Tag: নজরুল সঙ্গীত

  • আজ সৃষ্টি-সুখের উল্লাসে

    আজ সৃষ্টি-সুখের উল্লাসে

    আজ সৃষ্টি-সুখের উল্লাসে

      

    আজ
    সৃষ্টি সুখের উল্লাসে–
    মোর
    মুখ হাসে মোর চোখ হাসে মোর টগবগিয়ে খুন হাসে
    আজ
    সৃষ্টি সুখের উল্লাসে।

      

      
    আজকে আমার রুদ্ধ প্রাণের পল্বলে
      
    বান ডেকে ঐ জাগল জোয়ার দুয়ার – ভাঙা কল্লোলে।
      
    আসল হাসি, আসল কাঁদন
      
    মুক্তি এলো, আসল বাঁধন,
      
    মুখ ফুটে আজ বুক ফাটে মোর তিক্ত দুখের সুখ আসে।
    ওই
    রিক্ত বুকের দুখ আসে –
    আজ
    সৃষ্টি সুখের উল্লাসে।

      

      
    আসল উদাস, শ্বসল হুতাশ
      
    সৃষ্টি-ছাড়া বুক-ফাটা শ্বাস,
      
    ফুললো সাগর দুললো আকাশ ছুটলো বাতাস,
      
    গগন ফেটে চক্র ছোটে, পিণাক-পাণির শূল আসে!
      
    ওই   ধূমকেতু আর উল্কাতে
      
    চায়   সৃষ্টিটাকে উল্টাতে,
    আজ
    তাই দেখি আর বক্ষে আমার লক্ষ বাগের ফুল হাসে
    আজ
    সৃষ্টি সুখের উল্লাসে।

      

      
    আজ   হাসল আগুন, শ্বসল ফাগুন,
      
          মদন মারে খুন-মাখা তূণ
      
          পলাশ অশোক শিমুল ঘায়েল
      
          ফাগ লাগে ঐ দিক-বাসে
      
    গো    দিগ বালিকার পীতবাসে;
    আজ
    রঙন এলো রক্তপ্রাণের অঙ্গনে মোর চারপাশে
    আজ
    সৃষ্টি সুখের উল্লাসে!
      
    আজ   কপট কোপের তূণ ধরি,
      
    ওই   আসল যত সুন্দরী,
      
    কারুর পায়ে বুক-ডলা খুন, কেউ বা আগুন,
      
    কেউ মানিনী চোখের জলে বুক ভাসে।
      
    তাদের প্রাণের বুক-ফাটে-তাও-মুখ-ফোটে-না
      
    বাণীর বীণা মোর পাশে,
    ওই
    তাদের কথা শোনাই তাদের
      
    আমার চোখে জল আসে
    আজ
    সৃষ্টি সুখের উল্লাসে
      
    আজ আসল ঊষা, সন্ধ্যা, দুপুর,
      
    আসল নিকট, আসল সুদূর
      
    আসল বাধা-বন্ধ-হারা ছন্দ-মাতন
      
    পাগলা-গাজন-উচ্ছ্বাসে!
    ওই
    আসল আশিন শিউলি শিথিল
      
    হাসল শিশির দুবঘাসে
    আজ
    সৃষ্টি সুখের উল্লাসে–

      

      
    আজ জাগল সাগর, হাসল মরু
      
    কাঁপল ভূধর, কানন তরু
      
    বিশ্ব-ডুবান আসল তুফান, উছলে উজান
      
  • পিছু-ডাক

    পিছু-ডাক

    পিছু-ডাক

    সখি!
    নতুন ঘরে গিয়ে আমায় পড়বে কি আর মনে?
      
    সেথা তোমার নতুন পূজা নতুন আযোজনে!
      
          প্রথম দেখা তোমায় আমায়
      
          যে গৃহ-ছায় যে আঙিনায়,
      
          যেথায় প্রতি ধূলি-কণায়,
      
                    লতাপাতার সনে –
      
    নিত্য চেনার বিত্ত রাজে চিত্ত-আরাধনে,
      
    শূন্য সে ঘর শূন্য এখন কাঁদছে নিরজনে।

      

    সেথা
    তুমি যখন ভুলতে আমায়, আসত অনেক কেহ,
    তখন
    আমার হয়ে অভিমানে কাঁদত যে ঐ গেহ।
      
              যেদিক পানে চাইতে সেথা
      
              বাজতে আমার স্মৃতির ব্যথা,
      
                        নতুন আলাপনে।
      
    আমিই শুধু হারিয়ে গেলেম হারিয়ে-যাওয়ার বনে॥

      

    আমার
    এত দিনের দূর ছিল না সত্যিকারের দুর,
    ওগো
    আমার সুদুর করতে নিকট ঐ পুরাতন পুর।
      
          এখন তোমার নতুন বাঁধন
      
          নতুন হাসি, নতুন কাঁদন,
      
          নতুন সাধন, গানের মাতন
      
                    নতুন আবাহনে।
      
    আমারই সুর হারিয়ে গেল সুদুর পুরাতন।

      

    সখি!
    আমার আশাই দুরাশা আজ, তোমার বিধির বর,
    আজ
    মোর সমাধির বুকে তোমার উঠবে বাসর-ঘর!
      
          শূণ্য ভরে শুনতে পেনু
      
          ধেনু-চরা বনের বেণু-
      
           হারিয়ে গেনু হারিয়ে গেনু
      
                        অস্ত–দিগঙ্গনে।
      
    বিদায় সখি, খেলা-শেষ এই বেলা-শেষের খনে!
      
    এখন তুমি নতুন মানুষ নতুন গৃহকোণে।

      

  • মুখরা

    মুখরা

    মুখরা

    আমার
     কাঁচা মনে রং ধরেচে আজ,
      
    ক্ষমা করো মা গো আমার আর কি সাজে লাজ?
    আমার
     কাঁচা মনে রং ধরেচে আজ,

      

      
          আমার ভুবন উঠচে রেঙে
      
          তাঁর পরশের সোহাগ লেগে,
      
          ঘুমিয়ে ছিনু দেখনু জেগে মা,
    আমায়
    জড়িয়ে বুকে দাঁড়িয়ে আছেন নিখিল হৃদয়-রাজ।
      
    ক্ষমা করো মা গো আমার আর কি সাজে লাজ?

