ফ্রান্সিস সমগ্র
অনেকদিন আগের কথা। শান্ত সমুদ্রের বুক চিরে চলেছে একটা নিঃসঙ্গ পালতোলা জাহাজ। যতদূর চোখ যায় শুধু জল আর জল– সীমাহীন সমুদ্র।
বিকেলের পড়ন্ত রোদে পশ্চিমের আকাশটা যেন স্বপ্নময় হয়ে উঠেছে। জাহাজের ডেক-এ দাঁড়িয়ে সেইদিকে তাকিয়ে ছিল ফ্রান্সিস। সে কিন্তু পশ্চিমের আবির-ঝরা আকাশ দেখছিল না। সে ছিল নিজের চিন্তায় মগ্ন। ডেক-এ পায়চারি করতে করতে মাঝে-মাঝে দাঁড়িয়ে পড়ছিল। ভূরু কুঁচকে তাকাচ্ছিল, কখনো আকাশের দিকে, কখনো সমুদ্রের দিকে। তার মাথায় শুধু একটাই চিন্তা– সোনার ঘণ্টার গল্প কি সত্যি, না সবটাই গুজব। নিরেট সোনা দিয়ে তৈরী একটা ঘণ্টা– বিরাট ঘণ্টা– এই ভূমধ্যসাগরের কাছাকাছি কোন দ্বীপে নাকি আছে সেটা। কেউ বলে সেই সোনার ঘণ্টাটা নাকি জাহাজের মাস্তুলের সমান উঁচু, কেউ বলে সাত-আট মানুষ সমান উঁচু। যত বড়ই হোক– নিরেট সোনা দিয়ে তৈরী একটা ঘণ্টা, সোজা কথা নয়।
এই ঘণ্টাটা তৈরী করার ইতিহাসও বিচিত্র। স্পেন দেশের সমুদ্রের ধারে ডিমেলো নামে ছোট্ট একটা শহর। সেখানকার গীর্জায় থাকতো জনপঞ্চাশেক পাদ্রী। তারা দিনের বেলায় পাদ্রীর কাজকর্ম করতো। কিন্তু সন্ধ্যে হলেই পাদ্রীর পোশাক খুলে ফেলে সাধারণ পোশাক পরে নিতো। তারপর ঘোড়ায় চড়ে বেরুত। ডাকাতি, লুটপাট করতে। প্রতি রাত্রে দশ পনেরোজন করে বেরুত। টাকা-পয়সা লুঠ করা তাদের লক্ষ্য ছিল না। লক্ষ্য শুধু একটাই– সোনা সংগ্রহ করা। শুধু সোনাই লুঠ করত তারা।
ধারে কাছে শহরগুলোতে এমন কি দূর-দূর শহরেও তারা ডাকাতি করতে যেত। ভোর হবার আগেই ফিরে আসত ডিমেলোর গীর্জায়। গীর্জার পেছনে ঘন জঙ্গল। তার মধ্যে একটা ঘণ্টার ছাঁচ মাটি দিয়ে তৈরি করেছিল। সোনার মোহর বা অলংকার যা কিছু ডাকাতি করে আনত, সব গলিয়ে সেই ঘণ্টার ছাঁচে ফেলে দিত। এইভাবে দিনের পর দিন, বছরের পর বছর সোনা দিয়ে ছাঁচ ভরানো চলল।
কিন্তু ঘণ্টা অর্ধেক তৈরি হবার পর কাজ বন্ধ হয়ে গেল। এত ডাকাতি হতে দেখে দেশের সব বড়লোকেরা সাবধান হয়ে গেল। তারা সোনা সরিয়ে ফেলতে লাগল। ডাকাতি করে সিন্দুক ভেঙে পাদ্রী ডাকাতরা পেতে লাগল শুধু রুপার মুদ্রা। মোহর বা সোনার অলংকারের নামগন্ধও নেই।
কি করা যায়? ডাকাত পাদ্রীরা সব মাথায় হাত দিয়ে বসল। সোনার ঘণ্টাটা অর্ধেক হয়ে থাকবে? তারা যখন ভেবে কুলকিনারা পাচ্ছে না, তখন একজন পাদ্রী খবর নিয়ে এল– দেশের সব বড়লোকেরা বিদেশে সোনা সরিয়ে ফেলছে জাহাজে করে। ব্যাস। অমনি পাদ্রী ডাকাতরা ঠিক করে ফেলল, এবার জাহাজ লুঠ করতে হবে। যেমন কথা তেমনি কাজ। একটা জাহাজ কিনে ফেলল তারা। তারপর নিজেদের মধ্যে থেকে তিরিশজন বাছাই করা লোক নিয়ে একদিন গভীর রাত্রে তারা সমুদ্রে জাহাজ ভাসাল। বাকি পাদ্রীরা গীর্জাতেই রইল। লোকের চোখে ধুলো দিতে হবে তো! ডিমেলো শহরের লোকেরা জানল– গীর্জার তিরিশজন পাদ্রী বিদেশে গেছে ধর্মপ্রচারের জন্য। কারো মনেই আর সন্দেহের অবকাশ রইল না।
দীর্ঘ তিন-চার মাস ধরে পাত্রী ডাকাতরা সমুদ্রের বুকে ডাকাতি করে বেড়াল। স্পেনদেশ থেকে যত জাহাজ সোনা নিয়ে বিদেশে যাচ্ছিল, কোন জাহাজ রেহাই পেল না।
লুঠতরাজ শেষ করে ডাকাত পাদ্রীরা ডিমেলো শহরের গীর্জায় ফিরে এল। জাহাজ থেকে নামানো হল সোনাভর্তি বাক্স। দেখা গেল কুড়িটা কাঠের বাক্স ভর্তি অজস্র মোহর আর সোনার অলংকার। সবাই খুব খুশী হল। যাক এতদিনে ঘণ্টাটা পুরো তৈরী হবে।
ঘণ্টাটা সম্পূর্ণ তৈরী হল। কিন্তু মাটির ছাঁচটা ভেঙে ফেলল না। ছাঁচ ভেঙে ফেললেই তো সোনার ঘণ্টাটা বেরিয়ে আসবে। যদি সোনার ঝকমকানি কারোর নজরে পড়ে যায়।
তারপরের ঘটনা সঠিক জানা যায় না। তবে ফ্রান্সিস বুড়ো নাবিকদের মুখে গল্প শুনেছে, ডাকাত পাদ্রীরা নাকি একটা মস্তবড় কাঠের পাঠাতনে সেই সোনার ঘণ্টা তুলে নিয়ে জাহাজের পেছনে বেঁধে নিরুদ্দেশ যাত্রা করেছিল। সোনার ঘণ্টার গায়ে ঘন কালো রং লাগিয়ে দিয়েছিল যাতে কেউ দেখলে বুঝতে না পারে যে ঘণ্টাটা সোনার। ভূমধ্যসাগরের ধারেকাছে এক নির্জনদ্বীপে তারা সোনার ঘণ্টাটা লুকিয়ে রেখেছিল। তারপর ফেরার পথে প্রচণ্ড ঝড়ের মুখে ডাকাত পাদ্রীদের জাহাজ ডুবে গিয়েছিল। একজনও বাঁচেনি। কাজেই সেই নির্জন দ্বীপের হদিস আজও সবার কাছে অজানাই থেকে গেছে।
– এই যে ভায়া।
ফ্রান্সিসের চিন্তার জাল ছিঁড়ে গেল। ভুঁড়িওলা জ্যাকব কখন কাছে এসে দাঁড়িয়েছে ও বুঝতেই পারেনি। জ্যাকব হাসতে হাসতে বলল – ভুরু কুঁচকে কি ভাবছিলে অত?
ফ্রান্সিস নিঃশব্দে আঙুল দিয়ে পশ্চিমের লাল লাল আকাশটা দেখল।
– ওখানে কি? জ্যাকব বোকাটে মুখে জিজ্ঞেস করল।
– ওখানে– আকাশে কত সোনা– অথচ সব ধরাছোঁয়ার বাইরে। জ্যাকব এক মুহূর্ত চুপ করে থেকে বাজখাই গলায় হেসে বলল– “ফ্রান্সিস তোমার নির্ঘাৎ ক্ষিদে পেয়েছে, খাবে চলো।”
খেতে বসে দুজনে কথাবার্তা বলতে লাগল। ফ্রান্সিস জাহাজের আর কোন নাবিকের সঙ্গে বেশী মিশত না। ওর ভালও লাগত না। কিন্তু এই ভুঁড়িওয়ালা জ্যাকবের সঙ্গে ওর খুব বন্ধুত্ব হয়ে গিয়েছিল। ও জ্যাকবের কাছে মনের কথা খুলে বলত।
ফ্রান্সিস ছিল জাতিতে ভাইকিং। ইউরোপের পশ্চিম সমুদ্রতীরে ভাইকিংদের দেশ। ভাইকিংদের অবশ্য বদনাম ছিল ‘জলদস্যু’র জাত বলে। শৌর্যে-বীর্যে এবং জাহাজ চালনায় অসাধারণ নৈপুণ্যের জন্যে ইউরোপের সব জাতিই তাদের তারিফ করত। ফ্রান্সিস কিন্তু সাধারণ ঘরের ছেলে না। ভাইকিংদের রাজার মন্ত্রীর ছেলে সে। কিন্তু এই ভিনদেশী জাহাজে যাচ্ছিল সাধারণ নাবিকদের কাজ নিয়ে – নিজের পরিচয় গোপন করে। এটা জানত শুধু ভুঁড়িওলা জ্যাকব।
মুরগীর ঠ্যাং চিবুতে চিবুতে জ্যাকব ডাকল – ফ্রান্সিস?
