Category: জরাসন্ধ (চারুচন্দ্র চক্রবর্তী)

  • পাঁচ

    পাঁচ

    কোনো প্রসিদ্ধ মার্কিন বিশ্ববিদ্যালয়ের এক প্রবীণ অধ্যাপক একবার আমার জেল ‘ভিজিট’ করতে এসেছিলেন। দিগ্‌গজ ব্যক্তি। যেমনি পাণ্ডিত্য, তেমনি ভূয়োদর্শন। দু-দুটো ‘ওলজীচে ডক্টর—ক্রিমিনোলজী এবং পিনোলজী। অর্থাৎ একাধারে অপরাধতত্ত্বের ও দণ্ডবিধানে বিশেষজ্ঞ। আমার চাকরি তখন শেষ হব-হব করছে। বহু জেল ঘুরে এবং ঘেঁটে ‘বিশেষজ্ঞ’ আখ্যা না পেলেও অভিজ্ঞতার ব্যাঙ্কে মোটা সঞ্চয়ের দাবী করতে পারি। সম্ভবত সেই কারণেই কারাবিভাগের কর্তারা তাঁকে আমার স্কন্ধে চাপিয়ে দিয়েছিলেন। আমিও বেশ কয়েক দফা বাক্‌চক্রের জন্য তৈরী হচ্ছিলাম, সরকারী পরিভাষায় যার নাম রাউণ্ড অব টক্স। বলা বাহুল্য অন্যদিকে যাই হোক, এই একটা বিষয়ে আমরা কোনো দেশের কারও চাইতে কম যাই না।

    কিন্তু ভদ্রলোক আমাকে রীতিমত নিরাশ করলেন। নিজেও কোনো পাণ্ডিত্য প্রকাশের চেষ্টা করলেন না, আমাকেও তার সুযোগ দিলেন না। তাঁর কর্মপদ্ধতি সম্বন্ধে দু-চারটি কথাবার্তার পর, প্রথম দিন থেকেই ‘ফিল্ড-ওয়ার্কে’ নেমে পড়লেন। ‘অ্যাডমিশন রেজিস্টার’ (যার মধ্যে কয়েদীদের নাম ধাম এবং যাবতীয় বিবরণের ফিরিস্তি থাকে ) চেয়ে নিয়ে, তার থেকে বেছে বেছে কতগুলো নাম সংগ্রহ করে তাদের সঙ্গে দেখাশুনো, আলাপ-সালাপ শুরু করলেন।

    কোন্ মন্ত্রবলে তিনি জাতি, বর্ণ, দেশ ও ভাষার বর্ম ভেদ করে ‘অপরাধী’ নামক প্রাণীর প্রাণকেন্দ্রে পৌঁছে যেতেন, সেখান থেকে কেমন করে কি তথ্য সংগ্রহ করতেন, সে-সব কথা এখানে আলোচ্য নয়। দু-সপ্তাহের উপর আমার জেলে কাটিয়ে এখান থেকে কি অভিজ্ঞতা নিয়ে গেলেন, যাবার আগে তারই আভাসস্বরূপ যে কথাটি বলেছিলেন, সেইটুকুই আমার বক্তব্য। তিনি বলেছিলেন, ‘যাকে জাত-ক্রিমিনাল বলে, আপনার এখানে একটাও পেলাম না। আপনার এখানে বলি কেন, যে-ক’টা ইণ্ডিয়ান জেল ঘুরলাম—তা কম ঘুরি নি, সবখানেই তাদের সংখ্যা বড় কম।’

    ‘জাত-ক্রিমিনাল’ বলতে তিনি বোধহয় বোঝাতে চেয়েছিলেন—’ক্রাইম্’ যাদের ধর্ম এবং প্রকৃতি। হঠাৎ একদিন ঝোঁকের মাথায়, আবেগের বশে কিংবা প্রতিহিংসার তাড়নায় খুন করে বসল, বাহাদুরি দেখাবার জন্য দল বেঁধে ডাকাতি করে এল, সহসা কোনো অরক্ষিত স্ত্রীলোককে পেয়ে কামেচ্ছা মিটিয়ে নিল, কিংবা অপরের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে কিছু টাকাকড়ি আত্মসাৎ করে গা-ঢাকা দিল—এই জাতীয় অপরাধীকে তিনি, ‘ক্রিমিনাল’ বলে যে একটা জাত আছে, তার মধ্যে ফেলতে চান নি। তাঁর মতে ওরা সব ‘ক্যাজুয়াল অফেনডার’। আসল ক্রিমিন্যাল তারা, ‘ক্রাইম্’ যাদের ধ্যান জ্ঞান সাধনার বস্তু, মজ্জাগত সংস্কার কিংবা অত্যাজ্য জীবন-দর্শন।

    ‘এখানে যাদের দেখলাম’, বলেছিলেন অধ্যাপক, ‘তাদের বেশির ভাগই অবস্থার দাস, যা কিছু করেছে, লোভে বা বিপাকে পড়ে কিংবা জীবিকার প্রয়োজনে। তার পেছনে জীবনের কোনো গভীর প্রেরণা নেই। সত্যিকার ক্রিমিনাল কর্মযোগীর মতো নিষ্কাম, নিরুদ্দেশ্য। উদ্দেশ্য হয়তো একটা থাকে, কিন্তু সেটা অজুহাত মাত্র, অনেক সময়ে ওটা নিজের মনকে ভোলাবার প্রয়াস। আসলে “ক্রাইম্” তার কাছে এক ধরনের ওয়ার্ক অব আর্ট, শিল্পীর সৃষ্টি। ইচ্ছা করে যে করে তা নয়, ভিতর থেকে কে একজন ঠেলে এগিয়ে দেয়, না করে উপায় নেই।’

    সেদিন তার কথা শুনতে শুনতে আমি একটু অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিলাম। হঠাৎ রাজাবাহাদুরের কথা মনে পড়ে গিয়েছিল। হয়তো তার কারণ, অধ্যাপক যাদের সম্বন্ধে আলোচনা করছিলেন, তাদের সঙ্গে তাঁর কোথায় যেন মিল আছে। কিংবা হয়তো এমনিই মন কখন কি ভাবে, কেন ভাবে তার কি কোনো হেতু আছে? থাকলেও তাকে খুঁজতে যাওয়া নিছক বিড়ম্বনা। সেসব ‘কেন’র পিছনে না ছুটে যে লোকটিকে সেদিন মনে পড়েছিল, তার প্রসঙ্গটা কিঞ্চিৎ সবিস্তারে বলবার চেষ্টা করি।

    রাজাবাহাদুরের সঙ্গে দেখা আমার চাকরি-জীবনের প্রথম অধ্যায়ে। তখনও জেলের হাল-চাল, আইন-কানুন পুরোপুরি ধাতস্থ হয়নি। কারাবাসী ও কারাকর্মীর ভিতরে যে দুস্তর ব্যবধান, সেটা ঠিক বজায় রাখতে পারিনি। ‘প্রিজনার’ হিসাবে এই মানুষটিকে যতটা দূরে রাখা দরকার, তার চেয়ে একটু বেশী কাছে এসে পড়েছিলাম। তার প্রাথমিক কারণ বোধহয় তাঁর রূপ। নারীপুরুষ নির্বিশেষে রূপের যে একটি সর্বজনীন আকর্ষণ আছে, রাজাবাহাদুরকে দেখেই সেটা প্রথম অনুভব করেছিলাম। অতুলনীয় অঙ্গ-সৌষ্ঠব। দীর্ঘ উন্নত দেহ, প্রশস্ত ললাট, আয়ত চক্ষু। কাঁধ এবং বাহুযুগলের দিকে চেয়ে মনে হয়েছিল, ‘বৃষস্কন্ধ’ ও ‘শালপ্রাংশু’ বলে যে দুটি বিশেষণ কালিদাস ব্যবহার করে গেছেন, তার মধ্যে কোনো কবিজনোচিত অত্যুক্তি নেই। আর একটা কথা মনে হয়েছিল, এ দেহের প্রতি কণায় শোভাকে ছাড়িয়ে গেছে সম্ভ্রম, সৌষ্ঠবকে ছাপিয়ে উঠেছে আভিজাত্য। গিরীনদা বলেছিলেন, ‘সত্যিই রাজাবাহাদুর — Every inch an aristocrat!’ আমাদের অ্যাংলো-ইণ্ডিয়ান ওয়ার্ডার জোস্-এর উপর ভার পড়েছিল ওঁকে সেল্‌-এ পৌঁছে দেবার। ফিরে এসে বলেছিল, Bloody Mountain. বিশেষণ ও প্রকাশের ভঙ্গিটা কিঞ্চিৎ অমার্জিত হলেও, এক কথায় এর চেয়ে যথার্থ পরিচয় বোধহয় আর হতে পারত না। যখনই দেখেছি মনে হত, লোকটা যেন গিরিশৃঙ্গের সমস্ত মহিমা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

    রাজাবাহাদুর খুন-মামলার আসামী। ভ্রাতৃহত্যা। অব্যবহিত উপায়ে বিষপ্রয়োগ। কিন্তু তার প্রক্রিয়া অত্যাশ্চর্য ও অভিনব। বিষ সংগ্রহের সুদীর্ঘ এবং জটিল ইতিহাস অনুধাবন করতে গিয়ে পুলিস যে সব তথ্য উদ্ধার করেছিল, তার থেকে চিররহস্যাবৃত মানব-মনের একটি অনাবিষ্কৃত গোপন কক্ষের সন্ধান পাওয়া যায়। সবটুকু তখনও উন্মোচিত হয়নি। যেটুকু দৃশ্যমান, তাতেই আমরা স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিলাম। একজন মানুষকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেবার জন্যে আর একজন মানুষের কি সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা, তার রূপায়ণে কি গভীর অভিনিবেশ, কি দুর্জয় নিষ্ঠা, কি ক্লান্তিহীন সাধনা! শুধু তাই নয়, যে মস্তিষ্ক সেই গুপ্ত চক্রান্তের প্রতিটি পদক্ষেপ পরিচালিত করেছে, যে ধীর স্থির শাণিত কূটবুদ্ধি প্রতি স্তরে তার স্বাক্ষর রেখে গেছে, তা দিয়ে অনেক কম আয়াসে একটা গোটা রাজ্য ছিনিয়ে আনা যেত। আর এখানে সেই বিপুল প্রচেষ্টার একমাত্র লক্ষ্য ছিল একটিমাত্র নিরীহ মানুষের প্রাণটাকে ছিনিয়ে নেওয়া!

    আপাতদৃষ্টিতে মনে হবে, এই হত্যাযজ্ঞের অন্তর্নিহিত প্রেরণা সেই চিরন্তন রাজ্য- লোলুপতা, ক্ষমতা ও বিত্তের অধিকার-লিপ্সা, অনাদিকাল থেকে ছোট-বড় রাজপরিবারে যা বহু ভ্রাতৃহত্যা পিতৃহত্যার ইন্ধন যুগিয়ে এসেছে। তাই যদি হয়, সেই ঈপ্সিত বস্তুটিকে অনায়াসে আয়ত্ত করবার পথে এখানে তো কোনো বাধা ছিল না। যাকে হত্যা করা হল, সে তো স্বেচ্ছায় তার সব স্বত্ব ও স্বামিত্ব থেকে নিঃশব্দে সরে দাঁড়িয়েছিল। উনিশ বছরে পা দিয়েই সামান্য মাসোহারার বিনিময়ে তার অংশের সমস্ত সম্পত্তি বড় ভাইকে লিখে দিয়েছিল। পৈতৃক প্রাসাদে বাস করবার অধিকারটুকু পর্যন্ত রাখেনি। সব ছেড়ে বেরিয়ে চলে এসেছিল। ব্যক্তিগত ব্যবহারের দু-চারটি তুচ্ছ জিনিস ছাড়া আর কিছুই সঙ্গে আনেনি। কোলকাতার এক অখ্যাত গলির ছোট ভাড়া-বাড়িতে লেখাপড়া নিয়ে দিন কাটাচ্ছিল। বিয়ে করেনি। করবার ইচ্ছাও ত্যাগ করেছিল। যাতে করে তার কোনো উত্তরপুরুষ, সুদূর ভবিষ্যতে, সে যা ছেড়ে দিয়ে চলে এল, তারই দাবী নিয়ে সেই প্রাসাদের দ্বারে গিয়ে দাঁড়াতে না পারে।

    উত্তরাধিকারের সঙ্গে জড়িত দুটিমাত্র জিনিস সে নিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছিল। একটি পিতার আমলের ভৃত্য গঙ্গাচরণ, আর একটি তারই মুখের ডাক—ছোট কুমার’। প্রথমটি তাকে ছাড়েনি, দ্বিতীয়টি সে অনেক বকাবকি করেও ছাড়াতে পারেনি। ঐ নামটুকু ছাড়া ‘কুমারত্বের’ আর কোনো নিদর্শন তার জীবনযাত্রার কোনোখানেই দেখা যায় নি। স্বভাবে নিতান্ত নিরীহ, নির্বিরোধ, সরল ও অমায়িক। চালচলনে অতিশয় সাদাসিদে। বই ছাড়া আর কোনো নেশার বালাই নেই। বন্ধু-সংখ্যা অত্যন্ত সীমিত। আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে যোগাযোগ অতি ক্ষীণ। যেটুকু ছিল, তার মধ্যে স্বার্থের সংঘাত ঘটবার বিন্দুমাত্র সম্ভাবনাও দেখা দেয়নি। সে যে কোনো দিন কারও আক্রোশ বা বিদ্বেষের পাত্র হয়ে দাঁড়াতে পারে, একথা কে ভেবেছিল?

    তবু তাকেই একদিন আততায়ীর হাতে প্রাণ দিতে হল। আকস্মিকভাবে নয়, তার পিছনে কি বিপুল আয়োজন! সেই একই প্রশ্ন আবার আসছে—কেন? কি প্রয়োজন ছিল এই ছেলেটিকে অত কাণ্ড করে মেরে ফেলবার? কি উদ্দেশ্য?

    সে প্রশ্ন আজও আমার কাছে অমীমাংসিত রয়ে গেছে। পুলিস কিংবা আদালত সেই নিগূঢ় সত্যে পৌঁছতে পারেনি। কোনো মনস্তত্ত্ববিদ হয়তো এর উপরে কিছুটা আলোকপাত করতে পারেন, কিন্তু তাঁকেও স্বীকার করতে হবে, ‘এটা হয় এই পর্যন্ত জানি, কেন হয় তা জানি না।’

    আমার যেটুকু আবিষ্কার, তার মূলসূত্র রাজাবাহাদুরের নিজের উক্তি। দীর্ঘদিন পরে যখন তাঁর ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে আসবার সৌভাগ্য লাভ করেছি, তখন একদিন কথাচ্ছলে বলেছিলেন। মনে আছে, সেদিন আবিষ্কারের উল্লাসে আমি আত্মহারা হয়ে গিয়েছিলাম। এত চেষ্টা, এত সাধ্য-সাধনা, এত দীর্ঘদিনের গবেষণা ও অনুসন্ধানে যা কেউ পায়নি, আমি তাই পেলাম। কলম্বাসের চেয়েও আমি ভাগ্যবান। তারপর যেমন বয়স বেড়েছে, জীবনে অনেক কিছু দেখেছি এবং শুনেছি, ঘা খেয়ে খেয়ে অনেক কিছু শিখেছি, তখন মনে হয়েছে, রাজাবাহাদুর সেদিন যা বলেছিলেন, তার মধ্যে কপটতা হয়তো ছিল না, কিন্তু সেটাই যে সত্য সে-বিষয়ে কি নিজেই নিশ্চিত ছিলেন? আমার মনে হয়, ছিলেন না। উকিল, হাকিম, পুলিস এবং আমাদের মতো তিনিও একজন অনুসন্ধানী মাত্র। নিজের মনের ভিতরটা হাতড়ে দেখতে গিয়ে ঐ উত্তরটা পেয়ে গিয়েছিলেন। সেক্সপীয়রের ওথেলো নাটকের ভিলেন ইয়াগো মাঝে মাঝে নিজের কাছে তার চিন্তা ও আচরণের একটা কৈফিয়ত খাড়া করবার চেষ্টা করেছে। সেই সম্পর্কে একজন প্রসিদ্ধ সমালোচক বলেছেন—motive hunting of a motiveless malignity. আমার মনে হয়েছে, কথাটা রাজাবাহাদুরের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। এটাও motive-hunting ছাড়া আর কিছু নয়। নিজের উদ্দেশ্য বা অভিপ্রায়কে খুঁজে বের করবার চেষ্টা, আত্মানুসন্ধান—আসলে হয়তো কোনো উদ্দেশ্য ছিল না। নিছক নিরুদ্দেশ্য ম্যালিগনিটি কিংবা আর কিছু।

    তবু রাজাবাহাদুরের সেই স্বীকারোক্তি আজ আর আমি গোপন করতে চাই না। যথাসময়ে প্রকাশ করব। তার আগে আরও কিছু বলার আছে। বিশেষ করে আর একজনের কথা, যার বিস্ময়কর প্রতিভার সুবর্ণ সংযোগ না ঘটলে রাজাবাহাদুরের পরিকল্পনা সার্থক হতো না। সে একজন তরুণ ডাক্তার। নাম ধরুন নিশানাথ লাহিড়ী।

    নিশানাথ মেডিক্যাল কলেজের কৃতী ছাত্র। সেখানে তার প্রধান অধীত বিষয় ছিল জীবানুতত্ত্ব। বেরিয়ে এসে তাই নিয়েই গবেষণা শুরু করেছিল। অণুবীক্ষণের ভিতর দিয়ে সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম কিন্তু মহাশক্তিধর মারীকীটের সন্ধান। উপযুক্ত সহায় ও সুযোগ পেলে এই তরুণ বিজ্ঞানী মানব-কল্যাণে এই বিশেষ ক্ষেত্রে চাঞ্চল্যকর আবিষ্কারের কৃতিত্ব দেখিয়ে একদিন বিশ্বের দরবারে প্রতিষ্ঠালাভ করবে, সে বিষয়ে তার অধ্যাপকেরা নিঃসন্দেহ ছিলেন। কিন্তু কোত্থেকে আসবে সেই সুযোগ? কে হবে সেই সহায়? নিজের সঙ্গতি বলতে কিছুই ছিল না। বরং পাস করে বেরোবার সঙ্গে সঙ্গে বৃদ্ধ মা-বাপ, অপোগণ্ড ভাইবোন স্ত্রী ও একটি শিশুকন্যার ভার কাঁধে এসে চেপেছিল। নিশানাথ বুঝেছিল, ‘রিসার্চ’-এর বিলাস তাকে ছাড়তে হবে। ল্যাবরেটারী ছেড়ে নামতে হবে রোজগারের ধান্দায়।

    সে পথও সহজ বা সরল নয়। তখনকার দিনে চাকরি মেলা দুষ্কর। আর প্র্যাকটিস? তার পিছনেও অনেকখানি প্রস্তুতির প্রয়োজন। সেই সম্পর্কে কিঞ্চিৎ আনুকূল্যের আশা নিয়ে নিশানাথ একদিন হাজির হল তার হিতৈষী মুরুব্বি এবং প্রাক্তন শিক্ষক ডাক্তার মুস্তাফির কাছে। মুস্তাফি নামী ডাক্তার এবং রাজাবাহাদুরের গৃহ-চিকিৎসক। লাহিড়ী যখন গিয়ে পৌঁছল, তিনি তখন বেরোবার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিলেন। কয়েক সেকেণ্ড কি ভেবে নিয়ে বললেন, গাড়িতে ওঠো। নিশানাথ সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে তাকাতেই যোগ করলেন, “চল না!’—বলে সোজা নিয়ে গেলেন রাজাবাহাদুরের দরবারে। মোটামুটি একটা ক্লিনিক কিংবা ডিসপেনসারি সাজিয়ে বসবার মতো কিছু সাহায্য বিকল্পে একটা চাকরি—এর বেশি কোনো প্রত্যাশা মুস্তাফির মনেও ছিল না। কিন্তু ভাগ্যচক্রের কি আশ্চর্য বিবর্তন! ‘ছেলেটি’র প্রতিভার পরিচয় পাবার পর রাজহস্তের বদান্যতা আরও অনেকখানি প্রসারিত হল। সহকারী গৃহ-চিকিৎসক হিসাবে একটা মাসমাইনে চাররির ব্যবস্থা তখনই হয়ে গেল। রাজাবাহাদুর বিনীত মৃদু স্বরে মুস্তাফিকে বললেন, আত্মীয়-পরিজন, জ্ঞাতি- গোষ্ঠী, লোক-লস্কর নিয়ে পরিবারটি তো আমার ছোট নয়, স্যার। কারও না কারও একটা কিছু রোজই প্রায় লেগে আছে। সব ব্যাপারে আপনাকে ধরে টানাটানি—তার চেয়ে এ ভালোই হল। উনি একবার করে ঘুরে যাবেন। তেমন তেমন প্রয়োজন দেখা দিলে আপনি তো রইলেনই।

    এটা গেল প্রাথমিক বন্দোবস্ত। পরের পর্বটাই আসল। নিরুদ্বিগ্ন মন নিয়ে গবেষণা চালিয়ে যাবার মতো একটি সুসজ্জিত ল্যাবরেটরী। রাজাবাহাদুর খাজাঞ্চিকে ডেকে তখনই একটা মোটা টাকার চেক লিখে আনতে বললেন এবং নিশানাথের দিকে ফিরে বললেন, এটা শুধু ঘর আসবাবপত্তর আর আনুষঙ্গিক যা কিছু দরকার তার জন্যে। যন্ত্রপাতি বা রিসার্চের দরুন আর যা যা প্রয়োজন, তার একটা লিস্টি করে ফেলুন। কোনো রকম টানাটানি করবেন না। যেখানকার যেটা সেরা জিনিস বেছে নেবেন। দামের দিকটা আপনাকে ভাবতে হবে না। আমার ম্যানেজার এখন বিলেতে আছে। লিস্টিটা তার কাছে পাঠিয়ে দেবো। নিজে দেখে-শুনে সংগ্রহ করে সামনের ওপর প্যাক করিয়ে একেবারে সঙ্গে নিয়ে আসবে। কি বলেন স্যার, এইটাই ভালো ব্যবস্থা নয়? ও-সব ডেলিকেট জিনিস, সাবধানমতো নাড়াচাড়া না করলে পথেই কোনোটা খারাপ হয়ে যেতে পারে।

    শেষে কথাগুলো ডাক্তার মুস্তাফির উদ্দেশে। তিনি আবেগের সুরে বললেন, আমি আর কি বলবো, রাজাবাহাদুর? বলবার ভাষা খুঁজে পাচ্ছি না। আপনার এই মহৎ দান-

    -–এই দেখুন, আপনিও যদি অমন করে বলেন স্যার, তাহলে তো বড় মুশকিল। দানটান কিছু নয় ডক্টর মুস্তাফি। একরাশ পড়ে পাওয়া টাকা ব্যাঙ্কে বসে বসে পচছে। একটা ছেলে নেই যে তার জন্যে রেখে যাবো। একটা মাত্র ভাই, সেও তো দেখলাম বিবাগী হয়ে বেরিয়ে গেল। কি হবে টাকা দিয়ে? তবু যদি এই রকম একটি প্রভিভাবান ছেলেকে একটু দাঁড় করিয়ে দেওয়া যায়, শুধু ওর নয়, দেশের-দশের মঙ্গল হবে। এই সুযোগটুকু যে আপনি আমাকে পাইয়ে দিলেন, তার জন্যে আমি আপনার কাছে কৃতজ্ঞ। আচ্ছা তাহলে ঐ কথাই রইল লাহিড়ী। তোমাকে কিন্তু ভাই আমি ‘তুমি’ বলেই ডাকবো।

    —নিশ্চয় নিশ্চয়, তুমি বলবেন বৈকি। সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলেন ডাক্তার মুস্তাফি। একেবারে ছেলেমানুষ, তাছাড়া আমার ছাত্র।

    —শুধু ছাত্র নয় স্যর, আপনার উপযুক্ত ছাত্র।

    মাসখানেকের মধ্যেই ইউরোপ থেকে কয়েকটি সদ্য-আবিষ্কৃত মহামূল্য যন্ত্র এসে পৌঁছল। একেবারে আধুনিক সজ্জায় সজ্জিত হল ল্যাবরেটরী। রাজাবাহাদুর একদিন এসে দেখে গেলেন। নিশানাথ তখন কাজ করছিল, রাজ-অতিথিকে সসম্মানে অভ্যর্থনা করে একটি একটি করে প্রতিটি যন্ত্রের বৃত্তি সম্বন্ধে একটা মোটামুটি ধারণা দিয়ে দিল। তিনি মন দিয়ে শুনলেন। যাবার সময় বললেন, কোথাও কোনো ত্রুটি নেই তো? যা চেয়েছিলে, সব পেয়েছ?

    —তার চেয়ে অনেক বেশি পেয়েছি রাজাবাহাদুর। আশীর্বাদ করুন, যেন সেই পাওয়ার গৌরব বজায় রাখতে পারি।

    রাজাবাহাদুরের কণ্ঠস্বর ও বাচনভঙ্গীর মধ্যে একটি অরাজোচিত বিনম্র সঙ্কোচ সর্বদাই লেগে আছে। যেন তাঁর দৈবায়ত্ত রাজপদ এবং তার বাহক এই বিশাল দেহটার জন্যে তিনি সকলের কাছেই লজ্জিত। ব্যবহার ও কথাবার্তার মাধুর্য দিয়ে ঐ দুটি বস্তুকে যতখানি আড়াল করে রাখা যায় তারই জন্যে সচেষ্ট। নিশানাথের মতো একান্ত আশ্রিতজনের কাছেও তাঁর কুণ্ঠার সীমা নেই। তার কথায় অত্যন্ত লজ্জা পেয়েছেন এমনিভাবেই দাঁতে জিভ কেটে মাথা নেড়ে বললেন, না না, ও ‘কথা বলো না তোমাকে আশীর্বাদ করবার মতো স্পর্ধা আমার নেই। প্রাণভরে শুভেচ্ছা জানাই, তুমি অনেক বড় হও, আমাদের সকলের মুখ উজ্জ্বল কর, এই প্রার্থনা করি।

    বছর দেড়েক কেটে যাবার পর নিশানাথ তার গবেষণার এমন একটা স্তরে এসে পৌঁছল যেখানে বিশেষজ্ঞের প্রত্যক্ষ সহায়তা ছাড়া আর এগিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। তেমন ব্যক্তি এদেশে অত্যন্ত দুর্লভ। দু-একজন যাঁরা আছেন, তাঁরা অন্য ক্ষেত্রে ব্যস্ত। ঐ বিশেষ গবেষণার উপযোগী কোনো ল্যাবরেটরীও তখন কোলকাতায় নেই। পশ্চিমভারতের একটি প্রসিদ্ধ ইনস্টিটিউট্-এ প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম পাওয়া যেতে পারে। উচ্চাঙ্গ রিসার্চে সাহায্য করার মতো বিদেশী বিজ্ঞানীও আছেন ক’জন। কিন্তু সেখানে জায়গা পাওয়া দুরূহ ব্যাপার। অত্যন্ত নামী লোকের জোরালো সুপারিশ চাই। ডাক্তার মুস্তাফিকে কত আর বিরক্ত করা যায়? তাছাড়া তাঁর কথা কতখানি টিকবে, তাই বা কে জানে? সেদিক দিয়ে সুরাহা দেখা দিলেও আর্থিক প্রশ্নটা আরও বড়। অনেক টাকার দরকার।

    ওখানকার খরচ, কতদিন থাকতে হবে ঠিক নেই—তার উপরে কোলকাতার সংসারের ব্যয়ভার। অর্থাৎ চাকরিটি খোয়ালে চলবে না।

    রাজাবাহাদুরের কাছে কথাটা কেমন করে পাড়া যায়, এইসব যখন ভাবছে, হঠাৎ তাঁর কাছ থেকে ডিনারের নিমন্ত্রণ এসে হাজির। উপলক্ষের উল্লেখ নেই। অনেক সময়েই থাকে না। বিনা উপলক্ষে যখন-তখন বন্ধুবান্ধব এবং আশ্রিত-পরিজনদের ভুরিভোজে আপ্যায়িত করা ওঁর একটা বিলাস।

    কিন্তু এবারে সবিস্ময়ে লক্ষ্য করল নিশানাথ, নিমন্ত্রিত সে একা। খাবার যেখানে দেওয়া হল, সেটাও ভোজনশালা নয়, সদর ও অন্দরমহলের মাঝামাঝি রাজাবাহাদুরের নিজস্ব গোপন-মহলের একটি ছোট ঘর। তিনিও বসলেন অতিথির মুখোমুখি। মাঝখানে টেবিলের উপর খাবার সাজানো। উপকরণ যথারীতি, অর্থাৎ বৈচিত্র্য ও প্রাচুর্যের অভাব নেই। অভাব পরিবেশকের। সেই জমকালো পোশাকের তকমা-আঁটা ‘বয়’ বা ওয়েটারদের কোথাও দেখা গেল না। রাজাবাহাদুর তাঁর সেই নিজস্ব মধুর হাসির সঙ্গে মৃদু কণ্ঠ মিলিয়ে বললেন, রকম-সকম দেখে তুমি নিশ্চয়ই খুব অবাক হয়ে গেছ?

    নিশানাথ অস্বীকার করল না—তা একটু হয়েছি।

    রাজাবাহাদুরের মুখে সেই হাসিটি মিলিয়ে গেল, কিন্তু তার স্নিগ্ধ রেখাগুলো লেগে রইল। কয়েক মুহূর্ত বিরতির পর বললেন, অনেকদিন থেকে ভাবছি, একটা বেলা দুজনে একসঙ্গে বসে খাবো, সেখানে আর কেউ থাকবে না, এমনি কি বয়-বেয়ারার উৎপাত পর্যন্ত না। তোমার যেটি ভালো লাগবে, আমি নিজের হাতে পাতে তুলে দেবো। প্ল্যানটা খুব অরিজিন্যাল, কি বল?

    নিশানাথ বোধ হয় একটু বেশি অভিভূত হয়ে পড়েছিল, সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিতে পারল না। রাজাবাহাদুরও সেজন্যে অপেক্ষা করলেন না। বললেন, কিন্তু গোড়াতে কাজটা যত সোজা বলে মনে করেছিলাম, এখন দেখছি তা মোটেই নয়। ধর এই পদার্থটি—কি এটা? বোধ হয় চিংড়িমাছের মালাইকারী—এটিকে পাতে ঢালতে গিয়ে ডিশখানা যদি একবার তোমার কোলের উপর উপুড় করে ফেলি, ব্যাপারটা কি রকম দাঁড়াবে বল দেখি?

    বলে হো হো করে হেসে উঠলেন। তারপর চেয়ারটা একটু টেনে গোছগাছ করে বসে নিয়ে বললেন, নাও এসো। আরম্ভ তো করা যাক। তারপর তোমার সিল্কের পাঞ্জাবির কপালে যদি চিংড়িমাছের ঝোল ভক্ষণ লেখা থাকে, কে খণ্ডাবে বল?

    খেতে খেতে যে-সব কথাবার্তা চলল—রাজাবাহাদুরই চালালেন—তার বিষয় হাল্কা এবং সুরটি অন্তরঙ্গ; তার ফলে লাহিড়ীর মধ্যে প্রথমে যেটুকু আড়ষ্টতা দেখা দিয়েছিল, কাটিয়ে উঠতে দেরি হল না। নানা প্রসঙ্গের পর কিসের একটা সূত্র ধরে রাজাবাহাদুর হঠাৎ বলে উঠলেন, তোমার কাছে আমার কিন্তু একটি প্রার্থনা আছে, নিশানাথ

    ‘প্রার্থনা!’ ডাক্তারের কাঁটা-চামচে যেন ধাক্কা খেয়ে থেমে গেল।

    —হ্যাঁ, প্রার্থনাই বলবো। সে জিনিস আর কারও কাছে চাওয়া যায় না, আর কেউ তা দিতেও পারবে না।

    —এ শুধু আমাকে লজ্জা দেওয়া রাজাবাহাদুর। আপনার কোনো কাজে যদি কখনও লাগতে পারি নিজেকে ধন্য মনে করবো—এ কথাও কি আপনাকে বলে দিতে হবে? কিন্তু এমন কি জিনিস থাকতে পারে, যা আমি আপনাকে দিতে পারি, কিছুতেই ভেবে পাচ্ছি না।

    –তোমার কাছে তা অতি সাধারণ, কিন্তু আমার কাছে ভীষণ মূল্যবান।

    মুহূর্তকাল থেমে ডাক্তারের মুখের উপর একবার চোখ বুলিয়ে নিলেন রাজাবাহাদুর। তারপর যোগ করলেন, আমাকে কিছুটা প্লেগের জার্ম যোগাড় করে দিতে হবে।

    লাহিড়ী কাঁটায় গেঁথে একটা কি মুখে তুলতে যাচ্ছিল, সবসুদ্ধ ডিশের উপর পড়ে গেল। বিস্ময়-বিমূঢ় চোখ দুটো রাজাবাহাদুরের মুখের উপর রেখে ভীতি-বিহ্বল চাপাগলায় তাঁরই কথাটা শুধু আউড়ে গেল— প্লেগের জার্ম!

    রাজাবাহাদুর সহজ সুরেই বললেন, আমার বিশেষ দরকার।

    —ও দিয়ে আপনি কি করবেন! প্রশ্ন নয়, আরেক দফা বিস্ময় প্রকাশ।

    রাজাবাহাদুর সজোরে হেসে উঠলেন। পরক্ষণেই কুঞ্চিত চোখে লাহিড়ীর দিকে চেয়ে বললেন, তুমি না একজন প্যাথলজিস্ট! হাজার রকম রোগের জীবাণু ঘাঁটাই তো তোমার কাজ! প্লেগের নাম শুনেই ভয় পেয়ে গেলে?

    কথাটা বোধ হয় জীবাণু-বিজ্ঞানীর অভিমানে আঘাত করল। সোজা হয়ে বসে আত্মপ্রত্যয়ের সুরে বলল, আজ্ঞে না, ভয় পাই নি। জিজ্ঞেস করছিলাম, ওরকম মারাত্মক জিনিস আপনার কি কাজে লাগবে?

    ‘মারাত্মক কাজেই লাগবে’—তির্যক দৃষ্টিতে তাকিয়ে হাসিমুখে বললেন রাজাবাহাদুর -সেটাও তোমাকে জানাবো বৈকি। কিন্তু তুমি তো কিছুই খাচ্ছ না! আর দুটো পোলাও নাও! দাঁড়াও আমি দিচ্ছি।

    চামচে করে খানিকটা পোলাও ডাক্তারের প্লেটে তুলে দিতে দিতে বললেন, আব্দুল রাঁধে ভালো, ওর ঠাকুরদার বাবা নাকি জাহাঙ্গীর বাদশার খানা পাকাত। নূরজাহান খুশী হয়ে তাকে একটা সোনার মেডেল দিয়েছিলেন। সেটা অবিশ্যি নেই।

    নিশানাথের ভোজনস্পৃহা চলে গিয়েছিল। তবু পাছে দুর্বলতা ধরা পড়ে, তাই আপত্তি করল না। এটা-ওটা নিয়ে খানিকটা নাড়াচাড়াও করতে হল। এই ভাবান্তর রাজাবাহাদুরের নজরে পড়লেও তিনি আর ও নিয়ে কোনো কথাবার্তা বললেন না।

    ভারতবর্ষের পূর্বাঞ্চল থেকে প্লেগ তখন বিদায় নিয়েছে। পুনরাক্রমণের সম্ভাবনাও নেই। সুতরাং কোনো ল্যাবরেটরীতে তার জীবাণু নিয়ে কারও গবেষণা করবার কথা নয়। করলেও লাহিড়ীর সে খবর জানা নেই। এই কথাই যে সে বলবে, রাজাবাহাদুর অনুমান করেছিলেন এবং তার জন্যে প্রস্তুত ছিলেন। উত্তরে বললেন, এখানে সুবিধে হবে না তা জানি। তোমাকে একটু কষ্ট করে বাইরে যেতে হবে। বাইরে মানে বেশি দূরে নয়, দেশের মধ্যেই–

    বলেই পশ্চিমভারতের সেই প্রসিদ্ধ ইনস্টিটিউটের নাম করলেন। লাহিড়ী সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল, ওরে বাপরে, ওখানে আমাকে ঢুকতে দেবে কেন?

    –দেবে না মানে? দেখবে?

    রাজাবাহাদুর উঠে গিয়ে পাশের কোনো একটা কামরায় ঢুকলেন। মিনিটখানেক পরে লোহার সিন্দুকের ভারী পাল্লা খোলার শব্দ শোনা গেল। পরক্ষণেই একখানা খাম হাতে করে বেরিয়ে এসে ডাক্তারের দিকে বাড়িয়ে বললেন, পড়।

    খামের মুখটা খোলাই ছিল। ভিতরকার চিঠিখানায় একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে ডাক্তার প্রায় চেঁচিয়ে উঠল, ওরা রাজী হয়ে গেছে! স্যার তো আমাকে এসব কিছুই বলেন নি?

    —বলবার সময় আসে নি বলেই বলেন নি। চিঠিটাও সবে দু-দিন হল পেয়েছি।

    লাহিড়ীর মুখে কথা সরলো না। আজ কার মুখ দেখে ভোর হয়েছিল? কে জানে আরও কত আশ্চর্য অপ্রত্যাশিত ঘটনা তার জন্যে সঞ্চিত হয়ে আছে? প্রতিটির মধ্যেই তার ভাগ্যলক্ষ্মীর ইঙ্গিত সুস্পষ্ট। যা ছিল তার একান্ত অন্তরের অব্যক্ত কামনা মাত্র, এক অন্তর্যামী ছাড়া আর কেউ যার সন্ধান পায় নি, তিনিই অলক্ষ্যে বসে তার সফল রূপায়ণের সমস্ত আয়োজন করে রেখে দিয়েছেন! এ সুযোগ সে অবহেলা করবে না। তার গবেষণার বিষয় অবশ্য প্লেগ নয়, তবু একে অবলম্বন করেই যাত্রা শুরু করা যাক। অত বড় প্রতিষ্ঠানের সিংহদ্বার একবার যদি খোলা পাওয়া যায়, তার পথ সে নিজের শক্তিতেই করে নিতে পারবে, ততখানি আত্মবিশ্বাস তার আছে।

    রাজাবাহাদুরের কাজ নিয়ে যাবার সব চেয়ে বড় সুবিধা হল—এখানকার চাকরিটি বজায় থাকবে। অন্তত সে দাবী করা চলবে। তার নিজের প্রয়োজনে যদি যেতে হত, মুস্তাফির সুপারিশ পাওয়া গেলেও, তাতেও সন্দেহ ছিল—চাকরির আশা ছেড়ে দেওয়া ছাড়া গত্যন্তর ছিল না। তার মানে যাওয়া হত না। এতবড় একটা সাফল্যের স্বপ্ন চিরদিন আকাশ-কুসুমই থেকে যেত। আজ তার সম্ভাবনা উজ্জ্বল।

    ডাক্তার যখন এইসব দিকগুলো ভেবে দেখছিল, রাজাবাহাদুর তার মুখের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রেখেছিলেন। যখন দেখলেন, যেটুকু টোপ ফেলা হয়েছে ব্যর্থ হয় নি, তখন বাকীটুকু ফেলবার আয়োজন করলেন। বললেন, এদিকের জন্যে তোমাকে ভাবতে হবে না। ম্যানেজারকে বলে দিয়েছি, ওখানে তোমার যত দিনই লাগুক, সবটাই পুরো মাইনের ছুটি বলে গণ্য হবে। মাসের ১লা তারিখে আমারই লোক গিয়ে টাকাটা তোমার বাবার হাতে পৌঁছে দিয়ে আসবে। তার ওপরে যদি কখনও কিছু দরকার হয়, আমাকে একটু জানালেই সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা করে দেবো। বৌমাকেও সেই কথা বলো। যে প্রয়োজনই হোক, জানাতে যেন কোনোরকম সঙ্কোচ না করেন।

    বলতে বলতে ভারী মুখের উপর একটা গাম্ভীর্যের ছায়া ঘনিয়ে উঠল। কিছুক্ষণ মাটির দিকে নীরবে তাকিয়ে রইলেন। আবার যখন শুরু করলেন, গলাটাও ভারী শোনাল। তেমনি নতমুখেই বললেন, কোনোদিন মুখ ফুটে না বললেও একথা তুমি নিশ্চয়ই জানো নিশানাথ, তোমাকে আমি নিজের ভাই-এর থেকে আলাদা করে দেখি না। সে হতভাগাটা যেদিন সব ছেড়েছুড়ে বাউণ্ডুলে হয়ে বেরিয়ে গেল, এতবড় বংশের মানটুকু রাখল না, একটা বিয়ে-থা পর্যন্ত করল না, সেদিন থেকে আমার মন ভিতরে ভিতরে কাকে যেন খুঁজছিল। সে যে নিজে থেকে বাড়ি বয়ে এসে ধরা দেবে, স্বপ্নেও ভাবতে পারি নি। তোমাকে দাঁড় করিয়ে দেওয়া যে আমার নিজেরই গরজ।……থাক সে-কথা। ও, আর একটা ছোট্ট কাজ বাকী রয়ে গেছে।

    বলে তখনই ব্যস্ত হয়ে উঠলেন। পাশের ঘরে আবার সেই লোহার সিন্দুক খোলা এবং বন্ধ করার আওয়াজ। যখন বেরিয়ে এলেন, হাতে একখানা বিশেষ আকৃতির কাগজ, ডাক্তারের সঙ্গে যার পরিচয় আরও অনেকবার ঘটে গেছে। এগিয়ে ধরে বললেন, এটা রেখে দাও।

    কাগজের অঙ্কটা চোখে পড়তেই লাহিড়ীর চোখ দুটো জ্বলজ্বল করে উঠল—পাঁচ হাজার টাকা! তবু হাত না বাড়িয়ে অনেকটা নিস্পৃহকণ্ঠে বলল, কি ওটা?

    রাজাবাহাদুর সরাসরি তার জবাব না দিয়ে বললেন, যে পরিমাণ ক্ষতি তোমার করিয়ে দিলাম, অর্থ দিয়ে তার পূরণ হয় না, সে চেষ্টাও আমি করছি না। এটা এমনিই—মনে কর, ব্রাহ্মণ-ভোজনের দক্ষিণা। আমার ঠাকুর্দা হলে হয়তো একটা গ্রাম দান করে বসতেন। সে তুলনায় এ তো কিছুই নয়। নাও।

    লাহিড়ী দু-হাত বাড়িয়ে চেকখানা গ্রহণ করল এবং নত হয়ে মাথায় ঠেকিয়ে বলল, যে ভাবেই দিন, আপনার স্নেহের দানকে অস্বীকার করবো, সে স্পর্ধা আমার নেই। আপনার কাছে হাত পাতা আমার নতুন নয়। তার মধ্যে লজ্জারও কোনো কারণ দেখি না। লজ্জা পাচ্ছি অন্য কারণে। আপনি আমার ক্ষতি করিয়ে দিলেন, এমন কথাও আপনার মুখ থেকে আমাকে শুনতে হল!

    —ক্ষতি করছি না?

    —কোথায়, কেমন করে, কিছুই তো বুঝতে পারছি না।

    রাজাবাহাদুর মৃদু হেসে হাল্কা সুরে বললেন, দ্যাখ ডাক্তার, তোমার ঐ ল্যাবরেটরীতে বসে দিনের পর দিন তুমি কি কর, কি আছে ঐ যন্ত্রগুলোর মধ্যে, সে সম্বন্ধে কোনো জ্ঞান দূরে থাক, ধারণা করবার মতো বিদ্যেও আমার পেটে নেই, তা আমি জানি। আমি তো কোন্ ছার, অনেক মহা-মহা পণ্ডিতেরও নেই। কিন্তু তোমার ঐ সাধনার দামটা যে কত বড়, সেটুকু বুঝবার মতো বুদ্ধিও এ ঘটে নেই, একথা মনে করছ কেন?

    নিশানাথ ভীষণ অপ্রস্তুতে পড়ে গেল। দাঁতে জিভ কেটে বলল, ছিঃ ছিঃ, কি যে বলেন তার ঠিক নেই! আমি বুঝি তাই বলেছি? আপনি বড্ড—

    ডাক্তারের কথা শেষ হবার আগেই তাঁর মৃদু কণ্ঠ ডুবিয়ে দিয়ে বেজে উঠল সুগম্ভীর স্বর—নিছক নিজের স্বার্থে সেই সাধনাপীঠ থেকে অন্তত কিছুদিনের জন্যে তোমাকে সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছি, সে লোকসানের কি তুলনা আছে?

    –এখানে আপনার ভুল হল, রাজাবাহাদুর। লোকসান তো নয়ই, রিসার্চের দিক থেকে আমি অনেকখানি লাভবান হলাম। এত বড় সুযোগ ক’জনের ভাগ্যে জোটে? কিন্তু এর মধ্যে আপনার নিজের স্বার্থটা কী এখনও জানতে পারি নি!

