Category: তাহের আলমাহদী

  • জাকির নায়িক বক্তৃতামালা

    জাকির নায়িক বক্তৃতামালা

    [book]

    মূল: ডা. জাকির নায়িক

    অনুবাদ: তাহের আলমাহদী

    ভূমিকা

    ‘জাকির আবদুল করিম নায়িক’ ভারতীয় বংশোদ্ভূত ইসলামী চিন্তাবিদ, ধর্মপ্রচারক, বক্তা ও লেখক; তিনি ‘ডাক্তার জাকির নায়িক’ নামেই সমধিক বিখ্যাত। তিনি ইসলাম ও তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব বিষয়ে কাজ করেন, তিনি তাঁর কাজের সুবিধার্থে ‘ইসলামিক রিসার্চ ফাউণ্ডেশন’ প্রতিষ্ঠা করেন, অলাভজনক এই প্রতিষ্ঠান কর্তৃক বিভিন্ন ভাষায় ‘পিস টিভি নেটওয়ার্ক’ পরিচালিত হয়ে থাকে।

    জাকির আবদুল করিম নায়েক ১৮ অক্টোবর ১৯৬৫ সালে ভারতের মহারাষ্ট্রের মুম্বাইয়ে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি মুম্বাইয়ের সেন্ট পিটার্স হাই স্কুলের ছাত্র ছিলেন। এরপর তিনি কিশিনচাঁদ চেল্লারাম কলেজে ভর্তি হন। তিনি মেডিসিনের ওপর টোপিওয়ালা ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ অ্যান্ড নাইর হসপিটালে ভর্তি হন। অতঃপর, তিনি ইউনিভার্সিটি অফ মুম্বাই থেকে ব্যাচেলর অব মেডিসিন সার্জারি বা এমবিবিএস ডিগ্রি অর্জন করেন।

    ১৯৮৭ সালে বিখ্যাত ইসলাম প্রচারক ‘আহমদ দিদাতে’র সাথে তিনি সাক্ষাৎ করেন, তাঁর দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে ১৯৯১ সালে তিনি ইসলাম প্রচার শুরু করেন এবং আইআরএফ প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর স্ত্রী ফারহাত নায়েক, ইসলামিক রিসার্চ ফাউণ্ডেশনের (IRF) নারী শাখায় কাজ করেন। এই কারণে তাঁকে ‘আহমদ প্লাস’ বলা হয়ে থাকে।

    এছাড়াও তিনি মুম্বাইয়ের ইসলামিক ইন্টারন্যাশনাল স্কুল এবং ইউনাইটেড ইসলামিক এইডের প্রতিষ্ঠাতা, যা দরিদ্র ও অসহায় মুসলিম তরুণ-তরুণীদের বৃত্তি প্রদান করে থাকে।

    ‘ইসলামিক রিসার্চ ফাউণ্ডেশনে’র ওয়েবসাইটে তাকে “পিস টিভি নেটওয়ার্কের পৃষ্ঠপোষক ও আদর্শিক চালিকাশক্তি” হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। এই চ্যানেলটি ‘সমগ্র মানবতার জন্য সত্য, ন্যায়বিচার, নৈতিকতা, সৌহার্দ্য ও জ্ঞানের’ প্রচারের লক্ষ্যে কাজ করে বলে এর ওয়েবসাইটে উল্লেখ করা হয়েছে।

    ২০১৬ সালে, একটি প্রেস কনফারেন্সে, জাকির নিজেকে নন-রেজিস্ট্যান্ট ইন্ডিয়ান (এনআরআই) বা বছরের অর্ধেকের বেশি সময় প্রবাসে বসবাসকারী ভারতীয় হিসেবে দাবি করেন।

    নায়েক বর্তমানে মালেশিয়ায় স্থায়ী নাগরিকত্ব নিয়ে বসবাস করছেন।

    ‘পিস টিভি’ নেটওয়ার্কের মাধ্যমে তাঁর বক্তৃতা প্রায় দশ কোটি দর্শকের নিকট পৌঁছে যায়। তাকে ‘তুলনামূলক ধর্মতত্ত্বের একজন বিশেষজ্ঞ’, ‘অনুমেয়ভাবে ভারতের সালাফি মতাদর্শের অনুসারী সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তি’, ‘টেলিভিশনভিত্তিক-ধর্মপ্রচারণার রকস্টার এবং আধুনিক ইসলামের একজন পৃষ্ঠপোষক’ এবং ‘পৃথিবীর শীর্ষস্থানীয় ইসলাম ধর্মপ্রচারক’ বলা হয়ে থাকে। বহু ইসলামি ধর্মপ্রচারকদের সাথে তার ভিন্নতা হল, তার বক্তৃতাগুলো পারস্পারিক আলাপচারিতা ও প্রশ্নোত্তরভিত্তিক, যা তিনি আরবি কিংবা উর্দুতে নয় বরং ইংরেজি ভাষায় প্রদান করেন, এবং অধিকাংশ সময়েই তিনি ঐতিহ্যগত আলখাল্লার পরিবর্তে স্যুট-টাই পরিধান করে থাকেন।

    পেশাগত জীবনে তিনি একজন চিকিৎসক হলেও ১৯৯১ সাল থেকে তিনি ইসলাম ধর্ম প্রচারে মনোনিবেশ করেন। ইসলাম এবং তুলনামূলক ধর্মতত্ত্বের উপর তার বক্তৃতাসমূহ পুস্তকাকারে প্রকাশিত হয়েছে এবং সেগুলো বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়েছে।

    তিনি প্রকাশ্যে ইসলামে শ্রেণীবিভাজনকে অস্বীকার করে থাকেন, তবুও অনেকে তাকে সালাফি মতাদর্শের সমর্থক বলে মনে করেন এবং অনেকে তাঁকে ‘ওয়াহাবি মতবাদ প্রচারকারী’ একজন ‘আমূল-সংস্কারবাদী’ ইসলামিক ‘টেলিভেগানিস্ট’ বা ‘তহবিল সংগ্রহকারী টেলিভিশন ধর্মপ্রচারক’ বলে সমালোচনা করে থাকেন। বর্তমানে ভারত, কানাডা, যুক্তরাজ্য ও বাংলাদেশে তাঁর ধর্মপ্রচার নিষিদ্ধ। বলা হয়ে থাকে যে, মুসলিম সম্প্রদায়ের বাইরের তুলনায় এর ভেতরেই তাঁর সমালোচকের সংখ্যা বেশি।