      

    আমায়
    দিনের আলোয় নিলেন বুকে আপনি লজ্জাহারী!
      
    মা গো, আমি আর কি মিথ্যা লজ্জা করে পারি?
    আমায়
    দিনের আলোয় নিলেন বুকে আপনি লজ্জাহারী।
      
          জগৎ যারে পায় না সেধে
      
          সেই সে যখন সাধছে কেঁদে
      
          আমার চরণ বক্ষে বেঁধে মা,
    আমি
    বাঁধব না চুল, এই ভালো মোর ভিখারিনির সাজ।
      
    ক্ষমা করো মা গো আমার আর কি সাজে লাজ?

      

    আমার
    কীসের সজ্জা, কীসের লজ্জা, কীসের পরানপণ?
    মা গো
    বক্ষে আমার বিশ্বলোকের চির-চাওয়া ধন,
    আমার
    কীসের সজ্জা, কীসের লজ্জা, কীসের পরানপণ?

      

      
          বিশ্ব-ভুবন যার পদছায়
      
          সেই এসে হায় মোর পদ চায়,
    আমার
    সুখ-আবেগে বুক ফেটে যায় মা,
    আজ
    লাজ ভুলেছি, সাজ ভুলেছি, ভুলেছি সব কাজ।
      
    ক্ষমা করো মা গো আমার আর কি সাজে লাজ?

      

  • সাধের ভিখারিণী

    সাধের ভিখারিণী

    সাধের ভিখারিণী

    তুমি
    মলিন বাসে থাক যখন, সবার চেয়ে মানায়!
    তুমি
    আমার তরে ভিখারিনি, সেই কথা সে জানায়!
      
          জানি প্রিয়ে জানি জানি,
      
          তুমি হতে রাজার রানি,
      
          খাটত দাসী, বাজত বাঁশি
      
              তোমার বালাখানায়
    তুমি
    সাধ করে আজ ভিখারিনি, সেই কথা সে জানায়।

      

    দেবী!
    তুমি সতী অন্নপূর্ণা, নিখিল তোমার ঋণী,
    শুধু
    ভিখারিকে ভালোবেসে সাজলে ভিখারিনি
      
          সব ত্যজি মোর হলে সাথি,
      
          আমার আশায় জাগছ রাতি,
      
          তোমার পূজা বাজে আমার
      
              হিয়ার কানায় কানায়!
    তুমি
    সাধ করে আজ ভিখারিনি, সেই কথা সে জানায়।

      

  • কবি-রাণী

    কবি-রাণী

    কবি-রাণী

    তুমি আমায় ভালোবাসো তাই তো আমি কবি।

    আমার এ রূপ-সে যে তোমায় ভালোবাসার ছবি॥

    আপন জেনে হাত বাড়ালো-

    আকাশ বাতাস প্রভাত-আলো,

    বিদায়-বেলার সন্ধ্যা-তারা

    পুবের অরুণ রবি,—

    তুমি ভালোবাস ব’লে ভালোবাসে সবি?

      

    আমার আমি লুকিয়েছিল তোমার ভালোবাসায়,

    আমার আশা বাইরে এল তোমার হঠাৎ আসায়।

    তুমিই আমার মাঝে আসি

    অসিতে মোর বাজাও বাঁশি,

    আমার পূজার যা আয়োজন

    তোমার প্রাণের হবি।

    আমার বাণী জয়মাল্য, রাণি! তোমার সবই।

      

    তুমি আমায় ভালোবাস তাই তো আমি কবি।

    আমার এ রূপ-সে যে তোমার ভালোবাসার ছবি।

      

  • আশা

    আশা

    আশা

    আমি
    শ্রান্ত হয়ে আসব যখন পড়ব দোরে টলে,
    আমার
    লুটিয়ে-পড়া দেহ তখন ধরবে কি ওই কোলে?
      
          বাড়িয়ে বাহু আসবে ছুটে?
      
          ধরবে চেপে পরানপুটে?
      
          বুকে রেখে চুমবে কি মুখ
      
                নয়নজলে গলে?
    আমি
    শ্রান্ত হয়ে আসব যখন পড়ব দোরে টলে!

      

    তুমি
    এতদিন যা দুখ দিয়েছ হেনে অবহলা,
    তা
    ভুলবে না কি যুগের পরে ঘরে-ফেরার বেলা?
      
          বলো বলো জীবন-স্বামী
      
          সেদিনও কি ফিরব আমি
      
          অন্তকালেও ঠাঁই পাব না
      
                ওই চরণের তলে?
    আমি
    শ্রান্ত হয়ে আসব যখন পড়ব দোরে টলে!

      

  • তূর্য-নিনাদ

    তূর্য-নিনাদ

    তূর্য-নিনাদ

    [গান]

    কোরাস :
    (আজ) ভারত-ভাগ্য-বিধাতার বুকে গুরু-লাঞ্ছনা-পাষাণ-ভার,
    আর্ত-নিনাদে হাঁকিছে নকিব, – কে করে মুশকিল আসান তার?

    মন্দির আজি বন্দির ঘানি,

    নির্জিত ভীত সত্য, বদ্ধ রুদ্ধ স্বাধীন আত্মার বাণী,

    সন্ধি-মহলে ফন্দির ফাঁদ, গভীর আন্ধি-অন্ধকার!

    হাঁকিছে নকিব – হে মহারুদ্র চূর্ণ করো এ ভণ্ডাগার॥

    রক্তে-মদের বিষ পান করি

    আর্ত মানব; স্রষ্টা কাতর সৃষ্টির তাঁর নির্বাণ স্মরি!

    ক্রন্দন-ঘন বিশ্বে স্বনিছে প্রলয়-ঘটার হুহুংকার, –

    হাঁকিছে নকিব – অভয়-দেবতা, এ মহাপাথার করহ পার॥

    কোলাহল-ঘাঁটা হলাহল-রাশি

    কে নীলকণ্ঠ গ্রাসিবে রে আজ দেবতার মাঝে দেবতা সে আসি?

    উরিবে কখন ইন্দিরা, ক্রোড়ে শান্তির ঝারি সুধার ভাঁড়?