    —আজ থাক, সে কথা আরেকদিন বলবো।

    সে ‘আরেকদিন’ ক’দিনের মধ্যেই এসে গেল। নিজের প্রাসাদে নয়, নিশানাথের ল্যাবরেটরীর নিভৃতকক্ষে বসে নিতান্ত সহজ সুরে রাজাবাহাদুর তাঁর এই বিচিত্র অভিযানের গোপন উদ্দেশ্যটি ব্যক্ত করলেন। সেটি যে মারাত্মক’, সে আভাস তিনি আগেই দিয়ে রেখেছিলেন। ডাক্তার তার জন্যে নিশ্চয়ই প্রস্তুত ছিল। মনে মনে তার একটা কল্পিত রূপও দাঁড় করিয়ে রেখেছিল। শুনবার পর মনে হল, তার কল্পনাশক্তি কত দীন! আরও মনে হল, ভাষাকে যে ভাবপ্রকাশের বাহন বলা হয়, তার মধ্যে কোনো সত্য নেই, আসলে সে অনেক পিছনে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলেছে। সংগৃহীত কীটাণুগুলোকে যে কাজে এবং যে ভাবে নিয়োগ করা হবে, ‘মারাত্মক’ নামক নিরীহ বিশেষণ দিয়ে তার শতাংশের এক অংশও ব্যক্ত করা যায় না। তাকে পুরোপুরি প্রকাশ করবার মতো যোগ্য বিশেষণ এখনও তৈরী হয় নি।

    তারা দুজন ছাড়া সেখানে আর কেউ উপস্থিত ছিল না। ছিল কতকগুলো যন্ত্র। নিশানাথ সভয়ে তাদের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছিল, যেন যে-কোনো মুহূর্তে তারা সরবে প্রতিবাদ করে উঠবে। তারপর মনে পড়েছিল ওরা নিষ্প্রাণ, জড়পদার্থ। কিন্তু সে নিজে তো জড় নয়, পরিপূর্ণ চেতনাসম্পন্ন মানুষ। তবু প্রতিবাদ করতে পেরেছিল কি? পারে নি। তার ভিতর থেকে একজন সবেগে মাথা তুলে দাঁড়ালেও, আরেকজন এগিয়ে গিয়ে তার গলা টিপে ধরেছিল। প্রথমটার চেয়ে দ্বিতীয়টি অনেক বেশি শক্তিমান।

    একবার মনে হয়েছিল সে ডাক্তার, মানুষের কল্যাণ তার ব্রত, তার একমাত্র লক্ষ্য মানুষকে ব্যাধিমুক্ত করা, জরা ও মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করা। তারই জন্য তার এই দুস্তর সাধনা, এই বিপুল আয়োজন। সে আদর্শ থেকে স্খলিত হলে আর রইল কি? পরক্ষণেই সমস্ত মন আচ্ছন্ন করে জেগে উঠল লোভ—অর্থ, খ্যাতি এবং প্রতিষ্ঠার লালসা। বড় হতে হবে, নৈতিক আদর্শকে আঁকড়ে ধরে একটা ক্ষুদ্র গণ্ডির মধ্যে হাত পা ছুঁড়ে কোনো রকমে বেঁচে থাকবার জন্যে তার জন্ম হয় নি। প্রচলিত ভালোমন্দ, ন্যায়- অন্যায় এবং পাপ-পুণ্যের সংস্কার দিয়ে তৈরি যে বন্ধন, তার পাশ কেটে তাকে বেরিয়ে যেতে হবে। তার নির্ধারিত ভবিষ্যৎ সেই দিকেই তাকে টেনে নিয়ে চলেছে।

    তা যদি না হবে, কোথাকার কোন্ নিশানাথ লাহিড়ী, মেডিক্যাল কলেজের দরজা পেরোতেই যে হিমশিম খেয়ে মরছিল, দু’শ টাকা মাইনের একটা চাকরি পেলেই যে বর্তে যেত, তার জীবনে কোথা থেকে কেমন করে দেখা দিল স্বপ্নাতীত সুযোগ ও সাফল্যের ধারাবর্ষণ? এই অব্যাহত অগ্রগতির পিছনে নিশ্চয়ই কোনো অর্থপূর্ণ ইঙ্গিত আছে, কোনো অলক্ষ্য বিধান, যা তাকে মেনে চলতেই হবে। এই তার ভাগ্যবিধাতার অভিপ্রায়।

    মানুষের অন্তরে ‘অ্যাম্বিশন’ নামক পদার্থটি (‘উচ্চাকাঙ্ক্ষা’ বলা যেত কিন্তু ইংরেজির তুলনায় শব্দটি বড় নিষ্প্রভ) অগ্নিশিখার মতো ঊর্ধ্বগতি। একবার জ্বলে উঠলে নিজের শক্তিতেই বেড়ে চলে এবং চলতে চলতে পথের দু-ধারে যা কিছু পায়,—চিন্তা-ভাবনা, বিচার-বিবেচনা, দ্বিধা-সংস্কারের বাধা-বন্ধন—সব জ্বালিয়ে দিয়ে যায়। নিশানাথের মনের মধ্যে যখন সেই প্রক্রিয়া চলছিল, রাজাবাহাদুর তার সঙ্গে কিঞ্চিত ইন্ধন যোগ করলেন। বললেন, এটা যে সাধারণ লোকের কাজ নয় তা আমি জানি। তাদের কাছে এর নৈতিক আর আইনের দিকটাই বড় হয়ে দেখা দেবে। তার বাইরে তাদের দৃষ্টি পৌঁছায় না। কিন্তু আমি তো তেমন কারও কাছে আসি নি। যার কাছে এসেছি, সে সাধারণ স্তরের অনেক ওপরে এবং তার চেয়ে বড় কথা, সে বৈজ্ঞানিক। আমার এই সঙ্কল্পকে সে বিজ্ঞানের নিরপেক্ষ দৃষ্টি দিয়ে দেখবে, সে বিশ্বাস আছে বলেই সবকিছু তাকে বলতে পেরেছি। তা না হলে এ-সব তো কাউকে বলবার নয়।

    কোনো রকম দ্বিধা যদি লাহিড়ীর মনে তখনও থেকে থাকে, এর পরে তার লেশমাত্র রইল না। উত্তুঙ্গ উচ্চাশার কাছে হার হল শুভবুদ্ধির।

    দু-সপ্তাহের মধ্যেই পশ্চিমাঞ্চলের সেই বিশেষ শহরের উদ্দেশে রওনা হল নিশানাথ লাহিড়ী। ভারতবর্ষের মধ্যে ওখানকার ইন্‌স্টিটিউটই তখন একমাত্র গবেষণাগার যেখানে প্লেগের বীজাণু নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছিল। মুষ্টিমেয় বিশ্বস্ত, অভিজ্ঞ এবং কৃতী গবেষক সেখানে কাজ করছিলেন। অত্যন্ত জোরালো এবং বিশেষ বিশেষ সুপারিশ ছাড়া ডিরেক্টর কাউকে গ্রহণ করতেন না। সেই গোপন গণ্ডির মধ্যে তার প্রিয়তম ছাত্রের জন্যে একটি স্থান সংগ্রহ করা ডাক্তার মুস্তাফির মতো ভারত-বিখ্যাত চিকিৎসাবিদের পক্ষেও সহজ হয় নি। বহু চেষ্টার ফলেই শেষ পর্যন্ত সেটা সম্ভব হয়েছিল। নিশানাথের প্রতিভার উপর তাঁর গভীর আস্থা ছিল এবং সেটা যে অপাত্রে ন্যস্ত হয় নি, তার প্রমাণ কিছুদিনের মধ্যেই পাওয়া গেল। ডিরেক্টরকে খুশী করতে লাহিড়ীর বিশেষ বেগ পেতে হয় নি।

    রাজাবাহাদুরের পিতার যখন মৃত্যু হয়, ছোটকুমার তখন শিশু। তার কয়েক বছর পরে রাণীমাও স্বামীর অনুসরণ করলেন। প্রাচীন রাজবংশের ঐতিহ্য অনুসারে রাজাবাহাদুর তার কিছুদিন আগে একটি সুন্দরী কিশোরীর পাণিগ্রহণ করেছেন। বধূ নির্বাচন রাণীমাই করেছিলেন। তেমন কোনো বড় ঘরের মেয়ে নয়। একমাত্র রূপের জোরেই এখানে তার প্রবেশাধিকার। রূপের সঙ্গে ঐশ্বর্যের মিলন ঘটলে তার মধ্যে যে উগ্র জলুস বা তীব্র চমক ফুটে ওঠে, এ মেয়েটির তা ছিল না। তার শান্ত মুখশ্রী, স্নিগ্ধোজ্জ্বল শ্যামকান্তি এবং বিনম্র পেলব দেহসৌষ্ঠবের মধ্যে একটি মধুর কমনীয়তা ছিল। সম্ভবত সেইটিই রাণীমাকে আকৃষ্ট করে থাকবে। কিন্তু এ বিষয়ে তিনি আত্মীয় পরিজন আশ্রিত অমাত্য, কারোরই বিশেষ সমর্থন পান নি। নববধূ প্রাসাদে পা দিয়েই সেটা জানতে পেরেছিল। স্বামীর কাছ থেকে বাক্যে বা আচরণে বিশেষ কোনো রূঢ়তা বা অনাদর না পেলেও, তিনিও যে ঐ দলভুক্ত একথাও তার বুঝতে বাকী ছিল না। তার ফলে তার মনে প্রথম থেকেই কেমন একটা অপরাধীসুলভ সঙ্কোচ গড়ে উঠেছিল। দীর্ঘদিন ঘর করবার পরেও সে মনোভাব সে কাটিয়ে উঠতে পারে নি। স্বামী-স্ত্রীর মাঝখানে একটা অলক্ষ্য দূরত্ব বরাবর রয়ে গেছে।

    ছোটকুমারের প্রকৃতি ছিল তার জ্যেষ্ঠের ঠিক বিপরীত। ঐশ্বর্যলিপ্সা কিংবা আভিজাত্য-গৌরব তাকে কোনদিন আকর্ষণ করে নি। রাজপ্রাসাদের বিলাস-বহুল জীবনযাত্রার অসংখ্য প্রলোভন থেকে নিজের মনটাকে মুক্ত রাখবার এক আশ্চর্য ক্ষমতা বিধাতা তাকে বোধহয় মাতৃগর্ভ থেকেই দিয়েছিলেন। শিশুকাল থেকে সেখানকার সব কিছুর উপর তার নীরব ঔদাসীন্য ভৃত্যমহলেও আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছিল। নববধূ এসে যখন দেখল, এত বড় প্রাসাদের কোনো মহলে তার জন্যে সস্নেহ অভ্যর্থনার প্রসন্নদৃষ্টি নিয়ে কেউ অপেক্ষা করে নেই, তখন সকলের চেয়ে আলাদা এই কিশোর দেওরটির প্রতিই একটি অলক্ষ্য আকর্ষণ অনুভব করে থাকবে। সে নিজেও তখন কিশোরী। কৈশোরের স্বাভাবিক ধর্মও তাদের নিকটতর করবার সুযোগ দিয়েছে। কালক্রমে বৌরাণী এবং ছোটকুমারের মধ্যে যে প্রগাঢ় সখ্যবন্ধন গড়ে উঠেছিল, এইখানেই তার সূত্রপাত।

    রাণীমার মৃত্যুর পর সে বন্ধন দৃঢ়তর হল। বৌরাণীও তাঁর এই আত্মভোলা, উদাসীন দেওরটির মাতৃস্থানও অধিকার করলেন। বন্ধুত্ব ও মাতৃত্বের সে এক বিচিত্র সংযোগ। কিন্তু তার মিলিত শক্তিও এই সৃষ্টিছাড়া মানুষটিকে বেঁধে রাখতে পারল না। স্নেহ, প্রীতি, ঐশ্বর্য, বংশমর্যাদা—সব বন্ধন অনায়াসে ছিন্ন করে ছোটকুমার যেদিন রাজপ্রাসাদ ছেড়ে বেরিয়ে এল, কিছুতেই তাকে নিরস্ত করা গেল না। বৌরাণী সেদিন একটি কথা বলেন নি, একফোঁটা চোখের জলও তাঁকে কেউ ফেলতে দেখে নি। আত্মীয়-পরিজনেরা অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে দেখছিল। ভৃত্য ও আশ্রিতমহলে কানাকানি পড়ে গিয়েছিল—দেওরের ওপর কত যে দরদ, এইবার সব বোঝা গেছে! কেউ বলেছিল—সব কিছু যে লিখে-পড়ে দিয়ে গেল ছেলেটা! আজ তো ওর সুখের দিন, কাঁদতে যাবে কোন্ দুঃখে?

    সেইদিন থেকে বৌরাণীর মুখে ছোটকুমারের কোনো উল্লেখ একবারও শোনা যায় নি। যেন কিছুই হয় নি, এমনিভাবে সব কিছুর মধ্যে নিজেকে তিনি আরও নিবিড়ভাবে নিবিষ্ট করে দিয়েছিলেন। আগে মাঝে মাঝে বাইরে যেতেন, তাও বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। শুধু কাজ আর কাজ, বিশ্রামহীন নিরলস ব্যস্ততা। যে দেখেছে, বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেছে। শুধু রাজাবাহাদুর বুঝেছিলেন, এ কর্মশক্তি সবটাই যান্ত্রিক, ভিতরে কোনো প্রাণের প্রেরণা নেই। একজনের প্রস্থানের সঙ্গে সঙ্গে তার সবটাই বোধ হয় নিঃশেষ হয়ে গেছে।

    এক অনেকদিন পরে ভাই-এর কথাপ্রসঙ্গে বলেছিলেন, লোকে জানে, আমাকে সে তার সর্বস্ব দিয়ে গেছে। কি নিয়ে গেছে, সে খবর কেউ রাখে না। সে কথা শুধু আমিই জানি।

    সেই যে একদিন পিতৃ-পিতামহের প্রাসাদতোরণ পিছনে ফেলে স্বেচ্ছায় বেরিয়ে এসেছিল, তারপর আর একদিনের তরেও ছোটকুমার সেদিকে ফিরে তাকায় নি। ডাক এসেছে অনেকবার। প্রতিবারেই মৃদু হেসে সবিনয়ে প্রত্যাখ্যান করেছে। রাজাবাহাদুর এসেছেন, এ গলিতে তাঁর গাড়ি ঢোকে না—বড় রাস্তার মোড় থেকে গলিপথটুকু হেঁটে পার হয়ে, অতিকষ্টে সরু সিঁড়ি বেয়ে, কোনো রকমে উঠেছেন এসে দোতলার অপ্রশস্ত বসবার ঘরে। অনুযোগ দিয়েছেন, অভিমান প্রকাশ করেছেন, কখনও সস্নেহ আবেদন জানিয়ে দু-দিনের জন্যে একবারটি ঘুরে আসবার অনুরোধ করেছেন। একটি কুণ্ঠাপূর্ণ বিনীত হাসি ছাড়া আর কোনো উত্তর পান নি। কখনও বৌরাণীর নাম করে বলেছেন, তোকে একবার দেখতে চেয়েছে, বলেছে, যেমন করে পার ধরে নিয়ে এসো।

    এবার জবাব দিয়েছে ছোটকুমার—তাঁকে আমার প্রণাম জানিয়ে বলবেন, সময় হবে না।

    —কি রাজকাজে ব্যস্ত আছ যে সময় হবে না? তেড়ে উঠেছেন রাজাবাহাদুর। এ প্রশ্নের আর উত্তর আসে নি।

    প্রথমদিকে তাঁর আসাটা ছিল ঘন ঘন। ভাইকে বাড়ি নিতে পারুন আর না পারুন, একবার করে দেখে গেছেন। ক্রমশ তার ব্যবধান বেড়ে গেছে। ইদানীং কয়েক বছর তাঁর দেখা পাওয়া যায় নি। ম্যানেজার বা অন্য কোন আমলা পাঠিয়ে খোঁজ-খবর নিয়েছেন। তারপর সেটাও বিরল হয়ে এসেছে।

    অনেকদিন পরে সকালের দিকে ছোটকুমারের বাড়ির সামনে মোটর থামবার শব্দ শোনা গেল। তার কাছে যারা আসে, (বড় একটা কেউ আসে না) কারও গাড়ি নেই। গঙ্গাচরণের কৌতূহল হল। বারান্দা থেকে ঝুঁকে পড়ে একপলক তাকিয়েই ছুটে গেল মনিবের কাছে। ছোটকুমার তখন পড়বার ঘরে। গঙ্গাকে ব্যস্তভাবে ঢুকতে দেখে চোখ তুলতেই সে ফিসফিস করে বলল, রাজাবাহাদুর! বলেই নীচে নেমে গেল দরজা খুলতে।

    এত ছোট গাড়িতে রাজাবাহাদুরকে কখনও চড়তে দেখা যায় নি। বেশ কষ্ট হচ্ছিল নামতে। ড্রাইভারের সঙ্গে গঙ্গাচরণকে এগিয়ে গিয়ে সাহায্য করতে হল। আগের চেয়ে অনেকটা কাহিলও হয়ে পড়েছেন। কুমার আছে কিনা জেনে নিয়ে গঙ্গার কাঁধে হাত দিয়ে সিঁড়ি বেয়ে উঠতে লাগলেন।…

    বারান্দায় পড়তেই ছোটকুমার অগ্রজের বাহু ধরে বসবার ঘরের দিকে নিয়ে চলল। যেতে যেতে অনুযোগের সুরে বলল, এতটা শরীর খারাপ, একটা খবরও তো দেন নি?

    —কাকে খবর দেবো? তোমাকে? ক্ষুব্ধকণ্ঠে বললেন রাজাবাহাদুর, কি লাভ হত?

    ছোটকুমার যেমন মাথা নীচু করে চলছিল, তেমনিভাবে চুপ করে রইল।

    রাজাবাহাদুর সঙ্গে সঙ্গে সুর বদলে নিলেন। ঘরে ঢুকে সামনে যে কৌচটা পেলেন, তার উপর বসে পড়ে প্রসন্নমুখে বললেন, খুব রোগা হয়ে গেছি, না? ওটা কিছু না। শরীর আমার ভালোই আছে। খানিকটা চর্বি ঝরে গিয়ে বরং উপকারই হয়েছে। কিন্তু—কয়েক সেকেণ্ড থেমে ভাইয়ের মুখের উপর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি বুলিয়ে নিয়ে যোগ করলেন, তোকে তো তেমন ভালো দেখছি না। রাজ জেগে খুব-ই পড়াশুনো হচ্ছে? দেখবার তো কেউ নেই— আচ্ছা, আমিও পরোয়ানা নিয়ে এসেছি।

    পকেট থেকে একখানা খাম বের করে হাত বাড়িয়ে বললেন, এই নাও।

    —কি ওটা?

    —পড়েই দ্যাখ।

    ছোটকুমার খামটা খুলে চিঠিখানায় একবার চোখ বুলিয়েই শুষ্ক-মুখে বলল, কি হয়েছে বৌরাণীর?

    —কি করে জানবো? মুখ ফুটে কিছু বললে তো? দিন দিন শুকিয়ে যাচ্ছে, জিজ্ঞেস করলে সেই এক কথা—কিছু হয় নি আমার। কত করে বললাম, একবার কোলকাতায় চল। মুস্তাফির মতো অতবড় ডাক্তার রয়েছে হাতের মধ্যে, দরকার হলে আরও বড় কাউকে দেখানো যেতে পারে। কিছুতেই রাজী হল না। কাল যখন কোলকাতায় ফিরছিলাম, ঐ চিঠিখানা দিয়ে বলল, ঠাকুরপোকে দিও, আর একেবারে সঙ্গে করে নিয়ে এসো।

    হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে ব্যস্তভাবে বললেন, ট্রেনের সময় হয়ে এল, যা, জামা- কাপড়টা বদলে আয়। গঙ্গা….

    গঙ্গাচরণ পাশের কোনো ঘর থেকে সাড়া দিয়ে ছুটতে ছুটতে এসে জোড়হাত করে দাঁড়াল। রাজাবাহাদুর হুকুম দিলেন, একটা স্যুটকেসে ‘ছোট’র জিনিসপত্তরগুলো গুছিয়ে দে, দেরি করিস নে।

    ছোটভাইকে নাম ধরে বড় একটা ডাকতেন না। অন্যের কাছে উল্লেখ করবার বেলায় বলতেন ছোটকুমার, ডাকবার সময় তাকেই একটা সাদর ও সংক্ষিপ্ত রূপ দিয়েছিলেন—‘ছোট’।

    ছোটকুমার চিঠিখানা হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ কি ভাবল। তারপর মুখ তুলে বলল, আজ তো আমার যাওয়া হবে না।

    —কেন?

    —একটা বিশেষ কাজ আছে।

    —কি কাজ?

    —যাঁর কাছে ফ্রেঞ্চ শিখি, তাঁর আজ আসবার দিন। সন্ধ্যাবেলায় আসবেন।

    —কি শিখিস?

    —ফ্রেঞ্চ, ফরাসীভাষা।

    —তা দিয়ে কি হবে?

    কুমার মৃদু হেসে চুপ করে রইল। রাজাবাহাদুর বললেন, যত সব উদ্ভট খেয়াল! কোন্ দেশের লোক তিনি?

    —ইংরেজ।

    বেশ তো, একটা চিঠি লিখে রাখ—বিশেষ জরুরী কাজে বাড়ি যাচ্ছি। উনি এলে গঙ্গা সেটা দিয়ে দেবে।

    —তা হয় না, আমি বরং কাল যাবো। আপনাকে আসতে হবে না।

    —যাবে তো?

    কুমার একটু হাসল।

    রাজাবাহাদুর উঠে পড়ে বললেন, দেখো, তা না হলে আমাকে আবার ছুটতে হবে। ন’টা পঁচিশে ট্রেন। আমিও যাচ্ছি। টিকিট করে রাখবো। তাহলে অন্তত মিনিট পনেরো সময় হাতে রেখে যেও, ঠিক আটটায় এখানে গাড়ি আসবে।

    —গাড়ি লাগবে না।

    —কেন? অস্টিন্‌টা বেশ আসতে পারবে, আমি তো তাতে করেই এলাম। ছোটকুমার মাথা নেড়ে বলল, দরকার নেই। এখান থেকেই একটা ট্যক্সি নিয়ে নেবো।

    নিজের অজ্ঞাতসারেই রাজাবাহাদুরের কপালে কুঞ্চন দেখা দিল। রাজপরিবারের কেউ কোনোদিন ট্যাক্সিতে ওঠে না, তবু এ নিয়ে আর পীড়াপীড়ি করলেন না। বুঝলেন, এ ‘না’-কে ‘হ্যাঁ’ করানো যাবে না।

    রাজাবাহাদুরকে গাড়িতে তুলে দিয়ে ছোটকুমার ধীরে ধীরে সিঁড়ি ক’টা পেরিয়ে তার লাইব্রেরির কামরায় ফিরে গেল। কিছুক্ষণ আগে যে বইখানা পড়ছিল এবং খোলা রেখেই পাশের ঘরে চলে গিয়েছিল, সেটা তেমনি পড়ে রইল। পড়বার টেবিলে আর ফিরে যাওয়া হল না। কোণের দিকে একটা ইজিচেয়ার ছিল, তারই কোলে নিজেকে এলিয়ে দিল। মিনিট কয়েক পরে জামার পকেট থেকে বেরিয়ে এল একখানা ধার ছেঁড়া খাম, যার ভিতরকার বস্তুটির সঙ্গে এইমাত্র তার চাক্ষুষ পরিচয় ঘটে গেছে, তবু সেই ছোট্ট কাগজখানারই ভাঁজ খুলে আরেকবার তুলে ধরল চোখের উপর।

    গোটা গোটা অক্ষরে লেখা কয়েকটি মাত্র লাইন—

    কল্যাণীয়েসু,

    ঠাকুরপো,

    কিছুদিন যাবৎ আমার শরীরটা বিশেষ ভালো যাইতেছে না। তোমাকে একবারটি দেখিতে ইচ্ছা করে। যত শীঘ্র হয়, অবশ্য অবশ্য আসিও।

    ইতি-
    আশীর্বাদিকা
    তোমার বৌরাণী

    আনমনে ধীরে ধীরে চিঠিখানা আবার ভাঁজ করে মুঠোর মধ্যে রেখে তেমনি অসাড়ের মতো অনেকক্ষণ পড়ে রইল ছোটকুমার। বৌরাণীর চিঠি। বৌরাণী তাকে ডাকছে! কত বছর পরে। কিন্তু এ কথা-ক’টির মধ্যে তাকে যেন কোথাও খুঁজে পাওয়া গেল না। ‘ঠাকুরপো’ সম্বোধনটি কানে বড় নতুন ঠেকছে। এ বাড়িতে আসবার পর প্রথম প্রথম কয়েকদিন মাত্র ঐ নামে তাকে ডাকতে শুনেছিল, তারপর আর শোনে নি। হঠাৎ একদিন দাদার মতো ‘ছোট’ বলতে শুরু করল। তারপর কবে, কেমন করে মধুরতর রূপান্তর লাভ করে সেই ডাক ক্রমশ ‘ছোটু’তে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল, আজ আর মনে করতে পারে না। কেমন একটা আশ্চর্য তার ছিল সেই মিষ্টি-কণ্ঠের এই ছোটু কথাটুকুর মধ্যে, আজও দু-কান ভরে আছে। চিঠি যদি এল, তার উপরে ঐ সম্ভাষণটুকু জুড়ে দিলে কি ক্ষতি হত? একবার মনে হল, ঐ দুটি অক্ষরের মধ্যে যে নিবিড় সম্পর্ক একদিন জড়িয়ে ছিল, আজ তার অবসান ঘটেছে বলেই ওদের প্রয়োজনও ফুরিয়ে গেছে। হয়তো ইঙ্গিতে সেই কথাটিই বলতে চলেছে বৌরাণী।

    তাই যদি হয়, তবে আর গিয়ে কি লাভ? যেখানে যা কিছু বন্ধন, সবই তো একদিন নিজে হাতে ছিন্ন করে চলে এসেছিল। ঐ একটি জায়গায় শুধু পারে নি। একটা অলক্ষ্য সূত্র রয়ে গেছে। ক্ষীণ হলেও তার ধার বড় তীক্ষ্ণ। অগোচরে থেকেও নিজের বেদনাময় অস্তিত্ব কোনদিন ভুলতে দেয় নি। আজ যদি তার একটা দিক কালক্রমে কিংবা অন্য কোনো কারণে বিলীন হয়ে গিয়ে থাকে, আর এক দিক থেকে সেই ছিন্ন সূত্রে জোড়া দিতে যাওয়া নিরর্থক।

    সহসা আবার হাতের চিঠিখানার দিকে নজর পড়তেই ছোটকুমারের সমস্ত চিন্তাস্রোত ঐ একটি ধারায় গিয়ে মিলিত হল। সমস্ত ক্ষোভ অভিমান ছাপিয়ে উঠল একটিমাত্র দুর্ভাবনা—কি অসুখ বৌরাণীর? কি জানি কেমন আছে?

    অকস্মাৎ কে যেন তাকে সজোরে ঠেলে তুলে দিল। কাল ন’টা পঁচিশে গাড়ি। তার আগে অনেকগুলো কাজ সেরে নিতে হবে।

    যে-ভাষায়, যেমন করেই আসুক, বৌরাণীর রোগশয্যার ডাক তার কাছে অলঙ্ঘ্য—এই পরম সত্যটাই সবকিছু ছাপিয়ে ছোটকুমারের অন্তরের মধ্যে প্রতিভাসিত হল।

    ন’টা পঁচিশের গাড়িটা দূরপাল্লার যাত্রী। বরাবরই বেশ ভিড় থাকে। তাছাড়া তার মিনিট দশেক আগে ঠিক পাশেই একখানা লোক্যাল এসে দাঁড়ায় এবং তার গহ্বর থেকে পিলপিল করে বেরিয়ে আসে একপাল ঊর্ধ্বশ্বাসে ধাবমান ডেলিপ্যাসেঞ্জার। এই দুটো বিপরীতমুখী স্রোতের সংঘাতে মাঝখানের প্লাটফরমে যে ঘূর্ণাবর্ত দেখা দেয়, তার ভিতর থেকে নিজের দেহটাকে উদ্ধার করে গাড়ির কামরায় পৌঁছে দেওয়া শক্তির প্রয়োজন।

    ছোটকুমার যখন সেই সুকঠিন শক্তিপরীক্ষায় নাজেহাল হবার উপক্রম, হঠাৎ মনে হল কে যেন তার পিছন থেকে ঘাড়ের ঠিক নীচে একটা সূচ ফুটিয়ে দিলে। ‘উঃ’ বলে তৎক্ষণাৎ ফিরে তাকাল, কিন্তু সেই জনারণ্যের ভিতরে এমন কোনো লোককে চোখে পড়ল না, যাকে এই বিশেষ কর্মটির সঙ্গে জড়িত করা যেতে পারে। ব্যাপারটাকে মনে মনে উড়িয়ে দেবার চেষ্টা করল, কার এমন কি গরজ পড়ল খামকা তার গায়ে সূচ ফোটাবার? পিন-জাতীয় কিছু একটা কারও হাতে থেকে থাকবে হয়তো, ভিড়ের ধাক্কায় হঠাৎ লেগে গেছে।

    আহত স্থানটায় তখন রীতিমত জ্বালা করছে। গাড়িতে উঠে দেখতে হবে কি ব্যাপার, এই কথা ভেবে সেই দিকেই পা বাড়াতে যাবে, এমন সময় চোখে পড়ল গঙ্গাচরণ ভিড় ঠেলে এগিয়ে আসছে। চোখে মুখে ব্যস্ততার চিহ্ন। তাকে দেখে কুমারের মুখেও চিন্তার ছায়া পড়ল। গঙ্গার তো তার সঙ্গে যাবার কথা নয়! কাছে আসতেই জানতে চাইল, তুমি কোথায় যাচ্ছ?

    গঙ্গাচরণ একখানা খাম এগিয়ে ধরে চাপাগলায় বলল, বিধু এসে দিয়ে গেল। বৌরাণীর চিঠি। বলল, খুব জরুরী খবর আছে এর মধ্যে। আর বলেছে, এ চিঠির কথা রাজাবাহাদুর যেন জানতে না পারে।

    ভিড়ের মুখ থেকে একটুখানি সরে গিয়ে তাড়াতাড়ি খামের ধারটা ছিঁড়ে ফেলল ছোটকুমার। আগের মতো এ চিঠিখানাও সংক্ষিপ্ত, কিন্তু সুর একেবারে আলাদা।

    ভাই ছোটটু,

    এর আগে যে-চিঠিটা পেয়েছ, তার অক্ষরগুলো আমার, কিন্তু কথা আমার নয়। তবু লিখতে হয়েছিল। কেন, তা জিজ্ঞেস করো না। সে চিঠিতে তোমাকে আসতে বলেছিলাম। এবার বলছি, এসো না। বলতে আমার বুক ফেটে যাচ্ছে। কতকাল তোমাকে দেখিনি, তবু বলছি, আমার মাথা খাও, তুমি এসো না।

    বৌরাণীর নাম সুষমা, তারই আদ্যক্ষর সু।

    ইতি সু—।

    সমস্ত চিঠিখানার মধ্যে যে শঙ্কা ও সংশয় ঘেরা গূঢ়রহস্য জড়িয়ে আছে, এই ছোট্ট অক্ষরটিও যেন তার থেকে মুক্ত নয়। ছোটকুমার বিস্ময়বিহ্বল দৃষ্টিতে সেই দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর চিঠিটা মুড়ে যখন খামে ভরতে যাবে, গঙ্গাচরণ চেঁচিয়ে উঠল, এ কি! তোমার জামার পিঠে রক্ত কিসের? লোকটা কি তাহলে কিছু একটা ফুটিয়ে দিয়ে গেল?

    —কোন্ লোকটা! চমকে উঠল ছোটকুমার।

    —ঢ্যাঙা কালো মতন একটা লোক। যা ভিড়, পাছে হারিয়ে ফেলি, তাই ঐখান থেকে আমি ঠায় তোমার দিকে নজর রেখেছি। মনে হল, সেই লোকটা যেন ডান হাতটা তুলে তোমার ঘাড়ের ওপর গিয়ে পড়ল। তারপর আর দেখতে পেলাম না।

    কুমার কি একটা বলতে যাচ্ছিল, থেমে গেল—ঠিক পিছনেই রাজাবাহাদুরের কণ্ঠস্বর—কি হল, এখানে দাঁড়িয়ে কি করছিস? এখনই যে গাড়ি ছেড়ে দেবে!

    —আপনি উঠে পড়ুন, আমি যাই।

    —কোথায় যাবি?

    —বাসায়।

    –কেন?

    গঙ্গাচরণ বলে উঠল, এইমাত্তর কে একটা লোক ওর পিঠে কি যেন ফুটিয়ে দিয়ে গেল, রক্ত বেরুচ্ছে।

    রাজাবাহাদুর চিন্তিত মুখে উদ্বেগের সুরে বললেন, সে কি! কই দেখি!

    জামার পিছনটায় একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে গঙ্গার দিকে চেয়ে বললেন, তুই দেখেছিস লোকটাকে?

    —আজ্ঞে ঠিক ঠাহর করে দেখিনি, দূর থেকে মনে হল যেন—

    —মনে হল! গাঁজার দমটা বোধহয় একটু বেশি হয়ে গেছে!

    কুমারের দিকে ফিরে বললেন, ও কিছু না। পোকায়-টোকায় কামড়েছে মনে হচ্ছে। গাড়িতে চল্–জামাটা খুললেই বোঝা যাবে কি হয়েছে। আমার ব্যাগে আইডিন আছে, লাগিয়ে দিলেই সেরে যাবে। ঐ লাস্ট্ বেল পড়ে গেল, আর মোটে পাঁচ মিনিট আছে গাড়ি ছাড়তে।

    —আজ ইচ্ছে করছে না, আরেক দিন যাবো।

    —তোরও কি গঙ্গার ঐ গাঁজাখুরি গল্প শুনে মন খারাপ হয়ে গেল?

    —না তা নয়। শরীরটা বিশেষ ভালো লাগছে না।

    —তাই নাকি? সঙ্গে সঙ্গে সুর বদলে গেল রাজাবাহাদুরের, তাহলে আর গিয়ে কাজ নেই! সোজা ভবানীপুরের বাড়িতে চল। ওখানে তো এক গঙ্গা ভরসা।

    —এখন থাক, পরে, যদি দরকার হয় যাবো।

    বলেই ছোটকুমার ফিরে যাবার জন্যে পা বাড়ালো। রাজাবাহাদুর পিছন থেকে বললেন, আমিও তাহলে থেকে গেলাম। কেমন থাকিস, কাল সকালেই যেন একটা খবর পাই। দরকার হলে মুস্তাফিকে একবার দেখিয়ে দেওয়া যাবে।

    .

    সেদিন যদি মুস্তাফিসাহেবের দেখা পাওয়া যেত, ঘটনার গতি চলে যেত অন্য পথে। এ কাহিনীর পরিণতি শুধু ভিন্ন নয়, নিকটতর হত। ব্যস্ত পাঠকদের অনেকখানি সময় বাঁচত। এইখানে ট্রামের টিকেট কিংবা ছেঁড়া হ্যাণ্ডবিল গুঁজে দিয়ে আর একটা ‘সিটিং’-এর জন্যে অপেক্ষা করতে হতো না। গোটা কয়েক পাতা কোনো রকমে এগিয়ে গিয়ে এ ঝঞ্ঝাট চুকিয়ে ফেলে অন্য বই ধরতে পারতেন। সংসারের নানা কর্মে রত যেসব ক্লান্ত পাঠিকা গল্প-উপন্যাসকে নিদ্রাকর্ষণের টনিক হিসাবে ব্যবহার করে থাকেন, তাঁদেরও এই পর্যন্ত এসে পাতা মুড়ে রেখে পাশ ফিরে শোবার দরকার হত না। ঘনায়মান তন্দ্রার দোলায় দুলতে দুলতেই যবনিকায় পৌঁছে যেতেন।

    কিন্তু অলক্ষ্যে বসে যে বিশ্ববিধান-রচয়িতা বুদ্ধিগর্বিত মানুষের বহু-যত্ন-রচিত পরিকল্পনা একটিমাত্র অঙ্গুলিহেলনে ওলট-পালট করে দেন, তাঁর অভিপ্রায় ছিল অন্যরূপ। তাই ডাক্তার মুস্তাফিকে পাওয়া গেল না।

    রাজাবাহাদুর মনে মনে তাঁর প্রত্যাশিত ঘটনাগুলোকে পর পর সাজিয়ে রেখেছিলেন, এবং কার কোথায় কখন কি প্রয়োজন হবে, সব সেই অনুসারে স্থির করা ছিল। স্ত্রীকে চাপ দিয়ে চিঠি লেখানো, সেখানা হাতে করে ছোট গাড়ি নিয়ে একটা বিশেষ সময়ে ভাই-এর বাসায় গিয়ে ওঠা, নানা অভিনয়ের জাল ফেলে তখনই তাকে নিয়ে যাবার চেষ্টা, সে চেষ্টা ব্যর্থ হলে অন্য দিন-নির্বাচন, তার সঙ্গে একটি বিশেষ ট্রেনের সাহায্য গ্রহণ—সবই তাঁর পূর্ব-পরিকল্পিত। তার মধ্যে ঐ ন’টা পঁচিশের গাড়ির ভূমিকাও কিছুমাত্র অপ্রধান ছিল না। ঐরকম ভিড়ের আড়াল না পেলে যত পাকা হাতই হোক এবং যত কম সময়ই লাগুক, সকলের অগোচরে ইনজেকসন পর্বটার নির্বিঘ্ন ও সফল সমাধান সম্ভব হত না।

    এ পর্যন্ত সবই পূর্ব-প্রস্তুত-নির্ঘণ্ঠ অনুসারে ঠিকমত চলেছিল, গোল বাধল এর পরের দফায়। গাড়িতে উঠবার পূর্বমুহূর্তে ছোটকুমার বেঁকে বসল—সে যাবে না। হাওড়া স্টেশনের ভিড়ের ভিতর কিসের না কিসের সামান্য একটা খোঁচা—সেই তুচ্ছ জিনিসটা যে ওর কাছে এত বড় হয়ে উঠবে, বৌরাণীর রোগশয্যার আহ্বান পর্যন্ত তার কাছে হার মানবে, এই আশ্চর্য ঘটনা রাজাবাহাদুরের হিসাবের মধ্যে ছিল না। এর জন্যে দায়ী ঐ ‘গঙ্গা-আপদটা’। কে ভেবেছিল যে ঠিক ঐ মুহূর্তে ঐখানটিতে তার আবির্ভাব ঘটবে এবং তারই কথায় কুমার দাদা ও বৌরাণীর সব উপরোধ উপেক্ষা করে ফিরে যাবে। তাও যদি তাকে ভবানীপুরের প্রাসাদে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হত, কার্যসুচীর সামান্য পরিবর্তন ঘটলেও শেষ পর্যন্ত কার্যোদ্ধার আটকে থাকত না। কিন্তু সেখানেও রাজাবাহাদুর ব্যর্থ হলেন। সেই ব্যর্থতার জ্বালা ক্ষণিকের তরে হয়তো তাঁর চোখের তারায় ফুটে উঠে থাকবে, গঙ্গার নজর পড়তেই সে চমকে উঠল। কিন্তু সে বেচারা তখনও জানে না, সে নিজেই এই রাজ- রোষের লক্ষ্যস্থল এবং অদূর ভবিষ্যতে নিজের জীবন দিয়ে তাকে তার অসতর্ক হঠকারিতার মূল্য দিতে হবে।

    হতভাগ্য গঙ্গাচরণ। সে যে নিমিত্ত মাত্র, যে বস্তুটি তার মনিবকে শেষ-মুহূর্তে স্টেশন থেকে ফিরিয়ে এনেছিল, তার নির্দোষ বাহক, এই সত্যটি যদি রাজাবাহাদুর জানতে পারতেন, হয়তো তাকে অকালে অজ্ঞাত আততায়ীর হাতে প্রাণ দিতে হত না। জানতে তিনি পেরেছিলেন, কিন্তু তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে, ঘটনাস্রোতের গতিপথও তাঁর আয়ত্তের বাইরে চলে গেছে।

    সে চিঠি যিনি লিখেছিলেন, তিনিও ভাবতে পারেননি গভীর উৎকণ্ঠায় ভরা ঐ সামান্য ক’টি ছত্র একদিন তাঁর সমগ্র শ্বশুরকুলের ইতিহাস রচনা করবে। স্বামীর মনোরাজ্যে বৌরাণীর প্রবেশাধিকার ছিল না, তাঁর গতিবিধির কোনো খবরও তিনি রাখতেন না। তাকে দিয়ে এর আগের চিঠিখানা লেখাবার জন্যে রাজাবাহাদুর কেন যে অত পীড়াপীড়ি করেছিলেন, কি ছিল তাঁর মনে, তার কোনো আভাসও তিনি পাননি। শুধু মনে হয়েছিল, একটা কিসের কালো ছায়া যেন ঘনিয়ে আসছে। একটা কোনো অকল্যাণের ইঙ্গিত, যার লক্ষ্যস্থল তার পরম স্নেহ ও প্রীতিভাজন ছোটকুমার। এমনি একটা অস্পষ্ট আশঙ্কা তাঁকে ভিতরে ভিতরে চঞ্চল করে তুলেছিল। ভেবেছিলেন, যেমন করে হোক তাকে নিরস্ত করতে হবে।

    কিন্তু যে উদ্দেশ্য নিয়ে গোপনে বিশ্বস্ত ভৃত্যের হাত দিয়ে চিঠিখানা তাঁর আকৈশোর সখা সোদরোপম দেবরের কাছে পাঠিয়েছিলেন, সেটা সিদ্ধ হয়নি—তাকে তিনি বাঁচাতে পারেননি, তবু কুমারের কাছে ঐ কথা ক’টিই ছিল তার শেষ দুটি দিনের মহামূল্য সম্পদ।

    তার মৃত্যুর পরে খোলা খামখানি তার বালিশের তলায় পাওয়া গিয়েছিল। সকলের অলক্ষ্যে রাজাবাহাদুর সেটি সংগ্রহ করেছিলেন। তিনিও এর জন্যে কিছুমাত্র কম মূল্য দেননি। সেকথা যথাস্থানে প্রকাশ করবো।

    স্টেশন থেকে রাজাবাহাদুর সোজা গিয়ে উঠলেন ডাক্তার মুস্তাফির বাড়িতে। তাঁকে পাওয়া গেল না। ছুটলেন মেডিক্যাল কলেজে। সেখানেও নেই। আবার তাঁর বাড়ি ফিরে এসে শুনলেন, তিনি বর্ধমানে রোগী দেখতে গেছেন। ফিরতে রাত হবে কিংবা পরদিন সকালেও আসতে পারেন। রাজাবাহাদুরের মুখে বিরক্তির কুঞ্চন দেখা দিল। তার লক্ষ্য বোধহয় তিনি নিজেই। তাঁর কার্যসূচীতে ডাক্তারের স্থান রয়েছে তারও পরের দিন। টেলিগ্রাম পাওয়ামাত্র তাঁদের ‘দেশে’র বাড়িতে রওনা হবার কথা। ততক্ষণে ছোটকুমারের দেহে ইনজেকশনের ক্রিয়া শুরু হয়ে যাবে। তারপর যা করণীয়, মুস্তাফিই তার ভার নেবেন—এই ছিল ব্যবস্থা। কিন্তু ঘটনাচক্রে এই মুহূর্তেই তার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।

    রাজাবাহাদুরের আর ভবানীপুরে ফেরা হল না। ভাগ্যক্রমে বর্ধমানের রোগীর ঠিকানা মুস্তাফির বাড়িতে পাওয়া গেল। সেটি সংগ্রহ করে ওখান থেকে গ্রাণ্ড ট্রাঙ্ক রোড-এ গিয়ে পড়লেন। কিন্তু ভাগ্যের আনুকূল্য শেষ পর্যন্ত পেলেন না। গন্তব্যস্থলে গিয়ে শুনলেন রোগীটি মারা গেছে, সুতরাং নির্দিষ্ট সময়ের আগেই ডাক্তার কোলকাতায় রওনা হয়ে গেছেন। সঙ্গে সঙ্গে গাড়ি ফেরালেন রাজাবাহাদুর। এতক্ষণে মনটা একটু প্রসন্ন হল। এই মৃত্যুটা বোধহয় শুভলক্ষণ। এর মধ্যে তাঁর উদ্দেশ্যসিদ্ধির ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।

    ছোটকুমার যখন ট্যাক্সি করে বাসায় ফিরছিলেন, একটি চিন্তাই তাঁর সমস্ত মন অধিকার করে রইল—গুরুতর কারণ না থাকলে বৌরাণী তাকে এমন করে নিষেধ করত না। কিন্তু কী সেই কারণ? নিশ্চয়ই তার কোনো বিপদের আশঙ্কা করেছে বৌরাণী। কিসের বিপদ? সে তো কারও কোনো ক্ষতি করেনি! তার বিরুদ্ধে কার কি অভিযোগ থাকতে পারে, কুমার কিছুতেই ভেবে পেল না। তবু এই চিঠির পর আর তার কোনোমতেই যাওয়া চলে না। বৌরাণী তাকে যেতে বলেনি, বলেছে তুমি এসো না। তবু তার এই সুস্পষ্ট ‘না’-এর ভিতর থেকে একটি ব্যাকুল অন্তরের স্নেহনির্ঝর ঝরে ঝরে পড়ছে। তাতেই সে অভিভূত হয়ে রইল।

    বাসায় ফিরবার কিছুক্ষণ পরেই কুমার বুঝল তার জ্বর এসেছে। কিছু না খেয়েই শুয়ে পড়ল। গঙ্গা ব্যস্ত হয়ে উঠল। বারবার এসে বলতে লাগল, একজন ডাক্তার ডেকে আনি, তোমার সেই যে বন্ধুটি আসে, তাকেই না হয় খবর দিই।

    কুমার নিষেধ করল, এখন থাক, দরকার হলে পরে ডাকা যাবে।

    বিকেলের দিকে জ্বর খুব বেড়ে গেল। আর ওকে জিজ্ঞাসা করল না, শিয়ালদর কাছে ওর ডাক্তার-বন্ধু অমলবাবুর বাসা তার জানা ছিল, তাকে একেবারে সঙ্গে করে নিয়ে এল। কুমার তখন ভুল বকছে।

    রোগীকে পরীক্ষা করতে গিয়ে তার দেহের কয়েকটি বিশেষ জায়গায় এক ধরনের স্ফীতি লক্ষ্য করে অমল সন্দিগ্ধ হয়ে উঠল। তার যতদূর জানা, ওটা প্লেগের লক্ষণ। কিন্তু প্লেগ আসবে কোত্থেকে? হয়তো অন্য কারণে ফুলে থাকবে—যাই হোক, রক্তটা দেখা দরকার। তার এক সতীর্থ ছিল প্যাথলজিস্ট। তার কাছে ছুটে গেল। সে এসে তখনই স্লাইড্ নিয়ে গেল এবং মাইক্রোস্কোপের তলায় ফেলে চমকে উঠল। সত্যিই প্লেগের বীজাণু দেখা যাচ্ছে। দুজনেই টাটকা পাস করা অনভিজ্ঞ চিকিৎসক। নিজেদের বিদ্যার উপর সম্পূর্ণ নির্ভর না করে পরদিন সকালেই আর কয়েকটা স্লাইড্‌ নিয়ে দিয়ে এল মেডিক্যাল কলেজে এবং রিপোর্টের জন্যে সেখানেই অপেক্ষা করতে লাগল। রোগীর কাছে করবার বিশেষ কিছু ছিল না, চিকিৎসার গতি-প্রকৃতি, এমন কি আরোগ্যও নির্ভর করছিল রোগ-নির্ণয়ের উপর।

    ওখানকার যিনি বিশেষজ্ঞ, কোনো কারণে তিনি তখন অনুপস্থিত। অনেক দেরিতে ফিরলেন। আরও বহু কেস্ ছিল, তাতেও খানিকটা দেরি হল। তারপর লালফিতার বেড়া পার হয়ে সেই দীর্ঘ প্রতীক্ষিত কাগজখানি যখন অমল এবং তার বন্ধুর হাতে এসে পৌঁছল, তখন সন্ধ্যা হতে আর বাকী নেই। রিপোর্টে নিজেদের মতের সমর্থন দেখে তখনই ট্যক্সি নিয়ে ছুটল কুমারের বাসায়। গিয়ে দেখল কেউ নেই, শূন্য খাটখানা খাঁ খাঁ করছে।

    পাশের ঘর থেকে ঠাকুর এসে কেঁদে পড়ল

    তার মুখেই শোনা গেল, অমল বেরিয়ে যাবার পরমুহূর্তেই রাজাবাহাদুর কোনো এক বড় ডাক্তার নিয়ে এসে পড়েছিলেন, গোটা কয়েক ইন্জেকশনও দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু কুমারের আর জ্ঞান ফিরে আসেনি। তারপর দুপুরের মধ্যেই সব শেষ। এই কিছুক্ষণ হল যোগাড়যন্তর করে শ্মশানে নিয়ে গেছে। রাজাবাহাদুর সঙ্গে গেছেন। গঙ্গাকে তিনি নিতে চাননি, সে একরকম জোর করেই গেছে। কোন্ শ্মশানে, ঠাকুর ঠিক বলতে পারল না। হাত দিয়ে দক্ষিণ দিকটা দেখিয়ে দিল। অমল তার প্যাথলজিস্ট বন্ধুকে বলল, তাহলে বোধহয় কেওড়াতলায় নিয়ে গেছে। ওর বাবাও শুনেছি কোলকাতাতেই মারা যান এবং তাঁকেও কেওড়াতলায় দাহ করা হয়েছিল।

    —তার কারণ, ওদের ভবানীপুরের বাড়ি থেকে সেটা কাছে পড়ে। এখান থেকে নিশ্চয়ই অদূরে নিয়ে যায় নি।

    –যেখানেই নিক, শ্মশানে গিয়ে আর কী লাভ? উদাসকণ্ঠে বলল অমল। এই মৃত্যুতে সে অনেকটা ভেঙে পড়েছিল।

    বন্ধু বলল, তাহলেও একবার চল। ব্লাড-রিপোর্ট রইল আমাদের কাছে। সেটা না দেখেই ডেথ-সার্টিফিকেট দিলো কে, আর তাতে কি লিখল, একবার জানা দরকার। রাজারাজড়ার ব্যাপার, কোনো গণ্ডগোলও তো থাকতে পারে।

    —ওকে তুমি দ্যাখনি, তাই ওকথা বলছ। সব দাবিদাওয়া ছেড়ে এব কাপড়ে চলে এসেছিল। ওর বিরুদ্ধে কারও কোনো আক্রোশ থাকতে পারে না।

    —তবু একবার আমাদের যাওয়া উচিত। কোলকাতার শহরে হঠাৎ একটা লোক প্লেগে মারা গেল, ব্যাপারটা suppress করা ঠিক হবে না।

    কাশীমিত্তির এবং নিমতলায় সন্ধান না পেয়ে, কেওড়াতলাতে যখন ওরা পৌঁছল, তখন দাউ দাউ করে চিতা জ্বলছে। রাজাবাহাদুর এককোণে চুপ করে বসে আছেন। অমলকে দেখে গঙ্গা ছুটে এল। ওর পায়ের উপর পড়ে হাউ হাউ করে কেঁদে উঠল— সারাদিন তুমি কোথায় ছিলে ডাক্তারবাবু? আমি নিজে গিয়ে তোমায় ডেকে নিয়ে এলাম!