    ‘ডা. জাকির নায়িক’ শাইখ মোহাম্মাদ রাশিদ আল মাখতুম এ্যাওয়ার্ড ফর ওয়ার্ল্ড পিস কর্তৃক  ‘ইসলামিক পারসোনালিটি অব ২০১৩’, মালয়েশিয়ার রাষ্ট্রপ্রধান টুয়ানকু আব্দুল হালিম মুয়াদজাম শাহ ‘ডিস্টিংগুইশড ইন্টারন্যাশনাল পারসোনালিটি এওয়ার্ড’, শারজাহ শাসক সুলতান বিন মোহাম্মেদ আল কাশিমি কর্তৃক ‘শারজাহ এওয়ার্ড ফর ভলান্টারি ওয়ার্ক, ২০১৪’, গাম্বিয়ার রাষ্ট্রপতি ইয়াহিয়া জাম্মেহ কর্তৃক ‘ইন্সাইনিয়া অব দ্য কমান্ডার অব দ্য ন্যাশনাল অর্ডার অব দ্য রিপাবলিক অব দ্য গাম্বিয়া’, গাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক ‘অনারারি ডক্টরেট (ডক্টর অব হিউম্যান লেটারস)’, রাজকীয় সাউদী আরব কর্তৃক ‘বাদশাহ ফয়সাল আন্তর্জাতিক পুরস্কার’ লাভ করেন।

    মুসলিম বিশ্বে ব্যাপক জনপ্রিয় হলেও জাকির নায়েক তার বক্তব্য ও মতের জন্য বিভিন্ন স্থানে সমালোচিত হয়েছেন। এমনকি মুসলিম সম্প্রদায়ের একাংশ তাঁর প্রতি বিরূপ মনোভাব পোষণ করেন।

    ২০১৬ সালে ‘হুসনি টাইগার’ নামক স্বঘোষিত শিয়া দল কর্তৃক জাকির নায়েকের মাথার বিনিময়ে ১৫ লাখ রুপি পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছিল। একই সালের ১৩ জুলাই, ‘বিশ্ব হিন্দু পরিষদের নেত্রী’ ‘সাধ্বী প্রাচী’ জাকির নায়েকের শিরশ্ছেদকারীকে ৫০ লক্ষ রুপি পুরস্কার দেওয়ার ঘোষণা করেন।

    জাকির নায়েকের বিভিন্ন সময়ের প্রদত্ত বক্তৃতায় বিভিন্ন সম্প্রদায়ের আমন্ত্রিত ও অনামন্ত্রিত শ্রোতৃগণ অংশগ্রহণ করেন। তার উল্লেখযোগ্য বক্তৃতা পরবর্তীতে মূল ইংরেজিসহ একাধিক ভাষায় বই হিসাবে প্রকাশিত হয়েছে। জাকির নায়িকের প্রকাশিত বক্তৃতামালা বাংলায় অনূদিত হয়েছে, এর মধ্যে বাছাই করা গ্রন্থগুলোর সমন্বয়ে ‘জাকির নায়িক বক্তৃতামালা’ বা ‘জাকির নায়িক লেকচার সমগ্র’ বা ‘জাকির নায়িক উপদেশ সমগ্র’ নামে গ্রন্থ সঙ্কলিত হয়েছে।

  • অমুসলিমদের সচরাচর জিজ্ঞাসার জবাব

    অমুসলিমদের সচরাচর জিজ্ঞাসার জবাব

    [book]

    অমুসলিমদের সচরাচর জিজ্ঞাসার জবাব

    [REPLIES TO THE MOST COMMON QUESTIONS ASKED BY NON-MUSLIMS]

    ডঃ জাকির নায়েক কর্তৃক আন্তর্জাতিক দা’ওয়াহ প্রশিক্ষণ কর্মসূচির ধারণা, বিকাশ ও পরিচালনা

    ভূমিকা

    দাওয়াহ একটি কর্তব্য

    আরবী ‘দাওয়াহ’ শব্দের অর্থ ‘আহ্বান’ বা ‘আমন্ত্রণ’। ইসলামী প্রেক্ষাপটে এর অর্থ  অমুসলিমদের ইসলামের দাওয়াত দেওয়া বা ইসলাম প্রচার করা।

    ইসলাম একটি সার্বজনীন ধর্ম, যা সমগ্র মানবজাতির জন্য। আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) হলেন সমগ্র মহাবিশ্বের প্রভু, এবং মুসলমানদেরকে সমস্ত মানবজাতির কাছে তাঁর বাণী পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছে।

    মহিমান্বিত কুরআন বলে:

    ٱدْعُ إِلَىٰ سَبِيلِ رَبِّكَ بِٱلْحِكْمَةِ وَٱلْمَوْعِظَةِ ٱلْحَسَنَةِ ۖ وَجَـٰدِلْهُم بِٱلَّتِى هِىَ أَحْسَنُ ۚ … ١٢٥

    আপনি মানুষকে আপনার রবের পথে আহ্বান করুন প্রজ্ঞা (হিকমাহ) ও সদুপদেশ দ্বারা এবং তাদের সাথে আলোচনা করুন উত্তমপন্থায়।

    — আলকুরআন, সূরা নাহল, আয়াত ১২৫।

    দাওয়াতের কৌশল

    অমুসলিমদের দাওয়াত দেওয়ার বিভিন্ন কৌশল রয়েছে। এমনকি যদি একজন মুসলিম ইসলাম সম্পর্কে হাজারটা ভাল কথা বলে, তবুও অধিকাংশ অমুসলিম ইসলামের সত্যতা সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারবে না কারণ তাদের মনের পেছনে ইসলাম সম্পর্কে কিছু প্রশ্ন আছে যেগুলোর উত্তর পাওয়া যায় না।

    তারা ইসলামের ইতিবাচক প্রকৃতির সাথে একমত হতে পারে। কিন্তু, তাৎক্ষণিক তারা বলবে— “আহ! অথচ আপনারা সেই মুসলিম যারা মৌলবাদী, যারা সন্ত্রাসী। আপনি সেই মুসলিম যারা একাধিক নারীকে বিয়ে করেন। আপনারা সেই একই মানুষ যারা নারীদেরকে পর্দার আড়ালে রেখে অবরোধবাসিনী করে রাখেন, ইত্যাদি।”

