Tag: ক্রুসেড সিরিজ

  • ধাপ্পাবাজ

    ধাপ্পাবাজ

    ধাপ্পাবাজ

    রমলা থেকে কায়রো, অনেক দূরের পথ। যাত্রাপথও অনেক কঠিন ও কষ্টকর। পাথুরে পার্বত্য এলাকা, ধূসর বালির বিবর্ণ প্রান্তর, মাটির অসংখ্য উঁচু-নিচু ঢিবি এসব পার হয়ে যেতে হয় কায়রো। পার হতে হয় সুদীর্ঘ বিশাল উন্মুক্ত মরুভূমি।

    এই পথে অনেক বিপদ ও ভয় হঠাৎ করেই নেমে আসে যাত্রীদের জীবনে। কখনো ভয়ংকর মরু ডাকাত তাদের পথ আগলে দাঁড়ায়। কখনো অচেনা যাত্রী এসে রক্ত ও জীবন চুষে নেয়।

    সুলতান আউয়ুবীর পরাজিত সৈন্যরা এই কঠিন পথ ধরেই যুদ্ধের ময়দান থেকে মিশরে যাত্রা করল। তারা সেই দীর্ঘ ও ভয়ংকর রাস্তা পাড়ি দিচ্ছিল, যেখানে যে কোন সময় অজানা বিপদ এসে বিপন্ন করতে পারে তাদের জীবন।

    পুরো বাহিনী একসাথ হয়ে আসবে, তেমন সময় ও সুযোগ তাদের ছিল না। তাই ছোট ছোট গ্রুপে বিভক্ত হয়ে বিচ্ছিন্নভাবে পথ চলছিল ওরা।

    তাদের ফিরে আসার দৃশ্য ছিল খুবই করুণ ও ভয়ংকর। ওদের অনেকেরই মরুভূমিতে পথ চলার অভ্যাস এবং অভিজ্ঞতা ছিল না। মরুভূমির বালিতে একবার পা ডেবে গেলে সে পা আর তুলতে পারতো না এসব অনাড়ি পথিক। যুদ্ধ নয়, এই দুর্গম পথ পাড়ি দিতে গিয়েই অনেকে লাশ হয়ে পড়ে রইল মরুভূমিতে। কেউ হল মরুভূমির শিয়াল ও নেকড়ে বাঘের শিকার। তাদের দেহের হাড্ডি টেনে ছিঁড়ে বিচ্ছিন্ন করে দিচ্ছিল হায়েনার দল।

    যারা কাফেলা বেঁধে পথ চলার সুযোগ করে নিতে পারল, তারা এসব পরিণাম থেকে কিছুটা রেহাই পেল। আর যারা উট, ঘোড়া বা খচ্চরের উপর চড়ে রওনা করার সুযোগ পেল, তারা এই কষ্ট ও যাতনা থেকে কিছুটা রেহাই পেল। উত্তপ্ত বালির ওপর দিয়ে দীর্ঘ পথ পায়ে হেঁটে পাড়ি দেয়ার শ্রম তাতে কিছুটা লাঘব হলো ওদের।

    এমনি ছোট্ট কাফেলা রমলা থেকে কায়রো ফিরছিল মরুভূমির পথ ধরে। কাফেলার সবই ছিল আইয়ুবীর পরাজিত সৈন্য। তাদের কেউ ছিল ঘোরার পিঠে, কেউ উটের পিঠে। রাস্তায় তাদের আরও দু’একজন করে যাত্রী জুটতে লাগল। এক সময় এই ছোট্ট দলটি ত্রিশ-চল্লিশ জনের এক কাফেলায় পরিণত হয়ে গেল।

    তারা এক ভয়ংকর মরু অঞ্চল পার হচ্ছিল। আজ এই কঠিন মরু অঞ্চলকে সিনাই মুরুভূমি বলা হয়। তারা সবাই এক সাথে থাকার কারণে তখনো তাদের মনোবল ছিল অটুট। কিন্তু মরুভূমির এই সুদূর বিস্তৃত দিগন্তব্যাপী চরাচরে পানির কোন চিহ্নই দেখতে পাচ্ছিল না কেউ।

    যুদ্ধের ময়দান থেকে জীবন নিয়ে পালিয়ে আসতে পেরেছে, এটাই ছিল তাদের বড় শান্তনা। কিন্তু এর চেয়ে বড় বিপদ যে তাদের সামনে আসতে পারে এ কথা কেউ চিন্তাও করেনি।

    পরাজিত সৈন্যরা পা টেনে টেনে কদম ফেলছিল আর কাফেলার সাথে তাল মিলিয়ে কোন মতে এগিয়ে যাচ্ছিল। তাদের কারো অবস্থাই এমন ছিল না যে, একে অন্যকে সাহায্য করে। তবে কেউ মরে গেলে তাকে বালির নিচে দাফন করার মত অবস্থা তখনো তাদের ছিল।

    আরোহীরা চলতে চলতে এমন এক এলাকায় পৌঁছে গেল, যেখানে মাটির উঁচুনিচু টিলা এবং মস্ত বড় বড় স্তম্ভ মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে। কেউ একজন দূরে একটি টিলার আড়ালে এক লোকের মাথা ও কাঁধ দেখতে পেলো। কিন্তু সে কেবল মুহূর্তের জন্য। চকিতে তা আবার অদৃশ্য হয়ে গেল।

    লোকটি তার সঙ্গীকে বললো, ‘ওই টিলায় আমি একজনকে এই মাত্র দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলাম। আমরা ওখানে গিয়ে থেমে যাবো? ওখানে পানি না পাওয়া যাক, একটু ছায়া তো পাওয়া যাবে।”

    কাফেলার যাত্রীদের অধিকাংশই ছিল পিপাসায় কাতর। তাদের গলা শুকিয়ে খরকরে হয়ে গিয়েছিল। মুখ দিয়ে কথা বলতে অসুবিধা হচ্ছিল। মুখে পানি না থাকলেও জিভ নাড়ানো যে কষ্টের, এ কথা কেউ এতদিন ভেবেও দেখেনি। আজ বুঝলো তার মর্ম।

    প্রথম দিকে কাফেলার একজন আরেকজনের সাথে হেসে কথা বলেছিল। যুদ্ধের কথা, বাড়ীর কথা অনেক কিছুই তারা আলাপ করেছে। কিন্তু যতই এগিয়ে গেছে, ততই তাদের কথার বহর কমে এসেছে। কমতে কমতে এক সময় কথা বলা একদম বন্ধ হয়ে গেছে। সত্যি কথা বলতে কি, এখন আর কারো মুখ দিয়ে কোন কথা বের হচ্ছে না।

    তাদের পশুগুলোর অবস্থাও একই রকম। যদিও কোন পশু বা যাত্রী এখনও পিপাসায় মারা যায়নি, কিন্তু যে কোন সময় প্রাণ-বায়ু উড়ে যেতে পারে, এ অবস্থা অনেকেরই। মাত্র এক মাইল দূরের টিলা যেন শত মাইল দূরে মনে হচ্ছে।

    কাফেলা চলতে চলতে সেখানে পৌঁছে গেল। দু’টি টিলা পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে। কাফেলাটি দুই টিলার মাঝে গিয়ে টিলার ছায়ায় দাঁড়িয়ে পড়লো।

    একটু জিরিয়ে নেয়ার জন্য সকলেই সেখানে পশুগুলোর পিঠ থেকে নেমে এলো। পশুগুলোকে ছায়ায় ছেড়ে দিয়ে নিজেরাও বসে পড়লো টিলার ছায়াতে।

    ছায়ায় বসেও স্বস্তি পাচ্ছীল না কেউ। আগুনের মত গরম বাতাস বইছে। সেই বাতাস আঘাত হানছে যাত্রীদের চোখে-মুখে। তপ্ত বাতাসে ছ্যাকা খাওয়ার পর সেই যন্ত্রণা ছড়িয়ে পড়ছে সারা শরীরে।

    তখনো ওরা সেখানেই বসে আছে, এমন সময় ওরা দেখতে পেল, টিলার অন্য পাশ থেকে এক লোক তাদের দিকেও এগিয়ে আসছে। লোকটি আড়াল থেকে তাদের সামনে পৌঁছেই মূর্তির মত দাঁড়িয়ে গেল।

    লোকটির মাথা থেকে পা পর্যন্ত সাদা কাপড়ে ঢাকা। গায়ে ছিল সফেদ লম্বা জোব্বা। জোব্বাটি কাঁধ থেকে পা পর্যন্ত ছুলে আছে। লোকটির দাড়ি কালো এবং খাঁটো। সে দাড়ি পরিপাটি করে আঁচড়ানো।

    লোকটির হাতে একটি লাঠি। এমন লাঠি সাধারণত: পণ্ডিত ও জ্ঞাণী লোকেরাই ব্যবহার করে। মসজিদে খতিবও মিম্বরে দাঁড়ানোর সময় এমন লাঠিতে ভর করে দাঁড়ান।

    লোকটি নীরবে ওদের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল। লোকটিকে দেখে কাফেলার লোকজন বেশ অবাক হলো এবং লোকটি কি করে বা বলে দেখার জন্য নীরবে তার দিকে তাকিয়ে রইল। তার চেহারায় কোন কষ্ট বা মালিন্যের ছাপ ছিল না।

    কাফেলার কেউ একজন আস্তে করে বলল, ‘হযরত খিজির (আ:) হবেন হয়তো।’

    ‘না ইনি এই পৃথিবীর মানুষ নন!’ পাশের লোকটি প্রতিবাদ করে বলল।

    এই বিরাণ মরুভূমিতে লোকটি এমনভাবে চলা ফেরা করছিল, মনে হচ্ছিল, মরুভূমি নয়, লোকটি বিকেলের মিঠে রোদে বাগানে পায়চারী করছে। লোকটির এমন উদ্বেগহীন আচরণে কাফেলার লোকদের মনে কেমন এক ধরণের ভয় এসে জমা হতে লাগলো।

    এমনিতেই দুর্গম পথের আতঙ্ক ও ভীতি লেগেছিল তাদের চোখে, সেখানে এসে ঠাঁই নিল নতুন এক অজানা ভয়ের শিহরণ। আর সে ভয় এমনই তীব্র ছিল যে, এই রহস্যময় লোকটির পরিচয় জিজ্ঞেস করার সাহসও হলো না কারো। লোকটি কে, এই বিজন ও নিষ্ঠুর প্রান্তরে তিনি কি করছেন, কেউ এ কথাটিও জিজ্ঞেস করলো না।

    পোড়া মরুভূমির কঠিন উত্তাপ অগ্রাহ্য করে কি করে এমন উজ্জ্বল ও প্রশান্ত চেহারা নিয়ে তিনি তাদের সামনে হাজির হলেন, প্রত্যেকের মনেই এ প্রশ্ন তখন তোলপাড় করছে। লোকটির ধোপদুরস্ত পরিষ্কার পোষাক তাদের ভীতি আরো বড়িয়ে দিল। লোকগুলো হতবাক হয়ে তাকিয়ে রইল লোকটির দিকে।

    এ লোক যদি কোন সৈনিক হতো, তবে এই কাফেলার কেউ হয়তো তাকে দেখে ভয় পেতো না। কিন্তু এ লোক সৈনিক নয়, কোন মরু ডাকাতও নয়, খুবই শরীফ ও ভদ্রগোছের কেউ। কোন শাহী দরবারের সম্মানিত ওমরা বা সুফী দরবেশ কেউ হবেন, যাকে দেখলেই মনে শ্রদ্ধা ও ভক্তি জন্ম নেয়। তাহলে কে তিনি? এখানে তিনি কি করছেন? তিনি মানুষ, নাকি মানুষের বেশে কোন ভুত-প্রেত?

