» » ষষ্ঠ অধ্যায় : বেগম বৃত্তান্ত

আমিনা বেগম

আমিনা বেগম নবাব আলিবর্দির কনিষ্ঠা কন্যা ও সিরাজদ্দৌল্লার জননী। তাঁর বিয়ে হয় আলিবর্দির ভ্রাতুষ্পুত্র জৈনুদ্দিন আহমেদ খানের সঙ্গে। পরে আলিবর্দি জৈনুদ্দিনকে বিহারের ডেপুটি গভর্নর করে পাঠান। আমিনাও তাঁর সঙ্গে পাটনা যান। কিন্তু আমিনা বেগমের কপালে খুব বেশিদিন সুখভোগ করা ছিল না। বিহারের বিদ্রোহী আফগানরা আলিবর্দির ওপর প্রতিশোধ নিতে জৈনুদ্দিন ও তাঁর বৃদ্ধ পিতাকে হত্যা করে। আমিনা কোনওরকমে বেঁচে যান। আফগানরা তাঁকে বন্দি করে রাখে। শোনা যায় যে আফগানরা বেআব্রু করে খোলা গাড়িতে আমিনাকে পাটনায় প্রদক্ষিণ করায় এবং এতে সাধারণ মানুষ পর্যন্ত অত্যন্ত ব্যথা পায়। পরে আলিবর্দি পাটনা অভিযান করে আফগানদের শায়েস্তা করেন এবং আমিনাকে উদ্ধার করতে সমর্থ হন। এরপর আমিনা বেগম মুর্শিদাবাদে এসে আশ্রয় নেন।[১] সেখানে তিনি দিদি ঘসেটি বেগমের মতো অবৈধ প্রণয়ে লিপ্ত হয়ে পড়েন। সেটা ভেবেই হয়তো সিয়রের অনুবাদক নোটা মানুস (Nota Manus) ওরফে হাজি মুস্তাফা মন্তব্য করেন যে ‘She [Amina] became famous in Murshidabad by her amours and gallantry’.[২] দিদির প্রণয়ী হোসেন কুলির সঙ্গে তাঁর অবৈধ সম্পর্ক হয় এবং আমরা দেখেছি বেগম শরফুন্নেসার উদ্যোগে কীভাবে হোসেন কুলিকে হত্যা করা হয়। এই ত্রিকোণ প্রেম মুর্শিদাবাদের জনমানসে যে কতটা প্রভাব ফেলেছিল তা সিয়রের লেখক ও আলিবর্দির আত্মীয় গোলাম হোসেনের লেখা থেকে স্পষ্ট।[৩]

In the zenith of the conqueror’s (Alivardi’s) power, such infamies and lewdness came to be practised by some females and other persons of his family, as cannot be mentioned with decency, but effectually dishonoured his family for ever. All his daughters as well as his beloved Siraj-ud-daulla, lapsed into such a flagitious conduct, and they were guilty of such a variety of shameful excesses, as would have disgraced totally any person whatever, still more, persons of their elevated rank and sublime station.

এখানে অবশ্য বলা প্রয়োজন যে সিরাজদ্দৌল্লা সম্বন্ধে গোলাম হোসেনের যে বক্তব্য তা আমরা পুরোপুরি মেনে নিতে পারি না—এটা অনেকটাই উদ্দেশ্য প্রণোদিত, যা আমরা অন্যত্র বিশদ তথ্যপ্রমাণ দিয়ে দেখাবার চেষ্টা করেছি।[৪]