– হুঁ –
– তুমি বাপু দেশে ফিরে যাও।
– কেন?
– আমাদের এই দাঁড়বাওয়া, ডেক-মোছা– এসব কম্মো তোমার জন্যে নয়।
ফ্রান্সিস একটু চুপ করে থেকে বলল– তোমার কথাটা মিথ্যে নয়। এত পরিশ্রমের কাজ আমি জীবনে করিনি। কিন্তু জানো তো– আমরা ভাইকিং– যেকোনোরকম কষ্ট সহ্য করবার ক্ষমতা আমাদের জন্মগত। তাছাড়া–
– কি?
– ছেলেবেলা থেকে শুনে আসছি সেই সোনার ঘণ্টার গল্প–
– ও। সেই ডাকাত পাদ্রীদের সোনার ঘণ্টা? আরে ভাই ওটা গাঁজাখুরী গপ্পো।
– আমার কিন্তু তা মনে হয় না।
– তবে?
– আমার দৃঢ় বিশ্বাস ভূমধ্যসাগরের ধারে কাছে কোন দ্বীপে নিশ্চয়ই সেই সোনার ঘণ্টা আছে।
– পাগল। জ্যাকব খুক্-খুক্ করে হেসে উঠল।
ফ্রান্সিস একবার চারিদিকে তাকিয়ে নিয়ে চাপাস্বরে বলল– জানো– দেশ ছাড়বার আগে একজন বুড়ো নাবিকের সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল। বুড়োটা বলত– ও নাকি সোনার ঘণ্টার বাজনা শুনেছে।
– এ্যাঁ? বলো কি! জ্যাকব অবাক চোখে তাকাল।
– লোকে অবশ্য বুড়ো নাবিকটাকে পাগল বলে ক্ষেপাত। আমি কিন্তু মন দিয়ে ওর গল্প শুনেছিলাম।
– কী গল্প?
– ভূমধ্যসাগর দিয়ে নাকি ওদের জাহাজ আসছিল একবার। সেই সময় এক প্রচণ্ড ঝড়ের মুখে ওরা দিক ভুল করে ফেলে। তারপর ডুবো পাহাড়ের গায়ে ধাক্কা লেগে ওদের জাহাজ ডুবে যায়। ডুবন্ত জাহাজ থেকে জলে ঝাঁপিয়ে পড়ার সময় ও একটা ঘণ্টার শব্দ শুনেছিল– ঢং-ঢং। ঝড়জলের শব্দ ছাপিয়ে বেজেই চলেছিল– ঢং-ঢং।
জ্যাকবের খাওয়া বন্ধ হয়ে গেল। সে হাঁ করে ফ্রান্সিসের মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে তারপর জিজ্ঞেস করলে– সোনার ঘণ্টার শব্দ?
– নিশ্চয়ই। ফ্রান্সিস মাথা ঝাঁকিয়ে বলল।
ভুঁড়িওয়ালা জ্যাকবের মুখ দিয়ে আর কথা সরলো না।
* * *
পরের দু’দিন জাহাজের নাবিকদের বেশ আনন্দেই কাটলো। পরিষ্কার ঝকঝকে আকাশ। জোর বাতাস। জাহাজের পালগুলো হাওয়ার তোড়ে বেলুনের মত ফুলে উঠল। জাহাজ চলল তীরবেগে। দাঁড়টানার হাড়ভাঙ্গা খাটুনি থেকে নাবিকরা এই দু’দিন রেহাই পেল। কিন্তু জাহাজের ডেক পরিষ্কার করা, জাহাজের মালিকের ফাইফরমাস খাটা, এসব করতে হল। তবু নাবিকেরা সময় পেল– তাস খেলল, ছক্কা-পাঞ্জা খেলল, আড্ডা দিল, গল্পগুজব করল অনেক রাত পর্যন্ত।
ফ্রান্সিস যতক্ষণ সময় পেয়েছে হয় ডেক-এ পায়চারি করেছে, নয়তো নিজের বিছানায় শুয়ে থেকেছে। ভুঁড়িওলা জ্যাকব মাঝে-মাঝে ওর খোঁজ করে গেছে। শরীর ভালো আছে কিনা, জিজ্ঞেস করেছে। একটু খোশগল্পও করতে চেয়েছে। কিন্তু ফ্রান্সিসের তরফ থেকে কোন উৎসাহ না পেয়ে অন্য নাবিকদের আড্ডায় গিয়ে গল্প জুড়েছে। ফ্রান্সিসের একা থাকতে ভালো লাগছিল, নিজের চিন্তায় ডুবে থাকতে। দেশ ছেড়েছে কতদিন হয়ে গেল। আত্মীয়-স্বজন সবাইকে ছেড়ে এক নিরুদ্দেশ যাত্রায় বেরিয়েছে ও। কবে ফিরবে অথবা কোনদিন ফিরবে কি না কে জানে। মাথায় ওর মাত্র একটাই সংকল্প, যে করেই হোক খুঁজে বের করতে হবে সোনার ঘণ্টার হদিস।
সোনার ঘণ্টার কথা ভাবতে-ভাবতে কখন ঘুমে চোখ জড়িয়ে এসেছিল, ফ্রান্সিস জানে না। হঠাৎ নাবিকদের দৌড়োদৌড়ি উচ্চ কণ্ঠে ডাকাডাকি-হাঁকাহাঁকি শুনে ওর ঘুম ভেঙে গেল। ভোর হয়ে গেছে বোঝা যাচ্ছে। কিন্তু হল কি? এদের এত উত্তেজনার কারণ কি? এমন সময় জ্যাকব ছুটতে ছুটতে ফ্রান্সিসের কাছে এল।
– সাংঘাতিক কাণ্ড। জ্যাকব তখনও হাঁপাচ্ছে।
– কি হয়েছে?
– ওপরে– ডেক-এ চল– দেখবে ’খন।
দ্রুতপায়ে ফ্রান্সিস ডেক-এর ওপরে উঠে এল। জাহাজের সবাই ডেক-এর ওপরে এসে জড়ো হয়েছে। ফ্রান্সিস জাহাজের চারপাশে সমুদ্র ও আকাশের দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে গেল। প্রচণ্ড গ্রীষ্মকাল তখন। আর বেলাও হয়েছে। অথচ চারদিকে কুয়াশার ঘন আস্তরণ। সূর্য ঢাকা পড়ে গেছে। চারদিকে কেমন একটা মেটে আলো। এক ফোঁটা বাতাস নেই। জাহাজটা স্থাণুর মত দাঁড়িয়ে আছে। সকলের মুখেই দুশ্চিন্তার ছাপ। এই অসময়ে কুয়াশা? কোন এক অমঙ্গলের চিহ্ন নয় তো?
জাহাজের মালিক সর্দার-নাবিককে নিয়ে নিজের ঘরে চলে গেল। বোধহয় কি করবে এখন তারই শলা-পরামর্শ করতে। সবাই বিমূঢ়ের মত দাঁড়িয়ে আছে। হঠাৎ ফ্রান্সিস খুশীতে শিস্ দিয়ে উঠল। আশ্চর্য! শিসের শব্দ অনেকের কানেই পৌঁছল। এই বিপত্তির সময় কোন্ বেআক্কেলে শিস্ দেয় রে? তারা ফ্রান্সিসের দিকে মুখ ফিরিয়ে তাকাল। দেখল– ফ্রান্সিসের মুখে মৃদু হাসি। এবার ওদের আরো অবাক হবার পালা। ফ্রান্সিসকে ওরা কেউ কখনো হাসতে দেখেনি। সব সময় গোমড়া মুখে ভুরু কুঁচকে থাকতেই দেখেছে। মাথায় যেন রাজ্যের দুশ্চিন্তা। সেই লোকটা হাসছে? অবাক কাণ্ড!