    কাফেলার লোকগুলো তখনো অনিমেষ নয়নে তাকিয়ে আছে লোকটির দিকে, তখনি ঘটলো দ্বিতীয় বিস্ময়কর ঘটনাটি। টিলার অন্য পাশ থেকে এক যুবতী এসে দাঁড়ালো লোকটির পাশ ঘেঁষে। এই দেখে লোকগুলো যখন বাকহারা এবং স্তম্ভিত তখন তৃতীয় চমক হয়ে লোকটির পাশে এসে দাঁড়ালো আরো একটি মেয়ে। এতটুকু দেখেই লোকগুলো ভয় ও আতঙ্কে একেবারে দিশেহারা হয়ে গেল।

    মেয়ে দুটিই আপাদমস্তক বোরকা পরিহিতা। তাদের মুখে নেকাব আছে, তবে তা হালকা জালের মত পাতলা কাপড়ের। সে জন্য তাদের ফর্সা চেহারা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিল যাত্রীরা।

    বোরখার কারণে মেয়েদের শরীরের আর কোন অংশ দেখা না গেলেও, যেটুকু দেখতে পাচ্ছিল তাতেই লোকজন স্বীকার করতে বাধ্য হলো, মেয়ে দু’টি অসামান্য রূপসী।

    লোকটি এমন একটা ভাব করলো, যেন সে এক শাহানশাহ, সম্রাট। তার হাঁটার ভঙ্গিতে গাম্ভীর্য ও শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশ পাচ্ছিল। কয়েক কদম এগিয়ে লোকটি কাফেলার লোকগুলোর একদম কাছাকাছি এসে দাঁড়ালো। দুই পর্দানসীন মহিলাও তাকে অনুসরণ করে এগিয়ে তার পেছনে এসে দাঁড়িয়ে গেলো।

    লোকটির সম্মানে কাফেলার এক লোক উঠে দাঁড়ালো। তার দেখা দেখি অন্যরাও উঠে দাঁড়িয়ে গেলো। তাদের এ সম্মানের সাথে জড়িয়ে ছিল ভয় ও আতঙ্ক।

    লোকটি তাদের সামনে বসে পড়ল। মেয়েরাও বসলো তার পাশে। জালের মধ্য থেকে মেয়ে দু’টির পটলচেরা মায়াবী চোখগুলো জ্বলজ্বল করে জ্বলছিল। ওরা পলকহীন চোখে তাকিয়েছিল কাফেলার লোকগুলোর দিকে।

    সেই অতিমানবীয় লোকটি হাত ইশারায় সবাইকে বসতে বলল। লোকজন বসলে সে লোক কথা শুরু করল, ‘আমিও সেখান থেকেই এসেছি, যেখান থেকে তোমরা এসেছো।’ কালো দাড়িওয়ালা লোকটি বলল, ‘পার্থক্য শুধু এই, তোমরা ফিরে যাচ্ছো নিজের বাড়ীতে আর আমি আমার বাড়ী ছেড়ে চলে এসেছি।’ লোকটির কণ্ঠ থেকে ঝড়ে পড়ল বিষন্ন উদাসীনতা।

    ‘আমরা কেমন করে বিশ্বাস করবো, আপনি আমাদের মতই এক সাধারণম মানুষ?’ এক সৈনিক বললো, ‘আমরা তো আপনাকে অভিজাত ও খুবই গুরুত্বপূর্ণ কেউ মনে করছি।’

    ‘না, এখন আমি তোমাদেরই মতই এক সাধারণ মানুষ! আর এ মেয়ে দু’টি আমার কন্যা।’ দরবেশ ব্যক্তিটি উত্তরে বলল, ‘আমিও তোমাদের মত রমলা থেকে পালিয়ে এসেছি। যদি আমার মুরশিদ আমার উপর দয়া না করতেন তবে খৃষ্টানরা আমাকে খুন করে ফেলতো আর আমার এই দুই কন্যাকে ধরে নিয়ে যেতো। এটা আমার মুরশিদেরই কৃতিত্ব যে, তিনি আমাদের হেফাজত ও নিরাপত্তা দিয়ে ধন্য করেছেন। আমি রমলার বাসিন্দা। শিশুকাল থেকেই ধর্ম শিক্ষার প্রতি আমার গভীর আগ্রহ ছিল। ওস্তাদের কাছ থেকে আমি অনেক এলেম হাসিলও করেছি।’

    কথা বলছে লোকটি, তন্ময় হয়ে শুনছে কাফেলার যাত্রীরা। লোকটি বলে চলেছে, ‘শিক্ষা জীবন শেষ করার পর ওস্তাদের পরামর্শে আমি মসজিদে ইমামতি শুরু করি। আল্লাহই তার রাসূল ও দ্বীনের অনুসারীদের প্রতিপালন করেন। এক রাতে আমি স্বপ্নে হুকুম পেলাম, ‘বাগদাদ চলে যাও, আর সেখানে বাগদাদের শাহী মসজিদের ইমাম সাহেবের শাগরেদ হয়ে বসবাস করতে থাকো।

    আমি পায়ে হেঁটেই বাগদাদ রওনা দিলাম। আমার কাছে টাকা পয়সা তেমন কিছু ছিল না। আমার মা বাবা ছিল খুবই দরিদ্র। ছোট একটা মশকও আমার ভাগ্যে জোটেনি যে, রাস্তায় পানি পান করবো। বিদ্যার নেশা আমাকে ঘর থেকে বের করে দিল। সবাই বললো, এ ছেলে রাস্তাতেই মারা যাবে। আমার মা অনেক কাঁদলেন, বাবাও কাঁদলেন। কিন্তু আমি বাবা-মায়ের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে যাত্রা করলাম।

    দিনের বেলায় ক্ষুধা ও তৃষ্ণায় আমার জান বের হয়ে যেত। সন্ধ্যার পরে আমি এই আশা নিয়ে মাটিতে শুয়ে পড়তাম, যেন এভাবেই আমার মৃত্যু হয়। কিন্তু ঘুম থেকে জেগে দেখতাম, আমার পাশে এক পিয়ালা পানি ও কিছু খাবার রাখা।

    প্রথম প্রথম আমি ভয় পেতাম ও এগুলো কোন জ্বীন-পরীর কাজ মনে করতাম। কিন্তু রাতে স্বপ্নে আমাকে জানানো হলো, এসব কোন এক মুরশিদের কেরামতি। কিন্তু আমি জানতাম না, সে মুরশিদ কে ও কোথায় থাকে। আমি খেয়ে পিয়ে আবার গভীর নিদ্রায় শুয়ে পড়তাম। সকালে উঠে দেখতাম, সেখানে পিয়ালা পানি কিছুই নেই, রুটিও না।

    বাগদাদ পর্যন্ত পৌঁছতে দুইবার নতুন চাঁদের উদয় হলো। সে এক দীর্ঘ এবং কষ্টকর যাত্রা। প্রতি রাতেই আমি পানির পিয়ালা ও খাবার প্যাকেট পেতাম। বাগদাদ শাহী জামে মসজিদের ইমাম আমাকে দেখে আমার পরিচয় না নিয়েই বলতে লাগলেন, ‘আমি কত দিন ধরে তোমার অপেক্ষায় আছি।’

    তিনি আমাকে তার হুজরার মধ্যে নিয়ে গেলেন। আমি সেখানে গিয়ে অবাক হয়ে গেলাম। দেখলাম, প্রতি রাতে যে থলে ও পিয়ালায় করে আমাকে খাবার ও পানি দেয়া হতো সেই থলে ও পিয়ালা সেখানে রাখা। খতিব সাহেব জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমার খাবার ঠিকমত পৌঁছতো তো?’

    আমি উত্তরে বললাম, ‘জি হ্যাঁ।’

    কিন্তু আমি এই ভেবে অবাক হলাম, প্রতি রাতে এই থলে ও পিয়ালা কে আমার কাছে বহন করে নিয়ে যেত? আর কেইবা সেগুলো এখানে ফিরিয়ে আনতো?

    তিনি বললেন, ‘আল্লাহ যখন হযরত মুসা (আ:) কে সাহায্য করতে চাইলেন, তখন তিনি নীল দরিয়াকে আদেশ করলেন, ‘রাস্তা দিয়ে দাও।’ নদীর উজানের পানি উজানে ও ভাটির পানি ভাটিতে দাঁড়িয়ে গেল আর মাঝখান দিয়ে মোটা রাস্তা অতিক্রম করে হযরত মুসা (আ:) তাঁর দলবলসহ নদী পার হয়ে গেলেন। কিন্তু ফেরাউন যখন তার অনুসরণ করে সেই রাস্তায় প্রবেশ করলো তখন দু’দিকের পানি আবার এক হয়ে গেল। নদী আবার পূর্বের মত প্রবল বেগে প্রবাহিত হতে লাগল। ফেরাউন নদীতে ডুবে মারা গেল।’

    লোকটি বলতে লাগলো, ‘সম্মানিত খতিব বললেন, আমি সেই মহান মালিকের অধীন, যিনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন এবং যিনি আমার কাজ শেষ হয়ে গেলে আবার তার কাছে দুনিয়া থেকে উঠিয়ে নেবেন। তার যে বান্দা তার প্রেমে মাতোয়ারা থাকে এবং তার জ্ঞান হাসিলের জন্য পাগলপারা হয়ে যায়, যেমন তুমি হয়েছ, তাকে তিনি মরতে দেন না। কঠিন মরুভূমিতে তার খাবার ও পিপাসার পানি তিনিই সরবরাহ করেন। উত্তাল জোয়ারের সময় নদীতে পরড়ে গেলেও তিনিই তাকে রক্ষা করেন।

    করুণার আধার আমার সেই মালিক আমাকে হুকুম করলেন, ‘এক বান্দাকে আমি তোর কাছে আসতে বলেছি।’ তিনি আমাকে তোমার ছবি দেখিয়ে বললেন, ‘এই ছেলে এরই মধ্যে তোর কাছে রওনা হয়ে গেছে। হে খতিব, তোর ভেতরে যে জ্ঞান ও ইলম রয়েছে সেই জ্ঞান ঐ ছেলেটার অন্তরে দিয়ে দিবি। আর আমি তোর খেদমতের জন্য যে জ্বীনদের নিযুক্ত করে রেখেছি, তাদের বলবি, তারা যেন ছেলেটাকে নিয়মিত রোজ রাতে খাবার ও পানি পাঠাতে থাকে।

    আমি মহান আল্লাহর আদেশ পালন করেছি মাত্র। প্রতি রাতে এখান থেকে তোমার জন্য খাবার ও পানি পাঠানো হতো। আর সে খাবার যথাসময়ে পৌঁছে যেতো তোমার কাছে। ওহে বালক, অবাক হয়ো না, অধীর হয়ো না। খুব কম লোকের ভাগ্যেই এ বিদ্যার আলো জোটে। এই নূরে আলোকিত হয় অন্তর। তুমি বড় ভাগ্যবান। যে আলো আমার মাঝে আছে সে আলো তুমি পাবে। তবে তোমাকে সৎ হতে হবে, আর মনে আল্লাহকে খুশী করার ইচ্ছা থাকতে হবে। তখন জ্বীন ও মানুষ তোমার তাবেদার হয়ে যাবে।’

    ‘জ্বীনেরা কি আপনার গোলাম?’ এক সিপাই প্রশ্ন করলো।

    ‘না, তা নয়।’ লোকটি উত্তর দিল, ‘আমরা সবাই আল্লাহর গোলাম। জ্বীন ও ইনসান কেউ কাউকে গোলাম বানাতে পারে না। আমরা সবাই তাঁরই গোলামী করি, যাঁর কাছে উঁচু-নিচু, ধনী-গরীবের পার্থক্য নেই। ঈমানের দৃঢ়তা ও দুর্বলতা দ্বারাই মানুষ বড়-ছোট হয়।’

    লোকটির কথায় এমন প্রভাব বিস্তারকারী শক্তি ছিল যে, সকলের মনই তার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে গেল। তারা মনোযোগ দিয়ে তার কথা শুনতে লাগলো।

    লোকটি বলতে লাগলো, ‘বাগদাদের খতিব আমার আত্মাকে জ্ঞান দ্বারা আলোকিত করে দিলেন। তিনি আমার বিয়েও দিয়ে দিলেন। সেখানেই আমার এ দু’টি মেয়ে জন্মগ্রহণ করেছে। আমি অনেক সাধনা করে আল্লাহর মহিমার কয়েকটি গোপন রহস্য পেয়েছি।

    এক রাতে আমার উস্তাদ খতিব সাহেব আমাকে বললেন, ‘এখন তুমি এখান থেকে চলে যাও। গিয়ে সেই সব আল্লাহর বান্দার খেদমত করো, যারা আল্লাহর বান্দা হয়ে তার খেদমত করতে চায়।’

    তিনি আমাকে আমার দেশ রমলা যাওয়ার আদেশ দিলেন। দু’টি উট দান করলেন, যেন আমার সফর আরামদায়ক হয়। পথে খরচ দান করলেন আর বললেন, ‘দেখো, জীবনে আর কোন পাপ ও অন্যায়ের চিন্তাও করবে না। রমলা যখন পৌঁছবে, তখন এক রাতে তুমি তোমার ইচ্ছার বিরুদ্ধেই উঠে একদিকে যাত্রা শুরু করবে। হয়তো তোমাকে বেশী দূর যেতে হবে না। কিন্তু যেখানে তোমার পা নিজে নিজেই থেমে যাবে সে স্থানটি এক পবিত্র স্থান। তুমি সে স্থানেই তোমার আস্তানা বানিয়ে নেবে।

    কিন্তু খুব শীঘ্রই ভবিষ্যতের অন্ধকার ঢাকা এক সময় তোমার সামনে হাজির হবে। তখন তোমার পাপ ও অন্যের পাপের শাস্তিও তোমাকে ভোগ করতে হবে। অবস্থা তখন এতটাই নাজুক হয়ে যেতে পারে যে, তোমাকে সেখান থেকে হিজরত করতে হবে।’

    আমি যখন আমার স্ত্রী ও এই দুই মেয়েকে নিয়ে পথে বের হলাম, তখন সূর্যের তেজ ও প্রখরতা আমার এ ছোট্ট পরিবারের জন্য ঠাণ্ডা ও শীতল হয়ে ধরা দিল। আমরা আল্লাহর মর্জি সে স্থানেও পানি পেলাম, যেখানে বালির কণা ছাড়া এক ফোটা পানিও ছিল না।

    আমি রমলা পৌঁছে দেখলাম, ততদিনে আমার মাতাপিতা মারা গেছেন। আমার স্ত্রী সেই বিরান বাড়ীকে আবার আবাদ করে তুললো। আমি জ্ঞান সাধনার সাগরে ডুবে রইলাম। আমার মেয়ে দু’টি আস্তে আস্তে বড় হতে লাগলো।