    আমি ব্যক্তিগতভাবে অমুসলিমকে জিজ্ঞাসা করতে পছন্দ করি, তিনি ইসলামের ভুল কী বলে মনে করেন। তাদের সীমিত জ্ঞান দ্বারা, সঠিক বা ভুল, যেকোন উৎস থেকেই হোক না কেন, আমি সরাসরি জিজ্ঞাসা করতে পছন্দ করি, তারা ইসলামে কী ভুল বলে মনে করেন। আমি তাদের খুব অকপট এবং খোলামেলা হতে উত্সাহিত করি এবং তাদের বোঝাই যে আমি ইসলাম সম্পর্কে সমালোচনা সহ্য করতে পারি।

    কুড়িটি অতি সাধারণ প্রশ্ন

    আমার বিগত কয়েক বছরের দাওয়াতের অভিজ্ঞতায় বুঝতে পেরেছি যে, ইসলাম সম্পর্কে একজন সাধারণ অমুসলিমের বিশটি সাধারণ প্রশ্নও নেই। যখনই আপনি একজন অমুসলিমকে জিজ্ঞেস করেন, “ইসলামে আপনার কি ভুল মনে হয়?” তিনি পাঁচ বা ছয়টি প্রশ্ন করেন এবং এই প্রশ্নগুলি সর্বদাই বিশটি সাধারণ প্রশ্নের মধ্যে পড়ে।

    যৌক্তিক জবাব সংখ্যাগরিষ্ঠকে বোঝাতে সক্ষম

    ইসলাম সম্পর্কে বিশটি অতি সাধারণ প্রশ্নের উত্তর প্রজ্ঞা ও যুক্তি দিয়ে দেওয়া যেতে পারে। অধিকাংশ অমুসলিম এইসকল উত্তর দ্বারা প্রভাবিত হতে পারেন। একজন মুসলমান যদি এই উত্তরগুলো মুখস্থ করেন বা সহজভাবে মনে রাখেন, ইনশাআল্লাহ তিনি সফল হবেন; যদি অমুসলিমদের ইসলামের সম্পূর্ণ সত্য সম্পর্কে বোঝাতে না পারেন, তবে অন্তত ইসলাম সম্পর্কে অমুসলিমদের ভুল ধারণা দূর করতে এবং ইসলাম ও মুসলমান সম্পর্কে নেতিবাচক চিন্তাভাবনা বিরত রাখতে পারবেন। খুব অল্প সংখ্যক অমুসলিম এই উত্তরগুলির পাল্টা জবাব দিতে পারেন, যার জন্য আরও তথ্যের প্রয়োজন হতে পারে।

    সময়ের ব্যবধানে ভুল ধারণা পরিবর্তন হয়

    ইসলামের বিরুদ্ধে সবচেয়ে সাধারণ প্রশ্নগুলো বিভিন্ন সময় ও যুগে পরিবর্তিত হয়েছে। সঙ্কলিত এই বিশটি সর্বাধিক সাধারণ প্রশ্ন বর্তমান সময়ের উপর ভিত্তি করে। কয়েক দশক আগে, প্রশ্নগুলি ভিন্ন ছিল এবং কয়েক দশক পরেও এই প্রশ্নগুলি পরিবর্তন হতে পারে মিডিয়া ইসলামকে কিভাবে প্রক্ষেপণ করে তার উপর ভিত্তি করে।

    বিশ্বেজুড়ে অভিন্ন ভুল ধারণা

    আমি বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করেছি এবং বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষের সাথে আলোচনা করেছি। সারা বিশ্বের সাধারণ অমুসলিমদের দ্বারা জিজ্ঞাসা করা ইসলাম সম্পর্কে এই বিশটি সর্বাধিক সাধারণ প্রশ্ন একই।

    অঞ্চলভেদে সম্পূরক প্রশ্ন হতে পারে

    স্থানভেদে কয়েকটি সম্পূরক প্রশ্ন থাকতে পারে, উদাহরণ স্বরূপ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে, অতিরিক্ত প্রশ্ন ছিল; ইসলাম কেন সুদের লেনদেন হারাম করেছে?

    কিছু সাধারণ প্রশ্ন ভারতীয় অমুসলিমদের মধ্যে নির্দিষ্ট

    আমি সর্বাধিক জিজ্ঞাসিত বিশটি সাধারণ প্রশ্নের মধ্যে ভারতীয় অমুসলিমদের মধ্যে প্রচলিত কিছু প্রশ্ন অন্তর্ভুক্ত করেছি। যেমন, মুসলমানেরা আমিষ খায় কেন? কারণ এই যে, ভারতীয় বংশোদ্ভূত লোকেদের পরিমাণ প্রায় বিশ শতাংশ অর্থাৎ বিশ্বের জনসংখ্যার এক পঞ্চমাংশ এবং ভারতীয় বংশোদ্ভূত লোকেরা সারা বিশ্বে ছড়িয়ে রয়েছে, এইভাবে সারা বিশ্বে অমুসলিমদের মধ্যেও এই প্রশ্নগুলি সাধারণ হয়ে উঠেছে।

    মিডিয়ার কারণে ভুল ধারণা

    অধিকাংশ অমুসলিমের মনে ইসলাম সম্পর্কে ভুল ধারণা উদিত হয় মিডিয়ার কারণে, কেননা, মিডিয়া তাদের উপর ক্রমাগত ইসলাম সম্পর্কে ভুল তথ্যের বোমাবর্ষণ করতে থাকে। আন্তর্জাতিক মিডিয়া প্রধানত পশ্চিমা বিশ্বের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়, তা আন্তর্জাতিক স্যাটেলাইট চ্যানেল, রেডিও স্টেশন, সংবাদপত্র, ম্যাগাজিন বা বইই হোক না কেন। সম্প্রতি ইন্টারনেট তথ্যের একটি শক্তিশালী মাধ্যম হয়ে ওঠেছে। যদিও এটি ব্যক্তিবিশেষ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত নয়, তবুও ইন্টারনেটে ইসলাম সম্পর্কে একটি বিশাল পরিমাণ ভয়ানক প্রচারণা পাওয়া যায়। অবশ্য মুসলমানেরাও ইসলাম ও মুসলমানদের সঠিক ভাবমূর্তি তুলে ধরতে এই হাতিয়ার ব্যবহার করছেন, কিন্তু ইসলামের বিরুদ্ধে অপপ্রচারের তুলনায় তারা অনেক পিছিয়ে রয়েছেন। আমি আশা করি মুসলমানদের প্রচেষ্টা আরও বাড়বে এবং অব্যাহত থাকবে।