    হাঁকিছে নকিব – আনো ব্যথা-ক্লেশ-মন্থন-ধন অমৃত-ধার॥

    কণ্ঠ ক্লিষ্ট ক্রন্দন-ঘাতে,

    অমৃত-অধিপ নর-নারায়ণ দারুময় ঘন মনোবেদনাতে।

    দশভুজে গলে শৃঙ্খল-ভার দশপ্রহরণধারিণী মার –

    হাঁকিছে নকিব – ‘আবিরাবির্ম এধি’ হে নব যুগাবতার!

    মৃত্যু-আহত মৃত্যুঞ্জয়,

    কে শোনাবে তাঁরে চেতন-মন্ত্র? কে গাহিবে জয় জীবনের জয়?

    নয়নের নীরে কে ডুবাবে বলো বলদর্পীর অহংকার? –

    হাঁকিছে নকিব – সে দিন বিশ্বে খুলিবে আরেক তোরণ-দ্বার॥

  • বোধন

    বোধন

    বোধন1

    [গান]

    দুঃখ কী ভাই, হারানো সুদিন ভারতে আবার আসিবে ফিরে,

    দলিত শুষ্ক এ মরুভূ পুন হয়ে গুলিস্তাঁ হাসিবে ধীরে॥

    কেঁদো না, দমো না, বেদনা-দীর্ণ এ প্রাণে আবার আসিবে শক্তি,

    দুলিবে শুষ্ক শীর্ষে তোমারও সবুজ প্রাণের অভিব্যক্তি।

    জীবন-ফাগুন যদি মালঞ্চ-ময়ূর তখতে আবার বিরাজে,

    শোভিবেই ভাই, ওই তো সেদিন, শোভিবে এ শিরও পুষ্প-তাজে॥

    হোয়ো না নিরাশ, অজানা যখন ভবিষ্যতের সব রহস্য,

    যবনিকা-আড়ে প্রহেলিকা-মধু, – বীজেই সুপ্ত স্বর্ণ শস্য!

    অত্যাচার আর উৎপীড়নে সে আজিকে আমার পর্যুদস্ত,

    ভয় নাই ভাই! ওই যে খোদার মঙ্গলময় বিপুল হস্ত!

    দুঃখ কী ভাই, হারানো সুদিন ভারতে আবার আসিবে ফিরে,

    দলিত শুষ্ক এ মরুভূ পুন হয়ে গুলিস্তাঁ হাসিবে ধীরে॥

    দুদিনের তরে গ্রহ-ফেরে ভাই সব আশা যদি না হয় পূর্ণ,

    নিকট সেদিন, রবে না এদিন, হবে জালিমের গর্ব চূর্ণ!

    পুণ্য-পিয়াসী যাবে যারা ভাই মক্কার পূত তীর্থ লভ্যে;

    কণ্টক-ভয়ে ফিরবে বা তারা বরং পথেই জীবন সঁপবে।

    দুঃখ কী ভাই, হারানো সুদিন ভারতে আবার আসিবে ফিরে,

    দলিত শুষ্ক এ মরুভূ পুন হয়ে গুলিস্তাঁ হাসিবে ধীরে॥

    অস্তিত্বের ভিত্তি মোদের বিনাশেও যদি ধ্বংস-বন্যা,

    সত্য মোদের কাণ্ডারি ভাই, তুফানে আমরা পরোয়া করি না।

    যদিও এ পথ ভীতি-সংকুল, লক্ষ্যস্থলও কোথায় দূরে,

    বুকে বাঁধো বল, ধ্রুব-অলক্ষ্য আসিবে নামিয়া অভয় তূরে।

    দুঃখ কী ভাই, হারানো সুদিন ভারতে আবার আসিবে ফিরে,

    দলিত শুষ্ক এ মরুভূ পুন হয়ে গুলিস্তাঁ হাসিবে ধীরে॥

    অত্যাচার আর উৎপীড়নে সে আজিকে আমরা পর্যুদস্ত,

    ভয় নাই ভাই! রয়েছে খোদার মঙ্গলময় বিপুল হস্ত!

    কী ভয় বন্দি, নিঃস্ব যদিও, অমার আঁধারে পরিত্যক্ত,

    যদি রয় তব সত্য-সাধনা স্বাধীন জীবন হবেই ব্যক্ত!

    দুঃখ কী ভাই হারানো সুদিন ভারতে আবার আসিবে ফিরে,

    দলিত শুষ্ক এ মরুভূ পুন হয়ে গুলিস্তাঁ হাসিবে ধীরে॥

  • উদ্বোধন

    উদ্বোধন

    [গান]
    বাজাও প্রভু বাজাও ঘন বাজাও
    ভীম
    বজ্র-বিষাণে দুর্জয় মহা-আহ্বান তব,
    বাজাও!
    অগ্নি-তূর্য কাঁপাক সূর্য
    বাজুক রুদ্রতালে ভৈরব–
    দুর্জয় মহা-আহ্বান তব, বাজাও!
    নট-মল্লার দীপক-রাগে
    জ্বলুক তাড়িত-বহ্নি আগে
    ভেরীর
    রন্ধ্রে মেঘমন্দ্রে জাগাও বাণী জাগ্রত নব।
    দুর্জয় মহা-আহ্বান তব, বাজাও!
    দাসত্বের এ ঘৃণ্য তৃপ্তি
    ভিক্ষুকের এ লজ্জা-বৃত্তি,
    বিনাশো
    জাতির দারুণ এ লাজ, দাও তেজ দাও মুক্তি-গরব।
    দুর্জয় মহা-আহ্বান তব, বাজাও!
    খুন দাও নিশ্চল এ হস্তে
    শক্তি-বজ্র দাও নিরস্ত্রে;
    শীর্ষ
    তুলিয়া বিশ্বে মোদেরও দাঁড়াবার পুন দাও গৌরব–
    দুর্জয় মহা-আহ্বান তব, বাজাও!
    ঘুচাতে ভীরুর নীচতা দৈন্য
    প্রেরো হে তোমার ন্যায়ের সৈন্য
    শৃঙ্খলিতের টুটাতে বাঁধন আনো আঘাত প্রচণ্ড আহব।

    দুর্জয় মহা-আহ্বান তব, বাজাও!
    নির্বীর্য এ তেজঃ-সূর্যে
    দীপ্ত করো হে বহ্নি-বীর্যে,
    শৌর্য
    ধৈর্য মহাপ্রাণ দাও, দাও স্বাধীনতা সত্য বিভব!
    দুর্জয় মহা-আহ্বান তব, বাজাও!
  • অভয়-মন্ত্র

    অভয়-মন্ত্র

    অভয়-মন্ত্র

    [গান]
      
       বল,      নাহি ভয়, নাহি ভয়!
      
