    “তা আমি কি কোরবো?”— কিঞ্চিৎ উচ্চস্বরে কর্তা বোলে উঠলেন, “তা আমি কি কোরবো? এই জেলায় আমার বাড়ীতে তুমি আছ, সে কথা প্রকাশ হোলে দলে দলে লোক এসে আমাকে উস্তম-খুস্তম কোরবে, অনেক লোক তোমার তল্লাস কোরতে আসবে, সেটা আমি ইচ্ছা করি না। সাবধান, আমার অজ্ঞাতে ক্ষুদ্র একখানি চিঠিও এখানকার ডাকঘরে তুমি দিও না। যদি দাও, তোমার নিজেরই মন্দ হবে; স্মরণ রেখো।”

    এই সব কথা বোলে, কটমটচক্ষে আমার দিকে চাইতে চাইতে কর্তাবাবু ত্বরিতপদে সে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। কি কোত্তেই বা এসেছিলেন, কি কোরেই বা চোলে গেলেন, কিছুই আমি বুঝলেম না, অবাক হয়ে একটি ধারে আমি বোসে থাকলেম।

    কর্তাও বেরিয়ে গেলেন, তৎক্ষণাৎ রামদাস এসে উপস্থিত। আমি মনে কোল্লেম, রামদাস বুঝি এবার কর্তারই প্রেরিত; কিন্তু তা নয়।

    রামদাস এসেই যেন একটু চমকিতস্বরে আমারে জিজ্ঞাসা কোল্লে, “গত রাত্রিতে তুমি কি কাজ কোরেছিলে? তোমার ঘরের দক্ষিণের বারান্দায় সব শব্দ হয়েছিল?”

    প্রশ্নের ভাব আমি বুঝতে পাল্লেম না। নিত্য রাত্রে ভয়ানক ভয়ানক শব্দ হয়, বাড়ীর লোকেরা সকলেই তা জানে, রামদাসও জানে, না জানলে ভয় পেয়ো না বোলে আমারে সাবধান কোরবে কেন? জানে সব, আমার বারান্দায় শব্দ হওয়াটা মিথ্যা কথা; নিদ্রা আমার অল্পক্ষণ; অন্য দিকে শব্দ হয়, হাস্য হয়, নৃত্য হয়, সব আমার কানে আসে, আমার সম্মুখের বারান্দার কোন রাত্রে কোন শব্দ হয় না; জানালা-খড়খড়ী খোলা থাকে, শব্দ শোনা মাত্র নয়, শব্দের নায়কেরাও আমার নয়ন-পথবর্তী হোতে পাত্তো। বারান্দায় কিছুই হয় নাই। রামদাস তবে এমন কথা বলে কেন? কোন রকম ধাম্পা না কি?

    রাত্রে যে যে কাণ্ড হয়, একদিনও কাহারো কাছে আমি সে সকল গল্প করি না। সেই দিন রামদাসের কথায় কৌতূহলী হয়ে আমি বোল্লেম, “দেখ রামদাস, যে সব কথা তোমরা বোলেছিলে, সে সব কথা সত্য, অনেক রকম শব্দ আমি শুনতে পাই; কিসের শব্দ, কারা শব্দ করে, কিছু‍ই আমি বুঝতে পারি না, জান কি তুমি শব্দগুলো কিসের?”

    বেলা এক প্রহর, তথাপি রামদাসের চক্ষে যেন ভয়ের লক্ষণ দেখা গেল। চকিতনেত্রে চারিদিকে চেয়ে, রাম রাম মন্ত্রে আত্মসার কোরে রামদাস চুপি চুপি বোলে, “রামনাম কর! রামনাম কর! এখানা ভূতের বাড়ী! বাড়ীতে পরিবার অনেক ছিল, যমের দৌরাত্ম্যে প্রায় সকলেই শ্মশানশায়ী হয়েছে, যে কয়জন বেঁচে আছে, চক্ষেই দেখতে পাচ্ছো। বাড়ীখানাও কত বড়, আছেই বা কতটুকু, তাও তুমি দেখছো। পাড়ার লোকেরা বলে, থানা বাড়ী! সকলে তো ভেতরের খবর রাখে না, যার মনে যা উদয় হয়, সেই কথাই সেই বলে। এ বাড়ীতে আজ কাল ভূতের অধিকার! তুমি নূতন এসেছো, ভয় পাবে বোলে সব কথা আমি তোমাকে বলি না। ভূত সব দেখা যায়! ভয়ানক ভয়ানক ভূত! গণনাতে অনেক! ইদানীং উপদ্রবটা কিছু বেড়েছে, এত দিনের পর কর্তা ভয় পেয়েছেন; ভূতেরা দুদিন তিন দিন কর্তার ঘরে দুধ-সন্দেশ চুরি কোরে খেয়েছে। বাক্সের টাকা সিঁড়িতে ছড়াছড়ি যাওয়া আরম্ভ হয়েছে, বাক্সে চাবি দেওয়া থাকে, টাকা উড়ে যায়, টাকার বাটিতে চাঁপাফুল, কোন দিন বা দু একটা রসগোল্লা পাওয়া যায়।”

    এই পর্যন্ত শ্রবণ কোরে হঠাৎ আমি বোল্লেম, “তবে তো সে সকল ভূতের বেশ ধর্মজ্ঞান আছে! টাকা চুরী করে না, ছড়িয়ে দিয়ে যায়, খাবার জিনিস রেখে যায়, ফল রেখে যায়. আমার যেন মনে হয়, সে সব ভূত ঘরের ভূত! তাদের শরীরে মায়া দয়া বেশী। আচ্ছা রামদাস, ভূত যদি দেখা যায়, তবে কেন প্রতীকার করা যায় না?”

    একটু শিউরে উঠে মস্তক সঞ্চালন কোরে রামদাস বোল্লে, “এই রে! ছেলেমানুষ কি না, ভূতের প্রতীকার কোত্তে চায়! ভূতের প্রতীকার কি রকম হরিদাস? আদালতে মোকদ্দমা করা? ঢাল-তলোয়ার নিয়ে তাড়া করা? লাঠি-সোঁটা নিয়ে সদরদরজা আটক করা? তা নয় হরিদাস, তা নয়! মোকদ্দমা-মামলাতে কিম্বা যুদ্ধ-সজ্জাতে ভূত দমন করা যায় না, যাতে দমন করা যায়, কর্তা সেই উদযোগে আছেন; কর্তা-গিন্নী দুজনেই এই মাসের মধ্যে গয়াধামে যাবেন, গদাধরের পাদপদ্মে পিণ্ডদান কোল্লেই একদিনে সমস্ত ভূত উদ্ধার হয়ে যাবে, বাড়ীতে আর কোন প্রকার উপদ্রব থাকবে না।”

    সব কথায় বেশী মনোযোগ না রেখে, সত্যই যেন বেশী বিশ্বাস কোরেছি, সেই ভাব জানিয়ে গম্ভীরবদনে আমি বোল্লেম, “আচ্ছা রামদাস, সত্য কি ভূত তুমি স্বচক্ষে দেখেছ?”

    রামদাস উত্তর কোল্লে, “চক্ষে না দেখে কোন কথা বলা আমার অভ্যাস নয়। অনেকবার দেখেছি। কিন্তু একটা কথা কি জান, ছোটলোক ভূত আর ভদ্রলোক ভূত এক রকম হয় না; ছোটলোক ভূতেরা সম্মুখে পোড়লেই ঘাড় ভাঙে, ভদ্রলোক ভূতেরা সে রকম করে না, কেবল দূর থেকে ভয় দেখায়। তাদের আরো একটা গুণ আছে। ঘরের মধ্যে বেশী লোক থাকলে তারা দেখা দেয় না, বাইরে বাইরে শব্দ কোরেই পালিয়ে যায়, রাত্রিকালে একঘরে যদি একজন থাকে, তা হোলেই দেখা দেয়। দেখবে তুমি? আজ অনেক রাত পর্যন্ত তুমি জেগে থেকো; রাত্রি দুই প্রহরের পূর্বে ভূত আসে না, রাত্রি যখন ঝাঁ ঝাঁ করে, পশু-পক্ষী কীট-পতঙ্গ সব যখন নিস্তব্ধ থাকে, সকলে যখন নিদ্রা যায়, সেই সময় ভূতের আমদানী! আজ তুমি জেগে থেকো, ভয় পেয়ো না কিন্তু, ভয় পেলেই তারা বিকটমমূর্তি দেখায়। চুপটি কোরে ঠাণ্ডা হয়ে চেয়ে থেকো, ভূতগুলির লাফানী ঝাঁপানী দেখতে পাবে। তারা আমাদের পোষা ভূত!”

    ক্রমশঃ বেলা হোতে লাগলো, রামদাস উঠে গেল, দিবা-কর্তব্য সমাপ্ত কোরে আমি কিয়ৎক্ষণ বিশ্রাম কোল্লেম। বিশ্রামকালে রামদাসের কথা স্মরণ কোরে আমার হাসি পেলে, কিন্তু হাসতে পাল্লেম না। চিঠি লেখা হবে না, অমরকুমারীর সংবাদ লওয়া হবে না। কর্তা বোলে গেলেন, পূর্বেদেশের কোন ডাকঘরে আমার চিঠি অর্পণ করা হবে না। আমি যদি চিঠি লিখি, সাদা কথায় লিখে কর্তার হাতে দিব, এখান থেকে কলিকাতায় যারা যায়, সেই সকল চিঠি কর্তা তাদের হাতে দিবেন, কলিকাতার ডাকঘরে দস্তুরমত মোহর হয়ে সেই সব চিঠি বিলি হবে। কর্তার ইচ্ছা এই প্রকার। ভূতের কৌতুক মনে কোত্তে কোত্তে কর্তার ঐ সব কথা আগেই মনে এলো, হাসতে পাল্লেম না।

    তাৎপর্য কি? যেখানে আমি আছি, সেখানকার ডাকঘরে চিঠি দেওয়া হবে না, যে স্থানে আমি আছি, আমার বন্ধুগণকে সে ঠিকানা জানতে দেওয়া হবে না, তাৎপর্য কি? বা আমি ভেবেছিলেম, ঠিক তাই! যে সকল লোক এখানে আমারে রেখে গিয়েছে, নিশ্চয়ই তারা রক্তদন্তের দলের লোক;  রক্তদন্তের চক্র বহুদূর-বিস্তৃত! চিরদিন আমারে গোপন কোরে রাখা সেই চক্রের লোকের মতলব। দেখি দেখি, কপালে কি আছে! ভগবান কাহারো প্রতি নির্দয় থাকেন না, লোকের অবশ্যই চিরদিন সমান থাকে না, আমার এই দুরবস্থা যে চিরদিন সমান থাকবে, এমন কি পাপ আমি কোরেছি? প্রাণে যদি না মরি, বৈরিহস্তে যদি আমার প্রাণ না যায়, তা হোলে একদিন না একদিন অবশ্যই আমার অবস্থার পরিবর্তন হবে, অবশ্যই সুদিন উদয় হবে, ভগবান অবশ্যই মুখ তুলে চাইবেন, সেই সময় অবশ্যই জানতে পারবো, এই ভয়ানক যুক্তি-তর্কের গোড়া কোথায়?

    বেলা শেষ হয়ে এলো। আমি একাকী সেই ঘরটিতে বোসে আছি, রূপসী এসে আমারে ডেকে গেল; বোলে গেল, রাঙামামী ডাকছেন।

    রাঙামামী আমারে কেন ডাকেন? রাঙামামী আমারে দেখে লজ্জা করেন না, কোন কিছু, আবশ্যক হোলে আমারেই এনে দিতে বলেন, এই পর্যন্তই আমি জানি। দাসী দিয়ে তিনি আমারে ডেকে পাঠাবেন, এটা আমার জানা ছিল না। কি করি, চাকুরী সম্পর্ক না হোলেও এদের বাড়ীতে আমি আছি, আমার উপর কর্তার প্রভুত্ব চলে, ভাবতে গেলে এক রকম আমি চাকর। যেতে হলো।

    ভিতরমহলে আমি প্রবেশ কোল্লেম। এইখানে আমারে একটু অনধিকারচর্চা কোত্তে স্বাধীনতা নিতে হলো। পূর্বে বোলে রেখেছি, রাঙামামী বিধবা, রাঙামামী পরমা সুন্দরী। এই দিন আমি যে ভাবে তাঁরে দেখলেম, তাতে আমার এক মহা সন্দেহ দাঁড়ালো। অলঙ্কার-বস্ত্রে সুশোভিতা, অলক্তকরা-গরঞ্জিতা, মণি-মণ্ডিত-কবরী-বিভূষিতা সেই রাঙামামী একটি নির্জন গৃহে একাকিনী। তাঁর দুটি চক্ষে জলধারা। এই সুন্দরীর রূপ বর্ণনা করা আমার অনধিকারচর্চা। বিধবা যদি বিধবার মত ব্রহ্মচারিণীরূপে অধিষ্ঠিতা থাকতেন, তা হোলে সে দিকে চেয়ে দেখতে মানুষের মন পুলকিত হতো, দুষ্টের নয়ন ঝলসে যেতো। এ মূর্তি সে মূর্তি নয়, গৌরবর্ণের উপর গোলাপী আভা, অধরোষ্ঠে গোলাপী আভা, কপোল, গালে গোলাপী আভা, বিশাল নয়নে বক্রদৃষ্টি। বক্ষঃস্থলে নীলবর্ণ কাঁচালী, সেই কাঁচুলীর অর্ধাংশ নীলবসনে ঢাকা। সম্মুখে গিয়ে আমি নত-নয়নে নত-বদনে দাঁড়ালেম। মৃদু হেসে মামী বোল্লেন, “বোসো হরিদাস, তুমি অমন ভয় পাচ্ছো কেন? তুমি না কি ভূতের ভয় পেয়েছ?”

    আমি বোসলেম না, ভূতের ভয়ের কথাতেও কোন উত্তর দিলেম না। রাঙা-মামী আবার বোল্লেন, “রামদাস আমারে বোলে গেল, তুমি ভূতের ভয়ে কাতর আছ। ছি। ভূতকে কি ভয় করে? আমি তো মেয়েমানুষ, অন্য অনেক রকম ভয় আমার আছে, কিন্তু ভূতের ভয় আমি রাখি না। বাড়ীতে এক রকম শব্দ হয়। এত বড় বাড়ীখানা, কত লোক এ বাড়ীতে থাকতো, এখন গুটিকতক অস্থি-চর্মসার ক্ষুদ্র প্রাণী খেলা কোরে বেড়ায়, সমস্ত বাড়ীখানা ফাঁকা; তাতে কোরেই রেতের বেলা বাতাসের শব্দকেও যেন বড় বড় কামানের শব্দ মনে হয়। তাতে তুমি ভয় পেয়ো না : কোথায় কি শব্দ হোচ্ছে, জানবার জন্য বিছানা থেকে উঠো না, উঁকি মেরে দেখো না, হাঁকাহাঁকি কোরে গোলমাল কোরো না! দেখ ভাই—–(শ্রীবিষ্ণু!) দেখ হরিদাস, তোমার উপর আমি বড় সুখী আছি। আজ তুমি আমার একটি উপকার কর।”

    “উপকার কর!”—এই কথাটি শুনে, আমি তখন মুখে উচু কোরে রাঙা-মামীর মুখখানি ভাল কোরে দর্শন কোল্লেম। একটু পূর্বে চোখে জল দেখেছিলেম, সে জল কোথায় উড়ে গিয়েছে, চন্দ্রমুখ হাসি হাসি। চন্দ্ৰমুখ বোল্লেম, কিছু অশিষ্টতা প্রকাশ পেলে, কিন্তু কবিরা ভগবতীর বদনকেও চন্দ্রবদন বোলে বর্ণনা করেন। আমি কবি নই, কিন্তু সুন্দরী কামিনীর সুন্দর বদনকেও চন্দ্রবদন বলাতে দোষ হোতে পারে না, এইরূপ আমার ধারণা। উত্তমরূপে তাঁর মুখখানি নিরীক্ষণ কোরে, ধীরে ধীরে আমি বোল্লেম, “উপকার? – আমার দ্বারা আপনার কি উপকার হোতে পারে?”

    রাঙামামী উঠে দাঁড়ালেন; ঘরের পূর্বপ্রান্তে ক্ষুদ্র একটী তোরঙ্গ ছিল, সেইটী খুলে কি একটী পদার্থ হাতে কোরে নিয়ে আমার কাছে ফিরে এলেন। অন্য কোন প্রকার ভূমিকা না কোরেই সেই পদার্থটী আমার হাতে দিয়ে আমার পিঠ চাপড়ে চাপড়ে তিনি বোল্লেন, “তুমি বেশ ছোকরা, খুব বুদ্ধিমান, এই জিনিসটি নিয়ে গিয়ে অমুক জায়গায় অমুক ঠিকানায় অমুক বাড়ীর সেজোবাবুর হাতে দিয়ে এসো। বুঝতে পেরেছো ঠিকানাটি? সে দিন তোমরা যে রাস্তা ধোরে নদীর ধারে বেড়াতে গিয়েছিলে, যে দিকে আগুন লেগেছিলো, সেই দিকে—সেই বড় একটা আম গাছ,—সেই দিকে বাঁ-হাতী একখানা ছোটবাড়ী। বুঝতে পেরেছো? সেই বাড়ীর সেজোবাবুকে ডেকে চুপি চুপি এই মোড়কটী তাঁর হাতে দিয়ে এসো। এ মোড়কে ওষুধ আছে। সঙ্গোপনে দিও কেহ যেন দেখেনা কোন লোকের কাছে কোন কথা প্রকাশ কোরো না, আমাদের রামদাসকেও কিছু, বোলো না।”

    মোড়কটী আমার হাতে থাকলো, ফিরিয়ে দিতে পাল্লেম না, ‘এ কাজ আমার নয়’ এ কথা বোলে মুখের উপর স্পষ্ট জবাব দিতে পাল্লেম না, কাজে কাজে মুষ্টিবদ্ধ কোরে মোড়কটী ঢেকে রেখে আমি বেরিয়ে এলেম। আপনার ঘরে এনে মোড়কখানি আমি ভাল কোরে দেখলেম। বর্তুলাকার এক খণ্ড কাগজ। উপরে কিছু লেখা ছিল না ওজনেও ভারী নয়, ভিতরে কোন প্রকার ওষুধ কিম্বা বস্তু থাকলে ভারী হতো, তা নয় তবে কি? মোড়ক করা, ধারে ধারে আঠা দিয়ে জোড়া ভাব কিছু বুঝতে পাল্লেম না; এনেছি, মৌনসঙ্কেতে দৌত্যকর্ম স্বীকার কোরেছি দিয়ে আসতে হবে, তাও স্থির কোল্লেম কিন্তু মনে কেমন খটকা লাগলো।

    মনে কোরেছিলেম, রাত্রে ভূত দেখার কথা আছে, রাত জাগতে হবে, আজ আর বেড়াতে যাব না, কিন্তু রাঙামামীর দৌত্য কার্য্যে সে সঙ্কল্প অটল রাখতে পাল্লেম না, সন্ধ্যার পূর্বে কাপড় ছেড়ে সম্মুখ-রাস্তায় বাহির হোলেম। কেহই আমারে তখন দেখতে পেলে না। নদীর তীরে রাস্তাটা আমার জানা হয়েছিল, সরাসর সেই রাস্তায় গিয়ে সেই আম্রবৃক্ষের তলে আমি দাঁড়ালেম। হস্তে সেই বর্তুলাকার পত্রিকা। কি বোল্লেম?—পত্রিকা?—কে আমারে এমন কথা বলালে?— দেবতারা? —সত্যই তবে এখানি এক গুপ্তপত্রিকা। একজন সেজোবাবুর হাতে এই গুপ্তপত্রিকা অর্পণ কোত্তে হবে। বৃক্ষতলে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভাবছি, নিকটে একখানি বাড়ীও দেখতে পাচ্ছি, কিন্তু ডাকি কি বোলে? বাড়ীর ভিতর প্রবেশ কোত্তেও ভরসা হোচ্ছে না; বাইরে দাঁড়িয়ে “সেজোবাবু সেজোবাবু” বোলে ডাকা, সেটাও ঠিক নয়। আমি নূতনলোক, ততটা স্বাধীনতা লওয়া আমার পক্ষে দোষের কথা। করা যায় কি? সূর্যদেব অস্তাচলে যাচ্ছেন আকাশের অনেকদূর পর্যন্ত রক্তবর্ণ হয়েছে, কুলায়বাসী পাখীরাও সব উড়ে উড়ে পালাচ্ছে, সন্ধ্যার বাতাসে নদীর জলে তরঙ্গ খেলছে, এমন সময় সেই বাড়ী থেকে একটী স্ত্রীলোক বেরুলো; এক কোলে একটা জলের কলসী, এক কোলে একটা ছেলে।

    যেখানে আমি দাঁড়িয়ে ছিলেম, স্ত্রীলোকটা সেইখান দিয়ে চোলে যায়, অগ্রবর্তী হয়ে আমি তারে জিজ্ঞাসা কোল্লেম “তুমি কি এই বাড়ীতেই থাকো?”

    একটু চমকিতভাবে চমকিতস্বরে স্ত্রীলোক আমারে জিজ্ঞাসা কোল্লে, “কেন গা? কে গা তুমি? কোথা থেকে এসেছো?”

    এইবার আমি উত্তর কোল্লেম, “অনেক দূর থেকে এসেছি, দিনকতক এই গ্রামেই আছি, এখানে আমার একটু দরকার আছে।”

    স্ত্রীলোক বোল্লে, “কার কাছে দরকার? কি দরকার?” —আমি উত্তর কোল্লেম, “যে বাড়ী থেকে তুমি আসছো, ঐ বাড়ীর সেজোবাবুর কাছে আমার দরকার।” স্ত্রীলোক আপন মনে বোলতে লাগলো, “আমাদের সেজোবাবুর কাছে কত লোকের যে কতরকম দরকার, তা আর বলবার নয়। রাতদিন দরকার;—রাতদিন দরকার! দরকার আর ফুরায় না!” আপন মনে ঐ সব কথা বোলে, আমার মুখের দিকে চেয়ে, সে স্ত্রীলোক একটু যেন রুক্ষস্বরে বোল্লে, “সন্ধ্যা হয়, এখন আবার তোমার কি দরকার?”

    আমি বোল্লেম, “একবার সাক্ষাৎ করা দরকার। যদি তুমি একবার তাঁরে খবর দিতে পার, আমার বড় উপকার হয়।”

    বিড় বিড় কোরে আপনা আপনি কত কি বোকতে বোকতে সেই রুক্ষভাষিণী স্ত্রীলোক কি যেন ভেবে চিন্তে বিরক্ত হয়ে বোল্লে, “আচ্ছা, দাঁড়াও, আমি জল নিয়ে আসি, অন্ধকার হয়ে এলো, এ সব জায়গায়— আচ্ছা, এইখানে তুমি একটু দাঁড়াও, ফিরে এসে তাঁরে আমি জানাবো, কি তিনি বলেন, আমার মুখেই শুনতে পাবে।”

    আমি বুঝতে পাল্লেম, সেই স্ত্রীলোক সেই বাড়ীর চাকরাণী। বয়স কম, বাড়ীর মেয়ে হোলে আমার কাছে দাঁড়িয়ে অত কথা কইতো না। যাই হোক, কাজ নিয়ে আমার কথা, চাকরাণী কি রাজরাণী, তাতে আমার কোন প্রয়োজন ছিল না। আমি সোরে গিয়ে সেই বৃক্ষতলে দাঁড়ালেম। স্ত্রীলোকটী নদীর ঘাটে জল আনতে গেল। যখন সে ফিরে এলো, তখন আর আমার দিকে চাইলে না; হন্ হন্ কোরে বাড়ীর দিকেই চোল্লো। গাছতলা থেকে একটু উচ্চকণ্ঠে ডেকে ডেকে আমি তারে মনে কোরে দিলেম, “ভুলো না, আমি দাঁড়িয়ে থাকলেম।”

    স্ত্রীলোক উত্তর দিল না, চোলে গেল, বাড়ীর ভিতর প্রবেশ কোল্লে। সূৰ্য দেব অস্তে গেলেন। আমার ভয় হতে লাগলো। ভূতের ভয় নয়, কত লোকের কুচক্রের শীকার আমি, নূতন জায়গায় নিৰ্জন পথে একাকী, যদি আবার রাহুচক্রে পড়ি, সেই ভয়।

    দাঁড়িয়ে আছি, প্রায় অর্ধদণ্ড পরে একটী বাবু সেই বাড়ী থেকে বেরিয়ে এলেন। এসেই তফাৎ থেকে তিনি জিজ্ঞাসা কোত্তে লাগলেন, “কে গা? কে আমার তত্ত্ব কোচ্ছে?”—প্রশ্নের সঙ্গে সঙ্গে তিনি এগিয়ে আসতে লাগলেন, আমি সেই সময় তাঁর সম্মুখে গিয়ে দাঁড়ালেম। সূর্যদেব চোলে গিয়েছিলেন, অন্ধকার হয় নাই, বাবুটি আমার মুখের দিকে চেয়ে রইলেন, আমিও তাঁর মুখের দিকে চাইলেম। বেশ বাবুটী। উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ, চোখ-দুটী বড় বড়, ঝাঁকড়া ঝাঁকড়া বাবরী চুল, মাঝখানে সিঁতিকাটা। চুলের কেয়ারীতে কলিকাতার ধরণ অনেকটা জানা যায়। বোধ হলো এ বাবুটীর কলিকাতায় গতিবিধি আছে। কি জাতি, কি বৃত্তান্ত, জানা ছিল না, আমি নমস্কার কোল্লেম না; ধীরস্বরে জিজ্ঞাসা কোল্লেম, আপনি কি এই বাড়ীর সেজোবাবু?

    একটু চিন্তা কোরে বাবুটী উত্তর কোল্লেন, “হাঁ, আমি তাই। কেন তুমি ও কথা জিজ্ঞাসা কর? কে তুমি?” রাঙামামীর দত্ত-মোড়কটী বাহির কোরে দেখিয়ে আমি বোল্লেম, “একটি ওষুধের মোড়ক আছে, আপনার হাতে দিবার আদেশ।”

    “ওষুধের মোড়ক? আমার জন্য? তোমার তো ভুল হয় নাই?”

    বাবার মুখের ঐ প্রকার কাটা কাটা প্রশ্ন শুনে আমি উত্তর কোল্লেম, “আজ্ঞে না, ভুল হয় নাই। যিনি আমার হাতে দিয়েছেন, তিনি আমারে সব ঠিকানার কথা বোলে দিয়েছেন, আমি ঠিক এসেছি। যিনি দিয়েছেন, তিনি একটী স্ত্রীলোক।

    বাবু তখন পূর্বস্মৃতির প্রসন্নতা লাভ কোরে প্রফলবদনে বোল্লে, “ও— হো হো! বটে, বটে। একটী স্ত্রীলোক আমাকে একটী ঔষধ দিবেন স্বীকার কোরেছিলেন, মনে পোড়েছে!” সেজোবাবু, দক্ষিণ হস্ত বিস্তার কোল্লেন, আমি সেই মোড়কটী তাঁর হস্তে অর্পণ কোল্লেম।

    আর আমার সেখানে অপেক্ষা করা উচিত ছিল কি না, ভাবছিলেম, আমার মুখের দিকে চেয়ে বাবু বোল্লেন, “যিনি তোমার হাতে এই ঔষধের মোড়ক দিয়েছেন, ফিরে গিয়ে তাঁরে তুমি কিছু বোলো না। মোড়কটী যখন তিনি তোমারে দেন, তখন কেহ দেখেছিল, এমন তোমার মনে হয়?”

    কথা হলো দুটী, একটী নিবারণ, আর একটী প্রশ্ন। দুটী কথার উত্তরেই একটি “না” দিয়ে আমি বিদায় হোলেম; বাবু, আর আমারে কোন কথাই বোলেন না।

    সন্ধ্যার পর বাড়ীতে আমি ফিরে এলেম। সন্ধ্যার পূর্বে আমি কোথায় ছিলেম, কেহই আমারে সে কথা জিজ্ঞাসা কোল্লে না; বোধ হয়, কেহই সে সময় আমার তত্ত্ব করে নাই; বড় একটা কৈফিয়তের দায় থেকে নিষ্কৃতি পেলেম। সন্ধ্যার পর নিত্য যেমন হয়ে থাকে, সেই রকমে সময় কাটলো, আহারের সময় রাঙামামী একটু তফাতে দাঁড়িয়ে আমার চক্ষের দিকে চাইলেন, আমিও সেই রকমে চেয়ে ঈষৎ মস্তকসঞ্চালনে সঙ্কেতে সঙ্কেতে তদুত্তর দিলেম। রাঙামামী বুঝলেন, দৌত্যকার্যে আমি কৃতকার্য।

    আহারান্তে বাহিরের ঘরে আমি প্রবেশ কোল্লেম। রামদাস সেইখানে ছিল। অন্যদিন সে সময় কেহ থাকে না, রামদাস সে দিন কেন ছিল, একটু একটু আমি বুঝতে পাল্লেম। ভূত দেখাবার কথা। রামদাস আমার কাছে উপস্থিত থেকে ভুতের খেলা দেখাবে, তাই যেন আমার মনে হলো। রামদাস বোসে ছিল, আমারে দেখে উঠে দাঁড়ালো; চুপি চুপি বোলে, “ভূত যদি দেখতে পাও, গোলমাল কোরো না, কাহাকেও ডেকো না, চুপ্ কোরে শুয়ে থোকো, ভূতেরা তোমাকে কিছুই বোলবে না; যদি গোলমাল কর, হাঙ্গাম বেধে যাবে। শয়ন কর। দুই প্রহরের পূর্বে নিদ্রা যেয়ো না, আমার কথাগুলি মনে রেখো।”

    বেশীদিন আমি আছি, তথাপি রাত্রে আমার শয়নঘরে চাবী পড়ে। আমারে সদুপদেশ দান কোরে, দ্বারে চাবী দিয়ে রামদাস চোলে গেল। আমি শয়ন কোল্লেম। ঘরে আলো থাকলো, দক্ষিণ-বারান্দার দ্বার-গবাক্ষ অনাবৃত।

    রাত্রিকালে রূপসী আসে, যাবার সময় রূপসীই দ্বারে চাবী দিয়ে যায়, এ রাত্রে রামদাস; বোধ হয় উপদেবতার অধিবাস। নিত্য রজনীতেই আমি দুই প্রহর পর্যন্ত জাগি, এক একদিন বেশীও জাগি; সে রজনীতে সে অভ্যাসের ব্যতিক্রম হলো না; জেগেই থাকলেম। একটা কিছু নূতন উপলক্ষ্য পেলে রাত্রিজাগরণের কিছু সুবিধা হয়। নাচতামাসা, খোসগল্প, তাসপাশা নিশা- জাগরণের নির্দোষ সহায়। সে সব সহায় আমার ছিল না; চিন্তা আমার সখী, চিন্তার সঙ্গেই আমার খেলা।

    চিন্তা এলো, রাঙামামী ঔষধ জানেন; একটী গোলাকার মোড়কে ঔষধ পূর্ণ কোরে একটী বাবুর কাছে তিনি পাঠালেন। মোড়কে কেবল কাগজ ছিল, পরীক্ষা কোরে তা আমি জানতে পেরেছি। কাগজ যদি ঔষধ হয়, তবে সে ঔষধ ঠিক্। কাগজে শিরোনাম ছিল না, পত্রিকা বোলে অবধারণ করা সুসাধ্য নয়। একজন পরপুরুষের কাছে একটি কুলবধূর পত্রিকা-প্রেরণ, কথাও কিছু ভাল নয়; তবে কেন তিনি পাঠালেন? পাছে কাহারো মনে এই সন্দেহের উদয় হয়, সেই সন্দেহভঞ্জনের উদ্দেশে নাম দেওয়া হয়েছে ঔষধ। উত্তম ঔষধ। বাস্তবিক কাণ্ডখানা কি, জানতে পারা গেল না। ভবিষ্যতে কোন সূত্রে যদি কিছু জানা যায় ঔষধের পরাক্রমে সেজোবাবু যদি রোগমুক্ত হন, পাঠকমহাশয় জানতে পারবেন।

    রাত্রি দুই প্রহর অতীত। আমার নিদ্রা নাই। ভূতের সঙ্গেও সাক্ষাৎ নাই। রামদাস যে কথা বোলেছিল, সে কথা আমার মনে মনে জাগছিল, আমিও জাগছিলেম, কথাও জাগছিল, কিন্তু কিছুই না; নিত্য রাত্রে শব্দ হয়, সে রাত্রে শব্দ পর্যন্ত স্তব্ধ। আমার শিয়রের কাছে একটা খড়খড়ী, সে খড়খড়ীর পাখীগুলি আমি খুলে রেখেছিলেম। রাত্রি যখন প্রায় তৃতীয় প্রহর, সেই সময় আমার ঘরের ভিতর কেমন একরকম আলো এলো; ভাগ ভাগ করা আলো জ্যোৎস্নারজনী মনে কোল্লেম, চাঁদের আলো, কিন্তু তাও না, বারান্দার দিকে দ্বার গবাক্ষ সমস্তই উন্মুক্ত, খড়খড়ীর পাখীর ফাঁক দিয়ে বিছানায় যদি চাঁদের আলো আসে, অপরাপর দ্বার-পথ দিয়ে ঘরের ভিতর আলো আসাও সম্ভব। সে রকম কিছু দেখা গেল না, কেবল বিছানার উপর ভাগ ভাগ করা আলো। রংমশালের আলোর বর্ণ যেরূপ, সে আলোর সেইরূপ বর্ণ, এলো আর গেল; বিদ্যুতে আলো যেমন আসে আর যায়, ঠিক সেই প্রকার। এ তবে কি? এ তবে কি? এই বুঝি তবে ভূত? বিছানার উপর আমি উঠে বোসলেম, আমি অনেকক্ষণ বারান্দার দিকে চেয়ে থাকলেম, প্রকৃতি যেমন নিস্তব্ধ, ঠিক সেই ভাব, কৌমুদীর যেমন খেলা, ঠিক সেই ভাব। একবার যে আলো আমি দেখলেম, সে আলো আর এলো না, ঘরের ভিতর তো এলোই না, বাহিরেও জ্যোৎস্নার কোলে সেরূপ মিশ্রবর্ণের আলো দেখা গেল না। কোন লোক হয় তো আমার চক্ষে চমক লাগাবার জন্য রংমশাল জেলে আমার মাথার দিকে বারান্দা দিয়ে চোলে গিয়েছিল, আর ফিরে এলো না, তাই আমি মনে কোল্লেম; বৃথা বৃথা সমস্ত রজনী-জাগরণ; প্রায় ঊষাকালে নিদ্রা এসেছিল, প্রভাতেই নিদ্রাভঙ্গ। প্রভাতেই গৃহমধ্যে রামদাসের প্রবেশ। রামদাসের অধরে মৃদু মৃদ হাস্য।

    শয্যার উপর উপবিষ্ট হয়ে রামদাসকে আমি জিজ্ঞাসা কোল্লেম, “এত প্রত্যূষেই তুমি শয্যা ত্যাগ কর?” রামদাসের উত্তর,— “নিত্য আমার এরপ অভ্যাস নয়, তুমি যদি কোন প্রকার বিভীষিকা দর্শন কোরে থাক, তোমার মন যদি চঞ্চল হয়ে থাকে, তাই মনে কোরে সারারাত আমি ঘুমাই নাই; কেমন আছ, শীঘ্র শীঘ্র দেখতে এসেছি। কোন রকম বিভীষিকা কি তুমি দর্শন কোরেছ?”

    আমি উত্তর কোল্লেম, “প্রায় শেষ রাত্রে একটা রংমশালের আলো; আর কিছই নয়। রংমশালের আলোকে বিভীষিকা বলা—”

    ঐটুকু শুনেই রামদাস বোলে উঠলো, “আলো দেখেই বুঝি তবে তুমি চক্ষু বুজে শুয়ে ছিলে আলোর পশ্চাতে পশ্চাতে কি এসেছিল, সেটা দেখতে বুঝি তোমার ভরসা হয় নাই? ঐ রকম হয়। আগে একটা ঐ রকম আলো আসে, তার পশ্চাতে পশ্চাতে— রাম!—রাম!—রাম!—প্রভুরা দেখা দেন! তুমি তাঁদের দেখ নাই, ভালই হয়েছে; ছেলেমানুষ তুমি, একাকী এই ঘরের ভিতর সে সব মূর্তি দেখলে দাঁতকপাটি লেগে মূর্ছা যেতে।”

    হাস্য কোরে আমি বোল্লেম, “মূর্ছা গেলেই তোমাদের কর্তাটি এসে নেশা কোরে বেহুঁস হয়েছে বোলে ভূমিকা জুড়ে দিতেন! জান তো সে কথা? একটা তুচ্ছকথা নিয়ে তিনি আমারে এককালে পশুর অধম কোরে দিয়েছিলেন!”

    “না— না— না” মস্তকের সহিত বারকতক হস্তসঞ্চালন কোরে রামদাস বোলে উঠলো “না— না— না,— অমন কথা বোলো না! কর্তা আমাদের আশুতোষ! কটুবাক্য তাঁর মুখে নাই, সকলকেই তিনি ভালবাসেন, সকল লোকেই তাঁর নাম গায়, তাঁকে তুমি দোষের ভাগী কোরো না। যারা এসেছিল, তারা সেই কথা বোলে গিয়েছে, তুমিও অজ্ঞান ছিলে, কাজে কাজেই—”

    রাত্রিজাগরণের কষ্ট বিস্মৃত হয়ে রামদাসের দুখানি হাত ধোরে উত্তেজিতস্বরে আমি বোল্লেম, “কি বোল্লে, কি বোল্লে? যারা এসেছিল? কারা তারা রামদাস? যারা আমারে এখানে এনে রেখে গিয়েছে, তাদেরই কথা তুমি বোলছো, বেশ আমি বুঝতে পেরেছি। রামদাস! তারা কি রকম লোক? তাদের চেহারা কি রকম?”

    অসাবধানে রামদাসের মুখ থেকে ঐ সত্যকথাটি বেরিয়ে পোড়েছিল, প্রভু যেটি অস্বীকার করেন, ভৃত্য সেইটি প্রকাশ কোরবে, কথা ভাল নয়, অপ্রস্তুত হয়ে রামদাস বোল্লে, “তারা— তারা— অন্ধকার— চেহারা—”

    রামদাসের মনের ভাব আমি বুঝতে পাল্লেম, লোকটা অপ্রতিভ হয়ে গেল, বেশ দেখলেম। কর্তাও একদিন ঐরকম অপ্রতিভ হয়েছিলেন, সে কথাও আমার মনে হলো, আমি থেমে গেলেম। প্রসঙ্গটা ছেড়ে দিয়ে রামদাসকে আমি বোল্লেম, “তুমি আমার কাছে ঐ কথা প্রকাশ কোচ্ছিলে, কাহারও কাছে এ কথা আমি বোলবো না; উপদেবতা দর্শন কোরে আমি মুর্ছিত হব, এমন কখন তুমি ভেবো না। কোন রাত্রে যদি কিছু তুমি দেখতে পাও, আমারে ডেকে নিয়ে দেখিয়ে দিও, আমি গুলী কোরবো।”

    “ও বাবা! কি বুকের পাটা! উপদেবতাকে গুলী করে!” আত্মগত বাক্যে সাতঙ্কে এই কথা বোলতে বোলতে রামদাস অতি দ্রুত সেই ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। আমি ভাবলেম, ভালই হলো। নবীনকালী বিষফলের সরবত খাইয়ে আমারে অজ্ঞান কোরেছিল, তার মালিকেরা সেই অবস্থায় আমারে কুমিল্লার এলাকায় ফেলে দিয়ে গিয়েছিল, প্রথমাবধি সেটা আমি বুঝে আসছি; এ বাড়ীর কর্তা অস্বীকার কোরেছিলেন, নিজের উক্তিতেই একদিন ধরা পোড়েছিলেন, রামদাসও সত্যকথা বোলতে বোলতে সামলে গেল। নবীনকালীর নায়কেরাই আমার এই দুর্দশার কারণ, তাতে আর অণুমাত্র সন্দেহ থাকছে না; কিন্তু এখানে তারা ক-জন এসেছিল, জানবার উপায় নাই; এখন নাই, কিন্তু সব তত্ত্ব যখন প্রকাশ হবে, তখন আর কোন তত্ত্বই গুপ্ত থাকবে না।

    এইগুলি আমার নির্জন ভাবনা। রাঙামামীর ঔষধ-প্রেরণের ভাবনা অপেক্ষাও এই ভাবনাই আমার চিত্তচাঞ্চল্যের পক্ষে অধিক প্রবল।

    আর তিনটি দিবারাত্রি সমভাবে আমি কাটালেম। বাবু জয়শঙ্কর চৌধুরী সপরিবারে গয়াধামে যাত্রা কোল্লেন। সপরিবার অর্থে তিনি আর তাঁর সহধর্মিণী। ভূতের উপদ্রবে সংসারে অমঙ্গল হয়, সংসারের লোকেরাই অকাল-মরণে ভূতত্ব-প্রাপ্ত, গ্রামবাসী লোকেরাও মারীভয়ে গতানু হয়ে ভূতত্ব-প্রাপ্ত, গ্রামস্থ সমস্ত লোকের এই বিশ্বাস। গ্রামের কর্তা জয়শঙ্করবাবু। তিনি সস্ত্রীক গয়াতীর্থে গদাধরের পাদপদ্মে পিণ্ডদান কোল্লে সমস্ত ভূত উদ্ধার হয়ে যাবে, এটিও সে গ্রামের সর্ববাদিসম্মত।

    কর্তাবাবু গয়ায় গেলেন। বড়বাবু ছোটবাবু প্রায় সর্বক্ষণ আমার কাছে বোসে গল্প করেন, আমার পূর্ববৃত্তান্ত জিজ্ঞাসা করেন, আমার দুঃখে দুঃখ প্রকাশ করেন, আমি তবু তাঁদের কাছে জীবনের বেশী কথা ভাঙি না। রামদাস যখনি আসে, তখনি ভূতের কথা কয়। দশদিন পরে ভূতের দফা গয়া হয়ে যাবে, পিণ্ড পেলেই ভূতেরা সব পালাবে, এই কথাই রামদাস বার বার আমারে শোনায়। রূপসী, পাচিকা, রাঙামামী এই তিন জনেও বড় বড় ভূতের গল্প করে।

    দশদিন পরে ভূত থাকবে না, রামদাসের এই কথা। এ দশদিন মানে, অনেক দিন। তখন বাষ্পশকট ছিল না। ত্রিপুরাজেলা থেকে গয়াধামে যাত্রা, অধিক লোকের নামে পিণ্ডদান, কতক দিন তথায় অবস্থান, তৎপরে প্রত্যাগমন, অনেক দিনের কার্য।

    দিন দিন এ বাড়াতে ভূতের উৎপাত বেশী হোতে লাগলো। “আমি কিছুই দেখতে পাই না, কেবল শুনতে পাই। আহা! ভূতগুলির লীলা-খেলা চিরকালের মত ফুরিয়ে যাবে, এই দুঃখে আমার বড় কষ্ট হয়।

    পাঠকমহাশয় বোধ হয় ধৈর্যহারা হোচ্ছেন; একাদিক্রমে বহুক্ষণ এক বিষয়ের নানা কথা শুনে শুনে বোধ হয় বিরক্তিও জন্মাচ্ছে। নিজে আমি যে বিষয়টা মিথ্যা বোলে বুঝতে পাচ্ছি, সে বিষয়ে এত আড়ম্বর কি কারণে, এটাও বোধ হয়, অনেকের মনে উদয় হোচ্ছে। আমার নিবেদন, আর কিয়ৎক্ষণ ধৈর্য ধারণ করুন; উদ্দেশ্য অবশ্যই আছে; সেই উদ্দেশ্যটি প্রকাশ হোলে বিফল বর্ণনা বোলে বোধ হবে না।

    কর্তা গয়াধামে। দুই তিন দিন অতীত। রাত্রিকালে নিত্য যেমন আমি শয়ন কোরে থাকি, সেই রকমে শয়ন কোরে আছি, ঘরের দরজায় দস্তূরমত চাবী বন্ধ আছে, গৃহদীপ নির্বাপিত, দক্ষিণদিকের দ্বার-গবাক্ষ অনাবৃত। রাত্রি কত, ঠিক জানতে পারি নাই; স্মরণ হোচ্ছে, কৃষ্ণপক্ষের সপ্তমী কিম্বা অষ্টমী, তখনো অন্ধকার, একটু পরেই চন্দ্রোদয় হবে, এইরূপ আমি মনে কোচ্ছি। ছাদের উপর নিত্য যেরূপ শব্দ হয়, নৃত্য হয়, হাস্য হয়, এ রাত্রে তখনো পর্যন্ত সেরূপ কোন লক্ষণ জানা গেল না।

    আমার নিদ্রা নাই। উপাধানের উপর মুখে রেখে, শিয়রের খড়খড়ীপথে আমি চেয়ে আছি, বোধ হলো যেন, ফর্শা কাপড়পরা দুই মূর্তি সাঁ কোরে বারান্দা দিয়ে ছুটে গেল। মনের খেয়ালের সঙ্গে নয়নের ভ্রম হয়; আমার বোধ হয় তাই। লোকের মুখে শুনেছিলেম ভূত, মনে মনে ভাবছিলেম ভূত, রাত্রিও অন্ধকার ছিল, কোথাও কিছু নাই, যুগলমূর্তি ছুটে গেল, মনের কল্পনায় সে হয় তো আমার দৃষ্টিভ্রম। যারা ছটে গেল, আর তারা ফিরে এলো না; দৃষ্টির ভ্রমটাই যেন ঠিক দাঁড়ালো। যুগল হস্তে যুগল নয়ন মার্জন কোল্লেম। যে অন্ধকার, সেই অন্ধকার;— ঘরে বাহিরে সমান অন্ধকার। চন্দ্রমা তখনো অদৃশ্য।

    বারান্দাতে ঘন ঘন গম গম শব্দ। ইতিপূর্বে যে দুই মূর্তি দেখেছিলেম,— দেখেছিলেম বোলে জ্ঞান হয়েছিল, সে রকম মূর্তি কিছু দেখা গেল না, কেবল শব্দ। একবার শুনলেম, দুই তিন কণ্ঠমিলিত অস্ফূট হাস্য; বারান্দার দ্বার উন্মুক্ত ছিল, মনে কোল্লে উঠে দেখতে পাত্তেম, কেহ কোথাও আছে কি না,— যারা আমারে সাবধান করে, তারা বলে, “শব্দ শুনে উঠো না, তত্ত্ব জানবার চেষ্টা কোরো না।” সেই কথা মনে কোরে বিছানা থেকে আমি উঠলেম না, শব্দও থামলো না, ঠিক আমার মাথার কাছে শব্দ; এক একবার একটু দূরে যায়, আবার সেইখানে ফিরে আসে; শব্দেরই চলাচল, পদার্থ দৃষ্ট হয় না। ঠিক আমি চেয়ে আছি, দৃষ্টির ভ্রম হোচ্ছে না মনে ভয়ও আসছে না, তত্ত্ব জানবার ইচ্ছাও হোচ্ছে না।

    প্রায় এক ঘণ্টা এই ভাব। আকাশে চন্দ্রোদয়। চন্দ্রালোকে বাহিরের পদার্থগুলি আমার নয়নগোচর হোতে লাগলো, শব্দগুলাও শ্রবণগোচর হোতে লাগলো, সংশয়ে বিস্ময়ে আমি জড়ীভূত।

    কট্ কট্ কোরে চাবী খোলার শব্দ হলো। একজন লোক গৃহমধ্যে প্রবেশ কোল্লে। এই কি ভূত? চাবী খুলে ভূত আসবে কেন? ভূতেরা অগ্নি স্পর্শ করে না, লৌহ স্পর্শ করে না, এরূপ প্রবাদ। চাবী খুলে ভূত আসা অসম্ভব। তবে কি?—কে প্রবেশ কোল্লে? চাঁদের আলো ঘরের ভিতর আসে নাই, প্রবেশকারী ধীরে ধীরে আমার শয্যাপাশে এসে নিকটে একটু হেঁট হয়ে, চুপি চাপি বোল্লে, “জেগে আছ?”

    চক্ষু আমার গবাক্ষের দিকে ছিল, প্রশ্ন শুনে চোমকে উঠে পাশের দিকে চেয়ে দেখলেম, একটি মনুষ্য। স্বর শুনেও বুঝেছিলেন, অল্প অল্প চেহারা দেখেও বুঝলেম রামদাস। বিছানার উপর আমি উঠে বোসলেম; ডেকে ডেকে জিজ্ঞাসা কোল্লেম, “এত রাত্রে এখানে তুমি কি চাও রামদাস?”

    রামদাস চাপি ছাপি বোল্লে, “তোমাকেই চাই। উঠ। যে সব কথা তোমাকে আমরা বলি, তাতে তুমি বিশ্বাস কর না, শব্দ হয় শুনতে পাও, অলৌকিক শব্দ মনে কর; সত্য বটে অলৌকিক, কিন্তু কিছু বিশেষ আছে। উঠে এসো; দেখবে এসো।”

    বিছানা থেকে আমি নামলেন। রামদাস বোলে, “চলো।” মন্ত্রমুগ্ধের ন্যায় দ্বারের দিকে দুই তিন পদ আমি অগ্রসর হোলেম। রামদাস বোল্লে, “ওদিকে নয়।” রামদাসের দিকে মুখ ফিরিয়ে আমি দাঁড়ালেম। দক্ষিণের বারান্দার দিকে অগ্রসর হোতে হোতে পূর্ববৎ চুপি চুপি রামদাস বোল্লে, “সঙ্গে এসো— নিঃশব্দে, কথা কোয়ো না।”

    নিঃশব্দে রামদাসের সঙ্গে সঙ্গে আমি বারান্দায় উপস্থিত হোলেম। পশ্চিমদিকে অঙ্গুলি নির্দেশ কোরে আমার কাণের কাছে রামদাস চুপি চুপি বোল্লে, “ঐ দেখ!”

    স্বরকম্পনে আমি বুঝতে পাল্লেম, আতঙ্ক-মিশ্রিত কণ্ঠস্বর। রামদাস যেন কোন প্রকার ভয় পেয়ে সেই ভয়ের বস্তু আমাকে দেখাবার জন্য সমুৎসুক; আমারে বোল্পে, “ঐ দেখ!” নিজে কিন্তু পশ্চিমদিকে চাইলে না, পূর্বদিকে মুখ ফিরিয়ে থাকলো।

    চন্দ্রদেব তখন আমাদের মশালচির কাজ কোল্লেন। পশ্চিমদিকে আমি চাইলেম। পাঠকমহাশয়ের স্মরণ আছে, সম্মুখ-বারান্দার অর্ধাংশ ভগ্ন, সেই ভগ্নাংশের সর্বশেষে একটা ভগ্নগৃহ, সেই গৃহের সম্মুখভাগে প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড গোটাকতক মুণ্ড, এত প্রকাণ্ড যে, এতেদ্দেশে ঢাকাই জালার যেরূপ প্রসিদ্ধি, সেই প্রসিদ্ধির অনুগত জালার আকারে ভয়ঙ্কর ভয়ঙ্কর মুণ্ড। দুর্গার পদতলের পশুরাজ সিংহের যে প্রকার বর্ণ, মুণ্ডগুলোর বর্ণ সেই প্রকার। নাসিকাও সিংহনাসা সদৃশ। সুন্দরবন অঞ্চলে বনদেবতার পূজায় কালুরায় দক্ষিণরায় নামে বুনোরা যেরূপ বিগ্রহ গঠন করে, সেই সকল বিগ্রহের চক্ষের ন্যায় ভয়ানক ভয়ানক বড় বড় চক্ষু। বন্যবরাহের মূলদন্ত যে প্রকার, সেই সকল মুণ্ডের দন্তপাতি তদ্রূপ বৃহৎ বৃহৎ। সিংহের জটার ন্যায় পিঙ্গলবর্ণ কেশর বৃহৎ বৃহৎ কর্ণের উভয় পার্শ্বে বিলম্বিত। দূর থেকে দর্শন কোল্লে বাস্তবিক অন্তরে দারণ ভয়ের সঞ্চার হয়। মুণ্ডগুলো সারি সারি সংস্থাপিত।

    সেই সকল বিকট মুণ্ড আমি দর্শন কোল্লেম, মনে কোল্লেম, তামাসাস্থলে যারা সং দেখায় তারাই হয় তো অবোধ মানুষকে ভয় দেখাবার জন্য ঐ সব মুণ্ড ঐ ভাবে সাজিয়ে রেখেছে। আমি মনে কোল্লেম ঐ রকম, রামদাস কিন্তু ঘন ঘন কাঁপতে লাগলো, কাঁপতে কাঁপতে বোলে, “আর নয়, আর নয়, আর এখানে থাকা নয়, আমাদের দেখতে পেলেই লাফ দিয়ে ঘাড়ে পোড়ে—”

    রামাদাস ছুটে পালায়, আমি তার একখানা হাত ধোরে ফেল্লেম; অভয় দিয়ে বোল্লেম, “যা তুমি মনে কোচ্ছো, যা তোমরা মনে কর, বাস্তবিক তা নয়। তুমি এত ভয় পাচ্ছো কেন? আমি নিশ্চয় বুঝতে পাচ্ছি, দুষ্টমানুষের ঐ সব খেলা। কোন প্রকার মতলবে দুষ্টেরা ঐ রকম বিভীষিকা দেখায়, সেই চেষ্টাতেই তাদের অভীষ্ট সিদ্ধ হয়। তুমি দাঁড়াও, আমি আরও একটু ভাল কোরে দেখি।”

    আমার হাত ছাড়াবার জন্য ধস্তাধস্তি কোত্তে কোত্তে হাঁপিয়ে হাঁপিয়ে রামদাস বোল্লে, “রাম! রাম! রাম! কুলক্ষণ! বড় কুলক্ষণ! আজকের জন্যই আমি ছিলেম! ভূতের হাতে প্রাণ গেল! তুমি আমাকে ছেড়ে দাও।”

    আমার অপেক্ষা রামদাসের বয়স অনেক বেশী, আমার অপেক্ষা রামদাস কিন্তু দুর্বল; টানাটানি কোরেও রামদাস আমার হাত ছাড়াতে পাল্লে না। পুনর্বার হাঁপিয়ে হাঁপিয়ে বোলতে লাগলো, “তুমি ছেলেমান, কখন ওসব দেখ নাই, সেই জন্যই তোমার অত সাহস! বড় কুলক্ষণ! অমাবস্যার রাত্রে মেঘাড়ম্বর থাকলে, ঐ সব ভয়ানক-মূর্তি দেখা দেয়। জ্যোৎস্না-রাত্রে কখনো আমরা দেখি নাই, না জানি, কপালে আজ কি আছে! তুমি আমাকে ছেড়ে দাও! তুমিও এখান থেকে পালাও! কপালে—”

    আরো জোরে রামদাসের হস্ত ধারণ কোরে আমি তখন বোল্লেম, “কপালে কি আছে, তা আমি বুঝতে পাচ্ছি। তোমার কপালে কি আমার কপালে কিংবা ঐ সকল মুণ্ডর কপালে, কার কপালে কি ঘটে, তাই আজ আমি দেখবো, তোমার বন্দুক আছে?”

    চোমকে উঠে, শঙ্কিতনয়নে আমার মুখপানে চেয়ে রামদাস বোলে উঠলো, “বন্দুক? বন্দুক নিয়ে তুমি কি কোরবে?”—মৃদুস্বরে আমি বোল্লেম, “থাকে যদি, একটি আমারে তুমি এনে দাও। গুলী, বারুদ, সরঞ্জাম, সব যেন ঠিক থাকে। বন্দুক দিয়ে উপদেবতার পূজা কোত্তে হয়; সে পূজা তোমরা জান না, সেই জন্যই ভয় পাও; দেবতারাও সেই জন্য ভয় দেখান। আছে তোমার বন্দুক?”

    অল্পক্ষণ কি চিন্তা কোরে রামদাস বোল্লে, “আমার নাই, তুমি আসবার আগে এই বাড়ীতে দরোয়ান ছিল, সেই দারোয়ানের এক জোড়া গুলীভরা বন্দুক আমার ঘরে আছে; পূজা কোল্লে যদি ভাল হয়, একটা আমি এনে দিতে পারি।”

    “শীঘ্র এনে দাও। পূজা কোল্লে অবশ্যই ভাল হবে। এত ভাল হবে যে, সমস্ত উপদেবতা মুক্তিলাভ কোরে এই রাত্রেই স্বর্গধামে চোলে যাবে! এ কথা যদি আগে তুমি আমারে বোলতে কিম্বা আগে যদি ঐ সকল মূর্তি আমারে তুমি দেখাতে পাত্তে, তা হোলে আর কর্তাকে গয়ায় যেতে হোতো না; ঘরে বোসেই আমি নূতন প্রকার পিণ্ডদান কোরে দেবতাগুলিকে উদ্ধার কোরে দিতেম। দেখ না, এই রাত্রে তাই হবে। দাও তুমি, বন্দুক একটা আমাকে এনে দাও। কর্তা ফিরে আসতে না আসতে ভূতগুলি সব উদ্ধার হয়ে যাবে। দাও তুমি, দারোয়ানের সেই বন্দুক একটি আমাকে এনে দাও।”

    এই সব কথা বোলে রামদাসের হাতখানা আমি ছেড়ে দিলেম। আমার শয়নঘরের ভিতর দিয়ে ছুটে গিয়ে, রামদাস অবিলম্বে একটি দুনলি বন্দুক এনে আমার হাতে দিলে; দিয়েই আমার সন্দিগ্ধস্বরে বোল্লে, “পূজা হবে, ফুল-চন্দন দরকার হবে না?”

