[ ঘ ]

এখন বলছি বোন তোকে আমার কাহিনিটা, এও যে একটা ‘কেসসা’। কে আমার এ কথা বিশ্বাস করবে আর কেই বা শুনবে? তার উপর নাকি আমার মগজ বিগড়ে গিয়েছে, আর তাই মাঝে মাঝে আমি খুব শক্ত ‘বক্তিমা’ ঝেড়ে আমার বিদ্যা জাহির করি। আমার এই বকর বকর করাটা কেউ পছন্দ করে না, তাই একটু শুনেই বিরক্ত হয়ে চলে যায়। আচ্ছা বোন, বল তো, মেয়েমানুষ আবার কবে কথা গুছিয়ে বলতে পেরেছে, আর খুব বেশি বলাই মেয়েদের স্বভাব কি না। আমি কম কথায় কী করে আমার সকল কথা জানাব? তাই হয়ত বলবি, কে তোকে মাথার দিব্যি দিয়েছে তোর কথা বলবার জন্যে? তাও বটে, তবে পেটের কথা, বুকের ব্যথা লোককে না জানালেও যে জানটা কেমন শুধু আনচান করে, বুকটা ভারী হয়ে ওঠে, এও তো একটা মস্ত জইর ‘গজব’ ।

***

সইমা এত বড়ো রাশভারি লোক ছিলেন যে সবাই তাঁকে ভয় করে চলত। তিনিই ছিলেন ঘরের মালিক। কেউ তাঁর কথায় ‘টু’টি করতে পারত না। তাই এত বড়ো একটা অঘটন,—আমার মতো পাতাকুড়ুনির বেটিকে রাজবধূ করা সত্ত্বেও মুখ ফুটে কেউ আর কিছু বলতে পারল না তেমন। মেয়েরা প্রকারান্তরে আমার নিচু ঘরের কথা জানতে এলে তিনি জোর গলায় বলতেন, ‘জাত নিয়ে কি ধুয়ে খাই? আর জাত লোকের গায়ে লেখা থাকে? যার চলাচলন শরিফের মতো সেই তো আশরাফ । খোদা কিয়ামতের দিনে কখ্‌খনো এমন বলবেন না যে, তুমি সৈয়দ সাহেব, তোমার আবার পাপ পুণ্যি কী, তোমার নিঘ্‌ঘাত বেহেশত আর তুমি ‘হালগজ্জ’ শেখ, অতএব তোমার সব ‘সওয়াব’ (পুণ্য) বাজেয়াপ্ত হয়ে গেছে, কাজেই তোমার কপালে তো জাহান্নাম ধরাবাঁধা! আমি চাই শুধু গুণ, তা সে যে জাতই হোক না কেন? দেখুক তো এসে আমার বউকে—ঘর আলো করা রূপ, আশরাফের চেয়েও আদব তমিজ লেখাপড়া জানা, কাজকর্মে পাকা এমন লক্ষ্মী বউ আর কার আছে! আর কী জন্যেই বা বড়ো ঘরের বেটিকে ঘরে আনব, সে যত না আনবে রূপ-গুণ, তার চেয়ে বেশি আনবে বাপমায়ের গরব আর অশান্তি। আমার এই সোনার চাঁদ ছেলে বেঁচে থাক, ওর ঘরে ছেলেপিলে দেখি, তা হলেই আমি হাসতে হাসতে মরব।’ মায়ের সেই স্নেহভিজা কথায় যে কতই আনন্দে বুক ভরে উঠত। আমার চোখ দিয়ে টস টস করে জল পড়ত। কৃতজ্ঞতা আর ভক্তির ভাষা বুঝি মর্মের অশ্রু।

স্বামীর সত্যিকারের ভালবাসা আর সইমার মেয়ের চেয়েও নিবিড় স্নেহ আমার তো আর কিছুই অপূর্ণ রাখেনি। দুনিয়ায় যখন যা দেখতুম তাই সব যেন সুন্দর হয়ে ফুটে! কই, ওর আগে তো এই মাটির দুনিয়াকে এত সুন্দর করে দেখিনি। ভালবাসার অঞ্জন কী মহিমা জানে, যাতে সব অত সুন্দর হয়ে ফুটে ওঠে!

‘এত সুখ, তবুও পোড়া মন কেন আপনা আপনিই সঙ্কুচিত হয়ে পড়ত! পাড়াপড়শি লোকের ঐ একটা কথাই যেন শাখচিল্লির মতো কানের কাছে এসে বাজত, ‘সইবে না, সইবে না, সইবে না!’ চোরের মন বোঁচকার দিকে, তাই আমার মতো হতভাগির মনে যে শুধুই অমঙ্গলের বাঁশি বাজবে, তাতে আর আশ্চর্য কী!—ঐ অত গভীর ভালবাসার আঘাতই যে আমাকে বিব্রত করে তুলেছিল! মধু খুবই মিষ্টি, কিন্তু বেশি খাওয়ালেই গা জ্বালা করে। তাই আমার মনে হত ওঁদের পায়ে মাথা কুটে বলি, ‘ওগো দেবতা, ওগো স্বর্গের দেবী, তোমরা এত স্নেহ এত ভালবাসা দিয়ে ছেয়ে ফেলো না আমায়, আমি যে আর সইতে পারছি না। স্নেহের ঘায়ে যে আমার হৃদয় ভেঙে পড়ল! একটু ঘৃণা করো, খারাপ বলো, আমায় খুব ব্যথা দাও, তা নইলে আমার বক্ষ নুয়ে যাবে যে।’ আর অমনি আবার সেই ভীষণ মূর্তি চোখের সামনে ভেসে উঠত ‘সইবে না।’