আমিনা সম্বন্ধে অবশ্য বলা যায় যে তিনি নাকি উদার এবং কোমল বৃত্তিসম্পন্ন মহিলা ছিলেন। কাশিমবাজারের ইংরেজ কুঠি দখল করার পর সিরাজ যখন উইলিয়াম ওয়াটস ও তাঁর স্ত্রী পরিবারকে তাঁর সৈন্যবাহিনীর সঙ্গে কলকাতা যেতে বাধ্য করেন এবং পরে মুর্শিদাবাদ নিয়ে যান, তখন নাকি আমিনা বেগমের অনুনয়ে সিরাজদ্দৌল্লা তাদের মুক্তি দেন। এটা বোধ হয় সঠিক নয়, কারণ সিরাজ ওয়াটসের পরিবারকে বন্দি করে মুর্শিদাবাদ নিয়ে যান এমন কোনও নির্ভরযোগ্য তথ্য কিন্তু পাওয়া যায় না। বরঞ্চ দেখা যায় যে, কাশিমবাজারের পতনের পর সিরাজ ইংরেজ কুঠির অস্ত্রশস্ত্র ও গোলাবারুদ ছাড়া কিছুতে হাত দেননি। ইংরেজ মহিলা, শিশুদের এমনকী ওয়াটস সমেত কোনও কর্মচারীকে বন্দিও করেননি। শুধু ওয়াটস ও বেটসনকে তাঁর সঙ্গে কলকাতা অভিমুখে যাত্রার সঙ্গী করে নেন, খুব সম্ভবত সিরাজের সঙ্গে আপস-মীমাংসা করে নেওয়ার জন্য কলকাতার গভর্নর ও ফোর্ট উইলিয়াম কাউন্সিলের ওপর চাপ সৃষ্টি করার জন্য।[৫]

আমিনা বেগমের জীবনের সবচেয়ে দুঃসহ মুহূর্ত দেখা দেয় পলাশির যুদ্ধের ক’দিন পরে। পলাশির যুদ্ধে পরাজিত নবাব সিরাজদ্দৌল্লাকে নতুন নবাব মীরজাফরের পুত্র মীরণের নির্দেশে হত্যা করা হয়। তারপর সিরাজের ছিন্নভিন্ন দেহ হাতির পিঠে চড়িয়ে মুর্শিদাবাদ শহরে ঘোরানো হয়। মৃতদেহ নিয়ে হাতিটি আমিনার প্রাসাদের কাছে এসে পৌঁছয়। আমিনা খবর পেয়ে তখন বেআব্রু অবস্থায় পাগলের মতো বেরিয়ে আসেন এবং প্রিয়পুত্রের মৃতদেহের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে বিলাপ করতে থাকেন। এই হৃদয়বিদারক দৃশ্য দেখে মুর্শিদাবাদের মানুষ অশ্রু সংবরণ করতে পারেনি। এমন অবস্থা দেখে মীরজাফরের ভাগ্নে ও নানা বদ অভ্যেস ও বদকাজে তাঁর সহযোগী খাদিম হোসেন খান তাঁর ভৃত্যদের আমিনা বেগম ও অন্য মহিলাদের জোর করে সেখান থেকে সরিয়ে দিতে নির্দেশ দেন। এরপর যখন সিরাজের মৃতদেহ মুর্শিদাবাদের বাজারে এনে ফেলে দেওয়া হল, এবং কেউ মৃতদেহকে স্নান করিয়ে সমাধিস্থ করতে এগিয়ে এল না, তখন নবাব পরিবারের কাছে ঋণী এক বৃদ্ধ, মীর্জা জয়নাল আবেদিন বাকাওয়াল, সিরাজের মৃতদেহকে স্নান করিয়ে শবাধারে রেখে খোশবাগে আলিবর্দির সমাধির পাশে সমাধিস্থ করেন।[৬] এরপর আমিনার জীবনে যে দুঃসময় নেমে আসে এবং তাঁর যে মর্মান্তিক মৃত্যু হয় তা আমরা আগেই বলেছি।