    অন্তরে হাস্য কোরে আমি উত্তর দিলেম, “মন্ত্র পাঠ কোল্লেই বন্দুকর গর্ভস্থ উপকরণগুলি ফুল চন্দনের আকার ধারণ করে। পূজা দর্শন কোরে তোমরা এককালে মোহিত হয়ে যাবে।” পূর্বে রামদাসের যতটা কম্প ছিল, আমার পূজার ফলশ্রুতি শ্রবণ কোরে আর তার ততটা কম্প থাকলো না। তারে একটু পশ্চাতে সোরিয়ে রেখে, বন্দুক হস্তে আমি সম্মুখে দাঁড়ালেম। আমার দৃষ্টি সেই সকল মুণ্ডর দিকে। লক্ষ্য একটা প্রকাণ্ড মুণ্ড। বন্দুকটি ভাল কোরে বাগিয়ে ধোরে অতি সাবধানে আমি আওয়াজ কোল্লেম। অব্যবহিত পরেই সেই দিক থেকে ঘেউ ঘেউ ভেউ ভেউ রব সমুত্থিত হলো, একটা মুণ্ড সেইখানে পোড়ে থাকলো, ছড়িভঙ্গ হয়ে সমস্ত মুণ্ড অদৃশ্য! বারুদের ধোঁয়ায় সে দিকটা আচ্ছন্ন।

    রামদাসের মুখে আর বাক্য নাই। বাড়ীর ভিতর থেকে বড়বাবু ছোটবাবু সেই সময় তাড়াতাড়ি বেরিয়ে এলেন; স্ত্রীলোকেরাও অন্যদিক থেকে উঁকি মেরে আতঙ্ক প্রকাশ কোত্তে লাগলেন : “কি হলো, কি হলো” বোলতে বোলতে রাঙামামীও ছাদের উপর থেকে চীৎকার কোত্তে থাকলেন।

    আমি বুঝতে পাল্লেম, যা হবার তাই হলো; রামদাসকে বোল্লেম, “যে দিকে তোমাদের উপদেবতারা মায়া বিস্তার কোচ্ছিলেন, সেই দিকে আমারে তুমি একবার নিয়ে চল।” রামদাস নিরুত্তর। বাবুরা আমারে বার বার নিষেধ কোল্লেন, সে দিকে যাবার পথ নাই, এই কথা বোলে, আমারে নিরস্ত করবার চেষ্টা পেলেন। তাঁদের নিষেধ আমি শুনলেম না। একনলে আওয়াজ হয়েছিল, দ্বিতীয় নল তখন পরিপূর্ণ; বন্দুকটি উপর দিকে তুলে, উপরদিকে চেয়ে তাঁদের সকলকে আমি বোল্লেম, “ভগবান রক্ষাকর্তা, উপদেবতার উপরে সর্বময় দেবতার সম্পূর্ণ কর্তৃত্ব। উপদেবতাগুলি কোথায় গেল, একবার আমি দেখে আসি।”

    যে দিকে সেই সব মণ্ডু ছিল, সেই দিকে অনবরত কুক্করমণ্ডলীর বিভীষণ চীৎকার। বড়বাবু বোল্লেন, “কর্ম” তুমি ভাল কর নাই, উপদেবতার মায়া! মায়াবী দেবতারা কুক্কুরের মত কলরব কোরে আমাদের সংসারকে দেখাচ্ছেন! অবিশ্রান্ত ঘেউ ঘেউ রব। একে উপদেবতা, তাহার উপর তুমি তাঁদের ক্রোধ উৎপাদনের হেতু হয়েছ! আমাদের আর রক্ষা নাই! ওদিকে তুমি যেয়ো না। একান্তই যদি যাবার ইচ্ছা হয়, রাত্রি প্রভাত হোক, প্রভাতে যা ইচ্ছা, তাই তুমি কোরো।”

    রামদাস এই সময় বাবুদের কাছে আমার নামে নালিশ কোল্লে। আমি তার কাছে বন্দুক চেয়ে নিয়েছি, ভূতের মস্তকে আঘাত কোরেছি, ভূতগুলিকে রাগিয়ে দিয়েছি, এই তিন অভিযোগ। বড়বাবু আমারে বিস্তর ভর্ৎসনা কোল্লেন। কিছুতেই আমি সঙ্কল্প ত্যাগ কোল্লেম না। আমাদের পরস্পর কথা কাটাকাটি হোচ্ছে, সেই সময় নীচের সিঁড়ি দিয়ে গম গম শব্দে একটি নতূন বাবুলোক সেই বারান্দায় এসে উপস্থিত হোলেন। বাহিরের লোক। সদর দরজা যেন খোলা ছিল, বাহির থেকেই যেন তিনি এলেন, এইরূপ সকলে বিবেচনা কোল্লে। আমাদেরও তাই ভাবতে হলো। বাবুটিকে আমি দেখলেম। সম্পূর্ণ মুখমণ্ডল দৃষ্টিগোচর হলো না। মাথায় এক পাগড়ী। পাগড়ীর উপর দিয়ে কণ্ঠদেশ পর্যন্ত লম্বা একখানা সবুজ রুমালের পটি বাঁধা। কর্ণ, কপাল, ললাট, সমস্তই ঢাকা; কেবল নাকটি আর চক্ষুদুটি জাগছিল। চিনতে পারা অসম্ভব; কিন্তু চক্ষুঃ দর্শন কোরে আমি এক রকম অনুমান কোল্লেম। আমি কথা কোইলেম না। যিনি এলেন, তিনিও কোন কথা বোল্লেন না। আমার সঙ্কল্প উপদেবতার উপনিবেশনান্তর দর্শন করা। আমার নির্বন্ধতাতিশয্য দর্শন কোরে কেহই আর তখন বাধা দিলেন না, আমি তখন সঙ্গী পেলেম রামদাসকে আর ছোটবাবুকে। উপরেই বারান্দা, উপরেই সেই ভগ্নগৃহ; মধ্যস্থল সংযোগশূন্য। উপর দিয়ে সেই ভগ্নগৃহে গমন করবার উপায় ছিল না। তিনজনে আমরা উপর থেকে নেমে এলেম। রামদাস পূর্বে আমারে বোলেছিল, কোন প্রয়োজন উপস্থিত হোলে, বাঁশের সিঁড়ির সাহায্যে সেই ভগ্নগৃহে আরোহণ কোত্তে হয়। নির্দিষ্ট স্থলে আমরা উপস্থিত হোলেম। ফুট জ্যোৎস্না, বেশ দেখা গেল, দীর্ঘ একটা বাঁশের সিঁড়ি সেই স্থানে আড়ে আড়ে সংরক্ষিত আছে। রামদাস বোল্লে, “এই সিঁড়ি; এরূপ সিঁড়িতে উঠা নামা তোমার অভ্যাস আছে?” আমি উত্তর কোল্লেম, “অভ্যাসের কথা কেন বল : — আবশ্যক হোলে অনভ্যাসকেও অভ্যাসের মধ্যে গণনা কোরে নিতে হয়।”

    ছোটবাবুর আদেশে রামদাস সেই সিঁড়িখানা খাড়া কোরে তুল্লে। আমরা উঠতে আরম্ভ কোল্লেম। অগ্রে ছোটবাবু, মধ্যে আমি, পশ্চাতে রামাদাস। আমার বাম হস্তে বন্দুক; দক্ষিণহস্তে সিঁড়ির বাঁশ ধোরে ধোরে ধীরে ধীরে আমি আরোহণ কোল্লেম। উপর্যুপরি ঘেউ ঘেউ রব। বিরামের অবসরে এক একবার শুনা গেল, কেঁউ, কেঁউ, কেঁউ, কেঁউ!

    কুকুর নিশ্চয়। মানুষ ভূতের বদলে কুকুর ভূত, এটাও একটি আশ্চর্য ব্যাপার বটে। কোনটা আশ্চর্য, কোনটা আশ্চর্য নয় অগ্রে আমি স্থির কোত্তে পাল্লেম না। নিত্য রজনীতে ছাদের উপর যে রকম শব্দ হয়, কুকুরে সে রকম শব্দ কোত্তে পারে না। হাস্য, নৃত্য, হুহুঁঙ্কার, লম্ফনের গুপ গাপ শব্দ, সে সব কাণ্ড কুকুরের নয়। মানুষভূত আর কুকুরভূত দুই দল যদি থাকে, পরীক্ষা করা যাবে।

    আমরা আরোহণ কোল্লেম। ঘেউ ঘেউ রব কোত্তে কোত্তে সেই সকল প্রকাণ্ড মুণ্ড ছুটে ছুটে বেড়াতে লাগলো। চতুষ্পদ জন্তুর যে রকম গতি, মুণ্ডেরও সেইরূপে গতি; মণ্ডের ভিতর কুকুর আছে, বেশ বুঝতে পারা গেল। আর আমার বন্দুকের আওয়াজ করবার আবশ্যক হলো না। রাগী কুকুরেরা সম্মুখের মানুষকে দংশন করে, যে সকল কুকুর আমাদের সম্মুখে, তাদের মুখে মোটা মোটা আবরণ ছিল, সেই সকল আবরণ নরমুণ্ড অথবা সিংহমুণ্ড সদৃশ, সে আবরণ ভেদ কোরে মানুষকে দংশন করা সেই সকল কুকুরের পক্ষে দুঃসাধ্য ছিল। দুঃসাধ্য না বোলে অসাধ্য বলাই ঠিক। সুতরাং কুক্কুরদংশনের আতঙ্ক আমাদের থাকলো না, সে অংশে আমরা নিঃশঙ্ক।

    যে দিকে কেঁউ কেঁউ রব হোচ্ছিল, বন্দুক হতে দ্রুতগতি সেই দিকে আমি অগ্রসর হোলেম; দেখলেম, একটা কুক্কর রক্তাক্ত-কলেবরে ভূমিশায়ী। তার মুখের আবরণমুণ্ড আমার বন্দুকের গুলীতে বিদীর্ণ। সেই কৃত্রিম মুণ্ডটা ভেদ কোরে কুক্কুরের কণ্ঠদেশে গুলী লেগেছে, অনবরত রক্তধারা প্রবাহিত হোচ্ছে, মৃত্যু আসন্ন। থেকে থেকে এক একবার মৃত্যুযন্ত্রণায় কেঁউ কেঁউ রব।

    দেখে আমার বড় দয়া হলো, কষ্টও হলো। ছোটবাবুকে ডেকে সেই কষ্টকর দৃশ্য আমি দেখালেম। তেমন কৰ্ম্ম কখন আমি করি নাই, বিনা দোষে নিরীহ প্রাণীর প্রাণ বিনাশ করা আমার আন্তরিক ইচ্ছার সম্পূর্ণ বিরোধী। ছোটবাবুকে বোল্লেম, একপ্রকার কুহকে পোড়ে এই কার্য আমাকে কোত্তে হয়েছে। সকলেই বলে ভূত; শব্দ শুনেও মনে হয়, কোন প্রকার ভৌতিক কার্য। আজ রাত্রে সেই মুণ্ডগুলো দর্শন কোরে তথ্য জানবার নিমিত্ত আমার আগ্রহ জন্মেছিল, তাতেই বিনা দোষে এই অবলা জন্তুটি আমি বিনাশ কোরেছি। এখন আপনি সন্ধান করুন, এ কার্য কার? কোন ব্যক্তি এইসকল কুকুরের মুখে ভয়ানক ভয়ানক কাষ্ঠের মুখোস সংযুক্ত কোরে ঐ ভাবে সাজিয়ে রেখেছে। বনের কুকুর নয়, পোষা কুকুর, সন্দেহ নাই। কুকুরকে যেমন যেমন শিক্ষা দেওয়া যায়, কুকুরেরা তাই শিক্ষা করে। কুকুরেরা প্রতিপালকের একান্ত বশীভূত হয়। আপনি সন্ধান করুন, কোন ধূর্ত মায়াবী লোক এই সকল কুকুরের প্রতিপালক।”

    ছোটবাবু তখন আমার কথায় মনোযোগ দিলেন না: রামদাসকে বোল্লেন, “সব বুজরুকী বুঝতে পারা যাচ্ছে। এক এক কোরে এই কুকুরগুলিকে তুমি নামিয়ে নিয়ে চল। কার কি মতলব, এই সকল কুকুর কার কাছে ছুটে যায়, সেই ক্রিয়া দেখলে অভিসন্ধি নিরূপণ করা যাবে।”

    রামদাস তৎক্ষণাৎ আজ্ঞাপালন কোল্লে। কুকুরগুলি বেশ শান্ত, বিশেষতঃ পোষা কুকুর, রামদাসের কোলে বেশ স্থির হয়ে থাকলো। রামদাস একে একে সকলগুলিকেই নামিয়ে নিয়ে গেল। যে কুকুরটিকে আমি অগ্রে গুলী কোরেছিলেম, সেটি বাঁচলো না। বাকীগুলি আমার শয়নঘরের বারান্দায় প্রেরিত হলো। কুকুরের মুখোসগুলো সেই ভগ্নগৃহে পোড়ে থাকলো। কাঠের মুখোস; সাদা রং মাখিয়ে ভীষণ আকারে চিত্র করা। লোকে দেখলেই রাত্রিকালে ভূতের মুখ বোলে ভয় পাবে, কোন লোকের পরামর্শে চিত্রকরের সেইরূপ নৈপূণ্যের পরিচয়।

    রামদাসের কার্য সমাপ্ত হবার পর আমরা উভয়ে সেই বাঁশের সিঁড়ি বেয়ে নীচে নেমে এলেম; আমি আর ছোটবাবু।

    যে ঘরে আমি শয়ন করি, সেই ঘরের ভিতরে বাহিরে অনেকগুলি লোক। ভিতরের দিকের বারান্দায় স্ত্রীলোক : ঘরের ভিতর আর বাহিরের বারান্দায় পরুষ। সকলে সেই বাড়ীর লোক নয়, প্রতিবাসী লোকেরাও অনেকে সেই শেষরাত্রে সেইখানে এসে জমা হয়েছেন। আমরা গিয়ে সেইখানে ছোট-খাটো সমারোহ দেখলেম। এ সকল লোক খবর পেয়েছিল কিরূপে? বাড়ীতে তাদৃশ গোলমাল হয় নাই, কেহ চীৎকার করে নাই, কেহ কাহাকেও ডাকে নাই, কেহ কাহাকেও খবর দিতে যায় নাই, তবে কিরূপে এ স্থানে এত লোক একত্রিত হলো? এ প্রশ্নের উত্তর আমি স্বয়ং। ভূতের মুণ্ড লক্ষ্য কোরে আমি গুলী কোরেছিলেম, বন্দুকের আওয়াজ অনেকদূর গিয়েছিল, লোক জমায়েতের কারণ সেই আওয়াজ।

    বাড়ী যখন গুলজার ছিল, বাড়ীর অধিকারীরা যখন শ্রীমন্ত ছিলেন, তখন এই বাড়ীর নাম ছিল, “বাবুদের বাড়ী।” এখন ভগ্নাবস্থা, সকলদিকেই ভগ্নদশা, তথাপি নাম আছে, বাবুদের বাড়ী। যতদিন সেই জায়গায় দুই একখানা ইষ্টক, দুই একখানা কাষ্ঠ বিদ্যমান থাকবে, ততদিন নাম থাকবে, বাবুদের বাড়ী। এ দেশের সর্বত্র ঐ রকম হয়েই থাকে। অত রাত্রে বাবুদের বাড়ীতে বন্দুকের আওয়াজ হয়েছে, হয় তো কি একটা নূতন কাণ্ড উপস্থিত, তাই মনে কোরে প্রতিবাসী লোকেরা সেইখানে জড় হয়েছেন। অনেকেই শুনেছিলেন, বাবুদের বাড়ীতে এখন ভূতেরা বাসা কোরেছে; বাবুদের বাড়ীর নাম এখন ভূতের বাড়ী। আমি যে ভূত শীকার করবার মতলবে বন্দুক ছুড়েছিলেম, সেটা কেহ ভাবেন নাই; এখানে জমা হয়ে সকলেই শুনলেন, সাফ কথা। সকলেই বিস্ময়াপন্ন।

    কুকুরগুলিকে নামিয়ে এনে রামদাস নীচের একটি ঘরে শিকল দিয়ে বেঁধে রেখেছিল। আমার ইঙ্গিতে ছোটবাবুর আদেশে, সেই সময় সেইগুলিকে উপরে আনা হলো। পোষাকুকুর, ক্রীড়া-কৌতুকে সুশিক্ষিত। কার দ্বারা সুশিক্ষিত, সেইটি পরীক্ষা করবার জন্য সর্বাগ্রে আমার অভিলাষ। আমার অভিলাষে কাজ হয় না। চুপি চুপি বড়বাবুকে আমি মনের কথা জানালেম; ছোটবাবুও শুনলেন। যতগুলি পুরুষমানুষ সেখানে ছিল, সারিবন্দী কোরে সকলকে দক্ষিণ বারান্দায় দাঁড় কোরিয়ে দেওয়া হলো। উপদেশমতো রামদাস সেই সময় কুকুরগুলির শিকল ছেড়ে ছিল।

    পশুপ্রভৃতির আশ্চর্য ক্রীড়া। কুকুর সাতটি। যতগুলি লোক সেইখানে দাঁড়িয়ে ছিল, সাতটি কুকুর ক্রমে ক্রমে সকলের সমীপবর্তী হয়ে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ আঘ্রাণ কোল্লে; একে একে সকলের মুখের দিকে চাইলে, শেষকালে একটি লোকের নিকটে গিয়ে, অঙ্গবস্থাদির আঘ্রাণ লয়ে, আহ্লাদে লাঙ্গুল সঞ্চালনপূর্বক অস্ফুট আনন্দধ্বনি কোত্তে কোত্তে সেই লোকটির কন্ধে, বক্ষে, হস্তে ঝাঁপ দিয়ে দিয়ে উঠতে লাগলো। এই রঙ্গ দর্শন কোরে দর্শক লোকেরা স্তম্ভিতভাবে পরস্পর মুখ-চাহাচাহি কোত্তে লাগলো।

    যে লোকটির সঙ্গে কুক্কুরদলের ক্রীড়া, সেই লোকটি অতিদ্রুত উপর থেকে নেমে এসে দক্ষিণদিকে দৌড়িল; দেখতে দেখতে অদেখা হয়ে গেল। ঝন ঝন শব্দে শিকলি বাজিয়ে বাজিয়ে কুকুরেরাও খানিকদূরে সেই লোকের সঙ্গে ছুটেছিল, চার পাঁচজন সঙ্গীসহ রামদাস ধাবিত হয়ে কুকুরগুলিকে ফিরিয়ে আনলে। কুকুরেরা তখন প্রভু-বিরহে অস্থির হয়ে বন্ধনশৃঙ্খল টানাটানি কোত্তে লাগলো : লাফিয়ে লাফিয়ে ঘেউ ঘেউ রব কোত্তে লাগলো : অল্পক্ষণের মধ্যেই আটক পোড়ে গেল। উপস্থিত লোকেরা অল্প অল্প ইতিহাস শ্রবণ কোরে বিস্ময় প্রকাশ কোল্লেন। কুকুরের মুখে ভূতের মুখোস ছিল, সকলের কাছে সেটা আমি প্রকাশ কোল্লেম না; কিন্তু কুকুরগুলির রঙ্গ দেখে সকলেই হাস্য কোল্লেন। হাস্যের কোন হেতু আছে, আমি কিন্তু তেমন কিছু বিবেচনা কোল্লেম না; আমি কেবল ভাবতে লাগলেম, যে লোকটা ছুটে পালালো, সে লোকটা কে? ইতাগ্রে মুখে মাথায় রুমাল বাঁধা যে একটি লোক দর্শন দিয়েছিল, সেই লোক।

    কে সেই লোক, চিনে লওয়া আমার পক্ষে অসাধ্য। বড়লোকেরা যে সকল কুকুর পোষেন, সেই সকল কুকুরের সেবার নিমিত্ত এক এক চাকর নিযুক্ত থাকে; সেই সকল চাকরের উপাধি “ডুবিয়া”। অর্ধবদনাবৃত যে লোকের গাত্রে কুকুরগুলির খেলা, সে লোকের অবয়ব— সে লোকের পরিচ্ছদ ডুবিয়ার মত নয় : ডুবিয়ারা নীচজাতিসম্ভূত : অধিকাংশই মেথর। এখানকার কুকুরেরা যে লোকটিকে প্রভু বোলে চিনেছিল, সে লোকের আকার-প্রকার ভদ্রসন্তানের তুল্য; মেথর বলা যায় না। বস্তুত কুকুরগুলি সেই লোকের বহুদিনের পালিত, শিক্ষিত, বশীভূত, সে পক্ষে আমার কোন সংশয় থাকলো না।

    ঊষাকাল উপস্থিত। ঊষাবায়ু প্রবাহিত, ঊষা-বিহঙ্গের সঙ্গীতে চতুর্দিক কূজনিত। ক্রমশঃ পূর্বদিক পরিষ্কার। বাহিরের লোকেরা রঙ্গ দর্শনে পরিতৃপ্ত হয়ে স্ব স্ব গৃহে ফিরে গেলেন, বাড়ীর স্ত্রীলোকেরা অন্দরে প্রবেশ কোল্লেন, বাবুরা আমারে নিয়ে জেঁকে বোসলেন। নিকটে থাকলো রামদাস।

    কর্তা-গৃহিণী বাড়ীতে নাই। ছেলেবাবুরাই কর্তা। তাঁদের মতানুসারেই আমারে চোলতে হবে। যে যে কথা তাঁরা আমারে জিজ্ঞাসা করেন, সে সব কথার জবাব দিতে হবে, যে যে কার্য তাঁরা আমারে আদেশ করেন, আদেশ পালন কোরে সেই সকল কার্য আমারে নির্বাহ কোত্তে হবে; সেই সকল কার্য নির্বাহে আমি বাধ্য। উপস্থিত ক্ষেত্রে সম্ভবমত সকল কথার উত্তর আমি দিলেম।

    এখন অবধি রাত্রিকালে আর ভূতের উপদ্রব হয় কি না, অগ্রে দেখা হোক, তার পর অপরাপর বিষয়ের নিগূঢ় তত্ত্ব অবধারণ করা যাবে।

    প্রভাতে নিত্যকর্মে সকলেই ব্যাপৃত। মধ্যাহ্নে রামদাসকে নিৰ্জনে পেয়ে সকৌতুকে আমি বোল্লেম, “এই তো রামদাস! এই তো তোমাদের ভূতের বাড়ী! ভূতগুলি তো এখন বাঁধা পোড়ে গেল, কর্তা এখন গয়াধামে কোন ভূতের জন্য পিণ্ডদান করবেন, তা কিছু তুমি অননুমান কোত্তে পার?”

    কিয়ৎক্ষণ ইতস্তত কোরে রামদাস বোল্লে, “কে জানে বাপু ভূতের কথা; ভূতেরাই বোলতে পারে, পিণ্ডির কথা পাড়ালোকেরাই বোলতে পারে; যারা ভূতের পিণ্ড দেয়, তারাই তার মর্ম জানে;  আমি গরীবলোক, সামান্য মানুষ ও সব কথা আমাকে তুমি কিছু জিজ্ঞাসা কোরো না।”

    নিষেধ পেলেম, তথাপি আমি জিজ্ঞাসা কোল্লেম, “আচ্ছা রামদাস, ও সব তো তুমি জান না, ও সব কথা তো তুমি বোলতে পারবে না; আচ্ছা, কিন্তু ছাদের উপর না হয়, হাসি হয়, আরো কত রকম শব্দ হয়, সে সব তো নূতন ভূতের কাণ্ড। যে সকল ভূত এখন ধরা গেল, সে সকল ভূত মানুষের মত নৃত্য, হাস্য, হুহঙ্কার কোত্তে পারে না, এটা নিশ্চয়। তবে সে কি, তা কি তুমি জানো?”

    রামদাস উত্তর কোল্লে, “সবরে মেওয়া ফলে। দুদিন সবুর কর, দেখা যাক, কোন দিকে আর কোন রকম ভৌতিক ক্রিয়া— ভৌতিক উৎপাত ঘটে কি না। তা যদি কিছু না ঘটে, তবেই জানা যাবে, ঐ সকল কুকুর ভূতের—”

    প্রশ্ন এড়াবার মৎলবেই রামদাস ঐ রকম বাজেকথার আড়ম্বর আনছে, সেটা আমি বুঝতে পাল্লেম। সে সব কথা শুনবার আমার ইচ্ছা ছিল না, থামিয়ে দিলেম; অন্য প্রকার প্রশ্ন কোল্লেম, “গয়ায় পিণ্ডিদানের অগ্রে এখানকার উপদ্রব যদি থামে, তা হোলে কর্তা ফিরে এসে আমারে কি বোলবেন? গয়ামাহাত্ম্য অধিক কিম্বা আমার বন্দুকের মাহাত্ম্য অধিক, এই কথা আমি তাঁরে বোলতে পারবো কি না, তুমি রামদাস, তুমি অনেক দিন এই বাড়ীতে আছ, তুমি সে বিষয়ে আমারে কিরূপ পরামর্শ দিতে পার?”

    দ্বারের দিকে চাইতে চাইতে রামদাস ধীরে ধীরে বোল্লে, “সেই কথাই তো আমি বোলছিলেম; এখন অবধি এখানকার উপদ্রব যদি থামে, তা হোলে তোমার বন্দুকের মহিমাই গয়ার মহিমার চেয়ে বড় হবে।”

    রামদাসের মীমাংসা শ্রবণ কোরে আমার মনে একটি কৌতুক জন্মে থাকলো। কর্তার প্রত্যাগমনকাল পর্যন্ত প্রতীক্ষা না কোল্লে, সে কৌতুকের পরিতৃপ্তি সাধিত হবে না, মনে মনে সেটিও আমি বুঝে রাখলেম। নিম্নতলে ঘেউ ঘেউ রবে কুকুর ডেকে উঠলো। রামদাস উঠে দাঁড়ালো; একরকম মুখভঙ্গী কোরে বোল্লে, “ক্ষুধা লেগেছে, পেটের জ্বালায় চীৎকার জুড়েছে, খাবার দিলে খায় না, ক্ষুধা সেটা মানে না, যাই একবার, কৃষ্ণের জীব, অনাহারে মারা যাবে, সংসারের অকল্যাণ হবে।”

    কুকুরের সেবার জন্য রামদাস নেমে গেল। আমি মনে কোল্লেম, কথাও ঠিক, যে লোকের পোষা কুকুর, যে লোকের হাতে আহার করে, সেই লোক সম্মুখে থাকলে আহার করে; যে লোক নিত্য আহার দেয়, তার কাছে ও লাঙ্গুল-সঞ্চালনে আমোদ কোরে আহার করে; পোষা কুকুরের ধর্মই এই। অপরিচিত লোকের হাতে ভক্ষ্য গ্রহণে একজনের পোষা কুকুরের শীঘ্র প্রবৃত্তি হয় না। থাকতে থাকতে রামদাসের যদি পোষ মানে, তা হোলেই ঠিক হবে।

    আমার মনের কথা আমার মনেই থাকলো। কোন দিকে ভ্রূক্ষেপ না কোরে অবিরামে আপন কাম বাজিয়ে সূর্যদেব আপন বিরামস্থানে চোল্লেন, নানা চিন্তায় নিমগ্ন হয়ে একাকী আমি ঘরের মধ্যে বোসে থাকলেম।

    বড়বাবু দর্শন দিলেন। স্ফীতবদনে আমার মস্তক স্পর্শ কোরে বড়বাবু বোল্লেন, “ছেলেমানুষ বটে, কিন্তু তুমি খুব বাহাদুর আছ। যে কাজ তুমি কোরেছ, সে কাজ আমরা পাত্তেম না। কর্তা তোমাকে অবিশ্বাস কোত্তেন, স্বাধীনতা দিতে রাজী ছিলেন না, আজ অবধি আমি তোমাকে কর্তার চক্ষে দর্শন কোরবো না। তীর্থযাত্রার পূর্বে আমাদের দুটি ভাইকেও তিনি বিশেষ কোরে বোলে গিয়েছেন, ‘হরিদাসকে সর্বদা চক্ষে চক্ষে রেখো, একাকী কোথাও যেতে দিও না।’—মানে আমি বুঝেছিলেম, কিন্তু পিতার সে আজ্ঞা আমি পালন কোত্তে পাল্লেম না। তোমাকে আমি স্বাধীনতা দিলেম। এখন অবধি তুমি তোমার ইচ্ছামত কাজ কোত্তে পারবে? কিন্তু আমাদের অজ্ঞাতে বাড়ী ছেড়ে কোথাও যেতে পাবে না।”

    আমি মনে মনে হাস্য কোল্লেম। বড়বাবু শীঘ্র শীঘ্র উঠে গেলেন না, আমারে বেড়াতে যেতেও অনুরোধ কোল্লেন না। দিবাকার্য সমাধা কোরে দিবাকর স্বস্থানে প্রস্থান কোল্লেন। রূপসী এসে আমাদের দিকে চাইতে চাইতে ঘরে একটা বাতী জ্বেলে দিয়ে গেল। একটু পরেই ছোটবাবু সেইখানে এলেন। আকাশের মিহির আস্তাচলে বাড়ীর মিহিরটি উদয়াচলে উপস্থিত। আমরা তিনজনে নানা প্রসঙ্গে কথোপকথন কোচ্ছি, কথায় কথায় ভূতের প্রসঙ্গ এসে পোড়লো। ছোটবাবু বোল্লেন, “ইন্দ্রজাল অনেক রকম দেখা গিয়েছে, এরকম কোথাও দেখি নাই। কুকুরেরা ভূতের খেলা দেখায়, বড়ই আশ্চর্য। আমি একদিন—”

    কি কথা বলা ছোটবাবুর মনে ছিল, শেষ পর্যন্ত শ্রবণ করবার অবসর হলো না, একটি লোক সেই সময় মন্থরগতিতে সেই গৃহমধ্যে প্রবেশ কোল্লেন। পরিচ্ছদে ভদ্রলোক, দৃষ্টি কিছু কুটিল, মস্তকে লম্বা লম্বা চুল, সম্মুখভাগে কুঞ্চিত, চুলের বাবরীতে কাণ দুটি ঢাকা, মাথায় একটি মৌলবীকে তার তাজ, ডানদিকে বক্রভাবে হেলা, এত হেলানো যে, লোকটির ডানকানটি আছে কি না জানা যায় না।

    অভ্যর্থনা কোরে হাসতে হাসতে বড়বাবু বোল্লেন, “আসুন পায়রাবাবু, আসুন; অনেক দিনের পর আজ আপনার দর্শন পেলেম, সংসারের সমস্ত মঙ্গল ত?”

    পায়রাবাবু বোসলেন। বড়বাবুর প্রশ্নের উত্তরে তিনি কত রকম কথা বোল্লেন, আমি সকল কথার অর্থ বুঝলেম না। মন যদি আমার সেই দিকে থাকতো, হয় তো বুঝতে পাত্তেম, কিন্তু মন তখন আমার সে দিকে ছিল না। চক্ষের সঙ্গে মনের মিলন কোরে পায়রাবাবুর চেহারাটি তখন আমি দর্শন কোচ্ছিলেম। চক্ষে অবশ্য পলক ছিল, কিন্তু দৃষ্টি সেই দিকে অবিরাম। দেখছি, লোকটির আপাদমস্তক নিরীক্ষণ কোচ্ছি। মনে একটা নূতন ভাবের আবির্ভাব। পায়রাবাবুর মুখমণ্ডলের প্রতিই আমার নয়নের অধিক আকর্ষণ। অশ্রুপুট দর্শন কোল্লেম, নাসিকা দর্শন কোল্লেম, নেত্রপুট দর্শন কোল্লেম, কেশস্তবক দর্শন কোল্লেম। সুবক্র তাজের উপরে নেত্র স্থির। অনেকদিন পূর্বে কলিকাতার নিকটে একরাত্রে আমি বিদ্যাসুন্দর যাত্রা শ্রবণ কোরেছিলেম। গোপালে উড়ের যাত্রা। সেই যাত্রায় যে লোকটি বর্ধমানের সুন্দরের প্রতিনিধি সেজেছিল, সেই লোকটির মস্তকের তাজ ঠিক ঐ রকমে দক্ষিণে হেলা। যাত্রার সুন্দরকে আমার মনে পোড়লো। সুন্দরের কার্যের সঙ্গে পায়রাবাবুর কার্যের মিলন আছে কি না, ক্ষণকাল তাই আমি ভাবলেম।

    চেয়ে আমি পায়রাবাবুর মুখের দিকে; মনে হলো, মূর্তি যেন আমার চেনা। আর কোথাও দেখেছিলেম কি না, ঠিক স্মরণ কোত্তে পাল্লেম না, কিন্তু এই রুদ্রাক্ষগ্রামেই তাঁরে আমি দেখেছি, এইরূপে যেন অবধারণ কোল্লেম। গ্রামের কোথায় দেখা, সেটি স্মরণ কোত্তেও অধিক বিলম্ব হলো না। গতরাত্রে ভূতের উৎসবের সময় মুখে মাথায় রুমালবাঁধা যে লোকটি ভিড়ের ভিতর দর্শন দিয়েছিলেন, কুকুরেরা যাঁর গায়ে ঝাঁপিয়ে ঝাঁপিয়ে উঠেছিল, সেই লোক। মুখখানি তখন ঢাকা ছিল, নাকটি আর চক্ষুদুটি খোলাছিল। ঠিক চিনতে পারি নাই, একটু একটু সন্দেহ হয়েছিল। আজ এই সময় অনাবৃত মুখমণ্ডল দর্শন কোরে সেই সন্দেহভঞ্জন হয়ে গেল। সত্যই বড়বাবুর পায়রাবাবুটি সেই লোক। আমি যেমন স্থির কোল্লেম সেই লোক, বড়বাবু আর ছোটবাবু সে রকম স্থির কোত্তে পাল্লেন কি না, লক্ষণ দর্শনে তেমনটি নিশ্চয় কোত্তে আমি অক্ষম হোলেম।

    মুখ ঢাকা দেখেছিলেম, খোলামুখ দেখলেম, মনে মনে চিনতে পাল্লেম। কেবল তাও নয়, আর কোথায় দেখেছি। মনে মনেই তর্ক, মনে মনেই নিশ্চয়। নদীতীরের আম্রবৃক্ষতলে একটি সেজোবাবু আমি দেখেছিলেম। রাঙামামীর প্রেরিত দূতস্বরূপ যাঁর হস্তে আমি সেই ঔষধের মোড়ক সমর্পণ কোরেছিলেম, ইনিই সেই সেজোবাবু। সাক্ষী আমার চক্ষু, আর আমার মানসিক স্মৃতি। এই পায়রাবাবুই সেই সেজোবাবু।

    কথা কিছু ভাঙলেম না। পায়রাবাবু মধ্যে মধ্যে আমার দিকে কটাক্ষপাত কোচ্ছিলেন, কটাক্ষপাতে আমিও তাঁর সেই কটাক্ষ দর্শন কোচ্ছিলেম। বস্তুতঃ তাঁর দর্শন আর আমার দর্শনের ভাব স্বতন্ত্র। ভূতের গল্প আরম্ভ হলো। সেই সময় আমি দেখলেম, প্রবেশকালাবধি এতক্ষণ পর্যন্ত পায়রাবাবুর মুখের ভাব যে প্রকার ছিল, সে ভাবের সম্পূর্ণ পরিবর্তন। কোন প্রসঙ্গ শ্রবণের ইচ্ছা না থাকলে শ্রোতা যেমন ক্ষণে ক্ষণে অন্যমনস্ক হয়, কোন পুরাতন বৃত্তান্ত আপন কৃতকার্যের ন্যায় ভেবে নিয়ে সে যেমন ম্রিয়মাণ হয়, চাঞ্চল্যের হেতু উপস্থিত না থাকলেও সে যেমন ক্ষণে ক্ষণে চঞ্চল হয়ে অন্যদিকে দৃষ্টি ফিরায় কিম্বা পলায়নের পন্থা দেখে, মিহিরচাঁদের মুখে ভূতের গল্পের ভূমিকা শুনেই পায়রাবাবুর বাহ্যভাব সেই প্রকার। ভাবটা আমি বিশেষরূপে লক্ষ্য কোল্লেম। কি আমি লক্ষ্য কোচ্ছি, পায়রাবাবু হয় তো ঠিক সেটা অনুভব কোত্তে পাল্লেন না। অল্পক্ষণ পরেই অত্যন্ত চঞ্চল হয়ে তিনি উঠে দাঁড়ালেন; বড়বাবুর দিকে চেয়ে গদগদবচনে বোল্লেন, “রাত্রি হয়, স্থানান্তরে আমার আজ একটা কাজ আছে; এখন আমি চোল্লেম, অবকাশমতো আর একদিন এসে সকল কথা শুনবো।”

    পায়রাবাবু দরজা পর্যন্ত অগ্রসর হোলেন।

    ‘যাও কিম্বা থাকো’, বড়বাবু এই দুটি কথার একটি কথাও বোল্লেন না। বারান্দা পার হয়ে সিঁড়িতে নামছেন, সেই সময় ছোটবাবুর কানে কানে চুপি চুপি গুটিকতক কথা আমি বোল্লেম। শশব্যস্তে গাত্রোত্থান কোরে, ছোটবাবু বারান্দায় বেরিয়ে পশ্চাতে ডাকলেন;— ডেকে ডেকে বোল্লেন, “পায়রাবাবু! পায়রাবাবু! চোল্লেন আপনি? একটু দাঁড়ান; আপনার কুকুরগুলি নিয়ে যান।”

    ছোটবাবুর সঙ্গে আমিও বারান্দা পর্যন্ত গিয়েছিলেম, পশ্চাতেই দাঁড়িয়ে ছিলেম, দেখলেম, পায়রাবাবু নামতে নামতে মুখ ফিরিয়ে যেন কতই বিস্ময়ে বোলে উঠলেন, “আমার কুকুর? কে বলে এমন কথা? কোথাকার কুকুর? কার কুকুর? আমি ত— আমি—”

    উপযুক্ত অবসরে ছোটবাবুর কর্ণে আমি আর এক মন্ত্র ঝাড়লেম। পায়রাকে সম্বোধন কোরে ছোটবাবু শীঘ্র শীঘ্র বোল্লেন, “আপনি একবার উপরে আসুন, আপনার একটি কার্য বাকী আছে, দাদা আপনাকে ডাকছেন।”

    পায়রাবাবুর মুখের কথা ওষ্ঠাগ্রেই বিলীন হয়ে গিয়েছিল, ছোটবাবুর বাক্যাবসানে তিনি কিয়ৎক্ষণ সিঁড়ির উপর স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকলেন; নেত্রদ্বয় কিয়ৎক্ষণ উপরদিকে বিকসিত হয়ে থাকলো, তার পর ধীরে ধীরে তিনি উপরে এসে উঠলেন, গৃহমধ্যে প্রবেশ কোল্লেন, ছোটবাবু তাঁর সঙ্গে থাকলেন, আমি নীচে নেমে এলেম। পাঁচ সাত মিনিট পরেই আবার আমি বাবুদের মজলীসে গিয়ে আসনগ্রহণ কোল্লেম।

    যে সময়টকু আমি গরহাজির ছিলেম, সেই সময়ের মধ্যে পায়রাবাবুর সঙ্গে বাবুদের কিরূপ কথাবার্তা হয়েছিল, তা আমি জানতে পাল্লেম না। আমি হাজির হবার পর বড়বাবু জিজ্ঞাসা কোল্লেন, “আচ্ছা, পায়রাবাবু, আপনি বোলছেন, কুকুর আপনার নয়, কিন্তু আমি শুনেছি, কুকুরপোষা আপনার ভারী সখ; কুকুর স্বভাবতই প্রভুভক্ত, সেই ভক্তির উপর আপনি আরও অধিক ভক্তিসংযোগ কোরে কুকুরগুলিকে অধিক ভক্ত—অধিক বশীভূত কোরে তুলতে পারেন, সে বিষয়ে আপনার অতুল ক্ষমতা। যে কুকুরগুলি আমার এখানে আছে, সেগুলি যদি—”

    ঝুমুর ঝুমুর শব্দে শৃঙ্খলবাদন কোত্তে কোত্তে সাতটি কুকুর সেইখানে উপস্থিত হলো। আমাদের কাহারো মুখে বাক্য থাকলো না। কুকুরেরা সানন্দ-গুঞ্জনে লম্ফে ঝম্ফে দ্রুত ধাবিত হয়ে পায়রাবাবুর গায়ে মাথায় আরোহণ কোত্তে লাগলো। সেই ক্রীড়া দর্শনে বড়বাবু ছোটবাবু উভয়ে বিস্ময়াপন্ন, আমি কিন্তু কিছুমাত্র বিস্মিত হোলেম না। গত রাত্রে বহুরূপীর মত ছদ্মবেশে এই পায়রাবাবু এইখানে উপস্থিত ছিলেন, কুকুরেরা গত রাত্রে এই মূর্তির নিকটে এইরূপ অভিনয় কোরেছিল, আমি সেটি জানতে পেরেছিলেম, সেই কারণেই আমার মনে, বিস্ময়ের উদয় হলো না। আজ রাত্রে আবার সেই প্রকার অভিনয়ে আমি নিজেই এই অভিনয়ের সূত্রধার।

    সিঁড়ির পথে ছোটবাবুর আহ্বানে পায়রাবাবু যখন দ্বিতীয়বার উপরে উঠে আসেন, সেই সময় আমি একবার নীচে গিয়েছিলেম; রামদাসকে ক্ষেত্রকর্মের পরামর্শ দিয়াছিলেম। সেই পরামর্শের ফলে কুকুরের প্রবেশ। কুকুরের অভিনয়; সতেরাং আমিই এই অভিনয়ের সূত্রধার।

    পায়রাবাবু অস্থির। লোকটির মনে স্পষ্ট আঘাত লাগে, এমন কোন বাক্য উচ্চারণ না কোরেই হাসতে হাসতে বড়বাবু বোল্লেন, “বাঃ! আপনি তো কুকুরবশের উত্তম বশীকরণ জানেন; আপনাকে দেখলেই সব কুকুর আনন্দে নৃত্য করে, গায়ে উঠে খেলা করে। আশ্চর্য ক্ষমতা আপনার। আপনি বোলছিলেন। আপনার কুকুর নাই, আপনার কুকুর নয় সে কথায় অবিশ্বাস করা যায় না, কিন্তু এই কুকুরগুলো আপনি নিয়ে যান। একবার আপনাকে দেখেই এরা পোষ মেনেছে, আপনাকে দেখেই সুখী হয়েছে; আপনার কাছে এরা ভাল থাকবে, আপনি নিয়ে যান।”

    আমতা আমতা কোরে পায়রাবাবু বোল্লেন, “আমি?— আমি?— আমি কেন? আমি কেন?— এ সব কুকুর আমি—” এইরূপ অসম্বন্ধ কথা বোলতে বোলতে হাত ছুড়ে ছুড়ে গায়ের কুকুরগুলিকে তিনি তাড়িয়ে দিবার চেষ্টা কোল্লেন, দূর দূর বোলে ধমক দিলেন, কুকুরেরা সে ধমক মানলে না, শুনলে না, গ্রাহ্যই কোল্লে না; যতই তিনি ফেলে ফেলে দেন, নূতন খেলা মনে কোরে কুকুরেরা ততই আহ্লাদে লাঙ্গুল সঞ্চালন কোরে ঝাঁপিয়ে ঝাঁপিয়ে বার বার তাঁর গায়ে উঠে।

    টাকা যদি মেকী হয়, সে টাকার গায়ে অনেক রকম নিশানা থাকে, মানুষের কপটতারও নিশানা অনেক। কপট বিরক্তি দেখিয়ে পায়রাবাবু সেই কুকুরগুলিকে চপেটাঘাত মুষ্ট্যাঘাত উপহার দিতে আরম্ভ কোল্লেন : মুখে বোলতে লাগলেন, “এ কি উৎপাত! কোথাকার উপসর্গ! কোথাকার কুকুর এ সব! কেন আমাকে— কেন আপনারা— কেন আমি কুকুর নিয়ে—”

    শীকারের গন্ধ পেয়ে বিড়াল যেমন চুপি চুপি ছলী পেতে আসে, সেই রকম ছলী পেতে পেতে রামদাস সেইখানে এসে উপস্থিত। দরজার বাহিরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে রামদাস সেই মজলীসের বাগবিতণ্ডা শ্রবণ কোরেছিল, মধ্যবর্তী হয়ে পায়রাকে বোলতে লাগলো, “কেন মশাই অমন কর? কেন মশাই না না কর? নিয়ে যাও মশাই, নিয়ে যাও, কেন আমাদের মাথার উপর জীবহত্যা- পাপের বোঝাটা চাপিয়ে দিতে চাও? খাবার দিলে খায় না, ভেঁউ ভেঁউ কোরে কাঁদে, দু দিন থাকলে ঠায় মারা যাবে, কৃষ্ণের জীব, কে কোথায় অনাহারে বাঁচে? কেন আপনি আমাদের অতগুলো জীবহত্যার ভাগী কর। এখানে থাকলে ওরা বাঁচবে না; নিয়ে যাও।”

    কাহারো কোন কথাই পায়রাবাবু শুনলেন না; গায়ের উপর থেকে কুকুরগুলিকে ঝেড়ে ঝেড়ে ফেলে দিয়ে মুখ ভারী কোরে উঠে সটান চঞ্চলচরণে এককালে বাহিরের রাস্তায় উপস্থিত হয়েই ছুট! বড়বাবু, ছোটবাবু আর আমি তিনজনেই বাহিরের বারান্দায় দাঁড়িয়ে পায়রাবাবুর ছুটের ঘটা দেখলেম; তিনজনেই হাস্য কোল্লেম; তিনজনেই রামদাসের প্রতি ইঙ্গিত কোরে যথাকর্তব্য আদেশ দিলেন। রামদাস তৎক্ষণাৎ সে কুকুরগুলির গলার শিকলগুলি খুলে নিয়ে সদরদরজায় বাহির কোরে দিয়ে দরজা বন্ধ কোরে দিলে। বন্ধ করবারও আবশ্যক ছিল না, দরজা খোলা থাকলেও কুকুরেরা বাড়ীর ভিতর ফিরে আসতো না। রাস্তার ধূলা আঘ্রাণ কোত্তে কোত্তে ঘোড়দৌড়ের ঘোড়ার মত ছুটে ছুটে তারা সেই পলায়িত মনিবের পথানুসরণ কোল্লে; দেখতে দেখতে অদৃশ্য হয়ে গেল। এইখানেই এ নাটকের যবনিকা-পতন।

  • নবম কল্প : দারণ কলঙ্ক—কলঙ্কভঞ্জন

    নবম কল্প : দারণ কলঙ্ক—কলঙ্কভঞ্জন

    ভূবনচন্দ্র মুখোপাধ্যায়

    [book-name]

    নবম কল্প : দারণ কলঙ্ক—কলঙ্কভঞ্জন

    সপ্তাহ অতীত। এই সপ্তাহের মধ্যে একরাত্রেও ভূতের নৃত্য, ভূতের হুঙ্কার, ভূতের কুন্দন, ইত্যাকার কোন অদ্ভুত শব্দই শ্রুতিগোচর হয় নাই। কেবল আমার নিজের কথা বোলছি না, বাড়ীর কেহই কিছু শ্রবণ করেন নাই। অষ্টম দিবসে প্রাতঃকালে বড়বাবু প্রফুল্লবদনে আমার শয়নগৃহে প্রবেশ কোরে আমারে বাহাদুরী দিয়ে বোল্লে, “হরিদাস, তুমি বীরপুরুষ, যুদ্ধক্ষেত্রের বীরপুরুষের হস্তপদবিশিষ্ট সজীব মানুষের সঙ্গে যুদ্ধ করেন, সে যুদ্ধে জয়-পরাজয় উভয়ই আছে। তুমি ভূতের সঙ্গে যুদ্ধ কোরেছ, তোমার প্রতাপে ভূতেরা পরাজিত হয়ে পলায়ন কোরেছে। যথার্থই তুমি বীরপুরুষ! এখন অবধি আমি তোমাকে সহোদর তুল্য বিবেচনা কোরবো, তোমার পরামর্শ মতই কার্য কোরবো। লোকে যেমন নিরুপদ্রবে মনের সুখে নিজ বাড়ীতে বাস করে, এখন অবধি তুমি সেইরূপে মনের সাথে এই বাড়ীতে বাস কর। কর্তা ফিরে এসে যদি কোন বিরুদ্ধে কথা বলেন, আমি তাঁকে তোমার গুণের কথা বোলে ঠাণ্ডা কোরে রাখবো।”

    বাহাদুরী পেলেম; বীরপুরুষ হোলেম; কর্তা আমাদের সুনয়নে দেখবেন, সেরূপ আশ্বাসও পেলেম, কিন্তু একটি কথাও আমার ভাল লাগলো না। সে বাড়ীতে কি একটা যে গুপ্তকাণ্ড আছে, অনুমানে সেইটি চিন্তা কোরে আমি নীরব হয়ে থাকলেম; অকৃতজ্ঞ হোলেম না, মৌনভাবে দুইহাত তুলে বড়বাবুকে নমস্কার কোল্লেম।

    রামদাস আসে যায়, কত রকমের কত কথা কয়, রূপসী আসে যায়, অভ্যাসমত আপন মনে পাঁচ রকমের গল্প করে, যাবার সময় এক একবার আঁখি ঠেরে চোলে যায়। ছোটবাবু আসেন যান, আমার সঙ্গে বেশ আত্মীয়তা দেখান, এক একদিন আমারে সঙ্গে নিয়ে গ্রামের এক একদিক্ দেখিয়ে আনেন, এই রকমে দিন যায়। বড়বাবুর মুখে সেই উপদেবতার কথা ভিন্ন আর অন্যকথা প্রায়ই শুনতে পাই না; গতকথা নিয়ে অত আলোচনা কেন তাঁর, সেটাও ঠিক বুঝতে পারি না।

    আর এক সপ্তাহ অতীত। একদিন বৈকালে ছোটবাবুর সঙ্গে আমি একটি সরোবরতীরে ভ্রমণ কোচ্ছি, গুটিকতক হংস-হংসী সেই সরসীজলে খেলা কোরে বেড়াচ্ছে, দেখে দেখে মনে আমার একটা ভাব উদয় হলো। ছোটবাবুকে আমি জিজ্ঞাসা কোল্লেম, “আপনাদের গ্রামে পায়রাবাবু আছেন, মানুষের আকার ধারণ কোরে পায়রাবাবু সংসারধামে ক্রীড়া করেন, এই সকল হংসের মধ্যে কোন হংস নরমমূর্তি ধারণ কোরে হংসবাবু কেন হয় না; প্রণয়-সংসারে আমি সংসারী নই, বাস্তবিক প্রণয়পদার্থটি যে কি, তাও আমি বুঝি না। এ সংসারে বিহঙ্গকুলে হংস-হংসী আর কপোত-কপোতী বিমল প্রেমের দৃষ্টান্তে প্রসিদ্ধ পায়রাবাবুর ক্রীড়া দর্শনে একটি হংসবাবুর ক্রীড়া দর্শন কোত্তে আমার অভিলাষ হয়; হংসের বাক্যশ্রবণে কৌতূহল জন্মে। তার কি কোনরূপ উপায় হোতে পারে না?”

    ছোটবাবু বোল্লেন, “তোমার কথা আমি বুঝতে পাল্লেম না, হংসের বাক্য-শ্রবণে কৌতূহল, সে কৌতূহলের অর্থ কি? হংসেরা কি কথা কয়? সৃষ্টি কালাবধি হংসের মুখে কেহ কখন বাক্য শ্রবণ করে নাই।”

    সমান আগ্রহে তৎক্ষণাৎ আমি বোল্লেম, “কেহ কখন শ্রবণ না কোল্লে আমার মনে সে ভাবের উদয় হোতো না। শ্রীহর্ষ দেবের হংসের মুখে নলরাজা কথা শুনেছিলেন, দয়মতীদেবীও হংসমুখে পরিণয়-সম্বন্ধ শ্রবণ কোরেছিলেন, প্রণয়-বিজ্ঞানে অনভিজ্ঞ থাকলে আমি কেন হংসবাক্য শুনতে পাব না, তাই আমি ভাবি; বিশেষতঃ পায়রা যখন নরাকার ধারণ করে, তখন হংস অপারগ থাকে কেন? আচ্ছা, ছোটবাবু, সেই পায়রাবাবুটি আপনাদের গ্রামে কতদিন আছেন? এখানে তাঁদের কয়পুরুষের বাস?”

    খানিকক্ষণ বিস্মিতনেত্রে আমার মুখের দিকে চেয়ে থেকে কিঞ্চিৎ সঙ্কুচিতস্বরে ছোটবাবু বোল্লেন, “বংশাবলীর তত্ত্ব তুমি জানতে চাও? বেশী দিনের খবর আমি বোলতে পারবো না, পায়রাবাবুর পিত্রালয় এই গ্রামে বটে, কিন্তু এ গ্রামে পায়রাবাবুর জন্ম হয় নাই; মাতামহালয়ে জন্ম, মাতামহালয়েই তিনি প্রতিপালিত। জন্মাবধি এ গ্রামে তিনি আসেন নাই, সম্প্রতি এসেছেন। তাঁর প্রকৃত নামটি কি, তাও আমরা জানি না। কথা কবার সময় তাঁর গলাটি একটু ফুলে ফুলে উঠে, বক বকম, বক বকম শব্দের ন্যায় এক রকম ঘড় ঘড় শব্দ হয়, সেই জন্য দাদা রসিকতা কোরে তাঁর নাম দিয়েছেন ‘পায়রাবাবু’। দেখাদেখি— দাদার মুখে শুনে শুনে, গ্রামের পাঁচজনেও বলে পায়রাবাবু।”

    কথা শুনলেম, কি আমি ভাবলেম, আর একটি কথা জিজ্ঞাসা করবার ইচ্ছা হলো। জ্বলন্ত আগ্রহে, জ্বলন্ত কৌতুহলে আমি জিজ্ঞাসা কোল্লেম, “কোথায় পায়রাবাবুর মাতামহালয়?”— ছোটবাবু বোল্লেন, “বীরভূমজেলা।”

    আমার সর্বশরীর কেঁপে উঠলো। আর তখন ছোটবাবুর দিকে ভাল কোরে আমি চাইতে পাল্লেম না। বিস্ময়ের বিকাস হোলে মানুষের নয়নের দীপ্তি কেমন একপ্রকার দাঁড়ায়; বীরভূম জেলার নাম শ্রবণে আমার মনে এক মহাবিস্ময়ের উদয় হয়েছিল। সে সময় আমার চক্ষু দর্শন কোরে ছোটবাবু যদি কোন প্রকার বিস্ময়লক্ষণ বুঝতে পারেন, ভাল হবে না, সেই জন্যই ছোটবাবুর দিকে ভাল কোরে চাইতে পাল্লেম না; মাথা হেঁট কোরে মনে মনে বোল্লেম, “যা ভেবেছি, তাই, সেই লোক না হোলে এতদূর ধড়ীবাজী আর কার মাথায় যোগায়?”

    কি ভাব আমার মনে উদয়, নয়নে আমার কোন ভাবের বিকাস, ছোটবাবু সেটি অনুভব কোল্লেন না, আমার চক্ষের দিকেও চেয়ে দেখলেন না, হঠাৎ আমারে জিজ্ঞাসা কোল্লেন, “পায়রাবাবুর বংশপরিচয় জানতে তোমার এত আগ্রহ কেন?”

    বিভ্রাট! আগ্রহের হেতুবাদটা কি জানাই? অল্পক্ষণ চিন্তা কোরে একট উদাসীনভাবে আমি বোল্লেম, “এমন কিছু আগ্রহ নয়, বিশেষ কোন হেতুও নাই, তবে কি না, পায়রাবাবু একটি পাকালোক, কুকুর বশীভূত করবার বিশেষ ক্ষমতা তিনি ধরেন, কুকুরেরাও তাঁর সঙ্গে বেশ খেলা করে। পুরুষানুক্রমে কুকুরপোষার সখ না থাকলে এতটা দক্ষতা জন্মে না, এইজন্য আমি জিজ্ঞাসা কোরেছিলেম, এ গ্রামে তাঁর কয় পুরুষের বাস? জিজ্ঞাসা করবার আর কোন কারণ ছিল না।”

    আসল কথা আমি গোপন রাখলেম। কথাটা আমি উলটে নিলেম, ছোটবাবু কিন্তু ধোত্তে পাল্লেন না; ধরবার কোন সম্ভাবনাও ছিল না, আমার সংক্ষিপ্ত উত্তর শ্রবণ কোরেই তিনি সন্তুষ্ট হোলেন। বেলাও শেষ হয়ে এলো, বাড়ীতে আমরা ফিরে এলেম।

    সেই রাত্রে আর এক অভিনব কাণ্ড। রাত্রিকালে আমার আহারের পর প্রথম প্রথম ঘরের দরজায় চাবী বন্ধ হতো, এখন বড়বাবু আমার প্রতি সদয়, এখন আর চাবী বন্ধ হয় না। অন্দরেই আমি আহার করি, সামান্য সামান্য দুই একটা কাজের অছিলায় রূপসী আমার শয়ন-ঘরে আসে; নিত্য যেমন আসে, যে রাত্রের কথা আমি বোলছি, সে রাত্রেও সেইরূপ এসেছিল, রাত্রি দশটার পূর্বেই আবার চোলে গিয়েছিল। তার পর, রাত্রি যখন অনেক, বাড়ীর সকলে যখন নিদ্রাগত, সেই সময় রূপসী আবার চুপি চুপি দরজা ঠেলে, টিপি টিপি ঘরের ভিতর প্রবেশ কোল্লে, নিঃশব্দে দরজাটা ভেজিয়ে দিলে। আমি তখনো ঘুমাই নাই। যে রাত্রে কিছু বেশী চিন্তা থাকে কিম্বা কোন প্রকার নূতন চিন্তা উপস্থিত হয়, সে রাত্রে অনেকক্ষণ পর্যন্ত আমার ঘুম হয় না। আমি জেগেই ছিলেম; যা যা হোচ্ছে, ঘরে তখনো আলো ছিল, বেশ আমি দেখতে পাচ্ছি। রূপসী আমার বিছানার কাছে এসে দাঁড়ালো। কি করে, কি মতলব, জানবার জন্য কপটে সেই সময় আমি নয়ন মুদিত কোল্লেম; অনুমানে বুঝলেম, রূপসী আমার বিছানার উপর বোসলো। কিছু‍ই আমি বোল্লেম না, চক্ষু খুলে একবার চাইলেমও না। রূপসী ক্ষণকাল নিশ্চেষ্ট; তার পর ধীরে ধীরে একবার আমার বাহুমূল স্পর্শ কোল্লে, ধীরে ধীরে নাড়া দিলে, আমি জোরে জোরে নিশ্বাস ফেলতে লাগলেম, অঙ্গসঞ্চালন কোল্লেম না; কি ভেবে রূপসী তখন আমার হাত থেকে আপনার হাতখানা একবার সোরিয়ে নিলে, কিন্তু উঠলো না। ক্ষণকাল চুপ। আবার সেই রকম অঙ্গস্পর্শ।

    কোন প্রকার স্বপ্ন দর্শন কোরে কিম্বা ঘুমের ঘোরে কোন প্রকার শব্দ শ্রবণ কোরে মানুষ যেমন হঠাৎ শঙ্কিত-ভাবে জেগে উঠে, ভাণ কোরে সেই রকম ভাব দেখিয়ে, আমি সেই সময় একবার নয়ন উম্মীলন কোল্লেম; কেবল নেত্রোন্মীলন মাত্র নয়, চমকিতভাবে বিছানার উপর উঠে বোসলেম। কাঁচা ঘুমে আশু জাগরিত লোকে সম্মুখস্থ ব্যক্তিকে যেরূপ চমকিতভাবে ত্বরিত প্রশ্ন করে রূপসীকে সম্মুখে দেখে সেই ভাবে আমি ত্বরিত প্রশ্ন কোল্লেম, “রূপসি! এত রাত্রে তুমি এখানে কি জন্য?”