  • কিতাবুত তাওহীদ : তাওহীদের মাসায়েল

    কিতাবুত তাওহীদ : তাওহীদের মাসায়েল

    কিতাবুত তাওহীদ বা তাওহীদের মাসায়েল, উর্দু ভাষায় লিখিত তাফহীমুস্‌ সুন্নাহ সিরিজের প্রথম কিতাব। উর্দু নাম, তাওহীদ কি মাসায়েল; লেখক, মুহাম্মদ ইকবাল ইবনে ইদরীস কীলানী; ব্যবস্থাপক, হারুনুর রশিদ কিলানী; প্রকাশক, হাদীস পাবলিকেশন্স, ২ শিটমহল রোড, লাহোর; প্রথম প্রকাশ, জানুয়ারি ১৯৯৭। বাংলায় কিতাবটির একাধিক অনুবাদ প্রকাশিত হয়েছে। অনূদিত গ্রন্থগুলোর মধ্যে সবচেয়ে প্রচলিত মুহাম্মদ হারুন আযিযী নদভীর অনুবাদ। এটি প্রকাশ করেছে দারুস-সালাম, রিয়াদ, সাউদী আরব। এডুলিচারের জন্য গ্রন্থটি অনুবাদ করেছেন তাহের আলমাহদী। ধর্মীয় গ্রন্থের সাহিত্যমান থাকা জরুরি নয়, এমন একটি ভুল ধারণা প্রচলিত আছে। যে কোন গ্রন্থেরই সাহিত্যমান থাকা জরুরি। তার উৎকৃষ্ট প্রমাণ পবিত্র কুরআনুল কারীম। সাহিত্যমানের বিবেচনা করেই কিতাবটিকে অনুবাদে হাত দিয়েছেন তাহের আলমাহদী। আশাকরি, তার অনূদিত গ্রন্থটি যেকোন পাঠকের ভাল লাগবে।

    মহান আল্লাহর নিকট প্রার্থনা, গ্রন্থটির লেখক ও অনূবাদককে তিনি কবুল করুন এবং অনূদিত গ্রন্থটির মাধ্যমে বাংলাভাষী পাঠকদের আক়ীদায়ে তাওহীদকে মজবুত করুন। আমীন!

    ( ءَأَرْبَابٌۭ مُّتَفَرِّقُونَ خَيْرٌ أَمِ ٱللَّهُ ٱلْوَٰحِدُ ٱلْقَهَّارُ ) ٣٩

    ভিন্ন ভিন্ন বহু রব উত্তম, না মহাপ্রতাপশালী এক আল্লাহ্‌?

    —সূরা ইউসুফ, আয়াত ৩৯

    ⁑          ⁑          ⁑

    تَعَــالَوْا إِلىٰ كَلِمَــةٍ سَوَاءٍ بَيْنَنـا وَ بَيْنَكُــمْ

    হে মানুষ! এমন এক কালিমার দিকে এসো যা তোমাদের ও আমাদের মাঝে অভিন্ন।

    • ওহে বনি ইসরাঈল! তোমাদের বিশ্বাস যে, উজাইর আলাইহিস সালাম আল্লাহর পুত্র ছিলেন এবং এটাও স্বীকার কর যে, তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন। কখনও তোমরা বিবেচনা করেছ কি, আল্লাহর সত্তা হচ্ছে “হাইয়্যু” ও “কাইউম” এবং তাঁর পুত্রেরও এইসব গুণাবলী থাকা উচিত ছিল, তবে উজাইর আলাইহিস সালামের মৃত্যু হ’ল কেন? যিনি মৃত্যুবরণ করেন তিনি কি করে আল্লাহর পুত্র হতে পারেন?
    • ওহে মরিয়ম পুত্র ঈসা আলাইহিস সালামের অনুসারীগণ! তোমরা বিশ্বাস কর যে, ঈসা আলাইহিস সালাম আল্লাহর পুত্র এবং এটাও স্বীকার কর যে, তাঁকে ক্রুশ বিদ্ধ করা হয়েছে। কখনও চিন্তা করে দেখেছ কি, আল্লাহ সর্বশক্তিমান ও যে কারও উপর প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হওয়ার পরও তাঁর পুত্র এত দুর্বল ও অসহায় কেন ছিলেন যে তাঁকে ক্রুশে চড়ানো হয়েছিল, যাকে ক্রুশে চড়িয়ে হত্যা করা যায় তিনি কি করে আল্লাহর পুত্র হতে পারেন?
    • ওহে হিন্দুগণ! তোমরা তো তেত্রিশ কোটি দেবতায় বিশ্বাস কর। তোমাদের প্রত্যেকে আলাদা আলাদা দেবতা রাখে, যেন, একেক জনের জন্য একেক দেবতা যারা নিজ নিজ ভক্তের প্রয়োজন মেটাতে এবং আকাঙ্ক্ষাপূর্ণ করতে সক্ষম। যেন বাকী বত্রিশ কোটি নিরানব্বই লক্ষ নিরানব্বই হাজার নয়শত নিরানব্বই জন দেবতা তার প্রয়োজন মেটাতে অক্ষম। কখনও ভেবেছ কি, বত্রিশ কোটি নিরানব্বই লক্ষ নিরানব্বই হাজার নয়শত নিরানব্বই জন দেবতা যেখানে প্রয়োজন মেটাতে ও আকাঙ্ক্ষাপূর্ণ করতে সক্ষম নন, তাহলে একজন কি করে সক্ষম হবেন?
    • ওহে বৌদ্ধগণ! তোমাদের বিশ্বাস যে, গৌতম বুদ্ধ মহাসত্যের সন্ধানে বছরের পর বছর মাঠে, জঙ্গলে, মরুভূমিতে পড়েছিলেন। কখনও কি ভেবেছ যে ব্যক্তি মহাসত্যের সন্ধানে দীর্ঘ সময় ঘুরে বেড়ালেন তিনি কি করে মহাসত্য হতে পারেন?
    • ওহে নিষ্পাপ ইমামদের অনুসারীগণ! তোমরা বিশ্বাস কর যে, জগতের ছোট বড় সকল কিছু ইমামের আদেশের অধীন এবং তোমাদের দাবী হচ্ছে, ‘আহলে বাইতে’র উপর যা মসিবত ও দুঃখ-দুর্দশা এসেছিল ওই সব কিছু এসেছিল আবু বাকার রাদি আল্লাহু তা’য়ালা আনহু ও উমর রাদি আল্লাহু তা’য়ালা আনহুর কারণে। একবারও কি ভেবে দেখেছ যে, জগতের ছোট বড় সব কিছু যাদের হুকুমের অধীন তাদের উপর মসিবত ও দুঃখ-দুর্দশা কী করে আসতে পারে? আর যাঁর উপর মসিবত ও দুঃখ-দুর্দশা আসতে পারে তিনি কী করে পৃথিবীর সব কিছুর উপর হুকুমদাতা ও সর্বশক্তিমান হন কী করে?
    • ওহে বুজুর্গানে দীন ও আওলিয়াদের অনুসারীগণ! তোমরা বিশ্বাস কর যে, আলী হাজওয়েরী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি মানুষকে ভাণ্ডার দিয়ে থাকেন; খাজা মঈনুদ্দীন চিশতী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি তুফান থেকে মুক্তি দান করে থাকেন; আবদুল ক়াদীর জিলানী রহমাতুল্লাহি আলাইহি যাবতীয় বালা-মসিবত দূর করে থাকেন; ইমাম বরী রহমাতুল্লাহি আলাইহি হতভাগাকে ভাগ্যবান করে থাকেন এবং সুলতান বাহু রহমাতুল্লাহি আলাইহি ছেলে সন্তান দান করে থাকেন। কখনও কি চিন্তা করে দেখেছ, যখন আলী হাজওয়েরী রহমাতুল্লাহি আলাইহি ছিলেন না তখন ভাণ্ডার কে দান করতেন? যখন মুঈনুদ্দীন চিশতী রহমাতুল্লাহি আলাইহি ছিলেন না তখন তুফান থেকে মুক্তি দিতেন কে? যখন আবদুল ক়াদির জিলানী রহমাতুল্লাহি আলাইহি ছিলেন না তখন বালা-মসিবত কে দূর করতেন? যখন ইমাম বরী রহমাতুল্লাহি আলাইহি ছিলেন না তখন হতভাগাকে ভাগ্যবান কে করতেন? যখন সুলতান বাহু রহমাতুল্লাহি আলাইহি ছিলেন না তখন সন্তান কে দান করতেন?
    • ওহে দুনিয়ার মানুষ! আমার কথা মনোযোগ দিয়ে শোনো! আল্লাহ তায়ালা অবতীর্ণ শিক্ষায় কখনও স্ববিরোধ থাকতে পারে না। কিন্তু তোমাদের আকাইদ ও চিন্তাধারায় থাকা স্ববিরোধ এটা প্রমাণ করে যে, তোমাদের আকাইদ ও চিন্তাধারা আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে অবতীর্ণ নয়।