    একদিন আল্লাহতায়ালা তাদের মাকেও তাঁর কাছে ডেকে নিলেন। তখন মেয়েরাই আমার দেখাশোনা ও বাড়ীর কাজ করতে লাগলো। পরে এক রাতে আমি গভীর ঘুম থেকে কারো ডাকে জেগে উঠলাম। কিন্তু কে আমাকে ডেকে তুলল বুঝতে পারলাম না।

    আমি উঠে একেবারে দাঁড়িয়ে গেলাম। বাগদাদ জামে মসজিদের খতিবের অনেক পুরানো কথা আমার মনে পড়ে গেল, ‘তুমি সহসাই জেগে উঠবে ও অনিচ্ছা সত্ত্বেও যাত্রা করবে।’

    ঠিক তাই হলো। আমার ইচ্ছার বিরুদ্ধে আমি বাড়ী থেকে বের হয়ে এলাম এবং একদিকে হাঁটা ধরলাম।

    হাঁটতে হাঁটতে আমি আমার গ্রাম ও লোকালয় ছেড়ে এলাম। আমি থামতে চাচ্ছিলাম কিন্তু আমার পা আমাকে সামনের দিকে টেনে নিয়ে চললো। আমি চলতেই লাগলাম।

    জানি না তোমরা সে স্থানটি দেখেছো কি না। সেখানে গভীর খাদ ছিল এবং খাদের মধ্য দিয়ে নদী প্রবাহিত হচ্ছিল। খৃস্টানদের অসংখ্য সৈন্য সেই খাদের গভীরে লুকিয়েছিল। আমি শুনেছিলাম, সুলতান আইয়ুবী অন্তর্দৃষ্টি সম্পন্ন। তিনি মাটির দেয়াল ভেদ করে লুকানো শত্রু দেখতে পারেন। কয়েক মাইল দূর থেকে শত্রুর গন্ধ পেয়ে যান। শিকারী জন্তু যেমন গন্ধ শুঁকে শিকারের কাছে চলে যায়, তেমনি তিনি শত্রুর গন্ধ শুঁকে শত্রুর কাছে চলে যেতে পারেন।

    হয়তো আল্লাহ সত্যি সত্যি আইয়ুবীকে এমন শক্তি দিয়েছিলেন। আর সেই শক্তির বলেই তিনি বার বার যুদ্ধে জিতে ছিলেন। কিন্তু আল্লাহ অহংকারী মানুষ পছন্দ করেন না। বিজয়ের পর বিজয় তার মনে অহংকার জন্ম দিয়েছিল।

    তাই এবার যখন তিনি অভিযানে বের হলেন, আল্লাহর রহমত তার কাছ থেকে বিদায় হয়ে গেল। আল্লাহ তাকে যে নেয়ামত দিয়েছিলেন, তা উঠিয়ে নিলেন। তাঁর চোখের উপর আল্লাহ এমন পট্টি বেঁধে দিলেন যে, শত্রু তো দূরের কথা, তিনি নিজে কোথায় আছেন তাও জানতে পারলেন না। তাই ক্রুসেড বাহিনী তোমাদেরকে তাদের ফাঁদে ফেলে দিল। তারপর তারা খাদের ভেতর থেকে স্রোতের মত বেরিয়ে এলো এবং তোমাদের আক্রমণ করলো। তারপরের অবস্থা তো তোমরাই ভাল জানো।

    এই যুদ্ধের কয়েক বছর আগের কথা। আমি কোন অদৃশ্য শক্তির প্রভাবে একদিন এই খাদের কাছাকাছি এক জায়গায় এসে পৌঁছলাম। সেখানে আমার পা হঠাৎ করেই থেমে গেল।

    তখন ছিল চাঁদনী রাত। আমি সেখানে এক মাজার দেখতে পেলাম। কবরের চারপাশ পাথরের দু’হাত উঁচু দেয়াল দ্বারা বাঁধানো। আমি পরীক্ষা করার জন্য অন্য দিকে ফিরলাম। কিন্তু আমার পা আমাকে আবার কবরের দিকেই ঘুরিয়ে দিল।

    এবার আমি কবরের দিকে এগিয়ে গেলাম। আমার যাওয়ার জন্য পাথরের রাস্তা বানানোই ছিল। সেই পথ ধরে আমি কবরের চৌহদ্দিতে প্রবেশ করলাম। সঙ্গে সঙ্গে আমার হাত দোয়ার জন্য উঠে গেলো।

    আমার মনে হতে লাগলো, চাঁদ যেন আরও বেশী উজ্জ্বল হয়ে উঠছে। আমার মনে হলো, আমার ওস্তাদ মনে হয় আমাকে এই স্থানের কথাই বলেছিলেন। আমি কবরের পাশে বসে গেলাম ও করবের উপর হাত রেখে আবেদন করলাম, ‘আমার মত দাসের উপর আপনার কি আদেশ?’

    আমি এ প্রশ্নের কোন উত্তর পেলাম না। আমার মন বলল, এখানে কিছু চাইতে নেই। যে কল্যাণ ও সুবিধা তোমার পাওয়া উচিত তা স্বাভাবিক ভাবেই তার তরফ থেকে হয়ে যাবে।

    আমি রাতটা সেখানেই কাটিয়ে দেলাম। সকালে নদীতে অজু ও গোছল করতে গেলাম। তারপর কবরের কাছে এসে নামাজ পড়লাম।

    সেখান থেকে যখন বিদায় হলাম তখন মাতালের মত আমার নেশা নেশা ভাব হলো। আমার মাথা ঘুরতে লাগল। আমার মনে হলো, এটাই সে জায়গা, যেখানে আমাকে আস্তানা গাড়তে বলেছিলেন আমার ওস্তাদ।

    তারপর থেকে আমি নিয়মিত সেই মাজারে যাতায়াত শুরু করলাম। বলতে গেলে সেখানেই আমার আস্তানা বানিয়ে নিলাম। সেই কবরের পাশে দাঁড়ালে আপনাতেই আমার মনে নতুন নতুন ভাব জাগতো। তাপর সেটাই আমার বিশ্বাসে পরিণত হতো।

    আমি কবরের উপর উঁচু করে গম্বুজ বানিয়ে নিলাম। লোকজন জোর করে আমার মুরীদ হতে লাগলো। ক্রমে আমি দূর দূরান্ত পর্যন্ত সফল শুরু করলাম। হাজার হাজার মানুষ আমার মুরীদ হয়ে গেল। আমি হলব এবং মুশেলের বিভিন্ন অঞ্চলে গেলাম। এমনকি বায়তুল মুকাদ্দাস পর্যন্ত সফর করলাম।

    কিছুদিন থেকে আমি দিনের বেলাতেই এমন সব ইশারা পেতে লাগলাম, যা খুব ভাল নয়। মনে হলো, যে মহামানব এই মাজারে শুয়ে আছেন তার আত্মা অশান্ত হয়ে উঠেছে।

    কবরের উপর আমি সবুজ চাদর বিছিয়ে দিলাম। এক রাতে চাদরে ফড়ফড় শব্দ হতে লাগল। আমি ভয় পেয়ে গেলাম। আমি চাদরের উপর হাত দিয়ে বললাম, ‘মুরশিদ! আমার জন্য কি আদেশ?’

    মাজারের মধ্য থেকে শব্দ হল, ‘তুমি দেখছোনা, মুসলমানরা এখন মদ পান করতে শুরু করেছে?’ এর আগে আমি আর এমন শব্দ কোনদিন শুনিনি। তিনি আমাকে বললেন, ‘তুমি মুসলমানদেরকে মদের অপকারিতা সম্পর্কে সাবধান করো।’

    আমি তার আদেশ অনুযায়ী কাজ শুরু করলাম। কিন্তু দেখতে পেলাম, গরীবরা কেউ মদ পান করে না। মদ পান করে বড় বড় অফিসার ও আমীররা। তাদের কান পর্যন্ত আমার সাবধান বাণী পৌঁছতো না।

    আবারও এক রাতে কবরে চাদর ফরফড় করে আমাকে জানিয়ে দিল, মিশর থেকে আসা সৈন্যরা মুসলিম এলাকায় মুসলমানদের সাথে ঠিক সেই ব্যবহার করছে, যেমন ব্যবহার ক্রুসেড বাহিনী করে থাকে। সে সময় সুলতান সালাউদ্দিন আইয়ুবীর সৈন্য দামেশকেও ছিল।

    দামেশক থেকে হলব পর্যন্ত এবং হলব থেকে রমলা পর্য়ন্ত সৈন্যদল স্থানে স্থানে ছড়ানো ছিটানো ছিল। এই সব সৈন্যদের কমাণ্ডাররা মুসলমান বাড়ীতে ঢুকে মূল্যবান জিনিস ও নগদ অর্থ জোর করে কেড়ে নিতো। তারা পর্দানশীল মেয়েদের উপরেও হাত বাড়াল।

    তাদের দেখাদেখি সাধারণ সৈনিকরাও লুটপাট শুরু করে দিল এবং নারীদের লাঞ্ছিত করতে লাগল। এমন সংবাদও পাওয়া গেছে, সেনাপতি ও কমাণ্ডাররা মুসলমান মেয়েদেরকে ধরে নিয়ে তাদের ক্যাম্পে তুলেছে।

    মাজার থেকে আমাকে আদেশ দেয়া হলো, ‘তুমি সলতান আইয়ুবীর কাছে যাও। তাঁকে বলো, এই সৈন্য তো খেলাফতে বাগদাদের বাহিনী, মিশরের ফেরাউনের বাহিনী নয়। তারা যদি এমন পাপ কর্ম চালু রাখে, তবে তাদের হাশর ফেরাউনের মতই হবে।’

    সে সময় সুলতান আইয়ুবী হলবের নিকটে ক্যাম্প করেছিলেন। আমি এত দূর রাস্তা অতিক্রম করে তাঁর সঙ্গে যখন দেখা করতে গেলাম, তখন তাঁর রক্ষীরা বললো, ‘তুমি সুলতাদের সাথে কেন দেখা করতে চাও?’

    আমি বললাম, ‘আমি রমলা থেকে এসেছি ও একটি সংবাদ এনেছি।’

    তারা জিজ্ঞেস করলো, ‘সংবাদ কে দিয়েছে?’

    আমি বললাম, ‘সংবাদ যিনি দিয়েছেন, তিনি জীবিত নন।’

    রক্ষীরা হো হো করে হেসে উঠলো। তাদের কমাণ্ডার উচ্চস্বরে বললো, ‘ওগো, তোমরা যদি পাগল দেখতে চাও তো আসো। এই লোক বলছে সে কবর থেকে সুলতানের জন্য সংবাদ এসেছে।’

    অন্য একজন বললো, ‘এ লোক নিশ্চয় শেখ মান্নানের চেলা। বেটা ফেদাইন দলের লোক, সুলতানকে হত্যা করতে এসেছে। একে, ধরো, বন্দী করো।’

    অন্য একজন বললো, ‘এ লোক খৃষ্টানদের চর! একে হত্যা করো।’

    আমি বন্দী হওয়ার ভয়ে বললাম, ‘আমি সত্যি একজন পাগল!’

    আমি সেখান থেকে পালিয়ে এলাম। আমি স্বচক্ষে দেখলাম, সুলতান আইয়ুবীর ক্যাম্প থেকে দু’টি মেয়ে মাথা বের করে পাগলের তামাশা দেখার জন্য আমার দিকে তাকিয়ে আছে।’

    ‘আমারা তাঁর কোন সৈন্যের কাছে কোন মেয়ে দেখিনি।’ এক সৈনিক বললো।

    ‘তোমরা কি সেই সময় যখন তাঁর সৈন্যরা দামেশকে গিয়েছিল, তখন তাদের সাথে ছিলে? সাদা পোষাকধারী লোকটি প্রশ্ন করলো।

    ‘আমরা তো এই প্রথমবারের মত এদিকে এসেছি।’ এক সিপাই বললো, ‘আমরা সৈন্য বিভাগে নতুন ভর্তি হয়েছি। তখন আমরা সুলতাদের বাহিনীতে ভর্তিই হইনি তো সেখানে থাকবো কেমন করে?’