লুৎফুন্নেসা—সিরাজ-বেগম

লুৎফুন্নেসার নামে বাঙালির হৃদয়তন্ত্রীতে এখনও বিষাদের সুর বেজে ওঠে। সত্য-মিথ্যা কল্পনা মিশে লুৎফুন্নেসা এখনও বাঙালির জনমানসে প্রেম, ভালবাসা, ত্যাগ, তিতিক্ষার মূর্ত প্রতীক। আর বলা বাহুল্য, মুর্শিদাবাদের ইতিহাসের সঙ্গে লুৎফুন্নেসার নাম অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত। তাঁর শৈশবের পরিচয় নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতভেদ আছে। কথিত আছে যে তিনি জন্মসূত্রে হিন্দু ছিলেন। নাম ছিল রাজ কনওয়ার। তিনি সিরাজ-জননীর ক্রীতদাসী ছিলেন এবং সিরাজের তাঁকে খুব পছন্দ হওয়ায় তিনি তাকে সিরাজের হাতে তুলে দেন। সিরাজ তাঁর রূপ ও গুণে এতই মুগ্ধ হন যে তিনি তাকে যথাযোগ্য মর্যাদার সঙ্গে হারেমে রাখেন এবং তাঁর নতুন নামকরণ করেন লুৎফুন্নেসা। তাদের একটি কন্যা সন্তানও জন্মায়।[৭] প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ করা যেতে পারে যে ১৭৪৬ সালে আলিবর্দি তাঁর প্রিয় দৌহিত্র সিরাজদ্দৌল্লার সঙ্গে মহম্মদ ইরাজ খানের কন্যা উমদাতুন্নেসা ওরফে বানু বেগমের খুব ধুমধাম করে বিবাহ দেন। কিন্তু লুৎফুন্নেসা তাঁর ভক্তি, ভালবাসা, সেবাযত্ন ও গভীর অনুরাগে তাঁর স্বামীকে এমনই আপন করে নিলেন যে সিরাজ তাঁর বিবাহিতা স্ত্রী বানু বেগমের চেয়েও লুৎফুন্নেসার ওপর অনেক বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়েন এবং কার্যত তাকেই প্রধান বেগমের মর্যাদা দেন।

লুৎফুন্নেসাও অবশ্য এই মর্যাদার যথাযোগ্য সম্মান রেখেছিলেন। মুর্শিদাবাদের প্রখ্যাত ঐতিহাসিক নিখিলনাথ রায় এক শতাব্দীরও আগে লুৎফুন্নেসা সম্বন্ধে যা লিখেছিলেন তা যদিও খুবই ভাবাবেগপূর্ণ, তবুও অনেকাংশে সত্য।[৮]

লুৎফ উন্নেসা মানবী হয়েও দেবী। তাঁর এই পবিত্র দেবভাবে হতভাগ্য সিরাজ নিজের অপদগ্ধ জীবনে কিছুটা শান্তি লাভ করতে পেরেছিলেন। লুৎফ উন্নেসা ছায়ার মতো সিরাজের সঙ্গ দিতেন। কি বিপদে, কি সম্পদে, লুৎফ উন্নেসা কখনও সিরাজকে পরিত্যাগ করেননি। যখন সিরাজ বাঙ্গালা, বিহার, উড়িষ্যার যুবরাজ হয়ে আমোদ তরঙ্গে গা ঢেলে দিতেন, তখনও লুৎফু উন্নেসা তাঁর সহচরী। আবার যখন রাজ্যভ্রষ্ট হয়ে তেজোহীন—আভাহীন—কক্ষচ্যুত গ্রহের মতো পথে পথে ঘুরে বেড়িয়েছিলেন, তখনও লুৎফ উন্নেসা তাঁরই অনুবর্তিনী। যখন… [পলাশি যুদ্ধের পর] তাঁর আকুল আহ্বানে ও মর্মভেদী অনুনয়ে কেউই তাঁর অনুসরণ করতে ইচ্ছে করেনি, কেবল লুৎফ উন্নেসা নিজের জীবনকে অকিঞ্চিৎকর মনে করে শত বিপদ মাথায় নিয়ে সিরাজের পেছনে পেছনে চলেছেন। স্বামীর দেহত্যাগের পরও তাঁর জীবন তাঁরই পরকালের কল্যাণের উদ্দেশ্যে সমর্পিত হয়।