       বল,      মাভৈঃ মাভৈঃ, জয় সত্যের জয়!
    কোরাস :
       বল,      হউক গান্ধি বন্দি, মোদের সত্য বন্দি নয়।
      
       বল,      মাভৈঃ মাভৈঃ পুরুষোত্তম জয়।
      
       তুই      নির্ভর কর আপনার পর,
      
                আপন পতাকা কাঁধে তুলে ধর!
    ওরে
    যে যায় যাক সে, তুই শুধু বল, ‘আমার হয়নি লয়’!
      
       বল,      ‘আমি আছি’, আমি পুরুষোত্তম, আমি চির-দুর্জয়।
      
       বল,      নাহি ভয়, নাহি ভয়,
      
       বল,      মাভৈঃ মাভৈঃ, জয় সত্যের জয়। …

      

      
       তুই      চেয়ে দেখ ভাই আপনার মাঝে,
      
                সেথা জাগ্রত ভগবান রাজে,
    নিজ
    বিধাতারে মান, আকাশ গলিয়া ক্ষরিবে রে বরাভয়!
    তোর
    বিধাতার ধাতা বিধাতা, বিধাতা কারারুদ্ধ কি হয়?
      
       বল,      নাহি ভয়, নাহি ভয়,
      
       বল,      মাভৈঃ মাভৈঃ, জয় সত্যের জয়। …

      

      
       আজ      বক্ষের তোর ক্ষীরোদ-সাগরে
      
                অচেতন নারায়ণ ঘুম-ঘোরে
    শুধু
    লক্ষ্মীর ভোগ লক্ষ্য তাঁহার, নয় কিছুতেই নয়!
    তোর
    অচেতন চিতে জাগারে চেতনা নারায়ণ চিন্ময়।
      
       বল,      নাহি ভয়, নাহি ভয়,
      
       বল,      মাভৈঃ মাভৈঃ, জয় সত্যের জয়। …

      

      
       ওই      নির্যাতকের বন্দি-কারায়
      
                সত্য কি কভু শক্তি হারায়?
    ক্ষীণ
    দুর্বল বলে খণ্ড ‘আমি’র হয় যদি পরাজয়,
    ওরে
    অখণ্ড আমি চির-মুক্ত সে, অবিনাশী অক্ষয়!
      
       বল,      নাহি ভয়, নাহি ভয়,
      
       বল,      মাভৈঃ মাভৈঃ, জয় সত্যের জয়। …

      

      
       ওরে      সত্য যে চির-স্বয়ম্ প্রকাশ,
      
                রোধিবে কি তারে কারাগার-ফাঁস?
    ওই
    অত্যাচারীর সত্য পীড়ন? আছে তার আছে ক্ষয়!
    সেই
    সত্য মোদের ভাগ্য-বিধাতা, যাঁর হাতে শুধু রয়।
      
       বল,      নাহি ভয়, নাহি ভয়,
    বল,  মাভৈঃ মাভৈঃ, জয় সত্যের জয়। …
      
       যে      গেল সে নিজেরে নিঃশেষ করি
      
                তাদের পাত্র দিয়া গেল ভরি!
    ওই
    বন্ধু মৃত্যু পারেনিকো তাঁরে পারেনি করিতে লয়!
    তাই
    আমাদের মাঝে নিজেরে বিলায়ে সে আজ শান্তিময়!
      
       বল,      নাহি ভয়, নাহি ভয়,
      
       বল,      মাভৈঃ মাভৈঃ, জয় সত্যের জয়। …

      

      
       ওরে      রুদ্র তখনই ক্ষুদ্রেরে গ্রাসে
      
                আগেই যবে সে মরে থাকে ত্রাসে,
    ওরে
    আপনার মাঝে বিধাতা জাগিলে বিশ্বে সে নির্ভয়!
    ওই
    শূদ্র-কারায় কভু কি ভয়াল ভৈরব বাঁধা রয়?
      
       বল,      নাহি ভয়, নাহি ভয়,
      
       বল,      মাভৈঃ মাভৈঃ, জয় সত্যের জয়। …

      

      
       ওই      টুটে-ফেটে-পড়া লোহার শিকল,
      
                ভগবানে বেঁধে করিবে বিকল?
    ওই
    কারা ওই বেড়ি কভু কি বিপুল বিধাতার ভার সয়?
    ওরে
    যে হয় বন্দি হতে দে, শক্তি আত্মার আছে জয়।
      
       বল,      নাহি ভয়, নাহি ভয়,
      
       বল,      মাভৈঃ মাভৈঃ, জয় সত্যের জয়। …

      

      
       ওরে      আত্ম-অবিশ্বাসী, ভয়-ভীত!
      
                কেন হেন ঘন অবসাদচিত?
    বল
    পর-বিশ্বাসে পর-মুখপানে চেয়ে কি স্বাধীন হয়?
    তুই
    আত্মাকে চিন, বল ‘আমি আছি’, ‘সত্য আমার জয়’!
      
       বল,      নাহি ভয়, নাহি ভয়,
      
       বল,      মাভৈঃ মাভৈঃ, জয় সত্যের জয়।
      
       বল,      হউক গান্ধি বন্দি, মোদের সত্য বন্দি নয়!
  • আত্মশক্তি

    আত্মশক্তি

    আত্মশক্তি

    [গান]

    এসো বিদ্রোহী মিথ্যা-সূদন আত্মশক্তি বুদ্ধ বীর!

    আনো উলঙ্গ সত্যকৃপাণ, বিজলি-ঝলক ন্যায়-অসির।

    তূরীয়ানন্দে ঘোষো সে আজ

    ‘আমি আছি’– বাণী বিশ্ব-মাঝ,

    পুরুষ-রাজ!

    সেই স্বরাজ!

    জাগ্রত করো নারায়ণ-নর নিদ্রিত বুকে মর-বাসীর;

    আত্ম-ভীতু এ অচেতন-চিতে জাগো ‘আমি-স্বামী নাঙ্গা-শির।’

    এসো প্রবুদ্ধ, এসো মহান

    শিশু-ভগবান জ্যোতিষ্মান।

    আত্মজ্ঞান-

    দৃপ্ত-প্রাণ!

