ইস্তাহার বইটির লেখকের নাম জানা যায়নি, তাই অজ্ঞাতনামা লেখকের তালিকায় বইটি প্রকাশিত হলো। ইস্তাহার প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ১৩৫৮ বঙ্গাব্দের ফাল্গুনে (১৯৫১ খৃষ্টাব্দে)। প্রকাশক দেবকুমার বসু, ৯/৩ টেমার লেন। কলিকাতা ৯-এর বিশ্বজ্ঞান থেকে। বইটির মুদ্রাকর ছিলেন শ্রীপ্রভাতচন্দ্র রায়
শ্রীগৌরাঙ্গ প্রেস প্রাঃ লিঃ। ৫ চিন্তামশি দাস লেন। কলিকাতা ৯। প্রচ্ছদ এঁকেছিলেন গণেশ বসু।
Category: অজ্ঞাতনামা লেখক
-

ইস্তাহার
-

মুখবন্ধ
আমার কবিতাগুচ্ছ মুঠো মুঠো জ্বলস্ত অঙ্গার,
সৈনিকের অস্ত্রাগারে ইম্পাতের উজ্জ্বল তলোয়ার
ছত্রে ছত্রে স্বীকৃত জীবনের সত্য অঙ্গীকার,
দুর্বলের দরিদ্রের নিজস্ব কঠিন হাতিয়ার।আমার কবিতা বিংশ শতাব্দীর প্রত্যক্ষ দর্পণ,
আধ্যাত্মিক জীবনের বেদান্তের সহজ দর্শন।
কোমল কুসুম সুষমায় মাখা চন্দ্রমহিমা,
পাশাপাশি কামানের রকেটের শৌর্য গরিমা।তোমাদের দ্বারে দ্বারে আমি কবি নিত্য অতিথি,
তোমাদের সুখ দুঃখ পরিণয় জন্ম মৃত্যু তিথি
আমার কবিতা রাখে সযতনে মালিকায় গেঁথে;
আমি থাকি তোমাদের আঁতুড়ে বাসরে শ্মশানেতে।আমি কবি তোমাদের একান্ত আপনার জন,
আমার কবিতা চার বিশ্বজনে করিতে আপন। -

ইস্তাহার
পৃথিবীর নানা প্রান্তে শোষণের ভয়ঙ্কর ছবি
দেখে, আজ আমি এক বিদ্রোহী বিপ্লবী কবি,
আমার বুকের রক্তে লিখি লাল লাল ইস্তাহার।
দুর্ভিক্ষে যুদ্ধে রোগে অনশনে মানি নি তো হার,
মিছিলের পুরোভাগে করি আজ জেহাদ ঘোষণা,
আমি তো জানি না, বন্ধু, নত শির কাতর প্রার্থনা৷যে সকল বজ্র মুঠি কেড়ে নিয়ে অন্ন বারবার
দুর্বলের ভগ্ন প্রাণে জাগায় ক্ষুধার হাহাকার,
আমার এ মেরুদণ্ডে উষ্ণ রক্তে অশান্ত প্রবাহ
সেই লোভী জিহ্বাকে জিঘাংসায় করবেই দাহ।দেয়ালে দেয়ালে লেখা আমার জ্বলন্ত ইস্তাহার।
সাক্ষ্য দেবে অন্যায়ের ইতিহাসে। ঘৃণ্য অত্যাচার,
অবিচার অনশনে নিঃস্ব পঙ্গু দুঃস্থ দিশহারা
নিত্য বঞ্চিতের প্রতি সাত্বনার ধূর্ত ইসারা
তাহাদের প্রলুব্ধ করে, যারা ক্লীব মুর্খ পদানত।
যুগে যুগে অপদস্থ, অপমানে অতি মর্মাহত;
আমি কভু সেই দলে লিখি না তো পাগলের নাম,
তাদের বেদনা দুঃখ বঞ্চনা, আমি জানতাম!আমি লিখি ইস্তাহারে শুধু তাহাদেরই সব কথা,
যাদের চায় না কেউ, যাদের জীবনে ব্যর্থতা;
সেই সব প্রতিহিংসাপরায়ণ ক্ষুব্ধ কঙ্কাল
আপন অস্থি দিয়ে ভাবীকালে জ্বালবে মশাল। -

মশাল
মশাল জ্বলছে পৃথিবীর মুখে। রক্তমশাল।
আগ্নেয়গিরি ফুটন্ত লাভা ঢালে লাল লাল।
পাহাড় ফেটেছে চৌচির উত্তপ্ত রোদে,
জঠর জ্বলছে কঠোর ক্ষুধায়, দারুণ ক্রোধে।সংজ্ঞা খুঁজছো কঙ্কালটার অভিধান জুড়ে?
দেখাব বুকের ঝাঁজরা পাঁজরা নখাগ্রে খুঁড়ে?ভয় কি মানুষ, মানুষের এই হাড় মাস দেখে,
লোনা রক্ত ও স্বাদহীন মেদ দেখ না চেখে!
লকলকে লোভী জিভ খাঁক হবে মশালে জ্বলে,
লক্ষ মশাল জ্বলছে, জানো কি, বক্ষতলে! -