    শয্যা পরিত্যাগ না কোরেই দিব্য সপ্রতিভ ভঙ্গীতে একটু মৃদুস্বরে রূপসী উত্তর কোল্লে, “আমি তোমারে একটি কথা জিজ্ঞাসা কোত্তে এসেছি। সন্ধ্যার পর যখন এসেছিলেম, তখন মনে ছিল না, সেইজন্য আবার এসেছি।”

    সহসা আমার অন্তরে বিষম সন্দেহের সঞ্চার। সংশয়াকুললোচনে কিঙ্করীর মুখখানে চেয়ে আমি বোল্লেম “জিজ্ঞাসা করবার আর কি তুমি সময় পাও নাই? যখনি ইচ্ছা, তখনি আসছো, যতবার ইচ্ছা ততবার আসছো, একটা কথা জিজ্ঞাসা করবার আর কি সময় হয় না?”

    রূপসী।— সময় হয়, কিন্তু নির্জন হয় না। কথাটা নির্জনে জিজ্ঞাসা করবারই কথা। রোজ রোজ মনে করি, জিজ্ঞাসা কোরবো, এক একদিন ভুলে যাই, এক একদিন কেহ না কেহ এখানে উপস্থিত থাকে, অবসর পাই না।

    আমি।— বুঝলেম, বুঝলেম, আবশ্যকটা বুঝলেম, আচ্ছা, আচ্ছা, বল দেখি, এত রাত্রে কি তোমার জিজ্ঞাসা?

    রূপসী।— জিজ্ঞাসা— জিজ্ঞাসা— জিজ্ঞাসা—

    আমি।— (কিঞ্চিৎ উত্তেজিত-স্বরে) এত রাত্রে ঘুম ভাঙিয়ে বোলতে বোলতে আবার থামা মারো কেন? ঘোরফের আমি বুঝি না কথাটা কি, খোলসা কোরেই বল? কি তুমি জিজ্ঞাসা কোত্তে চাও?

    রূপসী।— কথা? চাই? একটি কথা; বেশী এমন কিছুই না, কেবল একটি মাত্র কথা। তুমি যদি—

    আমি।— (বিরক্ত হইয়া) গৌরচন্দ্রিকা ছেড়ে দাও, আসল কথাটা কি, বোলতে হয় তো বল, না হয় তো চোলে যাও।

    রূপসী।— (আমার দিকে একটু হেলিয়া মৃদুস্বরে) রাগ কর কেন? রাগ কর কেন? ভাল কথাই আমি বোলছি, ভাল কথা বোলতে আমি এসেচি। রোজ রাত্রে তুমি একলাটি এইখানে শুয়ে থাকো, ভয় করে না?

    আমি।— ভয়? —কিসের ভয়? —ভূতের?

    রূপসী।— না, না, না, সে ভয় তো তুমি এক রকম ঘুচিয়ে দিয়েচ সে কথা বোলচি না; বোলচি এই— ভয় অনেক রকম। এত বড় একটা বাড়ী, তাতে আবার লোকে বলে হানাবাড়ী— মানুষ কম, তারাও আবার অন্য মহলে, এ বাড়ীতে একা থাকতে রেতের বেলা তোমার ভয় করে না?

    আমি।— কিছুতেই আমার ভয় নাই। আমি ভয় পাই না, আমার ভয় হয় না, তুমি আবার কি নূতন ভয়ের কথা বোলতে এসেছ? আচ্ছা ধর, ভয় যদি থাকে, তুমিই বা তার কি উপায় কোতে পার?

    রূপসী।— আমি? —আমি? —ভয়ের? —না, —নূতন? —না, — নয়। দেখে অবধি তোমাকে আমি বড় ভালবেসেচি, তোমার জন্যই আমার ভয় হয়। ভালবেসেচি বোলেই সর্বক্ষণ যেন আমার মনে হয়, তুমি হয় তো ভয় পাও।

    আমি।— যেন তোমার মনে হয়, আমি হয় তো ভয় পাই, এ কথার উত্তর আমি কি দিব? তুমি এক জায়গায় চাকরী কর, আমি সেই জায়গায় নূতন এসেছি, তোমার সঙ্গে আমার দেখা-শুনা হয়, আমি ভয় পাই না, তুমি ভাব, হয় তো আমি ভয় পাই, এত টান কিসের? এত ভালবাসা কিসের?

    রূপসী।— টান? —ভালবাসা? এত কথা, এত কথা? —ভাব দেখি হরিদাস! আহাহা! কি সুন্দর নামটি তোমার! হরিদাস! —ইচ্ছে করে, নামটি লিখে মালা গেঁথে, গলায় পরি। —আহাহা! —কি সুন্দর রূপখানি তোমার! — কি সুন্দর মুখখানি তোমার! কি সুন্দর চক্ষু দুটি! —কি সুন্দর চুলগুলি! —আহাহা! রংটকু যেন কাঁচা সোণা! ইচ্ছা করে, সর্বকর্ম ত্যাগ কোরে রাতদিন ঐরূপখানি আমি দেখি! —আহাহা! কি মিষ্ট বচনগুলি তোমার! —কাণে যেন মধু ঢেলে দেয়! —ইচ্ছা করে, রাতদিন ঐ মধুমুখের মধু খেয়ে ভালবাসার ভাবে বিভোর হয়ে থাকি! —আচ্ছা, হরিদাস! কত ভালবাসি আমি তোমারে, আমার প্রাণ তা জানে; তুমি কি আমারে ভালবাস না? —একটুও ভালবাসতে পার না?

    আমি দেখলেম, বেগতিক। এতক্ষণ অতটা বুঝতে পারি নাই। এতক্ষণের পর স্বৈরিণীর মনের ভাব কি তা আমি বুঝে নিলেম। কথার ভাবেই মনের ভাব, কেবল তাও না— শেষকথাগুলো বলবার সময় ছুঁড়ি আমার মুখের কাছে মুখ আনবার উপক্রম কোরেছিল! সামান্য একটা চাকরাণীর এতদূর বুকের পাটা! ত্বরিত গতিতে বিছানা থেকে নেমে ঘরের মাঝখানে গিয়ে আমি দাঁড়ালেম। রূপসী তখন ফ্যাল-ফ্যাল-চক্ষে আমার দিকে চেয়ে থাকলো। আমি তখন একটু জোরে জোরে বোলতে লাগলেম, দেখ রূপসি! এখান থেকে চোলে যাও! এখনি এ ঘর থেকে বেরিয়ে যাও! একতিল যদি বিলম্ব কর, এখনি আমি গোলমাল বাধাব, এখনি আমি বড়বাবুকে ডাকবো। বাড়ীর সব ঘুমন্ত লোকগুলিকে এখনি আমি জাগাব, ভালমুখে এখনো বোলছি, গরীবের মেয়ে, কলঙ্কের ডালি মাথায় কোরে কেন এই চাকরিটি খোয়াবে? বেরিয়ে যাও, শিষ্টশান্ত হয়ে আপনার ঘরে গিয়ে শয়ন কর।”

    আমি ভেবেছিলেম, ঐ সব কথা শুনে চাকরাণীটা ভয় পাবে, ভয় পেয়েই হয় তো ছুটে পালাবে; কিন্তু কি আশ্চর্য, একটুও ভয় পেলে না, বিছানা থেকে লাফিয়ে পোড়ে উগ্রমূর্তিতে আমার দুহাত তফাতে এসে দাঁড়ালো। সেই রোগা শরীর যেন ফুলে উঠলো, কতই যেন দীর্ঘাকার দেখাতে লাগলো, ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র চক্ষু যেন জোনাকীর মত জ্বোলে উঠলো। স্বৈরিণী তখন আমার মুখের কাছে মুষ্টিবদ্ধ দক্ষিণহস্ত ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে গৰ্জনস্বরে বোল্লে, “আচ্ছা —আচ্ছা —আচ্ছা! থাকো থাকো —থাকো। থাকো তুমি! —এতখানি ভালবেসেছিলেম, সেই ভালবাসার তুমি এই প্রতিফল দিলে! —আচ্ছা দাও! — দেখবো আমি তোমাকে! কলঙ্কের ডালি! —আরে আমার কলঙ্কের ডালি রে! — দেখবো আমি, কেমন কোরে তুমি কলঙ্কের ডালি ঝেড়ে ফেলো! আমাকে তুমি চেনো না যাদু! —আগুন —আগুন! —আগুন! — উঃ! —বুকের ভিতর আগুন জ্বোলছে! — প্রাণের সঙ্গে ভালবেসে যৌবনধন ডালি দিতে চাইলেম, তার কি না এই ফল! এত অপমান! —এত যন্ত্রণা!— উঃ! দেখবো আমি তোমাকে! — মেয়েমানুষ আমি। দেখবো আমি তোমাকে! কেমন কোরে কলঙ্ক কাটাও, দেখবো আমি! — দেখবো দেখবো! দেখবো!”

    এই রকমে শাসিয়ে শাসিয়ে নাগিনী তখন যেন যষ্টি তাড়িতা নাগিনীর ন্যায় ফোঁস ফোঁস গর্জন কোত্তে কোত্তে চপলাগতিতে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। নিশ্বাস ফেলে, দরজা বন্ধ কোরে আমি শয়ন কোল্লেম। দুটি ভাবনা আমার নূতন সহচরী। পায়রাবাবুর মাতামহালয় বীরভূমজেলা। যে দিন আমি রাঙামামীর দূত হয়ে ঔষধের মোড়ক বিলী কোত্তে গিয়েছিলেম, সে দিন জানতেম না, বাবুটির নাম পায়রাবাবু; সে দিন জেনেছিলেম সেজোবাবু! মুখখানি দেখে সেজোবাবুকে আমি আর এক বাবু অনুমান কোরেছিলেম, বীরভূমজেলার নাম শুনে, এ রাত্রে সেই অনুমানটি ঠিক মনে হোচ্ছে। ঝাঁকড়া ঝাঁকড়া বাবরীচুল, সেই সব চুলে কাণদুটি ঢাকা। বাবুটি যে দিন তাজ মাথায় দিয়ে এসেছিলেন, সে দিনের ভঙ্গীতেও কতক কতক বুঝতে পারা গিয়েছিল। ছদ্মবেশী লোকের পরচুল খুলে দিলে আসল রূপ যেমন চেনা যায়, পায়রাবাবুকে নেড়া কোরে দিতে পাল্লে, সেইরূপ চেনা যেতে পারে। বরদারাজ্যে যে কথা আমার শুনা হয়েছে, সে কথা যে ঠিক নয়, এমন আমি মনে কোত্তে পাচ্ছি না। একটা গল্প মনে পোড়লো। একগ্রামে একটি বাবু ছিল; বাবুটি কুচকুচে কালো, লম্বে প্রায় চারি হাত, অঙ্গে মাংস অনেক, মস্তকটি অল্প অল্প চুলে ঢাকা, বাবুর মাথায় কি রকম রোগ ছিল, অধিক চুল রাখলে সেই রোগটা বাড়তো, সুতরাং হপ্তায় হপ্তায় বাবুটিকে নেড়া হোতে হতো। বাবুটির দুটি তিনটি মোসাহেব ছিল, বাবুর নেড়ামূর্তি দর্শন কোরে সেই মোসাহেবরা বৃহৎ বৃহৎ তারিফ কোত্তো। কেন কোত্তো, তার কারণ ছিল। গজকুম্ভের ন্যায় বাবুর মাথায় উঁচু নীচু দুটি তিনটি ঢিবি; কেশশূন্য হোলে সেই ঢিবিগুলি বেশ জেগে উঠতো, অত্যন্ত কদাকার দেখাতো। মোসাহেবেরা সেই সময় বাবুর মুখের কাছে হেঁট হয়ে পাঁচজনের সাক্ষাতে আমোদ কোরে বোলতো, “নেড়া হোলে আমাদের বাবুর চেহারার যেমন খোলতা হয়, আর কাহারো চেহারা তেমন খোলে না। অনেকেই ত সময়ে সময়ে নেড়া হয়ে থাকে, ছি ছি! কিম্ভুতকিমাকার দেখায়। আমাদের বাবু নেড়া হোলে কার্তিকের মত রূপ ফোটে।”

    গল্পের ভাব এইরূপে। পায়রাবাবুকে যদি সেইরূপ প্রশংসায় ফালিয়ে তুলে একবার নেড়া কোরে দেওয়া যায়, তা হোলেই রঙ-তামাসা ধরা পড়ে। সজ্জাপারিপাট্য ভদ্রলোকের মত;— “দেখি তোমার চুল কেমন, দেখি তোমার কাণ কেমন,” হঠাৎ ভদ্রলোককে এমন কথা বলা ভদ্রলোকের উচিত হয় না। ছোটবাবুকে সুপারিশ কোরে পায়রাটিকে একদিন নেড়া করাই সুপরামর্শ। প্রথম চিন্তাটার সেই পর্যন্তই বিরাম। দ্বিতীয় চিন্তা রূপসী দাসীর অভিসার। রূপসীর অত্যন্ত দুঃসাহস! কুপথে আমার প্রবৃত্তি লওয়াবার অভিলাষে দুশ্চারিণী ঘোর নিশীথসময়ে এই ঘরে প্রবেশ কোরেছিল, হতমনোরথ হয়ে প্রতিশোধের ভয় দেখিয়ে গেল। নাগিনী আমারে দেখবে, নাগিনী আমারে দেখাবে, আমার মাথায় কলঙ্কের ডালি চাপাবে, এই রকম ভয়প্রদর্শন। পারে তা, দুষ্টবুদ্ধিতে কুলটারা সব কোত্তে পারে, জানি; আমি কিন্তু ভয় পাচ্ছি না। মনে জানছি, সামান্য একটা চাকরাণীর কথায় আমার ভয় পাবার কোন কারণ নাই; চরিত্রের প্রতি আমার অধিক দৃষ্টি, চরিত্ররক্ষায় সর্বদা আমি সাবধান, পাপিনী আমার কি প্রকারে অপকার কোত্তে পারবে? —কিছুই পারবে না। এই বিশ্বাসে সে ভাবনাটা আমি মন থেকে দূরে কোরে দিলেম; সে পক্ষে একরকম নিশ্চিন্ত হয়েই থাকলেম।

    রূপসীকে আমি বার বার নাগিনী বোলে উল্লেখ কোচ্ছি; দৃষ্টান্তে নাগিনী বোলছি না, বাস্তবিক তার একটা নাম যেন নাগিনী, অনেকেই এইরূপে বিবেচনা কোরবেন, পাঠকের মনে সংশয় জন্মিবারও সম্ভাবনা; সে সংশয়ের হেতু আমি রাখবো না। চাকরাণীর কাজ করে, কিন্তু চেহারায় রূপসীকে চাকরাণী বোলে বোধ হয় না, এই কারণে রামদাসকে একদিন আমি জিজ্ঞাসা কোরেছিলেম, রূপসীটা কে?—রামদাস বোলেছিল “ছোটবাবুর জন্মের অগ্রে এই বাড়ীতে একজন চাকর ছিল, তার নাম লবকুমার লাগ; তারা স্ত্রীপুরুষে এই বাড়ীতে থাকতো, তাদেরই কন্যা ঐ রূপসী। ছোটবাবুর যখন জন্ম হয়, রূপসী তখন ছোট ছিল, বড় হয়ে এখন এই বাড়ীতেই দাসীবৃত্তি কোচ্ছে।”—বঙ্গের কোন কোন জেলার ইতরশ্রেণীর লোকেরা দন্ত্য “ন” স্থলে “ল” উচ্চারণ করে, সেই অভ্যাসে নবকুমার নাগকে রামদাস বোলেছিল, ‘লবকুমার লাগ’; সুতরাং নাগের কন্যাকে আমি নাগিনী বোলে পরিচয় দিলেম।

    সে রাত্রের দুটি চিন্তাকেই ঐ প্রকারে বিদায় দিয়ে আমি নিদ্রাভিভূত হয়েছিলেম। পরদিন প্রভাতে আমার ঘরের নিয়মিত কার্যগুলি রামদাস এসে নির্বাহ কোরে গেল, রূপসী এলো না। তদবধি রূপসী আর আমার সঙ্গে দেখা করে না, আমি যখন অন্দরে যাই, রূপসী তখন আমারে দেখে, মুচকে মুচকে দুষ্টহাসি হেসে, মুখ ঘুরিয়ে অন্য ঘরে প্রবেশ করে। ক্রমাগত একপক্ষ এই ভাব। কিছুই আমি গ্রাহ্য করি না।

    পক্ষান্তে এক রাত্রে আমি আপন কক্ষে শয়ন কোরে আছি, রাত্রি অনুমান দুই প্রহরের অধিক, অন্দরের ভিতর একটা গোলমাল উঠলো দুই তিনজনের কথা, একটি কণ্ঠস্বর কিছু উচ্চ উচ্চ। সে বাড়ীর সদর অন্দর একমহলে, অতি অল্পমাত্র ব্যবধান, এ কথা পূর্বেই আমি বোলেছি। যে ঘরে আমি শয়ন করি; সে ঘর থেকে অন্দরের উচ্চ উচ্চ কথা বেশ শুনা যায়; বিশেষতঃ গভীর রাত্রে। গোলমালটা ক্রমশই বাড়তে লাগলো। বিছানা থেকে আমি উঠলেম। রূপসীর দুর্বাসনা-প্রকাশের পর থেকে শয়ন-ঘরের দরজায় আমি রাত্রিকালে অর্গলবদ্ধ কোরে রাখি, নিঃশব্দে অর্গলমুক্ত কোরে চুপি চুপি বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালেম; এত রাত্রে বাড়ীর ভিতর কিসের গোলমাল, খানিকক্ষণ কান পেতে শুনলেম। স্ত্রীলোকের কন্ঠস্বর। স্বর বোলছে, “দেখ ঠাকুরপো, দেখ! তোমার দাদার কীর্তিখানা এসে দেখ; মামীর ঘরে রাসলীলা হোচ্ছে, তোমার দাদা দেই লীলার ঠাকুর হয়েছেন; দরজা খুলে একবার বেরিয়ে এসে দেখ!”

    এই কথার পর একটা বদ্ধ দরজায় গুম গুম কারে শব্দ হোতে লাগলো; একটা দরজার খিলখোলা শব্দও আমি শুনতে পেলাম। তার পর আবার সেই পূর্বস্বরের উচ্চ ধ্বনি। ভূত-শাসনের পরদিন থেকে বড়বাবুর অনুমতিক্রমে বাড়ির বৌমা দুটি আমার সঙ্গে কথা কন; স্বরে বুঝলেম, বড়-বৌমার কণ্ঠস্বর। ডেকে ডেকে তিনি বোলছেন, “ডাকো ঠাকুরপো, ডাকো! চক্ষের উপর দেখ, এই ঘরেই তোমার দাদা! যেদিন থেকে ভূতের উপদ্রব থেমেছে, সেইদিন থেকেই এই রকম হোচ্ছে। দরকার আছে, কার্য আছে, বন্ধুর বাড়ী নিমন্ত্রণ আছে, এই রকম এক একটা অছিলা কোরে বড়বাবু রোজ রোজ সন্ধ্যাকালে বেরিয়ে যান, অনেক রাত্রে ফিরে আসেন, কিছুই আমি জানতে পারি না, তক্কে তক্কে থেকে আজ রাত্রে আমি ধোরে ফেলেছি; জেগেছিলেম, রাঙামামীর ঘরে দুজন মানুষের কথা শুনে, দুজনের হাসির শব্দ পেয়ে, বারান্দায় আমি বেরিয়েছি, কথার আওয়াজে মানুষটিকেও চিনতে পেরেছি; ডাকাডাকি কোল্লেম, কতবার দরজা ঠেল্লেম, কত বকাবকী কোল্লেম, এখন আর সাড়া-শব্দ নাই। নিশ্চয়ই এই ঘরে তোমার দাদা আছেন। কি কেলেঙ্কার! কি কেলেঙ্কার! ডাকো তুমি! দাদাকে ডাকতে সাহস না হয়, মামীকে ডাকো। সব ভুর আজ ভেঙে দিব!”

    এই সব কথা আমি শুনলেম; শব্দে জানতে পাল্লেম, মামীর ঘরের দরজা খোলা হলো। বড়বাবু রেগে রেগে বোলতে লাগলেন, “কি— কিক্ক— কি? হয়েছে কি? অত হাঁকাহাঁকি ডাকাডাকি কিসের জন্য? রাঙামামীর পেটব্যথা কোচ্ছিল, যন্ত্রণায় ছটফট কোচ্ছিল, আমাকে ডেকেছিল, তাই আমি ওষুধের ব্যবস্থা কোত্তে এসেছিলেম; দেখো না এসে, ওষুধের শিশি! হয়েছে কি?”

    বড়-বৌমা আবার চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে ব্যঙ্গ কোরে বোল্লেন, “আহাহা! কি আমার ডাক্তার গো! রসের নাগর, গুণের সাগর! পেটের ব্যথার ওষুধ দিতে এসেছিলেন! শোনো ঠাকুরপো, শোনো। তোমার দাদাবাবুর ডাক্তারী বিদ্যার পরিচয়টা একবার শুনে রাখো! ছি ছি ছি! ভদ্রলোকের বাড়ীতে এ কি কারখানা! গলায় দড়ী দিয়ে মোত্তে ইচ্ছা হয়!”

    ছোটবাবুর কোন কথা আমি শুনতে পেলেম না; বড়বাবুও চাপ কোল্লেন, বোধ হলো যেন অন্যদিকে তিনি সোরে গেলেন। আবার বড়-বৌমার কণ্ঠস্বর। মামীকে লক্ষ্য কোরে তিনি বোলতে লাগলেন, “আর তোমাকেও বলি বাছা, তুমি রাঙামামী কুটুম্বুর মেয়ে, কুটম্বর বাড়ীতে রয়েছ, এ সব ঢলাঢলি কেমন কোরে কর? লজ্জা হয় না? ধিক্কি জীবন আর কি! মামী মায়ের সমান, ভাগ্নে সন্তান তুল্লি, ভাগ্নে নিয়ে এই সব কাণ্ড! দড়ী জোটে না? দড়ী কলসী নিয়ে আঘাটায় যাও। সব জ্বালা জুড়িয়ে যাবে; তোমারও যাবে, আমাদেরও যাবে। আমি না জানি কি? তোমাকে জানি, পায়রাকেও জানি, কি রকমে ভূতের নৃত্য হতো, তাও জানি, সব আমি জানি, হাঁস, পায়রা, হীরামন, পেঁচা, দাঁড়কাক, কত রকম ডাক্তার যে তোমার পেটের ব্যথার ওষধ দিতো, কিছুই আমার জানবার বাকী নাই! এখন কি না ঘরের ভিতর বৃন্দাবন বসালে! ভাগ্নে নিয়ে নীলে-খেলা! তুমি রাধা, তিনি শ্যাম! এইবার একটি কাঁদে বাড়ী বলরাম এলেই ঠিক হয়! কি ঠাকুরপো! বলরামের পালাটা গাইতে পারবে? ধিক— ধিক— ধিক! এখন আমাদের মরণই মঙ্গল!”

    এই সময় ছোটবাবু বোধ হয়, কোন রকম থাবাথুবি দিয়ে গোলমালটা থামিয়ে দিলেন, আর কোন উচ্চবাচ্য আমি শুনতে পেলেম না। খানিকক্ষণ সমস্তই চুপচাপ; চুপি চুপি ফিরে এসে ঘরের দরজা বন্ধ কোরে বিছানার উপর আমি বোসলেম। অনিচ্ছায় আমার নাসারন্ধ্র থেকে দুটি নিশ্বাস বহির্গত হলো। কি পাপের ভোগ! ভাগ্যশেষে এমন বাড়ীতেও আমি বাস কোচ্ছি! রক্তবিচার নাই! ওঃ! সেই কথাই বটে বড়-বৌমা ঠিক ধোরেছেন! আমার মনে মনেও একটা খটকা ছিল! ঔষধের মোড়ক নিয়ে আমি রাঙামামীর দৌত্যকার্য কোরেছিলেম! কিসের ঔষধ, এখন আমি বুঝলেম। পায়রাবাবুই রাঙামামীর প্রেমের নাগর! কেবল একটি নয়, বৌমার কথায় তাও আমি বুঝতে পাল্লেম। পালায় পালায় ছাদের উপর অনেক রকম ভূত এসে দক্ষযজ্ঞ ভোগ কোত্তো! ভূতের পালা এখন ফুরিয়ে গিয়েছে, এখন ঘরে ঘরেই বৃন্দাবন! ও! কত দিনে যে এই পাপপুরী থেকে আমি পরিত্রাণ পাব, কিছুই বুঝতে পাচ্ছি না। দুরাচার রক্তদন্ত কত রকম পাপের মূর্তি যে আমাকে দেখাচ্ছে, কত রকম পাপ-কথাই আমাকে শুনাচ্ছে, আমার অন্তরাত্মাই তা জানতে পাচ্ছেন। আবার আমার নাসারন্দ্রে অগ্নিশিখা তুল্য তিনটি দীর্ঘনিশ্বাস বহির্গত।

    বোসে বোসেই আমি রজনীপ্রভাত কোল্লেম। প্রভাতে রামদাস এসে ঘরের কাজগুলি সেরে দিয়ে গেল। রাত্রে কিছু আমি জেনেছি, কিছু আমি শুনেছি, রামদাসকে সে সব কথা কিছু আমি বোল্লেম না। ক্রমে ক্রমে বেলা হলো; কথায় কথায় আমি শুনলেম, শেষরাত্রে বড়বাবু কোথায় চোলে গিয়েছেন, কেহই কিছু বোলতে পারে না। দিন গেল, সন্ধ্যা হলো, রাত্রি এলো, বড়বাবু বাড়ী এলেন না। সকলেই উদ্বিগ্ন। কর্তাগৃহিণী বাড়িতে নাই, বড়বাবু কর্তৃত্ব কোচ্ছিলেন, তিনিও অদৃশ্য! আমার মনে কিছু ভয়ের সঞ্চার হলো! সর্বদাই আমি চিন্তাযুক্ত।

    এই ঘটনার পর আট দশ দিন অতিক্লান্ত। বড়বাবুর দেখা নাই। মামীর ঘরে বৃন্দাবন-লীলার রজনীতে যে সকল কাণ্ড হয়েছিল, এই আট দশ দিনের মধ্যে সে প্রকাণ্ড কাণ্ডের কোন কথা কাহার মুখে প্রকাশ পেলে না; তুষারাবৃত আগ্নেয়গিরির ন্যায় বাহিরে বাহিরে বাড়ীখানা এক রকম ঠাণ্ডা। বোল্লেম আমি ঠাণ্ডা, কিন্তু আমার ভাগ্য-চক্রের ঘর্ষণে এক অভাবনীয় অগ্নিস্ফুলিঙ্গের উৎপত্তি! সেই রুদ্রাক্ষগ্রামেই বড়-বৌমার পিত্রালয়। একটি ভ্রাতুষ্পুত্রের অন্নপ্রাশন উপলক্ষে বৌমা পিত্রালয়ে যাবেন, রামদাস তাঁর সঙ্গে যাবে, রামদাসের মুখে সেই কথা আমি শুনলেম। আমার মনটা কেমন খারাপ হয়ে গেল। এই দূরন্ত সংসারে বড়বাবু আমার প্রতি সদয়, ছোটবাবু আমার বন্ধু, আমার প্রতি বড়-বৌমার পুত্রতুল্য স্নেহ, রামদাসটিও আমার বিশেষ অনুগত, বাধ্য; বড়বাবু কোথায় চোলে গিয়েছেন, বড় বৌমাও বাড়ীতে থাকছেন না, রামদাসও থাকছে না। বোলতে গেলে আমি এক রকম অসহায় হব। কেন ভাবি অসহায়? —অকস্মাৎ যদি কোন বিপদ ঘটে, ছোটবাবুটি ছাড়া আর কাহাকেও আমি রক্ষাকর্তা পাব না— আর কেহই আমার সহায় হবে না। ছোট-বৌমাটি ছেলে-মানুষ, যদিও তাঁর স্বভাব অতি নির্মল, তথাপি সংসারের কোন কার্যে তাঁর তাদৃশ হাত নাই। কেন এটা আমি ভাবলেম, বিপৎপাতের ভাবী আশঙ্কা হঠাৎ কেন আমার মনে এলো, সে কথা আমি বোলতে পারি না। ঘুঘুর বাসায় আমি আগুন দিয়েছি, কুকুরের মুখোসে গুলী কোরে ভূতের বাসা ভেঙ্গে দিয়েছি, রাঙ্গামামী আমার শত্রু হয়ে আছেন, অভিসারিকার কুৎসিত অভিলাষে আমি উপেক্ষা কোরেছি, রূপসী আমার শত্রু হয়ে আছে, বড়-বৌমা বাড়ী থেকে চোলে গেলে কি জানি কে কোন দিক থেকে কি প্রকার ফ্যাঁসাদ বাধায়, সেই জন্যই আমার ভয়। ভয়ত্রাতা মধুসূদন। বিপদ্‌বারণ মধুসূদনকে স্মরণ কোরে সে ভয়টা তখন আমি চেপে রাখলেম।

    যে দিন আমি এই সব কথা ভাবলেম সত্য সত্যই রামদাসকে সঙ্গে কোরে বড়বৌমা সেইদিন বৈকালে ভ্রাতুষ্পুত্রের অন্নপ্রাশন দেখতে গেলেন। তিনদিন আসবেন না, রামদাসের মুখে সে কথাও আমি শুনেছিলেম। বেলাটুকু চোলে গেল, রামদাস নাই, রূপসী আসে না, সেই পাচিকাই সন্ধ্যাকালে আমার ঘরে আলো দিলেন, রাত্রিকালে আহারের পূর্বে যা কিছু আবশ্যক, সেই প্রাচীনার দ্বারাই অগত্যা আমি সেগুলি সাধন করাতে বাধ্য হোলেম। পরদিন প্রভাতেও তিনি আমার গৃহকার্য নির্বাহ কোরে দিলেন। বেলা দুই প্রহর পর্যন্ত আমি এক প্রকার গৃহশান্তি উপভোগ কোল্লেম; সন্ধ্যার পরে বিনামেঘে বজ্রপাত!

    আহারান্তে ছোটবাবুর সঙ্গে আমি বেড়াতে বেরিয়েছিলেম, সন্ধ্যার পর ফিরে এসে দেখি, যে ঘরে আমি থাকি, সেই ঘরে আমার বিছানার উপর দুটি লোক; —একটি যুবা, আর একটি অর্ধ বৃদ্ধ। দরজার কাছে বাড়ীর দাসী আর পাচিকা। লোক-দুটির বদন গম্ভীর। আমরা আসবার পূর্বে কি তাঁরা বলাবলি কোচ্ছিলেন, আমাদের দেখে হঠাৎ থেমে গেলেন। লোক-দুটিকে পূর্বে আমি দেখি নাই, গৃহে আমরা প্রবেশ করবামাত্র তাঁরা পরস্পর মুখে-চাহাচাহি কোরে কেমন একপ্রকার ভ্রকুটী-ভঙ্গীতে আমার দিকে চেয়ে রইলেন। তাঁদের সেই গম্ভীর বদনে সেই সময় একপ্রকার বিকৃতভাব লক্ষিত হলো। রূপসীর মুখে চক্ষে উল্লাসলক্ষণ দেখলেম, বিজয়োল্লাসে বীরপুরুষের মুখ-চক্ষু যেরূপ প্রফুল্ল হয়, ঠিক্ যেন সেইরূপ; ভাব আমি কিছুই বুঝতে পাল্লেম না।

    ছোটবাবুর দিকে চেয়ে সেই দুটি লোকের মধ্যে একটি লোক যেন কিছ উদাসীনভাবে বোলেন, “বসো মিহিরচাঁদ।—বস্,” এই পর্যন্ত কথা; আমারে কেহই কিছু, বোল্লেন না। ছোটবাবু বোসলেন। উদ্বেগযুক্ত হয়ে আমিও তাঁর কাছে বোসলেম। আমার দিকেই লোকদুটির ঘন ঘন দৃষ্টি। কিয়ৎক্ষণ সকলেই নীরব। নূতন লোকেরা কি জন্য এসেছেন, ছোটবাবু সেই কথা জিজ্ঞাসা কোরবেন, উপক্রম কোচ্ছেন, এমন সময় একটি বাধা। লোকটি এক নিশ্বাস ফেলে হঠাৎ বোলে উঠলেন, “দিন যায় ত ক্ষণ যায় না। কার মনে যে কি আছে, কে যে কখন কি করে, বুঝে উঠা ভার! দিনের বেলা বাড়ীতে চুরি হয়েছে, বড় আশ্চর্য কথা।”

    যে লোকটির বয়স অধিক, তিনি প্রথম বক্তা। ছোটবাবুর বিস্ময়সূচক প্রশ্নে তিনি উত্তর কোল্লেন, “হাঁ গো, তোমাদেরই বাড়ী,—তোমারই ঘরে! স্নান করবার সময় ছোট-বৌ-মা গলার হারছড়াটি খুলে একটা তাকের উপর রেখেছিলেন, বৈকালে চুলে বাঁধবার সময় খুঁজে দেখলেন হারছড়াটি নাই। তুমি বাড়ীতে ছিলে না, তোমার মামী, পাচিকা ব্রাহ্মণী, বৌমা নিজে আর ঐ রূপসী অনেক জায়গায় অনেক খুঁজেছে, কোথাও সে হার নাই। তোমার মামীর আদেশে রূপসী ছুটে গিয়ে আমাকে সংবাদ দিয়েছিল, বরদাকান্তকে সঙ্গে কোরে তাই আমি এখানে এসেছি। ব্যাপারখানা কি, কিছুতেই তো জানা যাচ্ছে না। ঘরের ভিতর থেকে জিনিস গেল, কেহই খোঁজে পেলে না, এ বড় আশ্চর্য কথা! এসে আবার শূনলেম, রূপসী বোল্লে, ‘সেই ঘরে পালঙের নীচে জলখাবার দুটি গেলাস ছিল, তাও পাওয়া যাচ্ছে না।’ তাজ্জব ব্যাপার! দিনের বেলা বাড়ীর ভিতর কি চোর প্রবেশ কোরেছিল? বাড়ীতে এখন বেশী লোক নাই, এ কাৰ্য কার তবে?”

    পূর্ণ বিশ্বাস না কোরে একটু তাচ্ছল্য-ভাবে ছোটবাবু বোল্লেন, “আছে হয় তো কোথায়, কে হয় তো কোথায় রেখেছে, এখন মনে কোত্তে পাচ্ছে না, একটা ভাল কোরে খুঁজলেই পাওয়া যাবে; চুরি কোত্তে কে আসবে?”

    তিন পা এগিয়ে এসে, হাত নেড়ে নেড়ে রূপসী বোলতে লাগলো “খুঁজতে কি আর আমরা বাকী কোরেছি? তন্ন তন্ন কোরে খুঁজেচি; কোথাও নাই! কোথাও নাই! নিশ্চয় চুরি গিয়েছে! ছোট ছোট সিকি আধূলি নয়, দুটো একটা পয়সা নয়, মস্ত একছড়া দামী হার, বড় বড় দুটো জলের গেলাস, কোথায় লুকিয়ে থাকবে? উড়ে যাবে কি?”

    বিরসবদনে পাচিকা ঠাকুরাণী মৌনবতী। ছোটবাবু চিন্তাযুক্ত। আমি বিস্ময়াপন্ন। কথায় কথায় আমি জানতে পাল্লেম, দুটি আগন্তুক ভদ্রলোকের মধ্যে যিনি বয়োধিক, তিনি এই গ্রামের একজন বদ্ধির্ষ্ণু লোক; — দলপতি; বরদাকান্তটি তাঁর কনিষ্ঠ সহোদর। পল্লীগ্রামে কোন প্রকার অকু ঘটনা হোলে গ্রামের মোড়ল-চৌকিদারকে মধ্যস্থ রেখে তদারক করা হয়, সেই হিসাবে এই দলপতি-মহাশয় এই গ্রামের মোড়ল; নাম রূপচাঁদ ভঞ্জ। রূপসীর বাক্যাবসানে ছোটবাবুকে সম্বোধন কোরে ভঞ্জবাবু বোল্লেন, “কথাও ত ঠিক্ বটে; ছোট-খাটো জিনিস নয়, বড় বড় জিনিস, ঘরের ভিতর কোথাও থাকলে কেনই বা খুঁজে পাওয়া যাবে না? চল দেখি যাই, তুমিও চল, রূপসীও চলুক, ব্রাহ্মণীও চলুন, আমিও তোমাদের সঙ্গে যাচ্ছি। ভাল কোরে অন্বেষণ কোল্লে, বোধ হয়, পাওয়া যেতে পারে। তাতেও যদি না পাওয়া যায়, তবে নিশ্চয় চুরি; নিশ্চয়ই চোরের কাজ।”

    দলপতিবাবু এই কথাগুলি যখন বলেন, তখন কটমট চক্ষে বারকতক আমার দিকে চেয়েছিলেন; ভিতরে ভিতরে রেগেছিলেন, দন্তে দন্তঘর্ষণের কড় মড় শব্দও আমার কর্ণে এসেছিল। আমি কিন্তু এতক্ষণের মধ্যে একটিও কথা কই নাই, কেহ আমাকে কোন কথা জিজ্ঞাসাও করেন নাই, বাবুদের মুখের দিকে চেয়ে চুপ কোরে আমি বোসে ছিলেম। দলপতির অনুরোধে ছোটবাবু উঠে দাঁড়ালেন, দলপতিও উঠলেন, বরদাকান্ত বোসে থাকলেন। যাবার সময় পশ্চাতে একবার চেয়ে ছোটবাবু আমারে বোল্লেন, “যাবে হরিদাস? এসো!”

    মুখ ফিরিয়ে সচকিতে দলপতি জিজ্ঞাসা কোল্লেন, “কারে তুমি ডাকছো?— কে যাবে?—হরিদাস?— কে হরিদাস?”

    আমার দিকে হস্তনির্দেশ কোরে ছোটবাবু উত্তর দিলেন, “এই ছোকরার নাম হরিদাস; এটি এখন আমাদের বাড়ীতেই আছে; বেশ ছোকরা, স্বভাব-চরিত্র বড় ভাল; চরিত্রে কিছুমাত্র দোষ নাই।”

    মুখ ভারী কোরে বক্রদৃষ্টিতে আমার দিকে চেয়ে দলপতি-মহাশয় ছোটবাবুকে বোল্লেন, “না না, অন্যলোকের সেখানে যাবার কোন দরকার নাই; তোমাতে আমাতে গেলেই চোলবে; এসো তুমি।”

    দলপতির সঙ্গে ছোটবাবু অন্দরের দিকে গেলেন, ঘনপদক্ষেপে সর্বাঙ্গ সঞ্চালন কোরে রূপসী তাঁদের সঙ্গে সঙ্গে চোল্লো; সর্বপশ্চাতে ব্রাহ্মণী-ঠাকুরাণীও চোল্লেন। ঘরে থাকলেম আমি আর বরদাকান্ত।

    আমি আর বরদাকান্ত। উভয়ের নিকটে উভয়েই আমরা অপরিচিত। পরিচয়ের অবসর উপস্থিত। আমার পরিচয় যৎসামান্য। বিদেশী বালক, নানা বিপাকে ঠেকে নানা স্থান পর্যটন কোরে গ্রহগতিকে এই গ্রামে এসে উপস্থিত হয়েছি, এই বাড়ীতেই আছি, এই পর্যন্ত আমার পরিচয়; বরদাকান্তের পরিচয় পূর্বে একটু প্রকাশ হয়েছিল, দলপতিবাবুর সহোদর তিনি; কোথাও কাহারো চাকুরী করেন না, সর্বদা বাড়ীতেই থাকেন, পিতার একখানি তালুক আছে, সেই তালুক-সংক্রান্ত বিষয়কৰ্ম দেখেন শুনেন, স্বহস্তেও লেখাপড়া করেন। পরিচয় এই পর্যন্ত। অতঃপর আর কি কথা? —নূতন লোকের সঙ্গে নূতন কথা আমার কিছুই ছিল না, কিন্তু দুজনে এক স্থানে বোসে চুপ কোরেও থাকা যায় না; প্রসঙ্গ-শূন্য দুটি একটি ফাঁকা ফাঁকা কথা তাঁরে আমি বোলছি, তিনি এক একবার হু হাঁ দিচ্ছেন, এক একবার চুপ কোরে থাকছেন; এক একবার আমি তাঁর মুখের দিকে চাচ্ছি, দেখতে পাচ্ছি, কথার দিকে তাঁর মন নাই। কোন বিষয় শ্রবণ কোত্তে কোত্তে শ্রোতার মনে ঘৃণার সঞ্চার হোলে তাঁর মুখের ভাব যেমন হয়, বরদাকান্তের মুখের ভাব তখন সেই প্রকার। কটাক্ষভঙ্গীতে যখন তিনি আমার প্রতি দৃষ্টিপাত করেন, তখন সেই কটাক্ষে বিলক্ষণ ঘৃণার লক্ষণ প্রকাশ পায়। মনে মনে আমার সন্দেহের উদয়।

    কেন তিনি আমারে ঘৃণার চক্ষে দেখেন? তাঁর চক্ষে আমি নূতন, আমার চক্ষেও তিনি নূতন মানুষ, এ ক্ষেত্রে ঘৃণার ভাব কেন আসে? নূতন দর্শনে পরস্পর অনুরাগ-বিরাগ একপ্রকার অস্বাভাবিক। নাটক-নবন্যাসে দুই একটি নায়ক-নায়িকার প্রথম-দর্শনে অভাবনীয় অনুরাগলক্ষণ পাঠ করা যায় বটে, কিন্তু প্রকৃতির সঙ্গে সে লক্ষণের তাদৃশ মিলন অনুভূত হয় না। সেই কথাই আমি ভাবছি, ছোটবাবুর সঙ্গে দলপতি মহাশয় সেই ঘরে ফিরে এলেন। দলপতির মুখখানা তখন অত্যন্ত ভার ভার; ছোটবাবুর মুখে সংশয়মাখা। দরজার দিকে আমি চেয়ে দেখলেম, এক ধার থেকে কে একজন উঁকি মেরে মেরে দেখছে। ভাল কোরে দেখে চিনলেম, উঁকি মারছিল রূপসী, রূপসীর চক্ষু যেন তখন কি আহ্লাদে ফিক ফিক কোরে হাসছিল, ভাব কিছু আমি বুঝতে পাল্লেম না।

    একটা কর্তব্যকর্ম সমাধা কোরে যাঁরা ফিরে এলেন, তাঁদের মুখ দেখে সে কার্যের ফলাফল কিছুই বুঝা গেল না; ফলটা ভাল কি মন্দ, কিছুই প্রকাশ পেলে না। অনুমানে আমি যেন মন্দটাই ভেবে নিলেম। তাঁরা বোসলেন না, স্তম্ভিতভাবে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে গুটিকতক কথা বলাবলি কোল্লেন। সে সব কথার মর্ম এইরূপ:— “কর্তার ঘরে চাবি বন্ধ, বড়বাবুর ঘরেও চাবি বন্ধ, যে কয়েকটি ঘর খোলা আছে, সেই সব ঘরে তল্লাস করা হয়েছে, চোরা জিনিস পাওয়া যায় নাই। বরদাবাবুকে সম্বোধন কোরে রূপচাঁদবাবু বোল্লেন, তোমরা একবার নেমে দাঁড়াও; এই ঘরটা একবার অন্বেষণ কোত্তে হবে।” বরদাবাবু বিছানা থেকে নামলেন, আমারে কেহই কিছু বোল্লেন না, তথাপি আমিও নামলাম।

    রূপচাঁদবাবু স্বয়ং আমার বিছানাটী উলট-পালট কোরে বিশেষরূপে নিরীক্ষণ কোল্লেন, কিছুই দেখতে পেলেন না। শেষকালে আমার মাথার বালিশের ওয়াড় খুলে অন্বেষণ করবার সময়ে ওয়াড়ের ভিতর থেকে একছড়া হার সোরে পোড়লো। বিস্ময়ব্যঞ্জক চীৎকারস্বরে অনুসন্ধানকারী বোলে উঠলেন,— “এই বটে! এই বটে! দেখ দেখি তোমরা, এই সেই হার কি না?”

    ছোটবাবুর মুখখানি এই সময় অত্যন্ত ম্লান হয়ে এলো। ম্লাননয়নে তিনি একবার আমার মুখের দিকে চাইলেন। তাঁর চক্ষু দুটী যেন ছল ছল কোত্তে লাগলো। নেত্রপ্রান্তে অশ্রুবিন্দুও দেখা গেল। রূপসী সেই সময় ছুটে এসে হার-ছড়াটা হাতে কোরে নিয়ে ত্বরিতস্বরে বোল্লে, “এই সেই হার, এই সেই হার। বাপ্ রে! আমার প্রাণে যে ভয় হয়েছিল, সে কথা আর বোলতে পারি না; চাকরাণী-মানুষ আমি, গরীবের মেয়ে, বাড়ীর লোকেরা হয় তো মনে কোচ্ছিলেন, আমিই চুরি কোরেছি। ধর্ম আছেন কি না, চারিযুগের সাক্ষী তিনি; আমার কোন পুরুষে চোর নয়, ধর্মের কাছে আমি খাঁটী আছি। ধর্মের বিচারে ধর্মে ধর্মে আজ রক্ষা পেলেম।”

    এই সব কথা বোলতে বোলতে কেমন একপ্রকার নয়নভঙ্গী কোরে রূপসী বার বার আমার দিকে চাইতে লাগলো; খানিকক্ষণ কি একটু ভেবে ভেবে আবার বোলে উঠলো, “হার যখন এ ঘরে পাওয়া গিয়েছে, গেলাস-দুটোও তবে এই ঘরেই পাওয়া যাবে। দেখ তোমরা ভাল কোরে; খোঁজ তোমরা ভাল কোরে। এই ঘরেই পাওয়া যাবে। আমার যেন মনে নিচ্ছে, এই ঘরেই—”

    আর তারে বেশী কথা বোলতে না দিয়ে দলপতি-মহাশয় ঘরের এধার ওধার, শয্যাতল, গবাক্ষতল, সমস্ত স্থান অন্বেষণ কোল্লেন, পাকলচক্ষে ঘন ঘন আমার দিকে চাইলেন, অন্বেষণ বিফল হলো। গেলাস পাওয়া গেল না।

    ঘরের উত্তর দেয়ালে এক হাত লম্বা এক হাত চওড়া একখানা তক্তা ঢাকা; এ বাড়ীতে এসে অবধি সেই তক্তাখানা আমি দেখে আসছি। কেন যে সে তক্তা সেখানে আছে, তক্তার ভিতর কি বস্তু যে রক্ষিত আছে, একদিনের জন্যও সেটা আমার জানবার ইচ্ছা হয় নাই; খুলিও নাই, দেখিও নাই, জানিও না, জানতেমও না। হন হন কোরে চোলে গিয়ে রূপসী সেই তক্তাখানা খুলে ফেল্লে, একধারে কবজা আঁটা ছিল, তক্তাখানা ঘুরে এসে দেয়ালের গায়ে লাগলো, ভিতরটা ফাঁক হয়ে গেল;— ছোট একটী কুলুঙ্গী,— সেই কুলুঙ্গীর ভিতর দুটী বড় বড় কাঁসার গেলাস।

    “এই যে গেলাস! এই যে গেলাস! যা আমি মনে কোরেছিলাম, ঠিক তাই মিলে যাচ্ছে। কার মনে যে কি আছে, কে বোলবে? রাঙামামী বোলছিলেন, হরিদাস তেমন ছেলে নয়; আমি তো জানতেন, তেমন হরিদাস নয়; কিন্তু এখন, ধর্ম সে কথা শুনবেন কেন? হাতে নাতে ধোরিয়ে দিলেন।”

    রূপসীর কথা শুনে ঠক ঠক কোরে আমি কাঁপতে লাগলেম, হঠাৎ আমার যেন বাক্‌রোধ হয়ে এলো, একটী কথাও বোলতে পাল্লেম না; চেষ্টা কোল্লেম কিছু বলবার, কথা আসলে ফুটলোই না; ললাটে বিন্দু বিন্দু ঘর্ম। ভাবতে লাগলেম, একি আশ্চর্য ব্যাপার! এ সব জিনিস আমার ঘরে কেমন কোরে এলো? কে এমন শত্রুতাবাদ সাধলে? কার কাছে আমি কি অপরাধী হয়েছিলেম? ভগবান আমার ভাগ্যে কেন এমন ঘটালেন? ওঃ! বৃথা কলঙ্কের আগুনে কেন আর দগ্ধ হও? বাহির হও! রাত্রিকাল, অন্ধকারে অন্ধকারে এই বেলা বাহির হয়ে যাও! কল্যকার সূর্য যেন আমার এই কলঙ্কিত বদন দর্শন না করেন!

    ভাবলেম অনেক। কতই যে ভাবলেম, ভেবে কিছু কূল-কিনারা পেলেম না। ভাবলেই বা কি হবে? লোকে আমার কথা শুনবে কেন? এত বড় প্রমাণের সম্মুখে লোকে আমার মনোবেদনা বুঝবেই বা কেন? চুতুর্দিক যেন আমি অন্ধকার দেখতে লাগলেম। যেখানে দাঁড়িয়ে ছিলেম, সেখান থেকে আর এক পাও নড়তে পাল্লেম না। দুটী চক্ষু দিয়ে অনবরত জলধারা গড়াতে লাগলো।

    আমারও যেমন বাকরোধ, ছোটবাবুরও প্রায় সেইরূপই বাকরোধ হয়েছিল। মোড়লবাবুর উগ্রমমূর্তি দর্শন কোরে উগ্রমূর্তি শ্রবণ কোরে, তিনি তখন অল্প অল্প কম্পিত-কণ্ঠে বোল্লেন, “শুনলেম সব; শুনলেম সব, কিন্তু বুঝলেম না কিছুই, হরিদাস চোর, কিছুতেই আমার বিশ্বাস হোচ্ছে না। এতদিন রয়েছে, একদিনও হরিদাসের স্বভাবে বিন্দুমাত্রও দোষ আমি দেখি নাই; অকস্মাৎ চোর হবে, কিছুতেই আমার বিশ্বাস হয় না; বোধ হয়, এ কাণ্ডের ভিতর কাহার কুচক্র থাকতে পারে।”

    আমি সেই সময় একটু সাহস পেয়ে ছোটবাবুর দুটি পায়ে জোড়িয়ে ধোল্লেম, চক্ষের জলে পা-দুখানি ভিজিয়ে দিলেম, কম্পিত-স্তম্ভিত স্বরে বোল্লেম, “দোহাই ছোটবাবুর! দোহাই ধর্মের! আমি চোর নই; কিছুই আমি জানি না, আমারে নষ্ট করবার মতলবে কে যে এই কুচক্রের সৃষ্টি কোরেছে, কিছুই আমি বুঝতে পাচ্ছি না; আপনি আমারে রক্ষা করুন! দোহাই আপনার থানায় খবর দিবেন না, থানায় আমারে পাঠাবেন না! বহু যন্ত্রণা আমি সহ্য কোরেছি, তত যন্ত্রণা পেয়েও জন্মাবধি আমি নিষ্কলঙ্ক, থানার হাতে সোঁপে দিলে কখনই আমি বাঁচবো না; ঘৃণায়, অপমানে, মিথ্যা অপবাদে প্রাণ আমার আপনা হোতেই ঠিকরে বেরিয়ে যাবে!”

    আমার সকরুণ রোদনে অন্তরে ব্যথা পেয়ে, দলপতির দিকে চেয়ে, গদগদবচনে ছোটবাবু তখন বোল্লেন, “আপনি আমাকে ক্ষমা করুন, জিনিসগুলি হরিদাসের ঘর থেকে বেরিয়েছে, যদিও স্বচক্ষে আমি দেখলেম, তথাপি হরিদাসকে চোর বোলতে আমার মন চায় না। হরিদাসকে আমি থানায় দিতে পারবো না; যেখান থেকেই যা হোক, জিনিসগুলি পাওয়া গিয়েছে এই মঙ্গল, হরিদাসকে পীড়ন কোত্তে আদৌ আমার ইচ্ছা নাই।”

    মোড়লবাবু রেগে উঠলেন; আসনত্যাগ কোরে দাঁড়িয়ে উঠে সক্রোধে বোলতে লাগলেন, “ইচ্ছা নাই? যদি ইচ্ছা নাই, তবে তোমার বাড়ীর মেয়েরা আমাকে খবর দিয়েছিল কেন? ডেকে পাঠিয়েছিল কেন? ঘরে ঘরে মিটমাট কোরে ঘরের ভিতর চোর পুষে রাখলেই তো ঠিক হতো, ডেকে এনে অপমান করা কি জন্য? থানায় তুমি যাবে না? চোরকে তুমি থানায় তবে দিবে না? আচ্ছা! আচ্ছা! থাক তবে। তুমি বুঝি মনে কোচ্ছো, আমার কান ক্ষমতা নাই? থানার দারোগা আমার আজ্ঞাকারী, মেজেষ্টার সাহেবের ডান হাত আমি, আমার পরামর্শ নিয়ে মেজেষ্টার সাহেব কাজ করে। আমার কথায় চোরকে তুমি থানায় দিতে রাজী নও? —আচ্ছা, আমি তবে চোল্লেম, দেখি, চোরকে তুমি কেমন কোরে রক্ষা কর! এসো হে বরদা! ঝকমারী কোরেছিলেম— এসেছিলেম, এসো!”