    জানাও জানাও, ক্ষুদ্রেরও মাঝে রাজিছে রুদ্র তেজ রবির!!

    উদয়-তোরণে উড়ুক আত্ম-চেতন-কেতন ‘আমি-আছি’-র॥

    করহ শক্তি-সুপ্ত-মন

    রুদ্র বেদনে উদ্‌বোধন,

    হীন রোদন –

    খিন্ন-জন

    দেখুক আত্মা-সবিতার তেজ বক্ষে বিপুলা ক্রন্দসীর!

    বলো, নাস্তিক হউক আপন মহিমা নেহারি শুদ্ধ ধীর!

    কে করে কাহারে নির্যাতন

    আত্ম-চেতন স্থির যখন?

    ঈর্ষা-রণ

    ভীম-মাতন

    পদাঘাত হানে পঞ্জরে শুধু আত্ম-বল-অবিশ্বাসীর,

    মহাপাপী সেই, সত্য যাহার পর-পদানত আনত শির॥

    জাগাও আদিম স্বাধীন প্রাণ,

    আত্মা জাগিলে বিধাতা চান।

    কে ভগবান? –

    আত্ম-জ্ঞান!

    গাহে উদ্‌গাতা ঋত্বিক গান অগ্নি-মন্ত্র শক্তি-শ্রীর।

    না জাগিলে প্রাণে সত্য চেতনা, মানি না আদেশ কারও বাণীর!

    এসো বিদ্রোহী তরুণ তাপস আত্মশক্তিবুদ্ধ বীর,

    আনো উলঙ্গ সত্য-কৃপাণ বিজলি-ঝলক ন্যায়-অসির॥

  • মরণ-বরণ

    মরণ-বরণ

    মরণ-বরণ

    [গান]
    এসো এসো এসো ওগো মরণ!
    এই
    মরণ-ভীতু মানুষ-মেষের ভয় করো তো হরণ॥
    না বেরিয়েই পথে যারা পথের ভয়ে ঘরে
    বন্ধ-করা অন্ধকারে মরার আগেই মরে,
    তাতা থইথই তাতা থইথই তাদের বুকের পরে
    ভীম
    রুদ্রতালে নাচুক তোমার ভাঙন-ভরা চরণ॥
    দীপক রাগে বাজাও জীবন-বাঁশি,
    মড়ার মুখেও আগুন উঠুক হাসি।
    কাঁধে পিঠে কাঁদে যেথা শিকল জুতোর-ছাপ,
    নাই সেখানে মানুষ সেথা বাঁচা-ও মহাপাপ।
    সে
    দেশের বুকে শ্মশান-মশান জ্বালুক তোমার শাপ,
    সেথা
    জাগুক নবীন সৃষ্টি আবার হোক নব নামকরণ॥
    হাতের তোমার দণ্ড উঠুক কেঁপে
    এবার দাসের ভুবন ভবন ব্যেপে,
    মেষগুলোকে শেষ করে দেশ-চিতার বুকে নাচো!
    শব করে আজ শয়ন, হে শিব জানাও তুমি আছ।
    মরায়-ভরা ধরায়, মরণ! তুমিই শুধু বাঁচো –
    এই
    শেষের মাঝেই অশেষ তুমি, করছি তোমায় বরণ॥
    জ্ঞান-বুড়ো ওই বলছে জীবন মায়া,
    নাশ করো ওই ভীরুর কায়া ছায়া!
    মুক্তিদাতা মরণ! এসো কালবোশেখির বেশে;
    মরার আগেই মরল যারা, নাও তাদেরে এসে।
    জীবন তুমি সৃষ্টি তুমি জরা-মরার দেশে,
    তাই
    শিকল-বিকল মাগছে তোমার মরণ-হরণ শরণ॥
  • বন্দি-বন্দনা

    বন্দি-বন্দনা

    বন্দি-বন্দনা

    [গান]
    আজি
    রক্ত-নিশি-ভোরে
    একী এ শুনি ওরে,
    মুক্তি-কোলাহল বন্দি-শৃঙ্খলে,
    ওই
    কাহারা কারাবাসে
    মুক্তি-হাসি হাসে,
    টুটেছে ভয়-বাধা স্বাধীন হিয়া-তলে॥
    ললাটে লাঞ্ছনা-রক্ত-চন্দন,
    বক্ষে গুরু শিলা, হস্তে বন্ধন,
    নয়নে ভাস্বর সত্য-জ্যোতি-শিখা,
    স্বাধীন দেশ-বাণী কণ্ঠে ঘন বোলে,
    সে ধ্বনি ওঠে রণি ত্রিংশ কোটি ওই
    মানব-কল্লোলে॥
    ওরা
    দু-পায়ে দলে গেল মরণ-শঙ্কারে,
    সবারে ডেকে গেল শিকল-ঝংকারে,
    বাজিল নভ-তলে স্বাধীন ডঙ্কারে,
    বিজয়-সংগীত বন্দি গেয়ে চলে,
    বন্দিশালা মাঝে ঝঞ্ঝা পশেছে রে
    উতল কলরোলে॥
    আজি
    কারার সারা দেহে মুক্তি-ক্রন্দন,
    ধ্বনিছে হাহা স্বরে ছিঁড়িতে বন্ধন,
    নিখিল গেহ যথা বন্দি-কারা, সেথা
    কেন রে কারা-ত্রাসে মরিবে বীর-দলে।
    ‘জয় হে বন্ধন’ গাহিল তাই তারা
    মুক্ত নভ-তলে॥
    আজি
    ধ্বনিছে দিগ্‌বধূ শঙ্খ দিকে দিকে,
    আজি
    গগনে কারা যেন চাহিয়া অনিমিখে,
    ধু ধু ধু হোম-শিখা জ্বলিল ভারতে রে,
    ললাটে জয়টিকা, প্রসূন-হার-গলে
    চলে রে বীর চলে;
    সে নহে নহে কারা, যেখানে ভৈরব-
    রুদ্র-শিখা জ্বলে॥
    কোরাস :
    জয় হে বন্ধন-মৃত্যু-ভয়-হর! মুক্তিকামী জয়।
    স্বাধীন-চিত জয়। জয় হে
    জয় হে! জয় হে! জয় হে!
  • বন্দনা-গান