জনতা
জনতার দেহে আজ প্রাণের সঞ্চার দেখি গ্রামে শহরে
অফিসে কাছারিতে কলে কারখানায় স্কুলে কলেজে রাজপথে;
গণতন্ত্রের সংজ্ঞা সাম্যবাদ আজ দেয়ালের পরিচিত লিপি,
তাই সমাজ ব্যবস্থার চাই আশু পরিবর্তন।এই উপমহাদেশে আজ এত দিনে রীতিমত কায়েম হল জনতার রাজ।
ছোট বড় উচু নীচু রোড রোলারের তলে পিষ্ট দলিত একাকার।
ফানুষের মতো ফাঁকা ঠুনকো বুলির ধাপ্পাবাজি ধরা পড়ে,
সখের নেতাদের স্বার্থপর পুরনো কারসাজির দিন খতম হয়েছে।এবার বন্ধু, শ্রমের কড়ি দিয়ে কেনো তোমাদের অন্ন বস্ত্র,
যথারীতি বংশানুক্রমিক শোষণের মহার্য রক্তের দামে নয়।
ব্যাঙ্কের লেজারে কাগজে কালিতে তোমাদের কোটি টাকার হিসেব
কোন আগন্তুক সকালে বাজেয়াপ্ত হলে বিস্মিত হয়ো না, বন্ধু!
অনেক দিনের জমানো দুধ ক্ষীর মাখন এত কাল খেয়েছ,
এবার জনতার মাঝে সকলের পাশে বসে ডাল রুটি খাও।
মনে রেখ বন্ধু, বাড়তি বিত্ত আনে বাড়তি রক্তচাপের রোগ;
বিত্তহীনের অকালমৃত্যু বিরল, যেমন মাথাহীনের থাকে না মাথাব্যথা।দিন আনা দিন খাওয়ার বাঁধাধরা সরল কাঠামোয়
ভেদাভেদের বিরাট ফাঁক ক্রমে ক্রমে ভরাট হয়ে আসে।
আজকের জনতার মুক্ত আদালতে সাম্যের আইনে বাঁধা
এই উপমহাদেশে এক জাতি। একতা।আজকের জাতীয় জীবনে ভাঙাগড়ার নিত্য খেলায়
পরম শত্রু সংক্রামক ব্যাধির মতো ঘৃণ্য মারাত্মক আক্রমণে
দূষিত বন্যার মতো সমাজের স্তরে স্তরে ক্ষয়িষ্ণু আস্তানা পাতে
নিদারুণ দারিদ্র্যের পচনশীল ক্ষতগ্রস্ত নিঠুর অভিশাপ।তাই বৈশাখের খরতর রুদ্র রৌদ্র দহনে ভস্মীভূত হয়ে যায়
গণজীবনের মূল মর্মকথা; প্রতিভার যোগ্যতার সাফল্যের উজ্জ্বল মানদণ্ড
বেসামাল দারিদ্র্যের দমকা ঝড়ে কালে কালে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়ে যায়।
কত মূল্যবান প্রাণ নিঃশেষিত, কত মহান আত্মা লাঞ্ছিত লুণ্ঠিত হয়,
সাধু আর শয়তানের ঐতিহাসিক উপাধিতে স্বচ্ছ তুলনা আনে
নিশি শেষের চরম ব্যর্থতা হতাশা অথবা বিকৃত মনোবৃত্তির বিকাশ।দুর্বাসার কঠিন অভিশাপ যেন দারিদ্র্যের প্রত্যক্ষ বিদ্রোহের ভাষা,
ভিক্ষা প্রতারণা আত্মদহন অথবা আত্মহত্যা কখনও পথের সম্বল;
কারণ দিনরাত মাটি কেটে পাথর ভেঙ্গে বোঝা বয়ে, তবু মেলে না
পেট ভরার মতো দু মুঠো ভাত, দুখানা রুটি কিংবা তৃষ্ণার জল।
স্নেহপুত্তলিকা রুগ্ন উলঙ্গ শিশুর ভাগ্যে বার্লি জোটে না,
পরম আদরের সোমত্ত বৌয়ের নেই পরনের এক টুকরো শাড়ী,
বেড়া ভাঙ্গা মাটির ঘরের জীর্ণ চালে নেই ছাউনির পাতা,
দারুণ খরায় মাঠের ফাটল বাড়ে, গোয়ালের বলদ মরে অনাহারে,
বাকি খাজনার দায়ে ঘরবাড়ী ঘটি বাটি মান ইজ্জত প্রাণটুকু পর্যন্ত
প্রতি বছরই মহাজনের হাতের মুঠোর মধ্যে অনায়াসে বাঁধা পড়ে।জনজীবনের এই সব মামুলি কথা কে কবে শুনতে চায়?
কোন হৃদয়বান বোঝে সর্বহারাদের এই চিরাচরিত দুঃখ?
তথাকথিত ভদ্র সভ্য সমাজের চোখে অনীপ্সিত নোংরা জঞ্জাল
এই উপমহাদেশের উপেক্ষিত জনগণের যে বিরাট অংশ,
তারাই কোটি কোটি দরিদ্র নিম্ন মধ্যবিত্ত অবহেলিত নগণ্য মানুষ;
তবু দেশ সংগঠনে তাদের সস্তা জলবৎ রক্তের বিশেষ প্রয়োজন।জনতার কণ্ঠে সংস্কারের সংগ্রামের উদার ডাক শোনা যায়,
সিভিল সাইরেণে দীর্ঘ দিনের ভয়াবহ কঠিন যুদ্ধের ঘোষণা,
জনগণের আশু পরম বৈরী দারিদ্র্যকে নিঃশেষিত করে মুছে দাও!এবার তাই ধনী বন্ধুদের সন্ধির হাত উদারতায় প্রসারিত হোক!
যা কিছু সঞ্চিত রয়েছে তাদের গোপন ভারী ভাণ্ডে সমানভাগেপুরনো দিনের পাওনার খতিয়ানে নির্ভুল গাণিতিক হিসেবে
আসরের সকলের মাঝে এনে সমানভাবে দিতে হবে বেঁটে,
সেই হবে দারিদ্র্যের সংগ্রামের স্বয়ংক্রিয় চরম সংহার হাতিয়ার।এ কথা তো মানো, এই উপমহাদেশ তোমার আমার এবং তাহাদের;
এখানের গণ আদালতে এক জাতি সমতায় চাই একতা।আজ সেই পরম লগ্ন এসেছে, বন্ধু। আর বৃথা দেরী নয়,
তোমাদের বৃহৎ প্রাসাদের অব্যবহৃত অখ্যাত কোন অন্ধকার কোণে
শত শত পথবাসী গৃহহীনের জন্যে সামান্যতম ঠাঁই চাই,
তোমাদের ভাঁড়ারের বাড়তি বাসি খাবারের অকৃপণ দানের দ্বারা
তাদের জ্বলন্ত জঠরের ক্ষুধার দাবানলের নিবৃত্তি অবশ্যই হবে!
শুধু মনে রেখ, বন্ধু, এক জাতি। একতা। -