    অমল কিছুক্ষণ তাকে সান্ত্বনা দেবার চেষ্টা করে রাজাবাহাদুরের কাছে গিয়ে নিজের পরিচয় দিতেই তিনি তাকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। অনুকূল শ্রোতা পেয়ে তাঁর শোকোচ্ছ্বাস তীব্র আকারে দেখা দিল।

    সেই সুযোগে অমলের বন্ধুটি ডেথ-সার্টিফিকেটের রহস্য উদ্ঘাটনের চেষ্টা করল। কিন্তু শ্মশান-কর্তৃপক্ষ তাকে আমল দিল না। একজন অজ্ঞাত ব্যক্তির এজাতীয় কৌতূহল মেটাবার সরকারী দায় বোধহয় তাঁদের ছিল না। তখন অমল মনে মনে অনিচ্ছুক হলেও, ব্যাধি এবং তার সঙ্গে জড়িত অন্য দু-একটি বিষয়ের (যেমন হাওড়া স্টেশনে সুঁচ ফোটানো) গুরুত্ব বিবেচনা করে রক্ত পরীক্ষার রিপোর্টখানা পুলিসের গোচরে আনাই তার কর্তব্য বলে মনে করল।

    ইংরেজ-আমলের পুলিস। সরকারী কর্তব্য করতে গিয়ে চাকরির ভাবনা ভাবতে হত না। সুতরাং তৎপরতার অভাব হয়নি। সেই রাত্রেই ডেথ সার্টিফিকেটখানা তাদের দখলে এসে গেল। তার মধ্যে কোনো একটি মারাত্মক রোগের উল্লেখ নিশ্চয়ই ছিল। কিন্তু সেটা প্লেগ নয়। ভোর হবার সঙ্গে সঙ্গেই ডাক্তার মুস্তাফি তাদের হেফাজতে এসে গেলেন। তাঁর অফিস-কামরায় তল্লাশ চালিয়ে যে-সব চিঠিপত্র পাওয়া গেল, তার সূত্র ধরে তারা প্রথমে হানা দিল নিশানাথের গবেষণাগারে এবং তারপর রাজাবাহাদুরের প্রাসাদে। আরেক দল চলে গেল সেই ইনস্টিটিউটের ডিরেক্টরের কাছে এবং বহু চাঞ্চল্যকর তথ্যাদি নিয়ে ফিরে এল। তার ফলে রাজাবাহাদুর এবং নিশানাথ একই দিনে আমাদের আতিথ্য গ্রহণ করলেন।

    সেই চিরস্মরণীয় দিনটির কথা আগেই উল্লেখ করেছি। তদন্ত শেষ করে মামলা দায়ের করতে পুলিসের বহুদিন লেগেছিল। এই সুদীর্ঘ হাজতবাসের প্রতিটি দিন আমি রাজাবাহাদুরের নিকট থেকে নিকটতর সান্নিধ্যে এসেছি আর মুগ্ধ হয়েছি। কার্য-সূত্রে যখনই একনম্বর সেল-ব্লকে যাবার প্রয়োজন হয়েছে, দেখেছি শ্বেতমর্মরে গড়া একটি বিশাল মূর্তি কখনও বসে, কখনও দাঁড়িয়ে, কখনও শুয়ে আছে। শান্ত, মৌনী, অবিচল। দেখামাত্র সৌম্য মুখখানি জুড়ে একটি বিনম্র মৃদু হাসি, তার সঙ্গে দীর্ঘ হাত দুটি তুলে একটি ক্ষুদ্র বিনীত নমস্কার। কোনোদিন তার অন্যথা দেখি নি। নালিশ নেই, অভিযোগ নেই, বিন্দুমাত্র বিরক্তি-প্রকাশ নেই। কুশল প্রশ্নের একটিমাত্র উত্তর, ‘ভালো আছি’। অথচ আমরা তো জানি, এই অভিশপ্ত জীবনের অনভ্যস্ত কৃচ্ছ্রতায় দিন দিন তাঁর স্বাস্থ্য ভেঙে পড়ছিল, ভালো তিনি ছিলেন না।

    হাজত থেকে যেদিন তাঁকে Condemned Cell অর্থাৎ মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত কয়েদীদের সেল-ব্লকে নিয়ে যাওয়া হল, সেদিনও তাঁর মধ্যে কোনো ব্যতিক্রম দেখা যায় নি। পাশের ঘরেই নিশানাথ। তারও ঐ একই দণ্ড। তার চিৎকারে, আবদারে, অভিযোগে আমরা অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিলাম, কিন্তু রাজাবাহাদুর তেমনি নীরব, নিশ্চল। শুধু একটি দিন তাঁকে কিঞ্চিৎ ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখেছিলাম, মুহূর্তের জন্যে একটুখানি ধৈর্যচ্যুতি। ঘটনাটির মধ্যে কিছু মজাও আছে। পাঠকের সেটা উপরি-পাওনা, সুতরাং বলে ফেলা যাক।

    ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেটকে মাঝে মাঝে জেল পরিদর্শনে আসতে হয়। তখন ওখানে ছিলেন একজন শ্বেতাঙ্গ সিভিলিয়ন। বেশ কড়া লোক, তার সঙ্গে একটু বোধহয় ছিটও ছিল। রাজাবাহাদুরের সেল্-এর সামনে গিয়ে যথারীতি জানতে চাইলেন—কোনো নালিশ আছে? তার অনেকদিন আগে ওঁরা দায়রা আদালতের রায়-এর বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আপীল করেছেন। বিচার দূরে থাক, শুনানির দিন পর্যন্ত ধার্য হয় নি। ব্যাপারটা শুধু আশ্চর্য নয়, অভূতপূর্ব। ফাঁসির আসামীর আপীল কখনও এতদিন পড়ে থাকে না। দিনের পর দিন এই অনিশ্চিত অবস্থার মধ্যে কাটানো এক দুঃসহ শাস্তি। তার থেকে যথাসম্ভব তাড়াতাড়ি মুক্তি দেওয়াই হাইকোর্টের চিরাচরিত রীতি। এক্ষেত্রে এই দীর্ঘ বিলম্বের কারণ কি, তাঁরাই বলতে পারেন।

    ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেটের প্রশ্নের সেই মামুলী উত্তরই আমরা আশা করেছিলাম। কিন্তু রাজাবাহাদুরের নিঃসীম সহিষ্ণুতা, সেখানেও রোধহয় একটু ফাটল ধরেছিল। গরাদে দেওয়া রুদ্ধ দরজার সামনে একটু এগিয়ে এসে বললেন, আপনার যদি ক্ষমতা থাকে সাহেব, একটা উপকার করলে বিশেষ বাধিত হবো। মাসের পর মাস ধরে মাধার ওপর যে সোর্ডখানা ঝুলছে, তাকে সোজা ফেলে দিতে বলুন। এছাড়া আমার আর কোনো প্রার্থনা নেই।

    সাহেব আমাদের দিকে তাকালেন। ব্যাপারটা তাঁকে বুঝিয়ে দেয়া হল। কোনো ক না বলে অফিসে চলে এলেন, ওয়ারেন্ট এবং অন্যান্য কাগজ-পত্রাদি দেখলেন, তার ভিজিটরস্ বুক টেনে নিয়ে মামলার একটা সংক্ষিপ্ত বিবরণ দিয়ে শেষের দিকে লিখলেন, কেটি মহামান্য হাইকোর্টের বিচারাধীন। এ বিষয়ে কোনোরকম মন্তব্য করবার অধিকার আমার নেই। কিন্তু এই জাতীয় কোনো পরিস্থিতি পৃথিবীর আর কোনো সভ্য দেশে ঘটেছে . বলে আমার জানা নেই, ঘটতে পারত কিনা সে-বিষয়েও আমি সন্দিহান।

    জেলের নিয়মানুসারে ভিজিটররা যে মন্তব্য করেন, সুপারিন্টেণ্ডেন্টের বক্তব্যসহ তার একটা নকল স্বরাষ্ট্রবিভাগে পাঠাতে হয়। দিন-তিনেক পরে হোম্ মেম্বারের কাছ থেকে ভীষণ জরুরী টেলিফোন, তার মধ্যে রীতিমত সন্ত্রাসের সুর—এ করেছ কি! এই কথাগুলো যদি কোনোরকমে হাইকোর্টের নজরে পড়ে, কালেক্টরকে যে তখনই তোমাদের অতিথি হতে হবে! সিরিয়স্ কনটেমপ্‌ট অব কোর্ট!

    —কি করতে হবে? ততোধিক ভীতকণ্ঠে জিজ্ঞাসা করলেন সুপার

    —ভিজিটরস্ বুকের ঐ পাতাটি এখুনি ছিঁড়ে ফেলে দাও। অফিসে যদি তার নকল থাকে, ডেস্‌ট্রয় অ্যাটওয়ান্স! আমরাও তাই করছি।

    যথাসময়ে অর্থাৎ তার অনেক পরে হাইকোর্টের রায় বেরোল। ডেথ সেটেন্স কমিউটেড টু ট্রানসপোর্টেশন ফর লাইফ। নিশানাথেরও তাই। মৃত্যুদণ্ডের পরিবর্তে যাবজ্জীবন দ্বীপান্তর। ডাক্তার মুস্তাফি আগেই খালাস পেয়েছিলেন।

    “রক্তপরীক্ষার ব্যবস্থা করা হয়েছে, সে খবর আমার আগে জানা ছিল না। তাহলে অবশ্যই তার রিপোর্টের জন্যে অপেক্ষা করতাম। আমার বুদ্ধি-বিবেচনা মতো যে রোগে মৃত্যু বলে মনে হয়েছে, ডেথ সার্টিফিকেটে তারই উল্লেখ করেছি”–

    তাঁর এই উক্তি কোর্ট অবিশ্বাস করে নি।

    নিশানাথ সম্পর্কে বলেছিলেন, “প্রতিভাবান ছাত্র হিসাবে গবেষণার সুবিধার জন্যেই আমি তার জন্যে যা কিছু করেছি। সেখানে থেকে বীজাণু সংগ্রহ করে খুনের উদ্দেশ্যে প্রয়োগ ইত্যাদি ব্যাপার যদি ঘটে থাকে, তার সঙ্গে আমার কোন সংস্রব নেই।”

    এ বিষয়েও দায়রা জজ তাঁকে বেনিফিট্ অব্ ডাউটের সুবিধা দিয়েছিলেন।

    রাজাবাহাদুরকে আন্দামানে পাঠানো হয় নি, ঐ জেলেই ছিলেন। তাঁর সেই পুরনো জায়গায়—একনম্বর সেল-ব্লক। সেখানে বসেই একদিন, হয়তো কোনো দুর্বল মুহূর্তে—যা সকলের জীবনেই আসে—তিনি আমার কাছে তাঁর সমস্ত অপরাধ স্বীকার করেছিলেন। সে কথা এই আখ্যায়িকার গোড়ার দিকে উল্লেখ করেছি। আমার মনের মধ্যে সেদিন যে অসামান্য আবিষ্কারের উল্লাস জেগে উঠেছিল, তাও গোপন রাখি নি। কিন্তু সত্যিই কি আমি তাঁর দুয়ে মানসের রুদ্ধকক্ষে প্রবেশের অধিকার পেয়েছিলাম? মনে আছে, সেদিন তাঁকে কোনো প্রশ্ন করি নি, তার কদিন পরে আমার সাধারণ বুদ্ধিতে যে স্থূল সন্দেহ জেগেছিল, তারই একটু আভাস দিয়েছিলাম। অনেক ইতস্তত করে বলে ফেলেছিলাম, আচ্ছা বৌরাণী এবং ছোটকুমারের আচরণে এমন কিছু কি আপনি দেখেছিলেন, যার থেকে-

    রাজাবাহাদুর কথাটা শেষ করতে দেন নি। তাড়াতাড়ি মাথা নেড়ে দাঁতে জিব কেটে বলেছিলেন, ছিঃ ছিঃ, ওদের সম্বন্ধে একথা ভাবাই যায় না। দুজনেই নিষ্পাপ, পবিত্র।

    তারপর কিছুক্ষণ নীরব থেকে বলেছিলেন, হয়তো সেই জন্যেই আমি ঐ ছেলেটাকে কোনোদিন সইতে পারি নি। ও বড় বেশী শুদ্ধ, বড় বেশী মহৎ। ছেলেবেলা থেকে কোনো কিছুতে আসক্তি নেই, লোভ নেই। সেই সৃষ্টিছাড়া বৈরাগ্য আমাকে উঠতে বসতে পীড়া দিত। কখনও ভুলতে পারি নি, ও আমার অনেক উঁচুতে দাঁড়িয়ে আছে, আমার সাধ্য নেই কোনোদিন সেখানে উঠি। বিয়ে করে যাকে নিয়ে এলাম, সেও আমার নাগালের বাইরে চলে গেল। আমি একেবারে নিঃস্ব হয়ে গেলাম। ওরা যে আমাকে একঘরে করে তাড়িয়ে দিল—কি করে যে আমার দিন কেটেছে, আপনাকে বোঝাতে পারবো না, মিস্টার চৌধুরী।

    আবার কিছুক্ষণের বিরতি। বোধহয় সেই দিনগুলোর মধ্যে ফিরে গিয়ে নতুন করে সেই যন্ত্রণাটা অনুভব করলেন। তেমনি গভীর সুরে বললেন, তারপর যেদিন সব কিছু আমাকে লিখে দিয়ে চলে গেল, আমার কি মনে হল জানেন? মনে হল সম্পত্তি নয়, সোনা-দানা নয়, একতাল কাদা ছুঁড়ে দিয়ে গেল আমার মুখের ওপর।

    —আপনি নিলেন কেন সে সম্পত্তি?

    —নিলাম তার কারণ, না নেবার মতো জোর আমার মধ্যে ছিল না। তাছাড়া আমি না নিলে হয়তো যাকে-তাকে দিয়ে যেত। যে সে আমার পিতৃ-পিতামহের সম্পত্তির অংশীদার হয়ে বসবে, আমার প্রাসাদের অর্ধেক অধিকার দাবি করবে, আমার জীবন থাকতে তা হতে পারে না। তাই নিতে হল, কিন্তু নিয়ে কি একদিনের তরেও স্বস্তি পেয়েছি মনে করেন? কেবলই মনে হত, সে আমাকে চিরদিনের তরে হারিয়ে দিয়ে গেল। সে স্পর্ধা কেমন করে সহ্য করা যায়, বলুন?

    আরেকদিন অন্য কি প্রসঙ্গে বলেছিলেন, আমাকে লোকে বলে রূপবান পুরুষ। রূপ আমার পূর্বপুরুষের দান। ও সেটা পায় নি, তার বদলে এমন একটা halo ছিল ওর মধ্যে দেখতাম আর হাড়ে হাড়ে অনুভব করতাম, তার কাছে আমি কত কুৎসিত! চোখের ওপর একটি চোখ ঝলসানো আলো কতক্ষণ বরদাস্ত করা যায়?

    কোলকাতা এবং তার আশেপাশের জেলগুলোতেই অনেকদিন ধরে ঘুরেছি, লালদীঘির কর্তাদের সেটা খেয়াল হয় নি, যখন হল, মোটা কলমের এক খোঁচায় আমাকে একেবারে দক্ষিণ বাংলার শেষ প্রান্তে ঠেলে দিলেন। বছর কয়েক পরে সেখান থেকে পাঠালেন উত্তরে। তারপর গোটা পূর্বাঞ্চল ঘুরিয়ে দিলেন। এমনি করে তিনদিকব্যাপী দীর্ঘ পরিক্রমা শেষ করে স্বাধীনতার টানে ‘অপটী’-রূপে (optee) আবার পশ্চিম বাংলায় ফিরে এলাম। ততদিন আমার মাথার চুল উজ্জ্বল শ্বেতবর্ণ ধারণ করেছে। কিন্তু রাজাবাহাদুরের রূপ বিস্মৃতির কালিমায় ম্লান হয়ে গেছে। ইতিমধ্যে কয়েক ধাপ উপরে উঠেছি, এবারে একটা বড় সেন্ট্রাল জেলের হাল ধরবার ডাক এসে গেল।

    চার্জ নেবার পরদিন সদলবলে ‘রাউণ্ডে’ চলেছি। দ্বিতীয় শ্রেণীর কয়েদীদের চত্বর পার হয়ে বারান্দায় পড়ে ডানদিকে মোড় নিতে যাব, হঠাৎ সামনের দিকে নজর পড়তেই থমকে দাঁড়ালাম। মুখ থেকে অজ্ঞাতসারে বেরিয়ে গেল—এ কে! নমস্কারের সেই বিশেষ ভঙ্গিটি তেমনি আছে। কিন্তু যে স্নিগ্ধ হাসিটি সেদিন মুহূর্তমধ্যে সমস্ত মুখখানাকে উদ্ভাসিত করে দিত, আজ শুধু কতকগুলো বিকৃত কুঞ্চন দিয়ে তাকে কুৎসিত ও ভয়াবহ করে তুলল। কণ্ঠস্বরের সে গাম্ভীর্যও কোথায় চলে গেছে। কেমন একটা কর্কশ খনখনে আওয়াজ বেরিয়ে এল—চিনতে পাচ্ছেন?

    উত্তর দিতে ভুলে গেলাম।

    আমি তখন অনেকগুলো বছর পার হয়ে সেই দিনটিতে ফিরে গেছি, যেদিন প্রথম এঁকে দেখেছিলাম। সহসা-জ্বলে-ওঠা তড়িৎচমকে আমার স্মৃতিকক্ষের সব অন্ধকার সরিয়ে দিয়ে সামনে এসে দাঁড়াল এক দীর্ঘ, ঋজু, ভাস্বর পুরুষ, যার দিকে তাকিয়ে গিরীনদা বলেছিলেন—Every inch an Aristocrat. তার সঙ্গে এই কঙ্কালের কোনোখানে কোনো মিল নেই। চিনতে যে পেরেছি, সেটাই আমার কাছে বিস্ময়কর বলে মনে হল।

    যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের মেয়াদ কুড়ি বছর। কিন্তু ‘Fourteen years’ rule নামক আইনের বলে রেমিশন সমেত চৌদ্দ বছর পার হলেই সুপারের অভিমত নিয়ে প্রাদেশিক সরকার বেশির ভাগ লোককে ছেড়ে দিয়ে থাকেন। রাজাবাহাদুরকে সে আইনের সুযোগ দেওয়া হয় নি। জেল থেকে যথারীতি সুপারিশ পাঠানো হয়েছিল। সরকার রাজী হন নি। এক বছর পরে কেসটা আবার নতুন করে পাঠাবার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।

    পরের সপ্তাহে খবর এল, রাজাবাহাদুর আমার দর্শন-প্রার্থী। অফিসে নিয়ে আসতে বলে দিলাম। ধীরে ধীরে নুইয়ে-পড়া-দেহটাকে যেন কোনোরকমে টেনে নিয়ে আমার টেবিলের সামনে এসে দাঁড়ালেন। পাশের চেয়ারটা দেখিয়ে বসতে বললাম। খানিকটা ইতস্তত করে সসঙ্কোচে সেটি দখল করলেন। বললাম, বৌরাণী কেমন আছেন?

    —অনেকদিন খবর পাই নি।

    —মাঝে মাঝে দেখা করতে আসেন না?

    —আমিই বারণ করেছি। শুনেছি বেশির ভাগ সময় ঠাকুরঘরেই পড়ে থাকে, তাই আর ডিস্টার্ব করতে চাই নি।

    আর কোনো প্রশ্ন না করে জিজ্ঞাসু-দৃষ্টিতে ওঁর দিকে তাকালাম। ইঙ্গিতটা বুঝলেও আরও কিছু সময় গেল দ্বিধার জড়তা কাটিয়ে উঠতে। তারপর ক্ষীণস্বরে ধীরে ধীরে বললেন, আসতে না আসতেই বিরক্ত করছি, অথচ-

    বললাম, আপনি নিঃসঙ্কোচে বলুন, আমি কিছুমাত্র বিরক্ত হবো না।

    —বেশ বুঝতে পারছি, ডাক এসে গেছে। আর বেশিদিন নেই। তাই ভাবছিলাম, শেষ নিঃশ্বাসটা যদি বাপ-পিতামহের ভিটেয় ফেলতে পারতাম তবু খানিকটা তৃপ্তি হত।

    বলতে যাচ্ছিলাম, ওসব আপনার মিথ্যা আশঙ্কা, সাহস হারাবেন না ইত্যাদি। ওঁর শরীরের দিকে চেয়ে নিরস্ত হলাম। ঐজাতীয় মামুলী সান্ত্বনা অন্য কাউকে দেওয়া যেত, এঁর বেলায় নিরর্থক। শুধু বললাম, আপনার কেস্টা আমি দেখেছি। আমার পক্ষে যতখানি সাধ্য চেষ্টার ত্রুটি করবো না।

    —জানি সেইটুকুই আমার ভরসা।

    কয়েকদিনের মধ্যেই খবর এল মন্ত্রী আসছেন। স্বাধীন রাষ্ট্রের প্রথম মন্ত্রী এবং এ জেলে তাঁর প্রথম পদার্পণ। রাজাবাহাদুরকে বলে পাঠালাম, ঐ ওয়ার্ডে যখন যাবেন, ওঁর প্রার্থনা যেন তাঁর কাছে পেশ করা হয়। তাই হল। এই কুখ্যাত মামলার বীভৎস ইতিহাস মন্ত্রীমহাশয়ের না জানবার কথা নয়। সেই হত্যাকাণ্ডের যে প্রধান নায়ক, তার উপরে কঠোর মনোভাব পোষণ করাই স্বাভাবিক। কিন্তু সেই লোকটার এই পরিণাম বোধহয় তিনি স্বপ্নেও ভাবতে পারেন নি। তার উপরে তার শেষ নিবেদনের বিষয়বস্তু এবং যে ভাষায় ও ভঙ্গিতে সেটা বর্ণিত হল, সবকিছু মিলে তাঁর মনে একটা অনুকূল আবহাওয়ার সৃষ্টি হয়েছে বুঝতে পারলাম। ওখানে একটা সময়োচিত জবাব দিয়ে অফিসে ফিরে গিয়ে বললেন, বিষদাঁত ভেঙে গেছে মনে হচ্ছে। এবার বোধহয় ছেড়ে দেওয়া যায়, আপনি কি বলেন?

    —আজ্ঞে আমারও তাই মনে হয়। Let him have the comfort of dying at home.

    কথাটা আমার রচনা নয়, জেলকোড-এর কোনো একটি ধারার পুনরুক্তি। যে হতভাগ্য বন্দীর জীবনের মেয়াদ শেষ হয়ে এসেছে, কিন্তু জেলের মেয়াদ বাকী, তার বেলায় ঐ আরামটুকু মঞ্জুর করবার বিধান আছে।

    মন্ত্রী বললেন, তাহলে একটা পিটিশন দিতে বলুন, আর তার ওপরে আপনি একটু ভালো করে লিখে-টিখে দিন। তার মধ্যে ঐ কথাটা যেন থাকে—বেরিয়ে গিয়ে আবার একটা কিছু করবার মতো দেহের শক্তি বা মনোবল দুটোই চলে গেছে? অর্থাৎ পুলিস যাকে বলে reversion to further crime—তার কোনো chance নেই।

    দু-দিনের মধ্যে দরখাস্ত চলে গেল, এবং মন্ত্রীমহাশয়ের উপদেশমত আমার সুপারিশের সঙ্গে ঐ বিশেষ মন্তব্যটুকু জুড়ে দেওয়া হল।

    মাসখানেক পরে রাজাবাহাদুর মুক্তি পেলেন। তার আগে ওঁকে নিয়ে যাবার ব্যবস্থা করবার জন্যে জেল থেকে ওঁর দেশের বাড়িতে টেলিগ্রাম পাঠানো হয়েছিল। দুজন পুরনো কর্মচারী এসেছিল—তারা এবং আমার কজন কর্মী ধরাধরি করে ওঁকে গাড়িতে তুলে দিল।

    এর পরের ঘটনাগুলো আমার সংগ্রহ। কিছুটা খবরের কাগজ থেকে, এবং বাকী অংশ একজন পুলিস অফিসার মারফৎ, এ বিষয়ে যাঁর প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা আছে।

    রেলস্টেশন থেকে প্রাসাদে পৌঁছবার পরেও রাদাবাহাদুরকে গাড়ি থেকে ধরে নামাতে হয়েছিল। একতলায় তাঁর নিজস্ব মহলে কোনো একটা ঘরে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেবার পর নানা প্রশ্নের মধ্যে ম্যানেজারকে জিজ্ঞাসা করলেন, আমার বন্দুকগুলো সব আছে তো?

    —আজ্ঞে, সবগুলো নেই। পুলিস লাইসেন্স দিতে চাইল না। কয়েকটা আছে।

    —চল তো দেখি।

    —এখনি যাবেন? খাওয়া-দাওয়ার পর বরং—

    —না, তার আগেই ঘুরে আসি চল।

    লোকজনের কাঁধে ভর করে তেমনি ধীরে ধীরে আর্মারিতে গিয়ে ঢুকলেন। তাঁর প্রথম যৌবনের শিকার-সঙ্গী প্রিয় রাইফেলটা বের করলেন, কয়েকটা রিভলবার নাড়া- চাড়া করে দেখলেন, গুলির বাক্সটাও খুলতে বললেন। ম্যানেজার ছিলেন দরজার বাইরে। তাকে লক্ষ্য করে বার বার অনুযোগ দিতে লাগলেন, এ করেছ কী? সব যে নষ্ট হতে বসেছে!

    এমন সময় বাইরে দাঁড়ানো চাকর-বাকরদের মধ্যে একটু চাঞ্চল্য দেখা দিল। কে যেন বলল, বৌরাণী আসছেন। চক্ষের নিমেষে সেই ভেঙে-পড়া অশক্ত দুর্বল ন্যুব্জ দেহটা সবেগে মাথা তুলে সোজা হয়ে দাঁড়াল, এবং ক্ষিপ্রবেগে দৃঢ় পদক্ষেপে বেরিয়ে এল ঘর থেকে। হাতে রাইফেল, কাঁধে গুলিভর্তি ব্যাণ্ডোলিয়র। বৌরাণী ওদিকের বারান্দা দিয়ে এগিয়ে আসছিলেন—পরনে পট্টবাস, হাতে ঠাকুরের আশীর্বাদী ফুল। চেঁচামেচি শুনে মাথা তুলতেই চোখে পড়ল বন্দুকের নল তাঁরই দিকে উদ্যত। চিৎকার করে একটা থামের আড়ালে সরে গেলেন। গুলি গিয়ে লাগল পেছনের দেয়ালে। ছুটে এগিয়ে গিয়ে আবার নিশানা নিলেন রাজাবাহাদুর, ঠিক সেই মুহূর্তে একটা চেয়ার সজোরে তাঁর পিঠের উপর এসে পড়ল। তিনি মুখথুবড়ে পড়ে গেলেন, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়িয়ে পিছন ফিরে গুলি ছুঁড়লেন। একজন চাকর ছুটে পালাচ্ছিল, পিঠে লাগতেই সে পড়ে গেল। ততক্ষণে দুজন দারোয়ান বন্দুক নিয়ে ছুটে এসেছে। রাজাবাহাদুর গুলি চালাতে চালাতে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে গেলেন।

    থানায় খবর দেওয়া হয়েছিল। ও. সি. ও এসেছিলেন জনকয়েক পুলিস নিয়ে, কিন্তু সেই গুলিবৃষ্টির মুখে এগোতে সাহস করেন নি। সদরে টেলিগ্রাম করে বেশ কিছু আম পুলিস আনিয়ে তারপরে আততায়ীকে আয়ত্তে আনতে পেরেছিলেন। তাও জীবন্ত মানুষটাকে ধরতে পারেন নি, পেয়েছিলেন তার প্রাণহীন দেহ। তার এক পকেটে ছিল সরকার প্রদত্ত মুক্তির আদেশের নকল, আরেক পকেটে এক টুকরো বহুদিনের পুরনো ভাঁজ করা বিবর্ণ কাগজ। তার সম্পূর্ণ পাঠোদ্ধার সম্ভব হয় নি। পুলিস অফিসারের কাছে দু-একটি লাইন যা শুনেছিলাম, তার থেকে বুঝেছি ওটা সেই চিঠি—’ছোটু’র উদ্দেশে বৌরাণীর শেষ সম্ভাষণ।

    আমি রাজাবাহাদুরকে চিনি। যে-চিঠি তাঁর দীর্ঘদিনব্যাপী বহুযত্নরচিত পরিকল্পনাকে সাফল্যের পূর্ব-মুহূর্তে অকস্মাৎ বানচাল করে দিয়েছিল, তাকে তিনি কোনোদিন ভুলতে পারেন না, একথা সহজেই বুঝতে পারি। সে চিঠি যার হাত থেকে বেরিয়েছিল, সে যে-ই হোক, তার বিরুদ্ধে এই আঠারো বছরের সঞ্চিত জিঘাংসা এবং প্রথম সুযোগেই তাকে চরিতার্থ করবার প্রচেষ্টা—এ-সবও আমার কাছে দুর্বোধ্য নয়, কিন্তু বিভিন্ন জেলখানার সজাগ ও সতর্ক দৃষ্টি এড়িয়ে ঐ কাগজটুকু কেন যে তিনি এত বছর ধরে এত যত্নে বয়ে নিয়ে বেড়িয়েছেন—সে রহস্য আজও ভেদ করতে পারি নি।

  • ছয়

    ছয়

    সেকালে কবি এবং কথাশিল্পীর কাজ ছিল রাজার মনোরঞ্জন। একালেও তাই, তবে এক রাজার নয়, বহু রাজার। তখন তাঁর গুণাগুণের বিচার করত রাজ-দরবার, এখন করে জন-দরবার। এ বড় কঠিন ঠাঁই। ‘একটি শ্লোকে স্তুতি গেয়ে’ সে-’রাজার কাছে’ হয়তো কোনো নগরপ্রান্তে একখানি ‘কানন-ঘেরা বাড়ি’ ‘চেয়ে’ নেওয়া যেত। এ রাজার কাছে সে আশা দুরাশা মাত্র। বহু শ্লোকেও এঁর মন গলে না। কখনও কারও ভাগ্যে মন যদি বা গলে, হাত দিয়ে যৎকিঞ্চিৎ দক্ষিণার বেশি আর কিছু গলে না। তবে একটা জিনিস মেলে, ‘ফাংশান’ নামক নাচ-গান-হাস্য-কৌতুকের আসরে একখানি উচ্চাসন, দীর্ঘ উৎসব-সূচীর শীর্ষদেশে একটি নাম—’সভাপতি’ কিংবা ‘প্রধান অতিথি’। ঐ সঙ্গে একটি গাঁদা কিংবা রজনীগন্ধার মালা। তাও ঠিক বিনামূল্যে নয়। বিনিময়ে বিমুখ এবং যথেচ্ছ আলাপরত শ্রোতৃমণ্ডলীর শির লক্ষ্য করে একটি কঠিন বস্তু ছাড়তে হয়, তার নাম ভাষণ

    দৈবক্রমে ‘লেখকে’র গদি যেদিন লাভ করলাম, তারপর থেকে ঐ আসনটিতে আমার মাঝে মাঝে ডাক পড়ে থাকে। সেই সূত্রেই একটা কোনো উপলক্ষে মফঃস্বলের যে শহরটিতে আমাকে যেতে হয়েছিল, কয়েক বছর আগে আমি ছিলাম সেখানকার বৃহৎ জেলখানার কর্ণধার। সেই বহু-পরিচিত সু-উচ্চ পাঁচিলের পাশ দিয়ে পথ। গাড়িখানা যখন একরাশ ধুলো উড়িয়ে দ্রুতবেগে তাকে ছাড়িয়ে চলে গেল, নিজের অজান্তে একবার পিছন ফিরে তাকালাম। ঐ পাষাণ-বেষ্টনীর অন্তরালে জীবনের যে অধ্যায়টা একদিন ফেলে গিয়েছিলাম, তার ভিতরকার অনেকগুলো মুখ সহসা এসে মনের দুয়ারে ভিড় করে দাঁড়াল। দেখলাম, সেখানেও বহু ধুলো জমে গেছে। কোনোটিকেই ঠিক ঠাহর করা যাচ্ছে না। অথচ সেদিন এত বড় দুনিয়া থেকে আলাদা ঐ ঘেরা জায়গাটুকুই ছিল আমার জগৎ। ওর ভিতরে জড়ো-করা একদল বিশেষ শ্রেণীর জীব নিয়েই গড়ে উঠেছিল আমার মানসলোক। তাদের প্রাত্যহিক জীবনযাত্রার ছোট ও বড় বহু সমস্যা আমার ধ্যান ও কর্মের প্রায় সবখানি দখল করে রেখেছিল। মাঝখানে এই সামান্য কটা বছরের ব্যবধান, এরই মধ্যে সেখান থেকে তারা সরে গেছে, কিংবা বলা যেতে পারে, হটে গেছে। আর কিছুদিন পরে ঐ ধূলি-মলিন অস্পষ্ট কায়াগুলো হয়তো একেবারেই লুপ্ত হয়ে যাবে।

    গিরীনদা বলতেন, মানুষের মন বড় অকৃতজ্ঞ। আজ যারা তার খাদ্য যোগায়, সর্বক্ষণ তাকে সঙ্গ দেয়, তার ভাবনা-অনুভূতি আনন্দ-বেদনার সঙ্গে অচ্ছেদ্য বন্ধনে জড়িয়ে থাকে, দু-দিন যেতে না যেতেই তাদের দিকে সে ফিরেও তাকায় না। তখন সে কোনো নতুনের প্রেমে মশগুল। কালক্রমে সে নতুনও কোথায় মিলিয়ে যায়, দেখা দেয় ‘নতুন-তর’।

    সত্যিই তাই। ‘মনের’ মন পাওয়া বড় দুষ্কর। সে চির-চঞ্চল। এক আসন থেকে আরেক আসনে সতত-সঞ্চরমাণ। কারও প্রতি পক্ষপাতিত্বের বালাই নেই। মধুকর-বৃত্তিই তার ধর্ম।

    ‘দুই বিঘা জমি’র ভূতপূর্ব মালিক হতভাগ্য ‘উপেন’ দীর্ঘকাল পরে সন্ন্যাসী-বেশে একদিন যখন তার ‘সপ্তপুরুষ যেথায় মানুষ’ সেই পুরনো মাটিতে ফিরে এসে দাঁড়াল, সবিস্ময়ে চেয়ে দেখল—’কোথায় তার সে জমি। কোনোখানে লেশ নাহি অবশেষ সেদিনের কোনো চিহ্ন।’ সেদিন ক্ষোভে, দুঃখে-বেদনায় সেই ‘নিলাজ কুলটা ভূমিকে’ সে বারংবার ধিক্কার দিয়েছিল। আমার এই মনটা কি তার চেয়ে নির্লজ্জ নয়? তবু কোনো ধিক্কারের সুর আমার কণ্ঠে বাজল না। ক্ষোভ এবং বিস্ময়ের যে সূক্ষ্ম বাষ্পজাল ক্ষণেকের তরে মনশ্চক্রবালে দেখা দিয়েছিল, তাকেও উড়িয়ে দেবার চেষ্টা করলাম। নিজেকে বোঝালাম পিছনপানে না তাকিয়ে নিয়ত এগিয়ে যাওয়াই তো সজীব মনের পরিচয়। অতীতের স্মৃতিভারে নুয়ে পড়াটাই মানসিক অবক্ষয় বা ‘ডেকাসেন্সের’ লক্ষণ

    সোজা হয়ে বসে সামনের দিকে তাকালাম। পশ্চাৎমুখী ঝিমিয়ে পড়া চিন্তার স্রোতকে টেনে নিয়ে এলাম আসন্ন কর্মধারার পথে। যে কাজে এসেছি, যে গৌরবময় গুরু দায়িত্ব- ভার এই মুহূর্তে আমার জন্যে অপেক্ষা করে আছে, তারই দিকে নিজেকে সজাগ করে তুললাম।

    তবু চলতে চলতে অন্তরের কোন্ কোণে কিসের একটা কাঁটা যেন খচ্ খচ্ করে বিঁধতে লাগল। যে কালো পাঁচিলটাকে পিছনে ফেলে এলাম, সে যেন সমস্ত পথটা আমাকে নিঃশব্দে অনুসরণ করে চলল, দূরে ঠেলে দিতে চাইলেও গেল না।

    যে প্রতিষ্ঠানের আমন্ত্রণে সভাস্থলে ছুটেছি, তার সুযোগ্য সম্পাদক আমার পাশেই বসেছিলেন। এতদিন ধরে তাঁদের এখানে যা কিছু গড়ে উঠেছে, এবং আজকের এই অনুষ্ঠানের যত কিছু আয়োজন, সবই যে তাঁর একক প্রচেষ্টার ফল, সেই সম্বন্ধে একটি দীর্ঘ ধারা-বিবরণী তিনি সগর্বে এবং সবিনয়ে আমার কর্ণমূলে পরিবেশন করে চলেছিলেন। আমি কিছুই শুনছিলাম না; মাঝে মাঝে শুধু মাথা নেড়ে দু-চারটা ‘ও’, ‘আচ্ছা’ ‘তাই নাকি’ যোগ করে যাচ্ছিলাম। মাঝপথে ঐ জেলের পাঁচিলটার অলক্ষ্য অনুসরণ বোধহয় আমাকে একটু আনমনা করে দিয়ে থাকবে। সম্পাদক সেটা লক্ষ্য করলেন। কি ভাবলেন জানি না, ক্ষণেকের তরে গাড়ির বাইরে দৃষ্টি বুলিয়ে নিয়ে বললেন, আপনার পুরনো কর্মস্থল ফেলে এলাম, দেখে যাবেন নাকি একবার?

    —কী আর দেখবো? তাছাড়া সময়ই বা কই?

    —তাই তো, কাল ভোরেই যে আপনাকে ছেড়ে দিতে হবে। কত কাজ আপনার। কত জায়গায় যেতে হয়। এত ব্যস্ততার মধ্যেও একটি দিনের জন্যে আপনাকে আমরা পেলাম, সেটাই আমাদের পরম সৌভাগ্য।

    স্তুতিবাদটুকু উপভোগ করলেও প্রতিবাদ-সূচক একটা কি জবাব দিতে যাচ্ছিলাম, তার আগেই গাড়িটা সভামঞ্চের গেট্‌-এ এসে থামল এবং আমাকে নামিয়ে নেবার জন্যে কর্তৃস্থানীয় ব্যক্তিরা চঞ্চল হয়ে উঠলেন।

    তারপর যেমন হয়ে থাকে, বারকয়েক আলো নেভা ও মাইক-বিভ্রাট। তারই মধ্যে সভার কাজ শেষ হল, শুরু হল নাটক। সেটা বেশ ভালোই লাগছিল, বিশেষ করে অভিনয়, সাজ-পোশাক এবং পরিচালনার ছোটখাটো ত্রুটিগুলো—মফঃস্বলের নাটমঞ্চে ঐগুলোই বেশি উপভোগ্য, ওখানে যাঁরা নিখুঁত’-এর আশা নিয়ে যান এবং না পেলে মন খুঁত খুঁত করেন তাঁদের ঠকতে হবে। খুঁতের মধ্যেই তো রস। ড্রপটা যদি দু-একবার মাঝপথে আটকে না যায়, চন্দ্রবাবুর দাড়ি কিংবা রসিকদাদার গোঁফ যদি আগাগোড়া স্বস্থানে অটুট থাকে, অভিনেতারা মাঝে মাঝে পার্ট ভুলে গিয়ে প্রশ্টারের পানে ফ্যাল্ ফ্যাল্ করে না তাকায়, তাহলে আর শখের থিয়েটার দেখে সুখ কোথায়? নাট্যকলার সঙ্গে এই সব মজাদার আনুষঙ্গিকগুলোকে সমভাবে উপভোগ করতে আমার কোনোদিন বাধে না। তাই এই জাতীয় অনুষ্ঠান থেকে বরাবরই যথার্থ আনন্দ পেয়ে থাকি।

    আজও পাচ্ছিলাম, এবং মনের দিক থেকে মাঝপথে উঠে পড়বার কোনো তাগিদ ছিল না। কিন্তু এদিকে যে আবার ভি. আই. পি. সেজে বসে আছি, এই সব অসার বস্তুর পিছনে মন ও সময়ের একটি ক্ষুদ্র অংশের বেশি ব্যয় করা চলে না, পদ-মর্যাদায় বাধে। একটি অঙ্ক, শেষ হতে না হতেই আশেপাশের আসনগুলো ফাঁকা হতে লাগল। বৃহৎব্যক্তিরা একে একে সবিনয়ে বিদায় নিচ্ছেন। আমিও তো সেই দলে—সুতরাং আর বসে থাকাটা শোভা পায় না।

    বিয়ে-বাড়ির সাধারণ ভোজের আসরে যদু-মধুদের মধ্যে বসে অতি-বিশিষ্ট অতিথি যদি শাকভাজা থেকে মিঠে পান পর্যন্ত গোটা পর্বটা চালাতে থাকেন, সেটা তাঁর পক্ষে অতিশয় বেমানান। পেটে ক্ষিদে এবং জিভে লোভ যতই থাক, মুখে লাজ না দেখিয়ে উপায় নেই। বাড়ির কর্তাও মনে মনে তাই চান। মহামান্য অতিথিকে আলাদা কোথাও বসিয়ে গোটা দুই সন্দেশ, একটু দই এবং তার সঙ্গে প্রচুর মৌখিক আপ্যায়ন দিয়ে তাড়াতাড়ি বিদায় করে দেন। এই সব সাংস্কৃতিক আসরের রীতিনীতিও তাই। বিশেষ ভাবে আমন্ত্রিত খ্যাতিমান ব্যক্তির বেলায় সংক্ষিপ্ত ভোজের ব্যবস্থা। শুধু অগ্রভাগ, বাকীটা অর্থাৎ উদ্বোধন থেকে উপসংহার পর্যন্ত বিস্তৃত যে বৃহৎ, প্রোগ্রাম, তা রইল অবৃহৎ ইতরজনের ভাগে।

    অতএব উঠে পড়লাম। উঁচু মহলের উদ্যোক্তাদের মুখে খুশির আভাস ফুটে উঠল। তাঁরাও যাবার জন্যে প্রস্তুত। আগেই যেতেন, ‘প্রধান অতিথি’কে ফেলে যাওয়াটা সৌজন্যে বাধছিল। এবং অপ্রধানজনিত আচরণে ভিতরে ভিতরে হয়তো অস্বস্তি বোধ করছিলেন। নীচের মহল, অর্থাৎ যারা সাক্ষাৎভাবে জড়িত— আয়োজক, শিল্পীগোষ্ঠী, তারা মনে মনে ক্ষুণ্ণ হল, যদিও মুখে সেটা প্রকাশ করতে সাহস করল না। ‘কষ্ট করে’ এতক্ষণ যে ছিলাম, সেটাই তো তাদের পরম ভাগ্য।

    সামিয়ানার বাইরে বেরোতেই অভিলাষবাবুর সঙ্গে দেখা। মুখ থেকে আপনা হতেই বেরিয়ে গেল—আপনি এখানে!

    তিনি হেসে বললেন—অবাক হবার কথাই। তবে যা মনে করছেন, তা নয়, বক্তৃতা শুনতে বা নাটক দেখতে আসি নি।

    —সেই কথাই ভাবছি। ওসব দুর্বলতা তো আপনার কোনো কালেই ছিল না।

    —দুর্বলতা নয় স্যার, বলতে পারেন অক্ষমতা। প্রথমটা বুঝি না, দ্বিতীয়টায় রস পাই না। এসেছি প্রাণের দায়ে। আপনাকে আমার ভয়ানক দরকার।

    —আমাকে!