    ‘আমি পুরাতন সৈন্যদের কথা বলছি।’ লোকটি বললো, ‘সেই কমাণ্ডার ও সৈন্যদের কথাই বলছি, যাদের পাপের শাস্তি তোমাদের মাথার ওপর এসে পড়েছে। তোমরা নতুন তো, সে জন্য কোন পাপের সাথে জড়াতে পারোনি। এ জন্যই তোমরা এখনো জীবিত আছো, নিরাপদে ফিরে আসতে পেরেছো। কিন্তু যারা মুসলমান হয়েও মুসলমানদের বাড়ীতে লুটপাট করেছে ও পর্দানশীন নারীদের উপর হস্তক্ষেপ করেছে, তারা সবাই মারা গেছে। আর যারা পাপী ও গোনাহগার তাদের কারো ঠ্যাং কেটেছে, কারো বাহু ও হাত কেটেছে।

    তোমরা খবর নিলেই জানতে পারবে, তোমাদের মতই অনেকে রমলা থেকে মিশরে রওনা দিয়েছিল। কিন্তু পথের মধ্যে তাদের পাপের শাস্তি শুরু হয়ে যায়। তারা ময়দান থেকে জীবিত ফিরলেও পথে অজ্ঞান হয়ে যায়। পরে তাদের দেহ থেকে চোখ শকুনে টেনে বের করেছে।

    আরো একদল পাপী ছিল, তারা খৃষ্টানদের হাতে বন্দী রয়েছে। এখন সেই বন্দীখানায় তারা তাদের পাপের শাস্তি ভোগ করছে। এই বন্দীখানার শাস্তি জাহান্নামের চেয়ে কোন অংশে কম নয়। সেখানে তাদের নিরন্তর শাস্তি চলতে থাকবে। তারা ক্ষুধা-তৃষ্ণায় সেখানে ধুকে ধুকে মরার মত পড়ে থাকবে, কিন্তু মরবে না। তারা মৃত্যুর জন্য দোয়া করবে, কিন্তু তাদের দোয়া আল্লাহর কাছে কবুল হবে না।’

    ‘আমাদের পরাজয়ের কারণ কি এটাই?’ এক সৈনিক প্রশ্ন করলো।

    ‘আমি দুই বছর আগেই ইশারা পেয়েছিলাম, আইয়ুবীর বাহিনী ধ্বংস হয়ে যাবে।’ লোকটি বললো, ‘তারা নিজেরা ধ্বংস হবে আর কাফেরদেকে এমন সুযোগ করে দেবে, যেন তারা ইসলামের ধ্বংস সাধন করতে পারে। কারণ এই বাহিনীর প্রতি আল্লাহ নাখোশ হয়ে গেছেন।

    ‘আপনি কোথায় যাচ্ছেন?’ একজন জিজ্ঞেস করলো।

    ‘আমি আল্লাহর গজব থেকে বাঁচার জন্য রমলা থেকে পালিয়ে এসেছি। রমলায় ক্রুসেড বাহিনীর রূপ ধরে আল্লাহর গজব নেমে এসেছে। এ গজব মুসলিম বিশ্বকে তছনছ করে দেবে।’

    ‘তাহলে আপনি কোথায় গিয়ে আশ্রয় নেবেন?’

    ‘আমি কোথায় আশ্রয় নেবো সে সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা আমার নেই। আমি শুধু আমার মুরশিদের হুমুক তামিল করতে পারি। ক্রুসেড বাহিনী তুফানের মত রমলায় আঘাত হানলে মুরশিদ আমাকে জানাল, ‘আইয়ুবীর বাহিনী এ তুফান রোধ করতে পারবে না।’ তোমরা নিজেরাই এর স্বাক্ষী, ক্রুসেড সৈন্যদের তোমরা বাঁধা দিতে পারোনি।

    যদি শুধু আমার জীবনের প্রশ্ন হতো, তবে আমি আমার মুরশিদের মাজারে আমার জীবন কুরবানী করতাম। কিন্তু মুরশিদ আমাকে এই যুবতী মেয়ে দু’টির জীবন ও সম্ভ্রম বাঁচানোর জন্য হিজরত করতে বললেন। কারণ খৃষ্টানরা দু’টি জিনিস খুব পছন্দ করে, সম্পদ ও পর্দানশীন মেয়ে। আমার মুরশিদ আমাকে বললেন, ‘তোমরা মেয়ে দু’টিকে সঙ্গে নিয়ে মিশর চলে যাও।’

    আমি করজোড়ে বললাম, ‘এত দূরের পথ আমি কেমন করে পার হবো।’

    মাজার থেকে আওয়াজ এলো, ‘তুমি এতদিন আমার যে খেদমত করেছো, তার বিনিময়ে তোমরা মঙ্গল মতে কায়রো পৌঁছতে পারবে। কিন্তু সেখানে গিয়ে চুপচাপ বসে থাকবে না। সবাইকে পাপ থেকে সাবধান করবে। বলবে, যদি বাঁচতে চাও তবে পাপের কাজ ছেড়ে দাও। নইলে তোমরাও সেই শাস্তি পাবে যে শাস্তি আইয়ুবীর সৈন্যদের দেয়া হয়েছে।

    মাজার আমাকে আরও অনেক কথাই বলেছে, সে সব কথা আমি মিশরে গিয়ে বলবো।

    তোমরা একে অন্যের দিকে লক্ষ্য করে দেখো, তোমাদের চেহারা সব লাশের মত ফ্যাকেশে হয়ে গেছে। তোমাদের দেহে প্রাণের স্পন্দন আছে কি নেই, বুঝার উপায় নেই। কিন্তু আমাকে দেখো, আমি ও আমার কন্যারা পায়ে হেঁটে যাচ্ছি। আমাদের সাথে খাবারও নেই, পানিও নেই। তবু আমরা কত সতেজ ও প্রাণবন্ত।’

    ‘আপনি কি আমাদেরকে মিশর পর্যন্ত আপনার মত শান্তিতে নিয়ে যেতে পারবেন?’ এক সৈনিক জিজ্ঞেস করলো।

    ‘যদি তোমরা খালেছ মনে এই প্রতিজ্ঞা করো, তোমরা পাপের চিন্তা মন থেকে মুছে ফেলবে, আর আমি যে উদ্দেশ্যে মিশর যাচ্ছি সে ব্যাপারে আমাকে সাহায্য করবে, তবে আমি তোমাদেরকে সহিসালামতে মিশর ফিরিয়ে নিয়ার চেষ্টা করবো।’

    ‘আমরা সত্য মনে অঙ্গিকার করছি।’ অনেকগুলো কণ্ঠস্বর এক সাথে বলে উঠলো, ‘আমরা অঙ্গীকার করছি, যে পর্যন্ত জীবিত আছি, আপনার সাথে থাকবো।’

    ‘আমি শুধু আমার এবং মেয়েদের জীবন ও সম্মান বাঁচানোর জন্য রমলা থেকে বের হইনি।’ লোকটি বললো, ‘আমাকে আদেশ করা হয়েছে, মিশরে গিয়ে জনগণকে সাবাধান করার জন্য।

    মিশরের মাটির একটি দোষ আছে। এই মাটিতে গোনাহের একটা প্রবণতা আছে। হযরত ইউসুফ (আ:) মিশরে নিলাম হয়েছিলেন। হযরত মুসা (আ:)-এর ওপর অত্যাচার করা হয়েছে মিশরের মাটিতে। মিশরে ফেরাউনের হাতে নির্যাতীত হয়েছে নবী, রাসূল ও পয়গম্বরগণ।’

    তিনি বললেন, ‘হে মিশরবাসী! তোমরা মাটির এই কুপ্রভাব থেকে বাঁচো এবং এর অনাচার থেকে মুক্ত হয়ে যাও। তোমরা আল্লাহর রশিকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করো, যেন আল্লাহ তোমাদেরকে আর শাস্তিযোগ্য মনে না করেন। তাহলেই তোমরা ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা পাবে।

    আমি মিশরবাসীকে এই বাণী শোনানোর জন্যই যাচ্ছি। যদি তোমরা এই বাণী পৌঁছাতে আমাকে সাহায্য করো, তবে তোমাদের জন্য এই পৃথিবী যেমন জান্নাত হয়ে যাবে তেমনি পরকালেও তোমাদের জন্য খোলা থাকবে বেহেশতের দরোজা।’

    ❀ ❀ ❀

  • হেমসের যোদ্ধা

    হেমসের যোদ্ধা

    হেমসের যোদ্ধা

    জাভীরা। শত হোক, সে এক মেয়ে বৈ তো নয়! একটার পর একটা ভয় ও আতংকের স্রোত জীবনের ওপর দিয়ে বয়ে গেলে কয়টার মোকাবেলা করবে সে? পাহাড়ে ধ্বস নামলে যেমন ছোট-বড় অসংখ্য পাথর অনবরত ছুটে আসতে থাকে, তেমনি একটার পর একটা বিপদ ক্রমাগত ছুটে আসতে লাগল তার দিকে। সেই বিপদ দেখে ভয়, শংকা ও ত্রাসের স্রোতে হাবুডুবু খেতে লাগল জাভীরা।

    জাভীরার ঝড়ের আতংক হারিয়ে গিয়েছিল প্লাবনের বিভীষিকা দেখে। প্লাবনের ভয় হারিয়ে গেল যখন অচেনা বিধর্মী যুবকের হাতে লাঞ্ছিত হবার ভয় এসে তাকে জাপটে ধরলো। সর্বনাশা স্রোত কেড়ে নিয়েছে তার উট। তার নিরাপত্তা বিধান করার দায়িত্ব ছিল যাদের, কাফেলার সেই সঙ্গীরা হারিয়ে গেছে তার জীবন থেকে। যে গোপন ও ভয়ংকর অভিযানে যাচ্ছিল ওরা, এখন সে অভিযানের কি হবে? কেমন করে কাদের নিয়ে সেই অভিযান সফল করবে জাভীরা?

    এ সব দুশ্চিন্তা যখন ওকে দিশেহারা করে তুলছিল তখনি সেই অচেনা বিধর্মী যুবকের কাছ থেকে তার কাছে এলো নির্ভরতার আশ্বাস। সেই আশ্বাস ও ব্যবহার তাকে বলছিল, আতংক দূর করে দাও মেয়ে। একজন মুমীন কখনো অসহায় নারীর জন্য ভয় ও ত্রাসের কারণ হতে পারে না। বরং পৃথিবীর সকল অসহায় মানুষের আশ্রয় ও সহায় হয়ে দেখা দেয় একজন ঈমানদার। অতএব ভয়ের জগত থেকে বেরিয়ে এসে আবার বাঁচার স্বপ্ন দেখো। ভুলে যেওনা, এই মুসলমানরা এমন সমাজ নির্মাণ করতে পারে, যেখানে মরুভূমির দুর্গম পথে কোন নারী একাকী শত শত মাইল পাড়ি দিতে পারে সম্পূর্ণ শংকাহীন চিত্তে। এটাই ইতিহাস, এটাই সত্য এবং বাস্তবতা।’

    কিন্তু জাভীরা ভাবছিল, ‘এতই কি সহজ ভয় শূন্য হওয়া! একজন মানুষ বলল, তুমি ভয় শূন্য হয়ে যাও আর তাতেই ভীত লোকটির অন্তর থেকে সব ভয় পালিয়ে যাবে? মানুষ কি এতই বিশ্বাসযোগ্য? এই আশ্বাসের মধ্যে প্রতারণা নেই, ছলচাতুরি নেই, কে এমন নিশ্চয়তা দেবে?’

    যুবকের আশ্বাস পেয়ে ভাবছিল জাভীরা, আমার অন্তর কি এই যুবকের ভালমানুষী চেহারা দেখে সত্যি সত্যি ভয় শূন্য হতে পেরেছে? না, বরং সে অনুভব করলো, ভয় ও আতংকের একটার পর একটা ঢেউ এখনো আছড়ে পড়ছে তার জীবনে।

    মুসলিম যুবকের হাতে লাঞ্ছিত হওয়ার ভয় কেটে যেতেই অন্য ভয় এসে বাসা বাঁধলো তার মনে। এমন কি হতে পারে না, লোকটি বড় অর্থলোভী? অনেক টাকার বিনিময়ে বিক্রি করে দেয়ার মানসেই এ যুবক আমাকে এভাবে আগলে রাখছে? এ কথা মনে হতেই জাভীরার মন বিক্রি হয়ে যাওয়ার পরবর্তী জীবনের কথা ভেবে শিউরে উঠল। সেই অনাগত ও অনিশ্চিত জীবনের পদে পদে সে অনুভব করলো হাজারো বিপদ তার জন্য ওঁৎ পেতে আছে।

    দুর্যোগের রাতটি তারা কাটিয়ে দিল পাহাড়ের এক গুহায়। জাভীরার মনে পড়লো, রাতে যুবককে হত্যা করার একটি ব্যর্থ চেষ্টা চালিয়েছিল সে। কিন্তু অসম্ভব ক্ষিপ্রতায় সে চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়েছিল যুবক।

    জাভীরার হত্যা প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর চরম উৎকণ্ঠা পেয়ে বসেছিল তাকে। ভেবেছিল, এ রাতই তার জীবনের শেষ রাত। আর কোন দিন সে এ পৃথিবীর আলো বাতাস দেখতে পাবে না। কাল ভোরেই তার এ সুন্দর দেহ আর কমনীয় শরীর খুবলে খাবে শেয়াল শকুন।

    খুনীকে কি কেউ ক্ষমা করে? কেন করবে? তাকে বাঁচিয়ে রাখার কি দায় ঠেকেছে এই মুসলিম যুবকের যে মেয়ে একবার তাকে খুন করার চেষ্টা করেছে, সুযোগ পেলে সে মেয়ে আবার তাকে খুন করার চেষ্টা করবে না, এমন নিশ্চয়তা তাকে কে দিয়েছে? যুবকের নিরাপত্তার সহজ পথ হচ্ছে প্রতিপক্ষকে নিঃশেষ করে দেয়া। যুবকটি কি শেষ পর্যন্ত তাই করবে?