ফ্রান্সিসের এই খুশীতে অর্থাৎ শিস দিয়ে ওঠাটা কেউ ভালো চোখে দেখল না। তবে সবাই মনে-মনে গজরাতে লাগল। জ্যাকব গম্ভীর মুখে ফ্রান্সিসের কাছে এসে দাঁড়াল। চাপাস্বরে বলল– বেশী বাড়াবাড়ি করো না।
– কেন?
– সবাই ভয়ে মরছি, আর তুমি কিনা শিস দিচ্ছ?
ফ্রান্সিস হেসে উঠল। জ্যাকব মুখ বেঁকিয়ে বলল, তোমরা ভাইকিং– খুব সাহসী তোমরা, কিন্তু তাই বলে তোমার কি মৃত্যু ভয়ও নেই?
– আছে বৈকি! তবে আমার খুশী হবার অন্য কারণ আছে।
– বলো কি?
– হ্যাঁ। ফ্রান্সিস জ্যাকবের কানের কাছে মুখ দিয়ে চাপা খুশীর স্বরে বলতে লাগল– জানো সেই বুড়ো পাগলা নাবিকটা বলেছিল– ওদের জাহাজ ঝড়ের মুখে পড়বার আগে ডুবো পাহাড়ে ধাক্কা খাওয়ার আগে– এমনি ঘন কুয়াশার মধ্যে আটকে গিয়েছিল– ঠিক এমনি অবস্থা, – বাতাস নেই, কুয়াশায় চারিদিক অন্ধকার–
ফ্রান্সিস আর জ্যাকব ডেক-এর কোনায় দাঁড়িয়ে যখন কথা বলছিল, তখন লক্ষ্য করেনি যে, ডেক-এর আর এক কোনে নাবিকদের একটা জটলার সৃষ্টি হয়েছে। ওরা ফিসফিস্ করে নিজেদের মধ্যে কি যেন বলাবলি করছে। দু-একজন চোখের ইশারায় জ্যাকবকে দেখল। ব্যাপারটা সুবিধে নয়। কিছু একটা ষড়যন্ত্র চলছে। জ্যাকব সজাগ হল। ফ্রান্সিস এতক্ষণ লক্ষ্য করেনি। ও উলটোদিকে মুখ ফিরিয়ে সামনের সাদাটে কুয়াশার আস্তরণের দিকে তাকিয়ে নিজের চিন্তায় বিভোর।
নাবিকদের জটলা থেকে তিন-চারজন ষণ্ডাগোছের নাবিক ধীর পায়ে ওদের দিকে এগিয়ে আসতে লাগল। জ্যাকব ওদের মুখ দেখেই বুঝলো, কিছু একটা কুমতলব আছে ওদের। ফ্রান্সিসকে কনুই দিয়ে একটা গুঁতো দিল। ফ্রান্সিস ঘুরে দাঁড়াল। জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে জ্যাকবের দিকে তাকাল। জ্যাকব চোখের ইশারায় ষণ্ডাগোছের লোকগুলোকে দেখাল। তাদের পেছনে পেছনে আর সব নাবিকেরা দল বেঁধে এগিয়ে আসছে দেখা গেল। ফ্রান্সিস কিন্তু এই থমথমে আবহাওয়াটাকে কাটিয়ে দেবার জন্যে হেসে গলা চড়িয়ে বলল– ব্যাপার কি? অ্যাঁ– এখানে নাচের আসর বসবে নাকি? কিন্তু কেউ ওর কথার জবাব দিল না। ষণ্ডাগোছের লোক ক’জন ওদের দুজনের কাছ থেকে হাত পাঁচেক দূরে এসে দাঁড়াল। দলের মধ্যে থেকে ইয়া দশাসই চেহারার একজন গম্ভীর গলায় ডাকল– এই জ্যাকব, শোন্ এদিকে।
ফ্রান্সিস তখন হেসে বলল– যা বলবার বাপু ওখান থেকেই বলো না।
সেই নাবিকটা এবার আঙ্গুল দিয়ে জ্যাকবকে দেখিয়ে পেছনের নাবিকদের বলল– এই জ্যাকব ব্যাটা ইহুদী। এই বিধর্মীটা যতক্ষণ জাহাজে থাকবে– ততক্ষণ কুয়াশা কাটবে না– বিপদ আরো বাড়বে! তোমরাই বলো ভাই– এই অলুক্ষুণেটাকে কি করবো?
হই-হই চীৎকার উঠল নাবিকদের মধ্যে।
কেউ-কেউ তীক্ষ্মস্বরে চেঁচিয়ে বলল– জলে ছুঁড়ে ফেলে দাও।
– খুন কর বিধর্মীটাকে।
– ফাঁসীতে লটকাও।
ভয়ে জ্যাকবের মুখ সাদা হয়ে গেল। কিছু বলবার জন্য ওর ঠোঁট দুটো কাঁপতে লাগল। কিছুই বলতে পারল না। দুহাতে মুখ ঢেকে ও কেঁদে উঠল। দশাসই চেহারার নাবিকটা জ্যাকবের উপর ঝাঁপিয়ে পড়বার উপক্রম করতেই ফ্রান্সিস জ্যাকবকে আড়াল করে দাঁড়াল। ফ্রান্সিসের তখন অন্য চেহারা। মুখের হাসি মিলিয়ে গেছে। সমস্ত শরীরটা ইস্পাতের মত কঠিন হয়ে উঠেছে। চোখ জ্বলজ্বল করছে। দাঁতচাপা স্বরে ফ্রান্সিস বলল– জ্যাকব আমার বন্ধু। যে ওর গায়ে হাত দেবে, তার হাত আমি ভেঙ্গে দেব।
একমুহূর্তে গোলমাল হই-চই থেমে গেল। ষণ্ডা ক’জন থমকে দাঁড়াল। কে যেন চীৎকার করে উঠল– দু’টোকেই জলে ছুঁড়ে ফেলে দাও।
আবার চিৎকার, মার-মার রব উঠল। ফ্রান্সিস আড়চোখে এদিক-ওদিক তাকাতে তাকাতে দেখল ডেক-এর কোণার দিকে একটা ভাঙা দাঁড়ের হাতলের অংশটা পড়ে আছে। চোখের নিমেষে সেটা কুড়িয়ে নিয়ে লাঠির মত বাগিয়ে ধরল। চেঁচিয়ে বলল– সাহস থাকে তো এক-একজন করে আয়।
দশাসই চেহারার লোকটা ফ্রান্সিসের দিকে এসে ঝাঁপিয়ে পড়ল। বিদ্যুদ্গতিতে একধারে সরে গিয়ে ফ্রান্সিস হাতের ভাঙা দাঁড়টা চালাল ওর মাথা লক্ষ্য করে। লোকটার মুখ দিয়ে একটা শব্দ বেরল শুধু– ‘অ-ক’। তারপরই ডেকের ওপর সে মুখ থুবড়ে পড়ল। মাথাটা দুহাতে চেপে কাতরাতে লাগল। ওর আঙ্গুলের ফাঁক দিয়ে রক্ত গড়াতে লাগল। ঘটনার আকস্মিকতায় সবাই থমকে দাঁড়ালো। কিন্তু একমুহূর্ত। তারপরেই আর একটা ষণ্ডাগোছের লোক ঘুষি বাগিয়ে ফ্রান্সিসের দিকে তেড়ে এল। ফ্রান্সিস তৈরী হয়েই ছিল। ভাঙা দাঁড়টা সোজা লোকটার থুতনি লক্ষ্য করে চালাল। লোকটা বেমক্কা মার খেয়ে দু’হাত শূন্যে তুলে ডেক-এর পাটাতনের ওপর চিৎ হয়ে পড়ল। দাঁত ভাঙল কয়েকটা। মুখ দিয়ে রক্ত উঠল। মুখ চেপে ধরে লোকটা গোঙাতে লাগল। ফ্রান্সিস উত্তেজিত নাবিকদের জটলার দিকে চোখ রেখে চাপাস্বরে ডাকাল– ‘জ্যাকব’।
জ্যাকব এতক্ষণে সাহস ফিরে পেয়েছে। বুঝতে পেরেছে ফ্রান্সিসের মত রুখে না দাঁড়াতে পারলে মরতে হবে। জ্যাকব চাপাস্বরে উত্তর দিল কী?
– ঐ যে ডেকঘরের দেয়ালে সর্দারের বেল্টসুন্ধ তরোয়ালটা ঝোলানো রয়েছে– ঐ দেখছো?
