Tag: প্রবন্ধ

  • জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়

    জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়

    জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়

    জাতীয় (ন্যাশনাল) বিদ্যালয় লইয়া একটু খোঁচা দিয়াছি, তাহা অন্য কোনো ভাব-প্রণোদিত হইয়া নয়। জাতীয় জিনিস লইয়া জাতির প্রত্যেকেরই ভালো-মন্দ বিচার করিয়া দেখিবার অধিকার আছে। তাহা ছাড়া, ‘মুনিনাঞ্চ মতিভ্রমঃ’, ভুল সকলেরই হয়; নিজের ভুল নিজে দেখিতে পায় না। অতএব আমাদেরই জাতীয় বিদ্যালয়ের যে ভুল আমাদের চোখে পড়িবে, তাহা আমাদেরই শোধরাইয়া লইতে হইবে। প্রথম কোনো বড়ো কাজ করিতে গেলে অনেক রকম ভ্রম-প্রমাদ হওয়া স্বাভাবিক জানি, এবং তাহাকে ক্ষমা করিতেও পারা যায় – যদি জানি যে তাঁহারা জানিয়া ভুল করিতেছেন না। কিন্তু যদি দেখি যে, এই সব হোমযজ্ঞের হোতারা জানিয়া শুনিয়া ভুল করিতেছেন বা জাতীয় শিক্ষা-রূপ পবিত্র জিনিসের নামেই নিজ-নিজ স্বার্থসিদ্ধির পথ খুঁজিতেছেন, তাহা হইলে হাজার অপ্রিয় হইলেও আমাদিগকে তাহা লইয়া আলোচনা করিতে হইবে। পবিত্র কোনো জিনিসে কীট প্রবেশ করিতে দেখিয়া চুপ করিয়া থাকাও অপরাধ। এই জাতীয় বিদ্যালয়ে কাঁচা কাঁচা অধ্যাপক নিয়োগ লইয়া যে ব্যাপার চলিতেছে, তাহা হাজার চেষ্টা করিলেও চাপা দেওয়া যাইবে না; ‘মাছ দিয়া শাক ঢাকা যায় না’। কাঁচা অধ্যাপক মানে বয়সে কাঁচা নয়, বিদ্যায় কাঁচা। আমাদের আর সবই ভালো, কেবল বে-বন্দোবস্তই হইতেছে ‘গুণরাশিনাশী।‘ গোদের উপর বিষফোঁড়ার মতন তদুপরি আবার আমাদের একগুঁয়েমিও আছে। দোষ করিতেছি জানিয়া শুনিয়াও তাহা শুধরাইব না। যাঁহারা দেশের মঙ্গলের জন্য সকল স্বার্থ বলিদান দিয়া গোলামখানা হইতে বাহির হইয়া আসিয়াছেন মনে করিয়াছিলাম, আজ যদি কর্মগতিকে দেখিতে পাই বা বুঝিতে পারি যে, তাঁহারা অন্য এক স্বার্থের লোভে বা বেশি লাভের সম্ভাবনায় ওরকম লোকদেখানো ত্যাগ দেখাইয়েছেন, তাহা হইলে বড়ো কষ্ট বোধ হয়। এখন কিন্তু অনেকেরই কার্য দেখিয়া সেই রকম বোধ হইতেছে। যে সব অধ্যাপক গোলামখানা ছাড়িয়া আমাদের বাহবা লইয়াছেন, তাঁহাদিগকেই যে জাতীয় বিদ্যালয়ের অধ্যাপক করিতে হইবে এমন কোনো কথা নাই। কেননা তাঁহারা কখনও এই ত্যাগের বদলে আর একটা বড়োরকম লাভের আশায় এ ত্যাগ দেখান নাই। যদি তাহাই হয়, তাহা হইলে আরও অনেকে লাফাইয়া উঠিয়া এইরকম মিথ্যা ভণ্ডামির ত্যাগ দেখাইতে ছুটিতে পারে। কেননা, ইহাতে তাঁহাদের ক্ষতি তো হইলই না, উলটো দেশময় একটা বাহবা পড়িয়া গেল যে, অমুক লোকটা একেবারে ত্যাগের চূড়ান্ত করিয়াছে – একেবারে বুদ্ধদেব! কিন্তু এ মিথ্যাকে আর যেই প্রশ্রয় দেন, আমরা প্রশ্রয় দিতে পারি না। মঙ্গল উৎসবে মিথ্যার অমঙ্গল কিছুতে প্রবেশ করিতে দিব না। আমরা অন্তর হইতে বলিতেছি, সত্যকে এড়াইয়া চলিয়ো না, ইচ্ছা করিয়া বা স্বার্থান্ধ হইয়া এমন মহৎ অনাবিল অনবদ্য জিনিসকে পঙ্কিল-কলঙ্কিত করিয়ো না, – যদি বুঝি তুমি বুঝিবার দোষে তাহা করিতেছ, ভণ্ডামি করিতেছ না, তবে তোমায় প্রাণ হইতে দেশবাসী ক্ষমা করিবে, স্নেহের দাবি লইয়া তোমার ভুল শুধরাইয়া দিবে, এবং তোমার গায়ে কাঁটাটি ফুটিতে দিবে না। যে সত্যিকার ত্যাগী তাঁহার পায়ে কাঁটা ফুটিলে আমরা দাঁত দিয়া তুলিয়া দিতে রাজি আছি। দোষ রাজতন্ত্রের নয়, দোষ আমাদেরই। আমরাই নিত্য নিতুই মঙ্গলের নামে, দেশের নামে নিজের স্বার্থ বাগাইয়া তো লইতেছি। এই ভণ্ডামি আর মোনাফেকিই তো সর্বনাশের মূল। প্রথমে আমাদিগকে মানুষ হইতে হইবে, স্বার্থের মায়া ত্যাগ করিয়া সত্যকে বড়ো করিয়া দেখিতে শিখিতে হইবে, তাহার পর যেন বড়ো কাজে হাত দিই। সেবার জাতীয় বিদ্যালয় অঙ্কুরেই বিনষ্টপ্রায় হইয়াছিল, এবারও যদি ওইরকম হয়, তাহা হইলে লজ্জায় আর মুখ দেখাইবার জো থাকিবে না। যাহার সত্যিকার কর্মী, তাঁহারাও কী অসত্যের জঞ্জাল হইতে মাথা ঝাড়া দিয়া উঠিবেন না? মিথ্যাকে সহ্য করার মতো কাপুরুষতা আর পাপ নাই। মহান কোনো কাজে অতি প্রিয়জনের দোষ থাকিলেও তাহা লুকাইলে চলিবে না। লোকলজ্জা বা মুখচোরা জিনিসটাই আমাদিগকে এমন দুর্বল করিয়া ফেলিয়াছে। বন্ধুর মর্যাদার চেয়ে সত্যের মর্যাদা অনেক উপরে।