    —হ্যাঁ, আপনি যা হয়েছেন তাঁকে নয়, আপনি যা ছিলেন তাঁকে।

    বুঝলাম, ভদ্রলোক আবার একটা কোনো ফ্যাসাদে পড়েছেন।

    অভিলাষবাবুর সঙ্গে পরিচয় আমার অনেক দিনের। একাধিক জেলে একসঙ্গে কাজ করেছি। উনি এক ধাপ নীচে ছিলেন আমার চেয়ে। সেটা নিছক অফিস-গত সম্পর্ক। তার বাইরে আমরা বরাবর বন্ধু। অবশ্য অফিসের বাইরে ওঁকে পাওয়াই ছিল দুরূহ ব্যাপার। ঢুকতেন সকলের আগে, আর বেরোতেন সকলের পরে। বেরনো মানে গেট পেরিয়ে কয়েক পা হেঁটে বাসায় গিয়ে বসা। সেটুকুও করতো ওঁর দেহ, মন থেকে যেত গেটের ভিতরে। অর্থাৎ কয়েক ঘণ্টার জন্যে জেল ছেড়ে এলেও জেল ওঁকে ছাড়ত না, সিন্ধবাদ হয়ে ঘাড়ের উপর চেপে বসে থাকত। ভদ্রলোকের চিন্তা-ভাবনা আলাপ-আলোচনার পরিধিটাকে তার চার দেয়ালের বাইরে বড় একটা যেতে দিত না, গেলেও তখনি আবার ফিরিয়ে নিয়ে আসত।

    নিজের সংসারের সঙ্গে অভিলাষবাবুর সম্পর্ক ছিল একমাত্র আর্থিক। সেটা চুকে যেত প্রতিমাসের পয়লা তারিখে—মাইনের টাকা কটি যখন স্ত্রীর হাতে এনে দিতেন। – বাকী যা কিছু, তার সব ভার ভদ্রমহিলা একাই বহন করতেন। না পারলে বা কোনোখানে আটকে গেলে স্বামীকে কখনও ঘাঁটাতেন না, জানতেন সেটা বৃথা—তাঁর সহকর্মীদের সাহায্য নিতেন। সেই সূত্রে ওদের পারিবারিক জটিলতার জট ছাড়াতে মাঝে মাঝে আমার ডাক পড়ত।

    একদিনের একটি ছোট্ট ঘটনা মনে পড়ছে। সকালে অফিস যাবার জন্যে তৈরি হচ্ছি, অভিলাষবাবুর আট বছরের মেয়ে পুঁটি এল ছুটতে ছুটতে। কিছু জিজ্ঞাসা করবার আগেই গম্ভীর মুখ করে চুপি চুপি খবর দিল, ‘দাদা কাল বাড়ি আসে নি। মা বললে, তোর জ্যাঠামশাইকে বলে আয়। আর—’

    পরের অংশটুকু আন্দাজে বুঝে নিয়ে বললাম—মাকে গিয়ে বল, আমি যাবার সময় দেখা করে যাব।

    মাঝে মাঝে বাড়ি না-ফেরার পালা এই ‘দাদাটির পক্ষে নতুন নয়। সম্প্রতি যে পথ সে ধরেছিল, সেখানেও তাকে একা বলা চলে না। আশেপাশের বাড়িগুলো খুঁজলে কৈশোর থেকে যৌবনের প্রথমাঙ্কে যারা পা দিয়েছে, তাদের মধ্যে ঐ রকম ‘দাদা’ বেশ কয়েকটি পাওয়া যাবে। কেউ প্রকাশ্য, কেউ প্রচ্ছন্ন। কেউ একটু বেশি এগিয়ে গেছে, কেউ ততটা পেরে ওঠে নি। মৌলিক কারণটা প্রায় সাধারণ, অর্থাৎ সকলের বেলাতেই মোটামুটি এক।

    জেলের মাটিতে, অর্থাৎ তাকে কেন্দ্র করে তৈরি যে উপনিবেশ, যার সরকারী আখ্যা জেল-কোয়ার্টার্স, সেইখানে ওদের জন্ম। জন্মাবার পরেই যে বাতাসে ওরা নিঃশ্বাস নেয়, বিশেষ অণুবীক্ষণ দিয়ে দেখলে ধরা পড়বে, তার মধ্যে এক ধরনের বিষাক্ত বীজাণু ভেসে বেড়াচ্ছে। তারা আকারে ছোটবড়, প্রকারেও বহুবিধ, সমষ্টিগত নাম ‘ক্রাইম’। সংক্রমণের দিক থেকে যক্ষ্মা বা বসন্তের চেয়ে কিছুমাত্র কম মারাত্মক নয়। কারণ এদের আক্রমণ দেহস্তরে নয়, দেহকে ভেদ করে পৌঁছে যায় মনের মজ্জায়, বাসা বাঁধে চরিত্রের অস্থিমূলে। সেই বিষে যারা আক্রান্ত এবং অনেক ক্ষেত্রে জর্জর, তেমনি একদল মসিচিহ্নিত প্রাণীর ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে ও সংস্পর্শে ওখানকার ছেলেমেয়েগুলো মানুষ হয় অর্থাৎ বেড়ে ওঠে। কী হয়, সে কথা অনুক্ত থাকাই বাঞ্ছনীয়।

    প্রশ্ন উঠবে—অতবড় পাঁচিল পেরিয়ে সংস্পর্শটা ঘটে কেমন করে? নানা ভাবে ঘটে। এক নম্বর—অলক্ষ্যে, মনস্তরে। নিজেদের অজ্ঞাতে ঐ ‘দাদাদের’ বাবা-কাকারাই জেল- ফটক থেকে প্রতি নির্গমে বীজাণুগুলো বয়ে নিয়ে আসেন এবং তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গি, মানসিক প্রবণতা, আলাপ-আলোচনা, অভ্যাস ও আচার-আচরণের ভিতর দিয়ে সেই বিষ অন্তঃপুরে সঞ্চারিত হয়। বেচারা বাবা-কাকাদের দোষ দেওয়া যায় না। জেলকে ঘিরেই তাঁদের জীবন। সৌরমণ্ডলের কেন্দ্র ঐ কালো পাঁচিল এবং তার ভিতরকার জীবনধারা, তাঁরা হলেন গ্রহ-উপগ্রহ। পরিক্রমার বিরাম নেই। সূর্যোদয়ের বহু আগে শুরু, সূর্যাস্তের বহু পরে শেষ। মাঝখানে কিছুক্ষণ মাধ্যাহ্নিক বিরতি। তাও নির্বিঘ্ন বা নিরবচ্ছিন্ন নয়।

    ‘বেলা দ্বিপ্রহরে’ বাসায় ফিরে ধড়া-চূড়া ছেড়ে সবে দু-মগ জল মাথায় ঢেলেছেন কি ঢালেন নি, দরজার ওপার থেকে ফেটে পড়ল ‘গেট ফালতুর’ পরিচিত কণ্ঠ—’কাছারি সে টেলিফুক আয়া হুজুর’; কিংবা তার চেয়েও মারাত্মক মেসেজ—’একঠো ভিজিটর বাবু অফিসমে বৈঠল বা। অর্থাৎ তখনি আবার ছুটতে হবে। ভিজিটরবাবুকে বেশিক্ষণ বসিয়ে রাখলে চাকরি নিয়ে টানাটানি।

    ‘রাত্রি দ্বিপ্রহরেও’ নিস্তার নেই। গাঢ় নিদ্রার নাসিকা গর্জন থমকে থেমে যাবে নাইট ডিউটি দেশোয়ালী জমাদারের বাঁজখাই গলার জরুরী আহ্বানে—’ডিভিজন সে বিশঠো আসামী চালান আয়া, জলদি আইয়ে।’ রাত দশটায় ট্রেন থেকে নেমেছে তারা। তিন মাইল পথ হাঁটিয়ে নিয়ে জেল-গেটে পৌঁছতে বারোটা তো বাজবেই।’ ছোট সাব ডিভিশনের এক-কামরাওয়ালা জেল। অত লোকের জায়গা নেই। কোর্ট থেকে আসা মাত্র রওনা করে দিয়েছে ডিস্ট্রিক্ট কিংবা সেন্ট্রাল জেলে। ওয়ারেন্ট ইত্যাদি পরীক্ষা না করে ‘রিসিভ’ করা যাবে না। অতএব ‘বোলাও ডেপুটিবাবুকো’। কেননা এটা ডেপুটি জেলারের বিশেষ দায়িত্ব। রামের বদলে শ্যাম এল কিনা, দলিলপত্র ঠিক আছে কিনা—সব দেখেশুনে নিতে হবে তাঁকেই।

    বন্দিশালার পরিধির বাইরেও যে একটা বিস্তীর্ণ জগৎ আছে, সেখানকার অতি সামান্য সাড়াই এদের কানে এসে পৌঁছায়। সব অকর্ষণ সব যোগাযোগ থেকে হাত, পা, চোখ, কান ইত্যাদি ইন্দ্রিয়গুলো গুটিয়ে এনে এরা কর্মের মতো আত্মনিবদ্ধ। তারই মতো শ্লথগতি। একটা সুনির্দিষ্ট সংকীর্ণ পথ ধরে গুটি গুটি যাওয়া এবং আসার মধ্যেই দৈনন্দিন জীবন সীমাবদ্ধ। প্রাত্যহিক চিন্তাধারা এবং পারিবারিক কথাবার্তার বিষয়বস্তু যে সেই চিহ্নিত সীমাকে ছাড়িয়ে যাবে, তার সম্ভাবনা কোথায়? এদের যারা বংশধর, তারাও ঐ আবহাওয়ার ভিতরে বসে ঐভাবেই ভাবান্বিত হয়ে উঠবে, তাতে আর আশ্চর্য কি?

    দু-নম্বর সংযোগটা আরও স্পষ্ট এবং প্রত্যক্ষ। সেখানে জীবাণুবহনের বাহন হল ‘জলভরি দফা’ নামক কয়েদীযূথ, জেল-কোড়-এর পরিভাষায় ‘ওয়াটার-ক্যারিং গ্যাঙ্’। নেহাৎ ঐতিহাসিক প্রয়োজনেই তার সৃষ্টি। সেই ইতিহাসটুকু সংক্ষেপে ব্যক্ত করা যাক।

    ইংরেজরাজ যখন জিলায় জিলায় ফৌজদারী আদালতের পত্তন করলেন, তার পিছনে একটা করে জেলও জুড়ে দিতে হল। দুয়ের মধ্যে সম্পর্কটা অঙ্গাঙ্গী হলেও, অবস্থানটা ঠিক পাশাপাশি হল না। জেল মানে বৃহৎ ব্যাপার। অনেক লোকের স্থায়ী আস্তানা, অর্থাৎ বড় বড় ব্যারাক, তাদের খাবার-দাবার, কাপড়চোপড়ের গুদাম, কাজ করবার খাটনী ঘর, হাসপাতাল এবং অনেক কিছু। এই গেল এক দিক। আরেক দিকে এই সব বিশেষ ব্যক্তিদের রক্ষণাবেক্ষণ এবং খবরদারির আয়োজনটাও কম বিপুল নয়। সেখানেও অনেক লোকের সমাবেশ। সাধারণ রক্ষী থেকে মুখ্য শাসক, মাঝখানে নানা স্তর এবং বিবিধ শ্রেণী। কারাগার এমন একটি প্রতিষ্ঠান, যার সুষ্ঠু পরিচালনার জন্যে পরিচালক-গোষ্ঠীর সর্বক্ষণের সান্নিধ্য প্রয়োজন। অর্থাৎ ‘জেল’ মানে শুধু বন্দিশালা নয়, তার চারদিক ঘিরে তার রক্ষক, পালক ও তদন্তকারীদের ছোট-বড় বাসস্থান। সব মিলিয়ে একটি নাতিবৃহৎ জনপদ। তার জন্যে জায়গা চাই, শহর যা দিতে অক্ষম, তাই কোর্টের পাশে, শহরের মধ্যে তার থাকা চলে না, সরে যেতে হল উপকণ্ঠে।

    যে কোন বসতির প্রাথমিক প্রয়োজন জল। শহরে তার যোগান দেয় মিউনিসিপ্যালিটি। আজকের দিনে কোথাও কোথাও শহরতলীর ভারও সে নিয়ে থাকে। কিন্তু তখনকার দিনে শহরের বাইরে, বিশেষ করে জেলখানার মতো বৃহৎ গোষ্ঠীর রাক্ষুসে পিপাসা মেটাবার মতো সামর্থ্য কোনো পৌরসংস্থার ছিল না। জেলকে তাই পুকুর কেটে, পাতকুয়ো খুঁড়ে নিজের ব্যবস্থা নিজেকেই করতে হয়েছিল। আভ্যন্তরীণ সরবরাহে কোনো অসুবিধায় পড়তে হয় নি। পাঁচিলের মধ্যে জনবলের অভাব ছিল না। কিন্তু মুশকিল দেখা দিল বাইরে। সেখানেও প্রয়োজনের পরিমাণ প্রচুর। সেটা নলকূপের যুগ নয়, তাহলে হয়তো এখানে সেখানে তারই গোটাকয়েক বসিয়ে দিয়ে কাজ চলে যেত। কিন্তু অনেকখানি দূরে একটা বা দুটো পাতকুয়ো থেকে পারিবারিক চাহিদামত জল-সংগ্রহের ব্যাপারটা কর্মীদের পক্ষে দুরূহ হয়ে দাঁড়াল। বাধ্য হয়ে সরকারই তার সুরাহা করে দিলেন। জেলের ভিতর থেকে বেরিয়ে এল একদল জাঙ্গিয়া-কুর্তা-পরা ‘পানি-পাঁড়ে’। ঘরে ঘরে জলদানের পুণ্য কর্মটি তাদের ‘রিগারাস ইমপ্রিজনমেন্ট’ অর্থাৎ কঠোর কারাদণ্ডের অন্তর্ভুক্ত করে নেওয়া হল। যে-সব কয়েদীর মেয়াদ এক বছর বা তার চেয়ে কম, কিংবা দীর্ঘতর-মেয়াদী হলেও ওর বেশি যাদের বাকী নেই, তাদের ভিতর থেকে বেছে বেছে তৈরী হল ‘একস্ট্রা-মিউরাল গ্যাঙ’, অর্থাৎ প্রয়োজনমত তারা প্রাচীরের বাইরে যাবার অধিকারী। অতঃপর তারা পায়ে একটা করে লোহার মল পরে দলবদ্ধভাবে একজন সিপাই-এর জিম্মায় গেটের বাইরে জেলবাবুদের বাসায় বাসায় জল যোগাতে লাগল। ইংরেজি নামটা রইল খাতাপত্রে। সম্ভবত ঐ সিপাইরাই ওদের নতুন নামকরণ করল—’জলভরি’ বা ‘পানি-দফা’। কড়া আদেশ জারি হল—গোটা গ্যাঙটাকে এক বাড়ি থেকে আরেক বাড়ি ‘মার্চ’ করিয়ে নিয়ে যেতে হবে, কেউ কখনও কোনো অবস্থাতেই যূথভ্রষ্ট হতে পারবে না। অন্যথায় সংশ্লিষ্ট কয়েদী তো বটেই, ভারপ্রাপ্ত সিপাইও দণ্ডনীয়।

    এই ব্যবস্থা যেদিন প্রবর্তিত হল, তারপর দীর্ঘকাল চলে গেল, প্রায় সবখানেই শহর বেড়ে বেড়ে জেলকে তার আওতার মধ্যে নিয়ে এসেছে এবং তার জল সরবরাহের দায়িত্ব ক্রমে ক্রমে চলে গেছে মিউনিসিপ্যাল কর্তৃপক্ষের হাতে। কোথাও কোথাও জেল- পল্লীর বাসায় বাসায় পাইপ বসে গেছে। কল ঘোরালেই জল। দূর থেকে বয়ে আনবার প্রয়োজন নেই। তবু ‘জলভরি’ রয়ে গেছে; যদিও জল আর তারা ভরে না। লম্বা কালো বড় বড় লৌহ-পিপার আংটায় বাঁশ চালিয়ে জোড়ায় জোড়ায় গোটা দলটা এ-বাড়ি থেকে ও-বাড়ি মার্চ করে চলেছে—এই বহু পুরাতন দৃশ্যটি আর চোখে পড়ে না। গেট পর্যন্ত অটুট গ্যাঙ, বেরিয়েই দুজন একজন করে ছড়িয়ে পড়ে বাসায় বাসায়। কে কোন্ বাসার কয়েদী তাও ঠিক করা আছে। সেখানে তাদের অনেক কাজ। বাসন মাজা, ঘর ঝাঁট দেওয়া, বিছানা করা, আসবাবপত্তর ঝাড়া মোছা, রান্নাবান্নার যোগাড় দেওয়া এবং গৃহিণী যখন অন্যত্র আটকা থাকেন, তাঁর কচি শিশুটিকে আগলে রাখা। অনুগত গৃহভৃত্য, কিন্তু অবৈতনিক। সেদিক থেকে গৃহস্থ হয়তো কিঞ্চিৎ লাভবান, কিন্তু অলক্ষ্যে অগোচরে যে লোকসান ঘটে চলেছে, তার পরিমাণ ঐ ‘লাভে’র চেয়ে অনেক বেশি। সেটি হচ্ছে বহু নিষ্পাপ অপরিণত মনে ‘ক্রাইম’ নামক সংক্রামক ব্যাধির অনুপ্রবেশ। যেজন্যে জলভরি দফার সৃষ্টি হয়েছিল, সে দরকার মিটে গেছে। জলের বদলে আজ তারা জেলবাবুদের ঘরে ঘরে বিষ ভরে দেয়। শুরুটা প্রায়ই সামান্য। বারো বছরের ছেলের পকেটে হঠাৎ গোটা দুই সিগারেটের অবির্ভাব, তার সদ্য-যৌবন-প্রাপ্তা দিদির আঁচলে এক টুকরো উচ্ছ্বাসময় চিঠির আবিষ্কার কিংবা তাদের বাবার ব্যাগ থেকে কয়েক আনা পয়সার অন্তর্ধান। কোনোটারই হয়তো কোনো নিজস্ব গুরুত্ব নেই। বিচলিত হবার মতো কিছু নয়। কিন্তু এই তুচ্ছ সূচনাই বড় হয়ে হয়ে একদিন অনেক পরিবারের মূল ধরে নাড়া দিয়েছে, সে দৃশ্য আমি নিজের চোখে দেখেছি। অপরাধ ও অধঃপতনের পথ বড় মসৃণ। তার প্রথম ধাপগুলো আপাত-রমণীয় প্রলোভনের রঙে রঙিন। একটি বিশেষ বয়সের কাছে তাদের নিয়ত হাতছানি প্রায় অপ্রতিরোধ্য। অভিলাষবাবুর ছেলের মতো আরও কত ছেলে তার টানে ভেসে চলে গেছে, কে তার খবর রাখে?

    এমনি একটি ‘ছেলের’—সম্ভবত তখন আর সে ‘ছেলে’ নেই—একখানি চিঠি আমি কোনদিন ভুলতে পারবো না। ‘লৌহকপাট’-এর অর্গল খুলে দিয়ে সবে তখন কারা- শাসক থেকে লেখকের পদে উন্নীত হয়েছি। অভিনন্দনের স্রোত বইছে। সকালের ডাক খুলতেই মধুস্রাবী ভাষায় রাশি রাশি মনোরম প্রশস্তি :-”আপনার দরদী মনের পরিচয় পেয়ে মুগ্ধ হলাম”, “আপনি অমানুষের ভিতরে মানুষের সন্ধান পেয়েছেন”, “সমাজের নীচের তলায় যুগ যুগ ধরে যারা মূক হয়ে ছিল, আপনি তাদের কণ্ঠে ভাষা দিয়েছেন” ইত্যাদি ইত্যাদি। একদিন একখানা অচেনা হাতের একপাতা চিঠির প্রথম কয়েক লাইনে চোখ বুলিয়েই প্রচণ্ড এক ধাক্কা খেলাম। ক্ষুদ্র একটা ‘অন্তর্দেশীয়ের’ অন্তরে এত বড় মুষল লুকানো ছিল, কে ভেবেছিল?

    চিঠিখানা আমার কাছে নেই। হুবহু প্রতিলিপি দিতে পারছি না। সুর এবং উক্তি অনেকটা এই রকম—রাস্তার মোড়ে যখন চোর ধরা পড়ে, তার কপালে জোটে পাইকারী মার। সত্যি চোর কিনা, কী চুরি করল, সেটুকুও কেউ ভেবে দেখে না। সেই লোকটাই যখন জেলে যায়, তাকে দেখে লোকে আহা-উহু করে, তখন সে কয়েদী—বন্দী। বন্দীর জন্যে মানুষের কত দরদ, কত চোখের জল! তার কারণ বুঝি। তারা যে কী ভয়ঙ্কর চীজ, সাধারণ লোকে জানে না। কিন্তু আপনি? আপনি তো জানেন, কতজনের কত সর্বনাশ করে তারা জেলে আসে। আসবার পরে যে সর্বনাশ করে, তা-ও আপনি দেখেছেন নিশ্চয়। ‘জেলখানার ছেলে’ বলে যে একটা আলাদা জাত আছে, তা কি আপনি শোনেন নি? তাদের ছোঁয়াচ পাছে নিজেদের ছেলেপিলের গায়ে লাগে, আশেপাশের ভদ্রলোকেরা সেই ভয়ে সজাগ, তাও আপনার চোখে না পড়বার কথা নয়। কিন্তু কেন তারা ‘মন্দ’ ছাপ মেখে গোড়া থেকেই ‘মন্দের’ পথ ধরে, সে খবরটা বাইরের লোকে না জানতে পারে, আপনিও কি না জানবার ভান করছেন? তা যদি না হবে, সেই সত্যি কথাটা স্পষ্ট ভাষায় প্রকাশ করবার বাধা কোথায়? হয়তো সে সাহস আপনার নেই। কিংবা হয়তো মনে করছেন, তাতে করে বাহবা পাবার সুবিধা নেই। তাই জেলখানার চোর-ডাকাত, গুণ্ডা- বদমাশের কল্পিত দুঃখের বানানো কাহিনী দিয়ে আসর মাত করছেন, তারই হাতার মধ্যে বসে শুধু সেই কারণেই যারা মানুষ হবার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হল, সেই হতভাগাদের ইচ্ছা করেই এড়িয়ে গেছেন।

    বলা বাহুল্য, এই চিঠি পড়ে সেদিন বিরক্ত হয়েছিলাম। আত্মপ্রসাদের মোহে মন ছিল আচ্ছন্ন, তাই ভক্ত পাঠকের অতিরঞ্জিত স্তুতিবাদকেই আমার ন্যায্য পুরস্কার বলে ধরে নিয়েছিলাম। সেই স্পষ্ট-ভাষণকে মনে হয়েছিল রুষ্ট পাঠকের অন্যায় তিরস্কার। ধাতস্থ হবার পরে বুঝেছি—না, ওটা আমার প্রাপ্য ছিল।

    একটা কথা সেই প্রথম জীবনে মনে হত, আজও হয়,—সরকারের কাছে তার প্রশাসনিক প্রয়োজনটাই আসল, যার কাছে মানুষের স্বার্থ ও ভালমন্দ অনায়াসে বলি দেওয়া যায়। তা যদি না হবে, জেল-পাঁচিলের চারদিক ঘিরে তার কর্মী-উপনিবেশ গড়া হত না। যক্ষ্মা বা বসন্ত হাসপাতালের সঙ্গে যারা জড়িত, তাদের তো কই তার হাতার মধ্যে মাথা গুঁজে পড়ে থাকতে বাধ্য করা হয় না। সংক্রমণের হাত এড়িয়ে নিরাপদ দূরত্বে বাস করবার অধিকার সেখানে স্বীকৃত। সে অধিকার নেই শুধু কারা-কর্মীর। তার কারণ এ নয় যে, কারাগার নামক যে ক্রাইম-হাসপাতাল, তার সংক্রামকশক্তি ঐসব হাসপাতালের চেয়ে কিছুমাত্র কম, কিংবা সেটা কর্তৃপক্ষের অগোচর। তার কারণ, এখানে নিরাপত্তার রূপ আলাদা।

    সেফটি নয়, সেফ্ কাস্টডি। শাসকের চেয়ে শাসিতের স্বার্থ বড়। তাদের জন্যেই দুর্ভাবনা। তাদের আগলে রাখা, আটকে রাখা—তারই প্রয়োজনে ইঁটের প্রাচীরের চারদিকে আবার মানুষের বেড়া। বিভিন্ন স্তরের মানুষ—অতবড় যন্ত্রটাকে চালাবার জন্যে যে সব রকম যন্ত্রীর দরকার—বেটন-ধারী, বন্দুক-ধারী তো বটেই, তার সঙ্গে ছোট-বড় কলম-ধারী। প্রথম দলের কিছু এবং শেষের দলের প্রায় সকলেই থাকে সপরিবারে। সরকারী দাক্ষিণ্যে ভাড়া দিতে হয় না। বরং কিছু উপরি-পাওনা আছে, আর্থিক নয়, সেবারূপী পাওনা, ইংরেজীতে যাকে বলে ‘স্যারভিসেজ’—অর্থাৎ ঐ ‘ওয়াটার-ক্যারিং গ্যাঙ’। তার আসল রূপটা যে কী, সে ‘লাভে’র কতটা যে ‘ক্ষতি’র ঘরে জমা হচ্ছে, তার হিসাব ওখানকার বাবুদের খাতায় হয়তো পাওয়া যাবে না, পাওয়া যাবে তাঁদের কোনো কোনো পুত্র-কন্যার ভবিষ্যতের পাতায়। তারই একখানা একদিন পত্রাঘাতের আকার নিয়ে আমার কাছে এসে পড়েছিল, এইমাত্র যার উল্লেখ করেছি, আরও অনেক আমার আগে থাকতেই জানা।

    পুঁটির মা আমার জন্যেই অপেক্ষা করছিলেন। গিয়েই শুনলাম, এযাত্রায় তাঁর শ্রীমানটি একটু বেশি এগিয়ে গেছেন, অর্থাৎ জনকয়েক বন্ধুর সঙ্গে গতরাত্রে জেলে এসে গেছেন। কোনো সূত্রে ভোরবেলাতেই তার কাছে খবর পৌঁছে গেছে। ‘সূত্রটি’ যে তাঁর স্বামী নন, জিজ্ঞাসা না করেই বুঝলাম। অথচ অভিলাষবাবুই তখন ‘আমদানী সেরেস্তার ভারপ্রাপ্ত অফিসার। সারাদিন ধরে যারা জেলে এল—হাজত বা কয়েদী—সন্ধ্যার পর তাদের সব ওয়ারেন্ট তাঁকে পরীক্ষা করতে হয়, এবং অ্যাডমিশন রেজিস্টার-নামক একটি বিশাল খাতায় তাদের নাম, ধাম, বিবরণের লম্বা ফিরিস্তি মিলিয়ে নিয়ে শেষ পংক্তিতে সই দিতে হয়। মেলাতে গিয়ে—ইংরেজীতে যাকে বলে চেক করা— অভিলাষবাবু ওয়ারেন্ট এবং খাতার বুকে এমন সজোরে এবং লম্বা হাতে পেন্সিল চালিয়ে থাকেন—যে তাঁর ‘কাজে’র সঙ্গে যাদের পরিচয় নেই, তাদের মনে হবে সব কেটে-কুটে দেওয়া হয়েছে। একবার এক নতুন শ্বেতাঙ্গ জেল-সুপার ক্ষত-বিক্ষত খাতার দিকে চেয়ে সবিস্ময়ে প্রশ্ন করেছিলেন—ইজ্ দিস্ অল রঙ্গ (wrong)?

    অভিলাষবাবু ততোধিক বিস্ময়ে জবাব দিলেন, নো স্যার!

    —দেন হোয়াই ক্রস্‌ড্ আউট?

    এবার লজ্জিত হলেন অভিলাষ মজুমদার। মাথা চুলকে বললেন, আই হ্যাভ্ থরোলি চেক্‌ দা এন্‌ট্রিজ।

    অফিসে পৌঁছেই আগের দিনের ওয়ারেন্ট-গুচ্ছের ভিতর থেকে যথারীতি পেন্সিলাহত ‘দীপঙ্কর মজুমদার’-কে টেনে বার করলাম। অভিলাষবাবুকে ডেকে দেখাতেই তিনি প্রথমটা কিছু বুঝতে পারলেন না, আর একটু নজর দিয়েই চমকে উঠলেন— ‘গুলে’! তারপর কিছুমাত্র অপ্রস্তুত না হয়েই বললেন, ও হতভাগার যে ঐরকম একটা পোষাকী নাম আছে, খেয়াল ছিল না।

    —তবে বাপের নামটা দেখেও মনে পড়ে নি?

    —যে ঝঞ্ছাটে আছি, নিজের বাপের নামই খেয়াল থাকে না, স্যার তো, এ তো ছেলের বাপের নাম।

    বলেই ছুটতে ছুটতে চলে গেলেন নিজের টেবিলে। অর্থাৎ এ ব্যাপারে তাঁর করণীয় কিছু নেই। ছেলের জেলে-আসার চেয়েও তাঁর কাছে বড় তাঁর জেলের ‘ঝঞ্ঝাট’।

    অভিলাষবাবুর ‘ঝঞ্ঝাট’ প্রায় বারো মাসই লেগে থাকত, এবং তার বেশির ভাগ তাঁর নিজের তৈরি। দু-একটার উল্লেখ না করে পারছি না।

    জেলের কয়েদী বা হাজতী আসামীদের সঙ্গে দেখা করতে হলে দরখাস্ত চাই। গেটের সামনে একটি করে বাক্স বসানো থাকে, দরখাস্ত-সংগ্রহের জন্যে, কোনো ফী দিতে হয় না। কিন্তু কোনো কোনো জেলে টহলদার সিপাইরা দর্শনপ্রার্থী জনসাধারণের অজ্ঞতার সুযোগ নিয়ে কিঞ্চিৎ বেসরকারী ফী আদায় করে থাকেন। খবরটা উপর-মহলের অজানা নয়, কিন্তু এই দু-চার-আনার দস্তুরি নিয়ে কাউকে বিশেষ মাথা ঘামাতে দেখা যায় নি। অভিলাষবাবু হঠাৎ এই দুর্নীতি দমনে তৎপর হয়ে উঠলেন। মস্ত বড় সাইনবোর্ড পড়ল জেলের সামনে—’দেখা করিতে পয়সা লাগে না। কেহ পয়সা চাহিলে সঙ্গে সঙ্গে কর্তৃপক্ষের নজরে আনুন।

    দিন কয়েক পরে দেখা গেল, রাতের অন্ধকারে ‘সাইনবোর্ড’ লোপাট। সান্ত্রীদের নিয়ে কদিন টানা-হেঁচড়া করলেন অভিলাষবাবু। কাউকে শাস্তি দেওয়া গেল না। সবাই বলল, দুর্ঘটনাটা তার ডিউটিতে ঘটে নি। নতুন সাইনবোর্ড টাঙানো হল এবং তার উপরে কড়া পাহারার ব্যবস্থা। ‘মোলাকাতি দস্তুরি’ সম্বন্ধেও কড়াকড়ি শুরু করলেন অভিলাষবাবু।

    কিছুদিনের মধ্যেই তাঁর বিরুদ্ধে নানা রকম দুর্নীতির ফিরিস্তি দিয়ে একেবারে খোদকর্তার বরাবর ঘন ঘন বেনামা দরখাস্ত পড়তে লাগল। তলায় তলায় গোপন তদন্তও চলল তার সঙ্গে। অভিলাষবাবু তখন ‘ওয়ার্ডার গার্ড’ নামক শাখার অফিসার-ইন-চার্জ। সিপাইদের ছুটির আবেদন, এবং তার বিলি—ব্যবস্থা ইত্যাদি তাঁর সেরেস্তার অন্তর্ভুক্ত। একদিন ‘কায়থি’ হরফে নাম লেখা একখানা খামের চিঠি এল জেলের ঠিকানায়। চিঠিপত্র বিভাগের কেরানী সেটা পড়তে না পেরে বড়সাহেবের কাছে নিয়ে গেল। হাতের লেখা দেহাতী কায়থিতে তাঁর কিঞ্চিৎ দখল ছিল। শিরোনামটা ভাল করে না দেখেই খুলে ফেললেন, এবং কোনোরকমে পাঠোদ্ধার করে সঙ্গে সঙ্গে গম্ভীর হয়ে গেলেন।

    চিঠিখানা অভিলাষবাবুকে লেখা। লিখছে একজন সিপাই। ছুটিতে দেশে আছে, সেটা আরও কিছুদিন বাড়ানো দরকার।

    সকাতর প্রার্থনা জানিয়েছে, ‘বাবু’ যদি মেহেরবানি করে সাহেবকে বলে ছুটির ব্যবস্থা করে দেন, তাঁর ‘পান খাবার’ যথারীতি ব্যবস্থাও সে ফিরে এসেই করবে। সে বিষয়ে কোন অন্যথা হবে না। সাহেব চিঠিখানা চেপে গেলেন, যদিও আগেকার কতগুলো বেনামী অভিযোগের সঙ্গে এটাকে যুক্ত করে তাঁর মনে কিঞ্চিৎ সন্দেহের ছায়া পড়ল। কদিন পরে ঠিক ঐ ধরনের আরেকখানা চিঠি আসতেই সেটা গাঢ়তর হল। তার পরেই নিতান্ত অসময়ে অভিলাষবাবুর বদলির হুকুম। অনেক অসুবিধা ছিল, রদ করবার চেষ্টা করলেন—। হল না।

    ব্যাপারটা আমি জানতাম। ওর সঙ্গে এ-ও জানতাম, ‘পান-খাওয়া’ নামক ব্যাধি থেকে অভিলাষবাবু সম্পূর্ণ মুক্ত ছিলেন। সবটাই সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্র। দুর্নীতি-উচ্ছেদ- কল্পে তাঁর অতিরিক্ত উৎসাহের ফল, স্বেচ্ছা-আমন্ত্রিত ফ্যাসাদ।

    মূল প্রসঙ্গ থেকে অনেক দূরে এসে পড়েছি। এবার ফেরা যাক।

    সভাস্থল থেকে বেরিয়ে অভিলাষবাবুর মুখে যখন শুনলাম, তিনি আমার সাহায্যপ্রার্থী, দীর্ঘকাল পরে হলেও প্রথমেই মনে হল, তিনি হয়তো আবার কোনো স্ব-রচিত ‘ঝঞ্ঝাটে র কবলে পড়ে থাকবেন। আমার প্রোগ্রাম বদলাতে হল। পরদিন সকালে স্টেশনের বদলে হাজির হলাম জেলখানায়। গিয়ে বুঝলাম, না এলেই ভালো ছিল। অভিলাষবাবুর প্রয়োজন মেটাতে গিয়ে বিনা প্রয়োজনে আর একটা নির্মম কঠোর জীবন্ত সত্যের মুখোমুখি গিয়ে দাঁড়াতে হবে কে ভেবেছিল?

  • সাত

    সাত

    সে কথা এখন থাক। অভিলাষবাবু যার জন্যে এত গরজ করে আমাকে টেনে নিয়ে এলেন, সেই ব্যাপারটা আগে বলে নিই।

    যা অনুমান করেছিলাম তাই। আবার একটা নতুন ঝঞ্ঝাট সাধ করে সেধে আনবার প্রয়োজন বোধ করছেন ভদ্রলোক। উদ্দেশ্য সেই—’অন্যায়ের প্রতিকার’। অর্থাৎ পঞ্চাশ পেরিয়েও ইংরেজীতে যাকে ‘ম্যাচিওরিটি’ বলে, সেটা ওঁর আসে নি। হয়তো কোনো কালেই আসবে না। একবার সিপাইদের দুর্নীতি তাড়াতে গিয়ে নিজেই তাড়িত হয়েছিলেন, সে কথা আমার মনে আছে, উনি বোধহয় ভুলে মেরে দিয়েছেন। কিংবা অভিলাষবাবুরা যে জাতের লোক, ‘ঠেকে শেখা’ বলে কোনো শব্দ তাঁদের অভিধানে নেই। ‘অব্যাপারে ব্যাপারং’ সম্বন্ধে হিতোপদেশের সাবধান বাণী তাঁরা কোনো কালেই কানে তোলে না।

    অভিলাষবাবু এবার যে কাণ্ডটা করতে চলেছেন, সোজা কথায় তাকে বলা যায় সরকারের ‘পলিসি’র গায়ে হাত। মারাত্মক অপরাধ। ইণ্ডিয়ান পেনাল কোড-এ ‘আউটরেজিং মডেস্টি’ বলে ধারাটা আছে, প্রায় তার সমতুল। ‘পলিসি’ হল মন্ত্রীমণ্ডলীর অসূর্যম্পশ্যা অন্তঃপুরিকা, চাকরে-গোষ্ঠীর ধরাছোঁয়ার বাইরে। এই সহজ কথাটা কিছুতেই ওঁর মাথায় ঢুকতে চাইল না। ঢোকাবার চেষ্টা করতেই অসহিষ্ণু কণ্ঠে বলে উঠলেন, ‘কিন্তু আমি যে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি, এই স্কীম ওঁদের আসল উদ্দেশ্যকেই পণ্ড করবে!’

    —করুক। তাতে আপনার কী? ‘স্কীম’-এর সঙ্গে ‘ইমপ্লিমেনটেশান’ বলে যে আর একটা কথা আছে, সে কি এখনও আপনার মুখস্থ হয় নি? প্রথমটা ওঁদের এলাকা, দ্বিতীয়টা আপনার, সোজা বাংলায় যার নাম চোখ বুজে হুকুম তামিল করা। উদ্দেশ্য কী, সেটা সফল হবে না পণ্ড হবে—এসব অবান্তর প্রশ্ন নিয়ে মাথা ঘামানো আপনার কাজ নয়।

    —এই জলজ্যান্ত গলদগুলো দেখিয়ে দেবো না?

    —না।

    –এতগুলো মেয়ের ভবিষ্যৎ যদি দেখতেন, কি রকম কান্নাকাটি করছে তারা।

    –করুক না? ওঁরা বলবেন দুনিয়ার নিজের মঙ্গল কে কবে বুঝে থাকে? যার ভাল করতে চান, সে-ই সবচেয়ে বেশী বাধা দেবে। কান্নাকাটি শুনতে গেলে রাষ্ট্রের চলে না, বিশেষ করে যে রাষ্ট্রের ব্রত হল জনকল্যাণ

    কথা হচ্ছিল, ‘সুপারে’র অফিস কামরায় বসে। টেবিলের উপর একটা খোলা ফাইল। তার ভিতরকার একটি সাম্প্রতিক সরকারী আদেশই ছিল আমাদের আলোচনার বিষয়বস্তু। আদেশটি নারী-কয়েদী সম্পর্কে। সংক্ষিপ্ত মুখবন্ধে বলা হয়েছে, এককালে ইম্‌প্রিজনমেন্ট, অর্থাৎ কারাদণ্ডের উদ্দেশ্য ছিল দণ্ডিতের উপর রিট্যারিয়েশন প্রতিশোধ, বর্তমানে সভ্য রাষ্ট্রের শেষ কাম্য হল তার রিহ্যাবিলিটেশন, মুক্তির পর সমাজদেহে তা পুনঃপ্রতিষ্ঠা। তার জন্যে তাকে এমন একটি কার্যকরী বৃত্তি শিখিয়ে দেওয়া দরকার, বাইরে গিয়ে যার অনুসরণ করে সে সৎপথে জীবিকা-নির্বাহ করতে পারে।

    এর পরেই আসল বক্তব্য : সরকার উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ্য করছেন, বিভিন্ন জেলে, বিশেষ করে ডিস্ট্রিক্ট জেলগুলোতে যেসব মেয়ে-কয়েদী থাকে, তাদের বেলায় ঐজাতীয় শিক্ষার কোনো সুষ্ঠু ব্যবস্থা নেই। তার প্রধান কারণ, তারা সংখ্যায় এত অল্প যে ঐ ক’টি মেয়ে নিয়ে কোনো কুটির শিল্প গড়ে তোলা যায় না। এই সমস্যার একমাত্র সমাধান তাদের কুড়িয়ে এনে এক জায়গায় জড়ো করা। সেই উদ্দেশ্য নিয়েই এই বৃহৎ সেন্ট্রাল জেলের একটি অংশকে পৃথক করে তৈরি হয়েছে বিস্তৃত জেনানা-ফাটক। তার ভিতরে নানা রকমের ওয়ার্কশপ, সবজি-বাগান, স্কুল, খেলা-ধূলার মাঠ, মায় সূতিকাগার (মাঝে মাঝে দু-একটি গর্ভিণী স্ত্রীলোকও আমদানি হয়ে থাকে) ও নার্স ট্রেনিং সেন্টার বা শুশ্রূষাকেন্দ্র ইত্যাদি।

    সরকার আশা করেন, মেয়ে-কয়েদীরা যাতে করে এই ব্যাপক ব্যবস্থার পূর্ণ সুযোগ গ্রহণ করে ভবিষ্যতে কর্মঠ ও কুশলী নাগরিকে পরিণত হতে পারে, সুপারিন্টেণ্ডেণ্ট সেদিকে বিশেষ মনোযোগ দেবেন।

    অভিলাষবাবু যখন এই বিশেষ সেন্ট্রাল জেলের কর্ণধার হয়ে এলেন, তার আগেই বিভিন্ন জেল থেকে দুটি চারটি করে মেয়েরা আসতে শুরু করেছে। মোট সংখ্যা পঞ্চাশের উপর। ওয়ার্কশপগুলো খুলবার আয়োজন চলছে।

    তাঁর চার্জ নেবার দিনতিনেক পরের ঘটনা। মঙ্গলবার। জেনানা-ফাটকের সাপ্তাহিক প্যারেড। নতুন সুপারের প্রথম পরিদর্শন। মেট্রন এবং তার সহকারিণীরা ভোরবেলা থেকে তার আয়োজনে ব্যস্ত। স্বয়ং জেলার গিয়ে একবার তদারক করে এসেছেন। মাঠের ধারে গাছের ছায়ায় মেয়েরা লাইন করে দাঁড়িয়েছে। পরনে সদ্য-কাচা শাড়ি, তার উপর ফিমেল কুর্তা। বাকী কিট্স, অর্থাৎ জামা-কাপড়-চাদর-কম্বল সযত্নে পাট করে প্রত্যেকের পায়ের কাছে সাজানো, তার পাশে ঝকঝকে করে মাজা অ্যালুমিনিয়মের থালা-বাটি। সুপারের ‘ফাইল’-এ খোঁপা বা বিনুনি বাঁধা নিষিদ্ধ। মাথায় কাপড় দেবারও হুকুম নেই। তাই বলে রুক্ষ মাথায় থাকা চলবে না। সরকারী খরচে আয়না-চিরুনি এবং কিছুটা নারকেলের তেল সরবরাহ করা হয়। তার সদ্ব্যবহারে কোনো ত্রুটি হয় নি। গত কয়েকদিনের বরাদ্দ থেকে বাঁচিয়ে তেলের ব্যবহারটা বরং একটু অতিরিক্তই বলা চলে। মেট্রন বার বার করে শাসিয়ে দিয়েছেন, বড়সাহেব যখন সামনে দিয়ে যাবেন, সবাই যেন মাটির দিকে তাকিয়ে থাকে। সেইটাই নিয়ম। নালিশ থাকলে তেমনি মাথা নীচু করে নিজের জায়গায় দাঁড়িয়ে মৃদুস্বরে জানাতে হবে। চোখ তুলে তাকানো বেয়াদপি।

    সপারিষদ অভিলাষবাবু সবেমাত্র লম্বা ‘ফাইল’-এর এক প্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছেন, মেট্রনের বিচিত্র উচ্চারণের সামরিক বুলি—স্কোয়াড্ অ্যাটেনশন’ তখনও বাতাসে মিলিয়ে যায় নি—হঠাৎ এক বিপর্যয় কাণ্ড! কোথায় গেল ‘ফাইল’ আর কাপড়-চোপড় থালা-বাটির থাক! সব ভেঙে উল্টে দিয়ে নারীবাহিনীর প্রায় সবটা সক্রন্দনে ছুটে এসে হুমড়ি খেয়ে পড়ল তাঁর পায়ের উপর। সকলে যে সে-পর্যন্ত পৌঁছতে পারল না, তার কারণ এ নয় যে তাদের তরফে চেষ্টার কোনো ত্রুটি ছিল। তার কারণ, সুপার যত বড় লোকই হোন, তাঁর পায়ের সংখ্যা মাত্র দুই, এবং সেই দুটি চরণের পক্ষে একসঙ্গে শত হস্তের কবলে পড়া কোনোমতেই সম্ভব ছিল না।

    চীফ হেড্‌ওয়ার্ডারের গর্জন এবং মেট্রন ও তার সহকীরিণীদের সবল হস্তক্ষেপে ভূলুণ্ঠিত বন্দিনীদের বহু কষ্টে টেনে তোলা হল। তারও বেশ কিছুক্ষণ পরে জানা গেল, এই সমবেত আবেদনের সুর ও ভাষা আলাদা হলেও বিষয় এক—সবাইকে অবিলম্বে যার যার ‘দেশের জেল’-এ পাঠিয়ে দেওয়া হোক। অভিলাষবাবুও সেই অনুমান করেছিলেন, এবং একে একে প্রশ্ন করে কারণ যেটা জানলেন, তাও তাঁর কাছে নতুন নয়। জেলে এলেও ঘর-সংসারের পাট তো আর শেষ করে দিয়ে আসে নি। সেখানে কেউ ফেলে এসেছে পাঁচ বছরের কচি বাচ্চা, কারও বা রয়ে গেছে বয়স্থা মেয়ে, রুগ্ন স্বামী, কিংবা বৃদ্ধ বাপ-মা। ওখানে থাকতে মাসান্তে কিংবা পক্ষান্তে একবার দেখা হত, লোহার জালে-ঘেরা গরাদের ফাক দিয়ে কথাবার্তাও হত দু-চারটা। এতদূরে আর সে সম্ভাবনা রইল না। আসবে কেমন করে? বুড়ো, কচি এবং মেয়েমানুষগুলোকে নিয়ে আসবে কে? সবচেয়ে বড় কথা, সে সঙ্গতি কই? বাড়ির সমর্থ পুরুষদের সে সময়ই বা কোথায়? সকলকেই উদয়াস্ত খেটে খেতে হয়, একদল পোষ্যকে খাওয়াতে হয়।

    কোণের দিকে একটি কমবয়সী মেয়ে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে কাঁদছিল। তার ‘কারণ টা একটু অন্য ধরনের। মুখ ফুটে বলতে চায় না। দু-তিনবার জিজ্ঞাসার পর মেট্রনকে জানাল চুপি চুপি। মেদিনীপুর থেকে এসেছে; জাতে বাউরী। মরদটি তার লোক ভালো। তাহলেও পুরুষমানুষ, তার জোয়ান বয়স। দূরের বৌকে একদিন মন থেকে দূর করে দেবে না, কে বলতে পারে? একদিন নয়, দু-দিন নয়, তিন বছর। তারপর ফিরে গিয়ে দেখবে, তার জায়গা আর একজন এসে দখল করে বসেছে।

    —তাই যদি করে, ওখানকার জেলে বসেই বা ঠেকাবে কেমন করে? প্রশ্ন করলেন অভিলাষবাবু, যদিও এর উত্তরটা তিনি জানেন। মেয়েটি জবাব দিল না। হয়তো লজ্জায়, কিংবা গুছিয়ে বলার মতো ভাষা খুঁজে পেল না। বলতে পারল না, ঘরের সঙ্গে মানুষের যে বন্ধন, শ্রীঘরে আসবার পর সেটা আপনা থেকেই শিথিল হয়ে আসে। বিশেষ করে, সে মানুষ যখন মেয়েমানুষ, ঘর তার দিক থেকে বড় তাড়াতাড়ি মুখ ফিরিয়ে নেয়। তবু মাঝে মাঝে ও-তরফের একটুখানি চোখের দেখা, এবং এ-তরফের দু-এক ফোঁটা চোখের জল সে বন্ধনকে কিছুদিন বাঁচিয়ে রাখতে পারে। দীর্ঘদিনের অদর্শন ও অসংযোগ সেখানে দ্রুত ছেদ টেনে দিতে সহায়তা করে। মেয়েটি আরও বলতে পারত—এই দুর্ভাগা দেশে, বিশেষ করে সমাজের যে স্তর থেকে ওরা এসেছে ( জেনানা ফাটকে তাদের সংখ্যাই বেশি), স্ত্রী নামক পণ্যটি বড় সুলভ। ঘাটতি পূরণে দেরি হয় না। রাজসিংহাসনের মতো পুরুষের হৃদয় নামক আসনটিও বেশি দিন খালি থাকতে পারে না। রাখতে চাইলেও সংসার তার নানা প্রয়োজন নিয়ে ক্রমাগত চাপ দিতে থাকে। সুতরাং একজন চোখের আড়ালে চলে গেলে, আরেকজন এসে তার জায়গা জুড়ে বসবে, তাতে আর আশ্চর্য কি? মেয়েদের জীবনে এই ‘জায়গা’টাই আসল। সেটি যদি চলে যায়, ফিরে গিয়ে পরিচিত গৃহকোণের সেই আশ্রয়টুকু না জোটে, তাহলে কোন্ কাজে লাগবে এই দূর কারাগার থেকে বয়ে নেওয়া তার কারিগরি বিদ্যার বোঝা?

    অভিলাষবাবু এই কথাগুলোই ক’দিন ধরে মনে মনে নাড়া-চাড়া করে দেখলেন। তারপর গাঁটের পয়সা খরচ করে উঠলেন গিয়ে লালদীঘির উত্তর-পারে। বড়কর্তাদের বোঝাতে চেষ্টা করলেন, এরা কয়েদী হলেও মেয়ে, এদের কাছে সামনের চেয়ে পিছনের টান বড়, আকাশ-বাতাসের চেয়েও বেশি সত্য মাটি। সেখান থেকে উপড়ে এনে যেখানে- সেখানে বসিয়ে দিলেই বাঁচবে এবং বাড়তে থাকবে, সে আশা করা যায় না। না, না, এ সেণ্টিমেন্টের কথা নয় (যদিও মেয়েদের বেলায় সে বস্তুটির দাম অনেক), এর প্রাক্‌টিক্যাল, অর্থাৎ বাস্তব দিকটাই বড়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে এদের ভবিষ্যৎ, যে উদ্দেশ্য নিয়ে এদের জড়ো করা হচ্ছে, সেই রিহ্যাবিলিটেশনের প্রশ্ন। অর্থাৎ কাজকর্ম না হয় শেখানো গেল, তারপর?