আদিম ও আগামী
আদিম, তুমি চলে গেছ বহু দূরেই আজ,
নাগাল তোমার পাবে না তো আর উড়োজাহাজ!লাঙল তোমার মরচে ধরেছে,
বলদ তোমার, তাও তো মরেছে,
ট্রাকটার আনে ফসল দিন,
প্রবীণ গিয়েছে, প্রাক্তন নেই, এল নবীন।
আকাশ নীলিমা ভরে গেছে আজ কলের ধোঁয়ায়,
মাটি পুড়ে পুড়ে রূপ পেল আজ ইট খোয়ায়।
মানচিত্রের সীমারেখা আজ হল বদল,
চলমান এই পৃথিবীতে কিছু নহে অটল।
যুগের চাকায় মানুষেরা চলে,জীবন চিনেছে ক্ষেত আর কলে,
তবুও ছেঁড়েনি মহামারী আর মৃত্যু ফাঁস,
জোড়াতালি দেওয়া এ জীবন যেন শুধু পরিহাস।
বহু দধীচির আত্মায় গড়া এই সমাজ
আশা উদ্যোগ সংগ্রাম নিয়ে জীবিত আজ।
অঙ্কুর কেউ বুনে গেছে এই মাটিরই বুকে
আজ তারই গাছ ধীরে ধীরে বাড়ে দুঃখে সুখে;
আগামী পৃথিবী পাবেই তাহার সোনার ফসল,
কেমন করে আদিম তাকে বাঁধবে, বল!
-

চোখ
মানুষের মুখে দেখেছি চোখ। অদ্ভুত চোখ।
ক্ষুব্ধ আত্মা খর দৃষ্টিতে খোলে নির্মোক,
কোটরগত ফারনেস থেকে আগুন ঝরায়,
শান্ত সবুজ পৃথিবীর শোভা জ্বলে পুড়ে যায়।অবুঝ শিশুর ক্ষুধার্ত চোখে অশ্রু ঝরে,
যুবকের চোখে হতাশাবহ্নি গরগরে।উপোস ক্লিষ্ট প্রৌঢ়ের চোখ পেচকের মতো,
বৃদ্ধের চোখে তন্দ্রা নেমেছে, যেন সে মৃত।প্রেয়সীর সেই মদনমুগ্ধ চোখের চাহনি গেল কোথায়?
আমার চোখের দৃষ্টিও দেখি জ্বলছে, হায়! -

জেহাদ
দিকে দিকে ওরা আঘাতে আঘাতে তোলে জেহাদ,
ভেঙ্গে পড়ে বুঝি শাসনের পুরাতন বনিয়াদ।
নিশানে নিশানে আন্দোলন তোলে মাথা,
বিক্ষুব্ধ হল গ্রাম শহর কলকাতা।এক সাথে আজ মজুর কেরানী কৃষাণ ভাই
কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে বলছে, ‘বাঁচতে চাই’!
দিকে দিকে জাগে মিছিলে মিছিলে জিন্দাবাদ;
ওরা যে আজি ঘোষণা করেছে দারুণ জেহাদ!পুরনো দিনের রঙটি বদল হয়েছে আজি,
বিদ্রোহী মনে বিপ্লব বীজ করছে কাজ,
জনতার দাবী, তার দাম দাও সবার আগে,
পাওনাগণ্ডা বুঝে নিতে দাও ভাগে ভাগে।মালিক, দালাল, কালোবাজারীর গুপ্ত দল,
এবার করবে সব একে একে পালা বদল,
পুরনো দিনের বিদূষকের রঙিন বেশ
দিনের আলোয় আদালতে করবে পেশ। -