    তাহা ছাড়া, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কারিকুলাম কী? স্টান্ডার্ডেরই বা কোনো একটা নিয়ম-কানুন বা প্রোগ্রাম আদি আছে কি? হইবে কখন? সকলেই তো দেখি, বসিয়া বসিয়া মাছি মারিতেছেন। অথচ কাঁদুনি গাহিতেছেন, ‘ছেলে জুটিতেছে না, আবার গোলামখানায় গিয়া ঢুকিতেছে’, ইত্যাদি! কিন্তু এই সব কাণ্ড দেখিয়া কয়জন বদসাহসী ছেলে ইহাতে আসিতে পারে? ভালো করিয়া কোমর বাঁধিয়া লাগিয়া যাও তো, দেখিবে তোমায় তখন ডাকিতে হইবে না – আপনিই তোমার অঙ্গন-ভরা লক্ষ তরুণ কণ্ঠে ‘হাজির’ ‘হাজির’ রব উত্থিত হইবে। তোমার মন্ত্রে তবে সে তোমার দোষ বা ক্ষমতার অভাব, তাহা মন্ত্রের দোষ নয়। নাচতে না জানলে উঠান বাঁকা বলিয়া আক্ষেপ করা – ধৃষ্টতা আর বোকামি মাত্র।

    আমরা চাই, আমাদের শিক্ষাপদ্ধতি এমন হউক, যাহা আমাদের জীবনশক্তিকে ক্রমেই সজাগ, জীবন্ত করিয়া তুলিবে। যে শিক্ষা ছেলেদের দেহ-মন দুইকেই পুষ্ট করে, তাহাই হইবে আমাদের শিক্ষা। ‘মেদা-মারা’ ছেলের চেয়ে সে হিসাবে ‘ডাংপিটে’ ছেলে বরং অনেক ভালো। কারণ পূর্বোক্ত নিরীহ জীবরূপী ছেলেদের ‘জান’ থাকে না; আর যাহার জান নাই, সে-‘মোর্দা’ দিয়া কোনো কাজই হয় নাই, আর হইবেও না। এই দুই শক্তিকে – প্রাণশক্তি আর কর্মশক্তিকে একত্রীভূত করাই যেন আমাদের শিক্ষার বা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য হয়, ইহাই আমাদের একান্ত প্রার্থনা। শত্তুর যেন ইহাকে গোলামখানা বা তেলাম-খানা না বলিতে পারে।

  • জাগরণী

    জাগরণী

    জাগরণী

    বকুল! জা-গো! জাগো বকুল, এই পল্লিমাঠের পথের পাশে মেঠো গানের সহজ সুরে জাগো। জাগো তারই রেশের ছোঁয়ায়! জাগো বেদন নিয়ে, পল্লিশিশুর মুক্ত-বিথার প্রাণ নিয়ে, পল্লিতরুণের তাজা খুনের তীব্র কাঁপুনি নিয়ে। জাগো – জাগো বকুল, জাগো! শরম-রাঙা পাপড়ি কটি তোমার খুলে দাও – ছড়িয়ে দাও এই নবীন আষাঢ়ের কালো মেঘের জোলো ঝাপটায়। সংকুচিতা, ভীতা, ত্রস্তা বকুল! ছোট্ট বকুল! জাগো! জাগো – পরাগ-মাখা পবিত্র তোমার ধৌত-করুণ চাউনি নিয়ে, – এই বাদর-রাগিণী-আহত বাদল-প্রাতে। তোমার পরিমলের উদাস সুরভি নিয়ে এসে আমেজ দাও রাজার যত গুল-ভরা বাগিচায়। অনাদৃতা তুমি, তাই বলে তোমার ওই এক নিশ্বাসের সুরভিটুকু নিয়ে গর্বিতার মতো এসো না। এসো তুমি আধ-মুকুলিত-যৌবনা নববধূর মতো ধীর-মন্থর চরণে – পায়ের মুখর পায়জোর সামলে! লাজ-জড়িমা-জড়িত তোমার বুক ভরে থাকে যেন পূত শালীনতার সংযম আর প্রশান্ত প্রীতির স্নিগ্ধ-শান্তি! জাগো বকুল, জাগো! তুমি যেখানে ফোটো, সেই পল্লিতেই আছে আমাদের সত্যিকার বাংলা, – বাঙালির আসল প্রাণ।

    আমাদের এই শাশ্বত বাঙালির সুষুপ্ত, ঘুমে-ভরা অলস-প্রাণ জাগিয়ে তোলো তোমার জাগরণের সোনার কাঠি দিয়ে! তাদের ফুলের প্রাণে দাগ বসিয়ে দিয়ো তোমার মদির বাসের উন্মাদনার ছুরি হেনে! জাগো বকুল, জাগো! ওই রাজবাগানের ফুলবালাদের সালাম করো, আর তোমার অশ্রু-ভরা অভিনন্দন জানাও। ছোট্ট তুমি, এই পল্লি-বাটের পায়ে-চলার-পথ থেকে তাগিদে তোমার বুকভরা ভক্তি-ভালোবাসা নিবেদন করো। তোমার ওই পরাগালক্ত নিবেদিত অর্ঘ্য নিয়ে সে গুলবাহার-ভরা সুন্দরীদের বলো, – “ওগো, আমি ছোট্ট বকুল – নেহাত ছোট্ট! আমি জেগেছি! তাও সে অনেক দূরে পল্লির অচিন পথে! তোমরা আমায় ঘৃণা কোরো না! আমি আনব শুধু আমার পল্লিদুলালদের বুকের বেদন, তাদের খাপছাড়া আকুল আবদার, আর যুগ যুগ ধরে – পিষ্ট ক্লিষ্ট প্রাণের ব্যথা বিজড়িত সহজ চিন্তার স্মৃতি। এ বাছাদেরও ঘৃণা কোরো না, অবহেলা এদের প্রাণে বড্ড বাজবে! শিশু এরা – কুঁড়ি এরা, এখনও ফোটেনি। এরা তোমাদের দেশের হাওযার উড়িয়ে দেওয়া রেণুকা।

    দিয়ো গো দিয়ো, তোমাদের ওই রানির স্নেহের শুধু একটু রেণু, উড়িয়ে দিয়ো দখিন বায়ে এদের পানে! আহা, অনাদৃত বিড়ম্বিত হতভাগা, এরা, ঘৃণা কোরো না এদের।’’…জাগো বকুল, জাগো! ঝোড়ো হাওয়ায় আর জোলো মেঘে তোমায় ডাক দিয়েছে। জাগো – জাগো, পল্লিবুকের বেদন নিয়ে, পল্লিশিশুর ঝরণা-হাসি নিয়ে, আর তরুণদের সবুজ বুকের অরুণ খুনের উষ্ণগতি নিয়ে! জাগো, বকুল জাগো!! জাগো যৌবনের জয়টিকা নিয়ে!!!