– হ্যাঁ।
– এক ছুটে গিয়ে নিয়ে এসো। ভয় নেই– একবার তরোয়ালটা হাতে পেলে সবকটাকে আমি একাই নিকেশ করতে পারবো– জলদি ছোট–
জ্যাকব পড়ি কি মরি ছুটল ডেকঘরের দেয়ালের দিকে। নাবিকদের দল কিছু বোঝবার আগেই ও দেওয়ালে ঝোলানো তরোয়ালটা খাপ থেকে খুলে নিল। এতক্ষণে নাবিকের দল ব্যাপারটা বুঝতে পারল। সবাই হইহই করে ছুটল জ্যাকবকে ধরতে। জ্যাকব ততক্ষণে তরোয়ালটা ছুঁড়ে দিয়েছে ফ্রান্সিসের দিকে। তরোয়ালটা ঝনাৎ করে এসে পড়ল ফ্রান্সিসের পায়ের কাছে। তরোয়ালটা তুলে নিয়েই ও ছুটল ভিড়ের দিকে। ততক্ষণে ক্রুদ্ধ নাবিকের দল জ্যাকবকে ঘিরে ধরেছে। কয়েকজন মিলে জ্যাকবকে ধরে ডেকঘরের কাঠের দেয়ালে ওর মাথা ঠুকিয়ে দিতে শুরু করেছে। কিন্তু খোলা তরোয়াল হাতে ফ্রান্সিসকে ছুটে আসতে দেখে ওরা জ্যাকবকে ছেড়ে দিয়ে এদিক-ওদিক ছুটে সরে গেল। ফ্রান্সিস সেই নাবিকদলের দিকে তলোয়ার উঁচিয়ে গলা চড়িয়ে বলল– জ্যাকব বিধর্মী হোক, আর যাই হোক– ও আমার বন্ধু। যদি তোদের প্রাণের মায়া থাকে জ্যাকবের গায়ে হাত দিবি না।
ফান্সিসের সেই রুদ্রমূর্তি দেখে সবাই বেশ ঘাবড়ে গেল! ওরা জানতো– ফ্রান্সিস জাতিতে ভাইকিং। তরোয়াল হাতে থাকলে ওদের সঙ্গে এঁটে ওটা মুশকিল। ডেক-এর ওপরে এত হই-চই চীৎকার ছুটোছুটির শব্দে মালিক আর নাবিকসর্দার ওপরে উঠে এল। ওরা ভাবতেই পারেনি, যে ব্যাপার এতদূর গড়িয়েছে। এদিকে দু’জন ডেক-এর ওপর রক্তাক্ত দেহে কাতরাচ্ছে– ওদিকে ফ্রান্সিস খোলা তরোয়াল হাতে রুদ্রভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে।
জাহাজের মালিক আশ্চর্য হয়ে গেল। সে দু’হাত তুলে চীৎকার করে বলল– শোন সবাই– মারামারি করবার সময় পরে অনেক পাবে, এখন যে বিপদে পড়েছি, তা থেকে উদ্ধারের কথা ভাবো।
এতক্ষণ উত্তেজনা মারামারির মধ্যে সবাই বিপদের কথা ভুলে গিয়েছিল। এখন আবার সবাই ভয়-ভয় চোখে চারদিকে ঘন কুয়াশার দিকে তাকাতে লাগল। কারো মুখে কথা নেই। এমন সময় ষণ্ডাগোছের নাবিকদের মধ্যে একজন চীৎকার করে বলল– এই যে জ্যাকব-– ও ইহুদী– ওর জন্যই আমাদের এই বিপদ।
আবার গোলমাল শুরু হল। মালিক দু’হাত তুলে সবাইকে থামাবার চেষ্টা করতে লাগল। গোলমাল কমলে বলল– এটা বাপু জাহাজ– গীর্জে নয়! কার কি ধম্মো, তাই দিয়ে আমার কি দরকার। আমি চাই কাজের লোক। জ্যাকব তো কাজকর্ম ভালোই করে।
আবার চীৎকার শুরু হল– আমরা ওসব শুনতে চাই না।
– জ্যাকবকে জাহাজ থেকে ফেলে দাও।
– ফাঁসিতে লটকাও।
জাহাজের মালিক ব্যবসায়ী মানুষ। সে কেন একটা লোকের জন্যে ঝামেলা পোহাবে। সে বলল– বেশ তোমরা যা চাইছ, তাই হবে।
ফ্রান্সিস চীৎকার করে বলে উঠল– আমার হাতে তরোয়াল থাকতে সেটি হবে না।
জাহাজের মালিক পড়ল মহাফাঁপরে! তবে সে বুদ্ধিমান ব্যবসায়ী। খুনোখুনি-রক্তপাত এসবে বড় ভয়। বলল– ঠিক আছে, আর একটা দিন সময় দাও তোমরা। দাঁড়ে হাত লাগাও– জাহাজ চলুক– দেখা যাক– যদি একদিনের মধ্যেও কুয়াশা না কাটে তাহলে জ্যাকবকে ছুঁড়ে ফেলে দিও।
নাবিকদের মধ্যে গুঞ্জন চলল। একটু পরে সেই ষণ্ডাগোছের নাবিকটা বলল, ঠিক আছে– আমরা আপনাকে একদিন সময় দিলাম।
– তাহলে আর দেরি করো না। সবাই যে যার কাজে লেগে পড়ো। মালিক নাবিকসর্দারের দিকে ইশারা করল। সর্দার ফ্রান্সিসের কাছে গিয়ে হাত বাড়িয়ে দাঁড়াল। ফ্রান্সিস একবার সেই নাবিকদের জটলার দিকে তাকাল। তারপর তরোয়ালটা সর্দারের হাতে দিল। চাপাস্বরে জ্যাকবকে বলল– ভয় নেই। দেখো– একদিনের মধ্যে অনেক কিছু ঘটে যাবে।
নাবিকদের জটলা ভেঙে গেল। যে যার কাজে লেগে পড়ল। একদল পাল সামলাতে মাস্তুল বেয়ে ওপরে উঠতে লাগল। ফ্রান্সিসদের দল সর্দারের নির্দেশে সবাই জাহাজের খোলে নেমে এল। সেখানে দু’ধারে সার সার বেঞ্চির মত কাঠের পাটাতন পাতা। সামনে একটা লম্বা দাঁড়ের হাতল। বেঞ্চিতে বসে ওরা পঞ্চাশজন দাঁড়ে হাত লাগাল। তারপর সর্দারের ইঙ্গিতে একসঙ্গে পঞ্চাশটা দাঁড় পড়ল জলে– ঝপ্-ঝপ্। জাহাজটা নড়েচড়ে চলতে শুরু করল। ফ্রান্সিসের, ঠিক সামনেই বসেছিল জ্যাকব। দাঁড় টানতে টানতে ফ্রান্সিস ডাকল– জ্যাকব?
– হুঁ।
– যদি সেই বুড়ো নাবিকটার কথা সত্যি হয়, তাহলে–
– তাহলে কী?
– তাহলে আর কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা ঝড়ের মুখে পড়ব।
– তারপর?
– ডুবো পাহাড়ে ধাক্কা লেগে–
– জলের তলায় অক্কা পাবে–
– তার আগে সোনার ঘণ্টাটা বাজনা তো শুনতে পাবো।
জ্যাকব এবার মুখ ফিরিয়ে ফ্রান্সিসের মুখের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলল– পাগল!