এমনি করে, দেখতে দেখতে দুটো বছর কোথায় দিয়ে যে কোথায় চলে গেল, তা জানতে পারলুম না। এমন সময় ঐ যে প্রথমে বলেছিলুম, কলেরা আর বসন্ত জোট করে রাক্ষসের মতো হাঁ করে আমাদের গ্রামটা গ্রাস করে ফেললে। তাদের উদর যেন আর কিছুতেই পুরতে চায় না। সে কী ভীষণ বুভুক্ষা নিয়ে এসেছিল তারা! সমস্ত গ্রামটা যেন গোরস্থানেরই মতো খাঁ খাঁ করতে লাগল। গ্রামের সকলে যে যেদিক পারলে মৃত্যুকে এড়িয়ে ছুটল। ভেড়ার দলে যখন নেকড়ে বাঘ প্রবেশ করে তখন সমস্ত ভেড়া একসঙ্গে জুটে চারিদিকে গোল হয়ে দাঁড়িয়ে চক্ষু বুজে, মাথা গুঁজে থাকে, মনে করে তাদের কেউ দেখতে পাচ্ছে না। কিন্তু মানুষ যারা, তারা তো আর মানুষকে এমন অবস্থায় ফেলে যেতে পারে না। তাদের একই রক্ত-মাংসের শরীর, তবে ভিতরে কোনো কিছু একটা বোধ হয় বড়ো জিনিস থাকে। সবারই সঙ্গে সমান দুঃখে দুঃখী, সবারই দুঃখ-ক্লেশের ভাগ নিজের ঘাড়ে খুব বেশি করে চাপানোতেই ওদের আনন্দ। ঐ বুঝি তাদের মুক্তি।

যখন সবাই চলে গেল গ্রাম ছেড়ে, তখন গেলুম না কেবল আমরা; উনি বললেন, ‘মৃত্যু নাই, এরূপ দেশ কোথা যে গিয়ে লুকুব?’ সবাই যখন মহামারির ভয়ে রাস্তায় চলা পর্যন্ত বন্ধ করে দিলে তখন কোমর বেঁধে উনি পথে বেরিয়ে পড়লেন, বললেন, ‘এই তো আমার কাজ আমায় ডাক দিয়েছে।’ সে কী হাসিমুখে আর্তের সেবার ভার নিলেন তিনি। তখন তিনি এম. এ. পাশ করে আইন পড়ছিলেন। কলকাতায় খুব গরম পড়াতে দেশে এসেছিলেন। কী গরীয়সী শক্তির শ্রী ফুটে উঠেছিল তাঁর প্রতিভা-উজ্জ্বল মুখে সেদিন।

আবার সেই বাণী, ‘সইবে না, সইবে না!’

দিন নেই , রাত নেই, খাওয়া নেই, দাওয়া নেই, আর্তের চেয়েও অধীর হয়ে তিনি ছুটে বেড়াতে লাগলেন কলেরা আর বসন্ত রোগী নিয়ে। আমি পায়ে ধরে বললুম, ‘ওগো দেবতা! থামো, থামো, তুমি অনেকের হতে পার, কিন্তু আমার যে আর কেউ নেই। ওগো আমার অবলম্বন, থামো, থামো!’ হায়, যাঁকে চলায় পেয়েছে তাঁকে আর থামায় কে? বিশ্বের কল্যাণের জন্য ছুটছিল তাঁর প্রাণ। তাঁর সে দুনিয়াভরা বিছানো প্রাণে আমার এ ক্ষুদ্র প্রাণের কান্নার স্পন্দন ধ্বনিত হত কি? যদিও হত তবে সে শুধু ছুঁয়ে যেত, নুয়ে যেত না।

যে অমঙ্গলের একটু আভাস আমার অন্তরের নিভৃততম কোণে লুকিয়ে থেকে আমার সারা বক্ষ শঙ্কাকুল করে তুলেছিল, সেই ছোট্ট ছায়া যেন সেদিন কায়া হয়ে আমার চোখের সামনে বিকট মূর্তিতে এসে দাঁড়ালে। সে কী বিশ্রী চেহারা তার।

মা কখনও ওঁর কাজে বাধা দেননি। শুধু একদিন সাঁঝের নমাজ শেষে অশ্রু-ছলছল চোখে তাঁর শ্রেষ্ঠধন একমাত্র পুত্রকে খোদার ‘রাহায়’ উৎসর্গ করে গিয়েছিলেন। ওঃ, ত্যাগের মহিমায়, বিজয়ের ভাস্বর-জ্যোতিতে কী আলোময় হয়ে উঠেছিল তাঁর সেই অশ্রুস্নাত মুখ সেদিন। মনে হল যেন শত ধারায় খোদার আশিস অযুত পাগলাঝোরার বেগে মায়ের শিরে ঝাঁপিয়ে পড়ল। আমারও বক্ষ একটা মূঢ় বেদনা-মাখা গৌরবে যেন উথলে পড়েছিল।

এই রকম লোককেই দেবতা বলে,—না?