  • রাজবন্দীর জবানবন্দী

    রাজবন্দীর জবানবন্দী

    রাজবন্দীর জবানবন্দী

    রাজবন্দীর জবানবন্দী কাজী নজরুল ইসলাম লিখিত একটি প্রবন্ধ। নজরূল সম্পাদিত অর্ধ-সাপ্তাহিক ধূমকেতু ১৯২৩ সালে ব্রিটিশ সরকার নিষিদ্ধ করে। সেই পত্রিকায় প্রকাশিত নজরুলের কবিতা আনন্দময়ীর আগমনে ও নিষিদ্ধ হয়। নজরুলকে জেলে আটক করে রাখার পর তার বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি লিখিতভাবে আদালতে উপস্থাপন করেন চার পৃষ্ঠার বক্তব্য। তাই রাজবন্দীর জবানবন্দী নামে পরিচিত। ১৯২৩ সালের ৭ ই জানুয়ারি কলকাতার প্রেসিডেন্সি জেলে বসে তিনি এই চার পৃষ্ঠার জবানবন্দী রচনা করেন। পরে বিভিন্ন পত্র পত্রিকা যেমন, ১৩২৯ সালের ১২ই মাঘ তারিখের ‘ধূমকেতু’, ১৩২৯ মাঘের ‘প্রবর্তক’, ১৩২৯ ফাল্গুনের ‘উপাসনা’ এবং ১৩২৯ ফাল্গুনের ‘সহচর’ প্রভৃতি সাময়িকপত্রে ‘রাজবন্দীর জবানবন্দী’ প্রকাশিত হয়। ‘ধূমকেতু’র মামলায় এই ‘জবানবন্দী’ আদালতে দাখিল করা হয়েছিল। পুস্তিকাকারে এর দুটি সংস্করণ প্রকাশিত হয়; কবির নূতনতম প্রতিকৃতি-সম্বলিত দ্বিতীয় সংস্করণের দাম ছিল দুই আনা।

    এই জবানবন্দীতে নজরুল বলেছেন:

    “আমার উপর অভিযোগ, আমি রাজবিদ্রোহী। তাই আমি আজ রাজকারাগারে বন্দি এবং রাজদ্বারে অভিযুক্ত।… আমি কবি,আমি অপ্রকাশ সত্যকে প্রকাশ করার জন্য, অমূর্ত সৃষ্টিকে মূর্তিদানের জন্য ভগবান কর্তৃক প্রেরিত। কবির কণ্ঠে ভগবান সাড়া দেন, আমার বাণী সত্যের প্রকাশিকা ভগবানের বাণী। সেবাণী রাজবিচারে রাজদ্রোহী হতে পারে, কিন্তু ন্যায়বিচারে সে বাণী ন্যায়দ্রোহী নয়, সত্যাদ্রোহী নয়। সত্যের প্রকাশ নিরুদ্ধ হবে না। আমার হাতের ধূমকেতু এবার ভগবানের হাতের অগ্নি-মশাল হয়ে অন্যায় অত্যাচার দগ্ধ করবে…।

    ‘আমার হাতের বাঁশি কেড়ে নিলেই সে বাঁশির মৃত্যু হবে না।’ কেননা আমি আর এক বাঁশি নিয়ে বা তৈরি করে তাতে সেই সুর ফোটাতে পারি। সুর আমার বাঁশির নয়, সুর আমার মনে এবং বাঁশির সৃষ্টির কৌশলে, অতএব দোষ বাঁশির নয়, সুরেরও নয়, দোষ তার, যিনি আমার কণ্ঠে তার বীণা বাজান, … সে বাণী রাজবিচারে রাজদ্রোহী হতে পারে। কিন্তু ন্যায়বিচারে সে বাণী ন্যায়দ্রোহী নয়। সত্যদ্রোহী নয়। সে বাণী রাজদ্বারে দণ্ডিত হতে পারে। কিন্তু ধর্মের আলোকে ন্যায়ের দুয়ারে তা নিরপরাধ, নিষ্কলুষ, অম্লান, অনির্বাণ, সত্যস্বরূপ। …তাকে শাস্তি দেয়ার মতো রাজশক্তি বা দ্বিতীয় ভগবান নেই। তাকে বন্দী করার মতো পুলিশ বা কারাগার আজো সৃষ্টি হয়নি। …বিচারক জানে আমি যা বলছি, যা লিখেছি, তা ভগবানের চোখে অন্যায় নয়, ন্যায়ের এজলাসে মিথ্যা নয়। কিন্তু হয়তো সে শাস্তি দেবে। কেননা সে সত্যের নয়, সে রাজার। সে ন্যায়ের নয়, সে আইনের। সে স্বাধীন নয়, সে রাজভৃত্য। তবু জিজ্ঞাসা করছি, এই বিচারাসন কার? রাজার না ধর্মের? এই যে বিচার, এ বিচারের জবাবদিহি করতে হয় রাজাকে, না তার অন্তরের আসনে প্রতিষ্ঠিত বিবেককে, সত্যকে? ভগবানকে? এ বিচারককে কে পুরস্কৃত করে? রাজা, না ভগবান? না আত্মপ্রসাদ?

    আজ ভারত পরাধীন। তার অধিবাসীবৃন্দ দাস। এটা নির্জলা সত্য। কিন্তু দাসকে দাস বললে, অন্যায়কে অন্যায় বললে এ রাজত্বে তা হবে রাজদ্রোহ। এত ন্যায়ের শাসন হতে পারে না, এই যে জোর করে সত্যকে মিথ্যা, অন্যায়কে ন্যায়, দিনকে রাত বলানো এটা কি সত্য সহ্য করতে পারে? এ শাসন কি চিরস্থায়ী হতে পারে? এত দিন হয়েছিল, হয়তো সত্য উদাসীন ছিল বলে। কিন্তু আজ সত্য জেগেছে, তা চুষ্মান জাগ্রত-আত্মা মাত্রই বিশেষ রূপে জানতে পেরেছে। এই অন্যায় শাসনকিষ্ট বন্দী সত্যের পীড়িত ক্রন্দন আমার কণ্ঠে ফুটে উঠেছিল বলেই আমি রাজদ্রোহী?