    সরোষগর্জনে এই সব কথা বোলতে বোলতে মহাপ্রতাপশালী দলপতিমহাশয় চঞ্চলপদে ঘরের চৌকাঠ পর্যন্ত অগ্রসর হোলেন। চঞ্চলপদে পশ্চাতে ধাবিত হয়ে তাঁর দুখানি হাত ধোরে মিনতিবচনে ছোটবাবু বোল্লেন, “রাগ কোরবেন না মহাশয়, রাগের কথা নয়, যে সব কথা আমি বোল্লেম, ভাল কোরে আপনি বিবেচনা করুন। যদি ঠিক ঠিক প্রমাণ হয়, অগত্যা থানার সাহায্য গ্রহণে আমি অসম্মত হব না; এখনো আমার সন্দেহ দূর হয় নাই, বিষম সন্দেহ আছে। হরিদাসের চরিত্র আপনি জানেন না, সেইজন্যই এত ব্যস্ত হোচ্ছেন; আমরা সকলেই জানি, হরিদাসের স্বভাব নিষ্কলঙ্ক। কর্তা বাড়ী নাই, দাদা বাড়ীতে নাই, বড়-বৌটিও পিত্রালয়ে; তাঁরা আসুন, ইতিমধ্যে আমি আরও ভাল কোরে তত্ত্বটা জানি, যে তত্ত্ব আজ প্রকাশ পেলে, এ তত্ত্বের বিপরীত যদি কিছু প্রকাশ না হয়, তা হোলে—”

    বিরক্ত হয়ে ভঞ্জবাবু বোলে উঠলেন, “তত্ত্ব আবার জানবে কি? তত্ত্ব জানবার আর বাকী কি? তোমার মামীও বোল্লেন, এই দাসীটিও বোল্লে, আজ বৈকালে এই ছোকরা ছোট-বৌমার ঘরে প্রবেশ কোরেছিল, অনেকক্ষণ সেই ঘরে ছিল; স্বকর্ণেই শুনে এলে, সে প্রমাণের উপর বিপরীত প্রমাণ তুমি আর কি জানতে চাও? আমি বাপু, তোমাদের ওসব কথার ভিতর আর থাকতে চাই না, চোর-ডাকাত ধরা যাদের কাজ, তারা যা জানে, তাই কোরবে, আমি এখন রিপোর্ট দিয়ে—”

    শেষকথা না শুনেই অধিক ব্যগ্রতা জানিয়ে ছোটবাবু বোল্লেন, “না মহাশয়! ও কাজ আপনি কোরবেন না; রিপোর্ট এখন পাঠাবেন না। বাড়ীর ভিতর বৌমানুষের ঘরে দিনের বেলা চুরি, এ কথাটা অনেক রকমে ঘোরে; কলঙ্কের ভয় আছে, রিপোর্ট আপনি এখন পাঠাবেন না; হরিদাস বরং এখন এই ঘরের মধ্যেই আটক থাকুক, ঘরের দরজায় আমি সর্বদা চাবীবদ্ধ রাখবো, এই ঘরটাই এক রকম হাজত-গারদ হবে, হরিদাস কোথাও যেতে পাবে না, যদি পালায়, হাজির করবার জন্য আমি দায়ী থাকবো, থানা জানাজানিতে এখন দরকার নাই; অনুগ্রহ কোরে আপনি আমার এই প্রস্তাবে সম্মতিদান করুন।”

    কিঞ্চিৎ শুভগ্রহ। সরলমনে না হউক, আন্তরিক অনিচ্ছায় দলপতিমহাশয় কিঞ্চিৎ ক্রোধ সংবরণ কোল্লেন, ছোটবাবুর অনুরোধে তিনি আমারে তত শীঘ্র পুলিশে পাঠাতে জিদাজিদি কোল্লেন না, ঘরের গারদে আটক রাখাই সাব্যস্ত হলো, বরদাকান্তকে সঙ্গে নিয়ে ভঞ্জবাবু বিদায় হোলেন। ঘরের গারদেই আমি বন্দী হয়ে থাকলেন। আমি পালাবো না, ছোটবাবু, সেটি জানতেন, দিনের বেলায় চাবী দিতেন না, রাত্রিকালে আহারাদির পর চাবী বন্ধ হতো। তিন দিন তিন রাত্রি এই রকম।

    চতুর্থ দিবসে বড়বৌমা বাড়ী এলেন, রামদাসও এলো। রামাদাসকে দোসর পেয়ে আমি অনেকটা ভরসা পেলেম। চোর অপবাদে ঘরের ভিতর আমি কয়েদ, বড়বৌমা সে কথা শুনলেন। যেমন যেমন হয়েছিল, তার উপর দশটা ডালপালা দিয়ে সাজিয়ে রাঙামামী তাঁর কাণ ভারী করবার— মন ভারী করবার চেষ্টা পেলেন; রূপসীও তাতে বাতাস দিলে, বড়বৌমা সে সব কথায় কিরূপ উত্তর দিয়েছিলেন, সে সব আমি শুনতে পেলেম না। রামদাসের মুখে শুনলেম, ছোটবৌমা বোলেছেন, “যেদিনে চুরী হয়, সেদিন বৈকালে হরিদাস আমার ঘরে প্রবেশ করে নাই।” তিনি আরো বোলেছেন, “হরিদাস চুরী কোরবে, এমন কথা তিনি মনের কোণেও স্থান দেন না।” এ সংবাদেও আমার একটু ভরসা হলো। ধর্মে যার অকপট বিশ্বাস, ধর্ম তারে রক্ষা করেন, চিরদিন এইরূপে আমার ধারণা; শাস্ত্রে কবিবাক্যেরও সেইরূপ মর্ম; সেই বিশ্বাস উদ্দেশে ধর্মদেবকে নমস্কার কোরে ভক্তিভাবে ভগবান দীনবন্ধুর করুণাময় নাম আমি জপ কোত্তে লাগলেম।

    এক গৃহস্থের এক গৃহমধ্যে আমি কয়েদ; রামদাস ছিল না, কথার দোসর পেতেম না, পাচিকা ব্রাহ্মণী দুইবেলা আমার আহারসামগ্রী দিয়ে যেতেন, সর্বদাই তাঁর মুখখানি আমি বিষণ্ণ বিষণ্ন দেখতেম। বিষণ্ণনয়নে আমার মুখের দিকে তিনি চেয়ে চেয়ে থাকতেন, কথা কইতেন না; দিবারাত্রি আমি একাকী থাকতেম। তিন দিন এই রকমে কেটেছিল। এখন রামদাস এসেছে, রামদাস মাঝে মাঝে আমার ঘরে আসে, দুটি পাঁচটি কথা কয়, আমি চোর হয়েছি, রামদাস সে কথায় বিশ্বাস করে না, আমার অবস্থা দেখে বরং দুঃখ প্রকাশ করে। রাত্রিকালে যখন চাবী বন্ধ হয়, তখন আর রামদাস আসতে পায় না। রাত্রেই আমার ভীষণ যন্ত্রণা।

    চিন্তা করা আমার অভ্যাস। ভগবান আমারে যত চিন্তা দিয়েছেন, তত চিন্তা বোধ হয়, আর কাহাকেও দেন নাই। চিন্তা ভগবান দেন কি মানুষে দেয় কি আপনাআপনি আসে, সে তত্ত্ব আমি জানি না; কিন্তু শৈশবে যখন গুরগৃহে ছিলেম, তখন অবধিই আমার চিন্তা করা শিক্ষা হয়েছে; দুশ্চিতাই অধিক; স্বভাবতঃ শুভচিন্তা আসে বটে, কিন্তু শুভঘটনা আমার ভাগ্যে প্রায়ই ঘটে না, কাজে কাজে শুভচিন্তাগুলি জলবিম্বের ন্যায় অন্তরেই মিলিয়ে যায়। কিঞ্চিৎ জ্ঞানোদয় হবার সঙ্গে সঙ্গে চিন্তা আমারে অধিকার কোরেছে, অবিচ্ছেদে আমার হৃদয়ে আশ্রয় নিয়েছে, রাত্রিকালে অধিক পরাক্রম প্রকাশ করে। এখন আমার যেরূপ অবস্থা, এ অবস্থায় অন্য চিন্তা আমি ভুলে যাই। নাম নাই, পরিচয় নাই, আশ্রয় নাই, একটিও আপনার লোক জানা নাই; ছিল কেবল একটি চরিত্র, রেখেছিলেম কেবল একটি চরিত্র, সেই চরিত্র এখন সঙ্কটাপন্ন, প্রতি নিশাকালে সেই চিন্তাই এখন কেবল প্রবলা। রাত্রিতে শুয়ে শুয়ে ভাবি কেবল কি হলো? আমি চোর হোলেম! বিধাতার মনে কি এই ছিল? মানুষের কাছেও আমি অপরাধী নই, বিধাতার কাছেও আমি অপরাধী নই, তবে কেন আমার কপালে এমন ঘোটলো? আমি অদৃষ্টবাদী, অদৃষ্টকেই আমি বলবান জ্ঞান করি। দুই একখানি পুস্তকে আমি পাঠ কোরেছি, কোন কোন লোক অদৃষ্ট মানে না। যারা মানে না, তারা সুখে থাকে কি কষ্টে থাকে, তাও আমি বুঝে উঠতে পারিনে, বোধ হয় যেন তারা বেশী কষ্ট পায়। ভাগ্যফল আমি মানি, সেই কারণেই জন্মাবধি মানুষের অসহ্য কষ্ট আমি সহ্য কোত্তে পাচ্ছি, অদৃষ্টে আছে, ঘোটছে, এই আমার প্রবোধ; ভাগ্য যদি না মানতেম, তা হোলে বোধ হয়, কিছুতেই এ সকল কষ্ট আমি সহ্য কোত্তে পাত্তেম না। চিরজীবন কষ্টে যাবে, চিরজীবন বিপদগ্রস্ত হয়ে থাকতে হবে, কাহারো অদৃষ্টে এমন ফল লেখা থাকে না। কখন না কখন জীবনকালের মধ্যে আমার ভাগ্যে শুভদিনের উদয় হবে, মহাবিপদে পতিত হয়েও সেইটিই আমি ভাবি; সেই শুভ আশা আমার অবসর হৃদয়কে প্রফুল্ল কোরে দেয়, তাতেই আমি বেঁচে আছি। অদৃষ্টবাদে অবিশ্বাস থাকলে বোধ হয় কখনই আমি বাঁচতেম না। লোকে যেটিকে বিধাতার লিখন বলে, আমি সেটিকে বিধাতার ইচ্ছা মনে কোরেই আপনা আপনি সান্ত্বনা প্রাপ্ত হই।

    পাঁচ দিন গেল, চোর অপবাদে পাঁচ দিন আমি বন্দী; থানার গারদে অথবা রাজকারাগারে বন্দী হয়ে থাকলে লোকে যত যন্ত্রণা ভোগ করে, তত যন্ত্রণা আমার হয় না বটে তথাপি আমি যেন মনে করি, অপরাধী বন্দী অপেক্ষা আমার যন্ত্রণা অধিক। অপরাধীরা জানে অপরাধের দণ্ড; আমি জানি কি? —আমি জানি, বিনা অপরাধে বিষম কলঙ্কে অজ্ঞাত লোকের কুচক্রে অকারণে আমি কারাবাসী!

    অকারণ? —অসম্ভব! কারণ ব্যতিরেকে কোন কার্যই হয় না; অকারণে আমার কারাবাস, মূলতত্ত্ব অগ্রাহ্য কোরে কি সাহসে আমি এমন কথা বলি? অকারণে নয়, অবশ্যই কারণ আছে; সে কারণটা কি তবে? ষষ্ঠ যামিনীর অবসানকালে এই তর্ক আমার মনোমধ্যে সমূদিত। মিথ্যা অপবাদে আমার কারাবাসের কারণ কি তবে? ভাবলেম অনেক; যে ক-দিন কয়েদ আছি, সে ক-দিন নিত্য নিত্যই ঐ কথা ভাবি; মনে মনে একটা সন্দেহ জাগে। এই শেষের রাত্রে যেন কার উপদেশে অবধারণ কোল্লেম, কারণসূত্র দুটি মনুষ্য;— দুটি স্ত্রীলোক। বাবুদের রাঙামামী বহু নায়ক-বিলাসে কলঙ্কিনী ছিলেন, বাড়ীতে ভূতের উপদ্রবে সে কলঙ্কে এক রকম চাপা পোড়ে থাকতো; পিণ্ডদানে না হোক, মন্ত্রবলে না হোক, আগ্নেয়াস্ত্রের বলে সে সব ভূত আমি তাড়িয়েছি, রাঙামামী দারুণ মনঃপীড়া প্রাপ্ত হয়েছেন, তাঁর মনঃপীড়ার প্রধান হেতুই আমি; সেই কারণে আমার উপর রাঙামামীর মর্মান্তিক রাগ হওয়া সম্ভব। তিনি আমার এই কলঙ্কের— এই যন্ত্রণার একটি কারণ। আর এক কারণ রূপসী। —কুৎসিত অভিলাষে রূপসী আমার কাছে প্রেমভিক্ষা চাইতে এসেছিল, ঘৃণা পূর্বক আমি তাকে প্রত্যাখ্যান কোরেছি, প্রতিফল দিবে বোলে রূপসী আমারে ভয়প্রদর্শন কোরে রেখেছিল, অবসর বুঝে সেই কোপ— সেই আক্রোশ জাগিয়ে তুলেছে। রাঙামামী আর রূপসী, উভয়েই আমার শত্রু! কি সূত্রে তাদের সেই কুচক্র প্রকাশ পায়, আপন মনে তার উপায় কল্পনা কোত্তে আমি সচেষ্ট হোলেম। উপায় আমার কল্পনায় এলো না। কল্পনার সঙ্গে ঊষাসতী ধীরে ধীরে বিদায় হয়ে গেলেন। রজনী প্রভাত।

    প্রভাতে আমার কয়েদঘরের চাবী খুলে রামদাস প্রবেশ কোল্লে। গৃহকর্ম সমাধা কোরে ম্লানবদনে রামদাস আমার বিছানার ধারে এসে বোসলো। কাতরনয়নে রামদাসের মলিন বদন নিরীক্ষণ কোরে সন্দিগ্ধস্বরে আমি জিজ্ঞাসা কোল্লেম, “রামদাস! সর্বদা আমি তোমাকে প্রফুল্ল দেখি, আজকাল তুমি এমন হয়েছ কেন? যখন তোমাকে দেখি, তখনি তোমার মুখখানি শষ্ক শুষ্ক, মুখে হাসি নাই, বেশী কথা নাই, কি যেন ভাবো, এই রকম লক্ষণ দেখতে পাই; কারণ কি?”

    ম্লানবদনেই রামদাস উত্তর কোল্লে, “কারণ তুমি; তোমাকে এরা চোর বোলে আটক রেখেছে, বড় আশ্চর্য ব্যাপার! এই কথা শুনে আমি যেন আকাশ থেকে পোড়েছি। এ বাড়ীতে কারা তোমার শত্রু, তা আমি জানতে পাচ্ছিনে; শত্রু পক্ষের কুচক্র ভিন্ন তোমার নামে এত বড় কলঙ্ক আর কিছুতেই সম্ভব হয় না। বাড়ীর ভিতর আমি শুনলেম, বড়-বৌমা বোলছেন, হরিদাস কখনই চোর নয়; ছোট-বৌমা বোলছেন, হরিদাস কখনই চোর নয়; ব্রাহ্মণী বোলছেন, হরিদাসকে সোণার সঙ্গে ওজন করা যায়; সোণাতে বরং খাদ থাকে, হরিদাসে খাদ নাই। এই তো তিনজনের কথা, তবে আর কার কথাতে লোকে তোমাকে অপরাধী বোলে বিশ্বাস কোরবে?”

    রামদাসের কথায় কিঞ্চিৎ উৎসাহ পেয়ে রামদাসকেই আমি জিজ্ঞাসা কোল্লেম, “তোমার কি রকম বোধ হয়?” রামদাস বোল্লে, “আমার তোমাকে দেবতা বোলে বোধ হয়। কলিকালে দেবতা যদি থাকে, ধৰ্ম যদি থাকে, তারা তবে অবশ্য তোমার মত একটি ক্ষুদ্র দেবতাকে—”

    বারান্দার দিকে মানুষের পদশব্দ। কারা যেন শীঘ্র শীঘ্র সেই ঘরের দিকে চোলে আসছে, এই রকম দ্রুত পদবিক্ষেপের শব্দ। রামদাসের কথা সমাপ্ত হোতে না হোতেই ছোটবাবুর সঙ্গে সেই দলপতিবাবু গৃহমধ্যে প্রবেশ কোল্লেন। রামদাস আমার বিছানার ধারে বোসে ছিল, এই সময় সোরে গেল;—ঘর থেকে বেরিয়ে গেল না, একটু দূরে দেয়াল ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলো। উপবেশন করবার অগ্রেই আমারে সম্বোধন কোরে একটু কুণ্ঠিতম্বরে দলপতিবাবু বোল্লেন, “হরিদাস! আগে ঠিক বুঝতে না পেরে আমি তোমাকে অপরাধী বিবেচনা কোরেছিলেম, এখন জানতে পাল্লেম, বিষম কুচক্র। তোমাকে আমি কষ্ট দিয়েছি, সে জন্য তুমি কিছু মনে কোরো না, ভুলচুক সকলেরই আছে; প্রথমে আমার বুঝবার ভুল হয়েছিল; তুমি এখন রাহুগ্রাসমুক্ত পূর্ণচন্দ্রের ন্যায় সগৌরবে প্রকাশ পাবে, তার আয়োজন হয়েছে। ছোটবাবুর মুখে সকল কথা শ্রবণ কর।”

    উৎফুল্ল-নয়নে ভঞ্জমহাশয়ের মুখপানে আমি চাইলেম, মনের কথা তিনি বোল্লেন, কিম্বা ব্যঙ্গচ্ছলে আমার প্রাণে অধিক বেদনা দিচ্ছেন, সেই তত্ত্বটি জানবার জন্য তাঁর দুটি নয়ন আমি নিরীক্ষণ কোল্লেম। কথা কবার সময় মনের ভাব অনেকটা নয়নে প্রকাশ পায়; রূপচাঁদ ভঞ্জের নয়নে বদনে ব্যঙ্গের লক্ষণ কিছুই দেখা গেল না।

    আমি যেখানে বোসে ছিলেম, তার দুই হাত তফাতে ফুল্লবদনে ছোটবাবু বোসলেন, ছোটবাবুর পার্শ্বে ভঞ্জবাবু উপবেশন কোল্লেন। ছোটবাবুর মুখে কি আমি শুনবো, আগ্রহে আগ্রহে প্রতীক্ষা কোচ্ছি, চক্ষের জল মুছতে মুছতে পাচিকাঠাকুরাণী সেই সময় এসে দেখা দিলেন।

    ছোটবাবু বোল্লেন, “আপনাদের কথাতেই আপনারা ধরা দিয়েছেন, ‘ধৰ্ম্মের কল বাতাসে নড়ে’, এই একটা সাধারণ কথা আছে, উপস্থিত ক্ষেত্রে সেই কথাই মিলে গেল। হরিদাস চুরি করে নাই, সে কথা সপ্রমাণ করবার সাক্ষী-সাবুদ ছিল না, ধর্মই সাক্ষী হোলেন। রূপসী বোলেছে সেই দিন বৈকালে হরিদাস আমাদের শয়নঘরে প্রবেশ কোরেছিল, রাঙামামী সেই কথার পোষকতা কোরেছিলেন। বৈকাল কথাটা মাঝখানে যদি না থাকতো, তা হোলে শীঘ্র শীঘ্র সংশয়ভঞ্জনের সুবিধা হোতো না। রূপসীকে আমি গতরাত্রে অনেক সওয়াল কোরেছিলেম, প্রত্যেক সওয়ালের জবাবেই রূপসী ধরা পোড়েছে। রূপসী ধরা পোড়লেই রাঙামামীর ধরা পড়া হলো, তাতে আর সন্দেহমাত্র নাই। আচ্ছা হরিদাস! রূপসী তো তোমার কাজকর্ম কোরে দিত, তোমার নাম হোলেই ভাল কথা বোলতো, হঠাৎ ভাবান্তরের হেতু কি, তা কি তুমি কিছু বুঝতে পার? কিছু কি অনুমান কোত্তে পার?”

    ভাবতে ভাবতে আমি উত্তর কোল্লেম “পারি কিছু, কিছু, কিন্তু সে কথা এখানে বলবার নয়, সকল লোকের সাক্ষাতে সে কথা আমি বোলতে পারবো না। আপনাদের প্রসাদে যদি আমি কলঙ্কমুক্ত হোতে পারি, তা হোলে সময়ান্তরে আপনাকে আমি নির্জনে সেই কথাগুলি শুনিয়ে দিব। বস্তুতঃ রূপসীর ভাবান্তরের বিশিষ্ট কারণ আছে, এই পর্যন্ত এখন আমি বোলে রাখতে পারি।”

    দলপতির নয়নে ছোটবাবু নয়ন নিক্ষেপ কোল্লেন, ধীরে ধীরে মস্তকসঞ্চালন কোরে দলপতি যেন একটু শিউরে উঠলেন, উভয়ের ঐরূপে ভঙ্গী আর দৃষ্টিবিনিময় আমি দর্শন কোল্লেম; বোধ হলো যেন, ঐ দিন প্রাতঃকালেই দলপতির সঙ্গে ছোটবাবুর তৎসম্বন্ধে কোন প্রকার কথা হয়েছিল, লক্ষণেই সেটি বুঝা গেল; সেই কথা স্মরণেই দলপতির ঐ ভাবে মস্তক সঞ্চালন।

    পাচিকাঠাকুরাণী আমার মুখের দিকে চেয়ে দলপতিকে বোল্লেন “যে কথা রূপসী বলে, সেই কথাটা আমি আর এক রকমে জানি। হরিদাসের কিছুমাত্র দোষ নাই, চন্দ্রসূর্য সাক্ষী কোরে সে কথা আমি বোলতে পারি।”

    রামদাসের দিকে চক্ষু ফিরিয়ে ছোটবাবু আদেশ কোল্লেন, “যাও রামদাস! রূপসীকে এখানে আন!”— আদেশমাত্রেই রূপসীকে আনতে রামদাস অন্দরে গেল। আমি বুঝতে পাল্লেম, আজ আবার নূতন বিচার হবে; এই বিচারের ফলের উপর আমার ভাগ্যফলাফল নির্ভর কোত্তে লাগলো।

    রামদাসের সঙ্গে রূপসী এসে উপস্থিত। আমার দিকে রূপসী আর চায় না, কোন দিকেই চায় না, কতই যেন ভালমানুষ, সেইভাবে মাথাটি হেঁট কোরে আপনার পদনখগুলি নিরীক্ষণ কোত্তে লাগলো। দলপতির দিকে ছোটবাবু, একবার নয়ন ইঙ্গিত কোল্লেন, ইঙ্গিতের তাৎপর্য হৃদয়ঙ্গম কোরে দলপতিমহাশয় কেবল রূপসীকে জিজ্ঞাসা কোত্তে লাগলেন; “রূপসি! হরিদাস যখন সে দিন ছোট বৌ-মার ঘরে প্রবেশ কোরেছিল, তখন বেলা কত?”

    রূপসী।— বেলা? —বেলা বৈকাল।

    দল।— বৈকাল বোল্লে অনেকটা সময় বুঝায়। বেলা দুই প্রহরের পর সন্ধ্যার পূর্বক্ষণ পর্যন্ত বৈকাল। তার মধ্যে কোন সময় তুমি হরিদাসকে সে ঘরে যেতে দেখেছিলে, সেইটি আমি জানতে চাই। বৈকালে দেখেছিলে, সে কথায় কিছুই স্থির বুঝা যায় না।

    রূপসী।— তবে আমি কি বোলবো?

    দল।—হরিদাসকে যখন তুমি দেখেছিলে, তখন কতখানি বেলা ছিল?

    রূপসী।— বেলা ছিল আন্দাজ চার দণ্ড কি ছয় দণ্ড। আমি যখন—

    এই সময় আমি ভিতরদিকের বারান্দায় বস্ত্রঘর্ষণের খস খস শব্দ শুনতে পেলেম; বুঝতে পাল্লেম, বিচারফল কিরূপ দাঁড়ায়, সেইটি শুনবার জন্য বাড়ীর স্ত্রীলোকেরা, স্ত্রীলোকেরা মানে, বৌ-মা দুটি সেইখানে এসে লুকিয়ে দাঁড়িয়েছেন, উৎকণ্ঠিতা হয়ে অঙ্গবস্ত্র সঞ্চালন কোচ্ছেন। ছোটবাবুর কর্ণ অথবা চক্ষু, সে দিকে ছিল না, রূপসীর অসমাপ্ত কথায় বাধা দিয়ে তিনি একটু উচ্চকণ্ঠে বোলে উঠলেন, “চারি দণ্ড কি ছয় দণ্ড! ধন্য জগদীশ!— আচ্ছা রূপসী! ছয় দণ্ড বেলা থাকতে হরিদাস কোথায় ছিল, তা কি তোমার মনে আছে?”

    রূপসী।— কেন থাকবে না? সেই সময় বৌ-মার ঘর থেকে বেরিয়ে আপনার ঘরে এসেছিল।

    ছোট।— হার আর গেলাস তখন হরিদাসের হাতে ছিল, তা কি তুমি দেখেছিলে?

    রূপসী।— তখন দেখি নাই, তার পর এই ঘরে যখন তল্লাস করা হয়, তখন এই ঘরেই বেরিয়েছে।

    ছোট।— তা তো জানি, বেরিয়েছে। কিন্তু চার ছ দণ্ড বেলা থাকতে হরিদাস কোথায় ছিল, সে কথা তুমি বলতে পার না?

    রূপসী।— কোথায় আর থাকবে? যেখানে থাকে, সেইখানেই ছিল।

    ছোট।— (পাচিকার প্রতি) আপনি কি জানেন? রূপসী যে কথা বোলছে, এই কথাই কি সত্য?

    পাচিকা।— চার ছ দণ্ড বেলা থাকতে রূপসী দুবার হরিদাসের ঘরে এসেছিল। হরিদাস তখন ঘরে ছিল না, এই পর্যন্ত আমি জানি, ছোট বৌমাও তাই জানেন।

    ছোট।— হাঁ! ছোট-বৌ সে কথা আমাকে বোলেছে; সব আমি জানতে পাচ্ছি। রাঙামামী আর রূপসী একপক্ষ। আপনি আর ছোট-বৌ এক পক্ষ। যার বস্তু সে বলে না হরিদাস দোষী, রূপসী বলে হরিদাস চোর, এখনই এ তত্ত্বের মীমাংসা হবে।

    আমি সেই সময় দাঁড়িয়ে উঠে দলপতিকে আর ছোটবাবুকে বিনীতভাবে বোল্লেম, আমার ঘরে চোরা জিনিস বেরিয়েছে, আমি দোষী হয়েছি, রূপসীর সাক্ষ্যবাক্যে সেইটিই সপ্রমাণ হোচ্ছে। এই সঙ্গে আর একটি তত্ত্বের মীমাংসা হোক। ঐ যে দেয়ালের গায় কুলঙ্গী, ঐ কুলঙ্গী আমি কখন দেখি নাই তক্তা ঢাকা থাকতো, কি তো কি, ওদিকে আমি চাইতেম না। ঐ কুলঙ্গীর ভিতর গেলাস- দুটি কি রকমে এসেছিল, সেই কথা আমি—

    আর আমারে কিছু বোলতে না দিয়ে গম্ভীর বদনে ছোটবাবু বোল্লেন, “বাস! বাস! তোমাকে আর কিছু বেশী বোলতে হবে না, সমস্তই আমি বুঝতে পেরেছি, গোড়া ফাঁক।” — আমারে এই পর্যন্ত বোলে দলপতির দিকে চেয়ে তিনি একটু নম্রস্বরে বোল্লেন, “দেখুন রূপচাঁদ কাকা, সে দিন আহারের পর বেলা দুই প্রহরের পূর্বে হরিদাসকে সঙ্গে নিয়ে আমি বেড়াতে বেরিয়েছিলেম, সন্ধ্যার পর ফিরে আসি। রূপসী দেখেছে, বেলা চার দণ্ড কি ছয় দণ্ড থাকতে হরিদাস আমার ঘরে হার চুরি কোরে গিয়েছিল! রূপসীই ফরিয়াদী, রূপসীই সাক্ষী; যোগের সাক্ষী রাঙামামী। এখন আপনি বিবেচনা করুন, এ মামলার জোর কত।”

    ভঞ্জবাবু পূর্বে হোতেই সপ্রতিভ হয়েছিলেন, ছোটবাবুর শেষকথা শ্রবণ কোরে খানিকক্ষণ তিনি অবাক হয়ে থাকলেন। রূপসী সেই অবসরে পালাবার উপক্রম কোচ্ছিল, চৌকাঠ পর্যন্ত এগিয়েছিল; উগ্রস্বরে ধমক দিয়ে ছোটবাবু বোল্লেন, “যাস কোথা? —দাঁড়া! হরিদাসের নামে তুই নালিশ কোরেছিস, হরিদাসকে চোর বোলে ধোরিয়ে দিয়েছিস, তোর কথার প্রমাণেই হরিদাসকে আমরা কয়েদ কোরে রেখেছি, মোকদ্দমা এখনো চোকে নাই, তুই এখন যাস কোথা? —দাঁড়া! শেষকথাগুলো বোলে যা! কত বেলা থাকতে হরিদাসকে তুই আমার ঘরে প্রবেশ কোত্তে দেখেছিলি, রাঙামামীকে তুই কি কি কথা বোলেছিলি, ভাল কোরে মনে কর, ঠিক ঠিক কথা বল!”

    রূপসী কাঁপতে লাগলো; অধোমুখে জড়িতস্বরে আমতা আমতা কোরে বোল্লে, “আমি তো— বেলা— মামীমা— হরি— বৌ— মা—”

    ছোটবাবু তখন আর কি কথাই বা শুনবেন, মোড়লমহাশয়ই বা কি সিদ্ধান্ত কোরবেন? আসল কথা তাঁরা বিলক্ষণ বুঝতে পাল্লেন। পাচিকাঠাকুরাণী চক্ষের জল মার্জন কোরে এক পা এগিয়ে ছোটবাবুকে বোলছিলেন, “রুপসী যখন এই ঘরে আসে, আমি তখন সঙ্গে সঙ্গে আসতে আসতে—”

    “আপনাকে আর কিছু বোলতে হবে না, যা কিছু বোলতে হয়, রূপসী নিজেই বোলবে; নিজেই বলকে।” —ব্রাহ্মণীকে এই রকমে থামিয়ে ছোটবাবু পুনর্বার রূপসীকে বোলতে লাগলেন, “দেখ রূপসী! ছোটবেলা থেকে আমাদের বাড়ীতে তুই আছিস, তোর বাপ এ বাড়ীতে অনেক দিন ছিল, তোর উপরে আমাদের মায়া বোসেছে, সত্যকথা বোলে তোকে আমরা কিছুই বোলবো না, যা যা হয়েছিল, ঠিক ঠিক বল; কার পরামর্শে তুই হরিদাসকে চোর বোলে সাক্ষ্য দিয়েছিলি, ঠিক ঠিক বল; মিথ্যাকথা যদি বলিস, পুলিশে চালান হোতে হবে; মনে রাখিস, সাবধান! মিথ্যাকথা বোল্লে কিছুতেই নিস্তার পাবি নে।”

    পুলিশের নাম শুনে দুই হাতে দুই চক্ষু ঢেকে রূপসী কেঁদে ফেল্লে। ছোটবাবু তখন জোরে জোরে আরো অধিক ধমক দিতে লাগলেন। রূপসীর রোদনে কাহারো হৃদয়ে দয়ার সঞ্চার হলো না। ছোটবাবুর রুক্ষ প্রশ্ন, রুক্ষ আদেশ; মোড়লবাবুর উগ্র প্রশ্ন উগ্র আদেশ; মাগীটা তখন ফাঁপোরে পোড়ে গেল; কি করে! ছোটবাবুর মুখের দিকে একবার চাইলে, মোড়লের দিকেও চাইলে, দরজার দিকে মুখ ফিরিয়ে ভিতরের বারান্দার দিকেও একবার চেয়ে দেখলে, কোন দিক থেকেই একটি অভয়বাক্য এলো না। প্রথম অভিযোগে যে সকল মুখে হাসি এসেছিল, রূপসীর চক্ষে সে সকল মুখ তখন সক্রোধ বিস্ময়ে রক্তবর্ণ; ভাবদর্শনে নিরুপায় হয়ে কাঁদতে কাঁদতে রূপসী তখন বোলতে লাগলো— “আমার কোন দোষ নাই—আমি, ঠাকুর দেবতাসাক্ষী— আমি— না, আমার কোন দোষ নাই,” এই রকম খাপছাড়া কথা বলে, আর মাঝে মাঝে এ দিক ও দিক চায়। ধৈর্য ধারণ কোত্তে না পেরে চঞ্চলম্বরে ছোটবাবু বোল্লেন, “ভাল কথায় এখনো বোলছি, সত্যকথা বল। তোর যদি কোন দোষ নাই, তবে হরিদাসের বালিশের ভিতর হারছড়াটা কেমন কোরে এসেছিল? দেয়ালের গায়ে ক্ষুদ্র খোপের ভিতর গেলাস-দুটো কেমন কোরে গিয়েছিল? হরিদাস যখন ঘরে ছিল না, তখন হরিদাসের বিছানার মধ্যে হার রেখেছিল কে? গেলাস-দুটো লকিয়ে রেখেছিল কে?”

    জলপূর্ণ চক্ষু ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে, চতুর্দিকে চেয়ে চেয়ে, কড়িকাষ্ঠের দিকে চক্ষু তুলে গলা কাঁপিয়ে কাঁপিয়ে রূপসী উত্তর কোলে, “মামী-মা আমাকে— না না— মামী-মা একদিন— ভূত পালাবার পর পায়রা— না—”

    ভঞ্জবাবু এই সময় ছোটবাবুকে বোল্লেন, “সহজে কথা পাওয়া যাবে না, পুলিশের একজন লোককে—”

    চক্ষের জলে ভেসে, মোড়লবাবুর পায়ের কাছে আছাড় খেয়ে পোড়ে, লুটোপুটি খেতে খেতে রূপসীটা চিৎকার কোরে বোলতে লাগলো, “না বাবা! —বলি বাবা! পুলিশ বাবা! —আমি বাবা! — মামী-মা আমাকে বোলেছিল— তাই জন্যে আমি—”

    এই পর্যন্ত বোলেই রূপসী আবার কান্না আরম্ভ কোল্লে। মৃদু হাস্য কোরে ছোটবাবু বোল্লেন, “তাই জন্যে তুই কি কোরেছিলি? চুপি চুপি হার চুরি কোরে এই ঘরে ঢুকিয়ে রেখেছিলি? গেলাস চুরি কোরে খোপের ভিতর লুকিয়ে রেখেছিলি? কেমন, এই তো তোর কথা? সত্য বল। আমিও সত্য বোলছি, সত্যকথা বোল্লে আমি তোকে পুলিশে দিব না।”

    রোদনের সুরের সঙ্গে নূতন রকম সুর মিশিয়ে গড়াগড়ি খেতে খেতে রূপসী বোলতে লাগলো, “আমি নই—আমি নই; ওগো, আমি তেমন কাজ করি নাই, তেমন কাজ আমি কোত্তেম না—রাঙামামী—”

    বোলতে বোলতে রূপসী আবার থেমে গেল। ছোটবাবু বোল্লেন, “রাঙামামী তোরে কি বোলেছিল? চুরি কোত্তে বোলেছিল? জিনিসগুলি হরিদাসের ঘরে এনে রাখতে বোলেছিল? হরিদাসের মাথায় দোষ চাপাতে বোলেছিল?”

    রূপসী উত্তর কোল্লে, “তাই তো আমি কোরেছিলেম, রাঙামামী শিখিয়ে দিয়েছিল, পায়রাবাবু আমাকে টাকা দিবে বোলেছিল, ভাল একটা চাকরী দিবে বোলেছিল, বুঝতে না পেরে—”

    “বুঝতে না পেরে সেই লোভে তুই আমার ঘরের জিনিস চুরি কোরেছিলি? একটি ভদ্রলোকের ছেলেকে চোর বোলে ধোরিয়ে দিয়েছিলি? পায়রা বাবু যদি তোকে আমার গলায় ছুরি দিবার পরামর্শ দিত, টাকার লোভে— চাকরীর লোভে তাও তুই দিতিস?”

    ছোটবাবুর এইরূপে তীব্র উক্তিতে দাসীটা কাঁপতে কাঁপতে দাঁড়িয়ে উঠে হাতযোড় কোরে বোলতে লাগলো, “না বাবা— না বাবা— না গো বাবা! তেমন কর্ম আর আমি কোরবো না। তুমি বরং আমার মাথা মুড়িয়ে দেশছাড়া কোরে দাও, পুলিশের হাতে আমারে ধোরিয়ে দিও না। হরিদাস চোর, এমন কথা আর আমি কখনই বোলবো না।”

    মোড়লবাবু হাসা কোল্লেন, ছোটবাবুও হাস্য কোল্লেন; আমারও হাসি পেয়েছিল, আমি সামলে গেলেম। আর একটা কথা উত্থাপন না কোল্লে সে সময় হাস্য সংবরণ করা যেতো না, সেই জন্য ছোটবাবুকে আমি বোল্লেম, “পায়রাবাবুকে যদি পাওয়া যায়, এই সময় তাঁকে একবার এইখানে হাজির কোত্তে পাল্লে ভাল হয়। একটা কথা এতদিন আমি আপনাকে বলি নাই, ঘটনার বৈচিত্র দেখে অগত্যা আজ সেই কথাটা বোলতে হলো। একদিন রাঙামামীর আমি একটি উপকার কোরেছিলেম, পায়রাবাবুরও উপকার কোরেছিলেম; রাঙামামী আমার মারফতে একদিন একটি ঔষধের মোড়ক পায়রাবাবুর কাছে পাঠিয়েছিলেন, পায়রাবাবুকে তখন আমি পায়রাবাবু বোলে চিনতেম না; রাঙামামী বোলেছিলেন, সেজোবাবু; আমিও জেনেছিলেম সেজোবাবু। সেই উপকার আমি কোরেছিলেম; সেই উপকারের প্রত্যুপকার এই। তাঁদের পরামর্শে, রূপসীর যোগাযোগে আমি চোরদায়ে ধরা পোড়েছিলেম; ভগবানের কৃপায়, আপনাদের অনুগ্রহে আজ আমি অব্যাহতি পেলেম; — নিষ্কলঙ্কে অব্যাহতি। এই সময় একবার পায়রাবাবুকে—”

    ছোটবাবু বোল্লেন, “সময় আছে, পায়রাকে এখন এখানে হাজির করবার দরকার নাই, ডেকে পাঠালেও পায়রা এখানে আসব না। কুকুরের খেলার সময় পায়রা এখানে বিলক্ষণ জব্দ হয়ে গিয়েছে, আমাদের উপর রাগ হয়েছে, সে কি আর এখন এখানে আসতে চায়? সময় আসুক, পাপের প্রায়শ্চিত্ত যে রকমে হয়, আর কিছুদিন যদি তুমি এখানে থাকো, চক্ষুই দেখতে পাবে। এখন তুমি একটা ভয়ানক অপকলঙ্ক থেকে মুক্ত হোলে, এইটিই আমাদের সন্তোষের বিষয়।”

    করযোড়ে নমস্কার কোরে আমি বোল্লেম, “আজ্ঞা হাঁ, আপনাদেরও সন্তোষের বিষয়, সেই সন্তোষে আমারও কলঙ্কভঞ্জন। নষ্টচন্দ্রদর্শনের কলঙ্ক। আমি তো আমি, নষ্টচন্দ্র দর্শনে দ্বারকানাথ শ্রীকৃষ্ণেরও ‘মণিচোরা’ কলঙ্ক হয়েছিল। আমার এই কলঙ্কভঞ্জনে আমি আপনার কাছে চিরজীবনের জন্য কৃতজ্ঞ থাকলেম।”

    এই কথাগুলি বলবার সময় মোড়লবাবুর দিকে আমি একবার বক্রনয়নে কটাক্ষপাত কোল্লেম। ভাব বুঝতে পেরে মিষ্টবচনে মোড়লবাবু আমাকে বোল্লেন, “দেখ হরিদাস! পুনরায় আমি বোলছি, তুমি কিছু মনে করো না; সে সব পূর্বকথা ভুলে যাও। মেয়েমহলে এত বড় একটা চক্র, চক্রের ভিতর এত সৃষ্টি, আগে আমি কিছুই বুঝতে পারি নাই, তোমাকে অনেক অপ্রিয় কথা বোলেছি, তজ্জন্য এখন আমার অনুতাপ আসছে, সে সব কথা তুমি ভুলে যাও; তোমার কলঙ্কভঞ্জনে আমি সুখী হোলেম।”

    প্রসন্নবদনে আমারে ঐ সব কথা বোলে, ছোটবাবুর কাছে বিদায় নিয়ে রূপচাঁদবাবু গাত্রোত্থান কোল্লেন, পুনঃ পুনঃ আত্মীয়তা জানিয়ে সে দিনের মত তিনি বিদায় হয়ে গেলেন। অধোবদনে নেত্রমার্জনা কোত্তে কোত্তে মৃদুপদসঞ্চারে রূপসীদাসী অন্দরে প্রবেশ কোল্লে; ভিতরবারান্দায় যাঁরা আমার মুক্তিমন্ত্র শ্রবণ কোরেছিলেন, তাঁরাও সেখান থেকে সোরে গেলেন। ঘরে আমরা তিনজনে থাকলেম— ছোটবাবু, আমি আর রামদাস।

    আমি কলঙ্কমুক্ত হোলেম, ছোটবাবু আনন্দিত হোলেন, রামদাসের শুষ্কমুখ প্রফুল্ল হয়ে উঠলো। খুসী হয়ে রামদাস বোলতে লাগলো, “মন যেন আগেই সব জানতে পারে। এই ঘটনার ভিতর রূপসী ছিল, ঘটনাটা শুনেই আমি সেটা বুঝতে পেরেছিলেম; রূপসীর সঙ্গে রাঙামামীর যোগ ছিল, তা আমি জানতে পারি নাই। ধর্মের কর্ম; ধর্ম হরিদাসকে রক্ষা কোল্লেন, মিথ্যা অপবাদ রটনার মূল যারা, ধৰ্মই তাদের চিনিয়ে দিলেন।”

    কিঞ্চিৎ অন্যমনস্কভাবে ছোটবাবু আমারে জিজ্ঞাসা কোল্লেন, “পায়রাবাবুকে এখানে একবার হাজির কোল্লে ভাল হয়, এ কথাটা তুমি কেন বোলছিলে?”

    কারণটা প্রকাশ করি কি না করি। প্রকাশে কোন প্রকার দোষ আছে, এইরূপ আমি ভাবলেম। সত্য যদি আমার অনুমানটি ঠিক না হয়, আমি অপ্রস্তুত হব, প্রথমে আমার মনোমধ্যে সেই ভাবের উদয় হলো; তার পর আবার বিবেচনা কোল্লেম, আসল কথা আগেই তো আমি ভাঙবো না, নিশ্চিতরূপে সন্দেহটা দূর হয়ে গেলে মনে কোল্লেম আমি খুলে দিব, স্থূলকথা প্রকাশে দোষ কি? এইরূপে ভেবে আমি উত্তর কোল্লেম “বোধ হয় যেন পায়রাবাবুকে আমি চিনি। ঐ নামে চিনি না, অন্য নামে চিনতেম, অন্যস্থানে দেখেছিলেম, এইরূপে যেন আমার মনে হয়। সত্য সত্য সেই লোকটি এই পায়রাবাবু কি না, একবার পরীক্ষা করবার ইচ্ছা হোচ্ছে; দেখেছিলেম, মুখোমুখি বোসে কথাবার্তা হয় নাই, কিন্তু লোকটির স্বভাব ভাল নয়, নানা প্রমাণে তা আমার জানা হয়েছিল। রাঙামামীর প্রেরিত দূত হয়ে পায়রাবাকে যে দিন আমি ঔষধের মোড়কটি দিতে যাই, সে দিন প্রায় সন্ধ্যা হয়ে এসেছিল, চেহারা ভাল কোরে দেখতে পাই নাই, তথাপি যেন পূর্বস্মৃতি একটু একটু জেগেছিল। তিনি তখন সেজোবাবু ছিলেন, এখন হয়েছেন পায়রাবাবু। যে রাত্রে আমি ভূত শীকার করি, সে রাত্রে সর্বাঙ্গ বসনাবৃত, রুমালে গালপাটা বাঁধা একটি লোক জনতামধ্যে দর্শন দিয়েছিলেন, বোধ করি, আপনারা সে দিকে ততটা লক্ষ্য রাখেন নাই, আকার-ইঙ্গিতে আমি কিন্তু বুঝেছিলেম, সেই সেজোবাবু। তার পর একরাত্রে এইখানে তাজপরা মূর্তি; সেই রাত্রে কুকুরগুলির কৌতুকাবহ ক্রীড়া। আর একবার সেই মূর্তি দর্শন কোল্লে মনের অভিপ্রায় আমি প্রকাশ কোত্তে পারবো, সেইজন্যই বোলেছিলেম, একবার হাজির কোত্তে পাল্লে ভাল হয়।

    ছোটবাবু বোল্লেন, “হাজির করা বোধ হয় সহজ হবে না; নিজে তিনি যে কথা অস্বীকার করেন, সেই কথাই ঠিক। তিনি বোলছিলেন কুকুর তাঁর নয়, কুকুরেরা দেখালে তারা তাঁরই। মিথ্যাকথা ধরা পড়াতে তিনি পালিয়ে গিয়েছেন, কুকুরেরা, তাঁর সঙ্গে সঙ্গে ছুটে গিয়েছে, সব আমরা বুঝেছি, তাও তিনি জানতে পেরেছেন। এখন যদি তাঁকে আমরা ডেকে পাঠাই, তা হোলে—”

    “রাধা-কৃষ্ণ! রাধা-কৃষ্ণ! মহাভারত! মহাভারত!” ছোটবাবুর কথা সায় হোতে না হোতে ঐরূপে পবিত্র নাম উচ্চারণ কোত্তে কোত্তে দ্রুতপদে একটি স্ত্রীলোক সেই ঘরে প্রবেশ কোল্লেন। চকিতনয়নে আমি চেয়ে দেখলেম, রাঙামামী! তাঁর বগলে একটি কাপড়ের পুঁটলী, হাতে একখানি ময়ূরপুচ্ছের পাখা। রোদনের সুরে ছোটবাবুকে তিনি বোলতে লাগলেন, “আর আমার এ বাড়ীতে থাকা হলো না! কর্তাকে বোলো, জন্মের মত আমি বিদায় হোলেম! রূপসী বোলে গেল, আমি তারে শিখিয়ে দিয়েছিলেম; হার চুরি কোরে হরিদাসের বালিশের ভিতর রাখা, সেটা আমারই পরামর্শ, এই কথাই রূপসী বোলেছে; তোমরাও তার কথাই বিশ্বাস কোরেছ, তোমাদের মোড়লবাবু— গাঁয়ের লক্ষ্মী ছেড়ে গিয়েছে কি না, গাঁখানা এখন ভাঙা গাঁ, মোড়লবাবটি সেই ভাঙা গাঁয়ের মোড়ল! প্রথম দিন তিনি বোলেছিলেন, হরিদাসকে থানায় দাও; আজ এসে বোলে গেলেন, হরিদাস ছোকরা রাহুমুক্ত পূর্ণচন্দ্র। দু রাত্রের বিচারের মূল সাক্ষী সর্বনাশী রূপসী। আমি সেই রূপসীর কথায় অপরাধিনী হয়েছি, ধর্মের বিচারে অপরাধিনী হব না, তোমাদের বিচারে আমি ধরা পোড়েছি, এ বাড়ীতে বাস করায় আর আমার মঙ্গল নাই, আমি বাপের বাড়ী চোল্লেম! আরো ভেবে দেখ, মিছামিছি, আমার সঙ্গে ঝগড়া বাধিয়ে তোমাদের বড়বৌটি সে রাত্রে কি কাণ্ডই না কোল্লেন! ছি! ছি! ছি! কি কেলেঙ্কার! গৃহস্থ-বাড়ীতে এমন কেলেঙ্কার ভাল কথা নয়, আমাকে নিমিত্তের ভাগী কোরে তোমার দাদাবাবুটি গাঁছাড়া হয়ে গিয়েছেন; গাঁ-ছাড়া কি দেশছাড়া, তাও ঠিক নাই, কর্তা ফিরে এসে আমাকেই দোষী কোরবেন; আসতেই আমি চাই নাই, কর্তাই জেদাজেদি কোরে আমাকে বাড়ীতে এনে রেখেছিলেন। আমার কপাল যখন ভেঙেছে তখনি আমি অকূল পাথারে ডুবেছি; ভাঙা কপাল নিয়ে যেখানে ইচ্ছা, সেইখানেই এখন আমি যেতে পারি। কর্তাকে এই সব কথা বোলো— আমি আমার বাপের বাড়ী চোল্লেম! সেখানে যদি আশ্রয় না পাই, পথের ভিখারিণী হয়ে দ্বারে দ্বারে ভিক্ষা কোরে বেড়াবো, তোমরা সুখে থাকো।”

    চক্ষের জলের সঙ্গে এই সব বিষাদবাক্য বর্ষণ কোত্তে কোত্তে অস্থিরপদে ঘর থেকে বেরিয়ে রাঙামামী সরাসরি সিঁড়ি দিয়ে নামতে আরম্ভ কোল্লেন, সঙ্গে সঙ্গে ছোটবাবু ছুটলেন, বাবুর সঙ্গে সঙ্গে রামদাসও ছুটলো; কি রঙ্গ হয়, দেখবার জন্য আমিও সিঁড়ির দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়ালেম। ছোটবাবু বিস্তর সাধ্যসাধনা কোল্লেন, “রূপসীর কথায় বিশ্বাস করি নাই” বোলে বিস্তর বুঝালেন, গোঁ ফিরাতে পারেন না। যুবতীমামীর হাত ধোরে টানাটানি কোত্তে পারেন না, পাল্লেনও না; রাঙামামী কত কি বোকতে বোকতে বাড়ী থেকে বেরিয়ে গেলেন।

    সে রাত্রের অভিনয় এই পর্যন্ত। পরদিন প্রাতঃকালে আমি শুনলেম রূপসী পালিয়ে গিয়েছে। উভয়েই আমার কলঙ্করটনার হেতু ছিল,— রাঙামামী আর রূপসী, উভয়েই পালালো। পায়রাটিও উড়েছে কি আছে, জানতে পারা গেল না। আমার নিজের জন্য যে উদ্বেগ জন্মেছিল, সে উদ্বেগটা দূর হয়ে গেল। নির্ভাবনায় দিবা অবসান। রাত্রিকালে আহারাদি কোরে আমি শয়ন কোল্লেম। পাঁচ দিন পাঁচ রাত্রি আমার নিশ্বাস পড়েছিল, সে নিশ্বাসে তীব্র তীব্র অগ্নিকণা আজ রাত্রে আমি স্বচ্ছলে নিশ্বাস ত্যাগ কোল্লেম। অমরকুমারীকে মনে পোড়লো; অমরকুমারী সর্বক্ষণ আমার মনের ভিতর জাগেন, এই রাত্রে মনে পোড়লো, কথাটা যেন অকৃতজ্ঞ হৃদয়ের কথা। তা নয়, চোর অপবাদে আমি প্রায় হতবুদ্ধি হয়েছিলেম, মনে যেন কোন বাসনা— কোন ধারণাই ছিল না; চিন্তাপথে অমরকুমারী আসতেন, চপলার মত চোলে যেতেন; চপলার সঙ্গে ছুটতে পাত্তেম না; নিজের ভাবনাতেই আমি আকুল হয়ে থাকতেম। মানুষের স্বভাবই এইরূপ। মানুষ যখন অভাবনীয় মহাবিপদে পতিত হয়, নিজের পরিত্রাণের চিন্তা ভিন্ন তখন তার মনে অন্যচিন্তা স্থান পায় না, নিজের চিন্তাই বলবতী হয়ে থাকে। সকল চিন্তার উপরেই চিন্তা। এই রাত্রে অমরকুমারীকে মনে পোড়লো, অমরকুমারী কোথায়? এখনো কি ঢাকায়? ঢাকার শাখা-মোকদ্দমা এখনো কি নিষ্পন্ন হয় নাই? আমার কথা কি অমরকুমারীর মনে আছে? লোকে আমারে চোর বোলেছিল, অমরকুমারীর মন কি সে অপবাদের কথা জানতে পেরেছে? আমার প্রতি কি অমরকুমারীর অশ্রদ্ধা জন্মেছে? কত দিনে আবার আমি অমরকুমারীকে দেখতে পাব?— নিৰ্জনে এক জায়গায় বোসে কবে আমি অমরকুমারীকে এই সব কথা জিজ্ঞাসা কোরবো? অমরকুমারীর নাম উচ্চারণ কোল্লে হৃদয় আমার শীতল হয়, দর্শনের আশায় প্রাণ আমার ব্যাকুল হয়; অন্য প্রকারে চিত্ত বিচলিত হয় না, এ রাত্রেও বিচলিত হোচ্ছে না। অমরকুমারী ভাল আছেন; কোন প্রকার অমঙ্গল ঘটনা হোলে বহুদূরে থেকেও অন্তরঙ্গ লোকের মন সে অমঙ্গল জানতে পারে; কোন অমঙ্গল ঘটে নাই, অমরকুমারী ভাল আছেন। অমরকুমারী হয় তো মুর্শিদাবাদে ফিরে গিয়েছেন, শান্তিরাম দত্ত হয় তো তাঁরে পুত্রীরূপে আশ্রয় দিয়েছেন। আবার কি রক্তদন্ত অমরকুমারীর উপর উপদ্রব কোরবে? —না, পারবে না; দীনবন্ধুবাবু অমরকুমারীর রক্ষার উপায়বিধান কোরবেন, পশুপতিবাবু সে কথা আমার কাছে মুক্তকণ্ঠে স্বীকার কোরেছেন। অমরকুমারীর ভয় নাই। আমার ভয় আছে, ভবসংসারের ভয়নিবারণ ভূতভাবন ভবানীপতি এ ভয় আমার ঘুচাবেন। পনেরায় আমি অমরকুমারীকে দেখতে পাব, দেখতে পেয়ে সখী হব, পদ্মমুখে হেসে হেসে পদ্মমুখী আমার সঙ্গে সুখর আলাপ কোরবেন, রজনী দেবী আজ আমারে সেই আশা প্রদান কোচ্ছেন। অমরকুমারীকে ভাবতে ভাবতে অন্যান্য হিতৈষী বন্ধুগণকে হৃদয়াসনে আমি আনয়ন কোল্লেম, হৃদয় জুড়াল; বিরামদায়িনী নিদ্রাদেবী এই সময় আমার প্রতি দয়া কোল্লেন, মঙ্গলময়ী আমাকে হৃদয়ে স্থান দান কোল্লেন। নিদ্রার ক্রোড়ে আমি অচেতন হোলেম।

    নিত্য আমার মনে নূতন নূতন আশার সঞ্চার। আশা সর্বত্র সর্বদা সর্বকার্যে ফলবতী হয় না, তথাপি আশা মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে, এই গুণে আশাকে আমি আদর করি। চোরদায় থেকে মুক্ত হয়ে আমি আশা সলিলে অবগাহন কোল্লেম। সে সময়ে আমার মনে কত রকমের কত আশা খেলা কোত্তে লাগলো, এখন সে সব স্মরণ কোত্তে পাচ্ছিনে। আমার প্রতি ছোটবাবুর যে রকম ভালবাসা ছিল বুঝলেম, সে ভালবাসা দিন দিন বেড়ে উঠলো। রামদাসের ভক্তিও দিন দিন বাড়তে লাগলো, বৌমা দুটিও দিন দিন আমারে বেশী আদর কোত্তে লাগলেন, পাচিকার স্নেহ-যত্নও দিন দিন আমি বেশী বেশী অনুভব কোত্তে লাগলেম। এই রকমে আর একমাস কেটে গেল।

    কর্তা বাড়ীতে এলেন। এসে তিনি সর্বাগ্রেই শুনলেন, বড়বাবু গৃহত্যাগী। কারণ-জিজ্ঞাসু হয়ে বাড়ীর পরিবারবর্গের কাছে কিরূপ তিনি শুনেছিলেন, সে সব কথা আমি শুনতে পেলেম না, তবু মনে মনে ভেবে নিয়েছিলেম, প্রাণগতিবাবু, তাঁর রাঙামামীর প্রাণগতি হয়েছিলেন, সেই গৌরবের কথা তিনি শুনতে পান নাই। রাঙামামী বাড়ীতে নাই, এ কথা যখন কর্তা শুনলেন, তখন তার কারণটিও অনলঙ্কৃতভাবে তাঁর কর্ণগোচর হয়েছিল। শুনে তিনি বিমর্ষ হয়েছিলেন; ক্রমে ক্রমে অপরাপর বিবরণ সমস্তই তিনি শুনলেন। ভূতের ক্রীড়ার অবসান। আমিই সেই অবসানের মূলাধার।

    রামদাস এসে আমারে সংবাদ দিলে, ঐ কথা যখন কর্তার কাণে যায়, তখন তিনি এক বিশাল নিশ্বাস পরিত্যাগ কোরেছিলেন; জানতে চেয়েছিলেন, কোন দিন কোন সময়ে ভৌতিকলীলার অবসান। দিনক্ষণ ছোটবাবুর একখানি খাতায় লেখা ছিল, ছোটবাবু সেই খাতাখানি কর্তার কাছে ধোরে দিলেন, কর্তা সেই অক্ষরগুলি দর্শন কোরে নিমীলিত-নয়নে ক্ষণকাল যেন কি গুটিকত মন্ত্র জপ কোল্লেন, এক দুই কোরে অঙ্গলীর পর্ব গণনা কোল্লেন, শেষে আর একটি দীর্ঘনিশ্বাস ত্যাগ কোরে বিস্মিতবদনে বোল্লেন, “ওঃ! তবে তো গয়ায় পিণ্ডদানের সপ্তাহপূর্বে সেই ঘটনা। আশ্চৰ্য।”

    এই সব কথা রামদাসের মুখে আমি শুনলেম। কর্তার সঙ্গে আমার যখন সাক্ষাৎ হলো, ভূতের কথা তখনো উঠেছিল, কর্তা কিন্তু আমার সাক্ষাতে তখন “আশ্চৰ্য” বাক্যটি উচ্চারণ কোল্লেন না। ভূতের তিরোধান, বড়বাবুর অদর্শন, রাঙামামীর পলায়ন, রূপসীর পলায়ন, এই সমস্ত প্রসঙ্গে অনেকটা সময় অতিবাহিত হয়ে গেল, “আমি কেমন আছি” কর্তা সে কথাটি পৰ্যন্ত জিজ্ঞাসা করবার সময় পেলেন না। সময় পেলেন না কিবা সে কথা জানবার তাঁর দরকার ছিল না, তিনিই তা বোলতে পারেন। গয়ায় গদাধরের পাদপদ্মে পিণ্ডদানের অগ্রে ও অন্য উপায়ে ভূত উদ্ধার হোতে পারে, কর্তার সেটা বিশ্বাস ছিল না, বন্দুকের গুলীতে আমি ভূত উদ্ধার কোরেছি, সে কথাটা তাঁর ভাল লাগলো না, তাঁর মুখের ভাব দেখে তা আমি বুঝতে পাল্লেম। রাঙামামী পালিয়েছে, রূপসী পালিয়েছে, আমিই তার হেতু, বাড়ীর লোকের মুখে সে কথা তিনি শুনেছিলেন, তাতেও যেন আমার উপর তাঁর একটা একটা মন ভার। মনোভাব গোপনে রেখে গুটিকত মিষ্টবচনে আমারে তিনি তুষ্ট করবার চেষ্টা কোল্লেন, আমি তুষ্ট হোতে পাল্লেম না। তাঁর পূর্ব ব্যবহার স্মরণ কোরে আমার দারুণ ভয় হোতে লাগলো।

    গৃহিণী ঠাকুরাণী আমার প্রতি সন্তুষ্ট। অজ্ঞাত লোকেরা আমারে যখন এই বাড়ীতে ফেলে দিয়ে যায়, কর্তা তখন আমারে নেশাখোর বিবেচনা কোরে কাৰ্যে বাক্যে ঘৃণা প্রকাশ কোরেছিলেন; গৃহিণী কিন্তু প্রথমাবধিই আমার প্রতি স্নেহবতী। বাড়ীতে যে কাজ আমি কোরেছি, ভূতগুলোকে তাড়িয়েছি, মিথ্যা মিথ্যা চোর অপবাদে অনেক কষ্ট পেয়েছি, সেই সব কথা শ্রবণ কোরে এবার আমার প্রতি গৃহিণীঠাকুরাণীর অধিক আদর, অধিক যত্ন, অধিক স্নেহ আমি অনুভব কোল্লেম। পুত্রের পরলোকপ্রাপ্তি হোলে জননীর পুত্রশোক উপস্থিত হয়; জ্যেষ্ঠপুত্রের অদর্শনে ততটা না হোক গৃহিণী-ঠাকুরাণী শোকসন্তাপ্ত হয়েছিলেন, কিন্তু আমার প্রতি কোন প্রকার অযত্ন হয় নাই। কর্তা-গিন্নীর প্রত্যাগমনে দিনকতক আমি বরং এক প্রকার সুখেই থাকলেম। কোন প্রকার অপ্রিয়বাক্য আমাকে শুনতে হলো না।

    একদিন সন্ধ্যার পর আমি আপনার ঘরে একাকী বোসে আছি, একজোড়া চসমা চক্ষে দিয়ে, হস্তে একগাছি যষ্টিধারণ কোরে কর্তা সেই সময় সেইখানে এসে উপস্থিত হোলেন; জড়সড় হয়ে বিছানার একধারে আমি সোরে বোসলেম। ঘরের চতুর্দিকে নেত্রপাত কোত্তে কোত্তে কর্তা আমার কাছে বোসলেন।

    কি তাঁর মতলব, কি কথা তিনি বলেন, ভাব বুঝতে না পেরে অবনতমস্তকে আমি ক্ষণকাল নীরব হয়ে থাকলেম। কর্তা হঠাৎ আমারে সম্বোধন কোরে গম্ভীরস্বরে বোল্লেন, “হরিদাস! পূর্বে কি তুমি বর্ধমানে ছিলে? মোহনলাল ঘোষ নামে একটি বাবুর সঙ্গে সেখানে তোমার সাক্ষাৎ হয়েছিল?” —দুই প্রশ্নেই আমি ‘হাঁ’ দিলেম। কর্তা বোল্লেন, “সেই মোহনলালবাবু এখন পাটনায়; তীর্থ কর্ম সমাধা কোরে আমি একবার পাটনায় গিয়েছিলেম, মোহনলালের সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হয়েছিল। তিনি একজন জমীদার। এই জেলায় তাঁর একখানি জমীদারী আছে, মধ্যে মধ্যে কোন কোন বিষয়কার্যের উপলক্ষে পূর্বে পূর্বে তিনি এখানে আসতেন, এইখানেই তাঁর সঙ্গে আমার দেখাশুনো ছিল, আলাপপরিচয় হয়েছিল। পাটনা সহরে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ কোরে অনেক নূতন নূতন কথা আমি জানতে পেরেছি। তিনি বেশ লোক; ভাললোকের প্রতি ভগবানের কৃপা হয়, ভগবানের কৃপা হোলে কমলাও প্রসন্না হন, মোহনলালের প্রতি কমলার শুভদৃষ্টি পতিত হয়েছে। ছিলেন তিনি বড়মানুষ, আছেন তিনি বড়মানুষ, তার উপর সম্প্রতি নূতন সৌভাগ্যের উদয়। তাঁর একটি মাতুলানী সম্প্রতি লোকান্তর প্রাপ্ত হয়েছেন; তিনি বিধবা ছিলেন, সন্তান-সন্ততি জন্মে নাই, প্রায় লক্ষ টাকা উপস্বত্বের বিষয় তাঁর অধিকারে ছিল, অন্য কোন নিকট উত্তরাধিকারী না থাকাতে মোহনলালবাবু সেই বিষয়ের অধিকারী হয়েছেন। কতকগুলি সৎকার্যের পুরস্কারস্বরূপ রাজদরবার থেকে তিনি রাজা উপাধি লাভ কোরেছেন। তাঁর মুখে আমি তোমার অনেক সুখ্যাতি শ্রবণ কোরেছি। ছেলেবুদ্ধিতে তুমি তাঁর অবাধ্য হয়েছিলে, সে জন্য তিনি আপসোস করেন; অন্তরে কিন্তু তোমার উপর তিনি দয়াশূন্য হন নাই। এই সময় তুমি যদি একবার তাঁর সঙ্গে দেখা কোত্তে পার, তা হোলে তোমার বিশেষ উপকার হোতে পারে। আর দেখ— অবস্থাগতিকে তোমার চরিত্রের প্রতি প্রথমে আমার কিছু সন্দেহ জন্মেছিল, তোমাকে আমি তিরস্কার কোরেছিলাম, সে সব কথা তুমি আর মনে কোরো না; প্রকৃত অবস্থা আমি বুঝতে পারি নাই; মোহনবাবুর মুখে তোমার চরিত্রের প্রশংসা শুনে আমি বিশেষ সন্তুষ্ট হয়েছি। চিরদিন এই বাড়ীতে রেখে তোমাকে আমি পুত্রবৎ পালন করি, এই আমার ইচ্ছা। কিন্তু কিছু দিনের জন্য একবার তোমার পাটনায় যাওয়া আবশ্যক। কি বল? — যাওয়ার তোমার ইচ্ছা আছে?”