    অতএব, হে দুনিয়ার মানুষ! এমন এক কালিমার দিকে এসো—

    • যার শিক্ষায় কোন স্ববিরোধ নেই;
    • যা মানব জাতির আত্মাকে প্রশান্তি ও দেহকে মুক্তি দান করে;
    • যা মানব জাতিকে মর্যাদা, সম্মান ও মহত্ত্ব প্রদান করে;
    • যা মানব জাতিকে শান্তি ও নিরাপত্তা, সাম্য ও ন্যায়বিচার, সাম্য ও স্বাধীনতা; ভাতৃত্ব ও ভালবাসা ইত্যাদি উচ্চমানের মানবীয় গুণাবলীর নিশ্চয়তা প্রদান করে;
    • যা মানব জাতিকে জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তি দেয়।

    সেই এক মাত্র কালিমা হলো—

    لآَ إِلٰــهَ إِلاَّ اللهٌ

    আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই।

  • তাওহীদের আকীদা

    তাওহীদের আকীদা

    তাওহীদের আকীদা

    أَلْحَمْـدُ لِلّٰهِ رَبِّ الْعَـالَـمِيْنَ وَ الصَّلاَةُ وَ السَّـلاَمُ عَلـىٰ رَسُـوْلِهِ الاَمِيْـن وَ الْعَاقِبَــةُ لِلْمُتَّقَيْنَ

    সমস্ত প্রশংসা বিশ্বজগতের পালনকর্তা আল্লাহর জন্য, এবং তাঁর বিশ্বস্ত রসূলের উপর সালাত ও শান্তি বর্ষিত হোক এবং মুক্তাকিনদের সর্বোত্তম বিনিময় লাভ হোক। অতঃপর—

    ক়িয়ামাতের দিন মানুষের মুক্তি নির্ধারিত হবে দুটি বিষয়ের ভিত্তিতে। এক. ঈমান ও দুই. আমল সালিহ বা সৎকর্ম। ঈমান হচ্ছে আল্লাহর সত্তার প্রতি বিশ্বাস, রিসালাত ও আখিরাতের প্রতি বিশ্বাস, ফিরিশতা ও কিতাব সমূহের প্রতি বিশ্বাস, তাক়দীরের ভাল মন্দের উপর বিশ্বাস। রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বরকতময় নির্দেশ হচ্ছে— ‘ঈমানের সত্তরটির বেশি শাখা রয়েছে, এর মধ্যে সর্বোত্তম শাখা হল— لآَ إِلٰــهَ إِلاَّ اللهٌ (লা ইলাহা ইল্লালাহু—আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই) বলা। (সহীহ বুখারী)। অর্থাৎ ঈমানের ভিত্তি হল কালিমা তাওহীদ।

    আমল সালিহ বা সৎকর্ম হচ্ছে সেই কর্মসমূহ যেগুলো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহিস সালামের সুন্নাহ মুতাবিক করা হয়ে থাকে। নিঃসন্দেহে, পারলৌকিক মুক্তির জন্য সৎকর্ম অনেক গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু তাওহীদের আক়ীদা ও সৎকর্ম—এতদোভয়ের মধ্যে তাওহীদের আক়ীদা সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব বহন করে।