রাজনীতি
এতদিন জানতাম, রাজনীতি শুধুমাত্র সংসদ ভবনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ;
কিন্তু আজ দেখি, রাজনীতির নামে মূর্তিরা নেমেছে রাজপথে ফুটপাথে,
রাজনীতির ছবি আঁকতে বোমা পিস্তল পাইপগান ছুরির ফলাকায়,
দেশের মানুষের তাজা রক্তে। ছন্নছাড়া পাটি প্রীতির অদম্য মোহে
দিক্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে অন্ধ অঙ্গীকারে বিপুল আক্রোশে
নিতান্ত জুলুমের বশে ফয়সালা হয় অসঙ্গত রাজনৈতিক মতবাদ।তারপর একদিন জনতা জাগে। সত্যের নির্ভীক আলোক বর্তিকা
যদিও কেউ আসে না দেখাতে; বরং দালালের কুর পরিহাস
তোমাকে আমাকে এবং সকলকে
ছেলেখেলার তামাসার মঞ্চে বোকা পুতুলের ছায়া বানাতে নিয়ত প্রয়াসী।
এই মর্মান্তিক প্রহসনের অর্থ, আপন মুণ্ড আপন হাতে কেটে
আপনার পায়েই নৈবেদ্যের ডালির মতো সমর্পণ করতে হয়।জনতার জমজমাট আসরে মহামান্য সম্রাটসম যাদুকর নেতাদের
সচরাচর দর্শন মেলে না। প্রহরারত রুদ্ধ কক্ষে নিরাপদে বসে
পত্র-পত্রিকায় মাঝে মাঝে বিভ্রান্তিময় ছলাকলার অমূলক বিবৃতিতে
তাদের অস্তিত্বের দুর্বল প্রমাণ। দেশকে, অথবা দেশের মানুষকে
তারা কোনদিন কি ভালবেসেছে? আপন গদি অথবা দলমত
সর্বোপরি স্বীয় উদরপূর্তি, ক্ষমতার প্রতিযোগিতামূলক মারাত্মক লড়াইয়ে
ছলে বলে কৌশলে ব্যালট বাক্সে বিজয়গৌরব অর্জনের বাহাদুরি
আপন বিশ্বের আধুনিকতম অভিধানে রাজনীতির অভিনব ব্যাখ্যা।কিন্তু এই প্রহসনের শহীদ হতে আমরা কখনও চাই নি।
তোমাদের আমাদের এবং তাহাদের নিম্নতম চাহিদা ছিল:
শুধুমাত্র পেট ভরে দু’বেলা দু’মুঠো ভাত, পরনের সামান্য আবরণ,
হতভাগ্য বংশধরদের জন্যে শিক্ষা স্বাস্থ্য এবং সুস্থ জীবন;
মানুষের উপযোগী মাথা গোঁজবার মতো এতটুকু স্থান,
আর প্রকৃত অর্থে আমাদের আপন দেশের সর্বাঙ্গীন সমৃদ্ধি। -

সঙ্কট
আমি জানতাম, বঞ্চনা ক্ষোভে ব্যাপক ধর্মঘট,
বেকারত্বের গণসমস্যা, খাদ্যের সঙ্কট,
নব বিপ্লবে আগ্নেয়গিরি ধূমায়িত ষড়যন্ত্রে,
কেমন করে তা রুখবে বন্ধু, কোন মহা যাদুমন্ত্রে?এই মহাদেশে কোটি মানুষের কোটি অনটন, দায়,
কোন কৌশলে নিমেষে তাদের সমাধান করা যায়?
নীচের তলার অন্ধকারের দুঃসহ হাহাকারে
উপর তলার ঘুম ভেঙে যাবে, করাঘাত দ্বারে দ্বারে।
গৃহযুদ্ধের প্রয়োজন নেই; বাঁচার চাহিদা পণ,
সদ্ধিপত্রে স্বাক্ষর পড়ে, সেটুকু হলে পূরণ।আমি জানতাম, লোক গণনার হিসেবে রয়েছে ভুল,
প্রতি মুহূর্তে জন্মের হার ছাপিয়ে সীমানা কুল
আরও কোটি ছায়া কিলবিল করে, নাহি লেখাজোখা মাপ,
তারাই আবার আনবে যুদ্ধ দুর্ভিক্ষের অভিশাপ। -

বন্যা
বন্যার জলে ভেসে গেছে সব ধানের চারারা;
অনেক শ্রমের মূল্যে বোনে মাঠে রক্তের ধারা
দরিদ্র কৃষক তার সামান্য সম্পদ বেচে কিনে,
এখন মরতে হবে দুর্ভিক্ষের দুরন্ত দুদিনে।জল নেমে গেলে, মাঠে জেগে ওঠে শুকনো ফাটল,
বুভুক্ষু গহবরে ওঠে ক্ষুধার উত্তাপে কোলাহল,
ধ্বংসের তাণ্ডবে চুর্ণ চৌচির বিচিত্র রুক্ষ্ম রুপ
দেখে দেখে আতঙ্কে অন্তরাত্মা হয়ে আসে চুপ।উপোসী বৌয়ের নেই, এমন কি, পরনের শাড়ী,
রুগ্ন শিশুর দুধ বার্লি নিয়ে তুচ্ছ কাড়াকাড়ি,
অন্ন নেই ঘরে, কানা কড়ি নেই কৃষকের হাতে,
দুঃখী কৃষক জানে, মৃত্যু আছে তাদের বরাতে।মহাজন দুর্ভিক্ষে কখনও করে না তো ক্ষমা!
তার ঘরে চড়া দামে কৃষকের মাথা পড়ে জমা।
ভাগ্যের পরিহাসে খাদ্যের দারুণ অভাব,
মজুতদারের দ্বারের কঙ্কালের দ্রুত আবির্ভাব।বন্যা কেন নিয়ে গেল শুধুই মাঠের যত ধান,
কেন সে নিল না এই কটিমাত্র হতভাগ্য প্রাণ! -

