» » ষষ্ঠ অধ্যায় : বেগম বৃত্তান্ত

ঘসেটি—মোতিঝিলের বেগম

ঘসেটি বেগম নবাব আলিবর্দির জ্যেষ্ঠা কন্যা। প্রথমে তাঁর নাম ছিল মেহেরুন্নিসা। পরে তিনি ঘসেটি বলেই পরিচিত হন। তবে অনেকেই তাঁকে ছোট বেগম হিসেবেই জানত কারণ তাঁর স্বামী নওয়াজিস মহম্মদ ছিলেন ঢাকার ছোট নবাব। মুর্শিদাবাদের জনমানসে তাঁর পরিচয় ছিল মোতিঝিলের বেগম বলে কারণ তাঁর স্বামীর তৈরি মুর্শিদাবাদের অদূরে মোতিঝিল প্রাসাদেই তিনি বসবাস করতেন।[১] আলিবর্দি ঘসেটির বিবাহ দেন তাঁর দাদা হাজি আহমেদের জ্যেষ্ঠ পুত্র নওয়াজিস মহম্মদের সঙ্গে। বাংলার মসনদ দখল করার পর তিনি নওয়াজিসকে ঢাকার ডেপুটি গভর্নর পদে নিযুক্ত করেন। নওয়াজিস প্রথম যৌবনে তাঁর উচ্ছৃঙ্খলতা, নিষ্ঠুরতা ও বদচরিত্রের জন্য কুখ্যাত ছিলেন কিন্তু পরে তাঁর চরিত্রে বিরাট পরিবর্তন আসে। শাসক হিসেবে তিনি বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন এবং সুখ্যাতি অর্জন করেন।[২] তবে কোনও কোনও ঐতিহাসিকের মতে ভগ্নস্বাস্থ্য ও নিজস্ব বুদ্ধিমত্তার অভাবের জন্য তিনি ঢাকার শাসনভার তুলে দিয়েছিলেন পত্নী ঘসেটি বেগম ও তাঁর প্রিয়পাত্র হোসেন কুলি খানের ওপর।[৩]

ঘসেটি বেগম ও নওয়াজিস মহম্মদের কোনও সন্তান ছিল না। তাই তাঁরা সিরাজদ্দৌল্লার ছোট ভাই এক্রামুদ্দৌল্লাকে দত্তক নিলেন। এক্ৰাম নওয়াজিসের নয়নের মণি হয়ে ওঠেন এবং তাঁর জীবনের একমাত্র আনন্দের উৎস। এদিকে আলিবর্দি খান ১৭৫২ সালে তাঁর দুই জামাতা ও ভ্রাতুষ্পুত্র, নওয়াজিস মহম্মদ ও পূর্ণিয়ার নবাব সৈয়দ আহমেদকে বাদ দিয়ে তাঁর প্রিয় দৌহিত্র সিরাজদ্দৌল্লাকে তাঁর উত্তরাধিকারী হিসেবে মনোনীত করেন।[৪] এতে মনে হয় নওয়াজিস খুবই ক্ষুব্ধ হন এবং তখন থেকে তিনি তাঁর বেগম ঘসেটিকে নিয়ে প্রধানত মুর্শিদাবাদে তাঁর মোতিঝিলের প্রাসাদে বাস করতে থাকেন। এর কিছুদিন পরেই ১৭৫৪ সালে তাঁর দত্তক পুত্র ও প্রাণাধিক প্রিয় এক্রামুদ্দৌল্লা বসন্তরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। নওয়াজিস এ নিদারুণ শোক সহ্য করতে পারলেন না। ১৭৫৫ সালের ডিসেম্বরে তাঁর মৃত্যু হয়। মোতিঝিলের প্রাসাদে এক্রামুদ্দৌল্লার পাশে তাঁকে সমাধিস্থ করা হয়।[৫]