    ক়িয়ামাতের দিন তাওহীদের আকীদা থাকলে কর্মের অপূর্ণতা ও ত্রুটি-বিচ্যূতি ক্ষমাযোগ্য হতে পারে, কিন্তু তাওহীদের আকীদায় বিকৃতি (কাফিরানা, মুশরিকানা বা তাওহীদে শির্কের মিশ্রণ) থাকলে জমিন-আসমান সমান সৎকর্মও অকেজো ও অনর্থক সাব্যস্ত হবে। সূরা আলে ইমরানে আল্লাহ তা’য়ালা বলেছেন যে, কাফিরেরা যদি পৃথিবী সমান সোনাও সদকা করে ঈমান বিহীন অবস্থায় এই সৎকর্ম আল্লাহর নিকট ক়বুল হবে না। আল্লাহ বলেছেন—

    ( إِنَّ ٱلَّذِينَ كَفَرُوا۟ وَمَاتُوا۟ وَهُمْ كُفَّارٌۭ فَلَن يُقْبَلَ مِنْ أَحَدِهِم مِّلْءُ ٱلْأَرْضِ ذَهَبًۭا وَلَوِ ٱفْتَدَىٰ بِهِۦٓ ۗ أُو۟لَـٰٓئِكَ لَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌۭ وَمَا لَهُم مِّن نَّـٰصِرِينَ ) ٩١

    ‘নিশ্চয়ই যারা কুফরী করে এবং সেই কাফির অবস্থায়ই মারা যায়, তাদের কেউ (নিজেকে শাস্তি থেকে বাঁচানোর জন্য) পৃথিবী-ভরা স্বর্ণও বিনিময় স্বরূপ প্রদান করতে চাইলে তা তার কাছ থেকে কক্ষণও গ্রহণ করা হবে না। এরাই তারা যাদের জন্য যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি রয়েছে এবং তাদের কোন সাহায্যকারী নেই। (সূরাহ আলি-ইমরান, আয়াত : ৯১)।

    অতএব, শুধু তাদের সৎকর্ম বিনষ্ট হয়ে যাবে তাই নয় বরং কুফুরী আকীদার কারণে তাদেরকে কষ্টদায়ক সাজাও প্রদান করা হবে। এবং কেউ তাদের সাহায্য বা তাদের জন্য কোন সুপারিশও করতে পারবে না। সূরা আনআমে নবীদের পবিত্র জামায়াত ইবরাহীম, ইসহাক, ইয়াকুব, নূহ, দাউদ, সুলাইমান, আইউব, ইউসুফ, মূসা, হারুন, জাকারিয়া, ইয়াহইয়া, ইসমাইল, ইয়াসা, ইউনুস, লূত আলাইহিস সালামের উল্লেখ করে আল্লাহ পাক বলেন,—

    ( وَلَوْ أَشْرَكُوا۟ لَحَبِطَ عَنْهُم مَّا كَانُوا۟ يَعْمَلُونَ ) ٨٨

    ‘তারা যদি শিরক করত তবে তাদের সব কৃতকর্ম বিনষ্ট হয়ে যেত।’ (সূরা আন’আম, আয়াত : ৮৮)।

    শিরকের নিন্দায় পবিত্র কুরআন মাজীদের আরও কতিপয় আয়াত লক্ষ্য করুন—

    ( وَلَقَدْ أُوحِىَ إِلَيْكَ وَإِلَى ٱلَّذِينَ مِن قَبْلِكَ لَئِنْ أَشْرَكْتَ لَيَحْبَطَنَّ عَمَلُكَ وَلَتَكُونَنَّ مِنَ ٱلْخَـٰسِرِينَ ) ٦٥

    ‘এবং আপনার কাছে আর আপনার পূর্ববর্তীদের কাছে ওয়াহী করা হয়েছে যে, “আপনি যদি (আল্লাহর) শরীক স্থির করেন, তাহলে আপনার কর্ম অবশ্য অবশ্যই নিস্ফল হয়ে যাবে, আর আপনি অবশ্য অবশ্যই ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবেন।”’ —সূরা জুমার, আয়াত ৬৫।

    ( فَلَا تَدْعُ مَعَ ٱللَّهِ إِلَـٰهًا ءَاخَرَ فَتَكُونَ مِنَ ٱلْمُعَذَّبِينَ ) ٢١٣

    ‘কাজেই আপনি অন্য কোন ইলাহকে আল্লাহর সঙ্গে ডাকবেন না। ডাকলে আপনি শাস্তিপ্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবেন।’ —সূরা শূ’আরা, আয়াত ৩১৩।

    উল্লিখিত দু’টি আয়াতে আল্লাহ তা’য়ালা তাঁর প্রিয় নবী সাইয়্যেদুল মুরসালীন মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহিস সালামকে সম্বোধন করে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলেন— আপনিও যদি শিরক করেন তাহলে আপনার সকল সৎকর্ম ধ্বংস হয়ে যাবে এবং অন্যদের সাথে আপনাকেও শাস্তি প্রদান করা হবে।

    সূরা মায়েদায় ঘোষণা করা হয়েছে—

    ( إِنَّهُۥ مَن يُشْرِكْ بِٱللَّهِ فَقَدْ حَرَّمَ ٱللَّهُ عَلَيْهِ ٱلْجَنَّةَ وَمَأْوَىٰهُ ٱلنَّارُ ) ٧٢

    ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর সঙ্গে অংশীস্থাপন করে তার জন্য আল্লাহ অবশ্যই জান্নাত হারাম করে দিয়েছেন আর তার আবাস হল জাহান্নাম।’ — সূরা মা’য়িদাহ, আয়াত ৭২।

    সূরা নিসার একটি আয়াতে আল্লাহ তা’য়ালা বলেন—

    ( إِنَّ ٱللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَن يُشْرَكَ بِهِۦ وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَٰلِكَ لِمَن يَشَآءُ ) ١١٦

    ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর সঙ্গে শরীক করাকে ক্ষমা করেন না, এছাড়া অন্য সব যাকে ইচ্ছে মাফ করেন।’ — সুরা নিসা আয়াত ১১৬।

    এই দুটি আয়াত দ্বারা স্পষ্ট হয়ে গেল যে, আল্লাহ তা’য়ালার সাথে শরীক করা অমার্জনীয় অপরাধ। শিরক ব্যতীত এমন কোন অপরাধ নেই যা আল্লাহ তা’য়ালা অমার্জনীয় বলেছেন বা যা করলে জান্নাত হারাম হবে বলেছেন।

    সূরা তাওবায় আল্লাহ তা’য়ালা মুশরিক অবস্থায় মৃত ব্যক্তির জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করতেও নিষেধ করেছেন—