    নজরুল সৃষ্টিকর্তাকে নিজের বিচারক হিসেবে ধরেছেন। জবানবন্দিতে সৃষ্টিকর্তার প্রতি অগাধ বিশ্বাস ও ভারতের স্বাধীনতার জন্য আকুতি ফুটে উঠেছে।

    মূলপ্রবন্ধ : রাজবন্দীর জবানবন্দী

    আমার উপর অভিযোগ, আমি রাজবিদ্রোহী! তাই আমি রাজকারাগারে বন্দি এবং রাজদ্বারে অভিযুক্ত।

    একধারে রাজার মুকুট; আরধারে ধূমকেতুর শিখা। একজন রাজা, হাতে রাজদণ্ড; আরজন সত্য, হাতে ন্যায়দণ্ড। রাজার পক্ষে রাজার নিযুক্ত রাজবেতনভোগী, রাজকর্মচারী। আমার পক্ষে – সকল রাজার রাজা, সকল বিচারকের বিচারক, আদি অনন্তকাল ধরে সত্য – জাগ্রত ভগবান।

    আমার বিচারককে কেহ নিযুক্ত করে নাই। এ মহাবিচারকের দৃষ্টিতে রাজা-প্রজা, ধনী-নির্ধন, সুখী-দুঃখী সকলে সমান। এঁর সিংহাসনে রাজার মুকুট আর ভিখারির একতারা পাশাপাশি স্থান পায়। এঁর আইন – ন্যায়, ধর্ম। সে আইন কোনো বিজেতা মানব কোনো বিজিত বিশিষ্ট জাতির জন্য তৈরি করে নাই। সে আইন বিশ্ব-মানবের সত্য-উপলব্ধি হতে সৃষ্ট; সে আইন সর্বজনীন সত্যের, সে আইন সার্বভৌমিক ভগবানের। রাজার পক্ষে – পরমাণু পরিমাণ খণ্ড-সৃষ্টি; আমার পক্ষে – আদি অন্তহীন অখণ্ড স্রষ্টা।

    রাজার পেছনে ক্ষুদ্র, আমার পেছনে – রুদ্র। রাজার পক্ষে যিনি, তাঁর লক্ষ্য স্বার্থ, লাভ অর্থ; আমার পক্ষে যিনি, তাঁর লক্ষ্য সত্য, লাভ পরমানন্দ।

    রাজার বাণী বুদ্‌বুদ্, আমার বাণী সীমাহারা সমুদ্র।

    আমি কবি, অপ্রকাশ সত্যকে প্রকাশ করবার জন্য, অমূর্ত সৃষ্টিকে মূর্তি দানের জন্য ভগবান কর্তৃক প্রেরিত। কবির কণ্ঠে ভগবান সাড়া দেন। আমার বাণী সত্যের প্রকাশিকা, ভগবানের বাণী। সে বাণী রাজবিচারে রাজদ্রোহী হতে পারে, কিন্তু ন্যায়বিচারে সে বাণী ন্যায়-দ্রোহী নয়, সত্য-দ্রোহী নয়। সে বাণী রাজদ্বারে দণ্ডিত হতে পারে, কিন্তু ধর্মের আলোকে, ন্যায়ের দুয়ারে তাহা নিরপরাধ, নিষ্কলুষ, অম্লান, অনির্বাণ, সত্য-স্বরূপ।

    সত্য স্বয়ং প্রকাশ। তাহাকে কোনো রক্ত-আঁখি রাজদণ্ড নিরোধ করতে পারে না। আমি সেই চিরন্তন স্বয়ম্-প্রকাশের বীণা, যে বীণায় চির-সত্যের বাণী ধ্বনিত হয়েছিল। আমি ভগবানের হাতের বীণা। বীণা ভাঙলেও ভাঙতে পারে, কিন্তু ভগবানকে ভাঙবে কে? একথা ধ্রুব সত্য যে, সত্য আছে, ভগবান আছেন – চিরকাল ধরে আছে এবং চিরকাল ধরে থাকবে। যে আজ সত্যের বাণীকে রুদ্ধ করেছে, সত্যের বীণাকে মূক করতে চাচ্ছে, সে-ও তাঁরই এই ক্ষুদ্রাদপি ক্ষুদ্র সৃষ্ট অণু। তাঁরই ইঙ্গিতে-আভাসে, ইচ্ছায় সে আজ আছে, কাল হয়তো থাকবে না। নির্বোধ মানুষের অহংকারের আর অন্ত নাই; সে যাহার সৃষ্টি, তাহাকেই সে বন্দি করতে চায়, শাস্তি দিতে চায়। কিন্তু অহংকার একদিন চোখের জলে ডুববেই ডুববে।

    যাক, আমি বলছিলাম, আমি সত্যপ্রকাশের যন্ত্র। সে যন্ত্রকে অপর কোনো নির্মম শক্তি অবরুদ্ধ করলেও করতে পারে, ধ্বংস করলেও করতে পারে; কিন্তু সে-যন্ত্র যিনি বাজান, সে-বীণায় যিনি রুদ্র-বাণী ফোটান, তাঁকে অবরুদ্ধ করবে কে? সে-বিধাতাকে বিনাশ করবে কে? আমি মরব, কিন্তু আমার বিধাতা অমর। আমি মরব, রাজাও মরবে, কেননা আমার মতন অনেক রাজবিদ্রোহী মরেছে, আবার এমনই অভিযোগ-আনয়নকারী বহু রাজাও মরেছে, কিন্তু কোনো কালে কোনো কারণেই সত্যের প্রকাশ নিরুদ্ধ হয়নি – তার বাণী মরেনি। সে আজও তেমনই করে নিজেকে প্রকাশ করেছে এবং চিরকাল ধরে করবে। আমার এই শাসন-নিরুদ্ধ বাণী আবার অন্যের কণ্ঠে ফুটে উঠবে। আমার হাতের বাঁশি কেড়ে নিলেই সে বাঁশির সুরের মৃত্যু হবে না; কেননা আমি আর এক বাঁশি নিয়ে বা তৈরী করে তাতে সেই সুর ফোটাতে পারি। সুর আমার বাঁশির নয়, সুর আমার মনে এবং আমার বাঁশি সৃষ্টির কৌশলে। অতএব দোষ বাঁশিরও নয় সুরেরও নয়; দোষ আমার, যে বাজায়; তেমনই যে বাণী আমার কণ্ঠ দিয়ে নির্গত হয়েছে, তার জন্য দায়ী আমি নই। দোষ আমারও নয়, আমার বাণীরও নয়; দোষ তাঁর – যিনি আমার কণ্ঠে তাঁর বাণী বাজান। সুতরাং রাজবিদ্রোহী আমিও নই; প্রধান রাজবিদ্রোহী সেই বাণী-বাদক ভগবান। তাঁকে শাস্তি দিবার মতো রাজশক্তি বা দ্বিতীয় ভগবান নাই। তাঁহাকে বন্দি করবার মতো পুলিশ বা কারাগার আজও সৃষ্টি হয় নাই।