নওয়াজিসের মৃত্যুর পর ঘসেটি বেগম ঢাকার শাসনব্যবস্থা পুরোপুরি হোসেন কুলির হাতেই দিয়ে দেন। আমরা আগেই বলেছি, ঘসেটির সঙ্গে হোসেন কুলির অবৈধ সম্পর্ক ছিল এবং কথিত আছে যে আলিবর্দির বেগম শরফুন্নেসা কৌশল করে সিরাজদ্দৌলাকে দিয়ে হোসেন কুলিকে হত্যা করান। এরপর ঢাকার শাসনভার চলে যায় নওয়াজিস পত্নী ঘসেটির আরেক প্রিয়পাত্র ও ঘনিষ্ঠ রাজবল্লভের হাতে। নওয়াজিস অত্যন্ত ধনী ছিলেন এবং তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর বেগম ঘসেটিই সবকিছুর মালিক হন। ঘসেটি প্রথম থেকেই সিরাজদ্দৌল্লার প্রতি বিরূপ ছিলেন। প্রথমত তাঁর আশঙ্কা ছিল সিরাজ নবাব হয়েই তাঁর সব ধনসম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করবেন। তা ছাড়া তিনি সিরাজদ্দৌল্লার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে নিজের জন্য মসনদ দখল করতে চেয়েছিলেন। আলিবর্দি তাঁর জীবিতাবস্থায় দু’জনের মধ্যে আপস-মীমাংসার চেষ্টা করেছিলেন কিন্তু সফল হতে পারেননি। বৃদ্ধ নবাব ৮০ বছর বয়সে ১৭৫৬ সালের ৯/১০ এপ্রিল মারা যান। খোশবাগে তাকে সমাধিস্থ করা হয়।[৬]

নবাব আলিবর্দির মৃত্যুর পর সিরাজদ্দৌল্লা ১০ এপ্রিল ১৭৫৬ সালে মুর্শিদাবাদের মসনদে বসেন। প্রথমেই তিনি মসনদের জন্য তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী ঘসেটি বেগমের সঙ্গে মোকাবিলা করতে চাইলেন। স্বামী নওয়াজিসের দৌলতে ঘসেটি প্রচুর ধনসম্পদের অধিকারী হয়েছিলেন। তা ছাড়া হোসেন কুলির মৃত্যুর পর ঢাকার শাসনভার যাঁর হাতে ছিল, সেই রাজবল্লভও ঘসেটি বেগমের দলভুক্ত হয়ে সিরাজদ্দৌল্লার বিরুদ্ধে বেশ শক্তিশালী চক্র গড়ে তোলেন। এদিকে সিরাজও সন্দেহ করেছিলেন যে ঘসেটি ও রাজবল্লভ ইংরেজদেরও তাদের দলে সামিল করার চেষ্টা করছিলেন। এ সন্দেহ একেবারে অমূলক নয়।[৭] ইউরোপীয় কোম্পানিগুলির রেকর্ড থেকে এর সত্যতা প্রমাণ করা যায়। বাংলায় ফরাসি কোম্পানির অধ্যক্ষ রেনল্ট (Renault) লিখেছেন যে, ইংরেজদের ধারণা হয়েছিল যে ঘসেটি বেগমের দলকে কেউ রুখতে পারবে না, ঘসেটিই মসনদ দখল করবেন। সিরাজদ্দৌল্লার পতন অনিবার্য। তাই তারা বেগমের সঙ্গে সিরাজের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে যোগ দেয়।[৮] আবার কাশিমবাজারের ফরাসি কুঠির প্রধান জাঁ ল’ও বলেছেন যে ইংরেজরা ভেবেছিল সিরাজদ্দৌল্লা কখনওই নবাব হতে পারবেন না। এ অভিমত অন্য একটি ফরাসি তথ্যেও পাওয়া যায়।[৯] ইংরেজদের মধ্যে অনেকের লেখা থেকেও এটা স্পষ্ট। হলওয়েলের নিশ্চিত বিশ্বাস ছিল সিরাজদ্দৌল্লার বিরুদ্ধে ঘসেটি বেগমের সাফল্য সম্বন্ধে কোনও সন্দেহ নেই। এমনকী কলকাতার গভর্নর রজার ড্রেকেরও (Roger Drake) ধারণা ছিল ঘসেটি বেগমের বিরুদ্ধে সিরাজের সফল হওয়ার কোনও সম্ভাবনাই নেই।[১০]