    এ প্রশ্ন মনে উদয় হতেই মৃত্যু ভয় মেয়েটির চেহারা আবার বিবর্ণ করে দিল। জাভীরা মনে মনে সিদ্ধান্ত নিল, ‘মরতে যদি হয়-ই তবে এ যুবককে ছেড়ে দিয়ে লাভ কি? ওকে সঙ্গে নিয়েই আমি মরবো।’

    তানভীরকে খুন করার অদম্য ইচ্ছা ও বাসনা নিয়েই জাভীরা চুপচাপ বসেছিল গুহার ভেতর। কিন্তু কখন ঘুম এসে তাকে কাবু করে ফেলল সে টেরই পায়নি। যখন ঘুম ভাঙল, তখন সকাল হয়ে গেছে।

    পাহাড়ের গুহায় সেই মুসলিম যুবকের সাথে তার প্রথম রাতটি শেষ হয়ে গেল। ভোরে যখন তার ঘুম ভাঙল সে এই ভেবে অবাক হলো, যুবক তানভীর তাকে তো খুন করেইনি, এমনকি তার এমন আকর্ষণীয় দেহ এবং লোভনীয় শরীরের প্রতিও কোনরূপ খেয়াল করেনি। এ কি কোন নির্বোধ আহাম্মক! নাকি অনুভূতিহীন কোন কাপুরুষ! তানভীরের কাণ্ড দেখে এ প্রশটাই প্রথম তার মনে জাগলো।

    পূর্বাকাশে রাঙা সূর্য উঠল। সূর্যের রোদ গুহায় ঢুকল না বটে, তবে তার আলোয় গুহা এবং তার আশপাশের এলাকা আলোকিত হয়ে উঠলো। ভোরের সেই স্নিগ্ধ আলোর দিকে তাকিয়ে চেতনার কোন অতল তলে হারিয়ে গেল জাভীরা, সে নিজেও তা টের পেলো না। ভোরের সেই স্নিগ্ধ আলোর দিকে তাকাতেই তার সমস্ত ক্লান্তি, অবসাদ ও অচেনা যুবকের লাঞ্ছনার ভয় সব যেন দূর হয়ে গেল। এতক্ষণ সে যাকে অনুভূতিহীন এক কাপুরুষ যুবক মনে করছিল, সেই যুবকের দিকে বিস্ময় বিমুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো জাভীরা।

    তানভীরের ঠোঁট নড়ছে। জাভীরার মনে হচ্ছে, এ লোক সরাসরি আল্লাহর সাথে আলাপ করছে। জাভীরার মনে পড়লো, তানভীর বলেছিল, খোদা শুধু তাকেই সাহায্য করেন, যার নিয়ত ও মন পবিত্র। তাহলে কি এই সে পবিত্র লোক। নাকি এ লোক মানুষ নয়, কোন ফেরেশতা মানুষের রূপ ধরে এসেছে তাকে বাঁচাতে! এ সব ভাবতে ভাবতে জাভীরার অসীম মুগ্ধতা আছড়ে পড়লো তানভীরের সেই প্রার্থনারত ঠোঁটের ওপর।

    নিজের জীবনের কথা মনে পড়লো তার। ভেবে দেখলো, নিজের দেহটাই কেবল অপবিত্র নয়, অপবিত্র তার ইচ্ছা এবং নিয়তও। তাই তো তানভীরের মত সুন্দর যুবকদের প্রতারিত করার চেষ্টাতেই কেটে যায় তার সকাল ও সন্ধ্যা।

    জাভীরা রাতে এটাও চিন্তা করে রেখেছিল, যদি কোন অলৌকিক কারণে সে যুবককে হত্যা করতে না পারে বা যুবকের হাতে সে নিহত না হয় তবে সে যুবকটিকে রূপের ফাঁদে আটকে ফেলবে। যদি সকাল পর্যন্ত যুবক নিজে তার রূপের সাগরে ঝাঁপ না দেয় তবে সকালে সে নিজেই উদ্যোগ নেবে যুবককে তার প্রেমের শেকলে বন্দী করার। সে তার রূপ ও যৌবন যুবকটিকে দান করে বলবে, ‘এর বিনিময়ে আমাকে হেমসে পাঠিয়ে দাও।’

    জাভীরা জীবনে এই প্রথম তার সংকল্প পরিত্যাগ করলো। সে অনুভব করলো, তার সাথে কেবল একটা শরীর নয়, আত্মা এবং বিবেকও আছে। যদিও সে আত্মা পাপ পংকিলতায় ভরা, কিন্তু আত্মার তো একটা মানবিক চাহিদাও আছে! বিবেক তো সত্যকে অস্বীকার করতে পারে না। এই যুবক যে মহত্ব ও মহানুভবতা দেখালো তা তো মিথ্যে নয়!

    জাভীরা নিজের জীবন ও আচরণের কথা মনে করে খুবই লজ্জা অনুভব করতে লাগলো। তানভীরকে এখন সে আর দশজন মানুষের মত কোন সাধারণ মানুষ ভাবতে পারছে না। তার দৃষ্টিতে সে এখন ফেরেশতার মত মহান। সে তাদেরই একজন, যে মানুষ স্বয়ং আল্লাহর সাথে কথা বলতে পারে।

    মেয়েটি এসব ভাবছিল আর তার চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ছিল অশ্রু। যতই তার চোখ থেকে অশ্রু ঝরে পড়ছিল ততই সে অনুভব করছিল, তার হৃদয়ের পাষাণভার হালকা হয়ে যাচ্ছে। তার মনে হচ্ছিল, তানভীরের অস্তিত্বের মধ্যে নিজেকে বিলীন করে দিতে পারলেই সে পরিপূর্ণ শান্তি ও তৃপ্তি পাবে।

    নামাজ শেষে তানভীর দোয়ার জন্য হাত উঠালো। তার ধারণা ছিল, জাভীরা ঘুমিয়ে আছে। এই নির্জন কক্ষে সে ছাড়া আর কেউ জেগে নেই। তাই সে উচ্চস্বরে বলতে লাগলো, “হে মহান প্রভূ। তুমি আমাকে পাপের পঙ্কিলতা থেকে পবিত্র রাখো। আমাকে পবিত্র থাকার চেতনা ও ক্ষমতা দান করো। আমার আত্মাকে পরিশুদ্ধ রাখো এবং যে আমানত তুমি আমার হাতে সোপর্দ করেছে খেয়ানত ছাড়াই তাকে ঠিকানায় পৌঁছে দেয়ার শক্তি দাও। হে আল্লাহ! আমার অন্তরে সেই ভয় পয়দা করে দাও, যে ভয় এক সুন্দরী যুবতীর রূপ ও যৌবনের প্রলোভনকে উপেক্ষা করে তোমার পথে টিকে থাকতে পারে। প্রভু হে, আমি তোমার এক অবুঝ ও দুর্বল বান্দা। তুমি আমাকে সেই শক্তি দান করো, যেনো আমি শয়তানের শয়তানী ও কুমন্ত্রণার সাথে লড়াই করে তোমার শ্রেষ্ঠত্ব ও মহিমার মর্যাদা রক্ষা করতে পারি।’

    তানভীর ফেরেশতা নয়, সে মানুষ। মানুষের কুপ্রবৃত্তি, লোভ লালসা, মোহ, দুর্বলতা সবই তার মধ্যে ছিল। কিন্তু ঈমান এমন এক জিনিস, যা মানুষকে এসব দুর্বলতা থেকে বাঁচিয়ে রাখে। আল্লাহর ভয়, পরকালের ভয় মানুষকে পশুত্ব ও বর্বরতা থেকে রক্ষা করে। এই মোনাজাতের মধ্য দিয়ে তানভীর সেই শক্তিই সঞ্চয় করছিল। সততা ও দায়িত্বশীলতার বর্ম দিয়ে আবৃত করছিল নিজেকে।

    দোয়া শেষ করে প্রশান্ত মনে উঠে দাঁড়াল তানভীর। ঘুরে জাভীরার দিকে তাকাতেই দেখলো, জাভীরা নির্ণিমেষ নয়নে তাকিয়ে আছে তার দিকে। তার গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে অশ্রু।

    কি কারণে মেয়েটি কাঁদছে জানে না তানভীর। সে কি পিতৃ হারানোর শোকে! অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দুশ্চিন্তায়! যে কারণেই কাঁদুক, তানভীর ওকে বিরক্ত না করে চুপচাপ থাকার সিদ্ধান্ত নিল।

    জাভীরাও তেমনি। অপলক চোখে কেবল তাকিয়েই রইলো, কোন নড়াচড়া করলো না। কোন কথাও বললো না। একটু পর। তানভীর জাভীরাকে বললো, বাইরে যাও। বাইরে পরিষ্কার পানির ঝরনা আছে, তাতে হাত মুখ ধুয়ে এসো।

    তানভীর তার মাথায় জড়ানো পাগড়ি খুলে জাভীরার দিকে বাড়িয়ে ধরে বললো, “এটা নাও। ভাল করে মুখ-হাত ধোও। তোমার চুলে এখনো কাদামাটি লেগে আছে, ওগুলো পরিষ্কার করো। আমি তোমাকে তোমার সাবেক চেহারায় তোমার আত্মীয়দের হাতে তুলে দিতে চাই, যেমনটি তুমি দুর্যোগের আগে ছিলে।’

    জাভিরা তার হাত থেকে কাপড়টা নিয়ে এমন ভঙ্গিতে বের হয়ে গেল, যেন কোন শিশু গুরুজনের আদেশ পালন করছে।

    তানভীরের কাছে খাবার ও পানীয় যা কিছু ছিল সেগুলো ঘোড়ার জিনের সাথে বাঁধা ছিল। এখন ঘোড়াও নেই, কোন খাবার বা পানীয়ও নেই। তাই সে চুপচাপ জাভীরার ফিরে আসার অপেক্ষায় বসেছিল।

    জাভীরা ফিরে এলো। তানভীরের কথামত ভাল করে মাথা ও মুখমন্ডল ধুয়ে এসেছে সে। একটু আগে জাভীরার চুল মাটি ও কাদায় জট পাকিয়েছিল। চেহারার অবস্থাও ছিল তথৈবচ। এখন শিশির ধোয়া ফুলের মতই সজীব ও প্রাণবন্ত চেহারা নিয়ে ফিরে এসেছে সে।

    তানভীর জাভীরার এ রূপের দিকে তাকিয়েই চমকে উঠলো, যেন তাকে চিনতেই পারছে না। মনে মনে হোঁচট খেল সে। এ যেন যাদুর চমক। এত তাড়াতাড়ি মেয়েটি শোক ও কষ্ট কাটিয়ে এমন স্বাভাবিক ও পরিপাটি হতে পারবে, ভাবতেই পারেনি তানভীর। পল্লী গ্রামের মানুষ সাধারণত এমন আকর্ষণীয় রূপ লাবন্যের অধিকারী নারীর দেখাই পায় না। কোন ধনীর দুলালীই কেবল এমন মায়াময় চেহারা ও এত আকর্ষণীয় দেহবল্লরীর অধিকারী হতে পারে। তানভীর জাভীরার এ রূপ দেখে বিস্মিত না হয়ে পারল না।

    তানভীর সেদিক থেকে চোখ সরিয়ে বললো, ‘আমাদের হাতে খাওয়ার মত কিছু নেই। খালি পেটেই আমাদের রওনা করতে হবে। তাই আর দেরী করতে চাই না। চলো বেরিয়ে পড়া যাক।’

    সে উঠার উদ্যোগ করতেই জাভীরা দু’কদম এগিয়ে তার সামনে দাঁড়িয়ে বললো, আর একটু বসো। আমি কিছু জিজ্ঞেস করতে চাই, কিছু জানতে চাই তোমার কাছে।’

    তানভীর প্রশ্নবোধক দৃষ্টি নিয়ে মেয়েটির দিকে তাকাল। বলল, ‘বলো, কি জানতে চাও?’

    ‘তুমি যখন তোমার আল্লাহর সাথে কথা বলছিলে, তখন কি তুমি তাকে দেখতে পেয়েছিলে?’

    ‘আল্লাহকে মানুষের এই সীমিত দৃষ্টি দিয়ে দেখা যায় না।’ তানভীর বললো, ‘আমি আলেম নই, এ জন্য বলতে পারছি না, দেখা না দিয়ে আল্লাহ কেমন করে তার অস্তিত্ব প্রকাশ করেন। আমি শুধু এতটুকু জানি, আল্লাহ আমার সব কথাই শুনতে পান। তিনি আমার দোয়া শুনেছেন এবং আমার দোয়া কবুল করেছেন, তার প্রমাণ আমি বহুবার পেয়েছি।’

    ‘তোমার কি বিশ্বাস, চেষ্টা ও শক্তির বিনিময়ে তুমি ঝড় ও স্রোতের কবল থেকে রক্ষা পাওনি বরং তোমাকে ও আমাকে মহা দুর্যোগ থেকে আল্লাহই বাঁচিয়েছেন?’ জাভীরা প্রশ্ন করলো।

    ‘একশো বার।’ দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে তানভীর জবাব দিল, ‘খতিব সাহেব বলেন, যত বড় বিপদই হোক, যদি কেউ মন থেকে আল্লাহর সাহায্য চায় তবে মহা বিপদ থেকেও আল্লাহ মানুষকে রক্ষা করতে পারেন। কিন্তু তার চাওয়া হতে হবে আন্তরিক ও নিষ্কলুষ।’ তানভীর বললো, যদি আমি এই আশায় তোমাকে বাঁচানোর চেষ্টা করতাম যে, তোমার মত সুন্দরীকে নিয়ে কোথাও পালিয়ে যাব, তবে কাল সেই প্লাবনের সয়লাবে তোমার সাথে আমিও ডুবে মরতাম।’

    ‘কিন্তু আমার আত্মা তো পবিত্র নয়!’ জাভীরা দুঃখভরা কণ্ঠে বললো, ‘আমাকে আল্লাহ কেন সাহায্য করবেন? আমাকে কেন বাঁচাবেন?’