জবানবন্দী
আমরা অগ্রগামী। অগ্রদূতের সারথি।
উর্বর জীবনের স্বপ্নে কাটে আমাদের দিন।
এটুকু যেন আজন্ম কুড়িয়ে পাওয়া আশীর্বাদ;
ভাঙ্গা বাসরের জোড়াতালি দেওয়া
বেসুরো বাঁশীর বিমুনি আজ আমাদের ইঞ্জিনের স্টীম।
শিল্পের সংজ্ঞা আমরা জানি না, ইস্পাতের যুগে
হায়, খলিফাকে প্রতিবেশী করেছি।
আগুনে মেঘ ওড়ে যদি আকাশে আকাশে,
নেহাত উদাসী বাউলের মতোই একতারার চুম্বকে
চাতক পাখীর ঠোঁটে তাকে গ্রাস করি।
চাঁদের আলো ফুলের হাসির দিন ফুরিয়েছে। পুরোনো রঙে
তুলি আর ভেজে না; ধানের চাষে এবার
বিদ্যুৎ চাই, ট্রাকটার চাই।
স্রোতস্বিনী ক্ষীণতর হয়ে আসে প্রতিদিন। আজ
ওপারের হাটের কৃত্রিম কোলাহল এপারে পৌছেচে,
কাঁপন লেগেছে দুরঙা নদীর বুকে। অবাক কাণ্ড!
আর্শিতে নিজেদের বিসদৃশ চেহারা চেনা যায় না;
রঙ মাখা সঙের মতোই আমরা কিম্ভূতকিমাকার!
দুনিয়ার প্রগতির তরী আমাদের ঘাটের পাশে এলে;
বোকা ছেলের হাতের মোয়ার মতো
আমরা বিমুগ্ধ চোখে তা দেখি, মাটির গন্ধ ভুলে।
তাই আমরা আজ দুর্বল বেকুব বিমূঢ়!
বিকৃত সূর্যের ছায়াই মাটিতে, শ্যামল বনানীতে;
আজ আমরা কোন সার্কাসের পংগু ‘ক্লাউন’,
সুরার প্রলাপ বা রোমাঞ্চ কাহিনীর ভূমিকা ভুলে
শুনি কোন দুরন্ত আসামীর কয়েদ জীবনের ব্যর্থ জবানবন্দী। -

নেতা
জনতার স্রোতস্বিনী উত্তাল জোয়ারের টানে
ভাসমান রাজনীতির পালে লাগে নতুন হাওয়া;
উজান স্রোতের মুখে তাই দিক্হারা নেতা
সাফল্যের পথ খোঁজে নতুন ধারায়, নতুন ভাবনায়।
জীর্ণ অট্টালিকার প্রাচীন বনিয়াদে যেমন করে জন্ম নেয়
ভাঙনের কুটিল কুচক্রী দুঃস্বপ্নের দল,
জনতার মনের রন্ধ্রে নব আবিষ্কারে তেমনি দ্রুত মগ্ন হয়
বল্লাহীন অশ্বের মতো নতুন কোন নেতা।
ঊর্ধ্বমুখী পতঙ্গের অবশ্যম্ভাবী দুঃসহ পতন রীতিমত অভ্যস্ত
দুর্বোধ্য অসংলগ্ন অঙ্গীকারের বুকে মূর্তিমান যাদুকর
সনাতন নেতার কাঠামো ভাঙে। আবার নতুন নেতা গড়ে।
দিকভ্রান্ত বিভ্রান্ত জনতার আশা আকাঙ্ক্ষার নগ্ন ইতিহাস
অসঙ্গত অন্যায় মুমুর্ষু জীবনের পাতায় পাতায়
যে মেঘলা প্রভাতে গোপনে গোপনে জলের রেখায় লেখা হয়,
অমৃতের বরপুত্রের মতো চমকপ্রদ পোষাকে ঠিক তখনই
আবার আকস্মিকভাবে নব জন্ম লাভ করে কোন নেতা।
পলায়নের খতিয়ানের ধূসর ছিন্নপত্রগুলো
ঘূর্ণি হাওয়ার মাঝে আবার সহসা কখনও উধাও হলে,
এবং জ্বলন্ত বক্তৃতার মালা কখনও অর্থহীন প্রমাণিত হলে,
সেই বিশেষ নেতার অপমৃত্যু ঘটে অনিবার্য গন্তব্যের মতোই।
যশ অপযশের নিরপেক্ষ চিরন্তন মানদণ্ডে জনতার ময়দানে
নিতুল সংকেতের স্পষ্ট ছায়াছবি নিয়তির পরিহাসে প্রতিফলিত;
শরৎকালের প্রতি প্রত্যুষের জীবন্ত নিষ্পাপ শিউলির মতোই
উচ্চাভিলাসী নেতারা ফোটে করে আবার মাটিতেই বিলীন হয়;
দেশে দেশে প্রতি মরশুমেই তারা আসে, আসবে এবং যাবে।
-