এই পরিপ্রেক্ষিতে ঘসেটি বেগমকে শায়েস্তা করা ছাড়া সিরাজদ্দৌল্লার কোনও গত্যন্তর ছিল না। সমসাময়িক ঐতিহাসিকদের কেউ কেউ অবশ্য বলেছেন যে ঘসেটি বেগমের ধনসম্পদ হস্তগত করাই ছিল সিরাজের প্রধান উদ্দেশ্য। এটা মনে হয় সর্বাংশে সত্য নয়। তবে সঙ্গে সঙ্গে এটাও বলা প্রয়োজন যে সিরাজ ভাবতেই পারেন যে ঘসেটি বেগমের হাতে যে প্রভূত অর্থ আছে, তা তিনি সিরাজের বিরুদ্ধে চক্রান্তে নানাভাবে কাজে লাগাতে পারেন। সেজন্য তাঁর কাছ থেকে ওই সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা অত্যন্ত জরুরি। ঘসেটি বেগম যে তাঁর ঐশ্বর্য ছড়িয়ে নানা শ্রেণীর লোককে তাঁর দলে টানছিলেন তা ফারসি ইতিহাসেও আছে।

তবে নবাব সিরাজদ্দৌল্লা ঘসেটি বেগমের বিরুদ্ধে প্রথমে কোনও জোরজবরদস্তি করেননি। তিনি আপস-মীমাংসার চেষ্টাই করেছিলেন। এজন্য তিনি আলিবর্দির বেগম শরফুন্নেসা ও বণিকরাজা জগৎশেঠকে ঘসেটি বেগমের কাছে পাঠান যাতে বেগম মোতিঝিলের প্রাসাদ ছেড়ে চলে যান। ঘসেটি বেগমের সঙ্গে সমঝোতা করতে সিরাজ যে এই কুটনৈতিক চালের আশ্রয় নিয়েছিলেন, তারিখ-ই-বংগালা-ই মহবৎজঙ্গীর লেখক ইউসুফ আলিও তাঁর তারিফ না করে পারেননি। উক্ত লেখক এই মর্মে লিখেছেন যে, বহুলোক যারা আগে বেগমকে সমর্থন করত, তারা সিরাজের আপসমূলক নীতি ও আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে বিরোধ মেটাবার প্রচেষ্টায় সন্তুষ্ট হয়ে বেগমের দল ছেড়ে সিরাজের সঙ্গে যোগ দিয়েছে।[১১] এদিকে হোসেন কুলির মৃত্যুর পর ঘসেটি বেগমের আরেক প্রণয়ী, মীরজা নজর আলি, মোতিঝিলের রক্ষণের দায়িত্বে ছিলেন। কোনও কোনও ফারসি ঐতিহাসিকের মতে সিরাজদ্দৌল্লা মোতিঝিল আক্রমণ করেন। নজর আলি পালিয়ে যান এবং সিরাজ বেগমকে বন্দি করে তাঁর সমস্ত ধনসম্পদ তাঁর মনসুরগঞ্জের প্রাসাদে নিয়ে আসেন। মুজাফ্‌ফরনামার লেখক করম আলির তথ্য অনুযায়ী এই সম্পদের মধ্যে হিরে, জহরত ছাড়াই নগদ চার কোটি টাকা, চল্লিশ লক্ষ মোহর এবং এক কোটি টাকা মূল্যের সোনা, রুপোর বাসন ছিল।[১২] এটা অত্যুক্তি বলেই মনে হয়।