    ‘এই প্রশ্নের জবাব আল্লাহই ভাল জানেন। তবে হেমসে গিয়ে খতিবকে জিজ্ঞেস করে দেখতে পারি তিনি এর কোন জবাব জানেন কিনা?’ তানভীর বললো, ‘আমার মধ্যে এত এলেম নেই যে, তোমাকে আল্লাহর সব মহিমা বুঝাতে পারবো।’

    ‘এই প্রশ্নের জবাব না হয় খতিবকে জিজ্ঞেস করে জেনে নেবে। কিন্তু এটা তো বলতে পারবে, আমার মত যুবতীর এমন নজরকাড়া সৌন্দর্য আর লোভনীয় রূপ দেখেও কেমন করে তুমি এমন নির্লিপ্ত থাকতে পারলে? কেন থাকলে?’ জাভীরা প্রশ্ন করলো।

    ‘তুমি যা বলতে চাইছো যদি আমি তাই করতে চাইতাম, তবে আমি তোমার খঞ্জরের আঘাত থেকে বাঁচতে পারতাম না। আল্লাহ আমাকে হেফাজত করার জিম্মা নিতেন না।’ তানভীর উত্তরে বলল, ‘তুমি আমার কাছে আল্লাহর এক পবিত্র আমানত। মুসলমান রিপুর তাড়নায় আমানতের খেয়ানত করতে পারে না।’

    তানভীর মেয়েটির দিকে তাকিয়ে কথা বলছিল। হঠাৎ সে তার চোখ নামিয়ে নিল এবং চুপ হয়ে গেল। কিছুক্ষণ নিচের দিকে তাকিয়ে থাকার পর বলল, ‘তুমি বড় বিপজ্জনক আমানত জাভীরা! তোমাকে নিয়ে আমি বড় ভয়ের মধ্যে আছি। তোমার হেফাজতের চিন্তায় আমি এমনিতেই অস্থির, দয়া করে আমাকে আর পেরেশান করো না। চলো এখন যাই।’

    সে অধীর হয়ে উঠতে চাইলো কিন্তু জাভীরা তার কাঁধে হাত রেখে বললো, ‘আরেকটু বসো। আমাকে বলো, আমাকে নিয়ে তোমার কিসের ভয়? তুমি কি ভাবছো আবার আমি তোমাকে আক্রমণ করবো।’

    ‘তাহলে তো বেঁচে যেতাম।’ তানভীর বললো, ‘তোমার শত্রুতা আমার জন্য বিপদের নয়, বিপজ্জনক হচ্ছে তোমার বন্ধুত্ব, তোমার সঙ্গ। আমাকে তোমার পাশে আর বেশীক্ষণ এভাবে আটকে রেখো না আমি ফেরেশতা নই জাভীরা, আমিও মানুষ। আমাকে এমন কঠিন পরীক্ষায় ফেলো না, যে পরীক্ষায় ফেল করলে আমার দুনিয়া আখেরাত উভয়ই বরবাদ হয়ে যাবে। আমাকে আল্লাহর কাছে নতি স্বীকার করতে দাও। তার রহমত থেকে আমাকে বঞ্চিত করার চেষ্টা করো না।’

    ‘তোমার আল্লাহর কসম!’ জাভীরা বললো ‘আমাকেও তোমার মত বানিয়ে নাও। তোমার আল্লাহর কাছে লজ্জিত হওয়ার যোগ্য করে দাও আমাকে। তুমি কোন সাধারণ মানুষ নও, তুমি সাধারণ মানুষের চেয়ে অনেক উপরে। তুমি খোদার দূত! আমি জানি আমি ক্ষমার অযোগ্য। কিন্তু যারা মহান তাদের ক্ষমার শক্তি যে আমার পাপের চেয়েও বিশাল।’ জাভীরা কথা বলতে বলতে কেঁদে ফেলল।

    ‘তুমি কাঁদছো কেন জাভীরা, কি জন্য কাঁদছো তুমি?’ জাভীরার কান্না দেখে অস্থির কণ্ঠে বলল তানভীর।

    ‘আমি জঘন্য খারাপ মেয়ে, আমি পাপিষ্ঠা। জাভীরা বললো, ‘আল্লাহ আমার প্রতি দারুণ অসন্তুষ্ট। যখন স্রোত আমাকে ভাসিয়ে নিচ্ছিল, তখনও আমার অন্তরে আল্লাহর কথা জাগেনি। আমি আমার দেহ-সম্পদের জন্য গর্ব করতাম। জানতাম, আমার দেহে আছে অমূল্য সম্পদ। এই সম্পদ যতক্ষণ আমার সঙ্গে থাকবে ততক্ষণ আমি রাজরাণী। এই দেহটাকে বাঁচাতে গিয়ে যখন আমি ব্যর্থ হলাম তখন তুমি এই দেহের ভার নিলে। আমাকে উদ্ধার করে আনলে সেই দুর্যোগের মধ্য থেকে। তাই ভয় পাচ্ছিলাম, যে কোন সময় এ দেহ তুমি দাবী করে বসতে পারো। এ ভয়েই আমি তোমাকে ছোরা নিয়ে আক্রমণ করেছিলাম। কারণ এ দেহই ছিল আমার শক্তি ও ক্ষমতার উৎস। কিন্তু আমি ব্যর্থ হলাম। স্বাভাবিকভাবেই এ ব্যর্থতার পর তুমি আমার জীবন ও দেহ চেয়ে বসলে আমার কিছুই করার ছিল না। কিন্তু তোমার আচরণ থেকে জানতে পারলাম, দেহটা মানুষ নয়, মানুষের খোলসমাত্র। আসল মানুষ বিরাজ করে অন্তরে অন্তরের সেই মানুষ মারা গেলে দেহ হয়ে যায় নিথর লাশ। তাহলে যাকে আমি অমূল্য সম্পদ জ্ঞান করতাম তা নিছক লাশ বৈ তো নয়! আমি কত মুর্খ দেখো, সামান্য একটা পচনশীল লাশের গর্বে মাটিতে আমার পা পড়তো না। কিন্তু যখন তোমার প্রার্থনা শুনলাম, তখন বুঝলাম আমি কত বড় আহাম্মক! বুঝলাম, আমি বা তুমি কিছু নই, আমাদের অতীত আমাদের নয়, বর্তমান আমাদের নয়, ভবিষ্যতও আমাদের নয়। আমরা আমাদের রক্ষা করতে জানি না। এক অদৃশ্য শক্তির ইশারায় নিয়ন্ত্রিত হয় আমাদের জীবন। কিন্তু সেই শক্তি কি? কোথায় এবং কেমন করে সেই শক্তির নাগাল পাবো আমি?’

    ‘যিনি সৃষ্টি করেছেন তিনিই আমাদের একমাত্র রক্ষক। এ ক্ষমতা কেবল তার হাতেই নিবদ্ধ। তোমার আত্মাকে পবিত্র করো, এ শক্তি তোমার হয়ে যাবে।’

    ‘কিন্তু আমার সারাটা জীবন কেটেছে পাপের মধ্যে, কেমন করে আমি পবিত্র হবো?’

    তানভীর তার দিকে গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো, ‘আমাকে পরিষ্কার করে বলল, তুমি কি নর্তকী? তুমি কি কোন আমীরের হেরেমের রাণী? নাকি তুমি কোন ধনাঢ্য ব্যক্তির আদরের দুলালী, জমিদারের সোহাগী কন্যা? শুনেছি এমন সব মেয়েরা খুব রূপসী হয়। তোমার মত সুন্দরী মেয়ে আমি এ জীবনে কোনদিন দেখিনি।’

    জাভীরা চুপচাপ মাথা নিচু করে শুনছিল তার কথা। তানভীরের কথা শুনে তার চোখে অশ্রু এসে গেল। সে তানভীরের আরো কাছে সরে এলো। তাকে ঘনিষ্ট হতে দেখে তানভীর একটু দূরে সরে গেল। জাভীরা বললো, ‘তানভীর, আমার খুব ভয় করছে। তুমি জানো না, সেদিন ঝড়ের রূপ ধরে আমাকে গ্রাস করতে এসেছিল আমার পাপ! তোমার পবিত্র হাতের ছোঁয়া পেয়েছিলাম বলে সে যাত্রা বেঁচে গেছি। দোহাই তোমার, আমাকে বাঁচাও। তোমার কাছ থেকে আমাকে দূরে ঠেলে দিও না। ঝড়ের সময় যেভাবে আমাকে আগলে রেখেছিলে সেভাবে আমাকে আকড়ে ধরে রাখো।’

    ‘না!’ তানভীর সচকিত হয়ে বললো, ‘তুমি এভাবে আমার ঘনিষ্ট হওয়ার চেষ্টা করো না। এতে যে কোন সময় আমি বিভ্রান্ত হয়ে যেতে পারি।’

    ‘অ, বুঝেছি। আমি পাপী বলে তুমি আমার কাছ থেকে দূরে থাকতে চাচ্ছো, যেন বিপথগামী হয়ে না যাও। স্বীকার করছি, আমি অনেক লোককে বিপথগামী করেছি। কিন্তু তখন পাপ ও পূণ্যের কোন বোধ আমার মধ্যে ছিল না।’

    জাভীরা লক্ষ্য করলো, তানভীরের মধ্যে ঈমানী চেতনা প্রবল পরিমাণেই আছে, কিন্তু তার মধ্যে জ্ঞানের গভীরতা নেই। এ ধরনের লোককে বিভ্রান্ত করা খুব কঠিন কিছু নয়। জাভীরা জানে, যদি এ ধরনের লোককে একবার বিভ্রান্ত করা যায় তবে তারা সহজে সেই বিভ্রান্তি থেকে বেরোতে পারে না। আর যদি তাদেরকে কোন ছাঁচে ঢেলে সাজানো যায় তবে তারা সে ছাঁচেই চলতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে।

    জাভীরা তার সাথে খোলাখুলি কথা বলা শুরু করে দিল। সে বলতে লাগলো, ‘তানভীর, তুমি জানো এ জগত সংসারে এখন আমার কেউ নেই। একমাত্র সম্বল বাবাও মারা গেলেন ঝড়ের কবলে পড়ে। এখন আমি এক অসহায়া নারী। বাঁচতে হলে আমার একটি অবলম্বন দরকার। যদি আমি তোমাকে বলি, এসো আমরা সারা জীবন একসাথে কাটাই, পরম্পর জীবন সঙ্গী হয়ে যাই, তুমি কি উত্তর দেবে?’