    বক্তব্যটাকে আরও বিশদ করবার চেষ্টা করেছিলেন অভিলাষবাবু। বলেছিলেন, পুরুষ-কয়েদীর কথা আলাদা, তাদের আমরা কিছু একটা শিখিয়ে দেবার চেষ্টা করি, তারপর মেয়াদ ফুরোলে গেটের বাইরে ছেড়ে নিয়ে নিশ্চিন্ত। একটা রেলের পাস আর কিছু পয়সা হাতে দিয়ে বলি, চরে খাওগে। তারপর সে কী করে, কোথায় যায়, তা নিয়ে আমাদের মাথাব্যথা নেই। কিন্তু মেয়েগুলোর বেলায় তো তা বলা যায় না। পরের ভাবনাও ভাবতে হয়। পুরুষগুলো যেখানে-সেখানে পড়ে থাকতে পারে। রাত কাটাবার জন্যে মাথার উপর যা হোক একটা আচ্ছাদন যথেষ্ট। গাছতলাতেও বাধা নেই। কিন্তু এদের বেলায় বিধাতা সে সুবিধা দেন নি। কাজেই বেরোবার সঙ্গে সঙ্গে প্রথম প্রয়োজন একটি নিরাপদ আশ্রয়। নিজের ঘরের চেয়ে বাঞ্ছনীয় আশ্রয় আর কী আছে একটি মেয়ের জীবনে? আমরা যা কিছু করবো, সব সেইদিকে চেয়ে। চেষ্টা করবো, জেলে এলেও স্বামী- পুত্র, বাপ-মা-ভাই-বোন, আত্মীয়-পরিজনের সংস্পর্শে থেকে সে বিচ্ছিন্ন না হয়ে পড়ে, তাদের কাছে ফিরে যাবার পথে কোনো রকম বাধা সৃষ্টি না হয়।

    এই নতুন ব্যবস্থায় যে তা-ই হতে চলেছে, অন্য কেউ হলে উপরওয়ালাদের দরবারে সে কথাটা হয়তো একটু ঘুরিয়ে বলত। কিন্তু অভিলাষবাবুর ধরনটা চিরকালই খোলাখুলি, ইংরেজীতে যাকে বলে ব্লান্ট্। বলা বাহুল্য, কর্তারা সেটা মোটেই পছন্দ করেন নি। একজন মাঝারিগোছের মুরুব্বি ওঁর মতামত সরাসরি অগ্রাহ্য না করলেও স্পষ্ট করেই জানিয়ে দিয়েছিলেন, এ বিষয়ে বর্তমান আদেশই বলবৎ থাকবে। বলেছিলেন, আরে মশাই, পুরো এক বছর লেখালেখির পর ফাইনান্স ডিপার্টমেণ্ট টাকা দিয়েছে। এখন যদি বলি দরকার নেই, তাদের কাছে মুখরক্ষা হয় কেমন করে?

    এ হেন মোক্ষম যুক্তিও অভিলাষবাবুকে নিরস্ত করতে পারে নি। বিষয়টাকে আরও জোরদার করবার জন্য বক্তব্যগুলো লিখিতভাবে পেশ করতে মনস্থ করেছেন। একটা খসড়াও করে ফেলেছেন। আমার প্রয়োজন সেইখানে। কয়েকটা ফুলস্ক্যাপ কাগজ আমার সামনে এগিয়ে দিয়ে বললেন, আপনার কলম তা চিনি স্যার, একটু ছোঁয়া লাগিয়ে দিন।

    বললাম, সে কলম বদলে গেছে অভিলাষবাবু। এর ছোঁয়ায় আপনার কাজ হবে না। বরং উল্টো ফল ফলতে পারে। তাছাড়া বুড়ো বয়সে সাধ করে কর্তাদের বিষনজরে পড়তে চাইছেন কেন?

    —আপনিও এই কথা ভাবছেন!

    —হ্যাঁ, নিজের অভিজ্ঞতা থেকেই বলছি।

    অভিলাষবাবু স্পষ্টত নিরাশ হলেন। কী একটা বলতে যাচ্ছিলেন, এমন সময় চীফ হেড্‌ ওয়ার্ডার ঘরে ঢুকে সেলাম ঠুকে জানাল, জেনানা-ফাটকের ‘ফাইল’ রেডি।

    —উঠিয়ে দাও। আজ আর সময় হবে না—

    ‘চীফ’-এর পিছনে মেট্রনকেও দেখা গেল। তার দিকে চেয়ে বললেন, তোমাদের নালিশ মানে তো ঐ একটি, শুনে শুনে কান ঝালাপালা হয়ে গেছে। ওছাড়া আর কারও কিছু আছে নাকি?

    —একটি মেয়ে বলছিল, তার কি একটা জরুরী নালিশ আছে।

    –এখানে নিয়ে এসো।

    উঠবার আয়োজন করছিলাম, দরজার দিকে নজর পড়তে আর ওঠা হল না। অজ্ঞাতসারে মুখ থেকে বেরিয়ে এল—কুসুম! মেট্রনের পিছনে যে মেয়েটি বেশ সপ্রতিভ ভাবে ঘরে এসে ঢুকলো, সে কোনো জবাব দিল না। মেট্রনকে পাশ কাটিয়ে এগিয়ে এসে আমার পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করল। সহজ বিনীত সুরে বলল, আপনি ভালো আছেন? আমি জবাব দেবার আগেই অভিলাষবাবু হাত বাড়িয়ে তার টিকেটখানা নিতে নিতে বললেন, ওঁর সময় থেকেই আছ বুঝি এখানে?

    কুসুম মৃদু হেসে বলল, না, মাঝখানে কিছুদিন বাইরে ছিলাম।

    —আবার এলে যে! এ প্রশ্ন আমার। বিস্ময়ের ভাবটা তখনও কাটিয়ে উঠতে পারি নি।

    —আসতে হল। আঁচলের কোণটা আঙুলে জড়াতে জড়াতে তেমনি হাসিমুখেই বলল কুসুম, যেন এই আসাটা নেহাৎ বেড়াতে আসার মতো।

    —ওখানে থাকতে পারলে না বুঝি?

    —কই আর পারলাম!

    —লেডি ডাক্তার রাখলেন না?

    —তিনি রাখতে চেয়েছিলেন, আমারই থাকা হল না।

    —কী কেস্-এ এলে?

    জবাব দিলেন অভিলাষবাবু—কেটি তো ভালোই দেখছি। একেবারে রাজসিক ব্যাপার—মার্ডার! আগে এসেছিলে কোন্ কেস্-এ?

    —’সেটাও খুন।’ সঙ্গে সঙ্গে উত্তর এবং তার মধ্যে দ্বিধা বা সঙ্কোচের চিহ্নমাত্র নেই। তবে নিজে করি নি, জড়িয়ে পড়েছিলাম—উনি সব জানেন।’ চোখের ইঙ্গিতে আমাকে দেখিয়ে দিল।

    —এবার বুঝি নিজেই হাত লাগিয়েছ? হালকা সুরে বললেন অভিলাষবাবু। বহুদিনের পুরনো প্রবীণ জেল-অফিসার। এই জাতীয় খুনখারাপি ওঁর কাছে জল-ভাত। আমারও তাই। কিন্তু কুসুমের মুখ থেকে এবার যে জবাব এল, শুনে এবং তার চোখের দিকে তাকিয়ে আমরা দুজনেই চমকে উঠলাম। এতক্ষণের সেই তরল সুর নয়। মুখের সে হাসি হাসি ভাবটাও সহসা কোথায় মিলিয়ে গেল। দু-চোখে আগুন ছড়িয়ে দাঁতে দাঁত চেপে চাপা কণ্ঠে বলল, ‘হ্যাঁ, এবার নিজের হাতেই সাধ মিটিয়ে নিয়েছি।’

    বলতে বলতে চোখ বুজল-গভীর আরামে, পরম তৃপ্তিতে আপনা হতেই যেমন করে ধীরে ধীরে নেমে আসে চোখের পাতা।

    .

    এই জেলেই কুসুমের সঙ্গে আমার প্রথম দেখা! সে দিনটা এখনও মনে আছে। ভারী মেয়াদ বলে কোন্ একটা ছোট জেল থেকে চালান হয়ে এসেছিল সেন্ট্রাল জেলে। নতুন আমদানী। তাই আমার অফিসে আনতে হয়েছিল, ভাষায় যাকে বলে ‘ভেরিফিকেশনে’র উদ্দেশ্যে, অর্থাৎ জামা-কাপড় ইত্যাদি ওয়ারেন্টে যা লেখা আছে তাতে কোনো ভুল নেই, সুপারের সামনে এই তথ্যটি কবুল করিয়ে নেবার জন্যে। সকলের বেলাতেই সেই নিয়ম।

    আমি মাথা নিচু করে কি লিখছিলাম, আচমকা নারীকণ্ঠের খিল্‌-খিল হাসি শুনে চোখ তুললাম। হাসিটা শুধু প্রগল্ভ নয়, অনেকটা নির্লজ্জ। ও দাঁড়িয়েছিল আমার মুখোমুখি, খানিকটা দূরে, দরজার ঠিক সামনে। কোনো কারণে সেদিন বিদ্যুৎ-সরবরাহ বন্ধ ছিল। আমার পিছনে দাঁড়িয়ে এক কয়েদী বড় একখানা পাখা নিয়ে আমাকে হাওয়া করছিল। তার দিকে আঙুল তুলে মেট্রনকে উদ্দেশ করে কলকণ্ঠে বলে উঠল, মিলেটার কাণ্ড দেখুন মাসিমা। পাখা-টাখা বন্ধ করে কীরকম চোখ করে তাকিয়ে আছে। গিলে খাবে নাকি? ওমা, একেবারে হুঁশ নেই!…. বলেই আবার সেই হাসি। মেট্রনের চাপা ধমক খেয়ে তার তোড়টা যেন আরও বেড়ে গেল। একঘর লোক। জেলর থেকে সিপাই, মেট—কোনো পদই বাকী নেই। অস্বস্তিকর পরিস্থিতি। যে-কাজে ওকে নিয়ে আসা হয়েছিল, সেটা বন্ধ রেখেই তাড়াতাড়ি সরিয়ে দেবার ব্যবস্থা হল।

    পাখা-চালানো কয়েদীটাকে মনে মনে বিশেষ দোষ দিতে পারি নি। কিছুক্ষণের জন্যে যদি তার বৈকল্য বা চিত্তবিক্ষেপ ঘটে থাকে, তার জন্যে দায়ী, যার দিকে তাকিয়ে সে ‘হুঁশ’ হারিয়েছিল তার প্রতি অঙ্গে সঞ্চরমাণ এক ধরনের অপর্যাপ্ত উদ্ধত যৌবন। কথাটা বোধ হয় স্পষ্ট হল না। যৌবন তো একটা বিশেষ বয়সে হয়। নারীদেহকেই আশ্রয় করে। কোথাও কোথাও তার উপচে-পড়া দুরন্ত বেগও দুর্লভ নয়। কিন্তু কুসুমের দেহে সেদিন যা দেখেছিলাম, তার মধ্যে এসব ছাড়িয়ে আরও কিছু ছিল, যা শুধু টানে না, টেনে নামায়। তার রেখায় রেখায় সর্বনাশের হাতছানি। অথচ রূপ বলতে যা বোঝায়, অঙ্গের সুষমা ও সৌষ্ঠব, তা তার ছিল না।

    বিধাতার চক্রান্তেই হোক কিংবা ইচ্ছা করেই হোক, কাউকে টেনে নামাতে হলে নিজেকেও নামতে হয়। সে অলঙ্ঘ্য পরিণাম থেকে কুসুমও রক্ষা পায় নি। তার মায়ের বৃত্তি ধাইগিরি। বয়সকালে আরও কিছু করত, সেটা লোকচক্ষুর অন্তরালে। ওদের বাড়িটা (অর্থাৎ ছোট একখানা চালাঘর এবং তার কোলে একচিলতে উঠোন) ছিল ছোট জেলা শহরের এক কোণে। মা ও মেয়ে মিলে সেখানে থাকত। বাবাকে কখনও দেখেছে কিনা মনে পড়ে না। যখন ছোট ছিল, অনেক রাত্রে কোনোদিন হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেলে অন্য দু’একজনকে দেখেছে, যারা তাকে বাবার মতোই আদর করত। আরও একটু বড় হবার পর আর তাদের দেখতে পায় নি। তখন সে মায়ের সঙ্গে বেরোতে শুরু করেছে। মায়ের প্রকাশ্য ইচ্ছা বোধ হয় ছিল তার নিজের বিদ্যায় মেয়েকে তালিম দেওয়া। তার সঙ্গে আর কোনো গোপন মতলব ছিল কিনা কে বলতে পারে? মেয়ের কিন্তু সেই ‘আর কিছু’র দিকেই বেশি নজর। চারদিকের নানাবয়সী পুরুষের চোখে একটা বিশেষ দৃষ্টি এবং তার অর্থ তখন সে বুঝতে শিখেছে।

    কুসুমের নামকরণ কে করেছিলেন, জানবার উপায় নেই। শিশু বয়সে হয়তো তার সার্থকতা ছিল, যেমন সব শিশুরই থাকে। যৌবনে পৌঁছতে না পৌঁছতেই যখন দেখা গেল ফুল হয়ে ফোটার চেয়ে আগুন হয়ে জ্বলার দিকেই তার গতি, তখন যেসব পতঙ্গের দল সেই আগুনে ঝাঁপ দিয়েছিল, তাদের মধ্যে শুধু একজনের কথা আমার জানবার সুযোগ হয়েছিল, তার, নাম অনাথ মল্লিক।

    অনাথের চাকরি ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডে। পৈতৃক বাড়ি রয়েছে জেলা শহরে। অবস্থা মোটামুটি সচ্ছল, বয়স তিরিশের কোঠায়। পাড়ার ব্যায়ামশালায় তৈরি সবল সুস্থ দেহ। বাপ-মা নেই। দুটি ভাই, দুজনেই চাকরিসূত্রে প্রবাসী। একমাত্র স্ত্রী নিয়ে সংসার। সুন্দরী বলে তার খ্যাতি আছে। নাক-চোখ-রং—কোনোটার তুলনা নেই, তবে বড্ড রোগা গড়ন। তার উপরে মাস পূর্ণ হবার আগেই প্রথম সন্তানটি নষ্ট হবার পর স্মৃতিকায় ভুগে ভুগে গায়ে আর মাংস নেই। তার মধ্যে আবার মা হতে চলেছে।

    আগের বারে কুসুমের মা-ই খালাস করেছিল। এবার হাসপাতালের প্রসূতি ওয়ার্ডের ‘ডাক্তারকে বলা আছে। পুরনো ধাই অবশ্য সঙ্গে থাকবে। কিন্তু প্রসবের রাত্রে তাকে পাওয়া গেল না। বিকালেই দূরে কোথায় ‘কল্’-এ বেরিয়ে গেছে। তার বদলে এল কুসুম শুধু এল না, রয়ে গেল কঙ্কালসার প্রসূতি এবং তার ক্ষীণজীবী নবজাতকের ভার নিয়ে। ডাক্তারই ব্যবস্থা করে দিলেন। মেয়েটির সেবাপরায়ণ সুনিপুণ হাত দুটিই কেবল তাঁকে আকৃষ্ট করে থাকবে, বাকী অঙ্গের সর্বনাশা আকর্ষণ হয়তো প্রৌঢ় ভদ্রলোকের নজরে পড়ে নি।

    তাঁর না পড়লেও পড়ল আরেকজনের। আগুনের স্পর্শেই আগুন জ্বলে ওঠে। একদিনের অগ্নিস্রাবী যৌবন আরেকদিকের লালসা-বহ্নিকে উদ্দীপ্ত করে তুলল।

    কদিন যেতে না যেতেই রূপহীনার কাছে হার হল রূপসীর। পতিগতপ্রাণা সাধ্বী স্ত্রীর পবিত্র আসন ছিনিয়ে নিয়ে গেল তারই স্বৈরিণী পরিচারিকা। দীর্ঘ দাম্পত্যবন্ধন, শিক্ষাদীক্ষা, নৈতিক আদর্শ, লোকলজ্জা, ভয়—কিছুই টিকল না। বহুদিনের অতৃপ্ত দীর্ঘসঞ্চিত ক্ষুধা রুগ্না ক্ষীণাঙ্গীর শীতল সঙ্গ যা মেটাতে পারে নি। তৃপ্তি খুঁজতে গেল স্থূল মাংসপিণ্ডের উত্তপ্ত উত্তেজনায়।

    মাস দুয়েকের মধ্যে এবারকার বাচ্চাটিও মায়ের কোল ছেড়ে চলে গেল। প্রসূতি তখন চলতে ফিরতে পারে না, সবে উঠে বসে বিছানার উপর। সুতরাং ঝি-এর প্রয়োজন শেষ হল না। তার চেয়ে বড় প্রয়োজন তখন দেখা দিয়েছে অন্যখানে।

    একদিন গভীর রাত্রে মনিবের গাঢ় আলিঙ্গন থেকে নিজেকে ছাড়াবার চেষ্টা করে কুসুম বলল, এবার ঘরে যাও।

    —কোন্ ঘরে? যেন বুঝতে পারে নি এমনি সুরে বলল অনাথ

    –কোন্ ঘরে আবার! তোমার বৌয়ের কাছে। একলা পড়ে আছে বেচারা।

    —থাক, তোকে আর অত দরদ দেখাতে হবে না।

    —না সত্যি, যদি জানতে পারে?

    —পারলেই বা, জেনে করবেটা কী?

    —বাঃ, তাড়িয়ে দেবে না আমাকে?

    —সে তাড়াবার কে? আমি তোকে রেখে দেবো।

    —তুমিই বা আর কদ্দিন রাখবে? আর একটু ভালো হলেই তো—

    —তখনও তোকে থাকতে হবে। তোকে আমি কোনোদিন ছাড়বো না।

    বলে ওকে আরও কাছে টেনে নিল। কুসুম আর কথা বলল না। সেই বলিষ্ঠ নিবিড় বাহুবন্ধনে নিজেকে সঁপে দিয়ে চোখ বুজল। পুরুষের বাহুপাশে ধরা দেওয়া কুসুমের কাছে এই নতুন নয়। এর স্বাদ সে এর আগে আরও পেয়েছে। কিন্তু এই সবল পেষণের মধুর যন্ত্রণা এমন করে আর কোথাও উপভোগ করে নি। আজ হোক, কাল হোক, একদিন এখান থেকে চলে যেতে হবে, এ চিন্তা তার কাছেও দুঃসহ। এই উত্তপ্ত আশ্রয়টুকু যদি চিরদিনের হত!

    এর দিন কয়েক পর অনাথ অফিস থেকে ফিরে চা খাচ্ছে। চাকর এসে জানাল, ‘মা’ তাকে ডাকছেন। মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই স্ত্রীর ঘরে ঢুকে, মাঝে মাঝে যেমন করে, জিজ্ঞাসা করল, এখন কেমন আছ?

    হৈমন্তী সে প্রশ্নের উত্তর দিল না, একটু উষ্মার সুরে বলল, কুসুমের আর দরকার নেই, এখনি বিদায় করে দাও।

    কথাগুলোর মধ্যে যে উত্তাপ ছিল সেটা গায়ে না মেখে অনাথ বেশ সহজ ঠাণ্ডা সুরেই বলল, তার জন্য ব্যস্ত হচ্ছ কেন? তুমি আগে পুরোপুরি সুস্থ হয়ে ওঠো!

    —না, ওকে আজই ছাড়িয়ে দিতে হবে।

    ভিতরে যাই ঘটুক, মল্লিকের মুখে বা কথায় তখনও কোনো বিরক্তি বা উত্তেজনা প্রকাশ পেল না—’আজই কি করে দিই? মাইনে চুকিয়ে দিতে হবে তো। মাসের শেষ, অত টাকা কোথায়?’

    দু-হাতে দু-গাছা বালা ছাড়া হৈমন্তীর দেহে তখন আর কোনো অলঙ্কার ছিল না। হঠাৎ তারই একটা খুলে নিয়ে স্বামীর দিকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে বলল, এই নাও। এটা বিক্রি করলেই বোধ হয় কুলিয়ে যাবে।

    —মাথা খারাপ করো না হৈম—গম্ভীর ভর্ৎসনার সুরে এই ক’টি কথা বলেই অনাথ বেরিয়ে যাচ্ছিল, স্ত্রীর চিৎকারে ফিরে দাঁড়াল। হৈমন্তী এতক্ষণ শুয়ে শুয়েই কথা বলছিল, অকস্মাৎ উঠে বসে তীক্ষ্ণ তীব্র কণ্ঠে চেঁচিয়ে উঠল, ও যদি আর একটা রাতও এ বাড়িতে থাকে, আমি মাথা খুঁড়ে মড়বো।

    —তাই মর।

    —কী বললে? আমি মরলে তোমার ভারি সুবিধে, পথের কাঁটা সরে যায়, না? বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়ল। অনাথ আর দাঁড়াল না।

    কপাটের আড়ালে দাঁড়িয়ে কুসুম আগাগোড়া সবটাই দেখল এবং শুনল।

    তখন কিছু বলল না। সন্ধ্যার পর তার ছোট্ট পোঁটলাটা হাতে করে বাইরের ঘরের দরজার সামনে গিয়ে বলল, আমি তাহলে যাই বাবু। মাইনের জন্যে তুমি ভেবো নি। মাস লাগলে মা এসে নিয়ে যাবে।

    অনাথ প্রথমটা ওকে দেখতে পায় নি। নিবিষ্ট মনে সিগারেট টানছিল। হঠাৎ চমকে উঠে বলল, কী বলছিস? না, তোর যাওয়া হবে না।

    —থেকে করবোডা কী?

    —কেন?

    কুসুম এক পলক এদিক ওদিক তাকিয়ে বলল, ঘরে ঢুকতে মানা করে দেছে।

    —ঢুকতে হবে না তার ঘরে। তুই—তুই এমনি থাকবি। আমার কাছে থাকবি।

    পরদিন থেকে শুরু হল নিত্য বিসংবাদ। যখন-তখন কথা-কাটাকাটি। ক্রমশ স্বামী-স্ত্রী কারও মুখেই আর বল্গা রইল না। দুজনের মধ্যে যে শালীনতার আড়ালটুকু ছিল, তাও ঘুচে গেল। দীর্ঘকাল রোগে ভুগে পর পর দুটি সন্তান হারিয়ে হৈমন্তীর আগে থাকতেই মাথার ঠিক ছিল না, তারপর নিজের চোখের উপর সংসারের মধ্যে বসে স্বামীর এই শোচনীয় বিবর্তন—সংযম ও সহিষ্ণুতার শেষ বাঁধ ভেঙে পড়ল। ওষুধ ঢেলে ফেলে, ভাতের থালা উল্টে দেয়, পাড়ার কোনো গৃহিণী ইনিয়ে-বিনিয়ে সহানুভূতি জানাতে এলে কড়া কথা শোনাতে ছাড়ে না। পুরনো ঠাকুর আগেই চলে গিয়েছিল, নতুন যে-ই আসে দু-দিনও টেকে না। ফলে সংসারের সব ভার আপনা থেকেই পড়ল গিয়ে কুসুমের হাতে। সে কদিন যাব-যাব করলেও যেতে পারল না।

    হৈমন্তীর মা নেই। বাপ থাকেন অনেক দূরে, দক্ষিণ বাংলার কোনো দুর্গম গ্রামে। দু-পুরুষ-আগে একটা ছোটখাটো জমিদারী ছিল। ইদানীং প্রায় বিত্তহীন। সে প্রতাপ নেই, কিন্তু তার তাপটা রয়ে গেছে। হঠাৎ একটা উড়ো চিঠি পেয়ে উত্তেজিত হয়ে ছুটে এলেন। কুসুম-ঘটিত ব্যাপারটা বেশ কিছুটা অতিরঞ্জিত হয়ে তাঁর কানে গিয়ে থাকবে। এসে যেটুকু দেখলেন, তাও কম নয়। তার উপরে মেয়ের শরীরের এই অবস্থা। অন্য কেউ হলে হয়তো মেয়ে-জামাইয়ের মধ্যে একটা বোঝাপড়ার চেষ্টা করতেন। খুব সম্ভব ভূতপূর্ব জমিদারের উষ্ণ রক্ত সে পথে বাধা হয়ে দাঁড়াল। জামাতার সঙ্গে একবার দেখা করবারও প্রয়োজন বোধ করলেন না। সোজা গিয়ে হাজির হলেন থানায়।

    পুলিস এসে অনাথের বিরুদ্ধে বিশেষ কিছুই পেল না। রুগ্না স্ত্রীর উপর ‘অপ্রেশান বা অত্যাচারের অভিযোগ হৈমন্তী নিজেই অস্বীকার করল। বাবা বোঝাতে চাইলেন, ঐ রকম একটা সোমত্ত ঝিকে যে তাঁর মেয়ের ইচ্ছার বিরুদ্ধে বাড়িতে পুষে রাখা হয়েছে, এইটাই তো সব চেয়ে বড় অত্যাচার। দারোগা হেসে চলে গেলেন।

    জামাইকে অন্য কোন উপায়ে ঢিট করা যায় কিনা, দু-একজন প্রতিবেশীর সঙ্গে বসে সে বিষয়ে যখন পরামর্শ করছেন, তখন দেশ থেকে নিজেরই কোনো মামলা-সংক্রান্ত জরুরী টেলিগ্রাম পেয়ে তাঁকেও হঠাৎ চলে যেতে হল। মেয়েকে আশ্বাস দিয়ে গেলেন, ওদিকের ঝামেলা মিটলেই আবার আসবেন।

    পুলিস কেস্ না নিলেও ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের চেয়ারম্যান (শহরের একজন প্রবীণ উকিল) অনাথকে ডেকে উপদেশের ছলে খানিকটা সাবধান করে দিলেন। উড়ো চিঠি তাঁর হাতেও পড়ে থাকবে। অনাথ আগুন হয়ে ফিরল। শ্বশুরকে এবং মনিবকে তাতিয়ে তোলার ব্যাপারে সাক্ষাৎভাবে পাড়ার কয়েকটা ছেলে-ছোকরার হাত আছে, একথা সে জানত। কিন্তু তার পিছনে হৈমন্তী নেই, এটা সে মনে মনে মেনে নিতে পারল না। ঐ ছোঁড়াগুলোর সঙ্গে নিশ্চয়ই তার গোপন যোগাযোগ আছে। কেউ কেউ তার ওখানে আগে থেকেই আসে যায়। ওকে দাদা এবং সেই সুবাদে হৈমন্তীকে বৌদি বলে ডাকে। হয়তো তাদের কাউকেই এইসব কাজে লাগানো হচ্ছে। অসুবিধা কিছুই নেই। মেয়েমানুষের যেটা প্রকৃতিদত্ত মূলধন চোখের জল, তার খানিকটা খরচ করলেই হল। সঙ্গে সঙ্গে ‘ঠাকুরপোদের’ শিভালরি মাথা চাড়া দিয়ে উঠবে। কিন্তু আর নয়—তারই ঘরে বসে তার বিরুদ্ধে এই ষড়যন্ত্র, এখানে সেখানে অপদস্থ করবার অপচেষ্টা এবং শেষ পর্যন্ত চাকরি ধরে টানাটানি কিছুতেই বরদাস্ত করবে না—আজই একটা হেস্তনেস্ত করে ফেলতে হবে।

    চেয়ারম্যানের কাছ থেকে অনাথ যখন ছাড়া পেল, তার আগেই সন্ধ্যা উরে গেছে। অনেকখানি পথ, বাড়ি ফিরতে রাত হল। ঠিক শহর নয়, শহরতলী। পাশেই রেল লাইন। ফাঁকা ফাঁকা বাড়ি। এমনিতেই লোক-চলাচল কম। এখন রাস্তা একেবারে খালি। প্রায় বাড়িতে আলো নিভে গেছে। হৈমন্তী তখনও জেগে। তার ঘরের দরজা আধ-ভেজানো। ভিতরে আলো জ্বলছে। বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়ে কী একটা লিখছিল। বাইরে থেকেই নজরে পড়ে। অনাথ দরজা ঠেলে ঘরে ঢুকেই ধমকের সুরে বলল, চেয়ারম্যানকে কী লিখেছ আমার বিরুদ্ধে?

    হৈমন্তী ঘাড় ফিরিয়ে স্বামীর দিকে একটা অবজ্ঞা-কুঞ্চিত দৃষ্টি নিক্ষেপ করে আবার লেখায় মন দিয়ে বলল, কে চেয়ারম্যান?

    —ন্যাকামো করো না। চেয়ারম্যান কে তা তুমি জানো। তাকে চিঠি লিখবার মতো সাহস তোমার এল কোত্থেকে?

    —আমার দায় পড়েছে তাকে চিঠি লিখতে।

    —না লিখলে আমার সংসারের খবর তার কানে যায় কেমন করে?

    —সংসারের খবর মানে? এবার উঠে বসল হৈমন্তী, ঐ মাগীটাকে নিয়ে যে ঢলাঢলি চালিয়েছ সে খবর কার জানতে বাকী আছে, শুনি?

    —ইতরের মতো মুখ-খারাপ করো না। গর্জে উঠল অনাথ।

    হৈমন্তীর মুখেও পালটা গর্জন—ইতর আমি না তুমি? তুমি বলে এখনও লোকের কাছে মুখ দেখাও, অন্য কেউ হলে—তীব্র উত্তেজনায় বাকীটা আর বলা হল না।

    অনাথ কিছুমাত্র দমে না গিয়ে বলল, আমার যা খুশী তাই করবো। তোমার না পোষায় চলে যাও, বেরিয়ে যাও আমার বাড়ি থেকে।

    হৈমন্তী তখনও হাঁপাচ্ছিল। কোনোরকমে দম নিয়ে ক্ষীণ-কণ্ঠে বলল, বেশ, তাই যাচ্ছি। তার আগে, অ্যাদ্দিন যা করি নি, তাই করবো। পাড়ার দশজনকে ডেকে

    —খবরদার! রুখে উঠল অনাথ। কারও কাছে যাবে তো তোমারই একদিন কি আমারই একদিন।

    —আমি যাবো, কী করবে তুমি?

    দরজার দিকে কয়েক পা এগিয়ে যেতেই অনাথ একটা বাহু ধরে এক ঝটকায় তাকে খাটের উপর ছুঁড়ে ফেলে দিল। হৈমন্তীর শীর্ণ দুর্বল দেহ প্রথমে খাটের পাশে এবং তারপর গড়িয়ে মাটিতে পড়ল। আর কোনো সাড়া পাওয়া গেল না।

    তীব্র বিহ্বল দৃষ্টি মেলে অনাথ শুধু তাকিয়ে রইল স্ত্রীর দিকে। ঐ সঙ্গে সেও যেন অসাড় হয়ে গেছে। হঠাৎ চোখে পড়ল, কুসুম এসে ঝুঁকে পড়ে কি দেখছে। পরক্ষণেই কানে গেল তার ত্রস্ত-কণ্ঠ—ঠাকুর, শীগগির এক বালতি জল নিয়ে এসো।

    জল এল। কোলের উপর মাথা রেখে কুসুমই ঘটির পর ঘটি জল ঢেলে চলল। কিছুক্ষণ পরে কী মনে হতে নাকের নীচে হাত দিল, সেই হাতটাই রাখল একবার বুকের বাঁদিকে, বাঁ হাতের কব্জিটাও টেনে নিয়ে দেখল। তারপর চোখ তুলে মনিবের সঙ্গে চোখাচোখি হতেই ঠোটে একটা বিকৃত ভঙ্গী করে নীরবে মাথা নাড়ল।

    একজন প্রসিদ্ধ ডাক্তারকে বলতে শুনেছি, ‘মায়ের কোলে যখন সন্তান আসে, যম তার শিয়রে ওত পেতে বসে থাকে। তাই যদি হয়, সব ক্ষেত্রেই সে শূন্যহাতে ফিরে যাবে, এতটা আশা করা যায় না। যেখানে মানুষে-যমে টানাটানি, কিছু ভাগ সে দেবতাটির হাতে পড়বেই। সুতরাং মায়ের (এবং ইদানীং তার নিজেরও) পেশার দৌলতে মৃত্যুর সঙ্গে মুখোমুখি পরিচয় কুসুমের একাধিকবার ঘটে গেছে। হৈমন্তীর নিমীলিত চোখ দুটি যে আর খুলবে না, এটা সে নিঃসন্দেহে বুঝতে পেরেছিল। তবু সম্ভবত মনিবকে প্রবোধ দেবার উদ্দেশ্যে তার মুখের দিকে চেয়ে বলল, ডাক্তারবাবুকে একটা খবর দিলে হয় না?

    কথাটা কানে যেতেই অনাথ হঠাৎ চমকে উঠল। খানিকটা ঝুঁকে পড়ে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে স্ত্রীর মুখের দিকে তাকিয়ে কি দেখল। তারপর ধীরে ধীরে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল।

    কুসুম আর কিছু বলল না। হৈমন্তীর মাথাটা কোল থেকে নামিয়ে কাঁধ আর হাঁটুর নীচে হাত দিয়ে শীর্ণ হালকা দেহখানা অনায়াসে তুলে নিয়ে খাটের উপর শুইয়ে দিল। পায়ের কাছে গুটিয়ে রাখা চাদরটা ধীরে ধীরে গলা পর্যন্ত টেনে এনে মুখটা ঢাকতে গিয়ে কয়েক মুহূর্ত সেইদিকে নিঃশব্দে চেয়ে রইল। তারপর তাড়াতাড়ি ঢাকা দিয়ে দিল।

    আমার পাঠক-পাঠিকাদের, বিশেষ করে পাঠিকাদের ওষ্ঠাগ্রে একটি সন্দিগ্ধ হাসির কুঞ্চন আমি মনশ্চক্ষে দেখতে পাচ্ছি। তাঁরা ভাবছেন, এই শেষের ছত্র দুটি আমার রচনা সন্দেহটা অযৌক্তিক নয়। তবু বলছি, না, এ আমার কল্পনা নয়, কুসুমই বলেছিল এবং সম্ভবত আমার মুখে অজান্তে ফুটে ওঠা কোনো বিস্ময়চিহ্ন লক্ষ্য করে একটা সকুণ্ঠ কৈফিয়তও জুড়ে দিয়েছিল ঐ সঙ্গে। তার নিজের ভাষায় বলেছিল, বেঁচে থাকতে একটিবারও সে আমার দিকে ভালো চোখে তাকায় নি, একটা কথাও কোনদিন ভালোভাবে বলে নি আমার সঙ্গে। তাই মরবার পর তার আসল মুখখানা দেখতে ইচ্ছা হল। দেখলাম সত্যিই রূপ ছিল মেয়েটার। কিন্তু কি কাজে লাগল সে রূপ!

    এইটুকু বলেই কুসুম সে প্রসঙ্গ চাপা দিয়ে কাজের কথায় চলে গিয়েছিল। পলকের তরে তাকাতে গিয়ে একটা মৃদু নিঃশ্বাস বেরিয়ে এসে যদি সেই মৃত্যু-শীতল মুখখানাকে স্পর্শ করে থাকে, সে নিজেই জানতে পারে নি। জানলেও সে তথ্যটুকু আমার কাছে অনুক্ত রয়ে গেছে। এ দৌর্বল্য যে তার পক্ষে একেবারে বেমানান, তার চরিত্রের এবং পূর্বাপর আচরণের সঙ্গে সঙ্গতিহীন, এ সহজ কথাটা আমি যেমন বুঝি, তারও না বোঝবার কথা নয়। তাকে আর যা-ই বলা যাক, নির্বোধ বলা চলে না।

    .

    অনাথ সেই যে গেল আর দেখা নেই। গেলই বা কোথায়? এদিকে রাত বেড়ে চলেছে। একটা দুর্ঘটনা ঘটতে কতক্ষণ লাগে? তার জের অত সহজে মেটে না। সবচেয়ে বড় পর্বটাই যে বাকী। তার আয়োজন এখন থেকেই শুরু করা দরকার। কুসুম উঠে পড়ল। হঠাৎ মনে হল, সে কে? তার এসব নিয়ে মাথা ঘামাবার কী প্রয়োজন? তার কাজ তো ফুরিয়ে গেছে। অনেকদিন আগেই গেছে। তবু এতদিন এখানে পড়ে থাকবার একটা অজুহাত ছিল। লোকের কাছে একটা পরিচয় ছিল। ঝি, অসুস্থ গৃহিণীর সেবাদাসী। আজ তাও শেষ হয়ে গেল। কিন্তু এইটাই কি তার একমাত্র পরিচয়? এর অন্তরালে—ভাবতে গিয়ে কুসুমের গোপন মনে এক ঝলক পুলক ছড়িয়ে গেল। আজ সব বাধা ঘুচে গেছে। এত শীঘ্র যে ঘুচবে, কে ভেবেছিল?

    পা বাড়াতে গিয়ে হঠাৎ চোখ পড়ল আপাদমস্তক চাদর ঢাকা হৈমন্তীর দেহটার উপর সঙ্গে সঙ্গে কোথা থেকে একটা কোন্ অজানা ভয়ের কালো ছায়া ধীরে ধীরে উঠে এসে তার সমস্ত বুকটা গ্রাস করে ফেলল। ঐ মৃত্যুর সঙ্গে কোথায় যেন তারও একটা যোগ আছে। তৎক্ষণাৎ চোখ ফিরিয়ে নিল। এই অশুভ চিন্তাটাকে মন থেকে জোর করে ঝেড়ে ফেলতে চাইল— না না, এসব কী ভাবছে সে? ওর সঙ্গে তার সম্পর্ক কী? এ মৃত্যুর জন্যে কেউ দায়ী নয়। তাই কী? অনাথ কী তাকে ঠেলে ফেলে দেয় নি? হ্যাঁ, সে তো শুধু ওকে বাধা দেবার জন্যে। ঝোঁকের মাথায় বেরিয়ে গিয়ে লোকজন ডেকে একটা হাঙ্গামা বাধিয়ে না বসে এই জন্যে। মেরে ফেলতে সে চায় নি। মনে মনে সে উদ্দেশ্য নিশ্চয়ই ছিল না। পাড়ার লোকগুলো তো এমনিতেই অনাথের বিরুদ্ধে মুখিয়ে আছে, এরকম একটা সুযোগ পেলে তার উপর এক হাত নেবার চেষ্টা না করে ছাড়ত না সেই কথা ভেবে নিতান্ত বাধ্য হয়েই সে বৌয়ের গায়ে হাত তুলেছিল, তার ফল যে এমন সাংঘাতিক হয়ে দাঁড়াবে কে ভাবতে পেরেছিল?

    কিন্তু এর উল্টো দিকটাও ভাবল কুসুম—এ-কথা যদি লোকে বিশ্বাস না করে? যদি বলে, অনাথ তার স্ত্রীকে ইচ্ছা করে খুন করেছে? তাকেও এর মধ্যে জড়িয়ে ফেলা কঠিন নয়। বাবুর সঙ্গে তার গোপন সম্পর্ক জানাজানি হতে বাকী নেই। হৈমন্তীর বাবা এসে একবার এই নিয়ে হৈ-চৈ বাধিয়ে দিয়েছিল। কিছু অবশ্য করতে পারে নি। এবার এই মৃত্যুটাকেই হয়তো কাজে লাগিয়ে দেবে। পাড়ার ছোকরাগুলো বলে বসবে—ঐ বৌটাই ছিল ওদের পথের কাঁটা। দুজনে মিলে তাকে রাতারাতি শেষ করে দিয়েছে।

    কুসুম এবার নিজের দিকটা আলাদা করে ভাবতে চেষ্টা করল। সত্যি সত্যি সে তো কোনো দোষ করে নি। তবে তার ভয় কিসের? সঙ্গে সঙ্গে মনে হল, সংসারে ক’টা সত্যি শেষ পর্যন্ত টিকে থাকে? বেশির ভাগই তো মিথ্যার জয়-জয়কার। তার কঠোর দৃষ্টান্ত

    এইটুকু বয়সেই কতবার তার চোখে পড়েছে। নিজেও সে ঘা কম খায় নি। সুতরাং আর নয়, এবার এখান থেকে তার বিদায়ের পালা। লোকজন এসে পড়বার আগেই তাকে চলে যেতে হবে। তখন এখানে থেকে সে করবেই বা কী? তাই বলে বাবুকে না বলে সে পালিয়ে যেতে চায় না, দেখা করে বলে-কয়েই যাবে।

    অনাথ বাড়িতেই ছিল। কুসুমকে বেশি খুঁজতে হল না। ওদিকের ঘরে ও বারান্দায় না পেয়ে বাইরের ঘরে গিয়ে দেখল সে অন্ধকারে চুপ করে বসে আছে। মিনিটখানেক নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে থেকে বলল, রাত যে কাবার হয়ে এল বাবু, এখন কি হাত-পা কোলে করে বসে থাকার সময়?

    অনাথ সাড়া দিল না, যেমন ছিল তেমনই নিশ্চল হয়ে রইল। কুসুম আরও কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে যাবার জন্যে পা বাড়াতেই, যেন হঠাৎ সম্বিৎ ফিরে পেল। মুখ তুলে বলল, কোথায় যাচ্ছিস?

    —কোথায় আবার, বাড়ি!

    —এই দুঃসময়ে তুইও আমাকে ছেড়ে যাবি কুসুম?

    সহসা উঠে এসে ওর হাত দুটো জড়িয়ে ধরে বলল, জানিস তো, তুই ছাড়া আপন বলতে আমার আর কেউ নেই। তার ওপরে চারিদিকে শত্রু। তোকে আমি কিছুতেই যেতে দেবো না। বলে আরও খানিকটা কাছে টেনে নিল।

    এ আকর্ষণ কুসুমের কাছে দুর্নিবার। তবু বলল, আমি মেয়েমানুষ, আমাকে দিয়ে আর কতটুকুন কি হবে? তাছাড়া পাড়ার পাঁচজন এসে—

    —কেউ আসবে না। মাঝখানে বাধা দিয়ে দৃঢ়কণ্ঠে বলল অনাথ।

    —বাঃ, ঘাটে নিতে লোকজন লাগবে না?

    অনাথ এ প্রশ্নের সরাসরি উত্তর না দিয়ে শুধু বলল, একমাত্র তোকেই আমার দরকার কুসুম, আর কাউকে চাই না।

    কথাটার তাৎপর্য বুঝতে না পেরে কুসুম বিস্মিত দৃষ্টি মেলে শুধু তাকিয়ে রইল। অনাথ তার বাহু ধরে জানালার ধারে নিয়ে গিয়ে একটা টুলের উপর বসিয়ে দিয়ে নিজেও বসল তার মুখোমুখি। আলো জ্বালা হল না, তার প্রয়োজনও ছিল না। কৃষ্ণপক্ষের রাত। দূরে গাছপালার উপর থেকে হেলে-পড়া শীর্ণ চাঁদ জানলাপথে যে ক’টি চূর্ণ রশ্মি পাঠিয়ে দিয়েছিল, তাতেই তারা পরস্পরের মুখ দেখতে পাচ্ছিল। কুসুমের একটা হাত নিজের মুঠোর মধ্যে চেপে ধরে তার চোখে চোখ রেখে অনাথ তার পরিকল্পনার খানিকটা আভাস দিতেই সে চমকে উঠল। সঙ্গে সঙ্গে তার মুখ থেকে দ্রুত বেরিয়ে এল কয়েকটা ভীত- বিহ্বল শব্দ—”না না, এ আমি পারবো না।’ হাতটাও ছাড়িয়ে নিতে চেষ্টা করল। অনাথ ছাড়ল না, জোর করে তাকে টেনে এনে নিজের পাশটিতে বসিয়ে দিল। এক হাতে তার দেহ বেষ্ঠন করে আর এক হাতে চিবুকটা তুলে ধরে বলল, তোর কোনো ভয় নেই কুসুম। এতটুকু বিপদের আশঙ্কা থাকলে তোকে আমি এর মধ্যে টানতে পারি? তাছাড়া আমি তো তোর সঙ্গেই থাকবো। চল, আর দেরি করলে লোকজন উঠে পড়বে।

    কুসুমের কাছ থেকে তখনও কোনো সাড়া না পেয়ে অনাথ তাকে ছেড়ে দিয়ে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। ক্ষুব্ধ উদাস সুরে বলল, থাক, তোর যখন ইচ্ছে নেই, আমি জোর করতে চাই না। মনে করেছিলাম, এই ঝামেলাটা মিটিয়ে ফেলে কাল সকালেই আমরা এ-দেশ ছেড়ে চলে যাবো, তোকে নিয়ে নতুন করে ঘর বাঁধবো। এ সাধ কি আমার আজকের? কবে কেমন করে তা সফল হবে ভেবে পাই নি। ভগবানকে কত ডেকেছি। কে জানত এত শীগগির সাড়া পাবো, এমন করে রাতারাতি আমার সৌভাগ্যের দ্বার খুলে যাবে। কিন্তু ভাগ্যদেবী যখন মুখ তুলে চাইলেন, যাকে ঘিরে এত আশা, এত স্বপ্ন, সে রইল মুখ ফিরিয়ে। যাক, তোকে আর আটকে রাখবো না। বাড়ি যেতে চেয়েছিস, তাই যা। আমার অদৃষ্টে যা আছে তাই হবে।

    টলতে টলতে ঘর থেকে বেরিয়ে যাচ্ছিল, সেদিকে চেয়ে কুসুমের বুকের ভেতরটা হঠাৎ মুচড়ে উঠল। বলল, শোনো!

    অনাথ ফিরে দাঁড়াল। কুসুম উঠে এসে ওর একান্ত কাছটিতে দাঁড়িয়ে চাপা গলায় বলল, ঠাকুরটা যে সব দেখে ফেলেছে!

    অনাথ যেন একটা প্রচণ্ড ধাক্কা খেয়ে দু-পা পিছিয়ে গেল। চোখের তারায় ফুটে উঠল ত্রাসের ছায়া। এই অবাঞ্ছিত লোকটাকে সে একেবারে ভুলে গিয়েছিল। কিন্তু কুসুম ভোলে নি। পুরুষের চেয়ে স্ত্রী চিরদিনই বেশি হুঁশিয়ার। পুরুষ চলে ভাবাবেগে, ঝোঁকের বশে তার দৃষ্টি শুধু সুমুখপানে, স্ত্রীজাতি কোনো অবস্থাতেই তার বাস্তব বুদ্ধি হারায় না। ডাইনে বাঁয়ে না তাকিয়ে পা বাড়ায় না।

    ঠাকুরের খোঁজ করা হল। ঘরে বাইরে কোথাও তার পাত্তা নেই। কুসুম এদিক-ওদিক খানিকটা তাকিয়ে ঘরে এসে বলল, চলে গেছে।

    —চলে গেছে!