    রাজার নিযুক্ত রাজ-অনুবাদক রাজভাষায় সে-বাণীর শুধু ভাষাকে অনুবাদ করেছে, তাঁর প্রাণকে অনুবাদ করেনি। তাঁর সত্যকে অনুবাদ করতে পারেনি। তার অনুবাদে রাজানুগত্য ফুটে উঠেছে, কেননা, তার উদ্দেশ্য রাজাকে সন্তুষ্ট করা, আর আমার লেখায় ফুটে উঠেছে সত্য, তেজ আর প্রাণঙ কেননা আমার উদ্দেশ্য ভগবানকে পূজা করা; উৎপীড়িত আর্ত বিশ্ববাসীর পক্ষে আমি সত্য-বারি, ভগবানের আঁখিজল! আমি রাজার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করি নাই, অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছি।

    আমি জানি এবং দেখেছি – আজ এই আদালতে আসামির কাঠগড়ায় একা আমি দাঁড়িয়ে নেই, আমার পশ্চাতে স্বয়ং সত্যসুন্দর ভগবানও দাঁড়িয়ে। যুগে যুগে তিনি এমনই নীরবে তাঁর রাজবন্দি সত্য-সৈনিকের পশ্চাতে এসে দণ্ডায়মান হন। রাজ-নিযুক্ত বিচারক সত্য-বিচারক হতে পারে না। এমনই বিচার প্রহসন করে যেদিন খ্রিস্টকে ক্রুশে বিদ্ধ করা হল, গান্ধিকে কারাগারে নিক্ষেপ করা হল, সেদিনও ভগবান এমনই নীরবে এসে দাঁড়িয়েছিলেন তাঁহাদের পশ্চাতে। বিচারক কিন্তু তাঁকে দেখতে পায়নি, তার আর ভগবানের মধ্যে তখন সম্রাট দাঁড়িয়েছিলেন, সম্রাটের ভয়ে তার বিবেক, তার দৃষ্টি অন্ধ হয়ে গেছিল। নইলে সে তার এই বিচারাসনে ভয়ে বিস্ময়ে থরথর করে কেঁপে উঠত, নীল হয়ে যেত, তার বিচারাসন সমেত সে পুড়ে ছাই হয়ে যেত।

    বিচারক জানে আমি যা বলেছি, যা লিখেছি তা ভগবানের চোখে অন্যায় নয়, ন্যায়ের এজলাসে মিথ্যা নয়। কিন্তু হয়তো সে শাস্তি দেবে, কেননা সে সত্যের নয়, সে রাজার। সে ন্যায়ের নয়, সে আইনের। সে স্বাধীন নয়, সে রাজভৃত্য। তবু জিজ্ঞাসা করছি, এই যে বিচারাসন – এ কার? রাজার না ধর্মের? এই যে বিচারক, এর বিচারের জবাবদিহি করতে হয় রাজাকে, না তার অন্তরের আসনে প্রতিষ্ঠিত বিবেককে, সত্যকে, ভগবানকে? এই বিচারককে কে পুরস্কৃত করে? – রাজা না ভগবান? অর্থ না আত্মপ্রসাদ?

    শুনেছি, আমার বিচারক একজন কবি। শুনে আনন্দিত হয়েছি। বিদ্রোহী কবির বিচার বিচারক কবির নিকট। কিন্তু বেলাশেষের শেষ-খেয়া এ প্রবীণ বিচারককে হাতছানি দিচ্ছে, আর রক্ত-উষার নব-শঙ্খ আমার অনাগত বিপুলতাকে অভ্যর্থনা করছে; তাকে ডাকছে মরণ, আমায় ডাকছে জীবন; তাই আমাদের উভয়ের অস্ত-তারা আর উদয়-তারার মিলন হবে কিনা বলতে পারি না। না, আবার বাজে কথা বললাম।

    আজ ভারত পরাধীন। তার অধিবাসীবৃন্দ দাস। এটা নির্জলা সত্য। কিন্তু দাসকে দাস বললে, অন্যায়কে অন্যায় বললে এ রাজত্বে তা হবে রাজদ্রোহ। এ তো ন্যায়ের শাসন হতে পারে না, এই যে জোর করে সত্যকে মিথ্যা, অন্যায়কে ন্যায়, দিনকে রাত বলানো – এ কি সত্য সহ্য করতে পারে? এ শাসন কি চিরস্থায়ী হতে পারে? এতদিন হয়েছিল, হয়তো সত্য উদাসীন ছিল বলে। কিন্তু আজ সত্য জেগেছে, তা চক্ষুষ্মান জাগ্রত-আত্মা মাত্রই বিশেষরূপে জানতে পেরেছে। এই অন্যায় শাসন-ক্লিষ্ট বন্দি সত্যের পীড়িত ক্রন্দন আমার কণ্ঠে ফুটে উঠেছিল বলেই কি আমি রাজদ্রোহী? এ ক্রন্দন কি একা আমার? না – এ আমার কণ্ঠে ওই উৎপীড়িত নিখিল-নীরব ক্রন্দসীর সম্মিলিত সরব প্রকাশ? আমি জানি, আমার কণ্ঠের ওই প্রলয়-হুংকার একা আমার নয়, সে যে নিখিল আর্তপীড়িত আত্মার যন্ত্রণা-চিৎকার। আমায় ভয় দেখিয়ে মেরে এ ক্রন্দন থামানো যাবে না! হঠাৎ কখন আমার কণ্ঠের এই হারা-বাণীই তাদের আরেক জনের কণ্ঠে গর্জন করে উঠবে।

    আজ ভারত পরাধীন না হয়ে যদি ইংলন্ডই ভারতের অধীন হত এবং নিরস্ত্রীকৃত উৎপীড়িত ইংলন্ড-অধিবাসীবৃন্দ স্বীয় জন্মভূমি উদ্ধার করবার জন্য বর্তমান ভারতবাসীর মতো অধীর হয়ে উঠত, আর ঠিক সেই সময় আমি হতুম এমনই বিচারক এবং আমার মতোই রাজদ্রোহ-অপরাধে ধৃত হয়ে এই বিচারক আমার সম্মুখে বিচারার্থ নীত হতেন, তাহলে সেই সময় এই বিচারক আসামির কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে যা বলতেন, আমি তো তাই এবং তেমনি করেই বলছি!