শকুনির পাশা
শকুনির পাশার যাদু কুরুক্ষেত্রের দামামা বাজাল
পূবে আর পশ্চিমে। পাণ্ডবে কৌরবে।
মরা হাড়ে ভেন্ধি দিয়ে গড়া শক্তিমত্ত বহুরূপী পাশা।
নগ্ন অট্টহাসিতে উৎকট বীভৎস,
মৈত্রী বর্মে জুয়াড়ীর গোলক ধাঁধার ফাঁদ।
তাই শকুনির অবশ্যম্ভাবী জয়ের পৈশাচিক উল্লাসে
উগ্র উৎকণ্ঠায় যুগে যুগে কত কঙ্কাল হয়েছে ফসিল;
দ্বন্দ্বে সংঘাতে বিচ্ছেদে সংগ্রামে ইতিহাসের পাতা ভরা।
সুপ্রাচীন অট্টালিকার কক্ষে কক্ষে রন্ধ্রে রন্ধ্রে
কালো হয়ে উঠেছে কত বিষাক্ত অজগরী নিঃশ্বাস।তবু যুগে যুগে মীরজাফর ফিরে আসে,
খাল কেটে আরো কুমীর আনা হয়,
নেকড়েকে আনা হয় লোকালয়ে।
আহা, ভাঙ্গনের সাধনায় মরে বেঁচে থাকা,
আর কুচক্রী শকুনি তার ক্রূর হাসি ছড়ায় বাতাসে -

মহাজীবন
এ মহাজীবন হয়েছে রুক্ষ্ম,
বসন্ত বায়ু হয়েছে তপ্ত,
হারাল কাব্য এ শতাব্দী,
আজ এ পৃথিবী কি অভিশপ্ত?এস, আজ মোরা নাটক লিথি,
তোমার আমার জীবনের ছবি
নগ্ন কাহিনী গদ্যেই গাঁথ,
তৃষ্ণা ব্যাকুল ক্ষুধার্ত কবি।এ মহাজীবন হয়েছে রুক্ষ্ম,
এ পৃথিবী আজ হয়েছে সাহারা,
পথে পথে দেখ ভুখা মিছিলেতে
সবহারা ওই চলেছে কাহারা!শিল্পী তোমার নরম তুলিতে
আঁকিতে পার এ রিক্ত ধরা?
ভাঙনের কুলে কুলে বুঝি আজ
ভাসে যাযাবর সারি সারি মরা।তোমরা কি কেউ বলতে পার,
কি নাম ওদের, কোন জাতি ওরা?
কণ্ঠে কণ্ঠে একই জবাব,
নাম জাত নেই, ওরা শুধু ‘মরা’। -

যৌথ
সবল পেশীর মুষ্টিতে ঘোরে যন্ত্রের চাকা,
প্রসূত সৃষ্টি মুনাফা আনে সহস্র টাকা।মজদুর আমি যন্ত্রের মতো দৃঢ় কঠোর,
আমার দেহের বয়লারটার নাম জঠর,
সেখানেও চাই কয়লার মতো কিছু রুটি।
ধর্মঘটের কৌশল আনে গণছুটি,
লক আউট সভা ঘেরাও মিছিল সন্ত্রাসে
দুঃখ ঘুচবে, এ কথা শুলে কে না হাসে?মজদুর আমি যান্ত্রিক আমি, এ দেশ আমার,
দেশের ফসল উৎপাদনের দায়িত্বভার
আমার মতন মজুর ভাইয়েরা নেয় যখন,
মালিক, বৃথা না-ই বা করলে আস্ফালন!
নির্ধারিত নিয়মে তব বখরার হার;
মজদুর মেরে উদরপূর্তি হবে না আর।এস আজ মোরা মালিক মজুর একই সাথে
যন্ত্রের চাকা ঘোরাই সহজে যৌথ হাতে। -

জালিয়াত
আমরা জালিয়াত!
দিনে দুপুরে তোমাদেরই সই শীলমোহর জাল করি;
হাজার হাজার মণি মানিক্যের স্বপ্ন আমাদের দু’চোখে,
তোমাদের ওই পায়ে বেড়ি পরানো কয়েদের আতঙ্ক ভুলেছি,
নইলে ‘পটাসিয়াম সাইয়ানাইডে’র ছোট্ট শিশিটা
নীচের পকেটে রাখতাম না।কখনও বা আমরা বাদশার বাচ্চা,
যখন জাল টাকার বাগুিলগুলো ছাপাখানায় বসে গুনি,
অথবা জাল দলিলের দামে করি মোটা অঙ্কের বাজিমাত,
আমরা জালিয়াত!।আদালতে আমরা যাই।
যাই শুধু বটতলায় জুয়োখেলার আড্ডা জমাতেই,
তোমাদের পকেট থেকে রেশনের দামটা
ফাঁক করে দিতে। তোমরা নেহাত ভালমানুষ!
আদর্শের ফাঁকা বুলি আউড়ে তৃপ্তি পাও,
আজকের যুগে তোমাদের দুঃখ তাই সবচেয়ে বেশী;
বন্ধু, আমরা বুঝি,
আমাদের শরীরও রক্তে মাংসে গড়া।
ক্ষণিকের বিষাক্ত মদের নেশা যখন কেটে যায়,
তখন তোমাদেরই মতো হালি কাঁদি ভালবাসি,
উপবাসী ছোট্ট ছেলেটার গালে চুমু খাই,
তার গলা টিপে ধরতে মন চায় না।
তবু তোমাদের কাছে আমাদের স্কুল পরিচয়:
আমরা জালিয়াত! -