জাহাজ চলল। ছপ্-ছপ্। পঞ্চাশটা দাঁড়ের শব্দ উঠছে। চারিদিকে জমে থাকা কুয়াশার মধ্য দিয়ে জাহাজ চলছে। কেমন একটা গুমোট গরম। দাঁড়িদের গা দিয়ে দরদর করে ঘাম ঝরছে। একফোঁটা হাওয়ার জন্যে সবাই হা-হুতাশ করছে।
হঠাৎ একটা প্রচণ্ড ঝড়ো হাওয়ার ঝাঁপটায় সমস্ত জাহাজটা ভীষণভাবে কেঁপে উঠল। কে কোথায় ছিটকে পড়ল, তার ঠিক নেই। পরক্ষণেই প্রবল বৃষ্টিধারা আর হাওয়ার উন্মত্ত মাতন। তালগাছ সমান উঁচু-উঁচু ঢেউ জাহাজের গায়ে এসে আছড়ে পড়তে লাগল। জাহাজটা কলার মোচার মত ঢেউয়ের আঘাতে দুলতে লাগল। এই একবার জাহাজটা ঢেউ-এর গভীর ফাটলের মধ্যে ঢুকে যাচ্ছে, আবার পরক্ষণেই প্রচণ্ড ধাক্কায় উঠে আসছে ঢেউয়ের মাথায়।
ঝড়ের প্রথম ধাক্কায় ফ্রান্সিস মুখ থুবড়ে পড়েছিল। তবে সামনে নিয়েছিল খুব। কারণ ও তৈরীই ছিল– ঝড় আসবেই। আর সবাই এদিক-ওদিক ছিটকে পড়েছিল। হামাগুড়ি দিয়ে কাঠের পাটাতন ধরে ধরে অনেকেই নিজের জায়গায় ফিরে এল। এল না শুধু জ্যাকব। কিছুক্ষণ আগে যে ধকল গেছে ওর ওপর দিয়ে। তারপর ঝড়ের ধাক্কায় টাল সামলাতে না পেরে পাটাতনের কোণায় জোর ধাক্কা খেয়ে ও অজ্ঞানের মত পড়েছিল একপাশে। ফ্রান্সিস কয়েকবার জ্যাকবকে ডাকল। ঝড়ের গোঁ-গোঁয়ানি মধ্যে সেই ডাক জ্যাকবের কানে পৌঁছল না। ফ্রান্সিস দাঁড় ছেড়ে হামাগুড়ি দিয়ে এদিক-ওদিক ঘুরে জ্যাকবকে খুঁজতে লাগল। কিন্তু কোথায় জ্যাকব? আর খোঁজা সম্ভব নয়। প্রচণ্ড দুলুনির মধ্যে টাল সামলাতে না পেরে বারবার হুমড়ি খেয়ে পড়ছিল ফ্রান্সিস।
হঠাৎ শক্ত কিছুতে ধাক্কা লেগে জাহাজের তলাটা মড়মড় করে উঠল। দাঁড়গুলো প্যাকাটির মত মটমট করে ভেঙে গেল। ফ্রান্সিস চমকে উঠল– ডুবোপাহাড়! আর এক মুহূর্ত দেরি না করে ফ্রান্সিস বহু কষ্টে টলতে টলতে ডেক-এর ওপর উঠে এল। দেখল, ঝোড়ো হাওয়ার আঘাতে বিরাট ঢেউ ডেক-এর ওপর আছড়ে পড়ছে। আর সে কি দুলুনি! ঠিক তখনই সমস্ত জল ঝড় বৃষ্টির শব্দ ছাপিয়ে শুনতে পেল ঘণ্টার শব্দ– ঢং-ঢং-ঢং। ঘণ্টা বেজেই চলল। সোনার ঘণ্টার শব্দ– ঢং-ঢং।
ফ্রান্সিস উল্লাসে চীৎকার করে উঠল। ঠিক তখনই মড়মড় শব্দে জাহাজের তলাটা ভেঙে গেল, আর সেই ভাঙা ফাটল দিয়ে প্রবল বেগে জল ঢুকতে লাগল। মুহূর্তে জাহাজের খোলটা ভরে গেল। জাহাজটা পেছন দিকে কাৎ হয়ে ডুবতে লাগল। সশব্দে মাস্তুলটা ভেঙ্গে পড়ল। জাহাজের রেলিঙের কোণায় লেগে মাস্তুলটা ভেঙে দু’টুকরো হয়ে গেল। উত্তাল সমুদ্রের বুকে মাস্তুলের যে টুকরোটা পড়ল, সেটার দিকে লক্ষ্য রেখে ফ্রান্সিস জলে ঝাঁপিয়ে পড়ল। ঢেউয়ের ধাক্কা খেতে খেতে কোনোরকমে ভাঙা মাস্তুলটা জড়িয়ে ধরল। বহুকষ্টে মাস্তুলের সঙ্গে বাঁধা দড়িটা দিয়ে নিজের শরীরটা মাস্তুলের সঙ্গে বেঁধে নিল। ওদিকে ঘণ্টার শব্দ ফ্রান্সিসের কানে এসে তখন বাজছে– ঢং-ঢং-ঢং।
* * *
ভোর হয়-হয়। পূর্বদিকে সমুদ্রের ঢেউয়ের মাথায় আকাশটায় লালচে রঙ ধরেছে। সূর্য উঠতে দেরি নেই। সাদা-সাদা সমুদ্রের পাখীগুলো উড়ছে আকাশে। বিস্তীর্ণ বালিয়াড়ির মধ্যে সমুদ্রের জলের ধার ঘেঁষে ফ্রান্সিস পড়ে আছে মড়ার মতো। কোন সাড়া নেই। ঢেউগুলো বালিয়ারির ওপর দিয়ে গড়িয়ে ওর গা পর্যন্ত চলে আসছে।
সমুদ্র-পাখীর ডাক ফ্রান্সিসের কানে গেল। অনেক দূরে পাখীগুলো ডাকছে। আস্তে আস্তে পাখীর ডাক স্পষ্ট হল। চেতনা ফিরে পেল ফ্রান্সিস। বেশ কষ্ট করেই চোখ খুলতে হল ওকে। চোখের পাতায় নুনের সাদাটে আস্তরণ পড়ে গেছে। মাথার ওপর আকাশটা দেখলও। অন্ধকার কেটে গেছে। অনেক কষ্টে আড়ষ্ট ঘাড়টা ফেরাল। দেখল সূর্য উঠছে। মস্তবড় থালার মতো টকটকে লাল সূর্য। আস্তে-আস্তে সূর্যটা ঢেউয়ের গা লাগিয়ে উঠতে লাগল। সবটা উঠল না, বড় বিন্দুর মত একটা অংশ লেগে রইল জলের সঙ্গে। তারপর টুপ করে উঠে ওপরের লাল থালাটার সঙ্গে মিশে গেল। সমুদ্রে এই সূর্য ওঠার দৃশ্য ফ্রান্সিসের কাছে খুবই পরিচিত। কিন্তু আজকে এটা নতুন বলে মনে হল। বড় ভাল লাগল। নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে ফিরে এসেছে ও।
ফ্রান্সিস জোরে শ্বাস ফেলল– আঃ কি সুন্দর এই পৃথিবী!
বেশ কষ্ট করে শরীরটা টেনে তুলল ফ্রান্সিস। হাতে ভর রেখে একবার চারদিকে তাকাল। ভরসা– যদি জাহাজের আর কেউ ওর মত ভাসতে ভাসতে এখানে এসে উঠে থাকে। কিন্তু বিস্তীর্ণ বালিয়াড়িতে যতদূর চোখ যায় ও কাউকেই দেখতে পেল না। ওদের জাহাজের কেউ বোধহয় বাঁচেনি। জ্যাকবের কথা মনে পড়ল। মনটা ওর বড় খারাপ হয়ে গেল। গা থেকে বালি ঝেড়ে ফেলে ফ্রান্সিস উঠে দাঁড়াল। হাঁটু দুটো কাঁপছে। সোজা হয়ে দাঁড়াতে কষ্ট হচ্ছে। শরীর অসম্ভব দুর্বল লাগছে। তবু উপায় নেই। চলতে হবে। লোকালয় খুঁজতে হবে। খাদ্য চাই, কিন্তু কোন দিকে মানুষের বসতি?
সূর্যের আলো প্রখর হতে শুরু করেছে। ফ্রান্সিস চোখে হাত দিয়ে রোদ আড়াল করে চারদিকে দেখতে লাগল। একদিকে শান্ত সমুদ্র। অন্যদিকে ধুধু বালি আর বালি। জনপ্রাণীর চিহ্নমাত্র নেই। এ কোথায় এলাম? আর ভেবে কি হবে। ফ্রান্সিস পা টেনে সেই ধুধু বালির মধ্যে দিয়ে চলতে লাগল।
মাথার ওপর সূর্য উঠে এল। কি প্রচণ্ড তেজ সূর্যের আলোর। তৃষ্ণায় জিভ পর্যন্ত শুকিয়ে আসছে। হু-হু হাওয়া বইছে, বালি উড়ছে। শরীর আর চলছে না। মাথা ঘুরছে। মাথার ওপর আগুন ঝরানো সূর্য। বালির দিগন্ত দুলে-দুলে উঠছে। শরীর টলছে। তবু হাঁটতেই হবে। একবার থেমে পড়লে, বালিতে মুখ গুঁজে পড়ে গেলে মৃত্যু অনিবার্য। জোরে শ্বাস নিল ফ্রান্সিস। অসম্ভব! থামা চলবে না।
একি? মরীচিকা নয় তো? ফ্রান্সিস হাত দিয়ে চোখ দু’টো ঘষে নিল। নাঃ। ঐ তো সবুজের ইশারা। কয়েকটা খেজুর গাছ। হাওয়ায় পাতাগুলো নড়ছে। কাছে আসতেই নজরে পড়ল তাঁবুর সারি, খেজুর গাছে বাঁধা অনেকগুলো ঘোড়া, একটা ছোট্ট জলাশয়। একটা লোক ঘোড়াগুলোকে দানা-পানি খাওয়াবার তদারকি করছিল। সেই প্রথম ফ্রান্সিসকে দেখতে পেল। লোকটা প্রথমে অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিল। তারপর তীক্ষ্ণস্বরে কি একটা কথা বলে চীৎকার করে উঠল। সঙ্গে সঙ্গে তাঁবুগুলো থেকে অনেক লোক বেরিয়ে এল। তাদের গায়ে আরবীদের পোশাক। ঢোলা জোব্বা পরনে। মাথায় বিড়েবাঁধা সাদা কাপড়। কান পর্যন্ত ঢাকা। ফ্রান্সিসের বুকে আর দম নেই। মুখ দিয়ে হাঁ করে শ্বাস নিচ্ছে তখন। ফ্রান্সিস শুধু দেখতে পেল লোকগুলোর মধ্যে কারো কারো হাতে খোলা তরোয়াল রোদ্দুরে ঝিকিয়ে উঠছে। আর কিছু দেখতে পেল না ফ্রান্সিস। সব কেমন আবছা হয়ে আসছে। ফ্রান্সিস মুখ থুবড়ে পড়ল বালির ওপর। অনেক লোকের কণ্ঠস্বর কানে এল। ওরা নিজেদের মধ্যে কী সব বলাবলি করতে করতে এদিকেই আসছে। তারপর আর কোন শব্দই ফ্রান্সিসের কানে গেল না।
* * *
ফ্রান্সিস যখন চোখ মেলল তখন রাত হয়েছে। ওপরের দিকে তাকিয়ে বুঝল, এটা তাবু। আস্তে আস্তে ওর সব কথা মনে পড়ল। চারিদিকে তাকাল। এককোণে মৃদু আলো জ্বলছে। একটা বিছানার মত নরম কিছুর ওপর শুয়ে আছে। শরীরটা এখন অনেক ভাল লাগছে। ওপাশে কে যেন মৃদুস্বরে কথা বলছে। ফ্রান্সিস পাশ ফিরল। লোকটা তাড়াতাড়ি এসে ওর মুখের ওপর ঝুঁকে পড়ল। লোকটার মুখে দাড়ি-গোঁফ। কপালে একটা গভীর ক্ষতচিহ্ন। হয়তো তরোয়ালের কোপের। লোকটা হাসল– কি? এখন ভাল লাগছে?