    আমি পরম আত্মবিশ্বাসী! তাই যা অন্যায় বলে বুঝেছি, তাকে অন্যায় বলেছি, অত্যাচারকে অত্যাচার বলেছি, মিথ্যাকে মিথ্যা বলেছি, – কাহারও তোষামোদ করি নাই, প্রশংসার এবং প্রসাদের লোভে কাহারও পিছনে পোঁ ধরি নাই, – আমি শুধু রাজার অন্যায়ের বিরুদ্ধেই বিদ্রোহ করি নাই – সমাজের, জাতির, দেশের বিরুদ্ধে আমার সত্য-তরবারির তীব্র আক্রমণ সমান বিদ্রোহ ঘোষণা করেছে, – তার জন্য ঘরের-বাইরের বিদ্রুপ, অপমান, লাঞ্ছনা, আঘাত আমার উপর পর্যাপ্ত পরিমাণে বর্ষিত হয়েছে, কিন্তু কোনো কিছুর ভয়েই নিজের সত্যকে, আপন ভগবানকে হীন করি নাই, লাভ-লোভের বশবর্তী হয়ে আত্ম-উপলব্ধিকে বিক্রয় করি নাই, নিজের সাধনালব্ধ বিপুল আত্মপ্রসাদকে খাটো করি নাই, কেননা আমি যে ভগবানের প্রিয়, সত্যের হাতের বীণা; আমি যে কবি, আমার আত্মা যে সত্যদ্রষ্টা ঋষির আত্মা। আমি অজানা অসীম পূর্ণতা নিয়ে জন্মগ্রহণ করেছি। এ আমার অহংকার নয়, আত্ম-উপলব্ধির আত্মবিশ্বাসের চেতনালব্ধ সহজ সত্যের সরল স্বীকারোক্তি। আমি অন্ধ-বিশ্বাসে, লাভের লোভে, রাজভয় বা লোকভয়ে মিথ্যাকে স্বীকার করতে পারি না, অত্যাচারকে মেনে নিতে পারি না। তাহলে যে আমার দেবতা আমায় ত্যাগ করে যাবে। আমার এই দেহ-মন্দির জাগ্রত দেবতার আসন বলেই তো লোকে এ-মন্দিরকে পূজা করে, শ্রদ্ধা দেখায়, কিন্তু দেবতা বিদায় নিলে এ শূন্য মন্দিরের আর থাকবে কি? একে শুধাবে কে? তাই আমার কণ্ঠে কাল-ভৈরবের প্রলয়তূর্য বেজে উঠেছিল, আমার হাতে ধূমকেতুর অগ্নি-নিশান দুলে উঠেছিল, সে সর্বনাশা নিশানপুচ্ছে মন্দিরের দেবতা নট-নারায়ণ-রূপ ধরে ধ্বংস-নাচন নেচেছিলেন। এ ধ্বংস-নৃত্য নব সৃষ্টির পূর্ব-সূচনা। তাই আমি নির্মম নির্ভীক উন্নত শিরে সে নিশান ধরেছিলাম, তাঁর তূর্য বাজিয়েছিলাম। অনাগত অবশ্যম্ভাবী মহারুদ্রের তীব্র আহ্বান আমি শুনেছিলাম, তাঁর রক্ত-আঁখির হুকুম আমি ইঙ্গিতে বুঝেছিলাম। আমি তখনই বুঝেছিলাম, আমি সত্য রক্ষার, ন্যায়-উদ্ধারের বিশ্ব-প্রলয় বাহিনীর লাল সৈনিক। বাংলার শ্যাম শ্মশানের মায়ানিদ্রিত ভূমিতে আমায় তিনি পাঠিয়েছিলেন অগ্রদূত তূর্যবাদক করে। আমি সামান্য সৈনিক, যতটুকু ক্ষমতা ছিল তা দিয়ে তাঁর আদেশ পালন করেছি। তিনি জানতেন, প্রথম আঘাত আমার বুকেই বাজবে, তাই আমি একবার প্রলয় ঘোষণার সর্বপ্রথম আঘাতপ্রাপ্ত সৈনিক মনে করে নিজেকে গৌরবান্বিত মনে করেছি! কারাগার-মুক্ত হয়ে আমি আবার যখন আঘাত-চিহ্নিত বুকে, লাঞ্ছনা-রক্ত ললাটে, তাঁর মরণ-বাঁচা চরণমূলে গিয়ে লুটিয়ে পড়ব, তখন তাঁর সকরুণ প্রসাদ চাওয়ার মৃত্যুঞ্জয় সঞ্জীবনী আমায় শ্রান্ত, আমায় সঞ্জীবিত, অনুপ্রাণিত করে তুলবে। সেদিন নতুন আদেশ মাথায় করে নতুন প্রেরণায় উদ্‌বুদ্ধ আমি, আবার তাঁর তরবারি-ছায়াতলে গিয়ে দণ্ডায়মান হব। সেই আজও-না-আসা রক্ত-উষার আশা, আনন্দ, আমার কারাবাসকে – অমৃতের পুত্র আমি, হাসি-গানের কলোচ্ছ্বাসে স্বর্গ করে তুলবে। চিরশিশু প্রাণের উচ্ছল আনন্দের পরশমণি দিয়ে নির্যাতিত লোহাকে মণিকাঞ্চনে পরিণত করবার শক্তি ভগবান আমায় না চাইতেই দিয়েছেন! আমার ভয় নাই, দুঃখ নাই; কেননা ভগবান আমার সাথে আছেন। আমার অসমাপ্ত কর্তব্য অন্যের দ্বারা সমাপ্ত হবে। সত্যের প্রকাশ-ক্রিয়া নিরুদ্ধ হবে না। আমার হাতের ধূমকেতু এবার ভগবানের হাতের অগ্নি-মশাল হয়ে অন্যায়-অত্যাচারকে দগ্ধ করবে। আমার বহ্নি-এরোপ্লেনের সারথি হবে এবার স্বয়ং রুদ্র ভগবান। অতএব, মাভৈঃ! ভয় নাই।