সাংবাদিক
যুদ্ধের দামামা বাজে। বাহিনী চলেছে ট্যাঙ্কে, কামান গর্জনে;
দুরন্ত বোমারু সেনা সুকৌশলে পাক খেয়ে নেমে এসে নীচে
কুশলী সাঁতারুর মতো অনায়াসে বোমা ফেলে যায়;
নগর বন্দর কাঁপে, জ্বলে লোকালয়, ঘর বাড়ী,
ভয়ঙ্কর যুদ্ধের আতঙ্কের বিভীষিকা অন্তর কাঁপায়।
কখনও বা দিবালোকে গুপ্ত পরিখায় নেমে দ্রুত শুয়ে পড়ে
কাঁধে বাঁধা ক্যামেরাটা তুলে ধরে রোমাঞ্চকর জ্যান্ত ছবি তুলি,
চক্ষের নিমেষে এসে জীবন মৃত্যুর কত নাটকীয় ক্ষণ
আকস্মিক বিস্ময়ে লেন্সে নেগেটিভে চিরবন্দী হয়ে থাকে;
তারপর কালক্রমে ঐতিহাসিক তাকে অমরত্ব দেয়।এ কথা তো ইতিহাস জানে না যে, তিল তিল করে
আমি সাংবাদিক নিত্য টেলিপ্রিণ্টারে রচি শত শত রক্তাক্ত কাহিনী;
এই সব খণ্ড খণ্ড অভিনব ইতিবৃত্ত সঞ্চয়ের দুঃসাহসিক আশায়
সৈনিকের উৎসাহে মারমুখো ফৌজের সঙ্গে পথ চলি।প্রবল বন্যায় ভাসে গ্রাম নদী খাল বিল, অসংখ্য সংসার,
দিকে দিকে ছন্নছাড়া গৃহহারা অন্নহীন কঙ্কালের অশ্লীল মিছিল;
গরু মোষ ছাগলের ভাসমান অগনিত গলিত শবের উপরে
ভোজনবিলাসী কাক চিল শকুনের লোভী তীক্ষ্ণ চঞ্চু দুর্গন্ধ ছড়ায়;
এদিকে তাকিয়ে দেখি, ঘরের টিনের চালে বিড়ালের ছানা কেঁদে মরে।জল, আরও জল, শুধু জল চারিদিকে। যা দেখেছি,
সব চিত্র সব কথা যায় না তো লেখা শুধু খবরের রূপে;
বন্যার মামুলি তথ্য পত্রিকার প্রকাশিত সংবাদ মারফত।
ঝড় আসে। গাছ পড়ে, ঘর ভাঙে, সেই সঙ্গে গণমৃত্যু আসে।
আকস্মিক দুর্ঘটনা আনে ক্ষয় ক্ষতি দুর্ভাবনা। দুর্ভিক্ষের প্রকোপে, অথবা
দেশব্যাপী নিদারুণ মহামারীর দুর্জয় বিপর্জয় লীলার রোমহর্ষক কাহিনীহয়ত প্রত্যক্ষদর্শী সাংবাদিকের লেখনী লেখে না সবিস্তারে,
প্রতিদিন টেলিপ্রিণ্টারে যায় যথারীতি নিতান্ত সংক্ষিপ্ত সমাচারে
সাঙ্কেতিক অঙ্কের ভাষায় মৃত্যুর সংখ্যার নির্ভরযোগ্য খতিয়ান।গ্রীষ্মে শীতে বর্ষায় গ্রামে গঞ্জে শহরের পথে বা প্রান্তরে
দিন কাটে রাত কাটে ছোট বড় বিচিত্র সংবাদ সংগ্রহে;
এখানে সেখানে কত প্রেম প্রতারণা তুচ্ছ ব্যর্থ জীবনের
সাদা কালো মুহূর্তের নগ্ন চিত্র হৃদয়ের অদৃশ্য ক্যামেরা
মুগ্ধ বিস্ময়ে ধরে রাখে কিছুক্ষণ। খাদ্যহীন বস্ত্রহীন
কৃষক মজুর মুটে কেরানী দালাল খুনী বেকার মাতাল,
বৃদ্ধ পঙ্গু কুষ্ঠরোগী পুত্রহারা শোকাতুরা উন্মাদিনী মাতা,
তাদের কথা কি কোন পত্রিকার শিরোনামা খবর হয়েছে?
আমি সাংবাদিক। তবু আমার ডায়েরীতে তারা উজ্বল নায়ক
পত্রিকা বা ইতিহাসে তারা থাকে চিরদিন নেপথ্য সৈনিক।হয়ত হাটের প্রান্তে অখ্যাত অজ্ঞাত কোন ভগ্ন কুটীরে
দিনান্তের ক্লান্তি মুছে মাদুরে বালিশ রেখে ক্ষণিক বিশ্রাম;
সস্তা হোটেলের ডাল ভাতে ক্ষিধে মেটে। ছোট গেলাসেতে চা।
ষ্টেশন বিশ্রামগৃহে কখনও বা পেতে হয় স্বর্গের স্বাদ।
দক্ষ শিকারীর চোখ নিয়ে তীক্ষ্ম অন্বেষণে কাছে কিংবা দূরে
খবরের জাল পেতে জীবিকা খবর কুড়োই নানা প্রান্ত থেকে।আমি সাংবাদিক। তবু আমি জানি, যদি কোন স্তব্ধ অবসরে
আকস্মিক আক্রমণে মৃত্যু এসে হানা দেয় আমার দ্বারে,
সেই মর্মান্তিক শোক সংবাদের প্রতিলিপি পৌঁছবে না টেলিপ্রিণ্টারে,
সান্ত্বনার বাণীযুক্ত ভদ্র আকৃতিতে গুণকীর্তি বর্ণনায়
মুদ্রিত হবে না কোন বিখ্যাত পত্রিকা কিংবা স্মারকগ্রন্থে।
বছর বছর ধরে লক্ষ লক্ষ সংবাদের বেচাকেনা হাট
কোটি কোটি মূল্যবান সংবাদের জন্মদাতা নিজে মূল্যহীন।
এ কথা সত্য তবু, আমি এক সাংবাদিক, সংবাদ আমার জীবিকা। -