অবশ্য অনেকে বলেন যে লুৎফুন্নেসার প্রতি সিরাজের ভালবাসা এবং আনুগত্যের আরও একটি কারণ ছিল। সিরাজ ফৈজি ফরজান নামে দিল্লির এক অপূর্ব সুন্দরী নর্তকীর মোহে পড়েন এবং তাকে এনে তাঁর মনসুরগঞ্জের প্রাসাদে তোলেন। কিছুদিন পর ফৈজি সিরাজের ভগ্নীপতি সৈয়দ মহম্মদ খানের শারীরিক সৌন্দর্যে বিমোহিত হয়ে তাঁর প্রেমে পড়েন এবং লুকিয়ে তাঁর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা করেন। এটা টের পেয়ে সিরাজ ফৈজিকে প্রাসাদের একটি ঘরে বন্দি করে চারদিক থেকে ঘরটি বন্ধ করে দেন। তাতে ফৈজির নির্মম মৃত্যু হয়।[৯] ফৈজির বিশ্বাসঘাতকতায় সিরাজ খুবই আঘাত পান এবং ফলে লুৎফুন্নেসার ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল হয়ে পড়েন।

পলাশির যুদ্ধে পরাজিত হয়ে সিরাজদ্দৌল্লা যখন মুর্শিদাবাদে পালিয়ে আসেন। তখন তাঁর এত বড় বিপদে তাঁর পাশে দাঁড়াবার জন্য বিশেষ কেউ এগিয়ে আসেনি। এমনকী তাঁর শ্বশুর ইরাজ খানও সাহায্যের হাত বাড়াননি। বাধ্য হয়ে সিরাজ ২৫ জুন রাত্রির অন্ধকারে মুর্শিদাবাদ ত্যাগ করলেন—সঙ্গে লুৎফুন্নেসা, তিন বছরের শিশুকন্যা ও দু’একজন দাসদাসী। সিরাজদ্দৌল্লা নাকি লুৎফুন্নেসাকে এ অবস্থায় তাঁর সঙ্গে যেতে বারণ করেছিলেন। কিন্তু লুৎফুন্নেসা তাতে কর্ণপাতও করেননি—এ দুর্দিনে তিনি স্বামীকে একা একা যেতে দিতে কিছুতেই রাজি হননি। তিনদিন তিনরাত অনাহারে পথ চলার পর রাজমহলের কাছে নৌকো থেকে নেমে সিরাজ দানশাহ নামে এক ফকিরের কাছে খাবার চাইতে গেলেন। সিরাজকে চিনতে পেরে দানাশাহ তাঁকে মীরজাফরের জামাই মীরকাশিমের হাতে তুলে দেন। এরপর তাকে মুর্শিদাবাদ নিয়ে যাওয়া হয় এবং সেখানে মীরজাফরের পুত্র মীরণের গুপ্তঘাতক মহম্মদি বেগ সিরাজকে হত্যা করেন। এসব ঘটনা মোটামুটিভাবে সবার জানা। তাই বিস্তারিত বিবরণের প্রয়োজন নেই।[১০]

স্বামীর মৃত্যুর পর লুৎফুন্নেসার জীবন নিদারুণ দুঃখদুর্দশা ও দারিদ্রের মধ্যে কাটে। নতুন নবাব মীরজাফর ও তাঁর পুত্র মীরণ লুৎফুন্নেসা ও তাঁর কন্যা উম্মত জহুরাকে আলিবর্দির বেগম শরফুন্নেসা, দুই কন্যা ঘসেটি ও আমিনা বেগমের সঙ্গে ১৭৫৮ সালের ডিসেম্বরে ঢাকায় নির্বাসিত করেন। সেখানে কীভাবে মীরণের নির্দেশে ঘসেটি ও আমিনা বেগমকে নৌকো থেকে নদীগর্ভে ফেলে দিয়ে হত্যা করা হয় তা আগেই বলা হয়েছে। শরফুন্নেসা, লুৎফুন্নেসা ও তাঁর কন্যা প্রাণে বেঁচে গেলেও বন্দি অবস্থায় তাদের দুঃখদুর্দশার সীমা ছিল না। তাঁদের জন্য যে সামান্য মাসোহারার ব্যবস্থা ছিল তাও তারা নিয়মিত পেতেন না। পরে মহম্মদ রেজা খান যখন ঢাকার শাসক হয়ে আসেন তখন তাঁদের নিয়মিত মাসোহারা দেওয়ার ব্যবস্থা হয়। আর ভাগ্যের এমনই পরিহাস, যে ক্লাইভ তাঁর স্বামীর ভাগ্য বিপর্যয়ের অন্যতম প্রধান কারণ, তাঁরই কৃপায় ঢাকায় সাত বছর বন্দিজীবন যাপন করার পর লুৎফুন্নেসাদের মুর্শিদাবাদে ফেরত পাঠানো হয়।[১১]