    —হ্যাঁ, জামা-কাপড় কিচ্ছু নেই।

    শুনে যেন কিছুটা আশ্বস্ত হল অনাথ। বলল, ভয় পেয়ে পালিয়েছে। তার মানে ওর দিক থেকে কোনো আশঙ্কা নেই। ভালোই, না পালালেই বরং মুশকিল ছিল। চল আমরাও বেরিয়ে পড়ি। রাত আর নেই বলে কুসুমের কাঁধের উপর হাত রেখে হৈমন্তীর ঘরের দিকে অগ্রসর হল।

    কুসুম তখনও দ্বিধাগ্রস্ত। কিছুতেই মনস্থির করতে পারছে না। চলছে আর ভাবছে, কী করবো! ‘একটা পা সামনে ফেলছি তো আর একটা পা পিছনে থেকে টানছে।’

    ছেলেমানুষ নয় যে নিজের অবস্থাটা বুঝতে পারছে না। তার উপরে যে ঘরে যেসব পারিপার্শ্বিকের মধ্যে মানুষ, সংসারের আসল রূপটা আগেই অনেকখানি চেনা হয়ে গেছে। সেই রাত্রে অনাথ মল্লিক তাকে দিয়ে যা করাতে চাইছিল, তার মধ্যে ঝুঁকি অনেক, সহজ বুদ্ধি দিয়েই তা সে বুঝতে পেরেছিল। সেখানে প্রতিটি পদক্ষেপ কতখানি বিপদসঙ্কুল, সে সম্বন্ধেও সে সচেতন ছিল না তা নয়। তবু কী ছিল ঐ লোকটার স্পর্শে, চোখে এবং কথায়, বিশেষ করে চোখ দুটিতে (একথা সে অনেকবার বলেছে), যার কাছে নিজেকে ধরে রাখা যায় না, সমস্ত অঙ্গ শিথিল হয়ে পড়ে, তীব্র স্রোতের মুখে অসহায় তৃণখণ্ডের মতো সারা মন ভেসে যেতে চায়। আসন্ন ভবিষ্যতের যে রমণীয় চিত্র সে কিছুক্ষণ আগে চোখের উপর তুলে ধরেছিল, তাও ওকে কম প্রলুব্ধ করে নি। তার মধ্যে একদিকে ছিল মদিরা, তার উদগ্র যৌবন যার জন্যে তৃষ্ণার্ত, আরেকদিকে ছিল স্নিগ্ধ বারি, যার স্পর্শে চির-গৃহলোলুপ নারীর শাশ্বত পিপাসা তৃপ্ত হয়।

    এতগুলো প্রবল আকর্ষণ কুসুম সেদিন রোধ করতে পারে নি। তারা বিধাতা তাকে যেসব বৃত্তি ও প্রবৃত্তি দিয়ে গড়েছিলেন, হয়তো তার মধ্যেই না-পারার বীজ নিহিত ছিল। তাই সব কিছু ছেড়ে, সব বিপদ মাথায় নিয়ে সেদিন অনাথের সঙ্গেই সে নিজের ভাগ্যকে জড়িয়ে ফেলেছিল।

    অনাথ মল্লিকের বাড়ির পিছনদিকে রেললাইন, মাঝখানে কোনো বসতি নেই। একটা অযত্নরক্ষিত বাগান আর কিছু ঝোপঝাড়, জঙ্গল। তার পাশ দিয়ে একফালি পায়ে চলার পথ রেলপথের গায়ে গিয়ে পড়েছে। শহরের প্রথম ট্রেন আসে ভোর পাঁচটার কিছু আগে, মফঃস্বলের বেশির ভাগ লোক তখন বিছানায়। স্টেশন দূরে নয়, ঘন ঘন হুইসিল্‌ দিতে দিতে এগিয়ে যায়, সেদিনও তাই যাচ্ছিল। যেতে যেতে হঠাৎ থেমে গেল। গাড়ির লোকেরা ভাবল, সিগন্যাল নামে নি। ‘রেল-বাবুদের বোধ হয় ঘুম ভাঙেনি’—মন্তব্য করলেন কে একজন।

    ড্রাইভার ব্রেক কষেই নেমে পড়েছিল। এঞ্জিনের পিছনেই যে কামরা, তার তলায় একবার উঁকি মেরে বিরস মুখে মাথা নাড়তেই ফ্যায়ারম্যান পাশ থেকে প্রশ্ন করল, সাবাড়?

    অ্যাংলো-ইণ্ডিয়ান ড্রাইভার কথা বলল না। সঙ্গীর হাতে একটা হ্যাঁচকা টান দিয়ে তাড়াতাড়ি এঞ্জিনে স্টার্ট দিল। গাড়িটাকে ধীরে ধীরে কয়েক গজ পিছনে নিয়ে গিয়ে আবার থামিয়ে দিল এবং সঙ্গে সঙ্গে নেমে বলল, একেবারে দু-টুকরো হয়ে গেছে।

    বিকৃত ওষ্ঠ থেকে বেরিয়ে এল একটা আপসোস-সূচক শব্দ এবং তার সঙ্গে ‘সোয়ের’ Swear বা শপথ-জাতীয় বুলি, ওদের দোষ বা বিরক্তি প্রকাশের প্রচলিত বাহন। এক্ষেত্রে তার লক্ষ্য বোধ হয় সে নিজেই। কয়েক সেকেণ্ড আগে দেখতে পেলে এ দুর্ভোগটা এড়ানো যেত, কতক্ষণ বসে থাকতে হবে কে জানে?

    ফায়ারম্যানের বয়স বেশি নয়। এগিয়ে গিয়ে খণ্ডিত দেহটাকে ভালো করে ঠাহর করে বলল, মেয়েছেলে! ড্রাইভার ঝাঁঝিয়ে উঠল, না, মেয়েছেলে হবে কেন—তোর মতো একটা বুড়ো মদ্দ এসে লাইনের ওপর শুয়ে পড়েছে!

    ততক্ষণে যাত্রীরাও অনেকে নেমে এসে ভিড় করেছে মৃতার চারিদিকে। নানা মুখে নানা ধরনের মন্তব্য—ইস্, একেবারে পেটের ওপর দিয়ে চলে গেছে চাকাটা!” ‘আহা, কাদের ঘরের বৌ গো!’ ‘কাঁচা বয়স মেয়েটার!’ ‘বাড়ির লোকেরা হয়তো কিছুই জানে না!’ ‘পুলিসে খবর দেওয়া দরকার।’

    হঠাৎ সেই ভিড়ের মধ্যে একটা চাঞ্চল্য দেখা দিল। একে ঠেলে ওকে ঠেলে সরিয়ে দিয়ে জনতা ফুঁড়ে এগিয়ে এল দুজন—একটি পুরুষ, অন্যটি স্ত্রীলোক। দুজনেই ছুটে গিয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ল মৃতদেহের উপর। তারপর শুরু হল গগনভেদী বিলাপ। পুরুষটি বলছে, ‘এ তুমি কী করলে গো? তোমার মনে এই ছিল, একদিনও তো জানতে পারি নি?’ স্ত্রীলোকটি আর এক পরদা সুর চড়িয়ে বলছে, ‘তোমার সোনার সংসার ফেলে কোথায় চললে দিদিমণি? এত বড় সব্বোনাশ কেন করতে গেলে গো?”

    গাড়িতে বোধ হয় একটি লোকও ছিল না—ছেলে, বুড়ো, তরুণ, তরুণী সবাই এসে দাঁড়িয়েছে রেললাইনের চারদিক ঘিরে। স্তব্ধ হয়ে দেখছে এই মর্মন্তুদ শোকোচ্ছ্বাস। মেয়েরা ঘন ঘন চোখ মুচছে। পুরুষেরা কেউ কেউ ভাবছে, এই হতভাগ্য লোকটার জীবনে কত বড় শূন্য সে রেখে গেল, একটিবারও যদি জানতে পারত মেয়েটা, হয়তো এমন করে নিজেকে শেষ করে দিত না।

    কিছুক্ষণ পরে হঠাৎ পিছন থেকে বেশ উঁচু গম্ভীর গলার নির্দেশ শোনা গেল, ‘আপনারা সব সরে যান, আমাদের কাজ করতে দিন।’ সমবেত দৃষ্টি গিয়ে পড়ল বক্তার দিকে, সঙ্গে সঙ্গে একটা ফালি মতো পথ তৈরি হয়ে গেল। তার ভিতর দিয়ে এগিয়ে এলেন ইউনিফর্মধারী পুলিস অফিসার, পেছনে দুজন অনুচর। মিনিট কয়েক মৃতদেহের উপর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি বুলিয়ে নিয়ে মাথার কাছে যে পুরুষটি বসেছিল তাকে প্রশ্ন করলেন, ‘কে হন আপনার?’

    অশ্রুজড়িত কণ্ঠে উত্তর এল, ‘আমার স্ত্রী।’

    –এটি কে? পাশের স্ত্রীলোকটির দিকে আঙুল তুললেন পুলিস অফিসার।

    —ও? ও আমাদের ঝি।

    অনাথকে আরও ক’টি প্রশ্ন করা হল এবং তার থেকে জানা গেল, গভীর রাত্রে হঠাৎ ঘুম ভাঙতেই দেখে পাশে স্ত্রী নেই। প্রথমে মনে করেছিল, হয়তো বাথরুমে গেছে। বেশ কিছুক্ষণ পরেও যখন ফিরল না, উঠে পড়ে খুঁজতে শুরু করল। বাথরুমের দরজা খোলা। ঘর, বারান্দা, উঠোন সব ফাঁকা, কেউ কোথাও নেই। তখন স্ত্রীর নাম ধরে ডাকাডাকি করতে লাগল। তাতেই বোধ হয় ঝিয়ের ঘুম ভেঙে গিয়েছিল। সে-ও খানিকটা খোঁজাখুঁজি করল। বাড়ির বাইরে বাগান রাস্তা পর্যন্ত ঘরে এল দুজনে, পাওয়া গেল না। অনেকদিন রোগে ভুগে ভুগে ইদানীং মাথাটা কেমন খারাপ হয়ে গিয়েছিল। গাড়ির হুইসিল শুনলে বলত, ‘রেল আমাকে ডাকছে!’ কখনও বলত, ‘কি মিষ্টি ডাক, শুনেছ?’ হঠাৎ সে কথা মনে পড়তেই বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। বাগান পার হয়ে ছুটে এসে দেখে যা ভয় করেছিল তাই। রেল ওকে ডেকে নিয়ে গেছে। ….

    বলে আবার ডুকরে কেঁদে উঠল অনাথ মল্লিক। কুসুমও যেন তৈরি হয়ে ছিল, এমনি ভাবে সঙ্গে সঙ্গে সুর মেলাল।

    ড্রাইভার স্বীকার করল, সে যখন দেখল লাইনের উপর সাদামতো একটা কি পড়ে আছে, তখন একেবারে কাছে এসে গেছে। ব্রেক কষতে কষতে ইঞ্জিনটা এগিয়ে গেল।

    দারোগা এবার ‘ঝি’-এর দিকে নজর দিলেন। প্রথমে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পা থেকে মাথা পর্যন্ত দেখলেন। তারপর ভিড় থেকে একটু তফাতে সরিয়ে নিয়ে মিনিট কয়েক জিজ্ঞাসাবাদ করলেন। কী বুঝলেন তিনিই জানেন, ফিরে এসে অনাথকে বললেন, ‘আপনাদের দুজনকে একটু থানায় যেতে হবে।’

    ঘটনাস্রোত এবার যে পথ ধরল, তার বিশদ বিবরণ কুসুমের কাছ থেকে পাবার কথা নয়। তার কাহিনী শুনবার পর যেসব তথ্য আমি ওদের মামলার ‘রায়’ থেকে সংগ্রহ করেছিলাম, তার বিস্তৃত বর্ণনা এখানে নিষ্প্রয়োজন। যেটুকু প্রাসঙ্গিক, সংক্ষেপে উল্লেখ করছি।

    পলাতক ‘ঠাকুর’কে তাদের দেশোয়ালী আড্ডা থেকে পুলিসই খুঁজে বের করেছিল। সেরাত্রে সে দূরে কোথাও যায় নি। অত বড় দুর্ঘটনার পর সম্ভাব্য পুলিসী হাঙ্গামার আশঙ্কা করে পাশের জঙ্গলে গা-ঢাকা দিয়েছিল। অপেক্ষা করছিল, অন্ধকারটা একটু পাতলা হলেই চলে যাবে। হঠাৎ দেখল, ‘বাবু’ আর কুসুম দুজনেই ধরাধরি করে ‘মাইজী’কে রেললাইনের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। ওরা খানিকটা এগিয়ে যেতেই সে আর দাঁড়ায় নি, বেরিয়ে উল্টো দিক দিয়ে শহরের আরেক প্রান্তে একেবারে তাদের ‘আড্ডা’য় গিয়ে উঠেছিল।

    ‘দুর্ঘটনা’র সময় যে মনিব-বাড়িতে উপস্থিত ছিল, একথা ঠাকুর অস্বীকার করে নি, এবং যা যা ঘটেছিল তার যথাযথ বর্ণনাই দিয়েছিল।

    ময়না-তদন্তের রিপোর্টের সঙ্গে সাক্ষীর উক্তির কোনো অসঙ্গতি দেখা যায় নি। মৃতার হার্টের অবস্থা আগে থেকেই খারাপ ছিল, ধাক্কা খেয়ে পড়ে যাওয়ার ফলে মৃত্যু হওয়া অসম্ভব নয়। শরীরে কোনো প্রাক্-মৃত্যু আঘাত-চিহ্ন পাওয়া যায় নি। রেলের ক্ষতটা নিঃসন্দেহে ‘পোস্ট-মর্টেম’ অর্থাৎ মৃত্যুর কয়েক ঘণ্টা পরবর্তী।

    সরকারের তরফ থেকে খুনের অভিযোগ দায়ের করা হলেও দায়রা আদালত সেটা গ্রহণ করেন নি। প্রথম আসামী অনাথ মল্লিককে দোষী সাব্যস্ত করলেন দুটো অপরাধে—অসতর্ক ও হঠকারিতামূলক কার্যের দ্বারা মৃত্যু ঘটানো, এবং তার প্রমাণলোপের অপচেষ্টা। দ্বিতীয় আসামী কুসুম দাসীর বিরুদ্ধে শুধু পরবর্তী অপরাধটা প্রমাণিত হল। দণ্ডের বেলায় অনাথের দ্বিতীয় ধারার মেয়াদ প্রথমটির সঙ্গে ‘কান্কারেণ্ট’ বা একযোগে চলবে বলে আদেশ দেওয়ায় দুজনের মধ্যে কার্যত কোনো তফাৎ রইল না। কিন্তু কারাদণ্ডের পরিমাণ এক হলেও, তফাৎ ঘটল কারাগারে এবং সেখানকার ‘স্ট্যাটাস্ বা পদমর্যাদায়। অনাথ মল্লিক শিক্ষিত ভদ্রলোক, সুতরাং ‘ডিভিশন টু’ বা দ্বিতীয় শ্রেণীর সনদ নিয়ে সে চলে গেল কলকাতার কুলীন জেলে। কুসুম দাসী নিরক্ষর ‘ছোট জাত’, তার আশ্রয় হল মফঃস্বল সেন্ট্রাল জেলের তৃতীয় শ্রেণীর জেনানা ফাটক। উভয়ের দণ্ডই সশ্রম, কিন্তু শ্রম-বণ্টনে আকাশ-পাতাল পার্থক্য। অনাথের সেই পুরনো কেরানীগিরিই বজায় রইল। ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের অফিস থেকে উঠল গিয়ে জেলের অফিসে। কুসুমের যা পেশা, জেল তা যোগাবে কোত্থেকে? তার কাজ হল রোজ দশ সের করে গম পেষা। প্রসূতি ও শিশুর সেবা নিয়ে যার দিন কেটেছে, তার হাতে উঠল দেড়মণি জাঁতার হাতল। দু-দিন ঘুরিয়েই দু-হাতের তালু জুড়ে দেখা দিল বড় বড় ফোস্কা

    সেই ফোস্কা-সূত্রেই তার সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয়। জেনানা-ফাটকের সাপ্তাহিক প্যারেডের জন্যে অপেক্ষা করবার ধৈর্য ছিল না, ‘বড় সায়েবের কাছে নিয়ে চল’ বলে এমন চেঁচামেচি বাধিয়ে দিয়েছিল যে মেট্রন তাকে সরাসরি আমার অফিসে হাজির না করে পারে নি। এসেই টেবিলের ওপার থেকে হাত দুটো প্রায় আমার মুখের কাছে বাড়িয়ে দিয়ে বলেছিল, ‘মেরে ফেললেও আর জাঁতা ঘোরাতে পারবো না।’

    কী একটা কাজে জেল-ডাক্তার সেখানে উপস্থিত ছিলেন। আমার ইঙ্গিত পেয়ে সেই সুডৌল হাত দু-খানা নিজের হাতে নিয়ে টিপে টিপে পরীক্ষা করলেন। যতটা এবং যতক্ষণ প্রয়োজন, তার চেয়ে কিছুটা বেশিই দেখলেন মনে হল। তারপর বললেন, কিছু দিন ‘রেস্ট’ দিতে হবে। বিশ্রামটা আপাতত সাময়িক হলেও ভবিষ্যতে স্থায়ী হয়ে দাঁড়াবে, সেটা আমি তখনই অনুমান করেছিলাম। সে অনুমান মিথ্যা হয় নি। ফোস্কা শুকিয়ে যাবার পরেও ডাক্তার তাকে বরাবরের জন্যে ‘আনফিট্ ফর হুইট্‌গ্রাইন্ডিং’ অর্থাৎ গম-খাটনির অযোগ্য বলে ঘোষণা করেছিলেন। অন্য কোনো বিকল্প খাটনির ব্যবস্থা অবশ্যই হয়ে থাকবে। সেটা বোধ হয় কাগজ-কলম ছাড়িয়ে ‘হাতে-কলমে’ পর্যন্ত পৌঁছয় নি। তা যদি হত, তাই নিয়ে আরও দু-চারবার সে নিশ্চয়ই আমার অফিস পর্যন্ত ধাওয়া না করে ছাড়ত না।

    ধাওয়া অবশ্য ক’দিন পরেই করেছিল। তবে খাটনির ব্যাপারে নয়, অন্য নালিশ নিয়ে। আগের দিনের মতোই একখানা চিঠি আমার সামনে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে, যেন কৈফিয়ৎ তলব করছে এমনি সুরে বলেছিল, আমার চিঠিতে এত কালি ফেলেছে কেন? চিঠিখানা তুলে নিয়ে দেখলাম, এখানে ওখানে দু-তিনটা লাইন বাদ দিয়ে বাকী সবটাই সেন্সরের ঘন কালিতে আচ্ছন্ন। মিনিট খানেক অপেক্ষা করে যখন হতাশ সুরে বলল,

    ‘এটা দিয়ে আমি কী করবো’, আমিও মনে মনে তার প্রশ্নে সায় না দিয়ে পারলাম না। তার মধ্যে বস্তু বলতে বিশেষ কিছুই ছিল না। বললাম, তুমি একটু বাইরে যাও। খবর নিয়ে পরে আবার ডাকবো।

    সঙ্গে যে ফিমেল ওয়ারর্ডারটি এসেছিল, সে ওকে বুঝিয়ে-শুঝিয়ে কোনো রকমে অফিসের বারান্দায় নিয়ে গেল। আমি আমার সেন্সর অফিসার মাধববাবুকে ডেকে পাঠালাম। গম্ভীর প্রকৃতির বয়স্ক লোক। বললেন, ওখানে যেসব কথা ছিল, আমি আপনার সামনে মুখে আনতে পারবো না স্যার।

    —কী ধরনের কথা? অশ্লীল?

    —ঠিক অশ্লীল নয়, তবে—একটু থেমে ইতস্তত করে বললেন, রীতিমতো লাভ্- লেটার। ও-জেল থেকে কেমন করে এল তাই ভাবছি। বোধ হয় কেউ স্মাগ্‌ করে পাঠিয়েছে।

    লেখকের নামটা মাধববাবু কাটেন নি। কুসুমকে ডাকিয়ে এনে বললাম, অনাথ কে?

    —আছে একজন।

    –সেই একজনের সঙ্গে তোমার সম্পর্কটা আমাদের জানা দরকার।

    –কেন?

    —তাই বুঝে আমরা ঠিক করবো, চিঠির কতটা থাকবে আর কতটা কাটা যাবে।

    কুসুম একটুখানি কি ভেবে নিয়ে বলল, ওর কাছেই তো আমি ছিলাম। আমাকে খু-উ-ব ভালোবাসে। (বলতে বলতে মুখখানা কোমল হয়ে এল। গলাটাও অনেকটা স্নিগ্ধ শোনাল) বাবু বলেছে, জেল থেকে বেরোলেই আমাকে নিয়ে কলকাতায় বাসা করবে। এই চিঠিতে বোধ করি সেই কথাই ছিল। কোন্ ড্যাক্রা সব কালি ঢেলে বুজিয়ে দিয়েছে দ্যাখো না! বলে সম্ভবত মাধববাবুকেই সেই দুর্বৃত্ত মনে করে তাঁর দিকে একটি অগ্নিকটাক্ষ নিক্ষেপ করল।

    ফিমেল ওয়ার্ডার বোধ হয় হাসি চাপবার চেষ্টায় অন্য দিকে মুখ ফেরাল। মাধববাবুর চোখে মুখে বিরক্তি ও বিতৃষ্ণার ভ্রূকুটি আরও খানিকটা স্পষ্ট হয়ে উঠল। যথোচিত ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দিয়ে অভিযোগকারিণীকে তখনকার মতো ভিতরে পাঠানো হল।

    এর পরের চিঠিখানা মাধববাবু আমাকে দেখিয়েছিলেন। কুসুম যদি পড়তে পারত এবং ফিমেল ওয়ার্ডের একমাত্র বাসিন্দা হত, চিঠিটা বিনা সেন্সরেই তার হাতে দেবার নির্দেশ দিতাম। সে আগেই যে স্তরে গিয়ে পৌঁছেছিল, তার ‘নৈতিক উন্নতি’ নিয়ে আমাদের মাথা ঘামাবার প্রয়োজন ছিল না। মাধববাবুর ওটা নিছক পণ্ডশ্রম। কিন্তু ওর সঙ্গে আরও মেয়ে থাকে—কয়েকজন তার মধ্যে উঠতি-বয়সী। এ চিঠি তাদেরও হাতে হাতে ঘুরবে। সে কথা আমাদের ভাবতে হয়েছিল। সুতরাং কুসুমের চিঠি পাওয়া বন্ধ হয়ে গেল। সঙ্গে সঙ্গে শুরু হল নানা রকম উৎপাত। যাকে যখন যা মুখে আসে তাই বলে, কোনো কাজ করে না, তুচ্ছ কারণে চেঁচামেচি করে, কখনও বা গুম্ হয়ে বসে থাকে।

    আবার একদিন এল আমার কাছে। মেট্রনের হাত ছাড়িয়ে ছুটে এসে পড়ল আমার পায়ের উপর। তিন-চারজনে টেনে তুলতে পারে না। সে কী আকুল কান্না! —আমাকে ওখানকার জেলে পাঠিয়ে দাও সায়েব। তাকে একবারটি না দেখলে আমি মরে যাবো।

    আমি ধমক দিলাম, একথা বলতে তোমার লজ্জা করে না?

    সে কিছুক্ষণ আমার চোখের দিকে তাকিয়ে থেকে মৃদু করুণ কণ্ঠে বলল—তার পক্ষে যেটা একেবারেই অপ্রত্যাশিত—তুমি যদি আমার সব কথা জানতে সায়েব, তাহলে বুঝতে। না, তার কাছে আমার কোনো লজ্জা নেই।

    এর পরেই সে আমার কাছে তার “সব কথা” খুলে বলবার জন্যে পাগল হয়ে উঠেছিল। মেট্রনকেও তাড়া দিয়ে দিয়ে পাগল করে তুলল। প্রথমটা আমি রাজী হই নি। তারপর মত বদলাতে হল। সেদিন তার যে অবস্থা, তাকে ঠিক প্রকৃতিস্থ বলা চলে না। পুরোপুরি মনোবিকার না ঘটলেও, কথায় বার্তায় আচরণে তার অনেকগুলো লক্ষণ সুস্পষ্ট। তার থেকে আমার একটা ধারণা হয়েছিল, ওর বহু অপরাধজড়িত তরুণ জীবনের যে অংশটা আড়ালে পড়ে আছে, তাকে খানিকটা উন্মোচিত করবার সুযোগ দিলে, উত্তেজিত ও অপরিণত মনের এখানে সেখানে যে-সব জট পাকিয়ে গেছে তার গ্রন্থিগুলো হয়তো খুলে যেতে পারে।

    অভিলাষবাবুর ঐ চেয়ারখানাই সেদিন একটু ঘুরিয়ে নিয়ে বসেছিলাম। ও ছিল আমার পায়ের কাছটিতে। অকপটে শুধু নয়, গভীর আগ্রহভরে একটানা বলে গিয়েছিল তার শত দুষ্কর্মের দীর্ঘ ইতিহাস। বলতে পেরে যেন বেঁচে গিয়েছিল। জানি না, সেদিন কিসের আলোড়ন উঠেছিল তার অন্তর জুড়ে, যার তাড়নায় একজন অনাত্মীয় প্রবীণ পুরুষের কাছে যুবতী নারীর যে ব্রীড়াজনিত স্বাভাবিক সঙ্কোচ, সেটাও সে অনায়াসে অতিক্রম করে গিয়েছিল। আমাদের উভয়ের ভিতরে যে দুস্তর ব্যবধান, তাও তার দিক থেকে অণুমাত্র বাধা সৃষ্টি করে নি।

    সে যেমন করে তার নির্লজ্জ প্রগল্ভ কাহিনীর রাশ খুলে দিয়েছিল, আমি তেমনি করে তার পুনরুক্তি করতে পারি নি। তার ভাষাকে কিঞ্চিৎ ভদ্র পোশাক পরাতে হয়েছে।

    ‘ঐ জেলে পাঠিয়ে দাও’ বলে কুসুম প্রথমটা যে ঝোঁক ধরেছিল, ক্রমশ তার বেগ পড়ে গেল। ও নিয়ে আর পীড়াপীড়ি করত না। তা-ই হয়। মানুষের মনের প্রবৃত্তিগুলো জোয়ারের জলের মতো। আসে, যায়, একটানা বেশি দিন থাকে না। আর একটা কারণ ছিল। অনাথের চিঠিতে আর সে উত্তাপ ছিল না। ভাষা ও সুর—দুটোই আশ্চর্যরকম বদলে গিয়েছিল। উচ্ছ্বাস নেই, আবেগ নেই, গোপন প্রণয়ের আবিলতা নেই, আগাগোড়া শুধু বড় বড় উপদেশ। মাধববাবুর সেন্সরের কাঁচি তার কোনোখানেই দাঁত বসাবার জায়গা পেত না। প্রতিটি চিঠি একেবারে অক্ষত দেহে ফিমেল ওয়ার্ডে গিয়ে পৌঁছত। মেট্রন পড়ে শুনিয়ে দিত। কিন্তু যার চিঠিতে তার কোনো আগ্রহ ছিল না, শুনে যেত, এই পর্যন্ত। চিঠিগুলো হাত বাড়িয়ে নিতেও চাইত না। মেট্রন দিতে গেলে বলত, থাক, ও দিয়ে আমি কী করব?

    তারপর অনেকদিন নির্বিবাদে কেটে গেল।

    কুসুমকে বিশেষভাবে চোখে বা মনে পড়বার মতো কোনো ঘটনা ঘটে নি। ইদানীং তার ভিতরকার সেই বন্য ভাবটা আশ্চর্যরকম শান্ত হয়ে গিয়েছিল। নিজেও কোনো নালিশ নিয়ে ছুটে আসে নি, তার নামেও কোনো ‘নালিশ’ ছিল না। দীর্ঘকাল পরে আমার অফিসেই আবার তাকে দেখলাম। অনেকটা যেন স্তিমিত। ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে একখানা খোলা চিঠি আমার টেবিলের উপর রাখল। বললাম, কী এটা?

    —পড়ে দেখুন।

    কয়েক বছর জেলে বাস করে কুসুমের ভাষার অনেকটা উন্নতি হয়েছিল। চিঠিটা তুলে নিয়ে লেখকের নামটা দেখে নিলাম। শ্রীঅনাথ মল্লিক। তার উপরে কয়েকটি মাত্র লাইন—

    কল্যাণীয়াসু

    কুসুম, এক-থোকে হঠাৎ খানিকটা ‘রেমিশন’ পেয়ে কালই আমি জেল থেকে বেরিয়ে যাচ্ছি। তোমারও বোধ হয় খালাসের বেশি দেরি নেই।

    ভেবে দেখলাম তোমার পথ এবং আমার পথ এক নয়। তোমার জীবনের সঙ্গে নিজেকে আর জড়াতে চাই না। এতদিন পরে একটা নতুন দিকের সন্ধান পেয়েছি।

    তোমার কাছে এই আমার শেষ চিঠি। হয়তো আর কখনও দেখা হবে না। আশীর্বাদ করি তুমি সুখী হও।

    .

    চিঠিটা মুড়ে টেবিলের উপর রাখতেই সে বলে উঠল, এখানে কি বরাবর থাকা যায় না?

    —না, মেয়াদ শেষ হবার পরে একদিনও আমরা রাখতে পারি না।

    —তাহলে আমি কোথায় যাবো?

    এ প্রশ্নের একটি মাত্র উত্তর ছিল—’জানি না’ কিংবা ‘আমাদের তা নিয়ে মাথা ঘামাবার কথা নয়’—কথাটা বোধ হয় মুখে বাধল, তাই পাল্টা প্রশ্ন করলাম, মা-র কাছে যেতে তোমার আপত্তি কী?

    কোন্ মুখে যাবো? অ্যাদ্দিন আছে কিনা কে জানে? থাকলেই বা…. বলতে বলতে দুচোখ জলে ভরে গেল। পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিয়ে দৃঢ়স্বরে বলল, আপনি বলুন, আমার একটা ব্যবস্থা করে দেবেন? তা নৈলে কিন্তু আমি কখনো এখান থেকে নড়বো না, তাড়িয়ে দিলেও পড়ে থাকবো।

    বললাম, খালাসের তো এখনও মাস কয়েক দেরি আছে, তখন দেখা যাবে কি করা যায়।

    —কথা দিচ্ছেন তাহলে?

    সঙ্গে যে ফিমেল ওয়ার্ডারটি ছিল, সে ধমকে উঠল, কাকে কি বলিস তার ঠিক নেই চল্…বলে এক রকম জোর করেই ওকে টেনে নিয়ে চলল। হঠাৎ টেবিলের উপর নজর পড়তে বললাম, চিঠিটা? কুসুম যেতে যেতে দরজার মুখে থমকে দাঁড়াল, দ্রুতপায়ে ফিরে এসে চিঠিখানা তুলে নিল এবং সঙ্গে সঙ্গে শত টুকরো করে জানলার বাইরে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে সবেগে বেরিয়ে চলে গেল।

    আমাকে বিশেষ চেষ্টা করতে হয় নি, অনেকটা আপনা হতেই কুসুমের একটা মোটামুটি ব্যবস্থা হয়ে গিয়েছিল। আমাদের ফিমেল ওয়ার্ডের একটি কয়েদী তখন আসন্ন – প্রসবা। মাস পাঁচেক আগে ছ’মাসের সাজা নিয়ে এসেছিল। জেলের মধ্যে আঁতুড়ের হাঙ্গামা তো কম নয়। সেটা এড়াবার জন্যে জেলর তার টিকেটে মোটা ‘রেমিশন’-এর সুপারিশ করেছিলেন, যাতে করে ও-পর্বটা বাইরে গিয়ে সমাধা হতে পারে; অর্থাৎ তার আগেই তাকে ছেড়ে দেওয়া যায়। অতটা ‘মাপ’ দেবার কোনো সঙ্গত কারণ না থাকলেও আমি রাজী হয়েছিলাম। কিন্তু বিধাতা বাধ সাধলেন। ডাক্তারের হিসাবমত নবজাতকটির যখন আসবার কথা, তার কিছুদিন আগেই তাকে পাঠিয়ে দিলেন। তাও এমন অকস্মাৎ যে লেডি ডাক্তার ডাকবার তর সইল না। তিনি যখন এসে পৌঁছলেন, শিশুটি তখন কুসুমের কোলে। প্রসূতিকে সুস্থ করে তুলতে ক’দিন সময় লেগেছিল। পর পর তিন চার দিন তাঁকে আসতে হল। না এলেও হত। কুসুম একাই সামলাতে পারতো। তার কাজ- কর্ম দেখে লেডি ডাক্তার এতটা খুশী হয়েছিলেন যে, খালাসের সঙ্গে সঙ্গে ওখানকার হাসপাতালেই একটা চাকরি জুটিয়ে দিতে বিশেষ বেগ পেতে হয় নি।

    তার কিছুদিন পরে শুনলাম, তিনি ওখান থেকে হুগলী না হাওড়া কোথায় যেন বদলি হয়েছেন, এবং কুসুমকেও সঙ্গে নিয়ে গেছেন।

    .

    সেদিন অভিলাষবাবুর অফিস থেকে যখন বেরিয়ে পড়লাম, তার ঘণ্টা দেড়েক পরেই আমার ট্রেন! কুসুম তখনও ওখানেই অপেক্ষা করছিল। আসবার সময় আর তার দিকে তাকাই নি। কিন্তু সেই জ্বলন্ত চোখ দুটো সমস্ত পথ আমাকে অনুসরণ করে চলল। একবার ভাবলাম ফিরে যাই, জেনে আসি ঐ আগুনের ইতিহাস, এতগুলো বছর অন্তরের কোন্ নিভৃত কোণে ঐ অনির্বাণ শিখাটাকে সে জ্বালিয়ে রেখেছিল কেমন করে! তারপর নিজেকে বোঝালাম, না, ফেরা যায় না। কুসুম এবং তাকে ঘিরে যে জগৎ সেখান থেকে আমি চিরদিনের তরে সরে এসেছি। পিছনে যা রইল তা পিছনেই থাক। মায়া বাড়িয়ে কী লাভ? এ শুধু ক্ষণিকের দুর্বলতা। একে প্রশ্রয় দেওয়া চলে না।

    কোলকাতায় ফিরে নানা কাজের মধ্যে ডুবে গেলাম। কুসুম আবার ধীরে ধীরে মনের তলায় মিলিয়ে গেল।

    হঠাৎ একদিন আমার বৈঠকখানায় অভিলাষবাবুর আবির্ভাব। বিস্মিত হলাম। চাকরি জগতে ভূতপূর্বের সঙ্গে বর্তমানের যে স্বাভাবিক বিচ্ছেদ, তার উপরে সেতু রচনা করবার ইচ্ছা বা আগ্রহ কোনো তরফেই বড় একটা দেখা যায় না। বিশেষ করে ভূতপূর্বের মাথায় যদি সাহিত্যের ভূত চাপে, বর্তমান তাকে সযত্নে এড়িয়ে চলবে, এইটাই প্রত্যাশিত। তাহলে কি উনি আবার নতুন কোনো ফ্যাসাদ ডেকে এনেছেন?

    বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হল না, অভিলাষবাবু একটা খাকী রংয়ের খামে মোড়া বস্তু আমার দিকে বাড়িয়ে বললেন, এই নিন।

    —কী ওটা?

    —আমি কিছু জানি না। শুধু পৌঁছে দেবার কথা, তাই দিয়ে গেলাম। উঃ, চীজ বটে একখানা! আপনি যে কি করে ওকে বরদাস্ত করতেন স্যার, আপনিই জানেন। আমি তো দুদিনেই অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছি। ওর জন্যেই বোধ হয় পালাতে হবে ওখান থেকে।

    —কার কথা বলছেন?

    —ঐ যে, আপনার কুসুম না কী! আমি বলবো ক্যাক্‌টাস্, ভীষণ কাঁটাওয়ালা ক্যাক্‌টাস্, আমরা যাকে বলি ফণীমনসা! বিচ্ছুও বলতে পারেন।

    —খুব জ্বালাচ্ছে বুঝি?

    —জ্বালাচ্ছে মানে! প্রাণ বের করে দিল। সেদিন এসে বলছে—’সায়েবকে একটা চিঠি দেবো।’ ‘কোন্ সায়েব?’ ‘কোন্ সায়েব আবার! আমার সায়েব সেদিন যিনি এসেছিলেন।’ বললাম, ‘বেশ তো। তার জন্যে আমার কাছে আসবার কী দরকার ছিল? মেট্রনকে বললেই চিঠির কাগজ পেয়ে যেতে।’ বললে, ‘চিঠি আমার লেখা হয়ে গেছে।

    ‘তাহলে অফিসে পাঠিয়ে দাও।’ উত্তরে কি বললে জানেন? ‘না, এ চিঠি আর কেউ পড়ে, তা আমি চাই না। এটা আমি আপনার হাতে দিয়ে যাবো।’ ‘আমার হাতে!” “হ্যাঁ, আপনি যেদিন কোলকাতা যাবেন, তাঁর কাছে পৌঁছে দেবেন।’

    শুনুন কথা! আর কী টোন্! যেন কুইন ভিক্টোরিয়া হুকুম চালাচ্ছে!

    —আর আপনিও তো দেখছি সেটা সঙ্গে সঙ্গে তামিল করতে ছুটেছেন?

    —না ছুটে উপায় আছে, স্যার? এর পরে কি বললে, তা তো এখনও শোনেন নি!

    —কি বললে?

    বোঝাতে গিয়েছিলাম, আমার যাবার দরকার হবে না, ডাকে দিলেও চিঠি ঠিক পৌঁছে যাবে। কথাটা শেষ হবার আগেই রুখে উঠল—’আপনি নেবেন কিনা বলুন, তা নইলে আমি এইখানে আপনার সামনে মাথা খুঁড়ে মরবো।’….বুঝুন একবার। বুড়ো বয়সে শেষকালে খুনের দায়ে পড়বো?

    চিঠিখানা কুসুমের নিজের হাতে লেখা, সে তথ্যটি গোড়াতেই জানা গেল। আর জানলাম, এই নতুন বিদ্যা তার নিজের ইচ্ছা বা আগ্রহে অর্জিত হয় নি, এর পেছনে সবটাই তার ‘মাসিমা’ অর্থাৎ লেডি ডাক্তার মিস দাসের চেষ্টা। চেষ্টাটা বিশেষ ফলবতী হয়েছে বলে মনে হল না। সে বিষয়ে কুসুম নিজেও সচেতন। বলছে, ‘আমার এই লেখা আপনি পড়তে পারবেন কি? না পারলেও আমি সে কথা জানতে যাবো না। আমার বুকের বোঝা আমি নামিয়ে দিয়েই খালাস। তা নাহলে সারাজীবন ধরে গুমরে গুমরে মরতাম।’ এতদিন পরে একটা পুরো নিঃশ্বাস পড়ল।

    ‘এবারে জেলে এসেই শুনেছিলাম, আপনি আর চাকরিতে নেই। কোথায় আছেন কেউ বলতে পারে না। কতদিন আপনার কথা ভেবেছি, কিন্তু এ জীবনে দেখা পাবো, তা কি কোনোদিন স্বপ্নেও ভাবতে পেরেছিলাম? দেখে কী ইচ্ছা হয়েছিল জানেন? সেই সেদিনের মতো আপনার পায়ের কাছটিতে গিয়ে বসি, বলে যাই যত কথা জমে আছে বুকের মধ্যে, যা কাউকে বলি নি, আর কাউকে বলা যায় না। সে সুযোগ হল না। এ জীবনে কোনোদিনই হবে না। তাই সেদিন থেকে বসে এই চিঠিটা লিখেছি। লিখে মনে হল, এ চিঠি তো এরা পাঠাবে না। পাঠালেও কেটেকুটে একশা করে দেবে। তা যাতে না হয়, তার জন্যে কত কাণ্ড যে আমাকে করতে হয়েছে, শুনলে আপনি হাসবেন।….যাক সে সব বাজে কথা।‘

    চাকরি-জীবনের প্রথম দিকে শিক্ষানবিশি-স্তরে চিঠি-সেন্সর নামক দুরূহ কার্যটি আমাকে কিছুদিন করতে হয়েছিল। সেই বিদ্যার জোরে ভাষা, বানান এবং লিপি বিন্যাসের কাঁটাবন ভেঙে চিঠিখানার মোটামুটি পাঠোদ্ধার কোনো রকমে করা গেল। কিন্তু গোটা চিঠিটার হুবহু উদ্ধৃতি শুধু অসম্ভব নয়, আমার পাঠককুলের কাছে রুচিকর হবে না, লেখিকার উপর অবিচার করা হবে। এ চিঠি একান্ত ভাবে আমারই জন্যে লেখা, প্রকাশের জন্যে নয়। আমি তাকে জানি, তার নিগূঢ় মনোরাজ্যের সন্ধান রাখি, তার বিধাতা তাকে যে-সব বিচিত্র উপাদান দিয়ে গড়েছেন, তারও পরিচয় পেয়েছি। সে কথা সে নিঃসংশয়ে জানে বলেই তার নারী-হৃদয়ের অন্তরালে প্রবৃত্তির যে উদ্দাম তাড়না, কামনার যে নগ্ন আবেগ, কোনোটাই সে গোপন করে নি। একদিন মুখে যতটা বলেছিল, তার চেয়েও বেশি, তার নিরাবরণ অন্তর্লোক অসংকোচে উদ্‌ঘাটিত করে গেছে। তার উপর কিছুটা সেন্সরের কলম না চালিয়ে উপায় নেই। ভাষার উপরেও যে ঘষা-মাজার প্রয়োজন ঘটেছে, সে কথা তো আগেই কবুল করেছি।

    লেডি ডাক্তার মিস দাস কুসুমকে শুধু আশ্রয় ও মোটামুটি সচ্ছল জীবনযাত্রার সংস্থান করে দেন নি, তাঁর নিঃসঙ্গ প্রৌঢ় জীবনের অনেকখানি স্নেহও ওকে দিয়েছিলেন। অন্য কোনো মেয়ে হলে হয়তো সেই স্নেহচ্ছায়ায় সুখে জীবন কাটিয়ে দিত। কুসুম তা পারে নি। সে সুখী ছিল না। মাসিমার প্রতি তার কৃতজ্ঞতার অন্ত নেই। সে যে তাঁর নিজের মেয়ে নয়, এ কথা তিনি একদিনের তরেও বুঝতে দেন নি—এও তারই অকপট উক্তি। তবু সুখ’ যাকে বলে তা সে পায় নি। সংসারে সুখের চেহারা সকলের বেলায় এক নয়।

    ‘সেই লোকটা’ (চিঠির ভাষায়) গোপন প্রেমের যে ফেনিল সুরাপাত্র ওর পিপাসিত ওষ্ঠপ্রান্তে তুলে ধরেছিল, তার তীব্র স্বাদ কুসুমের শিরায় শিরায় পরিব্যাপ্ত হয়ে গেছে। তাকে আশ্রয় করে একটি অপরিণত নারীমন সেদিন যে-জীবনের স্বপ্ন দেখতে শিখেছিল, দূরে গিয়েও সে দিনের পর দিন তারই উপরে নানা রঙের তুলি বুলিয়ে সেই জীবনকে আরও মোহময়, আরও লোভনীয় করে তুলেছে। মাধববাবুর সেন্সরের কালি তাকে ঢেকে রাখতে পারে নি, অতৃপ্ত রমণী-হৃদয়ের উদগ্র বাসনাকে আরও খানিকটা উসকে দিয়েছে। তারই মাদকরসে নিজেকে আকণ্ঠ ডুবিয়ে দিয়ে যে দুঃসহ আনন্দ, কুসুমের কাছে তারই নাম ‘সুখ’। জেনানা ফাটকে বসে বসে সেই সুখের উপরেই সে একটি মনোরম স্বর্গ গড়ে তুলেছিল। তারপর যাকে অবলম্বল করে এত সাধের স্বর্গ-রচনা, তারই রূঢ় হাতের অপ্রত্যাশিত আঘাতে যেদিন সেটা ভেঙে চুরমার হয়ে গেল, তখনও তার দুর্জয় মোহ কুসুমকে প্রচণ্ড আকর্ষণ করেছে। সেই দীর্ঘ-লালিত প্রলোভনের কবল থেকে নিজেকে টেনে সরিয়ে এনে মিস দাসের সহজ সুস্থ স্নেহময় গার্হস্থ্য জীবনের মধ্যে নিজেকে সে বসাতে পারে নি, হয়তো তেমন চেষ্টাও করে নি।

    তার অকপট স্বীকারোক্তি চিঠিতেই দেখতে পাচ্ছি—’আপনি তো সবই জানেন। এটুকু বলতে আর বাধা কী? আপনার কাছে আমার লজ্জাই বা কিসের? সত্যি বেশ লাগত। কত কী যে ভাবতাম! সব ‘তাকে’ নিয়ে। ‘তাকে’ নিয়ে সংসার পেতেছি। কোথায় জানেন? কোলকাতায়। একদিন দুজনে মিলে গিয়েছি আপনাকে প্রণাম করতে। সে যেতে চায় না, বলেছে, কি ভাববেন তিনি? আমি যেন জোর করে ধরে নিয়ে গেছি। তারপর নিজের মনেই হেসে ফেলতাম। ওমা, আপনার ঠিকানাই যে জানি না!…. কোনো কোনো দিন সে আসত। সত্যি বলছি আপনাকে, আমার পাশে এসে বসত। দু-হাতে জড়িয়ে ধরে আমাকে পিষে ফেলত। তারপর…হঠাৎ দেখতাম সব মিথ্যা, সব ভুল। আমি একা, সে কোথাও নেই। তখন সমস্ত শরীরে আগুন ধরে যেত। সে যে কী জ্বালা আপনাকে বোঝাতে পারবো না।

    এমনি করে কয়েক বছর কেটে গেল। কুসুমের রক্তধারায় সে দহন-জ্বালা হয়তো আপনা হতেই কিছুটা প্রশমিত হয়ে এল। আরও হত, অন্য কোনো কারণে না হলেও, মহাকালের অমোঘ বিধানে। কিন্তু হল না। বিধাতার হয়তো সে ইচ্ছা ছিল না। তাই তাঁরই হাতে লেখা ললাট-লিপি কুসুমকে টেনে নিয়ে গেল অন্য পথে, এক আকস্মিক, অভাবনীয়, ভয়ঙ্কর পরিণতির মধ্যে। চিঠির শেষ অংশ থেকে সেই কাহিনীটি উদ্ধার করছি।

    রাত আটটা বেজে গেছে। শহরতলীতে একটা ‘কল্’ সেরে মিস দাস ঘোড়ার গাড়ি করে ফিরছেন। সঙ্গে কুসুম। ওঁর এক বান্ধবীর বাড়ির সামনে দিয়ে পথ, হঠাৎ কী মনে হল, গাড়ি থামিয়ে বললেন, সতীর সঙ্গে একটু দেখা করে যাই, তুই চলে যা।

    ‘গাড়িটা পাঠিয়ে দেবো তো?’ জানতে চাইল কুসুম।

    —কী দরকার? আমি একটা রিক্শা নিয়ে নেবো

    গাড়ি আরও কিছু পথ এগোতেই, কাছাকাছি কোনো একটা বড় বাড়ি থেকে কীর্তনের সুর ভেসে এল। কানে যেতেই কুসুম চমকে উঠল। এ গলা যে তার চেনা। ‘চেনা’ বললে কিছুই বলা হল না, তার মর্মস্থলে গাঁথা হয়ে আছে—তার চেতনার পরতে পরতে জড়িয়ে গেছে।

    অনেকদিন আগের কথা মনে পড়ল। হৈমন্তী তখন একটু সুস্থ হয়ে উঠেছে। বাড়ি থেকে ঘুরে আসবার নাম করে সন্ধ্যার দিকে মাঝে মাঝে ও ছুটি নিত। রেললাইন পার হয়ে একটা নির্দিষ্ট জায়গায় অপেক্ষা করত। কিছুক্ষণের মধ্যেই ‘সে’ এসে পড়ত। তারপর দুজনে হাত-ধরাধরি করে নির্জন মাঠের অন্ধকারে মিলিয়ে যেত। দূরে একটা ছোট নদী ছিল, কোনো-কোনোদিন তার তীরে গিয়ে বসত। তারপর শুধু কথা। কথা যখন ফুরিয়ে যেত, তখন গান। কীর্তন নয়, ভালোবাসার গান। কী দরদ দিয়ে যে গাইত! আজও দু-কানে ভরে আছে। সেই গলা! সে কি কখনও ভোলবার? কুসুমের সমস্ত দেহমন রোমাঞ্চিত হয়ে উঠল।

    গাড়ির ভাড়া মিটিয়ে দিয়ে যন্ত্রপাতির ব্যাগটা নিয়ে নেমে পড়ল। কোনো বড়লোকের বাড়ি। মস্ত বড় গেট। তারপরেই বিস্তৃত আঙিনা। সবটা জুড়ে ফরাস পাতা, মাথার উপর সুদৃশ্য সামিয়ানা। লোক গিজগিজ করছে। বাঁ দিকটায় ভর্তি মেয়েরা, ডাইনে পুরুষদের ভিড়। সামনে সুসজ্জিত মঞ্চের উপর কীর্তনের দল। মাঝখানটার চারদিকে আলো করে সে বসে আছে। দূর থেকে এক পলক দেখেই কুসুমের বুকের রক্ত দোলা দিয়ে উঠল। এও কি কখনও সম্ভব? স্বপ্ন কি কখনও সত্য হয়? হয়। এই তো তার জলজ্যান্ত প্ৰত্যক্ষ প্রমাণ। দুচোখে মুগ্ধ দৃষ্টি মেলে চেয়ে রইল কুসুম। দেখে আর আশ মেটে না। নতুন সাজে কি সুন্দর মানিয়েছে! পরনে দামী সিল্কের ধূতি-চাদর—উজ্জ্বল গেরুয়ায় রাঙানো। কাঁধ পর্যন্ত চুল, মাঝখান দিয়ে উঠে গেছে সযত্ন-রচিত সিঁথি। কপালে চন্দন-তিলক।

    কুসুম মেয়েদের ভিড় ঠেলে আরও খানিকটা এগিয়ে গেল। গানের ফাঁকে ফাঁকে গায়কের ভাবগম্ভীর দৃষ্টি মাঝে মাঝে এদিকেও এসে পড়ছে। যদি একবার চোখাচোখি হয়ে যায়!