    কথাগুলি আমি শুনলেম, প্রশ্নমাত্রেই কোন উত্তর দিলেম না। আমার মৌন দর্শন কোরে কর্তামহাশয় কি ভাবলেন, কি বুঝলেন, বোলতে পারি না, নীরবে কিয়ৎক্ষণ আমার দিকে চেয়ে থেকে সহসা তিনি গাত্রোত্থান কোল্লেন, ঘর থেকে বেরিয়ে চোল্লেন: যাবার সময় আমারে বোলে গেলেন, “আচ্ছা, বিবেচনা কর। পাটনায় যেতে তোমার ইচ্ছা আছে কি না, বিবেচনা কোরে স্থির কর, কল্য আমি তোমার মুখে এই বিষয়ের মীমাংসা শ্রবণ কোরবো।”

    কর্তা চোলে গেলেন, আমি ভাবতে বোসলেম। মোহনলালবাবু লক্ষ টাকার বিষয় পেয়েছেন, রাজা হয়েছেন, আমারে স্মরণ কোরেছেন, কি ভাব? অকস্মাৎ আমার প্রতি কেন তিনি এত সদয়? তাঁর সঙ্গে আমার শেষ দেখা কাশীধামে। প্রথম প্রথম দিনকতক আদর পেয়েছিলেম। শেষকালে আমি তাঁর বিষনয়নে পড়ি; বুদ্ধির দোষে অথবা আত্মবিশ্বাসে আমি তাঁর চরিত্রের গুটিকতক কথা রমণবাবুর নিকটে ব্যক্ত কোচ্ছিলেম, গোপনে অন্তরালে দাঁড়িয়ে সেই সব কথা শ্রবণ কোরে তিনি আমার উপরে খড়্গহস্ত হয়েছিলেন, তদবধি তাঁর সঙ্গে আর আমার দেখা-সাক্ষাৎ নাই। এত দিনের পর অকস্মাৎ তিনি আমারে স্মরণ কোরেছেন, ভাব কি?— আর কি তবে আমার উপর কোন প্রকার উৎপীড়ন হবে না? বৈরিবেষ্টিত হয়ে আর কি আমারে অহরহ যন্ত্রণা ভোগ কোত্তে হবে না? সমস্ত উপদ্রবই কি থেমে যাবে? তাই যদি সত্য হয়, থামে যদি সত্য, তবে তো আমার গ্রহ সুপ্রসন্ন; কিন্তু তাও কি সম্ভব? দুরাচার রক্তদত্ত তাঁর প্রধান চেলা; কেবল চেলা নয়, বেতনভোগী চাকর। মোহনবাবুর পরামর্শে রক্তদন্ত চলে, বলে, কুকার্য করে, আবশ্যক হোলে মানুষ খুন কোত্তেও প্রস্তুত হয়। আমি ভুক্তভোগী, আমার উপর রক্তদন্তের বিষম আক্রোশ; মোহনবাবু যদি তারে নিবারণ করেন, তা হোলে সংসারে আমি এক প্রকার নিরাপদে থাকতে পারবো। কাশীতে আমি জানতে পেরেছিলেম, মোহনবাবু, একখানি পত্র লিখে রক্তদন্তকে আমার উপর দৌরাত্ম্য কোত্তে নিষেধ কোরেছিলেন; তার পর আবার যে সেই। এখন আমার কি করা কর্তব্য? পাটনায় গিয়ে মোহনবাবুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করা; পাটনায় আমার পরিচিত লোক কেহই নাই, কায়দায় পেয়ে মোহনবাবু, যদি আমারে আটক কোরে ফেলেন, তা হোলে আমি কি উপায়ে রক্ষা পাব? এ দিকে আমার অনেক কাজ বাকী, দুই জেলায় দুই মোকদ্দমা দায়ের, অমরকুমারীর উদ্ধারসাধন আমারই উদযোগ-সাপেক্ষ, কি করি?—যাই কি না যাই? প্রবলপক্ষের মনস্তুষ্টিসাধন করাতে উপকার আছে; মোহনবাবু প্রবল, আমি দুর্বল, তাঁর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা আমার অসাধ্য। তিনি কুপিত হোলে আমার বিস্তর অনিষ্ট কোত্তে পারেন; তিনি প্রসন্ন থাকলে সংসারে সর্বদা আমারে শঙ্কিত থাকতে হয় না। এই সকল বিবেচনা কোরে, কিঞ্চিৎ সন্দেহ থাকলেও অবশেষে স্থির কোল্লেম, পাটনায় একবার যাওয়াই কর্তব্য।

    কর্তব্য স্থির কোরে বোসে আছি, ছোটবাবু এলেন। কর্তব্য স্থির হোলেও চিত্ত তখন আমার চিন্তাশূন্য ছিল না। আমারে চিন্তানিমগ্ন দর্শন কোরে উপবেশনের অগ্রেই ছোটবাবু জিজ্ঞাসা কোল্লেন, “কি ভাবছো হরিদাস? যখন আমি তোমাকে দেখি, তখনি তুমি বিমর্ষ থাকো; কত রকম আমোদজনক ঘটনা হয়, কত রকম আনন্দোৎসব উপস্থিত হয়, সে দিকে তোমার মন থাকে না, সর্বদাই তুমি যেন কি ভাব; এত অল্প বয়সে এত ভাবনা কি তোমার?”

    আমি উত্তর কোল্লেম, “আপনি কখন আসবেন, তাই আমি ভাবছিলেম। আপনি বসুন কতকগুলি কথা আছে।” ছোটবাবু বোসলেন। প্রথমেই আমি কর্তার কথা তুল্লেম, কর্তা আমারে পাটনায় যেতে অনুরোধ কোচ্ছেন; পাটনায় একটি বাবু আছেন, সেই বাবুর সঙ্গে পূর্বে আমার জানাশুনা ছিল— আপনাদের বাড়ীতে আমি আছি, গল্প প্রসঙ্গে কর্তার মুখে সেই কথা জানতে পেরে সেই বাবুটি আমারে স্মরণ কোরেছেন, পাটনায় যেতে বোলেছেন; আমিও এক রকম স্থির কোরেছি, যাওয়া কর্তব্য। আপনি কিরূপ পরামর্শ দেন?”

    ছোটবাবু বোল্লেন, “তোমাকে ছেড়ে দিতে আমার ইচ্ছা হয় না। পরামর্শ কি দিব? পাটনার বাবু কি প্রকৃতির বাবু, তোমার সঙ্গে তাঁর কিরূপ আলাপ, তাঁর কাছে তোমার কিরূপ প্রয়োজন, সে সব না জানলে কি প্রকারে পরামর্শ দেওয়া যায়?” সংক্ষেপে আমি গুটিকতক কথা বোল্লেম, মোহনবাবু আমার ভয়ের কারণ, সে কথা বোল্লেম না, সাক্ষাৎ কোত্তে পাল্লে কোন প্রকার উপকারের সম্ভাবনা আছে, কেবল এই পর্যন্তই ছোটবাবুকে আমি জানালেম। তিনি তখন একটু চিন্তা কোরে বোল্লেন, “কর্তা যদি ইচ্ছা করেন, তুমি যদি ইচ্ছা কর, তবে একবার যেতে পার, কিন্তু বেশী দিন সেখানে থেকো না, শীঘ্র আবার ফিরে এসো। কবে যাবে স্থির কোরেছ?”

    আমি তখন আর একখানা ভাবছিলেম, “কবে যাবে স্থির কোরেছ” এই প্রশ্নের উত্তরের ভূমিকায় আমি বোল্লেম, স্থির এখনো কিছুই করি নাই, আপনার অভিপ্রায় জানবার জন্য অপেক্ষা কোচ্ছিলেম। এখানে এসে আমি অনেক রকম কাজ করেছি। অনেক রকম তাজ্জব ব্যাপার দর্শন কোরেছি, অনেক রকম অদ্ভুত অদ্ভুত কথাও শ্রবণ কোরেছি, একটি কাজ আমার বাকী আছে।” — ছোটবাবু জিজ্ঞাসা কোল্লেন, কোন কার্য বাকী?”

    সেই পূর্বকথাই আমি পুনরোল্লেখ কোল্লেম,— পায়রাবাবুকে একবার এই বাড়ীতে হাজির করা। কি কারণে হাজির করা প্রয়োজন, স্পষ্ট কিছু ভাঙলেম না, কেবল এইমাত্র বোল্লেম, “ভূতের ব্যাপারের সঙ্গে পায়রাবাবুর অতি নিকট সম্বন্ধ। ভূতগুলি উদ্ধার হয়ে গিয়েছে, সেই দুঃখে পায়রাবাবু ম্রিয়মাণ আছেন; তাঁরে গুটিকত প্রবোধ বাক্য—”

    হাস্য কোরে ছোটবাবু বোল্লেন, “পায়রাকে প্রবোধ দিয়ে তুমি ঠাণ্ডা কোত্তে পারবে, এমন আমার বিশ্বাস হয় না। পায়রাবাবুটি তুখোড় লোক, বেশী চালাক, সকল রকমে সকল দিকেই তার বুদ্ধি খেলে; অল্পদিনে সে সব আমি বুঝতে পেরেছি। পায়রা এ দেশে ছিল না, নূতন এসেছে, সে কথা তুমি শুনেছ; নূতন লোকের সঙ্গে বেশী ঘনিষ্ঠতা না কোল্লে চরিত্র ধরা যায় না, তথাপি বিনা ঘনিষ্ঠতায় পায়রাকে আমি এক প্রকার চিনে নিয়েছি। পায়রার একটা রোগ আছে; ঔষধের মোড়ক নিয়ে তুমি—”

    হাঁপাতে হাঁপাতে ছুটে এসে রামদাস সেই সময় সংবাদ দিলে, “নূতন বিপদ উপস্থিত! পুলিশের লোক এসেছে! খুনের খবর এনেছে! আমাদের বাড়ীতে যিনি আগে আগে ঠাকুরপূজা কোত্তেন, সেই বামুনঠাকুর সঙ্গে আছেন। চাতালপুর গ্রামের এক মাঠের ধারে একটা গাছতলায় মেয়েমানুষ খুন! এই রকম কথা তারা বোলছে, উপরে আসতে চাচ্ছে, আমি তাদের কি বোলবো?”

    খুনের খবর শুনে চমকিতভাবে ছোটবাবু বোল্লেন, “কোথায় মাঠের ধারে খুন হয়েছে, আমাদের বাড়ীতে তার কি? আচ্ছা, দাঁড়াতে বল গে, আমি যাচ্ছি।”

    রামদাস নেমে গেল। একটু পরে একটি জামা গায়ে দিয়ে ছোটবাবু উপর থেকে নামলেন, অনিশ্চিত ভাবনায় কৌতূহলবশে আমিও সঙ্গে গেলেম; — গিয়ে দেখি, একজন ফাঁড়ীদার ব্রাহ্মণ, আর দুই জন বরকন্দাজ, সঙ্গে একজন ভট্টাচাৰ্য। ভট্টাচাৰ্যকে সম্বোধন কোরে ছোটবাবু জিজ্ঞাসা কোল্লেন, “কি মথুরে কাকা? ব্যাপার কি? আপনার সঙ্গে পুলিশ কেন?”

    ছোটবাবু বোল্লেন মথুর কাকা, আমি শুনলেম মথুর কাকা, এখন মথুর কাকা কি উত্তর দেন, সেই কথা শুনবার জন্য তাঁর মুখ-পানে আমি চেয়ে থাকলেম। মথুর কাকা একবার ফাঁড়ীদারের মুখের দিকে চাইলেন, ফাঁড়ীদার বোলতে লাগলো, “চাতালপুরের এক বাগানের এক বৃক্ষতলে একটি স্ত্রীলোকের মৃতদেহ পাওয়া গিয়েছে, গলায় দড়ী কিম্বা সর্পাঘাত কিম্বা বিষখাওয়া, তার কোন নিদর্শন পাওয়া যাচ্ছে না। কেহ তাকে খুন কোরেছে কি না, তাও প্রকাশ হোচ্ছে না, কে সেই স্ত্রীলোক, কোথা থেকে এসেছিল, সে কথাও কেহ বোলতে পারে না। গ্রামের কেহ নয়; গ্রামের লোকেরা চিনতে পাচ্ছিল না, দু একজন বোলেছিল, তিন চারি দিন গ্রামের রাস্তার ধারে সেই স্ত্রীলোককে তারা দেখেছে। আর কোন বিশেষ কথা তার কিছুই জানে না। আমি তদারক কোচ্ছিলেম, এমন সময় এই ব্রাহ্মণঠাকুর সেইখানে উপস্থিত হোলেন, লাশ দেখে ইনি চিনতে পাল্লেন। এরি মুখে আমি শুনলেম, সেই স্ত্রীলোক আপনাদের বাড়ীতে ছিল, তার নাম রাধারাণী। কি প্রকারে মোরেছে, চাতালপুরে কেন গিয়েছিল, এই সব কথা আমাদের জানা দরকার। আপনাকে একবার চাতালপুরে যেতে হবে, মোড়ল-চৌকিদার মোতায়েন রেখে আপনার কাছে আমি এসেছি।”

    দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই কথা। ফাঁড়ীদারকে কেহ বোসতে বোল্লে না, আমরাও কেহ বোসলেম না, বরকন্দাজেরা এক এক লাঠি ঘাড়ে কোরে প্রাচীর ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলো। ফাঁড়ীদারের কথায় ছোটবাবু বোল্লেন, “সে সব কাজ তোমাদের, আমাকে কেন চাতালপুরে নিয়ে যাবার আকিঞ্চন পাও? ভট্টাচাৰ্য মহাশয় চিনতে পেরেছেন, নাম রাধারাণী, সে কথাও বোলেছেন, এখন আমি বুঝতে পাচ্ছি। সে স্ত্রীলোক আমাদের বাড়ীর লোক নয়, কিছুদিন আমাদের বাড়ীতে ছিল, একমাসের বেশী হলো আপন ইচ্ছায় চোলে গিয়েছিল; তার পর কোথায় কি হয়েছে আমরা তার কি জানি? কোথায় কি রকমে মোরেছে, সরকারী ডাক্তারেরা পরীক্ষা কোল্লেই জানতে পারবে। সনাক্ত হয়ে গিয়েছে, তবে আর আমাকে কেন কষ্ট দিতে চাও? তোমরাই বা কষ্ট পেয়ে এতদূর কেন এসেছ? স্বস্থানে ফিরে যাও; ঐরূপ অপঘাতমৃত্যুর তদারকে যেমন যেমন তোমাদের কর্তব্য, আইন যেমন বলে, তাই তোমরা কর গে; আমার সেখানে যাবার কোন দরকার নাই; আমি যাব না।”

    পুলিশের লোক প্রায়ই জুলমবাজ হয়; ভদ্রলোককে অনর্থক কষ্ট দিয়ে ষটচক্র সৃজন কোরে আপনাদের স্বার্থসিদ্ধির চেষ্টা পায়। এই ফাঁড়ীদারটী কিছু ভালমানুষ ছিল; বোধ হয় নূতন লোক, পুলিশের কায়দা দস্তুরমত শিক্ষা করে নাই। ছোটবাবুর কাটা কাটা কথাগুলি শ্রবণ কোরে সে লোক আর কোন মারপেঁচের কথা বোল্লে না, আট গড়া পয়সা রাহাখরচ গ্রহণ কোরে অল্পে অল্পে বিদায় হয়ে গেল। কায়দার মধ্যে কেবল এইটুকু দেখলেম, মথুর ভট্টাচাৰ্যকে ছেড়ে গেল না।

    আমরা আবার উপরে গিয়ে উঠলেম; যে সব কথা শুনে এলেম, অননুচ্চস্বরে তারই আলোচনা কোত্তে লাগলেম। রামদাসকে সাবধান কোরে ছোটবাবু বোলে দিলেন, খবরদার, কর্তা যেন এ সব কথা না শোনেন। বাড়ীর মেয়েরাও যেন এ সব কথা শুনতে না পায়। কাহারো কাছে তুমি এ গল্প কোরো না।”

    স্বীকার কোরে রামদাস আপন কর্মে গেল, ছোটবাবুতে আমাতে নির্জনে থাকলেম। ছোটবাবু বোল্লেন, “দেখ হরিদাস, কোথাকার পাপ কোথায়? পাপের প্রায়শ্চিত্ত এই রকমেই হয়। রাঙামামী মোরেছে, আত্মঘাতিনী হয়েছে কিম্বা কেহ তারে খুন কোরে মাঠের ধারে ফেলে গিয়েছে, ঠিক জানা যাচ্ছে না বটে; কিন্তু প্রায়শ্চিত্ত ঠিক হয়েছে। যে রকম ঢলাঢলি আরম্ভ হয়েছিল, আমি তাতে ভয় পেয়েছিলেম; বাড়ীর ভিতর পাছে কোন কাণ্ড ঘটে, বাড়ীর ভিতর পাছে খুনোখুনী হয়, সেই ভয়ে সদাই আমি শঙ্কিত থাকতেম। ভূতের কাণ্ড গেল, দাদার কাণ্ড গেল, তার পর তোমার নামে চোর অপবাদ রটলো, আর কিছু দিন থাকলে আরো যে কত রকম কি কারখানা হোতো, কে বোলতে পারে? ভালোয় ভালোয় আপনাআপনি বিদায় হয়ে গিয়েছিল, জন্মের মত পৃথিবী হোতে বিদায় হয়ে গেল, এক রকম হলো ভাল। সকল পাপের যদি এই রকম হাতে হাতে প্রায়শ্চিত্ত হয়, তা হোলে সংসারের পাপ-তাপ অনেকটা কম হয়ে আসে।”

    ফাঁড়ীদারের কথা আমি শুনেছি, ছোটবাবুর কথাও শুনলেম, কিন্তু ছোটবাবুর শেষের কথাগুলি বিশেষ মনোযোগ দিয়ে শুনলেম না। নূতন একটা কল্পনা মনোমধ্যে সমূদিত হয়ে আমারে কিছু অন্যমনস্ক কোরে দিয়েছিল। ছোটবাবুর কথা সমাপ্ত হলো কিম্বা আরও কিছু, তাঁর বক্তব্য বাকী থাকলো, সে দিকে লক্ষ্য না রেখে হঠাৎ আমি মন্তব্য দিলেম, “হাতে হাতে প্রায়শ্চিত্ত হওয়া খুব ভাল। আর একজন যদি এই সময় একটা প্রায়শ্চিত্ত করে, তা হোলে আমার একটা মনস্কামনা পূর্ণ হয়, মস্ত একটা সন্দেহও জন্মে রয়েছে, সেটাও দূর হয়ে যায়।”

    তাৎপর্যগ্রহণে অসমর্থ হয়ে সকৌতুকে ছোটবাবু আমারে জিজ্ঞাসা কোল্লেন, “আবার কার কি রকম প্রায়শ্চিত্ত হরিদাস? যার পাপ, সে তো আপনার জীবন দিয়ে মহাপ্রায়শ্চিত্ত কোরে গেল, তবে আর তুমি অন্য কোন পাপীর প্রায়শ্চিত্তের কথা বোলছ?”

    আমি একটু ভাবলেম, সহসা যদি অকপটে মনের কথা প্রকাশ করি, তা হোলে হয় তো উপহাসেই ছোটবাবু আমার কথাটা উড়িয়ে দিবেন, একটু বাঁধনী রাখা আবশ্যক। মনে মনে বন্ধনের সূত্র কল্পনা কোরে ছোটবাবুকে আমি বোল্লেম, “আপনাদের গ্রামে অনেক রকম তামাসা আমি দেখলেম, তামাসা-দর্শনে প্রায় সকল লোকেই কৌতুক অনুভব করে, আমোদ অনুভব করে, যারা তামাসা দেখায়, তাদের অনেকের রঙ্গভঙ্গ দর্শনে প্রায় সকলেই অবিচ্ছেদে হাস্য করে; এখানকার তামাসায় আমি দুই প্রকার দেখলেম। হাস্যের উদয় হয়, কতক তামাসায় কষ্ট অনভূত হয়ে থাকে। কতক তামাসায় তামাসগীর লোক এখানে অনেক আছে বোধ হয়। একটি কথা আপনাকে আমি জিজ্ঞাসা কোত্তে চাই; এ গ্রামে কি দুই একজন বহুরূপী পাওয়া যায়? বহরূপীদের তামাসা বড় চমৎকার। একটি বহুরূপীর ক্রীড়াদর্শনে আমার অভিলাষ জন্মেছে, আছে কি কোন বহরূপী?”

    একদৃষ্টে আমার নয়ন নিরীক্ষণ কোরে ছোটবাবু বোপ্পেন, “এ যে দেখছি তোমার অদ্ভুত অভিলাষ। সকল জায়গায় কি বহরূপী থাকে? সকল পল্লীগ্রামে কি বহুরূপী পাওয়া যায়? আমাদের গ্রামে বহুরূপী নাই; তবে মধ্যে মধ্যে দুই একটা মেলার স্থলে দুই একজন বহুরূপী আসে। মধ্যে মধ্যে কখন কখন গৃহস্থ লোকের বাড়ীতেও এক একজন বহুরূপী দেখা দেয়, এই পর্যন্ত আমি জানি। এ গ্রামে বহুরূপী নাই।”

    আবার আমি একটু ভাবলেম; ভেবে ভেবে জিজ্ঞাসা কোল্লেম, “বহরূপীদের কোনপ্রকার সজ্জা এখানকার নিকটবর্তী কোন স্থানে কাহারো নিকটে পাওয়া যেতে পারে না?”— ছোটবাবু বোল্লেন, “যেখানে বহুরূপী নাই, সেখানে বহুরূপীর সাজ পাওয়া অসম্ভব; তবে এখানে যাত্রার দল আছে তাদের কোন রকম সাজ পেলে যদি তোমার কোন কাজে লাগে, তা বরং যোগাড় করা যেতে পারে।”

    না পাওয়ার চেয়ে বরং তা পাওয়াও ভাল, এই বিবেচনা কোরে আমি বোল্লেম, “যাত্রার দলে যারা মুনিগোঁসাই সাজে, তাদের সেই রকমের একটা সাজ পেলে একটি লোকের উপকার হয়। আপনি যদি দয়া কোরে সেই সাজ আমারে আনিয়ে দেন, তা হোলে আমি উপকৃত হই।”

    ছোটবাবু সম্মত হোলেন। আর তখন আমাদের বেশী কথা কিছু হলো না। ছোটবাবু অন্দরে প্রবেশ কোল্লেন। উপর থেকে নেমে গিয়ে আমি রামদাসের অন্বেষণ কোল্লেম, রামদাসকে পেলেম, চুপি চুপি তারে একটি পরামর্শ দিলেম। যেন একটু ভয় পেয়ে রামদাস বোল্লো, “আমায় ও কথা কেন বল? সে কি আমার কর্ম? আমি পারব না। তুমি যদি নিজে পার, চেষ্টা কোরে দেখ; আমি বরং তোমার সঙ্গে থাকবো।”

    রামদাসের শঙ্কিতভাব অনুভব কোরে, মনে মনে হেসে পুনর্বার আমি তারে বোল্লেম “ভয় পাও কেন? সরপট তোমারে কোন কাজ কোত্তে হবে না, সে বাড়ীতে যেতে হবে না, পল্লীর অপর কোন লোককে জিজ্ঞাসা কোরে শুধু কেবল জেনে আসবে সেই লোক এখন এ গ্রামে আছে কি না? সর্বদা বাড়ীতে থাকে কি না? সর্বদা যদি না থাকে, কোন সময় তার দেখা পাওয়া যায়, শুধু কেবল সেইটুকু জেনে আসতে পার আমার কাজ হবে।”

    গণগণেশ্বরে আপন মনে কিয়ৎক্ষণ গুঞ্জন কোরে রামদাস শেষকালে বোল্লে, “তোমার খেলা তুমিই বুঝতে পার, খেলার ভাল-মন্দ তুমিই জানো; আমি তোমাদের হুকমের চাকর, কাজেই আমাকে সব রকম হুকুম তামিল কোত্তে হয়। এখন তুমি যে কথা বোল্লে, সে কাজটা হয় তো আমি পারবো। রাত্রের কথা নয়, প্রভাত হোক, আমি একবার চেষ্টা কোরে দেখে আসবো।”

    কাৰ্যসিদ্ধির আভাষ পেয়ে পুনর্বার আমি বোল্লেম, “প্রভাতে হোক, বেলা এক প্রহরে হোক, দ্বিপ্রহরে হোক, সন্ধ্যার মধ্যে সংবাদটা পেলেই আমি যথাকর্তব্য অবধারণ কোত্তে পারবো; কেবল কথাটিমাত্র এনে দিবে, এই তোমার কাজ।”

    কি একটা চিন্তা কোরে রামদাস বোল্লে, “ঐ পর্যন্ত আমার কাজ, তা আমি বুঝলেম, ভাবতে কথাটা খুব সহজ বটে, কিন্তু আমার মনে যেন কোন প্রকার গোলমাল ঠেকছে। দেখ বাপু, আর যেন কিছু বাড়াবাড়ি করো না; যা করবার, ঢের কোরেছ, তার উপর আর কিছু বেশী হোলে ঢলাঢলি আরো বেশী হবে, আমি কেবল সেই ভয় করি, যে সব কাজ তুমি কোরেছ, এক রকম মানিয়ে গিয়েছে; সে সময় কর্তা বাড়িতে ছিলেন না, ততটা গোলমাল হয় নাই; কর্তা এখন ফিরে এসেছেন, সাবধান হয়ে কাজ কোরো। খবরটা আমি তোমাকে এনে দিব, তুমি নিশ্চিন্ত থাকো।”

    রামদাসের তখন বাড়ির ভিতর কাজ ছিল, রামদাস অন্দরে গেল, আমি আপনার ঘরে গিয়ে এক প্রকার নিশ্চিন্ত হয়ে বোসলেম।

    রাত্রের কার্য এই পর্যন্ত। আহারান্তে ঘরের দরজা বন্ধ কোরে আমি শয়ন কোল্লেম। যেটি আমার নূতন সংকল্প, মনে মনে খানিকক্ষণ সেইটি আলোচনা কোরে, পাকিয়ে রেখে, ভবিষ্যৎ কর্তব্য অবধারণ কোতে লাগলেম। বাধা পোড়ে গেল। আমার গৃহদ্বারে দুই তিনবার জোরে জোরে করাঘাত। শুয়ে শুয়েই আমি জিজ্ঞাসা কোল্লেম, কে?— উত্তর পেলেম না। সদরদরজা বন্ধ হয়েছিল, বাহিরের লোক আসবে না; রূপসী পালিয়ে গিয়েছে, রূপসীর ভয়ও ছিল না; আমি উঠলেম। পুনর্বার দ্বারে করাঘাত। ধীরে ধীরে দরজা খুলে আমি পাশ কাটিয়ে সোরে দাঁড়ালেম: গৃহের দীপ তখনো নির্বাপিত হয় নাই; সম্মুখে দেখি— কর্তা।

    অকস্মাৎ আমার তখন কেমন একটা আতঙ্ক এলো। এত রাত্রে কর্তা এ ঘরে কেন? রামদাস বুঝি আমার পরামর্শের কথা কর্তাকে কিছু জানিয়েছে. তাই শুনে কর্তা বুঝি আমারে ধমক দিতে এসেছেন, এইরূপ ভাবনাই আমার আতঙ্কের কারণ। শেষে বুঝলেম; তা নয়; বিছানার উপর উপবিষ্ট হয়ে, নিকটে আমারে ডেকে, প্রফল্লবদনে কর্তা জিজ্ঞাসা কোল্লেন, “সে কথা মনে আছে হরিদাস? বিবেচনা কোরে কিরূপে স্থির কোরেছ? পাটনায় যেতে ইচ্ছা হয়; মোহনলালবাবু বেশ লোক, তিনি একবার তোমাকে দেখতে চান; দেখা কোল্লে বোধ করি তোমার পক্ষে ভাল হবে; তুমি তোমার নিজের জাতিকুল জানতে না, এখনো জান না; কিন্তু মোহনলালবাবু বোলেছেন, তিনি তোমার জাতিকুল অবগত আছেন। কথার ভাবে আমি বুঝেছি, তুমি তাঁর স্বজাতীয় কোন ভদ্রলোকের সন্তান। তার সময় এখন খুব ভাল, তোমার প্রতিও তিনি বেশ সদয়, এই সময় একবার যদি তুমি দেখা কর, খুব ভালই হবে, এইরূপ আমি বুঝতে পাচ্ছি। যাওয়া যদি তোমার মত হয়, বিলম্ব কারো না, বেশী দিন আর তিনি পাটনায় থাকবেন না; এক মাসের ভিতরেই তিনি শ্রীবৃন্দাবন- যাত্রা ’কারবেন, এইরূপে আমি শুনে এসেছি। কেন আমি তোমাকে এত কথা বোলছি, তা তুমি বুঝতে পেরেছ? তোমার উপকার হোলে, আমি সন্তুষ্ট হব, সেই জন্যই বলা। সন্ধ্যাকালে আমি পাঁজি দেখেছি, আগামী কল্য শুভদিন, কল্যই তুমি যাত্রা কোত্তে পার। রাহাখরচ ইত্যাদি যাহা কিছু প্রয়োজন, সব আমি দিব, কল্যই তুমি যাও, এই আমার ইচ্ছা।”

    কর্তার ইচ্ছায় আমার একটা বড় ইচ্ছা চরিতার্থ করবার বাধা পড়ে, তাই ভেবে, বিনীতভাবে মৃদুস্বরে আমি বোল্লেম, “আজ্ঞা! আপনার ইচ্ছার অবাধ্য হওয়া আমার উচিত হয় না, কিন্তু এখানে আমার একটি বিশেষ কার্য আছে. সপ্তাহের মধ্যে সেকার্য আমি সিদ্ধ কোত্তেও পারবো, এমন আশা রাখি; অনুগ্রহ পূর্বক সপ্তাহের পরে আপনি আর একটি শুভদিন স্থির কোরে দিবেন, সেই দিনেই আমি রওনা হবো। মোহনলালবাবু একমাস পাটনায় থাকবেন, তার মধ্যে আমি সেখানে উপস্থিত হয়ে দেখা কোত্তে পারবো, তাতে আর কোন সন্দেহ থাকবে না।

    কর্তা বোল্লেন, “আচ্ছা, তবে তাই কোরো, কিন্তু দেখো, বেশী বিলম্ব যেন না হয়।  এখানকার কাজটা সপ্তাহের অগ্রে যাতে সমাধা কোত্তে পার, চেষ্টা কোরো।”

    এইরূপ উপদেশ দিয়ে কর্তা উঠে গেলেন, আবার আমি দরজা বন্ধ কোরে শয়ন কোল্লেম। পাটনায় আমি যাব, ভেবে আমার ভয় হলো কি আহ্লাদ হলো, নিজেই যেন আমি সে ভাবটা স্থির কোত্তে পাল্লেম না। মোহনলালবাবু বর্ধমানে আমার প্রতি যেরূপ সদয়ভাব—নির্দয়ভাব দেখিয়েছিলেন, স্মরণ হলো; ভেলুয়া-চটিতে গৃহদাহের সময় তিনি আমারে যেরূপে আদর কোরেছিলেন, স্মরণ হলো; বারাণসীধামে প্রথম দর্শনে তাঁর প্রসন্নতা আমি লাভ কোরেছিলেম, তার পর অপ্রসন্নতার আক্রমণ, সে কথাও স্মরণ হলো। এখন পাটনায় গিয়ে আদর পাব কিম্বা তাঁর রক্তচক্ষু দর্শন কোরবো, নিশ্চয়তা নাই, এইরূপ আমি ভাবলেম। রক্তচক্ষু দর্শন সত্যই যদি আমার ভাগ্যে ঘটে, তাতেই বা এত কি ভয়? মোহনবাবু মনুষ্য, রাক্ষস নন, রাগের বশে টপ কোরে তিনি আমারে খেয়ে ফেলবেন না; যদি বেগতিক দেখি, পালিয়ে গিয়ে আত্মরক্ষা কোত্তে পারবো। পাটনায় আমি যাব। মোহনবাবু যেতে বোলেছেন, সেই জন্যই আমারে যেতে হবে, কর্তা যদি এমন কথা বোলতেন, তা হোলে আমি যেতেম না। আজ রাত্রে যে কথা শুনলেম, সেই কথার উপরেই আমার ভবিষ্যৎ আশার প্রধান একটি অংশ নির্ভর কোচ্ছে, সেই জন্যই আমি যাব।

    কর্তা বোলে গেলেন, মোহনলালবাবু বোলেছেন, আমি তাঁর স্বজাতি; এ কথা যদি সত্য হয়, তা হোলে মোহনলালবাবু আমার অপরাপর পরিচয়ও অবশ্য জানেন। যে পরিচয় আমি জন্মাবধি জানি না, সেই পরিচয় আমি তাঁর মুখে শুনতে পাব; মনে একটি উল্লাস জন্মিল; সেই জন্যই আমি যাব।

    একরকম সংকল্প আমি স্থির কোল্লেম, নিশ্চিন্ত হোলেম না; মনে আবার একটা তর্ক উঠলো। পাটনায় আমার কথাটা কেন উঠেছিল? কে তুলেছিলেন? মোহনবাবু কিম্বা জয়শঙ্করবাবু? মোহনবাবু হঠাৎ একজন অপর লোকের কাছে আমার কথা তুলবেন, এমন তো সম্ভব বোধ হয় না; জয়শঙ্করবাবুই তুলে থাকবেন; কিন্তু কেন? আবার মনটা আমার অন্যদিকে ঘুরে গেল; যে সন্দেহটা মনে মনে চাপা ছিল, সেই সন্দেহ আবার জাগলো। অজ্ঞান অবস্থায় ত্রিপুরা জেলায় যারা আমারে ফেলে রেখে গিয়েছে কর্তা সে কথা অস্বীকার কোল্লেও অন্য সূত্রে সে তত্ত্ব আমি জেনেছি। সূত্র কিছু না থাকলেও তাই-ই আমি জানতেম; কেন না অচেতন লোকেরা নিজের চেষ্টায় হেঁটে আসতে পারে না। আমি অচেতন ছিলেম, সেই অবস্থায় জয়শঙ্করবাবু এখানে আমারে দেখেছেন; তাতেই বুঝা গিয়েছে, আমার সঙ্গে অন্য লোক ছিল, আমারে এখানে রেখেই তারা পালিয়েছে। কারা তারা, প্রথমেই আমি অনুমান কোরেছিলেম। বনের ভিতর যারা আমারে ধোরে রেখেছিল, দুশ্চারিণী নবীনকালী যাদের সঙ্গিনী, তারাই ঢাকা থেকে ত্রিপুরায় আমারে এনেছিল, তাতে আর সন্দেহ নাই। তারা যদি নূতন লোক হতো, আমার বিপক্ষদলের সঙ্গে তাদের যদি কোন সংস্রব না থাকতো, তা হোলে এমন ঘটতো না। পূর্বেই আমি স্থির কোরেছিলেম, রক্তদন্তের চক্রের সঙ্গে সঙ্গে নানা দিকে নানা লোক ঘোরে। ঢাকায় যারা আমারে ধোরেছিল, তারা যে রক্তদন্তের লোক কিম্বা রক্তদন্তের শিক্ষিত গুপ্তচরের সহকারী লোক, সেটা নিঃসন্দেহ। রক্তদন্ত মোহনবাবুর পেটাও লোক।

    রক্তদন্ত অথবা রক্তদন্তের চরেরা আমার সম্বন্ধে যে সব কাজ করে, মোহনবাবু অবশ্য সে সব কাজের খবর পান। জয়শঙ্করবাবু ইচ্ছায় অথবা অনিচ্ছায় মোহনবাবুর কাছে আমার নাম কোরেছিলেন, মোহনবাবু অমনি সদয় হয়ে আমারে দেখতে চেয়েছেন, পাটনায় আমারে যেতে বোলেছেন, কথা কিছু আশ্চৰ্য বটে! কথার ভিতর কিছু, গোলমাল আছে, তাও যেন আমি বুঝতে পাচ্ছি, তত্ত্বও আমি যাব। কোন গতিকে মোহনবাবুর মূখে আমি আমার নিজের পরিচয়টা যদি জেনে নিতে পারি, তা হোলে আমার একটা বিশেষ উপকার হবে, বুকের উপর থেকে ভারী একটা বোঝা নেমে যাবে; অজ্ঞ পরিচয় সর্বদা আমারে অপর লোকের কাছে সঙ্কুচিত হয়ে থাকতে হয়, সে অসঙ্কোচটা দূরে হবে, মাথা উচুঁ কোরে পূর্ণ সাহসে বুক ফুলিয়ে সব জায়গায় আমি বেড়াতে পারবো, সকল লোকের কাছে সপ্রতিভ থাকবো; কেহ পরিচয় জিজ্ঞাসা কোল্লে বোবা হয়ে থাকতে হবে না, কোথাও কাহার কাছে মাথাও হেঁট হবে না। পরিচয় জানবার জন্যই পাটনায় আমি যাব।

    আর একটা কথা আমার মনে হলো। জয়শঙ্করবাবু বোলেছেন, মোহনলালের সঙ্গে তাঁর পূর্বাবধি পরিচয়। ত্রিপুরায় জয়শঙ্করবাবুদের বাড়ীতে আমি আছি, চক্ৰঘূর্ণনে মোহনবাবু হয় তো সে সংবাদ রাখতেন, জয়শঙ্করের মুখে আমার নাম শুনেই হয় তো আর কোন মতলব তিনি স্থির কোরেছেন; সেই মতলব সিদ্ধ করবার অভিপ্রায়েই পাটনায় আমারে যেতে বোলেছেন, এইটাই যেন সম্ভব বোধ হোচ্ছে। হয় হোক, তাই হোক; তবু, আমি যাব।

    রাত্রে আর নিদ্রা হলো না; চিন্তায় চিন্তায় সারা রাত্রিজাগরণ। ঊষাপক্ষিগণ বৃক্ষে বৃক্ষে কলরব আরম্ভ কোল্লে; যে সকল পক্ষী গীত গায়, তাঁদের সুরে তারা ঊষাবন্দনা আরম্ভ কোল্লে; পল্লীবাসী শ্রমজীবী লোকেরাও একে একে জেগে উঠলো, নিকটে নিকটে কত লোকের কত প্রকার অস্পষ্ট কথা আমার শ্রবণগোচর হোতে লাগলো; গবাক্ষপথ দিয়ে ঘরের ভিতর আলো এলো, রজনীপ্রভাত।

    বেলা দুই প্রহরের মধ্যে নূতন ঘটনা কিছুই হলো না। অপরাহ্ণে। রামদাস এসে আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ কোল্লে।

    রামদাসকে আমি একটি দৌত্যকার্যে নিযুক্ত কোরেছিলেম, সেই কার্যে সিদ্ধমনোরথ হয়ে চুপে চুপে রামদাস আমারে সংবাদ দিলে, “সে লোক এ গ্রামে আছে, আরো তিন দিন থাকবে, তিন দিন পরে স্থানান্তরে চোলে যাবে।” রামদাসকে তখন আমি আর কোন কথা জিজ্ঞাসা কোল্লেম না, রামদাস চোলে গেল।

    ঠিক সন্ধ্যার সময় একজন ছোকরাকে সঙ্গে কোরে ছোটবাবু এলেন। ছোকরার হাতে একটা পুঁটলী। ছোটবাবুর আদেশে সেই পুঁটলীটি আমার বিছানার উপর রেখে প্রণাম কোরে ছোকরা শীঘ্র শীঘ্র বিদায় হয়ে গেল। পুঁটলীটি খুলে ছোটবাবু আমারে কতকগুলি জিনিস দেখালেন। একখানি গেরুয়া বসন, একখানি নামাবলী, পরচুলা, শ্বেতবর্ণ দীর্ঘ দাড়ী, শ্বেতবর্ণ গোঁপ, পিঙ্গলবর্ণ জটা, আর একছড়া হরিনামের জপমালা; জিনিসগুলি দর্শন কোরে আমি হাস্য কোল্লেম।

    হাস্য কোরে ছোটবাবু আমারে জিজ্ঞাসা কোল্লেন, “এই তো বহুরূপীর সজ্জা এলো, এ সজ্জাগুলি নিয়ে তুমি কি কোরবে? —আমি উত্তর কোল্লেম, কি আমি কোরবো আজ রাত্রে তা আপনি শুনতে পাবেন না; কাৰ্যসিদ্ধির পর কল্য কিম্বা পরশু সমস্তই আপনি জানতে পারবেন। সে প্রসঙ্গে ছোটবাবু আর কোন কথা বোল্লেন না; অন্য কথা উত্থাপন কোরে আমার গায়ে হাত দিয়ে বোল্লেন, “তুমি কি নিমন্ত্রণে যেতে ভালবাস? আজ আমাদের গ্রামের দক্ষিণপাড়ায় এক বাড়ীতে সত্যনারায়ণের সিন্নী; — সত্যনারায়ণের কথা হবে, কৃষ্ণমঙ্গল গীত হবে, কৃষ্ণভক্তি যাত্রা হবে, খুব ঘটা। আমাদের নিমন্ত্রণ আছে, আমি যাব, কর্তাও যাবেন, তোমার কি যাবার ইচ্ছা আছে?”

    উল্লাসপ্রাপ্ত হয়ে মনে মনে আমি বোল্লেম, সত্যনারায়ণ দীর্ঘজীবী হয়ে থাকুন, ভালই হলো; যে ভাবনা আমি ভাবছিলেম, সত্যনারায়ণের ইচ্ছায় সে ভাবনা অন্তরে গেল, ছোটবাবুর প্রশ্নে উত্তর কোল্লেম, “আজ্ঞা না; আজ আমার শরীর বড় ভাল নয়, নিমন্ত্রণে আমি যেতে পারবো না।”

    ছোটবাবু আমারে আর কিছু বোল্লেন না, খানিকক্ষণ সেইখানে বোসে অন্য প্রসঙ্গে দুইটি চারিটি কথা কোয়ে, তিনি অন্দরে প্রবেশ কোল্লেন, আমি এদিকেও প্রস্তুত হোলেম। নিমন্ত্রণে যাব না, তবে আমার প্রস্তুত হওয়া কিসের জন্য, কিঞ্চিৎ পরে তাহার পরিচয়।

    রামদাসকে সঙ্গে নিয়ে কর্তা আর ছোটবাবু বাড়ী থেকে বেরলেন; যে বাড়ীতে নিমন্ত্রণ, সেই বাড়ীতেই গেলেন। কথা আছে, গীত আছে, যাত্রা আছে শীঘ্র তাঁরা ফিরে আসবেন না, তা আমি জানতে পাল্লেম। পাচিকা-ঠাকুরাণী সেই সময় একবার আমার ঘরে এসেছিলেন, তাঁরে আমি বোল্লেম, অসুখ আছে, রাত্রে আজ আমি কিছু আহার কোরবো না। সেই কথা শুনে, তিনি একবার আমার কপালে হাত দিয়ে বিষণ্ন বদনে বোল্লেন, “তাই তো! গা গরম হয়েছে! কপালের শির লাফাচ্ছে। মাথা ব্যথা কোচ্ছে বুঝি? চুপ কোরে শুয়ে থাক; বেশী রাত জেগো না। শীঘ্র যাতে ঘুম হয়, সেই চেষ্টা কর।”

    শয়নের উপদেশ দিয়ে পাচিকা-ঠাকুরাণী অন্তঃপুরে প্রবেশ কোল্লেন। আমি আপনি আপনি হাস্য কোল্লেম। কতকগুলি স্ত্রীলোকের স্বভাব এইরূপে যে, কোন প্রকার অসুখের কথা শুনলে—  অসুখটা সত্যই হউক বা মিথ্যাই হোক— স্নেহ জানিয়ে সেই কথারই পোষকতা করেন, সাবধান থাকবার পরামর্শ দেন। এই পাচিকাটিও তাই কোল্লেন; বাস্তবিক আমার কোন অসুখ ছিল না। ঘরের দরজা বন্ধ কোরে আমি আপনার ইচ্ছামত কাৰ্য কোল্লেম, দর্পণে মুখ দেখলেম, গৃহের প্রদীপটি নির্বাণ কোরে দরজা ভেজিয়ে বারান্দায় বেরুলেম। সে দিকটা অন্ধকার; সদরবাড়ীতে কেহই ছিল না, সিঁড়ির দরজাটি ভেজিয়ে রেখে নিঃশব্দে উপর থেকে নেমে এলেম, বাড়ী থেকে বেরুলেম। বাবুরা নিমন্ত্রণে গিয়েছেন, শীঘ্র শীঘ্র সদরদরজা বন্ধ হবে না, মনে ভরসা থাকলো, ধীরে ধীরে গন্তব্য স্থানে আমি চল্লেম।

    সেই নদীতীর, সেই আম্রবৃক্ষ, নিকটে সেই বাড়ী, বৃক্ষতলে আমি। সত্য বটে আমি; কিন্তু তখন আমারে হরিদাস বোলে চিনতে পারে, তেমন চক্ষু সে অঞ্চলে ছিল না। আমি তখন একজন শ্বেতশ্মশ্রুবিশিষ্ট জটাধারী সন্ন্যাসী। কৌপীন অথবা ব্যাঘ্রচর্মপরিধান করা নাই, অঙ্গে ভস্মলেপন নাই, কেবল মুখের ঠাঁই ঠাঁই শ্বেতচন্দনের রেখা একেছিলেম। সজ্জিত সন্ন্যাসীতে আর আমাতে অতি অল্পমাত্র প্রভেদ। আমার পরিধান গৈরিকবসন, কৃষ্ণ নামাবলীচিত্রিত গৈরিকবসনে সর্বাঙ্গ আচ্ছাদিত, হস্তে জপমালা, মুখে অবিরাম হরিনাম।

    সেই বাড়ীখানির সম্মুখ দরজার কাছে গিয়ে আমি দাঁড়ালেম; উচ্চকণ্ঠে হরিনাম গান কোচ্ছিলেম, একটি স্ত্রীলোক এসে আমারে দেখে গেল। ঔষধের মোড়ক সমর্পণ করবার দিন যে স্ত্রীলোকটি আমার দূতী হয়েছিল, সেই স্ত্রীলোক। আমারে তখন চিনতে পারে কার সাধ্য? সজ্জা সমাপ্ত কোরে দর্পণে যখন আমি মুখ দেখি, তখন আমি নিজেই আমারে চিনতে পারি নাই। স্ত্রীলোকটি আমারে দেখে গেল, অব্যবহিত পরেই বাবু এলেন। আমি সন্ন্যাসী, বাবু আমারে প্রণাম কোল্লেন। যে বাবুকে আমার দরকার, সেই বাবুই তিনি। জয়োচ্চারণ কোরে বাবুকে আমি বোল্লেম আপনার মঙ্গলের জন্যই আমার এখানে আসা; জন্মাবধি আপনি দেশে ছিলেন না, পৈতৃক ভদ্রাসনে নূতন এসেছেন, আপনার মনে কোন প্রকার অশান্তি আছে, গণনা কোরে সে সব আমি জানতে পেরেছি। কিছু দিন এই গ্রামে আমি আছি। গোটাকতক কুকুর সঙ্গে কোরে যে রাত্রে আপনি শিবের মন্দিরের সম্মুখে দিয়ে চোলে আসেন, সেই রাত্রে আপনারে আমি দেখেছিলেম, আপনারে দেখেই আমার দুঃখ উপস্থিত হয়েছিল। বুঝতে পেরেছেন আমার কথা? আপনার মনে কোন প্রকার দুশ্চিন্তা আছে; স্বকৃত কার্যের জন্যই সেই চিন্তা। এখানে আপনার নাম পায়রাবাবু। এখানে আপনার গুটিকতক বন্ধু আছেন, গুটিকতক শত্রুও আছেন, যাতে কোরে বন্ধুবিচ্ছেদ ঘটে, যারা শত্রুপক্ষ, তারা সেই চেষ্টাই কোচ্ছে। আপনি কোন প্রকার উৎকট পাপে— না না, সে কথা এখানে বলা হবে না, আপনার কোন ভয় নাই, শান্তি আছে, হরি আপনাকে শান্তি দিবেন। আপনি আমার সঙ্গে ঐ শিবালয়ে চলুন, আমি আপনার গ্রহশান্তির সুব্যবস্থা কোরে দিব।

    বাবু একটু মুখে বাঁকালেন। হরিনামে তাঁর বিশ্বাস নাই, ধর্মেকর্মে আস্থা নাই, বাড়ীর ভিতর ফিরে যাবার উপক্রম কোল্লেন। আমি তাঁর একখানি হাত ধোরে নরম কথায় চুপে চুপে তাঁর কাণের কাছে বোল্লেম, আমার সম্মুখে থেকে পালিয়ে গেলে তুমি পরিত্রাণ পাবে না, কার্য বড় শক্ত। কুলস্ত্রীর —–সে সব কথা এখানে যদি তুমি শুনতে চাও, ঘরে বাহিরে মহাকলঙ্ক বেঁধে উঠবে; আমি তোমারে চাই। গ্রামে এত লোক থাকতে, খুঁজে খুঁজে তোমাকেই আমি সুপাত্র বোলে ধোরেছি, আমি তোমার ভাল কোরবো; পালিয়ে যাবার চেষ্টা কোরো না; সব কথা আমি জানি। বীরভূমের কথাও জেনেছি, কাশীর কথাও জেনেছি, এখানকার কথাও জানতে পেরেছি। পাপের আগুন হু হু কোরে জ্বোলছে, লুকিয়ে থাকলে সে অগ্নিনির্বাপিত হবে না। আমার সঙ্গে তুমি শিবমন্দিরে চল, শান্তিজলে আমি তোমার অশান্তি-বহ্নি নির্বাণ কোরে দিব।

    পাঠক মহাশয়! বুঝতে পারেন, এই বাবুটিই সেই পায়রাবাবু। আমার মুখে শেষের কথাগুলি শুনে, মনে মনে কি তিনি ভাবলেন, তাঁর জীবনের সমস্ত খবর আমি রাখি, সেটিও যেন বুঝতে পাল্লেন; সেখানে আর আমি বেশী কথা না বলি, সেইরূপে সাবধান হয়ে আমার সঙ্গে শিবমন্দিরে আসতে সম্মত হোলেন।

    নদীতীরে একটি শিবমন্দির; বাবুকে সঙ্গে নিয়ে সেই মন্দিরে আমি এলেম। মন্দিরের দ্বারে চাবি দেওয়া ছিল; মন্দিরের একদিকের বারান্দায় উপবেশন কোরে সংক্ষেপে সংক্ষেপে সমস্ত কথার সারমর্ম তাঁকে আমি শুনিয়ে দিলেম। বাবু ঘন ঘন কেঁপে কেঁপে উঠলেন। ভূতভবিষ্যৎ গণনায় আমি পরম পণ্ডিত, বাবু যেন সেটি বেশ বুঝতে পাল্লেন; আমার কথাগুলি যেন তাঁর অস্থিতে অস্থিতে বিঁধে গেল। আরো একটু খোলসা কোরেই আমি বোল্লেম রাধারাণী মরেছে। আত্মঘাতিনী হয়েছে! তোমার জন্যই রাধারাণীর অপঘাত মৃত্যু। পুলিশ পর্যন্ত জানাজানি হয়েছে, পুলিশে এখনো তোমার নামটা উঠে নাই; কার মনে কি আছে, কে জানে? তদন্তমুখে উঠতে পারে, গণনাতে তাও আমি জানতে পেরেছি, এই বেলা প্রতীকারের চেষ্টা পাওয়া ভাল। বীরভূমে যা তুমি কোরেছ, তার ভিতরেও একটি কুলকন্যা ছিল; সেই কুলকন্যা এখন গুজরাটে, গণনায় সব আমি নখদর্পণে দেখতে পাচ্ছি। সে নায়িকা বেঁচে আছে, রাধারাণী ইহসংসার থেকে বিদায় হয়েছে। মহাপাপ! মহাপাপ!! এ পাপের প্রায়শ্চিত্ত শীঘ্র শীঘ্র যদি তুমি না কর, পুলিশের হস্তে শীঘ্র তুমি ধরা পোড়বে, ইহলোকে রাজবিচারে শাস্তি পাবে। তার পর পালিশের উপর পুলিশ, সর্বশক্তিমান পরমেশ্বর—

    এই পর্যন্ত শুনে পায়রাবাবু খানিকক্ষণ নির্বাক হয়ে থাকলেন, চঞ্চল-নয়নে চতুর্দিকে চাইলেন, কাতরবচনে আমারে বোল্লেন, “কি প্রকার প্রায়শ্চিত্ত কোল্লে আমি নিস্তার পাই, দয়া কোরে আপনি আমারে আজ্ঞা করুন।”

    কথার ভাবে আমি বুঝলেম, প্রায়শ্চিত্ত কোত্তে পায়রাবার ইচ্ছা আছে। কিরূপে প্রায়শ্চিত্ত, আমি তা মনে জানতেম; মনে রেখেই প্রকাশ্যে বোল্লেম, এখানে সে কথা বলা হবে না। রাধারাণী মরেছে, দেহ এখন শ্মশানে ভস্ম হয় নাই, সেই দেহ যদি তুমি দর্শন কর, তা হোলেই একরকম প্রায়শ্চিত্ত হয়। দর্শন কোত্তে পারবে কি? পুলিশের সম্মুখে তোমার প্রেমনায়িকার মৃতদেহ দর্শন কোত্তে তোমার সাহস হবে কি?