    তানভীর তার মুখের দিকে তাকিয়ে বিজ্ঞের মত একটু হাসলো। বললো, ‘সে উত্তর জানার চাইতে আগে তোমার হেমসে পৌঁছা দরকার। চলো এখন যাওয়া যাক। রোদ বেড়ে গেলে পথ চলা মুশকিল হয়ে যাবে।’

    এ জবাব ভাল না মন্দ জাভীরা ঠিক বুঝে উঠতে পারলো না। সে তার সঙ্গে উঠে যাত্রা করলো।

    পাহাড়ী রাস্তা ধরে পথ চলছে ওরা। তানভীরের দৃষ্টি সামনে। জাভীরা বার বার তার দিকে তাকিয়ে লক্ষ্য করছে তাকে। গত রাতে এ তানভীরকেই হত্যা করে হেমসে পালিয়ে যাওয়ার চিন্তা করেছিল সে। কিন্তু আজ? আজ দিব্বি তার সাথে দ্বিধাহীন চিত্তে হেমসের পথে হেঁটে যাচ্ছে।

    তানভীর খুব দ্রুত হাঁটছিল। তার সাথে তাল মিলাতে কষ্ট হচ্ছিল জাভীরার। সে তানভীরের হাত ধরে বললো, ‘এত তাড়া কেন, ধীরে চলো।’

    ‘আমার আস্তে চলা উচিত নয়।’ তানভীর বললো, ‘নইলে আবার রাত হয়ে যাবে।’

    ‘তা, রাত আসতে দাও না! জাভীরা বললো, ‘আমি এত দ্রুত হাঁটতে পারছি না।’

    ‘চেষ্টা করো। যখন আর হাঁটতে পারবে না তখন আমি তোমাকে আমার কাঁধে উঠিয়ে নেবো, কিন্তু চলার গতি কমাতে পারব না।’ তানভীর বললো, ‘আমার প্রচণ্ড তাড়া আছে।’

    ❀ ❀ ❀

    সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর ভাই তকিউদ্দিন খৃস্টান সম্রাট বিলডনকে হিম্মত দুর্গের বাইরে শোচনীয় ভাবে পরাজিত করেন। যার দরুণ হতভম্ব হয়ে বিলডনের সৈন্যেরা ছত্রভঙ্গ হয়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। খৃস্টান সম্রাট বিলডন তার বিচ্ছিন্ন সেনাদলকে অতি কষ্টে একত্রিত করেন। একত্রিত করার পর তিনি বুঝতে পারলেন, তার কি পরিমাণ সৈন্য ক্ষয় হয়েছে।

    তিনি দেখতে পেলেন, তার কাছে তখনো অর্ধেকের কিছু বেশী সৈন্য অবশিষ্ট আছে। তিনি এ বাহিনী নিয়ে এসেছিলেন দামেশক পর্যন্ত দখল করতে। কিন্তু তার দুর্ভাগ্য, তার প্রায় অর্ধেক সৈন্য তকিউদ্দিনের কমাণ্ডো বাহিনীর আক্রমণে মারা গেছে, নয়তো পালিয়ে পাহাড়ে জঙ্গলে আশ্রয় নিয়েছে।

    সম্রাট বিলডন পলাতক সৈন্যদের অবস্থা জানতেন না। তারা তখন বিচ্ছিন্ন হয়ে দিকবিদিক ছুটছিল। মুসলিম যাযাবর ও রাখালেরা ধাওয়া করছিল সেই পলাতক সৈন্যদের। এমনকি গ্রামের সাধারণ মুসলমান যুবক বুড়ো এবং ছেলে ছোকরার দল তাদের ধরে ধরে হত্যা করছিল। কেউ ছিনিয়ে নিচ্ছিল তাদের অস্ত্রশস্ত্র, কেউ হস্তগত করছিল তাদের ঘোড়াগুলো।

    সম্রাট বিলডন তার অবশিষ্ট সৈন্যদের একত্রিত করে হিম্মত দূর্গ থেকে কিছুটা দূরে এক পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থান নেয়ার হুকুম দিলেন। সেখানেই তিনি খবর পেলেন তার পলাতক সৈন্যরা বিচ্ছিন্নভাবে পালাতে গিয়ে সাধারণ মুসলমানদের হাতে নিহত হচ্ছে।

    পরাজিত বিলডন পরাজয়ের কারণে এমনিতেই কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে পড়েছিলেন। এ সংবাদ পেয়ে তিনি আরো দিশেহারা হয়ে গেলেন। রাগে উন্মত্ত হয়ে তিনি সৈন্যদের আদেশ দিলেন, ‘যেখানেই মুসলমানদের গ্রাম ও বস্তি চোখে পড়বে, সেখানেই নির্বিচারে লুটতরাজ চালাবে। সুন্দরী ও যুবতী মেয়েদের লাঞ্ছিত করবে। গ্রামের বাড়িঘর ও বস্তিতে আগুন ধরিয়ে দেবে।’

    আদেশ জারী করেই তিনি তার বাহিনীকে একদিকে এগিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিলেন। বিলডনের পরাজিত বাহিনী ক্যাম্প গুটিয়ে রওনা হলো। পরাজয়ের প্রতিশোধ নেয়ার জন্য তারা পথে যেখানেই মুসলমান বস্তি ও গ্রাম পেলো সেখানেই লুটতরাজ চালাতে লাগলো।

    মূল্যবান জিনিসপত্র লুট করার পর সেই গ্রামে তারা আগুন ধরিয়ে দিতো। গ্রামের নারীদের লাঞ্ছিত করতো এবং সুন্দরী ও যুবতী মেয়েদের অনেককেই ধরে নিয়ে যেতে লাগলো বাহিনীর সাথে। এতে মুসলিম জনসাধারণ তাদের উপরও মারমুখী হয়ে উঠলো। গ্রামের যুবক ও কিশোররা সেই বাহিনীর ক্ষতি সাধন করার জন্য জোট বেঁধে হামলা চালাতে লাগল। এভাবেই বিলডনের পরাজিত সৈন্যরা পথ চলছিল।

    এক রাতে হেমস থেকে ছয় সাত মাইল দূরে এক জায়গায় গিয়ে রাত্রি যাপনের জন্য ক্যাম্প করলো ওরা।

    বিলডন মনে মনে আশা করছিলেন, কোন খৃস্টান সম্রাট হয়তো তাকে সাহায্য করার জন্য এগিয়ে আসবে। যদি তিনি বাইরে থেকে নতুন করে সৈন্য সহযোগিতা পান তবে তিনি ফিরে যাওয়ার পরিবর্তে তকিউদ্দিনের কাছে পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে রুখে দাঁড়াবেন। তিনি আশা করছিলেন, আরেক বার তকিউদ্দিনের মুখোমুখি হলে নিশ্চয়ই তকিউদ্দিন ভড়কে যাবে। চাইকি দামেশক পর্যন্ত তার রাজ্য বিস্তারের পথও খুলে যেতে পারে।

    রাতে ক্যাম্পে বসে এসবই তিনি ভাবছিলেন। তখনই তার মনে পড়লো সম্রাট রিনাল্টের কথা। সম্রাট রিনাল্ট ক্রুসেড রাজ্য প্রতিষ্ঠা করার দৃঢ় সংকল্প নিয়ে এ যুদ্ধে শামিল হয়েছিলেন। যদি সম্রাট রিনাল্টের সহযোগিতা পাওয়া যায় তবে তকিউদ্দিনকে উপযুক্ত শিক্ষা দেয়া তেমন কঠিন হবে না ভেবে তিনি রিনাল্টের সাথে যোগাযোগ করার সিদ্ধান্ত নিলেন।

    ❀ ❀ ❀

    জাভীরার কোন সন্ধান না পেয়ে নিরাশ হয়ে বৃদ্ধ খৃস্টান ও তার সাথীরা সারা রাত পথ চলে সকালে গিয়ে হেমসে পৌঁছলো। কাফেলার অন্যরাও হেমসে পৌঁছে গেলো ওদের সাথে। কিন্তু তাদের কারো কারো গন্তব্য ছিল আরো দূরে। তারা হেমসের বাসিন্দা ছিল না, ফলে তারা হেমসে না থেমে আরও অগ্রসর হওয়ার জন্য ওদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। জাভীরার সঙ্গীরা হেমসে তাদের ঠিকানায় গিয়ে উঠল। তানভীরের ঘোড়া তাদের সাথেই ছিল। তারা ঘোড়াটি এক মসজিদের ইমামের কাছে হেফাজত রেখে বললো, ‘এ ঘোড়ার মালিক হেমসের এক যুবক। সে তুফানের মাঝে ঘোড়া থেকে পড়ে ডুবে গেছে। ঘোড়াটি কোন মতে বেঁচে গিয়ে নদীর কুলে উঠে এসেছিল। আমরা ঘোড়াটি ফেলে না রেখে নিয়ে এসেছি।’

    মসজিদ থেকে ঘোড়া যখন তানভীরের বাড়ী পৌঁছলো, তখন সেখানে শোকের ছায়া নেমে এলো।

    সেখানে এক ইহুদী বণিকের বাড়ী ছিল। ইহুদী বণিকটি ছিল ধনাঢ্য লোক। জাভীরার স্বঘোষিত বাবা বৃদ্ধ খৃস্টান তার সাথীদের নিয়ে সেই ইহুদীর বাড়ী গিয়ে উঠলো।

    ইহুদী লোকটি তাদের সাদরে বরণ করে নিয়ে বলল, “তোমাদের সাথে তো একটি মেয়ে আসার কথা, ও কোথায়?’

    বৃদ্ধ শোক প্রকাশ করে আফসোসের সাথে বলল, ‘জাভীরা উত্তাল স্রোতে ডুবে মারা গেছে।’

    এ কথা শুনে সেই ইহুদী এবং উপস্থিত সকলেই আফসোস করলো। বৃদ্ধ লোকটি ইহুদীকে জিজ্ঞেস করলো, ‘হেমসের মুসলমানদের অবস্থা কি? জেহাদের পক্ষে এখানে কেমন তৎপরতা চলছে?’ ইহুদী এ প্রশ্নের জবাব দেয়ার আগেই বৃদ্ধ আবার বলল, ‘তারা কি এখানে সংকল্পবদ্ধ ও সংগঠিত হয়েছে? অস্ত্রের ট্রেনিং নিচ্ছে?’

    ইহুদী বণিক উত্তরে বলল, ‘এখানকার অবস্থা খুবই খারাপ। এখানে মুসলমানদের তৎপরতা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। তারা যথারীতি অস্ত্রের ট্রেনিং ও প্রশিক্ষণ নিচ্ছে। এ এলাকাকে সুলতান আইয়ুবী তার কমান্ডো দলের কেন্দ্র বানিয়ে নিয়েছে। এখানকার খতিব তার জ্বালাময়ী ভাষণের মাধ্যমে মুসলমানদের উত্তেজিত করে তুলছে। লোকটাকে আমার কেবল ইমাম বলে মনে হয় না, মনে হয় এ লোক কোন সামরিক অফিসার। তার প্রতিটি কথা ও পদক্ষেপ অত্যন্ত সুপরিকল্পিত! কখন কি করতে হবে বা বলতে হবে এ কথা তিনি ভাল করেই জানেন। তিনি দক্ষ সেনা কমান্ডারের মতই প্রতিটি চাল চালছেন।’

    ‘যদি তাকে কৌশলে হত্যা করি তবে কি উপকার হবে মনে করেন?’ বুড়ো খৃস্টান বললো।

    ‘না, তাতে কোনই উপকার হবে না।’ ইহুদী বণিক বললো, বরং তাতে ক্ষতির সম্ভাবনা আছে। ‘মুসলমানরা এ জন্য আমাদের সন্দেহ করবে এবং আমাদের সকলকে ধরে ধরে হত্যা করবে। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, এ এলাকায় এখনো তাদেরই শাসন জারী আছে।’

    ‘এখানে যেসব খৃস্টান ও ইহুদী রয়েছে তাদের মেয়েরা কি কিছুই করতে পারছে না?’ বৃদ্ধ খৃস্টান জিজ্ঞেস করলো।

    ‘আপনি তো ভাল করেই জানেন এমন কাজ করতে কি পরিমাণ ট্রেনিং ও অভিজ্ঞতার প্রয়োজন হয়।’ ইহুদী বনিক বললো, ‘আমাদের মেয়েদের মধ্যে কেউ তেমন প্রশিক্ষণ পায়নি।’

    ‘আপনি কি এখানে মুসলমানের মধ্যে যুদ্ধের ট্রেনিং বন্ধ করে দিতে চান?’ বৃদ্ধ প্রশ্ন করলো।

    ‘আপনি কেন্দ্র থেকে কি নির্দেশ নিয়ে এসেছেন?’ ইহুদী পাল্টা প্রশ্ন করলো।

    ‘আমাকে বলা হয়েছে এখানে মুসলমানদের নিজেদের মধ্যে সংঘর্ষ বাঁধানোর আয়োজন করতে। সুলতান আইয়ুবীর বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলার ব্যবস্থা করতে। জাভীরার জন্য এ কাজ তেমন কঠিন ছিল না। কিন্তু তাকে ছাড়া তো এ কাজ করা সম্ভব নয়। এ কাজ করতে হলে এখানে তার মত আরো দুটি মেয়ে আনানো প্রয়োজন।’

    ‘কিন্তু আমাদের হাতে সময় খুবই কম।’ ইহুদী বললো, ‘আপনি তো জানেন, রমলার যুদ্ধে যে আইয়ুবীকে আমরা পরাজিত করেছিলাম, তিনি বসে থাকার লোক নন। আপনি বাস্তবতা স্বীকার করলে বলবো, এই পরাজয় সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর উদ্যম আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। বাঘকে খোঁচা দিলে সে বাঘ যেমন ভীত না হয়ে আরো মারমুখী হয় তেমনি হয়েছে আইয়ুবীর অবস্থা। তিনি নিশ্চয়ই এতদিনে পরাজয়ের ধকল সামলে নিয়ে তার অদক্ষ সৈন্যদেরকে দক্ষ সৈনিকে পরিণত করে নিয়েছেন। কায়রো থেকে গোয়েন্দারা যে রিপোের্ট পাঠাচ্ছে তা মোটেই ভাল নয়। সালাহউদ্দিন আইয়ুবী যে কোন মুহূর্তে কায়রো থেকে যুদ্ধ অভিযানে বের হয়ে যেতে পারেন। এখনও জানা যায়নি তিনি কোন দিকে অভিযান চালাবেন বা কোথায় আক্রমণ করবেন। কিন্তু তিনি যে শিঘ্রই অভিযানে বেরোবেন তা নিশ্চিত।

    এদিকে তার ভাই তকিউদ্দিনের কাছেও দামেশক থেকে সৈন্য ও রসদ পৌঁছে গেছে। তিনি সম্রাট বিলডনকে এমনভাবে পরাজিত করেছেন, দীর্ঘ দিন সম্রাট বিলডন তার বাহিনীকে ময়দানে পাঠাতে পারবেন কিনা সন্দেহ। ফলে অবস্থা আমাদের জন্য খুবই জটিল ও ঝুঁকিবহুল হয়ে উঠেছে।’