    ( مَا كَانَ لِلنَّبِىِّ وَٱلَّذِينَ ءَامَنُوٓا۟ أَن يَسْتَغْفِرُوا۟ لِلْمُشْرِكِينَ وَلَوْ كَانُوٓا۟ أُو۟لِى قُرْبَىٰ مِنۢ بَعْدِ مَا تَبَيَّنَ لَهُمْ أَنَّهُمْ أَصْحَـٰبُ ٱلْجَحِيمِ ) ١١٣

    ‘নবী ও মু’মিনদের জন্য শোভনীয় নয় মুশরিকদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা, তারা আত্মীয়-স্বজন হলেও, যখন এটা তাদের কাছে সুস্পষ্ট যে, তারা জাহান্নামের অধিবাসী।’ — সুরা তওবা, আয়াত ১১৩।

    এখন শিরকের নিন্দায় কয়েকটি পবিত্র হাদীস উল্লেখ করছি—

    1. রাসুল আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহিস সালাম মুআ’য রাদি আল্লাহু তা’য়ালা আনহুকে দশটি উপদেশ দিয়েছিলেন, যার মধ্যে শীর্ষ উপদেশ ছিল এই যে, لاَ تُشْرِك بِاللهِ ششَيَّئًا وَ إِنْ قُتَّلْتَ أوْ حُرِّقْتَ  অর্থাৎ, আল্লাহর সাথে শিরক করো না যদিও তোমাকে হত্যা করা হয় অথবা পুড়িয়ে ফেলা হয়।— মুসনাদ আহমদ।
    2. রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাহিস সালাম বলেন— সাতটি বিধ্বংসী বস্তু থেকে বেঁচে থাক — ১. আল্লাহর সাথে শিরক করা; ২. জাদু করা; ৩. অন্যায় ভাবে কাউকে হত্যা করা; ৪. ইয়াতীমের সম্পদ খাওয়া; ৫. সুদ খাওয়া; ৬. যুদ্ধের ময়দান থেকে পলায়ন করা; ও ৭. সহজ সরল নারীর উপর অপবাদ আরোপ করা। —সহীহ মুসলিম।
    3. রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহিস সালাম বলেন, ‘আল্লাহ তা’য়ালা ততক্ষণ পর্যন্ত বান্দার গুনাহ মাফ করতে থাকেন যতক্ষণ না আল্লাহ ও বান্দার মধ্যে পর্দা তৈরি না হয়।’ সাহাবায়ে কেরাম জানতে চাইলেন, ‘হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহিস সালাম, পর্দা তৈরি হওয়ার অর্থ কী?’ রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহিস সালাম বলেন, ‘পর্দার মানে হচ্ছে, মৃত্যু পর্যন্ত শিরকে নিমজ্জিত থাকা। —মুসনাদ আহমাদ।

    আলোচিত কুরআনের আয়াত ও হাদীস সমূহ থেকে এমন ধারণা করা কঠিন নয় যে শিরক এমন পাপ যার পরিণতিতে মানুষের মৃত্যু ও ধ্বংস সুনিশ্চিত হয়ে যায়।

    নিচে কয়েকটি উদাহরণ প্রদান করা হল—

    ক়িয়ামতের দিন ইবরাহীম আলাইহিস সালাম স্বীয় পিতা আজরকে জাহান্নাম থেকে মুক্তির জন্য আল্লাহ তা’য়ালার নিকট সুপারিশ করবেন, জবাবে আল্লাহ তা’য়ালা বলবেন,— ‘إِنِّىْ حَرَّمْتُ الْجَنَّةَ عَلَى الْكَافِرِيْنَ’ অর্থাৎ ‘আমি কাফিরদের জন্য জান্নাত হারাম করে দিয়েছি’ (সহীহ বুখারী)। এই বলে ইবরাহীম আলাইহিস সালামের সুপারিশ রদ করে দেওয়া হবে।

    রাসুলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহিস সালামের চাচা জনাব আবু ত়ালিব সম্পর্কে কে না জানেন। তিনি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহিস সালামের নবুওয়াত লাভের পর প্রতিটি মুহূর্তে অত্যন্ত বীরত্ব ও স্থিরতার সাথে রাসুল্লাহকে সহযোগিতা করেছিলেন। তিনি মক্কার ক়ুরাইশদের নির্যাতন, নিপীড়ন ও অপরিসীম চাপের মুখে লৌহপ্রাচীর হয়ে খাড়া হয়েছিলেন। শিয়াবে আবি ত়ালিব1 উপত্যাকায় বন্দী থাকার দিনগুলোতে তিনি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহিস সালামকে সম্পূর্ণরূপে সহযোগিতা করেছিলেন। আবু জাহল ও অন্যান্যরা যখন রাসুলুল্লাহকে হত্যা করার ইচ্ছা পোষণ করেছিল, তখন তিনি বনু হাশিম ও বনু মুত্তালিব গোত্রের যুবকদের মসজিদুল হারাম চত্বরে একত্রিত করে প্রকাশ্যে আবু জাহলকে যুদ্ধের হুমকি দিয়েছিলেন। জনাব আবু ত়ালিব সারাজীবন এভাবেই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহিস সালামকে সহযোগিতা করেছিলেন। যে বছর জনাব আবু ত়ালিবের ইন্তেকাল হয়েছিল, সে বছরকে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহিস সালাম দুঃখের বছর (عام الحزن) বলে অভিহিত করেছিলেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহিস সালামের সাথে রক্তের সম্পর্ক এবং ধর্মীয় বিষয়ে তার পূর্ণ সমর্থন থাকার পরও শুধুমাত্র ঈমান গ্রহণ না করার কারণে জনাব আবু ত়ালিবকে চিরস্থায়ী জাহান্নামে যেতে হবে। —সহীহ মুসলিম।