    আমি সন্ন্যাসী; সংসারের কোন কথাই যেন আমি জানি না, বিশ্বাসে একটু কপট বিস্ময় প্রকাশ কোরে তিনি বোল্লেন, “রাধারাণী? —কে রাধারাণী? রাধারাণীর মৃতদেহ আমি কেন দেখতে যাব? পুলিশ! পুলিশের সঙ্গে আমি কেন দেখা কোরবো? আমি যাব না।”

    মৃদুহাস্য কোরে আমি বোল্লেম, প্রায়শ্চিত্ত কোত্তে রাজী আছ, অথচ রাধারাণীকে জান না; পুলিশের নামে ভয় হয়, কার কাছে তুমি এ চাতুরী খেলাচ্ছ? মানুষের কাছে বরং চাতুরী খাটে, বিদ্যার কাছে খাটে না; জ্যোতির্বিদ্যা প্রভাবে সমস্তই আমি জানতে পেরেছি। একটি বালক একদিন তোমার হস্তে রাধারাণীর প্রেমপত্রিকা প্রদান কোরেছিল, তার পর রাধারাণীর প্রেমাশ্রমের উপদেবতানিপাত; আমার কাছে তুমি এ সব কথা অস্বীকার কোত্তে পার না। যদি কর, অস্বীকার করবার যদি চেষ্টা পাও, পুলিশের সঙ্গে সাক্ষাৎ কর।

    বাবুটির অন্তরে ভয় ছিল, বদনেও ভয়ের চিহ্ন উদিত হয়েছিল। দুই তিনবার আমার মুখে পুলিশের কথা শুনে, সেই ভয়টা এই সময়ে ঘনীভূত হয়ে উঠলো। তখন তিনি আমার প্রসাদভিখারী হয়ে মৃদুবচনে বোল্লেন, “ঐরূপ প্রায়শ্চিত্ত ছাড়া আর আপনি যেরূপে প্রায়শ্চিত্তের বিধি দেন, তাতে আমি প্রস্তুত আছি। আপনি দৈবজ্ঞ, ভূতভবিষ্যৎ উভয় তত্ত্ব আপনি পরিজ্ঞাত, আপনি আমাকে রক্ষা করুন!”

    আমার মনোবাসনা পূর্ণ হবার পূর্বলক্ষণ। রাত্রি প্রায় এক প্রহর। সত্যনারায়ণের সিন্নী রাত্রি এক প্রহর পর্যন্ত, শেষ হোতে বাকী থাকে না; ছোটবাবু যদি যাত্রাগীতি শোনবার আশা না রাখেন, শীঘ্রই ফিরে আসবেন; শীঘ্র শীঘ্র প্রস্থান করাই আমার আবশ্যক। পায়রাকে বোল্লেম, তোমার প্রায়শ্চিত্তটা যাতে অন্য লোকের চক্ষে না পড়ে, তেমন উপায় আমি কোত্তে পারি; তুমি নারীবেশ ধারণ কর। তোমাদের গ্রাম, পাল্কীবেহারা কোথায় পাওয়া যায়, তা তুমি জানো, নারীবেশধারণের অগ্রে একখানা পাল্কী ডাকাও, তার পর যা যা কোত্তে হয়, সে সব আমার ভার। এইখানে আমি থাকলেম, নারীবেশের উপকরণ বাড়ীর ভিতর থেকে সংগ্রহ কোরে আমার কাছে রেখে যাও, তার পর পাল্কী-বেহারা ডাকো। আমি তোমাকে নারী সাজাব; যাও, দুই কার্য কোরে এসো! পালিও না, পালিয়ে নিস্তার পাবে না। ধর্মের চক্ষু সর্বদর্শী, সর্বত্রদর্শী—জলধিজলে ডুবে থাকলেও সে চক্ষু তোমাকে দেখতে পাবে, নিবিড় বনে প্রবেশ কোল্লেও সে চক্ষু তোমাকে আকর্ষণ কোরবে, কিছুতেই পরিত্রাণ পাবে না! যাও, পালিও না!

    ধর্মের কর্ম, পায়রাবাবুকে আমি আপন কায়দায় আনলেম, যা যা বোল্লেম, সমস্তই ঠিকঠাক হলো। বস্ত্রালঙ্কার আর একখানি শিবিকা উপস্থিত। পায়রাকে আমি বধূসজ্জায় সজ্জিত কোল্লেম, পাল্কীর ভিতর বসালেম, সর্দার বেহারার কাণে কাণে ঠিকানা বোলে দিয়ে শিবিকার দ্বার রুদ্ধ কোরে দিলেম। শিবিকা সরাসর বাবুদের বাড়ীর ফটকের কাছে উপস্থিত হলো, শিবিকার সঙ্গে সঙ্গে পদব্ৰজে আমি।

    অবগুণ্ঠনে কপোতীর বচন আবৃত কোরে আমি সেটিকে উপরে নিয়ে তুল্লেম। যে ঘরে আমি থাকি, সে ঘরে তখন আলো ছিল না, অন্ধকারেই নববধূটিকে ঘরের একধারে আমি বসালেম, কথাবার্তা কিছুই নয়। কোথায় আমি এনেছি, পায়রা সেটা বুঝতে পারে না। মন্দিরে বোসে যা আমি ভেবেছিলেম, তাই ঠিক হলো। একটু পরেই ছোটবাবু ফিরে এলেন; হরিভক্তির আকর্ষণে হরিগুণগান শ্রবণের অভিলাষে কর্তা সেই নিমন্ত্রণকর্তার বাড়ীতেই থাকলেন। প্রায়শ্চিত্তের আয়োজনে আমি সুবিধা পেলেম।

    ছোটবাবু এসেছেন, জানতে পেরে, সিঁড়ির পথেই তাঁর সঙ্গে আমি সাক্ষাৎ কোল্লেম। তাঁর সঙ্গে আলো ছিল, সম্মুখে আমারে দেখে ছোটবাবু স্তম্ভিত হয়ে সিঁড়ির উপর দাঁড়ালেন। আমারে চিন্তে পাল্লেন না। আমি চুপি চুপি তাঁরে বোল্লেম, চমকিত হবেন না; ভাল কোরে আমারে দেখুন; আমি সন্ন্যাসী নয়, আমি হরিদাস। আপনি আমারে বহুরূপীর সাজ এনে দিয়েছিলেন, সেই সজ্জার অভ্যন্তরে আমি হরিদাস। আমি একটি কপোতী ধোরে এনেছি, সেই কপোতীও বহুরূপী; কখন কপোত হয়, কখন কপোতী সাজে। কপোত-কপোতীর প্রেম কবিকূলের প্রেম-সংসারের আদর্শ। কপোতবেশে আমার কপোতী বিশুদ্ধ প্রেমশিক্ষা করে নাই, পাপ হয়েছিল; সেই পাপের প্রায়শ্চিত্ত—”

    আমার হিঁয়ালীর অর্থ ছোটবাবু শীঘ্র বুঝলেন না; কি রকম কপোতী, দর্শনের কৌতূহলে তিনি আমার সঙ্গে গৃহমধ্যে প্রবেশ কোল্লেন। ঘরের অন্ধকার ঘুচে গেল; দীপাধারে উজ্জ্বল দীপ সংস্থাপিত, অন্ধকার দূরে গেল। ঘরের অন্ধকার গেল, ছোটবাবুর মনের অন্ধকারও দূর হলো; ঘোমটা খুলে কপোতীর মুখখানি তাঁরে আমি দেখালেম। ছোটবাবু বিস্ময়াপন্ন। বিস্ময়ের সঙ্গে হাস্যের সম্বন্ধ অল্প, কিন্তু সবিস্ময়ে ছোটবাবু হাস্য কোলেন। পায়রাবাবু কাঁপতে লাগলেন। ছদ্মবেশ খুলে নিয়ে পায়রাটিকে আমি আবার পায়রাবাবু সাজালেম।

    পরামর্শ স্থির হলো। অতি সহজেই প্রায়শ্চিত্ত হয়ে যাবে, লোক-জানা-জানি হবে না, এরূপ আশা দিয়ে, পায়রার মুখে আমি পাপস্বীকার করালেম। পূর্বকথা সে ক্ষেত্রে প্রকাশ পেলে না। রুদ্রাক্ষগ্রামের ভৌতিক ক্রীড়া পায়রাবাবু কথায় কথায় স্বীকার কোল্লেন; রাধারাণীর সঙ্গে গুপ্তপ্রেম, নিজমুখে তাঁকে স্বীকার কোত্তে হলো।

    ছোটবাবু আমারে জিজ্ঞাসা কোল্লেন, “এ পাপের প্রায়শ্চিত্ত কি?” আমি ব্যবস্থা দিলেম, মস্তক মুণ্ডন। মন্ত্র পাঠ হয়ে গেল; পাপীর নিজ মুখেই মন্ত্রপাঠ— পাপস্বীকার; বাকী কেবল মস্তকমুণ্ডন। আর কোন প্রকার ক্রিয়া-প্রক্রিয়ার আবশ্যক হবে না, কেবল মস্তকমুণ্ডনেই ইহলোকে পূর্ণাঙ্গ প্রায়শ্চিত্ত সম্পাদিত হবে। এই রাত্রের মধ্যেই সে কার্যটি সম্পন্ন হোলে ভাল হয়। অন্য লোকে দেখবে না, গ্রামের লোকে জানবে না, রাত্রের কার্য রাত্রের মধ্যেই শেষ হয়ে যাবে; পায়রাবাবু যেখানে ইচ্ছা, রাত্রের মধ্যে সেইখানেই চোলে যেতে পারবেন।

    ব্যবস্থা মঞ্জুর। ছোটবাবুও মঞ্জর কোল্লেন, পায়রাবাবু ও মঞ্জুরী জানালেন। রাত্রের মধ্যেই প্রায়শ্চিত্ত হওয়া স্থির। স্থির বটে, কিন্তু এ রাত্রে নাপিত কোথায় পাওয়া যায়? আমি সন্ন্যাসী; ক্ষৌরকারের কার্যে আমার পাণ্ডিত্য ছিল না, আমি কিঞ্চিৎ উদ্বিগ্ন হোলেম; উদ্বেগের কারণ ছোটবাবকে জানালেম। ছোটবাবু বোল্লেন, “চিন্তা কি? আমাদের রামদাসটি ক্ষৌরকার,— প্রামাণিক বংশসম্ভূত। কর্তা বোধ হয় প্রভাতের অগ্রে ফিরে আসবেন না, আমাদের সম্মুখে অনেকটা সময়; রামদাস নির্বিঘ্নে মুণ্ডনকার্য সমাধা কোরে দিতে পারবে।”

    রামদাসকে আহ্বান করা হলো, গৃহমধ্যে রামদাস উপস্থিত। পায়রা-দর্শনে রামদাসের বিস্ময়-কৌতুক একত্র। বিস্ময়ে নিস্তব্ধ, কৌতুকে হাস্য। ছোটবাবু তারে পায়রাটির মুণ্ডনকার্য নির্বাহ করবার আদেশ দিলেন। আর এক অভাব। রামদাসের ক্ষুর নাই। সে অভাবটাও অধিকক্ষণ থাকলো না, ছোটবাবুর নিজের একখানি ক্ষুর ছিল, অন্দরে প্রবেশ কোরে সেই ক্ষুরখানি তিনি বাহির কোরে এনে রামদাসের হাতে দিলেন; রামদাস তখন পায়রার সম্মুখে হাঁটু গেড়ে বোসলো।

    এইখানে আর এক রঙ্গ! উপনয়নের অগ্রে বিপ্রবালক এক নতুন আহ্লাদে আমোদিত হয়, কর্ণবেধ ও কেশমণ্ডনের সময় সেই আহ্লাদের সঙ্গে সে যেমন একটু একটু ভয় পায়, বিস্ফোটকে অস্ত্র করবার সময় তীক্ষ্ণছুরিকাধারী ডাক্তার সম্মুখে উপবিষ্ট হোলে রোগী যেমন নূতন যন্ত্রণার ভয়ে আকুল হয়, ক্ষুরাস্ত্রধারী রামদাসকে সম্মুখে দেখে যুগল হস্তে যুগলকর্ণ আচ্ছাদন কোরে পায়রাবাবু সেই রকম আতঙ্ক প্রকাশ কোত্তে লাগলেন; কাঁদো কাঁদো মুখে বোলতে লাগলেন, “মাথার মাঝখানটা কামিয়ে দিলেই ঠিক হয়, বাকী চুলগুলি থাক; সব চুল কামিয়ে দিলে মানুষকে কদাকার দেখায়, এ রকম হোলে লোকের কাছে আমি মুখ দেখাতে পারবো না। মাঝখানটি ছাড়া বাকী চুলগুলি আপনারা রেখে দিতে বলুন। আমি শুনেছি, মস্তকমুণ্ডন না কোরে চুলের মূল্য ধোরে দিলে ভট্টাচার্যেরা তুষ্ট হন। আমার প্রতি সদয় হয়ে তাই করুন, আমি মূল্য দিব।”

    ছোটবাবু আমার মুখের দিকে চাইলেন, অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে আমি হাস্য কোল্লেম। সম্মুখদিকে ফিরে আমি অভিপ্রায় দিলেম, “এ পাপের সে-রূপ প্রায়শ্চিত্ত নয়, সম্পূর্ণ মুণ্ডন আবশ্যক।” আমার কথাই গ্রাহ্য হলো, ছোটবাবু রামদাসের প্রতি পূর্ণমুণ্ডনের আদেশ দিলেন, উৎসাহযুক্ত হয়ে দশমিনিটের মধ্যে রামদাস সেই আদেশ পালন কোল্লে। পায়রাবাবুর বাবরীচুলগুলি তার পদতলে লুণ্ঠিত হোতে লাগলো। তখনো হস্তদ্বারা পায়রাবাবু আপনার কাণ-দুটি ঢেকে ঢেকে রাখবার চেষ্টা পেলেন, চেষ্টা ফলবতী হলো না। আমি নিকটবর্তী হয়ে, তাঁর হাত দুখানি ধোরে চাঁদমুখখানি ভাল কোরে দেখলেম। পায়রার চক্ষে জল, গাত্রে কম্প, রসনা বাকশূন্য। কারণ কি? —বামকর্ণ অর্ধচ্ছিন্ন, দক্ষিণকর্ণ নাই। এই গ্রামে প্রথম দর্শনাবধি যে সন্দেহ আমার মনে ছিল, সেই সন্দেহই ঠিক। সন্দেহ আর থাকলো না, স্পষ্টই দেখলেম, কাণকাটা কানাই! আর একটি ছোট কথায় বোঁচা কানাই! পাঠকমহাশয় স্মরণ কোত্তে পারবেন, বীরভূমের কানাইবাবু, আপন মাতুলকন্যার সতীত্বরত্ন হরণ কোরে, সেই ভগিনীটিকে কুলের বাহির কোরেছিলেন; কত জায়গায় কত খেলা খেলিয়েছিলেন; এই সেই কানাইবাবু। কত রাজ্য ঘুরে ঘুরে সেই কানাইবাবু এখন ত্রিপুরায় এসে ধরা পোড়লেন। কানাইকে আমি বোল্লেম, “চিনেছি আমি তোমাকে, সত্য তুমি পায়রাবাবু নও, বীরভূমের কানাইবাবু। তোমার নূতন নাম কাণকাটা কানাই! এই তোমার প্রায়শ্চিত্ত হয়ে গেল, এখন তুমি স্বাধীন, এখানে এখন তুমি নিষ্পাপ, এখন তুমি বিদায় হোতে পার। রাতারাতি প্রস্থান কোল্লে কেহই কিছু জানতে পারবে না। আমার কার্য শেষ হয়ে গেল, আমি এখন চোল্লেম।”

    ছোটবাবুর দিকে চাইতে চাইতে ঘর থেকে আমি একবার বেরিয়ে গেলেম, বাহিরে ছদ্মবেশ পরিত্যাগ কোরে, হরিদাস হয়ে গৃহমধ্যে পুনঃ প্রবেশ কোল্লেম। আমিই সেই সন্ন্যাসী, কানাইবাবু সেটি জানতে পাল্লেন না। দুই হস্তে কর্ণ আবৃত কোরে অধোবদনে তিনি বাড়ী থেকে বেরিয়ে গেলেন।

    কানাইকে কানাই সাজিয়ে একটা সংকল্প আমি সিদ্ধ কোল্লেম। তিন দিন পর আমার পাটনা যাত্রার আয়োজন। একাকী আমি যেতে পারবো না কিম্বা হয় তো অন্য দিকে চোলে যাব এইরূপ সন্দেহ কোরে কর্তা আমার সঙ্গে ছোটবাবুকে পাঠাবেন। ছোটবাবুর হস্তেই আমাদিগের রাহাখরচের টাকা দিবেন, এইরূপে স্থির হলো। চতুর্থ দিবসে ছোটবাবুর সঙ্গে আমি পাটনা যাত্রা কোল্লেম।

  • প্রথম কল্প : পাটলীপুত্র

    প্রথম কল্প : পাটলীপুত্র

    ভূবনচন্দ্র মুখোপাধ্যায়

    [book-name]

    প্রথম কল্প : পাটলীপুত্র

    যত অল্প সময়ে পৌঁছান যেতে পারে, বিশেষ চেষ্টা কোরে আমরা পাটনা-সহরে পৌঁছিলাম। পাটনার প্রাচীন নাম পাটলীপুত্র। এক সময়ে পাটলীপুত্রের সবিশেষ সমৃদ্ধি ছিল। বুদ্ধাধিকার সময়ে এখানে বৌদ্ধধর্মের বিশেষ আলোচনা হতো। পাটনায় উপস্থিত হয়ে অনেক লোকের মুখে আমরা শুনলেম, পূর্বের সে শ্রীসমৃদ্ধি এখন কিছু নাই। গঙ্গা আছেন, পাটনা নামে সেই পাটলীপুত্র বিদ্যমান আছে, ব্যবসায়ী মহাজনমণ্ডলীর কলরব আছে, ভূমির উর্বরতাশক্তির অধিক লাঘব হয় নাই, কিন্তু পূর্বে পূর্বে এই নগরী সন্দর্শন কোরে লোকে যেমন প্রীতি প্রাপ্ত হতো, আজকাল সেই প্রীতিকর দৃশ্য বিলুপ্ত। ঠিকানায় পৌঁছিবার অগ্রে অনেকক্ষণ আমরা নগর দর্শন কোল্লেম। বড় বড় মহাজন, প্রসিদ্ধ প্রসিদ্ধ মহাজনী গদী, বিবিধ পণ্যদ্রব্য সেখানে বিস্তর। খাপরেলের ঘর অসংখ্য; দেশপর্যটকেরা সকলেই বলেন, পাটনায় যত খোলার ঘর, এত খোলার ঘর আর কোথাও নাই; দর্শন কোরে আমরাও জানতে পাল্লেম, পর্যটকবর্গের কথাই সত্য, এত খোলার ঘর আর কোথাও নাই।

    যে পল্লীতে মোহনলাল বাবুর কুঠী, অন্বেষণ কোরে সেই পল্লীতে আমরা উপস্থিত হোলেম। পল্লীর মধ্যে অধিক লোকের কুঠী দেখা গেল না। একটি লোককে জিজ্ঞাসা কোরে জানলেম, রাজা মোহনলাল ঘোষ বাহাদুর সম্প্রতি স্থানান্তরে গিয়েছেন, শীঘ্রই ফিরে আসবেন; কুঠীবাড়ীতে লোকজন আছে, সেইখানে গেলেই বিশেষ বৃত্তান্ত জানতে পারা যাবে। কোথায় সেই কুঠীবাড়ী, সেই লোকটিকে আমরা জিজ্ঞাসা কোল্লেম, লোকটি আমাদের সঙ্গে কোরে বাড়ীখানি দেখিয়ে দিলো। বাড়ীখানি অতি সুন্দর; আমরা বাড়ীর মধ্যে প্রবেশ কোল্লেম।

    বাড়ীখানি অতি সুন্দর; জায়গা অনেক, চারিদিক প্রাচীর দিয়ে ঘেরা, মধ্যস্থলে ইমারত; ধারে ধারে ফুলবাগান, মধ্যে মধ্যে অপরাপর ফলকর বৃক্ষ; স্থানটি রমণীয়। দোতালা কুঠী; আমরা দোতালায় গিয়ে উঠলেম; একটি ঘরের সম্মুখে গিয়ে দেখি, ঘরের মধ্যে ঢালা বিছানা, সারি সারি পাঁচ সাতটি তাকিয়া, প্রত্যেক তাকিয়ার পার্শ্বে সুন্দর সুন্দর বৈঠকোবিষ্ট এক একটি হুঁকা। একটি তাকিয়ার কাছে একটি লোক; —দিব্য স্থূলাকার, শ্যামবর্ণ, গলদেশে যজ্ঞোপবীত, কণ্ঠে ছোট ছোট সোণার মাদুলী-গাঁথা তিন-নর তুলসী-মাল্য; মস্তকের মধ্যস্থলে টাক পড়া, পার্শ্বের চুলগুলি অল্প পক্ক, অল্প অপক্ক, বয়স অনুমান পঁয়তাল্লিশ কি ছচল্লিশ বৎসর। লোকটির সম্মুখে বৃহৎ একটা লাল কাপড়ের দপ্তর, দপ্তরের পার্শ্বে বৃহৎ একটা বাকস, বাকসের উপর অনেকগুলি কাগজপত্র ছড়ানো। লোকটি একখানি পত্রিকা চক্ষের নিকটে ধারণ কোরে মনে মনে পাঠ কোচ্ছিলেন; পাঠে তন্মনস্ক। অন্য বিষয়ে অন্য মনস্ক ছিলেন, অন্য দিকে দৃষ্টি ছিল না, আমরা গিয়ে চৌকাঠের কাছে দাঁড়িয়েছিলেম, প্রথমে তিনি দেখতে পান নাই; তার পর পত্রিকার উপর থেকে চক্ষু তুলে, আমাদের দেখে, গম্ভীরবদনে জিজ্ঞাসা কোল্লেন, “কে আপনারা? কোথা থেকে আসছেন? কি চান?”

    আমরা তখন গৃহমধ্যে প্রবেশ কোল্লেম। আমি বোল্লেম, “রাজা বাহাদুরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবার অভিলাষ; তিনি আসতে বোলেছিলেন, তন্নিমিত্তই আমাদের আসा।”

    লোকটি আমাদের বোসতে বোল্লেন; দুটি তাকিয়ার নিকটে পাশাপাশি হয়ে আমরা দুইজনে বোসলেম। যেরূপ গদিয়ানীভাবে সেই লোকটি সেইখানে বোসে ছিলেন, তাতে কোরে আমার বোধ হলো, তিনি হয় তো একজন সরকার অথবা মহুরী অথবা খাতাঞ্জী। যাই তিনি হোন, স্থূলাঙ্গদর্শনে আমি তাঁরে দেওয়ানজী বোলেই অনুমান কোল্লেম? জমিদারী সেরেস্তার নিম্নপদস্থ কর্মচারীকে দেওয়ানজী বোলে সম্মান দিলে খাতির পাওয়া যায়, তাই মনে কোরে আমি তারে দেওয়ানজী বোলে সম্বোধন কোরবো, এইরূপ ভাবছি, এমন সময় আর একটি লোক সেই গৃহে প্রবেশ কোরে সসম্ভ্রমে বোল্লে, “দেওয়ানজী মশায়! একজন ঘোড়সোয়ার এসেছে, একখানা চিঠি এনেছে, যদি বলেন, সেই লোককে আমি এখানে নিয়ে আসি। চিঠিখানি আমি চাইলেম, দিলে না;— বোল্লে, মহারাজের হাতে দিবার আদেশ। আমি বোল্লেম, ‘মহারাজ বাড়ীতে নাই,’ কথাও শুনলে না। চিঠি আমাকে দিলে না।”

    দেওয়ানজী মহাশয় গাত্রোত্থান কোল্লেন; আমাদিগের দিকে চেয়ে আর একবার বোল্লেন, “বসুন আপনারা, আমি আসছি।” যে লোক খবর দিতে এসেছিল, তার দিকে ফিরে তিনি আদেশ দিলেন, “বাবুদের তামাক দে রে!”— বোলেই তিনি ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। চাকরটি সেইখানেই দাঁড়িয়ে থাকলো।

    তামাক আমিও খাই না, ছোটবাবুও খান না; তামাক আনতে নিষেধ কোরে চাকরটিকে আমি জিজ্ঞাসা কোল্লেম, “রাজাবাহাদুর কোথায় গিয়েছেন? কবে আসবেন?” চাকর উত্তর কোল্লে, “কোথা গিয়েছেন, তা আমি জানি না; গত রাত্রে আসবার কথা ছিল, আসেন নাই; আজ রাত্রে আসতে পারেন; যদি না আসেন, কল্য নিশ্চয়।”

    চাকরের সঙ্গে আর আমাদের কোন কথা ছিল না; সে চোলে গেল, আমরা দুইজনে দেওয়ানজীর অপেক্ষায় সেইখানে বোসে থাকলেম।

    দেওয়ানজী ফিরে এলেন। কোথাকার সোয়ার, কিসের পত্র, সে কথা জিজ্ঞাসা করা আমাদের অনধিকারচর্চা; আমরা আগন্তুক, সে কথার সঙ্গে আমাদের কোন সম্বন্ধই ছিল না; সুতরাং আমরা পূর্ববৎ নিস্তব্ধভাবেই বোসে থাকলেম। নিজাসনে আসীন হয়ে দেওয়ানজী তখন আমাদের পরিচয় জিজ্ঞাসা কোল্লেন। আমার পরিচয় আমি। আমি হরিদাস, রাজাবাহাদুরের আহ্বানে আমি এখানে উপস্থিত, এই পর্যন্ত আমার পরিচয়। ছোটবাবুর পরিচয়ে কিছু বেশী কথা। তিনি পরিচয় দিলেন, “নাম মিহিরচাঁদ চৌধুরী, পিতা জয়শঙ্কর চৌধুরী, নিবাস ত্রিপুরা; আমার পিতাঠাকুর মহাশয় সম্প্রতি পাটনায় এসেছিলেন, রাজাবাহাদুরের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়েছিল, এই হরিদাস, আমাদের বাড়ীতে ছিল, আমার পিতার মুখে রাজাবাহাদুর সে কথা শুনেছিলেন, হরিদাসকে এখানে পাঠাবার জন্য পিতাকে অনুরোধ কোরেছিলেন, হরিদাস চিনবে না, একাকী আসতে পারবে না, সেই কারণে হরিদাসের সঙ্গে তিনি আমারে পাঠিয়ে দিয়েছেন।”

    শান্তদর্শনে দেওয়ানজী আমাদের উভয়ের বদন নিরীক্ষণ কোরে, কি যেন পূর্বকথা স্মরণ কোরে প্রশান্তস্বরে বোল্লেন, “ঠিক কথা বটে; এখন আমার মনে পোড়লো। রাজাবাহাদুর আপনার পিতার কাছে হরিদাসের নাম কোরেছিলেন বটে, হরিদাসকে এখানে পাঠাবার কথা বোলেছিলেন বটে, এই বালকটির নাম হরিদাস?”

    মিহিরবাবু উত্তর কোল্লেন, “হরিদাসের পরিচয় হরিদাস নিজ মুখেই প্রদান কোরেছে; আমিও পুনরায় বোলছি, এই বালকের নাম হরিদাস। বালকটি খুব ভাল; হরিদাসের শরীরে অনেক গুণে।”

    দেওয়ানজী বোল্লেন, “সন্তুষ্ট হোলেম, আপনারা থাকুন, রাজাবাহাদুর একটি বিশেষ কার্যের নিমিত্ত আজ তিন দিন হলো, একটি বন্ধুলোকের সঙ্গে সাক্ষাৎ কোত্তে গিয়েছেন, আজ রাত্রে প্রত্যাগমন করবার কথা। এইমাত্র মাজিষ্ট্রেট সাহেবের এক পত্র নিয়ে একজন সওয়ার এসেছিল, ম্যাজিষ্ট্রেট সাহেব আগামী কল্য এইখানে উপস্থিত হয়ে রাজাবাহাদুরের সঙ্গে সাক্ষাৎ কোরবেন, পত্রের মর্ম এইরূপ। পত্রের উত্তরে রাজাবাহাদুরের অনুপস্থিতির কথা আমি লিখে দিয়েছি। আপনারা থাকুন, আজ রাত্রে না হয়, কল্য আমি হরিদাসকে রাজসমীপে পরিচিত কোরে দিব।”

    আমরা থাকলেম। দেওয়ানজীর সুবন্দোবস্তে, সম্ভবমত আদর-যত্নে আমাদের কিছুমাত্র কষ্ট হলো না। রাত্রে রাজাবাহাদুর এলেন না, পরদিন বেলা দশটার সময় প্রত্যাগত হোলেন। দেওয়ানজীকে পুরোবর্তী কোরে রাজার সঙ্গে আমরা সাক্ষাৎ কোল্লেম। মিহিরচাঁদের পরিচয় পেয়ে রাজাবাহাদুর হর্ষ প্রকাশ কোল্লেন। নতুন কোরে আমার পরিচয় দিতে হলো না, আমারে তিনি চিনতেন; অনেক দিনের পর সাক্ষাৎ হোলে পরিচিত লোককে যে ভাবে জিজ্ঞাসা কোত্তে হয়, সেইভাবে তিনি আমারে জিজ্ঞাসা কোল্লেন, “কেমন আছ হরিদাস? দীর্ঘকালের পর তোমাকে আমি দেখলেম। এত দিন তুমি কোথায় ছিলে। তোমার জন্য আমার বড় কষ্ট হয়। তুমি আমার অবাধ্য, সেই জন্যই নিজের দোষে তুমি কষ্ট পাও। এখন অবধি আমার কাছেই তুমি থাকো; আমার বাধ্য থাকলেই তোমার ভাল হবে।”

    নম্রভাবে উচিতমত উত্তর প্রদান কোরে আমি মৌন অবলম্বন কোল্লেম। অনেক দিনের অনেক পূর্বকথা আমার স্মরণ হলো। বাবু মোহনলালের শ্রীবৃদ্ধি হয়েছে, তিনি রাজা হয়েছেন, আমার প্রতি তাঁর মনোভাবেরও পরিবর্তন হয়েছে, এইরূপ আমি ভাবলেম। বারাণসীধামে দুখানি পত্রিকা দর্শন কোরে আমার উপর তিনি যেরূপ রুষ্ট হয়েছিলেন, সে ভাব এখন নাই, ইহাই যেন আমি বুঝলেম।

    যতক্ষণ আমি ঐ সকল কথা আলোচনা কোল্লেম, রাজাবাহাদুর ততক্ষণ নিস্তব্ধ ছিলেন; সহসা মৌনভঙ্গ কোরে আমারে তিনি বোল্লেন, “ত্রিপুরায় জয়শঙ্করবাবুর বাড়ীতে তুমি ছিলে, তিনি মহৎ লোক, তাঁর কাছে তোমার কোন প্রকার অযত্ন ছিল না, সে সব আমি শুনেছি। তিনি এখানে এসেছিলেন; তাঁর মুখেই আমি তোমার সমাচার পেয়েছিলেম; পেয়েছিলেম বটে, কিন্তু কি প্রকারে কার সঙ্গে তুমি ত্রিপুরায় উপস্থিত হয়েছিলে, সেটা আমি জানতে পারি নাই, তিনিও কিছু বলেন নাই। ত্রিপুরায় তুমি কেন গিয়েছিলে? —সেখানে তোমার কি কোন বিশেষ প্রয়োজন ছিল?”

    কেন জানি না, রাজার প্রশ্ন শুনে হঠাৎ আমি চোমকে উঠলেম; ভাব গোপন কোরে উত্তর কোল্লেম, “আজ্ঞা না; বিশেষ অবিশেষ কোন প্রয়োজনই আমার সেখানে ছিল না; কি জন্য গিয়েছিলেম, কিরূপে গিয়েছিলেম, তাও আমি বোলতে পারি না। যে দিন আমি—”

    বোলতে বোলতে একবার আমি থাকলেম; ত্রিপুরার প্রথমদিনের কথা আমার মনে পোড়লো, আমি কাঁপলেম। প্রথমদিন জয়শঙ্করবাবু আমারে নেশাখোর বোলে তিরস্কার কোরেছিলেন; রাজাবাহাদুরের সঙ্গে তাঁর আত্মীয়তা আছে, ‘আমি নেশাখোর’ এ কথাটা যদি তিনি রাজাকে বোলে গিয়ে থাকেন, হয় তো বোলে থাকবেন, এমন যদি হয়, তা হোলে আমার উপর রাজাবাহাদুরের একটা কুসংস্কার জন্মেছে, ইহাই সম্ভব। সত্যকথা কি, জয়শঙ্করবাবু সে সবও হয় তো বোলে থাকবেন, রাজা হয় তো সেই কথা চেপে রেখে আমার মুখে কোন প্রকার নূতন কথা শ্রবণ করবার কৌশল প্রকাশ কোচ্ছেন, এইরূপ আমি ভাবলেম। প্রথমে যা ভেবেছিলেম, জয়শঙ্করবাবুদের তিরস্কার সহ্য করবার পর যে সব কথা আমার মনে হয়েছিল, সেই সব কথা যদি ঠিক হয়, তবে তো মোহনলালবাবুর কাছে আমাকে সর্বদা সাবধান হয়ে থাকতে হবে, পদে পদে কুণ্ঠিত হয়ে চোলতে হবে, সেটা নিশ্চয়। মনের কথা মোহনবাবুকে আমি, বোলবো কি না, একটু চিন্তা কোল্লেম। কৌশলক্রমে কিঞ্চিৎ আভাস দেওয়া ভাল; পরিশেষে সেই সিদ্ধান্তই অবধারিত হলো।

    কথাগুলি লিখতে যতক্ষণ গেল, ভাবতে ততক্ষণ লাগে নাই। যে পর্যন্ত বোলতে বোলতে আমি থেমেছিলেম, সেই সূত্র ধারণ কোরে রাজাকে আমি বোল্লেম, যে দিন আমি জয়শঙ্করবাবুর বাড়ীতে উপস্থিত হই, সে দিন আমি অজ্ঞান ছিলেম। কে আমারে অজ্ঞান কোরেছিল, তা আমি জানি না; অজ্ঞান অবস্থায় কারা আমারে ত্রিপুরায় ফেলে গিয়েছিল, তাও আমি বোলতে পারি না; জয়শঙ্করবাবু যত্ন কোরে আমারে আশ্রয় দিয়েছিলেন, এই পর্যন্ত আমি বোলতে পারি।”

    তাচ্ছল্যব্যঞ্জক হাস্য কোরে রাজাবাহাদুর বোল্লেন, “ওটা তোমার বুদ্ধির ভ্রম। মাঝে মাঝে তোমার এক একটা খেয়াল হয়, এটাও সেই প্রকার একটা খেয়াল। কে তোমাকে অজ্ঞান কোরে একটা জায়গায় ফেলে দিয়ে যাবে? কার এত দায় পোড়েছিল? কেনই বা তোমাকে অন্যলোকে একটা অজানা জায়গায় নিয়ে যাবে? ও সব কথা মনে কোরো না। ভাল লোকের আশ্রয়ে ছিলে, আমার কাছে এসেছ, শান্ত হয়ে থাকো, ও সব খেয়াল ছেড়ে দাও। শিষ্টশান্ত হয়ে কাজকর্ম কর, আমার পরামর্শ মত চল, সংসারে একজন মনুষ্য বোলে গণ্য হোতে পারবে। চিরদিন কি এইরূপে ছেলেমানুষ থাকবে? উদাসীনের মত চিরদিন কি দেশে বিদেশে পথে পথে ঘুরে ঘুরে বেড়াবে? ঐ রকম হয়ে ঘুরে বেড়ানো কি ভাল? স্থির হয়ে আমার কাছে থাকো; কাজকর্ম শিক্ষা কর, মঙ্গল হবে।”

    আর আমি কিছু বোল্লেম না; ভাগ্য বিরূপ থাকলে মনে সর্বদাই কু-গায়; কু-ভাবনা আমার গেল না। রাজাবাহাদুর আমাদের সেইখানে বোসতে বোলে গৃহান্তরে প্রবেশ কোল্লেন, চাকরেরা গৃহপরিষ্কারাদি নানা কার্যে ব্যস্ত হয়ে বেড়াতে লাগলো; দেওয়ানজী মহাশয় মরুব্বী আনা জানিয়ে এটা ওটা সেটা পাঁচ প্রকার হকুমজারী কোত্তে লাগলেন; রাজাও ব্যস্ত। ফল, ফুল, মাখন, মিছরি প্রভৃতি বিবিধ দ্রব্য আমদানী হোতে লাগলো। সেই সব আয়োজন দর্শন কোত্তে কোত্তে ভগবান মরীচিমালী অস্তাচল-শিখরে প্রস্থান কোল্লেন : সন্ধ্যা হলো; ঘরে ঘরে পরিষ্কার পরিষ্কার দীপাধারে পরিষ্কার পরিষ্কার বার্তী জ্বোলে উঠলো : বিচিত্র নাচঘরের ন্যায় একটি প্রশস্ত ঘরে ইংরাজী ধরণের মজলীস সাজানো হলো। বাড়ীতে কি একটা উৎসব আছে, কারা যেন আসবেন, অনেকেই এইরূপ বিবেচনা কোল্লেন।

    রাত্রি যখন আটটা, কি নয়টা, সেই সময় ফটকে একখানা গাড়ী এসে লাগলো। গাড়ীর পশ্চাতে একজন ঘোড়সওয়ার। একজন খানসামা দ্রুতগতি উপরে এসে সংবাদ দিলে, ম্যাজিস্ট্রেট সাহেব। রাজাবাহাদুর উপরে ছিলেন, তাড়াতাড়ি নেমে গেলেন, অভ্যাগত দুটি সাহেবকে সঙ্গে নিয়ে উপরে এসে উঠলেন। শেষে আমরা জানত পাল্লেম, একজন ম্যাজিস্ট্রেট আর একজন ম্যাজিস্ট্রেট সাহেবের নবাগত বন্ধু। যেখানে মজলীস হয়েছিল, আমরা সে ঘরে প্রবেশ কোল্লেম না; ঘরের দুইধারে রঙ্গিন উদ্দীপরা দুইজন আরদালী দাঁড়ালো, দ্বারের কপাট রুদ্ধ হয়ে গেল।

    কি প্রয়োজনে ম্যাজিস্ট্রেটের আগমন, সেটি আমি জানলেম না, জানবার জন্য আগ্রহও প্রকাশ কোল্লেম না। গৃহমধ্যে পান-ভোজন, কথোপকথন ও অন্যান্য কার্য সমাপ্ত হোলে, সাহেবেরা বিদায় হোলেন, ভোজনান্তে আমরাও বিশ্রাম করবার অবকাশ পেলেম।

    পাঁচদিন অতীত। মোহনবাদকে বারংবার রাজাবাহাদুর বোলে উল্লেখ করা আমার বেশ কিছু কষ্টকর বোধ হোতে লাগলো; বলি রাজাবাহাদুর, কিন্তু যেন বাধ বাধ করে। সম্বোধনে রাজাবাহাদুর কেন, অবাধে মহারাজ বলা যায়; কিন্তু অপরের কাছে পরিচয় দিবার সময় একটু থেমে থেমে সাবধান হোতে হয়। মোহনরাজা অথবা মোহনলাল রাজা, এরূপ উচ্চারণ শ্রবণে নীরস। যত দিনের জানানো, তত দিন আমি মোহনবাবু অথবা মোহনলালবাবু বোলে এসেছি। এখন তিনি নূতন রাজা হয়েছেন, রাজাবাহাদুর বোলতে হবে, না বলাটা ধৃষ্টতা, বলা চাই, ক্রমে ক্রমে অভ্যাস করা আবশ্যক। এই পাঁচদিন রাজাবাহাদুর আমারে বেশ আদর-যত্ন কোল্লেন, স্নেহ-মমতা জানালেন মিষ্টকথা বোল্লেন; তুষ্ট হয়েও আমি তুষ্ট হোতে পাল্লেম না। অতুষ্টির কি কারণ, পাঠক মহাশয় সেটি অনুভবে হৃদয়ঙ্গম কোরবেন। রাজার কাছে আমি আদর-যত্ন পেলেম আমার অপেক্ষা মিহিরবাবু কিছু বেশী পেলেন; পাওয়াই উচিত। একে তিনি নূতন তাতে আবার ব্রাহ্মণ, তার উপর আবার মিত্রকুমার। আমার অপেক্ষা মিত্রকুমারের অধিক সমাদর অবশ্যই সামাজিক রীতির গৌরববর্ধক; সমাজের প্রথাই এইরূপ; সমাদরে বাস্তবিক আমি সন্তোষলাভ কোল্লেম।

    পাঁচদিন পরে মিহিরচাঁদবাবু বিদায় হোলেন; তাঁরে প্রণাম কোরে রাজা-বাহাদুর বোলে দিলেন, “তোমার পিতাঠাকুরকে আমার প্রণাম দিও; হরিদাস এসেছে, ভাল আছে, থাকতে থাকতে ভাল হবে, এ কথাও তাঁরে বোলো।” মিহিরবাবু আশীর্বাদ কোল্লেন। আমাদের আসবার রাহাখরচ আর মিহিরবাবুর প্রতিগমনের রাহাখরচ রাজাবাহাদুর দিলেন। আমার সঙ্গে প্রিয়সম্ভাষণ কোরে মিহিরবাবু স্বদেশে প্রস্থান কোল্লেন। এইখানে আর একটি কথা বোলে রাখা আবশ্যক। প্রায়শ্চিত্তের ছলে পায়রাবাবুকে নেড়া করা, ‘কানকাটা কানাই’ প্রকাশ করা, কি প্রকার রহস্য, পাটনায় উপস্থিত হয়ে মিহিরবাবু নিৰ্জনে একদিন আমারে সেই কথা জিজ্ঞাসা কোরেছিলেন। কানাইয়ের স্থূল স্থূল পরিচয় তাঁর কাছে আমি ব্যক্ত কোরেছিলেম। শুনে তিনি ঘৃণার সঙ্গে বিস্ময় প্রকাশ কোরে বোলেছিলেন, “তবে আর রুদ্রাক্ষ-খোপে বাসা কোরে থাকতে পারবে না, লোকের কাছে বোঁচা-মুখ দেখাতে লজ্জা হবে, পায়রা অচিরেই রুদ্রাক্ষের বাসা ছেড়ে উড়ে পালাবে!” হাস্য কোরে আমি বোলেছিলেম, “সেটাও একপ্রকার দ্বিতীয় প্রায়শ্চিত্ত। তাদৃশ নরাধমের পনঃ পূনঃ প্রায়শ্চিত্ত হওয়াই কৃষ্ণের ইচ্ছা।”

    মিহিরবাবু চোলে গেলেন, আমি থাকলেম। আদর পাই, যত্ন পাই, রাজার মুখের মিষ্ট মিষ্ট বাক্য পাই, রাজাদেশে সামান্য সামান্য কাজ-কর্ম ও নির্বাহ করি, এই রকমে একমাস। নিত্য নিত্য মনে করি, রাজাকে আমি মনের কথা জানাব; চিরজীবনের ঘোর অন্ধকার সংশয়টা ভঞ্জন করবার প্রয়াস পাব, অবকাশ পাই না। তিনি বড়লোক, আমি গরীব, শীঘ্র কোন কথা জিজ্ঞাসা কোত্তেও সাহস হয় না। রাজাকে নিৰ্জনে না পেলে সে সব কথা জিজ্ঞাসা করা ভাল নয়, নিৰ্জনে পাবারও অবসর ঘটে না। আরও একপক্ষ অপেক্ষা কোল্লেম।

    বসন্তকাল উপস্থিত। বসন্তে আকাশমণ্ডল নিৰ্মল, প্রকৃতি প্রসন্নমুখী, তরুলতা প্রফুল্ল, বিহঙ্গকুল প্রফুল্ল, সুখলালিত মানবকুলও প্রফুল্ল। আমার মত অভাগা চিরদুঃখী ব্যতীত সকলেই প্রফুল্ল।

    একদিন অপরাহ্ণে রাজাবাহাদুর মোহিনীমোহন বসন-ভূষণে সজ্জিত হয়ে উপর থেকে নেমে আসছেন, আমি সেই সময় একটা কাজের জন্য তাড়াতাড়ি নীচে থেকে উপরে উঠছিলেম, সিঁড়ির পথে দেখা হলো। থোমকে দাঁড়িয়ে সস্নেহ-সম্ভাষণে রাজা আমারে বোল্লেন, “এসো হরিদাস! আমি তোমার তত্ত্ব কোচ্ছিলেম, কোথায় ছিলে তুমি? এসো!”

    বোলেই তিনি অগ্রে অগ্রে সোপানাবলী অতিক্রম কোত্তে লাগলেন, কথার ভাবনা বুঝতে না পেরে পূর্বস্থানেই আমি দাঁড়িয়ে থাকলেম। পশ্চাতে মুখ ফিরিয়ে রাজা পুনরায় আমারে আহ্বান কোরে বোল্লেন, “ভাবছ কি? এসো!”

    তখন আমি তাঁর মনের কথা বুঝতে পাল্লেম; যে কার্যে যাচ্ছিলেম, সে কার্যে আর যাওয়া হলো না, সন্দিগ্ধচিত্তে রাজার সঙ্গে সঙ্গে নেমে ফটক পর্যন্ত এলেম। ফটকে গাড়ী ছিল, রাজাবাহাদুর আরোহণ কোল্লেন, আমারেও আরোহণ কোত্তে বোল্লেন; নতবদনে আমি রাজাজ্ঞা পালন কোল্লেম।

    গঙ্গাতীরের রাস্তার অদূরে একটি মনোহর উদ্যান; সেই উদ্যানে শকট পৌঁছিল; আমরা অবরোহণ কোল্লেম। গাড়ীতে যতক্ষণ ছিলেম, ততক্ষণের মধ্যে আমি একটিও কথা কহি নাই, একখানা ইংরাজী খবরের কাগজে চক্ষু রেখে রাজাবাহাদুর অন্যমনস্ক ছিলেন, তিনিও আমারে কোন কথা জিজ্ঞাসা করেন নাই। গাড়ী থেকে নেমে রাজা যখন উদ্যানের পুষ্পবাটিকায় পরিক্রমণ করেন, আমি তখন তাঁর পশ্চাতে ছিলেম। রৌদ্রের উত্তাপ ছিল না, সুখস্পর্শ সমীরণ আমাদের অঙ্গস্পর্শ কোচ্ছিল, নানা কুসমের সৌরভে চিত্ত প্রমোদিত হোচ্ছিল, উদ্যানের শোভা দর্শনে আমি পরিতৃপ্ত হোচ্ছিলেম, উদ্যানপালেরা দূরে দূরে স্ব স্ব কার্যে নিযুক্ত ছিল, নিকটে কেহই ছিল না; নির্জন-আলাপের উত্তম অবসর।

    উদ্যানের স্থানে স্থানে উপবেশনযোগ্য সুন্দর সুন্দর বেদী; বেদীর ধারে ধারে শ্বেতপ্রস্তর নির্মিত-চীনের মৃত্তিকানির্মিত নানা প্রকার সুন্দর সুন্দর পুতুল; দিব্য সুদৃশ্য! কুসমকাননের মধ্যস্থলে একটি শ্বেতবর্ণ ধারাযন্ত্র; সেই ফোয়ারার একদিকে ময়ূরের মুখ, একদিকে সিংহমুখ, একদিকে হংসমুখ, একদিকে এক অসুরের মুখ, উপরিভাগে বিচিত্র পক্ষযুক্ত একটি সুন্দরী পরী; যন্ত্রগাত্রের চারিমুখ দিয়ে নির্ঝরের ন্যায় ঝর ঝর শব্দে স্নিগ্ধ সলিল বর্ষিত হোচ্ছিল। সেই সকল শোভা দর্শন কোত্তে কোত্তে রাজাবাহাদূর নিকটস্থ একটি বেদীর উপর উপবেশন কোল্লেন, প্রসন্ন-নয়নে আমার দিকে চেয়ে আমারেও বোসতে বোল্লেন। যে বেদীতে রাজা, সে বেদীতে না বোসে নিকটবর্তী আর একটি বেদীতে আমি উপবেশন কোল্লেম।

    প্রতিদিন মনোমোহিনী শোভা দর্শনে আমার চিত্ত পুলকিত হোচ্ছিল, কিন্তু আমার অন্তরসাগরে অহরহ অনুক্ষণ যেরূপ চিন্তা-তরঙ্গের খেলা, সে খেলার বিরাম ছিল না। রাজাকে একটি কথা জিজ্ঞাসা করা আমার ইচ্ছা; স্থান নির্জন, সময় রমণীয়; রাজাবাহাদুরের মেজাজ তখন বেশ ঠাণ্ডা, মনোগত কথা জিজ্ঞাসা করবার উপযুক্ত অবসর বটে; কিন্তু সহসা কি কথা বোলে মনের কথা উত্থাপন করি, তাই আমি ভাবতে লাগলেম। অবসর হয়েও অবসর হয় না; রাজার দৃষ্টি তখন অন্যদিকে ছিল, অপাঙ্গে তাঁর মুখের ভাব নিরীক্ষণ কোরে আমি বুঝলেম, আমার ন্যায় তিনিও যেন কোন প্রকার চিন্তায় অন্যমনস্ক। সেই ভাবে রাজার মুখের দিকে আমি চেয়ে আছি, হঠাৎ আমার দিকে ফিরে, কি যেন ভেবে তিনি আমারে জিজ্ঞাসা কোল্লেন, “কি ভাবছো হরিদাস?”

    কি আমি ভাবছি, আমিই তা জানতেম। শৈশবে জ্ঞানের সঞ্চার হওয়া অবধি সর্বদা যে কথা আমি ভাবি, সেই ভাবনা আমার সহচরী। ভাবনাকে অন্তরে রেখে আমি উত্তর কোল্লেম, “উদ্যানটী অতি সুন্দর। এ উদ্যানে যা কিছ দর্শন কোচ্ছি, সমস্তই যেন আমার চক্ষে নতুন বোধ হোচ্ছে; পুতুলগুলি যেন সজীব বিবেচনা কোচ্ছি; পুতুলেরা যেন বাতাসের সঙ্গে কথা কোচ্ছে, এই ভাব আমার মনে আসছে; বাতাসে দলে দলে ফুলগুলি যেন আহ্লাদে আহ্লাদে ঢোলে ঢোলে পোড়ছে, পবনদেবের সঙ্গে যেন খেলা কোচ্ছে তাই আমি দেখছি।”

    ঈষৎ হাস্য কোরে রাজাবাহাদুর বোল্লেন, “তা তো দেখছো, কিন্তু ভাবছো কি? দেখতে পাই, সর্বদাই কি তুমি ভাবো। পূর্বেও দেখেছি, এখনো দেখছি, একই ভাব। এখন আর তুমি নিতান্ত ছেলেমানুষটি নও, ক্রমেই বয়স বাড়ছে, উদাসীনের মত সর্বক্ষণ ভেবে ভেবে তোমার বুদ্ধিশক্তি দুর্বল হয়ে আসছে; ও সব ভাবনা ছেড়ে দাও। তোমাকে সংসারী হোতে হবে, সংসারী হবে, সংসারের মানুষগুলিকে চিনতে হবে, সংসারের প্রকৃতি বুঝতে হবে, সেগুলি কি তুমি একবারও ভাবো না? অন্য ভাবনা ছেড়ে দাও। যাতে কোরে মানুষের মত হোতে পার, সেই চেষ্টা কর; আমার কাছে যথেষ্ট সহায়তা পাবে।”

    সুরে সুরে সুর মিলে গেল; ঠিক সুরে আমার হৃদয়-বীণা বেজে উঠলো। সূত্র অন্বেষণ কোচ্ছিলেম, উত্তম সূত্র পেলেম; উত্তম সুবিধা; ভাগ্যে যা থাকে, তাই হবে, এই সূত্রে মনের কথা আমি প্রকাশ করি। রাজা যদি সদয় হন, আশা পূর্ণ হবে; কথা শুনে রাজা যদি রুষ্ট হন, আশা ভেসে যাবে; যত দিন বাঁচবো, এই রকমে অকূলপাথারে ভেসে ভেসে বেড়াবো। আজ আমার ভাগ্যপরীক্ষার শেষদিন, মনের কথা প্রকাশ করা কর্তব্য। ভেবে ভেবে দৃঢ়সঙ্কল্প হয়ে ধীরে ধীরে আমি বোল্লেম, “যা আপনি আজ্ঞা কোচ্ছেন, তা ঠিক। সংসারে যখন এসেছি, তখন সংসারের পদ্ধতিতে সংসারী হওয়াই উচিত; কিন্তু পন্থা অবলম্বনের মূলতত্ত্ব আমি অপরিজ্ঞাত। এ সংসারে কে আমি, কে আমার জন্মদাতা, কে আমার জননী, এত বড় বিশ্বসংসারে আমার আপনার লোক কেহ আছেন কি না জন্মাবধিই সেটী আমি জানলেম না। আমি আছি কেবল এইটুকু মাত্র জানি, আর কিছুই আমি জানি না। আপনি বোলছেন, ‘উদাসীনের মত সর্বক্ষণ ভেবে ভেবে বুদ্ধিশক্তি দুর্বল হয়ে আসছে’; যথার্থই তাই, যথার্থই আমি উদাসীন; সংসারে আমি এসেছি, সংসারে আমি আছি সংসারেই ভ্রমণ কোচ্ছি, কিন্তু সংসারটী কি, তা আমি জানি না। এমন অবস্থায় জীবন আমার বিড়ম্বনা জ্ঞান হয়। কেন বেঁচে আছি, তাও আমি বুঝতে পাচ্ছি না। আপনি যদি সদয় হয়ে আমার পরিচয়টি আমারে বোলে দেন, তা হোলে—”

    অকস্মাৎ রাজার মুখের সেই প্রফুল্লভাব তিরোহিত। আমার ঐ অর্ধোক্তি শ্রবণে যেন কতই বিস্ময়ভাব প্রকাশ কোরে রুক্ষস্বরে তিনি বোল্লেন, “পরিচয়? —তোমার? তোমার পরিচয় আমি কি জানি? পাগলের মত তুমি কি কথা কও? কোথাকার কে তুমি কিছুই আমি জানতেম না; আমার শ্বশুরের বাড়ীতে তোমাকে আমি প্রথম দেখি, দেখে তোমার প্রতি আমার দয়া হয়েছিল, নিজ বাড়ীতে নিয়ে গিয়ে যত্ন কোরে রাখবো, লেখাপড়া শিখাবো, কাজকর্ম শিক্ষা দিব, ঐরূপ আমার ইচ্ছা হয়েছিল; সে কথা তোমাকে আমি বোলেছিলেম। তুমি শুনলে না, আমার সৎপরমর্শ গ্রাহ্য কোল্লে না, আপন বুদ্ধিতে পথে পথে ঘুরে বেড়াতে লাগলে, তথাপি চৈতন্য হলো না। তার পরেও দুবার তোমার সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল, তখনো আমি তোমার ভাল চেষ্টা করেছিলেম, তাও তোমার ভাল লাগলো না। লোকের কাছে অকারণে তুমি আমার নিন্দা কোল্লে তাও আমি ভুলে গিয়েছিলেম, ছেলেমানুষ বোলে ক্ষমা কোরেছিলেম; তদবধি তুমি আর আমার সঙ্গে দেখা কোল্লে না। নিরাশ্রয় দেখে তোমাকে আশ্রয় দিবার নিমিত্ত কত চেষ্টা আমি কোরেছি, সমস্তই বিফল হয়েছে। দয়াবশে কত সন্ধানের পর সন্ধান পেয়ে এখানে তোমাকে আমি আনিয়েছি, ভবিষ্যতে আর কোন কষ্ট না পাও, তার উপায় আমি কোরবো, স্বীকার কোরেছি, তাতেও তুমি সন্তুষ্ট থাকছো না। কোথাকার কথা কোথায়! আমার কাছে তুমি তোমার পরিচয় চাও! তোমার পরিচয় আমি কিরূপে জানবো?”

    কঠোর কর্কশকণ্ঠে রাজাবাহাদুর এই সব কথা বোল্লেন, আমি কিন্তু ভয় পেলেম না; মনের উপদেশে আরো বরং অধিক সাহসে তৎক্ষণাৎ আমি বোল্লেম, “সব আপনি জানেন, কেন প্রতারণা করেন? গরীব দেখে কেন আমার কথাগুলি উড়িয়ে উড়িয়ে দেন? সমস্তই আপনি জানেন; দয়া করুন। দয়া কোরে বলুন, কে আমি, কোথা আমার জন্ম, কোথায় আমার জনক-জননী, কোথায় কোথায় কে আমার আপনার লোক বর্তমান আছেন, অনুগ্রহ কোরে সেই কথাগুলি আমারে বলুন! সমস্তই আপনি জানেন।”

    পূর্ববৎ রুক্ষস্বরে রাজাবাহাদুর বোলে উঠলেন, “কি আমি জানি? তুমি একজন বিদেশী বালক, তোমার পরিচয় আমি কেমন কোরে জানবো? কোথায় তোমার জন্ম, কে তোমার বাপ, কে তোমার মা, সে সব কথা আমি কি জানি? আমাকে তুমি ও রকমে বিরক্ত কোরো না। যদি ভাল চাও, ঠাণ্ডা হয়ে কিছুদিন আমার কাছে থাকো, পাগলামী দেখিও না। আমি অঙ্গীকার কোচ্ছি, সেই রকমে থাকলে আমি তোমার ভাল চেষ্টা করব; ও রকম পাগলামী দেখালে এখানে তুমি জায়গা পাবে না। বার বার আমি বোলছি, তোমার পরিচয়ের কোন কথাই আমি জানি না।”

    রাজা মোহনলাল আমারে ভয় দেখালেন, “পাগলামী দেখালে এখানে জায়গা পাবে না” বোল্লেন। যেটা আমার সত্যকথা, রাজা বোল্লেন, সেইটি আমার পাগলামী। আমি ভয় পেলেম না;  কোন প্রকার ভয়ের লক্ষণ না দেখিয়ে তৎক্ষণাৎ আমি বোল্লেম, “কেন আপনি গোপন করেন? গরীব বোলে কেন আপনি আমারে অন্ধকারে রাখতে চান? কিছুই যদি আপনি জানেন না, তবে রুদ্রাক্ষগ্রামের জয়শঙ্করবাবুকে সে কথা আপনি কিরূপে বোলেছিলেন?”