    কারাগারে আমার বন্দিনী মায়ের আঁধার-শান্ত কোল ও অকৃতী পুত্রকে ডাক দিয়েছে, পরাধীনা অনাথিনি জননীর বুকে এ হতভাগ্যের স্থান হবে কিনা জানি না, যদি হয় বিচারককে অশ্রু-সিক্ত ধন্যবাদ দিব। আবার বলছি, আমার ভয় নাই, দুঃখ নাই। আমি ‘অমৃতস্য পুত্রঃ’। আমি জানি –

    ওই অত্যাচারীর সত্য পীড়ন

    আছে, তার আছে ক্ষয়;

    সেই সত্য আমার ভাগ্য-বিধাতা

    যার হাতে শুধু রয়।

    প্রেসিডেন্সি জেল, কলিকাতা
    ৭ জানুয়ারি, ১৯২৩।
    রবিবার – দুপুর

  • ঋষি রবীন্দ্রনাথ

    ঋষি রবীন্দ্রনাথ

    ঋষি রবীন্দ্রনাথ

    অমলেন্দু দাশগুপ্ত

    ‘অমলেন্দু দাশগুপ্ত’ রচিত ‘ঋষি রবীন্দ্রনাথ’ প্রথম প্রকাশিত হয় ১৩৬১ বঙ্গাব্দের শ্রীঅক্ষয় তৃতীয়ায়। প্রকাশক শ্রীসুরেশচন্দ্র দাস, এম-এ; জেনারেল প্রিণ্টার্স য়্যাণ্ড পাব্লিশার্স লি., ১১৯, ধর্মতলা স্ট্রীট, কলিকাতা। গ্রন্থটির মূল্য ছিল তিন টাকা। মুদ্রাকর শ্রীসুরেশচন্দ্র দাস, এম-এ কর্তৃক জেনারেল প্রিণ্টার্স য়্যাণ্ড পাব্লিশার্স লিমিটেডের মুদ্রণ বিভাগ—অবিনাশ প্রেস, ১১৯, ধর্মতলা স্ট্রীট, কলিকাতা থেকে গ্রন্থটি মুদ্রিত হয়েছিল। রচনাটি ‘দেশ’ পত্রিকায় ১৩৬০ সালের ২৩শে শ্রাবণ হতে ২৩শে আশ্বিন ধারাবাহিক প্রকাশিত হয়েছিল।

    ❀ ❀ ❀

    ঋষিকবি রবীন্দ্রনাথের জন্মদিবস আজ জাতীয় উৎসবের পর্যায়ে উন্নীত হইয়াছে। লক্ষ্য করিলে দেখা যাইবে যে, রবীন্দ্রনাথের বিশেষ একটি পরিচয়ই প্রাধান্য লইয়া উত্তরোত্তর পুরোভাগে আগমন করিতেছে, সে-পরিচয়টি হইল— রবীন্দ্রনাথ এ-যুগে উপনিষদের ঋষি। ঋষি শব্দটি বিশেষ অর্থ বহন করিয়া থাকে। ঋষি অর্থে সত্যদ্রষ্টাকে বুঝাইয়া থাকে। যিনি ব্রহ্মকে জানিয়াছেন, তিনিই ঋষি। রবীন্দ্রনাথকে এই অর্থেই ঋষি বলা হইয়া থাকে।

    ঋষিকবি রবীন্দ্রনাথের জন্মদিবস আজ জাতীয় উৎসবের পর্যায়ে উন্নীত হইয়াছে। লক্ষ্য করিলে দেখা যাইবে যে, রবীন্দ্রনাথের বিশেষ একটি পরিচয়ই প্রাধান্য লইয়া উত্তরোত্তর পুরোভাগে আগমন করিতেছে, সে-পরিচয়টি হইল— রবীন্দ্রনাথ এ-যুগে উপনিষদের ঋষি। ঋষি শব্দটি বিশেষ অর্থ বহন করিয়া থাকে। ঋষি অর্থে সত্যদ্রষ্টাকে বুঝাইয়া থাকে। যিনি ব্রহ্মকে জানিয়াছেন, তিনিই ঋষি। রবীন্দ্রনাথকে এই অর্থেই ঋষি বলা হইয়া থাকে।

    অনেকেই প্রশ্ন করিয়া থাকেন, রবীন্দ্রনাথ কি ব্রহ্মজ্ঞ? প্রশ্নটি জিজ্ঞাসার মধ্যে কোন অবিশ্বাস, সন্দেহ, প্রতিবাদ ইত্যাদি সূচিত হয় না। রবীন্দ্রনাথের লেখা পড়িয়া, গান শুনিয়া সকলের মনেই এই ধারণা হইয়া থাকে যে, তিনি সত্যদ্রষ্টা ঋষি এবং তাঁহাকে ব্রহ্মজ্ঞ বলিয়াই সকলে বিশ্বাস করিয়া থাকেন। কিন্তু বিশ্বাস তো প্রমাণ নহে, তাই তাঁহাদের এই বিশ্বাসের সমর্থনে কোন প্রমাণ আছে কি না, ইহা জানিবার জন্যই উক্ত প্রশ্নটি জিজ্ঞাসিত হইয়া থাকে।

    রবীন্দ্রনাথের কবিতা, গান, গল্প, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ প্রভৃতি সম্পর্কে বহু পুস্তক রচিত হইয়াছে। রবীন্দ্রদর্শন সম্বন্ধে বিশ্ববিখ্যাত মনীষী ডাঃ রাধাকৃষ্ণণ এবং ডাঃ সুরেন্দ্রনাথ দাশগুপ্তও পুস্তক রচনা করিয়াছেন। উভয়েই তাঁহাকে ঋষি বলিয়া স্বীকার করিয়াছেন। কিন্তু তাঁহাদের এই স্বীকৃতি রবীন্দ্রনাথের মতবাদ, রবীন্দ্রনাথের রচনা ইত্যাদির ভিত্তিতেই প্রতিষ্ঠিত। রবীন্দ্রনাথ ব্রহ্মজ্ঞ, ইহা প্রমাণের চেষ্টা উভয়ের কেহই করেন নাই, ঋষিরূপে তাঁহাকে স্বীকার করিয়া লইয়া তাঁহারা রবীন্দ্রদর্শন ও বাণীরই ব্যাখ্যা বা ভাষ্য করিয়াছেন। রবীন্দ্রনাথ সম্বন্ধে আরও অনেকের উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ রহিয়াছে, কিন্তু কোন গ্রন্থেই বিশেষভাবে এই প্রশ্নটিকে গ্রহণ করিয়া ইহার মীমাংসার চেষ্টা করা হয় নাই। রবীন্দ্র-জীবনীও কয়েকখানা রহিয়াছে, তাহাতেও পূর্বোক্ত প্রশ্নের কোন আলোচনা পরিদৃষ্ট হয় না।