মুর্শিদাবাদে আসার পর শরফুন্নেসা, লুৎফুন্নেসা ও তাঁর কন্যা কোম্পানি সরকারের কাছে তাঁদের জীবিকার জন্য মাসোহারার ব্যবস্থা করতে আবেদন করেন। আবেদনপত্রে তিনজনেরই স্বাক্ষর ছিল।[১২] লুৎফুন্নেসাকে খোশবাগে আলিবর্দি ও সিরাজদ্দৌল্লার সমাধির তত্ত্বাবধান করার ভার দেওয়া হয়। এজন্য তিনি মাসে ৩০৫ টাকা করে পেতেন। তা ছাড়া মাসে ১০০ টাকা করে তিনি মাসোহারা পেতেন। কিছুদিন পর তাঁর একমাত্র কন্যা উম্মত জহুরার স্বামী মারা যাওয়ায় তিনি খুবই শোকগ্রস্ত হয়ে পড়েন। ১৭৭৪ সালে উম্মত জহুরার মৃত্যু হয়। জহুরার চারটি অল্প বয়স্কা কন্যা ছিল—শরফুন্নেসা, আসমতুন্নেসা, সাকিনা, আমাতুলমাদি। কোম্পানি এঁদের ভরণপোষণের জন্য মাসে ৫০০ টাকা বৃত্তি দেওয়ার ব্যবস্থা করে।[১৩] কিন্তু তারা যখন বড় হয়ে উঠল, তখন ওই টাকায় তাদের খরচপত্র চালানো লুৎফুন্নেসার পক্ষে কঠিন হয়ে পড়ে। তাই তিনি ১৭৮৭ সালে গভর্নর জেনারেল লর্ড কর্নওয়ালিসকে তাঁর অবস্থার কথা জানিয়ে এবং তাঁদের মাসোহারা বাড়াবার অনুরোধ জানিয়ে একটি চিঠি দেন। তাতে তিনি এটা জানান যে জহুরার দুটি মেয়ের তিনি বিয়ে দিয়েছেন, এতে তাঁর প্রচুর খরচ হয়েছে। আরও দুটি মেয়ের বিয়ে দিতে হবে, যা ব্যয় সাপেক্ষ এসব যেন বিবেচনা করা হয়।[১৪] কিন্তু কর্নওয়ালিসের কাছ থেকে কোনও সাড়া পাওয়া যায়নি। লুৎফুন্নেসা জীবনের শেষদিন পর্যন্ত সিরাজদ্দৌল্লার সমাধির দেখাশোনা করেছেন এবং রোজই সমাধিতে সন্ধ্যাপ্রদীপ দিয়েছেন। ১৭৯৫ সালের নভেম্বরে তাঁর মৃত্যু হয়।

সিরাজদ্দৌল্লার মৃত্যুর পর অনেকেই লুৎফুন্নেসাকে বিয়ে করতে চেয়েছিলেন কিন্তু তিনি কারও প্রস্তাবে রাজি হননি। মুজাফ্‌ফরনামার লেখক করম আলি লিখেছেন যে এরকম এক ব্যক্তি লুৎফুন্নেসাকে বিয়ের প্রস্তাব দিলে লুৎফুন্নেসা উত্তর দিয়েছিলেন যে ‘আমি হাতির পিঠে চড়তে অভ্যস্ত ছিলাম, এখন গদর্ভের পিঠে চড়ব কী করে’?[১৫] এটা থেকে লুৎফুন্নেসার চরিত্রের দৃঢ়তা ও তেজস্বিতার প্রমাণ পাওয়া যায়।