    কিঞ্চিৎ চমকিতভাবে রাজাবাহাদুর বোল্লেন, “কি আমি বোলেছিলেম? জয়শঙ্করের মুখে কি কথা তুমি শুনেছ? তোমার পরিচয় জয়শঙ্কর যেমন জানেন, আমিও সেইরূপে জানি। জয়শঙ্করের কাছে কি কথা আমি বোলেছিলেম? কিছুই ত আমার মনে হয় না। তুমি যদি—”

    সত্য সত্যই আমি যেন তখন পাগলের মত হোলেম। যদিও অশিষ্টতা, যদিও অনুচিত, তথাপি আমি রাজার কথায় বাধা দিয়ে উত্তেজিতস্বরে বোল্লেম, “কিছুই আপনার মনে হয় না? আচ্ছা, আমিই মনে কোরে দিচ্ছি। জয়শঙ্করবাবুর মুখে আমি শুনেছি, তাঁরে আপনি বোলেছিলেন, আমি আপনার জাতি; আপনিও যে জাতি, আমিও সেই জাতি। জাতির কথা যদি আপনি জানেন, তবে আমার জন্মের কথাও অবশ্য আপনার জানা আছে, এই আমার বিশ্বাস। সেই বিশ্বাসেই এখানেই আমি এসেছি। কেন আপনি অস্বীকার করেন? কেন আর আমারে অন্ধকারে রাখেন? জাতি-জন্ম সম্বন্ধে চিরদিন আমি অন্ধকারে থাকি, সেইটিই কি অপনার ইচ্ছা? আপনার তুল্য মহৎলোকের সে রকম ইচ্ছা থাকা শোভা পায় না। দয়া করুন! যদি আমি আপনার কাছে কোন অপরাধ কোরে থাকি, ক্ষমা করুন! দয়া কোরে সত্যকথা বলুন! বিস্তর কষ্ট আমি পেয়েছি, আর কষ্ট সহ্য হয় না! আমার কষ্টের অনেক কথা আপনি জ্ঞাত আছেন। যারা আমার উপর দৌরাত্মা করে, তাদের মধ্যে কোন কোন লোককে আপনি জানেন। আপনার উপদেশে একজন—”

    রাজা যেন কেমন এক রকম অস্থির হোলেন; অস্থির হয়েই বেদীর উপর থেকে নেমে দাঁড়ালেন; দুই চক্ষু রক্তবর্ণ কোরে সরোষে আমারে বোল্লেন, “আমি কি তবে মিথ্যাকথা বোলছি? যারা যারা তোমার উপর দৌরাত্মা করে, তাদের কি আমি জানি? আমার উপদেশে তোমার উপর দৌরাত্ম্য হয়? আমি কি তোমারে অন্ধকারে রাখছি? কি সব কথা তুমি বল? এ সব কথা শুনলে লোকে আমাকে কি বোলবে? তোমাকেই বা কি ঠাওরাবে? ও সব কথা তুলো না, ও সব কথা বোলো না; যা যা আমি বলি, আমার বাধ্য হয়ে তাই তুমি কর, বাচালতা দেখিও না; আমি যেন বুঝতে পাচ্ছি, দেশে দেশে ঘুরে ঘুরে তোমার মাথা খারাপ হয়ে গিয়েছে। হোতেই পারে; হোতেই পারে; অনেক লোকের এই রকম হয়। আমি বরং তোমার চিকিৎসা করাবো; এখানে ভাল ভাল কবিরাজ আছে, ডাক্তার আছে, ভাল ভাল ঔষধ আছে, চিকিৎসকের ব্যবস্থামত চোল্লে শীঘ্রই তুমি আরাম হোতে পারবে।”

    এই সব কথা বোলতে বোলতে একবার আকাশপানে চেয়ে রাজাবাহাদুর বোল্লেন, “আর বেলা নাই, চল আমরা কুঠীতে ফিরে যাই। যে সব কথা আজ তুমি আমাকে বোল্লে, নিকটে লোকজন থাকলে, ও রকম কথা বোলো না; লোকে কেবল প্রলাপ মনে কোরবে, তোমাকে উপহাস কোরবে, পাগল মনে কোরে হাততালি দিবে, গায়ে ধূলা দিবে; সাবধান! চল এখন!”

    আমার মনের ভিতর তখন কিরূপ ভাবের উদয় হলো, বিশ্ববিধাতা ভিন্ন আর কেহ সে ভাব জানতে পারেন না। রাজা চোল্লেন, নিস্তব্ধ হয়ে আমিও তাঁর সঙ্গে সঙ্গে চোল্লেম। অতঃপর শকটারোহণে কুঠীতে গিয়ে উপস্থিত হোলেম। সে রাত্রে সকল রাত্রি অপেক্ষা আমি অধিক অসুখী। বাবু মোহনলাল রাজা উপাধি পেয়েছেন, সম্প্রতি তাঁর ঐশ্বর্য বৃদ্ধি হয়েছে। আমি ভেবেছিলেম, পদমর্যাদা ও ধনমর্যাদার সঙ্গে তাঁর পূর্বপ্রকৃতির পরিবর্তন হয়ে থাকবে; কিন্তু পুষ্পকাননে আজ তিনি যেরূপ অভিনয় কোল্লেন, তাতে বুঝলেম, কপটতা আরো যেন বেশী পরিমাণে বর্ধিত হয়েছে। নিশ্চয় আমি বুঝতে পাচ্ছি, আমার পরিচয় তিনি জানেন; পূর্বে যতটকু বুঝেছিলেম, এখন তদপেক্ষা অনেকটা পরিষ্কার বুঝেছি; কিন্তু সেই পরিচয়টি তিনি আমার কাছে প্রকাশ কোরবেন না, অপ্রকাশ রাখতে তিনি যেন দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, লক্ষণে এইরূপ বুঝা গেল কিন্তু কেন? আমার পরিচয় আমার কাছে প্রকাশ কোল্লে তাঁর কি কোন প্রকার ক্ষতির সম্ভাবনা আছে? আমি আমার পরিচয় জানতে পাল্লে তাঁর কি কোন প্রকার ইষ্টসিদ্ধির আঘাত হবে? গরীবের পরিচয় বোলে দিলে তাঁর অভিনব রাজা উপাধিতে কি কোন প্রকার আঘাত পাবে? বহু-চিন্তা কোরেও কিছুই আমি অবধারণ কোত্তে পাল্লেম না, হতাশে কেবল এইটুকুমাত্র অবধারণ কোল্লেম যে, চিরদিন আমারে জাতি-জন্মের পরিচয়ে অন্ধকারেই থাকতে হবে। কেন না, ঐ মোহনলালবাবু ভিন্ন আর কেহ এই হতভাগ্য হরিদাসের সত্য পরিচয় জ্ঞাত আছে, এমন বোধ হয় না, বোধ হয়, রক্তদন্ত কিছু কিছু, জানতে পারে; কিন্তু তার মুখে সত্যকথা বাহির করা দূরাশামাত্র। এত বড় একজন সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি এই বাবু, মোহনলাল,— অভিনব রাজা মোহনলাল, ইনি যখন এতদূর কৃপণতা কোচ্ছেন, তখন সেই একটা ধড়ীবাজ ডাকাত,— নরহন্তা অনুমান কোল্লেও মিথ্যা অনুমান হয় না, — সেই পাষণ্ড দস্যু আমার সম্বন্ধে সত্যকথা বোলবে কোনক্রমেই সেটা সম্ভব মনে করা যায় না; তবে আর কার কাছে আমার অভীষ্টসিদ্ধির আশা?— আশা নাই! সূতিকাগারে আমি যেমন ছিলেম, কোথায় এলেম, কোথায় ছিলেম, কে আমি কিছুই জানতেম না, মৃত্যুকাল পর্যন্ত সেইরূপেই আমারে ঘোর অন্ধকারে থাকতে হবে, বিধাতার হয় তো ইচ্ছাই তাই। এখন আমি কি করি? পরিচয়প্রাপ্ত হবার আশা তো দূরে গেল! বিনা পরিচয়ে যাঁদের কাছে আমি এক রকমে পরিচিত হয়েছিলেম, যাঁদের কাছে আমি ভালবাসা পেয়েছিলেম, যাঁরা আমারে আদর-যত্নে আশ্রয় দিয়েছিলেন, তাঁরাই বা কে কোথায় থাকলেন? অমরকুমারী কোথায় রইলেন? অমরকুমারীর কাছে জীবনঋণে ঋণী আমি, সে ঋণ পরিশোধ কোত্তে পাল্লেম না। দুই জেলার দুই জায়গায় দুই মোকদ্দমা; সে দুই মোকদ্দমার কিরূপ নিষ্পত্তি হলো, জানতে পাল্লেম না। ত্রিপুরায় যখন ছিলেম, বন্ধুবান্ধবগণকে চিঠি লিখে তত্ত্ব জানবার আশা কোরেছিলেম, জয়শঙ্কর চৌধুরী বাধা দিয়াছিলেন, আশা ফলবতী হয় নাই। এখন আমি পাটনায়, এখন আমি সে বিষয়ে স্বাধীন; চিঠি আমি লিখবো, সে কথা রাজাকে জানাব না। কি জানি, যে রকম প্রকৃতি, তাতে কোরে রাজা যদি জয়শঙ্করের মত আমার অভিলাষের পথে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ান; তা হোলে মনোরথসিদ্ধি হবে না। রাজাকে জানাব না, সেই পরামর্শই ভাল। আপন সংকল্প আপনিই জানবো আর কাহাকেও জানতে দিব না;  দিনমানেও লিখবো না; কল্য রাত্রিতে বাড়ীতে নিশুতি হবে, বাড়ীর সকলে যখন ঘুমাবে, সেই সময় আমি পত্রগুলি লিখে রাখবো।

    এই আমার সংকল্প; দৃঢ়সংকল্প। দিবসের শেষভাগে সুখীলোকে সুখময় স্থানে ভ্রমণ করে; শরীর সুস্থ হয়, মন সুস্থ হয়, নিশাকালে সুখে নিদ্রা যায়। অসুখী লোকে তাদৃশ রমণীয় স্থান পরিভ্রমণ কোরে সুস্থ হোতে পারে না, নিদ্রাও তারে আলিঙ্গন করে না। আমি অসুখী, রাজার সঙ্গে পুষ্পকুঞ্জ পরিভ্রমণ কোরে এলেম, উপকার পেলেম? —দুশ্চিন্তা বেড়ে গেল, প্রাণের ভিতর আঘাত লাগলো, নিদ্রাদেবী আমারে একবারও দয়া কোল্লেন না; সমস্ত রজনী আমি অসুখী হয়েই জাগরণ কোল্লেম। একটি সুখ, ঐ কল্পনা; — বন্ধবান্ধনগণকে চিঠি লিখবো।

    রজনী প্রভাত। সূর্যোদয়ের পূর্বে গাত্রোত্থান কোরে আমি একবার নীচে নেমে এলেম, সম্মুখের রাস্তাটি উদাসনয়নে দর্শন কোল্লেম; সে ভাব আমার মনে কেন উদয় হয়েছিল, আমি নিজেই তা জানতেম না। অপরাপর স্থানে, অপরাপর সময়ে, যে যে বাড়ীতে আমি আশ্রয় পেয়েছিলেম, সেই সকল বাড়ীতে একটি না একটি অনুগত লোকের সঙ্গে আমার আত্মীয়তা ঘোটেছিল। বাবু হোক, সরকার হোক, সামান্য একজন চাকর হোক, যেই হোক, একটি না একটি লোকের সঙ্গে আমার সম্ভাব সঞ্চারিত হতো; কথা কহিবার দোসর পেতেম; এখানে সেটি ঘটে নাই। প্রথমে দেখেছিলেম, দেওয়ান।

    আমার সঙ্গে কথা কোয়েছিলেন, এখনো কথা হয়, কিন্তু সে সকল কথা যেন ফাঁকা ফাঁকা লাগে। অপরাপর লোকের সঙ্গেও কথা হয়, সে সকল কথাতেও কোন রস থাকে না। রাজার সঙ্গেও কথা চলে, কিন্তু সেই সকল কথায় আমার হৃদয়ের ভার যেন আরো বেশী বেশী গুরুভার মনে হয়। মনের কথা বোলতে পারি, পাটনার রাজবাড়ীতে তেমন সুখের সুখী, দুঃখের দুঃখী একটি লোকও পাই না, বাড়ী থেকে বেরিয়ে সহর দেখতে যাই না, সর্বদাই আমারে বাড়ীর মধ্যে বাস কোত্তে হয়। রাজাবাহাদুর আমারে গত কল্য উদ্যানে নিয়ে গিয়েছিলেন, সুখী হব ভেবেছিলেম, বিপরীত হয়ে গেল।

    আজ আমি রাস্তা দেখছি কেন? পালিয়ে যাবার জন্য কি?—তা নয়; চিঠি লিখতে হবে। কাগজ, কলম, কালি, ডাকের টিকিট আবশ্যক আছে। রাজবাড়ীতে সমস্যা আছে, সমস্তই হয় তো পেতে পারি, কিন্তু আমি চাইবো না; মনের কথা কাহাকেও জানতে দিব না; রাজকিঙ্করগণের মধ্যে কাহাকেও সেই উপকরণগুলি সংগ্রহ কোরে দিবার অনুরোধ কোরবো না, বাজার থেকে নিজেই সেইগুলি খরিদ কোরে আনা আমার অভিলাষ; সেই নিমিত্তই রাস্তা-দর্শন। কোন দিক দিয়ে কোথায় যেতে হবে সেইটি আমি ঠিক কোরে রাখলেম। অপর হেন কাহাকেও কিছু না বোলে রাজবাড়ী থেকে আমি বেরুলেম। এ বাড়ীকে বারম্বার আমি রাজবাড়ী বোলছি কেন? ভদ্রাসন না হোলেও মোহনবাবু এখন রাজা; অতএব বাড়ীর নাম এখন রাজবাড়ী।

    প্রয়োজন সিদ্ধ কোরে সন্ধ্যার মধ্যেই আমি ফিরে এলেম। দিনমানেও রাজার সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হয়েছিল, সন্ধ্যার পরেও সাক্ষাৎ হলো, পূর্বদিনের কোন কথাই তিনি উত্থাপন কোল্লেন না, তাঁর মুখের ভাবেও কোন প্রকার বিরক্তিলক্ষণ লক্ষিত হলো না, আমি সে প্রসঙ্গে তাঁরে কোন কথা বোল্লেম না। নিত্য যেমন হয়ে থাকে, সেই রকম পাঁচ প্রকার মজলিসী কথায় সম্ভবমত পরিতৃপ্ত হওয়া গেল। রাত্রি দশটা। আহারাদির পর সকলে স্ব স্ব স্থানে শয়ন কোল্লেন, আমার শয়নের জন্য যে ঘরটি নির্দিষ্ট হয়েছিল, সেই ঘরে আমি বোসলেম।

    এক ঘণ্টাকাল অনেক রকম আমি ভাবলেম, তার পর চিঠি লেখা আরম্ভ কোল্লেম। ঘরের দরজা বন্ধ করা হয়েছিল; কি আমি কোচ্ছি, হঠাৎ কেহ এসে দেখতে পাবে, সে ভয় ছিল না, নির্ভয়ে আমি চিঠি লিখতে লাগলেম। সাতখানি চিঠি; কাশীতে রমণবাবুর নামে একখানি, বরদায় রাজকুমার রণেন্দ্ররাও বাহাদুরের নামে একখানি; মুর্শিদাবাদে দীনবন্ধু বাবু, পশুপতিবাবু, শান্তিরাম দত্ত, মণিভূষণ দত্ত, এই চারি নামে চারিখানি আর মাণিকগঞ্জে হরিহরবাবুর নামে একখানি, এই সাতখানি। মোড়ক কোরে শিরোনাম লিখে, সেই পত্রগুলি আমি শয্যাতলে রেখে দিলেম; পরদিন প্রভাতে প্রভাতী-বায়ু সেবন-ব্যাপদেশে সেগুলি আমি স্বয়ং ডাকঘরের ডাকবাক্সে দিয়ে এলেম। একটা ভাবনা দূর হলো।

  • দ্বিতীয় কল্প : হায় হায়! আমি পাগল!

    দ্বিতীয় কল্প : হায় হায়! আমি পাগল!

    ভূবনচন্দ্র মুখোপাধ্যায়

    [book-name]

    দ্বিতীয় কল্প : হায় হায়! আমি পাগল!

    অষ্টাহ অতীত। রাজাবাহাদুরের সঙ্গে নিত্য আমার দেখা হয়, নিত্য তিনি আমারে উৎসাহবাক্যে আশা প্রদান করেন; আশ্রিতের প্রতি আশ্রয়দাতার যেরূপ স্নেহ থাকা সম্ভব, আমার প্রতি রাজা মোহনলাল সেইরূপ স্নেহ প্রদর্শন করেন; তাঁর কপট ব্যবহার জেনে শুনেও ঐ প্রকার বাহ্য ব্যবহারে আমি তুষ্ট থাকি। খেলাঘরের খেলার ন্যায় মিথ্যাবস্তুগুলিকে মনে মনে আমি সত্য সাজে সাজাই। কাজকর্ম কোরবো, রাজাবাহাদুর আমারে ভাল ভাল কাজকর্ম দিবেন, এইরূপ আশা করি, এইরূপ আশা পাই। যে সব কথা অন্তরে জাগে, এক এক সময় সে সব কথা ভুলে ভুলে থাকি।

    দিবসে উপবেশনের নিমিত্ত আমার একটি স্বতন্ত্র গৃহ নিদিষ্ট ছিল, প্রয়োজন ব্যতিরেকে কেহ সে গৃহে হঠাৎ প্রবেশ কোত্তেন না। একদিন অপরাহ্ণে একটি ভদ্রলোক সহাস্যবদনে সহসা আমার সম্মুখে উপস্থিত হোলেন। কথাবার্তা কিছুই নাই, লোকটি আপন মনে হাসতে হাসতে আমার বিছানার উপর বোসলেন, হাসতে হাসতে খানিকক্ষণ অনিমেষনেত্রে আমার মুখের দিকে চেয়ে থাকলেন; ভাব আমি কিছুই বুঝতে পাল্লেম না। তাঁর উপস্থিতির কারণ জানবার অভিলাষে কোন কথাই আমি জিজ্ঞাসা কোল্লেম না। তিনিও নিস্তব্ধ, আমিও নিস্তব্ধ। বিশেষের মধ্যে তাঁর মুখে হাস্য ছিল, আমার মুখ বিস্ময়ভাব প্রকাশক।

    লোকটির পরিচ্ছদ ভদ্রলোকের ন্যায়, চেহারায় কিন্তু তদ্রূপ ভদ্রতার কোন লক্ষণ প্রকাশ পায় না। সচরাচর বড়লোকের দরবারে মোসাহেব লোকের যেরূপ ভাব-ভঙ্গী দৃষ্ট হয়, এই লোকের ভাব-ভঙ্গী সেই প্রকার। বাক্যশ্রবণ না কোল্লে প্রকৃতি বুঝা যায় না; প্রকৃতির বিচারে আমি অক্ষম থাকলেম। লোকটির চক্ষু আমার মুখের দিকে, আমার চক্ষু তাঁর মুখের দিকে। এই ভাবে থাকতে থাকতে হেসে হেসে তিনি আমারে জিজ্ঞাসা কোল্লেন, “তোমার কি কোন প্রকার অসুখ আছে?”

    অদ্ভুত প্রশ্ন! কস্মিনকালেও দেখা-সাক্ষাৎ নাই, আমার সুখাসুখের কথা কেহ তাঁরে বলেও নাই, অকস্মাৎ তিনি আমারে অমন কথা কেন জিজ্ঞাসা করেন? আমি উত্তর কোল্লেম না; দুই তিনবার মস্তকসঞ্চালন কোরে পুনরায় তিনি আপনা আপনি বোল্লেন, “ওহো! সেই কথাই ঠিক বটে। সে রকম না হোলে এ রকমটা হয় না সেই কথাই ঠিক বটে! আত্মগত বাক্যে এইরূপ মন্তব্য দিয়ে পূর্ববৎ হাসতে হাসতে আমারে তিনি বোল্লেন, “দেখি দেখি, তোমার হাতখানি একবার দেখি।”

    আমি মনে কোল্লেম, হয় তো গণকঠাকুর; সামুদ্রিকবিদ্যায় পণ্ডিত; এই মনে কোরে আমি আমার দক্ষিণ করতলটি তাঁর সম্মুখে বিস্তার কোল্লেম। হাস্য কোরে তিনি বোল্লেন, “ও রকম নয়, ও রকম নয়, নাড়ী পরীক্ষা করা আবশ্যক।”

    হাতখানি সরিয়ে নিয়ে বিরক্তভাবে আমি বোল্লেম, “শরীরে আমার কোন পীড়া নাই নাড়ী-পরীক্ষার কিছুই প্রয়োজন আমি দেখছি না।”— আমার কথা তিনি শুনলেন না নিকটে সোরে এসে আমার হাতখানি ধোরে তিনবার তিনি টিপে টিপে দেখলেন, মাথা হেলিয়ে হাতের কাছে কাণ পাতলেন, তার পর হুঁ হুঁ শব্দ উচ্চারণ কোরে পূর্বের ন্যায় তিনবার মস্তকসঞ্চালন কোল্লেন; হাসতে হাসতে বোলতে লাগলেন, “সে রকম কিছু নয় বটে কিন্তু কোথা থেকে তুমি এসেছ? কোন কোন লোক তোমাকে বুঝি অনেক কষ্ট দিয়েছে? তুমি বুঝি দেশে দেশে বেড়িয়ে বেড়িয়ে অতিশয় ক্লান্ত হয়ে পোড়েছ? লোকেরা বুঝি তোমার অন্বেষণে যেখানে সেখানে ঘুরে বেড়াচ্ছে? কোথাও বুঝি তুমি স্থির হোতে পাচ্ছো না? নাড়ীর লক্ষণে সেই রকম আমি দেখছি। অজ্ঞাত লোকেরা তোমার পরম শত্রু। কেন তারা তোমার উপর সে রকম দৌরাত্মা করে? কেন তারা তোমার পাছে পাছে দেশে দেশে ঘোরে?”

    যখন তিনি আমার নাড়ী-পরীক্ষা করেন, সে সময় আমি ভেবেছিলেম, তিনি হয় তো বৈদ্যরাজ, শেষের কথাগুলি শুনে মনে কোল্লেম, তা নয়; কেবল বৈদ্যরাজ নয়, গণনাবিদ্যায় তাঁর দক্ষতা আছে। যে সব কথা তিনি বোল্লেন, যদি অন্য কারো মুখে না শুনে থাকেন, তবে তো সে সব কথায় তাঁর পাণ্ডিত্যের পরিচয় পাওয়া যাচ্ছে। পূর্বে যতটা বিরাগ জন্মেছিল, ততটা থাকলো না, গণকঠাকুর মনে কোরে তাঁর গুণপণার উপর আমার কিঞ্চিৎ ভক্তির সঞ্চার হলো। তখনো তিনি মুখ টিপে টিপে হাসছিলেন। হাসে কেন? আমি কষ্টে পোড়েছি, লোকের উপদ্রবে কষ্ট পেয়েছি, সে সব কথা জানতে পেরে কাহার মুখে হাসি আসে? লোকটির স্বভাব বুঝি ঐ রকম, সর্বদাই হাস্য করা বুঝি তাঁর অভ্যাস, এইরূপে বিবেচনা কোরে দুই চারি কথায় আমি বোল্লেম, “আজ্ঞা হাঁ লোকে অকারণে আমার শত্রু হয়েছে, তারা আমারে বিস্তর কষ্ট দিয়েছে, এখনো পৰ্যন্ত ক্ষান্ত হয় নাই, বেশী কথা কি, বাগে পেলে তারা আমারে প্রাণে মাত্তে পারে, সে সব আমি জানতে পেরেছি।”

    গণক, বৈদ্য অথবা সামুদ্রিক এই তিনের মধ্যে লোকটি যাই হোন, বিশ্বাস কোরে আমি তাঁরে বোল্লেম, “শত্রুর কুচক্রে সর্বদাই আমি বিপদাপন্ন।” সেই কথা শুনে সেইভাবে তিনি বোল্লেন, “হোতেই পারে, হোতেই পারে; তুমি মিথ্যাকথা বোলছো না। সত্য সত্যই তোমার পাছে শত্রু লেগেছে। তুমি বেশ ছেলে, কেন তারা তোমার শত্রু হলো, আমি বুঝতে পাচ্ছি না। আচ্ছা, তোমার বাড়ী কোন গ্রামে? তোমার পিতার নাম কি?”

    বিশ্বস্তভাবে আমি উত্তর কোল্লেম, “তা আমি জানি না, বাড়ী-ঘর আমার নাই, মাতা-পিতার পরিচয় আমি অজ্ঞাত, যেখানে যখন আমি যাই, এক একটি মহৎলোকের কাছে আশ্রয় পাই, আমার দুর্দশা শুনে তাঁরা দুঃখপ্রকাশ করেন; সেখানেও আমার সঙ্গে সঙ্গে শত্রু ঘোরে, কোথাও আমি শান্তি পাই না। এই রাজাবাহাদুর পূর্বে আমারে দেখেছিলেন, নিরাশ্রয় দেখে আশ্রয় দিতে চেয়েছিলেন, তাঁর কাছে থাকতে আমি সম্মত হই নাই; মধ্যে কিছুদিন দেখা-শুনা ছিল না, সম্প্রতি তিনি আমারে এইখানে আনিয়াছেন; এখন এইখানেই আমি আছি।”

    একবার ঊর্ধ্ব দিকে দৃষ্টিপাত কোরে লোকটি বোল্লেন, “হাঁ হাঁ; সেই কথাই তো আমি বোলছি, শত্রুর ভয়ে, শত্রুর উপদ্রবে কোথাও তুমি স্থির হোতে পাচ্ছো না। রাজাবাহাদুর আনিয়েছেন, এইখানেই তুমি আছ, সে কথা আমি জানতে পেরেছি; কিন্তু আচ্ছা, কারা তোমার শত্রু, কি কারণে তারা তোমার শত্রু, সে কথা তুমি বোলতে পার? শত্রু পক্ষের নাম তুমি জানো?”

    তাৎক্ষণাৎ আমি কোন উত্তর দিলেম না, মনে কোল্লেম, এ সকল কি কথা? আমার অবস্থার কথা ইনি জানেন; শত্রু লেগেছে, সে কথাও বোলছেন, বোলতে বোলতে শত্রু পক্ষের নাম জিজ্ঞাসা করেন কেন? নাম যদিও আমি জানি, কিন্তু সেই নামের সঙ্গে কতদূরে টান পড়ে সেটা ভাবতে গেলে প্রকাশ কোত্তে সাহস হয় না। শত্রু, আমার একটি নয়, অনেক; কার নাম বোলতে কার নাম আনবো, কোথায় গিয়ে পরিণাম দাঁড়াবে, ঠিক নাই, ফল বরং বিপরীত দাঁড়াবার সম্ভাবনা। এইরূপে চিন্তা কোরে আমি উত্তর কোল্লেম, “গুপ্তশত্রুর নাম নিঃসন্দেহে জানা যেতে পারে না। যাদের উপর আমার সন্দেহ হয়, তারা আমারে কিরূপ বিবেচনা করে, তাও আমি জানি না। অমুক অমুক আমার শত্রু, অমুক অমুক আমার প্রাণবিনাশে উদ্যত, ঠিক ঠিক তা যদি আমি জানতেম তা হোলে আদালতের সাহায্য নিতে পাত্তেম। যারা গোপনে থেকে যুদ্ধ করে, তাদের নাম বোলতে আমি ভয় পাই।”

    লোকটি আমার কথার প্রতিধ্বনি কোরে বোল্লেন, “তা তো বটেই! তা তো বটে! ঠিক কথাই তুমি বোলেছ! নাম বোলতে তুমি ভয় পাও! আমরাও ভয় পাই। আহা! বিস্তর কষ্ট তুমি পেয়েছ! যারা তোমাকে কষ্ট দিচ্ছে, তারা শাস্তি পাবে; এখানে না পায়, মরণান্তে যমলোকে অথবা অপর কোন পরলোকে অবশ্যই তারা শাস্তি পাবে। ও কি? তুমি অমন কোরে কাঁদ কেন? অসুখ হয়েছে, সেরে যাবে; শত্রু হয়েছে, ধরা পোড়বে; ভয় কি? রাজার বাড়ীতে এসেছ, রাজার বাজী আছ, কিসে তোমার ভয়? রোদন সংবরণ কর; শীঘ্রই আবার আমি তোমার কাছে আসছি, এখান থেকে তুমি কোথাও যেয়ো না।”

    এই সব কথা বোলে, মুখে টিপে হাসতে হাসতে সে লোকটি আমার ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। কোথাকার লোক?— কে সে? —কি সব কথা বোলে গেল? আমি কাঁদছি! কে তারে বোল্লে আমি কাঁদছি? লোকটা কোন চক্ষে দেখলে আমি কাঁদছি? প্রথমেই তারে দেখে, তার কথা শুনে, আমি মনে কোরেছিলেম, গণকঠাকুর, তার পর ভেবেছিলেম বৈদ্যরাজ, এখন বুঝতে পাচ্ছি, কিছুই না। ভণ্ডলোক! যে সকল লোক কেবল কথা বেচে খায়, পাঁচ রকম কথা বোলে লোকের মন ভুলাবার চেষ্টা পায়, ‘অসাধ্য রোগের অব্যর্থ ঔষধ জানি’ বোলে যারা অবোধ লোকের পয়সা ফাঁকি দেয়, ঐ লোক হয় তো সেই দলের লোক হবে, এইরূপে আমার সন্দেহ হলো।

    সন্দেহের কথাটা মনে মনে আলোচনা কোচ্ছি, সম্মুখে দেখি, আর একটি লোক। যে লোকটিরও অধর ওষ্ঠে মৃদু হাস্য। যে আসে, সেই হাসে, ব্যাপার কি? আমারে দেখলে নূতন লোকের হাসি পায়, পাটনায় এসে আমি কি সেই রকমের কোন আশ্চর্য বস্তু হয়ে পোড়েছি? লোকটি এলো, কৃষ্ণঠাকুরের মত পায়ের উপর পা দিয়ে আমার সম্মুখে দাঁড়ালো, হাসতে হাসতে জিজ্ঞাসা কোল্লে, “কি হে বালক! তোমারই নাম হরিদাস? জায়গায় জায়গায় তুমি না কি বিস্তর কষ্ট পেয়েছ? অজানা লোকেরা বা কি তোমার উপর বেজায় দৌরাত্ম্য কোরেছে? হায় হায়! এমন লক্ষ্মীছেলে তুমি, এমন চমৎকার রূপ তোমার, হায় হায়। তোমার উপর দৌরাত্ম্য? কেন তারা তোমার উপর দৌরাত্ম্য করে? মানুষ? না ভূত? হাঃ। হাঃ হাঃ! ভূতেরাই তোমার মত ছোট ছোট ছেলেদের উপর প্রতাপ দেখায়! নিশ্চয় তারা ভূত!”

    লোকটি ঝড়ের মত একসঙ্গে কত কথাই বোলে গেল, একটি কথাতেও আমি কোন উত্তর দিলেম না। নূতন লোকে অত কথা কেন বলে, কোন কথার সঙ্গে কোন কথার মিল নাই, বিকারগ্রস্ত রোগীর প্রলাপের ন্যায় প্রায় সকল কথাই অসম্বদ্ধ। লোকটির উদ্দেশ্য কি বুঝা গেল না। তার মুখপানে আমি চেয়ে দেখলেম, কেবল হাস্য; মাঝে মাঝে যতবার চেয়ে দেখেছি, ততবারই দেখেছি, সমভাবে হাস্য। শেষবার যখন আমি দেখলেম, তখন সেই মুখে একটু গাম্ভীৰ্য অনুভূত হলো। গম্ভীরভাব ধারণ কোরে লোকটি তখন আপন মনে বোল্লে, “তাই তো! তাই তো দেখছি! কাণ্ডখানা কি? এত অল্পবয়সে— আচ্ছা, আচ্ছা, —এখনো উপায় আছে।”

    “উপায় আছে” বোলতে বোলতে সেই লোক ধীরে ধীরে বাহির হয়ে গেল। কিসের উপায় আছে, আমি কিছু অনভব কোত্তে পাল্লেম না। সন্ধ্যার পর আর একজন? সেই তৃতীয় ব্যক্তিও পূর্বোক্ত দুইজনের ন্যায় অভিনয় কোরে গেল। প্রথম লোকটির কথায় বরং আমি দুই চারিটি উত্তর দিয়েছিলেম, এদের দুইজনের বক্তৃতার সময় উদাসভাবে আমি মৌন। কেন তারা এসেছিল, কেন তারা ঐ সব কথা বোল্লে, “আহা! আহা!” বোলে কেন তারা দুঃখপ্রকাশ কোল্লে, তারাই তা বোলতে পারে, আমি বোলতে পারি না। তারা নূতন; পরিচ্ছদ-পারিপাট্যে ভদ্রলোক, কথাগুলো কিন্তু ভদ্রলোকের কথার মত বোধ হলো না। আমার কষ্টের কথা উত্থাপন কোরে কেন তারা ততটা বাগাড়ম্বর বিস্তার কোরে গেল, আমার কষ্টের কথায় কেন তারা কষ্ট জানালে, সন্দেহে সন্দেহে তাই আমি ভাবতে লাগলেম।”

    এই ঘটনার পর দশদিন অতিক্রান্ত। যারা ঐরূপে আমার বিস্ময় উৎপাদন কোরেছিল, এই দশদিনের মধ্যে তারা কেহই আর একদিনও আমার সঙ্গে দেখা কোত্তে এলো না। রাজার সঙ্গে আমি দেখা করি, রাজা মিষ্ট মিষ্ট কথা কন, হিতোপদেশ শিক্ষা দেন, হাসির কথা উত্থাপিত হোলে একটু একটু হাস্য করেন, বাগানের কথাটা একবারও আমার সাক্ষাতে আর উত্থাপন করেন না; এই রকমে দিন যায়। একদিন সন্ধ্যার পর রাজা আমারে ডেকে পাঠালেন। যে ঘরে তিনি বসেন, সেটির নাম খাসকামরা, সেই ঘরে গিয়ে আমি উপস্থিত হোলেম।

    দেড় হাত উচ্চ গদীর উপর রাজাবাহাদুর উপবিষ্ট। আশেপাশে অনেক লোক। রাজার অতি নিকটে পাঁচজন; সেই পাঁচজনের মধ্যে একজন রাজগদীস কিনারার উপর হাতের কনুই রেখে, রাজার দিকে একটু হেলে, তাঁর কাণের কাছে কি যেন পরামর্শ দিচ্ছিল। বড় বড় লোকের মজলীসে ঐ রকমের লোক অনেক থাকে। গদীর গায়ে জানু রাখা, কণুই রাখা, মাথা রাখা সেই সব লোকের শ্লাঘাজনক দাম্ভিকতার পরিচয়; তারা ভাবে, আমাদের এইরূপ ভঙ্গী দেখে লোকে ভাবুক, আমরাও এক একজন বড়দলের লোকের মধ্যে গণ্য। বড়লোকের কাণের কাছে মুখ রেখে মিছামিছি মন্ত্র পড়াও ঐরূপ শ্লাঘাবিজ্ঞাপক; অমুক লোক অমুক রাজার অথবা অমুক বাবুর পরম প্রিয়পাত্র, দর্শকলোকের মনে এইরূপ বিশ্বাস উৎপাদন করা সেই সকল অভিমানী লোকের গূঢ় অভিপ্রায়। বড় বড় মজলীসে সর্বদা যাঁরা গতিবিধি করেন, তাঁদের মধ্যে যাঁরা সূক্ষ্মদর্শী, তাঁরা সকলেই জানেন, অনেক লোকেরই ঐ প্রকার অভ্যাস।

    আমি উপস্থিত হোলেম। বেদীর উপর পুরাণবক্তা কথকঠাকুর, মঞ্চোপরি রাজনীতিবক্তা বাগ্মীবাবু, নাট্যশালার রঙ্গমঞ্চে নান্দীপাঠক রসিক নট,—সঙযাত্রার আসরে রাক্ষস-বানররূপী নূতন সং, এই সকল মূর্তির প্রতি দর্শকলোকের চক্ষু যেমন সুস্থিরভাবে আকৃষ্ট থাকে, রাজমজলীসের সমস্ত লোকের চক্ষু সেইরূপে আমার প্রতি সমাকৃষ্ট। সমস্ত চক্ষুর সঙ্গে রাজার চক্ষু প্রথমে আমার দিকে নিক্ষিপ্ত হয় নাই, একটু পরে নেত্রোত্তোলন কোরে আমারে দেখে প্রসন্নবদনে রাজা বোল্লেন, “এসো হরিদাস, বোসো।”

    একটি পাশে চুপটি কোরে আমি বোসলেম। লোকেরা খানিকক্ষণ সমভাবে আমার দিকে চেয়ে থাকলো; দুই একজন একটু একটু হেলে হেলে পরস্পর ফুস ফুস কোরে কি যেন বলাবলি কোত্তে লাগলো, ভাব আমি অনুভব কোত্তে পাল্লেম না। হাঁ, একটি কথা বোলতে আমি ভুলেছি। ইতিপূর্বে তিন সময়ে যে তিনটি লোক আমার কষ্টে সমবেদনা জানাতে আমার ঘরে গিয়েছিল, তাদের মধ্যে একজনকে ঐ মজলীসে আমি দেখেছিলেম; রাজার অতি নিকটে যে পাঁচটি লোক উপবিষ্ট ছিল। তাদেরই মধ্যে সেই লোক। সেই পাঁচজনের দিকে অঙ্গুলিনির্দেশ কোরে রাজাবাহাদুর আমারে বোল্লেন, “দেখ হরিদাস! এখানে এসে অবধি তুমি যে প্রকার উন্মনা উন্মনা ভাব দেখাচ্ছো, মাঝে মাঝে লোকের সঙ্গে,— কেবল লোকের সঙ্গে কেন, মাঝে মাঝে আমার কাছেও তুমি যে প্রকার অর্থশূন্য তাৎপৰ্যশূন্য কথা কও, তাতে যেন বুঝা যায়, নানা কষ্টে, নানা ভাবনায় তোমার বুদ্ধি বিচলিত হয়েছে, মাথা যেন কেমন খারাপ হয়ে গিয়েছে চাউনীতেও এক এক সময় সেইরূপ লক্ষণ প্রকাশ পায়। এই পাঁচটি বাবু এখানকার লব্ধপ্রতিষ্ঠ ডাক্তার; পরীক্ষা কোরে এই ডাক্তারবাবুরা যেরূপ ব্যবস্থা দিবেন, সেই ব্যবস্থামতেই তোমাকে চোলতে হবে। আমার কাছে তুমি এসেছ, তুমি পীড়িত, যাতে কোরে তোমার চিকিৎসা হয়, সেরূপ বন্দোবস্ত করা আমারই কর্তব্য।”

    পাঁচজনের মুখের দিকে এক একবার চেয়ে, রাজার মুখের দিকে দুটি চক্ষু আমি স্থির কোরে রাখলেম। ডাক্তারের মধ্যে একজন সেই সময় মন্তব্য দিলেন, “পরীক্ষা নিষ্প্রয়োজন, মুখে-চক্ষের ভাব দেখেই প্রকৃত অবস্থা আমরা বুঝতে পেরেছি। বিশেষ, এই নীলাম্বরবাবু যে সব কথা বোলেছেন, তাতে আর নূতন পরীক্ষা করা আমরা আবশ্যক বিবেচনা কোচ্ছি না। রোগ এখনো প্রবল হয় নাই, দুই একটা লক্ষণ প্রকাশ পাচ্ছে মাত্র, সামান্য ঔষধেই আরাম হয়ে যাবে।”

    নীলাম্বরবাবুর কথার উপরেই ডাক্তারগুলির পূর্ণ বিশ্বাস। নীলাম্বরবাবু কে? যে তিনটি লোক পূর্বে আমারে ছলনা কোরে এসেছিলেন, তাদের মধ্যে যাঁকে আমি এই মজলীসে চিনেছি তাঁরই নাম নীলাম্বরবাবু; মোটামুটি পরিচয় পেয়ে এখন আমি চিনলেম, ইনি একজন ডাক্তার। হা জগদীশ্বর! ডাক্তারের সঙ্গে আমার কিসের সম্পর্ক? শরীর আমার বিলক্ষণ সুস্থ, অবস্থাচিন্তনে মন চাঞ্চল্য, কি কারণে চাঞ্চল্য, আমিই তা জানি, সে চাঞ্চল্যের কারণ নিরূপণ করা ডাক্তার-কবিরাজের সাধ্য নয়। তবে কেন আমি ডাক্তারের চক্রে নিক্ষিপ্ত হোলেম?

    উদ্বিগ্ন হয়ে এই রকম আমি ভাবছি, দলের ভিতর থেকে আর একটি লোক একটু মাথা উঁচু কোরে সেই সময় বোলে উঠলেন, “ততদূর বোধ হয় যেতে হবে না; রঘুনাথবাবু বোলছেন, সামান্য ঔষধেই আরাম হবে। আমি শুনেছি, ইংরাজীমতের ডাক্তারখানায় সামান্য ঔষধ থাকে না; যতই সামান্য হোক, সমস্ত ঔষধের শক্তি গরম; এ ছোকরাকে গরম ঔষধ দিবার দরকার নাই। আমার ঘরে পঞ্চানন্দের বিল্বপত্র আছে, সেই বিল্বপত্র ধরে একটু খাইয়ে দিলেই এক রাত্রির মধ্যে এ রোগটা সেরে যাবে।”

    হো হো শব্দে সকলেই হেসে উঠলেন, ম্রিয়মাণ হয়ে আমি মাথা হেঁট কোল্লেম; মনে ভাবলেম, এই জন্য কি রাজাবাহাদুর আমারে পাটনায় আনালেন? গুপ্তরথীরা গুপ্তশর সন্ধান কোরে আমারে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছিল, সে এক রকম ছিল ভাল, এখন কি না বহুরথী একত্র হয়ে আমার এই ক্ষুদ্রপ্রাণ সংহার কোত্তে উদ্যত। বিদ্রূপের অগ্নিবাণে আমার অন্তরাত্মা যেন জ্বোলে যাচ্ছে! ভাবলো এই রকম, মুখে কিছু বোল্লেম না। বুঝলেম রঘুনাথবাবু একজন ডাক্তারের নাম, রঘুনাথের ব্যবস্থা খণ্ডন কোরে কিম্বা খণ্ডন করবার চেষ্টা কোরে যিনি পঞ্চানন্দের বিল্বপত্রের ব্যবস্থা দিলেন, তিনি একজন কবিরাজ। ধর্মজ্ঞানে জলাঞ্জলি দিয়ে যাঁরা কেবল অর্থ লোভে ডাক্তার-কবিরাজের নাম কলঙ্কিত করেন, তাঁদের অসাধ্য কাৰ্য কিছুই নাই। একবার আমি শুনেছিলেম, একজন অর্থলোভী জমীদার তুচ্ছ বিষয়লোভে আপনার বাড়ীর একটি স্ত্রীলোককে পৃথিবী থেকে তফাৎ করবার অভিপ্রায়ে একজন ডাক্তারের আর দুজন বৈদ্যবংশীয় কবিরাজের গুপ্তসাহায্য গ্রহণ করেন, বিসূচিকা রোগ, এইরূপ প্রকাশ কোরে চিকিৎসকেরা সেই বিধবা বধূটিকে প্রাণঘাতক ঔষধ সেবন করান। অনবরত ঘর্ম হয়; আবীরে ঘর্ম নিবারণ করে, সেই ছলে বিধবার সর্বাঙ্গে সাত সের আন্দাজ আবীর মাখানো হয়; আবীর সেই আবীরাকে অতি শীঘ্র যমালয়ে প্রেরণ করে। ধর্মশীল চিকিৎসকেরা সেই মহৎ কার্যে লক্ষাধিক মুদ্রা পুরস্কার পেয়েছিলেন এইরূপ আমার শুনা আছে, যখন এই পাটনাসহরে বিনা রোগে ডাক্তার-কবিরাজের চিকিৎসায় আমার অদৃষ্টে কি ঘটে, ভগবান কি করেন, কিছুই আমি বোলতে পারি না।”

    মজলীসে অনেক প্রকার পরামর্শ হলো; চুপি চুপি পরামর্শই অনেক, সকলের সকল কথা আমি শুনতে পেলেম না। মজলীস থেকে উঠে আমি আসি আসি মনে কোচ্ছি, এমন সময় রাজাবাহাদুর বোল্লেন, “দেখ হরিদাস! আমার কথায় তুমি অবহেলা কোরো না; যা আমি বুঝেছি, তাই তোমাকে বোলেছি; তোমার চিকিৎসার জন্যই এই বিজ্ঞ বিজ্ঞ ডাক্তারগুলিকে আমি ডেকেছি। অবহেলা কোরো না, অবাধ্য হয়ো না; ডাক্তার-কবিরাজের অবাধ্য হোলে রোগ তো সারেই না, বরং বিপরীত হয়ে দাঁড়ায়। আমার এই কথাগুলি তুমি মনে রেখো।”

    আমি বিবেচনা কোল্লেম, যাঁর যা কিছু বলবার ছিল, শেষ হয়ে গেল, তবে আর কেন সেখানে বোসে থাকা। ধীরে ধীরে আমি উঠলেম; মজলীসকে নমস্কার কোরে ভগ্নান্তঃকরণে বিদায় চাইলেম। প্রায় আধ ঘণ্টা মজলীসে ছিলেম, অতক্ষণের মধ্যে একটি কথাও আমার রসনা থেকে নির্গত হয় নাই, বিদায়-প্রার্থনাই সে মজলীসে আমার প্রথম কথা।

    কতকগুলি লোক হো হো শব্দে হেসে উঠলেন। হাস্যের কারণ বুঝতে না পেরেও আমি অপ্রতিভ হোলেম। পূর্বে যাঁরা কথা কয়েছিলেন, জানা হয়েছে, তাঁদের মধ্যে একজনের নাম রঘুনাথ। যিনি রঘুনাথ, তিনি একজন ডাক্তার; আমার প্রস্থানের উপক্রমে বাধা দিয়ে, রাজার নিকট থেকে উঠে এসে তিনি আমারে বোল্লেন, “সত্য সত্যই বুদ্ধির স্থিরতা নাই; কোথায় চোলেছ?— বোসো; তোমার রূপদর্শনের জন্য এখানে তোমাকে আহ্বান করা হয় নাই, তোমার প্রতি আমাদের গুটিকতক জিজ্ঞাস্য আছে বোসো; অত ব্যস্ত হোচ্ছ কেন? তোমার চিকিৎসার জন্য রাজাবাহাদুরের আহ্বানে আমরা এখানে এসেছি;: ব্যাধিটা অগ্রে নির্ণয় করা হোক, তার পর তোমার ছুটি।”

    অপ্রস্তুত হয়ে পুনরায় আমি আসন গ্রহণ কোল্লেম। রাজাবাহাদুর একবার আমার দিকে চাইলেন; কিন্তু মুখে কিছু বোল্লেন না। দশদিন পূর্বে যে তিনটি লোক এসে আমার গৃহে উপস্থিত হয়েছিলেন, তাঁদের মধ্যে একজন এই মজলীসে উপস্থিত আছেন এ কথা আমি পূর্বে বোলেছি। সেই লোকটি ছাড়া ডাক্তারের দলের অপর চারিটি লোক সে সময় রাজার নিকট থেকে সোরে এসে আমারে ঘিরে বোসলেন; সুস্থির নয়নে ক্ষণকাল আমার মুখের দিকে চেয়ে থাকলেন। দর্শনকার্যের অবসানে একজন একটউ বিস্ময় প্রকাশ কোরে বোল্লেন, “এ ছোকরা যথার্থ অনেক কষ্টভোগ কোরেছে, অনেক লোক এই ছোকরার শত্রু হয়েছে, এক একটা শত্রুর চেহারার ছায়া এই ছোকরার নেত্র পুতুলীতে দেখা যাচ্ছে।”— প্রতিধ্বনি কোরে আর একজন বোল্লেন, “ঠিক, ঠিক, আমিও যেন তাই দেখতে পাচ্ছি। মানুষ চিনতে পাচ্ছি না, কিন্তু ছায়াগুলো ঘরে ঘরে বেড়াচ্ছে, বেশ দেখা যাচ্ছে।”— তৃতীয় ব্যক্তি বোল্লেন, “শুধু তাই নয়, এ ছোকরা এত বয়স পর্যন্ত নিজের পরিচয় নিজে জানে না, সেই জন্য চক্ষুর পুতুলীতে স্পষ্ট কাহার মুখ দেখা যায় না, কেবল ছায়া দেখা যায়।”—চতুর্থ ব্যক্তির প্রকৃতি কিছু গম্ভীর, মুখের আকৃতিও গম্ভীর। তাঁর মুখে দাড়ী ছিল; দুই হস্তে সেই দীর্ঘ দাড়ীতে ঢেউ খেলিয়ে খেলিয়ে তিনি বোল্লেন, “আপনারা করেন কি? ছায়াবাজীখেলার আলোচনার মত ওসব আপনারা বলেন কি? সাক্ষাতে ওসব কথা বোলতে নাই;  ছোকরাকে বোলতে দিন, পরিচয় অজ্ঞাত থেকে কোন কোন চক্রে কি প্রকারে ঘুরে ঘুরে কি প্রকার কষ্ট পেয়েছে কিম্বা পাচ্ছে, বোলতে দিন। কেমন হে ছোকরা!” আমারে সম্বোধন কোরে সেই গম্ভীর লোকটি বোল্লেন, “কেমন হে ছোকরা! সেই কথাই ঠিক নয়? নিজের পরিচয় তুমি জানো না, অনেক কষ্ট পেয়েছ, অনেক শত্রু তোমার আছে, এই সব কথা ঠিক নয়?”

    বার বার এক কথা; সকলের মুখেই এক কথা; এ সব কথার মানে কি, বক্তাগুলির উদ্দেশ্যই বা কি, কিছুই আমি স্থির কোত্তে পাল্লেম না; মাঝে মাঝে রোগের কথা বলে, এটাও একটা বিষম সমস্যা! যাই হোক, উত্তর দেওয়া কর্তব্য। মজলীস সরগরম, অনেক লোক একত্র,— রাজসভা, রাজা মোহনলাল ঘোষ বাহাদুর স্বয়ং সভাপতি, এ মজলীসে আমার ভাগ্যের কথা প্রকাশ কোল্লে মন্দ হবে না; সকল লোক দয়াশূন্য হবে এমন কখনই সম্ভব নয়। আমার দুঃখের কথা শুনে অবশ্যই কাহার কাহার হৃদয়ে দয়ার সঞ্চার হোলেও হোতে পারবে, আমার অনুকূলে রাজাবাহাদুরকে তাঁরা দুটি একটি কথা বোল্লেও বোলতে পারবেন, এই ভেবে সেই গম্ভীর লোকটির প্রশ্নের উত্তরে আমি বোল্লেম, “হাঁ মহাশয়! কষ্ট আমি অনেক পেয়েছি। আমার জাতি-জন্মের পরিচয় আমি জানি না;  শৈশবে আমি গুরুগৃহে বাস কোত্তেম, গুরুগৃহে বাস কোত্তেম, গুরুদেবের মৃত্যুর পর একটা বদমাসলোক আমারে দেশান্তরে নিয়ে যায়, তার পর একটি ভাল জায়গায় আমি আশ্রয় পাই, এই রাজাবাহাদুর সে কথা জানেন। তার পর আমার পশ্চাতে শত্রু লাগে, শত্রু একটা নয়, অনেক জায়গায় অনেক; এক একটা শত্রুর নাম আমি জানি, কিন্তু বোলতে ভরসা হয় না। ভগবান যদি—”

    যাঁরা আমারে ঘিরে বোসেছিলেন, আমার মুখে ভগবানের নাম শুনে তাঁরা হো হো কোরে হেসে উঠলেন। একজন বোল্লেন, “তা তো হোতেই পারে! আমাদেরও ও রকম হয়; শত্রুর নাম কোত্তে আমাদেরও ভরসা হয় না। ভগবান যদি সে সব নাম বোলে দেন, তা হোলেই প্রকাশ পায়, তা না হোলে চিরকাল কষ্টভোগ কোরে ছটফট কোরে বেড়াতে হয়। আহা! এ ছোকরা বড়ই কষ্ট পাচ্ছে! আপনার পরিচয়টা পর্যন্ত জানতে পাচ্ছে না, যাকে তাকে পরিচয়ের কথা জেজ্ঞাসা করে; প্রাণ সর্বদা হু হু করে কি না, কাজে কাজেই ঐ রকম; ঐ রকমেই এই দশা ঘোটেছে।”

    ঐ কথাগুলি যিনি বোল্লেন, তিনি আমার দিকে চাইলেন না, শেষে আমার দিকে চেয়ে যেন কতই সদয়ভাবে বোল্লেন, “ভয় পেয়ো না তুমি, অনেক লোকের ওরকম হয়; অল্পদিন চিকিৎসা কোল্লেই আরাম হয়ে যায়, ভয় কিছু নাই। দিবারাত্রি অত ভেবো না, সকল লোকের কাছে ওরকম গল্প কোরো না; তোমার মাথার ঠিক নাই, লোকে সেটা বুঝবে না, বৃথা তুমি ঐ রকম বোকে বোকে ক্লান্ত হয়ে পোড়বে, মাথাটা আরো খারাপ হবে। চুপ কোরে থেকো, আমরা যে রকম ব্যবস্থা কোরে দিব, সেই রকম ব্যবস্থা মতে দিনকতক থাকতে থাকতেই সমস্ত উপসর্গ সেরে যাবে। আচ্ছা, এখন তুমি যেতে পার, দু-দিন পরে আমরা আবার আসবো, সে দিন যদি এই রকম দেখি, তা হোলে চিকিৎসার বন্দোবস্ত ঠিক হবে।”

    রাজাবাহাদুর ঐ সকল কথা শুনলেন, কোন প্রকার অভিপ্রায় প্রকাশ কোল্লেন না। তিনি আমারে আহ্বান কোরেছিলেন, প্রয়োজন কি ছিল, ডাক্তারমহাশয়েরাই সেটি ব্যক্ত কোল্লেন। ডাক্তারগণের বক্তৃতার তাৎপর্য আমার চিকিৎসা করা। কি রোগের চিকিৎসা হবে, আমি বুঝলেম না, অথচ চিকিৎসা হবে আমার। রহস্য ভেদ করা আমার অসাধ্য। আমার জীবনের ঘটনায় প্রায় পদে পদেই রহস্য। একটা রহস্যেরও মর্মভেদে আমি সমর্থ হোলেম না, এটা সামান্য আশ্চর্য ব্যাপার নয়!