    বন্দনা-গান

    বন্দনা-গান

    [গান]
    কোরাস :
    শিকলে যাদের উঠেছে বাজিয়া বীরের মুক্তি-তরবারি,
    আমরা তাদেরই ত্রিশ কোটি ভাই, গাহি বন্দনা-গীতি তারি॥
    তাদেরই উষ্ণ শোণিত বহিছে আমাদেরও এই শিরা-মাঝে,
    তাদেরই সত্য-জয়-ঢাক আজি মোদেরই কণ্ঠে ঘন বাজে।
    সম্মান নহে তাহাদের তরে ক্রন্দন-রোল দীর্ঘশ্বাস,
    তাহাদেরই পথে চলিয়া মোরাও বরিব ভাই ওই বন্দি-বাস॥
    শিকলে যাদের উঠেছে বাজিয়া বীরের মুক্তি-তরবারি,
    আমরা তাদেরই ত্রিশ কোটি ভাই, গাহি বন্দনা-গীতি তারি॥
    মুক্ত বিশ্বে কে কার অধীন? স্বাধীন সবাই আমরা ভাই।
    ভাঙিতে নিখিল অধীনতা-পাশ মেলে যদি কারা, বরিব তাই।
    জাগেন সত্য ভগবান যে রে আমাদেরই এই বক্ষ-মাঝ,
    আল্লার গলে কে দেবে শিকল, দেখে নেব মোরা তাহাই আজ॥
    শিকলে যাদের উঠেছে বাজিয়া বীরের মুক্তি-তরবারি,
    আমরা তাদেরই ত্রিশ কোটি ভাই, গাহি বন্দনা-গীতি তারি॥
    কাঁদিব না মোরা, যাও কারা-মাঝে যাও তবে বীর-সংঘ হে,
    ওই শৃঙ্খলই করিবে মোদের ত্রিশ কোটি ভ্রাতৃ-অঙ্গ হে।
    মুক্তির লাগি মিলনের লাগি আহুতি যাহারা দিয়াছে প্রাণ
    হিন্দু-মুসলিম চলেছি আমরা গাহিয়া তাদেরই বিজয়-গান॥
    শিকলে যাদের উঠেছে বাজিয়া বীরের মুক্তি-তরবারি,
    আমরা তাদেরই ত্রিশ কোটি ভাই, গাহি বন্দনা-গীতি তারি॥
  • মুক্তি-সেবকের গান

    মুক্তি-সেবকের গান

    মুক্তি-সেবকের গান

    [গান]

    ও ভাই
    মুক্তিসেবক দল!
    তোদের
    কোন্ ভায়ের আজ বিদায়-ব্যথায় নয়ান ছল-ছল?
    ওই
    কারা-ঘর তো নয় হারা-ঘর,
    হোথাই মেলে মা-র-দেওয়া বর রে!
    ওরে
    হোথাই মেলে বন্দিনী মা-র বুক-জড়ানো কোল!
    তবে
    কীসের রোদনরোল?
    তোরা
    মোছ রে আঁখির জল।
    ও ভাই
    মুক্তিসেবক দল!।

    আজ
    কারায় যারা, তাদের তরে।
    গৌরবে বুক উঠুক ভরে রে!
    মোরা
    ওদের মতোই বেদনা ব্যথা মৃত্যু আঘাত হেসে
    বরণ যেন করতে পারি মাকে ভালোবেসে।
    ওরে
    স্বাধীনকে কে বাঁধতে পারে বল?
    ও ভাই
    মুক্তিসেবক দল!

    ও ভাই
    প্রাণে যদি সত্য থাকে তোর
    মরবে নিজেই মিথ্যা, ভীরু চোর।
    মোরা
    কাঁদব না আজ যতই ব্যথায় পিষুক কলজে-তল।
    মুক্তকে কি রুখতে পারে অসুর পশুর দল?
    মোরা
    কাঁদব যেদিন আসবে তারা আবার ফিরে রে,
    কাঙালিনি মায়ের আমার এই আঙিনা-তল।
    ও ভাই
    মুক্তিসেবক দল॥
  • শিকল-পরার গান

    শিকল-পরার গান

    শিকল-পরার গান

    এই
    শিকল-পরা ছল মোদের এ শিকল-পরা ছল।
    এই
    শিকল পরেই শিকল তোদের করব রে বিকল॥
    তোদের
    বন্ধ কারায় আসা মোদের বন্দি হতে নয়,
    ওরে
    ক্ষয় করতে আসা মোদের সবার বাঁধন-ভয়।
    এই
    বাঁধন পরেই বাঁধন-ভয়কে করব মোরা জয়,
    এই
    শিকলবাঁধা পা নয় এ শিকলভাঙা কল॥
    তোমার
    বন্ধ ঘরের বন্ধনীতে করছ বিশ্ব গ্রাস,
    আর
    ত্রাস দেখিয়েই করবে ভাবছ বিধির শক্তি হ্রাস।
    সেই
    ভয়-দেখানো ভূতের মোরা করব সর্বনাশ,
    এবার
    আনব মাভৈঃ-বিজয়মন্ত্র বলহীনের বল॥
    তোমরা
    ভয় দেখিয়ে করছ শাসন, জয় দেখিয়ে নয়;
    সেই
    ভয়ের টুঁটিই ধরব টিপে, করব তারে লয়।
    মোরা
    আপনি মরে মরার দেশে আনব বরাভয়,
    মোরা
     ফাঁসি পরে আনব হাসি মৃত্যু-জয়ের ফল॥
    ওরে
    ক্রন্দন নয়, বন্ধন এই শিকল-ঝঞ্ঝনা,
    এ যে
    মুক্তি-পথের অগ্রদূতের চরণ-বন্দনা।
    এই
    লাঞ্ছিতেরাই অত্যাচারকে হানছে লাঞ্ছনা,
    মোদের
    অস্থি দিয়েই জ্বলবে দেশে আবার বজ্রানল॥
  • মুক্ত-বন্দি

    মুক্ত-বন্দি

    মুক্ত-বন্দি2

    [গান]

    বন্দি তোমায় ফন্দি-কারার গণ্ডিমুক্ত বন্দিবীর,

    লঙ্ঘিলে আজি ভয়দানবের ছয় বছরের জয়প্রাচীর।

    বন্দি তোমায় বন্দিবীর

    জয় জয়স্তু বন্দিবীর!!