    গান শেষ হল। সবাইকে প্রণতি জানিয়ে বিদায় নিলেন গায়ক। বাড়ির মেয়েরা এসে সসম্ভ্রমে এগিয়ে নিয়ে গেল অন্দরমহলে। আসর আস্তে আস্তে ফাঁকা হয়ে গেল। কুসুম তখনও একপাশে দাঁড়িয়ে। একজন ভদ্রলোক, সম্ভবত ঐ বাড়ির কেউ, এসে জিজ্ঞাসা করলেন, আপনি কি গোসাঁইজীর সঙ্গে দেখা করতে চান?

    আশেপাশের টুকরো কথা থেকে কুসুম জানতে পেরেছিল, ঐ নামেই এখানে ওর পরিচয়। বলল, হ্যাঁ।

    —আজ তো দেখা হবে না। এখন ওঁর বিশ্রামের সময়। কাল বিকেল পাঁচটায় আসবেন, দেখা হবে।

    কুসুম আর কিছু বলল না। লোকটি সরে যেতেই সকলের অলক্ষ্যে বাড়ির ভিতর গিয়ে ঢুকল। দালানের সামনে একটি ছোট্ট মেয়ের সঙ্গে দেখা। তাকেই জিজ্ঞাসা করল, গোসাঁইজী কোন্ ঘরে আছেন, খুকী?

    —ঐ ঘরে। এখন যাবেন না।

    ততক্ষণে কুসুম সেই ঘরের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। দরজা ভেজানো। ঠেলা দিতেই খুলে গেল। সামনেই প্রশস্ত খাটের উপর পুরু ধবধবে বিছানা। মাথার উপরে ঘূর্ণমান বৈদ্যুতিক পাখা। গোসাঁইজী শুয়ে আছেন। মাথার কাছে বসে একটি মেয়ে তাঁর উন্মুক্ত প্রশস্ত বুকের উপর ধীরে ধীরে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। পায়ের কাছে আরও দুজন—মুখোমুখি বসে দু-হাতে পদসেবায় ব্যস্ত। সকলেই যুবতী, সুন্দরী এবং সুসজ্জিতা। একটি নীলাভ মৃদু আলো ছাড়া ঘরে আর কোনো আলো নেই।

    শিয়রের কাছে যে মেয়েটি ছিল, কুসুমের উপর সকলের আগে তারই নজর পড়ে থাকবে। একটু রূঢ় স্বরে বলে উঠল, কী চাই আপনার?

    ‘কিছু একটা চাই বৈকি? সেটা আমার চেয়ে উনিই ভালো বলতে পারবেন’—চোখের ইঙ্গিতে গোসাঁইজীকে দেখিয়ে দিল। তিনি চোখ বুজে ছিলেন, পাতাদুটো যেন চমক লেগে খুলে গেল। মুখ থেকে বেরিয়ে এল—কে? সঙ্গে সঙ্গে ধড়মড় করে উঠে বসলেন।

    কুসুম কয়েক পা এগিয়ে গিয়ে একটু ঝুঁকে পড়ে বলল, চিনতে পারছ না কে? . ….আপনাদের আলোর সুইচটা কোথায়?

    পরের প্রশ্নটা পায়ের কাছে যে মেয়ে দুটি বসেছিল তাদের উদ্দেশে। তারই মধ্যে একজন উঠে বড় আলোটা জ্বেলে দিল। গোসাঁইজী মুহূর্তকাল বিহ্বল দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে কপাল কুঞ্চিত করে বললেন, আপনাকে কোথাও দেখেছি বলে তো মনে পড়ছে না!

    কুসুম প্রথমটা হকচকিয়ে গেল। পরক্ষণেই খানিকটা সামলে নিয়ে বলল, আমি কুসুম!

    ‘আপনি ভুল করছেন’—কাষ্ঠহাসি হেসে বললেন গোসাঁইজী, ‘কুসুম বলে কাউকে আমি চিনি না। ও নামও কোনোদিন শুনি নি।’

    কুসুমের সমস্ত বাক্শক্তি যেন এক নিমেষে হারিয়ে গেল। তাদের পরিচয়টুকু পর্যন্ত ‘সে’ এমন স্রেফ অস্বীকার করে যাবে, এ যে তার স্বপ্নেরও অতীত!

    ততক্ষণে বাড়ির পুরুষেরাও এসে পড়েছেন। একটি যুবক এগিয়ে এসে ধমকের সুরে বলল, কে তুমি?

    —যে-ই হই, তাতে আপনার কী?

    —বটে! এখুনি বেরিয়ে যাবে কিনা বলো, তা না হলে—

    ‘উহুঁ, ওভাবে নয়’, করুণার্দ্র কণ্ঠে বাধা দিলেন গোসাঁইজী, ‘মিষ্টি কথায় বুঝিয়ে- শুঝিয়ে নিয়ে যাও। পাগল-টাগল হবে বোধ হয়।’

    ‘পাগল!’ বিড় বিড় করে আপন মনে আউড়ে গেল কুসুম। মুহূর্তমধ্যে সত্যিই যেন তার মাথার ভিতরটা ওলট-পালট হয়ে গেল। সেই সঙ্গে তার দেহকোষে, তার মনের মজ্জায় মজ্জায় এতদিন ধরে যত জ্বালা জমা হয়ে ছিল—কুসুম জানে না সে কিসের জ্বালা, হয়তো অতৃপ্ত বাসনার, অবদমিত সম্ভোগ-লিপ্সার, ক্ষোভের, নৈরাশ্যের, বঞ্চনার, প্রতিহিংসার—সব যেন একীভূত হয়ে তার শিরায় শিরায় উদ্দাম হয়ে উঠল। কম্পমান মুঠি থেকে ব্যাগটা মাটিতে পড়ে গেল। কুসুমের নজর পড়ল তারই উপর। ক্ষিপ্রহস্তে তার ভিতর থেকে একটা কি যন্ত্র তুলে নিতেই গোসাঁইজী স্থান-কাল ভুলে ভয়ার্ত বিকৃত কণ্ঠে চেঁচিয়ে উঠলেন–কুসুম!

    ততক্ষণে সেই ধারালো অস্ত্রটা সবেগে বসে গেছে তাঁর চোখের উপর। সঙ্গে সঙ্গে ফিকি দিয়ে উঠল রক্তধারা। তার উষ্ণ স্পর্শ ছড়িয়ে পড়ল কুসুমের মুখে বুকে গলায়। খানিকটা লোনা স্বাদ তার দীর্ঘ-তৃষ্ণা-পীড়িত ঠোট দুটিতেও জড়িয়ে গেল।

    তারপর কি হল কুসুম জানে না, যখন জ্ঞান হল তখন সে থানায়। তিনদিন পরে জেলে বসে খবর পেল, গোসাঁইজী হাসপাতালে মারা গেছেন।

    কুসুমের চিঠির শেষ ক’টি ছত্র আরেকবার পড়লাম—’তাকে খুন করবার মতলব আমার ছিল না। সেই সর্বনেশে চোখ দুটো, যা দিয়ে একদিন আমাকে ভুলিয়েছিল, হয়তো আরও কত মেয়েকে ভুলিয়েছে, তাই শুধু চিরদিনের তরে বন্ধ করে দিতে চেয়েছিলাম …তাই বলে যা করেছি তার জন্যে আমার কোনো দুঃখ নেই। আমার সব জ্বালা জুড়িয়ে গেছে।

    শেষ চিঠিতে সে আমাকে সুখী হবার আশীর্বাদ জানিয়েছিল। তার ফল ফলেছে। আজ সত্যিই আমি সুখী।’

  • আট

    আট

    এতদিন যেসব জেল-থেকে-ফেরা অচেনা পত্রলেখক ও লেখিকা আমাকে তাদের আত্মকাহিনী শুনিয়েছেন (যার কিছু কিছু আমি পাঠক-দরবারে পেশ করেছি), তাদের দুটো দলে ফেলা যেতে পারে। এক যাঁরা বলতে চেয়েছেন, তাঁরা নিরপরাধ অর্থাৎ বিভ্রান্ত বিচারের বলি, দুই—যাঁরা প্রমাণিত অপরাধ স্বীকার করলেও তার পুরোপুরি দায়িত্ব মেনে নিতে চান নি, তার পিছনে দাঁড় করিয়েছেন হয় কোনো সামাজিক অসাম্য কিংবা অত্যাচার, অবস্থার প্রতিকূলতা, নয়তো কোনো অপ্রতিরোধ্য প্রলোভন বা সাময়িক উত্তেজনা। আজ যে চিঠিখানা আমার ঝাঁপির তলা থেকে বের করলাম, তার লেখক এর কোনো দলেই পড়েন না। তাঁকে জেলে যেতে হয় নি, অর্থাৎ গুরুতর যে অপরাধে অভিযুক্ত হলেও আদালত তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করেন নি, কিন্তু তিনি যে অপরাধী, এই চিঠির মধ্যে সে কথা অকুণ্ঠ অবলীলায় কবুল করেছেন, নিজেকে কোথাও সমর্থন করবার চেষ্টা করেন নি। একটি লোমহর্ষক ঘটনার এমন সহজ ও নিরুত্তাপ বর্ণনা দিয়ে গেছেন, যেন তিনি তার নায়ক নন, রিপোর্টার মাত্র।

    বেশীর ভাগ · আসামীর মতো আদালতের কাঠগড়ায় তিনিও নীরব ভূমিকা নিয়েছিলেন, ইংরেজের ফৌজদারী আইন যেটুকু পেলেই সন্তুষ্ট। অর্থাৎ হাকিমের প্রশ্নের উত্তরে দুটি মাত্র বাক্য উচ্চারণ করেছিলেন, ‘আমি নির্দোষ’। তার দীর্ঘদিন পরে এই স্বীকারোক্তির উদ্দেশ্য কী এবং তার শ্রোতার পদে আমাকে কেন বরণ করলেন, সে কথা বলতে গিয়ে আমার সম্বন্ধে যে-সব মন্তব্য করেছেন, তার কোনোটাই শ্রুতিমধুর নয়। নিতান্ত অনিচ্ছাসত্ত্বেও কিছুটা প্রকাশ করতে বাধ্য হচ্ছি। তা না হলে তাঁর আসল বক্তব্যের মূল সূত্রটি ধরা যাবে না।

    তিনি লিখছেন, “গোড়াতেই বলে রাখি, আপনার লেখার সাহিত্যিক গুণাগুণ সম্বন্ধে আমার কিছু বলবার নেই।। সাহিত্য আমি বুঝি না, তা নিয়ে মাথা ঘামাবারও প্রয়োজন বোধ করি না। আমার ইন্টারেস্ট আপনার বিষয়বস্তু, – ক্রিমিন্যাল মাইণ্ড—আপনি যাকে কবিত্ব করে বলেছেন, ‘অপরাধী মানুষের মানস-লোক’। দুঃখের সঙ্গে বলছি, সেখানকার রহস্যোদ্ঘাটন করতে গিয়ে আপনি দার্শনিক স্বচ্ছ দৃষ্টির পরিচয় দিতে পারেন নি, সাহিত্যিক ভাবালুতার আশ্রয় নিয়েছেন। তাই যত কয়েদী আপনি আমদানি করেছেন; কোনোটাকেই ক্রিমিন্যাল বলে চেনা যাচ্ছে না, সবাই এক একটি রোমান্টিক হিরো কিংবা হিরোয়িন।

    “খুনী মাত্রেই মহানুভব, ডাকাত মাত্রেই হৃদয়বান। আপনার আয়রন-গে-এর অন্তরালে একটাও আয়রন-হার্টেড অমানুষ খুঁজে পেলাম না, সব কটাই গোল্ডেন্-হার্টেড অতিমানুষ। আপনার ভক্তেরা হয়তো বলবেন, কী আশ্চর্য লেখনী, যার স্পর্শে সব লোহা সোনা হয়ে গেছে। আমি ভাবছি, কী আশ্চর্য উপাদান আপনার হাতে ছিল। আপনি সেগুলোকে সত্যানুসন্ধানের কাজে না লাগিয়ে টিয়ারগ্যাস্-এর মতো ব্যবহার করেছেন। যার ফলে আপনার ভাবপ্রবণ পাঠক-পাঠিকার চক্ষুযুগল থেকে প্রচুর অশ্রু-পতন ঘটেছে আর কোনো কাজ হয় নি। আমার মনে হয়, ঐটাই আপনার উদ্দেশ্য ছিল। তা না হলে কেমন করে বিশ্বাস করি, এতদিন ধরে এত জেল ঘুরে এমন একটা অপরাধীও আপনি দেখতে পেলেন না, যার হৃদয় বলে কোনো বস্তু নেই? হয়তো দেখেছিলেন কিন্তু তার কথা বলতে চান নি, কিংবা যাদের কথা বলেছেন, তাদের মধ্যে ঐ পদার্থটি আপনি বসিয়ে দিয়েছেন, যে যা নয় তার উপর সেটি আরোপ করেছেন, প্রকৃতিকে বিকৃত করেছেন, সাহিত্যের স্বার্থে সত্যকে বিসর্জন দিয়েছেন।

    “কিংবা এও হতে পারে, জেলে বসে আপনার চারদিকে যে লোকগুলোকে বিচরণ করতে দেখেছেন, তারা তাদের আসল চেহারাটা আপনাকে দেখতে দেয় নি। কেউ কেউ সামনে এসে মুখ খুললেও মুখোশ খোলে নি। আপনি খোলকে আসল বলে ভুল করেছেন, খোসাকে মনে করেছেন শাঁস।

    “আজ আমি এমন একজনের কথা আপনাকে শোনাতে বসেছি, যার মুখে কোনো মুখোশ নেই, কোনো খোলসের আড়ালেও সে নিজেকে ঢেকে রাখতে চায় না। জেলের ছাপ তার গায়ে লাগে নি। তার কারণ এ নয় যে সে নিরপরাধ। তার অপরাধ প্রমাণিত হয় নি, আপনি তো জানেন, সেটা এমন কিছু নতুন বা আশ্চর্য নয়। আইন এবং তার প্রয়োগপদ্ধতি দুই অতি বিচিত্র ব্যাপার। নিতান্ত নির্দোষ লোকও যেমন অনেক সময় তার জালে জড়িয়ে পড়ে, তেমনি বহু দোষী ব্যক্তি কোনো একটা ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে যায়। আমি যার কথা বলতে যাচ্ছি, সে এই দ্বিতীয় দলের।

    “ডিটেকটিভ গল্পের মতো রহস্যের আবরণটা শেষ পর্যন্ত ঝুলিয়ে না রেখে শুরুতেই তুলে দেওয়া যাক। সে ব্যক্তিটি স্বয়ং আমি, আপনার এই দুর্মুখ পত্রলেখক। কি, চমকে উঠলেন তো?….”

    না, চমকাই নি। অজ্ঞাতসারে চোখ দুটো একবার শুধু চিঠির শীর্ষ ও তলদেশটায় চকিতে ঘুরে এল। যা অনুমান করেছিলাম তাই। নাম এবং ঠিকানা দুই-ই অনুপস্থিত।

    এর পরে লেখক তাঁর দীর্ঘ কাহিনী সবিস্তারে বর্ণনা করেছেন। পুরোপুরি পুনরুক্তির লোভ ত্যাগ করছি—দুটো কারণে! এক নম্বর— তার মধ্যে বিকৃত মানব-মনের এমন সব বিস্ময়কর তথ্য উদ্‌ঘাটিত হয়েছে, যা আমি বিশ্বাস করলেও আমার পাঠকবৃন্দের কাছে নিতান্ত অবিশ্বাস্য এবং অবান্তর বলে মনে হবে। দু নম্বর—প্রগাঢ় বীভৎস রসের এমন স্বচ্ছন্দ পরিবেশন কোনো কোনো কোমলহৃদয় পাঠক-পাঠিকার স্পর্শকাতর স্নায়ুদেশে বিপর্যয় সৃষ্টি করতে পারে। অন্তত আমার প্রতি বিশেষ বন্ধুভাবাপন্ন কয়েকটি সাময়িক পত্র সেই অভিযোগ তুলে আসর গরম করবার চেষ্টা করবেন, এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।

    কেবলমাত্র অনুমানের উপর ভিত্তি করে একথা বলছি না। এর নজির আছে এবং আশা করি এই সূত্রে তার সংক্ষিপ্ত উল্লেখ অপ্রাসঙ্গিক হবে না।

    ছ-সাত বছর আগেকার কথা। কোনো সুপরিচিত সাহিত্যিক তখন অল-ইণ্ডিয়া রেডিও’র কলকাতা কেন্দ্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিলেন। সম্ভবত তাঁরই উদ্যোগে আমার রচনা থেকে সংগৃহীত কয়েকটি কাহিনীর নাট্যরূপ বেতারে পরিবেশন করবার প্রস্তাব এল। আমি সম্মতি দিলাম। শর্ত রইল নাটকের পাণ্ডুলিপি আমার অনুমোদনের জন্য পাঠাতে হবে। আমি মফঃস্বলে থাকার দরুন এ বিষয়ে খানিকটা অসুবিধা দেখা দিয়েছিল। সে কথা এখানে বক্তব্য নয়।

    যথাসময়ে ‘বেতার জগৎ’ পত্রিকার সম্পাদকীয় স্তম্ভে বিজ্ঞপিত হল, পর পর ছ’টি নাটক অভিনীত হবে। তিনটি কি চারটি প্রচারিত হবার পর দীর্ঘকাল অনুষ্ঠানসূচীতে বাকী ক’টির কোনো উল্লেখ না দেখে স্টেশন ডিরেক্টর মহাশয়কে লিখতে হল, ওগুলোর সম্বন্ধে কি স্থির করলেন জানালে বাধিত হব এবং এ বিষয়ে আমার কাছে যে ডজনখানেক অনুসন্ধান পত্র জড়ো হয়েছে, তাদের কৌতূহল নিবৃত্তির সুবিধা হবে। উত্তরে বলা হল, আপাতত আমার আর কোনো কাহিনীর নাট্যরূপ প্রচার করা হবে না। বললাম, তাহলে সেইমতো আর একটি বিজ্ঞপ্তি ‘বেতার-জগতে’ প্রকাশ করুন। ডিরেক্টর অফিস সংক্ষেপে জানালেন, তার কোনো প্রয়োজন দেখি না।’

    মনে করলাম, দু-একটি নাটক এবং অভিনয় সম্বন্ধে আমি কিঞ্চিৎ বিরূপ মন্তব্য করেছি, এটা বোধ হয় তারই প্রতিক্রিয়া। আসল ব্যাপারটা জানতে পেরেছিলাম বেশ কিছুদিন পরে।

    যে মন্ত্রিবরের আদেশক্রমে আমাকে একদিন কলকাতার বৃহৎ জেল থেকে মফঃস্বলের ক্ষুদ্রতর জেলে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল তিনি তখন গদিচ্যুত। তাঁর স্থলে যিনি নতুন অধিষ্ঠিত, তিনি হয়তো আমার সাহিত্যিক কার্যকলাপ তেমন বিপজ্জনক মনে করেন নি। অতএব নির্বিবাদে রাজধানীতে ফিরে এসেছি এবং এমন একটি বিশিষ্ট জেলের কর্তৃত্বভার আমার হাতে দেওয়া হয়েছে, যেখানে গোড়া-থেকে-পুরোপুরি-জেল-গোষ্ঠীভুক্ত আমিই বোধ হয় প্রথম ভারতীয়। এই ক’বছরে সাহিত্যিক মহলে সাক্ষাৎ পরিচয়ের সূত্রপাত হয়েছে, এবার সেই সুযোগ আরও বিস্তৃত হল। তাঁদেরও কারও মুখে একদিন জানতে পারলাম, আকাশবাণীর নাট্যশালায় আমার কাহিনীর উপর্যুপরি অভিনয় জন-দুই প্রবীণ সাহিত্যিককে অত্যন্ত বিচলিত করে তুলেছিল এবং তাঁরাই অগ্রণী হয়ে কোনো ইংরেজী দৈনিকপত্রে কয়েকখানা কড়া চিঠি প্রকাশ করেছিলেন। তাঁদের বক্তব্য ছিল—এই সমস্ত বীভৎস ‘ক্রাইম-স্টোরী’ বহু সুকুমারমতি বেতার-শ্রোতার অন্তরে ‘বিভীষিকার উদ্রেক করছে, তরুণ-তরুণীদের মনে পাপের প্রতি সহানুভূতি জাগিয়ে তুলে তাদের বিপথে চালিত করছে, ইত্যদি ইত্যাদি। সুতরাং এদের প্রচার অবিলম্বে বন্ধ করা হোক।

    স্থানীয় বেতার কর্তৃপক্ষ চিঠিগুলোকে বিশেষ আমল দেন নি, কিন্তু দিল্লীর কর্তারা হঠাৎ সজাগ হয়ে উঠলেন। সম্ভবত সেখানে কিছুটা সরাসরি তদ্বিরাদি হয়ে থাকবে। কলকাতার অফিসে নাকি বোঝাতে চেষ্টা করেছিলেন, কাহিনীগুলো ঠিক ‘ক্রাইম-স্টোরী’ নয়, যে গ্রন্থ থেকে তাদের সংগ্রহ করা হয়েছে, অল্পদিনেই সেটি প্রচুর জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে এবং চিঠিগুলোতে যে-সব আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে তার কোনো ভিত্তি নেই।

    মিনিস্ট্রি অব্ ইনফরমেশন অ্যা ব্রডকাস্টিং এ কৈফিয়তে সন্তুষ্ট হলেন না। আদেশ হল—অভিনয় বন্ধ কর।

    বলা বাহুল্য, ইংরেজী দৈনিকে করেসপণ্ডেন্ট বা পত্রদাতার যে নাম ছিল সেটা কাল্পনিক।

    এই কৌতুকাবহ তথ্যটি যিনি আমাকে শুনিয়েছিলেন, আসল লেখকদের নামও তিনি প্রকাশ করেছিলেন। আমি সে সম্বন্ধে নীরব রইলাম। উভয়েই সাহিত্যক্ষেত্রে সুপ্রতিষ্ঠিত, তবে যদ্দুর শুনেছি, পাঠকমহলে বর্তমানে তেমন সমাদৃত নন। যাক সে কথা।

    আজ যে নির্লজ্জ এবং নিরাবরণ স্বীকারোক্তি আমার সামনে খোলা রয়েছে, তার কাছে সেদিনকার বেতার প্রচারিত কাহিনীগুলো নিতান্তই দুগ্ধপোষ্য। এর হুবহু চিত্রটা যদি প্রকাশ করি, আমার শির লক্ষ্য করে শুধু যে একদল সৎ সাহিত্যিক ও সম্পাদকের তীক্ষ্ণ লেখনী উদ্যত হবে তাই নয়, পুলিসের বাণও নিক্ষিপ্ত হতে পারে। সুতরাং শুধু অংশবিশেষের উল্লেখ করছি; তাও অনেক ক্ষেত্রে আমার নিজের ভাষায় ‘কোটিং’ দিয়ে।

    পত্রলেখক জানাচ্ছেন—আমার কাহিনীর প্রধান চরিত্র আমার স্ত্রী। ধরুন তার নাম মন্দাকিনী। তাকে নিয়েই উদ্বোধন, তাকে দিয়েই উপসংহার। সুতরাং একেবারে বিয়ের রাত থেকে শুরু করা যাক। না, প্রেম-ট্রেমের ব্যাপার কিছু নেই। বিয়ের আগে তাকে দেখি নি, এমন কি ছবি পর্যন্ত না। সম্বন্ধটা আমার বাবা এবং তার বাবা মিলে স্থির করেছিলেন, যেমন আগেকার দিনে হত, বিশেষ করে আমাদের মতো পরিবারে। আমার ঠাকুর্দার ছিল কতকগুলো পেটেণ্ট ওষুধের ব্যবসা। তার সঙ্গে কয়েকটা বাজার-চলতি নামকরা ওষুধের এজেন্সি নিয়ে কারবারটাকে বেশ বাড়িয়ে তুলেছিলেন। তার মুলে কিছু গোপন রহস্য ছিল, আজকের দিনে যা সকলেই জেনে ফেলেছে এবং ব্যাপকভাবে চালাচ্ছে। অর্থাৎ ঐসব ওষুধের খালি শিশি সংগ্রহ করে আমরা আমাদের নিজেদের তৈরী রসায়ন বা বটিকা ভরে দিতাম। তার জন্যে আমাদের একটা ছোটখাটো কারখানা ছিল। আমি তার দেখাশুনা করতাম। বিশেষ করে সেই উদ্দেশ্যেই বাবা আমাকে বি.এস-সি পাস করিয়েছিলেন। আমার যা কাজ, তাতে অতখানি বিদ্যার দরকার ছিল না। নানা রকমের জংলী গাছগাছড়া সংগ্রহ করে তার নির্যাস বের করা এবং প্রয়োজনমত রং-টং মেশানো—সেসব আমাদের কর্মীরাই করত। যে জিনিস তৈরী হল তার গুণাগুণ নিয়ে আমরা কখনও মাথা ঘামাই নি। প্রথম প্রথম এ নিয়ে খানিকটা মন খুঁত-খুঁত করলেও অল্পদিনেই সেটা কাটিয়ে উঠেছিলাম।

    এই পরিবারে এবং এই পরিবেশে মানুষ হয়ে রোমান্স বা পূর্বরাগের চর্চা করবার মতো সময় সুযোগ বা মনোবৃত্তি সব কিছুরই অভাব ছিল। সুতরাং বিয়েটাকে নিছক দৈহিক এবং সাংসারিক প্রয়োজন বলে ধরে নিয়ে লক্ষ্মীছেলের মতো পিতৃ-আজ্ঞা পালন করেছিলাম।

    আমার স্ত্রী যে পরিবারের মেয়ে সেখানে স্ত্রী-শিক্ষার দৌড় ছিল গ্রাম্য পণ্ডিতের পাঠশালা পর্যন্ত। তার পর রান্না-বান্না এবং যাবতীয় গৃহকর্মে হাতেখড়ি, নানারকম ব্রত ও পূজানুষ্ঠানের ভিতর দিয়ে ‘পতি পরম গুরু’ নামক বৃহৎ আদর্শে দীক্ষাদান। সে বিষয়ে যে কোনো রকম ত্রুটি হয় নি, তার প্রমাণ বিয়ের রাতেই পাওয়া গেল।

    আপনারা অর্থাৎ সাহিত্যিক নামক বাস্তবজ্ঞানহীন ভাবপ্রবণ ব্যক্তিরা বলে থাকেন, স্ত্রীর সঙ্গে দৈহিক সম্পর্ক স্থাপন করবার আগে তার মনকে জয় করতে হয়, ধীরে ধীরে ধৈর্যের সঙ্গে মধুর কলাকৌশলের ভিতর দিয়ে তার নারীসুলভ লজ্জা সঙ্কোচময় জড়িমার ঘুম ভাঙিয়ে—ইত্যাদি ইত্যাদি, আমি তার কোনোটাই করি নি। বাসর জাগতে যে মেয়েগুলো এসেছিল, তারা সরে যেতেই নিজের হাতে দরজা বন্ধ করে কোনো রকম ভূমিকার পথে না গিয়ে সরাসরি তার উপর পুরুষের সনাতন অধিকার প্রয়োগ করেছিলাম। সেই উদগ্র লালসার চাহিদা পূরণ করতে গিয়ে সে যে কিছুটা যন্ত্রণা বোধ করেছিল, সেটা সহজেই বুঝতেই পেরেছিলাম। তখন তার বয়স চৌদ্দ পূর্ণ হয় নি, কিন্তু কথায় বা ব্যবহারে কিছুমাত্র আপত্তি প্রকাশ করে নি। ব্যক্তিগত সুখ-দুঃখকে তুচ্ছ করে স্বামীর ইচ্ছার কাছে নিজেকে একান্তভাবে বলি দেওয়া—এটাকেই সে ধর্ম বলে জেনেছিল এবং নিঃশব্দে পালন করেছিল।

    আমার দৈহিক দাহ মিটে যেতেই আমি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। ভোরের দিকে যখন ঘুম ভাঙল, দেখি সে পাশে নেই। জ্যৈষ্ঠ মাস। ছোট শহর। বিদ্যুতের এলাকা নয়। অথচ বেশ ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা লাগছিল। উপরের দিকে তাকাতেই কারণটা ধরা পড়ল। আমার শিয়রের কাছে বসে একটা হাতপাখা দিয়ে সে আমাকে বাতাস করছে। বোধ হয় সারারাত ধরেই চালিয়েছে। বেশ লাগল। তাই বলে মনটা যে স্নেহ ও কৃতজ্ঞতায়, আপনারা যাকে বলেন উদ্বেলিত হয়ে উঠল তা নয়। স্ত্রীর কাছে যা প্রাপ্য তাই সে দিয়েছে। এই তো তার কাজ। তবু নেহাত কিছু একটা বলতে হয় তাই বললাম, একি! তোমাকে হাওয়া করতে কে বলেছে?

    মন্দাকিনী কোনো উত্তর না দিয়ে মাথা নোয়াল।

    —তুমি বুঝি একটুও ঘুমোও নি?

    মৃদু কণ্ঠে উত্তর এল, আপনার খুব ঘাম হচ্ছিল।

    —তাই বলে সারারাত ধরে এত কষ্ট করে পাখা চালাতে হবে!

    —এতে আমার কোনো কষ্ট হয় না।

    কষ্ট যে তার কোনো কিছুতেই হয় না, সে প্রমাণ দীর্ঘজীবন ধরে প্রতি মুহূর্তে দিয়ে গেছে। কষ্ট হয় না—এ কথাটা ঠিক নয়। মানুষের শরীর তো! আমার কথা হল, আমার জন্যে সব কষ্টই সে স্বচ্ছন্দে এবং হাসিমুখে সয়ে নিতে পারে এবং তাই নিয়েছে। শুধু আমার জন্যে কেন, সমস্ত সংসারের জন্যে।

    অনেকদিন আগেই আমার মা মারা গিয়েছিলেন। সুতরাং বাবার সেবাশুশ্রষা, যত্ন- আত্তির সব ভারও ছিল তার হাতে। কেউ বলে দেয় নি। স্বেচ্ছায় এবং সানন্দে সে নিজেই তুলে নিয়েছিল। তার বদলে বাবার কাছ থেকেও যে বিশেষ কোনো আদর স্নেহ কিংবা মিষ্টি ব্যবহার পেয়েছে তা নয়। বরং কোথাও কোনো ত্রুটি হলে তৎক্ষণাৎ সেটা তাকে কড়াভাবে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে।

    আমরা পিতাপুত্র দুজনেই ছিলাম ভোজন-বিলাসী। রোজকার রান্নার ব্যাপারটার পদ ও পরিমাণ দু-দিকেই বেশ ব্যাপক আকারে চালানো হত। কিন্তু ‘ঠাকুর’ রাখবার মতো বিলাসকে আমরা কোনোদিন প্রশ্রয় দিই নি। চাকর একটা ছিল, বাকী সব মন্দাকিনী। আমরা একসঙ্গে খেতে বসতাম এবং আশমিটিয়ে খেতাম। সে অবিরাম যুগিয়ে যেত। তারপর কী থাকত, তা নিয়ে আমরা কখনও মাথা ঘামাই নি। মেয়েদের খাওয়া-পরার দিকে নজর দেওয়া “মেনীমুখো” পুরুষের লক্ষণ। মাঝে মাঝে খোঁজ নিতে ইচ্ছে হলেও কেমন যেন পৌরুষে বাধত। মনে হত, তাতে করে নিজেকে অনেকখানি নামিয়ে আনা হবে।

    বাজার করবার ভার ছিল বাবার হাতে। কিন্তু ভালো ভালো জিনিসের লোভ যতখানি হাত ততটা দরাজ ছিল না। রসনার সঙ্গে পকেটের বিরোধ প্রায়ই লেগে থাকত এবং তার জের গিয়ে পড়ত পুত্রবধূর উপর। বাজারে বেরোবার সময় রোজই একবার জিজ্ঞাসা করতেন, ‘কি কি আনতে হবে, বৌমা?’ প্রশ্নটা অনাবশ্যক। ‘বৌমা’ তো গৃহিণী নয়, রাঁধুনী মাত্র। কোন্ কোন্ জিনিসের প্রয়োজন, স্থির করবার কর্তা তিনি নিজেই। মন্দাকিনী তা জানত। তাই মৃদুস্বরে শুধু জানাত, মাছ তরকারী আপনার যেটা পছন্দ হয় আনবেন। মশলাপাতি, ঘি, তেল সব আছে।

    ওসব জিনিস মাসের গোড়াতেই পুরো মাসের মতো সংগ্রহ করা হত। সে ফর্দ তিনি নিজে করতেন। মাঝে মাঝে ঘাটতি পড়ত। সেদিনই হত মুশকিল। ‘বৌমা’ হয়তো ঘিয়ের টিনটা হাতে করে ভাঁড়ার থেকে বাইরে পা দিয়েছে, শ্বশুর অমনি গর্জে উঠতেন, ‘এই তো সেদিন ঘি নিয়ে এলাম, এরই মধ্যে শেষ করেছ?

    মন্দা জবাব দিত না, মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে থাকত। কখনও বলতো না, ইদানীং পর পর কদিন রাত্রে রুটি-পরটার বদলে লুচি হয়েছে বলেই ঘিটা যদ্দিন যাবার কথা ছিল তা যায় নি।

    মাঝে মাঝে বাবা আবার আমাকে মধ্যস্থ মেনে বসতেন, বৌ-এর সামনে ডাকিয়ে এনে বলতেন, তুমি কি বল, পুরো মাসের হিসেবমত জিনিস আনা হচ্ছে, আর পঁচিশ তারিখ না যেতেই বাড়ন্ত—এরকম করলে চলবে কেমন করে?

    আমি মুখে কোনো জবাব দিতাম না বটে, কিন্তু জ্বলন্ত চোখে বৌ-এর দিকে তাকাতাম। চোখ না তুলেও সে নিশ্চয়ই দেখতে পেত। এই অপব্যয়ের সব অপরাধ যে তারই, সে বিষয়ে পিতার সঙ্গে পুত্রের মতান্তর হতে পারে, সেটা তার ধারণার অতীত। সব অভিযোগ নিঃশব্দে মেনে নিয়ে কাজে গিয়ে লাগত। উনুনে হয়তো কিছু একটা বসিয়ে এসেছে, পুড়ে গেলে রক্ষা থাকবে না!

    ‘বন্ধু’ বলতে যা বোঝায় তেমন কেউ আমার ছিল না। আপনার সাহিত্যিক ডাইঅ্যাগ্‌নৌসিস্ যদি এই হয় যে তার কারণ কারও সঙ্গে হৃদ্যতা গড়ে উঠবার মতো হৃদয় আমার মধ্যে নেই, আমি আপত্তি করব না। জীবনে আর যা কিছুর চর্চা করে থাকি না কেন, হৃদয়চর্চা কখনও করি নি। ব্যবসায়-সুত্রে কারও কারও সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা হয়েছে। তার মধ্যে একজনের নাম ছিল রমণীমোহন (বলা বাহুল্য আসল নামটা আলাদা)। কাজের কথার বাইরে যেসব আলাপ সে করত (প্রলাপ বললেই হয়), তার প্রায় সবটুকু জুড়ে থাকত একটি বিশেষ রমণী, অর্থাৎ তার বৌ। তারই হাসি-কান্না, মান-অভিমান, রাগ- অনুরাগ, খেয়াল-খুশির লম্বা ফিরিস্তি যখন শুনতাম, আমার মাঝে মাঝে মনে হত, কই মন্দার মধ্যে তো এর কোনোটাই কখনও দেখতে পাই না! রমণীমোহনের বৌ-এর মতো সে কোনোদিন ‘অকারণ পুলকে’ আমার গলা জড়িয়ে ধরে নি, অহেতুক অভিমানে ছলছল চোখে জানালার গরাদের পাশেও বসে থাকে নি! সে ‘বিচিত্ররূপিণী’ নয়, তার একটি মাত্র রূপ—উদয়াস্ত মুখ বুজে কাজ করে, সংসারের প্রয়োজন মেটায়; অস্তের পরেও তার কাজ থাকে, সেটা আমার প্রয়োজন মেটানো। তাও সে মুখ বুজেই করে।

    আমাকে ভুল বুঝবেন না। সেজন্য আমার কোনো আপসোস ছিল না, কোনো অভাবও কোনোদিন বোধ করি নি। বরং মন্দা যে রমণীমোহনের বৌ-এর মতো হাবভাব ছলা- কলার ধার ধারে না, কথায় কথায় বায়না ধরে না, কোনো কিছু নিয়ে আবদার করে না, সেজন্য আমি মনে মনে নিজেকে ভাগ্যবান মনে করতাম।

    একদিন সন্ধ্যার দিকে রমণীমোহন গম্ভীর মুখে আমার দোকানে ঢুকে বলল, চল বেরোই।

    —কোথায়?

    —চল না? যেতে যেতে বলবো।

    আমি একটু চিন্তিত হয়েই ওর গাড়িতে গিয়ে উঠলাম। রাস্তায় কোনো কথা হল না। নিউ মার্কেটের সামনে গাড়ি রেখে যখন নেমে পড়ল, তখনও তার মুখ ভার। বললাম, কী ব্যাপার বল দিকিন?

    মার্কেটে ঢুকতে ঢুকতে তেমনি মুখেই বলল, একটা মারাত্মক ভুল করে ফেলেছি ভাই।

    —কী ভুল করলে?

    —কাল ছিল আমাদের বিয়ের অ্যানিভারসারী, ফিফ্থ্ মানে পঞ্চবার্ষিক উৎসব। আমার ছাই মনে নেই। এদিকে কারখানায় স্ট্রাইক, মাথার ঠিক ছিল না। ফিরতেও রাত করে ফেলেছি। ঘরে ঢুকে বৌ-এর দিকে নজর পড়তেই মনে পড়ে গেল। একটা নেহাত আটপৌরে ময়লা কাপড় পরে হাঁড়িমুখ করে দাঁড়িয়ে আছে। আমাকে খালিহাতে ঢুকতে দেখে পাশ কাটিয়ে ঝড়ের মতো বেরিয়ে গেল। সারারাত ঘরে আসে নি। অনেক সাধ্যসাধনা করেও পাশের ঘরের দোর খোলানো গেল না। একটা বেশ ভালোরকম প্রেজেন্ট নিয়ে না গেলে আজ আর বাড়িমুখো হবার উপায় নেই।

    আমি এত জোরে হেসে উঠেছিলাম, আশেপাশের লোকগুলো নিশ্চয়ই মনে করে থাকবে, লোকটা হয় পাগল, নয় একোবারে গেঁয়ো অর্থাৎ কোলকাতার মতো সভ্য শহরে থাকবার যোগ্য নয়। কি করব বলুন, ব্যাপারটাকে নিছক হাস্যকর ন্যাকামি ছাড়া আমি আর কোনো ভাবে দেখতে পারি নি। আপনি হয়তো আপনার সাহিত্যিক দৃষ্টি দিয়ে এর মধ্যে একটা সম্রাট সাহাজান-সুলভ গভীর প্রেম আবিষ্কার করে বসবেন, আমার সে দৃষ্টি নেই। তাছাড়া আমার জীবনে এরকম দূরে থাক, এর কাছাকাছি কোনো অভিজ্ঞতাও কোনোদিন ঘটে নি এবং ঘটতে পারত না। বিয়ের অ্যানিভারসারী উদযাপন পড়ে মরুক, তার তারিখটাও মনে করে রাখি নি। আমার বিশ্বাস, আমার স্ত্রীও রাখে নি।

    রমণীমোহন সেদিন একটা কাণ্ড করে বসল। একগাদা বেনারসীর ভিতর থেকে অনেক বাছাবাছির পর (তার মধ্যে আমাকেও দু-একটা ‘হ্যাঁ’ ‘না’ বলতে হয়েছে) দু-খানা শাড়ি পছন্দ করল। একটা ভীষণ জমকালো, আর একটা ওরই মধ্যে একটু যাকে বলে sober—সেখানা আমার দিকে ঠেলে দিয়ে বলল, এটা তুমি নাও।

    ‘আমি!’ রীতিমতো চমকে উঠলাম।

    —আহা, ভয় পাবার কি আছে? ঘরে বৌ থাকলে মাঝে মাঝে দু-একটা বাড়তি খরচ করতে হয়। এমন কিছু দামও নয়। সঙ্গে টাকা না থাকলে আমি চালিয়ে দিচ্ছি। যখন সুবিধে হবে দিও।

    –বৌ-এর শাড়ি কেনা আমার কাজ নয়, ওটা বাবার ডিপার্টমেন্ট। তাছাড়া এরকম দামী শাড়ি সে কখনও পরে না।

    —দাও না বলেই পরে না। একদিন দিয়ে দ্যাখ, কত খুশী হবে।

    ততক্ষণে বিল এসে গেছে এবং পুরো টাকাটা মিটিয়ে দিয়ে সে উঠে দাঁড়িয়েছে। আমি বিরক্তির সুরে বললাম, কী যে কর তার ঠিক নেই। কথা নেই বার্তা নেই, হুট্ করে একটা শাড়ি নিয়ে গিয়ে উঠবো কী বলে? পূজোটুজোর সময় হলেও না হয়—

    —বৌকে প্রেজেন্ট্ দেবার আবার সময়-অসময় আছে নাকি? নাও!

    কাগজের বাক্সটা জোর করে আমার হাতে গুঁজে দিল এবং সঙ্গে সঙ্গে অত্যন্ত ব্যস্ত হয়ে উঠল—চল চল, তোমাকে নামিয়ে দিয়ে জুয়েলারীর দোকানটাও একবার ঘুরে যেতে হবে।

    বাক্সটা লুকিয়ে নিয়ে বাড়ি ঢুকলাম এবং লুকিয়ে রেখে দিলাম। তখন বাবা বাড়ি ছিলেন, মন্দাও রান্না-বান্না নিয়ে ব্যস্ত। রাত্রে যখন শুতে এল, কাপড়খানা বের করে ওর হাতে দিয়ে বললাম, দ্যাখ তো কেমন হল?

    এখানে একটা গোপন কথা স্বীকার করছি, যদিও জানি, হয়তো বিশ্বাস করতে দ্বিধা করবেন। কিন্তু সত্য বলছি, শাড়িটা দেবার পর মন্দার মুখে খুশির ঝলক না হলেও অন্তত একটা আভাস দেখতে পাব, এইরকম একটু আশা মনের মধ্যে ছিল। কিন্তু তার বদলে দেখলাম জিজ্ঞাসা। পরে ভেবে দেখলাম, সেইটাই স্বাভাবিক। বস্ত্র নামক বস্তুটিতে খাদ্যের মতো নিতান্ত দৈহিক প্রয়োজন হিসাবেই সে দেখে এসেছে। সেটা যে কখনও ‘উপহার’-এর মতো অনাবশ্যক রূপ নিতে পারে, সে অভিজ্ঞতা তার ছিল না। কাজেই তার মুখ থেকে যে কথাটি বেরিয়ে এল, সেটা একটি সরল প্রশ্ন—’এটা কার?’

    —কার আবার, তোমার।

    —’আমার!’ এটা নিছক বিস্ময়। ‘আমার তো শাড়ি রয়েছে!

    —থাকলই বা, এটা তোলা হিসেবে রইল। কোথাও যেতে আসতে পরবে।

    —বাবা জানেন?

    আমার পৌরুষে কিঞ্চিৎ আঘাত লাগল, যদিও লাগা উচিত নয়। উষ্মার সুরে বললাম, সব কিছুই যে বাবাকে জানাতে হবে, তার কি মানে আছে?

    —উনি শুনলে রাগ করবেন।

    কথাটা মিথ্যা নয়। তাই আমার মুখে তৎক্ষণাৎ কোনো উত্তর যোগাল না। মন্দা মুহূর্তকাল কি ভেবে নিয়ে বললে, দোকানে ফেরত দিতে গেলে নেবে না?

    আমি কিছু বলবার আগেই হঠাৎ যেন সব সমস্যার সহজ সমাধান হয়ে গেছে, এমনি ভাবে বলে উঠল, ভালই হয়েছে, ৭ই বীণার বিয়ে, আজই সকালে চিঠি এসে গেছে। একটা শাড়ি তো দিতে হত, এটা দিলেই হবে।

    বলে বেশ “খুশি” হয়েই মন্দা কাপড়খানা বাক্সে ভরে আলমারিতে তুলে রাখল। এই “খুশিই” কি আমি দেখতে চেয়েছিলাম?