    বিদায়কালে রাজাবাহাদুরের দিকে আমি চাইলেম; মুখে যেন একটু একটু হাসি ছিল, আমার দৃষ্টিপাতমাত্রেই সে হাসি লুকালো। —মন্দ নয়! অনেক বড়লোকের এইরূপ অভ্যাস আছে; অনেক অভিমানিনী রমণীরও এইরূপ প্রশংসনীয় অভ্যাস আছে; ক্ষণমাত্রে হাস্য, ক্ষণমাত্রেই গাম্ভীর্য, ক্ষণমাত্রেই বিষণ্ণতা, ক্ষণমাত্রেই চক্ষে জল। হাসা কোত্তে কোত্তে রাজাবাহাদুর গম্ভীরভাব ধারণ কোল্লেন, সেই সময় আমি নমস্কার কোল্লেম। যাও কি থাকো, একটি কথাও তিনি আমারে বোল্লেন না। মজলীসের দিকে চাইতে চাইতে রাজার খাসকামরা থেকে আমি বাহির হোলেম। মজলীসভঙ্গ হলো না, আমারে উপলক্ষ্য কোরে যেরূপ অভিনয় হয়ে গেল, মজলীসী লোকেরা সেই অভিনয় সমালোচনা আরম্ভ কোল্লেন। নিকটে দাঁড়িয়ে থাকলে কথাগুলি আমার কাণে আসতো কিন্তু আমি মনের উদ্বেগে দ্রুতগতি চোলে আসছিলেম, কথা কাণে এলো না, একটা মহোচ্চ হাস্য কোলাহল শ্রবণ কোল্লেম মাত্র। আমারে উপলক্ষ্য কোরেই সেই হাস্য, সেটি বুঝতে আমার বাকী থাকলো না।

    খেলা আমি অনেক রকম দেখেছি, রাজ-মজলীসের ডাক্তারমহাশয়েরা যেরূপ খেলা দেখালেন, সেরূপ খেলা আর কখন কোথাও দেখি নাই। খেলার সামগ্রী হরিদাস। —সত্যই এ সংসারে অনেক লোকের খেলার সামগ্রী হরিদাস। ডাক্তারের মুখে যে কথাগুলি আমি শুনলেম, নিজের চিন্তাগারে প্রবেশ কোরে মনে মনে সেইগুলি আলোচনা কোল্লেম। কথাগুলি যখন কাজে দাঁড়াবে, তখন যে রঙ্গ হবে, তাই ভেবে বড় দুঃখে আমার মুখে একটু হাসি এলো।

    দুদিন গেল। ডাক্তার রঘুনাথ সেইকালে বোলেছিলেন, দুদিন পরে আবার তাঁরা আমার কাছে আসবেন; আমি প্রস্তুত হয়ে থাকলেম। তৃতীয় দিবসের প্রাতঃকাল থেকে বেলা দুই প্রহর পর্যন্ত কেহই এলেন না, রাজাও আমারে ডেকে পাঠালেন না। আড়াই প্রহর, তৃতীয় প্রহর অতীত হয়ে গেল, তখনো পৰ্যন্ত কেহ দেখা দিলেন না, আমিও ঘর ছেড়ে কোথাও গেলেম না। সূৰ্য বোধ হয় আমার নূতন চিকিৎসার ব্যবস্থা দর্শন করা কষ্টকর বিবেচনা কোরে অস্তগমনের উপক্রম কোল্লেন। সন্ধ্যা হয় হয় এমন সময় নূতন ধরণের পোষাকপরা দুটি ভদ্রলোক ধীরে ধীরে ঘরে প্রবেশ কোরে আমার সম্মুখে দাঁড়ালেন। পোষাকের ধরণ নূতন হোলেও মুখের ধরণ পুরাতন দেখেই আমি চিনলেম। পঞ্চমমূর্তির মধ্যে যে দুই মূর্তির নাম পাওয়া গিয়েছিলো, তারাই তারা, নীলাম্বরবাবু আর রঘুনাথবাবু দুজনই ডাক্তার, এ পরিচয় বাহুল্য।

    ডাক্তারেরা আমার বিছানার উপর বোসলেন, গম্ভীরবদনে ক্ষণকাল আমার মুখপানে চেয়ে থাকলেন। দর্পণের সাহায্য ব্যতিরেকে নিজের মুখে নিজে দেখা যায় না, আমার মুখের ভাব তখন কি রকম ছিল কিম্বা ডাক্তার দর্শনে কি রকম হয়েছিল, আমি আর জানতে পাল্লেম না; যাঁরা দেখলেন, তারা অল্পক্ষণ নিস্তব্ধ থেকে, পরস্পর মুখচাহাচাহি কোরে অস্পষ্ট ইংরাজী ভাষায় কি দুই একটি কথা বোল্লেন, ঠিক আমি বুঝতে পাল্লেম না। তাদের উভয়ের নাম আমার শূনা হয়েছিল, চেহারাও বেশ মনে ছিল। যাঁর নাম নীলাম্বরবাবু, আমারে সম্বোধন কোরে তিনি বোল্লেন “তোমার মস্তিষ্কবিকারের একটা প্রধান হেতু আমি বুঝতে পেরেছি; শুনলেম, বাড়ী থেকে তুমি একবারও বাহির হও না। নিয়ত অষ্ট প্রহর এক জায়গায় আবদ্ধ থাকলে, সহজ মানুষেরও চিত্তবিকার ঘটে। আমি বোধ করি, ঔষধসেবনের অগ্রে তুমি যদি প্রতিদিন সকাল বিকাল— সূৰ্যকিরণ যখন প্রখর হয় না,— প্রখর থাকে না, সেই সময়—দুবেলা দুবার খানিক বেড়িয়ে আসতে পার, তা হোলে প্রভাতসমীর আর সন্ধ্যাসমীর সেবনে অনেকটা উপকার হোতে পারে। আমার ইচ্ছা, আজ থেকেই তুমি সেই অভ্যাস সুরু কর।”

    সেই সুপারিসের প্রতিধ্বনি কোরে রঘুনাথবাবু, তৎক্ষণাৎ বোল্লেন, “ঠিক আমার মুখের কথাটা তুমি কেড়ে নিয়েছ, আমিও ঐ কথাটা বোলবো বোলবো মনে কোচ্ছিলেম; আজ থেকে সুরু করাই ভাল।” —বন্ধুবাবুকে এই কথা বোলে, নূতন একটা চুরুট ধোরিয়ে মুখে দিয়ে, আমার দিকে ফিরে, কি যেন ভেবে গলা কাঁপিয়ে কাঁপিয়ে তিনি বোল্লেন, “তোমার নামটি কি ভাল? —হরি —হাঁ —হরিদাস। —হাঃ হাঃ হাঃ! হরিদাস-নামটা কিছুতেই আমার মনে থাকে না! হাঃ হাঃ হাঃ! যতগুলি হরিদাসকে আমি চিনি, মাঝে মাঝে আমার সঙ্গে দেখা হয়,—দেখা হোলেই নাম ভুলে যাই!—ওটা হোচ্ছে বাবুজী বৈরাগীদের মুখস্থ করা নাম; আমার মত ইংরাজীওয়ালাদের নয়; আমার মধ্যে ওনামটা যেন কেমন বাধো বাধো ঠেকে।”

    “বাধো বাধো ঠেকে” এই কথা বোলেই বক্তা ডাক্তারটি এক গাল ধূম উদ্গীরণ কোরে আমার মুখের কাছে ছেড়ে দিলেন। দোক্তার দুর্গন্ধ সহ্য কোত্তে না পেরে অন্যদিকে আমি মুখ ফিরালেম। বক্তার মুখের কাছে হাত ঘুরিয়ে ডাক্তার নীলাম্বর হাসতে হাসতে বোল্লেন, “কিছুদিন তুমি চৈতন্যচরিতামৃত পাঠ কর, হরিনাম মুখস্থ হবে, হরিদাস নামটিও আয়ত্ত কোরে রাখতে পারবে। আর একটা পরমার্শ আছে, আর এক সময়ে সে কথা হবে, এখন তুমি হরিদাসকে কি কথা বোলছিলে, বোলে যাও।”

    আর একবার চুরুটের ধূম্র উদ্গীরণ কোরে রঘুনাথবাবু আমারে বোল্লেন, “দেখ হরিদাস! খোলা জায়গার হাওয়া খাওয়া একটা পরম ঔষধ, —সকাল বিকাল দুবেলা। ঠিক সময় হয়েছে, আমাদের সঙ্গে গাড়ী আছে, তুমি প্রস্তুত হও। আজ আমরা তোমাকে হাওয়া খাওয়া ঔষধের প্রথম ফল দেখাব; মনে কর, আজ তোমার হাওয়া খাওয়া বিদ্যার হাতে খড়ী; প্রস্তুত হও।”

    কি আমি শুনলেম, কি আমি বুঝলেম, হঠাৎ যেন একটা সংশয়ের অন্ধকারমূর্তি আমার সম্মুখে এসে দাঁড়ালো। হাওয়া খাওয়া বিদ্যার হাতেখড়ী! ডাক্তারদের মুখের দিকে চেয়ে আমি নীরব হয়ে থাকলেম। ডাক্তারেরা উভয়েই দুই তিনবার আমারে বোল্লেন, “শুভক্ষণ, শুভক্ষণ প্রস্তুত হও, প্রস্তুত হও।” আর আমি অপ্রস্তুত থাকতে পাল্লেম না, ডাক্তারবাবুর অনুরোধ রক্ষা কোত্তে বাধ্য হোলেম। প্রস্তুত হওয়া কি রকম, তা আমি ভাবলেম না, অবসর চাইলেম না, কাপড়ও ছাড়লেম না, যে কাপড়খানি তখন আমার পরা ছিল, সেই কাপড়েই বাবুদের সঙ্গে আমি হাওয়া খেতে বেরুলেম, রাজাবাহাদুরের অনুমতি লওয়াও আবশ্যক বোধ কোল্লেম না।

    সূৰ্যদেব অস্তাচলে গিয়েছিলেন, অল্প অল্প অন্ধকার হয়ে আসছিল, ঘোর অন্ধকার হয় নাই, সময়টা গোধূলি; গোধূলি লগ্নে যাত্রা; —উপর থেকে আমরা নেমে এলেম। দরজার সম্মুখে দিব্য একখানি গাড়ী, দিব্য দুটি কৃষ্ণবর্ণ অশ্ব। রঘুনাথ ডাক্তার আমার একখানি হাত ধোরে গাড়ীতে তুলে দিলেন, তার পর তাঁরা দুজনে আরোহণ কোল্লেন। গাড়ী উত্তরমুখে চোল্লো। অশ্বেরা টপাটপ শব্দে দ্রুতবেগে ছুটে ছুটে যেতে লাগলো।

    কতদূরে গেলেম, ঠিক বুঝতে পাল্লেম না, অনুমানে বুঝলেম, এক কোশের বেশী। গাড়ীর ভিতর ডাক্তারেরা নানা রকম গল্প জুড়েছিলেন; গল্পের দিকে আমার কাণ ছিল না, মন ছিল না, সারা পথ আমি অন্যমনস্ক।

    সমবেগে আর খানিক দূরে এগিয়ে গিয়ে গাড়ীখানা থামলো, ডাক্তারেরা নামলেন, আমারেও নামালেন। সেই সময় আমি একবার চতুর্দিকে চেয়ে চেয়ে দেখলেম, অন্ধকার। বেশী দূর দেখা গেল না, তথাপি আমি বুঝতে পাল্লেম, পাটনায় এসে অবধি সে পথে আর কখনো আমি আসি নাই। রাস্তার বামদিকে প্রকাণ্ড একখানা বাড়ী; ফটকে প্রকাণ্ড একটা লণ্ঠন জ্বলছিল, পাথরের পুতুলের মত দুইজন দ্বারপাল বড় বড় দুটো বন্দুক ঘাড়ে কোরে দরজার দুই ধারে দাঁড়িয়ে ছিল। তারা নিষ্পন্দ। পথ দেখিয়ে দেখিয়ে ডাক্তারেরা আমারে সেই বাড়ীর ভিতর নিয়ে গেলেন। অকস্মাৎ দূর দূর কোরে আমার বুক কেঁপে উঠলো! কেন বোলতে পারি না, আমার মনে তখন যেন কোন প্রকার অমঙ্গল আশঙ্কার সঞ্চার হলো! গোধূলিলয়ে যাত্রা; এরূপ যাত্রাতে মঙ্গলফল হয়, এই কথাই লোকে বলে, আমার মন কেন বলে অমঙ্গল, কেমন কোরে জানবো?

    বাড়ীর ভিতর আমরা প্রবেশ কোচ্ছি, ঠাঁই ঠাঁই আলো জ্বোলছে দেখছি, শারি শারি কতই ঘর। যে দিক দিয়ে আমরা যাচ্ছি, সে দিকের দরজা বন্ধ। দুই ধারেই ঘর, মধ্যস্থলে সুঁড়ী পথ। প্রকাণ্ড বাড়ী, কোন দিকে কত ঘর, একদিক দর্শনে সেটা জানা গেল না। যাচ্ছি, এক একবার বামে দক্ষিণে চক্ষু ফিরাচ্ছি, মাঝে মাঝে এক একদিকে সেই রকমের অপ্রশস্ত এক একটা সুঁড়ীপথ দেখতে পাচ্ছি। ডাক্তারেরা আমারে সোজা পথেই নিয়ে চোলেছেন। বাতাসের লেশমাত্র নাই। অনেক দূর গিয়ে দক্ষিণধারে দেখলেম, একটা ঘরের দরজা খোলা। ঘরে আলো ছিল; দেখলাম ঘরটা দিব্য পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। আমারে অগ্রবর্তী কোরে ডাক্তারেরা সেই ঘরে প্রবেশ কোল্লেন। ঘরের একধারে একটি পরিষ্কার বিছানা, আর কোন আসবাবপত্র ছিল না। কেবল একদিকে দুটি বড় বড় মাটির কলসী, মুখে দুখানা কাচের বাসন ঢাকা; বোধ হলো, জলের কলসী। বিছানার উপর আমারে বোসতে বোলে নীলাম্বরবাবু আমার নিকটেই বোসলেন, রঘুনাথবাবু বেরিয়ে গেলেন।

    ঘরটি পরিষ্কার বটে, কিন্তু কেমন একটা দুর্গন্ধ আমার নাসারন্ধ্রে প্রবেশ কোত্তে লাগলো। ঘরেই গন্ধ অথবা বাহিরের দুর্গন্ধ এসে ঘরটিকে দুর্গন্ধময় কোচ্ছিল, সেটা আমি অনুভব কোত্তে পাল্লেম না। কিয়ৎক্ষণ নীরবে বোসে থেকে, মৃদুস্বরে আমি জিজ্ঞাসা কোল্লেম, এ আমি কোথায় এলেম? আমারে কোথায় নিয়ে এলেন?” মাথা নেড়ে নেড়ে নীলাম্বরবাবু একটু হাসলেন; আমার কথার কোন উত্তর দিলেন না। হাওয়া খাবার প্রস্তাব যখন হয়, তখন আমার মনে একটা সংশয় এসেছিল, সেই সংশয় এখন প্রবল হয়ে উঠলো। অমঙ্গল আশঙ্কাই বড় বেশী। বাম অঙ্গের ঘন ঘন স্পন্দন। কি যে সেই আশঙ্কা, কেন যে সেই আশঙ্কা, তার মূল কারণ তখন আমি কিছু স্থির কোত্তে পাল্লেম না; সন্দেহই প্রবল।

    রঘুনাথবাবু পুনঃপ্রবেশ কোল্লেন; সঙ্গে একটি লোক। কৃষ্ণযাত্রার আসরে বাসুদেবের যেমন সজ্জা, সেই লোকটির সজ্জাও সেইরূপে। লোকটি দীর্ঘাকার, কৃষ্ণবর্ণ, একহারা, মুখখানা কিছু গোল, চক্ষু ছোট, নাসিকা খর্ব, ঠোঁট পুরু, চোমরা গোঁফ, মাথার ঝাঁকড়া চুল, একখানা হাত একটু ছোট, সে হাতের অঙ্গুলি খুব মোটা মোটা, গণনায় একটি কম, বয়স অনুমান চল্লিশ বৎসর। অঙ্গুলিনির্দেশে আমারে দেখিয়ে দিয়ে ডাক্তার রঘুনাথ সেই লোকটিকে বোল্লেন, “দেখ অনাদি! এই বালকটি কিছুদিন এই বাড়ীতে থাকবে, যেন কোন অযত্ন না হয়; আহারে, শয়নে, ভ্রমণে বালক যেন কোন প্রকার কষ্ট না পায়। তোমার হস্তে এটিকে আমরা সমর্পণ কোল্লেম, আমাদের উপদেশমত কাজ কোল্লে তুমি প্রচুর পুরস্কার পাবে। বড়লোকের ছেলে, এখানে থেকে এ ছেলে যদি আরাম হয়, —বুঝলে অনাদি, —এখানে থেকে এ ছেলে যদি আরাম হয়, আরাম হবেই নিশ্চয়, —যদি বেশ আরাম হয়, তা হোলে তোমাকে আর এখানে চাকরী কোত্তে হবে না। সে কথাই বা কেন, একেবারেই হয় তো চাকরী কোত্তে হবে না; বাড়ী পাবে, পুকুর পাবে, আম-কাঁঠালের বাগান পাবে, দিব্য সুন্দরী একটি বৈষ্ণবীকে বিয়ে কোত্তে পারবে। সেবা-যত্নে এ ছোকরাকে খুসী রাখতে পাল্লে দু-একখানি কোম্পানীর কাগজও পাবে, কোন কষ্টই থাকবে না;— বুঝলে কি না?”

    রঘুনাথের সঙ্গে যে লোকের নবপ্রবেশ, সে লোকটার নাম অনাদি। ঘন ঘন চক্ষের পলক ফেলে। অনাদিকে ঐরূপ উপদেশ দিয়ে, আশ্বাস দিয়ে, আমার দিকে চেয়ে রঘুনাথ বোল্লেন “দেখ ছোক— ঐ দেখ! আবার ভুলে গিয়েছি! কতবার মনে করি, ইষ্টমন্ত্রের মত জপ করি, তবু মনে থাকে না! —ইষ্টমন্ত্র! —হাঁ হাঁ— দেখ হরিদাস! এইখানেই তোমার চিকিৎসা হবে; এই অনাদি ঠাকুরটি অহরহ তোমার সেবায় নিযুক্ত থাকবে। অনাদি ঠাকুর বেশ লোক, তোমাদের মত ছেলেদের আদর-যত্ন কোত্তে অনাদি যেমন জানে, এমন তার এ বাড়ীর একটা লোকও না। অনাদিঠাকুর ব্রাহ্মণ বুঝতে পেরেছ আমার কথাটা? —জাতিতে এই অনাদিঠাকুর একটি ব্রাহ্মণ; ব্রাহ্মণের যত প্রকার কর্তব্য কাৰ্য আছে, অনাদিঠাকুর সব জানে। তুমি বেশ থাকবে, এইখানেই তুমি থাকো, স্বচ্ছন্দে থাকো, বেপরোয়া থাকো; আমরা মাঝে মাঝে এসে দেখে যাব, নূতন ব্যবস্থা কোরে যাব, কোন ভয় নাই।”

    আমার চক্ষে জল এলো, অন্তরে অন্তরে আমি কাঁপছিলেম, এই সময় বাহ্য অবয়বে বিলক্ষণ কম্প! কাঁপতে কাঁপতে নীলাম্বরবাবুর দিকে আমি চাইলেম। হা অদৃষ্টে! নীলাম্বরবাবুও রঘুনাথের কথায় সায় দিলেন। হায় হায়! আর আমি কার মুখ চাই? এ দুটো লোক কে? সত্যই কি ডাক্তার? উঃ! ডাক্তার সেজে এ দুটো লোক আমারে এই বাড়ীতে কয়েদ কোরে রেখে যাচ্ছে! এটা কিসের বাড়ী? কাদের বাড়ী? জনমানবের সঞ্চার নাই, এত বড় বাড়ীতে কেবল এই একটা অনাদি দেখলেম, আর কোন লোকের সাড়া-শব্দ পাওয়া গেল না, মূর্তিও দেখা গেল না। কি ব্যাপার! না না, অবশ্যই লোক আছে। লোক না থাকলে ফটকে পাহারা থাকবে কেন? এতগুলো আলো জ্বোলবে কেন? অবশ্যই লোক আছে। কি রকম লোক তারা?

    কত যে আমি ভাবলাম, কিছুই এখন মনে নাই; সত্য সত্যই আমি কেঁদে ফেল্লেম! বিস্তর মিনতি কোরে নীলাম্বরবাবুকে বোল্লেম, “কেন আপনারা আমারে এই বিজন বাড়ীতে ফেলে যাচ্ছেন? আমি আপনাদের কাছে কি অপরাধ কোরেছি? হাওয়া খেলে শরীর সুস্থ হবে; আপনাদের সঙ্গে আমি হাওয়া খেতে এলেম, আপনারা আমারে ভাল হাওয়া খাওয়ালেন! হাওয়া খাওয়ার সাধ আমার মিটেছে, আর হাওয়া খাব না, দোহাই আপনার, দয়া কোরে আমারে এখান থেকে নিয়ে চলুন! আমার যেন মনে হোচ্ছে, উপর থেকে কে যেন আমারে বোলে দিচ্ছে, এটা রাক্ষসের পুরী; এ পুরীতে কিছুতেই আমি থাকতে পারবো না! দু-দিন থাকলেই হয় তো আমার প্রাণ যাবে! পায়ে ধরি, আপনি আমারে সঙ্গে কোরে নিয়ে চলুন!”

    মৃদুহাস্য কোরে নীলাম্বরবাবু বোল্লেন, “ভয় কর কেন? এখানে তোমার কোন ভয় নাই, এইখানেই তোমার চিকিৎসা হবে। রাজবাড়ীতে বেশী লোকের গোলমাল সেখানে তুমি শীঘ্র শীঘ্র আরাম হোতে পারবে না, এখানে থাকলে শীঘ্রই আরাম হবে, রঘুনাথবাবু যে যে কথা বোল্লেন, সমস্তই সত্যকথা; এখানে তোমার সেবাযত্ন বেশ হবে, ছেলেমানুষী কোরো না, পাগলের মত বোকো না, শান্ত হয়ে থাকো, কেঁদো না, চুপ কর, কাল আবার আমি আসবো।”

    এই সব কথা বোলে ব্যস্তভাবে নীলাম্বরবাবু উঠে দাঁড়ালেন, রঘুনাথ দাঁড়িয়েই ছিলেন, দুজনে একসঙ্গে বেরিয়ে যেতে লাগলেন। “যাবেন না, যাবেন না, যাবেন না! আমারে এখানে একা ফেলে রেখে আপনারা চোলে যাবেন না! দোহাই আপনাদের আমি আপনাদের সঙ্গে যাব, কখনই আমি এখানে থাকবো না! এ জীবনে কষ্ট আমি অনেক ভুগেছি, আবার এই নূতন কষ্টের মুখে আমারে নিক্ষেপ কোরে আপনারা যাবেন না, যাবেন না, যাবেন না!” কাঁদতে কাঁদতে এই সব কথা বোলতে বোলতে ঘরের চৌকাঠের ধার পর্যন্ত আমি ছুটে গেলেম; চৌকাঠ পার হয়ে তাঁরা তখন বাইরে গিয়েছিলেন। অনাদিটা ঘরের মধ্যেই ছিল, দাঁত-মুখ খিচিয়ে দু-হাত দিয়ে সে আমারে জাপটে ধোল্লে! লোকটা রোগা বটে, কিন্তু জোর খুব; ধস্তাধস্তি কোরেও আমি তার হাত ছাড়াতে পাল্লেম না। বাহির থেকে মুখ ফিরিয়ে নীলাম্বরবাবু বোল্লেন, “ঐ কথাই তো কথা, ঐ তো তোমার রোগ; অনেক কষ্ট ভুগেছ, এখানে থাকতে পারবে না, লোকের কথা শুনবে না, ঐ তো তোমার রোগ। সেই জন্যই তো তোমাকে এখানে আনা হয়েছে। ও রকম যদি কর, এ জন্মে তোমার ও রোগ সারবে না। থাকো, গোলমাল কোরো না। অনাদির সঙ্গে লড়ালড়ি কোরো না, আমরা চোল্লেম!”

    ডাক্তারেরা চোলে গেলেন, অনাদি আমারে আটকে রাখলে। ঝাড়া এক ঘণ্টাকাল আমি চীৎকার কোরে কাঁদলেম, ধমক দিয়ে দিয়ে অনাদি আমারে বশে আনবার চেষ্টা কোল্লে, কিছুতেই আমি শান্ত হোতে পাল্লেম না। খানিক পরে সেই ঘরে একটা স্ত্রীলোক এলো তার হাতে একটা চাবীর তাড়া। হেসে হেসে চাবীওয়ালা মুখ-চক্ষু ঘুরিয়ে অনাদিকে বোল্লে, “এই যে গো! এই যে তুমি দিব্য একটি নূতন শীকার পেয়েছ! বেশ হয়েছে; সদরদরজায় চাবী পোড়েছে, দরোয়ান এসে আমার হাতে এই চাবীর তাড়াটা দিয়ে গেল। ছেড়ে দাও, শীকারটিকে অমন কোরে ধোরে রেখেছ কেন? ছেড়ে দাও! আর পালাবার উপায় নাই।”

    মানুষের গন্ধ পেয়ে যে সকল বিষধর সর্প ফণা তুলে গর্জন করে, ওঝাদের কাছে সেই সকল সৰ্প যেন কেঁচো হয়। এখানেও আমি সেই রকম দেখলেম। অনাদিঠাকুর এতক্ষণ আমার উপর তর্জন-গর্জন কোচ্ছিল, সেই স্ত্রীলোকের দুটি একটি কথা শুনে একেবারে ঠাণ্ডা; আমারে ছেড়ে দিয়ে কতই যেন ভাল-মানুষ হয়ে, সেই স্ত্রীলোকের সঙ্গে রহস্যালাপ আরম্ভ কোল্লে। আমি সেই অবসরে ধীরে ধীরে পাশ কাটিয়ে বিছানার উপরে গিয়ে বোসলেম। হৃদয় অত্যন্ত ভারী, মনে যেন কিছুই নাই, কিছুই যেন চিন্তা কোত্তে পাচ্ছি না, সম্মুখে আলো আছে, তবুও যেন আমি চারিদিকে অন্ধকার দেখছি, তখন আমার এই রকম অবস্থা। ভাগ্যক্রমে আপনা আপনি আমি এক একটা প্রবোধ প্রাপ্ত হই; যতই কেন মহাবিপদ উপস্থিত হোক না, তাদৃশ বিপদে আমি বড় একটা অবসন্ন হই না। বাল্যাবধি পরমেশ্বরে আমার অচল বিশ্বাস; যা যখন হবার হয়, নিশ্চয়ই তা তখন হয়, যা হবার নয়, তা কখন হয় না, সংসারে মানুষের ভাগ্যে যা যখন ঘটে, সমস্তই সেই ইচ্ছাময়ের ইচ্ছা, এইরূপে আমার ধারণা; সেই ধারণাই আমার প্রবোধ। সংসারচক্রের এক এক আবর্তনে আমি এক এক প্রকার অবস্থা প্রাপ্ত হোচ্ছি; পাটনায় এই এক নূতন অবস্থা! এ অবস্থা আমার চিরদিন থাকবে না, দয়াময় অবশ্যই একদিন আমার প্রতি সদয় হবেন, সেই বিশ্বাসে, সেই আশ্বাসে আপন মনে আমি এক প্রকার সান্ত্বনা পেলেম। গৃহমধ্যে অনাদি আর সেই চাবীওয়ালী। অলক্ষিতে সেই যুগলমূর্তির দিকে কটাক্ষপাত কোরে আমি তাদের রহস্যালাপ শ্রবণ কোত্তে লাগলেম।

    অনাদি বোল্লে, “তুই ভাই আজ আমাকে যে হাসান হাসিয়েছিস জন্মেও আমি তেমন হাসি হাসি নাই; লোকেরা যখন চুপচাপ কোরে থাকে, তোর হাসিটা তখন খুব বাড়ে; তাই চিত্তোরি। তুই আমার প্রাণের সহচরী। তুই হাসিস, তুই হাসাস, তাতেই আমি বেঁচে থাকি। তোর হাসি যেন বরফের মত ঠাণ্ডা; হাটের কলরবের আগুনে আমার প্রাণ যখন জ্বোলে পুড়ে যায়, সেই সময় তুই হাসির ফোয়ারা খুলে দিস, জ্বালা-যন্ত্রণা সব আমি ভুলে যাই, হৃদয় জুড়িয়ে যায়; শুভক্ষণে বিধাতা তোর সঙ্গে আমার— বুঝলি চিতোরি,— তোর সঙ্গে আমার মিলন কোরে দিয়েছেন, জন্মেও আর ছাড়াছাড়ি হবে না। তুই বুঝলি? তুই আমার মাথার চুল, মুখের গোঁফ, চক্ষের তারা, বুকের মাংস, গায়ের লোম, তুই আমার সব। সেই একদিন তারা যখন—”

    এই পর্যন্ত বোলতে বোলতে অনাদিঠাকুর হঠাৎ থেমে গেল। যতগুলি কথা তার মুখে উচ্চারিত হলো, তার প্রকৃত তাৎপৰ্য আমি হৃদয়ঙ্গম কোত্তে পাল্লেম না; অনেক কথার অর্থ নাই; বুঝলেম, কেবল তাদের দুজনের প্রেমসম্বন্ধ। স্ত্রীলোকটির নামও পাওয়া গেল, নামটা খুব নূতন বটে; নতুন পুরাতন বিচার করা অনাবশ্যক, নামটি কিন্তু পাওয়া গেল; নাম হোচ্ছে চিতোরী। আমার দিকে চেয়ে, পুনরায় চিতোরীকে সম্বোধন কোরে অনাদিঠাকুর বোল্লে, “দেখ চিতোরী! সেই একদিন তারা যখন সেই রকম বাড়াবাড়ি কোচ্ছিল না, থাক সে কথা—” আবার এইখানে থেমে, আবার আমার দিকে চেয়ে একটু একটু চুপি চুপি বোলতে লাগলো, এই নূতন ছোকরাটা দেখছি অকালপক্ক; ভূতে পেয়েছে; সেই যে দুটি বাবু এসেছিল, ছোকরাকে তারা আমার হাতেই সোঁপে দিয়ে গেল, সেবা কোত্তে বোলে গেল; হো হো হো! কিন্তু ভাই চিতোরী! সেবা যদি তুই কোত্তে পারিস, খুব বড় একটা দাঁও মারা যাবে। দেখিস কিন্তু, কোন রকমে যেন না পালায়! সব সময় আমি—”

    এই সময় কে যেন কারে খুব চীৎকার কোরে ডাকলে। কাণ খাড়া কোরে শুনে, তাড়াতাড়ি চোলতে চোলতে অনাদিঠাকুর তাড়াতাড়ি বোলে গেল, “থাক তুই এইখানে, যেমন যেমন বন্দোবস্ত কোত্তে হয়, করিস; সব তুই জানিস, আমি যাই; আবার কে কোথায় কি হাঙ্গামা বাধিয়েছে, থামাই গিয়ে; ভাল ঝকমারীতেই পোড়েছি! রাত্রেও দু-দণ্ড স্থির হবার যো নাই।”

    অনাদিঠাকুর কোথাকার হাঙ্গামা থামাতে গেল, চিতোরী এসে আমার বিছানার উপর বোসলো; গা ঘেঁষে বোসলো না, হাতখানেক তফাতে। যে সুরে চিতোরী প্রথমে অনাদির সঙ্গে কথা কোয়েছিল সে সুরটা বদল কোরে আর এক রকম নূতন সুরে কি গোটা কতক কথা আমারে বোল্লে, আমার মন তখন অন্যদিকে ছিল, অর্থ বুঝলেম না, উত্তর দিতেও পাল্লেম না; চিতোরী আমার মুখপানে চেয়ে রইলো। আমি তখন আর একখানা ভাবছিলেম; অনাদিঠাকুর হাঙ্গামা থামাতে গেল, কিসের হাঙ্গামা? এ বাড়ীতে কি হাঙ্গামা হয়? কি রকম জায়গা? যে একটা চীৎকার শুনলেম, সেটাও কেমন বিকট। অনাদি ইতিপূর্বে একবার বোলেছিল, “হাটের কলরব”, এখানে কি হাট আছে? রাত্রেই কি হাট বসে? একটা লোকের চীৎকারেই কি হাট হয়? বোধ হয়, সে রকম হাট না হবে। কেন না, অনাদি বোলেছিল, “হাটের কলরবের আগুন”, সে আগুন আবার কি প্রকার? ভাল হাওয়া খেতে বেরিয়েছিলেম, হাওয়ার বদলে আগুনের ভিতরে এসে পোড়েছি; সত্যই আগুন! শরীর যেন সেই আগুনে দগ্ধ হয়ে যাচ্ছে!

    এই সব আমার মনের কথা। মনের কথা মনে মনে, মুখে কিছুই ফুটলো না। মুখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে চিতোরী সেই সময়ে আবার বোল্লে, “কথা কও না কেন? বোবা না কি? অত কথা জিজ্ঞাসা কোল্লেম, খাতির নাই, কোথাকার ছোকরা? এটা বুঝি তোমার শ্বশুরবাড়ী? কথা কোইতে বুঝি লজ্জা হয়? পাঠশাল কখনো দেখেছো? পাঠশালে বজ্জাতী কোল্লে ঘোড়া বেত পিঠে পড়ে, নাড়ুগোপাল হোতে হয়, জানো সে সব শাস্তি? এটাও একটা পাঠশালা; এখানেও সেই রকম শাস্তি আছে, এখানেও সেই রকম হবে; কথা শোনো, কথা কও, রাত্রি অনেক, খাবে কি? পেট তোমার কি চায়? পেট তোমার সঙ্গে আছে, না আর কোথাও রেখে এসেছো? কথা কও, উত্তর কর, বল, রাত্রে তুমি খাবে কি?”

    অনাদি চোলে যাবার পর চিতোরী প্রথমে আমারে যে সব কথা বোলেছিল, সে সব কোন ভাষার কথা, আমি বুঝি নাই, চিতোরী নামটা যেমন আমার কর্ণে নূতন, চিতোরীর ভাষাও সেই রকমের নূতন বোধ হয়েছিল। চিতোরী কি? রাজপুতানার চিতোর রাজ্যের মেয়েমানুষেরা কি চিতোরী নামে পরিচিতা হয়? এ চিতোরীর বাড়ী কি তবে চিতোরে?—তাই যেন বোধ হয়।

    চিতোরীর প্রথমবারের কথাগুলোও বোধ হয় চিতোরী ভাষা; এবারের কথাগুলো হিন্দী বাঙ্গলা মিশানো? জিহ্বার একটু একটু আড়ষ্ট আছে, এইমাত্র তফাৎ।

    কথাগুলো রুক্ষ রুক্ষ; চিতোরী কিন্তু দেখতে দিব্য সুশ্রী। তাদৃশী সুশ্ৰী রমণীর এ প্রকার কর্কশ কথা, এটাও আমার আশ্চৰ্য বোধ হলো। সুস্থিরনয়নে চিতোরীর অস্থিরনয়ন দর্শন কোরে আমি তার পূর্ব-প্রশ্নের উত্তর কোল্লেম, “রাত্রে আমি কিছুই খাব না, কিছুমাত্র ক্ষুধা নাই; তোমার যদি অন্য কাৰ্য থাকে, স্বচ্ছন্দে চোলে যাও, আমারে একটু বিশ্রাম কোত্তে দাও; আমার শরীর অসুস্থ, মন অসুস্থ, আমি অতিশয় পরিশ্রান্ত, অত্যন্ত ক্লান্ত, কিছুই আমি খাব না।”

    চক্ষু ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে মুচকে মুচকে হেসে, একখানা হাত নেড়ে চিতোরী বোল্লে “তা হবে না যাদুধন! খেতেই হবে, এখানকার নিয়ম সে রকম নয়; মানুষকে আরাম করবার জন্য এখানে আনা হয়। তুমি তো তুমি, তোমার মত কত ছোকরা, কত ছুকরী, কত পুরুষমানুষ, কত মেয়েমানুষ এখানে বাস করে, সকলকেই দুবেলা পেট ভোরে খেতে হয়। সহজে না খেলে, জোর কোরে খাওয়ানো হয়, আমি তোমাকে ভাল ছেলে দেখছি। সেই জন্যই ভালকথা বোলছি, ভালমুখে জিজ্ঞাসা কোচ্ছি, কি খেতে ইচ্ছা হয়; কি খাবে বল, আমি এনে দিব, না যদি বল, অনাদিঠাকুরের যে রকম ইচ্ছা হবে, সেই রকম জিনিস তোমাকে খেতে হবে— খেতেই হবে।”

    বড় দায়েই আমি ঠেকলেম। ক্ষুধা না থাকলেও খেতে হবে, না খেলে এরা জোর কোরে খাওয়াবে, কথা না শুনলে বেত লাগাবে, চিতোরী এই রকম ভয় দেখালে। চিতোরী মেয়েমানুষ, চিতোরীর মুখে যখন ঐ রকম কথা, তখন না জানি, অনাদিঠাকুর আরো কত উগ্রমূর্তি ধারণ কোরবে। সেটা ভাল নয়। মনে মনে এই রকম আলোচনা কোরে চিতোরীকে আমি বোল্লেম “একান্তই তোমরা যদি না ছাড়, এখানে যদি দুষ্প্রাপ্য না হয়, তবে আমারে কিঞ্চিৎ দুধ আর একপাত্র জল দিও, তাই দিলেই ঠিক হবে, তাই খেয়েই আমি শুয়ে থাকবো। চিতোরী উঠলো না; একটু পরে অনাদি এলো; আমার মুখের কথাগুলি চিতোরীর মুখে অনাদি শ্রবণ কোল্লে। ব্যবস্থা মঞ্জুর। অল্পক্ষণ পরে দুধ-জল পান কোরে আমি শয়ন কোল্লেম। কি বোলবো? —প্রকৃতই হোক কিম্বা কল্পিতই হোক, রহস্যালাপের ভাবে আমি বুঝলেম, এরা স্ত্রী-পুরুষ,—দম্পতী; ঘরের দরজায় চাবী দিয়ে অনাদিদম্পতি নিজস্থানে চোলে গেল।

    সে সময় যদি আমার নিদ্রা আসতো, তবে এক প্রকার ভালই হোতো; তা হলো না; তেমন অবস্থায় শীঘ্র নিদ্রা হয়ও না। পাটনায় আসা অবধি এই দিনের হাওয়া খাওয়ার ব্যবস্থা পর্যন্ত আলোচনা কোত্তে কোত্তে প্রায় এক ঘণ্টা পরে নিদ্রা এলো, আমি ঘুমালেম। শেষরাত্রে কিম্বা ঊষাকালে বহুকণ্ঠমিশ্রিত একটা ভয়ঙ্কর কলরব শুনে আমি জেগে উঠলেম। বিভীষণ চীৎকার! চীৎকারধ্বনিতে অত বড় বাড়ীখানা যেন ভূমিকম্পনের মত কেঁপে উঠলো! কত দূর পর্যন্ত সেই চীৎকারধ্বনির প্রতিধ্বনি হোতে লাগলো। অনাদির একটা কথা সার্থক বোধ হলো, হাটের কলরব;— সত্যই যেন হাটের কলরব! অনুমান কোল্লেম, সত্যই এখানে হাট আছে।

    পুনরায় সেই প্রকার কলরব! বোধ হলো যেন গগনভেদী চীৎকারধ্বনি! রুদ্ধদ্বার শিবমন্দিরমধ্যে চীৎকার কোল্লে যেমন গম্ভীর আওয়াজ হয়, মধ্যে মধ্যে সেইরূপ ভয়ঙ্কর ভয়ঙ্কর আওয়াজ আমার শ্রবণকুহরে প্রবেশ কোত্তে লাগলো। রাত্রি দুই প্রহরের পর আমার নিদ্রা হয়েছিল, ঊষাকালে ভীম চীৎকারে জাগরণ। যতক্ষণ আমি ঘুমিয়েছিলেম, ততক্ষণের মধ্যে সে প্রকার চীৎকার হয়েছিল কি না, বোলতে পারি না; জাগরণ কোরে অবধি দুই তিনবার সেইরূপে হৃদয়কম্পন, গৃহ কম্পন, ভীষণ চীৎকারধ্বনি আমি শুনলেম! কোথা থেকে সেই সকল চীৎকার আসছে, কারা চীৎকার কোচ্ছে, ঠিক নির্ণয় কোত্তে পাল্লেম না; অনুমানে বোধ হলো, বাড়ীর মধ্যেই চীৎকার; শত শত লোকের চীৎকার! দেশে বিদেশে, অনেক স্থানে আমি ভ্রমণ কোরেছি, চীৎকারও অনেক প্রকার শুনেছি, কিন্তু এমন চীৎকার কখনো আমার কর্ণে প্রবেশ করে নাই। একবার মনে হয় মানুষে, একবার মনে হয় জানোয়ার। কত লোক এ বাড়ীতে থাকে, কত লোক আছে, কেন আছে, তারা এখানে কি করে, কেন তারা ঐ রকম রণরঙ্গ-উত্তেজন সিংহনাদ করে, তাও আমি বুঝলেম না। যে ঘরে আমি ছিলেম, এই সময় সেই ঘরের দ্বার উদ্ঘাটিত হয়ে গেল।

    প্রবেশ কোলে অনাদি, চিতোরী আর একজন দীর্ঘাকার লোক। নূতন লোকের পরিধান খুব চোস্ত চুড়ীদার পায়জামা, ফরাসীছিটের চিত্র-বিচিত্র বুকবন্ধ চাপকান, মাথায় একটা সবুজবর্ণের বাধা পাগড়ী, হাতে একগাছা মনুষ্যপ্রমাণ প্রকাণ্ড যষ্টি। লোকটার মুখ দেখলে ভয় হয়। মুখখানা চৌগোঁফফা; বড় বড় রক্তবর্ণ দুই চক্ষু।

    তখন প্রভাত। কিছু পূর্বেই আমি জেগেছিলেম, চীৎকার শুনে ভয় পেয়েছিলেম, নিশ্চয়ই আমার চক্ষে আতঙ্কলক্ষণ ছিল, নূতন লোকটা আমার আপাদমস্তক রক্তচক্ষে নিরীক্ষণ কোল্লে; অনাদির দিকে চেয়ে, গভীরগৰ্জনে বোল্লে, “ঠিক বটে! কিন্তু ঠাণ্ডা আছে। চক্ষু দেখে বোধ হয়, রক্ত খুব গরম! তোমরা এই বালককে ঠাণ্ডা জিনিষ খেতে দিও, পাঁচ সাতটা ডাব নারিকেল পুকুরের পাঁকের ভিতর পুতে রেখে, সাত আট ঘণ্টা পরে তুলে সেই সকল ডাবের জল ঘণ্টায় ঘণ্টায় খাইয়ে দিও, আট দশ কলসী ঠাণ্ডা জলে স্নান করিও, আহারের ব্যবস্থা খাতাপত্রে যেরূপ লেখা আছে, সেইরূপে চোলবে। খবরদার! নূতন নূতন এ ছোকরাকে ঘরের বাহিরে নিয়ে যেয়ো না; সকলের পক্ষে যে রকম ব্যবস্থা। এ ছোকরার পক্ষে সে রকম ব্যবস্থা হবে না, ডাক্তারমহাশয়েরা সেই কথা বোলে গিয়েছেন; সে রকম ব্যবস্থা হবে না কিম্বা এ ছোকরার পক্ষে খাটবে না, সেটা আমি বুঝি নাই, ডাক্তারদুটিকে সে কথা আমি জিজ্ঞাসাও করি নাই। ছেলেটির বয়স কম, চেহারাও ভাল, কিন্তু রক্ত খারাপ। এখন বাহিরে বেড়াবার সময় নয়, যখন সময় হবে, সময় যখন আমি ঠিক বুঝবো, তখন ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে উচিতমত বন্দোবস্ত করা যাবে।”

    ব্যবস্থা বন্দোবস্তের এইরূপ উপদেশ দিয়ে, যষ্টিধারী নূতন লোক পুনর্বার আমার দিকে চাইতে চাইতে ঘর থেকে বেরুলো; ভাবে আমি বুঝলেম, সে লোকের ক্ষমতা কিছু অধিক; এখানে সেই লোকের প্রভুত্ব চলে, হুকুম চলে, বাসিন্দালোকের আহারাদির ব্যবস্থা করার ভারও সেই লোকের উপর।

    লোক চোলে গেল; অনাদি থাকলো, চিতোরীও থাকলো। আমার মাথার উপর খিলানকরা ছাদ, সেই ছাদের উপর গুম গুম কোরে অনেক মানুষের পায়ের শব্দ হোতে লাগলো। মানুষেরা যেন লাফিয়ে লাফিয়ে ছুটাছুটি কোচ্ছে কিম্বা আহ্লাদে উন্মত্ত হয়ে নৃত্য কোচ্ছে, সেইরূপ শব্দ। ভয় আছে, সন্দেহ আছে, বিস্ময় আছে, সেই তিন ভাবের মধ্যবর্তী হয়ে অন্যদিকে আমি জিজ্ঞাসা কোল্লেম, “ও সকল কিসের শব্দ! আমার মাথার উপর মানুষেরা ও সব কি কোচ্ছে? একটু আগে দুই তিনবার আমি ভয়ঙ্কর ভয়ঙ্কর চীৎকার শব্দ শুনেছি, একসঙ্গে বহু লোকের চীৎকার। কারা এখানে তেমন কোরে চীৎকার করে? কেন করে? বাড়ীতে কারা থাকে? বাড়ীখানা কার? এ বাড়ীতে কি হয়?”

    “কিসের চীৎকার, তাও বুঝি তোমাকে বোলতে হবে? কিছু‍ই বোলতে হবে না; থাকো কিছুদিন এখানে, থাকতে থাকতে সমস্তই জানতে পারবে; থাকতে থাকতে তোমাকেও এই রকম কোত্তে হবে। জায়গাটা বড় মজার জায়গা। দুনিয়ার মজা দেখতে যাদের সাধ হয়, তারাই এই বাড়ীতে আসে। দেখে যায়, শিখে যায়, ঐ রকম নেচে কুঁদে আমোদ করে যায়, শেষকালে আরাম হয়ে, দূরস্ত হয়ে ঘরে চোলে যায়।” —আমার বিস্ময়সূচক প্রশ্নে কৌতুকে উপরপড়া হয়ে চিতোরী এই সকল কথা বোলে উঠলো।

    কি উৎপাত! জিজ্ঞাসা কোল্লেম অনাদিকে, ব্যঙ্গ কোরে উত্তর কোল্লে, চিতোরী। উত্তরের কোন কথার মর্ম আমি বুঝে উঠতে পাল্লেম না; রাত্রে চিতোরীকে এক রকম দেখেছিলেম, এখন দেখলেম আর এক রকম। চিতোরী আমার সঙ্গে ঐ রকম পরিহাস কোত্তে লাগলো, অনাদিঠাকুর মুখে টিপে টিপে হাসতে আরম্ভ কোল্লে। আমি বিরক্ত হোলেম; আর কোন কথা আমি তখন জিজ্ঞাসা কোল্লেম না, মাথা হেঁট কোরে মৌনভাবে বোসে থাকলেম।

    রৌদ্রের তেজ বৃদ্ধি হবার অগ্রেই সেখানকার লোকেরা আমারে বাসী জলে স্নান করিয়ে দিলে, তত শীঘ্র পাঁকে পোতা হলো না, বড় বড় দুটো তাজা ডাবের শীতল জল আমারে খাইয়ে দিলে, উদর যেন পরিপূর্ণ হয়ে গেল। ভোরে একটু ক্ষুধাবোধ হয়েছিল, এখন আর কিছুমাত্র ক্ষুধা থাকলো না। অনাদিঠাকুর ঘণ্টাখানেক পরে আমার আহারসামগ্রী এনে হাজির কোল্লে; আমি বোল্লেম, “খাব না”, অনাদিঠাকুর সে কথা শুনলে না, কাজে কাজে যৎকিঞ্চিৎ মুখে দিয়ে বড় বড় ঢেঁকুর তুলে আমি আচমন কোল্লেম। আমার আচমন করা দেখে অনাদি চিতোরী উভয়েই যেন একটু চোমকে গেল। অনাদি চাইলে চিতোরীর মুখের দিকে, চিতোরী চাইলে অনাদির মুখের দিকে; শেষকালে দুইজনই চাইলে আমার মুখের দিকে। আমি ভ্রূক্ষেপ কোল্লেম না।

    এই রকমে আট দিন। এক ভাব। প্রথম রজনী প্রভাতে যেমন চীৎকার আমি শুনেছিলেন, যে রকম শব্দ পেয়েছিলেম, অবিচ্ছেদে ঐ আট দিন ঠিক সেই রকম শুনলাম। বোলতে হয় সেই রকম। বোল্লেমও সেই রকম; বাস্তবিক দিন দিন বরং উচ্চমাত্রার শ্রীবৃদ্ধি! একদিন জিজ্ঞাসা কোরে চিতোরীর মুখে পরিহাস শুনেছিলেম, অনাদিকে নিস্তব্ধ দেখেছিলেম, তদবধি আর কোনদিন আমি সে সকল উপসর্গের কারণ জিজ্ঞাসা করি নাই;— জিজ্ঞাসা করি নাই বটে, কিন্তু মনে মনে ভয়বিস্ময়ের অবিচ্ছেদ ক্রীড়া। সে সকল ক্রীড়া কেবল আমিই অনুভব কোল্লেম।

    অষ্টম রজনীতে বিশ্রামের জন্য যখন আমি শয়ন কোল্লেম, গৃহদ্বারে যখন চাবী বন্ধ হলো, সেই সময় আমার মনের সঙ্গে আমার প্রাণের কথা। রাজা মোহনলাল ঘোষ বাহাদুর আমারে পাটনায় আনালেন, ফলবাগানে যা কিছু বলবার, তা আমারে বোল্লেন, তার পর তিনবার তিন জন লোক এসে আমারে পরীক্ষা কোরে গেল। পরীক্ষার পর রাজাবাহাদুর একদিন এক সভা কোল্লেন, সভায় আমারে বিলক্ষণ অপ্রস্তুত হোতে হলো। লোকেরা জিজ্ঞাসা কোল্লে আমার কষ্টের কথা, আমিও বার বার বোল্লেম আমার কষ্টের কথা। বার বার কেহ যদি ঘুরিয়ে ফিরিয়ে এক কথা কয়, লোকে তারে পাগল মনে করে; রাজসভার লোকেরা আমারে পাগল বিবেচনা কোল্লে। ডাক্তার বোলে যারা পরিচয় দিয়েছিল, তারা আমার চিকিৎসা করবার ব্যবস্থা দিলে। চিকিৎসা! —কিসের চিকিৎসা;— তারা ভাবলে আমি পাগল; যে ঔষধে পাগল ভাল হয়, সেই রকম ঔষধ তারা আমার জন্য ব্যবস্থা কোরবে, এইরূপ আভাষ দিলে। তার পর দুটি ডাক্তার আমার কাছে গিয়ে নূতন রকম আত্মীয়তা জানালে; আমারে সন্ধ্যাকালের হাওয়া খাওয়াবে বোলে ফাঁকি দিয়ে এই বাড়ীতে নিয়ে এলো। আবার এসে দেখে যাবে বোলে, অনাদির হাতে আমারে সোঁপে দিয়ে হাসতে হাসতে তারা প্রস্থান কোল্লে; আর এলো না। নীলাম্বর আর রঘুনাথ।

    কোথায় তারা আমারে রেখে গেল? লক্ষণে যে রকম আমি বুঝতে পাচ্ছি, লাফালাফি, হাঁকাহাঁকির যে রকম ঘটা, তাতে আমার যেন মনে হোচ্ছে, এ বাড়ীতে যারা আছে, তারা সকলেই পাগল! এটা পাগলাগারদ! ধূর্ত ডাক্তারেরা ধূর্ততা কোরে আমারে বাতুলালয়ে রেখে গিয়েছে! আমি পাগল! হায় হায়! লোকের চক্রেই আমি পাগল। ভাঁড়ের গল্পে শুনেছিলেম, “দশচক্রে ভগবান ভূত!” মোহনলালের ডাক্তারেরা পাঁচজন, পঞ্চচক্রে আমিও এক রকম ভূত হয়েছি! সহজ মানুষে যদি পাগল হোতে পারে, তবে ভূত হওয়া বড় আশ্চৰ্য নয়! আমি ভূত।— আমি পাগল!— পাগলা গারদে আমি বন্দী! লোকের কুচক্রে কি যে হোতে পারে না, বিশ্বাসী জ্ঞানবান পণ্ডিতেরাও সে তত্ত্বের মীমাংসা কোত্তে অক্ষম।

    আমি পাগল! মানুষের চক্রান্তেই আমি পাগল! পর্যায়ে পর্যায়ে যে যে স্থানে যতপ্রকার বিপদের মুখে আমি নিক্ষিপ্ত হয়েছি, মানুষের চক্রান্তই সেই সমস্ত বিপদের মূল। আমার সম্বন্ধে একটিও দৈব বিপদ নয়, পূর্ণবিশ্বাসে এ কথা আমি বোলতে পারি। এখন আমি পাগল;— পাটনার পাগলাগারদে বন্দী। অমরকুমারী কি আমার এ অবস্থা জানতে পাচ্ছেন? অমরকুমারী এখন কোথায়!— ঢাকায় কিম্বা মাণিকগঞ্জে কিম্বা মুর্শিদাবাদে? আমি কোথায় আছি, অমরকুমারী কি তা জানেন?

    এই সব কথা ভাবতে ভাবতে আর একটা বড় কথা আমার মনে পোড়লো। ত্রিপুরায় জয়শঙ্করবাবু আমার বন্ধুবান্ধবগণকে চিঠি লেখার সংকল্পের পথে প্রবল বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন, পাটনায় এসে সেই বাধা অতিক্রম কোরে, সাতখানি পত্র লিখে ডাকযোগে ভিন্ন ভিন্ন স্থানে আমি প্রেরণ কোরেছি। যাঁর যাঁর নামে শিরোনাম, নিশ্চয়ই তাঁরা যথা সময়ে সেই সকল পত্র প্রাপ্ত হয়েছেন। উত্তরপ্রাপ্তির ঠিকানা আছে, রাজা মোহনলাল ঘোষ বাহাদুরের বাটী,— পাটনা। অমরকুমারী যদি মুর্শিদাবাদে থাকেন, শান্তিরামের মুখে অথবা মণিভূষণের মুখে আমার বর্তমান ঠিকানা তিনি জানতে পেরেছেন — অবশ্য জানতে পেরেছেন; জানতে পেরে এখন তিনি কি মনে কোচ্ছেন? যে “ভাব” তাঁর মনে উদয় হয়েছে, মনে মনে আমিও তা জানতে পাচ্ছি। কেবল জানামাত্র, ফলাংশে নূতন গোলমাল।

    পত্রগুলি যাঁরা পেয়েছেন, তাঁরা অবশ্যই উত্তর লিখে পাঠাবেন। কোথায় পাঠাবেন। রাজা মোহনলালের বাড়ীতে, রাজা মোহনলাল দয়া কোরে সে সকল পত্র আমার কাছে পাঠাবেন, সে আশা নাই;— পত্রগুলি আমি পাব না। পাগলাগারদে আমি কয়েদ আছি, ডাকঘরের লোকেরা এ অদ্ভুত ঠিকানা জানবে না, এখানে এসে আমার সঙ্গে দেখাও কোরবে না, পত্রগুলি আমি পাব না। বন্ধুলোকগুলির শারীরিক মানসিক শুভ সমাচার, অমরকুমারীর শারীরিক মানসিক অবস্থাও আমি জানতে পাব না। তাঁদেরও উদ্বেগবুদ্ধি হবে, আমারও উদ্বেগ দিন দিন বাড়তে থাকবে। দ্বিতীয়বার পত্র-লিখনেরও আর এখন আমার সুবিধা নাই। কতদিন যে এই রকমে যাবে, গণনা কোরে তার সীমাও আমি নিরূপণ কোত্তে পাচ্ছি না।

    বাতুলালয়ে অষ্টম রজনীতে আমার মনোমধ্যে এই সকল ভাবনা সমূদিত। এই সকল ভাবনার সঙ্গে হঠাৎ একটা তর্ক আমার মনে উঠলো। পূর্বে আমি শুনেছিলেম, যে সকল লোককে সরকারী লোকেরা পাগলাগারদে রাখে, সে সকল লোকের চিকিৎসা নতুন প্রকার। গারদের লোকেরা পাগলগুলিকে ধরে, মারে, বাঁধে, যন্ত্রণা দেয়, ভয় দেখায়, ফস্ত খোলে, এক এক জনের সম্মুখে পুতিগন্ধযুক্ত ঘৃণাকর বস্তু রেখে দেয়;— আরো কত কি করে, সব কথা আমি শুনি নাই। এরা আমারে কয়েদ কোরে রেখেছে, একজন পুরুষ আর একজন স্ত্রীলোক নিত্য নিত্য আমার সেবা-শুশ্রূষা কোচ্ছে, একজন একদিন এসে তদারক কোরে গিয়েছে, চিতোরী, মধ্যে মধ্যে ঠাট্টাতামাসার কথা কয়, এই পর্যন্ত; তা ছাড়া কেহই আমার উপর কোন প্রকার দৌরাত্ম্য করে না। কেন করে না, তাও আমি মনে মনে এক রকম অনুমান কোল্লেম। এখন সেটা বলা হবে না; ভাগ্যক্রমে কোন লোকের অনুগ্রহে যখন আমি এই পিশাচপুরী থেকে খালাস পাব, তখন সে অনুমানের কথাটা সকল লোককে জানাবো।

    রাত্রের কার্য নিদ্রা। আমার কার্য চিন্তা। বিশেষতঃ এই গারদঘরে। নানা দুর্ভাবনায়, দু-একটা সু-ভাবনায় সমস্ত রজনী আমি জাগরণ কোল্লেম। রজনী অবসানে। প্রভাতে—ঠিক প্রভাতে না, অথবা অল্পে অন্ধকার থাকতে দরজার চাবী খুলে এক জোড়া নর-নারী গৃহমধ্যে প্রবেশ কোল্লে; অনাদি আর চিতোরী। নিত্যনিয়মিত কাজগুলি সমাপ্ত হবার পর তারা দুজনে আমার নিকটে এসে বোসলো। অনাদিঠাকুর সত্য সত্য চিতোরীর স্বামী কি না, জানি না, কিন্তু আমি অনুমান কোরেছি স্বামী; অনুমানমতেই পূর্বে পরিচয় দিয়েছি “দম্পতি।” স্বামীর মুখপানে চেয়ে চিতোরী একটু মুচকে মুচকে হেসে আমার দিকে ফিরে বোল্লে, “হরিদাস।— এই দেখ, আমি তোমার নাম পেয়েছি! — হরিদাস! আজ তোমারে একটা সুসংবাদ দি! — আজ বৈকালে এক জায়গায় তোমার নিমন্ত্রণ হবে; সেখানে তুমি অনেক রকম নূতন নূতন মজা দেখতে পাবে।” এই কটী কথা বোলে, উঠে দাঁড়িয়ে তিনবার করতালি দিয়ে, কতই যেন উল্লাসে চিতোরী আপনা আপনিই বোল্লে, “ভারী মজা! ভারী মজা! ভারী মজা!”

    কতই যেন আহ্লাদে ঐ কথাগুলি বোলে, বেশ আড়খেমটা তালে, চিতোরী সেইখানে হেলে দুলে নৃত্য আরম্ভ কোরে দিলে! অনাদিঠাকুর একটিও কথা বোল্লে না, আমার মুখের দিকে চাইতে চাইতে চঞ্চলভাবে উঠে দাঁড়ালো; উভয়েই একসঙ্গে বেরিয়ে গেল। আর একবার তারা এসেছিল; আমার আহারের আয়োজন কোরে দিয়ে খানিকক্ষণ সেখানে থাকলো, আমি আহার কোল্লেম; প্রাণধারণের জন্য আমার আহার করার অনিচ্ছায় যৎকিঞ্চিৎ খাদ্যসামগ্রী গ্রহণ কোরে বিছানার ধারে আমি বোসলেম। পুনর্বার পূর্বরূপ করতালি দিয়ে, কোমর দুলিয়ে দুলিয়ে পূর্বরূপ স্বরেই চিতোরী তিনবার বোল্লে “ভারী মজা! ভারী মজা! ভারী মজা!” কিছুই ভাব বুঝতে না পেরে আমি ভাবতে লাগলেম, না জানি, কি মজাই এরা আমারে দেখাবে!