ঘসেটি বেগমের জীবন করুণ পরিণতির মধ্যেই শেষ হয়। আমরা আগেই দেখেছি, পলাশি যুদ্ধের পরে মীরজাফরের পুত্র মীরণের নির্দেশে আলিবর্দির বেগম শরফুন্নেসা, তাঁর দুই কন্যা ঘসেটি ও আমিনা বেগম, সিরাজ-পত্নী লুৎফুন্নেসা ও তাঁর শিশুকন্যাকে বন্দি করা হয় এবং কিছুদিন পরে তাদের ঢাকায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়, আগস্ট ১৭৫৮-তে। মীরণ এঁদের সবাইকে মসনদের দাবিদার ভেবে তাঁর শত্রু মনে করতেন। তিনি ঢাকার ডেপুটি গভর্নর যশরত খানকে এঁদের সবাইকে মেরে ফেলতে নির্দেশ পাঠান। যশরত তাতে রাজি না হওয়ায় মীরণ এ কাজ সম্পন্ন করতে তাঁর এক অনুচরকে পাঠান। সে অনুচরের কাছ থেকে ব্যাপারটা জানতে পেরে ঘসেটি বেগম কান্নায় ভেঙে পড়েন। কথিত আছে যে, এসময় আমিনা ও ঘসেটি বেগম এই বলে সান্ত্বনা পাওয়ার চেষ্টা করেন যে তাঁরা নিজেরাই অনেক পাপ করেছেন, তাই মর্মান্তিক মৃত্যুই তাদের প্রাপ্য। তবে তাঁরা ভাগ্যবান যে এভাবে মৃত্যু হলে তাঁদের পাপের ভার মীরণের ওপর পড়বে। তাদের দু’জনকে একটি নৌকো করে ঢাকার অদূরে বুড়িগঙ্গায় নিয়ে যাওয়া হয় এবং সেই নৌকো মাঝনদীতে ডুবিয়ে দেওয়া হয়। এভাবে দুই বোন ঘসেটি ও আমিনা বেগমের সলিল সমাধি হয়। জনশ্রুতি আছে যে দুই বোন মীরণকে এই বলে অভিশাপ দেন যে বজ্রাঘাতে যেন তাঁর মৃত্যু হয়। তাই নাকি হয়েছিল, যদিও এর সত্যতা সম্বন্ধে সন্দেহ আছে।[১৩]

সূত্রনির্দেশ ও টীকা

  1. সিয়র, ২য় খণ্ড, পৃ. ১০৯; J. N. Sarkar History of Bengal, vol II, p. 469; B. N. Banerjee, Begams of Bengal, p. 14.
  2. Law’s Memoir, Hill, III, pp. 162-64; S. Chaudhury, Prelude to Empire, pp. 34 35.
  3. J. N. Sarkar, History of Bengal, vol. II, p. 470.
  4. K. K. Datta, Sirajuddaullah, pp. 1-2.
  5. মুজাফ্‌ফরনামা, J. N. Sarkar, ed., Bengal Nawabs, pp. 56-57; আওয়াল-ই-মহবৎজঙ্গী, J. N. Sarkar, ed., Bengal Nawabs, pp. 152-53; J. N. Sarkar, ed., History of Bengal, vol. II, p. 446; সিয়র, ২য় খণ্ড, পৃ. ১২৭।
  6. রিয়াজ, পৃ. ৩৬২; মুজাফ্‌ফরনামা, J. N. Sarkar, ed., Bengal Nawabs, p.58; সিয়র, ২য় খণ্ড, পৃ. ৬০৯-১১; J. N. Sarkar, ed., History of Bengal, vol. II, p.447.
  7. S. Chaudhury, Prelude to Empire, pp. 41-42.
  8. ডুপ্লেকে রেনল্টের চিঠি, চন্দননগর, ২৬ আগস্ট ১৭৫৬, Hill, I, p. 207.
  9. Law’s Memoir, Hill, III, pp. 162-64; Hill, III, p. 219.
  10. কোর্ট অফ্‌ ডাইরেক্টরসকে লেখা হলওয়েলের চিঠি, ১০ আগস্ট ১৭৫৭, Hill, III, p. 349; Drake’s Narrative, 19 July 1756, Hill, I, pp. 122-23.
  11. রিয়াজ, পৃ. ৩৬৩; তারিখ-ই-বংগালা-ই-মজবৎজঙ্গী, পৃ. ১১৮।
  12. মুজাফ্‌ফরনামা, পৃ. ৬১-৬২; রিয়াজ, পৃ. ৩৬৩; সিয়র, ২য় খণ্ড, পৃ. ১৮৫-৮৬, Hill, II, P. 2; III, pp. 217-18.
  13. সিয়র, ২য় খণ্ড, পৃ. ২৮১, ৩৬৮-৭০; রিয়াজ, ৩৮৯; B. N. Banerjee, Begams of Bengal, pp. 21-23.