কুতুব মিনার
আমার উচ্চাশার মাপ ছিল তোমার অতি উচ্চতায়,
আমার সৌথীন মনের শিল্পখচিত কারুকার্যের প্রাচীন ধারা
তোমারই আকর্ষণীয় দীর্ঘ ছায়ায় রচিত।
মোগল যুগের ঐতিহাসিক অক্ষয় গৌরবের শিখরে
তুমি মহান; সামান্য আঁকশির নাগালের সীমানায়
ছোঁয়া দিতে চাও না। পৃথিবীর দারুণ বিস্ময়!আমি এক নগণ্য মানুষ। নিত্য হাহাকারে জর্জরিত জীবনে
ক্লান্ত। সকালে সন্ধ্যায় রুটির ছেঁড়া টুকরোয় ক্ষিধে মেটে না।
গ্রাম্য মেলায় ধূলোমাখা ভঙ্গুর কাচের বাসন নিতান্ত ঠুনকো আশায়
প্রত্যহই মিথ্যে সান্ত্বনায় বুক বেঁধে মৃত্যুর দিন গুনি।
অপদার্থ উৎসাহ, ব্যর্থ আশা অবশেষে ধূলো আবর্জনায় মেশে,
এবং ক্রমে অখ্যাত অজ্ঞাত বিস্মৃত কোন ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয়।তবু আজও আমার চির তৃষ্ণার্ত দৃষ্টির প্রসারিত ছায়া
তোমার আকাশচুম্বী শীর্ষদেশে নিরিবিলি শান্তি খুঁজে পেতে চায়। -

বাংলা দেশ
পুতুল নাচের মঞ্চে একদিন কালো হত্যা নাটকের শেষ;
বিশ্বগর্ভে জন্ম নিল নব রাষ্ট্র, নাম ‘বাংলা দেশ’
কোটি শহীদের শুদ্ধ রক্তের বিনিময়ে কেনা।
পীড়ন ধর্ষণপটু শয়তানের সন্তানেরা তবুও থামে না
ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থেকে স্বার্থাম্বেষী কালনেমী বন্ধুদের দ্বারে
আনবিক ধ্বংসাত্মক মরণাস্ত্রে সুসজ্জিত রণসম্ভারে
বিষধর সর্পকুল আক্রোশভরে করে কুটিল বীভৎস ফোঁসফোঁস
পলাতক শক্তিধর মুখের গ্রাসের জন্যে নিদারুণ জঘন্য আফশোস,
আদিম যুগের বন্য পশুর স্বভাবে মত্ত অসভ্য অনার্যসম।
পঙ্কিল পাপের শাস্তি দিতে আসে নিজ হাতে কালজয়ী যম,
কাল বৈশাখীর মতো লকলকে তার লাল জিহ্বা সর্বগ্রাসী
মুছে দিতে অন্ধকার গহ্বরের লোভী ক্রুর শয়তানী হাসি।অত্যাচারী রক্তিম ভূমিকা রচে পৃথিবীর আদি ইতিহাসে,
অভিনব দৃষ্টান্তে হিটলার মুসোলিনী নাদির শাহ বুঝি হাসে।
জালিওয়ানাবাগে সাদা প্রভুদের বিভীষিকা ভুলতে চেয়েছি,
কিন্তু পারি নি, বন্ধু! শোষণে শাসনে আজও দেখতে পেয়েছি
দুঃশাসনী প্রলয়ের আয়োজনে ভ্রূকুটিতে তিক্ত অবিচার,
সভ্যতার আবরণ মুহুর্মুহু ছিন্ন করে ক্লীব অনাচার,
নারী শিশু বৃদ্ধ রুগ্ন হত্যা নির্বিচারে
বেনামী যুদ্ধের ভানে রক্তে মাংসে গড়া কোন সৈনিক কি পারে?অন্ধ মন্ত্রে ধর্মের মুখোসধারী রক্তপায়ী মাংসলোভী জীব,
কোটি শহীদের ক্রুদ্ধ আত্মার অভিশাপ করছে নির্জীব
তিলে তিলে তোমাদের। নরকের কালো পাঁকে অতল কবরে
নিদারুণ যন্ত্রণায় তোমাদের প্রেতছায়া নিশিদিন কিলবিল করে।সোনার মাটির দানা শহীদের পবিত্র রক্তে শুদ্ধ সার পেয়ে
সোনার ফসলে ভরে। দুনিয়ার চার দিকে চেয়েনব রাষ্ট্র তার নব জন্মের বাস্তব খবর ছড়ায়:
বিস্ময়ে পুলকে বিশ্ব ধীরে ধীরে বিজয়ের মুকুট পরায়
উন্নত শিরে তার। সম্মুখে প্রসারিত উন্মুক্ত প্রশস্ত দীর্ঘ পথ
ধ্বংসের কীটের মৃত্যু। তারপর গঠনের কঠিন শপথ।
বীজমন্ত্রে উদ্বুদ্ধ আট কোটি মৃত্যুহীন মৃত্যুঞ্জয়ী প্রাণ,
তাদের মিলিত কণ্ঠে সোনার বাংলার প্রাণতুল্য প্রিয় গান।