মৃদু হেসে ফ্রান্সিস মাথা নাড়ল।
– খিদে পেয়েছে নিশ্চয়ই।
– হ্যাঁ।
লোকটা দ্রুতপায়ে তাবুর বাইরে চলে গেল। ফ্রান্সিস বুঝল– এই লোকটাই তার সেবাশুশ্রূষার ভার নিয়েছে।
পরের দিন বিকেল পর্যন্ত ফ্রান্সিস প্রায় সমস্তক্ষণ বিছানায় শুয়ে রইল। কপালকাটা লোকটাই তার দেখাশুনা করল। ফ্রান্সিস ঐ লোকটার কাছ থেকে শুধু এইটুকুই জানতে পারল, যে এরা একদল বেদুইন ব্যবসায়ী। এখান থেকে কিছুদূরেই আমদাদ শহর। এখানকার সুলতানের রাজধানী। ওখানেই যাবে এরা। সারাদিন এদের দলপতি বারদুয়েক ফ্রান্সিসকে দেখে গেছে। দলপতির দীর্ঘ দেহ, পরনে আরবীয় পোশাক, কোমরে সোনার কাজকরা খাপে লম্বা তরোয়াল। দলপতি বেশ হেসেই কথা বলছিল ফ্রান্সিসের সঙ্গে। ফ্রান্সিসকে তার যে বেশ পছন্দ হয়েছে, এটা বোঝা গেল। দলপতির সঙ্গে সবসময়ই একটা লোককে দেখছিল ফ্রান্সিস। মুখে বসন্তের দাগ। কেমন এবড়ো-থেবড়ো কঠিন মুখ। ধূর্ত চোখের দৃষ্টি। দেখলেই বোঝা যায় লোকটা নিষ্ঠুর প্রকৃতির।
তখন সূর্য ডুবে গেছে। অন্ধকার হয়ে আসছে চারদিক। ফ্রান্সিস তাঁবু থেকে বেরিয়ে একটা খেজুর গাছের নীচে এসে বসল। জলাশয়ের ওপর একজন বেদুইন একা তেড়াবাঁকা তারের যন্ত্র বাজিয়ে নাকিসুরে গান করছে। ফ্রান্সিস চুপ করে বসে গান শুনতে লাগল। হঠাৎ ফ্রান্সিস দেখল দূরে ছায়া-ছায়া বালি-প্রান্তর দিয়ে কে যেন খুব জোরে ঘোড়াছুটিয়ে আসছে। লোকটা এল। তারপর ঘোড়া থেকে নেমেই সোজা দলপতির আঁবুতে ঢুকে পড়ল। একটু পরেই দলপতির তাঁবু থেকে কয়েকজনকে বেরিয়ে আসতে দেখা গেল। কয়েকজন ঢুকল। বেশ একটা ব্যস্ততার ভাব। কি খবর নিয়ে এল লোকটা? ফ্রান্সিসের হঠাৎ মনে হল, ওর পাশেই কে যেন এসে দাঁড়িয়েছে। আরে? সেই কপাল কাটা লোকটা। ওর জন্যে অনেক করেছে অথচ নাম জানা হয়নি।
– আরে বসো-বসো। ফ্রান্সিস সরে বসবার জায়গা করে নিল। লোকটাও বসল।
– কি কাণ্ড দেখ– তোমার নামটাই জানা হয় নি। ফ্রান্সিস বলল।
– ফজল আলি, সবাই ফজল বলেই ডাকে– লোকটা আস্তে-আস্তে বলল।
এবার কি জিজ্ঞেস করবে ফ্রান্সিস ভেবে পেল না।
ফজলই কথা বলল– তুমি আমার কপালের দাগটার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়েছিলে।
ফ্রান্সিস একটু অপ্রস্তুত হল। বলল– তা ওরকম দাগ তো বড় একটা দেখা যায় না।
– আমার ভাই তরোয়াল চালিয়েছিল। এটা তারই দাগ।
– সে কি!
– হ্যাঁ।
ফ্রান্সিস চুপ করে রইল।
– সেইদিন থেকে তরোয়াল একটা রাখতে হয় তাই রাখি, কিন্তু আজ পর্যন্ত সেটা খাপ থেকে বের করিনি। যাকগে– ফজল একটু থেমে বলল– তুমি তো ভাই এখানকার লোক নও।
– ঠিক ধরেছো– আমি ভাইকিং।
– ভাইকিং! বাপরে, তোমাদের বীরত্বের অনেক কাহিনী আমরা শুনেছি।
– তাই নাকি? ফ্রান্সিস হাসল।
– তোমার নাম?
– ফ্রান্সিস।
– কোথায় যাচ্ছিলে?
ফান্সিস একটু ভাবল। সোনার ঘণ্টার খোঁজে যাচ্ছিলাম, এ সব বলা বিপজ্জনক। তা ছাড়া ও সব বললে পাগলও ঠাউরে নিতে পারে। বলল– এই– ব্যবসায় ফিকিরে–
– জাহাজ ডুবি হয়েছিল?
– হ্যাঁ।
দু’জনের কেউ আর কোন কথা বলল না। ফ্রান্সিস একবার আকাশের দিকে তাকাল। পরিষ্কার আকাশজুড়ে তারা। কি সুন্দর লাগছে দেখতে। হঠাৎ ফজল চাপাস্বরে ডাকল– ফ্রান্সিস?
– কি?
– যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এই দল ছেড়ে পালাও।
ফ্রান্সিস চমকে উঠে বলল– কেন?
ফজল চারিদিকে তাকিয়ে চাপাস্বরে বলল– এটা হচ্ছে বেদুইন মরুদস্যুদের দল।
– সে কি!
– হ্যাঁ।
– তুমিও তো এই দলেরই।
– উপায় নেই ভাই– একবার এই দস্যুদলে ঢুকলে পালিয়ে যাওয়ার সব পথ বন্ধ।
– কেন?
– এই তল্লাটের সব শহরে, বাজারে, মরুদ্যানে এদের চর রয়েছে। তোমাকে ঠিক খুঁজে বার করবে। তারপর–
– মানে– খুন করবে?
– বুঝতেই পারছো।
– কিন্তু– ফ্রান্সিসের সংশয় যেতে চায় না। বলল– সর্দারকে তো ভালো লোক বলেই মনে হল।
– তা ঠিক, কিন্তু সর্দারকে চালায় কাসেম– কাসেমকে দেখেছ তো? সব সময় সর্দারের সঙ্গে থাকে।
– হ্যাঁ– বীভৎস দেখতে।
– যেমন চেহারা তেমনি স্বভাব। ওর মত সাংঘাতিক মানুষ আমি জীবনে দেখিনি।
– হুঁ। কাসেমকে দেখে আমারও তাই মনে হয়েছে।
– কালকেই দেখতে পাবে, কাসেমের নিষ্ঠুরতার নমুনা।
– তার মানে?