    বীণা আমার পিসীমার মেয়ে। কাপড় দেখে বাবা যথারীতি মন্দার উপরই এক হাত নিতে ছাড়লেন না, যেন সে-ই আমাকে দিয়ে এমন একটা দামী শাড়ি আনিয়েছে। মেয়েমানুষকে তো রোজগারের ধান্দায় বেরোতে হয় না, পয়সার দাম বুঝবে কোত্থেকে— ইত্যাদি মন্তব্য তার মতো আমিও নীরবে গ্রহণ করলাম। বললাম না যে, এর ভিতরে ওর কোনো হাত নেই। কেন বলতে যাব? আপনি হয়তো বলবেন, মন্দার এই স্বার্থত্যাগের জন্যে তার উপর আমার কৃতজ্ঞ হওয়া উচিত ছিল, অন্তত কিছুটা সহানূভূতি সে দাবি করতে পারত। কিন্তু তার এই প্রত্যাখ্যান তাকে আমার কাছে বড় করা দূরে থাক, আরও ছোট করে দিল। ‘প্রত্যাখ্যান’ কথাটা বোধহয় ঠিক হল না। তার মধ্যে একটা জোর থাকে; যা ওর চরিত্রে একেবারেই ছিল না। একে বলা যেতে পারে গ্রহণ করার অক্ষমতা। মন্দাকে যদি আমি ভালোভাবে না জানতাম, হয়তো তার উপরে রাগ হত, এই ভেবে যে সে আমার স্বামিত্বের অধিকারকে অগ্রাহ্য করছে, আমাদের ভিতরকার যে-সম্পর্কটা— প্রভু ও দাসীর সম্পর্ক—সেই বিয়ের রাত থেকে মেনে আসছিল, তাকে যেন অস্বীকার করছে। কিন্তু মন্দাকিনীকে আমার চিনতে বাকী নেই, একথা তার সম্বন্ধে ভাবাই যায় না। এটা আর কিছু নয়, স্ত্রী হিসেবে তার নিছক অযোগ্যতা। কে জানে, রমণীমোহনের মাথার ভূতটা হয়তো কোনো দুর্বল মুহূর্তে আমার মাথায় চেপে থাকবে। মনে মনে তার বৌ-এর পাশে আমার বৌকে কখন বসিয়ে ফেলেছিলাম। ধাক্কা খেয়ে ভুল ভাঙল। হয়তো ঐ কল্পিত তুলনার ফলেই ও আমার কাছে আরও খেলো হয়ে গেল। স্ত্রীকে শ্রদ্ধা বা প্রীতির চোখে আমি কোনোদিন দেখিনি, এই ঘটনার পর থেকে তাকে রীতিমত ঘৃণা করতে শুরু করলাম।

    আপনার অনুচ্চারিত বিশেষণটা আমি শুনতে পাচ্ছি, বলছেন লোকটা কি পাষণ্ড! কি করবো বলুন? আমি যা তাই, আপনি কী ভাববেন তাই ভেবে মনের আসল রূপটা চাপা দিতে চাই না। তাহলে এই চিঠি লেখার কী প্রয়োজন ছিল?

    তবে আপনার তূণে যে-সব কড়া কড়া বিশেষণ আছে, সবগুলো যেন এখনই-নিঃশেষ করে বসবেন না। তাদের আসল প্রয়োজন দেখা দেবে শেষ অঙ্কে। অনাবশ্যক ভূমিকা না বাড়িয়ে এবার সেই দিকেই আপনাকে নিয়ে যাচ্ছি।

    আমার এবং আমাদের সংসারের প্রয়োজন মেটাতে গিয়ে মন্দাকিনী কোথাও কোনো ত্রুটি রাখে নি। ফাঁক ছিল শুধু এক জায়গায়। আমাদের একটি বংশধর সে দিতে পারে নি। বন্ধ্যা হলে হয়তো বা মার্জনা পেতে পারত, কিন্তু তার অপরাধ তার চেয়েও গুরুতর। সন্তান সে ধারণ করেছিল, জীবিতাবস্থায় পৃথিবীতে আনতে পারে নি। মাস পূর্ণ হবার আগে কি সব জটিলতা দেখা দেয়, যার ফলে হাসপাতালে না পাঠিয়ে উপায় ছিল না। ডাক্তারেরা এসব ক্ষেত্রে যা করে থাকেন তাই করলেন, অর্থাৎ ওঁদের ভাষায়—ফলের আশা ছেড়ে দিয়ে গাছের দিকেই পুরো নজর দিলেন, অনেক ধাক্কা ও ধকল খেয়ে ‘গাছ’ শেষ পর্যন্ত রইল বটে কিন্তু জানা গেল, সে চিরদিনের তরে নিষ্ফলা হয়ে গেছে।

    মোটা টাকা বেরিয়ে যাওয়ায় বাবার মেজাজ আগে থেকেই তেতে ছিল, তার উপর ডাক্তার এসে যখন এই শুভ সংবাদটি শুনিয়ে গেল, সঙ্গে সঙ্গে আগুন হয়ে উঠলেন। আমার উপর হুকুম হল, ‘আবার বিয়ে কর’। আমার বিশেষ আপত্তি ছিল না। মন্দাকে দিয়ে সত্যিই আর কাজ চলছিল না। কিন্তু রমনীমোহন অজান্তে কখন আমার মনে ভয় ঢুকিয়ে দিয়েছে। তার ঘরে যে চীজটি আছে, সেই রকম কিংবা তার কাছাকাছি কেউ এসে যদি ঘাড়ে চাপে, তখন কি করব। বাবা এদিকে ক্রমাগত চাপ দিয়ে যেতে লাগলেন। বৌ তাঁকে একটি পৌত্র-মুখ-দর্শনে বঞ্চিত করেছে, এইটাই তাঁর একামাত্র কারণ নয়, সংসারের চাকাগুলোকেও সে আগের মতো স্বচ্ছন্দ গতিতে চালিয়ে নিয়ে যেতে পারছে না, তাঁর সেবা-যত্ন-বিরামের ব্যবস্থায় মাঝে মাঝে ত্রুটি দেখা দিচ্ছে এবং সে-সব পূরণ করতে একটি বাড়তি ঝি-এর প্রয়োজন হয়েছে।

    যাই হোক, বেশি দিন আর তাঁকে এই অসুবিধাগুলো ভোগ করতে হল না। ইদানীং যাকে তিনি একেবারেই সহ্য করতে পারছিলেন না, সেই পুত্রবধূর কোলে মাথা রেখেই হঠাৎ একদিন শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন।

    গোটা ব্যবসাটা আমার হাতে এসে পড়ল। সেই দিকেই বেশি নজর দিলাম। মন্দা ফালতু ঝিকে ছাড়িয়ে দিয়ে গোটা সংসারের ভার আবার নিজের হাতে তুলে নিল। আমার চিরাচরিত অভ্যাস এবং প্রয়োজনগুলো কোথাও বিশেষ বাধা পেল না। সে বিষয়ে তার দৈহিক অক্ষমতা যতই থাক, অতিরিক্ত উৎসাহ দিয়ে তাকে ঢেকে রাখবার চেষ্টা করছে, সেটুকু বুঝতে কোনো অসুবিধা ছিল না। সেটা লক্ষ্য করে মাঝে মাঝে বিরক্ত হয়ে উঠতাম।

    —এতদিন হাসপাতালে কাটিয়ে এলে, ডাক্তারে ও ওষুধে এক ঝুড়ি টাকা বেরিয়ে গেল, এদিকে চেহারায় তো তার কোনো লক্ষণ দেখতে পাচ্ছি না। কী হয়েছে, খুলে বলবে তো?

    —হবে আবার কী? মুখে একটা মৃদু হাসি টেনে আনবার চেষ্টা করত মন্দা। তাতে তাকে আরও কুৎসিত দেখাতো, আমি তো ভালোই আছি।

    —তবে শরীর সারছে না কেন?

    —আর কত সারবে? এর চেয়ে মোটা তো আমি কোনো কালেই ছিলাম না।….বলে কোনো একটা কাজের অছিলা করে তখনই আমার সামনে থেকে সরে যেত।

    .

    মন্দার এক ভগ্নীপতি থাকতেন পশ্চিমের কোনো স্বাস্থ্যকর শহরে। নামটা আপনার পক্ষে নিষ্প্রয়োজন, সুতরাং উহ্য রইল। কোলকাতায় বড় একটা আসতেন না। একবার কী কাজে আসতে হল। যাবার আগে আমাদের সঙ্গে দেখা করতে এলেন। শ্যালিকা এগিয়ে গিয়ে প্রণাম করতেই খানিকক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইলেন। মন্দা হাসিমুখে বলল, চিনতে পারছেন না?

    –পেরেছি, তবে অতি কষ্টে। এ কী চেহারা হয়েছে তোমার?

    আমি বাড়িতেই ছিলাম। শ্যালিকার সম্বন্ধে তাঁর উদ্বিগ্ন প্রশ্নের উত্তরে গত কয়েক মাসের একটা মোটামুটি ইতিহাস দিলাম। বলা বাহুল্য, এ বিষয়ে আমাদের তরফ থেকে চিকিৎসাদির যথাসাধ্য ব্যবস্থার কোনো ত্রুটি হয় নি এবং তা সত্ত্বেও মন্দার স্বাস্থ্যের বিশেষ উন্নতি দেখা যাচ্ছে না—এই কথাটাই বোঝাবার চেষ্টা করলাম। আমার ভায়রাভাই বললেন, তার মানে একটা চেঞ্জ দরকার। তাহলে এক কাজ করা যাক, আমি ওকে সঙ্গে করে নিয়ে যাচ্ছি। জল-হাওয়ার দিক দিয়ে জায়গাটা খুব ভালো। মাসখানেক থাকলেই সেরে উঠবে। না হয় আরও কিছুদিন কাটিয়ে আসবে। অনেকদিন দেখাশুনো নেই, ওর দিদিও খুব খুশী হবে। তাই করি, কী বলো?

    আমি বললাম, বেশ তো, আপনি নিয়ে যাবেন, তাতে আর আমার বলবার কি আছে? সেই সময়ে মন্দা এল চা এবং খাবার নিয়ে। তিনি খুশিমুখে তাঁর প্রস্তাব এবং আমার সম্মতি তাকে জানিয়ে দিয়ে বললেন, কাল সন্ধা সাতটায় গাড়ি। নানা জায়গায় ঘোরাঘুরি সেরে আমি সাড়ে পাঁচটার আগে আসতে পারবো না, তুমি একেবারে তৈরী হয়ে থাকবে কিন্তু— আপনি একটু বসুন, আমি চুল বেঁধে আসি, তা বললে চলবে না। বাঁধা-ছাদা সব আগেই সেরে রাখবে।

    মন্দা চুপ করে রইল এবং ভগ্নীপতি চলে যেতেই বলল, কাল যখন আসবেন তুমি ওঁকে বুঝিয়ে বলো, আমার এখন যাওয়া হবে না।

    —কেন?

    কাপডিগুলো গোছাতে গোছাতে বলল, সংসারে আর কোনো লোক নেই, তোমাকে দেখবে কে? তাছাড়া

    ‘তাছাড়া’র ফিরিস্তি শোনবার আগেই শ্লেষের সুরে ঝাঁজিয়ে উঠলাম, এই শরীর নিয়ে যা দেখা দেখছ, সেটা কিছুদিন বন্ধ রাখলে কোনো ক্ষতি হবে না। তার চেয়ে বরং নিজেকে দেখবার চেষ্টা করো। এই পোড়া-কাঠের ওপর যদি একটু মাংস লাগাতে পার, তাহলেই আমি কৃতার্থ হবো।

    এর পরেও বোধহয় সে এখানকার ব্যবস্থার কথা তুলত। সব রকম অপমান এবং রূঢ় ব্যবহার সহ্য করবার এক অদ্ভুত শক্তি ছিল তার। ‘শক্তি’ না বলে তার অভাব বলাই বোধহয় ঠিক। এক ধরনের অসাড়তা। যাই হোক, তখনকার মতো আর কিছু বলবার সুযোগ আর তাকে দিলাম না, সশব্দে চেয়ারটা পেছনে ঠেলে দিয়ে উঠে পড়লাম।

    হাসপাতাল থেকে ফিরবার কিছুদিন পরে যে ঠাকুরকে সে ছাড়িয়ে দিয়েছিল, তাকেই কোত্থেকে খুঁজেপেতে ডেকে এনে নানারকম উপদেশ দিয়ে পরদিন সন্ধ্যার মুখে মন্দাকিনী এই প্রথম আমাকে ছেড়ে দূরে চলে গেল। যাবার আগে যথারীতি প্রণাম, সাবধানে থাকবার এবং অসুবিধা বোধ করলেই ফিরিয়ে আনবার অনুরোধ ইত্যাদি কোনো পর্বই বাদ যায় নি। চোখের জলও দেখেছিলাম। কিন্তু কিছুই আমার মনে এতটুকু স্নেহ বা করুণা জাগাতে পারে নি। নিজের চোখ দুটো অবশ্য দেখতে পাই নি, তবু নিশ্চয় করে বলতে পারি, তার মধ্যে তাচ্ছিল্য এবং অবজ্ঞা ছাড়া আর কিছু ছিল না।

    আজ ভাবছি, সেদিন তার চোখে জলের বদলে এক কণা আগুন যদি দেখতাম, হয়তো কিঞ্চিৎ শ্রদ্ধা সে আমার কাছে পেলেও পেতে পারত, অন্তত এতটা হেয় এবং তুচ্ছ হয়ে যেত না। আপনি কী বলেন?

    য়া আশঙ্কা করেছিলাম তাই, মাসখানেক যেতে না যেতেই মন্দার চিঠি পেলাম, সে এরই মধ্যে অনেকখানি সেরে উঠেছে, আর ওখানে থাকবার দরকার নেই, সুতরাং যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আমি যেন তাকে বাড়ি আনবার ব্যবস্থা করি।

    শ্যালিকার যে চিঠি পেলাম, তার বয়ান ঠিক উল্টো। মন্দার শরীরে কোনো উন্নতি হয় নি। বেশ কিছুদিন ওখানে থাকা দরকার। কিন্তু আমাকে এখানে একা ফেলে সে কিছুতেই নিশ্চিন্ত হতে পারছে না। সুতরাং আমি যেন এদিকের কাজকর্মের কোনো একটা ব্যবস্থা করে অন্তত মাসখানেকের জন্যে ওখানে গিয়ে থাকি। তাহলে আমরা সকলেই খুব আনন্দিত হবো। অনেকদিন তোমাকে দেখি নি, তোমার দাদা তবু কালেভদ্রে কলকাতায় যেতে পারেন, আমার কোথাও নড়িবার উপায় নাই। ইত্যাদি।

    আমাদের কারবারের কথা আগেই বলেছি। তার মধ্যে কারচুপির অংশটাই বড়। কালক্রমে এইসব লাইনে আরও কিছু লোক এসে জুটল। শুধু প্রতিযোগীর সংখ্যাই যে বাড়ল তাই নয়, তার মধ্যে কয়েকজন রীতিমতো পেছনে লাগল। বাবা পাকা লোক, এদের সঙ্গে খানিকটা এঁটে উঠতে পারতেন। তিনি মারা যাবার সঙ্গে সঙ্গে আমার অবস্থা কাহিল হয়ে উঠল। ক্রমশ নানা ঝামেলায় জড়িয়ে পড়লাম। শ্যালিকার নিমন্ত্রণ যখন এল, তখন আমারও এক পা নড়বার উপায় নেই। মন্দার স্বাস্থ্যের কোনো উন্নতি হচ্ছে না এ খবর পেয়ে দুশ্চিন্তার বদলে বিরক্তিটাই বেড়ে গেল। এটা যেন তার ভালো না হবার পণ, এখানকার শত্রুদের মতো এই দুঃসময়ে সেও আমার পেছনে লেগেছে। তার উপরে তার ঐ প্যানপেনে ‘পতি-বিরহ’ অসহ্য আদিখ্যেতা বলে মনে হল। শ্যালিকার চিঠির উত্তরে অবশ্য তার ভগিনীর জন্যে যথারীতি উদ্বেগ প্রকাশের ত্রুটি হল না। সেই সঙ্গে তাঁর আমন্ত্রণ গ্রহণে অক্ষমতার জন্য ক্ষমা চাইলাম। আলাদা চিঠিতে মন্দাকে বেশ কড়া করে লিখলাম, রীতিমত সুস্থ হবার আগে ফিরে আসবার কোনো কথাই উঠতে পারে না, এবং আমার জন্যে তার দুশ্চিন্তার কোনো কারণ নেই।

    এর পরে রমণীমোহনের স্ত্রী বা তার দোসর কোনো মেয়ে হয়তো লিখত, না, আমি এখনই যেতে চাই, কিংবা ঐ ধরনের একটা কিছু। কিন্তু আমার স্ত্রী একেবারে অন্য জাতের। সে কোনো কথাই লিখল না, অর্থাৎ স্বামীর ইচ্ছাকেই নিঃশব্দে মেনে নিল!

    যদি বলি, মেনে না নিলেই আমি মনে মনে খুশি হতাম এবং স্পষ্ট বা জোরালো হলেও আমার চিঠির একটা ক্ষীণ প্রতিবাদ আশা করে বসে ছিলাম—আপনি বিশ্বাস করবেন কি, করবেন না। কিন্তু এটুকু জেনে রাখুন, সে আশা যখন পূরণ হল না, আমার মনটা তার উপরে শুধু তিক্ত নয়, বিষাক্ত হয়ে উঠল।

    মন্দার আর কোনো চিঠি আমি পাই নি, তার দিদিরও না। পরের চিঠিটা এল তার ভগ্নীপতির কাছ থেকে। বেশ কিছুদিন, তা প্রায় মাস দুই পরে। প্রথমে আমার কুশল সম্বন্ধে আশা প্রকাশ করে লিখেছেন, “বড়ই দুঃখের বিষয়, শ্রীমতী মন্দাকিনীর শরীর দিন দিন খারাপের দিকে যাইতেছে। বর্তমানে সে প্রায় শয্যাগত। এখানকার সর্বাপেক্ষা বড় ডাক্তারকে দেখাইয়াছি। তাঁহার মতে শ্রীমতীকে অবিলম্বে কলিকাতায় লইয়া গিয়া কোনো বিশেষজ্ঞের চিকিৎসাধীনে রাখা প্রয়োজন। এখানে একটি বিশেষ জরুরী কার্যে আবদ্ধ হইয়া পড়িয়াছি। শীঘ্র ছাড়া পাইবার আশা নাই, নতুবা আমিই লইয়া যাইতাম। তুমি অতি সত্বর চলিয়া আসিবে। অন্য সকলে এক প্রকার আছে। ইতি।”

    অতি সত্ত্বর না হলেও কয়েকদিনের মধ্যেই আমাকে যেতে হল। দেখলাম, “শয্যাগত” শব্দটিকে আমার ভায়রাভাই যে ‘প্রায়’ নামক বিশেষণ দিয়ে মডিফাই অর্থাৎ মোলায়েম করবার চেষ্টা করেছেন, সেটা প্রকৃত ঘটনার দিকে চেয়ে নয়, আমার দিকে চেয়ে, আমি পাছে অতিরিক্ত বিচলিত হয়ে পড়ি আশঙ্কায়।

    মন্দার অবস্থা দেখে, তার ব্যাধির ইতিহাস এবং কাশির শব্দ শুনে আমি সত্যিই ‘বিচলিত’ হয়ে পড়লাম। বলা বাহুল্য, ওঁদের বা অন্য দশজনের মনে যে কারণ জাগবে, সে কারণে নয়। একে এই “শয্যা’ থেকে টেনে তুলে দাঁড় করাতে যে বিপুল অর্থ, পরিশ্রম, শুশ্রুষা অপব্যয় হবে, সেই চিন্তাই আমাকে চঞ্চল করে তুলল। তার চেয়েও বেশী মনে হল—একে দিয়ে আমি করবো কী?

    আশা করি, আমার কথাটা আপনি বুঝতে পারছেন। আপনার গল্পের নায়কদের মতো আমার মধ্যে কোনো রোমান্স নেই বা কোনোদিন হৃদয়-চর্চার ধার ধারি না, সে কথা আগেই জানিয়েছি। আমি রমণীমোহন নই, ‘প্রেম’জ্বরে কখনও ভুগি নি। দয়া, মায়া, স্নেহ, প্রীতি এসব বড় একটা নিজেও পাই নি, অন্য কারও জন্যেও অনুভব করি না। নিছক ‘ইউটিলিটি’ বা প্রয়োজন ছাড়া ‘স্ত্রী’ নামক মানুষটিকে আর কোনো দিক থেকে দেখি নি। সেও কোনোদিন বুঝতে দেয় নি, এর বাইরে তার আর কোনো অস্তিত্ব আছে। সেই ইউটিলিটির কষ্ঠিপাথরে তার দাম অনেকদিন থেকেই কমে আসছিল। আজ যখন সেটা শূন্যে এসে ঠেকল, তখন একটি মাত্র প্রশ্নই আমার মনের মধ্যে মাথা তুলে উঠল—একে দিয়ে আমি করবো কি? আমার জীবনে তার প্রয়োজন ফুরিয়ে গেছে। সেইখানেই শেষ নয়, তারপরেও সে থাকবে—কে জানে কত বছর–আমার বা আমার সংসারের ভার নিয়ে নয়, আমার দুর্বহ ভার হয়ে। অথচ —

    ফার্স্ট ক্লাসের একটা ‘কুপে’ আমাদের জন্যে রিজার্ভ করা হল। ভাড়াটা অবশ্য আমিই দিলাম, কিন্তু ব্যবস্থাটা আমার ভায়রাভাই-এর। অনেকটা পথ, সঙ্গে ঐরকম রুগী, তার ওপর মেয়েছেলে, তৃতীয় যাত্রীর ঝঞ্ঝাট রইল না, নির্বিবাদে যাওয়া যাবে।

    স্ট্রেচার লাগল না। দিদি আর ভগ্নীপতি দুজনে দুবাহু ধরে ধীরে ধীরে প্লাটফরমটুকু পার করিয়ে গাড়িতে তুলে দিলেন। বিছানা করে ওকে শুইয়ে ঘণ্টা পড়তে নেমে গেলেন। গাড়ি যখন চলতে শুরু করেছে, আমার শালিকার অনুচ্চ কণ্ঠ থেকে শোনা গেল, দুর্গা দুর্গা’। ভায়রাভাই চেঁচিয়ে বললেন, পৌঁছেই একটা তার করে দিও।

    গরম কাল। রাত নটা। জামাটা খুলে ঝুলিয়ে দিয়ে মন্দার মাথার কাছে বসে একটা সিগারেট ধরালাম। ও চোখদুটো তুলে আমার মুখের দিয়ে চেয়ে বলল, হ্যাঁগো, এ গাড়িতে আর কেউ উঠবে না?

    —না।

    আর কিছু বলল না। লক্ষ্য করলাম, ওর মুখের উপর খুশির আভা ফুটে উঠল। কিছুক্ষণ পরে বলল, তুমি কোথায় শোবে?

    হাত দিয়ে উপরের বার্থটা দেখিয়ে দিয়ে বললাম, ঐখানে।

    —ওখানে! উঠবে কেমন করে?

    —ঐ শেকলটা ধরে উঠবো।

    —না, না, তার চেয়ে আমার বিছানাটা মেঝেতে নাবিয়ে দাও, তুমি এইখানে শোও। এই ছেলেমানুষি প্রস্তাবে অন্য কেউ হলে হয়তো হেসে ফেলত, আমি গম্ভীরভাবেই বললাম, মেঝেটা শোবার জায়গা নয়। আমি ওপরেই শোবো। তুমি ঘুমোও—আমার এখন ঘুম পাচ্ছে না।

    কয়েক মিনিট চুপ করে থেকে আবার বলল, একটু উঠে বসবো?

    —পারবে?

    —খুব পারবো। তুমি যদি এই বালিশটাকে একটু-

    বাকীটুকু আর বলল না। আমি ওর মুখের দিকে তাকালাম। নিজের জন্যে আমাকে হঠাৎ কিছু একটা ফরমাশ করে বসেছে—হলই বা সে অতি তুচ্ছ—এটা ওর পক্ষে একেবারে নতুন। সেই লজ্জাটা তখনও ওর চোখমুখে জড়ানো। আমি উঠে বালিশটা ওর পিঠের দিকে খানিকটা সরিয়ে দিলাম। আধশোয়া মতো বসে মন্দা অনেকক্ষণ আমার দিকে চেয়ে রইল। আমি একমনে সিগারেট টানতে টানতে শুনলাম, ‘এই ক’মাসে তুমি অনেক রোগা হয়ে গেছ। খুব কাজ পড়েছে বুঝি?’

    আমি জবাব দিলাম না। ও তার অপেক্ষাও করল না। অনেকটা যেন নিজের মনে বলল, তাছাড়া দেখাশুনো কে করে, খাওয়া দাওয়া—

    বাধা দিয়ে বললাম, সেসব পরে ভাবলেও চলবে, এখন নিজের কথা ভাবো।

    —আমি এবার দু’দিনেই সেরে উঠবো।

    আমার মুখে বোধহয় অবিশ্বাসের কোনো চিহ্ন ফুটে উঠে থাকবে। হাসিমুখে তারই যেন প্রতিবাদ জানাল মন্দা— সত্যি দেখো তুমি!’

    এই জোর, এই তরল সুর—সবটাই আমার কাছে নতুন। যে মন্দাকে এতদিন দেখে এলাম, যাকে নিয়ে এতগুলো বছর ঘর করলাম, তার স্বভাবের সঙ্গে এটা যেন ঠিক খাপ খাচ্ছিল না।

    —’কী ভাবছ?’

    —’কিছু না।’ জবাবটা নিজের কানেই বেশ রূঢ় লাগল। ‘রাত দশটা বেজে গেছে, এবার ঘুমিয়ে পড়’ বলে উঠে পড়লাম।

    মন্দা আর কোনো কথা না বলে বালিশটা নিজেই ঠিক করে নিয়ে শুয়ে পড়ল।

    রাত বেড়ে চলল। আমার চোখে ঘুম নেই। গাড়ির সব জানালাগুলো খোলা, তার উপরে পুরোদমে পাখা চলছে, তবু মনে হচ্ছে, কী দুঃসহ গরম! দরজা খুলে তার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। চাঁদ নেই, কিন্তু আকাশ ভরা তারা। খোলা মাঠের ভিতর দিয়ে ট্রেন ছুটে চলেছে। বিহারের রুক্ষকঠিন, গাছপালাহীন, অসমান পাথুরে মাঠ। পাতলা অন্ধকারে ঢাকা। তারই মধ্যে চোখ দুটোকে ডুবিয়ে দিতে চেষ্টা করলাম। বৃথা চেষ্টা। তারা বার বার গাড়ির ভিতরে ফিরে আসতে লাগল। মন্দা শুয়ে আছে দেয়ালের দিকে পেছন ফিরে। আর সব আলো নেভোনো। শুধু একটা কম পাওয়ারের নীল আলো জ্বেলে রেখেছি। ওর কাঁধ পর্যন্ত চাদরে ঢাকা। মুখের একটা দিক আর নীচে নীচে গলাটা দেখা যাচ্ছে। অস্পষ্ট আলোয় শুকনো ভাঙা গালের ঠেলে ওঠা হাড়গুলো আরও ঠেলে উঠেছে, চোখটা যে কোন্ কোটরে তলিয়ে গেছে, দেখা যায় না। কণ্ঠার হাড় ঠিকরে বেরিয়ে এসেছে। মানুষের মুখ যে এত কুৎসিত, এর আগে কোনোদিন দেখি নি। শুধু কুৎসিত নয়, কী বীভৎস! একটা জীবন্ত কঙ্কাল! কী মূল্য এই জীবনের? কী সার্থকতা এই বেঁচে থাকার? ভাবতে গিয়ে সমস্ত মনটা গভীর নৈরাশ্যে ভরে উঠল! সেই একই প্রশ্ন মনে এল—এই জীবন্ত অভিশাপ নিয়ে আমি করবো কী?

    রেলগাড়ির চলন্ত চাকায় তারই প্রতিধ্বনি বেজে চলল—আমি করবো কী—আমি করবো কী?

    এই কিছুক্ষণ আগে সে আমাকে ভরসা দিয়েছে (ভরসাই বটে!)—’আমি দুদিনেই সেরে উঠবো।’ আমি জানি, সে কোনোদিনই সেরে উঠবে না। কিন্তু সেই মিথ্যা আশা, বেঁচে থাকবার সেই প্রবল আকাঙ্ক্ষা ওকে সহজে মরতে দেবে না, মৃত্যু-কবলিত প্রাণটাকে কোনো রকমে জীইয়ে রেখে দেবে। কে জানে সে কত কাল, কত বছর!

    বিধাতার কি নিষ্ঠুর পরিহাস! আমি যখন প্রায় সারারাত ধরে এমনি করে জ্বলেপুড়ে মরছি, যাকে ঘিরে সেই জ্বালা, সে তখন নির্বিবাদে ঘুমোচ্ছে। মাঝে মাঝে কোনো ছোট স্টেশনে গাড়ি থামতেই তার সেই নিশ্চিন্ত নিঃশ্বাস আমাকে পাগল করে তুলছিল। ভাবছিলাম প্রতিদিন প্রতি মুহূর্তে কত আকস্মিক ঘটনা ঘটছে, এই নিঃশ্বাসের গতিটা হঠাৎ থেমে যেতে পারে না? নিজে থেকে না থামলেও—

    কাশির শব্দে চমকে উঠলাম। একটানা প্রবল কাশি। তার দমকে গলার শিরাগুলো ফুলে উঠেছে, চোখ দুটো যেন ঠিকরে পড়ছে। এমনি করেও তো দম বন্ধ হয়ে যেতে পারে! কিন্তু গেল না। কাশির বেগটা পড়ে যেতেই গলায় কেমন একটা বোবা আওয়াজ তুলে হাত দিয়ে মুখের দিকে ইঙ্গিত করল। বুঝলাম, যেটা উঠে এসেছে, কোথাও ‘ফেলতে হবে। সঙ্গে একটা ঝুড়ি ছিল, তার মধ্যে পিকদানি বা ঐরকম কিছু আছে কিনা খুঁজে দেখছিলাম। মন্দা ইশারায় বাথরুমটা দেখিয়ে উঠে বসবার চেষ্টা করল। ধরে তুলে ধীরে ধীরে সেইখানে নিয়ে গেলাম। বেসিনের দিকে নজর পড়তেই গা পাক দিয়ে উঠল গয়েরের সঙ্গে জড়ানো রক্ত। অজ্ঞাতসারে হাতটা ওর বাহু থেকে সরে এল। দু-পা পিছিয়ে এলাম। সহসা মাথার ভিতরটা কেমন যেন ওলটপালট হয়ে গেল—ঘৃণায়, আতঙ্কে, আক্রোশে না কিসের তাড়নায় আমি বলতে পারবো না। গাড়ির গতিটা একটু কমে এল। তারপরেই তলা থেকে ছুটে এল একটা জোরালো ঘর্ঘর ঠঠুন্ শব্দ। হঠাৎ চমকে উঠলাম—কিসের শব্দ? বুঝলাম ভয়ের কিছু নয়, গাড়িটা কোনো পুলের উপর দিয়ে চলেছে। তবু সেই বিপুল শব্দের সঙ্গে তাল রেখে কে যেন আমার মাথার ভিতরে অবিরাম হাতুড়ির ঘা মারতে লাগল। মন্দা এসে দাঁড়াল বাথরুমের বাইরে এবং সঙ্গে সঙ্গে আমার ডানদিকের দরজাটা দড়াম্ করে খুলে গেল। হাতলটা বন্ধ করতে ভুলে গিয়েছিলাম। খোলা নদীর দমকা হাওয়ায়, কিংবা ব্রীজের ঝাঁকুনি লেগে হঠাৎ খুলে গেছে।

    যে কারণেই হোক, সেদিন সেই মুহূর্তে গাড়ির পাল্লার সঙ্গে আমার গোপন মনের কোনো অজ্ঞাত কুঠরির অদৃশ্য পাল্লাটাও সহসা খুলে গিয়ে থাকবে। হয়তো তারই আলোয় দেখেছিলাম, আমার ঠিক বুকের কাছে যে এসে দাঁড়াল, সে আমার স্ত্রী নয়, একটা ভয়াবহ বিষাক্ত ভাইপার। তার উদ্যত ছোবল থেকে নিজেকে যেমন করে হোক বাঁচাতে হবে–এই একটি মাত্র চিন্তাই সমস্ত মনটাকে আচ্ছন্ন করে ফেলেছিল। আর কোনো দিকে না চেয়ে দু’হাতে তার কাঁধ দুটো চেপে ধরে প্রচণ্ড বেগে খোলা দরজা দিয়ে ঠেলে ফেলে দিলাম।

    গভীর রাত্রির বুক চিরে একটা ভাঙা গলার তীক্ষ্ণ আর্তনাদ আমার কানে এসে লাগল।

    পাঁঠা-বলি দেখেছেন? গলাটা হাড়িকাঠের মধ্যে পুরে দিলে তার ভিতর থেকে যে অন্তিম ডাক ঢাকের শব্দ ছাপিয়ে বেরিয়ে আসে, তেমনি একটা আওয়াজ। একবার উঠেই গাড়ির শব্দে মিলিয়ে গেল।

    চলন্ত গাড়ির নিচে ও দু-পাশ জুড়ে তখনও সেই তুমুল ঘর্ঘর ঝন্‌ঝন্ বিপুল বেগে বেজে চলেছে, বলির পরেও যেমন চলতে থাকে ঢাক ঢোল কাঁসরের উন্মত্ত গর্জন। আমার মস্তিষ্কের রক্তপ্রবাহে শুদু তারই প্রতিধ্বনি শুনতে পাচ্ছি। সেই উত্তপ্ত উদ্দাম উত্তেজনা। আর কিছুই নেই। বিশ্ব-সংসার আমার কাছে লুপ্ত হয়ে গেছে।

    তার পর এক সময়ে সেই পাগল-করা দুর্দান্ত শব্দটা হঠাৎ থেমে গেল। নদীগর্ভের বিপদ-ঝঞ্ঝা পার হয়ে গাড়িটা যেন আবার নিরাপদ মাটির পৃথিবীতে ফিরে এল। তখনও সেই দরজার মুখেই দাঁড়িয়ে আছি। সামনে যতদূর চোখ যায়, বিস্তৃত খোলা মাঠ। সেই দিকে চেয়ে মনে হল, ওটা যেন আমারই অনাগত জীবনের প্রতিচ্ছবি। আমার সামনেও অমনি অবাধ উন্মুক্ত মুক্তি।

    গাড়ির গতি মন্থর হয়ে গেল। দেখলাম, সেই একটানা মাঠ আর নেই, এখানে ওখানে দু-চারখানা বাড়িঘর, গাছপালা, রাস্তাঘাট, চলন্ত আলো। ক্রমশ আরও বাড়ি, আরও আলো, মানুষের কোলাহল। স্বপ্নের জাল ছিঁড়ে হঠাৎ যেন একটা পরিপূর্ণ জীবজগতের মধ্যে জেগে উঠলাম।

    একটা কোন্ স্টেশনে এসে গাড়ি থামল। আমি যে দরজায় দাঁড়িয়েছিলাম তার উল্টো দিকে প্লাটফরম্। এদিকে দৃষ্টি ফেরাতেই চোখে পড়ল মন্দার শূন্য শয্যা। মুহূর্তমধ্যে কে যেন একটা ভীষণ ঝাঁকানি দিয়ে আমাকে একেবারে রূঢ় বাস্তব নগ্ন সত্যের মুখোমুখি এনে দাঁড় করিয়ে দিল। অগোছালো এলোমেলো বিছানাটার দিকে চেয়ে ভয়ে সমস্ত শরীরে কাঁটা দিয়ে উঠল। তবু সেখান থেকে চোখ ফেরাতে পারলাম না।

    এর পরের কয়েকটা মিনিট ঠিক কী ভাবে কেটেছিল, আজ আর মনে করতে পারছি না। মনের পরদায় যে-সব চিন্তার রেখা ছায়াছবির চেয়েও অনেক দ্রুত গতি নিয়ে ফুটেছিল এবং মিলিয়ে গিয়েছিল, এতদিন পরে সেগুলোকে গুছিয়ে তোলা অসম্ভব। তার কোনো প্রয়োজনও নেই। যে-জাতীয় খুনী মানুষের মনস্তত্ত্ব আপনাকে আকর্ষণ করে থাকে, আমি তাদের থেকে আলাদা। এক্ষেত্রে আপনার কৌতূহল না থাকাই স্বাভাবিক। সুতরাং মানসিক বিশ্লেষণে অযথা সময় নষ্ট না করে ঘটনার দিকে যাওয়া যাক।

    প্রথমটা যে খুব বিচলিত হয়ে পড়েছিলাম, সেকথা লুকোতে চাই না। একবার মনে হয়েছিল পালাই। নামতে গিয়ে থেমে গেলাম। কোথায় পালাবো? কদ্দিন থাকবো পালিয়ে? তার পর? গাড়ির কামরা থেকে একটি অসুস্থ স্ত্রীলোকের এই আকস্মিক অন্তর্ধান বেশী দিন চাপা থাকবে না! গ্রীষ্মের পাহাড়ী নদীর শুকনো চড়ায় মৃতদেহটাই হয়তো তার সন্ধান দেবে। সেই সুত্র ধরে পুলিস যখন তার একমাত্র সহযাত্রীকে খুঁজে বের করবে, তখন তার এই নীরব পালিয়ে যাওয়াই তার বিরুদ্ধে সব চেয়ে সরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়াবে। দরজার হাতলটা খুলতে গিয়েও হাত সরিয়ে নিলাম। গাড়ি ছেড়ে দিল। হঠাৎ নজর পড়ল উপরের বার্থে। হোলড-অন-এর বাঁধন থেকে বিছানাটা খুলে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল—আমার ভায়রাভাই-এর চাকরটা বোধহয় করেছিল কাজটা—কিন্তু সন্ধ্যা থেকে সেটা স্পর্শ করা হয় নি। এতক্ষণে তার প্রয়োজন দেখা দিল। শুধু স্পর্শ নয়, বেশ করে ঘেঁটে চাদরটাকে এখানে ওখানে কুঁচকে দিলাম। তারপর সোজা গিয়ে শেকলটা টেনে ধরলাম।

    গার্ড এসে জানতে চাইলেন, কী ব্যাপার?

    —আমার স্ত্রীকে পাওয়া যাচ্ছে না!

    —কোথায় ছিলেন তিনি?

    —এইখানে ঘুমোচ্ছিলেন।

    —আর আপনি?

    —ওপরের বার্থ-এ।

    —কখন থেকে পাওয়া যাচ্ছে না?

    ভুল করলাম। ব্রীজটা বোধহয় তখনও আমার মধ্যে ঘুরছিল, বললাম, ব্রীজের পর থেকে।

    গার্ড কপাল কোঁচকালেন—”ব্রীজের পর থেকে! এতক্ষণ শেকল টানেন নি কেন?”

    এ প্রশ্নের উত্তর আমার মাথায় যোগায় নি। বেশ কিছুদিন পরে যুগিয়েছিল আমার উকিলের মাথায়। আসামীর এই সন্দেহজনক আচরণ সরকারপক্ষের হাতে একটি ধারালো অস্ত্র হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তিনি এক কথায় তাকে ভোঁতা করে দিয়েছিলেন। সেসন্স জজের সামনে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, ইয়েস, ইওর অনার, ব্রীজ ছাড়বার পরেই আসামী দেখতে পেয়েছিল, তার স্ত্রী বিছানায় নেই। ওপর থেকে ঝুঁকে পড়ে দেখেছিল। রুগ্না স্ত্রীর সম্বন্ধে তার মনে গভীর উদ্বেগ ছিল তার ফলেই দেখা। দেখে তার পক্ষে যেটা সহজ ও স্বাভাবিক সেই কথাই ভেবেছিলেন—স্ত্রী বাথরুমে গেছেন। তারপর আবার ঘুমিয়ে পড়েছিল। মনে রাখবেন, তখন গভীর রাত। ঘুমিয়ে পড়াটা অপরাধ নয়। আমার মক্কেলের একমাত্র অপরাধ— যক্ষ্মারোগাক্রান্তা স্ত্রীর মনে যে আত্মহত্যার বীজাণু বাসা বেঁধেছে, সেটা সে কিছুমাত্র সন্দেহ করতে পারে নি। স্ত্রী যদি কাছে থাকত, হয়তো বুঝতে পারত। কিন্তু মেয়েটির দেহে এবং মনে যখন এই দুটি বীজাণুর আক্রমণ দেখা দেয়. ঘটনাচক্রে তখন সে স্বামীর কাছ থেকে দূরে গিয়ে পড়েছিল।

    আত্মহত্যার ব্যাপারটাকে প্রতিপন্ন করতে গিয়ে সুচতুর উকিলবাবু মন্দাকিনীর সমস্ত গার্হস্থ্য জীবনটাকে বিচারকের সামনে তুলে ধরেছিলেন (সে সম্পর্কে কয়েকজন প্রতিবেশীর সাক্ষ্য আগেই নিয়ে রাখা হয়েছিল)। তারপর শ্রদ্ধাপ্লুত গম্ভীর সুরে বলেছিলেন, এই মেয়েটি বয়সে নবীনা হলেও আদর্শে প্রাচীনা। বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চশিক্ষা সে পায় নি, কিন্তু হিন্দুনারীর যেটা সর্বোচ্চ শিক্ষা, তা সে সম্পূর্ণভাবে আয়ত্ত করেছিল। শুধু শিক্ষা নয়, বলব ধর্ম। স্বামীসেবা। সাক্ষ্য প্রমাণ থেকে দেখা গেছে, এই মহৎ আদর্শে সে তার জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত নিয়োগ করেছিল। স্বামীকে সে একটি সন্তান উপহার দিতে পারে নি, তারই অপরাধে স্বামীর বংশ লোপ পেতে বসেছে—এজন্যে নিজের উপর তার একটা গম্ভীর ধিক্কার ছিল। যে-সেবা ছিল তার মহান ব্রত, স্বাস্থ্য সেখানে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে, এজন্যেও তার মনোবেদনার অন্ত ছিল না। তারপর যেদিন সে জানতে পারল, স্বামীর আদেশে রোগ সারাতে এসে সে তার চেয়ে অনেক বেশী মারাত্মক, একটা সংক্রামক রোগ বয়ে নিয়ে চলেছে, তখন সে আর নিজেকে ক্ষমা করতে পারে নি। যে-জীবন তার স্বামীর সেবায় লাগল না, তাকে সে স্বেচ্ছায় এবং স্বচ্ছন্দে শেষ করে দিল।

    জজ এবং জুরি মুগ্ধ হয়ে শুনছিলেন। আমিও একটু অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিলাম। মনে পড়ছিল, মন্দার সেই শেষ কথাগুলো—”এবার আমি দু-দিনেই সেরে উঠবো… সত্যি দেখো তুমি।” সে মরতে চায় নি, অসম্ভব জেনেও বেঁচে উঠতে চেয়েছিল।

    একজন বিরুদ্ধ সাক্ষীর উক্তি জজসাহেবের মনে কিছুটা ছায়া ফেলে থাকবে। পাশের কামরার এক ভদ্রলোক। স্ত্রীলোকের গলার একটা তীক্ষ্ণ চিৎকার শুনে হঠাৎ তাঁর ঘুম ভেঙে গিয়েছিল। কিন্তু একেবারের বেশী আর শুনতে পান নি। মনে করেছিলেন ওটা হয়তো তাঁর ভ্রম।

    ‘এই একবারের বেশী না শোনাটা’কে পুলিস এবং সরকারী উকিল আমার বিরুদ্ধে কাজে লাগাবার চেষ্টা করেছিলেন। আমার উকিল জেরার ঘায়ে ভদ্রলোককে নাস্তানাবুদ করে ছাড়লেও জজের মনকে সন্দেহমুক্ত করতে পারেন নি। কিন্তু ‘সন্দেহ’কে ‘প্রমাণে’ দাঁড় করাবার মতো কোন হাতল জজসাহেব শেষ পর্যন্ত খুঁজে পেলেন না। কোনো একটা “মোটিভ”-এর জন্যে তিনি আকাশ-পাতাল হাতড়ে বেরিয়েছেন। খামকা এই লোকটা নিজের স্ত্রীকে খুন করতে যাবে কেন? মোটিভটা কী? তিনি সেই পুরনো থিওরি আঁকড়ে ধরে ছিলেন—খুন মাত্রেরই পিছনে একটি দু-অক্ষরের শব্দ থাকবে—নারী অথবা বিত্ত। হয় ইংরেজী ‘love’, নয়তো বাংলা ‘লাভ’। তার কোনোটাই যেখানে নেই সেখানে ন্যায়দণ্ড প্রয়োগ করা চলে না।

    একথা তিনি একবারও ভাবেন নি, যে মন দিয়ে মানুষ তার অনেকদিনের প্রিয় সঙ্গী এক পাটি ছেঁড়া জুতো টান মেরে ফেলে দেয়, সেই মন নিয়েই সে তার বহুব্যবহারে জীর্ণা, ব্যাধিগ্রস্তা শয্যাসঙ্গিনীকেও ট্রেন থেকে ঠেলে দিতে পারে।

    ‘মানুষে’র এই চেহারাটা হয়তো জজসাহেবের নজরে পড়ে নি, যদিও পড়া উচিত ছিল। তবু তাঁকে ক্ষমা করা যায়। আসামীকে তাঁরা দেখেন নথিপত্রের ভিতর দিয়ে। সে সংযোগ পরোক্ষ এবং সাময়িক। আপনার কয়েদীর সঙ্গে আপনার যে সুযোগ, সেটা প্রত্যক্ষ এবং দীর্ঘদিনব্যাপী তাদের প্রাত্যহিক জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত আপনি দেখতে পেয়েছেন। তবু যে এই জাতীয় একটা খুনী আপনার নজরে পড়ে নি, একথা কেমন করে বিশ্বাস করি? আমার মনে হয়, পড়েছে আপান ইচ্ছা করে এড়িয়ে গেছেন। তার কারণ যাই হোক, এ ত্রুটি ক্ষমা করা যায় না। শুধু ত্রুটি নয়, অপরাধ— আপনি সত্য গোপনের অপরাধে অপরাধী।

    চিঠির শেষে অংশটা পড়তে পড়তে শ্রীকান্তর কয়েকটি উক্তি আমার মনে পড়ল। অন্নদাদদির প্রসঙ্গে সে এক জায়গায় বলেছিল, “সংসারে পিশাচী কি নাই? নাই যদি, তবে পথে ঘাটে এত পাপের মূর্তি দেখি কাহাদের? সবাই যদি সেই ইন্দ্রর দিদি, তবে এত প্রকার দুঃখেরে স্রোত বহাইতেছে কাহারা? তবু কেমন করিয়া যেন মনে হয়, এ সকল তাদের বাহ্য আবরণ।… বন্ধুরা বলেন, ইহা আমার একটা শোচনীয় ভ্রুণ মাত্র। আমি তাহারও প্রতিবাদ করি না… শুধু বলি ইহা আমার যুক্তি নয়, আমার সংস্কার।”

    আমার বিরুদ্ধে এই পত্রলেখকের যে অভিযোগ আমিও তার প্রতিবাদ করছি না। যে রাজ্যে আমি দীর্ঘজীবন কাটিয়ে এলাম, সেখানে, ‘পিশাচে’র অভাব নেই, ‘পাপের মূর্তি’- ও কম দেখি নি। তবু মনে হয়েছে, সেইটাই সবটুকু নয়, তার অন্তরালে আরও কিছু আছে। কারও কারও বেলায় সেই ‘আরও কিছু’-টাই আমার চোখে ভাস্বর হয়ে উঠেছে। আজও কোনো নির্জন অবসরে যখন পিছন ফিরে তাকাই সেই কটা লোকই সামনে এসে দাঁড়ায়—সেই বদর মুন্সী, কাশিম ফকির, মংখিয়া জং, জ্ঞানদা, পরিমল ব্রহ্মচারী সদানন্দ। তাদের কাছে ম্লান হয়ে যায় অনাথ, কুসুম, রাজাবাহাদুর এবং এই পত্রলেখকের মতো আরও যাদের দেখেছি।

    হয়তো শ্রীকান্তের মতো আমারও এটা একটা সংস্কার। তার মধ্যে অপরাধ থাকে, সে-অপরাধ আমি অকপটে স্বীকার করছি।

    ।। সমাপ্ত।।