    বলা বাহুল্য, প্রশ্নটি বস্তুতই কঠিন প্রশ্ন। কেহ ব্রহ্মজ্ঞ কি না, এ-প্রমাণ কে দিবে? তাহা ছাড়া ব্রহ্মজ্ঞ প্রমাণ-নির্ভর, এমন কথাও বলা চলে না। ব্রহ্ম আছেন, ইহাই কেহ প্রমাণ করিতে পারেন না, কারণ ব্রহ্ম প্রমাণের অতীত। যাঁহাকে প্রমাণ করা যায় না, সেই ব্রহ্মকে কেহ জানিয়াছেন কি না, ইহাও প্রমাণ করা স্বভাবতই সমান সাধ্যাতীত। সাধকগণ বড়জোর এই কথাই বলিতে পারেন এবং বলিয়া থাকেন যে, ব্রহ্মকে জানা যায়, তাঁহাকে পাওয়া যায় এবং অনেকেই বলিয়া গিয়াছেন যে, তাঁহারা তাঁহাকে জানিয়াছেন। তাঁহাদের আত্মোপলব্ধিই এই বিষয়ে একমাত্র প্রমাণ।

    কিন্তু সে-প্রমাণও একান্তভাবে তাঁহাদের ব্যক্তিগত উপলব্ধিতেই আবদ্ধ, তাঁহারাও সে-প্রমাণকে বাহিরে আনিতে পারেন নাই। কাজেই রবীন্দ্রনাথ ঋষি, রবীন্দ্রনাথ ব্রহ্মজ্ঞ পুরুষ, ইহা প্রমাণ করা কাহারও পক্ষে সম্ভবপর নহে। শুধু ব্রহ্মজ্ঞ ব্যক্তিই জানিতে পারেন যে, রবীন্দ্রনাথ ব্রহ্মজ্ঞ কি না। কিন্তু তাঁহাদের সে-জানাটাও প্রমাণ করা অসাধ্য ও অসম্ভব।

    রবীন্দ্রনাথ ঋষি, তিনি ব্রহ্মজ্ঞ পুরুষ, আমাদের এই বিশ্বাসের তবে কি কোন প্রমাণই পাওয়া সম্ভবপর নহে? সে-প্রমাণ পাওয়া একেবারে অসম্ভব ব্যাপার বলিয়া আমি মনে করি না। কেন, তাহাই প্রথমে সংক্ষেপে একটু আলোচনা করা যাইতেছে।

    ব্রহ্মসূত্রে ব্রহ্মের পরিচয়ে বলা হইয়াছে—“জন্মাদ্যস্য যতঃ”, এই অচিন্ত্য বিচিত্র বিশ্বের সৃষ্টি স্থিতি প্রলয় যাঁহা হইতে, তিনিই সেই জিজ্ঞাসিত ব্রহ্ম। কিন্তু ইহা ব্রহ্ম সম্বন্ধে প্রমাণ নহে, শুধু লক্ষণ বা চিহ্ন। তেমনি ব্রহ্মজ্ঞ সম্বন্ধেও লক্ষণ বা চিহ্ন থাকে, তাহাই ব্রহ্মজ্ঞ সম্বন্ধে প্রমাণ বলিয়া স্বীকৃত হইয়া আসিয়াছে। ব্রহ্মজ্ঞের সে লক্ষণ বা চিহ্ন কি? ব্রহ্মোপলব্ধি বা আত্মোপলব্ধিই সেই লক্ষণ। দক্ষিণেশ্বরের পরমহংসদেব বলিয়াছেন যে, যখন নিজের উপলব্ধি এবং শাস্ত্রের বাক্য মিলিয়া যায়, তখনই সাধক সিদ্ধ হইয়াছে জানিবে। উপলব্ধি এবং শাস্ত্রবাক্য এই সঙ্কেতনির্দেশ গ্রহণ করিয়া অগ্রসর হইলেই রবীন্দ্রনাথ সম্বন্ধে জিজ্ঞাসিত সেই প্রমাণ পাওয়া যাইতে পারে।

    কিন্তু দুঃখের বিষয় যে, নিজের ব্যক্তিগত উপলব্ধি সম্বন্ধে রবীন্দ্রনাথ অতি অল্প কথাই লিখিয়াছেন। তাঁহার আত্মজীবনীর পাঠকমাত্রেই লক্ষ্য করিয়া থাকিবেন যে, নিজের জীবনস্মৃতি রচনাতে তিনি নিজেকেই যথাসাধ্য আড়ালে রাখিয়াছেন, শুধু জীবনকেই গ্রহণ করিয়াছেন। নিজের সম্বন্ধে বলিতে তাঁহার ভদ্রমন এতই সঙ্কোচ ও দ্বিধাবোধ করিয়াছে যে, নিজের জীবনের ঘটনারও খুব কম উল্লেখই তিনি আপন জীবনস্মৃতিতে করিয়াছেন। সংযত ভদ্রমনের এতবড় পরিচয় আজ পর্যন্ত কোন আত্মজীবনীতেই দেখা যায় না এবং মনের এইরূপ আভিজাত্য লইয়া কম মানুষই পৃথিবীতে আসিয়াছেন।

    ধর্মগুরু, বা ধর্মপ্রচারকের ভূমিকা লইয়া রবীন্দ্রনাথ আসেন নাই, আসিয়াছেন কবিরূপে, তাই আপন জীবনের এই গভীরতম দিকটি তিনি নিকটতম জনের নিকট হইতেও একান্তভাবে গোপন রাখিয়াছেন। তথাপি শ্রম ও অধ্যবসায় লইয়া অগ্রসর হইলে তাঁহার ব্যক্তিগত উপলব্ধির বিবরণ কিছু কিছু সংগ্রহ যে না করা যায়, এমন নহে। কোন অধিকারী পুরুষ যদি এই বিষয়ে অগ্রসর হন, তবে রবীন্দ্রনাথের ঋষি-জীবনী এক পরম সম্পদরূপেই তিনি দেশবাসীকে দিয়া যাইতে পারেন। রবীন্দ্রনাথের ঋষি-জীবনের সামান্য একটু দিগদর্শনের চেষ্টা মাত্র এখানে করা যাইতেছে।