আজকে শেষ রাত্তিরে আমরা বেরুবো। গুপ্তচর খবর নিয়ে এসেছে এইমাত্র– মস্তবড় একটা ক্যারাভান (মরুপথের যাত্রীদল) এখান থেকে মাইল পাঁচেক দূর দিয়ে যাবে।
– ক্যারাভ্যান?
– হ্যাঁ। ব্যবসায়ীদের ক্যারাভ্যান। দামী-দামী মালপত্র নিয়ে যাচ্ছে। তাছাড়া মোহর, সোনার গয়নাগাঁটি এসব তো রয়েইছে। ক্যারাভ্যানে তো শুধু ব্যবসায়ীরাই যায় না, অন্য লোকেরাও যায় তাদের পরিবারের লোকজন নিয়ে। দল বেঁধে গেলে ভয় কম।
– তোমরা ক্যারাভ্যান লুঠ করবে?
– সর্দারের হুকুম। কথাটা বলেই ফজল গলা চড়িয়ে অন্য কথা বলতে শুরু করল– ‘শুনেছি তোমাদের দেশে নাকি বরফ পড়ে– আমরা বরফ কোনদিন চোখেও দেখিনি।’ ফ্রান্সিস কি বলবে বুঝে উঠতে পারল না। তবে অনুমান করল কাউকে দেখেই ফজল অন্য কথা বলতে শুরু করেছে। আড়চোখে তাকিয়ে দেখল খেজুর গাছের আড়াল থেকে কে যেন বেরিয়ে এল। কাসেম! কাসেম গম্ভীর গলায় বলল ফজল, শেষ রাত্তিরে বেরুতে হবে– ঘুমিয়ে নাও গে, যাও।
– হ্যাঁ এই যাচ্ছি। ফজল তাড়াতাড়ি উঠে পড়ল। চলে যেতে-যেতে গলা চড়িয়ে বলল– তাহলে ঐ কথাই রইল– তুমি ওখান থেকে বরফ চালান দেবে, বদলে আমি এখান থেকে বালি চালান দেবো।
কাসেম এবার কুৎসিত মুখে হাসল– এই সাদা ভিনদেশী– তুইও যাবি সঙ্গে।
ফ্রান্সিসের সর্বাঙ্গ জ্বলে গেল। কথা বলার কি ভঙ্গী! কিন্তুও চুপ কবে রইল। শরীর দুর্বল। এখন আশ্রয়ের প্রয়োজন খুবই, চটাচটি করলে নিজেরই ক্ষতি। সময় আসুক। অপমানের শোধ তুলবে।
ফ্রান্সিস কোন কথা না বলে উঠে দাঁড়িয়ে নিজের তাবুর দিকে পা বাড়াল। পেছনে শুনল এ কাসেমের বীভৎস হাসি– ওঃ শাহজাদার গোঁসা হয়েছে– হা–হা।
* * *
মরুদস্যুর দল ঘোড়ায় চলে চলেছে। শেষ রাত্রির আকাশটা কেমন ঘোলাটে। তারাগুলো অস্পষ্ট। একটা ঠাণ্ডা শিরশিরে হাওয়া বইছে। ফ্রান্সিস উটের লোমের কম্বল কান অব্দি তুলে দিল। কোমরে নতুন তরোয়ালটার খাপটায় হাত দিল একবার।
বালিতে ঘোড়ার ক্ষুরের অস্পষ্ট শব্দ। ঘোড়ার শ্বাস ফেলার শব্দ। মাঝে-মাঝে ঘোড়ার ডাক। মরুদস্যুর দল ছুটে চলেছে। কাসেমের চীৎকার শোনা গেল– আরো জোরে। ফ্রান্সিস ঘোড়ার রাশ অনেকটা আলগা করে দিল। ঘোড়ার পেটে পা ঠুকলো। সকলেই ঘোড়ার চলা গতি বাড়িয়ে দিল।
পূবের আকাশটা লাল হয়ে উঠেছে। একটু পরেই লাল টকটকে সূর্য উঠল। তারপর নরম রোদ ছড়িয়ে পড়ল ধুধুবালির প্রান্তরে। সেই আলোয় হঠাৎ দুরে দেখা গেল– একা আঁকাবাঁকা সচল রেখা। স্যারাভ্যান চলেছে। কাশেমের উল্লসিত উচ্চস্বর শোনা গেল আরো জোরে।
বিদ্যুৎগতিতে ধূলোর ঝড় তুলে মরুদস্যুর দল ছুটলো ক্যারাভ্যান লক্ষ্য করে। একটু পরেই দেখা গেল ক্যারাভ্যানের আঁকাবাঁকা রেখাটা ভেঙে গেল। ওরা মরুদস্যুর লোকদের দেখতে পেয়েছে। যেদিকে পারছে ছুটছে। কিন্তু মালপত্র আর সওয়ারী পিঠে নিয়ে উটগুলো আর কত জোরে ছুটবে। কিছুক্ষণের মধ্যেই মরুদস্যুর দল ওদের দু’দিক থেকে ঘিরে ধরল। সকালের আকাশটা ভরে উঠল নারী আর শিশুদের ভয়ার্ত চিৎকারে।
শুরু হল খণ্ডযুদ্ধ। ক্যারাভ্যানের ব্যবসায়ীরা কিছু ভাড়াকরা পাহারাদার নিয়ে যাচ্ছিল সঙ্গে। তাদের সঙ্গেই লড়াই শুরু হল প্রথমে। উটের পিঠে কাপড়ের ঢাকনা দেওয়া ছইগুলো থেকে ভেসে আসতে লাগল ভয়ার্ত কান্নার চিৎকার। কিন্তু সেদিকে কারো কান নেই। সকালের আলোয় ঝিকিয়ে উঠল তরোয়ালের ফলা। তারপর তরোয়ালের সঙ্গে তরোয়ালের ঠোকাঠুকি– মূমূর্ষদের চীৎকার, গোঙানি।
ফ্রান্সিস একপাশে ঘোড়াটা দাঁড় করিয়ে যুদ্ধ দেখছিল। কিছুক্ষণের মধ্যে ক্যারাভ্যানের প্রহরীরা প্রায় সবাই বালির উপর লুটিয়ে পড়ল।
এমন সময় ব্যবসায়ীদের মধ্যে থেকে আরো কয়েকজন তরোয়াল হাতে এগিয়ে এল। ফ্রান্সিস অবাক হয়ে দেখল তার মধ্যে একটি কিশোর ছেলে। ছেলেটি অদ্ভুত দক্ষতার সঙ্গে তরোয়াল চালাতে লাগল। পাঁচ-ছয়জন মরুদস্যু ওকে ঘিরে ধরল। কিন্তু ছেলেটির কাছেও ঘেঁষতে পারছে না কেউ! ছেলেটির তরোয়াল চালানোর নিপুণ ভঙ্গী আর দুর্জয় সাহস দেখে ফ্রান্সিস মনে মনে তার তারিফ না করে পারল না। যারা ওকে ঘিরে ধরেছিল তাদেরই দুজন রক্তাক্ত শরীরে পালিয়ে এল। ছেলেটি তখনও অক্ষত। সবিক্রমে তরোয়াল চালাচ্ছে। কিশোর ছেলেটিকে দেখে ফ্রান্সিসের মনে পড়ল, নিজের ছোট ভাইটির কথা। তার ভাইটিও এমনি তেজী, এমনি নির্ভীক।
এবার আট-দশজন মরুদস্যু ছেলেটিকে ঘিরে ধরল। কিন্তু ছেলেটির প্রত্যুৎপন্নমতিত্বের কাছে ওদের বার বার হার স্বীকার করতে হল।
হঠাৎ দেখা গেল, কাসেম ছেলেটির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। ফ্রান্সিস বুঝল কাসেমের নিশ্চয়, কোন কুমতলব আছে। লড়াই তখন শেষ। ক্যারাভ্যানের দলের মাত্র কয়েকজন পুরুষ তখনও কোনোরকমে টিকে আছে। বাকী সবাই মৃত নয় তো মারাত্মকভাবে আহত হয়েছে। রয়েছে শুধু নারী আর শিশুরা। কাজেই লুঠতরাজ চালাতে এখন আর কোন বাধাই নেই। কিন্তু কাসেমের মতলব বোধহয় কাউকেই বেঁচে থাকতে দেবে না। ফ্রান্সিস ঘোড়াটা চালিয়ে নিয়ে একটু এগিয়ে দাঁড়ালো।