    অগ্রে তোমার নিনাদে শঙ্খ, পশ্চাতে কাঁদে ছয়-বছর,

    অম্বরে শোনো ডম্বরু বাজে–‘অগ্রসর হও, অগ্রসর!’

    কারাগার ভেদি নিশ্বাস ওঠে বন্দিনী কোন্ ক্রন্দসীর,

    ডান-আঁখে আজ ঝলকে অগ্নি, বাম-আঁখে ঝরে অশ্রু-নীর।

    বন্দি তোমায় ফন্দি-কারার গণ্ডি-মুক্ত বন্দি-বীর,

    লঙ্ঘিলে আজি ভয়-দানবের ছয় বছরের জয়প্রাচীর।

    বন্দি তোমায় বন্দিবীর

    জয় জয়স্তু বন্দিবীর!!

    পথতরুছায় ডাকে ‘আয় আয়’ তব জননীর আর্ত স্বর,

    এ আগুন-ঘরে কাঁপিল সহসা ‘সপ্তদশ সে বৈশ্বানর’।

    আগমনি তব রণদুন্দুভি বাজিছে বিজয়-ভৈরবীর,

    জয় অবিনাশী উল্কা-পথিক চিরসৈনিক উচ্চশির।

    বন্দি তোমায় ফন্দি-কারার গণ্ডিমুক্ত বন্দিবীর,

    লঙ্ঘিলে আজি ভয়-দানবের ছয় বছরের জয়প্রাচীর।

    বন্দি তোমায় বন্দিবীর

    জয় জয়স্তু বন্দিবীর!!

    রুদ্ধ-প্রতাপ হে যুদ্ধবীর, আজি প্রবুদ্ধ নব বলে।

    ভুলো না বন্ধু, দলেছ দানব যুগে যুগে তব পদতলে!

    এ নহে বিদায়, পুন হবে দেখা অমর-সমর-সিন্ধুতীর,

    এসো বীর এসো, ললাটে এঁকে দি অশ্রুতপ্ত লাল রুধির।

    বন্দি তোমায় ফন্দি-কারার গণ্ডিমুক্ত বন্দি-বীর,

    লঙ্ঘিলে আজি ভয়-দানবের ছয় বছরের জয়প্রাচীর।

    বন্দি তোমায় বন্দিবীর

    জয় জয়স্তু বন্দিবীর!!

  • যুগান্তরের গান

    যুগান্তরের গান

    যুগান্তরের গান

    [গান]

    বলো ভাই মাভৈঃ মাভৈঃ

    নবযুগ ওই এল ওই

    এল ওই রক্ত-যুগান্তর রে।

    বলো জয় সত্যের জয়

    আসে ভৈরব-বরাভয়

    শোন অভয় ওই রথ-ঘর্ঘর রে॥

    রে বধির! শোন পেতে কান

    ওঠে ওই কোন্ মহা-গান

    হাঁকছে বিষাণ ডাকছে ভগবান রে।

    জগতে জাগল সাড়া

    জেগে ওঠ উঠে দাঁড়া

    ভাঙ পাহারা মায়ার কারা-ঘর রে।

    যা আছে যাক না চুলায়

    নেমে পড় পথের ধুলায়

    নিশান দুলায় ওই প্রলয়ের ঝড় রে।

    সে ঝড়ের ঝাপটা লেগে

    ভীম আবেগে উঠনু জেগে

    পাষাণ ভেঙে প্রাণ-ঝরা নির্ঝর রে।

    ভুলেছি পর ও আপন

    ছিঁড়েছি ঘরের বাঁধন

    স্বদেশ স্বজন স্বদেশ মোদের ঘর রে।

    যারা ভাই বদ্ধ কুয়ায়

    খেয়ে মার জীবন গোঁয়ায়

    তাদের শোনাই প্রাণ-জাগা মন্তর রে।

    ঝড়ের ঝাঁটার ঝাণ্ডার নেড়ে

    মাভৈঃ-বাণীর ডঙ্কা মেরে

    শঙ্কা ছেড়ে হাঁক প্রলয়ংকর রে।

    তোদের ওই চরণ-চাপে

    যেন ভাই মরণ কাঁপে,

    মিথ্যা পাপের কণ্ঠ চেপে ধর রে।

    শোনা তোর বুক-ভরা গান,

    জাগা ফের দেশ-জোড়া প্রাণ,

    যে বলিদান প্রাণ ও আত্মপর রে॥

    মোরা ভাই বাউল চারণ,

    মানি না শাসন বারণ

    জীবন মরণ মোদের অনুচর রে।

    দেখে ওই ভয়ের ফাঁসি

    হাসি জোর জয়ের হাসি,

    অ-বিনাশী নাইকো মোদের ডর রে!