সূত্রনির্দেশ ও টীকা

  1. সিয়র, ২য় খণ্ড, পৃ. ৪৩-৪৪, ৫৬।
  2. সিয়র, ১ম খণ্ড, পৃ. ২৮২ পাদটীকা; ২য় খণ্ড, পৃ. ১২৪ পাদটীকা।
  3. সিয়র, ২য় খণ্ড, পৃ. ১২১।
  4. সুশীল চৌধুরী, পলাশির অজানা কাহিনী, পৃ. ১৯-২৩।
  5. Hyde, Parochial Annals of Bengal, p. 158 quoted in B.N. Banerjee, Begams of Bengal, p. 25; Hill, I, p. lx; 176; S. Chaudhury, Prelude to Empire, pp. 46-47, fn. 46, p. 47,
  6. মুজাফ্‌ফরনামা, পৃ. ৭৭-৭৮; রিয়াজ, পৃ. ৩৭৬; সিয়র, ২য় খণ্ড, পৃ, ২৪২-৪৩, J. N. Sarkar, ed., History of Bengal, vol. II, p. 496.
  7. Letter of the Board of Revenue to the Court of Directors, 29 Dec. 1794. Para 40, quoted in B. N. Banerjee, Begams of Bengal, p. 31, fn; সিয়রেও তাঁকে ক্রীতদাসী বলে বর্ণনা করা হয়েছে, সিয়র, ১ম খণ্ড, পৃ. ১৮২; বেভারিজ অবশ্য বলেছেন যে লুৎফুন্নেসা মোহনলালের সহোদরা ছিলেন কিন্তু এটা বোধ হয় ঠিক নয়, Beveridge, ‘Old Places in Murshidabad’, Calcutta Review, 1892.
  8. নিখিলনাথ রায়, মুর্শিদাবাদ কাহিনী, পৃ. ১১৩।
  9. সিয়র, ১ম খণ্ড, পৃ. ৬১৪-১৫ এবং পাদটীকা; নিখিলনাথ রায়, মুর্শিদাবাদ কাহিনী, পৃ. ১১৫-১৮। এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে যে ফৈজির ঘটনাটা কিন্তু রিয়াজ-উস-সলাতিন, মুজাফ্‌ফরনামা বা তারিখ-ই-বংগালা-ই-মহবৎজঙ্গীতে পাওয়া যায় না।
  10. রিয়াজ, পৃ. ৩৭৪-৭৬; মুজাফ্‌ফরনামা, পৃ. ৭৭-৭৮; সিয়র, ২য় খণ্ড, পৃ. ২৪০-৪২; নিখিলনাথ রায়, মুর্শিদাবাদ কাহিনী, পৃ. ১২২-২৩; B. N. Banerjee, Begams of Bengal, pp. 32-34.
  11. সিয়র, ২য় খণ্ড, পৃ. ২৮১; B. N. Banerjee, Begams of Bengal, p. 35; নিখিলনাথ রায়, মুর্শিদাবাদ কাহিনী, পৃ. ১২৪।
  12. Calender of Persian Correspondence, vol. 1, p. 452, Letter no. 2761, 10 Dec. 1756, quoted in B.N. Banerjee, Begams of Bengal, pp. 35-36.
  13. B. N. Banerjee, Begamas of Bengal, p. 36: নিখিলনাথ রায়, মুর্শিদাবাদ কাহিনী, পৃ. ১২২-২৩।
  14. Original Receipts, 1787, no. 176, quoted in B. N. Banerjee, Begams of Bengal, pp. 36-37.
  15. মুজাফ্‌ফরনামা, পৃ. ৭৮।