কাসেম তক্কে তক্কে রইল। ছেলেটি তখন ঘোড়ার মুখ উল্টেদিকে ফিরিয়ে অন্য দস্যু কটার সঙ্গে লড়াই চালাতে লাগল। কাসেম যেন এই সুযোগের অপেক্ষাতেই ছিল। সে নিচু হয়ে ছেলেটির ঘোড়ার পেটের দিকে জিনের চামড়াটায় তরোয়াল চালাল। জিনটা কেটে দু’টুকরো হয়ে গেল। ছেলেটি জিন সুদ্ধু হুড়মুড় করে গড়িয়ে বালির ওপর পড়ে গেল। ঘোড়ার গা থেকে রক্ত ছিটকে লাগল ওর সর্বাঙ্গে। ছেলেটি সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়াল। কাসেম অট্টহাসি হেসে উঠল। ওর কুৎসিত মুখটা আরো বীভৎস হয়ে উঠল। এবার অন্য দস্যুগুলো ঘোড়া নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়তে গেল। কিন্তু কাসেমের ইঙ্গিতে থেমে গেল।
ফ্রান্সিস বুঝল– কাসেমের নিশ্চয়ই কোন সাংঘাতিক অভিসন্ধি আছে। ঠিক তাই। কাসেম নিজের ঘোড়াটাকে ছেলেটির কাছে নিয়ে গেল। ছেলেটি তৎক্ষণাৎ তরোয়াল উঁচিয়ে দাঁড়াল। ছেলেটির সর্বাঙ্গে রক্তের ছোপ। সে বেশ ক্লান্ত এটাও বোঝা যাচ্ছে। কিন্তু মুখ দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। কাসেম নিচু হয়ে তরোয়ালের ডগায় বালি তুলে ছেলেটির চোখেমুখে ছিটোতে লাগল। দস্যুদলের মধ্যে হাসির ধুম পড়ে গেল। ওরা ছেলেটিকে চারদিক থেকে ঘিরে মজা দেখতে লাগল। একসময় অনেকটা বালি ছেলেটির চোখে ঢুকে পড়ল। সে বাঁ হাতে চোখ রগড়াতে লাগল। কিন্তু হাতের তরোয়াল ফেলল না, ঠিক তখনই বালিতে প্রায় অন্ধ ছেলেটির মাথা লক্ষ্য করে কাসেম তরোয়াল তুললো। ফ্রান্সিস আর সহ্য করতে পারল না। বিদ্যুৎবেগে ঘোড়াটাকে কাসেমের সামনে নিয়ে এল! কাসেম কিচ্ছু বোঝবার আগেই কাসেমের উদ্যত তরোয়ালটায় আঘাত করল। আগুনে ফুলকি ছুটল। বেকায়দায় তরোয়াল চালিয়েছিল ফ্রান্সিস। তাই মুঠি আলগা হয়ে ওর তরোয়ালটা ছিটকে পড়ে গেল। কাসেম তীব্র দৃষ্টিতে ফ্রান্সিসের দিকে তাকাল। তারপর দাঁতে দাঁত ঘষে গর্জে উঠল– কাফের। তারপরেই ছুটল ফ্রান্সিসের দিকে। ফ্রান্সিস বিপদ গুনলো। কাসেম তরোয়াল উঁচিয়ে আসছে। ফ্রান্সিসের সাধ্য নেই, খালি হাতে ওকে বাধা দেয়।
– ফ্রান্সিস। চাপাস্বরে কে ডাকল। ফ্রান্সিস দ্রুত ঘুরে তাকাল। ফজল! ফজল ওর তরোয়ালটা এগিয়ে দিল। তরোয়ালটা হাতে পেয়েই ফ্রান্সিস কাসেমের প্রথম আঘাতটা সামলাল। কাসেম আবার তরোয়াল তুলল। ঠিক তখনই সর্দারের বজ্রনির্ঘোষ কণ্ঠস্বর শোনা গেল– কাসেম ভুলে যেও না, আমরা লুঠ করতে এসেছি।
কাসেম উদ্যত তরবারি নামাল। শিকার হাত ছাড়া হয়ে গেল। দুজনে কি কথা হল। কাসেম তরোয়াল উঁচিয়ে ক্যারাভ্যানের দিকে ইঙ্গিত করল। কি হয় দেখবার জন্যে মরুদস্যুরা এতক্ষণ চুপ করে অপেক্ষা করছিল। সেই স্তব্ধতা খান খান হয়ে ভেঙে গেল তাদের চীৎকার। সবাই চীৎকার করতে করতে ছুটল ক্যারাভ্যানের দিকে। তারপর পৈশাচিক উল্লাসে ওরা ঝাঁপিয়ে পড়ল ক্যারাভ্যানের ওপর। আবার আর্তচীৎকার– কান্নার রোল উঠল। অবাধ লুঠতরাজ চলল।
এবার ফেরার পালা। ইতস্ততঃ বিক্ষিপ্ত মৃতদেহগুলোর ওপর দিয়েই দস্যুর দল ঘোড়া ছোটাল। ফ্রান্সিস অতটা অমানুষ হতে পারল না। অন্য দিক দিয়ে ঘুরে যেতে লাগল। হঠাৎ দেখল সেই ছেলেটি মাটিতে হাঁটু গেড়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। ফ্রান্সিস একবার ভাবল নেমে গিয়ে ওকে সান্ত্বনা দেয়। কিন্তু উপায় নেই। মরুদস্যুর দল অনেকটা এগিয়ে গেছে। ফ্রান্সিস ঘোড়া ছুটিয়ে দলের সঙ্গে এসে মিশল। ওরা যখন সেই মরুদ্যানে ফিরে এল তখন সূর্য মাথার ওপরে। চারদিকে বালির ওপর দিয়ে আগুনের হল্কা ছুটছে যেন।
বিকেলে খেজুর গাছটার তলায় ফজলের সঙ্গে দেখা হল। ফজল বলল– অতগুলো লোকের প্রাণ বাঁচালে তুমি ভাই।
– কেন?
– তোমার কাছে বাধা পেয়েই তো কাসেম আর এগোতে সাহস করেনি।
– তা না হলে কি করতো?
– সব ক’জনকে মেরে ফেলতো।
– সে কি! মেয়েরা বাচ্চাগুলো– ওরা তো নিরপরাধ।
– কাসেমের নিষ্ঠুরতার পরিমাণ করতে পারবে না। জাহান্মামেও ওর ঠাঁই হবে না।
– হুঁ।
– ও কিন্তু তোমাকে সহজে ছাড়বে না। সাবধানে থেকো।
– ও আমার কি করবে?
– জানো না তো ভাই, দলের কেউ ওকে ঘাঁটাতে সাহস করে না, এমন কি সর্দারও না। হঠাৎ পেছনে কাকে দেখে ফজল থেমে গেল। কাসেম নয়। দস্যু দলের একজন। কাছে এসে ফ্রান্সিসকে ডাকল– এই ভিনদেশী– তোমাকে সর্দার এত্তেলা পাঠিয়েছেন।
– চলো, ফ্রান্সিস উঠে দাঁড়াল। তারপর লোকটার সঙ্গে তাঁবুর দিকে চলল।
* * *
একটা মোটা তাকিয়া ঠেস দিয়ে আধশোয়া অবস্থায় সর্দার রূপোর গড়গড়ায় তামাক খাচ্ছিল। ফ্রান্সিস গিয়ে দাঁড়াতে নল থেকে মুখ না তুলে ইঙ্গিতে তাকে বসতে বলল। জাজিমপাতা ফরাসের ওপর বসতে গিয়ে ফ্রান্সিস দেখল, কাসেমও একপাশে বসে আছে। কাসেম তীব্র দৃষ্টিতে ফ্রান্সিসের দিকে একবার তাকাল। পরক্ষণেই যেন প্রচণ্ড ঘৃণায় মুখ ঘুরিয়ে নিল। এতক্ষণে সর্দার কেশে নিয়ে ডাকল– ফ্রান্সিস।
– বলুন।
– তুমি বিদেশী– আমাদের রাজনীতি তোমার জানবার কথা নয়। তুমি আজকে যা করেছ, অন্য কেউ হলে তাকে এতক্ষণে বালিতে পুঁতে ফেলা হত।
ফ্রান্সিস চুপ করে রইল। সর্দার বলল– কাশেম তুমি ওর সঙ্গে লড়তে রাজি আছ?
কাসেম সঙ্গে সঙ্গে খাপ থেকে একটানে তরবারিটা বের করে বলল– এক্ষুণি।
সর্দার ফ্রান্সিসের দিকে তাকাল– তুমি?
ফ্রান্সিস উঠে দাঁড়িয়ে বলল– আমি রাজী।
– হুঁ। সর্দার গড়গড়ার নলটা মুখে দিল। কয়েকবার টানল। তারপর বলল– রাত্তিরে তোমাকে ডেকে পাঠানো হবে। তৈরী হয়ে আসবে।
* * *