    ‘হ্যা, আপনি ঠিক কথাই বলেছেন। সালাহউদ্দিন আইয়ুবী অতর্কিত ও কমাণ্ডো আক্রমণে অসম্ভব পারদর্শী। এবারও তিনি এ ধরনের আক্রমণ চালানোর পরিকল্পনাই করবেন এটাই স্বাভাবিক। আর এ ধরনের আক্রমণ চালালে আমাদের রসদপত্র তাদের কমান্ডো বাহিনীর আক্রমণ থেকে নিরাপদ রাখা খুবই কঠিন হবে। যদি হেমসের মুসলমানদের মধ্য থেকেই তারা কমান্ডো নির্বাচন করে থাকে তবে এ বিপদের মাত্রা আরো একশো গুণ বেড়ে যাবে। তখন তাদের চোখকে ফাঁকি দিয়ে আমাদের রসদপত্র অন্যত্র পাঠানো যেমন নিরাপদ নয়, তেমনি বাইরে থেকে সাহায্য আসার পথও বিপদ মুক্ত নয়।’

    ‘এ জন্যই বলছিলাম, এই অবস্থায় মুসলমানদের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করে তাদেরকে দ্রুত চক্রান্তের জালে বন্দী করাটা জরুরী হয়ে পড়েছে। এ ক্ষেত্রে বিলম্ব করলে তা আমাদের জন্য কল্যাণের পরিবর্তে অকল্যাণই ডেকে আনবে। আর গুপ্তহত্যার যে চিন্তা আপনি করেছেন তা বাদ দিতে হবে। কারণ ওই পথে গেলে ব্যর্থতা গ্রাস করবে আমাদেরকে। তখন প্রমাণিত হবে আমরা এর সাথে জড়িত আছি। আর এমনটি ঘটলে এখানে যে দু’চার ঘর ইহুদী ও খৃস্টান আছে তাদেরকে মেরে টুকরো টুকরো করে ফেলবে এখানকার মুসলমানরা।’

    ‘কিন্তু মুসলমানদের বিভ্রান্ত করার মত প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মেয়ে এখানে নেই। নতুন করে মেয়ে আনতে গেলেও অনেক সময় লাগবে। তারচেয়ে আমার যে সঙ্গীরা আছে তারা দু’চারটি অপারেশন করলে তারা একটা ঝাঁকি খাবে। অস্ত্রশস্ত্রের ট্রেনিং সাময়িকভাবে বন্ধ করে দিতে পারে। কিছু না করে বসে থাকার চেয়ে একটা কিছু তো করা দরকার। তাদের জানান দেয়া দরকার যে, হেমসেও তোমাদের দুশমন আছে।’

    “কিন্তু তা করতে গেলে ওরা আমাদের মেরে একবারে সাফ করে দেবে!’ ইহুদী তার হাতকে তলোয়ারের মত করে ডানে বামে ঘুরিয়ে বললো, ‘এই মুসলিম এলাকা থেকে সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন করে দেবে আমাদের। এই অবস্থায় আমাদের স্ত্রী সন্তান-পরিজন ও ধন-সম্পদসহ এখান থেকে বের হয়ে যেতে হবে।’

    ‘আমি আশা করি খৃস্টান সম্রাটরা তোমাদের অন্যত্র বসতি স্থাপনে সাহায্য করবেন। অবস্থা বুঝিয়ে বলতে পারলে তারা ক্ষতিপুরণ দিতেও প্রস্তুত থাকবেন।’

    ‘ঠিক আছে, আপনি যা ভাল বুঝেন তাই করেন। আপনাকে কেন্দ্র থেকে পাঠানো হয়েছে। সবদিক বিবেচনা করে আপনি যে সিদ্ধান্ত নেবেন সেটাই আমাদের সিদ্ধান্ত। আমি ইহুদী, জেরুজালেমে আমাদের আধিপত্য টিকিয়ে রাখার জন্য আমি নিজের বাড়ীঘর ধন-সম্পদ ত্যাগ করতেও রাজী আছি।’

    ‘যদি এটাই হয় তোমাদের সম্মিলিত সিদ্ধান্ত তবে বিষয়টি আমি নতুনভাবে খতিয়ে দেখতে চাই। সে ক্ষেত্রে গুপ্তহত্যার পথে না গিয়ে পুরো জনপদ ধ্বংস করে দেয়ার ব্যবস্থা করলে কেমন হয়?’ বৃদ্ধ প্রশ্ন করলো।

    ‘এ জন্য তো সেনাবাহিনীর প্রয়োজন হবে!’ অবাক হয়ে বলল ইহুদী।

    ‘সে ব্যবস্থাও আছে। সেনাবাহিনী রেডী হয়েই আছে।’ বৃদ্ধ বলল, ‘সমাট বিলডনের সৈন্য বাহিনী এখান থেকে পাঁচ ছয় মাইল দূরে ক্যাম্প করে আছে। আপনি হয়তো জানেন না, এই বাহিনী এখানে আসার পথে যত মুসলিম পল্লী পেয়েছে সব আগুন জ্বালিয়ে ধ্বংস করে দিয়েছে। পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে তারা বেপরোয়া হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে, অকাতরে লুণ্ঠন চালিয়েছে। তাদের মধ্যে যে ক্ষোভ আছে সেখানে একটু ঘি ঢাললে তাদের দিয়েই হেমস ধ্বংস করে দেয়া সম্ভব। আপনি ভাববেন না, আমি আজই সেখানে যাবো এবং সম্রাট বিলডনকে বলবো হেমস দখল করার এটাই উপযুক্ত সময়।’

    ‘কিন্তু নির্বিচারে ধ্বংসযজ্ঞ চালালে এখানকার ইহুদী ও খৃস্টানদের কি হবে? আমরা কি এলাকা থেকে সরে পড়বো?’

    ‘আরে না, আমাদের উদ্দেশ্য এটা নয় যে, এলাকাটা ধ্বংস হোক।’ বৃদ্ধ বললো, ‘বরং আমাদের টার্গেট থাকবে যাতে এখানকার কোন মুসলমান জীবিত না থাকে। সৈন্যরা যে পরিমাণ সম্পদ পারে নিয়ে যাবে, বাকীটা তোমাদের। তোমরা নিজেরা তখন মুসলমানদের বাড়ীঘরগুলো দখল করে নেবে। আমি সেভাবেই অভিযান চালানোর জন্য বলে দেবো সম্রাট বিলডনকে।’

    ‘আর সুন্দরী মেয়েদেরকে?’ বুড়োর এক সঙ্গী পেছন থেকে প্রশ্নটা তুলল।

    ‘সৈন্যেরা ওদের মধ্য থেকে যাদের পছন্দ করবে উঠিয়ে নিয়ে যাবে, অবশিষ্টদের পাবে তোমরা।’

    সবাই এ প্রস্তাবে একমত হলো। সিদ্ধান্ত নেয়া হলো, আজ রাতেই বৃদ্ধ অতিথি সম্রাট বিলডনের ক্যাম্পে যাবেন।

    তারা যখন এ সিদ্ধান্ত নিয়ে বৈঠক শেষ করে বাইরে এলো, তখন এক অশ্বারোহীকে দেখলো ছুটে আসছে গ্রামের দিকে। অশ্বারোহী গ্রামের মধ্যে প্রবেশ করলো। স্থানীয় ইহুদী আগন্তুককে চিনতে পারল না। বুঝা গেল এ লোক বাইরে থেকে কোন খবর নিয়ে এসেছে। ইহুদী তাকিয়ে রইলো আগন্তুকের দিকে।

    সামনেই খতিবের বাড়ী দেখা যাচ্ছিল। অশ্বারোহী খতিবের বাড়ীর সামনে গিয়ে থেমে গেলো এবং অশ্বপৃষ্ঠ থেকে নেমে এলো। ইহুদী লোকটি দেখতে পেলো যুবক খতিবের দরোজায় করাঘাত করছে।

    খতিব বাইরে বেরিয়ে এলেন এবং আন্তরিকতার সাথে আগন্তুকের সঙ্গে মুছাফেহা করলেন। তারপর দু’জনই ঘরের ভেতরে ঢুকে গেলেন।

    ‘এই অশ্বারোহী দামেশক বা কায়রোর কাসেদ।’ ইহুদী বণিক বললো, “নিশ্চয়ই কোন গুরুতর খবর নিয়ে এসেছে।’

    এশার নামাজের পর সমস্ত মুসল্লীরাই চলে গেল। মাত্র পাঁচ ছয় জন লোক খতিবের পাশে বসে রইলো। তাদের মধ্যে আগন্তুক অশ্বারোহীও ছিল। খতিব কোন একজনকে বললো, ‘দরোজা ভেতর থেকে বন্ধ করে দাও।’

    ‘আমার বন্ধুগণ!’ খতিব বললেন, ‘আমার এ বন্ধু সুলতান তকিউদ্দিনের কাছ থেকে এই সংবাদ নিয়ে এসেছে যে, সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবী খুব শিঘ্রই কায়রো থেকে যুদ্ধ যাত্রায় বের হবেন। আপনারা সকলেই কমাণ্ডো বাহিনীর একেকজন উস্তাদ। আপনাদের এখন কি করতে হবে সে কথা বলে দেয়া আমি নিষ্প্রয়োজন মনে করি। আপনাদের কাজ আপনারা ঠিক করে নিন। তবে তার আগে নিজ নিজ বাহিনীর প্রশিক্ষণ ও ট্রেনিং ঠিক মত হয়েছে কিনা তা আবারো যাচাই করে নিন। তকিউদ্দিন সংবাদ পাঠিয়েছেন, খৃস্টান সম্রাট বিলডন তার সৈন্যসহ হিম্মত এলাকা থেকে পরাজিত হয়ে পালিয়ে আমাদের আশপাশে কোথাও ক্যাম্প করে আছে। যে কোন সময় সে আমাদের ওপর আঘাত হানতে পারে। তাই এদিকে আমাদের সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে।

    আজ রাতেই হেমসের বাইরে চারদিকে গোয়েন্দা পাঠিয়ে তারা কোথায় আস্তানা গেড়েছে খবর নিতে হবে। তারা কোথায় এবং কত দূরে আছে জানতে হবে আমাদের। তাদের চলাফেরা ও মতিগতির উপরে দৃষ্টি রেখে তাদের তৎপরতা সম্পর্কে তকিউদ্দিনের কাছে রিপোর্ট পৌঁছাতে হবে। তিনি আরও আদেশ দিয়েছেন, পরিস্থিতি বুঝে বিলডনের খৃস্টান বাহিনীর উপর অতর্কিত কমান্ডো আক্রমণ চালাতে দ্বিধা করবে না। তাদের উপর ততক্ষণ কমান্ডো আক্রমণ অব্যাহত রাখবে, যতক্ষণ তারা পরাজয় স্বীকার না করে বা তোমাদের সাহায্যে আমরা এসে না পৌঁছাই। যাতে তারা শান্তিতে থাকতে না পারে তার ব্যবস্থা করার দায়িত্ব এখন আমাদের।

    সেই সাথে তকিউদ্দিন আরও বলেছেন, তাদের সৈন্যরা অনেক মুসলমান গ্রাম ও বস্তি ধ্বংস করে হেমসের কাছে পৌঁছেছে। তাদের মনোভাব ভাল থাকার কথা নয়। সুযোগ পেলে তারা হেমসেও আক্রমণ করে বসতে পারে। অতএব তাদের ব্যাপারে খুবই সাবধান থাকবে।

    তকিউদ্দিন আরো জানিয়েছেন, তার কাছে সৈন্য সংখ্যা কম বলে তিনি খৃস্টান সৈন্যদের পিছু ধাওয়া করেননি। তিনি বলেছেন, যদি বিলডনের বাহিনী আরও পিছনে সরে যেতে চায় তবে তাদের বিরক্ত করবে না। তাদেরকে নির্বিঘ্নে সরে যেতে দেবে। অযথা আক্রমণ করে হেমসের জনপদে হামলে পড়ার সুযোগ তাদের দেয়ার দরকার নেই।

    তিনি আমাদের প্রশিক্ষণ ও ট্রেনিং জোরদার করার তাগিদ দিয়েছেন। তিনি আশংকা প্রকাশ করে বলেছেন, এমনও হতে পারে, সুলতান আইয়ুবী অভিযান শুরু করলে বিলডন গোপনে পিছন থেকে অতর্কিত আক্রমণ চালানোর চেষ্টা করতে পারে। তাই অবস্থার প্রেক্ষিতেই আমাদেরকে বিলডনের বাহিনীর ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। প্রয়োজনে অতর্কিতে গেরিলা আক্রমণ চালিয়ে তাদের গতিরোধ করে সেখানেই আটকে রাখতে হবে যেন কোন দিকে তারা অগ্রসর হতে না পারে।’

    খতিব বিভিন্ন জনকে বিভিন্ন দিকে পাঠিয়ে দিলেন বিলডন বাহিনীর তালাশে আর অবশিষ্টদের বললেন, ‘পূর্ণ সতর্ক অবস্থায় তোমাদেরকে মহল্লার চারদিকে পাহারা বসাতে হবে।’

    ❀ ❀ ❀