    গেয়ে যাই গান গেয়ে যাই,

    মরা-প্রাণ উটকে দেখাই

    ছাই-চাপা ভাই অগ্নি ভয়ংকর রে॥

    খুঁড়ব কবর তুড়ব শ্মশান

    মড়ার হাড়ে নাচাব প্রাণ

    আনব বিধান নিদান কালের বর রে।

    শুধু এই ভরসা রাখিস

    মরিসনি ভিরমি গেছিস

    ওই শুনেছিস ভারত-বিধির স্বর রে।

    ধর হাত ওঠ রে আবার

    দুর্যোগের রাত্রি কাবার,

    ওই হাসে মা-র মূর্তি মনোহর রে॥

  • চরকার গান

    চরকার গান

    চরকার গান

    ঘোর–
    ঘোর রে ঘোর ঘোর রে আমার সাধের চরকা ঘোর
    ওই
    স্বরাজ-রথের আগমনি শুনি চাকার শব্দে তোর॥
    তোর ঘোরার শব্দে ভাই
    সদাই শুনতে যেন পাই
    ওই
    খুলল স্বরাজ-সিংহদুয়ার, আর বিলম্ব নাই।
    ঘুরে
    আসল ভারত-ভাগ্য-রবি, কাটল দুখের রাত্রি ঘোর॥
    ঘর ঘর তুই ঘোর রে জোরে
    ঘর্ঘরঘর ঘূর্ণিতে তোর
    ঘুচুক ঘুমের ঘোর
    তুই   ঘোর ঘোর ঘোর।
    তোর
    ঘুর-চাকাতে বল-দর্পীর তোপ কামানের টুটুক জোর॥
    তুই  ভারত-বিধির দান,
    এই  কাঙাল দেশের প্রাণ,
    আবার
    ঘরের লক্ষ্মী আসবে ঘরে শুনে তোর ওই গান।
    আর
    লুটতে নারবে সিন্ধু-ডাকাত বৎসরে পঁয়ষট্টি ক্রোড়॥
    হিন্দু-মুসলিম দুই সোদর,
    তাদের মিলন-সূত্র-ডোর রে
    রচলি চক্রে তোর,
    তুই  ঘোর ঘোর ঘোর।
    আবার
    তোর মহিমায় বুঝল দু-ভাই মধুর কেমন মায়ের ক্রোড়॥
    ভারত  বস্ত্রহীন যখন
    কেঁদে  ডাকল – নারায়ণ!
    তুমি
    লজ্জা-হারী করলে এসে লজ্জা নিবারণ,
    তাই
    দেশ-দ্রৌপদীর বস্ত্র হরতে পারল না দুঃশাসন-চোর॥
    এই   সুদর্শন-চক্রে তোর
    অত্যাচারীর টুটল জোর রে ছুটল সব গুমোর
    তুই   ঘোর ঘোর ঘোর।
    তুই
    জোর জুলুমের দশম গ্রহ, বিষ্ণু-চক্র ভীম কঠোর॥
    হয়ে   অন্ন বস্ত্র হীন
    আর   ধর্মে কর্মে ক্ষীণ
    দেশ
    ডুবছিল ঘোর পাপের ভারে যখন দিনকে দিন,
    তখন
    আনলে অন্ন পুণ্য-সুধা, খুললে স্বর্গ মুক্তি-দোর॥
    শাসতে জুলুম নাশতে জোর
    খদ্দর-বাস বর্ম তোর রে অস্ত্র সত্যডোর,
    তুই   ঘোর ঘোর ঘোর।
    মোরা
    ঘুমিয়ে ছিলাম, জেগে দেখি চলছে চরকা, রাত্রি ভোর॥
    তুই   সাত রাজারই ধন,
    দেশ-   মা-র পরশ-রতন,
    তোর
    স্পর্শে মেলে স্বর্গ অর্থ কাম মোক্ষ ধন।
    তুই
    মায়ের আশিস, মাথার মানিক, চোখ ছেপে বয় অশ্রু-লোর॥
  • জাতের বজ্জাতি

    জাতের বজ্জাতি

    জাতের বজ্জাতি

    [গান]

    জাতের নামে বজ্জাতি সব জাত-জালিয়াত খেলছে জুয়া
    ছুঁলেই তোর জাত যাবে? জাত ছেলের হাতের নয় তো মোয়া॥
    হুঁকোর জল আর ভাতের হাঁড়ি, ভাবলি এতেই জাতির জান,
    তাই তো বেকুব, করলি তোরা এক জাতিকে একশো-খান!
     এখন দেখিস ভারত-জোড়া
     পচে আছিস বাসি মড়া,
    মানুষ নাই আজ, আছে শুধু জাত-শেয়ালের হুক্কাহুয়া॥
    জানিস না কি ধর্ম সে যে বর্মসম সহনশীল,
    তাকে কি ভাই ভাঙতে পারে ছোঁয়া-ছুঁয়ির ছোট্ট ঢিল।
     যে জাত-ধর্ম ঠুনকো এত,
     আজ নয় কাল ভাঙবে সে তো,
    যাক না সে জাত জাহান্নামে, রইবে মানুষ, নাই পরোয়া॥
    দিন-কানা সব দেখতে পাসনে দণ্ডে দণ্ডে পলে পলে
    কেমন করে পিষছে তোদের পিশাচ জাতের জাঁতাকলে।
     (তোরা) জাতের চাপে মারলি জাতি,
     সূর্য ত্যজি নিলি বাতি,
    তোদের
    জাত-ভগীরথ এনেছে জল জাত-বিজাতের জুতো-ধোয়া॥
    মনু ঋষি অণুসমান বিপুল বিশ্বে যে বিধির,
    বুঝলি না সেই বিধির বিধি, মনুর পায়েই নোয়াস শির।
     ওরে মূর্খ ওরে জড়,
     শাস্ত্র চেয়ে সত্য বড়ো,
    (তোরা)
    চিনলিনে তা চিনির বলদ, সার হল তাই শাস্ত্র বওয়া॥
    সকল জাতই সৃষ্টি যে তাঁর, এই বিশ্ব মায়ের বিশ্ব-ঘর,
    মায়ের ছেলে সবাই সমান, তাঁর কাছে নাই আত্ম-পর।
    (তোরা) সৃষ্টিকে তাঁর ঘৃণা করে
    স্রষ্টায় পূজিস জীবন ভরে
    ভস্মে ঘৃত ঢালা সে যে বাছুর মেরে গাভি দোওয়া॥
    বলতে পারিস বিশ্বপিতা ভগবানের কোন সে জাত?
    কোন ছেলের তাঁর লাগলে ছোঁয়া অশুচি হন জগন্নাথ?
     নারায়ণের জাত যদি নাই,
     তোদের কেন জাতের বালাই?
    (তোরা)
    ছেলের মুখে থুথু দিয়ে মার মুখে দিস ধূপের ধোঁয়া॥
    ভগবানের ফৌজদারি-কোর্ট নাই সেখানে জাতবিচার,
    (তোর)
    পইতে টিকি টুপি টোপর সব সেথা ভাই একাক্কার।
     জাত সে শিকেয় তোলা রবে,
     কর্ম নিয়ে বিচার হবে,
    (তা-পর)
    বামুন চাঁড়াল এক গোয়ালে, নরক কিংবা স্বর্গে থোয়া॥
    (এই)
    আচার-বিচার বড়ো করে প্রাণ দেবতায় ক্ষুদ্র ভাবা,
    (বাবা)
    এই পাপেই আজ উঠতে বসতে সিঙ্গি-মামার খাচ্ছ থাবা।
     তাই নাইকো অন্ন নাইকো বস্ত্র,
     নাইকো সম্মান, নাইকো অস্ত্র,
    (এই)
    জাত-জুয়াড়ির ভাগ্যে আছে আরও অশেষ দুঃখ-সওয়া॥