    একব্যক্তি আবদুল্লাহ ইবনে জাদ’আনের বিষয়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাহু আলাইহিস সালামের নিকট জানতে চেয়েছিলেন যে ‘তিনি তো আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষাকারী এবং লোকেদের খাদ্য দানকারী ছিলেন, তার এই সকল নেক আমল কি ক়িয়ামাতের দিন তার কোন উপকারে আসবে?’ উত্তরে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাহিস সালাম বললেন,— ‘না। কেননা, সে জীবনে একবারও এই কথা বলেনি,— (رَبِّ اغْفِرْلِى خَطِيْئَتِىْ يَوْمَ الدِّيْنَ) — হে আমার রব, ক়িয়ামাতের দিন আমার পাপসমূহ ক্ষমা করে দিন।’ (সহীহ মুসলিম)। অর্থাৎ, তার আল্লাহ তা’য়ালার প্রতি ঈমান ছিল না, ক়িয়ামাত দিবসের প্রতিও ঈমান ছিল না; ফলে তার সকল পূণ্য ও সৎকর্ম বিনষ্ট হয়ে যাবে।

    উল্লিখিত সত্য ঘটনাগুলো থেকে একথা সুস্পষ্ট যে, ‘আক়ীদায়ে তাওহীদ’ ব্যতীত কোন পূণ্য ও সৎকর্ম আল্লাহ তা’য়ালার দৃষ্টিতে সামান্যতম সওয়াব ও প্রতিদানের যোগ্য বলে বিবেচিত হবে না।

    শিরকের বিপরীতে, তাওহীদের বিশ্বাস ক়িয়ামাতের দিন গুনাহের কাফফারা এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে মাগফিরাতের কারণ হবে। রাসুল আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহিস সালাম বলেন, ‘যে ব্যক্তি لآَ إِلٰــهَ إِلاَّ اللهٌ কালিমা স্বীকার করবে এবং এই স্বীকৃতির উপর তার মৃত্যু হবে সে নিশ্চিত জান্নাতে প্রবেশ করবে।’ সাহাবীগণ জানতে চাইলেন, ‘যদি সে ব্যভিচার করে, যদি সে চুরি করে?’ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহিস সালাম বলেন, ‘হ্যাঁ! যদি সে ব্যভিচার করে, যদি সে চুরি করে।’ (সহীহ মুসলিম)। একটি হাদীসে কুদসীতে আল্লাহ তা’য়ালা বলেন,— ‘হে আদম সন্তান! যদি তুমি পৃথিবী সমান পাপও করে আস কিন্তু এমন অবস্থায় আসো যে, আমার সাথে অন্য কাউকে শরীক করোনি, তাহলে আমি তোমার পৃথিবী সমান পাপ ক্ষমা করে দিব। (তিরমিযী)।

    ক়িয়ামাতের দিন এক ব্যক্তি আল্লাহর দরবারে উপস্থিত হবে, যার নিরানব্বইটি খাতা হবে পাপে পরিপূর্ণ। সে তার পাপের কারণে হতাশ হবে। আল্লাহ তা’য়ালা ঘোষণা করবেন— ‘আজ কারও প্রতি জুলম করা হবে না, আপনাদের একটি সৎকর্ম থাকলেও কর্ম পরিমাপের পাল্লার নিকট চলে যান।’ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহিস সালাম বলেন,— ‘তার পাপসমূহ পাল্লার এক অংশে ঢেলে দেওয়া হবে এবং অপরাংশে ঢেলে দেওয়া হবে সৎকর্ম সমূহ। সেই একটি সৎকর্ম সমস্ত পাপের চেয়ে ভারী হয়ে যাবে। সেই একটি সৎকর্ম হবে— أَشْهَدُ أَنْ لآَ إَلَهَ إِلاَّ اللهُ وَ أَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَ رَسُوْلُهُ  (আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই এবং মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহিস সালাম আল্লাহর রাসুল)’ — (তিরমিযি)।

    এক বৃদ্ধ রাসুলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহিস সালামের নিকট উপস্থিত হয়ে জানতে চাইলেন,— ‘হে রাসুলুল্লাহ! সারা জীবন পাপে নিমজ্জিত ছিলাম, এমন কোন পাপ নেই যা করিনি; সমস্ত পৃথিবীতে যত প্রাণী রয়েছে সবার মধ্যে আমার পাপ বণ্টন করে দিলেও আমি তাদের সবাইকে নিয়ে জাহান্নামে চলে যা। আমার তাওবার কোন সুযোগ আছে কি?’ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহিস সালাম বললেন,— ‘ইসলাম গ্রহণ করেছেন কি?’ লোকটি বলল,— ‘أَشْهَدُ أَنْ لآَ إَلَهَ إِلاَّ اللهُ وَ أَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَ رَسُوْلُهُ (আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই এবং মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহিস সালাম আল্লাহর রাসুল)।’ রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহিস সালাম বলেন,— ‘আল্লাহ ক্ষমাশীল এবং পাপকর্মকে সৎকর্মে পরিবর্তনকারী।’ লোকটি জানতে চাইলেন,— ‘আমার পাপ ও অপরাধকে ক্ষমা করা হবে কি?’ রাসুল আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহিস সালাম বলেন,— ‘হ্যাঁ, আপনার পাপ ক্ষমা করা হবে।’ (ইবনে কাসির)।

    একবার ভাবুন তো! একদিকে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহিস সালামের আপন চাচা, যিনি আজীবন ধর্মের ব্যাপারে আপন ভাতিজার সাহচর্যের হক আদায় করেছেন, কিন্তু তাওহীদের আক়ীদার উপর ঈমান না আনার কারণে চিরস্থায়ী জাহান্নামের হক়দার হয়ে গেছেন। অপরদিকে, একজন অপরিচিত ব্যক্তি যার সাথে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রক্তের সম্পর্ক ছিল না, এবং তিনি নিজেও তার বিশাল পাপের কথা স্বীকার করছেন, তিনি তাওহীদের আক়ীদায় বিশ্বাস করার কারণে জান্নাতের হক়দার হয়েছিলেন।

    এই সমস্ত আলোচনা থেকে উপসংহার এই যে, কেয়ামতের দিন নাজাত লাভ সম্পূর্ণরূপে ব্যক্তির আক়ীদার উপর নির্ভর করবে। যদি আক়ীদা কিতাব ও সুন্নাহ মোতাবেক বিশুদ্ধ তাওহীদের উপর ভিত্তি করে হয়ে থাকে, তবে সৎকর্মের উত্তম প্রতিদান ও পুরষ্কার দেওয়া হবে এবং পাপসমূহকে ক্ষমা করে দেওয়া হবে। কিন্তু আক়ীদা তাওহীদের উপর না হয়ে শিরকের উপর হলে আসমান-জমিন পরিমাণ সৎকর্মও অগ্রহণযোগ্য এবং প্রত্যাখ্যাত হবে।